ঝুলন সেরা বাঙালি ক্রিকেটার? মোটেই না

ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস বাংলাকে বাদ দিয়ে লেখা অসম্ভব। কিন্তু গত শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাস বাংলাকে বাদ দিয়ে অনায়াসে লেখা যেত। রেকর্ড বইয়ে সর্বোচ্চ রানের ওপেনিং জুটির তালিকার একেবারে শীর্ষে পঙ্কজ রায়ের নাম ছিল ঠিকই, কিন্তু রেকর্ড বই ইতিহাস নয়। একবিংশ শতাব্দীতে ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে বাংলার পাকাপাকি জায়গা তৈরি করেছেন দুজন। একজন অবসর নেওয়ার দেড় দশক পরেও সারাক্ষণ সংবাদের শিরোনামে, বাঙালির নয়নের মণি। অর্থাৎ সৌরভ গাঙ্গুলি। অন্যজন কে, বাজি রেখে বলতে পারি, আপনি ভুরু কুঁচকে ভাবছেন।

এই শতাব্দীর প্রথম কয়েক বছরে ফিক্সিং কেলেঙ্কারির বিপর্যয় কাটিয়ে অধিনায়ক হিসাবে সৌরভ যখন ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাস বদলে দিচ্ছিলেন, সেই সময়েই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চেন্নাইতে একটি একদিনের ম্যাচে ভারতের হয়ে খেলতে শুরু করেন ঝুলন গোস্বামী। সে বছরই টেস্ট অভিষেক। ঝুলনের শুরুটা সৌরভের মত সাড়া জাগানো হয়নি। প্রথম টেস্টে এই ডানহাতি জোরে বোলার কোনো উইকেট পাননি। কিন্তু গত কুড়ি বছর ধরে ভারতের মহিলা দলের প্রায় সমস্ত স্মরণীয় জয়ে ঝুলনের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। ২০০৬ সালে ভারতীয় মহিলারা ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথম টেস্ট সিরিজ জেতেন। প্রথম টেস্টে লেস্টারে নৈশপ্রহরী হিসাবে ঝুলন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতরান করেন। আর টনটনের দ্বিতীয় টেস্টে তিনি একাই একশো। প্রথম ইনিংসে ৩৩ রানে পাঁচ উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৫ রানে পাঁচ উইকেট। একদিনের ক্রিকেটে ঝুলন প্রকৃতপক্ষে একজন কিংবদন্তি। চলতি বিশ্বকাপে তিনি মহিলাদের বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হলেন, তারপরেই মেয়েদের একদিনের ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম বোলার হিসাবে ২৫০ উইকেটের মালিক হলেন।

যাঁরা মেয়েদের ক্রিকেটের খবর রাখেন তাঁরা জানেন, ভারতের মহিলাদের দলে এই মুহূর্তে দুজন আছেন যাঁরা সর্বকালের সেরাদের মধ্যে পড়েন। কীর্তির দিক থেকে অধিনায়ক মিতালী রাজ যদি মেয়েদের ক্রিকেটের শচীন তেন্ডুলকর হন, ঝুলন অবশ্যই কপিলদেব। দুটো দশক জুড়ে ভারতীয় বোলিংকে নেতৃত্ব দেওয়া কত শক্ত, তা কপিলদেবের চেয়ে ভাল কে-ই বা জানে? ঝুলনের নামটা মাথায় আসেনি বলে জিভ কাটছেন নাকি? কাটবেন না, কারণ দোষ আপনার নয়। শুধু যে মহিলাদের ক্রিকেট টিভিতে অনেক কম দেখানো হয় আর কাগজে অনেক কম লেখা হয় তা-ই নয়, কপিলদেব ১৬ বছরে খেলেছেন ১৩১টা টেস্ট আর ২২৫টা একদিনের ম্যাচ। ঝুলন কুড়ি বছরে ২০১ খানা একদিনের ম্যাচ (২২ মার্চ, ২০২২ তারিখে ভারত বনাম বাংলাদেশ ম্যাচ পর্যন্ত) খেললেও টেস্ট খেলেছেন মাত্র বারোটা। একদিনের ম্যাচের সংখ্যাটাও আসলে কপিলের সাথে তুলনীয় নয়, কারণ কপিলের কেরিয়ারের বেশ খানিকটা সময়ে একদিনের ক্রিকেট ছিল লম্বা টেস্ট সিরিজের শেষ পাতে মিষ্টির মত। কিন্তু ঝুলনের দু বছর আগে অভিষেক হওয়া জাহির খান বারো বছরেই দুশো একদিনের ম্যাচ খেলে ফেলেছিলেন।

ভারতীয় পুরুষদের ক্রিকেটের মহীরুহ যাঁরা, তাঁদের ঝুলিতে একটা জিনিস আছে যা বাংলার গৌরব সৌরভের ঝুলিতে নেই। ২০০৩ সালের ২৩ মার্চ রিকি পন্টিংয়ের অপরাজেয় অস্ট্রেলিয়া সৌরভের হাতে বিশ্বকাপ ওঠার সমস্ত সম্ভাবনা দুরমুশ করে চতুর্থবার বিশ্বকাপ জিতেছিল। কিন্তু কপিলদেব বিশ্বকাপ জিতেছেন, সুনীল গাভস্করও সেই দলে ছিলেন। বিশ্বসেরার মেডেল গলায় ঝুলিয়েছে শচীন তেন্ডুলকর আর মহেন্দ্র সিং ধোনিও। ব্যক্তিগত কৃতিত্বে ঝলমলে কেরিয়ারে ঝুলন আর মিতালীর ও জিনিসটার স্বাদ এখনো পাওয়া হয়নি। পেতে গেলে চলতি বিশ্বকাপে দুজনকেই নিজেদের সেরা ফর্মের কাছাকাছি থাকতে হবে। প্রথম চারটে ম্যাচে নীরব থাকার পর পঞ্চম ম্যাচে মিতালীর ব্যাট কথা বললেও পার্থক্য গড়ে দিতে পারেনি। বাংলাদেশ ম্যাচে দল জিতে গেলেও মিতালী আবার ব্যর্থ। ঝুলন মন্দ খেলছিলেন না, কিন্তু অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে একেবারেই ফ্লপ, সহজ বাংলাদেশ ম্যাচে ছিলেন স্বমহিমায়। গতবার ফাইনালে উঠেও ইংল্যান্ডের কাছে হারতে হয়েছিল। বাকি রইল দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ। সেটা জিততে পারলে এখনো ভারতের সেমিফাইনালে পৌঁছবার সম্ভাবনা আছে। যদি শেষপর্যন্ত স্মৃতি মান্ধনা, পূজা বস্ত্রকর, শেফালি বর্মার মত তরুণদের সাথে মিতালী, ঝুলন, হরমনপ্রীতদের সুর মিলে যায় তাহলে ৩ এপ্রিল ক্রাইস্টচার্চে প্রথম বাঙালি হিসাবে ঝুলন ছুঁয়ে ফেলবেন ক্রিকেট বিশ্বকাপ। সঙ্গে থাকবেন শিলিগুড়ির রিচা ঘোষ।

চিন্তা করবেন না। এখন পর্যন্ত ধারাবাহিকতা দেখাতে না পারা ভারতীয় দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মত ঘটনা ঘটে গেলেও ঝুলনকে আমরা কেউ সেরা বাঙালি ক্রিকেটার বলার ধৃষ্টতা দেখাব না। মহিলাদের ক্রিকেট নিয়ে আমাদের আগ্রহ থাক আর না-ই থাক, শিগগির জেনে যাব যে মেয়েদের ক্রিকেটের বোলারদের গড় গতি ছেলেদের চেয়ে কম। আরও নানা তথ্য থেকে প্রমাণ করা খুব কঠিন হবে না যে মেয়েদের বিশ্বকাপ জয় আর ছেলেদের বিশ্বকাপ জয় এক নয়। সেরেনা উইলিয়ামসকে ও দেশে কেউ রাফায়েল নাদাল, রজার ফেডেরার বা নোভাক জোকোভিচের চেয়ে কম বড় খেলোয়াড় ভাবে না। তা বলে আমাদেরও যে ওভাবে ভাবতে হবে এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি।

আরও পড়ুন কালোর জন্যে কাঁদা, অথচ সাদা মনে কাদা

তাছাড়া সৌরভের বায়োপিক হওয়ার আগেই যে বলিউড ঝুলনের বায়োপিক বানিয়ে ফেলছে, সে কি কম স্বীকৃতি? তাতে আবার ঝুলনের চরিত্রে অভিনয় করছেন ছেলেদের ক্রিকেট দলের অধিনায়কের অভিনেত্রী স্ত্রী। এর চেয়ে বেশি কী-ই বা চাওয়ার থাকতে পারে ঝুলনের মত একজন শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারের? ঢ্যাঙা, কালো মেয়ে মাঠে উইকেট তুলতে পারে, রান করতে পারে। কিন্তু পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে যখন তার জীবন নিয়ে তৈরি সিনেমা দেখতে যাব, তখন পর্দায় একটা টুকটুকে মেয়ে না থাকলে চলবে কেন? আমরা মণিপুরি মেরি কমকে পর্দায় দেখি পাঞ্জাবি অভিনেত্রীর অবয়বে, বাংলার ঝুলনকেও সেভাবেই দেখব। দেখে পপকর্ন খেতে খেতে হাততালিও দেব। দেশের ক্রিকেট বোর্ডই যখন মহিলা ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক পুরুষদের ধারেকাছে হওয়া উচিত বলে মনে করে না, দলটার নিয়মিত খেলতে পাওয়া উচিত বলেও মনে করে না, তখন আমরা সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা সব সমান করে ভাবতে যাব কেন? আমাদের কালো মেয়ের পায়ের তলায় আলোর নাচন দেখার জন্য কেন ছটফট করব?

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

বেলা ফুরোতে আর বসে রইলেন না শেন ওয়ার্ন

আইপিএল আজকের তরুণ ক্রিকেট দর্শকদের কাছে জলভাত। কিন্তু আমাদের মত যারা পরিণত বয়সে আইপিএল শুরু হতে দেখেছে ২০০৮ সালে, তাদের বড় বিস্ময় লেগেছিল। আমার সেই বিস্ময় বেড়ে গিয়েছিল শেন ওয়ার্ন সম্পর্কে একটা কথা শুনে।

সদ্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া ওয়ার্ন সেবার আইপিএলের সবচেয়ে শস্তা দল জয়পুরের রাজস্থান রয়্যালসের একাধারে অধিনায়ক ও কোচ। নিলামের পর দলগুলোর যা চেহারা হয়েছিল, তাতে অনেকেরই ধারণা ছিল হইহই করে চ্যাম্পিয়ন হবে হায়দরাবাদের তারকাখচিত ডেকান চার্জার্স। আর জয়পুরের দলটার জায়গা হবে শেষের দিকে। ডেকান চার্জার্সের মালিক হায়দরাবাদের মহা বিত্তবান রেড্ডিরা। তাঁরা আবার ওই শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইংরেজি কাগজ ডেকান ক্রনিকলেরও মালিক। সেই কাগজের প্রতিনিধি হিসাবে মুম্বাইতে একটা আইপিএল ম্যাচ কভার করতে গিয়ে এক সর্বভারতীয় কাগজের সাংবাদিকের সাথে আলাপ হল। তার মুখেই শুনলাম রাজস্থান রয়্যালসের প্রায় অখ্যাত স্বপ্নিল অসনোদকর, রবীন্দ্র জাদেজা, ইউসুফ পাঠানদের সাথে ওয়ার্নের দারুণ ঘনিষ্ঠতা। ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের এইসব চারাগাছের জন্য নাকি ওয়ার্ন বটবৃক্ষ হয়ে উঠেছেন। আমি এবং আমার কাগজের অগ্রজ সাংবাদিক কথাটা প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কারণ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের উন্নাসিকতা জগদ্বিখ্যাত। শোনা যায় কেউ কেউ প্রবল বর্ণবিদ্বেষীও। যেহেতু ডেকান চার্জার্সে সেবার চাঁদের হাট, আমরা নিজেরাও দেখেছি, টিম ফ্লাইটে ভারতীয় ক্রিকেটাররা একসঙ্গে বসেন। অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস, হার্শেল গিবসরা নিজেদের মধ্যেই আড্ডা মারেন। আর ওয়ার্নের মত মহাতারকা অসনোদকরদের পাত্তা দেবেন, এ-ও কি সম্ভব? কিন্তু সেই সাংবাদিক বন্ধুর বিস্তারিত বিবরণ শুনে অবিশ্বাস করার উপায় রইল না।

সে বলল, প্রথম দিকে দলের ভারতীয় ক্রিকেটাররা ওয়ার্নের সাথে কথা বলতেই ভয় পেত। একে তিনি অত বড় ক্রিকেটার, তার উপর ইউসুফরা ইংরেজি বলায় একেবারেই সড়গড় নন। সাপোর্ট স্টাফের কারোর থেকে এই সমস্যার কথা জানতে পেরে ওয়ার্ন সকলকে বলেন, যে ভাষায় তোমরা স্বচ্ছন্দ সেই ভাষাতেই আমার সাথে কথা বলবে। আমি তোমাদের দেশে কাজ করতে এসেছি, আমার দায়িত্ব বুঝে নেওয়া।

শেন ওয়ার্ন বড় ক্রিকেটার বরাবরই মানতাম, কারণ গণ্ডমূর্খ না হলে মানতে সবাই বাধ্য। তাঁর প্রতি যে বিরূপতা ছিল, তা বিদায় নিল সেইদিন।

কেন ছিল বিরূপতা?

আসলে আমাদের কৈশোর ও প্রথম যৌবন কেটেছে ওয়ার্নের বোলিং দেখতে দেখতে। বলা ভাল, শচীন বনাম ওয়ার্ন দ্বৈরথ দেখতে দেখতে। আমাদের খেলা দেখতে শেখায় দল নির্বিশেষে নৈপুণ্যকে কুর্নিশ জানানোর পাঠ খুব বেশি ছিল না। আজকের কদর্য পার্টিজানশিপের সূচনা সে আমলেই হয়েছিল। আসলে আমাদের জন্যে কোনো মতি নন্দী লিখতেন না, প্রাঞ্জল বিশ্লেষণে বাঙালি পাঠককে বুঝিয়ে দিতেন না শচীন, সিধুরা অনায়াস দক্ষতায় তাঁকে মাঠের বাইরে পাঠালেও ওয়ার্ন একজন ক্ষণজন্মা শিল্পী। আমাদের সময়ে ইডেন উদ্যান থেকে রেডিওতে ভেসে আসত না ক্রিকেটরসিক অজয় বসুর কণ্ঠ। আমাদের টিভির ইডেন তখন কাগজের ভাষাতেও গার্ডেন্স হয়ে গেছে। ক্রিকেটের রোম্যান্স অনুভব করতে আমরা শিখলাম কই? ওয়ার্নের বলে শচীনের তিনরকম সুইপ, ক্রিজ ছেড়ে কোণাকুণি বেরিয়ে এসে ওয়াইড লং অন দিয়ে ছয় মারায় আমরা হাততালি দিয়েছি মূলত ভারতীয় ব্যাটার অস্ট্রেলিয় বোলারের বলে চার আর ছয় মেরেছে বলে। আমাদের মধ্যে যারা ইংরেজিতে দড় ছিল না, তারা পিটার রোবাকও পড়তে পারেনি। ওয়ার্ন কত বড় শিল্পী তা বোঝা দূরে থাক, শচীন কত বড় শিল্পী তা-ও তারা তখন বড় একটা বুঝতে পারেনি। তাছাড়া আমাদের সময়টা সুনীল গাভাসকর, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথদের যুগ নয়। বিপক্ষ দলের প্রিয় ক্রিকেটারের নামে বিশ্বসেরা ব্যাটার নিজের ছেলের নাম দেবেন, সে সংস্কৃতি তখন ক্রমশ লুপ্ত হচ্ছে; আগ্রাসন শব্দটা চালু হয়ে গেছে। কখন ব্যাটার একটা মনোরম লেট কাট মারবে বা স্পিনারের একটা বল ব্যাটারকে হাস্যকরভাবে পরাস্ত করবে, আর উইকেট পড়ুক না পড়ুক ওই বলটাই মনে রেখে দেবে দর্শক — সেসব দিন তখন চলে গেছে। আমরা দীর্ঘকাল খেলায় জয়, পরাজয়ের পরেও যে কিছু থাকে তা অনুভব করিনি। অস্ট্রেলিয়া যখন ১৯৯৭-৯৮ মরসুমে ভারত সফরে এল, ওয়ার্ন নিজের খাবার হিসাবে সেদ্ধ বিনের টিন নিয়ে এসেছেন দেশ থেকে — এই খবর পড়ে আমরা যারপরনাই উত্তেজিত হয়েছি। আমাদের উত্তেজিত করা হয়েছে। কাগজে লেখা হয়েছে এটা ভারতের অপমান, শচীন আমাদের সবার হয়ে এর প্রতিশোধ নেবেন। তাই সে মরসুমে যেখানে অস্ট্রেলিয়াকে পেয়েছেন, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা শচীন সেখানেই ওয়ার্নসুদ্ধু অজিদের একেবারে দুরমুশ করে দেওয়ায় আমরা কিছুটা অতিরিক্ত আনন্দ পেয়েছি।

কিন্তু আমাদের একটা জিনিস ছিল যা পূর্বসুরীরা পাননি। সেটা হল কেবল টিভি। তাই আমরা ভারতীয় ব্যাটিংয়ের হাতে ওয়ার্নের নাকানি চোবানি খাওয়া (১৪ টেস্টে ৪৩ উইকেট; গড় ৪৭.১৮, ৫ উইকেট মাত্র একবার) যেমন দেখেছি, তেমনি পৃথিবীর যে কোনো মাঠে, যে কোনো ধরনের পিচে অন্য দেশগুলোর মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া দেখার সৌভাগ্যও হয়েছে। ১৯৯২ সালে সিডনিতে ভারতের বিরুদ্ধে যখন ওয়ার্নের অভিষেক হল, তখনো আমাদের এখানে ঘরে ঘরে কেবল টিভি ছিল না। সোনালি চুলের একটা ২২ বছরের ছেলেকে বেধড়ক মারছেন রবি শাস্ত্রী আর শচীন — এই দৃশ্য আমরা কেবল রাতের খাবার খেতে খেতে দূরদর্শনের হাইলাইটসে দেখেছি। পরের বছর মাইক গ্যাটিংকে বোকা বানানো ‘শতাব্দীর সেরা বল’-ও লাইভ দেখেছিল খুব অল্পসংখ্যক ভারতীয়।

কিন্তু পুরনো সুরার মত স্বাদু, অবসরের দিকে এগিয়ে চলা ওয়ার্নের ২০০৫ সালে এজবাস্টনে অ্যান্ড্রু স্ট্রসকে জোকারে পরিণত করা বলটা আমরা অনেকেই লাইভ দেখেছি।

ভাগ্যিস দেখেছি! উসেন বোল্টের দৌড়, মাইকেল ফেল্পসের সাঁতার, রজার ফেডেরারের টেনিস দেখার মত যে কটা জিনিস যখন ঘটেছে তখনই দেখেছি বলে আমাদের মধ্যে যারা আশি-নব্বই বছর বাঁচবে তারা শেষ বয়সে গর্ব করতে পারবে, তার একটা হল ওয়ার্নের বোলিং।

তাঁর কিন্তু আব্দুল কাদিরের মত রহস্যময় গুগলি ছিল না। কিন্তু যে বলের পর বল একই জায়গায় ফেলতে পারে এবং একই জায়গা থেকে লেগ ব্রেক কখনো বেশি, কখনো কম ঘোরাতে পারে — তার গুগলিটা তেমন জোরদার না হলেই বা কী? কেবল বল ঘোরানোর পরিমাণের হেরফের করে যে ওয়ার্ন একটা দলের গোটা ব্যাটিং ধসিয়ে দিতে পারতেন, তা সবচেয়ে বেশি টের পেয়েছে অস্ট্রেলিয়ার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড। কখনো অফস্টাম্পের অনেক বাইরের বল নিশ্চিন্তে প্যাডে নিতে গিয়ে পায়ের পিছন দিয়ে বোল্ড হয়েছেন স্ট্রস, তো কখনো বল বেশি ঘুরবে ভেবে ব্যাট বাড়িয়ে দিয়ে মাটিতে পড়ে দ্রুত গতিতে সোজা চলে আসা ফ্লিপারে এল বি ডব্লিউ হয়েছেন ইয়ান বেল। ভারত ছাড়া অন্য দলের বিরুদ্ধে ওয়ার্ন ডানহাতি ব্যাটারকে ওভার দ্য উইকেট বল করলেই তাঁকে মনে হত সাক্ষাৎ নিয়তি। যখন ইচ্ছা একটা বল ভাসিয়ে দেবেন লেগ স্লিপের দিকে, অত দূরে যাচ্ছে দেখে ব্যাটার নিশ্চিন্তে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাববেন অথবা চার মারার মোক্ষম সুযোগ ভেবে সুইপ করতে যাবেন। আর অমনি বলটা মাটিতে পড়ে বিদ্যুৎ গতিতে উল্টো দিকে ঘুরে স্টাম্প ভেঙে দেবে। এভাবে বোকা বনেছেন মাইকেল আর্থারটনের মত দুঁদে ব্যাটারও। ভারতীয়দের মধ্যে সম্ভবত একমাত্র এমএসকে প্রসাদকেই এরকম অপ্রস্তুতে পড়তে হয়েছিল।

আবার রাউন্ড দ্য উইকেট বল করা ওয়ার্নের বিরুদ্ধে অতি সাবধানী হতে গিয়ে হাসির পাত্র হয়ে পড়েছিলেন নিউজিল্যান্ডের ক্রেগ ম্যাকমিলান।

আমাদের কেবল টিভি ছিল, এখন ইউটিউবও আছে। যতবার খুশি এইসব মুহূর্ত দেখা যায়। অনেকে যেমন বড়ে গুলাম আলি খাঁ সাহেবের গান বারবার শোনে; ফিরে ফিরে দেখে সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল বা কুরোসাওয়ার ছবি।

কিন্তু ওয়ার্ন আবার ওতেও শেষ হন না। বাউন্ডারির বাইরেও তিনি একজন বেহিসাবী শিল্পী। জীবন ভোগ করবার, নিজেকে অপচয় করবার বিপুল ক্ষুধা তাঁর। এ ব্যাপারে ওয়ার্নের তুলনা চলতে পারে একমাত্র দিয়েগো মারাদোনার সাথে। ওয়ার্ন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যত উইকেট নিয়েছেন, ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডগুলোকে মুখরোচক খবর আর ছবি জুগিয়েছেন বোধহয় তার চেয়েও বেশি। কখনো একাধিক যৌনকর্মীর সাথে যৌন অ্যাডভেঞ্চার, কখনো এলিজাবেথ হার্লির সাথে প্রেম। কখনো বুকিকে দিয়ে দেন পিচ সম্পর্কে তথ্য, কখনো নিষিদ্ধ ডাইইউরেটিক নিয়ে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ হারান। তিনি উপস্থিত থাকলে পাদপ্রদীপের আলো তাঁকে ছেড়ে থাকতে পারত না। আবার সেই আলোয় এক ঝাঁক অর্বাচীনকে আলোকিত করে তারকাখচিত আইপিএল জিতে নিয়েছিলেন ওয়ার্ন। মতি নন্দীর হয়ত সে ঘটনা দেখলে মনে পড়ত বুড়ো আর্চি ম্যাকলারেনের এক দল অপেশাদারকে নিয়ে ওয়ারউইক আর্মস্ট্রংয়ের সর্বগ্রাসী দলকে হারিয়ে দেওয়ার কথা। মহাকাব্য তো নয়ই, এ যুগ এমনকি খণ্ডকাব্যের যুগও থাকছে না। এখন ফেসবুক কবিতার যুগ, তাই টি টোয়েন্টিতেই কাব্যিকতা খুঁজতে হয় আমাদের। এ যুগে ওয়ার্ন বেমানান। তাঁর ধারাভাষ্য তাই অনেকেরই মনঃপূত হয়নি, রিচি বেনোর মত যত বড় ক্রিকেটার তত বড় ধারাভাষ্যকার হয়ে উঠতে যে ওয়ার্ন পারবেন না তা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। তবে তাতে শিল্পী ওয়ার্নের দাম কমে না।

লেগস্পিন এমনিতেই বড় কঠিন শিল্প। বলা হয়, জন্মগত প্রতিভা না থাকলে ও জিনিসটা হয় না। ওয়ার্নের প্রজন্মে অত্যাশ্চর্যভাবে বিশ্ব ক্রিকেটে ছিলেন তিনজন সর্বোচ্চ মানের স্পিনার — ভারতের অনিল কুম্বলে, পাকিস্তানের মুস্তাক আহমেদ আর অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ন। এঁদের অবসরের পরে পাকিস্তানের ইয়াসির শাহ ছাড়া আর তেমন লেগস্পিনার উঠে আসেননি। আসলে চটজলদি ক্রিকেটের রমরমার যুগে ওয়ার্নের মত বিপুল প্রতিভা না থাকলে লেগস্পিন করে টিকে থাকাই মুশকিল। এখন ফ্লাইট দিলে, লেগ ব্রেকের পর লেগ ব্রেক করে গেলে ছোট্ট মাঠে ব্যাটারের কাজ সহজ হয়ে যাবে। ওয়ার্ন পারতেন ওসব করেও একদিনের ক্রিকেটে হ্যাটট্রিক করতে, বিশ্বকাপে (১৯৯৯) সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হতে। টি টোয়েন্টিতেও ৭৩ ম্যাচে ওভার পিছু আটের কম রান দিয়ে সত্তরটা উইকেট নিয়েছিলেন। অ্যাডাম জাম্পা, আদিল রশিদরা পারবেন না। আর টি টোয়েন্টিতে ভাল করতে না পারলে আজকাল টেস্ট খেলার সুযোগও পাওয়া শক্ত। এখন বন্যেরা বনে সুন্দর, লেগস্পিন ইউটিউবে। ওয়ার্নকে আর ক্রিকেটের দরকার ছিল না বোধহয়।

বেলা ফুরোতেই তিনি চলে গেলেন। অন্য অনেক ব্যাপারে ওয়ার্ন একেবারেই অস্ট্রেলিয়সুলভ ছিলেন না, কিন্তু ঠিক সময়ে চলে যাওয়ার ব্যাপারে খাঁটি অস্ট্রেলিয়। তাঁর শেষ টেস্ট সিরিজ ছিল ২০০৬-০৭ অ্যাশেজ। আর্মস্ট্রংয়ের সেই দলের পর অস্ট্রেলিয়া প্রথমবার ৫-০ অ্যাশেজ জিতল। সেটা সম্ভব হত না অ্যাডিলেডে দ্বিতীয় টেস্টের পঞ্চম দিন সকালে ওয়ার্ন ইংল্যান্ডের কোমর ভেঙে না দিলে।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

ঋদ্ধিমান কাণ্ডে মুখোশ ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে কুৎসিত মুখ

ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহ শুরু হলেই বাঙালির জাত্যভিমান চড়চড়িয়ে বাড়তে থাকে। এমন একটা সময়ে সর্বশেষ বাঙালি টেস্ট ক্রিকেটার ঋদ্ধিমান সাহাকে (বাংলা থেকে নির্বাচিত সর্বশেষ টেস্ট ক্রিকেটার অবশ্য উত্তরপ্রদেশ থেকে এসে কলকাতার বাসিন্দা হয়ে যাওয়া মহম্মদ শামি) ভারতীয় দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সরকারিভাবে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে সিরিজের জন্য দল ঘোষণা ১৯ ফেব্রুয়ারি হয়ে থাকলেও সংবাদমাধ্যমে আগেই প্রকাশিত হয়েছিল, ভারতীয় দলের কোচ রাহুল দ্রাবিড় নাকি ঋদ্ধিমানকে বলে দিয়েছেন, তাঁকে দলে নেওয়া হবে না। প্রধান নির্বাচক চেতন শর্মা দল ঘোষণা করার পর থেকে ঋদ্ধিমান বেশ কয়েকটা সংবাদমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন। সর্বত্রই পরিষ্কার যে সত্যিই তাঁকে দ্রাবিড় সেরকমই বলেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, চেতনও ফোনে বলেছিলেন এরপর থেকে আর ঋদ্ধিমানের কথা ভাবা হবে না। একে ঋদ্ধিমান ধনী ক্রিকেট প্রশাসক বাবার আদরের ছোট ছেলে নন, মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা প্রথম প্রজন্মের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার; তার উপর তিনি কলকাতার ছেলে নন, শিলিগুড়ি থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। সেই কারণেই বোধহয় বাঙালির আবেগের এখনো তেমন বিস্ফোরণ ঘটেনি। তার আবেগ উস্কে দেয় কলকাতার যে খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেলগুলো, তারাও এখনো ঈষদুষ্ণ; টগবগিয়ে ফুটছে না। এর পাশে সৌরভ গাঙ্গুলির খেলোয়াড় জীবন মনে পড়লে অবাক লাগে।

জীবনের প্রথম দুটো টেস্টে শতরান করার পরে বাংলা কাগজগুলো স্রেফ সৌরভের প্রশংসা করে থামত না। তাঁকে যে কোনো মুহূর্তে বাদ দেওয়া হতে পারে, এমন আশঙ্কা সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হত। ওয়েস্ট ইন্ডিজে সৌরভ একটা টেস্টে বাদ পড়লেন। বাংলা কাগজে টেস্ট ম্যাচের রিপোর্টের থেকেও বেশি জল্পনা কল্পনা হল ভারতীয় দলে কতজন ব্রুটাস আছে তা নিয়ে। অধিনায়ক শচীন যে সৌরভকে মোটেই পছন্দ করেন না, তিনি ছেলেবেলার বন্ধু বিনোদ কাম্বলির জন্যে সৌরভকে বলি দিচ্ছেন — এসব কথা আমরা তখন গোগ্রাসে গিলতাম। আশ্চর্যের ব্যাপার, সৌরভকেই অধিনায়ক শচীন টাইটান কাপে নিজের ওপেনিং পার্টনার করে নিলেন। সেই জুটি একদিনের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা জুটি হয়ে উঠল। ২০০২ সালে অধিনায়ক সৌরভই সেই জুটি কিছুদিনের জন্য ভেঙে দিয়েছিলেন। আর কাম্বলি? তাঁর কেরিয়ার বেশি লম্বা হয়নি। তিনি বহু বছর পরে এক সংবাদমাধ্যমকে দুঃখ করে বলেছিলেন, শচীন আমার ছোটবেলার বন্ধু অথচ আমাকে একটু সাহায্য করল না। করলে আমার কেরিয়ারটা অন্যরকম হতে পারত। অধিনায়ক হিসাবে শচীন যে ঠিক লোকের উপরেই ভরসা করেছিলেন, সৌরভের কেরিয়ারই তার প্রমাণ।

গ্রেগ চ্যাপেলের আমলে তো চ্যাপেল আর দ্রাবিড় হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির জাতীয় শত্রু। ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটারটি যে কত বড় বদমাইশ, সে কথা গজাল দিয়ে বাঙালির মাথায় গুঁজে দিয়েছিল কলকাতার সংবাদমাধ্যম। তার ফল পাওয়া গিয়েছিল হাতে নাতে। সেইসময় ইডেন উদ্যানে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে একটা একদিনের ম্যাচে গোটা স্টেডিয়াম সমর্থন করেছিল গ্রেম স্মিথের দলকে। ভারতীয় অধিনায়ক বোল্ড হতে দর্শকরা উল্লাসে ফেটে পড়েছিলেন। তখন ভারতের বিপক্ষ দলকে সমর্থন করলে গ্রেফতার করার রেওয়াজ ছিল না। দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না।

২০১৮ সালে অস্ত্রোপচারের জন্যে ভারতীয় টেস্ট দলের এক নম্বর উইকেটরক্ষক ঋদ্ধিমানকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল, তাঁর জায়গা নিয়েছিলেন ঋষভ পন্থ। ঋদ্ধিমান যে সেইসময় ভারতের সেরা উইকেটরক্ষক তা নিয়ে কোথাও কোনো বিতর্ক ছিল না, বরং তিনিই বিশ্বসেরা কিনা তা নিয়ে আলোচনা হত। সৈয়দ কিরমানি থেকে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট — কিংবদন্তি উইকেটরক্ষকরা সকলেই তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। অথচ ঋদ্ধিমান ফিট হয়ে যাওয়ার পর তৎকালীন অধিনায়ক বিরাট কোহলি আর কোচ রবি শাস্ত্রী কিন্তু তাঁকে তাঁর জায়গা ফিরিয়ে দেননি। ঋষভ ঋদ্ধিমানের অনুপস্থিতিতে ইংল্যান্ডে শতরান করেছিলেন সত্যি, একবার এক ইনিংসে পাঁচটা ক্যাচ নিয়েছিলেন তা-ও সত্যি। কিন্তু তাঁর কিপিং যে মোটেই টেস্ট ক্রিকেটের মানের নয়, তা সাদা চোখেও ধরা পড়ত। বিশেষ করে স্পিনাররা বল করলে একেকসময় ব্যাপারটা হাস্যকর হয়ে দাঁড়াত। তবু ক্রমশ ঋদ্ধি হয়ে গেলেন টিম ম্যানেজমেন্টের দ্বিতীয় পছন্দ, ঋষভ বারবার ব্যর্থ না হলে অথবা আহত না হলে ঋদ্ধির জন্য প্রথম একাদশের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। তাতে সময়ে সময়ে বোলারদের উপর নিদারুণ অবিচার হচ্ছে দেখে নতুন সূত্র তৈরি করা হল, বিদেশে কিপিং করবেন ঋষভ আর দেশে ঋদ্ধি। সবসময়ে সেটাও অবশ্য মানা হয়নি। আশ্চর্যের কথা, পড়তি ফর্মের সৌরভকে বাদ দেওয়া হয়েছিল বলে যে সাংবাদিকরা প্রায় ধর্মযুদ্ধে নেমে পড়েছিলেন, তাঁরা ফর্মে থাকা ঋদ্ধিমানের প্রতি অবিচার নিয়ে বিশেষ শব্দ খরচ করেননি।

ঋষভের ফর্ম মুখ বন্ধ করে রেখেছিল — এই যুক্তি কিন্তু খাটবে না। কারণ প্রমাণিত যোগ্যতার সিনিয়র খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতিতে দারুণ খেলেও তিনি ফিরে আসায় জায়গা ছেড়ে দিতে হয়েছে জুনিয়রকে — এমন ঘটনা কোহলি-শাস্ত্রী জমানায় একাধিকবার ঘটেছে। বোলারদের ক্ষেত্রে তো আকছার এমনটা হয়েই থাকে। কিন্তু সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা ব্যাটার করুণ নায়ারের। ২০১৬ সালে চোটের জন্য অজিঙ্ক রাহানে দলের বাইরে থাকায় খেলতে নেমে করুণ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে শতরান নয়, দ্বিশতরান নয়, ত্রিশতরান করেছিলেন। পরের টেস্টে কিন্তু রাহানে নিজের জায়গা ফেরত পান। করুণ তারপর আর মাত্র তিনটে সুযোগ পেয়েছিলেন। রাহানেকে জায়গা ফিরিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে তখন অধিনায়ক কোহলি বলেছিলেন, একটা পারফরম্যান্স অন্য একজন খেলোয়াড়ের কয়েক বছরের পরিশ্রমের মূল্য চুকিয়ে দিতে পারে না। আজ রাহানের ফর্ম নেই, দল থেকে বাদ পড়েছেন বলে অনেকেই কোহলির এই মন্তব্য পড়ে নাক সিঁটকাবেন। কিন্তু সেদিন রাহানের গড় ছিল প্রায় পঞ্চাশ। সুতরাং কোহলি ভুল কিছু বলেননি। তবে দু বছরের মধ্যেই ঋষভের নড়বড়ে কিপিং আর একটা শতরান যে কী করে ঋদ্ধিমানের চার বছরের মসৃণ কিপিং আর তিনটে শতরানের চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে গেল, সে এক রহস্য।

আরও বড় রহস্য হল ব্যোমকেশে আপ্লুত কলকাতা শহরের সংবাদমাধ্যমের এই রহস্য উন্মোচনে উৎসাহের অভাব। সৌরভকে বাদ দিয়ে গ্রেগ চ্যাপেল দুর্গার অসুর হয়ে গিয়েছিলেন। সে সময় ফেলুদার ছবি করার সত্ব সন্দীপ রায় ছেড়ে দিলে, আর রিমেক হুজুগ থাকলে, নির্ঘাত মন্দার বোসের নাম রাহুল দ্রাবিড় করে দেওয়া হত। এ যুগে কিন্তু কলকাতার সংবাদমাধ্যমে কোহলি বন্দনায় ছেদ পড়েনি। তাঁর ট্যাটু থেকে হেলথ ড্রিঙ্ক, প্রেম-অপ্রেম সবই বাঙালিকে ষোড়শোপচারে খাওয়ানো হয়েছে। এমনও নয় যে বাংলার গৌরব সৌরভ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান বলেই ঋদ্ধির ব্যাপারটা মানিয়ে নেওয়া হয়েছে। কারণ সৌরভ বোর্ড সভাপতি হয়েছেন ২০১৯ সালে; ঋদ্ধিমানকে যখন দু নম্বর করে দেওয়া হল, তখন বোর্ড বলে প্রায় কিছুই ছিল না। সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত অ্যাড হক কমিটির মাথা হিসাবে বোর্ড চালাচ্ছিলেন বিনোদ রাই। তিনি কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল থাকাকালীন মনমোহন সিং সরকারের প্রতি যতটা কড়া ছিলেন, ঠিক ততটাই শিথিল ছিলেন কোহলি-শাস্ত্রীর টিম ম্যানেজমেন্টের প্রতি।

আসলে ভারতীয় ক্রিকেট কোনোদিনই পুরোপুরি ক্রিকেটিয় যুক্তি মেনে চলে না, আর ভারতীয় সাংবাদিকতা বহুদিন হল সাংবাদিকতার যুক্তি মেনে চলে না। ক্রিকেট সাংবাদিকতা তো নয়ই। এ দেশের ক্রিকেট সাংবাদিকতার মহীরুহরা সেই সৌরভ, শচীনদের সময় থেকেই খেলাটিকে ভুলে বাণীতে মনোনিবেশ করেছেন। সৌরভের নয়নাভিরাম কভার ড্রাইভের বিশ্লেষণে নয়, তাঁদের ওস্তাদি ছিল সৌরভ অমুক জায়গা থেকে তমুক জায়গায় যেতে যেতে গাড়িতে কী বললেন তার স্টেনোগ্রাফি করায়। ক্রিকেট সাংবাদিকতাকে সফলভাবে গসিপ সাংবাদিকতায় পরিণত করা হয়েছে গত শতকের শেষ থেকেই।

এখন মুশকিল হল, চেতেশ্বর পূজারা, রাহানে, ঋদ্ধিমানের মত লোকেরা ক্রিকেট খেলতে শিখেছেন। আক্রমণাত্মক ইংরেজি বলতে শেখেননি; বলিউডি নায়িকার সাথে প্রেম করতে পারেননি; মাঠে নেমে স্রেফ ক্যাচ ধরে, স্টাম্পিং করে আর রান করে চলে আসা যে কর্তব্য নয় তা-ও বোঝেননি। ফলে তাঁদের গ্ল্যামার নেই। যার গ্ল্যামার নেই তার খেলা সম্পর্কে লেখার ক্ষমতা আমাদের সাংবাদিকরা হারিয়েছেন, পাঠকের অভ্যাসও নষ্ট করে দিয়েছেন। এখন ঋদ্ধিমান বাদ পড়েছেন বলে আপনি যতই সহানুভূতি দেখান, বিরাট কী খেলেন, টুরের মাঝের বিরতিতে অনুষ্কাকে নিয়ে কোথায় গেলেন — এসব লিখলে আপনি হামলে পড়ে পড়বেন। ঋদ্ধিমান কোন অনুশীলনের জোরে যশপ্রীত বুমরার ঘন্টায় নব্বই মাইল গতিতে ধেয়ে আসা প্রচণ্ড সুইং হওয়া বলও অক্লেশে তালুবন্দি করেন তা নিয়ে লিখলে আপনার পানসে লাগবে। সৌরভ কেবল বাঙালি নন, তাঁর গ্ল্যামার ছিল। কালোকোলো বেঁটেখাটো রোগাসোগা ঋদ্ধির সেটা নেই। আছে বিরাটের, আছে রবি শাস্ত্রীর। তাঁরা ফোন ধরা বন্ধ করে দিলে আমাদের সাংবাদিকরা চোখে অন্ধকার দেখবেন। এখন সোশাল মিডিয়ার যুগ; বাংলা কাগজে, সাইটে বা চ্যানেলে বিরাটের সমালোচনা করে রিপোর্টার নিশ্চিন্তে তাঁর সাথে হেঁ হেঁ করতে যাবেন, সে গুড়ে বালি। ঠিক বিরাটের কানে পৌঁছে যাবে, অমুক জায়গায় তমুক কথা লেখা হয়েছে। আর সহিষ্ণুতায় এই প্রজন্মের তারকারা একেবারে শজারুপ্রতিম। ওসব ঝামেলায় কে পড়তে যাবে বাপু? কী জানি তা দিয়ে তো আর সাংবাদিকতা হয় না এ যুগে, হয় কাকে চিনি তা দিয়ে। বিরাট, রবিকে চিনলেই লাভ। ঋদ্ধিমানকে তো যে টিভিতে খেলা দেখে সে-ও চেনে।

অর্থাৎ যে গ্ল্যামারাস, ক্ষমতাশালী — তার সাতখুন মাফ।

কিন্তু জনরুচিকে সবসময়, সব বিষয়ে ইচ্ছে মতো চালনা করতে স্বয়ং নরেন্দ্র মোদী পারেন না; ক্রিকেট মাঠের উডওয়ার্ড, বার্নস্টাইনরা তো কোন ছার। তাই এই মুহূর্তে ঋদ্ধিমানের বাদ পড়া নিয়ে কিঞ্চিৎ লেখালিখি করতেই হচ্ছে। হাজার হোক, বাঙালি ক্রিকেটার বংশে বাতি দিতে উনিই তো ছিলেন। তাঁকে বাদ দেওয়ায় জাতির ভাবাবেগ বিলক্ষণ ক্ষতিগ্রস্ত। আমাদের ক্রিকেট সাংবাদিকরা বাজার বোঝেন। ঋদ্ধিমানের চোখের জল বিকোবে ভাল। অতএব দ্রাবিড়কে খলনায়ক বানানোর প্রকল্প আবার চালু হয়েছে। যখন ঋদ্ধিমানের হয়ে কলম ধরা উচিত ছিল তখন এঁরা নিদ্রামগন ছিলেন, এখন গগন অন্ধকার করে প্রমাণ করতে নেমেছেন, আটত্রিশে পা দিতে চলা ঋদ্ধিমানকে বাদ দেওয়া ঘোরতর অন্যায়।

সদ্য ভাষা শহিদ দিবস গেল বলে ঋদ্ধিকে শহিদ ঠাওরাতে যতই মন চাক, ক্রিকেটিয় যুক্তি কিন্তু অন্য কথা বলে। ঋষভের ব্যাটিং গড় এখন প্রায় চল্লিশ, ঋদ্ধিমানের তিরিশও নয়। উপরন্তু গত বছরের অস্ট্রেলিয়া সফরে ব্রিসবেনে যে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেছেন ঋষভ, মানতেই হবে সে ইনিংস খেলা ঋদ্ধিমানের পক্ষে সম্ভব নয়। ঋষভের কিপিংয়েও উন্নতি হয়েছে সম্প্রতি। তার কারণ হয়ত ঋদ্ধি স্বয়ং। দ্রাবিড়কে খলনায়ক বানানোর জন্য এক সাংবাদিক সম্প্রতি রবি শাস্ত্রীর ইয়াব্বড় সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। ঋদ্ধিকে এক নম্বর থেকে দু’নম্বর করে দেওয়া কোচ সেখানে তাঁকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন এমন টিমম্যান দেখা যায় না। নিজে খেলতে পাবে না জেনেও হাতে ধরে ঋষভকে শিখিয়েছে। তাকে এভাবে বিদায় করা অনুচিত।

আরও পড়ুন নিশীথিনী-সম

অর্থাৎ টেস্ট ক্রিকেটে কী করে কিপিং করতে হয় একজন জানত না। তা সত্ত্বেও তাকে খেলানো হয়েছে এবং তাকে খেলতে শেখানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাকে, যে খেলতে জানত। এখন কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করা হচ্ছে। দ্রাবিড়কে মগনলাল মেঘরাজ বানাতে হবে বলে এক বাঙালি সাংবাদিক এই অশ্রু বিসর্জনের পরিসরটি তৈরি করে দিলেন।

সাংবাদিকদের দোষত্রুটি নিয়ে এত কথা লেখার কি কোনো দরকার আছে? সত্যিই দ্বিধায় ছিলাম। দ্বিধা কাটিয়ে দিল ঋদ্ধিমানের একটি টুইট। ১৯ তারিখ সকালে এক টুইটে ঋদ্ধিমান জানালেন, এতক্ষণ যাঁদের নিন্দা করছি তেমনই এক “শ্রদ্ধেয়” সাংবাদিক সাক্ষাৎকার চেয়েছিলেন। তিনি পাত্তা দেননি বলে সাংবাদিকটি গ্যাংস্টারের কায়দায় হুমকি দিয়েছেন, ফল ভাল হবে না। এই সাক্ষাৎকার-সর্বস্ব সাংবাদিকরা সাংবাদিকতার যতটা ক্ষতি করেন, ততটাই ক্ষতি করেন ক্রিকেটারদের এবং ক্রিকেটের। এঁরাই অফসাইডের রাজা সৌরভকে বোঝাতেন, যে অত সহজে বাউন্ডারি মারতে পারে তার রানিং বিটুইন দ্য উইকেটসে উন্নতি না করলেও চলে। এঁরাই সৌরভের টেকনিকের ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করা ধারাভাষ্যকারদের বাঙালিবিরোধী প্রতিপন্ন করতেন। ফলে সৌরভের শর্ট বল খেলার দুর্বলতা রয়েই গেল, নইলে তাঁর মতো প্রতিভাবানের টেস্ট ক্রিকেটে মাত্র হাজার সাতেক রান আর ৪২ গড় নিয়ে কেরিয়ার শেষ করার কথা নয়। ফলে এই সাংবাদিকদের কুপ্রভাব নিয়ে যতদূর সম্ভব লেখা দরকার বইকি। আগে কেউ ঋদ্ধিমানের মত চ্যাট ফাঁস করে দিয়ে এঁদের কাঠগড়ায় তোলেনি। হয়ত সোশাল মিডিয়া ছিল না বলে তা করা সম্ভবও ছিল না। এখন শোনা যাচ্ছে, বোর্ড নাকি ঘটনার তদন্ত করবে।

সে তদন্তে অবশ্য সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকটির শাস্তির সম্ভাবনা কম, উল্টে ঋদ্ধিমান না শাস্তি পেয়ে যান। কারণ সাংবাদিকরা কেবল নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকতেই শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটার, কোচ, কর্তাদের চাটুকারিতা করেন তেমন নয়। ওঁরা চাটুকারিতা যথেষ্ট পছন্দ করেন এবং ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত নানা এজেন্ডা চরিতার্থ করতে এই সাংবাদিকদের ব্যবহার করে থাকেন। ফলে এই সাংবাদিকদের একেকজন প্রবল ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন। নইলে একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারকে এমন হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা হবে কী করে?

ঋদ্ধিমানের মত নিবেদিতপ্রাণ ক্রিকেটারের দল থেকে বাদ পড়লে মনখারাপ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ঘটনার উত্তাপ কেটে গেলে তিনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন, এই বয়সে রিজার্ভ কিপার করে না রেখে তাঁকে সোজাসাপ্টা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে দিয়ে দ্রাবিড় যথার্থ কাজই করেছেন। ২০ তারিখ ইডেনে ভারত বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে দ্রাবিড় পরিষ্কার বলেছেন, তিনি চাননি ঋদ্ধিমানের মত একজন সংবাদমাধ্যম থেকে বাদ পড়ার খবরটা জানুন।৩ বরং সিনিয়র ক্রিকেটারকে আলাদা করে “তোমাকে আর নিতে পারছি না” বলার সৌজন্য ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে খুব কম টিম ম্যানেজমেন্ট এবং নির্বাচন কমিটি দেখিয়েছে। ঋদ্ধি অভিমান করে বলছেন “আমাকে ঘুরিয়ে অবসর নিতে বলা হয়েছে”। তাঁর অভিমানে যে সাংবাদিকদের মাঠের বাইরের মশলাই রান্নার একমাত্র উপকরণ, তারা ছাড়া আর কারো লাভ হচ্ছে না। ভারতীয় ক্রিকেটের দুর্ভাগ্য,সচিন তেন্ডুলকরকে গোটা দুয়েক রেকর্ড ভাঙার জন্য ২০১১ বিশ্বকাপের পরেও খেলতে দেওয়া হয়েছিল। আর মহেন্দ্র সিং ধোনিকে বয়ে বেড়াতে হয়েছিল তিনি প্রবল প্রতাপশালী ক্রিকেট কর্তার কোম্পানির লোক বলে। নইলে ৩৭-৩৮ বছর বয়সের লোকের জায়গা সর্বোচ্চ স্তরের ক্রিকেটে অবশিষ্ট নেই।

আইপিএল সর্বোচ্চ স্তরের ক্রিকেট নয়।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

IPL auction: Where privilege holds court

Suhana and Aryan Khan look so like their father that even somebody who has stopped following showbiz and news, shall know they are Shah Rukh Khan’s children the moment he/she sees them. But this Saturday afternoon, while watching the Indian Premier League (IPL) auction I was wondering who the other girl beside them was at the Kolkata Knight Riders table. Wonder does not last in the age of social media. Within a few minutes, I came to know that she is Juhi Chawla’s daughter Jhanvi. The revelation came through a Twitter thread where people were arguing over dynasty. Some were scandalised that Jhanvi, Suhana and Aryan were judging the ability of some hard-working professionals whilst being present at the auction just by privilege of birth. The other lot argued, it was not their fault that they were born to rich and famous parents. Some went to the extent of saying: their parents worked hard, yours didn’t. Deal with it.

I found the conversation more comical than caustic because it reminded me what Rahul Gandhi, India’s most hated dynast, had said in Parliament just ten days ago. “There are two Indias — one for the rich, one for the poor — and the gap between the two was widening,” he had said. “Today, the earnings of 84 percent of Indians have dwindled, pushing them towards poverty.” I couldn’t help laughing. The IPL auction was making people from this 84 percent argue for and against the privilege of the 16 per cent.

We came to know in 2019 that India’s unemployment rate is at a 45-year-old high. The pandemic has only worsened the situation. If Gautama Buddha were alive today and the mother of a jobless youth went to him asking for her son’s/daughter’s job, Buddha would have asked her to bring a handful of mustard from a home where joblessness or pay cuts have not hit. The lady’s only hope would be the hotel where the IPL auction was held. Even during this distress, 204 cricketers found themselves worth Rs. 550 crore.

I am not going to put you off by talking about migrant labourers. I don’t need to. Because even Indian cricketers outside the IPL fold are part of the 84 per cent. If you look around, you will find enough reports about domestic cricketers deep in debt running their family in absence of first-class cricket. But IPL, supposedly, is the fountain that feeds the stream of domestic cricket. That fountain kept flowing during the pandemic, even shifting countries in the midst of waves of crisis. Which all means that the Ranji Trophy not taking place should matter little financially to cricketers, groundsmen, umpires, scorers et al. But it did. The Board, busy keeping the fountain alive, did not care about the stream. Compensation (and a much-needed hike) was announced only in September 2021. One can clearly see the two Indias here. IPL’s India deals in hundreds of crores, the rest of Indian cricket has to suffer an agonising wait for a few lakhs.

Like the debate over dynasty, the point about hard work and talent will obviously rear its beautiful head here. Some will definitely say, “Those who have enough talent and work hard play IPL.” Of course, T20 is the best form of cricket to judge talent and hard work. Don’t let banal commentators and star cricketers doing lip service tell you otherwise. This is not the era where cricketers will be happy receiving Rs one lakh each from a Lata Mangeshkar-led fundraiser, after winning the World Cup. It is the age of Chris Gayle and Kieron Pollard, who are comfortable not playing for their country as they can make a killing playing in T20 leagues all over the world. It is also the age of Liam Livingstone and Tim David, who may never stake a claim to cricketing immortality but are treasured more than World Cup-winning Eoin Morgan and the Bradmanesque Steve Smith. Talent and hard work are so key to IPL success that Paul Valthaty, Manvinder Bisla became footnotes soon after big success; Pravin Tambe succeeded at an age when life insurance policies mature, with a physique Virat Kohli still has nightmares about. There is also the story of hat-trick man Ajit Chandila, who like many others, shone only in IPL. But we shall not talk about these forgottens lest it opens a can of worms.

After every IPL auction, we invariably read some rags to riches stories. A player who has played only tennis ball cricket, someone who was not a professional cricketer even six months back or somebody who has never been selected for any first-class side. In short, you do not necessarily need to come through the dusty ranks of the domestic system to get into the IPL. It wholly depends on your marketability and ability (specifically in short format). A modern day, glorified slave market, the IPL auction is. Then you land on the biggest stage possible and rake in the moolah. Through a system that reduces a rigorous discipline into a TRP-driven melodrama. The other, and more problematic aspect of IPL is that nobody is sure of the logic with which and IPL auction plays out.

Obviously, it would be wrong to grudge young men of this poor, jobless country the chance to get rich. But we tend to forget, rags to riches stories hold charm only because there are more rags than riches. Today India has more billionaires than ever, along with unprecedented unemployment. Talent needs opportunity, to announce its presence and work, to work hard. Both are in short supply for us — the 84 per cent. Celebrating the pomp of IPL and arguing about the privilege of its elite is actually a nice way to laugh at ourselves. The joke actually is on us.

Published on https://newsclick.in

বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

ব্র্যান্ড বুদ্ধ। কথাটা এই শতকের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। এতটাই জনপ্রিয় যে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নিজের দলের সদস্যরা, যাঁদের তাত্ত্বিক ভাবে ব্র্যান্ডিং ব্যাপারটা নিয়েই প্রবল আপত্তি থাকার কথা, তাঁরাও বেশ সন্তোষ প্রকাশ করতেন। যদি ধরে নেওয়া যায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সত্যিই একটি ব্র্যান্ড, তাহলে মানতেই হবে সে ব্র্যান্ড রীতিমত জনপ্রিয় হয়েছিল। শতকের প্রথম দশকের দুটো নির্বাচনেই বুদ্ধদেবের নেতৃত্বাধীন দল তথা জোট হই হই করে জিতেছিল। ব্র্যান্ড বুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশি আলোচিত এবং সফল ব্র্যান্ড মোদি। মানতেই হবে ব্র্যান্ড নির্মাণের মুন্সিয়ানাও সেখানে অনেক বেশি। কারণ একজন লেখাপড়া জানা ভদ্রলোককে নির্ভরযোগ্য প্রশাসক হিসাবে তুলে ধরার চেয়ে গোটা রাজ্যে গণহত্যা চলার সময়ে ক্ষমতাসীন নেতাকে গোটা দেশ চালানোর পক্ষে বিকল্পহীন প্রশাসক হিসাবে তুলে ধরা বহুগুণ কঠিন। ব্র্যান্ড নির্মাণ মানেই হল যা না থাকলেও ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না তাকেই অপরিহার্য বলে প্রতিষ্ঠা করা, যার বিকল্প আছে তাকে নির্বিকল্প হিসাবে ঘোষণা করা। তাই কেবল ভালো বললে চলে না, তুলনায় যেতে হয়। আর সকলের চেয়ে ভালো, এ পর্যন্ত যা যা দেখেছেন, সবার চেয়ে ভাল — এইসব বলতে হয়। তাই নরেন্দ্র মোদি কোনো শিশুর দিকে তাকিয়ে হাসলেই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি কোনো শিশুর দিকে তাকিয়ে হাসলেন — এই জাতীয় প্রচারের প্রয়োজন পড়ে।

রাজনীতিবিদের ব্র্যান্ড নির্মাণ করার চেয়ে খেলোয়াড়দের ব্র্যান্ড নির্মাণ করা সহজ। কারণ তাঁরা কাজের অঙ্গ হিসাবেই সাধারণ মানুষের নিরিখে অবিশ্বাস্য কাণ্ডকারখানা করে থাকেন। অভিনেতারাও করেন বটে, কিন্তু তা অবশ্যই পূর্বনির্ধারিত; চিত্রনাট্য এবং প্রযুক্তির সহায়তায় করা। আজকের দিনের দর্শকরা জানেন কোনটা ক্যামেরার কারসাজি, কোথায় আসল নায়ক হল ভিএফএক্স। কিন্তু বিরাট কোহলির দিকে যখন বাউন্সার ধেয়ে আসে, তখন তিনি পুল করতে পারলে তবেই বল মাঠের বাইরে যাবে। ওখানে ফাঁকি চলে না। তাই তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা এমনিতেই বেশি। কিন্তু ওতে সন্তুষ্ট হলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যান্ড নির্মাণ সম্ভব নয়।

গাড়ির টায়ার থেকে টিএমটি বার, পেশাগত শিক্ষার সাইট থেকে পটেটো চিপসের বিকল্প স্ন্যাকস যাঁকে দিয়ে বিক্রি করাতে হবে — তিনি যে কেবল দারুণ খেলোয়াড় নন, অন্য সকলের চেয়ে, এমনকি আগে যাঁরা ক্রিকেট খেলেছেন তাঁদের সকলের চেয়ে ভাল; নিদেনপক্ষে সর্বকালের সেরাদের মতই ভাল, তা প্রতিষ্ঠা না করলে চলে না। এই কারণেই সারা পৃথিবীর খেলাধুলোয় বর্তমানের তারকাদের সর্বকালের সেরার আসনে বসানোর হুড়োহুড়ি।

অতীতে কোনো খেলোয়াড় সর্বকালের সেরাদের মধ্যে পড়েন কিনা সে আলোচনা শুরু হতো তাঁর কেরিয়ারের শেষ প্রান্তে বা কেরিয়ার শেষ হলে। কিন্তু শচীন তেন্ডুলকর যখন মধ্যগগনে, তখনই এই মর্মে বিপুল প্রচার শুরু হয়ে গিয়েছিল। কারণ তখন বিপুল টাকার চুক্তি নিয়ে ওয়ার্ল্ড টেল এসে পড়েছে ভারতীয় ক্রিকেটে, শচীনকে ধনী করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন মার্ক মাসকারেনহাস। অশীতিপর ডন ব্র্যাডম্যান এক সাক্ষাৎকারে বলে ফেলেছেন, ‘এই ছেলেটাকে দেখে আমার নিজের কথা মনে পড়ে।’ ব্যাস! আর যায় কোথায়? সর্বকালের সেরা হিসাবে শচীনের এমন জোরদার ব্র্যান্ডিং হল, কাগজে এমন লেখালিখি, টিভিতে এমন বিজ্ঞাপন যে আমরা যারা সুনীল গাভস্করের খেলা দেখিনি; কপিলদেব, ইয়ান বোথাম, ভিভ রিচার্ডসদের তাঁদের সেরা সময়ে দেখিনি; তারা নিঃসন্দেহ হয়ে উঠলাম — সবার উপরে শচীন সত্য, তাহার উপরে নাই। সর্বকালের সেরার মুকুটের জন্য শচীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে আমরা বড়জোর ব্রায়ান লারাকে মানতে রাজি ছিলাম, কোনো প্রাক্তনকে মোটেই নয়।

ব্র্যান্ডিংয়ের সেই ট্র্যাডিশন আজও সমান তালে চলছে। শচীন অবসর নিয়েছেন বলে তো আর ব্যবসা থেমে থাকতে পারে না, অতএব পরবর্তী GOAT (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম — এই অভিধাটি সোশাল মিডিয়ার যুগে নতুন আমদানি, শচীনের সময়ে চালু হয়নি) হয়ে গেলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। তাঁর কেরিয়ার শেষের দিকে যেতেই বিরাট। প্রত্যেক প্রজন্মেই আগের গোটের নৈপুণ্যকে অতিক্রম করে এসে যাচ্ছেন নতুন গোট। মানবিক দক্ষতার এত দ্রুত বিবর্তন হয় জানলে হয়ত চার্লস ডারউইন ওরিজিন অফ স্পিসিজ নিজে হাতে পুড়িয়ে দিতেন।

গোট প্রচার ভোট প্রচারের মতই শক্তিশালী। শচীনের আমলে কেবল সাংবাদিককুল আর বিজ্ঞাপন ছিল প্রচারযন্ত্র। এখন যুক্ত হয়েছে সোশাল মিডিয়া। কেবল প্রচার নয়, ভিন্নমতের প্রতিকারও সেখানে হয়ে থাকে। ট্যুইটারে একবার বলে দেখুন, বিরাট নিঃসন্দেহে বড় ব্যাটার। কিন্তু সর্বকালের সেরা বলার সময় হয়েছে কি? পঙ্গপালের মত ধেয়ে আসবেন বিরাটভক্তরা। আক্রমণ শুরু হবে আপনি যে ক্রিকেটের ‘ক’ বোঝেন না সেই ঘোষণা দিয়ে। ক্রমশ আপনি যে মোগ্যাম্বোসুলভ খলনায়ক তা বলা হবে। তারপর প্রমাণ করা হবে আপনি দেশদ্রোহী; নামটা মুসলমান হলে সোজা পাকিস্তানি। গালিগালাজ ইত্যাদি তো আছেই। বলা যেতেই পারত যে এসবের সাথে খেলার বা খেলোয়াড়ের কোনো সম্পর্ক নেই। ক্রীড়ানুরাগীরা কালে কালে এরকম জঙ্গিপনা করে আসছেন, সোশাল মিডিয়া আসায় পাড়ার রকের জঙ্গিপনা জনপরিসর পেয়ে গেছে মাত্র। দুঃখের বিষয়, তা বলা যাবে না। কারণ দু’টি।

প্রথমত, এমন আক্রমণ কেবল রাম শ্যাম যদু মধুরা করে না। সাংবাদিক, ধারাভাষ্যকার, ভেরিফায়েড হ্যান্ডেলওলা উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসার, ডাক্তার, উকিল — কেউই বাদ যান না। দ্বিতীয়ত, বিরাট নিজেও একাধিকবার ট্রোলদের মত আচরণ করেছেন।

ভারতের শাসক দলের মত ভারতের ক্রিকেট দলও সমালোচনা মোটেই বরদাস্ত করে না সেই ধোনির আমল থেকেই। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই মাইনে দিয়ে ধারাভাষ্যকার রাখে। দল হারুক আর জিতুক, ভারতীয় ক্রিকেটারদের সমালোচনা করেছ কি মরেছ। ব্যাপারটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে। অমিতাভ বচ্চনের টুইট রিটুইট করে ভোগলের ধারাভাষ্য নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন তৎকালীন ভারত অধিনায়ক ধোনি। তারপরই ভোগলের কন্ট্র্যাক্ট চলে যায়। বিরাট ক্রিকেটের মেধাবী এবং মনোযোগী ছাত্র; তিনি বড়দের দেখে যা শিখেছেন তা তাঁদের চেয়ে ঢের বেশি জোর দিয়ে করেন। ২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপ চলাকালীন অনুশীলনের সময়ে তিনি এক ভারতীয় সাংবাদিককে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন, কারণ তাঁর ধারণা হয়েছিল ওই সাংবাদিক বিরাট আর অনুষ্কা শর্মার সম্পর্ক নিয়ে আপত্তিকর কথাবার্তা লিখেছেন। পরে যখন জানা যায় সেই নিবন্ধ অন্য এক সাংবাদিকের লেখা, তখন বিরাট ক্ষমা চান। অর্থাৎ ভুল লোককে গালিগালাজ করা হয়েছে বলে ক্ষমা চান। এই ঘটনায় টিম ডিরেক্টর রবি শাস্ত্রী বলেছিলেন, তিনি বিরাটকে বুঝিয়েছেন যে ভবিষ্যৎ ভারত অধিনায়কের এরকম ব্যবহার সাজে না। যদিও বিরাট তখন ভারতের টেস্ট অধিনায়ক হয়ে গিয়েছেন।

২০১৮ সালে বিরাটের কোপে পড়েন এক ক্রিকেটপ্রেমীও। দোষের মধ্যে, তিনি বলেছিলেন ভারতের চেয়ে অন্য দেশের ব্যাটারদের খেলা দেখতে তাঁর বেশি ভালো লাগে। বিরাট তাঁকে সটান বলে দেন, তাহলে অন্য দেশে গিয়েই থাকা উচিত। দেশের শাসক দল বিজেপি ও তার ট্রোলরা তখন অনলাইন এবং অফলাইন — সর্বত্র সরকারবিরোধী কথা বললেই পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে। অবশ্য এরকম প্রতিধ্বনিতে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। কারণ ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী আচমকা নোটবন্দির ঘোষণা করার সাতদিন পরে সাংবাদিক সম্মেলনে বিরাট বলেছিলেন, ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ওটা তাঁর দেখা সেরা সিদ্ধান্ত।  বিরাট ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস কতখানি জানেন সে প্রশ্ন তোলা নিষ্প্রয়োজন, কারণ যিনি গোট তিনি তো কেবল খেলার গোট নন, তিনি সর্বজ্ঞ।

ব্র্যান্ডিংয়ের এমনই মহিমা, যে সাংবাদিক সম্মেলনে অপছন্দের প্রশ্ন শুনলেই রেগে যাওয়ার ধারাবাহিক ইতিহাস, কাগজে কী বেরোল তা নিয়ে সাংবাদিককে আক্রমণ করা এবং বিতর্কিত সরকারি সিদ্ধান্তকে সাত তাড়াতাড়ি সমর্থন করার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বিরাটের অধিনায়কত্ব নিয়ে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনে বড় অংশের বিজেপিবিরোধী মানুষ নিঃসন্দেহ, যে বিরাটকে সরিয়ে দেওয়া আসলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। মহম্মদ শামির পক্ষ নিয়ে কথা বলেছিলেন বলে অমিত শাহের নির্দেশে তাঁর পুত্র জয় শাহ ও বশংবদ সৌরভ গাঙ্গুলি মিলে বিরাটকে একদিনের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছেন, আর টেস্টের নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য করেছেন।

আরও পড়ুন সকলেই চুপ করে থাকবে, শামিকে মানিয়ে নিতে হবে

বিরাটের কথা উঠলেই যে দেশের বেশিরভাগ মানুষের যুক্তিবোধ ঘুমিয়ে পড়ে, সবটাই আবেগ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয় — এখানেই ব্র্যান্ড নির্মাতাদের সাফল্য। নানা মহল থেকে আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে প্রধানমন্ত্রী মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এখন আর আগের জায়গায় নেই। কিন্তু সর্বোচ্চ জনপ্রিয়তার সময়েও তিনি এভাবে ডান, বাম, মধ্যপন্থীদের এক করে ফেলতে পারেননি। রাজনীতিতে এবং সমাজে যেসব প্রবণতার চরম নিন্দা করে থাকেন মোদিবিরোধীরা, সেগুলোই বিরাটের মধ্যে দেখা গেলে সকলে জাতীয়তাবাদী হয়ে পড়েন। প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত পছন্দ হয়নি বলে অধিনায়ক সদলবলে হাস্যকর অসভ্যতা করলেও কেউ বলেন না, বিদেশের মাঠে অধিনায়ক প্রকৃতপক্ষে আমাদের রাষ্ট্রদূত। তিনি এই আচরণ করতে পারেন না, এর জন্যে শাস্তি হওয়া উচিত। উল্টে উঠে আসে বনলতা সেনগিরির যুক্তি (যাকে ইংরেজিতে বলা হয় হোয়াট্যাবাউটারি) — এরকম যখন সাহেবরা করত তখন কোথায় ছিলেন? এখন আমাদের জোর হয়েছে, তাই বিরাট করছে। বেশ করছে। রাজনীতিবিদদের গুন্ডাসুলভ কথাবার্তার যাঁরা অহরহ নিন্দা করেন, তাঁরাও বিরাটের নেতৃত্বাধীন দলের খেলার মাঠে অকারণ চিৎকার, খেলার পরেও সাংবাদিক সম্মেলনে এসে আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলাকে আগ্রাসনের যুক্তিতে সমর্থন করেন। বিজেপি কথিত যে ‘নিউ ইন্ডিয়া’ অনেকের প্রবল অপছন্দ, সেই ভারতের বৈশিষ্ট্যগুলোই বিরাটের শরীরী ভাষায় দেখে একই লোকেদের যে উল্লাস– সেটাই ব্র্যান্ডিংয়ের জয়পতাকা।

সরকারি দল, তাদের সাঙ্গোপাঙ্গ এবং সহায়ক সংবাদমাধ্যম যখন বলে তারা ক্ষমতায় আসার আগে ভারতে কোনো উন্নয়ন হয়নি, বিদেশে ভারতের কোনো সম্মান ছিল না, ভারতীয়রা ভীতু বলে পরিচিত ছিল; তখন প্রতিবাদ করার লোক পাওয়া যায়। অথচ শাস্ত্রী, বিরাট এবং তাঁদের ভগবান বানিয়ে তোলা সংবাদমাধ্যম গত কয়েক বছর ধরে প্রচার করে যাচ্ছেন ভারতীয় ক্রিকেট দল আগে আক্রমণাত্মক ছিল না, লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল না, ক্রিকেটাররা মুখের মত জবাব দিতে পারতেন না ইত্যাদি। এই প্রোপাগান্ডা হাঁ করে গিলছেন প্রায় সবাই। ইতিহাস বিকৃত করা অথবা অস্বীকার করার যে ধারা এ দেশে চালু হয়েছে, সেই ধারারই অংশ এসব। যেন ১৯৭৬ সালে পোর্ট অফ স্পেনে নেহাত মিনমিন করে মোহিন্দর অমরনাথ, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ, সুনীল গাভস্কররা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে চতুর্থ ইনিংসে ৪০৬ রান তুলে জয় ছিনিয়ে নিতে পেরেছিলেন। যেন স্টিভ ওয়র বিশ্বজয়ী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০০৩-০৪ মরসুমে সমানে সমানে লড়েনি ভারতীয় দল। যেন ১৯৮৩ বিশ্বকাপে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ১৭ রানে পাঁচ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর কপিলদেব অপরাজিত ১৭৫ করতে পেরেছিলেন লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা ছাড়াই। ১৯৮১ সালে আগের টেস্টেই বাউন্সারে আহত হয়ে হাসপাতালে চলে যাওয়া সন্দীপ পাতিলের অ্যাডিলেড টেস্টে ডেনিস লিলি, রডনি হগ, প্যাসকোকে বাইশটা চার আর একটা ছয় মেরে ১৭৪ রান করাও বোধহয় সম্ভব হয়েছিল আক্রমণাত্মক না হয়েই।

একটা প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত বিপক্ষে যাওয়ায় বিরাট নেশাগ্রস্তের মত স্টাম্প মাইক্রোফোনে টিভি সম্প্রচারকারীকে ধমকেছেন, সহ অধিনায়ক কে এল রাহুল গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা দেশটাকেই অভিযুক্ত করেছেন। কিন্তু ম্যাচের পর বিরাট ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কয়েকটা অর্থহীন কথা বলেছেন। “মাঠের ভিতরে ঠিক কী ঘটছিল বাইরের লোকেরা তো জানে না, আমরা জানি। আমি এখন বলব না যে আমরা বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। কারণ তখন যদি আমরা চার্জড আপ হয়ে গোটা তিনেক উইকেট নিয়ে নিতাম তাহলেই খেলাটা ঘুরে যেত।” মনে করুন ২০০৭-০৮ মরসুমে সিডনি টেস্টের কথা। অস্ট্রেলিয় তৃতীয় আম্পায়ারের একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তে ভারত কোণঠাসা হয়, তারপর শেষ দিনে স্রেফ রিকি পন্টিংয়ের মিথ্যাচারে বিশ্বাস করে আম্পায়াররা সৌরভকে ড্রপ পড়া বলে আউট দেন, দল হেরে যায়। ভারত অধিনায়ক অনিল কুম্বলে মাঠের ভিতরে ছেলেমানুষের মত হাত-পা ছোঁড়েননি, চিৎকার করেননি। কিন্তু খেলার পর দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন “এখানে একটা দলই ক্রিকেটের স্পিরিট অনুযায়ী খেলছিল।” এসব লড়াকু মনোভাব নয়, আগ্রাসন নয়, সাহসিকতা নয় — এমনটাই শিখে গেছি আমরা।

বিরাটের নেতৃত্বে নতুন কী ঘটেছে আসলে? ভারতীয় দল অনেক বেশি জয়ের মুখ দেখেছে। অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবার, দ্বিতীয়বার টেস্ট সিরিজ জিতেছে। কিন্তু সেই জয় আকাশ থেকে পড়েনি। বিরাটের দলের এই স্মরণীয় জয়গুলো এসেছে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায়। সৌরভের আমলে শুরু হয়েছিল বিদেশে নিয়মিত টেস্ট ম্যাচ জেতা। জয়ের সংখ্যা বাড়ে ধোনির আমলে, বিরাটের আমলে আরম্ভ হয়েছে সিরিজ জয়। তার কৃতিত্ব অনেকটাই জোরে বোলারদের, নেতা হিসাবে অবশ্যই বিরাটেরও। উপরন্তু জয়ের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বিরাটের আমলে ভারত ইংল্যান্ডে সিরিজ জেতেনি, নিউজিল্যান্ডেও নয়। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা হয়নি, দক্ষিণ আফ্রিকাতেও দু’বারের চেষ্টায় প্রথমবার সিরিজ জিতে নতুন ইতিহাস তৈরি করা যায়নি। কিন্তু বিরাট বন্দনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এসব কথা বলতে গিয়েও ঠারেঠোরে জওহরলাল নেহরুকে ছোট করার ঢঙে আগের অধিনায়কদের এক হাত নেওয়া হয়। বলা হয় বিরাটের আগে কোনো অধিনায়ক নাকি জোরে বোলারদের এত গুরুত্ব দেননি। ঘটনা হল, আগে কোনো অধিনায়ক একসাথে এতজন ভাল জোরে বোলার পাননি। ভারতীয় ক্রিকেটে একসময় বিষাণ সিং বেদিকে বোলিং ওপেন করতে হয়েছে, এমনকী দু-একবার গাভস্করকেও। কারণ বিশ্বমানের জোরে বোলার কেউ ছিলেন না। সে পরিবর্তনও এসেছে ধারাবাহিকভাবেই।

প্রথমে এসেছেন কপিলদেব। তাঁর কেরিয়ারের শেষ প্রান্তে জাভাগাল শ্রীনাথ, পিছু পিছু ভেঙ্কটেশ প্রসাদ। পরবর্তীকালে জাহির খান, আশিস নেহরারা। ২০০৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছনো হত না পেস ত্রয়ীকে ছাড়া। সে ত্রয়ী তৈরিই হত না অধিনায়ক সৌরভ প্রায় অবসর নিয়ে ফেলা শ্রীনাথকে খেলতে রাজি না করালে। সৌরভের সময়েই সাড়া জাগিয়ে এসেছিলেন ইরফান পাঠান, যাঁর অলরাউন্ডার হতে গিয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া ভারতীয় ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি। রাহুল দ্রাবিড় অধিনায়ক থাকার সময়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ভারতের হয়ে অল্প কিছুদিন রীতিমত গতিময় বোলিং করেছিলেন মুনাফ প্যাটেল আর বিক্রম রাজবীর সিং। প্রথম জন ক্রমশ গতি কমিয়ে ফেলেন, দ্বিতীয় জন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিকে থাকতে পারেননি। রাহুলের আমলেই উঠে এসেছিলেন শান্তাকুমারণ শ্রীশান্ত, রুদ্রপ্রতাপ সিংরা। ইতিমধ্যে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের আর্থিক সঙ্গতি বেড়েছে, জোরে বোলারদের প্রতি যত্ন বেড়েছে, ঘরোয়া ক্রিকেটে জোরে বোলিং সহায়ক পিচ তৈরিও শুরু হয়েছে। যশপ্রীত বুমরা, মহম্মদ শামিদের রাত্রির বৃন্ত থেকে ফুটন্ত সকাল ছিঁড়ে আনার মত করে বিরাট নিয়ে আসেননি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার সুযোগ না পাওয়া একজন অধিনায়কের পক্ষে তা সম্ভবও নয়।

এসব গোপনীয় তথ্য নয়, কিন্তু এখন কারো মনেই পড়ে না। কারণ আমাদের মুখ ঢেকেছে বিজ্ঞাপনে, আর বিজ্ঞাপন ঢেকেছে বিরাটের মুখে। তাই একদিনের ক্রিকেটের দল একের পর এক বিশ্ব স্তরের টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হোক, বিরাটকে সরানো চলবে না। তিনি বিবৃতি দেবেন “টেস্ট আর একদিনের দলের নেতৃত্ব দিতে তৈরি থাকার জন্য টি টোয়েন্টির নেতৃত্ব ছেড়ে দিচ্ছি।” তবু আমাদের মনে হবে না, ভদ্রলোক অধিনায়কত্বকে জমিদারি মনে করছেন। তিনি গোট, তাঁর সাত খুন মাফ।

বস্তুত, ব্র্যান্ডিংয়ের ফাঁদ থেকে বেরোতে পারলে দেখতে পেতাম, বিরাট (৯৯ টেস্টে ৭৯৬২ রান, গড় ৫০.৩৯, শতরান ২৭) টেস্ট ক্রিকেটে দারুণ এবং নিজের সময়ের সেরা ব্যাটারদের অন্যতম। কিন্তু গোট তো নয়ই, তাঁকে সর্বকালের সেরাদের একজন বলার সময়ও আসেনি। তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে স্টিভ স্মিথ (৮২ টেস্টে ৭৭৮৪ রান, গড় ৫৯.৮৪, শতরান ২৭), কেন উইলিয়ামসন (৮৬ টেস্টে ৭২৭২ রান, গড় ৫৩.৪৭, শতরান ২৪) বরং তাঁর চেয়ে বেশি ধারাবাহিক। কেবল রানের দিক থেকে টেস্টের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা দশে ঢুকতে হলেও বিরাটকে এখনো জনা কুড়ি খেলোয়াড়কে টপকাতে হবে। শুধু ভারতীয়দের মধ্যেও তিনি আপাতত ছয় নম্বরে। দলের জন্য যা আরও চিন্তার, তা হল গত কয়েক বছরে তাঁর পারফরম্যান্স গ্রাফ ক্রমশ নামছে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে শেষ শতরানের পর থেকে হিসাব করলে তাঁর গড় ২৮.১৪।

আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে তিনি এই মুহূর্তে রানের দিক থেকে দু’নম্বরে, গড়ে এক নম্বর (৯৫ ম্যাচে ৩২২৭ রান, গড় ৫২.০৪), অধিনায়কত্বের রেকর্ডও ভাল। একদিনের ক্রিকেটের অধিনায়কত্বের রেকর্ডও নিঃসন্দেহে ঈর্ষণীয়, কিন্তু দুঃখের বিষয় সাদা বলের ক্রিকেটে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জয়ের বিশেষ মূল্য নেই আজকের ক্রিকেটে। কারণ টি টোয়েন্টি যুগে দলগুলোর দ্বিপাক্ষিক ওয়ান ডে ম্যাচ খেলার আগ্রহ ক্রমশ কমছে। চার বছর অন্তর ৫০ ওভারের বিশ্বকাপের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে এক বছর অন্তর টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। অর্থাৎ একটি দল পাঁচ বছরে চারটি বিশ্বকাপ খেলছে। সুতরাং দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলো বিশ্বকাপের প্রস্তুতি মাত্র। লক্ষ করে দেখুন, অস্ট্রেলিয়ার যে দল সদ্য ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি জিতল, সেই দলের সঙ্গে কিছুদিনে আগেই যে দল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজ হেরেছিল তার বিস্তর তফাত। সুতরাং বিশ্বকাপে বা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে রান করতে না পারলে বা ট্রফি জিততে না পারলে অন্য সময়ের ফলাফলের বিশেষ গুরুত্ব থাকে না। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এখন প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে আইপিএলের মত ফ্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট। সেখানে ব্যাটে প্রচুর রান থাকলেও নেতা বিরাট কিন্তু চূড়ান্ত ব্যর্থ। রয়াল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের নেতা হিসাবে তাঁর প্রাপ্তি শূন্য।

যে ক্রিকেটে বিরাট সত্যিই সর্বকালের সেরাদের আসনের দাবিদার, তা হল একদিনের ক্রিকেট (২৫৫ ম্যাচে ১২২২০ রান, গড় ৫৯.০৩, শতরান ৪৩)। এখানে তাঁর সমসাময়িকরা কেউ ধারে কাছে নেই। শচীনের ৪৯ শতরানের রেকর্ডের থেকে মাত্র ছয় ধাপ দূরে আছেন বিরাট। গড়ের দিক থেকে তিনি আপাতত তিন নম্বরে, কিন্তু সামনের দু’জন খেলেছেন মাত্র গোটা তিরিশেক ম্যাচ। দুশোর বেশি ম্যাচ খেলেছেন এমন ক্রিকেটারদের মধ্যে তাঁর ব্যাটিং গড়ই সর্বোচ্চ। কিন্তু মুশকিল হল, ৫০ ওভারের খেলায় যাঁরা সর্বকালের সেরা হিসাবে সর্বজনস্বীকৃত, অর্থাৎ ভিভ রিচার্ডস, শচীন, রিকি পন্টিং, সনৎ জয়সূর্য, কুমার সঙ্গকারা বা ধোনি — তাঁদের বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের পাশে বিরাট ফ্যাকাশে (২৬ ম্যাচে ১০৩০ রান, গড় ৪৬.৮১, শতরান ২)। অথচ খেলে ফেলেছেন তিনটে বিশ্বকাপ। বিশেষত নক আউট স্তরে তাঁকে একবারও স্বমহিমায় দেখা যায়নি। বিশ্বকাপে রান এবং শতরানের দিক থেকে সবার উপরে থাকা শচীন তো বটেই, তিলকরত্নে দিলশান (২৭ ম্যাচে ১১১২ রান, গড় ৫২.৯৫, শতরান ৪), হার্শেল গিবসের (২৫ ম্যাচে ১০৬৭ রান, গড় ৫৬.১৫, শতরান ২) মত ক্রিকেটারদেরও বিরাটের চেয়ে বেশি স্মরণীয় পারফরম্যান্স রয়েছে। ফর্ম থাকলে আগামী বছর ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে হয়ত তিনি এই অভাব পুষিয়ে দেবেন।

একথা ঠিক যে পরিসংখ্যান দিয়ে সব কিছু প্রমাণ হয় না। কারণ পরিসংখ্যানে ধরা থাকে না পিচের অবস্থা, ম্যাচের পরিস্থিতি বা খেলোয়াড়ের শারীরিক অসুবিধা। ধুম জ্বর গায়ে বা বাউন্সারে মাথা ফেটে যাওয়ার পর করা ৩০ রানের মূল্য পরিস্থিতির বিচারে শতরানের চেয়েও বেশি হয় অনেকসময়। ব্যাটিংয়ের ল্যাজকে সঙ্গে নিয়ে আহত ভিভিএস লক্ষ্মণের অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট জেতানো ইনিংসের মূল্য সংখ্যায় মাপা যায় কখনো? গত বছর রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর হনুমা বিহারীর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট বাঁচানো জুটির ওজনও ওই ম্যাচের স্কোরকার্ড দেখে উপলব্ধি করা যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা, ব্যাটিং কতটা ভাল তা প্রতিপক্ষের বোলিংয়ের মান না জেনে বিচার করা মূর্খামি। কারণ ক্রিকেট খেলায় একমাত্র বোলিংটাই ক্রিয়া; ব্যাটিং আর ফিল্ডিং হল প্রতিক্রিয়া।

কিন্তু পরিসংখ্যান বাদ দিয়ে আলোচনা করলে বিরাটকে আর তত বিরাট মনে হবে না হয়তো। কারণ তখন বলতেই হবে, তাঁর কেরিয়ারের বড় অংশে সারা পৃথিবীতে এমন জোরে বোলার বিরল, যিনি যে কোনো পিচে যে কোনো আবহাওয়ায় দিনের যে কোনো সময়ে ঘন্টায় নব্বই মাইল বা তার বেশি গতিতে বল করতে পারেন। বড়জোর অস্ট্রেলিয়ার মিচেল জনসন আর দক্ষিণ আফ্রিকার ডেল স্টেইন, মর্নি মর্কেলের কথা ভাবা যেতে পারে। নব্বই আর শূন্য দশকে কার্টলি অ্যামব্রোস, কোর্টনি ওয়ালশ, প্যাট্রিক প্যাটারসন, অ্যালান ডোনাল্ড, শোয়েব আখতার, ব্রেট লি, শেন বন্ডরা ছিলেন। সত্তর ও আশির দশকে ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভয় ধরানো পেস চতুর্ভুজ, অস্ট্রেলিয়ার লিলি-থমসন, নিউজিল্যান্ডের রিচার্ড হেডলি, ইংল্যান্ডের বব উইলিস, পাকিস্তানের আক্রাম-ইউনিস। আরও বলতে হবে, তত গতিময় না হলেও এখন মিচেল স্টার্ক, জশ হেজলউড, জেমস অ্যান্ডারসন, স্টুয়ার্ট ব্রড, টিম সাউদিদের মত সুইং ও সিম করাতে পারা বোলাররা আছেন। কিন্তু বিশ্বমানের স্পিনার বলতে শুধু নাথান লায়ন। আজাজ প্যাটেল যতই এক ইনিংসে দশ উইকেট নিন, নিউজিল্যান্ড স্পিন সহায়ক উইকেট নয় বলে পরের ম্যাচেই তাঁকে খেলায়নি। আর ছিলেন ইয়াসির শাহ, কিন্তু রাজনৈতিক কারণে বিরাটের তাঁর বিরুদ্ধে খেলা হয়নি। অত্যন্ত মাঝারি মানের অ্যাডাম জাম্পা বা আদিল রশিদের বিরুদ্ধে কিন্তু বিরাটকে স্বচ্ছন্দ দেখায় না।

২০১১ সালের অক্টোবর মাসে ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা আইসিসি ৫০ ওভারের খেলা দু প্রান্ত থেকে দুটি আলাদা বলে খেলা হবে — এই নিয়ম চালু করে। আগে একটি বলেই গোটা ইনিংস খেলার নিয়ম ছিল। সাধারণত ৩৫-৪০ ওভার নাগাদ সেই বলের সাদা রং নষ্ট হয়ে গিয়ে ব্যাটারদের দেখতে অসুবিধা হত, বল নরম হয়ে যাওয়ায় মারতে অসুবিধায় পড়তে হত, অনেকসময় বলের আকৃতিও যেত বিগড়ে। তেমন হলে আম্পায়াররা বল বদলাতে পারবেন, কিন্তু সেই বল আনকোরা নতুন হবে না, হবে একটু পুরনো বল। আগে হয়ে যাওয়া খেলাগুলোর মাঠ থেকে সংগ্রহ করে আনা অনেকগুলো বলের মধ্যে থেকে আম্পায়াররা বল বেছে নেবেন — এই ছিল নিয়ম। দুটো বলে খেলা শুরু হওয়ায় রিভার্স সুইং প্রায় বন্ধ, কারণ বল তেমন পুরনো হচ্ছে না। একই কারণে স্পিনারদের পক্ষে বল ঘোরানোও বেশি শক্ত হয়ে গেছে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের প্রভাবে বাউন্ডারিও যে ছোট করে ফেলা হয়েছে, সচেতন টিভি দর্শকও তা বুঝতে পারেন। স্বভাবতই ব্যাটিং আগের চেয়ে সহজ হয়েছে। শতরানের সংখ্যা বেড়েছে, আগে ব্যাট করলে তিনশো রান করে নিশ্চিন্ত থাকার দিন শেষ।

১৯৭০ সালের ৫ জানুয়ারি খেলা হয়েছিল প্রথম একদিনের ক্রিকেট ম্যাচ, আর প্রথম দ্বিশতরান এসেছিল ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার মহিলা ক্রিকেটার বেলিন্দা ক্লার্কের ব্যাট থেকে। পুরুষদের ক্রিকেটে দ্বিশতরান এসেছে আরও ১৩ বছর পরে শচীনের ব্যাট থেকে। অথচ ২০১১ থেকে গত ১১ বছরে বীরেন্দ্র সেওয়াগ, ক্রিস গেল, মার্টিন গাপ্টিল, ফখর জমান — সকলেই দ্বিশতরান করেছেন। একা রোহিত শর্মাই তিনটে দ্বিশতরানের মালিক। একদিনের ক্রিকেটে যাঁদের গড় পঞ্চাশের বেশি, তাঁদের মধ্যে মাইকেল বিভান আর নেদারল্যান্ডসের রায়ান টেন দুশখাতাকে বাদ দিলে সকলেরই কেরিয়ারের বেশিরভাগ সময় কেটেছে ২০১১ সালের অক্টোবরের পরে।

বলা বাহুল্য, এসব পরিবর্তন বিরাটের সুবিধা হবে বলে কেউ করে দেয়নি। তিনি যে নিয়মে খেলার সুযোগ পেয়েছেন, তার মধ্যে নিজের সেরা পারফরম্যান্স দিয়েছেন। কিন্তু সর্বকালের সেরাদের পাশে বসাতে হলে বা একেবারে গোট বলতে হলে এমন তুল্যমূল্য আলোচনা যে করতেই হয়। আসলে ওসব ব্র্যান্ডিংয়ের কারসাজি। আশা করা যায় ভক্তরা না বুঝলেও বিরাট নিজে সে কথা বোঝেন, ফলে মেসিসুলভ মূঢ়তায় কোনো লম্বকর্ণের সঙ্গে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন না। এখনো যে অনেক কিছু অর্জন করা বাকি আছে, তা বুঝলে তিনি আরও বড় ক্রিকেটার হতে পারবেন। ভারতীয় দলও আরও অনেক বেশি জয়ের মুখ দেখবে। ইতিহাস পারফরম্যান্স বোঝে। মন কি বাত বোঝে না, স্টাম্প মাইক কি বাতও বোঝে না।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

Cape Town highlights Indian cricket’s superhero complex

From the aggressive, expressive Kohli to the usually calm Ashwin, everyone now thinks this is acceptable on-field behaviour.

Virat Kohli at Cape Town. Photo from Twitter

No true Amitabh Bachchan fan can forget the scene from the movie Amar Akbar Anthony, where he (the character of Anthony) talks to the mirror and scolds himself for drinking, blames getting badly beaten up on being drunk, then pastes a band-aid on the mirror instead of his wounds. Likewise, no ardent Virat Kohli fan will be able to forget the scene from Cape Town, where he talks to the stump microphone and scolds the TV broadcaster for ‘siding’ with the home team. Intoxication made Anthony’s behaviour plausible in Prayag Raj’s screenplay, but the screenplay writer of Kohli’s biopic will find it hard to make this stump mic scene plausible for cinema-goers of the future, who may have not watched it live.

How would the screenplay writer show what was going through Kohli’s mind? Being the Indian captain and having spent 14 years in international cricket, it is not possible that he did not know how the Decision Review System (DRS) works, or that HawkEye is not owned by Cricket South Africa. Then what prompted the overreaction? Was he more angry with himself because of his failure with the bat despite spending a lot of time at the crease, and needed somebody to shout at? Was it the feeling that the final frontier is slipping away, despite South Africa having a less experienced, perhaps less talented team?

The role of Ravichandran Ashwin makes the scene more baffling. One can understand Ashwin’s frustration. His place in the playing XI for overseas Tests has been uncertain under Kohli, and he went wicketless in the first innings at Cape Town, the series decider. That after picking up just three wickets in the first two Tests. The wicket of Dean Elgar at that point could have turned the match on its head and proved to everyone how valuable Ashwin is even in conditions not conducive to spin bowling. But a thinker like Ashwin should have been able to contain his emotions instead of putting up a spectacle that would only convey a wrong message to young cricketers — that everyone in the world is conspiring against you. And whenever a decision goes in your opponent’s favour, you should cry “murder”.

But which invisible monster was KL Rahul fighting in that scene? When the umpire who raised the finger against Elgar is a South African himself, how did Rahul get the idea that the entire country is fighting against 11 Indians? Has watching too much Bollywood on OTT done this to the elegant batter?

Answers to those questions shall not lead us anywhere because what happened on January 13 shows it is not about individuals anymore. From the aggressive, expressive Kohli to the usually calm Ashwin, everyone now thinks this is acceptable on-field behaviour. Therefore, we need to ask how and why they arrived at this conclusion. In fact, using the word ‘they’ would be holier-than-thou because the reaction of most cricketers, ex-cricketers and fans on social media show that most of us have arrived at that conclusion. Only a handful have said this behaviour is unacceptable and have been trolled for that.

This is not the first time a DRS call has gone against India and raised eyebrows. Mayank Agarwal’s LBW in the first Test is fresh in everyone’s memory, but at least some remember the dismissal of Rahul Dravid on his last England tour. DRS declared him out caught while the truth is he had only hit his shoelaces. Why did he not scream afterwards, not allege conspiracy? Why has the sky fallen now? One can always say Dravid, Sachin Tendulkar, Sourav Ganguly et al were softer human beings; as opposed to the bold, new Indian team built by Kohli and Ravi Shastri.

But the former lot had had their share of bad boy moments, most memorably, the Mike Dennes moment in South Africa. That was the first time the Board of Control for Cricket in India (BCCI) showed its monetary might to oppose the punishment meted out to six of its cricketers. Call it bold or arrogant, the board at least had the decency to negotiate matters with the International Cricket Council (ICC) after the heat of the moment evaporated. While five Indian cricketers had their one-Test ban overturned, Virender Sehwag had to serve it. Reason why that generation knew, no matter how big a stars they were, over-the-top reactions shall have consequences.

That is not the case with the current lot. BCCI’s coffers have grown in leaps and bounds since the Dennes incident. Today, the BCCI, with its rich brethren from England and Australia, decides who and how much they will play. Moreover, the BCCI has the Indian Premier League — a league everyone wants a piece of. The likes of Kohli, Ashwin and Rahul know they can live on their own terms, even if that goes against all norms.

Hence Kohli’s proud post-match remarks: “We understood what happened on the field and people on the outside don’t know exact details of what goes on on the field.” On one hand, this is a back-handed compliment to the BCCI. As if Kohli knows whatever his differences with the board president, that chair is so powerful that ICC would not dare to punish his employees. On the other hand, this is a warning to everyone concerned: if a technological error goes against us again, we shall deal with it this way.

To be fair to Kohli, Ashwin and Rahul, it is Mahendra Singh Dhoni who first showed an Indian cricketer is above the game. During the 2019 IPL game between his franchise Chennai Super Kings and Rajasthan Royals, he went straight into the ground to protest a no-ball decision reversed by the leg umpire. For such an unprecedented and uncouth behaviour, Captain Cool was only fined 50% of his match fee.

Like it or not, Indian cricketers are superheroes in the eyes of a lot of people, including themselves. Unfortunately, they do not have somebody like Spiderman’s uncle, who would pronounce “With great power, comes great responsibility.” So Cape Town can any day be repeated in Christchurch, Kanpur or Kandy. Endless whataboutery can be done to justify our superheroes. The problem is, superheroes can soar above rule of law but not laws of nature. What will happen if both teams on the pitch grow the superhero complex some day? Are we betting on the TRP of a Rashid Patel versus Raman Lamba rerun during an international match?

Published on https://newsclick.in

এরপর কি মাঠে কুস্তি লড়বেন বিরাট কোহলিরা?

কেপটাউন টেস্টের তৃতীয় দিনে বিরাট কোহলি। ছবি টুইটার থেকে

যন্ত্রের যন্ত্রণা কথাটা নতুন নয়। কিন্তু যন্ত্র মানুষের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করে — এ অভিযোগ নিঃসন্দেহে নতুন। সাই ফাইয়ের ভক্তরা অবশ্য বলবেন ভবিষ্যতে যন্ত্রেরা মন্ত্রণা করে মানুষের ভিটেমাটি চাটি করবে। আশঙ্কাটা হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়, কিন্তু তখনো মানুষ আর যন্ত্র একে অপরের বিরুদ্ধে লড়বে বলেই তো মনে করা হয়। যন্ত্র আমার সাথে ষড় করে আপনাকে বিপদে ফেলবে — এমনটা এখনো কোনো হলিউডি চিত্রনাট্যকারের মাথায় আসেনি। তবে ভারতীয় ক্রিকেটাররা যে সে লোক নন। তাঁরা আমার আপনার চেয়ে কিঞ্চিৎ উচ্চস্তরের জীব বইকি। তাই গতকাল কেপটাউনের তৃতীয় টেস্টে ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক ডীন এলগারকে এল বি ডব্লিউ হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল দেখে সরোষে ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলি, তাঁর সহকারী কে এল রাহুল, আর বর্ষীয়ান ক্রিকেটার রবিচন্দ্রন অশ্বিন প্রযুক্তির, সম্প্রচারকারীর এবং দক্ষিণ আফ্রিকা দেশটার শাপ শাপান্ত করেছেন।

সুকুমার রায় লিখেছিলেন “ছায়ার সাথে কুস্তি করে গাত্রে হল ব্যথা।” এ যে “আজগুবি নয়, আজগুবি নয়, সত্যিকারের কথা —” বিরাটদের কাণ্ড না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত হত। উইকেটের সামনে গিয়ে স্টাম্প মাইক্রোফোনের উপর ঝুঁকে পড়ে মাঠে অনুপস্থিত লোকেদের গাল দেওয়া যত না ক্রিকেটারসুলভ তার চেয়ে বেশি জনি লিভারসুলভ। হাস্যকর দিকটা বাদ দিলে, এই আচরণ হল অসভ্যতা। এক দশক আগেও একে অসভ্যতাই বলা হত, ইদানীং সভ্যতার সংজ্ঞা বিস্তর বদলেছে। তাই ভারতের ক্রিকেটার, প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক প্রমুখ কাল থেকে নানারকম নরম ব্যাখ্যা দিচ্ছেন:

ক) “আসলে ওরা প্রাণ দিয়ে খেলে তো, এত বাজে সিদ্ধান্ত হলে কি আর মাথার ঠিক রাখা যায়?”

খ) “ক্রিকেটাররাও তো মানুষ। উত্তেজনার মুহূর্তে আবেগ এসে পড়া স্বাভাবিক।”

গ) “ঝোঁকের মাথায় করে ফেলেছে।”

আরও নানারকম ব্যাখ্যা সোশাল মিডিয়ায় দেখা গেছে, তালিকা দীর্ঘতর করা নিষ্প্রয়োজন। ধারাভাষ্যের জগতে ভারতের প্রবীণতম প্রতিনিধি সুনীল গাভস্কর। তিনি ভাল করেই জানেন, টেস্টে ১০,১২২ রান যতই ক্রিকেটের ইতিহাসে তাঁর আসন পাকা করে থাকুক, সেটা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কমেন্ট্রি চুক্তির গ্যারান্টি নয়। তাই গতকাল খেলার পর মার্ক নিকোলাস আর শন পোলকের সাথে বিতর্কিত মুহূর্তগুলো নিয়ে আলোচনা করার সময়ে তিনি কেবল এলগার আউট ছিলেন কিনা, তা নিয়েই কথা বলে গেলেন। ভারতীয় ক্রিকেটারদের অন্যায় আচরণ সম্বন্ধে ভাল বা মন্দ একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না। হাতে গোনা কয়েকজন সত্যি কথাটা বলার সাহস করেছেন, যেমন বাংলার ক্রিকেটার এবং একদা অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলে বিরাটের সতীর্থ শ্রীবৎস গোস্বামী। তাঁকে যে পরিমাণ ট্রোলিংয়ের স্বীকার হতে হয়েছে, তা প্রমাণ করে ‘নতুন’ ভারতে অভদ্রতা পূজনীয়, ভদ্রতা বর্জনীয়।

কোনো সুস্থ দেশে গতকালের ঘটনার আলোচনায় এলগার আউট ছিলেন কি ছিলেন না তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে না। কারণ সে দেশের অধিকাংশ মানুষ মানবেন, ক্রিকেটে আউট থাকা সত্ত্বেও আউট না হওয়া, আর আউট না হওয়া সত্ত্বেও আউট হয়ে যাওয়া চলতেই থাকে। সে জন্যে মন খারাপ হতে পারে, মাথা গরম হতে পারে। কিন্তু গোটা দেশটা আমাদের দলের বিরুদ্ধে লড়ছে, মেজাজ হারিয়ে এরকম মন্তব্য করার অধিকার কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের নেই। কিন্তু আজকের ভারতকে নিঃসংশয়ে সুস্থ দেশ বলা চলে না। দেশপ্রেমিকরাই বলে থাকেন, এখানকার যুবসমাজ নাকি এতটাই অসুস্থ, যে পিতৃমাতৃহীন হওয়ার শোকে তারা মুসলমান মহিলাদের কাল্পনিক নিলাম করার অনলাইন অ্যাপ তৈরি করে। আলোচনা যখন এমন একটা দেশে দাঁড়িয়ে হচ্ছে, তখন বিরাটদের আচরণ যে অন্যায় তা প্রমাণ করার জন্যে এলগার আউট ছিলেন কিনা সে আলোচনায় না গিয়ে উপায় নেই।

ক্রিকেট খেলায় যতরকম আউটের সিদ্ধান্ত হয়, তার মধ্যে চিরকালই সবচেয়ে বিতর্কিত লেগ বিফোর উইকেট বা এল বি ডব্লিউ। কারণ অন্য সব আউটের ক্ষেত্রেই যা ঘটেছে তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এল বি ডব্লিউয়ের ক্ষেত্রে আম্পায়ার সিদ্ধান্ত নেন কী হতে পারত। বল যখন ব্যাটারের পায়ে লাগল তখন যদি পা-টা সেখানে না থাকত, তাহলে কি বলটা উইকেটে গিয়ে লাগতে পারত? যদি আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত হ্যাঁ হয়, তাহলে তিনি তর্জনী তুলে ব্যাটারের মৃত্যুঘন্টা বাজিয়ে দেন। নাহলে ব্যাটার বেঁচে যান। যখন লাইভ টিভি ছিল না তখনকার কত আউট যে আসলে আউট ছিল না, আর কত নট আউট আসলে আউট ছিল, আমরা কখনো জানতে পারব না। ডিসিশন রিভিউ সিস্টেমের বয়স মাত্র ১৪ বছর (চালু হওয়ার সময়ে নাম ছিল আম্পায়ার ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম)। ফলে লাইভ টিভি চালু হওয়ার পরেও দীর্ঘকাল এল বি ডব্লিউ বোলিং প্রান্তের আম্পায়ারের বিবেচনার উপরেই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল। ইদানীং ইউটিউব আর টুইটারের কল্যাণে সেই সময়কার বহু আউট নিয়েই হাসাহাসি চলে, কারণ দেখা যায় বহু ব্যাটার কোনো যুক্তিতেই আউট ছিলেন না, আম্পায়ার আউট দিয়েছেন। অনেকে আবার বল ব্যাটে খেলেও এল বি ডব্লিউ আউট হয়েছেন। প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতিতে বিপুল পরিমাণ টিভি দর্শকের চোখে আম্পায়ারের ভুল (ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত) নগ্নভাবে ধরা পড়ার কারণেই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল (আই সি সি) প্রথমে রান আউট ইত্যাদির জন্য তৃতীয় আম্পায়ার, পরে ডি আর এস চালু করতে বাধ্য হয়েছিল। ডি আর এসের আগেই এসেছে নিরপেক্ষ আম্পায়ার নিয়োগের নিয়ম। নব্বইয়ের দশকেও অনেকদিন যে দেশে খেলা হত, সে দেশেরই দুই আম্পায়ার খেলা পরিচালনা করতেন। কিন্তু বিশেষত এল বি ডব্লিউ আউটের ক্ষেত্রেই সন্দেহ জোরদার হয়ে উঠেছিল, যে আম্পায়াররা নিজের দেশের ব্যাটারদের ইচ্ছা করে আউট দেন না, আর প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের আউট না হলেও আউট করে দেন। সেই কারণেই প্রথমে চালু হয় টেস্ট ক্রিকেটে দুজন, একদিনের ক্রিকেটে একজন নিরপেক্ষ দেশের আম্পায়ার নিয়োগ। পরে আসে ডি আর এস। অর্থাৎ এল বি ডব্লিউয়ের সিদ্ধান্তকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে না দেওয়া ডি আর এস প্রবর্তনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তাই ডি আর এস যতগুলো প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তার অন্যতম হল হকআই। এল বি ডব্লিউয়ের আবেদন হলে এখন আম্পায়ার প্রথমে দ্যাখেন নো-বল ছিল কিনা, কারণ নো-বলে রান আউট ছাড়া অন্য আউট হয় না। তারপর দ্যাখেন বলটা লেগ স্টাম্পের বাইরে পিচ পড়েছিল কিনা। তেমনটা হয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী তখনই আবেদন বাতিল হয়ে যায়। সেখানেও সব ঠিকঠাক থাকলে স্নিকোমিটার বা হটস্পট দিয়ে দ্যাখেন বল পায়ে লাগার আগে ব্যাটে লেগেছিল কিনা। কারণ আগে ব্যাটে লাগলে আর লেগ বিফোর উইকেটের প্রশ্ন ওঠে না। সব শেষে আসে বল ট্র্যাকিং, অর্থাৎ পা ওখানে না থাকলে বলটা উইকেটে গিয়ে লাগত কিনা। বল ট্র্যাকিং প্রযুক্তি বলের সিম, স্পিনের সঙ্গে সঙ্গে পিচের বাউন্সও বিচার করে। ভারত বা শ্রীলঙ্কার পিচে বল যে মাটিতে পড়ার পর কম লাফায়, অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকায় বেশি — বল ট্র্যাকিংকে তা শেখানো আছে। ডীন এলগারের বেলায় যে দেখানো হয়েছে বল উইকেটের উপর দিয়ে চলে যেত, তা এই কারণেই ঘটেছে। এমন নয় যে বল ট্র্যাকিং অভ্রান্ত। এই সিরিজেরই প্রথম টেস্টে মায়াঙ্ক আগরওয়ালের বিরুদ্ধে আবেদন রিভিউ করতে গিয়ে দেখিয়েছিল বল উইকেটে লাগছে, অথচ প্রায় সকলেরই মনে হয়েছিল পেস বোলারের ওই বল বেশি বাউন্সের কারণে উইকেটে লাগত না। প্রযুক্তিটা সঠিক কিনা, আরও ভাল হতে পারে কিনা — তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু হক আই একটি নিরপেক্ষ সংস্থা। ভারতে যখন কোনো সিরিজ হয় তখনো এই প্রযুক্তি তারাই সরবরাহ করে, সম্প্রচারকারী সংস্থার কোনো হাত থাকে না। অতএব দক্ষিণ আফ্রিকার টিভি সম্প্রচারকারী সুপারস্পোর্টের বিরুদ্ধে বিরাট আর অশ্বিনের বিষোদ্গার একেবারেই অকারণ।

কে এল রাহুলের অভিযোগ আরও অন্যায়। স্টাম্প মাইকে শোনা গেছে তিনি বলছেন গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা ভারতীয় দলের এগারোজনের বিরুদ্ধে লড়ছে। অথচ বোলিং প্রান্তের যে আম্পায়ার এলগারকে আউট দিয়েছিলেন, সেই মারায় ইরাসমাস দক্ষিণ আফ্রিকারই মানুষ। ১৯৯৪ সালে তৈরি হওয়া নিরপেক্ষ আম্পায়ারের নিয়ম কোভিড-১৯ অতিমারি চালু হওয়ার পর থেকে স্থগিত রয়েছে। আপাতত সমস্ত সিরিজেই যে দেশে খেলা হচ্ছে সে দেশের আম্পায়াররাই দায়িত্ব পালন করছেন। স্টাম্প মাইকে শোনা গেছে, টিভি আম্পায়ার এলগারকে আউট ছিলেন না বলার পর ইরাসমাস বলছেন “এ হতে পারে না।” আর আজ বাদে কাল যিনি ভারতের স্থায়ী অধিনায়ক হবেন, তিনি কিনা বলছেন গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা ভারতীয় দলের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে পড়েছে।

আসল সমস্যা বিরাট, রাহুল বা অশ্বিনের ঔদ্ধত্য নয়। সমস্যা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অর্থবলে (গোদা বাংলায় টাকার গরমে) আইসিসিকে ঠুঁটো জগন্নাথ করে রাখা। বিরাটরা জেনে গেছেন তাঁরা পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ডের কর্মচারী, তাই সব নিয়মকানুনের ঊর্ধ্বে। মাঠে গালিগালাজ করলে একসময় জরিমানা-টরিমানা হত, এখন ওগুলোকে আবেগের বহিঃপ্রকাশ বলে ধরা হয়। কারণ ভারতীয় ক্রিকেটারদের জরিমানা দিতে বলার ক্ষমতা আইসিসির নেই। ফলে গালিগালাজ মাঠের মধ্যেও সীমাবদ্ধ থাকে না। পরে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে রাহুলের মত আপাত ভদ্র ক্রিকেটার গ্যাং ওয়ারের ভাষায় বলেন “আমাদের একজনকে ঘাঁটালে আমরা এগারোজন মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ব।”

অভিজ্ঞ সাংবাদিক থেকে শুরু করে রকে বসা ক্রিকেট পণ্ডিত, ব্যক্তিগত জীবনে যথেষ্ট ভদ্র বিশ্লেষক থেকে শুরু করে পাড়ার বৌদি পর্যন্ত সকলের কাছেই এর সপক্ষে যুক্তি মজুত। প্রথমত, এটা আগ্রাসন, এটা ছাড়া জেতা যায় না। দ্বিতীয়ত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের যখন ক্ষমতা ছিল তখন ওরা এসব অনেক করেছে। এখন আমাদের ক্ষমতা আছে তাই করছি। বেশ করছি।

প্রথম যুক্তিটার মানে হল ক্লাইভ লয়েডের ওয়েস্ট ইন্ডিজ বা অর্জুন রণতুঙ্গার শ্রীলঙ্কা কোনোদিন কিচ্ছু জেতেনি। অজিত ওয়াড়েকর বা সৌরভ গাঙ্গুলির ভারতীয় দলের কথা ছেড়েই দিন। দেশে যেমন নরেন্দ্র মোদী সরকার আসার আগে কোনো উন্নয়ন হয়নি, তেমনি বিরাট কোহলি আর রবি শাস্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার আগে ভারতীয় ক্রিকেট দলও কখনো কিছু জেতেনি।

দ্বিতীয় যুক্তিটা আরও চমৎকার। বনলতা সেনগিরি (“এতদিন কোথায় ছিলেন?”) বাদ দিলেও যা পড়ে থাকে তা হল, আমরা অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের উপর প্রতিশোধ নিচ্ছি তাদের সঙ্গেই হাত মিলিয়ে। কারণ ক্রিকেটের খবর রাখলে আপনি নিশ্চয়ই জানেন, এই তিনটে দেশের ক্রিকেট বোর্ড এখন ‘বিগ থ্রি’। হাত মিলিয়ে আইসিসির রাজস্বের সিংহভাগ দখলে রেখে সংগঠনটিকে ঠুঁটো জগন্নাথ করে রেখেছে। এরা নিজেদের মধ্যেই খেলে বেশি, অন্যদের সাথে খেলে কম। তাই নিউজিল্যান্ড বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়ন হলেও ভারত তাদের সাথে দুটো টেস্টের বেশি খেলে না, ইংল্যান্ড নড়বড়ে দল হলেও তাদের বিরুদ্ধে খেলে পাঁচ টেস্টের সিরিজ।

বলতেই পারেন, জোর যার মুলুক তার। এভাবেই তো দুনিয়া চলছে। এতে আপত্তি করার কী আছে? ঠিক কথা। সমস্যা একটাই। এরপর আপনার ছেলেকে ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে পাঠানোর পাশাপাশি কুস্তি বা বক্সিংও শেখাতে হতে পারে। কারণ মাঠে মাথা গরম হলেই যা ইচ্ছে তাই বলা যখন নিয়ম হয়ে যাচ্ছে, তখন কদিন পরে যা ইচ্ছে তাই করাও নিয়ম হয়ে দাঁড়াতে পারে। ১৯৯০-৯১ দলীপ ট্রফির ফাইনালে রশিদ প্যাটেল আর রমন লাম্বার উইকেট আর ব্যাট নিয়ে মারামারি হয়ত আজকের বাবা-মায়েদের কারো কারো মনে আছে। সেদিন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড দুজনকে যথাক্রমে ১৩ মাস আর দশ মাসের জন্য নির্বাসন দিয়েছিল। এখন অবশ্য তেমন হওয়ার সম্ভাবনা কম। “ক্রিকেট কোনোদিনই ভদ্রলোকের খেলা ছিল না”, “এমন তো আগেও হয়েছে” ইত্যাদি যুক্তি আজকাল সবসময় তৈরি থাকে।

তথ্যসূত্র

১। https://cricketaddictor.com/india-tour-of-south-africa-2021/watch-virat-kohli-ravi-ashwin-kl-rahul-take-a-dig-at-broadcasters-after-dean-elgar-survives-due-to-drs-gaffe/

২। https://twitter.com/thefield_in/status/1481666634138136577?t=LjROQTTUwJIbCvy3p2M3Ew&s=03

৩। https://twitter.com/shreevats1/status/1481648590389149696?s=20

৪। https://www.hindustantimes.com/cricket/if-you-go-after-one-of-us-all-xi-will-come-right-back-rahul-england-s-sledging-against-bumrah-shami-101629168592536.html

৫। https://en.100mbsports.com/on-this-day-ugly-spat-between-rashid-patel-and-raman-lamba-breaks-out/

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

সকলেই চুপ করে থাকবে, শামিকে মানিয়ে নিতে হবে

পাকিস্তান ম্যাচে হিন্দুরা খারাপ পারফরম্যান্স করলে সন্দেহ করার কিছু নেই, মুসলমানকে সন্দেহ করতে হবে — এই মানসিকতার বিরুদ্ধে কুম্বলে, শচীনরা একটাও কথা বলেননি।

ঘটনা ১

রাজস্থানের বাসিন্দা নাফিসা আত্তারি গত মঙ্গলবার তাঁর চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন, বুধবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। কারণ তিনি সোশাল মিডিয়ায় রবিবারের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে পাকিস্তান জিতে যাওয়ার পর আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন[১ ]।
ঘটনা ২

কাশ্মীরের শ্রীনগরের শের-এ-কাশ্মীর ইনস্টিটিউট অফ মেডিকাল সাইন্সেস আর গভমেন্ট মেডিকাল কলেজের ছাত্রছাত্রী, ওয়ার্ডেন ও ম্যানেজমেন্টের লোকেদের বিরুদ্ধে কুখ্যাত ইউএপিএ আইনে মামলা দায়ের করেছে পুলিস। অভিযোগ পাকিস্তানের জয়ে উল্লাস করা, বাজি পোড়ানো ইত্যাদি। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা হয়নি, তবে পুলিস বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। ক্যাম্পাসে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে [২]।
ঘটনা ৩

রবিবার ভারত-পাক ম্যাচের পর একটি দক্ষিণপন্থী ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করা হয় যে মুসলমান পাড়ায় পাকিস্তান জেতার পর বাজি পোড়ানো হয়েছে। পুলিস তদন্ত করে দেখে যে ওই পাড়ায় সেদিন বিয়ে ছিল এবং বাজি আসলে সেখানেই পোড়ানো হচ্ছিল। যারা ফেসবুক পোস্টটি করেছিল, তারা দোষ স্বীকার করে লিখিতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। পুলিস তাদের প্রত্যেককে দিয়ে ২৫ হাজার টাকার বন্ড জমা করিয়েছে [৩]।
ঘটনা ৪

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেছেন পাকিস্তানের জয় যারা উদযাপন করেছে তাদের বিরুদ্ধে সিডিশন ল, অর্থাৎ দেশদ্রোহবিরোধী আইন প্রয়োগ করা হবে [৪ ]। আগ্রাতে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ইতিমধ্যেই ।

সব ঘটনা উল্লেখ করা গেল না, নিশ্চিতভাবেই অনেক ঘটনা বাদ পড়ে গেল। পাঠকরা নিজেদের জানা ঘটনা এই তালিকায় জুড়ে নিতে পারবেন। এমন ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা সম্ভব হলে তা কুড়ি বিশের বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের একমাত্র মুসলমান ক্রিকেটার মহম্মদ শামির কাছে পাঠানো যেতে পারে। তাতে তাঁর মানসিক যন্ত্রণার কিছু উপশম হলেও হতে পারে। কারণ এই ঘটনাগুলো জানলে তিনি বুঝতে পারবেন, পাকিস্তানের কাছে ভারত হেরে যাওয়ার পর থেকে তাঁকে যা সহ্য করতে হয়েছে তা ভারতের সাধারণ মুসলমানদের দুর্গতির তুলনায় কিছুই নয়। তাঁকে নাহক অনলাইন গালাগালি সহ্য করতে হয়েছে, জামিন অযোগ্য ধারায় পুলিশ কেস তো আর হয়নি। চাকরিও খোয়াতে হয়নি। বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ উঠেছে মাত্র, সে অভিযোগের ভিত্তিতে অন্তত গ্রেপ্তার করা হয়নি। শামির নিয়োগকর্তা যে ক্রিকেট বোর্ড, সে বোর্ডের সেক্রেটারি যখন খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র, তখন দেশে ফিরলেও যে শামিকে ৩.৫ ওভারে ৪৩ রান দেওয়ার জন্য গ্রেপ্তার করা হবে না তা নিশ্চিত করে বলা যায়। সে নিশ্চয়তা এ মুহূর্তে ভারতের অধিকাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বীর নেই।

ফুটবলপ্রেমীরা জানেন ১৯৬৯ সালে একটা ফুটবল ম্যাচের জন্য হন্ডুরাস আর এল সালভাদোরের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল [৫]। মানে খেলার জন্য যুদ্ধ হওয়ার ইতিহাস আছে। কিন্তু ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ হল যুদ্ধের জন্য খেলা — গত পাঁচ দিনের ঘটনাবলী তা প্রমাণ করে দিয়েছে। পাকিস্তানের গণতন্ত্র নিয়ে অতি বড় পাকিস্তানিও গলা তুলে কথা বলতে সঙ্কোচ বোধ করেন। আর ভারত এখন এত মহান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যে ক্রিকেট ম্যাচে অন্য দেশের দলকে সমর্থন করলে চাকরি হারাতে হয়, গ্রেপ্তার হতে হয়, এমনকি দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগেও অভিযুক্ত হতে হয়। কিন্তু সে কথা বললে অর্ধেক বলা হয়। কোনো ভারতীয় অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, এমনকি ইংল্যান্ডকেও সমর্থন করতে পারেন। জেলে যেতে হবে না। যত দোষ পাকিস্তানকে সমর্থন করলেই। কেবল অন্ধ ক্রিকেটভক্তরা নয়, ক্রিকেটাররা পর্যন্ত তা-ই মনে করেন। প্রাক্তন ক্রিকেটার গৌতম গম্ভীর রবিবারই টুইট করেছিলেন, যারা ভারতের জয়ে বাজি পোড়াচ্ছে তারা ভারতীয় হতে পারে না [৬]। তিনি অবশ্য এখন বিজেপি সাংসদ, তাই এমন মন্তব্য তাঁর থেকে অপ্রত্যাশিত নয়, কিন্তু বীরেন্দ্র সেওয়াগও তীর্যক টুইট করতে ছাড়েননি। তাঁর বক্তব্য দীপাবলিতে ভারতের বেশকিছু এলাকায় বাজি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, অথচ পাকিস্তান জেতার পরে লোকে বাজি পোড়াচ্ছে। তারা বোধহয় ক্রিকেটের জয় উদযাপন করছে। তাহলে দীপাবলিতেই বা বাজি পোড়ালে দোষ কী? এই ভণ্ডামির কী প্রয়োজন? সব জ্ঞান দীপাবলির বেলাতেই কেন [৭]? সীমান্তের ওপারের ওঁরাও কিছু কম যান না। এক মন্ত্রী বলেছেন এই জয় ইসলামের জয়। প্রাক্তন ক্রিকেটার ওয়াকার ইউনিস লাইভ টিভিতে বলেছেন, রিজওয়ানের ব্যাটিংয়ের চেয়েও তৃপ্তিদায়ক ব্যাপার হল হিন্দুদের মধ্যে গিয়ে নমাজ পড়া [৮]। অর্থাৎ এতগুলো লোক তক্কে তক্কে ছিল যুদ্ধ করবে বলে — ধর্মযুদ্ধ।

কিন্তু এতেও সবটা বলা হল না। কারণ পাকিস্তানে এখন পর্যন্ত বিরাট কোহলি চার-ছয় মারার সময়ে উল্লাস করার জন্য কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে খবর নেই। ওয়াকারকেও তাঁর মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করে টুইট করতে হয়েছে [৯]। কিন্তু সেওয়াগ, গম্ভীররা ওসবের ধারে কাছে যাননি। কারণ পাকিস্তানি মন্ত্রী, প্রাক্তন ক্রিকেটাররা যেমন শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করেছেন, এঁরা মনে করেন এঁরাও তেমনই শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করেছেন। কে সেই শত্রু? উত্তরটা খুব সোজা। কানে বাজির আওয়াজ এলেই যাদের সম্বন্ধে মনে হয় নির্ঘাত ওরাই পোড়াচ্ছে এবং পাকিস্তান জিতেছে বলেই পোড়াচ্ছে, তারাই শত্রু, তারাই দেশদ্রোহী। অর্থাৎ আপনি ভারতীয় হয়ে পাকিস্তানকে সমর্থন করেও বেঁচে যেতে পারেন, যদি মুসলমান না হন।

নেহাত গা জোয়ারি মন্তব্য করা হল? মুসলমানদের দিকে ঝোল টেনে কথা বলা হল মনে হচ্ছে? মহম্মদ শামিকে রাম, শ্যাম, যদু, মধুর ‘গদ্দার’ ইত্যাদি বলা দেখেই সে সন্দেহ দূর হয়ে যাওয়ার কথা। যদি তারপরেও সন্দেহ থাকে, তাহলে শামির সমর্থনে ভারতীয় প্রাক্তন ক্রিকেটারদের টুইটগুলো লক্ষ করবেন। গম্ভীর, সেওয়াগ তো বটেই; অনিল কুম্বলে [১০], ভারতীয় ক্রিকেটের মৌনীবাবা শচীন তেণ্ডুলকার [১১]— সকলেই শামির পক্ষে টুইট করেছেন। সকলেরই বক্তব্য মোটামুটি এক। শামি চ্যাম্পিয়ন বোলার; খেলার মাঠে একটা খারাপ দিন যে কোনো খেলোয়াড়ের যেতে পারে; শামি, আমরা তোমাকে ভালবাসি, ইত্যাদি। একজনও কিন্তু বলেননি, শামি ভারতের হয়ে ক্রিকেট খেলে, আমরাও ভারতের হয়ে খেলেছি। ওকে সন্দেহ করা আর আমাদের সন্দেহ করা একই কথা। যারা তা করে তাদের মত ফ্যান আমাদের দরকার নেই। ইংল্যান্ডের ফুটবল দলের অধিনায়ক হ্যারি কেন কিন্তু পেনাল্টি শুট আউটে গোল করতে ব্যর্থ কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলারদের সমর্থনে ঠিক এই কথাই বলেছিলেন। শচীনরা বলেননি, কারণ ওঁরা খুব ভাল করে জানেন শামি মুসলমান বলেই সে সন্দেহের পাত্র। উইকেট না পেলেও, মার খেলেও যশপ্রীত বুমরা, ভুবনেশ্বর কুমার, রবীন্দ্র জাদেজা সন্দেহের পাত্র নয়। পাকিস্তান ম্যাচে হিন্দুরা খারাপ পারফরম্যান্স করলে সন্দেহ করার কিছু নেই, মুসলমানকে সন্দেহ করতে হবে — এই মানসিকতার বিরুদ্ধে কুম্বলে, শচীনরা একটাও কথা বলেননি। তাঁরা তবু মুখ খুলেছেন, অধিনায়ক ডাকাবুকো কোহলির থেকে পাওয়া গেছে বিরাট নীরবতা। সমালোচকদের বিরুদ্ধে কথার ফুলঝুরি ছোটানো কোচ রবি শাস্ত্রীরও মুখে কুলুপ। এমনকি টিমের বড়দা (মেন্টরের বাংলা প্রতিশব্দ পরামর্শদাতা। ধোনির জন্য সেটা বড্ড ম্যাড়মেড়ে নয়?) মহেন্দ্র সিং ধোনিও চুপ।

কেনই বা চুপ থাকবেন না? ওঁরাও তো আমার, আপনার মত কাগজ পড়েন, টিভি দেখেন, সোশাল মিডিয়া ঘাঁটেন। ফলে ওঁরা দেশের অবস্থা সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। ওঁরা হয়ত জানেন গুজরাটের আনন্দ (আমুল খ্যাত) শহরের মঙ্গলবারের ঘটনা [১২]। সেখানে একটি নতুন হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ব্যাঙ্কোয়েট হলের উদ্বোধন আটকাতে বিরাট জনতা হাজির হয় গত পরশু। তারা গঙ্গাজল দিয়ে এলাকা শুদ্ধিকরণের প্রয়াস করেছে। স্লোগান দিয়েছে, ভারতে থাকতে হলে জয় শ্রীরাম বলতে হবে। হিন্দু এলাকায় মুসলমান মালিকের হোটেল থাকবে, এ অনাচার তারা মানতে রাজি নয়। খবরে প্রকাশ, হোটেলটির তিন মালিকের একজন হিন্দু। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।

ধোনি ঝাড়খন্ডের মানুষ, দিব্যি বাংলা বলতে পারেন। রাঁচিতে তাঁর ঘনিষ্ঠ লোকজনদের মধ্যেও বাঙালি আছেন। তাঁর প্রতিভা প্রথম চিনেছিলেন কেশব ব্যানার্জি নামের এক বাঙালি মাস্টারমশাই। ফলে ধোনি হয়ত ত্রিপুরার খবরও রাখেন। হয়ত ভাল করেই জানেন, ওই রাজ্যে কীভাবে মুসলমান খ্যাদানো চলছে কদিন ধরে আর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মালিকানায় চলা সংবাদমাধ্যম চোখ বুজে আছে। এই পরিবেশের মধ্যে ধোনির কী দায় পড়েছে মুসলমান সতীর্থের হয়ে মুখ খোলার?

এত ঘটনা না জানলেও আইপিএল খেলা তারকা ক্রিকেটাররা বিলক্ষণ জানেন, এক গ্রাম মাদক উদ্ধার না হওয়া সত্ত্বেও শাহরুখ খানের ছেলেকে তিন সপ্তাহ কারাবাস করতে হল। ইতিমধ্যে তদন্তকারী অফিসারের বিরুদ্ধে নানা কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠে এসেছে। যে দেশে অর্ণব গোস্বামীর জামিনের জন্য মধ্যরাতে আদালত বসতে পারে, সে দেশে আদালতের সময়ই হয় না মাসের পর মাস, বছরের পর বছর উমর খালিদের জামিনের আবেদন শোনার। শার্জিল ইমাম যে কথা বলেননি তার জন্য, সিদ্দিক কাপ্পান যে প্রতিবেদন লেখেননি তার জন্য, মুনাওয়ার ফারুকি যে কৌতুক করেননি তার জন্য এবং আরিয়ান খান যে মাদক নেননি তার জন্য — কারাবাস করতে পারেন। একজন আদানির বন্দরে কয়েক হাজার গ্রামের মাদক পাওয়া গেলেও তেমন হেলদোল হয় না আইনের রক্ষকদের, একজন খানকে রেভ পার্টিতে পাওয়া গেলেই সে কেবল মাদকাসক্ত নয়, মাদক ব্যবসায়ী হয়ে যায় সারা দেশের চোখে — এ কথা আমাদের মত ক্রিকেট তারকারাও জানেন। তাই তাঁরা চুপ করেই থাকবেন।

শামিকে মানিয়ে নিতে হবে। তাঁর চেয়ে অনেক দূরে, অনেক নীচে থাকা ভারতীয় মুসলমানরা প্রতিনিয়ত যেমন মানিয়ে নিচ্ছেন।

তথ্যসূত্র

১। ইন্ডিয়া টুডে
২। দ্য ওয়ায়ার
৩। টুইটার -উমেশ কুমার রায়
৪। টুইটার – PTI News
৫। বিবিসি
৬। টুইটার – গৌতম গম্ভীর
৭। টুইটার – বীরেন্দ্র সহবাগ
৮। টুইটার – ওয়াকার ইউনিস
৯। টুইটার
১০। টুইটার – অনিল কুম্বলে
১১। টুইটার – শচীন তেন্ডুলকর
১২। দ্য ওয়ায়ার

https://nagorik.net এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে।

কালোর জন্যে কাঁদা, অথচ সাদা মনে কাদা

এই একটা ভারত-পাক ম্যাচে আমাকে এক ব্যাচমেট ‘পাকি’ বলে সম্বোধন করেছিল। কলেজজীবনের অনেক স্মৃতির মধ্যে সেইটা আজও ভুলতে পারিনি।

গো জরা সি বাত পর বরসোঁ কে ইয়ারানে গয়ে
লেকিন ইতনা তো হুয়া কুছ লোগ পহচানে গয়ে।

খাতির গজনভির এই বিষণ্ণ গজল মেহদি হাসানের গলায় একাধিকবার শুনেছি। গত কয়েক বছরে সামাজিক-রাজনৈতিক মতামতের কারণে বন্ধুবিচ্ছেদ হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে অনেকেরই। যতবার কারও এই অভিজ্ঞতার কথা শুনি বা নিজের এ অভিজ্ঞতা হয়, ততবার গজলের এই প্রথম পংক্তিদুটো (পরিভাষায় মতলা) মনে পড়ে। কিন্তু এ বছর মার্চ মাসে টের পেলাম, এই পংক্তিগুলোর বেদনা সঠিকভাবে অনুভব করা আসলে আমার কল্পনাবিলাস। এই বেদনা শতকরা একশো ভাগ অনুভব করেন যাঁরা, তাঁদের কথা আমি জানতে পারি না, জানার চেষ্টাও করি না বিশেষ। সামান্য কারণে বহু বছরের বন্ধুত্ব আর রইল না। তা না-থাকুক, কিছু লোককে তো চিনতে পারা গেল। কোন বেদনায় অক্ষম মলমের কাজ করে এই উপলব্ধি, তা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম কয়েকমাস আগে।

দেশের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কোনওদিন মুখ না-খোলা ক্রিকেটাররা যখন একযোগে মোদি সরকার-প্রণীত কৃষি আইনের সপক্ষে টুইট করতে শুরু করলেন, তখন এক জায়গায় লিখেছিলাম, ভারতীয় ক্রিকেট দল একসময় সব ভারতীয়ের ছিল, এখন আর নেই। কীভাবে সকলের ছিল, তা বোঝাতে ১৯৯৯ সালের ৩১ জানুয়ারি চিপকে শচীন তেন্ডুলকরের অসাধারণ ১৩৬ রানের ইনিংস দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিলাম। তখন ক্লাস ইলেভেনে পড়ি, কড়া নিয়মের হোস্টেলে থাকি। আমরা কয়েকজন পাঁচিল টপকে খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। লেখায় সেই বন্ধুদের কথাও ছিল। প্রকাশিত লেখাটা তাদের পাঠাতে ইচ্ছে হয়েছিল। পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “মনে পড়ে?” দেখলাম, সকলেরই সেই দিনটা ছবির মতো মনে আছে। তবে আমাকে নাড়িয়ে দিল এক মুসলমান বন্ধুর উত্তর। সে লিখল, “খুব সুন্দর লেখা। এই একটা ভারত-পাক ম্যাচে আমাকে এক ব্যাচমেট ‘পাকি’ বলে সম্বোধন করেছিল। কলেজজীবনের অনেক স্মৃতির মধ্যে সেইটা আজও ভুলতে পারিনি।”

আমার বন্ধুবিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা এর চেয়ে বেদনাদায়ক নিশ্চয়ই নয়। কারণ, মানসিক বিচ্ছেদ ঘটে গিয়ে থাকলেও এরপরেও সেই ব্যাচমেটের সঙ্গে বন্ধুত্বের অভিনয় করে যেতেই হয়েছিল আমার মুসলমান বন্ধুটিকে।

এসব কথা আজ তুলছি কেন? তুলছি, কারণ ইউরো ফাইনালে ইংল্যান্ডের কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার বুকায়ো সাকা, মার্কাস র‍্যাশফোর্ড আর জেডন স্যাঞ্চো পেনাল্টি শুটআউটে গোল করতে না-পারার পর যে বর্ণবিদ্বেষী আক্রমণের শিকার হয়েছেন, তার জোরালো প্রতিবাদ দেখতে পাচ্ছি ভারতীয়দের মধ্যে থেকে। তাতে কোনও অন্যায় নেই। বর্ণবিদ্বেষের প্রতিবাদ করাই উচিত, কিন্তু মুশকিল হল, আমাদের প্রতিবাদের মূল সুর “আমরা কিন্তু এরকম নই।” কথাটা যদি সত্যি হত, তা হলে আমার বন্ধুর অভিজ্ঞতা ওরকম হত না। প্রাক-বাবরি ভারতের কথা জানি না, কিন্তু নব্বইয়ের দশকে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের দিন শুধু যে আমার বন্ধুর মতো সাধারণ ক্রিকেটভক্তদেরই অকথা-কুকথা শুনতে হত তা নয়, মুসলমান ক্রিকেটারদের সন্দেহ করাও চলত পুরোদমে।

তখন শারজায় আব্দুল রহমান বুখাতিরের রমরমা। চেতন শর্মার শেষ বলে জাভেদ মিয়াঁদাদের ছক্কার পর থেকে কেবল শারজা নয়, বিশ্বকাপ ছাড়া অন্য যে কোনও মঞ্চে ভারত-পাকিস্তানের খেলায় পাকিস্তান না-জিতলেই অঘটন। সেই দিনগুলোতে আমাদের চোখে ‘জলজ্যান্ত খলনায়ক’ ছিলেন মহম্মদ আজহারউদ্দিন। এমনিতে তাঁর কব্জির মোচড় আর অসামান্য ফিল্ডিং দক্ষতার কারণে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভক্তকুল বিরাট। কিন্তু পাকিস্তান ম্যাচ মানেই অন্য ব্যাপার। ওই ম্যাচে শচীন সৎভাবেই শূন্য রানে আউট হতে পারেন, দিনটা তাঁর নয় বলে মনোজ প্রভাকর ব্যাটসম্যানের হাতে যথেচ্ছ মার খেতে পারেন, মনঃসংযোগ নষ্ট হয়ে কপিলের হাত থেকে ক্যাচ পড়ে যেতে পারে। কিন্তু আজহার ব্যর্থ হলেই সেটা ‘ইচ্ছাকৃত’ বলে মনে করা হত। আজ এ-কথা বললে অনেকেই বলবেন, ওটা একেবারেই মুসলমান-বিদ্বেষের ব্যাপার নয়। পরে তো সিবিআই তদন্তে প্রমাণ হল যে, আজহার একজন অসাধু ক্রিকেটার। অতএব, “আমরা আন্দাজ করতাম বলেই ওরকম বলতাম”। মুশকিল হল, সিবিআই তদন্তে আজহারের জুয়াড়ি-যোগ প্রমাণিত, তিনি মুসলমান বলে পাকিস্তানকে ম্যাচ ছেড়ে দিতেন এমনটা আদৌ প্রমাণিত হয়নি। তা ছাড়া, সেই সময়ের রথী-মহারথীদের কথাবার্তা যা লিপিবদ্ধ আছে, তা থেকে মোটেই প্রমাণ করা যায় না যে, তাঁরা জানতেন আজহার অসাধু।

ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ে তাঁর ‘আ কর্নার অফ আ ফরেন ফিল্ড’ বইয়ে লিখেছেন, একবার আজহারের শতরান এবং ভারতের জয়ের পর খোদ বাল ঠাকরে তাঁকে “জাতীয়তাবাদী মুসলিম” আখ্যা দিয়েছিলেন। শুধু কি তাই? অযোধ্যার রামমন্দির আন্দোলনের হোতা লালকৃষ্ণ আদবানি স্বয়ং ১৯৯৮ সাধারণ নির্বাচনের প্রচারে বেরিয়ে মুসলমান যুবকদের বলেছিলেন, তাঁদের আজহার কিংবা এ আর রহমানের মতো হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। সুতরাং এখন “আগেই বলেছি” বললে চিঁড়ে ভিজবে না। আরও বড় কথা হল, যারা আজহারকে সর্বদা সন্দেহ করত, তারা কিন্তু ঘুণাক্ষরেও অজয় জাদেজা বা নয়ন মোঙ্গিয়াকে সন্দেহ করেনি। কেন?

প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা…

ভারত আজ অবধি বিশ্বকাপে কখনও পাকিস্তানের কাছে হারেনি বলে আমরা বড় জাঁক করে থাকি। প্রথম তিনটে ম্যাচেই কিন্তু অধিনায়ক ছিলেন আজহারউদ্দিন। তিনবারের একবারও তিনি ব্যাট হাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হননি। সিডনিতে ১৯৯২ সালে কম রানের ম্যাচে ৩২, বাঙ্গালোরে ১৯৯৬ সালে ২২ বলে ২৭, আর ম্যাঞ্চেস্টারে ১৯৯৯ সালে গুরুত্বপূর্ণ ৫৯ রান করেন। সে যা-ই হোক, দুর্নীতির দায়ে ধরা পড়ে তিনি নির্বাসিত হওয়ার পর যদি মুসলমান ক্রিকেটারদের সন্দেহ করা শেষ হয়ে যেত, তা হলে আর আজ এত কথা উঠত না।

সেই কেলেঙ্কারির পরে সৌরভ গাঙ্গুলির হাতে নতুন করে গড়ে ওঠা ভারতীয় দল দেশের ক্রিকেটের দুটো ধারা একেবারে বদলে দিয়েছিল। এক, বিদেশের মাঠে নির্বিবাদে হেরে যাওয়া; আর দুই, পাকিস্তানের কাছে হারের পর হার। দুটোর কোনওটার পিছনেই ভারতীয় দলের ইসলাম ধর্মাবলম্বী ক্রিকেটারদের অবদান ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। ২০০৫-’০৬-এর পাকিস্তান সফরে প্রথম টেস্টে করাচিতে ইরফান পাঠানের হ্যাটট্রিক ভোলা যাবে? নাকি তার আগের সফরে চতুর্থ একদিনের ম্যাচে প্রায় তিনশো রান তাড়া করতে নেমে গদ্দাফিতে ১৬২ রানে পাঁচ উইকেট চলে যাওয়ার পর রাহুল দ্রাবিড়ের (অপরাজিত ৭৬) সঙ্গে মহম্মদ কাইফের (৭১) জুটি ভুলতে পারবেন কোনও ক্রিকেটরসিক? দেশ-বিদেশের মাঠ মিলিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য জয়গুলোর একটা হল লর্ডসে ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির ফাইনাল। সেই জয়ের কাণ্ডারীও তো এই কাইফ। আর জাহির খান তো প্রায় প্রতিষ্ঠান হয়ে গেলেন শেষপর্যন্ত। জাভাগল শ্রীনাথ অস্তাচলে গেলেন, আশিস নেহরা উপর্যুপরি চোট-আঘাতের কারণে নিজের প্রতিভার প্রতি সুবিচার করতে পারলেন না। মাঝখান থেকে ভারতীয় বোলিং আক্রমণের নেতা হয়ে উঠলেন জাহির। ভারতের বহু টেস্ট জয়ে তাঁর ঝলমলে ভূমিকা। শ্রীনাথ, নেহরার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বল করে ২০০৩ বিশ্বকাপ প্রায় তুলে দিয়েছিলেন অধিনায়কের হাতে।

এসব ইতিহাসে থেকে যাবে, কিন্তু আমাদের হৃদয় পরিবর্তনে খুব একটা প্রভাব ফেলেছে কি না তা বলা শক্ত। গদ্দাফিতে কাইফের ওই ইনিংস যখন চলছে, তখন আমাদের বাড়িতে বসে আমাদেরই সঙ্গে খেলা দেখছিল মাত্র বারো-তেরো বছরের এক ছেলে। সে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, “ও পাকিস্তানকে হারতে দেবে না। পাকিস্তান তো ওদেরই টিম।” সেই ছেলেমেয়েরা যে আজ বাবা-মা হয়েছে সে কথা খেয়াল হত, যখন অতিমারির আগে শুনতাম কোনও শিশু স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে বলেছে, “জানো তো বাবা, আমাদের ক্লাসের টিফিনে অমুক মাংস নিয়ে আসে।” যে বাবা-মায়েরা টুইটারে ইরফান পাঠানকে বলেন “গো টু পাকিস্তান”, তাঁদের ছেলেমেয়েদের এরকম আচরণে অবাক হওয়ার কিছু দেখি না।

আমার বন্ধুর ঘটনাটার মতো আমার অভিজ্ঞতাটাকেও স্রেফ একজনের অভিজ্ঞতা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা যে ঘরে-ঘরে। ওই যে গোড়াতেই বলেছি, আমরা জানতে চাই না বলেই জানতে পারি না। পিউ রিসার্চ সেন্টার-এর সাম্প্রতিক সমীক্ষা যেমন দেখিয়েছে আর কি। আমরা ভারতীয়রা যে যার নিজের খোপে থাকতে পারলেই খুশি। কে কোথায় কোন অবিচারের শিকার হল, তাতে আমাদের কী? সাকা, র‍্যাশফোর্ড, স্যাঞ্চোর দুঃখে আমাদের কান্নাকে তাই কুম্ভীরাশ্রু না-ভেবে পারছি না।

ওঁদের তিনজনের পিছনে লেগেছে অসভ্য শ্বেতাঙ্গ ইংরেজরা, আবার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন শ্বেতাঙ্গ অধিনায়ক হ্যারি কেন। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় টুইট করেছেন, এরকম সমর্থক তিনি চান না। কোচ গ্যারেথ সাউথগেটও শ্বেতাঙ্গ। তিনিও এই ট্রোলিং-এর নিন্দা করেছেন। উইদিংটনে র‍্যাশফোর্ডের মুরাল বিকৃত করা হয়েছিল। নতুন করে তা সাজিয়ে দিয়েছেন শ্বেতাঙ্গরা। দক্ষিণপন্থী এবং শ্বেতাঙ্গ প্রধানমন্ত্রীও ওই তিনজনের পাশে। ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও বিবৃতি দিয়ে নিন্দা করেছে। অথচ কী অভাগা আমাদের ওয়াসিম জাফর! এই তো সেদিনের ঘটনা। উত্তরাখণ্ডের কিছু ক্রিকেটকর্তার রঞ্জি দলের কোচ জাফরকে পছন্দ হচ্ছিল না। তাই তাঁরা সংবাদমাধ্যমকে বলে দিলেন, জাফর সাম্প্রদায়িক। মুসলমান দেখে দলে সুযোগ দেন, ড্রেসিংরুমে মৌলবী ঢোকান, টিম হাড্‌লে ‘জয় হনুমান’ বলতে দেন না। জাফর প্রত্যেকটা অভিযোগের যথাযোগ্য জবাব দিয়েছিলেন, কর্তারা প্রত্যুত্তর দিতে পারেননি। কিন্তু যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। অনলাইনে জাফরকে অকথ্য গালিগালাজ করা হয়েছে। মুসলমান মানেই যে বদমাইশ তারই প্রমাণ হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে তাঁকে। গোটা সময়টা ভারতের তারকা ক্রিকেটাররা মৌনীবাবা হয়ে ছিলেন। শচীন তেন্ডুলকরের মত মহীরুহ, যিনি আবার জাফরের সঙ্গে কেবল ভারতীয় দল নয়, মুম্বই দলেও খেলেছেন, তিনিও স্পিকটি নট। অমোল মুজুমদার, মনোজ তিওয়ারির মতো দু-একজন ছাড়া সকলেই যেন ধ্যানস্থ ছিলেন। আর বাংলার গৌরব সৌরভের নেতৃত্বাধীন ক্রিকেট বোর্ড তো মহাত্মা গান্ধির তিন বাঁদরের মতো হয়ে গিয়েছিল।

এসব কথা অপছন্দ হলে অনেকে তূণ থেকে ব্রহ্মাস্ত্র ভেবে বার করবেন সেই বাক্য— সাম্প্রদায়িকতা আর বর্ণবিদ্বেষ কি এক জিনিস নাকি? এ নিয়ে একটা সূক্ষ্ম তর্ক হতে পারে বটে, তবে সে-সবে যাচ্ছি না। না হয় বর্ণবিদ্বেষের কথাই হোক। বলুন তো, আমাদের ক্রিকেট বোর্ড বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে কবে কী ব্যবস্থা নিয়েছে? ২০২০ সালের ৮ জুলাই যখন অতিমারির মধ্যে আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চালু হল, তখন ইংল্যান্ড আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম টেস্টের প্রথম দিন খেলা শুরু হওয়ার আগে দু দলের ক্রিকেটাররা এক হাঁটু মুড়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশের দিকে তুলে বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ জানান। ততদিনে পৃথিবীর সব খেলার মাঠে ওটা দস্তুর হয়ে গিয়েছে। এই প্রতিবাদের প্রেক্ষাপটে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবিদ্বেষী পুলিসের হাতে নিহত জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু। ইংল্যান্ডের মাটিতে ওই টেস্ট ম্যাচের প্রায় আড়াই মাস পরে ১৯ সেপ্টেম্বর শুরু হয় ভারতীয় ক্রিকেটের বাৎসরিক মোচ্ছব— আইপিএল। সেখানে কিন্তু ওসব হাঁটু মুড়ে বসা-টসা হয়নি। ২৫ অক্টোবর মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের খেলোয়াড় হার্দিক পান্ডিয়ার যে কোনও কারণেই হোক (হয়তো তাঁর অধিনায়ক কায়রন পোলার্ড বলে) মনে হয় এমনটা করা উচিত, তাই তিনি রাজস্থান রয়ালসের বিরুদ্ধে অর্ধশতরানের পর হাঁটু মুড়ে বসেন। আইপিএল-এর গভর্নিং বডি বা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড থেকে কোনও নির্দেশ আসেনি কিন্তু।

আচ্ছা বলুন তো, ভারতের সর্বকালের সেরা অধিনায়কদের একজনের হাতে থাকা বোর্ড ইশান্ত শর্মাকে কী শাস্তি দিয়েছে আজ অবধি? ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর প্রাক্তন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি জানিয়েছিলেন, সানরাইজার্স হায়দরাবাদে একসঙ্গে খেলার সময় ইশান্ত তাঁকে ‘কালু’ বলে ডাকতেন। মানে জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন, ওটা নাকি আদরের ডাক। যদিও পরে স্যামি জানতে পেরেছিলেন, ওটা তাঁর চামড়ার রং নিয়ে ব্যঙ্গ। অভিযোগটা যে মিথ্যে নয় তার প্রমাণ হিসাবে পাওয়া গিয়েছিল ইশান্তের ইনস্টাগ্রাম পোস্ট। সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করা ছবিতেও ইশান্ত স্যামিকে ‘কালু’ বলেই উল্লেখ করেছিলেন। ইশান্ত এরপর স্যামির কাছে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চেয়ে নেন, কিন্তু বোর্ড কী ব্যবস্থা নিয়েছিল কেউ জানেন? ভারতের হয়ে একসময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা অভিনব মুকুন্দ আর দোদ্দা গণেশও সেইসময় বলেছিলেন, খেলোয়াড় জীবনে গায়ের রং নিয়ে তাঁদের কটুকাটব্য হজম করতে হয়েছে। তারকাদের কেউ দুঃখপ্রকাশ করেছেন তার জন্য? বোর্ড দুঃখপ্রকাশ করেছে? শুধু তো কয়েকটা ভাল শব্দ। তা-ও খরচ করা যায়নি এই মানুষগুলোর জন্য! আজ যেমন সাকা, র‍্যাশফোর্ড, স্যাঞ্চোর জন্য ইংরেজদের বর্ণবিদ্বেষী বলে নিন্দা করছেন; সেদিন মুখে কুলুপ এঁটে থাকা বোর্ড আর তারকাদের একইরকম নিন্দা করেছিলেন?

অবশ্য এসব প্রশ্ন অবান্তর। এ দেশের মাটি বড়ই উদার। এখানে “কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন” জনপ্রিয় হয়, আবার ফেয়ার অ্যান্ড লাভলিও রমরমিয়ে বিক্রি হয়।

https://4numberplatform.com/ এ প্রকাশিত

ওয়াসিম জাফর: ক্রিকেটের গৌরবহীন একা

ওয়াসিমের দীর্ঘ কেরিয়ারের টিমমেটদের অধিকাংশের নীরবতা দেখিয়ে দিচ্ছে, তাঁদের কাছে ওঁর শেষ পরিচয় একজন ভিন্নধর্মী মানুষের।

ওয়াসিম জাফর কিন্তু মুনাওয়ার ফারুকি নন। তিনি হিন্দু দেবদেবী বা অমিত শাহ – নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে মস্করা করতে পারেন এমন কোন সম্ভাবনা নেই। করেছেন এমন কোন ইউটিউব ভিডিও-ও নেই। কারণ ওটা ওয়াসিমের পেশা নয়। তাঁর পেশা ক্রিকেট। তিনি প্রাক্তন ক্রিকেটার, অবসর নেওয়ার পর উত্তরাখণ্ড রঞ্জি দলের হেড কোচের চাকরি করছিলেন। পদত্যাগ করেছেন, কারণ তাঁর মতে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ উত্তরাখণ্ডের (সিএইউ) কর্তারা তাঁর কাজে অন্যায় হস্তক্ষেপ করছিলেন, নিজেদের পছন্দের ক্রিকেটারদের যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও দলে নিচ্ছিলেন। ব্যাপারটা এ দেশের খেলার জগতের চিরপরিচিত ঘটনাগুলোর একটা হয়েই থেকে যেত, যদি না টিম ম্যানেজার নবনীত মিশ্র ওয়াসিমের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আনতেন।

ওয়াসিমের পদত্যাগের পর এক হিন্দি কাগজের কাছে তাঁর নামে বিষোদগার করতে গিয়ে নবনীত বলেন হেড কোচ নাকি দল নির্বাচন করছিলেন ধর্মের ভিত্তিতে। অর্থাৎ মুসলমান হলে দলে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছিল। আরো গুরুতর অভিযোগ, টিম হাডলে (পরস্পরের কাঁধে হাত রেখে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আলোচনা করার সেই যে প্রথা জন রাইট আর সৌরভ গাঙ্গুলি ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারতীয় ক্রিকেটে চালু করেছিলেন) “রামভক্ত হনুমান কি জয়” বলতে বারণ করেছিলেন। শুধু কি তাই? বায়ো বাবল ভেঙে এক মৌলবীকে নিয়ে এসেছিলেন সাজঘরে। শিশুর আত্মার উপর এমন নরকের দুঃস্বপ্ন চাপিয়ে দেওয়ার পরে কি আর…?

আর কী? ওয়াসিমের প্রত্যুত্তর এই প্রশ্নটাই। বলেছেন তিনি যদি সত্যিই সাম্প্রদায়িক হয়ে থাকেন, তাহলে আগেই তাড়িয়ে দেওয়া হয়নি কেন? উপরন্তু বলেছেন সাম্প্রদায়িক হলে তিনি হিন্দু জয় বিস্তাকে অধিনায়ক করতে চাইতেন না। কর্তারাই বরং তাঁর কথা না মেনে ইসলাম ধর্মাবলম্বী ইকবাল আবদুল্লাকে অধিনায়ক করেন। ওয়াসিম উল্লেখ করেছেন কোন কোন মুসলমান ক্রিকেটারকে তিনি ভাল খেলতে না পারার কারণে প্রথম একাদশ থেকে বাদ দিয়েছেন। এ-ও বলেছেন যে দলের কাউকে হনুমানের বা রামের জয়ধ্বনি দিতে তিনি শোনেননি। বরং শিখদের প্রিয় একটি জয়ধ্বনি দেওয়া হচ্ছিল। তিনি তার বদলে “গো উত্তরাখণ্ড” বা “লেট’স ডু ইট উত্তরাখণ্ড” কিংবা “কাম অন উত্তরাখণ্ড” বলতে পরামর্শ দেন। কারণ দলটা কোন সম্প্রদায়ের হয়ে খেলছে না, খেলছে রাজ্যের হয়ে। সাম্প্রদায়িক মানসিকতার লোক হলে তো দলকে দিয়ে “আল্লা হো আকবর” বলাতেন। মৌলবীকেও তিনি সাজঘরে আনেননি, এনেছিলেন ইকবাল — ওয়াসিমের বক্তব্য এই। [লিঙ্ক

ওয়াসিমের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে এখনো সিএইউ কর্তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করে উঠতে পারেননি। ইতিমধ্যে ইকবাল বলেছেন তিনিই মৌলবীকে জুম্মার নমাজের জন্য নিয়ে এসেছিলেন বটে, তবে ওয়াসিমের কাছ থেকে অনুমতি পাননি। তিনি বরং টিম ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করতে বলেছিলেন। হেড কোচের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আনা নবনীত স্বয়ং মৌলবী সাহেবকে নিয়ে আসার অনুমতি দেন। বারণ করলে তাঁকে আনা হত না। [লিঙ্ক] । সত্যি কথা বলতে, ইকবালের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে মৌলবী সাহেবের সাথে ক্রিকেটারদের যে ছবি রয়েছে তার ত্রিসীমানায় ওয়াসিম নেই। এই প্রবন্ধ লেখার সময় পরিস্থিতি এই, যে সিএইউ সচিব মহিম বর্মা (ওয়াসিম পদত্যাগপত্রে মূলত এই ভদ্রলোকের বিরুদ্ধেই হস্তক্ষেপের অভিযোগ এনেছেন) প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছেন বায়ো বাবল লঙ্ঘন করা সম্বন্ধে ম্যানেজারের থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। সেই বিজ্ঞপ্তিতে ওয়াসিমের কিন্তু নামগন্ধ নেই।

এতখানি এসে নিশ্চয়ই ভাবছেন, এর মধ্যে মুনাওয়ার ফারুকির কথা উঠছে কেন? উঠছে এই জন্য যে শেষ বিচারে মুনাওয়ারের দোষ যা, ওয়াসিমের দোষও তাই। মুসলমান পরিচিতি। ওয়াসিম তবু ভাগ্যবান। স্রেফ বদনামের ভাগী হতে হয়েছে, দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইট তার চরিত্রানুসারে ঘটনা আর রটনার তফাত না করে ট্রোলবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছে। মুনাওয়ারের মত নির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও মাস খানেক হাজতবাস তো করতে হয়নি।

যদি মনে হয় তুলনাটা অহেতুক, তাহলে লক্ষ করুন ক্রিকেট প্রশাসকদের বিরুদ্ধে ওয়াসিমের পদত্যাগপত্রে লেখা অভিযোগগুলো নস্যাৎ করতে কী কী বলা হয়েছে। বলা যেতেই পারত ওয়াসিম অযোগ্য, ওঁর কোচিং-এ দল কিছুই জেতেনি, তাই উনি কর্তাদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে পালিয়ে গেছেন। অথবা বলা যেতে পারত খেলোয়াড়রা ওয়াসিমকে পছন্দ করছিল না, তাই উনি পালিয়ে বাঁচলেন। কোচের চলে যাওয়ার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে এইসব কথাই ভারতের বিভিন্ন খেলার কর্মকর্তারা চিরকাল বলে থাকেন। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকদের তো এসব শুনে শুনে কান পচে গেছে। উত্তরাখণ্ডের কর্তারা তেমন বললেন না কিন্তু। বললেন এমন কিছু কথা, যা একমাত্র মুসলমানদের সম্বন্ধে বললেই মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা যায় এবং সব প্রশ্ন ভুলিয়ে দেওয়া যায়। ভেবে দেখুন, যদি উত্তরাখণ্ডের হেড কোচের নাম ওয়াসিম জাফর না হয়ে অসীম জৈন হত, তার সম্বন্ধে যদি বলা হত, “বেছে বেছে হিন্দু ক্রিকেটারদের খেলায়”, “টিম হাডলে আল্লা হো আকবর বলতে বারণ করেছিল”, “বায়ো বাবল লঙ্ঘন করে সাজঘরে স্থানীয় মন্দিরের পুরোহিতকে ডেকে এনে প্রার্থনা করেছে” — তাহলে সবাই বলতেন না, ঠিকই করেছে? যারা “হিন্দু খতরে মে হ্যায়” বলে, শুধু তারা নয়, বাকিরাও কি মনে করতেন না বিনা দোষে লোকটার পিছনে লাগা হচ্ছে?

সদ্য সমাপ্ত অস্ট্রেলিয়া সফরেই কয়েকজন ভারতীয় ক্রিকেটার বায়ো বাবল ভেঙে রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে এক ভক্তের ক্যামেরাবন্দী হয়েছিলেন এবং, ভক্তটির বয়ান অনুযায়ী, তাঁকে আলিঙ্গন করেছিলেন। সেকথা প্রকাশ্যে আসার পর এ দেশের আপামর ক্রিকেটপ্রেমী এবং ক্রিকেট সাংবাদিক ভক্তটিকেই আক্রমণ করেন। ক্রিকেটাররা নাকি অবোধ শিশু। উপরন্তু তাঁরা বৃষ্টি এসে যাওয়ায় নিরুপায় হয়ে রেস্তোরাঁয় ঢুকেছিলেন। ক্রিকেট বোর্ডও ক্রিকেটারদেরই পাশে দাঁড়ায়। বলে বাবলটি তো তেমনি আছে, কমেনি এক রত্তি। আজ হঠাৎ মৌলবী সাজঘরে আসায় সকলের খেয়াল হয়েছে সবার উপরে বাবল সত্য, তাহার উপরে নাই।

ঘটনাটায় ওয়াসিমের যোগ তো এখন অব্দি প্রমাণিতই নয়। তাঁর অন্য কথাগুলো ভেবে দেখুন। ক্রিকেটজীবনের শেষ দিক থেকে তিনি লম্বা দাড়ি রাখেন বলে তাঁকে দেখে আপনার আসাদুদ্দিন ওয়েসির কথা মনে পড়তেই পারে, পাকিস্তানি বলতেও ইচ্ছা করতে পারে, কিন্তু তিনি টিম হাডলে যে যুক্তিতে শিখ ধর্মের জয়ধ্বনিরও বিরোধিতা করেছেন, সেটাই প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা নয় কি? খেলছি উত্তরাখণ্ডের হয়ে, তাই উত্তরাখণ্ডের নামে ধ্বনি দাও, কোন ধর্মের নামে দিও না। এর চেয়ে যুক্তিযুক্ত পরামর্শ কিছু আছে? ভারত কি পাকিস্তানের মত এক ধর্মের দেশ যে এখানে কোন একটা ধর্মের জয়ধ্বনিকে দলের জয়ধ্বনি করে দেওয়া হবে, আর অন্য ধর্মের খেলোয়াড়দেরও তা মেনে চলতে হবে? উঠতে বসতে ইসলামের একেশ্বরবাদকে বলব গোঁড়ামি আর হিন্দুদের বহুত্ববাদকে বলব উদারতা, তারপর সামাজিক জীবনে নিজের ঈশ্বরকেই চাপিয়ে দেব?

সত্যি কথাটা সহজ করেই বলা যাক। এ দেশে এই মুহূর্তে একজন মুসলমানের মুসলমান হওয়াই সবচেয়ে বড় সমস্যা। তিনি মুনাওয়ারের মত দাড়ি গোঁফ কামানো হালফ্যাশানের তরুণ হলেও সমস্যা, ওয়াসিমের মত লম্বা দাড়ি রাখা, ইকবালের মত মৌলবী ডেকে জুম্মার নামাজ পড়া মুসলমান হলেও সমস্যা। একজন লোক হাসিয়ে আয় করছে, যেভাবে হাসাচ্ছে তা আমার পছন্দ নয়। আমি না শুনলেই পারি। কিন্তু তাতে আমি থামব কেন? মুসলমান পরিচিতিটাকে হাতিয়ার করি। তাহলেই তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া যাবে। উপরি জেলের ঘানিও টানানো যাবে। একজন দেশের হয়ে দিব্যি ক্রিকেট খেলেছে, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সকলের চেয়ে বেশি রান করেছে, এখন কোচিং করাচ্ছে, আবার আমার দোষও ধরছে। সেটা আমার পছন্দ নয়। কী করা যায়? খুব সোজা। মুসলমান পরিচিতিটাকে হাতিয়ার করি। তাহলেই তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া যাবে।

এই দেশ কোনদিনই নিখুঁত ছিল না, স্বাধীন হওয়ার সময় থেকেই সহস্র স্ববিরোধিতা। সংবিধান সব নাগরিককে সমান চোখে দেখেছে, অথচ সমাজ সকলকে সমান মনে করে না। এই বৈপরীত্য সম্পর্কে স্বয়ং ভীমরাও আম্বেদকর সচেতন ছিলেন। সংবিধান সভার শেষ বক্তৃতায় তিনি সেকথা উল্লেখও করেছেন। এই বৈপরীত্য দূর করার দায়িত্ব যাঁদের হাতে ন্যস্ত ছিল, তাঁরা দায়িত্ব পালন করেননি। ফলে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের থানায় কালীপুজো হয়েছে, আমরা শিখেছি এটা সাম্প্রদায়িক নয়, কারণ অন্য ধর্মের লোকেরা তো আপত্তি করেনি। স্কুলে সরস্বতীপুজো হয়েছে, আমরা জেনেছি এটাও সাম্প্রদায়িকতা নয়। কই অন্য ধর্মের ছাত্রছাত্রী বা তাদের বাবা-মায়েরা তো আপত্তি করেনি? ময়দানে ফুটবল মরসুম শুরু হয়েছে বারপুজো দিয়ে, আমরা সাম্প্রদায়িকতা দেখিনি। আই পি এল ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রমাগত হারের দোষ কাটাতে স্টেডিয়ামে পুজো করেছে, তাতেও কেউ সাম্প্রদায়িকতা দেখেনি। ২০১৫-১৬ মরসুমে দিল্লীর রঞ্জি দলকে দিয়ে প্রতিদিন খেলার আগে সূর্য নমস্কার করাতেন কোচ বিজয় দাহিয়া আর অধিনায়ক গৌতম গম্ভীর। যুক্তি ছিল “A team that prays together stays together.” [লিঙ্ক] । তখনো কারোর মনে হয়নি ব্যাপারটা সাম্প্রদায়িক।

আসলে বরাবর আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা এবং মানদণ্ড ঠিক করেছে সংখ্যাগুরু। আজ অবস্থার এমন অবনতি হয়েছে যে দেশের যে জায়গাটায় ধর্ম বা জাতপাতের পরিচিতি কোন ইস্যু ছিল না বলে আমরা জানতাম, সেই খেলার মাঠেও তফাত করা শুরু হয়েছে।

যদি কেবল কর্মকর্তারাই এমনটা করতেন, তাহলে তবু কথা ছিল। কারণ ভারতের খেলাধুলো চালান আসলে রাজনীতির ব্যাপারীরা। আর এই মুহূর্তে যাদের পাল্লা ভারী, তাদের তো মানুষে মানুষে ভেদ করাটাই রাজনীতি। আমরা অন্তত এই ভেবে সান্ত্বনা পেতাম যে আমাদের খেলোয়াড়রা এভাবে ভাবেন না। তাঁদের কাছে সহখেলোয়াড়ের একটাই পরিচয় — খেলোয়াড়। কিন্তু এখন আর তেমনটা ভাবা যাচ্ছে না। এই লেখা শেষ করা পর্যন্ত অনিল কুম্বলে ছাড়া এ দেশের প্রবাদপ্রতিম ক্রিকেটারদের একজনও ওয়াসিমের পক্ষ নিয়ে একটি শব্দও খরচ করেননি। প্রাক্তনদের মধ্যে দোদ্দা গণেশ, অমল মজুমদার, ইরফান পাঠান আর বর্তমান ক্রিকেটারদের মধ্যে মনোজ তিওয়ারির মত দু একজন ছাড়া সবাই চুপ। ইকবাল আবদুল্লা, বা ওয়াসিমের বিদর্ভের হয়ে খেলার সময়কার টিমমেট ফয়েজ ফজলের সহমর্মিতায় কী-ই বা এসে যায়? ওয়াসিমের দীর্ঘ কেরিয়ারের টিমমেটদের অধিকাংশের নীরবতা দেখিয়ে দিচ্ছে, তাঁদের কাছে ওঁর শেষ পরিচয় একজন ভিন্নধর্মী মানুষের।

মনে রাখা দরকার, ওয়াসিম জাফর যে সে ক্রিকেটার নন। বেশিরভাগ ম্যাচ খেলেছেন ভারতীয় ক্রিকেটের কুলীন দল মুম্বাইয়ের হয়ে। শুধু যে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর তর্কাতীত সাফল্য তা নয়, ভারতের হয়ে ৩১টা টেস্ট ম্যাচে প্রায় ৩৫ গড়ে হাজার দুয়েক রান করেছেন। মাত্র চারজন ভারতীয় ওপেনার ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে দ্বিশতরান করতে পেরেছেন। ওয়াসিম তাঁদের একজন। অন্যরা সুনীল গাভস্কর, দিলীপ সরদেশাই আর নভজ্যোৎ সিং সিধু। এ হেন ক্রিকেটারকে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য কোণঠাসা করা হচ্ছে, আর চুপ করে আছেন মুম্বাইয়ের মহীরুহেরা। তাঁদের একজন অজিঙ্ক রাহানে এখন ভারতীয় টেস্ট দলের সহ-অধিনায়ক। চেন্নাইতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট শুরুর আগের দিন সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন এই নিয়ে। রাহানে বলেছেন তিনি ব্যাপারটা ঠিক জানেন না। এই রাহানেই সপ্তাহ খানেক কৃষক আন্দোলন সম্বন্ধে যথেষ্ট জানতেন। দেশকে এক থাকার বার্তা দিয়েছিলেন আরো অনেক ক্রিকেটারের সঙ্গে মিলে। এঁরা সবাই এখন স্পিকটি নট। রোহিত শর্মা চুপ, গাভস্করেরও সাড়াশব্দ নেই।

এবং শচীন তেন্ডুলকর। আজও ইউটিউবে দেখা যায় নব্বইয়ের দশকে তৈরি একটা ভিডিও ক্যাম্পেন। সারা দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার আবেদন করতে গিয়ে শচীন সেখানে বলছেন “When we play for India, we’re a team. It doesn’t matter if you’re a Hindu or a Muslim on the field. Don’t let it matter off the field.” সেই ভিডিওতে অমিতাভ ও অভিষেক বচ্চন, অপর্ণা সেন, অনুপম খের, শাবানা আজমির মত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাথে শচীনও যে অভিনয়ই করছিলেন তা কে জানত?

নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না। সুতরাং ধর্মীয় বিভাজন মাঠে নেমে পড়ায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে কষ্ট হয় মহম্মদ সিরাজের মত যাঁরা একসাথে পিতা আর পিতৃভূমির জন্য কাঁদেন, তাঁদের জন্য। ভারতীয় ক্রিকেট ঐ অশ্রুর যোগ্য থাকবে তো?

https://nagorik.net এ প্রকাশিত।ছবি টুইটার থেকে।

%d bloggers like this: