আমিষ খান বলে গাঙ্গুলি জেঠিমা, ঘোষ কাকুও দেশের মানুষ নন?

এই যে বাঙালি পাড়ায় এসে পড়ছে আপনার মত অবাঙালি নিরামিষাশী হিন্দু পড়শি, এখন থেকে কি তারা আঘাত পেল কিনা খেয়াল রেখে আমিষ খেতে হবে?

প্রধানমন্ত্রী সমীপেষু,

আপনাকে যা লিখছি তার অনেকটাই ব্যক্তিগত। কারণ রাজনীতিটাকে একেবারে ব্যক্তিগত পরিসরে নিয়ে এসেছেন আপনিই। মানে গত শুক্রবার (১২ এপ্রিল, ২০২৪) উধমপুরে আপনার বক্তৃতা শোনার আগে পর্যন্ত খাদ্যাভ্যাসকে তো আমরা ব্যক্তিগত ব্যাপার বলেই জানতাম। একথা ঠিক যে ২০১৫ সালেই আমরা জেনে গেছিলাম, বাড়ির ফ্রিজে কিসের মাংস রাখা আছে তা ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়। তার জন্য একটা জলজ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেলা যেতে পারে। কিন্তু তখন আমরা নিশ্চিন্ত ছিলাম এই ভেবে যে একমাত্র গরুর মাংসই মৃত্যুর কারণ হতে পারে, অন্যান্য প্রাণির মাংস বা মাছ খাওয়া নিয়ে কেউ কিছু বলবে না। আমরা অনেকে একথা ভেবেও নিশ্চিন্ত ছিলাম যে ওসব কিছু গুন্ডা বদমাইশের কাজ। সরকার কে কী খেল তা নিয়ে মাথা ঘামায় না, আর সমাজবিরোধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্যে তো আইন আদালত আছেই। গত নয় বছরে অবশ্য আমরা বুঝে গেছি যে গোমাংস খাওয়া, বিক্রি করা বা গোমাংস হয়ে ওঠার জন্য গরু নিয়ে যাওয়ার সন্দেহে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলা তেমন গুরুতর অপরাধ নয়। দিব্যি জামিন পাওয়া যায়, চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়াও এ দেশের অন্যান্য অপরাধের মতই অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ। তবু আমাদের মধ্যে যারা গরুর মাংস খায় না তারা নিশ্চিন্ত ছিল। ও জিনিস তো এমনিই আমাদের খাওয়া বারণ। ‘প্রগতিশীল সাজতে’ না খেলেই কোনো অশান্তি নেই, কারোর আক্রমণের মুখে পড়তে হবে না। থানা পুলিস কোর্ট কাছারিহীন নিশ্চিন্ত জীবন কাটিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু শুক্রবার নির্বাচনের প্রচারে আপনি যা বলেছেন তাতে তো নিশ্চিন্তে আর থাকা যাচ্ছে না।

ব্যক্তিগত বিশ্বাস যা-ই হোক, কলার তুলে যে পরিচয়ই দিই না কেন, জন্মসূত্রে আমরা যারা হিন্দু, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দু, তাদের তো আর নিশ্চিন্তে থাকার উপায় রইল না।

আইনে কিছু খাওয়া বারণ নেই, আপনিও কাউকে কিছু বারণ করেন না। কিন্তু শ্রাবণ মাসে যারা খাসির মাংস রান্না করে তার ভিডিও প্রচার করে – তারা দেশের মানুষকে আঘাত করে। তাদের আসল উদ্দেশ্যই নাকি দেশের মানুষকে আঘাত করা, মোগলদের মত। মোগলরা ভারত আক্রমণ করে এখানকার রাজাদের হারিয়েই সন্তুষ্ট হত না, মন্দির ভেঙে দিয়ে, ধর্মস্থান নষ্ট করে তবে তারা শান্তি পেত। ‘মাটন’ খাওয়া লোকেরাও সেইরকম। তারা দেশের লোককে উত্যক্ত করতেই চায় এবং নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক পাকা করতে চায়। এও বলেছেন যে ব্যাপারটা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই আপনার দায়িত্ব এসব নিয়ে কথা বলা।

এরপর আর নিশ্চিন্ত থাকা যায়?

প্রথমত, আমি আমিষ রান্না করছি তার গন্ধেও নয়, স্রেফ ছবিতেই যদি কারোর মনে আঘাত লাগে, তাহলে তো ও জিনিস রান্না করাই বন্ধ করে দিতে হবে। নয়ত মাদক দ্রব্যের মত লুকিয়ে খেতে হবে। কারণ যার মনে আঘাত লাগবে সে যে দল পাকিয়ে এসে আমাকেও আখলাক আহমেদ বা পেহলু খান করে দেবে না তার গ্যারান্টি তো ‘মোদী কি গ্যারান্টি’-র মধ্যে পড়ে না দেখছি। তারপর কে কোন মাসে আমিষ খায় না তা ক্যালেন্ডারে দাগিয়ে রাখতে হবে। বাঙালি হিন্দুরা শ্রাবণ মাসে নিরামিষ খায় না, আপনি যে সময়টাকে নবরাত্রি বলেন তখন তো মোটেই নিরামিষ খায় না। অধিকাংশ বাঙালি হিন্দুর ধর্মাচারে তেমন কিছু বলাই নেই। তবে অনেকে সপ্তাহে একদিন বা দুদিন নিরামিষ খায় আর পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসে আমিষ গন্ধ। কিন্তু তা নিয়ে কেউ কোনোদিন ঝগড়া করতে যায় না। আমি আজ নিরামিষ খাচ্ছি, তাই তোমাকেও নিরামিষ খেতে হবে – এমন দাবি বাঙালি হিন্দুরা কখনো করেনি। কিন্তু আজকাল বাঙালি পাড়া বলে আলাদা করে কিছু থাকছে না পশ্চিমবঙ্গের শহর আর শহর ঘেঁষা মফস্বলে। থাকা যে উচিত তাও নয়। সবাই সর্বত্র সম্পত্তি ভাড়া নেবে বা কিনবে – তবেই না দেশ সবার। সেইজন্যেই তো কাশ্মীরের জন্যে সংবিধানে থাকা ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করিয়েছেন আপনি। তা এই যে বাঙালি পাড়ায় এসে পড়ছে আপনার মত অবাঙালি নিরামিষাশী হিন্দু পড়শি, এখন থেকে কি তারা আঘাত পেল কিনা খেয়াল রেখে আমিষ খেতে হবে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই এসে পড়ে দ্বিতীয় প্রশ্ন। দেশের মানুষ বলতে কাদের বোঝাচ্ছেন? কেবল যারা শ্রাবণ মাসে বা সারাবছর নিরামিষ খায় তারাই দেশের মানুষ? বাকি সবাই বাইরের লোক? তাহলে কি দেশব্যাপী এনআরসি করার সময়ে এও খতিয়ে দেখা হবে যে কে কে আমিষ খায়? তারপর কেবল নিরামিষাশীরাই পাবে নাগরিকের তকমা? মোগলদের মন্দির ভাঙার সঙ্গে আমিষ রান্নার যে প্রতিতুলনা আপনি করেছেন তা-ই বা কী করে নিশ্চিন্তে থাকতে দেয়? প্রথম মোগল সম্রাট বাবর যখন ভারতে এসে সাম্রাজ্য স্থাপন করেন তখন দিল্লির মসনদে কোনো হিন্দু রাজা ছিলেন না, ছিলেন পাঠান ইব্রাহিম লোদী। তিনিও মুসলমান। সুতরাং তাঁকে হারিয়ে মন্দির ভেঙে তবেই সন্তুষ্ট হওয়ার কোনো ব্যাপার ছিল না। মন্দির ভাঙলে লোদীর কী? কিন্তু সেকথা থাক। ধরে নিলাম আপনি পরবর্তীকালে ঔরঙ্গজেবের হাতে মন্দির ধ্বংসের কথা বোঝাতে চেয়েছেন। ইতিহাস তো আপনার বিষয় নয়, আপনার বিষয় হল ‘এন্টায়ার পলিটিকাল সাইন্স’। সুতরাং ওটুকু বাদ দিলাম। কিন্তু কথা হল, আপনি কি বলতে চেয়েছেন লালুপ্রসাদ আর রাহুল গান্ধীর মত যারা শ্রাবণ মাসে আমিষ খায় তারা এ দেশের মানুষ নয়?

আপনার সাঙ্গোপাঙ্গরা অনেকেই আগে বলেছে বাঙালির মাছ খাওয়ার অভ্যেসটা মোটেই ভদ্রজনোচিত নয়। ২০১৭ সালে হঠাৎ ‘অল ইন্ডিয়া ফিশ প্রোটেকশন কমিটি’ নামে এক সংগঠনের উদয় হয় সোশাল মিডিয়ায়। তারা বলতে থাকে যে বিষ্ণু যেহেতু মৎস্যাবতারে অবতীর্ণ হয়েছিলেন একবার, সেহেতু মাছ খাওয়া মানে ভগবানকেই উদরস্থ করা। অতএব মাছ খাওয়া অনুচিত কাজ। আপনার দলের নেতা পরেশ রাওয়াল ২০২২ সালে গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে বলেছিলেন ‘গ্যাস সিলিন্ডারের দাম আবার কমে যাবে, মুদ্রাস্ফীতিও উপর-নিচ হবে, লোকে চাকরিও পেয়ে যাবে। কিন্তু রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু আর বাংলাদেশিরা আপনার পাশে এসে থাকতে শুরু করলে কী করবেন, যেমন দিল্লিতে থাকে? গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে কী করবেন? আগে বাঙালিদের জন্যে মাছ রান্না করবেন?’ সত্যি বলছি, মোদীজি। তখনো আমরা অনেকে ভেবেছিলাম বিপদ যা হবে রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশিদেরই হবে। অনেকেরই মাথায় ঢোকেনি যে রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি আর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির খাওয়াদাওয়ায় খুব তফাত নেই। পোশাক দেখে বা মুখের ভাষা শুনেও আলাদা করে চেনা শক্ত। এখন আপনি স্বয়ং মাছ মাংস যারা রান্না করে, খায় তাদের বিরুদ্ধে কামান দাগলে ভয় না পেয়ে উপায় কী?

ভুল বুঝবেন না। মুসলমান, খ্রিস্টান, আদিবাসীদের কী হবে তা নিয়ে ভাবছি না। ২২ জানুয়ারি অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধনের দিনই তো আপনি বলে দিয়েছেন যে নতুন যুগের সূচনা হল। এই যুগে হিন্দু বাদে অন্য ধর্মের লোকেদের তো তা-ই খেতে হবে যা হিন্দুরা খায়। যা হিন্দুরা খায় না তা খাওয়া যে চলবে না সে আর বলতে? কিন্তু আপনার শুক্রবারের ভাষণ শুনে আশঙ্কা হচ্ছে অনেক হিন্দুও যে মাছ মাংস কবজি ডুবিয়ে খায় তা আপনি জানেন না। আপনার দোষ নয়। হয়ত দিলীপবাবু, সুকান্তবাবু, অগ্নিমিত্রা দেবীরা আপনাকে বলেননি। তাই ভাবলাম একটু জানিয়ে দিই। আর পাঁচজনের কথা তো বলতে পারি না, নিজের কথাই বলি। ওই যে বললাম – ব্যাপারটা ব্যক্তিগত।

আমার ছোটবেলায় স্কুলমাস্টারদের মাইনে লোককে বলার মত ছিল না বলে বাড়িতে মাছ প্রতিদিন হত না। মাংস হত বাবার মাইনে পাওয়ার সপ্তাহে। বাড়িতে টেলিফোন থাকার প্রশ্নই নেই। তাই সুদূর বর্ধমান জেলার গুসকরা থেকে আমার বড়মামা এসে পড়তেন বিনা নোটিসে। পোস্টকার্ড লিখতেন, কিন্তু সেটা সাধারণত এসে পৌঁছত মামা ফিরে যাওয়ার পরে। একাধিকবার তিনি এসে পড়েছেন সরস্বতীপুজোর দিন বেশ রাতে। সেদিন হয়ত আমাদের মেনু – ডাল আর আলুসেদ্ধ। কিন্তু দাদাকে তাই খাওয়ালে স্বামীর মান থাকে না। তখন কী করতেন আমার মা? টুক করে পিছনের উঠোন পেরিয়ে চলে যেতেন গাঙ্গুলিজেঠুর বাড়ি। তাঁর বাড়িতে প্রতিবার বড় করে সরস্বতীপুজো হত আর সে পুজোর ভোগে খিচুড়ির সঙ্গে থাকত জোড়া ইলিশ। জেঠু নিজে হাতে রাঁধতেন। আমার মা গাঙ্গুলি জেঠিমার সঙ্গে গোপন আঁতাতে দু টুকরো ইলিশ আর একটু ঝোল নিয়ে আসতেন, বাবার মান বেঁচে যেত। গাঙ্গুলি বোঝেন তো? গঙ্গোপাধ্যায় – খাঁটি বামুন। অমিত শাহের ছেলে জয় শাহের বিশেষ পরিচিত সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বা আপনার দলের যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী অনির্বাণ গঙ্গোপাধ্যায় যেমন। আমার সেই পাড়ার জেঠু গলার পৈতেটা পুকুরে স্নান করতে গিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতেন।

আরও পড়ুন কতটা পথ পেরোলে পরে ভারত পাওয়া যায়?

সেইসময় বাড়িতে মাংস হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা হত মুরগির মাংস, কারণ লালুপ্রসাদ যে মাংস রান্না করছিলেন দেখে আপনি চটেছেন, তার দাম আরও বেশি। বসে থাকতাম শীতলাপুজোর অপেক্ষায়। কারণ আমাদের অঞ্চলের একটা বাড়ির নামই শীতলা বাড়ি। সে বাড়িতে প্রতিবছর ঘটা করে শীতলাপুজো হত। সে পুজোর ভোগই পাঁঠার মাংস। আমাদের নেমন্তন্ন থাকত, ফলে মাটির ভাঁড়ে চার-পাঁচ টুকরো মাংস জুটে যেত। বিশ্বাস করুন, সে বাড়ির লোকেরাও হিন্দু। পদবি সম্ভবত ঘোষ। আপনার দলের বর্ধমান দুর্গাপুর কেন্দ্রের প্রার্থী দিলীপবাবুর মত আর কি।

আর নিরামিষাশী বাঙালি হিন্দুর কথা শুনবেন? আমার বাবা শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় রাঁধতে পারতেন না, আমিও তখন ছোট। মা গুরুতর অসুস্থ হলেন। সে কদিন দুবেলা রেঁধে বেড়ে আমাদের খাওয়াতেন মণ্ডল কাকিমা। নিজের রান্নাঘরে নিজের বাসনকোসনে রেঁধে ভাত, ডাল, তরকারি দিয়ে যেতেন আর দুবেলাই মুখ শুকনো করে আমার বাবাকে বলতেন ‘দাদা, আপনাদের খাওয়ার খুব কষ্ট হচ্ছে, না? আমি তো মাছ খাওয়াতে পারছি না।’ বাবা জবাবে বলতেন ‘ছি ছি! আপনি রেঁধে দিচ্ছেন বলে খাওয়া হচ্ছে, বৌদি। মাছ খাচ্ছি না তো কী হয়েছে? এ বাড়িতে এমনিতেও রোজ মাছ হয় না।’ কাকিমা মাছ খাওয়াতে পারতেন না কারণ ওঁরা অনুকূল ঠাকুরের শিষ্য। শুধু বাড়িতে আমিষ রান্না হত না তা নয়, কাকিমার দুই ছেলের বিয়েতেও নিমন্ত্রিতদের নিরামিষই খাওয়ানো হয়েছিল। পাড়ায় অমন পরিবার ওই একখানাই। অথচ কোনোদিন তাঁদের মনে আঘাত লাগেনি আর সব বাড়িতে আমিষ রান্না হওয়ায়। মণ্ডল মানে বুঝলেন তো? হিন্দু কিন্তু। আপনার দলের হলদিয়ার বিধায়ক তাপসী মণ্ডলের মত।

বেদ, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদিতে কোন কোন মাংস খাওয়ার কথা লেখা আছে সেসব আলোচনায় আর গেলাম না মোদীজি। আপনি সাধু সন্ন্যাসী পরিবৃত হয়ে থাকেন, সেসব কি আর আপনার অজানা? শুধু শেষে আপনাকে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে আমাদের রেল বাজারের সবজির দরগুলো জানিয়ে দিই। একটু দেখে বলবেন, শেষমেশ যদি এ দেশে থাকতে গেলে আমিষ ছেড়েই দিতে হয়, এত দাম দিয়ে কিনে খেতে পারবে কজন? আপনি তো সাংবাদিক সম্মেলন করেন না। করলেও আমার মত চুনোপুঁটির সেখানে জায়গা হত না। তাই হাটখোলা চিঠিতেই এত কথা বলতে হল। অপরাধ নেবেন না।

ঝিঙে ১০০/- কেজি
পটল ৮০/- কেজি
বেগুন ৮০/- কেজি
উচ্ছে ৮০/- কেজি
ঢ্যাঁড়স ৭০/- কেজি
পেঁপে ৬০/- কেজি
লাউ ৪০/- কেজি
সজনে ডাঁটা ৮০/- কেজি
শশা ৮০/- কেজি
টমেটো ৩০/- কেজি
বিট, গাজর ৫০/- কেজি
বিন ৮০/- কেজি
ক্যাপসিকাম ১০০/- কেজি
লঙ্কা ১০০/- কেজি
কুমড়ো ৩০/- কেজি
চিচিঙ্গা ৮০/- কেজি
মিষ্টি আলু ৬০/- কেজি
কাঁচকলা ১৫/- জোড়া
চালকুমড়ো ৬০/- কেজি

ইতি

একজন আমিষাশী হিন্দু সাংবাদিক।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

যারা বিজেপিতে ভিজেছিল

১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর থেকে বদলের হাওয়া বুঝে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে বেশকিছু রাজনৈতিক দল বিজেপির সঙ্গে গলাগলি বা ঈষৎ আশনাই করেছে। সেই দলগুলোর আজকের অবস্থা খেয়াল করলে ওই কথাই মনে হবে – বুঝতে পারি না ওর বিষনজরে থাকা বেশি খারাপ, নাকি সুনজরে?

দেশের রাজধানী এমনিতেই রাজনৈতিক কানাকানির কারখানা, অরবিন্দ কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির পর তো আরও বেশি। তিনি কারান্তরালে থেকেই সরকার চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো সাংবিধানিক বাধা না থাকায় কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেও কিছু করে উঠতে পারছে না। পাশাপাশি রাজনৈতিক ভয়ও আছে। এমনিতেই নাকি দিল্লির মানুষ কেজরিওয়ালের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েছেন। গোদি মিডিয়ার ‘মুড অফ দ্য নেশন’ পোলে দেখা গেছে গতবারের মত দিল্লিতে লোকসভার সাতটা আসনের সাতটাই বিজেপির জেতার সম্ভাবনা প্রায় অন্তর্হিত। এখন রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে আম আদমি পার্টির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করলে যদি কেজরিওয়াল আরও সহানুভূতি পেয়ে যান! তাই ও পথে এখনো যায়নি নরেন্দ্র মোদীর সরকার। কেজরিওয়ালের আপ্ত সহায়ককে বহু পুরনো মামলা দেখিয়ে বরখাস্ত করা, খালি পদে অফিসার নিয়োগ না করা, লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে দিয়ে মন্ত্রিসভাকে ব্যতিব্যস্ত করা ইত্যাদি ঘুরপথেই হয়রান করছে। কানাকানির কারখানা বলছে, দল গঠনের সময় থেকে কেজরিওয়ালের সঙ্গে থাকা কোনো এক ওজনদার আপ নেতা নাকি দলত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন। ইতিমধ্যেই কেজরিওয়ালের মন্ত্রিসভার এক সদস্য পদত্যাগ করেছেন। কারণ হিসাবে যা দেখিয়েছেন তা ২০২১ সালে দলে দলে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়ার সময়ে পশ্চিমবঙ্গের অনেক নেতা যা বলেছিলেন তার কাছাকাছি। যদিও ইনি শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিজেপিতে যোগ দেননি। ওদিকে আপের আরেক তরুণ এবং প্রভাবশালী নেতা রাঘব চাড্ডা বহুদিন হল বেপাত্তা। বলিউড অভিনেত্রী পরিণীতি চোপড়াকে বিয়ে করার পর থেকে তিনি আমেরিকায় না ইউরোপে, কেউ জানে না। বস্তুত, দলের এই সংকট মুহূর্তে আপের দশজন রাজ্যসভার সাংসদের মধ্যে সাতজনই নীরব। কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির পরে আপ নেত্রী আতিশী মারলেনা দাবি করেছিলেন যে কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে এবং আরও কয়েকজন আপ নেতাকে গ্রেফতার করার ফন্দি এঁটেছে। শুক্রবার বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার তালে আছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, গোটা দলটাকেই তুলে দেওয়ার অভিলাষ পোষণ করছে বিজেপি। কেবল আপ নয়। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, একথা বুঝতে কারোরই কোনো অসুবিধা হচ্ছে না যে দেশে অন্য কোনো দল থাকুক তা প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর দল চায় না।

সবচেয়ে বেশি রাজ্যে বিজেপির লড়াই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। তাই আয়কর বিভাগকে দিয়ে বহু পুরনো রিটার্নে অসঙ্গতি দেখিয়ে নোটিস পাঠিয়ে তাদের টাকাপয়সা খরচ করার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আইনি পথে আবেদন করে লাভ হয়নি। পরে বোধহয় ব্যাপারটা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও অসন্তোষ প্রকাশ করায় সরকারের জ্ঞান হল যে এটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। তাই আপাতত আয়কর বিভাগ জানিয়েছে তারা নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে না। কংগ্রেসের পর বিজেপির সবচেয়ে বড় শত্রু অবশ্যই আপ। তারা দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে পরপর দুবার বিজেপিকে দুরমুশ করার পর পাঞ্জাবেও ক্ষমতায় এসেছে। আরও মুশকিল হল, দিল্লিতে তবু আপকে লোকসভায় বিজেপি পর্যুদস্ত করতে পেরেছিল। পাঞ্জাবে আপ অল্পদিনের মধ্যেই প্রবেশ করে ক্ষমতায় পৌঁছে গেল। ওদিকে বিজেপি বহুবছর চেষ্টা করেও এখন ভোঁ ভাঁ হয়ে গেছে। এমনকি মোদী সরকারের কৃষকবিরোধী অবস্থানের প্রতিবাদে দীর্ঘদিনের সঙ্গী পাঞ্জাবের আঞ্চলিক দল, শিরোমণি অকালি দলও বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করেছে। অতি বড় বিজেপি সমর্থকও জানেন, লোকসভা নির্বাচনে পাঞ্জাবে বিজেপি শূন্য ছাড়া কিছুই পাবে না। তাই আপ হল দ্বিতীয় লক্ষ্য।

আপের দুই, তিন এবং চার নম্বর নেতা মনীশ সিসোদিয়া, সত্যেন্দ্র জৈন এবং সঞ্জয় সিংকে দীর্ঘদিন বন্দি করে রাখা হয়েছে। মামলাগুলোর কোনো অগ্রগতি নেই, একটি টাকাও উদ্ধার হয়নি। সঞ্জয়কে জামিন দেওয়ার পিছনে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অন্যতম যুক্তি ছিল সেটাই। এত সবেও আপ অনড় দেখেই হয়ত একেবারে এক নম্বর নেতাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। আপের গুরুত্বপূর্ণ নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, কেজরিওয়াল পদত্যাগ করলেই আপের বাকি নেতৃত্বকেও গ্রেফতার করা হবে। তারপর একই কায়দায় পাঞ্জাবের সরকারকেও ক্ষমতাচ্যুত করা হবে। আগেই এ চেষ্টা ঝাড়খণ্ডে করা হয়েছিল, কিন্তু সাফল্য আসেনি। এখন এভাবে দুটো রাজ্যের সরকার ফেলে দেওয়া গেলে কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া, তেলেঙ্গানার রেবন্ত রেড্ডি, তামিলনাড়ুর এম কে স্ট্যালিন, পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির মত সমস্ত বিরোধী দলের মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেফতার করে সরকার ফেলে দেবে বিজেপি। অর্থাৎ এক দেশ এক নির্বাচন তো পরের কথা, ২০২৪ লোকসভাতেই এক দল এক নির্বাচন সম্ভব হবে। অতজন নেতা গ্রেফতার হয়ে গেলে নির্বাচনের প্রচার করবে কে আর সংগঠন চালাবে কে? হতোদ্যম বিরোধী দলগুলোকে দেখে ভোটই বা দেবেন কোন ভোটার? তাঁদের মধ্যেও কি আতঙ্ক কাজ করবে না?

বলা যেতেই পারে, কেজরিওয়ালের পদত্যাগ না করাকে সমর্থন করতে গিয়ে সৌরভ কষ্টকল্পিত আতঙ্ক সৃষ্টি করছেন সাধারণ মানুষের মনে। সত্যিই ওরকম একনায়কতন্ত্র মোদীর লক্ষ্য হলে আদৌ নির্বাচন করাচ্ছেন কেন? এ প্রশ্নের উত্তর কিন্তু খুব সোজা। আজকের একনায়করা কেউ একনায়ক তকমাটা পছন্দ করেন না। তাঁরা চান একনায়কের লাগামহীন ক্ষমতার সঙ্গে গণতন্ত্রের গ্ল্যামার। একজন শাসক ধর্মে মুসলমান বা রাজনীতিতে কমিউনিস্ট না হলে বাকি পৃথিবীর কাছে গণতান্ত্রিক বলে পরিচিতি পাওয়া খুব কঠিনও নয়। তাই তুরস্কের রচপ তায়িপ এর্দোগান বা রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনও নিজের দেশে নির্বাচন করান, আর বিশ্বগুরু মোদী করাবেন না?

কোনো দেশে একনায়কের জন্ম হঠাৎ করে হয় না। পরিবারে, সমাজে দীর্ঘকাল ধরে একনায়কত্বের প্রতি সমর্থন তৈরি না হলে একটা বিরাট গণতান্ত্রিক দেশের মানুষ রাষ্ট্রক্ষমতায় একনায়ককে চাইবেন কেন? কোনো সন্দেহ নেই, ভারতে পরিবার থেকে শুরু করে কর্পোরেট অফিস পর্যন্ত সর্বত্র একনায়করা বিচরণ করে। তেমন একজন বসের অধীনে কাজ করার সময়ে আমার এক তিতিবিরক্ত সহকর্মী একটা মন্তব্য করেছিলেন, যা বিজেপি-আরএসএসের ক্ষেত্রে দারুণ লাগসই। ‘বুঝতে পারি না ওর বিষনজরে থাকা বেশি খারাপ, নাকি সুনজরে?’ ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর থেকে বদলের হাওয়া বুঝে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে বেশকিছু রাজনৈতিক দল বিজেপির সঙ্গে গলাগলি বা ঈষৎ আশনাই করেছে। সেই দলগুলোর আজকের অবস্থা খেয়াল করলে ওই কথাই মনে হবে – বুঝতে পারি না ওর বিষনজরে থাকা বেশি খারাপ, নাকি সুনজরে?

সেই দলগুলোর কথা আজ স্মরণ করা জরুরি। কারণ ভারত জুড়ে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি রাতারাতি এতখানি শক্তি সঞ্চয় করেনি। বহু রাজ্যে তাদের রাজনৈতিক, এবং তার চেয়েও বড় কথা সামাজিক স্বীকৃতি পাইয়ে দিয়েছে এই দলগুলো। নইলে সংঘ পরিবারের নানা সামাজিক সংগঠনের ৩৬৫ দিনের কাজ সত্ত্বেও এত নির্বাচনী সাফল্য সম্ভব হত কিনা তা তর্কসাপেক্ষ। কোন দলগুলোর কথা বলছি? আসুন, একেবারে ভারতের মানচিত্রের উপর দিক থেকে শুরু করা যাক।

ন্যাশনাল কনফারেন্স, জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি
ন্যাশনাল কনফারেন্স কাশ্মীর উপত্যকার সুপ্রাচীন দল। কাশ্মীরের ভারতভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শেখ আবদুল্লার। স্বাধীন ভারতে তিনি, তাঁর ছেলে ফারুক এবং নাতি ওমর – তিনজনেই দলের নেতা হিসাবে জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। ১৯৯৬ পর্যন্ত ফারুক ছিলেন বিজেপির সোচ্চার সমালোচক। অনেক পশ্চিমবঙ্গবাসীর হয়ত মনে আছে, ১৯৯৬ সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে বামপন্থীদের উদ্যোগে কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে কংগ্রেস ও বিজেপিবিরোধী ফ্রন্টের যে সমাবেশ হয়েছিল, তাতে ফারুক বিজেপির বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর দল অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) সরকারকে সমর্থন দেয়। তখন ফারুকের দল কাশ্মীরে ক্ষমতাসীন।

কাশ্মীরের রাজনীতিতে ন্যাশনাল কনফারেন্সের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হল মুফতি মহম্মদ সঈদ প্রতিষ্ঠিত দল জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি)। ১৯৮৯ সালে জনতা দল নেতা ভি পি সিংয়ের নেতৃত্বে কেন্দ্রে যে সরকার হয়েছিল সেই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মুফতি সাহেব (এ পর্যন্ত ভারতের একমাত্র মুসলমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)। সেই সরকারের প্রতি বিজেপিরও সমর্থন ছিল বটে, কিন্তু সে ছিল সাড়ে বত্রিশ ভাজা সরকার। বামপন্থীরাও সেই সরকারকে সমর্থন করেছিল। উপরন্তু রামমন্দিরের দাবিতে রথযাত্রায় বেরনো লালকৃষ্ণ আদবানিকে বিহারের লালুপ্রসাদ (তখন জনতা দলেই) সরকার গ্রেফতার করলে বিজেপি ভিপির সরকারের থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে। এছাড়া পিডিপির কখনো বিজেপির সঙ্গে সখ্য হয়নি। বরং মুফতি নিজে সুদূর অতীতে যেমন ন্যাশনাল কনফারেন্সে ছিলেন, তেমনি কংগ্রেসেও ছিলেন। কিন্তু সেই মুফতিই ২০১৪ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গঠন করেন। ২০১৬ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সেই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি। তারপর মুখ্যমন্ত্রী হন তাঁর মেয়ে মেহবুবা। বিজেপি সেই সরকার ফেলে দেয় ২০১৮ সালের ১৯ জুন।

তারপর থেকে কাশ্মীরের মানুষ কীরকমভাবে বেঁচে আছেন আমরা সবাই জানি। এই দুই দলের অবস্থাও তথৈবচ। ২০১৯ সালের ৫ অগাস্ট কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করে দেওয়ার পরে গোটা কাশ্মীরকে যখন জেলখানা করে তোলা হয়েছিল, তখন আবদুল্লা বা মুফতিরা বিজেপিসঙ্গের ইতিহাস থাকার জন্যে কোনো বিশেষ সুবিধা পাননি। তাঁদেরও গৃহবন্দি করে রাখা হয়। এখন ফারুক-ওমরের মত মেহবুবাও ঠুঁটো জগন্নাথ। দুই দলেরই সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়েছে, দুই দলই ইন্ডিয়া ব্লকের মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী জোট তৈরি করার প্রশ্নে দুপক্ষই অনড়। ফলে কাশ্মীরের চারটে লোকসভা আসনে দুই দলই প্রার্থী দিয়ে বসে আছে।

শিরোমণি অকালি দল
ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম পাঞ্জাবের এই আঞ্চলিক দল। দীর্ঘ ইতিহাস, ধর্মীয় সংযোগ এবং পাঞ্জাব রাজ্যের গঠনেও গুরুতর ভূমিকা থাকায় এই দলের পাঞ্জাবে বিপুল সমর্থন ছিল দীর্ঘকাল। এই দলও প্রয়াত প্রকাশ সিং বাদলের নেতৃত্বে বিজেপির জোটসঙ্গী হয়েছিল সেই ১৯৯৬ সালেই, অর্থাৎ বাজপেয়ী সরকারের আমলে। পরিণতি কী?

পাঞ্জাবি পরিচিতি এবং পাঞ্জাবিদের স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখাই যে দলের মতাদর্শ, নরেন্দ্র মোদীর আমলে তিনটে কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে কৃষক আন্দোলনের সময়ে সেই দলের অবস্থা হয়েছিল শ্যাম রাখি না কুল রাখি। শেষমেশ তারা কুল রাখারই সিদ্ধান্ত নেয়। নেত্রী হরসিমরত কৌর বাদল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন এবং তাঁর দল এনডিএ ছেড়ে বেরিয়ে আসে। বিজেপি কিন্তু চেয়েছিল লোকসভা নির্বাচনে আবার জোট হোক। অকালি দল পাত্তা দেয়নি। তারা বড় দেরিতে বুঝতে পেরেছে যে বিজেপি অন্য দলের ঘাড়ে পা দিয়ে উপরে ওঠায় বিশ্বাসী। বিজেপির সঙ্গে থাকায় যা হয়েছে তা হল পাঞ্জাবিদের স্বার্থরক্ষাকারী দল হিসাবে বাদল পরিবারের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে গেছে। পাঞ্জাবের কংগ্রেস দুর্বল হয়ে পড়লেও ফাঁক ভরাট করতে ঢুকে পড়েছে আপ। এখন শিরোমণি অকালি দল ভুগছে অস্তিত্বের সংকটে।

বহুজন সমাজ পার্টি
দ্বিখণ্ডিত হওয়ার পরেও ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশ, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যও বটে। কারণ এই রাজ্যেই অযোধ্যা, কাশী, মথুরা। রাম না থাকলে যেমন রামায়ণ লেখা হত না, তেমনি এই জায়গাগুলো না থাকলে সারা ভারতের হিন্দুদের মনে খতরার ধারণা তৈরি করাও সম্ভব হত না সংঘ পরিবারের পক্ষে। বাবরি মসজিদ বাঁচাতে সমাজবাদী পার্টির সরকার গুলি চালাল, কিছু মানুষের মৃত্যু হল – তবে না রণহুঙ্কারে পরিণত হল ‘মন্দির ওয়হি বনায়েঙ্গে’ স্লোগান? এই সংঘর্ষে মতাদর্শের দিক থেকে ভাবলে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংঘ পরিবারের বিপক্ষেই থাকার কথা ছিল আম্বেদকরপন্থী কাঁসিরামের হাতে তৈরি বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি)। কিন্তু ১৯৯৩ সাল থেকে সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে জোট সরকার চালানোর পর কাঁসিরামের উত্তরাধিকারী মায়াবতী মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং যাদবের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করে ১৯৯৫ সালের ২ জুন সমর্থন প্রত্যাহার করেন। কী আশ্চর্য! ঠিক পরদিনই বিজেপির সমর্থনে সরকার গঠন করেন মায়াবতী। সেই থেকে বহুজন সমাজ পার্টির চিরশত্রু হয়ে যায় সমাজবাদী পার্টি, বিজেপি নয়। যদিও বিজেপি তাঁর সরকারকে সে বছরের অক্টোবর মাসেই ফেলে দেয়। তারপরেও তিনবার উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মায়াবতী, এমনকি ফের বিজেপির সমর্থনেও। শুধু ২০০৭-১২ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুরো মেয়াদ কাটাতে পেরেছিলেন।

ভারতের আর পাঁচটা দলের মত মায়াবতীর দলের বিরুদ্ধেও বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ আছে। কিন্তু তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বে উত্তরপ্রদেশে যে নেহাত খারাপ উন্নয়ন হয়নি তাও স্বীকার করেন অনেক বিরোধী। তবু আজ ‘বহেনজি’ উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে গেছেন। জাতপাতের সমীকরণ ভেঙে দিয়ে যে অভিন্ন হিন্দু পরিচিতি তৈরি করার রাজনীতি বাজারে এনেছে মোদী-অমিত শাহ-যোগী আদিত্যনাথের বিজেপি, তাতে মায়াবতীর চিরাচরিত নিম্নবর্গীয় হিন্দু ও মুসলমান ভোটাররা তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন। স্পষ্টতই বিজেপির সঙ্গে জোট করে লাভ হয়েছে বিজেপির, বিএসপির নয়। দুর্নীতির অভিযোগগুলোকে হাতিয়ার করে একদা ভারতীয় রাজনীতির দাপুটে নেত্রী মায়াবতীকে এতটাই নখদন্তহীন করে দেওয়া গেছে যে সংসদে দাঁড়িয়ে তাঁর দলের সাংসদ দানিশ আলিকে মুসলমান বলে যা খুশি গালাগালি দিয়ে গেলেন বিজেপির রমেশ বিধুরী। বহেনজি রা কাড়লেন না। স্বভাবতই দানিশ সম্প্রতি কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে মায়াবতী কী আশায় একলা লড়ছেন তা কেউ জানে না। কংগ্রেস কিন্তু তাঁকে ইন্ডিয়া ব্লকে যোগ দিতে ডেকেছিল।

তৃণমূল কংগ্রেস
উপরে উল্লিখিত কাশ্মীরের দল দুটো যদি বলে বিজেপির হাত ধরা ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না, তাহলে হেসে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ সেই জওহরলাল নেহরুর আমলে অন্যায়ভাবে শেখ আবদুল্লাকে কারারুদ্ধ করার সময় থেকেই দিল্লিতে যে দলের সরকারই থাক, শ্রীনগরের সরকারকে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়নি (অনুচ্ছেদ ৩৭০ কাশ্মীরিদের অধিকারের চেয়ে বাকি ভারতের কাছে বদনাম দিয়েছে বেশি)। একাধিক মহলের মতে কাশ্মীরের মানুষকে সন্ত্রাসবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে একের পর এক কেন্দ্রীয় সরকারের কারচুপি করা নির্বাচন। শক্তি সামন্তের কাশ্মীর কি কলি (১৯৬৪) দেখে যে কাশ্মীরকে চেনা যায়, আসল কাশ্মীর যে তার চেয়ে বিশাল ভরদ্বাজের হায়দর (২০১৪) ছবিরই বেশি কাছাকাছি তা বুঝতে কয়েকশো বই পড়ার প্রয়োজন হয় না। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়তে হয় না। চোখ, কান আর মন খোলা রাখলেই বোঝা যায়। তাই মেহবুবা যখন সাংবাদিক সঙ্কর্ষণ ঠাকুরকে বলেন যে বিজেপির সঙ্গে জোট করার তিনি বিরোধী ছিলেন এবং বাবা মুফতি তাঁকে বলেন, এটা না করে কোনো উপায় নেই – তখন তাঁকে বিশ্বাস করা যায়। পরবর্তী ঘটনাবলী প্রমাণ করছে, মুফতি ভুল ভাবেননি। বাজপেয়ী সরকারের আমলেও কার্গিল যুদ্ধ বাদ দিলে কাশ্মীর যে মোটামুটি শান্ত ছিল সে হয়ত ন্যাশনাল কনফারেন্স ওই সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল বলেই। অন্য দুটো দল, অর্থাৎ শিরোমণি অকালি দল আর বহুজন সমাজ পার্টি কিন্তু এই যুক্তি দিতে পারে না। তবে উভয়ের রাজনীতিরই জন্ম কংগ্রেসবিরোধিতা থেকে। ভারতের আরও অনেক রাজ্যের আঞ্চলিক দলেরই তাই। তৃণমূল কংগ্রেস এই তালিকায় সম্ভবত একমাত্র দল যাদের ইতিহাস উলটো।

এই দলের জন্ম কংগ্রেস ভেঙে এবং মূল রাজনীতি বামবিরোধিতা। নিম্নবর্গীয় মানুষের জন্য সামাজিক ন্যায়ের দাবি বা বাঙালি পরিচিতি সত্তাও তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মের কারণ নয়। যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করছিলেন কংগ্রেস যথেষ্ট বামবিরোধিতা করছে না, তাই তিনি ক্রমশ জঙ্গি আন্দোলনের পথ নেন। তা নিয়ে রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘাত আর অজিত পাঁজার মত কয়েকজন বর্ষীয়ান নেতার সমর্থন লাভই তৃণমূলের জন্মের কারণ। জনশ্রুতি হল, তাতেও তৃণমূলের জন্ম হত না কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির সমর্থন না থাকলে। কিন্তু জনশ্রুতির কথা থাক, যা সর্বসমক্ষে আছে তা নিয়েই আলোচনা করি। শেষপর্যন্ত মমতার যা ঘোষিত একমাত্র এজেন্ডা – বামফ্রন্ট সরকারের অপসারণ – প্রায় এক যুগ বিজেপির হাত ধরেও বাস্তবায়িত করা যায়নি। বরং সেই পর্বে তৃণমূলকে ২০০৪ লোকসভা এবং ২০০৬ বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। শেষপর্যন্ত কংগ্রেসের হাত ধরেই ২০১১ সালে মমতার লক্ষ্যপূরণ হয়।

কিন্তু মমতার সঙ্গে জোট করে বিজেপির নিঃসন্দেহে লাভ হয়েছে। কখনো পশ্চিমবঙ্গের এই কোণে, কখনো ওই কোণে একটা কি দুটো বিধানসভা আসন জেতা বিজেপি এ রাজ্য থেকে সাংসদ পেয়েছে ওই জোট তৈরি হওয়ার পর। ২০১১ সালের পর থেকে কেবল বিজেপির নয়, পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের সংগঠনও বেড়েছে হু হু করে। দক্ষিণবঙ্গে কংগ্রেস ক্রমশ তৃণমূলে মিশে গেছে, সরাসরি সংঘাতে বামপন্থীরাও এঁটে উঠতে পারেনি শাসক দলের সঙ্গে। এত বড় শূন্যতা ভরাট করে আজ পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। এ রাজ্যের রাজনীতিতে যা বছর বিশেক আগেও অভাবনীয় ছিল, আজ ঠিক তাই ঘটছে। বহু আসনে স্রেফ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যাচ্ছেন ভোটাররা।

কেউ বলতে পারেন, বিজেপির লাভ হয়েছে না হয় বোঝা গেল। তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষতি হল কোথায়? বিলক্ষণ ক্ষতি হয়েছে। প্রথমত, তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়া আর বিজেপি থেকে তৃণমূলে আসার রাজপথ তৈরি হয়ে গেছে। ফলে কখন কোন ঘটনার ভিত্তিতে, কোন প্রলোভনে বা আতঙ্কে দলটা তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়বে তা মমতা নিজেও সম্ভবত জানেন না। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগে যাঁরা ‘দলে থেকে কাজ করতে পারছি না’ বলে চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ফিরে এসেছেন। তাঁদের যুক্তি না হয় বোঝা গেল। তাঁরা যে কোনো মূল্যে জয়ী দলে থাকতে চান, তৃণমূল হেরে গেলে ফিরতেন না। কিন্তু মমতা যে তাঁদের ফিরিয়ে নিলেন, এ থেকে কি প্রমাণ হয় না যে তাঁর ঘর আসলে তাসের ঘর? ক্ষমতার ঠেকনা দিয়ে খাড়া রাখা হয়েছে, সরিয়ে নিলেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে? মুকুল রায় যে শ্রডিংগারের বেড়ালের মত বিজেপিতেও আছেন আবার তৃণমূলেও আছেন হয়ে থেকে গেলেন – তাও কি এটাই প্রমাণ করে না যে তৃণমূল নেতৃত্বের আশঙ্কা, একটা তাস এদিক ওদিক হলেই বাকিগুলো ভেঙে পড়বে? এমন নড়বড়ে সরকার চালাতে কি মমতা পছন্দ করেন? কোনো নেতারই কি পছন্দ করার কথা? ইডি, সিবিআই, আয়কর বিভাগের জ্বালায় ব্যতিব্যস্ত হওয়ার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম।

বিজেপি প্রধান বিরোধী হয়ে যাওয়ায় শাসক হিসাবে তৃণমূলের কিছু সুবিধা নিশ্চয়ই হয়েছে। যেমন, বিধানসভায় কাজের বিতর্ক প্রায় হয়ই না। রাজ্য সরকারের কাজ নিয়ে বিরোধী দলনেতা যত কৈফিয়ত চান সবই বিধানসভা ভবনের বাইরে বিভিন্ন চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে। তাছাড়া রাজ্য রাজনীতির আলোচ্য বিষয়গুলোই এমন হয়ে গেছে যাতে কাজের কাজ না করলেও চলে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা প্রায় বন্ধ। বাজেটেও কেবল চালু ভাতাগুলোর টাকার অঙ্কটা বাড়িয়ে দিলেই চলে যায়। অযোধ্যার মন্দিরের পালটা দীঘার মন্দিরের কথা হয়। ইমাম ভাতায় কেউ চটে গেলে পুরোহিত ভাতা দিলেই যথেষ্ট। রামনবমীর বিপরীতে বজরংবলী পুজো হয়। তাতেও কাজ হচ্ছে না বুঝলে রামনবমীতে সরকারি ছুটি দেওয়া হয়। তারপরেও খোঁজ করতে হয়, চিরশত্রু বামেরা কত ভোট পাবে। এত নড়বড়ে, পরনির্ভরশীল, তৃণমূল কংগ্রেস ১৯৯৬ সালেও ছিল না। এই কারণেই ইন্ডিয়া ব্লকে মমতা ছিলেন বটে, কিন্তু এখনো আছেন না নেই, তা দেবা ন জানন্তি।

এখানে একটা মজার কথা স্মর্তব্য। বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। বহু বছর পরে দেখা যায়, আজীবন কংগ্রেসি হলেও আরএসএস তাঁকে রীতিমত শ্রদ্ধা করে। নিজেদের অনুষ্ঠানে বক্তা হিসাবে আমন্ত্রণ জানায়, তিনি সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করে বক্তৃতাও দিয়ে আসেন। ২০১৯ সালে বিজেপির সরকার তাঁকে ভারতরত্ন পুরস্কারও দেয়।

জনতা দল ইউনাইটেড
বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে আর যা-ই ঘটে যাক না কেন, সূর্য পূর্ব দিকে উঠবেই আর নীতীশ কুমারই বিহারের মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। ব্যাপার কতকটা এরকমই দাঁড়িয়েছে। দাঁড়াত না, যদি মণ্ডল রাজনীতির সন্তান, লালুপ্রসাদের এক সময়কার সতীর্থ নীতীশ বারবার বিজেপির সঙ্গে ঘর না করতেন। বিহারে গত বিধানসভা নির্বাচনে জিতে আরও একবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েও একসময় তাঁর আশঙ্কা হল, নিজের চেয়ার বাঁচাতে গিয়ে দলটা চলে যাচ্ছে বিজেপির পেটে। তাই পালটি খেয়ে পুরনো বন্ধু লালু, পুরনো শত্রু কংগ্রেস আর বামপন্থীদের সঙ্গে জোট করে মুখ্যমন্ত্রী রইলেন। সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। তবে বোধহয় এবার আরও বড় স্বপ্ন ছিল। তাই উদ্যোগ নিয়ে বিজেপিবিরোধী দলগুলোকে একজোট করে ইন্ডিয়া ব্লক তৈরি করলেন। তাঁর প্রবীণতাকে সম্মান দিয়ে সকলে আহ্বায়ক হিসাবে তাঁকে মেনেও নিল। তারপর ‘কী হইতে কী হইয়া গেল’, নীতীশ হঠাৎ একদিন সকালে আবার এনডিএ-তে ফিরে গেলেন। বিকেলবেলা নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রীও হয়ে গেলেন।

উপমুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তেজস্বী বন্ধুপুত্রের তেজ সহ্য হল না, নাকি রাহুল গান্ধী যেমন বলেছেন – ইডি, সিবিআই বা আয়কর বিভাগের ভয়ে নীতীশ এমনটা করলেন, তা হয়ত ভবিষ্যতের কোনো ঐতিহাসিক খুঁজে বার করবেন। তবে সমস্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষকই বলছেন, বিহারের মানুষের কাছে নীতীশের এবং তাঁর দলের আর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা অবশিষ্ট নেই। লোকসভায় যা ভোট পাবেন সে-ও মোদীর কল্যাণে, আর আগামী বিধানসভা নির্বাচনে নাকি তাঁর দলকে খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হবে। এতদিন মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যে নীতীশ বহু ভাল কাজ করেছেন তা বিরোধীরাও অস্বীকার করেন না। কিন্তু সেসবই নাকি এখন মূল্যহীন হয়ে পড়েছে ভোটারদের কাছে। সম্ভবত নীতীশও তা জানেন, নইলে কেবলই সঙ্গী খুঁজে হয়রান হবেন কেন? একলা লড়তে ভয় পাবেন কেন?

বিজু জনতা দল
বিজু পট্টনায়ক ওড়িশার প্রবাদপ্রতিম নেতা। একসময় কংগ্রেসে ছিলেন, পরে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সংঘাতে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন, জনতা পার্টিতে যোগ দেন, পরবর্তীকালে জনতা দলে। ওড়িশার এই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ছেলে নবীনই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজুর নামাঙ্কিত দলের একমেবাদ্বিতীয়ম নেতা। তিনি বিদেশে পড়াশোনা করেছেন এবং শোনা যায় ওড়িয়া ভাষায় ভাল করে কথাও বলতে পারেন না। তবু ওড়িশা রাজ্যটাকে এই শতকের শুরু থেকে চালিয়ে যাচ্ছেন প্রায় বিরোধীশূন্য অবস্থায়। কংগ্রেস ফিকে হয়ে গেছে, বিজেপি সেই জায়গায় উঠে এসেছে। উঠে আসার পিছনে নবীন স্বয়ং। ১৯৯৭ সালে জনতা দল ভেঙে বেরিয়ে নতুন দল গঠন করেই তিনি এনডিএ-তে যোগ দেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হয়ে যান। ওড়িশায় ক্ষমতা দখলও করেন বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধেই। ২০০৯ লোকসভা ভোটের আগে বিজেপির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ তুলে এনডিএ ত্যাগ করলেও সংসদে বড় বড় ইস্যুতে নবীনের দলের সাংসদরা কখনো বিজেপির বিরুদ্ধাচরণ করেননি। জাতীয় রাজনীতি নিয়ে নবীন প্রায় কথাই বলেন না। বিজেপিও, কোনো অজ্ঞাত কারণে, অন্যান্য রাজ্যে ক্ষমতা দখল করার জন্যে যতখানি আক্রমণাত্মক হয়েছে, ওড়িশায় আজও হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ বা দক্ষিণ ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর মত কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা আটকে দিয়েছে বলেও চট করে শোনা যায় না। প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধে ওড়িশা সরকার আন্তর্জাতিক মানের কাজ করেছে। তবে ওড়িশায় আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে শিল্প-টিল্প দিব্যি হয়, স্কুলে মিড ডে মিল দেওয়ার টাকা থাকে না, শিক্ষকরা উপযুক্ত পারিশ্রমিক পান না, তা নিয়ে আন্দোলনও করেন। এদিকে সরকার ভুবনেশ্বরে ঝাঁ চকচকে হকি স্টেডিয়াম বানায়, ভারতীয় হকি দলের স্পনসর হয়। অন্যান্য অবিজেপিশাসিত রাজ্যে এমন হলে গোদি মিডিয়া সে রাজ্যের সরকারকে তুলে আছাড় মারে। ওড়িশাকে কিন্তু দেখতেই পায় না। ওই রাজ্যে লোকসভার বছরেই বিধানসভা নির্বাচন হয়। ২০১৪ আর ২০১৯ – দুবারই দেখা গিয়েছিল বিধানসভায় বিজেডি হইহই করে জিতেছে আর লোকসভায় বিজেপি বেশ কয়েকটা আসন পেয়েছে।

এতদিন এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চালিয়ে হঠাৎ এবার ভোটের আগে কোনো কারণে নবীন বুঝতে পেরেছেন, তাঁর অজান্তেই তাঁর রাজ্য বিজেপির গ্রাসে চলে যাচ্ছে। তাই আসন সমঝোতার কথাবার্তা চালিয়েও শেষ মুহূর্তে আলাদা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে নেতাদের বিজেপি গমন কিন্তু ঠেকাতে পারেননি। নবীনের দলের বেশ কয়েকজন বিধায়ক এবং অন্যান্য নেতা বিজেপিতে চলে গেছেন। তার মধ্যে একজন ছবারের সাংসদ, আরেকজন পদ্মশ্রী প্রাপ্ত আদিবাসী নেত্রী। ভোটের ফল বেরোলেই বোঝা যাবে নবীন ঘর সামলাতে পারলেন, নাকি নীতীশের মত অবস্থা হল।

তেলুগু দেশম, ওয়াইএসআর কংগ্রেস
ব্রিগেডের যে সভায় ফারুক আবদুল্লা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেই সভায় চন্দ্রবাবু নাইডুও ছিলেন। তেলুগু দেশমের জন্মও কংগ্রেসবিরোধিতার মধ্যে দিয়ে, ইন্দিরার আমলে। জন্মদাতা ছিলেন চন্দ্রবাবুর শ্বশুরমশাই, তেলুগু সিনেমার এককালের জনপ্রিয় নায়ক, এন টি রামারাও। তাঁর মতই চন্দ্রবাবুও জাতীয় স্তরে তৃতীয় শক্তির অন্যতম নেতা হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ১৯৯৯ সালে কেন্দ্রে বাজপেয়ীর পাকাপোক্ত সরকার হতেই চন্দ্রবাবুর কংগ্রেসবিরোধিতা বিজেপিবিরোধিতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া তিনিও নবীনের মত ‘উন্নয়নমুখী’ মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের। অতএব কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতে যাবেন কেন? বিশ্বায়নের প্রথম যুগে শহরে মাখনের মত রাস্তা আর গাদা গাদা তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পকেই যারা উন্নয়ন মনে করে তাদের মতে দেশের সেরা মুখ্যমন্ত্রীদের একজন ছিলেন চন্দ্রবাবু। কিন্তু সে মলাট ছিঁড়তে বেশি সময় লাগেনি। অন্ধ্রের গ্রামে যে উন্নয়নের আলো বিশেষ পৌঁছয়নি তা বোঝা যায় ২০০৪ সালে তাঁর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মধ্যে দিয়ে। তার একবছর আগেই একটুর জন্যে প্রাণে বেঁচেছেন। পিপলস ওয়ার ল্যান্ডমাইন পেতে রেখেছিল তাঁর জন্যে।

২০১৪ সালে তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হয়ে যাওয়ার পর অন্ধ্রপ্রদেশের প্রথম নির্বাচনে বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় ফেরেন চন্দ্রবাবু। কিন্তু ২০১৮ সালে বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যায় কেন্দ্র অন্ধ্রকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা না দেওয়ায়। ২০১৯ সালে চন্দ্রবাবুর তেলুগু দেশম কংগ্রেস এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জোট করে হেরে যায় জগন্মোহন রেড্ডির নতুন দল ওয়াইএসআর কংগ্রেসের কাছে।

জগনের উত্থানও কংগ্রেসের বিরোধিতা করেই। অবিভক্ত অন্ধ্রে চন্দ্রবাবুর পরেই মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ওয়াই এস রাজশেখর রেড্ডি। ২০০৯ সালে কপ্টার দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। জগন সোজা বাবার চেয়ারে বসতে চেয়েছিলেন। কংগ্রেস হাইকমান্ড সে গুড়ে বালি দেওয়ায় নিজেই দল খুলে ফেলেন। ইনিও কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার লোক নন। তাই বিজেপির সঙ্গে জোট না থাকলেও বেশ মিষ্টিমধুর সম্পর্ক ছিল। সংসদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিলের ভোটাভুটিতে জগনের দল সরকারের পক্ষেই ভোট দিয়ে এসেছে। অন্ধ্রে বিজেপি এখনো ক্ষমতাসীন দলকে চিন্তায় ফেলে দেওয়ার মত শক্তি নয়। সেখান থেকে তাদের কোনো সাংসদ নেই। অনেকে ভেবেছিলেন বিজেপি তুলনায় শক্তিশালী জগনকেই এনডিএ-তে চাইবে। কিন্তু সকলকে অবাক করে কদিন আগেই দুর্নীতির মামলায় হাজতবাস করা চন্দ্রবাবুকে বেছে নিয়েছে বিজেপি, সঙ্গে থাকছে জন সেনা পার্টি।

চন্দ্রবাবু এনডিএ-তে ফিরে যাওয়ার যুক্তি হিসাবে বলেছেন, জগনের অপশাসন থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে রাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্য লাগবে। বিজেপি কেন জগনকে হতাশ করে তাঁকে বেছে নিল তা খোলসা করেনি। হতে পারে রাজ্য সরকার তাঁকে হাজতবাস করানোয় তিনি ভোটারদের সহানুভূতি পাবেন বলে বিজেপির বিশ্বাস। তবে এতে যা হল, তা হচ্ছে এতদিন সুসম্পর্ক বজায় রাখায় জগনের বিজেপির প্রতি আক্রমণ ভোঁতা হয়ে গেল। অন্যদিকে চন্দ্রবাবু ভাল ফল করলেও বিজেপির অবাধ্য হতে পারবেন না।

ভারত রাষ্ট্র সমিতি
তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হওয়ার পিছনে তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতির (এখন ভারত রাষ্ট্র সমিতি) এবং তাদের সর্বোচ্চ নেতা কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই সুবাদে পরে তারা তেলেঙ্গানায় বিধানসভা নির্বাচন জেতে এবং কেসিআর মুখ্যমন্ত্রী হন। তবে তার আগেই ২০০৯ সালে অবিভক্ত অন্ধ্রের ভোটে তেলুগু দেশম ও বিজেপির সঙ্গে জোট করেছিল বিআরএস। যদিও রাজ্য আলাদা হওয়ার আগে দলটা বলার মত নির্বাচনী সাফল্য পায়নি। বিজেপি কিন্তু কেসিআরের হাত ধরে ঢুকে পড়তে পেরেছে ওই রাজ্যে। ২০২০ সালে রাজধানী হায়দরাবাদের পৌর নির্বাচনে বিজেপি সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হয়। তখন মনে করা হয়েছিল তেলেঙ্গানায় বিআরএসকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিজেপি ক্ষমতা দখল করবে। শেষপর্যন্ত তা হয়নি এবং কংগ্রেস অনেক পিছন থেকে শুরু করেও জয়ী হয়। তবে বিজেপির ভোট শতাংশ আগেরবারের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। প্রশান্ত কিশোরের মত কেউ কেউ আবার মনে করছেন, লোকসভায় তেলেঙ্গানায় দুই বা এক নম্বরে থাকবে বিজেপি। স্পষ্টত, নিজেদের রাজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকা, বিজেপিকে বিশেষ আক্রমণ না করার সুবিধা বিআরএস পায়নি। বিজেপিই পেয়েছে।

জনপ্রিয় সাংসদ বন্ডি সঞ্জয় কুমারকে নির্বাচনের কয়েক মাস আগে রাজ্য বিজেপির প্রধান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ভোটের সপ্তাহখানেক আগে কংগ্রেস নেতাদের বাড়িতে ইডি হানা থেকে অনেকেরই সন্দেহ হয়েছিল যে বিজেপি বিআরএসকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইছে না। চাইছে কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসা আটকাতে। একে বিআরএসের সাময়িক লাভ বলে ভাবা যেতে পারে। তবে ‘দ্য ওয়্যার’ ওয়েবসাইটের এক প্রতিবেদন বলছে, তেলেঙ্গানা বিজেপির নেতারা চেয়েছিলেন কেসিআরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার করা হোক। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তা হতে দেননি। কেসিআরের মেয়ে কে কবিতাকে দিল্লির মদ কেলেঙ্কারিতে গ্রেফতার করা হোক – এটাও তখনই তাঁদের দাবি ছিল, কান দেওয়া হয়নি। সেই গ্রেফতারি হল লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে। অর্থাৎ বিআরএস এখন পুরোপুরি বিজেপির কবজায়।

শিবসেনা, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি
শোলে ছবির জয় আর বীরুর বন্ধুত্ব কোনোদিন ভেঙে যেতে পারে একথা কল্পনা করাও কঠিন। তার চেয়েও কঠিন ছিল বিজেপির সঙ্গে শিবসেনার বিচ্ছেদ কল্পনা করা। কিন্তু সেটাও হয়ে গেল মহারাষ্ট্রে গত বিধানসভা নির্বাচনের পর। সংঘ পরিবারের বাইরে বালাসাহেব ঠাকরে প্রতিষ্ঠিত এই দলটার সঙ্গেই বিজেপির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ভাবনার মিল ছিল সবচেয়ে বেশি। ফলে রামমন্দির আন্দোলন থেকে শুরু করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি – সমস্ত আদর্শগত ব্যাপারেই শিবসেনার সমর্থন উপভোগ করে এসেছে বিজেপি। মহারাষ্ট্রে একসঙ্গে সরকারও চালিয়েছে। কিন্তু ঠাকরের মৃত্যুর পর দলের কর্তৃত্ব নিয়ে তাঁর ছেলে উদ্ধব আর ভাইপো রাজের মধ্যে কোন্দলে সব গোলমাল হয়ে গেল। দেখা গেল হাবভাবে, আক্রমণাত্মক কথাবার্তায় বালাসাহেবের সঙ্গে তাঁর ছেলের চেয়ে ভাইপোরই মিল বেশি। উদ্ধব তুলনায় নরম। কিন্তু বিস্তর দড়ি টানাটানির পরে উদ্ধবই কর্মীবাহিনীকে নিজের দিকে টেনে রাখতে সফল হলেন। তাই মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা তৈরি করে রাজ এককোণে পড়ে রইলেন (এবার অবশ্য আবার তাঁর ডাক পড়েছে), বিজেপি উদ্ধবকেই আপন করে নিল।

কিন্তু নীতীশ কুমারের মত উদ্ধবও ২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পরে টের পেলেন, মোদী-শাহের বিজেপি তাঁর উপর ছড়ি ঘোরাতে চাইছে। তাই জোট ভেঙে দিয়ে কংগ্রেস আর শরদ পাওয়ারের ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির হাত ধরে মুখ্যমন্ত্রী হলেন। যে কল বিজেপি বহু রাজ্যে করে থাকে, সেই কল করেই এভাবে তুলে আছাড় মারবেন উদ্ধব তা বিজেপি নেতারা ভাবেননি। কিন্তু এই অপমানের শোধ না তুলে ছেড়ে দেওয়ার লোক মোদী-শাহ নন। তাই তিন বছরের বেশি চলতে পারল না উদ্ধবের সরকার। তাঁরই দলের বেশকিছু বিধায়ককে ভাঙিয়ে নিয়ে, রাজ্যপালের বদান্যতায় একনাথ শিন্ডেকে সাক্ষী গোপাল মুখ্যমন্ত্রী করে সরকার গড়ে ফেললেন বিজেপি নেতা এবং মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ। সেখানেই শেষ নয়। বালাসাহেবের উত্তরাধিকারীর হাত থেকে শিবসেনার প্রতীক তীর ধনুকটা পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। শিন্ডেদের দলত্যাগ বিরোধী আইনে শাস্তি হওয়া দূরে থাক, আইনত তাঁরাই আসল শিবসেনা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন। উদ্ধবের ডান হাত সঞ্জয় রাউতকে বেশ কিছুদিন হাজতবাস করতে হয়েছে।

কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করার পরে আজকাল উদ্ধবের দলেরা নেতারা এবং তাঁর ছেলে আদিত্য বেশ ধর্মনিরপেক্ষ গোছের কথাবার্তা বলেন। তাতে সততা কতটা আর অস্তিত্বের সংকট কতটা কে জানে? তবে তরুণরা শিবসেনাকে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে দেখে, এক মঞ্চে রাহুল গান্ধী আর উদ্ধবকে বক্তৃতা দিতে দেখে যতই অবাক হোন না কেন, প্রবীণদের ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে শিবসেনার উত্থান কংগ্রেসেরই মদতে। উদ্দেশ্য ছিল মুম্বাইয়ের ট্রেড ইউনিয়নগুলোতে প্রবল শক্তিশালী বামপন্থীদের একেবারে শারীরিকভাবে শেষ করে দেওয়া। তারই অঙ্গ হিসাবে বালাসাহেব ‘মারাঠি মানুস’ তত্ত্ব খাড়া করেন অন্য রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের কোণঠাসা করতে। বামপন্থীদের নিকেশ করতে সফল হয়েছিল বলেই মহারাষ্ট্রের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল শিবসেনা। বিজেপিকেও দীর্ঘকাল বালাসাহেবের মর্জি মত চলতে হয়েছে। কিন্তু যে কোনো কাল্টের যা হয়, তাঁর মৃত্যুর পর শিবসেনারও তাই হয়েছে। উদ্ধবের তাই আপাতত ইন্ডিয়া ব্লকের সদস্য হয়ে প্রগতিশীল হওয়ার চেষ্টা করা ছাড়া উপায় নেই। একনাথ মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারটা পেয়েছেন বটে, কিন্তু প্রত্যেক অনুষ্ঠানে বা সাংবাদিক সম্মেলনেই বিজেপি টের পাইয়ে দেয় যে তিনি ঠুঁটো জগন্নাথ। মানে একদা মুম্বাই শাসন করা শিবসেনা বিজেপির ছোঁয়ায় এখন দ্বিখণ্ডিত এবং বিপন্ন।

অবশ্য উদ্ধবের চেয়েও করুণ অবস্থা মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শরদ পাওয়ারের। তিনি কেবল নিজের রাজ্যের প্রবীণতম নেতাই নন, কংগ্রেসের জাতীয় স্তরের ডাকসাইটে নেতা ছিলেন। দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন একসময়, লোকসভায় বিরোধী দলনেতাও। ভারতের ক্রিকেট বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের শীর্ষ পদেও আসীন ছিলেন। মহারাষ্ট্রে তাঁর বিপুল সম্পত্তি এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তৃণমূল স্তরে একসময় দারুণ জনপ্রিয়তা ছিল। এমন অমিত ক্ষমতাধর শরদকে একেবারে ক্ষমতাহীন করে দিয়েছে তাঁর পুরনো সঙ্গী বিজেপি। বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে মহারাষ্ট্রে সরকার চালিয়েছে পাওয়ারের দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি)। ১৯৯৯ সালে কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত হওয়ার কারণটাও বেশ বিজেপিসুলভ। ‘বিদেশিনী’ সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্ব মেনে নিতে তাঁর আপত্তি ছিল। তিনি, প্রয়াত পূর্ণ সাংমা এবং তারিক আনোয়ার মিলে বহিষ্কৃত হওয়ার পর এই পার্টি গড়ে তোলেন। কথিত আছে এর পিছনে মহারাষ্ট্রের বিজেপি নেতা প্রমোদ মহাজনের হাত ছিল। তা সত্যি হোক আর না-ই হোক, ২০১৪-১৯ তাঁর দল যে মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল তা তো আর মিথ্যা নয়। আসলে বরাবরই ক্ষমতা যেখানে পাওয়ার সেখানেই থাকতে চেয়েছেন। যে সোনিয়ার জন্যে কংগ্রেস ছাড়লেন তাঁর সভাপতিত্বের কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারেই আবার মন্ত্রী হয়ে কাটিয়েছেন ২০০৪-১৪। কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকেই তাঁর সব হিসাব গুলিয়ে দিচ্ছে বিজেপি। তাঁর একসময়ের অনুগত নেতা ছগন ভুজবলকে টেনে নিয়েছে বিজেপি। চূড়ান্ত আঘাতটা অবশ্য এসেছে মাত্র কয়েকদিন আগে। শরদের ভাইপো অজিতকেও নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছে বিজেপি। দুর্নীতিতে অভিযুক্ত অজিতকে একেবারে উপমুখ্যমন্ত্রী করে দেওয়া হয়েছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মত শরদের পার্টির প্রতীকও কেড়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বলা হয়েছে অজিতের দলটাই নাকি আসল এনসিপি। তাই দলের প্রতীক অ্যালার্ম ঘড়ি তাঁরাই ব্যবহার করতে পারবেন, প্রতিষ্ঠাতা শরদের দলকে অন্য প্রতীকে লড়তে হবে।

অর্থাৎ ২০২৪ শরদের কাছেও অস্তিত্বের লড়াই। কী কুক্ষণে বিজেপির সঙ্গে ভাব করতে গিয়েছিলেন!

বিআরএসের সাময়িক লাভ বলে ভাবা যেতে পারে। তবে ‘দ্য ওয়্যার’ ওয়েবসাইটের এক প্রতিবেদন বলছে, তেলেঙ্গানা বিজেপির নেতারা চেয়েছিলেন কেসিআরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার করা হোক। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তা হতে দেননি। কেসিআরের মেয়ে কে কবিতাকে দিল্লির মদ কেলেঙ্কারিতে গ্রেফতার করা হোক – এটাও তখনই তাঁদের দাবি ছিল, কান দেওয়া হয়নি। সেই গ্রেফতারি হল লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে। অর্থাৎ বিআরএস এখন পুরোপুরি বিজেপির কবজায়।

ডিএমকে, এআইএডিএমকে
এই তালিকায় বিজেপির সঙ্গে সবচেয়ে কম সময়ের সম্পর্ক সম্ভবত তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমের (ডিএমকে)। তামিলনাড়ুর রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরে আবর্তিত হচ্ছে দুই দ্রাবিড় ভাবাদর্শের দল ডিএমকে আর অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমের (এআইএডিএমকে) মধ্যে। ১৯৯৮ সালে তৈরি হওয়া বাজপেয়ী সরকারেরও শরিক ছিল জয়ললিতার নেতৃত্বাধীন এআইএডিএমকে। কিন্তু সেই সরকার পড়ে যায় জয়ললিতা সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ায়। দাবি ছিল, তাঁর বিরুদ্ধে আয়কর সংক্রান্ত মামলাগুলো প্রত্যাহার করাতে হবে এবং তামিলনাড়ুর ডিএমকে সরকার ফেলে দিতে হবে। দাবি না মেটানোয় জয়ললিতা সরকার তো ভেঙে দিলেন বটেই, ১৯৯৯ সালের ভোটে উল্টে ডিএমকে নেতা এম করুণানিধি জোট করে ফেললেন বিজেপির সঙ্গে।

আজ করুণানিধির নাতি দয়ানিধি স্ট্যালিনের মুখে যে সনাতন ধর্মবিরোধী, বর্ণবাদবিরোধী কথাবার্তা বিজেপির গাত্রদাহের কারণ – সেগুলো নতুন কিছু নয়। ওই ভাবাদর্শই ডিএমকে-র ভিত্তি। সেদিক থেকে একেবারে বিপরীত মেরুতে দাঁড়ানো বিজেপির সঙ্গে কেন জোট করেছিলেন করুণানিধি, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। হয়ত তিনি ভেবেছিলেন, কেন্দ্রের সরকারের সঙ্গে বিবাদ করে সরকার টিকিয়ে রাখা মুশকিল হবে। কারণ তামিলনাড়ুতে কোনো পক্ষেরই দুর্নীতি কিছু কম ছিল না। জয়ললিতা ২০০১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে দুর্নীতির মামলায় ৭৮ বছর বয়সী করুণানিধিকে রাত দুটোর সময়ে গ্রেফতারও করিয়েছিলেন। কথিত আছে যে ২০০২ সালের গুজরাট গণহত্যার পর থেকেই ডিএমকে বিজেপির সঙ্গে জোট নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগছিল, কারণ তাদের সমর্থকদের উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলমান আর খ্রিস্টান। শেষমেশ ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে ডিএমকে এনডিএ ত্যাগ করে।

এআইএডিএমকে কিন্তু বারবার বিজেপির কাছে ফিরে গেছে। ১৯৯৯ সালে জোট ভেঙে দেওয়ার পর আবার ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেই তামিলনাড়ুতে বিজেপি-এআইএডিএমকে জোট হয়। কিন্তু সেই জোট শূন্য পায়, বিজেপি অবিলম্বে জোট ভেঙে দেয়। ২০১৬ সালে জয়ললিতার মৃত্যুর পরে যখন এআইএডিএমকে নেতৃত্ব দিশেহারা, তখন আবার বিজেপির সঙ্গে জোট বাঁধে। কিন্তু তাতেও বিজেপি শূন্যের গেরো কাটাতে পারেনি, এআইএডিএমকে জেতে মাত্র একটা আসন। তবু ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত এই জোট বজায় ছিল। গতবছর মে মাস নাগাদ এআইএডিএমকে মনে করতে থাকে বিজেপির সঙ্গে থাকলে তাদের ক্ষতি হচ্ছে। এআইএডিএমকে নেতা সি পোন্নাইয়ান প্রকাশ্যে বলে দেন যে বিজেপি এআইএডিএমকের ক্ষতি করে নিজেদের সংগঠন বাড়াচ্ছে।

তারপরেও হয়ত জোট ভাঙত না। কিন্তু তামিলনাড়ু বিজেপির প্রধান কে আন্নামালাই গত এক বছরে পরপর এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা এআইএডিএমকে সহ্য করলে তামিল দল হিসাবে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতায় আঘাত লাগত। আন্নামালাই প্রথমে এক সাক্ষাৎকারে বলেন তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীরা সব আদালতের হাতে শাস্তিপ্রাপ্ত এবং রাজ্যটা ভারতের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজ্যগুলোর অন্যতম। এআইএডিএমকে তখনই জেপি নাড্ডা আর অমিত শাহকে বলেছিল আন্নামালাইকে থামাতে, কিন্তু বিজেপি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এরপর আন্নামালাই ডিএমকে প্রতিষ্ঠাতা সিএন আন্নাদুরাই সম্পর্কেও কিছু আপত্তিকর মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ। শেষমেশ ২৫ সেপ্টেম্বর এআইএডিএমকে এনডিএ ত্যাগ করে।

এখন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা যা বলছে তা এআইএডিএমকে-র জন্য আশাব্যঞ্জক নয়। বিজেপি যে খাতা খুলতে পারবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও, অনেকে বলছে তাদের ভোট শতাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ বিজেপির সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের মাসুল এখানেও দিতে হচ্ছে আঞ্চলিক দলটাকেই। বিজেপির প্রেমে পড়েছ কি মরেছ।

আরও পড়ুন ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত আলোচনা হয়েছে। এবার যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে ফিরে আসি – আম আদমি পার্টি। আজ যেভাবে চক্রব্যূহে ফেলা হয়েছে দলটাকে, গণতন্ত্র নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবনা থাকলে যে কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলবেন। তবে তাদের আজ যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে তাও কিন্তু একার্থে আরএসএস-বিজেপির সঙ্গে আশনাইয়ের পরেই। ‘ইন্ডিয়া এগেনস্ট করাপশন’ বলে যে সংগঠন থেকে আপ দলের উদ্ভব, তার পিছনে কারা ছিল তা এখন অনেকটা পরিষ্কার। রামলীলা ময়দানের সেই দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের গুরু হয়ে বসেছিলেন যে আন্না হাজারে, তাঁর স্বরূপও উদ্ঘাটিত হয়েছে ২০১৪ সালের পর থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে বিরাট বিরাট স্মার্ট দুর্নীতির অভিযোগে নীরবতা এবং সম্প্রতি কেজরিওয়ালের গ্রেফতারি সমর্থন করা থেকে। কিরণ বেদির মত মানুষের আসল চেহারাও দেখা গেছে।

তবে হ্যাঁ। সংঘ পরিবারের প্রেমে নানাভাবে সিক্ত দল এবং ব্যক্তিদের ইতিহাস কাজে লাগবে তখনই, যদি ভারতের গণতন্ত্র বাঁচে। নইলে এরা তো স্বখাতসলিলে ডুববেই, এদের বিচার করার মতও কেউ থাকবে না।

পিপলস রিপোর্টারে প্রকাশিত

চাপা পড়া গার্ডেনরিচ খুঁড়ে যা বেরোল

বাঙালি ভদ্রলোকদের মধ্যে গার্ডেনরিচ আর রাজাবাজারকে জনান্তিকে শাসনের অযোগ্য এলাকা বলা বহুদিন ধরেই চালু। ইদানীং হিন্দুত্বের হাওয়া খেয়ে ফুরফুরে মেজাজে সেসব প্রকাশ্যে বলা আরম্ভ হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম ভূপতিনগরে এনআইএ আধিকারিকদের আক্রান্ত হওয়া এবং স্থানীয় তৃণমূল নেতার স্ত্রীর পালটা শ্লীলতাহানির অভিযোগ (মুখ্যমন্ত্রী যে অভিযোগে সিলমোহর দিয়েছেন) নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তা বাদে পশ্চিমবঙ্গের ৪২ লোকসভা আসনেই প্রায় সব দলের প্রার্থী ঘোষণা হয়ে গেছে, তা নিয়েও হইচই তুঙ্গে। ফলে গার্ডেনরিচে বাড়ি চাপা পড়ে যাওয়া মানুষগুলোর স্মৃতিও চাপা পড়ে গেছে। আর কে গ্রেফতার হল ওই কাণ্ডে, শেষমেশ কাউন্সিলর না কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নাকি মেয়র-ইন-কাউন্সিল – কে অতগুলো মৃত্যুর দায়িত্ব স্বীকার করলেন তা আর আমরা জানতে পারছি না। সম্ভবত আর কোনোদিন পারবও না। যদি নির্বাচনের পর কলকাতায় আবার কোনো বেআইনি নির্মাণ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে, তাহলে আলাদা কথা। তা এই চাপা পড়ে যাওয়া গার্ডেনরিচ কাণ্ড নিয়ে কিছু কুচিন্তা কিছুতেই মন থেকে যাচ্ছে না। এই চিন্তাগুলো আসন্ন নির্বাচনে হয়ত অপ্রাসঙ্গিক (কোন বিষয়গুলোর ভিত্তিতে মানুষ ভোট দেন তা অনুমান করতে গিয়ে আজকাল তো পোড়খাওয়া ব্যক্তিদেরও ঘোল খেয়ে যেতে দেখা যায়; আমি কোন ছার), কিন্তু বাংলার মানুষের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জরুরি বলেই মনে হয়।

সাধারণত তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো নেতা, মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কুকর্মের অভিযোগ উঠলেই দল যা করে তা হল আগেভাগে তাঁকে নির্দোষ বলে দেওয়া। গোটা ব্যাপারটাকেই চক্রান্ত বলে দেগে দেওয়া। অনুব্রত মন্ডল থেকে শাহজাহান শেখ পর্যন্ত সকলের ক্ষেত্রেই তাই করা হয়েছে। বড়জোর তৃণমূলের মুখপাত্ররা বলেন – আইন আইনের পথে চলুক। ব্যাপারটা তো প্রমাণসাপেক্ষ। কেউ দোষ করে থাকলে দল তার পাশে দাঁড়াবে না। সাম্প্রতিককালে এর ব্যতিক্রম অবশ্য ঘটেছে। বিশেষ করে নিয়োগ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত অনেকের সঙ্গে যোগাযোগই তৃণমূল বেমালুম অস্বীকার করেছে। কিন্তু তারা সব চুনোপুঁটি। রাঘব বোয়ালদের মধ্যে একমাত্র প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জির ক্ষেত্রেই তৃণমূল উলটো পথ নিয়েছিল। বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকার অযোধ্যা (পাহাড়) উদ্ধার হওয়ার অব্যবহিত পরেই তাঁকে দলের মহাসচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, পরবর্তীকালে মন্ত্রিসভা থেকেও। এমনকি তাঁর দুর্নীতির দায়ও দল সত্বর নিজের গা থেকে ঝেড়ে ফেলেছিল। বলা হয়েছিল, তিনি যদি ঘুষ নিয়ে থাকেন তাহলে ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন। দল বা মুখ্যমন্ত্রী এর বিন্দুবিসর্গ জানতেন না। পার্থ যে দলের আর পাঁচজন অভিযুক্তের মত নন, তা বারবার পরিষ্কার হয়ে গেছে। দলের বাকি যে নেতারা বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত, তাদের সম্পর্কে কথা বলার সময়ে মমতা ব্যানার্জি বা অভিষেক ব্যানার্জির মূল সুরটা থাকে এইরকম, যে তারা আসলে নির্দোষ। স্রেফ তৃণমূল করে বলে বিজেপি কেন্দ্রীয় সংস্থা দিয়ে তাদের হয়রান করাচ্ছে। যেমন অনুব্রত সম্পর্কে অভিষেক দিনদুয়েক আগেও বলেছেন ‘অনুব্রতই যদি আজ বিজেপিতে চলে যেতেন, ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে যেতেন। বিজেপিতে যাননি, তাই জেল খাটছেন।’ মুখ্যমন্ত্রী তো একাধিকবার বলেছেন ‘কেষ্ট’ যখন ফিরে আসবে তখন তাকে বীরের সম্মান দেওয়া হবে। পার্থ কিন্তু দলের এমন সমর্থন পাননি। বহুকাল হল তাঁর নাম পর্যন্ত শোনা যায় না মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর ভাইপোর মুখে। গার্ডেনরিচ কাণ্ডের পর দেখা গেল সেখানকার বিধায়ক তথা নগরোন্নয়ন মন্ত্রী এবং কলকাতার মেয়র ফিরহাদ (ববি) হাকিমও একলা পড়ে গেছেন।

গতমাসের তৃতীয় সপ্তাহে গার্ডেনরিচ কাণ্ড ঘটার ঠিক পরেই মমতা স্বয়ং এলাকায় গিয়েছিলেন এবং হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু সংবাদমাধ্যমকে যা বলেন তাতে ববি হাকিমকে আড়াল করার কোনো চেষ্টা ছিল না। তৃণমূলের দু নম্বর নেতা অভিষেক তো আদৌ ওমুখো হননি। গোটা রাজ্যের সংবাদমাধ্যম এবং বিরোধীরা যখন বেআইনি নির্মাণ নিয়ে ববিকে সঙ্গত কারণেই অভিযুক্ত করছেন, তখন তৃণমূল যেভাবে অনুব্রত বা শাহজাহানের মত জেলা স্তরের নেতার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেভাবে ববির পাশে দাঁড়ায়নি। টিভি স্টুডিওতেও তৃণমূলের মুখপাত্ররা কেবল বনলতা সেনগিরি করছিলেন। অর্থাৎ বামফ্রন্ট আমলেও বেআইনি নির্মাণ হত এবং ভেঙে পড়ত (শিবালিক অ্যাপার্টমেন্টের বারংবার উল্লেখ সমেত) – এই ছিল তাঁদের সার কথা। ববি নিজে আবার ব্যস্ত ছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলরকে বাঁচাতে। তা করতে গিয়ে কর্পোরেশনের ইঞ্জিনিয়ারদের ঘাড়ে পর্যন্ত দোষ চাপিয়েছেন। কিন্তু দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নীরব ছিলেন। তেরোজন মানুষের মৃত্যুর পরেও এই নীরবতার একটা ব্যাখ্যা অবশ্যই বিষয়টাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া। কিন্তু অন্য দিক থেকে ভাবলে, দলের অতি গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা প্যাঁচে পড়েছেন দেখেও তাঁর পক্ষ নিয়ে সোচ্চার না হওয়ার ব্যাখ্যা কী? একটা ব্যাখ্যা অবশ্যই পার্থ আর ববির মিল থেকে পাওয়া যায়। লুকিয়ে চুরিয়ে নয়, প্রকাশ্যেই তৃণমূলের প্রবীণদের সঙ্গে অভিষেকের নেতৃত্বাধীন নবীনদের সংঘাত হয়েছিল গতবছর। পার্থ, ববি দুজনেই প্রবীণ শিবিরের লোক – অভিষেকের অপছন্দের লোক। সেই সংঘাতে প্রবীণদের একেবারে সামনের সারিতে ছিলেন ববি। অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির উপর নজর রাখা যে কোনো মানুষ জানেন শাসক দলে এখন অভিষেকের অনুগামীদের পাল্লা ভারি। এতটাই ভারি যে আরেকটু হলে প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের টিকিট ফস্কে যাচ্ছিল। স্বভাবতই পার্থর মত, কোণঠাসা ববির পাশেও দল দাঁড়ায়নি।

কেউ বলতেই পারেন, তাঁকে তো মেয়র পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি। তেমন দাবিকে পাত্তাও দেওয়া হয়নি। তাহলে দল পাশে দাঁড়ায়নি কী করে বলা যায়? প্রশ্নটা খুব বুদ্ধিমানের মত হবে না। কারণ একটা বেআইনি ফ্ল্যাটবাড়ি ভেঙে পড়েছে বলে মেয়রকে বরখাস্ত করলে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যেত লোকসভা নির্বাচনের মুখে। প্রথমত, বিরোধীদের কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ স্বীকৃতি পেয়ে যেত। দ্বিতীয়ত, শিশুরাও জানে যে সত্যি সত্যি একা ববির অঙ্গুলিহেলনে কলকাতায় বেআইনি নির্মাণ, পুকুর ভরাট করে ফ্ল্যাট তৈরি ইত্যাদি চলে না। তিনি বড়জোর তাঁর দুটো বড় বড় পদাধিকার বলে ব্যাপারটায় পৌরোহিত্য করেন। সুতরাং এই সময়ে চটালে তিনি রেগেমেগে মুখ খুলে ফেলতে পারতেন, তাতে তৃণমূলের বিপদ বাড়ত বই কমত না। উপরন্তু তাঁকে ঘিরে যে চক্র, যাকে সংবাদমাধ্যমের মান্য ভাষায় বলা যায় ‘ইলেকশন মেশিনারি’, তাও তৃণমূলের হাত থেকে পিছলে যেতে পারত। গোটা রাজ্যের বেআইনি প্রোমোটিং ব্যবসায়ীদের কাছে যে বার্তা যেত সেকথা না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল। ভোটের বাজারে টাকার জোগানের কী হত সেকথাও না হয় থাক। নির্বাচনী বন্ড তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। অভিষেকের ববিকে যতই অপছন্দ হোক, দলের নির্বাচনী স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে লবিবাজি করার মত বোকা রাজনীতিবিদ অবশ্যই মমতার ভাইপো নন। ফলে ওটাকে পাশে দাঁড়ানো বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। পাশে দাঁড়ানো মানে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বিরোধীদের এবং জনগণকে প্রকাশ্য বার্তা দেওয়া, যে যাকে আক্রমণ করা হচ্ছে আমরা তার পাশে আছি। অনুব্রতদের ক্ষেত্রে বারবার যা করা হয়।

ববির ক্ষেত্রে তা না করা কি শুধুই দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে? সেই প্রশ্নটাই আরেকটু তলিয়ে দেখা যাক। কেবল তৃণমূল নয়, গার্ডেনরিচ কাণ্ড নিয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যম আর বিরোধী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া নিয়েও আরেকটু কাটাছেঁড়া করা যাক। কারণ আজকের ভারতে প্রায় কোনোকিছুই কোনো লুকনো এজেন্ডা ছাড়া করা হচ্ছে না। তাই এখন ‘সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে’। না দেখে উপায় নেই।

গার্ডেনরিচ ছাড়া যখন বাংলা সংবাদমাধ্যমে আর কোনো খবর ছিল না, সেইসময় একদিন এবিপি আনন্দের সান্ধ্য জটলায় তৃণমূল প্রতিনিধির বনলতা সেনগিরির জবাবে সিপিএম প্রতিনিধি শতরূপ ঘোষ বলেন, যে বামফ্রন্ট আমলেও কলকাতায় বেআইনি নির্মাণ হয়েছে – একথা বলে তৃণমূল পার পেতে পারে না। কারণ সে আমলেও দীর্ঘদিন কলকাতা কর্পোরেশন তৃণমূল চালিত ছিল। উপরন্তু ২০১০ সাল থেকে টানা ১৪ বছর তৃণমূলই কর্পোরেশন চালিয়েছে। মজার ব্যাপার ঘটে এরপর। সঞ্চালক সুমন দে শতরূপকে সমর্থন করলেন, কিন্তু সেই সূত্রে তৃণমূলের আর যে নেতারা কলকাতার মেয়র ছিলেন – সুব্রত মুখার্জি বা শোভন চট্টোপাধ্যায় – তাঁদের আমলে বেআইনি নির্মাণ কতটা কী হয়েছিল সেসব তথ্য তুলে ধরলেন না। ইদানীং প্রায় সব বাংলা খবরের চ্যানেলেই কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথের কবিতার লাইন, নজরুল বা সুকুমার রায়ের কবিতার লাগসই লাইন উদ্ধৃত করে রসবোধের পরিচয় দেন অতি বুদ্ধিমান সঞ্চালকরা। সুদূর অতীতের নানা তথ্যও তাঁদের হাতের কাছে সাজিয়ে দেয় রিসার্চ টিম। অথচ আগের দুই মেয়রের আমলে কী অবস্থা ছিল কলকাতার প্রোমোটিংয়ের – প্রায় দু সপ্তাহের বিতর্কে কোনো কাগজে বা টিভি চ্যানেলে এ নিয়ে একটি শব্দও দেখা গেল না। আশ্চর্য নয়? না সাংবাদিক, না বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা – কেউই ওসবের মধ্যে গেলেন না। পূর্ব কলকাতার জগদ্বিখ্যাত জলাভূমির কীভাবে বারোটা বাজানো হয়েছে সে আলোচনা রোজ হয়েছে। অথচ এমনভাবে আলোচনা হয়েছে যেন সবটাই ঘটেছে বর্তমান মেয়রের আমলে। ‘জল শোভন’ বলে পরিচিত পূর্বতন মেয়রকে সবাই যেন ভুলে গেছে। অথচ তাঁর বিবাহ বহির্ভূত প্রেম নিয়ে এই সংবাদমাধ্যমই ঘন্টার পর ঘন্টা খরচ করেছে অনতি অতীতে। তিনি কি সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে গেছেন বিজেপিতে চলে যাওয়ায়? কদিন আগে আবার তৃণমূলে ফিরেছিলেন না? পশ্চিমবঙ্গ অবশ্য অধুনা গেছোদাদাদের রাজ্য। কে যে কখন কোথায় আছেন বলা ঝুঁকিপূর্ণ। গুগলও সবসময় সঠিক তথ্য দিতে পারে না।

মোট কথা ববি কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত, মেয়রের পদে থাকার পক্ষে তিনি কতটা অযোগ্য তা প্রমাণ করতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা এবং সঞ্চালকরা চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু পর্যন্ত চলে গেলেন আর সাম্প্রতিককালের মেয়রদের কথা মনে পড়ল না – এ তো বড় রঙ্গ। এমন রঙ্গ কেন হল তা পরিষ্কার হতে অবশ্য সময় লাগেনি। মনে রাখতে হবে, গার্ডেনরিচের ঘটনা ঘটার আগে বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছিল সন্দেশখালি। সেখানে মূল অভিযুক্তের নাম শাহজাহান শেখ আর তার ভাইয়ের নাম আলমগীর। ফলে বিজেপি এবং রিপাবলিক বাংলার মত গর্বিত গোদি মিডিয়া যথেচ্ছ মুসলমানবিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছিল। ইতিহাসের কুখ্যাত লম্পটদের ধারা ভেঙে নিজের সম্প্রদায়ের মেয়েদের মায়ের চোখে দেখে, কেবলমাত্র হিন্দু মহিলাদের দিকেই হাত বাড়াত সন্দেশখালির তৃণমূলী দুষ্কৃতীরা – এই বয়ান ছড়িয়ে পড়েছিল। অগ্রাহ্য করা হচ্ছিল এই তথ্য, যে শাহজাহানের ডান হাত, বাঁ হাত দুজনেই হিন্দু – শিবু হাজরা আর উত্তম সর্দার।

ইতিমধ্যে গার্ডেনরিচে বেআইনি ফ্ল্যাটবাড়ি ভেঙে পড়ে মানুষের মৃত্যু। যারা গোদি মিডিয়া বলে পরিচিত নয়, তাদেরও মুখোশের আড়াল থেকে মুখ বেরিয়ে এল। সমস্ত আলোচনাই এমনভাবে হতে থাকল, যেন গোটা পশ্চিমবঙ্গে বা গোটা কলকাতায় একমাত্র গার্ডেনরিচেই ফ্ল্যাটের গায়ে ফ্ল্যাট লেগেছে। একমাত্র ওই এলাকার বাসিন্দারাই জেনে বুঝে পুকুর বোজানো জমিতে তৈরি হওয়া ফ্ল্যাট কেনেন, দুটো বাড়ির মাঝে যথেষ্ট জায়গা ছাড়া আছে কিনা সেসব দেখেন না। কেবল ওই এলাকার প্রোমোটাররাই যাবতীয় আইন ভাঙেন। কেন? সেকথা একদিন এক অধ্যাপক (যিনি ইদানীং রাজনৈতিক দলের মুখপাত্রদের থেকেও বেশি চেঁচামেচি করেন) বলেই দিলেন একটি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে। বললেন, একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের লোককে তোষণ করার জন্যে গার্ডেনরিচে যে যা খুশি আইন ভাঙলেও প্রশাসন কিচ্ছুটি বলে না। বিজেপির প্রতিনিধি দূরের কথা, স্টুডিওতে উপস্থিত বাম বা কংগ্রেস প্রতিনিধিও কথাটার প্রতিবাদ করলেন না। সুটবুট পরা বাবু সুমন দে তো বেশ জোরে জোরেই মাথা ঝাঁকালেন।

ঠিক কথা। আমরা তো জানি যে অমৃতকালের ভারতবর্ষের গার্ডেনরিচ এক ভয়ংকর অঞ্চল। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেন মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদের প্রশাসন, আইন, আদালত সকলেই হিন্দুদের চেয়ে বেশি ভালবাসে। তাই ওই সম্প্রদায়ের লোকেদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। অধ্যাপক, ব্যারিস্টার, পুলিসকর্তা, সেনাবাহিনীর অফিসার একেবারে গিজগিজ করছে। ওঁরাই তো দেশটা চালান আর কলকাতা তো চালান বটেই। কারণ কলকাতার মেয়র স্বয়ং ওই সম্প্রদায়ের লোক, ওই এলাকারই বিধায়ক। সেই মেয়রের এত ক্ষমতা যে মুখ্যমন্ত্রী মেয়র ঘোষিত নতুন পার্কিং ফি বাতিল করে দিতে পারেন। সেকথা আবার সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ, যিনি সরকার বা কর্পোরেশনের কেউ নন। কর্পোরেশনের সিদ্ধান্ত বাতিল করার সাংবিধানিক এক্তিয়ার মুখ্যমন্ত্রীর আছে কিনা সে প্রশ্নও কেউ তোলে না। মেয়রকে ঢোঁক গিলে মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত হজম করতে হয়।

যা-ই হোক, এভাবে ভালই চলছিল। খবরের কাগজ এবং সোশাল মিডিয়ার দৌলতে সকলের ঠোঁটস্থ হয়ে গিয়েছিল গার্ডেনরিচ এলাকায় ঠিক কতগুলো পুকুর বোজানো হয়েছে, কতগুলো ফ্ল্যাট কত ইঞ্চি ফাঁকের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে। এসব প্রকাশিত হওয়ায় গোটা রাজ্যের অসাধু প্রোমোটার এবং তাদের সঙ্গে শাসক দলের যোগসাজশ নিয়ে যেরকম অন্তর্তদন্ত হওয়া উচিত ছিল, তা কিন্তু হচ্ছিল না। বিরোধীরাও সে উৎসাহ দেখাচ্ছিলেন না। শুধু সন্ধে নামলেই বিষোদ্গার হচ্ছিল, কলকাতার সমস্ত বেআইনি নির্মাণ কেন ভেঙে ফেলা হচ্ছে না। তারপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। গার্ডেনরিচ এলাকাতেই একটি বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে গিয়ে বিরাট বাধার মুখে পড়লেন কর্পোরেশনের কর্মীরা এবং পুলিসবাহিনী। টিভির পর্দায় দেখানো হল, শেষপর্যন্ত সে বাড়ি না ভেঙেই তাঁদের ফিরে আসতে হচ্ছে। বড় বড় চোখে সুমন দে ও তাঁর অতিথিরা বিস্ময় প্রকাশ করলেন – কলকাতার এ কী ভয়ঙ্কর অবস্থা! মজার কথা, পর্দায় পরিষ্কার দেখানো হল, যিনি ভাঙতে না দেওয়ার পান্ডা, তিনি কর্পোরেশনের কর্মীদের কাছে দাবি করলেন ওই নির্মাণ অবৈধ নয়। তাঁর কাছে বৈধ কাগজপত্র আছে। কিন্তু সে কাগজ দেখালেন না। অথচ সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের বললেন, তাঁদের ফ্ল্যাট ভেঙে দেওয়া হচ্ছে কারণ তিনি বিজেপি করেন। মেয়রের বাইটও দেখানো হল। তিনি বললেন, বেআইনি নির্মাণ ভেঙে দেব বললেই ভাঙা যায় না। অনেক সমস্যা আছে। তার একটা ঝলকই আজ দেখা গেছে। তারপরে স্টুডিওতে কর্পোরেশনের এবং মেয়রের অনেক সমালোচনা হল, কিন্তু দুঁদে সাংবাদিক সুমন দে বিজেপির প্রতিনিধিকে একবারও জিজ্ঞেস করলেন না, কী মশাই? আপনাদের লোকই তো বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে দিচ্ছে না দেখা যাচ্ছে। এবার কী বলবেন? জানা কথা, বিজেপির প্রতিনিধি হয় ওই লোকটিকে বিজেপির প্রতিনিধি বলে স্বীকার করতেন না, নয়ত বলতেন ব্যাপারটা তো এখন আদালতের বিচারাধীন। দেখতে হবে পৌরসভা আসল দোষীদের বাড়ি বাঁচিয়ে নির্দোষ লোকের বাড়ি ভাঙছে কিনা। কিন্তু প্রশ্নটা কি সম্পাদকমশায়ের করা উচিত ছিল না? রিপাবলিক টিভির মত গর্বিত গোদি মিডিয়ার পাশে আনন্দবাজার গোষ্ঠী তো এখনো নিরপেক্ষ বলে পরিচিত। তারাও যে হাতে প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বিজেপির প্রতিনিধিকে ছাড় দিয়ে দিল গার্ডেনরিচ কাণ্ডে, তাতে একটা জিনিসই প্রমাণ হয়।

আরও পড়ুন বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে ইমাম রশিদি

গার্ডেনরিচ মুসলমানদের এলাকা। অতএব ওখানে কাউন্সিলর, প্রোমোটার মায় বাড়ি চাপা পড়ে মারা যাওয়া মানুষগুলো, সকলেই দুর্নীতিগ্রস্ত – এই ধারণা গেড়ে বসেছে সংবাদমাধ্যমের মনে। হয়ত আগে থেকেই বসেছিল, এখন সাহস পেয়ে প্রকাশ করা হচ্ছে। সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধরার মত ববি হাকিমকে আক্রমণও সেই কারণেই। স্টুডিওর জটলায় এ প্রশ্নও উঠেছে যে একই লোকের হাতে তিনটে পদ কেন? অথচ শোভন চাটুজ্জে মেয়র থাকার সময়ে এবং পরবর্তীকালে তাঁর মেয়র পদ নিয়ে যখন টানাপোড়েন চলছিল, তখন কেউ প্রশ্ন তোলেনি – উনি একইসঙ্গে বেহালার বিধায়ক আর কর্পোরেশনের মেয়র কেন? তাঁকে মেয়রের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরেও বাংলার এই সংবাদমাধ্যমগুলোই গদগদ ছিল তাঁর আর প্রেমিকা বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাচগান, কাশ্মীর ভ্রমণ দেখাতে। দুর্নীতি নিয়ে এত আলোচনা হয়, অথচ তখন শোভনের বিপুল সম্পত্তি নিয়েও কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি।

আসলে বাঙালি ভদ্রলোকদের মধ্যে গার্ডেনরিচ আর রাজাবাজারকে জনান্তিকে শাসনের অযোগ্য এলাকা বলা বহুদিন ধরেই চালু। ইদানীং হিন্দুত্বের হাওয়া খেয়ে ফুরফুরে মেজাজে সেসব প্রকাশ্যে বলা আরম্ভ হয়েছে। এমন নয় যে একা সুমন দে বা আনন্দবাজার গোষ্ঠী এই দোষে দুষ্ট। ভোটের বাজারে ফ্যাসিবিরোধী সভা সমাবেশে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানো এক সাংবাদিক যেমন কদিন আগে এক অনলাইন বিতর্কে বললেন, রাজাবাজারের অটোওলাদের দৌরাত্ম্যের কারণেই নাকি হিন্দুদের মনে মুসলমানদের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি হয় এবং বিজেপির কাজ সহজ হয়। অর্থাৎ গোটা রাজ্যের অন্য সব এলাকার হিন্দু অটোওলারা সুবোধ বালক। একমাত্র রাজাবাজারের মুসলমান অটোওলারাই ভীষণ দৌরাত্ম্য চালায় আরোহীদের উপর। ঠিক যেমন গোটা রাজ্যে আর কোথাও জলা জায়গা ভরাট করে বহুতল তৈরি হচ্ছে না, দুটো বাড়ির মধ্যে যতখানি ফাঁক থাকা উচিত তা অগ্রাহ্য করে ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি হচ্ছে না, যেখানে তিনতলা বানানোর অনুমতি আছে সেখানে পাঁচতলা তুলে ফেলা হচ্ছে না। যত কাণ্ড গার্ডেনরিচে।

বহুল প্রচারিত সংবাদমাধ্যম এবং প্রগতিশীল বলে পরিচিত সাংবাদিক, অধ্যাপকরাও যখন এই বয়ান প্রচার করেন আর বিজেপিবিরোধী রাজনৈতিক দলের মুখপাত্ররাও চুপচাপ বসে শোনেন, সজোরে প্রতিবাদ করেন না – তখন বোঝা যায় পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির শিকড় গভীরে চারিয়ে গেছে। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি শেষমেশ একশো আসনও পেল না দেখে যাঁরা উদ্বাহু নৃত্য করেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা জিতে গেল বলে, তাঁরা দিবাস্বপ্নে মগ্ন ছিলেন। আসন্ন ভোটের ফল যা-ই হোক, পশ্চিমবঙ্গের এটাই বাস্তবতা। তাই বোধহয় তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বও ভোটের মুখে ববির পক্ষ নিয়ে বেশি কথাবার্তা বলে সংখ্যাগুরু ভোটারদের চক্ষুশূল হতে চাইলেন না। স্বঘোষিত প্রগতিশীলদের শত বুকনি সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ তামিলনাড়ু নয়, যেখানে বিজেপির এক নম্বর নেতা কে আন্নামালাইকেও বলতে হয় – আমাদের এখানকার ভোটে ইস্যু উন্নয়ন আর দুর্নীতি। হিন্দুত্ব নয়।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ইন্দিরা হতে অর্ধশতক পরে মোদীর হাত ধরে ফিরেছে জরুরি অবস্থা

এই আবহে যে নির্বাচন হবে তা যদি অবাধ হয়, তাহলে ফড়িংও পাখি, জলহস্তীও হাতি, দেবও মহানায়ক।

আগামী ৪ জুন আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষিত হবে। তার ঠিক ২১ দিন পরেই জরুরি অবস্থা ৪৯ পেরিয়ে পঞ্চাশে পা দেবে। নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ওই দিনটা কাউকে ভুলতে দেয় না। প্রতিবছরই ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, ওই ২১ মাস ভারতের ইতিহাসে অন্ধকার সময়। এবার যদি মোদী ক্ষমতায় ফিরতে পারেন, হয়ত গোটা বছর ধরেই বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হবে ইন্দিরা গান্ধী কী মারাত্মক স্বৈরতন্ত্রী ছিলেন, কংগ্রেস দেশের কত ক্ষতি করেছে ইত্যাদি। সুখের কথা, তার জন্যে আলাদা করে আয়োজন না করলেও চলবে। কারণ মনে করিয়ে দেওয়ার কাজটা ইতিমধ্যেই আরম্ভ হয়ে গেছে। ইনস্টা রিল প্রজন্মের অনেকেই জানত না কীভাবে সারা ভারতে বিরোধী দলের নেতা, কর্মীদের উপর অত্যাচার চালানো হয়েছিল, গ্রেফতার করা হয়েছিল, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল, সাংবাদিকদেরও কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। দশ বছরের মোদী রাজত্বে সেসব দেখানো হয়েছে। তবে ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী স্বকণ্ঠে নতুন কালের সূচনা ঘোষণা করার পরে তাও ঘটেছে যা জরুরি অবস্থার সময়ে ঘটেনি – দুটো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে কেন্দ্রীয় এজেন্সি গ্রেফতার করেছে।

তথ্যের খাতিরে অবশ্য বলতে হবে যে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী জেএমএম নেতা হেমন্ত সোরেন গ্রেফতার হবেন বুঝতে পেরে আগেভাগেই মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বভার চম্পাই সোরেনকে সঁপে দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনা হল, মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করে দিল্লির আম আদমি পার্টি সরকারের মত ঝাড়খণ্ডের জোট সরকারকেও ভেঙে ফেলাই ছিল বিজেপির লক্ষ্য। হেমন্ত আর অরবিন্দ কেজরিওয়াল এই কৌশলের বিরুদ্ধে লড়াই করার দুটো আলাদা পথ বেছে নিয়েছেন। হেমন্ত ক্ষমতা হস্তান্তর করে কারাবরণ করার পর, বিধানসভায় আস্থা ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন জোট সরকার ফেলে দেওয়ার চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কেজরিওয়াল ঠিক করেছেন পদত্যাগ করবেন না, কারারুদ্ধ থেকেই প্রশাসন চালিয়ে যাবেন। হয়ত এমনটা করবেন ঠিক করে রেখেছিলেন বলেই তিনি গতমাসে দিল্লি বিধানসভায় নিজেই আস্থা প্রস্তাব এনে আরও একবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করেছেন। ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রীর গ্রেফতারি অভূতপূর্ব ঘটনা। ফলে সম্ভব-অসম্ভবের কথা আলাদা, আইনত এমনটা করা যায় কিনা তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরাও দ্বিধায়। অমৃতকালে বোধহয় এমনই হয়ে থাকে।

কেবল দুই মুখ্যমন্ত্রীর গ্রেফতারিই অবশ্য একমাত্র অভূতপূর্ব ঘটনা নয়। দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দিয়েছে আয়কর বিভাগ। বিশ বছর আগের কর নাকি বকেয়া আছে, এই যুক্তিতে জরিমানা হিসাবে বিপুল পরিমাণ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। সিবিআই, ইডি, আয়কর বিভাগকে ব্যবহার করে কীভাবে নিজেদের তহবিলে পাহাড়প্রমাণ টাকা জড়ো করেছে বিজেপি, তা তো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নির্বাচনী বন্ডের প্রথম দফার তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। ২১ মার্চ বন্ডের নম্বরগুলো প্রকাশিত হওয়ার পরে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বিকল্প সংবাদমাধ্যম এবং বিশ্লেষকদের তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে আরও নানা তথ্য। তার অন্যতম হল দিল্লি সরকারের আবগারি নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত এক কাহিনি।

এই সেই নীতি, যা দিয়ে দুর্নীতি করা হয়েছে অভিযোগ তুলে দিল্লির উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়াকে দীর্ঘদিন বন্দি রাখা হয়েছে, আপের রাজ্যসভার সাংসদ সঞ্জয় সিংকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এখন কেজরিওয়ালকেও গ্রেফতার করা হল। একই মামলায় এছাড়াও গ্রেফতার হয়েছেন তেলেঙ্গানার সদ্যপ্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের মেয়ে কে কবিতা। এঁদের সকলের গ্রেফতারির পিছনেই রাজসাক্ষী পি শরৎ চন্দ্র রেড্ডির বয়ান। ইনি হায়দরাবাদের অরবিন্দ ফার্মা লিমিটেডের অন্যতম ডিরেক্টর। স্ক্রোল ওয়েবসাইটের তদন্ত বলছে, ২০২২ সালে গ্রেফতার হওয়ার পাঁচদিন পরে শরৎ বিজেপিকে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে পাঁচ কোটি টাকা দেন। এর কিছুদিন পরে তিনি জামিনের আবেদন করেন এবং কী আশ্চর্য! ইডি জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করেনি! তারপরেই তিনি দিল্লির আবগারি নীতি নিয়ে মামলায় রাজসাক্ষী হয়ে যান।

অতঃপর শরৎ বিজেপিকে আরও ২৫ কোটি টাকা দেন। এর সঙ্গে কেজরিওয়ালদের গ্রেফতারির সম্পর্ক বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই, পাঠক বুদ্ধিমান।

হেমন্তের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন আছে। দেশজুড়ে যতজন বিরোধী নেতাকে ইডি গ্রেফতার করেছে, তাঁদের কারোর বিরুদ্ধেই মামলা কিন্তু কোথাও পৌঁছচ্ছে না। প্রায়শই এ আদালত সে আদালতের বিচারক ইডিকে ধমকে জিজ্ঞেস করছেন, আপনারা কি সত্যিই মামলার নিষ্পত্তি চান? শিবসেনার সঞ্জয় রাউতকে জামিন দেওয়ার সময়ে মুম্বাই হাইকোর্টের বিচারক জিজ্ঞেস করেছিলেন, মুখ্য অভিযুক্তদের গ্রেফতার না করে সঞ্জয়ের জামিন আটকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কেন? ইডির আচরণ কোথাও প্রশ্নাতীত নয়। ফলে কয়েকদিন আগেই সুপ্রিম কোর্ট আদেশ দেয়, ইডি কাউকে গ্রেফতার করলে লিখিতভাবে জানাতে হবে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার সেই আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। ২০ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট সরকারের আবেদন খারিজ করে দেয়।

অর্থাৎ দেশের সরকার কোনোরকম কার্যকারণ না দেখিয়েই মানুষকে গ্রেফতার করার অধিকার দাবি করেছিল। প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট, ২০০২ আইনটার অবশ্য বদনামই আছে অযৌক্তিক দমনমূলক আইন হিসাবে। কিন্তু সে অন্য আলোচনার বিষয়। আমরা বরং দেখি, জরুরি অবস্থার ইন্দিরা-সঞ্জয়কেও লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মত কী কী কাজ হয়ে চলেছে লোকসভা নির্বাচনের মুখে।

বিদায়ী সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে দুই কক্ষ মিলিয়ে বিরোধী পক্ষের ১৪৬ জন সাংসদকে নানা ছুতোয় সাসপেন্ড করে একতরফা পাস করিয়ে নেওয়া হল নতুন টেলিকম আইন আর পুরনো ফৌজদারি আইন বাতিল করা তিনটে নতুন আইন, যেগুলো মারাত্মক দমনমূলক বলে অভিযোগ উঠেছে।

সামান্য চণ্ডীগড়ের কর্পোরেশনও যাতে বিরোধী জোটের হাতে না যায় তার জন্যে অনিল মাসি নামক এক নির্লজ্জ আধিকারিককে দিয়ে মেয়র নির্বাচনের দিন ব্যালট বিকৃতি ঘটিয়ে আপের প্রার্থীকে হারিয়ে জিতিয়ে দেওয়া হল বিজেপি প্রার্থীকে। সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করা মাত্রই দেখা গেল কয়েকজন আপ কাউন্সিলর দলবদল করে ফেলেছেন। মোদীজির নেতৃত্বে হঠাৎ আস্থা জেগে উঠেছে। শেষপর্যন্ত অবশ্য সর্বোচ্চ আদালত কড়া অবস্থান নেওয়ায় চণ্ডীগড় কর্পোরেশনে ভোটারদের রায়ই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচনকেও ছাড়া হচ্ছে না। সেখানেও রাত দুটোর সময়ে এক প্রার্থীকে বাতিল করে দিয়েছে প্রশাসন।

হিমাচল প্রদেশে রাজ্যসভা নির্বাচনের ভোটাভুটির আগে কংগ্রেসের কয়েকজন বিধায়ক উধাও হয়ে গেলেন। সেই ছজন কংগ্রেস বিধায়ক বিজেপি প্রার্থীকে ভোট দেওয়ায় ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের প্রার্থীর সঙ্গে ভোট ‘টাই’ হয়ে যায়। টসে জিতে যান বিজেপি প্রার্থী। ওই বিধায়কদের স্পিকার পরে সাসপেন্ড করেন। একই দিনে উত্তরপ্রদেশের রাজ্যসভা নির্বাচনেও ক্রস ভোটিংয়ের ফলে বিজেপির একজন অতিরিক্ত প্রার্থী জিতে যান। সবই অবশ্য বিবেকের সহসা জাগরণ, মোদীজির নেতৃত্বে ভারতের দুর্বার অগ্রগতিতে আস্থা তৈরি হওয়ার ফল।

মহারাষ্ট্রে শিবসেনাকে দ্বিখণ্ডিত করে একনাথ শিন্ডেকে সমর্থন দিয়ে সরকার গড়েছিল বিজেপি। অতঃপর নির্বাচন কমিশন দল ভেঙে বেরিয়ে আসা শিন্ডে গোষ্ঠীকেই আসল শিবসেনা বলে রায় দিয়ে শিবসেনার প্রতীক তাদেরই দিয়ে দিয়েছে। একই ঘটনা ঘটানো হয়েছে রাজ্যের আরেক দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির প্রতিও। শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিরাট অভিযোগ ছিল। তিনি বিজেপিতে যোগ দিতেই হয়ে গেলেন ধপধপে সাদা। তারপর নির্বাচন কমিশন তাঁর গোষ্ঠীকেই আসল এনসিপি গণ্য করে দলীয় প্রতীক দিয়ে দিল। দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং মহারাষ্ট্রের প্রবীণ নেতা শরদের দলকে এখন লড়তে হবে অন্য প্রতীকে।

বুঝতে অসুবিধা হয় না যে লোকসভায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর ৪০০ পার করার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করারই অঙ্গ এসব। রাজ্যসভা, লোকসভা – দুই কক্ষেই দু-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাই বিজেপির। নইলে সংবিধানের ল্যাজা মুড়ো বদলে দেওয়া যাবে না, ২০২৫ সালের মধ্যে হিন্দুরাষ্ট্র তৈরি করাও স্বপ্নই থেকে যাবে। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত চেয়েছিলেন। অনেকেরই মনে হয়েছিল তা অসম্ভব। কীভাবে সম্ভব করতে হয় তা দেখিয়ে দিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীর দল। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত সাফল্যের পর বিজেপি বা এনডিএর পক্ষে আসন আরও বাড়ানোও অনেকের অসম্ভব মনে হচ্ছে। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির হাতে ছিল কেবল দলীয় কর্মীবাহিনী আর রাজ্য প্রশাসন। মোদীর হাতে আছে যাবতীয় কেন্দ্রীয় এজেন্সি।

নির্বাচন কমিশনটাকেও করতলগত করার ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করার জন্যে গঠিত কমিটিতে আগে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। মোদী সরকার নতুন আইন করে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে ঢুকিয়েছে মন্ত্রিসভার এক সদস্যকে, অর্থাৎ বিরোধী দলনেতার ভূমিকা হয়ে গেল দর্শকের। নির্বাচনী বন্ডকে অসাংবিধানিক বলে দাবি করে যেমন সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছিল, তেমন এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করেও মামলা হয়েছে। সে মামলার শুনানি হওয়ার আগেই সাত তাড়াতাড়ি সভা ডেকে দুজন নতুন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করেছে সরকার। বিরোধী দলনেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, মাত্র ২৪ ঘন্টা সময় দিয়ে শ দুয়েক নামের তালিকা হাতে ধরিয়ে বেছে নিতে বলা হয়েছিল। মামলা গ্রহণ করে বিচারপতিরা বলেছেন, নির্বাচন এসে যাওয়ায় ওই আইনে স্থগিতাদেশ দিতে চান না। কিন্তু আর যা যা বলেছেন, তাতে আইনটি সম্পর্কে তাঁরা খুব সদয় বলে মনে হচ্ছে না। সরকারের এত তাড়া কিসের – সে প্রশ্ন তুলেছেন।

কিন্তু তাতে কী? যতদিনে এ মামলার রায় বেরোবে, ততদিনে হয়ত নির্বাচন মিটে যাবে। ঠিক যেমন নির্বাচনী বন্ড নিয়ে মামলা হয়েছিল ২০১৮ সালে, রায় বেরোল ২০২৪ সালে। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া আবার চেয়েছিল নির্বাচন পর্ব চুকলে নির্বাচনী বন্ডের তথ্য প্রকাশ করতে। তারপর সুপ্রিম কোর্টের ধমকের জোর যত বাড়ল, তথ্য প্রকাশের গতিও তত বাড়ল। এখন দেখা যাচ্ছে, গত নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট বন্ডের মামলায় নিজেদের রায় রিজার্ভ করার পরেও বিজেপি সরকার বন্ড ছাপা বন্ধ করেনি। ২০২৪ সালের তৃতীয় মাস এখনো শেষ হয়নি, এর মধ্যেই ৮,৩৫০ কোটি টাকার নির্বাচনী বন্ড ছাপা হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিজেপি ২০১৮ সাল থেকে বন্ডে মোট ৮,২৫১ কোটি টাকা পেয়েছে। আর যে যে দল বন্ডে টাকা নিয়েছে তারা সকলে মিলেও এত টাকা পায়নি। এর পাশে রাখুন দেশের প্রধান বিরোধী দলের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া, টাকা কেড়ে নেওয়া। কোনো সন্দেহ নেই, এরপর কংগ্রেস অনেক আসনে প্রার্থী দিতেই খাবি খাবে। ইতিমধ্যেই গুজরাটের এক আসনে নাম ঘোষণা হয়ে যাওয়া প্রার্থী প্রথমে বাবা অসুস্থ – এই কারণ দেখিয়ে নিজের নাম তুলে নেন, তারপর পার্টি থেকেই পদত্যাগ করেছেন। এক্স হ্যান্ডেলে জানিয়েছেন, দুই প্রজন্ম ধরে তাঁকে আর তাঁর বাবাকে নাকি কংগ্রেস নেতৃত্ব চরম অসম্মান করে এসেছেন। তাই এই সিদ্ধান্ত। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন, কংগ্রেস নেতারা সনাতন ধর্মকে সম্মান করেন না।

এরপর কী হতে যাচ্ছে, কোন বিরোধী নেতা গ্রেফতার হতে যাচ্ছেন আমরা জানি না। শনিবার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী মহুয়া মৈত্রের বাড়িতেও সিবিআই হানা দেয় এবং শূন্য হাতে ফিরে যায়। দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে সরকারবিরোধী দল এবং ব্যক্তিদের একমাত্র আশার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। চাতক পাখির মত আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন সবাই – যদি এমন কোনো রায় দেওয়া হয় যাতে সরকার কোণঠাসা হয়। এমনটা যে দেশে হয়, বুঝতে হবে সে দেশের গণতন্ত্রের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। পার্শ্ববর্তী পাকিস্তানেই এমন হতে দেখা যায়। আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত লোকেরা আবার অবাধ নির্বাচন বলতে বোঝেন রক্তপাতহীন নির্বাচন। সেই সরলমতি মানুষগুলোর উদ্দেশে বলা যাক, এই আবহে যে নির্বাচন হবে তা যদি অবাধ হয়, তাহলে ফড়িংও পাখি, জলহস্তীও হাতি, দেবও মহানায়ক। এমনিতেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন আছে যার সন্তোষজনক উত্তর দিতে নির্বাচন কমিশনের ভারি অনীহা। উত্তর দিয়ে দিলে কথা ছিল না, কিন্তু আলোচনাই করতে না চাওয়া যে প্রবণতার দিকে নির্দেশ করে তাকে গোদা বাংলায় বলে ‘ঠাকুরঘরে কে রে?’, ‘আমি তো কলা খাইনি।’ আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে চাই না, তাই কেবল একটা তথ্য উল্লেখ করা যাক। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর দ্য কুইন্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, একটা-দুটো নয়, মোট ৩৭৩ আসনে নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী প্রদত্ত ভোটের সঙ্গে গোনা ভোটের বিস্তর তফাত ছিল। এই তফাতের কোনো ব্যাখ্যা কমিশন আজ পর্যন্ত দেয়নি।

তাহলে করণীয় কী? আমার-আপনার মত সাধারণ নাগরিকের কী করা উচিত জানি না, বিরোধী দলগুলোর অবশ্যই সর্বশক্তি দিয়ে পথেঘাটে আন্দোলনে নামা উচিত এই সরকারের বিরুদ্ধে। কারণ নির্বাচনে তারা যাতে নিজেদের শক্তি অনুযায়ীও লড়তে না পারে সরকারের তরফে তার যাবতীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। হয়ত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হবে যে বিরোধীপক্ষের সেরা বক্তারা প্রায় সবাই কারান্তরালে থাকবেন প্রচার পর্বে। সুতরাং এখন আর আলাদা করে প্রচার, আসন সমঝোতা – এসব নিয়ে ভেবে লাভ কী? পথে নামা ছাড়া বিরোধীদের সামনে প্রচারেরই বা আর কোন পথ খোলা আছে? প্রায় কোনো মূলধারার সংবাদমাধ্যমই তো বিরোধীদের জায়গা দেবে না। টাকাপয়সার বিপুল অসাম্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিজেপির সঙ্গে এঁটে ওঠাও তৃণমূল কংগ্রেসের মত দু-একটা দল ছাড়া বাকিদের পক্ষে অসম্ভব। সুতরাং রাস্তাই একমাত্র রাস্তা নয় কি?

অথচ আমরা কী দেখছি? কংগ্রেসের তিন প্রধান নেতা রাহুল গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী, মল্লিকার্জুন খড়্গেকে সাংবাদিক সম্মেলন করতে দেখছি। ইন্ডিয়া জোটের নেতাদের কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন নিবেদন করতে দেখছি। দিল্লির রাজপথে লাগাতার আন্দোলনে সব দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে কবে দেখব? কেরালায় কংগ্রেস, সিপিএম দুই দলই পথে নেমেছে। কিন্তু দেশজুড়ে বিরোধীদের পাড়ায় পাড়ায় আন্দোলন কবে দেখব? এদেশের বিরোধীরা কি তেমন আন্দোলন করতে ভুলে গেছেন? ২০১২ সালে নির্ভয়া কাণ্ডের পরে দিল্লির চেহারা এর মধ্যেই ভুলে গেলেন? আম আদমি পার্টির উত্থানই তো রামলীলা ময়দান আঁকড়ে পড়ে থাকা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে। সে আন্দোলনে যিনি কেজরিওয়ালের গুরু ছিলেন, সেই আন্না হাজারে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে অনন্ত শয্যায় শায়িত ছিলেন। কেজরিওয়াল গ্রেফতার হওয়ার পর জেগে উঠে সংবাদসংস্থা এএনআইকে বিবৃতি দিয়ে গ্রেফতার সমর্থন করেছেন। সমর্থন করার কারণটি জব্বর।

ওসব কথা থাক। প্রশ্ন হল, নিজেরা ক্ষমতায় থাকার সময়ে আন্দোলন, রাজনীতি সম্পর্কে যে বিতৃষ্ণা তৈরি করিয়েছিলেন সাধারণ নাগরিকদের মনে, বিজেপিবিরোধীরা কি এখন তারই ফাঁদে পড়েছেন? ১৯৯১ সালের উদারীকরণের পর থেকেই তো কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস, উদারপন্থী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, বিচারপতি, এমনকি এই শতাব্দীর গোড়া থেকে এ রাজ্যের কমিউনিস্ট শাসকদেরও আমরা বলতে দেখেছি – মিছিল মানুষকে অসুবিধায় ফেলে, বনধ কর্মনাশা ইত্যাদি। তাই বোধহয় এখন আন্দোলনের বদলে আদালতে ভরসা রাখতে হচ্ছে। যেসব দলের নির্বাচনে আসন পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য থেকে মাইনাসে, তারাও গণতন্ত্র বাঁচানোর চেয়ে কে কোন আসনে লড়বে তা নিয়ে দরাদরি করতে ব্যস্ত। কেউ বলছে ‘অমুক আসন আমাদের সেন্টিমেন্ট’, ‘কেউ বলছে তমুক আসনে আমরা যথেষ্ট শক্তিশালী’। যেন দাঁড়ালেই ‘এলেম, দেখলেম, জয় করলেম’ হয়ে যাবে।

এদেশের বিপন্ন মানুষ কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ভরসায় না থেকে নিজের মত করে লড়াই করে যাচ্ছেন। দেশের কৃষকরা আবার পথে। মোদী সরকার তাঁদের পথে আক্ষরিক অর্থে কাঁটা বিছিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা পিছু হটছেন না। যদিও সরকারের বদান্যতায় মূলধারার সংবাদমাধ্যম তো বটেই, সোশাল মিডিয়া থেকেও কৃষক আন্দোলনের খবর উধাও।

লাদাখের মানুষও গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে রোজ রাস্তায় নামছেন, পরিবেশ ধ্বংসের প্রতিবাদে সুবিখ্যাত সোনম ওয়াংচুক অনশনে বসেছেন।

ভারতের মত বিরাট দেশের অমিত ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে এ ধরনের আন্দোলন যে একেবারেই সফল হতে পারে না তা নয়। ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনই দেখিয়ে দিয়েছে গণআন্দোলনের ক্ষমতা কতখানি। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো নেতৃত্ব দিচ্ছে না এমন আন্দোলনের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও আছে। ২০১৯-২০ সালের এনআরসি, সিএএবিরোধী আন্দোলনেরও সেই সীমাবদ্ধতা ছিল। রাজনৈতিক দলগুলো সেই আন্দোলনেও ঝাঁপিয়ে পড়েনি, আন্দোলনকে এবং তার দাবিগুলোকে পাড়ায় পাড়ায় পৌঁছে দেয়নি। ফলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধারণা হয়ে যায় – এটা মুসলমানদের সমস্যা, তাই ওরা আন্দোলন করছে। একইভাবে এখনো বহু মানুষ ভাবছেন কৃষি আইনগুলো কৃষকদের সমস্যা, লাদাখের ব্যাপারটা লাদাখের মানুষের সমস্যা আর মণিপুর তো বিস্মৃত, কাশ্মীর মুসলমানপ্রধান হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কল্পনাতেও নেই। এককথায় দেশের বিরোধী রাজনীতি সময়ের চেয়ে, পরিস্থিতির চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। যতদিন পিছিয়ে থাকবে তত দ্রুত ভারত ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তায়িপ এরদোগানের তুরস্ক হওয়ার দিকে এগিয়ে যাবে। এখন জরুরি অবস্থা।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ওয়কীল হাসানের গণতন্ত্র, না মুকেশ আম্বানির ধনতন্ত্র?

‘আমার মাথার উপরে যে সামান্য ছাদ ছিল সেটাও আমার কাছে থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমার বাচ্চারা পথে বসে আছে, স্যার। এখন আমি এই বাচ্চাগুলোকে নিয়ে কোথায় কাটাব সারাজীবন? আজকাল মানুষের পক্ষে রোজগার করাই শক্ত। সেখানে আমি আবার ঘর কোথায় পাব, কী করে বানাব? ছেলেমেয়েদের মানুষ করব কী করে? মরে যাওয়া ছাড়া তো আর কোনো পথ নেই আমাদের সামনে… সরকারের সঙ্গে আমার কোনো কথাবার্তা হয়নি। আপনারা এসেছেন, আপনারা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। দেখা যাক, সরকারের কানে পৌঁছয় কিনা। জানি না সরকার আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে কি করবে না। আমি ওদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনাদের কাছে কী আছে যার ভিত্তিতে আপনারা আমার বাড়ি ভাঙতে এসেছেন? আমাকে কিছুই দেখাতে পারেনি। স্রেফ আমাকে ধরে পুলিস স্টেশনে পাঠিয়ে দিল। আমার সঙ্গে আমার বন্ধু মুন্নাও (কুরেশি) ছিল, ওকেও পাঠিয়ে দিল। সেখানে আটটা পর্যন্ত আটকে রেখেছিল। আমার নাবালিকা মেয়ে, বউ আর ছেলেকেও ওখানেই রাখা হয়েছিল। আমার ছেলের চোট লেগেছে, মারধরও করা হয়েছে… স্যার, আমার তারিফ তো গোটা দুনিয়া করছে। উত্তরাখণ্ড সরকার আমাদের ৫০ হাজার টাকা করে দিয়েছিলও। কিন্তু আজকের দিনে ৫০ হাজার টাকায় কী হয়? আমাদের মাথার উপরে এত ধার যে বাচ্চাদের খাইয়ে পরিয়ে মানুষ করব, বাড়ি বানাব, না ধার শোধ করব? অনেক কষ্ট করে অত ভাল একটা কাজ করলাম, সরকার আমাদের সাহায্য করলে আমাদেরও মেনস্ট্রিমে আসার সুযোগ হত। কিন্তু যেখানে ছিলাম আবার সেখানেই পৌঁছে গেলাম। আজ আমার বাড়িই ভেঙে দেওয়া হল, আমার বাচ্চারা দেখুন পথে বসে আছে।’

উপরের কথাগুলো কোনো সিনেমার সংলাপ নয়, নির্বাচনী বক্তৃতা নয়, পরাধীন দেশের মানুষের বিলাপও নয়। টিভি ক্যামেরার সামনে কথাগুলো বলেছেন ওয়কীল হাসান। মাত্র মাস তিনেক আগেই এই মানুষটি এবং তাঁর সঙ্গীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তরাখণ্ডের সিলকিয়ারা টানেল থেকে বার করে এনেছিলেন দুর্ঘটনায় আটকে পড়া ৪১ জন শ্রমিককে। ধন্য ধন্য করেছিলাম আপনি, আমি। পিঠ চাপড়াতে, মালা পরাতে ছুটে গিয়েছিলেন উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর ধামি স্বয়ং। মনে হয়েছিল এই র‍্যাট হোল মাইনারদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়েছে গোটা দেশ। দেখা গিয়েছিল, উদ্ধারকারীদের একটা বড় অংশ মুসলমান। সেই মুসলমান যাঁদের পোশাক দেখেই দেশের প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসবাদী বলে চিনতে পারেন। যাঁদের কথা বা কার্যকলাপ অপছন্দ হলেই পাকিস্তান চলে যেতে বলা আজকাল স্কুলের শিশুদের মধ্যেও চালু হয়ে গেছে। এঁরা সেই সম্প্রদায়ের লোক যাঁরা সম্প্রদায়গত পরিচিতির কারণেই ট্রেনে যেতে যেতে খুন হয়ে যান কোনো উর্দিধারী পুলিসের গুলিতে, গণপিটুনিতে মারা যান স্রেফ ফ্রিজে গোমাংস রাখা আছে সন্দেহে। যে উত্তরাখণ্ডের টানেল থেকে জীবন বাজি রেখে শ্রমিকদের উদ্ধার করেছিলেন, সেই উত্তরাখণ্ডেই মুসলমানদের বহুদিনের বাসা খালি করে চলে যেতে হয় হুমকির মুখে।

এই সমস্ত কথা জানা সত্ত্বেও যখন সিলকিয়ারার উদ্ধারকার্যের পর অনেকে উল্লেখ করছিলেন যে উদ্ধারকারীরা অনেকেই মুসলমান, তখন অনেক উদারপন্থী এবং বামপন্থীও নাক সিঁটকে বলেছিলেন – আহা, সবেতে ধর্ম টেনে আনা কেন! দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি পাড়ার অন্য সমস্ত বাড়ি অক্ষত রেখে স্রেফ তাঁর বাড়িটাকেই বেআইনি জমিতে তৈরি বলে দেগে দিয়ে ভেঙে ফেলার পর ওয়কীল প্রশ্ন তুলেছেন তিনি মুসলমান বলেই কি এই কাণ্ড করা হল?

ইন্ডিয়া টুডে চ্যানেলের সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাই আর দিল্লির প্রাক্তন লেফটেন্যান্ট গভর্নর নজীব জঙ্গের সঙ্গে কথোপকথনে তিনি বলেছেন, তাঁর বাড়ির গোটা এলাকা বহুকাল আগেই অনুমোদিত হয়ে গেছে। সেখানে স্কুল আছে, আইনি পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হয়েছিল এবং বাড়ি তৈরি করতে ব্যাঙ্ক ঋণও দিয়েছিল। ২০০৮ সালেই ওই এলাকাটিকে আইনি কলোনির শংসাপত্র দেওয়া হয় বলে ওয়কীল জানিয়েছেন।

তাহলে বেছে বেছে ওয়কীলের বাড়িই কেন ভাঙা হল? কেউ কৈফিয়ত দেয়নি। অমৃতকালের ভারতে কেউ কৈফিয়ত দেয় না। দিল্লির বিজেপি সাংসদ মনোজ তিওয়ারি বলেননি যে কী করে আইনি এলাকার মধ্যে হঠাৎ একটি বাড়ি বেআইনি হল। কিন্তু হইচই পড়ে যাওয়ায় জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার অধীনে ঝুপড়ির বাসিন্দাদের যে ঘর দেওয়া হয়, তেমনই একটা ঘর ওয়কীলের পরিবারকে দেওয়া হবে। ওয়কীল অবশ্য বলে দিয়েছেন, তিনি ঠিক ওখানেই তাঁর বাড়ি ফেরত চান। অন্য কোথাও অন্য কোনোখানে সরকারের দাক্ষিণ্যে কোনো ঘরবাড়ি তিনি চান না। পথে বসে যাওয়া মানুষের পক্ষে জেদ ধরে রাখা শক্ত। বিশেষত যখন তিনি যুগপৎ গরিব এবং সংখ্যালঘু। তাই ওয়কীল নিরুপায় হয়ে কিছুদিন পরে সরকারের দেওয়া বাড়িতে সপরিবারে উঠে গেলে তাঁকে দোষ দেওয়া যাবে না। হয়ত সেটাই অনিবার্য। কিন্তু ওয়কীলের প্রতি যে ব্যবহার করা হল তার আলোকে দেশের শাসনব্যবস্থা তথা গণতন্ত্র নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন।

ধরে নেওয়া যাক, ওয়কীল জীবনে একটিও নায়কোচিত কাজ করেননি। সিলকিয়ারা টানেলের উদ্ধারকার্যে তাঁর কোনো ভূমিকা ছিল না। তিনি কেবল একজন ছাপোষা ভারতীয়। তাহলেই কি দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির কাজটা বৈধ হয়ে গেল? নাজীব জঙ্গ কিন্তু বলেছেন কোনো অবৈধভাবে নির্মিত বাসস্থান ভেঙে দিতে হলে বসবাসকারীদের অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হয় – আইনে পরিষ্কার লেখা আছে।

মুশকিল হল, গত কয়েক বছরে আমরা এমন বুলডোজারপ্রেমী হয়ে উঠেছি, ক্ষমতাশালীকে অভ্রান্ত ভাবা এমন স্বভাবে পরিণত হয়েছে যে আইন মানা হয়েছে কি না হয়েছে তা নিয়ে আর আমরা ভাবি না। প্রকাশ্যে কারোর নামে একটা অভিযোগ করে দিলেই হল। সকলেই ধরে নিই, অভিযোগটা সত্যি। অর্থাৎ ডিডিএ যখন বলছে, সাংসদ যখন বলছেন, তখন ওয়কীলের বাড়িটা নিশ্চয়ই বেআইনি ছিল। অভিযুক্ত মাত্রেই অপরাধী বলে ধরে নেওয়ার এই মানসিকতার চাষ করা হয়েছে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে, সঙ্গত করেছে দেশের সংবাদমাধ্যম। ভুয়ো ভিডিও, ভুয়ো বলে ইতিমধ্যেই প্রমাণিত ভিডিও, চালিয়ে প্রমাণ করে দেওয়া হয়েছে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাশ্মীরের স্বাধীনতা চেয়ে স্লোগান দিয়েছে ছাত্রছাত্রীরা।

সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন এক বেঞ্চ এক মামলায় বলেছে, এখন থেকে অভিযুক্তের সম্পর্কে আইনের চিরাচরিত মূল নীতি – ‘নিঃসংশয়ে অপরাধী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ’ – থেকে সরে আসতে হবে; যদি ট্রায়াল কোর্টে অভিযুক্ত দোষী সাব্যস্ত হয়। এনকাউন্টারে অভিযুক্তদের মেরে ফেলা এবং আন্দোলনকারীদের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া তো নিয়মে পরিণত করা হয়েছে বহু রাজ্যে। উত্তরপ্রদেশ সরকার এর জন্যে সুপ্রিম কোর্টের কাছে বকুনি খাওয়ার পরেও বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে প্রতিবাদী স্বর স্তব্ধ করতে বুলডোজার চলছেই। এমনকি তৃণমূলশাসিত পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার চণ্ডীতলাতেও বুলডোজার দিয়ে বিরোধীদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল গতবছর। বুলডোজার ন্যায়কে বৈধতা দিতে মাঠে নেমেছেন বিচারপতিরাও। নিজের রায়ের থেকেও আক্রমণাত্মক বাণী দেওয়ার জন্যে বেশি বিখ্যাত কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অভিজিৎ গাঙ্গুলি গতবছর এক বেআইনি নির্মাণ সংক্রান্ত মামলায় সগর্বে বলেছিলেন, ‘দরকার পড়লে যোগী আদিত্যনাথের থেকে কিছু বুলডোজার ভাড়া করুন।’

অর্থাৎ আইনের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদনের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, নাগরিকের মৌলিক অধিকার – কোনোকিছুই আর আজকের ভারতে ধ্রুব সত্য নয়। একবার প্রশাসনের কোপে পড়লে আমি নির্দোষ, একথা প্রমাণের দায়িত্ব যে অভিযুক্ত তারই উপরে এসে পড়ছে ক্রমশ।

ফলে ওয়কীলের যা হয়েছে, তাঁর নাবালক ছেলেমেয়েরা যা সহ্য করেছে, তা কাল যে কোনো কারণে আমাদের যে কাউকে সহ্য করতে হতে পারে। ওয়কীল তবু একটা নায়কোচিত কিছু করেছিলেন, তাই গোদি মিডিয়াকেও তাঁর খবর দেখাতে হচ্ছে। দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর বিনয় কুমার সাক্সেনা, সাংসদ মনোজ প্রমুখকে অন্তত মুখে বলতে হচ্ছে – ব্যাপারটা দুঃখজনক, ওঁকে ঘর দেওয়া হবে ইত্যাদি। আমার, আপনার বেলায় তাও হবে না। দেশের বহু মানুষের ইতিমধ্যেই সেই দশা হয়েছে।

যাঁরা ভাবছেন প্রতিবাদে, প্রতিরোধে থাকেন না বলে বেঁচে যাবেন অথবা মুসলমান নন বলে বেঁচে যাবেন, তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার কানপুর দেহাতের এক ছোট গ্রামের বাসিন্দা প্রমীলা দীক্ষিত আর তাঁর মেয়ে নেহার কথা। তাঁদের বাড়িও অবৈধ বলে বুলডোজার দিয়ে ভাঙতে গিয়েছিল প্রশাসন। এক পক্ষ বলে তাঁরা প্রতিবাদে গায়ে আগুন দেন, আরেক পক্ষের বক্তব্য, প্রমীলা আর নেহা বাড়ির ভিতরে থাকা অবস্থাতেই তাঁদের কুঁড়ে ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয় উচ্ছেদ করতে আসা প্রশাসন। সম্ভবত এঁরা ব্রাহ্মণ বলেই উত্তরপ্রদেশ পুলিস আধিকারিকদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছিল। কিন্তু তাতে তো আর মরা মানুষ বেঁচে ওঠে না। সুতরাং ওয়কীলের সহমর্মী না হওয়া মানে, বুলডোজার ন্যায়কে সমর্থন করা মানে ঘুঁটে পুড়তে দেখে গোবরের মত হাসা।

সম্প্রতি জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠির একটি ভিডিও প্রচণ্ড ভাইরাল হয়েছে। সেখানে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ভারত ক্রমশ একনায়কতন্ত্রে পরিণত হচ্ছে কিনা। তিনি এমন কোনো তথ্য দেননি যা সচেতন ভারতীয়রা এতদিন জানতেন না। বরং অশনি সংকেতগুলোকে একত্র করাই এই ভিডিওতে ধ্রুবের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। তবে তিনি একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন – দেশে ভোট হচ্ছে মানেই গণতন্ত্র আছে এমন মনে করা ভুল।

উত্তরপ্রদেশে, দিল্লির জাহাঙ্গীরপুরী, খজুরি খাসে বা পশ্চিমবঙ্গের চণ্ডীতলায় – কোথাও নির্বিচারে বুলডোজার চলাই গণতন্ত্রের লক্ষণ নয়। ওয়কীল, মুন্নারা পথে বসলে গণতন্ত্র টেকে না। মুকেশ আম্বানির ছেলের বিয়ে গণতন্ত্র ছাড়াও হতে পারে।

ধৈর্য থাকলে ভেবে দেখতে পারেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সর্বদা গরিব মানুষের বাসস্থানই কেন বেআইনি গণ্য হয়? আর বড়লোকের ছেলের বিয়ের জন্যে কেন রাতারাতি ছোট বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অনুমোদন পেয়ে যায়?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

স্রেফ কৃষকদের আটকাতে দুর্ভেদ্য দিল্লি!

গণতান্ত্রিক দেশের রাজধানীতে রবারের বুলেট চলতে দেখার অভ্যাস ভারতের নাগরিকদের নেই। সেটা আছে কাশ্মীর উপত্যকার মানুষের। কাশ্মীরকে শান্ত করে দেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন সম্রাট মোদী। দেখা যাচ্ছে, কাশ্মীরের মত ঘটনা খোদ দিল্লিতে ঘটছে।

দুর্গকে দুর্ভেদ্য করে তুলতে চারপাশে পরিখা কেটে দেওয়ার প্রথা সুপ্রাচীন। ইউরোপ, এশিয়া – সব জায়গার রাজারাই এই পন্থা অবলম্বন করতেন। বর্তমানে কেন্দ্রে সরকার চালাচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের ঘোর অপছন্দের মোগল সম্রাটরাও একাজ করেছিলেন। লালকেল্লাকে বেষ্টন করে সেই পরিখা আজও আছে, যদিও এই শীতে সেই পরিখা শুকনো। লালকেল্লার প্রবেশদ্বারে আজ দাঁড়িয়ে আছেন নরেন্দ্র মোদী। সেলফি পয়েন্টে বসে, দাঁড়িয়ে তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার জন্যে সময়ও ব্যয় করেন অনেক পর্যটক। মোদী ছবির মত, বা সম্রাটের মতই নীরব, এবং তাঁর রাজধানী দিল্লিকে দুর্ভেদ্য করতে এই মুহূর্তে দুর্গের মতই ঘিরে ফেলেছে দিল্লি পুলিস। পার্শ্ববর্তী হরিয়ানা, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ থেকে যাতে দিল্লিতে ঢোকা না যায় সেজন্য লম্বা লম্বা পেরেক, কংক্রিটের বাধা, কাঁটাতারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কে আসছে দিল্লি আক্রমণ করতে? সুদূর পারস্য থেকে নাদির শাহ? আফগানিস্তান থেকে আহমদ শাহ আবদালী? গজনীর সুলতান মামুদ? অ্যাটিলা দ্য হুন? অ্যালারিক দ্য গথ? না। আসছেন এই দেশের মাটিতে জন্মানো, বেড়ে ওঠা এবং এদেশেরই মাটিতে ফসল ফলানো কৃষকরা। কী জন্যে আবার দিল্লি অভিমুখে চলেছেন কৃষক সংগঠনের আন্দোলনকারীরা? সরকারকে উৎখাত করতে নয়, নিজেদের বহু পুরনো দাবি আদায় করতে। সেই দাবিগুলোর মধ্যে আছে এম এস স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার দাবি। এই সেই স্বামীনাথন, যাঁকে মাত্র কয়েকদিন আগে ভারতরত্ন বলে ঘোষণা করেছে মোদীরই সরকার। তাহলে কৃষকদের ট্র্যাক্টর নিয়ে দিল্লি শহরে ঢুকতে দিতে আপত্তি কিসের? এই কৃষকদের বন্দুক দেখিয়ে লাভ হয় না, ইডি, সিবিআই লেলিয়ে দিয়ে দল ভাঙানোর উপায় নেই, এঁরা পথে নেমে পড়লে দাবি আদায় করে তবেই বাড়ি ফেরেন – এই কি তবে আতঙ্কের কারণ?

মাত্র দুটো শীত কেটেছে, তারপরেই আবার পথে নেমেছেন দেশের কৃষকরা। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে সংসদে পাস করা তিনটে নতুন কৃষি আইন বাতিল করার দাবিতে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা অগ্রাহ্য করে ২০২০ থেকে ২০২১ দিল্লির রাস্তায় বসেছিলেন আন্দোলনকারী কৃষকরা। প্রবল প্রতাপান্বিত সরকার প্রথমে তাঁদের দাবিতে আমল দিতে চায়নি, তারপর আলোচনায় বসেছে, একইসঙ্গে বশংবদ প্রচারমাধ্যমকে দিয়ে দেশের বাকি মানুষের কাছে আন্দোলনকারীদের ভণ্ড, সন্ত্রাসবাদী, দেশবিরোধী ইত্যাদি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। বহু কৃষক সেই দীর্ঘ আন্দোলনে থাকতে থাকতে পথেই প্রাণ হারিয়েছেন। উত্তরপ্রদেশের লখিমপুর খেরিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ছেলের গাড়ি চারজন কৃষককে পিষে দিয়েছে। কিন্তু আন্দোলন থামেনি। কৃষকদের ঘিরে ফেলতে সরকারের ঝুলি থেকে ব্যারিকেড, কাঁটাতার বেরিয়েছে তখনই। কিন্তু কৃষকরা পিছু হটেননি, নিজেদের দাবিতে অনড় থেকেছেন এবং শেষপর্যন্ত বিরোধী দলের সাংসদরা সংখ্যার কারণে সংসদে যে আইনগুলো পাস হওয়া আটকাতে পারেননি, সেগুলোকে বাতিল করিয়ে তবেই দিল্লি ছেড়েছেন। আর ২-৩ মাসের মধ্যেই নির্বাচন। এই সময় কৃষকদের চাপের কাছে ফের মাথা নোয়াতে হলে সম্রাট মোদীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ক্ষমতায় ফেরার পথে মাথা তুলে দাঁড়াবে কাঁটা – একথা ভেবেই কি কেন্দ্রীয় সরকার আক্রান্ত?

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, ১৪ ফেব্রুয়ারির দিল্লি অভিযানে হরিয়ানার কৃষকদের যোগ দেওয়া আটকাতে সে রাজ্যের বিজেপি সরকারের পুলিস এলাকায় এলাকায় হুমকি দিচ্ছে, যারা আন্দোলনে যাবে তাদের পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা হবে। আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে তাদের বিরুদ্ধে।

হরিয়ানা পুলিস ড্রোন থেকে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার মহড়া দিয়েছে। সে মহড়া কাজে লাগানো হয়েছে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে, শম্ভু সীমান্তে ১৪ ফেব্রুয়ারি সকালেও। চালানো হয়েছে জলকামান, এমনকি রবারের বুলেটও।

আরও পড়ুন ক্রিকেটার তুমি কার?

গণতান্ত্রিক দেশের রাজধানীতে রবারের বুলেট চলতে দেখার অভ্যাস ভারতের নাগরিকদের নেই। সেটা আছে কাশ্মীর উপত্যকার মানুষের। কাশ্মীরকে শান্ত করে দেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন সম্রাট মোদী। দেখা যাচ্ছে, কাশ্মীরের মত ঘটনা খোদ দিল্লিতে ঘটছে। আসলে সরকারের অপছন্দের কথা বললেই তার বিরুদ্ধে চলবে যাবতীয় অস্ত্র। জায়গাটা কাশ্মীর হোক, মণিপুর হোক আর দিল্লিই হোক। কাশ্মীরে না হয় ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের বিপদ আছে, মণিপুরে আছে মেইতেই বনাম কুকি সংঘর্ষ। দিল্লিতে তো কৃষকরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লড়তে আসছিলেন না। তাহলে এত বাধা তৈরি করা কেন? কার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে বলে সন্দেহ করছে সরকার? জানার কোনো উপায় নেই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর বলেছেন, হিংসায় কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। কৃষকদের আলাপ আলোচনা করা উচিত। সরকার আলোচনা করতে চায়, করছেও। তিনি অবশ্য বলেননি, আলোচনা করতে হলে দিল্লি শহরকে দুর্গম গিরি কান্তার মরু করে তুলতে হবে কেন? কেনই বা আন্দোলনকারীদের আক্রমণ করতে হবে?

গত দুদিনের ঘটনাবলী থেকে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যেও উঠে আসছে একগুচ্ছ প্রশ্ন। বিভিন্ন রাজ্যের, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের, নানা আদর্শের কৃষকরা তাঁদের দাবির ভিত্তিতে একজোট হয়ে এত আক্রমণের সামনেও এক হয়ে হার-না-মানা আন্দোলন করতে পারেন। অথচ বিরোধী দলগুলো পারে না কেন? তাদের সরকারবিরোধিতা কেবল কিছু বক্তৃতা, যাত্রা আর নির্বাচনে আসন ভাগাভাগিতে সীমাবদ্ধ থেকে যায় কেন? দেশের বিভিন্ন অংশের মানুষের অসন্তোষকে পুঞ্জীভূত করে গণআন্দোলনের রূপ দেওয়ার কাজে খামতি থেকে যাচ্ছে কেন? যে সরকার কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে বহিঃশত্রুর মত ব্যবহার করে, পেশিশক্তির পূর্ণ ব্যবহার করে, তাকে স্রেফ নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি আর আসন সমঝোতা করে হারিয়ে দেওয়া যাবে – এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে কী করে দিন কাটাচ্ছেন ভারতের বিরোধী নেতৃবৃন্দ?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করেও যে বিজেপি চারশো আসন পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয় তা পরিষ্কার। বিরোধী নেতাদের ভীরুতাকে তারা হাতিয়ার করতে চাইছে। ইডি, সিবিআইয়ের খাতায় কেবল নীতীশ কুমার বা মমতার দলের নেতা মন্ত্রীদের নামেই অভিযোগ আছে তা তো নয়। কেরালায় সিপিএম নেতা, মন্ত্রীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল।

জার্মানিতে নাজি পার্টির উত্থান ও পতন নিয়ে মার্কিন সাংবাদিক উইলিয়াম শাইরারের লেখা একখানা বই সারা বিশ্বে সমাদৃত। দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অফ দ্য থার্ড রাইখ নামে এই বইতে শাইরার লিখেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর হোহেনজোলার্ন রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছিল একটা দুর্ঘটনা (“proclaimed by accident!”)। কারণ যুদ্ধে পরাজয়ের পর কাইজার (জার্মান সম্রাট) সিংহাসন ছেড়ে দেন, ওদিকে বার্লিনে তখন জোরদার সাধারণ ধর্মঘট চলছে। রোজা লুক্সেমবার্গ আর কার্ল লিবনেখটের নেতৃত্বে বামপন্থী সমাজতন্ত্রীরা রাশিয়ার মত বিপ্লব করে ফেলতে পারে – এই ভয় চেপে ধরে সোশাল ডেমোক্র্যাট নেতা ফ্রেডরিশ এবার্ট আর ফিলিপ শাইডেমানকে, যাঁরা চ্যান্সেলর প্রিন্স ম্যাক্স অফ ব্যাডেনও পদত্যাগ করে দেওয়ায়, সেই মুহূর্তে দেশের দায়িত্বে ছিলেন। শাইরারের মতে, ওঁরা চেয়েছিলেন যেনতেনপ্রকারেণ রাজতন্ত্র বজায় থাকুক। তা হচ্ছে না দেখে বিপ্লবের আতঙ্কেই ১৯১৮ সালের ৯ নভেম্বর তড়িঘড়ি কোনিগসপ্লাৎজের সামনে জড়ো হওয়ার জনতার সামনে শাইডেমান ঘোষণা করে দেন – জার্মানি এখন থেকে ‘রিপাবলিক’। সেই রিপাবলিকের সংবিধান ঘোষণা হয় আরও একবছর পরে ওয়াইমার বলে একটা শহরে আয়োজিত অ্যাসেম্বলি থেকে। তাই তাকে ওয়াইমার রিপাবলিক বলা হয়ে থাকে। বিপ্লবের সম্ভাবনা দমন করতে যে ওয়াইমার রিপাবলিক দারুণ সফল হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। এমনকি রোজা আর কার্লকেও একেবারে প্রাণে মেরে দেওয়া হয়েছিল জানুয়ারি মাসেই। কিন্তু এসব করতে গিয়ে গণতন্ত্র যেমন হওয়া উচিত তেমন করে জার্মানিকে গড়ে তোলার দিকে মোটে নজর দেওয়া হয়নি। সামন্তপ্রভু, উচ্চবর্গীয় জার্মান এবং সেনাবাহিনীর লোকজন – যাদের গণতন্ত্র ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ ছিল না, তাদের পোষ মানানোর নরম বা গরম – কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। ফলে তৈরি হয় এক জগাখিচুড়ি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে সেনাবাহিনীর যতটা প্রভাব প্রতিপত্তি থাকা উচিত তার চেয়ে বেশিই ছিল। সঙ্গে ছিল ক্ষমতাশালী শ্রেণিগুলোর দুর্নীতি। সব মিলিয়ে কেমন অবস্থা হয় সাধারণ জার্মানদের? ভাষান্তরে শাইরার বর্ণিত সেই অসহনীয় পরিস্থিতি এইরকম:

… তবে জনতা বুঝতে পারেনি যে জার্মান মুদ্রার বিপর্যয়ে বৃহৎ শিল্পপতি, সেনাবাহিনী আর রাষ্ট্র কেমন লাভবান হচ্ছিল। তারা শুধু দেখতে পাচ্ছিল যে ব্যাঙ্কে অনেক টাকা থাকলেও খানিকটা গাজর, কিছুটা আলু, কয়েক আউন্স চিনি, এক পাউন্ড ময়দা কেনা যাচ্ছিল না। প্রত্যেকটি ব্যক্তি জানত যে সে দেউলিয়া আর প্রতিদিন খিদের জ্বালা টের পেত। এই যন্ত্রণা আর আশাহীনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে তারা যা কিছু হয়েছে তার জন্য গণতন্ত্রকে দায়ী করত।

এমন একটা সময় অ্যাডলফ হিটলারের জন্যে ছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত।

গত সোমবার কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে ভুবনেশ্বরে এক সভায় বলেছেন, কিছু নেতা এবং সাধারণ মানুষ যদি ভীরুতা অবলম্বন করেন তাহলে সংবিধান ও গণতন্ত্রের বাঁচা শক্ত। তার আগেরদিনই নীতীশ কুমার কংগ্রেস, রাষ্ট্রীয় জনতা দল এবং বাম দলগুলোর সমর্থন ছেড়ে বেরিয়ে ফের বিজেপির সঙ্গে জোট করে আরও একবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়ে ফেলেছেন। ফলে বোঝা শক্ত নয়, খড়্গের আঙুল কার দিকে ছিল। খড়্গে অবশ্য রাখঢাক করেননি, শুধু নীতীশের দিকে আঙুল তুলেও থামেননি। নীতীশ চলে যাওয়ায় ইন্ডিয়া জোট দুর্বল হবে না বলেছেন, একইসঙ্গে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কেরও নিন্দা করেছেন বিজেপির বিরুদ্ধে না দাঁড়ানোর জন্যে। দেশের সংকট মুহূর্তে কিছু রাজনীতিবিদের ভীরুতার কী দাম একটা দেশকে দিতে হয় তা শাইরারের বইয়ের যে অংশ নিয়ে আলোচনা করলাম তা পড়লেই বোঝা যায়। তবে খড়্গে সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছেন যে বিজেপির বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একা নীতীশই ভীরু নন।

বস্তুত, ভীরুদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করলে ইন্ডিয়া জোট আরও দুর্বল হয়ে পড়বে, আখেরে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়েরই ক্ষতি হবে – এই আশঙ্কাতেই সম্ভবত খড়্গে আর কারোর নাম করেননি। নইলে নিঃসন্দেহে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নামও করতে হত। তিনি ইন্ডিয়া জোটে আছেন, অথচ তাঁর দলের শাসনে থাকা পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই ঘোষণা করে দিয়েছেন – পাঞ্জাবে তাঁরা একাই লড়বেন, কংগ্রেসকে কোনো আসন ছাড়বেন না।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও করতে হত। তাঁর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল – কংগ্রেস দাদাগিরি করে, কংগ্রেস বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করার ব্যাপারে আন্তরিক নয়। কংগ্রেস ইন্ডিয়া জোটে এল, তাঁকে জোটের মিটিংয়ে একেবারে রাহুল গান্ধীর পাশে জায়গাও দেওয়া হল। অথচ কোনো মিটিংয়ে তিনি নিজে যান না, কখনো কোনো প্রতিনিধিকেও পাঠান না, কখনো আবার সংযুক্ত ঘোষণাপত্রে তাঁর দলের স্বাক্ষর থাকে না। গত কয়েকদিনে আবার সটান বলে দিয়েছেন, ইন্ডিয়া জোটে আছেন দেশে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে একাই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বেন। ত্রিপুরা, মেঘালয়, গোয়া ইত্যাদি নির্বাচনে লড়তে গিয়ে আদৌ সুবিধা করতে না পারার পরেও তিনি রাজ্যের বাইরে নিজের শক্তি সম্পর্কে কী করে আত্মবিশ্বাসী হচ্ছেন তা বোঝা শক্ত। রাহুলের ভারত ন্যায় যাত্রা মমতার রাজ্যে ঢুকে পড়েছে, অথচ তৃণমূল কংগ্রেসের দিক থেকে তাতে সঙ্গত করার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উলটে কংগ্রেস অভিযোগ করছে তৃণমূলই নাকি ন্যায় যাত্রার পতাকা ছিঁড়ে দিচ্ছে, রাহুলকে সরকারি গেস্ট হাউসে মধ্যাহ্নভোজন করতে দেওয়ার সৌজন্যটুকুও দেখানো হচ্ছে না। এর পিছনে ইডি, সিবিআই আতঙ্ক ছাড়া অন্য কিছু কি থাকা সম্ভব? এ যদি ভীরুতা না হয়, তাহলে তো ভাবতে হবে সিপিএম নেতারা যে তৃণমূল-বিজেপি সেটিংয়ের তত্ত্ব খাড়া করেন সেটাই সত্যি। নইলে বিজেপি যে দেশের শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু সেকথা তো খড়্গের মত মমতাও বলে থাকেন। তাহলে মিলেমিশে লড়তে আপত্তি থাকবে কেন? ইন্ডিয়া জোটে তাঁর চেয়ে বেশি সিপিএমকে গুরুত্ব দেওয়া হয় – এ তো অভিমানের কথা। এই কি মান-অভিমানের সময়? তাও যদি অভিমানের ভিত্তি থাকত। সিপিএমের সাংসদ সংখ্যা তৃণমূলের ধারেকাছে নয়। তাদের নেতা সীতারাম ইয়েচুরি মিটিংয়ে গুরুত্ব পেলেন কি পেলেন না তাতে কী-ই বা এসে যায়?

আরও পড়ুন মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু 

রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করেও যে বিজেপি চারশো আসন পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয় তা পরিষ্কার। বিরোধী নেতাদের ভীরুতাকে তারা হাতিয়ার করতে চাইছে। ইডি, সিবিআইয়ের খাতায় কেবল নীতীশ কুমার বা মমতার দলের নেতা মন্ত্রীদের নামেই অভিযোগ আছে তা তো নয়। কেরালায় সিপিএম নেতা, মন্ত্রীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল। সম্ভবত স্ট্যালিনের সরকার পালটা এক ইডি অফিসারকে গ্রেফতার করায়, মাদুরাইয়ের ইডি দফতরে হানা দেওয়ায় উৎসাহে ভাঁটা পড়েছে। নীতীশ এনডিএতে ফিরে যাওয়া মাত্রই তেজস্বী যাদবকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকেও এক মামলায় গ্রেফতার করা হতে পারে বলে হাওয়ায় খবর ভাসছে। ইন্ডিয়া জোটের আরেক শরিক শিবসেনা। তাদের ডাকাবুকো নেতা সঞ্জয় রাউত। তাঁর নামেও মামলা আছে ইডির হাতে, ইতিপূর্বে তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। দরকার পড়লে শিবসেনার ভীরুতার পরীক্ষাও নিশ্চয়ই নেওয়া হবে।

এবার্ট আর শাইডেমানের ভূমিকা ভারতে কারা পালন করলেন তা তো এখনই বোঝা যাবে না, স্পষ্ট হবে আজকের ইতিহাস যখন লেখা হবে তখন। কিন্তু কৌতূহল হয়, বিরোধী দলগুলো দুর্নীতিমুক্ত হলে বিজেপিবিরোধী জোটের এমন নড়বড়ে অবস্থা হত কিনা। কোনো সন্দেহ নেই, যেসব মামলায় বিভিন্ন দলের নেতাকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে তার অনেকগুলোরই ভিত্তি নেই। রাউতকে জামিন দেওয়ার সময়ে যেমন বিচারপতি বলেছিলেন, ওই গ্রেফতারি বেআইনি। যে কোনো দেওয়ানি গোলমালকে আর্থিক দুর্নীতির তকমা দেওয়া চলে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হল, গত কয়েক দশকে ভারতের প্রায় সব দলের নেতাদের এত আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হয়েছে, যে কোন ক্ষেত্রে পালে সত্যিই বাঘ পড়েছে আর কোথায় স্রেফ বিরোধী শক্তিকে গ্রাস করে নিতে কেন্দ্রীয় এজেন্সি ‘চোর চোর’ বলে চেঁচাচ্ছে – তা বোঝা শক্ত। এই ধোঁয়াশার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলগুলোকে ভোটারদের চোখে আরও ছোট করে দেওয়া এবং সম্ভব হলে দলে টেনে আনা চলছে।

হিটলারের অবশ্য ইডি, সিবিআই ছিল না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ভুল করেছেন সাক্ষী মালিক

মহম্মদ আলী সাদা চামড়ার আমেরিকানদের বর্ণবৈষম্যবাদী ব্যবহারে অপমানিত হয়ে নিজের অলিম্পিক পদক ওহায়ো নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন। সাক্ষী মালিক এখন নিশ্চয়ই ভাবছেন, সেদিন গঙ্গায় তাঁর অলিম্পিক পদকটাও ফেলে দিলেই ভাল হত। কৃষক নেতাদের কথায় থেমে যাওয়া উচিত হয়নি। ইতিহাসের চাকা ঘোরে। তাই আলীকে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি ১৯৯৬ সালে আটলান্টা অলিম্পিকের সময়ে আরেকটা সোনার পদক দেয়। এই ইতিহাস সাক্ষীকে কোনো আশা দেবে কিনা, আমরা জানি না। ইতিহাসের চাকা সবসময় সামনের দিকে ঘোরে না, পিছনদিকেও যে ঘোরে তার প্রমাণ ইতিহাসেই রয়েছে। কোনো দেশে ইতিহাসের উল্টোদিকে হাঁটা শুরু হলে সে চাকা ফের সামনের দিকে ঘোরা দেখে যাওয়ার সুযোগ সকলের হয় না। উপরন্তু বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই আলীর দেশে তাঁর জন্মের একশো বছর আগে থেকেই চলছিল, আলীর অলিম্পিক সোনা জয়ের একশো বছর আগে তা নিয়ে আস্ত একটা গৃহযুদ্ধও হয়ে গিয়েছিল। ভারতে আজও লিঙ্গবৈষম্য অত বড় সমস্যা বলে কেউ মনে করে না। ফলে সাক্ষীকে পদক জলাঞ্জলি দিতে না দিয়ে কৃষক নেতা নরেশ টিকায়েত সেদিন তাঁর উপকারই করেছিলেন বলতে হবে, কারণ বাকি জীবনটা সাক্ষীর অন্তত পদকটা রইল।

সাক্ষীকে অবশ্য বোকাই বলতে হবে। তিনি কি ভেবেছিলেন তাঁর এবং অন্য কুস্তিগীরদের লড়াইয়ে একজন দোর্দণ্ডপ্রতাপ পুরুষ ক্ষমতাচ্যুত হবে স্রেফ মেয়েদের লাঞ্ছনা করার অভিযোগে? এদেশে ও আবার একটা অভিযোগ নাকি? ‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা’ কথাটা তো আমাদের দেশেই তৈরি। ভোগ করতে না জানলে আর বীর কিসের? আজও সফল পুরুষদের বন্ধুবান্ধবরা (মেয়ে বন্ধুরাও) রসিকতা করে বলেই থাকে “এখনো একটা স্ক্যান্ডাল হল না? তাহলে আর কী সাকসেসফুল হলি?” ভারতে খেলাধুলো করতে তো সাধারণত যান নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েরা। কর্পোরেট চাকরি, যেখানে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলারা চাকরি করতে যান, সেখানকার ‘মি টু’ আন্দোলনই শেষপর্যন্ত মিইয়ে গেল। তখনকার মত চক্ষুলজ্জার খাতিরে যে অভিযুক্ত পুরুষদের পদচ্যুত করা হয়েছিল, তাঁরা অনেকেই নিজের জায়গায় ফিরে এসেছেন যথারীতি। অনেককে তো এমন দায়িত্বে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা কার্যত পদোন্নতি। এমন দেশে সাক্ষী, ফোগত বোনেরা, বজরং পুনিয়া প্রমুখ অন্যরকম পরিণামের আশা করেছিলেনই বা কেন?

আলীর দেশের জিমন্যাস্টদের ল্যারি নাসার বলে একজন ডাক্তার ছিল। সে দুই দশক ধরে মেয়ে জিমন্যাস্টদের উপর যৌন নির্যাতন চালিয়েছিল। শেষমেশ আদালতে দেড়শোর বেশি জিমন্যাস্ট সাক্ষ্য দেওয়ার পরে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে সেই নরাধম ৪০ থেকে ১৭৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়, অর্থাৎ তার বাকি জীবন কারাগারেই কাটবে। এদিকে ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে মহিলা কুস্তিগীরদের অভিযোগের তদন্ত কী হচ্ছে না হচ্ছে তারই ঠিক নেই। সামান্য এফআইআর ফাইল করাতেই দেশের হয়ে পদকজয়ী কুস্তিগীরদের রাস্তায় বসে থাকতে হয়েছে। নাসারের বিরুদ্ধে যাঁরা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তাঁদের পুরোভাগে ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অলিম্পিক পদকজয়ী জিমন্যাস্টরা। অলিম্পিক সোনা জয়ী এবং বিশ্বরেকর্ডধারী সিমোন বাইলসও ছিলেন। শুনানিতে যৌন হয়রানির কথা বলতে গিয়ে তাঁরও অশ্রুপাত হয়েছিল, কিন্তু তাঁকে চোখের জলে জিমন্যাস্টিক্সকে বিদায় জানাতে হয়নি।

সাক্ষী আর তাঁর সঙ্গী কুস্তিগীররা আরও একটা ভুল করেছেন। তাঁদের উচিত ছিল যৌন হয়রানির ভিডিও তুলে রাখা। আজকের ভারতে একমাত্র কোনো অন্যায়ের ভিডিও ভাইরাল হলেই আমরা আলোড়িত হই, প্রশাসন নড়ে চড়ে বসে, প্রধানমন্ত্রী অন্তত সংসদের বাইরে বিবৃতি দেন। পরে অবশ্য কে ভাইরাল করল সে খোঁজ পড়ে। তবু অন্তত নিন্দেমন্দ হয়। মণিপুরের সেই দুজন মহিলার ব্যাপারে তো তাই হয়েছিল। মনে নেই? সেই যাঁদের উলঙ্গ করে গোটা গ্রাম ঘোরানো হয়েছিল, গণধর্ষণ করা হয়েছিল? ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সে ঘটনা অবশ্য প্রকাশিত হয়েছিল অনেকদিন পরে। তাছাড়া ওই দুজনের একজন সৈনিকের বউ। তাঁর সঙ্গে কি আর কুস্তিগীরদের তুলনা চলে? এঁদের তো টিভি ক্যামেরার সামনে দিয়েই রাত্রিবেলা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে পারে পুলিস।

আরও পড়ুন শুধু কুস্তির পদক নয়, দেবতার গ্রাসে আজ সবার সন্তান

সাক্ষী আর কুস্তির আখড়ায় নামবেন না বলেছেন, গোটা লড়াইয়ে মহিলা কুস্তিগীরদের পাশে থাকা পুরুষ কুস্তিগীরদের অন্যতম বজরং পুনিয়া জানিয়েছেন, ২০১৯ সালে পাওয়া পদ্মশ্রী ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু এসবে আমাদের বিশেষ কিছু এসে যাচ্ছে না। সোশাল মিডিয়ায় কিছু পোস্ট হচ্ছে, সাক্ষীর কান্নায় বেঁকেচুরে যাওয়া মুখের ছবি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে – এই পর্যন্ত। অবশ্য কী-ই বা হওয়ার ছিল? সবে মঙ্গলবার গাজিয়াবাদের ধরমবীর চা দিতে দেরি হওয়ায় স্ত্রী সুন্দরীকে তলোয়ারের এক ঘায়ে শেষ করে দিয়েছেন। মাসখানেক হল সিনেমা হল মাতাচ্ছে কথায় কথায় বউয়ের গলা টিপে ধরা আর প্রেমিকাকে দিয়ে নিজের জুতো চাটানো রণবীর কাপুর অভিনীত একটা চরিত্র। এই দেশে সাক্ষীর কান্নার কী দাম? একটা মেয়ের অলিম্পিক পদকেরই বা কী মূল্য? শেষমেশ একটা মেয়েই তো।

মেয়েদের জন্যে দেশটা এমনই ছিল বরাবর, তবে মাঝেমধ্যে কিছু গোলমেলে কাণ্ডও ঘটতে দেখা গেছে অতীতে। এক যুগ আগের এক ডিসেম্বরের কথা মনে পড়ে। পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে বেরনো একটা মেয়েকে ঘন্টার পর ঘন্টা ধর্ষণ এবং অকথ্য অত্যাচার করেছিল কয়েকজন মিলে। মেয়েটা হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছিল অনেকদিন। শেষপর্যন্ত বাঁচেনি। দেশজুড়ে সে কদিন কেবল তারই কথা বলেছিল মানুষ। সারা সন্ধে গলা ফাটিয়েছিলেন টিভি অ্যাঙ্কররা, গর্জে উঠেছিলেন সরকারবিরোধী নেতারা, দিল্লির রাস্তায় পর্যন্ত মানুষের ঢল নেমেছিল। দামিনী, নির্ভয়া – কতশত নামকরণ হয়েছিল মেয়েটার। তার মৃত্যুর পরে ধর্ষণ সংক্রান্ত আইন সংস্কার, মেয়েদের নিরাপত্তা বিধানে নতুন তহবিল তৈরি – সে এক কাণ্ড! এবছর ডিসেম্বরে বোধহয় অনেক বেশি ঠান্ডা পড়েছে, তাই গোটা দেশ শীতল। অথবা শরীরটা একেবারে ক্ষতবিক্ষত না হলে, অত্যাচারিত হয়ে মৃত্যুশয্যায় না পৌঁছলে এদেশের মেয়েদের মানসম্মান নিয়ে ভাবা চলে না। অবশ্য হাথরাসের মেয়েটা মরে যাওয়ার পরেও, পুলিসই রাতের অন্ধকারে দাহকার্য সম্পন্ন করার পরেও আমরা তাকে নিয়ে ভাবিনি। কাঠুয়ার বাচ্চা মেয়েটার মৃত্যুর পরে তার ধর্ষকদের সমর্থনে তো রীতিমত মিছিল করেছি আমরা। সে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

একনায়কতন্ত্রের ছায়া ঘনাইছে সংসদ ভবনে

একথা পরিষ্কার যে সংসদ কক্ষে নিজের জায়গা বজায় রাখতে হলে বিরোধীদের স্পিকটি নট হয়ে বসে থাকতে হবে। প্রশ্ন করেছ কি মরেছ।

গতবছর ১৮ ডিসেম্বর ছিল বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল। ফাইনালের আগে এবং পরে ভারতের বহু জায়গায় ভারতীয়রা আর্জেন্তিনীয় হয়ে গিয়েছিলেন। নেহাত আর্জেন্টিনা মুসলমান-প্রধান দেশ নয়। নইলে যে হারে আর্জেন্টিনার পতাকা ঝোলানো হয়েছিল পাড়ায় পাড়ায়, কেবল পশ্চিমবঙ্গেই কয়েক হাজার লোকের নামে দেশদ্রোহের মামলা রুজু হয়ে যেত। এখনো সোশাল মিডিয়া খুললে দেখা যাচ্ছে শত শত ভারতীয় একবছর আগের সুখস্মৃতি রোমন্থন করছেন। এবছর ১৮ ডিসেম্বরে বোঝা গেল, ভারত আর আর্জেন্টিনার মিল কেবল ফুটবলপ্রীতিতে নয়।

সবে আর্জেন্টিনায় ক্ষমতায় এসেছে দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্রপতি হাভিয়ের মিলেইয়ের লিবার্টি অ্যাডভান্সেজ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট। এসেই দেশের মুদ্রার মূল্য অর্ধেক করে ফেলেছে এবং তা নিয়ে প্রতিবাদ হবে বুঝে নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী প্যাট্রিশিয়া বুলরিখ বলে দিয়েছেন, যেসব সংগঠন বা ব্যক্তি প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করবে তাদের ডিজিটাল বা সাধারণ উপায়ে চিহ্নিত করা হবে। তারপর প্রতিবাদ আটকাতে যে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করা হবে তার খরচ প্রতিবাদীদের থেকেই আদায় করা হবে। আরও যোগ করেছেন, আমরা বহুবছর সম্পূর্ণ অরাজকতার মধ্যে কাটিয়েছি। এসব খতম করার সময় এসেছে। আন্দোলন, প্রতিবাদকে ‘এক্সটর্শন’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, রাস্তাঘাটে প্রতিবাদ প্রতিরোধে নাগরিকরা অনেক ভুগেছেন। আর চলবে না। কাণ্ড দেখে বামপন্থী সাংসদ মিরিয়াম ব্রেগমান সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলেন, বুলরিখ যা ঘোষণা করেছেন তা একেবারে অসাংবিধানিক। প্রতিবাদের অধিকার সব অধিকারের মধ্যে প্রথম অধিকার। তাতে ক্ষমতাসীন জোটের নেতা হোসে লুইস এসপার্ত সটান জবাব দিয়েছেন – হয় কারাগার, নয় বুলেট।

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ বা মধ্যপ্রদেশের শিবরাজ চৌহান কি দিল্লি মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের বুলডোজার চালানো, প্রতিবাদীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইন প্রণয়নের সঙ্গে আর্জেন্টিনার সরকারের কার্যকলাপের আন্তরিক মিল। তবে মিলেই সবে ক্ষমতায় এলেন, জাঁকিয়ে বসতে সময় লাগবে। নরেন্দ্র মোদীর সরকার দুটো মেয়াদ পূর্ণ করতে চলল, তৃতীয় মেয়াদের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। ফলে তাঁর সরকারের দমননীতি আরও বেপরোয়া হওয়াই স্বাভাবিক। দেশে বেকারত্বের হার ইংরেজ আমলের হারে পৌঁছে গেছে, জিডিপির হিসাব সন্দেহজনক, ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলো ধুঁকছে, অনাহারের আন্তর্জাতিক সূচকে ভারত নেমেই চলেছে – এসব তথ্য প্রায় সমস্ত মূলধারার সংবাদমাধ্যম পকেটে থাকা সত্ত্বেও চেপে রাখা যাচ্ছে না। বিদেশনীতি বেশ নড়বড়ে দেখাচ্ছে, দক্ষিণ ভারতে যে রাজ্যে বিজেপি সবচেয়ে শক্তিশালী সেখানে বড় হার হল কিছুদিন আগে। এইসব কারণে সম্ভবত মোদী-অমিত শাহরা মাঝে কিছুটা অনিশ্চয়তায় ভুগছিলেন। কিন্তু রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড়ে বিরাট জয়ে তাঁরা বুঝে ফেলেছেন যে ভারতের প্রাণকেন্দ্র এখনো হাতের মুঠোয়। ফলে কংগ্রেসমুক্ত ভারতের স্লোগান বদলে ফেলা হয়েছে বিরোধীমুক্ত সংসদের অনুচ্চারিত নির্দেশে। তাই আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের বর্ষপূর্তির দিনে ইতিহাস সৃষ্টি করে শতাধিক সাংসদকে সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়েছে পুরো শীতকালীন অধিবেশন থেকে। কে জানত রোহিত শর্মার ক্রিকেট বিশ্বকাপের স্ট্রাইক রেট টপকে যাবেন দুই বৃদ্ধ – ওম বিড়লা আর জগদীপ ধনখড়! শচীন তেন্ডুলকর সম্পর্কে অভিযোগ ছিল, তিনি নব্বইয়ের ঘরে ঢুকে মন্থর হয়ে যান। সম্প্রতি বিরাট কোহলির বিরুদ্ধেও সেরকম অভিযোগ উঠছে। কিন্তু ওম আর জগদীপ ১৮ তারিখ পর্যন্ত ৯২ জন সাংসদকে সাসপেন্ড করে গতি কমাননি। পরদিনই সোজা ১৪১-এ পৌঁছে গেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ভারত অধিনায়কের হাতে বিশ্বকাপ তুলে দেওয়া এবং তা নিয়ে দেশব্যাপী বর্ণাঢ্য প্রচারের অভিলাষ তাঁরই নামাঙ্কিত মাঠে মারা গিয়েছিল, যার অন্যতম কারণ কোহলিদের মন্থর ব্যাটিং। একেবারে সুদে আসলে পুষিয়ে দিচ্ছেন সংসদের দুই কক্ষের কর্ণধার।

কেউ রেগে উঠে বলতেই পারেন, এটা কি ঠাট্টা তামাশার বিষয়? মুশকিল হল, যেভাবে এতজন বিরোধী দলের সাংসদকে সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়েছে তাতে সংসদ জায়গাটাই তো তামাশায় পরিণত হয়েছে। সাসপেন্ড হওয়া সাংসদদের অপরাধ কী? কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে কী করে চারজন সটান সংসদের ভিতরে ঢুকে পড়ল, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করা। দুজনেই সংসদের বাইরে এ নিয়ে কথা বলেছেন, সংবাদমাধ্যমে বলেছেন। কিন্তু কিছুতেই সংসদের ভিতরে বলবেন না। কেন বলবেন না? কোনো প্রশ্ন নয়।

সেই রাহুল গান্ধীকে তড়িঘড়ি লোকসভা থেকে সাসপেন্ড করার সময়েই অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে সরকারের অপছন্দের প্রশ্ন করলে সংসদে টিকতে দেওয়া হবে না। মহুয়া মৈত্রকে সাসপেন্ড করার পদ্ধতি সন্দেহকে বিশ্বাসে পরিণত করল। অবশেষে সরকারের গোঁয়ার্তুমির প্রতিবাদ করার জন্যে ১৪১ জনকে সাসপেন্ড করার পরে আর অন্যরকম ভাবার অবকাশ নেই। একথা পরিষ্কার যে সংসদ কক্ষে নিজের জায়গা বজায় রাখতে হলে বিরোধীদের স্পিকটি নট হয়ে বসে থাকতে হবে। প্রশ্ন করেছ কি মরেছ।

সাসপেনশনের যে কারণ দেখানো হচ্ছে তা যে নেহাতই লোকদেখানো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গৌতম আদানির মালিকানাধীন একটি চ্যানেলে দেখছিলাম বিজেপি মুখপাত্র শাজিয়া ইলমি আর বিজেপিপন্থী সাংবাদিক স্মিতা প্রকাশ বলছেন – সংসদ ভদ্র বিতর্কের জায়গা। বিরোধীদের তাতে আগ্রহ নেই, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছিলেন। তাই তাঁদের সাসপেন্ড করেছেন লোকসভার স্পিকার আর রাজ্যসভার চেয়ারম্যান। বহুজন সমাজ পার্টির সাংসদ দানিশ আলিকে ছাপার অযোগ্য গালাগালি দেওয়া বিজেপি সাংসদ রমেশ বিধুরীও তাহলে ভদ্র বিতর্কে লিপ্ত ছিলেন বলে ধরে নিতে হবে। আরেক বিজেপি সাংসদ প্রতাপ সিমহা, যাঁর সই করা পাস নিয়ে সেদিন সংসদ ভবনে ঢুকে পড়েছিলেন চার বিক্ষুব্ধ তরুণ, তিনিও স্পিকারকে ‘ওঁদের সম্বন্ধে কিছু জানি না’ বলেই পার পেয়ে গেলেন। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায় নিতে হল না। অর্থাৎ নিয়ম বিজেপি সাংসদদের জন্যে একরকম, বিরোধী দলের সাংসদদের জন্যে অন্যরকম।

সে ব্যাপারে অবশ্য বিজেপি নেতাদের বিশেষ রাখঢাক নেই। অরুণ জেটলি সংসদের কাজে বাধা দেওয়াকেও সংসদীয় ব্যবস্থার অঙ্গ বলেছিলেন। ২০০১ সালে সংসদ ভবনে সন্ত্রাসবাদী হানার পরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিবৃতি দিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীও বিবৃতি দিয়েছিলেন। এসব বলেও বিজেপি মুখপাত্রদের দমানো যাচ্ছে না। তাঁরা অবলীলাক্রমে বলে দিচ্ছেন, ওসব কবেকার কথা। এখন দিন বদলে গেছে, আজ আর ওসব চলবে না। যা নেহাতই চক্ষুলজ্জার খাতিরে বলছেন না, তা হল গণতন্ত্র-ফন্ত্র আর চলবে না। সে কারণেই তো ইংরেজ আমলের ফৌজদারি দণ্ডবিধির আধুনিকীকরণের নামে নিয়ে আসা হয়েছে এমন আইন যা পুলিসকে দেবে আরও একচ্ছত্র ক্ষমতা। সরকারের আস্তিনে আছে নতুন টেলিযোগাযোগ সংক্রান্ত বিল, যা আইনে পরিণত হলে কোনো ব্যক্তির বা কোনো এলাকার টেলিযোগাযোগ সরকার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারবে নিজের বিবেচনা অনুযায়ী। আরও আছে পোস্টাল পরিষেবা সংক্রান্ত আইন, যা মোতাবেক পোস্ট অফিস যে কোনো পার্সেল খুলে ফেলতে পারবে। দরকার বুঝলে তা প্রাপকের কাছে না-ও পাঠাতে পারে।

আরও পড়ুন এক যে ছিল সংসদ 

একনায়কতন্ত্রের ছায়া ঘনিয়ে এল। এদিকে বিরোধীরা তাঁদের অর্ধেকের বেশি সাংসদ সাসপেন্ড হয়ে যাওয়ার পরেও লক্ষ্মী হয়ে সংসদের সিঁড়িতেই ধরনা দিচ্ছেন। কে কটা আসনে লড়বেন তা নিয়ে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে আলোচনা হচ্ছে, মমতা ব্যানার্জি রাহুল গান্ধীকে পাশ কাটিয়ে জোটের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে মল্লিকার্জুন খড়্গের নাম করছেন। এ রাজ্যের বামেরা আরও এককাঠি সরেস। তাঁরা মীনাক্ষী মুখার্জিকে ইনসাফ যাত্রা নামক কী একটা কর্মসূচিতে নামিয়ে দিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখছেন তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করবেন। অথচ বিজেপি ২০২৪ নির্বাচন জিতে গেলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটা থাকবে কিনা, তার বিধানসভার গঠন কী হবে তার ঠিক নেই।

সুতরাং ভারতীয় গণতন্ত্র বাঁচবে কিনা, এ প্রশ্ন করলে একটাই উত্তর দেওয়া চলে – সবই রামের ইচ্ছে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

সঙ্কোচের বিহ্বলতায় নিজেরে অপমান করছে সিপিএম

সরকারবিরোধী মানুষ এত অসহায় যে এই সময়কালে অনেকের মনে বিরোধী নেতাদের শূন্য আসনে শুধু বিজেপি নেতারাই নয়, বিচারকরাও বসে পড়েছেন।

সালটা ১৯৯৬। জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করতে উদগ্রীব দেশের অকংগ্রেস, অবিজেপি দলগুলো। এই প্রস্তাবে সায় দেওয়া উচিত কিনা তা নিয়ে বিতর্ক চলছে সিপিএমের মধ্যে। সেইসময় আমাদের এলাকার সিপিএমের একেবারে নিচুতলার এক তরুণ কর্মী বলেছিলেন, ছোট থেকে শুনে আসছি আমাদের দলের নামে একটা ‘আই’ আছে। সেটার গুরুত্ব কী তা তো কোনোদিন টের পেলাম না। জ্যোতিবাবু প্রধানমন্ত্রী হলে গোটা দেশ টের পাবে। সেদিনের আড্ডায় অন্য এক কর্মী কংগ্রেসের সমর্থনে সরকারে যাওয়ার বিরোধিতা করে বলেছিলেন, আজ কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গড়ব, তারপর বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে কোন মুখে ভোট চাইতে যাব লোকের কাছে? শেষপর্যন্ত যিনি ‘আই’-এর প্রভাব দেখার আশা করেছিলেন তাঁকে আশাহত হতে হয়েছিল। জ্যোতিবাবু স্বয়ং সেই নিচুতলার কমরেডের চেয়ে কিছু কম নিরাশ হননি। সরকারে না যাওয়ার পার্টিগত সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েও বলেছিলেন, ঐতিহাসিক ভুল হল। জ্যোতিবাবুর জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির শরিক সেই কমরেড অতি সম্প্রতি প্রয়াত হলেন আর যিনি বিরোধিতা করেছিলেন তিনিও এখন বয়সের কারণে খানিকটা নিষ্প্রভ। ইতিমধ্যে সাতাশটা বছর কেটে গেছে, কিন্তু সিপিএমের ‘আই’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে পার্টির নিজেরই দ্বিধা এখনো কাটল না। ইন্ডিয়া জোটের ‘আই’-তে ‘আই’ মেলানো নিয়ে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন তারই প্রমাণ।

সেইসময় সরকারে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে ঘোষিত যুক্তি ছিল, এমন কোনো সরকারে যাব না যে সরকার মার্কসবাদী কর্মসূচি লাগু করে উঠতে পারবে না। কিন্তু সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গিয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গের বহু নেতা সরকারে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন এবং তাঁরা মনে করেন ‘কেরালা লবি’ জ্যোতিবাবুকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি। কথাটা সত্যি হোক বা না হোক, পশ্চিমবঙ্গের সব নেতাও যে সরকারে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না তা সর্বজনবিদিত। এবারেও দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্ব সর্বভারতীয় হয়ে ওঠার পক্ষপাতী নয়। ইন্ডিয়া জোটে সিপিএম এবং তৃণমূল কংগ্রেস – দুই দলই থাকলেও, রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এবং অন্যতম নেতা সুজন চক্রবর্তী বারবারই বলছেন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি আর তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে। সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিও একই কথা বলছেন, কিন্তু তৃণমূলের সঙ্গে এক জোটে থাকা ঠিক হচ্ছে কিনা তা নিয়ে সিপিএম নেতৃত্বের দ্বিধা স্পষ্ট হয়ে গেছে কো-অর্ডিনেশন কমিটিতে সদস্য না রাখার সিদ্ধান্তে। যদি গোড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হত তাহলে তবু বোঝা যেত। ইন্ডিয়া জোটের সব দল ওই কমিটিতে নেই। কিন্তু যখন কো-অর্ডিনেশন কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা হয়, তখন সিপিএমের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল তাদের প্রতিনিধির নাম পরে জানানো হবে। পরবর্তীকালে হঠাৎ কমিটিতে না থাকার সিদ্ধান্ত হল কেন?

সিপিএম নেতৃত্বের এই দ্বিধার সমালোচনায় অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু অনস্বীকার্য যে বিজেপিবিরোধিতা আর তৃণমূলবিরোধিতার মধ্যে একটি বেছে নেওয়া আজকের সিপিএমের পক্ষে কঠিন। তাদের বিজেপিবিরোধিতার ইতিহাসে কোনো ছেদ নেই। তৃণমূল কংগ্রেসের মত তারা কখনো বিজেপির সঙ্গে জোট সরকার গড়েনি, বিজেপির মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হননি কোনো সিপিএম নেতা। ১৯৮৯ সালে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের সরকারকে বিজেপি, সিপিএম দুই দলই সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু সেবার নির্বাচনে ভোটাররা কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। উপরন্তু স্বল্প সময়ে ভিপি সিংয়ের সরকার মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ লাগু করা, একজন মুসলমানকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করার মত অভূতপূর্ব কাজ করেছিল। সেই সরকারের অন্যতম নিয়ন্ত্রক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও বিজেপি বাবরি মসজিদ ভেঙে উঠতে পারেনি, বাধা পেয়েই সমর্থন প্রত্যাহার করে। অর্থাৎ বিজেপির কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়িত করতে দেওয়া হয়নি, উল্টে হিন্দুত্ববাদের অতি অপছন্দের গোটা দুয়েক কাজ সেই সরকার করে ফেলেছিল। স্বভাবতই সিপিএম বিজেপিবিরোধী জোটের স্বাভাবিক সদস্য।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বেশকিছু মানুষ যে এই মুহূর্তে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন তা বুঝতে বড় নেতা হতে হয় না। ট্রেনে বাসে বাজারে দোকানে খুচরো কথাবার্তায় গরিব, বড়লোক নির্বিশেষে মানুষের সরকারকে গাল দেওয়ার এরকম উৎসাহ শেষ দেখা গিয়েছিল বামফ্রন্ট আমলের শেষ পর্বে। এই অসন্তোষের কারণ যেমন ফ্ল্যাট থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়া অর্থাৎ যাবতীয় নিয়োগ দুর্নীতি, তেমনই প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা নিয়ে দুর্নীতি, একশো দিনের কাজ না পাওয়ার মত বিষয়ও। পরের দুটি বিষয় সরাসরি গ্রামের গরিব মানুষের গায়ে লাগে। তা না হলে মনোনয়ন পর্ব থেকে শুরু করে গণনা পর্যন্ত পুকুর চুরির পরেও পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধীরা এতগুলো আসনে জিততে পারত না, বাম-কংগ্রেসের ভোটও বাড়ত না। সংসদীয় রাজনীতিতে জনমতের এই স্রোতকে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের বিরোধী দল অগ্রাহ্য করতে পারে না।

এমতাবস্থায় সিপিএম কী করতে পারত? ইন্ডিয়া জোটে না গিয়ে বলতে পারত আমরা নিজেদের মত করে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ব। সেক্ষেত্রে তৃণমূল তো বটেই, সব রঙের সমালোচক সিপিএমকে বিজেপির দালাল বলে দেগে দিত। ইন্ডিয়া জোটে থাকায় যেমন বিজেপি তৃণমূলের দালাল বলছে এবং নিজেদের সদস্য, সমর্থকরাও সন্দেহের চোখে দেখছে। কথা হল, সমালোচকরা কী বলবে তা ভেবে রাজনীতি করা দিশাহীনতার লক্ষণ। এতদিনের দিশাহীনতাই আজকের গাড্ডায় ফেলেছে সিপিএমকে। ইন্ডিয়া জোটে না গেলেই সিপিএমকে বিজেপির দালাল বলার সুযোগ পাওয়া যাবে কারণ ২০১১ সালের পর থেকে রাজ্যে সিপিএমের সক্রিয়তার অভাবে বিরোধী পরিসর দখল করতে শুরু করে বিজেপি। তৃণমূল ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনকে গায়ের জোরে প্রহসনে পরিণত করার পর নিচের তলার হতাশ সদস্য, সমর্থকরা বিজেপির দিকে ভিড় জমান এবং ২০১৯ সালের লোকসভা আর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তার ফায়দা তোলে। সিপিএম শূন্যে পৌঁছয়। ফলে ‘পার্টি লাইন’ যা-ই হোক, সিপিএমই বিজেপিকে পুষ্ট করছে – একথা পাটিগাণিতিক সত্য হয়ে যায়। সেই বদনামের ভারে সিপিএম এখন ন্যুব্জ।

আরও পড়ুন নয়া বার্তা ছাড়া পরিশ্রমের ফল পাবে না সিপিএম

এই পরিস্থিতি তৈরিই হত না, যদি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে নেতৃত্ব বাম রাজনীতির লড়াকু বিরোধিতার ঐতিহ্য বজায় রাখতেন। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর অনতিবিলম্বে সারদা কেলেঙ্কারির পর্দাফাঁস হয়। অথচ সিপিএম একদিনের জন্যও তা নিয়ে জনজীবন অচল করে দেওয়ার মত আন্দোলন করেনি। নারদের ক্যামেরায় শাসক দলের নেতাদের নগদ টাকা ঘুষ নিতে দেখা যায়। সেইসময় বিরোধী নেত্রীর নাম মমতা ব্যানার্জি হলে কলকাতা অচল হয়ে যেত, সূর্যকান্ত মিশ্ররা কেবল বিবৃতি দিয়ে গেছেন। গতবছর মার্চে সেলিম রাজ্য সম্পাদক হওয়ার পরে এবং মীনাক্ষী মুখার্জির উদ্যোগে সিপিএমের আন্দোলনে ঝাঁজ আসে। তার আগে পর্যন্ত রাস্তার চেয়ে টিভির পর্দায় এবং ফেসবুক লাইভেই বেশি দেখা যেত সিপিএম নেতাদের। সরকারবিরোধী মানুষ এত অসহায় যে এই সময়কালে অনেকের মনে বিরোধী নেতাদের শূন্য আসনে শুধু বিজেপি নেতারাই নয়, বিচারকরাও বসে পড়েছেন।

এই দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তার মূল্য হিসাবে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনেও শূন্য পাওয়া তেমন বড় কিছু নয়, যদি বিরোধী হিসাবে বিশ্বাসযোগ্যতা কিছুটা হলেও ফেরত আনা যায়। সিপিএম নেতৃত্বের এবং বিজেপিবিরোধী সিপিএম সমালোচকদেরও ভেবে দেখা উচিত, সিপিএম ইন্ডিয়া জোট থেকে আলাদা হয়ে লড়লেই ভাল হয় কিনা। কারণ সিপিএম তৃণমূলবিরোধিতা না করলে আখেরে বিজেপিরই লাভ, তারা আরও বেশি করে তৃণমূলবিরোধী ভোট পাবে। মনে রাখা ভাল, ধূপগুড়ি বিধানসভার উপনির্বাচনে বিজেপি হেরেছে মাত্র হাজার চারেক ভোটে। ওই কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থীর (কংগ্রেস সমর্থিত) জামানত জব্দ হলেও তিনি পেয়েছেন তেরো হাজারের বেশি ভোট। এতগুলো তৃণমূলবিরোধী ভোট কিন্তু বিজেপির ঝুলিতে যেত তৃতীয় পক্ষ না থাকলে। এভাবে ভাবতে হলে অবশ্য সিপিএম নেতৃত্বকে ঠিক করতে হবে লোকসভা নির্বাচনে মূল লক্ষ্য কোনটা। জ্যোতি বসু, হরকিষেণ সিং সুরজিৎদের অন্তত সেই দ্বিধা ছিল না। তাঁরা বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকাতে ১৯৯৬ পর্যন্ত নরসিমা রাওয়ের সংখ্যালঘু সরকারকে চলতে দিয়েছিলেন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত