শ্রদ্ধেয়

আরেকজন কবির সঙ্গে আমার পরিচয় অত সহজে হয়নি। মূলত তাঁকে একজন পন্ডিত মানুষ বলে ভাবতাম। রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ, কৃতী অধ্যাপক, রাজনৈতিকভাবে সরব একজন বুদ্ধিজীবী বলে চিনতাম। এবং ছোট থেকেই পন্ডিতদের সম্পর্কে আমার যে সহজাত ভয়, সেই ভয়ে এঁর লেখাপত্র এড়িয়েই চলতাম। তারপর এক মাস্টারমশাইয়ের পাল্লায় পড়লাম যিনি সেই কবির ছাত্র এবং মাঝে মাঝেই বলতেন “বাংলায় রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দ বাদ দিলে আড়াইজন কবি — শঙ্খ ঘোষ, শঙ্খ ঘোষ আর হাফ শঙ্খ ঘোষ”

gulzar

নাইন কি টেনে পড়ার সময়ে একবার বাবার কাছে প্রচন্ড বকা খেয়েছিলাম একজন বাজে লোককে প্রণাম করার জন্যে। আসলে কোন এক গুরুজন আমাকে তার কিছুদিন আগেই বলেছিলেন “বয়সে বড় কারোর সাথে আলাপ হলে প্রণাম করবে।” বাবা একজনের সাথে আলাপ করানোয় আমি সেটাই করেছিলাম।

বাবা বাড়ি ফিরে বলেছিল “ঢিপ ঢিপ করে প্রণাম করা স্বভাবটা আবার তোর কবে হল? জানিস না শুনিস না, একটা অত্যন্ত নোংরা লোককে প্রণাম করলি আজকে। আলাপ না করিয়ে উপায় ছিল না তাই করিয়েছি। তা বলে প্রণাম করতে হবে? কক্ষনো প্রণামের যোগ্য কিনা না জেনে কাউকে প্রণাম করবি না।”

লৌকিকতার খাতিরে বাবার এই নির্দেশটা অনেকসময়ই মেনে উঠতে পারিনি, আজও পারি না। এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিই যে সত্যিই প্রণাম করতে ইচ্ছা করে এমন অনেককে তো আবার প্রণাম করে উঠতে পারি না তাঁদের কাছে পৌঁছনোর যোগ্যতা নেই বলে, অতএব ব্যাপারটা হরে দরে একই হয়ে যায়।

তা সেরকমই একজন লোক গুলজার। যে বয়সে নিজে নিজে কবিতা পড়তে শিখেছি তার আগে থেকেই ফিল্মের গানের মধ্যে দিয়ে গুলজারের লেখা কানে ঢুকেছে। তখুনি মরমে পশেছে বললে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, তবে বরাবরই অন্য ফিল্মের গানের চেয়ে আলাদা কিছু যে শুনছি সেটা বোধ করতাম। সম্ভবত সেটা আমার বাবারই কৃতিত্ব। ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে দাদুর আমলের একটা রেকর্ড প্লেয়ার ছিল। তখন আমাদের যা সামর্থ তাতে পুজোর সময়ে জামাকাপড়ের সঙ্গে দু একখানা এল পি রেকর্ড কেনা হত, তার বেশি নয়। বাবা যার বাড়িতেই যেত, পছন্দের রেকর্ড দেখতে পেলে কদিনের জন্য চেয়ে আনত। “দো নয়না ঔর এক কহানি” আমার সেখান থেকেই পাওয়া। মনে আছে বাবা ঐ রেকর্ডটা শোনার সময়ে বলেছিল “মন দিয়ে শোন। কি আশ্চর্য কথা! তুঝ সে নারাজ নহি জিন্দগি, হৈরান হুঁ ম্যায়। একটা লোক জীবনের সঙ্গে কথা বলছে।” যত বড় হয়েছি, আরো গান শুনেছি, আরো কবিতা পড়েছি তত গুলজারের দাম আমার কাছে বেড়ে গেছে, ওঁকে আরো অন্তরঙ্গ মনে হয়েছে। ২০১২-তে যখন একটা চাকরি ছেড়ে অন্যটায় যোগ দিতে যাচ্ছি তখন অনুজ সহকর্মীরা ভালবেসে গুলজারের ‘Selected Poems’ আর ‘Neglected Poems’ আমার ঝুলিতে ফেলে দিল। সেই থেকে গুলজার আমার আরো আপন।

আরেকজন কবির সঙ্গে আমার পরিচয় অত সহজে হয়নি। মূলত তাঁকে একজন পন্ডিত মানুষ বলে ভাবতাম। রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ, কৃতী অধ্যাপক, রাজনৈতিকভাবে সরব একজন বুদ্ধিজীবী বলে চিনতাম। এবং ছোট থেকেই পন্ডিতদের সম্পর্কে আমার যে সহজাত ভয়, সেই ভয়ে এঁর লেখাপত্র এড়িয়েই চলতাম। তারপর এক মাস্টারমশাইয়ের পাল্লায় পড়লাম যিনি সেই কবির ছাত্র এবং মাঝে মাঝেই বলতেন “বাংলায় রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দ বাদ দিলে আড়াইজন কবি — শঙ্খ ঘোষ, শঙ্খ ঘোষ আর হাফ শঙ্খ ঘোষ।” ফলে শঙ্খ ঘোষের কবিতা না পড়ে আর উপায় রইল না। কিন্তু তবুও বেশি পড়লাম ওঁর গদ্য। সমৃদ্ধ হলাম, কিন্তু তেমন টান তৈরি হল তা নয়। সেটা হল এই কয়েক বছর আগে, অগ্রজ সাংবাদিক অম্লানদার সাথে কথাবার্তায় আমার প্রিয় কবি জয় গোস্বামী বনাম ওর মতে “last of the great Bengali poets” শঙ্খ ঘোষ — এরকম একটা আবহাওয়া তৈরি হওয়ায়। এবারে তাঁর পান্ডিত্য ভেদ করে শঙ্খ ঘোষ একেবারে বুকে এসে বিঁধলেন। তবে হ্যাঁ, কোন সন্দেহ নেই যে মানুষটা শুধুই কবি নন। তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। তিরাশি বছর বয়সেও নিরপেক্ষ মনীষী হয়ে না থেকে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার নিতে গিয়ে যে বক্তৃতাটা তিনি দিয়েছেন, সেটাই প্রমাণ করে তিনি প্রণম্য।

এই দুই প্রণম্যকে এক মঞ্চে কলকাতায় পাওয়া যাবে জানতে পেরেছিলাম ফেসবুকের দৌলতেই। ভাগ্যিস শনিবার — আমার কর্পোরেট দাসত্ব থেকে সাপ্তাহিক বিরতির দিন, নইলে এমন একটা অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিতই থাকতে হত। উপলক্ষ বাংলায় গুলজারের প্রথম বই প্রকাশ। একটা বাঙালিদের সাথে ওঁর কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণ — পান্তাভাতে। অন্যটা তাঁর কবিতার বাংলা অনুবাদ — প্লুটো।

নন্দনের বাইরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, সাদা পাজামা পাঞ্জাবী পরে প্রথমে গুলজার এলেন। এমনিতেই তিনি সেদিনের মধ্যমণি, তার উপর কবি হলেও বলিউডের তারকাচূর্ণ তাঁর সর্বাঙ্গে। সেই কারণে কলকাতার সাহিত্য আর সিনেমা জগতের তারকারা তাঁকে প্রায় এসকর্ট করে ভেতরে নিয়ে গেলেন। সেই ভিড়েও দেখলাম ঠোঁটে সেই চিরপরিচিত “আধি অধূরি” হাসি। তার কিছু পরেই এলেন বাংলা ভাষার জীবিত কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ — শঙ্খ ঘোষ। তাঁকে ঘিরে কোন বলয় ছিল না। বিখ্যাত বাঙালিরা ততক্ষণে কে গুলজারের কত কাছে থাকতে পারেন সেই প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন হলের ভেতরে। সাদা ধুতি পাঞ্জাবীর মানুষটার অবশ্য আজও দেখলাম লাঠির প্রয়োজন হয় না। যাক সে কথা।

স্মরণীয় সন্ধের শুরুটা খুব সুখকর হয়নি। নন্দনের সাউন্ড সিস্টেম বোধহয় ঠিক করতে পারছিল না কোশিশের সঞ্জীব কুমার হবে না আঙ্গুরের সঞ্জীব কুমার হবে। যারপরনাই টাকা এবং সময় খরচ করে ওখানে পৌঁছনো আমরা স্বভাবতই অধৈর্য। শঙ্খ ঘোষের ধৈর্যচ্যুতি হওয়া অবশ্য বেশ শক্ত ব্যাপার। মিনিট পাঁচেক মঞ্চে ছিলেন। বললেন “দেশে বিদেশে অনেককে পেয়েছি যারা গীতাঞ্জলি ইংরেজি অনুবাদে পড়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। কিন্তু ‘Gardener’ পড়ে রবীন্দ্রনাথ পড়তে আগ্রহী হয়েছেন, তারপর নিজের উদ্যোগে বাংলায় পড়েছেন, এমন মানুষ গুলজার ছাড়া আর একজনও পাইনি… অন্য ভাষায় কাজ করেও তিনি এমন একজন শিল্পী, যাঁকে আমাদের খুব কাছের লোক বলে মনে হয়।”

গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত অনেকের দৃষ্টিপথ জুড়ে তখনো দাঁড়িয়ে আছে একগাদা টিভি ক্যামেরা এবং তার চালকেরা। শঙ্খ ঘোষের শান্ত থাকার আবেদনে আমল দেওয়া তাই বেশ শক্ত হচ্ছিল। তাতেই অবশ্য টের পাওয়া গেল গুলজারের সম্মোহনী শক্তি। বইপ্রকাশ, পান্তাভাতের কিছুটা অনুলেখিকার পাঠ করা — এসব পেরিয়ে যখন তাঁর হাতে মাইক পৌঁছল, তখনো এক ভদ্রলোক খুব বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে কিসব বলছেন একতলার দর্শকাসন থেকে। গুলজার প্রথমেই বেশ মোলায়েম অথচ দৃঢ়ভাবে বললেন “ভাইসাব, অভি আপ চুপ হো যাইয়ে। অব মেরি বারি হ্যায়।”

গুলজার বললে কে-ই বা না শুনে থাকতে পারে!
এরপর তিনি অনেকের স্মৃতি রোমন্থন করলেন। সবচেয়ে মনে রাখার মত “মেরা কুছ সামান” গান তৈরি হওয়ার গল্পটা।

দীর্ঘ কবিতাটা লিখে নিয়ে গুলজার গেছিলেন রাহুল দেববর্মনের কাছে, সুর করে দেওয়ার অনুরোধ নিয়ে। রাহুল দৈর্ঘ্যটা দেখেই উড়িয়ে দেন “এত বড় গান হয়! এরপরে কোনদিন টাইমস অফ ইন্ডিয়া নিয়ে এসে বলবে এটায় সুর দিয়ে দে।” তারপর কাগজটা টেনে নিয়ে পড়েন আশা এবং আপন মনে একটা সুর দিয়ে “লওটা দো” গেয়ে ওঠেন। সেটাই রাহুলকে উৎসাহিত করে হঠাৎ এবং কোলবালিশ আর হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে খানিকক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায় এদেশের শ্রেষ্ঠ মনখারাপ করা প্রেমের গানগুলোর একটা।

এইসব কথাবার্তার মাঝে নন্দনের সাউন্ড সিস্টেম কখন গুলজারের বাধ্য হয়ে উঠেছে। তারপর সন্ধে যত এগোল, গুলজার ঝমঝমে দিনের ময়ূরের মত পেখম মেলতে শুরু করলেন। রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করতে গিয়ে তাঁর অনুভবের কথা বললেন, কেন অকিঞ্চিৎকর প্লুটো তাঁর কবিতার বইয়ের নাম হয়ে উঠল সেকথা বললেন। এবং অবশ্যই কবিতা। এখন কীভাবে সব ছেড়ে কবিতা নিয়ে পড়ে আছেন সেকথা বললেন।

দেশের ৩২টা ভাষার ২৭৫ জন কবির কবিতা এ পর্যন্ত অনুবাদ করে সংকলিত করে ফেলেছেন, সংখ্যাটা আরো বাড়বে। এঁরা সবাই গুলজারের জীবনকালের মধ্যে লিখেছেন, এমন কবি। এখনো লিখছেন, এমন কবি। চুরাশি বছরের লব্ধপ্রতিষ্ঠ মানুষটা বললেন “এই সংকলনটা করতে গিয়ে আমি অনেক জানলাম, শিখলাম।” কী শিখলেন?

প্রথমত, মারাঠি, মালয়ালম আর বাংলা ছাড়া কোনো ভারতীয় ভাষায় এই মুহূর্তে ছোটদের জন্য কবিতা লেখা হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, দেশের সেরা কবিতাগুলো লেখা হচ্ছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভাষাগুলোয়। আর “কমপার্টমেন্ট মে জীনে কি আদত হো গয়ি হ্যায় ইস দেশ মে হামলোগোঁ কো। আসাম মে কুছ হোগা তো সির্ফ আসাম কে লোগ হি লিখেঙ্গে উস পর। সাউথ সে কোঈ নহি লিখেগা। দিল্লী সে কোঈ নহি লিখেগা।”

তবে সন্ধ্যের সেরা সময়টা এল আরো পরে, যখন গুলজার নিজের কবিতা পড়তে শুরু করলেন। প্লুটো নামের যে বইটা প্রকাশ হল, তাতে মূল কবিতার বাংলা অনুবাদগুলো বাঙালিদের লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মত। গোটা দুয়েক পড়া হতেই ব্যাপারটা বুঝে গুলজার অনুবাদককে আর পড়ার সুযোগ দিলেন না। তারপর শুধু গুলজার আর তাঁর গুণমুগ্ধরা ছিলেন সেখানে। অনুপুঙ্খ বিবরণ অবশ্য বলবে বাংলার এক কবি, প্লুটোর অনুবাদক, পান্তাভাতের অনুলেখিকা, বলিউডের এক জনপ্রিয় সুরকার — এঁরাও উপস্থিত ছিলেন।
শুধু ‘সরহদ’ এর মত পরিচিত এবং গ্রন্থিত কবিতা নয়, সুদূর ব্যালকনি থেকে দেখলাম কাগজে লেখা টাটকা কিছু কবিতাও গুলজার আমাদের উপহার দিলেন। ভাবছেন বুঝি চারিদিকের নানা সংকট থেকে বিযুক্ত হয়ে গুলজার আর আমরা কয়েক ঘন্টার জন্যে পলাতক হয়ে গেছিলাম? তাহলে একেবারে শেষদিকে পড়া একটা কবিতা উদ্ধৃত করি:

উসনে জানে কিঁউ অপনে দাঁয়ে কন্ধে পর

নীল গায় কা ইক ট্যাটু গুদওয়া থা

মর জাতা কল দঙ্গোঁ মে,

অচ্ছে লোগ থে…

গায় দেখকে ছোড় দিয়া!!

এই অবিস্মরণীয় সন্ধ্যায় আমার আর গিন্নী তুলিরেখার এক পাশে ছিল স্নেহভাজন অর্ণব আর স্বাগতা, অন্য পাশে সস্ত্রীক প্রিয় মাস্টারমশাই শামিমবাবু। এমন দিনের বন্ধুদের ভোলা যায়!

গুরুর ধর্ষণ মাপ

ঊনবিংশ শতাব্দীতে লেখা হুতোম প্যাঁচার নকশায় দেখছি খোদ বাংলায় হিন্দু বাড়িতে মেয়ের বিয়ে হলে পরিবারের গুরু ফুলশয্যায় বসে থাকতেন। তিনি “প্রসাদ করে দিলে” তবে স্বামী-স্ত্রী মিলিত হতে পারত। হুতোম সকৌতুকে লিখেছেন কিভাবে এক পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত স্বামী খাটের তলায় লুকিয়ে থেকে যথাসময় বেরিয়ে এসে এক গুরুর মাথা ফাটিয়ে দেন, অতঃপর প্রাণভয়ে গুরুরা এই প্রসাদ করার অভ্যেস ত্যাগ করেন

মনে রাখবেন, ২০১২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যখন এক ধর্ষিতা আর তার সঙ্গী দিল্লীর ঠান্ডায় উলঙ্গ, রক্তাক্ত, মৃতপ্রায় অবস্থায় রাস্তায় পড়েছিল তখন তাদের সাহায্য করতে একটি মানুষও এগিয়ে আসেনি অথচ তা নিয়ে মোমবাতি মিছিল করতে লোকের অভাব হয়নি। আর ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট একজন ধর্ষকের শাস্তির প্রতিবাদে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায়। নিরস্ত্র, নিরীহ অবস্থায় নয়, রীতিমত খুনে মেজাজে। টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গেছে বহু মহিলা এই ধর্ষকটির জন্যে কান্নাকাটি করছেন। মগজধোলাই কোন পর্যায়ে গেলে এটা সম্ভব একবার ভেবে দেখুন। মানলাম যে এই ভিড় সংগঠিত করা হয়েছে গোলমাল পাকানোর জন্য। কিন্তু একজন ধর্ষককে সমর্থন করার জন্যে এত লোককে সংগঠিত করা যে সম্ভব হচ্ছে (যে মূল্যেই হোক) তা মগজধোলাই ছাড়া একেবারেই অসম্ভব। সেই মগজধোলাইটা কী এবং কত প্রাচীন সেটা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিৎ।
ঘটনা হল যে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার গর্ব আমরা করে থাকি, এটা তার এক বিরাট উত্তরাধিকার। দেবদাসী এদেশের অতি প্রাচীন প্রথা তবে সেটা মন্দিরে সীমাবদ্ধ। কিন্তু শিষ্যদের বাড়ির মেয়েরা গুরুর ভোগ্য — এ বিশ্বাসটার ইতিহাসও কিন্তু আমাদের দেশে বেশ লম্বা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে লেখা হুতোম প্যাঁচার নকশায় দেখছি খোদ বাংলায় হিন্দু বাড়িতে মেয়ের বিয়ে হলে পরিবারের গুরু ফুলশয্যায় বসে থাকতেন। তিনি “প্রসাদ করে দিলে” তবে স্বামী-স্ত্রী মিলিত হতে পারত। হুতোম সকৌতুকে লিখেছেন কিভাবে এক পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত স্বামী খাটের তলায় লুকিয়ে থেকে যথাসময় বেরিয়ে এসে এক গুরুর মাথা ফাটিয়ে দেন, অতঃপর প্রাণভয়ে গুরুরা এই প্রসাদ করার অভ্যেস ত্যাগ করেন। অতএব ঐ যে দেড় লক্ষ লোক মনে করেছে তাদের গুরু নির্দোষ, ঐ যে সাক্ষী মহারাজ বলে শাসকদলের এক গেরুয়া মাফিয়া ধর্ষণ প্রমাণিত হওয়ার পরেও গুরমিত নামক বরাহনন্দনটিকে পুণ্যাত্মা বলেছে, এরা কিন্তু সত্যিই মনে করে গুরুর অধিকার আছে শিষ্যাদের একটুআধটু ভোগটোগ করার। আমাদের এই ধর্মশাসিত দেশে ব্যাপারটা এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। গুরুবাদী দেশ তো। “মহাজনো যেন গতঃ স পন্থা।” ফলে এদেশের অধিকাংশ পুরুষই মনে করে ধর্ষণ তার জন্মগত অধিকার। যাদের পেটে বিদ্যে আছে, ঘটে বুদ্ধি আছে — তারা এই মনোভাব গোপন করতে জানে, বাকিরা জানে না। ঠিক এই কারণেই আইন marital rape বলে কোনকিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করে না, ধর্ষণের আইন অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীর সাথে যৌন সংসর্গ ধর্ষণ বলে গণ্য হলেও অপকম্মটি মেয়েটির স্বামী করলে ধর্ষণ বলে ধরে না। এই আমাদের প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য, যা সমস্ত নারীকেই মা বলে ভাবতে শেখায় আর পুরুষকে শেখায় যে কোন নারীকেই সে ইচ্ছে হলেই মা বানিয়ে দিতে পারে, দোষ নেই। ভাগ্যিস সায়েবরা এসে আমাদের পাশ্চাত্যের আদবকায়দা শিখিয়ে নষ্ট করে দিয়েছিল, নইলে রামমোহন, বিদ্যাসাগরের লাশ পড়ে যেত তবু এদেশের মেয়েরা সতী হয়েই চলত, বালবিধবারা পাড়া প্রতিবেশীর সন্তানের মা হয়েই চলত। দেশের শিল্পোন্নত রাজ্যগুলো আবার এই পিছিয়ে পড়া বাংলার মত রামমোহন, বিদ্যাসাগর পায়নি কিনা তাই উনিশশো আশির দশকেও রূপ কানোয়ারকে সতী বানিয়েছে। শাহ বানোর নামটা মনে রাখা সোজা, এই মহিলার নামটা মনে পড়ে না সহজে।
নেহরু, আম্বেদকরদেরও বলিহারি। যে দেশ যা নয় তাকে তাই করে তোলার চেষ্টা! কতবড় সাহস! দেশের লোক গুরু ছাড়া বাঁচতে পারে না আর ওনারা বানাতে গেলেন সেকুলার দেশ। যত্তসব বিদেশী শিক্ষায় শিক্ষিত মোগল আর সোনার চাঁদের দল। এতদিনে দেশটা ধর্মের পথে ফিরছে, গুরুদের হাতে ফিরছে

ধোঁকা ধোঁকা ধোঁকা

এখন অব্দি যা খবর তাতে সুপ্রিম কোর্ট একটি ছ মাসের জন্য ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন। ছ মাসের জন্য কারণ মুসলমান মহিলাদের অধিকার রক্ষায় বিদ্যাসাগরের মত লড়ছেন যে ভদ্রলোক, তাঁর সরকার নাকি মুসলমানদের বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে কোন নতুন আইন টাইন করতে চান না। সেটা না করলে পরিস্থিতি ছ মাস পরে আবার পুনঃ তাৎক্ষণিক তালাক ভব হয়ে যাবে।
“আমরা” অবশ্য ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন ইত্যাদি জানিয়ে দিয়েছি এই রায়টার জন্যে। কারণ তাতে “আমাদের” এইটা ভাবতে সুবিধা হয় যে “আমাদের” নেতা “ওদের” মহিলাদের উদ্ধার করলেন। মামলাটা যে করেছিলেন মুসলমান মহিলারাই, এতদিন নিজেদের অধিকারের জন্য লড়লেন তাঁরাই সেটা ভুলে যেতে সুবিধা হয়। রায়টাও যে দিলেন বিচারপতিরা, মোদীবাবু নয় — সেটাও চেপে যাওয়াই ভাল কারণ আদালতের রায় বললে নেশাটা ঠিক জমে না। বিচারকদের তো আর দেখেশুনে, পছন্দ করে কপালে ভোটটি দিইনি। ফলে ওনাদের “আমাদের” লোক বলে ভাবতে এখনো একটু অসুবিধা হয়। তাছাড়া জহরকোট আর শ্বেতশুভ্র দাড়িতে যে মহারাণা প্রতাপসুলভ আবেদনটা আছে সেটা ঢলঢলে কালো কোটে কোথায়? অতএব যাঁর অবদান এই রায়ে গোটাকতক বক্তৃতা আর টুইট বৈ কিছু নয়, তাঁকেই কৃতিত্ব দিতে হবে।
দাঁড়ান, দাঁড়ান। অত অজ্ঞ ভাববেন না। এখুনি বলবেন তো “রাজীব গান্ধী যখন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে মুসলমান মহিলাদের অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দিলেন না তখন কোথায় ছিলেন?” তখন আমি অ আ ক খ শিখছিলাম। তবে রাজীব গান্ধী যে অন্যায় করেছিলেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু নিজেকে রাজীব গান্ধীর চেয়ে উৎকৃষ্ট প্রমাণ করতে শুধু আদালতে তাৎক্ষণিক তিনতালাকের (হ্যাঁ, তাৎক্ষণিক, মানে instant triple talaq কেই অসাংবিধানিক বলেছেন সুপ্রিম কোর্ট। তিনতালাককে নয়) বিরুদ্ধে সরকারী উকিলকে দিয়ে সওয়াল করালে তো যথেষ্ট হবে না, দাদা। একটা নতুন আইন করে দেখান।
এইবার অভিন্ন দেওয়ানি আইনের কথা বলবেন তো? সেটা হলেই এটা হয়ে যায়, তাই না? আচ্ছা তাই হোক। মোদীজি আমাদের বলুন শুনি কী কী থাকবে সেই আইনে? নাহয় টুইট করেই বলুন। কী বললেন? ওটা এখনো তৈরি হয়নি? বুঝুন। দেশসুদ্ধ লোকের গোঁফে তেল মাখিয়ে দিলেন এদিকে কাঁঠাল গাছটা কোথায় সেটাই বলতে পারছেন না? তার মানে যদ্দিন অভিন্ন দেওয়ানী আইন না করতে পারছেন তদ্দিন তাৎক্ষণিক তিনতালাকের কোন প্রতিকার করতে পারবেন না? ও হরি! তাহলে আর কী উদ্ধার করলেন মুসলমান মহিলাদের? না মানে এটা ঠিকই যে হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক, মহিলাদের উদ্ধার করতে না পারলে ঠিক নায়ক হওয়া যায় না। আর এদেশের বাস্তবটা হল সত্যিকারের ক্ষমতার জায়গায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষরাই বসে আছে, অতএব তারা অধিকার না দিলে মেয়েরা অধিকার পাবেও না। সুতরাং মোদীবাবুর দিকেই তো তাকিয়ে থাকতে হবে মুসলমান মহিলাদের অধিকার আদায়ের জন্যে। তিনিও যদি মুসলমান বোনেদের দুঃখে এরকম উদাসীন হন তাহলে চলে?

পুনশ্চ: এই স্ট্যাটাস যাঁরা পড়লেন তাঁদের মধ্যে যদি মোদীজির ঘনিষ্ঠ কেউ থাকেন, দয়া করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলবেন মুসলমান বোনেদের উদ্ধারকার্য শেষ করতে বেশি দেরী না করতে কারণ হিন্দু বোনেরা অনেকে বড় কষ্টে আছেন। বিবাহবিচ্ছেদ তো ছেড়ে দিন, কাকে বিবাহ করবেন সেটা ঠিক করার অধিকারটুকু পাচ্ছেন না, বাপদাদার হাতে বেঘোরে খুন হচ্ছেন। অনেকে আবার সাহস করে বিয়েটা করে ফেলেও স্বামীর সাথে শান্তিতে থাকতে পারছেন না, স্বামীর নামে লাভ জিহাদ না কিসব অভিযোগ শুনছেন বাপের বাড়িতে ঘরবন্দী হয়ে। এঁরাই বা মোদীজি ছাড়া কার ভরসায় থাকবেন?

শুনুন ধর্মাবতার

কোটাল বলিলেন “ধর্মাবতার, আমরা গোমাতার সুরক্ষার চিন্তা ত্যাগ করিয়া পাদুকার শুকতলা ক্ষয় করিয়া অনুসন্ধান করিয়া দেখিয়াছি যে ইহাই ঐ রাজ্যে এহেন একমাত্র ঘটনা নহে।”
বিচারকের রক্ত সাইক্লোনকালে ভারত মহাসাগরের ন্যায় উত্তাল হইয়া উঠিল। তিনি উত্তেজনার বশে দাঁড়াইয়া পড়িয়া বলিলেন “বল কি! আরো আছে!”
কোটাল উত্তর করিলেন “তবে আর বলিতেছি কি। আরো দুটি ঘটনার সন্ধান পাইয়াছি যেখানে পিতামাতার প্রতি রুষ্ট হইয়া অবোধ মেয়েটি ভিন্ন ধর্মের এক নরাধমকে বিবাহ করিয়াছে এবং ধর্মান্তরিত হইয়াছে।”
“দু-দুটি ঘটনা! তবে তো এ বড় ভয়ঙ্কর চক্রান্ত, কোটাল মহাশয়! আপনার বাহিনীকে বলুন মাতারক্ষা আপাতত স্থগিত রাখিয়া কন্যারক্ষায় মনোযোগ দিতে।”
এক্ষণে আলোচ্য কন্যার কৌঁসুলি আর্তনাদ করিলেন “ধর্মাবতার, আমার মক্কেল একজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা। এ সম্বন্ধে তাঁহার মতামতটা একবার শুনিয়া দেখুন। তিনি বলিয়াছেন তিনি স্বেচ্ছায় এই বিবাহ করিয়াছেন এবং ধর্মান্তরিত হইয়াছেন।”
বিচারকের সহকারী তাঁর কানে কানে বলিলেন “বাইজোভ, ছোকরা বলে কি! মহিলার আবার স্বেচ্ছা! কোনদিন শুনিব দুগ্ধ দোহনের জন্য গোমাতার অনুমতি প্রয়োজন। তিনি স্বেচ্ছায় দিলে তবেই নেওয়া চলিবে।”
একথায় দুজনে খুব হাসিলেন। হাসির কারণ বুঝিতে না পারিয়া কন্যার কৌঁসুলিদ্বয় একে অপরের পানে ফ্যালফ্যাল করিয়া চাহিয়া রহিলেন। অতঃপর বিচারপতি তাঁহাদের বলিলেন “প্রাপ্তবয়স্ক তো কী হইল? আপনারা দ্যাখেন নাই ইদানীং প্রাপ্তবয়স্করা কেমন শিশুদের মতন আহাম্মকি করিতেছেন? প্রবীণ প্রাক্তন ক্রিকেটার উদ্ভিন্নযৌবনা অনুষ্ঠান সঞ্চালিকাকে দেখিয়া নিজেকে ডিস্কো ড্যান্সার মনে করিতেছেন, সাংবাদিক নিজেকে বিচারক ভাবিতেছেন, অসংখ্য নরনারী মোবাইলকে জীবন আর জীবনকে মোবাইল ভাবিতেছেন, খেলা নিয়ে মেলা অনর্থ ঘটিতেছে এমনকি প্রাণ যাইতেছে। এসব কী করিয়া সম্ভব হইতেছে? না মগজধোলাই করিয়া। অতএব মগজধোলাই করিলেই যে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে দিয়া যা খুশি করাইয়া নেওয়া যায় ইহা বুঝিতে আপনাদের অসুবিধা হওয়া উচিৎ নহে।”
কন্যার কৌঁসুলি মাথা নাড়িয়া বলিলেন “যথার্থ, ধর্মাবতার। আপনি নির্ভুল। সত্যই আজকাল ভূমিকাগুলি বড্ড গুলাইয়া যাইতেছে। মন্ত্রীদের বিচারক মনে হইতেছে, বিচারককে প্রচারক মনে হইতেছে। তেনাদেরও মগজধোলাই হইয়াছে কিনা তাহাও তদন্ত করিয়া দেখা দরকার।”

*উপরের কথোপকথনটি কাল্পনিক। কোন বাস্তব ঘটনা বা চরিত্রের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয়

ছবিটা

বাড়ির রেকর্ড প্লেয়ারে হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং তাঁর দলবলের একটা রেকর্ড খুব বাজত। তাতে শঙ্খচিল বলে একটা গান ছিল। প্রশান্তের বুকে হিরোশিমা দ্বীপে বাস করা এক শঙ্খচিলের গল্প ছিল সেই গানে, যে ভালবাসত সাগরিকাকে। তার চোখে হিরোশিমার ধ্বংস কেমন লেগেছিল সেই গল্প। তখন থেকেই হিরোশিমাকে চিনি, নাগাসাকিকেও

আমাদের স্কুলজীবনের গোড়ার দিকে অফসেট প্রিন্টিং সুলভ ছিল না। সরকারের দেওয়া পাঠ্যবইগুলো ছিল ব্লক প্রিন্টিং, সে বইতে ফটোগ্রাফ থাকত না, থাকত স্কেচ। সম্ভবত ক্লাস ফাইভের ইতিহাস বইতে একটা ছবি ছিল — একটা গর্ত থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। ক্যাপশন ছিল এরকম কিছু: “পরমাণু বিস্ফোরণের পরে হিরোশিমা”। স্কেচ হওয়াতে বীভৎসতা ভাল করে বোঝা যেত না। আমাদের অনেকেরই পরমাণু আর হিরোশিমা শব্দদুটোর সাথে সেই প্রথম পরিচয়। অবশ্য রাজনীতিবিদ বাবার সন্তান আর রাজনীতিবিদ মামাদের ভাগ্নে হওয়ার কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, হিটলার, মুসোলিনি, স্তালিন, রুজভেল্ট, ঠান্ডাযুদ্ধ আমার তখনই পরিচিত। হিরোশিমার সঙ্গে আমার পরিচয় এসব চেনারও আগে। বাড়ির রেকর্ড প্লেয়ারে হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং তাঁর দলবলের একটা রেকর্ড খুব বাজত। তাতে শঙ্খচিল বলে একটা গান ছিল। প্রশান্তের বুকে হিরোশিমা দ্বীপে বাস করা এক শঙ্খচিলের গল্প ছিল সেই গানে, যে ভালবাসত সাগরিকাকে। তার চোখে হিরোশিমার ধ্বংস কেমন লেগেছিল সেই গল্প। তখন থেকেই হিরোশিমাকে চিনি, নাগাসাকিকেও।
যে ফটোগ্রাফটার অনুকরণে পাঠ্যবইয়ের স্কেচটা আঁকা হয়েছিল সেটা দেখি অনেক বড় হয়ে। কিন্তু প্রতিবছর আজকের দিনে আমার স্কুলের প্রার্থনাসভায় (ভগবানের নাম করার অনুষ্ঠান নয়। আমার স্কুলে ঐ জিনিসটা কী অপূর্ব ছিল তা নিয়ে পরে কখনো পোস্ট করব) মাস্টারমশাইরা, বিশেষত ইতিহাসের স্যার শঙ্খবাবু, হিরোশিমা আর নাগাসাকির বীভৎসতা বোঝাতে আর সেইসঙ্গে যুদ্ধ আর ভবিষ্যতে পারমাণবিক যুদ্ধ হলে তা কত ভয়ঙ্কর হবে তা বোঝাতে অনেকখানি সময় ব্যয় করতেন।
বড় হওয়ার পথে যখন ক্রমশ রাজনৈতিক হচ্ছি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রও হয়েছি সেইসময় এই উপমহাদেশে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হল। কোন একটা কাগজ তো মহা উৎসাহে হেডিং দিয়েছিল “ভারত ৫ : পাকিস্তান ৫”। তখনই প্রথম আঁচ পেলাম যে আমাদের চারপাশে অনেকেরই ধারণা পরমাণু বোমা বড়সড় পেটো ছাড়া কিছুই নয়। শত্রুপক্ষের দশটা আছে, মারতে পারে। কুছ পরোয়া নেহি। আমাদের বারোটা আছে। আমরাও মারব। এইরকম আর কি। অতঃপর কারগিল, পাকিস্তান, রক্তলোলুপতা, মারো শালাদের। তখন আবাসিক কলেজে পড়ি। বিজ্ঞানের ছাত্রদের অবৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা অত কাছ থেকে দেখার সুযোগ কমই পেয়েছি। কলেজ পত্রিকায় পদার্থবিদ্যার বিভাগীয় প্রধান দীপক ঘোষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরমাণু বোমার ধ্বংসক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ে লিখেছিলেন। কে শোনে কার কথা! আজ যাদের ভক্ত বলি, তাদের ভক্তির ট্রেলার সেইসময় দেখেছি।
মোটামুটি ঐ সময়েই ‘নির্বাপিত সূর্যের সাধনা’ গ্রন্থের লেখক জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায়, আমার ছোটমামা, বইটার একটা পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। পুরনোটা বাড়ির বইয়ের তাকে অনেকদিন পড়েছিল, আমার পড়া হয়নি। চারিদিকের যুদ্ধবাদী কোলাহল শেষ অব্দি আমাকে দিয়ে নতুন সংস্করণটা পড়িয়ে নেয়। ১৯৪০ এর দশকে যে বোমার ভূগর্ভে বিস্ফোরণ দেখে সংস্কৃতে পণ্ডিত রবার্ট ওপেনহাইমারের মনে পড়েছিল গীতায় বর্ণিত সহস্র সূর্যের বিস্ফোরণের কথা, তার শক্তি ১৯৯৯-২০০০ এ কোথায় এসে ঠেকে থাকতে পারে ভেবে স্তম্ভিত হয়ে যাই।
এরপর ২০০৪। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে এম এ পড়তে ঢুকেছি এবং বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা চলছে দারুণভাবে। সহপাঠী সুদীপ্ত, যাকে তখন কমরেড বলে সম্বোধন করি, হঠাৎ টানতে টানতে নিয়ে গেল ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের রাজ্য কমিটির দপ্তরে। আলাপ করাল এক পাঞ্জাবি পাজামা পরা জাপানি ভদ্রলোকের সঙ্গে। নাম তার জুনিচি কোদামা। জাপান থেকে এসেছে সেদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘আকাহাতা’ র হয়ে আমাদের লোকসভা নির্বাচন রিপোর্ট করতে। জুনিচি ভাঙা ভাঙা ইংরিজি বলতে পারে, হিন্দী বা বাংলা একদমই না। সুদীপ্ত ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দের অনুমতিক্রমে আমাকে জুতে দিল তার সাথে, সহকারী হিসাবে। পথ চিনিয়ে নিয়ে যাব আর স্থানীয় লোকেদের সাথে কথোপকথনে সাহায্য করব।
পরের বছর জুনিচি আবার কলকাতায় এল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ষাট বছর পূর্তিতে কলকাতায় কী হচ্ছে তার প্রতিবেদন লিখবে বলে। এবারে সঙ্গে এল ওর স্ত্রী রিয়েকো আসাতো। রিয়েকো পেশায় দোভাষী। দিব্যি হিন্দি বলতে পারে, চেষ্টা করলে বাংলাও শিখে নিতে পারে ঝটপট। তবু নাকি জুনিচির আমাকেই দরকার। অতএব ওদের সাথে পয়লা সেপ্টেম্বর টো টো করে কলকাতা ঘুরলাম। ওরা অবাক — বিশ্বযুদ্ধ থেকে এতদূরে থাকা একটা দেশে মানুষ সেই যুদ্ধ সম্পর্কে এত জানে! এত লোক সেজন্য মিছিলে হাঁটে! স্কটিশচার্চ স্কুলের মাস্টারমশাইরা ছেলেদের লাইন দিয়ে দাঁড় করাচ্ছেন, তাদের হাতে যুদ্ধবিরোধী প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন। জুনিচির ধারণা হল ছাত্ররা কী নিয়ে এই কান্ড সেসব জানে না, শুধু আদেশ পালন করছে। আমি, শঙখবাবুর ছাত্র আমি, এই অভিযোগ মানব কেন? জনে জনে ছাত্রকে ধরে ধরে প্রশ্ন করতে লাগলাম। তাদের উত্তরগুলো আমার, আমার দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে লাগল। জুনিচিও আপ্লুত। রিয়েকো হঠাৎ আমায় জিজ্ঞেস করল “আচ্ছা, এরা হিরোশিমা, নাগাসাকির কথা জানে?”
“আলবাৎ জানে।”
“দেখি, জিজ্ঞেস কর।”
ছাত্ররা ‘লিটল বয়’, ‘ফ্যাটম্যান’ পর্যন্ত যথাযথ বলে দিল।
সেবার ফেরত যাওয়ার আগে ওরা দুজনে আমাদের বাড়িতে এসেছিল। সেদিন জানতে পারলাম রিয়েকোর বাবা-মা হিবাকুশা। ১৯৪৫ এর ৬ই আগস্ট হিরোশিমায় ছিলেন। রিয়েকো জাপানে যুদ্ধবিরোধী, পরমাণু অস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। যাওয়ার আগে আমাকে ওদের আন্দোলনের স্মারক একখানা লকেট উপহার দিয়ে গিয়েছিল।
নব্বইয়ের দশকে তবু আমরা পরমাণু বোমাকে বড়সড় পেটো ভাবতাম। আজকাল যখন দেখি চকলেট বোমা ভাবা হচ্ছে, “লাহোরে একটা ফেলে দিলেই হয়” বলা হচ্ছে মুহুর্মুহু, যে বলছে সে বোঝেই না যে লাহোরে বোমা পড়লে তেজষ্ক্রিয়তায় আমাদের পাঞ্জাবের দেশপ্রেমিক মানুষও বাঁচবে না, তখন বেশ কষ্ট হয়। নিজের জন্যে নয়, শঙ্খবাবু, ডিজির মত মাস্টারমশাইদের জন্যে; রিয়েকোর জন্যে, তার বাবা-মায়ের জন্যে।
এসব বললে আমার অনেক বন্ধুবান্ধব, অনেক নিকটাত্মীয় সামনে বা পেছনে বলে “নিজেকে কী মনে করে ও? সব ব্যাপারে অন্যরকম কথা বলে নিজেকে এক্সেপশনাল প্রমাণ করতে চায়?”
কী করে বোঝাই বলুন? যারা এসব বলে তারাও কেউ কেউ স্যারেদের ক্লাসগুলো করেছে বটে, রিয়েকোর ছলছলে চোখদুটো তো দ্যাখেনি। ভাল করে তাকালে যেখান দিয়ে আজও সেই দৃশ্যটা দেখা যায় — বিরাট গর্ত, ধোঁয়ার কুণ্ডলী। অফসেট প্রিন্টের চেয়েও পরিষ্কার ছবিটা।

আমাদের মেয়েরা

indianteam

লক্ষ লক্ষ অন্য শুক্রাণুর সঙ্গে লড়াই করে আপনাকে মায়ের জরায়ুতে ঢুকতে হয়েছিল। তারপর আট-ন মাসের নিশ্চিন্ত বিশ্রাম, মায়ের শরীর থেকে পুষ্ট হওয়া, অবশেষে ভূমিষ্ঠ হওয়া। তারপর অন্তত এক-দেড় দশক জীবনযুদ্ধ কী আপনি টের পাননি কারণ আপনার হয়ে যুদ্ধটা করেছেন আপনার বাবা-মা, নিকটাত্মীয় — যদি আপনি পুরুষ হন। যদি আপনি ভারতে জন্মানো মহিলা হন, তাহলে কিন্তু আপনার লড়াইটা মায়ের জরায়ুতে ঢুকে পড়েই শেষ হয়নি। আপনি যে ভূমিষ্ঠ হবেনই তার কোন নিশ্চয়তা ছিল না। দেশের আইন আছে, তার ফাঁকও আছে। সেই ফাঁক দিয়ে কোন অসাধু ডাক্তারের সাহায্যে আপনাকে যে কোনদিন হত্যা করা হতেই পারত। এরকম রোজ, প্রতি সেকেন্ডে ভারতে ঘটছে। এখনো ঘটছে।
অর্থাৎ কাল লর্ডসে আপনি যে এগারোজনকে আকাশনীল জার্সি গায়ে লড়তে দেখলেন, তারা আসলে এগারোটি কন্যাভ্রূণ যাদের হত্যা করা হয়নি। এগারোটি শিশুকন্যা যাদের জন্মানোর পরেই মুখে ধান পুরে দিয়ে বা গরম দুধে চুবিয়ে মেরে ফেলা হয়নি। এগারোটি শিশু যারা, কি ভাগ্যিস, তিনবছর বয়সেই কোন তথাকথিত বাবার লালসার শিকার হয়ে প্রাণ হারায়নি। এগারোটা মেয়ে যারা ঋতুমতী হওয়ার আগে থেকেই ট্রেনে বাসে বাপের বয়সী লোকের কনুইয়ের গুঁতো খেয়েছে। এগারোটা মেয়ে যাদের খেলোয়াড় হয়ে ওঠা দেখে কেউ না কেউ বাপ-মাকে বলেছে “কেমন ব্যাটাছেলেদের মত চেহারা হয়েছে। এর আর বিয়ে দিতে পারবে?” এগারোটা মেয়ে যাদের নিয়ে গত পরশু অব্দি আমাদের কারো তেমন আগ্রহ ছিল না কিন্তু কাল জিতে গেলে “আমাদের মেয়েরা” বলে দাবী করতাম এবং এখন উড়িয়ে দিতে গিয়ে বলছি “কেন নিন্দে করব না? এটা একটা টিম? এখানেও মেয়ে বলে রিজার্ভেশন নাকি?”
নিশ্চিত জানবেন, মিতালী, ঝুলনরা জিতলে আমাদের অবদান তাতে ঘন্টা আর হারলেও আমাদের কোন অধিকার নেই নিন্দা করার। কারণ আমরা এরপরেও বাড়ির মেয়েটা ক্রিকেট খেলতে চাইলে বলব “ছেলেদের সঙ্গে মেয়েরা খেলে না।”

 

এই পথ যদি না শেষ হয়

Rogers Cup presented by National Bank - Day 10

১৯ নম্বর গ্র‍্যান্ড স্ল্যাম খেতাব জয়ের অনেক আগে থেকেই আমরা জানি রজার ফেডরার এমন একজন পুরুষ যিনি প্রকাশ্যে কাঁদেন।
গ্রীক দেবতা আপোলোপ্রতিম চেহারা, তবু আজ অব্দি তাঁর ঢেউখেলানো পেশি আমরা কেউ দেখিনি। কারণ তিনি দেখান না।
যে যুগে সম্পর্কগুলো সুদিনের প্রতিশ্রুতির মতই ভঙ্গুর, সেই যুগে তিনি সেই কবে আলাপ হওয়া মির্কার প্রেমে আজও বিভোর। চার ছেলেমেয়ের জন্মের পরেও। আমাদের মধ্যে কেউ যদি স্ত্রীর প্রতি ভালবাসায় এর অর্ধেকও হয়, তাকে এদেশে আজও আড়ালে স্ত্রৈণ বলা হয়।
অপরকে মাড়িয়ে উপরে ওঠার দর্শনে বুঁদ হয়ে থাকা সময়ে রজার তাঁর ছোটবেলার অকালমৃত্যুর শিকার কোচকে এখনো ভোলেননি। তার বাবা-মাকে নিজের সঙ্গে রাখেন প্রত্যেক গ্র্যান্ড স্ল্যামে।
আগ্রাসন ছাড়া সফল হওয়া যায় না — শেখায় যে পৃথিবী, সেই পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে রজার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী নাদাল সম্পর্কে বলেন “ওর থেকে আমি অনেক শিখেছি। রাফা, তুমি আরো অনেকদিন খেলো। টেনিসের তোমাকে দরকার।”
নিও লিবারেল অর্থনীতির স্বর্ণযুগে বিভিন্ন খেলার অতিধনী তারকারা নিজের নিজের দেশ ছেড়ে মোনাকোয় ঘাঁটি গেড়েছেন ওটা ট্যাক্স হাভেন বলে, অথচ রজার রয়ে গেছেন কল্যাণময় রাষ্ট্রের পতাকা ধরে রাখা মাতৃভূমি সুইটজারল্যান্ডে, গাদা ট্যাক্স দিয়ে।
অধিকাংশ কিংবদন্তী ক্রীড়াবিদ আমাদের দিয়ে যান শেষবার চোখ বোজার আগেও মনে পড়বে এমন কিছু শট আর অবিস্মরণীয় কিছু জয়ের মুহূর্ত। ভেবে দেখুন, রজার এরমধ্যেই তার চেয়ে অনেক বেশি দিয়েছেন। তবু মন ভরেনি। আরো কিছুদিন থাকুন, রজার। “প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে” ফোরহ্যান্ডের অলস মায়া আরো কিছুদিন চলুক।

আমাদের কেউ নেই

এই মেরুকরণে বেশিরভাগ মুসলমান ভোট আর কিছু হিন্দু ভোট তাঁর দিকে পড়লেই তো কেল্লা ফতে। রামনবমীর মিছিলের পরে বোধহয় বুঝেছেন অঙ্ক মিলছে না, তাই এখন আবার নিজেকে বড় হিন্দু প্রমাণ করতে নেমে পড়েছেন। তাঁর পার্টি বজরংবলীর পুজো করছে। তিনি পুরীর মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছেন, উল্টোরথেও জ্বলজ্বল করছেন। কিন্তু যা হবার তা তো হয়ে গেছে। এখন দুই ধর্মের নেতাদের গরম গরম বাণী দিচ্ছেন। এতদিন যে ইদ্রিশ আলিদের পুষলেন, সে পাপ ভাগীরথীতে ধোয়া যাবে কি?

মমতা ব্যানার্জি সত্যবাদী যুধিষ্ঠির — একথা ঘুমচোখে জিজ্ঞেস করলে বোধহয় পার্থ চ্যাটার্জিও বলবেন না। তবু রাজ্যপালের বিরুদ্ধে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যে অভিযোগ করেছেন সেটাকে অবিশ্বাস করার কারণ দেখছি না। তার কারণ দুটো। প্রথমত, কেশরীনাথ ত্রিপাঠী প্রাক্তন আর এস এস প্রচারক। আর এস এস দ্বারা শিক্ষিত একজন লোক ভারতীয় সংবিধানকে খুব সম্মান করে এবং নিজের সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন না করার ব্যাপারে খুব সচেতন — এরকম দাবী করলে ভক্তরা যা-ই বলুন, প্রেতলোকে গোলওয়ালকর, হেড়গেওয়াররা খুব রেগে যাবেন। দ্বিতীয়ত, বিজেপি ব্লক সভাপতির মত কথা এই ভদ্রলোক বলেই থাকেন। কদিন আগে টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারেও বলেছেন।
কিন্তু সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হল ওভাবে কথা বলার সুযোগ ত্রিপাঠীমশাইকে কে করে দিল? উত্তর একটাই। মমতা ব্যানার্জি নিজে।
দেড়শো কোটির দেশে আজকাল মানুষ অপ্রতুল, কিন্তু গরুর কোন অভাব নেই। এক গরুর নিজের ভগবানের মহত্ত্বে এত ঠুনকো বিশ্বাস যে অন্যের ধর্মস্থানে তাঁকে না বসালে শরীরটা বেশ হিন্দু হিন্দু লাগে না। আরেকপাল গরুর আবার নিজের ধর্মের উপরে বিশ্বাস এত ঠুনকো যে সামান্য ফটোশপের ধাক্কাতেই তার অপমান হয় এবং ভাঙচুর, বাড়ি পোড়ানো, মারধর (গণপিটুনিরও দাবী ছিল) না করলে নিজেদের যথেষ্ট মুসলমান মনে হয় না।
কিন্তু কথা হচ্ছে মনে মনে তো অমন অনেকেই ভাবে। এই পরিমাণ হিংসা ছড়ানোর সাহস এদের হয় কখন? তখনই হয় যখন বিশ্বাস থাকে যে “আমার কিস্যু হবে না।” মমতা ব্যানার্জির সরকার সেই বিশ্বাস তৈরি করে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘকাল কোন সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ছিল না। ২০১১ র পর থেকে, ২০১৬ র পরে বিশেষত, একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। সৌভাগ্যক্রমে এর জেরে এখন পর্যন্ত কোন প্রাণহানি হয়নি, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। নইলে আরো বড় আকার নিত। এই ঘটনাগুলোর সবকটাতেই পুলিশ পৌঁছেছে হিন্দী সিনেমার পুলিশের মত দেরীতে। মালদা, চন্দননগর, ধূলাগড়, খড়গপুর, নদীয়া, অধুনা বাদুড়িয়া — এই সংঘর্ষগুলো কেন আগে থাকতে আটকানো গেল না সেটাও বড় প্রশ্ন। প্ররোচনা যে যাকেই দিয়ে থাক, সে প্ররোচনায় আগুন জ্বলার আগেই জল ঢালা গেল না কেন? সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ তাহলে আছে কী করতে?
আসল কথা মমতা এক ভয়ঙ্কর খেলা শুরু করেছিলেন। এখন আর সামলাতে পারছেন না। বিজেপির হিন্দু মৌলবাদের মোকাবিলা করার বদলে মুসলমান মৌলবাদীদের তোল্লাই দিচ্ছিলেন। বস্তুত ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই দিচ্ছিলেন। মুসলমানদের উন্নয়নের জন্যে হাতেকলমে কিছু করার বদলে নজর ছিল মাথায় কাপড় দিয়ে নমাজ পড়ার ভঙ্গিতে ছবি তোলার দিকে। হাস্যকরভাবে সরকারী হোর্ডিং এ লেখা হচ্ছে “নমস্কার এবং সালাম।” যেন বাঙালি মুসলমান কখনো “নমস্কার” শব্দটা উচ্চারণ করে না। এতে কোন গরীব মুসলমানের কোন উপকার হয়নি। যা হয়েছে তা হল ইসলামিক মৌলবাদীদের বিশ্বাস তৈরি যে “দিদি আমাদের কিচ্ছু বলবে না” আর অন্যদিকে হিন্দু মৌলবাদীদের কাজ সহজ করা। তারা দিব্যি হিন্দুদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারছে “দিদি ওদের লোক। হিন্দুবিরোধী।” একইসঙ্গে মমতার আমলে গ্রামে, মফঃস্বলে গত কয়েকবছরে আর এস এস কিভাবে বেড়েছে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় সেটাও দিদির ইচ্ছা।
আদরের দিদি ভেবেছিলেন আর এস এস বাড়লে মুসলমানরা ভয় পাবে, তাঁকে রক্ষাকর্ত্রী হিসাবে দেখবে আর ঢেলে ভোট দেবে। অন্যদিকে মুসলমান মৌলবাদীদের ভয়ে হিন্দুরা যদি বিজেপির দিকে ঢলে পড়ে তো পড়ুক। এই মেরুকরণে বেশিরভাগ মুসলমান ভোট আর কিছু হিন্দু ভোট তাঁর দিকে পড়লেই তো কেল্লা ফতে। রামনবমীর মিছিলের পরে বোধহয় বুঝেছেন অঙ্ক মিলছে না, তাই এখন আবার নিজেকে বড় হিন্দু প্রমাণ করতে নেমে পড়েছেন। তাঁর পার্টি বজরংবলীর পুজো করছে। তিনি পুরীর মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছেন, উল্টোরথেও জ্বলজ্বল করছেন। কিন্তু যা হবার তা তো হয়ে গেছে। এখন দুই ধর্মের নেতাদের গরম গরম বাণী দিচ্ছেন। এতদিন যে ইদ্রিশ আলিদের পুষলেন, সে পাপ ভাগীরথীতে ধোয়া যাবে কি?
এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে রাজ্যের প্রধান প্রশাসক কী বললেন? না তিনি রাজ্যপালের কথায় এতটাই অপমানিত যে পদত্যাগ করবেন ভেবেছিলেন। চমৎকার। বাড়িতে ডাকাত পড়েছে, দাদু সুযোগ পেয়ে চেঁচামেচি করছেন আর মা ছেলেমেয়েদের কী করে বাঁচাব সেটা না ভেবে বললেন “আমি অত্যন্ত অপমানিত। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে বেরিয়ে যাব ভাবছিলাম। তারপর ভাবলাম আমি তো শ্বশুরমশাইয়ের মা নই, আমি ছেলেমেয়েদের মা। তাই গেলাম না। কিন্তু যেতে আমার দু মিনিট লাগবে।”
সঙ্কটমুহূর্তে পদত্যাগ যাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া, তিনি হচ্ছেন আমাদের মুখ্য প্রশাসক! আমাদের যে কে বাঁচাবে!
বিঃ দ্রঃ তৃণমূল, বিজেপি, জামাত ইত্যাদি ছাড়াও এ রাজ্যে আরেকটা রাজনৈতিক শক্তি নাকি আছে বলে খবর। তাদের নাম বামফ্রন্ট। তারা গরু নয়, কচ্ছপ। গতকাল কলকাতায় তারা একটা গনগনে মিছিল করেছে। কিসের বিরুদ্ধে? কলেজ স্কোয়ারে মিটিং, মিছিল নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে। নিষিদ্ধ করার ঘোষণাটা হয়েছিল প্রায় মাসখানেক আগে। অতএব ধৈর্য ধরতে হবে। আর মাসখানেক পরে ওঁরা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে কিছু একটা করবেন আশা করা যায়।

দেশপ্রেম না ছাই

বাস্তবটা হল আপনি যতবড় ক্রিকেটপ্রেমীই হোন, বি সি সি আই একটি স্বশাসিত সংস্থা। আপনি তার ঘন্টা করতে পারেন। আর ক্রিকেটাররা সেই সংস্থার বেতনভুক কর্মচারী। তারা বি সি সি আই এর কাছে দায়বদ্ধ। আপনার জাত্যভিমানের বন্দুক আপনি তাদের ঘাড়ে রাখেন কোন অধিকারে?

ভারতের হয়ে খেলতে নামা ১১ জন ক্রিকেটারকে কেন আপনার জাত্যভিমান রক্ষার দায়িত্ব নিতে হয় বলুন তো? আপনি কে? ওদের কাউকে আপনি দলে নির্বাচিত করেছেন? সে যোগ্যতা আছে? ক্রিকেটাররা তো জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন। যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত তাদের কাছে দায়িত্ববোধ দাবী করলে, প্রত্যেকটা কাজের জবাবদিহি চাইলে তো বলবেন দেশবিরোধী কাজ হচ্ছে। তাহলে যাদের মাইনেকড়ি আপনি দেন না, যাদের যোগ্যতার বিকাশে আপনার কোন প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই, যারা জাতীয় দলে নির্বাচিত হয়েছে নিজেদের যোগ্যতায় (যদি ঘুরপথেও হয়ে থাকে তাতেও তো আপনার কোন ভূমিকা নেই) তারা কেন দেখতে যাবে ম্যাচ জিতে আপনার কোন অহঙ্কার বজায় থাকল কিনা বা হেরে গিয়ে আপনার সম্মানে আঘাত লাগল কিনা?
আপনি বলবেন “আমি দেখি, পয়সা খরচা করি, সেইজন্যই ক্রিকেটে এত টাকা। তাই ওরা ধনী।” তা দ্যাখেন কেন? কেউ আপনাকে বাধ্য করেছে দেখতে? মোদীজি মাইনে পান আপনার আমার আয়করের টাকা থেকে। আইন অনুযায়ী আমি সেটা দিতে বাধ্য, তার বিনিময়ে মোদীজির সরকার আমাকে বিভিন্ন পরিষেবা দিতে বাধ্য, আমার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। কিন্তু আইন আপনাকে ক্রিকেট দেখতে বাধ্য করে না। আপনার ভাল না লাগলে আপনি ক্রিকেট দেখবেন না। পয়সা খরচ করবেন না। চুকে গেল। এভাবে যদি অনেকেই না দেখেন তাহলে বি সি সি আই, মানে কোহলি যে কোম্পানির কর্মচারী, তাদের রোজগার নিঃসন্দেহে কমবে। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে কোহলির দামও কমবে। ফলে তার আয় কমবে। কিন্তু কতটা আয় হলে তার মাইনে বাড়বে বা কমবে কিম্বা কমবে কিনা সেসব কিস্যু আপনার হাতে নেই। কারণ তাকে টাকা দেয় কতকগুলো কোম্পানি। কোহলির দায় অতএব তাদের কাছে, আপনার কাছে নয়।আপনি আসলে ভাবেন বি সি সি আই আপনার সম্পত্তি তাই ক্রিকেটাররাও আপনার সম্পত্তি। এরকম ভাবেন কারণ আপনাকে ভাবানো হয়। চতুর হোটেলমালিক যেমন হোটেলে পা রাখামাত্রই বলেন “নিজের মতন করে থাকবেন, স্যার। আপনাদেরই তো হোটেল।” কিন্তু বাস্তবটা হল আপনি যতবড় ক্রিকেটপ্রেমীই হোন, বি সি সি আই একটি স্বশাসিত সংস্থা। আপনি তার ঘন্টা করতে পারেন। আর ক্রিকেটাররা সেই সংস্থার বেতনভুক কর্মচারী। তারা বি সি সি আই এর কাছে দায়বদ্ধ। আপনার জাত্যভিমানের বন্দুক আপনি তাদের ঘাড়ে রাখেন কোন অধিকারে?
জাত্যভিমান না ছাই। আসলে তো জাতিবিদ্বেষ। ভাগ্যিস রবীন্দ্র জাদেজার নাম রবিউজ্জামান নয়। তাহলেই তো নিজের দেশের ক্রিকেটারকেও বাপ চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করে মীরজাফরের আত্মীয় বানিয়ে ফেলতেন। এমন ভাব করতেন যেন ঐ রান আউটটা না হলেই ভারত হৈ হৈ করে জিতে যেত। তা কোটি কোটি ভারতবাসীর অবদমিত ক্যানিবালিজম চরিতার্থ করার দায় বারবার ক্রিকেটারদের কেন নিতে হবে? শুধু ক্রিকেটারদেরই বা কেন?
 

বুদ্ধিজীবীর নিরপেক্ষতা : নিরপেক্ষতার ভন্ডামি

ভাবলে আরো অবাক লাগে যে হিটলারের বিরুদ্ধে শুধু ইহুদী বিজ্ঞানীরাই গিয়েছিলেন, খাঁটি জার্মান বিজ্ঞানীরা যাননি। ইতিহাস অবশ্য অন্যরকম বলছে। তবে সেক্ষেত্রেও ধরতে হবে ঐ জার্মানরা প্রশংসনীয় কিছু করেননি। আমি অবশ্য এত ভাবছি না। আমি মনে করছি কবি ইতিহাস পড়েন না। বড় কবি তো, শুধু কবিতাই পড়েন। অজস্র মধ্যমেধার বাঙালির মত সামান্য ‘বিশ্বাসঘাতক’ পড়াও তাঁর কাছে সময় নষ্ট।

রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন “যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি”। আজ সকালে শিখলাম বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের এখন এত বুদ্ধি যে আইওয়া পৌঁছলে তবে ইসলামিক স্টেট সম্পর্কে জানতে পারেন। এই শিক্ষাটি আমার হল আনন্দবাজার পত্রিকার উত্তর সম্পাদকীয় স্তম্ভে নামকরা সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখাটা পড়ে। ওঁর কবিতা কিছু কিছু পড়েছি। বেশ লাগে। বলতে কি, শ্রীজাতর চেয়ে বেশি ভাল লাগে। তার উপর আজকের লেখার শিরোনামটার সাথে একমত না হওয়ার কোন প্রশ্নই নেই: “সময় এসেছে ধর্ম না দেখে বিপন্নের পাশে দাঁড়ানোর”। অতএব লেখাটা গোগ্রাসে গিলতে গেলাম। আশা করেছিলাম লেখাটা ভাল হবে। এতটা শিক্ষামূলক হবে ধারণা করতে পারিনি।
কবি লিখছেন “গুজরাত দাঙ্গার পর দু’মাসের মাইনে দিয়েছিলাম। হেঁটেছিলাম বেশ অনেকগুলো মিছিলে। (তখনও জুকেরবার্গ ফুটেজ-বিপ্লবী হওয়ার সুযোগ করে দেননি)। তা সেই মিছিলের কয়েকটায় মহম্মদ সেলিম নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কই সেলিম সাহেবকে কেউ মুসলিম সাম্প্রদায়িক বলেনি তো! আইনস্টাইন যখন রুজভেল্টকে চিঠি লিখেছিলেন ইহুদিদের বাঁচাবার জন্য, কেউ কি তাঁকে ইহুদি-সাম্প্রদায়িক বলেছিলেন? মার্টিন লুথার কিং যে শ্বেতাঙ্গদের অত্যাচারের মোকাবিলা করার জন্য কৃষ্ণাঙ্গদের একে অপরের প্রতি “এক্সট্রিম ইন লাভ” হয়ে উঠতে বলতেন, তার জন্য কি কেউ বলেন যে উনি কৃষ্ণাঙ্গ সাম্প্রদায়িক?”
ইঙ্গিতটা বোঝা গেল? তিনটে উদাহরণ। একটাই মিল। মহম্মদ সেলিম জন্মসূত্রে মুসলমান, মিছিলটা ছিল ব্যাপক মুসলমান হত্যার বিরুদ্ধে। আইনস্টাইন জন্মসূত্রে ইহুদি, আবেদনটাও ছিল ইহুদিদের বাঁচানোর (যদিও এখানে কবি কোন চিঠির কথা বলছেন বুঝলাম না। কারোর জানা থাকলে জানাবেন। জানতে চাই। ম্যানহাটন প্রোজেক্ট নিয়ে চিঠিটা ঠিক ইহুদিদের বাঁচানোর জন্যে লেখা হয়েছিল বলে তো মনে হয় না)। মার্টিন লুথার কিং নিজে কৃষ্ণাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গদের এক হতে বলেছিলেন।
অর্থাৎ কবি ইঙ্গিত করছেন এঁদের কার্যকলাপ যে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো বলে প্রশংসনীয় তা নয়, এঁরা নিজ নিজ কৌমের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে প্রশংসনীয়। ভেবে অবাক লাগছে যে ২০০২ এ সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম একটা মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যেখানে জন্মসূত্রে হিন্দু কোন সিপিএম নেতা যাননি। মানে বিনায়কবাবু তো তেমন কারো নাম করেননি দেখছি। কেউ গিয়ে থাকলে অবশ্য সেটা প্রশংসনীয় নয়। তাঁদের এখন বিবেকের দংশন হওয়া উচিৎ। যেমনটা বিনায়কবাবুর নিজের হচ্ছে। নিজের কৌমের পাশে না দাঁড়িয়ে অন্য কৌমের পাশে কেউ দাঁড়াতে যায়?
ভাবলে আরো অবাক লাগে যে হিটলারের বিরুদ্ধে শুধু ইহুদী বিজ্ঞানীরাই গিয়েছিলেন, খাঁটি জার্মান বিজ্ঞানীরা যাননি। ইতিহাস অবশ্য অন্যরকম বলছে। তবে সেক্ষেত্রেও ধরতে হবে ঐ জার্মানরা প্রশংসনীয় কিছু করেননি। আমি অবশ্য এত ভাবছি না। আমি মনে করছি কবি ইতিহাস পড়েন না। বড় কবি তো, শুধু কবিতাই পড়েন। অজস্র মধ্যমেধার বাঙালির মত সামান্য ‘বিশ্বাসঘাতক’ পড়াও তাঁর কাছে সময় নষ্ট।
ভাল হত কবি যদি এই “নিজের কৌমের পাশে দাঁড়ান” কথাটাই সোচ্চারে গোটা লেখাটা জুড়ে বলতেন। তত্ত্বটা মানতে না পারলেও অন্তত বুঝতাম লোকটার সাহস আছে। কিন্তু না, সে সৎসাহস তিনি দেখাতে পারেননি। এরপরেই শুরু করেছেন, যাকে আজকাল ইংরিজিতে অনেকে বলেন whataboutery।
“কে বলবে এগুলোর বিরুদ্ধে? আমি নিজেই কি বলেছি? বলিনি বলেই মাথা নিচু হয়ে গেল যখন মল্লারপুরের একটি ছেলে বইমেলায় আমাকে বলল, ‘দাদরির পর আপনি খবরের কাগজে লিখেছিলেন, কিন্তু কই আমাদের ইন্দ্রজিৎকে যখন পিটিয়ে মেরে দিল, তখন কিছু লিখলেন না তো?’
কে ইন্দ্রজিৎ? আখলাখের মতো তাকেও পিটিয়ে মারা হয়েছে? জানি না তো! কোথায় ধূলাগড়? উস্তি-ক্যানিং-কালিয়াচক-সমুদ্রগড়-দেগঙ্গা কোথায়? এই পৃথিবীতে? সেখানে যাদের বাড়ি পোড়ানো হয়েছে তারা কারা? মানুষই তো?”
এই অংশটা পড়ে ইন্দ্রজিৎ কে সেটা আমারও মনে পড়েনি। তাই ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করতে হল। করে যা বেরোল তা হচ্ছে বীরভূম জেলার একটি ঘটনা। ‘দ্য হিন্দু’ র প্রতিবেদনে পেলাম ইন্দ্রজিৎ দত্ত বলে এক দোকানদারকে মহরম উপলক্ষে অনেক টাকা চাঁদা দিতে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ। দিতে আপত্তি করায় তাকে মারধোর করা হয় এবং সেই আঘাতের ফলেই কদিন পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। অত্যন্ত দুঃখজনক এবং প্রশাসনের অপদার্থতাজনিত মৃত্যু। কিন্তু আখলাক হত্যার সাথে তুলনাটা মেনে নেওয়া শক্ত। চাঁদার জুলুম আমাদের কারো অপরিচিত নয়, তার জেরে মৃত্যু বিরল হলেও। কিন্তু সেই মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করছেন একটি সংগঠিত হত্যার যার কারণ একজন মানুষের খাদ্যাভ্যাস! তার উপর তন্নতন্ন করে খুঁজেও এমন কোন খবর পেলাম না যে শাসকদলের কেউ ইন্দ্রজিতের হত্যাকারীর পক্ষে একটি কথা বলেছে। আখলাকের বেলায় কিন্তু এক অভিযুক্তের ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু হওয়ার পর তাকে জাতীয় পতাকায় মোড়া হয়েছিল এবং এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছিলেন। একজন কবি তুলনা করছেন এই দুটো ঘটনার? কবিরা আত্মভোলা হন শুনেছি, কাণ্ডজ্ঞানশূন্যও হন নাকি? আরো হাসির কথা এই যে বিনায়কবাবু এই হত্যাকে ভারতে আইসিসের জিহাদের এক নিদর্শন বলে ধরেছেন। চাঁদা দেয়নি বলে পিটিয়ে মারা যদি আন্তর্জাতিক জিহাদ হয়, তাহলে বলতে হবে পাড়ার তোলাবাজের সাথে এল বাগদাদির পার্থক্য কেবল পরিমাপগত।
গত দুবছরে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক অশান্তি লেগেছে। মানুষের ঘরবাড়ি পুড়েছে। প্রশাসনের গড়িমসি বারবার প্রকট হয়েছে। সেজন্যে সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী, বিরোধী দল সকলেই সরকারের অপদার্থতার দিকে আঙুল তুলেছেন, সে বিনায়কবাবু যতই বলুন হিন্দুদের জন্য কেউ বলে না। তবু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে যদি এই কারণে তিনি বিষোদগার করতেন একটুও অন্যায় হত না। কিন্তু আশ্চর্যের কথা তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য মোটেও সরকার নয়। লেখার শেষ প্যারায় গিয়ে কবি বলছেন “বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো-সরস্বতীপুজো-বারের উপোস, নাতির পইতে, দাদুর শ্রাদ্ধ, সব কিছু করার পরে ফেসবুকে নিজেকে ‘নাস্তিক’ দাবি করার এলিটিস্ট ভণ্ডামি এক জন মুসলমান কল্পনাও করতে পারেন না। পারেন না বলেই, কোথাও কোনও মুসলমান অত্যাচারিত হলে তিনি বুক চিতিয়ে তার পাশে দাঁড়ান। দাঁড়ান এক জন মানুষের পাশে আর এক জন মানুষের যে-ভাবে দাঁড়ানো উচিত, সে-ভাবেই। প্রাজ্ঞ হিন্দুরা কবে এক জন অত্যাচারিত হিন্দুকেও মানুষ ভাবতে পারবেন? কবে বলতে পারবেন, সতেরো জন হিন্দু সন্ন্যাসীকে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মারা অন্যায় হয়েছিল? কবে আমি দেগঙ্গা কিংবা ক্যানিং-এর রাস্তায় দাঁড়িয়ে, চিৎকার করে বলতে পারব, ‘প্লিজ পানিশ মি অলসো। আই হ্যাভ ডিসাইডেড টু কল মাইসেলফ, আ হিন্দু।'”
বুঝুন। হিন্দুদের প্রতি যত অত্যাচার, অনাচার, অবিচার হচ্ছে সবের জন্যে দায়ী হলেন সেইসব হিন্দুরা যাঁরা নিজেদের নাস্তিক বলে দাবী করেন। ধূলাগড়, দেগঙ্গা ইত্যাদির জন্যেও দায়ী হলেন নাস্তিকরা। কবিপ্রতিভা এখানে কি মারাত্মক বাইনারি নির্মাণ করল আসলে দেখুন, শিখুন।
বলা হল মুসলমানদের মধ্যে নাস্তিক-ফাস্তিক কেউ হয় না এবং মুসলমান সবসময় মুসলমানের পাশে দাঁড়ায়। অতএব আপনি যদি হিন্দু হন তাহলে ওসব নাস্তিক হওয়াটওয়া ত্যাগ করুন, হিন্দুর পাশে দাঁড়ান। লেখায় অনেক আগেই বলা হয়েছে যে ভারতে আইসিস ঠিক কত হাজার কোটি টাকা যে ঢোকাচ্ছে সেটা “সতর্ক করতে চাইলেও যাঁরা সতর্ক হন না, যাঁরা বিশ্বাস করেন অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ থাকবে, সেই পণ্ডিতদের” জানা নেই (কবির যখন জানা আছে তখন তিনি কেন লিখলেন না সে-ও এক রহস্য)। অর্থাৎ ধর্মযুদ্ধ শিগগির শুরু হবে, আপনি যদি নাস্তিক হন বা সংখ্যালঘুর প্রতি সংবেদনশীল হন, তার মানে আপনি হিন্দু হয়ে হিন্দুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।
হিন্দু এদেশে কিরকম নিপীড়িত, কেমন কুকুর বেড়ালের মত তাদের রাখা হয়েছে সেকথা প্রমাণ করতে কবি বাংলাদেশী হিন্দু, কাশ্মীরি পন্ডিত সকলকেই টেনে এনেছেন। যখন আর কুলোয়নি তখন সেই আশির দশকের বিজন সেতু অব্দি পৌঁছে গেছেন। কিন্তু এত চোখের জলেও বাঁকা হাসিটা লুকনো গেল না। “কাশ্মীরের যে পণ্ডিতগুলো দিল্লির রাস্তায় কাতরাচ্ছে গত পঁচিশ বছর, তাদের যন্ত্রণাতেও কারও বুকটা টনটন করে উঠলে সে তৎক্ষণাৎ বিজেপি বলে চিহ্নিত হয় কেন?” কে যে ওঁকে বিজেপি বলে চিহ্নিত করল উনিই জানেন। গোটা লেখায় যা যা বিজেপির বক্তব্য ঠিক তাই তাই বললেন, তারপর জানিয়ে দিলেন ওঁকে কিন্তু বিজেপি বলা চলবে না।
শিক্ষিত বিজেপি সমর্থকদের এই অভ্যেসটা অননুকরণীয়। সিপিএমের এই দুর্দিনেও কোন সমর্থককে আপনি বলতে শুনবেন না সে কোন পার্টির সমর্থক নয়। কংগ্রেস সমর্থকও তাই। এ রাজ্যে প্রবল প্রতাপান্বিত তৃণমূল সমর্থকরা তো সোচ্চার দিদিভক্ত। কিন্তু বিজেপিভক্ত নরেন্দ্র মোদীর ছবি বুকে আটকেও বলে “আমি কোন পার্টির সাপোর্টার নই।” ওদেরই সবার সমঝে চলা উচিৎ। ওরা কোথায় রেলা নেবে, তা নয়। আসলে সারাক্ষণ যারা ভয় বিক্রি করে তারাও ভীত হয়ে থাকে। বিনায়কবাবুর মত আপনার যদি সিরিয়া, তুরস্কের মুসলমানের আজানের সুর ভাল লাগে অথচ এদেশের কোটি কোটি মুসলমানের এক শতাংশেরও কম যুবকের আইসিসে যাওয়া দেখে মনে হয় ঘরে ঘরে জিহাদের প্রস্তুতি চলছে, তাহলে আর আপনি রেলায় থাকবেন কী করে?
এই রাজ্যে এখনো এক বোকা কবি আছেন যিনি বলেন সত্য বলা ছাড়া কবিতার আর কোন কাজ নেই। চতুর কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য তথ্যের বা বাস্তবের ধার না ধেরে দিব্যি ভয় ছড়ানোর কাজটা করেছেন। সত্য নয়, এখন যে উত্তরসত্যের যুগ।