নির্বাচিত ক্রোধ

অনেকদিন আগে একটা বই পড়েছিলাম — নির্বাচিত কলাম। সে বইয়ের লেখিকা তসলিমা নাসরিন দ্রুত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অগ্রগণ্য নারীবাদী, প্রগতিশীল লেখিকা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন। নিজের দেশ থেকে মুসলমান মৌলবাদীদের যাতনায় নির্বাসিত হয়ে দীর্ঘদিন এই বাংলায় ছিলেন। একই ধর্মের উগ্রবাদীদের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে ২০০৭ এ পশ্চিমবঙ্গের ধ্বজভঙ্গ সরকারের তাঁকে চলে যেতে বলা নিঃসন্দেহে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। মৌলবাদের যাতনায় মায়ের দেশ এবং মাসির দেশ (শিবনারায়ণ রায়ের ভাষায়) ছাড়তে বাধ্য হওয়া এই সাহিত্যিক শ্রীজাত, মন্দাক্রান্তার পাশে দাঁড়াবেন আশা করছিলাম। গতকাল দেখলাম দাঁড়িয়েছেন, তবে ছায়া এড়িয়ে। ভারতের অনেক জায়গায় এখনো উঁচু জাতের লোকেরা যেভাবে নীচু জাতের ছায়া এড়িয়ে দাঁড়ায়, সেভাবে

taslima

১৯৮০ সালে মুক্তি পায় ‘হীরক রাজার দেশে’। অনেকেই মনে করেন ছবিটা ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে সত্যজিৎ রায়ের প্রতিক্রিয়া। ওটা মুক্তি পাওয়ার সময়ে ভারতে “selective outrage” কথাটা চালু হয়নি। হয়নি বলেই কংগ্রেসিরা বা ইন্দিরা সমর্থকেরা প্রশ্ন তোলেনি “এমার্জেন্সির অত্যাচার নিয়ে ছবি করেছেন। ইংরেজের অত্যাচার নিয়ে ছবি করেননি কেন?”
“Selective” আর “outrage” দুটো শব্দই ইংরিজি ভাষায় থাকলেও পাশাপাশি বসিয়ে নতুন অর্থ দেওয়ার কথা সম্ভবত ১৯১৯ সালে ইংরেজদের মাথাতেও আসেনি। নইলে রবীন্দ্রনাথ নাইট উপাধি ত্যাগ করার পরে সরকার বাহাদুর বলতেই পারতেন “Where were you when Mughals killed Sikhs in Sikh-Mughal wars? Why this selective outrage?”
ভারতীয় দক্ষিণপন্থীদের এক অনন্য অবদান এই “selective outrage”। কী বাংলা হওয়া উচিৎ এর? “নির্বাচিত ক্রোধ?” আচ্ছা উন্মাদ ছাড়া কেউ কি সবেতেই রেগে যায়? নাকি সকলে একই জিনিসে ক্রুদ্ধ হন? আপনি কখনো কোন দক্ষিণপন্থীকে দেখেছেন ভারতে বিচারাধীন বন্দিদের মধ্যে মুসলমান আর দলিতদের অস্বাভাবিক বেশি অনুপাত নিয়ে “outraged” হতে? পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মগুরুদের প্রভাব নিয়ে সরব হলেও গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীকে মুখ্যমন্ত্রী করায় “outraged” হননি এরকম লোকেরাই তো এদেশে এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ। একেও কি “selective outrage” বলা উচিৎ? যাঁরা জাকির নায়েককে উস্কানিমূলক কথাবার্তার জন্য হাতকড়া পরাতে চান কিন্তু যোগী আদিত্যনাথকে একটা সুযোগ দিতে চান তাঁদের রাগকে কি নির্বাচিত ক্রোধের দলে ফেললে খুব অন্যায় হবে?
আসলে “outrage” বা ক্রোধ একটি মানবিক অনুভূতি, যা নির্ভর করে কোন বিষয়ে একজন মানুষের “opinion” বা মতামতের উপর। দক্ষিণপন্থীদের মত হল ভারতীয় মুসলমান এবং দলিতরা মায়ের পেট থেকেই পড়েই অপরাধী হয়ে যায়। সুতরাং অন্যদের চেয়ে তারা বেশি কারারুদ্ধ হবে, এতে আর ক্রুদ্ধ হওয়ার কী আছে? পাকিস্তান, বাংলাদেশের ধর্মগুরুরা অত্যন্ত রক্ষণশীল কিন্তু যোগী আদিত্যনাথ হাইটেক প্রগতিশীল অতএব তাঁর কথা আলাদা — এই হচ্ছে তাঁর সমর্থকদের মতামত। সেইজন্যেই এনার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া নিয়েও এঁদের কোন outrage নেই। জাকির নায়েক যে ধর্মের লোক সে ধর্মের লোকেরা সন্ত্রাসবাদী হয় তাই তাঁর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা দরকার কিন্তু যোগী আদিত্যনাথ যতই প্রকাশ্য সভায় বলে থাকুন যে “একজন হিন্দু মরলে আমরা এফ আই আর করতে যাব না, কম করে দশজন মুসলমানকে মারব”, তাঁর প্রশাসক হিসাবে একটা সুযোগ প্রাপ্য যেহেতু হিন্দুরা সন্ত্রাসবাদী হয় না, আজমের বিস্ফোরণে দোষী সাব্যস্ত হলেও “activist” হয়।
এই মতামতগুলো ভাল কি মন্দ, ন্যায় কি অন্যায় সে আলোচনায় যাচ্ছি না, কিন্তু দক্ষিণপন্থীদের ক্রোধও যে নির্বাচিত সেটা কিন্তু এ থেকে বোঝা যাচ্ছে। এবং সেজন্যে তাঁদের গাল পাড়ছি না কারণ তাঁদের মতামতানুসারেই তাঁরা ক্রুদ্ধ হবেন। সেটাই স্বাভাবিক। গাল পাড়ব মতামতগুলোর জন্য, নির্বাচিত রাগের মত কোন কাঁঠালের আমসত্ত্বের জন্য নয়।
অনেকদিন আগে একটা বই পড়েছিলাম — নির্বাচিত কলাম। সে বইয়ের লেখিকা তসলিমা নাসরিন দ্রুত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অগ্রগণ্য নারীবাদী, প্রগতিশীল লেখিকা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন। নিজের দেশ থেকে মুসলমান মৌলবাদীদের যাতনায় নির্বাসিত হয়ে দীর্ঘদিন এই বাংলায় ছিলেন। একই ধর্মের উগ্রবাদীদের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে ২০০৭ এ পশ্চিমবঙ্গের ধ্বজভঙ্গ সরকারের তাঁকে চলে যেতে বলা নিঃসন্দেহে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। মৌলবাদের যাতনায় মায়ের দেশ এবং মাসির দেশ (শিবনারায়ণ রায়ের ভাষায়) ছাড়তে বাধ্য হওয়া এই সাহিত্যিক শ্রীজাত, মন্দাক্রান্তার পাশে দাঁড়াবেন আশা করছিলাম। গতকাল দেখলাম দাঁড়িয়েছেন, তবে ছায়া এড়িয়ে। ভারতের অনেক জায়গায় এখনো উঁচু জাতের লোকেরা যেভাবে নীচু জাতের ছায়া এড়িয়ে দাঁড়ায়, সেভাবে।
“শ্রীজাত, মন্দাক্রান্তার পাশে আছি কারণ আমি বাকস্বাধীনতার পক্ষে। কিন্তু….” সেই নির্বাচিত ক্রোধের তত্ত্ব। ওঁকে কলকাতা থেকে যখন চলে যেতে বলা হয় তখন কিছু বলেনি কেন? এরা কেবল হিন্দু মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলে। কোথায় ছিল এরা যখন তামিলনাডুর নাস্তিক এইচ ফারুককে হত্যা করা হল? খাগড়াগড় নিয়ে কবিতা লেখেনি কেন? ধূলাগড় নিয়ে লেখেনি কেন? রোজ কত মেয়েকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়, তসলিমাকেই কত হুমকি দেওয়া হয়েছে। তাই নিয়ে বলে না কেন?
“তখন বলেনি এখন বলছে কেন” যুক্তিটা কতটা খেলো সেটা আগেই বলেছি। দুরভিসন্ধিযুক্ত শাসক বা নিজের কুকীর্তি ঢাকতে ব্যস্ত কেউ ছাড়া অন্য লোক প্রতিবাদের বিরুদ্ধে এই যুক্তি খাড়া করে না। তসলিমা কেন করলেন সেটা ভাববার বিষয়। কিন্তু আর যা যা বলেছেন সেগুলো দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে।
এরা কেবল হিন্দু মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলে। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম কথাটা একশোভাগ সত্যি। এবার বলি, বেশ করে। এক ধর্মের লোক অন্য ধর্মের মৌলবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে প্রথমেই মৌলবাদীরা যেটা করে সেটা হল তার ধর্মকে বিধর্মী আক্রমণ করেছে বলে চেঁচিয়ে মৌলবাদী নন এমন মানুষদেরও সহানুভূতি আদায় করা। তাই করেই মকবুল ফিদা হুসেনকে তাড়ানো হয়েছিল। তসলিমাও বেশ করেন কেবল মুসলমান মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। তিনিই বা কবে কালবুর্গি বা নরেন্দ্র দাভোলকারের হত্যার ব্যাপারে কড়া বিবৃতি দিলেন? উলটে বলেছিলেন কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনায় প্রমাণ হয় না ভারত অসহিষ্ণু।
এবার তর্কের খাতির দূর করে বাস্তবে আসি। তসলিমা যথেষ্ট না জেনেই অভিযোগটা করে বসেছেন। শ্রীজাত ইসলামিক মৌলবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন লিখছেন। বাংলাদেশে ব্লগার হত্যার বিরুদ্ধে তিনি এতটাই সরব ছিলেন যে কবীর সুমন তাঁকে মুসলমানবিদ্বেষী আখ্যা দিয়ে প্রায় গালিগালাজ করেছিলেন ফেসবুকেই।
খাগড়াগড় নিয়ে লেখেনি কেন? ধূলাগড় নিয়ে লেখেনি কেন? প্রশ্নগুলো এমন একজন করেছেন যিনি নাকি নিজে কবিতা লেখেন। অবাক লাগছে ভাবতে যে একজন কবি প্রায় রাজনৈতিক নেতার মত ভাষায় নির্ধারণ করতে চাইছেন কবিকে কোন কোন ঘটনা নিয়ে লিখতে হবে। কবি তা নিয়েই লিখবেন যা নিয়ে তাঁর লিখতে ইচ্ছা করে। কবি সাংবাদিক নন। এটা তসলিমা জানেন না? আর ধূলাগড়? একজনও মানুষ মারা গেছে ওখানে? একটিও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে? ঘরেদোরে আগুন ধরানো হয়েছিল। সেই সংক্রান্ত অপরাধে ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিলকে তাল কোন না কোন উদ্দেশ্য নিয়েই করা হয় বলে জানি। সোশাল মিডিয়ার গুন্ডাদের উদ্দেশ্য বোঝা যায়। তসলিমাকে সেই দলে ফেলতে যে মন চায় না।
খাগড়াগড়? সে তো আরেক কান্ড। বিস্ফোরণের পর থেকে মৃত অভিযুক্তের নাম বদলাতে বদলাতে কোথা থেকে কোথায় যে গিয়ে পৌঁছেছে। হাজার হাজার ডক্টর হাজরা একেবারে। এন আই এ তদন্ত করছে, কয়েকজনকে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, এদিকে যে নাকি নাটের গুরু সে গত ২৮শে মার্চ সিলেটে নিহত হয়েছে। এটা নিয়ে কবির কী লেখার ছিল বুঝলাম না। আচ্ছা একটা প্রতিপ্রশ্ন করি? এই যে কদিন আগে আজমের ব্লাস্টে দুই আর এস এস কর্মীর যাবজ্জীবন কারাদন্ড হল, তসলিমার কি এই নিয়ে কিছু লেখা উচিৎ ছিল? যাক গে।
মন্দাক্রান্তাকে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে তসলিমা যা বলেছেন সেটা পড়ে হাসব না কাঁদব এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। এরকম হুমকি তো কত মেয়েই পায়। এখন মন্দাক্রান্তা পেয়েছে বলে লোকে হৈ হল্লা করছে — এই হল তসলিমার খেদ। ঠিকই তো। ভারতে রোজ কত মেয়ে ধর্ষিতা হচ্ছে, হঠাৎ নির্ভয়াকে নিয়ে সকলের অত চেগে ওঠার কী দরকার ছিল ভগবান জানে। বহু মেয়ে ধর্ষণের হুমকি পায় এবং ভয়ে কুঁকড়ে যায়, চুপ করে যায়, অনেকসময় হুমকিবাজরা দেখিয়ে দেয় তারা মুখেন মারিতং জগৎ নয়। ধর্ষণের পর মেয়েটি আরো নীরব হয়ে যায়। মন্দাক্রান্তা সেনেরও উচিৎ ছিল চুপচাপ হয়ে যাওয়া, প্রয়োজন হলে ফেসবুক ছেড়ে দেওয়া, অতঃপর দরজা জানালা এঁটে বাড়িতে বসে থাকা। এরকমটাই আপনার থেকে আশা করেছিলাম, তসলিমা দেবী। এই না হলে নারীবাদী?
আপনি চালিয়ে যান, ম্যাডাম। আপনি পুরো ব্যাপারটাকেই দাঁড় করালেন বুদ্ধিজীবী বনাম বুদ্ধিজীবী হিসাবে। আপনি শ্রীজাতর পাশে আছেন কিনা সেটা তো বড় কথা নয়, বড় কথা হল আপনি দাঙ্গাবাজের রাষ্ট্রক্ষমতা পাওয়ার পক্ষে না বিপক্ষে। সে ব্যাপারে আপনি একটা শব্দও খরচ করেননি। আপনার নীরবতা মুখর।

কয়েকটা প্রাসঙ্গিক লিঙ্ক

http://www.outlookindia.com/…/taslima-questions-sri…/1018138
http://m.economictimes.com/…/wont-…/articleshow/51564448.cms
http://twocircles.net/2014dec03/1417616083.html
http://www.timesnow.tv/…/mastermind-behind-2014-burdw…/58316

আদিখ্যেতা নিপাত যাক

বাংলা ছবির পোস্টারে আজকাল আকছার ছবির নাম, পাত্রপাত্রীদের নাম লেখা হয় রোমান হরফে। ছবি দেখতে ঢুকেও দেখা যায় নাম দেখানো হচ্ছে রোমানে। এসব দেখে দর্শকের কিছু মনেও হয় না কারণ অনেক দর্শক, বিশেষ করে অল্পবয়সীরা, বাংলা অক্ষর পড়তেই পারেন না — এটাই তো বাস্তব। তাহলে আবার “আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই” উদ্ধৃত করার ন্যাকামি কেন?

বছরে দুটো দিন ভারতীয় বাঙালির বাংলা ভাষার প্রতি প্রেম উথলে ওঠে। যেসব হতভাগ্য শিশু উপেন্দ্রকিশোরের টুনটুনি আর নাককাটা রাজাকে চেনে না, সুকুমারের আশ্চর্য জগৎ থেকে বঞ্চিত তাদের বাবা-মায়েরাও ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ বিদীর্ণ করে ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে নানা কথা লেখে। ভারতবর্ষের বাঙালি এভাবে কাকে ফাঁকি দিতে চায় বুঝি না।
বাংলা টিভি সিরিয়ালে গল্পের পরিস্থিতি অনুযায়ী হিন্দি ছবির গান বাজানো হয়, দীর্ঘদিন হল বাংলা ছায়াছবি তৈরি হচ্ছে তামিল, তেলুগু ছবির গল্প টুকে, বলিউডি নাচ গান সহযোগে। সেসব সিনেমা, সিরিয়াল যে কেউ দেখছে না তা-ও নয়। উনিশশো আশি নব্বইয়ের দশকে, নাহয় সিপিএমের দোষেই, চালু হয়েছিল ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে দৌড় প্রতিযোগিতা। সে স্কুল ভাল কি মন্দ দেখার দরকার নেই, নামটা কলকাতার কোন বিখ্যাত স্কুলের মত শোনালেই হল। এখন আবার নতুন প্রবণতা হয়েছে বাংলাকে দ্বিতীয় ভাষার জায়গা থেকেও সরিয়ে হিন্দীকে সেই জায়গাটা দেওয়া। সেটা না করে আর উপায় নেই কারণ বহুকাল হল কে কত শিক্ষিত তার প্রমাণ হিসাবে ধরা হয় তার গড়গড়িয়ে ইংরিজি বলতে পারার ক্ষমতাকে, ইদানীং আবার নিজেকে আধুনিক প্রমাণ করতে গেলে কথার মধ্যে “ইয়ার”, “ঠিক হ্যায়,” “ক্যা বাত করতা হ্যায়” এসব বলা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। তা হোক। আপনি কেমন ভাষায় কথা বলবেন সেটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু তাহলে আবার একুশে ফেব্রুয়ারি বা পয়লা বৈশাখ নিয়ে গদগদ হওয়ার কী আছে?
বাংলা ছবির পোস্টারে আজকাল আকছার ছবির নাম, পাত্রপাত্রীদের নাম লেখা হয় রোমান হরফে। ছবি দেখতে ঢুকেও দেখা যায় নাম দেখানো হচ্ছে রোমানে। এসব দেখে দর্শকের কিছু মনেও হয় না কারণ অনেক দর্শক, বিশেষ করে অল্পবয়সীরা, বাংলা অক্ষর পড়তেই পারেন না — এটাই তো বাস্তব। তাহলে আবার “আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই” উদ্ধৃত করার ন্যাকামি কেন?
দেখুন তো, কিরকম পিছিয়ে পড়া মানসিকতা আমার! বাংলা বাংলা করতে গিয়ে এই বিশ্বায়নের যুগে বাঙালিরা পিছিয়ে পড়ুক আর কি। আমি একেবারে মৌলবাদী, তাই না?
মজার কথা হচ্ছে বাঙালি যখন বাংলার কদর করত তখন তারও সারা ভারতবর্ষে কদর ছিল। আর বাংলার কদর করার জন্যে বাঙালি কখনো অন্য ভাষার দোর বন্ধ করে দেয়নি। ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে তাড়াতাড়ি এবং সবচেয়ে ভাল ইংরিজি বাঙালিই শিখেছিল। কিন্তু তারজন্যে আমাদের পূর্বসুরিরা মাতৃভাষাকে বিসর্জন দেননি। সতীদাহ প্রথা রদের জন্য দিল্লীশ্বরের পক্ষ থেকে ইংল্যান্ডে বক্তৃতা দিতে যাওয়া রামমোহন রায় বহুভাষাবিদ ছিলেন, বাংলাতেও পন্ডিত। মাইকেল মধুসূদনের মত ইংরিজি পরবর্তীকালের কোন কনভেন্টশিক্ষিত বাঙালির আয়ত্ত হয়েছে কি?
বাংলা সাহিত্যও অন্য ভাষার সাহিত্যের রস টেনে স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠেছে শুরু থেকেই, সে বিদ্যাসাগরের দিকেই তাকান আর বুদ্ধদেব বসুর দিকেই তাকান। আমাদের সেরা কবিদের উপর ইংরিজি এবং ফরাসী কবিতার প্রভাব নিয়ে আস্ত বই লেখা যায়। এমনকি যে কবি “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি/ তাই পৃথিবীর রূপ আমি খুঁজিতে যাই না আর” লিখেছেন তিনিও সব দরজা বন্ধ করে বসেছিলেন না।
বাংলার রঙ্গমঞ্চও তো গিরীশ ঘোষ থেকে শুরু করে শম্ভু মিত্র হয়ে সুমন মুখোপাধ্যায় পর্যন্ত বিদেশী নাটকের থেকে যেমন নিয়েছে তেমন ফিরিয়েও দিয়েছে।
সুতরাং মাতৃভাষার চর্চা করার জন্য বাঙালির মৌলবাদী হওয়ার দরকার কখনো পড়েনি, পড়বেও না। বাঙালি কখনো ভাষা নিয়ে মৌলবাদী হয়নি বলেই ফাদার দ্যতিয়েন বলে এক দূরবিদেশী আজীবন বাংলার চর্চা করে গেলেন। বাংলা নাটকেরও তো পথ চলা শুরু রুশদেশের গেরাসিম লেবেদেফের হাত ধরে।
তবে আপনি বাংলার চর্চা করবেন কি করবেন না সেটা আপনার ব্যাপার। ইচ্ছে হলে আপনি, আপনার পরিবার খাঁটি সাহেব হয়ে উঠুন, কোন আপত্তি নেই। কিন্তু বছরে দুদিন বাংলা ভাষার জন্যে কান্নাকাটি কোন পাপ স্খালনের জন্যে?

নির্বোধ আর বুদ্ধিমান

এই যারা হাসাহাসি করছে তাদের নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তির উপরে আস্থা দেখে যে আমার হাসি পাচ্ছে। এরা অনেকেই তো কদিন আগে নিজেরাও বিশ্বাস করেছিল যে দু হাজার টাকার নোটের মধ্যে জিপিএস চিপ বসানো আছে, তাই মাটির নীচে পুঁতে রাখলেও আয়কর দপ্তর জানতে পারবে কোথায় আছে। এরাই তো গলা ফাটিয়ে বলে বেড়াচ্ছিল বিমুদ্রাকরণের ফলে নাকি আইএস ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরাই তো হোয়াটস্যাপ ফরোয়ার্ডকে বেদবাক্য বলে মনে করে

রাজধানী কলকাতার অধিবাসীদের চেয়ে এ রাজ্যের গ্রাম বা মফঃস্বলের বাসিন্দারা যে নিকৃষ্টতর জীব, এ রকম একটা ধারণা অনেকদিন ধরে চালু আছে। বহুকাল শুনে এসেছি মাধ্যমিকে জেলার ছাত্রছাত্রীরা স্ট্যান্ড করে না, করিয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ এমন হতেই পারে না যে জেলার ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় কলকাতার বাসিন্দাদের চেয়ে ভাল ফল করবে। ইদানীং কলকাতার অধিকাংশ ছেলেমেয়ে আইসিএসই বা সিবিএসই স্কুলে চলে গেছে বলেই বোধহয় এই অভিযোগটা আর তত শোনা যায় না।
বামফ্রন্ট যখন একের পর এক নির্বাচনে জিতত, যখন সেই জয়গুলোকে রিগিং এর ফল বলে এক কথায় উড়িয়ে দেওয়ার জায়গাটা তৈরি হয়নি, তখনো দেখতাম শহুরে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তরা বলতেন “ও তো গ্রামের ভোটে জেতে।” মানে গ্রামের ভোটগুলো ফাউ। শহরের একেকটা ভোটের মূল্য গ্রামের ভোটের থেকে বেশি হওয়া উচিৎ ছিল, তাহলে এই অনর্থ ঘটতে পারত না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয় নিয়েও দেখেছি একই কথা বলা হয়। অথচ কলকাতা কর্পোরেশন, বিধাননগর পুরসভা তৃণমূলের দখলে; কলকাতার অধিকাংশ বিধায়ক মমতার পার্টির।
মজা হচ্ছে, কলকাতার লোকেদের মনেই থাকে না যে বাঙালি যাঁদের নিয়ে গর্ব করে, রামমোহন রায় থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় পর্যন্ত, তাঁদের অনেকেরই জন্ম, বেড়ে ওঠা কলকাতার বাইরে।
যাক গে। যেজন্যে এত কথা বলছি এবারে সেটা বলি। ভাঙড়ে পাওয়ার গ্রিড বসানোর বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন চলছে। গত কয়েকদিনে যা জানা গেছে তাতে এটা স্পষ্ট যে এলাকার মানুষের ক্ষোভ আসলে পাওয়ার গ্রিড নিয়ে ততটা নয় যতটা বলপূর্বক বা ঠকিয়ে জমি দখল করা নিয়ে। এই আন্দোলনের পেছনে নকশাল বা অন্য বিরোধীদের প্রেরণা (বা প্ররোচনা) থাকুক আর না-ই থাকুক, দিদির ভাইয়েরা যে শুধু আইনকানুন মেনেই জমি নিয়েছেন ওখানে তা নয় — এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। পাওয়ার গ্রিড ওখানে বসলে ঐ এলাকার মানুষের কী সুবিধা হবে, আদৌ কোন সুবিধা হবে কিনা এসব বোঝানোর জন্য সরকার সময় ব্যয় করেননি। অতএব এটা গা জোয়ারি, যেমন গা জোয়ারি সিঙ্গুরে করা হয়েছিল, নন্দীগ্রামে করা শুরু হয়েছিল। কিন্তু মুশকিল হল, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী, সহকর্মী অনেকের কাছেই দেখছি ভাঙড় নিয়ে আলোচনায় মুখ্য বিষয় এগুলো নয়। মুখ্য হল এক স্থানীয় মহিলার বাইট, যেখানে তিনি বলেছেন ওখানে পাওয়ার গ্রিড হলে “আমাদের আর বাচ্চা হবে না।”
গ্রামের মানুষরা কত অজ্ঞ, কত অশিক্ষিত তা নিয়েই হাসাহাসি, রসালো আলোচনা ইত্যাদি চলছে। বিজ্ঞানে আমি বরাবরই অজ্ঞান। ইলেকট্রিক আর ইলেকট্রনিকের পার্থক্য বুঝিয়ে দেওয়ার যোগ্যতাও আমার নেই সুতরাং ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড মানুষের শরীরে কী প্রভাব ফ্যালে বা আদৌ ফ্যালে কিনা তা নিয়ে আমার কোন ধারণা নেই। আমার পদার্থবিদ বন্ধুদের অনুরোধ করব আলোকপাত করতে।
কিন্তু এই যারা হাসাহাসি করছে তাদের নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তির উপরে আস্থা দেখে যে আমার হাসি পাচ্ছে। এরা অনেকেই তো কদিন আগে নিজেরাও বিশ্বাস করেছিল যে দু হাজার টাকার নোটের মধ্যে জিপিএস চিপ বসানো আছে, তাই মাটির নীচে পুঁতে রাখলেও আয়কর দপ্তর জানতে পারবে কোথায় আছে। এরাই তো গলা ফাটিয়ে বলে বেড়াচ্ছিল বিমুদ্রাকরণের ফলে নাকি আইএস ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরাই তো হোয়াটস্যাপ ফরোয়ার্ডকে বেদবাক্য বলে মনে করে। ঐ গ্রাম্য মহিলা, যিনি হয়ত শুধু নিজের নামটুকু সই করতে পারেন, তার সাথে এই ইংরিজি জানা, স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারা লোকেদের পার্থক্য কোথায়? শহরে বাস করে, ডিগ্রিধারী হয়ে কী তফাত হল? এবার থেকে শঙখ ঘোষকে মনে রাখবেন:

‘হাওড়া ব্রিজের চূড়োয় উঠুন,
নীচে তাকান, ঊর্ধ্বে চান —
দুটোই মাত্র সম্প্রদায়
নির্বোধ আর বুদ্ধিমান।’

অখন্ড বাংলা

যদি আলাদাই হবেন তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় এপারের বাঙালি কেন অধীর হয়ে থাকত দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায় খবর শোনার জন্যে? কেন এপারের আমরা বড় হলাম শামসুরের নানির ‘বিষাদসিন্ধু’ পাঠ শুনতে শুনতে? যে কাজ লর্ড কার্জন করে উঠতে পারলেন না, কাঁটাতারও সেভাবে পেরে উঠল না, কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেকাজ করতে চাইছেন?

“মোরা এক সে দেশের খাই গো হাওয়া
এক সে দেশের জল”

“আল্লা মেঘ দে পানি দে
ছায়া দে রে তুই”

“বাংলার মাটি বাংলার জল
বাংলার বায়ু বাংলার ফল
পুণ্য হউক পুণ্য হউক
হে ভগবান”

উপরের পংক্তিগুলো বাংলা ভাষার সম্পদ। “জল” বললেও বাংলা, “পানি” বললেও। যে অন্যকিছু ভাবে সে হয় বাংলাকে, বাঙালিকে চেনে না অথবা বদমাইশ। অসদুদ্দেশ্য আছে, তাই বোকা সাজছে। গত কয়েকশো বছর ধরে যে বাঙালি “জল” বলে আর যে বাঙালি “পানি” বলে তারা পাশাপাশি বাস করছে। কখনো শোনা যায়নি একদল অন্য দলকে বলেছে “তোমায় আমি যা বলছি তা-ই বলতে হবে। নইলে তুমি বাঙালি নও।” বস্তুত কোন বাঙালি হিন্দু হলেই যে “জল” বলবে আর মুসলমান হলেই “পানি”, এই ধারণাগুলোও অতিসরলীকৃত। উপরের পংক্তিগুলোতেই দেখা যাচ্ছে ইসলাম ধর্মাবলম্বী নজরুল ব্রাক্ষ্ম রবীন্দ্রনাথের মতই “জল” লিখেছেন। ইচ্ছা হয়েছে বলে লিখেছেন, পানি লিখলেও মহাভারত অশুদ্ধ হত না। আব্বাসউদ্দিনের গলায় যখন ক্ষরাক্লিষ্ট গ্রাম্য মানুষের বৃষ্টির প্রার্থনা শুনি, “আল্লা” বলছেন বলে তা বিদেশী মনে হয় কি কখনো? বাংলার ভালোর জন্যে নিজের ভগবানের কাছে রবীন্দ্রনাথের উদাত্ত প্রার্থনা সুচিত্রা মিত্রের গলায় কি বিজাতীয় মনে হয় কোন মুসলমান শ্রোতার?
পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখন এইরকম কিম্ভূত কিমাকার চিন্তাই করছেন। রামধনু শব্দটা শুনে যে বাঙালির বৃষ্টিদিনের অপরূপ দৃশ্য মনে না পড়ে দাশরথির কথা মনে পড়ে সে যে সুকুমারের দাশরথির চেয়েও বড় পাগল এটা আলাদা করে বুঝিয়ে দেওয়ার দরকার নেই বোধহয়। হেসে উড়িয়ে দেওয়া যেত, যদি এই বিষ পাঠ্যবইয়ে ঢোকানোর চেষ্টা না হত।
বাংলা ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছিল তারা অনেকেই হয়ত মা-কে আম্মি বলে ডাকত, বাবাকে আব্বা বা আব্বু। আবার বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা অনেকে মা-কে মা বলেই ডাকতেন। কী তফাত? শামসুর রহমান বাঙালি আর নির্মলেন্দু গুণ হিন্দু বাঙালি? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাঙালি আর সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ মুসলমান বাঙালি? বাঙালি দুরকমের হয় — হিন্দু আর মুসলমান — শিশুদের একথা শিখিয়ে দেওয়া, এ তো নোংরামি! বাঙালি একরকমই — বাঙালি। কেউ ফুল বেলপাতা দিয়ে বিগ্রহের পূজা করেন, কেউ শুধু পশ্চিমদিকে মুখ করে জানু পেতে বসে নিজের ঈশ্বরের আরাধনা করেন। এ তো তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। তা বলে তাঁরা আলাদা!
যদি আলাদাই হবেন তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় এপারের বাঙালি কেন অধীর হয়ে থাকত দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায় খবর শোনার জন্যে? কেন এপারের আমরা বড় হলাম শামসুরের নানির ‘বিষাদসিন্ধু’ পাঠ শুনতে শুনতে? যে কাজ লর্ড কার্জন করে উঠতে পারলেন না, কাঁটাতারও সেভাবে পেরে উঠল না, কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেকাজ করতে চাইছেন?
সরকারের কীর্তিকলাপ বেশ কিছুদিন ধরেই ভরসার বদলে সন্দেহের উদ্রেক করছে। পশ্চিমবঙ্গের অনেক হতাশাজনক নেইয়ের পাশে দীর্ঘকাল একটা গর্ব করার মত নেই ছিল — সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নেই। বাম আমলের সবকিছুর সঙ্গে সঙ্গে এটাকেও বাতিল করবেন নাকি? সাম্প্রদায়িক গোলমাল আটকানোয় সরকারের গড়িমসি কিছুদিন ধরেই প্রকট হয়ে উঠছে। পুলিশ যেন হিন্দি সিনেমার পুলিশ হয়ে উঠেছে, পৌঁছয় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে। সেই প্রেক্ষাপটে রামধনুর রং বদল আরো বিপজ্জনক। এ যে একেবারে বুকের ভেতর দেওয়াল তোলার চেষ্টা, ছোট থেকেই আমরা-ওরা তৈরি করে দেওয়ার চেষ্টা।
বাঙালির এই বিপদে কোথায় কবি সুবোধ সরকার? তিনি তো মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ। তিনি প্রতিবাদ করবেন না? বলবেন না এটা অন্যায়, এটা বিপজ্জনক? নইলে কবি হিসাবে, সমাজের বিবেক হিসাবে কী করে মানব ভদ্রলোককে? কোথায় বা শিক্ষাবিদ সুনন্দ সান্যাল? তিনি তো শিক্ষার রাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে যাওয়া নিয়ে বরাবর সোচ্চার ছিলেন। প্রাথমিকে ইংরিজি না পড়তে পেরে যাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়েছে উনি বলতেন, তাদের ছেলেমেয়েরা একে অপরকে ধর্মের ভিত্তিতে চিনতে শিখুক — এই কি উনি চান? কোথায় কবীর সুমন যিনি বলেন মমতাদেবীর নামে মন্দির হবে? এই কি দেবীসুলভ কাজ?

পুনশ্চ: যাদের সাথে রাজনৈতিক লড়াইয়ে জেতার জন্যে মাননীয়া এই বিভাজন উস্কে দিচ্ছেন সেই সঙ্ঘ পরিবার এ খেলায় বিশ্বকাপের দাবিদার; মুখ্যমন্ত্রী তো সবে সন্তোষ ট্রফি খেলতে নেমেছেন। এখন মোহন ভ্যাগাবন্ড আসছে, এরপরে এ রাজ্যে ভোগী আদিত্যনাথ, শুঁড়ির সাক্ষী মহারাজও আসবে। এসে বঙ্গ ক্যালিফেট ইত্যাদি আষাঢ়ে গপ্প বলবে। সেই ঢপগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করার দায়িত্ব এতদ্বারা মুখ্যমন্ত্রীই নিয়ে নিয়েছেন। পারেন মাইরি! টিপু সুলতান মসজিদের একজন ইমাম আছেন তাই-ই জানতাম না ভাল করে। এখন দেখছি মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া ভাতায় বেশি খেয়ে তেনার এমন বদহজম হয়েছে যে নিজেকে দন্ডমুন্ডের কর্তা ভেবে বসেছেন।

সাচ্চা মুসলমান

কোন বন্ধুর সাথে আড্ডা মারার সময়ে, কোন স্যারের ক্লাস করার সময়ে, কোন ক্রিকেটারের নৈপুণ্যে মুগ্ধ হওয়ার সময়ে আমি সতর্ক হয়ে তাঁদের মুসলমানত্ব খেয়াল করিনি কারণ তাঁরা আমার হিন্দুত্ব সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন না। সরস্বতীপুজোর দিন আমি আর আমার বন্ধু মন দিয়ে খিচুড়ি আর ঘ্যাঁট সাঁটাচ্ছিলাম। ও মুসলমান হয়ে এই প্রসাদ খেয়ে ইসলামবিরোধী কাজ করছে কিনা এই গুরুতর সমস্যাটা নিয়ে আমাদের ভেবে দেখার সময় হয়নি

মহম্মদ শামির বউ কেন হিজাব ব্যবহার করেন না? মীর কেন সপরিবারে বড়দিন পালন করেন এবং অন্যদের শুভেচ্ছা জানান? এসব তো সাচ্চা মুসলমানের কাজ নয়।
এইসব কথাবার্তা শুনে যা বুঝছি, বহু মুসলমান বন্ধুর সাথে মেশা সত্ত্বেও, বহু মুসলমান মাস্টারমশাইয়ের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও, বহু মুসলমান অভিনেত্রীর প্রেমে পড়া সত্ত্বেও, বহু মুসলমান ক্রিকেটারের খেলা দেখা এবং প্রতিবেদন লেখায় যুক্ত থাকা সত্ত্বেও, মুসলমান কবিদের কবিতা পড়ে পাগল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এখন অব্দি একজনও সাচ্চা মুসলমানকে আমি চিনি না। অবশ্য আমার দিক থেকে একটা বড় ভুল হয়েছে। কোন বন্ধুর সাথে আড্ডা মারার সময়ে, কোন স্যারের ক্লাস করার সময়ে, কোন ক্রিকেটারের নৈপুণ্যে মুগ্ধ হওয়ার সময়ে আমি সতর্ক হয়ে তাঁদের মুসলমানত্ব খেয়াল করিনি কারণ তাঁরা আমার হিন্দুত্ব সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন না। সরস্বতীপুজোর দিন আমি আর আমার বন্ধু মন দিয়ে খিচুড়ি আর ঘ্যাঁট সাঁটাচ্ছিলাম। ও মুসলমান হয়ে এই প্রসাদ খেয়ে ইসলামবিরোধী কাজ করছে কিনা এই গুরুতর সমস্যাটা নিয়ে আমাদের ভেবে দেখার সময় হয়নি।
ম্যাকবেথ পড়ানোর সময়ে আমাদের মাস্টারমশাই শেক্সপিয়ারেই বুঁদ ছিলেন, আমার গায়ে পৈতে আছে কিনা সে ভাবনা ওঁর মাথায় আসেনি। আমিও ওঁর কন্ঠে উচ্চাকাঙ্ক্ষায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলা একজন মানুষকেই খুঁজছিলাম। তিনি দিনে পাঁচবার নমাজ পড়েন কিনা এ প্রশ্নটা আমার মনে জাগেনি।
কি অদ্ভুতই না হত যদি ওয়াহিদা রহমান বোরখায় ঢেকে রাখতেন ঐ রহস্যময় সৌন্দর্য! কোন গীতিকারের মনেই আসত না পূর্ণিমার চাঁদের সংগে তাঁর তুলনা চলে। একবার ভাবুন, মহম্মদ রফি গানটা গাইতে গিয়ে যদি বলে উঠতেন “বলি হচ্ছেটা কী? ওয়াহিদার তো পর্দার নীচে থাকা উচিৎ। তার বদলে এসব কী ধ্যাষ্টামো? এই যে ভাই শাকিল, বলি তোমার কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই? নিজে মুসলমান হয়ে আরেকজন মুসলমান মহিলাকে নিয়ে এইসব গান লিখেছ? বলি নবীকে কী জবাব দেবে ভেবেছ?”
কান্ডটা সত্যিই ঘটলে আমি অন্তত কিছুটা দরিদ্র হয়ে থাকতাম। আমার বউ যখন রেগে যায় তখন তাকে মানানোর জন্যে যে যে গান বেসুরো গলায় গাই তা থেকে একটা কম পড়ে যেত। তা এই রফি সাহেব, ওয়াহিদা আর গীতিকার শাকিল বাদাউনি দেখছি সাচ্চা মুসলমান নন। নির্দেশক মহম্মদ সাদিক তো কাফের টাফের হবেন বোধহয়।
মধ্য কলকাতার এক বারে ভাল চিলি পর্ক পাওয়া যায়। আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে ঐ অপূর্ব জিনিসটি যিনি প্রথমবার খাইয়েছিলেন তাঁকেও দেখছি সাচ্চা মুসলমান বলা চলে না, যদিও ইসলাম ধর্ম নিয়ে তাঁর অনেক পড়াশোনা।
যা-ই হোক আমার জীবনে এরকম মেকি মুসলমানদের যা অবদান তাতে এদের সাচ্চাই নিয়ে আমার মাথাব্যথা ছিল না। গন্ডগোল পাকালেন আরেক মুসলমান। কাজী নজরুল নামের এই ভদ্রলোক বেশকিছু রসোত্তীর্ণ শ্যামাসংগীত লিখে বসে আছেন। অতএব এনাকেও ঐ মেকিদের দলেই ধরেছিলাম। তারপর দেখি ও বাবা! “ক্ষমা কর হজরত” বলে একখানা কবিতাও লিখেছেন। সে কবিতাটা পড়লে কেমন যেন যারা শামি আর মীরের পেছনে লেগেছে তাদেরকেই মেকি মুসলমান বলে মনে হচ্ছে যে! কি বিপদ!
তারপর ভাবলাম, যাকগে! এসব ওদের ধর্মের ব্যাপার। হিন্দুরা কিন্তু এরকম গোলমেলে নয়। হিন্দুরা ভীষণ উদার। এই যে সবাই মিলে চার হাত পা তুলে সান্টাক্লসের টুপি মাথায় দিয়ে বড়দিন পালন করছে, এতে একজনও কিছু বলেছে? বলেনি তো। এই ভেবে একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে গিয়ে বিষম টিষম খেয়ে একাক্কার।
আসলে ফোনে ফেসবুকটা খোলা ছিল। এক বন্ধুর ওয়ালে দেখলাম কোন অভিনেত্রী নাকি টিভি সিরিয়ালে পার্বতী সাজে। সে বেড়াতে গিয়ে কেন বিকিনি পরেছে তাই নিয়ে বহু হিন্দু গোঁসা করেছে। তারপর দেখি সঈফ-করিনা কেন ছেলের নাম তৈমুর রেখেছে তা নিয়ে অনেক হিন্দুর অনেক বক্তব্য। কয়েকটি বরাহনন্দন আবার ঐ দুধের শিশুর ক্যান্সার কামনা করেছে। তারপরে আরো দেখলাম ইরফান পাঠানের ছেলে হওয়ায় কেউ কেউ পরামর্শ দিয়েছে “ভাই, ছেলের নাম কিন্তু দাউদ বা ইয়াকুব রেখো না।”
গর্বে বুকটা ফুলে উঠল, চোখে জল এসে গেল। বুঝলাম সব ধর্মের ইতরদের শ্রেষ্ঠ মিলনতীর্থ আমাদের এই ভারতবর্ষ। সম্যক বুঝলাম রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী, নেহরু, আম্বেদকর, মৌলানা আজাদ — সব্বাই ভুল। সবার উপরে ডি এল রায় সত্য তাহার উপরে নাই। “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।”

মৌলবাদী বনাম মৌলবাদী

এদেশে আমরা তো পারিনি এমন কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে যা দাবি করে ১৯৮৪র দেশজোড়া শিখ গণহত্যার নাটের গুরুদের শাস্তি, ২০০২ এর গুজরাটে মুসলমান গণহত্যার খলনায়কদের শাস্তি। বরং ভারতে তো উল্টোটাই হয়ে চলেছে। গণহত্যার পুরস্কারস্বরূপ মন্ত্রিত্ব পাওয়া যাচ্ছে — যেমন কংগ্রেস আমলে, তেমনি বিজেপি আমলে। গুজরাটের ঘটনায় তবু যে কজনের শাস্তি হয়েছিল তারাও মে ২০১৪র পরে গারদের বাইরে এসে ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গণপিটুনিতে অভিযুক্ত রোগভোগে মারা গেলে তার মৃতদেহ জাতীয় পতাকাশোভিত হচ্ছে

বাংলাদেশের হিন্দুদের উপরে অত্যাচার হলে বোধহয় সবচেয়ে উল্লসিত হয় ভারতের হিন্দু মৌলবাদীরা। কারণ তখন ওটা দেখিয়ে তারা বলতে পারে “কিছু বাঞ্চোদ তবুও বলবে ভারতে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে” (ভাষাটা দেখে কেউ নাক সিঁটকোবেন না দয়া করে। এই ভাষাতেই ওরা লেখে এগুলো)। কদিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা ফেসবুক পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় মন্দির, বিগ্রহ ভাঙা হয়েছে। হিন্দুবাড়িতে লুঠতরাজ, খুন, জখম ইত্যাদি করা হয়েছে। সেই ঘটনা নিয়েও উপরে যেমন বললাম তেমন পোস্ট দেখতে পাচ্ছি। যে মানসিকতা নিয়ে এই জাতীয় পোস্ট করা হয় তারমধ্যে অনেকগুলো মনুষ্যেতর যুক্তি কাজ করে। যেমন:

১) হিন্দুরা করলেই দোষ হয়ে যায়। এখন যে ওরা (মুসলমানরা) করছে!

২) আমরা তো এখনো কিছুই করিনি (দাদরি ফাদরি ভুলে যান)। দেখাব মজা, দাঁড়াও না (অর্থাৎ গোটা দেশটাকে গুজরাট বানিয়ে দেবো। যদিও বলার সময় বলব গুজরাট নিয়ে মোদীকে মিথ্যে অভিযুক্ত করা হয়। আদালত নির্দোষ ঘোষণা করেছে, ইত্যাদি)।

৩) আমাদের দেশের পাকিস্তানী এজেন্টগুলো (মানে কিছু রাজনৈতিক দল, ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী এবং কিছু সাংবাদিক যারা এখনো সংঘচালিত নয়) বাংলাদেশ, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার নিয়ে তো কিছু বলে না। যত দরদ খালি মুসলমানদের জন্য, না? কই বাংলাদেশের কেউ তো হিন্দুদের জন্য চোখের জল ফেলছে না, এদের এত মড়াকান্না কিসের জন্য?

এক এক করে উত্তর দেওয়া যাক।

১) দোষ হিন্দুরা করলেও হয়, মুসলমানরা করলেও হয়। পৃথিবীর কোথাও এমন আইন আছে শুনেছেন যে খুনীকে মাপ করে দেওয়া হয় এই যুক্তিতে যে আরো অনেকে খুন করেছে? এই যুক্তি একমাত্র সে-ই দেখায় যার উদ্দেশ্যই খুন করা।

২) এই যে তুলনামূলক আলোচনা করে বলছেন আমরা সহিষঞু, এতেই আপনারা নিজেরাই প্রমাণ করছেন সহিষঞু নন। তর্জনী উঁচিয়ে বলছেন “খবরদার অসহিষঞু বলবি না। কিছুই তো করিনি এখনো।” এ সেই সুকুমার রায়ের কবিতা হয়ে গেল “আমি আছি, গিন্নী আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে। সবাই মিলে কামড়ে দেব মিথ্যে এমন ভয় পেলে।” কবিতাটা পড়ে যেমন সবাই হাসে, আপনাদের কথাবার্তাও হেসে উড়িয়ে দেওয়া যেত আপনাদের হাতে ক্ষমতা না থাকলে। বস্তুত নেহরু এবং প্যাটেল আপনাদের হেসেই উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন এবং সেটাই ভুল হয়েছিল।

৩) এবার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগে আসা যাক। প্রথমত, “পাকিস্তানী এজেন্ট” কথাটা ভীষণ বোকাবোকা। চীনা এজেন্ট বললে তাও ভেবে দেখা যেত। পাকিস্তান ভারতের রাজনৈতিক দল, প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক — এদের হাতখরচই দিয়ে উঠতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, ভারতের অগ্রগণ্য সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের নিয়ে বিলক্ষণ লেখালিখি, আলাপ আলোচনা হয়। আপনারা যথারীতি সেটা চেপে যান। রাজনৈতিক দলগুলোও সময়ে সময়ে ওদেশের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যেই কথা বলে। নিঃসন্দেহে এদেশের পরিস্থিতি নিয়ে যতটা বলে ততটা বলে না। কেন বলবে? দলগুলো এদেশের। সংবিধান তাদের এদেশের মানুষের ভালমন্দের দায়িত্ব দিয়েছে। তারা এদেশের মানুষের দুর্দশা নিয়ে হইহল্লা না করে সারাক্ষণ বাংলাদেশ, পাকিস্তান নিয়ে ব্যস্ত থাকবে? মৌলবাদী মস্তিষ্ক ছাড়া এরকম চিন্তার উর্বর ক্ষেত্র পাওয়া মুশকিল।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশে, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের খবর আপনি জানছেন
কি করে? জানাচ্ছে তো সেদেশের সংবাদমাধ্যম। সেগুলো চালায় কারা? সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংবাদিক কারা? সেদেশের মুসলমানরা। হিন্দুদের আক্রমণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে, বাকস্বাধীনতার উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সামনের সারিতেই আছেন মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা। কতজনের প্রাণ গিয়েছে, কতজন দেশছাড়া হয়েছে জানেন না? নাকি না জানার ভান করছেন?
চতুর্থত, সাধারণ মানুষের কথা যদি বলেন, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ঘটনার পরেও দেখলাম ফেসবুকে সবচেয়ে সরব আমার বাংলাদেশি মুসলমান বন্ধুরাই। আমি তো ঘটনাটার কথা প্রথম জানলাম তেমন এক বন্ধুর দেয়াল থেকেই। বন্ধুর কোন দেশ হয় না, ধর্ম হয় না। কিন্তু এক্ষেত্রে বন্ধুদের এই দুটো পরিচয় উল্লেখ না করে উপায় থাকল না, এজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। শাহবাগে দিনের পর দিন যারা মৌলবাদীদের শাস্তির দাবিতে হত্যে দিয়ে পড়েছিল তাদের অধিকাংশও মুসলমান। আমার অন্তত একজন বন্ধু তার মধ্যে ছিল, একথা বলতে আমি গর্ববোধ করি।
এদেশে আমরা তো পারিনি এমন কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে যা দাবি করে ১৯৮৪র দেশজোড়া শিখ গণহত্যার নাটের গুরুদের শাস্তি, ২০০২ এর গুজরাটে মুসলমান গণহত্যার খলনায়কদের শাস্তি। বরং ভারতে তো উল্টোটাই হয়ে চলেছে। গণহত্যার পুরস্কারস্বরূপ মন্ত্রিত্ব পাওয়া যাচ্ছে — যেমন কংগ্রেস আমলে, তেমনি বিজেপি আমলে। গুজরাটের ঘটনায় তবু যে কজনের শাস্তি হয়েছিল তারাও মে ২০১৪র পরে গারদের বাইরে এসে ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গণপিটুনিতে অভিযুক্ত রোগভোগে মারা গেলে তার মৃতদেহ জাতীয় পতাকাশোভিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সশরীরে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছেন। কারোর দিকে আঙুল তোলা আমাদের সাজে না।