বিজেপি মুখপাত্র বিতাড়ন: হিন্দুত্বের টাইম আউট, খেলা শেষ নয়

bjp spokespersons

উত্তরপ্রদেশের বাদাউনের যুবক রেহান শাহের গত কয়েকদিন ধরে বারবার খিঁচুনি ধরছে। বেশ কিছুদিন বুলন্দশহর হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর গত শনিবার (৪ জুন) বাড়ি এসেছেন। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, রেহানের এই অবস্থার কারণ পুলিসি হেফাজতে অকথ্য অত্যাচার। গত ২ মে তাঁকে কাকরালা পুলিস আউটপোস্টে নিয়ে যাওয়া হয়, প্রচণ্ড মারধোর করা হয়, ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয় এবং গুহ্যদ্বারে প্লাস্টিকের পাইপ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটা মাসখানেক আগের হলেও প্রকাশ্যে এসেছে হপ্তাখানেক হল, কারণ রেহানের পরিবারের বক্তব্য, দোষী পুলিসকর্মীরা তাঁদের হুমকি দিয়েছিলেন যে এ নিয়ে মুখ খুললে ফল ভাল হবে না। রেহানের মা নাজমা শাহ শেষপর্যন্ত মরিয়া হয়ে বাদাউনের এসপি ডঃ ওমপ্রকাশ সিংয়ের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। প্রাথমিক তদন্তের পর দাতাগঞ্জের সার্কল অফিসার প্রেমকুমার থাপার সিদ্ধান্ত, রেহানের পরিবার যা বলছে তা সত্যি। ফলে পাঁচ পুলিসকর্মীর বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে।

এমন নয় যে এ দেশে পুলিস হেফাজতে অত্যাচারের এটাই প্রথম ঘটনা। স্মরণকালে সবচেয়ে বেশি হইচই হয়েছিল যে ঘটনা নিয়ে, তা হল ২০২০ সালে তামিলনাড়ুর শান্তাকুলমে ব্যবসায়ী পি জয়রাজ আর তাঁর ছেলে বেনিক্সের লক আপে মারধোর ও ধর্ষণ এবং তার ফলে মৃত্যু। তামিলনাড়ু পুলিস থার্ড ডিগ্রির জন্য কুখ্যাত, যা বহু আলোচিত জয় ভীম ছবিতেও দেখানো হয়েছে। এ বছরের এপ্রিল মাসেও চেন্নাইতে পুলিস হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে ভারতের প্রায় কোনো বড় রাজ্যই পুলিস হেফাজতে বা বিচারবিভাগীয় হেফাজতে অত্যাচার ও মৃত্যুর তালিকায় বাদ নেই। বস্তুত, উত্তরপ্রদেশ ২০২১-২২ সালে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে মৃত্যুর তালিকায় একেবারে শীর্ষে (৪৪৮) কিন্তু রেহানকে পুলিস যে কারণে জিজ্ঞাসাবাদ করতে নিয়ে গিয়েছিল, তার জন্যই এ ঘটনা আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। পুলিস বলেছে উনি নাকি গোহত্যায় জড়িত। শেষপর্যন্ত তাঁর অপরাধের কোনো প্রমাণ না পেয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়, যদিও রেহানের পরিবার বলেছে ৫০০০ টাকা ঘুষ দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশ তথা সারা ভারতে গত কয়েক বছরে গোহত্যার ‘অপরাধে’ কত ইসলাম ধর্মাবলম্বীকে স্রেফ পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে আমরা জানি। এরকম একটা ঘটনা সামলাতে গিয়ে উন্মত্ত জনতার হাতে বুলন্দশহরের পুলিস অফিসার সুবোধ সিং পর্যন্ত খুন হয়েছিলেন। উপরন্তু উত্তরপ্রদেশে বুলডোজারতন্ত্র চলছে। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে হিংসায় অভিযুক্ত সংখ্যালঘুদের বাড়ি ভেঙে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে শুরু হয়েছে, উত্তরপ্রদেশ তাতেও প্রথম সারিতে রয়েছে। ভারত এমন এক দেশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মধ্যপ্রদেশের ৬৫ বছরের বৃদ্ধ ভওরলাল জৈনকে মরতে হয় কারণ এক বিজেপি কর্মীর সন্দেহ হয়েছিল, তিনি মুসলমান। সুতরাং রেহানের দুর্দশার আসল কারণ যে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়, তা পরিষ্কার।

কিন্তু সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী বা ইরান ভারতজুড়ে গত কয়েক বছর ধরে রেহানের মত ইসলাম ধর্মাবলম্বী সাধারণ মানুষের উপর যে আক্রমণ চলছে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে – তার কোনো প্রতিবাদ করেনি। এমনকি স্পষ্ট ধর্মীয় বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন যখন পাস হয়েছিল, তখনো এই দেশগুলো টুঁ শব্দটি করেনি। হইহই করে উঠেছে কখন? যখন সরকারি দল বিজেপির দুই মুখপাত্র নূপুর শর্মা আর নবীন জিন্দাল হজরত মহম্মদ সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন। স্পষ্টত, সাধারণ মুসলমানের বাঁচা মরা নিয়ে ওই দেশগুলো ভাবিত নয়। তারা বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষায় আগ্রহী, বিশ্বাসীদের প্রাণরক্ষায় আগ্রহী নয়। যুক্তি দিয়ে বিচার করলে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মুসলমানরা মুসলমান ছাড়া কাউকে চেনে না, ওরা সব এক, ওদের উদ্দেশ্য বিশ্বজুড়ে ইসলামিক স্টেট তৈরি করা – এই তত্ত্বে যাদের মাথা ঘুরেছে তাদের কথা আলাদা, কিন্তু সাধারণ বুদ্ধি থাকলেই বোঝা যায় যে পশ্চিমবঙ্গ বা উত্তরপ্রদেশের ছাপোষা মুসলমানের জন্য আরব দেশের আমির ওমরাহের দরদ থাকার কোনো কারণ নেই। চীনের উইঘুর মুসলমান বাঁচল কি মরল তাতে যে আরব হোমরা চোমরাদের কিছু এসে যায় না, তা আগেই দেখা গেছে। এমনকি প্যালেস্তাইনের উপর আমেরিকার মদতপুষ্ট ইজরায়েলের হানাদারি নিয়েও আমেরিকার মিত্র সৌদি আরব কখনো মুখ খোলে না। এমনকি ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধেও মুসলিম দুনিয়া দ্বিধাবিভক্ত। অতিসরল শিয়া-সুন্নি বিভাজন তো আছেই, তা বাদেও নানা ভূ-রাজনৈতিক জটিল অঙ্ক আছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে কোনো দুটো দেশ বা দুটো গোষ্ঠীর দেশের মধ্যেই তা থাকে, দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে ধর্মেরই হোক, দেশটায় গণতন্ত্র বা রাজতন্ত্র – যা-ই চলুক।

কয়েকজন নেহাত মরণশীল ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতা রক্ষা না করলে মর্যাদাহানি হবে, হজরত মহম্মদ বা ইসলাম ধর্ম নিশ্চয়ই এত ঠুনকো নয়। হলেও সে জন্যে কাউকে খুনের হুমকি দেওয়া চলে না, যা অনেকে নূপুর আর নবীনকে দিচ্ছে বলে অভিযোগ। কিন্তু বাকস্বাধীনতার নামে মিথ্যার উপর ভর দিয়ে কুৎসা এবং ঘৃণা ছড়ানো যে চিরকাল চলতে পারে না – সে কথা শেষপর্যন্ত আরব দেশগুলোর ধমকানিতে বিজেপি সরকারকে ঢোঁক গিলে মানতে হল। ফরাসি কার্টুন পত্রিকা শার্লি এবদো কার্টুনের মাধ্যমে নিজেদের মতামত প্রকাশ করে, তাদের বক্তব্য তারা মুসলমানবিদ্বেষী নয়। কিন্তু ইসলাম বা অন্য যে কোনো আদর্শকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা তাদের বাকস্বাধীনতা। অন্তত তাত্ত্বিকভাবে এ কথায় ভুল নেই। ইসলাম, হিন্দুধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, জুডাইজম – যে কোনো ধর্মকে নিয়েই ব্যঙ্গ করার অধিকার সকলের আছে, অন্তত থাকা উচিত। শুধু ধর্মই বা কেন? গান্ধীবাদ, মার্কসবাদ বা হিন্দুত্ববাদ নিয়েও ব্যঙ্গ করা চলে, করা হয়ও। কিন্তু নূপুরদেবী কোনো আদর্শকে ব্যঙ্গ করেননি, গলার জোরে অর্ধসত্য উচ্চারণ করে ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতাকে হেয় করেছেন। ষষ্ঠ শতাব্দীর একজন পুরুষের স্ত্রীর সঙ্গে বয়সের পার্থক্যের কারণে যদি তাঁকে যে কোনো বিশেষণে ভূষিত করা চলে, তাহলে ভারতে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যাবে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে সারদামণির বয়সের তফাতও কম নয়, তাঁদের বিয়ের সময় সারদা নিতান্তই শিশু ছিলেন। অথচ তাঁরা হজরত মহম্মদের প্রায় বারোশো বছর পরের মানুষ। উপরন্তু এ দেশের কুলীন ব্রাহ্মণরা বিয়েকে রীতিমত লাভজনক ব্যবসা করে তুলে মনের সুখে ছোট ছোট মেয়েদের বিয়ে করে বেড়াতেন শ দেড়েক বছর আগেও। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নামক এক অতি দুর্বিনীত পণ্ডিত এ দেশে না জন্মালে সে ব্যবসা বহাল তবিয়তে আরও কতদিন চলত বলা মুশকিল।

দুঃখের বিষয়, ২০২১ সালে ইউনিসেফ প্রকাশিত এক সমীক্ষা বলছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে এখনো ভারতেই হয়। প্রত্যেক বছর প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ১৮ বছরের কমবয়সী মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় এ দেশে। ২০১৬ সালে ইন্ডিয়াস্পেন্ড জনগণনা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে যে সমীক্ষা করেছিল, যদি ইউনিসেফের সমীক্ষার সঙ্গে তা মিলিয়ে পড়েন তাহলে মাথা ঘুরে যাবে। ওই সমীক্ষা বলেছিল, প্রায় ১২ মিলিয়ন ভারতীয় শিশুর ১০ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। তাদের মধ্যে ৮৪% হিন্দু আর ১১% মুসলমান। এই শিশুদের ৬৫% মেয়ে। অতএব বিয়েশাদি নিয়ে কথা না বাড়ানোই ভাল। এই ধর্ম গোঁড়া, ওই ধর্ম উদার – এসব কথাও ধোপে টেকে না। ধর্মকে ধর্মের জায়গায় থাকতে দিয়ে কী করে দেশটা চালানো যায় তাতে মন দিলেই যে সরকারকে অপ্রস্তুতে পড়তে হয় না, এইটুকু সরকার এবং তার সমর্থকরা বুঝলেই যথেষ্ট হয়।

আরও পড়ুন আরএসএসের পছন্দসই অগভীর বিরোধিতার মুখ বাবুল, শত্রুঘ্ন

অবশ্য সে কথা মোদী, অমিত শাহরা বোঝেন না বললে তাঁদের বুদ্ধিসুদ্ধিকে ছোট করা হয়। সমস্যা হল ধর্মীয় জিগির বাদ দিয়ে কী করে রাজনীতি করতে হয় বা সরকার চালাতে হয় তা আজ নতুন করে শিখতে হলে বিজেপি মহা ফাঁপরে পড়বে। সঙ্ঘের একশো বছরের শিক্ষা তাহলে বাতিল করতে হয়, বেহাল অর্থনীতির হাল কী করে ফেরানো যায় তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে হয়। সেসব করবে কে? অরবিন্দ পনগরিয়া বা জগদীশ ভগবতীর মত যেসব দক্ষিণপন্থী অর্থনীতিবিদ প্রথম থেকে প্রবল উৎসাহে বিজেপি সরকারের প্রতিটি নীতির সমর্থনে তত্ত্ব খাড়া করতেন, তাঁরাও বেশ কিছুদিন হল নীরব হয়ে গেছেন। ইতিহাসের ছাত্র শক্তিকান্ত দাসকে দিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক চালাতে হচ্ছে। এমন একজনকে অর্থমন্ত্রী করা হয়েছে, যিনি পেঁয়াজের দাম বাড়ার সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করলে বলেন “আমি তো পেঁয়াজ খাই না, তাই জানি না।” এমন একজনকে বিদেশমন্ত্রী করা হয়েছে, যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সমালোচনা করলে নির্বোধের মত বলেন “ভোটব্যাঙ্ক পলিটিক্স করছে”। যেন জো বাইডেন ২০২৪ সালে বারাণসীতে মোদীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হবেন। এমতাবস্থায় তাজমহল, জ্ঞানবাপী, কুতুব মিনার – সর্বত্র মন্দির প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া বিজেপি অন্য কী রাজনীতি করবে? কিন্তু তাদের এই মুহূর্তে যতই অপরাজেয় মনে হোক, রাজনৈতিক বিরোধীরা যতই ক্ষুদ্র স্বার্থে অন্তর্কলহ বা অকারণ রোম্যান্টিকতায় মগ্ন থাকুন না কেন, এই রাজনীতি যে ক্রমশ হিন্দুত্ববাদীদেরও বড় বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সম্ভবত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তা আন্দাজ করছে। সেই কারণেই সঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত সম্প্রতি বলেছেন, সব মসজিদের তলায় শিবলিঙ্গ খুঁজতে যাওয়ার দরকার নেই। সেই অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমল থেকে দেখা যেত আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের লোকেরা সবচেয়ে উগ্র মন্তব্যগুলো করেন, বিজেপি নেতারা তুলনায় নরমপন্থা দেখান। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল গুজরাট ২০০২, যেখানে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মোদী গরম গরম বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সহসা উলটপুরাণ শুরু হয়েছে। বিজেপি মুখপাত্ররা সরাসরি হজরত মহম্মদকে গাল পাড়ছেন, আর সঙ্ঘের প্রধান বলছেন মারামারিতে কাজ নেই, ইতিহাস কি আর বদলানো যায়?

আসলে সঙ্ঘ বরাবরই মুখেন মারিতং জগৎ। অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠা আর কাশ্মীর থেকে সংবিধানের ৩৭০ নং ধারা প্রত্যাহার তাদের মৌলিক ইস্যুগুলোর মধ্যে পড়ে। প্রথমটা নির্বিঘ্নে মিটে গেলেও দ্বিতীয়টার ফলে কাশ্মীর যে হাতের বাইরে চলে গেছে তা আর লুকনো যাচ্ছে না। বাকি ভারতের হিন্দুদের মুসলমান জুজু দেখানোর জন্য তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যাদের উপেন্দ্রকিশোরের গল্পের কুমিরছানার মত বারবার দেখানো হয়েছে – সেই কাশ্মীরি হিন্দুরা এখন বেঘোরে মারা যাচ্ছে, ‘হিন্দু হৃদয়সম্রাট’ মোদী ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে আছেন। নিজেদের তাঁবে অস্ত্রশিক্ষা দিয়ে বেড়ানো অমুক সেনা, তমুক সেনাকে দিয়ে যে কাশ্মীরে জঙ্গি মোকাবিলা করা যাবে না, তা তাঁরা ভালই বোঝেন। আর হিংসা যে হিংসার জন্ম দেয় তা ভাগবত-মোদী-শাহের চেয়ে ভাল আর কে জানে? কাশ্মীরের জঙ্গিপনা যদি বাকি দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সামলানো কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে সম্ভবত ওঁরা নিজেরাই এখন সন্দিহান। আরব দুনিয়াকে চটালে কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা বাড়বে তা নয়, ইসলামিক মৌলবাদের সমস্যাও বাড়তে পারে। অতএব আপাতত ভালমানুষীর বিকল্প নেই।

নূপুর আর নবীনকে সাসপেন্ড করা যে ভালমানুষীর বেশি কিছু নয়, তা সাদা চোখেই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কারণ তাঁদের সাসপেন্ড করেছে বিজেপি দল, ভারত সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সবকিছু আভ্যন্তরীণ বিষয় বলে চালিয়ে দিয়ে যে বিদেশনীতির ক্ষেত্রে পার পাওয়া যায় না – এটা বুঝতে যেমন দেরি হল, তেমনি দল আর সরকারকে দেশের মানুষ এক বলে মেনে নিলেও অন্য দেশগুলো যে না-ও মানতে পারে, তা কোন মূল্যে বিজেপি সরকার বুঝবে তা গডসেই জানেন। ভারত সরকার যেভাবে চলছে তাতে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় থাকা উচিত সেইসব অনাবাসী ভারতীয়দের, যাঁরা বিভিন্ন আরব দেশে থেকে সোনামুখ করে কোনো বহুজাতিক বা আরব মালিকের কোম্পানিতে কাজ করে দু পয়সা কামান আর সোশাল মিডিয়ায় ভারতীয় মুসলমানদের অহোরাত্র গালি দিয়ে ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হওয়ার অপেক্ষা করেন। কারণ যদিও ভারতীয় মুসলমানের জন্য ও দেশের আমির, মুফতিদের প্রাণ কাঁদে না; ইসলামকে আক্রমণ করলেই তাঁরা কেমন অগ্নিশর্মা হয়ে যান তা একটা ঘটনায় প্রমাণ হয়ে গেল। এসব চলতে থাকলে ওখানকার হিন্দুদের গলাধাক্কা দিতে ওঁরা বেশি সময় নেবেন না। ওই দেশগুলো তো আর ‘মুসলিম এজেন্ট’ গান্ধী, ‘চরিত্রহীন’ নেহরু আর ‘সোনার চাঁদ’ আম্বেদকরের তৈরি গণতান্ত্রিক সংবিধান মেনে চলে না।

যে ভারতীয় উদারপন্থীরা কদিন “দ্যাখ কেমন লাগে” মেজাজে আছেন, তাঁদেরও নিশ্চিন্ত হওয়ার কারণ নেই। আরব দেশগুলো কী বলবে সেই ভাবনায় বুলডোজার থামবে না, বিনা বিচারে সংখ্যালঘু ও বিরোধীদের আটক করে রাখা বন্ধ হবে না, আম্বানি-আদানির হাতে দেশের সমস্ত সম্পদ তুলে দেওয়াও থমকে যাবে না। কারণ বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো নিজের দেশে এবং আশপাশে যথেচ্ছ অনাচার চালাতে পারে। স্রেফ পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়েই অন্য কোনো দেশ কিছু বলবে না। নেহাত কাকতালীয় ঘটনা নয় যে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোতেই দক্ষিণপন্থী স্বৈরাচারী শাসকদের উত্থান হয়েছে; মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রবলভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। বিশ্বায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল পৃথিবীটা ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ হবে। আসলে পৃথিবী এখন কয়েকটা কূপমণ্ডূক গ্রামে বিভক্ত, যেখানে নির্বাচনে জিতে আসা অগণতান্ত্রিক মোড়লরাই শেষ কথা। ন্যাটো ভ্লাদিমির পুতিনের হাত থেকে ইউক্রেনকে বাঁচাতে আসেনি, কাল চীন তাইওয়ান আক্রমণ করলে বাইডেন মোটেই বাঁচাতে আসবেন না, এখন যা-ই বলুন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত কোনো মিত্রপক্ষ বা মুক্তিবাহিনী এসে কাউকে উদ্ধার করবে না। নিজেদের মুক্তির ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: