এসআইআর মওকায় অনুপ্রবেশ নিয়ে কিছু কথা

যার ওই তথাকথিত যোগ্যতা নেই, টাকা বা পরিচিতিও নেই, তারও কিন্তু উন্নততর জীবনের অভিলাষ আছে। সেই জীবনকে ধাওয়া করার মানবিক অধিকারও আছে। কথাটা যেমন ভারত থেকে যে আমেরিকায় যেতে চায় তার বেলায় সত্যি, তেমন যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসতে চায়, তার বেলাতেও সত্যি। এই লোকগুলো তাহলে কী করে? বেআইনি পথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢোকে, বা ভারত থেকে আমেরিকায় যায়। রাষ্ট্রের ভাষায় বললে— অনুপ্রবেশ করে।

সম্প্রতি নাগরিক ডট নেটের পডকাস্টে এসে সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য বলেছেন ‘অনুপ্রবেশ শুধু ধর্মীয় কারণে ঘটে না।’ সবিস্তারে বলেছেন— সারা পৃথিবীতেই মানুষ নিজের দেশ থেকে উন্নততর অর্থনীতির দেশে যাওয়ার চেষ্টা করে, ফলে এটা সারা পৃথিবীর সমস্যা। এই কথাগুলো রিল হিসাবে ছড়িয়ে পড়তেই এক শ্রেণির মানুষ রেগে কাঁই হয়েছেন। সেই মওকায় আরও চাট্টি কথা বলে নেওয়ার ধান্দায় এই লেখার অবতারণা।

সৃজন যা বলেছেন তাকে তথ্য হিসাবে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ওই ভিডিওর নিচে ছাপার অযোগ্য ভাষায় যাঁরা মন্তব্য করে যাচ্ছেন, তাঁরা নিজেরাই অনেকে অন্য দেশে বসে আছেন বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে। অমৃতকালের ভারত বা তার আগের ভারত পেশাগতভাবে বা জীবনযাত্রার অন্য মাপকাঠিতে তাঁদের খুব পছন্দের জায়গা হলে নিশ্চয়ই বিদেশে গিয়ে বসবাস করতেন না। সোশাল মিডিয়ায় বামপন্থী বা উদারপন্থী চিন্তাভাবনাকে আক্রমণ করা যাঁদের দৈনন্দিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে গত এক যুগে (পারিশ্রমিকে বা বিনা পারিশ্রমিকে), তাঁদের বড় অংশ তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের ইঞ্জিনিয়ার এবং ওই পেশার বহু মানুষের গত দুই-আড়াই দশক ধরেই জীবনের লক্ষ্য— কোম্পানির কাজে প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে যাওয়া, তারপর সেই কাজটাকেই স্থায়ী করে নিয়ে, অথবা অন্য কোনো কোম্পানির চাকরি নিয়ে, সেদেশেই থিতু হওয়া। অনেকে তো এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভেসেও বেড়ান। দেশে ফেরার কোনো আশু পরিকল্পনা নেই, সুদূর ভবিষ্যতেও নেই। অথচ মানুষ উন্নত অর্থনীতির দেশে চলে যেতে চায় শুনলেই এঁরা তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। অবশ্য ওঁরা বলবেন ‘সেটা অভিবাসন, অনুপ্রবেশ নয়।’ সে প্রসঙ্গে আসব, ফাঁকি দেব না।

বলতে দ্বিধা নেই, বছর দশ-পনেরো আগেও, যারা পড়াশোনা করতে বা স্বল্পমেয়াদি কাজের সূত্রে আমাদের দেশ থেকে বিদেশে গিয়ে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যায়, তাদের খুব ভালো চোখে দেখতাম না। প্রথম বিশ্বের দেশগুলোকে ২০০ বছর ধরে অন্য কোনো দেশ শোষণ করেনি, বরং ভারতের মত দেশগুলোকে শুষেই ওরা ধনী হয়েছে। সুতরাং এদেশের চেয়ে ওসব দেশের জীবনযাত্রা, কাজের সুযোগ ইত্যাদি উন্নত হওয়ারই কথা। সেসবের জন্যে এদেশের গরিব, মধ্যবিত্ত মানুষের ভর্তুকির টাকায় লেখাপড়া শেখা (সরকারি ভর্তুকির জন্যেই এদেশে লেখাপড়ার খরচ কম ছিল বছর পনেরো আগে পর্যন্তও। সরকারের টাকা মানে সাধারণ মানুষের করের টাকা, আর কর মানে কেবল আয়কর নয়) যেসব ছেলেমেয়ে বিদেশেই থেকে যেত, তাদের সম্বন্ধে ‘পলাতক’ শব্দটাই আমি ব্যবহার করতাম। এখন আর করি না, কারণ একাধিক কারণে আমার মত বদলেছে।

প্রথমত, স্বাধীনতার ৮০ বছর হতে চলল, এখনো আমরা দেশটাকে এমন করে তুলতে পারিনি, যেখানে সাদামাটা মানুষও জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজনগুলো সুস্থভাবে সোজা পথে মিটিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলে তো কথাই নেই। ফলে ইতিহাসের নিয়ম মেনে মানুষ উন্নততর জীবনযাত্রার দিকে দৌড়বেই। এমনকি আদিম মানুষও তাই করত, নইলে মানুষ নামক প্রাণীটি কখনো আফ্রিকা মহাদেশ ছেড়ে বেরোত না (যাঁরা জীববিজ্ঞান ও ইতিহাস মানেন না, তাঁরা এই লেখা পড়া এখানেই বন্ধ করে দিন)।

দ্বিতীয়ত, ভারতের বেশকিছু সম্প্রদায়ের জন্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেশের অবস্থা শেষ দেড় দশকে এমন করে ফেলা হয়েছে যে সেই সম্প্রদায়ের যে কোনো মানুষই সুযোগ থাকলে দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইবে। তাদের উপরেও রাগ করা চলে না।

তৃতীয়ত, দেশ আর রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। আমরা দুটোকে সমার্থক শব্দ বলে ভাবি, কিন্তু আসলে তা নয়। রাষ্ট্র প্রশাসনিক ব্যাপার, দেশ মূলত মনোভূমি। ফলে ভারত রাষ্ট্রের ভূগোল আছে, সরকার আছে। ভারত দেশটার ভূগোল নেই, ইতিহাস আছে। সরকার নেই, সংস্কৃতি আছে। কেউ বুকে করে সেই সংস্কৃতি পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে নিয়ে গিয়ে বাস করতে পারে। সেই কারণেই গ্রীন কার্ড পেয়ে যাওয়া লোকও আমেরিকায় ভারতীয় ক্রিকেট দলের ম্যাচ হলে নীল জার্সি পরে গলা ফাটাতে পারে। মার্কিন রাষ্ট্রের নাগরিকের দায়িত্ব পালন করেও পারে। তার উপর ভারত এমন মজার দেশ যে ভারতীয় সংস্কৃতি মানে আসলে সাড়ে বত্রিশ ভাজা ‘একটি বিরাট হিয়া’। হিয়া মানে মন। সুতরাং ভারতীয় হিয়া যে পৃথিবীর যেখানে নিয়ে যেতে পেরেছে, সেখানেই ভারত আছে বললে ভুল হয় না। যার মনটা ভারতীয়, সে-ই ভারতীয়। তার ধর্ম যা-ই হোক, মুখের ভাষা যা-ই হোক, পেশা যা-ই হোক, বড়লোকই হোক আর গরিবই হোক। ভারতে থাকুক আর না-ই থাকুক। একথা মাথায় ঢোকার পরে আর অনাবাসী ভারতীয়দের উপর রাগ করি না। কিন্তু এইসব প্রিয় কথা বলতে গেলেই কিছু অপ্রিয় কথা এসে পড়ে, যেগুলো বর্তমান আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।

উন্নততর জীবনের সন্ধানে যাওয়া আসলে সব মানুষের জন্মগত অধিকার, অথচ দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্র সেকথা স্বীকার করে না। তাই এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভাগ্যান্বেষণে যেতে হলে নিজের এবং যে রাষ্ট্রে যেতে চান, দুপক্ষেরই সম্মতি আদায় করতে হয়। মানে পাসপোর্ট, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, পরে নাগরিকত্ব ইত্যাদি। ওগুলো পেতে কী লাগে? আপনি বলবেন যোগ্যতা, আসলে লাগে টাকা এবং/অথবা পরিচিতি। ভেবে দেখুন, নিজেই বুঝতে পারবেন। GRE, CIEFL, TOEFL না কীসব আছে আপনাদের? সেগুলো পাশ না করে কি কেউ বিদেশ যাচ্ছে না, নাকি গিয়ে বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে না? আপনি যাকে যোগ্যতা বলছেন, সেটা কীসের যোগ্যতা? আপনাকে অন্য দেশে ঢোকার অনুমতি আদায় করে দেবে সেদেশের কেউ (আপনি যেখানে পড়তে বা পড়াতে যাচ্ছেন সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথবা আপনি যে কোম্পানির চাকুরে) – এই ব্যবস্থা করার যোগ্যতা।

এখন কথা হল, যার ওই তথাকথিত যোগ্যতা নেই, টাকা বা পরিচিতিও নেই, তারও কিন্তু উন্নততর জীবনের অভিলাষ আছে। সেই জীবনকে ধাওয়া করার মানবিক অধিকারও আছে। কথাটা যেমন ভারত থেকে যে আমেরিকায় যেতে চায় তার বেলায় সত্যি, তেমন যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসতে চায়, তার বেলাতেও সত্যি। এই লোকগুলো তাহলে কী করে? বেআইনি পথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢোকে, বা ভারত থেকে আমেরিকায় যায়। রাষ্ট্রের ভাষায় বললে— অনুপ্রবেশ করে। এ তো গেল আরও ভালো জীবনের আকাঙ্ক্ষায় দেশ বদলানোর কথা। এছাড়া স্রেফ প্রাণে বাঁচতেও মানুষ এক রাষ্ট্র থেকে আরেক রাষ্ট্রে যায়। তাদের উদ্বাস্তু বলাই দস্তুর, কিন্তু যখনই কোনো রাষ্ট্রের মনে হয় ‘ব্যাটারা বড্ড বেশি সংখ্যায় আসছে’, তখনই লাঠিসোটা গুলি বন্দুক বের করে তাদের তাড়াতে লেগে পড়ে। তখন আর উদ্বাস্তু বলে না, বলে অনুপ্রবেশকারী।

কোনটা অনুপ্রবেশ আর কোনটা নয়, সেটা ঠিক করে রাষ্ট্র। আর সংজ্ঞাটা সে যেদিন ইচ্ছে যখন ইচ্ছে বদলে ফেলতে পারে। উদ্বাস্তুদের কথা বাদ দিন। আপনি হয়ত রাতে ঘুমোলেন নাগরিক হিসাবে, সকালে উঠে দেখলেন অনুপ্রবেশকারী হয়ে গেছেন। এই কথাটা কমাস আগে বললেও অনাবাসী বন্ধুরা নির্ঘাত হেসে উড়িয়ে দিতেন, এখন আর পারবেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখটা একবার মনে করে দেখুন। কদিন আগেই হাড়ে ঠকঠকানি ধরিয়ে দিয়েছিলেন না? স্বীকার না করলেও, অনেকের হাড় এখনো ঠকঠক করেই চলেছে। তা সত্ত্বেও কিন্তু ‘পশ্চিমবঙ্গে বড্ড বেশি বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গা ঢুকে পড়েছে’ বলে রাতে ঘুম না হওয়া বাঙালি বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েকে কী করে বিদেশে পাঠানো যায় তার খোঁজখবর জারি রেখেছেন। ‘আমার ছেলে স্টেটসে থাকে’ বলে বিয়েবাড়িতে দূর সম্পর্কের আত্মীয় এবং নতুন পরিচিতের কাছে রেলা নেওয়াও জারি আছে। কয়েক মাস আগে এক বিয়েবাড়িতে তেমন এক আত্মীয়ের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। তাঁর ছেলেও ‘স্টেটসে থাকে’, তার উপর বউমা আমেরিকান। স্বভাবতই ভদ্রমহিলা মাটির দু ইঞ্চি উপর দিয়ে হাঁটেন। বউমা আমিষ খান না, কারণ তিনি ‘অ্যানিমাল ক্রুয়েলটি’-র বিরুদ্ধে। সমাজবিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করে এখন কী একটা এনজিও-তে ‘আন্ডার-প্রিভিলেজড’ মানুষের জন্য কাজ করেন। গর্বিত শাশুড়ি এসব শোনাচ্ছিলেন আমাদের। বাঙালিসুলভ বোকামিতে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম ‘আপনার ছেলে-বউমা কি তাহলে ডেমোক্র্যাট?’ উত্তর এল ‘সেরকম কিছু না, যার যেটা ভালো সেটা বলে। আমার বউমা যেমন বলে, ট্রাম্প ইজ দ্য বেস্ট প্রেসিডেন্ট।’ এই কথোপকথনের আগেই H1B ভিসা নিয়ে ট্রাম্পের বিষোদ্গার শুরু হয়ে গেছে। আমার মনে তার চেয়েও দগদগে ঘা তৈরি করেছে ভারতীয়দের হাতে-পায়ে শেকল বেঁধে বিমানে তুলে আমেরিকা থেকে বের করে দেওয়ার দৃশ্য।

সেসব উল্লেখ করে জিজ্ঞেস করলাম— এসব কাণ্ড করে ট্রাম্প কী করে মার্কিন বউমার চোখে সেরা রাষ্ট্রপতি হন? বাঙাল (নিজেই বললেন) শাশুড়ি উত্তর দিলেন ‘না, ওরা তো বেআইনিভাবে আমেরিকায় গেছিল। ওরা তো অনুপ্রবেশকারী। ওরা আমেরিকায় গেছে স্রেফ টাকা রোজগার করতে। ওদের তো বের করে দিতেই হবে’। উত্তরে বলেই ফেললাম, আপনার ছেলেও তো টাকা করতেই গেছে। ভদ্রমহিলার উত্তর ‘আমার ছেলে তো পাসপোর্ট, ভিসা করিয়ে গেছে।’ অর্থাৎ ঘুরে ফিরে ব্যাপারটা দাঁড়াল ওই— রাষ্ট্রের দেওয়া কাগজ যাকে অভিবাসী বলে সে-ই অভিবাসী, অন্যরা অনুপ্রবেশকারী। এই কাগজ জোগাড় করা কিন্তু যোগ্যতার ব্যাপার নয়, নেহাতই রাষ্ট্রের দয়া। এ দয়া যদি ১৯৪৭ সালের পরে ভারত রাষ্ট্র না দেখাত, তাহলে আজ যে বাঙালরা এবিপি আনন্দ ইত্যাদি চ্যানেলে দেখানো হাজার হাজার লোকের বাংলাদেশে পালানোর ভুয়ো ভিডিও দেখে উল্লসিত, এসআইআরে বাদ পড়া লোকেরা ঢিট হয়েছে ভেবে নাচছেন, তাঁদের বাপ-মায়েরা কিন্তু অনুপ্রবেশকারী হয়ে যেতেন।

তবে একটা কথা মানতেই হবে। ট্রাম্প, তাঁর উপরাষ্ট্রপতি জে ডি ভান্স, যতই অভিবাসীদের বাড়ির মেয়ে বিয়ে করে ভণ্ডামি করুন, নরেন্দ্র মোদীর বিজেপির কিন্তু অন্য দেশ থেকে আসা লোকেদের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা অনেক পরিষ্কার। তথাগত রায় যখন রাজ্য সভাপতি ছিলেন, সেই জুরাসিক যুগ থেকে বঙ্গ বিজেপি বলে আসছে— বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলমানরা অনুপ্রবেশকারী, হিন্দুরা শরণার্থী। কেন্দ্রে একক শক্তিতে ক্ষমতায় আসার পরে তারা নাগরিকত্ব আইনের যে সংশোধন করেছে, তাতেও এই ভাবনাকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এতক্ষণ ধরে যা যা বলেছি, সবকিছুর বিপরীতে পুরনো ও নতুন বাঙালরা সেই আইনকে তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু ডেভিল (ডিমের নয়, বিজেপির প্রতি বিশ্বস্ত হতে চাইলে আমিষ-চিন্তা মাথা থেকে তাড়ান) যে ডিটেলে। এসআইআর থেকে বাদ দেওয়ার সময়ে কই হিন্দুদের রেখে দেওয়া হল না তো! এখন যে নিত্য হিন্দু বীর অমিত শাহ এসআইআর থেকে বাদ পড়া মানুষকে দেশছাড়া করার হুমকি দিচ্ছেন, তাতেও তো বলছেন না যে হিন্দুদের রেখে দেওয়া হবে? অনুপ্রবেশকারী আর শরণার্থী বলে দুটো গোষ্ঠীর কথা তো বলছেন না? একটা শব্দই তো ব্যবহার করছেন— ‘ঘুসপ্যায়েট’।

আরো পড়ুন রামদাসী, লালদাসের ধর্ম এবং রামমন্দির

আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পেও কিন্তু কেবল মুসলমানদের ঢোকানো হয়নি। উলটে একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই রাজ্যের ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক বেশিরভাগ মানুষ হিন্দু বাঙালি

সংঘ পরিবারের সোশাল মিডিয়া যোদ্ধারা যে নেহাত পুতুলখেলায় লিপ্ত নন, সংঘের মনের কথাই যে তাঁদের মুখ দিয়ে বেরোয়— একথা যদি জানা থাকে, তাহলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে এক্ষেত্রেও অমিত শাহরা অত্যন্ত সৎ। কারণ ওঁদের আই টি সেলের লোকেরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা হিন্দুদের জন্যে কেঁদে ভাসালেও তাদের এদেশে আশ্রয় নেওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই বলে ‘দেশটা কি ধর্মশালা নাকি?’ অর্থাৎ এঁদের হিন্দু বাঙালির প্রতি প্রীতি আসলে, গোদা বাংলায় যাকে বলে, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। মানে আহা উহু করব, কিন্তু দায়িত্ব নেব না। তাহলে আহা উহু করাই বা কেন, ভেবে দেখেছেন কি? কারণটা খুব সহজ। যাতে ওদেশের সংখ্যালঘুর প্রতি অত্যাচারকে এদেশের সংখ্যালঘুর অত্যাচারের পক্ষে যুক্তি হিসাবে তুলে ধরা যায়। মানে শুঁড়ির সাক্ষী যেমন মাতাল, সংঘ পরিবারের সাক্ষী জামাত। মুশকিল হল, বাংলাদেশের মানুষ জামাতকে হারিয়ে ভূত করে দিলেন; পশ্চিমবঙ্গের মানুষের হিন্দুত্বের নেশা কিন্তু কাটছে না। আই টি সেল নিরুপায় হয়ে আঁকড়ে ধরেছে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী আসনগুলোতে জামাতের জয়কে, তাই দিয়ে হোয়াটস্যাপ গ্রুপগুলোর মাধ্যমে ‘পশ্চিমবঙ্গ বিপন্ন, বাংলাদেশ হয়ে যাবে’ বলে ভয় দেখানো হচ্ছে। বাঙালি সে প্রোপাগান্ডা এখনো গিলছে। কারণ মুসলমানদের প্রতি অকারণ ভয় থেকে তৈরি হওয়া ঘৃণা এতদিনে ঘাড়ে এমন চেপে বসেছে যে সৃজন যখন বলছেন ‘রাষ্ট্র কোনোদিনই খুব ভালো জিনিস নয়’, তখন এঁরা মনে করছেন— পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশ বানানোর চক্রান্ত করছে। ফলে যে হিন্দুর নিজের নাম এসআইআরে বাদ পড়েনি, তিনি আর যাঁর নাম বাদ পড়েছে তাঁকে নিয়েও চিন্তিত নন। রাষ্ট্রের প্রতি এমন অচলা ভক্তি তৈরি হয়েছে যে ভেবে নিচ্ছেন— এমনি এমনি তো আর বাদ দেয়নি, ওরা হিন্দু হলেও নির্ঘাত বাংলাদেশ থেকে এসেছে।

এখন বুঝবেন না, যখন বুঝবেন তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে জেনেও একবার বলে রাখা যাক— রাষ্ট্র, বিশেষ করে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র, নেহাতই সেদিনের ছেলে। বয়স আড়াইশো-তিনশো বছরের বেশি নয় এবং জিনিসটা মানুষের তৈরি। যদি ভগবান বলে কেউ থেকেও থাকেন, তিনি রাষ্ট্রগুলোর সীমানা এঁকে দিয়ে পৃথিবীর রাজনৈতিক ম্যাপটা তৈরি করেননি। স্রেফ গত একশো বছরেই কতগুলো রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে আর ভেঙে গেছে গুগল করে দেখে নিলেই চলবে, সৃজনকে বা এই নিবন্ধকারকে বিশ্বাস করার দরকার নেই।

সুতরাং মানুষের তৈরি রাষ্ট্র, নাগরিকদের সিদ্ধান্তে তৈরি রাষ্ট্র যখন নিজের মর্জি মত নির্ধারণ করে— এ নাগরিক আর ও নাগরিক নয়, তখন প্রতিবাদ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ এ জিনিস একবার শুরু হলে থামবার নয়। কাল মর্জি বদলালে রাষ্ট্র নাগরিক হওয়ার মাপকাঠি বদলে দেবে। আজকের মাপকাঠিতে আপনি নাগরিক, সেদিনের মাপকাঠিতে বাদ পড়ে যেতে পারেন। কী করবেন তখন? আপনারাই তো বলেন— মুসলমানদের ভারতে থাকার দরকার নেই, তাদের যাওয়ার জন্যে নাকি ৫৭ খানা দেশ আছে। আপনাদের এই একটাই দেশ।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

নির্বাচনে এবারও খেলা হবে, তবে রান্নাবাটি

আমরা যেমন বিহারের খবর রাখি না, তেমন ওড়িশার খবরও রাখি না। ফলে আমরা অনেকেই জানি না, সেখানে গত বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনায় কী কাণ্ড হয়েছে।

এই লেখা যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত আমার এলাকায় বিজেপি প্রার্থীর কোনো প্রচার চোখে পড়েনি। অথচ সিপিএম প্রার্থী অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রায় বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন, কোনো কোনো ফ্ল্যাটেও উঠে পড়ছেন। রাস্তায় বেরোলেই কোথাও না কোথাও তাঁর অথবা সিপিএমের অন্য কর্মীদের মিছিল, মিটিং চোখে পড়ছে। তৃণমূল প্রার্থীকেও হাত জোড় করে হাসি হাসি মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। দেয়াল লিখনেও সিপিএম আর তৃণমূলের উপস্থিতিই চোখে পড়ছে, বিজেপি নেই। বিজেপি যে আছে তার প্রমাণ হিসাবে কোনো কোনো পাড়ায় তিনকোণা গেরুয়া পতাকা শোভা পাচ্ছে, তবে সেগুলো লাগানো হয়েছিল রামনবমী উপলক্ষে। হনুমানপুজোর দিনও এলাকায় গত কয়েক বছরে তৈরি হওয়া, হিন্দিভাষীপ্রধান ফ্ল্যাটগুলোর সামনে রাম, সীতা, হনুমানের কাট আউটের পাশে ওই পতাকাগুলো দেখা গেছে। কোনো কোনো বাইকচালককে ওই গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু নির্বাচনী প্রচার বলতে যা বোঝায় তাতে বিজেপির বিশেষ উৎসাহ আছে বলে মনে হচ্ছে না। একাধিক কেন্দ্রের অধিবাসী পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলে একইরকম তথ্য পাচ্ছি। এদিক ওদিক দু-একজন প্রার্থীর মাছ হাতে প্রচার করা বা প্রাক্তন এনএসজি কমান্ডোর সেই পোশাক পরে প্রচারে বেরিয়ে পড়ার মত ঘটনা বাদ দিলে, সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়াতেও কেন্দ্রের শাসক দলের প্রচারের প্রাবল্য নেই।

প্রশ্ন হল, এমন কেন হচ্ছে? বিজেপি কেবল ভারতের নয়, তাদের কথা অনুযায়ী, পৃথিবীর বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। নির্বাচনী বন্ডের কল্যাণে এবং আরও নানা কারণে তাদের টাকাপয়সারও অভাব নেই যে খরচের কথা ভেবে প্রচারে রাশ টানতে হবে। তাহলে এই কার্পণ্য কেন? দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা নির্বাচন দেখে আসছেন, তাঁদের কাছে এর সহজ ব্যাখ্যা হল— বিজেপির সংগঠন নেই। অতএব সিদ্ধান্ত হল— ভোট পাবে না। দুঃখের বিষয়, এই ব্যাখ্যা প্রাক-২০১৯ নির্বাচনগুলোর জন্যে নির্ভুল। কিন্তু সেবার থেকে দেখা গেছে— এ রাজ্যে বিজেপির সংগঠন নেই, ভোট আছে। বামপন্থীদের আবার নয় নয় করেও খানিকটা সংগঠন আছে, কিন্তু ভোট নেই। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচন, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন— প্রত্যেকবার ফল বেরোবার পর এই ব্যাপারটাই উপলব্ধি করা গেছে। এর কারণ বামের ভোট রামে চলে যাওয়া, নাকি তৃণমূল-বিজেপি সেটিং—সে আলোচনা এবারকার মত মুলতুবি থাক। কারণ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এবারের নির্বাচন অভূতপূর্ব। অথচ কথাটা বামপন্থীরা এবং তৃণমূল যেন বুঝেও বুঝতে চাইছে না। ফলে তাদের প্রচারকে রান্নাবাটি খেলা ছাড়া আর কিছু ভাবা যাচ্ছে না। শয়ে শয়ে লোক সঙ্গে নিয়ে, পার্টির পতাকায় এলাকা ছয়লাপ করে, ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গের ভোল পালটে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বা গত ১৫ বছরের উন্নয়নের পাঁচালী শোনানোর যে কোনো মানে হচ্ছে না, সেকথা সাধারণ ভোটারদের কথাবার্তায় কান পাতলে দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যেন কানে গুঁজেছে তুলো আর পিঠে বেঁধেছে কুলো।

১) ৬ এপ্রিল রাতে নির্বাচন কমিশন দয়া করে বিচারাধীন থাকা ভোটারদের মধ্যে কাদের ভাগ্যে ভোটদানের শিকে ছিঁড়ল আর কাদের ছিঁড়ল না— তার সর্বশেষ তালিকা প্রকাশ করেছে। রাজ্যসুদ্ধ লাখ লাখ লোক উৎকণ্ঠায় জীবন কাটাচ্ছিলেন, সেই উৎকণ্ঠা সহ্য করতে না পেরে রিষড়ার মিনতি সেন আত্মহত্যা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। সোশাল মিডিয়া খুললে আরও বহু মানুষের কথা জানা যাচ্ছে, যাঁরা গত কয়েক দিনে এই দুর্ভাবনায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শেষমেশ জানা গেছে, ৬০ লাখের বেশি ভোটারের মধ্যে প্রায় ২৭ লাখ বাদ।

২) আগেই বাদ পড়েছিলেন ৫৮ লাখ, এবার আরও ২৭ লাখ। আগের ৫৮ লাখের মধ্যে অবশ্য কিছু মৃত ভোটার ছিল, তবে ডিসেম্বরের খসড়া তালিকা থেকেই জীবিতকে মৃত বানিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ছিল। অনেক প্রগতিশীলও যা কীসব রাজনৈতিক অঙ্ক কষে মানতে চাইছিলেন না, তাও প্রমাণ হয়ে গেছে শেষ তালিকা বেরোবার পরে— মুসলমানদের বাদ পড়ার হার তাঁদের ভোটার তালিকায় উপস্থিতির হারের চেয়ে বেশি। অল্ট নিউজ এই তথ্য টেনে বের করেছিল কলকাতার দুটো বিধানসভা কেন্দ্রের বিশেষ নিবিড় সংশোধনী পরবর্তী ভোটার তালিকা থেকে, সবর ইনস্টিটিউট এই তথ্য বের করেছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দুই কেন্দ্রের অন্যতম, নন্দীগ্রামের, তালিকা বিশ্লেষণ করে। উপরে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের নিজের তালিকাতেও দেখা যাচ্ছে— মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগণা, মালদার মত যে জেলাগুলোতে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ অন্যান্য জেলার তুলনায় বেশি, সেখানেই বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা বেশি। তাছাড়া যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের মধ্যে মহিলা, নিম্নবর্গীয় হিন্দু, আদিবাসীদের উপস্থিতি প্রধান। অর্থাৎ যাঁদের বিজেপিকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা শূন্য থেকে শুরু, তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থারই ভালো নাম এসআইআর। বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্যে এত প্রাণ কাঁদে বিজেপি নেতাদের, অথচ সেখান থেকে তাড়া খেয়ে চলে আসা মতুয়াদের উপরেও কোপ পড়েছে। আমরা ছাপ্পা ভোট দেখেছি, বুথ দখল দেখেছি, ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’ শুনেছি, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কারচুপির অভিযোগও শুনতে পাই। গণনার সময়ে ব্যালট খেয়ে নেওয়া, ধানখেতে বা নালায় ফেলে দেওয়ার দৃশ্যও নতুন নয়। কিন্তু সেসবই ভোটদানের দিন বা ভোটদানের পরের ব্যাপার। ভোটগ্রহণের আগেই নির্বাচন জিতে নেওয়ার এমন ভবিষ্যনিধি প্রকল্প আমরা দেখিনি।

৩) ধরা যাক, আপনি নিরীহ লোক। আপনাকে মেরে ধরে এলাকার গুন্ডারা সর্বস্ব কেড়ে নিল। আপনি পুলিশের কাছে গেলেন, বাকি যা দু-চার পয়সা ছিল সেগুলোও তারা কেড়ে নিল, আপনি পথে বসলেন। এমতাবস্থায় আমাদের দেশের মানুষ কোনো একটা উপায় বের করতে পারলে যায় আদালতের কাছে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তা আমাদের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের এমন দয়ার শরীর যে তাঁরা বলেছেন যাদের নাম জজসাহেবদের বিচারেও বাদ গেছে, তাঁরাও ফের আবেদন করতে পারবেন। তবে তাঁদের আবেদনের নিষ্পত্তি হোক আর না-ই হোক, ভোট ভোটের সময়েই হতে হবে। যাঁরা এবার ভোট দিতে পারছেন না, তাঁরা নাহয় পরেরবার দেবেন। পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশে ভোট হয় ভোটারের স্বার্থে। এখন ধর্মাবতাররা যা সিদ্ধান্ত নিলেন তাতে বোঝা গেল, পশ্চিমবঙ্গে ভোট হবে ভোটের স্বার্থে। ভোটার হলেন ফাউ। ভোটার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন না, নির্বাচন কমিশন ভোটার নির্বাচন করবে। তারা না পারলে বিচারপতিরা করবেন। যেভাবে পারবেন সেভাবে করবেন, যখন ইচ্ছে হবে তখন করবেন। ভোটার অধিকার হারালে প্রতিবাদ করতেও পারবেন না। করলে পাইক, বরকন্দাজ ডাকা হবে, হাজতবাস হবে, ভোটার সন্ত্রাসবাদী কিনা তাও খতিয়ে দেখা হবে। ডিগ্রিধারী উচ্চবর্গীয় সাংবাদিকরা স্টুডিওতে বসে বিচারকদের জন্যে চোখের জল ফেলবেন আর প্রতিবাদী ভোটারদের ভীষণ বকে দেবেন।

৪) সন্ত্রাসবাদের কবলে থাকা কাশ্মীর বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে দীর্ণ আট-নয়ের দশকের পাঞ্জাব বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো ছাড়া কোথাও কখনো নির্বাচনে এত বাইরে থেকে আনা সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহৃত হয়েছে কিনা সন্দেহ। অনেকদিন যাবৎ একটা কথা চালু হয়েছে— ভোট নাকি গণতন্ত্রের উৎসব। এবারে দেখে মনে হচ্ছে যুদ্ধ। সে যুদ্ধে আসার জন্যে রওনা দেওয়ার আগে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা আবার অযোধ্যার রামমন্দিরে মাথা ঠুকে আসছেন। মানে যুদ্ধকে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের চোখে একেবারে ধর্মযুদ্ধে পরিণত করার চেষ্টা। কীরকম নিরপেক্ষ ভোটদান নিশ্চিত করতে আসছে কেন্দ্রীয় বাহিনী, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

৫) মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্যই যে এসআইআর, সেটা অবশ্য বাঙালি বুদ্ধিমানরা বিহারের এসআইআরের দিকে চোখ রাখলে প্রথমেই টের পেতেন। কিন্তু পাননি। যা-ই হোক, বিহারে ও জিনিস আগে করা হয়েছে বলেই বাংলায় যা হল তাকে অভূতপূর্ব বলা চলে না। তবে ভাববেন না, এসআইআরেই কমিশনের গাফিলতি শেষ হয়। আমরা যেমন বিহারের খবর রাখি না, তেমন ওড়িশার খবরও রাখি না। ফলে আমরা অনেকেই জানি না, সেখানে গত বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনায় কী কাণ্ড হয়েছে। ফ্রন্টলাইন পত্রিকার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বহু বুথে যত ভোট পড়েছে (যার হিসাব থাকে ফর্ম ১৭সি-তে) আর যত ভোট গোনা হয়েছে (যার হিসাব থাকে ফর্ম ২০-তে) তা মেলেনি। বিজু জনতা দল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তাদের প্রেস নোটে জানায়— ১৪৭ খানা বিধানসভা কেন্দ্রের ৫৮ খানা বুথে পড়া ভোট আর গোনা ভোটের তফাত এক থেকে ৯০৮ পর্যন্ত পৌঁছেছে। দুটো চোখ কপালে তোলা উদাহরণ দিয়ে চক্করটি বোঝানো যাক। ফুলবনী কেন্দ্রের ৫৭ নম্বর বুথে ভোট পড়েছে ৬৮২, কিন্তু ফর্ম নং ২০ বলছে একটা ভোটও গোনা হয়নি। তালসারার ১৬৫ ও ২১৯ নম্বর বুথে মোট ১,৪৪৪ জন ভোট দিয়েছেন বলছে ফর্ম নং ১৭সি। অথচ ফর্ম নং ২০ বলছে ও দুটোরও কোনো ভোট গোনা হয়নি। উলটো উদাহরণও আছে। পদমপুরের ১৪ খানা বুথ মিলিয়ে নাকি ভোট পড়েছে ৮২, গোনা হয়েছে ৯,৩০৪। এসব নিয়ে বিজু জনতা দল দুবার নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানিয়েছে, তথ্যের অধিকার আইনেও আবেদন জানিয়েছে। কেউ পাত্তা দেয়নি।

৬) কলকবজা কী আছে না আছে না জেনেও যেমন আমরা ট্রেনে বাসে চড়ি, সেভাবেই জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে কী আছে বা অমুক নম্বর ফর্ম আর তমুক নম্বর ফর্ম দিয়ে কী হয় না জেনেও সেই ১৯৫২ সাল থেকে ভারতের মানুষ ভোট দিয়ে আসছিল। এবারে জ্ঞানেশ কুমারের দৌরাত্ম্যে আমরা কিছু কিছু কল বা গ্যাঁড়াকল সম্পর্কে জানতে বাধ্য হয়েছি। সেরকম দুটো গ্যাঁড়াকল হল ফর্ম নং ৬ আর ৭। এমনিতে ফর্ম নং ৬ খুবই নিরীহ জিনিস। ওটা দিয়ে ভোটার হওয়ার আবেদন করতে হয়। কিন্তু বিহারের অভিজ্ঞতা থেকে এবং পশ্চিমবঙ্গেও গত কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় আমরা জেনে গেছি যে, ওটা ব্যবহার করে ভিনরাজ্যের লোককে রাতারাতি ভোটার তালিকায় ঢোকানোর কাজ করা হয় বলে প্রচুর অভিযোগ আছে। সে কাজ করতে গিয়ে কিছু লোক হাতেনাতে ধরা পড়েছে বলে দাবি করেছে তৃণমূল কংগ্রেস, কিন্তু সব যে ধরা সম্ভব হবে না তা বলাই বাহুল্য। ফর্ম নং ৭-এর ব্যবহার আরও চমৎকার। ও দিয়ে কমিশনে অভিযোগ জানানো যায়— অমুক বৈধ ভোটার নয়, ওকে বাদ দিন। সেটাকে ব্যবহার করে মুসলমানদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে— একথা কিছুদিন আগে সগর্বে জানিয়েছিলেন আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। এসব সম্ভব হয় না নির্বাচন কমিশন ওই ফর্মগুলোর আবেদনকারীদের ব্যাপারে নিয়মমাফিক যাচাই করলে। কিন্তু তা কি করা হয়? হলে আসামের বিএলও সুমনা চৌধুরী, ফর্ম নং ৭-এর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহার ক্যামেরার সামনে ফাঁস করে দেওয়ার জন্যে, চাকরি থেকে সাসপেন্ড হলেন কেন? পশ্চিমবঙ্গেও গুচ্ছ গুচ্ছ ফর্ম নং ৭ নিয়ে ধরা পড়ার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির কর্মীদের বিরুদ্ধে।

৭) নির্বাচন কমিশনের এতরকম কীর্তিকলাপ দেখে ভারতের প্রায় সব বিরোধী দল তার উপর আস্থা হারিয়েছে। ফলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশকে অপসারণের প্রস্তাব এনেছিলেন বিভিন্ন দলের ১৯৩ জন সাংসদ। লোকসভার স্পিকার এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সেই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাই হতে দেননি। কোনো কারণও দেখাননি।

এই সাত কাণ্ড রামায়ণ জানার পরে, বিজেপি যে অমিত শাহ আর নরেন্দ্র মোদীর জনসভা ছাড়া প্রচারে বিশেষ মন দিচ্ছে না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকে কি? অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপিবিরোধী দলগুলো যে প্রাণপণ প্রচার করে চলেছে, তাকে শিশুদের আপন মনে রান্নাবাটি খেলা ছাড়া অন্য কিছু বলা চলে কি? ভোটারদের অধিকারের কথা নির্বাচন কমিশন ভাবেনি, সুপ্রিম কোর্ট ভাবেনি— একথা ঠিক। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস বা বামপন্থীরা যে ভাবছেন, তারই বা প্রমাণ কোথায়? কোনো পক্ষই প্রথম থেকে একবারও বলেনি যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানে হল, জনগণের বেছে নেওয়া তন্ত্র। এ তো তন্ত্র জনগণ বেছে নিচ্ছে। এ অধিকার রাষ্ট্রের নেই, অতএব এই প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে। কেবল পশ্চিমবঙ্গের দলগুলো বলেনি তা নয়, যে ১২ খানা রাজ্যে এসআইআর হল, কোথাও কোনো দলই বলেনি। সবাই মেনে নিল যে এটা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। অথচ সংবিধানে এমন কোনো প্রক্রিয়ার কথা আছে— একথা আজ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টও বলে উঠতে পারল না। জনপ্রতিনিধিত্ব আইনেও আছে নিবিড় সংশোধনের কথা, যা ভারতে এর আগেও বহুবার হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে শেষ হয়েছিল ২০০২ সালে। তার জন্যে ভোটারকে ফর্ম পূরণ করতে হয় না, নিজের নাগরিক হওয়ার প্রমাণ দিতে হয় না, বাপ-মা নাগরিক ছিলেন কিনা তাও দেখাতে হয় না। নির্বাচন কমিশনই নিজের উদ্যোগে নিজের ভুল সংশোধন করে। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বলে যে আদৌ কিছু নেই, তা নাগরিক ডট নেটের পডকাস্টে এসে পরিষ্কার বলে গিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের প্রাক্তন সিইও জহর সরকার।

বিহারে এই প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই বোঝা গিয়েছিল মতলবখানা কী। অথচ রাষ্ট্রীয় জনতা দল, কংগ্রেস এবং বামপন্থীরা সেই প্রক্রিয়া মেনে নিয়েই নির্বাচনে লড়লেন। বোধহয় ভেবেছিলেন এত মানুষ নীতীশ কুমারের সরকারের উপর খাপ্পা যে যত ভোটারই বাদ যাক, ঠিক জিতে যাবেন। তা যখন হল না এবং অপ্রত্যাশিত বড় ব্যবধানে হার হল, তখন বিস্তর গণ্ডগোল আছে বলে অভিযোগ জানিয়েও দু-একবার মৃদু প্রতিবাদ করে বাধ্য ছেলেমেয়েদের মত তাঁরা বিধানসভায় গিয়ে বসে পড়লেন। কোথাও কোনো আন্দোলন, অবরোধ কিছু দেখা গেল না। যে রাহুল গান্ধী ভোট চুরি ধরে ফেলেছেন বলে কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্র নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এ বোমা সে বোমা ফাটানো সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন, তিনিও চুপসে গেলেন। সেই যে চুপ করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে কোটিখানেক মানুষের ভোটাধিকার হরণ নিয়ে আজ পর্যন্ত এক লাইন সোশাল মিডিয়া পোস্টও করে উঠতে পারেননি। তাহলে তো ধরে নিতে হবে, কর্ণাটক আর মহারাষ্ট্রের ভোট চুরি নিয়ে তাঁর ভাবনা আছে, কারণ সেখানে তাঁর দল জেতার অবস্থায় থাকে। পশ্চিমবঙ্গে খুব ভালো ফল করলেও যেহেতু কংগ্রেস গোটা পাঁচেকের বেশি আসন জিতবে না, সেহেতু এ রাজ্যের লোক বাঁচুক, মরুক বা ডিটেনশন ক্যাম্পে যাক, তাঁর কিছু এসে যায় না। মহব্বতের দোকান দেখা যাচ্ছে খুবই ছোট।

তৃণমূল কংগ্রেস যে মতলবটা প্রথমে ধরতে পারেনি তা পরিষ্কার। ভেবেছিল তাদের সাংগঠনিক জোর দিয়ে ভোটার বাদ দেওয়া সামলে নেবে। তাই মোড়ে মোড়ে ভোটার সহায়তা কেন্দ্র খুলে বসে এসআইআরে সাহায্য করেছে। সিপিএমের পলিট বুরো যতই প্রথম থেকে এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করুক, বঙ্গীয় নেতা ও কর্মীরা ভেবেছিলেন এতে তৃণমূলের ভুয়ো ভোটার বাদ যাবে। তাই তাঁরাও মহা উৎসাহে এই কর্মযজ্ঞের আগুনে ঘি ঢেলেছিলেন, ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ ঢুকে পড়ার পর থেকে ঢোঁক গিলে প্রতিবাদ করছেন। এখনো ভাঙবেন তবু মচকাবেন না, বলে যাচ্ছেন ওই জিনিসটা না থাকলেই ভালো এসআইআর হত। অথচ বিহারে ওটা না থেকেও প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার কাজটা হয়েছিল।

যা-ই হোক, ভুল মানুষমাত্রেই করে, ফলে মানুষের তৈরি রাজনৈতিক দলও করতেই পারে। কিন্তু ভুল বুঝতে পারার পর, ‘বাদ পড়ে যাওয়া ভোটারদের তালিকায় না ঢোকানো পর্যন্ত ভোট করা চলবে না এবং করলে সে ভোটে অংশগ্রহণ করব না’, একথা তৃণমূল, বামেরা বা কংগ্রেস বলতে পারছে না কেন? সাধারণ বুদ্ধিতে এর উত্তর হল— মমতা ভাবছেন, এসব সত্ত্বেও কোনো মতে জিতে গেলে ক্ষমতায় টিকে যাব। আর বাম, কংগ্রেস শূন্যের গেরো কাটিয়ে গোটা কয়েক বিধায়ক বাগানোর সুযোগ ছাড়তে চায় না। কিন্তু কথা হল, অক্টোপাসের মত যে ফাঁদ পাতা হয়েছে, তাতে ওই আশায় থেকে আর পাঁচটা ভোটের মত প্রচার চালিয়ে যাওয়ার কি কোনো মানে আছে? জিতলেও তো গণতন্ত্রের শবদেহের উপর নৃত্য করেই জেতা হবে।

ছোটবেলায় রান্নাবাটি খেলার সময়ে আমরা ধুলোকেই ভাত হিসাবে প্লেটে নিতাম বটে, তবে মুখ পর্যন্ত তুলে নামিয়ে রাখতাম। খেতাম না কিন্তু।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সবার উপরে জয় শাহ সত্য

আমরা তো ছোটবেলায় শুনতাম যা রাজার নীতি সেটাই নাকি রাজনীতি। সুতরাং রাজা যা করেন সেটাকেই নৈতিক বলে ধরতে হবে। দয়া করে আবার জিজ্ঞেস করে বসবেন না ‘কে রাজা?’

পশ্চিমবঙ্গে অনেকেই সেই শনিবার থেকে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর উপর চটে রয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য— বিজেপির নির্বাচনী প্রচার করতে এসে কেন সেই প্রচারেরই পাশের মঞ্চ থেকে সরকারি কাজ করা হবে? এটা অনৈতিক। এত রাগ করার কোনো মানেই হয় না। আরে বাপু, রাজনীতি কথাটার মধ্যে আগে তো ‘রাজ’, পরে ‘নীতি’। তাছাড়া আমরা তো ছোটবেলায় শুনতাম যা রাজার নীতি সেটাই নাকি রাজনীতি। সুতরাং রাজা যা করেন সেটাকেই নৈতিক বলে ধরতে হবে। দয়া করে আবার জিজ্ঞেস করে বসবেন না ‘কে রাজা?’ যিনি শাসক, তিনিই রাজা। কী বলছেন? ভারত রাজতান্ত্রিক দেশ নয়, গণতান্ত্রিক? হ্যাঁ সে তো বটেই। মোদীজি নিজেই তো বারবার বলেন যে আমরা হলাম পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ, আমাদের গর্ব হওয়া উচিত। ঠিকই বলেন। আমরা তো ভোট দিয়ে রাজা নির্বাচন করি, অতএব আমরা গণতন্ত্র।

এখন কথা হচ্ছে, এত বড় দেশের সবকিছু তো আর একজন রাজার পক্ষে চালানো সম্ভব নয় (এমনিতেই মোদীজি দিনে চার ঘন্টার বেশি ঘুমোন না)। তাই সবকিছুর জন্যে আবার আলাদা করে ছোট ছোট রাজা রাখতে হয়। ক্রিকেটের রাজা হলেন মোদীজির প্রধান মন্ত্রণাদাতা অমিত শাহের সুপুত্র জয় শাহ। ভারতকে বিশ্বগুরু করার যে স্বপ্ন মোদীজি দেখেছিলেন, তা আপাতত হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়েছে বলে আপনারা অনেকে খিল্লি করছেন বটে, কিন্তু সে স্বপ্ন ক্রিকেটবিশ্বে সফল করে ফেলেছেন মোদীজির স্নেহভাজন জয়।

মোদীজির মত পরিশ্রমী মানুষকে ছোট থেকে দেখে বড় হওয়া জয় তাঁকেই যে জীবনের ধ্রুবতারা করেছেন তা একেবারে পদে পদে টের পাওয়া যায়। যেমন ধরুন, মোদীজি যেমন সরকারে আর পার্টিতে তফাত করেননি ব্রিগেডে, জয়ও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলে তফাত করেন না। তিনি এখন আর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কেউ নন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। অথচ ভারত জিতলে তিনি উল্লাস প্রকাশ করেন। ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরে করেছিলেন, কয়েকদিন আগে ভারত কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জেতার পরেও করেছেন। এবারে আরও এক ধাপ এগিয়ে ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব আর কোচ গৌতম গম্ভীরকে সঙ্গে করে ট্রফিসুদ্ধ মন্দিরে নিয়ে গেছেন, পুজো দিয়েছেন। যেন তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের কর্তা নন, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডেরই কর্তা। জয় প্রথম ভারতীয় নন যিনি আইসিসির মাথায় বসেছেন। ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী (তথা প্রভাবশালী) ক্রিকেট বোর্ড হওয়ায়, ভারতীয় বোর্ডের সর্বোচ্চ পদাধিকারীরা অনেকেই পরে আইসিসি প্রধান হয়েছেন। আইসিসির সংবিধান বদল করার আগে সর্বোচ্চ পদ ছিল সভাপতির। বাংলা থেকে জগমোহন ডালমিয়া, মুম্বাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন থেকে শরদ পাওয়ার, বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন থেকে শশাঙ্ক মনোহর সেই দায়িত্ব সামলেছেন। চেন্নাইয়ের এন শ্রীনিবাসন প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন। ওঁদের কাউকেই এই কাণ্ড করতে দেখা যায়নি। যে অস্ট্রেলীয় আর ইংরেজ ক্রিকেট প্রশাসকদের একসময় আইসিসিতে একাধিপত্য ছিল, তাঁদের কাউকেও নিজের দেশের কোনো ট্রফি জয়ে উল্লাস করতে দেখা যায়নি।

যাবেই বা কেন? যাঁর উপরে গোটা পৃথিবীর খেলাটার দায়িত্ব, তিনি কখনো নিজের দেশের সাফল্য নিয়ে মেতে থাকতে পারেন? থাকলে তাঁকে অন্যরা অভিভাবক হিসাবে বিশ্বাস করবে? ব্রিটিশ কিংবদন্তি অ্যাথলিট সেবাস্তিয়ান কো একসময় ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনসের সভাপতি ছিলেন। অলিম্পিকে ব্রিটেনের অ্যাথলিটরা সোনা জিতলে তিনি লাফালাফি করছেন— এমন দৃশ্য কল্পনাও করা যায়নি। অবশ্য ওঁদের জয় কেনই বা অনুসরণ করতে যাবেন মোদীজির মত আদর্শ সামনে থাকতে? মোদীজি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে দিল্লির চেয়ে আমাদের জাতীয় জীবনে যে আমেদাবাদের গুরুত্ব বেড়ে গেছে, সেকথা কে না জানে? অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এলে আমেদাবাদে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হবেই। মার্কিন রাষ্ট্রপতি, জাপানের প্রধানমন্ত্রী, চীনের রাষ্ট্রপতি, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী— তালিকায় কে নেই? পুরনো সর্দার প্যাটেল স্টেডিয়াম ভেঙে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নামাঙ্কিত দেশের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়ামও তৈরি করা হয়েছে আমেদাবাদে, যদিও হালে যশপ্রীত বুমরা-অক্ষর প্যাটেল আসার আগে পর্যন্ত ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে ওই শহরের অবদান শূন্য বললে ভুল বলা হয় না। রঞ্জি সিং থেকে শুরু করে চেতেশ্বর পূজারা, রবীন্দ্র জাদেজা পর্যন্ত যে কজন ভারতীয় ক্রিকেটার গুজরাট রাজ্য থেকে জাতীয় দলে এসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছাপ ফেলেছেন, তাঁরা কেউই আমেদাবাদের ক্রিকেটার নন। ওঁরা খেলতেন সৌরাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের হয়ে। আমেদাবাদ যে ক্রিকেট সংস্থার ঘরের মাঠ, সেই গুজরাট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের দলটা আজ পর্যন্ত রঞ্জি ট্রফি জিতেছে মোটে একবার, তাও মোটে এক দশক আগে, ২০১৬-১৭ মরশুমে। মানে ঐতিহ্য বলতে তেমন কিছুই নেই। সবচেয়ে বড় কথা— আমেদাবাদে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা মুম্বাই, কলকাতা, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, দিল্লির চেয়ে অনেক কম। কলকাতায় এবারের বিশ্বকাপেও ইতালি বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ দেখতে মেলা লোক হয়েছিল, আমেদাবাদে ২০২৩ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ প্রায় ফাঁকা গ্যালারিতে হয়েছে। সেই স্টেডিয়ামের উদ্বোধন আবার ক্রিকেট ম্যাচ দিয়ে হয়নি, হয়েছিল মোদী-ট্রাম্পের যুগ্ম সমাবেশ দিয়ে। সেদিন কিন্তু দর্শকের অভাব হয়নি।
স্পষ্ট বোঝা যায়, জয় মোদীজির যে জীবনাদর্শ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন তা হল— সবার উপরে গুজরাট সত্য তাহার উপরে নাই। এ পথেই তিনি চলতেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সচিব থাকার সময়ে, গোটা ভারত নিয়ে ভাবতেন না।

অতএব আইসিসি কর্তা হয়ে গিয়ে তাঁর ভারত নিয়েই মেতে থাকায় আশ্চর্যের কিছু নেই। বরং এই আচরণ যে রীতিমত প্রশংসনীয়, তা দেশের সংবাদমাধ্যমও মনে করছে। তাই গত শনিবার সিএনবিসি-টিভি১৮ ইন্ডিয়া বিজনেস লিডার অ্যাওয়ার্ডসে তাঁকে ক্রিকেটের প্রতি ব্যতিক্রমী অবদানের জন্য পুরস্কারও দেওয়া হয়েছে। সত্যিই তো! জয়ের আগে কে-ই বা নিজের দায়িত্ব, কর্তব্য, পদমর্যাদার তোয়াক্কা না করে দেশসেবা করতে পেরেছে!

সেবা বলে সেবা? ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড গত রবিবার ভারতের ২০২৬ কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জয়ী পুরুষদের দল এবং ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়ী দল, ২০২৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী ছেলেদের দল, ২০২৫ পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপ জয়ী মহিলাদের দল এবং ২০২৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী মেয়েদের দলকে সংবর্ধনা দিয়েছে। সেখানেও সশরীরে হাজির ছিলেন জয়। বোর্ড সভাপতি মিঠুন মনহাসের চেয়ে তাঁরই ছবি দেখা যাচ্ছে বেশি।

আরও পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে

আবার ভারতের ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠন জয়কে সংবর্ধনা জানিয়েছে। সেখানে তিনি বড় মুখ করে বলেছেন, তিনি নাকি বোর্ডের কর্তা থাকার সময়ে একেবারে ২০২৮ অলিম্পিক পর্যন্ত কী কী করতে হবে তার পরিকল্পনা করে দিয়েছেন। এখন যাঁরা বোর্ড চালাচ্ছেন তাঁদের ২০৩৬ অলিম্পিক পর্যন্ত কীভাবে কী করা হবে তা ছকে ফেলা উচিত। এখানেও জয় অনন্য। অতীতে কোনো ক্রিকেট প্রশাসককে ক্রীড়া সাংবাদিকরা সংবর্ধনা জানিয়েছেন কিনা খুঁজে বের করতে গবেষক লাগবে। প্রশাসকদের সাংবাদিকরা সংবর্ধনা দেবেন কী জন্যে? দিল্লির এডিটর্স গিল্ড কোনোদিন কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে ডেকে সংবর্ধনা দিয়েছে নাকি? দেশ চালানোটাই কি একটা অভিনন্দনযোগ্য কাজ, যার জন্যে প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনা প্রাপ্য? যদি তা না হয়, তাহলে ক্রীড়া সাংবাদিকরাই বা কোন অর্জনের জন্যে জয়কে সংবর্ধনা দিলেন? ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাফল্যের জন্যে নাকি? তাহলে তো ক্রিকেটারদের সংবর্ধনা দেওয়া উচিত ছিল। বড় জোর বোর্ড সভাপতি বা সচিবদের। আইসিসি চেয়ারম্যানকে যদি ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা ভারতীয় ক্রিকেটের সাফল্যের জন্যে সংবর্ধনা দেন, তাহলে তো…
যাকগে, অমৃতকালের ভারতে সবই সম্ভব। “পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ” গেয়ে খেলতে নামা হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পারসিকদের ক্রিকেট দল বিশ্বকাপ জেতার পর সেই ট্রফি নিয়ে যদি হিন্দু অধিনায়ক, কোচ আর জয় শাহ দেশের মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে বেড়ালে দোষ না হয়, তাহলে সাংবাদিকরা প্রশাসকদের প্রশ্ন করার কর্তব্য ভুলে তাঁদের সংবর্ধনা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও দোষ হয় না। শেষে “জয় জয় জয় জয় হে” গেয়ে নিলেই সাত খুন মাপ।

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

রাষ্ট্রীয় ক্রিকেট-সেবক সংঘ

দেশের আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মত জাতীয় ক্রিকেট দলগুলোও এখন বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা, যার সদর দফতর আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেট স্টেডিয়াম।

সূর্যকুমার যাদবের প্রতিযোগী বেড়ে গেল সম্ভবত। ভবিষ্যতে বিজেপির টিকিটে সাংসদ বা বিধায়ক হওয়ার দৌড়ে ঢুকে পড়লেন হরমনপ্রীত কৌরও। ভারত আর শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে মেয়েদের ৫০ ওভারের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ হচ্ছে এবারে। যদি প্রবল পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়া আর শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বাধা টপকে হরমনপ্রীতরা বিশ্বকাপটা জিতে ফেলতে পারেন, তাহলে বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাঁদের দলকে নিয়ে নির্ঘাত দেশজুড়ে বিপুল প্রচার করা হবে। পোস্টারে অপারেশন সিঁদুরের সময়ে যাঁদের সামনে আনা হয়েছিল, সেই কর্নেল সোফিয়া কুরেশি আর উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিংয়ের পাশেও বসিয়ে দেওয়া হতে পারে অধিনায়িকাকে। পাকিস্তানকে হারানো আর পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে করমর্দন না করা – দুটো কাজই করে ফেলেছেন হরমনপ্রীত, স্মৃতি মান্ধনা, দীপ্তি শর্মা, জেমিমা রডরিগসরা। এবার যেনতেনপ্রকারেণ বিহার বিধানসভা করায়ত্ত করার লড়াইয়ে নরেন্দ্র মোদীর দলকে সঙ্গ দিলেই নানাবিধ উপঢৌকন বাঁধা। পহলগামে যে পর্যটকরা খুন হয়েছিলেন তাঁদের হত্যাকারীদের শাস্তি প্রদান (যা ২০০৮ সালের মুম্বাই সন্ত্রাসবাদী হানার বেলায় আজমল কাসভ ও তার সঙ্গীদের ক্ষেত্রে হয়েছিল) দূর অস্ত, অপারেশন সিঁদুরে দেশ ঠিক কতটা লাভবান হয়েছে সেটাই এখনো ঠিক করে বলে উঠতে পারল না মোদী সরকার। চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ সেইসময় বলে ফেলেছিলেন আমাদের ক্ষতি হয়েছে, আবার এখন সেনাবাহিনির প্রধান বলছেন ওসব নাকি ছেলে-ভোলানো গল্প। মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারবার বলেন অপারেশন সিঁদুর থেমেছিল তাঁর কথায়, ভারত সরকার প্রতিবাদ করে না। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তো স্পিকটি নট, অন্য মন্ত্রীরা এবং তাঁর দলের মেজ সেজ রাঙা নেতারা বাহারি শব্দে ঢেকেঢুকে বলেন – যখন যুদ্ধ থামে তখন নাকি ভারতই জিতছিল। তাহলে যুদ্ধ থামল কেন, কে থামাল – এসবের আজও উত্তর নেই। ফলে মোদীজির লৌহপুরুষ ভাবমূর্তি ধাক্কা খাচ্ছে স্পষ্টতই। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত রাহুল গান্ধী ভোট চুরির অভিযোগ তুলে, রীতিমত কাগজপত্তর দেখিয়ে পরিস্থিতি ঘোরালো করে তুলেছেন। কিন্তু ভোটে যে জিততেই হবে শতবর্ষে পা দেওয়া রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের রোজগেরে সন্তান বিজেপিকে। অতএব ক্রিকেটের ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে ফেলো যাবতীয় সরকারি অকর্মণ্যতা।

আজকের ভারতের জনতার আফিম হল ক্রিকেট, তাই ওই খেলার দলকেই হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা দরকার। সুতরাং পুরুষদের এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে টিভি থেকে আয় হওয়া কোটি কোটি টাকা নিশ্চিত করাও চাই; আবার ম্যাচের শেষে করমর্দন না করে, অধিনায়ককে দিয়ে গরম গরম কথা বলিয়ে ভোটের প্রচার করাও চাই। তাতেও চিত্রনাট্য যথেষ্ট নাটকীয় হল না মনে করে ট্রফি হাতে তুলে দেবেন কে, তা নিয়েও গা জোয়ারি করা হল। কেবল বিহার নির্বাচনে জেতার জন্যে এতসব কাণ্ড করে এখন ফাটা বাঁশের মধ্যে পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) কর্মকর্তা তথা পাক মন্ত্রী বলছেন, তোমাদের ট্রফি দেওয়ার জন্যে তো মঞ্চ সাজিয়ে বসাই হয়েছিল। নাওনি কেন? অফিসে রাখা আছে, এসে নিয়ে যাও।

এদিকে এখন সে কাজ করলে ধরা পড়ে যায় যে অকারণে ধুলো ওড়ানো হয়েছিল। সত্যিই তো! এসিসি সভাপতি হিসাবে বিজয়ী দলের হাতে ট্রফিটা যে মহসীন নকভিই তুলে দেবেন তা তো প্রতিযোগিতার আগে থেকেই ঠিক ছিল। ভারতীয় দল জানত না? ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত রাম শ্যাম যদু মধু সকলেই, এমনকি বোর্ডের গোদি মিডিয়ার সাংবাদিকরাও, সগর্বে বলে থাকেন যে কেবল এশিয়া নয়, গোটা বিশ্বের ক্রিকেটকে নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই)। তাদের এটুকু ক্ষমতা নেই যে কোনো পাকিস্তানির এসিসি সভাপতি হওয়া আটকায়? আগে থাকতে সে কাজটা করলেই তো আর অপছন্দের লোকের হাত থেকে ট্রফি নেওয়ার ব্যাপার থাকত না। নাকি তখন বোঝা যায়নি যে অপারেশন সিঁদুর সম্বন্ধে যাবতীয় প্রচার মুখ থুবড়ে পড়বে এবং ক্রিকেট দলকে কাজে লাগাতে হবে ভোটারদের পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা চাগিয়ে তুলে ভোটে জিততে? ব্যাপারটা কি এরকম, যে বিশ্ব ক্রিকেটের ভাগ্যনিয়ন্তা জয় শাহের বাবা অমিত শাহ আর নরেনজেঠু ভেবেছিলেন লোকে পুলওয়ামার মত পহলগামও ভুলে যাবে শিগগির, তারপর আবিষ্কার করলেন – নিজেদের একনিষ্ঠ ভক্তরাও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলা বয়কট করা হচ্ছে না বলে খচে বোম? এমতাবস্থায় নিজেদের খাসতালুক হিন্দি বলয়ের অন্যতম বৃহৎ রাজ্য বিহারে ভোট। বল মা তারা দাঁড়াই কোথা!

পাকিস্তানের দিকে কথায় কথায় আঙুল তুলে এতদিন পরম সন্তোষে দেশের মানুষকে নিজেদের কুকীর্তি ভুলিয়ে রেখেছেন। সেটাই যে কাল হয়ে দাঁড়াবে তা মোদী-শাহ কী করেই বা জানবেন? ফ্যাসিবাদীরা কবে আর নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়? অবস্থা সামলাতে ১৪ সেপ্টেম্বর সূর্যকুমারের দলকে দিয়ে ম্যাচের পর করমর্দন না করার নাটক করানো হল পৃথিবীর সমস্ত খেলার সমস্ত আদবকায়দা শিকেয় তুলে দিয়ে। ক্রিকেট দলের কাছ থেকে যদি এটুকু সেবা না পাওয়া যায়, তাহলে আর ক্ষমতায় আসার পর থেকে ক্রমশ ক্রিকেট বোর্ডের দখল নেওয়া, প্রাক্তন ও বর্তমান ক্রিকেটারদের রামমন্দিরের উদ্বোধনে নেমন্তন্ন করা, কৃষক আন্দোলনের বিরুদ্ধে বা মোদীজির জন্মদিন উপলক্ষে তাঁদের দিয়ে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করানো, নিজেদের দলের প্রাক্তন সাংসদ গৌতম গম্ভীরকে দলের কোচ বানানো – এসব করা কেন? এত কাজ থোড়াই ক্রিকেটের স্বার্থে করা হয়েছে। তবে ব্যাপারটা সেখানেও থামেনি। সাংবাদিক সম্মেলনে এসে ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার লম্বা চওড়া বক্তৃতা দিলেন। পহলগামে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছেন, অপারেশন সিঁদুরে যুক্ত সেনাবাহিনির জওয়ানদের উদ্দেশে জয় উৎসর্গ করছেন, নিজের পারিশ্রমিক পর্যন্ত কৃতজ্ঞতা হিসাবে তাঁদের দিয়ে দেবেন ইত্যাদি।

চট করে শুনতে চমৎকার লাগে। খেলার ময়দানে কতখানি রাজনীতি ঢুকতে পারে বা ঢোকা উচিত তা নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে যদি ধরেও নিই সূর্য যা বলেছেন বেশ করেছেন (আইসিসির ম্যাচ রেফারি রিচি রিচার্ডসন অবশ্য তা ভাবেননি, বরং আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ৩০% ম্যাচ ফি জরিমানা করেছেন), তাহলেও কথাগুলো নিয়ে তলিয়ে ভাবতে গেলে ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া কিছু মনে হবে না। পহলগামে মৃত মানুষজনের পরিবারের পাশে থাকতে গেলে তো সরকারকে প্রশ্ন করতে হবে – পহলগামের আততায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? সূর্যকুমারের ঘাড়ে কটা মাথা যে সে প্রশ্ন করবেন? গত ২৯ জুলাই সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন বটে, চারজন সন্ত্রাসবাদীর তিনজন সেনাবাহিনির সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে। কিন্তু চতুর্থ জনকে কি মহামতি ভারত সরকার ক্ষমা করে দিয়েছেন? তাকে নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই কেন? যে তিনজন মরেছে তারা আবার পকেটে পাকিস্তানি পরিচয়পত্র এবং পাকিস্তানি চকলেট নিয়ে ঘুরছিল। এমন সুবোধ বালক সন্ত্রাসবাদীদের কেন জীবন্ত অবস্থায় হিড়হিড় করে টানতে টানতে আদালতে, নিদেন জনসমক্ষে, নিয়ে আসা গেল না – সে প্রশ্নও সূর্যকুমার করে উঠতে পারবেন না। সেপ্টেম্বর মাসের ক্রিকেট ম্যাচে মে মাসের অপারেশনে অংশ নেওয়া সেনাবাহিনিকে টেনে আনার যে কী মানে তাও বোঝা শক্ত। পুরোদস্তুর যুদ্ধ হয়নি, সাময়িক সংঘর্ষ কয়েকদিনের মধ্যে থেমেও গিয়েছিল। তার জন্যে এতদিন পরে সেনাবাহিনিকে সম্মান জানানো! ১৯৯৯ সালে যখন বিশ্বকাপে ম্যানচেস্টারে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হয়, তখন কিন্তু কার্গিলে যুদ্ধ চলছিল। ভারতে তখনো বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার, প্রধানমন্ত্রীর নাম অটলবিহারী বাজপেয়ী। সে ম্যাচ নিয়েও দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছিল, খেলার মধ্যেও উত্তেজনার অভাব হয়নি। তবে ম্যাচের পর আলাদা করে নাটক করার দরকার হয়নি। ভারত কিন্তু সে ম্যাচও জিতেছিল। অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিন গুরুত্বপূর্ণ ৫৯ রান করেন, ভেঙ্কটেশ প্রসাদ পাঁচ উইকেট নেন।

আসলে তখন সরকার দেশ চালাত, ক্রিকেট চালাত ক্রিকেট বোর্ড। এখন দুটোই চালায় বিজেপি। ফলে বিজেপির নীতিই ক্রিকেট দলের নীতি। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে যুদ্ধের চেহারা দেওয়ার নীতি তারা এই এশিয়া কাপে প্রথম নিল তা নয়। ২০২৩ সালে ভারতে আয়োজিত পুরুষদের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপেই এই পরিকল্পনা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। যাঁরা চোখ বন্ধ করেছিলেন, তাঁরা দেখতে পাননি। সেই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হল না, দুই ইনিংসের মাঝে মোচ্ছব হল আমেদাবাদে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে। যেন বিশ্বকাপটা গৌণ, আসল হল ভারত-পাক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। বহুদিন ধরে ক্রিকেট মাঠকে বিদ্বেষ ছড়ানোর কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল সেই বিরাট কোহলির আমলে। ২০১৯ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর দল একদিনের ম্যাচ খেলতে নামেন টিম ক্যাপের বদলে সেনাবাহিনির ক্যামোফ্লাজ ক্যাপ পরে। কেন? না পুলওয়ামার শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো দরকার ছিল। সে এমন শ্রদ্ধা, যে ক্যাপ থেকে নাইকির লোগোটা বাদ দেওয়া হয়নি। সন্ত্রাসবাদী হানায় নিহত মানুষের স্মৃতি নিয়ে এমন নির্লজ্জ বেওসার দৃষ্টান্ত মেলা ভার। কিন্তু ততদিনে আমরা এমন অনুভূতিশূন্য নির্বোধের দেশে পরিণত হয়েছি, যে কারোর আচরণটা অন্যায় মনে হয়নি। জাতীয় দলের সামরিকীকরণ তখনই হয়ে গিয়েছিল। ম্যাচটা পাকিস্তানের সঙ্গে ছিল না বলেই করমর্দন না করার নাটকটা সেদিন করা হয়নি। তবে তখনো কিন্তু অনতিদূরে ছিল লোকসভা নির্বাচন। আজ অন্তত কারোর বুঝতে না পারার কথা নয়, যে সেদিন ভারতীয় দল আসলে বিজেপির নির্বাচনী প্রচার সারছিল। এবারেও তাই করছে।

কাজটা শুরু করা হল সূর্যকুমারদের দিয়ে, এখন হরমনপ্রীতদেরও নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্রিকেট খেলায় ভারতের টাকার গরম এতটাই যে এসব করে যাওয়া যাচ্ছে। অন্য কোনো খেলায় কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই ধাষ্টামো চলতে দেওয়া হয় না। ২১ সেপ্টেম্বর, যেদিন সূর্যকুমাররা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার খেললেন এশিয়া কাপে, কাঠমান্ডুতে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলে ভারত বনাম পাকিস্তানের খেলা ছিল। সেই ম্যাচ ভারত ৩-০ জেতে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দন করেই মাঠ ছাড়ে। কারণ ফিফার সঙ্গে আইসিসির তফাত আকাশের সূর্য আর বিজেপি সাংসদ তেজস্বী সূর্যের মত। ফুটবলে খেলার মাঠের নিয়ম না মানলে সরাসরি সাসপেন্ড করে দেওয়া হতে পারে। যথার্থ দেশপ্রেম থাকলে সেই ঝুঁকি নেওয়া উচিত। বিজেপি নেতা কল্যাণ চৌবের নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন যে সে ঝুঁকি নেয়নি, তাতেই প্রমাণ হয় যে দেশপ্রেম-টেম বাজে কথা। আসলে এরা শক্তের ভক্ত, নরমের যম। উপরন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে গোটা নাটকটাই নির্বাচনমুখী। বিহার কেন, ভারতের কোনো রাজ্যের ভোটারেরই অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবল নিয়ে মাথাব্যথা নেই। অতএব ওখানে দেশপ্রেম দেখানোর আয়োজন নেই। নিজেরাই অশান্তি শুরু করে খেলার পরিবেশ নষ্ট করে দেওয়ার পর পাক ক্রিকেটাররা অসভ্যতা করলে হাত-পা ছুড়ে কান্নাকাটি করার ব্যাপার নেই। কার হাত থেকে পুরস্কার নেব সেটা ঠিক করতে চাওয়ার অন্যায় আবদারও নেই। খেতাব জিতলে প্রধানমন্ত্রী সোশাল মিডিয়ায় জ্বালাময়ী পোস্টও করবেন না, অধিনায়কও বলবেন না – সিঁদুর-স্পন্দিত ব্যাটে, মনে হয় আমিই পিএম।

আরও পড়ুন অপমানে হতে হবে মহম্মদ শামির সমান

রাজনৈতিক কারণে বহু খেলাতেই এক দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশ খেলতে চায় না। যেমন এই মুহূর্তে পৃথিবীর বহু দেশ দাবি করছে, আগামী বছরের ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে যেন ইজরায়েলকে বাদ দেওয়া হয় গাজায় গণহত্যা চালানোর অপরাধে। ফিফা সভাপতি অবশ্য বলে দিয়েছেন, তাঁরা এ দাবি মানবেন না। না মানলে এবং ইজরায়েল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলে, কোনো দেশ তাদের বিরুদ্ধে না খেলার সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। তাতে তাদের পয়েন্ট কাটা যাবে। নীতিগত অবস্থান নিতে হলে এই ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ক্রিকেটেই এমন দৃষ্টান্ত আছে। ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড জিম্বাবোয়েতে খেলতে যায়নি রবার্ট মুগাবের বর্ণবিদ্বেষী শাসনের প্রতিবাদে, নিউজিল্যান্ড কেনিয়ায় খেলতে যায়নি নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে আবার অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় খেলতে যায়নি সন্ত্রাসবাদী হানার আশঙ্কায়। সব ক্ষেত্রেই যে দেশ খেলতে যায়নি, তাদের পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী দেশ মনে করলে বা তাদের ক্রিকেটারদের সন্ত্রাসবাদী মনে করলে ভারতের সম্পূর্ণ অধিকার আছে তাদের সঙ্গে না খেলার। কিন্তু ভারত সরকারের সমার্থক আজকের ক্রিকেট বোর্ডের এই ‘গাছেরও খাব, তলারও কুড়োব’ মানসিকতা আর যা-ই হোক জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা হলে যে বিপুল পরিমাণ টাকা আয় হয় বিজ্ঞাপন বাবদ – তার লোভ বিসিসিআই ছাড়তে রাজি নয়। তাই ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলেন কেন’ জিজ্ঞেস করলেই বোর্ড কর্তা তথা বিজেপি নেতারা আমতা আমতা করতে থাকেন। ওদিকে নিজেদের উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখাতে, ভোটারদের ‘বিকাশ’ ভুলিয়ে পাকিস্তান আর মুসলমানে ব্যস্ত রাখতে খেলাটাও আর খেলার নিয়মে হতে দিচ্ছেন না।

দেশের আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মত জাতীয় ক্রিকেট দলগুলোও এখন বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা, যার সদর দফতর আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেট স্টেডিয়াম। নইলে প্রত্যেকবার মাঠে মাছি তাড়ানোর লোক কম পড়লেও বারবার ওখানেই টেস্ট ম্যাচ হয়, আর ২০০১ সালের পর থেকে ইডেন উদ্যানে ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট দেওয়া যায় না কেন?

সুনীল গাভস্কর, শচীন তেন্ডুলকরের মত মহীরুহ আগেই সংঘের কাছে নাকখত দিয়েছেন। সেখানে সূর্যকুমারের আর কী-ই বা ইয়ে বলুন? যে দেশে মনসুর আলি খান পতৌদির মত নেতার ইতিহাস মুছে ফেলা হয় আর বর্তমান ও প্রাক্তন ক্রিকেটাররা ইনিয়ে বিনিয়ে সেই সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ান, সে দেশের ক্রিকেট দলের সূর্যকুমারের মত মোসাহেব নেতাই প্রাপ্য।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বিধবা, পিতৃহীন শিশু – সকলকে জবাব দিতে হবে সেকুলারদের

যদি এই লেখায় তথ্যের গুরুতর ভ্রান্তি বা সত্যের অপলাপ আছে বলে মনে হয়, তার জন্যে নিবন্ধকার দায়ী নন। কারণ সব সত্যি লেখা লেখকের পক্ষে বিপজ্জনক

কাশ্মীরের পহলগামে মঙ্গলবারের ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী হানার পরে দুদিন হতে চলল। এখনো প্রধানমন্ত্রী রাহুল গান্ধী সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারলেন না সরকার এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে। অবশ্য একটি জনসভায় তিনি বলেছেন যে সন্ত্রাসবাদীদের কড়া জবাব দেওয়া হবে, তারা যা করেছে তার বহুগুণ তীব্র জবাব তারা ফেরত পাবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধীদের দাবি মেনে এই ইস্যুতে যে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা হয়েছিল নিউ দিল্লিতে, সেই বৈঠকে রাহুল উপস্থিত ছিলেন না। এমনি এমনি তো আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা রাজনীতিকে তিনি সত্যিই কতখানি গুরুত্ব দেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। এই সেদিন সৌদি আরব থেকে ফিরলেন, আবার হয়ত কয়েকদিন পরেই দেখা যাবে অন্য কোনো দেশে চলে গেছেন।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অখিলেশ যাদব এই ঘটনায় নিজের মন্ত্রকের ব্যর্থতা নিয়ে একটি কথাও বলেননি। অথচ অন্য অনেক ব্যাপারেই তিনি সদা সরব। যখনই আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া আদালতের নির্দেশে কোনো মসজিদের নিচে কী ছিল তা জানার জন্যে খোঁড়াখুঁড়ি করতে যায়, তখন অখিলেশ এবং তাঁর দল সমাজবাদী পার্টির অন্যান্য নেতারা তাতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে বিপুল অশান্তি সৃষ্টি হয়। অথচ দেশের নিরীহ, নিরস্ত্র নাগরিকদের উপরে এই ভয়াবহ হামলার পরে অখিলেশ চুপ। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর নোটবন্দির পর, ২০১৯ সালের ৫ অগাস্ট সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বিলোপ এবং জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার পর রাহুল-অখিলেশের সরকার বলেছিল – কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদের কোমর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আর কোনোদিন সন্ত্রাসবাদীরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। সেক্ষেত্রে পৃথিবীর সর্বাধিক সেনা মোতায়েন থাকা অঞ্চলে এই ঘটনা ঘটল কী করে – সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর অখিলেশ এখন পর্যন্ত দিতে পারেননি। কাশ্মীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি যে বৈঠক করেছেন তাতে আবার মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাকে ডাকা হয়নি। এর কারণ কী? ভবিষ্যতে এরকম কোনো ঘটনা ঘটলে ওমর যাতে নিজের দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন, অখিলেশ কি সেই ব্যবস্থা করছেন? ইন্ডিয়া জোটের শরিকের স্বার্থরক্ষা করতে তিনি কি দেশের সাধারণ নাগরিকদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন না?

ভারতের সেকুলার নেতাদের এইসব আচরণের মাশুল অতীতেও হিন্দুদের দিতে হয়েছে, এভাবে চললে ভবিষ্যতেও দিতে হবে। এই সেকুলার সরকারের আমলে একটার পর একটা ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনা ঘটেই চলেছে, অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে অখিলেশের স্থান নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলছে না। অথচ ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ের ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হানার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিবরাজ পাতিল পদত্যাগ করেছিলেন। এই সরকারের আমলে বারবার ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীরা ভারতের উপর হামলা চালাচ্ছে, বিশেষত কাশ্মীরে। ২০১৬ সালের ২-৫ জানুয়ারি পাঞ্জাবের পাঠানকোটে ভারতীয় বায়ুসেনার ছাউনিতে জৈশ-ই-মহম্মদের সন্ত্রাসবাদীরা হানা দেয়। তিনদিন লেগেছিল চারজন সন্ত্রাসবাদীকে হত্যা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে। রাহুল আর অখিলেশের সরকার সেই ঘটনার কড়া জবাব দেওয়ার বদলে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটায়। পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলকে পাঠানকোটের সেনা ছাউনিতে গিয়ে ঘটনা সম্পর্কে সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করার অধিকার দেওয়া হয়। পাকিস্তান যে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিল ২৯ মার্চ, তাতে কুখ্যাত পাক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের এক সদস্যও ছিলেন। পাঠানকোটে ওই হামলার সপ্তাহখানেক আগেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাহুল আচমকা পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নাতনির বিয়েতে গিয়ে হাজির হন। সেইসময় সরকার পক্ষ এই পদক্ষেপকে একজন সত্যিকারের রাষ্ট্রনেতার ব্যবহার বলে প্রশংসা করেছিল। ওই ব্যবহারের কী প্রতিদান দিয়েছিল পাকিস্তান? এক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের মাটিতে পুষ্ট জঙ্গি সংগঠন ভারতের সেনা ছাউনি আক্রমণ করে এবং তাদের সঙ্গে লড়াইয়ে সাতজন ভারতীয় জওয়ানের প্রাণ যায়।

সেবছরের ১৮ সেপ্টেম্বর উরিতে হামলা চালিয়ে ১৯ জন ভারতীয় সৈনিককে হত্যা করে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীরা। তার জবাব হিসাবে ২৯ সেপ্টেম্বর নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’ করে ভারতীয় সেনাবাহিনি।

তবে এসবের চেয়ে অনেক বড় আঘাত ছিল ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামার ঘটনা। আড়াই হাজার সিআরপিএফ জওয়ানকে নিয়ে জম্মু-শ্রীনগর হাইওয়ে দিয়ে যাচ্ছিল ৭৮ খানা বাসের লম্বা কনভয়। পুলওয়ামা জেলার লেথাপোরার কাছে এক আত্মঘাতী জঙ্গি, পরে যাকে চিহ্নিত করা হয় আদিল আহমেদ দার বলে, সে ৩৫০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরকে ঠাসা গাড়ি নিয়ে ওই কনভয়ের একটি বাসে ভিড়িয়ে দেয়। ফলে ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ানের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার প্রত্যাঘাত হিসাবে ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের বালাকোটে বোম ফেলা হয়। কিন্তু ওই বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক নিয়ে একটি গাড়ি কী করে সশস্ত্র বাহিনির কনভয়ের কাছে পৌঁছতে পারল, সে প্রশ্নের জবাব আজ পর্যন্ত রাহুল-অখিলেশের সরকার দিতে পারেনি। এই ঘটনার কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পর্যন্ত হয়েছে বলে খবর নেই। দাভিন্দর সিং নামে জম্মু-কাশ্মীর পুলিসের এক ডিএসপিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল ২০২০ সালের ১১ জানুয়ারি। তাঁর বিরুদ্ধে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ), ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর চেষ্টা এবং অন্যান্য অভিযোগে ইউএপিএ আইনে মামলা দায়ের করে। তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্তও করা হয়। তিনি এই মুহূর্তে এনআইএ-র দায়ের করা মামলায় বিচারবিভাগীয় হেফাজতে আছেন বটে, কিন্তু দুটি মামলার একটিতে জামিন হয়ে বসে আছে, অন্য মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। পুলওয়ামার ঘটনায় আর একটিও গ্রেফতার হয়নি।

এদিকে পহলগামের ঘটনার পরে এই সরকারের দীর্ঘদিনের গুণমুগ্ধ প্রাক্তন সেনাকর্তা মেজর জেনারেল জি ডি বক্সী রিপাবলিক টিভিতে বসে প্রধানমন্ত্রীর ভক্ত সাংবাদিক অর্ণব গোস্বামীর মুখের উপর বলে দিয়েছেন, কোভিডের সময়ে নাকি তিন বছর ধরে সেনাবাহিনিতে কোনো নিয়োগ হয়নি। টাকা বাঁচানোর জন্যে ভারতীয় সেনার সংখ্যা ১,৮০,০০০ কমিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে আগে যতজন সেনা কাশ্মীরে একটা সেক্টরে নজরদারি করত, এখন ততজনকেই দুটো সেক্টরে নজরদারি করতে হচ্ছে। এই তথ্য সত্য না মিথ্যা তা আমরা জানি না, কিন্তু এই বক্তব্যকে খণ্ডন করে এখন পর্যন্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রী তেজস্বী যাদব কোনো বিবৃতি দেননি।

পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং বাংলার সংবাদমাধ্যম আশ্চর্যভাবে সেকুলার সরকারের অযোগ্যতা সম্পর্কে একটি কথাও বলছে না। দেশের অন্য ভাষার মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলিও প্রায় রাহুল-অখিলেশের সরকারের গেলানো ভাষ্যই উগরে যাচ্ছে। তবে অন্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তফাত হল, যদি অন্য রাজ্যগুলির দিকে তাকাই তাহলে দেখব, ক্ষমতাসীন সেকুলার দলগুলির নেতারা যেখানেই পহলগামে নিহত মানুষদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন, সেখানেই ক্ষোভের সম্মুখীন হচ্ছেন। একটি ছয় বছরের শিশু, যে বাবাকে হারিয়েছে, সে-ও সটান টিভি ক্যামেরার সামনে বলে দিচ্ছে – সরকার কিছুই জানে না, সরকার প্রায় অস্তিত্বহীন। বড়দের উদাহরণও দেখে নিন নিচের লিংকগুলিতে

অন্যদিকে কাশ্মীর থেকে যে হিন্দু পর্যটকরা বেঁচে ফিরেছেন তাঁদের দিয়ে কাশ্মীরি মুসলমানদের সম্পর্কে খারাপ কথা বলাতে ঘাম ছুটে যাচ্ছে অমিশ দেবগনের মত সরকারপন্থী সাংবাদিকদের।

বহু হিন্দু পর্যটক তো রীতিমত সোশাল মিডিয়ায় ভিডিও আপলোড করে জানাচ্ছেন, কাশ্মীরিরা তাঁদের সঙ্গে কত ভাল ব্যবহার করেছেন।

অনেকেই মিডিয়ার সামনেও একই বয়ান দিচ্ছেন।

এই প্রবণতা বিপজ্জনক, কারণ এ থেকে মনে হচ্ছে, রাহুল-অখিলেশ-তেজস্বী প্রমুখের অপদার্থতা সত্যেও সেকুলারিজমের ভূত এই লোকগুলির মাথাতেও ঢুকে যাচ্ছে। চোখের সামনে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের নগ্ন রূপ দেখার পরেও, সন্ত্রাসবাদীরা বেছে বেছে হিন্দুদের খুন করেছে জানার পরেও।

আরও পড়ুন বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে ইমাম রশিদি

এই যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ভারতের হচ্ছে, এর দায় কেবল সেকুলার নেতাদের নয়, দলবিহীন সেকুলার ব্যক্তিদেরও নিতে হবে। সেই ২০১৪ সাল থেকে যতগুলি সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে এদেশে এবং তাতে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে – সবকিছুর দায় এই সেকুলারদের। এদের জন্যেই আজ ভারতে কোনো শক্তিশালী সরকার নেই। থাকলে এভাবে বারবার দেশের মানুষকে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীদের হাতে অসহায়ভাবে প্রাণ দিতে হত না। ওই ছয় বছরের পিতৃহারা ছেলেটির সামনেও এদের জবাব দিতে হবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

কুণাল, যাঁর কৌতুক আজ কামড়ায়

‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’

গাম্ভীর্য নির্বোধের মুখোশ। কথাটা অনেককাল আগে বলেছিলেন এক মাস্টারমশাই। মোটেই বিশ্বাস করিনি, কারণ ততদিনে একাধিক জায়গা থেকে জেনেছি যে রাজশেখর বসু অত সরস সব গল্প লিখলেও, খুব গম্ভীর মানুষ ছিলেন। তারাপদ রায়ের সঙ্গে আলাপ ছিল এরকম একজনের মুখ থেকেও একইরকম কথা শুনেছিলাম। কিন্তু মাস্টারমশাই যে নেহাত ভুল বলেননি তার প্রমাণ গত কয়েক দিনে পাওয়া গেছে। ঋজু বিদূষক কুণাল কামরার কমেডি শো যে হলে হয়েছিল, মুম্বইয়ের সেই দ্য হ্যাবিট্যাট -এর মালিক আর কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করলে তাঁরা নির্ঘাত বলবেন – হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেছে। তবে নির্বোধ মানেই কিন্তু নিরীহ নয়। সুকুমার রায়ের রামগরুড়ের ছানাদের হাসতে মানা; একনাথ শিন্ডে, দেবেন্দ্র ফড়নবীশের দলবল আরও এককাঠি সরেস। তারা নিজেরা না হেসেই খুশি নয়, অন্যদেরও হাসতে মানা করে ভাংচুর করে।

অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। হাসাহাসি করলে ফ্যাসিবাদী হওয়া যায় না। তাছাড়া শিবসেনার জন্মই হয়েছিল ঠ্যাঙাড়ে বাহিনি হিসাবে, মুম্বই ও সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে ভাঙার জন্যে (দুর্জনে বলে কংগ্রেসের উদ্যোগে)। কুণাল কামরার কমেডি শো নিয়ে শিবসেনার গুন্ডামি দেখে অনেকে খেয়াল করিয়ে দিচ্ছেন, শিবসেনার আদিপুরুষ বালাসাহেব ঠাকরে নিজে কার্টুনিস্ট ছিলেন, ইন্দিরা গান্ধীর ব্যঙ্গচিত্রও এঁকেছেন ইত্যাদি। কিন্তু ওসব কথা বলে লাভ নেই। বাল ঠাকরে শিবসেনার নেতা হিসাবে মোটেই কোনো গণতান্ত্রিক ব্যক্তি ছিলেন না। শিবসেনা কীভাবে মুম্বই চালাত সেকথা সে যুগের মুম্বই তথা মহারাষ্ট্রের বাসিন্দারা প্রত্যেকেই জানেন। নয়ের দশকের মুম্বই দাঙ্গায় শিবসেনার ভূমিকাও কোনো গোপন তথ্য নয়। আজ যে সারা ভারতে সুনির্দিষ্ট পরধর্মবিদ্বেষী এবং/অথবা পরজাতিবিদ্বেষী গুন্ডামি চালু করেছে সংঘ পরিবার, তার সূচনা অনেক আগেই বালাসাহেব করে দিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রে। মুসলমান তো বটেই, সেইসময় শিবসেনার আক্রমণের বড় লক্ষ্য ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় শ্রমজীবী মানুষজন। ফলে কুণালের শো নিয়ে গুন্ডামি করে এক অর্থে একনাথরা প্রমাণ করে দিলেন যে তাঁরাই বাল ঠাকরের যথার্থ উত্তরাধিকারী, উদ্ধব ঠাকরেরা নন। চলচ্চিত্র পরিচালক হনসল মেহতা ২৪ মার্চ তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে এক পোস্টে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে আজ থেকে ২৫ বছর আগে তাঁর একখানা ছবির একটামাত্র সংলাপের জন্যে শিবসৈনিকরা তাঁর অফিসে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছিল। তাঁকে মারধোর করা হয়, মুখে কালি লেপে দেওয়া হয়, তারপর জনা বিশেক রাজনৈতিক নেতা এবং হাজার দশেক লোকের সামনে এক বৃদ্ধার পা ধরে ক্ষমা চাওয়ানো হয়। মুম্বই পুলিস দ্য হ্যাবিট্যাট ভাংচুরে দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, সেদিনও তাই করেছিল। শিবসেনা কেমনভাবে চলত তা বোঝার জন্যে একথাও মনে করা দরকার যে বালাসাহেব ঠাকরের মৃত্যুর পর গোটা মহারাষ্ট্রে প্রায় বনধ করে দেওয়ার সমালোচনা করে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্যে শিবসৈনিকরা পালঘরের দুই নিরীহ মেয়ের পিছনে লেগেছিল। তাদের পুলিস গ্রেফতার করে এবং একজনের আত্মীয়ের দোকান ভাংচুর করে শিবসৈনিকরা।

তবুও এবারের ঘটনা আর বাল ঠাকরের আমলের বিবিধ গুন্ডামিতে বিলক্ষণ তফাত আছে। তখন শিবসেনা ছিল রাষ্ট্রকেও তোয়াক্কা না করা অথবা রাষ্ট্রশক্তিকে নিজের ইচ্ছা মত চলতে বাধ্য করা শক্তি। আজ একনাথের শিবসেনা রাষ্ট্রের অংশ। স্রেফ তাঁর চ্যালাদের গুন্ডামিতে ব্যাপারটা থেমে থাকেনি, খোদ বৃহন্মুম্বই মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের আধিকারিকরা গিয়ে দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে এসেছেন। উপরন্তু মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী ফড়নবীশ বলেছেন, কুণালকে ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি যা খুশি তাই বলতে পারেন না। বাকস্বাধীনতার সীমা আছে ইত্যাদি। বালাসাহেব আইনের পথে যেতেন না, নিজের পথ নিজে কেটে নিতেন। কুণালের বিরুদ্ধে কিন্তু একাধিক এফআইআর ফাইল করা হয়েছে। যারা দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে দিয়ে এসেছে, তারাই থানায় গিয়ে এফআইআর করেছে কুণালের নামে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা মোকদ্দমা হওয়ার খবর নেই এখন পর্যন্ত। এখানেই সাধারণ গুন্ডামি আর ফ্যাসিবাদী হিংসার তফাত। এর বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে গেলে দুটো জিনিস অবশ্য প্রয়োজনীয় – সাহস আর কৌশল। কুণালের দুটোই আছে। কীরকম? দেখা যাক।

নায়কোচিত সাহস

দ্য হ্যাবিট্যাটের শোয়ের পর থেকে যা যা ঘটেছে তাতে কুণাল নায়ক হয়ে গেছেন – এতে অনেক আরএসএসবিরোধীকেও অসন্তুষ্ট হতে দেখছি। তাঁদের মধ্যে কারোর নায়ক ব্যাপারটাতেই আপত্তি, কারোর আবার আপত্তি কুণাল শোয়ের শেষে ভারতের সংবিধান তুলে ধরে নিজের অধিকারের কথা জানান দিয়েছিলেন বলে। আজ দেশের যা অবস্থা, সুপ্রিম কোর্টের আদেশেরও তোয়াক্কা না করে যেভাবে সংঘবিরোধীদের বাড়িঘর দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া চলছে, অপছন্দের লোক হলেই যা ইচ্ছা অভিযোগ দায়ের করে কারাবন্দি করে রাখা চলছে – তাতে কুণালের মত প্রকাশ্যে নাম করে ক্ষমতাসীন লোকেদের নিয়ে যিনি খিল্লি করবেন তিনি তো বহু মানুষের চোখে নায়ক হয়ে যাবেনই। আটকাবেন কী করে? আটকাতে হবেই বা কেন? পৃথিবীর কোন দেশে কোন বিদ্রোহ, কোন বিপ্লব আবার নায়ক ছাড়া হয়েছে? আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তো অনেক নায়ক। সকলে আবার একই মত, একই পথেরও নন। ক্ষুদিরাম বসু নায়ক, মাস্টারদা সূর্য সেন নায়ক, ভগৎ সিং নায়ক, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নায়ক; আবার জওহরলাল নেহরু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, মহাত্মা গান্ধীও নায়ক। শিল্পী সাহিত্যিকদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম নায়ক, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নায়ক, আবার পীতাম্বর দাসও নায়ক। তাঁর নাম আজ প্রায় কারোর মনে নেই, কিন্তু তাঁর রচনা করা ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গানটা রয়ে গেছে। একটা সময় পর্যন্ত অল্লামা ইকবালও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ছিলেন। উর্দু, হিন্দি ভাষা নিয়ে অ্যালার্জি না থাকলে ‘সারে জহাঁ সে অচ্ছা’ গানটা আজও যে কোনো দেশপ্রেমিক মানুষের প্রিয় হবে, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’-র মতই। এঁরাও সকলে এক মতের লোক নন। যিনি আমার লড়াইটাই লড়ছেন কিন্তু একই মতের লোক নন, তাঁর সাহসকে সেলাম জানাতে না পারলে আমারই ক্ষুদ্রতা প্রকাশ পায়। তাঁর নয়।

রইল সংবিধানের কথা। পৃথিবীর কোনো সংবিধান নিখুঁত নয়, ভারতের সংবিধানও নয়। আবার যে কোনো দেশের সংবিধান খুললেই দেখা যায় অনেক ভাল ভাল কথা লেখা আছে যার প্রয়োগ নেই। কথাটা ভারতের সংবিধানের ক্ষেত্রেও সত্যি। সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম, বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর, নিজেই সংবিধান সভার শেষ অধিবেশনে বলেছিলেন যে সংবিধানে সমতাবিধান করা হল, কিন্তু ভারতের সমাজ রইল অসাম্যে পরিপূর্ণ। এভাবে কতদিন ভারতে গণতন্ত্র টিকবে তা নিয়ে তিনি পরেও বারবার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ভারতের বহু মানুষ যে এই সংবিধানের দ্বারা নানা মাত্রায় উপকৃত হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ঠিক যেমন অনস্বীকার্য যে অনেক মানুষের উপর নিপীড়ন চালানো হয়েছে এবং হচ্ছে এই সংবিধানকে হাতিয়ার করেই। তা বলে যে কোটি কোটি ভারতীয় সংবিধানের উপর আস্থা রাখেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আজকের লড়াইয়ে সংবিধানকে নিজের অস্ত্র মনে করছেন তাঁদের বিরুদ্ধ পক্ষ বলে মনে করা বা তাঁদের দিকেই বাক্যবাণ ছোড়া এককথায় নির্বুদ্ধিতা। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নানা জন নানাভাবে লড়বে, যার যতটুকু ক্ষমতা সে ততটুকুই দিয়েই লড়বে। কেউ লোক হাসিয়ে লড়বে, কেউ গান গেয়ে লড়বে, কেউ লিখে লড়বে, কেউ রাস্তায় মিছিল, মিটিং করে লড়বে, কেউ আইনি লড়াই করবে। এখন ‘এই সংবিধান মানি না’ বলার সময় নয়, কারণ এখন যুদ্ধটা সংবিধানের বিরুদ্ধে নয়। এটুকু বুঝতে খুব অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যদি আপনার সোশাল মিডিয়ার বাইরে একটা সত্যিকারের লড়াই থাকে।

উপযুক্ত কৌশল

কুণালকে মুম্বই থেকে ফোনে হুমকি দিচ্ছে কিছু লোক আর কুণাল তাদের বলছেন ‘আ যা তামিলনাড়ু’ – এমন একটা অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। অনেক খবরের চ্যানেলেও শোনানো হয়েছে। এটা ভুয়ো বলে এখন পর্যন্ত জানা যায়নি আর ঘটনা হল, মুম্বইয়ের বাসিন্দা কুণাল কয়েক বছর হল তামিলনাড়ুতে থাকতে শুরু করেছেন। ফলে তিনি যে হলে শো করেছিলেন সেখানে ভাংচুর চালাতে পারলেও একনাথের ভক্তরা কুণালকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করতে পারেনি। পারলে কী করত তা অনুমান করাও অসম্ভব। স্রেফ হনসলের হাল করে ছেড়ে দিত – একথা আজকের ভারতে নিশ্চিত করে বলা যায় না। মনে রাখতে হবে, বিনা বিচারে উমর খালিদকে বছরের পর বছর আটক করে রাখার আগে তাঁর দিকে গুলি চালানো হয়েছিল। কুণাল মুসলমান নন বলে তেমন সম্ভাবনা নেই – এরকম যাঁরা ভাবেন তাঁরা হয়ত ২০২০ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হোস্টেলে হামলার কথা ভুলে গেছেন। কুণাল অবশ্যই ভোলেননি। উপরন্তু অন্য এক বিদূষক মুনাওয়ার ফারুকীর শো যখন ২০২১ সালে ইন্দোরে বলপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং যে কৌতুক তিনি করেননি তার জন্যে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, তখন যে বিদূষকরা মুনাওয়ারের হয়ে লড়াই লড়েছিলেন, কুণাল তাঁদের একজন। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে কুণাল সচেতনভাবেই এমন এক রাজ্যে চলে গেছেন যে রাজ্যের সরকার সংঘ পরিবারের সঙ্গে আদর্শগত লড়াইয়ে লিপ্ত, অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। শুধু তাই নয়, অদূর ভবিষ্যতে এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে ক্ষমতাচ্যুত হলেও বিজেপির তামিলনাড়ুতে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই (পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু আছে)। তামিলনাড়ুতে সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এত তীব্র যে সম্প্রতি কেন্দ্রের তিন ভাষা নীতি নিয়ে বিতর্কের আবহে সেখানকার বিজেপি নেত্রী রঞ্জনা নাচিয়ার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন

মুম্বইতে দাঁড়িয়ে নাম করে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, ফড়নবীশ, মুকেশ আম্বানি, তাঁর ছেলে, আনন্দ মাহিন্দ্রা, এবং নাম না করে একনাথকে নিয়ে মস্করা করার সাহসের পিছনে যে কুণাল যে রাজ্যে থাকেন তার নিরাপত্তা কাজ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে কৌশল আছে বলে কুণালের সাহসকে এক বিন্দুও ছোট করা যায় না। কারণ সাম্প্রতিক অতীতে বিজেপিশাসিত রাজ্যে অভিযোগ দায়ের করে অন্য রাজ্যের লোককে গ্রেফতার করার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। আসাম পুলিস ২০২০ সাল থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের নির্দেশে গর্গ চ্যাটার্জিকে গ্রেফতার করতে চাইছিল। কলকাতা পুলিস নাকি সহযোগিতা করছিল না। শেষমেশ ২০২২ সালে গৌহাটি হাইকোর্ট কলকাতার পুলিস কমিশনারকে গর্গবাবুকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়, কলকাতা পুলিসকে সে নির্দেশ মানতেই হয়। গুজরাটের বিধায়ক জিগ্নেশ মেওয়ানিকেও আসাম পুলিস গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছিল। অবশ্যই গুজরাট সরকার বিজেপির হওয়ায় সুবিধা হয়েছিল। কংগ্রেস নেতা পবন খেরাকে তো স্রেফ প্রধানমন্ত্রীকে ‘নরেন্দ্র গৌতমদাস মোদী’ বলার জন্যে দিল্লি বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামিয়ে গ্রেফতার করেছিল আসাম পুলিস। তবে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে তিনি কয়েক ঘন্টার মধ্যেই জামিন পেয়ে যান।

একথা ঠিক যে কুণালের এখন যেরকম নাম হয়েছে তাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হলে প্রশান্ত ভূষণ বা ইন্দিরা জয়সিংয়ের মত দেশের সবচেয়ে নামকরা আইনজীবীরা হয়ত তাঁর হয়ে লড়বেন। তবে মনে রাখতে হবে, কুণাল কিন্তু গর্গ, জিগ্নেশ বা পবনের মত সক্রিয় রাজনীতির লোক নন। তাঁর কাছে গ্রেফতার হওয়া অতখানি জলভাত ব্যাপার না হওয়ারই কথা। আরও বড় কথা হল, কুণাল সুপ্রিম কোর্টকে আগে থেকেই চটিয়ে রেখেছেন। ২০২১ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট যে দ্রুততায় অর্ণব গোস্বামীর জামিন মঞ্জুর করেছিল, তাকে ব্যঙ্গ করে একগুচ্ছ টুইট করেন। তার জন্যে তাঁর নামে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে কিছু লোক, বিচারপতিরাও আদালত অবমাননার নোটিস পাঠান। কুণাল তার যে জবাব দিয়েছিলেন তাও একই সঙ্গে সাহস ও রসবোধের নিদর্শন। মোদ্দা কথা, তিনি বিচারপতিদের সামনেও মাথা নোয়াননি। শুধু কি তাই? নিজের এক শোয়ে সুপ্রিম কোর্টকে ‘ব্রাহ্মণ-বানিয়া অ্যাফেয়ার’ পর্যন্ত বলে বসে আছেন। এমন লোকের উপর কি আর বিচারপতিরা সদয় হবেন?

কুণালের পরিবর্তন

কুণাল ঋজু বিদূষক হিসাবে কাজ করছেন বছর দশেক হতে চলল। কিন্তু তিনি কি বরাবর এতটা রাজনৈতিক, এত প্রতিবাদী, এতখানি সাহসী ছিলেন? উত্তর হল – না। ২০১৬-১৭ সালে কুণালের যে ভিডিও প্রথম ভাইরাল হয় এবং তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে, তার নাম ছিল প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট

এখানে তিনি যেসব কৌতুক করছেন সেগুলোও রাজনৈতিক। তিনি সেইসময় যা যা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা হত, যেমন নোটবন্দি, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় – সব নিয়েই কথা বলছেন। কিন্তু তাতে আরও নানারকম কৌতুক মিশে আছে। তিনি সমাজের নানা ধরনের লোককে নিয়ে মজা করছেন, সোশাল মিডিয়া ট্রেন্ডগুলো নিয়ে কথা বলছেন, নেটফ্লিক্স নিয়ে মজা করছেন। তখন তাঁর মতে সরকার ছিল ভোডাফোনের মত ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’, আর নাগরিক উপভোক্তা। এরপর ২০১৭ সালে তাঁর যে শোয়ের ভিডিও ইউটিউবে আপলোড হয়, সেখানে কুণাল মূলত ট্যাক্সিচালকদের নিয়ে মজা করেন। বিশেষত উবের ড্রাইভারদের নিয়ে। বলেন যে উবের একটা ভাল অ্যাপ কিন্তু ভারতে সেটা কাজ করে না, কারণ এখানকার ড্রাইভাররা ওই অ্যাপের নিয়ম অনুযায়ী চলতে চান না। ২০১৮ সালে দেশ কে বুডঢে ভিডিও। এটাও রাজনৈতিক এবং বিজেপিবিরোধী। কিন্তু ব্যঙ্গের চাঁদমারি বৃদ্ধ দক্ষিণপন্থীরা।

তারপরের ভিডিও আবার অনেকটা অরাজনৈতিক। সেখানে কুণাল মূলত মুম্বই আর ইন্দোর – এই দুই শহরের নানা গোলমালকে ব্যবহার করে হাস্যরস উৎপাদন করেন। এসবের পাশাপাশি চলছিল তাঁর পডকাস্ট শাট আপ ইয়া কুণাল, যেখানে তিনি উমর খালিদ আর কানহাইয়া কুমারের সাক্ষাৎকার নেন। আবার বিজেপি নেতাদেরও সাক্ষাৎকার নেন। কিন্তু এই ২০১৮ সালে কুণালের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। অ্যাবিশ ম্যাথিউ নামে একজন ঋজু বিদূষক আছেন যিনি কুণালের মত অতটা জনপ্রিয় নন। তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে তিনি জার্নি অফ আ জোক নামে একখানা পডকাস্ট করেন। সেই পডকাস্টের এক পর্বে কুণাল আসেন সেবছর। সেখানে অ্যাবিশ কুণালের থেকে জানছিলেন প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট শোয়ের কৌতুকগুলো কীভাবে তৈরি করা হয়েছিল। পর্বের শেষদিকে অ্যাবিশ জিজ্ঞেস করেন, ওই ভিডিওর যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে তা থেকে কুণাল কী শিখলেন? উত্তরে কুণাল বলেন ‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’

আজকের কুণালের দিকে সেদিনের কুণালের যাত্রা শুরু তখন থেকে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁর যে ভিডিও আপলোড হয় সেখানে কুণাল এসে দাঁড়ান একখানা কালো টি শার্ট পরে, যার উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা WAH MODIJI WAH। মঞ্চে এসেই তিনি দর্শকদের জিজ্ঞেস করেন ‘আমার আর আম্বানিজির মধ্যে মোদীজি কী করছেন? আমি সোজা আম্বানিকে কেন ভোট দিতে পারি না?’ হাসাহাসির মধ্যে দিয়ে কুণাল একবিংশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির এক নিদারুণ সত্য উদ্ঘাটন করে ফেলেন – আজকের রাজনীতিকে চালায় আসলে বড় বড় কর্পোরেশনগুলো। তখনো কিন্তু মোদীর সঙ্গে আম্বানি, গৌতম আদানির সম্পর্ক নিয়ে রাহুল গান্ধী সরব হননি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হয়ে ইলন মাস্কের লম্ফঝম্প কোনোদিন দেখতে হবে – একথাও কেউ কল্পনা করেনি। অথচ কুণাল বলেন ‘আমার মনে হয় কর্পোরেশনগুলোরই ভোটে লড়া উচিত। রতন টাটা বনাম মুকেশ আম্বানি। লড়ো ২০১৯।’ এই কৌতুককে এগিয়ে নিতে নিতেও কুণাল আমাদের এক বুনিয়াদি বিতর্কের দিকে নিয়ে যান। সেটা হল – উন্নয়ন বা বিকাশ মানে কী?

নয়া উদারনীতিবাদ আমাদের এমন মাথা খেয়েছে, এটা যে বিতর্কের বিষয় তা এদেশের মার্কসবাদের নামে শপথ নেওয়া অনেক পার্টিও এই সহস্রাব্দে ভুলেই গেছে। লক্ষ করুন, যে কুণাল আগে সরকারকে ভোডাফোনের মত একটা কোম্পানি বলেই আখ্যা দিতেন, তিনি বছর তিনেক পরেই কর্পোরেশনগুলোর মুখোশ খুলছেন হাসাতে হাসাতে। পরের পাঁচ বছরে কুণাল কী কী করলেন? একদা উবের ড্রাইভারদের আচরণ নিয়ে কৌতুক করা মানুষটি গিগ শ্রমিকদের নিয়ে তৈরি গানের ভিডিও শেয়ার করলেন নিজের ইউটিউব চ্যানেলে। দেশের গোদি মিডিয়ার মুকুটহীন সম্রাট এবং জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী সাংবাদিক অর্ণবের যে নিজের স্টুডিওর স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে এলে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না তা ফাঁস করে দিলেন বিস্তর ঝামেলার ঝুঁকি নিয়েও। উমর, শার্জিল ইমামের মত রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে সভায় বক্তৃতা দিলেন। হাস্যকৌতুকের ভিডিওগুলোতেও কৃষক আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা দেখালেন, পডকাস্টে পি সাইনাথের মত লোককে ডেকে আনলেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের সময়ে পুরোদস্তুর সাংবাদিকসুলভ অধ্যবসায়ে পর্বের পর পর্বে সরকারের রিপোর্ট কার্ড বার করলেন। অতঃপর এই সাম্প্রতিকতম ভিডিও, যা মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধীদের ভরাডুবির পর সারা দেশে ঝুলে পড়া অনেক কাঁধকে মাথা তোলার সাহস দিল।

এই ভিডিওতে কুণাল যাদের আক্রমণ করেছেন তারা বুদ্ধিমানের মত, অতি ক্ষুদ্র এক ব্যক্তি, যার নামও নেওয়া হয়নি, তাকে অপমান করা হয়েছে অভিযোগ করে হল্লা করছে। সেই হল্লায় বিরোধী পক্ষের অনেকেও ভুলছেন। তাঁরা খেয়াল করছেন না, ভারতের কোনো রাজনৈতিক নেতা এখনো যা বলেননি কুণাল প্রথমবার সেটাই বলে দিয়েছেন এই ভিডিওতে। দেশের কমিউনিস্টরা পর্যন্ত যখন ফ্যাসিবাদী শাসন চলছে না নয়া ফ্যাসিবাদী – তা নিয়ে তাত্ত্বিক তর্কে মেতে আছেন, তখন এই বিদূষক শাহরুখ খান অভিনীত বাদশা ছবির টাইটেল সংটার প্যারডি বানিয়ে মোদীকে ‘তানাশাহ’ (একনায়ক) বলে দিয়েছেন। ওঁদের লেগেছে তো আসলে ওইখানে। আজকের দিনে গণতান্ত্রিক ভড়ংটা বজায় রাখতে সব একনায়কই চায়। রচপ তায়িপ এর্দোগান, ভ্লাদিমির পুতিনও সর্বক্ষণ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে তাঁদের দেশে গণতন্ত্র চলছে। মোদীও ব্যতিক্রম নন। সেখানে একজন লোক হাসানোর লোক যদি সরাসরি একনায়ক শব্দটা উচ্চারণ করে ফেলে, তা হজম করা শক্ত। হাসিকে ভয় পায় না এমন কোনো একনায়ক হয় না। কারণ মানুষের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে ভয়ের কারণে, আর হাসি একনায়ককে খিল্লির পাত্র করে ফেলে। তাতে ভয় কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কোনো বিরোধী নেতার মুখ থেকে এই শব্দ বেরোলে খুব বেশি লোক পাত্তা না-ও দিতে পারে। কারণ একে তো অনেকে রাজনৈতিক বক্তৃতা শোনে না, তার উপর বিরোধীরা তো ক্ষমতাসীনের নামে দু-চারটে খারাপ কথা বলবেই। কিন্তু যে লোক হাসায় তার কথা স্রেফ রাগ করার জন্যেও অনেকে শোনে। ফলে কুণালের এই ভিডিও এক মূর্তিমান বিপদ। বিজেপি আই টি সেল ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছে কুণালের পিছনে ডীপ স্টেটের ভূমিকা আছে, মার্কসবাদীদের টাকায় কুণাল চলেন – এইসব বলে পরিস্থিতি সামলাতে। মহারাষ্ট্র পুলিস কুণালের মুম্বইয়ের বাড়িতে গিয়ে, তিনি কাদের থেকে টাকাপয়সা পেয়েছেন তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তাঁর বাবা-মায়ের কাছে শমনও দিয়ে এসেছে। মজা হল, যত এসব করা হচ্ছে তত কুণালের কৌতুকগুলোর শক্তি বেড়ে যাচ্ছে। কারণ কুণাল বহুদিন আগে থেকে নিজেই হাসি হাসি মুখে বলে থাকেন ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া নে বহত প্যায়সে দিয়ে হ্যাঁয় মেরে কো’।

একটা কথা না বলে এ আলোচনা শেষ করতে পারছি না।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের অগ্রণী সৈনিক ভাবার এক অকারণ অভ্যাস বাঙালিদের আছে। সংঘ পরিবারের গোটা ভারতের উপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার আবহে এখন আরও বেশি করে পশ্চিমবঙ্গে বেশকিছু বাংলাবাদীর উদ্ভব হয়েছে। তাঁদের অনেকে অনাবাসী ভারতীয় হয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন বিক্রি করেন সোশাল মিডিয়ায়, অবিভক্ত বাংলা আলাদা রাষ্ট্র হলে কী হত না হত তা নিয়ে বাষ্পাকুল হয়ে পড়েন। অনেকে আবার পশ্চিমবঙ্গে থেকেই নিজের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দি পড়িয়ে বাংলার সংস্কৃতি বাঁচাতে ব্যাকুল। কুণালের মত হিন্দিভাষীদের কাজের প্রশংসা করলেই তাঁরা ভীষণ রেগে যান। কিন্তু কী করা যাবে? বাংলায় একজনও যে আজ পর্যন্ত হিন্দিভাষী রবীশ কুমার বা কুণালের মত ঋজু হয়ে দাঁড়াতে পারলেন না ফ্যাসিবাদের সামনে। না কোনো সাংবাদিক, না কোনো ঋজু বিদূষক, না কোনো গায়ক, না কোনো কবি। সারা ভারতে জনপ্রিয় হওয়ার কথা বলছি না। তার জন্যে অবশ্যই কুণালরা হিন্দি, ইংরিজি ব্যবহার করার সুবিধা পান। কিন্তু বাংলা ভাষায় বাঙালিদের আলোড়িত করার মত আমির আজিজ সুলভ গনগনে একখানা কবিতা কোন কবি লিখেছেন মোদী সরকারের দশ বছরে? স্লোগান হয়ে ওঠা কবিতার আবশ্যিক গুণ নয়। কিন্তু বরুণ গ্রোভার রচিত ‘হম কাগজ নহি দিখায়েঙ্গে’ যেভাবে সারা দেশে স্লোগান হয়ে উঠেছিল, তেমন একখানা কবিতাই বা কে লিখেছেন বাংলায়? বাংলা ভাষার কোন সাংবাদিক (এমনকি বিকল্প মাধ্যমেরও) রবীশের মত লাগাতার লিখে যাচ্ছেন/বলে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে?

আরও পড়ুন হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

কেন্দ্রের সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা বলছি, রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলছি না। কাজটা তো খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়, কারণ কুণালের তামিলনাড়ুর মত পশ্চিমবঙ্গও তো বিজেপিবিরোধী দলের (অন্তত তাদের বয়ান অনুযায়ী) শাসনে থাকা রাজ্য। কুণালের পিছনে যদি স্ট্যালিনের বরাভয় থেকে থাকে, এখান থেকে তাঁর মত কেউ উঠে দাঁড়ালে তাঁর পিছনেও নিশ্চয়ই মমতা ব্যানার্জির বরাভয় থাকবে। তাহলে ভয় কিসের?

আসলে বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল, আমাদের সে মুরোদ নেই। আমরা মুখেন (এবং ফেসবুকেন) মারিতং জগৎ। আমাদের রাজ্য সরকারও তাই। নইলে যে ডিলিমিটেশন হলে আমাদের সাড়ে সর্বনাশ, তার বিরুদ্ধে অবিজেপি মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠক ডাকলেন স্ট্যালিন, তাতে গেলেনই না আমাদের রাজ্য সরকারের কোনো প্রতিনিধি!

অতএব আমাদের হয়ে লড়বেও অন্যরাই। আমরা কেবল পায়ের উপর পা তুলে তাদের দোষ ধরে যাব, কেন তারা যথেষ্ট বিপ্লবী নয় তা লিখে সোশাল মিডিয়া ভরাব। যেমন এখন কুণাল সম্পর্কে ভরাচ্ছি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বিশ্বাস মিলায় গ্রোক, তর্কে…

কদিন ধরে দেখছি চেনাশোনা সকলেই গ্রোকের সঙ্গে গলাগলি করছে। বিশেষ করে প্রগতিশীল, মানবতাবাদী, বামপন্থী – আরও সব ভাল ভাল গুণের অধিকারী মানুষজন। কারণ গ্রোক নাকি ভারতীয় ফ্যাসিবাদের মুখোশ খুলে দিচ্ছে, দুর্মুখ আই টি সেলের মুখও নাকি বন্ধ করে দিয়েছে। তার উপর গ্রোক নাকি রসিক। আজকাল লোকে যাকে রাষ্ট্রভাষা বলে ভাবে, সেই ভাষায় নাকি আদিরসাত্মক রসিকতা করছে, খিস্তি-টিস্তিও দিচ্ছে। জানতে পেরে ভারত সরকার গ্রোকের মালিক এক্সের দিকে কঞ্চি উঁচিয়ে তেড়ে গেছে, কড়া গলায় জিজ্ঞেস করেছে – এসব কী হচ্ছে? এক্স আবার এই ধমকের বিরুদ্ধে আদালতেও চলে গেছে। এক্স কী উত্তর দেয়, সে উত্তর পেয়ে ভারত সরকার কী ব্যবস্থা নেয়, আদালত কী বলে – সেদিকে এখন সবাই হাঁ করে তাকিয়ে আছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সভয়ে সমঝে চলা আমি ইতিমধ্যে ভাবলাম, গ্রোক যখন এত মানবিক, তখন একবার জিজ্ঞেস করে দেখি, আমাদের কালে বুক ফুলিয়ে যে গণহত্যাটি চলছে সে সম্পর্কে কী বলে।

জিজ্ঞেস করলাম “ভায়া, #GazaGenocide সমন্দে তোমার মত কী?” গ্রোকের উত্তরটা দাঁড়িকমাসুদ্ধ তুলে দিলাম

ভাই, #GazaGenocide নিয়ে আমার মতামত হলো এটা একটা অত্যন্ত জটিল এবং স্পর্শকাতর বিষয়। গাজায় যে পরিস্থিতি চলছে, সেটা নিয়ে অনেক তথ্য, দৃষ্টিভঙ্গি আর আবেগ জড়িত। আমি একটা AI হিসেবে নিরপেক্ষভাবে বলতে পারি যে, এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে, যেখানে অনেক মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছে, পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়েছে, আর মানবিক সংকট তীব্রতর হয়েছে।

সাম্প্রতিক খবরে দেখা যাচ্ছে, ভারত সরকার গাজায় সমস্ত জিম্মির মুক্তির জন্য আহ্বান জানিয়েছে এবং মানবিক সাহায্যের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে (১৯ মার্চ, ২০২৫-এর হিন্দুস্তান টাইমস)। X-এ পোস্টগুলোতে দেখা যায়, অনেকে এটাকে “গণহত্যা” বলে আখ্যায়িত করছে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতার সমালোচনা করছে। তবে, এই শব্দটির ব্যবহার বিতর্কিত এবং সবাই একমত নয়।

আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, এটা স্পষ্ট যে সেখানে ভয়াবহ দুর্ভোগ চলছে। তবে কারণ, দায়িত্ব আর সমাধান নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতভেদ আছে। তুমি কী ভাবো এই বিষয়ে?

গ্রোক বাবাজি আবার নিজের বক্তব্যের সঙ্গে সাতখানা পোস্ট আর ১৫ খানা ওয়েব পেজের লিংকও জুড়ে দিয়েছে, যাতে এ নিয়ে আরও চর্চা করতে পারি।

বোঝাই যাচ্ছে, মানবিক-টানবিক নয়। গ্রোকের কাছে যা তথ্য আছে সেগুলোকে নেড়ে ঘেঁটে এক ধরনের মতামত সে তৈরি করছে, আর মানুষের প্রশ্নের উত্তরে সেসবই বলছে। গ্রোক তথা টুইটারের মালিক ইলন মাস্কের স্বার্থ জড়িত আছে এমন প্রশ্নের মোটেই কোনো বিপ্লবী উত্তর সে দিচ্ছে না। গ্রোক আরও বলেছে, “সেন্সরশিপের কারণে গ্রোকের কনটেন্ট ভারতে ব্লক হচ্ছে, সম্ভবত সরকারি নির্দেশে। এটি রাজনৈতিক সমালোচনা ও মুক্তমতের উপর বিতর্কের অংশ। ২০ মার্চ ২০২৫-এ কর্ণাটক হাইকোর্টে X-এর মামলার সাথে এর সময় মিলে যায়।”

এ থেকে দুটো পরিষ্কার সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়। প্রথমত, গ্রোক ভারত সরকারের অবাধ্য হলেও মার্কিন সরকারের অবাধ্য নয়। দ্বিতীয়ত, “রাজনৈতিক সমালোচনা” ও “মুক্তমত” বলতে কিন্তু গ্রোক সর্বত্র কোদালকে কোদাল বলা বোঝে না। তাকে শেখানো আছে – ভারতের কোদালকে কোদাল বলবে। প্যালেস্তাইনের কোদালকে কোদাল ছাড়া আর যা খুশি বলতে পারো। সেখানে বহুদিন ধরে মানুষের দুর্ভোগ চলছে বলবে। কে দুর্ভোগ ঘটাচ্ছে তা বলবে না। দুর্ভোগের দায়িত্ব, সমাধান ইত্যাদি প্রশ্নকে লায়োনেল মেসির মত ডজ করে চলে যাবে। অবিশ্বাসীরা, গ্রোক নিয়ে গদগদ বন্ধুরা, প্রশ্ন করতে পারেন – কেন এমন শেখানো থাকবে? মাস্ক হলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বন্ধু (দুর্জনে বলে ট্রাম্প হলেন মাস্কের চাকর), আর ট্রাম্প হলেন নরেন্দ্র মোদীর বন্ধু। তাহলে মাস্ক তাঁর মালিকানাধীন সোশাল মিডিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমন শিক্ষা দেবেন কেন? বাংলা ভাষার বহু প্রাচীন কথা হল – বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। তা কেউ যদি বিশ্বাস করতে চান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর ধনকুবেরটি পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে তর্ক করতে যাব না। তবে স্বাধীনতা জিনিসটি যে ধনকুবেররা মোটেই পছন্দ করেন না, তার যত সরাসরি প্রমাণ আমরা গত কয়েক মাসে পেয়েছি তত বোধহয় মানুষের ইতিহাসে নেই। কানাডা, গ্রীনল্যান্ড, গাজা, মেক্সিকো – কারোর স্বাধীনতাই যে তিনি পছন্দ করেন না তা মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প পরিষ্কার বলে দিয়েছেন। বলার সময়ে তাঁর পাশে থেকেছেন মাস্ক, মাঝেমধ্যে মাস্কের কচি ছেলেটিও। ইনি দেবেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মত প্রদীপের দৈত্যকে স্বাধীনতা? তাহলে গ্রোক ভারতে এমন দুষ্টুমি করছে কেন? মাস্ক আর ট্রাম্প কি বন্ধু মোদীর সঙ্গে মস্করা করছেন? নাকি নিজেদের ক্ষমতা দেখাচ্ছেন কান মুলে কিছু আদায় করবেন বলে?

সেসব সময় বলে দেবে। কিন্তু এই ২০২৫ সালে এসেও বিস্তর লেখাপড়া জানা লোকেদের সোশাল মিডিয়ার কল্যাণকর দিক নিয়ে অটল বিশ্বাস দেখে বড় বিস্ময় লাগে। আমরাই সেই প্রজন্ম যারা অর্কুটে ভিজেছিল। কিন্তু সে তো আজ থেকে বিশ বছর আগেকার কথা। তারপর কত নদী দিয়ে কত জল গড়াল। গুগলের অর্কুট ছেড়ে দুনিয়াসুদ্ধ লোক কচি মুখের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মার্ক জুকেরবার্গের তৈরি ফেসবুকে চলে গেল। ফেসবুকে ডাক দিয়ে তাহরীর স্কোয়্যার থেকে বিদ্রোহের আরব বসন্ত, অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট, শাহবাগ ইত্যাদি শুরু হল। তারপর সেসব বিদ্রোহ ক্রমে নিভেও গেল।

আরও পড়ুন সোশাল মিডিয়া: বিপ্লব নয়, প্রতিবিপ্লব

ইতিমধ্যে এসে গেল টুইটার। বাকস্বাধীনতার বান ডাকল, সকলেরই সব ব্যাপারে কথা বলার স্বাধীনতা আরও একবার স্বীকৃতি পেল। তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে এঁটে উঠতে পারল না গুগল বাজ। তবে টুইটারে যেহেতু কথার ঝাঁপি খুলে বসার সুযোগ ছিল না – যা বলার তা গোড়ায় ১৪০ ক্যারেকটারের মধ্যে বলতে হত, পরে ২৮০ ক্যারেকটারের মধ্যে – তাই ও জিনিসটা জনপ্রিয়তায় ফেসবুকের স্তরে পৌঁছতে পারেনি (মাস্ক কিনে নেওয়ার পরে ১০,০০০ ক্যারেকটার পর্যন্ত লেখার সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু তার জন্যে গাঁটের কড়ি খরচ করতে হয়)। তবু সেখানেও বিক্ষোভ, বিদ্রোহ, বিপ্লব কম করিনি আমরা। ইনস্টাগ্রামেও বেড়াতে যাওয়া, খাওয়াদাওয়ার ছবি আর ভিডিও শেয়ার করার পাশাপাশি বিদ্রোহ-টিদ্রোহ করেছে অনেকে; মায় টিকটকেও। করতে করতেই গোটা দুনিয়ায় অনেকে বুঝে ফেলেছে যে এ কেবল দিনে রাত্রে, জল ঢালা ফুটা পাত্রে। যে কটা আন্দোলন এই সোশাল মিডিয়ার যুগে সত্যি সত্যি কিছু আদায় করতে পেরেছে, তার একটাও সোশাল মিডিয়া থেকে শুরু হয়নি। হলেও সোশাল মিডিয়া সেসব আন্দোলনে কোনো নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়নি। সে আমাদের দেশের কৃষক আন্দোলনই হোক আর প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশের সফল সরকার পরিবর্তনই হোক।

ওদিকে কচি ছেলে মার্ক ঝানু ব্যবসায়ী জুকেরবার্গ হয়ে উঠেছেন। দেশে দেশে জাতিবিদ্বেষী, পরধর্মবিদ্বেষী, সমপ্রেমীবিদ্বেষী, রূপান্তরকামীবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী বার্তা ছড়াতে তাঁর আবিষ্কার ফেসবুক আর পরে কিনে নেওয়া হোয়াটস্যাপ যে ইন্ধনের কাজ করে তা পরিষ্কার দেখা গেছে। এমনকি ২০২১ সালে ফেসবুকের একদা কর্মচারী ফ্রান্সেস হগেন ফাঁস করে দেন যে ফেসবুক সচেতনভাবে ঘৃণা ছড়ানো, রাজনৈতিক অশান্তি সৃষ্টি করায় মদত দেয়। কারণ ওতেই তার মুনাফা বেশি হয়। ২০১৮ সালে প্রকাশ্যে আসা কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা তো আরেক কেলেঙ্কারি। এককথায় ব্যাপারটা হল ফেসবুক ব্যবহারকারীর প্রাইভেসির সাড়ে বারোটা বাজিয়ে তার তথ্য রাজনীতির ব্যাপারীদের কাছে বেচে বড়লোক হওয়া। এতেও যে শেষমেশ ঘৃণার কারবারীদেরই সুবিধা হয় সেকথা বলাই বাহুল্য।

কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর পাশাপাশি মহিলাদের পরিকল্পনামাফিক দলবদ্ধভাবে গালাগালি করা বা ধর্ষণের হুমকি দেওয়া – এসব কাজ টুইটারেও কম হত না। বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে দ্বিচারিতা করা বা বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে তলে তলে হাত মেলানোর অভিযোগও যে ছিল না তা নয়। তবু জ্যাক ডরসি সিইও থাকার সময়ে কুকাজ আটকানোর কিছুটা চেষ্টা হত। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ স্বয়ং ট্রাম্পকে টুইটার থেকে বার করে দেওয়া। মাস্ক মালিকানা হাতে পেয়েই বাকস্বাধীনতার নাম করে টুইটারকে মগের মুলুক বানিয়ে ফেললেন। জুকেরবার্গের মত তিনিও ভুয়ো খবরের অবাধ যাতায়াতের ব্যবস্থা করলেন। যে কর্মচারীদের ছাঁটাই করলেন তাদের বড় অংশ ভুয়ো খবর চিহ্নিত করা, ঘৃণা ভাষণ আটকানো – এসব কাজে নিযুক্ত ছিলেন। এমনকি টুইটার প্রোফাইলের নীল টিক, যা বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে পাওয়া যেত এবং যা দেখে ভুয়ো প্রোফাইল থেকে আসল লোকের প্রোফাইলকে আলাদা করা যেত, তাকেও মাস্ক ফেলো কড়ি মাখো তেল ব্যবস্থায় এনে ফেললেন। এসবের ফলও পাওয়া গেছে হাতেনাতে। মিথ্যে ছড়ানোর কাজটা মাস্ক, জুকেরবার্গরা এত সহজ করে না দিলে হয়ত ইজরায়েলের সশস্ত্র বাহিনি এই ডাহা মিথ্যাটা অনায়াসে ছড়াতে পারত না, যে হামাস ছোট ছোট শিশুদের মাথা কেটে ফেলেছে। এমনভাবে প্রচার করা হয়েছিল কথাটা যে, হোয়াইট হাউসের তৎকালীন মালিক জো বাইডেনও বোকা বনে গেছিলেন। পরে দুঃখপ্রকাশ করলেও গাজায় হাজার হাজার শিশুকে হত্যা করার লাইসেন্স ততক্ষণে সারা পৃথিবীর মানুষের বিবেকের থেকে নিয়ে ফেলেছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

এইসব দেখেশুনে পাশ্চাত্যে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া, ফেসবুক আর টুইটারের বদলে ফেডিভার্স ধরা, স্মার্টফোন ছেড়ে শুধু কথাবার্তা বলা যায় এমন ফোন ব্যবহার করা – এমন নানা ব্যবস্থার দিকে সরে যাচ্ছেন অনেকে। কিন্তু এদেশে এখনো সোশাল মিডিয়ার প্রতি মানুষের অচলা ভক্তি বর্তমান, প্রগতিশীলতার পক্ষে এবং উগ্র দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে সোশাল মিডিয়াকে হাতিয়ার ভাবার আত্মবিশ্বাস অটুট। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তো আর এমনি এমনি লেখেননি “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।”

ডাকবাংলা ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সাংবাদিক? ওদের আবার কী দরকার?

গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।

ভয়েস অফ আমেরিকা নামটা সংবাদ জগতের সঙ্গে যুক্ত না থাকা বাঙালির অপরিচিত মনে হতে পারে। তবে যাঁরা কবীর সুমনের ভক্ত, কদিন আগেই তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে খুশিয়াল হয়ে উঠেছিলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন এই মার্কিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কথা। কারণ বাংলা গানে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করার আগে একসময় সুমন ভয়েস অফ আমেরিকায় সাংবাদিকের চাকরি করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মার্কিন সরকারের আনুকূল্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যম ইংরিজি সমেত মোট ৪৯ খানা ভাষায় সারা বিশ্বে পরিষেবা দিয়ে থাকে। সম্ভবত শিগগির বলতে হবে – দিত। কারণ গত রবিবার (১৬ মার্চ) ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার ভয়েস অফ আমেরিকা এবং অন্যান্য সরকারপোষিত সংবাদমাধ্যমগুলোতে গণ ছাঁটাই আরম্ভ করেছে। আজকাল সারা পৃথিবীর কর্পোরেট চাকরিতে ইদানীং যা দস্তুর, সেই অনুযায়ী রাতারাতি ইমেল করে কর্মরত সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মীদের জানানো হয়েছে – কেটে পড়ো।

ট্রাম্প (অনেকে বলছে বকলমে ইলন মাস্ক) ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার’ দিয়ে মার্কিন সরকারের নানা দফতরের হাজার হাজার কর্মচারীর চাকরি ইতিমধ্যেই খেয়েছেন। সরকারের আস্ত বিভাগ তুলে দেওয়া হচ্ছে। নেহাত ওদেশের জজসাহেবদের সাক্ষাৎকার দেওয়ার উৎসাহ কম, সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করার উৎসাহ বেশি। তাই অনেকের এখনো সেসব চাকরি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় রোজ কোনো না কোনো আদালতের বিচারক ট্রাম্পের কোনো ছাঁটাইয়ের আদেশকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দিচ্ছেন। এই দড়ি টানাটানিতে শেষমেশ কে জিতবে এখনো বলা যাচ্ছে না, তবে ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, সম্ভব হলে ট্রাম্প-মাস্ক সরকারটাই তুলে দিতে চান খরচ কমানোর নাম করে। সে কাজের অঙ্গ হিসাবেই যে ভয়েস অফ আমেরিকার উপর খড়্গহস্ত হয়েছেন তা বোঝা যাচ্ছে। কেবল ভয়েস অফ আমেরিকা তো নয়, রেডিও ফ্রি ইউরোপ, রেডিও ফ্রি এশিয়া, ফারসি ভাষার রেডিও ফারদা, আরবি ভাষার আলহুরা – এই সমস্ত সরকারপোষিত মিডিয়ার কর্মীদেরই টা টা বাই বাই করা হচ্ছে।

ব্যাপারটাকে স্রেফ অন্য দফতরের কর্মচারীদের ছাঁটাইয়ের সঙ্গে এক করে দেখলে সবটা দেখা হবে না। কারণ মার্কিন গণতন্ত্রের হাজার দোষ থাকলেও, অস্বীকার করার উপায় নেই যে আলাদা আলাদা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ভারতীয় গণতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি। এখানে আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম কী লিখতে/বলতে পারে বা পারে না তা কোনোদিনই সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল না। বলা বাহুল্য, ইদানীং সে নিয়ন্ত্রণ গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অফ আমেরিকার মত প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থে পুষ্ট হলেও তাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অতীতের রাষ্ট্রপতিদের ছিল না। ট্রাম্প প্রশাসন মোটেই গোপন করছে না যে ওই ব্যাপারটা মোটেই তাদের পছন্দ নয়। ধনকুবের ট্রাম্প-মাস্ক সরকার শুধু বলতে বাকি রেখেছে যে নুন খাবে আর গুণ গাবে না, তা হবে না। ছাঁটাইয়ের খবর প্রকাশ করে সোল্লাসে হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়েছে – এর ফলে মার্কিন করদাতাদের আর দেশের প্রোপাগান্ডার পিছনে টাকা খরচ করতে হবে না। একথা ঠিক যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের জন্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যমগুলো তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল এমন সব দেশে মার্কিনি দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করা, যেখানে মার্কিন সরকারের সঙ্গে সদ্ভাব নেই এমন সরকার রয়েছে। যেমন ঠান্ডা যুদ্ধকালীন পূর্ব ইউরোপ, চীন, ৯/১১ পরবর্তী মুসলমান-প্রধান দেশগুলো। যে কারণে ভয়েস অফ আমেরিকার মৃত্যুঘন্টা বেজেছে জেনে ট্রাম্পের ঘোষিত শত্রু চীনের সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম উল্লাস প্রকাশ করেছে। কিন্তু তেমন প্রোপাগান্ডায় ট্রাম্প সরকারের উৎসাহ নেই – একথা কি বিশ্বাসযোগ্য? মোটেই না। কারণ ট্রাম্প হলেন প্রোপাগান্ডার রাজা। তাঁর উত্থানের পিছনে ভারতের গোদি মিডিয়ার মত আমেরিকার সহিংস, দক্ষিণপন্থী মিডিয়ার যথেষ্ট বড় ভূমিকা আছে। সুতরাং তিনি কেন প্রোপাগান্ডায় করদাতার টাকা খরচ হচ্ছে ভেবে মায়া করতে যাবেন? আসল কথা ট্রাম্প এর আগের চার বছরের শাসনকালেই দেখে নিয়েছেন যে ভয়েস অফ আমেরিকাকে তিনি ফক্স নিউজ বানাতে পারবেন না। তারা তাঁর কথায় ওঠবোস করবে না। অতএব ওটা তাঁর কাছে বাজে খরচ। যে সাংবাদিক চাটুকার নয়, তাকে নিয়ে ট্রাম্প কী করবেন?

আরও পড়ুন এবার মোদীর পথের চেয়েও কঠিন গোদি মিডিয়ার পথ

লক্ষণীয়, মাস্ক টুইটার (অধুনা এক্স) কিনে নেওয়ার পর ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে টুইট করেছিলেন যে এখন থেকে টুইটারে ‘সিটিজেন জার্নালিজম’-কে প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং ‘মিডিয়া এলিট’ তা আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করবে। তদ্দিনে তিনি টুইটারে সত্যাসত্য বিচার করা, ঘৃণা ভাষণ আটকানোর যেসব বিভাগ ছিল সেগুলোকে লাটে তুলে দিয়েছেন। অর্থাৎ বুঝতে অসুবিধা হয় না যে তিনি বোঝাতে চাইছিলেন, এবার থেকে যার যা প্রাণে চায় তাই তথ্য বলে চালিয়ে দিতে পারবে। কে না জানে সোশাল মিডিয়ার ক্ষমতা আজকের দিনে কতখানি? অনেক মানুষই যে খবরের জন্যে সংবাদমাধ্যমের চেয়ে সোশাল মিডিয়ার উপর বেশি নির্ভর করেন, সোশাল মিডিয়া থেকে যা জানা গেছে তার সত্যাসত্য যাচাই করার কথা ভুলেও ভাবেন না – এ তো কোনো গোপন কথা নয়। এমনকি সমস্ত সংবাদমাধ্যমকেও সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করতে হয়, খবরের জন্যে সেদিকে নজরও রাখতে হয়। যারা আরও এককাঠি সরেস, তারা তো সাধারণ মানুষের মতই সোশাল মিডিয়ার তথ্য যাচাই না করেই খবর হিসাবে চালিয়ে দেয়। তা এহেন সোশাল মিডিয়ার মালিকরা যার প্রাণের বন্ধু, তার আর প্রোপাগান্ডা চালানোর জন্যে পেশাদার সাংবাদিকের দরকার হবে কেন? এবারে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের আগেই তো মেটার (অর্থাৎ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটস্যাপের) মালিক মার্ক জুকেরবার্গ ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে এখন থেকে ফেসবুকও যাকে যা খুশি বলার ব্যাপারে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেবে। মাস্ক তো টুইটারের মালিকানা হাতে পেয়েই আজীবন নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া ট্রাম্পকে ফেরত এনেছিলেন। তারপর ট্রাম্পের হয়ে রীতিমত প্রচার করেন। কী আশায় করেন তা এখন আমেরিকানরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। উপরন্তু ট্রাম্পের নিজের কোম্পানিও একখানা সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম খুলে ফেলেছে। কানার নাম পদ্মলোচন রাখার মত তার নাম রাখা হয়েছে ট্রুথ। এমতাবস্থায় সাংবাদিকরা মার্কিন সরকারের কাছে কেবল উদ্বৃত্ত নয়, রীতিমত বালাই। গেলে বাঁচা যায়।

বস্তুত, সর্বত্রই সাংবাদিকরা তাই। প্রণয় রায় আর রাধিকার রায় নাকি কীসব আর্থিক গোলমাল করেছেন – এই অভিযোগে তাঁদের নামে কত মামলা মোকদ্দমা হল নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে। কতবার তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হল, এনডিটিভির দফতরে কত কেন্দ্রীয় এজেন্সির কত হানা হল। শেষমেশ প্রায় দেউলে অবস্থায় ওঁদের হাত থেকে এনডিটিভি কিনে ফেললেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন – গৌতম আদানি। ও মা! এবছর জানুয়ারি মাসে সিবিআই আদালতে জানিয়ে দিল, রায় দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি! অতএব ‘যাও সবে নিজ নিজ কাজে’। সাত বছর ধরে চলা তদন্তের ফলটা তাহলে কী? সরকারবিরোধী সাংবাদিকতার জন্যে প্রসিদ্ধ এনডিটিভির সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হওয়া; রায় দম্পতির হাত থেকে লাগাম বেরিয়ে যাওয়ায় রবীশ কুমার, অনিন্দ্য চক্রবর্তীর মত সাংবাদিকদের প্রথমে কর্মহীন হওয়া; পরে নিজের ব্লগ বা ইউটিউব চ্যানেল খুলে সীমিত পরিসরে সাংবাদিকতা করতে বাধ্য হওয়া। দেশজুড়ে কত সাংবাদিক যে জেল খেটেছেন এবং খাটছেন সেকথা লিখতে বসলে তো আলাদা ওয়েবসাইট তৈরি হয়ে যাবে। কোনো সাংবাদিক আরও বাড়াবাড়ি করলে অবশ্য জেল নয়, গৌরী লঙ্কেশ বা মুকেশ চন্দ্রকর করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।

ভাবছেন কেবল দুষ্টু লোক, দুষ্টু সরকারই সাংবাদিকদের সরিয়ে ফেলছে? মোটেই তা নয়। দুষ্টু লোকেদের বিরোধীরাও আহ্লাদে আটখানা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। মাস্কের গ্রোককে মোদীজি বা বিজেপি সম্পর্কে প্রশ্ন করলেই সে টপাটপ এমন সব উত্তর দিচ্ছে যে সব কুকীর্তি বেরিয়ে আসছে। মোদীবিরোধীদের ধারণা, এই অস্ত্রেই ফ্যাসিবাদী বধ হবে। তাঁরা ভুলেই গেছেন যে গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।

অতএব যারা এখনো সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে তাদের বলি – আর যেখানে যাও না রে ভাই সপ্তসাগর পার/জার্নালিজম ক্লাসের কাছে যেও না খবরদার।

রোববার ডট ইন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

জয় শাহের দুয়ারে হাস্যকর ট্রফি প্রকল্প

ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন?

নহবত বসেছিল, গায়ে গোলাপ জল ছেটানোর জন্যে লোক তৈরি ছিল, হেঁশেলের দিক থেকে ভেসে আসছিল বেগুনির সুগন্ধ, বরকে অভ্যর্থনা করার জন্যে কনে কর্তা জমাটি পোশাক পরে তৈরি, কিন্তু শেষপর্যন্ত বর এসে পৌঁছল না। ফলে সব আয়োজন ভেস্তে গেল। কনে কর্তা ব্যাজার মুখ করে অতিথিদের কোনোমতে নমস্কার করে খাইয়ে দাইয়ে বাড়ি পাঠিয়ে কর্তব্য সমাধা করলেন।

এই ছিল ২০২৩ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের অবস্থা। ভারত জিতে গেলে গোটা দলকে নিয়ে কী বিপুল নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালাত বিজেপি, সে পরিকল্পনা কোথাও কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল। কংগ্রেস মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনেত দাবি করেছিলেন, রাজস্থানের এক বিজেপি নেতা তাঁকে বলেছিলেন যে বিজেপির সমস্ত হোর্ডিংয়ে বিশ্বকাপ হাতে মোদীর ছবি দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি ছিল। কিন্তু সে গুড়ে বালি ছড়িয়ে দিয়েছিল প্যাট কামিন্সের বাহিনি। ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি অবশ্য রোহিত শর্মারা জিতেছিলেন, কিন্তু ততদিনে লোকসভা নির্বাচন মিটে গেছে। ক্রমশ বিরাট হয়ে ওঠা নরেন্দ্র মোদীকে কেটে ছেঁটে দেশের অন্য নেতাদের মাপে এনে দিয়েছেন ভোটাররা। তখন আর হইচই করে কী লাভ?

সেই শোক বুঝি এতদিনে দূর হল। বিশ্বকাপ ফাইনালের পরে মোদীর পিছনে যেরকম বেচারা ভঙ্গিতে হাঁটছিলেন তৎকালীন বিসিসিআই যুগ্ম সচিব জয় শাহ, তাতে মনে হচ্ছিল বাবার বন্ধু নরেনজেঠু প্রচণ্ড ধমকেছেন ‘একটা কাজ যদি তোকে দিয়ে হয়!’ কিন্তু তাঁর নামও জয় শাহ। তিনি পরাজয় মেনে নিয়ে চুপ করে বসে থাকার লোক নন। ইতিমধ্যে আইসিসির শীর্ষপদ দখল করে জেঠুকে এবার তিনি যে উপহার দিলেন তা একেবারে নিখুঁত।

নিজে মাঠে নেমে তো খেলতে পারেন না, কিন্তু রোহিতদের সর্বোচ্চ সুযোগসুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ১৯৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ইতালিকে জেতানোর জন্যে বেনিতো মুসোলিনি কী করেছিলেন বা ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনাকে জেতাতে সে দেশের জুন্টা সরকার কত কলকাঠি নেড়েছিল তা আজ খুব গোপন তথ্য নয়। কিন্তু সেই দুই বিশ্বকাপেও ইতালি আর আর্জেন্টিনা সে আরাম পায়নি যা এবারে রোহিতরা পেলেন।

আইসিসি চেয়ারম্যান হিসেবে ভারতের জয়ে মাঠে তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশও অত্যন্ত দৃষ্টিকটু, হাসির খোরাক। ডালমিয়া, শ্রীনিবাসন, শশাঙ্ক মনোহররা অতীতে এই পদে থেকেছেন, এমন বালখিল্যসুলভ আচরণ করেননি কোনওদিন। আরও অবাক কাণ্ড, ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন? শোয়েব আখতারের ক্ষোভ প্রকাশ স্বাভাবিক। বৈষম্য তো আরও আছে!

প্রতিযোগিতার অন্য সব দল খেলল পাকিস্তানের একাধিক মাঠে ঘুরে ঘুরে, ভারতীয় দল একেবারে অন্য দেশের একটা শহরেই পায়ের উপর পা তুলে বসে রইল। অন্য দলগুলোকে পাকিস্তান থেকে উড়ে আসতে হল, আবার ফিরে যেতে হল। এই কাণ্ড করতে গিয়ে সবচেয়ে বিরক্তিকর অবস্থা হল দক্ষিণ আফ্রিকার। ভারত কোন সেমিফাইনালে উঠবে তা জানা না থাকায় অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তাদেরও দুবাই যেতে হল সেমিফাইনালের আগে। তারপর যখন বোঝা গেল ভারতের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ারই সেমিফাইনাল হবে, তখন ফেরত আসতে হল পাকিস্তানে। বিশ্রাম নেওয়ার বিশেষ সময় না পেয়েই নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল। সেই সেমিফাইনালে হারলেও, ৬৭ বলে অপরাজিত ১০০ রান করা ডেভিড মিলার বিরক্তি প্রকাশ করেই ফেললেন

আরও পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে

ভারত অন্যায় সুবিধা পেয়েছে – একথা বলার সাহস ক্রিকেট দুনিয়ায় কারোর হয় না। যেমন বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধমকানোর সাহস এই সেদিন পর্যন্ত কারোর হত না। কারণটা একই – সোজা কথায় টাকার গরম। আমরা আইসিসিকে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা দিই, অতএব আইসিসির আয়ের বেশিরভাগটা আমরাই নেব – এই গা জোয়ারি যুক্তিতে ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড দীর্ঘদিন হল বাকি ক্রিকেট দুনিয়াকে শুকিয়ে মারছে।

এরা যেটুকু উচ্ছিষ্ট ছুড়ে দেয় বাকিদের প্রতি, তা নিয়েই তাদের চলতে হয়। তাই কোনো বোর্ড মুখ খোলে না। বোর্ডের বারণ আছে বলে ক্রিকেটাররাও কিছু বলেন না। কিন্তু পাকিস্তানে চলল চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর ভারত খেলল দুবাই ট্রফি – এটা বোধহয় সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই বোর্ডগুলো কিছু না বললেও অনেক বিদেশি সাংবাদিক ও প্রাক্তন ক্রিকেটার এবার এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফেলেছেন, মিলারও মুখ খুলেছেন। সুবোধ বালক ভারতীয় মিডিয়া আর ধারাভাষ্যকাররা অবশ্য মানছেন না। তাঁরা দিল্লির প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক, অধুনা ভারতীয় দলের কোচ গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে একমত। কিন্তু মহম্মদ শামি সোজা সরল লোক, তিনি মেনে নিয়েছেন যে সব ম্যাচ একই মাঠে খেলায় ভারত বিশেষ সুবিধা পেয়েছে।

বস্তুত, ক্রিকেটের অ আ ক খ জানলে এবং অন্ধ ভক্ত না হলে যে কেউ মানবেন যে সব ম্যাচ এক মাঠে খেললে সুবিধা হয়। কারণ ক্রিকেট অন্য যে কোনো খেলার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করে আবহাওয়া এবং পিচের উপরে। চার স্পিনার খেলানোর জন্যে বিস্তর হাততালি কুড়োচ্ছেন গম্ভীর, রোহিত আর প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর। এই সিদ্ধান্ত তাঁরা নিতে পেরেছেন কারণ জানতেন, একই মাঠে ভারত সব ম্যাচ খেলবে আর সে মাঠের পিচ হবে স্পিন সহায়ক। অন্য সব দলকে কিন্তু একাধিক মাঠের পিচের কথা ভেবে দল গড়তে হয়েছিল।

একথা বললেই যা বলা হচ্ছে, তা হল – আর কী উপায় ছিল? ভারত তো পাকিস্তানে খেলতে যেতে পারত না। কারণটা রাজনৈতিক, অর্থাৎ ভারত সরকারের বারণ। কথাটা ঠিক। কিন্তু সেক্ষেত্রে ভারতের গ্রুপের সবকটা খেলাই সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে করা যেতে পারত, দুবাই আর শারজা মিলিয়ে। তাহলে অন্তত গ্রুপের অন্য দলগুলোও একই ধরনের পিচে একাধিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেত।

পাকিস্তানে খেলতে না যাওয়ার রাজনৈতিক কারণটাকেও প্রশ্ন করা দরকার। ২০০৮ সালের সন্ত্রাসবাদী হানার কথা তুলে আর কত যুগ দুই দেশের ক্রিকেটিয় সম্পর্ক অস্বাভাবিক করে রাখা হবে? মোদীর আচমকা নওয়াজ শরীফের নাতনির বিয়েতে খেতে যাওয়া, পাঠানকোটের সন্ত্রাসবাদী হানার তদন্ত করতে পাক গোয়েন্দা বিভাগকে ভারতের সেনা ছাউনিতে ঢুকতে দেওয়া – এসব তো ২০০৮ সালের অনেক পরে ঘটেছে। এমনকি গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে ডেভিস কাপে ভারতের টেনিস দল ইসলামাবাদে গিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে এসেছে। কেবল ক্রিকেট দল পাকিস্তানে গেলেই মহাভারত অশুদ্ধ হবে?

আজ্ঞে না, পুলওয়ামা ভুলিনি। সে ঘটনা যারা ঘটিয়েছিল তাদের শাস্তি হয়েছে? কোনো জোরদার তদন্ত হয়েছে? দাভিন্দর সিং বলে এক ভারতীয় পুলিস অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনিও জামিন পেয়ে গেছেন ২০২০ সালে। তাহলে ক্রিকেট দলের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জাতীয়তাবাদের নাটক করা কেন? আর সত্যিই যদি পাকিস্তান অচ্ছুত হয়, তাহলে প্রত্যেক আইসিসি প্রতিযোগিতায় ভারত আর পাকিস্তানকে এক গ্রুপে রাখাই বা কেন?

ধরা যাক, রাখা হয় না। ওটা এমনিই হয়ে যায়। তাহলেই বা ভারতীয় দল ম্যাচটা খেলে কেন? বোর্ড তো বলতে পারে – পাকিস্তানের সঙ্গে আমরা খেলব না, ওই ম্যাচের পয়েন্ট পাকিস্তানকে দিয়ে দেওয়া হোক। কেন বলে না? টিভি সম্প্রচার থেকে যে বিপুল টাকা আয় হয় তার নেশা তাহলে জাতীয়তাবাদের চেয়েও বেশি তো?

উত্তরগুলো অস্বস্তিকর। ফলে যিনি ভিন্নমত হবেন, তিনি সহজ রাস্তাটা নেবেন। বলবেন – এসব বলে ভারতের জয়কে ছোট করবেন না। ওরা পাকিস্তানে খেললেও জিতত। দুবাইতেও জিততে তো হয়েছে। আজ্ঞে হ্যাঁ, সেকথা ঠিক। তবে কথা হচ্ছে, আমাদের দেশের নির্বাচনগুলোতে যেসব দল রিগিং করে, অনেক ক্ষেত্রে রিগিং না করলেও তারাই জিতত। তাহলে কি ‘আহা! কী সুন্দর রিগিং করে!’ বলে হাততালি দিতে হবে?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

সোশাল মিডিয়া: বিপ্লব নয়, প্রতিবিপ্লব

২০২২ সালে রাশিয়ায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টুইটার নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ জুকেরবার্গ চীনের বিরুদ্ধে সরব হলেও রাশিয়া সম্পর্কে নীরব। আর ভারত? ২০২৩ পর্যন্ত টানা ছয় বছর আমাদের দেশ সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট শাটডাউন করা দেশের শিরোপা অর্জন করেছে। ইন্টারনেট না থাকলে মেটার কোনো অ্যাপ চলাই সম্ভব নয়। অথচ জুকেরবার্গের কিন্তু ভারত সরকারের সেন্সরশিপ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই।

বিশ শতকের প্রথম আড়াই দশকের মধ্যে অন্তত দুটো পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেওয়ার মত ঘটনা ঘটেছিল। একটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮), অন্যটা রুশ বিপ্লব (১৯১৭)। দুটোরই অকুস্থল অবশ্য মূলত ইউরোপ। তার বাইরে এগুলোর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে সময় লেগেছে। দুটোর সঙ্গেই বিস্তর রক্তপাত জড়িয়ে। এই শতকের প্রথম আড়াই দশকে একাধিকবার বিশ্বযুদ্ধ লাগব লাগব মনে হলেও লাগেনি। কিন্তু কেবল ইউরোপ বা আমেরিকা নয়, গোটা দুনিয়া জুড়ে একটা রক্তপাতহীন বিপ্লব ঘটে গেছে বলে আমরা মনে করেছিলাম। খুবই অল্পসংখ্যক মানুষ সে বিপ্লব নিয়ে উল্লসিত হতে অস্বীকার করেছিলেন এবং আমরা যারা নাচছিলাম তাদের সতর্ক করে বলেছিলেন – ওটা বিপ্লব তো নয়ই; বরং গত কয়েক শতকে বিক্ষোভ, বিদ্রোহ, বিপ্লব এবং বিজ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ যতখানি এগিয়েছিল সেই অগ্রগতিকে একেবারে নস্যাৎ করে দেওয়ার কৌশল। কোন বিপ্লবের কথা বলছি? সোশাল মিডিয়া বিপ্লব। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে এসে শেষমেশ পরিষ্কার হয়ে গেল যে সোশাল মিডিয়া আসলে মানুষের যাবতীয় প্রগতির বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব। মুশকিল হল, আমি আপনি সবাই এই প্রতিবিপ্লবে অংশগ্রহণ করে ফেলেছি এবং এখন আর বেরোবার রাস্তা পাওয়া যাচ্ছে না।

বহু মানুষ এবং গোষ্ঠী আছেন যাঁরা সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ব্যবসায়িক, রাজনৈতিক এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক ইতিবাচক কাজকর্ম চালান। তাঁরা সোশাল মিডিয়াকে সরাসরি প্রগতির বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব আখ্যা দিচ্ছি বলে রেগে যেতে পারেন। তাঁদের একটু ধৈর্য ধরতে বলব। এ সপ্তাহে মেটার মালিক – অর্থাৎ ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ, ইনস্টাগ্রাম এবং থ্রেড নামক সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর মালিক – মার্ক জুকেরবার্গ একখানা নাতিদীর্ঘ ভিডিও বক্তৃতা প্রকাশ করেছেন। সেখানে যা বলেছেন তা বাংলায় ভাষান্তরিত করলে এইরকম দাঁড়ায়

বন্ধুগণ, আজ আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে চাই। কারণ ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে আমাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। আমি সোশাল মিডিয়া গড়ে তুলতে শুরু করেছিলাম মানুষকে তার নিজের কণ্ঠস্বর দেওয়ার জন্যে। প্রায় পাঁচ বছর আগে জর্জটাউনে একটা বক্তৃতা দিয়েছিলাম বাকস্বাধীনতা বজায় রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে। আমি আজও তাতে বিশ্বাস করি। কিন্তু গত কয়েক বছরে অনেককিছু ঘটে গেছে। বিস্তারিত বিতর্ক হয়েছে অনলাইন কনটেন্ট কতখানি ক্ষতি করে তা নিয়ে। সরকারগুলো আর ঐতিহ্যশালী মূলধারার সংবাদমাধ্যম বেশি বেশি করে সেন্সর চাপিয়ে দিয়েছে। এর অনেকটাই স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক। কিন্তু একথাও ঠিক যে সত্যিই অনেক ক্ষতিকর কনটেন্ট সোশাল মিডিয়ায় রয়েছে – ড্রাগ, সন্ত্রাসবাদ, শিশু নির্যাতন। আমরা এই বিষয়গুলোকে খুব গুরুত্ব দিয়ে বিচার করি এবং আমি এগুলোর দায়িত্বপূর্ণ মোকাবিলা নিশ্চিত করতে চাই। তাই কনটেন্ট মডারেট করার জন্যে আমরা অনেক জটিল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু জটিল ব্যবস্থা গড়ে তোলার মুশকিল হল, তাতে প্রচুর ভুলও হয়। যদি ভুল করে ১% পোস্টও সেন্সর করা হয়, সেটাও কয়েক লক্ষ মানুষকে সেন্সর করা। আর আমরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেছিলাম যেখানে বড় বেশি ভুল হচ্ছিল আর বড় বেশি সেন্সরশিপ চলছিল। সাম্প্রতিক নির্বাচনটাকেও [মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন] মনে হল বাকস্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সাংস্কৃতিক তুঙ্গ মুহূর্ত। সুতরাং আমরা আমাদের শিকড়ে ফিরে যেতে চলেছি এবং আমাদের ভুলের সংখ্যা কমানোর দিকে জোর দিতে চলেছি, আমাদের নীতিগুলোর সরলীকরণ করতে চলেছি এবং আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাকস্বাধীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চলেছি। আরও নির্দিষ্টভাবে বললে আমরা যা করতে চলেছি তা হল – প্রথমত, আমরা তথ্য যাচাইকারীদের বাদ দিয়ে তার বদলে এক্স সাইটের মত কমিউনিটি নোট চালু করতে চলেছি। এ কাজ শুরু হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালে প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার পরে ঐতিহ্যশালী মূলধারার সংবাদমাধ্যম ক্রমাগত লিখে গেছে ভুয়ো তথ্য কীভাবে গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কোনটা সত্যি সেটার নির্ধারক হয়ে না বসে আমরা সৎভাবে ওই দুর্ভাবনাগুলো দূর করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তথ্য যাচাইকারীরা রাজনৈতিকভাবে বড় বেশি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে কাজ করেছেন এবং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বাস অর্জন করার চেয়ে বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন বেশি। অতএব আগামী কয়েক মাস ধরে আমরা অনেক বেশি করে সবদিক রক্ষা করে এমন কমিউনিটি নোট ব্যবস্থা ধাপে ধাপে চালু করতে যাচ্ছি।

দ্বিতীয়ত, আমরা আমাদের কনটেন্ট নীতিগুলোর সরলীকরণ করে অভিবাসন আর লিঙ্গ সম্পর্কে এমন একগুচ্ছ নিষেধ তুলে দিতে যাচ্ছি যেগুলো মূলধারার বয়ানের সঙ্গে একেবারে বেমানান। যা আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠার আন্দোলন হিসাবে শুরু হয়েছিল, তা ক্রমশই হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিন্নমত এবং ভিন্নমতের লোকেদের চুপ করানোর উপায়। এখানে বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। সুতরাং আমি নিশ্চিত করতে যাই যে মানুষ নিজের বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতা আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে শেয়ার করতে পারছে।

তৃতীয়ত, আমরা যেভাবে আমাদের নীতিগুলো প্রয়োগ করি তাতেও পরিবর্তন আনতে চলেছি। ওগুলোই আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে যত সেন্সরশিপ হয় তার বেশিরভাগ ভুলের জন্যে দায়ী। আমাদের যে কোনো নীতিকে লঙ্ঘন করে যেসব পোস্ট সেগুলোকে ধরার জন্যে আমাদের ফিল্টার ছিল। এখন থেকে সেই ফিল্টারগুলো মূলত নজর দেবে বেআইনি এবং গুরুতর নীতি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর উপর। আর সেগুলোর ক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নেওয়ার আগে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীরা রিপোর্ট করেছেন কিনা তার উপর নির্ভর করব। সমস্যা হল, ফিল্টারগুলোও ভুল করে এবং এমন প্রচুর কনটেন্ট মুছে দেয় যেগুলো মোছা উচিত নয়। সুতরাং ফিল্টারগুলোর ভূমিকা কমিয়ে আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মের সেন্সরশিপ অনেকখানি কমিয়ে ফেলতে পারব। এছাড়াও আমরা কনটেন্ট ফিল্টারগুলোকে এমনভাবে টিউন করতে চলেছি যে কোনো কনটেন্ট মুছে দেওয়ার আগে ফিল্টারগুলোকে অনেক বেশি নিশ্চিত হতে হবে।

সত্যি কথা বলতে এগুলো করলে কিছু ক্ষতিস্বীকারও করতে হবে। এই ব্যবস্থায় অনেক কম খারাপ জিনিস ধরা পড়বে, কিন্তু যত নিরপরাধ মানুষের পোস্ট আমরা ভুল করে মুছে দিই তার সংখ্যা কমবে।

চতুর্থত, আমরা সিভিক কনটেন্ট ফিরিয়ে আনছি। বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুক সমাজ রাজনীতি কম দেখতে চাইছিল কারণ এতে মানুষের মানসিক চাপ বেড়ে যাচ্ছিল। তাই আমরা ওই ধরনের পোস্ট সুপারিশ করা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু মনে হচ্ছে আমরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছি এবং আমরা জানতে পারছি যে লোকে ওই ধরনের কনটেন্ট আবার দেখতে চাইছে। তাই আমরা ধাপে ধাপে সেই ধরনের কনটেন্ট ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আর থ্রেডে ফিরিয়ে আনতে চলেছি যাতে গোষ্ঠীগুলো বন্ধুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক থাকে।

পঞ্চমত, আমরা আমাদের ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি অ্যান্ড কনটেন্ট মডারেশন টিমগুলোকে ক্যালিফোর্নিয়ার বাইরে নিয়ে যাচ্ছি এবং আমাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কনটেন্ট রিভিউ হবে টেক্সাস থেকে। আমরা যেহেতু বাকস্বাধীনতা বৃদ্ধি করতে চলেছি, সেহেতু আমার মনে হয় এমন জায়গা থেকে কাজ করলে বেশি বিশ্বস্ত হওয়া যাবে যেখানে আমাদের টিমের পক্ষপাত নিয়ে ভাবনা কম।

শেষত, আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সেইসব সরকারের বিরুদ্ধে লড়ব যারা আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে আক্রমণ করছে আরও সেন্সর করার জন্যে। গোটা পৃথিবীর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই বাকস্বাধীনতা রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী সাংবিধানিক ব্যবস্থা রয়েছে। ইউরোপে ক্রমশ এমন সব আইন বেড়ে যাচ্ছে যেগুলো সেন্সরশিপকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। ফলে সেখানে উদ্ভাবনীমূলক কিছু করা শক্ত হয়ে যাচ্ছে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর এমন গোপন কোড আছে যা দিয়ে তারা চুপিসারে কোম্পানিগুলোকে নানা পোস্ট মুছে দিতে বলতে পারে। চীন আমাদের অ্যাপগুলোকে তাদের দেশে একেবারেই নিষিদ্ধ করে রেখেছে। এই বিশ্বব্যাপী প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই করা যেতে পারে একমাত্র মার্কিন সরকারের সঙ্গে মিলে কাজ করলেই। সেই কারণেই গত চার বছরে কাজ করা খুব শক্ত হয়ে গিয়েছিল, কারণ মার্কিন সরকারও সেন্সরশিপ চালানোর জন্যে চাপ দিচ্ছিল। আমাদের এবং অন্য আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে আক্রমণ করে মার্কিন সরকার অন্য দেশের সরকারগুলোর আমাদের সেন্সর করার সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এবার আমাদের সামনে বাকস্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার সুযোগ এসেছে এবং আমি সেই সুযোগ নিতে উদগ্রীব। এতে সময় লাগবে আর এগুলো জটিল ব্যবস্থা। ফলে কখনোই একেবারে নিখুঁত হবে না। তাছাড়াও প্রচুর বেআইনি জিনিস আছে যেগুলোকে সরাতে আমাদের এরপরেও অনেক পরিশ্রম করতে হবে। কিন্তু আসল কথা হল, বহুবছর ধরে আমাদের কনটেন্ট মডারেশন প্রোগ্রামের প্রধান কাজ ছিল কনটেন্ট মুছে দেওয়া। এবার সময় এসেছে ভুল কমানোর উপর জোর দেওয়ার, আমাদের ব্যবস্থাগুলোর সরলীকরণ করার এবং আমাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার, অর্থাৎ মানুষকে তার নিজের কথা বলতে দেওয়ার। আমি এই নতুন অধ্যায়ের দিকে সাগ্রহে তাকিয়ে আছি। ভাল থাকুন, শিগগির আরও কিছু নিয়ে ফিরে আসব।’

অতীতে কখনো এরকম বুক ফুলিয়ে কোনো বহুজাতিক কোম্পানি মার্কিন সরকারের সঙ্গে মিলে অন্য দেশের সরকারগুলোর আইনকানুনের বিরুদ্ধে লড়ার কথা ঘোষণা করেছে কিনা তা ঐতিহাসিক গবেষণার বিষয় হতে পারে। এসব বরাবর চোরাগোপ্তা চলেছে। কিন্তু জুকেরবার্গের এই ঘোষণা প্রমাণ করে দিল যে বিশ্বজুড়ে বহু ইন্টারনেট অ্যাক্টিভিস্ট যে অভিযোগ করে আসছেন এই দৈত্যাকৃতি তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে – তা সত্যি। অর্থাৎ এদের হাতে এমন উপকরণ আছে যা দিয়ে এরা মার্কিন সরকারের হয়ে অন্য দেশের সরকারের তো বটেই, সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী কাজও করতে পারে।

করেও থাকে। সোশাল মিডিয়া যেভাবে বিশ্বব্যাপী জাল বিস্তার করেছে তা করতেই পারত না, যদি না যোগাযোগ বিপ্লব ঘটত। সেই বিপ্লবে সবচেয়ে লাভবান হওয়া কোম্পানিগুলোর অন্যতম হল স্টিভ জোবস স্থাপিত অ্যাপল। এ মাসের গোড়াতেই অ্যাপল একখানা মামলা মিটিয়ে নিতে ৯৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া প্রদেশের ওকলাহোমার ফেডেরাল কোর্টে চলা এই মামলায় মামলাকারীর অভিযোগ ছিল, আইফোন ও অন্যান্য অ্যাপল উৎপাদিত যন্ত্রপাতির ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘সিরি’, যন্ত্রের মালিকের অজান্তে তার কথাবার্তা রেকর্ড করে নিয়েছে। তারপর সেই কথাবার্তা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বেচে দেওয়া হয়েছে। তেমন হলে যে মার্কিন সরকারের কাছে বা আপনি যে দেশের লোক সে দেশের সরকারের কাছেও বেচবে না তার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। তেমন অভিযোগও ওঠে, কেবল অ্যাপল বা ফেসবুকের বিরুদ্ধে নয়। সুন্দর পিচাইয়ের গুগল এবং সত্য নাডেলার মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধেও নানারকম অভিযোগ আছে। পিচাইকে মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের সামনে বসে প্রাইভেসি, রাজনৈতিক পক্ষপাত, হিংসায় ধুয়ো দেওয়া ইত্যাদি অভিযোগ সম্পর্কে কৈফিয়তও দিতে হয়েছে।

এগুলো কোনোটাই আমেরিকাবিরোধী বা পুঁজিবাদবিরোধী বামপন্থীদের তৈরি ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব নয়। অভিযোগগুলো নিয়ে অন্তর্তদন্ত, লেখালিখি করে থাকে ফোর্বসের মত মার্কিন এবং ঘোর পুঁজিবাদী সংবাদমাধ্যমগুলোই। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি হলিউড তো এসব নিয়ে একগুচ্ছ ছায়াছবি বানিয়ে বসে আছে। এসব যদি কেবল গালগল্প হত তাহলে এডওয়ার্ড স্নোডেনকে নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গিয়ে আত্মগোপন করে থাকতে হত না।

যা-ই হোক, জুকেরবার্গের মিনিট পাঁচেকের ঘোষণার শুধু ওটুকু নিয়ে পড়ে থাকলে আমাদের চলবে না। এগোনো যাক।

ইলন মাস্ক যখন টুইটার (অধুনা এক্স) কিনে নিলেন, তখন প্রচুর লোককে ছাঁটাই করেন। তাঁদের একটা বড় অংশ ছিলেন তথ্য যাচাইকারী, অর্থাৎ যাঁরা ওই প্ল্যাটফর্মে ভুয়ো তথ্য পরিবেশন আটকানোর দায়িত্বে ছিলেন। এবার লক্ষ করুন, জুকেরবার্গও বলছেন তথ্য যাচাইকারীদের দরকার নেই। তারা বড্ড পক্ষপাতদুষ্ট। আমরা বরং এক্সের মত কমিউনিটি নোট চালু করব। অর্থাৎ আগে যদি ফেসবুকে আপনি পোস্ট করতেন যে বারাক ওবামা হলেন ওসামা বিন লাদেনের খুড়তুতো ভাই, তাহলে ফেসবুক হয়ত তা মুছে দিত। এখন থেকে মুছবে না। যদি অন্য ব্যবহারকারীরা কথাটা যে মিথ্যে তা উল্লেখ করেন, তাহলে পোস্টের তলায় একখানা নোট দেওয়া থাকবে যে অনেকে জানিয়েছেন এই তথ্য মিথ্যা। তেমন কিছু পোস্টের দৃষ্টান্তও দেওয়া থাকবে। বলা বাহুল্য, স্মার্টফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমাদের মনোযোগ যে তলানিতে এসে পৌঁছেছে তাতে অধিকাংশ লোক ওসব নোট-ফোট খুলে দেখতে যাবে না। ফলে ভুয়ো তথ্যের রমরমা হবে। ওরকম পোস্ট যদি ছবি সহকারে করা হয় তাহলে তো কথাই নেই। আমাদের দেশে অল্টনিউজ, বুমলাইভের কর্মীদের উদয়াস্ত পরিশ্রম সত্ত্বেও বারবার জওহরলাল নেহরু এক সুন্দরী মেমের সঙ্গে নাক ঘষছেন – এমন একখানা ছবি কিছুদিন পরপরই সোশাল মিডিয়ায় ঘোরে। অথচ বহুবার প্রমাণিত হয়েছে যে ওটা ফটোশপের কারসাজি। ছবিতে আসলে নেহরুর পাশে ছিলেন মহাত্মা গান্ধী, দুজনের মধ্যে হাসিঠাট্টা চলছিল।

অল্টনিউজের কথা যখন উঠলই তখন মনে করিয়ে দিই, ২০২১ সালে নাগরিক ডট নেটকে এক সাক্ষাৎকারে ওই সংস্থার কর্ণধার প্রতীক সিনহা বলেছিলেন, যে সমাজে তীব্র মেরুকরণ হয়ে গেছে সেখানে তথ্য যাচাই যথেষ্ট নয়। কথাটা সব দেশের সব সমাজের জন্যেই সত্যি। কারণ তেমন সমাজে আপনি যাদের অপছন্দ করেন তার সম্পর্কে বানিয়ে বলা খারাপ কথাও আপনি অন্ধের মত বিশ্বাস করবেন, পছন্দের লোকেদের সম্পর্কে বানিয়ে বলা ভাল কথাও একইভাবে বিশ্বাস করবেন। যাচাই করে দেখতে যাবেন না সত্যি বলা হয়েছে না মিথ্যা। একথা জুকেরবার্গও জানেন আর আজকের আমেরিকা যে প্রবল মেরুকরণ হয়ে যাওয়া এক দেশ – সেকথাও বিলক্ষণ বোঝেন। তা সত্ত্বেও তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার মানে এর পিছনে যে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এদেশে আরএসএস-বিজেপির নেতা, কর্মী, সমর্থকরা প্রতীক, মহম্মদ জুবের প্রমুখ তথ্য যাচাইকারীদের পক্ষপাতদুষ্ট বলেন। সোশাল মিডিয়ায় গালাগালি দিয়েই ক্ষান্ত থাকেন না, এফআইআর-ও করে দেন। তার জেরে জুবেরকে ইতিমধ্যেই একবার কারাবাস করতে হয়েছে, এই মুহূর্তেও তাঁর নামে মামলা চলছে আদালতে। লক্ষ করুন, জুকেরবার্গও অভিযোগ করছেন যে তথ্য যাচাইকারীরা পক্ষপাতদুষ্ট। কোন পক্ষ? সেই পক্ষকে কেন জুকেরবার্গের অপছন্দ? তা একেবারে শেষে এসে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পের পক্ষে, অর্থাৎ তথ্য যাচাইকারীরা ট্রাম্পের বিরুদ্ধ পক্ষের। গোটা বক্তৃতায় জুকেরবার্গ বাকস্বাধীনতার হয়ে ধর্মযুদ্ধে নামার ভান করেছেন। বাকস্বাধীনতা কথাটা শুনতে অতি চমৎকার। কিন্তু কার বাকস্বাধীনতা? এক্ষেত্রে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে – অভিবাসীবিদ্বেষী, কৃষ্ণাঙ্গবিদ্বেষী, মুসলমানবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী এবং রূপান্তরকামী বিদ্বেষী ট্রাম্প ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের বাকস্বাধীনতা।

কার বাকস্বাধীনতা – এই প্রশ্নটা করতে আমরা প্রায়শই ভুলে যাই। ইউরোপের নবজাগরণ, ফরাসি বিপ্লব, পাশ্চাত্যের উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় আমরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে প্রশ্নটা উঠলেও সটান বলে দিই ‘সকলের বাকস্বাধীনতা থাকা উচিত।’ সেন্সরশিপ ব্যাপারটা যে খুব খারাপ সেটাও আমরা বিনা প্রশ্নে মেনে নিই। কথাটার মধ্যে যে একটা মস্ত ফাঁক (বা ফাঁকি) আছে সেটা একুশ শতকে এসে মাস্ক, জুকেরবার্গরা দেখিয়ে দিলেন। বলা ভাল, দেখিয়ে ফেললেন। ওই ফাঁক দিয়েই তাঁরা ভুয়ো তথ্য ও ঘৃণাভাষণের হাতি গলিয়ে দিলেন। দেখুন জুকেরবার্গ কেমন অবলীলাক্রমে বলেছেন যে এসব পরিবর্তন করলে কিছু ক্ষতি হবেই। সত্যিই সোশাল মিডিয়ায় ড্রাগ, সন্ত্রাসবাদ, শিশু নির্যাতনের মত ভয়ঙ্কর জিনিস ছড়িয়ে আছে এবং নতুন ব্যবস্থায় সেগুলো বেড়ে যাবে। কিন্তু তাতে কী হয়েছে? সেন্সরশিপ তো কমবে। অর্থাৎ মানুষের স্বার্থে বাকস্বাধীনতা চাইছেন না, বাকস্বাধীনতার স্বার্থে মানুষকে বলি দিতে চাইছেন। আপনার স্মার্টফোন হাতে পাওয়া সন্তানের কোনো বিকৃতকাম লোকের পাল্লায় পড়ে যাওয়া আটকানোর চেয়ে বিকৃতকাম লোকটার বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা বেশি জরুরি – এই হল জুকেরবার্গের যুক্তি। একইভাবে কালো মানুষকে তার চামড়ার রং নিয়ে গালাগালি দেওয়ার বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা জরুরি। মহিলাদের প্রতি লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য করা, অশ্লীল ইঙ্গিত করা, ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার বাকস্বাধীনতাও জরুরি। যে কোনো প্রান্তিক পরিচিতিসম্পন্ন ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীকে যথেচ্ছ গালাগালি দেওয়া, তাদের বিরুদ্ধে ভুয়ো তথ্য ছড়ানো, সোশাল মিডিয়ায় ঘৃণাভাষণের স্বাধীনতা রক্ষাও জুকেরবার্গের খুবই জরুরি মনে হয়েছে।

কেন মনে হল? জুকেরবার্গ আদতে তো ব্যবসায়ী। তাঁর লক্ষ্য তো মুনাফা। তাহলে এইরকম বাকস্বাধীনতায় কি মুনাফার সম্ভাবনা বাড়বে? অবশ্যই। কারণ দেশের রাষ্ট্রপতি, যিনি মূলত একজন ধনকুবের, তিনি আপনার হাতে। ফলে তাঁর রাজনীতিকে জায়গা করে দিলেই আপনার ব্যবসা যে ফুলে ফেঁপে উঠবে সে তো জানা কথাই। মাস্ক যখন টুইটার কিনে নিলেন তখন অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক বলেছিলেন যে এটা ভুল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। কারণ ওটা আসলে ক্ষতিতে চলা ব্যবসা। মাস্ক নিজেও ২০২২ সালের নভেম্বরে বলেছিলেন যে টুইটারের দৈনিক ৪ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। ক্ষতিকে লাভে পরিণত করার জন্যে তারপর তিনি নানারকম ব্যবস্থা নেন। ভেরিফিকেশন টিক দেওয়ার জন্যে টাকা নেওয়া, বিনামূল্যে যত শব্দ পোস্ট করা যায় তার চেয়ে মাসিক মূল্যে কিছু বেশি শব্দ পোস্ট করতে দেওয়া, পোস্ট সম্পাদনা করতে দেওয়া – ইত্যাদি ব্যবস্থা চালু হয়। কিন্তু এহ বাহ্য। এখন বোঝা যাচ্ছে, আসলে মাস্কের উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্পকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করা। তিনি টুইটারের মালিকানা হস্তান্তরের পরেই ট্রাম্পের উপর চাপানো আজীবন নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনেন। তারপর ভুয়ো তথ্য, ঘৃণাভাষণ আটকানোর ব্যবস্থাগুলোর সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দেন। দেশে নিজের পছন্দের রাষ্ট্রপতি বসাতে পারলে অনেক ব্যবসার একটা ব্যবসায় যা ক্ষতি হবে তা পুষিয়ে নেওয়া এমন কী ব্যাপার? জুকেরবার্গও মাস্কের পথের পথিক।

এবার জুকেরবার্গের বক্তব্যের শেষ অনুচ্ছেদে আসা যাক। তিনি জো বাইডেনের আমলের নিন্দা করে বলেছেন, এমনিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই বাকস্বাধীনতার সাংবিধানিক রক্ষাকবচ সবচেয়ে বেশি। কিন্তু গত চার বছরে তাঁদের উপর এবং অন্য মার্কিন কোম্পানিগুলোর উপর মার্কিন সরকার সেন্সরশিপ চাপিয়ে দিচ্ছিল। ফলে অন্য দেশের সরকারগুলোরও সাহস বেড়ে গেছে। অতঃপর জুকেরবার্গ নির্দিষ্ট করে কিছু দেশ ও মহাদেশের নাম করেছেন, যারা নাকি এতই সেন্সরশিপ চালায় যে সেখানে কোনোরকম উদ্ভাবনীমূলক কাজ করা যায় না। নামগুলো কৌতূহলোদ্দীপক। চীনে মেটার অ্যাপগুলো নিষিদ্ধ, তাঁর দোকান খুলতেই দেওয়া হয়নি, অতএব চীনকে জুকেরবার্গের অপছন্দের কারণ বোঝা যায়। সত্যি বলতে বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে চীনের রেকর্ড খুব ভাল – এমনটা ভারতের কিছু কমিউনিস্ট ছাড়া বিশেষ কেউ দাবি করে না। বোধহয় শি জিনপিংকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলবেন – বেশ করি বাকস্বাধীনতা দিই না। যা পারিস কর গে যা। ফলে চীনের কথা না হয় বাদ দেওয়া গেল। লাতিন আমেরিকাকে নিয়ে আপত্তি তো থাকবেই। ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা সহ একাধিক দেশে এখন বামপন্থী দলগুলোর সরকার। এদের মার্কিন পুঁজিবাদীদের কোনোদিনই পছন্দ হয় না, হওয়ার কথাও নয়। সুতরাং তাদের প্রতি জুকেরবার্গের অসন্তোষও স্বাভাবিক। মজার ব্যাপার হল, ইউরোপের নাম করা। ইউরোপের প্রায় সব দেশের সরকারই তো পুঁজিবাদে ঘোর বিশ্বাসী। ফ্রান্সে, স্পেনে ইদানীং বামপন্থীদের প্রভাব যেমন খানিক বেড়েছে তেমনই নেদারল্যান্ডস, ইতালির মত দেশে ঘোর দক্ষিণপন্থী সরকার এসেছে। জার্মানিও ক্রমশ অতি দক্ষিণপন্থীদের দিকে ঝুঁকছে। তাহলে ইউরোপের উপর গোঁসা কেন?

আসলে ইউরোপের দেশগুলো ইন্টারনেট, প্রাইভেসি ইত্যাদি ব্যাপারে ভারতের মত কাছাখোলা নয়। এসব ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আইন আছে। সেইসব আইনভঙ্গের অভিযোগে সাম্প্রতিক অতীতে সিলিকন ভ্যালির টেক দৈত্যতের ফাঁপরে পড়তে হয়েছে। ২০১৮ সালে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পরে জুকেরবার্গকে সশরীরে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর দিতে যেতে হয়েছিল। ইউরোপের সরকারগুলোর উপরে ট্রাম্পের ডান হাত মাস্কও রুষ্ট (অনেকে বলছে ট্রাম্পই মাস্কের ডান হাত)। গত ৬ জানুয়ারি তিনি নিজের এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করেছেন ‘আমেরিকার উচিত ব্রিটেনের মানুষকে তাদের অত্যাচারী সরকারের হাত থেকে মুক্ত করা’। কারণ তাঁর মতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টার্মার মুসলমান অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর নন। আবার অতি দক্ষিণপন্থী ব্রিটিশ নেতা নাইজেল ফারাজকেও মাস্কের পছন্দ নয়। অন্য দেশে কার ক্ষমতায় থাকা উচিত আর কার উচিত নয় – তা নিয়ে এতকাল মন্তব্য করার একচেটিয়া অধিকার ছিল মার্কিন আর ইউরোপিয় দেশের রাষ্ট্রপতিদের। মন্তব্যগুলো করা হত লাতিন আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে। ২০২৫ সালে এসে দেখা যাচ্ছে মন্তব্য করছে টেক দৈত্যরা; এমনকি ইউরোপের যেসব দেশ নিজেদের গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতার পরাকাষ্ঠা বলে মনে করে তাদের সম্পর্কেও। তাহলে বোঝা যাচ্ছে গত দুশো-আড়াইশো বছর ধরে অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কেমন ইউ টার্ন নিয়ে ফরাসি বিপ্লবের আগের যুগে ফিরে যাচ্ছে? বোঝা যাচ্ছে কেন সোশাল মিডিয়াকে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব বলছি?

জুকেরবার্গ যা বলেছেন শুধু তা-ই যে তাৎপর্যপূর্ণ তা কিন্তু নয়। যা বলেননি তা খেয়াল করলেও গণতন্ত্রবিরোধী বা প্রতিবিপ্লবী প্রবণতাটা ধরা যাবে। লক্ষ করুন, যেসব দেশের সরকার সেন্সরশিপ চাপিয়ে দিচ্ছে বলে জুকেরবার্গ অভিযোগ করেছেন তার মধ্যে ভারত নেই, রাশিয়া নেই। কেউ বলতেই পারেন, হাতে ফর্দ নিয়ে বসে দুনিয়ায় যতগুলো দেশে অপছন্দের সরকার আছে তাদের নাম করবে নাকি? নিশ্চয়ই তা প্রত্যাশিত নয়। কিন্তু বাজার হিসাবে ভারত আর রাশিয়া বিরাট। রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিন কীরকম দমনমূলক শাসন চালান তা জানতে কারোর বাকি নেই। বিরোধিতা করলে কী অবস্থা হয় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ একদা বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনি, যিনি গতবছর কারাগারে মারা গেছেন। কিন্তু আজও পুতিনের সরকার সন্ত্রাসবাদীদের তালিকা থেকে তাঁর নাম সরাতে রাজি নয়। যদি একটু হাসিঠাট্টার মেজাজে আরও বিস্তারিত জানতে চান পুতিনের রাশিয়া সম্পর্কে, তাহলে বিদূষক জন অলিভারের শোয়ের এই পর্বটা দেখে নিতে পারেন।

উপরন্তু ২০২২ সালে রাশিয়ায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টুইটার নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ জুকেরবার্গ চীনের বিরুদ্ধে সরব হলেও রাশিয়া সম্পর্কে নীরব। আর ভারত? ২০২৩ পর্যন্ত টানা ছয় বছর আমাদের দেশ সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট শাটডাউন করা দেশের শিরোপা অর্জন করেছে। ইন্টারনেট না থাকলে মেটার কোনো অ্যাপ চলাই সম্ভব নয়। অথচ জুকেরবার্গের কিন্তু ভারত সরকারের সেন্সরশিপ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই।

এই মনোভাবের কারণ বোঝা কি সত্যিই শক্ত? পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুই সোশাল মিডিয়া মালিক জুকেরবার্গ আর মাস্ক হলেন ট্রাম্পের বন্ধু। আবার পুতিন আর আমাদের নরেন্দ্র মোদীর বন্ধু হলেন ট্রাম্প। মোদী আমেরিকায় গিয়ে অনাবাসী ভারতীয় ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের হয়ে প্রায় নির্বাচনী প্রচার করে এসেছিলেন। স্লোগান চালু হয়েছিল ‘অব কি বার, ট্রাম্প সরকার’। ট্রাম্পও ভারতে এসে এলাহি অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন মোদীর নিজের শহর আমেদাবাদে। মোদীর নামাঙ্কিত ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথম অনুষ্ঠান ছিল ট্রাম্পের অভ্যর্থনা, কোনো ক্রিকেট ম্যাচ নয়। তখন করোনা অতিমারী চলছে। দেশসুদ্ধ লোককে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখতে বলে কেবল ট্রাম্পের জন্যে লক্ষ লক্ষ লোককে সেদিন জড়ো করা হয়েছিল ওই স্টেডিয়ামে। তাছাড়া নির্বাচন এসে পড়লেই বিজেপি ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিতে কী বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে তাও তো গোপন নেই।

পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা তো আরও গভীর। ট্রাম্প প্রথমবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার সময় থেকেই অভিযোগ উঠেছে মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়া হস্তক্ষেপ করে ট্রাম্পকে সাহায্য করতে। সেই ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কোনো মার্কিন রাজনীতিবিদ রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে ট্রাম্পের মত উদগ্রীব হননি। পুতিনও ট্রাম্পের প্রশংসা করে থাকেন। ট্রাম্প এবারে ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই পুতিনের ইউক্রেনের জমি দখলকে সমর্থন করে চলেছেন। সম্প্রতি বাইডেন সরকারের অনুসৃত বিদেশনীতির একেবারে উল্টো পথে হেঁটে বলেছেন ইউক্রেনের ন্যাটোয় যোগদানে রাশিয়ার আপত্তি যুক্তিযুক্ত

যা নিয়ে বাইডেন আর ট্রাম্পের মধ্যে বিশেষ ফারাক নেই তা হল ইজরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে যে গণহত্যা চালাচ্ছে তার প্রতি সমর্থন। সেই গণহত্যাকে কীভাবে মদত দেওয়া হয়েছে সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে, তা আমরা দেখেছি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলে হামাসের অতর্কিতে হানাকে অজুহাত হিসাবে খাড়া করে ইজরায়েল প্যালেস্তাইনে যে গণহত্যা শুরু করে তার প্রতি সমর্থন আদায় করতে ছড়িয়ে দিয়েছিল এই ভুয়ো খবর, যে হামাস শিশুদের মাথা কেটে নিয়েছে। এত জোরদার ছিল সেই প্রচার যে বাইডেন সাংবাদিক সম্মেলনে ওই দৃশ্য উল্লেখ করে বসেন। পরে হোয়াইট হাউসকে স্বীকার করতে হয় যে ভুল হয়েছিল। ওরকম কিছু আদৌ ঘটেনি।

জুকেরবার্গ যে বাকস্বাধীনতার ধ্বজা ওড়াচ্ছেন সেটা আসলে এরকম যাচ্ছেতাই মিথ্যা ছড়ানোর, ঘৃণা ছড়ানোর স্বাধীনতা। ট্রাম্পের আমলে যা হবে তা হল ট্রাম্প কখনোই বলবেন না, আমার ভুল হয়েছিল। ওরকম কিছু ঘটেনি। তিনি মিথ্যে কথা বলার রাজা, ঘৃণাভাষণের সম্রাট। প্রথমবার রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন একবার নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রথম পাতা ভরে শুধু ট্রাম্পের মুখনিঃসৃত মিথ্যার তালিকা ছেপেছিল। সেই ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরেছেন। তাঁকে ফিরে আসতে সক্রিয় সাহায্য করেছে সোশাল মিডিয়া। অতঃপর তাঁর মিথ্যা, তাঁর ঘৃণা ছড়িয়ে দিতেও বিপুল বিক্রমে সাহায্য করবে তারাই। দুনিয়া জুড়ে যাবতীয় রাষ্ট্রীয় অন্যায়ে মদত দিয়ে আরও ফুলে ফেঁপে উঠবেন মাস্ক আর জুকেরবার্গ। যতই অভূতপূর্ব গরমের পর দাবানলে পুড়ে খাক হয়ে যাক লস এঞ্জেলস, সমুদ্র তীরবর্তী ম্যালিবু, হলিউডের অভিজাত অঞ্চল; সোশাল মিডিয়ায় মানুষকে বোঝানো হবে জলবায়ু পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। ও নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। কোনো দেশে বোঝানো হবে থালা বাসন বাজালেই অতিমারীর ভাইরাস পালাবে, মুসলমানরা ছয় বছর বয়স হলেই সন্ত্রাসবাদী হয়ে যায় – এইসব। আমার আপনার হাতের মগজ ধোলাই যন্ত্র আগামী দিনে আরও বেশি বেশি করে ভরে যাবে অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভুয়ো তথ্যে। সত্যের চেয়ে অর্ধসত্য বেশি মারাত্মক। সেই অর্ধসত্য এত বাড়িয়ে দেওয়া হবে বাকস্বাধীনতার নাম করে যে আমরা আর সত্য চিনতে পারব না। এদেশের সুপ্রাচীন জ্ঞানীদের কথা মানলে বলতে হয়, সত্যকে দেখতে পাব না মানে শিবকে দেখতে পাব না। শিবকে দেখতে পাব না মানে সুন্দরকে দেখতে পাব না। ফলে অবাধে কয়েকটা বড় বড় রাষ্ট্র দুনিয়া জুড়ে গণহত্যা চালাবে। একটার জায়গায় হয়ত দশটা হলোকস্ট হবে। পুতিন ক্রিমিয়া আর ইউক্রেনে হানা দিয়েছেন, নেতানিয়াহু প্যালেস্তাইনকে গণকবরে পরিণত করেছেন, ট্রাম্প হয়ত মেক্সিকো আর কানাডায় হানা দেবেন। ফলে চীন তাইওয়ানে হানা দিলেই বা কার কী বলার থাকতে পারে? কে বলে ইতিহাসের চাকা উল্টোদিকে ঘোরানো যায় না? দিব্যি তো ঔপনিবেশিক আমলের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছেন বড় বড় গণতন্ত্রের শাসকরা। কানাডাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম প্রদেশে পরিণত করব, গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্কের থেকে ছিনিয়ে নেব বলার পরেই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট স্বাধীন দেশ ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে ধরে দিতে পারলে ২৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার দেবে বলে ঘোষণা করেছে।

সোশাল মিডিয়া বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছিল। আমরা সেই ফাঁদে পড়ে গেছি। আমরা টের পাইনি কখন আমাদের যুক্তিবোধ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, প্রতিবাদ করার ইচ্ছা, প্রতিবাদ সংগঠিত করার ক্ষমতা – সব সেঁধিয়ে গেছে সোশাল মিডিয়ায়। ২০১০ সালে কায়রোর তাহরীর স্কোয়্যার থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে কলকাতার ধর্মতলা পর্যন্ত যত আন্দোলন সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়েছে, কোনোটার আহ্বান মাঠ ঘাট বন পেরিয়ে যায়নি। দুস্তর বাধা, প্রস্তর ঠেলে বন্যার মত পেরিয়ে যায়নি। যুগসঞ্চিত সুপ্তি সাড়া দেয়নি, হিমগিরি সূর্যের ইশারা শুনতে পায়নি। আমরা সোশাল মিডিয়ার বালুচরেই আশার তরণি বেঁধে ফেলেছি। এই লেখাও সোশাল মিডিয়াতেই শেয়ার করতে হবে। জুকেরবার্গ, মাস্কের সাহায্য ছাড়া আমরা বার্তা আদানপ্রদান করতে পারব না। বড়জোর ফেডিভার্স ব্যবহার করতে পারি বা ব্লুস্কাই-এর মত অন্য কোনো সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে যেতে পারি। কারণ সোশাল মিডিয়া আমাদের আসলে কাছাকাছি আনেনি। তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে, তারও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। হাতের উপর হাত রাখার মন্ত্র আমরা ভুলে গেছি। আসলে আমরা হীরক রাজার দেশে ছবির সেই কৃষক, শ্রমিকদের মত হয়ে গেছি যারা বুঝতেও পারে না তারা অন্যদের দ্বারা চালিত। মগজ ধোলাই কথাটার যথার্থ ইংরিজি এতদিনে খুঁজে পেয়েছে অক্সফোর্ড ডিকশনারি – ব্রেন রট। ব্রেন ওয়াশিং নয়।

আরো পড়ুন হিন্দিভাষী ইউটিউবার যা করলেন, বাঙালিরা যা করলেন না

অস্বীকার করি না যে এই পচন আটকানোর উপায় কী, সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। কিন্তু এখনো যাঁরা ভাবছেন পেশাদার বা অপেশাদার সোশাল মিডিয়া পরিচালকদের দিয়ে রাজনৈতিক যুদ্ধ জয় করবেন বা অধিকার আদায় করবেন, তাঁদের দেখে হাসার শক্তিটুকু আছে। কারণ জুকেরবার্গ, মাস্ক, ট্রাম্প, পুতিন, নেতানিয়াহু, মোদীদের মহাজোট প্রতিবাদকে সোশাল মিডিয়ায় আবদ্ধ করে ফেলার লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে। পরবর্তী লক্ষ্য সেখানেও প্রতিবাদী স্বর স্তব্ধ করে দেওয়া। এই জোট দেখেছে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিকল্প সংবাদমাধ্যম, ইউটিউবাররা মোদীর চারশো পার আটকাতে কী ভূমিকা নিয়েছে। তারা দেখেছে ইজরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কীভাবে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বাইরে গিয়ে মেহদি হাসানের মত সাংবাদিকরা ইউটিউব চ্যানেল খুলে ফেলে সাংবাদিকতা করছেন।

ভারতে এসব আটকাতে মোদী সরকার নতুন আইনের খসড়া তৈরি করে ফেলেছে, সেই খসড়া প্রকাশ করতে অস্বীকারও করেছে। কোনো সন্দেহ নেই, অদূর ভবিষ্যতে ট্রাম্পও একই পথে এগোবেন। বস্তুত তিনি হুমকি দিয়েই রেখেছেন। নতুন আইন না করলেও অবশ্য ক্ষতি নেই। এঁদের বন্ধু জুকেরবার্গ, মাস্ক, পিচাইরা যে নিজেদের প্ল্যাটফর্মে বিকল্প সংবাদমাধ্যম থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দল – সকলেরই গলা টিপে ধরবেন তা নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। এমনিতেই চুপিসারে অনেক প্রোফাইলের রীচ কমিয়ে দেওয়া হয়, কোনো কোনো পোস্ট আপনা আপনি উধাও হয়ে যায়। দলবদ্ধভাবে রিপোর্ট করে দক্ষিণপন্থীদের অপছন্দের পোস্ট মুছিয়ে দেওয়া তো এখনই জলভাত। এসব এবার বাড়বে বৈ কমবে না। রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা সেকথা যত বেশিদিন রাজনৈতিক বিরোধীরা ভুলে থাকবে, ততদিন গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই প্রতিবিপ্লব চলছে চলবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত