মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কেবল গুণী মানুষ নন, তাঁর প্রতিভা বহুমুখী। তিনি সাহিত্য রচনা করেন, ছবি আঁকেন, গান লেখেন। তার উপর রাজ্যের প্রশাসন চালাতে হয়। একজন মানুষকে এত কাজ করতে হলে কাগজ পড়ার সময়ের অভাব ঘটা খুবই স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই প্রতিদিন কাগজ পড়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী পান না। পেলে চোখে পড়ত কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজের একটা খবর, যার শিরোনাম ‘RSS yet to clear air on bombing claim affidavit’। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের প্রধান পবন খেরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) এক প্রাক্তন প্রচারকের মহারাষ্ট্রের নানদেড় জেলা ও সেশনস আদালতে জমা দেওয়া হলফনামা প্রকাশ্যে এনেছেন। সেই হলফনামায় যশবন্ত শিন্ডে নামক ওই লোকটি দাবি করেছে, সংঘ পরিবারের সদস্য সংগঠনগুলো দেশের বিভিন্ন জায়গায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সংবাদমাধ্যমের একাংশ এবং পুলিস প্রশাসনের সহযোগিতায় তার দোষ মুসলমান সম্প্রদায়ের ঘাড়ে চাপিয়েছে। ফলে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি লাভবান হয়েছে।

খবরটা মুখ্যমন্ত্রীর চোখ এড়িয়ে গিয়ে থাকতেই পারে, কারণ এ নিয়ে কোনো চ্যানেলে কোনো বিতর্কসভা বসেনি। কলকাতার অন্যান্য তথাকথিত উদার খবরের কাগজগুলোতেও আতসকাচ দিয়ে খুঁজে দেখতে হবে এই খবর। তাছাড়া কংগ্রেস তো বানিয়েও বলতে পারে। কারণ তারা তৃণমূল কংগ্রেসকে বিজেপির প্রধান বিরোধী হয়ে উঠতে দিতে চায় না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর শক্তিশালী সোশাল মিডিয়া টিম আছে। টুইটারে তাঁর সাত মিলিয়ন ফলোয়ার, ফেসবুকে ৪.৯ মিলিয়ন। সেই সোশাল মিডিয়া টিমের সাহায্য নিলেই মুখ্যমন্ত্রী জানতে পারবেন যে ওই মর্মে হলফনামা সত্যিই ফাইল করা হয়েছে। চাইলে স্বয়ং যশবন্তের মুখ থেকেই হলফনামায় লিখিত অভিযোগগুলো সংক্ষেপে শুনে নিতেও পারবেন। মারাঠি যশবন্তের ভিডিও ইংরেজি সাবটাইটেল সমেত সোশাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

যশবন্তের হলফনামার কথা প্রকাশ্যে এল বৃহস্পতিবার, কলকাতার কাগজের প্রথম পাতায় সে খবর বেরোল শুক্রবার সকালে। সেদিনই সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বললেন “আরএসএস এত খারাপ ছিল না, এবং এত খারাপ বলে আমি বিশ্বাস করি না।” মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই খবরটা জানতে পারেননি বলেই ওরকম বলেছেন। স্বীকার্য যে যশবন্তের কথাগুলো অভিযোগ মাত্র। কিন্তু যে সংগঠনের একদা প্রচারকরা এই মুহূর্তে দেশের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বহু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী – তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ যে মারাত্মক, সে কথা না বোঝার মত রাজনীতিবিদ মমতা ব্যানার্জি নন। তাছাড়া তিনদিন হয়ে গেল, এখন পর্যন্ত আরএসএস যশবন্তকে মিথ্যাবাদী বলে কোনো বিবৃতি দেয়নি। অবশ্য জবাবদিহি না চাইলে বিবৃতি দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। ২০০৬ সালের নানদেড় বিস্ফোরণ কাণ্ডে সরকারি সাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হতে চেয়ে আবেদন করেছিল যশবন্ত। আদালত সবেমাত্র সেই আবেদন গ্রহণ করেছে, আরএসএসকে জবাবদিহি করতে তো ডাকেনি। সাংবাদিকদেরই বা ঘাড়ে কটা মাথা, যে এ নিয়ে মোহন ভাগবতকে প্রশ্ন করবে? অতএব আরএসএসের বয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা বলে ঘোষণা করতে। কথায় আছে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। মুখ্যমন্ত্রী তো বিশ্বাসই করেন না আরএসএস খারাপ। ফলে যতক্ষণ তারা নিজেরা না বলছে “হ্যাঁ, আমরা খারাপ”, মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চিন্ত। কিন্তু খটকা অন্যত্র।

“এত খারাপ ছিল না”। এত খারাপ মানে কত খারাপ? তার মানে মুখ্যমন্ত্রী জানেন যে আরএসএস একটু একটু খারাপ? সেই পরিমাণটা কি তাঁর পক্ষে সুবিধাজনক? খারাপ ছিল না মানেই বা কী? আগে যতটুকু খারাপ ছিল তাতে তাঁর আপত্তি ছিল না, এখন বেশি খারাপ হয়ে গেছে – এ কথাই কি বলতে চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী? তাঁর কাছে কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ তা অবশ্য আমাদের জানা নেই। মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা কি খারাপ? সে হত্যায় আরএসএস যোগ প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ হয়নি বটে, তবে সেই ঘটনার পরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লিখেছিলেন, আরএসএস নেতাদের ভাষণগুলো যে বিষ ছড়িয়েছে তারই পরিণতি গান্ধীহত্যা। তাই ভারত সরকার আরএসএসকে নিষিদ্ধ করে। কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন? সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। জওহরলাল নেহরুর বদলে যিনি প্রধানমন্ত্রী হলে ভারত সোনার দেশ হত বলে আরএসএস এখন দিনরাত ঘোষণা করে। মুখ্যমন্ত্রী নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাই ধরে নিচ্ছি অতকাল আগের ব্যাপার তাঁর মনে নেই। তাই তার ভালমন্দ ভেবে দেখেননি। তবে যেহেতু তিনি একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী এবং নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করেন, সেহেতু ধরে নিতে দোষ নেই যে যশবন্ত শিন্ডে তার হলফনামায় যে ধরনের কার্যকলাপের কথা লিখেছে সেগুলো আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর চোখে খারাপই। কারণ কাজগুলো বেআইনি এবং সাম্প্রদায়িক।

এখন কথা হল, যশবন্ত যে অভিযোগ করেছে আরএসএসের বিরুদ্ধে, সে অভিযোগও কিন্তু এই প্রথম উঠল তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী কাগজ পড়ারই সময় পান না যখন, বই পড়ার সুযোগ না পাওয়ারই কথা। তবে তাঁর তো পড়ুয়া পারিষদের অভাব নেই। তাঁরা কেউ কেউ নির্ঘাত মহারাষ্ট্র পুলিসের প্রাক্তন ইন্সপেক্টর জেনারেল এস এম মুশরিফের লেখাপত্র পড়েছেন। তাঁর লেখা আরএসএস: দেশ কা সবসে বড়া আতঙ্কবাদী সংগঠন বইতে ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত মোট ১৮টা বোমা বিস্ফোরণে আরএসএস, অভিনব ভারত, জয় বন্দেমাতরম, বজরং দল এবং সনাতন সংস্থা – এই পাঁচটা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনকে দায়ী করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর পার্ষদরা কেন যে এসব কথা তাঁকে জানাননি! জানলে নিশ্চয়ই আরএসএস খারাপ “ছিল না” – একথা মুখ্যমন্ত্রী অতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলতেন না। অবশ্য মুশরিফ যা লিখেছেন তার সমস্তই তো স্রেফ অভিযোগ। মালেগাঁও বিস্ফোরণের প্রধান অভিযুক্ত সাধ্বী প্রজ্ঞা যেভাবে ছাড়া পেয়ে সাংসদ হয়ে গেছেন, তাতে ওসব অভিযোগকে আর আমল দেওয়া চলে কিনা সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে আরএসএসের উপর অত্যন্ত জোরালো বিশ্বাস না থাকলে এসব জেনে সংঘ পরিবারের সদস্য নয় এমন এক রাজনৈতিক দলের সর্বময় নেত্রীর কিছুটা সন্দিহান হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিজের বিশ্বাসে অটল।

রাজনীতিতে দুজন ব্যক্তি, দুটো সংগঠন বা একজন ব্যক্তির সঙ্গে একটা সংগঠনের সম্পর্ক চোখ বন্ধ করে ভরসা করার মত পর্যায়ে পৌঁছনো চাট্টিখানি কথা নয়। বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস না থাকলে তেমনটা হওয়া শক্ত। সেদিক থেকে মমতার আরএসএসের প্রতি এই বিশ্বাস বুঝতে অসুবিধা হয় না। আজকের মুখ্যমন্ত্রী গত শতকের শেষ দশকে যখন ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন এককালের স্বয়ংসেবক অটলবিহারী বাজপেয়ী আর লালকৃষ্ণ আদবানির স্নেহ না পেলে মমতার পক্ষে আস্ত একখানা রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা সম্ভব হত কি? হলেও সদ্যোজাত দলটাই মধ্যগগনে থাকা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের বিরোধী হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে – এ বিশ্বাস কংগ্রেসের ভোটার তথা কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা যেত কি? মাত্র আটজন সাংসদ যে দলের, সেই দলের নেত্রীকে রেল মন্ত্রকের দায়িত্ব দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের প্রভাবিত করার মহার্ঘ সুযোগ দিয়েছিল বিজেপি। শুধু কি তাই? তেহেলকা কাণ্ড প্রকাশিত হওয়ার পরেই সততার প্রতীক মমতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এনডিএ ত্যাগ করেন। তা সত্ত্বেও ২০০৩ সালে তাঁকে দপ্তরহীন মন্ত্রী করে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। আরএসএস আর বিজেপি আলাদা – এই তত্ত্বে এখনো বিশ্বাস করেন যাঁরা, তাঁদের কথা আলাদা। বাকিরা নিশ্চয়ই মানবেন, এভাবে পাশে থাকার পরেও যদি মমতা আরএসএসকে বিশ্বাস না করতেন তাহলে ভারি অন্যায় হত।

আসলে মমতার আরএসএসে বিশ্বাস ততটা অসুবিধাজনক নয়। তাঁর বারংবার আরএসএস প্রীতি ঘোষণা সত্ত্বেও দেশসুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের কেষ্টবিষ্টুদের মমতায় বিশ্বাস বরং বৃহত্তর বিপদের কারণ। গত বছর বিধানসভা নির্বাচনে যখন বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানোই মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াল, তখন বামপন্থীদের মধ্যে লেগে গেল প্রবল ঝগড়া। সিপিএম নেতৃত্বাধীন বাম দলগুলো বলতে শুরু করল বিজেপি আর তৃণমূল অভিন্ন, তাই তৃণমূলকে ভোট দেওয়া আর বিজেপিকে ভোট দেওয়া একই কথা। উঠে এল একটা নতুন শব্দ – বিজেমূল। অন্যদিকে নকশালপন্থীরা বলতে লাগল, যেখানে যে প্রার্থী বিজেপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী তাকে ভোট দিতে। বিজেমূল তত্ত্বের প্রমাণ হিসাবে সিপিএম “দলে থেকে কাজ করতে পারছি না” বলে লাইন দিয়ে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়া শীর্ষস্থানীয় নেতা, মন্ত্রীদের দেখাতে লাগল। আর যত না তৃণমূল, তার চেয়েও বেশি করে নকশালরা তার জবাবে তালিকা দিতে থাকল, কোন ব্লক স্তরের সিপিএম নেতা বিজেপিতে গেছে, কোন জেলা স্তরের নেত্রী বিজেপিতে যোগ দিলেন। অর্থাৎ দুপক্ষের কেউই তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতি কী, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকলে কেন আছে বা না থাকলে কেন নেই – সে আলোচনায় গেল না। অথচ ঠিক তখনই ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে বসে লাইভ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন “আমি সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়ছি না। ওরা তো নির্বাচনে লড়ে না। ওরা বিজেপিকে সমর্থন করে। আমি লড়ছি বিজেপির সঙ্গে।” এই নেত্রীর দল জয়যুক্ত হল, একমাত্র বিরোধী দল হিসাবে উঠে এল বিজেপি। অর্থাৎ ঘোষিতভাবে আরএসএসের বন্ধু দুটো দলের হাতে চলে গেল বাংলার আইনসভা। অথচ পশ্চিমবঙ্গের ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিমানরা উল্লসিত হয়ে ঘোষণা করলেন, বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য জিতে গেল। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ জিতে গেলেন, ইত্যাদি।

আরও মজার কথা, নির্বাচনে গোল্লা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিপিএমও পরিত্যাগ করল বিজেমূল তত্ত্ব। আরও এক ধাপ এগিয়ে এ বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দেশের একমাত্র যে নেতা সর্বদা নাম করে আরএসএসকে আক্রমণ করেন, সেই রাহুল গান্ধীর দল কংগ্রেস থেকে শুরু করে সিপিএম, লিবারেশন সমেত সমস্ত বাম দল সমর্থন করে বসল মমতার পছন্দের প্রার্থীকে। সে আরেক যশবন্ত – বিজেপি থেকে তৃণমূলে এসেছেন। এ থেকে যা প্রমাণিত হয় তা হল, মমতার মত আরএসএস-বান্ধব নয় যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো, তারাও ব্যাপারটাকে নির্বাচনী লড়াইয়ের বেশি কিছু ভাবে না।

আরএসএসের কাছে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করে তোলা মতাদর্শগত মরণপণ লড়াই। সে লক্ষ্যে পৌঁছতে তারা সাংবিধানিক, অসাংবিধানিক – সবরকম পথই নিতে রাজি। প্রয়োজনে আদবানির মত আগুনে নেতাকে বঞ্চিত করে বাজপেয়ীর মত নরমপন্থীকে প্রধানমন্ত্রী করতে রাজি ছিল। জমি শক্ত হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদীর মত কড়া হিন্দুত্ববাদীকে নেতা করেছে, ভবিষ্যতে তাঁকেও আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে আরও গোঁড়া আদিত্যনাথকে সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসাতে পারে। বিরোধীরা ওই বিস্তারে ভেবেই উঠতে পারেনি এখনো। এমনকি তথাকথিত কমিউনিস্ট দলগুলোও কেবল স্ট্র্যাটেজি সন্ধানে ব্যস্ত। কোথায় কাকে সমর্থন করলে বা কার সাথে নির্বাচনী জোট গড়লে বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানো যাবে – এটুকুই তাদের চিন্তার গণ্ডি। সে কারণেই বিজেমূল শব্দটা নির্বাচনের আগে ভেসে ওঠে, পরাজয়ের পর মিলিয়ে যায়। যদি সিপিএমের পক্ষ থেকে সংঘমূল কথাটা বলা হত এবং শূন্য হয়ে যাওয়ার পরেও বলে যাওয়া হত, তাহলে জনমানসে সত্যি সত্যি প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হতে পারত। হিন্দুরাষ্ট্র কী, তা হওয়া আটকানো কেন দরকার, আটকানোর ক্ষেত্রে মমতাকে সত্যিই প্রয়োজন, নাকি তিনি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া – শতকরা ৮০-৯০ জন মানুষ এই মুহূর্তে এসব নিয়ে ভাবছেন না (সোশাল মিডিয়া দেখে যা-ই মনে হোক)। সংঘ পরিবারকে সরাসরি রাজনৈতিক ভাষণে, কর্মসূচিতে আক্রমণ করা হলে ভাবতে বাধ্য হতেন।

বিহারে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুযোগ আসা মাত্রই সমস্ত বাম দল একজোট হয়ে নীতীশকুমারকে সমর্থন করেছে। কেবল লিবারেশন নয়, সিপিএমও। সে জোটে কংগ্রেসও আছে। অথচ নীতীশও মমতার মতই বিজেপির সঙ্গে ঘর করেছেন। শুধু তা-ই নয়, মমতার বিজেপির সাথে শেষ জোট ছিল ২০০৬ সালে। নীতীশ কিন্তু ২০১৬ বিধানসভা ভোটে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সঙ্গে লড়ে জিতেও বিশ্বাসঘাতকতা করে বিজেপির কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। কেন নীতীশ আরএসএস-বিরোধী বাম দল এবং কংগ্রেসের কাছে গ্রহণযোগ্য আর কেন মমতা নন, তা নিয়ে কোনো আলোচনাই শুনলাম না আমরা। আলোচনাটা হল না সম্ভবত এইজন্যে, যে বামেরা বা কংগ্রেস নিজেরাই ওসব নিয়ে ভাবে না। বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পারলেই খুশি, শেষমেশ আরএসএসের প্রকল্পই সফল হয়ে যাবে কিনা তা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। অথবা ‘যখন হবে তখন দেখা যাবে’ নীতি নিয়ে চলছে।

আসলে কিন্তু মমতায় আর নীতীশে তফাত বড় কম নয়। নীতীশ সুযোগসন্ধানী, ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ। তারই অনিবার্য ফল হিসাবে ভূতপূর্ব জনতা দলের সঙ্গে, একদা সতীর্থ লালুপ্রসাদের সাথে তাঁর বিচ্ছেদ হয়েছিল। কিন্তু তাঁর রাজনীতির সূতিকাগার হল সমাজবাদী রাজনীতি, নিম্নবর্গীয় মানুষের রাজনীতি। সে কারণেই নীতীশ কখনো বিজেপিকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি, বিজেপিও পারেনি। নীতীশ কখনো মমতার মত সোচ্চার আরএসএস বন্দনাও করেননি। কারণ আরএসএস হল ব্রাহ্মণদের দ্বারা পরিচালিত, হিন্দু সমাজের উপর ব্রাহ্মণ আধিপত্য বজায় রাখার জন্য গঠিত সংস্থা। নীতীশের দলের নিম্নবর্গীয় সদস্য, সমর্থকদের সঙ্গে আরএসএসের আড়চোখে দেখার সম্পর্কটুকুই হওয়া সম্ভব। তার বেশি নয়।

অন্যদিকে মমতা ব্রাহ্মণকন্যা। তাঁকে দুর্গা বলে সম্বোধন করতে আরএসএসের কোথাও বাধে না। মমতার রাজনীতির ইতিহাস অন্য দিক থেকেও নীতীশের সঙ্গে মেলে না। বস্তুত যুগপৎ কংগ্রেস বিরোধিতা এবং কমিউনিস্ট বিরোধিতার ইতিহাস সম্ভবত মমতা ছাড়া ভারতের কোনো আঞ্চলিক দলের নেই। তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় রাজনীতির ভিত্তিতে তৈরি দলগুলোর স্বভাবতই প্যাথোলজিকাল বাম বিরোধিতা নেই, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেস বিরোধিতা ছিল। তেলুগু দেশম, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি, জগন্মোহন রেড্ডির দল বা ওড়িশার বিজু জনতা দলের জন্ম তৃণমূলের মতই কংগ্রেস ভেঙে। কিন্তু তাদেরও বামেদের সাথে ধুন্ধুমার সংঘাতের ইতিহাস নেই। তাদের এলাকায় বামেদের দুর্বলতা তার কারণ হতে পারে, কিন্তু এ কি নেহাত সমাপতন যে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তর দিকে আরএসএস বাদ দিলে তৃণমূলই একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি, কমিউনিস্ট এবং কংগ্রেস, দু পক্ষই যাদের ঘোষিত শত্রু? লক্ষণীয়, ২০১১ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল আর কংগ্রেসের জোট গড়তে দারুণ উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখা গেল, তিনি আরএসএসের বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন। সেই জোট বামফ্রন্টকে হারাতে পেরেছিল বটে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ভাঙনের গতিও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

তাহলে আরএসএসের সাথে সম্পর্ক মমতাকে কী কী দিয়েছে তা বোঝা গেল। এবার আরএসএস কী কী পেয়েছে সে আলোচনায় আসা যাক? রাজনীতিতে তো কেউ “আমি   নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি,/ তুমি   অবসরমত বাসিয়ো” গায় না। আরএসএস যা যা পেয়েছে সবকটাই অমূল্য।

১) আরএসএসের দুই ঘোষিত শত্রু মুসলমান আর কমিউনিস্ট। তৃণমূলের উদ্যোগে কমিউনিস্টরা প্রথমে তাদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি থেকে ক্ষমতাচ্যুত, পরে ছত্রভঙ্গ হয়েছে। তার জন্যে আরএসএসের আগমার্কা কোম্পানি বিজেপিকে বিন্দুমাত্র কসরত করতে হয়নি। মুসলমানরা আগে প্রান্তিক ছিলেন, তৃণমূল আমলে বাংলার হিন্দুদের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত হয়ে গেছেন। মমতা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে ইমাম ভাতা চালু করলেন, বিজেপি প্রায় বিনা আয়াসেই হিন্দুদের বোঝাতে সক্ষম হল, মুসলমানরা মমতার দুধেল গাই। পরে মমতা নিজেই অনবধানবশত (নাকি সচেতনভাবেই?) সেকথা বললেনও। এখন পরিস্থিতি এমন, যে বাম আমলে মুসলমানরা বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ভাড়া পেতেন না, এখন খোদ সল্টলেকে হোটেলের ঘর ভাড়া পান না।

২) মুসলমান তোষণ হচ্ছে – এই প্রোপাগান্ডা হিন্দুদের একটা বড় অংশের বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয়েছে তৃণমূল শাসনের ১১ বছরে। ইতিমধ্যে বেলাগাম হিন্দু তোষণ চলছে। বিজেপি আজগুবি অনলাইন প্রচার শুরু করল “পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো করতে দেওয়া হয় না”, তৃণমূল সরকার দুর্গাপুজোগুলোকে নগদ অনুদান দিতে শুরু করল। আরএসএস শুরু করল রামনবমীতে অস্ত্র মিছিল, তৃণমূল আরম্ভ করল বজরংবলী পুজো। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরির পথ খুলে গেল, আরএসএসের প্রতিশ্রুতি পূরণ হল। এদিকে দিদি দীঘায় জগন্নাথ মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা নিলেন। রাজ্যে বিজেপির সরকার থাকলেও এভাবে হিন্দুত্বকে রাজনীতির এজেন্ডায় নিয়ে আসতে পারত কিনা সন্দেহ।

৩) ভারতের একেক রাজ্যের একেকটা বিশিষ্ট গুণ আছে, যা সেই রাজ্যের মানুষের মূলধন। গুজরাটের যেমন ব্যবসা, পাঞ্জাবের কৃষিকাজ। বাংলার ছিল লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা ইত্যাদি। অন্য রাজ্যের লোকেরা যাকে কটাক্ষ করে এককথায় বলে কালচার। এই কালচার আরএসএসের হিন্দুত্বের একেবারে বিপরীত মেরুর জিনিস। তৃণমূল আমলে সবচেয়ে নির্বিঘ্নে সাড়ে সর্বনাশ ঘটানো গেছে এই কালচারের। বাংলার ছেলেমেয়েরা ফড়ফড় করে ইংরেজি বলতে না পারলেও দেশে বিদেশে গবেষক, অধ্যাপক হিসাবে তাদের দাম ছিল। এখনো সর্বভারতীয় বিজ্ঞান পুরস্কারগুলোর প্রাপকদের তালিকা মাঝে মাঝে সেকথা জানান দেয়। সে দাম ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে স্কুল, কলেজের চাকরি বিক্রি করে লেখাপড়া লাটে তুলে দিয়ে। নায়ক, নায়িকা, গায়ক, গায়িকারা কাতারে কাতারে বিধায়ক আর সাংসদ হয়ে গেছেন। লেখকরা ব্যস্ত পুষ্পাঞ্জলি দিতে আর চরণামৃত পান করতে। সিনেমার কথা না বলাই ভাল। শৈল্পিক উৎকর্ষ বাদ দিন, পারিশ্রমিকের হাল এত খারাপ যে কলকাতার শিল্পীরা স্রেফ বাংলা ছবিতে, ওয়েব সিরিজে কাজ করে টিকে থাকতে পারবেন কিনা সন্দেহ। মন্ত্রীর বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়ার ছবি দেখে প্রথম সারির অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য হা-হুতাশ করছেন, ওই পরিমাণ টাকার অর্ধেক পেলেও বাংলা ছবিগুলো অনেক ভাল করে করা যেত।

কিন্তু এসব গোল্লায় যাওয়ার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে। লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা মিলিয়ে যে বাঙালি মনন ছিল সেটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আসল ক্ষতি সেটা। বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকের অন্তত একটা ভান ছিল, যে সে ভারতের অন্য অনেক রাজ্যের লোকেদের মত ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না। দুর্গাপুজো এলে কদিন পাগলামি করে; নিজের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো, সত্যনারায়ণের সিন্নি চলে। কিন্তু বাইরে সে একজন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। এখন সেসব গেছে। নতুন ফ্ল্যাটবাড়ি হলে তার গায়ে খোদাই করা হচ্ছে গণেশের মুখ, শিবলিঙ্গ বা স্বস্তিকা। কলিং বেলে বেজে উঠছে “ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ”। অক্ষয় তৃতীয়ায় এখনো গণেশপুজো এবং হালখাতা হয় এমন দোকান খুঁজে পাওয়া দায়, অথচ গণেশ চতুর্থী এক দশকের মধ্যে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। শিগগির পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনন্ত ছুটির তালিকায় যোগ হবে নির্ঘাত। অল্পবয়সী বাঙালি কথা বলছে হিন্দি মিশিয়ে, ছোটরা স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে শিখছে হিন্দি। বঙ্গভঙ্গের নাম করতেই লর্ড কার্জনের ঘুম কেড়ে নেওয়া বাঙালি নিজে নিজেই প্রায় উত্তর ভারতীয় হিন্দু হয়ে গেল তৃণমূল আমলে। এই সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ তামিলনাড়ুতে কিছুতেই হয়ে উঠছে না আরএসএসের দ্বারা। কেরালায় মার খেতে হচ্ছে, এমনকি নিজেদের হাতে থাকা কর্ণাটকেও করতে গিয়ে অনবরত সংঘাত হচ্ছে। বাংলায় কিন্তু ওসবের দরকারই হচ্ছে না। বিনা রক্তপাতে বাঙালি বাঙালিয়ানা বিসর্জন দিচ্ছে।

আরও পড়ুন শাহেনশাহ ও ফ্যাসিবিরোধী ইশতেহার

এর বেশি আর কী চাইতে পারত আরএসএস? মমতা হিন্দুরাষ্ট্রের জন্য রুক্ষ, পাথুরে বাংলার মাটিতে হাল চালিয়ে নরম তুলতুলে করে দিয়েছেন। বীজ বপনও সারা। ফসল তোলার কাজটা শুধু বাকি।

বিজেপি মুখপাত্র বিতাড়ন: হিন্দুত্বের টাইম আউট, খেলা শেষ নয়

উত্তরপ্রদেশের বাদাউনের যুবক রেহান শাহের গত কয়েকদিন ধরে বারবার খিঁচুনি ধরছে। বেশ কিছুদিন বুলন্দশহর হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর গত শনিবার (৪ জুন) বাড়ি এসেছেন। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, রেহানের এই অবস্থার কারণ পুলিসি হেফাজতে অকথ্য অত্যাচার। গত ২ মে তাঁকে কাকরালা পুলিস আউটপোস্টে নিয়ে যাওয়া হয়, প্রচণ্ড মারধোর করা হয়, ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয় এবং গুহ্যদ্বারে প্লাস্টিকের পাইপ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটা মাসখানেক আগের হলেও প্রকাশ্যে এসেছে হপ্তাখানেক হল, কারণ রেহানের পরিবারের বক্তব্য, দোষী পুলিসকর্মীরা তাঁদের হুমকি দিয়েছিলেন যে এ নিয়ে মুখ খুললে ফল ভাল হবে না। রেহানের মা নাজমা শাহ শেষপর্যন্ত মরিয়া হয়ে বাদাউনের এসপি ডঃ ওমপ্রকাশ সিংয়ের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। প্রাথমিক তদন্তের পর দাতাগঞ্জের সার্কল অফিসার প্রেমকুমার থাপার সিদ্ধান্ত, রেহানের পরিবার যা বলছে তা সত্যি। ফলে পাঁচ পুলিসকর্মীর বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে।

এমন নয় যে এ দেশে পুলিস হেফাজতে অত্যাচারের এটাই প্রথম ঘটনা। স্মরণকালে সবচেয়ে বেশি হইচই হয়েছিল যে ঘটনা নিয়ে, তা হল ২০২০ সালে তামিলনাড়ুর শান্তাকুলমে ব্যবসায়ী পি জয়রাজ আর তাঁর ছেলে বেনিক্সের লক আপে মারধোর ও ধর্ষণ এবং তার ফলে মৃত্যু। তামিলনাড়ু পুলিস থার্ড ডিগ্রির জন্য কুখ্যাত, যা বহু আলোচিত জয় ভীম ছবিতেও দেখানো হয়েছে। এ বছরের এপ্রিল মাসেও চেন্নাইতে পুলিস হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে ভারতের প্রায় কোনো বড় রাজ্যই পুলিস হেফাজতে বা বিচারবিভাগীয় হেফাজতে অত্যাচার ও মৃত্যুর তালিকায় বাদ নেই। বস্তুত, উত্তরপ্রদেশ ২০২১-২২ সালে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে মৃত্যুর তালিকায় একেবারে শীর্ষে (৪৪৮) কিন্তু রেহানকে পুলিস যে কারণে জিজ্ঞাসাবাদ করতে নিয়ে গিয়েছিল, তার জন্যই এ ঘটনা আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। পুলিস বলেছে উনি নাকি গোহত্যায় জড়িত। শেষপর্যন্ত তাঁর অপরাধের কোনো প্রমাণ না পেয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়, যদিও রেহানের পরিবার বলেছে ৫০০০ টাকা ঘুষ দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশ তথা সারা ভারতে গত কয়েক বছরে গোহত্যার ‘অপরাধে’ কত ইসলাম ধর্মাবলম্বীকে স্রেফ পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে আমরা জানি। এরকম একটা ঘটনা সামলাতে গিয়ে উন্মত্ত জনতার হাতে বুলন্দশহরের পুলিস অফিসার সুবোধ সিং পর্যন্ত খুন হয়েছিলেন। উপরন্তু উত্তরপ্রদেশে বুলডোজারতন্ত্র চলছে। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে হিংসায় অভিযুক্ত সংখ্যালঘুদের বাড়ি ভেঙে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে শুরু হয়েছে, উত্তরপ্রদেশ তাতেও প্রথম সারিতে রয়েছে। ভারত এমন এক দেশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মধ্যপ্রদেশের ৬৫ বছরের বৃদ্ধ ভওরলাল জৈনকে মরতে হয় কারণ এক বিজেপি কর্মীর সন্দেহ হয়েছিল, তিনি মুসলমান। সুতরাং রেহানের দুর্দশার আসল কারণ যে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়, তা পরিষ্কার।

কিন্তু সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী বা ইরান ভারতজুড়ে গত কয়েক বছর ধরে রেহানের মত ইসলাম ধর্মাবলম্বী সাধারণ মানুষের উপর যে আক্রমণ চলছে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে – তার কোনো প্রতিবাদ করেনি। এমনকি স্পষ্ট ধর্মীয় বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন যখন পাস হয়েছিল, তখনো এই দেশগুলো টুঁ শব্দটি করেনি। হইহই করে উঠেছে কখন? যখন সরকারি দল বিজেপির দুই মুখপাত্র নূপুর শর্মা আর নবীন জিন্দাল হজরত মহম্মদ সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন। স্পষ্টত, সাধারণ মুসলমানের বাঁচা মরা নিয়ে ওই দেশগুলো ভাবিত নয়। তারা বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষায় আগ্রহী, বিশ্বাসীদের প্রাণরক্ষায় আগ্রহী নয়। যুক্তি দিয়ে বিচার করলে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মুসলমানরা মুসলমান ছাড়া কাউকে চেনে না, ওরা সব এক, ওদের উদ্দেশ্য বিশ্বজুড়ে ইসলামিক স্টেট তৈরি করা – এই তত্ত্বে যাদের মাথা ঘুরেছে তাদের কথা আলাদা, কিন্তু সাধারণ বুদ্ধি থাকলেই বোঝা যায় যে পশ্চিমবঙ্গ বা উত্তরপ্রদেশের ছাপোষা মুসলমানের জন্য আরব দেশের আমির ওমরাহের দরদ থাকার কোনো কারণ নেই। চীনের উইঘুর মুসলমান বাঁচল কি মরল তাতে যে আরব হোমরা চোমরাদের কিছু এসে যায় না, তা আগেই দেখা গেছে। এমনকি প্যালেস্তাইনের উপর আমেরিকার মদতপুষ্ট ইজরায়েলের হানাদারি নিয়েও আমেরিকার মিত্র সৌদি আরব কখনো মুখ খোলে না। এমনকি ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধেও মুসলিম দুনিয়া দ্বিধাবিভক্ত। অতিসরল শিয়া-সুন্নি বিভাজন তো আছেই, তা বাদেও নানা ভূ-রাজনৈতিক জটিল অঙ্ক আছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে কোনো দুটো দেশ বা দুটো গোষ্ঠীর দেশের মধ্যেই তা থাকে, দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে ধর্মেরই হোক, দেশটায় গণতন্ত্র বা রাজতন্ত্র – যা-ই চলুক।

কয়েকজন নেহাত মরণশীল ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতা রক্ষা না করলে মর্যাদাহানি হবে, হজরত মহম্মদ বা ইসলাম ধর্ম নিশ্চয়ই এত ঠুনকো নয়। হলেও সে জন্যে কাউকে খুনের হুমকি দেওয়া চলে না, যা অনেকে নূপুর আর নবীনকে দিচ্ছে বলে অভিযোগ। কিন্তু বাকস্বাধীনতার নামে মিথ্যার উপর ভর দিয়ে কুৎসা এবং ঘৃণা ছড়ানো যে চিরকাল চলতে পারে না – সে কথা শেষপর্যন্ত আরব দেশগুলোর ধমকানিতে বিজেপি সরকারকে ঢোঁক গিলে মানতে হল। ফরাসি কার্টুন পত্রিকা শার্লি এবদো কার্টুনের মাধ্যমে নিজেদের মতামত প্রকাশ করে, তাদের বক্তব্য তারা মুসলমানবিদ্বেষী নয়। কিন্তু ইসলাম বা অন্য যে কোনো আদর্শকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা তাদের বাকস্বাধীনতা। অন্তত তাত্ত্বিকভাবে এ কথায় ভুল নেই। ইসলাম, হিন্দুধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, জুডাইজম – যে কোনো ধর্মকে নিয়েই ব্যঙ্গ করার অধিকার সকলের আছে, অন্তত থাকা উচিত। শুধু ধর্মই বা কেন? গান্ধীবাদ, মার্কসবাদ বা হিন্দুত্ববাদ নিয়েও ব্যঙ্গ করা চলে, করা হয়ও। কিন্তু নূপুরদেবী কোনো আদর্শকে ব্যঙ্গ করেননি, গলার জোরে অর্ধসত্য উচ্চারণ করে ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতাকে হেয় করেছেন। ষষ্ঠ শতাব্দীর একজন পুরুষের স্ত্রীর সঙ্গে বয়সের পার্থক্যের কারণে যদি তাঁকে যে কোনো বিশেষণে ভূষিত করা চলে, তাহলে ভারতে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যাবে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে সারদামণির বয়সের তফাতও কম নয়, তাঁদের বিয়ের সময় সারদা নিতান্তই শিশু ছিলেন। অথচ তাঁরা হজরত মহম্মদের প্রায় বারোশো বছর পরের মানুষ। উপরন্তু এ দেশের কুলীন ব্রাহ্মণরা বিয়েকে রীতিমত লাভজনক ব্যবসা করে তুলে মনের সুখে ছোট ছোট মেয়েদের বিয়ে করে বেড়াতেন শ দেড়েক বছর আগেও। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নামক এক অতি দুর্বিনীত পণ্ডিত এ দেশে না জন্মালে সে ব্যবসা বহাল তবিয়তে আরও কতদিন চলত বলা মুশকিল।

দুঃখের বিষয়, ২০২১ সালে ইউনিসেফ প্রকাশিত এক সমীক্ষা বলছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে এখনো ভারতেই হয়। প্রত্যেক বছর প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ১৮ বছরের কমবয়সী মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় এ দেশে। ২০১৬ সালে ইন্ডিয়াস্পেন্ড জনগণনা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে যে সমীক্ষা করেছিল, যদি ইউনিসেফের সমীক্ষার সঙ্গে তা মিলিয়ে পড়েন তাহলে মাথা ঘুরে যাবে। ওই সমীক্ষা বলেছিল, প্রায় ১২ মিলিয়ন ভারতীয় শিশুর ১০ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। তাদের মধ্যে ৮৪% হিন্দু আর ১১% মুসলমান। এই শিশুদের ৬৫% মেয়ে। অতএব বিয়েশাদি নিয়ে কথা না বাড়ানোই ভাল। এই ধর্ম গোঁড়া, ওই ধর্ম উদার – এসব কথাও ধোপে টেকে না। ধর্মকে ধর্মের জায়গায় থাকতে দিয়ে কী করে দেশটা চালানো যায় তাতে মন দিলেই যে সরকারকে অপ্রস্তুতে পড়তে হয় না, এইটুকু সরকার এবং তার সমর্থকরা বুঝলেই যথেষ্ট হয়।

আরও পড়ুন আরএসএসের পছন্দসই অগভীর বিরোধিতার মুখ বাবুল, শত্রুঘ্ন

অবশ্য সে কথা মোদী, অমিত শাহরা বোঝেন না বললে তাঁদের বুদ্ধিসুদ্ধিকে ছোট করা হয়। সমস্যা হল ধর্মীয় জিগির বাদ দিয়ে কী করে রাজনীতি করতে হয় বা সরকার চালাতে হয় তা আজ নতুন করে শিখতে হলে বিজেপি মহা ফাঁপরে পড়বে। সঙ্ঘের একশো বছরের শিক্ষা তাহলে বাতিল করতে হয়, বেহাল অর্থনীতির হাল কী করে ফেরানো যায় তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে হয়। সেসব করবে কে? অরবিন্দ পনগরিয়া বা জগদীশ ভগবতীর মত যেসব দক্ষিণপন্থী অর্থনীতিবিদ প্রথম থেকে প্রবল উৎসাহে বিজেপি সরকারের প্রতিটি নীতির সমর্থনে তত্ত্ব খাড়া করতেন, তাঁরাও বেশ কিছুদিন হল নীরব হয়ে গেছেন। ইতিহাসের ছাত্র শক্তিকান্ত দাসকে দিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক চালাতে হচ্ছে। এমন একজনকে অর্থমন্ত্রী করা হয়েছে, যিনি পেঁয়াজের দাম বাড়ার সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করলে বলেন “আমি তো পেঁয়াজ খাই না, তাই জানি না।” এমন একজনকে বিদেশমন্ত্রী করা হয়েছে, যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সমালোচনা করলে নির্বোধের মত বলেন “ভোটব্যাঙ্ক পলিটিক্স করছে”। যেন জো বাইডেন ২০২৪ সালে বারাণসীতে মোদীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হবেন। এমতাবস্থায় তাজমহল, জ্ঞানবাপী, কুতুব মিনার – সর্বত্র মন্দির প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া বিজেপি অন্য কী রাজনীতি করবে? কিন্তু তাদের এই মুহূর্তে যতই অপরাজেয় মনে হোক, রাজনৈতিক বিরোধীরা যতই ক্ষুদ্র স্বার্থে অন্তর্কলহ বা অকারণ রোম্যান্টিকতায় মগ্ন থাকুন না কেন, এই রাজনীতি যে ক্রমশ হিন্দুত্ববাদীদেরও বড় বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সম্ভবত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তা আন্দাজ করছে। সেই কারণেই সঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত সম্প্রতি বলেছেন, সব মসজিদের তলায় শিবলিঙ্গ খুঁজতে যাওয়ার দরকার নেই। সেই অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমল থেকে দেখা যেত আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের লোকেরা সবচেয়ে উগ্র মন্তব্যগুলো করেন, বিজেপি নেতারা তুলনায় নরমপন্থা দেখান। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল গুজরাট ২০০২, যেখানে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মোদী গরম গরম বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সহসা উলটপুরাণ শুরু হয়েছে। বিজেপি মুখপাত্ররা সরাসরি হজরত মহম্মদকে গাল পাড়ছেন, আর সঙ্ঘের প্রধান বলছেন মারামারিতে কাজ নেই, ইতিহাস কি আর বদলানো যায়?

আসলে সঙ্ঘ বরাবরই মুখেন মারিতং জগৎ। অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠা আর কাশ্মীর থেকে সংবিধানের ৩৭০ নং ধারা প্রত্যাহার তাদের মৌলিক ইস্যুগুলোর মধ্যে পড়ে। প্রথমটা নির্বিঘ্নে মিটে গেলেও দ্বিতীয়টার ফলে কাশ্মীর যে হাতের বাইরে চলে গেছে তা আর লুকনো যাচ্ছে না। বাকি ভারতের হিন্দুদের মুসলমান জুজু দেখানোর জন্য তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যাদের উপেন্দ্রকিশোরের গল্পের কুমিরছানার মত বারবার দেখানো হয়েছে – সেই কাশ্মীরি হিন্দুরা এখন বেঘোরে মারা যাচ্ছে, ‘হিন্দু হৃদয়সম্রাট’ মোদী ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে আছেন। নিজেদের তাঁবে অস্ত্রশিক্ষা দিয়ে বেড়ানো অমুক সেনা, তমুক সেনাকে দিয়ে যে কাশ্মীরে জঙ্গি মোকাবিলা করা যাবে না, তা তাঁরা ভালই বোঝেন। আর হিংসা যে হিংসার জন্ম দেয় তা ভাগবত-মোদী-শাহের চেয়ে ভাল আর কে জানে? কাশ্মীরের জঙ্গিপনা যদি বাকি দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সামলানো কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে সম্ভবত ওঁরা নিজেরাই এখন সন্দিহান। আরব দুনিয়াকে চটালে কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা বাড়বে তা নয়, ইসলামিক মৌলবাদের সমস্যাও বাড়তে পারে। অতএব আপাতত ভালমানুষীর বিকল্প নেই।

নূপুর আর নবীনকে সাসপেন্ড করা যে ভালমানুষীর বেশি কিছু নয়, তা সাদা চোখেই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কারণ তাঁদের সাসপেন্ড করেছে বিজেপি দল, ভারত সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সবকিছু আভ্যন্তরীণ বিষয় বলে চালিয়ে দিয়ে যে বিদেশনীতির ক্ষেত্রে পার পাওয়া যায় না – এটা বুঝতে যেমন দেরি হল, তেমনি দল আর সরকারকে দেশের মানুষ এক বলে মেনে নিলেও অন্য দেশগুলো যে না-ও মানতে পারে, তা কোন মূল্যে বিজেপি সরকার বুঝবে তা গডসেই জানেন। ভারত সরকার যেভাবে চলছে তাতে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় থাকা উচিত সেইসব অনাবাসী ভারতীয়দের, যাঁরা বিভিন্ন আরব দেশে থেকে সোনামুখ করে কোনো বহুজাতিক বা আরব মালিকের কোম্পানিতে কাজ করে দু পয়সা কামান আর সোশাল মিডিয়ায় ভারতীয় মুসলমানদের অহোরাত্র গালি দিয়ে ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হওয়ার অপেক্ষা করেন। কারণ যদিও ভারতীয় মুসলমানের জন্য ও দেশের আমির, মুফতিদের প্রাণ কাঁদে না; ইসলামকে আক্রমণ করলেই তাঁরা কেমন অগ্নিশর্মা হয়ে যান তা একটা ঘটনায় প্রমাণ হয়ে গেল। এসব চলতে থাকলে ওখানকার হিন্দুদের গলাধাক্কা দিতে ওঁরা বেশি সময় নেবেন না। ওই দেশগুলো তো আর ‘মুসলিম এজেন্ট’ গান্ধী, ‘চরিত্রহীন’ নেহরু আর ‘সোনার চাঁদ’ আম্বেদকরের তৈরি গণতান্ত্রিক সংবিধান মেনে চলে না।

যে ভারতীয় উদারপন্থীরা কদিন “দ্যাখ কেমন লাগে” মেজাজে আছেন, তাঁদেরও নিশ্চিন্ত হওয়ার কারণ নেই। আরব দেশগুলো কী বলবে সেই ভাবনায় বুলডোজার থামবে না, বিনা বিচারে সংখ্যালঘু ও বিরোধীদের আটক করে রাখা বন্ধ হবে না, আম্বানি-আদানির হাতে দেশের সমস্ত সম্পদ তুলে দেওয়াও থমকে যাবে না। কারণ বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো নিজের দেশে এবং আশপাশে যথেচ্ছ অনাচার চালাতে পারে। স্রেফ পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়েই অন্য কোনো দেশ কিছু বলবে না। নেহাত কাকতালীয় ঘটনা নয় যে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোতেই দক্ষিণপন্থী স্বৈরাচারী শাসকদের উত্থান হয়েছে; মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রবলভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। বিশ্বায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল পৃথিবীটা ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ হবে। আসলে পৃথিবী এখন কয়েকটা কূপমণ্ডূক গ্রামে বিভক্ত, যেখানে নির্বাচনে জিতে আসা অগণতান্ত্রিক মোড়লরাই শেষ কথা। ন্যাটো ভ্লাদিমির পুতিনের হাত থেকে ইউক্রেনকে বাঁচাতে আসেনি, কাল চীন তাইওয়ান আক্রমণ করলে বাইডেন মোটেই বাঁচাতে আসবেন না, এখন যা-ই বলুন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত কোনো মিত্রপক্ষ বা মুক্তিবাহিনী এসে কাউকে উদ্ধার করবে না। নিজেদের মুক্তির ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

%d bloggers like this: