ইন্দিরা হতে অর্ধশতক পরে মোদীর হাত ধরে ফিরেছে জরুরি অবস্থা

এই আবহে যে নির্বাচন হবে তা যদি অবাধ হয়, তাহলে ফড়িংও পাখি, জলহস্তীও হাতি, দেবও মহানায়ক।

আগামী ৪ জুন আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষিত হবে। তার ঠিক ২১ দিন পরেই জরুরি অবস্থা ৪৯ পেরিয়ে পঞ্চাশে পা দেবে। নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ওই দিনটা কাউকে ভুলতে দেয় না। প্রতিবছরই ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, ওই ২১ মাস ভারতের ইতিহাসে অন্ধকার সময়। এবার যদি মোদী ক্ষমতায় ফিরতে পারেন, হয়ত গোটা বছর ধরেই বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হবে ইন্দিরা গান্ধী কী মারাত্মক স্বৈরতন্ত্রী ছিলেন, কংগ্রেস দেশের কত ক্ষতি করেছে ইত্যাদি। সুখের কথা, তার জন্যে আলাদা করে আয়োজন না করলেও চলবে। কারণ মনে করিয়ে দেওয়ার কাজটা ইতিমধ্যেই আরম্ভ হয়ে গেছে। ইনস্টা রিল প্রজন্মের অনেকেই জানত না কীভাবে সারা ভারতে বিরোধী দলের নেতা, কর্মীদের উপর অত্যাচার চালানো হয়েছিল, গ্রেফতার করা হয়েছিল, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল, সাংবাদিকদেরও কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। দশ বছরের মোদী রাজত্বে সেসব দেখানো হয়েছে। তবে ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী স্বকণ্ঠে নতুন কালের সূচনা ঘোষণা করার পরে তাও ঘটেছে যা জরুরি অবস্থার সময়ে ঘটেনি – দুটো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে কেন্দ্রীয় এজেন্সি গ্রেফতার করেছে।

তথ্যের খাতিরে অবশ্য বলতে হবে যে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী জেএমএম নেতা হেমন্ত সোরেন গ্রেফতার হবেন বুঝতে পেরে আগেভাগেই মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বভার চম্পাই সোরেনকে সঁপে দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনা হল, মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করে দিল্লির আম আদমি পার্টি সরকারের মত ঝাড়খণ্ডের জোট সরকারকেও ভেঙে ফেলাই ছিল বিজেপির লক্ষ্য। হেমন্ত আর অরবিন্দ কেজরিওয়াল এই কৌশলের বিরুদ্ধে লড়াই করার দুটো আলাদা পথ বেছে নিয়েছেন। হেমন্ত ক্ষমতা হস্তান্তর করে কারাবরণ করার পর, বিধানসভায় আস্থা ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন জোট সরকার ফেলে দেওয়ার চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কেজরিওয়াল ঠিক করেছেন পদত্যাগ করবেন না, কারারুদ্ধ থেকেই প্রশাসন চালিয়ে যাবেন। হয়ত এমনটা করবেন ঠিক করে রেখেছিলেন বলেই তিনি গতমাসে দিল্লি বিধানসভায় নিজেই আস্থা প্রস্তাব এনে আরও একবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করেছেন। ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রীর গ্রেফতারি অভূতপূর্ব ঘটনা। ফলে সম্ভব-অসম্ভবের কথা আলাদা, আইনত এমনটা করা যায় কিনা তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরাও দ্বিধায়। অমৃতকালে বোধহয় এমনই হয়ে থাকে।

কেবল দুই মুখ্যমন্ত্রীর গ্রেফতারিই অবশ্য একমাত্র অভূতপূর্ব ঘটনা নয়। দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দিয়েছে আয়কর বিভাগ। বিশ বছর আগের কর নাকি বকেয়া আছে, এই যুক্তিতে জরিমানা হিসাবে বিপুল পরিমাণ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। সিবিআই, ইডি, আয়কর বিভাগকে ব্যবহার করে কীভাবে নিজেদের তহবিলে পাহাড়প্রমাণ টাকা জড়ো করেছে বিজেপি, তা তো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নির্বাচনী বন্ডের প্রথম দফার তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। ২১ মার্চ বন্ডের নম্বরগুলো প্রকাশিত হওয়ার পরে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বিকল্প সংবাদমাধ্যম এবং বিশ্লেষকদের তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে আরও নানা তথ্য। তার অন্যতম হল দিল্লি সরকারের আবগারি নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত এক কাহিনি।

এই সেই নীতি, যা দিয়ে দুর্নীতি করা হয়েছে অভিযোগ তুলে দিল্লির উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়াকে দীর্ঘদিন বন্দি রাখা হয়েছে, আপের রাজ্যসভার সাংসদ সঞ্জয় সিংকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এখন কেজরিওয়ালকেও গ্রেফতার করা হল। একই মামলায় এছাড়াও গ্রেফতার হয়েছেন তেলেঙ্গানার সদ্যপ্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের মেয়ে কে কবিতা। এঁদের সকলের গ্রেফতারির পিছনেই রাজসাক্ষী পি শরৎ চন্দ্র রেড্ডির বয়ান। ইনি হায়দরাবাদের অরবিন্দ ফার্মা লিমিটেডের অন্যতম ডিরেক্টর। স্ক্রোল ওয়েবসাইটের তদন্ত বলছে, ২০২২ সালে গ্রেফতার হওয়ার পাঁচদিন পরে শরৎ বিজেপিকে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে পাঁচ কোটি টাকা দেন। এর কিছুদিন পরে তিনি জামিনের আবেদন করেন এবং কী আশ্চর্য! ইডি জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করেনি! তারপরেই তিনি দিল্লির আবগারি নীতি নিয়ে মামলায় রাজসাক্ষী হয়ে যান।

অতঃপর শরৎ বিজেপিকে আরও ২৫ কোটি টাকা দেন। এর সঙ্গে কেজরিওয়ালদের গ্রেফতারির সম্পর্ক বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই, পাঠক বুদ্ধিমান।

হেমন্তের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন আছে। দেশজুড়ে যতজন বিরোধী নেতাকে ইডি গ্রেফতার করেছে, তাঁদের কারোর বিরুদ্ধেই মামলা কিন্তু কোথাও পৌঁছচ্ছে না। প্রায়শই এ আদালত সে আদালতের বিচারক ইডিকে ধমকে জিজ্ঞেস করছেন, আপনারা কি সত্যিই মামলার নিষ্পত্তি চান? শিবসেনার সঞ্জয় রাউতকে জামিন দেওয়ার সময়ে মুম্বাই হাইকোর্টের বিচারক জিজ্ঞেস করেছিলেন, মুখ্য অভিযুক্তদের গ্রেফতার না করে সঞ্জয়ের জামিন আটকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কেন? ইডির আচরণ কোথাও প্রশ্নাতীত নয়। ফলে কয়েকদিন আগেই সুপ্রিম কোর্ট আদেশ দেয়, ইডি কাউকে গ্রেফতার করলে লিখিতভাবে জানাতে হবে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার সেই আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। ২০ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট সরকারের আবেদন খারিজ করে দেয়।

অর্থাৎ দেশের সরকার কোনোরকম কার্যকারণ না দেখিয়েই মানুষকে গ্রেফতার করার অধিকার দাবি করেছিল। প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট, ২০০২ আইনটার অবশ্য বদনামই আছে অযৌক্তিক দমনমূলক আইন হিসাবে। কিন্তু সে অন্য আলোচনার বিষয়। আমরা বরং দেখি, জরুরি অবস্থার ইন্দিরা-সঞ্জয়কেও লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মত কী কী কাজ হয়ে চলেছে লোকসভা নির্বাচনের মুখে।

বিদায়ী সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে দুই কক্ষ মিলিয়ে বিরোধী পক্ষের ১৪৬ জন সাংসদকে নানা ছুতোয় সাসপেন্ড করে একতরফা পাস করিয়ে নেওয়া হল নতুন টেলিকম আইন আর পুরনো ফৌজদারি আইন বাতিল করা তিনটে নতুন আইন, যেগুলো মারাত্মক দমনমূলক বলে অভিযোগ উঠেছে।

সামান্য চণ্ডীগড়ের কর্পোরেশনও যাতে বিরোধী জোটের হাতে না যায় তার জন্যে অনিল মাসি নামক এক নির্লজ্জ আধিকারিককে দিয়ে মেয়র নির্বাচনের দিন ব্যালট বিকৃতি ঘটিয়ে আপের প্রার্থীকে হারিয়ে জিতিয়ে দেওয়া হল বিজেপি প্রার্থীকে। সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করা মাত্রই দেখা গেল কয়েকজন আপ কাউন্সিলর দলবদল করে ফেলেছেন। মোদীজির নেতৃত্বে হঠাৎ আস্থা জেগে উঠেছে। শেষপর্যন্ত অবশ্য সর্বোচ্চ আদালত কড়া অবস্থান নেওয়ায় চণ্ডীগড় কর্পোরেশনে ভোটারদের রায়ই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচনকেও ছাড়া হচ্ছে না। সেখানেও রাত দুটোর সময়ে এক প্রার্থীকে বাতিল করে দিয়েছে প্রশাসন।

হিমাচল প্রদেশে রাজ্যসভা নির্বাচনের ভোটাভুটির আগে কংগ্রেসের কয়েকজন বিধায়ক উধাও হয়ে গেলেন। সেই ছজন কংগ্রেস বিধায়ক বিজেপি প্রার্থীকে ভোট দেওয়ায় ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের প্রার্থীর সঙ্গে ভোট ‘টাই’ হয়ে যায়। টসে জিতে যান বিজেপি প্রার্থী। ওই বিধায়কদের স্পিকার পরে সাসপেন্ড করেন। একই দিনে উত্তরপ্রদেশের রাজ্যসভা নির্বাচনেও ক্রস ভোটিংয়ের ফলে বিজেপির একজন অতিরিক্ত প্রার্থী জিতে যান। সবই অবশ্য বিবেকের সহসা জাগরণ, মোদীজির নেতৃত্বে ভারতের দুর্বার অগ্রগতিতে আস্থা তৈরি হওয়ার ফল।

মহারাষ্ট্রে শিবসেনাকে দ্বিখণ্ডিত করে একনাথ শিন্ডেকে সমর্থন দিয়ে সরকার গড়েছিল বিজেপি। অতঃপর নির্বাচন কমিশন দল ভেঙে বেরিয়ে আসা শিন্ডে গোষ্ঠীকেই আসল শিবসেনা বলে রায় দিয়ে শিবসেনার প্রতীক তাদেরই দিয়ে দিয়েছে। একই ঘটনা ঘটানো হয়েছে রাজ্যের আরেক দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির প্রতিও। শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিরাট অভিযোগ ছিল। তিনি বিজেপিতে যোগ দিতেই হয়ে গেলেন ধপধপে সাদা। তারপর নির্বাচন কমিশন তাঁর গোষ্ঠীকেই আসল এনসিপি গণ্য করে দলীয় প্রতীক দিয়ে দিল। দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং মহারাষ্ট্রের প্রবীণ নেতা শরদের দলকে এখন লড়তে হবে অন্য প্রতীকে।

বুঝতে অসুবিধা হয় না যে লোকসভায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর ৪০০ পার করার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করারই অঙ্গ এসব। রাজ্যসভা, লোকসভা – দুই কক্ষেই দু-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাই বিজেপির। নইলে সংবিধানের ল্যাজা মুড়ো বদলে দেওয়া যাবে না, ২০২৫ সালের মধ্যে হিন্দুরাষ্ট্র তৈরি করাও স্বপ্নই থেকে যাবে। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত চেয়েছিলেন। অনেকেরই মনে হয়েছিল তা অসম্ভব। কীভাবে সম্ভব করতে হয় তা দেখিয়ে দিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীর দল। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত সাফল্যের পর বিজেপি বা এনডিএর পক্ষে আসন আরও বাড়ানোও অনেকের অসম্ভব মনে হচ্ছে। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির হাতে ছিল কেবল দলীয় কর্মীবাহিনী আর রাজ্য প্রশাসন। মোদীর হাতে আছে যাবতীয় কেন্দ্রীয় এজেন্সি।

নির্বাচন কমিশনটাকেও করতলগত করার ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করার জন্যে গঠিত কমিটিতে আগে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। মোদী সরকার নতুন আইন করে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে ঢুকিয়েছে মন্ত্রিসভার এক সদস্যকে, অর্থাৎ বিরোধী দলনেতার ভূমিকা হয়ে গেল দর্শকের। নির্বাচনী বন্ডকে অসাংবিধানিক বলে দাবি করে যেমন সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছিল, তেমন এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করেও মামলা হয়েছে। সে মামলার শুনানি হওয়ার আগেই সাত তাড়াতাড়ি সভা ডেকে দুজন নতুন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করেছে সরকার। বিরোধী দলনেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, মাত্র ২৪ ঘন্টা সময় দিয়ে শ দুয়েক নামের তালিকা হাতে ধরিয়ে বেছে নিতে বলা হয়েছিল। মামলা গ্রহণ করে বিচারপতিরা বলেছেন, নির্বাচন এসে যাওয়ায় ওই আইনে স্থগিতাদেশ দিতে চান না। কিন্তু আর যা যা বলেছেন, তাতে আইনটি সম্পর্কে তাঁরা খুব সদয় বলে মনে হচ্ছে না। সরকারের এত তাড়া কিসের – সে প্রশ্ন তুলেছেন।

কিন্তু তাতে কী? যতদিনে এ মামলার রায় বেরোবে, ততদিনে হয়ত নির্বাচন মিটে যাবে। ঠিক যেমন নির্বাচনী বন্ড নিয়ে মামলা হয়েছিল ২০১৮ সালে, রায় বেরোল ২০২৪ সালে। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া আবার চেয়েছিল নির্বাচন পর্ব চুকলে নির্বাচনী বন্ডের তথ্য প্রকাশ করতে। তারপর সুপ্রিম কোর্টের ধমকের জোর যত বাড়ল, তথ্য প্রকাশের গতিও তত বাড়ল। এখন দেখা যাচ্ছে, গত নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট বন্ডের মামলায় নিজেদের রায় রিজার্ভ করার পরেও বিজেপি সরকার বন্ড ছাপা বন্ধ করেনি। ২০২৪ সালের তৃতীয় মাস এখনো শেষ হয়নি, এর মধ্যেই ৮,৩৫০ কোটি টাকার নির্বাচনী বন্ড ছাপা হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিজেপি ২০১৮ সাল থেকে বন্ডে মোট ৮,২৫১ কোটি টাকা পেয়েছে। আর যে যে দল বন্ডে টাকা নিয়েছে তারা সকলে মিলেও এত টাকা পায়নি। এর পাশে রাখুন দেশের প্রধান বিরোধী দলের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া, টাকা কেড়ে নেওয়া। কোনো সন্দেহ নেই, এরপর কংগ্রেস অনেক আসনে প্রার্থী দিতেই খাবি খাবে। ইতিমধ্যেই গুজরাটের এক আসনে নাম ঘোষণা হয়ে যাওয়া প্রার্থী প্রথমে বাবা অসুস্থ – এই কারণ দেখিয়ে নিজের নাম তুলে নেন, তারপর পার্টি থেকেই পদত্যাগ করেছেন। এক্স হ্যান্ডেলে জানিয়েছেন, দুই প্রজন্ম ধরে তাঁকে আর তাঁর বাবাকে নাকি কংগ্রেস নেতৃত্ব চরম অসম্মান করে এসেছেন। তাই এই সিদ্ধান্ত। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন, কংগ্রেস নেতারা সনাতন ধর্মকে সম্মান করেন না।

এরপর কী হতে যাচ্ছে, কোন বিরোধী নেতা গ্রেফতার হতে যাচ্ছেন আমরা জানি না। শনিবার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী মহুয়া মৈত্রের বাড়িতেও সিবিআই হানা দেয় এবং শূন্য হাতে ফিরে যায়। দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে সরকারবিরোধী দল এবং ব্যক্তিদের একমাত্র আশার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। চাতক পাখির মত আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন সবাই – যদি এমন কোনো রায় দেওয়া হয় যাতে সরকার কোণঠাসা হয়। এমনটা যে দেশে হয়, বুঝতে হবে সে দেশের গণতন্ত্রের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। পার্শ্ববর্তী পাকিস্তানেই এমন হতে দেখা যায়। আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত লোকেরা আবার অবাধ নির্বাচন বলতে বোঝেন রক্তপাতহীন নির্বাচন। সেই সরলমতি মানুষগুলোর উদ্দেশে বলা যাক, এই আবহে যে নির্বাচন হবে তা যদি অবাধ হয়, তাহলে ফড়িংও পাখি, জলহস্তীও হাতি, দেবও মহানায়ক। এমনিতেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন আছে যার সন্তোষজনক উত্তর দিতে নির্বাচন কমিশনের ভারি অনীহা। উত্তর দিয়ে দিলে কথা ছিল না, কিন্তু আলোচনাই করতে না চাওয়া যে প্রবণতার দিকে নির্দেশ করে তাকে গোদা বাংলায় বলে ‘ঠাকুরঘরে কে রে?’, ‘আমি তো কলা খাইনি।’ আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে চাই না, তাই কেবল একটা তথ্য উল্লেখ করা যাক। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর দ্য কুইন্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, একটা-দুটো নয়, মোট ৩৭৩ আসনে নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী প্রদত্ত ভোটের সঙ্গে গোনা ভোটের বিস্তর তফাত ছিল। এই তফাতের কোনো ব্যাখ্যা কমিশন আজ পর্যন্ত দেয়নি।

তাহলে করণীয় কী? আমার-আপনার মত সাধারণ নাগরিকের কী করা উচিত জানি না, বিরোধী দলগুলোর অবশ্যই সর্বশক্তি দিয়ে পথেঘাটে আন্দোলনে নামা উচিত এই সরকারের বিরুদ্ধে। কারণ নির্বাচনে তারা যাতে নিজেদের শক্তি অনুযায়ীও লড়তে না পারে সরকারের তরফে তার যাবতীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। হয়ত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হবে যে বিরোধীপক্ষের সেরা বক্তারা প্রায় সবাই কারান্তরালে থাকবেন প্রচার পর্বে। সুতরাং এখন আর আলাদা করে প্রচার, আসন সমঝোতা – এসব নিয়ে ভেবে লাভ কী? পথে নামা ছাড়া বিরোধীদের সামনে প্রচারেরই বা আর কোন পথ খোলা আছে? প্রায় কোনো মূলধারার সংবাদমাধ্যমই তো বিরোধীদের জায়গা দেবে না। টাকাপয়সার বিপুল অসাম্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিজেপির সঙ্গে এঁটে ওঠাও তৃণমূল কংগ্রেসের মত দু-একটা দল ছাড়া বাকিদের পক্ষে অসম্ভব। সুতরাং রাস্তাই একমাত্র রাস্তা নয় কি?

অথচ আমরা কী দেখছি? কংগ্রেসের তিন প্রধান নেতা রাহুল গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী, মল্লিকার্জুন খড়্গেকে সাংবাদিক সম্মেলন করতে দেখছি। ইন্ডিয়া জোটের নেতাদের কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন নিবেদন করতে দেখছি। দিল্লির রাজপথে লাগাতার আন্দোলনে সব দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে কবে দেখব? কেরালায় কংগ্রেস, সিপিএম দুই দলই পথে নেমেছে। কিন্তু দেশজুড়ে বিরোধীদের পাড়ায় পাড়ায় আন্দোলন কবে দেখব? এদেশের বিরোধীরা কি তেমন আন্দোলন করতে ভুলে গেছেন? ২০১২ সালে নির্ভয়া কাণ্ডের পরে দিল্লির চেহারা এর মধ্যেই ভুলে গেলেন? আম আদমি পার্টির উত্থানই তো রামলীলা ময়দান আঁকড়ে পড়ে থাকা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে। সে আন্দোলনে যিনি কেজরিওয়ালের গুরু ছিলেন, সেই আন্না হাজারে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে অনন্ত শয্যায় শায়িত ছিলেন। কেজরিওয়াল গ্রেফতার হওয়ার পর জেগে উঠে সংবাদসংস্থা এএনআইকে বিবৃতি দিয়ে গ্রেফতার সমর্থন করেছেন। সমর্থন করার কারণটি জব্বর।

ওসব কথা থাক। প্রশ্ন হল, নিজেরা ক্ষমতায় থাকার সময়ে আন্দোলন, রাজনীতি সম্পর্কে যে বিতৃষ্ণা তৈরি করিয়েছিলেন সাধারণ নাগরিকদের মনে, বিজেপিবিরোধীরা কি এখন তারই ফাঁদে পড়েছেন? ১৯৯১ সালের উদারীকরণের পর থেকেই তো কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস, উদারপন্থী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, বিচারপতি, এমনকি এই শতাব্দীর গোড়া থেকে এ রাজ্যের কমিউনিস্ট শাসকদেরও আমরা বলতে দেখেছি – মিছিল মানুষকে অসুবিধায় ফেলে, বনধ কর্মনাশা ইত্যাদি। তাই বোধহয় এখন আন্দোলনের বদলে আদালতে ভরসা রাখতে হচ্ছে। যেসব দলের নির্বাচনে আসন পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য থেকে মাইনাসে, তারাও গণতন্ত্র বাঁচানোর চেয়ে কে কোন আসনে লড়বে তা নিয়ে দরাদরি করতে ব্যস্ত। কেউ বলছে ‘অমুক আসন আমাদের সেন্টিমেন্ট’, ‘কেউ বলছে তমুক আসনে আমরা যথেষ্ট শক্তিশালী’। যেন দাঁড়ালেই ‘এলেম, দেখলেম, জয় করলেম’ হয়ে যাবে।

এদেশের বিপন্ন মানুষ কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ভরসায় না থেকে নিজের মত করে লড়াই করে যাচ্ছেন। দেশের কৃষকরা আবার পথে। মোদী সরকার তাঁদের পথে আক্ষরিক অর্থে কাঁটা বিছিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা পিছু হটছেন না। যদিও সরকারের বদান্যতায় মূলধারার সংবাদমাধ্যম তো বটেই, সোশাল মিডিয়া থেকেও কৃষক আন্দোলনের খবর উধাও।

লাদাখের মানুষও গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে রোজ রাস্তায় নামছেন, পরিবেশ ধ্বংসের প্রতিবাদে সুবিখ্যাত সোনম ওয়াংচুক অনশনে বসেছেন।

ভারতের মত বিরাট দেশের অমিত ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে এ ধরনের আন্দোলন যে একেবারেই সফল হতে পারে না তা নয়। ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনই দেখিয়ে দিয়েছে গণআন্দোলনের ক্ষমতা কতখানি। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো নেতৃত্ব দিচ্ছে না এমন আন্দোলনের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও আছে। ২০১৯-২০ সালের এনআরসি, সিএএবিরোধী আন্দোলনেরও সেই সীমাবদ্ধতা ছিল। রাজনৈতিক দলগুলো সেই আন্দোলনেও ঝাঁপিয়ে পড়েনি, আন্দোলনকে এবং তার দাবিগুলোকে পাড়ায় পাড়ায় পৌঁছে দেয়নি। ফলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধারণা হয়ে যায় – এটা মুসলমানদের সমস্যা, তাই ওরা আন্দোলন করছে। একইভাবে এখনো বহু মানুষ ভাবছেন কৃষি আইনগুলো কৃষকদের সমস্যা, লাদাখের ব্যাপারটা লাদাখের মানুষের সমস্যা আর মণিপুর তো বিস্মৃত, কাশ্মীর মুসলমানপ্রধান হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কল্পনাতেও নেই। এককথায় দেশের বিরোধী রাজনীতি সময়ের চেয়ে, পরিস্থিতির চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। যতদিন পিছিয়ে থাকবে তত দ্রুত ভারত ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তায়িপ এরদোগানের তুরস্ক হওয়ার দিকে এগিয়ে যাবে। এখন জরুরি অবস্থা।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

কেন আমি আইপিএল নাস্তিক?

প্রতিবছর ঘটা করে নিলাম হয়, বাবুরা দাসী বাঁদি কেনার মত পছন্দের ক্রিকেটার কেনেন। খেলার সময়েও কেবল খেলা হয় না। গ্যালারিতে এবং আফটার পার্টিতে বলিউড সুন্দরীরা আসেন, মাঠের ধারে চিয়ারলিডার নাম দিয়ে স্বল্পবাস মেম নাচানো হয়।

সদ্য দ্বিতীয়বার বাবা হওয়া বিরাট কোহলি মাঠে নামার জন্যে মুখিয়ে আছেন। মহেন্দ্র সিং ধোনির নাকি ব্র্যাড পিট অভিনীত বেঞ্জামিন বাটনের মত বয়স বাড়ার বদলে কমছে। হার্দিক পান্ডিয়ার কাছে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের অধিনায়কত্ব হারানোয় রোহিত শর্মা কি রেগে আছেন, নাকি হালকা বোধ করছেন?

খবরের কাগজের খেলার পাতা থেকে সোশ্যাল মিডিয়া– সর্বত্র ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন এসব নিয়েই আলোচনা করছেন। কারণ শীত চলে যেতেই এসে পড়েছে ভারতীয় ক্রিকেটের বৃহত্তম রিয়েলিটি শো। পেশাগত বাধ্যবাধকতা সরে যাওয়ার পর থেকে আইপিএল দেখি টিভির চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে কখনও চোখে পড়ে গেলে দু-এক ওভার। উপরন্তু কাগজে, টিভিতে বা হাতের মোবাইলে শিরোনাম পেরিয়ে আইপিএলের খবরেও ঢুকি না। প্রশ্ন হচ্ছে, ক্রিকেটপ্রেমিক হয়েও আইপিএল দেখতে যাই না কেন? যুক্তিগুলো সাজানো যাক।

ক্রিকেটের কাঠিন্য নেই, আছে আমোদ 

২০০৮ সালের প্রথম আইপিএলের সময়ে যে কাগজের ক্রীড়া সাংবাদিক ছিলাম, সেই কাগজের মালিক আইপিএলের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিরও মালিক ছিলেন। প্রথম খেলার দিনই মাঠে গিয়ে দেখি– অবাক কাণ্ড! বাউন্ডারির দড়ির বাইরে যতটা জায়গা পড়ে, তা একত্র করলে আরেকটা ছোটখাটো মাঠ হয়ে যায়। খেলা শুরু হতেই দেখা গেল, রোহিত শর্মা স্পিনারের বল চামচের মত করে পিছন দিকে তুলে দিলেও মাত্র একবার ড্রপ খেয়ে মাঠের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমাদের উপর কিন্তু কাগজের কর্তাদের কড়া নির্দেশ ছিল, বাউন্ডারি যে ছোট করে দেওয়া হয়েছে সেকথা কোনও কারণেই লেখা যাবে না।

গত দেড় দশকে অবশ্য এসব লুকোচুরি আর নেই। এখন সবাই জানে, ৫০ ওভারের খেলাতেও বাউন্ডারি ছোট করে ফেলা হয় চার-ছয়ের সংখ্যা বাড়াতে। স্বীকার্য যে, আজকাল এমন বড় বড় ছয় মারা হয় যে বল গিয়ে পড়ে গ্যালারিতে। তার কারণ ব্যাটগুলোর গঠন এবং ওজন, বাউন্ডারির দৈর্ঘ্য নয়। কিন্তু একইসঙ্গে লক্ষ করে দেখবেন, সীমানার ধারে রোমাঞ্চকর ক্যাচের সংখ্যা কত বেড়ে গিয়েছে। পৃথিবীর যে কোনও দেশে কুড়ি ওভারের লিগ চললেই প্রায় প্রতিদিন কোনও না কোনও ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে একজন ফিল্ডার অপূর্ব কায়দায় শূন্যে শরীর ছুড়ে দিয়ে বা অন্য একজন ফিল্ডারের সাহায্যে সীমানার বাইরে থেকে ফিরে ক্যাচ নিচ্ছেন। এমনটা সম্ভব হয় সীমানার বাইরে অনেকখানি জায়গা থাকে বলেই।

ইউটিউবে প্রাক-আইপিএল যুগের সাদা বলের ক্রিকেটই দেখুন– সীমানার পরে মাঠ শেষ। সেখানে এসব করতে গেলে ভারতীয় স্টেডিয়ামগুলোর গ্রিলে ধাক্কা খেতে হত। আরও লক্ষ করুন, বাউন্ডারি ছোট করে দেওয়ায় রানিং বিটুইন দ্য উইকেটসে কত কম শক্তি খরচ হচ্ছে ব্যাটারের। তিন রান প্রায় হয়ই না, কারণ ফিল্ডারের বল তাড়া করে চার আটকে বল ফেরত পাঠানোর অবকাশ কম। তার আগেই বল সীমানা পেরিয়ে যাবে।

সাধারণভাবে পরিশ্রমের দিক থেকে দেখলেও যে আইপিএল বা টি২০ ক্রিকেট একজন ক্রিকেটারের পক্ষে তুলনায় আরামদায়ক তা নিশ্চয়ই আলাদা করে বলে দেওয়ার দরকার নেই। বোলারকে চার ওভারের বেশি বল করতে হয় না, একজন ব্যাটার প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত খেলে শতরান করলেও বড়জোর ৬০-৭০ বল খেলবেন। টেস্ট ক্রিকেটের কথা বাদ দিন, ৪২ বছর বয়সে পঞ্চাশ ওভারের খেলা খেলতে হলেও টের পাওয়া যেত ধোনির বয়স কমছে না বাড়ছে। জেমস অ্যান্ডারসন একজনই হয়, তিনিও বেছে বেছে ম্যাচ খেলেন।

বড়লোকের বেড়ালের বিয়ে

সদ্য প্রকাশিত এক সমীক্ষায় পাওয়া গিয়েছে, ভারতের উপরতলার ১% লোকের হাতে দেশের ২২.৬% আয় আর ৪০% সম্পদ রয়েছে। তা এমন এক দেশে বাবুরা বেড়ালের বিয়ে দেবেন না মোচ্ছব করে? প্রতিবছর ঘটা করে নিলাম হয়, বাবুরা দাসী বাঁদি কেনার মত পছন্দের ক্রিকেটার কেনেন। খেলার সময়েও কেবল খেলা হয় না। গ্যালারিতে এবং আফটার পার্টিতে বলিউড সুন্দরীরা আসেন, মাঠের ধারে চিয়ারলিডার নাম দিয়ে স্বল্পবাস মেম নাচানো হয়। কোন কোন বছর কোন ক্রিকেটার কোন চিয়ারলিডারের সঙ্গে কী ধরনের যৌনতায় লিপ্ত হয়েছিলেন তা নিয়ে রসালো কাহিনীও প্রকাশিত হয় সংবাদমাধ্যমে।

একবার যেমন প্রাক্তন দক্ষিণ আফ্রিকা অধিনায়ক গ্রেম স্মিথের কীর্তিকলাপ মুখরোচক হয়েছিল, আরেকবার ক্রিস গেল আর শেরলিন চোপড়ার নাচানাচি কলকাতার কাগজের প্রথম পাতায় জায়গা করে নিয়েছিল। আজ থেকে ঠিক এক যুগ আগে পুনে ওয়ারিয়র্স দলের ক্রিকেটাররা রেভ পার্টিতে গিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ে ক্যাচ কট কটও হয়েছিলেন। নেহাত তাঁরা শাহরুখ খানের ছেলে নন, তাই বেশি হয়রানি হয়নি।

কবি বলেছেন, শীত এসে পড়লে বসন্ত খুব পিছিয়ে থাকতে পারে না। তেমনই ফুর্তির উপাদান হিসাবে মদ, মেয়েমানুষ এসে পড়লে জুয়াও পিছিয়ে থাকে না। তবে ভারতের সরকার, সাংবাদিক, ভাষ্যকার, সর্বোপরি ক্রিকেটপ্রেমী জনতা অত্যন্ত ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলেন। তাই ম্যাচ ফিক্সিংয়ের ঘটনা ধরা পড়ে গেলে শান্তাকুমারণ শ্রীসান্ত, অজিত চান্ডিলার মত কয়েকজনকে শাস্তি দিয়ে মিটিয়ে ফেলা হয়। চেন্নাই সুপার কিংস দল সাসপেন্ড হয়ে যায় তাদের মালিকদের অন্যতম গুরুনাথ মেইয়াপ্পন অবৈধ বাজি ধরায় যুক্ত ছিলেন বলে, অথচ তৎকালীন অধিনায়ক ধোনি নাকি কিছুই জানতেন না। এক ফ্রেমে একাধিক ছবি থাকলেও তিনি নাকি এন শ্রীনিবাসনের জামাইকে আদৌ চিনতেন না। অথচ ধোনি নিজে শ্রীনিবাসনের স্নেহভাজন, তাঁর কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্টও নিযুক্ত হয়েছিলেন।

আইপিএলের উদ্গাতা ললিত মোদি বিস্তর আর্থিক কেলেঙ্কারি করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে ২০১০ সালে। নিজের লোকদের কম পয়সায় ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা পাইয়ে দেওয়া, আইপিএলের মিডিয়া স্বত্ব বিক্রির টাকা থেকে কাটমানি নেওয়া, বিদেশে গোপন অ্যাকাউন্টে টাকা সরানো– কী ছিল না তার মধ্যে? প্যান্ডোরার বাক্স খুলেছিলেন ললিত নিজেই। যখন তিনি অভিযোগ করেন যে, তৎকালীন মন্ত্রী শশী থারুর নিজের প্রভাব খাটিয়ে সুনন্দা পুষ্করকে কোচি টাস্কার্স ফ্র্যাঞ্চাইজি কিনিয়ে দিয়েছেন। তা থেকে আরও নানা অভিযোগ উঠেছিল– আইপিএলের সব ফ্র্যাঞ্চাইজিতেই নাকি বেনামে অনেকের টাকা খাটে। অন্য কোনও দেশে হয়তো এত কাণ্ডের পর এই লিগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু যারা দেশ চালায়, তাদের মোচ্ছব থামায় কার সাধ্যি? ‘দ্য শো মাস্ট গো অন’।

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ? সত্যি?

কবি বলেছেন নামে কী আসে যায়? আইপিএলের বেলায় সেকথা মনে রাখা খুব জরুরি। এ এমনই ভারতীয় লিগ যে, ২০০৯ সালে সাধারণ নির্বাচনের সময়ে ম্যাচের আয়োজন করা যাবে না বলে দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলা হয়েছিল। পরেও সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে খেলা হয়েছে। অতএব দরকার পড়লে উত্তর মেরুতে বা চাঁদেও খেলা যেতে পারে। কিন্তু খেলা হওয়া চাই, কারণ সম্প্রচার স্বত্ব বেচে পকেট ভারী হচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের। সেটাই লক্ষ্য, ক্রিকেট উপলক্ষ্য।

বোর্ড ধনী হলে তা কি ভারতীয় ক্রিকেটের লাভ নয়? এর উত্তর দেওয়া বেজায় শক্ত। ভারতীয় ক্রিকেটারদের, এমনকি ঘরোয়া ক্রিকেটারদেরও যে আইপিএল যুগে পারিশ্রমিক অনেক বেড়েছে তা অনস্বীকার্য। কিন্তু মুশকিল হল, কর্তা এবং ক্রিকেটারদের লক্ষ্য, মোক্ষ সবই হয়ে গিয়েছে আইপিএল। অতিমারির সময়ে আইপিএলটা যেন হতে পারে তার সযত্ন ব্যবস্থা করেছিল সৌরভ গাঙ্গুলির নেতৃত্বাধীন বোর্ড। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও চালু ছিল যে রনজি ট্রফি, তা চালু রাখার উদ্যোগ নেয়নি। ঘরোয়া ক্রিকেটারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও হয় অনেক পরে।

আরো পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট মানে ফলাফল নিরপেক্ষ ব্যবসা

দেওধর ট্রফি, চ্যালেঞ্জার ট্রফির মত গুরুত্বপূর্ণ ঘরোয়া প্রতিযোগিতা প্রায় তুলে দেওয়া হয়েছে। শুধু টি২০ নয়, পঞ্চাশ ওভারের জাতীয় দল বা টেস্ট দল বাছার সময়েও যে আইপিএলের পারফরমেন্সকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তা এখন সুনীল গাভাসকারের মত শান্তশিষ্ট লোকও বলতে শুরু করেছেন। কেএল রাহুলের মত প্রতিষ্ঠিত তারকা তো বটেই, ঈশান কিষান বা শ্রেয়স আয়ারের মত তরুণ তুর্কিরাও এখন আইপিএল ছাড়া অন্য কিছুকে পাত্তা দিচ্ছেন না। কেউ মানসিক সমস্যার দোহাই দিয়ে আইপিএলের আগের টেস্ট সিরিজ থেকেও পালাচ্ছেন, কেউ চোট আছে বলে রনজি না খেলে বসে থাকছেন।

তাহলে আইপিএল থেকে ভারতীয় ক্রিকেট টাকা ছাড়া পেল কী? মনে রাখা ভাল, পৃথিবীর সেরা টি ২০ লিগের আয়োজক হওয়া নিয়ে গুমর থাকলেও ভারত সেই ২০০৭ সালের পরে আর ওয়ার্ল্ড টি২০ও জেতেনি। এই লিগ কেন দেখব? হাতে নষ্ট করার মত সময় থাকলে না হয় কোনও ওয়েব সিরিজ দেখা যাবে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

শ্রীমালবিজয়: রক্তাক্ত প্রথম উপন্যাসে অকুতোভয় পরীক্ষা

অভিষেক ঝা সম্পাদিত ‘ত্রস্তের শিকড়বাকড়’ নামের সেই সংকলনের পৃষ্ঠ প্রচ্ছদে লেখা হয়েছিল ‘সৃষ্টি ও কৃষ্টির বেলোয়ারী ধারণা, বিবিধের মাঝে মিলনমহান ভারতরাষ্ট্রের সফেদ পোশাকে এই বই হলুদ মূত্রদাগ।’ ভারতেরই আরেক অঞ্চলে স্থাপিত অন্য এক জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত সিন্ধুর উপন্যাসকেও একই আখ্যা দিলে ভুল হবে না।

একজন বিজ্ঞানী আর একজন সাহিত্যিক – দুজনেই পরীক্ষানিরীক্ষা চালান। তফাত হল, বিজ্ঞানীর পরীক্ষা সফল না ব্যর্থ তা তিনি টের পেয়ে যান হাতেনাতে, স্বীকৃতিও পান অনতিবিলম্বে। সাহিত্যে কোন পরীক্ষা সফল আর কোন পরীক্ষা ব্যর্থ তা ঠিক করে দেবে কে? ফলে সাহিত্যিককে সাফল্যের জন্যে সারাজীবন অপেক্ষা করতে হয়। এমনও হতে পারে, জীবদ্দশায় তাঁকে কেউ সফল বলে মানল না, স্বীকৃতি পেলেন মৃত্যুর পর। জীবনানন্দ দাশ যতই লিখুন ‘মানুষটা মরে গেলে যদি তাঁকে ওষুধের শিশি/কেউ দেয়, বিনি দামে, তাতে কার লাভ…’, সাহিত্যিক মরণোত্তর স্বীকৃতিকে অগ্রাহ্য করতে পারেন না। বিজ্ঞানীর পরীক্ষার পরীক্ষক প্রকৃতি। নম্বর দেন তখনই। সাহিত্যিকের পরীক্ষক কাল। তিনি এক লেখাই বারবার দেখেন। আজ যে লেখায় একশোয় একশো দিলেন, পরে সেই লেখাকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দিতে পারেন। আবার বহুদিন ডাস্টবিনে পড়ে থাকা লেখা তুলে এনে লেটার মার্কস বসিয়ে দিতে পারেন। গ্যালিলিও বা টেস্টটিউব বেবির আবিষ্কারক সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের উল্লেখ করে কেউ বলতেই পারেন যে বিজ্ঞানীদেরও সর্বদা স্বীকৃতি জীবদ্দশায় জোটে না। কিন্তু সমকালের স্বীকৃতি না পেলেও, প্রকৃতি যে তাঁকে জয়যুক্ত করেছে তা একজন বিজ্ঞানীর কাছে গোপন থাকে না। তাই তো কথিত আছে, গ্যালিলিও নাকি অর্ধোন্মাদ অবস্থাতেও বলতেন ‘কিন্তু পৃথিবী ঘুরছে’। সাহিত্যিক এই স্বস্তিটুকুও পান না। সুতরাং সিন্ধু সোম তাঁর প্রথম উপন্যাস শ্রীমালবিজয়-এ যে পরীক্ষা চালিয়েছেন, তা সফল না ব্যর্থ সে আলোচনায় যাব না। কিন্তু শুরুতেই বলে নেওয়া যাক, শুধু এই পরীক্ষাটা চালানোর জন্যেই তাঁর প্রশংসা প্রাপ্য। একশো আটান্ন পাতার এই উপন্যাসে লেখক শুধু চরিত্রগুলোর নয়, নিজেরও রক্ত ঝরানোর স্পর্ধা দেখিয়েছেন। নিজের লেখাকে নিজেই বলেছেন ‘একটি আনখাই গদ্যপাঁচালি’।

এই গদ্যপাঁচালির মূল স্পর্ধা গদ্যে। কথক তথাকথিত মান্য বাংলাকে পাত্তা না দিয়ে কখনো লিখেছেন বরাকর উপত্যকার মালদের ভাষায়। ওই স্থানীয় ভাষায় স্বভাবতই মিশেছে ওই এলাকার নানা জনগোষ্ঠীর ভাষা। এ ভাষা পড়তে অপরিচিত পাঠককে প্রথমদিকে হোঁচট খেতে হবে। হোঁচট খেতে খেতে এগোবার উদ্যম থাকলে এই মালভূমির ভূপ্রকৃতি একসময় সড়গড় হয়ে আসবে, পরিচিত সমভূমিতেও গিয়ে পড়বেন একসময়। কিন্তু সেখানে নিয়ে গিয়েও লেখক পাঠককে ভুলতে দেন না আসলে কোন অশান্ত ভূমিতে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। কথক মাল যুবক তো আর নাগরিক জীবন থেকে বিযুক্ত নয়, তাকে শিল্পী হওয়ার চেষ্টা করতে হয় প্রমিত বাংলা বলা সমাজের মধ্যেই। কোন মানুষের বেড়ে ওঠাই বা একান্ত নিজের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ? তাই তার ভাবনার ভাষায় মিশেই থাকে নিজস্ব ভাষা আর মান্য ভাষা। কিন্তু গোটা উপন্যাসে মান্য ভাষায় লেখা অংশগুলোতেও অন্তত সমাপিকা ক্রিয়ার ব্যবহারে লেখক ধরে রেখেছেন স্থানীয় ভাষা। যাইনি নয়, ‘যাই নাই’। দেখিনি নয়, ‘দেখি নাই’। এই একরোখামি চিনিয়ে দেয় লেখকের রাজনীতিকে, তাঁর স্পর্ধাকে।

সাম্প্রতিক অতীতে পশ্চিমবঙ্গে আসামের বাঙালি বিস্তর আলোচিত হয়েছিল আসামে ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস (এনআরসি) তৈরি প্রসঙ্গে। অধুনা বাংলাদেশে শিকড় থাকা মানুষকে বেনাগরিক করে দেওয়ার সেই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে কোণঠাসা করার চেষ্টা হয়েছিল ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের। দীর্ঘকাল ধরেই তাঁরা অসমিয়াদের চক্ষুশূল, তাঁদের বলা হয় মিঞা। তাঁরা সগর্বে কবিতা লেখেন নিজেদের মুখের ভাষায়, যাকে আলাদা করে মিঞা কবিতা বলার চল আছে। সে ভাষাকে রাষ্ট্রের এতই অপছন্দ (নাকি ভয়?) যে মিঞা কবিদের নামে এফআইআর হয়, গ্রেফতারও হতে হয়। ২০১৯ সালে সেই মিঞা কবিতার একখানা সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ থেকে। অভিষেক ঝা সম্পাদিত ত্রস্তের শিকড়বাকড় নামের সেই সংকলনের পৃষ্ঠ প্রচ্ছদে লেখা হয়েছিল “সৃষ্টি ও কৃষ্টির বেলোয়ারী ধারণা, বিবিধের মাঝে মিলনমহান ভারতরাষ্ট্রের সফেদ পোশাকে এই বই হলুদ মূত্রদাগ।’ ভারতেরই আরেক অঞ্চলে স্থাপিত অন্য এক জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত সিন্ধুর উপন্যাসকেও একই আখ্যা দিলে ভুল হবে না।

এও এক বিক্ষুব্ধ জনপদ। এখানে মিশে রয়েছে নানা জনগোষ্ঠী, যাদের মধ্যে কখনো রক্তাক্ত সংঘাত চলে, কখনো শান্তিকল্যাণ। তবে সিন্ধুর কলমে তারা স্বনামে নেই সর্বদা। বাস্তব আর জাদুবাস্তব আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে যেভাবে প্রবল হিংসার রক্তে মাখামাখি ছবি এঁকেছেন লেখক, তাতে আপনাকে মৃত্যু উপত্যকার বাসিন্দাদের চিনে নিতে হবে লক্ষণ দেখে। যেমন

তখন উদ্বাস্তু বস্তি বা অজাতকুজাত পাড়া, কোনোটারই অবস্থা খুব একটা ভালো না। আকাশ মাঝে মাঝেই গরুড়ের ছায়ায় ছল ছল করে উঠছে! মাটিতে তার ছায়াটা স্পষ্ট হলেও আকাশ থেকেই সে রওনা দেয় বলে বোধহয় আকাশে সেই মৃদু অন্ধকারের কোনো লেশ পাওয়া যায় নাই কোনদিন! অন্তত আমি তো দেখি নাই! এককালে হয়তো যেত! তখন মূল কায়ার বিভীষিকা ছায়া অবধি গড়িয়ে নামত না। কিন্তু এই কালে বস্তির বাচ্চাগুলো পর্যন্ত নিজের ছায়ার সঙ্গে খেলতে ভয় পায়। মানুষ নিজের ছায়া দেখে আঁতকে উঠে কাপড় চোপড় সামলে রাখে। বিশ্বাসঘাতকের গন্ধ ভাসে বাতাসে বাতাসে। কলজে পোড়া গন্ধ তার বড়ই খোশবু আনে আমার ভিতরে।

অথবা

…কিন্তু বাকি পিঁপড়ারা বলাবলি করে, সেই ঝুলিয়ে রাখা শরীর থেকেও নাকি শুদ্ধতার জ্যোৎস্না একেবারে ঝরে ঝরে পড়ছিল। তখন সেই বমিগায়ে পিঁপড়া সমেত অন্য পিঁপড়ারা দাবিয়ে রাখা কয়েকজনকে দ্রুত গাড়িতে তুলে বস্তি থেকে মিলিয়ে যেতে থাকলে মালতীর ছিটকে পড়া ঘিলুর অনেকখানি তাদের সঙ্গে মিলিটারির গাড়িতেই পাড়ি দেয়। যেটুকু পড়ে থাকে চাকার ধূলায় তার চারপাশে একটা নীরব বলয় তৈরি হয়। তখন সেই গোধূলিকবর ভেদ করে ওপাশে দূর থেকে আমি বাবাকে পিঁপড়াগাড়িতে চলে যেতে দেখি। এরপরে বাবার সঙ্গে আমার আর দেখা হয় না।

ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীকে এইভাবে আঁকার শৈলীতে মনে পড়ে যায় ১৯৯২ সালে পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া আর্ট স্পিগেলমানের গ্রাফিক নভেল মাউস।

অবশ্য স্পিগেলমানের চেয়েও শ্রীমালবিজয়ের লেখকের আত্মীয়তা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের সঙ্গে বেশি। বিশ্বসাহিত্য যেদিকেই গড়াক, বাংলার সাহিত্যিকদের মধ্যে এখনো জাদু বাস্তবের যথেষ্ট রমরমা। অনেক লেখকই তাঁর গল্পে, উপন্যাসে জাদু বাস্তব তৈরি করেছেন বলে কলার তোলেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সেইসব প্রয়াস স্রেফ ভাষার কারিকুরিতে বা গল্প বলার বিশেষ ঢঙে পর্যবসিত হয়েছে। মার্কেজ বা অন্যরা যে শখ করে, কেবল লিখতে ভাল লেগেছে বলেই জাদু বাস্তব ব্যাপারটা সৃষ্টি করেননি তা বাঙালি লেখকদের সচরাচর মনে থাকে না। অথচ ১৯৮২ সালে নোবেল পুরস্কার নেওয়ার বক্তৃতায় মার্কেজ নিজের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে, নিজের বিশ্ববিশ্রুত উপন্যাস ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচিউড-এর সূত্র ধরে, বলেছিলেন, লাতিন আমেরিকার বাস্তবতা এমনই যে তা ব্যক্ত করার অন্য কোনো উপায় ছিল না। তাই লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে জাদু বাস্তবতার জন্ম, যা ইউরোপের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। মার্কেজের কথায় ‘আমি কিছুটা দুঃসাহস করেই বলতে পারি যে বাস্তবের মাপে না আঁটা এই বাস্তবটার দিকে সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ লেটার্সের নজর পড়া উচিত ছিল, কেবল তার সাহিত্যিক অভিব্যক্তির উপরে নয়। কাগুজে বাস্তব নয়, যে বাস্তব আমাদের ভিতরে বাস করে এবং যা আমাদের প্রতিদিনের অসংখ্য মৃত্যুর মুহূর্তগুলোর কারণ। যা আমাদের অন্তহীন সৃজনশীলতার উৎস; দুঃখ এবং সৌন্দর্যে ভরপুর। আমি, এই ভবঘুরে এবং স্মৃতিমেদুর কলম্বিয়ানটি, তারই অংশ হয়ে থাকা একজন ভাগ্যবান ব্যক্তি মাত্র। কবি ও ভিক্ষুরা, সঙ্গীতশিল্পী ও ভবিষ্যদ্বক্তারা, যোদ্ধা ও ইতররা, আমরা যারা ওই বেলাগাম বাস্তবতায় বেঁচে থাকা জীব – আমাদের খুব বেশি কল্পনা করতে হয়নি। কারণ আমাদের একটা বড় সমস্যা হল আমাদের জীবনগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার মত করে বলার পথ দুর্লভ। বন্ধুরা, এটাই আমাদের নিঃসঙ্গতার মূল।’ [নোবেল পুরস্কারের ওয়েবসাইট থেকে ইংরেজি বক্তৃতার ভাষান্তর আমার]

শ্রীমালবিজয় পাঁচালিকারের নিঃসঙ্গতাও ঠিক এইখানে। তার রক্তাক্ত বাস্তবের বয়ানও অন্য কোনো প্রকরণে, অন্য কোনো ভাষায় বলা যেত না।

… শূন্যতার বুকে দানা দেয় অপরিশীলন। মনে হল সাঁত করে গলির ওপাশে কেউ সরে গেল। লোকটা ন্যাংটো! লোক? ছায়ার লিঙ্গ নিয়েও আজকাল ভেবে চলেছি দেখছি! গ্রেট! এতটা না এসে শিল্পী কীভাবেই বা হতাম? আমার শিকড়ের কাছে আমার রক্তবমি করা শরীর পড়ে থাকত না?

শিকড়ের প্রতি টান থেকেই হয়ত সেই স্পর্ধা আসে যা একই উপন্যাসে দুরকম বাংলা ব্যবহার করার সাহস দেয় লেখককে। না, এখানে কথকের বাংলা আর সংলাপের বাংলা আলাদা হওয়ার কথা বলা হচ্ছে না। সে তো হওয়ারই কথা। ইদানীং লেখকদের আলস্যে বা নানারকম মানুষের কথা শোনার অনভ্যাসে বাংলা গল্প, উপন্যাসে হয়ে ওঠে না। কেউ চেষ্টা করতে গেলে বিকট ফলাফল হয়। শ্রীমালবিজয় উপন্যাসে লেখক গল্প বলতেই দুরকম ভাষা ব্যবহার করেছেন। ভারতের বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন চেহারার বাংলা কোনোদিনই মূলধারার সাহিত্য, সিনেমার ভাষা হয়ে উঠতে পেল না। এর একমাত্র ব্যতিক্রম বোধহয় বাংলা ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংলাপ। কিন্তু তাও শুধুমাত্র হাস্যরসের উদ্রেক করতেই ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে কলকাতার বাংলা ছাড়া কোনো ভাষায় যে ‘সিরিয়াস’ সাহিত্য সম্ভব, লেখা হয়েছেও, তা বড় অংশের পাঠক জানতেই পারেননি। অনেকে সেসব ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা হিসাবে মানতেও চান না। সিন্ধু নিজের প্রথম উপন্যাসেই কিন্তু এই বিভাজনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়েছেন। কে না জানে, মানুষ যখন চিন্তামগ্ন থাকে অথবা স্বপ্ন দেখে, তখনকার ভাষাই আসলে তার মাতৃভাষা। সে ভাষা ব্যবহার করলে হয়ত পারিপার্শ্বে তাকে হাস্যাস্পদ হতে হয়, তাই সে বলে না। কিন্তু নিজের সঙ্গে কথোপকথনে সেই ভাষাই একমেবাদ্বিতীয়ম। পারিপার্শ্বের ভাষাও আবার দীর্ঘ অভ্যাসে মিশে যায় সেই ভাষায় – অনায়াসে, অলক্ষ্যে। জন্ম হয় এক অন্যতর ভাষার। শ্রীমালবিজয় উপন্যাসে ঠিক তাই করা হয়েছে। ভাবতে ভাবতে যেমন হয়, কোনো কোনো অনুচ্ছেদের মাঝখানেই ভাষা বদলে ফেলেছেন লেখক। লোকে পড়বে কি পড়বে না, ভাষার জন্যেই এ বই প্রত্যাখ্যান করবে কিনা, সেসব চিন্তা উড়িয়ে দিয়ে এই প্রয়াস। তাও আবার প্রথম উপন্যাসে। শিহরণ জাগানো আখ্যানের কথা বাদ দিলেও, কেবল এইজন্যে লেখক প্রশংসার্হ।

আরও পড়ুন সুখেন মুর্মুর চদরবদর: অচেনার আনন্দ, অজানার সংকট

তবে সুপ্রসন্ন কুণ্ডুর প্রচ্ছদ সন্তুষ্ট করতে পারে না। আগে দর্শনধারী পরে গুণবিচারী – বেশিরভাগ পাঠকের ক্ষেত্রেই এ কথার মার নেই। সম্ভবত প্রকাশকের পরিকল্পনাতেই এই উপন্যাসের প্রচ্ছদ অবিশেষ, কারণ এটা ‘প্রথমোপন্যাস’ সিরিজের বই। এই পরিকল্পনা অনেক পাঠককে বিমুখ করতে পারে। অন্তত এই উপন্যাসের বেলায় তাতে লেখকের চেয়ে পাঠকের ক্ষতি বেশি বলেই মনে হয়।

শ্রীমালবিজয়
লেখক: সিন্ধু সোম
প্রকাশক: কেতাবি
প্রচ্ছদ: সুপ্রসন্ন কুণ্ডু
দাম: ৩০০ টাকা

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ওয়কীল হাসানের গণতন্ত্র, না মুকেশ আম্বানির ধনতন্ত্র?

‘আমার মাথার উপরে যে সামান্য ছাদ ছিল সেটাও আমার কাছে থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমার বাচ্চারা পথে বসে আছে, স্যার। এখন আমি এই বাচ্চাগুলোকে নিয়ে কোথায় কাটাব সারাজীবন? আজকাল মানুষের পক্ষে রোজগার করাই শক্ত। সেখানে আমি আবার ঘর কোথায় পাব, কী করে বানাব? ছেলেমেয়েদের মানুষ করব কী করে? মরে যাওয়া ছাড়া তো আর কোনো পথ নেই আমাদের সামনে… সরকারের সঙ্গে আমার কোনো কথাবার্তা হয়নি। আপনারা এসেছেন, আপনারা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। দেখা যাক, সরকারের কানে পৌঁছয় কিনা। জানি না সরকার আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে কি করবে না। আমি ওদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনাদের কাছে কী আছে যার ভিত্তিতে আপনারা আমার বাড়ি ভাঙতে এসেছেন? আমাকে কিছুই দেখাতে পারেনি। স্রেফ আমাকে ধরে পুলিস স্টেশনে পাঠিয়ে দিল। আমার সঙ্গে আমার বন্ধু মুন্নাও (কুরেশি) ছিল, ওকেও পাঠিয়ে দিল। সেখানে আটটা পর্যন্ত আটকে রেখেছিল। আমার নাবালিকা মেয়ে, বউ আর ছেলেকেও ওখানেই রাখা হয়েছিল। আমার ছেলের চোট লেগেছে, মারধরও করা হয়েছে… স্যার, আমার তারিফ তো গোটা দুনিয়া করছে। উত্তরাখণ্ড সরকার আমাদের ৫০ হাজার টাকা করে দিয়েছিলও। কিন্তু আজকের দিনে ৫০ হাজার টাকায় কী হয়? আমাদের মাথার উপরে এত ধার যে বাচ্চাদের খাইয়ে পরিয়ে মানুষ করব, বাড়ি বানাব, না ধার শোধ করব? অনেক কষ্ট করে অত ভাল একটা কাজ করলাম, সরকার আমাদের সাহায্য করলে আমাদেরও মেনস্ট্রিমে আসার সুযোগ হত। কিন্তু যেখানে ছিলাম আবার সেখানেই পৌঁছে গেলাম। আজ আমার বাড়িই ভেঙে দেওয়া হল, আমার বাচ্চারা দেখুন পথে বসে আছে।’

উপরের কথাগুলো কোনো সিনেমার সংলাপ নয়, নির্বাচনী বক্তৃতা নয়, পরাধীন দেশের মানুষের বিলাপও নয়। টিভি ক্যামেরার সামনে কথাগুলো বলেছেন ওয়কীল হাসান। মাত্র মাস তিনেক আগেই এই মানুষটি এবং তাঁর সঙ্গীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তরাখণ্ডের সিলকিয়ারা টানেল থেকে বার করে এনেছিলেন দুর্ঘটনায় আটকে পড়া ৪১ জন শ্রমিককে। ধন্য ধন্য করেছিলাম আপনি, আমি। পিঠ চাপড়াতে, মালা পরাতে ছুটে গিয়েছিলেন উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর ধামি স্বয়ং। মনে হয়েছিল এই র‍্যাট হোল মাইনারদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়েছে গোটা দেশ। দেখা গিয়েছিল, উদ্ধারকারীদের একটা বড় অংশ মুসলমান। সেই মুসলমান যাঁদের পোশাক দেখেই দেশের প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসবাদী বলে চিনতে পারেন। যাঁদের কথা বা কার্যকলাপ অপছন্দ হলেই পাকিস্তান চলে যেতে বলা আজকাল স্কুলের শিশুদের মধ্যেও চালু হয়ে গেছে। এঁরা সেই সম্প্রদায়ের লোক যাঁরা সম্প্রদায়গত পরিচিতির কারণেই ট্রেনে যেতে যেতে খুন হয়ে যান কোনো উর্দিধারী পুলিসের গুলিতে, গণপিটুনিতে মারা যান স্রেফ ফ্রিজে গোমাংস রাখা আছে সন্দেহে। যে উত্তরাখণ্ডের টানেল থেকে জীবন বাজি রেখে শ্রমিকদের উদ্ধার করেছিলেন, সেই উত্তরাখণ্ডেই মুসলমানদের বহুদিনের বাসা খালি করে চলে যেতে হয় হুমকির মুখে।

এই সমস্ত কথা জানা সত্ত্বেও যখন সিলকিয়ারার উদ্ধারকার্যের পর অনেকে উল্লেখ করছিলেন যে উদ্ধারকারীরা অনেকেই মুসলমান, তখন অনেক উদারপন্থী এবং বামপন্থীও নাক সিঁটকে বলেছিলেন – আহা, সবেতে ধর্ম টেনে আনা কেন! দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি পাড়ার অন্য সমস্ত বাড়ি অক্ষত রেখে স্রেফ তাঁর বাড়িটাকেই বেআইনি জমিতে তৈরি বলে দেগে দিয়ে ভেঙে ফেলার পর ওয়কীল প্রশ্ন তুলেছেন তিনি মুসলমান বলেই কি এই কাণ্ড করা হল?

ইন্ডিয়া টুডে চ্যানেলের সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাই আর দিল্লির প্রাক্তন লেফটেন্যান্ট গভর্নর নজীব জঙ্গের সঙ্গে কথোপকথনে তিনি বলেছেন, তাঁর বাড়ির গোটা এলাকা বহুকাল আগেই অনুমোদিত হয়ে গেছে। সেখানে স্কুল আছে, আইনি পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হয়েছিল এবং বাড়ি তৈরি করতে ব্যাঙ্ক ঋণও দিয়েছিল। ২০০৮ সালেই ওই এলাকাটিকে আইনি কলোনির শংসাপত্র দেওয়া হয় বলে ওয়কীল জানিয়েছেন।

তাহলে বেছে বেছে ওয়কীলের বাড়িই কেন ভাঙা হল? কেউ কৈফিয়ত দেয়নি। অমৃতকালের ভারতে কেউ কৈফিয়ত দেয় না। দিল্লির বিজেপি সাংসদ মনোজ তিওয়ারি বলেননি যে কী করে আইনি এলাকার মধ্যে হঠাৎ একটি বাড়ি বেআইনি হল। কিন্তু হইচই পড়ে যাওয়ায় জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার অধীনে ঝুপড়ির বাসিন্দাদের যে ঘর দেওয়া হয়, তেমনই একটা ঘর ওয়কীলের পরিবারকে দেওয়া হবে। ওয়কীল অবশ্য বলে দিয়েছেন, তিনি ঠিক ওখানেই তাঁর বাড়ি ফেরত চান। অন্য কোথাও অন্য কোনোখানে সরকারের দাক্ষিণ্যে কোনো ঘরবাড়ি তিনি চান না। পথে বসে যাওয়া মানুষের পক্ষে জেদ ধরে রাখা শক্ত। বিশেষত যখন তিনি যুগপৎ গরিব এবং সংখ্যালঘু। তাই ওয়কীল নিরুপায় হয়ে কিছুদিন পরে সরকারের দেওয়া বাড়িতে সপরিবারে উঠে গেলে তাঁকে দোষ দেওয়া যাবে না। হয়ত সেটাই অনিবার্য। কিন্তু ওয়কীলের প্রতি যে ব্যবহার করা হল তার আলোকে দেশের শাসনব্যবস্থা তথা গণতন্ত্র নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন।

ধরে নেওয়া যাক, ওয়কীল জীবনে একটিও নায়কোচিত কাজ করেননি। সিলকিয়ারা টানেলের উদ্ধারকার্যে তাঁর কোনো ভূমিকা ছিল না। তিনি কেবল একজন ছাপোষা ভারতীয়। তাহলেই কি দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির কাজটা বৈধ হয়ে গেল? নাজীব জঙ্গ কিন্তু বলেছেন কোনো অবৈধভাবে নির্মিত বাসস্থান ভেঙে দিতে হলে বসবাসকারীদের অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হয় – আইনে পরিষ্কার লেখা আছে।

মুশকিল হল, গত কয়েক বছরে আমরা এমন বুলডোজারপ্রেমী হয়ে উঠেছি, ক্ষমতাশালীকে অভ্রান্ত ভাবা এমন স্বভাবে পরিণত হয়েছে যে আইন মানা হয়েছে কি না হয়েছে তা নিয়ে আর আমরা ভাবি না। প্রকাশ্যে কারোর নামে একটা অভিযোগ করে দিলেই হল। সকলেই ধরে নিই, অভিযোগটা সত্যি। অর্থাৎ ডিডিএ যখন বলছে, সাংসদ যখন বলছেন, তখন ওয়কীলের বাড়িটা নিশ্চয়ই বেআইনি ছিল। অভিযুক্ত মাত্রেই অপরাধী বলে ধরে নেওয়ার এই মানসিকতার চাষ করা হয়েছে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে, সঙ্গত করেছে দেশের সংবাদমাধ্যম। ভুয়ো ভিডিও, ভুয়ো বলে ইতিমধ্যেই প্রমাণিত ভিডিও, চালিয়ে প্রমাণ করে দেওয়া হয়েছে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাশ্মীরের স্বাধীনতা চেয়ে স্লোগান দিয়েছে ছাত্রছাত্রীরা।

সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন এক বেঞ্চ এক মামলায় বলেছে, এখন থেকে অভিযুক্তের সম্পর্কে আইনের চিরাচরিত মূল নীতি – ‘নিঃসংশয়ে অপরাধী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ’ – থেকে সরে আসতে হবে; যদি ট্রায়াল কোর্টে অভিযুক্ত দোষী সাব্যস্ত হয়। এনকাউন্টারে অভিযুক্তদের মেরে ফেলা এবং আন্দোলনকারীদের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া তো নিয়মে পরিণত করা হয়েছে বহু রাজ্যে। উত্তরপ্রদেশ সরকার এর জন্যে সুপ্রিম কোর্টের কাছে বকুনি খাওয়ার পরেও বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে প্রতিবাদী স্বর স্তব্ধ করতে বুলডোজার চলছেই। এমনকি তৃণমূলশাসিত পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার চণ্ডীতলাতেও বুলডোজার দিয়ে বিরোধীদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল গতবছর। বুলডোজার ন্যায়কে বৈধতা দিতে মাঠে নেমেছেন বিচারপতিরাও। নিজের রায়ের থেকেও আক্রমণাত্মক বাণী দেওয়ার জন্যে বেশি বিখ্যাত কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অভিজিৎ গাঙ্গুলি গতবছর এক বেআইনি নির্মাণ সংক্রান্ত মামলায় সগর্বে বলেছিলেন, ‘দরকার পড়লে যোগী আদিত্যনাথের থেকে কিছু বুলডোজার ভাড়া করুন।’

অর্থাৎ আইনের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদনের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, নাগরিকের মৌলিক অধিকার – কোনোকিছুই আর আজকের ভারতে ধ্রুব সত্য নয়। একবার প্রশাসনের কোপে পড়লে আমি নির্দোষ, একথা প্রমাণের দায়িত্ব যে অভিযুক্ত তারই উপরে এসে পড়ছে ক্রমশ।

ফলে ওয়কীলের যা হয়েছে, তাঁর নাবালক ছেলেমেয়েরা যা সহ্য করেছে, তা কাল যে কোনো কারণে আমাদের যে কাউকে সহ্য করতে হতে পারে। ওয়কীল তবু একটা নায়কোচিত কিছু করেছিলেন, তাই গোদি মিডিয়াকেও তাঁর খবর দেখাতে হচ্ছে। দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর বিনয় কুমার সাক্সেনা, সাংসদ মনোজ প্রমুখকে অন্তত মুখে বলতে হচ্ছে – ব্যাপারটা দুঃখজনক, ওঁকে ঘর দেওয়া হবে ইত্যাদি। আমার, আপনার বেলায় তাও হবে না। দেশের বহু মানুষের ইতিমধ্যেই সেই দশা হয়েছে।

যাঁরা ভাবছেন প্রতিবাদে, প্রতিরোধে থাকেন না বলে বেঁচে যাবেন অথবা মুসলমান নন বলে বেঁচে যাবেন, তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার কানপুর দেহাতের এক ছোট গ্রামের বাসিন্দা প্রমীলা দীক্ষিত আর তাঁর মেয়ে নেহার কথা। তাঁদের বাড়িও অবৈধ বলে বুলডোজার দিয়ে ভাঙতে গিয়েছিল প্রশাসন। এক পক্ষ বলে তাঁরা প্রতিবাদে গায়ে আগুন দেন, আরেক পক্ষের বক্তব্য, প্রমীলা আর নেহা বাড়ির ভিতরে থাকা অবস্থাতেই তাঁদের কুঁড়ে ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয় উচ্ছেদ করতে আসা প্রশাসন। সম্ভবত এঁরা ব্রাহ্মণ বলেই উত্তরপ্রদেশ পুলিস আধিকারিকদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছিল। কিন্তু তাতে তো আর মরা মানুষ বেঁচে ওঠে না। সুতরাং ওয়কীলের সহমর্মী না হওয়া মানে, বুলডোজার ন্যায়কে সমর্থন করা মানে ঘুঁটে পুড়তে দেখে গোবরের মত হাসা।

সম্প্রতি জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠির একটি ভিডিও প্রচণ্ড ভাইরাল হয়েছে। সেখানে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ভারত ক্রমশ একনায়কতন্ত্রে পরিণত হচ্ছে কিনা। তিনি এমন কোনো তথ্য দেননি যা সচেতন ভারতীয়রা এতদিন জানতেন না। বরং অশনি সংকেতগুলোকে একত্র করাই এই ভিডিওতে ধ্রুবের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। তবে তিনি একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন – দেশে ভোট হচ্ছে মানেই গণতন্ত্র আছে এমন মনে করা ভুল।

উত্তরপ্রদেশে, দিল্লির জাহাঙ্গীরপুরী, খজুরি খাসে বা পশ্চিমবঙ্গের চণ্ডীতলায় – কোথাও নির্বিচারে বুলডোজার চলাই গণতন্ত্রের লক্ষণ নয়। ওয়কীল, মুন্নারা পথে বসলে গণতন্ত্র টেকে না। মুকেশ আম্বানির ছেলের বিয়ে গণতন্ত্র ছাড়াও হতে পারে।

ধৈর্য থাকলে ভেবে দেখতে পারেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সর্বদা গরিব মানুষের বাসস্থানই কেন বেআইনি গণ্য হয়? আর বড়লোকের ছেলের বিয়ের জন্যে কেন রাতারাতি ছোট বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অনুমোদন পেয়ে যায়?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

বাংলার ক্রিকেটের রূপ খুঁজিতে যাই না আর

কলকাতা নাইট রাইডার্স আইপিএল জেতায় রাজ্যের রাজধানীতে এ রাজ্যের করদাতাদের টাকায় ঘটা করে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছিল। তাতে বাংলার ক্রিকেটের কী উপকার হয়েছে?

শিল্পপতি সৌরভ গাঙ্গুলির শালবনির প্রস্তাবিত ইস্পাত কারখানা সফল হবে কিনা তা ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল কর্তা সৌরভের ভিশন ২০-২০ প্রোজেক্ট যে মুখ থুবড়ে পড়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সিএবি প্রধান হয়েই ভারতের সর্বকালের সেরা ক্রিকেট অধিনায়কদের অন্যতম সৌরভ বাংলার ক্রিকেটকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতির জোরে ব্যাটারদের জন্যে ভাঙ্গিপুরাপ্পু ভেঙ্কটসাই লক্ষ্মণ, জোরে বোলারদের জন্যে ওয়াকার ইউনিস, স্পিনারদের জন্যে মুথাইয়া মুরলীথরন বাংলা দলের নেট আলো করে ছিলেন বেশ কিছুদিন। কিন্তু সেসবই ক্ষণিকের হাসিকান্না। তাতে বাংলার ক্রিকেট দলের বা রাজ্যের ক্রিকেটের কোনো দীর্ঘমেয়াদি লাভ হয়েছে বলে এই ২০২৪ সালের শেষ শীতে এসে তো দেখা যাচ্ছে না। এই বাক্য এমন একটা সময়ে লিখতে হচ্ছে যখন ভারতীয় দলে একসঙ্গে দুজন বাংলা দলের বোলার রয়েছেন, রাঁচি টেস্টে আকাশ দীপের অভিষেকও মন্দ হয়নি। মহম্মদ শামি এই মুহূর্তে চোটের জন্যে বিশ্রামে থাকলেও দীর্ঘকাল ধরে তিনি ভারতীয় বোলিংয়ের স্তম্ভ। ফিরে এলে অদূর ভবিষ্যতে যশপ্রীত বুমরার বিশ্রামের ম্যাচে যদি বাংলার তিন পেসারকে একসঙ্গে খেলতে দেখা যায় তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অভিমন্যু ঈশ্বরণ যে হারে রান করে চলেছেন ঘরোয়া ক্রিকেটে এবং ভারত এ দলের হয়ে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে তাঁকেও ভারতীয় দলে খেলতে দেখা যেতেই পারে। তাহলে বাংলার ক্রিকেটের কোনো লাভ হয়নি বলছি কেন? কারণ একাধিক।

এগুলো ব্যক্তিগত সাফল্য মাত্র। শামি, মুকেশ কুমার আর আকাশকে রঞ্জি ট্রফিতে বাংলার হয়ে একসঙ্গে খেলতে দেখা যাবে – এমন সম্ভাবনা কম। ভারতীয় দল এত বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে যে একবার জাতীয় দলে থিতু হয়ে গেলে রঞ্জি ম্যাচ খেলার আর অবকাশ থাকে না। তার উপর সময়, সুযোগ থাকলেও ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার আগ্রহ এখন ক্রিকেটারদের মধ্যে ক্রমহ্রাসমান। আইপিএলে নিয়মিত হয়ে যেতে পারলে তো কথাই নেই। বাংলার প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের ঈশান কিষণ তো টেস্টও খেলতে চাইছেন না। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের মাঝপথ থেকে পলাতক ছবির অনুপকুমার হয়ে গেলেন। ঝাড়খণ্ড দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও তাঁকে খুঁজে পাচ্ছেন না। ফলে রাজ্য থেকে কোনো ক্রিকেটার জাতীয় দলে সুযোগ পেলে এখন বেল পাকলে কাকের কী বলাই সমীচীন। দেখা দরকার, রাজ্য দল সাফল্য পাচ্ছে কি? সে প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক।

শীত শেষ হওয়ার আগেই বাংলার রঞ্জি দলের অভিযান শেষ হয়ে গেছে এবারে। এলিট গ্রুপ বি-তে তৃতীয় স্থানে শেষ করেছে বাংলা। ফলে নক আউট পর্যায়ে পৌঁছনো হয়নি। গত মরসুমে ফাইনালে পৌঁছে থাকলেও সৌরাষ্ট্রের কাছে শোচনীয় হার হয়েছিল। তার আগেরবার সেমিফাইনালে মধ্যপ্রদেশের বিরুদ্ধেও একই ঘটনা ঘটে। অতিমারীর আগের শেষ রঞ্জি ট্রফিতেও ফাইনালে সৌরাষ্ট্রের কাছেই ইনিংসে হার হয়েছিল বাংলার। অর্থাৎ ঘরোয়া ক্রিকেটে যে দলগুলো ধারাবাহিকভাবে সফল, তাদের সামনে পড়লেই ব্যবধান অনেকখানি হয়ে যাচ্ছে। মুম্বাইয়ের মত ঘরোয়া ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা দল দূর অস্ত, কর্ণাটক বা তামিলনাড়ুর স্তরেও পৌঁছয়নি বাংলা। সাফল্যের লেখচিত্র ঊর্ধ্বগামী হওয়ার বদলে নিম্নগামী বললেও ভুল হয় না। পঞ্চাশ ওভারের প্রতিযোগিতা বিজয় হাজারে ট্রফিতেও সাম্প্রতিককালে বলার মত সাফল্য নেই। কুড়ি ওভারের মুস্তাক আলি ট্রফি নিয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন, কারণ ওটা বস্তুত আইপিএলের প্রতিভা অন্বেষণ পরীক্ষা। সেখান থেকে আকাশ দীপ, শাহবাজ আহমেদদের ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো খুঁজে নিচ্ছে।

বাংলার ক্রিকেটের আরেকটা দিকও আলোচনার যোগ্য। শামি, মুকেশ, আকাশরা নিজেদের রাজ্যে ক্রিকেট খেলার পরিবেশ না পেয়ে কলকাতায় এসে পরিশ্রম করে জাতীয় দলে খেলার যোগ্যতা অর্জন করছেন। অথচ সৌরভের পর ঋদ্ধিমান সাহা ছাড়া কোনো স্থানীয় ক্রিকেটার কিন্তু ভারতীয় দলে নিয়মিত হয়ে উঠতে পারেননি। তাহলে নয়ের দশক থেকে সৌরভের দৃষ্টান্তে পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে ওঠা কোচিং সেন্টারগুলো কী অবদান রাখল? না, বাংলা পক্ষ মার্কা বাঙালির প্রতি বঞ্চনার অভিযোগ তুলছি না। বলছি ছেলের কিটব্যাগ বয়ে নিয়ে যাওয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাঙালি বাবা-মায়েরা ভিনরাজ্য থেকে আসা ছেলেগুলোকে দেখে শিখতে পারেন – সাফল্যের খিদে আসলে কী জিনিস এবং পরিশ্রম কাকে বলে।

পরিশ্রমী বাঙালিকে অবশ্য বাঙালিরাও যে প্রাপ্য সম্মান দেন তা নয়। নইলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটে মনোজ তিওয়ারির চেয়ে অনেক বেশি সফল ঋদ্ধিমান সাহাকে বাংলা ছেড়ে ত্রিপুরায় চলে যেতে হত না। তাঁর অপরাধ কী ছিল? অনেক ভেবেও সৌরভ-ঘনিষ্ঠ এক সাংবাদিককে চটিয়ে ফেলা ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া যাবে না। অথচ মনোজ গত মরসুমের শেষে আর খেলব না বলায় কান্নাকাটি পড়ে গিয়েছিল। শেষমেশ সিএবি সচিব স্নেহাশিস গাঙ্গুলির অনুরোধে তিনি এ মরসুমেও খেলতে রাজি হয়ে যান। তরুণ ক্রিকেটারদের উঠে আসার সুযোগ দিতে হবে ইত্যাদি যুক্তি কারোর মাথায় আসেনি। এবারে বিহারের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচ খেলে চূড়ান্ত অবসর ঘোষণা করার পর মনোজকে রীতিমত সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছে। অবশ্য ঋদ্ধিমান এমন ব্যবহার আশা করতে পারেন না। তাঁর চোদ্দ পুরুষে কেউ কখনো সিএবি কর্তা ছিলেন না। তার উপর তিনি কলকাতার অভিজাত পরিবারের সন্তান নন। তিনি হলেন শিলিগুড়ির ছেলে, যেখান দিয়ে কলকাতার বাবু বিবিরা দার্জিলিং, কালিম্পং, গ্যাংটক বেড়াতে যান। খেলতে খেলতেই রাজনীতিতে নেমে পড়ে কেউকেটা হতে পারলে অন্য কথা ছিল। অন্যথায় ঋদ্ধিমান বাংলার ক্রিকেটের কতটা সেবা করেছেন না করেছেন তার হিসাব করা বৃথা।

আরও পড়ুন কুস্তিগীরদের আন্দোলন: মহাতারকাদের মহাকাপুরুষতা

আরও একটা কথা ভেবে দেখার মত। শাহরুখ খান ধুতি পাঞ্জাবি পরে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে মালা দিয়ে, ভুল বাংলায় থিম সং গেয়ে ইডেন উদ্যানে যে দলটার তাঁবু ফেলেছেন, সেই কলকাতা নাইট রাইডার্সকে দিয়ে বাংলার ক্রিকেটের কী উপকার হচ্ছে? ওটা কাল রাজকোট নাইট রাইডার্স বা অযোধ্যা নাইট রাইডার্স হয়ে গেলেই বা কী ক্ষতি হবে? সে দল আইপিএল জেতায় রাজ্যের রাজধানীতে এ রাজ্যের করদাতাদের টাকায় ঘটা করে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছিল। তাতে বাংলার ক্রিকেটের কী উপকার হয়েছে? আইপিএল যখন চালু হয়, তখন বলা হয়েছিল ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো যে এলাকায়, সেই এলাকার ক্রিকেটের উন্নতিকল্পে তারা কাজ করবে। সে কাজের কোনো হিসাব আছে? রাজ্য সরকারের এ রাজ্যের সমস্ত খেলায় যেরকম কড়া নজর, তাতে কলকাতা নাইট রাইডার্সের জবাবদিহি চাইতে পারে কিন্তু।

মনোজ নিজেই মন্ত্রিসভার সদস্য। সুতরাং চাইলে স্বয়ং এ কাজ করতে পারেন। কিন্তু বাংলার ক্রিকেটের যে আর গুরুত্ব নেই তা তো তিনি ভালই বুঝে ফেলেছেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দশ হাজারের বেশি রানের মালিক মনোজ বিদায়কালে বলেছেন, তরুণ খেলোয়াড়রা আইপিএলকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে হতাশ হয়ে এক্সে পোস্ট করে ফেলেছিলেন যে পরের মরসুম থেকে রঞ্জি ট্রফি বন্ধই করে দেওয়া উচিত। তার জন্যে বোর্ডকে জরিমানাও দিতে হয়েছে। কিন্তু কথাটা তো ভুল বলেননি। আগামী দিনে বাংলার ক্রিকেট বলে আদৌ কিছু থাকবে কিনা কে জানে? সুতরাং আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজকে চটিয়ে কী লাভ? তাদের বিরুদ্ধে কিছু করে, লড়েই জেতার আশা নেই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

স্রেফ কৃষকদের আটকাতে দুর্ভেদ্য দিল্লি!

গণতান্ত্রিক দেশের রাজধানীতে রবারের বুলেট চলতে দেখার অভ্যাস ভারতের নাগরিকদের নেই। সেটা আছে কাশ্মীর উপত্যকার মানুষের। কাশ্মীরকে শান্ত করে দেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন সম্রাট মোদী। দেখা যাচ্ছে, কাশ্মীরের মত ঘটনা খোদ দিল্লিতে ঘটছে।

দুর্গকে দুর্ভেদ্য করে তুলতে চারপাশে পরিখা কেটে দেওয়ার প্রথা সুপ্রাচীন। ইউরোপ, এশিয়া – সব জায়গার রাজারাই এই পন্থা অবলম্বন করতেন। বর্তমানে কেন্দ্রে সরকার চালাচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের ঘোর অপছন্দের মোগল সম্রাটরাও একাজ করেছিলেন। লালকেল্লাকে বেষ্টন করে সেই পরিখা আজও আছে, যদিও এই শীতে সেই পরিখা শুকনো। লালকেল্লার প্রবেশদ্বারে আজ দাঁড়িয়ে আছেন নরেন্দ্র মোদী। সেলফি পয়েন্টে বসে, দাঁড়িয়ে তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার জন্যে সময়ও ব্যয় করেন অনেক পর্যটক। মোদী ছবির মত, বা সম্রাটের মতই নীরব, এবং তাঁর রাজধানী দিল্লিকে দুর্ভেদ্য করতে এই মুহূর্তে দুর্গের মতই ঘিরে ফেলেছে দিল্লি পুলিস। পার্শ্ববর্তী হরিয়ানা, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ থেকে যাতে দিল্লিতে ঢোকা না যায় সেজন্য লম্বা লম্বা পেরেক, কংক্রিটের বাধা, কাঁটাতারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কে আসছে দিল্লি আক্রমণ করতে? সুদূর পারস্য থেকে নাদির শাহ? আফগানিস্তান থেকে আহমদ শাহ আবদালী? গজনীর সুলতান মামুদ? অ্যাটিলা দ্য হুন? অ্যালারিক দ্য গথ? না। আসছেন এই দেশের মাটিতে জন্মানো, বেড়ে ওঠা এবং এদেশেরই মাটিতে ফসল ফলানো কৃষকরা। কী জন্যে আবার দিল্লি অভিমুখে চলেছেন কৃষক সংগঠনের আন্দোলনকারীরা? সরকারকে উৎখাত করতে নয়, নিজেদের বহু পুরনো দাবি আদায় করতে। সেই দাবিগুলোর মধ্যে আছে এম এস স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার দাবি। এই সেই স্বামীনাথন, যাঁকে মাত্র কয়েকদিন আগে ভারতরত্ন বলে ঘোষণা করেছে মোদীরই সরকার। তাহলে কৃষকদের ট্র্যাক্টর নিয়ে দিল্লি শহরে ঢুকতে দিতে আপত্তি কিসের? এই কৃষকদের বন্দুক দেখিয়ে লাভ হয় না, ইডি, সিবিআই লেলিয়ে দিয়ে দল ভাঙানোর উপায় নেই, এঁরা পথে নেমে পড়লে দাবি আদায় করে তবেই বাড়ি ফেরেন – এই কি তবে আতঙ্কের কারণ?

মাত্র দুটো শীত কেটেছে, তারপরেই আবার পথে নেমেছেন দেশের কৃষকরা। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে সংসদে পাস করা তিনটে নতুন কৃষি আইন বাতিল করার দাবিতে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা অগ্রাহ্য করে ২০২০ থেকে ২০২১ দিল্লির রাস্তায় বসেছিলেন আন্দোলনকারী কৃষকরা। প্রবল প্রতাপান্বিত সরকার প্রথমে তাঁদের দাবিতে আমল দিতে চায়নি, তারপর আলোচনায় বসেছে, একইসঙ্গে বশংবদ প্রচারমাধ্যমকে দিয়ে দেশের বাকি মানুষের কাছে আন্দোলনকারীদের ভণ্ড, সন্ত্রাসবাদী, দেশবিরোধী ইত্যাদি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। বহু কৃষক সেই দীর্ঘ আন্দোলনে থাকতে থাকতে পথেই প্রাণ হারিয়েছেন। উত্তরপ্রদেশের লখিমপুর খেরিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ছেলের গাড়ি চারজন কৃষককে পিষে দিয়েছে। কিন্তু আন্দোলন থামেনি। কৃষকদের ঘিরে ফেলতে সরকারের ঝুলি থেকে ব্যারিকেড, কাঁটাতার বেরিয়েছে তখনই। কিন্তু কৃষকরা পিছু হটেননি, নিজেদের দাবিতে অনড় থেকেছেন এবং শেষপর্যন্ত বিরোধী দলের সাংসদরা সংখ্যার কারণে সংসদে যে আইনগুলো পাস হওয়া আটকাতে পারেননি, সেগুলোকে বাতিল করিয়ে তবেই দিল্লি ছেড়েছেন। আর ২-৩ মাসের মধ্যেই নির্বাচন। এই সময় কৃষকদের চাপের কাছে ফের মাথা নোয়াতে হলে সম্রাট মোদীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ক্ষমতায় ফেরার পথে মাথা তুলে দাঁড়াবে কাঁটা – একথা ভেবেই কি কেন্দ্রীয় সরকার আক্রান্ত?

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, ১৪ ফেব্রুয়ারির দিল্লি অভিযানে হরিয়ানার কৃষকদের যোগ দেওয়া আটকাতে সে রাজ্যের বিজেপি সরকারের পুলিস এলাকায় এলাকায় হুমকি দিচ্ছে, যারা আন্দোলনে যাবে তাদের পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা হবে। আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে তাদের বিরুদ্ধে।

হরিয়ানা পুলিস ড্রোন থেকে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার মহড়া দিয়েছে। সে মহড়া কাজে লাগানো হয়েছে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে, শম্ভু সীমান্তে ১৪ ফেব্রুয়ারি সকালেও। চালানো হয়েছে জলকামান, এমনকি রবারের বুলেটও।

আরও পড়ুন ক্রিকেটার তুমি কার?

গণতান্ত্রিক দেশের রাজধানীতে রবারের বুলেট চলতে দেখার অভ্যাস ভারতের নাগরিকদের নেই। সেটা আছে কাশ্মীর উপত্যকার মানুষের। কাশ্মীরকে শান্ত করে দেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন সম্রাট মোদী। দেখা যাচ্ছে, কাশ্মীরের মত ঘটনা খোদ দিল্লিতে ঘটছে। আসলে সরকারের অপছন্দের কথা বললেই তার বিরুদ্ধে চলবে যাবতীয় অস্ত্র। জায়গাটা কাশ্মীর হোক, মণিপুর হোক আর দিল্লিই হোক। কাশ্মীরে না হয় ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের বিপদ আছে, মণিপুরে আছে মেইতেই বনাম কুকি সংঘর্ষ। দিল্লিতে তো কৃষকরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লড়তে আসছিলেন না। তাহলে এত বাধা তৈরি করা কেন? কার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে বলে সন্দেহ করছে সরকার? জানার কোনো উপায় নেই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর বলেছেন, হিংসায় কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। কৃষকদের আলাপ আলোচনা করা উচিত। সরকার আলোচনা করতে চায়, করছেও। তিনি অবশ্য বলেননি, আলোচনা করতে হলে দিল্লি শহরকে দুর্গম গিরি কান্তার মরু করে তুলতে হবে কেন? কেনই বা আন্দোলনকারীদের আক্রমণ করতে হবে?

গত দুদিনের ঘটনাবলী থেকে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যেও উঠে আসছে একগুচ্ছ প্রশ্ন। বিভিন্ন রাজ্যের, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের, নানা আদর্শের কৃষকরা তাঁদের দাবির ভিত্তিতে একজোট হয়ে এত আক্রমণের সামনেও এক হয়ে হার-না-মানা আন্দোলন করতে পারেন। অথচ বিরোধী দলগুলো পারে না কেন? তাদের সরকারবিরোধিতা কেবল কিছু বক্তৃতা, যাত্রা আর নির্বাচনে আসন ভাগাভাগিতে সীমাবদ্ধ থেকে যায় কেন? দেশের বিভিন্ন অংশের মানুষের অসন্তোষকে পুঞ্জীভূত করে গণআন্দোলনের রূপ দেওয়ার কাজে খামতি থেকে যাচ্ছে কেন? যে সরকার কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে বহিঃশত্রুর মত ব্যবহার করে, পেশিশক্তির পূর্ণ ব্যবহার করে, তাকে স্রেফ নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি আর আসন সমঝোতা করে হারিয়ে দেওয়া যাবে – এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে কী করে দিন কাটাচ্ছেন ভারতের বিরোধী নেতৃবৃন্দ?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

দুঃসময়ের পাঠ: ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা

ধর্মকে ধ্বজা হিসাবে ব্যবহার করার লোক বা তাকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করার লোক সেই মহাভারতের যুগেও ছিল। তারপরেও কয়েক হাজার বছর ধরে মনুষ্যত্ব মরে যায়নি, ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা সম্ভব হয়েছে, অতএব ভবিষ্যতেও হওয়া সম্ভব – এ বই এই ভরসাটুকু জোগায়।

এমন দেশ বা জাতি নাই, যাহাতে ভগবান তাহাদের জন্য কোনো ধর্মগুরুকে পাঠান নাই।

হিন্দুস্থান কে দো পয়গম্বর, রাম ঔর কৃষ্ণ।

হিন্দুদের কোনো ধর্মগ্রন্থে আছে কথাগুলো? নাকি কোনো হিন্দু ধর্মগুরু বলেছেন?

কোনোটাই নয়। প্রথম বাক্যটা আছে কোরান শরীফে, আর ওই বাক্যকে আশ্রয় করেই দ্বিতীয় বাক্যটা উচ্চারণ করেছিলেন নিজামুদ্দীন আউলিয়ার দরগার হাফিজ হুসেন নিজামী।

উদার, ধর্মনিরপেক্ষ, শিক্ষিত হিন্দুদের আড্ডাতেও বারবারই উঠে আসে একটা কথা – হিন্দুধর্ম অনেক উদার, ইসলামে কড়াকড়ি অনেক বেশি। তাই মুসলমানদের অনেকে উদার হলেও, ওদের মধ্যে গোঁড়ামি বেশি। হিন্দু পরিবারে জন্মে একথা বারবার শুনতে শুনতে দুরকম প্রতিক্রিয়া হওয়া সম্ভব। এক, বদ্ধমূল ধারণা হয়ে যাওয়া যে কথাটা ঠিক। দুই, কথাটা ঠিক কিনা খুঁজে দেখার ইচ্ছা তৈরি হওয়া। দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া হলেও ব্যাপারটা নেহাত সহজ নয়। হিন্দুধর্মের কোনো একমেবাদ্বিতীয়ম পবিত্র গ্রন্থ নেই, আব্রাহামের সন্তানদের ধর্মগুলোর (জুডাইজম, খ্রিস্টধর্ম, ইসলাম) ক্ষেত্রে সে সুবিধা আছে। কিন্তু কেবল কোরান পড়লেই ইসলামের সব জানা হয়ে যায় না (এবং হাদিশ পড়লেও নয়), কেবল বাইবেল পড়লেই খ্রিস্টধর্মের আদ্যোপান্ত আয়ত্ত হয় না। পৃথিবীর যে কোনো ধর্মের আগাপাশতলা জানতে পড়তে হয় প্রচুর বইপত্র, লেগে যায় গোটা জীবন। আমাদের অনেকের জীবনেরই আর বড়জোর অর্ধেক বাকি আছে। তাহলে আজকের সর্বগ্রাসী বিদ্বেষ, ভুয়ো ইতিহাস, ভুয়ো খবরের যুগে সত্য যাচাইয়ের উপায় কী? ভারতের প্রধান দুটো ধর্মীয় সম্প্রদায় – হিন্দু আর মুসলমান। তাদের মধ্যে সংঘাতের যে অনস্বীকার্য দীর্ঘ ইতিহাস, তার মূল একেবারে ভাবনার জায়গাতেই কিনা, তা জানার উপায় কী? পাঠ্য ইতিহাসে যেটুকু পড়েছিলাম আমরা, সেটুকু তো পরীক্ষার খাতায় উগরে দেওয়ার জন্যে মুখস্থ করা। ফলে পরীক্ষা দেওয়ার পাট চুকে যাওয়া মাত্রই বেমালুম ভুলে গেছি। এমতাবস্থায় আমার মত অপণ্ডিতদের একটাই উপায় – যাঁরা আজীবন এই প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তাঁদের শরণাপন্ন হওয়া। ক্ষিতিমোহন সেন তেমনই একজন। তাঁর ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা বইটার নাম শুনেছি অনেক, কিন্তু চোখে দেখিনি আগে। যাঁদের লেখায় এই বইয়ের উল্লেখ পেয়েছি তাঁরা অনেক দূরের মানুষ। ফলে ধারণা ছিল, নির্ঘাত ওটা ইয়া মোটা একখানা বই এবং অমন একজন পণ্ডিতের লেখা যখন, তখন পড়তে গেলে মাথা চুলকেই দিন কেটে যাবে। ফলে এবারের কলকাতা বইমেলায় যখন ন্যাশনাল বুক এজেন্সির স্টলে ঢুকে আবিষ্কার করলাম বইটা দু আঙুলেই তুলে ফেলা যায়, পাতার সংখ্যা মাত্র ১১১, তখন কিনে ফেলতে দেরি করিনি।

পড়লাম, মনের অনেক অন্ধকার দূর হল। কিন্তু এত প্রসিদ্ধ ইতিহাস বিষয়ক বইয়ের আলোচনা আমার লেখা উচিত হবে কিনা, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম। দ্বিধা কাটল এই বইয়ের প্রকাশকালের সঙ্গে আমার কালের মিল উপলব্ধি করে। ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার মধ্যে ১৯৪৭ সালে ভারত দ্বিখণ্ডিত এবং স্বাধীন হয়, ১৯৪৮ সালে নাথুরাম গডসের গুলিতে খুন হন মহাত্মা গান্ধী আর ১৯৪৯ সালে স্বাধীন ভারত হিন্দুরাষ্ট্র না হয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান গ্রহণ করে। সেবছরই প্রকাশিত হয় এই বই। বস্তুত, পরিশিষ্টের ‘মহাবীর ভীষ্ম’ শীর্ষক লেখার উপরে ছোট অক্ষরে লেখা আছে:

মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুসংবাদ পাইবার অব্যবহিত পরে লেখা। যে ছাত্রটি দুঃসংবাদ বহন করিয়া লেখককে সঙ্গে করিয়া আশ্রম-কেন্দ্র, গৌর-প্রাঙ্গণে লইয়া গিয়াছিলেন, অল্প কয়েক বৎসরের মধ্যে তিনিও এক উন্মত্ত আততায়ী দলের হস্তে নিহত হন। ছাত্রটি তখন দূর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত অধ্যাপক।

লক্ষ করে দেখলাম, সেইসময় দাঁড়িয়ে লেখা এই বইয়ের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত প্রায় সবটাই আমার সময়ে উদ্ধৃতিযোগ্য। অতএব যোগ্যতর আলোচকের সন্ধানে কালক্ষেপ না করে লিখে ফেলাই কর্তব্য। এই লেখার লক্ষ্য আমার মত ইতিহাসে অদীক্ষিত পাঠকরা – ইতিহাসবোধহীন জীবনযাপন যাদের জীবনকে ক্রমশ বিপদসংকুল করে তুলছে – তাদের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ বইয়ের সন্ধান দেওয়া, বইটা পড়তে উস্কানি দেওয়া।

এই লেখার শুরুতে উদ্ধৃত লাইনগুলো ইসলাম ধর্ম এবং মুসলমানদের গোঁড়ামি সম্পর্কে বদ্ধমূল ধারণার পরিপন্থী। তবে ক্ষিতিমোহনের বইয়ের ঠিক ওই পাতাতেই আছে আরও কয়েকটি বাক্য, যা ওই ধারণার মূল ধরেই টান দেয়:

কুরান আরও বলেন, হজরতের পূর্বে যেসব মহাপুরুষ ধর্ম সম্বন্ধে যাহা কিছু উপদেশ দিয়া গিয়াছেন সেইসব সত্যও বিশ্বাস করিতে হইবে।

পূর্ববর্তী সব সত্যকে আরও দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করাই কুরানের কাজ।

ওই অধ্যায়েই কিছু পরে ক্ষিতিমোহন লিখছেন:

নানাজনে কুরানকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। ব্যাখ্যাতাদের ইমাম বলে। এই ব্যাখ্যানে হজরত প্রত্যেককেই প্রভূত স্বাধীনতা দিয়াছেন। তাঁহার নিজেরই কথা আছে যে, তাঁহার ধর্মে নানা যুক্তি অনুসারে তিয়াত্তরটি দল হইবে। তিনি বলিয়াছেন, আমার দলে যে মতের ভেদ হয় তাহা ভগবানেরই দয়া – ইখতিলাফু উম্মতি রহমতুন।

যে ধর্মগ্রন্থে ধর্মের প্রতিষ্ঠাতার জন্মেরও আগে অন্য যাঁরা যা উপদেশ দিয়েছেন তাও বিশ্বাস করতে বলা হয় এবং যে ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই মতভেদকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ বলে আখ্যা দেন, সেই ধর্মে মৌলিকভাবেই কড়াকড়ি বা গোঁড়ামি বেশি – এমনটা যে কেবল অজ্ঞানতাবশতই বলা সম্ভব তাতে সন্দেহ কী? তবে একথা অনস্বীকার্য যে কোনো ধর্মগ্রন্থে কী লেখা আছে তা দিয়ে মানুষের – বিশেষ করে অন্য ধর্মের মানুষের – খুব একটা কিছু এসে যায় না। এসে যায় সেই ধর্মের মানুষ কীভাবে ধর্মপালন করছেন তা দিয়ে। অনেকে এই যুক্তিতেই বলবেন, কোরানে যা-ই বলা থাক আর হজরত মহম্মদ যা-ই বলে থাকুন, বাস্তবে দেখা যায় মুসলমানরা অন্য ধর্ম সম্পর্কে মোটেই সহিষ্ণু নয়। ধর্মাচরণে মোটেই উদার নয়। একথাও যে সত্য নয়, ভারতবর্ষীয় মুসলমানদের ধর্মাচরণ যে যুগে যুগে এর উল্টোটাই প্রমাণ করেছে, তা এই বই পড়লে দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে যায়। অনেকে অবশ্য কিছুটা উদারতা দেখিয়ে বলে থাকেন – ভারতীয় মুসলমানরা পৃথিবীতে অনন্য। এখানে বিশেষত সুফিদের উদ্যোগে হিন্দু-মুসলমানের সাধনা মিলেমিশে যাওয়ায় তাঁরা উদার। কিন্তু আরব মুসলমানরা এরকম নয়। এই মতেরও মূলে আছে অজ্ঞানতা। যেন সুফিবাদ আকাশ থেকে টুপ করে ভারতেই পড়েছিল। ক্ষিতিমোহন ইসলামের জন্মলগ্ন থেকে একের পর এক সাধকের উল্লেখ করে তাঁদের উদারতা দেখিয়েছেন। তার মধ্যে যাঁর কথা উদার, অনুদার নির্বিশেষে হিন্দুদের সবচেয়ে চমৎকৃত করবে এবং গোঁড়া মুসলমানদের রুষ্ট করবে, তাঁর দৃষ্টান্তই নেওয়া যাক। তাঁর নাম অবু অল আলা মু-অররীর। ইনি মোটেই ভারতীয় নন। ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোতে এঁর জন্ম। ক্ষিতিমোহন লিখছেন তিনি বলতেন

পৌত্তলিকতা ছাড়িয়াছ বলিয়া তো গর্ব কর। ভাবিয়া দেখিয়াছ কি, তুমি নিজে কত বড়ো পৌত্তলিক? বিশেষ-শাস্ত্র বিশেষ-গ্রন্থ বিশেষ-ভাষা বিশেষ-দেশ বিশেষ-দিন ও বিশেষ-দিককেই যদি একমাত্র পবিত্র মানো তবে তাহাও তো পৌত্তলিকতা। দেবপূজা ছাড়িয়া দেবালয় অর্থাৎ মসজিদেরই পূজা যদি কর তবেই বা কম পৌত্তলিকতা কি?

এ পর্যন্ত এসে পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন, ক্ষিতিমোহন কি বেছে বেছে মুসলমানদের উদারতার দৃষ্টান্তই তুলে ধরেছেন? নাকি আমিই তাঁর বই থেকে বেছে বেছে সেগুলো তুলে ধরছি? সম্ভবত এমন প্রশ্নের মোকাবিলা ক্ষিতিমোহনকেও করতে হত। তাই ‘মিলিত সাধনা’ অধ্যায়ে তিনি লিখছেন

হিন্দু-মুসলমান সাধনা এদেশে এমন যুক্ত হইয়া গিয়াছে যে রচনা দেখিয়া লেখক হিন্দু কি মুসলমান তাহা বলা অসম্ভব। দরাফ খাঁর রচিত সংস্কৃত গঙ্গাস্তব তো অতি নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণেরও নিত্যপাঠ্য।

আবার তুলসী সাহেব হাথরসীর জন্ম ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে বেদপরায়ণ মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ বংশে। যৌবনেই তিনি সন্ন্যাসী হইয়া যান। তাঁহার লেখা দেখিয়া মনে হয় যেন মুসলমানেরই লেখা। একটু নমুনা দেওয়া যাউক:

রোজা নিমাজ বাংগ অংদর মাহীঁ
আশীক মাশূক মিহর দিদা সাঈঁ।।

রোজা, নামাজ, নামাজের জন্য ডাক সবই অন্তরের মধ্যে। প্রেমিক, প্রেমাস্পদ, প্রেম, প্রেমময় স্বামীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ সবই আমাদের ভিতরে।

‘মিলিত সাধনা’ অধ্যায়ে ক্ষিতিমোহন এক নাতিদীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন, যা হিন্দুদের উদারতার তালিকা না মুসলমানদের উদারতার তালিকা তা বলা মুশকিল। গুজরাটের খোজা কাকাপন্থী ইমামশাহী মৌল-ইসলাম মতিয়া সংঘ; রাজপুতানার মেও, মিরাশি, লবানা, সখীসরবরের উপাসকদের কথা লিখেছেন। এঁদের বৈশিষ্ট্য হল এঁরা পুরোপুরি হিন্দু হয়েও মুসলমানি সাধনার সঙ্গে যুক্ত। এঁদের বাড়িতে নানা হিন্দু আচার, রামনবমী, জন্মাষ্টমী ইত্যাদি পালিত হয়। সামসী সম্প্রদায়ের লোকেরা গীতাও মানেন, মুসলমান গুরুদেরও মানেন। রসুলসাহীরা তান্ত্রিক যোগসাধন করেন। গঞ্জামের আরুবারা, তৈলঙ্গের কাটিকরাও এইরকম। ক্ষিতিমোহন লিখছেন, বোহরারা একদা ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে অনেক ব্রাহ্মণসুলভ আচার বিচার রয়ে গেছে। ডফালী, ঘোসীরাও আধা হিন্দু, আধা মুসলমান। এই জাতীয় ব্রাহ্মণদের বলা হয় হুসেনী ব্রাহ্মণ। এঁরা পাণ্ডার কাজ করেন। কোনো মন্দিরে নয়, আজমীরে মৈনুদ্দীন চিশতীর দরগায়। কাশীর ভর্তরীরা আবার যোগী। রীতিমত গেরুয়া ধারণ করেন, হিন্দু আচার পালন করেন। অন্তত ক্ষিতিমোহনের সময়ে হিন্দুদের ক্রিয়াকর্মের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল তাঁদের গান। অথচ ভর্তরীদের গুরু মুসলমান।

হিন্দুধর্ম বলতে যাঁরা উঁচু পাঁচিল দেওয়া একটা নির্দিষ্ট ভূমিখণ্ড জাতীয় জিনিসকে বোঝেন, ‘হিন্দুধর্মে উদারতার বাণী’ অধ্যায়ের প্রথম দুটো অনুচ্ছেদে বলা কথাগুলো তাঁদের কতটা পছন্দ হবে তা বলা শক্ত:

ধর্ম সম্বন্ধে ভারতের ইতিহাস একটু বিচিত্র। যাহা বৈদিকধর্ম তাহাই যে ঠিক হিন্দুধর্ম এ কথা সত্য নহে। প্রাচীনকাল হইতেই এদেশে অবৈদিক বহু সংস্কৃতি ও ধর্ম ছিল। সেইসব অবলম্বন করিয়াই হিন্দুধর্ম। বৈদিকধর্ম কর্মকাণ্ড প্রধান, দ্রাবিড়ধর্ম ভক্তিপ্রধান। এইসব নানা সংস্কৃতির ও ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের পলিমাটির স্তর পড়িয়া ভারতের ধর্মভূমি গড়িয়া উঠিয়াছে…

শৈব ও বৈষ্ণব প্রভৃতি ভাগবতধর্মে বৈদিক কর্মকাণ্ড বিশেষ কিছুই নাই। বেদ তিন ভাগে বিভক্ত, কর্মকাণ্ড, উপাসনাকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড, যে অংশে যজ্ঞাদি কর্মের বিধান আছে তাহা কর্মকাণ্ড। ভাগবতধর্মের প্রাণই হইল প্রেম ভক্তি ও পূজা। বাহির হইতে আগত গ্রিক হুণ শক প্রভৃতির দল বৈদিক দলে ঢুকিতে না পারিলেও ভক্তিপ্রধান ভাগবতধর্মে সকলে সাদরে গৃহীত হইয়াছেন।

অন্তত বেদকে যে অভিন্ন, অভ্রান্ত একটা জিনিস বলে ভাবব তারও জো নেই। ক্ষিতিমোহন লিখেছেন বেদ আর্য সাধনার প্রাচীনতম ভাণ্ডার, কিন্তু একই কালের বা একই দলের জিনিস নয়। বেদে বেদেও বিরোধ ছিল। মোটামুটি ঋগ্বেদই প্রাচীনতম, সামবেদ ও সামগান তুলনায় নতুন। মজার কথা

এই সামবেদকেও একদিন ঋগ্বেদ সহিতে পারে নাই। সামবেদ-গান ঋগ্বেদীয়দের কানে পেচক-শৃগাল-কুকুর-গাধার ডাকের মতোই মনে হইত।

‘সংগীত’ নামের এই অধ্যায়ে ভাগবত মুনিদের যুগের কথা এসেছে একটু পরেই। সেখানেও দেখা যায় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরেই মুনিদের মধ্যে মতভেদ। ক্ষিতিমোহনের ভাষায়

এখনকার দিনেও রাজনীতিতে দেখা যায় কোনো একটা দল শক্তি ও প্রতিষ্ঠা লাভ করিলে তখন নানা দল দেখা দেয়। তখনকার দিনেও দেখা যায় সংগীতে ভাগবত-মত প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে নানা মতবাদ চলিল। এমন একজন মুনি নাই যাঁহার সঙ্গে অন্যের মতভেদ না আছে।

নাসৌ মুনির্যস্য মতং ন ভিন্নম্।।

সংগীতের প্রসঙ্গেই ফিরে আসা যাক বাস্তবে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা কেমন আচরণ করেন সে প্রশ্নে। এই বইয়ের লেখক যেন পাঠক পড়তে পড়তে কী ভাববেন তা আগে থেকেই জানতেন। মনে প্রশ্ন ওঠামাত্রই দেখা যায় তার উত্তর হাজির

একটা কথাতে বড়োই বিস্ময় লাগে। সংগীতকলা মুসলমানশাস্ত্রে নিষিদ্ধ। অথচ বড়ো বড়ো ওস্তাদেরা তো প্রায় সকলেই মুসলমান। মুসলমানশাস্ত্রে যাহাই থাকুক মুসলমান-তীর্থে তো সংগীত খুবই প্রচলিত। আজমীরে মৈনউদ্দীন চিশতীর দরগা হইল ভারতে মুসলমানদের সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থ। সেখানে মূল তোরণে প্রহরে প্রহরে নহবত বাজে। ভিতরে প্রত্যেক পবিত্র স্থানে গায়ক-গায়িকারা যাত্রীদের পুণ্যার্থ সংগীত করেন ও যাত্রীরা তাহার জন্য রীতিমত দক্ষিণা দেন।

স্বভাবতই কাশীর মন্দিরে মন্দিরে মুসলমান বাদকদের সানাই ও নহবতের কথা এসেছে। নাকাড়ার বহু গৎ যে সম্রাট আকবর প্রবর্তিত সেকথাও এসেছে। ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের বাজনা থেকে বিভিন্ন রাগ সৃষ্টি – সবেতেই যে মুসলমানদের বিপুল অবদান সেকথা সঙ্গীতপ্রেমী মাত্রেই জানেন। ক্ষিতিমোহন প্রত্যেকটা উদাহরণ সবিস্তারে লিখেছেন। ব্যাপারটা যে শুধু আমির খুসরো আর তানসেনের অবদানে শেষ নয়, আমাদের কালের ওস্তাদ বিসমিল্লা খানের সরস্বতীর প্রতি ভক্তি যে আকাশ থেকে পড়েনি এবং তাঁর বাড়ি মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে তাকে মুছে দেওয়াও যাবে না – তা স্পষ্ট হয় এই অধ্যায়ে। তবে চমকে দেওয়ার মত তথ্য এগুলো নয়। চমকে উঠতে হয় যখন ক্ষিতিমোহন ঔরঙ্গজেবের সঙ্গীতপ্রীতির আলোচনায় আসেন। সেই ঔরঙ্গজেব, যিনি প্রায় সব মতের ঐতিহাসিকদের ভাষ্যেই অত্যন্ত গোঁড়া মুসলমান এবং হিন্দুদের উপর দমনপীড়নের সবচেয়ে বড় প্রতিভূ।

লেখক বলছেন ঔরঙ্গজেব হিন্দি গীত-কবিতার অনুরাগী ছিলেন, তাঁর দরবারে বড় বড় গায়কও ছিলেন। ঔরঙ্গজেবের জন্মদিনে নতুন ধ্রুপদ এবং খেয়াল রচিত হত। সেসব গান সুরক্ষিত আছে এবং ছাপার অক্ষরে প্রকাশিতও হয়েছে। রাগ টোড়ীতে রচিত এরকম একটা গানে আছে

অকবর সুত জহাঁগীর তাকে শাহজহাঁ
তাকো সুত ঔরংগজেব ভয়ো হৈ ভুর পর।

এরকম আরও অনেকগুলো গানের দৃষ্টান্ত কলাবতী-গীতসংগ্রহে পেয়েছেন বলে ক্ষিতিমোহন জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ঔরঙ্গজেবের দরবারে গীত-কবি হিসাবে ব্রাহ্মণবংশীয় আলম পণ্ডিত ছিলেন বলে জানা গেছে। ঔরঙ্গজেবের নাতি আজিমুশশানকে যখন ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় শাসক হিসাবে, তখন তিনি প্রবাসের দুঃখ দূর করতে কবি আলমকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আলম তাঁর প্রেমিকাকে ছেড়ে অতদূর যেতে রাজি হননি। তখন আজিমুশশান চাইলেন আরেক কবি কলাবত কালিদাস ত্রিবেদীকে। তাঁকে আবার ঔরঙ্গজেব ছাড়তে চাইলেন না।

এসব প্রমাণ দেখে ক্ষিতিমোহনের অনুমান

ঔরংগজেব অতিশয় নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। চরিত্রগত নীতির শৈথিল্য তিনি সহিতে পারিতেন না। গায়ক ও কলাবতদের মধ্যে নীতিগত শৈথিল্যে হয়তো তিনি রুষ্ট হইয়া থাকিবেন; তাই তাঁহাদের গানকে তিনি নিষিদ্ধ করিয়া থাকিবেন।

অবশ্য সঙ্গীত, চিত্রকলা এবং স্থাপত্যশিল্পে অবদানের জন্যে অন্য মোগল সম্রাটদের অবিমিশ্র প্রশংসা করলেও বাদশাহ আলমগীর সম্পর্কে ক্ষিতিমোহনের ভাবনায় স্ববিরোধিতা রয়েছে বলে মনে হয়। কারণ ‘স্থাপত্যশিল্প’ অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন:

ঔরংগজেব নানা উপায়ে পিতৃসিংহাসন অধিকার করিয়াই ধর্মের নামে শিল্পকে নির্বাসিত করিলেন আর গোঁড়া মুসলমান কারিগর ছাড়া আর সব শিল্পীদের তাড়াইয়া দিলেন। ইহার পরেই মোগল দরবারে শিল্পসৃষ্টির অবসান হইয়া গেল।

চিত্রশিল্পের আলোচনায় ক্ষিতিমোহন স্পষ্ট লিখেছেন

মুসলমান ধর্মের অনুশাসনে শিল্পসাধনা নানাভাবে বদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিল। তাহাকে সম্পূর্ণ মুক্তি দিতে না পারিলেও মোগল সম্রাটেরা বন্ধন দুঃখ অনেকটা ঘুচাইলেন। মোগল বাদশাবৃন্দের সময়ে মৃত্যুপাশ হইতে অনেক পরিমাণে মুক্ত হইয়া ভারতীয় মুসলমানদের শিল্পকলা একটু নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিল।

এই ‘চিত্রশিল্প’ অধ্যায় অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক এই কারণে যে লেখক জানিয়েছেন, ইউরোপিয় চিত্রশিল্পের যেসব নিদর্শন নিয়ে আমরা সাধারণত উচ্ছ্বসিত হই তার অনেকগুলো ভারতীয় শিল্পের কাছে, বিশেষত মোগল যুগের শিল্পের কাছে, বিশেষভাবে ঋণী। প্যারিসের ল্যুভর এবং লন্ডনের মিউজিয়ামে ডাচ চিত্রশিল্পী রেমব্র্যান্টের যেসব বিশ্ববিখ্যাত কীর্তি রয়েছে তার অনেকগুলোই মোগল মিনিয়েচার পেন্টিংয়ের হুবহু নকল বা তা থেকেই উদ্ভূত। এই তথ্যের উৎস হিসাবে লেখক দুই ইউরোপিয় শিল্পরসিকের কথাই উল্লেখ করেছেন। আজকের ভারতে মোগলদের মন্দির ধ্বংসকারী, হিন্দুবিরোধী যে ভাবমূর্তি জনপ্রিয় হয়েছে তাতে এই অধ্যায়ে লেখকের ইতিহাস পাঠ অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেছেন যে ভারতে পৌঁছবার আগে মোঙ্গল আক্রমণ আরব সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে। ফলে আরবরা পারস্যের সংস্কৃতির উপরে ছশো বছর ধরে যে জগদ্দল পাথর চাপিয়ে রেখেছিল তা সরে যায়। আবার পারস্যের সাম্রাজ্যও মোঙ্গলদের হাতেই ধ্বংস হয়। দুটোই কিন্তু মুসলমানদেরই সভ্যতা। ক্ষিতিমোহনের মতে মোঙ্গলরা গথ, হুনদের মত শুধু ধ্বংস করতে করতে এগোননি। একইসঙ্গে তাঁদের হাতে শিল্প, সাহিত্যের নির্জীব বন্ধনের অবসান এবং নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। এক ধাপ এগিয়ে তিনি লিখছেন

মনে হয়, ইউরোপে রেনাসাঁসের যুগ প্রবর্তনের প্রধান কারণই এই মোঙ্গলেরা। কারণ ইহাদেরই জন্য এতকাল খোরাসানের অন্ধকারে অবরুদ্ধ অটোমান তুর্কেরা কনস্টান্টিনোপলে আসিয়া সকলের দৃষ্টির সম্মুখে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিলেন। ইহাদেরই জন্য বাইজ্যান্টাইন সাম্রাজ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হইল। ইহাদেরই জন্য গ্রিক পণ্ডিতগণ তাঁহাদের জ্ঞানের ভাণ্ডার লইয়া সারা ইউরোপে নানা স্থানে ছড়াইয়া পড়িলেন।

সেই ধারাতেই পাঠান, মোগলরা ভারতে এসে বহু সংস্কৃতি ও শিল্পশৈলীর সমন্বয় ঘটান। তাই মোগল আমলের শিল্পীদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান – দুরকম শিল্পীই দেখা যায়। আকবরের আমলের চিত্রশিল্পীদের মধ্যে যাঁদের নাম পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে দুজন মুসলমান, আর সকলেই হিন্দু। তাঁদের মধ্যে আবার কায়স্থ, চিতেরা (চিত্রকর), শিলাবত (শিলাশিল্পী), খাটি (কাঠশিল্পী), এমনকি কাহার (পালকিবাহক) জাতের মানুষও ছিলেন। অর্থাৎ উঁচু জাত, নিচু জাতের বিভাজনও সেক্ষেত্রে কাজ করেনি। ক্ষিতিমোহন জানিয়েছেন নন্দলাল বসুর থেকে মোগল আমলের শিল্পীদের নামের এক তালিকা তিনি পান। তার মধ্যে ১০৮ জন হিন্দু, ৯১ জন মুসলমান।

ভারতীয় সঙ্গীত, শিল্প, স্থাপত্যে মুসলমানদের অবদান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনিবার্যভাবে এসে পড়ে তাজমহলের কথা। যদিও তাজের স্থাপত্যে যে হিন্দু-মুসলমানের মিশ্র সংস্কৃতির চিহ্ন আছে তা সচরাচর কাউকে বলতে শুনি না। পি এন ওকের তেজো মহালয়ের আষাঢ়ে গপ্প হয়ত সেই ফাঁক দিয়েই ঢুকে পড়ে। ক্ষিতিমোহন তাজমহল সম্পর্কে কী লিখেছেন দেখা যাক

তাজের ভারতীয়ত্বের একটা বড়ো প্রমাণ, তাজ পশ্চিমমুখী নহে। আর. এফ. চিজলম্ দেখাইয়াছেন তাজের চারি কোণাতে চারি মিনার, মধ্যে গম্বুজযুক্ত রচনা। এই রচনারীতি ঠিক যবদ্বীপের চণ্ডীসেবার পঞ্চরত্ন মন্দিরের নকশার সঙ্গে মেলে। হিন্দু শিল্পশাস্ত্রের পঞ্চরত্ন মন্দিরেরও এইরূপই গঠনপ্রণালী। অজন্তার চিত্রেও ঠিক তাজের নকশার নমুনা পাওয়া যায়। প্রথম গুহাচিত্রে বুদ্ধের কাছে মা ও শিশুর চিত্রে এবং অনুরাধাপুরে ও বরোবুদুরে বুদ্ধমূর্তির সঙ্গে অনুরূপ নকশা পাওয়া যায়। শুধু তাজে নহে, আকবরের সেকেন্দ্রাতেও এমনসব শৈলী দেখা যায় যাহাকে ঠিক মুসলমানি বলা চলে না। আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান – এই তিনজনেই সংস্কৃতি হিসাবে অনেকখানি ভারতীয় ছিলেন।

তাজশিল্পের ক্রমবিকাশের ইতিহাস খুঁজিতে ভারত ছাড়িয়া পারস্য দেশে বা মধ্য এশিয়াতে ঘুরিয়া মরা বৃথা। তাজের নির্মাণে যেমন কান্দাহার, কনস্টান্টিনোপল ও সমরখন্দের কারিগর ছিলেন, তেমনি সঙ্গে সঙ্গে মুলতান লাহোরের কারিগরেরও অভাব ছিল না। দিল্লিরও বহু কারিগর ছিলেন। তাঁহাদের শিক্ষার মধ্যে ভারতীয় শৈলীই চলিত ছিল। একজন বড়ো ওস্তাদ ছিলেন চিরঞ্জীব লাল, তাঁহার অনুবর্তী ছিলেন ছোটেলাল, মন্নুলাল ও মনোহরলাল।

মুসলমানি য়ুনানী শাস্ত্র আর আয়ুর্বেদের মধ্যে কেমন দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে সম্পর্ক, সম্রাট আকবরের মন্ত্রী এবং রামচরিতমানস রচয়িতা তুলসীদাসের বন্ধু আবদুর রহীম খানখানাঁ কেমন সংস্কৃত ছন্দে হিন্দি, সংস্কৃত, ফারসি ভাষা মিশিয়ে লিখেছেন (‘করোম্যেব্ দুল্ রোহীমোইহং খুদাতালাপ্রসাদতঃ/পারসিয়পদৈর্যুক্তং খেটকৌতুকজাতকম্’) – সেসব দৃষ্টান্ত দিতে থাকলে এই আলোচনা কখনো শেষ হবে না। কিন্তু ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনার আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে দুজনের কথা উল্লেখ না করলে – মালিক মহম্মদ জায়সী আর কবীর। জায়সী ক্ষিতিমোহনের কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁকে নিয়ে শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক সম্মিলনীতে আলাদা বক্তৃতাও দিয়েছিলেন।

জায়সী হলেন সেই কবি, যাঁর ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি লেখা পদুমাবতী (পদ্মাবতী) কাব্য ইদানীং ইতিহাস বলে গণ্য হচ্ছে। তারই জেরে দীপিকা পাড়ুকোনকে শূর্পনখা করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ইনি ক্ষিতিমোহনের ভাষায় ‘সাধকশ্রেষ্ঠ’। সংস্কৃত যোগশাস্ত্র, পুরাণ, কাব্য, অলংকার, ব্যাকরণে পণ্ডিত, ফকির জায়সীর চার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দুজন ছিলেন হিন্দু। মারা যাওয়ার সময়ে তিনি ব্রাহ্মণ বন্ধু গন্ধর্বরাজের ছেলেদের বলেন, আমার নিজের সন্তান নেই। তোমরা যেহেতু বন্ধুর সন্তান, তোমরাই আমার সন্তান। আমার পারিবারিক মালিক উপাধি যদি তোমরা বহন করো, তাহলে উপাধিটা লুপ্ত হবে না। আমার আশীর্বাদে যতদিন এই উপাধি নিয়ে তোমরা ভগবানের গুণগান করবে, ততদিন তোমাদের বংশে সুগায়কের অভাব হবে না। এই বইয়ের রচনাকালেও উত্তরপ্রদেশের বালিয়ার হলদী ও রায়পুর এলাকার কথকরা মালিক উপাধিই ব্যবহার করতেন। আজকের ভক্তরা জায়সীর কাব্য নিয়ে যা ব্যাখ্যাই করুন না কেন, ক্ষিতিমোহন লিখেছেন পদ্মাবতী কাব্যে আসলে যোগমার্গের গভীর তত্ত্বকথা রয়েছে। জায়সীর মতে রানি পদ্মিনী জীবাত্মার প্রতীক, রাজা রতন সেন পরমাত্মার আর আলাউদ্দীন পাপের। জায়সীর সমাধিমন্দির আবার আমেথির হিন্দু রাজার তৈরি। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন, জায়সীর আশীর্বাদ পাওয়ার পরে তাঁর ছেলে হয়। ফলে তিনি জায়সীর ভক্ত হয়ে যান।

আরও পড়ুন আখতারনামা : বিস্মৃত ইতিহাস

কবীরের অপরাধ – তিনি হিন্দু, মুসলমানকে মেলাতে চেয়েছিলেন। ফলে দুই দলই তাঁর নামে বাদশার কাছে নালিশ করে। তলব পেয়ে দরবারে পৌঁছে অভিযোগকারীদের কাঠগড়ায় মোল্লা আর পণ্ডিতদের একসঙ্গে দেখে কবীর বলেন, হায়, আমি তো এটাই চেয়েছিলাম। তাহলে তোমরা ভুল করলে কেন? বিশ্ববিধাতার সিংহাসনের নিচে মিলিত হতে ডেকেছিলাম, সেখানে জায়গায় কুলোল না, কুলোল রাজসিংহাসনের নিচে! মেলাতে চেয়েছিলাম প্রেমে-ভক্তিতে, তোমরা মিলেছ বিদ্বেষে! বিদ্বেষের চেয়ে প্রেম-ভক্তির জায়গা কি বেশি চওড়া নয়? কবীরকে যদি বলা হত সাধনা সুরক্ষিত রাখতে সম্প্রদায় দরকার, তাহলে তিনি বলতেন ‘বেহা দীনহী খেতকো বেহ্রাহী খেত খায়’। অর্থাৎ বাইরের ছাগল, গরুর ভয়ে ক্ষেতে বেড়া দিলাম। দেখি বেড়াই ক্ষেত খেয়ে উজাড় করে দিল। ক্ষিতিমোহন উদ্ধৃত কবীরের অসংখ্য সহজ সরল রচনার মধ্যে এমন চারটে লাইন রয়েছে যা পড়লে মনে হয় এই সবে লেখা হল

জো খোদায় মসজিদ বসতু হৈ
ঔর মুলুক কেহিকেরা।
তীরথ মূরত রাম নিবাসী
বাহর করে কো হেরা।।

খোদা যদি মসজিদেই বাস করেন তবে বাকি জগৎটা কাহার? তীর্থে মূর্তিতেই যদি রাম রহেন তবে বাহিরকে দেখে কে?

কেবল ইতিহাস পাঠে নয়, সমসময়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা কীভাবে ধরা পড়েছে তাও লেখক বিবৃত করেছেন। চট্টগ্রামের সাহিত্যসেবক আবদুল করীমের কাছে পাওয়া হোরান জরিপ (কোরান শরীফের প্রাকৃত উচ্চারণ) পুথি থেকে শুরু করে বাংলার গ্রামের মুসলমান পটুয়াদের কথা, যাঁদের পটের কাহিনি হয় হিন্দু দেবদেবী, পুরাণ ইত্যাদি নিয়ে – সবই খোলা মনের পাঠকের অপেক্ষায় আছে।

খোলা মন জিনিসটা কি আজ সুলভ? বিশেষ করে ধর্মের ব্যাপারে? এখন তো ধর্ম মূলত ধ্বজা। সে সম্পর্কে ক্ষিতিমোহন মহাভারতের অনুশাসন পর্ব থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন

এক এব চরেদ্ ধর্মং ন ধর্মধ্বজিরো ভবেৎ।
ধর্মবাণিজ্যকা হ্যেতে যে ধর্মমুপভূঞ্জতে।।

ধর্ম হইল আপনার জীবনটি নিয়ন্ত্রিত ও শান্ত করিবার জন্য ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাই ধর্মকে ধ্বজার মতো ব্যবহার করিয়া কোনো বিরোধ ঘোষণা করা বা কোনো সুবিধা আদায় করার চেষ্টা অতিশয় অন্যায়।

ধর্মকে ধ্বজা হিসাবে ব্যবহার করার লোক বা তাকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করার লোক সেই মহাভারতের যুগেও ছিল। তারপরেও কয়েক হাজার বছর ধরে মনুষ্যত্ব মরে যায়নি, ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা সম্ভব হয়েছে, অতএব ভবিষ্যতেও হওয়া সম্ভব – এ বই এই ভরসাটুকু জোগায়। সেই আশায় খোলা মনের মানুষ খুঁজে যাওয়া, তার কাছে এইসব বহুযুগের ওপার হতে আসা বার্তা পৌঁছে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কী-ই বা করার আছে আজ?

পুনশ্চ: কপিরাইট উঠে যাওয়া এই বইয়ের যে সংস্করণ আমার হাতে এসেছে তাতে বিকট অযত্নের ছাপ রয়েছে। একই ব্যক্তির নাম, একই বইয়ের নাম একেক জায়গায় একেকরকম বানানে লেখা হয়েছে। এমনকি বইয়ের নামও প্রচ্ছদে আর পৃষ্ঠ প্রচ্ছদে আলাদা। মুদ্রণ প্রমাদ অগ্রাহ্য করলেও এই ত্রুটিগুলো এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ভাল সংস্কৃত, আরবি, উর্দু জানা কোনো পাঠক হয়ত উদ্ধৃতিগুলোতেও কিছু ভুল ধরতে পারবেন যা আমার বোধগম্য হয়নি। বইয়ের শেষের টীকাগুলো লেখার ভিতরে চিহ্নিতকরণেও অস্পষ্টতা, অসঙ্গতি রয়েছে। পরিশিষ্টে জায়সীকে নিয়ে যে লেখা প্রকাশিত হয়েছে তা যে কী করে ৮ শ্রাবণ ১৯১২ তারিখে পঠিত হয়ে থাকতে পারে তা বোঝা অসম্ভব। ১৯১২ বঙ্গাব্দ আসতে এখনো শ পাঁচেক বছর দেরি আছে, অন্যদিকে গ্রেগরিয়ান (ইংরিজি) ক্যালেন্ডারে শ্রাবণ নামে কোনো মাস নেই। এই দুঃসময়ে এই বই সুলভে পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্যে সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা সংস্থার ধন্যবাদ প্রাপ্য। কিন্তু এত মূল্যবান বইয়ের কি এই অযত্ন প্রাপ্য?

ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা
লেখক: ক্ষিতিমোহন সেন
প্রকাশক: ন্যাশনাল বুক এজেন্সি
মূল্য: ১১০ টাকা

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করেও যে বিজেপি চারশো আসন পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয় তা পরিষ্কার। বিরোধী নেতাদের ভীরুতাকে তারা হাতিয়ার করতে চাইছে। ইডি, সিবিআইয়ের খাতায় কেবল নীতীশ কুমার বা মমতার দলের নেতা মন্ত্রীদের নামেই অভিযোগ আছে তা তো নয়। কেরালায় সিপিএম নেতা, মন্ত্রীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল।

জার্মানিতে নাজি পার্টির উত্থান ও পতন নিয়ে মার্কিন সাংবাদিক উইলিয়াম শাইরারের লেখা একখানা বই সারা বিশ্বে সমাদৃত। দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অফ দ্য থার্ড রাইখ নামে এই বইতে শাইরার লিখেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর হোহেনজোলার্ন রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছিল একটা দুর্ঘটনা (“proclaimed by accident!”)। কারণ যুদ্ধে পরাজয়ের পর কাইজার (জার্মান সম্রাট) সিংহাসন ছেড়ে দেন, ওদিকে বার্লিনে তখন জোরদার সাধারণ ধর্মঘট চলছে। রোজা লুক্সেমবার্গ আর কার্ল লিবনেখটের নেতৃত্বে বামপন্থী সমাজতন্ত্রীরা রাশিয়ার মত বিপ্লব করে ফেলতে পারে – এই ভয় চেপে ধরে সোশাল ডেমোক্র্যাট নেতা ফ্রেডরিশ এবার্ট আর ফিলিপ শাইডেমানকে, যাঁরা চ্যান্সেলর প্রিন্স ম্যাক্স অফ ব্যাডেনও পদত্যাগ করে দেওয়ায়, সেই মুহূর্তে দেশের দায়িত্বে ছিলেন। শাইরারের মতে, ওঁরা চেয়েছিলেন যেনতেনপ্রকারেণ রাজতন্ত্র বজায় থাকুক। তা হচ্ছে না দেখে বিপ্লবের আতঙ্কেই ১৯১৮ সালের ৯ নভেম্বর তড়িঘড়ি কোনিগসপ্লাৎজের সামনে জড়ো হওয়ার জনতার সামনে শাইডেমান ঘোষণা করে দেন – জার্মানি এখন থেকে ‘রিপাবলিক’। সেই রিপাবলিকের সংবিধান ঘোষণা হয় আরও একবছর পরে ওয়াইমার বলে একটা শহরে আয়োজিত অ্যাসেম্বলি থেকে। তাই তাকে ওয়াইমার রিপাবলিক বলা হয়ে থাকে। বিপ্লবের সম্ভাবনা দমন করতে যে ওয়াইমার রিপাবলিক দারুণ সফল হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। এমনকি রোজা আর কার্লকেও একেবারে প্রাণে মেরে দেওয়া হয়েছিল জানুয়ারি মাসেই। কিন্তু এসব করতে গিয়ে গণতন্ত্র যেমন হওয়া উচিত তেমন করে জার্মানিকে গড়ে তোলার দিকে মোটে নজর দেওয়া হয়নি। সামন্তপ্রভু, উচ্চবর্গীয় জার্মান এবং সেনাবাহিনীর লোকজন – যাদের গণতন্ত্র ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ ছিল না, তাদের পোষ মানানোর নরম বা গরম – কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। ফলে তৈরি হয় এক জগাখিচুড়ি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে সেনাবাহিনীর যতটা প্রভাব প্রতিপত্তি থাকা উচিত তার চেয়ে বেশিই ছিল। সঙ্গে ছিল ক্ষমতাশালী শ্রেণিগুলোর দুর্নীতি। সব মিলিয়ে কেমন অবস্থা হয় সাধারণ জার্মানদের? ভাষান্তরে শাইরার বর্ণিত সেই অসহনীয় পরিস্থিতি এইরকম:

… তবে জনতা বুঝতে পারেনি যে জার্মান মুদ্রার বিপর্যয়ে বৃহৎ শিল্পপতি, সেনাবাহিনী আর রাষ্ট্র কেমন লাভবান হচ্ছিল। তারা শুধু দেখতে পাচ্ছিল যে ব্যাঙ্কে অনেক টাকা থাকলেও খানিকটা গাজর, কিছুটা আলু, কয়েক আউন্স চিনি, এক পাউন্ড ময়দা কেনা যাচ্ছিল না। প্রত্যেকটি ব্যক্তি জানত যে সে দেউলিয়া আর প্রতিদিন খিদের জ্বালা টের পেত। এই যন্ত্রণা আর আশাহীনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে তারা যা কিছু হয়েছে তার জন্য গণতন্ত্রকে দায়ী করত।

এমন একটা সময় অ্যাডলফ হিটলারের জন্যে ছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত।

গত সোমবার কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে ভুবনেশ্বরে এক সভায় বলেছেন, কিছু নেতা এবং সাধারণ মানুষ যদি ভীরুতা অবলম্বন করেন তাহলে সংবিধান ও গণতন্ত্রের বাঁচা শক্ত। তার আগেরদিনই নীতীশ কুমার কংগ্রেস, রাষ্ট্রীয় জনতা দল এবং বাম দলগুলোর সমর্থন ছেড়ে বেরিয়ে ফের বিজেপির সঙ্গে জোট করে আরও একবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়ে ফেলেছেন। ফলে বোঝা শক্ত নয়, খড়্গের আঙুল কার দিকে ছিল। খড়্গে অবশ্য রাখঢাক করেননি, শুধু নীতীশের দিকে আঙুল তুলেও থামেননি। নীতীশ চলে যাওয়ায় ইন্ডিয়া জোট দুর্বল হবে না বলেছেন, একইসঙ্গে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কেরও নিন্দা করেছেন বিজেপির বিরুদ্ধে না দাঁড়ানোর জন্যে। দেশের সংকট মুহূর্তে কিছু রাজনীতিবিদের ভীরুতার কী দাম একটা দেশকে দিতে হয় তা শাইরারের বইয়ের যে অংশ নিয়ে আলোচনা করলাম তা পড়লেই বোঝা যায়। তবে খড়্গে সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছেন যে বিজেপির বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একা নীতীশই ভীরু নন।

বস্তুত, ভীরুদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করলে ইন্ডিয়া জোট আরও দুর্বল হয়ে পড়বে, আখেরে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়েরই ক্ষতি হবে – এই আশঙ্কাতেই সম্ভবত খড়্গে আর কারোর নাম করেননি। নইলে নিঃসন্দেহে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নামও করতে হত। তিনি ইন্ডিয়া জোটে আছেন, অথচ তাঁর দলের শাসনে থাকা পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই ঘোষণা করে দিয়েছেন – পাঞ্জাবে তাঁরা একাই লড়বেন, কংগ্রেসকে কোনো আসন ছাড়বেন না।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও করতে হত। তাঁর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল – কংগ্রেস দাদাগিরি করে, কংগ্রেস বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করার ব্যাপারে আন্তরিক নয়। কংগ্রেস ইন্ডিয়া জোটে এল, তাঁকে জোটের মিটিংয়ে একেবারে রাহুল গান্ধীর পাশে জায়গাও দেওয়া হল। অথচ কোনো মিটিংয়ে তিনি নিজে যান না, কখনো কোনো প্রতিনিধিকেও পাঠান না, কখনো আবার সংযুক্ত ঘোষণাপত্রে তাঁর দলের স্বাক্ষর থাকে না। গত কয়েকদিনে আবার সটান বলে দিয়েছেন, ইন্ডিয়া জোটে আছেন দেশে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে একাই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বেন। ত্রিপুরা, মেঘালয়, গোয়া ইত্যাদি নির্বাচনে লড়তে গিয়ে আদৌ সুবিধা করতে না পারার পরেও তিনি রাজ্যের বাইরে নিজের শক্তি সম্পর্কে কী করে আত্মবিশ্বাসী হচ্ছেন তা বোঝা শক্ত। রাহুলের ভারত ন্যায় যাত্রা মমতার রাজ্যে ঢুকে পড়েছে, অথচ তৃণমূল কংগ্রেসের দিক থেকে তাতে সঙ্গত করার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উলটে কংগ্রেস অভিযোগ করছে তৃণমূলই নাকি ন্যায় যাত্রার পতাকা ছিঁড়ে দিচ্ছে, রাহুলকে সরকারি গেস্ট হাউসে মধ্যাহ্নভোজন করতে দেওয়ার সৌজন্যটুকুও দেখানো হচ্ছে না। এর পিছনে ইডি, সিবিআই আতঙ্ক ছাড়া অন্য কিছু কি থাকা সম্ভব? এ যদি ভীরুতা না হয়, তাহলে তো ভাবতে হবে সিপিএম নেতারা যে তৃণমূল-বিজেপি সেটিংয়ের তত্ত্ব খাড়া করেন সেটাই সত্যি। নইলে বিজেপি যে দেশের শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু সেকথা তো খড়্গের মত মমতাও বলে থাকেন। তাহলে মিলেমিশে লড়তে আপত্তি থাকবে কেন? ইন্ডিয়া জোটে তাঁর চেয়ে বেশি সিপিএমকে গুরুত্ব দেওয়া হয় – এ তো অভিমানের কথা। এই কি মান-অভিমানের সময়? তাও যদি অভিমানের ভিত্তি থাকত। সিপিএমের সাংসদ সংখ্যা তৃণমূলের ধারেকাছে নয়। তাদের নেতা সীতারাম ইয়েচুরি মিটিংয়ে গুরুত্ব পেলেন কি পেলেন না তাতে কী-ই বা এসে যায়?

আরও পড়ুন মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু 

রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করেও যে বিজেপি চারশো আসন পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয় তা পরিষ্কার। বিরোধী নেতাদের ভীরুতাকে তারা হাতিয়ার করতে চাইছে। ইডি, সিবিআইয়ের খাতায় কেবল নীতীশ কুমার বা মমতার দলের নেতা মন্ত্রীদের নামেই অভিযোগ আছে তা তো নয়। কেরালায় সিপিএম নেতা, মন্ত্রীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল। সম্ভবত স্ট্যালিনের সরকার পালটা এক ইডি অফিসারকে গ্রেফতার করায়, মাদুরাইয়ের ইডি দফতরে হানা দেওয়ায় উৎসাহে ভাঁটা পড়েছে। নীতীশ এনডিএতে ফিরে যাওয়া মাত্রই তেজস্বী যাদবকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকেও এক মামলায় গ্রেফতার করা হতে পারে বলে হাওয়ায় খবর ভাসছে। ইন্ডিয়া জোটের আরেক শরিক শিবসেনা। তাদের ডাকাবুকো নেতা সঞ্জয় রাউত। তাঁর নামেও মামলা আছে ইডির হাতে, ইতিপূর্বে তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। দরকার পড়লে শিবসেনার ভীরুতার পরীক্ষাও নিশ্চয়ই নেওয়া হবে।

এবার্ট আর শাইডেমানের ভূমিকা ভারতে কারা পালন করলেন তা তো এখনই বোঝা যাবে না, স্পষ্ট হবে আজকের ইতিহাস যখন লেখা হবে তখন। কিন্তু কৌতূহল হয়, বিরোধী দলগুলো দুর্নীতিমুক্ত হলে বিজেপিবিরোধী জোটের এমন নড়বড়ে অবস্থা হত কিনা। কোনো সন্দেহ নেই, যেসব মামলায় বিভিন্ন দলের নেতাকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে তার অনেকগুলোরই ভিত্তি নেই। রাউতকে জামিন দেওয়ার সময়ে যেমন বিচারপতি বলেছিলেন, ওই গ্রেফতারি বেআইনি। যে কোনো দেওয়ানি গোলমালকে আর্থিক দুর্নীতির তকমা দেওয়া চলে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হল, গত কয়েক দশকে ভারতের প্রায় সব দলের নেতাদের এত আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হয়েছে, যে কোন ক্ষেত্রে পালে সত্যিই বাঘ পড়েছে আর কোথায় স্রেফ বিরোধী শক্তিকে গ্রাস করে নিতে কেন্দ্রীয় এজেন্সি ‘চোর চোর’ বলে চেঁচাচ্ছে – তা বোঝা শক্ত। এই ধোঁয়াশার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলগুলোকে ভোটারদের চোখে আরও ছোট করে দেওয়া এবং সম্ভব হলে দলে টেনে আনা চলছে।

হিটলারের অবশ্য ইডি, সিবিআই ছিল না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

রামদাসী, লালদাসের ধর্ম এবং রামমন্দির

রামদাসী রক্তচক্ষু দেখিয়ে বলেন, হিন্দুর ছেলে হয়ে ঠাকুরের নামে এইসব কথা বলছ! মুসলমানের ছেলে আমি ঠাকুরঘরে লুকিয়ে রাখব? দারোগা ব্রাহ্মণীর অভিশাপের ভয়ে মানে মানে কেটে পড়ে।

আমার মায়ের দিদিমা রামদাসী চক্রবর্তী অধুনা বাংলাদেশের যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার আঠারোখাদা গ্রামের এক সম্পন্ন পরিবারের ধর্মপ্রাণ গৃহবধূ ছিলেন। রোজ গৃহদেবতার পুজো করতেন নিজের হাতে এবং সে দেবতার মূর্তি পরিবারের সচ্ছলতার সঙ্গে মানানসই আকারে বড় ছিল। রামদাসীর মেজ ছেলে জগন্নাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এক মুসলমান, যিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে স্থানীয় কংগ্রেসের সক্রিয় কর্মী। একদিন তাঁকে এবং অন্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গ্রেফতার করতে গোটা গ্রাম চষে ফেলছে পুলিস। জগন্নাথ বন্ধুকে লুকিয়ে রাখার জায়গা ভেবে না পেয়ে নিয়ে এলেন মায়ের কাছে। যথাসময়ে পুলিস চক্রবর্তী বাড়িতেও হানা দিল, কারণ সে বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সভা-টভা হত। বাড়ির ছেলেমেয়েদেরও কংগ্রেসের সঙ্গে কিঞ্চিৎ যোগাযোগ আছে বলে খবর। কিন্তু গোটা বাড়ি তল্লাশ করেও পুলিস সেদিন যাকে খুঁজছিল, তাকে পেল না। কেন? কারণ রামদাসী তাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন ঠাকুরঘরে, গৃহদেবতার পিছনে। এই পর্যন্ত ইতিহাস। আমাদের পারিবারিক কিংবদন্তি বলে, বাঙালি দারোগার নাকি সন্দেহ হয়েছিল। সে রামদাসীকে হালকা চালে জিজ্ঞাসাও করে, ঠাকুরঘরটা দেখলাম না যে মাসিমা? রামদাসী রক্তচক্ষু দেখিয়ে বলেন, হিন্দুর ছেলে হয়ে ঠাকুরের নামে এইসব কথা বলছ! মুসলমানের ছেলে আমি ঠাকুরঘরে লুকিয়ে রাখব? দারোগা ব্রাহ্মণীর অভিশাপের ভয়ে মানে মানে কেটে পড়ে।

বলা বাহুল্য, রামদাসী ধর্মনিরপেক্ষতা কথাটা জানতেন না। পরবর্তী জীবনে তিনি একজন হিন্দু বিধবার যা যা শাস্ত্র নির্ধারিত কর্তব্য তা থেকে এক চুল বিচ্যুত হননি। অথচ যাঁরা তাঁকে স্বচক্ষে দেখেছেন তাঁদের মুখে শুনেছি, ওই ঘটনা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র পাপবোধ ছিল না। আবার ফলাও করে বলেও বেড়াতেন না। স্পষ্টতই তিনি মনে করতেন তাঁর ভগবানের ঘর একজন বিধর্মীর স্পর্শে অপবিত্র হয়ে যায় না। তাই একজন মুসলমানকে ঠাকুরঘরে বসালে পাপ হয় না।

আনন্দ পট্টবর্ধনের ‘রাম কে নাম’ তথ্যচিত্রে বিতর্কিত রাম জন্মভূমির আদালত নিযুক্ত পূজারী লালদাসকে দেখানো হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন হিন্দুধর্ম অনুযায়ী ভগবান যে বাড়িতে থাকেন সেটাই মন্দির। আলাদা করে ভগবানকে কোথাও নিয়ে গিয়ে মন্দির বানানোর প্রয়োজন পড়ে না, ভগবান যেখানে আছেন সেই ঘর ভেঙে দেওয়ারও প্রশ্ন ওঠে না।

বোঝা যায়, আমার প্রমাতামহী রামদাসী কোনো ব্যতিক্রম নন। ভারতবর্ষ মুসলমানদের দেশ এবং রামদাসী, লালদাসের মত কোটি কোটি হিন্দুর দেশ। এঁরা নাস্তিক নন, সঙ্ঘ পরিবার যাকে ভারতীয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী পাশ্চাত্য থেকে শেখা ধর্মনিরপেক্ষতা বলে, এঁরা তার আওতাতেও পড়েন না। এঁদের ধর্মবিশ্বাস এমন আত্মবিশ্বাসী যে অন্যকে আক্রমণ করে সে বিশ্বাস জাহির করতে হয় না। অন্যের ধর্মস্থান দখল করে নিজের দেবতার বিগ্রহও স্থাপন করতে হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, ভগবানকে এঁরা এত ছোট মনে করেন না, যে তাঁকে কোনো নির্দিষ্ট মন্দিরে জায়গা না দিলে তিনি গৃহহীন হয়ে থাকবেন।

আরও পড়ুন হিন্দুরাষ্ট্রের হিন্দু নাগরিকের পিঠ বাঁচানোর চিঠি

রাম এঁদের সকলের আরাধ্য নন। সেই কারণেই সকলকে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা বা ভারতে থাকতে হলে জয় শ্রীরাম বলতেই হবে এমন দাবি অসঙ্গত, অন্যায়। অযোধ্যায় ঝাঁ চকচকে রামমন্দির নির্মাণ, দিশি পিস্তলের গুলিতে হত লালদাসের ভাষায় বললে “রাজনৈতিক মুদ্দা” (রাজনৈতিক বিষয়)। আমরা চাইলেই অন্যের ধর্মস্থান গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজেদের ধর্মস্থান গড়ে তুলতে পারি – এই অহঙ্কার প্রকাশ করা ছাড়া এর অন্য কোনো সার্থকতা নেই। অবশ্য এই অহঙ্কার সার্বিক প্রচারে মোহিত হয়ে যাওয়া সাধারণ হিন্দুদের দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষার অভাব, জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম, চিকিৎসার নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার যন্ত্রণা ভুলে থাকতে আফিম হিসাবে কাজ করবে। আফিম খেয়ে সাধারণ হিন্দু ঝিমোবেন আর সেই সুযোগে তাঁদের ভোটগুলো পাওয়া যাবে – এই হল মহত্তর উদ্দেশ্য। মুসলমানদের তো আগেই অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়েছে। তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির অবাঞ্ছিত নাগরিক করে দেওয়ার চেষ্টায় ত্রুটি রাখা হয়নি। তা দেখিয়ে উল্লাসে উন্মাদ করে দেওয়া হয়েছে সাধারণ হিন্দুদের। তাঁরা খেয়ালও করছেন না, প্রাচীন শহর অযোধ্যার ছোটখাটো হিন্দু ব্যবসায়ীর দোকানপাটও উড়িয়ে দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এক রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য।

কাশীর বিশ্বনাথ মন্দিরের বংশানুক্রমিক মহন্ত রাজেন্দ্রপ্রসাদ তিওয়ারি তাই বলেছেন, “অযোধ্যায় ওটা মন্দির নয়, মল। ওই ধরনের প্রথম মল ছিল কাশী বিশ্বনাথ মন্দির। তৃতীয়টা হবে মথুরায়।”

প্রতর্ক ব্লগে প্রকাশিত

ধৈর্যের টেস্টে আমরা সবাই ফেল

মহাতারকারা সব গুণের অতীত। তাই নিজেদের ত্রুটি স্বীকার না করে সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে, অর্থাৎ পিচকে, ধরা হয়।

কেপটাউনে বুধবার দক্ষিণ আফ্রিকা ৫৫ রানে অল আউট হল সকালে, বিকেলে ভারতের আধ ডজন উইকেট পড়ে গেল কোনো রান না করেই। বৃহস্পতি বাদ দিয়ে শুক্রবারেই সিডনিতে এক ডজন উইকেট পড়ে গেল ৭৮ রানে। প্রথমে অস্ট্রেলিয়ার পাঁচটা উইকেট পড়ল দশ রানে, তারপর পাকিস্তানের সাতজন আউট ৬৮ রানে। কেপটাউন টেস্ট বৃহস্পতিবারেই চুকে গেল, টেস্ট ক্রিকেটের প্রায় দেড়শো বছরের ইতিহাসে সংক্ষিপ্ততম ম্যাচ হল। সিডনি টেস্টও পাঁচদিন গড়াল না, শনিবারেই শেষ হয়ে গেল। গত কয়েক বছরে বহু ম্যাচ পাঁচদিন গড়ায়নি। মোটেই তার সবকটা অতি দ্রুত বা একেবারে ধুলো ওড়া পিচে খেলা হয়নি। ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ড টেস্ট ক্রিকেটকে পাঁচদিনের বদলে চারদিনের খেলা করে দিতে পারলে খুশি হয়। গতবছর জুন মাসে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটা চারদিনের টেস্ট খেলেও ফেলেছে।

মোদ্দাকথা, পাঁচদিনের ক্রিকেট আর পোষাচ্ছে না। কর্তাদের পোষাচ্ছে না কারণ এখনকার ক্রিকেটকর্তারা খেলা বেচে টাকা করতে চান না। টাকা করার জন্যে খেলাতে চান। আর টাকা আসে টি টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে, ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ থেকে। তাই ক্রিকেটারদের ক্লান্তি, চোট আঘাত ইত্যাদির তোয়াক্কা না করে দেদার টি টোয়েন্টি লিগ চালু করা হচ্ছে। চুলোয় যাক একদিনের ক্রিকেট, টেস্ট ক্রিকেট। ক্রিকেটাররাই বা ঘন্টা পাঁচেক খেলে কোটিপতি হওয়া গেলে পাঁচদিনের রগড়ানি সহ্য করতে যাবেন কেন? অনেকেই তাই নানা কারণে একদিনের ক্রিকেট, পাঁচদিনের ক্রিকেটকে বিদায় জানাচ্ছেন। বাকিদেরও টেস্ট খেলার প্রয়োজনীয় গুণগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। বোলাররা পিচের একটা জায়গায় ওভারের পর ওভার বল ফেলতে গলদঘর্ম, কয়েক ওভার উইকেট না পড়লেই অধিনায়করাও অধৈর্য হয়ে বোলিং পরিবর্তন করে ফেলেন। আরও শোচনীয় অবস্থা ব্যাটারদের। সারাক্ষণ মাথায় স্ট্রাইক রেটের পোকা নড়ে। বোলার যখন দারুণ বোলিং করছে তখন কয়েকটা ওভার মেডেন দেওয়ার ধৈর্য নেই, বল ছাড়তে ভুলে যাচ্ছেন। কারণ চার, ছয় মারতে না পারলে মনে হয় ব্যাটিং বৃথা। কয়েকটা বলে রান না করার পর একটা ড্রাইভ করার মত বল দেখলেই চোখ চকচক করে ওঠে। সুইং, বাউন্স, স্পিন ইত্যাদির বিচার না করে ব্যাট চলে যায় বলের পানে। ফলে ১৫৩/৪ থেকে ১৫৩ রানেই অল আউট হয়ে যেতে পারে একটা দল।

আরও পড়ুন ক্রিকেট জেনেশুনে বিশ করেছে পান

কিন্তু মহাতারকারা সব গুণের অতীত। তাই নিজেদের ত্রুটি স্বীকার না করে সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে, অর্থাৎ পিচকে, ধরা হয়। ভারত অধিনায়ক জাঁক করে বলতে পারেন, এরকম পিচ হলে কিন্তু আমাদের দেশের পিচ নিয়েও অভিযোগ করা চলবে না।

অবশ্য এ জন্যে কেবল ক্রিকেটারদের সমালোচনা করা অনুচিত। ঠান্ডা মাথায় গলদ বিচার করে শুধরে নেওয়ার ব্যবস্থা করার ধৈর্য কারই বা আছে আজকাল? বিচারক কথায় কথায় চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশ দেন, শিক্ষক পাঠ্য বই পড়ানোর রাস্তায় না গিয়ে সহায়িকার সন্ধান দিয়ে দেন, সাংবাদিক সত্যাসত্য বিচার না করে হোয়াটস্যাপে ফরোয়ার্ড হওয়া বার্তাকেই খবর বলে চালিয়ে দেন, লেখকের কবিতা বা গল্প কি উপন্যাস লিখে কাটাছেঁড়া করে তাকে আরও ভাল করার ধৈর্য নেই। সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে পোস্ট করে লাইক পাওয়া চাই, তারপর আগামী বইমেলাতেই বই আকারে প্রকাশ করা চাই। জীবনানন্দ দাশ যেমন লিখেছেন আর কি “সকলকে ফাঁকি দিয়ে স্বর্গে পৌঁছুবে/সকলের আগে সকলেই তাই।”

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত