ভারতীয় বোর্ডের চোটপাটে আইপিএলের দৈর্ঘ্য বেড়ে চলায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়ে যাচ্ছে আইসিসি। ফলে দুনিয়ার যেখানে যত কুড়ি বিশের লিগ গজাচ্ছে, সবেতেই ঘাড় নাড়তে হচ্ছে।
‘আঠারো বছর বয়স’ নামে একখানা কবিতা লিখেছিলেন তরুণ বয়সেই চলে যাওয়া কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর জীবনের সবটুকুই পরাধীন দেশে কেটেছিল। সেই দেশে ক্ষুদিরাম বসুর মতো ১৮ বছরের ছেলেও ফাঁসি যাওয়ার ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করত না। স্বভাবতই সুকান্তর কবিতায় ওই বয়সে পৌঁছোনো মানুষ যে নির্ভয়ে অনেক কিছু ওলট-পালট করার ক্ষমতা রাখে, সেকথা লেখা হয়েছে। কিন্তু আমরা দাঁড়িয়ে আছি স্বাধীনতার ৭৫ বছর অতিক্রম করে যাওয়া দেশে। এখন আর ওই বয়সের ছেলেমেয়েদের কোনও কিছুর জন্য প্রাণ দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। বরং আজ যারা তাদের বাবা-মা, তাদের অনেকে ওই বয়সে চালু করেছিল ‘বার খেয়ে ক্ষুদিরাম’ কথাটা। অর্থাৎ ক্ষুদিরাম নাকি আদতে বোকা। এমন দেশে আঠারোয় পা দেওয়ার আলাদা তাৎপর্য কী জানি না। তবে ভারতীয় ক্রিকেটের মোচ্ছব আইপিএল আঠারোয় পা দেওয়ায় ক্রিকেট মহলে বিলক্ষণ আলোড়ন তৈরি হয়েছে। সুতরাং আমরা ভেবে দেখি, গত ১৮ বছরে আইপিএল আমাদের কী দিল।
বাঞ্ছিত ১। অলরাউন্ডার: শেন ওয়ার্ন যদি প্রথম আইপিএলেই রবীন্দ্র জাদেজাকে আবিষ্কার না করতেন, বা হার্দিক পান্ডিয়া আইপিএলে নজর কাড়তে না পারতেন, তাহলে কি ভারতীয় দলের নির্বাচকরা তাঁদের নিজ গুণে চিনে নিতেন? সন্দেহ হয়। আইপিএল চালু হওয়ার পর থেকে যেভাবে ক্রমশ তিন ধরনের ক্রিকেটের জাতীয় দল নির্বাচনেই আইপিএলের পারফরমেন্সকে গুরুত্ব দেওয়া বেড়েছে আর রনজি ট্রফি, দলীপ ট্রফি, ইরানি ট্রফি, বিজয় হাজারে ট্রফির গুরুত্ব কমেছে; দেওধর ট্রফি উঠে গিয়েছে, তাতে মনে হয় এঁদের উত্থান এবং ভারতীয় দলে স্থায়ী হওয়ার কৃতিত্ব আইপিএলকে না দিয়ে উপায় নেই।
২। ছেঁড়া কাঁথা থেকে লাখ টাকা: ২০০৮ সালের প্রথম আইপিএল থেকেই বেশ কিছু ক্রিকেটারকে পাওয়া গেছে যাঁরা নিম্নমধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মে অনেক কষ্ট করে ক্রিকেট জগতে প্রবেশ করেছেন, পুরো পরিবারকেও অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। আইপিএলের অর্থ তাঁদের দারিদ্র্য দূর করেছে। ছত্তিশগড়ের কুলদীপ সেন বা উত্তরপ্রদেশের রিঙ্কু সিং ক্রিকেটার হিসাবে হয়তো স্মরণীয় হয়ে থাকবেন না, কিন্তু মানুষ হিসাবে তাঁদের জীবনযাত্রার উন্নতির কৃতিত্ব আইপিএলেরই।
৩। ভারতীয় ফিল্ডিংয়ের দলগত উন্নতি: তরুণদের কাছে ব্যাপারটা তেমন চোখে পড়ার মতো না-ও মনে হতে পারে, কিন্তু আমরা যারা নরেন্দ্র হিরওয়ানি, ভেঙ্কটপতি রাজুদের দেখেছি; মহম্মদ আজহারউদ্দিন, অজয় জাদেজা, মাঝেমধ্যে কপিলদেব বা শচীন তেন্ডুলকর দারুণ ফিল্ডিং করলেও দল হিসাবে ভারতকে অতি সাধারণ ফিল্ডিং করতে দেখেছি, তারা মানতে বাধ্য যে আইপিএল তথা কুড়ি বিশের ক্রিকেটের কল্যাণে ভারতীয়দের ফিল্ডিংয়ের সাধারণ মানই অনেক উঁচুতে উঠেছে।
৪। ভয়হীন তরুণ ভারতীয় ক্রিকেটার: অনেকদিন যাবৎ টেস্ট ক্রিকেট খেলিয়ে দেশগুলোর মধ্যে জাতীয় দলে আগামীদিনে আসতে পারেন বা বাদ পড়ে গেছেন, ফিরতে পারেন– এমন ক্রিকেটারদের নিয়ে ‘এ’ দলের খেলা চালু ছিল। তাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আসার প্রস্তুতি হত। কিন্তু আইপিএলে যেভাবে অন্য দেশের সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে এবং বিপক্ষে খেলার সুযোগ পায় একেবারে কচিকাঁচারা, সে সুযোগ ওখানে ছিল না। আজ যে যশস্বী জয়সওয়াল, নীতীশ রেড্ডিদের জাতীয় দলে প্রথম ম্যাচেই অকুতোভয় মনে হয়, তার কৃতিত্ব আইপিএলের।
৫। সেরা লোকের থেকে সেরা জিনিস শেখার সুযোগ: জম্মুর ছেলে উমরান মালিক বিদ্যুৎ গতির ইয়র্কারে ব্যাটারের উইকেট ছিটকে দিলেন আর ডাগ আউটে নিজে উইকেট পাওয়ার মতো উল্লাসে ফেটে পড়লেন একদা বিশ্বত্রাস দক্ষিণ আফ্রিকার ডেল স্টেইন– এ দৃশ্য আমরা আইপিএলে দেখেছি। উমরানের গতি অনেক আশা জাগালেও ভারতীয় দলের হয়ে তেমন কিছু করতে পারেননি। খুব বেশি সুযোগও পাননি। কিন্তু স্টেইনের চেয়ে ভালো জোরে বোলিং কোচ তিনি পেতেন কোথায়? আর আইপিএল না থাকলে স্টেইনের ধারেকাছেও পৌঁছানো হত না উমরানের। এমন উদাহরণ অসংখ্য।
অবাঞ্ছিত ১। যা বদলায় সেটাই নিয়ম: কম সময়ের খেলা হিসাবেই যে কুড়ি ওভারের খেলার উৎপত্তি, তাতে অনন্তকাল ধরে ফিল্ডিং সাজিয়ে, ওভার রেটের তোয়াক্কা না করেও বহুবার কোনও শাস্তি হয়নি মহাতারকা অধিনায়কদের। কে এই সুবিধা পেয়েছেন আর কে পাননি তা নিয়ে অনলাইনে বিস্তর চুলোচুলি চলে এঁদের ভক্তদের মধ্যে। আইপিএল কর্তৃপক্ষ অবশ্য সে অশান্তি মিটিয়ে ফেলেছেন। আগে তবু তিনটে ম্যাচে নির্ধারিত সময়ে ওভার শেষ করতে না পারলে অধিনায়ককে একটা ম্যাচে সাসপেন্ড করা হত। এবার থেকে আর সে ঝক্কি থাকছে না। কেবল ‘ডিমেরিট পয়েন্ট’ দেওয়া হবে। অমন অনেক পয়েন্ট জমলে তবে সাসপেনশনের প্রশ্ন। নতুন করে নিলাম হবে, ছয়জনের বেশি ক্রিকেটারকে ধরে রাখা যাবে না, আবার অতজনকে রাখার খরচ বিস্তর, ওদিকে মহেন্দ্র সিং ধোনি চেন্নাই সুপার কিংস ছেড়ে নড়বেন না। অতএব নিয়ম বদলে ধোনিকে কোনওদিন দেশের হয়ে না খেলা ক্রিকেটারদের মতো ‘আনক্যাপড’ হওয়ার, মানে শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢোকার, সুযোগ করে দেওয়া হল।
২। মহাতারকাদের মুখ বাঁচানোর সুযোগ: ধরুন, আপনি অনেকদিন হল টেস্টে সুবিধা করতে পারছেন না। বল বেশি লাফালে বা সুইং হলে অথবা স্পিন হলেই আপনাকে সর্বকালের সেরা তো দূরের কথা, নিজের কালের মাঝারিও মনে হচ্ছে না। কুছ পরোয়া নেই। আইপিএল মাস দুয়েকের লম্বা প্রতিযোগিতা। রান আপনি পাবেনই। অমনি সকলে ভুলে যাবে টেস্টে কতকাল রান করেননি, ড্যাং ড্যাং করে পরের সিরিজেও খেলতে নামবেন।
৩। ঘরোয়া ক্রিকেটের সাড়ে সর্বনাশ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও বন্ধ হয়নি ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা রনজি ট্রফি। কিন্তু করোনা অতিমারির সময়ে বন্ধ হয়ে রইল। কেবল ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে সংসার চলে যে ক্রিকেটারদের, তাঁদের আক্ষরিক অর্থে হাঁড়ির হাল হল। কিন্তু উপায় কী? ওতে খরচ আর আইপিএলে আয়। তাই ক্রিকেট বোর্ড ব্যস্ত ছিল আইপিএলের আয়োজন করতে।
৪। সব ক্রিকেটের ঊর্ধ্বে: ক্রিকেট ১১ জনের খেলা, কিন্তু আইপিএল ১২ জনের খেলা। এগারোজনের মধ্যে যথেষ্ট ধুন্ধুমার ব্যাটার ঢোকানো যাচ্ছে না? আচ্ছা, ব্যাটিংয়ের সময়ে একজন বোলারকে বসিয়ে ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ হিসাবে আরেকজন ব্যাটারকে ঢুকিয়ে নেবেন। বোলার কম পড়ছে? অসুবিধা নেই। ফিল্ডিং করার সময়ে ব্যাটারদের একজনকে বসিয়ে আরেকজন বোলারকে খেলাবেন।
৫। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্তর্জলিযাত্রা: নিজের দেশে আসন্ন মরশুমে এবারের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠা দক্ষিণ আফ্রিকা একটাও টেস্ট খেলবে না, খেলবে শুধু পাঁচখানা টি টোয়েন্টি। ভারতীয় বোর্ডের চোটপাটে আইপিএলের দৈর্ঘ্য বেড়ে চলায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়ে যাচ্ছে আইসিসি। ফলে দুনিয়ার যেখানে যত কুড়ি বিশের লিগ গজাচ্ছে, সবেতেই ঘাড় নাড়তে হচ্ছে। ক্রিকেট দুনিয়ার বড়, মেজো, সেজো ভাই ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড আবার ঠিক করেছে টেস্ট নিজেদের মধ্যেই খেলবে, অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ক্ষমাঘেন্না করে একটা-দুটো। এদিকে, আইসিসির আয়ের বেশিরভাগটাও ওরাই নেয়। ফলে বাকি বোর্ডগুলোর অবস্থা সঙ্গিন। তারাও টিকে থাকতে কুড়ি বিশের লিগ আয়োজনেই মন দিচ্ছে। খেলোয়াড়রাও ৩০-৩২ বছরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফেলছেন। পাঁচদিন নয়, এমনকি ৬-৭ ঘণ্টাও নয়, ঘণ্টা চারেক খেলেই যদি মেলা রোজগার করা যায় তো কে বেশি খাটতে যাবে? এরপর হয়তো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট হবে সারাবছর আর মাস দুয়েক আন্তর্জাতিক। খেলাটা ক্রিকেট থাকবে না ডাংগুলি হয়ে যাবে– সেটা অন্য আলোচনার বিষয়।
ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন?
নহবত বসেছিল, গায়ে গোলাপ জল ছেটানোর জন্যে লোক তৈরি ছিল, হেঁশেলের দিক থেকে ভেসে আসছিল বেগুনির সুগন্ধ, বরকে অভ্যর্থনা করার জন্যে কনে কর্তা জমাটি পোশাক পরে তৈরি, কিন্তু শেষপর্যন্ত বর এসে পৌঁছল না। ফলে সব আয়োজন ভেস্তে গেল। কনে কর্তা ব্যাজার মুখ করে অতিথিদের কোনোমতে নমস্কার করে খাইয়ে দাইয়ে বাড়ি পাঠিয়ে কর্তব্য সমাধা করলেন।
এই ছিল ২০২৩ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের অবস্থা। ভারত জিতে গেলে গোটা দলকে নিয়ে কী বিপুল নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালাত বিজেপি, সে পরিকল্পনা কোথাও কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল। কংগ্রেস মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনেত দাবি করেছিলেন, রাজস্থানের এক বিজেপি নেতা তাঁকে বলেছিলেন যে বিজেপির সমস্ত হোর্ডিংয়ে বিশ্বকাপ হাতে মোদীর ছবি দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি ছিল। কিন্তু সে গুড়ে বালি ছড়িয়ে দিয়েছিল প্যাট কামিন্সের বাহিনি। ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি অবশ্য রোহিত শর্মারা জিতেছিলেন, কিন্তু ততদিনে লোকসভা নির্বাচন মিটে গেছে। ক্রমশ বিরাট হয়ে ওঠা নরেন্দ্র মোদীকে কেটে ছেঁটে দেশের অন্য নেতাদের মাপে এনে দিয়েছেন ভোটাররা। তখন আর হইচই করে কী লাভ?
সেই শোক বুঝি এতদিনে দূর হল। বিশ্বকাপ ফাইনালের পরে মোদীর পিছনে যেরকম বেচারা ভঙ্গিতে হাঁটছিলেন তৎকালীন বিসিসিআই যুগ্ম সচিব জয় শাহ, তাতে মনে হচ্ছিল বাবার বন্ধু নরেনজেঠু প্রচণ্ড ধমকেছেন ‘একটা কাজ যদি তোকে দিয়ে হয়!’ কিন্তু তাঁর নামও জয় শাহ। তিনি পরাজয় মেনে নিয়ে চুপ করে বসে থাকার লোক নন। ইতিমধ্যে আইসিসির শীর্ষপদ দখল করে জেঠুকে এবার তিনি যে উপহার দিলেন তা একেবারে নিখুঁত।
নিজে মাঠে নেমে তো খেলতে পারেন না, কিন্তু রোহিতদের সর্বোচ্চ সুযোগসুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ১৯৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ইতালিকে জেতানোর জন্যে বেনিতো মুসোলিনি কী করেছিলেন বা ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনাকে জেতাতে সে দেশের জুন্টা সরকার কত কলকাঠি নেড়েছিল তা আজ খুব গোপন তথ্য নয়। কিন্তু সেই দুই বিশ্বকাপেও ইতালি আর আর্জেন্টিনা সে আরাম পায়নি যা এবারে রোহিতরা পেলেন।
আইসিসি চেয়ারম্যান হিসেবে ভারতের জয়ে মাঠে তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশও অত্যন্ত দৃষ্টিকটু, হাসির খোরাক। ডালমিয়া, শ্রীনিবাসন, শশাঙ্ক মনোহররা অতীতে এই পদে থেকেছেন, এমন বালখিল্যসুলভ আচরণ করেননি কোনওদিন। আরও অবাক কাণ্ড, ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন? শোয়েব আখতারের ক্ষোভ প্রকাশ স্বাভাবিক। বৈষম্য তো আরও আছে!
প্রতিযোগিতার অন্য সব দল খেলল পাকিস্তানের একাধিক মাঠে ঘুরে ঘুরে, ভারতীয় দল একেবারে অন্য দেশের একটা শহরেই পায়ের উপর পা তুলে বসে রইল। অন্য দলগুলোকে পাকিস্তান থেকে উড়ে আসতে হল, আবার ফিরে যেতে হল। এই কাণ্ড করতে গিয়ে সবচেয়ে বিরক্তিকর অবস্থা হল দক্ষিণ আফ্রিকার। ভারত কোন সেমিফাইনালে উঠবে তা জানা না থাকায় অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তাদেরও দুবাই যেতে হল সেমিফাইনালের আগে। তারপর যখন বোঝা গেল ভারতের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ারই সেমিফাইনাল হবে, তখন ফেরত আসতে হল পাকিস্তানে। বিশ্রাম নেওয়ার বিশেষ সময় না পেয়েই নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল। সেই সেমিফাইনালে হারলেও, ৬৭ বলে অপরাজিত ১০০ রান করা ডেভিড মিলার বিরক্তি প্রকাশ করেই ফেললেন।
ভারত অন্যায় সুবিধা পেয়েছে – একথা বলার সাহস ক্রিকেট দুনিয়ায় কারোর হয় না। যেমন বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধমকানোর সাহস এই সেদিন পর্যন্ত কারোর হত না। কারণটা একই – সোজা কথায় টাকার গরম। আমরা আইসিসিকে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা দিই, অতএব আইসিসির আয়ের বেশিরভাগটা আমরাই নেব – এই গা জোয়ারি যুক্তিতে ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড দীর্ঘদিন হল বাকি ক্রিকেট দুনিয়াকে শুকিয়ে মারছে।
এরা যেটুকু উচ্ছিষ্ট ছুড়ে দেয় বাকিদের প্রতি, তা নিয়েই তাদের চলতে হয়। তাই কোনো বোর্ড মুখ খোলে না। বোর্ডের বারণ আছে বলে ক্রিকেটাররাও কিছু বলেন না। কিন্তু পাকিস্তানে চলল চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর ভারত খেলল দুবাই ট্রফি – এটা বোধহয় সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই বোর্ডগুলো কিছু না বললেও অনেক বিদেশি সাংবাদিক ও প্রাক্তন ক্রিকেটার এবার এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফেলেছেন, মিলারও মুখ খুলেছেন। সুবোধ বালক ভারতীয় মিডিয়া আর ধারাভাষ্যকাররা অবশ্য মানছেন না। তাঁরা দিল্লির প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক, অধুনা ভারতীয় দলের কোচ গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে একমত। কিন্তু মহম্মদ শামি সোজা সরল লোক, তিনি মেনে নিয়েছেন যে সব ম্যাচ একই মাঠে খেলায় ভারত বিশেষ সুবিধা পেয়েছে।
বস্তুত, ক্রিকেটের অ আ ক খ জানলে এবং অন্ধ ভক্ত না হলে যে কেউ মানবেন যে সব ম্যাচ এক মাঠে খেললে সুবিধা হয়। কারণ ক্রিকেট অন্য যে কোনো খেলার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করে আবহাওয়া এবং পিচের উপরে। চার স্পিনার খেলানোর জন্যে বিস্তর হাততালি কুড়োচ্ছেন গম্ভীর, রোহিত আর প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর। এই সিদ্ধান্ত তাঁরা নিতে পেরেছেন কারণ জানতেন, একই মাঠে ভারত সব ম্যাচ খেলবে আর সে মাঠের পিচ হবে স্পিন সহায়ক। অন্য সব দলকে কিন্তু একাধিক মাঠের পিচের কথা ভেবে দল গড়তে হয়েছিল।
একথা বললেই যা বলা হচ্ছে, তা হল – আর কী উপায় ছিল? ভারত তো পাকিস্তানে খেলতে যেতে পারত না। কারণটা রাজনৈতিক, অর্থাৎ ভারত সরকারের বারণ। কথাটা ঠিক। কিন্তু সেক্ষেত্রে ভারতের গ্রুপের সবকটা খেলাই সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে করা যেতে পারত, দুবাই আর শারজা মিলিয়ে। তাহলে অন্তত গ্রুপের অন্য দলগুলোও একই ধরনের পিচে একাধিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেত।
পাকিস্তানে খেলতে না যাওয়ার রাজনৈতিক কারণটাকেও প্রশ্ন করা দরকার। ২০০৮ সালের সন্ত্রাসবাদী হানার কথা তুলে আর কত যুগ দুই দেশের ক্রিকেটিয় সম্পর্ক অস্বাভাবিক করে রাখা হবে? মোদীর আচমকা নওয়াজ শরীফের নাতনির বিয়েতে খেতে যাওয়া, পাঠানকোটের সন্ত্রাসবাদী হানার তদন্ত করতে পাক গোয়েন্দা বিভাগকে ভারতের সেনা ছাউনিতে ঢুকতে দেওয়া – এসব তো ২০০৮ সালের অনেক পরে ঘটেছে। এমনকি গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে ডেভিস কাপে ভারতের টেনিস দল ইসলামাবাদে গিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে এসেছে। কেবল ক্রিকেট দল পাকিস্তানে গেলেই মহাভারত অশুদ্ধ হবে?
আজ্ঞে না, পুলওয়ামা ভুলিনি। সে ঘটনা যারা ঘটিয়েছিল তাদের শাস্তি হয়েছে? কোনো জোরদার তদন্ত হয়েছে? দাভিন্দর সিং বলে এক ভারতীয় পুলিস অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনিও জামিন পেয়ে গেছেন ২০২০ সালে। তাহলে ক্রিকেট দলের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জাতীয়তাবাদের নাটক করা কেন? আর সত্যিই যদি পাকিস্তান অচ্ছুত হয়, তাহলে প্রত্যেক আইসিসি প্রতিযোগিতায় ভারত আর পাকিস্তানকে এক গ্রুপে রাখাই বা কেন?
ধরা যাক, রাখা হয় না। ওটা এমনিই হয়ে যায়। তাহলেই বা ভারতীয় দল ম্যাচটা খেলে কেন? বোর্ড তো বলতে পারে – পাকিস্তানের সঙ্গে আমরা খেলব না, ওই ম্যাচের পয়েন্ট পাকিস্তানকে দিয়ে দেওয়া হোক। কেন বলে না? টিভি সম্প্রচার থেকে যে বিপুল টাকা আয় হয় তার নেশা তাহলে জাতীয়তাবাদের চেয়েও বেশি তো?
উত্তরগুলো অস্বস্তিকর। ফলে যিনি ভিন্নমত হবেন, তিনি সহজ রাস্তাটা নেবেন। বলবেন – এসব বলে ভারতের জয়কে ছোট করবেন না। ওরা পাকিস্তানে খেললেও জিতত। দুবাইতেও জিততে তো হয়েছে। আজ্ঞে হ্যাঁ, সেকথা ঠিক। তবে কথা হচ্ছে, আমাদের দেশের নির্বাচনগুলোতে যেসব দল রিগিং করে, অনেক ক্ষেত্রে রিগিং না করলেও তারাই জিতত। তাহলে কি ‘আহা! কী সুন্দর রিগিং করে!’ বলে হাততালি দিতে হবে?
কোনওদিন ভারত অধিনায়ক হওয়া হল না— এই নিয়ে আফসোস আছে কিনা জিজ্ঞেস করায় বলেছেন, তিনি ভেবে নিয়েছেন যে তিনি এমন এক কর্পোরেট কোম্পানিতে কাজ করতেন যারা তাঁকে ওই ভূমিকায় দেখতে চায়নি।
চাহি না রহিতে বসে ফুরাইলে বেলা, তখনি চলিয়া যাব শেষ হলে খেলা।
রবীন্দ্রনাথের গান সম্পর্কে একটা কথা অনেকেরই মনে হয়— যেন সকলের জীবনের সব মুহূর্তের সঙ্গেই লাগসই দু-চারখানা লাইন লিখে গেছেন। সম্প্রতি ভারতীয় দলের ক্রিকেটার রবিচন্দ্রন অশ্বিন যে অনায়াস ভঙ্গিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেন, তাতে মনে হয় উপরের লাইন দুটো যেন তাঁরই কথা।
২০১১ সালের নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল অশ্বিনের। তারপর থেকে দেশের মাটিতে যত সিরিজ খেলেছে ভারত, তার মধ্যে হার হয়েছিল কেবল ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। ভারতীয় স্পিনারদের সেই সিরিজে টেক্কা দিয়েছিলেন দুই ইংরেজ স্পিনার— গ্রেম সোয়ান আর মন্টি পানেসার। অশ্বিন চার টেস্টে ১৪টা উইকেট নিয়েছিলেন, প্রজ্ঞান ওঝা ২০টা, রবীন্দ্র জাদেজা আর পীযূষ চাওলা মিলে আরও সাতখানা। কিন্তু অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছিল সোয়ান-পানেসারের ৩৭ (যথাক্রমে ২০ আর ১৭)-টা উইকেট। অশ্বিন বলেছেন, ওই সিরিজের পর তিনি প্রতিজ্ঞা করেন— যতদিন খেলবেন, ঘরের মাঠে ভারতকে হারতে দেবেন না। তাঁর প্রতিজ্ঞা অটুট থেকেছে এতগুলো বছর, ভেঙে গেল ২০২৪ সালের শেষে এসে নিউজিল্যান্ড সিরিজে। অশ্বিন একেবারেই সুবিধা করতে পারলেন না। তিন টেস্টের সিরিজে মাত্র ন-খানা উইকেট, গড় ৪১। তিনি আর জাদেজা এতগুলো বছর ধরে যেভাবে ঘোল খাইয়ে ছেড়েছেন অতিথি ব্যাটারদের, তা এবারে হয়নি। উপরন্তু সেই ইংল্যান্ড সিরিজের মতোই এবারে নিউজিল্যান্ডের মিচেল স্যান্টনার (১৩ উইকেট) আর আজাজ প্যাটেল (১৫ উইকেট) টেক্কা দিয়েছেন ভারতীয় স্পিনারদের।
যদিও অস্ট্রেলিয়ায় খুব কম ক্ষেত্রেই একটা টেস্টে একজনের বেশি স্পিনার খেলানোর প্রয়োজন হয়, তবু ভারতীয় নির্বাচকরা এবার অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়েছিলেন তিনজনকে। তাছাড়া উপায়ই বা কী ছিল? ওয়াশিংটন সুন্দর যে দুটো টেস্ট খেলেই ১৬ খানা উইকেট নিয়ে ফেলেছেন নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। তার উপর সাড়ে চুয়াল্লিশ গড়ে রানও করে ফেলেছেন। ভারতীয় টেস্ট দল আবার অদ্ভুত নিয়মে চলে। ব্যাটাররা রান করতে পারবেন না জেনে, বোলার নির্বাচনের সময়ে একদিনের ক্রিকেট বা কুড়ি-বিশের ক্রিকেটের মতো মাথায় রাখা হয় সে রান করতে পারবে কিনা। এই নিয়ম মহেন্দ্র সিং ধোনির আমল থেকেই অল্পবিস্তর চলছিল, গত পাঁচ বছরে তুঙ্গে উঠেছে। কারণ দুই মহাতারকা ব্যাটার বিরাট কোহলি আর রোহিত শর্মার রান করার ঘটনা নরেন্দ্র মোদির সংসদে উপস্থিত থাকার মতোই বিরল হয়ে গেছে। কেএল রাহুল, শুভমান গিলরাও ধারাবাহিক নন। অশ্বিন বিলক্ষণ জানতেন, দেশের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বোলারদের সামলাতেই হিমশিম খেয়ে যাওয়া ভারতীয় ব্যাটারদের অস্ট্রেলিয়ায় রান করার সম্ভাবনা আরও কম। অতএব ওখানে চূড়ান্ত একাদশ নির্বাচন করার সময়ে আরও বেশি করে মাথায় রাখা হবে কোন বোলার বেশি রান করতে পারে। অশ্বিন এও জানতেন যে টেস্টে আধডজন শতরান, ১৪ খানা অর্ধশতরান, আগের অস্ট্রেলিয়া সফরে নায়কোচিত ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস, ২০২২ সালে মীরপুরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ঘূর্ণি উইকেটে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলার পরেও টিম ম্যানেজমেন্টের তাঁর ব্যাটিং দক্ষতায় বিশ্বাস নেই। অতএব প্যাট কামিন্সদের বিরুদ্ধে তাঁর খেলার সম্ভাবনা কম। প্রথম দুই টেস্টের এলোমেলো দল নির্বাচন সে-কথা প্রমাণও করে দেয়। তাই দ্বিতীয় টেস্টের পরেই তিনি অবসর নিয়ে নেন। অধিনায়ক রোহিত শর্মা সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, অশ্বিন নাকি পার্থেই অবসর নিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। রোহিতের অনুরোধেই অ্যাডিলেড পর্যন্ত থেকে যেতে রাজি হন।
ভারত অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জিতে গেলেই বা কী হত? বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠলেও সেই ম্যাচ হবে ইংল্যান্ডে। অর্থাৎ সেখানেও অশ্বিনকে বসিয়ে রাখা হত— এই সম্ভাবনা প্রবল। তারপর ভারতের টেস্ট সিরিজ বলতে ইংল্যান্ডে পাঁচ টেস্টের সিরিজ। ফের দেশের মাঠে টেস্ট সিরিজ আসতে আসতে অশ্বিনের বয়স চল্লিশের দিকে এগিয়ে যাবে। অশ্বিন ততদিন আর অপেক্ষা করলেন না। কেন করলেন না? ঠিক কী কথাবার্তা হয়েছিল অধিনায়ক আর কোচ গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে? সম্যক জানা যাচ্ছে না বলেই নানারকম গুজব এবং প্রচার ডালপালা মেলেছে। সেসব কথা থাক। এখানে বলার কথা হল, অশ্বিনের সঙ্গে যে-কোনও গড়পড়তা ভারতীয় ক্রিকেট-তারকার বিস্তর অমিল। তিনি কোহলির মতো বলিউড অভিনেত্রীর সঙ্গে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং করেননি। ব্যক্তিগত জীবন হাট করে ইনস্টাগ্রামে খুলে দেওয়ার পর ‘আমার বাচ্চার ছবি তুলছেন কেন’ বলে অস্ট্রেলীয় সাংবাদিকদের দিকে তেড়েও যাননি। সোশাল মিডিয়ায় তাঁর স্ত্রী, সন্তানদের ছবি বা ভিডিও রোহিতের পরিবারের চেয়েও কম দেখা যায়। সোশাল মিডিয়া মানে অশ্বিনের কাছে এক্সে একেবারেই ক্রিকেট সংক্রান্ত কিছু পোস্ট আর নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল। সেখানে মূলত ক্রিকেট নিয়েই ভিডিও পোস্ট করেন, কিন্তু দাবাও থাকে। আজ্ঞে হ্যাঁ, দাবা। এমন একজন ক্রিকেটার সদ্য প্রকাশ করেছেন আত্মজীবনীমূলক বই। এ বই তো পড়বই।
বহু বিখ্যাত খেলোয়াড় এই ধরনের বই লিখেছেন। সাধারণত লেখার কাজে তাঁর সঙ্গে থাকেন কোনও ক্রীড়া সাংবাদিক। ভারতীয় দাবার জীবন্ত কিংবদন্তি বিশ্বনাথন আনন্দের আত্মজীবনীর নাম যেমন মাইন্ড মাস্টার (২০১৯), তাঁর সঙ্গে লিখেছেন সাংবাদিক সুজান নাইনান। শচীন তেন্ডুলকরের আত্মজীবনী প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে(২০১৪), সহলেখক বোরিয়া মজুমদার। আন্দ্রে আগাসির আত্মজীবনী ওপেন (২০০৯) লেখায় তাঁকে সাহায্য করেছিলেন পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক জে আর মোরিঙ্গার। এই বইগুলোর কাটতি বেশ ভাল। কারণ খেলাপাগল লোকেদের মধ্যে এমন মানুষ কম নেই যারা খেলোয়াড়দের জীবনযাত্রা, ভাবনার ধরন, প্রস্তুতি, মনস্তত্ত্ব, ব্যক্তিগত জীবনের লড়াই সম্পর্কে জানতে চান। আবার কেউ হয়তো তেমন পড়ুয়া নন, কিন্তু প্রিয় খেলোয়াড়ের আত্মজীবনী স্রেফ সংগ্রহে রাখার আগ্রহে কিনে ফেলেন। অশ্বিনের বইও লেখা হয়েছে এক সাংবাদিকের সাহায্য নিয়ে। তিনি ক্রিকেট সাংবাদিক সিদ্ধার্থ মঙ্গা। কিন্তু মজার কথা, সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রায় দেড় দশক ক্রিকেট খেলে ফেলা অশ্বিনের বইয়ের নাম আই হ্যাভ দ্য স্ট্রিটস। প্রচ্ছদে দেখা যায় বল হাতে নয়, ব্যাটের উপর ভর দিয়ে বসে আছেন ভারতের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী বোলার।
এ কি অশ্বিনের শ্লেষ? ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যাটারদের সমান সম্মান যে হাজার সাফল্য সত্ত্বেও বোলারদের কপালে জোটে না— এ-কথা তো সর্বজনবিদিত। মাত্র একটা সিরিজে ব্যর্থ হয়েই নিজের বয়সের ভার স্বীকার করে নিয়ে অশ্বিন অবসর নিলেন। অথচ সমবয়স্ক কোহলি কালেভদ্রে একটা শতরান করলেই ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পারমানেন্ট’ জাতীয় কথা বলে সাংবাদিক, ধারাভাষ্যকার, ক্রিকেটভক্ত— সকলেই একেবারে গদগদ হয়ে যান। রোহিত নিতান্ত চাপে পড়ে এত বছর পরে রঞ্জি ট্রফি খেলতে নেমে জম্মু-কাশ্মীরের পেসারের গতিতেও চোখে অন্ধকার দেখছেন, অথচ নির্বাচকরা এখনও সাহস করে বলতে পারছেন না— এবার অবসর নাও। উল্টে অস্ট্রেলিয়ায় একটা টেস্টে তিনি নাকি নিজেকে বিশ্রাম দিয়েছিলেন। তাতে অবসর নেবেন কিনা জল্পনা শুরু হওয়ায় টিভি ক্যামেরার সামনে এসে সগর্বে বলে দিয়েছেন— আমি এখন আছি। কোথাও যাচ্ছি না। ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যাটারদের এই রাজার ব্যাটাসুলভ অবস্থানকেই কি নীরবে ব্যঙ্গ করছে অশ্বিনের বইয়ের প্রচ্ছদ?
লোকটার নাম অশ্বিন বলেই এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না এবং ওই বইয়ের ভিতরে কী আছে তা জানার কৌতূহল বাড়ে। পরিতাপের বিষয় হল, ভারতীয় ক্রিকেট-সাংবাদিকতা মোটের উপর বিশ্লেষণহীন পেজ থ্রি সাংবাদিকতায় পরিণত হয়েছে। তাই অশ্বিনের অবসরের পর থেকে আজ পর্যন্ত কেউ তাঁর দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনের নানা দিক নিয়ে একখানা গভীর সাক্ষাৎকার নিল না। নিলে সামগ্রিকভাবে গত দেড় দশকে যেভাবে ভারতীয় ক্রিকেট পরিচালিত হয়েছে, যার ক্ষতি তাৎক্ষণিক না হলেও এখন টের পাওয়া যাচ্ছে, তা নিয়ে অনেক কিছু জানা যেতে পারত। অশ্বিনের মতো একজন ভাবুক ক্রিকেটারের ক্রিকেট-ভাবনা নিংড়ে নেওয়ার কাজ তো হতই। কাজটা করেছেন স্কাই ক্রিকেটের পডকাস্টে দুই প্রাক্তন ইংল্যান্ড অধিনায়ক— মাইকেল অ্যাথারটন আর নাসের হুসেন। সেই পডকাস্ট শুনলে অশ্বিনের বইখানা পড়ার আগ্রহ আরও বেড়ে যেতে বাধ্য। অশ্বিন বলেছেন তিনি বই পড়তে ভালবাসেন। নির্দিষ্ট করে বলেছেন ‘সেলফ-হেল্প বই নয়, উপন্যাস পড়তে ভালবাসি।’ তারপর জানিয়েছেন নিজের বইটাকেও তিনি এমনভাবে সাজাতে চেয়েছেন যাতে নিজেকে বইয়ের প্রথম অংশে লেখক হিসাবে বা বইয়ের প্রধান চরিত্র (“author or protagonist”) হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। ফলে শেষমেশ বইটা উপন্যাসের মতো হয়ে ওঠে। আরও বলেছেন ‘আমি আজও একজন গলি-ক্রিকেটার।’ বোঝা যায়, নিজের শিকড়ের প্রতি বিশ্বস্ততা বোঝাতেই তাঁর বইয়ের নামকরণ।
কোনও রাখঢাক না করে ওই পডকাস্টে অশ্বিন নির্দ্বিধায় বলেছেন, একজন বোলারের জীবন মোটেই খুব রঙিন নয়। তাই অনেকসময় দেখা যায়, উইকেট নিল অশ্বিন আর লাফিয়ে বেড়াচ্ছে বিরাট। কোনওদিন ভারত অধিনায়ক হওয়া হল না— এই নিয়ে আফসোস আছে কিনা জিজ্ঞেস করায় বলেছেন, তিনি ভেবে নিয়েছেন যে তিনি এমন এক কর্পোরেট কোম্পানিতে কাজ করতেন যারা তাঁকে ওই ভূমিকায় দেখতে চায়নি। ২০২৫ সালের ভারতে ক্রিকেটার, কোচ, বোর্ড, সাংবাদিক, বিশেষজ্ঞ, প্রাক্তন ক্রিকেটার— সকলে মিলে জাতীয় দলকে দেশের সমার্থক করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। সেখানে অশ্বিনের মতো উচ্চতার একজন ক্রিকেটার বোর্ডকে কর্পোরেট কোম্পানি বলছেন, জাতীয় দলে খেলাকে স্রেফ আরেকটা চাকরির মতো করে বর্ণনা করছেন— এই প্রবল কাণ্ডজ্ঞান তাঁকে এবং তাঁর বইকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
এমন নয় যে বড় ক্রিকেটার হলেই তাঁর আত্মজীবনী বা জীবনী খুব আকর্ষণীয়, পাঠযোগ্য হয়। শচীনের বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত কিছু অংশ পড়ে গাঁটের কড়ি খরচ করে আর কিনতে ইচ্ছে করেনি। যারা কিনে পড়েছে, প্রায় কারও মুখে প্রশংসা শুনিনি। সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগ শুনেছি তা হল, বইতে এমন একটা কথাও নেই যা শচীন সম্পর্কে ক্রিকেটভক্তরা আগেই জানত না। হয়তো তা খুব অবাক করার মতো নয়। কারণ শচীনের ব্যাটিং যতখানি চিত্তাকর্ষক ছিল, তাঁর কথাবার্তা ঠিক ততখানিই একঘেয়ে। অশ্বিন কিন্তু অন্য মানুষ। কার্টুনিস্ট প্রাণ তাঁর সৃষ্ট চরিত্র চাচা চৌধুরী সম্পর্কে যে কথা কমিক স্ট্রিপে লিখতেন, সে-কথা অশ্বিন সম্পর্কেও বলা যায়— অশ্বিনের মাথা কাজ করে কম্পিউটারের মতো।
অশ্বিন কেন, যে কোনো বুদ্ধিমান মানুষ বুঝতে পারবেন যে আসলে আমাদের কোচ আর অধিনায়ক দল তৈরি করেন ব্যর্থ ব্যাটারদের পিঠ বাঁচাতে। কাজটা যে আজ নতুন হচ্ছে, তাও নয়। এ জিনিস চালু করে দিয়েছিলেন ধুমধাম ধোনি। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।
ভারতের হয়ে টেস্ট খেলেছেন মাত্র ১৭টা, নিয়েছেন ৪২.৪০ গড়ে ৪৪ খানা উইকেট। একদিনের ম্যাচ খেলেছেন ১২০টা, ৩১.৭২ গড়ে নিয়েছেন ১৫৭ খানা উইকেট। কুড়ি বিশের ম্যাচ খেলেছেন ২৭টা, ২২.২৯ গড়ে নিয়েছেন মোটে ৩৪ খানা উইকেট। না, রবিচন্দ্রন অশ্বিনের কথা হচ্ছে না। বলছি আশিস নেহরার কথা। উপরের পরিসংখ্যান সাধারণ বললেও বেশি বলা হয়। বলা উচিত আলোচনার অযোগ্য। শেষ টেস্ট ম্যাচ খেলেছিলেন ২০০৪ সালে, শেষ একদিনের ম্যাচ ছিল ২০১১ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। সেই নেহরার জন্যে ঘটা করে তাঁর ঘরের মাঠে বিদায়ী ম্যাচের বন্দোবস্ত করেছিল ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) – তারিখটা ছিল ১ নভেম্বর ২০১৭। ভারতের বিজেপি সরকারের মত ক্রিকেট বোর্ডেরও আছে গোদি মিডিয়া। সেই মিডিয়া ভরে গিয়েছিল স্বনামধন্য সাংবাদিকদের লম্বা লম্বা লেখায়। তাঁরা যেনতেনপ্রকারেণ প্রমাণ করেছিলেন – নেহরা মহান ক্রিকেটার, তাই তাঁর এই সম্মান প্রাপ্য। বোর্ডের মাইনে করা প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও নিজেদের শব্দভাণ্ডার উজাড় করে দিয়েছিলেন নেহরার জন্য। তিনি নাকি অসম্ভব সম্ভাবনাময় ছিলেন, কেবল চোট আঘাতের জন্যে বেশি খেলে উঠতে পারলেন না। পারলেই…
হতেও পারে। সম্ভাবনা তো আর মাপা যায় না, আর কী হলে কী হত তা নিয়েও অনন্তকাল আলোচনা চালানো যায়। সুকান্ত ভট্টাচার্য ৮০ বছর বাঁচলে রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বড় কবি হতেন – একথা প্রমাণ করার যেমন উপায় নেই, অপ্রমাণ করারও উপায় নেই। কিন্তু সাফল্য তো পরিমাপযোগ্য। নেহরা যদি বিদায়ী ম্যাচ পাওয়ার যোগ্য হন, তাহলে টেস্টে তিনশোর বেশি, একদিনের ক্রিকেটেও প্রায় তিনশো উইকেট পাওয়া, ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম কাণ্ডারী জাহির খান কী দোষ করেছিলেন? কী দোষ ছিল হরভজন সিংয়ের? তিনি তো টেস্টে চারশোর বেশি উইকেটের মালিক, একদিনের ক্রিকেটেও আড়াইশোর বেশি। বহু স্মরণীয় জয়ের নায়ক। নেহরার তো স্মরণীয় পারফরম্যান্স বলতে ঠিক একটা – ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ডারবানে ২৩ রানে ছয় উইকেট নেওয়া। ভারতীয় ক্রিকেটে মহান হওয়া এত সহজ তাহলে?
এসব পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে হত না, অশ্বিন অস্ট্রেলিয়া সিরিজের মাঝখানেই অবসর নিয়ে না ফেললে। এই ওয়েবসাইটেই নিউজিল্যান্ড সিরিজে ভারত গোহারান হারার পরে লিখেছিলাম অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজা হলেন মাঝারিয়ানার দেবদূত। সেই মত পরিবর্তন করার মত কিছু ঘটেনি। কিন্তু সে মাঝারিয়ানা তো সর্বকালের সেরাদের সাপেক্ষে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে অশ্বিন ভারতের বর্তমান প্রজন্মের সেরা স্পিনার। তাছাড়া মাঝারিয়ানা এক জিনিস, অপকর্ষ আরেক জিনিস। যে দেশে নেহরাকে ধূপধুনো দিয়ে পুজো করে বিদায় জানানো হয়, সেখানে অনিল কুম্বলের পরেই ভারতের সবচেয়ে সফল টেস্ট বোলার, সবচেয়ে বেশিবার সিরিজের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার বিশ্বরেকর্ড করে ফেলা অশ্বিন একটা সিরিজের মাঝখানে এমন চকিতে বিদায় নেবেন – এটা ক্রিকেটপ্রেমীরা নীরবে হজম করবেন? প্রশ্ন করবেন না, কেন এভাবে বিদায় নিলেন অশ্বিন?
যদি আর টেস্ট খেলতে পারবেন না বলেই মনে করে থাকেন, তাহলে তো নিউজিল্যান্ড সিরিজের পরেই অবসর নিতে পারতেন। অথবা বলে দিতে পারতেন – অস্ট্রেলিয়া সিরিজই হবে আমার শেষ সিরিজ। অনেকেই তো এভাবে অবসর নেন। নিউজিল্যান্ডের নির্ভরযোগ্য জোরে বোলার টিম সাউদি অশ্বিনের আগেরদিনই টেস্ট কেরিয়ার শেষ করলেন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের শেষ টেস্ট খেলে। তিনি কিন্তু ম্যাচের আগেই বলে দিয়েছিলেন, ওটাই হতে চলেছে তাঁর শেষ টেস্ট। কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডের জেমস অ্যান্ডারসন আর স্টুয়ার্ট ব্রডও আগে থেকে ঘোষণা করে অবসর নিয়েছেন। যেসব ক্রিকেটারের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ার হয়, ভক্তকুল তৈরি হয় – তাঁরা তো এভাবেই বিদায় নেন। শেষ সময়ে ভক্ত, সহখেলোয়াড়, প্রাক্তনদের অভিবাদন পেতে কার না ভাল লাগে? মানুষ যে পেশাতেই থাকুক, কোনো বয়সেই অবসর নেওয়া সোজা নয়। ভাল হোক, মন্দ হোক, অনেকগুলো সম্পর্ক তৈরি হয় কর্মস্থলে। কাজ থেকে অবসর নিতেই হয়। কারণ শরীর প্রাকৃতিক নিয়মে একসময় কাজের অনুপযোগী হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের মন তো প্রকৃতির নিয়মে চলে না। কাজ ছেড়ে যেতে এবং কাজের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলোকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হয়, বিষণ্ণতা তৈরি হয়। শুধু যে অবসর নিচ্ছে তারই হয় তা নয়, তার সহকর্মীদেরও হয়। অশ্বিনের মত বিখ্যাত খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে যারা কোনোদিন তাঁর ধারেকাছে যেতে পারেনি, কেবল কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে টিভি বা মোবাইলের পর্দায় দেখেছে, তারাও বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। অত মানুষের বিষণ্ণতা, শেষ মুহূর্তের ভালবাসা ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনই আবার অবসরপ্রাপ্ত মানুষটার বাকি জীবনের পাথেয়। এক্ষেত্রে অশ্বিন বা আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই। সেই ভালবাসা গুছিয়ে চেটেপুটে নেওয়ার সুযোগ কে ছাড়তে চায়? চাওয়ায় কোনো দোষও নেই। তাহলে অশ্বিন এমন হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?
ব্রিসবেনে বৃষ্টিতে শেষদিনের খেলা ভেস্তে যাওয়ার পর অধিনায়ক রোহিত শর্মার সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে অশ্বিন কী বলেছেন এতদিনে সবাই জানেন। দু মিনিটেরও কম দৈর্ঘ্যের সেই বক্তব্য শুনলে মনে হয়, সিদ্ধান্তটা চট করে নেওয়া। অথচ অশ্বিনের ক্রিকেটজীবন যাঁরা অনুসরণ করেছেন তাঁরা জানেন, অশ্বিন হুটহাট কাজ করার লোক নন। এমনিতেই স্পিন বোলিং ব্যাপারটায় গায়ের জোরের চেয়ে মস্তিষ্কের কাজ বেশি বৈ কম নয়। তার উপর অশ্বিন এমন একজন ক্রিকেটার, যাঁর মাথা ব্যাট করার সময়েও একইরকম সক্রিয় থাকত। শেন ওয়ার্ন সম্পর্কে একসময় বলা হত ‘the best captain Australia never had’। অশ্বিন সম্পর্কেও বলা যায়, তিনি ভারতের সেরা না-হওয়া অধিনায়ক। এমন লোক আজ ভাবলেন, আর এখুনি অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন – এমনটা না হওয়াই স্বাভাবিক। অশ্বিনের প্রস্থানের পর রোহিত যা বলেছেন, তা থেকে কিন্তু পরিষ্কার যে এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ নেওয়া হয়নি। রোহিত বলেন ‘আমি পার্থে এসে এটা শুনি। এটা তখন থেকেই ওর মাথায় ঘুরছিল। আমি কোনো মতে ওকে গোলাপি বলের টেস্টটা [অ্যাডিলেড] অব্দি থেকে যেতে রাজি করাই। ওর মনে হয়েছে, যদি আমার প্রয়োজন না পড়ে তাহলে আমার বিদায় নেওয়াই ভাল।’
হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে অশ্বিনের বাবা রবিচন্দ্রন মেলবোর্ন আর সিডনির শেষ দুটো টেস্ট দেখতে যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট কেটে ফেলেছিলেন। ছেলে অবসর নেওয়ার খবর জানানোর পরে টিকিটগুলো বাতিল করেন। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রবিচন্দ্রন অবসরের কারণ হিসাবে ছেলের অপমানিত বোধ করার সম্ভাবনাও জানিয়ে ফেলেছেন। তবে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হতেই অশ্বিন এক্স হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করেছেন, তাঁর বাবার মিডিয়া সামলানোর প্রশিক্ষণ নেই। অতএব তাঁকে সবাই দয়া করে ক্ষমা করে দিন। লক্ষ করুন, অশ্বিন বলেছেন, বাবা মিডিয়াকে কী বলতে হয় না হয় জানেন না, তাই ওরকম বলে ফেলেছেন। বাবা ভুল বুঝেছেন, আমি খুশি মনেই অবসর নিয়েছি – এমন কথা বলেননি কিন্তু। পাশাপাশি রোহিত বলেছেন যে পার্থ থেকেই অশ্বিন অবসরের চিন্তা করছিলেন। তার মানে রোহিত অ্যাডিলেডের দ্বিতীয় টেস্ট পর্যন্ত থেকে যাওয়ার কথা না বললে হয়ত পার্থেই অবসর ঘোষণা করে দিতেন। এখানেই ভারতীয় দল যেভাবে চালানো হয় তা নিয়ে একগুচ্ছ প্রশ্ন তোলার অবকাশ তৈরি হয়।
কী হয়েছিল পার্থে? দলে দুজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ স্পিনার থাকা সত্ত্বেও খেলানো হয়েছিল মাত্র চারটে টেস্ট খেলা ওয়াশিংটন সুন্দরকে। ওয়াশিংটনকে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ৫১.২ ওভারের মধ্যে মাত্র দু ওভার বল করতে দেওয়া হয়, দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫ ওভার বল করলেও মিচেল স্টার্ক আর নাথান লায়ন নামে দুই বোলারের উইকেট নেওয়ার বেশি প্রভাব ফেলতে পারেননি। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন ব্যাট হাতে তিনি অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজার চেয়েও বেশি নির্ভরযোগ্য হওয়াই নাকি তাঁর সুযোগ পাওয়ার আসল কারণ। কিন্তু ওয়াশিংটন প্রথম ইনিংসে করেন ৪, দ্বিতীয় ইনিংসে ২৯। তবে তরুণ ক্রিকেটারকে একটা টেস্টে ব্যর্থ হওয়ার জন্য সমালোচনা করা অন্যায়। বিশেষত প্রথম ইনিংসে যেখানে দুই দলের সমস্ত ব্যাটার ব্যর্থ হয়েছিলেন আর ভারতের বোলিংয়ের সময়েও পিচ, আবহাওয়া – সবকিছুই ছিল জোরে বোলারদের জন্যে আদর্শ। কিন্তু কথা হল, ওয়াশিংটনকে তাহলে অ্যাডিলেডের দ্বিতীয় টেস্টে বাদ দেওয়া হল কেন? তাঁর বোলিং ও ব্যাটিং দক্ষতার প্রতি ভরসা রোহিত-গৌতম গম্ভীরের টিম ম্যানেজমেন্ট মাত্র একটা ম্যাচের পরেই হারিয়ে ফেলল? এভাবে কোনো তরুণ ক্রিকেটারকে লম্বা রেসের ঘোড়া করে তোলা যায়?
নাকি ব্যাপারটা আসলে এইরকম, যে অশ্বিন পাঁচশোর বেশি উইকেট নিয়ে ফেলার পরেও বিদেশের মাঠে বারবার বাদ পড়ায় বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যাবেন বলছেন শুনে প্রথম টেস্টে না খেলা অধিনায়ক রোহিত তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন – অ্যাডিলেডে ওঁকেই খেলানো হবে? যদি তা হয়, তাহলে কিন্তু বলতে হবে টিম ম্যানেজমেন্ট অবৈজ্ঞানিক, যুক্তিহীন, আবেগসর্বস্ব পদ্ধতিতে দল চালান। অশ্বিন অ্যাডিলেডে খেললেন এবং মন্দ খেললেন না। প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয়ের মধ্যে ২২ বলে ২২ রান করলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে আর সকলের মত তিনিও ব্যর্থ। তাঁর প্রধান কাজ তো বল করা। তাতে কিন্তু প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হয়েছেন বলা যাবে না। ১৮ ওভার বল করেছেন, অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের বেশি রান করতে দেননি এবং অলরাউন্ডার মিচেল মার্শের উইকেট তুলে নিয়েছেন।
তারপরেও তৃতীয় টেস্টে অশ্বিনকে বাদ দিয়ে জাদেজাকে খেলানো হল কোন যুক্তিতে? একটা যুক্তিই থাকা সম্ভব। প্রথম দুই টেস্টে ব্যাটাররা ডুবিয়েছেন, আবার ডোবাতে পারেন। জাদেজা টেনে তোলার কাজটা ওয়াশিংটন আর অশ্বিনের চেয়েও ভাল পারবেন, তাই। সেই মহেন্দ্র সিং ধোনির আমল থেকে ভারতীয় ক্রিকেটে চালু ধারণা – জাদেজা অশ্বিনের থেকে ভাল ব্যাট করেন। যদিও দুজনের মধ্যে তফাত মোটেই আকাশপাতাল নয়। অশ্বিন বিদেশে ৪০ খানা টেস্ট খেলে ১৪৮৫ রান করেছেন ২৫.৬০ গড়ে, দুটো শতরান আর ছটা অর্ধশতরান সমেত। জাদেজা ২৭ খানা টেস্ট খেলে ১২১০ রান করেছেন ৩৪.৫৭ গড়ে, একটা শতরান আর নটা অর্ধশতরান সমেত। জাদেজার গড় অশ্বিনের চেয়ে নিঃসন্দেহে অনেকটা ভাল হলেও মনে রাখতে হবে, গত অস্ট্রেলিয়া সফরে সিডনিতে হনুমা বিহারীর সঙ্গে অশ্বিন যে ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস খেলেছিলেন, তেমন অবিশ্বাস্য ইনিংস বিশ্বমানের জোরে বোলিংয়ের বিপক্ষে জাদেজা বিদেশে কখনো খেলেননি। ব্রিসবেনে সদ্য যে ৭৭ রানের ইনিংস খেললেন, তা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনজন বিশেষজ্ঞ বোলারের বিরুদ্ধে। কারণ আহত জশ হেজলউড ইনিংসের শুরুর দিকেই মাঠ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
তবে এই তুলনামূলক আলোচনা যে করতে হচ্ছে – সেটাই অশ্বিন, জাদেজা, ওয়াশিংটনের প্রতি অবিচার। তুলনা করতে হলে তো করা উচিত তাঁদের বোলিং নিয়ে, কারণ ওঁরা প্রথমত বোলার। ব্যাটের হাত ভাল সেটা বোনাস হিসাবেই ধরা উচিত, কারণ খেলাটা টেস্ট ক্রিকেট। কুড়ি বিশের ক্রিকেট নয়, যেখানে ১ থেকে ১১ সকলেরই রান করতে পারা দরকার। ওয়াশিংটন যেহেতু মোটে ছটা টেস্ট খেলেছেন, সেহেতু তাঁকে আলোচনার বাইরে রেখে অশ্বিন আর জাদেজার বিদেশের মাঠের পরিসংখ্যান দেখি।
অশ্বিন ৪০ টেস্টে ৩০.৫৫ গড়ে ১৫০ খানা উইকেট নিয়েছেন। এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন আটবার, আর ম্যাচে দশ উইকেট দুবার। অন্যদিকে জাদেজা ২৭ টেস্টে ৩৪.০৩ গড়ে মাত্র ৭৬ খানা উইকেট নিতে পেরেছেন। এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট মাত্র দুবার, ম্যাচে দশ উইকেট একবারও নয়। অর্থাৎ বিদেশে জাদেজা কোনো আলোচনার যোগ্য বোলারই নন। উপমহাদেশের বাইরে তাঁর বোলিং এতই পানসে হয়ে যায় যে ২০১৩ ইংল্যান্ড সফরে একটা টেস্টে ধোনি উইকেট থেকে পিছিয়ে দাঁড়িয়ে জাদেজাকে দিয়ে কয়েক ওভার মিডিয়াম পেস বল করিয়েছিলেন। ব্রিসবেনে টেস্টেও দেখা গেল, পিচে কিঞ্চিৎ টার্ন ও বাউন্স থাকলেও জাদেজা কিছুই করতে পারলেন না। বরং ২৩ ওভার বল করে ৯৫ রান দিয়ে ফেললেন।
এসব দেখে অশ্বিন কেন, যে কোনো বুদ্ধিমান মানুষ বুঝতে পারবেন যে আসলে আমাদের কোচ আর অধিনায়ক দল তৈরি করেন ব্যর্থ ব্যাটারদের পিঠ বাঁচাতে। কাজটা যে আজ নতুন হচ্ছে, তাও নয়। এ জিনিস চালু করে দিয়েছিলেন ধুমধাম ধোনি। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। ২০১৪-১৫ মরশুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রথম টেস্টই ছিল অ্যাডিলেডে। অধিনায়ক বিরাট কোহলি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে অশ্বিনকে বসিয়ে রেখে লেগস্পিনার কর্ণ শর্মাকে খেলিয়ে দেন। দুই ইনিংস মিলিয়ে কর্ণ চারটে উইকেট নিলেও বেধড়ক মার খান। প্রথম ইনিংসে ৩৩ ওভার বল করে ১৪৩ রান দেন, দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬ ওভার বল করে ৯৫। ওটাই তাঁর জীবনের প্রথম ও শেষ টেস্ট। মনে রাখবেন, ওই টেস্টে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন লায়ন। পরের তিনটে টেস্টে অশ্বিনই খেলেন এবং ইনিংস পিছু গোটা দু-চার করে উইকেটও নেন। কিন্তু কর্ণ কুন্তীর প্রথম পছন্দ না হলেও ধোনি, কোহলিদের প্রথম পছন্দ হতে পেরেছিলেন কোন গুণে? আইপিএলে কিছু চার, ছয় মারতে পারার সুনাম ছিল বলে।
ওই সিরিজের মাঝখানেই ধোনি অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়ে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। অশ্বিন হয়ত ভেবেছিলেন নতুন আমলে দেশের মত বিদেশেও তিনি প্রথম পছন্দ হয়ে উঠবেন। কিন্তু বিরাট কোহলির আমলেও তা ঘটল না, জাদেজা এসে পড়লেন। পৃথিবীর সর্বত্র সব বোলারের বিরুদ্ধে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করা স্টিভ স্মিথকে ২০২০-২১ সিরিজে বোতলবন্দি করতে পেরে এবং সিডনির সেই ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস খেলার পরে অশ্বিন নির্ঘাত ভেবেছিলেন – আর বিদেশে বেঞ্চে বসে থাকতে হবে না। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তিনি দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় পছন্দ হতে চলেছেন। গত এক দশকে টেমস ইত্যাদি নদী দিয়ে কত জল গড়াল। ধোনি আর বিরাটের অভিভাবক রবি শাস্ত্রী গেলেন, রাহুল দ্রাবিড় এলেন। তাও এই ধারা বদলাল না। বিরাটের বদলে রোহিত টেস্ট অধিনায়ক হলেন। তাতেও অশ্বিন বিদেশে দ্বিতীয় পছন্দই রয়ে গেলেন। দ্রাবিড়ের জায়গায় গম্ভীর এলেন। অশ্বিন যে তিমিরে সেই তিমিরেই। কেন? ক্রিকেটের আদিম যুগের ভাষায় বললে – ভারতীয় দলের জেন্টলম্যান হলেন ব্যাটাররা। তাঁদের বছরের পর বছর ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার অধিকার আছে। সেই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব প্লেয়ারদের, মানে স্পিনারদের, ঘাড়ে। সেই অধিকার রক্ষার্থে সেরা স্পিনারকে নয়, খেলানো হবে স্পিনারদের মধ্যে সেরা ব্যাটারকে। সেটাও আবার তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ঠিক হবে না, হবে অধিনায়ক আর কোচের মতানুসারে। আটত্রিশ বছর বয়সে এসে এই অবিচার আর সহ্য না হওয়ারই কথা। আমাদের অনেককেই বিভিন্ন পেশায় এ জিনিস সহ্য করতে হয়। বহু ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ ভুল লোক ভুল উদ্দেশ্য নিয়ে ‘টিম লিডার’ হয়ে বসে আছে। তাদের কাছে অভিজ্ঞতা, নৈপুণ্যের দাম থাকে না। সিনিয়র কর্মচারীরা মুখ বুজে নিজের যোগ্যতার অবমূল্যায়ন হচ্ছে বুঝেও কাজ চালিয়ে যান। কারণ তাঁদের কাছে আইপিএলের মত বিকল্প নেই। অশ্বিনের মত তুখোড় ইউটিউবার হতেও সবাই পারে না। উনি পারেন। সুতরাং এই ধাষ্টামো কেন মেনে নেবেন?
অশ্বিন এভাবে বিদায় জানিয়ে আরেকটা জরুরি কাজও করে গেলেন। তাঁরই বয়সী রোহিত আর বিরাটের নির্লজ্জতা উন্মোচিত করে দিলেন। দেশের মাঠেও নিউজিল্যান্ডের স্পিনাররা এসে বেশি উইকেট নিয়ে চলে যাচ্ছেন মানে সূর্যাস্তের দিকে যাত্রা যে শুরু হয়ে গেছে সেটা বোঝামাত্রই আর পরের হোম সিরিজের জন্য অপেক্ষা করলেন না অশ্বিন। চলতি সিরিজের পরের দুটো টেস্ট মেলবোর্ন আর সিডনিতে। শোনা যাচ্ছে মেলবোর্নে নাকি স্পিনের দরকার বেশি পড়বে প্রথম তিন টেস্টের তুলনায়, আর সিডনি তো ঐতিহাসিকভাবেই অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে স্পিনারবান্ধব পিচ। তার জন্যেও দাঁড়ালেন না। অথচ রোহিত আর বিরাট প্রায় পাঁচ বছর ধরে পণ করে আছেন, যতক্ষণ না কেরিয়ার ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে ততক্ষণ খেলে যাবেন।
২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজে চূড়ান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরে শচীন তেন্ডুলকর সম্পর্কে কপিলদেব কিন্তু টিভি স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন ‘জিন্দগি ঔর ভি হ্যায়’। অর্থাৎ শচীনের বোঝা উচিত যে ক্রিকেটের বাইরেও জীবন আছে। অথচ নিজের দেশের মাঠে রোহিত, বিরাটের নাকানি চোবানি খাওয়া দেখেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাক্তন বলেননি যে ওদের এবার অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে।
ভারতীয় বোলিংয়ের মাঝারিয়ানার আলোচনা যেখানে শেষ হয়েছিল, ব্যাটিংয়ের মাঝারিয়ানার আলোচনা সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। অর্থাৎ রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজা থেকে। বোলার হিসাবে এঁদের মাঝারিয়ানা আগের লেখায় দেখিয়েছি, কিন্তু ভারতীয় দলের মেগাস্টার ব্যাটারদের মাঝারিয়ানা আরও সরেস। এতটাই সরেস যে এই দুজনের ব্যাটের হাত সাধারণ বোলারদের তুলনায় অস্বাভাবিক ভাল না হলে নিউজিল্যান্ড সিরিজের লজ্জায় ভারতকে অনেক আগেই পড়তে হত। কিন্তু ভারত এমন এক দেশ যেখানে ব্যাটারদের সাত খুন মাফ। তাই বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মারা বছরের পর বছর রান না করেও কলার তুলে ঘুরতে পারেন। ভাগ্যিস নিউজিল্যান্ড ৩-০ করে দিয়ে গেছে। ওয়াংখেড়ের ‘ডেড রাবার’ যদি কোনোমতে ঋষভ পন্থ জিতিয়ে দিতেন, তাহলে এই যে এখন দীনেশ কার্তিকের মত প্রাক্তনরা ঢোঁক গিলে বিরাট, রোহিতকে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে বলছেন – এটুকুও হত না।
দেশে, বিদেশে গত এক যুগ অধিনায়ক মহেন্দ্র সিংহ ধোনি থেকে বিরাট হয়ে রোহিতের আমল পর্যন্ত ভারতীয় ব্যাটিংকে বারবার চরম লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে লোয়ার অর্ডার ব্যাটিং। তার অনেকখানি কৃতিত্ব অশ্বিন আর জাদেজার। বস্তুত গ্যারি সোবার্স, জাক কালিস, ইয়ান বোথাম, কপিলদেব, ইমরান খান, রিচার্ড হেডলির মত কিংবদন্তি অলরাউন্ডারদের বাদ দিলে টেস্টে অশ্বিন আর জাদেজার মত অতগুলো উইকেটের সঙ্গে এত রান করা ক্রিকেটার খুঁজে পাওয়া ভার। ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের কাছে ঘরের মাঠে সিরিজ হারার পর থেকে এই নিউজিল্যান্ড সিরিজে হারের মাঝের যে সময়টা নিয়ে বিস্তর গর্ব আমাদের, সেই সময়কালের প্রায় সমস্ত স্মরণীয় জয় এবং ড্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন ভারতের নিচের দিকের ব্যাটাররা। বিশেষত শেষ ৫-৬ বছরে উইকেটরক্ষক পন্থ আর বোলাররাই ভারতের হয়ে ব্যাট হাতে সবচেয়ে ধারাবাহিক। এমনকি ২০২০-২১ মরশুমে ব্রিসবেনের গাব্বায় যে জয় নিয়ে আমাদের যারপরনাই গর্ব, সেই টেস্টেও ব্যাট হাতে রোহিতের অবদান ছিল ৪৪, ৭। বিরাট সেই টেস্টে খেলেননি। প্রথম ইনিংসে শুভমান গিল, পূজারা, রাহানে, মায়াঙ্ক আগরওয়াল – কেউই সুবিধা করতে পারেননি। ওয়াশিংটন সুন্দর আর শার্দূল ঠাকুর জোড়া অর্ধশতরান না করলে অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসেই বিরাট লিড পেয়ে যেত। দ্বিতীয় ইনিংসেও গিল (৯১) আর পূজারার (৫৬) লড়াই বৃথা যেত পন্থ (অপরাজিত ৮৯) আর ওয়াশিংটন (২২) না থাকলে।
চট করে প্রথম চার-পাঁচটা উইকেট পড়ে যাবে। তারপর কোনো একজন মিডল অর্ডার ব্যাটার অশ্বিন, জাদেজা বা অন্য বোলারদের সঙ্গে নিয়ে ভদ্রস্থ রান তুলে দেবেন বা ম্যাচ জিতিয়ে দেবেন, নিদেনপক্ষে হার বাঁচিয়ে দেবেন – এটাই নিয়ম হয়ে গেছে ভারতীয় ক্রিকেটে। পৃথিবীর সর্বত্র, যে কোনো বোলিংয়ের বিরুদ্ধে, এমনকি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও। অথচ এবার ৩-০ হওয়ার পরে এমন ভান করা হচ্ছে যেন স্রেফ স্পিন খেলতে না পেরেই আমাদের এই অবস্থা হয়েছে এবং ভারি অপ্রত্যাশিত একটা ব্যাপার ঘটেছে। অথচ গত কয়েক বছরে ভারতের বারবার ঘটে চলা ব্যাটিং ব্যর্থতা খেয়াল করলে বোঝা যায় – এটাই প্রত্যাশিত ছিল। আগে কেন ঘটেনি সেটাই আশ্চর্যের।
বেশি পিছোতে হবে না। যে বাংলাদেশকে দুদিনে হারিয়ে দিয়েছি বলে কদিন আগেই পেশি ফোলালাম আমরা, তাদের সঙ্গেই সেপ্টেম্বরে চেন্নাইতে প্রথম টেস্টের প্রথম দিন সকালে ৯৬ রানে চার উইকেট চলে গিয়েছিল আমাদের। তথাকথিত বিশ্বসেরা ওপেনার রোহিত আর তথাকথিত সর্বকালের সেরা ব্যাটার কোহলি আনকোরা হাসান মাহমুদের সুইং সামলাতে না পেরে ছখানা করে রান করে প্যাভিলিয়নের পথ ধরলেন। গিল তো খাতাই খুলতে পারলেন না। পন্থ ৩৯ রান করেছিলেন, সুপ্ত প্রতিভাসম্পন্ন কে এল রাহুল আবার ব্যর্থ। সেদিনও জাদেজা ৮৬ আর অশ্বিন শতরান না করলে শ দুয়েক রানেই গুটিয়ে যেত ভারতের ইনিংস। বিপক্ষ দলের মান বাংলাদেশের চেয়ে ভাল হলে কী হত সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেল নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বেঙ্গালুরুর প্রথম টেস্টে। প্রথম দিন বৃষ্টিতে খেলা না হওয়ার পর দ্বিতীয় দিন জোরে বোলিং সহায়ক আবহাওয়ায় ম্যাট হেনরি আর বাচ্চা ছেলে উইলিয়াম ও’রুর্ক ৪৬ রানে গুটিয়ে দিলেন ভারতের ইনিংস। স্কোরবোর্ড জুড়ে শূন্য আর দুইয়ের ছড়াছড়ি। রোহিত সুইং সামলাতে পারবেন না বুঝে স্টেপ আউট করে মারতে গিয়ে দুই রানে বোল্ড, আর কোহলি দীর্ঘকায় ও’রুর্কের বাউন্স সামলাতে না পেরে লেগ স্লিপের হাতে বল জমা দিয়ে শূন্য রানে আউট। দ্বিতীয় ইনিংসের ভাল ব্যাটিং ইনিংস হার বাঁচানোর কাজটুকু করতে পেরেছিল। তাও রোহিত যেভাবে আউট হলেন, তাতে বোঝা যায় তিনি সেই স্তরে পৌঁছেছেন যেখানে শরীর চলে তো মাথা কাজ করে না। নইলে নিজের ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ স্ট্রোকে মুগ্ধ হয়ে থেকে বলটা গড়িয়ে উইকেটে যাচ্ছে কিনা তা খেয়াল করতে ভুলে যাবেন কেন?
ভারতীয় দল এবার অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছে বর্ডার-গাভস্কর ট্রফির অঙ্গ হিসাবে পাঁচখানা টেস্ট খেলতে। অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। তার একটা বড় কারণ – দীর্ঘ সময় ধরে ব্যর্থ কোনো ক্রিকেটারকে প্রতিভাবান, বা সম্ভাবনাময়, বা সিনিয়র, বা অধিনায়ক, বা রেকর্ড করবে – এই অজুহাতে তারা বয়ে বেড়ায়নি কোনোদিন। বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক স্টিভ ওয়কেও ২০০৩ বিশ্বকাপের একবছর আগে একদিনের দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, কারণ তাঁর বয়স তখন ৩৭। ফর্ম নেহাত খারাপ ছিল না, অর্থাৎ বর্তমান ছিল, কিন্তু ভবিষ্যৎ ছিল না। আর এদেশে আমরা কী করছি? স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ৩৭ বছরের রোহিতের না শরীর চলছে, না মাথা ঠিকমত কাজ করছে (সদ্যসমাপ্ত সিরিজে অধিনায়কত্বে অজস্র ভুলও স্মর্তব্য)। তাঁর চেয়ে বছর দেড়েকের ছোট বিরাটও সোজা ফুলটসে ক্রস ব্যাট চালিয়ে বোল্ড হচ্ছেন, বেশিক্ষণ ক্রিজে টিকতেই পারছেন না। অথচ এতদিনে এঁদের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ওসব পরামর্শ ৩০-৩২ বছরের ব্যাটারদের দিতে হয়, কারণ তাঁদের বয়স অনুযায়ী খেলা বদলে নিয়ে ফিরে আসার সময় থাকে। রোহিত, বিরাটের বয়সটা সটান বলে দেওয়ার সময় – বাপু, এবার মানে মানে বিদায় হও। কিন্তু আমাদের বিশেষজ্ঞরা, সাংবাদিকরা, নির্বাচকরা – কেউ সেকথা বলবেন না।
কোনোদিনই যে কেউ বলতেন না তা কিন্তু নয়। ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজে চূড়ান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরে শচীন তেন্ডুলকর সম্পর্কে কপিলদেব কিন্তু টিভি স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন ‘জিন্দগি ঔর ভি হ্যায়’। অর্থাৎ শচীনের বোঝা উচিত যে ক্রিকেটের বাইরেও জীবন আছে। আর ঠোঁটকাটা জিওফ্রে বয়কট আরও সরাসরি বলেছিলেন ‘হি শুড ইম্প্রুভ অর রিটায়ার’। মানে উন্নতি করতে না পারলে ওর অবসর নেওয়া উচিত। অথচ নিজের দেশের মাঠে রোহিত, বিরাটের নাকানি চোবানি খাওয়া দেখেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাক্তন বলেননি যে ওদের এবার অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে। বরং বলা হচ্ছে – কে জানে! হয়ত অস্ট্রেলিয়ার পিচে ওদের সুবিধাই হবে। এই আজগুবি তত্ত্বটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সব মহল থেকে বলা হচ্ছে, ভারতীয় ব্যাটাররা স্পিন খেলতে ভুলে গেছে। কথাটা সত্যি। কিন্তু ভাবখানা এমন, যেন জোরে বোলিং আমাদের ব্যাটাররা চমৎকার খেলেন।
অস্ট্রেলিয়ায় রোহিতদের স্বাগত জানাতে বসে আছেন মিচেল স্টার্ক, জশ হেজলউড আর প্যাট কামিন্স। এই অস্ট্রেলিয়াতেই গত সফরে অ্যাডিলেডে ভরদুপুরে ৩৬ অল আউট হয়ে গিয়েছিলেন আমাদের বিশ্বসেরা, সর্বকালের সেরা প্রমুখরা। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়েছিল মেলবোর্নে পরের টেস্টে অস্থায়ী অধিনায়ক রাহানের শতরানের পাশে জাদেজার অর্ধশতরানের জন্যে। তবে তারপরেও সিডনিতেই ভারত হেরে যেত দুজন ক্রিকেটার অতিমানবিক ইনিংস না খেললে। একজনের নাম হনুমা বিহারী, অন্যজন সেই অশ্বিন। প্রথম জন পায়ে চোট নিয়ে দৌড়তে পারছিলেন না, দ্বিতীয় জন পিঠের ব্যথায় কাবু ছিলেন। সেভাবেই দুজনে মিলে মোট ২৮৯ খানা বল, অর্থাৎ প্রায় ৫০ ওভার, কেবল ব্লক করে আর বল ছেড়ে অস্ট্রেলিয়াকে আটকে দিয়েছিলেন। অন্য যে কোনো দেশে ওই টেস্টের পর থেকে যে কোনো ম্যাচে নির্বাচন সমিতির সভা শুরু হত বিহারীর নামটা প্রথমে লিখে। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট কেবল ক্রিকেটিয় যুক্তিতে চলে না। তাই তারপর বিহারী খেলেছেন আর মাত্র চারখানা টেস্ট। সেগুলোতে তাঁর রান যথাক্রমে ২০, অপরাজিত ৪০, ৫৮, ৩১, ৩৫, ২০, ১১। মানে অসাধারণ নয়, কিন্তু একেবারে ফেলে দেওয়ার মতও নয়। কিন্তু উনি তো আইপিএলে খেলতে পারেন না, পকেটে বিজ্ঞাপনী চুক্তিও নেই। অতএব ২০২২ সালের পর থেকে তিনি আর আলোচনায় নেই। ওই গর্বের সিরিজ জয়ে কিন্তু ব্যাটিংয়ের দুই মহাতারকার অবদান যৎসামান্য। কোহলি একটা ম্যাচ খেলে দুই ইনিংস মিলিয়ে ৭৮ রান করেছিলেন আর রোহিত দুটো ম্যাচ খেলে সোয়া বত্রিশ গড়ে ১২৯ রান। ওই সিরিজে ব্যাট হাতে নায়ক ছিলেন পন্থ আর পূজারা, সঙ্গতে গিল। পূজারার গড় ছিল মোটে ৩৩.৮৭। কিন্তু দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়া আর ভারতের মধ্যে, খেলেছিলেন ৯২৮ খানা বল।
মাঝারি শব্দটা ব্যবহার করলে আবার আমাদের দেশের ক্রিকেটতারকাদের ভক্তরা বেজায় রেখে যান। তার উপর রোহিত আর কোহলির ভক্তকুল রীতিমত সহিংস। বছর কয়েক আগে এক কোহলিভক্ত তার রোহিতভক্ত বন্ধুর সঙ্গে তর্কাতর্কি করতে করতে বন্ধুটিকে খুনই করে ফেলে শেষপর্যন্ত। তাই এঁদের মাঝারি বলে প্রমাণ করতে গেলে আটঘাট বেঁধে এগোতে হবে। আগে রোহিতের ব্যাপারটাই আলোচনা করা যাক। কারণ একে টেস্টে তাঁর রান বিরাটের চেয়ে অনেক কম, তার উপর তাঁকে বিশ্বসেরা ওপেনার বলে দাবি করলেও সর্বকালের সেরাদের পাশে বসায় না আমাদের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র। যাঁকে বসায় তাঁকে নিয়ে তো আরও বেশি শব্দ খরচ করতে হবে।
বস্তুত, আজ ফর্ম পড়ে গেছে বলে নয়, রোহিত কোনোদিনই টেস্টে অসাধারণ ছিলেন না। যে যুগে পিচ ঢাকা থাকত না, হেলমেট ছিল না, সে যুগের কথা আলাদা। কিন্তু নয়ের দশকের পর থেকে পঞ্চাশের ঘরে গড় না থাকলে কোনো ব্যাটারকে বিশ্বসেরাদের মধ্যে ধরা হয় না। রোহিতের গড় ৬৪ খানা টেস্ট খেলে ফেলার পরেও ৪২.২৭-এ আটকে আছে। বিদেশে তাঁর ব্যাটিংকে মাঝারি বললেও বাড়াবাড়ি করা হবে। এগারো বছর খেলে গড় ৩৩.৬০, শতরান মাত্র দুটো। তার একটা আবার আজকের দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজে। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকায় কখনো তিন অঙ্কে পৌঁছতে পারেননি। ইংল্যান্ডে শতরান করলেন ২০২১ সালে পৌঁছে। পাঁচ টেস্টের ওই সিরিজটা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছিল। কোভিড বিধি মানা হয়েছে না হয়নি, আইপিএল খেলার তাড়া আছে না নেই – এই নিয়ে এক আশ্চর্য বিতর্কে বিরাট-শাস্ত্রীর দল দেশে ফেরত চলে আসে শেষ টেস্ট না খেলেই। পরের বছর ফেরত যায় পঞ্চম টেস্ট খেলতে এবং হেরে বসে। কিন্তু বলার কথাটা হল, ওই সিরিজেও বারবার ভারত ব্যাটিং বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। হেডিংলির তৃতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৭৮ অল আউট হয়ে গিয়েছিল, ওভালে চতুর্থ টেস্টের প্রথম ইনিংসেও ২০০ পেরোতে পারেনি।
টেস্ট ক্রিকেটে রোহিতের শুরুটা নিঃসন্দেহে সাড়া জাগিয়ে হয়েছিল। অভিষেকে ইডেন উদ্যানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ১৭৭, পরের টেস্টে ওয়াংখেড়েতেও শতরান। তবে দুটোই ছ নম্বরে ব্যাট করে। তারপর দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছেই কিন্তু দেখা গেল রোহিত অকুল পাথারে পড়েছেন। জোহানেসবার্গ আর ডারবানের চারটে ইনিংসে দুবার বোল্ড, একবার এলবিডব্লিউ। পরের দেড় বছরে নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ঘুরে তিনি মাত্র চারটে অর্ধশতরান করেন। তৃতীয় টেস্ট শতরান আসে ২০১৭ সালে নাগপুরে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে। অন্য কেউ হলে ততদিনে দল থেকে বাদ পড়ে যেতেন। কিন্তু ভারতের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের সকলেই রোহিতের ‘ট্যালেন্ট’ সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। তার উপর সাদা বলের ক্রিকেটে, বিশেষত আইপিএলে, তিনি ততদিনে তারকা। ফলে দামি ব্র্যান্ড হয়ে গেছেন। উপরন্তু ধোনি শিখিয়েছিলেন ‘ইনটেন্ট’ নামক একটা পবিত্র জিনিস ব্যাটিংয়ে থাকতেই হবে। শাস্ত্রী আর বিরাটও মনে প্রাণে তা বিশ্বাস করতেন। ওটা না থাকার যুক্তিতে পূজারা, রাহানেকে বারবার বাদ দিয়েছেন। রোহিতের জিনিসটা ছিল। তাই তিনি অপরিহার্য।
যা-ই হোক, ২০১৭ সালের সেই শ্রীলঙ্কা সিরিজটায় রোহিত আরও দুটো অর্ধশতরান করেন। তারপর কিন্তু আবার খরা। সেবছর আর একটামাত্র অর্ধশতরান করেন বছরের শেষ টেস্টে মেলবোর্নে। তাঁকে দিয়ে যে চলবে না তার এর থেকে বেশি প্রমাণের দরকার হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যিনি ব্র্যান্ড এবং যাঁর ট্যালেন্ট আর ইনটেন্ট আছে তাঁকে তো যে করেই হোক দলে রাখতে হবে। অতএব নতুন বছরে রোহিত হয়ে গেলেন ওপেনার। তখন ভারত সফরে এসেছে ভাঙাচোরা দক্ষিণ আফ্রিকা। সে দলে আন্তর্জাতিক মানের বোলার বলতে কাগিসো রাবাদা। অ্যানরিখ নর্খের সবে প্রথম সিরিজ। রোহিত প্রথম টেস্টের দুই ইনিংসেই বেধড়ক পিটিয়ে শতরান করলেন। দ্বিতীয় টেস্টে পুনেতে রান পাননি, রাঁচিতে পৌঁছেই একেবারে ২১২। আর পায় কে? বলা শুরু হয়ে গেল, একদিনের ক্রিকেটের মত টেস্টেও উনি বিশ্বসেরা ওপেনার। এমন আর দুটো হয় না। দুঃখের বিষয়, রোহিতের এরপরের রানের বহর কিন্তু সেকথা বলছে না। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে দুটো টেস্টে সর্বোচ্চ রান ২১। অতিমারী পেরিয়ে যখন আবার টেস্ট খেললেন অস্ট্রেলিয়ায়, চারটে ইনিংসে একবার ৫০ পেরোলেন। দেশে ফিরে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সাত ইনিংসে একটা বড় শতরান আর একটা অর্ধশতরান। তারপর থেকে কেবলই মাঝেমধ্যে একটা শতরান বা গোটা দুয়েক অর্ধশতরানের কাহিনি। বাকিটা ব্যর্থতার গল্প।
গত এক বছরে রোহিতকে দেখে মনে হয়, তিনিও জানেন যে বয়সের কারণে তাঁর লম্বা ইনিংস খেলার ক্ষমতা কমেছে। রিফ্লেক্স তো কমেছেই। অতএব তিনি এখন ঠিক করে নিয়েছেন অনেক বেশি ঝুঁকি নেবেন, তাতে যা রান হয়। এই পরিকল্পনা টি টোয়েন্টি এবং একদিনের ক্রিকেটে কার্যকরী, কারণ সাদা বল সুইং করে লাল বলের চেয়ে কম এবং ফিল্ডিং দলও অনেক বেশি রক্ষণাত্মক ফিল্ড সাজাতে বাধ্য। উপরন্তু নিজের দলের পক্ষেও এই কৌশল উপকারী। গতবছর ভারতের বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছবার পিছনে রোহিতের ঝোড়ো ইনিংসগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু ও জিনিস টেস্টে ভাল বোলিংয়ের বিরুদ্ধে যে চলবে না তা নিউজিল্যান্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। এমনকি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও ওই কৌশল খাটেনি। চারটে ইনিংসে রোহিতের সর্বোচ্চ রান ছিল ২৩। এ যদি মাঝারিয়ানা না হয়, তবে মাঝারিয়ানা বলে কাকে? কোনো দলের ওপেনার তথা অধিনায়ক এত মাঝারি হলে সে দলের কপালে অনেক দুঃখ। সেই ধোনির আমল থেকে শাস্ত্রী বুক ফুলিয়ে বলে গেছেন, এই দলটা নাকি ভারতের সেরা সফরকারী দল। অথচ এই আমলে না নিউজিল্যান্ডে সিরিজ জেতা হয়েছে, না ইংল্যান্ডে – যা অতীতে একাধিক ভারতীয় দল করে দেখিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ধোনির দল অন্তত একবার সিরিজ ড্র রেখে আসতে পেরেছিল। কোহলির দল দুবার সুযোগ পেয়ে সেটুকুও করতে পারেনি। এমন নড়বড়ে ওপেনার থাকলে পারা প্রায় অসম্ভব। অথচ ঘরোয়া ক্রিকেটে সাই সুদর্শন বা অভিমন্যু ঈশ্বরনরা যতই রান করুন, তাঁদের দলে নেওয়া যাবে না। রোহিতের মত ব্র্যান্ডের মূল্য কি আর রান দিয়ে মাপা চলে?
বিরাট কিন্তু মাঝারিয়ানায় রোহিত-সুলভ নন। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর শুরুটা রোহিতের মত হয়নি। টেস্ট জীবনের প্রথম বারোটা ইনিংসে দেশের মাঠে দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দুটো অর্ধশতরান ছাড়া বলার মত কিছুই ছিল না। ২০১১-১২ মরশুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রথম দুটো টেস্টে রান করতে না পেরে প্রায় বাদ পড়ে গিয়েছিলেন। পার্থ টেস্ট ছিল শেষ সুযোগ। সেখানে দুই ইনিংসেই রান করেন, পরের টেস্টে অ্যাডিলেডে প্রথম শতরান। তারপর থেকে সাফল্যের লেখচিত্র ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছিল। এটা পরিসংখ্যানের যুগ, সোশাল মিডিয়ার যুগ। তরুণ ক্রিকেটপ্রেমীরা মনে করেন ক্রিকেটারদের উৎকর্ষ, অপকর্ষ পুরোটাই স্কোরবোর্ডে আর ডেটা অ্যানালিটিক্সে ধরা থাকে। নেভিল কার্ডাস লিখেছিলেন – স্কোরবোর্ড একটা গাধা। আমাদের দেশে তাঁর এমন কোনো উত্তরসূরি নেই যিনি ধরিয়ে দেবেন, যে স্কোরবোর্ড একেবারে গাধা না হলেও তার দৈর্ঘ্য প্রস্থের সীমাবদ্ধতা আছে। ক্রিকেট খেলার মানবিক প্রয়াসের দিকটার অনেককিছুই স্কোরবোর্ডের পরিসরে ধরা পড়ে না। ফলে গোটা কেরিয়ারে অস্তগামী মিচেল জনসন ছাড়া একজনও সারাক্ষণ ৯০ মাইল+/ঘন্টার বোলারকে না খেললেও, নাথান লায়ন ছাড়া কোনো উঁচু দরের স্পিনারকে খেলতে না হলেও বিরাটকে ভিভিয়ান রিচার্ডস, শচীন, রিকি পন্টিংদের পাশে বসানো হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞাপন জগৎ বুদ্ধিমানের মত সর্বকালের সেরার (GOAT) মুকুটও সোশাল মিডিয়ার সাহায্যে বিরাটের মাথায় পরিয়ে দিয়েছিল।
খেয়াল করা হয়নি, যে কোনো ব্যাটারের অন্যতম কঠিন পরীক্ষাগার ইংল্যান্ডে বিরাট একাধিকবার সফরে গিয়েও মূলত অসফল। সতেরোটা টেস্ট খেলে মাত্র দুটো শতরান, গড় মাত্র ৩৩.২১। আসলে বিরাটের সাফল্যকে বিরাটতর করে তুলেছিল তিনটে জিনিস – ১) একদিনের ক্রিকেটে শতরান করে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় শচীনের রেকর্ডকে ধাওয়া করা, ২) ২০১৩-১৪ মরশুমের অস্ট্রেলিয়া সফরের অপ্রতিরোধ্য ফর্ম থেকে শুরু করে বছর পাঁচেক টেস্টে রানের বন্যা, ৩) এই সময়কালে তাঁর অধিনায়কত্বে যশপ্রীত বুমরা, মহম্মদ শামি, অশ্বিন-জাদেজার কল্যাণে দেশ বিদেশে শচীন, রাহুল দ্রাবিড়দের যুগের চেয়ে ভারতের বেশি ম্যাচ জেতা। লোভনীয় ব্র্যান্ডকে সে যত বড় তার চেয়েও বড় করে দেখানোর যে প্যাঁচ পয়জার চলে এবং এখনো চলছে তা নিয়ে আর আলাদা করে বলব না, কারণ তা পৃথক আলোচনা দাবি করে। সে আলোচনা আগেই করেছি এই লেখায়। কিন্তু ঘটনা হল, বিরাটের সমকক্ষ অন্তত তিনজন ব্যাটার যে তাঁর নিজের প্রজন্মেই রয়েছেন – সেকথাকে পাত্তা না দিয়ে বিরাটকে আকাশে তুলে দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে তাঁর দ্রুত পতন হয়েছে গত ৫-৬ বছরে। আগেই বলেছি, নয়ের দশকের পর থেকে অন্তত ৫০ গড় না হলে আর বিশ্বসেরাদের দলে ঢোকার ছাড়পত্র পাওয়া যায় না। সর্বকালের সেরা হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। বিরাটের গড় এখন নামতে নামতে ৪৭.৮৩। নিজের প্রজন্মের প্রতিদ্বন্দ্বী জো রুট প্রায় ১৩,০০০ রান করে ফেলেছেন, গড় ৫১.০১। স্টিভ স্মিথও অতিমারীর আগের ফর্মে নেই, তবু তাঁর গড় ৫৬.৯৭ – এখনো অসাধারণ। মোট রানের দিক থেকে একমাত্র কেন উইলিয়ামসনই এখনো বিরাটের থেকে পিছিয়ে, তবে তিনি ম্যাচও খেলেছেন কম। গড় যেহেতু ৫৪.৪৮, তাই বিরাটকে টপকে যাওয়া সময়ের অপেক্ষা।
তবে এসব পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় কথা হল, সেই ২০১৯ সালের নভেম্বরে ইডেন উদ্যানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শতরান করার পর থেকে বিরাটের ফর্ম সেই যে পড়তে শুরু করেছে, সে পতন থামছে না। তার ফল ভুগছে দল। ওই শতরানের পর থেকে ৩৪ খানা টেস্টের ৬০ ইনিংসে তিনি মাত্র ১৮৩৮ রান করেছেন ৩১.৬৮ গড়ে। শতরান মাত্র দুটো, অর্ধশতরান নটা, পাঁচবার শূন্য রানে আউট হয়েছেন। উপরন্তু প্রমাণ হয়ে গেছে যে ঘূর্ণি উইকেটে সাধারণ স্পিনারদের মাথায় চেপে বসার ক্ষমতাও তাঁর নেই। তাইজুল ইসলাম থেকে মিচেল স্যান্টনার – সবাই বিরাটের পক্ষে একইরকম দমবন্ধ করা, বিপজ্জনক। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাদা বলের ক্রিকেটেও তাঁকে বেঁধে রাখতে স্পিনারদের ব্যবহার করা শুরু করেছে দলগুলো। সুইং সামলাতেও যে বিরাট তেমন দড় নন তা তাঁর ইংল্যান্ডের রেকর্ড প্রমাণ করে। আজকাল তো দেশের মাঠেও ঘেমে উঠছেন বেঙ্গালুরুর মত। এই বয়সে শচীন কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ডেল স্টেইন আর মর্নি মর্কেলের বিরুদ্ধে তিনটে টেস্টে দুটো শতরান করেছেন। সুনীল গাভস্কর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জীবনের শেষ টেস্টে এমন একটা ইনিংস খেলেছেন, যাকে বলা হয় ঘূর্ণি পিচে স্পিন খেলার টিউটোরিয়াল।
সোজা কথা হল, যেরকম ব্যর্থতার কারণে পূজারা আর রাহানেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেরকম ব্যর্থতা সত্ত্বেও বিরাট আর রোহিত এখনো নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছেন। কারণ তাঁদের মাঝারিয়ানা কেউ স্বীকার করবে না। বিশেষজ্ঞরা কেন বলছেন না? সাংবাদিকরা কেন লিখছেন না? কারণ কিন্তু এটা নয় যে ভবিষ্যতের কথা কেউ বলতে পারে না, দুই হুজুর অস্ট্রেলিয়ায় ফের রান করে দিতে পারেন। সে তো পারেনই, কিন্তু তাতে তো গত ৫-৬ বছরের টানা ব্যর্থতা মিথ্যে হয়ে যাবে না। কিন্তু ওই যে – ব্র্যান্ড মূল্য। টিভি খুললে, ওটিটি চালালে কতশত বিজ্ঞাপনে দুজনকে দেখতে পান তা খেয়াল করবেন। ক্রিকেট খেলা ভারতে যত বড় ব্যবসা, পৃথিবীর আর কোনো দেশে তত বড় নয়। ফলে অত্যন্ত মাঝারি রাহুলকে (৫৩ টেস্ট খেলে ফেলার পর গড় ৩৩.৮৭) যেনতেনপ্রকারেণ দলে রাখার চেষ্টার পিছনেও এনডর্সমেন্ট। এঁরা খেললে এঁদের বিজ্ঞাপন দেখানোর মানে থাকবে। থাকলে বিজ্ঞাপনদাতাদের টাকায় বিসিসিআইয়ের সঙ্গে যে সম্প্রচারের চুক্তি করেছে টিভি/ওটিটি নেটওয়ার্ক, তা উসুল হবে।
উপরন্তু ভারতের মাটিতে ভারতীয় দলের ম্যাচগুলোর প্রযোজনার দায়িত্বে থাকে বিসিসিআই নিজে। নিজেদের ব্র্যান্ড সম্পর্কে মন্দ কথা তারা মেনে নেবে না। অতএব ভারতীয় ক্রিকেটারদের দোষগুণ নিয়ে নির্মোহ আলোচনা করলে ধারাভাষ্যকারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে দেবে। সম্প্রচার সংস্থাকেও বাধ্য করতে পারে তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কাউকে বাদ দিতে। সে তিনি যত বড় বিশেষজ্ঞই হোন। টাকার পাহাড়ে বসে থাকা নিয়োগকর্তা বিসিসিআইয়ের কাছে গাভস্কর আর মুরলী কার্তিকের দর একই। তার উপর সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ট্রোলবাহিনী লেলিয়ে দেওয়ার কায়দাও আজকের ক্রিকেটারদের জানা আছে। সেভাবেও ধারাভাষ্যকারদের ভাতে মারা যায়। ব্যাপারটা একবার টের পেয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে, আরেকবার সঞ্জয় মঞ্জরেকর। এই কারণেই ২০১৩ সালে ইয়ান চ্যাপেল ভারতে ধারাভাষ্য দেওয়ার চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
আরেকটা কারণ হল খারাপ দৃষ্টান্ত। এই দৃষ্টান্ত তৈরি করে দিয়ে গেছেন পৃথিবীর সর্বকালের সেরা দুজন ক্রিকেটার – শচীন আর ধোনি। ২০১১ সালের ২ এপ্রিল বিশ্বকাপ জেতার পর বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে ভারতীয় দল পরপর আটটা টেস্টে হারে। স্পষ্ট বোঝা যায়, যাঁরা আছেন তাঁদের দিয়ে আর চলবে না। অথচ একমাত্র দ্রাবিড় আর ভাঙ্গিপুরাপ্পু ভেঙ্কটসাই লক্ষ্মণ ছাড়া কেউ এই সত্য মেনে নিলেন না। ওঁরা দুজন অবসর নিলেন, শচীন রয়ে গেলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শততম শতরান আর দুশোতম টেস্ট খেলার রেকর্ড করার জন্যে। উইকেটরক্ষক ব্যাটার হিসাবে, অধিনায়ক হিসাবে ব্যর্থ ধোনিকে বাঁচিয়ে দিলেন তাঁর গডফাদার এন শ্রীনিবাসন। শচীন বহাল তবিয়তে ২০১৩ পর্যন্ত খেলে গেলেন আর ধোনি অধিনায়কত্ব চালিয়ে গেলেন ২০১৩-১৪ অস্ট্রেলিয়া সফর পর্যন্ত। তারপর টেস্ট সিরিজের মাঝখানে দুম করে অবসর নিলেন।
যাঁরা আট টেস্টে হারের পরেও ধোনিকে রেখে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন, তাঁরা সেইসময় বলতেন ‘এখন ছাড়লে ক্যাপ্টেন হবে কে?’ সত্যিই তেমন কেউ ছিলেন না, কারণ প্রজন্ম বদলের কোনো পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়নি বোর্ড। তাই ধোনি বহাল তবিয়তে যতদিন ইচ্ছা খেলে যেতে পেরেছিলেন। এখন ভারতীয় ক্রিকেট ফের সেই জায়গায় এসে পৌঁছেছে। যে রাহুলকে বছর দুয়েক আগে ভবিষ্যৎ অধিনায়ক বলে ভাবা হচ্ছিল, তিনি এখন দলে নিজের জায়গা ধরে রাখতেই খাবি খাচ্ছেন। ‘এ’ দলের হয়ে খেলতে নেমেও হাস্যকর কায়দায় আউট হচ্ছেন। গিল ধারাবাহিকতা হারিয়েছেন, পন্থ প্রতিভাবান কিন্তু এখনই নেতৃত্ব দিতে কি তৈরি? কেউ নিশ্চিত নয়।
অর্থাৎ গত এক যুগে এত জয় সত্ত্বেও ভারতীয় ক্রিকেট যে তিমিরে সেই তিমিরেই আছে। ব্র্যান্ড সর্বস্বতা, বিশেষত মাঝারিয়ানা সর্বস্বতা, এভাবেই প্রগতি আটকায়।
ডেমোক্রেসিতে গভমেন্টই সকলের মাইবাপ। কিন্তু কজনের বাপই গভমেন্ট হয়? যাদের হয় তারা এতকাল হাতে মাথা কেটে এসেছে, আর এখন একজন একটু সব ছবিতে থাকতে চেয়েছে বলে আপনারা তাকে ট্রোল করছেন! এমনি এমনি তো আর সাহেবরা বলেনি যে ভারত পরশ্রীকাতর লোকেদের দেশ। কোথায় বলেছে সেকথা জিজ্ঞেস করবেন না। একবার যখন লিখেছি সাহেবরা বলেছে, তখন অবশ্যই বলেছে। না বলে থাকলেও আপনাদের কীর্তিকলাপ দেখে শিগগির বলবে। সোশাল মিডিয়া হয়ে এই হয়েছে ঝামেলা। সকলেরই হাতে একখানা ফোন আছে, ফলে কারোর কোনো ণত্ব ষত্ব জ্ঞান নেই। যার যা সম্মান তাকে যে সেটা দিতে হয়, সেই বোধ নেই। যিনি এত বড় বোর্ডটাকে কাঁধে করে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, তিনি একটু বিশ্বকাপে হাত দিয়েছেন বলে সকলে যা খুশি তাই পোস্ট করে চলেছে। অবশ্য এ দেশের লোকের ধর্মই তো এই। যে দেশে প্রধানমন্ত্রীকেই লোকে সম্মান দেয় না, মিম বানায়; সে দেশে ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্টকে আর কে সম্মান দেবে?
অ্যাঁ, কী বলছেন? জয় শাহ প্রেসিডেন্ট নন, সেক্রেটারি? প্রেসিডেন্ট কে তাহলে? রজার বিনি? আরে ওসব বিনি পয়সার লোককে অত পাত্তা দেওয়ার কী আছে? তাছাড়া তেনাকে তো দেখাও যায় না চট করে, কথা-টথাও শোনা যায় না। ক্রিকেট কি যক্ষপুরী নাকি, যে রজারকে রক্তকরবীর রাজা বলে মেনে নিতে হবে? ওসব ছাড়ুন। মানিব্যাগ যার কাছে, সে-ই হল আসল রাজা। আজ দেশের ক্রিকেট চালাচ্ছেন, এশিয়ার ক্রিকেট চালাচ্ছেন, অন্যদের ঘাড় ধরে দুনিয়ার ক্রিকেটও নিজের মর্জি মত চালিয়ে নিচ্ছেন। কাল হয়ত বসেই পড়বেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের চেয়ারে। যে দেশে কানার নাম হয় পদ্মলোচন, সে দেশে বিশ্বকাপে জয় পাওয়া এবং বিশ্বক্রিকেটের শাহ হতে চলা লোককে এত লোক গাল দিচ্ছে দেখলে মানুষটার প্রতি মায়া হয়। মানুষটার কতখানি মায়া দয়া সে খবর আপনারা রাখেন? এই যে হারিকেন বেরিলে আপনাদের প্রিয় ক্রিকেটাররা ওয়েস্ট ইন্ডিজে আটকে পড়েছিলেন, চার্টার্ড ফ্লাইট পাঠিয়ে তাঁদের উড়িয়ে আনল কে? ওই শর্মা, থুড়ি শাহই তো। শুধু কি তাই? ক্রিকেটাররা কে কোথায় কার সঙ্গে কানাকানি করলেন, কার সঙ্গে চুপিচুপি দেখা করলেন, ডিনার খেতে গেলেন, খেয়ে হোটেলে নিজের ঘরে গেলেন নাকি তার ঘরে গেলেন – এসব জরুরি ইনফর্মেশন আপনাদের ফোনে পৌঁছে দেন যে ধুরন্ধর জার্নালিস্টরা, তাঁদের পর্যন্ত উড়িয়ে এনেছেন বিসিসিআই সেক্রেটারি জয়। এমন লোকের নামে জয়ধ্বনি না দিয়ে তাকে নিয়ে চালাক চালাক জোক ক্র্যাক করা! এসব ধম্মে সইবে? নেহাত লোকটা বায়োলজিকাল, তাই অভিশাপ-টাপ দিতে পারে না। তা বলে লোকটাকে নাহক ছোট করবে দেশসুদ্ধ ক্রিকেটপ্রেমী মিলে?
বলা হচ্ছে যশপ্রীত বুমরার হাত থেকে নাকি কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে জয় কাপটা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন রোহিত শর্মার সঙ্গে ছবি তুলবেন বলে।
Jay Shah is constantly seen snatching the trophy from players just to be seen in the camera frame holding it.
This nepotism product wont even qualify for the BCCI's peon post if he weren't Amit Shah's son, look at the audacity of this langur
কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে তাতে? বছর বছর আইপিএলের ম্যাচ বাড়িয়ে খেলোয়াড়দের আরও ধনী করার ব্যবস্থা করছেন, ফি বছর আইসিসি টুর্নামেন্টের বন্দোবস্ত করেছেন (২০১৯ – ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২১ – বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল আর ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২২ – আবার ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২৩ – বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল আর ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২৪ – আরও একবার ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২৫ – চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল) যাতে ক্রিকেটাররা বড় ট্রফি জেতার অনেক সুযোগ পান, বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে অন্য সেমিফাইনালে রিজার্ভ ডে রেখে ভারতের ম্যাচে না রাখার ব্যবস্থা করেছেন, গতবছর দেশের মাঠে বিশ্বকাপের আয়োজন করে অন্য দেশের সমর্থকদের আসার রাস্তা এমনভাবে বন্ধ করেছিলেন যে খেলোয়াড়রা গ্যালারিতে কেবল নীল সমুদ্রই দেখতে পেতেন। মানে রোহিত, বুমরারা দারুণ খেলেন তাই। যদি না-ও খেলতেন, তাহলেও তাঁদেরই হাতে ট্রফি তুলে দেওয়ার জন্যে যতটা করা সম্ভব, সবটাই শাহ করেছেন। এশিয়া কাপ থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ – সর্বত্রই করে থাকেন। এত কিছু করার পরেও যারা প্রশ্ন তোলে – এই লোকটার কী যোগ্যতা আছে কাপ হাতে নেওয়ার, তারা দেশদ্রোহী ছাড়া কী?
তাছাড়া আপনারা খেয়ালই করেন না যে আপনাদের জন্যেও মানুষটা কত করে। সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে বিশ্বকাপ হল, তবু কেমন সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে মাঝরাত অব্দি খেলা দেখে আবার পরদিন সকাল সকাল অফিস চলে গেলেন। ওদিকে যেখানে খেলা হল সেখানকার লোকেরা সাতসকালে বা ভরদুপুরে কাজকম্ম ফেলে মাঠে যেতে পারল না বলে অনেক খেলায় গ্যালারি বিজেপির ভোটের মিটিংয়ের মাঠের মত খালি গেল। শাহের বোর্ড না থাকলে আপনারই চেতনার রঙে পান্না সবুজ হতে পারে, চুনি রাঙা হয়ে উঠতে পারে আর আপনার প্রাইম টাইমে ভারতের ক্রিকেট ম্যাচ হতে পারে একেবারে অন্য গোলার্ধে – এ কি স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন? তা এত কাণ্ড যে টাকার গরমে সম্ভব হল, সে টাকার মালিককে আপনারা ফ্রেমের বাইরে রাখতে চান? নিজেদের ইচ্ছা মত টুর্নামেন্ট সাজিয়ে নেয়া নিয়ে সায়েবরা লেখালিখি করলে গোঁফে তা দিয়ে আপনারা বলেন – ‘এসব সাদা চামড়ারা অনেক করেছে। এখন আমাদের সময়, আমরা করব।’ আর এদেশের দু-একজন সাংবাদিক ভুল করে লিখে ফেললে দুর্বাসা মুনির মতন রেগে বলেন ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল।’ সত্যযুগ হলে বেচারিরা ভস্মই হয়ে যেত। তা এখন শাহের জন্যেও চাড্ডি হাততালি দিলেন না হয়।
কী দরাজ মন দেখুন তো লোকটার! আইসিসি চ্যাম্পিয়ন টিমকে দিয়েছে এদেশের কারেন্সিতে ২০ কোটি টাকা মত, আর উনি দিচ্ছেন ১২৫ কোটি। পঞ্চাশ গ্রামের টুর্নামেন্টে কোনোদিন দেখেছেন, কমিটি দিল ৫০১ টাকা আর আপনার ক্লাব দিল ৩০০১ টাকা? আহা! অমন হলে দুনিয়াটাই অন্যরকম হত মশাই। একবার ভাবুন। দুনিয়ার ফিফথ লার্জেস্ট ইকোনমির দেশ আমাদের, তাও এত লোক গরিব যে জয়ের জেঠুমণির সরকার ৮০ কোটি লোককে ফ্রিতে রেশন দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। সেই দেশের ক্রিকেট দলকে ২০ ওভারের বিশ্বকাপ জেতার জন্যে ১২৫ কোটি টাকা দিলেন জয়। কিছু লোক আবার কেমন নিন্দুক দেখুন – বলে বেড়াচ্ছে যে এটা তেলা মাথায় তেল দেয়া। একেকজনের ভাগে কোটি পাঁচেক করে পড়বে, ওর চেয়ে বেশি ওরা এনডর্সমেন্ট থেকেই পায়। এদিকে মেয়েদের আর ছেলেদের দলের ম্যাচ ফি সমান করে দিয়ে মেয়েদের ম্যাচের আয়োজনই করা হয় না। তা ওদের জন্যে কিছু ভাবলে হত। কোভিডে রঞ্জি ট্রফি বন্ধ থাকার সময়ে দিন আনি দিন খাই অবস্থা হয়েছিল অনেক ঘরোয়া ক্রিকেটারের। তাদের জন্যেও কিছু করে না জয়ের বোর্ড। আরে বাপু, মানুষটার মনটা নরম বলে কি দানসত্র খুলে বসতে হবে নাকি? যারা টাকা করার ব্যবস্থা করে তাদেরই দেয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। যে সে মাথায় তেল দিলে চলবে? তেলের যা দাম বেড়েছে।
তা ক্রিকেটাররা কি কিছু মাইন্ড করেছেন? দেখে মনে তো হল না। তাঁরা জানেন যে জয় হলেন গোপাল পাঁঠার মত। তিনি আছেন বলে আমি আছি, আপনি আছেন, রোহিত আছেন, বিরাট আছেন, বুমরা আছেন, হার্দিক আছেন। তাই লক্ষ্মী ছেলের মত তাঁরা বিভিন্ন ব্যাপারে জয়ের জেঠুমণির সরকারের পক্ষ নিয়ে পোস্ট করে দেন। আবার লক্ষ্মী ছেলের মত পোস্ট করেন না, যখন দেশের মহিলা অলিম্পিয়ানদের রাতের অন্ধকারে টেনে হিঁচড়ে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায় জয়ের বাবার পুলিস।
দেশের লোক কি কিছু মাইন্ড করেছে? মোটেও না। নিদেনপক্ষে মুম্বাইয়ের লোকেরা তো একেবারেই মাইন্ড করেনি। ১৯৮৩ সালের কথা বাদ দিন, ২০০৭ বা ২০১১ সালেও মেরিন ড্রাইভে এত লোক দেখা যায়নি উইক ডে-তে ভর সন্ধেবেলা। এই অনন্ত আনন্দধারার মধ্যে স্রেফ মুখখানা অপছন্দ বলে ছুতোয় নাতায় মিষ্টি লোকটার পিছনে লেগে অ্যাম্বিয়েন্সটা বিগড়ে দেবেন না মাইরি। কটা দিন অন্তত নিট, নেট, ব্রিজ ভাঙা, এয়ারপোর্টের ছাদ ধসে পড়ে অক্কা পাওয়া, দেশের রাজধানীতে জলের অভাবে মিনিস্টারের অনশন, অগ্নিবীর, ঠেঙিয়ে মুসলমান হত্যা – এসব পলিটিকাল কচকচি ভুলে থাকতে দিন। আচ্ছে দিন না আসুক, আচ্ছে উইন তো এসেছে। গলা ছেড়ে গেয়ে উঠুন ‘জয় জয় জয় জয় হে’।
নতুন বছরে আরও টাকা উড়বে ক্রিকেট মাঠে, কুড়ি ওভারের খেলার সঙ্গে যুক্ত হবে দশ ওভারের খেলা। নির্ঘাত আরও কমবে সাদা জামা লাল বলের ক্রিকেট, একদিনের ক্রিকেট আদৌ হবে কিনা কে জানে!
ইংল্যান্ডের প্রাক্তন জোরে বোলার স্টিফেন হার্মিসন বেজায় চটেছেন। কারণ ইংল্যান্ড নতুন বছরে পাঁচ টেস্টের সিরিজ খেলতে ভারতে পা দিচ্ছে হায়দরাবাদে প্রথম টেস্ট শুরু হওয়ার মাত্র তিনদিন আগে। হার্মিসন বলেছেন, এই কান্ড করলে ইংল্যান্ডের ৫-০ হারা উচিত। কারণ ভারত সফরে ‘এলেম, দেখলেম, জয় করলেম’ চলে না। এ বড় কঠিন ঠাঁই। হার্মিসনের মতে, ২০১২-১৩ সালে ভারত থেকে সিরিজ জিতে যাওয়া অ্যালাস্টেয়ার কুক বা কেভিন পিটারসেনকে যদি বলা হয় ইংল্যান্ড মাত্র তিনদিন আগে ভারতে যাচ্ছে, তাঁরা হাসাহাসি করবেন। যে পডকাস্টে হার্মিসন এসব বলেছেন, তার সঞ্চালক তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে দিনকাল বদলে গেছে। হার্মিসন পাত্তা না দিয়ে মন্তব্য করেন, জেতার জন্যে যা যা করতে হয় সেগুলো একটুও বদলায়নি। তাহলে ইংল্যান্ড এমন করছে কেন? তাঁর বক্তব্য, এর কারণ হল বোর্ড ক্রিকেটারদের ভয় পাচ্ছে। ইংল্যান্ড ক্রিকেট এখন সুতোর উপর ঝুলছে। বোর্ড আতঙ্কে আছে যে ক্রিকেটারদের কোনোকিছু মানতে বাধ্য করলেই তারা বোর্ডের চুক্তি ভেঙে বেরিয়ে যাবে। তাই তাদের যাবতীয় আবদার মেনে নেওয়া হচ্ছে।
২০২৪ সালে ক্রিকেট কোনদিকে যাবে তা আন্দাজ করার জন্যে হার্মিসনের এই কথাগুলোই যথেষ্ট। তিনি অবশ্য একটা ভুল করেছেন – ব্যাপারটাকে আখ্যা দিয়েছেন ‘প্লেয়ার পাওয়ার’। আসলে তো এটা খেলোয়াড়দের ক্ষমতার পরিচয় নয়, এ হল টাকার ক্ষমতার পরিচয়। একের পর এক টি টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ তৈরি হচ্ছে দেশে দেশে, আর ক্রিকেটারদের যে টাকা দেওয়া হচ্ছে তা জাতীয় দলে খেলার জন্যে কোনো দেশের বোর্ড দিতে পারবে না। এমনকি ইংল্যান্ডের বোর্ড, যারা বিসিসিআই আর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার পরেই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী বোর্ড, তারাও নয়। এমনিতেই ইংল্যান্ডের ক্রিকেটারদের ইদানীং দেশের হয়ে খেলার উৎসাহে ঘাটতি হচ্ছে। অনিচ্ছুক বেন স্টোকস আর মঈন আলিকে হাতে পায়ে ধরে ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ খেলানো হল। ফল শোচনীয়। আবার বিশ্বকাপ চলাকালীন বোর্ডের সঙ্গে কেন্দ্রীয় চুক্তির জন্যে নির্বাচিত ক্রিকেটারদের তালিকা ঘোষিত হল। তাতে নিজের নাম দেখতে না পেয়ে জোরে বোলার ডেভিড উইলি তুরন্ত বিশ্বকাপের পর জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার কথা ঘোষণা করে দিলেন। সিদ্ধান্তটা নেওয়া মোটেই শক্ত নয়, কারণ তিনি জানেন ইংল্যান্ডের হয়ে ৪৩টা টি টোয়েন্টি ম্যাচে যা খেলেছেন তাতে কোনো না কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের একটা না একটা দলে জায়গা করে নেবেনই। তাহলেই ইংল্যান্ড দলের প্রান্তিক ক্রিকেটার হয়ে যা রোজগার করতেন তার চেয়ে ঢের বেশি টাকা রোজগার করা যাবে।
এমতাবস্থায় ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের কর্তারা যদি টেস্ট দলের খেলোয়াড়দের বলতে ভয় পান, যে ভারতে সিরিজ জেতা খুব গুরুত্বপূর্ণ, তার জন্যে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে হবে, অন্তত দিন দশেক আগে যেতেই হবে, গিয়ে ওখানে প্র্যাকটিস করতে হবে – তাহলে তাঁদের দোষ দেওয়া যায় না। দুনিয়াটা চিরকালই চালায় অর্থবানরা, এখন তো আবার ধনকুবেররা প্রায় সরকার চালায়। ক্রিকেট খেলা এই নিয়মের বাইরে থাকবে কী করে? ফলে টেস্ট সিরিজের গুরুত্ব, সিরিজ জেতার গুরুত্ব ক্রমশ কমবে। যেহেতু টিভি সম্প্রচার থেকে বিস্তর টাকা আসে, সেহেতু উত্তেজক বিজ্ঞাপন দিয়ে বা বিবৃতি দিয়ে ভীষণ গুরুত্ব আছে বোঝানোর চেষ্টা নিশ্চয়ই চলবে। কিন্তু প্রস্তুতি নিয়ে মাথা ঘামাবে না কোনো দল। ইংল্যান্ডের টেস্ট অধিনায়ক স্টোকস তাঁর এক্স হ্যান্ডেল থেকে হার্মিসনের বক্তব্যের প্রতিবাদ করে জানিয়েছেন, তাঁর দল প্রস্তুতির জন্য ভারতে আসার আগে আবু ধাবিতে কিছুদিন থাকবে। এতে কী এসে যায় বোঝা শক্ত। কারণ জানুয়ারি থেকে মার্চের ভারতের সঙ্গে আবু ধাবির আবহাওয়া সংক্রান্ত মিল যদি থেকেও থাকে, পিচের চরিত্রের মিল থাকবে কিনা তা নিয়ে ইংরেজ বিশেষজ্ঞরাও দ্বিধান্বিত। তার চেয়েও বড় কথা, ভারতে এসে কিছু অনুশীলন ম্যাচ খেললে ইংল্যান্ড অনেক বেশি তৈরি থাকতে পারত।
সাহেবরা বলে থাকে, সকালই দিনটা কেমন যাবে দেখিয়ে দেয়। ২০২৪ সালের প্রথম বড় টেস্ট সিরিজ নিয়ে এই বাদানুবাদও বুঝিয়ে দিচ্ছে টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে। পাঁচ টেস্টের সিরিজ দীর্ঘদিন অতীত হয়ে গেছে। ভারত, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া একমাত্র নিজেদের মধ্যেই অতগুলো টেস্ট খেলে। তারও কারণ টিভি সম্প্রচারের টাকা। অন্য দেশগুলোর সঙ্গে টেস্ট সিরিজ নমো নমো করে সারে। প্রস্তুতি ম্যাচের পাট কবেই চুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন হার্মিসনের কথাবার্তাকে অন্যায় আবদারই বলতে হবে।
ভারতকেই দেখুন। দক্ষিণ আফ্রিকায় কখনো সিরিজ জেতা হয়নি, তাই ওটা নাকি ‘ফাইনাল ফ্রন্টিয়ার’। এবারের সফরের আগে এসব নিয়ে কত কথা বলা হল, লেখা হল। এদিকে খেলা হচ্ছে মাত্র দুটো টেস্ট। টেস্টে একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধেও ভারতীয় বোর্ড সে দেশে দুটো টেস্টের বেশি খেলতে চায় না। দক্ষিণ আফ্রিকায় এবারেও সিরিজ জেতা হবে না, কারণ প্রথম টেস্টে ইতিমধ্যেই হেরে ভূত হতে হয়েছে। সেখানেও কিন্তু প্রস্তুতির অভাব স্পষ্ট দেখা গেছে। প্রস্তুতি থাকবে কী করে? দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডই দীর্ঘ ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ শেষ হতে না হতেই টি টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে চেয়েছিল, কারণ নতুন বছরে আবার ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি খেলা হবে। তার আগেই হবে ক্রিকেটবিশ্বের সবচেয়ে অর্থকরী প্রতিযোগিতা – ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ। তার মিনি নিলামে কদিন আগেই খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকের রেকর্ড দু দুবার ভেঙেছে। অতএব ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা/কুড়ি, তোমার পানে, তোমার পানে, তোমার পানে।
অবশ্য সেখানেই শেষ নয়। একবিংশ শতকের বৈশিষ্ট্য হল মানুষের যাবতীয় দুঃস্বপ্ন ও রসিকতার বাস্তবায়ন। প্রথমটার উদাহরণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শীতের দেশের লোকের গরমে প্রাণান্তকর অবস্থা; অন্যত্র ঘনঘন ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ইত্যাদি। দ্বিতীয়টার উদাহরণ টি টেন। যখন টি টোয়েন্টি চালু হল, বিশুদ্ধবাদী ক্রিকেটরসিকরা ঠাট্টা করে বলতেন, আর কত কমাবে বাপু? এরপর টি টেন, তারপর এফ ফাইভ। এই করতে করতে তো টস করে জেতা হারায় পৌঁছবে শেষে। ২০০৭ সালে প্রথম ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির পরে দুই দশকও কাটেনি, টি টেন নিয়মিত হতে চলল বলে। ইতিমধ্যেই আবু ধাবিতে একটা ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ হয়। কিন্তু তাতে মূলত প্রাক্তন ক্রিকেটাররা খেলেন। সম্প্রতি জানা গেছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ জয় শাহের নেতৃত্বাধীন বিসিসিআইও দশ ওভারের লিগ চালু করতে চাইছে। অতএব নতুন বছরে আরও টাকা উড়বে ক্রিকেট মাঠে, কুড়ি ওভারের খেলার সঙ্গে যুক্ত হবে দশ ওভারের খেলা। নির্ঘাত আরও কমবে সাদা জামা লাল বলের ক্রিকেট, একদিনের ক্রিকেট আদৌ হবে কিনা কে জানে! সুতরাং বিশ্বকাপ ফাইনালে হার বা সেঞ্চুরিয়নের ইনিংস হার নিয়ে মন খারাপ করবেন না।
ভারতীয় ক্রিকেটের গোটা বাস্তুতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে সত্যকে অস্বীকার করে। বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর একাধিক ক্রিকেট ওয়েবসাইট এবং পরিসংখ্যানবিদ সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন একটা পরিসংখ্যান – ভারত গত তিনটে বিশ্বকাপে মাত্র চারটে ম্যাচ হেরেছে। এমন অনর্থক পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে বা এদেশের অন্য কোনো খেলায় হয় না।
সপ্তাহের অর্ধেক কেটে গেল, বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের শোকপালন এখনো শেষ হল না। সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের খোঁজ নিয়েছেন কিনা জানি না, তবে ফাইনালের পর পরাজিত ভারতীয় দলের সদস্যদের পিঠ চাপড়ে দিতে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং সাজঘরে গেছেন। দলের প্রত্যেককে আলাদা করে সান্ত্বনা দিয়েছেন, মহম্মদ শামির মাথাটাকে নিজেদের কাঁধে ঠেসে ধরেছেন, তারপর স্লো মোশনে আবেগাকুল আবহসঙ্গীত সহকারে বেরিয়ে এসেছেন – এই ভিডিও মুক্তি পেয়েছে। অতএব এই শোক পর্ব নির্ঘাত দীর্ঘায়িত হবে। আগে মানুষ শোকে নিস্তব্ধ হয়ে যেত, আজকাল আক্রমণাত্মক হয়ে যায়। শোকের জন্যে যাকে দায়ী করে তার মেয়ে, বউকে ধর্ষণের হুমকি দেয়। অন্তত সেইটা আশা করা যায় আজ সন্ধে থেকে বন্ধ হয়ে যাবে, কারণ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে কুড়ি বিশের সিরিজ শুরু হয়ে যাচ্ছে। সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বাধীন দল যদি অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিতে পারে তাহলে তো কথাই নেই। গলার শির ফুলিয়ে সেই কথা বলা যাবে যা এখন বিনীতভাবে বলা হচ্ছে – আমাদের দলটাই সেরা, ওই দিনটা খারাপ গেছিল আর কি। মোদ্দাকথা, কেন আরও একবার একটা আইসিসি ট্রফি জিততে ব্যর্থ হলাম তার কোনো ক্রিকেটিয় বিশ্লেষণ হবে না।
কে-ই বা সেটা চায়? ভারতের কোনো প্রাক্তন ক্রিকেটার কোনো ত্রুটি তুলে ধরেছেন? গত কয়েকদিন বাংলা কাগজ-টাগজ ঘেঁটেও কোথাও রবিবারের হারের কোনো বিশ্লেষণ চোখে পড়ল না। কার চোখে কত জল কেবলই তা মাপা চলছে। সব সংবাদমাধ্যম ‘খলনায়ক’ খুঁজতে শুরু করেনি এটা যতখানি স্বস্তিদায়ক, ততটাই অস্বস্তির কারোর কোনো ক্রিকেটিয় ব্যাখ্যায় না যাওয়া। দল জেতে ক্রিকেটারদের মুনশিয়ানায় আর হারে কপালের দোষে – এই যদি ক্রিকেটভক্ত, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক এবং টিম ম্যানেজমেন্টের মিলিত সিদ্ধান্ত হয় তাহলে দশ বছর কেন; বিশ বছরেও ট্রফির খরা কাটা শক্ত।
চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি, বিশ্বকাপ – একটা করে প্রতিযোগিতার কোনো একটা স্তরে ভারতীয় দল মুখ থুবড়ে পড়ে আর ভারতের তাবড় প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার আর সাংবাদিকরা মূলত দুটো কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে থাকেন – ১) একটা খারাপ দিন একটা ভাল দলকে রাতারাতি খারাপ করে দেয় না, ২) ভাগ্য খারাপ, তাই খারাপ দিনটা ফাইনালেই এল। কী আর করা যাবে?
সব দেশেই খেলা সম্পর্কে সাধারণ দর্শকের মতামত গঠনে প্রধান ভূমিকা নেন বিশেষজ্ঞ আর সাংবাদিকরা। তাঁরাই দিনের পর দিন এসব বলে চললে ক্রিকেটভক্তদের দোষ দেওয়া যায় না। সবাই তো আর দেখতে পান না অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড বা নিউজিল্যান্ডের প্রাক্তনরা নিজেদের দল হারলে (এমনকি জিতলেও) কীরকম চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন, ছোট ছোট ত্রুটিকেও রেয়াত করেন না ধারাভাষ্যে। ভারতের বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিককুল বিসিসিআই প্রযোজিত টিভি সম্প্রচারের আমলে, কর্তাদের চটালে মাঠে ঢোকার অনুমোদন না পাওয়ার যুগে দেশসুদ্ধু লোককে শিখিয়ে দিয়েছেন যে জিতলে সমালোচনা করা হল ছিদ্রান্বেষণ আর হারলে সমালোচনা করতে নেই। দলের পাশে দাঁড়াতে হয়। মুশকিল হল, বারবার ব্যর্থতার ফলে ব্যাপারটা বাংলা ছবির পাশে দাঁড়ানোর মত কঠিন হয়ে যাচ্ছে। পরপর দশটা ম্যাচ জেতার পরে একটা ম্যাচ হেরেছে বলে একথা একটু বেশি কটু শোনাতে পারে। কিন্তু আসলে তো একটা ম্যাচ নয়, ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর থেকে কোনো আইসিসি টুর্নামেন্ট জিততে পারেনি ভারত। দ্বিপাক্ষিক সিরিজের বাইরে জয় বলতে ২০২৩ এশিয়া কাপ। কিন্তু ক্রিকেট বহির্ভূত কারণে (ক্রিকেটিয় কারণ বাদই দিলাম) পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশের যা অবস্থা তাতে ওটাও না জিতলে আর দল রাখার মানে কী?
আসলে ভারতীয় ক্রিকেটের গোটা বাস্তুতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে সত্যকে অস্বীকার করে। বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর একাধিক ক্রিকেট ওয়েবসাইট এবং পরিসংখ্যানবিদ সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন একটা পরিসংখ্যান – ভারত গত তিনটে বিশ্বকাপে মাত্র চারটে ম্যাচ হেরেছে। এমন অনর্থক পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে বা এদেশের অন্য কোনো খেলায় হয় না। প্রাথমিক স্তরের ম্যাচের সংখ্যা নক আউট পর্যায়ের চেয়ে কম তো হবেই। প্রাথমিক স্তরের বেশিরভাগ ম্যাচ না জিতলে নক আউটে ওঠা যায় না। সেমিফাইনাল তো দুটোই হয়, ফাইনাল একটা। জগতে যতদিন পাটিগণিত আছে, ততদিন এমনটাই হবে। পিভি সিন্ধু কোনো প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালে বা ফাইনালে হারলে তাঁর পক্ষ নিয়ে কেউ বলে না, অধিকাংশ ম্যাচই তো জিতেছিল। অতএব চ্যাম্পিয়ন না হলেও ও-ই সেরা খেলোয়াড়। ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজিত দলের সমর্থকরা ঝরঝরিয়ে কাঁদেন, অনেকে ক্ষিপ্তও হয়ে ওঠেন। কিন্তু তাঁরা বা তাঁদের দেশের প্রাক্তন ফুটবলাররা কখনো বলেন না, অধিকাংশ ম্যাচ জিতেছি। অতএব চ্যাম্পিয়ন না হলেও আমরাই সেরা দল। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটে এই জাতীয় নির্বুদ্ধিতার প্রদর্শনী দশ বছর ধরে প্রত্যেক প্রতিযোগিতার পরেই হয়ে থাকে। মায়াবাদের দেশ ভারতবর্ষে কেউ একথা স্বীকার করতে রাজি নন, যে নক আউটে বারবার হার অঘটন হতে পারে না। নিজেদের মধ্যে গলদ আছে, সে গলদ খুঁজে বার করতে হবে এবং সংশোধন করতে হবে। আসলে স্বীকার করতে গেলেই একগাদা অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, অনেক সযত্নলালিত বুদ্বুদ দুম ফটাস হয়ে যাবে। তাতে এই যে কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্রিকেট বাণিজ্য, তার সঙ্গে যুক্ত বিবিধ কায়েমি স্বার্থে ঘা লাগবে।
সেই বুদ্বুদগুলোর আলোচনায় যাওয়ার আগে বলে নেওয়া যাক, ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের কেউ কেউ কখনো কখনো স্বীকার করেন যে বারবার আইসিসি টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হওয়া একটা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। কিন্তু তাঁরাও ব্যাপারটাকে স্রেফ মানসিক বলে আখ্যা দেন। যদি সেটাই ঠিক হয়, তাহলে খেলোয়াড়দের মানসিক সমস্যা দূর করার যেসব অত্যাধুনিক ব্যবস্থা আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞানে আছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ডকে সেগুলো ব্যবহার করতে আটকাচ্ছে কে? নাকি সেসব করেও ফল একই থেকে যাচ্ছে? এসব প্রশ্ন ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের লোকেরা তোলেন না।
এবার বুদ্বুদগুলোর দিকে তাকানো যাক।
১. বেশিরভাগ ম্যাচে জয়
এবারের মত বিশ্বকাপে পরপর দশটা ম্যাচ ভারত কখনো জেতেনি, তার চেয়েও বড় কথা এমন দাপটে জেতেনি। সেই কারণে এই দলের বাহবা প্রাপ্য, কিন্তু সেই সুবাদে ২০১৫ আর ২০১৯ সালের ভারতীয় দলগুলোকেও স্রেফ বেশিরভাগ ম্যাচ জেতার জন্য একইরকম ভাল বলে প্রমাণ করতে চাইলে কিছু অপ্রিয় প্রসঙ্গ না তুলে উপায় থাকে না।
২০০৭ সালে ভারত ভীষণ সহজ গ্রুপে ছিল (অন্য দলগুলো বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং বারমুডা)। তা সত্ত্বেও গ্রুপ স্তর থেকেই বিদায় নেয়। ভারত যেহেতু সবচেয়ে জনপ্রিয় দল, তাই তারা বিদায় নিলে মাঠ ভরে না। তার চেয়েও বড় কথা টিভি রেটিংয়ের বারোটা বেজে যায়। বিজ্ঞাপনদাতাদের বিপুল লোকসান হয়। আইসিসি সেবার বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ফলে ভবিষ্যতে ভারতের দ্রুত বিদায়ের সম্ভাবনা নির্মূল করতেই হত। তাই ২০১১ বিশ্বকাপে ফরম্যাটই বদলে ফেলা হয়। ১৯৯৯ সাল থেকে চালু হয়েছিল গ্রুপ লিগের পর সুপার সিক্স (২০০৭ সালে সুপার এইট) স্তর, তারপর সেমিফাইনাল, ফাইনাল। ২০১১ সালে ফিরে যাওয়া হল ১৯৯৬ সালের ফরম্যাটে। প্রথমে থাকল গ্রুপ স্তর (সাত দলের), তারপর কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল, ফাইনাল। অর্থাৎ একটা দল (পড়ুন ভারত) কমপক্ষে ছটা ম্যাচ খেলবেই গ্রুপ স্তরে, ফাইনাল পর্যন্ত গেলে নটা। ২০১৫ সালে ভারত ছিল পুল বি-তে। সেখানে বাকি ছটা দলের মধ্যে তিনটের নাম আয়ারল্যান্ড, জিম্বাবোয়ে আর সংযুক্ত আরব আমীরশাহী। বাকি তিনটে দলের মধ্যে ছিল ক্ষয়িষ্ণু ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এই পুলের সব ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার জন্যেও আলাদা হাততালি প্রাপ্য? কোয়ার্টার ফাইনালে আবার প্রতিপক্ষ ছিল বাংলাদেশ। সেমিফাইনালে কঠিন প্রতিপক্ষের সামনে পড়ামাত্রই মহেন্দ্র সিং ধোনির দল দুরমুশ হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়া জেতে ৯৫ রানে।
পরের বিশ্বকাপে ফের ফরম্যাট বদলে ফেলা হয়, অনিশ্চয়তা আরও কমিয়ে আনা হয়। বিশ্বকাপ ফুটবল জিততে হলে চার-চারটে নক আউট ম্যাচ জিততে হয়। কিন্তু ২০১৯ থেকে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিততে হলে মোটে দুটো – সেমিফাইনাল আর ফাইনাল। ২০০৭ সালের ১৬ দলের বিশ্বকাপকে ছোট করতে করতে করে দেওয়া হল দশ দলের। সবাই সবার বিরুদ্ধে খেলবে, অর্থাৎ কমপক্ষে নটা ম্যাচ খেলা নিশ্চিত হল। প্রথম চারে থাকলেই সোজা সেমিফাইনাল, সেখান থেকে দুটো ম্যাচ জিতলেই কেল্লা ফতে। এই ব্যবস্থায় ভারত আর নিউজিল্যান্ডের লিগের ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেস্তে যায়, ইংল্যান্ড বেশ সহজেই ভারতকে পরাস্ত করে। সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ড ভারতকে হারিয়ে দেয়।
আগের লেখাতেই লিখেছি, কীভাবে ত্রিদেব শুকিয়ে মারছে বাকি ক্রিকেট দুনিয়াকে। যাঁদের সত্যিই শুধু ক্রিকেটার নয়, ক্রিকেটের প্রতিও ভালবাসা আছে এবং দশ বছরেরও বেশি আগের ক্রিকেট সম্পর্কে জানা আছে, তাঁরা নিশ্চয়ই মানবেন যে ২০১১ সালের পর থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান যেখানে পৌঁছেছে তাতে বিশ্ব ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে তিন-চারটে দলের মধ্যে। এবারের বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখাল, কিন্তু ২০১৯ সালে তাদের অবস্থা ছিল টালমাটাল। ফলে আসলে বিশ্বকাপের দাবিদার ছিল ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ড। ভারত একমাত্র অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পেরেছিল। বাকি দুই দলের কাছেই হারে। ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে গ্রুপের খেলায় হারতে হয়েছিল শ্রীলঙ্কার কাছে আর ফাইনালে শোচনীয় হার হয়েছিল পাকিস্তানের কাছে। ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির আলোচনায় যাওয়া অর্থহীন, কারণ সেখানে ২০০৭ সালে খেতাব জয় বাদ দিলে ভারতের অবস্থা আরও করুণ।
সুতরাং বেশিরভাগ ম্যাচে জেতার তথ্যকে গলার মালা করে লাভ নেই। সমস্যাটাও মোটেই স্রেফ মানসিক নয়, দক্ষতাজনিত।
২. দক্ষতার দিক থেকে বিশ্বসেরা
বিশ্বসেরার শিরোপা যে নেই তা তো বলাই বাহুল্য, কিন্তু দক্ষতার দিক থেকে বিশ্বসেরা – এই ধারণাও দাঁড়িয়ে আছে নরম মাটির উপরে। ক্রিকেটে কোনোদিনই দক্ষতা মানে কেবল ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং করার পারদর্শিতা নয়। সঠিক পরিকল্পনার দক্ষতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। আজকের ভিডিও অ্যানালিসিস ইত্যাদি অতি উন্নত প্রযুক্তির যুগে সঠিক পরিকল্পনার গুরুত্ব ও ক্ষমতা আরও বেড়ে গেছে। ভারতীয় দল কি সেইখানে অন্য দলগুলোর সমতুল্য? স্মৃতিতে এখনো টাটকা এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল দিয়েই দেখা যাক।
ম্যাচের প্রথম বল থেকেই পরিষ্কার হয় যে অস্ট্রেলিয়া একবার ভারতের সঙ্গে খেলা হয়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয়বার খেলতে এসেছে অনুপুঙ্খ পরিকল্পনা নিয়ে। প্রত্যেক ভারতীয় ব্যাটারের জন্যে ছিল আলাদা আলাদা পরিকল্পনা।
রোহিত শর্মা প্রত্যেক ম্যাচে ঝোড়ো সূচনা করেছেন, তাঁর বেশিরভাগ চার ছয় হয়েছে অফ সাইডে পয়েন্টের পর থেকে মিড অফ পর্যন্ত এলাকা দিয়ে আর লেগ সাইডে স্কোয়্যার লেগ দিয়ে। অস্ট্রেলিয়া ঠিক ওই দুই জায়গায় সীমানার ধারে ফিল্ডার রেখে বল করা শুরু করে। তার উপর আগের ম্যাচগুলো ভারত যেসব মাঠে খেলেছে তার তুলনায় নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের মাঠ বড়। অন্য ম্যাচে যেসব শটে চার বা ছয় হচ্ছিল, সেগুলোতে এক-দুই রান হতে শুরু করল। ফলে প্রথম দু-এক ওভার রোহিতকে কিছুটা হতাশ করে। তিনি অবশ্য একটু পরেই এই পরিকল্পনাকে পরাস্ত করে মারতে শুরু করেন। তখন আসে দ্বিতীয় পরিকল্পনা। পাওয়ার প্লে শেষ না হতেই গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে দিয়ে স্পিন করানো, যাতে জোরে বোলারের গতি রোহিতকে বড় শট নিতে সাহায্য না করে। তাঁকে যেন অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করতে হয়, ভুল করার সম্ভাবনা বাড়ে। ম্যাক্সওয়েল প্রথমে মার খেলেও শেষপর্যন্ত এই পরিকল্পনায় ফল হয়, রোহিত বড় শট নিতে গিয়ে আউট হয়ে যান।
শুভমান গিলের মূল শক্তি পয়েন্ট থেকে কভার পর্যন্ত অঞ্চল দিয়ে সামনের পায়ে ড্রাইভ করে বাউন্ডারি পাওয়া আর সামান্য খাটো লেংথের বলে একটুখানি হাত খোলার জায়গা পেলেই স্কোয়্যার কাট করা। তাঁকে কাট করার কোনো সুযোগই দেওয়া হল না এবং অফ সাইডে ফিল্ডারের ভিড় জমিয়ে দেওয়া হল। গিল নিজেও জানেন তাঁর ড্রাইভ কখনো কখনো কিছুটা পথ হাওয়ায় যাত্রা করে, তার উপর সেদিনের পিচটা ছিল মন্থর। ফলে তেমন হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি। সেই ভাবনায় বিব্রত রাখতে শর্ট কভার দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল মুখের সামনে। গিল রান করার জায়গা খুঁজে না পেয়ে হাঁসফাঁস করলেন, তারপর অফের বল জোর করে লেগে ঘুরিয়ে মারতে গিয়ে মিড অনে ক্যাচ দিয়ে আউট হলেন।
বিরাট কোহলিকে চটপট আউট করতে হলে ক্রিজে এসেই তিনি যে খুচরো রান নিতে শুরু করেন তা আটকাতে হয়। লখনৌতে পিচ ছিল আমেদাবাদের মতই মন্থর। সেখানে ইংল্যান্ড কভারে, মিড উইকেট, মিড অফ, মিড অনে লোক দাঁড় করিয়ে সফলভাবে আট বল কোনো রান করতে দেয়নি। নবম বলে তিনি ধৈর্য হারিয়ে জোরে ড্রাইভ করতে গিয়ে মিড অফে ক্যাচ দিয়ে আউট হন। অস্ট্রেলিয়াও তাঁকে মোটামুটি চুপ রাখছিল, কিন্তু মিচেল স্টার্ক একটা ওভারে নো বল করার পর খেই হারিয়ে ফেললেন। কোহলি পরপর তিনটে চার মেরে দিলেন। পরিকল্পনা ব্যর্থ হল। তবু অস্ট্রেলিয়া কোনো সময়েই তাঁকে শট নেওয়ার জন্যে বেশি জায়গা দেয়নি, হাফভলি প্রায় পাননি। যে পিচে বল ব্যাটে আসছে না, সেখানে কোহলির পছন্দের খেলা – বলের গতিকে ব্যবহার করে ফিল্ডারদের ফাঁকে বল ঠেলে দিয়ে দৌড়ে রান নেওয়া – বেশ শক্ত। অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্স সমেত সব জোরে বোলারই স্লোয়ারের উপর জোর দিচ্ছিলেন। মোটেই দরকার অনুযায়ী রান হচ্ছিল না। উলটো দিকে কে এল রাহুল তো সেদিন বিশ্বকাপের মন্থরতম অর্ধশতরান করেছেন। ফলে কোহলির উপর চাপ বাড়ছিল। যতই মনে হোক তিনি নিশ্চিত শতরানের দিকে এগোচ্ছিলেন আর কপাল দোষে কামিন্সের বলটা ব্যাটে লেগে উইকেটে পড়ল, আসলে কোহলি কখনোই স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। ওই পিচে বারবার স্কোয়্যারে বল ঠেলে রান নিতে থাকলে গায়ের দিকে আসা খাটো লেংথের বলে ওভাবে প্লেড অন হওয়া মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়।
রাহুলের জন্যে কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন পড়েনি হয়ত। তিনি বেশ কিছুদিন হল একদিনের ক্রিকেট তো বটেই, কুড়ি বিশের ক্রিকেটেও এমনভাবে ব্যাট করেন যা দেখে মনে পড়ে কবীর সুমনের গান “ও গানওলা, আরেকটা গান গাও। আমার আর কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই।” সেমিফাইনালে যেরকম নির্ভেজাল পাটা উইকেট পাওয়া গিয়েছিল এবং দেরিতে ব্যাট করতে নামার সুযোগ পেয়েছিলেন, একমাত্র সেরকম ক্ষেত্রেই রাহুলকে চার ছয় মারতে ইচ্ছুক দেখা যায়। অন্যথায় তিনি ওরকম মন্থর ব্যাটিংই করেন, তারপর হয় স্টার্কের বলটার মত একটা দারুণ বলে আউট হয়ে যান, নয়ত উপায়ান্তর নেই দেখে মারতে গিয়ে আউট হন।
মধ্যে ছিলেন শ্রেয়স আয়ার। তাঁর জন্যেও স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল। সাংবাদিক সম্মেলনে শর্ট বল নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি যতই রাগ করুন আর শ্রীলঙ্কা বা নিউজিল্যান্ডের বোলারদের বিরুদ্ধে যতই শতরান হাঁকান; কামিন্স, স্টার্ক, জশ হেজলউডের মত দীর্ঘদেহী জোরে বোলারদের বিরুদ্ধে তিনি যে সামনের পায়ে আসতে ইতস্তত করেন তা সাদা চোখেই দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক তাঁকে গুড লেংথে বল করলেন, তিনি সামনের পায়ে না এসে দোনামোনা করে খেলে খোঁচা দিয়ে ফেললেন।
সূর্যকুমার যাদবের শক্তি হল বোলারদের গতিকে কাজে লাগিয়ে মাঠের দুরূহ কোণে বল পাঠানো। আমেদাবাদের পিচে সে কাজটা এমনিতেই শক্ত ছিল। তার উপর অস্ট্রেলিয়া তাঁকে কোনো গতিই দেয়নি। যে বলে আউট হলেন সেটাও ছিল হেজলউডের মন্থর গতির খাটো লেংথের বল।
রবীন্দ্র জাদেজা টেস্টে ব্যাট হাতে দিব্যি ধারাবাহিক, একদিনের ক্রিকেটে মোটেই তা নন। তবু কেন তাঁকে সূর্যকুমারের আগে পাঠানো হয়েছিল তা রোহিত আর রাহুল দ্রাবিড়ই জানেন। কিন্তু তিনিও অলরাউন্ডারসুলভ কিছু করে উঠতে পারেননি। অনেকগুলো বল খেলে মোটে নয় রান করে অসহায়ের মত আউট হন।
এত পরিকল্পনার বিপরীতে ভারতের পরিকল্পনা কীরকম ছিল?
দুনিয়াসুদ্ধ লোক জানে ডানহাতি জোরে বোলার রাউন্ড দ্য উইকেট বল করলে ডেভিড ওয়ার্নার অস্বস্তি বোধ করেন। ইংল্যান্ডের স্টুয়ার্ট ব্রড সব ধরনের ক্রিকেটেই তাঁকে ওইভাবে বল করে বহুবার আউট করেছেন। অথচ মহম্মদ শামি শুরু করলেন যথারীতি ওভার দ্য উইকেট এবং চার হল। ওয়ার্নার ভাগ্যিস আত্মঘাতী শট খেলে আউট হয়ে গেলেন।
ট্রেভিস হেডের অস্বস্তি যে শরীর লক্ষ করে ধেয়ে আসা খাটো লেংথের বলে, তাও সুবিদিত। কিন্তু শামি আর যশপ্রীত বুমরা – দুজনেই তাঁকে অফস্টাম্পের বাইরে বল দিয়ে গেলেন, তিনিও বলের লেংথ অনুযায়ী কখনো সামনের পায়ে কখনো পিছনের পায়ে কভার, মিড অফ দিয়ে রান করে গেলেন। যতক্ষণে মহম্মদ সিরাজ তাঁকে শরীর লক্ষ করে বল করা শুরু করলেন ততক্ষণে ট্রেভিস হেড ক্রিজে জমে গেছেন।
মারনাস লাবুশেন আরেকটু হলে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ দলে সুযোগই পেতেন না। কারণ তিনি বড় শট নিতে পারেন না বললেই হয়। তাই তাঁর কাজ একটা দিক ধরে থাকা, খুচরো রান নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখা। এটাও গোপন তথ্য নয়। খুচরো রান নিতে না পারলেই যে লাবুশেন হাঁকপাক করেন, বিশেষ করে স্পিনারের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক শট নিতে গিয়ে বিপদে পড়েন তা চেন্নাইয়ের ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচেও দেখা গিয়েছিল। অথচ ফাইনালে তিনি ব্যাট করতে আসার পরে তাঁর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করার কোনো চেষ্টা হয়েছিল কি? এক প্রান্ত থেকে স্পিনার এনে মুখের সামনে ফিল্ডার দাঁড় করিয়েও অন্যরকম চেষ্টা করা যেত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে যে দল পরিকল্পনার দক্ষতায় প্রতিপক্ষের থেকে এতখানি পিছিয়ে থাকে, তাকে দক্ষতায় বিশ্বসেরা কী করে বলা যায়?
৩. এক দিনের ভুল
কেউ বলতেই পারেন, একটা ম্যাচ হারলেই এত কিছুকে ভুল বলে দেগে দেওয়া অন্যায়। ওই পরিকল্পনা নিয়েই তো টানা দশটা ম্যাচ জিতেছে। ঘটনা হল, ফাইনাল আর দশটা ম্যাচের মতই আরেকটা ম্যাচ – একথা মাইকের সামনে বলতে ভাল, শুনতে আরও ভাল। কিন্তু কোনো ভাল দল ওই কথা বিশ্বাস করে বসে থাকে না। ফাইনালে তো বটেই, যে কোনো নক আউট ম্যাচেই সকলে বেশি তৈরি হয়ে আসে। অস্ট্রেলিয়াই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। আর গত দশ বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, ভারত আলাদা প্রস্তুতি নেয় না। সেই কারণেই বারবার অপ্রস্তুত হয়।
এই প্রস্তুতিহীনতা অবশ্য কেবল নক আউটের ব্যাপার নয়, এই বিশ্বকাপের ব্যাপারও নয়। মহেন্দ্র সিং ধোনির আমল থেকেই স্টেজে মেরে দেওয়ার প্রবণতা আর কিছু গোঁড়ামি ভারতীয় দলের মজ্জাগত হয়ে গেছে। সেগুলো কী কী কারণে নক আউটের আগে ভারতকে অসুবিধায় ফেলে না তা যাঁরা এতদূর পড়ে ফেলেছেন তাঁরা বুঝে ফেলেছেন। এবার প্রবণতাগুলো কী তা দেখে নেওয়া যাক:
বিশ্বকাপের দল তৈরি করতে হয় চার বছর ধরে। কিন্তু ২০১৫ বিশ্বকাপের পরের চার বছরেও ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট একজন চার নম্বর ব্যাটার ঠিক করতে পারেনি। ২০১৮ সালে অধিনায়ক কোহলি বলে দিয়েছিলেন, আম্বাতি রায়ুডুই হবেন বিশ্বকাপের চার নম্বর। শেষমেশ যখন বিশ্বকাপের দল ঘোষণা হল তখন দেখা গেল রায়ুডু আদৌ দলে নেই। বিজয়শঙ্কর বলে একজন হঠাৎ টিম ম্যানেজমেন্টের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিলেন। কেন তা আজও বোঝা যায়নি। প্রায় খেলা ছেড়ে দেওয়া দীনেশ কার্তিকও বিশ্বকাপ খেলতে চলে গেলেন, রায়ুডু বাদ। দলের অত গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা নিয়ে অমন ফাজলামি করে কোনো দল কোনোদিন বিশ্বকাপ জেতেনি। পরের চার বছরেও বিস্তর কাটা জোড়ার পরে শ্রেয়সে মনস্থির করতে পারল টিম ম্যানেজমেন্ট, কিন্তু হার্দিক পান্ডিয়া ছাড়া অলরাউন্ডার পাওয়া গেল না। তাঁর বদলে কাজ চালাতে পারেন ভেবে যাঁকে নেওয়া হয়েছিল, সেই শার্দূল ঠাকুরকে বল হাতে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। ব্যাটেও তিনি বিশেষ সুবিধা করতে পারেন না। সেই যে অস্ট্রেলিয়ায় একটা টেস্টে রান করে দিয়েছিলেন, সেই ভরসাতেই আজও তাঁকে অলরাউন্ডার বলে চালানো হচ্ছে। এ সমস্যার একটা সহজ সমাধান হতে পারত, যদি ভারতের ব্যাটাররা কেউ কেউ কাজ চালানোর মত বোলিং করতে পারতেন। এই বিশ্বকাপে যেখানে উইকেটে বল ঘুরেছে, অস্ট্রেলিয়ার হয়ে কাজ চালানোর চেয়ে বেশি কাজই করেছেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল আর হেড। নিউজিল্যান্ডেরও ছিলেন গ্লেন ফিলিপস, ড্যারিল মিচেল, মিচেল স্যান্টনার, রচিন রবীন্দ্ররা। দক্ষিণ আফ্রিকার এইডেন মারক্রামের অফস্পিনও মন্দ নয়। কিন্তু রোহিতের হাতে ঠিক পাঁচজন বোলার। তাঁদের একজন মার খেয়ে গেলে সমূহ বিপদ। ওই পাঁচজন এতটাই ভাল বল করেছেন ফাইনাল পর্যন্ত, যে এই ফাঁকটা ধরা পড়েনি। কিন্তু একদিনের ক্রিকেটে এ ফাঁক বড় ফাঁকি। এ নিয়েই বিশ্বকাপ জিতে গেলে সেও এক ইতিহাস হত। ফাইনালে হেড আর লাবুশেন জমে যেতেই ফাঁকি ধরা পড়ে গেল, অধিনায়ক নিরুপায়।
আমাদের ব্যাটাররা বল করতে পারেন না কেন? বোলারদের ব্যাটের হাতেরই বা কেন উন্নতি হচ্ছে না? এসব প্রশ্ন করলেই মহাতারকাদের মহা ইগোর কথা উঠে আসবে। রোহিত নিজে দীর্ঘকাল কাজ চালানোর মত অফস্পিন বল করতেন, অনেকদিন হল ছেড়ে দিয়েছেন। কোহলিও মিডিয়াম পেস বল করতেন, তিনিও ছেড়ে দিয়েছেন। কেন ছাড়লেন? দলের প্রয়োজন থাকতেও কেন আবার শুরু করেননি? দেবা ন জানন্তি। এঁদের কি এমন কোনো চোট আছে যা বল করলে বেড়ে যেতে পারে? তেমন কোনো খবর নেই কিন্তু।
শচীন তেন্ডুলকরের (ম্যাচ ৪৭০, বল ৮০৫৪, ওভার পিছু রান ৫.১০, উইকেট ১৫৪, সেরা বোলিং ৫/৩২) টেনিস এলবো হয়েছিল, একসময় কোমরে বেল্ট পরে ব্যাট করতে নামতে হয়েছিল, তারপর সেই চোট মাস ছয়েকের জন্যে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তার আগে পরে বল করেছেন, ম্যাচ জিতিয়েছেন। বীরেন্দ্র সেওয়াগও (ম্যাচ ২৫১, বল ৪৩৯২, ওভার পিছু রান ৫.২৬, উইকেট ৯৬, সেরা বোলিং ৪/৬) চোটমুক্ত ছিলেন না, কিন্তু বল করতেন। সৌরভ গাঙ্গুলির (ম্যাচ ৩১১, বল ৪৫৬১, ওভার পিছু রান ৫.০৬, উইকেট ১০০, সেরা বোলিং ৫/১৬) ফিটনেস তো হাস্যকৌতুকের বিষয় ছিল। অথচ বল করে একাধিক স্মরণীয় জয় এনে দিয়েছেন।
সুরেশ রায়না (ম্যাচ ২২৬, বল ২১২৬, ওভার পিছু রান ৫.১১, উইকেট ৩৬, সেরা বোলিং ৩/৩৪) এঁদের মত অত উঁচু দরের ব্যাটার ছিলেন না, কিন্তু মিডল অর্ডারে ভরসা দিয়েছেন একসময়। দরকারে অফস্পিনটাও করে দিতেন।
এদিকে আজকের মহাতারকা ব্যাটারদের কেবল ফিটনেস নিয়েই কয়েকশো প্রবন্ধ লেখা হয়েছে, রোজ লক্ষ লক্ষ গদগদ পোস্ট হয় সোশাল মিডিয়ায়। কিন্তু ওঁরা বল করতে পারেন না। কেদার যাদব বলে একজন ছিলেন। মারকুটে ব্যাট আর খুব নিচ থেকে বল ছেড়ে অফস্পিন করতেন, মারা সোজা ছিল না। বিরাটের সঙ্গে শতরান করে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটা স্মরণীয় ম্যাচ জিতিয়েছিলেন। তিনি হঠাৎ কোনো অজ্ঞাত কারণে নির্বাচক ও টিম ম্যানেজমেন্টের বিষনজরে পড়ে বাদ চলে যান ২০২০ সালে।
২০১৪ সালের ইংল্যান্ড সফরে দেখা গিয়েছিল ভুবনেশ্বর কুমারের ব্যাটের হাত রীতিমত ভাল। ট্রেন্টব্রিজ টেস্টের দুই ইনিংসেই অর্ধশতরান করেছিলেন। আবার ২০১৭ সালে পাল্লেকেলেতে যখন শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ১৩১ রানে সাত উইকেট পড়ে যায়, তখন অপরাজিত ৫৩ রান করে মহেন্দ্র সিং ধোনির সঙ্গে জুটিতে ১০০ রান তুলে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন। মাঝে বেশ কিছুদিন একদিনের দলের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিলেন ভুবনেশ্বর। অথচ তাঁকে গড়েপিটে অলরাউন্ডার করে তুলতে পারেননি সর্বকালের সেরা ভারতীয় দল তৈরি করার কৃতিত্ব যিনি দিনরাত দাবি করেন, সেই রবি শাস্ত্রী, আর তাঁর আদরের দুই অধিনায়ক ধোনি, কোহলি।
এখনকার বোলারদের মধ্যে শামি আর বুমরা দুজনেই যে ব্যাটিং উপভোগ করেন তা টেস্ট ক্রিকেটে স্পষ্ট দেখা যায়। শামি দিব্যি কয়েকটা বড় শট নিয়ে ফেলতে পারেন। বুমরা আরও এক ধাপ এগিয়ে। স্টুয়ার্ট ব্রডকে ঠেঙিয়ে টেস্টে এক ওভারে সবচেয়ে বেশি রান দেওয়ার রেকর্ড করিয়ে নিয়েছেন তিনি।
এঁদের ব্যাটের হাতটা যত্ন করে আরেকটু ভাল করে দেওয়ার কাজটুকুও যদি না পারেন, তাহলে রাহুল দ্রাবিড় আর ব্যাটিং কোচ বিক্রম রাঠোর করেনটা কী? রোহিত, কোহলিকে তো আর হাতে ধরে ব্যাটিং শেখাতে হয় না।
আসলে এসব করতে গেলে নমনীয়তা দরকার। কিন্তু ভারতীয় দলের একদিনের ক্রিকেটের ব্যাটিং আর গোঁড়ামি সমার্থক। বেশিরভাগ পাঠক রে রে করে তেড়ে আসবেন জেনেও না বলে উপায় নেই, শচীন আর সেওয়াগের প্রস্থানের পর থেকে ভারত একদিনের ক্রিকেটে যে ব্যাটিংটা করছিল এতকাল, সেটা গত শতাব্দীর ব্যাটিং। রোহিত আর শিখর ধাওয়ান যেভাবে ইনিংস শুরু করতেন – একজন মারতেন, আরেকজন ধরে ধরে খেলতেন – সেটা করা হত ১৯৯৬ বিশ্বকাপের আগে পর্যন্ত। সনৎ জয়সূর্য আর রমেশ কালুভিথরনা সেই ধারা বদলে দেন। শচীন-সৌরভ, সৌরভ-সেওয়াগ, শচীন-সেওয়াগ মান্ধাতার আমলের ছকে ফেরত যাননি। ২০০০ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে ওঠা, ২০০২ ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি জয়, ২০০৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা, ২০১১ বিশ্বকাপ জয় – এসবের পিছনে ভারতের ওপেনিং জুটির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।
এদিকে বিশ্বজয়ী অধিনায়ক ধোনি নিজে ‘ফিনিশার’, বিশ্বাস করতেন যে কোনো জায়গা থেকে ম্যাচ জিতিয়ে দেবেন। সম্ভবত সে কারণেই ২০১২ সালে শচীন আর ২০১৩ সালে সেওয়াগের প্রস্থানের পর উইকেট হাতে রেখে খেলার নীতি তিনি চালু করেন। রোহিতের যতদিন বয়স ছিল, ধৈর্য আর রিফ্লেক্স দুটোই ভাল ছিল, ততদিন লম্বা ইনিংস খেলে পরের দিকে স্ট্রাইক রেটের ঘাটতি পুষিয়ে দিতেন। কোহলির তখন স্বাভাবিক খেলাতেই অতি দ্রুত রান হত। ওই ক্ষমতাই তাঁকে রান তাড়া করার রাজায় পরিণত করেছিল। তার প্রমাণ ২০১২ সালে হোবার্টে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে, ২০১৩ সালে জয়পুরে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বা ২০১৭ সালে পুনেতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলা ইনিংসে রয়েছে। ধোনিও সত্যিই শেষ লগ্নে যে কোনো রান তুলে দিতে পারতেন। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে ধোনির বড় শট নেওয়ার ক্ষমতা ক্রমশ কমে আসে। তাঁর মত রিফ্লেক্স-নির্ভর, চোখ আর হাতের সমন্বয়ের উপর নির্ভরশীল ব্যাটারের ক্ষেত্রে ওই বয়সে সেটা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি ততদিনে ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বশক্তিমান তারকা। বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? মহিন্দর অমরনাথ ২০১১ সালের শেষদিকে টেস্ট ক্রিকেটে বাঁধতে চেয়েছিলেন, ধোনির গডফাদার এন শ্রীনিবাসন তাঁকে হেলিকপ্টার শট মেরে গ্যালারিতে পাঠিয়ে দেন।
যা-ই হোক, ঘটনা হল দুই প্রান্ত থেকে দুটো নতুন বল আর আগাগোড়া পাওয়ার প্লের যুগে বেশি ঝুঁকি নিয়ে অনেক বেশি রান করাটাই ব্যাটিং। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড সে খেলাই খেলছে গত এক দশক। তারাই জিতেছে বিশ্বকাপ, ভারত ২০১৩ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জেতার পর থেকে জিতেছে শুধু কিছু অর্থহীন দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। ধোনির বয়স যত বেড়েছে তিনি সত্যকে অস্বীকার করে সেই পুরনো খেলাই খেলে গেছেন এবং যে ম্যাচেই অন্য কেউ বড় শট নিতে পারেনি, সেখানে ধোনি শেষ অবধি ক্রিজে থেকেও ‘ফিনিশ’ করতে পারেননি। ওই চক্করে ২০১৯ বিশ্বকাপটাই ফিনিশ করে দিয়ে গেছেন। ধোনিভক্তরা আজও বীরবিক্রমে বলেন, মার্টিন গাপ্টিলের ওই থ্রোটা উইকেটে না লাগলেই নাকি…। অথচ ওই বিশ্বকাপেই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ধোনি শেষ ওভার পর্যন্ত ক্রিজে ছিলেন (৩১ বলে অপরাজিত ৪২), ভারত দুই কি পাঁচ রানেও নয়, ৩১ রানে হেরেছিল। ওই ম্যাচের স্কোরকার্ডের দিকে তাকালেই দুই দলের ব্যাটিং ভাবনার তফাতটা দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে যায় এবং ওই ভাবনাই যে তফাত গড়ে দিচ্ছে তাও স্পষ্ট বোঝা যায়।
২০১৯ সালের পর থেকে কোহলি, রোহিতেরও বয়স বাড়ছে। পাওয়ার প্লের নিয়ম বদলাচ্ছে, আরও বেশি রান উঠছে। রোহিত তো ধোনির আমলে ইনিংস শুরু করার সময় থেকে বরাবরই প্রথমে রক্ষণ, পরে আক্রমণ নীতিতে খেলে এসেছেন। সেভাবেই তিনবার দ্বিশতরান করেছেন। তিনি বদলাবেন কেন? এদিকে কোহলিরও ক্ষমতা কমছে। যত কমছে তিনি তত সাবধানী হচ্ছেন। আজকের একদিনের ক্রিকেটে ঝুঁকি না নিলে কোহলির দরের ব্যাটার রোজ অর্ধশতরান করতে পারেন। তাও মাঝে তিন-চার বছর তাঁর সব ধরনের ক্রিকেটেই সময় খারাপ যাচ্ছিল। পঁচিশ ইনিংস পরে একদিনের ক্রিকেটে শতরান এল গত বছর ডিসেম্বরে চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। মনে রাখা ভাল, সিরিজটা ভারত আগেই হেরে গিয়েছিল। কোহলির শতরানটা আসে সিরিজ হেরে যাওয়ার পরের ম্যাচে। অতঃপর কোহলি ছন্দে ফিরেছেন, বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও হলেন। কিন্তু দেখা গেল তিনি ধোনিসুলভ সাবধানী ব্যাটিং করছেন। ধোনির চেয়ে কোহলি অনেক উঁচু দরের ব্যাটার, তাছাড়া নামেনও অনেক আগে। তাই রান করছেন বেশি, কিন্তু দ্রুত রান তোলার দায়িত্ব অন্য কাউকে নিতে হচ্ছে। ফাইনালে সে দায়িত্ব রাহুল পালন করতে পারেননি। পরিসংখ্যান বলছে, ফাইনালে প্রথম দশ ওভারের পরে ভারত মাত্র চারটে চার মেরেছে। ২০০৫ সালের পর পুরুষদের একদিনের ম্যাচে এটা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এই ব্যাটিং কোনো ম্যাচ জেতাতে পারে না, বিশ্বকাপ ফাইনালে জেতা তো অসম্ভব। এমন ইনিংসে মহাতারকা পঞ্চাশ, একশো যা-ই করুন; কী এসে যায়?
সত্যিকারের বিশ্লেষণ করলে স্বীকার করতে হবে, ফাইনালে ভারতকে হারিয়েছে মিডল অর্ডার ব্যাটিং। বোলিং নয়। বস্তুত, গত চার-পাঁচ বছরে ভারতীয় বোলাররা টেস্টে এবং একদিনের ক্রিকেটে এত বেশি হারা ম্যাচ জিতিয়ে দিয়েছেন যে ব্যাটারদের এরকম মন্থর ব্যাটিং, সার্বিক ব্যর্থতা – সবই ঢেকে গেছে বারবার। এবারের ইংল্যান্ড ম্যাচও অমন হইহই করে জেতার কথা নয় ওই কটা রান নিয়ে। কিন্তু ঐন্দ্রজালিক জুটি শামি-বুমরা ফর্মে থাকলে সবই সম্ভব। তার উপর আছেন মহম্মদ সিরাজ আর রহস্যময় কুলদীপ যাদব, যাঁর কোনটা গুগলি আর কোনটা সাধারণ লেগ ব্রেক তা বুঝতে ফাইনালে ট্রেভিস হেড আর মারনাস লাবুশেনের আগে পর্যন্ত সব দলের ব্যাটাররা হিমশিম খেলেন। এঁদের সঙ্গে রবীন্দ্র জাদেজা। কিন্তু এঁরা কোনোদিন ব্যর্থ হবেন না এমন দাবি করা চলে না। তাই হাতে রান থাকা দরকার। কথাটা আর কেউ না বুঝুক, অধিনায়ক রোহিত বুঝেছিলেন। তাই বিশ্বকাপে এসে নিজের ব্যাটিং বদলে ফেললেন। কিন্তু দলের সবচেয়ে বড় তারকাকে বদলানোর সাধ্য তাঁরও নেই। কোহলি ঠিক তিনটে শতরান সমেত ৭৬৫ রান করলেন। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপের প্রথম দশজন রান সংগ্রাহকের মধ্যে একমাত্র তাঁর আর রাহুলের স্ট্রাইক রেটই একশোর নিচে।
অস্ট্রেলিয়াকে ফাইনালে জেতাল হেড আর লাবুশেনের চতুর্থ উইকেট জুটি, ভারতকে হারাল কোহলি আর রাহুলের শম্বুক গতির চতুর্থ উইকেট জুটি। অথচ ভারত এমন আজব দেশ, তারকা সাংবাদিক থেকে ফেসবুক পণ্ডিত – সকলে এখনো প্রশ্ন করে যাচ্ছেন, রোহিত কেন ওই শটটা খেলতে গেল? ফাইনালে কেউ ওরকম খেলে? সাক্ষ্যপ্রমাণ বলছে ফাইনালে রোহিত ওই ব্যাটিং না করলে অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্যটা আরও কম হত, ম্যাচটা আরও আগে শেষ হত।
তারকা থেকে ক্রিকেটপ্রেমী – গোটা বাস্তুতন্ত্রের গোঁড়ামি না কাটলে ভারতীয় ক্রিকেট, দেশটার মতই, পিছন দিকে এগোতে থাকবে।
ক্রিকেট এমন এক আফিম, যে রাজনীতির বামপন্থী এবং উদারপন্থীরাও এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। ন্যায়-অন্যায়ের বিচার যে ফলে নয়, প্রক্রিয়ায় – সেকথা অন্তত ক্রিকেটের ক্ষেত্রে তাঁরা মানতে রাজি নন।
আজ পর্যন্ত অলিম্পিকে সবচেয়ে বেশি পদক জিতেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গড়ের দিক থেকে আবার সবচেয়ে ভাল ফল পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের। দ্রুত এই তালিকায় উপরে উঠছে চীন। প্রত্যেক অলিম্পিকের পরেই পদক তালিকায় চোখ বুলোলে প্রথম চার-পাঁচটা স্থানে যে দেশগুলোর নাম দেখা যায় সেগুলো অর্থনীতিতেও বিশ্বের অগ্রসর দেশগুলোর মধ্যে পড়ে। ফুটবল বিশ্বকাপের প্রায় একশো বছরের ইতিহাসও অনুরূপ। সবচেয়ে ধনী মহাদেশ ইউরোপের পাঁচটা দেশ মিলে বিশ্বকাপ জিতে ফেলেছে ১২ বার (পশ্চিম জার্মানি/জার্মানি ৪, ইতালি ৪, ফ্রান্স ২, ইংল্যান্ড ১, স্পেন ১)। অসামান্য প্রতিভাধর খেলোয়াড়দের উপস্থিতি সত্ত্বেও গরিব লাতিন আমেরিকার তিনটে দেশ বিশ্বকাপ জিতেছে সব মিলিয়ে দশবার (ব্রাজিল ৫, আর্জেন্টিনা ৩, উরুগুয়ে ২)। এশিয়া আর আফ্রিকার কোনো দেশ আজ অবধি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, অদূর ভবিষ্যতেও পারবে এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
আগামীকাল বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল। তার আগে এসব কথা বলা এইজন্যে যে উপরের ঘটনাগুলোর পিছনে সফলতর ধনী দেশগুলোর কোনো চক্রান্ত নেই, সমস্ত খেলোয়াড়কে দিয়ে মাদক সেবন করানো নেই, রেফারি বা জাজদের ঘুষ খাওয়ানো নেই। যা আছে তা হল টাকার জোর। যে কোনো খেলার সর্বোচ্চ স্তরের প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে সফল হতে গেলে একটা দেশকে বিপুল অর্থ খরচ করতে হয়। ২০১৬ অলিম্পিকের পর অভিনব বিন্দ্রা হিন্দুস্তান টাইমস কাগজে এক কলামে লিখেছিলেন, “দেশ হিসাবে আমাদের ঠিক করতে হবে আমরা এমন একটা স্তরে পৌঁছতে চাই কিনা যেখানে পদক তালিকায় প্রথম পাঁচে শেষ করতে পারি। সেটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিনা, মানসম্মানের প্রশ্ন কিনা… আমরা উন্নয়নশীল দেশ, আমাদের দেশে দারিদ্র্য আছে। সুতরাং আমাদের ঠিক করতে হবে অলিম্পিককে আমরা তার চেয়েও বেশি অগ্রাধিকার দেব কিনা। কিন্তু যদি আমরা চাই আমাদের অ্যাথলিটরা জিতুক, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি লগ্নি করা দরকার। ব্যাপারটা জটিল।” বলা বাহুল্য, দলগত খেলায় ব্যাপারটা আরও বেশি জটিল। গত দুই দশক ধরে ভারতীয় ক্রিকেট অর্থের দিক থেকে সমস্ত ক্রিকেট খেলিয়ে দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভাল জায়গায়। এর প্রতিফলন খেলার মাঠে পড়তে বাধ্য। তাই চলতি বিশ্বকাপে ভারতীয় ক্রিকেট দলের আধিপত্যকে ব্যাখ্যা করতে কোনো ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খাড়া করা নেহাতই হাস্যকর। বরং এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবহার করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ভারত যে ২০১৩ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরে আর কোনো বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে পারেনি তা নিতান্তই লজ্জাজনক। আর কোনো ক্রিকেট খেলিয়ে দেশের এত বড় প্রতিভার মানবজমিন নেই, সেই জমিনে গজানো প্রতিভাকে সার জল দিয়ে বড় করার সামর্থ্য নেই। তা সত্ত্বেও যদি এ দেশ থেকে মহম্মদ শামি, যশপ্রীত বুমরা, রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, শুভমান গিলরা উঠে না আসেন তাহলে কোন দেশ থেকে আসবেন?
ক্রিকেট দুনিয়ায় আর্থিকভাবে দু নম্বর এবং তিন নম্বর স্থানে আছে যথাক্রমে অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড। লক্ষ করুন, ফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়াই। ইংল্যান্ডও হয়ত শেষ চারে থাকত, যদি ২০ ওভার আর ৫০ ওভারের খেলায় তফাত করতে ভুলে না যেত, কিছু অনিচ্ছুক বুড়িয়ে যাওয়া ক্রিকেটারকে দলে না রাখত আর তাদের উদ্ধত ক্রিকেট বোর্ড টালবাহানার পর কেন্দ্রীয়ভাবে চুক্তিবদ্ধ করার জন্যে ক্রিকেটারদের এমন এক তালিকা প্রকাশ না করত, যা প্রায় কাউকে খুশি করেনি। যাঁরা আইপিএল নিলামের বাইরেও ক্রিকেটের অর্থনীতির খবর রাখেন তাঁরা জানেন যে গত এক দশকে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের আর্থিক ব্যবধান অস্বাভাবিক বাড়িয়ে তুলে ক্রিকেট দুনিয়াকে ক্রমশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন করে তুলেছে এই ‘বিগ থ্রি’ – ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, সর্বোপরি ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত একদা শক্তিশালী দলগুলোর অনেক পিছিয়ে পড়ার পিছনে এর ভূমিকা কম নয়। ত্রিদেবের এই প্রতাপে বছর বিশেক আগে জিম্বাবোয়ে, কেনিয়ার মত যে দেশগুলো দ্রুত উঠে আসছিল তারাও ক্রিকেট মানচিত্রের বাইরে ছিটকে পড়েছে। অল্প কিছুদিন আগে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া আফগানিস্তান, আয়ারল্যান্ডের সঙ্গেও কেউ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলে না। ফিফা যেখানে ব্যবসা বাড়ানোর জন্যে বিশ্বকাপের মূলপর্বে দেশের সংখ্যা ক্রমশ বাড়াচ্ছে, সেখানে আইসিসি ২০১১ আর ২০১৫ সালের ১৪ দলের বিশ্বকাপকে গত বিশ্বকাপ থেকেই নামিয়ে এনেছে দশ দলের বিশ্বকাপে। শুধুমাত্র ব্যবসা বাড়াতে দলের সংখ্যা বাড়ানো ভাল নয় – এ যুক্তি দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু কমানো হল কার ভালর জন্যে? তাছাড়া ত্রিদেবের সকলের উপর ছড়ি ঘোরানোর পিছনে ব্যবসা ছাড়া আর কোন মহৎ উদ্দেশ্য কাজ করছে? ‘বিগ থ্রি মডেল’ কীভাবে ক্রিকেট দুনিয়ার সংকোচন ঘটাচ্ছে, অনেক দেশকে শুকিয়ে মারছে তা নিয়ে গত একবছর বারবার লিখেছি। বিস্তারিত পাবেন এই লেখায়।
শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডগুলো আইসিসির আয় বন্টনের এই অসাম্য থেকে বাঁচতে যে রাস্তা বার করেছে তা হল আইপিএলের আদলে কুড়ি বিশের লিগ আয়োজন করা। যে দেশের ভারতের মত আইপিএলের বাইরেও অনেকগুলো প্রথম শ্রেণির দল নেই, ঘরোয়া পঞ্চাশ ওভারের খেলার পরিকাঠামো তেমন নয়, সে দেশে এর অনিবার্য পরিণতি কী, তা এবারের বিশ্বকাপে দেখা গেছে। এমন বোলার পাওয়া দুষ্কর যারা দশ ওভার ভাল বল করতে পারে। আরও শক্ত এমন ব্যাটার পাওয়া যার গোটা ১৫ বলে চার, ছয় মারতে না পারলেই নিজেকে ব্যর্থ মনে হয় না। আইপিএলের মত রোজগার অন্য দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলো থেকে হয় না। ফলে ওই দেশগুলোর ক্রিকেটাররা সারা পৃথিবী ঘুরে একাধিক লিগে খেলে বেড়ান। এত খেললে গড়ে ঘন্টায় ৯০ মাইলের বেশি গতিতে বল করার বোলার পাওয়া যাবে না, আজকাল যায়ও না। তাছাড়া কুড়ি বিশের আদলে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে যেভাবে মাঠ ছোট করে আনা হয়েছে তাতে অত জোরে বল করে লাভই বা কী? ব্যাটের কানায় লাগলেও ছয় হয়ে যাবে। ব্যাটারদেরও ইনিংস গড়ে তোলার ধৈর্য থাকছে না। সুইং বা স্পিন সামলানোর ক্ষমতাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। কুড়ি ওভারের খেলায় বোলাররা তো সারাক্ষণ রান আটকাতে বৈচিত্র্য আনতে ব্যস্ত। তাই ক্রস সিম, নাকল বল, স্লোয়ার ইত্যাদি চেষ্টা করে যাচ্ছেন। শামি বা বুমরার মত সিম সোজা রেখে খাঁটি সুইং বা সিম করানোর ক্ষমতা থাকছে না। চলতি বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিল, সাদা বলের ক্রিকেটে প্রথম দু-এক ওভারের মধ্যে উইকেট নেওয়ার জন্যে প্রসিদ্ধ শাহীনশাহ আফ্রিদিও নতুন বল সুইং করানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারেন। ট্রেন্ট বোল্টেরও প্রায় একই সমস্যা হল। সারাবছর কুড়ি বিশের ক্রিকেট খেলে হঠাৎ অভ্যাস বদলে ফেলা যায় না। এতকিছু সত্ত্বেও এই বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার সেমিফাইনালে লড়ে যাওয়া এটুকুই প্রমাণ করে যে ক্রিকেটে মহান অনিশ্চয়তা কিছুটা অবশিষ্ট আছে।
ওসব সমস্যা ভারতের ক্রিকেটারদের নেই। তাঁরা ভারতীয় দলের হয়ে খেলে আর আইপিএল খেলেই যা রোজগার করেন তার সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান বা দক্ষিণ আফ্রিকার একজন গড় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের রোজগারের তুলনা চলে না। তাঁদের দেশে দেশে খেলে বেড়াতে হয় না। তার চেয়েও বড় কথা, আইপিএলের ব্র্যান্ড মূল্য বজায় রাখতে বিসিসিআই তাঁদের অন্য লিগে খেলার অনুমতিও দেয় না। ফলে বুমরা, শামি বা মহম্মদ সিরাজ, কুলদীপ যাদবরা ক্রিকেটের সাবেকি দক্ষতাগুলোয় শান দেওয়ার সুযোগ পান। গত একবছর চোটের কারণে না খেলা বুমরার পক্ষে শাপে বর হয়ে দাঁড়িয়েছে। শরীর বিশ্রাম পেয়েছে। শামি আবার ভারতীয় কুড়ি বিশের দলে নিয়মিত নন, একদিনের ম্যাচ আর টেস্ট ম্যাচের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। সেটাও এক্ষেত্রে সুবিধা। আর ব্যাটাররা? কোহলি, রোহিত, রাহুলরা গতবছর পর্যন্ত বলের চেয়ে বেশি রান করার দর্শনকে পাত্তাই দেননি। তাই বারবার দল ব্যর্থ হয়েছে। পাত্তা না দেওয়ার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে আয়ের নিশ্চয়তা। ভারতীয় বোর্ডের অর্থকরী কেন্দ্রীয় চুক্তি আর আইপিএল – দুটোই। এই নিরাপত্তা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই হয়ে যাওয়ায় তাঁরা কুড়ি বিশ বা ৫০ ওভার, কোনো ধরনের খেলাতেই আদৌ ঝুঁকি নিতে রাজি হচ্ছিলেন না। তারই ফল গত দেড়-দুই বছরের হারগুলো। বিশ্বকাপেও সেই ধারা চালু রাখলে ফলাফল অন্যরকম হত না, বোলাররা যতই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠুন। কারণ ভারতীয় বোলিং কয়েকটা খারাপ দিন বাদ দিলে টেস্ট আর একদিনের ম্যাচে বেশ কয়েকবছর ধরেই অসাধারণ। বিশ্বকাপের কিছুদিন আগে থেকে তিন নিরাপদ ব্যাটারের মধ্যে একজন, রোহিত শর্মা, ঠিক করলেন আক্ষরিক অর্থে সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেবেন। আগের কয়েকটা সিরিজে এ জিনিস অনুশীলন করেছেন, অবশেষে বিশ্বকাপে সাফল্য পেতে শুরু করলেন। ফলে বাকিদের নিজেকে কমবেশি না বদলে উপায় রইল না। অর্থাৎ ওই বোলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হল আক্রমণাত্মক ব্যাটিং। তার উপর ঘরের মাঠের চেনা পরিবেশ, চেনা পিচের সুবিধা তো আছেই। এতসব মিলিয়ে অন্য দলগুলোর সঙ্গে এই দুস্তর ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া জিতে গেলেও এগুলো মিথ্যে হয়ে যায় না। এর জন্যে আলাদা করে সমস্ত ম্যাচ ‘ফিক্স’ করার প্রয়োজন পড়ে না। এই দলের যা শক্তি, তাতে পিচ বদল করাও নিষ্প্রয়োজন। এদেশের যে কোনো পিচেই এই দল জিততে পারত। অন্য দেশে বিশ্বকাপ হলে অন্য কথা ছিল।
সুতরাং ভারত আগামীকাল বিশ্বকাপ জিতলে তিনটে খেতাবের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে দাপুটে জয় হবে এটা। কিন্তু সকলের জন্যে সবচেয়ে আনন্দের জয় বলা যাবে কি? বিশ্বকাপ উপলক্ষ, বিজেপি সরকারের মহিমা প্রচার এবং শাসক দলের রাজনৈতিক প্রকল্প অনুযায়ী সবকিছু চালানোই যে লক্ষ্য তা সেই ৫ অক্টোবর থেকেই পরিষ্কার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হল না, এদিকে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে বলিউডি শিল্পীদের ডেকে এনে ধুমধাম হল। আগামীকাল আবার ম্যাচের আগে মোচ্ছব, মাঝে মোচ্ছব, পরে মোচ্ছব। শুধু তাই নয়, দেশের সেনাবাহিনীকেও নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে খেলার আঙিনায় শক্তি প্রদর্শন করতে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিমানবাহিনী খেল দেখাবে।
মজার কথা, আইসিসির এসব আপত্তি নেই। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে ভারতের বোর্ডের সর্বেসর্বা হয়ে বসেছেন, সর্বজনবিদিত যে এই ঘটনায় স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবদান ছিল। তাতেও আইসিসির আপত্তি নেই। অথচ বিশ্বকাপ চলতে চলতেই শ্রীলঙ্কার বোর্ডকে সাসপেন্ড করা হল সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে। যারা স্রেফ ভারতের সাফল্য নিয়ে গদগদ হতে রাজি নয়, ভারতীয় বোর্ডের কার্যকলাপ নিয়ে এখনো প্রশ্ন তুলছে, তাদের ঠিক বিজেপি সরকারের কায়দাতেই ভারতবিরোধী বলে দেগে দেওয়ার সংস্কৃতি দেশের ক্রিকেটমহলে চালু করে দেওয়া হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক সাংবাদিকতার মত ক্রিকেট সাংবাদিকতাও গোদি মিডিয়ার দখলে। প্রথিতযশা সাংবাদিকরা বস্তুত বোর্ড এবং/অথবা বিখ্যাত ক্রিকেটারদের জনসংযোগ আধিকারিকে পরিণত হয়েছেন। তাই ভারতের খুব অল্প সংবাদমাধ্যমেই যথাযোগ্য গুরুত্বে প্রকাশিত হয়েছে এই খবর, যে শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ জয়ী প্রাক্তন অধিনায়ক অর্জুনা রণতুঙ্গা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের দুর্দশার জন্যে দায়ী বিসিসিআই সচিব জয় শাহ। তাঁর অঙ্গুলিহেলনেই নাকি শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট চলে।
অভিযোগটা সত্যি হোক আর মিথ্যেই হোক, ভারতের, বিশেষত বাংলার, নামকরা ক্রিকেট সাংবাদিকদের স্রেফ চেপে যাওয়ার কারণ কী? দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত হয়ে যাওয়া, নাকি বোর্ডের আনুকূল্য বন্ধ হয়ে যাওয়া? ধরে নেওয়াই যেত, রণতুঙ্গা বিশ্বকাপে দেশের ভরাডুবি দেখে হতাশায় প্রলাপ বকেছেন। শ্রীলঙ্কার বিদায়ের পর তাদের এক সাংসদ যেমন বলেছিলেন, ব্যাটিং কোচ মাহেলা জয়বর্ধনে নাকি বিসিসিআইয়ের প্রভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ককে বলেছিলেন টসে জিতে ফিল্ডিং নিতে। মুশকিল হল, শ্রীলঙ্কার সরকার রণতুঙ্গার মন্তব্যের জন্যে বিসিসিআই সচিবের কাছে ক্ষমা চেয়েছে একেবারে সংসদের অধিবেশনে। উপরন্তু পর্যটন মন্ত্রী বলেছেন, স্বয়ং রাষ্ট্রপতি নাকি শাহকে ফোন করে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। যদি ভারতীয় বোর্ডের এত প্রভাব থাকে একেবারে শ্রীলঙ্কা সরকারের উপর, তাহলে ক্রিকেট বোর্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকা আর কী এমন ব্যাপার? বোর্ড প্রভাব না খাটালেও ফল একই হত, আর প্রভাব খাটায়নি – এ দুটো কিন্তু এক নয়। অটো ফন বিসমার্কের সেই বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে যায় – রাজনীতিতে কোনোকিছু বিশ্বাস করবে না, যতক্ষণ না সেটা অস্বীকার করা হচ্ছে। কিন্তু ক্রিকেট এমন এক আফিম, যে রাজনীতির বামপন্থী এবং উদারপন্থীরাও এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। ন্যায়-অন্যায়ের বিচার যে ফলে নয়, প্রক্রিয়ায় – সেকথা অন্তত ক্রিকেটের ক্ষেত্রে তাঁরা মানতে রাজি নন।
ভারত বনাম নিউজিল্যান্ড সেমিফাইনালের পিচ বদলানোর অভিযোগকেও নস্যাৎ করেছেন ভারতের সাংবাদিককুল, প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং ক্রিকেটভক্তরা। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার কিছু সংবাদমাধ্যমের বক্তব্য, আইসিসি থেকে বিশ্বকাপের পিচগুলোর সার্বিক দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যান্ডি অ্যাটকিনসন তাদের ইমেলে জানিয়েছেন, তাঁর অজ্ঞাতসারে সেমিফাইনালে যে পিচে খেলা হওয়ার কথা ছিল তা বদলে দেওয়া হয়। একই ইমেলে অ্যাটকিনসন এই আশঙ্কাও প্রকাশ করেন যে ফাইনালের জন্য তিনি যে পিচ পছন্দ করেছেন তাও ভারতীয় দলের সুবিধার্থে বদলে দেওয়া হতে পারে। এ নিয়ে হইচই পড়ে যাওয়ায় আইসিসি সেমিফাইনাল চলাকালীন একটা বিবৃতি দেয়। সেই বিবৃতিতে কিন্তু বলা হয়নি যে পিচ বদলানোর অভিযোগ মিথ্যা। শুধু বলা হয়েছে, এমনটা করা হয়েই থাকে এবং অ্যাটকিনসনকে জানানো হয়েছিল (“was apprised of the change”)। এই বয়ান যদি সঠিক হয়, তাহলে হয় অ্যাটকিনসন মিথ্যা বলেছেন অথবা তাঁকে জানানো হয়েছিল পিচ বদলে ফেলার পরে। সত্যানুসন্ধান করতে হলে কোনটা ঘটেছে তা অ্যাটকিনসনের কাছে জানতে চাওয়া উচিত ছিল। ভারতের সংবাদমাধ্যম এবং প্রাক্তন ক্রিকেটাররা কিন্তু সেসবের মধ্যে যাননি। তাঁরা আইসিসির বিবৃতিকে তুলে ধরে রায় দিয়ে দিলেন, এসব ভারতের কাছে হেরে যাওয়া লোকেদের মড়াকান্না। যাহা সরকারি বিবৃতি তাহাই সত্য – ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে তলানিতে পড়ে থাকা দেশে এটাই যে নিয়ম তা অবশ্য বলাই বাহুল্য। আরও মজার কথা, সেমিফাইনালে প্রচুর রান হওয়ার ঘটনাকে যুক্তি হিসাবে তুলে ধরা বলা হল – এই তো। নতুন পিচ নয় বলে আপত্তি করার কী ছিল? পিচটা তো মোটেই মন্থর ছিল না। অর্থাৎ নিয়ম মানা হল কি হল না, তা আলোচ্য নয়। আলোচ্য হল ফলাফলটা কী? কোনো সাংবাদিক বা প্রাক্তন ক্রিকেটার কিন্তু আইসিসির নিয়মাবলী তুলে দেখাননি যে অ্যাটকিনসনকে জানিয়েই কাজ করতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। অ্যাটকিনসন রাবার স্ট্যাম্প মাত্র। উলটে নানারকম অক্রিকেটিয় যুক্তি উঠে এসেছে।
কেউ বলেছেন ভারত যে এতদিনে ইংরেজদের প্রভুত্ব নাশ করে ক্রিকেটে শেষ কথা হয়ে উঠেছে এটা অনেকের সহ্য হচ্ছে না, তাই ভারতকে ছোট করতে এসব বাজে কথা বলা। ইংল্যান্ডের ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রাক্তন ক্রিকেটার মার্ক রামপ্রকাশ একথা বলে আবার লিখেছেন, দিল্লির প্রবল বায়ুদূষণ নিয়ে যারা কথা বলছে তারাও নাকি এই উদ্দেশ্যেই ওসব বলছে। এ তো গেল ঋষি সুনকসুলভ ভারতপ্রেমের দৃষ্টান্ত। সুনীল গাভস্করের মত শতকরা একশো ভাগ ভারতীয় আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ভারতকে এদের দরকার কারণ ভারতের সঙ্গে খেললে অনেক টাকা রোজগার হয়। অথচ এরা ভারতের দিকেই আঙুল তোলে। মানে এরা চায় ভারতকে নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে, কিন্তু ভারত নিজের সুবিধা দেখলেই এদের অসুবিধা। আরও বলেছেন, পিচ যদি বদলানো হয়েই থাকে তো আইসিসিকে জানিয়েই হয়েছে। লুকিয়ে চুরিয়ে হয়নি। আইসিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকটার যদি কিছু বলার সাহস না থাকে, তাহলে আইসিসিকে ধরো। বিসিসিআইয়ের দিকে আঙুল তুলো না। সংবাদসংস্থা পিটিআই গতকাল একটি নামহীন বিসিসিআই সূত্রকে উদ্ধৃত করে খবর দিয়েছিল, অ্যাটকিনসনের কাজ নাকি শেষ। তিনি দেশে ফিরে গেছেন। অথচ আজ তাঁকে আমেদাবাদে পিচ পরিদর্শন করতে দেখা গেছে।
বৃদ্ধ কিংবদন্তির এই প্রবল জাতীয়তাবাদ খুবই প্রশংসনীয় হত, যদি হাস্যকর না হত। হাস্যকর এই কারণে, যে বিসিসিআই বাকি দেশগুলোর উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে ওই ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়েই। তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নয়। ঠিক কথাই যে তাদের ভারতকে দরকার, কিন্তু ভারতও ঘুরে ফিরে তাদের সঙ্গেই খেলে। অন্যদের সঙ্গে খেলতে চায় না। কারণ এদের সঙ্গে খেললেই টিভি সম্প্রচার থেকে সবচেয়ে বেশি টাকা আসে।
অর্থাৎ অন্যায় ঢাকতে জাতীয়তাবাদ টেনে আনা, লোক খেপাতে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর বিরুদ্ধে গরম গরম কথা বলা আর ব্যবসায়িক স্বার্থে সেই দেশগুলোর সঙ্গেই হাত মেলানো, পাকিস্তানকে দিনরাত খলনায়ক বলে দাগানো আর টাকা উঠবে বলে তাদের বিরুদ্ধে খেলা নিয়েই উদ্বাহু নৃত্য করা এবং সেই উন্মাদনাকে ব্যবহার করে ঘৃণা ছড়ানো – ভারতের শাসক দলের রাজনীতির সব বৈশিষ্ট্যই ভারতীয় ক্রিকেট শরীরে ধারণ করে ফেলেছে এই বিশ্বকাপে। কাল হবে ফাইনাল। জিতলে জবরদস্ত নির্বাচনী প্রচার। ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি জেয়ার বলসোনারো যেভাবে নির্বাচনে ব্রাজিল ফুটবল দলকে নিজের কাজে লাগিয়েছিলেন, নরেন্দ্র মোদীও সেভাবে ভারতীয় ক্রিকেট দলকে ব্যবহার করা শুরু করবেন নিজের নামাঙ্কিত স্টেডিয়াম থেকেই। নেইমাররা বলসোনারোর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, বিরাটরা তো সেই ২০১৪ সাল থেকেই দাঁড়াচ্ছেন। এবার না হয় নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চেই দাঁড়াবেন। উপরি হিসাবে থাকবেন গাভস্কর, শচীন তেন্ডুলকররা। বারাণসী ক্রিকেট স্টেডিয়ামের শিলান্যাসে চার মারাঠি ব্রাহ্মণ প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক (গাভস্কর, দিলীপ ভেঙসরকর, রবি শাস্ত্রী, তেন্ডুলকর) যেতে পারেন, ভোটের প্রচারে নামতে আর আপত্তি কী?
কর্তারা যে ৫০ ওভারের খেলাটাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচেন তা সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির প্রাক্তন অধিনায়ক এবং সদ্য পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রিকেট ক্লাব এমসিসির সভাপতি হওয়া মার্ক নিকোলাস।
১৯৮৭ সালে যখন প্রথমবার এদেশে ক্রিকেট বিশ্বকাপ হয় তখন দুনিয়াটাই অন্যরকম ছিল। তাই সেকথা থাক, বরং ১৯৯৬ সালের কথা ভাবা যাক। আজ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের খেলা আর আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করে যে টাকার হিমালয়ে চড়েছে তা টেথিস সাগরের মত উঁচু হতে শুরু করেছিল ওই সময় থেকেই। প্রয়াত জগমোহন ডালমিয়া বুঝতে পেরেছিলেন ভারতের ক্রিকেটপাগল জনতার বাজার কত লোভনীয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে। সেই বাজারে তাদের প্রবেশাধিকার দিয়ে এত টাকা কামাতে পারে ভারতীয় বোর্ড, যে গোটা ক্রিকেট দুনিয়া শাসন করা যাবে। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার চোখরাঙানি সহ্য করার বদলে তাদেরই চোখ রাঙানো যাবে। তবে ডালমিয়া ছিলেন খাঁটি ব্যবসায়ী। কামানোর জন্য খরচ করতে তাঁর আপত্তি ছিল না। বিশেষত টাকা যখন বোর্ডের, নিজের পকেটের নয়। ফলে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে হওয়া সেবারের বিশ্বকাপে জাঁকজমকের খামতি ছিল না। সেই বিশ্বকাপ থেকে বিস্তর আয় হয়েছিল এবং তার অনেকটা ডালমিয়া পকেটে পুরেছেন – এমন অভিযোগ পরে উঠেছিল। সেসব মামলা মোকদ্দমার জেরেই একসময় তাঁকে বোর্ডছাড়া হতে হয়, পরে আবার ফিরেও আসেন। কিন্তু বিশ্বকাপের আয়োজন যে জবরদস্ত হয়েছিল তা কেউ অস্বীকার করে না। ইডেন উদ্যানে বহু অর্থ খরচ করে বিরাট উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল, গঙ্গার হাওয়া এসে অদৃষ্টপূর্ব লেজার শোকে অভূতপূর্ব বিপর্যয়ে পরিণত করেছিল। ভারত সেমিফাইনালে শোচনীয়ভাবে শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে যাওয়ার পরে লেখালিখি হয়েছিল, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি মঞ্চটাই নাকি যত নষ্টের গোড়া। ওটা তৈরি করতে গিয়েই নাকি পিচের বারোটা বেজে গিয়েছিল, ফলে সেমিফাইনালের দিন অরবিন্দ ডি সিলভা আর মুথাইয়া মুরলীধরন এক জাতের বোলার হয়ে গিয়েছিলেন। ২০১১ সালে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কায় হওয়া বিশ্বকাপেও জাঁকজমক কম ছিল না। সেবার ঢাকার বঙ্গবন্ধু ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল। তদ্দিনে ভারত হিমালয়ে উঠে পড়েছে, বোর্ডের টাকার অভাব নেই। ফলে বাকি বিশ্বকাপটাও হয়েছিল বিশ্বকাপের মত। আর এবার?
আজ গতবারের দুই ফাইনালিস্ট ইংল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপ শুরু করবে। কিন্তু তার আগে কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে না, কারণ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড খুবই মিতব্যয়ী। চোখধাঁধানো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করে শুধু আইপিএল শুরুর দিনে। ১৯৯৬ সালে বোর্ড সভাপতি ছিলেন শিল্পপতি ডালমিয়া, এখন শিল্পপতি জয় শাহ। ও না! ভুল হল। বোর্ড সভাপতি ১৯৮৩ বিশ্বকাপ জয়ী ভারতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রজার বিনি, জয় হলেন সচিব। আসলে বিনিকে দেখা যায় কম, শোনা যায় আরও কম। তাই খেয়াল থাকে না। মানে তাঁর অবস্থা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর মত। তিনি সাংবিধানিক প্রধান বটে, সবেতেই তাঁর স্বাক্ষর লাগে বটে, কিন্তু নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনে তাঁকে ডাকাই হয় না। রাজদণ্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন মোদীজি। ক্রিকেট বোর্ডের সর্বেসর্বাও এখন শাহজি, বিনিজি অন্তঃপুরবাসী। যাঁর নাম জয় আর পদবি শাহ, তিনি সর্বেসর্বা হবেন না তো হবে কে? সে যতই তিনি এশিয়ান গেমসে মহিলাদের ক্রিকেটে স্মৃতি মান্ধনা একাই সোনা জিতেছেন মনে করুন না কেন।
কথা হল, জগমোহনের বিশ্বকাপ আয়োজন করা নিয়ে যা উৎসাহ ছিল, জয়ের তার অর্ধেকও দেখা যাচ্ছে না। তাই এবারের বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা হয়েছে মাত্র ১০০ দিন আগে, যেখানে পৃথিবীর যে কোনো খেলায় বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা হয়ে যায় বছরখানেক আগে। আগামী বছর জুন মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির সূচি যেমন প্রকাশিত হয়েছে গত মাসে। কারণ বিভিন্ন দেশের মানুষকে খেলা দেখতে একটা নির্দিষ্ট সময়ে একটা দেশে পৌঁছতে হবে। যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে, থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। সেসব প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য যত কম সময় পাওয়া যাবে খরচ বেড়ে যাবে ততই। অব্যবস্থা দেখা দেবে, যে দেশে খেলা সেই দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হবে। কিন্তু ওসব ভাবনা রাজা বাদশাহরা কবেই বা করলেন? তাঁরা চলেন নিজের নিয়মে, বাকি সকলকে মানিয়ে নিতে হয়। বিশ্বকাপ এমনিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রতিযোগিতা, ফলে সূচি ঘোষণা করার কথা তাদের। কিন্তু আয়োজক দেশকেই ঠিক করতে হয় সূচিটা। একথাও কারোর জানতে বাকি নেই যে ফুটবল দুনিয়াকে ফিফা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, আইসিসির মুরোদ নেই তা করার। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অর্থবল এত বেশি যে আইসিসি এখন ঠুঁটো জগন্নাথ। অনতি অতীতে আইসিসির ফিউচার টুরস প্রোগ্রামে (অর্থাৎ পরবর্তী কয়েক বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নির্ধারিত সূচিতে) আইপিএলের জন্য যে আরও বেশি ফাঁক রাখা হবে তা ঘোষণা করে দিয়েছেন শাহজিই, আইসিসি নয়। তা নিয়ে আইসিসি ট্যাঁ ফোঁ করতে পারেনি। ফলে এত দেরিতে বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণার দায় আইসিসির ঘাড়ে চাপানো চলে না।
তবে অস্বাভাবিক দেরিতে সূচি ঘোষণাতেই অব্যবস্থার শেষ নয়, বরং সূচনা। কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা গেল বিভিন্ন আয়োজক রাজ্য সংস্থা তাদের স্টেডিয়ামে যেদিন ম্যাচ দেওয়া হয়েছে সেদিন আয়োজন সম্ভব নয় বলছে। খোদ কলকাতাতেই যেমন কালীপুজোর দিন ইংল্যান্ড বনাম পাকিস্তান ম্যাচ রাখা হয়েছিল। ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজনের অভিজ্ঞতা না থাকা মানুষও বোঝেন যে সেদিন ম্যাচ আয়োজন করা অসম্ভব, কিন্তু দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র বোঝেন না। ক্রীড়াসূচি তৈরি করার সময়ে যে যেখানে খেলা সেখানকার আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়, সম্ভবত তাও তিনি বোঝেন না। নইলে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের আয়োজকরা নিশ্চয়ই এত বোকা নন যে কালীপুজোর দিন ম্যাচ করতে রাজি হবেন? জয় শাহীর মজা হল, হিন্দুত্ববাদী দলের নেতা অমিত শাহের পুত্র সর্বেসর্বা হলেও বিশ্বকাপের সূচি বানানোর সময়ে বোর্ডের খেয়ালই ছিল না যে ১৫ অক্টোবর নবরাত্রি উৎসবের সূচনা, সেদিন আমেদাবাদ শহরে ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ করা সম্ভব নয়। এহেন প্রশাসনিক নৈপুণ্যের কারণে অনেক দেরিতে সূচি ঘোষণা করার পরেও সব মিলিয়ে গোটা দশেক ম্যাচের দিনক্ষণ বদল করতে হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি নিয়ে যা চলছে তা প্রাক-২০১৪ ভারতে সম্ভবত তদন্তযোগ্য কেলেঙ্কারি বলে গণ্য হত এবং সমস্ত খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেলে দিনরাত এ নিয়েই তর্কাতর্কি চলত। একে তো টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম, তার উপর বিশ্বকাপের টিকিট অনলাইনে কিনতে গিয়ে অনেকেই তাজ্জব বনে গেছেন। ঘন্টা চারেক ‘কিউ’-তে পড়ে থেকেও টিকিট পাননি অনেকে। আইসিসি এখন পর্যন্ত বলেনি কত টিকিট বিক্রি হওয়ার কথা ছিল আর কত টিকিট বিক্রি হয়েছে। বিক্রির দায়িত্বে থাকা বুকমাইশো সোশাল মিডিয়ায় জানিয়েছে, তাদের হাতে নাকি সীমিত সংখ্যক টিকিটই আছে। এত টিকিট গেল কোথায়? এসব নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে যত লেখালিখি হয়েছে, ভারতের সংবাদমাধ্যমে তত হয়নি। ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমে তবু খানিকটা হয়েছে, বাংলার কথা না বলাই ভাল। একদিকে টিকিটের আকাল, অন্যদিকে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, আজকে উদ্বোধনী ম্যাচে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে নাকি ৪০,০০০ মহিলাকে দর্শক হিসাবে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেছে গুজরাট বিজেপি। আমেদাবাদের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে হোয়াটস্যাপে আমন্ত্রণ পাঠিয়ে নাকি এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাহলে কি বিশ্বকাপের টিকিট পেতে গেলে বিজেপির সদস্য বা সমর্থক হতে হবে? সেকথা যদি ঠিক না-ও হয়, এই বিশ্বকাপে হক যে অন্য সব রাজ্যের চেয়ে গুজরাটের বেশি, তাতে কিন্তু সন্দেহ নেই। ভারতে এর আগে অনুষ্ঠিত তিনটে বিশ্বকাপে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম, কলকাতার ইডেন উদ্যান, দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা বা চেন্নাইয়ের চিদম্বরম স্টেডিয়ামের মত ঐতিহ্যশালী মাঠের যে সৌভাগ্য হয়নি সেই সৌভাগ্যই এবার হয়েছে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ ওখানে, ফাইনাল ওখানে, আবার ক্রিকেটবিশ্বের সকলের চোখ থাকে যে ম্যাচের দিকে – সেই ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচও ওই মাঠেই।
কেন ঘটছে এসব? জলের মত সরল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন বহুদিনের ক্রীড়া সাংবাদিক শারদা উগ্রা, সম্প্রতি দ্য ক্যারাভ্যান পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর দীর্ঘ প্রতিবেদনে, যার শিরোনাম Shah’s playground: BJP’s Control of Cricket in India। সেই প্রতিবেদনে বোর্ডের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন, অমিতপুত্র বোর্ড চালান একেবারেই একনায়কত্বের ঢঙে। মিনমিনে বিনির সময় থেকে নয়, সৌরভ গাঙ্গুলি বোর্ড সভাপতি থাকার সময় থেকেই। অনেকসময় তিনি বোর্ডের অন্যদের সৌরভের ফোন ধরতে বারণ করতেন। যদি সৌরভ বলতেন অমুক ম্যাচটা ওইদিন হতে হবে, অবধারিতভাবে অন্য কোনোদিন ধার্য করা হত। জয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে কাঁচকলা দেখিয়ে নিজের সভাপতি পদের মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া সৌরভ এসব মেনে নিয়েই পদ আঁকড়ে পড়েছিলেন। বোঝা শক্ত নয়, কেন বিশ্বকাপ আয়োজনে এত ডামাডোল। যাঁর কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নেই, তিনি যদি একনায়কের কায়দায় এত বড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন তাহলে এর চেয়ে উন্নত আর কী হওয়া সম্ভব?
যোগ্যতার অভাবের পাশাপাশি সদিচ্ছার অভাবটাও অবশ্য উড়িয়ে দেওয়ার নয়। ১৯৯৬ সালে একদিনের ক্রিকেটের রমরমা ছিল, এখন বিশ্বজুড়েই ৫০ ওভারের খেলা অবাঞ্ছিত। ১৯৭০-এর দশকে একদিনের ক্রিকেটের দরকার হয়েছিল টেস্টের একঘেয়েমি কাটিয়ে মাঠে দর্শক ফেরাতে। সেই চেষ্টা সফল হয়। পরে খেলায় আরও বিনোদন আনতে কেরি প্যাকার চালু করেন রঙিন জামা, সাদা বলে দিনরাতের একদিনের ম্যাচ। প্রথম দিকে তিনি বিদ্রোহী তকমা পেলেও শেষপর্যন্ত কর্তারা বোঝেন এতে বিপুল মুনাফার সম্ভাবনা। প্যাকারের ক্রিকেটই হয়ে দাঁড়ায় মান্য একদিনের ক্রিকেট। এখন আর সে দিন নেই। বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট। ক্রিকেটের কর্তাব্যক্তিরা তাকে যথেচ্ছ বাড়তেও দিচ্ছেন, কারণ ওতেই পকেট ভরে যাচ্ছে। যদি একদিনের ক্রিকেটের প্রতি মমতা থাকত, তাহলে ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলোতে লাগাম দিতেন। টি টোয়েন্টির মত একদিনের ক্রিকেটেও দুই প্রান্ত থেকে দুটো বলে খেলা চালু করে, মাঠের সীমানা দৃষ্টিকটুভাবে ছোট করে এনে, ইনিংসের সবকটা ওভারকেই ফিল্ডিং সাজানোর নানাবিধ নিষেধের আওতায় নিয়ে এসে ব্যাট-বলের লড়াইকে দুদলের ব্যাটারদের চার, ছয় মারার প্রতিযোগিতায় পরিণত করতেন না। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। কথায় কথায় সাড়ে তিনশো-চারশো রান হচ্ছে, দ্বিশতরান হচ্ছে মুহুর্মুহু। পুরুষদের একদিনের ক্রিকেটে ২০১০ সালে শচীন তেন্ডুলকার প্রথম দ্বিশতরান করার পর থেকে গত ১৩ বছরে আরও নখানা দ্বিশতরান হয়ে গেছে, একা রোহিত শর্মার ঝুলিতেই তিনখানা। অথচ একদিনের ক্রিকেটের প্রতি দর্শকদের আগ্রহ কমে গেছে পৃথিবীর সর্বত্র। ঘন্টা তিনেক লাগাতার চার-ছক্কা দেখতে ভাল লাগে, ছ-সাত ঘন্টা ধরে ও জিনিস দেখা সাধারণত ক্লান্তিকর। শেষের দিকের ওভারগুলোতে পুরনো বলে রিভার্স সুইং করিয়ে ব্যাটারদের কাজ কঠিন করে দেওয়া বোলারদের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। স্পিনারদেরও চকচকে নতুন বলে চার, ছয় না খাওয়ার দিকেই মনোযোগ দিতে হচ্ছে। ওয়াসিম আক্রাম, শেন ওয়ার্নরা এখন খেললে কোনো তফাত গড়ে দিতে পারতেন কিনা বলা মুশকিল।
খেলোয়াড়রাও ইদানীং ৫০ ওভারের ক্রিকেট খেলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। অনেক কম পরিশ্রমে অনেক বেশি টাকা রোজগার করা যাচ্ছে কুড়ি বিশের ক্রিকেট খেলে। ফলে ওটাকেই তাঁরা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। টেস্ট ক্রিকেট আর ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট খেলে শরীরেও আর এত তাগদ থাকছে না যে একদিনের ক্রিকেট খেলবেন। গত বিশ্বকাপের সেরা ক্রিকেটার বেন স্টোকস তো গতবছর একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসরই নিয়ে ফেলেছিলেন। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটকর্তারা অনেক বলে কয়ে তাঁকে শুধুমাত্র ২০২৩ বিশ্বকাপ খেলতে রাজি করিয়েছেন। বিশ্বকাপের পর কী হবে কেউ জানে না। নিউজিল্যান্ডের সেরা বোলার ট্রেন্ট বোল্টও নিজের দেশের বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। অর্থাৎ দেশের হয়ে খেলার আগ্রহ কমে গেছে, ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের দিকে ঝুঁকছেন। ভারতের সাদা বলের অধিনায়ক রোহিত শর্মা আর বিরাট কোহলিও সাম্প্রতিককালে একদিনের ম্যাচের সিরিজে একটা ম্যাচ খেলেন তো দুটো ম্যাচে বিশ্রাম নেন। বিশ্বকাপের আগে শেষ দুটো সিরিজ ছিল এশিয়া কাপ আর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। তারও সব ম্যাচ খেললেন না।
কর্তারা যে ৫০ ওভারের খেলাটাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচেন তা সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির প্রাক্তন অধিনায়ক এবং সদ্য পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রিকেট ক্লাব এমসিসির সভাপতি হওয়া মার্ক নিকোলাস। ইএসপিএন ক্রিকইনফো ওয়েবসাইটকে তিনি বলেছেন, একদিনের ক্রিকেট আগামীদিনে বিশ্বকাপের বাইরে আর হওয়ার মানে হয় না। এমসিসি এখন আর ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা নয়, কিন্তু ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে এখনো তাদের মতামতের বিস্তর গুরুত্ব আছে আর ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার বোর্ডগুলোই জয় শাহের বোর্ডের পরে সবচেয়ে ধনী বোর্ড। বস্তুত তারা ভারতীয় বোর্ডের নন্দী, ভৃঙ্গী। অনেকের ধারণা ভারতই ৫০ ওভারের খেলাটাকে ধরে রেখেছে এবং এবারের বিশ্বকাপটা জমজমাট হলে খেলাটা বেঁচে যাবে। এককথায়, ভারতই পারে বাঁচাতে। পারে হয়ত, কিন্তু বিশ্বকাপ আয়োজনে যে অযত্ন প্রকট তাতে বাঁচানোর ইচ্ছা আছে বলে তো মনে হয় না। আগামী কয়েক মরসুমে আইপিএলকে আরও লম্বা করার যে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলা হয়েছে সেটাও একদিনের ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসার লক্ষণ নয়। অতএব ২০২৭ সালে আর ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ না হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এতখানি অনিশ্চয়তা নিয়ে সম্ভবত কোনো খেলার বিশ্বকাপ শুরু হয়নি এর আগে।