ললিপপ বনাম আমলকী। যে ভূখণ্ডে রাজনীতি করেছেন এবং বক্তৃতা দিয়েছেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু, ফজলুল হক, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, যোগেন মন্ডল, জ্যোতি বসু, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, মওলানা ভাসানী, তাজউদ্দীন, মুজিবুর রহমানরা – সেই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক বিতর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ললিপপ বনাম আমলকীর বিতর্ক।
নিজেদের দূরদৃষ্টিহীন বিদেশনীতির চক্করে পড়ে যাওয়া ভারত সরকার শেষপর্যন্ত শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিবিদদের মাধ্যমে বাংলাদেশের তদারকি সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে সফল হয়েছে। সেই বৈঠকে উত্তেজনার পারদ নেমেছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের প্রতিকার করতে যেমন বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং হবে। অথচ পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা কমার নাম নেই। তাতে ধুয়ো দিচ্ছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী, যাঁর এ বিষয়ে গরম গরম কথা বলার কোনো প্রয়োজন ছিল না, সাংবিধানিক এক্তিয়ারও নেই। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির নেতা, কর্মীরা লোকসভা নির্বাচনে এবং সদ্যসমাপ্ত উপনির্বাচনে পর্যুদস্ত হওয়ার পর ভেসে যেতে যেতে খড়কুটোর খোঁজ করছিলেন, চট্টগ্রামের অশান্তি তাঁদের পাড়ে তুলে দিয়েছে। ফলে তাঁরা যে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করে, ওপারের হিন্দুদের প্রতি প্রবল প্রীতি প্রদর্শন করে এপারের হিন্দু ভোট একত্রিত করতে চাইবেন তা প্রত্যাশিত। তবলার বাঁয়ার মত যুদ্ধবাজ এবং টিআরপিবাজ মিডিয়ার সাংবাদিকরাও যে যা মুখে আসে তাই বলবেন তাও জানা কথা। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির কী প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশি সেনার কিছু অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক আর বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনপি) একজন নেতা, যাঁরা বাংলাদেশ সরকারের কেউ নন, তাঁদের মন্তব্যের জবাবে খোদ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলার ‘এত বড় হিম্মত, আপনাদের কেন, কারো নেই যে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা সব নিয়ে নেবেন আর আমরা বসে বসে ললিপপ খাব’?
এর জবাবে আবার বিএনপির ওই নেতা, রুহুল কবীর রিজভি, বলেছেন ‘আপনারা যদি চট্টগ্রামের দিকে তাকান, তাহলে আমরা কি আমলকী মুখে চুষব?’
মানে দুই দেশের সরকার – যাদের হাতে বিদেশনীতি এবং প্রতিরক্ষা – তারা কেউ কারোর এলাকা দখল করার হুমকি দেয়নি। পশ্চিমবঙ্গের কিছু বিজেপি নেতা আর বিজেপি প্রোপাগান্ডার প্রচারক (নামে সাংবাদিক) বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করলেন। তার জবাবে বাংলাদেশের কিছু লোক, যাঁদের কোনো ক্ষমতাই নেই, তাঁরা পালটা গা গরম করা মন্তব্য করলেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সেই মন্তব্যের ততোধিক অর্থহীন জবাব দেওয়ার জন্য বেছে নিলেন রাজ্যের আইনসভাকে। কেন? বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারদের আর বিএনপি নেতার মেজাজ কেন বিগড়ে গেল, সে ভাবনা ওঁদের দেশের মানুষের উপর ছেড়ে দিয়ে আমরা বরং আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর উত্তেজনার কারণ অনুসন্ধান করি।
বাংলাদেশের ঘটনাবলীতে প্রথম থেকেই মনে হচ্ছে মমতা যেন কত কট্টরপন্থী প্রতিক্রিয়া দিতে পারেন তার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন বিজেপির সঙ্গে। ললিপপের বদলে আমলকীর হাস্যকর মন্তব্য করার সময়ে রিজভি এমন একটা কথা বলেছেন যা প্রণিধানযোগ্য। বলেছেন মমতাকে ওঁরা ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক বলে ভাবতেন। কিন্তু বাংলাদেশে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর কথা বলে মমতা নাকি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে তিনিও আসলে কট্টরপন্থী হিন্দু। মমতার ওই প্রস্তাবে সত্যিই তা প্রমাণ হয় কিনা তা তর্কসাপেক্ষ, কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ওই মন্তব্য বিজেপির চেয়েও চরমপন্থী। নরেন্দ্র মোদীর সরকার সেই জওহরলাল নেহরুর আমল থেকে চলে আসা সর্বসম্মত বিদেশনীতি ত্যাগ করে বহু ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। যেমন প্যালেস্তাইনের প্রতি মিত্রতার নীতি ত্যাগ করে ইজরায়েলের বন্ধু হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটা ব্যাপারে এখনো চিরকালীন নীতি বজায় রাখা হয়েছে, তা হল অন্য দেশের সঙ্গে ভারত সরকারের গোলমালকে দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসাবে দেখা। এমনকি কাশ্মীর সমস্যাকেও অতীতের কংগ্রেস এবং যুক্তফ্রন্ট সরকারগুলোর মতই মোদী সরকার ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা হিসাবেই দেখে। কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ চায় না। অথচ মমতা সটান একটা সার্বভৌম প্রতিবেশী রাষ্ট্র, যেখানকার সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হলে ভারতের স্বার্থও বিঘ্নিত হতে পারে, তাদের আভ্যন্তরীণ গোলমালে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের শান্তিবাহিনী পাঠানোর দাবি করে বসলেন!
মমতা প্রবীণ রাজনীতিবিদ, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে একাধিকবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও ছিলেন। ফলে তাঁর এত চরমপন্থী অবস্থানের রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে তিনি সচেতন নন এমন ভাবার কারণ নেই। যা হওয়ার তাই হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর এহেন আচরণে বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া হয়েছে। শান্তিবাহিনীর কথা বলায় খোদ বাংলাদেশ সরকার অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। মহম্মদ ইউনুসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন ‘আমরা অবাক হয়েছি ওঁর মন্তব্যে। এক জন মুখ্যমন্ত্রীর তো কথার ওজন থাকবে? তা ছাড়া এখানে যাঁরা পড়তে বা কোনও কাজে এসেছেন, সেই ভারতীয়রা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন, এমন কোনও খবর আমাদের কাছে নেই।’ এরপরেও মমতা সুর নরম করেননি। ললিপপ-আমলকীর যুদ্ধে এসে পৌঁছেছেন। এর একটাই অর্থ হয়। কোনো বিষয়ে আন্দোলন করে রাজ্য সরকারকে ফ্যাসাদে ফেলতে অক্ষম বঙ্গ বিজেপি বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর নির্যাতনকে যেভাবে আঁকড়ে ধরেছে, তাতে মমতা হিন্দু ভোট হারানোর আশঙ্কা করছেন। আশঙ্কা সত্যি হলে ক্ষমতা হাতছাড়া হতে পারে। তাই আর বছর দেড়েক পরের বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে তিনি যে বিজেপির চেয়েও বড় হিন্দু তা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। তাতে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি হল কি না হল তা ভেবে দেখার সময় নেই।
বিজেপিকে আটকানোর তাড়নায় এবং বামপন্থীদের দুর্বলতায় পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে একমাত্র পছন্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তার সুযোগ নিয়ে মমতা বাংলার মুসলমানদের প্রতি যথেচ্ছ অন্যায় করে চলেছেন। মমতার শাসনে এ রাজ্যের মুসলমানদের বলার মত আর্থসামাজিক উন্নয়নের কোনো দৃষ্টান্ত নেই। অথচ সারা ভারতে হিন্দুত্ববাদী নেতারা মুসলমানদের যে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেন তাঁদের ভাষণে, তারই অন্য পিঠে আছে মমতার ‘যে গরু দুধ দেয় তার লাথি খাওয়া উচিত’ মন্তব্য। ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষকে মনুষ্যেতর প্রাণির সঙ্গে তুলনা করাই ওই মন্তব্যের একমাত্র খারাপ দিক নয়। ওতে বিজেপির এই প্রোপাগান্ডাতেও সিলমোহর দেওয়া হয়েছে যে মুসলমানরা মমতার দলকে ভোট দেয় বলে তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে এই রাজ্যে। রেড রোডে ঈদের নমাজে গিয়ে নির্বাচনী কথাবার্তা বলেও তিনি রাজ্যের মুসলমানদের বিপদ বাড়িয়েছেন। রাজ্যের হিন্দুদের মধ্যে যতজন ইমাম, মোয়াজ্জেমদের সরকারি ভাতা দেওয়া সংখ্যালঘু তোষণ বলে মনে করেন, তার অর্ধেকও বোধহয় পুরোহিত ভাতার কথা মনে রাখেননি। দুর্গাপুজো করতে সরকারের টাকা দেওয়াও যে হিন্দু তোষণ, তা তিন শতাংশে নেমে আসা বামপন্থী ভোটারও মানতেই চান না। মমতা এসব ভালই বোঝেন। তাই সম্ভবত তিনি ঠিক করেছেন, ২০১১ সাল থেকে চালিয়ে আসা নরম হিন্দুত্ববাদ আর যথেষ্ট নয়। এবার একেবারে কট্টর হিন্দুত্ববাদী হয়ে উঠতে হবে।
অযোধ্যায় যেখানে বাবরি মসজিদ ছিল ঠিক সেখানেই সুবিশাল রামমন্দির বানিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন মোদী। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগেই কাজ শেষ না হওয়া সত্ত্বেও সেই মন্দির উদ্বোধন করেছেন। তাতে নির্বাচনী লাভ হয়েছে কি হয়নি তা অন্য আলোচনার বিষয়। কিন্তু ২০২৬ বিধানসভার অনেক আগেই মমতাও দীঘায় জগন্নাথধাম বানিয়ে, বাংলা খবরের চ্যানেলের ভাষায়, ‘পালটা দিলেন’। বাংলাদেশে যে ইস্কন এই মুহূর্তে আক্রান্ত বলে অভিযোগ, সেই সংগঠনের সাধুদের পাশে নিয়েই মমতা বুধবার ঘোষণা করলেন যে আগামী অক্ষয় তৃতীয়ায় ওই মন্দিরের উদ্বোধন হবে।
কে জানে মোদীর মত মমতাও প্রাণপ্রতিষ্ঠা ইত্যাদি দায়িত্ব নিজেই পালন করবেন কিনা। তাঁর প্রগতিশীল সমর্থকরা যতই তাঁর উপর সাবল্টার্নত্ব আরোপ করুন, মুখ্যমন্ত্রী যে সাক্ষাৎ ব্রাহ্মণসন্তান তাতে তো ভুল নেই। সুতরাং করতেই পারেন। প্রধানমন্ত্রী ও জিনিস করায় আমরা বিস্তর চেঁচামেচি করেছিলাম রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের শ্রাদ্ধ করা হল অভিযোগ তুলে। কিন্তু সরকারি টাকায় জগন্নাথের মন্দির বানালেও যে একই কাজ হয় সেকথা আমরা বলিনি, বলবও না। কারণ আমরা বাঙালি প্রগতিশীলরা জানি, মমতার সিদ্ধান্তে তৈরি মন্দির হল ধর্মনিরপেক্ষ মন্দির। আর তিনি যদি নিজে হাতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন তাহলে তা দেখে বিজেপির ভোটাররাও তৃণমূলকে ভোট দিয়ে দেবেন। সুতরাং সেটা হবে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার জয়।
শুভেন্দু সম্ভবত সেই আশঙ্কাতেই চেঁচামেচি আরম্ভ করেছেন। তিনি হঠাৎ রাষ্ট্র আর ধর্মের পৃথকীকরণ সম্পর্কে ভারি সচেতন হয়ে বলে উঠেছেন ‘সরকারি টাকায় কোনো মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরদোয়ারা করা যায় না…আমরা রামমন্দির বানিয়েছি হিন্দুদের টাকায়, সরকারের টাকায় নয়’। আরও বলেছেন, মমতা যা বানিয়েছেন ওটা নাকি মন্দিরই নয়। তিনি কাদের যেন মেদিনীপুরে নিয়ে এসে ধর্মসম্মেলন করে প্রমাণ করে দেবেন যে ওটা মন্দির নয়, ফলে মমতার ভণ্ডামি ফাঁস হয়ে যাবে। আরেক নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি আবার টিভি স্টুডিওতে বসে হুগলী আর মালদা জেলার দুটো মসজিদকে আসলে মন্দির বলে দাবি করে সেখানে পুজো দেওয়া যাবে কিনা সে প্রশ্ন খুঁচিয়ে তুলেছেন।
মোদ্দাকথা, ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে ২০২১ সালের মত ২০২৬ সালের নির্বাচনও তৃণমূল সরকার পাঁচ বছরে কতটা কী কাজ করল না করল, তা নিয়ে হবে না। সরকারি দল এবং সরকারের দুষ্কর্ম বা দুর্নীতি নিয়েও নয়। কারণ কেবল সরকার নয়, রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলও তা চায় না। আর জি কর কাণ্ড নিয়ে আন্দোলনে তারা কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি বলে ও ব্যাপারটা সকলে ভুলে গেলেই তারা খুশি হত। ঠিক সেটাই হয়েছে। আন্দোলনকারীরা মিইয়ে গেছেন তো বটেই; মৃতার জন্যে ন্যায়বিচার চাই, কিন্তু ডাক্তাররা ধান্দাবাজ ও দুর্নীতিগ্রস্ত – এই যুক্তিতে যাঁরা আর জি কর আন্দোলনের প্রাণপণ বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁরাও আর খবর রাখছেন না যে সরকারি কর্মচারী সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে গেলে রাজ্য সরকারের যে অনুমতি প্রয়োজন সেটা সরকার দিচ্ছে না। তা নিয়ে তাঁরা সরকারের কৈফিয়ত তলব করছেন না, টুঁ শব্দটিও করছেন না। বরং অনেকে বলছেন, সন্দীপ ছাড়া কি আর কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ডাক্তার নেই রাজ্যে? একা ওকেই কেন শাস্তি পেতে হবে? সত্যিই তো। বেচারা সন্দীপ! যা নিয়ে টানা আড়াই মাস আন্দোলন চলল, মাস চারেক যেতেই যখন সে ব্যাপারটা এরকম দাঁড়িয়েছে, তখন আগামী দেড় বছরে সরকার যা-ই করুক না কেন, সেগুলো ভুলতেও সময় লাগবে না।
তাহলে কোন প্রশ্নে ভোট হবে? বাংলাদেশ নিয়ে হাওয়া গরম করে রাজ্য বিজেপি এইটুকু নিশ্চিত করতে পেরেছে যে মমতাকেও হিন্দু ভোটের জন্যে ঝাঁপাতে হবে। অর্থাৎ সংখ্যালঘুদের ভোটার হিসাবে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়ার যে কাজ সঙ্ঘ পরিবার সারা ভারতে করতে চায় এবং অনেকটা করেও ফেলেছে, তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরের মাথায় সে কাজ মোটামুটি সম্পূর্ণ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। ২০২১ সালে বিজেপিকে আটকাতে হবে – এই প্রশ্নে ভোট হয়েছিল। তাই বহু ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ তৃণমূলের কাজকর্মে বিরক্ত হওয়া সত্ত্বেও মমতাকেই ভোট দিয়েছিলেন। এবার মমতাও কে বড় হিন্দু – সেই প্রশ্নের দিকেই নির্বাচনকে নিয়ে যাচ্ছেন। হিন্দুদের মধ্যে যাঁরা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলে এতদিন দাবি করতেন, তাঁদের অনেকের গত একমাসে যে চেহারা বেরিয়ে পড়েছে তাতে বিজেপিকে আটকাতে তাঁরা সকলে আর আগ্রহী কিনা তাতে সন্দেহ আছে। হিন্দুত্ববাদের এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারত? এরপর মমতা হারলে হিন্দুত্ববাদ জিতবে তো বটেই, মমতা জিতলেও হিন্দুত্ববাদ হারবে না।
অবশ্য মমতা হারবেন কেন? শুভেন্দু যতই লাফালাফি করুন, মোহন ভাগবত কি আর শুভেন্দুর মত কোনো মন্দিরকে ‘কালচারাল সেন্টার’ বলে হেলাফেলা করতে রাজি হবেন? বাংলাদেশ সম্পর্কে মমতা যা যা বলেছেন, সেগুলো কি মোদী বা অমিত শাহেরও মন কি বাত নয়? নেহাত প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মত পদে থাকলে ওসব কথা বলা যায় না তাই। অন্য কেউ বলে দিলে মন্দ কী? যা নিয়ে কথা বললে মোদী, শাহদের পছন্দ না-ও হতে পারে তা নিয়ে তো মমতা বা তাঁর দল কিছু বলছে না। সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকে তো মনে হচ্ছে মহুয়া মৈত্র কংগ্রেস সাংসদ বা নির্দল। কারণ গৌতম আদানি নিয়ে আলোচনা চেয়ে রাহুল গান্ধীরা যে হল্লা করছেন তাতে মমতার দল যোগ দিতে চাইছে না। একা মহুয়াই সোশাল মিডিয়ায় আদানি নিয়ে গলা ফাটিয়ে যাচ্ছিলেন। তৃণমূল বলেছে ওটা নাকি সাধারণ মানুষের ইস্যু নয়, যদিও আদানি গ্রুপে শুধু স্টেট ব্যাংক আর এলআইসির মাধ্যমে মধ্যবিত্তের টাকা আটকে আছে তা নয়। বিদ্যুৎ বিতরণের ব্যবসা থেকে শুরু করে ভোজ্য তেলের ব্যবসা পর্যন্ত সবেতে আদানি গ্রুপ থাকায় তাদের হাতে লুণ্ঠিত হচ্ছেন গরিব মানুষও। আবার এই যে চতুর্দিকে মসজিদের নিচে, মাজারের নিচে মন্দির ছিল দাবি করে মামলা ঠুকছে হিন্দুত্ববাদীরা – তা নিয়েও ধর্মনিরপেক্ষ চূড়ামণি মমতা একটি শব্দ উচ্চারণ করেননি। কংগ্রেস হরিয়ানা, মহারাষ্ট্রে হারের সম্মুখীন হতেই ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্ব মমতার হাতেই তুলে দেওয়া উচিত – এই মর্মে বয়ান দিতে শুরু করেছেন তৃণমূলের মুখপাত্ররা; সমর্থন করছেন অখিলেশ যাদব, শরদ পাওয়ার, লালুপ্রসাদ প্রমুখ। অথচ এইসব জাতীয় স্তরের ব্যাপার বা অখিলেশের রাজ্যের সম্ভলের সাম্প্রদায়িক হিংসা নিয়ে এক লাইন প্রতিক্রিয়া দেননি নেত্রী।
একমাত্র রাজ্যসভার চেয়ারম্যান হিসাবে জগদীপ ধনখড়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবে কংগ্রেসের সঙ্গে একমত হয়েছে তৃণমূল। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের আগে শেষ অধিবেশনে অন্য দলের মত মমতার দলের সাংসদদেরও ধনখড় সাসপেন্ড না করলে কি সেটুকুও করা হত? সন্দেহ করতেই হচ্ছে, কারণ পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল পদে ধনখড়ের উত্তরসূরি সি ভি আনন্দ বোসের সঙ্গে প্রায় সব বিষয়ে ‘কাম অন ফাইট, কাম অন ফাইট’ করার পরে, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে রাজভবনের এক মহিলা কর্মীকে যৌন হয়রানি করার মত গুরুতর অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষিতে বৈঠক করতে পর্যন্ত রাজ্যপালের কাছে যাবেন না বলার পরে হঠাৎ গত সোমবার কোন দেবতা সে, কার পরিহাসে, দুজনের ভাব হয়ে গেছে। ধনখড়ের বেলাতেও একটুখানি আড়ি আর সারাজীবন ভাব হয়েছিল। রাজ্যপাল পদে যাঁকে ঘোর অপছন্দ ছিল, উপরাষ্ট্রপতি পদে তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রার্থী মার্গারেট আলভাকে সমর্থন করেনি তৃণমূল।
এভাবে একে অন্যকে বিপদে না ফেলে এবং নিঃশব্দে বিরোধ মিটিয়ে ফেলে যদি দিন চলে যায়, তাহলে আর মমতাকে হারানোর জন্যে বিজেপির উতলা হবার দরকার কী? তবে এখানে একটা বিধিসম্মত সতর্কীকরণ দিয়ে রাখা দরকার – পাশেই ওড়িশায় এমনই সাতে পাঁচে না থাকা, দীর্ঘদিনের নিরঙ্কুশ বিজয়ী নবীন পট্টনায়ককে এবছর বিজেপির কাছে মসনদ খোয়াতে হয়েছে।
আরো পড়ুন ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে
লেখাটা এখানেই শেষ করা যেত। কিন্তু ভারতের অন্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তফাত আছে। অন্যত্র শাসক, বিরোধী – দুই পক্ষের সমালোচনা করলে মিটে যায়। কিন্তু এ রাজ্যে সেখানেই থেমে গেলে চলে না। প্রকৃত বিরোধীর অভাব এবং তেমন একটা শক্তির জন্যে মানুষের হাহাকার এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে গায়ক, নায়ক, কবি – সকলের থেকেই তাঁরা বিরোধিতা দাবি করেন এবং দাবি পূরণ না হলে গাল দেন। ইদানীং লক্ষ করছি, আমাদের মত চুনোপুঁটি সাংবাদিকের লেখা পড়েও অনেকে মন্তব্য করছেন ‘অল্টারনেটিভটা কী’ বা ‘করণীয় কী’? অনেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে বলে দিচ্ছেন যে বিকল্প না বলতে পারলে কিছু লেখাই উচিত নয়। যেন প্রশ্ন তোলা নয়, সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই সংবাদমাধ্যমের কাজ। আবার কেউ কেউ ঘোষণা করে দিচ্ছেন, বিকল্প বলছে না মানে ও আসলে অমুক পক্ষে বা তমুক পক্ষে। সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে এই ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার জন্যে অবশ্য সাংবাদিকরাই দায়ী। আসলে যে নিরপেক্ষতা বলে কিছু হয় না, বিশেষত আজকের পৃথিবীতে সাংবাদিকের নৈর্ব্যক্তিকতার ধারণাও বদলে ফেলা দরকার, তা নিয়ে বিস্তর লেখালিখি আছে। আগ্রহীরা উদাহরণ হিসাবে এই লেখাটা পড়ে দেখতে পারেন। তা সত্ত্বেও একথা ঠিকই যে সাংবাদিকরা তাঁদের উদ্দেশ্যকে সন্দেহ করার একাধিক কারণ রোজ জুগিয়ে চলেছেন।
ঠিক তেমনই পশ্চিমবঙ্গের মানুষের রাজনীতির বাইরের লোকের মধ্যে বিরোধী খোঁজা এবং না পেলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠার জন্যেও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোই দায়ী। বিজেপি আর তৃণমূল যে মুদ্রার এ পিঠ ও পিঠ সেকথা কেউ না-ও মানতে পারেন, কিন্তু বিজেপি যে বিধানসভার ভিতরে বা বাইরে সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করে না তা সাদা চোখেই দেখা যায়। কংগ্রেস তো বামফ্রন্ট আমলেই প্রান্তিক শক্তি হয়ে গিয়েছিল, রইল বাকি বামপন্থীরা।
রাজ্যের বৃহত্তম বামপন্থী দল বিরোধিতা করবে কী; ইদানীং বুঝেই উঠতে পারে না তারা কোনো পার্টি, নাকি এনজিও, নাকি কোম্পানি। তাই কখনো কিছুটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠা যুবনেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জিকে পাহাড় থেকে সাগর হাঁটিয়ে ভাবে ভোট পাওয়া যাবে, কখনো মনে করে অতিমারীতে বা অন্য সময়ে অসুস্থ মানুষের শুশ্রূষা করে বা অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দিয়ে ভোট পাওয়া যাবে, কখনো পতাকা বাদ দিয়ে কোনো আন্দোলনে ঢুকে পড়ে জনসমর্থন ফেরত আসবে মনে করে, কখনো আবার পেশাদার লোক দিয়ে কিছু হিসাবনিকাশ করালেই সব ঠিক হয়ে যাবে মনে করে। নির্বাচনের ফল বেরোলে কোনোটাই কাজে লাগল না দেখে সদস্য, সমর্থকরা অভিমান করেন আর সোশাল মিডিয়ায় — নেতৃত্বের বারণ অমান্য করে – সরকারি প্রকল্পে উপকৃত গরিব মানুষকে গালাগালি দেন। এই ‘বাহির-পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয়-পানে চাই নি’ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে না পারলে তৃণমূল, বিজেপিকে পরাস্ত করার জায়গায় পৌঁছনো শক্ত। নবীন ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট না পুরনো নকশাল, নাকি প্রাচীন কংগ্রেস – কাদের সঙ্গে জোট করলে ভোট ফেরত আসবে তা ভাবতেই দিন যাবে।
সিপিএম বা বামফ্রন্টের বাইরেও কিছু বামপন্থী আছেন পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু তাঁরা সিপিএমের শূন্যস্থান পূরণ করার কোনো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেননি সিপিএম হীনবল হয়ে যাওয়ার পরেও।
সুতরাং হতাশাজনক হলেও, সত্যি কথাটা হল, ফ্যাসিবাদ বা হিন্দুত্ববাদকে পরাজিত করেছি বলে যে উল্লাস পশ্চিমবঙ্গবাসী ২০২১ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনের ফল বেরোবার পর করেছিলেন তা যে অকারণ ছিল সেকথা স্বীকার করার সময় এসে গেছে। এখন ‘আমাদের ডান পাশে ধ্বস/আমাদের বাঁয়ে গিরিখাত…।’
নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত
