শীর্ষে উঠেও গলি-ক্রিকেট না ভোলা অশ্বিন

কোনওদিন ভারত অধিনায়ক হওয়া হল না— এই নিয়ে আফসোস আছে কিনা জিজ্ঞেস করায় বলেছেন, তিনি ভেবে নিয়েছেন যে তিনি এমন এক কর্পোরেট কোম্পানিতে কাজ করতেন যারা তাঁকে ওই ভূমিকায় দেখতে চায়নি।

চাহি না রহিতে বসে ফুরাইলে বেলা,
তখনি চলিয়া যাব শেষ হলে খেলা।

রবীন্দ্রনাথের গান সম্পর্কে একটা কথা অনেকেরই মনে হয়— যেন সকলের জীবনের সব মুহূর্তের সঙ্গেই লাগসই দু-চারখানা লাইন লিখে গেছেন। সম্প্রতি ভারতীয় দলের ক্রিকেটার রবিচন্দ্রন অশ্বিন যে অনায়াস ভঙ্গিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেন, তাতে মনে হয় উপরের লাইন দুটো যেন তাঁরই কথা।

২০১১ সালের নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল অশ্বিনের। তারপর থেকে দেশের মাটিতে যত সিরিজ খেলেছে ভারত, তার মধ্যে হার হয়েছিল কেবল ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। ভারতীয় স্পিনারদের সেই সিরিজে টেক্কা দিয়েছিলেন দুই ইংরেজ স্পিনার— গ্রেম সোয়ান আর মন্টি পানেসার। অশ্বিন চার টেস্টে ১৪টা উইকেট নিয়েছিলেন, প্রজ্ঞান ওঝা ২০টা, রবীন্দ্র জাদেজা আর পীযূষ চাওলা মিলে আরও সাতখানা। কিন্তু অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছিল সোয়ান-পানেসারের ৩৭ (যথাক্রমে ২০ আর ১৭)-টা উইকেট। অশ্বিন বলেছেন, ওই সিরিজের পর তিনি প্রতিজ্ঞা করেন— যতদিন খেলবেন, ঘরের মাঠে ভারতকে হারতে দেবেন না। তাঁর প্রতিজ্ঞা অটুট থেকেছে এতগুলো বছর, ভেঙে গেল ২০২৪ সালের শেষে এসে নিউজিল্যান্ড সিরিজে। অশ্বিন একেবারেই সুবিধা করতে পারলেন না। তিন টেস্টের সিরিজে মাত্র ন-খানা উইকেট, গড় ৪১। তিনি আর জাদেজা এতগুলো বছর ধরে যেভাবে ঘোল খাইয়ে ছেড়েছেন অতিথি ব্যাটারদের, তা এবারে হয়নি। উপরন্তু সেই ইংল্যান্ড সিরিজের মতোই এবারে নিউজিল্যান্ডের মিচেল স্যান্টনার (১৩ উইকেট) আর আজাজ প্যাটেল (১৫ উইকেট) টেক্কা দিয়েছেন ভারতীয় স্পিনারদের।

যদিও অস্ট্রেলিয়ায় খুব কম ক্ষেত্রেই একটা টেস্টে একজনের বেশি স্পিনার খেলানোর প্রয়োজন হয়, তবু ভারতীয় নির্বাচকরা এবার অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়েছিলেন তিনজনকে। তাছাড়া উপায়ই বা কী ছিল? ওয়াশিংটন সুন্দর যে দুটো টেস্ট খেলেই ১৬ খানা উইকেট নিয়ে ফেলেছেন নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। তার উপর সাড়ে চুয়াল্লিশ গড়ে রানও করে ফেলেছেন। ভারতীয় টেস্ট দল আবার অদ্ভুত নিয়মে চলে। ব্যাটাররা রান করতে পারবেন না জেনে, বোলার নির্বাচনের সময়ে একদিনের ক্রিকেট বা কুড়ি-বিশের ক্রিকেটের মতো মাথায় রাখা হয় সে রান করতে পারবে কিনা। এই নিয়ম মহেন্দ্র সিং ধোনির আমল থেকেই অল্পবিস্তর চলছিল, গত পাঁচ বছরে তুঙ্গে উঠেছে। কারণ দুই মহাতারকা ব্যাটার বিরাট কোহলি আর রোহিত শর্মার রান করার ঘটনা নরেন্দ্র মোদির সংসদে উপস্থিত থাকার মতোই বিরল হয়ে গেছে। কেএল রাহুল, শুভমান গিলরাও ধারাবাহিক নন। অশ্বিন বিলক্ষণ জানতেন, দেশের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বোলারদের সামলাতেই হিমশিম খেয়ে যাওয়া ভারতীয় ব্যাটারদের অস্ট্রেলিয়ায় রান করার সম্ভাবনা আরও কম। অতএব ওখানে চূড়ান্ত একাদশ নির্বাচন করার সময়ে আরও বেশি করে মাথায় রাখা হবে কোন বোলার বেশি রান করতে পারে। অশ্বিন এও জানতেন যে টেস্টে আধডজন শতরান, ১৪ খানা অর্ধশতরান, আগের অস্ট্রেলিয়া সফরে নায়কোচিত ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস, ২০২২ সালে মীরপুরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ঘূর্ণি উইকেটে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলার পরেও টিম ম্যানেজমেন্টের তাঁর ব্যাটিং দক্ষতায় বিশ্বাস নেই। অতএব প্যাট কামিন্সদের বিরুদ্ধে তাঁর খেলার সম্ভাবনা কম। প্রথম দুই টেস্টের এলোমেলো দল নির্বাচন সে-কথা প্রমাণও করে দেয়। তাই দ্বিতীয় টেস্টের পরেই তিনি অবসর নিয়ে নেন। অধিনায়ক রোহিত শর্মা সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, অশ্বিন নাকি পার্থেই অবসর নিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। রোহিতের অনুরোধেই অ্যাডিলেড পর্যন্ত থেকে যেতে রাজি হন।

ভারত অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জিতে গেলেই বা কী হত? বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠলেও সেই ম্যাচ হবে ইংল্যান্ডে। অর্থাৎ সেখানেও অশ্বিনকে বসিয়ে রাখা হত— এই সম্ভাবনা প্রবল। তারপর ভারতের টেস্ট সিরিজ বলতে ইংল্যান্ডে পাঁচ টেস্টের সিরিজ। ফের দেশের মাঠে টেস্ট সিরিজ আসতে আসতে অশ্বিনের বয়স চল্লিশের দিকে এগিয়ে যাবে। অশ্বিন ততদিন আর অপেক্ষা করলেন না। কেন করলেন না? ঠিক কী কথাবার্তা হয়েছিল অধিনায়ক আর কোচ গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে? সম্যক জানা যাচ্ছে না বলেই নানারকম গুজব এবং প্রচার ডালপালা মেলেছে। সেসব কথা থাক। এখানে বলার কথা হল, অশ্বিনের সঙ্গে যে-কোনও গড়পড়তা ভারতীয় ক্রিকেট-তারকার বিস্তর অমিল। তিনি কোহলির মতো বলিউড অভিনেত্রীর সঙ্গে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং করেননি। ব্যক্তিগত জীবন হাট করে ইনস্টাগ্রামে খুলে দেওয়ার পর ‘আমার বাচ্চার ছবি তুলছেন কেন’ বলে অস্ট্রেলীয় সাংবাদিকদের দিকে তেড়েও যাননি। সোশাল মিডিয়ায় তাঁর স্ত্রী, সন্তানদের ছবি বা ভিডিও রোহিতের পরিবারের চেয়েও কম দেখা যায়। সোশাল মিডিয়া মানে অশ্বিনের কাছে এক্সে একেবারেই ক্রিকেট সংক্রান্ত কিছু পোস্ট আর নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল। সেখানে মূলত ক্রিকেট নিয়েই ভিডিও পোস্ট করেন, কিন্তু দাবাও থাকে। আজ্ঞে হ্যাঁ, দাবা। এমন একজন ক্রিকেটার সদ্য প্রকাশ করেছেন আত্মজীবনীমূলক বই। এ বই তো পড়বই।

বহু বিখ্যাত খেলোয়াড় এই ধরনের বই লিখেছেন। সাধারণত লেখার কাজে তাঁর সঙ্গে থাকেন কোনও ক্রীড়া সাংবাদিক। ভারতীয় দাবার জীবন্ত কিংবদন্তি বিশ্বনাথন আনন্দের আত্মজীবনীর নাম যেমন মাইন্ড মাস্টার (২০১৯), তাঁর সঙ্গে লিখেছেন সাংবাদিক সুজান নাইনান। শচীন তেন্ডুলকরের আত্মজীবনী প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে (২০১৪), সহলেখক বোরিয়া মজুমদার। আন্দ্রে আগাসির আত্মজীবনী ওপেন (২০০৯) লেখায় তাঁকে সাহায্য করেছিলেন পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক জে আর মোরিঙ্গার। এই বইগুলোর কাটতি বেশ ভাল। কারণ খেলাপাগল লোকেদের মধ্যে এমন মানুষ কম নেই যারা খেলোয়াড়দের জীবনযাত্রা, ভাবনার ধরন, প্রস্তুতি, মনস্তত্ত্ব, ব্যক্তিগত জীবনের লড়াই সম্পর্কে জানতে চান। আবার কেউ হয়তো তেমন পড়ুয়া নন, কিন্তু প্রিয় খেলোয়াড়ের আত্মজীবনী স্রেফ সংগ্রহে রাখার আগ্রহে কিনে ফেলেন। অশ্বিনের বইও লেখা হয়েছে এক সাংবাদিকের সাহায্য নিয়ে। তিনি ক্রিকেট সাংবাদিক সিদ্ধার্থ মঙ্গা। কিন্তু মজার কথা, সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রায় দেড় দশক ক্রিকেট খেলে ফেলা অশ্বিনের বইয়ের নাম আই হ্যাভ দ্য স্ট্রিটস। প্রচ্ছদে দেখা যায় বল হাতে নয়, ব্যাটের উপর ভর দিয়ে বসে আছেন ভারতের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী বোলার।

এ কি অশ্বিনের শ্লেষ? ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যাটারদের সমান সম্মান যে হাজার সাফল্য সত্ত্বেও বোলারদের কপালে জোটে না— এ-কথা তো সর্বজনবিদিত। মাত্র একটা সিরিজে ব্যর্থ হয়েই নিজের বয়সের ভার স্বীকার করে নিয়ে অশ্বিন অবসর নিলেন। অথচ সমবয়স্ক কোহলি কালেভদ্রে একটা শতরান করলেই ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পারমানেন্ট’ জাতীয় কথা বলে সাংবাদিক, ধারাভাষ্যকার, ক্রিকেটভক্ত— সকলেই একেবারে গদগদ হয়ে যান। রোহিত নিতান্ত চাপে পড়ে এত বছর পরে রঞ্জি ট্রফি খেলতে নেমে জম্মু-কাশ্মীরের পেসারের গতিতেও চোখে অন্ধকার দেখছেন, অথচ নির্বাচকরা এখনও সাহস করে বলতে পারছেন না— এবার অবসর নাও। উল্টে অস্ট্রেলিয়ায় একটা টেস্টে তিনি নাকি নিজেকে বিশ্রাম দিয়েছিলেন। তাতে অবসর নেবেন কিনা জল্পনা শুরু হওয়ায় টিভি ক্যামেরার সামনে এসে সগর্বে বলে দিয়েছেন— আমি এখন আছি। কোথাও যাচ্ছি না। ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যাটারদের এই রাজার ব্যাটাসুলভ অবস্থানকেই কি নীরবে ব্যঙ্গ করছে অশ্বিনের বইয়ের প্রচ্ছদ?

আরও পড়ুন বিরাট, রোহিত, রাহুলদের সত্য রচনা চলছে চলবে

লোকটার নাম অশ্বিন বলেই এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না এবং ওই বইয়ের ভিতরে কী আছে তা জানার কৌতূহল বাড়ে। পরিতাপের বিষয় হল, ভারতীয় ক্রিকেট-সাংবাদিকতা মোটের উপর বিশ্লেষণহীন পেজ থ্রি সাংবাদিকতায় পরিণত হয়েছে। তাই অশ্বিনের অবসরের পর থেকে আজ পর্যন্ত কেউ তাঁর দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনের নানা দিক নিয়ে একখানা গভীর সাক্ষাৎকার নিল না। নিলে সামগ্রিকভাবে গত দেড় দশকে যেভাবে ভারতীয় ক্রিকেট পরিচালিত হয়েছে, যার ক্ষতি তাৎক্ষণিক না হলেও এখন টের পাওয়া যাচ্ছে, তা নিয়ে অনেক কিছু জানা যেতে পারত। অশ্বিনের মতো একজন ভাবুক ক্রিকেটারের ক্রিকেট-ভাবনা নিংড়ে নেওয়ার কাজ তো হতই। কাজটা করেছেন স্কাই ক্রিকেটের পডকাস্টে দুই প্রাক্তন ইংল্যান্ড অধিনায়ক— মাইকেল অ্যাথারটন আর নাসের হুসেন। সেই পডকাস্ট শুনলে অশ্বিনের বইখানা পড়ার আগ্রহ আরও বেড়ে যেতে বাধ্য। অশ্বিন বলেছেন তিনি বই পড়তে ভালবাসেন। নির্দিষ্ট করে বলেছেন ‘সেলফ-হেল্প বই নয়, উপন্যাস পড়তে ভালবাসি।’ তারপর জানিয়েছেন নিজের বইটাকেও তিনি এমনভাবে সাজাতে চেয়েছেন যাতে নিজেকে বইয়ের প্রথম অংশে লেখক হিসাবে বা বইয়ের প্রধান চরিত্র (“author or protagonist”) হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। ফলে শেষমেশ বইটা উপন্যাসের মতো হয়ে ওঠে। আরও বলেছেন ‘আমি আজও একজন গলি-ক্রিকেটার।’ বোঝা যায়, নিজের শিকড়ের প্রতি বিশ্বস্ততা বোঝাতেই তাঁর বইয়ের নামকরণ।

কোনও রাখঢাক না করে ওই পডকাস্টে অশ্বিন নির্দ্বিধায় বলেছেন, একজন বোলারের জীবন মোটেই খুব রঙিন নয়। তাই অনেকসময় দেখা যায়, উইকেট নিল অশ্বিন আর লাফিয়ে বেড়াচ্ছে বিরাট। কোনওদিন ভারত অধিনায়ক হওয়া হল না— এই নিয়ে আফসোস আছে কিনা জিজ্ঞেস করায় বলেছেন, তিনি ভেবে নিয়েছেন যে তিনি এমন এক কর্পোরেট কোম্পানিতে কাজ করতেন যারা তাঁকে ওই ভূমিকায় দেখতে চায়নি। ২০২৫ সালের ভারতে ক্রিকেটার, কোচ, বোর্ড, সাংবাদিক, বিশেষজ্ঞ, প্রাক্তন ক্রিকেটার— সকলে মিলে জাতীয় দলকে দেশের সমার্থক করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। সেখানে অশ্বিনের মতো উচ্চতার একজন ক্রিকেটার বোর্ডকে কর্পোরেট কোম্পানি বলছেন, জাতীয় দলে খেলাকে স্রেফ আরেকটা চাকরির মতো করে বর্ণনা করছেন— এই প্রবল কাণ্ডজ্ঞান তাঁকে এবং তাঁর বইকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

এমন নয় যে বড় ক্রিকেটার হলেই তাঁর আত্মজীবনী বা জীবনী খুব আকর্ষণীয়, পাঠযোগ্য হয়। শচীনের বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত কিছু অংশ পড়ে গাঁটের কড়ি খরচ করে আর কিনতে ইচ্ছে করেনি। যারা কিনে পড়েছে, প্রায় কারও মুখে প্রশংসা শুনিনি। সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগ শুনেছি তা হল, বইতে এমন একটা কথাও নেই যা শচীন সম্পর্কে ক্রিকেটভক্তরা আগেই জানত না। হয়তো তা খুব অবাক করার মতো নয়। কারণ শচীনের ব্যাটিং যতখানি চিত্তাকর্ষক ছিল, তাঁর কথাবার্তা ঠিক ততখানিই একঘেয়ে। অশ্বিন কিন্তু অন্য মানুষ। কার্টুনিস্ট প্রাণ তাঁর সৃষ্ট চরিত্র চাচা চৌধুরী সম্পর্কে যে কথা কমিক স্ট্রিপে লিখতেন, সে-কথা অশ্বিন সম্পর্কেও বলা যায়— অশ্বিনের মাথা কাজ করে কম্পিউটারের মতো।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাঙালির উদাসীনতার প্রমাণ ঋদ্ধিমান

ঠ্যালার নাম বাবাজি। সেই বাবাজির কল্যাণে এই জানুয়ারিতে হঠাৎ ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত রথী মহারথীদের মনে পড়ে গেছে যে ঘরোয়া ক্রিকেট ব্যাপারটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এবং রঞ্জি ট্রফি বলে একটা প্রতিযোগিতা হয় দেশে। ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের কাছে নাকানিচোবানি খাওয়ার পর অস্ট্রেলিয়াতেও কাপড়ে চোপড়ে করে আসার পর বাধ্য ছেলের মত রঞ্জি খেলতে নেমে পড়েছেন বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, শুভমান গিল, ঋষভ পন্থ প্রমুখ তারকারা। ফলে জন্মে রঞ্জি ট্রফির ধারেকাছে না যাওয়া সংবাদমাধ্যমকেও রোজ জানান দিতে হচ্ছে বিরাট নেটে কার সঙ্গে কথা বললেন, কতজন তাঁকে দেখতে এল, কেমন ওজনের ব্যাট নিয়ে খেললেন ইত্যাদি। ৩০ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া রঞ্জি ম্যাচগুলোতে সারা দেশের নজর দিল্লি বনাম রেলওয়েজ ম্যাচের দিকে, কারণ ওই ম্যাচেই এক যুগ পরে রঞ্জি খেলতে নামছেন বিরাট। তাঁর বিশ্বরূপে চোখ ধাঁধিয়ে গিয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যমও দু-চার লাইন লিখেই ক্ষান্ত দিচ্ছে যে এই রাউন্ডে সম্ভবত জীবনের শেষ প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলতে নামছেন ঋদ্ধিমান সাহা। কারণ বাংলার নক আউট স্তরে ওঠার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।

কেন দু-চার লাইনের বেশি প্রাপ্য ঋদ্ধিমানের? কারণ সর্বকালের সেরা পুরুষ বাঙালি ক্রিকেটারদের তালিকায় তিনি তিন নম্বরে থাকবেন। ইডেন উদ্যানে বৃহস্পতিবার বাংলা বনাম পাঞ্জাব ম্যাচ খেলতে নামার আগে পর্যন্ত ১৪১ খানা প্রথম শ্রেণির ম্যাচে শিলিগুড়ির ছেলে ঋদ্ধিমান ৩৪৪ খানা ক্যাচ ধরেছেন আর ৩৮ খানা স্টাম্পিং করেছেন, প্রায় ৪২ গড়ে সাত হাজারের বেশি রানও করেছেন। ফলে তিনি যে বাংলার সর্বকালের সেরা উইকেটরক্ষক তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হল, সৌরভ গাঙ্গুলি আর পঙ্কজ রায়কে বাদ দিলে আর কোনো বাঙালি ক্রিকেটার ঋদ্ধিমানের চেয়ে বেশি টেস্ট (৪০) খেলে উঠতে পারেননি। শুধু খেলেছেন বললে ভুল হবে। বরেণ্য উইকেটরক্ষক অ্যালান নটের সমসাময়িক হওয়ায় প্রতিভাবান বব টেলরের যেমন ইংল্যান্ডের হয়ে বেশি খেলা হয়নি, মহেন্দ্র সিং ধোনির সমসাময়িক হওয়ায় ঋদ্ধিমানও ভারতীয় দলে নিয়মিত হয়েছেন তিরিশের কোঠায় পা দিয়ে। তা সত্ত্বেও উইকেটের পিছনের দক্ষতায় মুগ্ধ করেছেন সৈয়দ কিরমানি, অ্যাডাম গিলক্রিস্টের মত কিংবদন্তিদের। তাঁর কোনো কোনো ক্যাচ চোখ কপালে তুলে দিয়েছে, ঘূর্ণি উইকেটে তাঁর উইকেটরক্ষা শিল্পের পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়েছে অনেকসময়। নিঃসন্দেহে বলা যায়, ঋষভ পন্থ এসে না পড়লে ঋদ্ধিমান অনায়াসে পঞ্চাশের বেশি টেস্ট খেলে ফেলতেন।

অথচ এই লোকটার অবসর নিয়ে বাংলায় কোনো হইচই নেই। বেহালার নীল রক্তের ক্রিকেটারের খেলোয়াড় জীবনে তাঁকে ঘিরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রাবল্য দেখলে বোধহয় সুরেন বাঁড়ুজ্জেও আশ্চর্য হতেন। অথচ শিলিগুড়ির মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেটার ব্যাপারে কোনোদিন তার ছিটেফোঁটা দেখা যায়নি। স্বভাবতই সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদেরও তাঁকে নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই। চোট আঘাতে চিরকাল জর্জরিত দিল্লির ছেলে আশিস নেহরা, যিনি খেলেছেন মাত্র ১৭ খানা টেস্ট আর ১২০ খানা একদিনে আন্তর্জাতিক ম্যাচে মনে রাখার মত পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন মাত্র একবার – তাঁকে যখন বিশেষ সম্মান দিয়ে ঘরের মাঠে টি টোয়েন্টি খেলে অবসর নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, তখন বাংলার সাংবাদিকরা কত কাব্য যে করেছেন! ঋদ্ধিমানের বেলায় সাজানো কালি শুকিয়ে গেল? একখানা সর্বভারতীয় ইংরিজি খেলার পত্রিকা ছাড়া কোথাও তো ঋদ্ধিমানের কোনো দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেখছি না!

আরো পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য আরও আঘাত অপেক্ষা করছে

অথচ ঋদ্ধিমানের ক্রিকেটজীবন যেভাবে শেষ হল, তিনি তত অযত্নের পাত্র ছিলেন না। টেস্ট দলে জায়গা পাকা করে নেওয়া ঋদ্ধিমান ২০১৮ সালে অস্ত্রোপচারের জন্য বিশ্রামে যেতে বাধ্য হলেন। যখন ফিরে এলেন তখন তাঁকে জায়গা ফিরিয়ে দেওয়া হল না, রেখে দেওয়া হল তরুণ ঋষভকে। কেন? না তিনি ইংল্যান্ডে শতরান করে ফেলেছেন। অথচ ঋষভের উইকেটরক্ষা এখন যত ভালই হোক, তখনো মোটেই ভরসা জোগানোর মত হয়নি। সে যতই তিনি এক ইনিংসে পাঁচটা ক্যাচ ধরে থাকুন। বিশেষত স্পিনারদের বিরুদ্ধে তাঁর উইকেটরক্ষা হাস্যকর হয়ে দাঁড়াত প্রায়শই। তা সত্ত্বেও ঋদ্ধিমান হয়ে গেলেন দ্বিতীয় পছন্দ। একটা অভিনব সূত্র দিল টিম ম্যানেজমেন্ট – বিদেশে কিপিং করবেন ঋষভ, কারণ ওখানে স্পিনারদের সামলাতে হয় না। আর দেশে ঋদ্ধিমান। সবসময় অবশ্য তাও মানা হয়নি। সৌরভের গোটা কেরিয়ারে প্রতিদিন তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া বাঙালি সমাজ তখন বিক্ষোভে ফেটে পড়েনি। ঋষভ ভাল খেলে দিয়েছেন, ঋদ্ধিমানকে জায়গা ফিরিয়ে দেওয়ার উপায় ছিল না – এ যুক্তি কিন্তু অসার। কারণ প্রথমত, ভাল খেলার বহরটা আগেই উল্লেখ করলাম। দ্বিতীয়ত, অধিনায়ক বিরাটের আমলেই ২০১৬ সালে চোটের জন্য দলের বাইরে থাকা সিনিয়র ক্রিকেটার অজিঙ্ক রাহানের জায়গায় একটা টেস্টে সুযোগ পেয়ে করুণ নায়ার ত্রিশতরান হাঁকিয়েছিলেন। অথচ পরের টেস্টেই সুস্থ রাহানেকে তাঁর জায়গা ফেরত দেওয়া হয় (করুণ আজ পর্যন্ত আর মোটে তিনটে টেস্ট খেলেছেন)। তখন বিরাটের যুক্তি ছিল – একটা পারফরম্যান্স অন্য একজন খেলোয়াড়ের কয়েক বছরের পরিশ্রমের মূল্য চুকিয়ে দিতে পারে না। সঠিক ক্রিকেটিয় যুক্তি, কিন্তু সেটা ঋদ্ধিমানের বেলায় খাটল না!

তাঁকে একেবারে বাদ দেওয়ার সময়ে অবশ্য কোচ রাহুল দ্রাবিড় আলাদা করে ডেকে বলেছিলেন বয়সের কারণে তাঁকে নিয়ে আর ভাবা হবে না। এটাও ক্রিকেটিয় যুক্তি হিসাবে ভুল নয়। কিন্তু তাঁর বদলে যাকে ভাবা হয়েছিল, সেই কে এস ভরত ইতিমধ্যেই তলিয়ে গেছেন। আরও বড় কথা, ঋদ্ধিমানের চেয়ে অনেক বেশি ধারাবাহিক ব্যর্থতার পরেও একই বয়সে পৌঁছে যাওয়া বিরাট আর রোহিতকে আজ ‘তোমাদের নিয়ে আর ভাবা হবে না’ বলার সাহস গৌতম গম্ভীর বা প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর দেখাতে পারছেন না। দলের স্বার্থে নিজেকে বাদ দেওয়া, ধেড়ে বয়সে রঞ্জি দলের নেটে এসে ব্যাকফুটে খেলার অনুশীলন ইত্যাদি আদিখ্যেতা চলছে।

ঋদ্ধিমানের প্রতি সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ব্যবহার করেছেন অবশ্য বাঙালিরাই। ভুললে চলবে না, তাঁকে যখন দল থেকে ক্রমশ সরিয়ে দেওয়া হল তখন বোর্ড সভাপতি ছিলেন বাংলার গৌরব সৌরভ। তারপর ২০২২ সালে এক বাঙালি সাংবাদিক সাক্ষাৎকার না দেওয়ার ‘অপরাধে’ ঋদ্ধিমানকে রীতিমত হুমকি দেন – দলে একজন উইকেটরক্ষকই সুযোগ পায়, তুমি ১১ জন সাংবাদিককে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছ। এটা আমার মতে ঠিক নয়… তুমি আমায় ফোন করোনি… কাজটা কিন্তু ভাল করলে না…ইত্যাদি। সেই হুমকি টুইটারে ফাঁস করে দেন ঋদ্ধিমান। বোর্ড বাধ্য হয়ে সেই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তদন্ত করে এবং সাময়িকভাবে তাঁর ভারতীয় ক্রিকেট কভার করা নিষিদ্ধ হয়। তবে তিনি বহাল তবিয়তে ফিরে এসেছেন। তাঁর প্রতি অবিচার হয়েছে – এই মর্মে বই লিখেছেন, সে বই ক্রিকেটমহলের পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছে। মাঝখান থেকে ঋদ্ধিমানের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার শেষ হয়ে গেছে। তারপর ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল (সিএবি) কর্তাদের ব্যবহারে আঘাত পেয়ে তিনি ত্রিপুরার হয়ে খেলতে চলে গিয়েছিলেন। শেষমেশ গ্যালারির ফাঁক দিয়ে ইডেন উদ্যানে শুভবুদ্ধির হাওয়া এসে পড়ে হাইকোর্ট প্রান্ত থেকে এবং সৌরভের কথায় (ঋদ্ধিমানের বয়ান অনুযায়ী) তিনি শেষ মরশুমটা বাংলার হয়ে খেলার সুযোগ পান।

সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ঋদ্ধিমানের যে সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করলাম, তাতে অভিমানের সুর স্পষ্ট। তিনি বলেছেন “আমি বরাবর বিশ্বাস করেছি যে পারফরম্যান্সই একজন খেলোয়াড়ের পরিচয়, পাবলিক রিলেশন নয়।” বলা বাহুল্য, যুগটা বদলে গেছে। একটা ব্যাপার অবশ্য বদলায়নি – কলকাতার বাইরের বাঙালি সম্পর্কে বাঙালির উদাসীনতা।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

অশ্বিনের অবসর ব্যাটারদের পিঠ বাঁচানোর নীতির গালে চড়

অশ্বিন কেন, যে কোনো বুদ্ধিমান মানুষ বুঝতে পারবেন যে আসলে আমাদের কোচ আর অধিনায়ক দল তৈরি করেন ব্যর্থ ব্যাটারদের পিঠ বাঁচাতে। কাজটা যে আজ নতুন হচ্ছে, তাও নয়। এ জিনিস চালু করে দিয়েছিলেন ধুমধাম ধোনি। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।

ভারতের হয়ে টেস্ট খেলেছেন মাত্র ১৭টা, নিয়েছেন ৪২.৪০ গড়ে ৪৪ খানা উইকেট। একদিনের ম্যাচ খেলেছেন ১২০টা, ৩১.৭২ গড়ে নিয়েছেন ১৫৭ খানা উইকেট। কুড়ি বিশের ম্যাচ খেলেছেন ২৭টা, ২২.২৯ গড়ে নিয়েছেন মোটে ৩৪ খানা উইকেট। না, রবিচন্দ্রন অশ্বিনের কথা হচ্ছে না। বলছি আশিস নেহরার কথা। উপরের পরিসংখ্যান সাধারণ বললেও বেশি বলা হয়। বলা উচিত আলোচনার অযোগ্য। শেষ টেস্ট ম্যাচ খেলেছিলেন ২০০৪ সালে, শেষ একদিনের ম্যাচ ছিল ২০১১ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। সেই নেহরার জন্যে ঘটা করে তাঁর ঘরের মাঠে বিদায়ী ম্যাচের বন্দোবস্ত করেছিল ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) – তারিখটা ছিল ১ নভেম্বর ২০১৭। ভারতের বিজেপি সরকারের মত ক্রিকেট বোর্ডেরও আছে গোদি মিডিয়া। সেই মিডিয়া ভরে গিয়েছিল স্বনামধন্য সাংবাদিকদের লম্বা লম্বা লেখায়। তাঁরা যেনতেনপ্রকারেণ প্রমাণ করেছিলেন – নেহরা মহান ক্রিকেটার, তাই তাঁর এই সম্মান প্রাপ্য। বোর্ডের মাইনে করা প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও নিজেদের শব্দভাণ্ডার উজাড় করে দিয়েছিলেন নেহরার জন্য। তিনি নাকি অসম্ভব সম্ভাবনাময় ছিলেন, কেবল চোট আঘাতের জন্যে বেশি খেলে উঠতে পারলেন না। পারলেই…

হতেও পারে। সম্ভাবনা তো আর মাপা যায় না, আর কী হলে কী হত তা নিয়েও অনন্তকাল আলোচনা চালানো যায়। সুকান্ত ভট্টাচার্য ৮০ বছর বাঁচলে রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বড় কবি হতেন – একথা প্রমাণ করার যেমন উপায় নেই, অপ্রমাণ করারও উপায় নেই। কিন্তু সাফল্য তো পরিমাপযোগ্য। নেহরা যদি বিদায়ী ম্যাচ পাওয়ার যোগ্য হন, তাহলে টেস্টে তিনশোর বেশি, একদিনের ক্রিকেটেও প্রায় তিনশো উইকেট পাওয়া, ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম কাণ্ডারী জাহির খান কী দোষ করেছিলেন? কী দোষ ছিল হরভজন সিংয়ের? তিনি তো টেস্টে চারশোর বেশি উইকেটের মালিক, একদিনের ক্রিকেটেও আড়াইশোর বেশি। বহু স্মরণীয় জয়ের নায়ক। নেহরার তো স্মরণীয় পারফরম্যান্স বলতে ঠিক একটা – ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ডারবানে ২৩ রানে ছয় উইকেট নেওয়া। ভারতীয় ক্রিকেটে মহান হওয়া এত সহজ তাহলে?

এসব পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে হত না, অশ্বিন অস্ট্রেলিয়া সিরিজের মাঝখানেই অবসর নিয়ে না ফেললে। এই ওয়েবসাইটেই নিউজিল্যান্ড সিরিজে ভারত গোহারান হারার পরে লিখেছিলাম অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজা হলেন মাঝারিয়ানার দেবদূত। সেই মত পরিবর্তন করার মত কিছু ঘটেনি। কিন্তু সে মাঝারিয়ানা তো সর্বকালের সেরাদের সাপেক্ষে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে অশ্বিন ভারতের বর্তমান প্রজন্মের সেরা স্পিনার। তাছাড়া মাঝারিয়ানা এক জিনিস, অপকর্ষ আরেক জিনিস। যে দেশে নেহরাকে ধূপধুনো দিয়ে পুজো করে বিদায় জানানো হয়, সেখানে অনিল কুম্বলের পরেই ভারতের সবচেয়ে সফল টেস্ট বোলার, সবচেয়ে বেশিবার সিরিজের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার বিশ্বরেকর্ড করে ফেলা অশ্বিন একটা সিরিজের মাঝখানে এমন চকিতে বিদায় নেবেন – এটা ক্রিকেটপ্রেমীরা নীরবে হজম করবেন? প্রশ্ন করবেন না, কেন এভাবে বিদায় নিলেন অশ্বিন?

যদি আর টেস্ট খেলতে পারবেন না বলেই মনে করে থাকেন, তাহলে তো নিউজিল্যান্ড সিরিজের পরেই অবসর নিতে পারতেন। অথবা বলে দিতে পারতেন – অস্ট্রেলিয়া সিরিজই হবে আমার শেষ সিরিজ। অনেকেই তো এভাবে অবসর নেন। নিউজিল্যান্ডের নির্ভরযোগ্য জোরে বোলার টিম সাউদি অশ্বিনের আগেরদিনই টেস্ট কেরিয়ার শেষ করলেন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের শেষ টেস্ট খেলে। তিনি কিন্তু ম্যাচের আগেই বলে দিয়েছিলেন, ওটাই হতে চলেছে তাঁর শেষ টেস্ট। কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডের জেমস অ্যান্ডারসন আর স্টুয়ার্ট ব্রডও আগে থেকে ঘোষণা করে অবসর নিয়েছেন। যেসব ক্রিকেটারের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ার হয়, ভক্তকুল তৈরি হয় – তাঁরা তো এভাবেই বিদায় নেন। শেষ সময়ে ভক্ত, সহখেলোয়াড়, প্রাক্তনদের অভিবাদন পেতে কার না ভাল লাগে? মানুষ যে পেশাতেই থাকুক, কোনো বয়সেই অবসর নেওয়া সোজা নয়। ভাল হোক, মন্দ হোক, অনেকগুলো সম্পর্ক তৈরি হয় কর্মস্থলে। কাজ থেকে অবসর নিতেই হয়। কারণ শরীর প্রাকৃতিক নিয়মে একসময় কাজের অনুপযোগী হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের মন তো প্রকৃতির নিয়মে চলে না। কাজ ছেড়ে যেতে এবং কাজের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলোকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হয়, বিষণ্ণতা তৈরি হয়। শুধু যে অবসর নিচ্ছে তারই হয় তা নয়, তার সহকর্মীদেরও হয়। অশ্বিনের মত বিখ্যাত খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে যারা কোনোদিন তাঁর ধারেকাছে যেতে পারেনি, কেবল কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে টিভি বা মোবাইলের পর্দায় দেখেছে, তারাও বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। অত মানুষের বিষণ্ণতা, শেষ মুহূর্তের ভালবাসা ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনই আবার অবসরপ্রাপ্ত মানুষটার বাকি জীবনের পাথেয়। এক্ষেত্রে অশ্বিন বা আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই। সেই ভালবাসা গুছিয়ে চেটেপুটে নেওয়ার সুযোগ কে ছাড়তে চায়? চাওয়ায় কোনো দোষও নেই। তাহলে অশ্বিন এমন হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?

ব্রিসবেনে বৃষ্টিতে শেষদিনের খেলা ভেস্তে যাওয়ার পর অধিনায়ক রোহিত শর্মার সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে অশ্বিন কী বলেছেন এতদিনে সবাই জানেন। দু মিনিটেরও কম দৈর্ঘ্যের সেই বক্তব্য শুনলে মনে হয়, সিদ্ধান্তটা চট করে নেওয়া। অথচ অশ্বিনের ক্রিকেটজীবন যাঁরা অনুসরণ করেছেন তাঁরা জানেন, অশ্বিন হুটহাট কাজ করার লোক নন। এমনিতেই স্পিন বোলিং ব্যাপারটায় গায়ের জোরের চেয়ে মস্তিষ্কের কাজ বেশি বৈ কম নয়। তার উপর অশ্বিন এমন একজন ক্রিকেটার, যাঁর মাথা ব্যাট করার সময়েও একইরকম সক্রিয় থাকত। শেন ওয়ার্ন সম্পর্কে একসময় বলা হত ‘the best captain Australia never had’। অশ্বিন সম্পর্কেও বলা যায়, তিনি ভারতের সেরা না-হওয়া অধিনায়ক। এমন লোক আজ ভাবলেন, আর এখুনি অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন – এমনটা না হওয়াই স্বাভাবিক। অশ্বিনের প্রস্থানের পর রোহিত যা বলেছেন, তা থেকে কিন্তু পরিষ্কার যে এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ নেওয়া হয়নি। রোহিত বলেন ‘আমি পার্থে এসে এটা শুনি। এটা তখন থেকেই ওর মাথায় ঘুরছিল। আমি কোনো মতে ওকে গোলাপি বলের টেস্টটা [অ্যাডিলেড] অব্দি থেকে যেতে রাজি করাই। ওর মনে হয়েছে, যদি আমার প্রয়োজন না পড়ে তাহলে আমার বিদায় নেওয়াই ভাল।’

হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে অশ্বিনের বাবা রবিচন্দ্রন মেলবোর্ন আর সিডনির শেষ দুটো টেস্ট দেখতে যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট কেটে ফেলেছিলেন। ছেলে অবসর নেওয়ার খবর জানানোর পরে টিকিটগুলো বাতিল করেন। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রবিচন্দ্রন অবসরের কারণ হিসাবে ছেলের অপমানিত বোধ করার সম্ভাবনাও জানিয়ে ফেলেছেন। তবে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হতেই অশ্বিন এক্স হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করেছেন, তাঁর বাবার মিডিয়া সামলানোর প্রশিক্ষণ নেই। অতএব তাঁকে সবাই দয়া করে ক্ষমা করে দিন। লক্ষ করুন, অশ্বিন বলেছেন, বাবা মিডিয়াকে কী বলতে হয় না হয় জানেন না, তাই ওরকম বলে ফেলেছেন। বাবা ভুল বুঝেছেন, আমি খুশি মনেই অবসর নিয়েছি – এমন কথা বলেননি কিন্তু। পাশাপাশি রোহিত বলেছেন যে পার্থ থেকেই অশ্বিন অবসরের চিন্তা করছিলেন। তার মানে রোহিত অ্যাডিলেডের দ্বিতীয় টেস্ট পর্যন্ত থেকে যাওয়ার কথা না বললে হয়ত পার্থেই অবসর ঘোষণা করে দিতেন। এখানেই ভারতীয় দল যেভাবে চালানো হয় তা নিয়ে একগুচ্ছ প্রশ্ন তোলার অবকাশ তৈরি হয়।

কী হয়েছিল পার্থে? দলে দুজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ স্পিনার থাকা সত্ত্বেও খেলানো হয়েছিল মাত্র চারটে টেস্ট খেলা ওয়াশিংটন সুন্দরকে। ওয়াশিংটনকে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ৫১.২ ওভারের মধ্যে মাত্র দু ওভার বল করতে দেওয়া হয়, দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫ ওভার বল করলেও মিচেল স্টার্ক আর নাথান লায়ন নামে দুই বোলারের উইকেট নেওয়ার বেশি প্রভাব ফেলতে পারেননি। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন ব্যাট হাতে তিনি অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজার চেয়েও বেশি নির্ভরযোগ্য হওয়াই নাকি তাঁর সুযোগ পাওয়ার আসল কারণ। কিন্তু ওয়াশিংটন প্রথম ইনিংসে করেন ৪, দ্বিতীয় ইনিংসে ২৯। তবে তরুণ ক্রিকেটারকে একটা টেস্টে ব্যর্থ হওয়ার জন্য সমালোচনা করা অন্যায়। বিশেষত প্রথম ইনিংসে যেখানে দুই দলের সমস্ত ব্যাটার ব্যর্থ হয়েছিলেন আর ভারতের বোলিংয়ের সময়েও পিচ, আবহাওয়া – সবকিছুই ছিল জোরে বোলারদের জন্যে আদর্শ। কিন্তু কথা হল, ওয়াশিংটনকে তাহলে অ্যাডিলেডের দ্বিতীয় টেস্টে বাদ দেওয়া হল কেন? তাঁর বোলিং ও ব্যাটিং দক্ষতার প্রতি ভরসা রোহিত-গৌতম গম্ভীরের টিম ম্যানেজমেন্ট মাত্র একটা ম্যাচের পরেই হারিয়ে ফেলল? এভাবে কোনো তরুণ ক্রিকেটারকে লম্বা রেসের ঘোড়া করে তোলা যায়?

নাকি ব্যাপারটা আসলে এইরকম, যে অশ্বিন পাঁচশোর বেশি উইকেট নিয়ে ফেলার পরেও বিদেশের মাঠে বারবার বাদ পড়ায় বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যাবেন বলছেন শুনে প্রথম টেস্টে না খেলা অধিনায়ক রোহিত তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন – অ্যাডিলেডে ওঁকেই খেলানো হবে? যদি তা হয়, তাহলে কিন্তু বলতে হবে টিম ম্যানেজমেন্ট অবৈজ্ঞানিক, যুক্তিহীন, আবেগসর্বস্ব পদ্ধতিতে দল চালান। অশ্বিন অ্যাডিলেডে খেললেন এবং মন্দ খেললেন না। প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয়ের মধ্যে ২২ বলে ২২ রান করলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে আর সকলের মত তিনিও ব্যর্থ। তাঁর প্রধান কাজ তো বল করা। তাতে কিন্তু প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হয়েছেন বলা যাবে না। ১৮ ওভার বল করেছেন, অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের বেশি রান করতে দেননি এবং অলরাউন্ডার মিচেল মার্শের উইকেট তুলে নিয়েছেন।

তারপরেও তৃতীয় টেস্টে অশ্বিনকে বাদ দিয়ে জাদেজাকে খেলানো হল কোন যুক্তিতে? একটা যুক্তিই থাকা সম্ভব। প্রথম দুই টেস্টে ব্যাটাররা ডুবিয়েছেন, আবার ডোবাতে পারেন। জাদেজা টেনে তোলার কাজটা ওয়াশিংটন আর অশ্বিনের চেয়েও ভাল পারবেন, তাই। সেই মহেন্দ্র সিং ধোনির আমল থেকে ভারতীয় ক্রিকেটে চালু ধারণা – জাদেজা অশ্বিনের থেকে ভাল ব্যাট করেন। যদিও দুজনের মধ্যে তফাত মোটেই আকাশপাতাল নয়। অশ্বিন বিদেশে ৪০ খানা টেস্ট খেলে ১৪৮৫ রান করেছেন ২৫.৬০ গড়ে, দুটো শতরান আর ছটা অর্ধশতরান সমেত। জাদেজা ২৭ খানা টেস্ট খেলে ১২১০ রান করেছেন ৩৪.৫৭ গড়ে, একটা শতরান আর নটা অর্ধশতরান সমেত। জাদেজার গড় অশ্বিনের চেয়ে নিঃসন্দেহে অনেকটা ভাল হলেও মনে রাখতে হবে, গত অস্ট্রেলিয়া সফরে সিডনিতে হনুমা বিহারীর সঙ্গে অশ্বিন যে ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস খেলেছিলেন, তেমন অবিশ্বাস্য ইনিংস বিশ্বমানের জোরে বোলিংয়ের বিপক্ষে জাদেজা বিদেশে কখনো খেলেননি। ব্রিসবেনে সদ্য যে ৭৭ রানের ইনিংস খেললেন, তা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনজন বিশেষজ্ঞ বোলারের বিরুদ্ধে। কারণ আহত জশ হেজলউড ইনিংসের শুরুর দিকেই মাঠ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

আরো পড়ুন স্বর্গহারা মাঝারিয়ানার দেবদূত: বিরাট, রোহিত ও সম্প্রদায়

তবে এই তুলনামূলক আলোচনা যে করতে হচ্ছে – সেটাই অশ্বিন, জাদেজা, ওয়াশিংটনের প্রতি অবিচার। তুলনা করতে হলে তো করা উচিত তাঁদের বোলিং নিয়ে, কারণ ওঁরা প্রথমত বোলার। ব্যাটের হাত ভাল সেটা বোনাস হিসাবেই ধরা উচিত, কারণ খেলাটা টেস্ট ক্রিকেট। কুড়ি বিশের ক্রিকেট নয়, যেখানে ১ থেকে ১১ সকলেরই রান করতে পারা দরকার। ওয়াশিংটন যেহেতু মোটে ছটা টেস্ট খেলেছেন, সেহেতু তাঁকে আলোচনার বাইরে রেখে অশ্বিন আর জাদেজার বিদেশের মাঠের পরিসংখ্যান দেখি।

অশ্বিন ৪০ টেস্টে ৩০.৫৫ গড়ে ১৫০ খানা উইকেট নিয়েছেন। এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন আটবার, আর ম্যাচে দশ উইকেট দুবার। অন্যদিকে জাদেজা ২৭ টেস্টে ৩৪.০৩ গড়ে মাত্র ৭৬ খানা উইকেট নিতে পেরেছেন। এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট মাত্র দুবার, ম্যাচে দশ উইকেট একবারও নয়। অর্থাৎ বিদেশে জাদেজা কোনো আলোচনার যোগ্য বোলারই নন। উপমহাদেশের বাইরে তাঁর বোলিং এতই পানসে হয়ে যায় যে ২০১৩ ইংল্যান্ড সফরে একটা টেস্টে ধোনি উইকেট থেকে পিছিয়ে দাঁড়িয়ে জাদেজাকে দিয়ে কয়েক ওভার মিডিয়াম পেস বল করিয়েছিলেন। ব্রিসবেনে টেস্টেও দেখা গেল, পিচে কিঞ্চিৎ টার্ন ও বাউন্স থাকলেও জাদেজা কিছুই করতে পারলেন না। বরং ২৩ ওভার বল করে ৯৫ রান দিয়ে ফেললেন।

এসব দেখে অশ্বিন কেন, যে কোনো বুদ্ধিমান মানুষ বুঝতে পারবেন যে আসলে আমাদের কোচ আর অধিনায়ক দল তৈরি করেন ব্যর্থ ব্যাটারদের পিঠ বাঁচাতে। কাজটা যে আজ নতুন হচ্ছে, তাও নয়। এ জিনিস চালু করে দিয়েছিলেন ধুমধাম ধোনি। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। ২০১৪-১৫ মরশুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রথম টেস্টই ছিল অ্যাডিলেডে। অধিনায়ক বিরাট কোহলি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে অশ্বিনকে বসিয়ে রেখে লেগস্পিনার কর্ণ শর্মাকে খেলিয়ে দেন। দুই ইনিংস মিলিয়ে কর্ণ চারটে উইকেট নিলেও বেধড়ক মার খান। প্রথম ইনিংসে ৩৩ ওভার বল করে ১৪৩ রান দেন, দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬ ওভার বল করে ৯৫। ওটাই তাঁর জীবনের প্রথম ও শেষ টেস্ট। মনে রাখবেন, ওই টেস্টে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন লায়ন। পরের তিনটে টেস্টে অশ্বিনই খেলেন এবং ইনিংস পিছু গোটা দু-চার করে উইকেটও নেন। কিন্তু কর্ণ কুন্তীর প্রথম পছন্দ না হলেও ধোনি, কোহলিদের প্রথম পছন্দ হতে পেরেছিলেন কোন গুণে? আইপিএলে কিছু চার, ছয় মারতে পারার সুনাম ছিল বলে।

ওই সিরিজের মাঝখানেই ধোনি অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়ে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। অশ্বিন হয়ত ভেবেছিলেন নতুন আমলে দেশের মত বিদেশেও তিনি প্রথম পছন্দ হয়ে উঠবেন। কিন্তু বিরাট কোহলির আমলেও তা ঘটল না, জাদেজা এসে পড়লেন। পৃথিবীর সর্বত্র সব বোলারের বিরুদ্ধে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করা স্টিভ স্মিথকে ২০২০-২১ সিরিজে বোতলবন্দি করতে পেরে এবং সিডনির সেই ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস খেলার পরে অশ্বিন নির্ঘাত ভেবেছিলেন – আর বিদেশে বেঞ্চে বসে থাকতে হবে না। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তিনি দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় পছন্দ হতে চলেছেন। গত এক দশকে টেমস ইত্যাদি নদী দিয়ে কত জল গড়াল। ধোনি আর বিরাটের অভিভাবক রবি শাস্ত্রী গেলেন, রাহুল দ্রাবিড় এলেন। তাও এই ধারা বদলাল না। বিরাটের বদলে রোহিত টেস্ট অধিনায়ক হলেন। তাতেও অশ্বিন বিদেশে দ্বিতীয় পছন্দই রয়ে গেলেন। দ্রাবিড়ের জায়গায় গম্ভীর এলেন। অশ্বিন যে তিমিরে সেই তিমিরেই। কেন? ক্রিকেটের আদিম যুগের ভাষায় বললে – ভারতীয় দলের জেন্টলম্যান হলেন ব্যাটাররা। তাঁদের বছরের পর বছর ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার অধিকার আছে। সেই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব প্লেয়ারদের, মানে স্পিনারদের, ঘাড়ে। সেই অধিকার রক্ষার্থে সেরা স্পিনারকে নয়, খেলানো হবে স্পিনারদের মধ্যে সেরা ব্যাটারকে। সেটাও আবার তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ঠিক হবে না, হবে অধিনায়ক আর কোচের মতানুসারে। আটত্রিশ বছর বয়সে এসে এই অবিচার আর সহ্য না হওয়ারই কথা। আমাদের অনেককেই বিভিন্ন পেশায় এ জিনিস সহ্য করতে হয়। বহু ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ ভুল লোক ভুল উদ্দেশ্য নিয়ে ‘টিম লিডার’ হয়ে বসে আছে। তাদের কাছে অভিজ্ঞতা, নৈপুণ্যের দাম থাকে না। সিনিয়র কর্মচারীরা মুখ বুজে নিজের যোগ্যতার অবমূল্যায়ন হচ্ছে বুঝেও কাজ চালিয়ে যান। কারণ তাঁদের কাছে আইপিএলের মত বিকল্প নেই। অশ্বিনের মত তুখোড় ইউটিউবার হতেও সবাই পারে না। উনি পারেন। সুতরাং এই ধাষ্টামো কেন মেনে নেবেন?

অশ্বিন এভাবে বিদায় জানিয়ে আরেকটা জরুরি কাজও করে গেলেন। তাঁরই বয়সী রোহিত আর বিরাটের নির্লজ্জতা উন্মোচিত করে দিলেন। দেশের মাঠেও নিউজিল্যান্ডের স্পিনাররা এসে বেশি উইকেট নিয়ে চলে যাচ্ছেন মানে সূর্যাস্তের দিকে যাত্রা যে শুরু হয়ে গেছে সেটা বোঝামাত্রই আর পরের হোম সিরিজের জন্য অপেক্ষা করলেন না অশ্বিন। চলতি সিরিজের পরের দুটো টেস্ট মেলবোর্ন আর সিডনিতে। শোনা যাচ্ছে মেলবোর্নে নাকি স্পিনের দরকার বেশি পড়বে প্রথম তিন টেস্টের তুলনায়, আর সিডনি তো ঐতিহাসিকভাবেই অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে স্পিনারবান্ধব পিচ। তার জন্যেও দাঁড়ালেন না। অথচ রোহিত আর বিরাট প্রায় পাঁচ বছর ধরে পণ করে আছেন, যতক্ষণ না কেরিয়ার ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে ততক্ষণ খেলে যাবেন।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

স্বর্গহারা মাঝারিয়ানার দেবদূত: বিরাট, রোহিত ও সম্প্রদায়

২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজে চূড়ান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরে শচীন তেন্ডুলকর সম্পর্কে কপিলদেব কিন্তু টিভি স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন ‘জিন্দগি ঔর ভি হ্যায়’। অর্থাৎ শচীনের বোঝা উচিত যে ক্রিকেটের বাইরেও জীবন আছে। অথচ নিজের দেশের মাঠে রোহিত, বিরাটের নাকানি চোবানি খাওয়া দেখেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাক্তন বলেননি যে ওদের এবার অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে।

ভারতীয় বোলিংয়ের মাঝারিয়ানার আলোচনা যেখানে শেষ হয়েছিল, ব্যাটিংয়ের মাঝারিয়ানার আলোচনা সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। অর্থাৎ রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজা থেকে। বোলার হিসাবে এঁদের মাঝারিয়ানা আগের লেখায় দেখিয়েছি, কিন্তু ভারতীয় দলের মেগাস্টার ব্যাটারদের মাঝারিয়ানা আরও সরেস। এতটাই সরেস যে এই দুজনের ব্যাটের হাত সাধারণ বোলারদের তুলনায় অস্বাভাবিক ভাল না হলে নিউজিল্যান্ড সিরিজের লজ্জায় ভারতকে অনেক আগেই পড়তে হত। কিন্তু ভারত এমন এক দেশ যেখানে ব্যাটারদের সাত খুন মাফ। তাই বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মারা বছরের পর বছর রান না করেও কলার তুলে ঘুরতে পারেন। ভাগ্যিস নিউজিল্যান্ড ৩-০ করে দিয়ে গেছে। ওয়াংখেড়ের ‘ডেড রাবার’ যদি কোনোমতে ঋষভ পন্থ জিতিয়ে দিতেন, তাহলে এই যে এখন দীনেশ কার্তিকের মত প্রাক্তনরা ঢোঁক গিলে বিরাট, রোহিতকে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে বলছেন – এটুকুও হত না।

দেশে, বিদেশে গত এক যুগ অধিনায়ক মহেন্দ্র সিংহ ধোনি থেকে বিরাট হয়ে রোহিতের আমল পর্যন্ত ভারতীয় ব্যাটিংকে বারবার চরম লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে লোয়ার অর্ডার ব্যাটিং। তার অনেকখানি কৃতিত্ব অশ্বিন আর জাদেজার। বস্তুত গ্যারি সোবার্স, জাক কালিস, ইয়ান বোথাম, কপিলদেব, ইমরান খান, রিচার্ড হেডলির মত কিংবদন্তি অলরাউন্ডারদের বাদ দিলে টেস্টে অশ্বিন আর জাদেজার মত অতগুলো উইকেটের সঙ্গে এত রান করা ক্রিকেটার খুঁজে পাওয়া ভার। ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের কাছে ঘরের মাঠে সিরিজ হারার পর থেকে এই নিউজিল্যান্ড সিরিজে হারের মাঝের যে সময়টা নিয়ে বিস্তর গর্ব আমাদের, সেই সময়কালের প্রায় সমস্ত স্মরণীয় জয় এবং ড্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন ভারতের নিচের দিকের ব্যাটাররা। বিশেষত শেষ ৫-৬ বছরে উইকেটরক্ষক পন্থ আর বোলাররাই ভারতের হয়ে ব্যাট হাতে সবচেয়ে ধারাবাহিক। এমনকি ২০২০-২১ মরশুমে ব্রিসবেনের গাব্বায় যে জয় নিয়ে আমাদের যারপরনাই গর্ব, সেই টেস্টেও ব্যাট হাতে রোহিতের অবদান ছিল ৪৪, ৭। বিরাট সেই টেস্টে খেলেননি। প্রথম ইনিংসে শুভমান গিল, পূজারা, রাহানে, মায়াঙ্ক আগরওয়াল – কেউই সুবিধা করতে পারেননি। ওয়াশিংটন সুন্দর আর শার্দূল ঠাকুর জোড়া অর্ধশতরান না করলে অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসেই বিরাট লিড পেয়ে যেত। দ্বিতীয় ইনিংসেও গিল (৯১) আর পূজারার (৫৬) লড়াই বৃথা যেত পন্থ (অপরাজিত ৮৯) আর ওয়াশিংটন (২২) না থাকলে।

চট করে প্রথম চার-পাঁচটা উইকেট পড়ে যাবে। তারপর কোনো একজন মিডল অর্ডার ব্যাটার অশ্বিন, জাদেজা বা অন্য বোলারদের সঙ্গে নিয়ে ভদ্রস্থ রান তুলে দেবেন বা ম্যাচ জিতিয়ে দেবেন, নিদেনপক্ষে হার বাঁচিয়ে দেবেন – এটাই নিয়ম হয়ে গেছে ভারতীয় ক্রিকেটে। পৃথিবীর সর্বত্র, যে কোনো বোলিংয়ের বিরুদ্ধে, এমনকি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও। অথচ এবার ৩-০ হওয়ার পরে এমন ভান করা হচ্ছে যেন স্রেফ স্পিন খেলতে না পেরেই আমাদের এই অবস্থা হয়েছে এবং ভারি অপ্রত্যাশিত একটা ব্যাপার ঘটেছে। অথচ গত কয়েক বছরে ভারতের বারবার ঘটে চলা ব্যাটিং ব্যর্থতা খেয়াল করলে বোঝা যায় – এটাই প্রত্যাশিত ছিল। আগে কেন ঘটেনি সেটাই আশ্চর্যের।

বেশি পিছোতে হবে না। যে বাংলাদেশকে দুদিনে হারিয়ে দিয়েছি বলে কদিন আগেই পেশি ফোলালাম আমরা, তাদের সঙ্গেই সেপ্টেম্বরে চেন্নাইতে প্রথম টেস্টের প্রথম দিন সকালে ৯৬ রানে চার উইকেট চলে গিয়েছিল আমাদের। তথাকথিত বিশ্বসেরা ওপেনার রোহিত আর তথাকথিত সর্বকালের সেরা ব্যাটার কোহলি আনকোরা হাসান মাহমুদের সুইং সামলাতে না পেরে ছখানা করে রান করে প্যাভিলিয়নের পথ ধরলেন। গিল তো খাতাই খুলতে পারলেন না। পন্থ ৩৯ রান করেছিলেন, সুপ্ত প্রতিভাসম্পন্ন কে এল রাহুল আবার ব্যর্থ। সেদিনও জাদেজা ৮৬ আর অশ্বিন শতরান না করলে শ দুয়েক রানেই গুটিয়ে যেত ভারতের ইনিংস। বিপক্ষ দলের মান বাংলাদেশের চেয়ে ভাল হলে কী হত সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেল নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বেঙ্গালুরুর প্রথম টেস্টে। প্রথম দিন বৃষ্টিতে খেলা না হওয়ার পর দ্বিতীয় দিন জোরে বোলিং সহায়ক আবহাওয়ায় ম্যাট হেনরি আর বাচ্চা ছেলে উইলিয়াম ও’রুর্ক ৪৬ রানে গুটিয়ে দিলেন ভারতের ইনিংস। স্কোরবোর্ড জুড়ে শূন্য আর দুইয়ের ছড়াছড়ি। রোহিত সুইং সামলাতে পারবেন না বুঝে স্টেপ আউট করে মারতে গিয়ে দুই রানে বোল্ড, আর কোহলি দীর্ঘকায় ও’রুর্কের বাউন্স সামলাতে না পেরে লেগ স্লিপের হাতে বল জমা দিয়ে শূন্য রানে আউট। দ্বিতীয় ইনিংসের ভাল ব্যাটিং ইনিংস হার বাঁচানোর কাজটুকু করতে পেরেছিল। তাও রোহিত যেভাবে আউট হলেন, তাতে বোঝা যায় তিনি সেই স্তরে পৌঁছেছেন যেখানে শরীর চলে তো মাথা কাজ করে না। নইলে নিজের ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ স্ট্রোকে মুগ্ধ হয়ে থেকে বলটা গড়িয়ে উইকেটে যাচ্ছে কিনা তা খেয়াল করতে ভুলে যাবেন কেন?

ভারতীয় দল এবার অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছে বর্ডার-গাভস্কর ট্রফির অঙ্গ হিসাবে পাঁচখানা টেস্ট খেলতে। অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। তার একটা বড় কারণ – দীর্ঘ সময় ধরে ব্যর্থ কোনো ক্রিকেটারকে প্রতিভাবান, বা সম্ভাবনাময়, বা সিনিয়র, বা অধিনায়ক, বা রেকর্ড করবে – এই অজুহাতে তারা বয়ে বেড়ায়নি কোনোদিন। বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক স্টিভ ওয়কেও ২০০৩ বিশ্বকাপের একবছর আগে একদিনের দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, কারণ তাঁর বয়স তখন ৩৭। ফর্ম নেহাত খারাপ ছিল না, অর্থাৎ বর্তমান ছিল, কিন্তু ভবিষ্যৎ ছিল না। আর এদেশে আমরা কী করছি? স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ৩৭ বছরের রোহিতের না শরীর চলছে, না মাথা ঠিকমত কাজ করছে (সদ্যসমাপ্ত সিরিজে অধিনায়কত্বে অজস্র ভুলও স্মর্তব্য)। তাঁর চেয়ে বছর দেড়েকের ছোট বিরাটও সোজা ফুলটসে ক্রস ব্যাট চালিয়ে বোল্ড হচ্ছেন, বেশিক্ষণ ক্রিজে টিকতেই পারছেন না। অথচ এতদিনে এঁদের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ওসব পরামর্শ ৩০-৩২ বছরের ব্যাটারদের দিতে হয়, কারণ তাঁদের বয়স অনুযায়ী খেলা বদলে নিয়ে ফিরে আসার সময় থাকে। রোহিত, বিরাটের বয়সটা সটান বলে দেওয়ার সময় – বাপু, এবার মানে মানে বিদায় হও। কিন্তু আমাদের বিশেষজ্ঞরা, সাংবাদিকরা, নির্বাচকরা – কেউ সেকথা বলবেন না।

কোনোদিনই যে কেউ বলতেন না তা কিন্তু নয়। ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজে চূড়ান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরে শচীন তেন্ডুলকর সম্পর্কে কপিলদেব কিন্তু টিভি স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন ‘জিন্দগি ঔর ভি হ্যায়’। অর্থাৎ শচীনের বোঝা উচিত যে ক্রিকেটের বাইরেও জীবন আছে। আর ঠোঁটকাটা জিওফ্রে বয়কট আরও সরাসরি বলেছিলেন ‘হি শুড ইম্প্রুভ অর রিটায়ার’। মানে উন্নতি করতে না পারলে ওর অবসর নেওয়া উচিত। অথচ নিজের দেশের মাঠে রোহিত, বিরাটের নাকানি চোবানি খাওয়া দেখেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাক্তন বলেননি যে ওদের এবার অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে। বরং বলা হচ্ছে – কে জানে! হয়ত অস্ট্রেলিয়ার পিচে ওদের সুবিধাই হবে। এই আজগুবি তত্ত্বটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সব মহল থেকে বলা হচ্ছে, ভারতীয় ব্যাটাররা স্পিন খেলতে ভুলে গেছে। কথাটা সত্যি। কিন্তু ভাবখানা এমন, যেন জোরে বোলিং আমাদের ব্যাটাররা চমৎকার খেলেন।

অস্ট্রেলিয়ায় রোহিতদের স্বাগত জানাতে বসে আছেন মিচেল স্টার্ক, জশ হেজলউড আর প্যাট কামিন্স। এই অস্ট্রেলিয়াতেই গত সফরে অ্যাডিলেডে ভরদুপুরে ৩৬ অল আউট হয়ে গিয়েছিলেন আমাদের বিশ্বসেরা, সর্বকালের সেরা প্রমুখরা। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়েছিল মেলবোর্নে পরের টেস্টে অস্থায়ী অধিনায়ক রাহানের শতরানের পাশে জাদেজার অর্ধশতরানের জন্যে। তবে তারপরেও সিডনিতেই ভারত হেরে যেত দুজন ক্রিকেটার অতিমানবিক ইনিংস না খেললে। একজনের নাম হনুমা বিহারী, অন্যজন সেই অশ্বিন। প্রথম জন পায়ে চোট নিয়ে দৌড়তে পারছিলেন না, দ্বিতীয় জন পিঠের ব্যথায় কাবু ছিলেন। সেভাবেই দুজনে মিলে মোট ২৮৯ খানা বল, অর্থাৎ প্রায় ৫০ ওভার, কেবল ব্লক করে আর বল ছেড়ে অস্ট্রেলিয়াকে আটকে দিয়েছিলেন। অন্য যে কোনো দেশে ওই টেস্টের পর থেকে যে কোনো ম্যাচে নির্বাচন সমিতির সভা শুরু হত বিহারীর নামটা প্রথমে লিখে। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট কেবল ক্রিকেটিয় যুক্তিতে চলে না। তাই তারপর বিহারী খেলেছেন আর মাত্র চারখানা টেস্ট। সেগুলোতে তাঁর রান যথাক্রমে ২০, অপরাজিত ৪০, ৫৮, ৩১, ৩৫, ২০, ১১। মানে অসাধারণ নয়, কিন্তু একেবারে ফেলে দেওয়ার মতও নয়। কিন্তু উনি তো আইপিএলে খেলতে পারেন না, পকেটে বিজ্ঞাপনী চুক্তিও নেই। অতএব ২০২২ সালের পর থেকে তিনি আর আলোচনায় নেই। ওই গর্বের সিরিজ জয়ে কিন্তু ব্যাটিংয়ের দুই মহাতারকার অবদান যৎসামান্য। কোহলি একটা ম্যাচ খেলে দুই ইনিংস মিলিয়ে ৭৮ রান করেছিলেন আর রোহিত দুটো ম্যাচ খেলে সোয়া বত্রিশ গড়ে ১২৯ রান। ওই সিরিজে ব্যাট হাতে নায়ক ছিলেন পন্থ আর পূজারা, সঙ্গতে গিল। পূজারার গড় ছিল মোটে ৩৩.৮৭। কিন্তু দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়া আর ভারতের মধ্যে, খেলেছিলেন ৯২৮ খানা বল।

মাঝারি শব্দটা ব্যবহার করলে আবার আমাদের দেশের ক্রিকেটতারকাদের ভক্তরা বেজায় রেখে যান। তার উপর রোহিত আর কোহলির ভক্তকুল রীতিমত সহিংস। বছর কয়েক আগে এক কোহলিভক্ত তার রোহিতভক্ত বন্ধুর সঙ্গে তর্কাতর্কি করতে করতে বন্ধুটিকে খুনই করে ফেলে শেষপর্যন্ত। তাই এঁদের মাঝারি বলে প্রমাণ করতে গেলে আটঘাট বেঁধে এগোতে হবে। আগে রোহিতের ব্যাপারটাই আলোচনা করা যাক। কারণ একে টেস্টে তাঁর রান বিরাটের চেয়ে অনেক কম, তার উপর তাঁকে বিশ্বসেরা ওপেনার বলে দাবি করলেও সর্বকালের সেরাদের পাশে বসায় না আমাদের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র। যাঁকে বসায় তাঁকে নিয়ে তো আরও বেশি শব্দ খরচ করতে হবে।

বস্তুত, আজ ফর্ম পড়ে গেছে বলে নয়, রোহিত কোনোদিনই টেস্টে অসাধারণ ছিলেন না। যে যুগে পিচ ঢাকা থাকত না, হেলমেট ছিল না, সে যুগের কথা আলাদা। কিন্তু নয়ের দশকের পর থেকে পঞ্চাশের ঘরে গড় না থাকলে কোনো ব্যাটারকে বিশ্বসেরাদের মধ্যে ধরা হয় না। রোহিতের গড় ৬৪ খানা টেস্ট খেলে ফেলার পরেও ৪২.২৭-এ আটকে আছে। বিদেশে তাঁর ব্যাটিংকে মাঝারি বললেও বাড়াবাড়ি করা হবে। এগারো বছর খেলে গড় ৩৩.৬০, শতরান মাত্র দুটো। তার একটা আবার আজকের দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজে। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকায় কখনো তিন অঙ্কে পৌঁছতে পারেননি। ইংল্যান্ডে শতরান করলেন ২০২১ সালে পৌঁছে। পাঁচ টেস্টের ওই সিরিজটা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছিল। কোভিড বিধি মানা হয়েছে না হয়নি, আইপিএল খেলার তাড়া আছে না নেই – এই নিয়ে এক আশ্চর্য বিতর্কে বিরাট-শাস্ত্রীর দল দেশে ফেরত চলে আসে শেষ টেস্ট না খেলেই। পরের বছর ফেরত যায় পঞ্চম টেস্ট খেলতে এবং হেরে বসে। কিন্তু বলার কথাটা হল, ওই সিরিজেও বারবার ভারত ব্যাটিং বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। হেডিংলির তৃতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৭৮ অল আউট হয়ে গিয়েছিল, ওভালে চতুর্থ টেস্টের প্রথম ইনিংসেও ২০০ পেরোতে পারেনি।

টেস্ট ক্রিকেটে রোহিতের শুরুটা নিঃসন্দেহে সাড়া জাগিয়ে হয়েছিল। অভিষেকে ইডেন উদ্যানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ১৭৭, পরের টেস্টে ওয়াংখেড়েতেও শতরান। তবে দুটোই ছ নম্বরে ব্যাট করে। তারপর দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছেই কিন্তু দেখা গেল রোহিত অকুল পাথারে পড়েছেন। জোহানেসবার্গ আর ডারবানের চারটে ইনিংসে দুবার বোল্ড, একবার এলবিডব্লিউ। পরের দেড় বছরে নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ঘুরে তিনি মাত্র চারটে অর্ধশতরান করেন। তৃতীয় টেস্ট শতরান আসে ২০১৭ সালে নাগপুরে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে। অন্য কেউ হলে ততদিনে দল থেকে বাদ পড়ে যেতেন। কিন্তু ভারতের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের সকলেই রোহিতের ‘ট্যালেন্ট’ সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। তার উপর সাদা বলের ক্রিকেটে, বিশেষত আইপিএলে, তিনি ততদিনে তারকা। ফলে দামি ব্র্যান্ড হয়ে গেছেন। উপরন্তু ধোনি শিখিয়েছিলেন ‘ইনটেন্ট’ নামক একটা পবিত্র জিনিস ব্যাটিংয়ে থাকতেই হবে। শাস্ত্রী আর বিরাটও মনে প্রাণে তা বিশ্বাস করতেন। ওটা না থাকার যুক্তিতে পূজারা, রাহানেকে বারবার বাদ দিয়েছেন। রোহিতের জিনিসটা ছিল। তাই তিনি অপরিহার্য।

যা-ই হোক, ২০১৭ সালের সেই শ্রীলঙ্কা সিরিজটায় রোহিত আরও দুটো অর্ধশতরান করেন। তারপর কিন্তু আবার খরা। সেবছর আর একটামাত্র অর্ধশতরান করেন বছরের শেষ টেস্টে মেলবোর্নে। তাঁকে দিয়ে যে চলবে না তার এর থেকে বেশি প্রমাণের দরকার হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যিনি ব্র্যান্ড এবং যাঁর ট্যালেন্ট আর ইনটেন্ট আছে তাঁকে তো যে করেই হোক দলে রাখতে হবে। অতএব নতুন বছরে রোহিত হয়ে গেলেন ওপেনার। তখন ভারত সফরে এসেছে ভাঙাচোরা দক্ষিণ আফ্রিকা। সে দলে আন্তর্জাতিক মানের বোলার বলতে কাগিসো রাবাদা। অ্যানরিখ নর্খের সবে প্রথম সিরিজ। রোহিত প্রথম টেস্টের দুই ইনিংসেই বেধড়ক পিটিয়ে শতরান করলেন। দ্বিতীয় টেস্টে পুনেতে রান পাননি, রাঁচিতে পৌঁছেই একেবারে ২১২। আর পায় কে? বলা শুরু হয়ে গেল, একদিনের ক্রিকেটের মত টেস্টেও উনি বিশ্বসেরা ওপেনার। এমন আর দুটো হয় না। দুঃখের বিষয়, রোহিতের এরপরের রানের বহর কিন্তু সেকথা বলছে না। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে দুটো টেস্টে সর্বোচ্চ রান ২১। অতিমারী পেরিয়ে যখন আবার টেস্ট খেললেন অস্ট্রেলিয়ায়, চারটে ইনিংসে একবার ৫০ পেরোলেন। দেশে ফিরে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সাত ইনিংসে একটা বড় শতরান আর একটা অর্ধশতরান। তারপর থেকে কেবলই মাঝেমধ্যে একটা শতরান বা গোটা দুয়েক অর্ধশতরানের কাহিনি। বাকিটা ব্যর্থতার গল্প।

গত এক বছরে রোহিতকে দেখে মনে হয়, তিনিও জানেন যে বয়সের কারণে তাঁর লম্বা ইনিংস খেলার ক্ষমতা কমেছে। রিফ্লেক্স তো কমেছেই। অতএব তিনি এখন ঠিক করে নিয়েছেন অনেক বেশি ঝুঁকি নেবেন, তাতে যা রান হয়। এই পরিকল্পনা টি টোয়েন্টি এবং একদিনের ক্রিকেটে কার্যকরী, কারণ সাদা বল সুইং করে লাল বলের চেয়ে কম এবং ফিল্ডিং দলও অনেক বেশি রক্ষণাত্মক ফিল্ড সাজাতে বাধ্য। উপরন্তু নিজের দলের পক্ষেও এই কৌশল উপকারী। গতবছর ভারতের বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছবার পিছনে রোহিতের ঝোড়ো ইনিংসগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু ও জিনিস টেস্টে ভাল বোলিংয়ের বিরুদ্ধে যে চলবে না তা নিউজিল্যান্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। এমনকি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও ওই কৌশল খাটেনি। চারটে ইনিংসে রোহিতের সর্বোচ্চ রান ছিল ২৩। এ যদি মাঝারিয়ানা না হয়, তবে মাঝারিয়ানা বলে কাকে? কোনো দলের ওপেনার তথা অধিনায়ক এত মাঝারি হলে সে দলের কপালে অনেক দুঃখ। সেই ধোনির আমল থেকে শাস্ত্রী বুক ফুলিয়ে বলে গেছেন, এই দলটা নাকি ভারতের সেরা সফরকারী দল। অথচ এই আমলে না নিউজিল্যান্ডে সিরিজ জেতা হয়েছে, না ইংল্যান্ডে – যা অতীতে একাধিক ভারতীয় দল করে দেখিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ধোনির দল অন্তত একবার সিরিজ ড্র রেখে আসতে পেরেছিল। কোহলির দল দুবার সুযোগ পেয়ে সেটুকুও করতে পারেনি। এমন নড়বড়ে ওপেনার থাকলে পারা প্রায় অসম্ভব। অথচ ঘরোয়া ক্রিকেটে সাই সুদর্শন বা অভিমন্যু ঈশ্বরনরা যতই রান করুন, তাঁদের দলে নেওয়া যাবে না। রোহিতের মত ব্র্যান্ডের মূল্য কি আর রান দিয়ে মাপা চলে?

আরও পড়ুন বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

বিরাট কিন্তু মাঝারিয়ানায় রোহিত-সুলভ নন। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর শুরুটা রোহিতের মত হয়নি। টেস্ট জীবনের প্রথম বারোটা ইনিংসে দেশের মাঠে দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দুটো অর্ধশতরান ছাড়া বলার মত কিছুই ছিল না। ২০১১-১২ মরশুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রথম দুটো টেস্টে রান করতে না পেরে প্রায় বাদ পড়ে গিয়েছিলেন। পার্থ টেস্ট ছিল শেষ সুযোগ। সেখানে দুই ইনিংসেই রান করেন, পরের টেস্টে অ্যাডিলেডে প্রথম শতরান। তারপর থেকে সাফল্যের লেখচিত্র ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছিল। এটা পরিসংখ্যানের যুগ, সোশাল মিডিয়ার যুগ। তরুণ ক্রিকেটপ্রেমীরা মনে করেন ক্রিকেটারদের উৎকর্ষ, অপকর্ষ পুরোটাই স্কোরবোর্ডে আর ডেটা অ্যানালিটিক্সে ধরা থাকে। নেভিল কার্ডাস লিখেছিলেন – স্কোরবোর্ড একটা গাধা। আমাদের দেশে তাঁর এমন কোনো উত্তরসূরি নেই যিনি ধরিয়ে দেবেন, যে স্কোরবোর্ড একেবারে গাধা না হলেও তার দৈর্ঘ্য প্রস্থের সীমাবদ্ধতা আছে। ক্রিকেট খেলার মানবিক প্রয়াসের দিকটার অনেককিছুই স্কোরবোর্ডের পরিসরে ধরা পড়ে না। ফলে গোটা কেরিয়ারে অস্তগামী মিচেল জনসন ছাড়া একজনও সারাক্ষণ ৯০ মাইল+/ঘন্টার বোলারকে না খেললেও, নাথান লায়ন ছাড়া কোনো উঁচু দরের স্পিনারকে খেলতে না হলেও বিরাটকে ভিভিয়ান রিচার্ডস, শচীন, রিকি পন্টিংদের পাশে বসানো হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞাপন জগৎ বুদ্ধিমানের মত সর্বকালের সেরার (GOAT) মুকুটও সোশাল মিডিয়ার সাহায্যে বিরাটের মাথায় পরিয়ে দিয়েছিল।

খেয়াল করা হয়নি, যে কোনো ব্যাটারের অন্যতম কঠিন পরীক্ষাগার ইংল্যান্ডে বিরাট একাধিকবার সফরে গিয়েও মূলত অসফল। সতেরোটা টেস্ট খেলে মাত্র দুটো শতরান, গড় মাত্র ৩৩.২১। আসলে বিরাটের সাফল্যকে বিরাটতর করে তুলেছিল তিনটে জিনিস – ১) একদিনের ক্রিকেটে শতরান করে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় শচীনের রেকর্ডকে ধাওয়া করা, ২) ২০১৩-১৪ মরশুমের অস্ট্রেলিয়া সফরের অপ্রতিরোধ্য ফর্ম থেকে শুরু করে বছর পাঁচেক টেস্টে রানের বন্যা, ৩) এই সময়কালে তাঁর অধিনায়কত্বে যশপ্রীত বুমরা, মহম্মদ শামি, অশ্বিন-জাদেজার কল্যাণে দেশ বিদেশে শচীন, রাহুল দ্রাবিড়দের যুগের চেয়ে ভারতের বেশি ম্যাচ জেতা। লোভনীয় ব্র্যান্ডকে সে যত বড় তার চেয়েও বড় করে দেখানোর যে প্যাঁচ পয়জার চলে এবং এখনো চলছে তা নিয়ে আর আলাদা করে বলব না, কারণ তা পৃথক আলোচনা দাবি করে। সে আলোচনা আগেই করেছি এই লেখায়। কিন্তু ঘটনা হল, বিরাটের সমকক্ষ অন্তত তিনজন ব্যাটার যে তাঁর নিজের প্রজন্মেই রয়েছেন – সেকথাকে পাত্তা না দিয়ে বিরাটকে আকাশে তুলে দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে তাঁর দ্রুত পতন হয়েছে গত ৫-৬ বছরে। আগেই বলেছি, নয়ের দশকের পর থেকে অন্তত ৫০ গড় না হলে আর বিশ্বসেরাদের দলে ঢোকার ছাড়পত্র পাওয়া যায় না। সর্বকালের সেরা হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। বিরাটের গড় এখন নামতে নামতে ৪৭.৮৩। নিজের প্রজন্মের প্রতিদ্বন্দ্বী জো রুট প্রায় ১৩,০০০ রান করে ফেলেছেন, গড় ৫১.০১। স্টিভ স্মিথও অতিমারীর আগের ফর্মে নেই, তবু তাঁর গড় ৫৬.৯৭ – এখনো অসাধারণ। মোট রানের দিক থেকে একমাত্র কেন উইলিয়ামসনই এখনো বিরাটের থেকে পিছিয়ে, তবে তিনি ম্যাচও খেলেছেন কম। গড় যেহেতু ৫৪.৪৮, তাই বিরাটকে টপকে যাওয়া সময়ের অপেক্ষা।

তবে এসব পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় কথা হল, সেই ২০১৯ সালের নভেম্বরে ইডেন উদ্যানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শতরান করার পর থেকে বিরাটের ফর্ম সেই যে পড়তে শুরু করেছে, সে পতন থামছে না। তার ফল ভুগছে দল। ওই শতরানের পর থেকে ৩৪ খানা টেস্টের ৬০ ইনিংসে তিনি মাত্র ১৮৩৮ রান করেছেন ৩১.৬৮ গড়ে। শতরান মাত্র দুটো, অর্ধশতরান নটা, পাঁচবার শূন্য রানে আউট হয়েছেন। উপরন্তু প্রমাণ হয়ে গেছে যে ঘূর্ণি উইকেটে সাধারণ স্পিনারদের মাথায় চেপে বসার ক্ষমতাও তাঁর নেই। তাইজুল ইসলাম থেকে মিচেল স্যান্টনার – সবাই বিরাটের পক্ষে একইরকম দমবন্ধ করা, বিপজ্জনক। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাদা বলের ক্রিকেটেও তাঁকে বেঁধে রাখতে স্পিনারদের ব্যবহার করা শুরু করেছে দলগুলো। সুইং সামলাতেও যে বিরাট তেমন দড় নন তা তাঁর ইংল্যান্ডের রেকর্ড প্রমাণ করে। আজকাল তো দেশের মাঠেও ঘেমে উঠছেন বেঙ্গালুরুর মত। এই বয়সে শচীন কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ডেল স্টেইন আর মর্নি মর্কেলের বিরুদ্ধে তিনটে টেস্টে দুটো শতরান করেছেন। সুনীল গাভস্কর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জীবনের শেষ টেস্টে এমন একটা ইনিংস খেলেছেন, যাকে বলা হয় ঘূর্ণি পিচে স্পিন খেলার টিউটোরিয়াল।

সোজা কথা হল, যেরকম ব্যর্থতার কারণে পূজারা আর রাহানেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেরকম ব্যর্থতা সত্ত্বেও বিরাট আর রোহিত এখনো নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছেন। কারণ তাঁদের মাঝারিয়ানা কেউ স্বীকার করবে না। বিশেষজ্ঞরা কেন বলছেন না? সাংবাদিকরা কেন লিখছেন না? কারণ কিন্তু এটা নয় যে ভবিষ্যতের কথা কেউ বলতে পারে না, দুই হুজুর অস্ট্রেলিয়ায় ফের রান করে দিতে পারেন। সে তো পারেনই, কিন্তু তাতে তো গত ৫-৬ বছরের টানা ব্যর্থতা মিথ্যে হয়ে যাবে না। কিন্তু ওই যে – ব্র্যান্ড মূল্য। টিভি খুললে, ওটিটি চালালে কতশত বিজ্ঞাপনে দুজনকে দেখতে পান তা খেয়াল করবেন। ক্রিকেট খেলা ভারতে যত বড় ব্যবসা, পৃথিবীর আর কোনো দেশে তত বড় নয়। ফলে অত্যন্ত মাঝারি রাহুলকে (৫৩ টেস্ট খেলে ফেলার পর গড় ৩৩.৮৭) যেনতেনপ্রকারেণ দলে রাখার চেষ্টার পিছনেও এনডর্সমেন্ট। এঁরা খেললে এঁদের বিজ্ঞাপন দেখানোর মানে থাকবে। থাকলে বিজ্ঞাপনদাতাদের টাকায় বিসিসিআইয়ের সঙ্গে যে সম্প্রচারের চুক্তি করেছে টিভি/ওটিটি নেটওয়ার্ক, তা উসুল হবে।

উপরন্তু ভারতের মাটিতে ভারতীয় দলের ম্যাচগুলোর প্রযোজনার দায়িত্বে থাকে বিসিসিআই নিজে। নিজেদের ব্র্যান্ড সম্পর্কে মন্দ কথা তারা মেনে নেবে না। অতএব ভারতীয় ক্রিকেটারদের দোষগুণ নিয়ে নির্মোহ আলোচনা করলে ধারাভাষ্যকারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে দেবে। সম্প্রচার সংস্থাকেও বাধ্য করতে পারে তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কাউকে বাদ দিতে। সে তিনি যত বড় বিশেষজ্ঞই হোন। টাকার পাহাড়ে বসে থাকা নিয়োগকর্তা বিসিসিআইয়ের কাছে গাভস্কর আর মুরলী কার্তিকের দর একই। তার উপর সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ট্রোলবাহিনী লেলিয়ে দেওয়ার কায়দাও আজকের ক্রিকেটারদের জানা আছে। সেভাবেও ধারাভাষ্যকারদের ভাতে মারা যায়। ব্যাপারটা একবার টের পেয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে, আরেকবার সঞ্জয় মঞ্জরেকর। এই কারণেই ২০১৩ সালে ইয়ান চ্যাপেল ভারতে ধারাভাষ্য দেওয়ার চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন

আরেকটা কারণ হল খারাপ দৃষ্টান্ত। এই দৃষ্টান্ত তৈরি করে দিয়ে গেছেন পৃথিবীর সর্বকালের সেরা দুজন ক্রিকেটার – শচীন আর ধোনি। ২০১১ সালের ২ এপ্রিল বিশ্বকাপ জেতার পর বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে ভারতীয় দল পরপর আটটা টেস্টে হারে। স্পষ্ট বোঝা যায়, যাঁরা আছেন তাঁদের দিয়ে আর চলবে না। অথচ একমাত্র দ্রাবিড় আর ভাঙ্গিপুরাপ্পু ভেঙ্কটসাই লক্ষ্মণ ছাড়া কেউ এই সত্য মেনে নিলেন না। ওঁরা দুজন অবসর নিলেন, শচীন রয়ে গেলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শততম শতরান আর দুশোতম টেস্ট খেলার রেকর্ড করার জন্যে। উইকেটরক্ষক ব্যাটার হিসাবে, অধিনায়ক হিসাবে ব্যর্থ ধোনিকে বাঁচিয়ে দিলেন তাঁর গডফাদার এন শ্রীনিবাসন। শচীন বহাল তবিয়তে ২০১৩ পর্যন্ত খেলে গেলেন আর ধোনি অধিনায়কত্ব চালিয়ে গেলেন ২০১৩-১৪ অস্ট্রেলিয়া সফর পর্যন্ত। তারপর টেস্ট সিরিজের মাঝখানে দুম করে অবসর নিলেন।

যাঁরা আট টেস্টে হারের পরেও ধোনিকে রেখে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন, তাঁরা সেইসময় বলতেন ‘এখন ছাড়লে ক্যাপ্টেন হবে কে?’ সত্যিই তেমন কেউ ছিলেন না, কারণ প্রজন্ম বদলের কোনো পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়নি বোর্ড। তাই ধোনি বহাল তবিয়তে যতদিন ইচ্ছা খেলে যেতে পেরেছিলেন। এখন ভারতীয় ক্রিকেট ফের সেই জায়গায় এসে পৌঁছেছে। যে রাহুলকে বছর দুয়েক আগে ভবিষ্যৎ অধিনায়ক বলে ভাবা হচ্ছিল, তিনি এখন দলে নিজের জায়গা ধরে রাখতেই খাবি খাচ্ছেন। ‘এ’ দলের হয়ে খেলতে নেমেও হাস্যকর কায়দায় আউট হচ্ছেন। গিল ধারাবাহিকতা হারিয়েছেন, পন্থ প্রতিভাবান কিন্তু এখনই নেতৃত্ব দিতে কি তৈরি? কেউ নিশ্চিত নয়।

অর্থাৎ গত এক যুগে এত জয় সত্ত্বেও ভারতীয় ক্রিকেট যে তিমিরে সেই তিমিরেই আছে। ব্র্যান্ড সর্বস্বতা, বিশেষত মাঝারিয়ানা সর্বস্বতা, এভাবেই প্রগতি আটকায়।

সমস্ত পরিসংখ্যান ক্রিকইনফো থেকে

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

স্বর্গহারা মাঝারিয়ানার দেবদূত: অশ্বিন, জাদেজা

ভারত টেস্ট ক্রিকেট খেলছে ১৯৩২ সাল থেকে, আর ভারতের মাটিতে প্রথম টেস্ট খেলা হয় ১৯৩৩ সালে। একানব্বই বছরের ইতিহাসে প্রথমবার তিন বা তার বেশি ম্যাচসম্পন্ন সিরিজের সবকটা ম্যাচ হেরে যাওয়ায় যাঁরা এখন মুহ্যমান, তাঁদের মাঝারিয়ানা এবং অশ্বিন, জাদেজার প্রসঙ্গে নিয়ে যাওয়ার আগে কয়েকটা কথা একটু বলে নেওয়া দরকার।

২০২৩-২০২৭ আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব বেচার জন্য যখন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল, তখন ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৪ সালে আইপিএলে খেলা হবে ৭৪ খানা ম্যাচ, ২০২৫ ও ২০২৬ আইপিএলে ৮৪ এবং ২০২৭ আইপিএলে ৯৪। তবে এবছর সেপ্টেম্বর মাসে ক্রিকইনফো ওয়েবসাইট এক প্রতিবেদনে জানায় – ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ২০২৫ আইপিএলে ম্যাচের সংখ্যা না বাড়ানোই ভাল বলে মনে করছে, কারণ ভারত বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার মত জায়গায় আছে। আর ফাইনাল হবে মে-জুন নাগাদ। সুতরাং আইপিএল বেশি লম্বা হলে ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের চাপ বেড়ে যাবে। এখনো আইপিএলের সূচি ঘোষণা হয়নি, ইতিমধ্যে ভারতের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় নিদেনপক্ষে চারটে টেস্ট জিততে না পারলে অন্য দলগুলোর জেতা-হারার উপর নির্ভর করতে হবে। সুতরাং অস্ট্রেলিয়া সফরে ভারতীয় দলের ব্যর্থতা বিসিসিআইয়ের কাছে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ৮৪ ম্যাচের আইপিএল করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দিতে পারে। বেশি ম্যাচ খেলা মানে খেলোয়াড়দের জন্যেও বেশি টাকা।

গন্ধটা খুব সন্দেহজনক লাগছে? কিছু করার নেই। এটাই আজকের ক্রিকেটের বাস্তবতা। ভারতের সংবাদমাধ্যমের বেশিরভাগটাই বিসিসিআইয়ের অনুগত বলে এসব নিয়ে বিশেষ লেখালিখি হয় না, কিন্তু ইংল্যান্ডের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ কাগজের সাংবাদিক টিম উইগমোর সম্প্রতি এক বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন। শিরোনাম ‘হাউ ক্রিকেট এট ইটসেলফ’, অর্থাৎ ক্রিকেট কীভাবে নিজেকে খেয়ে ফেলল। সেই লম্বা প্রতিবেদনে টিম দেখিয়েছেন যে সারা পৃথিবীতে এখন এত বিপুল সংখ্যক ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ হচ্ছে যে প্রকৃতপক্ষে ৫০০ দিনের ক্রিকেট খেলা হচ্ছে ৩৬৫ দিনে। একই ক্রিকেটার সাত-আটটা লিগে খেলছেন, অনেকসময় একই সপ্তাহে তিনটে আলাদা আলাদা লিগে খেলছেন। ফলে এক লিগে খেলতে খেলতে অনেকেই চাইছেন যেন তাঁর দল হেরে যায়, যাতে তিনি অন্য একটা লিগে গিয়ে যোগ দিতে পারেন। কারণ তাতে রোজগার বাড়বে। অনেক লিগে আবার লগ্নি ব্যাপারটা এত গোলমেলে যে অনেক দলের মালিক নিজের দলের বিরুদ্ধেই বাজি ধরেন বেটিং সাইটে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল এবং বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট নিয়ামক সংস্থাগুলো ঢালাও এইসব লিগকে অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে আগাপাশতলা না ভেবে। ফলে এমন লিগও আছে যেগুলোতে দল গঠন করা হচ্ছে, খেলোয়াড়দের নেওয়া হচ্ছে টিভি সম্প্রচার স্বত্ব থেকে টাকা আসবে আশা করে। তারপর টাকা না আসায় একটা বলও খেলা হওয়ার আগেই লিগ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় আবার খেলোয়াড়রা টাকা পাচ্ছেন না বলে মাঠে পৌঁছে খেলতে নামতে চাইছেন না। ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, আন্দ্রে রাসেলের মত লোকেরও এই অভিজ্ঞতা হয়েছে।

এসব খবর দিয়ে এই ইঙ্গিত করছি না যে ভারতীয় দল ইচ্ছা করে নিউজিল্যান্ডের কাছে গোহারা হেরেছে বা অস্ট্রেলিয়ায় ইচ্ছে করে হারবে। যাঁরা ক্রিকেট খেলা ন্যূনতম মনোযোগ দিয়ে দেখেন এবং অন্তত কিছুটা বোঝেন, তাঁদেরও বুঝিয়ে বলার দরকার নেই যে এই ভারতীয় দলের ইচ্ছে করে হারার যোগ্যতা নেই। তবু খবরগুলো দিলাম এইজন্যে যে ৩-০ হওয়ার পর থেকে উদ্ধারের উপায় হিসাবে কোনো কোনো প্রাক্তন ক্রিকেটার, সাংবাদিক এবং বহু ক্রিকেটপ্রেমী আইপিএলকে এই দুরবস্থার একমাত্র কারণ বলে ঠাওরাচ্ছেন এবং আইপিএল বন্ধ করা বা আইপিএলকে কম গুরুত্ব দেওয়ার নিদান দিচ্ছেন। প্রথম দুই অনুচ্ছেদ পড়লে দুটো জিনিস বুঝতে পারা উচিত – ১) ওসব দিবাস্বপ্ন দেখে লাভ নেই, ২) কেবল আইপিএলের ঘাড়ে দোষ চাপালে চলবে না, কারণ ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নিয়ে বাড়াবাড়ি গোটা ক্রিকেট দুনিয়ায় হচ্ছে এবং তার ফলে একা ভারতীয় দল ভুগছে না।

ভারত-নিউজিল্যান্ড সিরিজের পাশাপাশিই চলছিল পাকিস্তান-ইংল্যান্ড সিরিজ। ভারতে এসে নিউজিল্যান্ডের ৩-০ জয়কে বলা হচ্ছে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন, কিন্তু পাকিস্তানের সিরিজটাতে যা হয়েছে তাও কম চমকপ্রদ নয়। পাকিস্তান গত কয়েকবছর ধরে হাইওয়ের মত পিচ বানিয়ে যাচ্ছিল। ইংল্যান্ডের এর আগের পাকিস্তান সফরে সেইসব পিচে ম্যাককালাম-বেন স্টোকসের মস্তিষ্কপ্রসূত ব্যাজবল দারুণ কাজ দিয়েছিল। ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা এত দ্রুত এত রান তুলছিলেন যে সেই রানের চাপেই পাকিস্তানের ব্যাটিং ধসে পড়ছিল। ফলে ইংল্যান্ড সিরিজ জিতে ফিরেছিল। এবারেও প্রথম টেস্টে সেই একইরকম পিচ তৈরি করা হয়েছিল মুলতানে। সেখানে পাকিস্তানের ৫৫৬ রানের জবাবে ইংল্যান্ড সাত উইকেটে ৮২৩ রান করে, মারকুটে হ্যারি ব্রুক একাই ৩১৭। ওই রানের চাপে দ্বিতীয় ইনিংসে পাকিস্তান মাত্র ৫৪.৫ ওভারে ২২০ রানে গুটিয়ে যায়।

তারপর পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ড কী করল? নির্বাচক কমিটি বদলে দিল। আকিব জাভেদের নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচক কমিটি দায়িত্ব নিয়েই দলের খোলনলচে বদলে ফেলল। দলের এক নম্বর ব্যাটিং তারকা বাবর আজমকে বিশ্রামে পাঠিয়ে দিল; বোলিং তারকা শাহীন আফ্রিদি, নাসিম শাহদেরও বসিয়ে দেওয়া হল। দলে এলেন ত্রিশোর্ধ্ব দুই স্পিনার নোমান আলি আর সাজিদ খান। আরও অদ্ভুত সিদ্ধান্ত – দ্বিতীয় টেস্টও মুলতানের একই পিচে খেলা। শেষপর্যন্ত সবকটা সিদ্ধান্তই কিন্তু খেটে গেল। টানা দুটো টেস্ট হওয়া পিচে বল ঘুরল বনবনিয়ে আর ইংল্যান্ডের কুড়িটা উইকেটই তুলে নিলেন সাজিদ আর নোমান। দ্বিতীয় ইনিংসে তো ওই দুজন ছাড়া কাউকে বলই করতে হল না। দেখা গেল ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা পাটা উইকেটে যত রানই করুন, বল ঘুরলেই চোখে সর্ষেফুল দেখছেন। রাওয়ালপিণ্ডির তৃতীয় টেস্টেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এখানে সাজিদ-নোমান প্রথম ইনিংসে নিলেন নটা উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসে দশটাই।

ক্রিকেট দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে ধনী তিনটে ক্রিকেট বোর্ডের দুটো হল আমাদের বিসিসিআই আর স্টোকসদের ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি)। কোন দুটো বোর্ড ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করে? এই দুটো দেশই। ভারতীয় ক্রিকেটে বিপণন থেকে দল নির্বাচন – সবকিছু আইপিএলকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। ইংল্যান্ডে আবার শুধু কুড়ি বিশের লিগ ‘টি টোয়েন্টি ব্লাস্ট’ নয়, ১০০ বলের খেলা ‘দ্য হান্ড্রেড’ বলেও একটা প্রতিযোগিতা চালু হয়েছে। পাঁচ বলের ওভার, বাহারি রংদার জামা, সাদা বল, ছোট মাঠ, একইসঙ্গে ছেলেদের আর মেয়েদের লিগ – সে এক মোচ্ছব। এত কাণ্ড করতে গিয়ে কাউন্টি ক্রিকেটের মরশুম বদলাতে হয়েছে, অর্থাৎ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের গুরুত্ব কমেছে। এদিকে টেস্ট দল পড়েছে গাড্ডায়। জো রুটের আমলে দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়েও সিরিজ হারার পরে দায়িত্ব দেওয়া হয় স্টোকস-ম্যাককালামকে। তাঁরা ব্যাজবল চালু করে দেশের মাঠে নিউজিল্যান্ড আর ভারতের বিরুদ্ধে বেশ কিছুটা সাফল্য পেয়েছিলেন, পাকিস্তানে এসে সিরিজ জিতেছিলেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে অ্যাশেজের ফলাফলের বিশেষ তারতম্য হয়নি, এবছরের গোড়ার দিকে ভারতে এসে সিরিজ হেরেছেন, এখন ছন্নছাড়া পাকিস্তানের কাছেও হারলেন। উপরন্তু ২০২১ সালে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চালু হওয়ার পর থেকে দুবার ফাইনাল হয়েছে, একবারও ইংল্যান্ড ফাইনালে উঠতে পারেনি। ভারত সফরে আর সদ্যসমাপ্ত পাকিস্তান সফরে – দুবারই দেখা গেছে যে রুটকে বাদ দিলে ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা স্পিন একেবারেই খেলতে পারছেন না। এক-আধটা ইনিংসে অলিভার পোপ বা বেন ডাকেট রান করে ফেলছেন। কিন্তু সেগুলো ব্যতিক্রম। সুতরাং স্পিন খেলতে না পারার দোষে শুধু রোহিত শর্মারা দুষ্ট নন। কুড়ি বিশের খেলা যে সব দলের ব্যাটারদেরই স্পিন খেলার দক্ষতার বারোটা বাজাচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। কেভিন পিটারসেন সেকথা স্পষ্ট বলেও দিয়েছেন

কিন্তু মুশকিল হল, এসব বলে রোহিতরা পার পেতে পারেন না। কারণ প্রথমত, স্টোকসরা খেলছিলেন বিদেশে, রোহিতরা দেশে। টেস্ট ক্রিকেটের প্রায় দেড়শো বছরের ইতিহাসে মাত্র দশবার কোনো দল নিজের দেশে তিন বা তার বেশি টেস্টের সিরিজের সবকটা ম্যাচে হেরেছে। দ্বিতীয়ত, স্টোকসদের জন্ম বেদি-প্রসন্ন-চন্দ্রশেখর-ভেঙ্কটরাঘবন, অনিল কুম্বলে, হরভজন সিংদের দেশে নয়। তৃতীয়ত, কিথ ফ্লেচার, অ্যালাস্টেয়ার কুক, পিটারসেন, রুটের মত কয়েকজনকে বাদ দিলে কোনোদিনই ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা স্পিন খেলতে দারুণ পারদর্শী ছিলেন না।

ভারতীয়দের ইতিহাস ঠিক উল্টো। আমাদের দলকে যে ‘দেশে বাঘ বিদেশে বেড়াল’ বলা হত তার বড় কারণ – আমাদের নেহাত মাঝারি মানের ব্যাটাররা জোরে বলে চোখ বুজে ফেললেও স্পিনারদের ছিঁড়ে খেতেন। সেই কারণেই সর্বকালের সেরা লেগস্পিনার শেন ওয়ার্ন ভারতের বিরুদ্ধে এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন ১৪ টেস্টে মাত্র একবার। তিনি যখন ১৯৯৮ সালে ভারতে প্রথম টেস্ট খেলতে আসেন, তখন শচীন তেন্ডুলকর ব্যাট করতে নামার আগেই ওয়ার্নকে মেরে আধমরা করে রাখতেন নভজ্যোৎ সিং সিধু। ইনি কিন্তু ভারতের সর্বকালের সেরা ১৫ জন ব্যাটারের তালিকাতেও থাকবেন না। মুথাইয়া মুরলীধরনের ভারতের বিরুদ্ধে সাফল্য ওয়ার্নের চেয়ে বেশি, কিন্তু তারও বেশিরভাগটা শ্রীলঙ্কায়। ভারতে এসে তিনি এক ইনিংসে দুবারের বেশি পাঁচ উইকেট নিতে পারেননি। দুজনেরই ভারতের বিরুদ্ধে গড় সামগ্রিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।

ইংল্যান্ড থেকে সেই প্রাচীনকালের জিম লেকার আর ছয়, সাতের দশকের ডেরেক আন্ডারউড ছাড়া বিশ্বমানের স্পিনারই বা এসেছে কজন? ২০১২-১৩ মরশুমে তারা ভারতে এসে সিরিজ জিতেছিল যে দুজনের জন্যে, তাঁদের মধ্যে গ্রেম সোয়ান তো বেশিদিন খেললেনই না। আর মন্টি পানেসার সম্পর্কে ওয়ার্ন একবার বলেছিলেন – ও পঞ্চাশটা টেস্ট খেলেনি, একই টেস্ট পঞ্চাশবার খেলেছে। সাম্প্রতিক ভারত সফর আর পাকিস্তান সফরে প্রমাণ হয়ে গেছে যে এখনো ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা তেমন দরের স্পিনারদের বিরুদ্ধে অনুশীলনের সুযোগ পান না। জ্যাক লিচের সীমাবদ্ধতা অসীম, শোয়েব বশির আর রেহান আহমেদ ভবিষ্যতে কেমন হবেন তা ভবিষ্যৎ বলবে – কিন্তু এখনো ৩৮ বছরের নোমান আর ৩১ বছরের সাজিদের সমকক্ষ নন। এই সমস্যা তো রোহিত, বিরাট কোহলি, শুভমান গিলদের নেই। তাঁরা এখন ঠাসা আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের ঠ্যালায় না হয় ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার সময় করতে পারেন না, উঠে এসেছিলেন তো ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেই। সেখানে তো একগাদা ভাল মানের স্পিনারকে খেলতে হয়েছিল। যদি ধরে নিই এই ব্যাপারটা সাইকেল চালাতে শেখার মত নয়, ছোট থেকে শিখে আসা জিনিসও খেলোয়াড়রা ভুলে যান, তাহলেও ভারতীয় দলে এই মুহূর্তে এমন অন্তত দুজন স্পিনার আছেন যাঁদের একজনকে সারাক্ষণই আমাদের প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং সাংবাদিকরা ভারতের সর্বকালের সেরা বলেন – রবিচন্দ্রন অশ্বিন। অন্যজন বিশ্বের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন, এমন দাবিও নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে পর্যন্ত শোনা গেছে – রবীন্দ্র জাদেজা। তা আমাদের ব্যাটাররা তো নেটে এঁদের বোলিংয়ে ব্যাট করেন। তা সত্ত্বেও এই ধেড়ে বয়সে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেন না বলেই বিরাট, রোহিতরা স্পিনারদের বিরুদ্ধে রান করতে পারেননি, আর রঞ্জি ট্রফিতে ফেরত গেলেই আবার তরতরিয়ে রান করতে শুরু করবেন? বিশ্বাস করা শক্ত।

আসল কথা হল, ভারতের টেস্ট দলের সদস্যদের মাঝারিয়ানা ধরা পড়ে গিয়েছে। বোর্ডের বিপুল অর্থবলে চালিত সর্বব্যাপী প্রচারযন্ত্র যে সত্য চাপা দিয়ে রেখেছিল, টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রতিযোগিতামূলক ১২-১৩ বছর যে সত্যকে চেপে রাখা সম্ভব করেছিল, পরিশ্রমী নিউজিল্যান্ড দল সেই সত্যকে একেবারে উলঙ্গ করে দিয়েছে। তাই এখন রেখে ঢেকে সমালোচনা করে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করছে এ দেশের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র।

ক্রিকেটভক্তরা এখনই তেড়ে আসবেন – ‘১২ বছরে দেশের মাঠে পরপর ১৮ খানা সিরিজ জিতেছে যে দল, তারা মাঝারি? এই রেকর্ড আর কোনো দলের নেই তা জানেন?’ আজ্ঞে জানি। কথাটা একদম সত্যি। ঠিক যেমন ‘অশ্বত্থামা হত’ কথাটাও সত্যি। এক্ষেত্রে ‘ইতি গজ’-র হাতিটা একটা বড়সড় দাঁতাল। তার একটা দাঁত হল অতীতের ভারতীয় দলগুলোর ঘরের মাঠের রেকর্ড, যা নিয়ে কদিন আগেই এইখানে বিস্তারিত লিখেছি। সে দাঁতের কথা জেনেও কেউ কেউ নিশ্চয়ই বলবেন – আগের দলগুলো যতই জিতুক, বিরাট আর রোহিতের দলের মত পরপর ১৮ খানা তো জেতেনি। ঠিক। কেন এই রেকর্ডটা হয়েছে তা বোঝা যাবে অন্য দাঁতটার কথা বললে।

বিরাট-রবি শাস্ত্রী জমানার আগেও ভারতে ঘূর্ণি পিচই হত বটে, কিন্তু বল প্রথম দিন মধ্যাহ্নভোজনের বিরতির আগে থেকেই ঘুরছে – এমনটা কমই দেখা যেত। বল তাক লাগিয়ে দেওয়ার মত ঘুরত তৃতীয় দিন থেকে। তার আগে পর্যন্ত স্পিনারদের ঘাম ঝরাতে হত। মূলত গতি আর লাইন, লেংথের বৈচিত্র্যের উপর নির্ভর করে উইকেট নিতে হত। বেদি-প্রসন্ন-চন্দ্রশেখর থেকে আরম্ভ করে কুম্বলে-হরভজন ওরকম পিচেই বল করেছেন এবং ম্যাচ জিতিয়েছেন বছরের পর বছর। এই কথাটা অবশ্য পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করার উপায় নেই, কারণ এর কোনো পরিসংখ্যান হয় না। যাঁরা সেই যুগ থেকে খেলা দেখছেন তাঁরা হয় একবাক্যে একমত হবেন, নয় একেবারেই মানবেন না। তরুণরা তো মানতেই চাইবেন না, কারণ কুড়ি বিশ প্রজন্মের ইউটিউব থাকলেও ধৈর্য নেই। কিন্তু অন্য একটা ব্যাপার আছে যার প্রমাণ দেওয়া যায়।

বিরাট-শাস্ত্রী জমানার আগে পর্যন্ত কিন্তু প্রত্যেক সিরিজেই এমন এক-আধটা মাঠে খেলা দেওয়া হত যেখানকার পিচ, আবহাওয়া মিলিয়ে সফরকারী দলেরও কিছুটা সাহায্য পাওয়ার আশা থাকত। যেমন কলকাতার ইডেন উদ্যানে অনেক সময়েই বিপক্ষের জোরে বোলাররা গঙ্গার হাওয়াকে কাজে লাগাতে পারতেন, পিচেও অনেক সময় বেশ ঘাস থাকত। ইতিহাস বলছে ইডেনে অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড জিতেছে দুবার করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতেছে তিনবার আর পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকাও একবার করে জিতেছে। সেই ইডেনে ভারত শেষ তিনটে টেস্ট খেলেছে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। শেষ ম্যাচটা ছিল সেই ২০১৯ সালে। অস্ট্রেলিয়ার মত দলের বিরুদ্ধে ২০০১ সালের সেই অবিস্মরণীয় টেস্টের পর থেকে আর খেলাই হয়নি ইডেনে।

এমন আরেকটা মাঠ ছিল মোহালির পিসিএ স্টেডিয়াম। ওই মাঠে সফরকারী দলগুলো জিততে না পারলেও অন্তত ড্র করতে পারত। কোর্টনি ওয়ালশের ওয়েস্ট ইন্ডিজ তো ১৯৯৪ সালে গোটা সফরে কিছু জিততে না পারলেও ওখানে শেষ টেস্টে ভারতকে হারিয়েছিল। ওই মাঠে ইংল্যান্ড ড্র করেছে একবার, নিউজিল্যান্ড দুবার, পাকিস্তান একবার, শ্রীলঙ্কা একবার। সে মাঠেও গত ১১ বছরে খেলা হয়েছে মাত্র চারটে টেস্ট।

তাহলে আজকাল খেলা দেওয়া হয় কোথায়? এরও গোটা দুয়েক উদাহরণ দেওয়া যাক।

২০১৭ সালে প্রথম টেস্ট ম্যাচ হওয়া পুনের এমসিএ স্টেডিয়ামে সাত বছরের মধ্যে তিনটে ম্যাচ হয়ে গেল এবং তিনটেই ঘূর্ণি পিচে। রান উঠল কম। ২০১৭ সালের প্রথম খেলাটায় আমাদের রবি-অ্যাশ জুটিকে টপকে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায় স্টিভেন ও’কিফ আর নাথান লায়ন। ২০১৯ সালে দুর্বল স্পিন আক্রমণের দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে অবশ্য ভারত ছশোর বেশি রান করেছিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ফলো অন করে হেরেছিল। এবারেও টেস্টে অনিয়মিত মিচেল স্যান্টনার ম্যাচে ১৩ খানা উইকেট তুলে নিলেন, আমাদের সর্বকালের সেরা দুই স্পিনারকে টেক্কা দিলেন। ভাগ্যে ওয়াশিংটন সুন্দর ছিলেন, নইলে অবস্থা আরও শোচনীয় হত।

আমেদাবাদের সর্দার প্যাটেল স্টেডিয়াম ভেঙেচুরে নতুন করে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে পরিণত করা হল, সেখানে প্রথম টেস্ট হল ২০২১ সালে। একেবারে পরপর দুটো টেস্ট। প্রথমটা শেষ হল দুদিনে, দ্বিতীয়টা তিনদিনে। প্রথম টেস্টে দুদলের কেউ দেড়শো পেরোতে পারেনি, ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংসে ৮১ রানে অল আউট। এরকম পিচ কুম্বলেরা গোটা জীবনে পাননি। মাত্র দুবছর বয়সী ওই স্টেডিয়ামে তিন নম্বর টেস্টও খেলা হয়ে গেছে গতবছর। আগের দুই টেস্টে পিচ নিয়ে বড্ড বাড়াবাড়ি করা হয়ে গেছে ভেবেই বোধহয় একেবারে ঢ্যাবঢেবে পিচ বানানো হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। আড়াই খানা ইনিংস খেলা হয়েছিল, চারজন শতরান করেছিলেন। তাছাড়া ট্রেভিস হেড ৯০, অক্ষর প্যাটেল ৭৯।

তালিকা আরও লম্বা করা যায়, কিন্তু যাঁর বোঝার তিনি এতেই বুঝে নেবেন পরপর ১৮ খানা সিরিজ জেতার মাস্তানি আসলে কোথায়। অশ্বিন আর জাদেজার মাঝারিয়ানা আরও পরিষ্কার হয় দেশের মাঠের সঙ্গে বিদেশের মাঠে তাঁদের পরিসংখ্যান মিলিয়ে দেখলে। অশ্বিনের ৫৩৬ খানা উইকেটের মাত্র ১৪৯টা এসেছে বিদেশে, গড় ৩০.৪০। উনচল্লিশটা টেস্টে এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন আটবার। এই পরিসংখ্যান খারাপ নয়, মাঝারি। দেশের মাঠে ৬৫ খানা টেস্ট খেলে নিয়েছেন ৩৮৩ খানা উইকেট, গড় ২১.৫৭, এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন ২৯ বার। মানে দুজন অশ্বিন একেবারে দুজন আলাদা বোলার।

জাদেজার পরিসংখ্যান দেখবেন? উনি ভারতের মাটিতে ৪৯ টেস্টে ২৩৮ উইকেট নিয়েছেন মাত্র ২০.৭১ গড়ে, এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট ১৩ বার। কিন্তু বিদেশে? ২৬ খানা টেস্ট খেলে মোটে ৭৬ খানা উইকেট, গড় ৩২.৭৮। এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট মোটে দুবার। হিন্দি সিনেমা হলে দেখানো হত দেশে খেলেন জাদেজা, আর বিদেশে ভিলেন তাঁকে তালা বন্ধ ঘরে রেখে তাঁরই মত দেখতে অন্য একজনকে খেলতে নামায়। একথা ঠিকই যে প্রায় সব বোলারই নিজের দেশে বেশি ভাল বল করেন। কিন্তু সর্বকালের সেরার তকমাধারীদের পরিসংখ্যানে দেশে আর বিদেশে এত তফাত ঘটে না। আমাদের দেশের সবচেয়ে সফল স্পিনারদেরই দেখুন না:

এই পরিসংখ্যানগুলো দেখলেই পরিষ্কার হয়, অশ্বিন-জাদেজার চেয়ে অনেক বড় স্পিনার ছিলেন অজিত ওয়াড়েকরের স্পিন ত্রয়ী। কারণ তাঁদের দেশে আর বিদেশে উইকেট সংখ্যা আর এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার ঘটনা প্রায় সমান। সেই কারণেই তাঁরা ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ডেও সিরিজ জেতাতে পেরেছিলেন। কুম্বলে, হরভজন বিদেশে ওঁদের মত ভাল না হলেও নেহাত ফেলনা ছিলেন না। বিদেশে অন্তত দুটো টেস্ট ম্যাচের কথা উল্লেখ করা যায় যেখানে এঁরা দুজনে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন – ১) ২০০৬ সালে কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে হরভজন পাঁচ উইকেট নেন আর দ্বিতীয় ইনিংসে কুম্বলে ছয় উইকেট নিয়ে ৪৯ রানে ম্যাচ জেতান। ২) ২০০২ সালে লিডসের ইনিংস জয়ে তাঁদের অবদান আরও উল্লেখযোগ্য, কারণ ভিজে আবহাওয়ায় পিচটা ছিল জোরে বোলারদের জন্য আদর্শ। সেখানে কুম্বলে-হরভজন বিপক্ষের কুড়িটা উইকেটের ১১ খানা তুলে নেন। অশ্বিন আর জাদেজা কিন্তু এমন দুজন বোলার যাঁদের উপমহাদেশের বাইরে একসঙ্গে খেলানোর কথা ভারত অধিনায়করাই ভেবে উঠতে পারেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে অশ্বিনকে বসিয়ে রাখা হয় তার কারণ কিন্তু বোলিং নয়। সম্ভবত তার কারণ কোহলি-শাস্ত্রীর মত দ্রাবিড়-রোহিতেরও ধারণা ছিল, জাদেজা অশ্বিনের চেয়ে ব্যাট ভাল করেন।

আরও পড়ুন এ যুগে তৃতীয় নয়নও জিরো

নিউজিল্যান্ড সিরিজে ব্যাটাররা চূড়ান্ত ব্যর্থ, অথচ অশ্বিন আর জাদেজার মাঝারিয়ানা নিয়ে এত বড় লেখা কেন লিখলাম? তার কারণ টেস্ট জিততে গেলে কুড়িটা উইকেট নিতে হয় এবং ভারতের মাটিতে জিততে গেলে স্পিনারদের সাফল্য অপরিহার্য। ব্যাটারদের ব্যর্থতায় মুহ্যমান হয়ে আলোচকরা অশ্বিন-জাদেজার ব্যর্থতাকে তত গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ‘একটা সিরিজে হতেই পারে’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। লেখার এই পর্বে এ জন্যেই দেখানো দরকার ছিল যে এই ব্যর্থতা একটা সিরিজের ব্যাপার নয়। এতদিন এক বানানো স্বর্গের দেবদূত করে রাখা হয়েছিল ওঁদের। তাই এই পতন অনিবার্য ছিল। অতীতেও একাধিকবার ওঁদের মাঝারিয়ানা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন অন্য দেশের স্পিনাররা। কিন্তু ভারত শেষপর্যন্ত সিরিজ জিতে গেছে বলে চোখে পড়েনি। ভারতে এসে বেদি, প্রসন্ন, চন্দ্রশেখর, কুম্বলে, হরভজনের থেকে বেশি উইকেট নিয়ে চলে যাওয়ার ক্ষমতা হয়নি ওয়ার্ন বা মুরলীদেরও। অথচ অশ্বিন-জাদেজার চেয়ে বেশ কয়েকবার বেশি উইকেট নিয়েছেন সোয়ান-পানেসার, ও’কিফ-লায়ন, লায়ন-ম্যাট কুনেমান-টড মার্ফি, টম হার্টলি-বশির স্যান্টনার, আজাজ প্যাটেল, গ্লেন ফিলিপসরা।

রবি-অ্যাশের এই ব্যর্থতা ঢাকতে এখন নতুন কায়দা চালু করেছেন ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা। বলা এবং লেখা হচ্ছে, যত দোষ টিম ম্যানেজমেন্টের। বেশি ঘূর্ণি উইকেট বানালে মুড়ি মিছরি এক দর হয়ে যায়। ফলে রবি-অ্যাশের মুনশিয়ানার আর দাম থাকে না। কিমাশ্চর্যমতৎপরম! ওঁরা যদি এত বড় স্পিনার হন যে যেখানে বল তেমন ঘোরে না সেখানেও কেরামতি দেখাতে পারেন, তাহলে যেখানে বল বেশি ঘোরে সেখানে তো ওঁদের ধারেকাছে অন্যদের আসতে পারার কথা নয়। কোনো ব্যাটার সম্পর্কে কখনো শুনেছেন যে ব্যাটিং সহায়ক পিচে অন্যরা বেশি রান করে দেয়, কিন্তু শক্ত পিচে সে-ই সেরা? তাছাড়া রবি-অ্যাশ বরাবর কম ঘূর্ণির পিচেই এত উইকেট নিয়ে এসেছেন – সাক্ষ্যপ্রমাণ তো তা বলছে না। আর বিদেশে, যেখানে বল বিশেষ ঘোরে না, সেখানে তো ওঁদের একসঙ্গে খেলানোই যায় না।

আজ এ পর্যন্তই। ভারতীয় দলের তারকা ব্যাটাররাও যে মাঝারিয়ানার বানানো স্বর্গের দেবদূত, কেবল স্পিন খেলতে না পারা যে ৩-০ ফলাফলের কারণ নয়, সেসব কথা সবিস্তারে না লিখলে এই লেখা সম্পূর্ণ হবে না। সে কাজ পরের পর্বের জন্য তোলা রইল।

সমস্ত পরিসংখ্যান ক্রিকইনফো থেকে

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য আরও আঘাত অপেক্ষা করছে

একজন-দুজন নয়, গোটা ক্লাসই ফেল। এরপরেও রোহিত বুক ফুলিয়ে বললেন, কাটাছেঁড়া করার দরকার নেই।

মনে করুন আপনি একটা ক্লাসের ক্লাস টিচার। আপনার ক্লাসের সবকটা ছাত্রছাত্রী বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করেছে। হেডমাস্টার আপনার কাছে কৈফিয়ত চাইলেন। আপনি বললেন “এ নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। এতবছর তো সবাই পাস করেছে। একদিন তো এই রেকর্ড ভাঙতই, না হয় এবছরই ভাঙল।” কী ফল হবে? স্কুল বেসরকারি হলে চাকরিটি যাবে। সরকারি স্কুলে তা হবে না, কিন্তু বিলক্ষণ গালমন্দ হজম করতে হবে। ঘটনা হল, নিউজিল্যান্ডের কাছে একটা টেস্ট বাকি থাকতেই সিরিজ হেরে যাওয়ার পরে ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা প্রায় এই কথাগুলোই বলেছেন।

বলেছেন, এত কাটাছেঁড়া করার কী আছে? বারো বছর পরে একটা সিরিজ (ঘরের মাঠে) তো দল হারতেই পারে। যা চেপে গেছেন, তা হল দল সমানে সমানে লড়াই করে হারেনি, ল্যাজেগোবরে হয়েছে। প্রথম টেস্টের প্রথম দিনে ভিজে আবহাওয়ায় বল সুইং করতেই রোহিত বাহিনী ৪৬ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে ঋষভ পন্থ আর সরফরাজ খান দুর্দান্ত ব্যাটিং করায় ইনিংস হার বেঁচেছে। পুনের দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে স্পিনারদের পিচেও দেড়শো রানেই জারিজুরি শেষ। দ্বিতীয় ইনিংসেও যশস্বী জয়সোয়াল ছাড়া সব ব্যাটার ব্যর্থ। নিচের দিকে রবীন্দ্র জাদেজা কিছু রান না করলে আবার দুশোর নিচে ইনিংস গুটিয়ে যেত। শুধু কি তাই? প্রথম টেস্টে জোরে বোলিং সহায়ক পিচকে বুঝতে ভুল করে তিন স্পিনারে খেলা হল। ফলে আবহাওয়া যেমনই থাকুক, টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া ছাড়া উপায় রইল না। ওদিকে এখনই যাঁকে কপিলদেবের চেয়েও ভাল বলা শুরু হয়ে গেছে, সেই যশপ্রীত বুমরা ওই পিচে বিশেষ কিছু করতে পারলেন না। আরেক ‘গোট’ (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম) রবিচন্দ্রন অশ্বিনকেও নির্বিষ দেখাল। জাদেজা আর কুলদীপ যাদব তিনটে করে উইকেট নিলেন বটে, কিন্তু নিউজিল্যান্ড চারশো রান তুলে ফেলল। দ্বিতীয় টেস্টেও ভারতের আটশোর বেশি উইকেট নিয়ে ফেলা ‘রবি-অ্যাশ’ জুটি ব্যর্থ। এক ব্যাগ অভিজ্ঞতা নিয়ে, ওয়াশিংটন সুন্দর আর মিচেল স্যান্টনারের বোলিং দেখেও, তাঁরা বুঝেই উঠতে পারলেন না যে এই পিচে আস্তে বল করতে হবে। জোরে জোরে বল করে লাভ নেই। বুমরা এখানেও রিভার্স সুইং-টুইং করাতে পারলেন না। মানে একজন-দুজন নয়, গোটা ক্লাসই ফেল। এরপরেও রোহিত বুক ফুলিয়ে বললেন, কাটাছেঁড়া করার দরকার নেই।

আসলে রোহিত জানেন, তিনি যে ক্রিকেট বোর্ডের কর্মচারী তারা টাকা দিয়ে কিনে রেখেছে যাদের কাটাছেঁড়া করা কাজ তাদের এক বড় অংশকে। প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার আর সাংবাদিকদের কথা বলছি। আরেকটা অংশ ভয়েই চুপ করে থাকবে। কারণ সত্যি কথা বলে/লিখে ফেললে ক্রিকেট বোর্ড ধারাভাষ্যের চুক্তি থেকে বাদ দিয়ে দেবে বা আর মাঠে ঢুকতে দেবে না। হাতে না মেরে ভাতে মারা যাকে বলে আর কি। রোহিত নির্ভুল আন্দাজ করেছেন। একই দিনে পাকিস্তানে, অর্থাৎ বিদেশের মাঠে, ইংল্যান্ডের হারের পর নাসের হুসেন, মাইকেল আথারটনরা চুলচেরা সমালোচনা করছেন বেন স্টোকসের দলের। অন্যদিকে সুনীল গাভস্কর, রবি শাস্ত্রী, সঞ্জয় মঞ্জরেকর, অনিল কুম্বলেরা ‘আহা! ওরা তো খারাপ খেলোয়াড় নয়। খেলায় হার জিত তো আছেই। ঘরের মাঠে টানা ১২ বছর, ১৮ খানা সিরিজ জিতেছে। সেটা তো মনে রাখতে হবে’ – এই জাতীয় কথাবার্তা বলছেন। বেশ, ওঁদের কথাও থাক। অত বড় ক্রিকেটারদের তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই ১২ বছর অপরাজিত থাকার রেকর্ডটা নিয়েই বরং কাটাছেঁড়া করা যাক।

ভারত কি কোনোদিন ঘরের মাঠে দুর্বল দল ছিল, বা মাঝেমধ্যেই এর তার কাছে সিরিজ হারত? সোজা উত্তর – না। এই শতাব্দীর ইতিহাসে ২০১২ সালে অ্যালাস্টেয়ার কুকের ইংল্যান্ডের আগে ভারত শেষ সিরিজে হেরেছিল আরও আট বছর আগে, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট-রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার কাছে। অর্থাৎ আড়াই দশকে মোটে চারটে সিরিজ হার। তার আগের সিরিজ হার ছিল ২০০০ সালে, হ্যানসি ক্রোনিয়ের দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। আর গত শতকের ইতিহাস?

অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। সেই অস্ট্রেলিয়া ২০০৪-০৫ মরশুমের ওই জয়ের আগে ভারতে শেষ জিতেছিল ১৯৬৯-৭০ সালে। ইংল্যান্ডের ভারতের মাঠে কুকের দলের আগে শেষ সিরিজ জয় ছিল ১৯৮৪-৮৫ মরশুমে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ দেশে এসে শেষবার সিরিজ জিতেছে ১৯৮৩-৮৪ মরশুমে। শ্রীলঙ্কা আজ পর্যন্ত জেতেনি, নিউজিল্যান্ড যে আগে কখনো জেতেনি তা তো এখন সকলেই জানেন। তারা শেষবার এ দেশে একটা টেস্ট ম্যাচই জিতেছিল সেই ১৯৮৮ সালে, তাও ১৯৬৯ সালের পর প্রথমবার। এমনকি পাকিস্তান, যাদের সঙ্গে আমাদের আবহাওয়া এবং পিচের চরিত্র সবচেয়ে বেশি মেলে, তারাও ১৯৫২-৫৩ থেকে ২০০৭-০৮ পর্যন্ত ভারত সফরে এসে সিরিজ জিততে পেরেছিল মাত্র একবার – ১৯৮৬-৮৭ মরশুমে। সুতরাং ভারত চিরকালই নিজের দেশে বাঘ। কোহলি, রোহিতরা নতুন কিছু করেননি। বস্তুত, সব দলই নিজের দেশে বাঘ। তাই যে কোনো টেস্ট দলেরই উৎকর্ষ বিচার করা হয় বিদেশে তারা কেমন তাই দিয়ে। অজিত ওয়াড়েকরের ভারতীয় দল শ্রদ্ধেয়, কারণ ১৯৭১ সালে তারা ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং ইংল্যান্ডে সিরিজ জিতেছিল। সৌরভ গাঙ্গুলির দল ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে চিরকাল উঁচু জায়গায় থাকবে, কারণ তারা নিয়মিত বিদেশে টেস্ট ম্যাচ জেতা শুরু করেছিল। গত এক দশকে কোহলির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের কলার তোলার মত সাফল্যও দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা। দেশের মাঠে একের পর এক দলকে দুরমুশ করা নয়।

আরও পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে

এর সঙ্গে আরেকটা কথা না বললেই নয়, যা এক পডকাস্টে বলে বিস্তর ট্রোলড হয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে। কথাটা হল, গত ১০-১২ বছরে টেস্ট ক্রিকেট সম্ভবত খেলাটার ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। ২০১১ বিশ্বকাপের পর থেকে ধাপে ধাপে অবসর নিলেন শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের মহীরুহরা। ছোট্ট দেশে চট করে সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেটার পাওয়া শক্ত, ফলে দলটা একেবারে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক কারণে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলেনি। মাঝেমধ্যে এক-আধটা অঘটন ছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজও অতি দুর্বল হয়ে পড়েছে এইসময়। ওখানে বাস্কেটবল, বেসবলের দিকেই বেশি ধাবিত হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বিপদে পড়েছিল কালো মানুষদের জন্য সংরক্ষণ নীতির প্রভাবে বহু ক্রিকেটার দেশত্যাগ করায়। অর্থাৎ ভাল মানের আন্তর্জাতিক দল ছিল ভারতকে নিয়ে বড়জোর চারটে। সুতরাং ১২ বছর দেশে হারিনি – এই নিয়ে উদ্বাহু না হয়ে বরং মনে রাখা ভাল, এই যুগেও কিন্তু আমরা দক্ষিণ আফ্রিকাকে ও দেশে হারাতে পারিনি, ইংল্যান্ডে সিরিজ জিততে পারিনি, নিউজিল্যান্ডেও নয়। এমনকি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শুধু ফাইনালটা ইংল্যান্ডে হতেই পরপর দুবার হেরে বসেছি।

বাংলাদেশকে দুদিনে হারিয়েছি বলে পেশি ফোলানোর ফল এই সিরিজে দেখা যাচ্ছে। এখনো ভুল কারণে নাচানাচি চালু রাখলে অদূর ভবিষ্যতে আরও আঘাত পেতে হবে। অবশ্য সেটা প্রায় অনিবার্য। কারণ এই সিরিজ ৩-০ হারলে, এমনকি আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সফরে ৫-০ হারলেও, কিছু বদলানোর আশা কম। কারণ ২০১১-১২ মরশুমে পরপর আটটা টেস্ট হারার পরেও মহেন্দ্র সিং ধোনির অধিনায়কত্ব যায়নি, শচীনকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়নি। ফলাফলকে সেদিনই গুরুত্বহীন করে দেওয়া হয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদ কাগজে প্রকাশিত

ষড়যন্ত্র না হলেও, ভিনেশ অবহেলার শিকার

ভিনেশ ফোগত যে প্যারিস থেকে খালি হাতে ফিরছেন, তা একরকম ভালই হল। কারণ তাঁর যে পদকটা প্রাপ্য, সেটা দেওয়ার সাধ্য আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) নেই। সে পদক আজ থেকে ৬৪ বছর আগে মহম্মদ আলি বিসর্জন দিয়েছেন ওহায়ো নদীর জলে। ঈশপের গল্পের মত কোনো দেবী উঠে এসে তো আর সে পদক ভিনেশের গলায় পরিয়ে দেবেন না। তার জায়গায় অন্য কোন পদক মানাবে?

খবরে প্রকাশ, শেষপর্যন্ত প্যারিস অলিম্পিকে কুস্তিতে ভারতকে পদক এনে দিলেন যিনি, সেই অমন শেরাওয়াতও ব্রোঞ্জ পদকের জন্য লড়াইয়ের আগের রাতে দু-এক কেজি নয়, সাড়ে চার কেজি বেশি ওজনে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তারপর সেই ওজন কমাতে অমন আর তাঁর দুই কোচ – জগমন্দর সিং আর বীরেন্দর দাহিয়া – সারারাত কী করলেন? প্রথমে দুজনে অমনের সঙ্গে দেড় ঘন্টা কুস্তি লড়লেন ম্যাটে। তারপর এক ঘন্টার হট বাথ। তারপর রাত সাড়ে বারোটা থেকে এক ঘন্টা অমন ট্রিডমিলে একটুও না থেমে দৌড়ে গেলেন। অতঃপর আধ ঘন্টার বিরাম, যাতে ঘাম ঝরে এবং সেই সূত্রে ওজন খানিকটা কমে। তারপর পাঁচ মিনিট করে পাঁচবার সাওনায় বসা। তারপরেও অমনের ওজন ৫৭ কেজির চেয়ে ৯০০ গ্রাম বেশি ছিল। তারপর তাঁকে আচ্ছা করে দলাই মলাই করা হয় এবং দুই কোচ অমনকে হালকা জগিং করতে বলেন। এরপর পাঁচবার ১৫ মিনিট করে দৌড়। শেষে ভোর সাড়ে চারটের সময়ে দেখা যায় অমনের ওজন ৫৬.৯ কেজি হয়ে গেছে। তবে নিশ্চিন্দি।

এখন কথা হল, এক ভারতীয় কুস্তিগিরের ওজন যদি ঘন্টা দশেকের মধ্যে ৪.৬ কেজিরও বেশি কমিয়ে ফেলা যায়, তাহলে অন্য একজনের ওজন কিলো তিনেক কমানো গেল না কেন? ভারতীয় দলের চিফ মেডিকাল অফিসার দিনশ পারদিওয়ালা বলেছেন সম্ভাব্য সবকিছু করার পরেও ১০০ গ্রাম ওজন বেশি থেকেই গেছে।

হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদন বলছে, গোলমালটা পেকেছে হিসাবের ভুলে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও একদিনে তিনটে কুস্তি ম্যাচ খেলার পরেও ওজন বেড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। একথা কুস্তিগিররা জানেন, তাঁদের পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা কোচ, ফিজিও, ডাক্তার, নিউট্রিশনিস্ট – সকলেই জানেন। কিন্তু ভিনেশের নিউট্রিশনিস্টের নাকি হিসাব ছিল, ওজন দেড় কেজি বাড়বে। অথচ জাপানের অপরাজেয় কুস্তিগির ইউয়ি সুসাকি সমেত তিনজনকে হারানোর পরে দেখা যায় ভিনেশের ওজন ২.৭ কেজি বেড়ে গেছে। সারারাত পরিশ্রম করেও শেষরক্ষা হয়নি। ভিনেশের চুল কেটে দিয়েও চেষ্টা করা হয়েছিল।

আমরা জানি, পৃথিবীতে বড় বড় ব্যাপারে দুরকমের ভুল হয় – ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত। দিয়েগো মারাদোনা যেমন ১৯৯৪ ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালীন এফিড্রিন নামক একটি নিষিদ্ধ ড্রাগ সেবন করে ডোপ পরীক্ষায় ধরা পড়ে বলেছিলেন, তাঁর ডাক্তার তাঁকে কী ওষুধ খাইয়ে দিয়েছেন তিনি জানেন না। অর্থাৎ তিনি জানতেন না যে ওই ওষুধে কোনো নিষিদ্ধ ড্রাগ আছে। মারাদোনার দাবির সত্যতা প্রমাণিত হয়নি, কারণ তাঁর সেই ব্যক্তিগত ডাক্তারটিকে আর্জেন্টিনা শিবিরের ত্রিসীমানায় পাওয়া যায়নি। অবশ্য ডোপ করে ধরা পড়ার পরে অনেক অ্যাথলিটই ঠিক মারাদোনার যুক্তিই দিয়ে থাকেন। মারিয়া শারাপোভাও তাঁর আত্মজীবনীতে তেমনটাই লিখেছেন। সুতরাং মনে করার কারণ আছে যে ওটা ইচ্ছাকৃত ভুল। ভিনেশের বেলায় অবশ্য কোনো অসদুপায় অবলম্বন করার চেষ্টা ছিল না। কুস্তি এবং বক্সিং এমন দুটো খেলা, যেখানে ওজনের ভিত্তিতে খেলোয়াড়দের ভাগ করা হয় এবং প্রায় সব খেলোয়াড়ই নিজের চেয়ে কিছুটা কম ওজনের বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বাড়তি ওজনটুকু নিয়ামক সংস্থার ওজন যন্ত্রে ওঠার (যার পোশাকি নাম ওয়ে-ইন) আগে কমিয়ে ফেলেন নানা উপায়ে। ঠিক যেমন অমন কমিয়েছিলেন ব্রোঞ্জ পদকের জন্য ম্যাচের আগের রাতে। ভিনেশের অতখানি ওজন না কমালেও চলত। যেটুকু দরকার তাও যে করা গেল না, তার জন্য দায়ী কি ইচ্ছাকৃত ভুল, না অনিচ্ছাকৃত ভুল?

মজার কথা, অমনের কোচেরা বলেছেন যে ভিনেশের ঘটনায় তাঁরা তৎপর হয়ে গিয়েছিলেন। যদিও ওই দুজন ভিনেশের ব্যক্তিগত কোচ নন (তাঁর কোচ বিদেশি, নাম ওলার অ্যাকোস), তবু এই কথা থেকে কি ধরে নেওয়া যায় যে ভারতীয় দল ভিনেশের ফাইনাল গুবলেট হওয়ার আগে পর্যন্ত গদাই লস্করি চালে চলছিল? ষড়যন্ত্রের তত্ত্বে না গিয়েও বলা যায়, এরকম মনে করা ভুল নয়। কারণ নিউট্রিশনিস্টের ভুল যদি ঐতিহাসিক অনিচ্ছাকৃত ভুলও হয়, ভিনেশের হয়ে কোর্ট অফ আরবিট্রেশন ফর স্পোর্টে (ক্যাস) আবেদন জানাতে যে গড়িমসি করা হয়েছিল তা তো প্রকাশ করেই দিয়েছেন ভিনেশের আইনজীবী রাহুল মেহরা।

বস্তুত, ক্যাস ভিনেশের আবেদন গ্রহণ করে যে বিবৃতি দিয়েছিল তাতেও বলা হয়েছে, আবেদনকারী কোনো অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশের আবেদন করেননি। করলে কিন্তু ভিনেশের বিভাগের ফাইনাল স্থগিত রাখার নির্দেশও দিতে পারত ক্যাস (রায় দান পিছোতে পিছোতে এখন ১৩ অগাস্ট তারিখ ধার্য হয়েছে)। কিন্তু সেসব হবে কী করে? ভারতীয় অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (আইওএ) তো তখনো নিজেদের আইনজীবীই নিয়োগ করে উঠতে পারেনি। অলিম্পিক আয়োজকদের দ্বারা নিযুক্ত প্যারিস বারের ফরাসি আইনজীবীরাই উদ্যোগ নিয়ে ভিনেশের হয়ে আবেদন করেছেন। তাঁরা যতটুকু করেছেন, ততটুকুই হয়েছে। এই দীর্ঘসূত্রিতা দুর্বোধ্য, কারণ ভিনেশ যে ফাইনালে লড়তে পারবেন না সে খবর গত বুধবার আইওসি সরকারিভাবে ঘোষণা করার আগেই ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ – প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী – ভিনেশের লড়াইকে সেলাম-টেলাম জানিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও মঙ্গলবার যখন অসাধ্য সাধন করে ভিনেশ পদক নিশ্চিত করলেন তখন প্রধানমন্ত্রী কোনো সোশাল মিডিয়া পোস্ট করেননি।

মোদ্দাকথা যতক্ষণে ভিনেশের হয়ে ক্যাসে আবেদন জানানো হয়েছে, ততক্ষণে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ঘটনা সম্পর্কে অবগত। তবু হরীশ সালভের মত বড় উকিলকে নিযুক্ত করতে দেরি হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ ভারতীয় ক্রীড়াপ্রেমী ভিনেশের ঘটনায় যতটা মর্মাহত হয়েছেন, ভারতীয় কুস্তি বা অলিম্পিক সংস্থা কিম্বা দেশের হোমরা চোমরারা মোটেই ততটা হননি। বিজেপি আই টি সেলের পক্ষ থেকে ভিনেশকে কটাক্ষ করে নানারকম পোস্টও চালু হয়ে গিয়েছিল। সম্ভবত সংসদে বিরোধীদের হইচই, ওয়াক আউট এবং সোশাল মিডিয়ায় বেশিরভাগ মানুষের সহানুভূতি ভিনেশের দিকে থাকা – এই ত্র্যহস্পর্শে হরিয়ানার বিধানসভা নির্বাচনের আগে জনমত আরও সরকারবিরোধী হয়ে যাওয়ার ভয়ে হোমরা চোমরারা গা ঝাড়া দিয়ে ওঠেন।

এই কারণেই বলা, মহম্মদ আলির ফেলে দেওয়া পদকের ন্যায্য দাবিদার আমাদের ভিনেশ। আলি (তখন ক্যাসিয়াস ক্লে) দুনিয়ার সেরা বক্সার হয়েও সাদা চামড়ার লোকেদের রেস্তোরাঁয় বন্ধুদের নিয়ে খাবার খেতে পারেননি, গলাধাক্কা খেয়েছিলেন। কারণ তিনি কালো মানুষ হয়ে জন্মেছিলেন। আর প্রায় কেরিয়ার শেষ করে দেওয়া আঘাত কাটিয়ে, অসম্ভব শারীরিক বেদনা সহ্য করে ভিনেশের কুস্তির ম্যাটে ফিরে আসা জয়যুক্ত হল না, কারণ তাঁর দেশে মেয়ে হয়ে জন্মালে কেবল ভাল খেলোয়াড় হওয়া যথেষ্ট নয়। কোনো সন্দেহ নেই, ভিনেশ যদি আমাদের দেশের লক্ষ্মী ছেলে ক্রিকেটারদের মত লক্ষ্মী মেয়ে হতেন, নিয়মিত শাসক দল বিজেপির বিভিন্ন রাজনৈতিক এজেন্ডার পক্ষ নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করতেন, তাহলে তাঁর হয়ে সাত তাড়াতাড়ি ক্যাসে ছুটে যেত ভারতীয় অলিম্পিক সংস্থা। বিশিষ্ট ক্রীড়াপ্রেমী নীতা আম্বানিও নির্ঘাত কিছু একটা করতেন, সেটা ন্যায্যই হোক আর অন্যায্যই হোক। কিন্তু ভিনেশ যে ম্যাটের বাইরেও কুস্তি বজায় রেখেছেন।

আরও পড়ুন কুস্তিগীরদের আন্দোলন: মহাতারকাদের মহাকাপুরুষতা

বিজেপি সাংসদ ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে কুস্তিগিরদের হয়রানি ইত্যাদি অভিযোগ নিয়ে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছেন বলে মোদীজি অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে ভিনেশের সোনা জেতার পথ রুদ্ধ করেছেন – এমন বলছি না। কারণ বলার মত যথেষ্ট প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। কিন্তু নিজের শরীরের ওজন ৫৬ কেজির আশেপাশে হওয়া সত্ত্বেও ভিনেশকে ৫০ কেজি ফ্রিস্টাইলে লড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, কারণ চোট সারানোর চিন্তা ছেড়ে, কুস্তি ছেড়ে তাঁকে রাস্তায় বসে থাকতে হয়েছে দিনের পর দিন। দিল্লি পুলিস টানতে টানতে নিয়ে গেছে রাস্তা দিয়ে। সেসবের পর শেষমেশ লিগামেন্টের চোটের জন্য অস্ত্রোপচার হয়েছে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে।

অস্ত্রোপচারের পর প্রথম যেদিন ম্যাটে পা রাখেন, সেদিন কয়েক পা হেঁটেই যন্ত্রণায় লুটিয়ে পড়েছিলেন। এদিকে ততদিনে ৫৩ কেজি ফ্রিস্টাইল কুস্তিতে উঠে এসেছেন অন্তিম পাঙ্ঘেল। ফলে আবার অলিম্পিকের যোগ্যতা অর্জন করতে হলে নিজের ওজনের চেয়ে আরও কম ওজনের বিভাগে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না ভিনেশের। এতখানি ওজন কমানো এবং প্রতিযোগিতা চলাকালীন কম রাখা মোটেই সহজ নয়। এবছর এপ্রিল মাসে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে যোগ্যতার্জন প্রতিযোগিতার আগের রাতেও ওজন কমানোর জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছিল ভিনেশকে। কোচ অ্যাকোসের বন্ধুর বাড়ির সাওনায় ৯৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতায় বসে থাকতে হয়েছিল ১৫+১৫ = ৩০ মিনিট। তখন আবার কোচ শুকনো ডাল পাতা দিয়ে তাঁকে মারছিলেন, যাতে ঘাম বেরোয়, ওজন কমে। অত লড়াই করতে হয়েছিল ৭০০ গ্রাম ওজন কমানোর জন্যে। এই লড়াইয়ে বারবার জেতা শক্ত। ২০১৬ অলিম্পিক পর্যন্ত কুস্তির প্রথম রাউন্ড থেকে ফাইনাল পর্যন্ত লড়াই একই দিনে হত। সে নিয়ম চালু থাকলে হয়ত ভিনেশের ম্যাটের বাইরের লড়াইটা এত বড় হয়ে দাঁড়াত না।

থাক, না-ই বা জিতলেন অলিম্পিক পদক। সকলেই যদি জিতে যায়, তাহলে যারা কিছুই জেতে না তারা লড়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাবে কাকে দেখে? ভিনেশ তো ঠিকই বুঝেছেন। গোটা জীবনটাই তো কুস্তির ম্যাট। প্রতিপক্ষও অসংখ্য এবং নানারকম।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

জয় জয় জয় জয় হে

ডেমোক্রেসিতে গভমেন্টই সকলের মাইবাপ। কিন্তু কজনের বাপই গভমেন্ট হয়? যাদের হয় তারা এতকাল হাতে মাথা কেটে এসেছে, আর এখন একজন একটু সব ছবিতে থাকতে চেয়েছে বলে আপনারা তাকে ট্রোল করছেন! এমনি এমনি তো আর সাহেবরা বলেনি যে ভারত পরশ্রীকাতর লোকেদের দেশ। কোথায় বলেছে সেকথা জিজ্ঞেস করবেন না। একবার যখন লিখেছি সাহেবরা বলেছে, তখন অবশ্যই বলেছে। না বলে থাকলেও আপনাদের কীর্তিকলাপ দেখে শিগগির বলবে। সোশাল মিডিয়া হয়ে এই হয়েছে ঝামেলা। সকলেরই হাতে একখানা ফোন আছে, ফলে কারোর কোনো ণত্ব ষত্ব জ্ঞান নেই। যার যা সম্মান তাকে যে সেটা দিতে হয়, সেই বোধ নেই। যিনি এত বড় বোর্ডটাকে কাঁধে করে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, তিনি একটু বিশ্বকাপে হাত দিয়েছেন বলে সকলে যা খুশি তাই পোস্ট করে চলেছে। অবশ্য এ দেশের লোকের ধর্মই তো এই। যে দেশে প্রধানমন্ত্রীকেই লোকে সম্মান দেয় না, মিম বানায়; সে দেশে ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্টকে আর কে সম্মান দেবে?

অ্যাঁ, কী বলছেন? জয় শাহ প্রেসিডেন্ট নন, সেক্রেটারি? প্রেসিডেন্ট কে তাহলে? রজার বিনি? আরে ওসব বিনি পয়সার লোককে অত পাত্তা দেওয়ার কী আছে? তাছাড়া তেনাকে তো দেখাও যায় না চট করে, কথা-টথাও শোনা যায় না। ক্রিকেট কি যক্ষপুরী নাকি, যে রজারকে রক্তকরবীর রাজা বলে মেনে নিতে হবে? ওসব ছাড়ুন। মানিব্যাগ যার কাছে, সে-ই হল আসল রাজা। আজ দেশের ক্রিকেট চালাচ্ছেন, এশিয়ার ক্রিকেট চালাচ্ছেন, অন্যদের ঘাড় ধরে দুনিয়ার ক্রিকেটও নিজের মর্জি মত চালিয়ে নিচ্ছেন। কাল হয়ত বসেই পড়বেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের চেয়ারে। যে দেশে কানার নাম হয় পদ্মলোচন, সে দেশে বিশ্বকাপে জয় পাওয়া এবং বিশ্বক্রিকেটের শাহ হতে চলা লোককে এত লোক গাল দিচ্ছে দেখলে মানুষটার প্রতি মায়া হয়। মানুষটার কতখানি মায়া দয়া সে খবর আপনারা রাখেন? এই যে হারিকেন বেরিলে আপনাদের প্রিয় ক্রিকেটাররা ওয়েস্ট ইন্ডিজে আটকে পড়েছিলেন, চার্টার্ড ফ্লাইট পাঠিয়ে তাঁদের উড়িয়ে আনল কে? ওই শর্মা, থুড়ি শাহই তো। শুধু কি তাই? ক্রিকেটাররা কে কোথায় কার সঙ্গে কানাকানি করলেন, কার সঙ্গে চুপিচুপি দেখা করলেন, ডিনার খেতে গেলেন, খেয়ে হোটেলে নিজের ঘরে গেলেন নাকি তার ঘরে গেলেন – এসব জরুরি ইনফর্মেশন আপনাদের ফোনে পৌঁছে দেন যে ধুরন্ধর জার্নালিস্টরা, তাঁদের পর্যন্ত উড়িয়ে এনেছেন বিসিসিআই সেক্রেটারি জয়। এমন লোকের নামে জয়ধ্বনি না দিয়ে তাকে নিয়ে চালাক চালাক জোক ক্র্যাক করা! এসব ধম্মে সইবে? নেহাত লোকটা বায়োলজিকাল, তাই অভিশাপ-টাপ দিতে পারে না। তা বলে লোকটাকে নাহক ছোট করবে দেশসুদ্ধ ক্রিকেটপ্রেমী মিলে?

বলা হচ্ছে যশপ্রীত বুমরার হাত থেকে নাকি কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে জয় কাপটা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন রোহিত শর্মার সঙ্গে ছবি তুলবেন বলে।

কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে তাতে? বছর বছর আইপিএলের ম্যাচ বাড়িয়ে খেলোয়াড়দের আরও ধনী করার ব্যবস্থা করছেন, ফি বছর আইসিসি টুর্নামেন্টের বন্দোবস্ত করেছেন (২০১৯ – ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২১ – বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল আর ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২২ – আবার ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২৩ – বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল আর ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২৪ – আরও একবার ২০ ওভারের বিশ্বকাপ, ২০২৫ – চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল) যাতে ক্রিকেটাররা বড় ট্রফি জেতার অনেক সুযোগ পান, বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে অন্য সেমিফাইনালে রিজার্ভ ডে রেখে ভারতের ম্যাচে না রাখার ব্যবস্থা করেছেন, গতবছর দেশের মাঠে বিশ্বকাপের আয়োজন করে অন্য দেশের সমর্থকদের আসার রাস্তা এমনভাবে বন্ধ করেছিলেন যে খেলোয়াড়রা গ্যালারিতে কেবল নীল সমুদ্রই দেখতে পেতেন। মানে রোহিত, বুমরারা দারুণ খেলেন তাই। যদি না-ও খেলতেন, তাহলেও তাঁদেরই হাতে ট্রফি তুলে দেওয়ার জন্যে যতটা করা সম্ভব, সবটাই শাহ করেছেন। এশিয়া কাপ থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ – সর্বত্রই করে থাকেন। এত কিছু করার পরেও যারা প্রশ্ন তোলে – এই লোকটার কী যোগ্যতা আছে কাপ হাতে নেওয়ার, তারা দেশদ্রোহী ছাড়া কী?

তাছাড়া আপনারা খেয়ালই করেন না যে আপনাদের জন্যেও মানুষটা কত করে। সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে বিশ্বকাপ হল, তবু কেমন সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে মাঝরাত অব্দি খেলা দেখে আবার পরদিন সকাল সকাল অফিস চলে গেলেন। ওদিকে যেখানে খেলা হল সেখানকার লোকেরা সাতসকালে বা ভরদুপুরে কাজকম্ম ফেলে মাঠে যেতে পারল না বলে অনেক খেলায় গ্যালারি বিজেপির ভোটের মিটিংয়ের মাঠের মত খালি গেল। শাহের বোর্ড না থাকলে আপনারই চেতনার রঙে পান্না সবুজ হতে পারে, চুনি রাঙা হয়ে উঠতে পারে আর আপনার প্রাইম টাইমে ভারতের ক্রিকেট ম্যাচ হতে পারে একেবারে অন্য গোলার্ধে – এ কি স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন? তা এত কাণ্ড যে টাকার গরমে সম্ভব হল, সে টাকার মালিককে আপনারা ফ্রেমের বাইরে রাখতে চান? নিজেদের ইচ্ছা মত টুর্নামেন্ট সাজিয়ে নেয়া নিয়ে সায়েবরা লেখালিখি করলে গোঁফে তা দিয়ে আপনারা বলেন – ‘এসব সাদা চামড়ারা অনেক করেছে। এখন আমাদের সময়, আমরা করব।’ আর এদেশের দু-একজন সাংবাদিক ভুল করে লিখে ফেললে দুর্বাসা মুনির মতন রেগে বলেন ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল।’ সত্যযুগ হলে বেচারিরা ভস্মই হয়ে যেত। তা এখন শাহের জন্যেও চাড্ডি হাততালি দিলেন না হয়।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট: জাহান্নামের আগুনে পুষ্পের হাসি

কী দরাজ মন দেখুন তো লোকটার! আইসিসি চ্যাম্পিয়ন টিমকে দিয়েছে এদেশের কারেন্সিতে ২০ কোটি টাকা মত, আর উনি দিচ্ছেন ১২৫ কোটি। পঞ্চাশ গ্রামের টুর্নামেন্টে কোনোদিন দেখেছেন, কমিটি দিল ৫০১ টাকা আর আপনার ক্লাব দিল ৩০০১ টাকা? আহা! অমন হলে দুনিয়াটাই অন্যরকম হত মশাই। একবার ভাবুন। দুনিয়ার ফিফথ লার্জেস্ট ইকোনমির দেশ আমাদের, তাও এত লোক গরিব যে জয়ের জেঠুমণির সরকার ৮০ কোটি লোককে ফ্রিতে রেশন দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। সেই দেশের ক্রিকেট দলকে ২০ ওভারের বিশ্বকাপ জেতার জন্যে ১২৫ কোটি টাকা দিলেন জয়। কিছু লোক আবার কেমন নিন্দুক দেখুন – বলে বেড়াচ্ছে যে এটা তেলা মাথায় তেল দেয়া। একেকজনের ভাগে কোটি পাঁচেক করে পড়বে, ওর চেয়ে বেশি ওরা এনডর্সমেন্ট থেকেই পায়। এদিকে মেয়েদের আর ছেলেদের দলের ম্যাচ ফি সমান করে দিয়ে মেয়েদের ম্যাচের আয়োজনই করা হয় না। তা ওদের জন্যে কিছু ভাবলে হত। কোভিডে রঞ্জি ট্রফি বন্ধ থাকার সময়ে দিন আনি দিন খাই অবস্থা হয়েছিল অনেক ঘরোয়া ক্রিকেটারের। তাদের জন্যেও কিছু করে না জয়ের বোর্ড। আরে বাপু, মানুষটার মনটা নরম বলে কি দানসত্র খুলে বসতে হবে নাকি? যারা টাকা করার ব্যবস্থা করে তাদেরই দেয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। যে সে মাথায় তেল দিলে চলবে? তেলের যা দাম বেড়েছে।

তা ক্রিকেটাররা কি কিছু মাইন্ড করেছেন? দেখে মনে তো হল না। তাঁরা জানেন যে জয় হলেন গোপাল পাঁঠার মত। তিনি আছেন বলে আমি আছি, আপনি আছেন, রোহিত আছেন, বিরাট আছেন, বুমরা আছেন, হার্দিক আছেন। তাই লক্ষ্মী ছেলের মত তাঁরা বিভিন্ন ব্যাপারে জয়ের জেঠুমণির সরকারের পক্ষ নিয়ে পোস্ট করে দেন। আবার লক্ষ্মী ছেলের মত পোস্ট করেন না, যখন দেশের মহিলা অলিম্পিয়ানদের রাতের অন্ধকারে টেনে হিঁচড়ে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায় জয়ের বাবার পুলিস।

দেশের লোক কি কিছু মাইন্ড করেছে? মোটেও না। নিদেনপক্ষে মুম্বাইয়ের লোকেরা তো একেবারেই মাইন্ড করেনি। ১৯৮৩ সালের কথা বাদ দিন, ২০০৭ বা ২০১১ সালেও মেরিন ড্রাইভে এত লোক দেখা যায়নি উইক ডে-তে ভর সন্ধেবেলা। এই অনন্ত আনন্দধারার মধ্যে স্রেফ মুখখানা অপছন্দ বলে ছুতোয় নাতায় মিষ্টি লোকটার পিছনে লেগে অ্যাম্বিয়েন্সটা বিগড়ে দেবেন না মাইরি। কটা দিন অন্তত নিট, নেট, ব্রিজ ভাঙা, এয়ারপোর্টের ছাদ ধসে পড়ে অক্কা পাওয়া, দেশের রাজধানীতে জলের অভাবে মিনিস্টারের অনশন, অগ্নিবীর, ঠেঙিয়ে মুসলমান হত্যা – এসব পলিটিকাল কচকচি ভুলে থাকতে দিন। আচ্ছে দিন না আসুক, আচ্ছে উইন তো এসেছে। গলা ছেড়ে গেয়ে উঠুন ‘জয় জয় জয় জয় হে’।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

হিন্দুরাষ্ট্রের ক্রিকেট দলের কোচ হিসাবে গম্ভীর সেরা পছন্দ

২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন।

ভালমানুষ রাহুল দ্রাবিড় আর পেরে উঠছেন না। তাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড পুরুষদের জাতীয় দলের নতুন কর্ণধারের খোঁজ করছে। শোনা যাচ্ছে বোর্ড একজন শাঁসালো কোচ চায়। স্টিফেন ফ্লেমিংকে নাকি মহেন্দ্র সিং ধোনি রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। রিকি পন্টিংকে নাকি বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি রাজি নন। জাস্টিন ল্যাঙ্গারও রাজি হচ্ছেন না বলে শোনা যাচ্ছে। এসব অবশ্য নেহাত গুজব বলে বিবৃতি দিয়েছেন বোর্ডের সর্বেসর্বা জয় শাহ। তবে গৌতম গম্ভীরের নাম যে উঠে এসেছে, এই প্রচার সম্পর্কে কিছু বলেননি। এই কাজের জন্যে ওই নামটি কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক।

গৌতম সত্যিই গম্ভীর। তাঁকে চট করে হাসতে দেখা যায় না। সম্প্রতি রবিচন্দ্রন অশ্বিনের পডকাস্টে এসে গৌতম বলেছেন ‘লোকে আমার হাসি দেখতে আসে না। আমার জয় দেখতে আসে।’ ফুর্তিবাজ রবি শাস্ত্রীর সঙ্গে এতবছর ঘর করার পরে রোহিত শর্মা, বিরাটরা কি এত গম্ভীর লোকের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারবেন? গুরুতর প্রশ্ন।

গম্ভীরের কথা উঠলেই এসে পড়ে বিরাটের কথাও। দুজনেই দিল্লির ছেলে। শুধু জাতীয় দল নয়, রঞ্জি দলেও একসঙ্গে খেলেছেন। কিন্তু সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়। প্রাক্তন ক্রিকেটারদের যে কজন আজও বিরাটের ব্যাটিংয়ের সমালোচনা করার সাহস দেখান, গম্ভীর তাঁদের একজন। গতবছর আইপিএলে গম্ভীরের তখনকার দল লখনৌ সুপার জায়ান্টস আর বিরাটের রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর ম্যাচের পর তো হাতাহাতির উপক্রম হয়েছিল। ভারতীয় ক্রিকেটের বর্তমান মহাতারকার সঙ্গে এমন সম্পর্ক যাঁর, তিনি কী করে দল চালাবেন? কুম্বলের সময়ে  অবশ্য বিরাট অধিনায়ক ছিলেন, এখন সে ঝামেলা নেই। কিন্তু এই প্রজন্ম তো আবার সৌরভ গাঙ্গুলিদের প্রজন্ম নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাত্র হাজার নয়েক রানের মালিক জন রাইট তাঁর ইন্ডিয়ান সামার্স বইয়ে লিখেছেন, ভারতীয় দলের কোচ থাকার সময়ে তিনি একবার খারাপ শট খেলে আউট হওয়ার জন্যে রাগের চোটে বীরেন্দ্র সেওয়াগের কলার ধরেছিলেন, মারতে গিয়েছিলেন। অথচ সেই ঘটনা দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার বহুবছর পরে রাইট নিজেই লেখার আগে কেউ জানতেও পারেনি। আজ এর অর্ধেক ঘটলেও সোশাল মিডিয়ায় ‘সূত্রের খবর’ বলে ঘটনাটা ভাইরাল হবে, বোর্ড বিবৃতি দেবে এমন কিচ্ছু ঘটেনি। কিন্তু কোচের চাকরিটি চলে যাবে।

গম্ভীর যে কোচ হওয়ার যোগ্য তাতে সন্দেহ নেই। ২০০৭ আর ২০১১ – দুই ধরনের ক্রিকেটে ভারতের দুই বিশ্ব খেতাব জয়েই তাঁর বড় অবদান ছিল। দুটো ফাইনালেই তিনি সর্বোচ্চ রান করেন। আটান্নটা টেস্ট ম্যাচেও তাঁর কীর্তি ফেলে দেওয়ার মত নয়। আর কিচ্ছু না করে শুধু যদি ২০০৯ সালে নিউজিল্যান্ডের নেপিয়ারে এগারো ঘন্টা ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচানো ইনিংসটাই খেলতেন, তাহলেও তাঁর নাম ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে লেখা থাকত। তার উপর তিনি দুবার কলকাতা নাইট রাইডার্স অধিনায়ক হিসাবে আইপিএল খেতাব জিতেছেন। লখনৌ সুপার জায়ান্টস তাঁর মেন্টরশিপে আইপিএলে যোগ দিয়েই শেষ চারে পৌঁছেছিল। ফলে দল চালানোর ক্ষমতা যে তাঁর আছে, তা নিয়েও সংশয় নেই।

কিন্তু ভারতীয় দল আর পাঁচটা দলের চেয়ে আলাদা। অস্ট্রেলিয় ল্যাঙ্গার অতশত বোঝেন না। তিনি সরল মনে সংবাদমাধ্যমকে বলে বসেছেন, কে এল রাহুল নাকি তাঁকে বলেছেন – আইপিএলের দলে যদি চাপ আর রাজনীতি আছে বলে মনে করো, সেটাকে হাজার দিয়ে গুণ করলে তবে ভারতীয় দলের কোচিং কীরকম চাপের সেটা বুঝতে পারবে। তাই ল্যাঙ্গার ঠিক করেছেন ও কাজ তাঁর জন্যে নয়।

বলে ফেলার জন্যে রাহুলের হয়ত গর্দান যাবে, কিন্তু কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। প্রসিদ্ধ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পত্রিকা উইজডেন-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায় বর্ষীয়ান সাংবাদিক শারদা উগ্রা ‘মোদী অপারেন্ডি: দ্য পলিটিসাইজেশন অফ ইন্ডিয়ান ক্রিকেট’ শীর্ষক নিবন্ধে সবিস্তারে লিখেছেন, কীভাবে ক্রিকেট বোর্ডকে বিজেপি দলের একটা ইউনিটে পরিণত করা হয়েছে। ২০২৩ বিশ্বকাপকেও কীভাবে বিজেপির স্বার্থে চালানো হচ্ছিল। সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা – ২০২৩ বিশ্বকাপে পাকিস্তান ম্যাচে নীল জার্সির বদলে সম্পূর্ণ গেরুয়া জার্সি পরতে বলা হয়েছিল ভারতীয় দলকে। কিন্তু ক্রিকেটাররা বেঁকে বসেন। কেন? শারদা দুটো সূত্র থেকে দুরকম খবর পেয়েছেন। একটা বলছে, ক্রিকেটাররা ওই জার্সি বাতিল করেন জার্সিটা হল্যান্ডের মত দেখতে বলে। দ্বিতীয়টা বলছে, ক্রিকেটাররা বলেন – এ কাজ আমরা করব না। এতে আমাদের দলের ক্রিকেটারদেরই অসম্মান করা হবে। কারণ ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ দৃশ্যতই হয়ে দাঁড়াবে হিন্দু বনাম মুসলমান ম্যাচ। অথচ ভারতীয় দলে আছেন মহম্মদ শামি আর মহম্মদ সিরাজ। অনেক পাঠকের হয়ত খেয়াল আছে, ওই গেরুয়া জার্সির ছবি সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিল। তখন বোর্ডের হিসাবরক্ষক বলেছিলেন, ওটা ভুয়ো। কিন্তু শারদা লিখেছেন, দল, ক্রিকেট বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক নিয়ামক সংস্থা আইসিসি – তিনটে সূত্র থেকে তিনি খবর পেয়েছেন যে এমন পরিকল্পনা সত্যিই নেওয়া হয়েছিল।

আগামী ৪ জুন নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় ফিরলে হয়ত ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা জার্সির রং বদল আর আটকাতে পারবেন না। এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়, গম্ভীরই দ্রাবিড়ের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার উপযুক্ত লোক। কারণ তিনি ‘মোদী কা পরিবার’-এর গর্বিত সদস্য, বিদায়ী লোকসভায় বিজেপি সাংসদও ছিলেন। জাতীয় ক্রিকেট দলের লাগাম নিজেদের হাতে রাখতে গেলে মোদীর তো গম্ভীরকেই দরকার। যদি মোদী ক্ষমতায় না ফেরেন তাহলে গম্ভীরের গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে। কারণ একটা নির্বাচনে হার হলেই দেশের জন্যে মোদীর এক হাজার বছরের পরিকল্পনার পরিসমাপ্তি ঘটবে না। ভারতীয় সংস্কৃতির সমস্ত অভিজ্ঞান শরীরে ধারণ করা ক্রিকেট দল যাতে বেপথু না হয়ে যায়, তার জন্যে তো গম্ভীরের মত নির্ভরযোগ্য লোককেই দরকার। ভুললে চলবে না, ২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন। এক সাংবাদিক দাহিয়াকে বলেছিলেন যে কাণ্ডটা দেখে ইনজামাম উল হকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান দলের মাঠেই নমাজ পড়ার মত হয়ে যাচ্ছে। দাহিয়া বলেছিলেন, মোটেই তা নয়। সূর্যপ্রণামটা নাকি ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। ওতে চাপ কমে, মন শান্ত হয়।

সরকার হাতে থাক আর না-ই থাক, এই ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন’ তো বজায় রাখতে হবে জাতীয় ক্রিকেট দলে। তার জন্যে গম্ভীরের চেয়ে উপযুক্ত আর কে আছে?

এই সময় কাগজে প্রকাশিত

গোট কত বেড়া খেয়ে যাচ্ছে

গাভস্কর যখন খেলতেন তখন সোশাল মিডিয়া ছিল না, গোট কে তা নিয়েও আলোচনাই হত না। সবার উপরে স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান আর স্যার গারফিল্ড সোবার্স। বাকিরা তারপর – এই সহজ ভাবনায় ক্রিকেট দুনিয়া চলত।

সম্প্রতি কিংবদন্তি সুনীল গাভস্করের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন মহাতারকা বিরাট কোহলি। সামনেই টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। বিরাট তার আগে আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের হয়ে প্রচুর রান করছেন (এই লেখার সময়ে ১৩ ইনিংসে ৬৬৮; গড় ৬৬.১০)। ধারাভাষ্যকাররা, যাঁদের অনেকেই বিশ্ব ক্রিকেটে একদা সফল প্রাক্তন ক্রিকেটার, বিরাটের স্ট্রাইক রেটের সমালোচনা করছিলেন। তাই একটি ম্যাচ জিতিয়ে বিরাট তাঁদের বিরুদ্ধে ক্যামেরার সামনে বিবৃতি দেন। বিরাটের দল এবারের আইপিএলের হারতে হারতে প্রায় প্লে অফের ওঠার দৌড় থেকে ছিটকে গেছে। এমতাবস্থায় প্রাক্তন ক্রিকেটাররা বিরাটের মন্থর ব্যাটিং এবং স্পিনারদের মারার অক্ষমতার সমালোচনা করছেন। বিরাট সেই সমালোচনা থেকে কিছু শেখার বদলে সমালোচকদের দিকেই তোপ দেগেছেন। বলে দিয়েছেন, যারা তাঁর পরিস্থিতিতে পড়েনি তাদের পক্ষে বক্সে বসে সমালোচনা করা সহজ। বাইরের লোক যা খুশি ভেবে নিতে পারে। তিনি বাইরের কে কী বলল তাতে কান দেন না। একথায় গাভস্কর বেজায় চটে বলে দিয়েছেন, বাইরের লোকের কথায় যদি কান না-ই দেয় তো কথার উত্তর দিচ্ছে কেন? আমরা যা দেখব তাই তো বলব। আমাদের তো কারোর বিরুদ্ধে কোনো এজেন্ডা নেই। টিভির পর্দায় দেখা গেছে, গাভস্কর যখন একটি ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে মাঠে দাঁড়িয়ে মাইক হাতে এসব কথা বলছেন, তখন কাছেই অনুশীলনরত বিরাট কথাগুলো শুনে কটমটিয়ে তাকিয়েছেন।

এমন হতে পারে না যে বিরাট জানেন না গাভস্কর কত বড় ব্যাটার ছিলেন। আর পাঁচজনের কথার দাম না থাক, গাভস্করের কথার অবশ্যই দাম আছে। অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের কথারও বিলক্ষণ দাম আছে। নইলে তাঁদের সমালোচনায় বিরাট ক্ষেপে যেতেন না। তাহলে তিনি ওরকম আক্রমণাত্মক মন্তব্য করলেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা যা পাব, তা হল ঔদ্ধত্য। টেস্ট ক্রিকেটে যখন হেলমেট প্রায় ছিলই না, প্রত্যেক আন্তর্জাতিক দলেই এক বা একাধিক ঘন্টায় ৯০ মাইলের বেশি গতিতে বল করা বোলার ছিল, সেইসময় যিনি প্রথম ব্যাটার হিসাবে দশ হাজার রান করেছিলেন বেশ দুর্বল একটা দলে খেলে, তাঁকে আমল না দেওয়ার ঔদ্ধত্য কী করে তৈরি হল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সোশাল মিডিয়া যুগের এক অদ্ভুত প্রবণতার মধ্যে। প্রবণতাটা হল বিভিন্ন যুগের খেলোয়াড়দের মধ্যে তুলনা করে, এক ধরনের কাল্পনিক র‍্যাঙ্কিং তৈরি করে নিজের সময়ের সেরাকে সর্বকালের সেরা প্রতিপন্ন করা। হালে একটি শব্দের জন্ম হয়েছে খেলার জগতে – GOAT, অর্থাৎ ‘গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম’। গাভস্কর যখন খেলতেন তখন সোশাল মিডিয়া ছিল না, গোট কে তা নিয়েও আলোচনাই হত না। সবার উপরে স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান আর স্যার গারফিল্ড সোবার্স। বাকিরা তারপর – এই সহজ ভাবনায় ক্রিকেট দুনিয়া চলত। শচীন তেন্ডুলকরের আমল থেকে এনডর্সমেন্টের দুনিয়ায় কে সর্বকালের সেরা তা নিয়ে মশলাদার আলোচনা শুরু হয়। শচীনের বিদায়ের পর কবে যেন মহেন্দ্র সিং ধোনি গোট হয়ে গেলেন, তাঁর বিদায়ের পর বিরাট।

গাভস্করের হয়ে কথা বলার জন্যে সোশাল মিডিয়ায় ট্রোলবাহিনী নেই, বিরাটের জন্যে আছে। তারা বলে দিয়েছে বিরাটই গোট, কেউ অন্য কিছু বললে দল বেঁধে তেড়ে আসে তাকে গাল দিতে। শুধু তাই নয়, প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও অনেকদিন ধরে বিরাটকে ভিভিয়ান রিচার্ডস বা শচীনের সমান বা তার চেয়েও মহান ক্রিকেটারের তকমা দিয়ে চলেছেন। ফলে নির্ঘাত বিরাট নিজেও মনে করেন তিনি সর্বকালের সেরা। তাই গাভস্কর, ম্যাথু হেডেনরা এলেবেলে।

এই গোটে যে আজকাল কত বেড়া খেয়ে ফেলছে খেলার জগতে, তার হিসাব নেই। আমরা যে যুগে বাস করি, সেখানে হাতের ফোনটাতেই চাইলে দেখে ফেলা যায় যে কোনো খেলার কিংবদন্তিদের স্মরণীয় এবং সাধারণ খেলাগুলো। বর্তমান প্রজন্ম চাইলেই পেলে বা দিয়েগো মারাদোনার খেলা দেখে ফেলতে পারে। শচীন বা ভিভ তো বটেই, এমনকি ব্র্যাডম্যানের খেলারও এক-আধটা ক্লিপ সোশাল মিডিয়ায় পাওয়া যায়। সেগুলো দেখলে মাঠের তারতম্য, প্রতিপক্ষের গুণমানের তারতম্য নিজের চোখে দেখা যায়। অন্ধ ভক্ত না হলে বোঝাই যায়, এক যুগের সঙ্গে অন্য যুগের খেলোয়াড় তুলনীয় নয়। খেলার মান নির্ভর করে যে যে জিনিসগুলোর উপরে তার প্রায় কোনোটাই এক নেই, থাকার কথাও নয়। দুনিয়ার সবকিছুই তো প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে। সেখানে সর্বকালের সেরা দশ বা পাঁচ বা এক মুখরোচক আড্ডার বিষয়বস্তু হতে পারে বড়জোর। এছাড়া কোনোরকম র‍্যাঙ্কিংয়ের কোনো মানে হয় না।

আরও পড়ুন বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

মুশকিল হল, অধিকাংশ ক্রীড়ামোদী সুচিন্তিত মতামতের মানুষ হয়ে গেলে একনিষ্ঠ ভক্তকুল গড়ে উঠবে না। সেটা না হলে জনপ্রিয় খেলোয়াড়রা যে শত শত ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে কাজ করেন, সেগুলো চোখ বন্ধ করে কেনার লোক কমে যাবে। তাহলে স্পনসর পাওয়া যাবে না, খেলাধুলো করে কোটি কোটি টাকা কামানোর রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। এসব হতে দেওয়া যায় না। তাই খেলোয়াড় নিজে, তার সোশাল মিডিয়া টিম, সংবাদমাধ্যম, খেলার সম্প্রচারক, ধারাভাষ্যকাররা – সকলে মিলে কাল্পনিক র‍্যাঙ্কিং গড়ে তোলেন। তাতে সমসাময়িক কাউকে সর্বকালের সেরার মুকুট দিয়ে দেন। যদি কোনো সম ক্ষমতার খেলোয়াড় থাকেন, তাহলে পোয়া বারো। কে সত্যিকারের গোট তা নিয়ে তর্ক বাধিয়ে ব্যাপারটাকে আরও মুখরোচক করে তোলা হয়। ফুটবলে যেমন লিওনেল মেসি বনাম ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো। আমিই সেরা – এই কথা ২৪ ঘন্টার মধ্যে ২৬ ঘন্টা শুনতে শুনতে কোনো কোনো খেলোয়াড়ের বিশ্বাস হয়ে যেতে পারে তিনিই সর্বকালের সেরা। তখন তিনি লিওনেল মেসির মত, রামছাগলের সঙ্গে ছবি তোলাতে পারেন বা বিরাটের মত, প্রাক্তন ক্রিকেটারদের ফালতু মনে করতে পারেন।

কোনো খেলোয়াড় নিজেকে সর্বকালের সেরা মনে করলে এমনিতে বিশেষ ক্ষতি ছিল না। কিন্তু তাঁদের ব্যবহারে সেই মনোভাব প্রকাশ হয়ে পড়লে এখন যা হয়, তা হল তাঁদের অন্ধ ভক্তরা প্রাক্তন খেলোয়াড়দের এবং যারা তেমন ভক্ত নয় তাদের গালিগালাজ করার লাইসেন্স পেয়ে যায়। যখন অতীতের খেলা দেখা প্রায় অসম্ভব ছিল, তখন কিন্তু গাভস্করের ভক্তরা বলত না – বিজয় মার্চেন্ট বা সি কে নাইডু ক্রিকেটের কী বোঝে? এমনকি শচীনের দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনের প্রথমদিকের ভক্তরাও বলত না গাভস্কর কী বোঝে? বলত না, কারণ গাভস্কর কখনো তেমন ভাবার মত আচরণ করতেন না। বরং আজীবন নিজের আগের প্রজন্মের ক্রিকেটারদের সম্পর্কে শ্রদ্ধা দেখিয়ে এসেছেন। শচীনও গাভস্করের সঙ্গে কথা বলতেন মাথা নিচু করে, কখনো ফর্ম পড়ে গেলে গাভস্করের পরামর্শ নিতেন। অথচ টেস্ট ক্রিকেটে গাভস্করের সব রেকর্ডই তো শচীন ভেঙে দিয়েছেন। এখন কিন্তু বিরাটের ভক্তরা বলেন, গাভস্কর কে? ও কী বোঝে? রোহিত শর্মার ভক্তরা সোশাল মিডিয়ায় মাঝেমধ্যেই বলে যান, রোহিত একদিনের ক্রিকেটে ভারতের গোট ক্রিকেটার। বিরাট দূরের কথা, শচীনও তাঁর ধারে কাছে আসতে পারেন না। এর কারণ আজকের খেলোয়াড়দের আচরণে এক ধরনের ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায়। কারোর কম, কারোর বেশি। কথায় কথায় কাল্পনিক, অযৌক্তিক র‍্যাঙ্কিং তৈরি করে সেই ঔদ্ধত্য উস্কে দেওয়া হয়। কারণ ঔদ্ধত্যের ভাল বাজার আছে। আজকাল খেলার মাঠে সভ্যতা, ভদ্রতার চেয়ে ঔদ্ধত্য, অসভ্যতার কাটতি বেশি।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত