যোগাযোগ

পঞ্চায়েত নির্বাচন: ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক

প্রত্যেকবার পঞ্চায়েত নির্বাচন এসে পড়লেই খবরের কাগজে এবং খবরের চ্যানেলে বেশকিছু খবর দেখে আমার বেজায় হাসি পায়। যখন কাগজে কাজ করতাম তখনও পেত, এখনও পায়। কারণ আজন্ম পঞ্চায়েত এলাকায় বসবাস করার কারণে খবরগুলো দেখেই বুঝতে পারি, এগুলোকে যাঁরা প্রকাশযোগ্য খবর বলে চিহ্নিত করেন তাঁদের পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম এবং পঞ্চায়েত ব্যাপারটা সম্পর্কে ধারণা শূন্যের কাছাকাছি। যতদিন কলকাতার কাগজে কাজ করেছি, বরাবরই খেলার পাতায় কাজ করতাম। ফলে ভুলটা ধরিয়ে দেওয়ার সুযোগ খুব বেশি ছিল না। তার উপর সাংবাদিকরা কোনও বিষয়ে জানেন না বা ভুল জানেন, একথা মুখোমুখি বলার মত ভুল জগতে কমই আছে। তার চেয়ে জঙ্গলের মধ্যে বাঘের সামনে পড়ে গিয়ে দাঁত খিঁচানো বুদ্ধিমানের কাজ। আমার বুদ্ধিসুদ্ধি যত কমই হোক, ওই ভুল বারবার করতে যাওয়ার মতো কম নয়। তাই গোদা বাংলায় যাকে বলে ‘চেপে যাওয়া’, সেটাই করে গেছি। এবারেও তেমনই করতাম, কিন্তু উস্কে দিলেন চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের সম্পাদকমণ্ডলী। বললেন পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে একটা লেখা চাই। বললে বিশ্বাস করবেন না, এড়িয়ে যাওয়ার একটা শেষ চেষ্টাও করেছিলাম। চার নম্বর থেকে যিনি ফোন করেছিলেন তাঁকে সাবধান করে দেওয়ার ঢঙে বলেছিলাম “লেখাটা হার্ডকোর পলিটিক্স হবে না কিন্তু”। তিনি “তা চাইছিও না” বলে বলটা রাহুল দ্রাবিড়ের মতো ডেড ব্যাটে থামিয়ে দিলেন। তা ভাবলাম চাকরি যাওয়ার ভয় যখন আর নেই, তখন লিখেই ফেলি চেপে রাখা কথাগুলো।

পঞ্চায়েত এবং পঞ্চায়েত নির্বাচন আমার কাছে রীতিমতো ব্যক্তিগত ব্যাপার, ফলে এই লেখাটাও অনেকখানি ব্যক্তিগত হবে। আজকাল তো বলাই হয় “The personal is political”, যা ব্যক্তিগত তা রাজনৈতিকই। এই যে প্রাক-নির্বাচনী হিংসার খবরের প্রাচুর্য সত্ত্বেও কিছু খবর পড়ে আমার হাসি পায়, সে তো পঞ্চায়েত এলাকায় জীবন কাটানো এবং পঞ্চায়েত নির্বাচন সম্পর্কে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থাকার কারণেই। সে অভিজ্ঞতা ভুলে লিখলে শহুরে সাংবাদিকদের ভুলভুলাইয়াতেই আমাকেও ঘুরে মরতে হবে।

এবার আসল কথা বলি। কোন খবরে আমার হাসি পায়? দেখবেন সব কাগজেই এই মর্মে খবর বেরোয়, যে অমুক বাড়ির দুই জা দুই পার্টির প্রার্থী হয়েছেন। কাগজের তৎপর আলোকচিত্রী বা চ্যানেলের চিত্রগ্রহণকারী দুজনকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে (ক্ষেত্রবিশেষে দুজনের হাতে নিজ নিজ দলের পতাকা ধরিয়ে) ছবিও তোলেন। শহরের মানুষ এ ধরনের খবর যত বড় হাঁ করে গেলেন তার মধ্যে দিয়ে ভারতের সমস্ত বিরোধী দলের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতারা বিজেপিতে গিয়ে শুদ্ধ হয়ে যেতে পারেন। এই খবরগুলোতে সূক্ষ্ম বা স্থূলভাবে ইঙ্গিত থাকে, যে আসলে দুই দলের তলায় তলায় আঁতাত হয়েছে। একই পরিবারের দুজনের দুই দলের হয়ে ভোটে দাঁড়ানো তারই জলজ্যান্ত প্রমাণ। এ জাতীয় খবর দুই জা, দুই ভাই, কাকা-ভাইপো, মামা-ভাগ্নে— নানারকম সম্পর্কের প্রার্থীদের নিয়েই ছাপা হয়। সাংবাদিকতার ক্লাসে প্রথমেই শেখানো হয়, কুকুর মানুষকে কামড়ালে তা খবর নয়। মানুষ কুকুরকে কামড়ালে তবেই খবর। অস্যার্থ, যা ঘটেই থাকে তা খবর নয়। যা সচরাচর ঘটে না তা ঘটলেই খবর। স্রেফ সেই যুক্তিতেই এই খবরগুলোকে বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দেওয়ার কথা। কিন্তু যে সম্পাদকরা হাওড়া ব্রিজের ওপারটা কখনও স্বচক্ষে দেখেননি, তাঁরা ফেলেন না। বছরের পর বছর এইসব খবর দেখে শহুরে পাঠক/দর্শকেরও বিশ্বাস জন্মে যায়, অন্য কিছু নয়, এইটেই দুটো দলের আঁতাতের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

তাঁদের কে বোঝাবে যে, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা তৈরি করার উদ্দেশ্যই ছিল গ্রামের মানুষের শাসনভার তাদের হাতেই তুলে দেওয়া। নিজের বাড়ির সামনের রাস্তাটা খারাপ হলে সেটা সারানোর দায়িত্ব যেন মানুষ নিজেই নিতে পারেন— এমন ব্যবস্থা করাই পঞ্চায়েতি রাজের লক্ষ্য। কীভাবে তা করা যায় তা নিয়ে দুই ভাই, দুই জা, এমনকি বাপ-ছেলেরও মতভেদ থাকতে পারে। পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিধান হল, ভোটে দাঁড়িয়ে পড়ো। এলাকার লোক যাকে জেতাবে সে ঠিক করবে কীভাবে কী হবে। একই পরিবারের দুজন দুরকম পথ নিচ্ছেন, এটা নীতিহীনতার প্রমাণ হতেও পারে, না-ও হতে পারে। বরং পঞ্চায়েত ব্যবস্থার গণতান্ত্রিকতার নিদর্শন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মত ঘোর রাজনীতি সচেতন সমাজে এমনটা হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়।

১৯৭৮ সালে যখন পশ্চিমবঙ্গে প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়, তখন আমার জন্ম হয়নি। কিন্তু সেবার পঞ্চায়েত সমিতিতে সিপিএম প্রার্থী ছিলেন আমার বাবা। যে নিকটতম কংগ্রেস প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে তিনি নির্বাচিত হন, তিনি আমার বাবারই কাকিমার আপন ভাই। আমাদের নবগ্রাম বস্তুত পূর্ববাংলা থেকে আসা উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর জঙ্গল সাফ করে গড়ে তোলা বসতি। সে কারণেই নাম— নতুন গ্রাম। আমাদের পরিবার এই লোকালয়ে এসেছে দেশভাগের অনেক পরে, কারণ আমার ঠাকুর্দা রেলের চাকুরে ছিলেন বলে গোটা পরিবার ছিল ভ্রাম্যমান। বাবাদের নয় ভাইবোনের একেকজনের জন্ম ভারতের একেক জায়গায়। তার কোনও কোনও জায়গা দেশভাগের পর আর ভারতে নেই। ঠাকুর্দা যতদিনে অবসর নিলেন ততদিনে তাঁর আদি বাড়ি হয়ে গেছে পূর্ব পাকিস্তান, সেখানে আত্মীয়স্বজন কেউ নেই। তাহলে অত বড় পরিবার নিয়ে বাকি জীবনটা কাটাবেন কোথায়? যাঁকে আমার বাবা আটাত্তরের ভোটে হারালেন, বস্তুত তাঁদের পরিবারের ভরসাতেই ঠাকুর্দা এসে বাড়ি করেন হুগলি জেলার নবগ্রামে। ১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে যখন আমাদের বাড়ি তৈরি তদারক করছেন বাবার সেই মামাটি, তখন কি আর জানতেন এ বাড়ির ছোট ছেলে হয়ে যাবে কমিউনিস্ট আর ভোটে দাঁড়াবে তাঁরই বিপরীতে? এসব গল্প হলেও সত্যি এবং শুধু আটাত্তর সালে সত্যি ছিল তা নয়, রাজ্যের যে কোনও পঞ্চায়েত এলাকায় আজও সত্যি। বাবার সেই মামাটি আজীবন কংগ্রেসিই ছিলেন, বাবাও আমৃত্যু সিপিএম। কেউ কারও সঙ্গে কথা বন্ধ করেননি, আবার একে অপরের দলেও যোগ দেননি। দুই পরিবারের আত্মীয়তাও এখনও অটুট। শহুরে সংবাদমাধ্যম আপনাকে বোঝাবে, এটা সেই সাতের দশক থেকেই কংগ্রেসের সিপিএমের বি টিম হওয়ার লক্ষণ। কিন্তু সত্যিটা জানতে হলে আপনাকে গ্রামে যেতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম আবার একরকম নয়। যেমন ধরুন আমাদের নবগ্রামে আজ এসে দাঁড়ালে আপনি বিশ্বাসই করবেন না এটা পঞ্চায়েত এলাকা। কারণ রেলস্টেশনের বাইরে দু পা বাড়াতেই আপনার চোখে পড়বে যানজট, যার মধ্যে আটকে আছে গোটা দুয়েক রীতিমত দামি গাড়ি। তাছাড়া গ্লো সাইন, বাহারি কনফেকশনারি, কাবাবের দোকান, বাতানুকূল কেক-পেস্ট্রির দোকান, অটো, টোটো, সাইকেল রিকশা। এমনকি স্টেশন চত্বর থেকে বেরিয়ে যত এগোবেন তত চোখে পড়বে ছোটবড় রেস্তোরাঁ, এদিকে ওদিকে সম্পূর্ণ এবং নির্মীয়মাণ বহুতল। একটি বহুতলের দোতলায় সুবিখ্যাত হাবিবসের বিউটি পার্লার। অলিগলি দিয়ে হাঁটলেই দেখা যাবে, শুধু ৫০-৬০ বছরের বাড়ি নয়, ভাঙা পড়ছে মাত্র বছর পনেরো আগে তৈরি হওয়া কারও সাধের বাড়িও। একের পর এক ফ্ল্যাটবাড়ি মাথা তুলছে। শান্ত জনপদ নবগ্রাম, যেখানে বছর দশেক আগেও রাত সাড়ে নটার পর রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যেত, সেখানে আলো চুঁইয়ে পড়ছে সর্বক্ষণ। ভিটেমাটি খোয়ানো বাঙালদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে অবাঙালি মানুষের স্রোত, নয়ের দশকেও যা ছিল একশো শতাংশ হিন্দু এলাকা, সেখানে এখন তবু দু-চারটে মুসলমান পরিবার দেখা যায়। এই গ্রামের সঙ্গে কোনওভাবেই মিলবে না সুন্দরবন এলাকার কোনও গ্রাম অথবা আলিপুরদুয়ারের কোনও গ্রামের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, পঞ্চায়েত সদস্যদের কাছে দাবিদাওয়ার তালিকা।

২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আর শোনা যায় না, কিন্তু বামফ্রন্ট আমলের শেষদিকে প্রত্যেক পঞ্চায়েত নির্বাচনেই বাম দলের কর্মীরা প্রচারে বেরোলে ভোটাররা একটি প্রশ্ন অবশ্যই করতেন, “আমরা কবে মিউনিসিপ্যালিটি হব?” তাঁরা প্রতিবারই বলতেন “আগামীবার”। কিন্তু সে আগামীবার এসে পৌঁছবার আগেই বামফ্রন্ট সরকারের পতন হয়। এই প্রশ্ন নিশ্চিতভাবেই পূর্ব মেদিনীপুর বা দক্ষিণ দিনাজপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের ভোটাররা করেন না। এই বৈচিত্র্য বুঝতে পারে এ রাজ্যের কটা সংবাদমাধ্যম? বোঝাতে পারেন কতজন শহুরে মানুষকে? জানি না। মুখরোচক হওয়ায় পঞ্চায়েত বলতেই তুলে ধরা হয় খুনোখুনি আর আঁতাতের গল্প।

প্রকাশ্য বা গোপন আঁতাতের গল্প একেবারেই মিথ্যে নয়। গোটা দেশের রাজনীতি থেকেই নীতি দৌড়ে পালাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে সে নিয়মের ব্যতিক্রম হতে পারে না। কিন্তু যেসব ঘটনাকে আঁতাতের নিদর্শন বলে তুলে ধরা হয়, সেগুলো দেখে আমাদের মত পঞ্চায়েতবাসীর না হেসে উপায় থাকে না। আরও বেশি হাসি পায়, যখন অন্য দল করে বলে একই পরিবারের দুজন সদস্যের মধ্যে মারামারি, এমনকি খুনোখুনির খবর দেখিয়ে সুটবুট পরা অ্যাঙ্কররা মুখে বেদনা ফুটিয়ে বলেন “কোথায় চলেছি আমরা! সামান্য রাজনীতির জন্যে মানুষ নিজের আত্মীয়কে খুন করবে?” তারপর তুলে আনেন সংসদীয় রাজনীতির সৌজন্যের নানা দৃষ্টান্ত, সবই বিধানসভা বা লোকসভার গল্প। অর্থাৎ তখন আর মনে থাকে না, যে একই পরিবারের দুজন দুই দলের লোক হওয়ার অর্থ অশুভ আঁতাত।

আরও পড়ুন কর্ণাটক নির্বাচনের ফল: মিডিয়া, জিভ কাটো লজ্জায়

আসলে সেই ১৯৭৮ থেকে এ রাজ্যে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়ে চললেও গ্রামসভাকে শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত বাঙালি আজও বিধানসভা, লোকসভার সমান বলে ভাবতে শেখেনি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্লাসে বা টিভি চ্যানেলের আলোচনায় ‘local self-government’ কথাটা শুনতে চমৎকার লাগে। কিন্তু পঞ্চায়েতকে স্থানীয় সরকার বলে ভাবতে গেলেই মনে হয়, গাঁয়ের চাষাভুষো আবার সরকার চালাবে কী? তাই বিভিন্ন জেলার পৌরসভা নির্বাচনে বা কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচনে গোলাগুলি চললে যা শোনা যায় না, সে কথাই অনায়াসে বলা হয় পঞ্চায়েত নির্বাচনের বেলায়— “এত খুনোখুনি হলে এরকম নির্বাচনের দরকার কী?” যে এলাকা যত নগরায়িত হচ্ছে, সেই এলাকার মানুষ এই বক্তব্যের সঙ্গে তত একমত হচ্ছেন। আমাদের নবগ্রামেও আজকাল অনেককে এরকম বলতে শোনা যায়। কারণ অধিকার যত সহজে পাওয়া যায়, তত তার গুরুত্ব ভুলে যাওয়াই বোধহয় আমাদের চরিত্র। তাই সেইসব পঞ্চায়েতেই মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার অধিকার ফেরত পেতে, ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরে পেতে রক্তাক্ত লড়াই হয় যেখানে গরিব মানুষের সংখ্যা বেশি।

২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতল শাসক দল এবং চক্ষুলজ্জা থাকলে অস্বীকার করা যায় না এমন হিংসার ছবি উঠে এল সমস্ত সংবাদমাধ্যমে। আমি তখনও একটি কাগজের চাকুরে সাংবাদিক। মনে আছে আমার হিন্দি বলয় থেকে আসা সহকর্মীরা কাণ্ড দেখে হাসাহাসি করতেন এবং বলতেন “আপনাদের এখানে সামান্য পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে এত মারামারি হয় কেন? আমাদের ওখানে তো এসব হয় না! আমরা তো আগে থেকেই ঠিক করে রাখি কে কী হবে না হবে। পঞ্চায়েতটা এমন কী ব্যাপার যে এর জন্যে এত লড়তে হবে?” সিনিয়র বাঙালি সাংবাদিকরা তাঁদের সঙ্গে একমত হয়ে স্বীকার করতেন যে ব্যাপারটা সত্যিই খুব লজ্জার। কাউকে দেখিনি বুঝিয়ে বলতে, যে আপনাদের ওখানে যেটা হয় সেটা গণতন্ত্র নয়। পঞ্চায়েতি রাজ প্রতিষ্ঠা হয়েছে নামেই, তাই মুখিয়ার ছেলেই মুখিয়া হয়। মতান্তর নেই, মনান্তরও নেই। কারণ পঞ্চায়েতের হাতে তেমন ক্ষমতাই নেই। পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত এসেছে ভূমিসংস্কারের হাত ধরে। সে সংস্কার মধ্যচাষি পর্যন্ত গিয়ে থেমে গেছে কিনা তা অন্য আলোচনার বিষয়, কিন্তু এ রাজ্যের পঞ্চায়েত সত্যিই গ্রামের চিরকালীন ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে হেলাশ্রদ্ধার পাত্রদের জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। সেই অধিকার ছিনিয়ে নিতে এক দল সদা সচেষ্ট, অন্য দল অধিকার বজায় রাখতে মরিয়া। তাই লড়াই অবশ্যম্ভাবী। আপনাদের শান্তি শ্মশানের শান্তি, ওর চেয়ে অশান্তি ভাল। বোধহয় নিজেরা বোঝেন না বলেই বোঝাতে পারতেন না। এ বছরের নির্বাচনী সাংবাদিকতা দেখে বোধ হচ্ছে, আজও বোঝেন না।

শুরু করেছিলাম আমার জন্মের আগের এক পঞ্চায়েত নির্বাচনের ঘটনা দিয়ে। শেষ করি ১৯৯৮ সালের নির্বাচনের ঘটনা দিয়ে, যা পঞ্চায়েত নির্বাচন সম্পর্কে আমার প্রাচীনতম স্মৃতি।

আমাদের নবগ্রামের পাশের পঞ্চায়েতের নাম কানাইপুর। সেই কানাইপুরের বেশ খানিকটা এলাকা বিড়লাদের হিন্দমোটর কারখানার গায়ে। এখন সে কারখানা জঙ্গলে পরিণত হয়েছে, কিন্তু তখন রমরমা ছিল। কারখানার সাইরেন শুনে ঘড়ি মেলানো চলত আমাদের এলাকায়। কারখানা সংলগ্ন আলোচ্য এলাকা দুটির নাম আদর্শনগর আর শাস্ত্রীনগর। সেখানকার বাসিন্দা মূলত কারখানার হিন্দি বলয় থেকে আসা শ্রমিকরা। পঞ্চায়েত সমিতিতে ১৯৯৩ সালে তাঁদের ভোটে জিতেছিলেন সিপিএম প্রার্থী। তিনি পরিশ্রমী এবং এলাকায় যারপরনাই জনপ্রিয়, অনর্গল হিন্দি বলতে পারতেন। শ্রমিকদের যে-কারও বাড়িতে পাত পেড়ে বসে যেতে পারতেন যে-কোনও সময়। কিন্তু ভোটের কিছুদিন আগে সেই যুবক একটি গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গের কাজ করে ফেললেন। ফলে সিপিএম তাঁকে প্রার্থী না করার সিদ্ধান্ত নিল। ওই কেন্দ্রের প্রার্থীর নাম ঘোষণা হওয়ার আগেই ভোটাররা জেনে ফেললেন এই সিদ্ধান্ত, কারণ রুষ্ট পার্টিকর্মী ঘোষণা করে দিলেন তিনি নির্দল প্রার্থী হিসাবে দাঁড়াবেন। ভোটাররা কী করলেন? দলে দলে লোক একদিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে এক-দেড় কিলোমিটার হেঁটে হাজির হলেন স্থানীয় সিপিএমের যে নেতাকে তাঁরা সবচেয়ে বড় নেতা মনে করেন তাঁর বাড়িতে। বক্তব্য এক লাইনের— সেই শৃঙ্খলাভঙ্গকারী পার্টিকর্মীকেই প্রার্থী না করলে “আমরা সিপিএমকে ভোট দেব না।” সিপিএম তাঁদের দাবি মেনে নেয়নি। কিন্তু ওই নির্দল প্রার্থীকে হারাতে প্রার্থী করা হয়েছিল যাঁর কাছে ওই মানুষগুলো ফরিয়াদ নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁকেই।

ভোটারদের এইভাবে সরাসরি নিজের বক্তব্য প্রকাশ করার সুযোগ দেয়, শাসক দলের দলীয় সিদ্ধান্তকেও চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেয় যে ব্যবস্থা, তারই নাম পঞ্চায়েত নির্বাচন। আমাদের প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে প্রায় প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের স্বাদ দেয় এই নির্বাচন। যদি এই সুযোগ হারিয়ে যায়, সে ক্ষতি অপূরণীয়। লোকসভা, বিধানসভায় সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

কাশ্মীর আর মণিপুরের হাল দেখে বাঙালির শিউরে ওঠা উচিত

“আসলে কাশ্মীর আর কাশ্মীরীদের নেই। সমস্ত বড় বড় কনট্র্যাক্ট দেওয়া হচ্ছে বহিরাগতদের। গুজরাট, হরিয়ানার মত জায়গার ব্যবসাদারদের। আমাদের লোকেদের ব্যবসাগুলো ওদের সঙ্গে টাকায় পেরে উঠবে না। ফলে তারা এখন বাইরের লোকেদের সাব-কনট্র্যাক্টর।”

দুজন রাজনীতিবিদ। দুজনেই নিজের রাজ্যের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ – একজন হিন্দু, একজন মুসলমান। একজন মণিপুরের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী, অন্যজন অধুনালুপ্ত জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের শেষ মুখ্যমন্ত্রী। প্রথমজন বিজেপির নংথমবাম বীরেন সিং, দ্বিতীয়জন জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বা পিডিপির মহবুবা মুফতি। এই দুজন অতি সম্প্রতি দুই মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে এমন দুটো সাক্ষাৎকার দিয়েছেন যা পাশাপাশি রেখে দেখলে শুধু মণিপুরি বা কাশ্মীরী নয়, বাঙালিদেরও শিউরে উঠতে হবে। বস্তুত, বাঙালিদেরই শিউরে ওঠার কথা। কাশ্মীরী আর মণিপুরিদের তো সর্বনাশের মাথায় বাড়ি পড়েই গেছে। তাঁদের আর নতুন করে শিউরে ওঠার কী আছে?

২ জুলাই (রবিবার) মহবুবার এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বর্ষীয়ান সাংবাদিক সঙ্কর্ষণ ঠাকুর। সেই সাক্ষাৎকারের প্রায় প্রত্যেকটা কথাই উদ্ধৃতিযোগ্য, কিন্তু আমাদের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ের দেওয়ার মত কথাটা হল “আমি পাটনায় বিরোধী নেতাদের [সাম্প্রতিক বৈঠকে] বলেছি, মণিপুরে যা ঘটছে সেটাই ভারতের ভবিষ্যৎ চেহারা এবং কেউ কিছু করে উঠতে পারবে না। মণিপুর আমাদের আয়না দেখাচ্ছে।”

গোটা সাক্ষাৎকারে একটাও আশাব্যঞ্জক বাক্য বলেননি মহবুবা। অবশ্য ২০১৯ সালের ৫ অগাস্টের পর কোনো কাশ্মীরীর মুখ থেকে আশার বাণী শোনার আশা করা মানে হয় আপনি কাশ্মীরের ঘটনাবলী সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, নয় মুখে দরদ দেখাচ্ছেন আর মনে মনে ভাবছেন “ভাল টাইট হয়েছে ব্যাটারা”। এই টাইট হওয়ার ব্যাপারটাই ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মানুষের, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মানুষের, ভাল করে বোঝা প্রয়োজন এবং বুঝতে গেলে বীরেনের সাক্ষাৎকারের কাছে যেতে হবে। প্রণয় ও রাধিকা রায়ের বিতাড়নের পর এনডিটিভিও যে রবীশ কুমার নামাঙ্কিত গোদি মিডিয়ার অংশ হয়ে গেছে তা সর্বজনবিদিত। সেই চ্যানেল সমেত অন্য অনেক চ্যানেলকেই বীরেন কেন ৩০ জুন (শুক্রবার) পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন এবং শেষপর্যন্ত করলেন না, তা নিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সর্বত্র প্রায় একই কথা বলেছেন, এখানে এনডিটিভির সাক্ষাৎকার নিয়েই আলোচনা করব।

পদত্যাগ করতে চাওয়ার কারণ হিসাবে যা জানিয়েছেন তাতে চমকে ওঠার মত কিছু নেই। লোকে যতক্ষণ তাঁর খড়ের পুতুল পোড়াচ্ছিল ততক্ষণ ঠিক ছিল। তা বলে মোদীজির কুশপুত্তলিকা দাহ করবে! অহো, কী দুঃসহ স্পর্ধা! ওই স্পর্ধা দেখে বীরেন আর স্থির থাকতে পারেননি। তিনি ব্যথিত হন এবং ভাবেন, লোকে যখন তাঁকে বিশ্বাসই করছে না, শ্রদ্ধাই করছে না, তখন চেয়ারে বসে থেকে কী হবে? এসব কথায় প্রশাসক হিসাবে বীরেনের যোগ্যতা বা অযোগ্যতা নয়, প্রকট হয় ফুয়রারের সেনাপতি হিসাবে তাঁর বিশ্বস্ততা। প্রায় ২৮ মিনিটের সাক্ষাৎকারে দেশের বাকি অংশের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল শেষ মিনিট আষ্টেক।

প্রায় দুমাস ধরে চলা মণিপুরের দাঙ্গা কেন, কোন ঘটনা থেকে শুরু হল তা দুনিয়াসুদ্ধ লোক জেনে গেছে বহু আগেই। প্রায় সমস্ত সংবাদমাধ্যম, এমনকি এই ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত হয়েছে, যে ঘটনার সূত্রপাত ৩ মে মণিপুরের সমস্ত উপজাতিদের এক সম্মিলিত পদযাত্রা থেকে। কী জন্যে আয়োজিত হয়েছিল সেই পদযাত্রা? মণিপুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় মেইতেইরা দাবি তুলেছে তাদের তফসিলি উপজাতি বলে ঘোষণা করতে হবে। ২০ এপ্রিল মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে বলে, এই দাবি দশ বছর ধরে ফেলে রাখা হয়েছে। কালবিলম্ব না করে যেন রাজ্য সরকার চার সপ্তাহের মধ্যে এ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকারকে তার সুপারিশ জানায়। আদালতের এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়াতেই ওই পদযাত্রা বেরোয় এবং দাঙ্গা শুরু হয়। মূল সংঘর্ষ যে মূলত উপত্যকায় বসবাসকারী মেইতেইদের সঙ্গে পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী কুকি এবং নাগাদের, সেকথাও কারোর অজানা নেই। কোনো রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং আর্থসামাজিকভাবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা সম্প্রদায় সংরক্ষণ দাবি করছে, এমনটা ২০১৪ সালের আগে বিশেষ দেখা যেত না। উপরন্তু মুখ্যমন্ত্রী বীরেন নিজে মেইতেই। এসব কারণেই যে মণিপুরের উপজাতিদের মধ্যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, তাও এখন সবার জানা। কিন্তু বীরেন এনডিটিভির সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে এই দুমাসব্যাপী দাঙ্গার এক সম্পূর্ণ নতুন কারণ নির্দেশ করেছেন। বলেছেন মেইতেইদের তফসিলি উপজাতি তালিকাভুক্ত করার আইনি নির্দেশ নাকি আদৌ এসবের কারণ নয়। তাঁর বক্তব্য “সরকার তো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে মেইতেইদের তফসিলি উপজাতি ঘোষণা করার সুপারিশ এখনো পাঠায়নি। তাহলে সেদিন পদযাত্রা বার করা হয়েছিল কিসের দাবিতে? যারা করেছিল তাদের জিজ্ঞাসা করুন।” তারপর নিজেই উত্তর দিয়েছেন এবং সেই উত্তরে আলোচনার অভিমুখই বদলে দিয়েছেন।

বলেছেন তাঁর সন্দেহ, এর পিছনে আসলে অনুপ্রবেশকারী এবং মাদক ব্যবসায়ীরা। বলেছেন মণিপুরের পার্বত্য এলাকায় নাকি জনবিন্যাসজনিত ভারসাম্য (“demographic balance”) নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মেইতেই এবং নাগা এলাকায় সব ঠিক আছে, কিন্তু কুকি এলাকায় নাকি জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, রাজ্যের মায়ানমার সীমান্তবর্তী তিন জেলায় নাকি গত কয়েক বছরে প্রায় ১,০০০ নতুন গ্রাম গড়ে উঠেছে। একথা জানতে পারার পর তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে ওই এলাকার মানুষের বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র পরীক্ষা করতে বলেন। সেই উদ্দেশ্যে ক্যাবিনেট সাব-কমিটি গড়া হয়। তাঁর সাফাই “সেই কমিটির চেয়ারম্যান করি লেপাও হাওকিপকে, যে নিজেই একজন কুকি। আমার যদি কুকিদের সম্পর্কে খারাপ মনোভাব থাকত, তাহলে এটা করতাম কি?” তিনি এও বলেন যে মণিপুরের কুকিরা তাঁর ভাই, তাদের নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু যারা বাইরে থেকে আসছে তাদের বরদাস্ত করা যায় না। তা সেই সাব-কমিটি নাকি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ২,১৭৪ জন অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে ফেলে। বীরেন ভারি নরম গলায় বলেন “আমি বললাম, এরা নিরীহ লোক। বিপদে পড়ে এখানে এসেছে, এদের উপযুক্ত পরিচয়পত্র দিয়ে শেল্টার হোম বানিয়ে রাখা হোক যাতে ভারতীয় নাগরিক না হতে পারে। মায়ানমারে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া যাবেখন। তা এসব করেছি বলে এই গণ্ডগোল করা হয়ে থাকতে পারে।” টানা দুমাস দাঙ্গা চলার পরে, বহু মানুষের মৃত্যুর পরে, বহু মানুষ ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেওয়ার পরেও রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসক সঠিক কারণ বলতে পারলেন না। হাওয়ায় কিছু অভিযোগ ভাসিয়ে দিলেন।

এরপরেই তিনি যোগ করলেন “তাছাড়া ২০১৯ সাল থেকে আমরা মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছি। তাতে দু হাজারের বেশি লোক গ্রেফতার হয়েছে জঙ্গলের এলাকা থেকে। তার মধ্যে একজন গ্রামপ্রধানও আছেন। সুতরাং এই সঙ্কট যারা আফিম চাষ করে সেই মাফিয়ারা আর যারা মায়ানমার থেকে অনুপ্রবেশে প্রশ্রয় দেয়, তারা মিলিতভাবে তৈরি করে থাকতে পারে।”

এই কয়েক মিনিটের কথায় জ্বলন্ত মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী কী কী করলেন একবার দেখে নেওয়া যাক:

১) গোটা অশান্তির দায় কুকিদের উপর চাপিয়ে দিলেন। মেইতেইদের কোনো দোষ নেই। অর্থাৎ একটা রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সুচতুরভাবে একটা সম্প্রদায়ের (তাঁর নিজের সম্প্রদায়) পক্ষ নিয়ে নিলেন।
২) কুকিদের মধ্যে অনেকেই আসলে অনুপ্রবেশকারী – এই সন্দেহ ছড়িয়ে দিলেন। অর্থাৎ কুকিদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলেন।
৩) কুকিরা পার্বত্য এলাকায়, অরণ্য এলাকায় গ্রামে গ্রামে আফিম চাষ করে। কুকি মানেই সন্দেহজনক, কুকি মানেই অপরাধী হতে পারে – এই ভাষ্য প্রচার করে দিলেন।

এই কায়দা কি নতুন? একেবারেই নয়। গোটা ভারতে মুসলমানদের সম্পর্কে ঠিক এই ভাষ্যই চালায় হিন্দুত্ববাদীরা। কুকির বদলে মুসলমান বসিয়ে নিন আর তৃতীয় ক্ষেত্রে পার্বত্য এলাকা, অরণ্য এলাকার বদলে মাদ্রাসা বসিয়ে নিন। আফিম চাষের বদলে সন্ত্রাসবাদী চাষ বসিয়ে নিন।

সুতরাং বীরেন যা বলেছেন তা বস্তুত বর্তমান ভারতে প্রচলিত সংখ্যাগুরুবাদী ভাষ্যের মণিপুরি রূপ। এবার আসা যাক, বাঙালিদের কেন সচকিত হওয়া উচিত সেই প্রসঙ্গে।

এই ভাষ্যের অসমিয়া রূপটা নিশ্চয়ই সকলের মনে আছে। সেখানে সংখ্যাগুরু অসমিয়ারা, আর জনবিন্যাসজনিত ভারসাম্য নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগ বাঙালিদের বিরুদ্ধে। অতএব ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার (এনআরসি)। সেই ব্যবস্থার প্রকোপে কত মানুষকে ডিটেনশন সেন্টারে কাটাতে হচ্ছে, কত মানুষের সেখানে মৃত্যু হয়েছে ইতিমধ্যেই, কতজন যে কোনো সময়ে অনুপ্রবেশকারী বলে অভিযুক্ত হওয়ার ভয়ে কাঁটা হয়ে আছেন – তার সঠিক সংখ্যা কারোর পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমরা শুধু একটা সংখ্যাই নির্দিষ্টভাবে জানি – ১৯ লক্ষ। ৩১ অগাস্ট ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত চূড়ান্ত এনআরসি থেকে বাদ পড়ে এতগুলো মানুষের নাম। বলা হয়, এঁরা ভারতের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেননি। এঁদের সম্পর্কেও বলা হয়েছিল বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। বাংলাদেশ সে কথায় আমল দেয়নি, মায়ানমারও দেবে না, পৃথিবীর কোনো দেশই দিত বলে মনে হয় না। এদিকে অসমিয়া সংখ্যাগুরুবাদীরা কিন্তু এনআরসি থেকে ‘মাত্র’ ১৯ লক্ষ মানুষ বাদ যাওয়ায় অখুশি। তারা আরও নিখুঁত (অর্থাৎ আরও বেশি মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার মত) এনআরসি চায়। কোনো মানুষকে বেআইনি বলাই যে অমানবিক, সে আলোচনায় না গিয়েও এনআরসি যে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়া তা বলাই যায়। নইলে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির পরিবারের সদস্যরা এ দেশের নাগরিক নয় – একথা এনআরসিতে প্রমাণিত হল কী করে?

নাগরিকত্বের ধারণাতেই যে মৌলিক গোলমাল আছে সে তর্কে এই আলোচনায় ঢুকব না, অন্য কথা বলি। এ দেশের নাগরিকদের হাতে একাধিক পরিচয়পত্র বহুকাল ধরে আছে। সেসবে এমনিতেই পাহাড়প্রমাণ ভুল থাকে যার জন্য নাগরিকরা নন, সরকারি ব্যবস্থা দায়ী। যে কোনোদিন দেশের যে কোনো মহকুমা আদালতে খানিকক্ষণ বসে থাকলেই দেখা যায় বহু মানুষ আসেন শুধু নাম এফিডেভিট করাবেন বলে। একেক নথিতে একেকরকম নাম ছাপা হয়েছে একেকরকম বানানে। সেইসব মানুষের অধিকাংশই হয় মুসলমান, নয় নিম্নবর্গীয় হিন্দু। কারণ পরিচয়পত্র তৈরির দায়িত্বে থাকা সরকারি আধিকারিকদের মধ্যে হিন্দু উচ্চবর্গীয়রা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাঁরা এঁদের নামগুলো জম্মে শোনেননি, শুনলেও বানান জানেন না। জেনে নেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেন না। তাই ভুলের বেশিরভাগটা মুসলমান ও হিন্দু নিম্নবর্গীয়দের কাগজপত্রেই হয়ে থাকে। বন্যা ইত্যাদি দুর্যোগে কাগজপত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা বাদই দিলাম। তা এই এনআরসি সারা দেশেই করার অভিপ্রায় ছিল কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের। উদ্দেশ্য স্পষ্ট – যেসব সম্প্রদায় হিন্দুরাষ্ট্রে অবাঞ্ছিত, তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া। যেহেতু হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে না এত কোটি মানুষ, তাই গণহত্যায় যদি না মরে তো থাকবে। কিন্তু শাসক সংখ্যাগুরুর অধীনস্থ প্রজা হিসাবে থাকবে। এত বড় দেশে ব্যাপারটা করা অসম্ভব, যদি না যাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে তাদের মধ্যেই সমর্থন তৈরি করা যায়। তাই ঝোলানো হয়েছিল নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নামক গাজর। ফলে এনআরসি বরাক উপত্যকার বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে সমর্থন পেয়ে গেল, পশ্চিমবঙ্গেও ১৯৪৭ বা ১৯৭১ সালের পর এপারে আসা বাঙালদের উত্তরপুরুষের এনআরসি সম্পর্কে মতামত হয়ে গেল “সরকার একটা ভাল জিনিস করলে বিরোধিতা করব কেন?” সঙ্গে মিশে থাকল পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারানোর গল্প শুনে বড় হওয়া মস্তিষ্কের প্রতিশোধস্পৃহা। বরাবরের পশ্চিমবঙ্গীয়দের তো কথাই নেই। তাঁরা নিশ্চিন্ত – “আমি যে ছিলাম এই গ্রামেতেই”। যাঁরা এরকম মানসিকতার নন, তাঁরাও ভাবলেন সিএএবিরোধী আন্দোলন করার প্রয়োজন মুসলমানদের। নাগরিকত্ব গেলে তো তাদের যাবে, হিন্দুরা তো এনআরসিতে জায়গা না পেলেও ফের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। মতুয়ারা রীতিমত আশান্বিত হলেন বহু প্রতীক্ষিত নাগরিকত্ব এইবার পাওয়া যাবে ভেবে। নাগরিকত্ব পেতে গেলে যেসব অলীক শর্ত পূরণ করার কথা আইনে বলা আছে সেদিকে খুব বেশি লোকের চোখই পড়ল না।

দেশজুড়ে পথে পথে আন্দোলন এবং কোভিড-১৯ নামক ভাইরাসের নিচে এনআরসি চাপা পড়ে গেল। সম্ভবত সেই কারণেই আন্দোলন বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকলেও সিএএ অনুযায়ী কাউকে নাগরিকত্ব দেওয়ার তাগিদ আর নরেন্দ্র মোদী সরকারের নেই। আসল উদ্দেশ্য তো অনেককে বাদ দেওয়া, কাউকে কাউকে যোগ করা নয়। যাঁরা ভেবেছিলেন আরএসএস-বিজেপি এনআরসির কথা ভুলে গেছে, তাঁদের বীরেনের কথা মন দিয়ে শোনা উচিত। তাঁর তৈরি ক্যাবিনেট সাব-কমিটি যা করছিল বলছেন, তা তো আসলে এনআরসির কাজই। কিছু মানুষকে অনাগরিক চিহ্নিত করে আলাদা জায়গায় রাখা। বীরেন খেলার মাঠের লোক ছিলেন বলে বোধহয় মনটা নরম, তাই ডিটেনশন সেন্টার না বলে শেল্টার হোম বলেছেন। লক্ষণীয় যে অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করা হয়েছে বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র দিয়ে, অর্থাৎ আধার কার্ড। এই জিনিসটি যে একেবারে ফালতু, সেকথা এখন নেহাত নিরক্ষর মানুষও জেনে গেছেন। আধার জাল করা অত্যন্ত সহজ, নিত্যই আধার জাল করে লোকের টাকাপয়সা মেরে দেওয়ার কাহিনি কাগজে, টিভিতে, ওয়েবসাইটে দেখা যায়। আর বায়োমেট্রিক? প্রায়শই শোনা যায় অমুকের আঙুলের ছাপ আর মিলছে না, তমুকের চোখের মণি মিলছে না। ফলে অমুক সরকারি প্রকল্পের টাকা তোলা যাচ্ছে না, রেশন তোলা যাচ্ছে না। এই গোলযোগে ঝাড়খণ্ডে লুখি মুর্মু নামে এক মহিলা অনাহারে মারা গেছেন বলেও অভিযোগ আছে। সেই আধার কার্ড দিয়ে নাগরিক চিনে নিচ্ছে বীরেনের সরকার।

তবে এনআরসির চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে গেছে তাঁর ক্যাবিনেট কমিটি। কারণ গোটা রাজ্যের মানুষের নাগরিকত্বের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে না, হচ্ছে শুধু সংখ্যালঘু কুকিদের। আগামীদিনে কি তাহলে এভাবেই অন্য নামে এনআরসি হবে সারা দেশে? যে যেখানে সংখ্যালঘু কেবল তাদেরই নাগরিকত্বের পরীক্ষায় বসানো হবে, যাতে আসামের এনআরসির চেয়ে অনেক সহজ, সুশৃঙ্খল হয় কাজটা, আরও বেছে বেছে অপছন্দের জনগোষ্ঠীর মানুষকে বাদ দেওয়া যায়? আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। যাঁরা জানেন না তাঁরা বলবেন, এ তো মেইতেই-নাগা জাতিগত রেষারেষির ব্যাপার। এর মধ্যে আরএসএস, হিন্দুত্ব, হিন্দুরাষ্ট্র আসছে কোথা থেকে? তাঁদের জন্য উল্লেখ থাক, মেইতেইরা প্রধানত হিন্দু। কুকিরা প্রধানত খ্রিস্টান। গত দুমাসে কয়েকশো গির্জা এবং মন্দির পোড়ানোর ঘটনা ঘটেছে মণিপুরে।

ভারতে তো আজকাল আর এসব পড়ে মানুষ হিসাবে খারাপ লাগে না অনেকের। ফলে শুধু সংখ্যালঘুদের জন্য এনআরসি করার আশঙ্কাতেও শিউরে উঠবেন না অনেকেই, যদি তিনি যেখানে আছেন সেখানকার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ হন। তাই মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, ভারতবর্ষ এমন এক সাড়ে বত্রিশ ভাজা যে এদেশে সকলেই কোথাও না কোথাও সংখ্যালঘু। মারোয়াড়ি বা গুজরাটি নিজের রাজ্যে ধর্মীয় এবং জাতিগতভাবে সংখ্যাগুরু; কর্মসূত্রে পশ্চিমবঙ্গে এসে জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু। বাঙালি হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় ও জাতিগতভাবে সংখ্যাগুরু; বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ বা দিল্লিতে জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু। বাঙালি মুসলমান হিন্দি বলয়ে গেলে আবার জাতিগত ও ধর্মীয় – দুভাবেই সংখ্যালঘু। দেড়শো কোটি ভারতীয়ের মধ্যে এমন কাউকে পাওয়া খুব শক্ত যে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত যেখানেই যাবে সেখানেই সবদিক থেকে সংখ্যাগুরুই থাকবে। অথচ করমণ্ডল এক্সপ্রেসের অসংরক্ষিত কামরায় যাত্রা করা দিনমজুর থেকে শুরু করে লোরেটো হাউসের প্রাক্তনী আই টি মজুর পর্যন্ত সকলকেই জীবিকার টানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যেতে হবে, সেখানে সংখ্যালঘু হয়ে থাকতে হবে। যতই ফড়ফড়িয়ে ইংরিজি বলুন আর গড়গড়িয়ে হিন্দি, নাম দেখে বাঙালি বলে ঠিক চিনে ফেলা যাবে। ফলে নিশ্চিন্ত থাকার উপায় কারোরই নেই।

এই কারণেই মহবুবা যা বলেছেন তা অভ্রান্ত। আসামে এনআরসি নাম দিয়ে বা মণিপুরে ক্যাবিনেট সাব-কমিটির নাম দিয়ে যা করা হচ্ছিল তা আসলে ভারতের প্রতিটি রাজ্যের জন্য সযত্নে আলাদাভাবে তৈরি একেকটা হিন্দুত্ববাদী মডেল (যদিও উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদকে উস্কে দিয়ে এনআরসির পথ করে দিয়েছিলেন কংগ্রেস নেতা রাজীব গান্ধী)। হিন্দুত্ববাদের লক্ষ্য অখণ্ড ভারত, কিন্তু আসলে যা করছে এবং এই কর্মপদ্ধতি একমাত্র যা করে উঠতে পারে, তা হল ভারতের বালকানায়ন (Balkanisation)। অর্থাৎ খণ্ড খণ্ড ভারত। যত এক দেশ, এক ভাষা, এক ধর্ম, এক পুলিস, এক নির্বাচন, এক দেওয়ানি বিধি ইত্যাদি ধারণা গোটা ভারতের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বাড়ছে, তার প্রতিক্রিয়ায় ভূমিপুত্রদের জন্য সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের মত রক্ষণশীল দাবিও বাড়ছে। দুই রাজ্যের পুলিসের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যাওয়ার মত ঘটনা ঘটছে। এভাবে চললে সব রাজ্যেই ‘ভিনরাজ্যের লোক হটাও’ অভিযান শুরু হবে। এর ট্রেলারও ইতিমধ্যেই কিছু কিছু জায়গায় দেখানো হয়ে গেছে। সোশাল মিডিয়ার যুগে কোনো রাজ্যকে এসব ইস্যুতে মণিপুর করে দেওয়া কয়েক মিনিটের ব্যাপার। সংরক্ষণের মত কোনো বড় ইস্যুর প্রয়োজনই পড়বে না।

আরো পড়ুন স্রেফ বলপ্রয়োগে মণিপুর সমস্যা আরো বাড়বে

তবে হিন্দুত্ববাদী মডেল যারা তৈরি করে তাদের আর যা-ই হোক, অবধানের এবং পরিশ্রমের খামতি নেই। একই মডেল যে সব রাজ্যে চলবে না তা তারা বিলক্ষণ জানে। তারা বোঝে যে কিছু রাজ্য আছে যেখানকার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে এভাবে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সরাসরি লড়িয়ে দেওয়া যাবে না। অন্য কৌশল দরকার হবে। আবার জম্মু ও কাশ্মীরের মত রাজ্যও ছিল, যেখানে হিন্দুত্বের সবচেয়ে বড় ঘোষিত শত্রু মুসলমানরাই সংখ্যাগুরু। সেক্ষেত্রে রাজ্যটাকেই ভেঙে দেওয়া দরকার। সে কাজ সম্পন্ন হয়েছে লোকসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে। কিন্তু আধিপত্য স্থায়ী করতে হলে দরকার রাজ্যটার চরিত্রই বদলে দেওয়া। জনবিন্যাসজনিত ভারসাম্য নষ্ট করার যে অভিযোগ কুকিদের বিরুদ্ধে বীরেন করেছেন, মহবুবা সঙ্কর্ষণকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন প্রায় সে জিনিসই ৫ অগাস্ট ২০১৯ তারিখের পর থেকে কাশ্মীরে করা হচ্ছে। “আসলে কাশ্মীর আর কাশ্মীরীদের নেই। সমস্ত বড় বড় কনট্র্যাক্ট দেওয়া হচ্ছে বহিরাগতদের। গুজরাট, হরিয়ানার মত জায়গার ব্যবসাদারদের। আমাদের লোকেদের ব্যবসাগুলো ওদের সঙ্গে টাকায় পেরে উঠবে না। ফলে তারা এখন বাইরের লোকেদের সাব-কনট্র্যাক্টর। বালি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের বিরাট আবিষ্কার লিথিয়াম – সবকিছু বাইরের লোকেদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। তাও দুর্নীতি করে,” বলেছেন জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।

তাহলে মোদ্দা কথা হল, যে রাজ্যের সংখ্যাগুরু (ধর্মীয় বা জাতিগত) হিন্দুত্বের পতাকা নিজেই তুলে নেবে না সে রাজ্যকে ভেঙে দেওয়া হবে। সেখানকার অর্থনীতির লাগাম তুলে দেওয়া হবে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী রাজ্যগুলোর ধনী ব্যবসায়ীদের হাতে। বদলানোর চেষ্টা হবে জনবিন্যাস। ফলে যারা ছিল সংখ্যাগুরু, তারা হয়ে যেতে পারে ভীত সন্ত্রস্ত সংখ্যালঘু। এ হল হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠার আরেকটা মডেল। পশ্চিমবঙ্গবাসীর শিউরে ওঠা উচিত, কারণ পশ্চিমবঙ্গে একইসঙ্গে মণিপুর মডেল এবং কাশ্মীর মডেল প্রয়োগ করা সম্ভব।

ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির একেকজন নেতা উত্তরবঙ্গকে আলাদা রাজ্য করা নিয়ে একেকরকম কথা বলে রেখেছেন। এমনকি কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশনের প্রধান জীবন সিং এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ বছর জানুয়ারি মাসে দাবি করেছিলেন, আলাদা কামতাপুর রাজ্যের দাবি নিয়ে নাকি কেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা চলছে। মধ্যস্থতা করছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। একথা সত্যি যে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো ভাবনাচিন্তা আছে বলে ঘোষণা করা হয়নি। তবে মনে রাখা ভাল, সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করা এবং জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য ভেঙে দেওয়ার ব্যাপারে আগের দিন সন্ধেবেলাও কিছু জানতেন না বলে দাবি করেছেন তৎকালীন রাজ্যপাল সত্যপাল মালিক। অবশ্য যিনি বলেন রাজভবনের ফ্যাক্স মেশিন খারাপ ছিল বলে মহবুবার সরকার গঠন করার দাবি জানতে পারেননি, তাঁকে বিশ্বাস করা চলে না। কিন্তু সঙ্কর্ষণের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মহবুবাও বলেছেন “হপ্তাখানেক ধরে গুজব শুনছিলাম…সেইজন্যেই আমি, ওমর আবদুল্লা এবং অন্যরা মিলে রাজ্যপালের কাছে যাই জানতে যে সত্যিই ৩৭০ রদ করা হবে কিনা। উনি আমাদের বলেন ‘আমি আপনাদের বলছি, সেরকম কিচ্ছু হবে না’। পরদিন সকালে কী হল সে তো জানেনই। আমাদের সন্দেহ হচ্ছিল বটে, কিন্তু যতক্ষণ না পরেরদিন আমাদের মাথায় বাজ পড়ার মত করে ব্যাপারটা ঘটল, আমরা বিশ্বাস করতে পারিনি।”

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির লাগাম এমনিতেই অনেকটা হিন্দিভাষীদের হাতে। রাজ্য ভাগ করলে বাঙালি হিন্দুরা উত্তরবঙ্গে নানা জাতি, উপজাতির মধ্যে হয়ে পড়বেন সংখ্যালঘু। কাশ্মীরী মুসলমানদের দুর্গতি দেখে ২০১৯ সালে যাঁরা উল্লসিত হয়েছিলেন তাঁরা সেদিন বিপুল অপরাধবোধে ভুগতে পারেন।

দক্ষিণবঙ্গে হিন্দিভাষী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালের পর জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সারা দেশের লোকসভা, বিধানসভার আসনগুলোর ভোটার পুনর্বিন্যাস করার কথা। গোটা বা ভাঙা দক্ষিণবঙ্গে এমন হতেই পারে যে বেশকিছু আসনে বাঙালিরা নয়, হিন্দিভাষীরাই হয়ে গেলেন নির্ণায়ক শক্তি। অথচ মণিপুরের মতই পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে, অনুপ্রবেশকারীতে ভরে যাচ্ছে – এ অভিযোগ বিজেপির বহুকালের (সংসদে এ অভিযোগ প্রথম তোলেন অবশ্য মমতা ব্যানার্জি)। বীরেন যেমন সংখ্যালঘু কুকিদের মায়ানমার থেকে আসা অনুপ্রবেশকারী বলে সন্দেহ ছড়াচ্ছেন, তেমনই বাঙালি মুসলমানরা আসলে বাংলাদেশি – এই সন্দেহ সারা ভারতে ইতিমধ্যেই ছড়ানো হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত তার ফল ভোগ করেছেন শুধুমাত্র ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। কিন্তু সোশাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই টের পাওয়া যায়, ধর্ম বা শ্রেণি নির্বিশেষে বাঙালি মাত্রেই যে বাংলাদেশি (হ্যাঁ, হিন্দু উচ্চবর্গীয়রাও। কারণ দেশভাগের ফলে বিপুল সংখ্যক বাঙালি হিন্দুর এ পারে চলে আসার কথা আই টি সেলের প্রত্যেকটি কর্মী জানে) – এই ধারণার প্রচার পুরোদমে চলছে। রাজ্য ভেঙে গেলে চাটুজ্জে, বাঁড়ুজ্জে, ঘোষ, বোসদেরও অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত হতে সময় লাগবে না।

আরও পড়ুন প্রজাতন্ত্রসাধনা

কাশ্মীরীরা আজ কেমন আছে জিজ্ঞেস করায় মহবুবা যা বলেছেন তা একেবারে জর্জ অরওয়েলের ডিস্টোপিক উপন্যাস নাইন্টিন এইট্টি ফোর মনে পড়ায়। “কাশ্মীরীরা প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যে বাস করছে। তারা ঘরের মধ্যেও মন খুলে কথা বলত পারে না, কারণ তারা ভীত, তাদের বেঁচে থাকার বোধটাকেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আমরা বন্দুক আর বুটের নিচে বাস করছি।” যেসব জনগোষ্ঠীকে হিন্দুত্ব নিজেদের শত্রু বলে মনে করে, তাদের কিন্তু এভাবেই রাখতে পছন্দ করে। কেবল বাঙালি মুসলমান নয়, বাঙালি হিন্দুরাও যে মোটেই আরএসএসের পছন্দের জনগোষ্ঠী নয় তার বহু প্রমাণ আছে, খামোকা এ লেখার কলেবর বাড়িয়ে লাভ নেই। কিছুই খুঁজে না পেলে পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রচারসভায় “ভারত মাতা কি জয়” স্লোগান খেয়াল করুন। নিদেন বাংলায় অনুবাদ করে নিয়ে “ভারতমাতার জয়” বলাও বিজেপি কর্মীদের না-পসন্দ।

কেউ অবশ্য বলতেই পারেন, পশ্চিমবঙ্গ অনেক বড় রাজ্য, বাঙালিরাও অনেক বড় জাতি। সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গবাসী হিন্দু তো বটে। সুতরাং মণিপুর, কাশ্মীর নিয়ে আমাদের ভাবার দরকার কী? অমন ব্যবহার আমাদের প্রতি আরএসএস-বিজেপি করতে যাবে কেন? বড় রাজ্য, বড় জাতিকে ছোট করে নেওয়ার কায়দা যে হিন্দুত্ববাদীদের জানা আছে তা তো আগেই ব্যাখ্যা করেছি। ফলে বিরাটাকার নিয়ে ভরসা করে বোধহয় লাভ নেই। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যবাসীর হিন্দুরাষ্ট্রের আদর্শ নাগরিক হয়ে ওঠার ক্ষমতার উপর হয়ত ভরসা রাখা যায়। যেভাবে চতুর্দিক হিন্দিভাষীতে ভরে যাওয়া নিয়ে নিচু গলায় অসন্তোষ প্রকাশ করতে করতে নিজের ছেলেমেয়েদের স্কুলের দ্বিতীয় ভাষা হিন্দি করে দিচ্ছেন কলকাতা ও শহরতলির ভদ্রলোকেরা, বাঙালি হিন্দুর বহুকালের উৎসব রথযাত্রার চেয়ে বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছেন গণেশপুজোয়, যেভাবে বারাণসীর ঢঙে কলকাতার ঘাটে গঙ্গারতি চালু করেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, দীঘাকে করে তুলছেন পুরীর মত তীর্থস্থান, শাসক দল রামনবমীর মিছিল করছে বিজেপির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, বজরংবলীর পুজো হচ্ছে ঘটা করে, বাংলা মেগাসিরিয়ালে বাজছে হিন্দি ছবির গান, বাংলা ছবির পোস্টার সারা ভারতে মুক্তির দোহাই দিয়ে লেখা হচ্ছে দেবনাগরী হরফে আর বাঘাযতীনের চেহারা হয়ে যাচ্ছে অক্ষয় কুমারের কেশরী ছবির পাঞ্জাবি যোদ্ধার মত – তাতে বিনাযুদ্ধে শুধু মেদিনীপুর নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গ হিন্দুরাষ্ট্রের সবচেয়ে লক্ষ্মীসোনা রাজ্য হয়ে গেলেও আশ্চর্য হওয়া যাবে না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

টেস্ট পরীক্ষায় আবার ফেল: একটি পূর্ণাঙ্গ প্রহসন

এই সময়কালে টেস্ট দল পরপর দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা ছাড়া বিদেশের কোথাও সিরিজ জেতেনি। বিদেশে খেলা হলেই রোহিত, চেতেশ্বর পূজারা, কোহলি, অজিঙ্ক রাহানে ধ্যাড়াবেন আর কখনো ঋষভ পন্থ, কখনো জাদেজা, কখনো শার্দূল, কখনো ওয়াশিংটন সুন্দর রান করে মুখরক্ষা করবেন – এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথম অঙ্ক: সব ব্যাটাকে ছেড়ে টস ব্যাটাকে ধর

ভারত কেন ওভালে হারল? টসে জিতে রোহিত শর্মা অস্ট্রেলিয়াকে ব্যাট করতে ডাকলেন বলে। ধারাভাষ্যকার অথবা খবরের কাগজে কলাম লেখা বিশেষজ্ঞ প্রাক্তন ক্রিকেটার, ক্রিকেট সাংবাদিক এবং জনতা – সকলে মিলে এই উত্তরটা তৈরি করে ফেলেছিলেন বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম দিনের খেলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। কারণ অস্ট্রেলিয়া দিনের শেষে তিন উইকেটে ৩২৭ রানে পৌঁছে গিয়েছিল। রানের অযোধ্যা পাহাড় যে পরদিন হিমালয়ে পরিণত হবে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। তবু তো শেষমেশ অস্ট্রেলিয়া এভারেস্টে উঠতে পারেনি, কারাকোরামে পৌঁছেই থেমে গিয়েছিল। অতএব স্রেফ প্রথম দিনের আবহাওয়া দেখেই কেন ফিল্ডিং নেবে – এ সমালোচনা করা ভারি সহজ হয়ে গেল। কেউ আসল কথাটাই বললেন না। টস করতে যাওয়ার সময়ে তো অধিনায়ককে হাতে যে ১১ জন খেলবেন তাদের তালিকাটা নিয়ে যেতে হয়। সেখানে বাঘা বাঘা চারজন জোরে বোলারের নাম লেখা হয়ে গেছে। তারপর টস জিতে আর ব্যাটিং নেওয়া যায় নাকি? যদি ইংল্যান্ডের মাঠে প্রথম দিনের তাজা পিচে বল করার সুযোগই না নেব, তাহলে আর চারজন জোরে বোলারকে নিলাম কেন? সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার পর টস জিতে ব্যাটিং নেওয়ার মত আহাম্মকি আর আছে নাকি?

এমন নয় যে এই কথাটা একমাত্র আমিই বুঝেছি আর সুনীল গাভস্কর, রবি শাস্ত্রী, আকাশ চোপড়া প্রমুখ তাবড় প্রাক্তন ক্রিকেটার ধরতে পারেননি। কিন্তু তাঁরা সেকথা বলেননি। তাঁরা বলেছেন বটে, যে পৌনে পাঁচশো উইকেট নিয়ে ফেলা রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে খেলানো উচিত ছিল। কিন্তু কেন বিদেশের মাঠে একের পর এক টেস্টে একমাত্র স্পিনার হিসাবে তাঁর বদলে দলে থাকেন রবীন্দ্র জাদেজা – তার যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিতেও তাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। ব্যাখ্যাটা হল, জাদেজার ব্যাটিং অশ্বিনের চেয়ে ভাল। অথচ ব্যাপারটা কিন্তু মোটেই প্রশ্নাতীত নয়।

এই ম্যাচে জাদেজা প্রথম ইনিংসে ৪৮ রান করেছেন, যা না করলে ভারতের হারের ব্যবধানটা আরও বড় হত। দ্বিতীয় ইনিংসে স্কট বোল্যান্ডের সামনে দু বলের বেশি টিকতেই পারেননি। স্কোরারদের কাজ না বাড়িয়ে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তার জন্যে তাঁকে উড়িয়ে দেব না। কোনো খেলোয়াড়ই সব ম্যাচে সফল হন না। ঘটনা হল অশ্বিন আর জাদেজার গোটা কেরিয়ারের ব্যাটিং পাশাপাশি রাখলে পরিষ্কার দেখা যায় অলরাউন্ডার হিসাবে অশ্বিন মোটেই খুব পিছিয়ে নেই। এখন পর্যন্ত ৬৫ টেস্টে ২৬৮ উইকেটের সঙ্গে জাদেজার রান ২৭০৬, গড় ৩৫.৬০, ১৮ অর্ধশতরানে সঙ্গে শতরান তিনটে। অশ্বিন ৯২ টেস্টে ৪৭৪ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ২৬.৯৭ গড়ে ৩১২৯ রানও করে ফেলেছেন। তেরোটা অর্ধশতরানের পাশাপাশি পাঁচ-পাঁচটা শতরানও আছে তাঁর। এর উপর আছে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে সিডনিতে সারাদিন ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচানো ৩৯, যার দাম একটা দ্বিশতরানের চেয়েও বেশি। অতি বড় জাদেজাভক্তও ম্যাচের উপর ওর চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে এমন কোনো ইনিংসের কথা বলতে পারবেন না।

তাছাড়া জাদেজা দেশের মাঠের ঘূর্ণি পিচে যতখানি প্রভাবশালী বোলার, বিদেশে ততটাই নির্বিষ। তিনি ওভালে বিষাণ সিং বেদীকে টপকে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী বাঁহাতি স্পিনার হয়ে গেছেন বটে, কিন্তু ২৬৮ উইকেটের মধ্যে ১৯৪ খানা উইকেটই এসেছে দেশের মাটিতে (৪০ টেস্টে), উইকেট পিছু মাত্র ২০.৪৫ রান খরচ করে। কিন্তু বিদেশে গেলেই জাদেজা অন্য বোলার। পঁচিশটা টেস্ট খেলে পেয়েছেন মাত্র ৭৪ খানা উইকেট। একেকটার জন্যে খরচ হয়েছে ৩৪.৩২ রান। ওভাল টেস্টেও দেখা গেল প্রথম ইনিংসে তিনি কোনো প্রভাবই ফেলতে পারলেন না। দ্বিতীয় ইনিংসে যখন বল রীতিমত ঘুরছে এবং লাফাচ্ছে তখন তিনটে উইকেট পেলেন বটে, কিন্তু স্টিভ স্মিথ আর ট্রেভিস হেডের দ্রুত রান তোলার তাড়া না থাকলে এবং ক্যামেরন গ্রীন স্কুল ক্রিকেটারের মত করে ডিফেন্স না করলে সেগুলো জুটত না। মহেন্দ্র সিং ধোনি অধিনায়ক থাকাকালীন একবার ইংল্যান্ডেই একটা টেস্টে জাদেজার স্পিন এতটাই পানসে হয়ে গিয়েছিল যে ধোনি উইকেট থেকে পিছিয়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে দিয়ে মিডিয়াম পেস বোলিং করিয়েছিলেন। তবু একমাত্র স্পিনার হিসাবে জাদেজাই খেলবেন, অশ্বিন নয়। তাঁরও বিদেশের রেকর্ড (৩৭ ম্যাচে ১৩৭ উইকেট, গড় ৩১.৪৫) দেশের তুলনায় সাধারণ, কিন্তু গত কয়েকটা বিদেশে সফরে অনেকখানি উন্নতি দেখা গিয়েছিল। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া সফরে এ যুগের সম্ভবত সেরা টেস্ট ব্যাটার স্মিথকে তিনি বোতলবন্দি করে ফেলেছিলেন।

এই অশ্বিনের চেয়ে শার্দূল ঠাকুর আর উমেশ যাদবকেও বেশি প্রয়োজনীয় মনে করা হয়েছে। উমেশ সেই ২০১১ সাল থেকে টেস্ট খেলছেন। সাতান্নটা টেস্ট খেলার পরেও তাঁর বোলিংয়ে অভিজ্ঞতার কোনো ছাপ দেখা যায় না। আজও গড় তিরিশের নিচে নামল না, ওভার পিছু সাড়ে তিনের বেশি রানও দিয়ে ফেলেন। কোনো ওভারে একটাও চার মারার বল না দিলে ধারাভাষ্যকাররা আপ্লুত হয়ে পড়েন। কিন্তু তিনি নাকি দারুণ রিভার্স সুইং করান – এরকম একটা যুক্তি ওভালে তাঁর নির্বাচনের সপক্ষে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন শাস্ত্রীরা। ইংল্যান্ডের আবহাওয়ার কারণে সাধারণত বল এমনিই সারাদিন সুইং করে। সেখানে যে রিভার্স সুইং বিশেষজ্ঞের বিশেষ দরকার পড়বে না, তা কি ওই বোদ্ধারা জানেন না? আর দরকার পড়লেই বা। উমেশ তো ওয়াকার ইউনিসের মাপের বোলার নন। শার্দূলেরও না আছে গতি, না বিরাট সুইং। যতই নটা টেস্টে ২৯ খানা উইকেট পেয়ে থাকুন, দারুণ বোলিং সহায়ক পরিবেশ না পেলে তিনি নেহাত সাধারণ। ব্যাটেও এমন কিছু ধারাবাহিক নন, গড় মোটে ২০.৩৩। ত্রিশোর্ধ্ব এই ক্রিকেটারদের কাছ থেকে যে নতুন কিছু পাওয়ার থাকতে পারে না, সেকথা রোহিত আর সারাক্ষণ মনোযোগী ছাত্রের মত খাতায় নোট নেওয়া রাহুল দ্রাবিড় বোঝেন না কেন?

বোঝেন না যে সেকথা কিন্তু গাভস্কররা বলেন না। তাঁরা বরং টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তগুলোর সপক্ষে যুক্তি খাড়া করার চেষ্টা করেন। কারণ নুন খেলে গুণ গাইতেই হয়। নইলে নুন খাওয়া ছাড়তে হয়। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড শুধু পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী বোর্ডই নয়, একমাত্র বোর্ড যারা জাতীয় দল এবং আইপিএলের সম্প্রচারের সুতোও নিজেদের হাতে রাখে। ধারাভাষ্যকাররা তার হাতের পুতুল। অপছন্দের কথা বলেছ কি চুক্তি বাতিল। অতএব বোর্ড যা করে সব ভাল, টিম ম্যানেজমেন্টও সবসময় ভালই করে, তবে মাঝেমধ্যে দু-একটা ভুল হয়ে যায় আর কি। যেমন টস জিতে ফিল্ডিং নিতে গিয়ে ব্যাটিং নেওয়া হয়ে যায়। তা বলে কি আর অচল ক্রিকেটার দলে নেওয়া হয়? মোটেই তা বলা যায় না।

দ্বিতীয় অঙ্ক: ভাঙব তবু মচকাব না

যাঁরা মন দিয়ে ওভাল টেস্ট দেখেছেন এবং পঞ্চম দিন সকাল সকাল ভারত হেরে যাওয়ার পরেও ভগ্ন হৃদয়ে অস্ট্রেলিয়ার ট্রফি হাতে নেওয়া পর্যন্ত সম্প্রচার দেখেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই দুটো কথা ভাবছেন। প্রথমত, ডুবিয়েছে ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা। খামোকা প্রাক্তন ক্রিকেটারদের সমালোচনা করা কেন? দ্বিতীয়ত, অন্য সময়ে যা-ই করুন, ওভাল টেস্টের পরে তো আমাদের প্রাক্তনরা যারপরনাই সমালোচনা করেছেন। গাভস্কর তো এত রেগে গিয়েছিলেন যে স্টার স্পোর্টসের অ্যাঙ্কর ভদ্রমহিলাকে দেখে মনে হচ্ছিল পালাতে পারলে বাঁচেন। দ্রাবিড়ের দুই পুরনো বন্ধু সৌরভ গাঙ্গুলি আর হরভজন সিংও তাঁকে বিস্তর চোখা চোখা প্রশ্নে বিদ্ধ করেছেন। তাহলে এঁদের সমালোচনা করা কেন?

ঠিক কথা। প্রথম প্রশ্নের উত্তরে আসতে একটু সময় লাগবে। আগে দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নিই। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের চুক্তি যতই মহার্ঘ হোক, চোখের চামড়া তো কিনতে পারে না। ফলে ২০৯ রানে টেস্ট হারার পরে মিষ্টি কথা বলা কী করে সম্ভব? তাছাড়া হাজার হোক, গাভস্কর, সৌরভদের ক্রিকেট দুনিয়ায় তাঁদের খেলোয়াড় জীবনের অর্জনগুলোর জন্য বিশেষ সম্মান আছে। সে সম্মান তাঁরা বিসর্জন দেন কী করে? তাঁরা তো আর রাহুল কাঁওয়াল বা অর্ণব গোস্বামী নন যে বিজেপির গোহারা হারকে লাইভ টিভিতে ‘সম্মানজনক হার’ বলে চালানোর চেষ্টা করবেন অন্য দেশের লোকে কী ভাবল সেসবের তোয়াক্কা না করে। ক্রিকেটার গাভস্করের নামে গান বাঁধা হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজে, অধিনায়ক সৌরভকে এখনো সমীহ করে সারা বিশ্বের ক্রিকেটমহল। সেগুলোর মূল্য ক্রিকেট বোর্ডের মহাত্মা গান্ধীর ছবিওয়ালা কাগজ এখনো পুরোপুরি ভুলিয়ে দিতে পারেনি। তার উপর ধৈর্যচ্যুতির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিদেশের মাঠে ভারত এই প্রথম হারল না, এর চেয়ে লজ্জাজনকভাবেও হেরেছে। কিন্তু একটা সাধারণ পিচে পাঁচদিন সবদিক থেকে পর্যুদস্ত হয়ে সেই সৌরভের আমল থেকে কতবার হেরেছে তা হাতে গুণে বলা যাবে। ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদানই হল বিদেশে জিততে শেখানো। গাভস্করও বিদেশে বহু যুদ্ধের নায়ক। ওই ওভালেই তাঁর মহাকাব্যিক ২২১ রান আছে চতুর্থ ইনিংসে। সেদিন চারশোর বেশি রান তাড়া করে ভারত আরেকটু হলে জিতেই যাচ্ছিল। ফলে এই হার তাঁদের হজম না হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু…

এই কিন্তুর মধ্যেই আছে দ্বিতীয় উত্তর। রাগত প্রাক্তনরা কী বলেছেন তা কি খেয়াল করেছেন? বিরাট কোহলির আউট সম্পর্কে মতামত চাইলে ক্রুদ্ধ গাভস্কর বলেছেন, ওকেই জিজ্ঞেস করুন চতুর্থ-পঞ্চম স্টাম্পের বল কেন তাড়া করতে গেছিল। সৌরভ দ্রাবিড়কে প্রশ্ন করেছেন, প্রথমে ব্যাট করার কী যুক্তি ছিল? তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে ভারতের প্রথম পাঁচ ব্যাটার দীর্ঘদিন হল রান করতে পারছেন না। ব্যাটিংয়ে কি রদবদলের দরকার নেই? হরভজন জিজ্ঞেস করেন, ভারতীয় দলের মহাতারকারা বিদেশের পিচে কেন রান করতে পারেন না? বোলাররাই বা সুবিধা করতে পারেন না কেন?

প্রশ্নগুলো চোখা বটে, কিন্তু বেশি চোখা লাগছে এই কারণে যে ভারতের প্রাক্তনদের মুখ থেকে বর্তমান ক্রিকেটারদের স্তুতি শুনতেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ব্যর্থ হলে সমালোচনা করা, প্রশ্ন করাই যে তাঁদের কাজ – একথা আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম। এমনটা কিন্তু অন্য দেশে হয় না। ২০২১-২৩ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গোড়ার দিকে ইংল্যান্ড জঘন্য খেলছিল। অধিনায়ক জো রুট ছাড়া প্রায় কেউই রান করতে পারছিলেন না, বোলারদের অবস্থাও ছিল তথৈবচ। রুটের অধিনায়কত্বও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছিল না। এমনকি দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছেও শোচনীয় পরাজয় ঘটে ইংল্যান্ডের। সেইসময় নাসের হুসেন, মার্ক বুচারের মত প্রাক্তনরা কিন্তু টিম ম্যানেজমেন্টকে ছেড়ে কথা বলেননি। তাঁর ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে পরিষ্কার বলতেন রুটকে দিয়ে আর অধিনায়কত্ব হবে না। রুট শেষপর্যন্ত দায়িত্ব ছেড়ে দেন, ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেন ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে জাতীয় দল এবং আরও অনেককিছুর দায়িত্বে থাকা অ্যান্ড্রু স্ট্রস। তাঁর জায়গায় আসেন রবার্ট কী। তারপর টেস্ট দলের কোচ ক্রিস সিলভারউডকে সরিয়ে নিয়ে আসা হয় ব্রেন্ডন ম্যাককালামকে, অধিনায়ক হন বেন স্টোকস। দলেও বেশকিছু রদবদল করা হয়। তারপর থেকে ইংল্যান্ড যে ক্রিকেট খেলছে তাতে শুধু যে তারা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে তাই নয়, তারা টেস্ট ক্রিকেটকে নতুন যুগে নিয়ে যাচ্ছে কিনা সেটাই এখন আলোচনার বিষয়। ম্যাককালামের আদরের নাম ব্যাজ। সেই থেকে তাদের খেলার ধরনের নামকরণ হয়েছে ব্যাজবল।

অথচ আমাদের প্রবাদপ্রতিম প্রাক্তনদের দেখুন। পৃথিবীর সেরা মানের পারিশ্রমিক, অনুশীলনের সুযোগসুবিধা ইত্যাদি পেয়েও সেই ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর থেকে আর কোনো আইসিসি ট্রফি জেতেনি ভারত। উপরন্তু এই সময়কালে টেস্ট দল পরপর দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা ছাড়া বিদেশের কোথাও সিরিজ জেতেনি। বিদেশে খেলা হলেই রোহিত, চেতেশ্বর পূজারা, কোহলি, অজিঙ্ক রাহানে ধ্যাড়াবেন আর কখনো ঋষভ পন্থ, কখনো জাদেজা, কখনো শার্দূল, কখনো ওয়াশিংটন সুন্দর রান করে মুখরক্ষা করবেন – এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। দশ বছর ধরে এই ঘটনা বারবার ঘটে চললেও এখনো গাভস্কর, সৌরভরা নাম করে বলতে পারছেন না অমুককে বাদ দেওয়া উচিত। ২০১৩ সালে যখন ভারত বহুকাল পরে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের কাছে সিরিজ হারল, তখন জিওফ্রে বয়কট আর কপিলদেব কিন্তু রাখঢাক না রেখেই বলেছিলেন, শচীন তেন্ডুলকর উন্নতি করতে না পারলে অবসর নিন। আজ বিরাটের নাম মুখে আনতে পারছেন না আমাদের প্রাক্তনরা, বহু ভারতীয় গিন্নী যেমন কর্তার নাম মুখে আনেন না। অথচ একা কোহলিই যে কতখানি ডুবিয়ে দিচ্ছেন ভারতকে, তার স্পষ্ট পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন ক্রিকেট অ্যানালিটিক্স সংস্থা ক্রিকভিজের সিনিয়র ব্রডকাস্ট অ্যানালিস্ট সোহম সরখেল। নিচের এই টুইটসূত্রে চোখ রাখলেই দেখতে পাবেন, সদ্য শেষ হওয়া টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অন্য ব্যাটারদের ব্যর্থতা সত্ত্বেও ভারতের চার নম্বর ব্যাটার বাদে সব জায়গার ব্যাটাররাই বিপক্ষের ব্যাটারদের চেয়ে গড়ে ভাল রান করেছেন। কিন্তু একা কোহলির ব্যর্থতাই এত বিরাট যে তা অন্য সবার কাজে জল ঢেলে দিয়েছে। ২০২০ সালে তাঁর গড় ছিল ১৯, ২০২১ সালে ২৮ আর ২০২২ সালে ২৬। এ বছর এখন পর্যন্ত ৪৫, কিন্তু তার কারণ আমেদাবাদের ঢ্যাবঢেবে পিচে ১৮৬। ওই ইনিংস বাদে চলতি বছরেও তাঁর গড় ২৫।

তৃতীয় অঙ্ক: মানুষের তৃতীয় হাত

জিততে পারুন আর না-ই পারুন, ভারতীয় দলের ক্রিকেটার বা কোচের মুখে সবসময় খই ফোটে। এ জিনিসটা শিখিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব অবশ্যই ধোনি আর শাস্ত্রীর। ধোনি ইংরেজি অভিধান থেকে একটি চমৎকার শব্দ চয়ন করেছিলেন – প্রোসেস। হেরে গেলেই বলতেন, আমরা হারজিত নিয়ে চিন্তিত নই। প্রোসেস ‘ফলো’ করা হয়েছে কিনা সেটাই বড় কথা। সেটা করা হলে ‘রেজাল্ট’ ঠিক এসে যাবে। কথাগুলো চমৎকার। বেশ একটা মহাত্মা গান্ধীসুলভ প্রশান্তি রয়েছে কথাগুলোর মধ্যে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ধোনি বাবা হয়ে গেলেন, চুল পেকে গেল, ভারতীয় দল থেকে অবসর নিয়ে ফেললেন, ‘রেজাল্ট’ তো আজও এসে পৌঁছল না। তাঁর উত্তরসূরী কোহলি আর ভারতীয় দলের তৎকালীন কোচ শাস্ত্রী প্রোসেসের সঙ্গে যোগ করেছিলেন আরেকটি শব্দ – ইনটেন্ট। বারবার সাংবাদিক সম্মেলনে এসে দুজনেই বলতেন, ইনটেন্টই হচ্ছে আসল। ওটা যার আছে তার উপর টিম ম্যানেজমেন্টের ভরসা আছে। ইনটেন্ট দেখিয়ে হারলে কোনো দুঃখ নেই। এই ইনটেন্ট নেই বলে পূজারা যখন ধারাবাহিক ছিলেন তখনো বারবার বাদ পড়তে হয়েছে, ফর্মে থাকা রাহানেকে বসিয়ে রেখে নড়বড়ে রোহিতকে টেস্ট খেলানো হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়।

এইবার দ্বিতীয় অঙ্কে উত্থাপিত প্রথম প্রশ্নের জবাবটা দিয়ে ফেলা যাক। ভারতীয় ক্রিকেট দলের ব্যর্থতায় প্রাক্তনদের সমালোচনা করছি কেন?

এই যে ইনটেন্ট নামক ধাষ্টামো, এর টেস্ট ক্রিকেটে কোনো মানেই হয় না জেনেও আমাদের প্রাক্তনরা কিন্তু সেসময় অধিনায়ক কোহলি আর কোচ শাস্ত্রীকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন, দুহাত তুলে সমর্থন করেছিলেন। ২০১৫ সালের শ্রীলঙ্কা সফরে প্রথম দুটো টেস্টে পূজারাকে বসিয়ে রাখা হয়, কারণ তার আগের অস্ট্রেলিয়া সিরিজে তাঁর মধ্যে ইনটেন্ট দেখা যায়নি। তৃতীয় টেস্টে দুই ওপেনারের অভাব ঘটায় অগত্যা তাঁকে খেলানো হয় এবং তিনি ১৪৫ রানে অপরাজিত থাকেন। বস্তুত, দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য রানে আউট হলেও, কম রানের সেই ম্যাচে ওই ইনিংসই তফাত গড়ে দেয় এবং ভারত জেতে। পূজারা প্রথম ইনিংসে যখন পঞ্চাশ পেরোন, তখন ধারাভাষ্যকার সঞ্জয় মঞ্জরেকর গাভস্করকে জিজ্ঞেস করেন পূজারা কি দলে নিজের জায়গা পাকা করতে পারলেন, নাকি শতরান করলে জায়গা পাকা হবে? সানি উত্তর দেন, এই দলে যা প্রতিভার ছড়াছড়ি তাতে আলোচনায় থাকতে গেলে পূজারাকে দেড়শোর বেশি করতে হবে। বিরক্ত কলামনিস্ট মুকুল কেশবন দ্য টেলিগ্রাফ-এ লেখেন “A century and a half…what team of Titans was this, what bastion of Bradmans was Pujara trying to breach?” সেই ইনটেন্টের ভূত যে পূজারাকে আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে, তার প্রমাণ ওভালের দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর চরিত্রবিরোধী এবং খেলার পরিস্থিতি অনুযায়ী সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় শট খেলতে গিয়ে আউট হওয়া। ক্রিজে জমে যাওয়া রোহিতের হঠাৎ নাথান লায়নের সোজা বলকে সুইপ করতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হওয়া বা কোহলির কয়েকটা ডট বল হতেই বহুদূরের বল তাড়া করে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যাওয়ার পিছনেও ইনটেন্টের ভূমিকা নিশ্চয়ই আছে।

ভারতীয় ক্রিকেটের একেবারে ভাবনার জায়গায় এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিগুলো যখন করা হয়েছে, তখন হাততালি দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ প্রাক্তনরা। কোহলির জিম-পাগল হওয়া এবং গোটা দলকে জিম-পাগল করে তোলাকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন আমাদের প্রাক্তনরা, হর্ষ ভোগলেরা এবং প্রাতঃস্মরণীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা। অথচ মাইকেল হোল্ডিং, ওয়াসিম আক্রাম, কপিলদেবের মত নমস্য জোরে বোলাররা চিরকাল বলে এসেছেন, ক্রিকেটার মানে কুস্তিগীর নয়। তাদের পেশি ওরকম হওয়ার দরকার নেই। তাদের শরীর তৈরি করতে সেরা প্র্যাকটিস হল নেট প্র্যাকটিস। বিশেষ করে জোরে বোলারদের উচিত যত বেশি সম্ভব বোলিং করা। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এঁরা বারবার বলেছেন, এমনকি অফ সিজনেও কয়েকশো ওভার বল করতেন নেটে। সেভাবেই চোট-আঘাত মুক্ত অবস্থায় টানা প্রায় দুই দশক ভারতের হয়ে খেলে গেছেন কপিল। অথচ এখন আমাদের জিম করা ক্রিকেটারদের এমন অবস্থা যে ব্যাটাররাই অনেকে টানা দুটো সিরিজ খেলে উঠতে পারেন না। আর বোলাররা? যশপ্রীত বুমরা সেই যে আহত হয়েছেন, কিছুতেই মাঠে ফিরতে পারছেন না। বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন কিনা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ, নভদীপ সাইনি – যাঁকেই ভবিষ্যৎ বলে ভাবা হয়, কিছুদিন পরেই দেখা যায় তিনি আহত। অতএব ঘুরে ফিরে বুড়িয়ে যাওয়া উমেশ আর মাঝারি মানের শার্দূলকেই খেলাতে হয়। অর্থাৎ গোলমালটা প্রথম একাদশ নির্বাচন থেকে শুরু হয়নি। দেশের কয়েকশো খেলোয়াড়ের মধ্যে থেকে ১৪-১৫ জন বেছে নেওয়ার সময়েই গোড়ায় গলদ হয়ে গেছে।

ব্যাটার বেছে নেওয়ায় গলদ তো আরও গভীর। কারণ টপ অর্ডার এবং মিডল অর্ডারের নিষ্কর্মাদের সরানো যাবে না। পূজারা, রাহানেদের তবু বাদ দেওয়া গেছে। তাঁদের কাউন্টি ক্রিকেটে বা ঘরোয়া ক্রিকেটে রান করে ফিরতে হয়েছে। কিন্তু রোহিত আর কোহলির আছে বিপুল বিজ্ঞাপনী সমর্থন। অর্থাৎ তাঁদের উপর কোটি কোটি টাকা লগ্নি করে রেখেছে বহু কোম্পানি। তার মধ্যে আছে ঘুরিয়ে নাক দেখিয়ে জুয়া খেলার কোম্পানিগুলোও। তাদের কেউ কেউ এমনকি জাতীয় দলের শার্ট স্পনসর, অমুক স্পনসর তমুক স্পনসর। তাদের আর্থিক ক্ষতি হয় এমন কাজ মোটেই করা চলে না। অতএব রান করতে না পারলেও শালগ্রাম শিলার মত এদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ তারকাদের দলে রাখতেই হবে। রঞ্জি ট্রফিতে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করা সরফরাজ খানরা যদ্দিন আইপিএলে রানের বন্যা বইয়ে শাঁসালো স্পনসর জোগাড় করতে না পারছেন তদ্দিন বাড়ির টিভিতে টেস্ট ম্যাচ দেখা ছাড়া কিছুই করতে পারবেন না। এর ফলে দলের যে ক্রিকেটিয় ক্ষতি, তা পূরণ করতেই টেস্ট দল নির্বাচনের সময়ে বোলারদের বেলাতেও দেখা হয় ভাল ব্যাট করতে পারে কিনা, উইকেটরক্ষক বাছার সময়েও তাই।

অগ্রাধিকারের এই উলটপুরাণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ওভাল টেস্টে কে এল রাহুলকে উইকেটরক্ষক হিসাবে খেলানোর নিদান দিয়ে ফেলেছিলেন বহু বোর্ড ঘনিষ্ঠ ক্রিকেট সাংবাদিক। রাহুল ফিট থাকলে বোধহয় সেটাই ঘটত। যদিও সকলেই জানেন ইংল্যান্ডে উইকেটরক্ষা ভীষণ শক্ত কাজ কারণ বল ব্যাটারকে অতিক্রম করার পরেও সুইং করে অনেকসময়, পিচে অসমান বাউন্সও থাকতে পারে। সেখানে পাঁচদিনের খেলায় রাহুলের মত ঠেকনা দেওয়া উইকেটরক্ষক খেলানো আর খাদের ধারে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলা একই কথা। ওভালে কোনা শ্রীকর ভরত প্রশংসনীয় উইকেটরক্ষা করেছেন। তারপরেও সোশাল মিডিয়ায় “ওকে দিয়ে হবে না” লিখে চলেছেন বহু বোদ্ধা সাংবাদিক। পন্থ থাকলে আলাদা কথা ছিল। তিনি অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও বেচারা ভরত শান্তিতে খেলতে পারবেন না। ঋদ্ধিমান সাহাকে যখন দ্রাবিড় ডেকে বলে দিয়েছিলেন, তাঁর বয়স হয়েছে বলে আর টেস্ট দলে না নেওয়ার কথা ঠিক করেছে টিম ম্যানেজমেন্ট, তখন মনে হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার মত নতুন খেলোয়াড় তুলে আনার প্রগতিশীল পথে এগোচ্ছে ভারতীয় দল। এখন বোঝা যাচ্ছে, ওসব কিছু নয়। ঋদ্ধিমানের দরকার ছিল অমুক ডট কমের একটা এনডর্সমেন্ট চুক্তি। তাহলেই বয়সটা বাড়তি না হয়ে কমতি হয়ে যেত।

দল নির্বাচনে এইসব শর্তাবলী প্রযোজ্য বলেই বোধহয় বোর্ড পাঁচজনের নির্বাচন সমিতিতে চারজনকে রেখে, অস্থায়ী চেয়ারম্যান রেখে দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে সেই ২০২০ সাল থেকে। তাঁদের আর গুরুত্ব কী? রাজ সিং দুঙ্গারপুরের মত বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো সাড়ে ষোলো বছরের ছেলেকে দলে ঢুকিয়ে দেওয়া বা যাঁকে ভবিষ্যতের অধিনায়ক বলে কেউ ভাবছেই না, তাকে গিয়ে “মিয়াঁ, ক্যাপ্টেন বনো গে?” বলার অধিকারই আজকের নির্বাচকদের নেই। তাঁরা স্রেফ দক্ষ বাজিকরের হাতের পুতুল।

সমস্ত ক্রিকেট ব্যবস্থাটাই যে অব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে সেকথা বলার কাজ তো বিশেষজ্ঞ, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিকদেরই। যিনি যত বড় নাম, তাঁর দায়িত্ব তত বেশি। অথচ সকলেই সুকুমার রায়ের ছড়ার মত “এই দুনিয়ার সকল ভাল, আসল ভাল নকল ভাল” বলে চালিয়ে যাচ্ছেন এক দশক যাবৎ। কারণ কেউ ধারাভাষ্য দেওয়ার চুক্তির লোভ সামলাতে পারছেন না, কারোর চাকরি বোর্ডের জো হুজুরি না করলে চলে যাবে। যেমন স্মৃতি ইরানিকে প্রশ্ন করায় এক সাংবাদিকের চাকরি গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিকরা না হয় চাকরি বাঁচাতে ব্যস্ত, কিন্তু ভারতের হয়ে খেলা এবং এত বছর মোটা মাইনের ধারাভাষ্যের কাজ করা বিশেষজ্ঞরা এখনো জো হুজুরি করে যাবেন আর দুকথা শুনবেন না তা কি হয়?

আজ ভারতীয় ক্রিকেটে যে হারজিতের যে কোনো মূল্য নেই, রোহিত-কোহলিরা যে বারবার ব্যর্থতার পরেও কলার তুলে ‘গ্রেট’ অভিধা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারেন এবং প্রত্যেকটা হারের পর নতুন নতুন অজুহাত খাড়া করতে পারেন তার জন্যে তো ভারতীয় ক্রিকেটের গোটা বাস্তুতন্ত্র দায়ী। এমন বাস্তুতন্ত্র তৈরি করায় সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন প্রাক্তনরা। ওভালের পরাজয়ের পরেও একগুচ্ছ অজুহাত খাড়া করেছেন অধিনায়ক রোহিত। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল আইপিএল ফাইনালের পরে কেন হবে? জুনের বদলে মার্চে কেন হবে না? হলেই তো প্রস্তুতি নেওয়ার যথেষ্ট সময় পাওয়া যেত। এত বড় প্রতিযোগিতার ফাইনাল তিন ম্যাচের হওয়া উচিত – এমন দাবিও করেছেন। হেরোদের ঘ্যানঘ্যান শুনতে কারই বা ভাল লাগে? অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্স তাই বিদ্রুপ করেছেন “পঞ্চাশটা ম্যাচের সিরিজ হচ্ছে আদর্শ। কিন্তু অলিম্পিকে সোনার মেডেল জেতার জন্যে একটাই রেস হয়। এএফএল, এনআরএল সিরিজগুলোরও ফাইনাল থাকে। একেই খেলা বলে।”

চতুর্থ অঙ্ক: সাধের লাউ

পৃথিবীর সমস্ত খেলার নিয়ামক সংস্থার মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল সংস্থার নাম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল, অর্থাৎ আইসিসি। তাদের টিকি বাঁধা আছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কাছে, কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি টাকার জোগান দেয় আইসিসিকে। বিনিময়ে সবচেয়ে বেশি লাভের গুড়ও নেয়। ফলে ভারতীয় বোর্ড চাইলে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালও তিন ম্যাচের হতেই পারে, ইংল্যান্ডের বদলে আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে হতে পারে। সেখানে এমন পিচ বানিয়ে দেওয়া হবে যে আমি-আপনি গিয়ে বল করলেও এক হাত ঘুরবে। কিন্তু কথা হল, ভারতীয় বোর্ড কি অতটা মাথা ঘামাবে?

তার সোনার ডিম পাড়া হাঁস হল আইপিএল। সেই আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব থেকে এত টাকা আয় হয় যে আগামী দিনে প্রতিযোগিতাটাকে টেনে আরও লম্বা করা হচ্ছে। আইসিসি তাতে মাথা নেড়ে সায়ও দিয়ে ফেলেছে। আইপিএল সম্পর্কে আমাদের সমস্ত বর্তমান ও প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার এবং প্রাতঃস্মরণীয় সাংবাদিকরা উচ্ছ্বসিত। তাঁদের কথাবার্তায়, লেখাপত্রে মনে হয় মানবজাতি এই প্রথম একটি জিনিস আবিষ্কার করতে পেরেছে যার কোনো নেতিবাচক দিক নেই। সমালোচনা করার মত একখানা বৈশিষ্ট্যও নেই। অথচ ওভাল টেস্টে হারের পর হঠাৎ সকলের মনে পড়েছে, যে আইপিএলটা না থাকলে এই ফাইনালের জন্যে যথেষ্ট প্রস্তুতির সময় পাওয়া যেত।

আরও পড়ুন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে মরে প্রমাণ করতে হবে সে মরেনি

অনেকে বলছেন এই হারের পর নাকি দ্রাবিড়ের চাকরি নিয়ে টানাটানি হতে পারে। হয়ত সেটা আন্দাজ করে মরিয়া হয়ে অথবা চাকরিটা যাবেই ধরে নিয়ে তিনি বলেছেন ক্রীড়াসূচি নিয়ে তিনি কখনোই খুশি হতে পারেন না। ফাইনালের দিন কুড়ি আগে যদি ইংল্যান্ডে পৌঁছনো যেত আর দু-তিনটে সাইড ম্যাচ পাওয়া যেত, তাহলে চমৎকার প্রস্তুতি হত। শুনলে মনে হয় ইনি রিপ ভ্যান দ্রাবিড়। নিজের খেলোয়াড় জীবন শেষ হওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, এইমাত্র জেগে উঠেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যা ঠাসা ক্রীড়াসূচি তাতে সাইড ম্যাচ ব্যাপারটা তো বন্ধ হয়ে গেছে বহুদিন। বিশেষ করে ভারতীয় দলের অফ সিজন বলে কিছু নেই দ্রাবিড় যখন ক্রিকেটার তখন থেকেই। তিনি যখন অবসর নেন আইপিএল তখনো চারাগাছ। এখন সে বটবৃক্ষ, দুর্জনে বলছে ছদ্মবেশী সেপ্টোপাস। তার খিদে ক্রমশ বাড়ছে, বিশ্বের অন্যত্র তার বীজ থেকে আরও নানা মাংসাশী লিগের জন্ম হচ্ছে যারা ক্রমশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে গিলে নেবে। এমন দিনে ভারত অধিনায়ক চাইছেন তিন ম্যাচের ফাইনাল, কোচ সাইড ম্যাচের কথা বলছেন। এসব কি প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি টাকা রোজগার করার অপরাধবোধের প্রকাশ, নাকি আমাদের দেশের পরিচালকদের মত বৈদিক যুগে ফিরে যাওয়ার সাধ?

গত ইংল্যান্ড সফরে ভারতীয় দলের কোচ থাকা অবস্থায় যে শাস্ত্রী কোভিড পরিস্থিতির মধ্যে সিরিজটা ভালয় ভালয় শেষ করার চেয়ে নিজের বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তিনি আবার জ্ঞান দিয়েছেন, আইপিএল বাদ দিয়ে টেস্টের জন্যে প্রস্তুতি নেওয়ার কাজটা খেলোয়াড়দের নিজ দায়িত্বেই করা উচিত। যোগ করেছেন, ভারতীয় বোর্ডের ফ্র্যাঞ্চাইজদের সঙ্গে চুক্তিতে একটা শর্ত রাখা উচিত যাতে খেলোয়াড়রা ভবিষ্যতে এত বড় ম্যাচের জন্যে এরকম সুযোগ পায়। এত উত্তম প্রশাসনিক পরিকল্পনা তিনি জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময়ে কোথায় ছিল কে জানে? তিনি দায়িত্বে থাকতেই ভারত প্রথমবার বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠে। তখন এমন কোনো প্রয়াস তিনি করেননি, হার থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন কোনো পরামর্শই বোর্ডকে দিয়ে যাননি। এখন অসংখ্য ভাল ভাল ধারণা তাঁর মাথায় গিজগিজ করছে।

পঞ্চম অঙ্ক: যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ

ক্রিকেট এখন আগে অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা, পরে খেলা। সে ব্যবসার সবচেয়ে কম চাহিদার মালটির নাম টেস্ট ক্রিকেট। অতএব আপনি আরও একটা আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারত জিততে পারল না বলে যতই দুঃখ পান, জানবেন কর্তারা বা ক্রিকেটাররা আপনার দুঃখের ভাগী নয়। ভারতীয় ক্রিকেটারদের দুঃখে প্রাণ যাচ্ছে এমন মনে করার কারণ নেই, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররাও টেস্ট ক্রিকেটের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত বলে ভাববেন না। প্রমাণ চান? ওভাল টেস্টের একটা মিনিটও ইংল্যান্ডের বিখ্যাত বা কুখ্যাত খামখেয়ালি আবহাওয়ার জন্যে নষ্ট হয়নি। অথচ পাঁচদিন মিলিয়ে মোট ৪৪ ওভার কম খেলা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো দলেরই দিনে যতগুলো ওভার বল করা সম্ভব ততগুলো সম্পূর্ণ করার গরজ ছিল না।

সুতরাং যদি পাঁচদিনের খেলার প্রতি ভালবাসা থেকে থাকে, তাহলে বয়স্ক ঠাকুমার ফোকলা হাসি যেভাবে লোকে শেষ কয়েকদিন প্রাণভরে দেখে নেয়, সেইভাবে উপভোগ করে নিন। এ খেলা বাঁচুক তা কর্তারা চান না, সম্ভবত খেলোয়াড়রাও নয়। নইলে নিউজিল্যান্ডের ট্রেন্ট বোল্ট, ইংল্যান্ডের জেসন রয়রা স্বেচ্ছায় দেশের বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতেন না ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ খেলবেন বলে। কর্তারা ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ খোলায় লাগাম দিতেন, টেস্ট ক্রিকেটকে আকর্ষণীয় করে তুলতে গোলাপি বলের দিন-রাতের টেস্ট আয়োজন ক্রমশ বাড়াতেন। হচ্ছে ঠিক উল্টো – বোল্টরা দলে ভারি হচ্ছেন। শোনা যাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার সৌদি আরবেও বিপুল অর্থকরী ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু হবে। আর দিন-রাতের টেস্টের কেউ নামোচ্চারণ করছে না।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

দল হারলেও গুহার চিচিং বনধ হতে দেবে না ক্রিকেট বোর্ড

এঁদের সময় শেষ। সেকথা এঁদের ভক্তরা মানবেন না, তার চেয়েও বড় কথা ক্রিকেট বোর্ড মানবে না। কারণ এই তারকাদের পিছনে টাকার থলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একগুচ্ছ স্পনসর।

রবিচন্দ্রন অশ্বিন খেললেই কি ভারত ওভালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল জিতে যেত? যশপ্রীত বুমরা যদি ফিট থাকতেন এবং খেলতেন, তাহলে কি ভারত জিতে যেত? ঋষভ পন্থ যদি প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে অন্যের এবং নিজের জীবন বিপন্ন করে শয্যাশায়ী না হতেন, তাহলে কি শেষ ইনিংসে ৪৪৪ রান তাড়া করার বিশ্বরেকর্ড করে জিতিয়ে দিতেন? এগুলোর কোনো ঠিক বা ভুল উত্তর হয় না, কারণ কী হলে কী হত কেউ বলতে পারে না। তবে তথ্য বলছে, ২০২১ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে এই তিনজনই খেলেছিলেন। তবু ভারত হেরেছিল। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সময়ে এই তিনজনের উল্লেখযোগ্য অবদান সত্ত্বেও ভারত সেই ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরে আর কোনো আইসিসি টুর্নামেন্টেই খেতাব জেতেনি। শুধু টেস্ট ক্রিকেটের কথাই যদি বলি, গত দশ বছরে দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা ছাড়া ভারতের আর কোনো বলার মত সাফল্য নেই। দেশের মাঠে দাপটে যে কোনো দলকে হারিয়ে দেওয়ার রেকর্ড ভারতের টেস্ট ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। কিন্তু অতীতে একাধিক ভারতীয় দল ইংল্যান্ডে টেস্ট সিরিজ জিতেছে, নিউজিল্যান্ডে জিতেছে। এর একটাও রবি শাস্ত্রী-বিরাট কোহলি, রাহুল দ্রাবিড়-কোহলি বা দ্রাবিড়-রোহিত শর্মার দ্বারা হয়ে ওঠেনি। এমনকি গত দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ভাঙাচোরা, নতুন মুখদের নিয়ে তৈরি দলটার কাছেও হেরে এসেছে এই দল। সুতরাং এই একটা ম্যাচে অমুক, অমুক আর অমুক থাকলেই ভারত জিতে যেত কিনা সে প্রশ্ন না তুলে বরং অন্য কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর জানা আছে কিনা দেখুন।

১) কোন টেস্ট খেলিয়ে দেশের নির্বাচন সমিতিতে যতজন নির্বাচক থাকার কথা ততজন নেই
২) কোন টেস্ট খেলিয়ে দেশের নির্বাচন সমিতিতে প্রধান নির্বাচক বলে কেউ নেই?
৩) কোন টেস্ট খেলিয়ে দেশের জাতীয় দল নির্বাচনের পর কোনো সাংবাদিক সম্মেলন হয় না?

জানেন কি, এই তিনটে প্রশ্নেরই উত্তর ভারত? যে কোনো খেলার আন্তর্জাতিক স্তরটাকে যাঁরা পেশাদার এবং সর্বোচ্চ গুরুত্বের ব্যাপার বলে মনে করেন, তাঁরা নিশ্চয়ই বুঝবেন যে দিনের পর দিন এই ফাজলামি চালিয়ে গিয়ে বিশ্ব খেতাব কেন, কোনো সিরিজই জেতার আশা করা উচিত নয়।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী পাঁচজন নির্বাচক থাকার কথা। কিন্তু আছেন চারজন – শিবসুন্দর দাস, সুব্রত ব্যানার্জি, সলিল আঙ্কোলা আর শ্রীধরণ শরথ। এ বছর জানুয়ারি মাসে পাঁচ সদস্যের নির্বাচক কমিটিই ঘোষণা করা হয়েছিল, তার একজন চেয়ারম্যানও ছিলেন – চেতন শর্মা। কিন্তু পরের মাসেই তাঁকে পদত্যাগ করতে হয় একটা স্টিং অপারেশনে নির্বাচন সংক্রান্ত কিছু তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার ফলে। তারপর চার মাস কেটে গেছে। ভারত দেশের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট ও একদিনের সিরিজ খেলল। প্রথম দুটো টেস্টের দল নির্বাচনের সময়ে চেতন ছিলেন। তারপর থেকে দল নির্বাচন করেছেন ওই ভাঙাচোরা নির্বাচন সমিতি এবং তার অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ারম্যান শিবসুন্দর। মনে রাখা ভাল, এ বছর অক্টোবর-নভেম্বরে ভারতে একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ। ফলে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একদিনের সিরিজটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার দল নির্বাচনও করে ওই ভাঙা নির্বাচন কমিটি। বলা বাহুল্য, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের দল নির্বাচনের সময়েও পঞ্চম নির্বাচককে নিয়োগ করার কথা ভাবেনি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড। এভাবে বোধহয় পয়সা বাঁচানো হচ্ছে। বোর্ড সভাপতি জয় শাহের ক্রিকেটবুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, গত কয়েক বছরে তাঁর সম্পত্তি যেভাবে কয়েক হাজার গুণ বেড়েছে তাতে তাঁর ব্যবসাবুদ্ধি নিয়ে তো আর প্রশ্ন তোলা চলে না।

মজার কথা, নির্বাচন সমিতি নিয়ে এই ধাষ্টামোর সূচনা কিন্তু চেতনের পদত্যাগ থেকে শুরু হয়নি। গত নভেম্বরে কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ থেকে ভারত বিদায় নেওয়ার পর এর আগের নির্বাচন সমিতিকে ঘটা করে বরখাস্ত করে বোর্ড। সেই নির্বাচন সমিতিতেও চারজন সদস্যই ছিলেন, এবং কী আশ্চর্য! তখনো চেয়ারম্যান ছিলেন চেতনই। অর্থাৎ যে ব্যর্থতার দায় ঘাড়ে চাপিয়ে অন্য তিন নির্বাচক সুনীল যোশী, দেবাশিস মোহান্তি আর হরবিন্দর সিংকে বিদায় করে দেওয়া হল; সেই ব্যর্থতার কাণ্ডারী চেতনকে আবার নির্বাচন সমিতির চেয়ারম্যান করে নিয়ে আসা হয়েছিল।

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ক্রিকেট বোর্ড দল নির্বাচনকে তেমন জরুরি ব্যাপার বলে মনে করে না। সেটা দল ঘোষণার ভঙ্গিতেও পরিষ্কার। ভারতীয় ক্রিকেটে দস্তুর ছিল প্রধান নির্বাচক সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে দল ঘোষণা করেন। ক্রিকেটজীবনে অতি সাধারণ এমএসকে প্রসাদ, প্রশাসক হিসাবে বিশালকায় রাজ সিং দুঙ্গারপুর বা ক্রিকেটার হিসাবেও যথেষ্ট সফল দিলীপ ভেংসরকার – কেউ প্রধান নির্বাচক হয়ে এর অন্যথা করেননি। কিন্তু সেসব বন্ধ হয়ে গেছে জয় বোর্ড সভাপতি হওয়ার পর থেকে। এখন দিনের কোনো একটা সময়ে বোর্ড প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে খেলোয়াড় তালিকা জানিয়ে দেয়। তারপর কে বাদ পড়লেন আর কাকে বিশ্রাম দেওয়া হল তা নিয়ে গুজব পল্লবিত হয়।

সবচেয়ে শোচনীয় ব্যাপার হল, ঘরোয়া ক্রিকেটে দিনের পর দিন ভাল খেলেও যে তরুণ ক্রিকেটাররা দলে সুযোগ পান না, তাঁদের কেন নেওয়া হল না তার জন্য জবাবদিহি করা হয় না। ভারতীয় ব্যাটিংয়ের টপ অর্ডার ফর্মে নেই কোভিড অতিমারীর আগে থেকে। কালে ভদ্রে এক-আধটা অর্ধশতরান বা শতরান করে উদ্ধার করেন। অধিকাংশ ইনিংসে শেষদিকে পন্থ, রবীন্দ্র জাদেজা বা শার্দূল ঠাকুর সম্মানজনক স্কোরে পৌঁছে দেন দলকে। সেই কারণেই বোলার হিসাবে বিদেশের মাঠে কল্কে না পেলেও ওঁদেরই খেলানো হয় সেরা বোলার অশ্বিনকে বসিয়ে রেখে। যেদিন জাদেজা, শার্দূলরাও পেরে ওঠেন না, সেদিন মধ্যাহ্নভোজনের আগেই খেলা শেষ হয়ে যায়, যেমন রবিবার ওভালে হল। অথবা দল খটখটে রোদের দিনেও ৩৬ অল আউট হয়ে যায়, যেমনটা ঘটেছিল ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর অ্যাডিলেডে।

এভাবে সিরিজ বা বড় ম্যাচ জেতা সম্ভব নয় বলেই ভারত অধিকাংশ ক্ষেত্রে জেতে না। অথচ ঘুরে ফিরে সেই রোহিত, সেই চেতেশ্বর পূজারা, সেই অজিঙ্ক রাহানে, সেই কোহলি খেলেই চলেছেন। এদিকে মুম্বাইয়ের ২৫ বছরের ছেলে সরফরাজ খান ৩৭ প্রথম শ্রেণির ম্যাচে সাড়ে তিন হাজার রান করে বসে আছেন প্রায় ৮০ গড়ে। তিনি কেন সুযোগ পান না জবাব দেওয়ার কেউ নেই। বাংলা দলের অভিমন্যু ঈশ্বরন (৮৭ ম্যাচে ৬৫৫৬ রান, গড় প্রায় ৪৮) পরপর বেশ কয়েকটা রঞ্জি ট্রফিতে ধারাবাহিকভাবে রান করে যাচ্ছেন। তাঁরও মেঘে মেঘেই বেলা বাড়ছে। এরকম আরও নাম আছে।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট বয়স ঢেকে ফেলছে বিজ্ঞাপনে

বাদ গিয়ে ফেরত আসা রাহানে ওভালে দুই ইনিংসেই ভারতের সেরা ব্যাটার ছিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে রোহিত আর কোহলিও বেশ ভাল ব্যাট করলেন। কিন্তু দেখা গেল, তাঁদের যথেষ্ট ভাল ফর্মও আর দলের জন্য যথেষ্ট নয়। ভারত দুশোর বেশি রানে হারল। ক্রিকেট জগতে একথার একটাই মানে হয়। এঁদের সময় শেষ। সেকথা এঁদের ভক্তরা মানবেন না, তার চেয়েও বড় কথা ক্রিকেট বোর্ড মানবে না। কারণ এই তারকাদের পিছনে টাকার থলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একগুচ্ছ স্পনসর। খেলা সরাসরি সম্প্রচারকারীদের প্রাণ তাদের হাতে, আর সম্প্রচারই হল বোর্ডের ধনরত্নে ভরা গুহা। হারজিতের কথা ভেবে কি আর ও গুহার চিচিং বনধ হতে দেওয়া যায়? যায় না বলেই বয়সের যুক্তিতে ঋদ্ধিমান সাহাকে রাহুল দ্রাবিড় বলে দিতে পেরেছিলেন, এবার তুমি এসো। কিন্তু কোহলিদের বয়স চোখে দেখতে পান না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

শুধু কুস্তির পদক নয়, দেবতার গ্রাসে আজ সবার সন্তান

যেমন সৌরভ গাঙ্গুলি, তেমন এম সি মেরি কম আর পিটি ঊষা। তাঁরা নিজেদের পদক জেতার কষ্ট বুঝেছিলেন নিশ্চয়ই, কিন্তু সহখেলোয়াড়দের কষ্ট যে বোঝেন না তা তো দেখাই যাচ্ছে।

অলিম্পিক নয়, এশিয়ান গেমস নয়, কমনওয়েলথ গেমস নয়, এমনকি সাফ গেমসও নয়। স্রেফ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে জেতা একখানা পদকের পিছনেও কত বছরের পরিশ্রম, কত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ত্যাগস্বীকার থাকে তা যে কোনো ক্রীড়াবিদকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যায়। আরও বেশি করে টের পাওয়া যায় একটুর জন্য পদক জিততে পারেননি যাঁরা, তাঁদের সঙ্গে কথা বললে। প্রয়াত মিলখা সিং জানতেন, কলকাতার ছেলে জয়দীপ কর্মকার জানেন, আগরতলার মেয়ে দীপা কর্মকারও জানেন সারাজীবনের পরিশ্রমের পর তীরে এসে তরী ডুবলে কেমন লাগে। অথচ গোটা দুনিয়ায় চতুর্থ হওয়াও সারাজীবনের সাধনা ছাড়া সম্ভব নয়।

সেই ১৮৯৬ সালে শুরু হয়েছিল আধুনিক অলিম্পিক। সোয়াশো বছরের বেশি পেরিয়ে গেছে। অথচ হকি দলের পদকগুলো বাদ দিলে কতজন ভারতীয় অলিম্পিক পদক জিতেছেন তা আজও এক হাতের কড়ে গুনে ফেলা যায়। এ দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয় যে ১৪ বছরের বাচ্চা মেয়ে শ্যানন মিলার একটা অলিম্পিক থেকেই পাঁচটা পদক জিতে নেবেন বা একা মাইকেল ফেল্পসের আলমারিতেই থাকবে প্রায় আড়াই ডজন অলিম্পিক পদক। দেশটা চীনও নয় যে ছোটবেলা থেকে পদকজয়ী অলিম্পিয়ান তৈরি করতে যত্ন নেবে দেশের সরকার। এমন দেশের ক্রীড়াবিদরা যখন ঠিক করেন আন্তর্জাতিক স্তরে জেতা পদক জলে ফেলে দেবেন, তখন বুঝতে হবে পৃথিবীর সব রং মুছে গেছে তাঁদের চোখের সামনে থেকে। সূর্য নিভে গেছে।

‘দেবতার গ্রাস’ কবিতায় যে মা রাগের মাথায় সন্তানকে বলে ফেলেছিলেন “চল তোরে দিয়ে আসি সাগরের জলে”, নিজের কথা কানে যেতে যে অনুতাপবাণে তাঁর প্রাণ কেঁদে উঠেছিল, একজন পদকজয়ী ক্রীড়াবিদের “মেডেল গঙ্গায় ফেলে দেব” বলার সময়ে তার চেয়ে কম যন্ত্রণা হয় না। কারণ একটা পদক জিততে হলে সন্তান পেটে ধরার মতই দীর্ঘ শারীরিক ও মানসিক বেদনা সহ্য করতে হয়। ভারতের কুস্তিগীররা, বিশেষ করে মহিলা কুস্তিগীররা, আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন তা বুঝতে চাইলে আগে এই কথাটা স্পষ্ট বোঝা দরকার।

ক্রীড়াবিদরা সফল হওয়ার পরে সমস্ত আলো তাঁদের উপর এসে পড়ে। সাফল্যের পথটার উপরে আলো ফেলা হয় না সচরাচর। ফলে স্বীকার্য যে পদক জয়ের সলতে পাকানোর পর্ব খুব বেশি মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। কিন্তু যাঁরা মতি নন্দীর কাহিনি অবলম্বনে সরোজ দে পরিচালিত কোনি বা শিমিত আমীন পরিচালিত চক দে ইন্ডিয়া দেখেছেন, তাঁদের বলে দিতে হবে না যে স্রেফ প্রতিভায় চিঁড়ে ভেজে না। পেশাদার খেলোয়াড়ের জীবন বস্তুত ব্যথার পূজা। এমন ভয়ঙ্কর ব্যথা, যে খেলার জগতের বাস্তবতা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা না থাকা কিছু ফিল্ম সমালোচকের মনে হয়েছিল, গীতা ও ববিতা ফোগত এবং তাঁদের বাবা মহাবীর ফোগতের জীবন নিয়ে তৈরি দঙ্গল ছবিতে নারীত্বের অবমাননা দেখানো হয়েছে। মহাবীর মেয়েদের উপরে নিজের মতামত চাপিয়ে দিয়েছেন, সেখানে ‘ফিমেল এজেন্সি’-র অভাব ইত্যাদি। এঁরা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাঁশ নিয়ে তাড়া করার দৃশ্য সম্পর্কে কী ভাবেন কে জানে! যা-ই ভাবুন, পৃথিবীর সমস্ত ক্রীড়াবিদের সাফল্য ওই পথেই এসেছে। নির্মম মমতা ছাড়া সফল ক্রীড়াবিদ হওয়া যায় না।

তাহলে ভাবুন, পছন্দের খাবার খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে, নিজের বয়সী আর পাঁচটা ছেলেমেয়ের মত আনন্দ ফুর্তি বাদ দিয়ে, কোচের চোখরাঙানি হজম করে, খাটতে খাটতে আধমরা হয়ে গিয়ে যে পদক জেতেন একজন ক্রীড়াবিদ – সেই পদক বিসর্জন দিতে চান কোন অসহায়তায়।

ভিনেশ ফোগত, সঙ্গীতা ফোগত, সাক্ষী মালিক, বজরং পুনিয়ারা সেই অসহায়তায় পৌঁছেছেন। আপাতত হরিয়ানার কৃষক নেতাদের অনুরোধে গঙ্গায় পদক বিসর্জন দেওয়ার পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন। কিন্তু কী হবে পাঁচদিন পরে?

হবে অশ্বডিম্ব – এই মনোভাব নিয়েই এই ইস্যুতে এখন পর্যন্ত চলেছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। তাই এই চরম সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হয়েছে আমাদের কুস্তিগীরদের। সাধারণভাবে একটা তৃতীয় বিশ্বের দেশের ক্রীড়াবিদদের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, ভারতের ক্রীড়াবিদদের ঘাড়ে সেসব তো আছেই। আছে একগাদা উপরি পাওনাও। বরাবরই দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের মেজাজ মর্জি অনুযায়ী চলতে হয় তাঁদের। দেশের আর সবকিছুর মত খেলার জন্য বরাদ্দ টাকাও চলে যায় কর্মকর্তাদের পকেটে। আর কিছু মনে না থাকলেও কমনওয়েলথ গেমস কেলেঙ্কারি আর সুরেশ কালমাদির কথা কার না মনে আছে? ফলে অনেকেরই ধারণা ছিল, প্রাক্তন খেলোয়াড়দের খেলা চালানোর দায়িত্ব দিলে সব ম্যাজিকের মত বদলে যাবে। ক্রিকেট বোর্ডের দুর্নীতি, ইন্ডিয়ান অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের দুর্নীতি – সবই আদালত পর্যন্ত গড়ানোর ফলে এসে পড়েছিল সেই সুযোগ। কিন্তু মোদী সরকারের আমলে দেখা গেল, রাজনীতিবিদদের বশংবদ প্রাক্তন খেলোয়াড়রা কিছু কম যান না। যেমন সৌরভ গাঙ্গুলি, তেমন এম সি মেরি কম আর পিটি ঊষা। তাঁরা নিজেদের পদক জেতার কষ্ট বুঝেছিলেন নিশ্চয়ই, কিন্তু সহখেলোয়াড়দের কষ্ট যে বোঝেন না তা তো দেখাই যাচ্ছে।

ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে প্রথম যখন লাগাতার যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন ভিনেশ, সাক্ষীরা – তখন একটা ওভারসাইট কমিটি গড়ে দেওয়া হয়েছিল, যার কর্ণধার ছিলেন মেরি কম এবং আরেক অলিম্পিক পদকজয়ী কুস্তিগীর যোগেশ্বর দত্ত। সেই কমিটি অশ্বডিম্বই প্রসব করেছিল। নইলে যন্তর মন্তরে ধরনায় বসতেই হত না সাক্ষীদের।

মেরি কম, ঊষারা একে খেলোয়াড় তায় মহিলা। তবু তাঁরা যৌন হয়রানির অভিযোগকে পাত্তা দিচ্ছেন না, ভিনেশদের চোখের জলের দাম তাঁদের কাছে মিনারেল ওয়াটারের চেয়ে বেশি নয়। হয়ত ব্রিজভূষণের মত তাঁরাও মনে করেন ওসব পদকের দাম ১৫ টাকা। নতুন সংসদ ভবনের বর্ণাঢ্য উদ্বোধন নির্বিঘ্ন করতে কুস্তিগীরদের উপর পুলিসি আক্রমণ সম্পর্কে তাঁদের নীরবতা, ব্রিজভূষণের প্রতি মৌন সমর্থন প্রমাণ করে ক্ষমতার মদের নেশা অন্য সব নেশার চেয়ে কড়া। হাজার হোক, মেরি কম মণিপুরের নির্বাচনে বিজেপির তারকা প্রচারক ছিলেন। যোগেশ্বর তো রীতিমত বিজেপি দলের সদস্য। অর্থাৎ ভারতের ক্রীড়াপ্রেমীদের অরাজনীতির সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল।

কুস্তিগীরদের প্রতি সহানুভূতিশীল অনেকেরও রাজনীতি ব্যাপারটা প্রবল অপছন্দ। তাঁরা কোমলমতি। শাসক দলের সাংসদ যৌন হয়রানির একাধিক অভিযোগ সত্ত্বেও গ্রেফতার হন না, সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ না করলে, অলিম্পিক পদকজয়ীরা ধরনায় না বসলে এফআইআর পর্যন্ত দায়ের হয় না। তবু বিরোধী দলের নেতারা কুস্তিগীরদের পাশে দাঁড়ালে কোমলমতি ক্রীড়াপ্রেমীরা নাক কোঁচকান। তাঁদের জন্য উল্লেখ থাক, আজকের অপমানিত কুস্তিগীররা কিন্তু কখনো অরাজনৈতিক ছিলেন না। ২০১৪ সালের পর থেকে চালু হওয়া ধারা অনুযায়ী তাঁরা সোশাল মিডিয়ায় মোদী সম্পর্কে এবং তাঁর সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত ছিলেন দীর্ঘকাল। হিন্দুত্বের রাজনীতিও তাঁদের অনেকেরই পছন্দের। মে মাসের গোড়ার দিকেও বজরং ইনস্টাগ্রামে বজরং দলকে সমর্থন করে পোস্ট করেছিলেন, পরে মুছে দেন।

তা বলে বজরংদের এই আন্দোলনকে বাঁকা চোখে দেখার কোনো কারণ নেই। হরিয়ানার রক্ষণশীল, খাপ পঞ্চায়েত নিয়ন্ত্রিত সমাজ থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের ফ্যাসিবাদের ক্রীড়নক হয়ে যাওয়া খুব আশ্চর্যের নয়। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের জাতিভুক্ত এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের প্রাক্তনী সৌরভেরই যদি অমিত শাহের অনুগ্রহে আপত্তি না থাকে তো বজরংদের দোষ কী? কে লড়ছেন তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোন দাবিতে লড়ছেন। যে দেশের মেয়েদের ছোট থেকে নিকটাত্মীয়ের হাতে যৌন হয়রানি অভ্যাস করে নিতে হয়, ধর্ষক বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর অত্যাচারিত মেয়েটির পরিবার লোকলজ্জায় মুখ লুকোয় – সে দেশে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মহিলা ক্রীড়াবিদরা তাঁদের যৌন হয়রানির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছেন; পাশে রয়েছেন পুরুষ ক্রীড়াবিদরা – একে ঐতিহাসিক বলে মানতেই হবে। কর্পোরেট পেশাদার মহিলারাও জানেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগুলো বহু জায়গাতেই এখনো দায়সারা। এই আন্দোলন তেমন অনেক কর্তৃপক্ষকেই তটস্থ করে তুলছে। ইতিমধ্যেই এসে পড়েছে কুস্তির আন্তর্জাতিক নিয়ামক সংস্থার হুঁশিয়ারি।

আরও পড়ুন কুস্তিগীরদের আন্দোলন: মহাতারকাদের মহাকাপুরুষতা

বিজেপির রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির চেয়ে এসব অনেক দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। যদিও রাকেশ ও মহেশ টিকায়েতের মত খাপ পঞ্চায়েতের নেতার উপস্থিতি, বরাবরের বিজেপি সমর্থক ফোগত পরিবারের প্রধান মহাবীরের বিবৃতি এবং হরিয়ানার বিজেপি নেতাদের উল্টো গাওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এ ব্যাপারে রাজনৈতিকভাবে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ক্রমশ কোণঠাসা হচ্ছে। মোদীর দেবতাপ্রতিম ভাবমূর্তি বিশেষ কাজে আসছে না।

অনির্বাচিত মনুবাদী সাধুসন্তরা ঢুকে পড়েছেন ভারতের সংসদে, অযোধ্যার মহন্তরা অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন আক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে যে আইন (Protection of Children from Sexual Offences Act, 2012) আছে তা বদলানোর দাবিতে সভা করতে চলেছেন ব্রিজভূষণের সমর্থনে। বলা বাহুল্য, তাঁদের কথার ওজন আজকের ভারত সরকারের কাছে অসীম। ফলে সরকার যে তাঁদের প্রণাম জানিয়ে অর্ডিন্যান্স এনে আইন বদলে ফেলবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তা ঘটলে বুক ফুলিয়ে ঘুরতে পারবে আমাদের সকলের সন্তানের ধর্ষকরা। সুতরাং ভিনেশ, সাক্ষী, বজরংদের লড়াই এখন শুধু পদকজয়ী ক্রীড়াবিদদের লড়াই নয়, সমস্ত ভারতীয়ের লড়াই। সব মেয়েকে, সব শিশুকে দেবতার গ্রাস থেকে বাঁচানোর লড়াই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

বায়রন যদি ব্রুটাস হন, তৃণমূল কে?

২০২১ সালে যে তৃণমূল নেতাদের প্রতি মানুষ ক্ষুব্ধ ছিলেন, যাঁরা বিজেপিতে গিয়ে বিপুল ভোটে হেরেছিলেন, তাঁদের নির্বাচনের ফল বেরোবার পর অনতিবিলম্বেই ফিরিয়েও নেওয়া হয়েছিল।

অবাক হওয়ার ক্ষমতা কমে আসাই সম্ভবত বার্ধক্যের সবচেয়ে নিশ্চিত লক্ষণ। বায়রন বিশ্বাস কংগ্রেসের টিকিটে, সিপিএমের সমর্থনে মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদীঘি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেওয়ায় খুব একটা অবাক হতে পারিনি। ফলে বুঝলাম, বুড়ো হচ্ছি। আমি যখন ছাত্র, তখন আমাদের কলেজের সেমিনারে সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের মুখে একটা গল্প শুনেছিলাম। পিঠে ভারি স্কুলব্যাগ নিয়ে হেঁটে যাওয়া এক পরিচিত স্কুলছাত্রকে নাকি তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন “কেমন আছ?” সে উত্তর দিয়েছিল “ওই আছি আর কি। এবার গেলেই হয়।” তখনও এ-দেশে মোবাইল ফোন সহজলভ্য হয়নি। তখনই যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এসে আমার মতো চালসে পড়া লোকের তো বুড়ো হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। চারপাশ অতি দ্রুত বদলাচ্ছে। এত দ্রুত, যে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেকে বদলানো প্রায় কোনও মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই বোধহয় সাহিত্য, সিনেমা, সোশাল মিডিয়া— সর্বত্র স্মৃতিমেদুরতার ছড়াছড়ি, একমাত্র নস্টালজিয়ার বাজারই সর্বদা সরগরম। বদল এমনিতে জীবনের লক্ষণ, তা মনোরঞ্জক এবং উত্তেজক। কিন্তু ঘনঘন বদল আবার একঘেয়ে হয়ে যায়। সর্বক্ষণ চার, ছয় হয় বলে যেমন আজকাল আর আইপিএল ম্যাচ দেখতে ভাল লাগে না। মনে হয়, এ তো জানা কথাই। খেলার মহান অনিশ্চয়তা বলে আর কিছু নেই। রাজনীতিও ক্রমশ মহান অনিশ্চয়তা হারাচ্ছে। এ রাজ্যের রাজনীতি তো বটেই।

অনেকেই চটে যাবেন। তবু না বলে পারছি না— পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দলবদল ব্যাপারটা এতই জলভাত হয়ে গেছে গত কয়েক বছরে, যে বায়রনের দলবদল নিয়ে কংগ্রেস ও বাম নেতৃত্বের আহত হওয়া এবং বহু সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া বা হতাশায় ভোগা আমার কাছে প্রাথমিকভাবে কৌতুককর। পরে অন্য কিছু। আগেই বলেছি, অতি দ্রুত সবকিছু বদলালে নিরুপায় মানুষ স্মৃতির কাছেই আশ্রয় নেয়। অনতি-অতীতে ফিরে গেলেই দেখতে পাই, এ রাজ্যের সর্বত্র একেকটা পাড়া বা পরিবার সম্পর্কে অন্যরা বলত “ওরা পাঁড় কংগ্রেসি” বা “ওরা কট্টর সিপিএম”। কোনও কোনও মানুষ সম্পর্কে বলা হত “প্রথমদিন থেকে তৃণমূলে আছে”। আজকাল আর সেসব বলা যায় না। এক যুগ আগে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেখা গেছে রেজ্জাক মোল্লার মতো “ঘামের গন্ধওলা কমরেড” তৃণমূলে চলে যেতে পারেন। উদয়ন গুহর মতো পারিবারিকভাবে বামপন্থী নেতা দল বদলাতে পারেন। হাত-পা নেড়ে মার্কসবাদ কপচানো, পকেটে মঁ ব্লাঁ পেন আর হাতে আই ওয়াচ পরা সিপিএমের রাজ্যসভার সদস্য ঋতব্রত ব্যানার্জি তৃণমূলের মুখপাত্র হয়ে উঠতে পারেন নিঃসঙ্কোচে। এমনকি প্রবীণ সিপিএম নেতা তথা বামফ্রন্ট সরকারের দীর্ঘদিনের মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যের বিশ্বস্ত সৈনিক শঙ্কর ঘোষ বিজেপির নির্ভরযোগ্য ‘কারিয়াকার্তা’ হয়ে উঠতে পারেন। তালিকা দীর্ঘতর করা যেতেই পারে, কিন্তু বক্তব্য পরিষ্কার করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। যেসব মানুষ কখনও বামপন্থীদের ভোট দেন না, দেবেন না— তাঁদেরও কিন্তু বরাবর প্রত্যাশা থাকে, আর যে যা-ই করুক, বামপন্থীরা এমন নীতিহীনতায় জড়াবেন না। সেই বামপন্থীদেরই এসব করতে দেখে ফেলার পর ধনী ব্যবসায়ী কংগ্রেসি বায়রনের কাছে অন্যরকম প্রত্যাশা থাকবেই বা কেন? তিনি তো দেখলাম ঘোরপ্যাঁচহীন সরল মানুষ। বলেছেন, তৃণমূল প্রার্থী করেনি বলে কংগ্রেসে গিয়েছিলেন। এখন যখন বিধায়ক হয়েই গেছেন, তখন আর দলের উপর রাগ করে থাকার দরকার কী?

সাগরদীঘির ভোটাররা রাগ করতে পারেন এই লোকটির বিশ্বাসঘাতকতার জন্য, অধীর চৌধুরী রাগ করতে পারেন তাঁকে বোকা বানানো হয়েছে বলে। আমরা, বাকি রাজ্যের মানুষ, যদি রাগ করতে চাই তাহলে কয়েকটা কথা একটু স্মরণ করে নেওয়া দরকার।

এ রাজ্যের বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় দিনের পর দিন একাধিক বিধায়ককে বাইরে তৃণমূল, ভিতরে বিজেপি হয়ে থাকতে দিচ্ছেন। এঁদের মধ্যে মুকুল রায় বলে একজন আছেন, যিনি বিজেপির টিকিটে বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে পরে ঘটা করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির উপস্থিতিতে তৃণমূলে ফিরে এসেছেন বলে সাংবাদিক সম্মেলন করেন। তারপর যখন তাঁকে বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির মাথায় বসিয়ে দেওয়া হয়, তখন বিরোধীরা সমালোচনা করেন। কারণ সংসদীয় প্রথা অনুযায়ী ওই পদটা প্রধান বিরোধী দলকে দেওয়া হয়ে থাকে। এই সমালোচনার জবাবে মুখ্যমন্ত্রী যুক্তি দেন, মুকুল তো বিজেপিরই বিধায়ক। কদিন আগেও মমতা একথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। বিধানসভার বাইরে প্রায় প্রতিদিন গরম গরম মন্তব্য করে বিজেপিকে সংবাদের শিরোনামে রাখেন যে বিরোধী দলনেতা, জনসভার অনুমতি আদায় করতে বারবার আদালতের দ্বারস্থ হতে যাঁর ক্লান্তি নেই, সেই শুভেন্দু অধিকারী কিন্তু এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার হুমকি-টুমকি দেননি কখনও। সুতরাং ধরে নিতে হয় মুকুল তৃণমূলেরও, বিজেপিরও। শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণী সারদামণি যেমন বলতেন “আমি সতেরও মা, অসতেরও মা।” তা এই ব্যবস্থায় যদি আমাদের রাগ না হয়, খামোকা বায়রনকে ব্রুটাসের সঙ্গে একাসনে বসানোর প্রয়োজন কী?

ওই লোকটি যে জনাদেশকে অসম্মান করেছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এ রাজ্যের এক বড় অংশের মানুষ তো আবার তৃণমূল দল ভাঙালে তাতে জনাদেশের অসম্মান হয় বলে মনে করেন না। ঠিক যেভাবে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে এবং সোশাল মিডিয়ায় বিজেপি কোনও রাজ্যের সরকার দল ভাঙিয়ে ভেঙে দিলে অমিত শাহকে চাণক্য বলা হয়, ব্যাপারটাকে মাস্টারস্ট্রোক বলা হয়, সেইভাবে এ রাজ্যেও তো অন্য দলের নেতা তৃণমূলে যোগ দিলে তা গণতন্ত্রের জয় বলেই ঘোষণা করেন বহু মানুষ। বিভিন্ন চ্যানেলের অ্যাঙ্কররাও গদগদ হয়ে বলেন, তৃণমূল দেখিয়ে দিল। বায়রনের দলবদলের পর যেমন বলা হচ্ছে, সাগরদীঘির পরাজয়ের জবাব দিল তৃণমূল। প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে, জবাবটা কাকে দিল? ভোটারদের? যে ভোটাররা তৃণমূলকে দরজা দেখিয়ে দিয়েছিলেন? তাহলে লড়াইটা কি শাসক দল বনাম ভোটারের? একেই তাহলে এখন গণতন্ত্র বলছি আমরা? পরপর হিমাচল প্রদেশ আর কর্নাটকে মুখ থুবড়ে পড়ার আগে বিজেপি সম্পর্কে সর্বভারতীয় স্তরে একটা কথা চালু হয়ে গিয়েছিল— ভোটে যে-ই জিতুক, সরকার গড়বে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কি আলাদা কিছু করছে?

২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন যে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল তা তো ইদানীং অভিষেকও ঠারেঠোরে স্বীকার করেন। এ বছরে সময় অতিক্রান্ত হলেও পঞ্চায়েত নির্বাচন করানো নিয়ে সরকারের কোনও উৎসাহ নেই। রাজ্যপাল রাজ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করছেন না, সরকারও তা নিয়ে সংঘাতে যাচ্ছে না। অথচ এমনিতে কত বিষয়ে রাজ্যপালের সঙ্গে কত আকচা-আকচি চলে! ২০২১ সালে যে তৃণমূল নেতাদের প্রতি মানুষ ক্ষুব্ধ ছিলেন, যাঁরা বিজেপিতে গিয়ে বিপুল ভোটে হেরেছিলেন, তাঁদের নির্বাচনের ফল বেরোবার পর অনতিবিলম্বেই ফিরিয়েও নেওয়া হয়েছিল। উপরন্তু বাবুল সুপ্রিয়র মতো দাঙ্গাবাজ বিজেপিফেরতকে উপনির্বাচনে প্রার্থী করে মন্ত্রীও বানানো হয়েছে। এগুলো জনাদেশকে সম্মান করার লক্ষণ? এই ধারাতেই তো কংগ্রেসের একমাত্র বিধায়ককে দলে টেনে নেওয়া হল। আবার মঞ্চে বসে অভিষেক জাঁক করে এও বললেন, যে বোতাম টিপলেই কংগ্রেসের চারজন সাংসদকে তৃণমূল নিয়ে নিতে পারে। একের পর এক দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলায় দল যখন টলমল করছে, দিদির দূত প্রকল্প ঘটা করে ঘোষণা করার পর জনরোষের চেহারা দেখে চুপিসাড়ে বন্ধ করে দিতে হয়েছে, নবজোয়ারে বেরিয়ে নিত্য ল্যাজেগোবরে হতে হচ্ছে— তখনও এভাবে বুক ফুলিয়ে দল ভাঙানোর হুমকি দেওয়া থেকে বোঝা যায় যে অভিষেক মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নীতি একটা বাতিল পণ্য হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন চাকরি চুরির চাঁইদের শেষ অব্দি কী গতি হয়?

তাঁর ধারণা যথার্থ। বিজেপির বিরুদ্ধে চাট্টি গরম গরম কথা বললেই (এমনকি আরএসএসের বিরুদ্ধেও বলতে হয় না। মুখ্যমন্ত্রী বারবার বলেন আরএসএস খারাপ নয়) সরকারি দলের যাবতীয় অন্যায়, অত্যাচার, দুর্নীতি, গঙ্গারতি ও মন্দির নির্মাণ সত্ত্বেও বিজেপিকে আটকাতে তাদেরই ভোট দেওয়া আমাদের কর্তব্য— একথা যখন থেকে এ রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখনই নীতির ডেথ সার্টিফিকেট লেখা হয়ে গেছে। ২০২১ সালের নির্বাচনের ফলাফল নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করে ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বড় ইস্যু ছিল বিজেপিকে আটকানো, রাজ্যের সরকারের কাজের মূল্যায়ন নয়। তাতে ক্ষতি নেই। গণতন্ত্রে ভোটাররা নিজেদের অ্যাজেন্ডা নিজেরাই তো ঠিক করবেন। কিন্তু আজ দুবছর পরে ভেবে দেখা দরকার, বিজেপিকে আটকানোর উদ্দেশ্যটুকুও সফল হয়েছে কি? বিজেপি তিনজন বিধায়ক নিয়ে এককোণে পড়ে থাকা দল থেকে প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়েছে তো বটেই, সরকারবিরোধী ভোটাররা যাতে বিজেপি ছাড়া আর কোনও দলের উপর ভরসা করতে না পারেন তার জন্যে শাসক দল আপ্রাণ চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। তৃতীয় পক্ষের কাছে সামান্য একটা উপনির্বাচনে হারও তারা সহ্য করছে না। না হয় মেনে নেওয়া গেল, কংগ্রেস নিজেদের বিধায়ককে ধরে রাখতে পারে না বলে অপদার্থ। সিপিএম আরও অপদার্থ, কারণ তারা আদালতের মুখাপেক্ষী হয়ে আন্দোলন করে— এও না হয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপিই একমাত্র পদার্থ হিসাবে পড়ে থাক— এমন পরিস্থিতিই কি তৈরি করতে চেয়েছিলাম আমরা? বায়রনের বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে চুটকি আর মিম বানানো বা ক্ষোভ প্রকাশ করার চেয়ে নিজেদের এই প্রশ্ন করা বেশি জরুরি। কারণ আবার নির্বাচন আসছে। গণতন্ত্রের ওইটুকু তলানিই তো পড়ে আছে আমাদের জন্যে— একটা ভোট দেওয়ার অধিকার।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

কর্ণাটক নির্বাচনের ফল: মিডিয়া, জিভ কাটো লজ্জায়

কর্ণাটক নির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকতা আজ কদর্যতার নতুন শৃঙ্গে আরোহণ করল বিজেপি হেরে যাওয়ায়। এর বিপদ দীর্ঘমেয়াদি।

কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল রাজনৈতিকভাবে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যেভাবে এই নির্বাচনের ফলাফল সম্প্রচারিত হতে দেখলাম টিভির পর্দায়, সাংবাদিক হিসাবে সেটা নিয়ে আলোচনা করাও আমার অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ মনে হল। ব্যাপারটার শুরু নির্বাচনের কয়েকদিন আগে থেকেই।

নতুন সহস্রাব্দের গোড়ায় এ দেশে চব্বিশ ঘন্টার খবরের চ্যানেলের ছড়াছড়ি হওয়ার পর থেকেই প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা বা ওপিনিয়ন পোল এবং বুথফেরত সমীক্ষা বা এক্সিট পোলের বিপুল জনপ্রিয়তা। প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা ভোটারদের প্রভাবিত করে কিনা বা এক দফা ভোটের পর টিভিতে বুথফেরত সমীক্ষা হলে পরের দফাগুলোয় যেখানে ভোটদান হবে সেখানকার ভোটদাতারা প্রভাবিত হন কিনা – এ নিয়ে একসময় বিস্তর বিতর্ক হয়েছে। ফলে এখন নিয়ম হয়ে গেছে, যে কোনো স্তরের নির্বাচনের ৪৮ ঘন্টা আগে থেকে প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষার ফল প্রকাশ করা যাবে না, আর শেষ দফার ভোটদান সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা যাবে না। ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো গত কয়েক বছরে নিরপেক্ষতার ভান ত্যাগ করে ক্রমশ যত একচোখা হয়ে উঠেছে, তত এইসব সমীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তা সত্ত্বেও গত ডিসেম্বর মাসেই সংসদে মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানিয়ে দিয়েছেন, এইসব সমীক্ষা নিষিদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।

খুব ভাল কথা। গত দশ বছরে লোকসভা তো বটেই, বেশিরভাগ নির্বাচনের প্রাক্কালে মতামত সমীক্ষায় দেখা গেছে বিজেপি ভাল জায়গায় আছে, বুথফেরত সমীক্ষাতেও তাই। সবসময় যে সেইসব সমীক্ষার ফল মিলেছে তা নয়, সব নির্বাচনেও বিজেপি জেতেনি। কিন্তু ভুল কোন সমীক্ষায় না হয়? কোন দলই বা সব নির্বাচনে জেতে? ফলে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের এইসব সমীক্ষা নিষিদ্ধ করতে চাওয়ার কারণও ছিল না। কিন্তু এবারে কর্ণাটক নির্বাচনের আগে একটা অন্যরকম প্রবণতা লক্ষ করা গেল। যেই দেখা গেল প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষাগুলোতে ক্ষমতাসীন বিজেপির হাল ভাল নয় বলে দেখা যাচ্ছে, অমনি চ্যানেলগুলো ওইসব সমীক্ষা নিয়ে হইচই করা বন্ধ করে দিল। কোন চ্যানেলের সমীক্ষায় কী পাওয়া গেছে তা নিয়ে খবরের কাগজগুলোও বিশেষ জায়গা খরচ করল না। অথচ কাগজের রাশিফলের কলাম অনেকে যেভাবে গেলে, সেইভাবে ভোটে কী হতে চলেছে তা নিয়ে অনুষ্ঠান হলেও লোকে বিলক্ষণ গেলে। কারণ ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা কল্পনা করতে প্রায় প্রত্যেকটা মানুষ ভালবাসে। অতএব টিআরপি আদায় করতে যে কোনো চ্যানেলের কাছে সমীক্ষাগুলো দারুণ লোভনীয়। তবু ঢাকঢোল পিটিয়ে সেগুলো নিয়ে প্রচার করতে দেখা গেল না। অথচ অতীতে খোদ বিজেপিকে দেখা গেছে বিজ্ঞাপন দিতে, যার বয়ান খানিকটা এইরকম – সমস্ত ওপিনিয়ন পোল বলছে আমরা জিতব। তাই আমাদেরই ভোট দিন। এবারে প্রায় কোনো প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষাকেই সেভাবে ব্যবহার করার সুযোগ ছিল না। তাই কি গোদা বাংলায় যাকে চেপে যাওয়া বলে, গোদী মিডিয়া তাই করতে শুরু করল?

এ সন্দেহ দৃঢ় হয় রায় দম্পতির হাত থেকে গৌতম আদানির করতলগত হওয়া এনডিটিভির কাণ্ড খেয়াল করলে। তারা ১০ মে ভোটদানের আগে দুদিন ধরে বিস্তারিত প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষার ফলাফল সম্প্রচার করল। তাতে ভোটাররা কোন ইস্যুকে প্রধান ইস্যু বলে ভাবছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ সম্পর্কে মতামত কী, রাজ্য সরকারের কাজ সম্পর্কে কী ভাবছেন – এইসব গভীর প্রশ্ন ছিল। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে কত শতাংশ মানুষ কাকে দেখতে চান – এ প্রশ্নও ছিল। অথচ কে কত আসন পেতে পারে সেই হিসাবটাই দেখানো হল না।

আরও মজা হল গত বুধবার ভোটদানের পর সন্ধেবেলা। একমাত্র নিউজ নেশন-সিজিএস বুথফেরত সমীক্ষা নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে বলল, বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে পারে ১১৪ আসন নিয়ে, কংগ্রেস পাবে ৮৬, জেডিএস ২১ আর অন্যরা তিন। আর কোনো সর্বভারতীয় সমীক্ষাই নির্দিষ্ট সংখ্যা বলতে রাজি হল না। “এত আসন থেকে অত আসনের মধ্যে পাবে” – এটাই দেখা গেল সকলের পছন্দের নীতি। তাতেও সমস্যা ছিল না। কিন্তু কংগ্রেস আর বিজেপি – দুই প্রধান পক্ষকে যে সংখ্যাগুলো দেওয়া হল, সেগুলোর কোনো সীমা পরিসীমা নেই। যেমন এবিপি নিউজ-সি ভোটার বলল বিজেপি পাবে ৬৬-৮৬ আসন আর কংগ্রেস ৮১-১০১। রিপাবলিক টিভি-পি মার্কের মতে বিজেপি ৮৫-১০০; কংগ্রেস ৯৪-১০৮। সুবর্ণ নিউজ-জন কি বাত বিজেপিকে দিল ৯৪-১১৭, কংগ্রেসকে ৯১-১০৬। টিভি ৯ ভারতবর্ষ-পোলস্ট্র্যাট বলল বিজেপি পাবে ৮৮-৯৮, কংগ্রেস ৯৯-১০৯।

সংখ্যাগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন। একটা দল ৯৪ আসন পাওয়া মানে তার বিরোধী আসনে বসা প্রায় নিশ্চিত, অন্যদিকে ১১৭ আসন পাওয়া মানে নিশ্চিন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ছেলে পরীক্ষা দিয়ে এল, বাবা জিজ্ঞেস করলেন “কত পাবি?” ছেলে বলল “পাসও করতে পারি, ফেলও করতে পারি।” এ তো সেইরকম সমীক্ষা হয়ে গেল। একটা দল ৮৫ পেতে পারে, আবার একশোও পেতে পারে – একথা বলার জন্যে সমীক্ষা করার প্রয়োজন কী? এনডিটিভি নিজে কোনো সংস্থার সাহায্য নিয়ে এবারে বুথফেরত সমীক্ষা করেনি। এই সংখ্যাগুলো যখন বুধবার সন্ধ্যায় তাদের চ্যানেলে দেখানো হচ্ছিল, তখন বিজেপি মুখপাত্র দেশরতন নিগম সঙ্গত কারণেই বলেছিলেন “এবার দেখছি আমিও একটা পোল সার্ভে এজেন্সি খুলে ফেলতে পারি।”

চূড়ান্ত ফল এই সমস্ত সমীক্ষাকেই ভুল প্রমাণ করেছে। যখন এই লেখা লিখছি, তখন নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট বলছে কংগ্রেস ১১৭ আসনে জিতে গেছে, আরও ১৯ আসনে এগিয়ে। অর্থাৎ মোট ১৩৬। বিজেপি ৫৩ আসনে জয়ী, আরও ১১ আসনে এগিয়ে। অর্থাৎ মোট ৬৪। এছাড়া জেডিএস ১৮ আসনে জয়ী, আরও দুই আসনে এগিয়ে। গত কয়েক বছর ধরে এই সমীক্ষাগুলোর ভুলের পরিমাণ কিন্তু লাগাতার কমছিল। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মত হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনের ফলাফল কোনদিকে যাবে তা সঠিকভাবে অনুমান করতে পেরেছিলেন অনেক সংস্থার সমীক্ষকই, দু-একটা সংস্থা আসন সংখ্যাও প্রায় নিখুঁতভাবে বলে দিয়েছিল। তাহলে কর্ণাটকে গিয়ে কি তাঁরা সকলে রাতারাতি সব দক্ষতা হারিয়ে ফেললেন? নাকি সমীক্ষকদের দেওয়া সত্যিকারের সংখ্যাগুলো মিডিয়া আমাদের দেখতেই দিল না প্রলোভনে বা ভয়ে?

কোনো সন্দেহ নেই যে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ২০২১ সালের নির্বাচন জিততে চেয়েছিল। কিন্তু হারলেও তাদের পক্ষে ফলটা তো নেহাত খারাপ হয়নি। সেই প্রথম তারা এই রাজ্যে একক বিরোধী দল হিসাবে উঠে আসে। ২০১৬ বিধানসভার তুলনায় বিধায়কের সংখ্যা বেড়ে যায় ২৫ গুণেরও বেশি। ফলে হারলেও সেই ফলকে যে একাদশাবতার মোদীজির সাফল্য হিসাবে দেখানো সম্ভব হবে তা তো বিজেপির জানাই ছিল। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের এক বছরও যখন বাকি নেই, সেইসময় কর্ণাটকের মত বড় রাজ্যে প্রধানমন্ত্রী দিনরাত প্রচার করার পরেও কেবল ক্ষমতা খোয়ানো নয়, গোটা ষাটেক আসনে নেমে আসাকে যে কোনোভাবেই সাফল্য বলে প্রমাণ করা যাবে না – তা বোধহয় অমিত শাহের মত পাকা মাথার লোকেদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তাই কি এত-থেকে-অত শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে বলা হয়েছিল বৃহৎ পুঁজির মালিকানায় থাকা সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোকে?

ইন্দিরা গান্ধী আরোপিত জরুরি অবস্থা সম্পর্কে লালকৃষ্ণ আদবানির একটা উক্তি বিজেপি নেতারা কয়েক বছর আগে পর্যন্তও খুব আওড়াতেন। আদবানি বলেছিলেন “শ্রীমতি গান্ধী মিডিয়াকে নত হতে বলেছিলেন, মিডিয়া হামাগুড়ি দিয়েছিল।” ২০১৪ সাল থেকে মূলধারার মিডিয়া যেভাবে চলছে সে সম্পর্কে অধুনা মার্গদর্শকমণ্ডলীর সদস্য আদবানির মতামত আমরা জানি না। কিন্তু আজ ফল প্রকাশের দিন সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো যা করল, তাকে বোধহয় একমাত্র দণ্ডি কাটার সঙ্গে তুলনা করে চলে।

ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল সকালের দিকেই। ইন্ডিয়া টুডের অ্যাঙ্কর রাহুল কাঁওয়াল কংগ্রেসের অফিসিয়াল হ্যান্ডেল থেকে টুইট করা একটা ভিডিও নিয়ে বেজায় আপত্তি করতে লাগলেন। কেন সেই ভিডিওতে রাহুল গান্ধীকে নায়কোচিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে? কেন লেখা হয়েছে “আমি অপরাজেয়। আমি আত্মবিশ্বাসী। হ্যাঁ, আজ আমি অপ্রতিরোধ্য।” ভিডিওটায় আপত্তিকর কী আছে তা কাঁওয়াল কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারছিলেন না, কিন্তু কী যেন খচখচ করে বিঁধছিল। সত্যি কথা বলতে, দেখে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো মনে পড়ে যাচ্ছিল। ক্লাসের কোনো একটা ছেলের দিকে একাধিক মেয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালে আমরা বাকিরা যেনতেনপ্রকারেণ প্রমাণ করার চেষ্টা করতাম তার মধ্যে বিশেষ কিছুই নেই – না রূপের দিক থেকে, না গুণের দিক থেকে। এও যেন সেই ব্যাপার।

যদিও কাঁওয়াল মোটেই আমাদের মত যৌন ঈর্ষায় ভুগছিলেন না। পর্দার নিচের দিকে তাকালেই দেখা যাচ্ছিল কংগ্রেস তখন ১২১, বিজেপি ৭৬। সংখ্যার উপর তো আর রাগ দেখানো চলে না, তাই গায়ের ঝালটা কংগ্রেস নেতাটির উপরেই ঝাড়ছিলেন তিনি। ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হল খানিক পরে যখন কংগ্রেস মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনাতে অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এলেন। কংগ্রেস কেন এগিয়ে বা আরও এগিয়ে নেই কেন, সেসব প্রশ্নে না গিয়ে কাঁওয়ালবাবুর বর্ষীয়ান সহকর্মী রাজদীপ সরদেশাই প্রবল বিক্রমে প্রশ্ন করলেন, কংগ্রেস কর্মীরা কেন পোস্টাল ব্যালট গণনার সময় থেকেই ঢাকঢোল পিটিয়ে নাচ করছিলেন। যেন তাতে বিরাট কিছু হেরফের হয়ে যাবে বা কোনো নির্বাচনী বিধি ভঙ্গ করা হয়েছে। কাঁওয়ালও সঙ্গত করলেন। সুপ্রিয়া পাল্টা আক্রমণে গিয়ে যা বললেন তার নির্যাস হল, নেচেছে বেশ করেছে। আপনাদের স্টুডিওতে তো সকাল থেকে শোকপালন চলছে বলে মনে হচ্ছে। এহেন আক্রমণের মুখে দুজনকেই ব্যাকফুটে যেতে হল। কিন্তু তাতে অনুষ্ঠানের গুণগত পরিবর্তন কিছু হয়নি। সারাদিন ধরেই নানাবিধ গ্রাফিক্স তুলে ধরে প্রমাণ করার চেষ্টা চলল যে বিজেপির এই হার তেমন বড় হার নয়। মাঝে মাঝে উত্তরপ্রদেশের পঞ্চায়েত, পৌরসভার নির্বাচনে বিজেপির সাফল্য তুলে ধরার চেষ্টাও করা হল। উপরন্তু দিন দুয়েক আগে লাইভ অনুষ্ঠানে যোগেন্দ্র যাদবের খোঁচা উপেক্ষা করে আগাগোড়া ইন্ডিয়া টুডে মল্লিকার্জুন খড়গে আর জেপি নাড্ডার ছবি ব্যবহার করে গেল। কংগ্রেস হারলে আর বিজেপি জিতলে যেভাবে রাহুল আর মোদীর ছবি ব্যবহার করা হয় তা এ দিন করা হল না।

রাজদীপ অবশ্য নিজেকে নিরপেক্ষ প্রমাণ করতে অত্যুৎসাহী হওয়ার ফল হাতেনাতে পেলেন কিছুক্ষণ পরেই, যখন বিজেপির আই টি সেলের সর্বেসর্বা অমিত মালব্য তাঁকে কুৎসিত ভাষায় অকারণে ব্যক্তিগত আক্রমণ করলেন।

কতটা বেহায়া এবং অসাংবাদিক হলে শাসক দলের মুখপাত্রের হাতে সহকর্মীর অমন অপমানে চুপ করে থাকা যায় কাঁওয়াল তা দেখিয়ে দিলেন। সেই তিনিই আবার বিকেলের দিকে সুপ্রিয়া যখন ফেরত এলেন, তখন পুরুষসিংহের মত গর্জন করে গেলেন “আজ কেন বলছেন না গণতন্ত্র মৃত? আজ কেন বলছেন না ইভিএমে গণ্ডগোল আছে?” অবশ্য ফ্যাক্ট চেকার মহম্মদ জুবেরের টুইট দেখে জানতে পারছি, বিজেপির পরাজয় থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য আজ ওটাই গোদী মিডিয়ার বিশিষ্ট সাংবাদিকদের অন্তিম হাতিয়ার হিসাবে স্থির হয়েছিল।

এ তো গেল ইন্ডিয়া টুডের কথা। সাধারণত কোলাহল সবচেয়ে কম হয় বলে এখনো এনডিটিভি দেখে থাকি। প্রণয় রায়দের প্রস্থানের পর সেখানেও অন্য চ্যানেলের মত অত্যন্ত হাস্যকর কার্যকলাপ শুরু হয়েছে। আজ যেমন স্টুডিওর এক কোণে একজনকে কন্নড় খাবারদাবার তৈরি করতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরিচিত মুখ বিষ্ণু সোম এবং আদানি আমলে নতুন যোগ দেওয়া দুই অপেক্ষাকৃত তরুণ সাংবাদিকের সঙ্গে বিশেষজ্ঞ বলতে যাঁরা ছিলেন, তাঁরাও কেবলই বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন কেন এই হার বিজেপির পক্ষে রীতিমত সম্মানজনক। ব্যাপারটা একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে দুই তরুণ মুখের একজন ‘সিনিয়র জার্নালিস্ট’ শ্রীনিবাস রাজুকে বলেই ফেললেন “কংগ্রেস যখন হারে তখন তো আমাদের এক্সপার্টরা বলেন ‘ডেসিমেটেড’। আজ বিজেপি হারছে অথচ ‘তেমনভাবে হারছে না’ বলছেন কেন বলুন তো?” রাজু বলার চেষ্টা করলেন, তিনি কিছু বলছেন না। যা বলার ডেটাই বলছে। সামনে ল্যাপটপ নিয়ে বসা অ্যাঙ্কর বললেন “কই, ডেটা তা বলছে না তো!” বেচারির কাল সকাল পর্যন্ত চাকরিটা থাকলে হয়।

আরও পড়ুন রাজদীপের দ্বীপান্তর: নিরপেক্ষতার পুরস্কার?

এবং অর্ণব গোস্বামী। প্রিন্স অফ ডেনমার্ককে বাদ দিয়ে যেমন হ্যামলেট হয় না, ভারতীয় মিডিয়া আলোচনাও তেমনি এ গোঁসাইকে বাদ দিয়ে হয় না। তবে যে যা-ই মনে করুক, আমার মত স্বাধীন সাংবাদিকের বাড়িতে মাস গেলে কোনো রাজনৈতিক দলের দপ্তর থেকে মোটাসোটা প্যাকেট এসে তো পৌঁছয় না, ফলে কোন চ্যানেল রাখব আর কোনটা রাখব না সে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সারাক্ষণ গোঁসা করে থাকা গোঁসাইয়ের চ্যানেল পয়সা খরচ করে দেখার শখ আমার নেই। তাই রিপাবলিক নেটওয়ার্ক দেখি না। কিন্তু আজ অন্য সূত্র থেকে একটু-আধটু দেখতেই হল। দেখলাম তাঁর মেজাজ বরাবরের মতই সপ্তমে চড়ে যাচ্ছে যখন তখন, তবে সে চাপ বেশিক্ষণ নিলে শরীরের ক্ষতি হতে পারে ভেবেই হয়ত কভারেজ কখনো জলন্ধর লোকসভার উপনির্বাচন, কখনো পাকিস্তানের সঙ্কটে চলে গেছে তাঁর গোটা নেটওয়ার্কেই।

বাংলা চ্যানেলগুলোর কথা আর কী বলব? বছরে ৩৬৪ দিন তারা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া অন্যকিছুর খবর রাখে না। সেই কূপমণ্ডূকতা একদিনে কাটিয়ে উঠে কি আর জাতীয় হয়ে ওঠা যায়? এবিপি আনন্দে দেখলাম নানা ছুতোয় তৃণমূল কংগ্রেস এরপর কী করবে আর পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি কর্ণাটক থেকে কিছু শিখবে কিনা এই নিয়েই চিল চিৎকার চলছে। টিভি৯ বাংলা আরও এককাঠি সরেস। তারা বেশ বেলা পর্যন্ত পর্দায় সংখ্যাগুলো উপস্থাপন করা ছাড়া কর্ণাটক নির্বাচন নিয়ে কিছুই দেখাচ্ছিল না, ব্যস্ত ছিল অয়ন শীলকে নিয়ে। পরে দায়সারা সম্প্রচার শুরু হল। বাকি চ্যানেলগুলো দেখার আর প্রবৃত্তি হয়নি।

এত লম্বা লেখা পড়ে কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন, আজ মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে আলাদা করে লেখার কী দরকার ছিল?

উত্তরে বলি, সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা যে একটি সোনার পাথরবাটি তাতে সন্দেহ নেই। বড় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কারণগুলো বাদ দিলেও, সাংবাদিকরা মানুষ এবং কোনো মানুষ নিরপেক্ষ নয়। ফলে মানুষের সাংবাদিকতাও ১০০% নিরপেক্ষ হতে পারে না। সে কারণেই সমস্ত পেশার মত সাংবাদিকতাতেও কিছু নিয়মকানুন (যার পোশাকি নাম এথিক্স) মেনে চলা হয় চিরকাল। সেগুলোর সময়োচিত পরিবর্তনও ঘটে। কিন্তু অমৃতকালে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো ন্যূনতম এথিক্স বিসর্জন দিয়ে এতটাই পক্ষ নিয়ে ফেলেছে যে বিশ্বাসযোগ্যতা বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। উল্টে সাংবাদিকতার অর্থটাই সাধারণ দর্শকের কাছে উল্টে গেছে। এখন তাঁরা মনে করেন একজন সাংবাদিক অমুক দলের কোনো কাজের সমালোচনা করেছেন মানেই তিনি ওই দলের বিরোধী। পরে আবার একই দলের কোনো কাজের প্রশংসা করলে মনে করেন পালটি খেল, বা এতদিনে আসল চেহারা বের করল। এই অভিজ্ঞতা রাজদীপের মত স্বনামধন্য সাংবাদিক থেকে শুরু করে আমার মত চুনোপুঁটি – সকলেরই। কর্ণাটক নির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকতা আজ কদর্যতার নতুন শৃঙ্গে আরোহণ করল বিজেপি হেরে যাওয়ায়। এর বিপদ দীর্ঘমেয়াদি। বহুদিন পরে জয়ী হওয়া দলের সদস্য, সমর্থকরা আজ নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে মিডিয়া নামেই সাংবাদিকতা করে, এরা আসলে ক্ষমতাসীন দলের দালাল। অতএব কেন্দ্রীয় সরকারের জোয়াল ২০২৪ বা পরবর্তী যে সময়েই বিজেপি-আরএসএসের হাত থেকে বেরিয়ে যাক না কেন, নতুন যে দল ক্ষমতায় আসবে তারাও মিডিয়ার কাছ থেকে দালালিই দাবি করবে। একবার যে দালাল বলে প্রমাণিত হয়েছে তাকে তো আর সাংবাদিক বলে বিশ্বাস করা যায় না।

এই ক্ষতি সমস্ত সাংবাদিকের। তার চেয়েও বড় কথা, এই ক্ষতি গণতন্ত্রের।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

নাসার আর ব্রিজভূষণ: যৌন নির্যাতনের আমরা ওরা

নাসার কাণ্ডের বেলায় কিন্তু ইউ এস অলিম্পিক কমিটির প্রেসিডেন্ট সারা হির্শল্যান্ড একবারও বলেননি জিমন্যাস্টরা দেশের বদনাম করছেন। বরং জিমন্যাস্টদের বলেছিলেন, তাঁদের এই দুর্ব্যবহার প্রাপ্য নয়।

ইন্টারনেটের যুগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অলিগলির খবর পর্যন্ত আমরা যেভাবে রাখি, আমেরিকানরাও ভারতের খবর সেভাবে রাখেন কিনা জানি না। মার্কিন জেলগুলোতে বন্দিদের ইন্টারনেট ব্যবহার করার অধিকার আছে কিনা তাও জানি না। তবে যদি থেকে থাকে, তাহলে নির্ঘাত সেখানে বসে ল্যারি নাসার আফসোস করছে ভারতে তার জন্ম হয়নি বলে। নামটা অচেনা? সেটাই স্বাভাবিক। বাংলা খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেলে খেলার খবর বলতে তো আইপিএল আর আইএসএল। আন্তর্জাতিক খেলা মানে বড়জোর ভারতীয় দলের ক্রিকেট আর ইউরোপের বিভিন্ন ফুটবল লিগ, চার বছরে একবার বিশ্বকাপ। ফলে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে দেড়শোর বেশি জিমন্যাস্টের সাক্ষ্যদানের পর দুই দশক ধরে যৌন নির্যাতন চালানোর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত নাসারের ৪০ থেকে ১৭৫ বছরের কারাদণ্ডের খবর হয়ত অনেকেরই চোখে পড়েনি বা স্মরণ নেই। নাসার ছিল ইউএসএ জিমন্যাস্টিক্স, ইউ এস অলিম্পিক কমিটি এবং মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির অগ্রগণ্য ডাক্তার। সেই মওকায় চিকিৎসার নাম করে সে মহিলা জিমন্যাস্টদের যথেচ্ছ যৌন নিপীড়ন করত।

এমনিতে একজন আমেরিকানের ভারতীয় হয়ে জন্মাতে চাওয়ার কোনো কারণ নেই, বরং ভারতীয়রাই অনেকে আমেরিকান হয়ে জন্মাতে পারলে খুশি হত। কিন্তু নাসার মনে করতেই পারে, ভারতে জন্মালে সে স্রেফ ডাক্তার হয়ে না থেকে ইউএসএ জিমন্যাস্টিক্সের শীর্ষ কর্তা হয়ে বসতে পারত। এমনিতেই তার বিকৃতির শিকার হওয়া মহিলাদের মুখ খুলতে বছর বিশেক সময় লেগেছে, কর্মকর্তা হলে নিশ্চয়ই তারা আরও ভয় পেত। ফলে আরও দেরিতে মুখ খুলত। খুললেও সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত না গেলে, অলিম্পিক পদকজয়ীরা রাস্তায় বসে না পড়লে পুলিস এফআইআর পর্যন্ত নিত না। নিলেও নাসার বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারত, সাংবাদিক সম্মেলন করতে পারত, যদি সে শাসক দলের টিকিটে নির্বাচিত সেনেটর হতে পারত। সেসব কিছুই হল না নাসার মার্কিন দেশে জন্মেছিল বলে। এসবের জন্যে যদি সে ব্রিজভূষণ শরণ সিংকে হিংসা করে, তাকে দোষ দেওয়া চলে কি? বিশেষ করে যখন দুজন কুস্তিগির ব্রিজভূষণের সম্পর্কে পুলিসের কাছে যে অভিযোগগুলো করেছেন তার সঙ্গে নাসারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্পষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে।

এমন নয় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মেয়েদের জন্যে একেবারে স্বর্গরাজ্য। ২০২১ সালে ইংল্যান্ডের দ্য গার্ডিয়ান কাগজের মার্কিন কলামনিস্ট ময়রা ডোনেগান দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লিখেছিলেন নাসার কাণ্ডে ফেডেরাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) অপদার্থতার কথা। হলিউডি থ্রিলার দেখার অভ্যাস যাঁদের আছে তাঁরা জানেন, এই এফবিআইকে প্রায়শই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তদন্তকারী সংস্থা হিসাবে দেখানো হয়। ব্যতিক্রমী ছবি না হলে এফবিআইয়ের গোয়েন্দাদের এত তৎপর, এত সৎ বলে দেখানো হয় যেন তাঁদের চোখ এড়িয়ে মাছি গলতে পারে না। কিন্তু ডোনেগান লিখেছেন ২০১৫ সালে অলিম্পিয়ান ম্যাককেলা ম্যারোনি নাসারের নামে এফবিআইয়ের কাছে অভিযোগ জানানোর পরেও তারা নড়েচড়ে বসেনি। তারা তদন্ত শুরু করে ২০১৬ সালে যখন স্থানীয় পুলিস নাসারের একটা হার্ড ড্রাইভ থেকে ৩৭,০০০ শিশু নির্যাতনের ছবি বাজেয়াপ্ত করে। নাসারের নামে এফবিআইয়ের কাছে জমা পড়া প্রথম অভিযোগ থেকে শুরু করে তার বিরুদ্ধে প্রথম ব্যবস্থা নেওয়ার সময়টুকুতেও সে প্রায় ৭০ জন মহিলা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের উপরে নির্যাতন চালিয়েছে। নাসারের ঘটনা নিয়ে মার্কিন সেনেটে শুনানির সময়ে এফবিআই ডিরেক্টর ক্রিস রে স্বীকার করেন যে তাঁর সংস্থার গাফিলতি ছিল। কিন্তু তিনি দাবি করেন সেটা সংশ্লিষ্ট এজেন্টদের ব্যক্তিগত গাফিলতি, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপার নয়। অথচ ডোনেগান লিখেছেন স্থানীয় পুলিস থেকে শুরু করে এফবিআই পর্যন্ত সর্বত্রই যৌন নির্যাতনের অভিযোগকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। গোটা আমেরিকা জুড়ে বহু মেয়ের অভিজ্ঞতাই তা বলে। সেদিক থেকে আমাদের মেয়েদের চেয়ে মার্কিন মেয়েদের অবস্থা বিশেষ উন্নত নয় বলতে হবে। কিন্তু তাহলেও তফাত বিস্তর। কোথায় তফাত?

এফবিআইয়ের গড়িমসির কথা প্রকাশ্যে এল কী করে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের ইনস্পেক্টর জেনারেল নাসার কাণ্ডের তদন্ত সম্পর্কে যে অন্তর্তদন্ত চালিয়েছিলেন তার নির্মম রিপোর্ট থেকে। উপরন্তু যে তিনটে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নাসার যুক্ত ছিল, সেগুলোকেও ফল ভোগ করতে হয়েছে। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ চাপের মুখে অ্যাটর্নি জেনারেলকে দিয়ে সংগঠনের প্রতিক্রিয়া সঠিক ছিল কিনা সে সম্পর্কে তদন্ত করায়। ইউ এস অলিম্পিক কমিটি একসময় ইউএসএ জিমন্যাস্টিক্সের অনুমোদন বাতিল করে দেবে ঠিক করেছিল। অলিম্পিক কমিটির চাপে তাদের সিইও এবং প্রেসিডেন্ট কেরি পেরিকে পদত্যাগ করতে হয়। এমনকি তাঁর স্থলাভিষিক্ত অন্তর্বর্তীকালীন সিইও এবং প্রেসিডেন্ট মেরি বনোকেও পদত্যাগ করতে হয় চারদিনের মাথায়, কারণ জিমন্যাস্টরা তাঁকে ওই পদে দেখতে চাননি। আসলে বনো এমন এক ল ফার্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন যা নাসারকে সাহায্য করেছিল।

অর্থাৎ ও দেশে এক প্রতিষ্ঠানের দোষ দেখে অন্য প্রতিষ্ঠান শাক দিয়ে মাছ ঢাকেনি। অলিম্পিকে সোনা জয়ী সিমোন বাইলস, অ্যালি রাইসম্যান বা ম্যারোনি, ম্যাগি নিকলদের কথা সেনেট শুনেছে, আদালতও ধৈর্য ধরে শুনেছে। তার জন্যে তাঁদের ওয়াশিংটন ডিসি বা নিউইয়র্কের ফুটপাথে গিয়ে বসতে হয়নি। একথা সত্যি, যে ব্রিজভূষণ দোষী কি দোষী নন সেকথা বিচার করবে আদালত। কিন্তু তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতের সামনে হাজির করার দায়িত্বটুকু নিতেও তো এ দেশের পুলিস বা সরকার রাজি নয়। এমনকি ভারতীয় অলিম্পিক কমিটির সভাপতি পিটি ঊষা কদিন আগে বলে বসেছিলেন, যৌন নির্যাতনের প্রতিবাদ করে বিনেশ ফোগত, বজরং পুনিয়া, সাক্ষী মালিকের মত কুস্তিগিররা নাকি দেশের বদনাম করছেন। নাসার কাণ্ডের বেলায় কিন্তু ইউ এস অলিম্পিক কমিটির প্রেসিডেন্ট সারা হির্শল্যান্ড একবারও বলেননি জিমন্যাস্টরা দেশের বদনাম করছেন। বরং জিমন্যাস্টদের বলেছিলেন, তাঁদের এই দুর্ব্যবহার প্রাপ্য নয়।

আরও পড়ুন হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

নাসার জেল খাটছেন, ইউএসএ জিমন্যাস্টিক্সের সেই কর্তারাও বিতাড়িত, জিমন্যাস্টরা আছেন স্বমহিমায়। বাইলস আরও একটা অলিম্পিকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, গোটা পৃথিবী অপেক্ষা করে আছে আবার কোন রুদ্ধশ্বাস দেহভঙ্গিমায় তিনি তাক লাগিয়ে দেবেন। এদিকে ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে তিন সদস্যের অ্যাড হক কমিটির হাতে। নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে, এই অ্যাড হক কমিটি নাকি আসন্ন এশিয়ান গেমসের সংগঠকদের কাছে ভারত থেকে যে কুস্তিগিররা প্রতিযোগী হতে পারেন তার এক প্রাথমিক তালিকা পাঠিয়েছে। সেই তালিকায় প্রতিবাদী কুস্তিগিরদের মধ্যে থেকে বজরং, ভিনেশ আছেন। তাছাড়াও আছেন রবি দাহিয়া, দীপক পুনিয়া, অংশু মালিক, সোনম মালিক। কিন্তু অলিম্পিকে ব্রোঞ্জজয়ী সাক্ষী বাদ। কেন তিনিই বাদ? সরাসরি প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য স্মৃতি ইরানির জবাবদিহি দাবি করেছিলেন বলে কি?

দেখে শুনে মনে হয়, কদিন আগে রাতের অন্ধকারে দিল্লি পুলিসের গলাধাক্কা খাওয়ার পর ভিনেশ কাঁদতে কাঁদতে ক্যামেরার সামনে যা বলেছেন তার চেয়ে ন্যায্য কথা নেই – দেশের মেডেল জেতার পরেও যদি এত অপমান সহ্য করতে হয়, তাহলে আর কারোর কখনো মেডেল না জেতাই ভাল।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

কুস্তিগীরদের আন্দোলন: মহাতারকাদের মহাকাপুরুষতা

‘ভগবান’ শচীন তেন্ডুলকর কোনোদিনই গোলযোগ সইতে পারেন না, রাজ্যসভার গোলযোগ ছাড়া। বাঙালির গর্ব সৌরভ গাঙ্গুলিও দিল্লি ক্যাপিটালস নিয়ে খুব ব্যস্ত। মহিলা কুস্তিগীরদের দুর্দশা নিয়ে ভাববেন কখন?

এ দেশের ক্রিকেটমহল এখন ভীষণ ব্যস্ত। ক্রিকেট ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা আইপিএল চলছে। নিজ নিজ ফ্র্যাঞ্চাইজের জন্য জান লড়িয়ে দিচ্ছেন তাঁরা। লখনৌ সুপারজায়ান্টস অধিনায়ক কে এল রাহুল তো এতটাই নিবেদিতপ্রাণ যে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের বিরুদ্ধে ম্যাচে ফিল্ডিং করতে গিয়ে গুরুতর চোট পাওয়ার পরে হার নিশ্চিত জেনেও দশ নম্বরে ব্যাট করতে নেমেছিলেন। অতঃপর চোটের প্রভাবে বাকি টুর্নামেন্টে আর খেলতে পারবেন না, সামনের মাসে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেও খেলতে পারবেন না। এমন বীরত্বের জন্যই তো জাতীয় নায়কের মর্যাদা পান ক্রিকেটাররা। মুশকিল হল, দেশের জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে পদকজয়ী কুস্তিগীর ভিনেশ ফোগত এতেও সন্তুষ্ট নন। তাঁর দাবি, মহিলা কুস্তিগীরদের উপর যৌন আক্রমণের অভিযোগে ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের মাথা ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন চলছে, ক্রিকেটারদের তার পাশে দাঁড়ানো উচিত।

গত ২৮ এপ্রিল ভিনেশ বলেন, ক্রিকেটারদের তো আমাদের দেশে পুজো করা হয়। তাঁরা আমাদের পক্ষ যদি না-ও নেন, অন্তত একটা নিরপেক্ষ বার্তা দিয়েও তো বলতে পারেন যে দোষীদের শাস্তি পাওয়া উচিত। কেবল ক্রিকেটার নয় অবশ্য, সব খেলার তারকাদের কাছেই আবেদন ছিল ভিনেশের। তারপর থেকে অভিনব বিন্দ্রা আর নীরজ চোপড়া – ভারতের ইতিহাসে যে দুজন অলিম্পিকে ব্যক্তিগত সোনা জিতেছেন, দুজনেই ওই আবেদনে সাড়া দিয়েছেন। সদ্যপ্রাক্তন টেনিস তারকা সানিয়া মির্জাও দোষীদের শাস্তি চেয়েছেন। কিন্তু ক্রিকেটারদের বিশেষ হেলদোল নেই। বর্তমান ক্রিকেটারদের মধ্যে একমাত্র মহিলাদের জাতীয় দলের শিখা পাণ্ডে মুখ খুলেছেন। সদ্য চালু হওয়া মহিলাদের প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে দামী ক্রিকেটার স্মৃতি মান্ধনার কোনো বক্তব্য নেই। জাতীয় দলের অধিনায়িকা হরমনপ্রীত কৌরও চুপ। প্রাক্তনদের মধ্যে হরভজন সিং, বীরেন্দ্র সেওয়াগ, ইরফান পাঠান সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন। একমাত্র নভজ্যোৎ সিং সিধু সশরীরে ভিনেশ, সাক্ষী মালিক, বজরং পুনিয়াদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিংবদন্তি ক্রিকেটারদের মধ্যে কেবল কপিলদেব ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করে প্রশ্ন তুলেছেন, এরা কবে ন্যায়বিচার পাবে?

স্পষ্ট বক্তা হওয়ার জন্য যাঁর বিপুল খ্যাতি, সেই বিরাট কোহলি স্পিকটি নট। যাবতীয় বাহাদুরি গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ে খরচ করছেন। নারীবাদীরা প্রায়শই বিরাটকে নিয়ে গদগদ হয়ে পড়েন তিনি জীবনে স্ত্রী অনুষ্কা শর্মার অবদান স্বীকার করেন বলে, তাঁর ব্যর্থতায় ট্রোলরা অনুষ্কাকে টার্গেট করলে বিরাট মুখ খোলেন বলে। দেখে মনে হয়, পৃথিবীতে বিরাটই একমাত্র পুরুষ যিনি নিজের বউকে ভালবাসেন। তাঁর ধারে কাছে আসতে পারেন একমাত্র অস্কার মঞ্চে বউকে নিয়ে কটূক্তি করায় ক্রিস রককে ঘুঁষি মেরে দেওয়া উইল স্মিথ। দেখা যাচ্ছে, স্ত্রীর প্রতি বিরাটের ভালবাসা আমাদের পাড়ার রানাদার পর্ণা বউদির প্রতি ভালবাসার চেয়ে মহত্তর কিছু মোটেই নয়। বরং হয়ত কিছুটা নিকৃষ্টতরই। কারণ রানাদা রাস্তাঘাটে অন্য কোনো মহিলার সঙ্গে কাউকে বিশ্রীভাবে কথা বলতে দেখলে অন্তত একটু ধমকা-ধমকি করেন। কিন্তু দেশের লাঞ্ছিত মহিলা কুস্তিগীরদের নিয়ে বিরাটের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই।

মনে রাখা ভাল, অনুষ্কা নিজেও কম নারীবাদী নন। তিনি একদা সুনীল গাভস্করের বিরুদ্ধে নারীবিদ্বেষী হওয়ার অভিযোগ এনেছিলেন, কারণ গাভস্কর বলেছিলেন অনুষ্কার বোলিংয়ে অনুশীলন করে বিরাটের লাভ হবে না। সেই অনুষ্কাও আজ চুপ। চুপ মানে অন্তঃপুরবাসিনী হয়ে গেছেন তা কিন্তু নয়। দুটিতে কেমন জীবন উপভোগ করছেন তার তত্ত্বতাল্লাশ দিব্যি দিয়ে যাচ্ছেন টুইটার বা ইনস্টাগ্রামে। তবে গাভস্করের বিরুদ্ধে লম্বা বিবৃতি দিয়েছিলেন, অলিম্পিয়ান মহিলাদের প্রতিবাদ নিয়ে এক লাইনও লেখেননি। অবশ্য পরীক্ষায় আনকমন প্রশ্ন এসে গেলে আমরাও সে প্রশ্ন ছেড়ে আসতাম।

গম্ভীর আবার দিল্লি থেকে নির্বাচিত সাংসদ। সেই দিল্লির যন্তর মন্তরেই কুস্তিগীরদের অবস্থান বিক্ষোভ চলছে। যদিও ওই এলাকা গম্ভীরের কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত নয়, তবু তিনি একজন জনপ্রতিনিধি তো বটেন। অবশ্য উনি সাংসদের দায়িত্ব খুব মন দিয়ে কোনোদিন পালন করেছেন বলে অভিযোগ নেই। উনি সারাবছর ক্রিকেটের ধারাভাষ্য দিয়ে বেড়ান, আইপিএলের সময়ে যোগী আদিত্যনাথের রাজধানীর ফ্র্যাঞ্চাইজের দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকেন। কদিন পরে হয়ত ওই দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে সারাবছরই বিশ্বভ্রমণ করে বেড়াবেন। কারণ লখনৌ সুপারজায়ান্টসে তাঁর পদটির নাম গ্লোবাল মেন্টর, আর ওই ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিকরা ইতিমধ্যেই দক্ষিণ আফ্রিকার টি টোয়েন্টি লিগে দল কিনে বসে আছেন। আর কোথায় কোথায় কিনবেন কে বলতে পারে? এমন বিশ্বনাগরিকের কি আর যন্তর মন্তরের অবস্থান বিক্ষোভ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার কূপমণ্ডূকতা মানায়?

পিভি সিন্ধু, সায়না নেহওয়ালদেরও মুখে কুলুপ। ছবারের বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়ন মেরি কম তো পিটি ঊষা গোত্রের, অর্থাৎ ভারতীয় জনতা পার্টির অতি ঘনিষ্ঠ, তাই নীরব। গত কয়েকদিন অবশ্য তাঁর রাজ্য মণিপুরে লঙ্কাকাণ্ড চলছে। বিজেপি তাঁকে এত গুরুত্ব দেয় যে টুইট করে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, রাজনাথ সিংকে ট্যাগ করে বলতে হচ্ছে “মাই স্টেট ইজ বার্নিং, কাইন্ডলি হেল্প”। যে নিখাত জারীনকে একসময় স্রেফ জ্যেষ্ঠত্বের অধিকারে অবজ্ঞা করতেন মেরি, সেই দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নিখাত কিন্তু সরব হয়েছেন।

প্রাক্তন সাংসদ ভারতরত্ন ‘ভগবান’ শচীন তেন্ডুলকর মুম্বাই ইন্ডিয়ানস ডাগআউটে নিদ্রা গিয়েছেন। তিনি অবশ্য কোনোদিনই গোলযোগ সইতে পারেন না, রাজ্যসভার গোলযোগ ছাড়া। বাঙালির গর্ব সৌরভ গাঙ্গুলিও দিল্লি ক্যাপিটালস নিয়ে খুব ব্যস্ত। মহিলা কুস্তিগীরদের দুর্দশা নিয়ে ভাববেন কখন? তবু তো দয়া করে শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে মুখ খুলেছেন। লর্ডসের ব্যালকনির চিরস্মরণীয় ঔদ্ধত্য ত্যাগ করে ভারী বিনীতভাবে বলেছেন, ওদের লড়াই ওরা লড়ুক। আমি তো খবরের কাগজে পড়ছি, যা জানি না তা নিয়ে তো কথা বলা উচিত নয়।

এদিকে শচীন, সৌরভ দুজনেই কন্যাসন্তানের পিতা।

সত্যি কথা বলতে, ভারতীয় তারকা খেলোয়াড়দের যা ইতিহাস, তাতে এঁরা মহম্মদ আলি হয়ে উঠবেন বলে কেউ আশা করে না। সাম্প্রতিক অতীতে তাঁরা কিন্তু সাতে পাঁচে না থাকার নীতি অনেকটাই ত্যাগ করেছেন। ওঁরা এখন শচীন বা ঊষার মত শাসক দলের প্রসাদ গ্রহণ করে রাজ্যসভার সদস্য হচ্ছেন, এ পদ সে পদ গ্রহণ করছেন, গম্ভীরের মত ভোটে লড়ে সাংসদ বা বিধায়কও হচ্ছেন। যাঁদের অত এলেম নেই তাঁরাও কোহলির মত করে নোটবন্দি হওয়া মাত্রই তা কত বড় ঐতিহাসিক পদক্ষেপ তা নিয়ে মতামত দিয়েছিলেন, কৃষক আন্দোলন চলাকালীন তার বিরোধিতা করে টুইট করেছিলেন। সেওয়াগের মত কেউ কেউ আরও এককাঠি সরেস। শহিদ হওয়া সৈনিকের মেয়েকে যুদ্ধবিরোধী কথা বলার জন্য ট্রোল করতেও ছাড়েননি। কেবল সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খোলার দরকার পড়লেই এঁরা কেউ নীরব হয়ে যান, কেউ এক-দু লাইনে কাজ সারেন। সেওয়াগ, কপিলদেব, হরভজন দিল্লি, হরিয়ানা, পাঞ্জাবের মানুষ। কুস্তিগীরদের আন্দোলনের সামনের সারিতে আছেন হরিয়ানার কুস্তিগীররাই। তা না হলে এতেও ওই তিন প্রাক্তন মুখ খুলতেন কিনা সন্দেহ।

আরও পড়ুন ক্রিকেটার তুমি কার?

যে পদকজয়ী অলিম্পিয়ানরা আজ রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁরা কিন্তু এই সেদিন পর্যন্ত বিজেপি-ঘনিষ্ঠই ছিলেন। নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিনে বা জয়ে তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে টুইট করতে এঁদেরও কামাই ছিল না। এখন চোখের জলে সেসবের দাম দিতে হচ্ছে। এখনো যে মহাতারকারা নীরব, তাঁদের দেখে একটাই ভয় হয়। জার্মান যাজক মার্টিন নিয়মোলারের অনুসরণে এঁদের না কোনোদিন আওড়াতে হয়, প্রথমে ওরা এসেছিল কুস্তিগীরদের জন্যে। আমি কিছু বলিনি, কারণ আমি কুস্তিগীর নই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

নয়া বার্তা ছাড়া পরিশ্রমের ফল পাবে না সিপিএম

তৃণমূলকে যত বড় ধাক্কা দেওয়া দরকার, বিজেপিকে রাজ্য রাজনীতিতে যতটা অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া দরকার – তার জন্যে কেবল দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কি যথেষ্ট?

গত এক দশকে বাংলার রাজনীতিতে সর্বাধিক ব্যবহৃত শব্দগুলোর যদি একটা তালিকা তৈরি করা যায়, তাহলে প্রথম স্থান দখল করার লড়াইয়ে থাকবে ‘দুর্নীতি’ আর ‘সেটিং’। গত বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে ‘এন আর সি’, ‘সি এ এ’, ‘এন পি আর’ শব্দগুলোর বহুল ব্যবহার সত্ত্বেও মনে হয় না ও দুটোকে টলানো যাবে। কারণ তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর সেই ২০১৩ সালে সারদা কেলেঙ্কারি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় মাপের আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা শুরু হয়েছিল। তারপর সামনে আসে নারদ স্টিং অপারেশন, অতঃপর প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা কেলেঙ্কারি, গরু পাচার, অবৈধ বালি খাদান, কয়লা পাচার এবং সর্বোপরি নিয়োগ কেলেঙ্কারি। একের পর এক অভিযোগ উঠেই চলেছে। এগুলো ছাড়াও বিরোধীরা বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করেছেন ত্রিফলা আলো নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে, কন্যাশ্রী প্রকল্পের সাইকেল নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে, উমপুনের ত্রাণের চাল ও ত্রিপল বিতরণে দুর্নীতি হয়েছে। যদিও এই কটা অভিযোগ আইনি পথে খুব বেশি এগোয়নি, জনমনেও তেমন প্রভাব ফেলতে পেরেছে বলে সাধারণ মানুষের কথাবার্তা থেকে মনে হয় না। এর পাশাপাশি বামপন্থীরা এবং কংগ্রেস বারবার দাবি করে এসেছে তৃণমূল আর বিজেপির মধ্যে ‘সেটিং’, অর্থাৎ গোপন আঁতাত, আছে। সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের দুর্নীতির তদন্তগুলো শেষমেশ কোথাও পৌঁছয় না। অন্যদিকে ২০১১ পরবর্তী সময়ে যখনই তৃণমূল নিজেকে কোণঠাসা মনে করেছে, স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনো বলেছেন সিপিএম, কংগ্রেস, বিজেপি একসাথে তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। কখনো বা বলেছেন সিপিএম বিজেপির হাত শক্ত করছে। এই করতে করতে বাংলার রাজনৈতিক বয়ানে যুক্ত হয়েছে দুটো শব্দ – বিজেমূল আর বিজেপিয়েম।

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে সিপিএমের নিচের তলা সচেতনভাবে বিজেপিতে ভোট নিয়ে গেছে বলে জোরদার অভিযোগ উঠেছিল। তাতে ইন্ধন জুগিয়েছিল জেলাস্তরের কিছু নেতার প্রকাশ্য উক্তি। আবার ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে যেভাবে “দলে থেকে কাজ করতে পারছি না” অজুহাত দিয়ে দলে দলে তৃণমূল নেতা বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, তার ফলে তৃণমূল আর বিজেপি একই দল – এই জাতীয় অভিযোগ ওঠে। নির্বাচনের পর আবার ঘরের ছেলে ঘরে ফেরার মত করে বহু নেতা তৃণমূলে ফিরে আসেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বড় নাম অবশ্যই মুকুল রায়, যিনি বিধানসভার খাতায় এখনো বিজেপি। অথচ রীতিমত সাংবাদিক সম্মেলন করে মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর ভাইপোর উপস্থিতিতে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। এখন আবার তিনি তৃণমূল, না বিজেপি, নাকি অসুস্থ – তা নিয়ে তরজা চলছে। ফলে বিজেমূল তত্ত্বও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না আর।

কিন্তু সন্দেহ নেই, এই মুহূর্তে সেটিংকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে দুর্নীতি। লোকাল ট্রেনের ভেন্ডর কামরার আরোহী সবজি বা ছানার ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে মফস্বলে নতুন গজিয়ে ওঠা শীততাপনিয়ন্ত্রিত রিটেল চেনে বাজার করা গৃহবধূ – সকলেরই আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্নীতি। রাজ্য সরকারের পক্ষে যা বিশেষ উদ্বেগের, তা হল এই ইস্যু নিয়ে শাসক দল সম্পর্কে নরম মন্তব্য করতে প্রায় কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। সারদা কেলেঙ্কারি এ রাজ্যের মধ্যবিত্তকে প্রায় ছুঁতেই পারেনি, কারণ আমানতকারীরা অধিকাংশই ছিলেন গরিব মানুষ। তার উপর তখন ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের উপর তিতিবিরক্ত হয়ে নতুন শক্তিকে ক্ষমতায় আনা মানুষের তৃণমূল সম্পর্কে খানিকটা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। নারদ কেলেঙ্কারির ঢেউ তো আরও অল্পেই ভেঙে গিয়েছিল। ততদিনে মন্ত্রীসান্ত্রীরা একটু-আধটু ঘুষ নেবেন – এ কথা পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক জীবনে স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। তাছাড়া যে টাকা ঘুষ হিসাবে দেওয়া হয়েছে তা আমার-আপনার টাকা কিনা তাও সন্দেহাতীত নয়। ফলে ও নিয়ে বেশি মানুষ ভাবেননি। কিন্তু এবার তাহলে জনমানসে এত অসন্তোষ কেন?

কারণ নানাবিধ, কিন্তু একটা কারণ অবশ্যই বিরোধী দলগুলোর সক্রিয়তার তফাত। ২০১১ সাল থেকে বছর খানেক আগে পর্যন্তও বিরোধী হিসাবে সিপিএম অবিশ্বাস্য নিষ্ক্রিয়তা দেখিয়েছে। নারদের ক্যামেরায় তৃণমূলের মন্ত্রীদের ঘুষ নেওয়ার দৃশ্য প্রকাশ হয়ে যাওয়ার পরেও রাজ্যটা যেমন চলেছিল তেমনই চলেছে। বামফ্রন্টের মন্ত্রীরা এরকম কাণ্ডে জড়ালে আর বিরোধী নেত্রীর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হলে সেদিন রাত থেকেই আলিমুদ্দিন স্ট্রিট অবরুদ্ধ হয়ে যেত – একথা হলফ করে বলা যায়। তৎকালীন সিপিএম রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র ও তাঁর দলবল কিন্তু আলিমুদ্দিনে বসে বিবৃতি দেওয়া ছাড়া বিশেষ কিছু করেননি। মাঝেমধ্যে কলকাতার রাজপথে এক-আধটা মিছিল টিভির পর্দায় লাল পতাকার উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, সরকারের উপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। বিগত রাজ্য সম্মেলনে নতুন রাজ্য কমিটি নির্মিত হওয়ার পর এবং মহম্মদ সেলিম রাজ্য সম্পাদকের দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির অনেকখানি পরিবর্তন ঘটেছে। কেবল কলকাতা নয়, জেলা সদরগুলোতে দুর্নীতির প্রতিবাদে এবং আরও নানা দাবি নিয়ে বামেদের সরকারি অফিস অবরোধ করতে বা সমাবেশ, মিছিল ইত্যাদি করতে দেখা যাচ্ছে। যে লড়াকু মেজাজের জন্য বামপন্থী দলগুলোর কর্মীদের সুনাম বা দুর্নাম ছিল বরাবর, সেই মেজাজ আবার দেখা যাচ্ছে। কেবল নবান্ন নয়, উত্তরকন্যা অভিযান হচ্ছে নিয়মিত। কখনো ছাত্র-যুব সংগঠনের উদ্যোগে, কখনো বা শিক্ষক সংগঠনের উদ্যোগে। সেখানে ব্যারিকেড ভেঙে ফেলা হচ্ছে, আতঙ্কিত প্রশাসন জলকামান চালিয়ে দিচ্ছে। কলকাতায় চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন সরকারের সোজা পথ, বাঁকা পথের নানা কৌশল সত্ত্বেও কিছুতেই ভাঙছে না। উল্টে ডিএ নিয়ে আন্দোলন করতে নেমে পড়েছেন শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং অন্য রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা। একসঙ্গে এতগুলো আন্দোলনের প্রভাব পৃথিবীর যে কোনো দেশে যে কোনো কালে সরকারকে চাপে ফেলে। এখানেও ফেলেছে। মমতা সরকারের গোদের উপর বিষফোঁড়া আদালত।

দল এবং সরকার যে ঘূর্ণির মধ্যে পড়েছে তা আর কেউ মানুক না মানুক, পোড়খাওয়া নেত্রী মমতা নিশ্চয়ই মানেন। তাই একের পর এক জনসংযোগ কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে, রাজ্য নির্বাচন কমিশন পঞ্চায়েত নির্বাচনের তারিখ নিয়েও উচ্চবাচ্য করছে না। যেসব এলাকায় পাঁচ বছর মানুষ খানাখন্দ পেরিয়ে যাতায়াত করেছেন, সেখানে এক বেলার মধ্যে নতুন রাস্তা তৈরি করা চলছে। মানুষের অসন্তোষের তীব্রতা টের পাওয়া যাচ্ছে এই দিয়েই যে তৃণমূল সাংসদ, বিধায়করা পর্যন্ত দিদির দূত হয়ে গিয়ে কোথাও তাড়া খেয়েছেন, কোথাও ভোটাররা মুখের উপর বলে দিয়েছেন ভোট দেওয়া হবে না। তাই এখন অভিষেক নতুন নাম দিয়ে ফের জনসংযোগের চেষ্টায় নেমেছেন।

মানুষের মধ্যে যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রয়েছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হল, সেই ক্ষোভকে নালা কেটে ব্যালট বাক্সে বইয়ে দেওয়ার মত পরিশ্রম কি বামেরা করছেন? কোনো সন্দেহ নেই, রামনবমীর অজুহাতে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক অশান্তি তৈরি করে বিজেপি গত এক মাসে আবার এক ধরনের বাইনারি তৈরি করতে সফল হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। সে কাজে তাদের সাহায্য করছেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। ঈদ উদযাপনে গিয়ে এন আর সি, সি এ এ নিয়ে ভয় দেখাচ্ছেন সংখ্যালঘু মানুষকে। সাগরদীঘির হার এবং নওশাদ সিদ্দিকীর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা সামলাতে এবং একের পর এক তৃণমূল নেতার দুর্নীতির কেসে ফেঁসে যাওয়ার অস্বস্তির হাত থেকে বাঁচতে হলে বিজেপি যে বামেদের চেয়ে প্রার্থিত প্রতিপক্ষ – তা মুখ্যমন্ত্রী বুঝিয়ে দিচ্ছেন। কথা হল, এই কৌশল ভোঁতা করে দিতে বামেরা কী করতে পারেন? “বিজেপি-তৃণমূলের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে ভুলবেন না। দুর্নীতির মাধ্যমে রাজ্যটাকে কীভাবে ফোঁপরা করে দেওয়া হয়েছে খেয়াল রাখুন” – এই আবেদন আজকের বহুধাবিভক্ত ভারতে রাজনৈতিক বার্তা হিসাবে কি যথেষ্ট কার্যকরী? পশ্চিমবঙ্গ তো ভারতের বাইরে নয়। গোটা দেশে যা চলছে, তাতে আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কেবল তৃণমূলের দুর্নীতির ইস্যুতে লড়ে কি সুবিধা করতে পারবেন বামেরা? তৃণমূলকে যত বড় ধাক্কা দেওয়া দরকার, বিজেপিকে রাজ্য রাজনীতিতে যতটা অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া দরকার – তার জন্যে কেবল দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কি যথেষ্ট? নাকি মানুষের পালস বুঝতে আবার ভুল হচ্ছে সিপিএম তথা বাম নেতৃত্বের?

আরও পড়ুন বৃদ্ধতন্ত্র নয়, সিপিএমের সমস্যা মধ্যবিত্ততন্ত্র

সাম্প্রদায়িক বাইনারি তৈরি করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক জমির সবটা দখলে রাখতে চাইছে তৃণমূল আর বিজেপি। তা ভাঙতে বৃহত্তর কোনো রাজনৈতিক বার্তা কি দিতে পারবেন সিপিএম ও তার শরিকরা? এখন পর্যন্ত দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকায় মিছিল করা ছাড়া তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। শিগগির নতুন কোনো বার্তা দিতে না পারলে গত এক-দেড় বছরের পরিশ্রম কিন্তু জলে যেতে পারে। বুথ স্তরে মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে তৃণমূলের সঙ্গে লড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সাংগঠনিক খামতি তো আছেই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত