লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ: আমাদের ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’ দেশের মুখ

রবি শাস্ত্রীর বরাবরই জনপ্রিয়তার কারণ ছিল অতিকথন আর গলা সপ্তমে চড়িয়ে কথা বলা, ইদানীং উত্তেজনার বশে খেলোয়াড়দের নামও ভুল করেন। টসে গিয়ে কার সঙ্গে কথা বলছেন গুলিয়ে ফেলেন, তবু তিনিই টসে যাবেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জয়ী প্রাক্তন অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি ২০২০ সালে ক্রিকেট দুনিয়ায় হইচই ফেলে দিয়েছিলেন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ খেলার সময়ে বর্ণবৈষম্যবাদী কথা শুনতে হয়েছে অভিযোগ তুলে। স্যামি বলেছিলেন, ২০১৩ আর ২০১৪ মরশুমে তিনি যখন সানরাইজার্স হায়দরাবাদে খেলতেন, তখন ইশান্ত শর্মা তাঁর নামকরণ করেছিলেন ‘কালু’। দলের অনেকেই তাঁকে ওই নামেই সম্বোধন করতেন। স্যামি তখন জানতেও পারেননি, যত আদর করেই ওই নাম রাখা হয়ে থাক, ওটা আসলে তাঁর গায়ের রং নিয়ে নোংরা রসিকতা। ২০২০ সালে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েড শ্বেতাঙ্গ পুলিসকর্মীর হাতে খুন হওয়ার পরে পৃথিবীজুড়ে বর্ণবৈষম্য নিয়ে প্রকাশ্যে কথাবার্তা চালু হয়ে যায়, তখন স্যামি ইশান্তের কীর্তি প্রকাশ্যে আনেন। তখনকার সতীর্থদের উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন, আমাকে কালু বলে তোমরা কী বোঝাতে চাইতে? এরপর কী হয়? কিচ্ছু না। এই ঘটনা ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মত শ্বেতাঙ্গপ্রধান দেশে প্রকাশ্যে এলে হয়তো সানরাইজার্স বা আইপিএল কর্তৃপক্ষ অথবা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) কোনো তদন্ত শুরু করে দিত, যেমনটা আজীম রফিকের অভিযোগ নিয়ে ইয়র্কশায়ার কাউন্টি করেছিল। কিন্তু আমরা তো ভারতীয়, আমাদের তো ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’, আরও নানা বকম বকম। অতএব আমরা বর্ণবৈষম্যবাদী হতেই পারি না। তাই স্রেফ ইশান্ত স্যামির সঙ্গে কথা বলে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন

কেন আবার এতদিন পরে এসব কথা? কারণ সম্প্রতি প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ ঘোষণা করেছেন যে তিনি আর ধারাভাষ্যকারের কাজ করবেন না। তিনি সোশাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন এর কারণ— তিনি গায়ের রঙের কারণে বৈষম্যের শিকার হতে হতে ক্লান্ত। কালো বলে তাঁকে এত বছর ধারাভাষ্য দেওয়ার পরেও কোনোদিন টসের সময়ে মাঠে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

একথা অবিশ্বাস করার কারণ আছে, যেহেতু ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রাক্তন জোরে বোলার ইয়ান বিশপ এবং জিম্বাবোয়ের প্রাক্তন ক্রিকেটার পুমেলেলো বাঙ্গোয়াকে প্রায়ই টসে দেখা যায়। কিন্তু গতকাল দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের দুই সাংবাদিক – শ্রীরাম বীরা ও আর ভেঙ্কট কৃষ্ণ – এক দীর্ঘ প্রতিবেদন লিখেছেন শিবরামকৃষ্ণণের সঙ্গে কথা বলে। সেই প্রতিবেদন পড়লে পরিষ্কার হয়, শিবরামকৃষ্ণণ নেহাত আন্দাজে এই অভিযোগ তোলেননি। আটের দশকে বিরল প্রতিভা হিসাবে চিহ্নিত এই লেগস্পিনার সেই খেলোয়াড় জীবন থেকেই গায়ের রঙের কারণে নিজের দেশে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। সুতরাং শিকারি বেড়াল যে তিনি গোঁফ দেখলেই চিনতে পারবেন— এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। আমরা চিনি বা না-ই চিনি। তাছাড়া নিজেদের দিকে ভালো করে তাকালেই টের পাওয়া যাবে— আমরা আফ্রিকা-জাত খেলোয়াড়দের প্রতি যে সম্ভ্রম নিয়ে তাকাই, তা আমাদের আশপাশের কালো মানুষদের জন্য বরাদ্দ করি না। একদা কলকাতা ফুটবল মাতানো চিমা ওকোরি, ক্রিস্টোফার, প্রয়াত চিবুজোর, ওমোলো, ওডাফা ওকোলিদের নিয়ে আমরা নাচানাচি করতাম ঠিকই; তা বলে পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে ‘অমুক মেয়েটা কালো হলেও সুন্দর’ বলা বন্ধ করিনি। মজার কথা, ভারতীয়দের বর্ণবৈষম্য এমন বহুমাত্রিক যে তার মধ্যে এমন লিঙ্গবৈষম্যও মিশে থাকে যার শিকার ছেলেরা! কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে মেয়ে বন্ধুদের আলোচনা করতে শুনতাম ‘অত ফরসা ছেলে আমার ভালো লাগে না, একেবারে মেয়েদের মত টুকটুকে গায়ের রং।’ সুতরাং শিবরামকৃষ্ণণকে যে টিভি প্রোডিউসার বলেছেন ‘বসরা আপনাকে টসে বা প্রেজেন্টেশনে না রাখতে’, তিনি খুব অবিশ্বাস্য কিছু বলেননি।

ক্রিকেট মাঠ যে ভারতীয় সমাজের বাইরে নয় তা বুঝতে হলে শিবরামকৃষ্ণণের এই আখ্যান অবশ্যপাঠ্য। মাত্র ১৭ বছর বয়সে টেস্ট অভিষেক (শচীন তেন্ডুলকরের আগে সবচেয়ে কম বয়সে অভিষেকের রেকর্ড) হওয়ার আগেই শিবরামকৃষ্ণণকে নেট বোলার থাকার সময়ে ভারতীয় দলের এক সিনিয়র ক্রিকেটার তাঁর জুতো পালিশ করে দিতে বলেছিলেন। টেস্ট দলে ঢুকে পড়ার পর এবং নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখার পরে কটুকাটব্য আরও বাড়ে। পাকিস্তান সফরে গিয়ে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে অধিনায়ক সুনীল গাভস্কর চকোলেট কেক আনান দলের সকলে মিলে জন্মদিন পালন করার জন্য। সেখানে দলের এক ক্রিকেটার বলেন ‘সানি, তুমি ঠিক রঙের কেক আনিয়েছ। কালো ছেলের জন্যে ডার্ক চকোলেট কেক।’ শিবরামকৃষ্ণণ বলেছেন, তিনি কেঁদে ফেলেন এবং কেক কাটতে চাননি। গাভস্কর বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাঁকে শান্ত করেন, কেক কাটা হয়।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট: জাহান্নামের আগুনে পুষ্পের হাসি

আমরা শিবরামকৃষ্ণণের খেলা দেখেছি পরে সোশাল মিডিয়ার ক্লিপে বা ইউটিউবে, কারণ আমাদের জন্মের আগেই তাঁর স্বল্পমেয়াদি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটজীবন শেষ হয়ে গিয়েছিল। যাঁরা দেখেছেন এবং তাঁর প্রতিভায় চমৎকৃত হয়েছেন, তাঁরা বরাবরই বলেন যে শিবরামকৃষ্ণণের কেরিয়ার লম্বা না হওয়ার পিছনে দায়ী তিনি নিজেই। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মুখেও শুনেছি— শিবরামকৃষ্ণণ প্রথমে মদ খেতেন, পরে মদ তাঁকে খেয়েছে। কিন্তু এত বছর পরে তিনি বলছেন, ক্রমাগত টিটকিরি শুনতে শুনতে ওই ১৮-১৯ বছর বয়সে তিনি হীনমন্যতায় ভুগতেন এবং যখন স্বাভাবিক কারণেই ব্যর্থ হতে শুরু করেন, তখন কেউ পিঠে হাত দিয়ে ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়নি। উলটে তিনি খুব মদ খান— এই গল্প ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আরও চমৎকৃত হওয়ার মত কথা হল, ওই ছোট্ট আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে শিবরামকৃষ্ণণ নিজের দলের ড্রেসিং রুমের চেয়ে বেশি স্বস্তি পেতেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ড্রেসিং রুমে। বলেছেন তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলেন ডেসমন্ড হেইনস। অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েড তাঁকে সর্বদা স্বাগত জানাতেন। মনে পড়ে যায় মহম্মদ আলির কথা, যিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকার করে বলেছিলেন ‘ভিয়েত কংদের সঙ্গে আমার কোনো ঝগড়া নেই। কোনো ভিয়েত কং আমাকে কখনো নিগার বলেনি।’

শিবরামকৃষ্ণণ অবশ্য আলির মত সিংহহৃদয় লড়াকু কেউ নন। তিনি খুবই সাধারণ লোক, ফলে এই মানসিক চাপ সহ্য করতে পারেননি। ছিটকে গিয়েছিলেন। সোশাল মিডিয়া পোস্ট থেকে তাঁর রাজনৈতিক ভাবনাচিন্তা যেটুকু জানা যায়, তাও বেশ গোলমেলে। কিন্তু এখানে সে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক। দুর্ভাগ্যজনক হল— পরে ধারাভাষ্যকার হিসাবে যখন তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে আসেন, তখনো তাঁকে একই ব্যবহার সহ্য করতে হয়েছে। ভারতীয় সমাজ যে এগোবার বদলে পিছিয়ে যাচ্ছে তা আমরা আজকাল অনেক ঘটনাতেই বুঝতে পারি, শিবরামকৃষ্ণণ আরও একটা প্রমাণ জুগিয়ে দিলেন।

ভারতীয় ক্রিকেটের ধারাভাষ্য বেশ কিছুদিন হল আবর্জনায় পরিণত হয়েছে। চমৎকার ইংরিজি এবং গভীর বিশ্লেষণে একসময় মোহিত করে দেওয়া গাভস্কর, শিবরামকৃষ্ণণকে বুক দিয়ে আগলানো অধিনায়ক গাভস্কর এখন চটুল কথাবার্তা বলে নিজেকে জাতীয়তাবাদী বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন সারাক্ষণ। রবি শাস্ত্রীর বরাবরই জনপ্রিয়তার কারণ ছিল অতিকথন আর গলা সপ্তমে চড়িয়ে কথা বলা, ইদানীং উত্তেজনার বশে খেলোয়াড়দের নামও ভুল করেন। টসে গিয়ে কার সঙ্গে কথা বলছেন গুলিয়ে ফেলেন, তবু তিনিই টসে যাবেন। একদা মুগ্ধ করে দেওয়া হর্ষ ভোগলেও এখন ভারতীয় ক্রিকেটার আর বিসিসিআইয়ের চাটুকারিতা ছাড়া কিছু করে উঠতে পারেন না। মহেন্দ্র সিং ধোনির অসন্তোষের কারণ হয়ে একবার ধারাভাষ্যের চুক্তি খুইয়েছিলেন, ফের কেন ঝুঁকি নিতে যাবেন? ঠেকে শেখেননি বলে সঞ্জয় মঞ্জরেকর তো ধারাভাষ্যের চুক্তি হারিয়েছেন চোখের সামনেই। রিকি পন্টিং, ম্যাথু হেডেনরাও হাওয়া বুঝে ভীষণ ভারতপ্রেমী হয়ে যান মাইক হাতে নিলেই। ফলে নিশ্চিত হওয়া যায়, শিবরামকৃষ্ণণের ব্যাপারটা নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা হবে না। ফ্লয়েড হত্যার পরে ইংল্যান্ড বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের প্রথম টেস্টের প্রথম দিন মাইকেল হোল্ডিং স্কাই স্পোর্টসের সরাসরি সম্প্রচারে বর্ণবৈষম্য নিয়ে এক অবিস্মরণীয় আলোচনা করেছিলেন। তাঁর সঙ্গী ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত, কিন্তু সাহেবদের মত ফরসা নাসের হুসেন, আর শ্বেতাঙ্গ এবোনি রেনফোর্ড-ব্রেন্ট।

অমনটা আমাদের এখানে হবে না। কারণ ভারতীয় সমাজে কোনো বৈষম্য নেই। আমরা পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র, আমাদের দেশ একেবারে ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’। তাই ফ্লয়েডের স্মৃতিতে সেবারের আইপিএলে কিছু করার কথা ভাবেনি কর্তৃপক্ষ। এক হাঁটু মুড়ে বসে মুষ্টিবদ্ধ হাত উপরে তোলার যে রীতি তখন প্রায় গোটা ক্রিকেট বিশ্বে চালু হয়েছিল, তা একক উদ্যোগে পালন করেছিলেন হার্দিক পান্ডিয়া। তাও ১৯ সেপ্টেম্বর চালু হওয়া আইপিএলে ২৬ অক্টোবরের ম্যাচে। এই হার্দিককে আবার ভারতীয় ক্রিকেটভক্তরা সোশাল মিডিয়ায় প্রায়ই ‘ছাপড়ি’ বলে গালি দেন। সদ্য কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জেতার পরেও দিয়েছেন। হার্দিকের অপরাধ? তিনি বান্ধবীকে খোলা মাঠেই চুমু খাচ্ছিলেন। ভেবে দেখুন, অন্যের বান্ধবীও নয়। নিজের বান্ধবীকেই চুমু খাচ্ছিলেন। অত্যন্ত অশ্লীল আচরণ সন্দেহ নেই। বান্ধবী বা বউকে প্রকাশ্যে চুলের মুঠি ধরে পেটানো যেতে পারে, চুমু খাওয়া কি কোনো ভদ্রলোকের কাজ? ওসব যারা ‘ছাপড়ি’, তারাই করে। কথাটার মানে জানেন তো? ছাপরবন্দ বলে এক ‘ডি-নোটিফায়েড’ জনগোষ্ঠীর মানুষ। ওঁদের সংস্কৃতি আর অসভ্যতা সমার্থক। বুঝলেন কিনা?

এতদ্বারা প্রমাণিত হইল যে, শিবরামকৃষ্ণণ বাজে কথা বলেছেন। আমরা ভারতীয়রা কোনোরকম বৈষম্যে বিশ্বাস করি না।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

তুমি আর নেই সে সানি

যুদ্ধ করা সৈনিকদের কাজ। ক্রিকেটাররা সৈনিক নন, সন্ত্রাসবাদীও নন। আজ পর্যন্ত কোনও দেশের ক্রিকেটারই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন— এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। সুতরাং দুই দেশের সৈনিকদের মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে বলে দুই দেশের ক্রিকেটারদেরও মুখ দেখাদেখি বন্ধ করতে হবে— এ হল উন্মাদের যুক্তি।

বিশ্ব একাদশের খেলোয়াড়রা, বিশেষ করে [হিলটন] অ্যাকারম্যান, এই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে মজার মজার ঘটনা কল্পনা করত। যেমন ইন্তিখাব [আলম] আর ফারুক [ইঞ্জিনিয়ার] বেয়নেট হাতে মুখোমুখি; আমি যুদ্ধবিমান নিয়ে উড়ছি, আমাকে আরেকটা যুদ্ধবিমানে তাড়া করছে আসিফ মাসুদ; বিষেণ [সিং বেদি] আর জাহির [আব্বাস] পালানোর চেষ্টা করছে। আমরা খুব হাসতাম। অস্ট্রেলিয় খেলোয়াড়রা এমনিতে এই বিষয়টা নিয়ে আমাদের সঙ্গে মজা না করার ব্যাপারে সতর্ক থাকত। কিন্তু রিচার্ড হাটন ওর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে একবার বলেছিল যে ফারুক যদি ইন্তিখাবের পেটে আগে বেয়নেট ঢুকিয়েও দেয়, ইন্তিখাব [আলম] বেঁচে যাবে। কারণ ওর পেটে এত চর্বি যে তাতেই আঘাতটা সামলে দেবে।

বলতেই হবে যে, সেই সময়ে যা চলছিল তাতেও ভারতীয় আর পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়নি। প্রায় প্রত্যেক সন্ধেবেলা আমরা একজন পাকিস্তানি মালিকের রেস্তোরাঁয় খেতে যেতাম। উনি বিভিন্ন রেডিও বুলেটিন থেকে খবর শুনতেন আর একটা পেপার ন্যাপকিনে উর্দুতে লিখে ইন্তিখাবকে দিতেন। ও সেটা ভালো করে দেখতও না, মুচড়ে ফেলে দিত।

উপরের অংশটা সুনীল গাভস্করের স্মৃতিকথা সানি ডেজ (প্রথম প্রকাশ ১৯৭৬) বইয়ে রয়েছে (ভাষান্তর আমার)। এই ঘটনাবলি ১৯৭১ সালের, যখন তিনি গারফিল্ড সোবার্সের নেতৃত্বাধীন বিশ্ব একাদশের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সিরিজ খেলতে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। তখন ভারত-পাক যুদ্ধ চলছে। ভেবে দেখুন, সেই যুদ্ধ চলাকালীন দেশপ্রেমিক গাভস্কর পাক ক্রিকেটারদের সঙ্গে একই দলে খেলছিলেন! শুধু তাই নয়, যে যুদ্ধে ভারতীয় সৈনিকরা জীবনমরণ লড়াই করছিলেন, সেই যুদ্ধ নিয়ে শ্বেতাঙ্গ ক্রিকেটারদের রসিকতায় হাসাহাসিও করছিলেন! সেখানেই শেষ হলে কথা ছিল, পাক ক্রিকেটারদের সঙ্গে সন্ধেবেলা একজন পাকিস্তানির রেস্তোরাঁয় খেতেও যাচ্ছিলেন! কোনও সন্দেহ নেই— আজ এমন করলে তিনি যে কেবল সোশাল মিডিয়ায় ট্রোলবাহিনীর শিকার হতেন তা-ই নয়, তাঁর নামে দেশদ্রোহের মামলাও হয়ে যেত দেশের কোনও না কোনও আদালতে। দেশে ফিরতেই হয়তো বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হয়ে যেতেন।

একেবারেই অন্যায় হত, কারণ যুদ্ধ করা সৈনিকদের কাজ। ক্রিকেটাররা সৈনিক নন, সন্ত্রাসবাদীও নন। আজ পর্যন্ত কোনও দেশের ক্রিকেটারই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন— এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। সুতরাং দুই দেশের সৈনিকদের মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে বলে দুই দেশের ক্রিকেটারদেরও মুখ দেখাদেখি বন্ধ করতে হবে— এ হল উন্মাদের যুক্তি। ভারত আজ উন্মাদের যুক্তিতে চলে, ১৯৭১ সালে চলত না। তাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে মদত দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জব্বর লড়াই করে তাদের হারিয়ে দিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষুরও পরোয়া করেনি। আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলার আগেই মার্কিন রাষ্ট্রপতির সোশাল মিডিয়া পোস্ট থেকে জানা যাচ্ছে যে, ভারতের সৈনিকরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অপারেশন সিঁদুর থামিয়ে দিয়েছেন। এদিকে বৃদ্ধ সুনীল গাভস্কর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের হায়দ্রাবাদ ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিককে আক্রমণ করছেন, কারণ তিনি পাকিস্তানি ক্রিকেটার আবরার আহমেদকে ইংল্যান্ডের দ্য হান্ড্রেড প্রতিযোগিতার নিলাম থেকে নিজের মালিকানাধীন দলের জন্য কিনেছেন।

অর্থাৎ আজকের গাভস্কর ১৯৭১ সালের গাভস্করকে ট্রোল করছেন। নিজের মন্তব্যের যুক্তি হিসাবে গাভস্কর যা বলেছেন, তার সঙ্গে ট্রোলদের কথাবার্তার কোনও তফাত নেই। পাকিস্তানি ক্রিকেটারকে নাকি দলে নেওয়া উচিত নয়, কারণ তিনি যে টাকা আয় করবেন সে টাকা পাকিস্তানে যাবে। পাকিস্তানের টাকা ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদত দিতে খরচ হয়। সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপে ভারতের সৈনিক এবং সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়। দেশের স্বার্থের চেয়ে একটা সামান্য লিগ জেতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়, অতএব সানরাইজার্স লিডস দলের মালিক কাব্যা মারানের উচিত ছিল আবরারকে নিলাম থেকে না কেনা।

সন্ত্রাসবাদের এই অদ্ভুত ফ্লো চার্ট হাজির করেছেন গাভস্কর। সাংবাদিক মহলে প্রায় সবাই জানেন যে গাভস্কর চিরকাল বইপ্রেমী। কিন্তু এসব কথা শুনলে সন্দেহ হয়, ইদানীং বই পড়া ছেড়ে বোধহয় ধুরন্ধর জাতীয় বলিউডি সিনেমায় মন দিয়েছেন। যে কোনও পাকিস্তানি নাগরিক পৃথিবীর যে কোনও জায়গা থেকে যা রোজগার করেন, সবই পাকিস্তান থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ চালাতে ব্যবহৃত হয়— এই ঘৃণায় বাঁধানো অতি সরল আজগুবি তত্ত্ব আর কোথা থেকে শেখা সম্ভব? তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই পাকিস্তানি মানেই সন্ত্রাসবাদী, তাহলে আবার গাভস্কর নিজেই বিপদে পড়ে যাবেন। এবং সেটা শুধু ১৯৭১ সালের কার্যকলাপের জন্য নয়।

আরও পড়ুন রাষ্ট্রীয় ক্রিকেট-সেবক সংঘ

মাত্র কয়েকদিন আগে প্রাক্তন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেলের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের ১৪ জন প্রাক্তন ক্রিকেটার পাকিস্তান সরকারকে চিঠি লিখেছিলেন কারাবন্দি ইমরান খানের স্বাস্থ্যের যথাযথ যত্ন এবং তাঁর প্রতি যথাযথ ব্যবহার দাবি করে।[1] সেই ১৪ জনের মধ্যে ছিলেন আমাদের কপিলদেব এবং গাভস্কর। সব পাকিস্তানিই যদি সন্ত্রাসবাদী হয়, তাহলে গাভস্কর একজন সন্ত্রাসবাদীর প্রতি দরদে পাকিস্তান সরকারকে চিঠি লিখেছিলেন বলতে হয়। ইমরানের বিরুদ্ধে গাভস্কর যখন খেলেছেন তখনও তো পাকিস্তানের মাটি থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চলেছে। এমনকি ইমরান যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, তখনও যে ভারত-পাক সীমান্তে উত্তেজনা একেবারে শূন্যে নেমে এসেছিল তা নয়। তাহলে গাভস্কর সেসব ভুলে ইমরানের জন্যে মুখ খুলতে গেলেন কেন?

এর একটাই উত্তর হয়। গাভস্কর ভালো করেই জানেন যে পাকিস্তানি মানেই সন্ত্রাসবাদী নয়। ফলে পৃথিবীর যেখানে যে পাকিস্তানি টাকা রোজগার করবে, সেই টাকাই পাকিস্তানে ফেরত গিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে— এ-কথার কোনও ভিত্তি নেই। গাভস্কর অবশ্য আত্মপক্ষ সমর্থনে বলতেই পারেন যে তিনি বলেছেন “indirectly contributes”, অর্থাৎ “পরোক্ষভাবে” ওই টাকার অবদান থাকে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে। কিন্তু এই কথাটা দলে পাকিস্তানি ক্রিকেটার না নেওয়ার যুক্তিকে আরও দুর্বল করে। যদি একজন করদাতা না-ই জানতে পারেন তাঁর করের টাকা পরোক্ষভাবে কোথায় কোথায় ব্যবহৃত হয়, তাহলে অপব্যবহারের জন্যে তো তাঁকে দোষী ঠাওরানো যায় না। তাঁর রোজগারের পথ বন্ধ করাও চলে না।

এর চেয়েও বড় কথা, কোনও কোম্পানি যে দেশে ব্যবসা করে তাকে সে দেশের নিয়মকানুন মেনেই চলতে হয়। সান গ্রুপ ব্যবসা করছে ইংল্যান্ডে, আর চলবে ভারতীয়দের আবেগ অনুভূতি অনুযায়ী— এমন মামাবাড়ির আবদার কেমন করে করা যায়? তাছাড়া ভারতীয়দের টাকা পরোক্ষভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়া নিয়ে গাভস্করের এতই যদি মাথাব্যথা, তিনি সদ্যসমাপ্ত কুড়ি-বিশের বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হওয়ার বিরোধিতা করলেন না কেন? আবরার দ্য হান্ড্রেড প্রতিযোগিতায় সানরাইজার্স লিডসের হয়ে খেলে পারিশ্রমিক পাবেন ১,৯০,০০০ পাউন্ড, অর্থাৎ প্রায় আট কোটি পাকিস্তানি টাকা। তার কয়েকশো গুণ টাকা ভারত-পাক ম্যাচ থেকে কামিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। গাভস্কর একবারও বলেননি এটা হওয়া উচিত নয়। উলটে সে ম্যাচের ধারাভাষ্যে নিজে যুক্ত ছিলেন, মানে নিজেও ওই ম্যাচ থেকে রোজগার করেছেন। তাঁর সঙ্গে ধারাভাষ্যে ছিলেন ওয়াসিম আক্রম, রামিজ রাজার মতো পাকিস্তানি প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও। তাঁরাও ওই ম্যাচ থেকে রোজগার করেছেন। গাভস্করের যুক্তি মানলে সে টাকাও পরোক্ষভাবে বেশ কিছু ভারতীয়ের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সেসব আটকানোর কথা তিনি একবারও মুখ ফুটে বলেননি কেন?

তাহলে কি বুঝতে হবে, ১৯৯২ সালে মুম্বইয়ের দাঙ্গায় হিন্দু দাঙ্গাবাজদের সামনে এক মুসলমান পরিবারের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়া গাভস্কর আজ হিন্দুত্ববাদী দক্ষ বাজিকরের হাতের পুতুল মাত্র? তাই যে ম্যাচ থেকে আরএসএস শাখা হয়ে দাঁড়ানো বিসিসিআইয়ের বিপুল আয় হয়, সেই ম্যাচে পাকিস্তানিদের অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁর আপত্তি নেই, অথচ ইংল্যান্ডের লিগে ভারতীয় মালিকের দলে পাকিস্তানের ক্রিকেটার খেললে তিনি খড়্গহস্ত?

জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে ভারতীয়দের অনেক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন উপহার দিয়েছিলেন যে গাভস্কর, তিনি অস্ত গিয়েছেন। এখন ধান্দাবাজ ধর্মান্ধতায় ঢাকা তাঁর মুখ।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সবার উপরে জয় শাহ সত্য

আমরা তো ছোটবেলায় শুনতাম যা রাজার নীতি সেটাই নাকি রাজনীতি। সুতরাং রাজা যা করেন সেটাকেই নৈতিক বলে ধরতে হবে। দয়া করে আবার জিজ্ঞেস করে বসবেন না ‘কে রাজা?’

পশ্চিমবঙ্গে অনেকেই সেই শনিবার থেকে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর উপর চটে রয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য— বিজেপির নির্বাচনী প্রচার করতে এসে কেন সেই প্রচারেরই পাশের মঞ্চ থেকে সরকারি কাজ করা হবে? এটা অনৈতিক। এত রাগ করার কোনো মানেই হয় না। আরে বাপু, রাজনীতি কথাটার মধ্যে আগে তো ‘রাজ’, পরে ‘নীতি’। তাছাড়া আমরা তো ছোটবেলায় শুনতাম যা রাজার নীতি সেটাই নাকি রাজনীতি। সুতরাং রাজা যা করেন সেটাকেই নৈতিক বলে ধরতে হবে। দয়া করে আবার জিজ্ঞেস করে বসবেন না ‘কে রাজা?’ যিনি শাসক, তিনিই রাজা। কী বলছেন? ভারত রাজতান্ত্রিক দেশ নয়, গণতান্ত্রিক? হ্যাঁ সে তো বটেই। মোদীজি নিজেই তো বারবার বলেন যে আমরা হলাম পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ, আমাদের গর্ব হওয়া উচিত। ঠিকই বলেন। আমরা তো ভোট দিয়ে রাজা নির্বাচন করি, অতএব আমরা গণতন্ত্র।

এখন কথা হচ্ছে, এত বড় দেশের সবকিছু তো আর একজন রাজার পক্ষে চালানো সম্ভব নয় (এমনিতেই মোদীজি দিনে চার ঘন্টার বেশি ঘুমোন না)। তাই সবকিছুর জন্যে আবার আলাদা করে ছোট ছোট রাজা রাখতে হয়। ক্রিকেটের রাজা হলেন মোদীজির প্রধান মন্ত্রণাদাতা অমিত শাহের সুপুত্র জয় শাহ। ভারতকে বিশ্বগুরু করার যে স্বপ্ন মোদীজি দেখেছিলেন, তা আপাতত হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়েছে বলে আপনারা অনেকে খিল্লি করছেন বটে, কিন্তু সে স্বপ্ন ক্রিকেটবিশ্বে সফল করে ফেলেছেন মোদীজির স্নেহভাজন জয়।

মোদীজির মত পরিশ্রমী মানুষকে ছোট থেকে দেখে বড় হওয়া জয় তাঁকেই যে জীবনের ধ্রুবতারা করেছেন তা একেবারে পদে পদে টের পাওয়া যায়। যেমন ধরুন, মোদীজি যেমন সরকারে আর পার্টিতে তফাত করেননি ব্রিগেডে, জয়ও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলে তফাত করেন না। তিনি এখন আর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কেউ নন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। অথচ ভারত জিতলে তিনি উল্লাস প্রকাশ করেন। ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরে করেছিলেন, কয়েকদিন আগে ভারত কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জেতার পরেও করেছেন। এবারে আরও এক ধাপ এগিয়ে ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব আর কোচ গৌতম গম্ভীরকে সঙ্গে করে ট্রফিসুদ্ধ মন্দিরে নিয়ে গেছেন, পুজো দিয়েছেন। যেন তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের কর্তা নন, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডেরই কর্তা। জয় প্রথম ভারতীয় নন যিনি আইসিসির মাথায় বসেছেন। ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী (তথা প্রভাবশালী) ক্রিকেট বোর্ড হওয়ায়, ভারতীয় বোর্ডের সর্বোচ্চ পদাধিকারীরা অনেকেই পরে আইসিসি প্রধান হয়েছেন। আইসিসির সংবিধান বদল করার আগে সর্বোচ্চ পদ ছিল সভাপতির। বাংলা থেকে জগমোহন ডালমিয়া, মুম্বাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন থেকে শরদ পাওয়ার, বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন থেকে শশাঙ্ক মনোহর সেই দায়িত্ব সামলেছেন। চেন্নাইয়ের এন শ্রীনিবাসন প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন। ওঁদের কাউকেই এই কাণ্ড করতে দেখা যায়নি। যে অস্ট্রেলীয় আর ইংরেজ ক্রিকেট প্রশাসকদের একসময় আইসিসিতে একাধিপত্য ছিল, তাঁদের কাউকেও নিজের দেশের কোনো ট্রফি জয়ে উল্লাস করতে দেখা যায়নি।

যাবেই বা কেন? যাঁর উপরে গোটা পৃথিবীর খেলাটার দায়িত্ব, তিনি কখনো নিজের দেশের সাফল্য নিয়ে মেতে থাকতে পারেন? থাকলে তাঁকে অন্যরা অভিভাবক হিসাবে বিশ্বাস করবে? ব্রিটিশ কিংবদন্তি অ্যাথলিট সেবাস্তিয়ান কো একসময় ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনসের সভাপতি ছিলেন। অলিম্পিকে ব্রিটেনের অ্যাথলিটরা সোনা জিতলে তিনি লাফালাফি করছেন— এমন দৃশ্য কল্পনাও করা যায়নি। অবশ্য ওঁদের জয় কেনই বা অনুসরণ করতে যাবেন মোদীজির মত আদর্শ সামনে থাকতে? মোদীজি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে দিল্লির চেয়ে আমাদের জাতীয় জীবনে যে আমেদাবাদের গুরুত্ব বেড়ে গেছে, সেকথা কে না জানে? অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এলে আমেদাবাদে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হবেই। মার্কিন রাষ্ট্রপতি, জাপানের প্রধানমন্ত্রী, চীনের রাষ্ট্রপতি, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী— তালিকায় কে নেই? পুরনো সর্দার প্যাটেল স্টেডিয়াম ভেঙে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নামাঙ্কিত দেশের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়ামও তৈরি করা হয়েছে আমেদাবাদে, যদিও হালে যশপ্রীত বুমরা-অক্ষর প্যাটেল আসার আগে পর্যন্ত ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে ওই শহরের অবদান শূন্য বললে ভুল বলা হয় না। রঞ্জি সিং থেকে শুরু করে চেতেশ্বর পূজারা, রবীন্দ্র জাদেজা পর্যন্ত যে কজন ভারতীয় ক্রিকেটার গুজরাট রাজ্য থেকে জাতীয় দলে এসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছাপ ফেলেছেন, তাঁরা কেউই আমেদাবাদের ক্রিকেটার নন। ওঁরা খেলতেন সৌরাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের হয়ে। আমেদাবাদ যে ক্রিকেট সংস্থার ঘরের মাঠ, সেই গুজরাট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের দলটা আজ পর্যন্ত রঞ্জি ট্রফি জিতেছে মোটে একবার, তাও মোটে এক দশক আগে, ২০১৬-১৭ মরশুমে। মানে ঐতিহ্য বলতে তেমন কিছুই নেই। সবচেয়ে বড় কথা— আমেদাবাদে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা মুম্বাই, কলকাতা, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, দিল্লির চেয়ে অনেক কম। কলকাতায় এবারের বিশ্বকাপেও ইতালি বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ দেখতে মেলা লোক হয়েছিল, আমেদাবাদে ২০২৩ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ প্রায় ফাঁকা গ্যালারিতে হয়েছে। সেই স্টেডিয়ামের উদ্বোধন আবার ক্রিকেট ম্যাচ দিয়ে হয়নি, হয়েছিল মোদী-ট্রাম্পের যুগ্ম সমাবেশ দিয়ে। সেদিন কিন্তু দর্শকের অভাব হয়নি।
স্পষ্ট বোঝা যায়, জয় মোদীজির যে জীবনাদর্শ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন তা হল— সবার উপরে গুজরাট সত্য তাহার উপরে নাই। এ পথেই তিনি চলতেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সচিব থাকার সময়ে, গোটা ভারত নিয়ে ভাবতেন না।

অতএব আইসিসি কর্তা হয়ে গিয়ে তাঁর ভারত নিয়েই মেতে থাকায় আশ্চর্যের কিছু নেই। বরং এই আচরণ যে রীতিমত প্রশংসনীয়, তা দেশের সংবাদমাধ্যমও মনে করছে। তাই গত শনিবার সিএনবিসি-টিভি১৮ ইন্ডিয়া বিজনেস লিডার অ্যাওয়ার্ডসে তাঁকে ক্রিকেটের প্রতি ব্যতিক্রমী অবদানের জন্য পুরস্কারও দেওয়া হয়েছে। সত্যিই তো! জয়ের আগে কে-ই বা নিজের দায়িত্ব, কর্তব্য, পদমর্যাদার তোয়াক্কা না করে দেশসেবা করতে পেরেছে!

সেবা বলে সেবা? ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড গত রবিবার ভারতের ২০২৬ কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জয়ী পুরুষদের দল এবং ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়ী দল, ২০২৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী ছেলেদের দল, ২০২৫ পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপ জয়ী মহিলাদের দল এবং ২০২৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী মেয়েদের দলকে সংবর্ধনা দিয়েছে। সেখানেও সশরীরে হাজির ছিলেন জয়। বোর্ড সভাপতি মিঠুন মনহাসের চেয়ে তাঁরই ছবি দেখা যাচ্ছে বেশি।

আরও পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে

আবার ভারতের ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠন জয়কে সংবর্ধনা জানিয়েছে। সেখানে তিনি বড় মুখ করে বলেছেন, তিনি নাকি বোর্ডের কর্তা থাকার সময়ে একেবারে ২০২৮ অলিম্পিক পর্যন্ত কী কী করতে হবে তার পরিকল্পনা করে দিয়েছেন। এখন যাঁরা বোর্ড চালাচ্ছেন তাঁদের ২০৩৬ অলিম্পিক পর্যন্ত কীভাবে কী করা হবে তা ছকে ফেলা উচিত। এখানেও জয় অনন্য। অতীতে কোনো ক্রিকেট প্রশাসককে ক্রীড়া সাংবাদিকরা সংবর্ধনা জানিয়েছেন কিনা খুঁজে বের করতে গবেষক লাগবে। প্রশাসকদের সাংবাদিকরা সংবর্ধনা দেবেন কী জন্যে? দিল্লির এডিটর্স গিল্ড কোনোদিন কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে ডেকে সংবর্ধনা দিয়েছে নাকি? দেশ চালানোটাই কি একটা অভিনন্দনযোগ্য কাজ, যার জন্যে প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনা প্রাপ্য? যদি তা না হয়, তাহলে ক্রীড়া সাংবাদিকরাই বা কোন অর্জনের জন্যে জয়কে সংবর্ধনা দিলেন? ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাফল্যের জন্যে নাকি? তাহলে তো ক্রিকেটারদের সংবর্ধনা দেওয়া উচিত ছিল। বড় জোর বোর্ড সভাপতি বা সচিবদের। আইসিসি চেয়ারম্যানকে যদি ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা ভারতীয় ক্রিকেটের সাফল্যের জন্যে সংবর্ধনা দেন, তাহলে তো…
যাকগে, অমৃতকালের ভারতে সবই সম্ভব। “পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ” গেয়ে খেলতে নামা হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পারসিকদের ক্রিকেট দল বিশ্বকাপ জেতার পর সেই ট্রফি নিয়ে যদি হিন্দু অধিনায়ক, কোচ আর জয় শাহ দেশের মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে বেড়ালে দোষ না হয়, তাহলে সাংবাদিকরা প্রশাসকদের প্রশ্ন করার কর্তব্য ভুলে তাঁদের সংবর্ধনা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও দোষ হয় না। শেষে “জয় জয় জয় জয় হে” গেয়ে নিলেই সাত খুন মাপ।

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

না হয় আজ চ্যাম্পিয়ন হলাম, কিন্তু ভারতীয় দলটা আসলে কার?

নয়ের দশকে রঙিন জামার ক্রিকেট চালু হওয়ার পর থেকে নানা ধরনের নীল জার্সি পরে আসছে ভারত, তার মধ্যেও গেরুয়া রং ঢুকে পড়েছে।

যদি বলি আজ গ্রহ, উপগ্রহগুলো চিন্তায় আছে— তাহলে হাসাহাসি করবেন না। ব্যাপার খুব গুরুতর। টানা দ্বিতীয়বার যদি ভারতীয় দল কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জিতে যায়, তাহলে কোনও কথা নেই। কিন্তু যদি হেরে যায়, তখন বৃহস্পতি কোন অবস্থানে থাকার জন্যে চরম মুহূর্তে ঈশান কিষণের হাত থেকে অমুক ক্যাচটা পড়ে গেল, অথবা শনির কোন চক্রান্তে যশপ্রীত বুমরার ইয়র্কারটা লেংথ মিস করে ফুলটস হয়ে গেল আর ড্যারিল মিচেল বোল্ড হওয়ার বদলে ছক্কা মেরে দিলেন— তা নিয়ে শোরগোল পড়ে যেতে পারে। তাতে কোন জ্যোতিষীর কপাল পুড়বে আমরা জানি না। যাঁর পুড়বে তিনি নিজের পিঠ বাঁচাতে বলতেই পারেন “আমার গণনায় ভুল ছিল না। হতভাগা শনি নিজের গতি কমিয়ে ফেলেছে চক্রান্ত করে। ভাগ্যিস বৃহস্পতিটাকে বেঁধে রেখেছিলাম, তাই শেষ ওভার পর্যন্ত গেছে। নইলে দু ওভার আগেই খেল খতম হয়ে যেত।”

আষাঢ়ে গপ্পো লিখছি ভেবে অন্য লেখায় চলে যাচ্ছেন তো? আচ্ছা যাবেন নাহয়। যাওয়ার আগে শুনে যান, বাংলার সাংবাদিক বা ইউটিউবাররা আপনাকে খবরটা না দিলেও, দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের সাংবাদিক দেবেন্দ্র পাণ্ডে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের আগেরদিন লিখেছিলেন যে, ভারতীয় দলের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অনুশীলন করার কথা ছিল সন্ধে ছটা থেকে। কিন্তু যেহেতু সেদিন চন্দ্রগ্রহণ চলার কথা বিকেল তিনটে কুড়ি থেকে ছটা বেজে সাতচল্লিশ মিনিট পর্যন্ত, সেহেতু টিম ম্যানেজমেন্ট ঠিক করে, এই অশুভ সময়ে শুভ কাজ করতে না যাওয়াই ভালো। তাই অনুশীলন শুরু হয় চন্দ্রগ্রহণের পরে।

শাস্ত্রে বলেছে— মহান ব্যক্তিরা যে পথে চলেন সেটাই সঠিক পথ। আর কে না জানে, ভারতীয় ক্রিকেটের ভাগ্যনিয়ন্তারা সকলেই মহান! গৌতম গম্ভীর থেকে শুরু করে বোর্ড সভাপতি মিঠুন মানহাস, সকলেই সনাতনী। ২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লির রঞ্জি দলের অধিনায়ক ছিলেন, তখনও নাকি এসব হতো। তবে তফাতটা হল, তখন গম্ভীর আর কোচ বিজয় দাহিয়া বুক ফুলিয়ে বলতেন যে তাঁরাই এটা করাচ্ছেন। এখন কে যে চন্দ্রগ্রহণের সময়ে অনুশীলন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা কিন্তু প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে না। দেবেন্দ্র পাণ্ডের ওই প্রতিবেদনেও বলা নেই। প্রতিবেদনে কেবল বলা আছে ‘টিম ম্যানেজমেন্ট’। সাধারণত এই শব্দগুলো দিয়ে বোঝানো হয় অধিনায়ক, কোচ আর নির্বাচকদের। আজকাল ‘সাপোর্ট স্টাফ’-ও গুরুত্বপূর্ণ, ফলে ব্যাটিং কোচ সীতাংশু কোটকও সিদ্ধান্তটা নিয়ে থাকতে পারেন। বোলিং কোচ মর্নি মর্কেলের ধর্মে চন্দ্রগ্রহণ অশুভ বলা আছে বলে তো জানা নেই। সিদ্ধান্তটা সূর্যকুমার যাদব, গম্ভীর, কোটক, নির্বাচন সমিতির প্রধান অজিত আগরকর— সকলে মিলেও নিয়ে থাকতে পারেন। দলে যতই সঞ্জু স্যামসনের মত খ্রিস্টান, অর্শদীপ সিংহের মতো শিখ আর মহম্মদ সিরাজের মত মুসলমান ক্রিকেটার থাকুন, দলটা তো সনাতনীদেরই। ফলে তাঁদের ধর্মে যে সময়টাকে অশুভ বলা হয়েছে, সেইসময় অনুশীলন করা যে কোনওভাবেই চলতে পারে না তাতে সন্দেহ কী?

এ মা! রেগে গেলেন নাকি? আরে আমি কি বলেছি যে ব্যাপারটা অন্যায় হয়েছে? আমি শুধু বলছি, অক্ষরে অক্ষরে শাস্তর মেনে পাঁজি-টাজি দেখে যখন মাঠে নামা হচ্ছে, তখন দল হেরে গেলে তার দোষ কখনওই খেলোয়াড়দের বা কোচদের হতে পারে না। সব গ্রহদোষ। এমনিতেও সর্বশক্তিমান জয় শাহ বিসিসিআই ছেড়ে আইসিসির চেয়ারম্যান হয়ে যাওয়ার পরে বিসিসিআইয়ের কোনও সিদ্ধান্ত যে কে নেন তা কেউ বলে না। সিদ্ধান্তগুলো সর্বসমক্ষে জানান বোর্ড সচিব দেবজিৎ শইকিয়া, কিন্তু নেন কে? সেকথা কিন্তু দেবজিৎও বলেন না।

যেমন ধরুন, বাংলাদেশে দীপু দাসকে হত্যা করা হয়েছে বলে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে খেলতে দেওয়া যাবে না— এই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে? ভারত সরকার? না তো! বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংহ মোটেই এরকম কিছু বলেননি। তাঁদের মন্ত্রকের কোনও উচ্চপদস্থ অফিসারও বলেননি। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আমাদের সরকারের সম্পর্কেরও কোনও অবনতি হয়নি ওদেশের প্রাক-নির্বাচনী খুনোখুনির কারণে। বেগম খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পরে জয়শংকর, রাজনাথ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। খালেদা-পুত্র তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে তাঁর সঙ্গে কুশল বিনিময়ও হয়েছে। তাহলে মুস্তাফিজুরের অপরাধটা কী? কেউ জানে না। আপাতত বাংলাদেশে হিন্দুবিদ্বেষী জামাত-এ-ইসলামি তো হেরে ভূত, তাহলে আইপিএলের সময়ে মুস্তাফিজুরকে ডেকে নেওয়া হবে কি? কেউ জানে না। কারণ তাড়ানোর সিদ্ধান্তটা কে নিয়েছিল তা-ই কেউ জানে না। কেবল দেবজিৎ একদিন ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে— ওকে বাড়ি পাঠাতে হবে।

তেমনই পহলগামে সন্ত্রাসবাদীরা হানা দিয়ে অনেককে খুন করেছে বলে ভারতীয় ক্রিকেটাররা পাকিস্তানিদের সঙ্গে খেলবেন কিন্তু করমর্দন করবেন না, অর্থাৎ ‘যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভিজাব না’— এই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল, তাও কেউ জানে না। বলা হয়, বিসিসিআই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিসিসিআই কি গা ছমছমে হলিউডি কল্পবিজ্ঞান ফিল্মে দেখা সর্বশক্তিমান কোনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যে মানুষকে দিয়ে যা ইচ্ছে করিয়ে নেয়, মানুষ টেরই পায় না? বিসিসিআইয়ের তো একজন সভাপতি আছেন। বোর্ডের সংবিধান অনুযায়ী তিনিই সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক। অথচ তিনি তো কই কিছু বলেননি! আচ্ছা কে এই ভদ্রলোক? চেনেন তাঁকে? না চিনলে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। দিল্লির বাইরে তাঁকে বিশেষ কেউ চেনে না। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মন্দ ব্যাট করতেন না, দিল্লির হয়ে খেলতেন। বিসিসিআইয়ের সভাপতির আসনে বসেছেন জগমোহন ডালমিয়া, এন শ্রীনিবাসনের মত নামকরা শিল্পপতিরা; কখনও এনকেপি সালভে, মাধবরাও সিন্ধিয়া, শরদ পাওয়ারের মত বড় মাপের রাজনৈতিক নেতারা, কিম্বা রাজ সিংহ দুঙ্গারপুর, সৌরভ গাঙ্গুলির মতো প্রাক্তন ক্রিকেটার অথবা শশাঙ্ক মনোহরের মত ক্রিকেটপ্রেমী ক্ষমতাশালী লোকেরা। এই আসনে মিঠুনকে বসানো মানে হল “চন্দ্র সূর্য অস্ত গেল/জোনাক ধরে বাতি/ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ গেল/শল্য হল রথী।” এই লজ্জাতেই হয়তো মিঠুন মুখ খোলেন না বা সংবাদমাধ্যম তাঁর কাছে কিছু জানতেও চায় না, যা বলার দেবজিতই বলেন। তাহলে দেবজিৎ কি শ্রীরামকৃষ্ণ, আর মিঠুন গিরিশ ঘোষ? দেবজিতকে বকলমা দিয়েছেন? কেন দিলেন? কার নির্দেশে দিলেন? উত্তর নেই।

অবশ্য মিঠুনের পূর্বসুরি রজার বিনি, যাঁর ক্রিকেটিয় কীর্তি ভোলার নয় কারণ তিনি ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য, তিনিও কোনও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানা যায় না। যা ঘটত সবই যে তৎকালীন সচিব জয়ের নির্দেশে, তা নিয়ে তখন রাখঢাক ছিল না। ব্যাপারটা রেখে ঢেকে করা হতো সৌরভ বিসিসিআই সভাপতি থাকাকালীন।

সাংবাদিক শারদা উগ্রা ২০২৩ সালেদ্য ক্যারাভ্যান পত্রিকায় এক দীর্ঘ প্রতিবদনে লেখেন যে, সৌরভের আমলের শেষদিকে জয়ের নির্দেশে বিসিসিআইয়ের অন্যরা সৌরভের ফোনই ধরতেন না। সৌরভ যে বোর্ড সভাপতি হতে পেরেছিলেন জয়ের বাবা, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের আনুকূল্যে— সেকথা এখন অনেকেরই জানা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তৈরি নতুন সংবিধান ফের বদলাতে আদালতে বারবার আবেদন করে সৌরভ অনেকদিন পদে টিকে ছিলেন জয়ের সঙ্গে গলাগলি করে। তার মূল্য তাঁকে চোকাতে হয়েছে। যা-ই হোক, কথা হল, এখন তো আর জয় বিসিসিআই কর্তা নন। তাহলে বিসিসিআই চালাচ্ছে কে? এই প্রশ্ন মনে জাগতে পারে। তাই মনে রাখবেন— শারদার ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘Shah’s Playground: BJP’s Control of Cricket in India’।

অর্থাৎ বিসিসিআই হল জয়ের খেলার মাঠ তথা বিজেপির শাখা অফিস। এই কথাটি ক্রিকেটমহলে জানে সবাই, কিন্তু লেখার মত মেরুদণ্ড গোটা ভারতে হাতে গোনা যে কজনের আছে (বাংলায় কারও নেই), তাঁদের মধ্যে এক নম্বরে আছেন শারদা। ২০২৩ সালের অগাস্ট মাসে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন ইংরিজিতে লিখিত এবং বেশ দামি একটা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বলেই বেশিরভাগ ক্রিকেটপ্রেমীর নজরে পড়েনি। পড়লেও যে খুব বিশ্বাস করতেন তা অবশ্য নয়। কারণ ক্রিকেট ভারতে ধর্মের স্তরে উন্নীত হয়েছে অনেককাল হলো। এই ধর্মের ভক্তরা আবার হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন বা খ্রিস্টানদের চেয়েও এককাঠি সরেস। সারা পৃথিবীতে সব ধর্মের গোঁড়া লোকেরা চিরকাল নিজের ধর্মের না হোক, অন্য ধর্মের দোষ দেখতে পায়। তা নিয়ে খুনোখুনি করে। সহিষ্ণু ধর্মাবলম্বীরা এবং নাস্তিকরা তাদের নিন্দা করেন। গত বিশ-তিরিশ বছরে যেহেতু বিজেপি এদেশে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছে, সেহেতু রাজনৈতিকভাবে যাঁরা বিজেপির বিরোধী তাঁরাও চারদিকে এত ধর্মের বাড়বাড়ন্তের নিন্দা করেন। সবেতে ধর্মকে টেনে আনা, নিজের ধর্মবিশ্বাসের উগ্র প্রকাশের মাধ্যমে অন্য ধর্মের মানুষের পিছনে লাগার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানুষ এদেশে এখনও পাওয়া যায়। কিছুদিন আগেই যেমন হিমাচল প্রদেশের এক যুবককে পেয়েছি, যিনি উন্মত্ত হিন্দু গুন্ডাদের হাত থেকে এক মুসলমান বৃদ্ধকে বাঁচাতে নিজের নাম বলেছেন মহম্মদ দীপক। কিন্তু ভারতে ক্রিকেট এমন এক ধর্ম, যার কোনো দোষ উপরে উল্লিখিত ধর্মগুলোর কেউই দেখতে পান না। ফলে দেশের ক্রিকেট চালাচ্ছে বিজেপি— একথা নাস্তিক, ঘোর বামপন্থী ক্রিকেটপ্রেমীদের বললেও তাঁরা পাত্তা দেন না। নার্সারি স্কুলের বাচ্চাদের মতই তাঁদের চোখে ভারতীয় ক্রিকেট দল আজও ফুলের মত নিষ্পাপ এবং ক্রিকেটাররা স্রেফ ননীচোর বালগোপাল।

বিজেপি আমলে যেমন, তেমনই চন্দ্রগ্রহণের সময়ে অনুশীলন না করার মত ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে ক্রিকেট দল। বিসিসিআইকে তুষ্ট করতে ব্যস্ত সম্প্রচারকারী সংস্থা একেবারে বিজেপির ঢঙেই উগ্র জাতীয়তাবাদী, খেলোয়াড়ি মনোভাব বর্জিত কুরুচিকর প্রোমো প্রচার করে যাচ্ছে বছরের পর বছর। এশিয়া কাপ জিতে ক্রিকেট অধিনায়ক বলে দিয়েছেন, মনে হচ্ছিল নরেন্দ্র মোদী নিজেই স্ট্রাইক নিয়ে রান করে দিলেন। ভাবা যায়!

নয়ের দশকে রঙিন জামার ক্রিকেট চালু হওয়ার পর থেকে নানা ধরনের নীল জার্সি পরে আসছে ভারত, তার মধ্যেও গেরুয়া রং ঢুকে পড়েছে। এদিকে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী মহম্মদ শামি এখন আগরকরের কথা মতো ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে ঝুড়ি ঝুড়ি উইকেট নেওয়ার পরেও দলে সুযোগ পাচ্ছেন না (কুড়ি বিশের দলে সুযোগ দেওয়া উচিত বলছি না)। সরফরাজ খান শয়ে শয়ে রান করেও নড়বড়ে ভারতীয় টেস্ট ব্যাটিংয়ের অংশ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। হর্ষিত রানা আহত না হলে মহম্মদ সিরাজকেও চলতি বিশ্বকাপের ১৬ জনের মধ্যে রাখা যাচ্ছিল না। অথচ তিনি ভারতীয় পেসারদের মধ্যে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে ফিট, লম্বা লম্বা স্পেলে বল করেছেন, ম্যাচ জেতানো বোলিংও করেছেন। এসবের কোনওটাই ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে ভারতীয় ক্রিকেটের বিজেপি-চালিত হওয়ার প্রমাণ নয়। কারণ ওঁদের মধ্যে যাঁরা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিবাদী ইত্যাদি বলেন, তাঁদের চোখেও ক্রিকেটাররা ‘নন-বায়োলজিকাল’।

যাঁরা বিজেপির দেশ শাসনের ব্যর্থতা দেখতে পান না, তাঁদের বিসিসিআইয়ের অপদার্থতা দেখতে না পাওয়ার মধ্যে তবু ধারাবাহিকতা আছে। কিন্তু যাঁরা প্রথমটা নিয়ে রীতিমতো সোচ্চার, তাঁরা ২০২৩ বিশ্বকাপের মতও এবারও টিকিট বিক্রির অব্যবস্থা নিয়ে টুঁ শব্দ করলেন না। স্রেফ গা জোয়ারি করে, বিসিসিআইয়ের জেদ বজায় রাখতে, জয়ের নেতৃত্বাধীন আইসিসির বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়ে দেওয়াও চার হাত-পা তুলে সমর্থন করলেন। এ হল বিশ্বের অষ্টমাশ্চর্য!

আরো পড়ুন ভারতের দাপুটে বিশ্বকাপ: কিছু কাঁটা রহিয়া গেল

ভারত, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার বোর্ড ক্রিকেট বাণিজ্যের মুনাফার সিংহভাগ নিজেদের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিয়ে একদা প্রতিষ্ঠিত দেশগুলোতেও যে খেলাটার কফিনে পেরেক ঠুকে দিচ্ছে— সেকথা স্বীকার করার মানসিকতাও ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা হারিয়েছেন। তাই সেমিফাইনালে হারার পর ইংল্যান্ড দল দেশে ফিরছে চার্টার্ড বিমানে আর আগেই হেরে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভারতেই বসে থাকতে হচ্ছে— এ নিয়ে খেলোয়াড়রা অসন্তোষ প্রকাশ করলে সোশাল মিডিয়ায় কুযুক্তি এবং গালাগালির শিকার হচ্ছেন। কী আশ্চর্য দেখুন! যে সুনীল গাভাসকর আজকাল কথায় কথায় বিসিসিআইয়ের ধ্বজা ধরে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার অতীতের অপরাধের প্রতিশোধ নেওয়ার তত্ত্ব আওড়ান, তিনি এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি। যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটপ্রেমীরা একসময় গাভসকরের নামে গান বেঁধেছেন, নিজেদের দেশে রাস্তার নাম রেখেছেন, সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটারদের প্রতি বৈষম্য দেখেও তিনি কিন্তু চুপ। যে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরাতে মুখ্য ভূমিকা ছিল বিসিসিআইয়ের, তাদের প্রতি বৈষম্য নিয়ে বিসিসিআই (যদি সরল শিশুর মত ধরে নিই, আইসিসিকে বিসিসিআই নিয়ন্ত্রণ করে না) চুপ। মুখ খুলেছেন কে? ইংল্যান্ডেরই প্রাক্তন অধিনায়ক মাইকেল ভন। তিনি সোশাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ব্যবহার সব দলের প্রতি সমান হওয়া উচিত। কার আইসিসিতে কত প্রভাব তার ভিত্তিতে কাজ হওয়া উচিত নয়।

পণ্ডিতরা বলেন, হিন্দুশাস্ত্রে লেখা আছে “অতিথি দেবো ভব”। মানে অতিথি হল ঈশ্বর। সংবিধানকে মারো গুলি, আমাদের ক্রিকেটে সবই হিন্দু মতে চলছে। শুধু অতিথিদের বেলায় ব্যতিক্রম। অন্য দেশের সমর্থকরা যাতে বেশি সংখ্যায় বিশ্বকাপ দেখতে আসতে না পারে, তার ব্যবস্থা পাকা করা হয় ভিসা নিয়ে নানা গ্যাঁড়াকল করে। এমনকি অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের পাক বংশোদ্ভূত ক্রিকেটারদের ভিসা নিয়েও প্রতিবার ঝামেলা পাকানো হয়।

অ্যাঁ, কী বলছেন? বিজেপি ক্রিকেট চালাচ্ছে তো কী হল, আসল কথা হল মাঠে জেতা? আজ্ঞে তা তো বটেই। তবে কিনা জগতের নিয়ম হল, কোনো দেশ চিরকাল জেতে না। কে ভেবেছিল ক্লাইভ লয়েড, ভিভিয়ান রিচার্ডসদের ওয়েস্ট ইন্ডিজের আজকের অবস্থা হবে? কে-ই বা ভেবেছিল, অস্ট্রেলিয়া চলতি বিশ্বকাপের শেষ চারেও উঠতে পারবে না? কেবল খেলার মাঠে নয়, জগতের কোনও ময়দানেই কেউ চিরকাল জেতে না। হারার সময় যখন আসে, তখন মানসম্মান তাদেরই বজায় থাকে, যারা নিজেদের সুসময়ে পরাজিতকে সম্মান দিয়েছিল। বেপরোয়া মস্তানদের শেষ পরিণতি নিয়ে বিস্তর বই-টই, সিনেমা-টিনেমা হয়েছে। চ্যাটজিপিটিকে তালিকা বানিয়ে দিতে বলুন।

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সাংবাদিকরাই এখন ক্রিকেট বোর্ডের ‘চিয়ারলিডার’

এই জাতীয় সাংবাদিকরাই তাই মালিকদের পছন্দের লোক হয়ে উঠলেন, কারণ এঁদের মাধ্যমে ক্রিকেটজগতের সবচেয়ে নামকরা খেলোয়াড় আর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রশাসকদের সঙ্গ পাওয়া যায়। ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। কর্পোরেট মিডিয়ায় মালিকের পছন্দের লোক হওয়া মানেই উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি। ফলে ওই সাংবাদিকরাই একতলা বাড়ি থেকে ফট্টি টু পৌঁছলেন, বিখ্যাতও হলেন। পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকরা শিখলেন— ওটাই পথ, ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট আর সিলি পয়েন্টের তফাত না জানলেও ক্ষতি নেই।

নয়ের দশকে অক্ষয় কুমার অভিনীত একখানা হিন্দি ছবিতে একটি মহা চটুল গান ছিল। গানের স্থায়ীতে নায়কের বক্তব্য হল— কোথা থেকে প্রেম শুরু করব বুঝতে পারছি না।
লিখতে বসে আমারও একই অবস্থা হয়েছিল। কারণ অ2অনুস্বর সম্পাদক যে বিষয়টি বেছে দিয়েছেন তা নিয়ে অনেককিছু বলার আছে। আমাকে উদ্ধার করলেন টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রতিবেদন লেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক সাংবাদিক। তাঁর নামটি উহ্যই থাক, কামটি যখন গর্ব করার মতো নয়। তবে সোশাল মিডিয়ার দৌলতে তাঁর কামটি দুনিয়াসুদ্ধ লোক জেনে ফেলেছে।
২৬ ফেব্রুয়ারির ভারত-জিম্বাবোয়ে ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে আমাদের আলোচ্য সাংবাদিকটি জিম্বাবোয়ের পক্ষ থেকে আসা ক্রিকেটারটিকে প্রশ্ন করেন— আপনাদের দলের ব্যাটাররা ব্রায়ান বেনেটকে শতরান করার সুযোগ দিল না কেন? ভিডিওতে ক্রিকেটারটির মুখের চেহারা দেখে আপনার স্কুলজীবনের সেইসব বন্ধুদের মনে পড়বে, যারা ইতিহাসের সব প্রশ্নের উত্তর কণ্ঠস্থ করে স্কুলে পৌঁছে আবিষ্কার করত যে সেদিন অঙ্ক পরীক্ষা।

আপনি যদি না জেনে থাকেন যে সাংবাদিক সম্মেলনে কোন ক্রিকেটার এসেছিলেন, তাহলে আপনি হয়তো ভাবছেন—এভাবে লেখার কী আছে? প্রশ্নটা তো সঙ্গত। দল তো এমনিতেও হারত, বেচারা ৯৭ রানে অপরাজিত রয়ে গেল। সতীর্থরা একটু চেষ্টা করলে কি ওর শতরানটা হয়ে যেত না?

আবার আপনি যদি ভারতীয় ক্রিকেট ব্যক্তিসর্বস্ব বলে মনে করেন, তাহলে ভাবছেন— ঠিকই তো করেছে। দলগত খেলায় কে সেঞ্চুরি পেল না পেল তা নিয়ে ভাববে কেন? দয়া করে অত গভীরে ভাবতে যাবেন না। কারণ সাংবাদিক সম্মেলনে যিনি এসেছিলেন তিনিই বেনেট।
তিনি প্রশ্নটা শুনে অবাক হয়ে, কী প্রশ্ন করা হল জিজ্ঞেস করছেন দেখেও, সাংবাদিকটি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রশ্নটি বুঝিয়ে বলেন। তখন বেনেটকে বলতে হয়— আমিই বেনেট। তাতে হাসির রোল ওঠে এবং লজ্জাজনক ব্যাপারটির মধুরেণ সমাপয়েৎ হয়। এই হল আমাদের দেশে ক্রিকেট সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা। এমন সব দুর্দান্ত পরিশ্রমী ও প্রতিভাবান লোকেরা কাজটা করছে যে, কার সাংবাদিক সম্মেলনে বসে আছে তা-ই জেনে উঠতে পারছে না।

অবশ্য অ্যালবার্ট আইনস্টাইন সম্পর্কেও কথিত আছে যে তিনি নাকি একবার ট্রেনে উঠে টিকিট হারিয়ে ফেলে যারপরনাই লজ্জিত বোধ করছিলেন, তখন টিকিট চেকার তাঁকে আশ্বস্ত করেন— আমি জানি আপনি ডক্টর আইনস্টাইন। টিকিট নিয়ে ব্যস্ত হবেন না, আপনি যখন বলছেন টিকিট কেটেছিলেন, তখন আমি বিশ্বাস করলাম। কিন্তু আইনস্টাইন আশ্বস্ত হলেন না, কারণ টিকিটটার দরকার চেকারের নয়, তাঁর নিজেরই। কোথায় যাচ্ছেন সেটাই ভুলে বসে আছেন যে।

এটি ঘটনাই হোক আর রটনাই হোক, ব্যবহার করা হয় একথা বোঝাতে যে জিনিয়াসরা এমন সব ভুল করে থাকেন যা সাধারণ মানুষের কাছে হাস্যকর। তা আমাদের সাংবাদিক বন্ধুটি যদি আপেক্ষিকতার তত্ত্ব জাতীয় কিছু আবিষ্কার করে ফেলতে পারেন, তাহলে তাঁকেও জিনিয়াস বলে মেনে নিয়ে প্রমাণস্বরূপ এই ঘটনাটি প্রচার করা যাবেখন। কিন্তু আপাতত এ ঘটনা থেকে একটি জিনিসই প্রমাণিত হচ্ছে— এদেশে ক্রিকেট সাংবাদিকতা করতে এখন ন্যূনতম যোগ্যতারও প্রয়োজন হচ্ছে না।

একথায় অনেক সাংবাদিকই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন। ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের পরে যেমন জ্বলে উঠেছিলেন, তার কারণ আরেকখানা ভিডিও। তাতে দেখা যাচ্ছে, এক সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ম্যাচের পরে পৌঁছে গেছেন একেবারে মাঠের মাঝখানে, যেখানে কোনো সাংবাদিক যাওয়ার অনুমতি পান না। গিয়ে কী করছেন? ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় ডেভিড মিলারকে দাঁড় করিয়ে তাঁর চারপাশে ঘুরে ঘুরে ঠোঁট ফুলিয়ে রাগ দেখাচ্ছেন। ব্যাপারটি পড়তে যত ন্যাকা ন্যাকা লাগছে, আসলে তার চেয়েও বেশি ন্যাকা ছিল।
তবে সে ভিডিও আর দেখতে পাবেন না, কারণ সাংবাদিকদের রাগ এবং কিছু ক্ষিপ্ত ক্রিকেটভক্তের অশ্লীল মন্তব্যের ঠ্যালায় সেই ইনফ্লুয়েন্সার মহিলা ভিডিওটি মুছে দিয়েছেন। তবে তিনি একা নন, আরও কয়েকজন ইনফ্লুয়েন্সার চলতি বিশ্বকাপে এমন গুরুত্ব পাচ্ছেন আয়োজক ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের থেকে, যা নিয়ে সাংবাদিকরা সঙ্গত কারণেই রুষ্ট হয়েছেন।

এই ইনফ্লুয়েন্সারদের ক্রিকেটারদের এত কাছে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, স্টেডিয়ামের এমন সব জায়গা থেকে তাঁরা ভিডিও করার সুযোগ পাচ্ছেন যেখানে কোনও ক্রীড়া সাংবাদিক (আলোকচিত্রী এবং ক্যামেরাপার্সনদের ধরে বলছি) যাওয়ার অধিকার পান না। অধিকার পেয়ে যেসব কনটেন্ট এই ইনফ্লুয়েন্সাররা তৈরি করছেন, তাতে ক্রিকেটের ক নেই। বিনোদন আছে, তাও অত্যন্ত মেধাহীন বিনোদন। যে কোনো খেলা থেকে একজন ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ যে ধরনের বিনোদন পেতে পারে, সে জিনিস নয়।

কিন্তু ক্রিকেট বোর্ড সাংবাদিকদের চেয়ে এই ইনফ্লুয়েন্সারদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কেন? সে প্রশ্নের উত্তর সৎভাবে খুঁজতে গেলে এদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকদের আত্মসমালোচনা করতে হবে। করতে গিয়ে নিজেদের সম্পর্কে এত তেতো সব কথা উঠে আসবে, যে নিমপাতা মিষ্টি মনে হবে।

একটু পিছন থেকে শুরু করা যাক। ললিত মোদী ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ চালু করার কিছুদিনের মধ্যে যেই বুঝে গেলেন যে এখান থেকে অভূতপূর্ব টাকা রোজগার করার সুযোগ রয়েছে, অমনি নিয়ম করে দিলেন— খেলার দিন খেলার মাঠে কোনে সংবাদমাধ্যম ক্যামেরা নিয়ে ঢুকতে পারবে না। মানে ভিডিও তোলা তো এমনিতেই বারণ, কারণ ভিডিও স্বত্ব সম্প্রচারকারীর দখলে; কাগজে ছাপার জন্য বা টিভির খবরে দেখানোর জন্য স্টিল ছবিও তোলা যাবে না।

তাহলে কী হবে? আইপিএল আয়োজকরা কি নিজেদের খেলার প্রচার কমিয়ে ফেলতে চান? মোটেই তা নয়। নিয়ম করা হল, ছবি নিতে হবে শুধুমাত্র আইপিএলের নিজের ওয়েবসাইট থেকে। ভারতের সংবাদমাধ্যম বিনা প্রতিবাদে এই ব্যবস্থা মেনে নিয়েছিল। নিজেদের মত করে ছবি তুলতে না পারা যে নিজের বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ— সেকথা মিডিয়ার বাবুদের কারও মাথায় আসেনি। আইপিএলের ছবি আইপিএলের হাত থেকে নেওয়া মানেই হল, যেসব ছবি তারা প্রকাশিত হতে দিতে চায়, কেবল সেসব ছবিই প্রকাশিত হবে। আয়োজকদের পক্ষে অপ্রীতিকর কোনো দৃশ্যের অবতারণা হলে তা সংবাদমাধ্যমের চোখে পড়ার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হল। সংবাদমাধ্যম সোনামুখ করে এই ব্যবস্থা সেদিন মেনে নিয়েছিল।

যা অপ্রিয় তা প্রকাশ করাই যে আমাদের কাজ এবং খেলার মাঠেও তেমন কিছু ঘটতেই পারে— একথা হয় খেয়াল করেনি, অথবা সংবাদমাধ্যমের মালিক আর উচ্চপদস্থ সাংবাদিকরা ভারতীয় ক্রিকেটের নিয়ন্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েই এমনটি ঘটিয়েছিলেন। কোন আশঙ্কাটি ঠিক তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়, কারণ তখন মূলধারার মিডিয়ায় (বস্তুত তখন ওই একটি ধারাই ছিল) কাজ করলেও অত উচ্চপদস্থ আমি কোনোদিনই ছিলাম না।

ললিতবাবু পরে আইপিএল সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় জড়িয়ে পদচ্যুত হন এবং দেশত্যাগ করেন। ছবি সম্পর্কে ওই নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহৃত হয়। কিন্তু অধিকার এমন জিনিস যে একবার ছাড়তে শুরু করলে ক্ষমতাবান ক্রমশ একটু একটু করে তা কেড়েই নিতে থাকে।

আইপিএলের মুনাফার ফলে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে এবং অর্থের জোরে তার শক্তিও বাড়তে থাকে। ভারতের মাটিতে যে কোনো আন্তর্জাতিক সিরিজের টিভি প্রযোজনা বোর্ড নিজের হাতে তুলে নিল। মানে সম্প্রচার স্বত্ব যে সংস্থার হাতেই যাক, প্রযোজনা করবে বিসিসিআই। মানে দর্শক টিভিতে কী দেখতে পাবেন, কোনটা পাবেন না— সবই চলে গেল বোর্ডের হাতে। যে সংস্থার হাতেই ক্যামেরা থাকুক, তাদের ঘাড়ে কটা মাথা যে এমন কিছু দেখাবে যা বিসিসিআইয়ের বাবুরা লোককে দেখতে দিতে চান না? আপনি বলবেন, ক্রিকেট খেলার সরাসরি সম্প্রচারে এমন কী দেখানোর থাকতে পারে, যা ক্রিকেট বোর্ড লুকোতে চায়? যাঁর বছরের পর বছর মাঠে বসে ক্রিকেট ম্যাচ কভার করার অভিজ্ঞতা নেই, তাঁকে এটা বোঝানো শক্ত।

একটা নিরীহ উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, আপনি অনুমান করে নিতে পারেন আর কী কী না দেখানো সম্ভব। মহেন্দ্র সিং ধোনি তখনো একদিনের দলের অধিনায়ক, যদিও টেস্ট থেকে অবসর নিয়েছেন। রাঁচিতে একটা একদিনের ম্যাচ কভার করতে গেছি, ম্যাচ চলাকালীন বারবারই বিরাট কোহলি মিড অফ বা মিড অনে দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং বদলাচ্ছিলেন, বোলারকে বিভিন্ন নির্দেশ দিচ্ছিলেন। ধোনি দর্শকের ভূমিকায়। প্রেস বক্সেও টিভি চলে, সেখানে কিন্তু একবারও এ দৃশ্য দেখানো হয়নি।

তবে প্রযোজনা বিসিসিআই নিজের হাতে নিয়ে নেওয়ায় আসল ক্ষতি দৃশ্যের দিক থেকে হয়নি, হয়েছে শ্রাব্যের দিক থেকে। মোটামুটি নয়ের দশক থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এই পরিমাণ সরাসরি সম্প্রচার দেখার সুযোগ হচ্ছে ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীদের। যাঁদের স্মৃতি দুর্বল নয়, তাঁরা স্পষ্ট বুঝতে পারছেন ধারাভাষ্য কোথা থেকে কোথায় নেমেছে। আগে প্রাক্তন ক্রিকেটারদের ধারাভাষ্য মন দিয়ে শুনলে খেলাটা সম্পর্কে সত্যিই অনেককিছু শেখা যেত। কারণ রিচি বেনো, সুনীল গাভস্কর, জিওফ্রে বয়কট, ইয়ান চ্যাপেল প্রমুখ ধারাভাষ্যকার তাঁদের বিপুল অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানের সদ্ব্যবহার মাঠে যা হচ্ছে তার বিশ্লেষণ করতেন। তার চেয়েও বড় কথা, দল নির্বিশেষে ভালো খেলার প্রশংসা করতেন এবং নিজের দেশের খেলোয়াড়রা খারাপ খেললেও নির্মম সমালোচনা করতেন।

আর এখন? বেনো আর টনি গ্রেগ প্রয়াত। বয়কট স্বাস্থ্যের কারণে এবং চ্যাপেল বয়সের কারণে আর ধারাভাষ্যে নেই। মাইকেল হোল্ডিং সরে যাওয়ার সময়ে বলেছিলেন বটে যে, আর মন চাইছে না; কিন্তু তিনি যেভাবে কমেন্ট্রির মাইক হাতে নিয়ে খেলার বিশ্লেষণের পাশাপাশি ক্রিকেট প্রশাসকদের বিরুদ্ধে খেলোয়াড় জীবনের মতই ভীষণ গতির বাউন্সার হাঁকাতেন, তাতে তাঁর প্রস্থানে কারা খুশি হয়েছে তা বুঝে নেওয়া শক্ত নয়। তবে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা ভারতীয় ধারাভাষ্যের।

সেকালের সুরেশ সারাইয়া, নরোত্তম পুরীরা অসাধারণ ছিলেন না; প্রবাদপ্রতিম প্রাক্তন ক্রিকেটারও ছিলেন না। কিন্তু কোদালকে কোদাল বলতেন। অনেকদিন পর্যন্ত হর্ষ ভোগলেও তাই। কিন্তু অমিতাভ বচ্চন আর ধোনির টুইটের ঠ্যালায় একবার বিসিসিআইয়ের চুক্তি হারাবার পর থেকে তিনি ভারতীয়দের বেলায় কোদাল দেখলে কেবল চুপ করে থাকেন না, অনেকসময় কোদালকে এরোপ্লেনও বলে দেন। রবি শাস্ত্রী তো চিরকালই প্রশাসকদের চিৎকৃত আনুগত্য দেখিয়েছেন। তার পুরস্কারস্বরূপ ভারতীয় দলের ম্যানেজারি করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কমেন্ট্রি বক্সে ফেরত এসেও একই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কেবল বিরাট বা রোহিত শর্মা নন, শাস্ত্রীর ধারাভাষ্য অনুসারে সূর্যকুমার যাদব, অক্ষর প্যাটেল, হার্দিক পান্ডিয়া, বরুণ চক্রবর্তীরাও একেকজন ‘গ্রেট’।

ভারতীয় দল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা নামিবিয়াকে হারালেও ঐতিহাসিক জয় হয় আর পরপর সিরিজ হারলেও শাস্ত্রী ও সম্প্রদায় বলে যান— একটা হার একটা বিশ্বসেরা দলকে রাতারাতি খারাপ করে দেয় না। কী করে যে বিশ্বসেরা প্রমাণ হল তা বোঝা মুশকিল, তবে এই আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ শিগগির মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের একটি গ্যালারি শাস্ত্রীর নামাঙ্কিত হতে চলেছে।

আকাশ চোপড়া ও অন্যান্য প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার, যাঁরা একইভাবে সমস্ত ভারতীয় ক্রিকেটারকে অন্য গ্রহের জীব বলে প্রচার করতে সদাব্যস্ত এবং বিসিসিআই ও জয় শাহের গুণগান করতে পিছপা নন, তাঁরাও আশা করতে পারেন এরকম কিছু পুরস্কার পাবেন। ভারতে তো আর ক্রিকেট স্টেডিয়ামের অভাব নেই, যতই সেখানে খেলা দেখতে যাওয়া সাধারণ দর্শকের কাছে নরকযন্ত্রণা হোক। এই নুন খাও আর গুণ গাও ব্যবস্থায় মানিয়ে নিতে পারলেন না বলে, সঞ্জয় মঞ্জরেকর বহুদিন হয়ে গেল নিয়মিত ধারাভাষ্য দেওয়ার ডাক পান না। এই সাইট সেই সাইটের বিশেষজ্ঞ হয়ে কাটে। অথচ তাঁর চেয়ে ভাষার উপর অনেক কম দখল থাকা এবং অগভীর বিশ্লেষণ করা বহু প্রাক্তন ক্রিকেটার প্রত্যেক সিরিজে এবং আইপিএলে ধারাভাষ্যকার হিসাবে থাকেন।

ভাবছেন তো, ধারাভাষ্যকারদের কথাবার্তা বিসিসিআই নিয়ন্ত্রণ করার সঙ্গে ক্রিকেট সাংবাদিকতার কী সম্পর্ক? সম্পর্কটা খুবই ঘনিষ্ঠ। প্রথমত, ধারাভাষ্য ব্যাপারটাও ক্রীড়া সাংবাদিকতারই একটা দিক। ওখানেও সত্যি কথাটা বলাই কাজ। সে কাজ আজও ইয়ান বিশপ, ইয়ান স্মিথ, নাসের হুসেন, মাইকেল অ্যাথারটনদের করতে দেখা যায়। তাঁরা ভারতের সমালোচনা করেন বলে আপনি হয়ত রুষ্ট এবং ওঁদের কথায় বর্ণবৈষম্য খুঁজছেন। কিন্তু অ্যাশেজ চলাকালীন ইংল্যান্ডের কী তীব্র সমালোচনা করেছিলেন নাসের আর অ্যাথারটন, সেটা সোশাল মিডিয়ায় খুঁজলেই পেয়ে যাবেন। আমাদের ধারাভাষ্যকাররা কী করেন? শুধু যে নিজেদের ক্রিকেটারদের কোনো দোষ দেখেন না তা নয়, ইদানীং আবার হিন্দুত্ববাদের প্রচারও করেন। কথায় কথায় লাইভ ম্যাচে মা ভবানী, বিষ্ণু, ভোলেনাথ প্রমুখ ভগবানের নাম নেন বিবেক রাজদানরা। উপরন্তু দল নির্বাচনে যত ভুলই হোক, কমেন্ট্রি বক্সে বসে সেটাকে প্রাণপণে ঠিক বলে প্রমাণ করাই তাঁদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই মিথ্যাচারের ফল কিন্তু ভুগছে ভারতীয় ক্রিকেট। বহু যোগ্য ক্রিকেটার জাতীয় দলে সুযোগ পাচ্ছেন না, অযোগ্যরা খেলেই যাচ্ছেন। যদি বলেন খেলায় ফলাফলই শেষ কথা, তাহলে নিজেই বলুন, টেস্ট ক্রিকেটে ভারতীয় দলের সাফল্যের লেখচিত্র উঠছে না নামছে? একদিনের দলও নড়বড় করতে শুরু করেছে। ২০২৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার পর থেকে ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতলেও, দুর্বল শ্রীলঙ্কার কাছে ২৭ বছর পরে সিরিজ হেরেছে। নতুন বছরের শুরুতেই ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের কাছেও হারল। টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত জয়ের পর জয় এলেও, বিশ্বকাপ শুরু হতেই নড়বড়ে দেখাচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে তো মনে হল দুই দলের মধ্যে এক সমুদ্র ব্যবধান। কিন্তু ধারাভাষ্যে কান দিন। সেই এক কথা শুনবেন— একটা ম্যাচ বা একটা সিরিজ হারলেই বিশ্বসেরা দল খারাপ হয়ে যায় না।
সবচেয়ে চোখে পড়ার মত অধঃপতন হয়েছে গাভস্করের। তিনি এখন ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের চেয়েও বেশি প্রশংসা করেন বিসিসিআইয়ের। এমন ভালো বোর্ড নাকি ক্রিকেটের ইতিহাসে হয়নি। ক্রিকেট দুনিয়ায় যা কিছু ভালো হচ্ছে সবই নাকি বিসিসিআইয়ের দাক্ষিণ্যে, আর যা যা খারাপ হচ্ছে? সেগুলো সবই ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া যখন ক্রিকেট দুনিয়াকে শাসন করত তখন আরও খারাপ ছিল। অতএব বিসিসিআই যা করছে বেশ করছে।
এবার ভাবুন, যদি কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ড বুঝতে পারে যে টাকার জোরে তারা তাবড় প্রাক্তন ক্রিকেটারদের দিয়ে যা খুশি বলিয়ে নিতে পারে, বলতে না চাইলে মুখ বন্ধ করিয়ে দিতে পারে, তাহলে মাস মাইনেয় বিভিন্ন কাগজে বা টিভি চ্যানেলে অথবা ওয়েবসাইটে কাজ করা সাংবাদিকদের তো এলেবেলে জ্ঞান করবেই। তাদের গলা টিপে ধরবেই। প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারত যে গত এক-দেড় দশকে ক্রমাগত নিচে নামছে, সেকথা তো এখন সবাই জেনে গেছেন।

সাংবাদিকদের গ্রেফতার হওয়া বা খুন হওয়ার খবরেও আজকাল আমরা আর অবাক হই না। অমুক জায়গায় সংবাদমাধ্যমের ঢোকা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তমুক জায়গায় বিশেষ একটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের ঢোকা বারণ— এসবও আজকাল প্রায়ই আমরা জানতে পারি। কিন্তু ভারত সরকার বা বিভিন্ন রাজ্যের সরকারগুলো এ কাজ নিয়মিত শুরু করার আগেই করেছিল বিসিসিআই। করোনা অতিমারীর সময়ে অকালমৃত আমার একদা সহকর্মী রুচির মিশ্র, নাগপুরের সাংবাদিক হয়েও জীবনের শেষ ৫-৭ বছর বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামে (যে মাঠে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ হয়) ঢুকতে পারেননি। কারণ তিনি ওই ক্রিকেট সংস্থার কর্তাদের বিপক্ষে যায়, এমন একটি প্রতিবেদন লিখেছিলেন।
স্বভাবতই, দ্য হিন্দু বা দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর মত দু-একটি সংবাদমাধ্যম ছাড়া কোথাও আপনি এ নিয়ে কোনো প্রতিবেদন পড়বেন না যে, বিসিসিআই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড হওয়া সত্ত্বেও, অধিকাংশ স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়ে দর্শকরা দুর্গন্ধযুক্ত, নোংরা বাথরুম পান। খাবার জলের সুব্যবস্থাও থাকে না প্রায়শই। কেবল দর্শকদেরই এই অভিজ্ঞতা হয় তা নয়। আমি নিজে ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিবেদন লিখতে আমেদাবাদে গিয়ে দেখেছি, প্রেস বক্সের বাথরুমের অবস্থা কোনো মফসসলের রেলস্টেশনের বাথরুমের থেকেও খারাপ।

কিন্তু এসব তখনো লেখা যেত না, এখনো অধিকাংশ জায়গায় যায় না। লিখলেও ছাপা হবে না, বস বলবেন ‘এটা খবর নয়।’ প্রতিবেদক বেশি চাপাচাপি করলে বেঘোরে চাকরিটা খোয়াতে হতে পারে।

ভাবুন। আপনি দর্শক, আপনার জন্যেই ক্রিকেট চলে কিন্তু। আপনি টিকিট কেটে মাঠে যান বলে বোর্ডের আয় হয়। তার থেকেও বহুগুণ বেশি আয় হয় আপনারা টিভিতে বা ওটিটিতে খেলা দেখেন বলে। আপনাদের বিজ্ঞাপনদাতারা নিজের পণ্য বা পরিষেবা চেনাতে চায় বলে বড় বড় কোম্পানি বিজ্ঞাপন দেয়, সে বাবদ টাকা নিয়েই বিসিসিআই আর আইসিসি ধনী হচ্ছে। নিজেদের আইপিএল ছাড়াও, আইসিসির টাকার সিংহভাগ বিসিসিআই নিয়ে নিচ্ছে আপনার ঘাড়ে বন্দুক রেখে ‘আমাদের জন্যেই তো এত টাকা ওঠে’ যুক্তি দিয়ে। অথচ আপনি যে ন্যূনতম পরিষেবা পান না, সেটা খবর নয়। খবর তাহলে কোনটা? গৌতম গম্ভীর কখন কালীঘাটে পুজো দিতে যাবেন।

মোদ্দাকথা, ভারতের ক্রিকেট সাংবাদিকরা এখন বিসিসিআইয়ের ‘চিয়ারলিডার’। কথাটার বাংলা নেই, তবে রবীশ কুমার ভারতের রাজনৈতিক মিডিয়ার একাংশকে চিহ্নিত করেছেন গোদি মিডিয়া বলে। কারণ তারা নরেন্দ্র মোদী সরকারের কোলে বসে শাসক দল যা বলায় তাই বলে। সেভাবে এই ক্রিকেট সাংবাদিকদেরও গোদি মিডিয়া বলা যেতে পারে। এঁরা প্রলয় দেখেও অন্ধ সেজে থাকতে পারেন এবং সোশাল মিডিয়ার যুগে যেহেতু দায়িত্ব প্রতিবেদন লেখা বা শুট করা দিয়ে শেষ হয় না, সেহেতু সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ঠিক সেই কাজই করে থাকেন, যার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘বাবু যত বলে/পারিষদ দলে/বলে তার শতগুণ।’
ধরুন, মহম্মদ শামি প্রথম শ্রেণি, লিস্ট এ, কুড়ি বিশ— সবরকম ক্রিকেটে ঝুড়ি ঝুড়ি উইকেট নেওয়ার পরেও কেন বাদ? সরফরাজ খান আর কত রান করলে টেস্ট দলে জায়গা পাবেন? বিশেষত যেখানে দল সিরিজের পর সিরিজ হেরেই চলেছে। মুখ্য নির্বাচক অজিত আগরকর এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে উঠতে পারছেন না, এদিকে এই সাংবাদিকরা একশো যুক্তি দিয়ে যাচ্ছেন। কে এঁদের দায়িত্ব দিল? কেনই বা নির্বাচকদের যে কোনো সিদ্ধান্তের সপক্ষে এঁদের যুক্তি জোগাতেই হবে? উত্তর একটাই। এঁরা বোঝেন না বা ইচ্ছে করেই ভুলে গেছেন যে এঁরা সাংবাদিক, বোর্ডের মুখপাত্র নন। একই কাজ এঁরা অনেকে কোনো নির্দিষ্ট ক্রিকেটারের হয়েও করেন। দুর্জনে বলে মোটেই নিষ্কাম কর্ম নয় এগুলো, তবে প্রমাণাভাবে সে প্রশ্নে যাচ্ছি না।
এখন কথা হল, বিনা পয়সার চিয়ারলিডারদের বিসিসিআই বা ক্রিকেটাররা কেনই বা গুরুত্ব দেবে, সম্মান করবে? প্রযুক্তির প্রভাবে খবরের কাগজ পড়া অনেক কমে গেছে। টিভির খবরের প্রতিও মানুষের আকর্ষণ দ্রুত কমছে। বহু ক্রিকেটপ্রেমীই এখন খেলার পাশাপাশি খেলার খবরও দেখেন হাতের মোবাইলেই। তাঁদের কাছে পৌঁছবার জন্যে সত্যিই তো সাংবাদিকদের চেয়ে অনেক ভালো মাধ্যম ইনস্টাগ্রামার বা ইউটিউবাররা। তাঁদের আচার আচরণ আমাদের চোখে যতই কুরুচিকর মনে হোক।

আরও পড়ুন রাষ্ট্রীয় ক্রিকেট-সেবক সংঘ

ক্রিকেটার ও প্রশাসকদের চিয়ারলিডার হয়ে যাওয়া অবশ্য শুরু করেছিলেন আগের প্রজন্মের সাংবাদিকরা। বিশেষত পশ্চিমবাংলার ক্রিকেট সাংবাদিকরা সাংবাদিকতাকে ‘পেজ থ্রি’ সাংবাদিকতায় পরিণত করার ব্যাপারে পথিকৃৎ। কী কুক্ষণে কবি বিষ্ণু দে একবার লিখে ফেলেছিলেন ‘সংবাদ মূলত কাব্য’। আজ থেকে বছর তিরিশেক আগে, বাংলার কিছু সাংবাদিক কথাটাকে আক্ষরিক অর্থে নিয়ে ফেলে ক্রিকেটের প্রতিবেদনে কাব্যি করা শুরু করে দিলেন। হয়ত খেলাটাকে বোঝা এবং বিশ্লেষণ করতে পারার খামতি ঢাকতেই। যেহেতু ওঁরা জনপ্রিয় কাগজের সাংবাদিক ছিলেন, তাই ওটাই দস্তুর হয়ে দাঁড়াল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ওসব পড়ে শিখল— ক্রিকেট সাংবাদিকতা মানে হল, মাঠে কী ঘটছে সেটা বাদ দিয়ে ড্রেসিংরুমের অন্দরের কার সঙ্গে কার ঝগড়া হল বা গলাগলি হল, কে রাতের অন্ধকারে কোন নায়িকার সঙ্গে প্রেম করতে বেরোল— এইসব সুললিত গদ্যে লেখা।

এরকম সাংবাদিকতা করার একটা মস্ত সুবিধা আছে। কারও সমালোচনা করতে হয় না, কেউ খুব একটা চটে না। সকলের প্রিয় থাকা যায় এবং ইনি কী বললেন আর উনি কী বললেন, তাই লিখেই দিনের পর দিন চালিয়ে দেওয়া যায়। খেলোয়াড় আর প্রশাসকদের খুশি রাখতে পারলে কাঁড়ি কাঁড়ি সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়। তাতে পরিশ্রম আরও কমে যায়। যদ শুনিতং তদ লিখিতং। উচ্চ পদে উঠে গেলে শুনে শুনে লেখার পরিশ্রমটাও করতে হয় না।
একসময় এক প্রথিতযশা ক্রিকেট সাংবাদিকের অধীনে কাজ করতাম, যাঁর কাজ বলতে ছিল রেকর্ডার নিয়ে গিয়ে কোনো একজন নামকরা বর্তমান বা প্রাক্তন ক্রিকেটারের সাক্ষাৎকার নেওয়া। তারপর সেটা নিজে টাইপ করার পরিশ্রমটুকুও করতেন না। কোনো একজন অধীনস্থ সাংবাদিকের হাতে রেকর্ডারটি ধরিয়ে দিতেন। তারপর একদিন গোটা পাতা বা অর্ধেক পাতা জুড়ে সেই হাজার হাজার শব্দের উদ্দেশ্যহীন, অর্থহীন সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হত। কার সাক্ষাৎকার নেবেন তার পিছনেও কোন ভাবনাচিন্তা থাকত না। যাকে পেতেন তারই সাক্ষাৎকার নিতেন, খবরের দিক থেকে তাঁর ওই সময়ে কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাক আর না-ই থাক।

এর নাম নাকি সাংবাদিকতা। এ জিনিস দিনের পর দিন চালিয়ে যেতে গেলে একটি ব্যাপারই খেয়াল রাখতে হয়— ক্ষমতাশালীদের খুশি রাখা। সে কাজটা আমার সেই বস এবং তাঁর সমসাময়িক বাংলা কাগজের ক্রীড়া সম্পাদকরা, খুব মন দিয়েই করতেন। আমার বসটি তো একবার ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের নির্বাচনের আগেরদিন জগমোহন ডালমিয়া গোষ্ঠীর ইশতেহারই কাগজে ছাপিয়ে দিয়েছিলেন। সেসব পাপের ফলই এখন ফলছে। এসব হল খোলা বাজার অর্থনীতি ভারতে চালু হওয়ার পরের সাংবাদিকতার নিদর্শন। তখন সারা ভারতের সংবাদমাধ্যম সবে জনকল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করার খোলস ছাড়তে শুরু করেছে, সংবাদমাধ্যমের মালিকরা টাকা করার নতুন নতুন রাস্তা খুঁজছেন।

এই জাতীয় সাংবাদিকরাই তাই মালিকদের পছন্দের লোক হয়ে উঠলেন, কারণ এঁদের মাধ্যমে ক্রিকেটজগতের সবচেয়ে নামকরা খেলোয়াড় আর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রশাসকদের সঙ্গ পাওয়া যায়। ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। কর্পোরেট মিডিয়ায় মালিকের পছন্দের লোক হওয়া মানেই উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি। ফলে ওই সাংবাদিকরাই একতলা বাড়ি থেকে ফট্টি টু পৌঁছলেন, বিখ্যাতও হলেন। পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকরা শিখলেন— ওটাই পথ, ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট আর সিলি পয়েন্টের তফাত না জানলেও ক্ষতি নেই।

সব মিলিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটে তৈরি হয়ে গেল এমন এক বাস্তুতন্ত্র, যেখানে কেউ কারও ভুল ধরে না। আমিও ভালো, তুমিও ভালো। কিন্তু সবার চাইতে ভালো পাঁউরুটি আর লাভের গুড়। ইতিমধ্যে এসে পড়েছে হিন্দুত্ববাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ। প্রথমে সরকারের গোদি মিডিয়া এই বয়ানটি দাঁড় করাল যে, সরকার মানেই দেশ। এখন বিসিসিআইয়ের গোদি মিডিয়া এই বয়ান প্রতিষ্ঠা করিয়েছে যে, জাতীয় ক্রিকেট দল মানেই দেশ। ফলে এখন ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ তকমা পেতে আর সরকারের সমালোচনা করতে হয় না, ক্রিকেট দলের সমালোচনা করাই যথেষ্ট। সমালোচনা করতে না হলে বিশ্লেষণ করতে হয় না, বিশ্লেষণ করতে না হলে পরিশ্রম করতে হয় না, মেধার দরকার হয় না। অতএব ক্রিকেট সাংবাদিকরা ক্রমশ ডোডোপাখি হয়ে যাবেন, দাপিয়ে বেড়াবেন ইনফ্লুয়েন্সাররা।

১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে মহম্মদ আজহারউদ্দিনের ভারত মোহালির সবুজ পিচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে শোচনীয়ভাবে তৃতীয় টেস্টে হেরে যাওয়ার পর মতি নন্দী লিখেছিলেন ‘বিনোদ কাম্বলির ব্যাটিং বাহাদুরি সবই দেশি মন্থর বাউন্সহীন পিচে। পাথরের ওপর মাটি ফেলে তৈরি মোহালির শক্ত নিখুঁত নতুন পিচের বাউন্স এবং ওয়ালশের বলে নাক ফেটে যাওয়া প্রভাকরের রক্তাক্ত মুখ দেখার পর ভারতীয় ব্যাটিংয়ের অবস্থাটা ধরা পড়ল স্কোর বোর্ডে— এক কথায় সেটি হল ভয়।’ সমালোচনার তীক্ষ্ণতায় এর ধারেকাছে পৌঁছতে পারে এমন কোনো লেখা ভারত দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের কাছে রসগোল্লা পাওয়ার পরে আপনার প্রিয় সাংবাদিকরা কেউ লিখেছেন কি? মতিবাবু আজ এমন লিখলে সোশাল মিডিয়ায় তাঁর মা-মাসিকে ধর্ষণের হুমকি দিতেন তথাকথিত ক্রিকেটপ্রেমীরাই। অন্য সাংবাদিকরাও পোস্ট করতেন, এসব লেখা অন্যায়। একটা ম্যাচে ব্যর্থ হলেই বিশ্বসেরা দল খারাপ হয়ে যায় না।
অতএব ব্রায়ান বেনেটকে না চিনে সাংবাদিক সম্মেলনে বসাই যুগোপযোগী।

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভারত-পাক ম্যাচ এখন ক্রিকেটের দুর্বিপাক

নেদারল্যান্ডস একের পর এক বিশ্বকাপে নজরকাড়া ক্রিকেট খেললেও তাদের খেলা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয় না আইসিসি। নেপালও আটকে আছে একই জায়গায়, অথচ সেখানে ক্রিকেটের বিপুল জনপ্রিয়তা। এসব হচ্ছে, কারণ আইসিসি ফিফার মত শক্তিমান নিয়ামক সংস্থা নয়, তাকে ঘাড় ধরে চালাচ্ছে বিসিসিআই।

ব্যাট, বল, উইকেট, প্যাড, গ্লাভস, এমনকি মাঠের মালিকও আপনি হতে পারেন। কিন্তু খেলতে হলে আরেকটা দল লাগে। কথাটা বাচ্চারাও বোঝে, কিন্তু বড়রা ভুলে যায়— টাকার গরমে, এবং অনেক টাকা যে বিপুল ক্ষমতা দেয় তার মদে মত্ত হয়ে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) ঠিক তাই হয়েছে। অসুখটা আজকের নয়, অনেকদিনের। কিন্তু চলতি বছরের আগে টাকা আছে এবং ক্ষমতা আছে বলে যা ইচ্ছে তাই করার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ হয়নি, ফলে সেরকম ল্যাজেগোবরেও হতে হয়নি, যা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে হল। আপনি হাঁই হাঁই করে উঠতে পারেন এই বলে যে, মোটেই বিসিসিআই ল্যাজেগোবরে হয়নি। হয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। আপনার দোষ নেই। আপনার সন্ধেবেলার টিভি চ্যানেল, সকালবেলার খবরের কাগজ আর হাতের মোবাইল ফোন আপনাকে একথাই বোঝাচ্ছে। অনেক প্রথিতযশা সাংবাদিক তো এমনও লিখছেন এবং বলছেন যে প্রথমে রেলা নিয়ে খেলবে না বলার পর, শেষমেশ পাকিস্তান ম্যাচটা খেলার জন্য ভিখারির মত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে ছুটে গেছে। কথাগুলো ঠিক কিনা তা বিচার করার জন্যে আমরা স্রেফ সেটুকু নিয়েই আলোচনা করব যা প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ ‘সূত্রের খবর’ কথাটার কী পরিমাণ অপব্যবহার এদেশের সাংবাদিকরা করে থাকেন তা এখন প্রায় সবাই জানেন। অতএব ওসব থাক।

তথ্য বনাম মনগড়া তত্ত্ব

প্রথমেই খেয়াল করুন, পাকিস্তানই রবিবারের ম্যাচটা খেলতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল (বা ভিক্ষা চেয়েছিল আইসিসির কাছে)— এমন বলার মত কোনো ঘটনা আমরা দেখিনি। ভিক্ষা চাইতে ভিখারিকেই যেতে হয়। কোনোদিন এমন হয়েছে, আপনি কোনো ভিখারির বাড়ি খুঁজতে বেরিয়েছেন ভিক্ষা দেবেন বলে? খুঁজে বের করে ভিখারির হাতে পায়ে ধরেছেন ‘ওগো, আমার থেকে ভিক্ষা নাও গো’? পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে খেলব না বলার পরে আমরা কী দেখলাম? পিসিবির কোনো কর্তাকে দুবাইতে আইসিসির দফতরে যেতে দেখলাম কি? না, বরং উলটোটা ঘটল। আইসিসি চিফ এক্সিকিউটিভ সংযোগ গুপ্তাই পাকিস্তানে উড়ে গেলেন পিসিবি প্রধান মহসীন নকভির সঙ্গে কথা বলতে। সেই বৈঠকে গেলেন বিশ্বকাপ থেকে আগেই বিতাড়িত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল।

সেই বৈঠকে কে কী বলেছিল, পাকিস্তান কী কী দাবি করেছিল আর আইসিসি ফুৎকারে কোন কোন দাবি উড়িয়ে দিয়েছে— তা নিয়ে এখন বাজার গরম করছেন বিভিন্ন প্রথিতযশা ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিক। অন্যদিকে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম বোঝানোর চেষ্টা করছে— তাদের ক্রিকেট বোর্ড যা চেয়েছিল তাই পেয়েছে। আমরা এই আকচা-আকচির মধ্যে ঢুকবই না। এদের কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই, কারণ বৈঠকটা ছিল রুদ্ধদ্বার। কোনো সাংবাদিকই সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। অতএব এ ওকে ভিক্ষা দিল, না ও একে— সে তর্ক ট্রোলরা করুক গে। বরং দেখা যাক, সেই বৈঠকের পরে কী কী ঘটল।

প্রথমত, আমিনুল দেশে ফিরে একখানা বিবৃতি দিলেন। সেই বিবৃতিতে তিনি পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানালেন সংকট মুহূর্তে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, কামনা করলেন— এই সৌভ্রাতৃত্ব যেন দিন দিন বাড়ে। তারপর ‘সম্পূর্ণ ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের সুবিধার্থে’ অনুরোধ করলেন ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচটা খেলতে। দ্বিতীয়ত, আইসিসি একখানা লম্বা বিবৃতি দিল। সেই বিবৃতিতে দেখা যাচ্ছে, সংযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন যে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না থাকা দুঃখজনক।

বাংলাদেশ সম্পর্কে আরও অনেক ভালো ভালো কথা বলার পাশাপাশি এই বিবৃতিতে লেখা হয়েছে যে বাংলাদেশকে কোনো শাস্তি দেওয়া হবে না বা জরিমানা করা হবে না। বরং তারা চাইলে আইসিসির ‘ডিসপিউট রেজলিউশন কমিটি’-র কাছেও আবেদন করতে পারে এই গোলমাল নিয়ে। উপরন্তু ২০৩১ ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগেই তাদের কোনো একটা আইসিসি প্রতিযোগিতা আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হবে। সোজা কথায়, বিশ্বকাপ না খেলতে পারায় বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা খানিকটা পূরণ করার ব্যবস্থা হল। দোষটা বাংলাদেশেরই ছিল— এমনটা মানলে নিশ্চয়ই তা করা হত না। আইসিসির গোটা বিবৃতিতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নামগন্ধ নেই। স্রেফ বলা আছে, আইসিসি, পিসিবি ও বিসিবি অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে মিলে খেলাটার স্বার্থে আলাপ আলোচনা, সহযোগিতা এবং গঠনমূলক ব্যবস্থাপনার প্রতি দায়বদ্ধ।

অপারেশন সিঁদুরের সময়ে একদিন রাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম লাহোর, করাচি, ইসলামাবাদ দখল করে ফেলেছিল। অনেকটা সেই কায়দায় ৯ তারিখের ওই বৈঠকের আগে পর্যন্ত ভারতের প্রায় গোটা ক্রিকেট মিডিয়া বলে যাচ্ছিল— বাংলাদেশ নিজেদের কত বড় ক্ষতি করল জানে না। এরপর ওদের দেশে কেউ খেলতে যাবে না। ভারত তো যাবেই না। ওদের সমস্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে আইসিসি নিষিদ্ধও করে দিতে পারে ইত্যাদি। একইভাবে পাকিস্তান যেই বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে ভারত ম্যাচ খেলতে চাইল না, অমনি বলা হচ্ছিল, না খেললে পাকিস্তান বিরাট বিপদে পড়বে। বিশ্বকাপের সম্প্রচারকারীকে অনেক টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল)-কে আইসিসি নিষিদ্ধ করে দেবে, সমস্ত আইসিসি প্রতিযোগিতা থেকে ওদের বাদ দিয়ে দেবে ইত্যাদি প্রভৃতি।

তথ্য অগ্রাহ্য না করলে এবং ইতিহাস-বিস্মৃত না হলে এসব দিনের পর দিন বলে/লিখে যাওয়া মুশকিল। কারণ প্রথমত, সম্প্রচারকারীর চুক্তি হয় আইসিসির সঙ্গে। কেবল কোনো প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে নয়। যদি ধরেও নিই ক্ষতিপূরণের টাকা আইসিসি পাকিস্তানের থেকেই আদায় করত, তাহলেও আইসিসিকে প্রমাণ করতে হত যে পিসিবি অকারণে ম্যাচ বয়কট করছে। খেলব না— এই ঘোষণা কিন্তু এসেছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে। কোনো দেশের কোনো খেলার ফেডারেশনই সেদেশের সরকারের নির্দেশ অমান্য করতে পারে না।

ভারত এই যুক্তিতেই পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলে না, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হিসাবে পাকিস্তান ভারতে আসে না বা ভারত পাকিস্তানে যায় না। সে কারণেই বাংলাদেশ নিজের সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী ‘ভারতে খেলতে যাব না’ বলায় তাদের বাদ দেওয়া আইসিসির অন্যায় হয়েছে বলা হচ্ছে। আইসিসি বলতে পারে না— ক যা করলে ঠিক, খ আর গ করলে সেটা বেঠিক। আর যেকথা গত কয়েকদিনে কোনো ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলতে দেখলাম না, সেটা হল, আইসিসি তেমন কিছু বললেও বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের কাছে এমন একটা জায়গার দরজা খোলা থাকত, যেখানে বিসিসিআই বা আইসিসির বিশেষ প্রভাব নেই। জায়গাটার নাম কোর্ট অফ আরবিট্রেশন ফর স্পোর্ট (ক্যাস)। এই ঝামেলা সেখানে চলে গেলে কী হত বলা যায় না। একথা ঠিক যে আইসিসি এখন পর্যন্ত নিজেদের ‘ডিসপিউট রেজলিউশন কমিটি’-কেই সর্বোচ্চ বলে মানে এবং ক্রিকেটের ঝামেলা ক্যাস পর্যন্ত কখনো নিয়ে যাওয়া হয়নি, কিন্তু ক্রিকেট এখন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির আওতায় এসে পড়েছে। ২০২৮ লস এঞ্জেলস অলিম্পিকে খেলা হবে। এমতাবস্থায় ক্যাসকে মানব না বলা যায় কি?

দ্বিতীয়ত, ১৯৯৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে যায়নি। তার জন্যে তাদের পয়েন্ট কেটে নেওয়া ছাড়া আর কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি। ২০০৩ বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ড জিম্বাবোয়েতে খেলতে যায়নি, নিউজিল্যান্ড কেনিয়ায় যায়নি। সেক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। মামলা মোকদ্দমা হলে এসব দৃষ্টান্ত আইসিসির বিপক্ষেই যেত। আর পিএসএল? সেটা ঘরোয়া লিগ, তাকে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা আইসিসির নেই। যেমন আইপিএলকেও আইসিসি নিষিদ্ধ করতে পারে না। যা-ই হোক, এত আইনি জটিলতার দরকার পড়েনি, কারণ আইসিসির সঙ্গে পিসিবি আর বিসিবির বৈঠক সফল হয়েছে।

রাজনৈতিক হার

কে জিতল কে হারল তা নিয়ে কাজিয়ার মধ্যে মহসীন ১০ ফেব্রুয়ারি বলেছেন, ভারতের ম্যাচ বয়কট করার পিছনে তাঁদের একটাই লক্ষ্য ছিল— বাংলাদেশের সঙ্গে যে অবিচার হয়েছে তার প্রতিকার করা। তাই বাংলাদেশের দাবিই তাঁদের দাবি, নিজেদের অন্য কোনো দাবি ছিল না। বাংলাদেশের সম্মান পুনরুদ্ধার হয়েছে বলেই তাঁরা খেলতে রাজি হয়েছেন। কথাটা বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থরক্ষা যে হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই, আর পাকিস্তান এই কাণ্ড না করলেও যে স্বার্থরক্ষা হত তার গ্যারান্টি নেই। কিন্তু ভেবে দেখুন, পিসিবি এ জিনিস করল কেন? পাকিস্তান এক মহান দেশ বলে? নাকি বাংলাদেশের ক্রিকেটার ও ক্রিকেটভক্তদের দুঃখে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বুকের ভিতরটা হু হু করছিল বলে? দুটোর কোনোটাই নয়। পাকিস্তান যে কোনো মহান দেশ নয় তা আমরা ভারতীয়রা ভালো করেই জানি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুলে না যাওয়া বাংলাদেশীরাও জানেন।

আসলে মহসীন একজন দুঁদে রাজনীতিবিদ। তিনি পাকিস্তানের মন্ত্রিসভার সদস্য। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো পুরোপুরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, এবং ক্রিকেট নিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে দেবজিৎ শইকিয়াদের ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড রাজনীতিতেই ল্যাজেগোবরে হল। স্রেফ সোশাল মিডিয়া ট্রোলদের কথায় কান দিয়ে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে তাড়ানো হয়েছিল। অথচ এর কোনো রাজনৈতিক যুক্তি ছিল না, কারণ পাকিস্তানের মত বাংলাদেশ আমাদের শত্রু রাষ্ট্র নয়। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনোদিন যুদ্ধ হয়নি, বরং তাদের ইতিহাসের একমাত্র যুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমরাই সহায়তা করেছিলাম। বাংলাদেশে যে দলের সরকারই এসে থাক, কোনোদিন আমাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে পড়েনি। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে ভারতই আশ্রয় দিয়েছে, আবার বর্তমান তদারক সরকারের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক বজায় আছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরে শোকপ্রকাশ করতে আমাদের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর স্বয়ং বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। সেই দেশের ক্রিকেটারকে আমাদের দেশের লিগে খেলতে দেওয়া হল না কোন যুক্তিতে?

মুসলমানবিদ্বেষ, এবং বোর্ডের সেক্রেটারি দেবজিৎ যে রাজ্যের লোক সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার স্পষ্ট বাঙালিবিদ্বেষ— এছাড়া আর কোনো যুক্তিই খাটে না। সেই যুক্তি প্রয়োগ করেই গণ্ডগোলটা পাকাল বিসিসিআই। জবাবে বিসিবি ভারতে খেলতে আসতে অস্বীকার করল। আইসিসি যে বিসিসিআইয়ের দুবাই শাখা মাত্র, সেকথা নিতান্ত বোকা আর ন্যাকা ছাড়া ক্রিকেট-দুনিয়ার সবাই জানে। তা যদি না হত, তাহলে আইসিসি বাংলাদেশের দাবি মেনে নিয়ে তাদের শ্রীলঙ্কায় খেলতে দিত। ঠিক যেমন গতবছর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতকে পাকিস্তানের বদলে সংযুক্ত আরব আমীরশাহীতে খেলতে দিয়েছিল। বাংলাদেশের নিরাপত্তার অভাববোধ করার দাবি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, আইসিসির নিরাপত্তা দল যা-ই বলে থাক। কারণ ততদিনে কলকাতা নাইট রাইডার্সে মুস্তাফিজুরকে নেওয়ার জন্যে শাহরুখ খানকে এবং মুস্তাফিজুরকে ভারতের শাসক দলের নেতারা হুমকি দিয়ে ফেলেছেন। শেষ মুহূর্তে সূচি পরিবর্তন করা মোটেই কঠিন নয়।

কিন্তু তাতে ভারত আর বাংলাদেশকে সমানভাবে দেখা হয়ে যেত। আইসিসি মানে তো আসলে বিসিসিআই। নইলে আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ ভারত জিতলে বাচ্চা ছেলের মত লাফালাফি করেন কেন? সেই লোকের অধীন আইসিসি মুড়ি মিছরি এক দর করে দিতে পারে না। ফলে বাংলাদেশের দাবি মানা হল না। ক্রিকেটপাগল দেশের জনগণ, যাদের মধ্যে এমনিতেই রাজনৈতিক কারণে ভারতবিরোধিতা দিন দিন বাড়ছে, তাদের বাদ দিয়ে দেওয়া হল বিশ্বকাপ থেকে। এই সুযোগটাই নিলেন মহসীন। গোটা ঘটনাবলীতে সবচেয়ে ক্ষতি হল ভারতের বিদেশনীতির। ‘বিজেপিচালিত’ ক্রিকেট বোর্ড এবং আইসিসির নৈপুণ্যে আমাদের পশ্চিম সীমান্তের শত্রু রাষ্ট্রটির সঙ্গে পূর্ব সীমান্তের বন্ধু রাষ্ট্রটির গলাগলি হয়ে গেল। এবার বাংলাদেশের নির্বাচনে যে দলই জিতুক, তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করতে ভারত সরকারকে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হবে।

কেলোর কীর্তি এখানেই শেষ নয়। দক্ষিণদিকের প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক মোটের উপর বরাবরই ভালো, এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত না থাকায় শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক যৎসামান্য। একসময় বরং একটু গোলমেলেই হয়ে গিয়েছিল, কারণ ২০০৯ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তানে খেলতে গিয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলার শিকার হয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা। এবারে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হচ্ছে কলম্বোয়, সেহেতু ম্যাচটা না হলে শ্রীলঙ্কার ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল। তাই তারাও পাকিস্তানকে অনুরোধ করেছিল ম্যাচটা খেলতে। পাকিস্তান শেষপর্যন্ত রাজি হয়ে যাওয়ার পরে শ্রীলঙ্কার বিদেশমন্ত্রী ও পর্যটন মন্ত্রী সোশাল মিডিয়া পোস্টে ধন্যবাদ জানিয়েছেন কাকে? পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ আর পিসিবিকে। উপরন্তু লিখেছেন, পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্ত খেলোয়াড়ি মনোভাব, মিত্রতা এবং দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের শক্তির নিদর্শন। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কার থেকেও হাততালি কুড়িয়ে নিল পাকিস্তান, আইসিসি নয়।

অতি দর্পে…

সেই জগমোহন ডালমিয়ার আমলে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ একত্রে বিশ্ব ক্রিকেটে উপমহাদেশের আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা শুরু করেছিল এবং সফল হয়েছিল। কারণটা ব্যবসায়িক। যতগুলো দেশ ক্রিকেট খেলে, তার মধ্যে খেলাটার জনপ্রিয়তা এই অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি এবং প্রত্যেকটা জনবহুল দেশ। এখন যুক্ত হয়েছে নেপাল আর আফগানিস্তান। ফলে এই উপমহাদেশই স্পনসরদের জন্যে সবচেয়ে বড় বাজার। অন্যান্য কুড়ি বিশের লিগের তুলনায় আইপিএলের রমরমাও এই কারণেই বেশি, বিসিসিআইও এই কারণেই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড হতে পেরেছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের হাত থেকে বিশ্ব ক্রিকেটের রাশ কেড়ে নেওয়ার পরে ডালমিয়া চেষ্টা করেছিলেন ক্রিকেটকে আরও ছড়িয়ে দিতে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনা, বাংলাদেশকে টেস্ট ক্রিকেটের আঙিনায় নিয়ে আসা সেই চেষ্টারই অংশ। সে আমলেই অ্যাসোসিয়েট দেশগুলোর মধ্যে ক্রিকেট আরও ছড়াচ্ছিল। কেনিয়া ভাগ্যের সামান্য সহায়তা পেয়ে ২০০৩ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিল। সিঙ্গাপুর, টরন্টো, নাইরোবির মত নতুন নতুন জায়গায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আসর বসছিল। কিন্তু এন শ্রীনিবাসনের আমল থেকে, বলা ভালো, আইপিএলের টাকায় পকেট ভীষণ গরম হওয়ার পর থেকে, উপমহাদেশীয় ঐক্যের তোয়াক্কা না করে বিসিসিআই এককালে সকলের উপর ছড়ি ঘোরানো অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ডের সঙ্গেই জোট বেঁধে তৈরি করেছে ‘বিগ থ্রি’ মডেল।

এই মডেল অনুযায়ী, আইসিসির আয়ের সিংহভাগ নিয়ে নেয় এই তিন দেশের ক্রিকেট বোর্ড। বাকিদের দিকে কাঁটা কুটো ছুড়ে দেওয়া হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার মত জায়গায় একাধিক কারণে ক্রিকেটের নাভিশ্বাস উঠে গেছে গত ১০-১৫ বছরে। অ্যাসোসিয়েট দেশগুলোর অবস্থা স্বভাবতই আরও সঙ্গীন। দুর্বল দেশগুলোকে বেশি সাহায্য করাই তো যে কোনো খেলার নিয়ামক সংস্থার দায়িত্ব হওয়ার কথা। কিন্তু ত্রিদেবের যুক্তি হল— আমাদের এখান থেকে আইসিসির সবচেয়ে বেশি টাকা আয় হয়, অতএব আমরাই সবচেয়ে বেশি টাকা নেব।

অর্থাৎ পুঁজিবাদের যতরকম মডেল হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে শোষণমূলক মডেলটাতেই চালানো হচ্ছে বিশ্ব ক্রিকেট। টাকার নেশায় চুর এই ক্রিকেট প্রশাসকদের মাথায় ঢোকে না যে, পুঁজিবাদের যুক্তি অনুযায়ীই বাজার ক্রমাগত বড় করে যেতে হয়, ছোট করলে ব্যবসার পঞ্চত্বপ্রাপ্তির পথ খুলে দেওয়া হয়। ফলে বিসিসিআই তার দুই স্যাঙাতের সঙ্গেই বারবার খেলছে, বেশি ম্যাচের সিরিজ খেলছে। নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকাকেও বিশেষ পাত্তা দিচ্ছে না। আফগানিস্তান আর আয়ারল্যান্ডকে তো টেস্ট খেলার অধিকার দেওয়া হয়েছে নামেই। তারা টেস্ট দূরের কথা, বড় দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বা কুড়ি বিশ বা একদিনের ম্যাচের সিরিজ খেলারও সুযোগ পায় না। নেদারল্যান্ডস একের পর এক বিশ্বকাপে নজরকাড়া ক্রিকেট খেললেও তাদের খেলা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয় না আইসিসি। নেপালও আটকে আছে একই জায়গায়, অথচ সেখানে ক্রিকেটের বিপুল জনপ্রিয়তা। এসব হচ্ছে, কারণ আইসিসি ফিফার মত শক্তিমান নিয়ামক সংস্থা নয়, তাকে ঘাড় ধরে চালাচ্ছে বিসিসিআই। তার যাতে আগ্রহ নেই, আইসিসি তা করতে পারবে না।

এই ব্যবস্থায় বিসিসিআই ফুলে ফেঁপে উঠছে, ফলে তার গোদি মিডিয়া (প্রাক্তন ক্রিকেটার সমেত) আপনাকে সারা বছর বোঝাচ্ছে— এটাই ঠিক ব্যবস্থা। যখন সাহেবদের ক্ষমতা ছিল সাহেবরা যা করত, আমরাও তাই করছি। একে তো খ-এর আজকের খারাপ কাজটা ক আগে করত বলেই সেটা ভালো কাজ হয়ে যায় না, তার উপর একথা সম্পূর্ণ চেপে যাওয়া হচ্ছে যে সাহেবদের সঙ্গে গলাগলি করেই ব্যাপারটা করছি। এটা মোটেই তাদের বিরুদ্ধে কোনো জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নয়। যা-ই হোক, ব্যাপারটা চলছিল ভালোই। কিন্তু এক মাঘে যে শীত যায় না সেটা ভুলে গিয়েই গোলমাল হয়ে গেল। ক্রিকেটের অর্থনীতি যে ভিতর থেকে ফোঁপরা হয়ে গেছে, তা প্রকাশ হয়ে গেল পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে খেলতে অস্বীকার করতেই। দেখা গেল, যে যার নিজের দেশে কুড়ি বিশের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু করে নিজেদের পকেট যতটা পারছে ভরাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভিতেই উই ধরে গেছে। বাকি ম্যাচগুলোকে অবহেলা করতে করতে আর ভারত-পাক ম্যাচের বেলুনে ফুঁ দিতে দিতে (২০২৩ বিশ্বকাপে কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করা হয়নি। মনে আছে তো? ঝলমলে নাচাগানা হয়েছিল ভারত-পাক ম্যাচের দিন) এত বড় করা হয়েছে যে ওই ম্যাচের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে সকলের আয়। কোনো কোনো হিসাব বলছে, আইসিসি প্রতিযোগিতায় একটা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ থেকে ২,২০০ কোটি টাকার বেশি উঠে আসে (প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার)। মানে ভারত-পাক রাজনৈতিক উত্তেজনার আগুনেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রান্নাবাড়ি চলছে। আচ্ছা তা-ও নাহয় মানা গেল। কিন্তু কথাটা যখন জানাই আছে, তখন ম্যাচটা খেলতে গেলে যে পাকিস্তানকে লাগবে একথা তো বোঝা উচিত ছিল। সেক্ষেত্রে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার কী প্রয়োজন ছিল?

দেশপ্রেম বনাম ডলার-প্রেম

এই প্রশ্নটা শুনেই অনেকে তেড়ে এসে বলবেন ‘পাকিস্তান আমাদের দেশের এত ক্ষতি করেছে, ওদের সঙ্গে কি গলাগলি করতে হবে?’ আজ্ঞে না, গলাগলি করা একেবারেই অনুচিত। দেশপ্রেমের যুক্তি বলে, পহলগামের সন্ত্রাসবাদী হানার পরে খেলাই উচিত নয় তাদের সঙ্গে। মানে ভারতেরই বরং পাকিস্তান ম্যাচ বয়কট করা উচিত। কী হবে তাতে? দুটো পয়েন্ট কাটা যাবে। আমাদের তো বিশ্বসেরা দল, তারা সে ক্ষতি পুষিয়ে দিয়ে খেতাব জিততে পারবে না? নির্ঘাত পারবে। তাহলে আমরা খেলি কেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে?

শুধু খেলি তা নয়। বিসিসিআই যে আইসিসির ঘাড় ধরে দুনিয়ার ক্রিকেট চালায়, সেটা আমাদের অনেকেরই গর্বের বিষয়। অথচ তা সত্ত্বেও সব আইসিসি প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানকে আমাদের গ্রুপেই রাখা হয়, যাতে নিদেনপক্ষে একবার ভারত-পাক ম্যাচ হয়। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এসিসি) আয়োজিত এশিয়া কাপে তো ভারত-পাক ম্যাচ হতেই হবে, এড়ানোর উপায় নেই। কিন্তু ২০২৫ এশিয়া কাপে এমন ব্যবস্থা করা হল যে ফাইনালের আগেই দু-দুবার এই দুই দলের খেলা হল, ফাইনালে আরও একবার।

রাজনৈতিক কারণে এক দেশের আরেক দেশের বিরুদ্ধে না খেলা কিন্তু পৃথিবীর কোনো খেলাতেই বিরল ব্যাপার নয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনা নামানোর প্রতিবাদে ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিক বয়কট করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমেত ৬০ খানার বেশি দেশ। তার বদলা নিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার বন্ধু দেশগুলো ১৯৮৪ সালের লস এঞ্জেলস অলিম্পিক বয়কট করে। আস্ত অলিম্পিক বয়কট করতে পেরেছে অতগুলো দেশ, আমরা একটা ম্যাচ বয়কট করতে পারি না?

আরো পড়ুন ভারত-পাক ম্যাচ এখন ক্রিকেটের দুর্বিপাক

কেন পারি না? উত্তর একটাই। ওই ২৫০ মিলিয়ন ডলার। ও হিসাবটা তবু পাওয়া যায়, এই খেলা ঘিরে যে উন্মাদনা তাকে ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যম, তথাকথিত স্বাধীন সাংবাদিক, সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা যে কত টাকা রোজগার করেন তার হিসাব পাওয়াও সম্ভব নয়। ওই ভাগটা কেউই ত্যাগ করতে রাজি নয়। তাই পাকিস্তান বয়কটের কথা বলতেই, বিসিসিআইয়ের চেয়েও বেশি উৎসাহে এই ম্যাচ না খেলা কেন পাকিস্তানের অন্যায়, তা আপনার মাথায় ঢোকাতে কদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করলেন আপনার প্রিয় সাংবাদিকরা। এদিকে দেশপ্রেমও দেখাতে হবে। তাই কী বুদ্ধি বের করেছিল বিসিসিআই?

খেলব, কিন্তু খেলার মাঠের দস্তুর অনুযায়ী পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে আমাদের ক্রিকেটাররা হাত মেলাবেন না। উপরন্তু আমাদের অধিনায়ক সাংবাদিক সম্মেলনে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা দেবেন। গোদি মিডিয়া হাততালি দেবে, আপনাকে জানাবে যে পহলগামের মুখের মত জবাব এইটাই। সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নয়। এক বাংলা কাগজে তো লেখা হয়েছিল, ভারত এতদ্বারা পাকিস্তানকে বলল ‘চল ফোট’।

এই নাটুকেপনা পৃথিবীর অন্য কোনো খেলার নিয়ামক সংস্থা করতে দিত না। তার প্রমাণ— এশিয়া কাপে যেদিন (২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫) সূর্যকুমার যাদবের দল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার খেলেছিল, সেদিনই কাঠমান্ডুতে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলে ভারত বনাম পাকিস্তানের খেলা ছিল। সেই ম্যাচ ভারত ৩-০ জেতে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দন করেই মাঠ ছাড়ে। কিন্তু এশিয়া কাপে ফাইনালের পরে আরও বড় নাটক করে ভারতীয় দল। তারা নাকি কোনো পাকিস্তানির হাত থেকে কাপ নেবে না। অথচ আগে থেকেই জানা ছিল যে, এসিসির প্রধান এখন মহসীন নকভি। ফলে কাপ জিতলে তাঁর হাত থেকেই নিতে হবে। জেদ করে সেই কাপ না নিয়েই ফিরে এসেছিলেন সূর্যকুমাররা।

তখনো ভারতের প্রথিতযশা ক্রিকেট সাংবাদিকরা এবারকার মতই প্রবল জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠেছিলেন এবং রেলা নিয়ে লিখেছিলেন, ও কাপ নাকি দিয়ে যেতে বাধ্য হবেন নকভি। পাঁচ মাস হয়ে গেল, আজও সে কাপ এল না। বিসিসিআই এ নিয়ে আইসিসির কাছে, মানে প্রবল পরাক্রমশালী জয় শাহের কাছে, ছুটে গিয়েছিল। তিনিও সুবিধা করতে পারেননি। তাঁর আইসিসি মধ্যস্থতা করার জন্যে একখানা কমিটি গড়ে দিয়েছিল, সেই কমিটি ততটাই সফল হয়েছে যতটা গাজার গণহত্যা থামাতে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ সফল। মহসীন বলেছেন, কাপটা রাখাই আছে। একখানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারি, এসে নিয়ে যেতে হবে এসিসি অফিস থেকে। হয়ত বিসিসিআই ভিখারি নয় বলেই হকের কাপ নিতেও ক্রিকেটারদের পাঠাতে রাজি নয়।

এসব অসোয়াস্তি এড়ানো যায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মায়া ছাড়তে পারলে। কিন্তু তা তো হয় না, গোটা ক্রিকেট-দুনিয়ার দায়িত্ব যেখানে আমাদের ঘাড়ে। এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আর কী কী যে করতে হবে? দেখুন আবার, আজ থেকে ফের পাকিস্তানিদের সঙ্গে করমর্দন শুরু করতে হয় কিনা। গতকাল সাংবাদিক সম্মেলনে করমর্দনের প্রশ্ন উঠতেই সূর্যকুমার যেভাবে সরাসরি উত্তর না দিয়ে স্মার্ট সাজার চেষ্টা করেছেন, তাতে সন্দেহ হয়, তাঁকেও বলা হয়েছে ‘জো আপ উচিত সমঝো।’ তাঁকে অবশ্য এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দিতে পারে কলম্বোর বৃষ্টি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

খেলোয়াড় মেয়েদের জয় হোক

মেয়েদের দলের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাকে বড় করে দেখানোর যে প্রবণতা এতদিন দেখা গেছে, তার ব্যাখ্যা নারীবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে হয় না।

‘খেলোয়াড় মেয়ে’ কথাটা প্রথম কার মুখে শুনেছিলাম মনে করতে পারছি না, কিন্তু কয়েকশোবার শুনেছি। কোনও মেয়েকে খারাপ মেয়ে বলে দেগে দিতে এই শব্দবন্ধ বেশ জনপ্রিয়। রবিবার মাঝরাতে যখন নাদিন দে ক্লার্কের ব্যাট থেকে বেরোনো উড়ন্ত বলটাকে টেনে নামিয়ে দু-হাত ছড়িয়ে উড়ান শুরু করলেন হরমনপ্রীত কৌর আর তাঁকে ধরতে দৌড়লেন স্মৃতি মান্ধনা, শেফালি বর্মা, জেমিমা রডরিগস, দীপ্তি শর্মা, অমনজ্যোত কৌর, রিচা ঘোষ, রাধা যাদব, শ্রী চরনি, ক্রান্তি গৌড়, রেণুকা সিং ঠাকুররা— ঠিক তখন, এ-যুগের সেরা ধারাভাষ্যকার ইয়ান বিশপ বলে উঠলেন ‘এই মুহূর্ত কয়েক প্রজন্মের উত্তরাধিকার তৈরি করল।’ আমার ভাবতে ইচ্ছে হল, সেই উত্তরাধিকারের জোরে খেলোয়াড় মেয়ে কথাটা আর গালাগালি থাকবে না। চারপাশ দেখে আমরা যতই হতাশ হই প্রায়শ, দুনিয়া যে বদলায় তাতে তো সন্দেহ নেই। একসময় ভালোঘরের মেয়েরা অভিনয় করে না— এই সংস্কার তো ছিল আমাদের সমাজে। সত্যিই ‘ভালো’-ঘরের মেয়েদের অভিনয় করতে দেওয়াও হত না। সেই পরিস্থিতি তো বদলেছে। মেয়ে অভিনেত্রী হলে, বিখ্যাত হলে তাকে নিয়ে তো আজ গর্ব করেন বাবা-মা, পাড়া-প্রতিবেশীরা। তেমন এমন ভবিষ্যৎও নিশ্চয়ই আসবে, এই ভারতেই আসবে, যখন একটা মেয়ের যৌন বিশুদ্ধতাই তাকে বিচার করার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হয়ে থাকবে না।

বাইরে আমরা যে যা-ই বলি, মেয়েরা বিশ্বখেতাব জিতেছে বলে যতই তাদের প্রশংসায় ভরিয়ে দিই এখন, সামগ্রিকভাবে কিন্তু আজও ওটাই মাপকাঠি। মান্ধাতার আমলের কথা বলছি না। মাত্র এক দশক আগে, রিও অলিম্পিকের সময়ে, এক সর্বভারতীয় ইংরেজি কাগজে কাজ করতাম। সেদিন নিউজ এজেন্সি একটা খবর পাঠিয়েছিল গেমস ভিলেজে কন্ডোমের চাহিদা সম্পর্কে। সন্ধেবেলার এডিট মিটিংয়ে অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, উচ্চশিক্ষিত সাংবাদিকরা জানতেনই না যে গেমস ভিলেজে অ্যাথলিটদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক হয়। কিন্তু ব্যাপারটা বিস্ময়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও কথা ছিল। সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা সাংবাদিক বলে বসলেন ‘তাহলে বাপু মেয়েদের খেলতে না দেওয়াই ভালো।’ অর্থাৎ মেয়েদের ‘সতীত্ব’ বজায় রাখাই আসল। ওটা করতে না পারলে হাজার সাফল্যেও কিছু এসে যায় না। আশা করা যাক, হরমনপ্রীতদের বিশ্বজয়ের পরে অন্তত উচ্চশিক্ষিত বাবা-মায়েরা ওই সাংবাদিকের মতো ভাবা বন্ধ করবেন।

‘অনার কিলিং’-খ্যাত হরিয়ানার মেয়ে শেফালি, হিমাচল প্রদেশের ঠাকুর পরিবারের মেয়ে রেণুকা, মুম্বাইয়ের ধার্মিক খ্রিস্টান জেমিমা বা আমাদের শিলিগুড়ির রিচা— প্রায় সকলেরই ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে, তাদের ক্রিকেট শুরু ছেলেদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে। কিংবদন্তি ঝুলন গোস্বামীর শুরুটাও একইভাবে হয়েছিল চাকদায়। কারণ মাঠের দখল ছেলেদের হাতে। খেলোয়াড় জীবন তৈরি করতে হলে এ-দেশে আগে ছেলেদের সমকক্ষ হতে হয়, তাদের হারিয়ে দেখাতে হয়। ঠিক যেমন দঙ্গল (২০১৬) ছবিতে আমরা দেখেছিলাম— মহাবীর সিং ফোগতকে মেয়েদের এমনভাবে তৈরি করতে হয়েছিল যাতে তারা কুস্তিতে ছেলেদের হারাতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো দেশের মেয়েদের পেশাদার খেলোয়াড় হতে হলে এমন অসম লড়াই দিয়ে শুরু করতে হয় না। ফলে রবিবারের জয় এ-দেশের নারীবাদীদের দায়িত্ব বাড়িয়ে দিল। রাতদখলের মতো মাঠদখলের আন্দোলনও তাঁদের করতে হবে। প্রাক্তন বোর্ড সভাপতি এন শ্রীনিবাসনের সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল পুরনো মন্তব্য থেকে নিশ্চয়ই সকলে জেনে গেছেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড যাঁরা চালান, তাঁরা মেয়েদের ক্রিকেটকে কী নজরে দেখেন। বর্তমান বোর্ডকর্তারাও খুব অন্যরকম ভাবেন এমন মনে করার কারণ নেই। ফাইনালের দিন মাঠে সপরিবার জয় শাহের উপস্থিতি দেখে ঠকবেন না।

প্রথমত, ভারতের জয়ে প্রকাশ্যে উল্লাস করা তাঁর বর্তমান পদের সঙ্গে মোটেই মানানসই নয়। কারণ তিনি এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, ভারতের বোর্ডের কেউ নন, যদিও বকলমে তিনিই সর্বেসর্বা। খেলাটার প্রতি গভীরে প্রোথিত অশ্রদ্ধা না থাকলে এবং নিজের পদমর্যাদা বুঝতে সম্পূর্ণ অক্ষম না হলে ওই পদের লোক অমন আচরণ করে না। অতীতে যে ভারতীয়রা আইসিসির সর্বোচ্চ পদ অলঙ্কৃত করেছেন (যেমন জগমোহন ডালমিয়া, শরদ পাওয়ার, শশাঙ্ক মনোহর) তাঁরা এই আদেখলেপনা করতেন না। দ্বিতীয়ত, জয়ের অনুগত ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা এখন কদিন বিস্তর প্রোপাগান্ডা চালাবেন, জয় মেয়েদের ক্রিকেটের জন্যে কত কিছু করেছেন তার ফিরিস্তি দিয়ে। ওতেও ভুলবেন না। তথ্যের আড়ালে লুকিয়ে ফেলা তথ্য জানতে এইটা পড়ে নিতে পারেন।

সত্যিই যদি বোর্ডের মেয়েদের ক্রিকেটের প্রতি দরদ থাকত, তাহলে টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটার দীপ্তি শর্মাকে মুখ ফুটে বলতে হত না— আরও বেশি ম্যাচ খেলার ব্যবস্থা হলে ভালো হয়। মনে রাখবেন, কিংবদন্তি ঝুলন গোস্বামী দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটজীবনে খেলতে পেরেছিলেন মাত্র এক ডজন টেস্ট আর ২০৪ খানা একদিনের ম্যাচ। অথচ ভারতের হয়ে বছর বারো খেলেই ৯২ খানা টেস্ট আর ২০০ একদিনের ম্যাচ খেলেছিলেন জাহির খান। বিরাট কোহলি ১৩-১৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনেই ১২৩ খানা টেস্ট আর তিনশোর বেশি একদিনের ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। আজকের বিশ্বজয়ী দলের সহ-অধিনায়িকা স্মৃতি ২০১৩ সালে অভিষেকের পর থেকে খেলেছেন ১১৭ খানা একদিনের ম্যাচ আর ২০১৪ সালে টেস্ট অভিষেকের পর মাত্র সাতখানা টেস্ট। ওদিকে একই সময়ে অভিষেক হওয়া মহম্মদ শামি খেলে ফেলেছেন ৬৪ খানা টেস্ট আর ১০৮ খানা একদিনের ম্যাচ। ইচ্ছাকৃতভাবে মেয়েদের বিশ্বকাপকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ছোট ছোট শহরে ম্যাচ দেওয়া, মুম্বাইয়ের তিনটে ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মধ্যে সবচেয়ে ঐতিহ্যহীন এবং শহরের প্রান্তে থাকা স্টেডিয়ামকে সেমিফাইনাল ও ফাইনালের জন্যে বেছে নেওয়া আর বিশ্বকাপসুলভ প্রচারের ব্যবস্থা না করা তো আছেই। বোঝাই যায়, অ্যালিসা হিলির অস্ট্রেলিয়া, ন্যাট শিভার-ব্রান্টের ইংল্যান্ড বা লরা উলভার্টের দক্ষিণ আফ্রিকা খেলছিল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। হরমনপ্রীতের ভারত খেলছিল প্রতিপক্ষ এবং নিজেদের বোর্ডের বিরুদ্ধে। এখন দলকে এককালীন ৫১ কোটি টাকা পুরস্কার দিয়ে নারীদরদি সাজবে বোর্ড।

আরও পড়ুন আলতো ফ্লিক: ক্রিকেট নিয়ে ব্যতিক্রমী বই

অবশ্য কেবল বোর্ডই যে হরমনপ্রীতদের বিরুদ্ধে ছিল তা নয়। মেয়েদের দল এত বছরে যতবার হেরেছে, ততবার মেয়েদের দ্বারা যে ক্রিকেট হয় না, মেয়েদের দলের পিছনে টাকা খরচ করা যে অপচয়— সে-কথা আজ উদ্বাহু নৃত্য করা সাধারণ দর্শকরা তো বটেই, ক্রীড়া সাংবাদিকরাও বলে গেছেন সোশাল মিডিয়ায়। খবরের কাগজে বা টিভি চ্যানেলে যৎসামান্য জায়গা বরাদ্দ হয়েছে মেয়েদের ক্রিকেটের জন্য। এ-কথা ঠিকই যে খেলায় সাফল্য না এলে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ে না, সংবাদমাধ্যমেও বেশি জায়গা দেওয়ার কোনও যুক্তি নেই। এখন চূড়ান্ত সাফল্য এসেছে, স্বভাবতই সব মহলের আগ্রহ বাড়বে। কিন্তু মেয়েদের দলের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাকে বড় করে দেখানোর যে প্রবণতা এতদিন দেখা গেছে, তার ব্যাখ্যা নারীবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে হয় না। ভারতের মেয়েরা এর আগেও দু-দুবার একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছেছিল। দুবারই হেরে যাওয়া মাত্রই লেখালিখি হয়েছে— এদের দিয়ে কিস্যু হবে না। এদের জন্যে এত করা হয়, তবু…। কত যে করা হয় তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপরেই দিয়েছি। এদিকে ছেলেদের দল পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ডের বিরাট মুনাফার যাবতীয় সুবিধা পেয়ে থাকে। অথচ গত ১২ বছরে অসংখ্য সুযোগেও বিশ্বখেতাব মাত্র একটা, তাও কুড়ি-বিশের ক্রিকেটে। বরং গত দুবছরে একদিনের ম্যাচ আর টেস্ট ক্রিকেটে হারের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু ওই দলের ন্যূনতম সাফল্যকেও বিরাট করে দেখাতে উঠে পড়ে লাগে বোর্ড আর তার গোদি মিডিয়া। হারা সিরিজের গুরুত্বহীন ম্যাচে রোহিত শর্মা বা বিরাট শতরান করলে সেই ইনিংসকেই কাব্যিক করে তুলতে ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রাক্তন ক্রিকেটার, সাংবাদিক আর সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা। অথচ ভেবে দেখুন, কতবার আপনি পড়েছেন যে, বর্তমানে মেয়েদের ক্রিকেটে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটার হলেন স্মৃতি, আর সবচেয়ে ধারাবাহিক অলরাউন্ডারদের একজন দীপ্তি?

যা-ই হোক, হয়তো আমি পুরুষ বলেই এসব নিয়ে ভাবছি। স্মৃতি, দীপ্তি, রিচারা যেভাবে বেড়ে উঠেছেন তাতে ওঁরা জানেন যে এরকমই হওয়ার কথা ছিল, এরকমই হবে। কদিন পরেই যদি তাঁদের কারও উপরে মেয়ে বলে কোনও আক্রমণ চলে (যেমনটা বিশ্বকাপ চলাকালীন দুই অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটারের উপরে চলেছে), তখন আজ মাথায় তুলে নাচা ‘পাবলিক’ এবং ‘মিডিয়া’ পাশে দাঁড়াবে না। নিজের সম্মান বজায় রাখতে না পারার দোষ নিজের— এই জাতীয় কিছু বলে দেবেন কৈলাস বিজয়বর্গীয়ের মতো কোনও নেতা। বিশ্বকাপটা যে মধ্যরাতে জেতা হয়েছিল, সে-কথা ভুলে গিয়ে কোনও মহিলা মুখ্যমন্ত্রী বলে দিতে পারেন— অত রাতে বাইরে যাওয়া উচিত হয়নি। সাংবাদিকরা গসিপের খোঁজ করবেন, কেউ হয়তো লিখে দেবেন— বিশ্বকাপ জিতে ধরা কে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছিল এরা। তাই এই ঘটনা ঘটেছে। এরা মহা খেলোয়াড় মেয়ে।

সে যা-ই হোক, হরমনদের দৌলতে অনেকদিন পরে আস্ত একখানা প্রতিযোগিতা দেখা গেল, যেখানে প্রতিপক্ষকে আউট করে মুখের সামনে গিয়ে অসভ্যের মতো চিৎকার করলেন না ভারতীয় ক্রিকেটাররা। আউট হলে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন না, আম্পায়ারদের সিদ্ধান্ত নিয়ে আক্রমণাত্মক বিবৃতি দিলেন না পৃথিবীর সবচেয়ে পয়সাওয়ালা বোর্ডের খেলোয়াড় হওয়ার রেলায়। নীল জার্সির গা বেয়ে উপচে পড়ল না উগ্র জাতীয়তাবাদ, গ্যালারির হিংস্র চেহারাও দেখা গেল না।

খেলোয়াড় মেয়েদের জয় হোক।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভারতে মেয়েদের ক্রিকেটের পথ এখনো বন্ধুর

জেমিমাকে মাঠের মধ্যে এনে ধর্ষণ করা উচিত – এমন কথাও পোস্ট করা হচ্ছিল সোশাল মিডিয়ায়। নারীবাদীরা কেউ তখন টুঁ শব্দ করেছিলেন বলে জানি না। এখন করছেন, কারণ জেমিমাকে চেনা গেছে। বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে, মহিলাদের ক্রিকেটের খবর নারীবাদীরাও বিশেষ রাখেন না।

লক্ষ করে দেখলাম, বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো মতপার্থক্য নেই যে ৩০ অক্টোবর ২০২৫ মেয়েদের ক্রিকেটের ইতিহাসে একটা বিশেষ দিন ছিল। মেয়েদের ক্রিকেটে এত রান তাড়া করে কোনো দল কখনো জেতেনি। শুধু তাই নয়, ছেলেদের বিশ্বকাপেও নক আউট ম্যাচে এত রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড নেই। জেমিমা রডরিগসের অপরাজিত ১২৭ রান যে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে কোনো ভারতীয়ের সেরা ইনিংস তা নিয়েও মনে হয় না বিশেষ তর্কের অবকাশ আছে। ২০১১ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে শচীন তেন্ডুলকর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একা কুম্ভ হয়ে ৮৫ রান করেছিলেন, যা পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল। শচীনও একাধিকবার আউট হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন জেমিমার মতই। কিন্তু সেদিন ভারত প্রথমে ব্যাট করেছিল, ঘাড়ে পাহাড়প্রমাণ রানের বোঝা ছিল না। সেই পাকিস্তান কোনো ভয় ধরানো দলও ছিল না। বৃহস্পতিবার রাতে যে অস্ট্রেলিয়াকে হরমনপ্রীত কৌররা হারালেন, তারা কিন্তু ছেলেদের ক্রিকেটে ১৯৯৯-২০১১ পর্বের অস্ট্রেলিয়ার মত দুর্ধর্ষ। এরা বিশ্বকাপে শেষবার একটা ম্যাচ হেরেছিল সেই ২০১৭ সালে। এই অবিস্মরণীয় রাতের পর দেশজুড়ে সবাই উচ্ছ্বসিত। অনেকে বলছেন, এরপর জেমিমারা বিশ্বকাপ জিতুন আর না-ই জিতুন, ভারতে মেয়েদের ক্রিকেটের দারুণ উন্নতি হতে চলেছে। সুতরাং অপ্রিয় কথাগুলো বলে ফেলার এটাই সঠিক সময়।

ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত মেয়েদের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ শেষ লগ্নে পৌঁছে গেছে। এই বিশ্বকাপ নিয়ে কথাবার্তা সম্ভবত বহুবছর পরেও শেষ হবে না। তার কারণটা স্রেফ ক্রিকেটীয় হলে চমৎকার হত। জেমিমার ঐতিহাসিক ইনিংস, ভারতের ঐতিহাসিক জয় তো রইলই, ফাইনালে যে দল জিতবে তাদেরই এটা প্রথমবার বিশ্বকাপ জয় হবে। কেবল সেগুলোই চর্চার বিষয় হয়ে থাকলে ভালো হত। প্রথম সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়িকা লরা উলভার্ট যে অনবদ্য শতরান (১৪৩ বলে ১৬৯) করেছেন, যদি তা নিয়ে আলোচনা হয় তাহলেও ক্ষতি নেই। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার ফিবি লিচফিল্ডের মারকাটারি শতরান (৯৩ বলে ১১৯), হরমনপ্রীত কৌরের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের খেলা নিয়ে কাটাছেঁড়া হলেও কোনো কথা ছিল না। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন, বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়ার পর থেকে, এদেশে না হলেও বাকি ক্রিকেট দুনিয়ায় এসবের চেয়ে বেশি আলোচনা হবে মাঠের বাইরের একটা ঘটনা নিয়ে। তার কারণ গত ২৬ অক্টোবর (রবিবার) ইন্দোরে যে ঘটনা ঘটেছে, তা ক্রিকেটে কেন, কোনো খেলার আন্তর্জাতিক আঙিনাতেই বিরল। বিশ্বকাপ খেলতে এসে অস্ট্রেলিয়ার দুই মহিলা ক্রিকেটারের সেই অভিজ্ঞতা হয়েছে যা এদেশের মেয়েদের রাস্তাঘাটে প্রায় রোজই হয়। অর্থাৎ তাঁরা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। টিম হোটেল থেকে বেরিয়ে তাঁরা কাছাকাছি এক কাফেতে যাচ্ছিলেন, পথে আকিল খান নামে একজন বাইক নিয়ে তাঁদের পিছু ধাওয়া করে, এমনকি তাঁদের শরীরেও হাত দেয়।

ব্যাপারটা নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দেড় দিনের বেশি হইচই হয়নি, ফলে হয়ত অনেকেরই নজর এড়িয়ে গেছে। কেনই বা হবে? ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত নিত্যযাত্রী মহিলারাই তো এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন প্রায়ই। ছাত্রীজীবন থেকে সাংবাদিক জীবনে পৌঁছতে পৌঁছতেই এটা এমন অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায় যে তাঁরা অফিসে বা বাড়িতে – কোথাও আর এ নিয়ে বাক্য ব্যয় করেন না। করলে বাড়িতে যার যেমন অভিজ্ঞতাই হোক, অফিসের পুরুষ সহকর্মীরা যে এটাকে কোনো ব্যাপার বলেই মনে করবেন না – একথা তাঁরা জেনে যান। অফিসের ভিতরেই তাঁদের যৌন হয়রানির ঘটনা যে ঘটে তা তো ‘মি টু’ আন্দোলনের সময়ে সংবাদমাধ্যমের বাইরের লোকেরাও জেনে গেছেন। যৌন হয়রানি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে তৈরি আভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটিগুলো (ICC) অনেক অফিসেই হয় নিষ্ক্রিয়, নয় যারা হয়রান করে তাদেরই আখড়া। তাছাড়া আর সব পেশার মত সাংবাদিকতাতেও অধিকাংশ জায়গাতেই লাগাম তো পুরুষদের হাতে। কোনটা খবর আর কোনটা নয়, কোনটা কত বড় খবর – এসব সিদ্ধান্ত পুরুষরাই নেন। ফলে যে দিন দুয়েক অস্ট্রেলিয়ার মেয়েদের খবরটা টিভি চ্যানেল এবং খবরের কাগজে জায়গা জুড়ে ছিল, তখনো সেটা এমনকি খেলার বিভাগেরও সবচেয়ে বড় খবর হয়ে দাঁড়ায়নি। মধ্যপ্রদেশের শাসক দল বিজেপির অন্যতম পরিচিত মুখ কৈলাস বিজয়বর্গীয় যদি খাঁটি ভারতীয় কায়দায়, আক্রান্ত ক্রিকেটারদেরই এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত – এই মর্মে বক্তব্য না রাখতেন, তাহলে আরও কমেই নটে গাছ মুড়িয়ে যেত।

সত্যি বলতে, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের সম্ভবত ভারতের মেয়েরা কীভাবে বাঁচে সে ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই। হোটেলে আসা খবরের কাগজও তাঁরা বিশেষ পড়েন না বা ভারতীয় খবরের চ্যানেলগুলো দেখেন না। দেখলে হয়ত কৈলাসকেই শুভাকাঙ্ক্ষী বলে মনে করতেন, কারণ ওই ঘটনার ঠিক দুদিন আগে মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলায় এক মহিলা ডাক্তার হাতের তালুতে সুইসাইড নোট লিখে আত্মহত্যা করেন। কারণ একজন পুলিশকর্মী তাঁকে পাঁচ মাস ধরে বারবার ধর্ষণ করেছেন এবং অন্য এক পুলিশকর্মী তাঁর উপর মানসিক অত্যাচার চালাচ্ছিলেন। রক্ষকই ভক্ষক কথাটার এমন প্রাঞ্জল উদাহরণ চট করে পাওয়া যায় না। কিন্তু আমাদের দেশের মেয়েরা এমন ঘটনাতেও অবাক হবেন না। কারণ তাঁরা হাথরাসের কথা জানেন, মহিলা কুস্তিগিরদের দুর্দশাও দেখেছেন। অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটাররা অত খবর পাবেন কোথায়? ফলে নিশ্চয়ই তাঁদের মনে হয়েছিল – শহরের মাঝখানে রয়েছি, রাস্তায় লোকজনও আছে, অতএব একটু এদিক ওদিক ঘুরে আসাই যায়। ওঁরা কী করে জানবেন যে ভারতের রাস্তায় নির্জনতাই কোনো মেয়ের একমাত্র শত্রু নয়, বরং লোক বেশি থাকলে ভয় বেশি!

এ মাসের গোড়ার দিকে হায়দরাবাদ বেড়াতে গিয়ে একদিন চারমিনার দেখতে গিয়েছিলাম, সঙ্গীদের মধ্যে তিনজন লিঙ্গ পরিচয়ে নারী। একজনের বয়স ১৩, একজন চল্লিশোর্ধ্ব, আরেকজন প্রায় ৭০। সেদিন রবিবার, সন্ধে হয়ে গেছে। সামনে দেখতে পাচ্ছি চারমিনার, কিন্তু যত এগোচ্ছি সেটা যেন পিছিয়ে যাচ্ছে, কিছুতেই পৌঁছতে পারছি না। কারণ রাস্তাটায় তিলধারণের জায়গা নেই। নিজের শরীরটাকে ওই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে এদিক ওদিক করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আক্ষরিক অর্থে রুদ্ধশ্বাস ‘অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্ট’। সেই ভিড় পেরিয়ে যখন গন্তব্যে পৌঁছলাম, তখন সঙ্গী তিন নারী এক যোগে যে মন্তব্য করলেন তাতেই টের পাওয়া যায় ভারতের রাস্তাঘাট মেয়েদের জন্যে কেমন। বললেন ‘জীবনে এই প্রথম ভিড়ের মধ্যে কেউ অসভ্যতা করল না’।

এই অবস্থা অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটারদের জানার কথা নয়। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডও নাকি জানে না। অস্ট্রেলিয়ার দুই মহিলা ক্রিকেটার আক্রান্ত হওয়ার পর বোর্ডের অনারারি সেক্রেটারি দেবজিৎ শইকিয়া যে বিবৃতি দেন, তাতে বলা হয় ‘এটা গভীরভাবে দুঃখজনক এবং বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ভারত চিরকাল তার সমস্ত অতিথির প্রতি উষ্ণতা, আতিথ্য ও যত্নের জন্য পরিচিত।’ বিচ্ছিন্ন ঘটনা! মধ্যপ্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন, যাদের আতিথ্যে অস্ট্রেলিয়া দল ছিল, তাদের অনারারি সেক্রেটারি সুধীর আসনানির বিবৃতির একটা অংশ আরও এককাঠি সরেস – ‘এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় এটা পরীক্ষা করে দেখতেই হবে যে খেলোয়াড়রা হোটেলের বাইরে ঘোরাফেরা করার জন্যে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেছিলেন, নাকি তেমন কোনো অনুরোধ ছাড়াই বেরিয়েছিলেন।’ যদিও অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের চিফ এক্সিকিউটিভ পল মার্শ অচিরেই জানিয়ে দেন, খেলোয়াড়রা নিরাপত্তা প্রোটোকল মেনেই বাইরে বেরিয়েছিলেন।

এইসব কথাও আমাদের অতি পরিচিত। বাইরে বেরোল কেন, না বেরোলেই তো ধর্ষণ হত না – একথা ভারতের কত নেতা যে কতবার বলেছেন তার ঠিক নেই। নেহাত এক্ষেত্রে ব্যাপারটা আন্তর্জাতিক, বিশ্বগুরুর সম্মানের প্রশ্ন জড়িত। তার উপর যে লোকটি এই কাণ্ড করে ধরা পড়েছে সে মুসলমান। নইলে হয়ত বলা হত – মেয়েগুলো উত্তেজক জামাকাপড় পরে বেরিয়েছিল। অথবা এমনও বলা যেতে পারত যে মেয়েগুলোই লোকটাকে উত্তেজিত করে আকর্ষণ করেছিল। মানে আগামীকাল অমনজোত কৌর বা রিচা ঘোষ এমনভাবে আক্রান্ত হলে যে কর্তারা সেরকম বলবেন না তার গ্যারান্টি কিন্তু বিশ্বকাপ জিতলেও পাওয়া যাবে না। সাক্ষী মালিক, বিনেশ ফোগতদের বেলায় আমরা দেখেছি যে দেশের জন্যে সোনার মেডেল জেতাও ভারতের মেয়েদের নিরাপত্তার বা যৌন অত্যাচারের শিকার হলে তার প্রতিকারের গ্যারান্টি নয়।

আসলে মেয়েরা বাইরে বেরোবে, নিজেদের মত করে ঘুরে বেড়াবে, ক্রিকেট খেলবে – এসব ভারতের বড় অংশের মানুষের আজও পছন্দ নয় (মানুষই লিখলাম, কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে অনেক মেয়েও ঘোর পিতৃতান্ত্রিক)। তেমন লোকেদের হাতেই এখন দেশের ভার এবং সেই সূত্রে ক্রিকেট বোর্ডের ভার। সম্ভব হলে এঁরা নতুন বন্ধু তালিবানদের মত মেয়েদের ক্রিকেট দলটা তুলেই দিতেন। কিন্তু স্বাধীনতার পরের প্রায় আট দশকে দেশটা যেখানে পৌঁছেছে সেটা তো দুম করে অস্বীকার করা যায় না, চোখের চামড়া আছে তো। সুট বুট পরা ইংরিজি জানা মৌলবাদীদের ‘মেয়েদের ক্রিকেট খেলা চলবে না’ বলতেও একটু কেমন কেমন লাগে। নইলে বিজেপির করতলগত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের মেয়েদের ক্রিকেট সম্পর্কে অবজ্ঞা কিছু কম নয়।

প্রমাণ চান? ভারতে কোথায় কোথায় বিশ্বকাপের খেলাগুলো হল দেখুন – গৌহাটি, ইন্দোর, বিশাখাপত্তনম আর মুম্বই। কল্পনা করতে পারেন, ভারতে ছেলেদের বিশ্বকাপ হচ্ছে আর কলকাতার ইডেন উদ্যান, দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা (ইদানীং অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম), চেন্নাইয়ের চিপক বা বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে একটাও খেলা নেই? ২০২৩ সালে যখন এদেশে ছেলেদের বিশ্বকাপ হল, তখন এই প্রত্যেকটা জায়গায় খেলা ছিল। মেয়েদের খেলা দেখতে এইসব বড় শহরে লোক আসবে না, তাই ছোট শহরে খেলা দেওয়া হয়েছে – এই যুক্তির কিন্তু কোনো পরিমাপযোগ্য প্রমাণ নেই। বরং বোর্ডের পক্ষ থেকে বিশ্বকাপসুলভ প্রচার না থাকা সত্ত্বেও যে চার শহরে খেলা হয়েছে, সেখানে ভারতের ম্যাচগুলোতে নিয়মিত ২৫,০০০-৩০,০০০ দর্শক হয়েছে। এর বেশি দর্শক আজকাল ছেলেদের ৫০ ওভারের ম্যাচেও প্রায়শই হয় না। এমনকি আমেদাবাদে ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ম্যাচ হচ্ছে, বিরাট কোহলি বহুদিন পরে শতরান করছেন, অথচ গ্যালারি খাঁ খাঁ – এই দৃশ্যও সাম্প্রতিক অতীতে দেখা গেছে। উপরন্তু ভারত ফাইনালে ওঠায় এখন ফাইনালের টিকিটের দাম বেড়ে গেছে বহুগুণ, কারণ চাহিদা বিপুল বেড়েছে।

মুম্বইতেও ঐতিহ্যশালী ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম বা ব্র্যাবোর্ন স্টেডিয়ামে খেলা দেওয়া হয়নি। ডি ওয়াই পাতিল স্টেডিয়াম এমন জায়গায়, যার সম্পর্কে ২০০৮ সালে মুম্বইয়ের সাংবাদিকরা মজা করে বলতেন ‘ওটা মুম্বইয়ের চেয়ে পুনের বেশি কাছাকাছি।’ শ্রীলঙ্কায় যে খেলাগুলো ছিল তার সবকটাই কিন্তু রাজধানী কলম্বোর বিখ্যাত রণসিঙ্ঘে প্রেমদাসা স্টেডিয়ামে হয়েছে। ডাম্বুলা বা ক্যান্ডিতে নয়।

তবে মেয়েদের ক্রিকেটের প্রতি বোর্ডের অবহেলা এটুকুই নয়। বিজেপির মত বিসিসিআইয়েরও গোদি মিডিয়া আছে। তার সাংবাদিকরা সোশাল মিডিয়া বিদীর্ণ করে লিখে থাকেন, মেয়েদের ক্রিকেটের জন্যে বোর্ড কতকিছু করছে। ২০২২ সালে জয় শাহ বোর্ডের সরাসরি দায়িত্বে থাকার সময়ে ঘটা করে ঘোষণা করা হয়েছিল – এখন থেকে বোর্ডের সঙ্গে কেন্দ্রীয় চুক্তিতে আবদ্ধ ছেলে আর মেয়ে ক্রিকেটাররা সমান ম্যাচ ফি (টেস্ট পিছু ১৫ লক্ষ টাকা, একদিনের ম্যাচ পিছু ৬ লক্ষ টাকা, কুড়ি বিশের ম্যাচ পিছু ৩ লক্ষ টাকা) পাবেন। গোদি মিডিয়া ঢাকঢোল পিটিয়ে একে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলেছিল। কিন্তু এর চেয়ে ন্যক্কারজনক অর্ধসত্য কমই হয়। কারণ কোহলি, রোহিত শর্মা, শুভমান গিলরা এক বছরে যত ম্যাচ খেলেন হরমনপ্রীত, জেমিমারা তার অর্ধেকেরও কম খেলেন। ২০২২ সালের উদাহরণই নেওয়া যাক। ভারতের ছেলেদের দল খেলেছিল ১১ খানা টেস্ট ম্যাচ, ২৯ খানা একদিনের ম্যাচ আর ২২ খানা কুড়ি বিশের ম্যাচ। ভারতের মেয়েরা খেলেছিলেন মাত্র দুটো টেস্ট, ২১ খানা একদিনের ম্যাচ আর ১৭ খানা কুড়ি বিশের ম্যাচ। ২০২১ সালে করোনা অতিমারীর জন্যে স্থগিত মেয়েদের একদিনের ম্যাচের বিশ্বকাপ ২০২২ সালে হয়েছিল। নইলে একদিনের ম্যাচের সংখ্যাটা আরও কম হত। মেয়েদের ক্রিকেট এভাবে চলে বলেই ২০২৩ সালে টেস্ট অভিষেক হওয়া জেমিমা এ পর্যন্ত খেলেছেন মাত্র তিনটে টেস্ট, অথচ একই বছরে টেস্ট খেলা শুরু করে যশস্বী জয়সোয়াল খেলে ফেলেছেন ২৬ খানা ম্যাচ। সমান কাজ না দিলে সমান পারিশ্রমিক দেওয়ার ঘোষণা যে বিশুদ্ধ গঞ্জিকা, তা বলাই বাহুল্য।

পৃথিবীর যে কোনো খেলায় সাফল্য অনেককিছু বদলে দেয়। এই বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা বা খেতাব জিতে নেওয়া মেয়েদের ক্রিকেট সম্পর্কে বোর্ডের ভাবনাচিন্তা বদলাবে কিনা সেটা সময় বলবে। লোকের আগ্রহ নেই কথাটা কিন্তু মিথ্যে। যে হাজার হাজার দর্শক মাঠে এসেছেন তাঁরা সকলে যে মহিলা নন তা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না। উপরন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের তথ্য বলছে, এই বিশ্বকাপের প্রথম ১১ ম্যাচেই লিনিয়ার ও ডিজিটাল রিচের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে গেছে। বাহাত্তর মিলিয়ন দর্শকের কাছে পৌঁছেছে এই ম্যাচগুলো। গত বিশ্বকাপের চেয়ে এটা ১৬৬% বেশি। বিশেষত ৫ অক্টোবরের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মেয়েদের ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দর্শকের দেখা ম্যাচ হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন ঝুলন সেরা বাঙালি ক্রিকেটার? মোটেই না

শেষে যে কথাটা বলব, সেটা সম্ভবত অনেক নারীবাদীরও ভালো লাগবে না। যে জেমিমার হাউ হাউ করে কান্না নিয়ে সকলে মিলে কাব্যি করা চলছে এখন, গতবছর অক্টোবরে কুৎসিতভাবে তাঁরই পিছনে লেগেছিল এদেশের সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে অনেকেই। মুম্বইয়ের খার জিমখানার প্রথম মহিলা সদস্য জেমিমাকে সেই ক্লাব ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল, তাঁর বাবার বিরুদ্ধে ক্লাব চত্বরে ধর্মান্তরের আসর বসানোর অভিযোগ তুলে। ধর্মপ্রাণ ইভান রডরিগসকে বিবৃতি দিয়ে জানাতে হয়েছিল – তিনি প্রার্থনা সভার আয়োজন করেছিলেন, তাও ক্লাব কর্তৃপক্ষের আপত্তিতে বন্ধ করে দেন। সেইসময় জেমিমাকে মাঠের মধ্যে এনে ধর্ষণ করা উচিত – এমন কথাও পোস্ট করা হচ্ছিল সোশাল মিডিয়ায়। নারীবাদীরা কেউ তখন টুঁ শব্দ করেছিলেন বলে জানি না। এখন করছেন, কারণ জেমিমাকে চেনা গেছে। বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে, মহিলাদের ক্রিকেটের খবর নারীবাদীরাও বিশেষ রাখেন না। সেটা যে খুব দোষের তা নয়। খেলার জগতে জয় না এলে মানুষের আগ্রহ তৈরি হয় না। ঠিক যে কারণে ভারতের ছেলেদের জাতীয় ফুটবল দলের থেকে ক্রিকেট দলের খবর বেশি রাখি আমরা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। যে কারণে সায়না নেহওয়াল, পি ভি সিন্ধুর সাফল্যের পর আমাদের সকলের ব্যাডমিন্টনে আগ্রহ বেড়েছে। নীরজ চোপড়ার কারণেই তো আমরা জ্যাভেলিনের খবর রাখতে শুরু করেছি।

বলার কথা এটুকুই যে খেলার মাঠে কেঁদে ফেলা অভিনব কোনো ব্যাপার নয়, পুরুষরাও কাঁদেন। ভারতীয় পুরুষরাও। স্মৃতিশক্তি নিতান্ত দুর্বল না হলে সকলেরই মনে থাকার কথা। ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের ফুটেজ দেখুন, শচীনের অবসর নেওয়ার দিনের ফুটেজ দেখুন। দিয়েগো মারাদোনার সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে পড়ে তাঁর কান্নার ছবি। সামনের বছর ফুটবল বিশ্বকাপে আবার তেমন দৃশ্য দেখতে পাবেন। কিন্তু জেমিমার কান্না মাঠে থামেনি। তিনি ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে গিয়েও ফোঁপাচ্ছিলেন। বলেছেন তিনি প্রবল উদ্বেগের শিকার (‘anxiety’) হয়েছেন গোটা বিশ্বকাপ জুড়ে। কেন এই উদ্বেগ, তাঁর কান্না কেবলই আনন্দাশ্রু কিনা, তা তলিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। মাত্র কয়েক ঘন্টার প্রশংসার পরেই সোশাল মিডিয়ায় জেমিমার কৈশোরের ভিডিও খুঁড়ে আনা শুরু হয়ে গেছে, যেখানে তিনি খ্রিস্টানদের সভায় কিছু ধর্মীয় কথাবার্তা বলছেন। সেটা নাকি ভীষণ অপরাধ। দাঁত নখ বেরিয়ে এসেছে হিন্দুত্ববাদীদের, কারণ জেমিমা ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলতে পারার জন্যে বাইবেলকে, যিশুকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা। ফাইনালে জেমিমা শূন্য রানে আউট হতে পারেন, লোপ্পা ক্যাচ ফেলে দিতে পারেন। তাঁর জন্যে আমাদের গদগদ আবেগ যেন সেদিনও অক্ষত থাকে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

রাষ্ট্রীয় ক্রিকেট-সেবক সংঘ

দেশের আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মত জাতীয় ক্রিকেট দলগুলোও এখন বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা, যার সদর দফতর আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেট স্টেডিয়াম।

সূর্যকুমার যাদবের প্রতিযোগী বেড়ে গেল সম্ভবত। ভবিষ্যতে বিজেপির টিকিটে সাংসদ বা বিধায়ক হওয়ার দৌড়ে ঢুকে পড়লেন হরমনপ্রীত কৌরও। ভারত আর শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে মেয়েদের ৫০ ওভারের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ হচ্ছে এবারে। যদি প্রবল পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়া আর শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বাধা টপকে হরমনপ্রীতরা বিশ্বকাপটা জিতে ফেলতে পারেন, তাহলে বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাঁদের দলকে নিয়ে নির্ঘাত দেশজুড়ে বিপুল প্রচার করা হবে। পোস্টারে অপারেশন সিঁদুরের সময়ে যাঁদের সামনে আনা হয়েছিল, সেই কর্নেল সোফিয়া কুরেশি আর উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিংয়ের পাশেও বসিয়ে দেওয়া হতে পারে অধিনায়িকাকে। পাকিস্তানকে হারানো আর পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে করমর্দন না করা – দুটো কাজই করে ফেলেছেন হরমনপ্রীত, স্মৃতি মান্ধনা, দীপ্তি শর্মা, জেমিমা রডরিগসরা। এবার যেনতেনপ্রকারেণ বিহার বিধানসভা করায়ত্ত করার লড়াইয়ে নরেন্দ্র মোদীর দলকে সঙ্গ দিলেই নানাবিধ উপঢৌকন বাঁধা। পহলগামে যে পর্যটকরা খুন হয়েছিলেন তাঁদের হত্যাকারীদের শাস্তি প্রদান (যা ২০০৮ সালের মুম্বাই সন্ত্রাসবাদী হানার বেলায় আজমল কাসভ ও তার সঙ্গীদের ক্ষেত্রে হয়েছিল) দূর অস্ত, অপারেশন সিঁদুরে দেশ ঠিক কতটা লাভবান হয়েছে সেটাই এখনো ঠিক করে বলে উঠতে পারল না মোদী সরকার। চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ সেইসময় বলে ফেলেছিলেন আমাদের ক্ষতি হয়েছে, আবার এখন সেনাবাহিনির প্রধান বলছেন ওসব নাকি ছেলে-ভোলানো গল্প। মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারবার বলেন অপারেশন সিঁদুর থেমেছিল তাঁর কথায়, ভারত সরকার প্রতিবাদ করে না। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তো স্পিকটি নট, অন্য মন্ত্রীরা এবং তাঁর দলের মেজ সেজ রাঙা নেতারা বাহারি শব্দে ঢেকেঢুকে বলেন – যখন যুদ্ধ থামে তখন নাকি ভারতই জিতছিল। তাহলে যুদ্ধ থামল কেন, কে থামাল – এসবের আজও উত্তর নেই। ফলে মোদীজির লৌহপুরুষ ভাবমূর্তি ধাক্কা খাচ্ছে স্পষ্টতই। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত রাহুল গান্ধী ভোট চুরির অভিযোগ তুলে, রীতিমত কাগজপত্তর দেখিয়ে পরিস্থিতি ঘোরালো করে তুলেছেন। কিন্তু ভোটে যে জিততেই হবে শতবর্ষে পা দেওয়া রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের রোজগেরে সন্তান বিজেপিকে। অতএব ক্রিকেটের ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে ফেলো যাবতীয় সরকারি অকর্মণ্যতা।

আজকের ভারতের জনতার আফিম হল ক্রিকেট, তাই ওই খেলার দলকেই হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা দরকার। সুতরাং পুরুষদের এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে টিভি থেকে আয় হওয়া কোটি কোটি টাকা নিশ্চিত করাও চাই; আবার ম্যাচের শেষে করমর্দন না করে, অধিনায়ককে দিয়ে গরম গরম কথা বলিয়ে ভোটের প্রচার করাও চাই। তাতেও চিত্রনাট্য যথেষ্ট নাটকীয় হল না মনে করে ট্রফি হাতে তুলে দেবেন কে, তা নিয়েও গা জোয়ারি করা হল। কেবল বিহার নির্বাচনে জেতার জন্যে এতসব কাণ্ড করে এখন ফাটা বাঁশের মধ্যে পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) কর্মকর্তা তথা পাক মন্ত্রী বলছেন, তোমাদের ট্রফি দেওয়ার জন্যে তো মঞ্চ সাজিয়ে বসাই হয়েছিল। নাওনি কেন? অফিসে রাখা আছে, এসে নিয়ে যাও।

এদিকে এখন সে কাজ করলে ধরা পড়ে যায় যে অকারণে ধুলো ওড়ানো হয়েছিল। সত্যিই তো! এসিসি সভাপতি হিসাবে বিজয়ী দলের হাতে ট্রফিটা যে মহসীন নকভিই তুলে দেবেন তা তো প্রতিযোগিতার আগে থেকেই ঠিক ছিল। ভারতীয় দল জানত না? ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত রাম শ্যাম যদু মধু সকলেই, এমনকি বোর্ডের গোদি মিডিয়ার সাংবাদিকরাও, সগর্বে বলে থাকেন যে কেবল এশিয়া নয়, গোটা বিশ্বের ক্রিকেটকে নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই)। তাদের এটুকু ক্ষমতা নেই যে কোনো পাকিস্তানির এসিসি সভাপতি হওয়া আটকায়? আগে থাকতে সে কাজটা করলেই তো আর অপছন্দের লোকের হাত থেকে ট্রফি নেওয়ার ব্যাপার থাকত না। নাকি তখন বোঝা যায়নি যে অপারেশন সিঁদুর সম্বন্ধে যাবতীয় প্রচার মুখ থুবড়ে পড়বে এবং ক্রিকেট দলকে কাজে লাগাতে হবে ভোটারদের পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা চাগিয়ে তুলে ভোটে জিততে? ব্যাপারটা কি এরকম, যে বিশ্ব ক্রিকেটের ভাগ্যনিয়ন্তা জয় শাহের বাবা অমিত শাহ আর নরেনজেঠু ভেবেছিলেন লোকে পুলওয়ামার মত পহলগামও ভুলে যাবে শিগগির, তারপর আবিষ্কার করলেন – নিজেদের একনিষ্ঠ ভক্তরাও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলা বয়কট করা হচ্ছে না বলে খচে বোম? এমতাবস্থায় নিজেদের খাসতালুক হিন্দি বলয়ের অন্যতম বৃহৎ রাজ্য বিহারে ভোট। বল মা তারা দাঁড়াই কোথা!

পাকিস্তানের দিকে কথায় কথায় আঙুল তুলে এতদিন পরম সন্তোষে দেশের মানুষকে নিজেদের কুকীর্তি ভুলিয়ে রেখেছেন। সেটাই যে কাল হয়ে দাঁড়াবে তা মোদী-শাহ কী করেই বা জানবেন? ফ্যাসিবাদীরা কবে আর নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়? অবস্থা সামলাতে ১৪ সেপ্টেম্বর সূর্যকুমারের দলকে দিয়ে ম্যাচের পর করমর্দন না করার নাটক করানো হল পৃথিবীর সমস্ত খেলার সমস্ত আদবকায়দা শিকেয় তুলে দিয়ে। ক্রিকেট দলের কাছ থেকে যদি এটুকু সেবা না পাওয়া যায়, তাহলে আর ক্ষমতায় আসার পর থেকে ক্রমশ ক্রিকেট বোর্ডের দখল নেওয়া, প্রাক্তন ও বর্তমান ক্রিকেটারদের রামমন্দিরের উদ্বোধনে নেমন্তন্ন করা, কৃষক আন্দোলনের বিরুদ্ধে বা মোদীজির জন্মদিন উপলক্ষে তাঁদের দিয়ে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করানো, নিজেদের দলের প্রাক্তন সাংসদ গৌতম গম্ভীরকে দলের কোচ বানানো – এসব করা কেন? এত কাজ থোড়াই ক্রিকেটের স্বার্থে করা হয়েছে। তবে ব্যাপারটা সেখানেও থামেনি। সাংবাদিক সম্মেলনে এসে ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার লম্বা চওড়া বক্তৃতা দিলেন। পহলগামে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছেন, অপারেশন সিঁদুরে যুক্ত সেনাবাহিনির জওয়ানদের উদ্দেশে জয় উৎসর্গ করছেন, নিজের পারিশ্রমিক পর্যন্ত কৃতজ্ঞতা হিসাবে তাঁদের দিয়ে দেবেন ইত্যাদি।

চট করে শুনতে চমৎকার লাগে। খেলার ময়দানে কতখানি রাজনীতি ঢুকতে পারে বা ঢোকা উচিত তা নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে যদি ধরেও নিই সূর্য যা বলেছেন বেশ করেছেন (আইসিসির ম্যাচ রেফারি রিচি রিচার্ডসন অবশ্য তা ভাবেননি, বরং আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ৩০% ম্যাচ ফি জরিমানা করেছেন), তাহলেও কথাগুলো নিয়ে তলিয়ে ভাবতে গেলে ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া কিছু মনে হবে না। পহলগামে মৃত মানুষজনের পরিবারের পাশে থাকতে গেলে তো সরকারকে প্রশ্ন করতে হবে – পহলগামের আততায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? সূর্যকুমারের ঘাড়ে কটা মাথা যে সে প্রশ্ন করবেন? গত ২৯ জুলাই সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন বটে, চারজন সন্ত্রাসবাদীর তিনজন সেনাবাহিনির সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে। কিন্তু চতুর্থ জনকে কি মহামতি ভারত সরকার ক্ষমা করে দিয়েছেন? তাকে নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই কেন? যে তিনজন মরেছে তারা আবার পকেটে পাকিস্তানি পরিচয়পত্র এবং পাকিস্তানি চকলেট নিয়ে ঘুরছিল। এমন সুবোধ বালক সন্ত্রাসবাদীদের কেন জীবন্ত অবস্থায় হিড়হিড় করে টানতে টানতে আদালতে, নিদেন জনসমক্ষে, নিয়ে আসা গেল না – সে প্রশ্নও সূর্যকুমার করে উঠতে পারবেন না। সেপ্টেম্বর মাসের ক্রিকেট ম্যাচে মে মাসের অপারেশনে অংশ নেওয়া সেনাবাহিনিকে টেনে আনার যে কী মানে তাও বোঝা শক্ত। পুরোদস্তুর যুদ্ধ হয়নি, সাময়িক সংঘর্ষ কয়েকদিনের মধ্যে থেমেও গিয়েছিল। তার জন্যে এতদিন পরে সেনাবাহিনিকে সম্মান জানানো! ১৯৯৯ সালে যখন বিশ্বকাপে ম্যানচেস্টারে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হয়, তখন কিন্তু কার্গিলে যুদ্ধ চলছিল। ভারতে তখনো বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার, প্রধানমন্ত্রীর নাম অটলবিহারী বাজপেয়ী। সে ম্যাচ নিয়েও দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছিল, খেলার মধ্যেও উত্তেজনার অভাব হয়নি। তবে ম্যাচের পর আলাদা করে নাটক করার দরকার হয়নি। ভারত কিন্তু সে ম্যাচও জিতেছিল। অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিন গুরুত্বপূর্ণ ৫৯ রান করেন, ভেঙ্কটেশ প্রসাদ পাঁচ উইকেট নেন।

আসলে তখন সরকার দেশ চালাত, ক্রিকেট চালাত ক্রিকেট বোর্ড। এখন দুটোই চালায় বিজেপি। ফলে বিজেপির নীতিই ক্রিকেট দলের নীতি। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে যুদ্ধের চেহারা দেওয়ার নীতি তারা এই এশিয়া কাপে প্রথম নিল তা নয়। ২০২৩ সালে ভারতে আয়োজিত পুরুষদের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপেই এই পরিকল্পনা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। যাঁরা চোখ বন্ধ করেছিলেন, তাঁরা দেখতে পাননি। সেই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হল না, দুই ইনিংসের মাঝে মোচ্ছব হল আমেদাবাদে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে। যেন বিশ্বকাপটা গৌণ, আসল হল ভারত-পাক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। বহুদিন ধরে ক্রিকেট মাঠকে বিদ্বেষ ছড়ানোর কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল সেই বিরাট কোহলির আমলে। ২০১৯ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর দল একদিনের ম্যাচ খেলতে নামেন টিম ক্যাপের বদলে সেনাবাহিনির ক্যামোফ্লাজ ক্যাপ পরে। কেন? না পুলওয়ামার শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো দরকার ছিল। সে এমন শ্রদ্ধা, যে ক্যাপ থেকে নাইকির লোগোটা বাদ দেওয়া হয়নি। সন্ত্রাসবাদী হানায় নিহত মানুষের স্মৃতি নিয়ে এমন নির্লজ্জ বেওসার দৃষ্টান্ত মেলা ভার। কিন্তু ততদিনে আমরা এমন অনুভূতিশূন্য নির্বোধের দেশে পরিণত হয়েছি, যে কারোর আচরণটা অন্যায় মনে হয়নি। জাতীয় দলের সামরিকীকরণ তখনই হয়ে গিয়েছিল। ম্যাচটা পাকিস্তানের সঙ্গে ছিল না বলেই করমর্দন না করার নাটকটা সেদিন করা হয়নি। তবে তখনো কিন্তু অনতিদূরে ছিল লোকসভা নির্বাচন। আজ অন্তত কারোর বুঝতে না পারার কথা নয়, যে সেদিন ভারতীয় দল আসলে বিজেপির নির্বাচনী প্রচার সারছিল। এবারেও তাই করছে।

কাজটা শুরু করা হল সূর্যকুমারদের দিয়ে, এখন হরমনপ্রীতদেরও নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্রিকেট খেলায় ভারতের টাকার গরম এতটাই যে এসব করে যাওয়া যাচ্ছে। অন্য কোনো খেলায় কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই ধাষ্টামো চলতে দেওয়া হয় না। ২১ সেপ্টেম্বর, যেদিন সূর্যকুমাররা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার খেললেন এশিয়া কাপে, কাঠমান্ডুতে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলে ভারত বনাম পাকিস্তানের খেলা ছিল। সেই ম্যাচ ভারত ৩-০ জেতে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দন করেই মাঠ ছাড়ে। কারণ ফিফার সঙ্গে আইসিসির তফাত আকাশের সূর্য আর বিজেপি সাংসদ তেজস্বী সূর্যের মত। ফুটবলে খেলার মাঠের নিয়ম না মানলে সরাসরি সাসপেন্ড করে দেওয়া হতে পারে। যথার্থ দেশপ্রেম থাকলে সেই ঝুঁকি নেওয়া উচিত। বিজেপি নেতা কল্যাণ চৌবের নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন যে সে ঝুঁকি নেয়নি, তাতেই প্রমাণ হয় যে দেশপ্রেম-টেম বাজে কথা। আসলে এরা শক্তের ভক্ত, নরমের যম। উপরন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে গোটা নাটকটাই নির্বাচনমুখী। বিহার কেন, ভারতের কোনো রাজ্যের ভোটারেরই অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবল নিয়ে মাথাব্যথা নেই। অতএব ওখানে দেশপ্রেম দেখানোর আয়োজন নেই। নিজেরাই অশান্তি শুরু করে খেলার পরিবেশ নষ্ট করে দেওয়ার পর পাক ক্রিকেটাররা অসভ্যতা করলে হাত-পা ছুড়ে কান্নাকাটি করার ব্যাপার নেই। কার হাত থেকে পুরস্কার নেব সেটা ঠিক করতে চাওয়ার অন্যায় আবদারও নেই। খেতাব জিতলে প্রধানমন্ত্রী সোশাল মিডিয়ায় জ্বালাময়ী পোস্টও করবেন না, অধিনায়কও বলবেন না – সিঁদুর-স্পন্দিত ব্যাটে, মনে হয় আমিই পিএম।

আরও পড়ুন অপমানে হতে হবে মহম্মদ শামির সমান

রাজনৈতিক কারণে বহু খেলাতেই এক দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশ খেলতে চায় না। যেমন এই মুহূর্তে পৃথিবীর বহু দেশ দাবি করছে, আগামী বছরের ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে যেন ইজরায়েলকে বাদ দেওয়া হয় গাজায় গণহত্যা চালানোর অপরাধে। ফিফা সভাপতি অবশ্য বলে দিয়েছেন, তাঁরা এ দাবি মানবেন না। না মানলে এবং ইজরায়েল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলে, কোনো দেশ তাদের বিরুদ্ধে না খেলার সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। তাতে তাদের পয়েন্ট কাটা যাবে। নীতিগত অবস্থান নিতে হলে এই ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ক্রিকেটেই এমন দৃষ্টান্ত আছে। ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড জিম্বাবোয়েতে খেলতে যায়নি রবার্ট মুগাবের বর্ণবিদ্বেষী শাসনের প্রতিবাদে, নিউজিল্যান্ড কেনিয়ায় খেলতে যায়নি নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে আবার অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় খেলতে যায়নি সন্ত্রাসবাদী হানার আশঙ্কায়। সব ক্ষেত্রেই যে দেশ খেলতে যায়নি, তাদের পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী দেশ মনে করলে বা তাদের ক্রিকেটারদের সন্ত্রাসবাদী মনে করলে ভারতের সম্পূর্ণ অধিকার আছে তাদের সঙ্গে না খেলার। কিন্তু ভারত সরকারের সমার্থক আজকের ক্রিকেট বোর্ডের এই ‘গাছেরও খাব, তলারও কুড়োব’ মানসিকতা আর যা-ই হোক জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা হলে যে বিপুল পরিমাণ টাকা আয় হয় বিজ্ঞাপন বাবদ – তার লোভ বিসিসিআই ছাড়তে রাজি নয়। তাই ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলেন কেন’ জিজ্ঞেস করলেই বোর্ড কর্তা তথা বিজেপি নেতারা আমতা আমতা করতে থাকেন। ওদিকে নিজেদের উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখাতে, ভোটারদের ‘বিকাশ’ ভুলিয়ে পাকিস্তান আর মুসলমানে ব্যস্ত রাখতে খেলাটাও আর খেলার নিয়মে হতে দিচ্ছেন না।

দেশের আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মত জাতীয় ক্রিকেট দলগুলোও এখন বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা, যার সদর দফতর আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেট স্টেডিয়াম। নইলে প্রত্যেকবার মাঠে মাছি তাড়ানোর লোক কম পড়লেও বারবার ওখানেই টেস্ট ম্যাচ হয়, আর ২০০১ সালের পর থেকে ইডেন উদ্যানে ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট দেওয়া যায় না কেন?

সুনীল গাভস্কর, শচীন তেন্ডুলকরের মত মহীরুহ আগেই সংঘের কাছে নাকখত দিয়েছেন। সেখানে সূর্যকুমারের আর কী-ই বা ইয়ে বলুন? যে দেশে মনসুর আলি খান পতৌদির মত নেতার ইতিহাস মুছে ফেলা হয় আর বর্তমান ও প্রাক্তন ক্রিকেটাররা ইনিয়ে বিনিয়ে সেই সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ান, সে দেশের ক্রিকেট দলের সূর্যকুমারের মত মোসাহেব নেতাই প্রাপ্য।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ব্যথার পূজারা হয়নি সমাপন

বিজ্ঞাপনদাতা নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবস্থাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, প্রাক্তন ক্রিকেটার, ক্রিকেট সাংবাদিক, বিশ্লেষক, ধারাভাষ্যকার – সকলকে চালায়। নিজের অজান্তে চালিত হন দর্শকরাও। ফলে পূজারা যখন খেলতেন, তখন অসম্ভব নায়কোচিত কিছু না করলে ক্রিকেটপ্রেমীরাও বিরক্তই হতেন তাঁর উপর।

আমার মায়ের দিদিমা ছিলেন ধর্মপ্রাণ হিন্দু বিধবা, নিয়মকানুন সবই পালন করতেন। কিন্তু কেউ মারা গেলে ঘটা করে শ্রাদ্ধশান্তি করা নাকি পছন্দ করতেন না। আমাদের পরিচিত মহলে প্রায়ই দেখা যেত, কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা নিজের ছেলেমেয়ের কাছে চূড়ান্ত অবহেলার শিকার হলেন। কিন্তু তিনি মারা যেতেই তারা দুশো লোক খাইয়ে শ্রাদ্ধ করছে, দানধ্যান করছে, খাবারের তালিকায় রাখা হয়েছে মৃত মানুষটার প্রিয় খাবারদাবার। তখনই আমার মা স্মরণ করতেন ‘দিদিমা বলত, থাকতে দিলে না ভাতকাপড়, মরলে পরে দানসাগর।’ গত রবিবার (২৪ অগাস্ট) চেতেশ্বর পূজারা অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর থেকে প্রাক্তন ক্রিকেটার, পূজারার সহখেলোয়াড়, সাংবাদিক, ধারাভাষ্যকার এবং ক্রিকেটভক্তদের প্রতিক্রিয়া দেখে ঠিক ওই কথাটাই মনে পড়ছে।

এ প্রসঙ্গে ঠিক দশ বছর আগে, ২০১৫ সালের ২৮ অগাস্ট, কলম্বোয় শুরু হওয়া ভারত বনাম শ্রীলঙ্কা সিরিজের তৃতীয় টেস্টের কথা স্মরণ করা দরকার। সেই সিরিজের প্রথম দুটো টেস্টে পূজারাকে খেলানো হয়নি, কারণ প্রবল প্রতিভাবান রোহিত শর্মাকে টেস্ট দলে যেনতেনপ্রকারেণ থিতু করার চেষ্টা চলছিল। জীবনের প্রথম দুটো টেস্টে পরপর শতরান করার পর থেকে পাঁচ-ছয় নম্বরে ব্যাট করে তিনি আর সুবিধা করতে পারছিলেন না। শ্রীলঙ্কার মাটি ভারতীয় ব্যাটারদের পক্ষে কোনোদিনই দুর্জয় ঘাঁটি নয়, আর ততদিনে শ্রীলঙ্কার বোলিংও অনেকটা নিরামিষ। তাই রান করার দেদার সুযোগ পাওয়া যাবে ভেবে তিন নম্বরে খেলানো হয়েছিল রোহিতকে। গলে প্রথম টেস্টে তিনি করেন যথাক্রমে ৯ ও ৪; ভারত হারে। দ্বিতীয় টেস্টে রোহিতকে আগলাতে ফেরত পাঠানো হয় পাঁচ নম্বরে, তিনে আসেন অজিঙ্ক রাহানে। রোহিত করেন ৭৯ ও ৩৪। অজিঙ্ক প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হলেও, দ্বিতীয় ইনিংসে শতরান করেন। তার উপর ভারত জিতে যায়। ফলে তৃতীয় টেস্টেও পূজারার খেলার সম্ভাবনা ছিল না, যদিও তার আগের অস্ট্রেলিয়া সফরে অ্যাডিলেডে ৭৩ ও ২১ (রোহিত ৪৩ ও ৬) আর ব্রিসবেনে ১৮ ও ৪৩ (রোহিত ৩২ ও ০) করে এসেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্ট চলাকালীনই প্রারম্ভিক ব্যাটার মুরলী বিজয়ের হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট মাথাচাড়া দিল। আরেক প্রারম্ভিক ব্যাটার শিখর ধাওয়ানেরও চোট ছিল। তাহলে কে এল রাহুলের সঙ্গে ইনিংস শুরু করবেন কে? যুক্তি বলে – রোহিত, কারণ তাঁরই তো দলে জায়গা পাকা করা দরকার। তাছাড়া তিনি এই সিরিজেই আগে তিন নম্বরে ব্যাটও করেছিলেন। ক্রিকেট মহলের চিরকালীন যুক্তি হল – যে তিন নম্বরে ব্যাট করতে পারে, সে প্রয়োজনে ইনিংস শুরু করবে। এই যুক্তিতে রাহুল দ্রাবিড় পর্যন্ত একাধিকবার ইনিংস শুরু করেছেন। কিন্তু ওসব যুক্তি রোহিতের মত প্রতিভাবানদের জন্য নয়। তিনি সেই পাঁচ নম্বরেই খেললেন, পূজারাকে বলা হল – ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে। ওপেন করতে হবে। পূজারা এলেন, দেখলেন এবং নিজস্ব ভঙ্গিমায় জয় করলেন। সাড়ে সাত ঘন্টার বেশি ব্যাট করে অপরাজিত ১৪৫। ভারত করেছিল মোটে ৩১২, বাকি ব্যাটাররা সবাই ব্যর্থ, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোর লেগস্পিনার অমিত মিশ্রের ৫৯। দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য রানে আউট হলেও, পূজারার ওই শতরানের জন্যই ভারত প্রথম ইনিংসে শতাধিক রানে এগিয়ে যায় এবং ম্যাচ ও সিরিজ জেতে।

এরপর কী হওয়ার কথা? ভূয়সী প্রশংসা এবং দলে জায়গা পাকা হয়ে যাওয়া। কিন্তু পূজারার বেলায় তা হয়নি। বাকিদের কথা ছেড়ে দিন, স্বয়ং সুনীল গাভস্কর ধারাভাষ্য দিতে দিতে কী বলেছিলেন মনে করিয়ে দিই। পূজারা যখন অর্ধশতরান করেন ওই ইনিংসে, তখন সঞ্জয় মঞ্জরেকর গাভস্করকে জিজ্ঞেস করেন যে, পূজারা কি এবার দলে পাকা হলেন? উত্তরে গাভস্কর বলেন, ওই দলে টিকতে থাকতে গেলে নাকি শ দেড়েক রান করতে হবে। গোটা দেশের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র পূজারাকে এভাবেই দেখে এসেছে বরাবর। সেই কারণেই আজ তাদের পূজারার বিদায়ে চোখের জল ফেলা দেখে ‘ন্যাকা’ বলতে ইচ্ছে করছে। পূজারার ওই ইনিংসের কয়েক দিনের মধ্যেই মুকুল কেশবন কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজে একখানা উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন। তাতে গাভস্করকে ওই মন্তব্যের জন্য তীব্র আক্রমণ করেন। মুকুল প্রশ্ন তোলেন ‘What team of titans was this? And what bastion of Bradmans was Pujara trying to breach?’ গোদা বাংলায় – কী এমন ভগবানদের দল এই ভারতীয় দলটা? কোন ব্র্যাডম্যানদের দুর্গে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন পূজারা? মুকুলের এই তীক্ষ্ণতা অত্যন্ত যৌক্তিক, কারণ ওই ইনিংস খেলতে খেলতে পূজারার গড় ৫০ পেরিয়ে যায়। সেইসময় রোহিত আর রাহানে তো বটেই, বিরাট কোহলির গড়ও পঞ্চাশের নিচে ছিল।

ভারতীয় ক্রিকেটের সমস্যা হল, ওই কথাগুলো কোনো ক্রীড়া সাংবাদিক লেখেননি। মুকুলের মত কলাম লেখক, যাঁরা আরও নানা বিষয়ে লেখেন, এইসব গোলমাল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে তাঁদেরই কলম ধরতে হয়। ক্রীড়া সাংবাদিকরা কখনো যে সংবাদমাধ্যমে চাকরি করেন তার স্বার্থে, কখনো বা নিজের কায়েমি স্বার্থে, যা সত্য তা বলেন না। জনপ্রিয় ক্রিকেটারদের সমালোচনা করেন না। যেসব ক্রিকেটার পরিশ্রমী কিন্তু গ্ল্যামারবিহীন কারণ সাদা বলের ক্রিকেটে সাফল্য নেই, পকেটে মোটা টাকার আইপিএল চুক্তি নেই, তাঁদের কয়েকটা ব্যর্থতাতেই ‘একে দিয়ে হবে না’ জাতীয় কথাবার্তা চালু করে দেন। পঞ্চাশ করলে বলেন একশো করতে হবে, একশো করলে বলেন দেড়শো করতে হবে, দেড়শো করলে বলেন ধারাবাহিক হতে হবে। যেন বাকিরা ভীষণ ধারাবাহিক। এই যে বিদায়ী প্রজন্মকে এখন ঘটা করে সোনার প্রজন্ম বলা হচ্ছে, তাদের একেকজনের ব্যাটিং গড় দেখুন – বিরাট (৪৬.৮৫), পূজারা (৪৩.৬০), রোহিত (৪০.৫৭), রাহানে (৩৮.৪৬)। সেরা ব্যাটারটির গড় প্রায় ৪৭। পঞ্চাশের উপরে দূরের কথা, ধারেকাছেও কেউ নেই। এই যদি সোনার প্রজন্ম হয়, তাহলে বলতে হবে সোনাও যা পেতলও তাই।

আসলে গত শতকের শেষ থেকেই যত দিন যাচ্ছে, ভারতে ক্রিকেট ব্যবসা হিসাবে তত ফুলে ফেঁপে উঠছে। ব্যবসা যত বড় হচ্ছে, তত খেলার যে অনিশ্চয়তা, খেলোয়াড়দের সাফল্য-ব্যর্থতার যে স্বাভাবিক উত্থান পতন – তা মেনে নেওয়া লগ্নিকারীদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে দিনকে রাত, রাতকে দিন করতেই হবে। যে খেলোয়াড়কে দেখতে শুনতে ভাল, কুড়ি বিশের ক্রিকেটে বা একদিনের ক্রিকেটে (ক্রমশ এটার প্রভাবও কমে যাচ্ছে) সাফল্য আছে – তার তেলা মাথাতেই তেল দিতে হবে। সোজা কথায়, যে খেলোয়াড়কে ব্র্যান্ডে পরিণত করে তার হাত দিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি পণ্যের বিজ্ঞাপন করানো যায়, তার সাফল্যই সাফল্য এবং সে সামান্য সফল হলেও সেটাকে বেলুনের মত ফুলিয়ে বিরাট করে দেখাতে হবে। কেবল টেস্ট খেলা শান্তশিষ্ট ক্রিকেটার ব্র্যান্ড হিসাবে বিকোবে না। অতএব সে খেলার জোরে ব্র্যান্ডের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারে দেখলেই সাবধান হও। তার সাফল্যকে কমিয়ে দেখাও, ব্যর্থতাকে বাড়িয়ে দেখাও।

বিজ্ঞাপনদাতা নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবস্থাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, প্রাক্তন ক্রিকেটার, ক্রিকেট সাংবাদিক, বিশ্লেষক, ধারাভাষ্যকার – সকলকে চালায়। নিজের অজান্তে চালিত হন দর্শকরাও। ফলে পূজারা যখন খেলতেন, তখন অসম্ভব নায়কোচিত কিছু না করলে ক্রিকেটপ্রেমীরাও বিরক্তই হতেন তাঁর উপর। এখন সোশাল মিডিয়ায় যতজন পূজারাকে পুরনো যৌথ পরিবারের অল্প আয়ের বড়দার মত দেখছেন বা ‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বোঝা যায় না’ কথাটা দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছেন, তাঁরাও অনেকে পূজারা দুটো ম্যাচে ব্যর্থ হলেই বলেছেন – এটাকে বাদ দেয় না কেন?

কারণ গোটা বাস্তুতন্ত্র আমাদের মাথায় ঢুকিয়েছে, বাদ দিতে হলে আগে পূজারাকেই বাদ দেওয়া উচিত, যেহেতু তাঁর ‘ইনটেন্ট’ নেই। কথাটা ভারতীয় ক্রিকেটে চালু করেছিলেন সাদা বলের ক্রিকেটে আমাদের দুটো বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি, পরে ওটাকে মুদ্রাদোষে পরিণত করেন বিরাট আর তাঁর দাদাভাই রবি শাস্ত্রী। রান করলে কি করলে না, হারলে না জিতলে – সেসব বড় কথা নয়। বড় কথা হল ‘ইনটেন্ট’ আছে কিনা। একথা যে কতবার অধিনায়ক থাকার সময়ে বিরাট আর কোচ হিসাবে শাস্ত্রী বলেছেন তার ইয়ত্তা নেই। লক্ষ করলে দেখা যাবে, হারলেই ওই শব্দটা বেশি ব্যবহার করতেন তাঁরা। কারণ ওরকম গালভরা কথা বললে হারের কারণ নিয়ে কথা বলা এড়িয়ে যাওয়া যায়, টিম ম্যানেজমেন্টের দোষত্রুটি ঢেকে ফেলা যায়। আর ধারাভাষ্যকার হয়ে যাওয়া প্রাক্তন ক্রিকেটাররা তো বহুকাল হল ‘রাজা যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ’ নীতি নিয়েছেন, যেহেতু ভারতে ক্রিকেট সম্প্রচারের দায়িত্ব পুরোপুরি বিসিসিআইয়ের হাতে এবং তাদের অলিখিত শর্ত হল – ভারতীয় দলের বা কোনো ক্রিকেটারের সমালোচনা করা যাবে না। টিম ম্যানেজমেন্ট যা বলবে তা-ই শিরোধার্য। তাই তাঁরাও দিনরাত ‘ইনটেন্ট’ নিয়ে হাত-পা নেড়ে বাণী দিয়ে গেছেন। তার উপর আছে সোশাল মিডিয়া এবং বিরাট, রোহিতদের মত তারকাদের জনসংযোগ মেশিনারি। ফলে পূজারা আরও কোণঠাসা হয়েছেন। এতকিছু সামলে তিনি যে শতাধিক টেস্ট খেলে গেলেন, কেবল তার জন্যেই একখানা প্রণাম প্রাপ্য।

সোজা কথাটা সোজা করেই বলা দরকার। বিরাট, রোহিত, রাহানে, পূজারাদের ব্যাটিং প্রজন্ম মোটেই সোনার ছিল না, ছিল মাঝারি মানের। তাঁদের সময়ে ভারতের বোলিং অতীতের বহু বোলিং আক্রমণের চেয়ে বৈচিত্র্যময় এবং উন্নত হওয়ায় বেশকিছু স্মরণীয় জয় পেয়েছে দল। আবেগ বাদ দিয়ে দেখলে এটুকুই সত্যি। যে ব্যাটিং লাইন আপে একজনের গড়ও পঞ্চাশের উপরে নয়, সে ব্যাটিং নিজের সময়ের বিশ্বসেরাও নয়। ভারতীয় দলের খেলা বেচার জন্যে ওভাবে ব্র্যান্ডিং করা দরকার ছিল, তাই করা হয়েছে। ভারতীয় ব্যাটিংয়ের সোনার প্রজন্ম ছিল শচীন তেন্ডুলকর (৫৩.৭৮), রাহুল দ্রাবিড় (৫২.৩১), বীরেন্দ্র সেওয়াগ (৪৯.৩৪), ভিভিএস লক্ষ্মণ (৪৫.৯৭), সৌরভ গাঙ্গুলিদের (৪২.১৭) প্রজন্ম। ক্রিকেটের যে কোনো যুগে যে কোনো দলে প্রথম দুজন থাকলেই অধিনায়ক বলবেন – আর যে ইচ্ছে খেলুক, চিন্তা নেই। তার সঙ্গে আবার শুরুতে মারকুটে সেওয়াগ, নিচের দিকে বিপদের দিনে ঠিক খেলে দেওয়া সৌরভ আর লক্ষ্মণ। অথচ পূজারাদের প্রজন্মের দিকে তাকালে দেখা যাবে – সৌরভ, লক্ষ্মণ যেসব সীমাবদ্ধতার কারণে আরও বড় ব্যাটার হতে পারেননি, ঠিক সেগুলোই বিরাট-রোহিত-রাহানে-পূজারাদের ছিল। এঁরা কেউ সব দেশে প্রায় সমান সফল নন। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে চারজনেই মোটের উপর ব্যর্থ, ইংল্যান্ডের রেকর্ডও সুবিধাজনক নয়। পূজারার রেকর্ড তো বেশ খারাপ (মাত্র একটা শতরান, গড় ২৯), বিরাটের রেকর্ড তত খারাপ দেখায় না ২০১৮ সালের সফরের সৌজন্যে। একমাত্র অস্ট্রেলিয়ায় এঁরা খুব সফল, যেমন সফল ছিলেন লক্ষ্মণ।

ফলে এই যে পূজারা অবসর নেওয়ার পরে তাঁকে অতিমানবিক চেহারা দেওয়া হচ্ছে, কাব্যি উপচে পড়ছে – এর কোনো যুক্তি নেই। এটা করা হচ্ছে, কারণ এই মুহূর্তে পূজারাকে নিয়ে গদগদ হয়ে কিছু লিখলেই প্রচুর ক্লিক, হিট, লাইক পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ পূজারা এখন ‘ট্রেন্ডিং’। এই চক্করে টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারীদের তালিকায় পাঁচ নম্বরে থাকা রাহুলের (১৩,২৮৮) সমগোত্রীয় বলা হচ্ছে পূজারাকে (৭,১৯৫)। এতে পূজারার গৌরব বাড়ে না, দৈত্যাকৃতি রাহুলকে বনসাই করার অপচেষ্টা হয়। পূজারা সম্প্রতি ভারত-ইংল্যান্ড সিরিজে ধারাভাষ্য দিলেন। তাতে দেখা গেল শাস্ত্রীসুলভ চড়া গলায় আবেগমথিত কথাবার্তা বলার লোক তিনি নন, বরং অল্প কথায় গভীর বিশ্লেষণই তাঁর শক্তি। সুতরাং মনে হয়, তিনিও জানেন যে রাহুলের সঙ্গে তাঁর একটাই মিল – দুজনেই তিন নম্বরে ব্যাট করেছেন দীর্ঘ সময়। বাকি সব অতিকথন।

এতক্ষণে নব্য পূজারাভক্তরা নির্ঘাত আস্তিন গোটাচ্ছেন, বলছেন ‘পূজারা খতরে মে হ্যায়’। দাঁড়ান, অত চটবেন না। পূজারা একেবারে কিছুই নন – একথা বলছি না। টেস্ট ক্রিকেটে সাত হাজার রান করাও কম কথা নয়। কিন্তু মুশকিল হল, গা জোয়ারি তুলনা এবং অতিকথনে ওই সাত হাজার রানের দাম কমে যায়। পূজারাকে তাঁর সমসাময়িক ভারতীয় ব্যাটারদের সঙ্গে তুলনা করলেই সঠিক গুরুত্ব মালুম হয়।

গত কয়েক দিন ধরে মূলত তাঁর একখানা ইনিংস নিয়েই যাবতীয় ভজন পূজন চলছে। সোশাল মিডিয়া থেকে খবরের কাগজ – সর্বত্র চোখে পড়ছে তাঁর হেলমেট পরিহিত, বাউন্সার এড়াতে ঈষৎ ঝুঁকে পড়া ছবি। সে ছবিতে চিহ্নিত করা – শরীরের কোথায় কোথায় বল লেগেছিল, তবু তিনি আউট হননি। অর্থাৎ সেই ২০২১ সালের ১৫-১৯ জানুয়ারির গাব্বা টেস্টের কথা হচ্ছে। ওই ইনিংস অবশ্যই অবিস্মরণীয়। সোয়া পাঁচ ঘন্টা ব্যাট করে, গায়ে ডজনখানেক আঘাত সহ্য করে অমূল্য ৫৬ রান করেছিলেন চতুর্থ ইনিংসে ৩২৮ রান তাড়া করতে নেমে। কিন্তু ভাগ্যিস শুভমান গিল (৯১) আর ঋষভ পন্থ (অপরাজিত ৮৯) ছিলেন। টেস্টটা ড্র হয়ে গেলে বা ভারত হেরে গেলে পূজারার ব্যথার পূজা ব্যর্থ হত, আজ কেউ ওই ইনিংসের কথা বলত না। কারণ ভারতীয় ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র, আমি-আপনিও যার অঙ্গ, এই ধরনের ইনিংসকে তার গুণমানের জন্য পাত্তা দেয় না।

বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে বলুন দেখি হনুমা বিহারী এখন কোথায়? ঠিক তার আগের টেস্টেই আহত অবস্থায়, অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে হেরে যাওয়া ম্যাচ প্রায় তিন ঘন্টা ব্যাট করে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন বিহারী। নইলে ব্রিসবেনে সিরিজ জেতার সুযোগ পাওয়াই জেতা যেত না। অথচ ওই ম্যাচের পর মাত্র চারটে টেস্টে খেলানো হয়েছিল বিহারীকে। সেগুলোতে যে একেবারে রান করতে পারেননি তাও নয়। অথচ তিনি আজ বিস্মৃত। আসন্ন রঞ্জি ট্রফিতে ত্রিপুরার হয়ে খেলবেন ঠিক করেছেন, অর্থাৎ বুঝে গেছেন যে আর জাতীয় দলে ফেরা হবে না। সিডনির সেই ইনিংসে ব্যথায় নড়তে পারছিলেন না বিহারীর সঙ্গী অশ্বিনও। তবুও দু ঘন্টার বেশি ব্যাট করে গেছেন, অস্ট্রেলিয়ার পূর্ণ শক্তির বোলিং আক্রমণ তাঁকে আউট করতে পারেনি। তারপরেও টিম ম্যানেজমেন্টের বিশ্বাস হয়নি যে অশ্বিনের ব্যাটিং শক্তি রবীন্দ্র জাদেজার চেয়ে খারাপ নয়। অশ্বিনকে বিদেশের মাঠে সেই বাইরেই বসে থাকতে হয়েছে। সম্প্রতি নিজের পডকাস্টে রাহুলের প্রশ্নের উত্তরে স্পষ্টাস্পষ্টি অশ্বিন বলেও দিয়েছেন যে ব্যাপারটা অসহ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছিল বলেই তিনি অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। এই হল ভারতীয় ক্রিকেট। এখানে পূজারার ওই ইনিংস মনে রাখা হত ম্যাচ না জিতলে?

উপরন্তু চারপাশ দেখে মনে হচ্ছে, যেন ওই ইনিংস আর ওই সিরিজ ছাড়া আর বলার মত কিছু কোনোদিন করেননি পূজারা। অথচ এই লেখা শুরুই করা গেছে এমন একটা ইনিংসের কথা দিয়ে, যেখানে দলের ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো পূজারা জেতার মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের মাটিতে পূজারার একমাত্র শতরানটাও কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ব্যাটিং বিপর্যয়ের মধ্যে একা কুম্ভ হয়ে লড়ার দৃষ্টান্ত। ২০১৮ সালে সাদাম্পটনে সেই ইনিংসে ভারতের তাবড় ব্যাটাররা অনিয়মিত স্পিনার মঈন আলিকে পাঁচ উইকেট দিয়ে বসেন। মাত্র ৮৪.৫ ওভারে ২৭৩ রানে অল আউট হয়ে যায় দল, পূজারা অপরাজিত ১৩২। তাঁর পরে সর্বোচ্চ রান ছিল অধিনায়ক বিরাটের – ৪৬। ম্যাচটা অবশ্য দল হেরেছিল।

পূজারার আরও বড় কীর্তি কী?

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাঁর রান এবং শতরান বিরাটের চেয়ে কম হলেও, গড় প্রায় সমান (বিরাট ৪৬.৭২; পূজারা ৪৭.২৮)। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। কে কত বড় খেলোয়াড় তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ভাবতেই হয় কার খেলা ম্যাচের ফলাফলকে কতখানি প্রভাবিত করেছে। আজকাল ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ কথাটাও খুব চালু। তা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পূজারা কিন্তু বিরাটের চেয়েও বড় ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার। বিরাটের অস্ট্রেলিয়ায় সেরা সিরিজ ছিল ২০১৪-১৫ মরশুমে। সেবার তিনি চারটে টেস্টে চারখানা শতরান করেন। সেই সিরিজ ভারত হেরেছিল। ২০১৮-১৯ মরশুমে ভারত যখন জিতল, বিরাটের গড় ছিল ৪০.২৮। পার্থে যে ম্যাচে শতরান করেন, সে ম্যাচে ভারত প্রায় দেড়শো রানে হেরে যায়। সেই সিরিজে রানের পাহাড় গড়েছিলেন পূজারা। চার ম্যাচে ৫২১ রান (গড় ৭৪.৪২; শতরান ৩, অর্ধশতরান ১)। শেষ টেস্টে সিডনিতে শুরুতেই ভারত অস্ট্রেলিয়ার ঘাড়ে ৬২২ রানের গন্ধমাদন চাপিয়ে দিতে পেরেছিল পূজারার ম্যারাথন ১৯৩ রানের সৌজন্যে (সঙ্গে ঋষভের স্বভাবসিদ্ধ অপরাজিত ১৫৯)। সেই ইনিংসটা নিয়েও বিশেষ কথা হচ্ছে না।

আরও পড়ুন শীর্ষে উঠেও গলি-ক্রিকেট না ভোলা অশ্বিন

২০২০-২১ মরশুমে যখন ভারত দ্বিতীয়বার সিরিজ জেতে, তখন বিরাট প্রথম টেস্টের পরে আর খেলেননি। অ্যাডিলেডের দিন-রাতের সেই ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ৭৪ রান করেছিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৬ অল আউটের লজ্জার মধ্যে ৪। এই সিরিজে পূজারার রান দেখলে মনে হবে সাধারণ (চার টেস্টে ২৭১; গড় ৩৩.৮৭; অর্ধশতরান ৩)। কিন্তু অস্ট্রেলিয়াকে তিনি পরাস্ত করেছিলেন ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যাট করে। গোটা সিরিজে ব্যাট করেছিলেন ১,৩৬৬ মিনিট, অর্থাৎ ২২ ঘন্টার বেশি। সেবারে খুব বেশি রান ওঠেনি, ভারতের হয়ে সবচেয়ে বেশি রান করেছিলেন ঋষভ – পূজারার থেকে মাত্র তিন রান বেশি। শতরান করেছিলেন একমাত্র রাহানে। কিন্তু ভারতের জেতার পিছনে পূজারার ৯২৮ বল খেলার ভূমিকা যে কতখানি, তা এবারের অস্ট্রেলিয়া সফরের মুখে স্পষ্ট করে দিয়েছেন স্বয়ং জশ হেজলউড। তিনি বলেছেন – পূজারা না থাকায় অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগছে।

সুতরাং তথাকথিত সোনার প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সাফল্য – অস্ট্রেলিয়ায় পরপর দুবার টেস্ট সিরিজ জয় – মহানায়ক বিরাট কুমার বা রোহিত কুমারের জন্যে আসেনি, এসেছে ‘ইনটেন্ট’ না থাকা পূজারার জন্যে। তবু তাঁর টেস্ট কেরিয়ার শেষ হয়েছে ওই দুজনের আগেই। কারণ তাঁর উপর কোটি কোটি টাকা লগ্নি করা ছিল না বিজ্ঞাপনদাতাদের। ফর্ম পড়ে যাওয়ার কারণ তাঁকে বাদ দেওয়া যায়, ব্র্যান্ডদের বাদ দেওয়ার আগে নানা নাটক করতে হয়। রোহিত সম্পর্কে রটাতে হয় নিজেই নিজেকে দল থেকে সরিয়ে নিয়েছে। বিরাট অবসর নিয়ে ফেলার পরেও ফিরে আসার গুজব ছড়ানো চলতে থাকে। ২০২৩ সালের জুন মাসে শেষবার টেস্ট খেলার পরে পূজারা সাসেক্সের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছেন এবং হাজার দুয়েক রান করেছেন। কিন্তু তিনি টেস্ট দলে ফিরবেন – এমন গুজব ছড়ায়নি। বিরাট টেস্ট থেকে অবসর নিয়ে নেওয়ার পরেও ভারতের এবারের ইংল্যান্ড সফরের আগে বেশকিছু সংবাদমাধ্যম বলতে শুরু করেছিল – বিরাট নাকি কাউন্টি ক্রিকেট খেলবেন। তরুণ ভারতীয় দল লম্বা সিরিজে বিপদে পড়ে গেলে নাকি তিনি এসে উদ্ধার করবেন। বিরাট কাউন্টি খেলেননি, ভারতের তরুণ ব্যাটিংয়ের উদ্ধারকর্তার প্রয়োজনও হয়নি।

পূজারাকে নিয়ে অমন গুজব ছড়ানোর সুযোগও ছিল না, কারণ তিনি কমেন্ট্রি বক্সে হাজির ছিলেন। মুশকিল হল, তাঁর ব্যাটিংয়ের মতই ধারাভাষ্যও শান্তশিষ্ট, যুক্তিনিষ্ঠ। বৃদ্ধ গাভস্করও যে যুগে অতিরিক্ত উত্তেজনা দেখাচ্ছেন কমেন্ট্রি বক্সে, যুক্তির তোয়াক্কা না করে উগ্র জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠছেন সামান্যতম কারণে, সেখানে পূজারার ধারাভাষ্য কি চলতে দেওয়া হবে? নাকি তাঁকে এখানেও ঘাড়ধাক্কা খেতে হবে? এই আশঙ্কা থেকেই মনে হয়, পূজারার ব্যথার পূজা এখনো শেষ হয়নি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত