অশ্বিনের অবসর ব্যাটারদের পিঠ বাঁচানোর নীতির গালে চড়

অশ্বিন কেন, যে কোনো বুদ্ধিমান মানুষ বুঝতে পারবেন যে আসলে আমাদের কোচ আর অধিনায়ক দল তৈরি করেন ব্যর্থ ব্যাটারদের পিঠ বাঁচাতে। কাজটা যে আজ নতুন হচ্ছে, তাও নয়। এ জিনিস চালু করে দিয়েছিলেন ধুমধাম ধোনি। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।

ভারতের হয়ে টেস্ট খেলেছেন মাত্র ১৭টা, নিয়েছেন ৪২.৪০ গড়ে ৪৪ খানা উইকেট। একদিনের ম্যাচ খেলেছেন ১২০টা, ৩১.৭২ গড়ে নিয়েছেন ১৫৭ খানা উইকেট। কুড়ি বিশের ম্যাচ খেলেছেন ২৭টা, ২২.২৯ গড়ে নিয়েছেন মোটে ৩৪ খানা উইকেট। না, রবিচন্দ্রন অশ্বিনের কথা হচ্ছে না। বলছি আশিস নেহরার কথা। উপরের পরিসংখ্যান সাধারণ বললেও বেশি বলা হয়। বলা উচিত আলোচনার অযোগ্য। শেষ টেস্ট ম্যাচ খেলেছিলেন ২০০৪ সালে, শেষ একদিনের ম্যাচ ছিল ২০১১ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। সেই নেহরার জন্যে ঘটা করে তাঁর ঘরের মাঠে বিদায়ী ম্যাচের বন্দোবস্ত করেছিল ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) – তারিখটা ছিল ১ নভেম্বর ২০১৭। ভারতের বিজেপি সরকারের মত ক্রিকেট বোর্ডেরও আছে গোদি মিডিয়া। সেই মিডিয়া ভরে গিয়েছিল স্বনামধন্য সাংবাদিকদের লম্বা লম্বা লেখায়। তাঁরা যেনতেনপ্রকারেণ প্রমাণ করেছিলেন – নেহরা মহান ক্রিকেটার, তাই তাঁর এই সম্মান প্রাপ্য। বোর্ডের মাইনে করা প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও নিজেদের শব্দভাণ্ডার উজাড় করে দিয়েছিলেন নেহরার জন্য। তিনি নাকি অসম্ভব সম্ভাবনাময় ছিলেন, কেবল চোট আঘাতের জন্যে বেশি খেলে উঠতে পারলেন না। পারলেই…

হতেও পারে। সম্ভাবনা তো আর মাপা যায় না, আর কী হলে কী হত তা নিয়েও অনন্তকাল আলোচনা চালানো যায়। সুকান্ত ভট্টাচার্য ৮০ বছর বাঁচলে রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বড় কবি হতেন – একথা প্রমাণ করার যেমন উপায় নেই, অপ্রমাণ করারও উপায় নেই। কিন্তু সাফল্য তো পরিমাপযোগ্য। নেহরা যদি বিদায়ী ম্যাচ পাওয়ার যোগ্য হন, তাহলে টেস্টে তিনশোর বেশি, একদিনের ক্রিকেটেও প্রায় তিনশো উইকেট পাওয়া, ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম কাণ্ডারী জাহির খান কী দোষ করেছিলেন? কী দোষ ছিল হরভজন সিংয়ের? তিনি তো টেস্টে চারশোর বেশি উইকেটের মালিক, একদিনের ক্রিকেটেও আড়াইশোর বেশি। বহু স্মরণীয় জয়ের নায়ক। নেহরার তো স্মরণীয় পারফরম্যান্স বলতে ঠিক একটা – ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ডারবানে ২৩ রানে ছয় উইকেট নেওয়া। ভারতীয় ক্রিকেটে মহান হওয়া এত সহজ তাহলে?

এসব পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে হত না, অশ্বিন অস্ট্রেলিয়া সিরিজের মাঝখানেই অবসর নিয়ে না ফেললে। এই ওয়েবসাইটেই নিউজিল্যান্ড সিরিজে ভারত গোহারান হারার পরে লিখেছিলাম অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজা হলেন মাঝারিয়ানার দেবদূত। সেই মত পরিবর্তন করার মত কিছু ঘটেনি। কিন্তু সে মাঝারিয়ানা তো সর্বকালের সেরাদের সাপেক্ষে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে অশ্বিন ভারতের বর্তমান প্রজন্মের সেরা স্পিনার। তাছাড়া মাঝারিয়ানা এক জিনিস, অপকর্ষ আরেক জিনিস। যে দেশে নেহরাকে ধূপধুনো দিয়ে পুজো করে বিদায় জানানো হয়, সেখানে অনিল কুম্বলের পরেই ভারতের সবচেয়ে সফল টেস্ট বোলার, সবচেয়ে বেশিবার সিরিজের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার বিশ্বরেকর্ড করে ফেলা অশ্বিন একটা সিরিজের মাঝখানে এমন চকিতে বিদায় নেবেন – এটা ক্রিকেটপ্রেমীরা নীরবে হজম করবেন? প্রশ্ন করবেন না, কেন এভাবে বিদায় নিলেন অশ্বিন?

যদি আর টেস্ট খেলতে পারবেন না বলেই মনে করে থাকেন, তাহলে তো নিউজিল্যান্ড সিরিজের পরেই অবসর নিতে পারতেন। অথবা বলে দিতে পারতেন – অস্ট্রেলিয়া সিরিজই হবে আমার শেষ সিরিজ। অনেকেই তো এভাবে অবসর নেন। নিউজিল্যান্ডের নির্ভরযোগ্য জোরে বোলার টিম সাউদি অশ্বিনের আগেরদিনই টেস্ট কেরিয়ার শেষ করলেন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের শেষ টেস্ট খেলে। তিনি কিন্তু ম্যাচের আগেই বলে দিয়েছিলেন, ওটাই হতে চলেছে তাঁর শেষ টেস্ট। কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডের জেমস অ্যান্ডারসন আর স্টুয়ার্ট ব্রডও আগে থেকে ঘোষণা করে অবসর নিয়েছেন। যেসব ক্রিকেটারের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ার হয়, ভক্তকুল তৈরি হয় – তাঁরা তো এভাবেই বিদায় নেন। শেষ সময়ে ভক্ত, সহখেলোয়াড়, প্রাক্তনদের অভিবাদন পেতে কার না ভাল লাগে? মানুষ যে পেশাতেই থাকুক, কোনো বয়সেই অবসর নেওয়া সোজা নয়। ভাল হোক, মন্দ হোক, অনেকগুলো সম্পর্ক তৈরি হয় কর্মস্থলে। কাজ থেকে অবসর নিতেই হয়। কারণ শরীর প্রাকৃতিক নিয়মে একসময় কাজের অনুপযোগী হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের মন তো প্রকৃতির নিয়মে চলে না। কাজ ছেড়ে যেতে এবং কাজের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলোকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হয়, বিষণ্ণতা তৈরি হয়। শুধু যে অবসর নিচ্ছে তারই হয় তা নয়, তার সহকর্মীদেরও হয়। অশ্বিনের মত বিখ্যাত খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে যারা কোনোদিন তাঁর ধারেকাছে যেতে পারেনি, কেবল কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে টিভি বা মোবাইলের পর্দায় দেখেছে, তারাও বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। অত মানুষের বিষণ্ণতা, শেষ মুহূর্তের ভালবাসা ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনই আবার অবসরপ্রাপ্ত মানুষটার বাকি জীবনের পাথেয়। এক্ষেত্রে অশ্বিন বা আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই। সেই ভালবাসা গুছিয়ে চেটেপুটে নেওয়ার সুযোগ কে ছাড়তে চায়? চাওয়ায় কোনো দোষও নেই। তাহলে অশ্বিন এমন হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?

ব্রিসবেনে বৃষ্টিতে শেষদিনের খেলা ভেস্তে যাওয়ার পর অধিনায়ক রোহিত শর্মার সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে অশ্বিন কী বলেছেন এতদিনে সবাই জানেন। দু মিনিটেরও কম দৈর্ঘ্যের সেই বক্তব্য শুনলে মনে হয়, সিদ্ধান্তটা চট করে নেওয়া। অথচ অশ্বিনের ক্রিকেটজীবন যাঁরা অনুসরণ করেছেন তাঁরা জানেন, অশ্বিন হুটহাট কাজ করার লোক নন। এমনিতেই স্পিন বোলিং ব্যাপারটায় গায়ের জোরের চেয়ে মস্তিষ্কের কাজ বেশি বৈ কম নয়। তার উপর অশ্বিন এমন একজন ক্রিকেটার, যাঁর মাথা ব্যাট করার সময়েও একইরকম সক্রিয় থাকত। শেন ওয়ার্ন সম্পর্কে একসময় বলা হত ‘the best captain Australia never had’। অশ্বিন সম্পর্কেও বলা যায়, তিনি ভারতের সেরা না-হওয়া অধিনায়ক। এমন লোক আজ ভাবলেন, আর এখুনি অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন – এমনটা না হওয়াই স্বাভাবিক। অশ্বিনের প্রস্থানের পর রোহিত যা বলেছেন, তা থেকে কিন্তু পরিষ্কার যে এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ নেওয়া হয়নি। রোহিত বলেন ‘আমি পার্থে এসে এটা শুনি। এটা তখন থেকেই ওর মাথায় ঘুরছিল। আমি কোনো মতে ওকে গোলাপি বলের টেস্টটা [অ্যাডিলেড] অব্দি থেকে যেতে রাজি করাই। ওর মনে হয়েছে, যদি আমার প্রয়োজন না পড়ে তাহলে আমার বিদায় নেওয়াই ভাল।’

হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে অশ্বিনের বাবা রবিচন্দ্রন মেলবোর্ন আর সিডনির শেষ দুটো টেস্ট দেখতে যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট কেটে ফেলেছিলেন। ছেলে অবসর নেওয়ার খবর জানানোর পরে টিকিটগুলো বাতিল করেন। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রবিচন্দ্রন অবসরের কারণ হিসাবে ছেলের অপমানিত বোধ করার সম্ভাবনাও জানিয়ে ফেলেছেন। তবে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হতেই অশ্বিন এক্স হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করেছেন, তাঁর বাবার মিডিয়া সামলানোর প্রশিক্ষণ নেই। অতএব তাঁকে সবাই দয়া করে ক্ষমা করে দিন। লক্ষ করুন, অশ্বিন বলেছেন, বাবা মিডিয়াকে কী বলতে হয় না হয় জানেন না, তাই ওরকম বলে ফেলেছেন। বাবা ভুল বুঝেছেন, আমি খুশি মনেই অবসর নিয়েছি – এমন কথা বলেননি কিন্তু। পাশাপাশি রোহিত বলেছেন যে পার্থ থেকেই অশ্বিন অবসরের চিন্তা করছিলেন। তার মানে রোহিত অ্যাডিলেডের দ্বিতীয় টেস্ট পর্যন্ত থেকে যাওয়ার কথা না বললে হয়ত পার্থেই অবসর ঘোষণা করে দিতেন। এখানেই ভারতীয় দল যেভাবে চালানো হয় তা নিয়ে একগুচ্ছ প্রশ্ন তোলার অবকাশ তৈরি হয়।

কী হয়েছিল পার্থে? দলে দুজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ স্পিনার থাকা সত্ত্বেও খেলানো হয়েছিল মাত্র চারটে টেস্ট খেলা ওয়াশিংটন সুন্দরকে। ওয়াশিংটনকে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ৫১.২ ওভারের মধ্যে মাত্র দু ওভার বল করতে দেওয়া হয়, দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫ ওভার বল করলেও মিচেল স্টার্ক আর নাথান লায়ন নামে দুই বোলারের উইকেট নেওয়ার বেশি প্রভাব ফেলতে পারেননি। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন ব্যাট হাতে তিনি অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজার চেয়েও বেশি নির্ভরযোগ্য হওয়াই নাকি তাঁর সুযোগ পাওয়ার আসল কারণ। কিন্তু ওয়াশিংটন প্রথম ইনিংসে করেন ৪, দ্বিতীয় ইনিংসে ২৯। তবে তরুণ ক্রিকেটারকে একটা টেস্টে ব্যর্থ হওয়ার জন্য সমালোচনা করা অন্যায়। বিশেষত প্রথম ইনিংসে যেখানে দুই দলের সমস্ত ব্যাটার ব্যর্থ হয়েছিলেন আর ভারতের বোলিংয়ের সময়েও পিচ, আবহাওয়া – সবকিছুই ছিল জোরে বোলারদের জন্যে আদর্শ। কিন্তু কথা হল, ওয়াশিংটনকে তাহলে অ্যাডিলেডের দ্বিতীয় টেস্টে বাদ দেওয়া হল কেন? তাঁর বোলিং ও ব্যাটিং দক্ষতার প্রতি ভরসা রোহিত-গৌতম গম্ভীরের টিম ম্যানেজমেন্ট মাত্র একটা ম্যাচের পরেই হারিয়ে ফেলল? এভাবে কোনো তরুণ ক্রিকেটারকে লম্বা রেসের ঘোড়া করে তোলা যায়?

নাকি ব্যাপারটা আসলে এইরকম, যে অশ্বিন পাঁচশোর বেশি উইকেট নিয়ে ফেলার পরেও বিদেশের মাঠে বারবার বাদ পড়ায় বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যাবেন বলছেন শুনে প্রথম টেস্টে না খেলা অধিনায়ক রোহিত তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন – অ্যাডিলেডে ওঁকেই খেলানো হবে? যদি তা হয়, তাহলে কিন্তু বলতে হবে টিম ম্যানেজমেন্ট অবৈজ্ঞানিক, যুক্তিহীন, আবেগসর্বস্ব পদ্ধতিতে দল চালান। অশ্বিন অ্যাডিলেডে খেললেন এবং মন্দ খেললেন না। প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয়ের মধ্যে ২২ বলে ২২ রান করলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে আর সকলের মত তিনিও ব্যর্থ। তাঁর প্রধান কাজ তো বল করা। তাতে কিন্তু প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হয়েছেন বলা যাবে না। ১৮ ওভার বল করেছেন, অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের বেশি রান করতে দেননি এবং অলরাউন্ডার মিচেল মার্শের উইকেট তুলে নিয়েছেন।

তারপরেও তৃতীয় টেস্টে অশ্বিনকে বাদ দিয়ে জাদেজাকে খেলানো হল কোন যুক্তিতে? একটা যুক্তিই থাকা সম্ভব। প্রথম দুই টেস্টে ব্যাটাররা ডুবিয়েছেন, আবার ডোবাতে পারেন। জাদেজা টেনে তোলার কাজটা ওয়াশিংটন আর অশ্বিনের চেয়েও ভাল পারবেন, তাই। সেই মহেন্দ্র সিং ধোনির আমল থেকে ভারতীয় ক্রিকেটে চালু ধারণা – জাদেজা অশ্বিনের থেকে ভাল ব্যাট করেন। যদিও দুজনের মধ্যে তফাত মোটেই আকাশপাতাল নয়। অশ্বিন বিদেশে ৪০ খানা টেস্ট খেলে ১৪৮৫ রান করেছেন ২৫.৬০ গড়ে, দুটো শতরান আর ছটা অর্ধশতরান সমেত। জাদেজা ২৭ খানা টেস্ট খেলে ১২১০ রান করেছেন ৩৪.৫৭ গড়ে, একটা শতরান আর নটা অর্ধশতরান সমেত। জাদেজার গড় অশ্বিনের চেয়ে নিঃসন্দেহে অনেকটা ভাল হলেও মনে রাখতে হবে, গত অস্ট্রেলিয়া সফরে সিডনিতে হনুমা বিহারীর সঙ্গে অশ্বিন যে ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস খেলেছিলেন, তেমন অবিশ্বাস্য ইনিংস বিশ্বমানের জোরে বোলিংয়ের বিপক্ষে জাদেজা বিদেশে কখনো খেলেননি। ব্রিসবেনে সদ্য যে ৭৭ রানের ইনিংস খেললেন, তা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনজন বিশেষজ্ঞ বোলারের বিরুদ্ধে। কারণ আহত জশ হেজলউড ইনিংসের শুরুর দিকেই মাঠ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

আরো পড়ুন স্বর্গহারা মাঝারিয়ানার দেবদূত: বিরাট, রোহিত ও সম্প্রদায়

তবে এই তুলনামূলক আলোচনা যে করতে হচ্ছে – সেটাই অশ্বিন, জাদেজা, ওয়াশিংটনের প্রতি অবিচার। তুলনা করতে হলে তো করা উচিত তাঁদের বোলিং নিয়ে, কারণ ওঁরা প্রথমত বোলার। ব্যাটের হাত ভাল সেটা বোনাস হিসাবেই ধরা উচিত, কারণ খেলাটা টেস্ট ক্রিকেট। কুড়ি বিশের ক্রিকেট নয়, যেখানে ১ থেকে ১১ সকলেরই রান করতে পারা দরকার। ওয়াশিংটন যেহেতু মোটে ছটা টেস্ট খেলেছেন, সেহেতু তাঁকে আলোচনার বাইরে রেখে অশ্বিন আর জাদেজার বিদেশের মাঠের পরিসংখ্যান দেখি।

অশ্বিন ৪০ টেস্টে ৩০.৫৫ গড়ে ১৫০ খানা উইকেট নিয়েছেন। এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন আটবার, আর ম্যাচে দশ উইকেট দুবার। অন্যদিকে জাদেজা ২৭ টেস্টে ৩৪.০৩ গড়ে মাত্র ৭৬ খানা উইকেট নিতে পেরেছেন। এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট মাত্র দুবার, ম্যাচে দশ উইকেট একবারও নয়। অর্থাৎ বিদেশে জাদেজা কোনো আলোচনার যোগ্য বোলারই নন। উপমহাদেশের বাইরে তাঁর বোলিং এতই পানসে হয়ে যায় যে ২০১৩ ইংল্যান্ড সফরে একটা টেস্টে ধোনি উইকেট থেকে পিছিয়ে দাঁড়িয়ে জাদেজাকে দিয়ে কয়েক ওভার মিডিয়াম পেস বল করিয়েছিলেন। ব্রিসবেনে টেস্টেও দেখা গেল, পিচে কিঞ্চিৎ টার্ন ও বাউন্স থাকলেও জাদেজা কিছুই করতে পারলেন না। বরং ২৩ ওভার বল করে ৯৫ রান দিয়ে ফেললেন।

এসব দেখে অশ্বিন কেন, যে কোনো বুদ্ধিমান মানুষ বুঝতে পারবেন যে আসলে আমাদের কোচ আর অধিনায়ক দল তৈরি করেন ব্যর্থ ব্যাটারদের পিঠ বাঁচাতে। কাজটা যে আজ নতুন হচ্ছে, তাও নয়। এ জিনিস চালু করে দিয়েছিলেন ধুমধাম ধোনি। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। ২০১৪-১৫ মরশুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রথম টেস্টই ছিল অ্যাডিলেডে। অধিনায়ক বিরাট কোহলি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে অশ্বিনকে বসিয়ে রেখে লেগস্পিনার কর্ণ শর্মাকে খেলিয়ে দেন। দুই ইনিংস মিলিয়ে কর্ণ চারটে উইকেট নিলেও বেধড়ক মার খান। প্রথম ইনিংসে ৩৩ ওভার বল করে ১৪৩ রান দেন, দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬ ওভার বল করে ৯৫। ওটাই তাঁর জীবনের প্রথম ও শেষ টেস্ট। মনে রাখবেন, ওই টেস্টে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন লায়ন। পরের তিনটে টেস্টে অশ্বিনই খেলেন এবং ইনিংস পিছু গোটা দু-চার করে উইকেটও নেন। কিন্তু কর্ণ কুন্তীর প্রথম পছন্দ না হলেও ধোনি, কোহলিদের প্রথম পছন্দ হতে পেরেছিলেন কোন গুণে? আইপিএলে কিছু চার, ছয় মারতে পারার সুনাম ছিল বলে।

ওই সিরিজের মাঝখানেই ধোনি অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়ে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। অশ্বিন হয়ত ভেবেছিলেন নতুন আমলে দেশের মত বিদেশেও তিনি প্রথম পছন্দ হয়ে উঠবেন। কিন্তু বিরাট কোহলির আমলেও তা ঘটল না, জাদেজা এসে পড়লেন। পৃথিবীর সর্বত্র সব বোলারের বিরুদ্ধে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করা স্টিভ স্মিথকে ২০২০-২১ সিরিজে বোতলবন্দি করতে পেরে এবং সিডনির সেই ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস খেলার পরে অশ্বিন নির্ঘাত ভেবেছিলেন – আর বিদেশে বেঞ্চে বসে থাকতে হবে না। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তিনি দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় পছন্দ হতে চলেছেন। গত এক দশকে টেমস ইত্যাদি নদী দিয়ে কত জল গড়াল। ধোনি আর বিরাটের অভিভাবক রবি শাস্ত্রী গেলেন, রাহুল দ্রাবিড় এলেন। তাও এই ধারা বদলাল না। বিরাটের বদলে রোহিত টেস্ট অধিনায়ক হলেন। তাতেও অশ্বিন বিদেশে দ্বিতীয় পছন্দই রয়ে গেলেন। দ্রাবিড়ের জায়গায় গম্ভীর এলেন। অশ্বিন যে তিমিরে সেই তিমিরেই। কেন? ক্রিকেটের আদিম যুগের ভাষায় বললে – ভারতীয় দলের জেন্টলম্যান হলেন ব্যাটাররা। তাঁদের বছরের পর বছর ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার অধিকার আছে। সেই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব প্লেয়ারদের, মানে স্পিনারদের, ঘাড়ে। সেই অধিকার রক্ষার্থে সেরা স্পিনারকে নয়, খেলানো হবে স্পিনারদের মধ্যে সেরা ব্যাটারকে। সেটাও আবার তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ঠিক হবে না, হবে অধিনায়ক আর কোচের মতানুসারে। আটত্রিশ বছর বয়সে এসে এই অবিচার আর সহ্য না হওয়ারই কথা। আমাদের অনেককেই বিভিন্ন পেশায় এ জিনিস সহ্য করতে হয়। বহু ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ ভুল লোক ভুল উদ্দেশ্য নিয়ে ‘টিম লিডার’ হয়ে বসে আছে। তাদের কাছে অভিজ্ঞতা, নৈপুণ্যের দাম থাকে না। সিনিয়র কর্মচারীরা মুখ বুজে নিজের যোগ্যতার অবমূল্যায়ন হচ্ছে বুঝেও কাজ চালিয়ে যান। কারণ তাঁদের কাছে আইপিএলের মত বিকল্প নেই। অশ্বিনের মত তুখোড় ইউটিউবার হতেও সবাই পারে না। উনি পারেন। সুতরাং এই ধাষ্টামো কেন মেনে নেবেন?

অশ্বিন এভাবে বিদায় জানিয়ে আরেকটা জরুরি কাজও করে গেলেন। তাঁরই বয়সী রোহিত আর বিরাটের নির্লজ্জতা উন্মোচিত করে দিলেন। দেশের মাঠেও নিউজিল্যান্ডের স্পিনাররা এসে বেশি উইকেট নিয়ে চলে যাচ্ছেন মানে সূর্যাস্তের দিকে যাত্রা যে শুরু হয়ে গেছে সেটা বোঝামাত্রই আর পরের হোম সিরিজের জন্য অপেক্ষা করলেন না অশ্বিন। চলতি সিরিজের পরের দুটো টেস্ট মেলবোর্ন আর সিডনিতে। শোনা যাচ্ছে মেলবোর্নে নাকি স্পিনের দরকার বেশি পড়বে প্রথম তিন টেস্টের তুলনায়, আর সিডনি তো ঐতিহাসিকভাবেই অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে স্পিনারবান্ধব পিচ। তার জন্যেও দাঁড়ালেন না। অথচ রোহিত আর বিরাট প্রায় পাঁচ বছর ধরে পণ করে আছেন, যতক্ষণ না কেরিয়ার ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে ততক্ষণ খেলে যাবেন।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

স্বর্গহারা মাঝারিয়ানার দেবদূত: অশ্বিন, জাদেজা

ভারত টেস্ট ক্রিকেট খেলছে ১৯৩২ সাল থেকে, আর ভারতের মাটিতে প্রথম টেস্ট খেলা হয় ১৯৩৩ সালে। একানব্বই বছরের ইতিহাসে প্রথমবার তিন বা তার বেশি ম্যাচসম্পন্ন সিরিজের সবকটা ম্যাচ হেরে যাওয়ায় যাঁরা এখন মুহ্যমান, তাঁদের মাঝারিয়ানা এবং অশ্বিন, জাদেজার প্রসঙ্গে নিয়ে যাওয়ার আগে কয়েকটা কথা একটু বলে নেওয়া দরকার।

২০২৩-২০২৭ আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব বেচার জন্য যখন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল, তখন ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৪ সালে আইপিএলে খেলা হবে ৭৪ খানা ম্যাচ, ২০২৫ ও ২০২৬ আইপিএলে ৮৪ এবং ২০২৭ আইপিএলে ৯৪। তবে এবছর সেপ্টেম্বর মাসে ক্রিকইনফো ওয়েবসাইট এক প্রতিবেদনে জানায় – ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ২০২৫ আইপিএলে ম্যাচের সংখ্যা না বাড়ানোই ভাল বলে মনে করছে, কারণ ভারত বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার মত জায়গায় আছে। আর ফাইনাল হবে মে-জুন নাগাদ। সুতরাং আইপিএল বেশি লম্বা হলে ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের চাপ বেড়ে যাবে। এখনো আইপিএলের সূচি ঘোষণা হয়নি, ইতিমধ্যে ভারতের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় নিদেনপক্ষে চারটে টেস্ট জিততে না পারলে অন্য দলগুলোর জেতা-হারার উপর নির্ভর করতে হবে। সুতরাং অস্ট্রেলিয়া সফরে ভারতীয় দলের ব্যর্থতা বিসিসিআইয়ের কাছে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ৮৪ ম্যাচের আইপিএল করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দিতে পারে। বেশি ম্যাচ খেলা মানে খেলোয়াড়দের জন্যেও বেশি টাকা।

গন্ধটা খুব সন্দেহজনক লাগছে? কিছু করার নেই। এটাই আজকের ক্রিকেটের বাস্তবতা। ভারতের সংবাদমাধ্যমের বেশিরভাগটাই বিসিসিআইয়ের অনুগত বলে এসব নিয়ে বিশেষ লেখালিখি হয় না, কিন্তু ইংল্যান্ডের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ কাগজের সাংবাদিক টিম উইগমোর সম্প্রতি এক বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন। শিরোনাম ‘হাউ ক্রিকেট এট ইটসেলফ’, অর্থাৎ ক্রিকেট কীভাবে নিজেকে খেয়ে ফেলল। সেই লম্বা প্রতিবেদনে টিম দেখিয়েছেন যে সারা পৃথিবীতে এখন এত বিপুল সংখ্যক ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ হচ্ছে যে প্রকৃতপক্ষে ৫০০ দিনের ক্রিকেট খেলা হচ্ছে ৩৬৫ দিনে। একই ক্রিকেটার সাত-আটটা লিগে খেলছেন, অনেকসময় একই সপ্তাহে তিনটে আলাদা আলাদা লিগে খেলছেন। ফলে এক লিগে খেলতে খেলতে অনেকেই চাইছেন যেন তাঁর দল হেরে যায়, যাতে তিনি অন্য একটা লিগে গিয়ে যোগ দিতে পারেন। কারণ তাতে রোজগার বাড়বে। অনেক লিগে আবার লগ্নি ব্যাপারটা এত গোলমেলে যে অনেক দলের মালিক নিজের দলের বিরুদ্ধেই বাজি ধরেন বেটিং সাইটে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল এবং বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট নিয়ামক সংস্থাগুলো ঢালাও এইসব লিগকে অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে আগাপাশতলা না ভেবে। ফলে এমন লিগও আছে যেগুলোতে দল গঠন করা হচ্ছে, খেলোয়াড়দের নেওয়া হচ্ছে টিভি সম্প্রচার স্বত্ব থেকে টাকা আসবে আশা করে। তারপর টাকা না আসায় একটা বলও খেলা হওয়ার আগেই লিগ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় আবার খেলোয়াড়রা টাকা পাচ্ছেন না বলে মাঠে পৌঁছে খেলতে নামতে চাইছেন না। ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, আন্দ্রে রাসেলের মত লোকেরও এই অভিজ্ঞতা হয়েছে।

এসব খবর দিয়ে এই ইঙ্গিত করছি না যে ভারতীয় দল ইচ্ছা করে নিউজিল্যান্ডের কাছে গোহারা হেরেছে বা অস্ট্রেলিয়ায় ইচ্ছে করে হারবে। যাঁরা ক্রিকেট খেলা ন্যূনতম মনোযোগ দিয়ে দেখেন এবং অন্তত কিছুটা বোঝেন, তাঁদেরও বুঝিয়ে বলার দরকার নেই যে এই ভারতীয় দলের ইচ্ছে করে হারার যোগ্যতা নেই। তবু খবরগুলো দিলাম এইজন্যে যে ৩-০ হওয়ার পর থেকে উদ্ধারের উপায় হিসাবে কোনো কোনো প্রাক্তন ক্রিকেটার, সাংবাদিক এবং বহু ক্রিকেটপ্রেমী আইপিএলকে এই দুরবস্থার একমাত্র কারণ বলে ঠাওরাচ্ছেন এবং আইপিএল বন্ধ করা বা আইপিএলকে কম গুরুত্ব দেওয়ার নিদান দিচ্ছেন। প্রথম দুই অনুচ্ছেদ পড়লে দুটো জিনিস বুঝতে পারা উচিত – ১) ওসব দিবাস্বপ্ন দেখে লাভ নেই, ২) কেবল আইপিএলের ঘাড়ে দোষ চাপালে চলবে না, কারণ ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নিয়ে বাড়াবাড়ি গোটা ক্রিকেট দুনিয়ায় হচ্ছে এবং তার ফলে একা ভারতীয় দল ভুগছে না।

ভারত-নিউজিল্যান্ড সিরিজের পাশাপাশিই চলছিল পাকিস্তান-ইংল্যান্ড সিরিজ। ভারতে এসে নিউজিল্যান্ডের ৩-০ জয়কে বলা হচ্ছে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন, কিন্তু পাকিস্তানের সিরিজটাতে যা হয়েছে তাও কম চমকপ্রদ নয়। পাকিস্তান গত কয়েকবছর ধরে হাইওয়ের মত পিচ বানিয়ে যাচ্ছিল। ইংল্যান্ডের এর আগের পাকিস্তান সফরে সেইসব পিচে ম্যাককালাম-বেন স্টোকসের মস্তিষ্কপ্রসূত ব্যাজবল দারুণ কাজ দিয়েছিল। ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা এত দ্রুত এত রান তুলছিলেন যে সেই রানের চাপেই পাকিস্তানের ব্যাটিং ধসে পড়ছিল। ফলে ইংল্যান্ড সিরিজ জিতে ফিরেছিল। এবারেও প্রথম টেস্টে সেই একইরকম পিচ তৈরি করা হয়েছিল মুলতানে। সেখানে পাকিস্তানের ৫৫৬ রানের জবাবে ইংল্যান্ড সাত উইকেটে ৮২৩ রান করে, মারকুটে হ্যারি ব্রুক একাই ৩১৭। ওই রানের চাপে দ্বিতীয় ইনিংসে পাকিস্তান মাত্র ৫৪.৫ ওভারে ২২০ রানে গুটিয়ে যায়।

তারপর পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ড কী করল? নির্বাচক কমিটি বদলে দিল। আকিব জাভেদের নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচক কমিটি দায়িত্ব নিয়েই দলের খোলনলচে বদলে ফেলল। দলের এক নম্বর ব্যাটিং তারকা বাবর আজমকে বিশ্রামে পাঠিয়ে দিল; বোলিং তারকা শাহীন আফ্রিদি, নাসিম শাহদেরও বসিয়ে দেওয়া হল। দলে এলেন ত্রিশোর্ধ্ব দুই স্পিনার নোমান আলি আর সাজিদ খান। আরও অদ্ভুত সিদ্ধান্ত – দ্বিতীয় টেস্টও মুলতানের একই পিচে খেলা। শেষপর্যন্ত সবকটা সিদ্ধান্তই কিন্তু খেটে গেল। টানা দুটো টেস্ট হওয়া পিচে বল ঘুরল বনবনিয়ে আর ইংল্যান্ডের কুড়িটা উইকেটই তুলে নিলেন সাজিদ আর নোমান। দ্বিতীয় ইনিংসে তো ওই দুজন ছাড়া কাউকে বলই করতে হল না। দেখা গেল ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা পাটা উইকেটে যত রানই করুন, বল ঘুরলেই চোখে সর্ষেফুল দেখছেন। রাওয়ালপিণ্ডির তৃতীয় টেস্টেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এখানে সাজিদ-নোমান প্রথম ইনিংসে নিলেন নটা উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসে দশটাই।

ক্রিকেট দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে ধনী তিনটে ক্রিকেট বোর্ডের দুটো হল আমাদের বিসিসিআই আর স্টোকসদের ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি)। কোন দুটো বোর্ড ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করে? এই দুটো দেশই। ভারতীয় ক্রিকেটে বিপণন থেকে দল নির্বাচন – সবকিছু আইপিএলকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। ইংল্যান্ডে আবার শুধু কুড়ি বিশের লিগ ‘টি টোয়েন্টি ব্লাস্ট’ নয়, ১০০ বলের খেলা ‘দ্য হান্ড্রেড’ বলেও একটা প্রতিযোগিতা চালু হয়েছে। পাঁচ বলের ওভার, বাহারি রংদার জামা, সাদা বল, ছোট মাঠ, একইসঙ্গে ছেলেদের আর মেয়েদের লিগ – সে এক মোচ্ছব। এত কাণ্ড করতে গিয়ে কাউন্টি ক্রিকেটের মরশুম বদলাতে হয়েছে, অর্থাৎ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের গুরুত্ব কমেছে। এদিকে টেস্ট দল পড়েছে গাড্ডায়। জো রুটের আমলে দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়েও সিরিজ হারার পরে দায়িত্ব দেওয়া হয় স্টোকস-ম্যাককালামকে। তাঁরা ব্যাজবল চালু করে দেশের মাঠে নিউজিল্যান্ড আর ভারতের বিরুদ্ধে বেশ কিছুটা সাফল্য পেয়েছিলেন, পাকিস্তানে এসে সিরিজ জিতেছিলেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে অ্যাশেজের ফলাফলের বিশেষ তারতম্য হয়নি, এবছরের গোড়ার দিকে ভারতে এসে সিরিজ হেরেছেন, এখন ছন্নছাড়া পাকিস্তানের কাছেও হারলেন। উপরন্তু ২০২১ সালে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চালু হওয়ার পর থেকে দুবার ফাইনাল হয়েছে, একবারও ইংল্যান্ড ফাইনালে উঠতে পারেনি। ভারত সফরে আর সদ্যসমাপ্ত পাকিস্তান সফরে – দুবারই দেখা গেছে যে রুটকে বাদ দিলে ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা স্পিন একেবারেই খেলতে পারছেন না। এক-আধটা ইনিংসে অলিভার পোপ বা বেন ডাকেট রান করে ফেলছেন। কিন্তু সেগুলো ব্যতিক্রম। সুতরাং স্পিন খেলতে না পারার দোষে শুধু রোহিত শর্মারা দুষ্ট নন। কুড়ি বিশের খেলা যে সব দলের ব্যাটারদেরই স্পিন খেলার দক্ষতার বারোটা বাজাচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। কেভিন পিটারসেন সেকথা স্পষ্ট বলেও দিয়েছেন

কিন্তু মুশকিল হল, এসব বলে রোহিতরা পার পেতে পারেন না। কারণ প্রথমত, স্টোকসরা খেলছিলেন বিদেশে, রোহিতরা দেশে। টেস্ট ক্রিকেটের প্রায় দেড়শো বছরের ইতিহাসে মাত্র দশবার কোনো দল নিজের দেশে তিন বা তার বেশি টেস্টের সিরিজের সবকটা ম্যাচে হেরেছে। দ্বিতীয়ত, স্টোকসদের জন্ম বেদি-প্রসন্ন-চন্দ্রশেখর-ভেঙ্কটরাঘবন, অনিল কুম্বলে, হরভজন সিংদের দেশে নয়। তৃতীয়ত, কিথ ফ্লেচার, অ্যালাস্টেয়ার কুক, পিটারসেন, রুটের মত কয়েকজনকে বাদ দিলে কোনোদিনই ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা স্পিন খেলতে দারুণ পারদর্শী ছিলেন না।

ভারতীয়দের ইতিহাস ঠিক উল্টো। আমাদের দলকে যে ‘দেশে বাঘ বিদেশে বেড়াল’ বলা হত তার বড় কারণ – আমাদের নেহাত মাঝারি মানের ব্যাটাররা জোরে বলে চোখ বুজে ফেললেও স্পিনারদের ছিঁড়ে খেতেন। সেই কারণেই সর্বকালের সেরা লেগস্পিনার শেন ওয়ার্ন ভারতের বিরুদ্ধে এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন ১৪ টেস্টে মাত্র একবার। তিনি যখন ১৯৯৮ সালে ভারতে প্রথম টেস্ট খেলতে আসেন, তখন শচীন তেন্ডুলকর ব্যাট করতে নামার আগেই ওয়ার্নকে মেরে আধমরা করে রাখতেন নভজ্যোৎ সিং সিধু। ইনি কিন্তু ভারতের সর্বকালের সেরা ১৫ জন ব্যাটারের তালিকাতেও থাকবেন না। মুথাইয়া মুরলীধরনের ভারতের বিরুদ্ধে সাফল্য ওয়ার্নের চেয়ে বেশি, কিন্তু তারও বেশিরভাগটা শ্রীলঙ্কায়। ভারতে এসে তিনি এক ইনিংসে দুবারের বেশি পাঁচ উইকেট নিতে পারেননি। দুজনেরই ভারতের বিরুদ্ধে গড় সামগ্রিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।

ইংল্যান্ড থেকে সেই প্রাচীনকালের জিম লেকার আর ছয়, সাতের দশকের ডেরেক আন্ডারউড ছাড়া বিশ্বমানের স্পিনারই বা এসেছে কজন? ২০১২-১৩ মরশুমে তারা ভারতে এসে সিরিজ জিতেছিল যে দুজনের জন্যে, তাঁদের মধ্যে গ্রেম সোয়ান তো বেশিদিন খেললেনই না। আর মন্টি পানেসার সম্পর্কে ওয়ার্ন একবার বলেছিলেন – ও পঞ্চাশটা টেস্ট খেলেনি, একই টেস্ট পঞ্চাশবার খেলেছে। সাম্প্রতিক ভারত সফর আর পাকিস্তান সফরে প্রমাণ হয়ে গেছে যে এখনো ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা তেমন দরের স্পিনারদের বিরুদ্ধে অনুশীলনের সুযোগ পান না। জ্যাক লিচের সীমাবদ্ধতা অসীম, শোয়েব বশির আর রেহান আহমেদ ভবিষ্যতে কেমন হবেন তা ভবিষ্যৎ বলবে – কিন্তু এখনো ৩৮ বছরের নোমান আর ৩১ বছরের সাজিদের সমকক্ষ নন। এই সমস্যা তো রোহিত, বিরাট কোহলি, শুভমান গিলদের নেই। তাঁরা এখন ঠাসা আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের ঠ্যালায় না হয় ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার সময় করতে পারেন না, উঠে এসেছিলেন তো ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেই। সেখানে তো একগাদা ভাল মানের স্পিনারকে খেলতে হয়েছিল। যদি ধরে নিই এই ব্যাপারটা সাইকেল চালাতে শেখার মত নয়, ছোট থেকে শিখে আসা জিনিসও খেলোয়াড়রা ভুলে যান, তাহলেও ভারতীয় দলে এই মুহূর্তে এমন অন্তত দুজন স্পিনার আছেন যাঁদের একজনকে সারাক্ষণই আমাদের প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং সাংবাদিকরা ভারতের সর্বকালের সেরা বলেন – রবিচন্দ্রন অশ্বিন। অন্যজন বিশ্বের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন, এমন দাবিও নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে পর্যন্ত শোনা গেছে – রবীন্দ্র জাদেজা। তা আমাদের ব্যাটাররা তো নেটে এঁদের বোলিংয়ে ব্যাট করেন। তা সত্ত্বেও এই ধেড়ে বয়সে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেন না বলেই বিরাট, রোহিতরা স্পিনারদের বিরুদ্ধে রান করতে পারেননি, আর রঞ্জি ট্রফিতে ফেরত গেলেই আবার তরতরিয়ে রান করতে শুরু করবেন? বিশ্বাস করা শক্ত।

আসল কথা হল, ভারতের টেস্ট দলের সদস্যদের মাঝারিয়ানা ধরা পড়ে গিয়েছে। বোর্ডের বিপুল অর্থবলে চালিত সর্বব্যাপী প্রচারযন্ত্র যে সত্য চাপা দিয়ে রেখেছিল, টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রতিযোগিতামূলক ১২-১৩ বছর যে সত্যকে চেপে রাখা সম্ভব করেছিল, পরিশ্রমী নিউজিল্যান্ড দল সেই সত্যকে একেবারে উলঙ্গ করে দিয়েছে। তাই এখন রেখে ঢেকে সমালোচনা করে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করছে এ দেশের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র।

ক্রিকেটভক্তরা এখনই তেড়ে আসবেন – ‘১২ বছরে দেশের মাঠে পরপর ১৮ খানা সিরিজ জিতেছে যে দল, তারা মাঝারি? এই রেকর্ড আর কোনো দলের নেই তা জানেন?’ আজ্ঞে জানি। কথাটা একদম সত্যি। ঠিক যেমন ‘অশ্বত্থামা হত’ কথাটাও সত্যি। এক্ষেত্রে ‘ইতি গজ’-র হাতিটা একটা বড়সড় দাঁতাল। তার একটা দাঁত হল অতীতের ভারতীয় দলগুলোর ঘরের মাঠের রেকর্ড, যা নিয়ে কদিন আগেই এইখানে বিস্তারিত লিখেছি। সে দাঁতের কথা জেনেও কেউ কেউ নিশ্চয়ই বলবেন – আগের দলগুলো যতই জিতুক, বিরাট আর রোহিতের দলের মত পরপর ১৮ খানা তো জেতেনি। ঠিক। কেন এই রেকর্ডটা হয়েছে তা বোঝা যাবে অন্য দাঁতটার কথা বললে।

বিরাট-রবি শাস্ত্রী জমানার আগেও ভারতে ঘূর্ণি পিচই হত বটে, কিন্তু বল প্রথম দিন মধ্যাহ্নভোজনের বিরতির আগে থেকেই ঘুরছে – এমনটা কমই দেখা যেত। বল তাক লাগিয়ে দেওয়ার মত ঘুরত তৃতীয় দিন থেকে। তার আগে পর্যন্ত স্পিনারদের ঘাম ঝরাতে হত। মূলত গতি আর লাইন, লেংথের বৈচিত্র্যের উপর নির্ভর করে উইকেট নিতে হত। বেদি-প্রসন্ন-চন্দ্রশেখর থেকে আরম্ভ করে কুম্বলে-হরভজন ওরকম পিচেই বল করেছেন এবং ম্যাচ জিতিয়েছেন বছরের পর বছর। এই কথাটা অবশ্য পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করার উপায় নেই, কারণ এর কোনো পরিসংখ্যান হয় না। যাঁরা সেই যুগ থেকে খেলা দেখছেন তাঁরা হয় একবাক্যে একমত হবেন, নয় একেবারেই মানবেন না। তরুণরা তো মানতেই চাইবেন না, কারণ কুড়ি বিশ প্রজন্মের ইউটিউব থাকলেও ধৈর্য নেই। কিন্তু অন্য একটা ব্যাপার আছে যার প্রমাণ দেওয়া যায়।

বিরাট-শাস্ত্রী জমানার আগে পর্যন্ত কিন্তু প্রত্যেক সিরিজেই এমন এক-আধটা মাঠে খেলা দেওয়া হত যেখানকার পিচ, আবহাওয়া মিলিয়ে সফরকারী দলেরও কিছুটা সাহায্য পাওয়ার আশা থাকত। যেমন কলকাতার ইডেন উদ্যানে অনেক সময়েই বিপক্ষের জোরে বোলাররা গঙ্গার হাওয়াকে কাজে লাগাতে পারতেন, পিচেও অনেক সময় বেশ ঘাস থাকত। ইতিহাস বলছে ইডেনে অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড জিতেছে দুবার করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতেছে তিনবার আর পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকাও একবার করে জিতেছে। সেই ইডেনে ভারত শেষ তিনটে টেস্ট খেলেছে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। শেষ ম্যাচটা ছিল সেই ২০১৯ সালে। অস্ট্রেলিয়ার মত দলের বিরুদ্ধে ২০০১ সালের সেই অবিস্মরণীয় টেস্টের পর থেকে আর খেলাই হয়নি ইডেনে।

এমন আরেকটা মাঠ ছিল মোহালির পিসিএ স্টেডিয়াম। ওই মাঠে সফরকারী দলগুলো জিততে না পারলেও অন্তত ড্র করতে পারত। কোর্টনি ওয়ালশের ওয়েস্ট ইন্ডিজ তো ১৯৯৪ সালে গোটা সফরে কিছু জিততে না পারলেও ওখানে শেষ টেস্টে ভারতকে হারিয়েছিল। ওই মাঠে ইংল্যান্ড ড্র করেছে একবার, নিউজিল্যান্ড দুবার, পাকিস্তান একবার, শ্রীলঙ্কা একবার। সে মাঠেও গত ১১ বছরে খেলা হয়েছে মাত্র চারটে টেস্ট।

তাহলে আজকাল খেলা দেওয়া হয় কোথায়? এরও গোটা দুয়েক উদাহরণ দেওয়া যাক।

২০১৭ সালে প্রথম টেস্ট ম্যাচ হওয়া পুনের এমসিএ স্টেডিয়ামে সাত বছরের মধ্যে তিনটে ম্যাচ হয়ে গেল এবং তিনটেই ঘূর্ণি পিচে। রান উঠল কম। ২০১৭ সালের প্রথম খেলাটায় আমাদের রবি-অ্যাশ জুটিকে টপকে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায় স্টিভেন ও’কিফ আর নাথান লায়ন। ২০১৯ সালে দুর্বল স্পিন আক্রমণের দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে অবশ্য ভারত ছশোর বেশি রান করেছিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ফলো অন করে হেরেছিল। এবারেও টেস্টে অনিয়মিত মিচেল স্যান্টনার ম্যাচে ১৩ খানা উইকেট তুলে নিলেন, আমাদের সর্বকালের সেরা দুই স্পিনারকে টেক্কা দিলেন। ভাগ্যে ওয়াশিংটন সুন্দর ছিলেন, নইলে অবস্থা আরও শোচনীয় হত।

আমেদাবাদের সর্দার প্যাটেল স্টেডিয়াম ভেঙেচুরে নতুন করে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে পরিণত করা হল, সেখানে প্রথম টেস্ট হল ২০২১ সালে। একেবারে পরপর দুটো টেস্ট। প্রথমটা শেষ হল দুদিনে, দ্বিতীয়টা তিনদিনে। প্রথম টেস্টে দুদলের কেউ দেড়শো পেরোতে পারেনি, ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংসে ৮১ রানে অল আউট। এরকম পিচ কুম্বলেরা গোটা জীবনে পাননি। মাত্র দুবছর বয়সী ওই স্টেডিয়ামে তিন নম্বর টেস্টও খেলা হয়ে গেছে গতবছর। আগের দুই টেস্টে পিচ নিয়ে বড্ড বাড়াবাড়ি করা হয়ে গেছে ভেবেই বোধহয় একেবারে ঢ্যাবঢেবে পিচ বানানো হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। আড়াই খানা ইনিংস খেলা হয়েছিল, চারজন শতরান করেছিলেন। তাছাড়া ট্রেভিস হেড ৯০, অক্ষর প্যাটেল ৭৯।

তালিকা আরও লম্বা করা যায়, কিন্তু যাঁর বোঝার তিনি এতেই বুঝে নেবেন পরপর ১৮ খানা সিরিজ জেতার মাস্তানি আসলে কোথায়। অশ্বিন আর জাদেজার মাঝারিয়ানা আরও পরিষ্কার হয় দেশের মাঠের সঙ্গে বিদেশের মাঠে তাঁদের পরিসংখ্যান মিলিয়ে দেখলে। অশ্বিনের ৫৩৬ খানা উইকেটের মাত্র ১৪৯টা এসেছে বিদেশে, গড় ৩০.৪০। উনচল্লিশটা টেস্টে এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন আটবার। এই পরিসংখ্যান খারাপ নয়, মাঝারি। দেশের মাঠে ৬৫ খানা টেস্ট খেলে নিয়েছেন ৩৮৩ খানা উইকেট, গড় ২১.৫৭, এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন ২৯ বার। মানে দুজন অশ্বিন একেবারে দুজন আলাদা বোলার।

জাদেজার পরিসংখ্যান দেখবেন? উনি ভারতের মাটিতে ৪৯ টেস্টে ২৩৮ উইকেট নিয়েছেন মাত্র ২০.৭১ গড়ে, এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট ১৩ বার। কিন্তু বিদেশে? ২৬ খানা টেস্ট খেলে মোটে ৭৬ খানা উইকেট, গড় ৩২.৭৮। এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট মোটে দুবার। হিন্দি সিনেমা হলে দেখানো হত দেশে খেলেন জাদেজা, আর বিদেশে ভিলেন তাঁকে তালা বন্ধ ঘরে রেখে তাঁরই মত দেখতে অন্য একজনকে খেলতে নামায়। একথা ঠিকই যে প্রায় সব বোলারই নিজের দেশে বেশি ভাল বল করেন। কিন্তু সর্বকালের সেরার তকমাধারীদের পরিসংখ্যানে দেশে আর বিদেশে এত তফাত ঘটে না। আমাদের দেশের সবচেয়ে সফল স্পিনারদেরই দেখুন না:

এই পরিসংখ্যানগুলো দেখলেই পরিষ্কার হয়, অশ্বিন-জাদেজার চেয়ে অনেক বড় স্পিনার ছিলেন অজিত ওয়াড়েকরের স্পিন ত্রয়ী। কারণ তাঁদের দেশে আর বিদেশে উইকেট সংখ্যা আর এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার ঘটনা প্রায় সমান। সেই কারণেই তাঁরা ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ডেও সিরিজ জেতাতে পেরেছিলেন। কুম্বলে, হরভজন বিদেশে ওঁদের মত ভাল না হলেও নেহাত ফেলনা ছিলেন না। বিদেশে অন্তত দুটো টেস্ট ম্যাচের কথা উল্লেখ করা যায় যেখানে এঁরা দুজনে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন – ১) ২০০৬ সালে কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে হরভজন পাঁচ উইকেট নেন আর দ্বিতীয় ইনিংসে কুম্বলে ছয় উইকেট নিয়ে ৪৯ রানে ম্যাচ জেতান। ২) ২০০২ সালে লিডসের ইনিংস জয়ে তাঁদের অবদান আরও উল্লেখযোগ্য, কারণ ভিজে আবহাওয়ায় পিচটা ছিল জোরে বোলারদের জন্য আদর্শ। সেখানে কুম্বলে-হরভজন বিপক্ষের কুড়িটা উইকেটের ১১ খানা তুলে নেন। অশ্বিন আর জাদেজা কিন্তু এমন দুজন বোলার যাঁদের উপমহাদেশের বাইরে একসঙ্গে খেলানোর কথা ভারত অধিনায়করাই ভেবে উঠতে পারেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে অশ্বিনকে বসিয়ে রাখা হয় তার কারণ কিন্তু বোলিং নয়। সম্ভবত তার কারণ কোহলি-শাস্ত্রীর মত দ্রাবিড়-রোহিতেরও ধারণা ছিল, জাদেজা অশ্বিনের চেয়ে ব্যাট ভাল করেন।

আরও পড়ুন এ যুগে তৃতীয় নয়নও জিরো

নিউজিল্যান্ড সিরিজে ব্যাটাররা চূড়ান্ত ব্যর্থ, অথচ অশ্বিন আর জাদেজার মাঝারিয়ানা নিয়ে এত বড় লেখা কেন লিখলাম? তার কারণ টেস্ট জিততে গেলে কুড়িটা উইকেট নিতে হয় এবং ভারতের মাটিতে জিততে গেলে স্পিনারদের সাফল্য অপরিহার্য। ব্যাটারদের ব্যর্থতায় মুহ্যমান হয়ে আলোচকরা অশ্বিন-জাদেজার ব্যর্থতাকে তত গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ‘একটা সিরিজে হতেই পারে’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। লেখার এই পর্বে এ জন্যেই দেখানো দরকার ছিল যে এই ব্যর্থতা একটা সিরিজের ব্যাপার নয়। এতদিন এক বানানো স্বর্গের দেবদূত করে রাখা হয়েছিল ওঁদের। তাই এই পতন অনিবার্য ছিল। অতীতেও একাধিকবার ওঁদের মাঝারিয়ানা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন অন্য দেশের স্পিনাররা। কিন্তু ভারত শেষপর্যন্ত সিরিজ জিতে গেছে বলে চোখে পড়েনি। ভারতে এসে বেদি, প্রসন্ন, চন্দ্রশেখর, কুম্বলে, হরভজনের থেকে বেশি উইকেট নিয়ে চলে যাওয়ার ক্ষমতা হয়নি ওয়ার্ন বা মুরলীদেরও। অথচ অশ্বিন-জাদেজার চেয়ে বেশ কয়েকবার বেশি উইকেট নিয়েছেন সোয়ান-পানেসার, ও’কিফ-লায়ন, লায়ন-ম্যাট কুনেমান-টড মার্ফি, টম হার্টলি-বশির স্যান্টনার, আজাজ প্যাটেল, গ্লেন ফিলিপসরা।

রবি-অ্যাশের এই ব্যর্থতা ঢাকতে এখন নতুন কায়দা চালু করেছেন ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা। বলা এবং লেখা হচ্ছে, যত দোষ টিম ম্যানেজমেন্টের। বেশি ঘূর্ণি উইকেট বানালে মুড়ি মিছরি এক দর হয়ে যায়। ফলে রবি-অ্যাশের মুনশিয়ানার আর দাম থাকে না। কিমাশ্চর্যমতৎপরম! ওঁরা যদি এত বড় স্পিনার হন যে যেখানে বল তেমন ঘোরে না সেখানেও কেরামতি দেখাতে পারেন, তাহলে যেখানে বল বেশি ঘোরে সেখানে তো ওঁদের ধারেকাছে অন্যদের আসতে পারার কথা নয়। কোনো ব্যাটার সম্পর্কে কখনো শুনেছেন যে ব্যাটিং সহায়ক পিচে অন্যরা বেশি রান করে দেয়, কিন্তু শক্ত পিচে সে-ই সেরা? তাছাড়া রবি-অ্যাশ বরাবর কম ঘূর্ণির পিচেই এত উইকেট নিয়ে এসেছেন – সাক্ষ্যপ্রমাণ তো তা বলছে না। আর বিদেশে, যেখানে বল বিশেষ ঘোরে না, সেখানে তো ওঁদের একসঙ্গে খেলানোই যায় না।

আজ এ পর্যন্তই। ভারতীয় দলের তারকা ব্যাটাররাও যে মাঝারিয়ানার বানানো স্বর্গের দেবদূত, কেবল স্পিন খেলতে না পারা যে ৩-০ ফলাফলের কারণ নয়, সেসব কথা সবিস্তারে না লিখলে এই লেখা সম্পূর্ণ হবে না। সে কাজ পরের পর্বের জন্য তোলা রইল।

সমস্ত পরিসংখ্যান ক্রিকইনফো থেকে

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত