বিধবা, পিতৃহীন শিশু – সকলকে জবাব দিতে হবে সেকুলারদের

যদি এই লেখায় তথ্যের গুরুতর ভ্রান্তি বা সত্যের অপলাপ আছে বলে মনে হয়, তার জন্যে নিবন্ধকার দায়ী নন। কারণ সব সত্যি লেখা লেখকের পক্ষে বিপজ্জনক

কাশ্মীরের পহলগামে মঙ্গলবারের ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী হানার পরে দুদিন হতে চলল। এখনো প্রধানমন্ত্রী রাহুল গান্ধী সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারলেন না সরকার এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে। অবশ্য একটি জনসভায় তিনি বলেছেন যে সন্ত্রাসবাদীদের কড়া জবাব দেওয়া হবে, তারা যা করেছে তার বহুগুণ তীব্র জবাব তারা ফেরত পাবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধীদের দাবি মেনে এই ইস্যুতে যে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা হয়েছিল নিউ দিল্লিতে, সেই বৈঠকে রাহুল উপস্থিত ছিলেন না। এমনি এমনি তো আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা রাজনীতিকে তিনি সত্যিই কতখানি গুরুত্ব দেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। এই সেদিন সৌদি আরব থেকে ফিরলেন, আবার হয়ত কয়েকদিন পরেই দেখা যাবে অন্য কোনো দেশে চলে গেছেন।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অখিলেশ যাদব এই ঘটনায় নিজের মন্ত্রকের ব্যর্থতা নিয়ে একটি কথাও বলেননি। অথচ অন্য অনেক ব্যাপারেই তিনি সদা সরব। যখনই আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া আদালতের নির্দেশে কোনো মসজিদের নিচে কী ছিল তা জানার জন্যে খোঁড়াখুঁড়ি করতে যায়, তখন অখিলেশ এবং তাঁর দল সমাজবাদী পার্টির অন্যান্য নেতারা তাতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে বিপুল অশান্তি সৃষ্টি হয়। অথচ দেশের নিরীহ, নিরস্ত্র নাগরিকদের উপরে এই ভয়াবহ হামলার পরে অখিলেশ চুপ। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর নোটবন্দির পর, ২০১৯ সালের ৫ অগাস্ট সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বিলোপ এবং জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার পর রাহুল-অখিলেশের সরকার বলেছিল – কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদের কোমর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আর কোনোদিন সন্ত্রাসবাদীরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। সেক্ষেত্রে পৃথিবীর সর্বাধিক সেনা মোতায়েন থাকা অঞ্চলে এই ঘটনা ঘটল কী করে – সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর অখিলেশ এখন পর্যন্ত দিতে পারেননি। কাশ্মীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি যে বৈঠক করেছেন তাতে আবার মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাকে ডাকা হয়নি। এর কারণ কী? ভবিষ্যতে এরকম কোনো ঘটনা ঘটলে ওমর যাতে নিজের দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন, অখিলেশ কি সেই ব্যবস্থা করছেন? ইন্ডিয়া জোটের শরিকের স্বার্থরক্ষা করতে তিনি কি দেশের সাধারণ নাগরিকদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন না?

ভারতের সেকুলার নেতাদের এইসব আচরণের মাশুল অতীতেও হিন্দুদের দিতে হয়েছে, এভাবে চললে ভবিষ্যতেও দিতে হবে। এই সেকুলার সরকারের আমলে একটার পর একটা ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনা ঘটেই চলেছে, অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে অখিলেশের স্থান নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলছে না। অথচ ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ের ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হানার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিবরাজ পাতিল পদত্যাগ করেছিলেন। এই সরকারের আমলে বারবার ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীরা ভারতের উপর হামলা চালাচ্ছে, বিশেষত কাশ্মীরে। ২০১৬ সালের ২-৫ জানুয়ারি পাঞ্জাবের পাঠানকোটে ভারতীয় বায়ুসেনার ছাউনিতে জৈশ-ই-মহম্মদের সন্ত্রাসবাদীরা হানা দেয়। তিনদিন লেগেছিল চারজন সন্ত্রাসবাদীকে হত্যা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে। রাহুল আর অখিলেশের সরকার সেই ঘটনার কড়া জবাব দেওয়ার বদলে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটায়। পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলকে পাঠানকোটের সেনা ছাউনিতে গিয়ে ঘটনা সম্পর্কে সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করার অধিকার দেওয়া হয়। পাকিস্তান যে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিল ২৯ মার্চ, তাতে কুখ্যাত পাক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের এক সদস্যও ছিলেন। পাঠানকোটে ওই হামলার সপ্তাহখানেক আগেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাহুল আচমকা পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নাতনির বিয়েতে গিয়ে হাজির হন। সেইসময় সরকার পক্ষ এই পদক্ষেপকে একজন সত্যিকারের রাষ্ট্রনেতার ব্যবহার বলে প্রশংসা করেছিল। ওই ব্যবহারের কী প্রতিদান দিয়েছিল পাকিস্তান? এক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের মাটিতে পুষ্ট জঙ্গি সংগঠন ভারতের সেনা ছাউনি আক্রমণ করে এবং তাদের সঙ্গে লড়াইয়ে সাতজন ভারতীয় জওয়ানের প্রাণ যায়।

সেবছরের ১৮ সেপ্টেম্বর উরিতে হামলা চালিয়ে ১৯ জন ভারতীয় সৈনিককে হত্যা করে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীরা। তার জবাব হিসাবে ২৯ সেপ্টেম্বর নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’ করে ভারতীয় সেনাবাহিনি।

তবে এসবের চেয়ে অনেক বড় আঘাত ছিল ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামার ঘটনা। আড়াই হাজার সিআরপিএফ জওয়ানকে নিয়ে জম্মু-শ্রীনগর হাইওয়ে দিয়ে যাচ্ছিল ৭৮ খানা বাসের লম্বা কনভয়। পুলওয়ামা জেলার লেথাপোরার কাছে এক আত্মঘাতী জঙ্গি, পরে যাকে চিহ্নিত করা হয় আদিল আহমেদ দার বলে, সে ৩৫০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরকে ঠাসা গাড়ি নিয়ে ওই কনভয়ের একটি বাসে ভিড়িয়ে দেয়। ফলে ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ানের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার প্রত্যাঘাত হিসাবে ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের বালাকোটে বোম ফেলা হয়। কিন্তু ওই বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক নিয়ে একটি গাড়ি কী করে সশস্ত্র বাহিনির কনভয়ের কাছে পৌঁছতে পারল, সে প্রশ্নের জবাব আজ পর্যন্ত রাহুল-অখিলেশের সরকার দিতে পারেনি। এই ঘটনার কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পর্যন্ত হয়েছে বলে খবর নেই। দাভিন্দর সিং নামে জম্মু-কাশ্মীর পুলিসের এক ডিএসপিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল ২০২০ সালের ১১ জানুয়ারি। তাঁর বিরুদ্ধে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ), ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর চেষ্টা এবং অন্যান্য অভিযোগে ইউএপিএ আইনে মামলা দায়ের করে। তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্তও করা হয়। তিনি এই মুহূর্তে এনআইএ-র দায়ের করা মামলায় বিচারবিভাগীয় হেফাজতে আছেন বটে, কিন্তু দুটি মামলার একটিতে জামিন হয়ে বসে আছে, অন্য মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। পুলওয়ামার ঘটনায় আর একটিও গ্রেফতার হয়নি।

এদিকে পহলগামের ঘটনার পরে এই সরকারের দীর্ঘদিনের গুণমুগ্ধ প্রাক্তন সেনাকর্তা মেজর জেনারেল জি ডি বক্সী রিপাবলিক টিভিতে বসে প্রধানমন্ত্রীর ভক্ত সাংবাদিক অর্ণব গোস্বামীর মুখের উপর বলে দিয়েছেন, কোভিডের সময়ে নাকি তিন বছর ধরে সেনাবাহিনিতে কোনো নিয়োগ হয়নি। টাকা বাঁচানোর জন্যে ভারতীয় সেনার সংখ্যা ১,৮০,০০০ কমিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে আগে যতজন সেনা কাশ্মীরে একটা সেক্টরে নজরদারি করত, এখন ততজনকেই দুটো সেক্টরে নজরদারি করতে হচ্ছে। এই তথ্য সত্য না মিথ্যা তা আমরা জানি না, কিন্তু এই বক্তব্যকে খণ্ডন করে এখন পর্যন্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রী তেজস্বী যাদব কোনো বিবৃতি দেননি।

পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং বাংলার সংবাদমাধ্যম আশ্চর্যভাবে সেকুলার সরকারের অযোগ্যতা সম্পর্কে একটি কথাও বলছে না। দেশের অন্য ভাষার মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলিও প্রায় রাহুল-অখিলেশের সরকারের গেলানো ভাষ্যই উগরে যাচ্ছে। তবে অন্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তফাত হল, যদি অন্য রাজ্যগুলির দিকে তাকাই তাহলে দেখব, ক্ষমতাসীন সেকুলার দলগুলির নেতারা যেখানেই পহলগামে নিহত মানুষদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন, সেখানেই ক্ষোভের সম্মুখীন হচ্ছেন। একটি ছয় বছরের শিশু, যে বাবাকে হারিয়েছে, সে-ও সটান টিভি ক্যামেরার সামনে বলে দিচ্ছে – সরকার কিছুই জানে না, সরকার প্রায় অস্তিত্বহীন। বড়দের উদাহরণও দেখে নিন নিচের লিংকগুলিতে

অন্যদিকে কাশ্মীর থেকে যে হিন্দু পর্যটকরা বেঁচে ফিরেছেন তাঁদের দিয়ে কাশ্মীরি মুসলমানদের সম্পর্কে খারাপ কথা বলাতে ঘাম ছুটে যাচ্ছে অমিশ দেবগনের মত সরকারপন্থী সাংবাদিকদের।

বহু হিন্দু পর্যটক তো রীতিমত সোশাল মিডিয়ায় ভিডিও আপলোড করে জানাচ্ছেন, কাশ্মীরিরা তাঁদের সঙ্গে কত ভাল ব্যবহার করেছেন।

অনেকেই মিডিয়ার সামনেও একই বয়ান দিচ্ছেন।

এই প্রবণতা বিপজ্জনক, কারণ এ থেকে মনে হচ্ছে, রাহুল-অখিলেশ-তেজস্বী প্রমুখের অপদার্থতা সত্যেও সেকুলারিজমের ভূত এই লোকগুলির মাথাতেও ঢুকে যাচ্ছে। চোখের সামনে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের নগ্ন রূপ দেখার পরেও, সন্ত্রাসবাদীরা বেছে বেছে হিন্দুদের খুন করেছে জানার পরেও।

আরও পড়ুন বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে ইমাম রশিদি

এই যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ভারতের হচ্ছে, এর দায় কেবল সেকুলার নেতাদের নয়, দলবিহীন সেকুলার ব্যক্তিদেরও নিতে হবে। সেই ২০১৪ সাল থেকে যতগুলি সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে এদেশে এবং তাতে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে – সবকিছুর দায় এই সেকুলারদের। এদের জন্যেই আজ ভারতে কোনো শক্তিশালী সরকার নেই। থাকলে এভাবে বারবার দেশের মানুষকে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীদের হাতে অসহায়ভাবে প্রাণ দিতে হত না। ওই ছয় বছরের পিতৃহারা ছেলেটির সামনেও এদের জবাব দিতে হবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাঙালির অরাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নিচে চাপা পড়ছে ছাত্রছাত্রীরা

গণতন্ত্র-ফন্ত্র কে চায়? বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্র তো বাবা-মায়েরা মোটেই চান না। ছেলেমেয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে লেখাপড়া করতে। ওটা রাজনীতি করার জায়গা নাকি?

ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকাররা প্রায়ই বলেন – ক্রিকেট হল মিলিমিটারের খেলা। মানে কয়েক মিলিমিটার এদিক-ওদিক হলে নট আউটটা আউট হয়ে যেতে পারে, ছয়টা চার হয়ে যেতে পারে, ফলে জয়টা পরাজয়ে বদলে যেতে পারে। ব্রাত্য বসু আর তাঁর গাড়ির চালক বোধহয় ক্রিকেট দেখেন না। পশ্চিমবঙ্গের লেখাপড়া, নাটক, সিনেমা – এত কিছু সামলে কি আর সময় পাওয়া যায়? নইলে ইন্দ্রানুজ রায়ের গায়ে উঠে পড়ার কয়েক মিলিমিটার আগেই গাড়ির ব্রেক কষে ফেলতেন। তাহলেই কোনো সমস্যা থাকত না। কোনো চ্যানেল তাদের সাংবাদিককে পাঠিয়ে দিত ক্যাম্পাসে পড়ে থাকা মদের বোতল আর কন্ডোম গুনতে, কোনো চ্যানেল অতীতে ছড়িয়ে লাট করা কোনো প্রাক্তন উপাচার্যকে ডেকে এনে বোঝাত যাদবপুরে কোনো ‘ডিসিপ্লিন’ নেই এবং ‘ডিসিপ্লিন’ প্রতিষ্ঠা করতে গেলে কী করতে হবে। কোনো তথাকথিত স্বাধীন সাংবাদিক নিশ্চিন্তে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে বলে দিতে পারতেন ব্যাপারটা স্রেফ শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য তৈরি করার জন্যে সিপিএমের চক্রান্ত, কে কে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোকে পৃথিবীর কোথা থেকে কত টাকা চাঁদা দিয়েছে তার এক্সেল শীট বানিয়ে ‘বিগ এক্সপোজে’ বলে প্রকাশ করতে পারতেন। আর জি কর আন্দোলনে যেসব বামপন্থীরা কর্পোরেট হাসপাতালের চক্রান্ত, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প বানচাল করার ষড়যন্ত্র, বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা দেখতে পাচ্ছিলেন তাঁরাও নিশ্চিন্তে শিক্ষার বেসরকারিকরণের চক্রান্ত, কন্যাশ্রী প্রকল্প বানচাল করার ষড়যন্ত্র, ২০২৬ সালে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় লম্ফঝম্প করতে পারতেন। নিজেদের ছাত্রজীবনে মুখে চোখে বিপ্লবের স্বপ্ন মেখে যথেষ্ট অশান্ত ছাত্র আন্দোলন করে, এখন পুলিসের সত্যবাদিতায় এবং শিক্ষামন্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষায় দারুণ বিশ্বাসী হয়ে যাওয়া অনাবাসী ফেসবুক ইনফ্লুয়েন্সার সদগুরুরাও দীর্ঘ পোস্ট লিখতে পারতেন – যাদবপুরের চ্যাংড়ারা ছাত্র সংসদের নির্বাচন ইত্যাদি দাবি করে ক্যাম্পাসে যে ফ্যাসিবাদ প্রবেশের রাস্তা খুলে দিচ্ছে – এই মর্মে। এমনকি সাংস্কৃতিক কর্মী ব্রাত্যবাবুর নাটক, সিনেমার বন্ধুরাও টিভি ক্যামেরাকে বড় মুখ করে বলতে পারতেন ‘কোনো রাজনীতির মধ্যে না গিয়ে বলছি – একজন শিক্ষিত, রুচিবান মানুষ, যিনি আবার মাস্টারমশাইও, তাঁর উপরে এই আক্রমণ নিন্দাযোগ্য।’ এই জাতীয় কিছু। সব বানচাল করে দিল ওই মিলিমিটার।

একটা জলজ্যান্ত ছেলের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই দৃশ্য ভাইরাল হয়ে গেছে, অস্বীকার করা যাবে না। ফলে অরূপ বিশ্বাস বা দেবাংশু ভট্টাচার্যের মত সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেস করেন না যাঁরা, তাঁদের এখন ঢোঁক গিলে মানবিকতা দেখাতেই হচ্ছে। নইলে ভবিষ্যতে নিরপেক্ষতা (সংবাদমাধ্যমের), ফ্যাসিবাদবিরোধিতা (বামপন্থী ও উদারপন্থীদের) ইত্যাদি ভাল ভাল জিনিস করি বলে দাবি করা যাবে না। না, মানে করতে কে আর আটকাত? কিন্তু নিজেদেরই একটু বিবেকে লাগত বোধহয়। তাই ওঁদের এই মহানুভবতা। বোধহয় অনেকের মহানুভবতার কারণ এটাও যে ইন্দ্রানুজ রাজ্যের কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্য নয়। সেটা হলে সংবাদমাধ্যম তো বটেই, বিকল্প বামেরাও অনেকে শিক্ষামন্ত্রীকে ঘিরে ধরা, তাঁর গাড়ির কাচ ভাঙা ইত্যাদির নিন্দা করতেন এবং একে ওই বিরোধী রাজনৈতিক দলটার ক্ষমতা দখলের ঘৃণ্য চেষ্টা বলে সাংবাদিক সম্মেলন করতেন। যেমনটা আর জি কর আন্দোলনের শেষ পর্বে আমরা দেখেছি।

দেখুন, সত্যি কথা সোজা করে বলাই ভাল। গণতন্ত্র-ফন্ত্র কে চায়? বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্র তো বাবা-মায়েরা মোটেই চান না। ছেলেমেয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে লেখাপড়া করতে। ওটা রাজনীতি করার জায়গা নাকি? বাবা-মায়েরা বিলক্ষণ জানেন যে যাদবপুরে লেখাপড়া হয় না। ওখানে কেবল ছেলেরা গাঁজা খায়, মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে বসে হাফপ্যান্ট পরে সিগারেট খায়। কিন্তু সেসবও মেনে নেওয়া যেত যুগের ধর্ম হিসাবে। এসবের থেকেও বড় অপরাধ যেটা করে যাদবপুরের ছেলেমেয়েরা, সেটা হল রাজনীতি করে। তাও আবার মূলত বামপন্থী রাজনীতি। এই রাজনীতির ছোঁয়াচ বাঁচাতে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম বাবা-মায়েরা পাঁচতারা হোটেলের মত যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে ছেলেমেয়েদের সেখানে পাঠাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সির মত দু-একটা জায়গা বাদে পশ্চিমবঙ্গের কোনো কলেজে যে ২০১৭ সাল থেকে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয় না তাতে বাবা-মায়েরা তো বটেই, অনেক ছাত্রছাত্রীও খুশি। ভোট দেব পঞ্চায়েত, পৌরসভা, বিধানসভা, লোকসভার জন্যে। পড়াশোনার জায়গায় আবার ভোট কিসের? এইসব করতে গিয়েই তো বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গে লেখাপড়া হত না, তাই না? এদিকে ২০১১ সাল থেকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমশ ছাত্র রাজনীতি তুলে দিয়ে কীরকম দুর্দান্ত পড়াশোনা হচ্ছে তা সমস্ত ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবক জানেন। আরও নিদারুণভাবে জানেন মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা। বছরের পর বছর নির্বাচন না হওয়া মানে যে একনায়কতন্ত্র – সেকথা তাঁরা দেশের রাজনীতি সম্পর্কে মানতে রাজি। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে হিংসা, রিগিং ইত্যাদি নিয়েও অসন্তুষ্ট হন। কিন্তু কলেজ ক্যাম্পাসে তাঁরা রাজনীতি চান না, ভোট-ফোট চান না। কেন? জিজ্ঞেস করলেই উত্তর পাওয়া যাবে ‘ওতে লেখাপড়ার ক্ষতি হয়। অশান্তি হয়।’ প্রথম যুক্তিটা সত্যি হলে যাদবপুর বছরের পর বছর ইউজিসি, ন্যাক, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে কী করে দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে থাকে, সে প্রশ্নের উত্তর কিন্তু কারোর কাছে নেই। দ্বিতীয় যুক্তিটা ঠিক হলে অন্য শান্তিপূর্ণ কলেজগুলোতে ছাত্রসংখ্যা কমছে কেন, যাদের নাম খাতায় আছে তারাও ক্লাস করতে আসে না কেন, এসব প্রশ্নও কেউ নিজেকে করে না। ছাত্র রাজনীতির প্রায় পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হওয়া পশ্চিমবঙ্গে যাদবপুরের মত জায়গাতেও খাতা না দেখেই নম্বর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২০ জনের খাতা হারিয়ে যাচ্ছে কেন?

দীর্ঘ চেষ্টায় গোটা রাজ্যের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে ছাত্রছাত্রীরা রাজনীতি করলে লেখাপড়া হয় না আর শ্রমিকরা রাজনীতি করলে শিল্প হয় না। ২০১১ সালের পর থেকে সরকারি প্রচেষ্টায় দুটোই প্রায় তুলে দেওয়া হয়েছে সফলভাবে। অথচ না লেখাপড়া হচ্ছে, না শিল্প হচ্ছে। এসব বললে উত্তর আসবে, অত সালে অমুক কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনে হিংসায় অমুকের প্রাণ গিয়েছিল, তমুকের চোখ নষ্ট হয়েছিল। তমুক কলেজে এসএফআই বাম আমলে তোলাবাজি করেছিল, তৃণমূল নতুন কিছু করছে না। ঠিক কথা। একথাও ঠিক যে বহু কারখানায় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা (শ্রমিক ইউনিয়ন কেবল সিপিএম বা অন্য বামপন্থী দলের নেই; কংগ্রেস, তৃণমূল, এমনকি আরএসএসেরও আছে। এটা আবার এ যুগের সবজান্তারা জানেন না) মালিকপক্ষের সঙ্গে তলে তলে আপোস করে শ্রমিকদের বারোটা বাজিয়েছেন। কিন্তু তার জন্যে ইউনিয়ন, রাজনীতি, গণতন্ত্র সব তুলে দেওয়া উচিত – এই প্রত্যয় তৈরি হলে মাথায় ব্যথা হওয়া মাত্রই ব্যথার ওষুধ না খেয়ে বা দীর্ঘকালীন মাথাব্যথার কারণ সন্ধানে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে পত্রপাঠ মাথাটা কেটে ফেলা উচিত। তাতে অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ স্কন্ধকাটাদের রাজ্যে পরিণত হবে। ইতিমধ্যেই দু-কান কাটাদের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। তাই চার্জশিটে যার নাম লেখা আছে সে বুক ফুলিয়ে সভায় বলতে পারে – ওটা কার নাম, নির্দিষ্ট করে বলুক। টিভি স্টুডিওর সান্ধ্য আলোচনায় গভীর জল্পনা কল্পনা চলে – নামটা কার।

এমন রাজ্যে সরকার যে নিতান্ত কোণঠাসা না হলে কোনো আন্দোলনকে গ্রাহ্য করবে না, কোনো দাবিকেই পাত্তা দেবে না তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। আর জি কর আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন জুনিয়র ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে কলেজগুলোতে ছাত্র সংসদের নির্বাচন করানোর দাবি করেছিলেন। সরকারপক্ষ থেকে অমনি প্রচার করা শুরু হয় ‘এই দেখুন, এরা আসলে ক্ষমতা চায়’। সেই প্রচার অনেকের পছন্দও হয়ে যায়। মানে গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন চাওয়া মহা অপরাধ। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় তারা ক্ষমতা চায় বলেই নির্বাচন চেয়েছিল, সেটাই বা অপরাধ হবে কেন? নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর তো গণতন্ত্রের লক্ষণ। গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করতে তো চায়নি। অথচ বহু বিপ্লবীও সেইসময় সরকারি দলের এই অন্যায় প্রচারের প্রতিবাদ করেননি। ব্রাত্যবাবুর গাড়ির বেপরোয়া মেজাজ তখনই তৈরি হয়েছে। এমনিতেই আমাদের দেশে গণতন্ত্র সংকুচিত হতে হতে এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে শাসক দলগুলোর যে কোনো অন্যায় নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তারা বলে দেয়, কাজটা করার পরেও তারাই জিতেছে। অতএব মানুষের তাদের উপর আস্থা আছে। সুতরাং ওটা অন্যায় নয়। তার উপর লেখাপড়া জানা নাগরিকরা যদি নিজেরাই নানা ভাষায় বলতে শুরু করেন যে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বা টিচার্স কাউন্সিল, সমবায় সংস্থা ইত্যাদি ছোট ছোট পরিসরেও নির্বাচন চাওয়াই অপরাধ – তাহলে তো সোনায় সোহাগা।

অর্থাৎ ছাত্রের উপর দিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার ঔদ্ধত্য শাসককে আমরাই উপহার দিয়েছি বললে বিশেষ ভুল হয় না। বিরোধী দলগুলো অবশ্যই দায়হীন নয়। বিধানসভার বিরোধী দল বিজেপির স্বর যে যাদবপুর বা ছাত্র রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলে তৃণমূলের সঙ্গে মিশে যায় তা অতীতেও দেখা গেছে, গতকাল থেকেও দেখা যাচ্ছে। এটা কাকতালীয় নয়। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত যেসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা আজও মূলত বামপন্থী সেইসব প্রতিষ্ঠানকে তৃণমূল কংগ্রেসের মত বিজেপিও শত্রুই মনে করে এবং সেগুলোর সাড়ে বারোটা বাজাতে চেষ্টার ত্রুটি রাখে না। মতপার্থক্য যা নিয়ে হয় সেটা হল যারা বাবুল সুপ্রিয়র মাথায় চাঁটি মেরেছে বা ব্রাত্যবাবুকে আঘাত করেছে তাদের কী বলা হবে তাই নিয়ে। নকশাল, নাকি আর্বান নকশাল, নাকি দেশদ্রোহী, নাকি পাকিস্তানি ইত্যাদি প্রভৃতি। অমন মতপার্থক্য তৃণমূলের নিজের ভিতরেও তো হয়। কাল থেকে যেমন কোনো তৃণমূল নেতা বলছেন এটা সিপিএমের বদমাইশি, কেউ বলছে অতিবামদের গুন্ডামি ইত্যাদি প্রভৃতি। বিধানসভা, লোকসভায় বারবার শূন্য পেলেও যাদের হাতে নাকি এই রাজ্যের প্রগতিশীলতার ঐতিহ্য রক্ষা করার দায়িত্ব, সেই সিপিএম বা বামফ্রন্টের দলগুলোর আবার অন্য সমস্যা। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তাদের ছাত্রনেতারা যতটা লড়াকু, বিশেষত অন্য বামেদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, ক্যাম্পাসের বাইরে পার্টির ততটা লড়াই দেখা যায় না। তার উপর ইদানীং আবার সিপিএম নেতারা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর সিস্টেম চালু করেছেন। ব্রিগেডের ডাক দেয় যুব সংগঠন বা খেতমজুরদের সংগঠন। যাদবপুরে ছাত্রের উপর দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি চলে গেছে বলে ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ছাত্র সংগঠন। স্কুলশিক্ষার অব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন করতে হলে সে আন্দোলন হয় শিক্ষক সংগঠনের ব্যানারে। পার্টির নাম, পার্টির পতাকা দেখা যায় কেবল সম্মেলনে আর সাংবাদিক সম্মেলনে। পার্টির ‘নতুন মুখ’, ‘তরুণ মুখ’ বলে খ্যাত নেতৃবৃন্দকে কলকাতায় বিভিন্ন ছায়াছবির প্রিমিয়ারে আর টিভি স্টুডিওতে রোজ দেখা যায়। কিন্তু মীনাক্ষী মুখার্জি বাদ দিলে কাউকে প্রত্যন্ত এলাকার আন্দোলনে নিয়মিত দেখা যায় না। ক্ষমতাসীন তৃণমূলে এত জটিলতা নেই। একটাই বুলডোজার, সব জায়গায় চালানো হয়।

পশ্চিমবঙ্গে এর বাইরেও তৃণমূলবিরোধী দল আছে। কয়েকটা কোণে কংগ্রেস আছে, যাদের কথা বলাই বাহুল্য। তাছাড়া কিছু বাম দল আছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যখন বামফ্রন্ট শূন্য হয়ে গেল, তখন এক ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখেছিলাম, তাঁদের অনেককালের অভিযোগ, সিপিএম বামপন্থার বদনাম করছে। একটিবার সুযোগ পেলেই তাঁরা দেখিয়ে দিতে পারেন আসল বামপন্থা কী, কিন্তু সিপিএম তাঁদের জায়গা ছাড়ে না। এবার সিপিএম শূন্য হয়ে গেল, সামনে ফ্যাসিবাদের বিপদ। এইবার তাঁরা সিপিএমের জায়গাটা নিন, দেখিয়ে দিন। কিন্তু ২০২৬ আসতে চলল, তাঁরা জায়গা ভরাট করতে পারলেন না। এখনো বলছেন যা ঘটছে সবই সিপিএমের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে সিপিএম যে ব্যর্থ তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু ওটুকু বলে ওঁরা সন্তুষ্ট নন। আবার সিপিএমের উপর অভিমান করাও চাই। ‘বিজেপিকে ফ্যাসিবাদী না বলে নয়া ফ্যাসিবাদী বললি কেন? এরম কল্লে খেলব না।’ আবার সিপিএমও বলে ‘তোরা মমতাকে লেসার ইভিল বলেছিলিস না? এখন কেন?’ মানে রবীন্দ্রনাথের কাছে কথাঞ্জলি পুটে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে ব্যাপারটাকে এরকমভাবে বলা যায় যে ‘বাম ভাবে আমি দেব/বিকল্প ভাবে আমি/নিউট্রাল ভাবে আমি দেব/হাসে ফ্যাসিনামী।’

আরও পড়ুন আন্দোলন, ন্যায়বিচার, পুজো: একটি অরোম্যান্টিক বয়ান

পশ্চিমে গুজরাট থেকে শুরু হয়ে বিজেপির বিজয়রথ পূর্বে ওড়িশা পর্যন্ত এসে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে পারেনি বলে আমরা অনেকেই আহ্লাদিত। সেই ২০২১ সাল থেকেই ফ্যাসিবাদকে হারিয়ে দিয়ে বেশ একটা বিপ্লবী অনুভূতি হচ্ছে। এদিকে সেবার নির্বাচন পর্ব মিটতেই তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়া নেতারা গুটিগুটি ফিরে এসেছেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু নেত্রী মমতা ব্যানার্জি ফিরিয়েও নিয়েছেন। আসানসোল দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়া বাবুলবাবু তো তৃণমূলে এসে মন্ত্রীও হয়ে গেছেন। মুকুল রায় বিজেপিতে আছেন, না তৃণমূলে – সে আবার এক রহস্য। রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কও উন্নয়ন থেকে ধর্মে সরে গেছে। অযোধ্যার রামমন্দিরের পালটা দীঘায় জগন্নাথের মন্দির হয়েছে সরকারি টাকায়। দুর্গাপুজোয় সরকারি সাহায্য তো ছিলই, কাশীর অনুকরণে কলকাতায় গঙ্গার ঘাটে সন্ধ্যারতিও চালু হয়ে গেছে। কোথাও নির্বাচন হলে অশান্তি শুধু নয়, দেখা যাচ্ছে নির্বাচন চাইলেও অশান্তি হয়। দেশের সবচেয়ে বড় সিনেমা শিল্প বলিউডকে দখল করে ফেলেছে বিজেপি, একের পর এক হিন্দুত্ব প্রোপাগান্ডা ছবি চলছে। অথচ তৃণমূল সাংসদ, বিধায়কে ভর্তি টলিউডে কিন্তু তার পালটা প্রোপাগান্ডা ছবি হচ্ছে না। বরং প্রবল মুসলমানবিদ্বেষী বয়ানে ছবি হয়েছে, তাতে যাদবপুরের তৎকালীন তৃণমূল সাংসদ অভিনয় করেছেন। গোয়েন্দা ব্যোমকেশকে ত্রিশূলধারী শিব সাজানো ছবি হয়েছে ঘাটালের তৃণমূল সাংসদের প্রযোজনায়, শ্রেষ্ঠাংশেও তিনি। উপরন্তু ইতিমধ্যেই রুগ্ন শিল্প হয়ে যাওয়া আঞ্চলিক ভাষার এই ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা আরও কাহিল হচ্ছে তৃণমূল নেতাদের প্রতাপে। টেকনিশিয়ানদের গিল্ড আর নির্দেশকদের দ্বন্দ্বে গতবছর জুলাই মাসে একবার বেশ কয়েকদিন শুটিং বন্ধ ছিল। তারপর অক্টোবর মাসে ২৩৩ জন পরিচালক তৃণমূলের টলিপাড়ার নেতা স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। সম্ভবত তারই প্রতিক্রিয়ায় টেকনিশিয়ানদের গিল্ড কয়েকজন পরিচালকের ছবির কাজে বাগড়া দেয়। ফলে গতমাসে পরিচালকরা কর্মবিরতি পালন শুরু করেছিলেন, তবে তাঁদের একতার অভাবে ব্যাপারটা দাঁড়ায়নি। সমস্যা কিন্তু রয়েই গেছে।

এ রাজ্যে অনেকে তো মানেন ভারতে ফ্যাসিবাদ এসে গেছে এবং ফ্যাসিবাদী বলেই আরএসএসের বিরুদ্ধে লড়াইটা আসলে সাংস্কৃতিক লড়াই। তাঁদের অনেকেই আবার বলেন তৃণমূল ফ্যাসিবাদী নয়, কারণ খুব খারাপ শক্তি হলেও তাদের কোনো আদর্শ নেই। আদর্শ না থেকেই যদি ফ্যাসিবাদ যে যে লক্ষ্য পৌঁছতে চায় সেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় কোনো দল, তাহলেও কি সে ফ্যাসিবাদী হয় না?

কে জানে বাপু! বাঙালি তাত্ত্বিক জাতি। স্বৈরাচারী না ফ্যাসিবাদী; ফ্যাসিবাদী না নয়া ফ্যাসিবাদী? এসব তাত্ত্বিক লড়াই আমরা সারাদিন করে যেতে পারি। করছিও তাই। কাজের কাজ তো কিছু করছি না। অবশ্য করতে যাবই বা কেন? আমাদের তো অরাজনৈতিক, নিরপেক্ষ থাকতে হবে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাঙালির গর্বের প্রগতিশীল খবরের কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ-এর মত, যারা আজ যাদবপুরের খবরের শিরোনামে লিখেছে ‘Bratya, student hurt in JU clash’। ভাবুন! যার হাতে কাচ ঢুকেছে সে-ও ‘hurt’, যে গাড়ির তলায় পড়েছে, মারা যেতে পারত, সে-ও ‘hurt’। তুলনাহীন নিরপেক্ষতা।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি: আর জি কর পেরিয়ে

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির সরকার আসার পরে আর ২০১৪ সালে দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর সরকার আসার পরে ভারতীয় রাজনীতিতে, সমাজে এবং সংবাদমাধ্যমে একটা নতুন কায়দা চালু হয়েছে। প্রশ্ন যা করার বিরোধীদের করা হয়, সরকারকে নয়। অথচ গণতন্ত্র মানে ঠিক উলটো। অন্তত ১৯৪৭ সাল থেকে ভারতে গণতন্ত্র মানে ছিল – প্রশ্ন সরকারকে করা হবে, আন্দোলন হবে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বা কাজের বিরুদ্ধে। সেটা উলটে গেছে। এখন সরকার অপকর্ম করলে সরকার আর সরকারি দলের সুরে সুর মিলিয়ে সংবাদমাধ্যম, এমনকি সাধারণ মানুষও ফিরিস্তি দেন – বিরোধীরা সরকারে থাকার সময়ে কী কী অপকর্ম করেছিল। বিজেপি এবং গোদি মিডিয়ার এই কাজটা করার জন্যে আছে দুটো হাতিয়ার – ‘নেহরু’ আর ‘কংগ্রেস কে ৬০ সাল’। তৃণমূল আর তাদের সোচ্চার ও নিরুচ্চার সমর্থকদের জন্যে আছে ‘বামফ্রন্টের ৩৪ বছর’। আপনি বলতেই পারেন, ‘বাপু, ওই কারণেই তো ওদের সরিয়ে তোমাদের ক্ষমতায় এনেছি। তোমাদের এতদিন হয়ে গেল সরকারে, তাও ওরা কবে কী করেছিল কেন শুনব?’ ওই ফাটা রেকর্ড কিন্তু বেজেই চলবে।

এবারের লোকসভা ভোটে দেশের মানুষ বিজেপির ফাটা রেকর্ড বাজানো অনেকটা বন্ধ করে দিয়েছেন। তার কৃতিত্ব খানিকটা অবশ্যই বিকল্প সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের। কিন্তু বেশিটাই দেশের বিরোধী দলগুলোর। কোনো সাংবাদিক বা বিকল্প সংবাদমাধ্যম, তাদের যত লক্ষ ফলোয়ারই থাকুক না কেন, যদি ভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীদের তুলনায় তারা বেশি পরিশ্রম করে বা সাধারণ মানুষ তাদের উপর বেশি নির্ভর করেন, তাহলে সেই সাংবাদিক বা ওয়েবসাইট মাটির সঙ্গে সম্পর্কহীন। রাজনীতির র-ও তারা বোঝে না। তবে তাদের অবদান অন্যূন নয়। ঘটনা হল, বিরোধীদের আন্দোলন করার মত একটা সুস্থ স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যাপারকে ভারতে দশবছর ধরে অস্বাভাবিক, দেশবিরোধী বলে তুলে ধরা হত। ওটাই যে স্বাভাবিক, ওভাবেই যে সরকার বদলায় এবং ওভাবেই যে নরেন্দ্র মোদীও ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেকথা মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গত এক-দেড় বছরে মানুষের সেই মনোভাব অনেকটাই কেটেছে। আরএসএস-বিজেপি ও তাদের বশংবদ মিডিয়া, বিরোধীরা আন্দোলন করলেই তাকে নানাভাবে বদনাম করে আর পার পাচ্ছে না। মানুষের মানসিকতার এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব অনেকটাই বিকল্প ওয়েবসাইট, স্বাধীন সাংবাদিক, ইউটিউবারদের।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এখনো বাকি দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে। এখানে একে বিজেপি ক্ষমতায় নেই, তার উপর এখানেও দিদি মিডিয়া সেই ২০১১ সাল থেকেই আছে। সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে, বন্ধ করার হুমকি দিয়ে বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার লোভ দেখিয়ে মমতা ব্যানার্জির সরকার পশ্চিমবঙ্গে দিদি মিডিয়া তৈরি করেছে সচেতনভাবে। উপরি সমস্যা হিসাবে আছেন বাম এবং/অথবা প্রগতিশীল মানুষদের একাংশ। তাঁরা ‘বিজেপি এসে যাবে’, এই যুক্তিতে তৃণমূল সরকারের যাবতীয় অপকর্ম চাপা দেন। বিরোধীরা (বামেদের কথা বলছি, এ রাজ্যে বিজেপি বিরোধীসুলভ কোন কাজটা করে?) গত ১৩ বছরে পর্যাপ্ত পরিমাণে বা তীব্রতায় আন্দোলন করেননি এটা যেমন সত্যি, তেমন এটাও সত্যি যে কোনো বিষয়ে তাঁরা প্রতিবাদ করলেই, মমতা বা তৃণমূল কংগ্রেসের অন্য কোনো নেতা কিছু বলারও আগে খবরের কাগজে বা সোশাল মিডিয়ায় লেখা শুরু হয়ে যায় ‘ওরা আবার কথা বলছে কী? ওরা তো অত সালে অমুকটা করেছিল।’ সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিকল্প ওয়েবসাইটগুলোর লেখক এবং জনপ্রিয় ফেসবুকারদের মধ্যে বেশকিছু মানুষ সর্বদা তালিকা নিয়ে তৈরি থাকেন – কবে, কোথায়, কখন তৃণমূল দল বা সরকারের করা কোন অন্যায়টা বামফ্রন্ট সরকারের আমলে সিপিএম বা জোট শরিক অন্য কোনো দল করেছিল। যুক্তি হিসাবে এটা অবশ্যই বনলতা সেনগিরি (whataboutery), যা আজকাল সারা পৃথিবীতে বাম, মধ্য, ডান – সব পক্ষের লোকেরাই করে থাকেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা ও অন্যান্য মিডিয়ার কয়েক দশকের যত্নে গড়ে তোলা এই নাগরিক বিশ্বাস, যে রাজনীতি অত্যন্ত নোংরা একটা ব্যাপার এবং শুধুমাত্র বদ লোকেরাই রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়।

ফলে সরকারের বিরুদ্ধে কোনোরকম আন্দোলনে যুক্ত হতে গেলেই রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত বাম দলগুলোকে আন্দোলনকারীরাই বাধা দেন। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে এ জিনিস ঘটেছে, সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনও বামপন্থীদের বাইরে রাখতে গিয়ে দুভাগ হয়ে গিয়েছিল – বামফ্রন্টের সদস্য দলগুলোর সংগঠনের যৌথ মঞ্চ, বাকিদের সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ। তারপর কোন মঞ্চ দিল্লিতে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে হিন্দু মহাসভার আতিথ্য গ্রহণ করল তা নিয়ে ভুল খবরও রটেছিল তৃণমূলের উদ্যোগে। যেহেতু সিপিএমের শিক্ষক সংগঠন নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির নাম ওই পেশার বাইরের মানুষের কাছে বেশি পরিচিত এবং আন্দোলনের বাইরে থাকা অনেক শিক্ষকও খবর রাখতেন না আন্দোলনের কতগুলো ভাগ হয়েছে, সেহেতু অনেকে সাক্ষ্যপ্রমাণ না দেখেই ধরে নিয়েছিলেন কাজটা সিপিএমের সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা অংশেরই। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষও সুযোগ বুঝে সোশাল মিডিয়ায় রাম-বাম-কং আঁতাত প্রমাণিত হল বলে ধুয়ো তুলেছিলেন। অথচ ঘটনা ছিল উলটো

সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে যে বিরোধীরা, তাদের এইভাবে যে কোনো আন্দোলন থেকে দূরে রাখার এই কৌশল কংগ্রেস সম্পর্কে সেই ২০১৪ সাল থেকে সারা দেশে প্রয়োগ করে যাচ্ছিল বিজেপি। তাদের দ্বারা শাসিত কোনো রাজ্যে ধর্ষণ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হলেই বিজেপি নেতারা এবং গোদি মিডিয়া মনে করিয়ে দিত – নির্ভয়া কাণ্ড হয়েছে কংগ্রেস আমলে। অতএব কংগ্রেসের ও নিয়ে কোনো কথা বলার অধিকার নেই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কোনো অগণতান্ত্রিক কাজ নিয়ে প্রতিবাদ করলেই ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা মনে করিয়ে দেওয়া হত। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কথা বললেই শাহ বানো মামলার নাম করা হত। দেশের সাধারণ মানুষও এই একপেশে ধারণায় বিশ্বাস করছিলেন, যে কংগ্রেসের ৬০ বছরের শাসনে দেশে একটাও ভাল কাজ হয়নি। উপরন্তু বিজেপি এমন কিছুই করছে না, যা কংগ্রেস আগে করেনি। পশ্চিমবঙ্গের মতই কোথাও কোনো আন্দোলন দানা বাঁধলেই সংগঠকরা আগেভাগে বলে দিতেন ‘আমাদের এখানে কোনো রাজনৈতিক দল নেই। আমরা আন্দোলনের রাজনীতিকরণ চাই না।’ ফলে কংগ্রেসও হয়ে পড়েছিল রক্ষণাত্মক। যখন সারা দেশে এনআরসি-সিএএবিরোধী আন্দোলন চলছে, তখন এআইসিসি অফিসে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করা ছাড়া ওই আন্দোলনে কোনো ভূমিকা নিতে ভয় পেয়েছে। সংগঠনকে কাজে লাগায়নি। কখনো দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কোনো আন্দোলনে কংগ্রেসের কেউ গিয়ে হাজির হলেই সমবেত গোদি মিডিয়া এবং বিজেপি সেই আন্দোলনকে ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদ’ বলে দেগে দিয়েছে। এমনকি আন্দোলনকারীরাও আপত্তি করেছেন। ২০১৫ সালে যন্তর মন্তরে প্রাক্তন সেনাকর্মীদের আন্দোলনে রাহুল হাজির হওয়ায় তাঁকে আন্দোলনকারীরাই চলে যেতে বলেন।

২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের সময়ে পাঞ্জাবে কংগ্রেস সরকার থাকা সত্ত্বেও দিল্লির আন্দোলনে কংগ্রেসের কোনো ভূমিকা ছিল না বললেই চলে। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং (পরে কংগ্রেস ছেড়ে নিজের দল খোলেন, এখন আবার বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন) আন্দোলনকে মৌখিক সমর্থন জানিয়েছিলেন কেবল। কংগ্রেসের এই নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা বিজেপিকে ভয়ানক হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। কংগ্রেস শেষমেশ এই সংকোচ কাটিয়ে ওঠে রাহুলের ভারত জোড়ো যাত্রার মধ্যে দিয়ে।

পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম তথা বাম দলগুলোর সংকোচ আজও কাটেনি। তার অন্যতম কারণ, তাঁরা কংগ্রেসের মত কোনো নতুন বয়ান খাড়া করতে পারেননি। যে শিল্পায়ন হয়নি তার জন্য এবং ব্যর্থ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জন্য অশ্রুপাত করা ছাড়া তাঁদের বক্তব্য বলতে তৃণমূলের দোষগুলো দেখিয়ে দেওয়া। সিপিএম সদস্য, সমর্থকরা এখনো ‘গর্বের ৩৪’ নিয়ে বিভোর। এখনো নিজেরাই মেনে নিতে পারেননি যে ৩৪ বছরের সবটাই গর্বের হলে সংখ্যাটা উনচল্লিশে পৌঁছত, চৌত্রিশে থেমে যেত না। ফলে এখনো তাঁদের আমল নিয়ে বনলতা সেনগিরি করে সিপিএম নেতাকর্মীদের স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। কোনো আন্দোলনের নেতৃত্ব হাতে তুলে নেওয়ার সাহস তাঁরা করে উঠতে পারেন না, পতাকাহীন মিছিলের ডাক দেন। বড়জোর ছাত্র সংগঠন বা যুব সংগঠনের নামে মিছিল, জমায়েত ইত্যাদি করা হয়। এই সংকোচের ফলে পশ্চিমবঙ্গে এক অদ্ভুত রাজনীতি রমরমিয়ে চলছে।

তৃণমূল সরকারের আমলে সরকারি হাসপাতালের ভিতরে সরকারি ডাক্তার ধর্ষিত হয়ে খুন হলেন। ইতিমধ্যেই পরিষ্কার যে প্রথম থেকে ঘটনাটা চেপে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে হাসপাতাল ও পুলিসের তরফ থেকে। স্বাস্থ্য আর স্বরাষ্ট্র – দুটো দফতরই স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর হাতে। খুনের ঘটনা ৯ অগাস্ট সকালে প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিসের কাজে, অর্থাৎ সরকারি কাজে, এত অসঙ্গতি যে কলকাতা হাইকোর্টে তো বটেই, সুপ্রিম কোর্টে পর্যন্ত ‘হ্যাঁ স্যার, ভুল হয়ে গেছে স্যার’-এর বাইরে যেতে পারেননি রাজ্য সরকারের কৌঁসুলি।

তবু এখনো তৃণমূল তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের একটা অংশও এই আলোচনায় বানতলা, ধানতলা টেনে আনছেন। রাত দখল আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী বলে পরিচিত শতাব্দী দাশ গত বুধবারের আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘অ-দলীয়, প্রবল রাজনৈতিক’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন ‘সাধারণ মানুষই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁদের কাঁধে চেপে কাউকে রাজনৈতিক আখের গোছাতে দেবেন না তাঁরা। বর্তমান শাসনহীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত মিছিল থেকেই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, মনুবাদী পিতৃতান্ত্রিক বিজেপিকে এই আন্দোলনের সুবিধা তুলতে দেওয়া হবে না। মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে সিপিএম যুগের বানতলা আর তৃণমূলের কামদুনি, একই সঙ্গে।’ পড়ে গুলিয়ে গেল – আন্দোলনের দাবিটা কী? অনেকের হাতে পোস্টার ছিল এবং মুখে স্লোগান ছিল ‘We want justice’, অর্থাৎ ‘আমরা ন্যায়বিচার চাই’। কার জন্য ন্যায়বিচার? আর জি করে মৃত মেয়েটার জন্যে ন্যায়বিচার, নাকি কামদুনির ধর্ষিতার জন্য ন্যায়বিচার, নাকি বানতলার ধর্ষিতার জন্য ন্যায়বিচার, নাকি এদের সকলের জন্য ন্যায়বিচার? মুশকিল হল, বানতলা আর কামদুনি – দুটো মামলারই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে আগেই। ন্যায়বিচার হয়েছে কিনা তা ভিন্ন প্রশ্ন, কিন্তু আর জি করের ঘটনার পরে ওইসব ঘটনার জন্যে আন্দোলন করার তো মানে নেই। বিশেষত বানতলার ন্যায়বিচার তৃণমূল সরকারের কাছে তো চাওয়া যেতে পারে না। চাইলে বামফ্রন্ট সরকারের কাছে চাইতে হয়। যে সরকারের এখন আর অস্তিত্বই নেই, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন মোদীর ভারত আর দিদির পশ্চিমবঙ্গেই শুধু সম্ভব। অবশ্য শতাব্দী বা সমমনস্করা বলতেই পারেন, ওই বাক্যগুলোর অর্থ তা নয়। অর্থ হল – এসব অনাচার সিপিএমও আগে করেছে, তৃণমূলও করেছে। অতএব তাদের এই আন্দোলনে প্রবেশ নিষেধ। পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের অরাজনৈতিক নেতারা এরকমই বলেন সাধারণত। কিন্তু একথা বললে আন্দোলনের লক্ষ্য আরও অস্পষ্ট হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবেশ না হয় আটকানো গেল, তাদের সহযোগিতা অগ্রাহ্য করা গেল কি? কামদুনির তৃণমূল সরকার রাত দখলের আন্দোলনের বিরোধিতা করেনি। বরং তাদের দখলে থাকা অটো, টোটো ইউনিয়ন বেশি রাতেও যানবাহন সচল রেখে সাহায্য করেছে। বানতলার সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন সিটুর দখলে থাকা অ্যাপ ক্যাব চালকদের ইউনিয়নও সহযোগিতা করেছে। তার উপর আন্দোলনকারীরা নিজেরাই মনুবাদী পিতৃতান্ত্রিক বিজেপি সরকারের অধীনে থাকা মেট্রো রেলকে ইমেল করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন মেট্রো চালু রাখতে। মেট্রো রেল সে দাবি পূরণ করেছে। এসব না হলে ১৪ তারিখ রাতে কলকাতায় অমন জমায়েত হত কি? হয়েছে ভাল কথা। কিন্তু মেয়েদের রাত দখল কি সফল হয়েছে? প্রশ্নটা তুলতে হচ্ছে, কারণ কদিন পরেই রাজ্য সরকার মহিলাদের রাতে সুরক্ষিত রাখতে যেসব ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে, তার অন্যতম হল – মহিলাদের নাইট ডিউটি কম দেওয়া, সম্ভব হলে না দেওয়া। অর্থাৎ রাতের যেটুকু দখল মেয়েদের হাতে এখন আছে, সরকার নিজের অক্ষমতা ঢাকতে সেটুকুও কেড়ে নিতে চায়। তাহলে ‘শাসনহীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত মিছিল’ থেকে দেওয়া হুঁশিয়ারিটা যথেষ্ট জোরদার ছিল কিনা – এই প্রশ্নটা ওঠা উচিত নয় কি?

ঘটনা হল, তথাকথিত নাগরিক আন্দোলনের হুঁশিয়ারি এর চেয়ে বেশি জোরদার হয় না। সেকথা সরকারও জানে। সেই কারণেই কোনো রাজনৈতিক দলের সভা, সমাবেশ, মিছিল হলে যত পুলিস মজুত করা হয় তা এই ধরনের আন্দোলনের জন্য করা হয় না। ২০ অগাস্ট মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ বাতিলের পর সমর্থকরা যে প্রতিবাদী জমায়েতের ডাক দিয়েছিলেন, সেটাও অ-দলীয় কিন্তু রাজনৈতিক জমায়েত। অথচ তার প্রতি সরকারের অবিশ্বাস অনেক বেশি ছিল। তাই জমায়েতের ঘোষিত জায়গা (যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন) পর্যন্ত কাউকে যেতেই দেওয়া হয়নি। উপরন্তু কেবল পুলিস নয়, ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসে র‍্যাফ পর্যন্ত নামানো হয়। লাঠিও চালানো হয়।

যা-ই হোক, ১৪ অগাস্টের কর্মসূচি অন্তত একটা ব্যাপারে সফল। সরকার ভেবেছিল ওইদিন ওই প্রতিবাদ হতে দিলে পরদিন থেকে প্রতিবাদ থিতিয়ে যাবে। কিন্তু তা ঘটেনি। ফলে এখন দেখা যাচ্ছে সরকার বলছে, সাধারণ মানুষের আন্দোলনে বিরোধীরা ঢুকে পড়ে সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। মৃতার জন্যে ন্যায়বিচার আদায় করা নয়, এর উদ্দেশ্য সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। যেহেতু বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী, পরে বামেরাও, মমতার পদত্যাগের দাবি তুলেছেন, সেহেতু একথা আরও বেশি করে বলা হচ্ছে। এতে তৃণমূল আপত্তি করতেই পারে, শঙ্কিতও হতে পারে। কিন্তু তৃণমূলের স্বার্থ যাঁদের স্বার্থ নয়, তাঁরা আপত্তি করবেন কেন? অথচ করছেন। এখানেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির জটিলতা, দ্বিধা।

একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে মিল বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গের

লক্ষণীয় যে ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে একাধিক ভয়ানক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং পার্ক স্ট্রিট থেকে হাঁসখালি – প্রায় কোথাও মুখ্যমন্ত্রী ধর্ষিতাকে নিয়ে কুমন্তব্য করে ব্যাপারটাকে লঘু করে দিতে ছাড়েননি। তবু বিরোধীরা তাঁর পদত্যাগ দাবি করেনি। তুলনায় এবারে মুখ্যমন্ত্রী অনেক সংযত। প্রথমদিনই বলে দিয়েছিলেন যে মৃতার বাবা-মা চাইলে সিবিআই তদন্তে তাঁর আপত্তি নেই। তাহলে এবার বিরোধীরা পদত্যাগ চাইছেন কেন? কারণটা সহজবোধ্য। মুখ্যমন্ত্রীর কাজের চেয়ে তো আর কথার গুরুত্ব বেশি নয়। এবারের ঘটনায় যুক্ত দুটো দফতরই মুখ্যমন্ত্রীর নিজের হাতে এবং তারা নিজেদের কাজে বিস্তর গাফিলতি করেছে তা ঘটনার দিন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। পরবর্তীকালে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও সেই মতই ব্যক্ত করেছেন। এ রাজ্যে এমনিতে তৃণমূলের রাজনৈতিক বিরোধীরা ছাড়া প্রায় সকলেই যে কোনো দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতির ঘটনায় বলেন – দোষীরা তৃণমূলের লোক হলেও মুখ্যমন্ত্রীর দোষ নেই। সাধারণ ভোটাররাও সাধারণত তাই মনে করেন। হাজারো কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও একের পর এক নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের বড় কারণ মমতার এই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। রাজ্যের সবচেয়ে গরিব মানুষ, যিনি হয়ত স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ, তাঁরও বিশ্বাস ‘দিদির পার্টির ছেলেগুলো বদমাইশ। দিদি কী করবে?’ কিন্তু আর জি করের ঘটনায় এরকম বলার কোনো উপায় নেই।

শিক্ষা দুর্নীতিতে সব দোষই শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি এবং আমলাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া গিয়েছিল। গরু পাচার, কয়লা পাচার ইত্যাদি মামলায় তো অভিযুক্ত বা গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সংযোগ আবিষ্কার করার প্রশ্নই নেই। অনুব্রত মণ্ডল তৃণমূল নেতা বলেই যে মমতা তাঁর থেকে টাকা পান – এমন কথা ইডিও বলেনি। সারদা কেলেঙ্কারিতে দু-একবার মুখ্যমন্ত্রীর নাম এলেও তা গুজবের বেশি এগোয়নি। নারদ কেলেঙ্কারির অভিযুক্তদের সম্পর্কেও মমতা বলতে পেরেছিলেন ‘আগে জানলে ভোটে দাঁড় করাতাম না’। কিন্তু তাঁরই অধীন দুটো দফতর একযোগে খুনের ঘটনায় অবহেলা করল, তিনি কিছুই জানলেন না। উপরন্তু আর জি করের কুখ্যাত অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করলেন সর্বসমক্ষে, তারপর পদত্যাগের কয়েক ঘন্টার মধ্যে তাঁকে অন্য হাসপাতালের অধ্যক্ষ করে দিল তাঁরই দফতর। আদালতের ধমক খেয়ে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হল। এত কিছু মুখ্যমন্ত্রীর অগোচরে হয়েছে – একথা চরম মমতাভক্তও কি বিশ্বাস করবে? ২২ তারিখই সুপ্রিম কোর্টে আর জি কর মামলার দ্বিতীয় শুনানিতে সিবিআই অভিযোগ করেছে – অপরাধের অকুস্থলের অবস্থার পরিবর্তন করা হয়েছে মামলা তাদের হাতে যাওয়ার আগেই। প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় দেখিয়ে দিয়েছেন যে রাজ্য সরকারের জমা দেওয়া টাইমলাইনে অপরাধীকে শাস্তি দিতে তাদের একনিষ্ঠতা নয়, অনীহাই প্রমাণ হয়।

আইনকানুনের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। আইনজীবী কপিল সিব্বাল এহেন আচরণের ব্যাখ্যা দিতে খাবি খেয়েছেন। তাই বিচারপতি পরবর্তী শুনানিতে কলকাতা পুলিসের একজন দায়িত্বশীল অফিসারকে উপস্থিত থাকতে বলেছেন, যাঁর কাছে এই অসঙ্গতির সন্তোষজনক উত্তর আছে।

এমতাবস্থায় বিরোধীরা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? যাঁরা বনলতা সেনগিরি অন্যায় মনে করেন না তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলা যাক, মমতা নিজে বিরোধী নেত্রী থাকার সময়ে একাধিকবার মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন।

উপরের ছবির তারিখগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, ২০০৬ সালে বামফ্রন্ট ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৩৫ আসন জিতে আসার পরেও ওই দাবি করেছেন। অর্থাৎ তখন কিন্তু বামফ্রন্টের জনপ্রিয়তা নিয়ে অন্তত সংসদীয় পথে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ ছিল না। তবু। সত্যি কথা বলতে, অন্যায় কিছু করেননি। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজই হল সরকারের পান থেকে চুন খসলে ক্ষেপে ওঠা। কাজটা মমতা চমৎকার পারতেন। বাম দলগুলো আজ পারে না, জাতীয় স্তরে কংগ্রেসও এই সেদিন পর্যন্ত পারত না। মমতার অবশ্য একটা সুবিধা ছিল। ২০১১ সালের আগের সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ মমতাকে ‘আন্দোলনের সুবিধা তুলতে দেওয়া হবে না’ বলত না। সরকারের সমালোচনা করে মমতা রাজ্যের বদনাম করছেন – এই জাতীয় কথা সিপিএম নেতাদের মুখে শোনা গেলেও, নাগরিক সমাজের লোকেরা কখনো বলতেন না। ইতিহাস তো সকলেরই থাকে। মমতারও আছে। তিনি তৃণমূল দল খোলার আগে দীর্ঘকাল কংগ্রেসে ছিলেন। কংগ্রেস আমলে পশ্চিমবঙ্গে যেসব অত্যাচার, অনাচার হয়েছে সেগুলোর দায়ও তাঁর ঘাড়ে চাপা উচিত তাহলে। কারণ তিনি কোনোদিন বলেননি যে তিনি সেসবের জন্যে লজ্জিত। উপরন্তু তিনি পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের স্নেহভাজনও ছিলেন। এতৎসত্ত্বেও মমতাকে কংগ্রেসের কুকীর্তি মনে করিয়ে দিয়ে চুপ থাকতে বলত না কেউ। কারণ সেটা অপ্রাসঙ্গিক। কে আগে ক্ষমতায় থাকার সময়ে কী করেছিল, তার জন্যে তার পরবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার নেই, আন্দোলন করার অধিকার নেই – একথা যারা বলে তারা আসলে স্থিতাবস্থার সমর্থক। কোনো দল বা জোট সরকারে থাকাকালীন কুকর্ম করলে তার শাস্তি হিসাবে ভোটাররা তাদের ক্ষমতাচ্যুত করে অন্য কাউকে ক্ষমতায় আনেন। তাদের শাসন অপছন্দ হলে আবার তাদেরও তাড়ান – এভাবেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলে। ভোটারদের বিশ্বাস অর্জন করতে বিরোধী দলগুলোকে অনবরত লড়াই করে যেতে হয়, সরকার পক্ষের ভুলের ফায়দা তোলার চেষ্টা করতে হয়। এই কাঠামোর বাইরেও একজন বা কয়েকজন নাগরিক অথবা কোনো সংগঠন নির্দিষ্ট দাবি বা দাবিসমূহ নিয়ে আন্দোলন করতেই পারে। কিন্তু কোনো আন্দোলনে অমুককে ঢুকতে দেব না, তমুককে থাকতে দেব না বলাও যে অগণতান্ত্রিক এবং এক ধরনের বামনাই – তা মনুবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ব্যক্তিরাও উপলব্ধি করছেন না।

আরও পড়ুন সব ধর্ষণ সমান নয়

আন্দোলনে একমাত্র তাকেই ঢুকতে দেব না বলা সঙ্গত, যার বিরুদ্ধে আন্দোলন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এই মুহূর্তে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ যে তথাকথিত অরাজনৈতিক আন্দোলনগুলো করছেন, সেগুলো যে কার বিরুদ্ধে তা প্রায়শই বোঝা যাচ্ছে না। অনেক সময় আন্দোলনকারীরা নিজেরাই জোরের সঙ্গে বলছেন – কারোর বিরুদ্ধে নয়। ২২ তারিখ রাত দখল আন্দোলনের আহ্বায়ক বলে পরিচিত রিমঝিম সিনহা ২৫ অগাস্ট (রবিবার) রাতে ফের টর্চ জ্বেলে, বেগুনি পতাকা নিয়ে এক আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। সেই ডাক দেওয়ার ভিডিওতেও এই আন্দোলন কার বিরুদ্ধে তা বলা হয়নি, যদিও বলা হয়েছে ‘আজ ২২ অগাস্ট, প্রায় ১২ দিন কেটে গেল, সুবিচার আসেনি। আর জি করের ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলকে গ্রেফতার করাও হয়নি।’ আন্দোলনের এক বিখ্যাত মুখ, অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত ২৩ অগাস্ট (শুক্রবার) তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছেন ‘একজনকে থামালে হাজার হাজার গলা আরও জোরে চিৎকার করবে’। এই শিরোনাম দেখে ভাবলাম যে থামাচ্ছে তার বিরুদ্ধে শেষমেশ বোধহয় দুকথা লিখেছেন। কিন্তু পড়তে গিয়ে হতাশ হলাম। উনি বরং লিখেছেন ‘আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব রাজনৈতিক বোধ রয়েছে। সেটা দিয়ে, আর নিজেদের সুবুদ্ধি দিয়ে আমরা ‘অ্যাপলিটিক্যাল’ শব্দটি ব্যবহার করছি। এটার মানে কিন্তু এই নয় যে, আমাদের কোনও পক্ষ নিতে হবে। আমাদের কেন কোনও পক্ষ নিতে হবে? আমাদের নিজের কণ্ঠস্বরই আমাদের পক্ষ।’

ন্যায়বিচার চাই বলছি, কিন্তু কার কাছে চাই বলছি না – এর কারণ কী? দুটো কারণ সম্ভব। ১) কার কাছে ন্যায়বিচার চাইছি নিজেও জানি না, ২) জানি, কিন্তু বলতে চাইছি না। কারণ বললেই বোঝা যাবে যে সে ন্যায়বিচার দিচ্ছে না। এই সত্য তাকে বিপদে ফেলবে। কিন্তু আমি কোনো কারণে তাকে বিপদে ফেলতে চাই না।

সমাজের উচ্চকোটির যথেষ্ট লেখাপড়া জানা নারী (এবং পুরুষরা) যেহেতু এই নাগরিক আন্দোলনের মুখ, সেহেতু প্রথম সম্ভাবনাটা বাতিল করে দেওয়াই শ্রেয়। সোহিনী তাঁর লেখার উপর্যুক্ত অংশের পরেই একটা বাচ্চা মেয়ের উল্লেখ করে লিখেছেন সে-ও হাতে মোমবাতি নিয়ে চিৎকার করতে করতে ন্যায়বিচার দাবি করেছে। তারপর মন্তব্য করেছেন ‘সে রাজনীতির কী বোঝে?’ প্রশ্ন হল, সে ন্যায়বিচারেরই বা কী বোঝে? তাকে বড়রা কিছু একটা বুঝিয়েই তো নিয়ে এসেছিলেন প্রতিবাদে? তা আর জি কর কাণ্ড যেভাবে গড়িয়েছে গত কয়েক দিনে, তাতে ওই বাচ্চা মেয়ের বড়রা নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে যথাসময়ে এফআইআর না করে, মৃতার বাবা-মাকে বিভ্রান্ত করে, এমনকি তড়িঘড়ি মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে বার করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রাজ্যের সরকারই। কথাটা অনেকে বুঝে গেছেন বলেই শতাব্দী, রিমঝিম, সোহিনীরা ঢোঁক গিললেও ১৪ তারিখ রাতেই এবং তারপর থেকে কোনো কোনো নাগরিক মিছিলেও সরাসরি সরকারবিরোধী স্লোগান শোনা গেছে। তাহলে এবার দ্বিতীয় সম্ভাবনার আলোচনায় আসা যাক।

কী কারণে তৃণমূল সরকারকে বিপদে ফেলতে চাই না? এটাই বাংলার রাজনীতির সেই দ্বিধা, যার কথা এই লেখার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছিলাম। এই রাজ্যে বহু মানুষ আছেন যাঁরা আন্তরিকভাবে বিজেপি-আরএসএসের বিরোধী, আবার এও বোঝেন যে তৃণমূল সরকার বিস্তর অন্যায় করে চলেছে। কিন্তু মনে করেন সিপিএম/বামফ্রন্টকে আর ভোট দেওয়া চলে না (এরকম মনে হওয়ার জন্যে বাম নেতৃত্বের দিশাহীনতা, সাংগঠনিক ব্যর্থতা এবং বিজেপিবিরোধিতায় সিদ্ধান্তহীনতা যথেষ্ট পরিমাণে দায়ী)। অতএব বিজেপিকে আটকাতে তৃণমূলকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে।

এই মনোভাবকে প্রশ্ন করার সময় এসে গেছে। নিঃসন্দেহে বিজেপি-আরএসএস যে কোনো রাজ্যের পক্ষেই ধ্বংসাত্মক শক্তি। কিন্তু তৃণমূল যে ধ্বংসাত্মক নয় – একথা কি আর বলা চলে? স্রেফ উল্টোদিকে আরও খারাপ একটা শক্তি আছে – এই যুক্তিতে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশেও শেখ হাসিনার দলের দমনপীড়ন, এমনকি নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা মেনে নিয়েও তাঁকেই বহুকাল ধরে সমর্থন করছিলেন প্রগতিশীলরা। কিন্তু মানুষের সহ্যের সীমা থাকে। চৈনিক চক্রান্তই বলুন আর মার্কিন চক্রান্তই বলুন – একটা দল কোনো ভূখণ্ডে বারবার ভোটই হতে দেবে না, সেই ভূখণ্ডের মানুষ তা কতবার কোন কোন যুক্তিতে মেনে নেবেন? পুলিস, অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনী এবং শাসক দলের গুন্ডাদের গুলিতে প্রাণ গেলেও মানুষ অন্যদিকে মৌলবাদীরা আছে বলে মুখ বুজে থাকবে – এ জিনিস তো চিরকাল চলে না। স্বীকার্য যে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা, লোকসভায় ভোটদানে যে হিংসা, কারচুপি হয় তা এ আমলে নতুন নয়। মমতা ভোটকে হাসিনার মত প্রহসনে পরিণত করেছেন বলা যাবে না। কিন্তু ক্রমশ সেদিকেই এগোচ্ছেন বললে নেহাত ভুল বলা হবে কি?

পরপর দুটো পঞ্চায়েত নির্বাচন কিন্তু প্রহসনেই পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন শাসক দলের প্রার্থীরা। ভোটের দিন রক্তারক্তি দেখতে অভ্যস্ত এই রাজ্যের মানুষও মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার সময়েই অত মারামারি, মহিলাদের শাড়ি খুলে নেওয়া ইত্যাদি দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন না। ২০২৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি এমন আসনের সংখ্যা নেমে আসে ৯.৫ শতাংশে। কিন্তু তা যত না শাসকের বদান্যতায়, তার চেয়ে বেশি বিরোধীদের লড়াকু মনোভাবের কারণে। মনোনয়ন জমা দেওয়ায় অত্যন্ত কম সময় দিয়ে, জমা দিতে আসা প্রার্থীদের নিরাপত্তা দিতে না পেরে ভোটের আগেই শিরোনামে চলে আসেন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহা। তবে আসল খেলা হল ভোট গণনার সময়ে। হিংসা তো হলই, জয়ী প্রার্থীকে আমলারা সার্টিফিকেট দেননি এমন অভিযোগ উঠল। মাঠে ঘাটে ব্যালট ও ব্যালট বাক্স পড়ে থাকতে দেখা গেল, প্রচুর মামলা হল এবং আদালতের নির্দেশে বহু আমলার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ল।

সিবিআই আর ইডি যে অসংখ্য দুর্নীতির মামলায় তৃণমূলের বিভিন্ন নেতা, মন্ত্রীকে গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সেগুলো থমকে গেছে। ঠিক যেভাবে সারদা ও নারদ মামলার কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। তার মানে এই নয় যে তৃণমূল দুর্নীতিমুক্ত। একথা তৃণমূলকে ফ্যাসাদে ফেলতে না চাওয়া মানুষও জানেন। আজ এখানে বাড়ি ভেঙে পড়ছে, কাল ওখানে বাজি তৈরির কারখানায় বিস্ফোরণ হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে সেখানে বোমা তৈরি হত, পরশু তৃণমূলের কাউন্সিলররাই প্রকাশ্যে মারামারি করছেন, তার পরদিন কোনো সমাজবিরোধী গ্রেফতার হওয়ায় প্রবীণ বিধায়ক আর সাংসদ (মদন মিত্র, সৌগত রায়) ফোনে খুনের হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করছেন – এসব তো এ রাজ্যে চলছিলই। আর জি কর কাণ্ডে দেখা গেল সরকারি হেফাজতে সরকারি কর্মচারীর জান, মালের সুরক্ষাও নেই। সেটা শুধু ধর্ষণ, খুনে প্রমাণিত হয়নি; ১৪ অগাস্ট রাতে হাসপাতালে যে তাণ্ডব চলেছে তাতেও প্রমাণিত হয়েছে। সেদিন ডিউটিতে থাকা নার্সরা জানিয়েছেন, পুলিস তাঁদের নিরাপত্তা দিতে তো ব্যর্থ বটেই, নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও তাঁদের কাছেই হাত পেতেছিল। বিজেপি এসে যেতে পারে – স্রেফ এই যুক্তিতে এই চরম নৈরাজ্য দেখেও কি তৃণমূলকে যেনতেনপ্রকারেণ সুরক্ষা দেওয়া চলে? রাজ্যের সব মানুষেরই ভাবার সময় এসেছে।

ভোট তো এখনো অনেক দূরে। ইতিমধ্যে তৃণমূল শুধরেও তো যেতে পারে, যদি টের পায় মানুষ তাদের কর্মকাণ্ডে খুশি নন। কিন্তু প্রাণপণে তাদের অন্যায় ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করলে তো দমনপীড়ন বেড়েই চলবে। ঠিক যা এই মুহূর্তে ঘটছে। ফুটবল মাঠে সমর্থকরা কিছু টিফো দেখাবেন – এই আশঙ্কায় একটা নিরীহ ফুটবল ম্যাচ বাতিল করে দিয়ে আরও বড় প্রতিবাদের রাস্তা খুলে দেওয়া হল। তারপর সেই প্রতিবাদও আটকাতে নিরস্ত্র ফুটবলপ্রেমীদের উপরে লাঠি চালানো হল। এখন স্কুলগুলোকে পর্যন্ত সরকার আদেশ দিচ্ছে – সরকারি অনুষ্ঠান ছাড়া কোনোকিছুতে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে যাওয়া চলবে না।

গণতন্ত্রের চেয়ে একনায়কতন্ত্রের সঙ্গেই যে এই আচরণের মিল বেশি, তা নাগরিক সমাজ স্বীকার না করলে নিজেদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই বলে কোন মুখে?

দলহীন প্রতিবাদ সংঘ পরিবারের পক্ষে সুবিধাজনক

সব কথার পরেও রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কে একটা অরাজনৈতিক আপত্তি উঠবেই। তা হল, দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়া কিছু দেখে না। অতএব প্রতিবাদকে তাদের হাতে চলে যেতে দেওয়া যায় না। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত কোন রাজনৈতিক দলের স্বার্থ কী তার বিচার করে। যেমন বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম – সকলেরই রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষমতায় আসা। বিরোধীদের ক্ষমতায় আসতে চাওয়া যে পাপ নয়, একথাটা ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের এবং ২০১৪ সালের পর থেকে গোটা দেশের মানুষকে বলে বোঝাতে হয়। সে না হয় হল। কিন্তু এরপরেও বিচার করা দরকার, ক্ষমতায় এলে কে কী করতে পারে? সিপিএম আর কংগ্রেস (একলা বা জোটে) কী করতে পারে তা বোধহয় তারা নিজেরাও ভেবে দেখেনি। সেই কারণেই তাদের ভোট দেওয়ার কথা কেউ ভাবতে পারে না। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় এলে কী করবে তা নিয়ে বুদ্ধি বিসর্জন না দেওয়া মানুষের সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কার্যকলাপ দেখে যদি যথেষ্ট শিক্ষা না হয়ে থাকে, তাহলে বিজেপিশাসিত গুজরাট, মণিপুর, ত্রিপুরা, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, আসাম – যে রাজ্য ইচ্ছা হয় দেখে নিন। তাহলেই বিজেপির হাতে প্রতিবাদ চলে যাওয়ার বিপদের সঙ্গে অন্যদের হাতে চলে যাওয়ার ফলের তফাত স্পষ্ট হবে। কিন্তু এসব রাজনৈতিক বিচারে আবার নাগরিক সমাজের লোকেরা যেতে চান না। রাজনৈতিক স্বার্থ তাঁদের কাছে প্রায় অপশব্দ। অনেক মানুষের কাছেই তাই হয়ে দাঁড়ানোর পিছনে রাজনৈতিক দলগুলোর যে কোনো দায় নেই তা নয়। কিন্তু যাঁরা দলগুলোর ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়ের জন্য, রাজ্যের ভালর জন্য দাঁড়িয়েছেন বলে দাবি করেন, তাঁদের কি কোনো স্বার্থ নেই? সেটাও একটু পরখ করে নেওয়া ভাল।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জন্যে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ বলে এক প্রচারাভিযানে নেমেছিল বাংলার নাগরিক সমাজ। বাম কর্মী, সমর্থকরা রুষ্ট হয়েছিলেন। তাঁরা মনে করেছিলেন, এটা ঘুরিয়ে নাক দেখানোর মত করে তৃণমূলকে ভোট দিতে বলা। এই প্রচারাভিযানে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তৃণমূলের থেকে টাকাপয়সা নেওয়ার ভিত্তিহীন অভিযোগও তুলেছিলেন। তবে পরে বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে এবং ২০২৪ সালে দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রে ওই প্রচারাভিযানের অন্যতম মুখ সায়রা শাহ হালিমকে সিপিএম প্রার্থী করে। কিন্তু ঘটনা হল, ওই প্রচারাভিযানের উদ্যোগীদের একজন – সামিরুল ইসলাম – পরে তৃণমূলের হয়ে রাজ্যসভায় চলে গেছেন।

‘নো ভোট টু বিজেপি’-কে জনপ্রিয় করতে জরুরি ভূমিকা নিয়েছিল একখানা মিউজিক ভিডিও। সেখানে দেখা গিয়েছিল বাংলা থিয়েটার ও সিনেমা জগতের একগুচ্ছ তারকাকে। সেখানে যেমন সব্যসাচী চক্রবর্তী, চন্দন সেন, রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত মার্কামারা সিপিএম ছিলেন; তেমন ছিলেন দলহীন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। তিনি সেইসময় বিজেপির বিরুদ্ধে কাগজে লেখালিখিও করেছিলেন। ২০২১ নির্বাচনের কিছুদিন পরেই দেখা গেল, তিনি দেউচা পাঁচামিতে কয়লাখনি হওয়া নিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরকারের সমন্বয় সাধনের জন্য তৈরি এক রাজ্য সরকারি কমিটির প্রধান নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি কয়লার কী জানেন, খনির কী জানেন, আদিবাসীদেরই বা কী জানেন – তা কি নিজেও জানেন? ২০২৩ সালে এসে এক সাক্ষাৎকারে পরমব্রত জানান যে তিনি ওই কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন, ‘সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে।’ কারণ তাঁকে যে কাজ দেওয়া হয়েছিল সে কাজ নাকি শেষ হয়ে গেছে। কী কাজ, সে কাজ করতে গিয়ে কী পাওয়া গেল – এই ধরনের কমিটি সম্পর্কে এসব প্রশ্ন ভারতবর্ষে কোনোদিনই কেউ তোলে না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অন্তত দুজনকে চিনি, যাঁরা ‘নো ভোট টু বিজেপি’-র লোকেদের তৃণমূল সরকারের থেকে এরকম সুবিধা গ্রহণ করা দেখে বিতৃষ্ণায় ২০২৪ নির্বাচনের আগে আর এই ধরনের কোনো উদ্যোগে জড়িত হতে চাননি। নিশ্চিতভাবে এমন মানুষ আরও আছেন। সম্ভবত সে কারণেই এবারে আর ওই ক্যাম্পেনকে অন্তত ওই নামে দেখা যায়নি। কথা হল, দলের ঊর্ধ্বে দণ্ডায়মানরা যদি এমনভাবে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করেন, তাহলে দলগুলোর দোষ কী? তারা তো তবু কোনো একটা সমষ্টির স্বার্থ চরিতার্থ করতে চায়।

দলগুলোর সততা নেই, বিশেষত কাজে আর কথায় মিল নেই, তাই তাদের বিশ্বাস করা যায় না – এই বয়ান বাংলার নাগরিক সমাজে খুব জনপ্রিয়। কথাটা যে পুরোপুরি মিথ্যে তাও নয়। দলগুলোও সেকথা জানে। গত কয়েক বছরে বামেদের দলের পতাকা বাদ দিয়ে মিছিল, মিটিংয়ের ডাক দেওয়ার অভ্যাস হয়ত তারই স্বীকৃতি। সিপিএমের লোকেদের সংগঠিত মিছিল, রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম স্বয়ং হাঁটছেন, অথচ বলা হচ্ছে নাগরিক মিছিল – এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। এমন ব্যানারবিহীন দলীয় অভিযানের সাম্প্রতিকতম উদ্যোগ অবশ্য দক্ষিণপন্থীদের – মঙ্গলবারের নবান্ন অভিযান, যার ডাক দিয়েছিল ‘বাংলার ছাত্রসমাজ’। সে এমন ছাত্রসমাজ যে তাতে সহজেই যুক্ত হয়ে যান ব্যারাকপুরের অর্জুন সিং, সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেন লম্বা সাদা দাড়িওলা এক সাধু। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে অস্বীকার করে বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠতে চান যে বিদ্রোহীরা, তাঁদের সততার উদাহরণগুলোও যে নিদারুণ।

যেমন ধরুন দামিনী বেণী বসু। কয়েক মাস আগেই তাঁর একটা লেখা নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। টিনের তলোয়ার নাটকে ধর্ষণে অভিযুক্ত অভিনেতা সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়কে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার প্রতিবাদ করে নির্দেশক সুমন মুখোপাধ্যায়কে সোশাল মিডিয়ায় খোলা চিঠি লিখেছিলেন দামিনী। তা নিয়ে একটা ওয়েবসাইটে খবর হয়, পরে সে খবর সরিয়ে দেওয়া হয়। দামিনী দাবি করেন যে সুমনের অঙ্গুলিহেলনেই ওই লেখা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে অন্য এক সাইটে লেখেন। সে লেখায় অন্য অনেক কথার সঙ্গে দামিনী লেখেন, বাংলা থিয়েটারে ‘রেপ-কালচার’ চালু আছে। সুমন দামিনীর সেই লেখার লিখিত উত্তরও দেন। বলা বাহুল্য, দামিনী মিথ্যা অভিযোগ করেছিলেন এমন প্রমাণ যখন নেই, তখন বেশ করেছিলেন। কিন্তু মুশকিল হয়েছে ওই কথায় আর কাজে মিল নিয়ে। গত সপ্তাহে কলকাতার এক বিলাসবহুল হোটেলে বিতরণ করা হয়েছে দেবী অ্যাওয়ার্ডস ২০২৪। অতীতে এই পুরস্কার যাঁরা প্রত্যাখ্যান করেছেন তাঁদের মধ্যে আছেন তামিলনাড়ুর দলিত কবি সুকীর্তা রানি। গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার কারণ হিসাবে তিনি ফেসবুকে লেখেন ‘আমি সবে গতকাল জানতে পেরেছি যে এই অনুষ্ঠানের প্রধান স্পনসর হল আদানি গ্রুপ। আমি এমন কোনো সংগঠনের হাত থেকে বা এমন কোনো অনুষ্ঠানে পুরস্কার নিয়ে খুশি হব না, যা আদানির আর্থিক সাহায্যপ্রাপ্ত। কারণ সেটা আমি যে রাজনীতির কথা বলি বা যে আদর্শে বিশ্বাস করি তার পরিপন্থী। তাই আমি এই পুরস্কার গ্রহণ করব না।’

লিঙ্গ রাজনীতি, আদর্শ ইত্যাদি সম্পর্কে দামিনীকে অত্যন্ত সচেতন একজন শিল্পী হিসাবেই আমরা চিনেছি। এবছর ওই পুরস্কারপ্রাপ্ত ১৩ জন মহিলার মধ্যে একজন সেই দামিনী। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছেন কে? বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানি। বিজেপি ভারতের একমাত্র রাজনৈতিক দল যাদের নেতারা ধর্ষকের সমর্থনে মিছিল করে; যাদের সরকার ধর্ষণে শাস্তিপ্রাপ্তদের কেবল ক্ষমা করে দেয় না, মালা পরিয়ে, মিষ্টি খাইয়ে বরণ করে নেয়; রাতের অন্ধকারে পুলিস পাঠিয়ে ধর্ষিতার পরিবারকে আটকে রেখে দেহ ছিনিয়ে নিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সেই দলের নেত্রীর হাত থেকে হাসিমুখে পুরস্কার নিয়েই দামিনী ক্ষান্ত দেননি। আর জি কর কাণ্ড নিয়েও দুকথা বলে দিয়েছেন সুললিত ইংরিজিতে। হরিবংশ রাই বচ্চন রচিত ‘অগ্নিপথ’ কবিতার লাইন আউড়ে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে লড়ার শপথ-টপথ নিয়েছেন, সেই শপথে গলা মেলানোর জন্য মাইকটা স্মৃতির দিকে এগিয়েও দিয়েছেন।

পুরস্কৃতদের মধ্যে ছিলেন টালিগঞ্জের অভিনেত্রী শুভশ্রী গাঙ্গুলিও। তিনিও পুরস্কার গ্রহণ করে বলেন ‘আমি সম্মানিত এবং কৃতজ্ঞ। কিন্তু সেই কথাতেই ফিরে আসতে হচ্ছে। খুশি নই। আমরা সবাই ভেঙে পড়েছি। আজকে এই পুরস্কার পেয়ে আমি নিশ্চয়ই খুশি, কিন্তু আনন্দ করতে পারছি না।’ শুভশ্রীকে এই পুরস্কার নেওয়ার কয়েকদিন পরে আর জি কর কাণ্ডে ন্যায়বিচার চেয়ে সিনেমা পাড়ার শিল্পীদের মিছিলেও হাঁটতে দেখা গেছে।

একই অঙ্গে এত রূপ দেখে সন্দেহ হয় – এঁদের প্রতিবাদ, আন্দোলনের পিছনেও আসলে নিজের যশলোভ। ওটা নিশ্চিত করতেই কখনো ক্ষমতাসীন তৃণমূলের দোষ নিয়ে চুপ করে থাকা, কখনো বিজেপি নেত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দেওয়া। রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে খুব চালু কথা – তাঁরা জনতাকে ভুলিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেন। ১৪ তারিখ রাতে যে মহিলারা রাত দখলের ডাক পেয়ে পথে বেরিয়েছিলেন বা এখন শিল্পীদের মিছিল দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন, তাঁদেরও কি তথাকথিত নাগরিক সমাজের এই নেতৃস্থানীয়রা ভোলাচ্ছেন না? নেতাদের নিদেনপক্ষে ভোট চাইতে আসতে হয়, তাই খানিকটা দায়বদ্ধতা থাকে। নাগরিক সমাজের নেতাদের তো সে চিন্তাও নেই। একটা রাজ্যসভার আসন অথবা সরকারি কমিটির সদস্যপদ, নিদেন কাগজে লেখা বা নাম বেরনো, খবরের চ্যানেলের প্যানেলে গিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে পারলেই কাজ হাসিল। তার চেয়ে মহত্তর কোনো ন্যায়বিচার কি সত্যিই তাঁরা চান?

একবিংশ শতকে পৃথিবীর বহু দেশেই অবশ্য এরকম দলবিহীন নাগরিক সমাজের আন্দোলন দেখা যাচ্ছে। অনেকে এই প্রবণতা নিয়ে খুব উৎসাহিত। তাঁরা বলেন এটাই নতুন যুগের রাজনীতি। যুগে যুগে রাজনীতি যে বদলায় সেকথা তো ঠিকই। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের রাজনীতি কিন্তু কোথাও প্রগতিশীলদের জয়যুক্ত করেনি। ‘অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ কিছু অর্জন করতে পারেনি। তাহরীর স্কোয়ার থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্তও কোনো নতুন ভোর নিয়ে আসেনি। বাংলাদেশে কদিন আগে হওয়া বিদ্রোহের পরিণামও যে প্রগতিশীল হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সেদেশের বামপন্থী, প্রগতিশীল শক্তির বেশকিছু অপছন্দের ঘটনাও ঘটছে মুহাম্মদ ইউনুসের সরকারের আমলে। উপরন্তু আমাদের দেশে দলবিহীন, পতাকাবিহীন ‘ইন্ডিয়া আগেনস্ট করাপশন’ এবং নির্ভয়া কাণ্ডের পরবর্তী আন্দোলনের পরিণাম হয়েছে ভয়াবহ। হিন্দুত্ববাদীদের ক্ষমতায় আনতে বড় ভূমিকা পালন করেছিল ওই দুটো আন্দোলন। কারণ বোধহয় এই, যে যেখানে কোনো পতাকা নেই সেখানে সংঘ পরিবারের লোকেরা সামাজিক সংগঠন করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে খুব সহজেই সেঁধিয়ে যেতে পারে। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে নাগরিক সমাজের স্বয়ংক্রিয় আন্দোলনকে জয় বলে ভেবে নেওয়া বিপজ্জনক। এতে বেয়াদপ শাসককে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে কিনা তা যেমন ভাবার, তেমনই বিজেপিকে আটকানো হচ্ছে মনে করে বিজেপির রাস্তাই পরিষ্কার করা হচ্ছে কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার।

২০১৪ সালে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই প্রথম কোনো অ-বিজেপি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে এত বড় গণআন্দোলন হচ্ছে। কেন পশ্চিমবঙ্গেই এমন হল? যে প্রতিবাদীরা একাধারে ফ্যাসিবিরোধী এবং তৃণমূলের কোনো দোষ দেখতে পান না, তাঁরা কি ভেবে দেখবেন?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

গিলি গিলি গে: মোদী ম্যাজিক বলতে যা বোঝায়

মোদী ম্যাজিক কথাটা তো সেই ২০১৪ সাল থেকে শুনে আসছেন। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, ম্যাজিকটা ঠিক কী? এমনিতে বাঙালি পি সি সরকারের জাত। হাত-পা বেঁধে গালা দিয়ে সিল করা প্যাকিং বাক্সে পুরে সমুদ্রে ফেলে দিলেও সাঁতরে পাড়ে এসে ওঠা, লোকের চোখে সামনে আস্ত ট্রেন বা তাজমহল ভ্যানিশ করে দেওয়াই যে ম্যাজিকের সর্বোচ্চ স্তর তা আমরা ছোটবেলা থেকে জানি। ফলে জাত জাদুকর চিনতে আমাদের ভুল হয় না। পি সি সরকার জুনিয়র যে দলের প্রার্থী হয়েছিলেন একদা, সেই দলের সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা নরেন্দ্র মোদীর ম্যাজিকগুলো এইবেলা চিনে নেওয়া আমাদের কর্তব্য। কারণ প্রথম দু দফা ভোটদানের পরে অনেক বিশ্লেষক বলছেন ২০১৪ আর ২০১৯ সালের মত মোদী ম্যাজিক নাকি হচ্ছে না। এঁদের বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে ৪ জুন মোদী চারশো পার করে ফেলতেই পারেন। তখন এঁরা কী বলবেন? আমরা বরং একটু এগিয়ে থাকার চেষ্টা করি। ইন্দ্রজাল কেমন করে হয় তা তো শুধু জাদুকর জানেন। আমাদের সাধ্য কী বুঝে ফেলি? আমরা কেবল জাদুকর মঞ্চের উপরে যা যা করেন সেগুলো চিহ্নিত করতে পারি। সেটাই করা যাক।

ছিল নির্বাচন কমিশন, হল ঠুঁটো জগন্নাথ

এবারের ভোটে সোজা পথে জেতা সহজ হবে না আন্দাজ করে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বেছে নেওয়ার কমিটিতে দেশের প্রধান বিচারপতির বদলে একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে রাখার আইন পাস করা হয়েছে। তারপর সেই আইন অনুযায়ী এমন লোকেদের বেছে নেওয়া হয়েছে যাঁরা মোদীর গত রবিবারের ঘৃণাভাষণ নিয়ে মন্তব্য করতেও ভয় পান। সতেরো হাজার নাগরিক স্বাক্ষরিত চিঠি বা মোদীর মন্তব্য নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সমালোচনাও নির্বাচন কমিশনের মুখ খোলাতে পারেনি। এর জন্যে নির্বাচন কমিশনারদের আবার রামভক্ত বলে বসবেন না। তাঁরা কুম্ভকর্ণের ভক্ত। তবে চক্ষুলজ্জা বলে তো একটা জিনিস আছে। তাই তাঁরা নিরপেক্ষতা দেখাতে রাহুল গান্ধী আর মোদী – দুজনের বক্তব্যেই আপত্তি জানিয়ে দুই ব্যক্তিকে নয়, তাঁদের পার্টিকে নোটিস পাঠিয়েছেন। অভূতপূর্ব ঘটনা, অর্থাৎ ম্যাজিক।

প্রার্থী ভ্যানিশ

যে কোনো বড় ঐন্দ্রজালিকের মত মোদীর ঝুলিতে আরও অনেক তাস আছে। তাঁর খাসতালুক গুজরাটের সুরাটে যাতে এই গরমে ভোটারদের ভোট দিতে বেরোতে না হয় তার ব্যবস্থা করে ফেলেছে দল। কংগ্রেস প্রার্থী নীলেশ কুম্ভানির প্রস্তাবকদের সই নিয়ে সন্দেহ আছে বলে অভিযোগ করেছিল বিজেপি। রিটার্নিং অফিসার সৌরভ পাড়হি সেই অভিযোগে সায় দেন। বলেন প্রস্তাবকরা নাকি হলফনামা জমা দিয়ে জানিয়েছেন যে ওগুলো তাঁদের সই নয়। কংগ্রেস অভিযোগ করেছে সেই প্রস্তাবকদের অপহরণ করা হয়েছিল, যাতে প্রার্থী তাঁদের সশরীরে রিটার্নিং অফিসারের সামনে হাজির করতে না পারেন। ঘটনা এইটুকু হলেও না হয় কথা ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের বিকল্প প্রার্থী সুরেশ পাড়সালার মনোনয়নও বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। শুধু কি তাই? সুরাট কেন্দ্রের নির্দল প্রার্থীরাও কোনো অজ্ঞাত কারণে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন। ফলে বিজেপি প্রার্থী মুকেশ দালাল ইতিমধ্যেই হাসি হাসি মুখে রিটার্নিং অফিসারের হাত থেকে জয়ীর শংসাপত্র নিয়ে ছবি তুলে ফেলেছেন। এদিকে কুম্ভানি নিজেও সোমবারের পর উধাও। কংগ্রেসের কেউ কেউ মনে করছেন উনি কয়েকদিনের মধ্যেই বিজেপিতে যোগ দেবেন। গুজরাট প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি তাঁকে ছ বছরের জন্য দল থেকে বহিষ্কারও করেছে বিজেপির সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ করে।

এর আগেই আমেদাবাদ পূর্ব আসনের কংগ্রেস প্রার্থী রোহন গুপ্তা নাম ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পর বাবার অসুস্থতার দোহাই দিয়ে ভোটে দাঁড়াবেন না বলেন, তারপর দলত্যাগ করেন। আগামী কয়েক দফার নির্বাচনে আরও কত আসনে এরকম ঘটবে কে বলতে পারে?

এক পার্টি থেকে দুই, দুই থেকে চার

কংগ্রেস মোদীর ঘৃণাভাষণ এবং সুরাটের ঘটনার প্রতিবাদ করে নির্বাচন কমিশনে লম্বা চিঠি দিয়ে এসেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কী করবে? অনেক আগেই মহারাষ্ট্রের দুই শক্তিশালী দল শিবসেনা আর এনসিপিকে ভেঙে দিয়েছে মোদীর বিকাশ। তারপর বিজেপির সঙ্গে চলে যাওয়া অংশকেই আসল দল তকমা দিয়ে তাদেরই দলীয় প্রতীক ব্যবহারের ক্ষমতা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। মোদী সাত্ত্বিক মানুষ, মদ্যপান করেন না। তাই দীপ জ্বেলে যাই ছবির অনিল চ্যাটার্জির মত জলের বোতল হাতে নিয়ে গাইতেই পারেন ‘এমন বন্ধু আর কে আছে?’

লোকাল ট্রেনে দশ টাকায় দশখানা কলম বিক্রি করা হকারদের দেখেছেন তো? তাঁরা একটা করে কলম বার করেন আর এমন বিশদে তার গুণাবলী বর্ণনা করেন যে মনে হয় এটাই শেষ কলম। তারপর বলেন ‘এখানেই শেষ নয়…’। মোদীর চারশো পারের ম্যাজিকও সেইরকম।

যেমন সিপিএম অভিযোগ করেছে, ত্রিপুরা পশ্চিম কেন্দ্রের সরকারি নথিই বলছে কোথাও কোথাও ১০০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে।

নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র…

এখানেই শেষ নয়। আছে ইভিএম। মোদীভক্তদের কথা আলাদা। তার বাইরে যাঁরা কাল অবধিও ইভিএমে কারচুপি আছে শুনলেই বিরোধীদের ছিঁচকাঁদুনে বলতেন, তাঁরাও এখন ব্যাপারটাকে নেহাত ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব বলে উড়িয়ে দিতে পারছেন না। কারণ নির্বাচন কমিশন ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই যা করে, তাকে বাংলায় বহুকাল ধরে বলা হয় ‘ঠাকুরঘরে কে রে? আমি তো কলা খাইনি’।

নির্বাচনী বন্ড নিয়ে যাঁরা মামলা করেছিলেন তাঁদের অন্যতম, অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রাইটস (এডিআর), এবং আরও অনেকে মিলে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ইভিএম নিয়ে। ইভিএম বাতিল করার দাবি করা হয়নি। দাবি ছিল ইভিএমের ভোট যে ভোটারের মতই প্রতিফলিত করছে তা নিশ্চিত করতে সমস্ত ভোটার ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেল (ভিভিপ্যাট) স্লিপ গোনা হোক। নির্বাচন কমিশন সেটুকুও এড়াতে মরিয়া। ভিভিপ্যাট গোনার জন্যে নয়, গুনতে গেলে পাঁচদিন লেগে যাবে ইত্যাদি অদ্ভুত যুক্তি দেওয়া হয়েছিল কমিশনের পক্ষ থেকে। কোনো প্রযুক্তিগত গোলমাল যে নেই তাও কেবল মুখের কথায় বিশ্বাস করতে হবে – এরকমই দাবি নির্বাচন কমিশনের। শুনানি চলাকালীনই কেরালার কসরগোড় থেকে খবর আসে যে মক পোলে বিজেপির প্রতীকে একটা করে অতিরিক্ত ভোট চলে যাচ্ছে কিছু ইভিএমে। বিচারপতি সঞ্জীব খান্না ও বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের বেঞ্চ কমিশনকে খতিয়ে দেখতে বলে। কমিশন বলে দেয় খবরটাই নাকি মিথ্যে।

আরও পড়ুন এক যে ছিল সংসদ

মজার কথা, নির্বাচন কমিশনের যে চার বিশেষজ্ঞের দল আছে ইভিএম-ভিভিপ্যাট ব্যবস্থা সুরক্ষিত আছে কিনা তা দেখার জন্য, তার সদস্যরা নিজেরাই ভিভিপ্যাট নির্মাণ করেছেন। দ্য নিউজ মিনিট ওয়েবসাইটের এই তাক লাগানো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গত সোমবার। মানে আপনার বানানো মেশিন যে ঠিক কাজ করছে তার সার্টিফিকেট দিচ্ছেন আপনিই। এরকম একটা ব্যবস্থায় চলছে গোটা দেশের লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন। কখনো কোনো বাইরের লোককে পরীক্ষা করে দেখতে দেওয়া হয়নি এই ব্যবস্থায় কোনো গলদ আছে কিনা। কিন্তু শেষমেশ বিচারপতিরা রায় দিয়েছেন, সমস্ত ভিভিপ্যাট স্লিপ গোনার কোনো দরকার নেই। তবে যে কম্পিউটার থেকে ইভিএমে পার্টিগুলোর প্রতীক ঢোকানো হয়, সেগুলোকেও ইভিএম আর ভিভিপ্যাট মেশিনের সঙ্গে ফল ঘোষণার ৪৫ দিন পর পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে। পরাজিত প্রার্থীরা ৫% ইভিএম যাচাই করতে চাইতে পারবেন স্বখরচায়।

বিচারপতি খান্না আর বিচারপতি দত্ত এই রায় দিতে গিয়ে বলেছেন, সবসময় অন্ধভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অবিশ্বাস করলে অপ্রীতিকর সন্দেহ তৈরি হতে পারে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি। এতদিন জানতাম বিশ্বাস অন্ধ হয়। বিচারপতিদ্বয় আমাদের শেখালেন, অবিশ্বাসও অন্ধ হয়।

ট্রেন ভ্যানিশ

এখানেও শেষ নয়। অভিযোগ উঠেছে যে আসামের প্রবাসী শ্রমিকরা (যাঁদের বড় অংশ মুসলমান) যাতে ভোট দিতে আসতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যে আসামগামী ছটা ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।

জাদুকর মোদী যখন ঝুলি থেকে এত পায়রা, খরগোশ ইত্যাদি বার করতে পারেন তখন তাঁর চারশো পার করা কি নিশ্চিত?

মোটেই না। গত কয়েক বছর ধরে যেভাবে বিরোধী মতের রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, ছাত্রনেতা এবং সাংবাদিকদের কারারুদ্ধ করা হচ্ছে; গত কয়েক মাসে যেভাবে বিরোধী দলের মুখ্যমন্ত্রীদেরও জেলে পোরা হয়েছে; গত কয়েক দিন ধরে মোদী যেভাবে কংগ্রেসকেও মাওবাদী বলে দেগে দিচ্ছেন তাঁর বক্তৃতায় এবং তাঁর ডান হাত শাহ যেভাবে বলেছেন এবার ক্ষমতায় এলে দুবছরের মধ্যে ভারতে মাওবাদ শেষ করে দেওয়া হবে, তার সঙ্গে অনেকটা মিলে যায় ১৯৩৩ সালে জার্মানির ফেডারেল ইলেকশনের আগে নাজি সরকারের কার্যকলাপ। অত কাণ্ড করেও কিন্তু তারা সেবার নির্বাচনে একা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। জার্মান ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (ডিএনভিপি) মদত দরকার হয়েছিল। সেই দলকে অনতিবিলম্বেই গিলে নেয় অ্যাডলফ হিটলারের দল এবং প্রতিষ্ঠিত হয় একনায়কতান্ত্রিক শাসন। মোদীর দলেরও জোটসঙ্গী আছে। ২০১৯ সালের চেয়ে কম, কারণ অনেকেই বিপদের আশঙ্কা করে কেটে পড়েছে। তবু আছে। তার বাইরেও আছে কিছু দল, যাদের দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে ভ্যানিশ করার জন্যে মোদীর হাতে আছে আয়কর বিভাগ, ইডি, সিবিআই। গত সোমবারই যেমন কলকাতা হাইকোর্টের এসএসসি মামলার রায়ে সিবিআই তদন্তের আওতায় চলে এসেছে মমতা ব্যানার্জির পুরো ক্যাবিনেট। অর্থাৎ এই রায়ে আর কিছু হোক না হোক, অন্তত লোকসভা ত্রিশঙ্কু হলে মোদীর তৃণমূলের সমর্থন আদায় করার ব্যবস্থা হয়ে রইল।

১৯৩৩ সালের পর জার্মানিতে আর বহুদলীয় নির্বাচন হয়নি দেড় দশক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাজি জার্মানির শোচনীয় পরাজয় না হলে আরও কতদিন হত না তা বলা কঠিন। সুতরাং যে ভারতীয় ভোট দেওয়ার অধিকারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, তিনি যে দলেরই সমর্থক হোন, এই নির্বাচনে তাঁর একটাই কাজ – আর পাঁচটা দলের সমর্থন নিয়েও মোদীর ক্ষমতায় ফিরতে না পারা নিশ্চিত করা। ম্যাজিক মঞ্চেই ভাল। কারণ সে ম্যাজিকে যারা ভ্যানিশ হয় তাদের জাদুকর আবার ফিরিয়ে আনেন। নাজিরা যাদের ভ্যানিশ করে দিয়েছিল তারা কিন্তু আর ফেরেনি। তাদের মধ্যে কেবল কমিউনিস্ট, সোশালিস্ট আর নাজিবিরোধী, ইহুদি আর সমকামীরা ছিল না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

আসল মোদী প্রকট হয়েছেন, এবার ভবিষ্যৎ বেছে নিন

রাকেশ শর্মা কেবল ভারতের একমাত্র মহাকাশচারীর নাম নয়। একই নামে একজন তথ্যচিত্র নির্মাতাও আছেন। তাঁর নির্মিত সবচেয়ে আলোচিত ও পুরস্কৃত তথ্যচিত্রের নাম ফাইনাল সলিউশন (২০০৪)। এই মুহূর্তে ইউটিউব অথবা ভাইমিও ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখে নেওয়া সম্ভব, তবে দুটো জায়গাতেই মোটামুটি আড়াই ঘন্টার ছবি রয়েছে। কিন্তু ২০০৪ লোকসভা নির্বাচনের কিছুদিন আগে রাকেশ শর্মার এক বাঙালি সহকারীর সৌজন্যে যাদবপুর এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই তথ্যচিত্রের দুটো প্রদর্শনী হয়েছিল। তাতে ঘন্টা চারেকের ছবি দেখেছিলাম আমরা অনেকে। দেখেছিলাম বলেই গত রবিবার রাজস্থানের বনসোয়াড়ায় নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতা শুনে একটুও অবাক হইনি। ‘মুসলমানদের বেশি বাচ্চা হয়’ বলা বা মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী বলা মোদীর পক্ষে অস্বাভাবিক তো নয়ই, নতুনও নয়। নতুন হল প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে নির্বাচনী প্রচারে বলা। ২০০২ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে মোদী এই ভাষাতেই কথা বলতেন বিজেপির সমাবেশে। বস্তুত আরও প্ররোচনামূলক, বর্বর ভাষায় কথা বলতেন। জানি না আড়াই ঘন্টার সম্পাদিত তথ্যচিত্রে তার কতটুকু দেখা যায়, তবে মনে হয় না রাকেশ খুব বেশি কাটছাঁট করেছিলেন। কারণ ছবিটাকে অটলবিহারী বাজপেয়ীর এনডিএ সরকারের আমলে অনুপম খেরের নেতৃত্বাধীন সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন (চালু লব্জে সেন্সর বোর্ড) প্রথমে ভারতে প্রদর্শনের অনুমতি দিতে চায়নি। কীভাবে রাকেশ সে ছবি সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তা নিজেই এক রোমাঞ্চকর কাহিনি। পরে মনমোহন সিংয়ের ইউপিএ সরকার ক্ষমতায় এলে সেন্সরের ছাড়পত্র পাওয়া গিয়েছিল। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে যখন মোদীর নতুন ভাবমূর্তি তৈরি করা হচ্ছিল, আজকের অনেক মোদীবিরোধীও লিখতে/বলতে শুরু করেছিলেন – এদেশে চণ্ডাশোক ধর্মাশোক হয়েছিলেন, মোদীও বদলে গেছেন; তখন রাকেশ তাঁর ছবি থেকে কেটে রাখা বেশকিছু ক্লিপ আলাদা করে প্রকাশ করেছিলেন। আগ্রহীরা সেগুলোও খুঁজে দেখতে পারেন।

এই ইতিহাস স্মরণ করানো এই কারণে, যে মোদীর বনসোয়াড়ার কুরুচিকর বক্তৃতা নিয়ে মোদীবিরোধীদের মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া খুব বেশি মাত্রায় দেখা যাচ্ছে। তা হল, প্রথম দফার নির্বাচনের পর মোদী বুঝেছেন যে হাওয়া ভাল নয়। ভোট আসছে না। চারশো পার দূরের কথা, দুশো পার হবে কিনা সন্দেহ। তাই ‘মোদী কি গ্যারান্টি’, ‘বিকাশ’ ইত্যাদি ছেড়ে দিয়ে চূড়ান্ত ধর্মীয় মেরুকরণের খেলা খেলেই ভোট কুড়োতে হবে। তাতে রক্তগঙ্গা বয়ে গেলেও কিছু যায় আসে না। এই ব্যাখ্যা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ হঠাৎ দেখা যাচ্ছে সুধীর চৌধুরীর মত গোদি মিডিয়ার তারকা মোদীর বনসোয়াড়ার বক্তৃতায় মনমোহনের বক্তব্যকে যে বিকৃত করা হয়েছে তা ঘোষণা করে অনুষ্ঠান করছেন।

আরেক গোদি তারকা রাহুল কাঁওয়াল অমিত শাহকে ‘ওয়াশিং মেশিন’ নিয়ে প্রশ্ন করার সাহস দেখিয়ে ফেলছেন।

আনন্দবাজার পত্রিকার ঈশানী দত্ত রায় আর দেবাশিস চৌধুরী তো অমিতকে সিএএ থেকে মণিপুর পর্যন্ত নানা বিষয়ে চোখা চোখা প্রশ্ন করে একেবারে ল্যাজেগোবরে করে দিয়েছেন। ২০১৪ সাল থেকে দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যম যেভাবে চলছে তার বিচারে এসব সাহস নয়, রীতিমত দুঃসাহস। শুধু তাই নয়। কদিন আগেও যেসব সেফোলজিস্ট (বাংলা কি ভোটজ্যোতিষী?) বিজেপি একাই ৩৫০-৩৮০ পেয়ে যাবে বলছিলেন জোর গলায়, তাঁরাও কেমন কিন্তু কিন্তু করছেন। অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়া সংস্থার কর্ণধার প্রদীপ গুপ্ত একটা ওয়েবসাইটকে বলেছেন ১৩টা গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে (মহারাষ্ট্র, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, গুজরাট, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিসগড়, হরিয়ানা, দিল্লি, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, গোয়া) এবং কিছু কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এনডিএ-র পক্ষে ২০১৯ সালের সমান আসন ধরে রাখা শক্ত। সেই খবরের লিঙ্ক অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়ার এক্স হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করা হয়, প্রদীপ নিজে তা রিপোস্টও করেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সেই পোস্ট ডিলিট করে দেওয়া হয়। তারপর প্রদীপের সংস্থার করা সমীক্ষা বলে কিছু কম্পিউটার প্রিন্ট আউটের ছবি ভাইরাল হয়, যেখানে দেখা যাচ্ছে এনডিএ আর ইন্ডিয়া প্রায় সমান ভোট পাবে এবং আসন সংখ্যাতেও খুব বেশি হেরফের হবে না। তা নিয়ে অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়া এফআইআর দায়ের করেছে। সংস্থার দাবি ওগুলো ভুয়ো, আদৌ তেমন কোনো সমীক্ষা করা হয়নি। তারা প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা করেই না, শুধু বুথফেরত সমীক্ষা করে। কিন্তু তাহলে প্রদীপ কিসের ভিত্তিতে বললেন, ১৩ রাজ্যে কী হবে? সে প্রশ্ন রয়েই গেল। ওদিকে সিভোটার সংস্থার কর্ণধার যশবন্ত দেশমুখ বলেছেন পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ুর মত রাজ্যে প্রথম দফায় এমন হয়ে থাকতেই পারে যে বিজেপির ভোটাররা অনেকে ভোট দিতে আসেননি। ভেবেছেন বিজেপির ওসব জায়গায় জেতার সম্ভাবনা নেই, তাই ভোট দিতে গিয়ে লাভ নেই।

এঁদের চেয়েও মানুষ কোন দিকে ঝুঁকছে তা ঢের ভাল বোঝে আরএসএস-বিজেপির সংগঠন। তাদের নয়নের মণি মোদী নিজেই ১৯ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটদানের পরে এক সমাবেশে ভোটারদের বলেছিলেন ভোট না দেওয়া ভাল নয়, ভোট দেওয়া নাগরিক কর্তব্য ইত্যাদি। অর্থাৎ তিনিও কম ভোট পড়া নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। সুতরাং এমন হতেই পারে যে তারই প্রভাবে ২০০২ সালের মোদীকে ভিতর থেকে বার করে এনেছেন। রবিবারের পরে সোমবারই যেভাবে উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ে ভোল বদলে ফেলে সৌদি আরবের যুবরাজের সঙ্গে কথা বলে ভারতীয় মুসলমানদের হজ করতে যাওয়ার কোটা কত বাড়িয়েছেন সেকথা ফলাও করে বলেছেন, তাতে আরও বেশি সন্দেহ হয় – মোদী বুঝতে পারছেন না এই নির্বাচনে জিততে গেলে কোনটা করলে বেশি ভাল হবে। মুসলমানদের যথাসম্ভব গালাগালি দিয়ে ২০০২ সালের মূর্তি ধরা, নাকি আপাতত হিন্দুত্বকে ঝুড়ি চাপা দিয়ে মুসলমানদের ভোটও যাতে পাওয়া যায় তা নিশ্চিত করা।

সবই সত্যি। কিন্তু এসব দেখে উল্লসিত হওয়া বোকামি হবে। কেবল এ জন্যে নয় যে এগুলো অনুমান মাত্র। এ জন্যেও যে রবিবারের মোদীই আসল মোদী এবং মোদীর জনপ্রিয়তা মূলত ওই মোদীরই জনপ্রিয়তা। গণতন্ত্রে মানুষের উপর বিশ্বাস রাখা ছাড়া যেমন কোনো উপায় নেই, তেমন বিনা প্রমাণে মানুষকে স্বর্গীয় জীব বলে ভেবে নেওয়ারও কোনো কারণ নেই। আপনার চারপাশের মানুষের মধ্যে গত এক যুগ বা তারও বেশি সময় ধরে যে সংখ্যালঘুবিদ্বেষ দেখেছেন তা হঠাৎ কমে গেছে – এমন কোনো লক্ষণ দেখছেন কি? যদি না দেখেন, তাহলে মোদীর মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার তাঁকে ভোটারদের কাছে আরও অপ্রিয় করবে এমন ভেবে নেওয়া অর্থহীন। মোদীর সাফল্যের রহস্যই হল, সংখ্যাগুরু মানুষ আগে যা নিজস্ব আড্ডায় চুপিচুপি বলাবলি করত তিনি তা প্রকাশ্যে বলা ফ্যাশনে পরিণত করেছেন। প্রথমে করেছিলেন গুজরাটে, ২০১৪ সালের পর ক্রমশ সারা ভারতে। একমাত্র কেরালা আর তামিলনাড়ুই এই সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন অনেকখানি প্রতিহত করতে পেরেছে। তাই সেখানে আজও বিজেপি রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক শক্তি। তামিলনাড়ুতে বিজেপির রাজ্য সভাপতিকে বলতে হয় তিনি রাজদীপ সরদেশাইয়ের সঙ্গে মুরগি খাবেন, আমিষ-নিরামিষ নিয়ে তাঁর বাছবিচার নেই। কেরালায় আবার এক বিজেপি প্রার্থী ২০১৭ সালে উপনির্বাচনের প্রচারে বলেছিলেন, জিতলে ভাল মানের গোমাংসের সরবরাহ নিশ্চিত করবেন। আগামী ৪ জুনও ওই রাজ্যগুলোর ছবি বদলানোর সম্ভাবনা কম। কিন্তু ভারতের আর কোনো অংশই সংঘের ঘৃণার রাজনীতির আওতার বাইরে নেই।

মুসলমানদের চারটে বউ আর চল্লিশটা বাচ্চা – একথা আমার, আপনার মামা কাকা পিসে জ্যাঠা মাসি পিসিরাই প্রবলভাবে বিশ্বাস করে আজকাল। অথচ জিজ্ঞেস করলে দেখা যায় এমন কোনো মুসলমানকে তাঁরা চেনেন না যার একাধিক স্ত্রী। অনেকে জীবনে কখনো কোনো মুসলমান মহিলা বা পুরুষের সঙ্গে আলাপই করেননি। অথচ মোদী এ বিশ্বাস তাঁদের মধ্যে গেঁথে দিতে পেরেছেন যে তেমন মুসলমান দেশের কোথাও না কোথাও আছে। বামপন্থী দলের কর্মী, সমর্থকদেরও কত সহজে সোশাল মিডিয়ায় ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সঙ্গে জোট ভেঙে গেলে বলতে দেখা যায় – মুসলমানদের কখনো বিশ্বাস করা উচিত নয়। মুসলমানরাই ভোটের দিন মারামারি করে, বিভিন্ন দলের হয়ে তারাই বোমা ছোড়ে – এসব বিজেপিবিরোধী ভোটাররাও ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েই বলেন। নিজে কানেই পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়ে শুনেছি একজন বলছেন, আমাদের এলাকায় মুসলমান নেই বলেই ভোটে অশান্তি হয় না, অনেকে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ছেন। গত পুজোতেই তো মুসলমান মানেই সন্ত্রাসবাদী – এমন বক্তব্যের একখানা বাংলা ছবি দিব্যি হিট হয়ে গেল।

এইসব প্রবণতাই ইংরেজ আমলের সমান বেকারত্ব আর আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধির যুগেও মোদীর রক্ষাকবচ। তিনি ভাল করেই জানেন, যখন আর কিছু কাজ করবে না তখনো মুসলমানদের সম্পর্কে ভয় দেখানো কাজে লাগবে। হিন্দু মহিলাদের গলার মঙ্গলসূত্রটা পর্যন্ত কংগ্রেস ছিনিয়ে নিয়ে তাদের দিয়ে দেবে যাদের বাচ্চা বেশি হয় – হয়ত আপনি আশা করছেন এ তত্ত্ব হিন্দি বলয়ে আর কাজে লাগবে না। হয়ত আপনি ঠিকই ভাবছেন। কারণ যে ন্যাড়া আগে বেলতলায় গেছে সে যাওয়া থামাবে অন্যদের আগে – এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হয়ত দেখলেন আপনার উচ্চশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ার মামাই বিশ্বাস করে ফেলেছেন কথাটা। কারণ তিনি সারাদিনে পড়ার মধ্যে পড়েন হোয়াটস্যাপ আর তাতে দশ বছর ধরে পড়ে চলেছেন যে গোপাল পাঁঠা ছিলেন বলে তিনি আছেন, প্রেরক আছেন, হাওড়া ব্রিজ আছে।

এঁরা আদিবাসী নন, দলিত নন, সংখ্যালঘু নন। এঁরা আশৈশব কল্যাণকামী ভারত রাষ্ট্রের সমস্ত সুযোগসুবিধা পেয়ে সরকারি স্কুল কলেজে পড়াশোনা করে মোটা মাইনের চাকরি বাগিয়েছেন। ভারতের গলতিওলা গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সুবাদে যা ইচ্ছে খেয়েছেন, যা ইচ্ছে পরেছেন, যেখানে ইচ্ছে বেড়িয়েছেন। তারপর মনমোহনী আমল থেকে ছেলেমেয়েদের শিখিয়েছেন – ‘বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে’, ‘গান্ধী, নেহরু মহা বদমাইশ’, ‘মুসলমানদের বিশ্বাস করতে নেই’, ‘ভাল ছেলেমেয়েরা সাইন্স পড়ে, সাইন্সে চান্স না পেলে আর্টস পড়তে হয়’, ‘ইতিহাস ফালতু সাবজেক্ট’ ইত্যাদি। এখন এঁরা ধেড়ে বয়সে এবং এঁদের সন্তানরা কচি বয়সে হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রছাত্রী। এখন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়া বিজ্ঞান ভুলে, স্কুলে মুখস্থ করে খাতায় উগরে দিয়ে ভুলে যাওয়া ইতিহাস আর নাক সিঁটকে এড়িয়ে যাওয়া রাষ্ট্রবিজ্ঞান টপাটপ শিখে ফেলছেন হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক থেকে। সেখান থেকেই শিখেছেন – হিন্দু ঘরে জন্মে এতদিন তাঁরা অত্যাচারিত, নিপীড়িত ছিলেন। মোদীর আমলে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারছেন। ভারতের অন্য সব রাজনৈতিক দলই মুসলমানদের তোষণ করে গেছে চিরকাল। অতএব বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির তৈরি করা বহুযুগের অন্যায়ের প্রতিশোধ। রামনবমীতে অস্ত্র মিছিল করা অন্যায় নয়। ক্রুদ্ধ রাম আর ক্রুদ্ধ হনুমান বাঙালির দেবতা।

আরও পড়ুন ওয়কীল হাসানের গণতন্ত্র, না মুকেশ আম্বানির ধনতন্ত্র?

এই বাঙালিরা এখনো রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ কপচান। নিজেদের ভারতের অন্য সব জাতির লোকেদের চেয়ে শিক্ষিত মনে করেন, কিন্তু হতে চান মাড়োয়ারিদের মত ধনী। হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয় এঁদের শিখিয়েছে যে সেটা হওয়ার পথে একমাত্র বাধা বাংলাদেশ থেকে আসা কাতারে কাতারে মুসলমান, যাদের মোদী বনসোয়াড়ায় বলেছেন ‘ঘুসপেটিয়া’। আপনি যতই এই বাঙালিদের দ্য হিন্দু কাগজের এই প্রতিবেদনের মত তথ্য দিয়ে বোঝান যে মুসলমানদের গাদা গাদা বাচ্চা হয় আর হিন্দুরা সব একটি-দুটিতে থেমে থাকে এমনটা ঘটনা নয়, বা কাতারে কাতারে মুসলমান বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়েছে এমনটাও নয়, এঁরা চোখ বন্ধ করে থাকবেন।

নিজেদের সুরক্ষিত অতীত আর আরামদায়ক বর্তমানে হেলান দিয়ে এঁরা ইদানীং হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্ন সফল করতে ভোট দেন, যাতে আমাদের এবং আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়। ইরান, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের মত ধর্মকেন্দ্রিক রাষ্ট্র যে খুব খারাপ তা এঁরা হোয়াটস্যাপ থেকে বিলক্ষণ শিখেছেন। কিন্তু হিন্দুরাষ্ট্র নিয়ে গদগদ হওয়ার বেলায় সেসব মনে থাকে না। এঁদের মধ্যে যাঁদের বয়স কম, হিন্দুরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে তাঁদের জন্যেও বেদনাদায়ক হবে। কিন্তু কালিদাসের উত্তরাধিকারী তো এদেশে কম নেই। এই বাঙালিদের মোদী বিলক্ষণ চেনেন আর এও জানেন যে এরকম মানুষ কেবল বাংলায় নয়, সারা ভারতে রয়েছে। তাঁর বনসোয়াড়ার ভাষণের লক্ষ্য তারাই।

অর্থাৎ এবারের ভোট কেবল আপনার সাংসদ বেছে নেওয়ার বা কোন দল সরকার চালাবে তা বেছে নেওয়ার ভোট নয়। ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ারও। উন্নয়ন ইত্যাদি ঢক্কানিনাদে এখন আর মোদীও সময় ব্যয় করছেন না। ‘মোদী কি গ্যারান্টি’ কথাটাও আর বলছেন না। এখন স্রেফ মুসলমানকে হিন্দুর শত্রু হিসাবে খাড়া করে, নিজের দলকে হিন্দুদের দল আর বিরোধী দলগুলোকে মুসলমানদের দল প্রতিপন্ন করেই ভোট চাইছেন। এবার আপনাকে বেছে নিতে হবে, আপনি সোশাল মিডিয়া থেকে গেলা বিষ পান করে আরও বিষ পান করার জন্যে ভোট দেবেন, না নিজের এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য ভোট দেবেন। এবার মোদীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে অনেক বিষাক্ত আপনজনের বিরুদ্ধে যেতে হবে। অথচ আপনজনদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হলে তাছাড়া উপায় নেই। কবি তো ভরসা দিয়েছেন ‘তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে/তা ব’লে ভাবনা করা চলবে না’।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

কাশ্মীর আর মণিপুরের হাল দেখে বাঙালির শিউরে ওঠা উচিত

“আসলে কাশ্মীর আর কাশ্মীরীদের নেই। সমস্ত বড় বড় কনট্র্যাক্ট দেওয়া হচ্ছে বহিরাগতদের। গুজরাট, হরিয়ানার মত জায়গার ব্যবসাদারদের। আমাদের লোকেদের ব্যবসাগুলো ওদের সঙ্গে টাকায় পেরে উঠবে না। ফলে তারা এখন বাইরের লোকেদের সাব-কনট্র্যাক্টর।”

দুজন রাজনীতিবিদ। দুজনেই নিজের রাজ্যের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ – একজন হিন্দু, একজন মুসলমান। একজন মণিপুরের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী, অন্যজন অধুনালুপ্ত জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের শেষ মুখ্যমন্ত্রী। প্রথমজন বিজেপির নংথমবাম বীরেন সিং, দ্বিতীয়জন জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বা পিডিপির মহবুবা মুফতি। এই দুজন অতি সম্প্রতি দুই মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে এমন দুটো সাক্ষাৎকার দিয়েছেন যা পাশাপাশি রেখে দেখলে শুধু মণিপুরি বা কাশ্মীরী নয়, বাঙালিদেরও শিউরে উঠতে হবে। বস্তুত, বাঙালিদেরই শিউরে ওঠার কথা। কাশ্মীরী আর মণিপুরিদের তো সর্বনাশের মাথায় বাড়ি পড়েই গেছে। তাঁদের আর নতুন করে শিউরে ওঠার কী আছে?

২ জুলাই (রবিবার) মহবুবার এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বর্ষীয়ান সাংবাদিক সঙ্কর্ষণ ঠাকুর। সেই সাক্ষাৎকারের প্রায় প্রত্যেকটা কথাই উদ্ধৃতিযোগ্য, কিন্তু আমাদের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ের দেওয়ার মত কথাটা হল “আমি পাটনায় বিরোধী নেতাদের [সাম্প্রতিক বৈঠকে] বলেছি, মণিপুরে যা ঘটছে সেটাই ভারতের ভবিষ্যৎ চেহারা এবং কেউ কিছু করে উঠতে পারবে না। মণিপুর আমাদের আয়না দেখাচ্ছে।”

গোটা সাক্ষাৎকারে একটাও আশাব্যঞ্জক বাক্য বলেননি মহবুবা। অবশ্য ২০১৯ সালের ৫ অগাস্টের পর কোনো কাশ্মীরীর মুখ থেকে আশার বাণী শোনার আশা করা মানে হয় আপনি কাশ্মীরের ঘটনাবলী সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, নয় মুখে দরদ দেখাচ্ছেন আর মনে মনে ভাবছেন “ভাল টাইট হয়েছে ব্যাটারা”। এই টাইট হওয়ার ব্যাপারটাই ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মানুষের, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মানুষের, ভাল করে বোঝা প্রয়োজন এবং বুঝতে গেলে বীরেনের সাক্ষাৎকারের কাছে যেতে হবে। প্রণয় ও রাধিকা রায়ের বিতাড়নের পর এনডিটিভিও যে রবীশ কুমার নামাঙ্কিত গোদি মিডিয়ার অংশ হয়ে গেছে তা সর্বজনবিদিত। সেই চ্যানেল সমেত অন্য অনেক চ্যানেলকেই বীরেন কেন ৩০ জুন (শুক্রবার) পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন এবং শেষপর্যন্ত করলেন না, তা নিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সর্বত্র প্রায় একই কথা বলেছেন, এখানে এনডিটিভির সাক্ষাৎকার নিয়েই আলোচনা করব।

পদত্যাগ করতে চাওয়ার কারণ হিসাবে যা জানিয়েছেন তাতে চমকে ওঠার মত কিছু নেই। লোকে যতক্ষণ তাঁর খড়ের পুতুল পোড়াচ্ছিল ততক্ষণ ঠিক ছিল। তা বলে মোদীজির কুশপুত্তলিকা দাহ করবে! অহো, কী দুঃসহ স্পর্ধা! ওই স্পর্ধা দেখে বীরেন আর স্থির থাকতে পারেননি। তিনি ব্যথিত হন এবং ভাবেন, লোকে যখন তাঁকে বিশ্বাসই করছে না, শ্রদ্ধাই করছে না, তখন চেয়ারে বসে থেকে কী হবে? এসব কথায় প্রশাসক হিসাবে বীরেনের যোগ্যতা বা অযোগ্যতা নয়, প্রকট হয় ফুয়রারের সেনাপতি হিসাবে তাঁর বিশ্বস্ততা। প্রায় ২৮ মিনিটের সাক্ষাৎকারে দেশের বাকি অংশের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল শেষ মিনিট আষ্টেক।

প্রায় দুমাস ধরে চলা মণিপুরের দাঙ্গা কেন, কোন ঘটনা থেকে শুরু হল তা দুনিয়াসুদ্ধ লোক জেনে গেছে বহু আগেই। প্রায় সমস্ত সংবাদমাধ্যম, এমনকি এই ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত হয়েছে, যে ঘটনার সূত্রপাত ৩ মে মণিপুরের সমস্ত উপজাতিদের এক সম্মিলিত পদযাত্রা থেকে। কী জন্যে আয়োজিত হয়েছিল সেই পদযাত্রা? মণিপুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় মেইতেইরা দাবি তুলেছে তাদের তফসিলি উপজাতি বলে ঘোষণা করতে হবে। ২০ এপ্রিল মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে বলে, এই দাবি দশ বছর ধরে ফেলে রাখা হয়েছে। কালবিলম্ব না করে যেন রাজ্য সরকার চার সপ্তাহের মধ্যে এ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকারকে তার সুপারিশ জানায়। আদালতের এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়াতেই ওই পদযাত্রা বেরোয় এবং দাঙ্গা শুরু হয়। মূল সংঘর্ষ যে মূলত উপত্যকায় বসবাসকারী মেইতেইদের সঙ্গে পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী কুকি এবং নাগাদের, সেকথাও কারোর অজানা নেই। কোনো রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং আর্থসামাজিকভাবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা সম্প্রদায় সংরক্ষণ দাবি করছে, এমনটা ২০১৪ সালের আগে বিশেষ দেখা যেত না। উপরন্তু মুখ্যমন্ত্রী বীরেন নিজে মেইতেই। এসব কারণেই যে মণিপুরের উপজাতিদের মধ্যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, তাও এখন সবার জানা। কিন্তু বীরেন এনডিটিভির সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে এই দুমাসব্যাপী দাঙ্গার এক সম্পূর্ণ নতুন কারণ নির্দেশ করেছেন। বলেছেন মেইতেইদের তফসিলি উপজাতি তালিকাভুক্ত করার আইনি নির্দেশ নাকি আদৌ এসবের কারণ নয়। তাঁর বক্তব্য “সরকার তো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে মেইতেইদের তফসিলি উপজাতি ঘোষণা করার সুপারিশ এখনো পাঠায়নি। তাহলে সেদিন পদযাত্রা বার করা হয়েছিল কিসের দাবিতে? যারা করেছিল তাদের জিজ্ঞাসা করুন।” তারপর নিজেই উত্তর দিয়েছেন এবং সেই উত্তরে আলোচনার অভিমুখই বদলে দিয়েছেন।

বলেছেন তাঁর সন্দেহ, এর পিছনে আসলে অনুপ্রবেশকারী এবং মাদক ব্যবসায়ীরা। বলেছেন মণিপুরের পার্বত্য এলাকায় নাকি জনবিন্যাসজনিত ভারসাম্য (“demographic balance”) নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মেইতেই এবং নাগা এলাকায় সব ঠিক আছে, কিন্তু কুকি এলাকায় নাকি জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, রাজ্যের মায়ানমার সীমান্তবর্তী তিন জেলায় নাকি গত কয়েক বছরে প্রায় ১,০০০ নতুন গ্রাম গড়ে উঠেছে। একথা জানতে পারার পর তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে ওই এলাকার মানুষের বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র পরীক্ষা করতে বলেন। সেই উদ্দেশ্যে ক্যাবিনেট সাব-কমিটি গড়া হয়। তাঁর সাফাই “সেই কমিটির চেয়ারম্যান করি লেপাও হাওকিপকে, যে নিজেই একজন কুকি। আমার যদি কুকিদের সম্পর্কে খারাপ মনোভাব থাকত, তাহলে এটা করতাম কি?” তিনি এও বলেন যে মণিপুরের কুকিরা তাঁর ভাই, তাদের নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু যারা বাইরে থেকে আসছে তাদের বরদাস্ত করা যায় না। তা সেই সাব-কমিটি নাকি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ২,১৭৪ জন অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে ফেলে। বীরেন ভারি নরম গলায় বলেন “আমি বললাম, এরা নিরীহ লোক। বিপদে পড়ে এখানে এসেছে, এদের উপযুক্ত পরিচয়পত্র দিয়ে শেল্টার হোম বানিয়ে রাখা হোক যাতে ভারতীয় নাগরিক না হতে পারে। মায়ানমারে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া যাবেখন। তা এসব করেছি বলে এই গণ্ডগোল করা হয়ে থাকতে পারে।” টানা দুমাস দাঙ্গা চলার পরে, বহু মানুষের মৃত্যুর পরে, বহু মানুষ ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেওয়ার পরেও রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসক সঠিক কারণ বলতে পারলেন না। হাওয়ায় কিছু অভিযোগ ভাসিয়ে দিলেন।

এরপরেই তিনি যোগ করলেন “তাছাড়া ২০১৯ সাল থেকে আমরা মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছি। তাতে দু হাজারের বেশি লোক গ্রেফতার হয়েছে জঙ্গলের এলাকা থেকে। তার মধ্যে একজন গ্রামপ্রধানও আছেন। সুতরাং এই সঙ্কট যারা আফিম চাষ করে সেই মাফিয়ারা আর যারা মায়ানমার থেকে অনুপ্রবেশে প্রশ্রয় দেয়, তারা মিলিতভাবে তৈরি করে থাকতে পারে।”

এই কয়েক মিনিটের কথায় জ্বলন্ত মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী কী কী করলেন একবার দেখে নেওয়া যাক:

১) গোটা অশান্তির দায় কুকিদের উপর চাপিয়ে দিলেন। মেইতেইদের কোনো দোষ নেই। অর্থাৎ একটা রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সুচতুরভাবে একটা সম্প্রদায়ের (তাঁর নিজের সম্প্রদায়) পক্ষ নিয়ে নিলেন।
২) কুকিদের মধ্যে অনেকেই আসলে অনুপ্রবেশকারী – এই সন্দেহ ছড়িয়ে দিলেন। অর্থাৎ কুকিদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলেন।
৩) কুকিরা পার্বত্য এলাকায়, অরণ্য এলাকায় গ্রামে গ্রামে আফিম চাষ করে। কুকি মানেই সন্দেহজনক, কুকি মানেই অপরাধী হতে পারে – এই ভাষ্য প্রচার করে দিলেন।

এই কায়দা কি নতুন? একেবারেই নয়। গোটা ভারতে মুসলমানদের সম্পর্কে ঠিক এই ভাষ্যই চালায় হিন্দুত্ববাদীরা। কুকির বদলে মুসলমান বসিয়ে নিন আর তৃতীয় ক্ষেত্রে পার্বত্য এলাকা, অরণ্য এলাকার বদলে মাদ্রাসা বসিয়ে নিন। আফিম চাষের বদলে সন্ত্রাসবাদী চাষ বসিয়ে নিন।

সুতরাং বীরেন যা বলেছেন তা বস্তুত বর্তমান ভারতে প্রচলিত সংখ্যাগুরুবাদী ভাষ্যের মণিপুরি রূপ। এবার আসা যাক, বাঙালিদের কেন সচকিত হওয়া উচিত সেই প্রসঙ্গে।

এই ভাষ্যের অসমিয়া রূপটা নিশ্চয়ই সকলের মনে আছে। সেখানে সংখ্যাগুরু অসমিয়ারা, আর জনবিন্যাসজনিত ভারসাম্য নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগ বাঙালিদের বিরুদ্ধে। অতএব ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার (এনআরসি)। সেই ব্যবস্থার প্রকোপে কত মানুষকে ডিটেনশন সেন্টারে কাটাতে হচ্ছে, কত মানুষের সেখানে মৃত্যু হয়েছে ইতিমধ্যেই, কতজন যে কোনো সময়ে অনুপ্রবেশকারী বলে অভিযুক্ত হওয়ার ভয়ে কাঁটা হয়ে আছেন – তার সঠিক সংখ্যা কারোর পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমরা শুধু একটা সংখ্যাই নির্দিষ্টভাবে জানি – ১৯ লক্ষ। ৩১ অগাস্ট ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত চূড়ান্ত এনআরসি থেকে বাদ পড়ে এতগুলো মানুষের নাম। বলা হয়, এঁরা ভারতের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেননি। এঁদের সম্পর্কেও বলা হয়েছিল বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। বাংলাদেশ সে কথায় আমল দেয়নি, মায়ানমারও দেবে না, পৃথিবীর কোনো দেশই দিত বলে মনে হয় না। এদিকে অসমিয়া সংখ্যাগুরুবাদীরা কিন্তু এনআরসি থেকে ‘মাত্র’ ১৯ লক্ষ মানুষ বাদ যাওয়ায় অখুশি। তারা আরও নিখুঁত (অর্থাৎ আরও বেশি মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার মত) এনআরসি চায়। কোনো মানুষকে বেআইনি বলাই যে অমানবিক, সে আলোচনায় না গিয়েও এনআরসি যে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়া তা বলাই যায়। নইলে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির পরিবারের সদস্যরা এ দেশের নাগরিক নয় – একথা এনআরসিতে প্রমাণিত হল কী করে?

নাগরিকত্বের ধারণাতেই যে মৌলিক গোলমাল আছে সে তর্কে এই আলোচনায় ঢুকব না, অন্য কথা বলি। এ দেশের নাগরিকদের হাতে একাধিক পরিচয়পত্র বহুকাল ধরে আছে। সেসবে এমনিতেই পাহাড়প্রমাণ ভুল থাকে যার জন্য নাগরিকরা নন, সরকারি ব্যবস্থা দায়ী। যে কোনোদিন দেশের যে কোনো মহকুমা আদালতে খানিকক্ষণ বসে থাকলেই দেখা যায় বহু মানুষ আসেন শুধু নাম এফিডেভিট করাবেন বলে। একেক নথিতে একেকরকম নাম ছাপা হয়েছে একেকরকম বানানে। সেইসব মানুষের অধিকাংশই হয় মুসলমান, নয় নিম্নবর্গীয় হিন্দু। কারণ পরিচয়পত্র তৈরির দায়িত্বে থাকা সরকারি আধিকারিকদের মধ্যে হিন্দু উচ্চবর্গীয়রা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাঁরা এঁদের নামগুলো জম্মে শোনেননি, শুনলেও বানান জানেন না। জেনে নেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেন না। তাই ভুলের বেশিরভাগটা মুসলমান ও হিন্দু নিম্নবর্গীয়দের কাগজপত্রেই হয়ে থাকে। বন্যা ইত্যাদি দুর্যোগে কাগজপত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা বাদই দিলাম। তা এই এনআরসি সারা দেশেই করার অভিপ্রায় ছিল কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের। উদ্দেশ্য স্পষ্ট – যেসব সম্প্রদায় হিন্দুরাষ্ট্রে অবাঞ্ছিত, তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া। যেহেতু হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে না এত কোটি মানুষ, তাই গণহত্যায় যদি না মরে তো থাকবে। কিন্তু শাসক সংখ্যাগুরুর অধীনস্থ প্রজা হিসাবে থাকবে। এত বড় দেশে ব্যাপারটা করা অসম্ভব, যদি না যাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে তাদের মধ্যেই সমর্থন তৈরি করা যায়। তাই ঝোলানো হয়েছিল নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নামক গাজর। ফলে এনআরসি বরাক উপত্যকার বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে সমর্থন পেয়ে গেল, পশ্চিমবঙ্গেও ১৯৪৭ বা ১৯৭১ সালের পর এপারে আসা বাঙালদের উত্তরপুরুষের এনআরসি সম্পর্কে মতামত হয়ে গেল “সরকার একটা ভাল জিনিস করলে বিরোধিতা করব কেন?” সঙ্গে মিশে থাকল পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারানোর গল্প শুনে বড় হওয়া মস্তিষ্কের প্রতিশোধস্পৃহা। বরাবরের পশ্চিমবঙ্গীয়দের তো কথাই নেই। তাঁরা নিশ্চিন্ত – “আমি যে ছিলাম এই গ্রামেতেই”। যাঁরা এরকম মানসিকতার নন, তাঁরাও ভাবলেন সিএএবিরোধী আন্দোলন করার প্রয়োজন মুসলমানদের। নাগরিকত্ব গেলে তো তাদের যাবে, হিন্দুরা তো এনআরসিতে জায়গা না পেলেও ফের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। মতুয়ারা রীতিমত আশান্বিত হলেন বহু প্রতীক্ষিত নাগরিকত্ব এইবার পাওয়া যাবে ভেবে। নাগরিকত্ব পেতে গেলে যেসব অলীক শর্ত পূরণ করার কথা আইনে বলা আছে সেদিকে খুব বেশি লোকের চোখই পড়ল না।

দেশজুড়ে পথে পথে আন্দোলন এবং কোভিড-১৯ নামক ভাইরাসের নিচে এনআরসি চাপা পড়ে গেল। সম্ভবত সেই কারণেই আন্দোলন বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকলেও সিএএ অনুযায়ী কাউকে নাগরিকত্ব দেওয়ার তাগিদ আর নরেন্দ্র মোদী সরকারের নেই। আসল উদ্দেশ্য তো অনেককে বাদ দেওয়া, কাউকে কাউকে যোগ করা নয়। যাঁরা ভেবেছিলেন আরএসএস-বিজেপি এনআরসির কথা ভুলে গেছে, তাঁদের বীরেনের কথা মন দিয়ে শোনা উচিত। তাঁর তৈরি ক্যাবিনেট সাব-কমিটি যা করছিল বলছেন, তা তো আসলে এনআরসির কাজই। কিছু মানুষকে অনাগরিক চিহ্নিত করে আলাদা জায়গায় রাখা। বীরেন খেলার মাঠের লোক ছিলেন বলে বোধহয় মনটা নরম, তাই ডিটেনশন সেন্টার না বলে শেল্টার হোম বলেছেন। লক্ষণীয় যে অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করা হয়েছে বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র দিয়ে, অর্থাৎ আধার কার্ড। এই জিনিসটি যে একেবারে ফালতু, সেকথা এখন নেহাত নিরক্ষর মানুষও জেনে গেছেন। আধার জাল করা অত্যন্ত সহজ, নিত্যই আধার জাল করে লোকের টাকাপয়সা মেরে দেওয়ার কাহিনি কাগজে, টিভিতে, ওয়েবসাইটে দেখা যায়। আর বায়োমেট্রিক? প্রায়শই শোনা যায় অমুকের আঙুলের ছাপ আর মিলছে না, তমুকের চোখের মণি মিলছে না। ফলে অমুক সরকারি প্রকল্পের টাকা তোলা যাচ্ছে না, রেশন তোলা যাচ্ছে না। এই গোলযোগে ঝাড়খণ্ডে লুখি মুর্মু নামে এক মহিলা অনাহারে মারা গেছেন বলেও অভিযোগ আছে। সেই আধার কার্ড দিয়ে নাগরিক চিনে নিচ্ছে বীরেনের সরকার।

তবে এনআরসির চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে গেছে তাঁর ক্যাবিনেট কমিটি। কারণ গোটা রাজ্যের মানুষের নাগরিকত্বের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে না, হচ্ছে শুধু সংখ্যালঘু কুকিদের। আগামীদিনে কি তাহলে এভাবেই অন্য নামে এনআরসি হবে সারা দেশে? যে যেখানে সংখ্যালঘু কেবল তাদেরই নাগরিকত্বের পরীক্ষায় বসানো হবে, যাতে আসামের এনআরসির চেয়ে অনেক সহজ, সুশৃঙ্খল হয় কাজটা, আরও বেছে বেছে অপছন্দের জনগোষ্ঠীর মানুষকে বাদ দেওয়া যায়? আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। যাঁরা জানেন না তাঁরা বলবেন, এ তো মেইতেই-নাগা জাতিগত রেষারেষির ব্যাপার। এর মধ্যে আরএসএস, হিন্দুত্ব, হিন্দুরাষ্ট্র আসছে কোথা থেকে? তাঁদের জন্য উল্লেখ থাক, মেইতেইরা প্রধানত হিন্দু। কুকিরা প্রধানত খ্রিস্টান। গত দুমাসে কয়েকশো গির্জা এবং মন্দির পোড়ানোর ঘটনা ঘটেছে মণিপুরে।

ভারতে তো আজকাল আর এসব পড়ে মানুষ হিসাবে খারাপ লাগে না অনেকের। ফলে শুধু সংখ্যালঘুদের জন্য এনআরসি করার আশঙ্কাতেও শিউরে উঠবেন না অনেকেই, যদি তিনি যেখানে আছেন সেখানকার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ হন। তাই মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, ভারতবর্ষ এমন এক সাড়ে বত্রিশ ভাজা যে এদেশে সকলেই কোথাও না কোথাও সংখ্যালঘু। মারোয়াড়ি বা গুজরাটি নিজের রাজ্যে ধর্মীয় এবং জাতিগতভাবে সংখ্যাগুরু; কর্মসূত্রে পশ্চিমবঙ্গে এসে জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু। বাঙালি হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় ও জাতিগতভাবে সংখ্যাগুরু; বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ বা দিল্লিতে জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু। বাঙালি মুসলমান হিন্দি বলয়ে গেলে আবার জাতিগত ও ধর্মীয় – দুভাবেই সংখ্যালঘু। দেড়শো কোটি ভারতীয়ের মধ্যে এমন কাউকে পাওয়া খুব শক্ত যে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত যেখানেই যাবে সেখানেই সবদিক থেকে সংখ্যাগুরুই থাকবে। অথচ করমণ্ডল এক্সপ্রেসের অসংরক্ষিত কামরায় যাত্রা করা দিনমজুর থেকে শুরু করে লোরেটো হাউসের প্রাক্তনী আই টি মজুর পর্যন্ত সকলকেই জীবিকার টানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যেতে হবে, সেখানে সংখ্যালঘু হয়ে থাকতে হবে। যতই ফড়ফড়িয়ে ইংরিজি বলুন আর গড়গড়িয়ে হিন্দি, নাম দেখে বাঙালি বলে ঠিক চিনে ফেলা যাবে। ফলে নিশ্চিন্ত থাকার উপায় কারোরই নেই।

এই কারণেই মহবুবা যা বলেছেন তা অভ্রান্ত। আসামে এনআরসি নাম দিয়ে বা মণিপুরে ক্যাবিনেট সাব-কমিটির নাম দিয়ে যা করা হচ্ছিল তা আসলে ভারতের প্রতিটি রাজ্যের জন্য সযত্নে আলাদাভাবে তৈরি একেকটা হিন্দুত্ববাদী মডেল (যদিও উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদকে উস্কে দিয়ে এনআরসির পথ করে দিয়েছিলেন কংগ্রেস নেতা রাজীব গান্ধী)। হিন্দুত্ববাদের লক্ষ্য অখণ্ড ভারত, কিন্তু আসলে যা করছে এবং এই কর্মপদ্ধতি একমাত্র যা করে উঠতে পারে, তা হল ভারতের বালকানায়ন (Balkanisation)। অর্থাৎ খণ্ড খণ্ড ভারত। যত এক দেশ, এক ভাষা, এক ধর্ম, এক পুলিস, এক নির্বাচন, এক দেওয়ানি বিধি ইত্যাদি ধারণা গোটা ভারতের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বাড়ছে, তার প্রতিক্রিয়ায় ভূমিপুত্রদের জন্য সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের মত রক্ষণশীল দাবিও বাড়ছে। দুই রাজ্যের পুলিসের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যাওয়ার মত ঘটনা ঘটছে। এভাবে চললে সব রাজ্যেই ‘ভিনরাজ্যের লোক হটাও’ অভিযান শুরু হবে। এর ট্রেলারও ইতিমধ্যেই কিছু কিছু জায়গায় দেখানো হয়ে গেছে। সোশাল মিডিয়ার যুগে কোনো রাজ্যকে এসব ইস্যুতে মণিপুর করে দেওয়া কয়েক মিনিটের ব্যাপার। সংরক্ষণের মত কোনো বড় ইস্যুর প্রয়োজনই পড়বে না।

আরো পড়ুন স্রেফ বলপ্রয়োগে মণিপুর সমস্যা আরো বাড়বে

তবে হিন্দুত্ববাদী মডেল যারা তৈরি করে তাদের আর যা-ই হোক, অবধানের এবং পরিশ্রমের খামতি নেই। একই মডেল যে সব রাজ্যে চলবে না তা তারা বিলক্ষণ জানে। তারা বোঝে যে কিছু রাজ্য আছে যেখানকার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে এভাবে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সরাসরি লড়িয়ে দেওয়া যাবে না। অন্য কৌশল দরকার হবে। আবার জম্মু ও কাশ্মীরের মত রাজ্যও ছিল, যেখানে হিন্দুত্বের সবচেয়ে বড় ঘোষিত শত্রু মুসলমানরাই সংখ্যাগুরু। সেক্ষেত্রে রাজ্যটাকেই ভেঙে দেওয়া দরকার। সে কাজ সম্পন্ন হয়েছে লোকসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে। কিন্তু আধিপত্য স্থায়ী করতে হলে দরকার রাজ্যটার চরিত্রই বদলে দেওয়া। জনবিন্যাসজনিত ভারসাম্য নষ্ট করার যে অভিযোগ কুকিদের বিরুদ্ধে বীরেন করেছেন, মহবুবা সঙ্কর্ষণকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন প্রায় সে জিনিসই ৫ অগাস্ট ২০১৯ তারিখের পর থেকে কাশ্মীরে করা হচ্ছে। “আসলে কাশ্মীর আর কাশ্মীরীদের নেই। সমস্ত বড় বড় কনট্র্যাক্ট দেওয়া হচ্ছে বহিরাগতদের। গুজরাট, হরিয়ানার মত জায়গার ব্যবসাদারদের। আমাদের লোকেদের ব্যবসাগুলো ওদের সঙ্গে টাকায় পেরে উঠবে না। ফলে তারা এখন বাইরের লোকেদের সাব-কনট্র্যাক্টর। বালি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের বিরাট আবিষ্কার লিথিয়াম – সবকিছু বাইরের লোকেদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। তাও দুর্নীতি করে,” বলেছেন জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।

তাহলে মোদ্দা কথা হল, যে রাজ্যের সংখ্যাগুরু (ধর্মীয় বা জাতিগত) হিন্দুত্বের পতাকা নিজেই তুলে নেবে না সে রাজ্যকে ভেঙে দেওয়া হবে। সেখানকার অর্থনীতির লাগাম তুলে দেওয়া হবে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী রাজ্যগুলোর ধনী ব্যবসায়ীদের হাতে। বদলানোর চেষ্টা হবে জনবিন্যাস। ফলে যারা ছিল সংখ্যাগুরু, তারা হয়ে যেতে পারে ভীত সন্ত্রস্ত সংখ্যালঘু। এ হল হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠার আরেকটা মডেল। পশ্চিমবঙ্গবাসীর শিউরে ওঠা উচিত, কারণ পশ্চিমবঙ্গে একইসঙ্গে মণিপুর মডেল এবং কাশ্মীর মডেল প্রয়োগ করা সম্ভব।

ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির একেকজন নেতা উত্তরবঙ্গকে আলাদা রাজ্য করা নিয়ে একেকরকম কথা বলে রেখেছেন। এমনকি কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশনের প্রধান জীবন সিং এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ বছর জানুয়ারি মাসে দাবি করেছিলেন, আলাদা কামতাপুর রাজ্যের দাবি নিয়ে নাকি কেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা চলছে। মধ্যস্থতা করছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। একথা সত্যি যে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো ভাবনাচিন্তা আছে বলে ঘোষণা করা হয়নি। তবে মনে রাখা ভাল, সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করা এবং জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য ভেঙে দেওয়ার ব্যাপারে আগের দিন সন্ধেবেলাও কিছু জানতেন না বলে দাবি করেছেন তৎকালীন রাজ্যপাল সত্যপাল মালিক। অবশ্য যিনি বলেন রাজভবনের ফ্যাক্স মেশিন খারাপ ছিল বলে মহবুবার সরকার গঠন করার দাবি জানতে পারেননি, তাঁকে বিশ্বাস করা চলে না। কিন্তু সঙ্কর্ষণের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মহবুবাও বলেছেন “হপ্তাখানেক ধরে গুজব শুনছিলাম…সেইজন্যেই আমি, ওমর আবদুল্লা এবং অন্যরা মিলে রাজ্যপালের কাছে যাই জানতে যে সত্যিই ৩৭০ রদ করা হবে কিনা। উনি আমাদের বলেন ‘আমি আপনাদের বলছি, সেরকম কিচ্ছু হবে না’। পরদিন সকালে কী হল সে তো জানেনই। আমাদের সন্দেহ হচ্ছিল বটে, কিন্তু যতক্ষণ না পরেরদিন আমাদের মাথায় বাজ পড়ার মত করে ব্যাপারটা ঘটল, আমরা বিশ্বাস করতে পারিনি।”

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির লাগাম এমনিতেই অনেকটা হিন্দিভাষীদের হাতে। রাজ্য ভাগ করলে বাঙালি হিন্দুরা উত্তরবঙ্গে নানা জাতি, উপজাতির মধ্যে হয়ে পড়বেন সংখ্যালঘু। কাশ্মীরী মুসলমানদের দুর্গতি দেখে ২০১৯ সালে যাঁরা উল্লসিত হয়েছিলেন তাঁরা সেদিন বিপুল অপরাধবোধে ভুগতে পারেন।

দক্ষিণবঙ্গে হিন্দিভাষী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালের পর জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সারা দেশের লোকসভা, বিধানসভার আসনগুলোর ভোটার পুনর্বিন্যাস করার কথা। গোটা বা ভাঙা দক্ষিণবঙ্গে এমন হতেই পারে যে বেশকিছু আসনে বাঙালিরা নয়, হিন্দিভাষীরাই হয়ে গেলেন নির্ণায়ক শক্তি। অথচ মণিপুরের মতই পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে, অনুপ্রবেশকারীতে ভরে যাচ্ছে – এ অভিযোগ বিজেপির বহুকালের (সংসদে এ অভিযোগ প্রথম তোলেন অবশ্য মমতা ব্যানার্জি)। বীরেন যেমন সংখ্যালঘু কুকিদের মায়ানমার থেকে আসা অনুপ্রবেশকারী বলে সন্দেহ ছড়াচ্ছেন, তেমনই বাঙালি মুসলমানরা আসলে বাংলাদেশি – এই সন্দেহ সারা ভারতে ইতিমধ্যেই ছড়ানো হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত তার ফল ভোগ করেছেন শুধুমাত্র ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। কিন্তু সোশাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই টের পাওয়া যায়, ধর্ম বা শ্রেণি নির্বিশেষে বাঙালি মাত্রেই যে বাংলাদেশি (হ্যাঁ, হিন্দু উচ্চবর্গীয়রাও। কারণ দেশভাগের ফলে বিপুল সংখ্যক বাঙালি হিন্দুর এ পারে চলে আসার কথা আই টি সেলের প্রত্যেকটি কর্মী জানে) – এই ধারণার প্রচার পুরোদমে চলছে। রাজ্য ভেঙে গেলে চাটুজ্জে, বাঁড়ুজ্জে, ঘোষ, বোসদেরও অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত হতে সময় লাগবে না।

আরও পড়ুন প্রজাতন্ত্রসাধনা

কাশ্মীরীরা আজ কেমন আছে জিজ্ঞেস করায় মহবুবা যা বলেছেন তা একেবারে জর্জ অরওয়েলের ডিস্টোপিক উপন্যাস নাইন্টিন এইট্টি ফোর মনে পড়ায়। “কাশ্মীরীরা প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যে বাস করছে। তারা ঘরের মধ্যেও মন খুলে কথা বলত পারে না, কারণ তারা ভীত, তাদের বেঁচে থাকার বোধটাকেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আমরা বন্দুক আর বুটের নিচে বাস করছি।” যেসব জনগোষ্ঠীকে হিন্দুত্ব নিজেদের শত্রু বলে মনে করে, তাদের কিন্তু এভাবেই রাখতে পছন্দ করে। কেবল বাঙালি মুসলমান নয়, বাঙালি হিন্দুরাও যে মোটেই আরএসএসের পছন্দের জনগোষ্ঠী নয় তার বহু প্রমাণ আছে, খামোকা এ লেখার কলেবর বাড়িয়ে লাভ নেই। কিছুই খুঁজে না পেলে পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রচারসভায় “ভারত মাতা কি জয়” স্লোগান খেয়াল করুন। নিদেন বাংলায় অনুবাদ করে নিয়ে “ভারতমাতার জয়” বলাও বিজেপি কর্মীদের না-পসন্দ।

কেউ অবশ্য বলতেই পারেন, পশ্চিমবঙ্গ অনেক বড় রাজ্য, বাঙালিরাও অনেক বড় জাতি। সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গবাসী হিন্দু তো বটে। সুতরাং মণিপুর, কাশ্মীর নিয়ে আমাদের ভাবার দরকার কী? অমন ব্যবহার আমাদের প্রতি আরএসএস-বিজেপি করতে যাবে কেন? বড় রাজ্য, বড় জাতিকে ছোট করে নেওয়ার কায়দা যে হিন্দুত্ববাদীদের জানা আছে তা তো আগেই ব্যাখ্যা করেছি। ফলে বিরাটাকার নিয়ে ভরসা করে বোধহয় লাভ নেই। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যবাসীর হিন্দুরাষ্ট্রের আদর্শ নাগরিক হয়ে ওঠার ক্ষমতার উপর হয়ত ভরসা রাখা যায়। যেভাবে চতুর্দিক হিন্দিভাষীতে ভরে যাওয়া নিয়ে নিচু গলায় অসন্তোষ প্রকাশ করতে করতে নিজের ছেলেমেয়েদের স্কুলের দ্বিতীয় ভাষা হিন্দি করে দিচ্ছেন কলকাতা ও শহরতলির ভদ্রলোকেরা, বাঙালি হিন্দুর বহুকালের উৎসব রথযাত্রার চেয়ে বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছেন গণেশপুজোয়, যেভাবে বারাণসীর ঢঙে কলকাতার ঘাটে গঙ্গারতি চালু করেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, দীঘাকে করে তুলছেন পুরীর মত তীর্থস্থান, শাসক দল রামনবমীর মিছিল করছে বিজেপির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, বজরংবলীর পুজো হচ্ছে ঘটা করে, বাংলা মেগাসিরিয়ালে বাজছে হিন্দি ছবির গান, বাংলা ছবির পোস্টার সারা ভারতে মুক্তির দোহাই দিয়ে লেখা হচ্ছে দেবনাগরী হরফে আর বাঘাযতীনের চেহারা হয়ে যাচ্ছে অক্ষয় কুমারের কেশরী ছবির পাঞ্জাবি যোদ্ধার মত – তাতে বিনাযুদ্ধে শুধু মেদিনীপুর নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গ হিন্দুরাষ্ট্রের সবচেয়ে লক্ষ্মীসোনা রাজ্য হয়ে গেলেও আশ্চর্য হওয়া যাবে না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

হিন্দুরাষ্ট্রের হিন্দু নাগরিকের পিঠ বাঁচানোর চিঠি

ওদের গুজরাটের মত, উত্তরপ্রদেশের মত শিক্ষা দেওয়া যাবে কী করে? সে আশাতেই তো বিরাট হিন্দু নেতাদের ভোট দেয়া। কিন্তু ওদের শিক্ষা দিতে দিতে আমাদের ছেলেপুলেগুলো অশিক্ষিত হয়ে যাবে না তো?

শুনুন ধর্মাবতার,

হিন্দুরাষ্ট্রের জন্মসূত্রে হিন্দু নাগরিক হিসাবে যা যা অপরাধ করে ফেলেছি সেসব স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে এই চিঠি লিখছি।

অ্যাঁ, কী বলছেন? ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র? আজ্ঞে হ্যাঁ, তা তো বটেই। সংবিধান নামে ওই যে মোটা বইটা আছে, যেটার নামে নেতা, মন্ত্রীরা শপথ নেন এবং ভুলেও মনে রাখেন না – সে বইতে ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলে লেখা আছে তো বটেই। স্কুল কলেজে পড়েছিলুম সেসব। এমনকি দরকারে পড়ে দেখব বলে আর ছেলেপুলেকে শেখাব বলে বাড়িতে এক কপি কিনেও রেখেছি। কিন্তু কথা হচ্ছে, বইতে তো কত কথাই লেখা থাকে। সব মেনে চললে তো বাঁচা যাবে না। যেমন ধরুন ‘সদা সত্য কথা বলিবে, মিথ্যা বলিলে পাপ হয়’। এরকম কথা ছোটবেলায় কত বইতে পড়েছি। তা বলে কি সবসময় সব জায়গায় সত্যি কথা বলে বেড়াই? সকলে সত্যবাদী যুধিষ্ঠির হয়ে গেলে আর আইন আদালত কোন কাজে লাগবে? কে সত্যি বলছে, কে মিথ্যে বলছে তার বিচার করতেই তো বিচারকরা আছেন। তা সংবিধানও একটা বই বৈ তো নয়। তার উপর আবার ইয়া মোটা। আজকাল তিন প্যারার বেশি ফেসবুক পোস্টই পড়ে ওঠা যায় না, অত মোটা বই কে পড়তে যাবে? ওসব জলাঞ্জলি দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ, নয় কি? হোয়াটস্যাপেই এঁটে যাবে – দয়া করে এমন একটি সহজ ও ছোট সংবিধান বানিয়ে দিন না, মোটা ঝামেলাটি চিরতরে চুকে যাক। নতুন সংবিধানে ভারত যে হিন্দুরাষ্ট্র হবে তাতে তো সন্দেহ নেই, মানে চাদ্দিকে সবাই যখন বলছে দেশটা হিন্দুদের। তাই এখনই ক্ষমা-টমা চেয়ে পাপস্খালন করে রাখতে চাইছি আর কি, নইলে তখন যদি গদ্দার বলে শূলে চড়ানো হয়? মরণকালে হরিনাম করলে তো আর জীবন ফিরে পাওয়া যায় না, তাই প্রাণের মায়ায় কাজটা সেরে রাখছি।

প্রথম অপরাধটি করেছিলুম সেই ১৯৯২ সালে। আমার কোনো দোষ নেই, মাইরি বলছি। যত রাজ্যের হিন্দুবিরোধী খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেল দেখে বিশ্বাস করেছিলুম অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা ভারি অন্যায় কাজ হয়েছে। ব্যাটা সেকুলার মিডিয়া আর পার্টিগুলো মিলে বুঝতেই দেয়নি যে বাল্মীকি, তুলসীদাস প্রমুখ রামায়ণ রচয়িতারা ভগবান শ্রীরামের জন্মস্থানের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ, মৌজা ও দাগ নম্বর লিখে না গিয়ে থাকলেও অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানি, উমা ভারতী, মুরলী মনোহর যোশীর মত দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন নেতারা ঠিকই জানতেন যে একেবারে রামের ভূমিষ্ঠ হওয়ার জায়গাটিতেই পাপিষ্ঠ বাবর মসজিদ বানিয়ে ছেড়েছিল। আমার অজ্ঞানতা ক্ষমা করুন প্রভু।

সেই থেকে একের পর এক পাপ করেই চলেছি। এই ধরুন বাঙাল পরিবারের ছেলে হয়েও শিখে ফেলেছি দেশভাগের দায় হিন্দু, মুসলমান কোনো পক্ষের কম নয়। আরও শিখেছি ওপার থেকে যেমন ভিটেমাটি ছেড়ে অনেক হিন্দুকে এপারে চলে আসতে হয়েছিল, এপার থেকেও বিস্তর মুসলমান সব ফেলে ওপারে চলে গেছে। ওপারের লোক মোটেই সাধ করে চলে আসেনি, এপারের লোকও যে ড্যাং ড্যাং করে ওপারে পাড়ি দিয়েছে ঠিক তা নয়। এসব ঘোর বিজাতীয় কথাবার্তা যাঁরা শিখিয়েছিলেন তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে দেহ রেখেছেন, ধর্মাবতার। ফলে আপনার কাজ কমেছে। যখন এক হোয়াটস্যাপ মেসেজ লম্বা সংবিধান অনুযায়ীও হিন্দুরাষ্ট্র নির্মাণ শেষ হবে, তখন আর তেনাদের শাস্তি দেয়ার দরকার হবে না। আপনাদের হয়ে বরং আমিই তেনারা যা যা শিখিয়ে যেতে পারেননি তার জন্যে দু-চাট্টি গাল পেড়ে নিই।

যেখানে ইচ্ছে যত ইচ্ছে অন্যায় করে সবই বাবর ও তার চোদ্দ গুষ্টির পাপের শোধ তোলা হচ্ছে বলে ব্যাখ্যা করতে তাঁরা শিখিয়ে যাননি। মুসলমান মানেই মোগল আর মোগল মানেই রক্তপিশাচ বজ্জাত – এ কথাটি শিখিয়ে যাননি, মায় ওদের যে একটু শিক্ষা দিয়ে রাখা উচিত তা অবধি শিখিয়ে যাননি। কী ঝামেলা বলুন দেখি? অমৃতকালটি যে চেটেপুটে উপভোগ করব তার ব্যবস্থাই করে গেলেন না! তবে আর কী ছেলেপুলে মানুষ করলেন? ঘোর কলি। এখন দাড়িওলা, বন্দে ভারতে সওয়ার কল্কি অবতার যদি এর প্রতিকার করেন তবেই এ অধমের স্বর্গবাসের রাস্তা খোলে।

একটু ধৈর্য ধরুন, ধর্মাবতার। আমার পাপের এখানেই শেষ নয়। দ্বিগুণ পাপ করলুম ২০০২ সালে। ২৪ ফেব্রুয়ারি গুজরাটের গোধরায় মহান করসেবকদের ট্রেনে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর পর কয়েকদিন সামান্য একটু প্রতিক্রিয়া হল। অথচ ফের হিন্দুবিরোধী মিডিয়ার কথায়, ছবিতে বিশ্বাস করলুম ঘোর অন্যায় হচ্ছে। নারোদা পাটিয়া, নারোদা গাম, গুলবার্গ সোসাইটি – এসব জায়গার নাম মুখস্থ করে ফেললুম। আহসান জাফরিকে খুন করা হয়েছেবিলকিস বানোকে দল বেঁধে ধর্ষণ করা হয়েছে, পুলিস দেখেও কিছু দেখেনি, এমনকি মায়া কোদনানির মত মন্ত্রীসান্ত্রীরা দাঁড়িয়ে থেকে এসব করিয়েছেন – এমন গালগল্পে বিশ্বাস করে ফেললুম। একবারও ভেবে দেখলুম না, এক নিষ্ঠাবান হিন্দু মহিলা যাঁর নামেই রয়েছে মায়া, তিনি এমন মায়াদয়াহীন হতেই পারেন না। এসব হিন্দু সমাজকে বদনাম করার চক্রান্ত। গুজরাট মানে আসলে ভাইব্র্যান্ট গুজরাট, যেখানে মাঠে মাঠে ফসল আছে, গাছে গাছে পাখি আছে, ঘরে ঘরে চাকরি, থুড়ি ব্যবসা, আছে। যারা অন্য কথা বলে তাদের হিন্দু হৃদয়সম্রাটকে গাল পাড়া ছাড়া আর কাজ নেই – এই সহজ কথাটা বুঝে উঠতে পারিনি। চাকরি সূত্রে ও রাজ্যে থাকা আত্মীয়স্বজন শুভানুধ্যায়ীরা অনেকবার বলেছে, তেমন কিছুই হয়নি ওখানে। কেবল মায়ের পেট থেকে পড়েই আরডিএক্স চিনে যায় যারা, তাদের একটু শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এমন শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে এখন গুজরাটের মত শান্ত রাজ্য আর নেই। কিন্তু সেকথা শুনে বিশ্বাস করিনি। কাউকে কাউকে মুখের উপর বলে দিয়েছি, ওটা শ্মশানের শান্তি।

ছ্যা ছ্যা! কী পাপ বলুন দেখি! একেবারেই উচিত হয়নি এসব বলা। এই তো কেমন ধীরে ধীরে প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে, কেবল নারোদা পাটিয়া বা নারোদা গাম কেন, ২০০২ সালে গুজরাটের কোথাও কেউ কাউকে খুন করেনি। ধর্ষণ যারা করেছিল তারাও সব নিপাট ভালমানুষ, বামুন বাড়ির ভদ্র ছেলেপুলে। তাই তাদের খামোকা সারাজীবন জেলের অন্ধকূপে আটকে রাখার মানে হয় না। তাদের এত সুখ আছে, এত সাধ আছে। সবকিছু থেকে বঞ্চিত হবে? না হয় তাদের দেখে কিছু লোক সাহস পেয়েছে, না হয় কাশ্মীরের কাঠুয়ায় বছর আষ্টেকের শিশুকেও ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়েছে, না হয় ধর্ষকদের বাঁচাতে হিন্দুরা গোটা কতক মিছিল মিটিংই করেছে, মৃত শিশুর উকিলকে খুনের হুমকি দিয়েছে। সে আর তালিবান, আল কায়দা, আইসিস, বোকো হারামের অপরাধের তুলনায় কতটুকু? গেরুয়া পরে তো কেউ সন্ত্রাসবাদী হতে পারে না, ওসব কংগ্রেসি প্রোপাগান্ডা। গেরুয়া পরে কেবল এমপি, এমএলএ, মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী হওয়া যায়। কারণ তালিবানদের কেউ ভোট দেয় না, গেরুয়া পরে বোম ফিট করার অভিযোগ উঠলে দেয়। কারণ ওটি বীরত্ব।

আরও পড়ুন বিজেপি মুখপাত্র বিতাড়ন: হিন্দুত্বের টাইম আউট, খেলা শেষ নয়

দেশটা এখন বীরে বীরে বীরাক্কার। এদিকে আমার বীরেদের মর্যাদা দিতেও শেখা হয়নি। সেকুলাররা মাথাটা এমন খেয়েছে, কী বলব ধর্মাবতার, গোমাতাকে মাংস বানিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বা খাচ্ছে – এই অভিযোগে কাউকে উচিত শাস্তি দেয় যারা তাদের আমি ভেবেছি ‘লিঞ্চ মব’। এইসব সাহেবদের শেখানো কথাবার্তা, বুঝলেন কিনা? আমাদের দেশের কোনো ভাষায় ও কথাটা আছে? নেই, কারণ আমাদের দেশে ওরকম হয় না। আমাদের এখানে কেবল গোমাতার অসম্মান করলে উচিত শিক্ষা দেওয়া হয়। শিক্ষা যারা দেয় তারা সব খোদ রাণাপ্রতাপের লোক, মানে সেই যিনি হলদিঘাটের যুদ্ধে আকবরের সেনাবাহিনীকে হারিয়ে দিয়েছিলেন। এই দেখুন, যত পাপই করে থাকি, আমার কিন্তু শুধরে নেওয়ার চেষ্টা আছে। যত রাজ্যের কমুনিস্টের লেখা ইতিহাস পড়ে শিখেছিলুম রাণাপ্রতাপ নাকি হেরে গেছিলেন। তা আবার হয় নাকি? ওই গরুখেকো মোগলদের কাছে আমাদের বিরাট হিন্দু রাজপুতরা কখনো হারতে পারে?

এত বছরের এত পাপ সব আপনার পায়ে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলুম। এবার থেকে একেবারে লক্ষ্মী ছেলে হয়ে যাব, কথা দিচ্ছি। শুধু একটা ব্যাপারেই মনটা একটু খচখচ করছে, আপনি মাইবাপ, তাই আপনাকেই বলছি। হিন্দুরাষ্ট্র হওয়া যে দরকার তাতে সন্দেহ নেই। নইলে ওদের গুজরাটের মত, উত্তরপ্রদেশের মত শিক্ষা দেওয়া যাবে কী করে? সে আশাতেই তো বিরাট হিন্দু নেতাদের ভোট দেয়া। কিন্তু ওদের শিক্ষা দিতে দিতে আমাদের ছেলেপুলেগুলো অশিক্ষিত হয়ে যাবে না তো? ডারউইন বলেছিলেন মানুষ বাঁদর ছিল। আমাদের মুনি ঋষিরা বলেননি, তাই বোধহয় ওসব বই থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ইন্টারভিউতে “অমৃতস্য পুত্রাঃ” বলে-টলে আমাদের ছেলেপুলেগুলো চাকরি বাকরি পাবে তো, ধর্মাবতার? না, মানে বলছি চাকরি বাকরি তো এদেশে বিশেষ নেই, বিদেশেই খোঁজ করতে হবে। সেখানে এসব বললে আবার হাঁকড়ে দেবে না তো অশিক্ষিত লালমুখো সাহেবগুলো?

আর আপনার সময় নষ্ট করব না ধর্মাবতার। কেবল একখানা শেষ প্রশ্ন আছে। বলি বিলকিস বানোর ওই যে ভালমানুষ ধর্ষকগুলি, তাদের আবার মুসলমানদের শিক্ষা দেয়া হয়ে গেলে আমাদের মেয়েদের শিক্ষা দেয়ার প্ল্যান আছে নাকি? না, মানে হিন্দুরাষ্ট্রে কি মুসলমান থাকতে দেয়া হবে? না হলে এই লক্ষ লক্ষ বীরেরা করবেটা কী? শিক্ষা দেয়া ছাড়া আর কোনো বিদ্যে কি এদের আছে?

অপরাধ নেবেন না হুজুর। এসব প্রশ্ন করব কাকে? কল্কি অবতার তো আর প্রেস কনফারেন্স করেন না, তেনার এজলাসও নেই। অগত্যা আপনাকেই করলুম আর কি। তাছাড়া আমাদের সাধুসন্তরা বলেছেন, সবই মায়া। তাই ছোট মুখে বড় কথা বলে অপরাধ হয়ে থাকলে মায়া বলে মামলা ডিসমিস করে দেবেন, এই আশা রাখি।

বিনয়াবনত

হিন্দুরাষ্ট্রের এক হিন্দু নাগরিক

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অপমানে হতে হবে মহম্মদ শামির সমান

যথার্থ স্ট্রিট ফাইট করার সময়ে কোহলি কোথায় গেলেন, সে প্রশ্ন ধর্মনিরপেক্ষরা করবেন না? শামির হয়ে নিদেনপক্ষে একখানা টুইটও তো করতে পারতেন প্রাক্তন অধিনায়ক।

এমনকি অ্যাডলফ হিটলারের জন্যেও করুণা হয়। সে যাবতীয় কুকীর্তিকে ক্রীড়াধৌত করার জন্য পেয়েছিল মাত্র একটা অলিম্পিক, নরেন্দ্র মোদী পেয়েছেন আস্ত একটা ক্রিকেট বোর্ড। নিজের নামাঙ্কিত ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাশে অন্য এক রাষ্ট্রনেতাকে নিয়ে গেরুয়া রঙের গ্যালারির দিকে হাত নাড়তে নাড়তে গোটা মাঠ ঘুরছেন সর্বাধিনায়ক। এ দৃশ্য অমর করে রাখার জন্যে কোনো লেনি রিফেনশ্টল নেই – এই যা। কত বড় ইতিহাস তৈরি হল তা বোঝার মেধা বিবেক অগ্নিহোত্রীদের নেই, থাকলে ক্যামেরা নিয়ে ঠিক পৌঁছে যেতেন আমেদাবাদে ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্টের প্রথম দিনে।

অবশ্য এ কথাও ঠিক, আজকাল দৃশ্যের জন্ম দিতে জিনিয়াসের দরকার হয় না। অসংখ্য ক্যামেরা সারাক্ষণ হাতে হাতে ঘুরছে আর কোটি কোটি দৃশ্যের জন্ম দিচ্ছে। তাছাড়া স্টার স্পোর্টসের ক্যামেরা তো ছিলই। তার উপর ছিলেন অমিত শাহের সুপুত্রের অধীন বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ধারাভাষ্যকাররা, যাঁদের চাটুকারিতার একমাত্র তুলনীয় উদাহরণ রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার বাবুর মোসাহেবরা – “রাজা যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ।” মুশকিল হল মোসাহেবি একটি প্রতিযোগিতামূলক পেশা, আলাপ আলোচনা করে এ কাজ করা যায় না। ফলে ধারাভাষ্যকাররা দর্শকসংখ্যা এদিক-ওদিক করে ফেলেছেন। বর্ষীয়ান সাংবাদিক শারদা উগ্রা লিখেছেন, খেলা শুরু হওয়ার আগেই সাতসকালে ম্যাথু হেডেন, সঞ্জয় মঞ্জরেকর আর স্টার স্পোর্টসের উপস্থাপক সুরেশ সুন্দরম বলে দিয়েছিলেন, মাঠে তিলধারণের জায়গা থাকবে না। কারণ শুধু ক্রিকেট নয়, লোকে আসবে তাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে। এক লক্ষ লোক নাকি এসে পড়বে। খেলা শুরুর মিনিট পঞ্চাশেক আগেই নাকি মাঠ প্রায় ভরে গিয়েছে। অথচ পরে রবি শাস্ত্রী, যাঁর পরম শত্রুও তাঁকে পৃথিবীর কোনো বিষয়ে কমিয়ে বলার অপবাদ দেবে না, ধারাভাষ্য দিতে দিতে প্রবল উৎসাহে বলেন ৫০ হাজারের বেশি লোক হয়েছে। কে জানে, হয়ত অর্ধেক লোক আসলে ক্রিকেট নয়, মোদীকে দেখতেই এসেছিল! পরে তিনি চলে যাওয়ায় তারাও চলে গেছে। উসমান খাজার শতরান দেখতে কি আর দেশপ্রেমিক দর্শকরা বসে থাকতে পারেন? পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত হওয়ায় তাঁকে তো ভিসাই দেওয়া হয়েছে বাকি অস্ট্রেলিয়দের একদিন পরে

আসলে ক্রিকেট যে উপলক্ষ, মোদীর মহানতা প্রমাণই লক্ষ্য – তা নিয়ে বিশেষ সন্দেহের অবকাশ নেই। নইলে দেশের এত ক্রিকেটপাগল এবং ঐতিহ্যময় শহর থাকতে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়াম আমেদাবাদেই বানানো হবে কেন? পতৌদি ট্রফি (ভারত-ইংল্যান্ড ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজে জয়ী দলকে প্রদেয়) আর বর্ডার-গাভস্কর ট্রফি (ভারত-অস্ট্রেলিয়া সিরিজে জয়ী দলকে প্রদেয়) – এই দুটো আজকের ক্রিকেটে সারা বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় সিরিজের মধ্যে পড়ে এবং কারো কারো দাবি অনুযায়ী খেলার উৎকর্ষে অ্যাশেজের চেয়েও এগিয়ে। সেক্ষেত্রে পরপর দুবার ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার ভারত সফরে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামই বা খেলা পায় কেন? ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে তো ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টানা দুটো টেস্ট খেলা হয়েছিল ওই স্টেডিয়ামে। তখন অবশ্য যুক্তি হিসাবে কোভিড অতিমারী ছিল, এ বারে যুক্তি কী?

দেশের অর্থনীতির বেহাল অবস্থা প্রাণপণ চেষ্টাতেও চেপে রাখা যাচ্ছে না, যেখানেই ভোট হচ্ছে বিজেপির ভোট কমে যাচ্ছে, বিরোধী ভোট কাটাকাটিতে মানরক্ষা হচ্ছে। ওদিকে ব্রিটিশ চ্যানেল তথ্যচিত্র বানিয়ে বিশ্বগুরু বেলুনে পিন ফুটিয়ে দিচ্ছে। এমতাবস্থায় মোদী অস্ট্রেলিয় প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করবেন, তার জন্য একটা মোচ্ছব করা দরকার, সেই দ্য গ্রেট ডিক্টেটর ছবির মোচ্ছবটার মত। তাই বুঝি আমেদাবাদে এই আয়োজন। ওই শহরের গুজরাটি ভাষার কাগজ দিব্য ভাস্কর তো লিখেছে প্রথম দিনের খেলার ৮০,০০০ টিকিট নাকি বিজেপি দলই কিনে নিয়েছে। দ্য ওয়্যারের সাংবাদিকের কাছে কয়েকজন বিজেপি বিধায়ক স্বীকারও করেছেন যে দল থেকে তাঁদের প্রথম দিনের খেলার বিপুল পরিমাণ টিকিট কিনতে বলা হয়েছে। কিন্তু এ তো টি টোয়েন্টি নয়, খেলাটা যে পাঁচ দিনের। পৃথিবীর বৃহত্তম ক্রিকেট স্টেডিয়াম যে শহরে, সেখানকার মানুষের ক্রিকেটপ্রেম এত প্রবল যে কাল চতুর্থ দিন দুপুরে বিরাট কোহলি যখন কোভিডোত্তর দুনিয়ায় প্রথম টেস্ট শতরান করলেন তখনো টিভির পর্দায় দেখা গেল মাঠের অর্ধেক ভরেনি। তিনি প্রায় দ্বিশতরান করে ফেললেও ছবিটা বিশেষ বদলায়নি। অথচ কাল ছিল রবিবার। এদিকে ২০০১ সালের সেই বিখ্যাত টেস্টের পর গত ২২ বছরে ভারত-অস্ট্রেলিয়ার একটাও টেস্ট ম্যাচ হয়নি কলকাতায় ক্রিকেটের নন্দনকাননে।

অবশ্য কবি বলেছেন “ঘটে যা তা সব সত্য নয়”। আমেদাবাদে কেন তেমন দর্শক হয়নি, এ প্রশ্ন চারিদিক থেকে উঠতে শুরু করলেই হয়ত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড রীতিমত পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়ে দেবে, মাঠ একেবারে উপচে পড়ছিল। ঠিক যেমনটা কদিন আগে ইন্ডিয়ান সুপার লিগের মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ সম্পর্কে লিগ কর্তৃপক্ষ বলেছে। ইদানীং ভারতে সমস্ত গোনাগুনিই হযবরল নিয়মে চলে। ইচ্ছামত বাড়ানো, কমানো যায়। একেবারেই এদিক-ওদিক করা না গেলেও বলে দিলেই চলবে “দর্শক কম হয়নি, স্টেডিয়াম বড় হয়ে গেছে।” নির্মলা সীতারামণ তো পথ দেখিয়েই রেখেছেন। ভবিষ্যৎ চিন্তা করেই বোধহয় ঠিক কত দর্শক ধরে এই স্টেডিয়ামে তা নিয়ে দুরকম বয়ান সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। গুজরাট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন নিজেই স্টেডিয়ামের এক জায়গায় লিখে রেখেছে “১৩০,০০০”, আরেক জায়গায় “১১০,০০০”। এ যেন সেই ২০০২ নিয়ে কথা উঠলেই এক দলের “সব বাজে কথা, সুপ্রিম কোর্ট ক্লিনচিট দিয়েছে” আর আরেক দলের “যা হয়েছিল বেশ হয়েছিল” বলার মত। হাজার হোক, জায়গাটা আমেদাবাদ, রাজ্যটা গুজরাট।

গুজরাট মডেলের চেয়ে ভাল মডেল ভূভারতে নেই। ওখানে ভারতের সবচেয়ে সিনিয়র বোলারকেও গ্যালারি থেকে ক্রিকেটপ্রেমীরা বুঝিয়ে দেন, বাপু, তুমি মুসলমান হও আর যা-ই হও, এখানে এলে “জয় শ্রীরাম” শুনতে হবে। ত্রিনিদাদ ও টোব্যাগোর ইতিহাসবিদ এবং সাংবাদিক সিএলআর জেমস বিয়ন্ড দ্য বাউন্ডারি নামে একটা বই লিখেছিলেন, আর সেখানে লিখেছিলেন, সে কী জানে যে শুধু ক্রিকেট জানে? ক্রিকেট যে সত্যিই সীমানার ওপারেও খেলা হয়, তার এমন চমৎকার উদাহরণ রোজ পাওয়া যায় না। স্রেফ কয়েকটা বাজে লোক এই কাণ্ড করেছে বলে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই। ভারতীয় ক্রিকেট দলের গৈরিকীকরণ বেশ কয়েক বছর ধরে চলছে। তারই প্রতিফলন আমেদাবাদ টেস্টের প্রথম দিনের এই ঘটনা। যারা কাণ্ডটা ঘটিয়েছে তারা কেমন লোক তা বলাই বাহুল্য, কিন্তু ওই ভিডিওতে মহম্মদ শামির সতীর্থদের আচরণ লক্ষ করার মত।

SHAMI KO JAI SHREE RAM 🚩 PIC.TWITTER.COM/RWVG1YMEAZ— Gems of Shorts (@Warlock_Shabby) March 9, 2023

প্রথমে সূর্যকুমার যাদবকে দেখে সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীসুলভ উল্লাসে তাঁর নাম ধরে ডাকা হয়, তিনি সাড়া দিয়ে ডান হাত তোলেন। তারপর দুহাত জোড় করে দর্শকদের নমস্কার জানান। এরপর তাঁর পাশে মহম্মদ সিরাজকে দেখা যেতেই শুরু হয় “জয় শ্রীরাম” ধ্বনি। তারপর শামিকে দেখে উৎসাহ চরমে ওঠে। তাঁর নাম ধরে ডেকে ওই স্লোগান দেওয়া হয়, যাতে তিনি বোঝেন তাঁকেই শোনানো হচ্ছে। সেইসময় ওখানে উপস্থিত গুজরাটেরই বাসিন্দা এবং দলের অত্যন্ত সিনিয়র সদস্য চেতেশ্বর পূজারা, সৌরাষ্ট্র রঞ্জি দলের অধিনায়ক জয়দেব উনড়কত, আরেক সিনিয়র জোরে বোলার উমেশ যাদব এবং ব্যাটিং কোচ বিক্রম রাঠোর। সকলেরই হাবভাব দেখে মনে হয়, তাঁরা শুনতেই পাননি। একই দূরত্ব থেকে দুজনের নাম ধরে ডাকা হল, একজন শুনতে পেয়ে সাড়া দিলেন আর বাকিরা শুনতেই পাননি এমন তো হতে পারে না। তাহলে বুঝতে হবে হয় তাঁদের অবস্থা তপন সিংহের আতঙ্ক ছবির মাস্টারমশাইয়ের মত, নয় তো শামির প্রতি ধর্মীয় টিটকিরি তাঁরা দিব্যি উপভোগ করছিলেন। এই দল যদি চলতি সিরিজ জেতে, এমনকি যদি আসন্ন বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে খেতাবও জেতে। তা কি ভারতের জয়?

সাংবাদিক মানস চক্রবর্তী বহুকাল আগে ব্রায়ান লারাকে নিয়ে একখানা কিশোরপাঠ্য বই লিখেছিলেন। সেখানে আছে, মানস লারার কথা প্রথম শোনেন অরুণলালের মুখে এবং সেটা লারার ব্যাটিং প্রতিভার কথা নয়। ১৯৮৯ সালে ভারত যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যায়, অরুণ অন্যতম ব্যাটার হিসাবে সেই দলে ছিলেন। অরুণ বলেছিলেন, একটা টেস্টে দ্বাদশ ব্যক্তি ছিল ব্রায়ান লারা বলে একটা বাচ্চা ছেলে। প্রথম দিনের খেলার পর খবর এল ওর বাবা মারা গেছেন। অধিনায়ক ভিভিয়ান রিচার্ডস সমেত গোটা দল ওর বাড়ি চলে গেল। কথাটা বলে অরুণের মন্তব্য ছিল, বোঝা যায় কেন ওরা বছরের পর বছর টেস্ট হারে না। ২০০২ সালের ৫ ডিসেম্বরের ঘটনাও এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য। সেদিন তৎকালীন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক স্টিভ ওয়র সিডনির বাড়ির দিকে ধেয়ে এসেছিল এক দাবানল। স্টিভ তখন মেলবোর্নে, স্ত্রী লিনেট তিন সন্তান আর বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে বাড়িতে। লিনেটের ফোন পেয়ে গ্লেন ম্যাকগ্রা পৌঁছে যান এবং আপ্রাণ লড়ে বাড়িটাকে আগুনের হাত থেকে বাঁচান। স্টিভ খবর পেয়ে বিমানে চেপে শেষপর্যন্ত বাড়ি পৌঁছন রাত এগারোটায়। ততক্ষণে আগুন নিয়ন্ত্রণে। স্টিভ গিয়ে জানতে পারেন ম্যাকগ্রা ছ-সাত ঘন্টা ধরে আগুনের বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন।

সহখেলোয়াড় মাঠের বাইরেও প্রাণাধিক প্রিয় – এই মূল্যবোধই খেলার মাঠের চিরকালীন শিক্ষা। সেই শিক্ষার পরিচয় কোথায় শামির সহখেলোয়াড়দের ব্যবহারে? ভারতে অবশ্য এখন অমৃত কাল। চিরকালীন সবকিছুই এখন বাতিল। কেউ কেউ বলবেন, কী করা উচিত ছিল পূজারাদের? শামির হয়ে লোকগুলোকে পাল্টা গালাগালি দিত, না হাতাহাতি করতে যেত? যে কোনো সভ্য দেশে এই প্রশ্নটাই অবান্তর। ভারতের গত অস্ট্রেলিয়া সফরে সিরাজকে বর্ণবিদ্বেষী গালাগালি দেওয়ার অভিযোগ উঠতেই কয়েকজন দর্শককে মাঠ থেকে বার করে দেওয়া হয়েছিল। যা অন্য দেশের ক্রিকেট বোর্ড করতে পারে, তা যে এ দেশের বোর্ড করবে না — এমনটা তাহলে সূর্য, পূজারা, উনড়কত, উমেশ, বিক্রমরা জানেন? তাই তাঁরা প্রতিবাদ করেননি, বোর্ডের কাছে কোনো অভিযোগও জানাননি? এই ভিডিও যেভাবে ভাইরাল হয়েছে, বেশকিছু সংবাদমাধ্যম যেভাবে খবর প্রকাশ করেছে, তাতে অধিনায়ক রোহিত শর্মা বা কোচ রাহুল দ্রাবিড়ের চোখে পড়েনি — এমনটা হওয়া অসম্ভব। তাঁরাই বা চুপ কেন? এর নাম নেতৃত্ব, নাকি হিন্দুত্ব?

ভারতীয় দলে আবার ভয়ানক লড়াকু কয়েকজন ক্রিকেটার আছেন। তাঁদের সারা দেশের ক্রিকেট সাংবাদিকরা ‘স্ট্রিট ফাইটার’ বলে বিস্তর প্রশংসা করে থাকেন। এঁরা বিপক্ষ দলের ১১ নম্বর ব্যাটারকে বাউন্সারের পর বাউন্সার দিয়ে, স্লেজ করে বাহাদুরি দেখান। পরে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে বড় মুখ করে বলেন, আমাদের একজনকে আক্রমণ করলে আমরা ১১ জন মিলে প্রতিআক্রমণ করব।

এঁদের মধ্যে সবচেয়ে ওজনদার অবশ্যই ২৪ টেস্টে ৪২ খানা ইনিংস খেলার পরে ২৭ নম্বর থেকে ২৮ নম্বর শতরানে পৌঁছনো বিরাট। তিনি ২০২১ সালের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির সময়ে শামির ধর্ম তুলে যারা টুইট করেছিল তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ উদারপন্থীদের হৃদয়সম্রাট হয়ে উঠেছিলেন। অধিনায়কত্ব যখন চলে গেল, তখন আপন মনের মাধুরী মিশায়ে ধর্মনিরপেক্ষরা গর্জন করেছিলেন, শামির পক্ষ নেওয়ার অপরাধেই নাকি বেচারা বিরাটকে বিজেপি নিয়ন্ত্রিত ক্রিকেট বোর্ড বরখাস্ত করেছে। এবার যথার্থ স্ট্রিট ফাইট করার সময়ে কোহলি কোথায় গেলেন, সে প্রশ্ন ধর্মনিরপেক্ষরা করবেন না? শামির হয়ে নিদেনপক্ষে একখানা টুইটও তো করতে পারতেন প্রাক্তন অধিনায়ক। তিনি যে এখনো ভারতীয় ক্রিকেটের এক নম্বর তারকা তাতে তো সন্দেহ নেই। তাঁকে তো যথেষ্ট মান্যিগণ্যি করেন ক্রিকেটভক্তরা, আর তাঁর ভক্তের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। টুইটারে বিরাটের সমালোচনা করলেই যেভাবে ট্রোলবাহিনী ধেয়ে আসে তাতেই তা টের পাওয়া যায়। এহেন বিরাটের জাভেদ মিয়াঁদাদসুলভ আগ্রাসন আমেদাবাদে শামির অপমান দেখেও মিইয়ে রইল? তাহলে বুঝতে হবে, বিরাট এবং তাঁর মত ডানপিটেদের যত হম্বিতম্বি সব ক্রিকেট বোর্ডের ছত্রছায়ায়, ক্রিকেট মাঠের ভিতরে। সিনেমার অ্যাকশন হিরোদের যেমন যত বীরত্ব সিনেমার সেটে, স্টান্টম্যানদের উপস্থিতিতে।

আরও পড়ুন সকলেই চুপ করে থাকবে, শামিকে মানিয়ে নিতে হবে

এমন নয় যে হিন্দুগরিষ্ঠ ভারতে মুসলমান ক্রিকেটাররা ব্যর্থ হলে অতীতে কখনো কেউ তাদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে পাঁচটা কথা বলেনি। মহম্মদ আজহারউদ্দিন তো তেমন লোকেদের পোয়া বারো করে দিয়ে গেছেন ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে। কিন্তু সেসব মন্তব্য চলতে ঠারেঠোরে এবং ক্রিকেটারের কানে পৌঁছতে না দিয়ে। এখন সোশাল মিডিয়ার যুগে টিটকিরি উদ্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে। ফলে শুধু মুসলমান শামি কেন, শিখ অর্শদীপ সিংকেও পাকিস্তান ম্যাচে ক্যাচ ফেলার জন্য অনলাইন গালাগালি হজম করতে হয়েছে। কিন্তু আমেদাবাদে যা হল তা অভূতপূর্ব। শামির হাত থেকে ক্যাচ পড়েনি, তিনি অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের হাতে বেদম মারও খাননি। ম্যাচটাও পাকিস্তান ম্যাচ নয়। স্রেফ উত্যক্ত করার উদ্দেশ্য নিয়েই তাঁকে সরাসরি আক্রমণ করেছে কিছু তথাকথিত ক্রিকেটপ্রেমী। অথচ গোটা দল চুপ, বোর্ডও চুপ। এ থেকে বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না দলটা আসলে কাদের। অবশ্য এতে আশ্চর্য হওয়ারই বা কী আছে? এই দলেই তো খেলছেন রবীন্দ্র জাদেজা, যিনি গুজরাটের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির হয়ে প্রচারে জাতীয় দলের জার্সিকে ব্যবহার করেছেন। বোর্ড কোনো আপত্তি করেনি। কারণ ভারতীয় ক্রিকেট দল এখন দেশের নয়, সরকারের দল। তাদের প্রধান কর্তব্য মোদীর যাবতীয় কীর্তিকে ক্রীড়াধৌত করা। তাই তাদের সমস্ত আচরণই এখন হিন্দুত্বানুসারী।

রবীন্দ্রনাথের কল্পনার ‘ভারততীর্থ’ কোথাও না থাকলেও, অন্তত আমাদের জাতীয় ক্রিকেট দল সেদিকে যাত্রা করছিল। স্বীকার করে নেওয়া ভাল, যে যাত্রা থেমে গেছে। অবশ্য ওই কবিতার ভাবনায় বেশকিছু আপত্তিকর দিক আছে বলে লিখেছিলেন অধ্যাপক জ্যোতি ভট্টাচার্য। তা সবিস্তারে আলোচনা এখানে প্রাসঙ্গিক হবে না। প্রাসঙ্গিক অংশটা হল

রবীন্দ্রনাথও ভক্তি-গদগদ হতেন। তাতে স্বদেশচেতনার উদ্দীপন ঘটত, সেটা আমাদের লাভ। কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য যে রবীন্দ্রনাথ বেশিক্ষণ ওরকম ভক্তিগদগদ অভিভূত হয়ে থাকতে পারতেন না। গদগদচিত্তকে তিনিই আবার আঘাত করতেন…

‘ভারততীর্থ’ লেখার পর একটিমাত্র দিন গেল। তার পরেই রবীন্দ্রনাথ যা লিখলেন তা হল স্বদেশের প্রতি নিদারুণ ধিক্কার, অভিশাপ – “হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান/অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান/…বিধাতার রুদ্ররোষে দুর্ভিক্ষের দ্বারে বসে/ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান।”

ভারততীর্থের পথে নয়, ভারতীয় ক্রিকেট এবং দেশটা এ পথেই চলেছে।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

কী ঢাকছে সরকারি চোলি? কেনই বা ঢাকছে?

আজ বিবিসির তথ্যচিত্র মুছে দেওয়া হচ্ছে, কাল ২০০২ সালে গুজরাটে আদৌ কোনো দাঙ্গা হয়েছিল বলে পোস্ট করলেই তা মুছে দেওয়া হবে। আহসান জাফরি খুন হননি – ওটি ভুয়ো খবর। বিলকিস ধর্ষিত হননি – ওটিও ভুয়ো খবর।

চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়
চোলি কে পিছে?
চুনরী কে নীচে কেয়া হ্যায়
চুনরী কে নীচে?

আমাদের তখন সবে গোঁফের রেখা উঠছে। সন্ধেবেলা দূরদর্শনের ‘সুপারহিট মুকাবলা’ অনুষ্ঠানে খলনায়ক ছবির এই গান পরপর কয়েক সপ্তাহ বেজেছিল এবং আমাদের উদ্বেল করেছিল। তখনো বাঙালি ছেলেমেয়েরা ভূমিষ্ঠ হয়েই হিন্দিতে পণ্ডিত হয়ে যেত না, ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের বাবা-মায়েরাও দলে দলে হিন্দিকে তাদের দ্বিতীয় ভাষা করে তুলতে উদগ্রীব হতেন না। ফলে চোলি আর চুনরী শব্দদুটির অর্থ জানতে আমাদের কিঞ্চিৎ সময় লেগেছিল। জানার পর আমাদের রোমাঞ্চ কোন মাত্রায় পৌঁছেছিল তা আজকের স্মার্টফোন প্রজন্ম কল্পনা করতে পারবে না। কিছুদিন পরে সে রোমাঞ্চে জল ঢেলে দিতে কেউ বা কারা আদালতে মামলা ঠুকে দিল। গানটি শ্লীল না অশ্লীল তা নিয়ে প্রবল তর্কাতর্কি লেগে গেল, কিছুদিন পরে দেখা গেল জনপ্রিয়তায় একসময় এক নম্বরে উঠে যাওয়া ওই গান আর ‘সুপারহিট মুকাবলা’ অনুষ্ঠানে বাজানো হচ্ছে না। ইলা অরুণের গাওয়া ওই চারটি লাইন মোটেই অশালীন নয় – এই যুক্তির পক্ষে যারা, তাদের হাতিয়ার ছিল অলকা ইয়াগনিকের গাওয়া পরের কয়েক লাইন

চোলি মে দিল হ্যায় মেরা
চুনরী মে দিল হ্যায় মেরা
ইয়ে দিল ম্যায় দুঙ্গি মেরে ইয়ার কো, পেয়ার কো।

অকাট্য যুক্তি। ছবিতে দেখা যেত এক নাচাগানার আসরে নীনা গুপ্তা গানের প্রথম চার লাইনের প্রশ্নটি তুলছেন, আর লাস্যময়ী মাধুরী দীক্ষিত স্পষ্ট উত্তর দিয়ে দিচ্ছেন। অতএব অন্য কিছু ভাবার তো কোনো কারণ নেই। যতদূর মনে পড়ে আদালতে গানটির অশ্লীলতা প্রমাণ হয়নি, তাই প্রায় একই যুগের খুদ্দার ছবির অন্য একটি গান ‘সেক্সি সেক্সি সেক্সি মুঝে লোগ বোলে’-র মত আদালতের নির্দেশে গানের কথা বদল করে নতুন করে প্রকাশ করতে হয়নি। কিন্তু ঘটনা হল, চোলির পিছনে আর চুনরীর নিচে যা আছে তা নিয়ে আমাদের রোমাঞ্চে জল ঢালা সম্ভব হয়নি। আমরা যে যার মত করে বুঝে নিয়েছিলাম কী আছে – দিল না অন্য কিছু।

২০০২ সালে গুজরাটে গোধরায় ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের পর কী ঘটেছিল, তাতে নরেন্দ্র মোদীর কতখানি দায় ছিল, আদৌ ছিল কি ছিল না – এ প্রশ্ন উঠলেই আমার ওই গানটির কথাই মনে পড়ে। হৃদয় তো অনেক গভীরে গেলে পাওয়া যায়। বয়ঃসন্ধির ছেলেপুলেদের অতদূর যাওয়ার ধৈর্য থাকে না। আমরা, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘স্কিন ডিপ’, ওই গানের সে অর্থটুকু ভেবেই আহ্লাদিত হতাম। দূরবর্তী কোনো মাইক থেকে গানটি ভেসে এলে বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে চোখ মারামারি চলত, ঠোঁটে থাকত দুষ্টু হাসি। তা বলে কি আমাদের মধ্যে একটিও সুবোধ বালক ছিল না? তারা আমাদের অসভ্য উল্লাস দেখে যারপরনাই বিরক্ত হত। দু-একজন খাঁটি সাত্ত্বিক মানসিকতায় আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করত, আমরা গানটির একেবারে ভুল অর্থ ভেবে নিচ্ছি। একই গানের কথার যে একাধিক অর্থ হওয়া সম্ভব সে শিক্ষা আমরা তখনই পাই – রবীন্দ্রসঙ্গীতের গভীরতা বা ভারতচন্দ্রের ব্যাজস্তুতিকে স্পর্শ করার আগেই।

বিলিতি কবিতার রোম্যান্টিক যুগের কবিরা মনে করতেন মানুষ অমৃতের সন্তান। জন্মের পরেও বেশ কিছুদিন সে নিষ্পাপ থাকে, তারপর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তার মধ্যে পাপ প্রবেশ করে, পবিত্রতা বিদায় নেয়। কবি উইলিয়াম ব্লেক Songs of Innocence আর Songs of Experience নামে দুটি পরিপূরক কবিতার বই লিখে ফেলেছিলেন, আর উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ লিখেছিলেন এ জগৎ হল কারাগার। একটি ছেলে যত বড় হয় তত তার চতুর্দিকে ঘনিয়ে আসে সে কারাগারের গরাদ (“Shades of the prison-house begin to close/Upon the growing Boy”)। ২০০২ সালের মত ঘটনা যখন ঘটে তখন মানুষ অমৃতের সন্তান না মৃত্যুর সওদাগর তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ দেখা দেয়। তবে এখন পিছন ফিরে মনে হয় মাধুরীর চোলি যেমন আমাদের নিষ্পাপ নাবালকত্ব থেকে অভিজ্ঞ সাবালকত্বে পৌঁছে দিয়েছিল, তেমনই গুজরাট ২০০২ ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে রাম জন্মভূমি নিয়ে গণহিস্টিরিয়া তৈরি করা আর মসজিদ ভাঙার রাজনীতির নাবালকত্ব থেকে শাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে অভীষ্ট লক্ষ্যপূরণের সাবালকত্বে পৌঁছে দিয়েছিল।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত একাধিক মামলায় রায় দিয়েছে – কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু, ধর্ষণ, বাস্তুচ্যুতির পিছনে কোনো বৃহত্তর অপরাধমূলক চক্রান্ত ছিল না। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মোদীরও কোনো প্রত্যক্ষ দায় ছিল না। এর উপরে আর কথা কী? কে না জানে, ভারতের বিচারব্যবস্থার মত নিখুঁত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা পৃথিবীর কোথাও নেই? সেই কারণেই তো বিচারপতি নিয়োগের কলেজিয়াম ব্যবস্থাকে বাতিল করার দাবিতে উঠেপড়ে লেগেছে মোদী সরকার। তাদের অভিযোগ – ব্যবস্থাটি অগণতান্ত্রিক। আইনমন্ত্রী কিরেন রিজিজু আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশবন্ত চন্দ্রচূড় প্রায় বাগযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন প্রতিদিন। কী কাণ্ড! যে ব্যবস্থা মোদীর বিরুদ্ধে যাবতীয় রাজনৈতিক চক্রান্ত নস্যাৎ করে তাঁকে পদ্মফুলের মত নিষ্পাপ প্রমাণ করেছে, সেই ব্যবস্থাকে কিনা তাঁর সরকারই মনে করে অগণতান্ত্রিক!

এমন সময়, হাঁউ মাউ খাঁউ, গণহত্যার গন্ধ পাঁউ বলে এসে পড়ল বিবিসির তথ্যচিত্র ইন্ডিয়া: দ্য মোদী কোয়েশ্চেন। নতুন করে উঠে পড়ল চোলির পিছনে কী আছে সেই প্রশ্ন। এইবেলা পরিষ্কার করে দেওয়া যাক, উদাহরণ হিসাবে শুধুমাত্র বিপরীতকামী পুরুষদের মধ্যে চালু থাকা নারীদেহ সম্পর্কে একটি রগরগে আলোচনাকে কেন টেনে এনেছি। কারণটি খুব সোজা। ওই যে বললাম, আমরা যে যার মত করে বুঝে নিয়েছিলাম? লক্ষ করলে দেখা যাবে, গুজরাটে ঠিক কী হয়েছিল বিজেপির ভোটাররাও ঠিক একইভাবে যে যার মত করে বুঝে নিয়েছে। ওই যে বললাম, গানটি ভেসে এলেই আমাদের মধ্যে চোখ মারামারি চলত? ঠিক একই ব্যাপার বিজেপি ও তার ভোটারদের মধ্যে চলে। বিবিসির তথ্যচিত্রে যা যা দেখানো হয়েছে তার কিছুই কিন্তু নতুন নয়। নতুন খবর বলতে এটুকুই, যে ব্রিটিশ সরকার এক নিজস্ব তদন্ত চালিয়েছিল, যার সিদ্ধান্ত হল মোদী স্বয়ং দায়ী। যে সমস্ত প্রমাণ, যেসব সাক্ষীকে এই তথ্যচিত্রের দর্শকরা দেখছেন তাঁদের কথা ভারতের বহু ছোটবড় সংবাদমাধ্যমে গত দুই দশকে প্রকাশিত হয়েছে। রাকেশ শর্মার তথ্যচিত্র ফাইনাল সলিউশন দেখলে বিবিসির তথ্যচিত্রের চেয়েও বেশি ঠান্ডা স্রোত নামবে শিরদাঁড়া বেয়ে। সেই তথ্যচিত্রটি যখন ইউটিউবে প্রথম আপলোড করা হয়, তখন সরকারের হাতে তা ব্লক করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু দলে দলে লোক বারবার রিপোর্ট করে ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড’-কে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করে সাময়িকভাবে ব্লক করিয়ে দিয়েছিল।

ফলে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। উঠলেই প্রত্যেকবার বিজেপি নেতা ও সমর্থকদের থেকে দুরকম উত্তর পাওয়া যায়। এক দল বলে, সব বানানো গল্প। সুপ্রিম কোর্ট ক্লিনচিট দিয়েছে। আরেক দল বলে, যা করেছে বেশ করেছে। মুসলমানদের বেশি বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। অমিত শাহ স্বয়ং যেমন সংবাদসংস্থা এএনআইকে বলেছিলেন, মোদীজির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত অভিযোগ করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সেই অভিযোগকারীদের ক্ষমা চাওয়া উচিত। আবার সম্প্রতি হিমাচল প্রদেশে নির্বাচনী প্রচারে বলেছেন, ২০০২ সালে মোদীজি যারা হিংসা ছড়ায় তাদের উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন। ফলে গুজরাটে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যার যা পছন্দ সে তাই বুঝে নেবে।

আমরাও ঠিক এমনই করতাম। এক দল মাধুরীর হৃদয় নিয়ে ভাবত, আরেক দল মাংসপিণ্ড নিয়ে। এমন চোলিকেন্দ্রিক পৌরুষই যে গুজরাট ২০০২-এর অভিজ্ঞান তা আর কেউ না জানলেও বিলকিস বানো বিলক্ষণ জানেন।

ভারত সরকার ইউটিউবে বিবিসির তথ্যচিত্রের যত লিঙ্ক আছে সব ব্লক করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিবিসির তথ্যচিত্রের লিঙ্ক শেয়ার করায় বেশকিছু টুইটও মুছে দিতে বলেছে। যদি বলি এই সাবালক জীবনের চেয়ে সেই নাবালক জীবন ভাল ছিল, তাহলে স্রেফ স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়ছি বলা যাবে কি? তখন ভারত রাষ্ট্র স্রেফ যৌনতাকেই অশ্লীল বলে বিবেচনা করত, ঢেকেঢুকে রেখে, গানের কথা বদলে দিয়ে বা কোনো ফিল্মের গোটা দু-চার চুম্বন দৃশ্য বাদ দিয়েই নিজের ক্ষমতা জানান দিত। তাও কেউ আদালতে দৌড়লে তবে। এখন তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে নিজের অপছন্দের কিছু দেখলেই তাকে অসত্য বলে দেগে দিয়ে ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে দিতে পারে। ঠিক সেই কাজটিই করা হয়েছে এক্ষেত্রে। কদিন আগেই, গত মঙ্গলবার, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের ওয়েবসাইটে আপলোড হওয়া সংশোধনীর এক খসড়ায় দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো যে খবরকে ভুয়ো খবর বলে ঘোষণা করবে সে খবর কোনো সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করা যাবে না। শেয়ার হলে তার দায়িত্ব বর্তাবে সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মটির উপর।

অর্থাৎ আজ বিবিসির তথ্যচিত্র মুছে দেওয়া হচ্ছে, কাল ২০০২ সালে গুজরাটে আদৌ কোনো দাঙ্গা হয়েছিল বলে পোস্ট করলেই তা মুছে দেওয়া হবে। আহসান জাফরি খুন হননি – ওটি ভুয়ো খবর। বিলকিস ধর্ষিত হননি – ওটিও ভুয়ো খবর। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো হয়ত এমনই বলবে। তা সরকার বা সরকারি সংস্থাগুলি বলতেই পারে। কিন্তু যত বলবে ততই চোলির পিছনে কী আছে সে প্রশ্ন জোরালো হবে। সরকারের এখনো চোলি কেন প্রয়োজন – সে প্রশ্নও উঠবে নির্ঘাত। কারণ গুজরাট দাঙ্গায় অভিযুক্ত, এমনকি শাস্তিপ্রাপ্তরাও তো এখন মুক্ত। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাব্যের সত্যতা প্রমাণ করে গারদ ঘনিয়ে এসেছে কেবল উমর খালিদ, শার্জিল ইমামদের মত নাবালকদের উপর – যারা গালভর্তি দাড়ি গজিয়ে যাওয়ার পরেও মানুষকে মৃত্যুর সওদাগর ভাবার সাবালকত্বে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

আরও পড়ুন অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

সামান্য আশাবাদী অবশ্য হওয়া যায় একথা ভেবে, যে সরকারের এখনো খানিক লজ্জাশরম আছে বলেই চোলির প্রয়োজন পড়ছে। তবে ইন্টারনেটের যুগে চোলি যথাস্থানে রাখা লৌহকঠিন সরকারের পক্ষেও কষ্টসাধ্য। শীত বড়জোর আর এক মাস। তারপর বসন্ত সমীরণে ভোরের দিকে হাওড়ার ফেরিঘাট থেকে যদি বাগবাজার অভিমুখে নৌকাবিহারে বেরিয়ে পড়েন, তাহলে দেখতে পাবেন ভাগীরথীর পাড়ে প্রাতঃকৃত্য করতে বসেছেন অনেকে। তাঁরা বসেন নদীর দিকে পিছন ফিরে। তাতে সুবিধা হল, আপনি তাঁদের উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে পেলেও তাঁরা আপনাকে দেখতে পান না। ফলে ভেবে নেওয়া সহজ হয় যে আপনিও তাঁদের দেখতে পাচ্ছেন না। ইন্টারনেটে একটি দেশের মধ্যে তথ্য ও তথ্যচিত্র ব্লক করা এমনই ব্যাপার। অবশ্য আত্মপ্রতারণা ছাড়া একনায়কত্ব বাঁচে কেমন করে?

পুনশ্চ: বিবিসির তথ্যচিত্রের নামে পার্ট ওয়ান কথাটি রয়েছে। কঙ্গনা রানাওয়াতের হিট ছবির সংলাপের ভাষায় “অভি তো হমে ঔর জলীল হোনা হ্যায়।”

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

সেতু ভাঙলেও টাল খায় না গুজরাট মডেল

সারা দেশের ভদ্রলোক শ্রেণি গুজরাট বলতে অজ্ঞান। কি চমৎকার রাস্তা! সবরমতীর ধারটা কি দারুণ করেছে! লোকের কত টাকা! দিল্লি থেকে কন্যাকুমারী – সর্বত্রই মুগ্ধতার কারণগুলো মোটামুটি এক। বাঙালি ভদ্রজনের মুগ্ধতার দুটো অতিরিক্ত কারণ আছে – ১) ওখানে কত ইন্ডাস্ট্রি, ২) ওখানে কেউ চাকরি বাকরি নিয়ে মাথায় ঘামায় না, সবাই ব্যবসা করে। এই মুগ্ধ জনতার সাথে খানিকক্ষণ কথা বললেই টের পাওয়া যায় এঁরা গুজরাট বলতে বোঝেন আমেদাবাদ, বড়জোর ভদোদরা। তলিয়ে জিজ্ঞেস করলে বেরিয়ে পড়ে বেড়াতে গিয়ে আমেদাবাদের বাইরে কেবল গির অরণ্যের সিংহ দেখেছেন। অবশ্য পশ্চিমবঙ্গ বলতেও এঁরা কলকাতাই বোঝেন, মহারাষ্ট্র বলতে মুম্বাই। ফলে বামপন্থী বা ডানপন্থী যা-ই হোন, গুজরাট মডেলে এঁদের অগাধ আস্থা। তবে স্বপ্নের গুজরাটে বেমক্কা সেতু ভেঙে পড়লে কিঞ্চিৎ ফাঁপরে পড়েন।

মোরবিতে মেরামতির জন্য সাত মাস বন্ধ থাকা সেতু দিন পাঁচেক হল খোলা হয়েছিল, রবিবার ভর সন্ধেবেলা ভেঙে পড়েছে। এখন শোনা যাচ্ছে খুলে দেওয়ার আগে নাকি সুরক্ষা শংসাপত্রও নেওয়া হয়নি। উন্নয়নের গুজরাট বলে কথা, উন্নয়ন কি আর লাল ফিতের ফাঁসে আটকে রাখা যায়? কর্মবীর নরেন্দ্র মোদীর রাজ্য। কয়েক হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি ডুবে যাবে জেনেও যেখানে সর্দার সরোবর বাঁধ তৈরি করা হয় বহু বছরের আন্দোলন দুরমুশ করে দিয়ে।

এই লেখা যখন লিখতে বসেছি, তখন পর্যন্ত শ দেড়েক মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। তাতে কী-ই বা এসে গেল? গুজরাটে অনেক কাজ হয়, তার মধ্যে খানিকটা দুর্নীতি তো হবেই। আমাদের এখানে তো কাজই হয় না – এমন ধারণা দিয়েই অনেকে এ ঘটনার ব্যাখ্যা করবেন সন্দেহ নেই। আসলে উন্নয়ন মানে যে শহরের উন্নয়ন; অর্থাৎ ফ্লাইওভার, রাস্তা, সেতু, পার্ক, রেলিং, ফুটপাথ নির্মাণ – একথাই আমরা শিখেছি। অমর্ত্য সেন বাঙালি বলে আমাদের দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না। কিন্তু তিনি উন্নয়নের যে অন্যতর সংজ্ঞা দিয়েছেন তাতে আমাদের আগ্রহ নেই। তাঁর কাজের ভিত্তিতে অর্থনীতিবিদ মহবুব উল হকের তৈরি হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে গুজরাট সচরাচর মাঝের সারির উপরে উঠতে পারে না। ২০২১ সালেও অন্ধ্রপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ সমেত ১৯ রাজ্যের সঙ্গে গুজরাট মিডিয়াম এইচডিআই ক্যাটেগরিতেই ছিল। সে রাজ্যের অনেক জায়গায় যে ছেলেমেয়েরা সাঁতরে নদী পেরিয়ে স্কুলে যায়, শিক্ষার হাল ভাল নয়, স্বাস্থ্যের হাল ভাল নয় – এসব খবরও বাসি। কিন্তু ওসবে আমরা আমল দেব কেন? পেল্লাই কারখানা হলেই যে প্রচুর কর্মসংস্থান হয় না, উন্নয়ন হয় না সেসব আমরা এখনো টের পাইনি যে। তাই তো পশ্চিমবঙ্গে সিঙ্গুর এখনো রাজনৈতিক চাপান উতোরের বিষয়।

আরও পড়ুন কী ঢাকছে সরকারি চোলি? কেনই বা ঢাকছে?

সংবাদসংস্থা আইএএনএস জুন মাসে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, গুজরাটে বেকার সমস্যা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে গ্রাম পঞ্চায়েতের এক্সিকিউটিভ প্রধানের ৩৪০০ শূন্য পদে চাকরির জন্য ১৭ লক্ষ আবেদন পত্র জমা পড়েছিল। কিন্তু গুজরাট বিধানসভার আসন্ন নির্বাচনের প্রচারের দিকে নজর রাখলেই বোঝা যায় ওসব কোনো ইস্যু নয়। ইস্যু হল হিন্দুত্ব। অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলছেন টাকায় লক্ষ্মী, গণেশের ছবি ছাপানো উচিত আর বিজেপির বিদায়ী মন্ত্রিসভা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লাগু করার জন্য কমিটি গঠন করছে। সেতু ভেঙে পড়া এমন কী ব্যাপার? জীবন মৃত্যু তো ভগবানের হাতে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত