বিজেপি মুখপাত্র বিতাড়ন: হিন্দুত্বের টাইম আউট, খেলা শেষ নয়

উত্তরপ্রদেশের বাদাউনের যুবক রেহান শাহের গত কয়েকদিন ধরে বারবার খিঁচুনি ধরছে। বেশ কিছুদিন বুলন্দশহর হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর গত শনিবার (৪ জুন) বাড়ি এসেছেন। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, রেহানের এই অবস্থার কারণ পুলিসি হেফাজতে অকথ্য অত্যাচার। গত ২ মে তাঁকে কাকরালা পুলিস আউটপোস্টে নিয়ে যাওয়া হয়, প্রচণ্ড মারধোর করা হয়, ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয় এবং গুহ্যদ্বারে প্লাস্টিকের পাইপ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটা মাসখানেক আগের হলেও প্রকাশ্যে এসেছে হপ্তাখানেক হল, কারণ রেহানের পরিবারের বক্তব্য, দোষী পুলিসকর্মীরা তাঁদের হুমকি দিয়েছিলেন যে এ নিয়ে মুখ খুললে ফল ভাল হবে না। রেহানের মা নাজমা শাহ শেষপর্যন্ত মরিয়া হয়ে বাদাউনের এসপি ডঃ ওমপ্রকাশ সিংয়ের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। প্রাথমিক তদন্তের পর দাতাগঞ্জের সার্কল অফিসার প্রেমকুমার থাপার সিদ্ধান্ত, রেহানের পরিবার যা বলছে তা সত্যি। ফলে পাঁচ পুলিসকর্মীর বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে।

এমন নয় যে এ দেশে পুলিস হেফাজতে অত্যাচারের এটাই প্রথম ঘটনা। স্মরণকালে সবচেয়ে বেশি হইচই হয়েছিল যে ঘটনা নিয়ে, তা হল ২০২০ সালে তামিলনাড়ুর শান্তাকুলমে ব্যবসায়ী পি জয়রাজ আর তাঁর ছেলে বেনিক্সের লক আপে মারধোর ও ধর্ষণ এবং তার ফলে মৃত্যু। তামিলনাড়ু পুলিস থার্ড ডিগ্রির জন্য কুখ্যাত, যা বহু আলোচিত জয় ভীম ছবিতেও দেখানো হয়েছে। এ বছরের এপ্রিল মাসেও চেন্নাইতে পুলিস হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে ভারতের প্রায় কোনো বড় রাজ্যই পুলিস হেফাজতে বা বিচারবিভাগীয় হেফাজতে অত্যাচার ও মৃত্যুর তালিকায় বাদ নেই। বস্তুত, উত্তরপ্রদেশ ২০২১-২২ সালে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে মৃত্যুর তালিকায় একেবারে শীর্ষে (৪৪৮)। কিন্তু রেহানকে পুলিস যে কারণে জিজ্ঞাসাবাদ করতে নিয়ে গিয়েছিল, তার জন্যই এ ঘটনা আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। পুলিস বলেছে উনি নাকি গোহত্যায় জড়িত। শেষপর্যন্ত তাঁর অপরাধের কোনো প্রমাণ না পেয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়, যদিও রেহানের পরিবার বলেছে ৫০০০ টাকা ঘুষ দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশ তথা সারা ভারতে গত কয়েক বছরে গোহত্যার ‘অপরাধে’ কত ইসলাম ধর্মাবলম্বীকে স্রেফ পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে আমরা জানি। এরকম একটা ঘটনা সামলাতে গিয়ে উন্মত্ত জনতার হাতে বুলন্দশহরের পুলিস অফিসার সুবোধ সিং পর্যন্ত খুন হয়েছিলেন। উপরন্তু উত্তরপ্রদেশে বুলডোজারতন্ত্র চলছে। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে হিংসায় অভিযুক্ত সংখ্যালঘুদের বাড়ি ভেঙে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে শুরু হয়েছে, উত্তরপ্রদেশ তাতেও প্রথম সারিতে রয়েছে। ভারত এমন এক দেশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মধ্যপ্রদেশের ৬৫ বছরের বৃদ্ধ ভওরলাল জৈনকে মরতে হয় কারণ এক বিজেপি কর্মীর সন্দেহ হয়েছিল, তিনি মুসলমান। সুতরাং রেহানের দুর্দশার আসল কারণ যে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়, তা পরিষ্কার।

কিন্তু সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী বা ইরান ভারতজুড়ে গত কয়েক বছর ধরে রেহানের মত ইসলাম ধর্মাবলম্বী সাধারণ মানুষের উপর যে আক্রমণ চলছে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে – তার কোনো প্রতিবাদ করেনি। এমনকি স্পষ্ট ধর্মীয় বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন যখন পাস হয়েছিল, তখনো এই দেশগুলো টুঁ শব্দটি করেনি। হইহই করে উঠেছে কখন? যখন সরকারি দল বিজেপির দুই মুখপাত্র নূপুর শর্মা আর নবীন জিন্দাল হজরত মহম্মদ সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন। স্পষ্টত, সাধারণ মুসলমানের বাঁচা মরা নিয়ে ওই দেশগুলো ভাবিত নয়। তারা বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষায় আগ্রহী, বিশ্বাসীদের প্রাণরক্ষায় আগ্রহী নয়। যুক্তি দিয়ে বিচার করলে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মুসলমানরা মুসলমান ছাড়া কাউকে চেনে না, ওরা সব এক, ওদের উদ্দেশ্য বিশ্বজুড়ে ইসলামিক স্টেট তৈরি করা – এই তত্ত্বে যাদের মাথা ঘুরেছে তাদের কথা আলাদা, কিন্তু সাধারণ বুদ্ধি থাকলেই বোঝা যায় যে পশ্চিমবঙ্গ বা উত্তরপ্রদেশের ছাপোষা মুসলমানের জন্য আরব দেশের আমির ওমরাহের দরদ থাকার কোনো কারণ নেই। চীনের উইঘুর মুসলমান বাঁচল কি মরল তাতে যে আরব হোমরা চোমরাদের কিছু এসে যায় না, তা আগেই দেখা গেছে। এমনকি প্যালেস্তাইনের উপর আমেরিকার মদতপুষ্ট ইজরায়েলের হানাদারি নিয়েও আমেরিকার মিত্র সৌদি আরব কখনো মুখ খোলে না। এমনকি ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধেও মুসলিম দুনিয়া দ্বিধাবিভক্ত। অতিসরল শিয়া-সুন্নি বিভাজন তো আছেই, তা বাদেও নানা ভূ-রাজনৈতিক জটিল অঙ্ক আছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে কোনো দুটো দেশ বা দুটো গোষ্ঠীর দেশের মধ্যেই তা থাকে, দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে ধর্মেরই হোক, দেশটায় গণতন্ত্র বা রাজতন্ত্র – যা-ই চলুক।

কয়েকজন নেহাত মরণশীল ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতা রক্ষা না করলে মর্যাদাহানি হবে, হজরত মহম্মদ বা ইসলাম ধর্ম নিশ্চয়ই এত ঠুনকো নয়। হলেও সে জন্যে কাউকে খুনের হুমকি দেওয়া চলে না, যা অনেকে নূপুর আর নবীনকে দিচ্ছে বলে অভিযোগ। কিন্তু বাকস্বাধীনতার নামে মিথ্যার উপর ভর দিয়ে কুৎসা এবং ঘৃণা ছড়ানো যে চিরকাল চলতে পারে না – সে কথা শেষপর্যন্ত আরব দেশগুলোর ধমকানিতে বিজেপি সরকারকে ঢোঁক গিলে মানতে হল। ফরাসি কার্টুন পত্রিকা শার্লি এবদো কার্টুনের মাধ্যমে নিজেদের মতামত প্রকাশ করে, তাদের বক্তব্য তারা মুসলমানবিদ্বেষী নয়। কিন্তু ইসলাম বা অন্য যে কোনো আদর্শকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা তাদের বাকস্বাধীনতা। অন্তত তাত্ত্বিকভাবে এ কথায় ভুল নেই। ইসলাম, হিন্দুধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, জুডাইজম – যে কোনো ধর্মকে নিয়েই ব্যঙ্গ করার অধিকার সকলের আছে, অন্তত থাকা উচিত। শুধু ধর্মই বা কেন? গান্ধীবাদ, মার্কসবাদ বা হিন্দুত্ববাদ নিয়েও ব্যঙ্গ করা চলে, করা হয়ও। কিন্তু নূপুরদেবী কোনো আদর্শকে ব্যঙ্গ করেননি, গলার জোরে অর্ধসত্য উচ্চারণ করে ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতাকে হেয় করেছেন। ষষ্ঠ শতাব্দীর একজন পুরুষের স্ত্রীর সঙ্গে বয়সের পার্থক্যের কারণে যদি তাঁকে যে কোনো বিশেষণে ভূষিত করা চলে, তাহলে ভারতে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যাবে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে সারদামণির বয়সের তফাতও কম নয়, তাঁদের বিয়ের সময় সারদা নিতান্তই শিশু ছিলেন। অথচ তাঁরা হজরত মহম্মদের প্রায় বারোশো বছর পরের মানুষ। উপরন্তু এ দেশের কুলীন ব্রাহ্মণরা বিয়েকে রীতিমত লাভজনক ব্যবসা করে তুলে মনের সুখে ছোট ছোট মেয়েদের বিয়ে করে বেড়াতেন শ দেড়েক বছর আগেও। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নামক এক অতি দুর্বিনীত পণ্ডিত এ দেশে না জন্মালে সে ব্যবসা বহাল তবিয়তে আরও কতদিন চলত বলা মুশকিল।

দুঃখের বিষয়, ২০২১ সালে ইউনিসেফ প্রকাশিত এক সমীক্ষা বলছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে এখনো ভারতেই হয়। প্রত্যেক বছর প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ১৮ বছরের কমবয়সী মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় এ দেশে। ২০১৬ সালে ইন্ডিয়াস্পেন্ড জনগণনা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে যে সমীক্ষা করেছিল, যদি ইউনিসেফের সমীক্ষার সঙ্গে তা মিলিয়ে পড়েন তাহলে মাথা ঘুরে যাবে। ওই সমীক্ষা বলেছিল, প্রায় ১২ মিলিয়ন ভারতীয় শিশুর ১০ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। তাদের মধ্যে ৮৪% হিন্দু আর ১১% মুসলমান। এই শিশুদের ৬৫% মেয়ে। অতএব বিয়েশাদি নিয়ে কথা না বাড়ানোই ভাল। এই ধর্ম গোঁড়া, ওই ধর্ম উদার – এসব কথাও ধোপে টেকে না। ধর্মকে ধর্মের জায়গায় থাকতে দিয়ে কী করে দেশটা চালানো যায় তাতে মন দিলেই যে সরকারকে অপ্রস্তুতে পড়তে হয় না, এইটুকু সরকার এবং তার সমর্থকরা বুঝলেই যথেষ্ট হয়।

আরও পড়ুন আরএসএসের পছন্দসই অগভীর বিরোধিতার মুখ বাবুল, শত্রুঘ্ন

অবশ্য সে কথা মোদী, অমিত শাহরা বোঝেন না বললে তাঁদের বুদ্ধিসুদ্ধিকে ছোট করা হয়। সমস্যা হল ধর্মীয় জিগির বাদ দিয়ে কী করে রাজনীতি করতে হয় বা সরকার চালাতে হয় তা আজ নতুন করে শিখতে হলে বিজেপি মহা ফাঁপরে পড়বে। সঙ্ঘের একশো বছরের শিক্ষা তাহলে বাতিল করতে হয়, বেহাল অর্থনীতির হাল কী করে ফেরানো যায় তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে হয়। সেসব করবে কে? অরবিন্দ পনগরিয়া বা জগদীশ ভগবতীর মত যেসব দক্ষিণপন্থী অর্থনীতিবিদ প্রথম থেকে প্রবল উৎসাহে বিজেপি সরকারের প্রতিটি নীতির সমর্থনে তত্ত্ব খাড়া করতেন, তাঁরাও বেশ কিছুদিন হল নীরব হয়ে গেছেন। ইতিহাসের ছাত্র শক্তিকান্ত দাসকে দিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক চালাতে হচ্ছে। এমন একজনকে অর্থমন্ত্রী করা হয়েছে, যিনি পেঁয়াজের দাম বাড়ার সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করলে বলেন “আমি তো পেঁয়াজ খাই না, তাই জানি না।” এমন একজনকে বিদেশমন্ত্রী করা হয়েছে, যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সমালোচনা করলে নির্বোধের মত বলেন “ভোটব্যাঙ্ক পলিটিক্স করছে”। যেন জো বাইডেন ২০২৪ সালে বারাণসীতে মোদীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হবেন। এমতাবস্থায় তাজমহল, জ্ঞানবাপী, কুতুব মিনার – সর্বত্র মন্দির প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া বিজেপি অন্য কী রাজনীতি করবে? কিন্তু তাদের এই মুহূর্তে যতই অপরাজেয় মনে হোক, রাজনৈতিক বিরোধীরা যতই ক্ষুদ্র স্বার্থে অন্তর্কলহ বা অকারণ রোম্যান্টিকতায় মগ্ন থাকুন না কেন, এই রাজনীতি যে ক্রমশ হিন্দুত্ববাদীদেরও বড় বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সম্ভবত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তা আন্দাজ করছে। সেই কারণেই সঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত সম্প্রতি বলেছেন, সব মসজিদের তলায় শিবলিঙ্গ খুঁজতে যাওয়ার দরকার নেই। সেই অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমল থেকে দেখা যেত আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের লোকেরা সবচেয়ে উগ্র মন্তব্যগুলো করেন, বিজেপি নেতারা তুলনায় নরমপন্থা দেখান। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল গুজরাট ২০০২, যেখানে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মোদী গরম গরম বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সহসা উলটপুরাণ শুরু হয়েছে। বিজেপি মুখপাত্ররা সরাসরি হজরত মহম্মদকে গাল পাড়ছেন, আর সঙ্ঘের প্রধান বলছেন মারামারিতে কাজ নেই, ইতিহাস কি আর বদলানো যায়?

আসলে সঙ্ঘ বরাবরই মুখেন মারিতং জগৎ। অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠা আর কাশ্মীর থেকে সংবিধানের ৩৭০ নং ধারা প্রত্যাহার তাদের মৌলিক ইস্যুগুলোর মধ্যে পড়ে। প্রথমটা নির্বিঘ্নে মিটে গেলেও দ্বিতীয়টার ফলে কাশ্মীর যে হাতের বাইরে চলে গেছে তা আর লুকনো যাচ্ছে না। বাকি ভারতের হিন্দুদের মুসলমান জুজু দেখানোর জন্য তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যাদের উপেন্দ্রকিশোরের গল্পের কুমিরছানার মত বারবার দেখানো হয়েছে – সেই কাশ্মীরি হিন্দুরা এখন বেঘোরে মারা যাচ্ছে, ‘হিন্দু হৃদয়সম্রাট’ মোদী ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে আছেন। নিজেদের তাঁবে অস্ত্রশিক্ষা দিয়ে বেড়ানো অমুক সেনা, তমুক সেনাকে দিয়ে যে কাশ্মীরে জঙ্গি মোকাবিলা করা যাবে না, তা তাঁরা ভালই বোঝেন। আর হিংসা যে হিংসার জন্ম দেয় তা ভাগবত-মোদী-শাহের চেয়ে ভাল আর কে জানে? কাশ্মীরের জঙ্গিপনা যদি বাকি দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সামলানো কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে সম্ভবত ওঁরা নিজেরাই এখন সন্দিহান। আরব দুনিয়াকে চটালে কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা বাড়বে তা নয়, ইসলামিক মৌলবাদের সমস্যাও বাড়তে পারে। অতএব আপাতত ভালমানুষীর বিকল্প নেই।

নূপুর আর নবীনকে সাসপেন্ড করা যে ভালমানুষীর বেশি কিছু নয়, তা সাদা চোখেই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কারণ তাঁদের সাসপেন্ড করেছে বিজেপি দল, ভারত সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সবকিছু আভ্যন্তরীণ বিষয় বলে চালিয়ে দিয়ে যে বিদেশনীতির ক্ষেত্রে পার পাওয়া যায় না – এটা বুঝতে যেমন দেরি হল, তেমনি দল আর সরকারকে দেশের মানুষ এক বলে মেনে নিলেও অন্য দেশগুলো যে না-ও মানতে পারে, তা কোন মূল্যে বিজেপি সরকার বুঝবে তা গডসেই জানেন। ভারত সরকার যেভাবে চলছে তাতে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় থাকা উচিত সেইসব অনাবাসী ভারতীয়দের, যাঁরা বিভিন্ন আরব দেশে থেকে সোনামুখ করে কোনো বহুজাতিক বা আরব মালিকের কোম্পানিতে কাজ করে দু পয়সা কামান আর সোশাল মিডিয়ায় ভারতীয় মুসলমানদের অহোরাত্র গালি দিয়ে ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হওয়ার অপেক্ষা করেন। কারণ যদিও ভারতীয় মুসলমানের জন্য ও দেশের আমির, মুফতিদের প্রাণ কাঁদে না; ইসলামকে আক্রমণ করলেই তাঁরা কেমন অগ্নিশর্মা হয়ে যান তা একটা ঘটনায় প্রমাণ হয়ে গেল। এসব চলতে থাকলে ওখানকার হিন্দুদের গলাধাক্কা দিতে ওঁরা বেশি সময় নেবেন না। ওই দেশগুলো তো আর ‘মুসলিম এজেন্ট’ গান্ধী, ‘চরিত্রহীন’ নেহরু আর ‘সোনার চাঁদ’ আম্বেদকরের তৈরি গণতান্ত্রিক সংবিধান মেনে চলে না।

যে ভারতীয় উদারপন্থীরা কদিন “দ্যাখ কেমন লাগে” মেজাজে আছেন, তাঁদেরও নিশ্চিন্ত হওয়ার কারণ নেই। আরব দেশগুলো কী বলবে সেই ভাবনায় বুলডোজার থামবে না, বিনা বিচারে সংখ্যালঘু ও বিরোধীদের আটক করে রাখা বন্ধ হবে না, আম্বানি-আদানির হাতে দেশের সমস্ত সম্পদ তুলে দেওয়াও থমকে যাবে না। কারণ বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো নিজের দেশে এবং আশপাশে যথেচ্ছ অনাচার চালাতে পারে। স্রেফ পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়েই অন্য কোনো দেশ কিছু বলবে না। নেহাত কাকতালীয় ঘটনা নয় যে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোতেই দক্ষিণপন্থী স্বৈরাচারী শাসকদের উত্থান হয়েছে; মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রবলভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। বিশ্বায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল পৃথিবীটা ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ হবে। আসলে পৃথিবী এখন কয়েকটা কূপমণ্ডূক গ্রামে বিভক্ত, যেখানে নির্বাচনে জিতে আসা অগণতান্ত্রিক মোড়লরাই শেষ কথা। ন্যাটো ভ্লাদিমির পুতিনের হাত থেকে ইউক্রেনকে বাঁচাতে আসেনি, কাল চীন তাইওয়ান আক্রমণ করলে বাইডেন মোটেই বাঁচাতে আসবেন না, এখন যা-ই বলুন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত কোনো মিত্রপক্ষ বা মুক্তিবাহিনী এসে কাউকে উদ্ধার করবে না। নিজেদের মুক্তির ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

১৪৬ বছর ধরে ক্ষমতা দেখিয়ে চলেছে বুলডোজার

 “বুলডোজার, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?”

রাজধানী দিল্লির জাহাঙ্গিরপুরীতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেরও তোয়াক্কা না করা বুলডোজারে বাড়িঘর, দোকানপাট গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল যাঁদের, তাঁরা এই প্রশ্ন করেছিলেন কিনা জানি না। তবে বৃন্দা কারাত নিশ্চিত জানতেন, বুলডোজার কখনো পথ হারায় না। যন্ত্র হলেও সে নিজের পক্ষ সম্পর্কে রীতিমত সচেতন। সেই ১৮৭৬ সাল থেকে সে ক্ষমতা প্রদর্শনের কাজ করে যাচ্ছে।

সে বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী রাদারফোর্ড বি হেস আর ডেমোক্র্যাট স্যামুয়েল টিলডেনের লড়াইতে বারবার এসে যেত বুলডোজারের কথা। বুলডোজ করা বলতে বোঝানো হত কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের উপর অত্যাচার করে, ভয় দেখিয়ে তাদের ভোটদানে বিরত করা। অবাক হচ্ছেন? ভেবেছিলেন চড়াম চড়াম ঢাকের বাদ্যি আমাদের নিজেদের আবিষ্কার? তা-ও কি হয়? আমরা না অহিংস জাতি? বরং বলা যায় আমেরিকা যেখানে, বুলডোজার সেখানে। ওসামা বিন লাদেনের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ও দিয়েই। আমেরিকা সমর্থিত ইজরায়েলের সেনাবাহিনীকেও গাজায় প্যালেস্তিনীয় যুবকের মৃতদেহ বুলডোজার দিয়ে পরিষ্কার করতে দেখা গেছে। আবার আফগানিস্তানের প্রাক্তন সিআইএ এজেন্ট গুল আগা শেরজাই, যে এখন তালিবান সরকারের শরিক, তার নাঙ্গারহার প্রদেশের শাসক থাকার সময়ে (২০০৫-২০১৩) নামই হয়ে গিয়েছিল বুলডোজার। কারণ প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে গেলেই সাধারণ মানুষ তার কাছে অসমাপ্ত রাস্তা তৈরি করার আবেদন জানাত। শেরজাই নাকি পত্রপাঠ বুলডোজার চালিয়ে কাজ শুরু করে দিত।

আসলে চাষবাসের কাজে লাগবে বলে তৈরি বুলডোজারের ব্যবহার ক্রমশই শহুরে হয়ে উঠেছে। পালোয়ানরা পেশি ফোলায়, ক্ষমতাশালীরা বুলডোজার ফলায়। জরুরি অবস্থার সময়ে ভারতভাগ্যবিধাতা হয়ে ওঠা সঞ্জয় গান্ধীও পুরনো দিল্লির সৌন্দর্যায়নের নাম করে ওই যন্ত্র চালিয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালে এই এপ্রিল মাসেই সঞ্জয়ের ডান হাত আমলা জগমোহনের (সেই জগমোহন, যিনি ১৯৮৯ সালে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের হত্যার সময়ে জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যপাল ছিলেন এবং পরে বিজেপিতে যোগ দেন) উদ্যোগে লালকেল্লা, জামা মসজিদ এবং এবং তুর্কমান গেট সংলগ্ন এলাকা চিহ্নিত করা হয় বস্তি উচ্ছেদ করে সৌন্দর্যায়নের জন্য। তা করতে গিয়ে অশান্তি দেখা দিলে ওই এলাকার বাসিন্দাদের অন্যত্র সরে যেতে বলা হয়, কিন্তু তুর্কমান গেটের বাসিন্দারা নাছোড়বান্দা। ১৮ এপ্রিল পুলিস প্রতিবাদীদের উপর গুলি চালায়, অনেকের মৃত্যুও হয়। বিবিসির মত বিদেশি সংবাদমাধ্যমের মতে, বেশকিছু প্রতিবাদীকে বুলডোজার দিয়ে পিষেও দেওয়া হয়েছিল।

আরও পড়ুন শাহীনবাগ: কী পাইনি তার হিসাব মেলাতে…

অতএব যোগী আদিত্যনাথের বুলডোজার, মধ্যপ্রদেশের খারগোনে শিবরাজ সিং চৌহানের বুলডোজার বা দিল্লির জাহাঙ্গিরপুরীর — ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা মেনেই এগিয়েছে। তবে আরেকটা ব্যাপারেও ইতিহাস দারুণ ধারাবাহিক। তা হল গা-জোয়ারি শাসককে শেষপর্যন্ত বুলডোজ করে দেওয়া। এই বিধির বাঁধন কাটবার মত শক্তিমান বুলডোজার সম্ভবত এখনো তৈরি হয়নি।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

চিরতরে কমিউনিস্টদের পর হয়ে যাবেন না কানহাইয়া

রাহুল গান্ধীর কংগ্রেসে ডাঙ্গের দল থেকে যাওয়া কানহাইয়ার সাথে আম্বেদকরপন্থী জিগ্নেশেরও জায়গা হয়েছে। কানহাইয়া আবার প্রায় সব বক্তৃতাতেই আম্বেদকরের কথা বলে থাকেন।

পরলোক থাকলে সেখানে হয়ত শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে মুচকি হাসছেন। কারণ দীর্ঘকাল তিনি যে পার্টির প্রবাদপ্রতিম নেতা ছিলেন এবং যে পার্টি থেকে তাঁর বহিষ্কারের অন্যতম কারণ কংগ্রেসকে ভারতীয় গণতন্ত্রের কালো দিনগুলোতে সমর্থন করা, সেই পার্টির উদীয়মান নেতা দল বদলে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন।

এতদিনে সবাই জেনে গেছেন, কানহাইয়া জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের প্রথম প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নন, যিনি পরবর্তীকালে কংগ্রেসে যোগদান করলেন। কিন্তু কানহাইয়া আগের সকলের থেকে আলাদা। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরোবার আগেই সারা দেশ তাঁকে চিনে গেছে। ইচ্ছামত এডিট করা ভিডিও ক্লিপকে হাতিয়ার করে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। হাজতবাস করে এসেই তিনি যে বক্তৃতা দেন, তা তাঁকে রাতারাতি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল। অতঃপর সুবক্তা কানহাইয়া ভাইরাল হয়ে যান। ভাইরাল ভিডিওর প্রভাব এখন ভাইরাল অসুখের চেয়ে কম নয়। ফলত কানহাইয়াকে নিয়ে কেবল বামপন্থী নয়, সমস্ত বিজেপিবিরোধী মানুষেরই প্রত্যাশা আকাশচুম্বী হয়েছিল। তিনি সিপিআই ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ায় স্বভাবতই নৈতিকতার প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু তাছাড়াও বিষয়টিকে ভারতীয় বামপন্থার সাথে কংগ্রেসের সম্পর্কের নিরিখে দেখা প্রয়োজন।

স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে কমিউনিস্টরা কংগ্রেসকে কীভাবে দেখবেন তা নিয়ে বরাবর ধন্দে ভুগেছেন। তার অন্যতম কারণ জওহরলাল নেহরু। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী কেবল সামাজিক চিন্তাধারার দিক দিয়ে প্রগতিশীল ছিলেন না, তাঁর অর্থনীতিও আধা-সমাজতান্ত্রিক। তার উপর তাঁর সোভিয়েত প্রীতি সর্বজনবিদিত। সোভিয়েত সরকার স্বাধীন ভারতের প্রথম দিককার উন্নয়নেও যথেষ্ট সহায়তা করেছিল। ফলত ডাঙ্গের মত নেতারা কংগ্রেসকে শত্রু বলে ভাবতে চাননি। ১৯৫৯ সালে কেরালার নাম্বুদিরিপাদ সরকারকে নেহরু অন্যায়ভাবে ভেঙে দেওয়ার পরও নয়। অনতিকাল পরেই ভারত-চীন যুদ্ধ, কংগ্রেসের পক্ষাবলম্বন নিয়ে মতভেদ অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে এমন পর্যায়ে পৌঁছল, যে প্রথমবার পার্টি ভাঙল। সেই ভাঙনের মাশুল ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন আজও দিয়ে চলেছে। তারপর থেকে অন্য কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর সাথে কংগ্রেসের সম্পর্ক বেশিরভাগ সময়ে আদায় কাঁচকলায় হলেও, সিপিআইয়ের সাথে অম্লমধুর। সত্তরের দশকে কেরালায় একসঙ্গে সরকার চালিয়েছে কংগ্রেস, সিপিআই। জরুরি অবস্থার সময়ে বোধহয় অনেক কংগ্রেসির চেয়েও ইন্দিরার প্রতি সিপিআইয়ের সমর্থন বেশি সোচ্চার ছিল।

সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কংগ্রেস সরকারের আগ্রাসন সিপিএম ও নকশালদের সাথে কংগ্রেসের শত্রুতাকে চিরস্থায়ী করেছে বলে মনে হত অনেকদিন পর্যন্ত। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে সিপিএমের সাথেও কংগ্রেসের সম্পর্ক বদলেছে। দিল্লিতে কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রীর সরকার চলছে সিপিএমের সমর্থনে — এ একসময় অকল্পনীয় ছিল। এমনকি ২০০৪-০৯ সেই সরকার চলার পরেও ভাবা যায়নি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় সিপিএম, কংগ্রেস জোট বেঁধে লড়তে পারে। তা-ও সম্ভব হয়েছে। সিদ্ধার্থশঙ্করের দমননীতিতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন নকশালরা। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সংসদীয় নকশালপন্থী দলটি কিন্তু সিদ্ধার্থশঙ্করের স্নেহভাজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা হিসাবে দেখে। মমতার দল কংগ্রেস থেকে বেরিয়েই তৈরি এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সর্বার্থে কংগ্রেসের জায়গাই অধিকার করেছে। অতএব ব্যক্তির নৈতিকতার প্রশ্নে কানহাইয়ার দলবদল নিন্দার্হ হতে পারে, রাজনৈতিক নীতির দিক থেকে তিনি কতটা বিচ্যুত, তা তর্কসাপেক্ষ।

আরও পড়ুন কানহাইয়ার কেরিয়ার আর কমিউনিস্ট আদর্শবাদ: তার ছিঁড়ে গেছে কবে

ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন যে একশো বছরেও সারা দেশে প্রভাব বিস্তার করতে পারল না, তার কারণ হিসাবে অনেকেই আম্বেদকরপন্থীদের সঙ্গে ঐক্যের চেষ্টা না করাকে দায়ী করেন। ডাঙ্গে যখন মহারাষ্ট্রের গিরনি কামগর ট্রেড ইউনিয়নের নেতা, তখন সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল। কিন্তু আম্বেদকরের প্রস্তাব অনুযায়ী দলিত শ্রমিকদের বস্ত্রশিল্পের বয়ন বিভাগে কাজ করতে দেওয়ার দাবিকে ডাঙ্গে আন্দোলনের দাবিতে যুক্ত করতে রাজি হননি, ফলে ঐক্য হয়নি। মজার কথা, রাহুল গান্ধীর কংগ্রেসে ডাঙ্গের দল থেকে যাওয়া কানহাইয়ার সাথে আম্বেদকরপন্থী জিগ্নেশেরও জায়গা হয়েছে। কানহাইয়া আবার প্রায় সব বক্তৃতাতেই আম্বেদকরের কথা বলে থাকেন। কংগ্রেসে বাম ঘেঁষা আর্থসামাজিক চিন্তার রাহুলই শেষ কথা হয়ে উঠবেন, নাকি কপিল সিবালের মত বৃদ্ধ সিংহেরা নিজেদের মত চাপিয়ে দিতে সমর্থ হবেন — কানহাইয়ার ভবিষ্যৎ নিঃসন্দেহে অনেকটা তার উপরেও নির্ভর করবে। তবে অদূর ভবিষ্যতেই এমন দিন আসতে পারে, যখন আজ বিশ্বাসঘাতক মনে হওয়া কানহাইয়ার হয়ে তাঁর প্রাক্তন কমরেডদের প্রচারে বেরোতে হবে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

দলে দলে দলবদলের খেলায় বাঙালি এখন দিব্যি দড়

পেপ বার্সেলোনার একগুচ্ছ খেলোয়াড়কে বায়ার্ন মিউনিখ বা ম্যাঞ্চেস্টার সিটিতে আনতে পারেননি। মুকুল দলে দলে বিজেপি নেতা, কর্মীকে তৃণমূলে আনছেন। আস্ত জেলা কমিটি তুলে আনছেন।

টিভিতে ইউরো দেখছেন? হিংসা হচ্ছে না? প্রায় সব মাঠেই দর্শক আছে। অথচ এ দেশে আমরা ভয়ে ভয়ে বাজার যাচ্ছি, ট্রেন চলছে না বলে বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে কাজে যেতে হচ্ছে, তিতিবিরক্ত মানুষ স্পেশাল ট্রেন আটকে দিচ্ছেন, ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজ যাওয়া ভুলে গেছে, বড় বড় পরীক্ষা বাতিল, খেলাধুলোর তো প্রশ্নই নেই। ফাঁকা মাঠে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ আর অর্ধেক ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ ছাড়া ভারতে দেখার মত খেলা হয়নি সেই গত বছরের মার্চ থেকে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের খেলাপাগল লোকেদের খেলা দেখার তেষ্টা যে কমেনি, বরং বেড়েছে — সেকথা রাজ্যের নেতৃবৃন্দ বিলক্ষণ জানেন। অতএব নির্বাচনে স্লোগান হল “খেলা হবে”। ঘ্রাণেন অর্ধভোজনম কথাটা যদি সত্যি হয়, তাহলে শ্রবণেন সোয়া ভোজনম তো বটে। সোয়াই বা কেন? এক জনসভায় তো মুখ্যমন্ত্রী হুইল চেয়ার থেকে দর্শকদের দিকে একটা সত্যিকারের ফুটবলই ছুঁড়লেন। হাড্ডাহাড্ডি খেলার মাঠে দর্শকদের প্রাণ যাওয়ার ইতিহাস সারা পৃথিবীতেই আছে। ইডেনে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ দেখতে গিয়ে ১৬ জনের মৃত্যুর কথা এ রাজ্যের কে না জানে? এবারের নির্বাচনও ছিল মরণপণ লড়াই, অতএব বেশকিছু প্রাণ গেল।

তবে মাঠের খেলার সাথে রাজনীতির খেলার বড় তফাত হল মাঠের খেলার শুরু আছে, শেষ আছে। শেষ হলে জয়ী দলের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন পরাজিত অধিনায়ক বিরাট কোহলির কাঁধে মাথা রাখতে পারেন, কোহলি ঠেলে সরিয়ে দেন না। আইসিসির কাছে অকারণ নালিশ ঠুকে ট্রফি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করেন না। কিন্তু রাজনীতির খেলার সূচনা, উপসংহারের ঠিক নেই। অনেকে ভাবেন কেবল নির্বাচনটুকু খেলা। “খেলা হবে” স্লোগান যাঁর মাথা থেকে বেরিয়েছিল, তিনিও হয়ত তাই ভেবেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ফল বেরোনো মাত্রই পরাজিত বিজেপি বুঝিয়ে দিল, বিধানসভা নির্বাচনটা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের মত ‘ওয়ান-অফ’ খেলা নয়, লম্বা সিরিজ।

খেলা হবে আর আনুষঙ্গিক উত্তেজনাগুলো থাকবে না তা কি হয়? সৌরভোত্তর বাঙালি না হয় ক্রিকেটের দিকে বেশি ঝুঁকেছে, কিন্তু তার সেরা খেলা এখনও ফুটবল। নইলে ইস্টবেঙ্গলকে আই এস এল খেলানোর জন্য মুখ্যমন্ত্রী মাঠে নামেন? ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণ হল ‘ট্রান্সফার মার্কেট’। এই বিলিতি কথাটা হালের আমদানি। গত শতকের আশি-নব্বইয়ের দশক অব্দি যখন টিভির চ্যানেল ঘোরালেই ইউরোপের লিগ দেখা যেত না; সেইসময় আমরা বলতাম ‘দলবদল’। দিবারাত্র খবরের চ্যানেল ছিল না, ডিজিটাল মাধ্যম ছিল না, কিন্তু সকালের কাগজ তেতে থাকত দলবদলের খবরে। আজ পড়লাম কৃশানু-বিকাশ মোহনবাগানে যাচ্ছেন, কালই ছবি বেরোল “ইস্টবেঙ্গলের গোপন আস্তানায় আড্ডার আসরে অভিন্ন জুটি”। সঙ্গে হয়ত পল্টু দাসের উক্তি “ওরা ঘরের ছেলে, আমাদের ছেড়ে কোথায় যাবে?” মহমেডান ছাড়ছেন চিমা? সুদীপ চ্যাটার্জি কি দল বদলাবেন? কার অফার নিয়ে ভাবছেন শিশির ঘোষ? বিজয়ন-সত্যেন কি সত্যিই কেরালা পুলিস ছেড়ে মোহনবাগানে আসছেন? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে মাঠে বল পড়ার আগেই ফুটবল মরসুম শুরু হয়ে যেত। একসময় রীতিমত অপহরণের অভিযোগে জেরবার হয়ে আই এফ এ চালু করল টোকেন ব্যবস্থা। টোকেন যার, ফুটবলার তার। তখন আবার এক ক্লাবকে টোকেন দিয়ে ফেলে পুলিসে ডায়রি করা শুরু হল টোকেন হারিয়ে গেছে বা কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে।

আই এস এল যুগের তরুণ বাঙালির কাছে এসব গল্পকথা মনে হবে। কলকাতা লিগকে দুয়োরানি করে দিয়েছিল যে আই-লিগ, তাও তো এখন সবার পিছে সবার নীচে। কিন্তু মাঝবয়সী বা বার্ধক্যে উপনীত ফুটবলপ্রেমীরা নিশ্চয়ই গত কয়েক মাস স্মৃতিমেদুরতায় ভুগছেন। ভোটের মরসুমে ফিরে এসেছে তিরিশ-চল্লিশ বছর আগের উত্তেজনা। প্রত্যেকবার অমিত শাহ উড়ে আসার কয়েকদিন আগে থেকে চ্যানেলে, কাগজে, ফেসবুকে আলোচনা চলেছে কোন কোন তৃণমূল নেতা বিজেপিতে যাচ্ছেন, কোন কোন সাংসদ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছেন, কোন সিপিএম কাউন্সিলর কোন দিনের সভায় বিজেপিতে যোগ দেবেন। সন্দেহ নেই বিজেপির রিক্রুটারদের কাছে সে আমলের টুটু বসু, পল্টু দাস, মহম্মদ ওমররা নস্যি। তৃণমূল মন্ত্রিসভার সদস্য শুভেন্দু অধিকারী থেকে প্রবীণ সিপিএম নেতা অশোক ভট্টাচার্যের ডান হাত শঙ্কর ঘোষ পর্যন্ত কাকে না বঁড়শিতে গেঁথেছেন? তৃণমূলও হাত গুটিয়ে বসে ছিল না, তবে দলে টানা লোকেদের ধারে এবং ভারে তারা পিছিয়ে ছিল। সৌমিত্র খাঁয়ের ঘর ভাঙা ছাড়া আর তেমন সাফল্য কোথায়? তাছাড়া কৃশানু এক দলে, বিকাশ অন্য দলে থাকলে লাভ কী?

ফুটবলের দলবদল শেষ হয়ে যেত মরসুম শুরু হওয়ার আগেই। ‘মিড-সিজন ট্রান্সফার উইন্ডো’ ব্যাপারটা ইউরোপ থেকে শেখা হল অনেক পরে। কিন্তু সে তো উইন্ডো, মানে জানলা। নির্বাচনের পরে যা খুলে গেছে তা সিংহদুয়ার। ধীরেন দে, জ্যোতিষ গুহ পর্যন্ত ফেল পড়ে যাবেন মুকুল রায়ের সামনে। বাংলা সংবাদমাধ্যমে তাঁকে চাণক্য বলা হচ্ছে ইদানীং, অচিরেই মোরিনহো বা গুয়ার্দিওলার সাথে তুলনা করতে হবে। যদিও তাঁদেরও এমন চৌম্বকশক্তি নেই। পেপ বার্সেলোনার একগুচ্ছ খেলোয়াড়কে বায়ার্ন মিউনিখ বা ম্যাঞ্চেস্টার সিটিতে আনতে পারেননি। মুকুল দলে দলে বিজেপি নেতা, কর্মীকে তৃণমূলে আনছেন। আস্ত জেলা কমিটি তুলে আনছেন। খেলার আরও রোমহর্ষক হয়ে উঠছে। মুকুলবাবু বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান হতে চলেছেন। বিরোধীরা আপত্তি করেছিলেন, ও পদটায় বিরোধী দলের বিধায়ককে বসানোই তো দস্তুর। কারণ শাসক দলে থাকা বিধায়ক সরকারি হিসাবপত্র পরীক্ষা করলে যে গলতি মাপ করে দেবেন না, তার নিশ্চয়তা নেই। জবাবে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন মুকুলবাবু তো বিজেপিরই বিধায়ক, তৃণমূল তাঁকে সমর্থন করবে কেবল।

পিকে ব্যানার্জি আর অমল দত্ত যখন যথাক্রমে ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানের কোচ ছিলেন, তখন উত্তেজনার পারদ চড়েই থাকত। ডায়মন্ড ম্যাচের আগে সে কি প্রবল বাদানুবাদ! একবার ভাবুন তো, যদি পিকে একইসঙ্গে দুই দলেরই কোচ হতেন? সাইডলাইনের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত দৌড়ে বেড়াতেন, বাইচুংকে নির্দেশ দিতেন “অপেক্ষা করলে হবে না, বল কাড়তে হবে।” তারপর বাইচুং গোল করতেই বাসুদেব মণ্ডলকে বকতেন “হচ্ছেটা কী? তুই থাকতে বাইচুং সাপ্লাই পাচ্ছে কেন?” মুকুল রায় খেলাটাকে সেই উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করেছিলেন, বাঙালি মুকুলবাবুর বিশ্বরূপ দেখছে। এদিকেও তিনি, ওদিকেও তিনি।

আরও পড়ুন রাহুলে না, বাবুলে হ্যাঁ: তৃণমূলের প্রকৃত এজেন্ডা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

যে সময়ের কথা বলে লেখা শুরু করেছিলাম, সে সময় বাঙালির গুমোর ছিল, আর যা-ই হোক, ফুটবলে আমরা ভারতসেরা, কলকাতা হল ভারতীয় ফুটবলের মক্কা। সে গর্ব গোয়ায় গুঁড়িয়ে গেছে অনেককাল আগে। আরেক অহঙ্কার ছিল বাংলার রাজনীতি। এখানে মারামারি, খুনোখুনি হয়। কিন্তু আয়ারাম গয়ারাম সংস্কৃতি নেই, ওসব গোবলয়ের ব্যাপার। আজকের ট্রান্সফার মার্কেটে সে গর্বও ধূলিসাৎ।

অবশ্য রাজনীতি খেলা হয়ে দাঁড়ালে এসব হবেই। যে কোন ঘটনাই প্রথমবার ঘটলে চোখ কপালে ওঠে, দ্বিতীয়বার আর কেউ উচ্চবাচ্য করে না। ফলে খেলা যত এগোবে, নেতাদের যাওয়া আসা বাঙালিরও গা-সওয়া হয়ে যাবে। রবি শাস্ত্রী ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় উত্তেজক ম্যাচের শেষে বলতেন, আসলে জয়ী হল খেলাটা। এ ক্ষেত্রেও যে খেলাটাই জিতবে তাতে সন্দেহ নেই। কারণ হারবে, হারছে সাধারণ নাগরিক।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত: পুরনো পড়া ভুলে গেছেন কমরেডরা?

তরুণরা না জানলেও মাঝবয়সী বা প্রবীণদের নিশ্চয়ই মনে আছে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত ব্যাপারটা একেবারেই নতুন নয়।

“কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত বলতে তোর কী মনে পড়ে, তোপসে?”

“মোদী বনাম মমতা।”

জয়বাবা ফেলুনাথ ছবির সংলাপ অদল বদল করে নিয়ে আজকাল সোশাল মিডিয়ায় অনেক মিম ঘুরে বেড়ায়। এরকম একটা মিম তৈরি হওয়াও আশ্চর্য নয়। তবে তরুণরা না জানলেও মাঝবয়সী বা প্রবীণদের নিশ্চয়ই মনে আছে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত ব্যাপারটা একেবারেই নতুন নয়। সাংবিধানিকভাবেই রাজ্য সরকারগুলোকে কেন্দ্রীয় সরকারের তুলনায় পিগমি করে রাখা হয়েছে এবং এই সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস দরকার — এই দাবিতে সবচেয়ে সরব ছিলেন যে মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর নাম জ্যোতি বসু। বস্তুত, আশির দশকে অকংগ্রেসি রাজ্যগুলোর কেন্দ্রের বঞ্চনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিত বামফ্রন্ট সরকার। ১৯৭৭-এ তৈরি হওয়া বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র তাঁর আপিলা-চাপিলা গ্রন্থে সেকথা সবিস্তারে লিখেছেন। আজকের বাংলা সংবাদমাধ্যম এই সংঘাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি সহানুভূতিশীল, কিন্তু সেদিনের সরকারকে বিস্তর টিটকিরি সহ্য করতে হয়েছিল। বলা হত, কেন্দ্রের টাকা না পাওয়া নিয়ে কাঁদুনি গেয়ে সরকার নিজের দায়িত্ব এড়াচ্ছে।

ব্যাপারটা যে তা ছিল না, বরং সমস্ত রাজ্যের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অধিকার বাড়ানোর জন্য অতি প্রয়োজনীয় লড়াই ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, ১৯৮৩ সালে শ্রীনগরে রাজ্যগুলোর দাবি জোরদার করতে ফারুক আবদুল্লার ডাকা সম্মেলনে খসড়া দাবি সনদ তৈরি করার জন্য গঠিত উপসমিতির সঞ্চালক হিসাবে অশোকবাবুর উপস্থিতি। ঐ বছরই ডিসেম্বরে কলকাতায় জ্যোতিবাবুর আমন্ত্রণে ঐ মর্মে আরো একটি বৈঠক হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে যখন জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যপাল ন্যাশনাল কনফারেন্স সরকারকে পদচ্যুত করেন, তখন জ্যোতিবাবুর নির্দেশে অশোকবাবু দিল্লী গিয়ে কংগ্রেস বিরোধীদের সভায় যোগ দেন এবং পরদিন শ্রীনগরে রাজ্যপালের সাথে দেখা করে প্রতিবাদ করেন; কাশ্মীরের মানুষের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করে ন্যাশনাল কনফারেন্সের সদর দপ্তরের ব্যালকনি থেকে জড়ো হওয়া জনতার উদ্দেশে ভাষণও দেন।

১৯৮৩-তে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়নের জন্য গঠিত সারকারিয়া কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করতে হবে — এ ছিল সেইসময় জ্যোতিবাবু, অশোকবাবুদের জোরালো দাবি। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার তা মানেনি। মানলে মমতা দেবীর জগদীপ ধনখড়কে সহ্য করতে হত না। তার চেয়েও বড় কথা, জম্মু ও কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করে দেওয়া; দিল্লীর রাজ্য সরকারকে আইন বদলে ফেলে ঠুঁটো জগন্নাথ করে দেওয়া এবং মন্ত্রীদের গ্রেপ্তার, মুখ্যসচিবকে নিয়ে টানাটানি করে পশ্চিমবঙ্গে অস্থিরতা তৈরি করা — যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর এই ধারাবাহিক আঘাত হানা বিজেপির পক্ষে শক্ত হত।

আরও পড়ুন Has the CPI(M) forgotten its strong federal roots?

দুর্ভাগ্যজনক যে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্যে পূর্বসুরীদের এই লড়াইয়ের ইতিহাস সিপিএমের বর্তমান নেতৃত্বের মনে আছে, এমন কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল সম্বন্ধে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির মতামত প্রকাশিত হয়েছে। বলা হয়েছে “তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে তীব্র মেরুকরণ হয়ে যায়। নির্বাচনী ফলাফলের এটিই সম্ভবত মূল কারণ।” নির্বাচনের প্রচারেও সিপিএমের (বা সংযুক্ত মোর্চার) পক্ষ থেকে এই বাইনারি ভাঙতে চাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। গত এক মাসের ঘটনাবলীকে সিপিএম নিজেই কিন্তু ওই বাইনারির ঊর্ধ্বে উঠে দেখতে পারছে না। ভোট পরবর্তী এই লড়াই যে কেবল বিজেপি বনাম তৃণমূল নয়, বরং কেন্দ্রীয় সরকার বনাম রাজ্য সরকার — তা তারা এখনো বুঝছে না। মন্ত্রীদের গ্রেপ্তারিকে সিপিএমের আইনজীবী নেতা বিকাশ ভট্টাচার্য চটজলদি সমর্থন করেছিলেন। পার্টির মতামত তাঁর সঙ্গে মেলেনি, কিন্তু সে জন্যে বিকাশবাবুকে তিরস্কার করা হয়েছে বলেও খবর নেই। মুখ্যসচিবের ঘটনায় সুজন চক্রবর্তী যদিও বলেছেন এটা কেন্দ্রের প্রতিহিংসামূলক আচরণ, সাথে জুড়ে দিয়েছেন আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজের সমালোচনা।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, বিধানসভা, লোকসভায় অনুপস্থিত দলের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো-টাঠামো নিয়ে ভেবে লাভ কী? উত্তর হল, বাইনারি ভেঙে যে বিরোধী পরিসর পুনরায় দখল করা এখন সিপিএমের লক্ষ্য, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে গেলে সেই পরিসরই আর থাকবে না। কারণ কেন্দ্রের হাতে সমস্ত ক্ষমতা চলে যাওয়া একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার ঠিক আগের ধাপ।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

সোশাল মিডিয়ায় চোখ ধাঁধিয়েই বামেদের সর্বনাশ

ইদানীংকালে বামপন্থী কর্মীদের মধ্যে, বিশেষত তরুণদের মধ্যে, এক অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁরা মনে করেন সোশাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

এই স্তম্ভে আমার প্রথম লেখা ছিল সিপিএমের প্রচারে ব্যবহৃত টুম্পাসোনা প্যারডি নিয়ে। সেই ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল, ইউটিউবে কয়েক কোটি হিট হয়। কারো কারো অপছন্দ হলেও, শেয়ার, লাইক এবং ইউটিউব হিটের সংখ্যাই প্রমাণ করে বহু মানুষ সেই ভিডিও পছন্দ করেছিলেন। সেই ভিডিও তখন একাধিক কাগজে খবর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সিপিএম নেতারা দাবি করেছিলেন যুবসমাজের ভাষায়, সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলার ক্ষেত্রে তাঁদের যে ঘাটতি, ওই ভিডিও তা পূরণ করার প্রচেষ্টা। সোশাল মিডিয়ায় সাফল্য প্রমাণ করে তাঁরা সফল। অর্থাৎ বিজ্ঞাপন সংস্থা যেভাবে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতার কাছে পৌঁছতে চায়, বামপন্থীরাও সেইভাবে বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন ভোটারদের কাছে। বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলো নিজেদের ক্যাম্পেনের সাফল্য মাপে আর্থিক বর্ষের শেষে বিজ্ঞাপিত পণ্য বা পরিষেবার বিক্রির পরিসংখ্যান দেখে। সেই যুক্তি মানলে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল যেহেতু দেখাচ্ছে বামেদের হাত খালি, সেহেতু টুম্পাসোনাও যে ফ্লপ তা এবার মেনে নেওয়া দরকার। যে যুবসমাজকে ওঁরা ধরতে পেরেছেন বলে ভাবছিলেন, তাঁদের কত শতাংশ ভোট দিয়েছেন তা বিস্তারিত ফলাফল এলে তবেই বোঝা যাবে। কিন্তু রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ যে তাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছেন তা পরিষ্কার। এবার তাহলে ভাবার সময়, কোথায় ভুল হল? তীব্র বামবিরোধী মানুষও ভাবেননি যে স্বাধীন ভারতে বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের সবচেয়ে খারাপ ফল বামেরা এবার করবে।

চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হলে অপেক্ষা করতে হবে সম্পূর্ণ ফলাফল হাতে নিয়ে পর্যালোচনা পর্যন্ত। কিন্তু প্রাথমিকভাবে যা বোঝা যাচ্ছে, তা হল জনগণের ভাবনা চিন্তার সাথে বামপন্থীদের চিন্তাভাবনার দুস্তর ফারাক। ইদানীংকালে বামপন্থী কর্মীদের মধ্যে, বিশেষত তরুণদের মধ্যে, এক অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁরা মনে করেন সোশাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। টুম্পাসোনা নিয়ে আপ্লুত হওয়াও তারই প্রকাশ। সন্দেহ নেই যে সমস্ত আলোচনায় উঠে আসে বিজেপি কিভাবে হাজার হাজার হোয়াটস্যাপ গ্রুপকে ব্যবহার করে ভুয়ো খবর এবং নিজেদের বার্তা ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দিয়ে ২০১৪ থেকে নির্বাচন জিতে চলেছে। কিভাবে টুইটারের হ্যাশট্যাগ যুদ্ধ চালিয়ে তাদের বহু শাখাবিশিষ্ট প্রোপাগান্ডা মেশিনারি ভোটারের মস্তিষ্কের দখল নেয়। এসবের বিরুদ্ধে লড়তে হবে ঠিক কথা, কিন্তু মানুষের সাথে নিবিড় যোগাযোগের যে কোন বিকল্প নেই, সেকথা বললে আজকালকার অনেক সিপিএম কর্মী বেশ রেগেই যান। “ওসব করে আজকাল আর জেতা যায় না” — এটা তাঁদের অনেকের প্রিয় বাক্যবন্ধ।

আরও পড়ুন বৃদ্ধতন্ত্র নয়, সিপিএমের সমস্যা মধ্যবিত্ততন্ত্র

আপত্তি উঠবে, যে তরুণ সিপিএম কর্মীরা কি গত বছরের লকডাউনের সময় থেকে শুরু করে উম্পুনের বিপর্যয় হয়ে এখনকার দ্বিতীয় কোরোনা ঢেউয়ে একেবারে নীচের তলার মানুষের পাশে থাকেননি? নিঃসন্দেহে থেকেছেন। তৃণমূল বা বিজেপির উপস্থিতি বরং সেখানে নগণ্য। এই মুহূর্তেও দলমত নির্বিশেষে বহু মানুষ অক্সিজেন সিলিন্ডার, অ্যাম্বুলেন্স বা হাসপাতালের বেডের দরকারে রেড ভলান্টিয়ার্সের খোঁজ করছেন। গ্রীন ভলান্টিয়ার্স বা স্যাফ্রন ভলান্টিয়ার্স বলে কিছুর অস্তিত্ব কারোর জানা নেই। কিন্তু সিপিএম নেতৃত্বের ভাবা প্রয়োজন, কর্মীদের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল ভোট বাক্সে উঠছে না কেন? স্পষ্টতই মানুষ কোন ইস্যুকে ভোটের ইস্যু বলে মনে করেন, তা বুঝতে তাঁদের ভুল হচ্ছে। তাঁরা মনে করছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ আছে। অথচ দেখা গেল ভোটারদের কাছে প্রধান ইস্যু ছিল বিজেপি শাসনের ভয়। কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো, দুর্নীতি — যেগুলো বামেদের ইশতেহার এবং নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে ছিল — তার চেয়ে ভোটারদের বেশি জরুরি মনে হয়েছে বিজেপি জিতলে এনআরসি, সিএএ-র বিপদের কথা। হয়ত এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে চাকরি না পাওয়ার চেয়েও তরুণ ভোটারদের বড় বিপদ মনে হয়েছে অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াডের হুমকিকে। সোশাল মিডিয়ার বিজেপির সাথে টক্কর দেওয়া বামেরা এসব বুঝতেই পারেননি, তাই মাটিতে দাঁড়িয়ে না পেরেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাথে টক্কর দিতে, না পেরেছেন বিজেপির প্রতিপক্ষ হিসাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

তরুণ কৃষক নেতা, শ্রমিক নেতারা কোথায়?

সিপিএমের মত দল যে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ২ থেকে বামফ্রন্টের অন্য দল সমেত শত মুখে বলার মত ২৩৫-এ পৌঁছেছিল, তার পিছনে কিন্তু ছিলেন জ্যোতি বসুর মত শ্রমিক নেতা এবং হরেকৃষ্ণ কোঙার, বিনয় চৌধুরীদের মত কৃষক নেতারা।

যৌবন রাজনীতির কাছে কী চায়? ক্ষমতা? নাম? যশ? অর্থ?

প্রশ্নগুলোর উত্তর বেশ কঠিন। সাধারণ বুদ্ধি বলে নিতান্ত সাধু সন্ন্যাসী না হলে এই জিনিসগুলো পাওয়ার ইচ্ছা সকলেরই থাকে। যত বেশি থাকলে তাকে লোভ বলা যায়, তত বেশি না থাকলেও, থাকে। অথচ যৌবন এসবের জন্যই রাজনীতিতে আসে, এ কথা যদি সত্যি হত, তাহলে পৃথিবী জুড়ে ইতিহাসের সমস্ত যুগেই সরকারবিরোধী, বা ব্যাপকার্থে প্রতিষ্ঠানবিরোধী রাজনীতিতে, যুবক-যুবতীদের বিরাট সংখ্যায় অংশগ্রহণ করতে দেখা যেত না। কারণ ও রাজনীতিতে পাওয়ার চেয়ে খোওয়ানোর সম্ভাবনা বেশি। ক্ষুদিরাম বসু, ভগৎ সিং-এর নাম তবু ইতিহাসে থেকে গেছে; বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে কত যুবক-যুবতী প্রাণ হারিয়েছে, পঙ্গু হয়ে গেছে, কারাবাস করেছে তার কোন হিসাব কোনদিন করা সম্ভব হবে না। তবুও যে কোন আন্দোলনে তাদের ঝাঁপিয়ে পড়া থামে না। এবং ব্যতিক্রমহীনভাবে যে কোন দেশেই বেশ কিছু ছেলেমেয়েকে আকর্ষণ করে বামপন্থী রাজনীতি। এ দেশে এ রাজ্যেও তাই। ষাট-সত্তরের দশকে অসংখ্য মার্কসবাদে আকৃষ্ট যুবক-যুবতী নকশাল আন্দোলনের প্রভাবে বা প্রকোপে খুন হয়েছে, বন্দী হয়েছে, লাঞ্ছিত হয়েছে, পঙ্গু হয়েছে। তারপরেও বিভিন্ন মতের বামপন্থী দলগুলোর প্রতি ঐ বয়সের ছেলেমেয়েদের আকর্ষণ রয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে এই দলগুলোর নেতৃত্বে তারুণ্যের অভাব দেখা দিল। সে অভাব সবচেয়ে বেশি করে চোখে পড়ত দেশের বৃহত্তম বাম দল সিপিএমের দিকে তাকালে। ইদানীং প্রবাহ বদলের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের জন্য অধিকাংশ বামপন্থী প্রার্থীর নাম ঘোষিত হয়েছে। তরুণ মুখের ভিড়, ছাত্র যুব ফ্রন্টের প্রাধান্য। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এবং দোর্দণ্ডপ্রতাপ শুভেন্দু অধিকারীর মত ওজনদার প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নন্দীগ্রাম আসনে দাঁড়াচ্ছেন ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের নেত্রী মীনাক্ষি মুখোপাধ্যায়। সিঙ্গুরের মত প্রতীকি আসনে ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের রাজ্য সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য। এ ছাড়াও জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির জন্য প্রসিদ্ধ ঐশী ঘোষ আর দীপ্সিতা ধরও প্রার্থী তালিকায়। বৃদ্ধতন্ত্র বলে ব্যঙ্গ করা হয় যে দলগুলোকে, সেই দলের প্রার্থীদের মধ্যে এত নতুন এবং তরুণ মুখের ভিড় প্রমাণ করে ব্যঙ্গের অন্তর্নিহিত ইতিবাচক সমালোচনা বামেরা গ্রহণ করেছেন। পার্টির মস্তিষ্কে নতুন রক্ত সঞ্চালন করা যে দরকারি এবং সেই প্রক্রিয়া শুরু করা যে আশু প্রয়োজন, তা শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছেন। গোটা ২০২০ জুড়ে বাম দলগুলো রাজ্য রাজনীতির আলোচনায় যতটা জায়গা অধিকার করে ছিল, এ বছরের প্রথম দু মাসেই যে তার চেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে, তার পিছনেও অল্পবয়সীরাই। ১১ই ফেব্রুয়ারি ছাত্র-যুবদের নবান্ন অভিযান দিয়েই বামেরা নতুন করে সবার কাছে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিল। অনেকদিন পরে বাংলা টিভি চ্যানেলগুলোতে তৃণমূল-বিজেপি তরজার বাইরে কোন রাজনৈতিক খবর দেখা গেল। মইদুল ইসলাম মিদ্যার মৃত্যু নিয়ে সরকারকে আক্রমণ করার কাজেও এসএফআই, ডিওয়াইএফআইয়ের ছেলেমেয়েদেরই পুরোভাগে দেখা গেছে। তারপর ২৮শে ফেব্রুয়ারি ব্রিগেডের জনসভাতেও তরুণদের অভূতপূর্ব গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তরুণ নেতৃত্ব তৈরি করার এই চেষ্টা কতটা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত আর কতটা ভোটারদের মন পাওয়ার চেষ্টা তা সময় বলবে, কিন্তু এই প্রচেষ্টার অন্য একটা দিক আছে যা নিয়ে বামপন্থী সদস্য সমর্থকদের বড় একটা কথাবার্তা বলতে শোনা যায় না। ছাত্র, যুব ফ্রন্টের নেতাদের প্রবীণ নেতৃত্ব গুরুত্ব দিচ্ছেন, বিভিন্ন আন্দোলনে সামনের সারিতে তারা থাকছে দেখে একেবারে পাড়া স্তরের কর্মী, সমর্থক, সাধারণ ভোটার যে বেশ খুশি তা স্পষ্ট দেখা যায়। যিনি কোনদিন বামেদের ভোট দেননি, হয়ত ভবিষ্যতেও দেবেন না, তিনিও বলেন “যাক, নতুনদের জায়গা দিয়েছে। এক মুখ দেখতে দেখতে মানুষ ক্লান্ত।” হয়ত ঠিকই বলেন, কিন্তু যে প্রশ্নটা কেউ করে না, তা হল তরুণ নেতা মানে কী?

অন্যান্য দলে তরুণ নেতা বলতে বোঝানো হয় অল্পবয়সী, উচ্চশিক্ষিত, প্রায়শই সুদর্শন, সুবক্তা নেতাদের। কংগ্রেসের মত প্রাচীন এবং অভিজাতবংশীয় নেতায় পরিপূর্ণ দলে যেমন শচীন পাইলট, জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া, মিলিন্দ দেওরাদের বোঝানো হত কিছুদিন আগেও। বিজেপিতে এখন তরুণ নেতা বলতে বোঝায় চমৎকার ইংরেজিতে বিষাক্ত বিদ্বেষপূর্ণ বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন বছর তিরিশেকের সাংসদ তেজস্বী সূর্যকে। বিহারে এখন তরুণ নেতা তেজস্বী যাদব। বছর দশেক আগে উত্তরপ্রদেশে ছিলেন অখিলেশ। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিগুলোতেও যেন ক্রমশ তরুণ নেতার মধ্যে ঐ গুণগুলোই খোঁজা হচ্ছে — বয়সে তরুণ কিনা, উচ্চশিক্ষিত কিনা, ছবিতে ভাল দেখায় কিনা আর ভাল কথা বলতে পারে কিনা। বলা বাহুল্য, এসব গুণ দোষের নয়। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির এর সঙ্গে আরো একটা জিনিসের খোঁজ করার কথা, তা হল শ্রেণী। তিনি কোন শ্রেণী থেকে আসছেন তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কোন শ্রেণীর মধ্যে কাজ করেন। যৌবন কোন শ্রেণী নয়, ছাত্র কোন শ্রেণী নয়।

তরুণ বামপন্থী মুখ বললেই কোন নামগুলো আমাদের মনে আসে? কানহাইয়া, ঐশী, দীপ্সিতা, সৃজন, শতরূপ; কয়েক বছর আগে পর্যন্ত ঋতব্রত। মানে ঘুরে ফিরে জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, আশুতোষ কলেজের মত নামকরা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রনেতারা। এমন ছেলেমেয়েদের রাজনীতিতে আসা নিঃসন্দেহে দেশের জন্য ভাল খবর, কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব জুড়েও কেবল এরাই থাকলে সমাজের নিপীড়িত শ্রেণী কোথায় প্রতিনিধিত্ব পাবে? তরুণ কৃষক নেতা হতে পারেন না? একশো দিন পেরিয়ে যাওয়া দিল্লী সীমান্তের কৃষক আন্দোলনে এত যে তরুণ মুখ দেখছি? এ রাজ্যেরই লোক হান্নান মোল্লার নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা সারা দেশ জানতে পারল তিনি প্রবীণ বয়সে সারা ভারত কিষাণ সভার সাধারণ সম্পাদক হয়ে তিনি অন্য রাজ্যে চলে যাওয়ার পর। অথচ এ রাজ্যে কৃষক সভার আন্দোলন টের পাওয়া যায় না দীর্ঘকাল। তরুণ কৃষক নেতা পাওয়া যাবে কোথা থেকে?

আরও পড়ুন বৃদ্ধতন্ত্র নয়, সিপিএমের সমস্যা মধ্যবিত্ততন্ত্র

এক সিপিএম কর্মী বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিল কয়েক মাস আগে। সে বলছিল “উত্তরবঙ্গের চা বাগানে আমাদের শক্তি বেশ কিছুটা বেড়েছে গত পাঁচ বছরে। কৃতিত্ব যার, সেই ছেলেটা বছরে অন্তত ৩০০ দিন চা বাগানের শ্রমিকদের মধ্যেই পড়ে থাকে। বাংলা, হিন্দি, উর্দু, নেপালি — সব ভাষায় গড়গড় করে কথা বলতে পারে। শ্রমিকদের ঘরের লোক হয়ে গেছে। তাকে কেউ চেনে না, কারণ তার ফেসবুক লাইভ করার সময় নেই।” শুনে সন্দেহ জাগল, তবে কি তরুণ শ্রমিক নেতাও আছে, আমরা অভ্যাসের দাস বলে তাদের চিনি না? সে বিলাসিতা আমাদের মানায়, কমিউনিস্ট পার্টিকে মানায় কিনা সন্দেহ। শ্রমিক, কৃষকের প্রতিনিধি ছাড়া কী করে সংযোগ সম্ভব গরীব মানুষের সাথে? সেই সংযোগ ছিন্ন হয়েই তো ক্ষমতা হারানোর দশ বছরের মধ্যে ভোট শতাংশ এক অঙ্কে নেমে আসার বিপত্তি আর নির্বাচনের মুখে অনন্যোপায় জোটসঙ্গীর খোঁজ।

সিপিএমের মত দল যে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ২ থেকে বামফ্রন্টের অন্য দল সমেত শত মুখে বলার মত ২৩৫-এ পৌঁছেছিল, তার পিছনে কিন্তু ছিলেন জ্যোতি বসুর মত শ্রমিক নেতা এবং হরেকৃষ্ণ কোঙার, বিনয় চৌধুরীদের মত কৃষক নেতারা।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

খাপ বলেছে খাব খাব, বলিউডকে খাই

এক ভাষা, এক ধর্ম, এক রাষ্ট্রের যে ছবি সঙ্ঘ সকলের মাথায় ঢোকাতে চায়, সে ছবি বলিউডে এসেই বর্ণহীন হয়ে পড়ে।

খাপ কথাটা শুনলেই অনিবার্যভাবে পঞ্চায়েত শব্দটা মনে আসে। আর পঞ্চায়েত যেহেতু গেঁয়ো ব্যাপার, সেহেতু শহুরে মানুষ নাক সিঁটকান। কিন্তু ভারতবর্ষ আজও আসলে গ্রামীণ সভ্যতা। মানে শহরে গ্রামের মৃদুল মলয়, মাঠে মাঠে ধান আর গাছে গাছে পাখি থাক বা না থাক; পরনিন্দা, পরচর্চা, পরশ্রীকাতরতা বিলক্ষণ থাকে। তাই যাঁরা নাক সিঁটকান তাঁরাও সুযোগ পেলে খাপ পঞ্চায়েত বসাতে ছাড়েন না। ১৪ জুন অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার পরের ঘটনাবলী এর প্রমাণ। তদন্তে যদি শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয় সুশান্ত খুনই হয়েছেন এবং রিয়া চক্রবর্তীই খুনটা করিয়েছেন (যদিও সি বি আই, ই ডি, এন সি বি এই মুহূর্তে খুনের নামও করছে না), তাহলেও গত তিন মাস ধরে টিভি স্টুডিও আর আমাদের বৈঠকখানার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে যা চলছে, তা আসলে ই-খাপ পঞ্চায়েত বা খাপিনার (ওয়েবিনার বলে ওয়েবিনারকে অপমান করা অনুচিত)।

খাপ পঞ্চায়েত কেমনভাবে কাজ করে? প্রথমত, খাপ নিজেই নিজের আইন; দেশের আইন ফালতু। দ্বিতীয়ত, ওখানে অভিযুক্ত আর অপরাধী সমর্থক। অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয় না, কী শাস্তি দেওয়া হবে তা ঠিক হয়। তৃতীয়ত, অপরাধ যে বা যারাই করে থাক, শাস্তি হয় গোটা পরিবারের। তিন মাস ধরে ঠিক তাই চলছে সুশান্তের মৃত্যু নিয়ে, আর গেঁয়ো ভূত থেকে শুরু করে আলোকপ্রাপ্ত মহানগরের মানুষ পর্যন্ত সকলেই শখ মিটিয়ে বিচারকের ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু এই খাপ পঞ্চায়েত বসাল কে? কেনই বা এই ঘটনা নিয়েই জাতীয় খাপ পঞ্চায়েত বসল? সেসব ভেবে দেখা দরকার।

সুশান্তের চেয়ে অনেক কম বয়সে জিয়া খান আত্মহত্যা করেছিলেন মাত্র তিন বছর আগে। কে বা কারা তাঁকে এমন করতে বাধ্য করল তা ছ পাতার সুইসাইড নোটে লেখা ছিল। তখন এমন আবেগমথিত খাপ বসেনি, সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া হয়নি। প্রধান অভিযুক্ত পাঞ্চোলিপুত্র গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তবে এখন বহাল তবিয়তে আছেন।১ অতএব সুশান্তের মৃত্যু দুঃখজনক, বিহ্বল করে দেওয়ার মত, তবু অভূতপূর্ব নয়। তাহলে এভাবে খাপ প্রবৃত্তিকে জাগ্রত করতে পারল কী করে? ভাবা যাক।

ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে বলিউড। ব্যাপারটা ভাল হোক আর মন্দ হোক, যতজন ভারতীয় বলিউডি ছবি দেখেন, ততজন নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতা শোনেন না। ফিল্মের মাধ্যমে কোন বার্তা দিলে সে বার্তা যে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং বার্তার জোর অনেক বেশি হয় সেকথা বামপন্থী, মধ্যপন্থী, দক্ষিণপন্থী — সকলেই বোঝেন। উপরন্তু বলিউড ভারতের মানুষের কাছে পুরাণকথিত স্বর্গলোক, যেখানে দেবদেবীদের বসবাস। সুতরাং বলিউডি ছবির বার্তা বিরাট অংশের মানুষের কাছে বেদবাক্য — কখনো সচেতনভাবে, কখনো অবচেতনে — এ কথা বুঝতে আধুনিক চাণক্য হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। অতএব যাদের ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, তাদেরও কিন্তু হিন্দি ছবি দিয়ে বশ করা যায়। বাজপেয়ী-আদবানির আমলে বিজেপি নেতাদের এবং অনেক নিরপেক্ষ বিশ্লেষককেও জোর গলায় বলতে শোনা যেত “বিজেপি আর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ এক জিনিস নয়।” মোদীশাহির শুরুর দিকেও এ কথা বলা হত, ইদানিং তত শোনা যায় না। অনেকেই বুঝছেন যে সঙ্ঘের হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্নপূরণই বিজেপির আসল অ্যাজেন্ডা। হিন্দুরাষ্ট্র শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্মাণ করা যায় না, সাংস্কৃতিক বিজয় প্রয়োজন। সে বিজয় বলিউডকে করতলগত করতে না পারলে সম্পূর্ণ হয় না। প্রথমে স্বজনপোষণের অভিযোগ, তারপর মাদক নেওয়ার অভিযোগ — এসব আসলে বলিউডকে পেড়ে ফেলার প্রয়াস কিনা তা ভাবা বিশেষ প্রয়োজন।

ভারতীয় জনতার এখন দুটো আফিম — ক্রিকেট আর বলিউড। প্রথমটাকে সরকারপক্ষ নির্বিঘ্নে নিজেদের কাজে লাগাতে পেরেছে। যে কোন বড় সরকারি সিদ্ধান্তে দারুণ ক্ষিপ্রতায় ভারতের বর্তমান এবং প্রাক্তন ক্রিকেটাররা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। বিমুদ্রাকরণের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলি জানিয়ে দিয়েছিলেন ওটা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। শচীন তেন্ডুলকর, অনিল কুম্বলে, বীরেন্দ্র সেওয়াগ — সকলেই অর্থনীতিবিদ হয়ে বসেছিলেন। অতঃপর তো খোদ ক্রিকেট বোর্ডটাই দখল করা গেছে। বাংলার গৌরবের নেতৃত্বে চাণক্যপুত্র স্বয়ং বোর্ডের অন্যতম কর্ণধার হয়েছেন, এবং মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও উভয়েই আদালত ও অতিমারীর দয়ায় চেয়ারে গ্যাঁট হয়ে বসে আছেন। অথচ বলিউডকে কিন্তু বাগে আনা যাচ্ছে না।

নাগরিকত্ব বিল, এন আর সি, এন পি আরের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যে আন্দোলন চলছিল অনতি অতীতে, সেই আন্দোলনের কথা স্মরণ করুন। বলিউডের একটা বড় অংশ কেবল টুইট করে ক্ষান্ত হয়নি। স্বরা ভাস্কর, অনুরাগ কাশ্যপরা রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন। সেই আন্দোলনের অসংখ্য মনে রাখার মত দৃশ্যের মধ্যে একটা ছিল — মুম্বাইয়ের কার্টার রোডে দাঁড়িয়ে স্বানন্দ কিরকিরে গাইছেন “বাওরা মন দেখনে চলা এক সপনা”, আর সামনে বসা বলিউডি সহকর্মীরা গলা মেলাচ্ছেন। বিশাল ভরদ্বাজ, অনুভব সিনহা, রিমা কাগতি, দিয়া মির্জা, রিচা চাড্ডা প্রমুখ ছিলেন সেখানে। যারা প্রশান্ত ভূষণের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা ঠুকেছিল, তারা স্বরার বিরুদ্ধে দিল্লির এক পথসভায় বক্তৃতা দেওয়ার জন্য একই মামলা দায়ের করতে চেয়েছিল। অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে বেণুগোপালের আপত্তিতে হয়ে ওঠেনি।

বলিউড অভিনেতা-অভিনেত্রীদের এভাবে রাস্তায় নেমে আসা হিন্দুরাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য নিঃসন্দেহে সুখবর নয়। কিন্তু বলিউডি বিদ্রোহ সেখানেও শেষ হল না। জে এন ইউ তে সশস্ত্র হামলা হল, প্রতিবাদের মঞ্চে পৌঁছে গেলেন দীপিকা পাড়ুকোন। এঁর জনপ্রিয়তাকে স্বরার মত “ফ্লপ অভিনেত্রী” তকমা দিয়ে উপেক্ষা করার উপায় নেই। ফিল্মফেয়ার পত্রিকার মতে গত এক দশকে যে দশটা ভারতীয় ছবি সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করেছে২, তার মধ্যে অষ্টম ছবিটার নাম ‘পদ্মাবত’। দীপিকা সেই ছবির নায়িকা। ইন্ডাস্ট্রির প্রায় সব বড় ব্যানারে সব বড় অভিনেতার সাথে কাজ করে ফেলেছেন তার আগেই।

ফিল্মফেয়ারের তালিকার দশটা ছবির মধ্যে তিনটের কেন্দ্রীয় চরিত্রে আমির খান (দঙ্গল ৩৮৭.৩৮ কোটি; পি কে ৩৪০.৮ কোটি; ধুম থ্রি ২৮৪.২৭ কোটি) আর তিনটের সলমন খান (টাইগার জিন্দা হ্যায় ৩৩৯.১৬ কোটি; বজরঙ্গি ভাইজান ৩২০.৩৪ কোটি; সুলতান ৩০০.৪৫ কোটি)। প্রযোজক, পরিচালকদের মধ্যে একাধিকবার নাম পাচ্ছি রাজকুমার হিরানি-বিধু বিনোদ চোপড়া জুটির (পি কে; সঞ্জু ৩৪২.৫৩ কোটি), আদিত্য চোপড়া (টাইগার জিন্দা হ্যায়; ওয়ার ৩১৭.৯১ কোটি; ধুম থ্রি ২৮৪.২৭ কোটি) এবং আব্বাস জাফরের (টাইগার জিন্দা হ্যায়; সুলতান ৩০০.৪৫ কোটি)। দুই খানের নামও প্রযোজক হিসাবে এসে পড়ছে।

‘পদ্মাবত’ ছাড়া ফিল্মফেয়ার উল্লিখিত দশটা ছবির কোনটাই হিন্দু জনগণের কয়েক শতাব্দীব্যাপী নিপীড়নের কাহিনি নয়, আধ সেদ্ধ ইতিহাস ঘেঁটে ঐস্লামিক অত্যাচারের গল্প বলে না। অর্থাৎ দর্শকের কাছে হিন্দুরাষ্ট্রের ঔচিত্য প্রতিষ্ঠায় এই ছবিগুলোর কোন ভূমিকা নেই। উল্টে ‘পি কে’ ধর্ম সম্বন্ধে এক প্রস্থ অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে। ছ নম্বরে থাকা ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ আবার ভারত-পাকিস্তান শত্রুতার বদলে সৌহার্দ্যের বার্তা দেয়।

এদিকে ২০১৯-এ একগুচ্ছ সরকারি বয়ানের অনুগত ছবি মুক্তি পেয়েছে। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভাল ব্যবসা করেছে ‘উরি: দ্য সার্জিকাল স্ট্রাইক’ (২৪৪.০৬ কোটি)৩, অথচ এই দশকের সবচেয়ে ভাল ব্যবসা করা ছবিগুলোর তালিকায় দশ নম্বরে থাকা ধুম থ্রি ও তার চেয়ে বেশি ব্যবসা করেছে। অবশ্য সর্বজন মান্য ফিল্ম ব্যবসার বিশ্লেষক তরণ আদর্শের তালিকায় ধুম থ্রি আছে ন নম্বরে, উরি দশে।

অজয় দেবগন অভিনীত ‘তানহাজি’৪, যেখানে হিন্দু-মুসলমান লড়াইয়ের কাহিনি আছে, তা অবশ্য তরণবাবুর মতে ২৭৫ কোটি টাকার বেশি বাণিজ্য করেছে। তবু এই দশকের প্রথমে দশে ঢুকতে পারেনি।

শোচনীয় অবস্থা সুশান্তের সুবিচার তথা বলিউডের মাদকচক্রের পর্দা ফাঁস আন্দোলনের নেত্রী কঙ্গনা রানাওয়াত নির্দেশিত ও অভিনীত (যিনি মহারাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর মাদক সেবনের উল্লেখ হওয়ার পরেই রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে মুম্বাই ছেড়েছেন) ‘মণিকর্ণিকা’৫ র। যাঁরা বলিউডের খবর রাখেন, তাঁরা জানেন যে অমন জাঁকজমকের ছবি বানাতে একশো কোটি খরচ হয়েই যায়। ‘মণিকর্ণিকা’র আয় কিন্তু ৯০.৭৬ কোটি।

সঙ্ঘ পরিবারের বর্ষীয়ান পোস্টার বয় অনুপম খেরকে মনমোহন সিং এর চরিত্রে রেখে ‘দি অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ বলে একটা ছবি হয়েছিল। কোন সূত্রই ছবিটার আয় ৯৫-৯৬ কোটির বেশি হয়েছে বলছে না।

সবচেয়ে বেশি দুর্দশা অবশ্য বিবেক ওবেরয় অভিনীত ‘পি এম নরেন্দ্র মোদী’৬ ছবিটার। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের মুখে, প্রধানমন্ত্রীর উত্তুঙ্গ জনপ্রিয়তার মুহূর্তে মুক্তি পেয়েও ছবিটা ২৫ কোটির বেশি ব্যবসা করতে পেরেছে এমন কথা কোন সূত্র বলছে না।

স্পষ্টতই মনোগ্রাহী প্রোপাগান্ডা বলিউডে তৈরি হচ্ছে না। এমনকি বিজেপি সমর্থকদের সকলকেও আকর্ষণ করতে পারছে না এইসব ছবি। তাতে আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় ক্ষতি যা হচ্ছে তা হল ভারতীয় জনতার মস্তিষ্কের একচেটিয়া দখল ফসকে যাচ্ছে। কঙ্গনা, বিবেক, অজয়, অক্ষয়দের দিয়ে যে ও কাজ হবে না, তা নাগপুরের সঙ্ঘ বিল্ডিং রোড থেকে দিল্লির অশোকা রোড, রেসকোর্স রোড পর্যন্ত সকলেই বুঝে ফেলেছে। আমির বা সলমন লোককে যতটা মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতে পারেন, অজয় বা বিবেক পারেন না। রাজু হিরানি জানেন কেমন করে দর্শক টানতে হয়, সঙ্ঘের সঙ্গী পরিচালকরা জানেন না।

এটা শৈল্পিক উৎকর্ষের আলোচনা নয়। বক্স অফিসই বলে দিচ্ছে দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডিস্টরা বলিউডের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির লোক। প্রথম সারির লোকেদের দিয়ে সঙ্ঘ কিছুতেই নিজেদের কথা বলাতে পারছে না। তাঁরা স্বেচ্ছায় বা চাপে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সেলফি তুলে যাচ্ছেন, কিন্তু ফিল্ম বানানোর সময় নিজেদের মর্জি মতই চলছেন।

সুশান্তের মৃত্যুতদন্ত ক্রমে বলিউডে মাদক যোগের তদন্ত হয়ে দাঁড়াল কয়েক গ্রাম গাঁজার জন্য। এক টিভি চ্যানেল বলে দিল রিয়া নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোর জিজ্ঞাসাবাদে আরো জনা বিশেক মাদকাসক্ত অভিনেতা-অভিনেত্রীর নাম জানিয়েছেন, তার মধ্যে জনা দুয়েকের নাম প্রকাশও করে দিল। অথচ এন সি বি বলছে এমন কোন নাম তারা রিয়ার কাছ থেকে পায়নি।৭ স্পষ্টতই এরকম ভুয়ো খবর ছড়ানোর পিছনে উদ্দেশ্য বলিউডে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু ক্ষমতাবানদের অপছন্দের ব্যক্তিদের এবং তাদের পরিবারকে সাধারণ মানুষের চোখে অপরাধী প্রতিপন্ন করা। ভেবে দেখুন, স্বজনপোষণ নিয়ে চেঁচামেচি করে কাদের আক্রমণ করা হয়েছে?

প্রথমত, করণ জোহর। নব্বইয়ের দশক থেকে এঁর তৈরি বিপুল জনপ্রিয় ছবিগুলো সঙ্ঘ পরিবারের সামাজিক আদর্শকে, ভারতীয়ত্ব ও দেশপ্রেমের সংজ্ঞাকে মানুষের মধ্যে চারিয়ে দিতে নিঃসাড়ে সাহায্য করেছে। কিন্তু তার সুবিধা বিজেপি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই ফুরিয়ে গেছে। সফটওয়্যারের ভাষায় যাকে পরের প্রজন্ম বলে, সেই পরের প্রজন্মের প্রোপাগান্ডা ফিল্ম করণের প্রোডাকশন হাউস থেকে এখন অব্দি বেরোয়নি। বরং তিনি বা তাঁর প্রোডাকশন হাউস নাচ-গানওলা ছবিই করে যাচ্ছেন, এমনকি বিকল্প যৌনতার গল্পও ইদানীং উঠে আসছে তাঁর ক্যামেরায়। দুটোই সঙ্ঘের লক্ষ্যবিরোধী। করণ এমনিতে লক্ষ্মী ছেলে। পাকিস্তানের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের যখন মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা বাদ দিতে বলেছিল, তিনি মেনে নিয়েছিলেন।৮ অথচ ২০১৮ তে মুক্তি পাওয়া ‘রাজি’ ছবির তিনি অন্যতম প্রযোজক। সে ছবিতে এমনকি পাক সেনাবাহিনীর লোকেদেরও রক্তমাংসের মানুষ হিসাবে দেখানো হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, মহেশ ভাট আর আলিয়া ভাট। আলিয়া সাধারণত রাজনীতি এড়িয়ে চলেন। কিন্তু তাঁর বাবা মহেশ বরাবরই সোচ্চার বিজেপিবিরোধী। মহেশের দোষ হল রিয়ার সঙ্গে তাঁর বেশ কিছু ছবি আছে, তাঁর প্রোডাকশন হাউসের সাথে রিয়ার যোগ আছে। এ ছাড়াও জাভেদ আখতার-ফারহান আখতার, নাসিরুদ্দিন শাহ।

এবং অনুরাগ। গত এক সপ্তাহে সুশান্ত ক্রমশ আলোচনার বাইরে চলে গেছেন। বাঙালিদের কেউ কেউ বাঙালি মেয়ে রিয়ার উপর আক্রমণে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এখন সে ক্ষোভের অভিমুখ ঘুরে যাবে অনুরাগ কাশ্যপের দিকে। আরেক বাঙালি অভিনেত্রী পায়েল ঘোষ অনুরাগের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছেন। অনুরাগ নাকি পায়েলকে যৌন সংসর্গে রাজি করাতে বেছে বেছে সোচ্চার বিজেপিবিরোধী অভিনেত্রীদের নাম (হুমা কুরেশি, রিচা চাড্ডা, মাহি গিল) করে বলেছেন তাঁরা অনুরাগকে নিয়মিত তৃপ্ত করেন। এই প্রথম বোধহয় কোন #মিটু অভিযোগে অন্য মহিলাদের নাম করা হল। প্রধানমন্ত্রীকে ট্যাগ করা পায়েলের টুইট দেখে অবিলম্বে অভিযোগ জমা দিতে বলেছে জাতীয় মহিলা কমিশন। এ হেন তৎপরতা সব মহিলার কাঙ্ক্ষিত হলেও, কার্যক্ষেত্রে তাঁরা ধর্ষিত হলেও মহিলা কমিশনের মনোযোগ জোটে না ।

এই মুহূর্তে বিজেপিবিরোধী সকলেই আক্রমণের লক্ষ্য। সুতরাং যে পরিমাণ গাঁজা যে কোন মুহূর্তে নেহাত অনামী সাধুদের আখড়াতেও পাওয়া যায় অথবা অধুনা আই টি সেলের সদস্য হওয়া ইঞ্জিনিয়ারদের হোস্টেলে পাওয়া যেত, তা নিয়ে অক্লান্ত ত্রিমুখী তদন্ত এবং প্রতিদিন প্রাইম টাইম খাপিনার স্রেফ সুশান্তের প্রতি ভালবাসায় বা রিয়ার প্রতি ঘৃণায় চালিত — একথা মেনে নেওয়া শক্ত।

কঙ্গনা রানাওয়াতের ৯ই সেপ্টেম্বর তারিখের একটা টুইট লক্ষ্য করার মত। ততদিনে তিনি বলে ফেলেছেন মহারাষ্ট্রের অবস্থা পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মত। উত্তরে মারাঠি অস্মিতার স্বনিযুক্ত অভিভাবক শিবসেনা অভব্য ভাষা ব্যবহার করেছে, বলেছে কঙ্গনা মহারাষ্ট্রকে অপমান করেছেন। প্রতিক্রিয়ায় কঙ্গনা কী টুইট করলেন?

“ইন্ডাস্ট্রির একশো বছরে এরা মারাঠি অস্মিতা নিয়ে একটাও ছবি বানাতে পারেনি, আমি মুসলিম অধ্যুষিত ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের জীবন এবং কেরিয়ার বাজি রেখেছি, শিবাজি মহারাজ আর রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের সম্বন্ধে ছবি বানিয়েছি, আজ মহারাষ্ট্রের এই ঠিকেদারদের জিজ্ঞেস করো মহারাষ্ট্রের জন্য এরা করেছে কী?” (ভাষান্তর আমার)

এই টুইট থেকে পরিষ্কার যে কঙ্গনা জানেন না মারাঠি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পৃথক অস্তিত্ব আছে। বলিউড হিন্দি ফিল্ম তৈরির জায়গা, মারাঠি অস্মিতা নিয়ে ছবি করার দায়িত্ব তার নয়। কিন্তু এই টুইটে কঙ্গনার মেধার যে অভাব প্রকাশিত, তার দিকে নজর না দিয়ে বরং “মুসলিম অধ্যুষিত ইন্ডাস্ট্রি” কথাটায় মন দেওয়া যাক। বলিউড সম্বন্ধে কঙ্গনার তথা সঙ্ঘ পরিবারের প্রকৃত আপত্তি অনেকটাই ঐ শব্দবন্ধে ধরা আছে।

এক ভাষা, এক ধর্ম, এক রাষ্ট্রের যে ছবি সঙ্ঘ সকলের মাথায় ঢোকাতে চায়, সে ছবি বলিউডে এসেই বর্ণহীন হয়ে পড়ে। উপরে উল্লিখিত বক্স অফিসের যে হিসাব পাওয়া গেছে, তাতে পরিষ্কার যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর দেশে গত দশ বছরে সঙ্ঘের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য সত্ত্বেও আমির খান, সলমন খান জনপ্রিয়তায় অনেক এগিয়ে। আরেক খান — শাহরুখ — এখন আর তত ছবি করেন না, করলেও আগের মত হিট হয় না। তবু তাঁর তারকা চূর্ণের এক কণা গায়ে এসে পড়লে যে এখনো লক্ষ লক্ষ ভারতীয় হিন্দু আত্মহারা হন, তা মোহন ভাগবতও বিলক্ষণ জানেন। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের সামনে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো একে একে সাষ্টাঙ্গ হয়েছে। দেশে সব ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের আরো প্রান্তিক, আরো ভীত এক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করা গেছে। কিন্তু বলিউডে এখনো ভরদ্বাজ ব্রাক্ষ্মণ বিশালের সমান দাপটে (জনপ্রিয়তার নিরিখে বেশি দাপটেও বলা যায়) কাজ করে যাচ্ছেন কবীর খান। চাওলা জুহি আর তাঁর স্বামী মেহতা জয়ের সাথে মিলে প্রোডাকশন হাউস চালাচ্ছেন খান শাহরুখ। অন্তত এই একটা ব্যাপার প্রাক-স্বাধীনতা যুগের বলিউডের মতই রয়ে গেছে। উপরন্তু আগে যা কখনো হয়নি, নিম্নবর্গীয় মানুষের নিষ্পেষণ মধ্যে মধ্যে পর্দায় উঠে আসছে (‘আর্টিকল ফিফটিন’), ছোট শহরে আর এস এস – বিজেপির কার্যকলাপকে হাসির খোঁচায় এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে কোন কোন ছবি (‘লুকাছুপি’,‘দম লাগাকে হাইশা’)। ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইন্ডাস্ট্রিতে এমন বেনিয়ম চলতে থাকলে হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তান নিরঙ্কুশ হবে কী করে?

তাই বিহার জয় বা মহারাষ্ট্র জয় আশু লক্ষ্য হলেও রাষ্ট্রীয় খাপের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অবশ্যই বলিউড জয়। নইলে সি বি আই তদন্ত চলাকালীন বিজেপি সাংসদ রবি কিষণ কেন সংসদে বলিউডের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে যাবেন? উদ্দেশ্য মহৎ বুঝলে একই দলের সাংসদ হয়েও হেমা মালিনী কেন বিপক্ষে দাঁড়াবেন? জয়া বচ্চনের অসন্তুষ্টি না হয় অগ্রাহ্য করলাম।

তথ্যসূত্র:
১। https://www.indiatoday.in/movies/celebrities/story/rabia-khan-blasts-sooraj-pancholi-on-truth-always-wins-post-in-ssr-case-all-criminals-use-that-phrase-1713284-2020-08-20
২। https://www.filmfare.com/news/bollywood/10-highest-grossing-bollywood-films-of-the-decade-38316.html
৩। https://www.hindustantimes.com/bollywood/vicky-kaushal-s-uri-is-among-10-highest-hindi-grossers-ever-with-rs-244-cr-here-s-how-it-ranks-against-aamir-salman-films/story-PruGX0G1eHE07alRJuUkhP.html
৪। https://www.republicworld.com/entertainment-news/bollywood-news/tanhaji-the-unsung-warrior-collections.html
৫। https://timesofindia.indiatimes.com/entertainment/hindi/bollywood/box-office/manikarnika-final-box-office-collection-the-kangana-ranaut-starrer-period-drama-finishes-with-rs-90-76-crore/articleshow/68405988.cms
৬। https://www.bollywoodhungama.com/movie/pm-narendra-modi/box-office/
৭। https://www.freepressjournal.in/entertainment/bollywood/fpj-fact-check-did-rhea-chakraborty-really-name-sara-ali-khan-rakul-preet-singh-to-ncb
৮। https://www.bbc.com/news/world-asia-india-37701024

https://guruchandali.com/ এ প্রকাশিত। ছবি ঋণ: টাইমস নাউ

সুবোধ কুমারের সন্ততি

ভেবে দেখলাম যে অক্ষয় ধন আমার সন্তানকে দিয়ে যেতে পারি তা হল সমাজ, সংসারের সঙ্গে, সারা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের বোধ

ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

– শঙ্খ ঘোষ (বাবরের প্রার্থনা)

যেদিন বাবা হয়েছি সেদিন থেকে ভেবে চলেছি, মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার সময় সন্তানকে যা যা দিয়ে যেতে পারে তার মধ্যে কোনটা সবচেয়ে মূল্যবান?

অনেকে টাকাপয়সা, ধনসম্পদ দিয়ে যান। টাকার দাম মুদ্রাস্ফীতির কারণে দিন দিন কমে, সম্পত্তির মূল্যও নানা কারণে বাড়ে কমে। কথায় বলে কুবেরের ধনও ফুরিয়ে যায়। ফলে সন্তানকে যত ধনসম্পত্তিই দিয়ে যান না কেন, তার মূল্য অবিকৃত থাকবে না।

সফল, কৃতি মানুষেরা তাঁদের সন্তানদের খ্যাতি দিয়ে যান। কিন্তু সেই খ্যাতি বজায় রাখতে হলে সন্তানকেও বিখ্যাত বাবা কি মায়ের মত প্রতিভাবান এবং সফল হতে হয়, যা প্রায়শই হয় না। উপরন্তু বাবা-মায়ের খ্যাতির অপব্যবহার করে সন্তান তাঁদের দুর্নামের কারণ হচ্ছে — এমন দৃষ্টান্তই চোখে পড়ে বেশি। উপেন্দ্রকিশোরের পরে সুকুমার, সুকুমারের পর সত্যজিৎ নেহাতই ব্যতিক্রম। সে জন্যেই মনে থাকে। ঈশ্বরচন্দ্রের পরে নারায়ণচন্দ্রই বরং বেশি দেখা যায়।

আমরা সাধারণ মানুষ। এ যুগে সন্তানের ভোগ করার মত যথেষ্ট সম্পত্তি রেখে যাওয়ার সুযোগ আমাদের অনেকেরই হবে না। মৃত্যুর পরেও সন্তান “অমুকের ছেলে” বা “তমুকের মেয়ে” হিসাবে সমাজে অতিরিক্ত সম্মান, সুযোগসুবিধা বা খ্যাতি ভোগ করবে তেমন সম্ভাবনাও নেই। তবে কি এমন কিছুই নেই যা আমাদের মৃত্যুর পরেও সন্তানদের সম্পদ না হোক, অন্তত ছাতা হিসাবে কাজ করতে পারে? আমার সন্তানের সঙ্গে আমার সম্পর্কের সীমা তবে আমার শরীর? সেই শরীর অবলুপ্ত হওয়ার পর আমার সাথে সম্পর্কের কোন মূল্যবান অর্জন তার কাছে থাকবে না? তাহলে কেন দেশ কাল নির্বিশেষে বাবা-মায়েরা নিজের জীবনের চেয়েও সন্তানের মঙ্গলকে ঊর্ধ্বে স্থান দেন? আমাদের অষ্টাদশ শতকের কবির কেন মনে হল ঈশ্বরীর দেখা পেলে বাংলার নিরক্ষর পাটনী প্রার্থনা করবে “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”? প্রায় তিনশো বছর পরের কবির কেন মনে হল ভাগ্যান্বেষী উজবেক যোদ্ধা বাবর, যার সাথে সেই বাঙালি পাটনীর কোন দিক থেকে কোন মিল নেই, তিনিও নিজের ঈশ্বরের কাছে বলতেন, আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও আমার সন্তানের জীবন দাও? কবির কল্পনা তো আকাশ থেকে পড়েনি, এমনই আকুতি বিভিন্ন ভাষায় কত বাবা-মাকে তো আজও উচ্চারণ করতে দেখি আমরা। সেই বাবা মায়েরা তাহলে জীবন ফুরোলেই ফুরিয়ে যাবেন সন্তানের কাছেও?
কেউ কেউ বলবেন বাবা-মা শিক্ষা দেন, জীবনে নিজের পায়ে দাঁড় করান। সেটাই তো সারাজীবন সঙ্গে থাকে। সেকথা ঠিক, কিন্তু সে অবদান বাবা-মায়ের অনন্য অবদান নয়। মানুষ আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের থেকেও শিক্ষা পায়, সর্বোপরি শিক্ষক শিক্ষিকাদের থেকে পায়। এবং যে শিক্ষা সে পায় তার বেশিরভাগটাই স্বোপার্জিত। বাবা-মা বড় জোর সুযোগ তৈরি করে দেন।

ভেবে দেখলাম যে অক্ষয় ধন আমার সন্তানকে দিয়ে যেতে পারি তা হল সমাজ, সংসারের সঙ্গে, সারা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের বোধ। সুসময়ে, এবং দারুণ দুঃসময়ে, সেই বোধ তাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে।

সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের প্রত্যেককে আমাদের বাবা-মায়েরাও জেনে বা না জেনে ঐ বোধই দিয়ে গেছেন, দিয়ে যাচ্ছেন। ইতিহাসের কোন মুহূর্তে ঠিক কোন জায়গাটায় আমি দাঁড়িয়ে আছি এবং তার সাপেক্ষে বর্তমানে আর ভবিষ্যতে আমার কোথায় দাঁড়ানো উচিৎ সেই বোধ সচেতন বাবা-মায়েরা আমাদের দিয়ে যান জেনে বুঝে। আর যে বাবা-মায়েরা তত সচেতন নন আসলে তাঁরাও স্থান নির্দেশ করে দিয়ে যান তাঁদের কথাবার্তায়, জীবনচর্যায়।
কথাটা নতুন করে উপলব্ধি করলাম টিভিতে তথাকথিত গোরক্ষকদের হাতে নিহত পুলিশকর্মী সুবোধ কুমার সিংয়ের ছেলে অভিষেকের কথা শুনতে শুনতে।

সুবোধ কুমার খুন হওয়ার পর যত সময় যাচ্ছে তত পরিষ্কার হচ্ছে যে খুন হওয়ার দিনের ঘটনাবলী সুপরিকল্পিত, হঠাৎ উত্তেজিত জনতা তাঁকে হত্যা করেনি। তিনি সাম্প্রতিক অতীতে গোহত্যার “অপরাধে” প্রথম যে খুনটা হয়েছিল দাদরিতে, সেই খুনের তদন্তকারী অফিসার ছিলেন। সেই খুনের অপরাধীদের হাজতবাস করার পেছনে তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল। বদলি হয়ে বুলন্দশহরে এসে পড়ার পরেও আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশে আপোষ না করে তিনি হিন্দুত্ববাদীদের যথেষ্ট বিরাগভাজন হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী বলেছেন সুবোধ কুমারকে প্রায়শই খুনের হুমকি দেওয়া হত। খবরে প্রকাশ বিজেপি নেতারা বুলন্দশহর থেকে তাঁর বদলি দাবী করেছিলেন অতি সম্প্রতি। বিপদের মধ্যে দিয়ে হাঁটছেন জেনেও সুবোধ কুমার ঘটনার দিন পুলিশ ইন্সপেক্টর হিসাবে যা কর্তব্য ঠিক তাই করছিলেন। কোন সাহস তাঁকে প্রণোদিত করেছিল তা বলার জন্যে তিনি নেই, তা দেশ হিসাবে আমাদের ব্যর্থতা। কিন্তু বাবা হিসাবে তাঁর সাফল্য এই অন্ধকারে আমাদের ক্ষীণ আলো দেখাচ্ছে।

আরও পড়ুন ওয়কীল হাসানের গণতন্ত্র, না মুকেশ আম্বানির ধনতন্ত্র?

সকালের কাগজে মুন্ডিতমস্তক যে ছেলেদুটির ছবি কয়েকশো কিলোমিটার দূরে বসা আমাকে ক্ষিপ্ত করে তুলছিল, সেই বাবা হারা কিশোর যখন টিভির পর্দায় বলে “শুধু মুখ্যমন্ত্রীকে নয়, সারা ভারতের লোকের কাছে আমার আবেদন, হিন্দু মুসলমান নিয়ে দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক হিংসা দয়া করে বন্ধ করুন,” তখন বোঝা যায় সুবোধ কুমার ছেলেটির সঙ্গেই আছেন।

আরও পরিষ্কার হয় যখন অভিষেক বলেন “আমার বাবা একটা কথাই বলতেন ‘আর কিছু হতে পারো না পারো, সুনাগরিক হও। সব ধর্ম, সব জাতির লোকই এক। তুমি কারো চেয়ে বড় নও, কারো চেয়ে ছোটও নও।”

বাবা খুন হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে এই ভাষায় এই কথাগুলো বলতে পারা মুখস্থ বিদ্যায় সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী যে বিদ্যার বলে মধ্যে মধ্যে মহাত্মা গান্ধীর বন্দনা করেন সে বিদ্যার কর্ম নয় এসব। অনুভূতিদেশ থেকে আলো না পেলে শুধু ক্রিয়া, বিশেষণের জোরে এসব কথা বেরোয় না। অভিষেক যখন আমাদের সবাইকে সাবধান করেন এই বলে যে আমরা আত্মহননের পথে এগোচ্ছি; পাকিস্তান, চীনের দরকার নেই, আমরাই একে অপরের অনেক বড় শত্রু হয়ে উঠছি; তখন বোঝা যায় অভিষেকের প্রয়াত বাবা, এবং অবশ্যই মা, এই যুগসন্ধিক্ষণে তার যে স্থান নির্দেশ করেছেন সে সেই স্থানের যোগ্য হয়ে উঠছে। এইখানে মৃত সুবোধ কুমারের জিত, হত্যাকারীদের হার। হত্যাকারীদের সরকার তাঁর নামে রাস্তার নামকরণ করুক আর না-ই করুক, সুবোধ কুমার সন্তানের মধ্যে বেঁচে রইলেন। আমাদেরও বাঁচার রাস্তার সন্ধান দিলেন।

এত কথা বলার পরে একটা প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। সন্তান কি সবসময় বাবা-মায়ের দেখানো অবস্থান মেনে নেয়? নেয় না। প্রকৃতপক্ষে সর্বদা মেনে নেওয়া উচিৎও নয়। কারণ অনেক বাবা-মা এমন অবস্থানও ঠিক করেন যা সমাজের পক্ষে, সন্তানের চারপাশের মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর, পশ্চাৎমুখী। সেইসব বাবা-মায়েদের অবাধ্য সন্তানেরাই যুগে যুগে সমাজকে বদলে দেন, এগিয়ে নিয়ে যান। সেই জন্যেই আমাদেরও বারবার ভাবতে হবে সন্তানকে ঠিক কোথায় দাঁড়াতে বলছি। কার পক্ষে, কার বিপক্ষে? তাকে যে অবস্থান নিতে শেখাচ্ছি তা শুধু তার জন্যে ভাল, না আর পাঁচজনের জন্যেও ভাল — সেকথাও ভাবতে হবে। এমনি এমনি তো আর ঠাকুমা, দিদিমারা বলতেন না “প্রসব করলেই হয় না মাতা।”

এক যে ছিল সংসদ

বিনা বিতর্কে পছন্দের কাজগুলো হয়ে যাক – এটা এদেশে কে না চায়? যে কোনো বড় শহরের জনবহুল মোড়ে দাঁড়িয়ে যাদের ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা বলে মনে হয় তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন। কতজন যে বলবে “গণতন্ত্রের সীমা থাকা উচিৎ”, “মিলিটারি রুল হচ্ছে বেস্ট”!

সে এক সংসদ ছিল। প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসতেন জহরলাল নেহরু বলে একজন। সাহিত্যিক ই এম ফর্স্টারের ধারণা ছিল, ফরাসী দার্শনিক ভলতেয়ারের যদি পুনর্জন্ম হয় আর তিনি বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে একটা চিঠি লিখবেন ঠিক করেন, তাহলে একমাত্র যে রাষ্ট্রনেতা সেটা পাওয়ার যোগ্য, তিনি নেহরু। আর বিরোধী দলনেতার আসনে বসতেন অসামান্য বাগ্মী এবং পণ্ডিত, অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। একটু দূরেই ছিলেন হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনিও কম বড় বক্তা নন। একবার শ্যামাপ্রসাদ বক্তৃতা দিচ্ছেন, নেহরু উঠে বললেন “What nonsense are you talking?” শ্যামাপ্রসাদ জবাব দিলেন “There’s no monopoly of yours in talking nonsense, sir.”

ঘটনাটা শুনেছিলাম হাওড়ার এক সময়কার সিপিএম সাংসদ প্রয়াত সুশান্ত চক্রবর্তীর মুখে। তিনি আরও একটা সংসদীয় বিতর্কের গল্প শুনিয়েছিলেন। সেটা ওরকম মান্ধাতার আমলের ঘটনা নয়, আমাদের সময়ের অনেক কাছাকাছি। কংগ্রেস নেতা এ আর আন্তুলের বিরুদ্ধে সিমেন্ট নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ। তা নিয়ে বিরোধীরা সংসদে জোর চেপে ধরেছেন সরকারকে। বিতর্কে এক মন্ত্রী দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন, তারপর বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং বলতে উঠেছেন। শুরুতেই বললেন “The minister spoke at length, trying to cement his argument. But failed.”

এই গল্পগুলো শুনি ২০০০ সাল নাগাদ। তখন ক্লাস টুয়েলভে পড়ি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তরুণ মাস্টারমশাই বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠিক করলেন আমাদের দিয়ে মক পার্লামেন্ট করাবেন। যেদিন অনুষ্ঠানটা হল সেদিন অতিথি হিসাবে এসে সুশান্তবাবু শুনিয়েছিলেন গল্পগুলো। ওগুলো অবশ্য লোকসভা, রাজ্যসভার অধিবেশনের সরাসরি টিভি সম্প্রচার শুরু হওয়ার আগের ঘটনা। আমি যে প্রজন্মের লোক, তারাই প্রথম টিভিতে ওসব দেখতে পায়। তখনো কিন্তু সংসদের বিতর্কগুলোর একটা ন্যূনতম মান ছিল।

আমরা ট্রেজারি বেঞ্চে অটলবিহারী বাজপেয়ীর কথার চেয়ে লম্বা বিরামযুক্ত বক্তৃতা শুনেছি, সাথে তাঁর স্বরচিত কবিতা। যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে আছে আস্থাভোটে জয়যুক্ত হওয়ার আগে বলা “কর্তব্য পথ পর / ইয়ে ভি সহি, উয়ো ভি সহি।” আমরা লালকৃষ্ণ আদবানির সংস্কৃতাশ্রয়ী হিন্দি বক্তৃতা শুনেছি, বিরোধী আসন থেকে জলদগম্ভীর সোমনাথ চ্যাটার্জিকে শুনেছি, পূর্ণ সাংমাকে মনে আছে, ভোজপুরী হিন্দি আর টুকরো রসিকতায় গুরু বিষয়কে লঘু করে বলতে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন লালুপ্রসাদকেও মনে আছে। আরও পরে সরকারপক্ষের পি চিদম্বরম, কপিল সিবাল আর বিরোধীপক্ষের অরুণ জেটলি, সুষমা স্বরাজ, সীতারাম ইয়েচুরির বক্তব্যও কান পেতে শোনার মত ছিল। তার চেয়েও বড় কথা ওয়াক আউট, বিলের প্রিন্ট আউট ছেঁড়া, ওয়েলে নেমে স্লোগান দেওয়া — এসব সত্ত্বেও খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বিতর্ক হত। তাতে সব পক্ষের প্রধান নেতারা অংশগ্রহণও করতেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা দেবেন না, এটা কল্পনাতীত ছিল।

তারপর আচ্ছে দিন এল। কার জানি না, তবে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে নয় তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিন সংসদ ভবনে ঢোকার সময় সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন, বলেছিলেন “এটাই তো আমার মন্দির।” এবং তারপর থেকেই ক্রমশ সংসদের অধিবেশন বসার দিন কমেছে, মন্দিরের প্রধান সেবায়েতের উপস্থিতিও কমেছে। অনেক দেশদ্রোহী বলে উনি সংসদ এড়িয়ে যান কারণ মেঠো বক্তৃতায় হাত-পা নেড়ে, চোখের জল ফেলে উতরে গেলেও সংসদে জোরালো বক্তৃতা দেওয়া ওঁর কম্ম নয়। তবে আমি একথা বিশ্বাস করি না। এটা নেহাতই কুৎসা। আসলে ভদ্রলোক দিনে মোটে চার ঘন্টা ঘুমোন তো। আমার ধারণা সেই চার ঘন্টা হল দুপুর বারোটা থেকে চারটে। তা ঐ সময়টা কি সংসদে বসে নষ্ট করা যায়? ওটুকু না ঘুমোলে মানুষটা অসুস্থ হয়ে পড়বে না?

কিন্তু দেশদ্রোহীরা তো এসব শুনবে না, তারা উল্টোপাল্টা বলবেই। সেটা বন্ধ করতে সরকার ভাল বুদ্ধি বার করেছেন – কোনো বিতর্ক হওয়ারই দরকার নেই সংসদে। এই প্রবণতা শুরু থেকেই অল্প অল্প দেখা যাচ্ছিল। বিমুদ্রাকরণের মত বড় বিষয় নিয়েও বিরোধীরা চেঁচামেচি করার পর সরকার আলোচনায় রাজি হয়েছিল। তাও চেয়েছিল যেন সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়, ভোটাভুটির ব্যাপার না থাকে। এবং যেভাবেই আলোচনা হোক না কেন, প্রধানমন্ত্রী কিন্তু বক্তব্য রাখবেন না।

এবারে আরেক কাঠি সরেস। একটা লোক দেশের এত টাকা মেরে দিয়ে পালিয়ে গেল যে এখনো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কত টাকা, অথচ সরকারের মনেই হল না এটা নিয়ে সংসদে আলোচনার প্রয়োজন আছে। বিরোধীরা আলোচনার দাবীতে বিস্তর চেঁচামেচি করছেন (বেশ করছেন), এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানাচ্ছেন সরকার সবকিছু নিয়ে আলোচনায় রাজি। কিন্তু একথা বলছেন কবে? না বিনা বিতর্কে অর্থ বিল পাশ হয়ে যাওয়ার পরে। যা যা ছিল তাতে তার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর বিদেশের টাকায় পুষ্ট হওয়াকে আইনসম্মত করে নেওয়াও আছে। এতবড় কান্ড হয়ে গেল কোনো বিতর্ক ছাড়াই। সরকারের যেন কোনো দায় নেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সংসদ সচল করার। ফ্লোর ম্যানেজমেন্ট কথাটার যেন কোনো অস্তিত্বই নেই।

আসলে বিনা বিতর্কে পছন্দের কাজগুলো হয়ে যাক – এটা এদেশে কে না চায়? যে কোনো বড় শহরের জনবহুল মোড়ে দাঁড়িয়ে যাদের ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা বলে মনে হয় তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন। কতজন যে বলবে “গণতন্ত্রের সীমা থাকা উচিত”, “মিলিটারি রুল হচ্ছে বেস্ট”!

আরও পড়ুন কী ঢাকছে সরকারি চোলি? কেনই বা ঢাকছে?

যাঁরা মনে করেন কথাগুলো ঠিকই, তাঁদের জন্যে একটা ঐতিহাসিক ঘটনা বলে শেষ করি। ঘটনাটার সাথে আমাদের দেশের কোন ঘটনার মিল আছে কিনা আপনারাই ভেবে দেখুন।

ঘটনাটা ঘটে ২১ মার্চ, ১৯৩৩ তারিখে। সেদিন নাজি পার্টির নেতা হিটলার পটসডাম গ্যারিসন চার্চের বাইরে তদানীন্তন জার্মান রাষ্ট্রপতি পল ফান হিন্ডেনবার্গকে হাঁটু মুড়ে অভিবাদন জানায় এবং করমর্দন করে। উপলক্ষটা ছিল নব নির্বাচিত রাইখস্ট্যাগের (জার্মান সংসদ আর কি) প্রথম অধিবেশন। যেহেতু হিন্ডেনবার্গ রাষ্ট্রপ্রধান আর দিনটা হল রাইখস্ট্যাগের অধিবেশন শুরুর দিন, তাই অনেকে মনে করেছিল হিটলার জার্মান সংবিধান ইত্যাদির প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ করল। এর পরের বারো বছর প্রমাণ করেছে তাদের ভাবনাটা সঠিক ছিল কিনা।