আইপিএল: ১৮ বছর বয়স কী দুঃসহ

ভারতীয় বোর্ডের চোটপাটে আইপিএলের দৈর্ঘ্য বেড়ে চলায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়ে যাচ্ছে আইসিসি। ফলে দুনিয়ার যেখানে যত কুড়ি বিশের লিগ গজাচ্ছে, সবেতেই ঘাড় নাড়তে হচ্ছে।

কুড়ি আইপিএল

‘আঠারো বছর বয়স’ নামে একখানা কবিতা লিখেছিলেন তরুণ বয়সেই চলে যাওয়া কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর জীবনের সবটুকুই পরাধীন দেশে কেটেছিল। সেই দেশে ক্ষুদিরাম বসুর মতো ১৮ বছরের ছেলেও ফাঁসি যাওয়ার ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করত না। স্বভাবতই সুকান্তর কবিতায় ওই বয়সে পৌঁছোনো মানুষ যে নির্ভয়ে অনেক কিছু ওলট-পালট করার ক্ষমতা রাখে, সেকথা লেখা হয়েছে। কিন্তু আমরা দাঁড়িয়ে আছি স্বাধীনতার ৭৫ বছর অতিক্রম করে যাওয়া দেশে। এখন আর ওই বয়সের ছেলেমেয়েদের কোনও কিছুর জন্য প্রাণ দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। বরং আজ যারা তাদের বাবা-মা, তাদের অনেকে ওই বয়সে চালু করেছিল ‘বার খেয়ে ক্ষুদিরাম’ কথাটা। অর্থাৎ ক্ষুদিরাম নাকি আদতে বোকা। এমন দেশে আঠারোয় পা দেওয়ার আলাদা তাৎপর্য কী জানি না। তবে ভারতীয় ক্রিকেটের মোচ্ছব আইপিএল আঠারোয় পা দেওয়ায় ক্রিকেট মহলে বিলক্ষণ আলোড়ন তৈরি হয়েছে। সুতরাং আমরা ভেবে দেখি, গত ১৮ বছরে আইপিএল আমাদের কী দিল।

বাঞ্ছিত
১। অলরাউন্ডার: শেন ওয়ার্ন যদি প্রথম আইপিএলেই রবীন্দ্র জাদেজাকে আবিষ্কার না করতেন, বা হার্দিক পান্ডিয়া আইপিএলে নজর কাড়তে না পারতেন, তাহলে কি ভারতীয় দলের নির্বাচকরা তাঁদের নিজ গুণে চিনে নিতেন? সন্দেহ হয়। আইপিএল চালু হওয়ার পর থেকে যেভাবে ক্রমশ তিন ধরনের ক্রিকেটের জাতীয় দল নির্বাচনেই আইপিএলের পারফরমেন্সকে গুরুত্ব দেওয়া বেড়েছে আর রনজি ট্রফি, দলীপ ট্রফি, ইরানি ট্রফি, বিজয় হাজারে ট্রফির গুরুত্ব কমেছে; দেওধর ট্রফি উঠে গিয়েছে, তাতে মনে হয় এঁদের উত্থান এবং ভারতীয় দলে স্থায়ী হওয়ার কৃতিত্ব আইপিএলকে না দিয়ে উপায় নেই।

২। ছেঁড়া কাঁথা থেকে লাখ টাকা: ২০০৮ সালের প্রথম আইপিএল থেকেই বেশ কিছু ক্রিকেটারকে পাওয়া গেছে যাঁরা নিম্নমধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মে অনেক কষ্ট করে ক্রিকেট জগতে প্রবেশ করেছেন, পুরো পরিবারকেও অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। আইপিএলের অর্থ তাঁদের দারিদ্র্য দূর করেছে। ছত্তিশগড়ের কুলদীপ সেন বা উত্তরপ্রদেশের রিঙ্কু সিং ক্রিকেটার হিসাবে হয়তো স্মরণীয় হয়ে থাকবেন না, কিন্তু মানুষ হিসাবে তাঁদের জীবনযাত্রার উন্নতির কৃতিত্ব আইপিএলেরই।

৩। ভারতীয় ফিল্ডিংয়ের দলগত উন্নতি: তরুণদের কাছে ব্যাপারটা তেমন চোখে পড়ার মতো না-ও মনে হতে পারে, কিন্তু আমরা যারা নরেন্দ্র হিরওয়ানি, ভেঙ্কটপতি রাজুদের দেখেছি; মহম্মদ আজহারউদ্দিন, অজয় জাদেজা, মাঝেমধ্যে কপিলদেব বা শচীন তেন্ডুলকর দারুণ ফিল্ডিং করলেও দল হিসাবে ভারতকে অতি সাধারণ ফিল্ডিং করতে দেখেছি, তারা মানতে বাধ্য যে আইপিএল তথা কুড়ি বিশের ক্রিকেটের কল্যাণে ভারতীয়দের ফিল্ডিংয়ের সাধারণ মানই অনেক উঁচুতে উঠেছে।

৪। ভয়হীন তরুণ ভারতীয় ক্রিকেটার: অনেকদিন যাবৎ টেস্ট ক্রিকেট খেলিয়ে দেশগুলোর মধ্যে জাতীয় দলে আগামীদিনে আসতে পারেন বা বাদ পড়ে গেছেন, ফিরতে পারেন– এমন ক্রিকেটারদের নিয়ে ‘এ’ দলের খেলা চালু ছিল। তাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আসার প্রস্তুতি হত। কিন্তু আইপিএলে যেভাবে অন্য দেশের সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে এবং বিপক্ষে খেলার সুযোগ পায় একেবারে কচিকাঁচারা, সে সুযোগ ওখানে ছিল না। আজ যে যশস্বী জয়সওয়াল, নীতীশ রেড্ডিদের জাতীয় দলে প্রথম ম্যাচেই অকুতোভয় মনে হয়, তার কৃতিত্ব আইপিএলের।

৫। সেরা লোকের থেকে সেরা জিনিস শেখার সুযোগ: জম্মুর ছেলে উমরান মালিক বিদ্যুৎ গতির ইয়র্কারে ব্যাটারের উইকেট ছিটকে দিলেন আর ডাগ আউটে নিজে উইকেট পাওয়ার মতো উল্লাসে ফেটে পড়লেন একদা বিশ্বত্রাস দক্ষিণ আফ্রিকার ডেল স্টেইন– এ দৃশ্য আমরা আইপিএলে দেখেছি। উমরানের গতি অনেক আশা জাগালেও ভারতীয় দলের হয়ে তেমন কিছু করতে পারেননি। খুব বেশি সুযোগও পাননি। কিন্তু স্টেইনের চেয়ে ভালো জোরে বোলিং কোচ তিনি পেতেন কোথায়? আর আইপিএল না থাকলে স্টেইনের ধারেকাছেও পৌঁছানো হত না উমরানের। এমন উদাহরণ অসংখ্য।

আরও পড়ুন গোট কত বেড়া খেয়ে যাচ্ছে

অবাঞ্ছিত
১। যা বদলায় সেটাই নিয়ম: কম সময়ের খেলা হিসাবেই যে কুড়ি ওভারের খেলার উৎপত্তি, তাতে অনন্তকাল ধরে ফিল্ডিং সাজিয়ে, ওভার রেটের তোয়াক্কা না করেও বহুবার কোনও শাস্তি হয়নি মহাতারকা অধিনায়কদের। কে এই সুবিধা পেয়েছেন আর কে পাননি তা নিয়ে অনলাইনে বিস্তর চুলোচুলি চলে এঁদের ভক্তদের মধ্যে। আইপিএল কর্তৃপক্ষ অবশ্য সে অশান্তি মিটিয়ে ফেলেছেন। আগে তবু তিনটে ম্যাচে নির্ধারিত সময়ে ওভার শেষ করতে না পারলে অধিনায়ককে একটা ম্যাচে সাসপেন্ড করা হত। এবার থেকে আর সে ঝক্কি থাকছে না। কেবল ‘ডিমেরিট পয়েন্ট’ দেওয়া হবে। অমন অনেক পয়েন্ট জমলে তবে সাসপেনশনের প্রশ্ন। নতুন করে নিলাম হবে, ছয়জনের বেশি ক্রিকেটারকে ধরে রাখা যাবে না, আবার অতজনকে রাখার খরচ বিস্তর, ওদিকে মহেন্দ্র সিং ধোনি চেন্নাই সুপার কিংস ছেড়ে নড়বেন না। অতএব নিয়ম বদলে ধোনিকে কোনওদিন দেশের হয়ে না খেলা ক্রিকেটারদের মতো ‘আনক্যাপড’ হওয়ার, মানে শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢোকার, সুযোগ করে দেওয়া হল।

২। মহাতারকাদের মুখ বাঁচানোর সুযোগ: ধরুন, আপনি অনেকদিন হল টেস্টে সুবিধা করতে পারছেন না। বল বেশি লাফালে বা সুইং হলে অথবা স্পিন হলেই আপনাকে সর্বকালের সেরা তো দূরের কথা, নিজের কালের মাঝারিও মনে হচ্ছে না। কুছ পরোয়া নেই। আইপিএল মাস দুয়েকের লম্বা প্রতিযোগিতা। রান আপনি পাবেনই। অমনি সকলে ভুলে যাবে টেস্টে কতকাল রান করেননি, ড্যাং ড্যাং করে পরের সিরিজেও খেলতে নামবেন।

৩। ঘরোয়া ক্রিকেটের সাড়ে সর্বনাশ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও বন্ধ হয়নি ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা রনজি ট্রফি। কিন্তু করোনা অতিমারির সময়ে বন্ধ হয়ে রইল। কেবল ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে সংসার চলে যে ক্রিকেটারদের, তাঁদের আক্ষরিক অর্থে হাঁড়ির হাল হল। কিন্তু উপায় কী? ওতে খরচ আর আইপিএলে আয়। তাই ক্রিকেট বোর্ড ব্যস্ত ছিল আইপিএলের আয়োজন করতে।

৪। সব ক্রিকেটের ঊর্ধ্বে: ক্রিকেট ১১ জনের খেলা, কিন্তু আইপিএল ১২ জনের খেলা। এগারোজনের মধ্যে যথেষ্ট ধুন্ধুমার ব্যাটার ঢোকানো যাচ্ছে না? আচ্ছা, ব্যাটিংয়ের সময়ে একজন বোলারকে বসিয়ে ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ হিসাবে আরেকজন ব্যাটারকে ঢুকিয়ে নেবেন। বোলার কম পড়ছে? অসুবিধা নেই। ফিল্ডিং করার সময়ে ব্যাটারদের একজনকে বসিয়ে আরেকজন বোলারকে খেলাবেন।

৫। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্তর্জলিযাত্রা: নিজের দেশে আসন্ন মরশুমে এবারের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠা দক্ষিণ আফ্রিকা একটাও টেস্ট খেলবে না, খেলবে শুধু পাঁচখানা টি টোয়েন্টি। ভারতীয় বোর্ডের চোটপাটে আইপিএলের দৈর্ঘ্য বেড়ে চলায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়ে যাচ্ছে আইসিসি। ফলে দুনিয়ার যেখানে যত কুড়ি বিশের লিগ গজাচ্ছে, সবেতেই ঘাড় নাড়তে হচ্ছে। ক্রিকেট দুনিয়ার বড়, মেজো, সেজো ভাই ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড আবার ঠিক করেছে টেস্ট নিজেদের মধ্যেই খেলবে, অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ক্ষমাঘেন্না করে একটা-দুটো। এদিকে, আইসিসির আয়ের বেশিরভাগটাও ওরাই নেয়। ফলে বাকি বোর্ডগুলোর অবস্থা সঙ্গিন। তারাও টিকে থাকতে কুড়ি বিশের লিগ আয়োজনেই মন দিচ্ছে। খেলোয়াড়রাও ৩০-৩২ বছরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফেলছেন। পাঁচদিন নয়, এমনকি ৬-৭ ঘণ্টাও নয়, ঘণ্টা চারেক খেলেই যদি মেলা রোজগার করা যায় তো কে বেশি খাটতে যাবে? এরপর হয়তো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট হবে সারাবছর আর মাস দুয়েক আন্তর্জাতিক। খেলাটা ক্রিকেট থাকবে না ডাংগুলি হয়ে যাবে– সেটা অন্য আলোচনার বিষয়।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading