মঈন সম্পর্কে কুৎসিত বিদ্রূপে সন্দেহ জাগে, তসলিমা কি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া?

আমরা যাকে লেখিকা তসলিমার সত্যবাদিতা বলে ভেবেছি, তা কি আসলে শুধুমাত্র তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জারিত মুসলমান বিদ্বেষ?

এই উপমহাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কথা হবে, নারী স্বাধীনতা নিয়ে কথা হবে, আর তসলিমা নাসরিনের নাম আসবে না — এমনটা প্রায় হয় না। ২০০৯ লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন এসে পড়লেও একবার না একবার তাঁর নাম ওঠেই। এ বারেও দিন দুয়েক আগে একটা বাংলা খবরের চ্যানেলে দেখলাম বিজেপির মুখপাত্র যুগপৎ তৃণমূল এবং সিপিএমকে আঘাত করতে তসলিমা অস্ত্র ব্যবহার করলেন। অনস্বীকার্য যে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ থেকে তসলিমার বিতাড়ন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে বামপন্থীদের অবস্থানকে দুর্বল করেছে। গোটা কতক গুন্ডার তাণ্ডবে সন্ত্রস্ত হয়ে বামফ্রন্ট সরকার তাঁকে কলকাতা ছেড়ে যেতে বাধ্য করল — এ দৃশ্য কেবল বামপন্থী নয়, কোন উদারচেতা মানুষেরই পছন্দের দৃশ্য নয়। বিশেষত যখন একই সরকার অতীতে পাকিস্তানের ক্রিকেট দলকে শিবসেনা মুম্বাইতে খেলতে দেবে না শুনে সাদরে ডেকে এনেছে। দীপা মেহতাকে হিন্দুত্ববাদীরা বারাণসীতে ‘ওয়াটার’ ছবির শুটিং করতে দেবে না শুনে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য স্বয়ং পশ্চিমবঙ্গে আহ্বান করেছেন। তৃণমূল রাজত্বে এক দিকে তসলিমাকে ফিরিয়ে না আনা, অন্য দিকে গজল শিল্পী গুলাম আলিকে অন্য জায়গায় গাইতে দেওয়া হচ্ছে না বলে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে গাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির দ্বিচারিতা নির্দেশ করে। কিন্তু এসব জানা কথার পুনরালোচনা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আলোচ্য তসলিমার বিদ্রোহী, উদার ভাবমূর্তি।

সাহিত্যিক জীবনের শুরু থেকেই তসলিমা পশ্চিমবঙ্গের আদর পেয়েছেন। সম্ভবত নিজের দেশের চেয়েও বেশি সমাদৃত হয়েছেন সীমান্তের এ পারে। অবশ্য তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখাগুলো থেকে জানা যায় পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি জগতের অনেকেই তাঁর প্রতি ঈর্ষায় ভুগতেন, সকলেই তাঁর গুণমুগ্ধ ছিলেন না। কিন্তু ঈর্ষা তো যে কোন গুণী মানুষের জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তসলিমার বই যে পশ্চিমবঙ্গের পাঠক একসময় গোগ্রাসে গিলেছেন তা তো আর মিথ্যে নয়। লোকাল ট্রেনে ‘লজ্জা’-র কপিরাইটকে কাঁচকলা দেখানো শস্তা সংস্করণ বিক্রি হতে দেখার অভিজ্ঞতা সে যুগে অনেকেরই হয়েছে। গ্রামীণ লাইব্রেরিতেও একসময় ‘নির্বাচিত কলাম’ ফেরত আসতে না আসতে অন্য কোন পাঠক নিয়ে নিতেন। তাছাড়া এ রাজ্যের বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ যে তসলিমার দুঃসময়ে তাঁর পাশে থেকেছেন তা নেহাত অকৃতজ্ঞ না হয়ে উঠলে তিনি কোনদিন অস্বীকার করবেন না। নিজেই তো লিখেছেন, শিবনারায়ণ রায়ের মত মানুষ নাকি বলেছিলেন বাংলাদেশ তসলিমার বাড়ি হলে পশ্চিমবঙ্গ তার মাসির বাড়ি। মায়ের কাছে থাকতে না পারলে মাসিই তো আগলাবে। এই সমাদরের কারণ কী? কারণটা সহজ।

তিনি এমন একজন সাহিত্যিক, যিনি নিজের লেখার জন্য সামাজিকভাবে কোণঠাসা হয়েছেন, খুন এবং ধর্ষণের হুমকি পেয়েছেন, নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। যে কোন রুচিশীল স্বাভাবিক মানুষেরই এমন মানুষের প্রতি সহানুভূতি এবং সমর্থন থাকে, অন্তত গত শতাব্দীতে থাকত। ধর্মীয় মৌলবাদীদের বিপক্ষে যাঁরা দাঁড়ান, তাঁদের প্রতিও গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ (অন্তত সাংবিধানিকভাবে) দেশের মানুষের সহমর্মিতা থাকাই স্বাভাবিক। শুধু পশ্চিমবঙ্গ কেন? পাশ্চাত্যেও তসলিমা একই কারণে আশ্রয় পেয়েছেন। কিন্তু মুশকিল হল, ভারতে হিন্দু মৌলবাদের উত্থান হওয়ার পর থেকেই তসলিমার উদারপন্থার সততা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে। ২০১৪ থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, তসলিমা ইসলামিয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে যত সোচ্চার, হিন্দু মৌলবাদের বিরুদ্ধে তার ছিটেফোঁটাও নন। উপরন্তু, প্রকৃত দক্ষিণপন্থীদের মতই তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য যতটা না ধর্মীয় মৌলবাদ, তার চেয়ে বেশি ধর্মাচরণকারী মানুষজন।

গত বছর কেন্দ্রের বিজেপি সরকার নতুন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাশ করল এবং দেশজুড়ে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের সাথে সাথে হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিষ্টান — সকলেই প্রতিবাদে পথে নেমে এলেন। কারণ এই আইন স্পষ্টতই সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের বিপরীত এবং মুসলমানদের অনাগরিক করে দেওয়ার প্রথম ধাপ। উদারচেতা, মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বীর সৈনিক, নারীবাদী আইকন তসলিমা কিন্তু বিপুল সংখ্যক মহিলার অংশগ্রহণে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়াননি। বরং ১৭ জানুয়ারি ২০২০ কেরালা সাহিত্য উৎসবে তিনি আইনটার প্রশংসা করেন, শুধু যোগ করেন তাঁর মত নাস্তিক বা উদারচেতা মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের জন্য এই আইনে বিশেষ ব্যবস্থা থাকা উচিৎ  [১]। বিজেপি রাজত্বে পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী তারেক ফতের মতই তসলিমাও হিন্দুত্ববাদের কাজের মানুষ, কাছের মানুষ হয়ে উঠেছেন বোঝা যায়।

তবু তাঁর লেখালিখির ভক্ত কম নেই পশ্চিমবঙ্গে। তসলিমার বিভিন্ন সোশাল মিডিয়া পোস্ট নিয়ে প্রায়শই দু দল বাঙালির মধ্যে তর্ক বেধে যায়। এক পক্ষে ইসলাম ধর্মের ধ্বজাধারীরা থাকেন, অন্য পক্ষে তাঁদের মৌলবাদী বলা মানুষজন থাকেন — ব্যাপারটা ঠিক এরকম নয়। এক পক্ষে এমন হিন্দু এবং মুসলমান থাকেন, যাঁরা মনে করেন তসলিমা ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। অন্য পক্ষে থাকেন সেই হিন্দু এবং মুসলমানরা, যাঁরা মনে করেন তসলিমা অন্যায় কথাবার্তা লিখেছেন। স্বভাবতই দুই ধর্মের মৌলবাদীরাও এই কথোপকথনে ঢুকে পড়ে, কুকথার আদান প্রদান হয়, শেষ অব্দি কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয় না। কিন্তু গত পরশু তসলিমা যে টুইট করেছেন, সেটাকে কিছুতেই ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে টুইট বলে চালিয়ে দেওয়ার উপায় নেই।

তসলিমা লিখেছেন ইংল্যান্ডের ক্রিকেটার মঈন আলি ক্রিকেট নিয়ে ব্যস্ত না থাকলে সিরিয়ায় গিয়ে ইসলামিয় সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আইসিসে যোগ দিতেন। স্পষ্টতই এখানে তসলিমা ইসলামিয় গোঁড়ামিকে আক্রমণ করছেন না। তাঁর লক্ষ্য মঈন আলি মানুষটাই, কারণ তিনি যে মুসলমান তা প্রচ্ছন্ন নয়। তাঁর লম্বা দাড়ি ধার্মিক মুসলমান হওয়ার সাক্ষ্য বহন করে। তসলিমার তাতেই আপত্তি এবং এই নিষ্ঠুর রসিকতায় তিনি ধার্মিক মুসলমান মাত্রেই সন্ত্রাসবাদী — এই বার্তাই দিতে চাইছেন। অতীতে ভারতীয় মুসলমানদের সম্বন্ধে এ জাতীয় মন্তব্য করে তিনি পার পেয়ে গেছেন, কারণ বর্তমান ভারতের বহু মানুষ তাঁর সমর্থনে উঠে দাঁড়ায়। বিপদে পড়লেন ইংল্যান্ডের ক্রিকেটারকে নিয়ে টানাটানি করে। মুহূর্তের মধ্যে ইংল্যান্ড দলের জোফ্রা আর্চার, স্যাম বিলিংস, বেন ডাকেট প্রমুখ তসলিমার নিন্দা করে টুইট করেন।

Are you okay ? I don’t think you’re okay https://t.co/rmiFHhDXiO

— Jofra Archer (@JofraArcher) April 6, 2021

Can’t believe this. Disgusting tweet. Disgusting individual https://t.co/g8O1MWyR81

— Saqib Mahmood (@SaqMahmood25) April 6, 2021

This is the problem with this app. People being able to say stuff like this. Disgusting. Things need to change, please report this account! https://t.co/uveSFqbna0

— Ben Duckett (@BenDuckett1) April 6, 2021


তাঁদের ভক্তরাও যোগ দেন। লেখিকা আর যা-ই হোন, বোকা নন। তিনি নিজের দেশ ছাড়া অন্য কোন দেশের সংখ্যাগুরুকে চট করে চটান না। তাই পরবর্তী টুইটেই দাবি করেন মঈন সম্বন্ধে টুইটটা ছিল “sarcasm”। লোকে সব বুঝেও তাঁকে আক্রমণ করছে, কারণ তিনি মুসলমান সমাজকে ধর্মনিরপেক্ষ করে তোলার চেষ্টা করেন এবং তিনি ইসলামিয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে:

Haters know very well that my Moeen Ali tweet was sarcastic. But they made that an issue to humiliate me because I try to secularize Muslim society & I oppose Islamic fanaticism. One of the greatest tragedies of humankind is pro-women leftists support anti-women Islamists.

— taslima nasreen (@taslimanasreen) April 6, 2021


খ্রিষ্টানরা তাঁকে আক্রমণ করছে তিনি ইসলামিয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন বলে — এই বাণীতে চিড়ে ভেজার কথা নয়, ভেজেওনি। অগত্যা তিনি টুইটটা মুছে দেন। অবশ্য দুঃখপ্রকাশ করেননি। উপরন্তু প্রথম টুইটের সমালোচনায় লিবারেশন নেত্রী কবিতা কৃষ্ণণ তাঁকে “garden variety bigot” বলায় দাবি করেছেন কবিতা তাঁর বিরুদ্ধে “ফতোয়া” দিচ্ছেন। এই শব্দের ব্যবহার থেকেই পরিষ্কার তসলিমার বিরুদ্ধে কথা বলা যে কোন মানুষই তাঁর কাছে ইসলামিয় মৌলবাদী। প্রথমে অন্যকে অকারণে আক্রমণ করা, তারপর প্রতিবাদের সম্মুখীন হলে নিজেকেই আক্রান্ত বলে দাবি করা এক চিরায়ত দক্ষিণপন্থী কায়দা। তসলিমা সেটা চমৎকার রপ্ত করেছেন দেখা যাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হল, এই যে এতগুলো বছর ধরে আমরা, আমাদের শিল্পী সাহিত্যিকরা তাঁকে মাথায় করে রেখেছি তাঁর লেখনীর জন্য, সেটা কি স্রেফ বোকামি? আমরা যাকে লেখিকা তসলিমার সত্যবাদিতা বলে ভেবেছি, তা কি আসলে শুধুমাত্র তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জারিত মুসলমান বিদ্বেষ? আমরা, ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা, নেহাত বাংলাদেশের হিন্দুদের নির্যাতনের কথা পড়তে ভাল লাগছিল, মুসলমান সমাজে মেয়েদের কোন স্বাধীনতা নেই –- এই স্টিরিওটাইপে তসলিমার লেখা চমৎকার খাপ খাচ্ছিল বলেই কি এতকাল তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছি? কখনো সখনো অন্য ধর্মের গোঁড়ামি নিয়েও তিনি লিখেছেন সত্যি। কিন্তু যে ধারাবাহিকতায় এবং তীব্রতায় তিনি ইসলাম ধর্মকে আক্রমণ করেন, একইভাবে হিন্দু ধর্মকে আক্রমণ করলেও আমাদের এই উদারতা বজায় থাকত তো?

তসলিমা কি সত্যিই হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া, যাকে আমরা চিনতে পারিনি? নাকি এই মুহূর্তে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচার করে নিজের পিঠ বাঁচানোর জন্য তিনি তীব্র মুসলমান বিদ্বেষ প্রদর্শনের রাস্তা নিয়েছেন? আপনাকে, আমাকে, সবাইকেই তো শেষ পর্যন্ত নিজেকে বাঁচাবার জন্য আপোষ করতেই হয়। তসলিমাই বা ব্যতিক্রম হবেন কী করে? তিনি বিখ্যাত হলেও শেষপর্যন্ত একজন নিরস্ত্র, ক্ষমতাহীন মানুষই তো।

এই যুক্তিতে ক্রিকেটে যাকে benefit of doubt বলে, তসলিমা সেটা পেতে পারেন। কিন্তু তাহলে মেনে নিতে হবে তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সৈনিক নন, নারীস্বাধীনতার লড়াকু আইকন নন। কারণ সেই স্তরের মানুষের পিঠ বাঁচানোর অধিকার থাকে না। মেয়েদের জন্য লড়ছি, সংখ্যালঘুদের জন্য লড়ছি, অথচ সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হতে পারব না, একথা বললে চলে না। দুই বাংলার যেসব মানুষ, বিশেষ করে মহিলা, তসলিমাকে উচ্চাসন দিয়েছিলেন; মঈনের কাছে না হলেও তাঁদের কাছে তসলিমাকে একদিন কৈফিয়ত দিতেই হবে।

সূত্র:
১. দ্য হিন্দু সংবাদপত্র

https://nagorik.net এ প্রকাশিত। ছবি টুইটার থেকে।

নির্বাচিত ক্রোধ

অনেকদিন আগে একটা বই পড়েছিলাম — নির্বাচিত কলাম। সে বইয়ের লেখিকা তসলিমা নাসরিন দ্রুত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অগ্রগণ্য নারীবাদী, প্রগতিশীল লেখিকা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন। নিজের দেশ থেকে মুসলমান মৌলবাদীদের যাতনায় নির্বাসিত হয়ে দীর্ঘদিন এই বাংলায় ছিলেন। একই ধর্মের উগ্রবাদীদের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে ২০০৭ এ পশ্চিমবঙ্গের ধ্বজভঙ্গ সরকারের তাঁকে চলে যেতে বলা নিঃসন্দেহে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। মৌলবাদের যাতনায় মায়ের দেশ এবং মাসির দেশ (শিবনারায়ণ রায়ের ভাষায়) ছাড়তে বাধ্য হওয়া এই সাহিত্যিক শ্রীজাত, মন্দাক্রান্তার পাশে দাঁড়াবেন আশা করছিলাম। গতকাল দেখলাম দাঁড়িয়েছেন, তবে ছায়া এড়িয়ে। ভারতের অনেক জায়গায় এখনো উঁচু জাতের লোকেরা যেভাবে নীচু জাতের ছায়া এড়িয়ে দাঁড়ায়, সেভাবে

taslima

১৯৮০ সালে মুক্তি পায় ‘হীরক রাজার দেশে’। অনেকেই মনে করেন ছবিটা ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে সত্যজিৎ রায়ের প্রতিক্রিয়া। ওটা মুক্তি পাওয়ার সময়ে ভারতে “selective outrage” কথাটা চালু হয়নি। হয়নি বলেই কংগ্রেসিরা বা ইন্দিরা সমর্থকেরা প্রশ্ন তোলেনি “এমার্জেন্সির অত্যাচার নিয়ে ছবি করেছেন। ইংরেজের অত্যাচার নিয়ে ছবি করেননি কেন?”
“Selective” আর “outrage” দুটো শব্দই ইংরিজি ভাষায় থাকলেও পাশাপাশি বসিয়ে নতুন অর্থ দেওয়ার কথা সম্ভবত ১৯১৯ সালে ইংরেজদের মাথাতেও আসেনি। নইলে রবীন্দ্রনাথ নাইট উপাধি ত্যাগ করার পরে সরকার বাহাদুর বলতেই পারতেন “Where were you when Mughals killed Sikhs in Sikh-Mughal wars? Why this selective outrage?”
ভারতীয় দক্ষিণপন্থীদের এক অনন্য অবদান এই “selective outrage”। কী বাংলা হওয়া উচিৎ এর? “নির্বাচিত ক্রোধ?” আচ্ছা উন্মাদ ছাড়া কেউ কি সবেতেই রেগে যায়? নাকি সকলে একই জিনিসে ক্রুদ্ধ হন? আপনি কখনো কোন দক্ষিণপন্থীকে দেখেছেন ভারতে বিচারাধীন বন্দিদের মধ্যে মুসলমান আর দলিতদের অস্বাভাবিক বেশি অনুপাত নিয়ে “outraged” হতে? পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মগুরুদের প্রভাব নিয়ে সরব হলেও গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীকে মুখ্যমন্ত্রী করায় “outraged” হননি এরকম লোকেরাই তো এদেশে এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ। একেও কি “selective outrage” বলা উচিৎ? যাঁরা জাকির নায়েককে উস্কানিমূলক কথাবার্তার জন্য হাতকড়া পরাতে চান কিন্তু যোগী আদিত্যনাথকে একটা সুযোগ দিতে চান তাঁদের রাগকে কি নির্বাচিত ক্রোধের দলে ফেললে খুব অন্যায় হবে?
আসলে “outrage” বা ক্রোধ একটি মানবিক অনুভূতি, যা নির্ভর করে কোন বিষয়ে একজন মানুষের “opinion” বা মতামতের উপর। দক্ষিণপন্থীদের মত হল ভারতীয় মুসলমান এবং দলিতরা মায়ের পেট থেকেই পড়েই অপরাধী হয়ে যায়। সুতরাং অন্যদের চেয়ে তারা বেশি কারারুদ্ধ হবে, এতে আর ক্রুদ্ধ হওয়ার কী আছে? পাকিস্তান, বাংলাদেশের ধর্মগুরুরা অত্যন্ত রক্ষণশীল কিন্তু যোগী আদিত্যনাথ হাইটেক প্রগতিশীল অতএব তাঁর কথা আলাদা — এই হচ্ছে তাঁর সমর্থকদের মতামত। সেইজন্যেই এনার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া নিয়েও এঁদের কোন outrage নেই। জাকির নায়েক যে ধর্মের লোক সে ধর্মের লোকেরা সন্ত্রাসবাদী হয় তাই তাঁর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা দরকার কিন্তু যোগী আদিত্যনাথ যতই প্রকাশ্য সভায় বলে থাকুন যে “একজন হিন্দু মরলে আমরা এফ আই আর করতে যাব না, কম করে দশজন মুসলমানকে মারব”, তাঁর প্রশাসক হিসাবে একটা সুযোগ প্রাপ্য যেহেতু হিন্দুরা সন্ত্রাসবাদী হয় না, আজমের বিস্ফোরণে দোষী সাব্যস্ত হলেও “activist” হয়।
এই মতামতগুলো ভাল কি মন্দ, ন্যায় কি অন্যায় সে আলোচনায় যাচ্ছি না, কিন্তু দক্ষিণপন্থীদের ক্রোধও যে নির্বাচিত সেটা কিন্তু এ থেকে বোঝা যাচ্ছে। এবং সেজন্যে তাঁদের গাল পাড়ছি না কারণ তাঁদের মতামতানুসারেই তাঁরা ক্রুদ্ধ হবেন। সেটাই স্বাভাবিক। গাল পাড়ব মতামতগুলোর জন্য, নির্বাচিত রাগের মত কোন কাঁঠালের আমসত্ত্বের জন্য নয়।
অনেকদিন আগে একটা বই পড়েছিলাম — নির্বাচিত কলাম। সে বইয়ের লেখিকা তসলিমা নাসরিন দ্রুত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অগ্রগণ্য নারীবাদী, প্রগতিশীল লেখিকা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন। নিজের দেশ থেকে মুসলমান মৌলবাদীদের যাতনায় নির্বাসিত হয়ে দীর্ঘদিন এই বাংলায় ছিলেন। একই ধর্মের উগ্রবাদীদের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে ২০০৭ এ পশ্চিমবঙ্গের ধ্বজভঙ্গ সরকারের তাঁকে চলে যেতে বলা নিঃসন্দেহে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। মৌলবাদের যাতনায় মায়ের দেশ এবং মাসির দেশ (শিবনারায়ণ রায়ের ভাষায়) ছাড়তে বাধ্য হওয়া এই সাহিত্যিক শ্রীজাত, মন্দাক্রান্তার পাশে দাঁড়াবেন আশা করছিলাম। গতকাল দেখলাম দাঁড়িয়েছেন, তবে ছায়া এড়িয়ে। ভারতের অনেক জায়গায় এখনো উঁচু জাতের লোকেরা যেভাবে নীচু জাতের ছায়া এড়িয়ে দাঁড়ায়, সেভাবে।
“শ্রীজাত, মন্দাক্রান্তার পাশে আছি কারণ আমি বাকস্বাধীনতার পক্ষে। কিন্তু….” সেই নির্বাচিত ক্রোধের তত্ত্ব। ওঁকে কলকাতা থেকে যখন চলে যেতে বলা হয় তখন কিছু বলেনি কেন? এরা কেবল হিন্দু মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলে। কোথায় ছিল এরা যখন তামিলনাডুর নাস্তিক এইচ ফারুককে হত্যা করা হল? খাগড়াগড় নিয়ে কবিতা লেখেনি কেন? ধূলাগড় নিয়ে লেখেনি কেন? রোজ কত মেয়েকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়, তসলিমাকেই কত হুমকি দেওয়া হয়েছে। তাই নিয়ে বলে না কেন?
“তখন বলেনি এখন বলছে কেন” যুক্তিটা কতটা খেলো সেটা আগেই বলেছি। দুরভিসন্ধিযুক্ত শাসক বা নিজের কুকীর্তি ঢাকতে ব্যস্ত কেউ ছাড়া অন্য লোক প্রতিবাদের বিরুদ্ধে এই যুক্তি খাড়া করে না। তসলিমা কেন করলেন সেটা ভাববার বিষয়। কিন্তু আর যা যা বলেছেন সেগুলো দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে।
এরা কেবল হিন্দু মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলে। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম কথাটা একশোভাগ সত্যি। এবার বলি, বেশ করে। এক ধর্মের লোক অন্য ধর্মের মৌলবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে প্রথমেই মৌলবাদীরা যেটা করে সেটা হল তার ধর্মকে বিধর্মী আক্রমণ করেছে বলে চেঁচিয়ে মৌলবাদী নন এমন মানুষদেরও সহানুভূতি আদায় করা। তাই করেই মকবুল ফিদা হুসেনকে তাড়ানো হয়েছিল। তসলিমাও বেশ করেন কেবল মুসলমান মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। তিনিই বা কবে কালবুর্গি বা নরেন্দ্র দাভোলকারের হত্যার ব্যাপারে কড়া বিবৃতি দিলেন? উলটে বলেছিলেন কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনায় প্রমাণ হয় না ভারত অসহিষ্ণু।
এবার তর্কের খাতির দূর করে বাস্তবে আসি। তসলিমা যথেষ্ট না জেনেই অভিযোগটা করে বসেছেন। শ্রীজাত ইসলামিক মৌলবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন লিখছেন। বাংলাদেশে ব্লগার হত্যার বিরুদ্ধে তিনি এতটাই সরব ছিলেন যে কবীর সুমন তাঁকে মুসলমানবিদ্বেষী আখ্যা দিয়ে প্রায় গালিগালাজ করেছিলেন ফেসবুকেই।
খাগড়াগড় নিয়ে লেখেনি কেন? ধূলাগড় নিয়ে লেখেনি কেন? প্রশ্নগুলো এমন একজন করেছেন যিনি নাকি নিজে কবিতা লেখেন। অবাক লাগছে ভাবতে যে একজন কবি প্রায় রাজনৈতিক নেতার মত ভাষায় নির্ধারণ করতে চাইছেন কবিকে কোন কোন ঘটনা নিয়ে লিখতে হবে। কবি তা নিয়েই লিখবেন যা নিয়ে তাঁর লিখতে ইচ্ছা করে। কবি সাংবাদিক নন। এটা তসলিমা জানেন না? আর ধূলাগড়? একজনও মানুষ মারা গেছে ওখানে? একটিও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে? ঘরেদোরে আগুন ধরানো হয়েছিল। সেই সংক্রান্ত অপরাধে ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিলকে তাল কোন না কোন উদ্দেশ্য নিয়েই করা হয় বলে জানি। সোশাল মিডিয়ার গুন্ডাদের উদ্দেশ্য বোঝা যায়। তসলিমাকে সেই দলে ফেলতে যে মন চায় না।
খাগড়াগড়? সে তো আরেক কান্ড। বিস্ফোরণের পর থেকে মৃত অভিযুক্তের নাম বদলাতে বদলাতে কোথা থেকে কোথায় যে গিয়ে পৌঁছেছে। হাজার হাজার ডক্টর হাজরা একেবারে। এন আই এ তদন্ত করছে, কয়েকজনকে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, এদিকে যে নাকি নাটের গুরু সে গত ২৮শে মার্চ সিলেটে নিহত হয়েছে। এটা নিয়ে কবির কী লেখার ছিল বুঝলাম না। আচ্ছা একটা প্রতিপ্রশ্ন করি? এই যে কদিন আগে আজমের ব্লাস্টে দুই আর এস এস কর্মীর যাবজ্জীবন কারাদন্ড হল, তসলিমার কি এই নিয়ে কিছু লেখা উচিৎ ছিল? যাক গে।
মন্দাক্রান্তাকে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে তসলিমা যা বলেছেন সেটা পড়ে হাসব না কাঁদব এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। এরকম হুমকি তো কত মেয়েই পায়। এখন মন্দাক্রান্তা পেয়েছে বলে লোকে হৈ হল্লা করছে — এই হল তসলিমার খেদ। ঠিকই তো। ভারতে রোজ কত মেয়ে ধর্ষিতা হচ্ছে, হঠাৎ নির্ভয়াকে নিয়ে সকলের অত চেগে ওঠার কী দরকার ছিল ভগবান জানে। বহু মেয়ে ধর্ষণের হুমকি পায় এবং ভয়ে কুঁকড়ে যায়, চুপ করে যায়, অনেকসময় হুমকিবাজরা দেখিয়ে দেয় তারা মুখেন মারিতং জগৎ নয়। ধর্ষণের পর মেয়েটি আরো নীরব হয়ে যায়। মন্দাক্রান্তা সেনেরও উচিৎ ছিল চুপচাপ হয়ে যাওয়া, প্রয়োজন হলে ফেসবুক ছেড়ে দেওয়া, অতঃপর দরজা জানালা এঁটে বাড়িতে বসে থাকা। এরকমটাই আপনার থেকে আশা করেছিলাম, তসলিমা দেবী। এই না হলে নারীবাদী?
আপনি চালিয়ে যান, ম্যাডাম। আপনি পুরো ব্যাপারটাকেই দাঁড় করালেন বুদ্ধিজীবী বনাম বুদ্ধিজীবী হিসাবে। আপনি শ্রীজাতর পাশে আছেন কিনা সেটা তো বড় কথা নয়, বড় কথা হল আপনি দাঙ্গাবাজের রাষ্ট্রক্ষমতা পাওয়ার পক্ষে না বিপক্ষে। সে ব্যাপারে আপনি একটা শব্দও খরচ করেননি। আপনার নীরবতা মুখর।

কয়েকটা প্রাসঙ্গিক লিঙ্ক

http://www.outlookindia.com/…/taslima-questions-sri…/1018138
http://m.economictimes.com/…/wont-…/articleshow/51564448.cms
http://twocircles.net/2014dec03/1417616083.html
http://www.timesnow.tv/…/mastermind-behind-2014-burdw…/58316