টুপির আমি টুপির তুমি?

২৬শে নভেম্বর ২০০৮। ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদী হামলা। হতাহতের সংখ্যা, আক্রমণের ব্যাপকতা, দৈর্ঘ্য — যেদিক দিয়েই বিচার করুন। সেই ঘটনার ঠিক দু সপ্তাহ পরে, এগারোই ডিসেম্বর, চেন্নাইয়ের এম এ চিদম্বরম স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের একটি টেস্ট ম্যাচ শুরু হয়। গোটা ম্যাচে পিঠ দেওয়ালে ঠেকে থাকার পর, চতুর্থ দিন বিকেলে ৬৮ বলে ৮৩ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে বীরেন্দ্র সেওয়াগ ম্যাচ জেতার পথ খুলে দিয়ে যান। পঞ্চম দিন সকালে ভারতের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজন, তখন দেশের নয়নমণি শচীন তেন্ডুলকর অপরাজিত শতরান করে ভারতীয় দলকে জেতান। খেলার পরে তিনি বলেন

What happened in Mumbai was extremely unfortunate and I don’t think by India winning or me scoring a hundred, people who have lost their loved ones will feel any better. It’s a terrible loss for all of them and our hearts are with them, but whatever manner we can contribute to making them feel better we’ll make that effort.

(www.telegraph.co.uk)

শোক প্রকাশে যে পরিমিতি জরুরী, তাঁর কথায় শুধু যে তা ছিল তাই নয়, ঐ কথাগুলোর মধ্যে এই উপলব্ধিও রয়েছে যে ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত একটা খেলাই, তার বেশি কিছু নয়। কোন জয়, কোন শতরান মানুষের মৃত্যুর ক্ষতি পূরণ করতে পারে না।
মাঝে এগারো বছর কেটে গেছে। “আশাটাও পণ্য এখন বাজার দরে / বিকোতে পারলে টাকা আসবে ঘরে।“ শুধু আশা নয়, শোকও এখন বিক্রয়যোগ্য। দেশপ্রেম তো বটেই।
তাই দেশসুদ্ধ দেশপ্রেমিকরা হাততালি দিলেন, হর্ষিত হলেন এই দেখে যে বিরাট কোহলি তাঁর দলবল নিয়ে ক্রিকেট মাঠে নামলেন সেনাবাহিনীর টুপি পরে, যে টুপিতে আবার বহুজাতিক ব্যবসায়িক সংস্থা নাইকির লোগো। অর্থাৎ ভারতীয় ক্রিকেটাররা পুলওয়ামার শহীদদের, সেনাবাহিনীর জওয়ানদের এত সম্মান করেন যে তাঁদের সম্মান জানানোর জন্যেও একটা দিন সেলসম্যান হওয়া বন্ধ রাখতে পারলেন না। স্পনসরের লোগো লাগানো টুপি যদ্দিন তৈরি হয়নি তদ্দিন ওঁরা শোকপালন স্থগিত রেখেছিলেন। পুলওয়ামায় হামলা হয়েছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি। এমন নয় যে তারপর থেকে ভারতীয় দল আর মাঠে নামেনি। অথচ শহীদদের সম্মানে একটা ম্যাচের ফি দিয়ে দেব, জওয়ানদের মত ক্যামোফ্লাজ টুপি পরব — এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ধোনি, কোহলির মত বিরাট দেশপ্রেমিকদের লেগে গেল প্রায় এক মাস। আচ্ছা, সিদ্ধান্তটা এমন হল না কেন যে এই দিনটায় যেহেতু সেনাবাহিনীর টুপি পরছি, সেহেতু আমাদের জামা, জুতো, টুপি, ব্যাট, প্যাড কোত্থাও কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের লোগো থাকবে না? যাঁরা জীবন দিলেন তাঁদের জন্যে এটুকু ত্যাগ করতে পারি না, অথচ দেশপ্রেম আমার উপচে পড়ছে? দেশ ভর্তি দেশপ্রেমিক বলিউড তারকা, রাজনীতিবিদ, খোদ প্রধানমন্ত্রী, তাঁর আই টি সেল — সকলে কী করে মেনে নিলেন সেনাবাহিনীর টুপির এই বেসাতি? এরপর তো কোনদিন দেখব তেরঙার মাঝখানে অশোকচক্রের পাশে জিও লোগো। দেশপ্রেমিকরা মেনে নেবেন তো? অবশ্য এতে আপত্তির আছেটাই বা কী? লালকেল্লা তো ইতিমধ্যেই ডালমিয়া রেড ফোর্ট। দেশপ্রেম তো শুধু বিরোধী কণ্ঠ রোধ করার সময়ে পবিত্র, ধরা ছোঁয়ার ঊর্ধ্বে।
ক্রিকেটাররা নিজেদের এক দিনের বেতন দিয়ে দিলেন জাতীয় নিরাপত্তা তহবিলে। চমৎকার খবর। গত বছর কেরালায় ভয়াবহ বন্যা হল, সচরাচর এত বড় বন্যা হয় না। তখন ক্রিকেটাররা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে কদিনের বেতন দিয়েছিলেন মনে করতে পারছি না। আমার মত দেশদ্রোহীরা অবশ্য দেশের ভাল কাজ দেখতে পান না। দেশপ্রেমিকরা কেউ মনে করিয়ে দিলে ভাল হয়। অবশ্য ত্রাণ তহবিলে দান ঠিক ফোটোজিনিক নয়। নিহত জওয়ানদের স্ত্রীরা যা-ই বলুন না কেন, সেনাবাহিনীর নাম করে কিছু করার মধ্যে যে মাচোপনা আছে বন্যাদুর্গতদের সাহায্য করার মধ্যে তা কোথায়?
তাছাড়া ক্রিকেটারদের মাথায় তুলতে তুলতে আমরা যে কৈলাসে তুলেছি, সেখানে বসে গঞ্জিকা সেবন না করেও তাঁদের মনে হতেই পারে ক্রিকেট শুধু খেলা নয়, তাঁরাও নেহাত খেলোয়াড় নন। সকলেই সাক্ষাৎ যোদ্ধা একেকজন। বিরাট ভাবতেই পারেন তাঁর ব্যাটটা এক্কেবারে এ কে ৪৭, ধোনির হেলিকপ্টার শটে চাপিয়ে অভিনন্দন বর্তমানকে পাঠানো হলে তিনি পাক সেনার হাতে ধরা পড়তেন না। ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা যে নিজেদের দেবতা গন্ধর্ব বলে মনে করেন তা তো আমরা দেখেছিই কিছুদিন আগে, যখন দুই তরুণ ক্রিকেটার নিজেদের কার্তিক আর কেষ্ট জ্ঞানে টেলিভিশনের প্রাইম টাইম অনুষ্ঠানে বসে লীলা বর্ণনা করছিলেন। অতএব সেনাবাহিনীর জীবন নিংড়ে নেওয়া ট্রেনিং না নিয়েও, মাসের পর মাস সমস্ত শারীরিক, মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে কাজ না করেও যদি ক্রিকেটাররা মনে করেন তাঁরা আর্মি ক্যাপ পরার যোগ্য, তাঁদের ঠেকাবে কে? “সিয়াচেনে আমাদের জওয়ানরা লড়ছে” বলে যাঁরা সমালোচনার মুখ বন্ধ করেন, নিরীহ লোককে ঠ্যাঙান বা ভোট ভিক্ষা করেন — বিরাটবাহিনীর এই ধ্যাষ্টামোতে তাঁদের আহ্লাদ প্রমাণ করে সত্যিকারের জওয়ানদের প্রতি এঁদের বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই।
বিরাট কোহলি আজ নিজেকে সৈনিক ভেবে আমোদিত হচ্ছেন, তাঁর ব্যর্থতা এবং তাঁর দলের ব্যর্থতাকে যেদিন দেশের মানুষ সেনাবাহিনীর পরাজয়ের মতই মরণবাঁচন সমস্যা মনে করবেন, সেদিন কিন্তু হেরে গেলে গালিগালাজ, মারধোর, বাড়িতে ইঁট পড়া — কোনটাকেই অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ খেলা যে শুধু খেলা নয়, ভারতীয় ক্রিকেট দল যে সেনাবাহিনীর মতই দেশরক্ষার কাজে নিযুক্ত সেটা বিরাটরা নিজেরাই তো প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হয়েছেন। ইতালিতে বিয়ে করতে যাওয়া যায়, সেই সঙ্কটে ওখানে ক্রিকেট খেলতে চলে গেলে লাভ হবে তো?
এসব কেনা বেচার বাইরেও অবশ্য কালকের দিনটা অন্য এক বিপদের জন্ম দিয়ে গেল। বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল ভারতীয় ক্রিকেট সংস্থার কাছে কাঞ্চনমূল্যে আত্মবিক্রীত। তাদের ঠুঁটোপনার কারণেই সম্ভবত খেলার মাঠে সামরিক তথা রাজনৈতিক প্রতীকের প্রবেশ অনুমতি পেয়েছে। পৃথিবীর অন্য কোন খেলায় এ ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে বলে মনে হয় না। কারণ খেলার মাঠকে রাজনৈতিক, সামরিক বিষয়ে মত প্রকাশের মঞ্চ হয়ে উঠতে দিলে খেলাধুলোর রক্তাক্ত শত্রুতা হয়ে উঠতে বিশেষ সময় লাগবে না।
ফুটবলপ্রেমীদের নিশ্চয়ই মনে আছে গত ফুটবল বিশ্বকাপে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে গোল করার পর আলবানিয়ার পতাকায় যে দুমুখো ঈগল থাকে সেটার সম্পর্কে ইঙ্গিত করায় ফিফা সুইজারল্যান্ডের গ্রানিত ঝাকা আর ঝেরদান শাকিরিকে জরিমানা দিতে বাধ্য করেছিল। ঐ দুজনের উদ্বাস্তু জীবন, একজনের বাবার পূর্বতন যুগোস্লাভিয়ায় নির্যাতিত হওয়ার ইতিহাসের কারণে বিশ্বজুড়ে এই সিদ্ধান্তের জন্যে ফিফা সমালোচিতও হয়। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, খেলোয়াড়রা বা দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক চাওয়া পাওয়া, ইতিহাস, ক্ষোভ, রাগ ইত্যাদি খেলার মাঠে প্রকাশ করে শাস্তি না পেলে মাঠে ক্রমশ রাজনীতিই হতে থাকবে, খেলা নয়। ক্রিকেটে সেই সম্ভাবনা গতকাল তৈরি হয়ে গেল। এরপর ভারত বনাম শ্রীলঙ্কার খেলায় যদি শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা রাজীব গান্ধী প্রেরিত শান্তি বাহিনীর হাতে নিহতদের স্মৃতিতে লুঙ্গি ছাপ টুপি পরে খেলতে চায় আই সি সি না বলবে কোন যুক্তিতে? এই কষ্টকল্পনারও প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের খেলায় যদি বাংলাদেশ দল পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন গণহত্যায় মৃতদের স্মরণে দেখতে রক্তের ছিটের মত এমন নকশার জার্সি পরতে চায়, আটকানো হবে কোন যুক্তিতে? রাজনীতি খেলার অ্যাজেন্ডা নির্ধারণ করতে শুরু করলে অচিরেই খেলা রাজনীতির অ্যাজেন্ডা নির্ধারণ করবে। সে বড় সুখের সময় নয়, সে বড় আনন্দের সময় নয়। হন্ডুরাস আর এল সালভাদোরের যুদ্ধ লেগেছিল সামান্য একটা ফুটবল ম্যাচ নিয়ে। আমরা আধুনিক রাষ্ট্রের মানুষ নিশ্চয়ই এই ধ্বংসাত্মক ছেলেমানুষীর পুনরাবৃত্তি চাইব না।
শেষে একটা কথা বলার আছে। অনেকেই বলেন, খেলা কি তার পারিপার্শ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন? খেলাধুলোর ইতিহাসে কখনো কি রাজনীতি ঢুকে পড়েনি? বিশ্বকাপ ফুটবলে আমরা কাকে সমর্থন করছি তার পেছনে কি রাজনীতি থাকে না কখনোই?
সত্যি কথা। খেলা বা খেলোয়াড় তার চারপাশ বাদ দিয়ে নয়। বিশ্বকাপ ফুটবলে আমাদের সমর্থনও প্রায়শই রাজনৈতিক কারণে হয়। খেলাধুলোর ইতিহাসেও বহু রাজনৈতিক ঘটনার পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ প্রভাব আছে।
কিন্তু এই আলোচনায় আমাদের সমর্থনের প্রশ্নটা প্রথমেই বাদ দিতে হবে। কারণ মাঠ থেকে বহু দূরে থাকা সমর্থকের রাজনৈতিক বা সামাজিক পছন্দ অপছন্দ খেলায় প্রভাব ফ্যালে না। যাঁরা মাঠে থাকেন তাঁদের ব্যবহার নিঃসন্দেহে প্রভাব ফ্যালে। সেই কারণেই তাঁদের ব্যবহারেরও নিয়মকানুন আছে। সে নিয়ম ভাঙলে তাঁরা যে ক্লাবকে বা দেশকে সমর্থন করেন তাদের শাস্তি দেওয়ার নিয়মও আছে প্রায় সব খেলাতে। সেই কারণেই চেলসি সমর্থকরা বর্ণবিদ্বেষী গালাগালি দিলে চেলসি পার পায় না।
এবার খেলোয়াড়দের প্রসঙ্গে আসা যাক। রাজনৈতিক বিবৃতির কতকগুলো অবিস্মরণীয়, উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত খেলার মাঠে আছে। কিন্তু সেই বিবৃতি এসেছে খেলার মধ্যে দিয়েই, আক্রমণাত্মক সামরিক পোশাকের মধ্যে দিয়ে নয়। আমার সবচেয়ে প্রিয় দৃষ্টান্তটা দিয়ে শেষ করি।
বার্লিন অলিম্পিক, ১৯৩৬। অ্যাডলফ হিটলার ভেবেছিল আর্য রক্তের বিশুদ্ধতা প্রমাণের সবচেয়ে বড় মঞ্চ তৈরি করবে অলিম্পিকটাকে। অথচ তার নাজি গর্ব গুঁড়িয়ে গিয়েছিল একজন কালো মানুষের পায়ের তলায়। তাঁর নাম জেসি আওয়েন্স। নাজিবাদকে খেলার মাঠে হারিয়ে দিয়েছিল চারটে সোনার মেডেল। মার্কিন সেনাবাহিনীর পোশাক নয়।

ঐ অলিম্পিকেই হকি ফাইনালে হিটলারের জার্মানিকে ভানুমতীর খেল কাকে বলে দেখিয়ে দিয়েছিলেন এক ভারতীয়। তাঁর নাম ধ্যানচাঁদ। পরাধীন দেশের কালো চামড়ার লোকেদের দলের কাছে সেদিন আট গোল খেয়েছিল হিটলারের আর্য রক্তের বীরপুঙ্গবরা। শোনা যায় হিটলার নাকি ধ্যানচাঁদকে জার্মানিতে রেখে দিতে চেয়েছিল৷ হকির জাদুকর পাত্তা দেননি। তাঁর কিন্তু শস্তার জার্সি ছাড়া কিচ্ছু ছিল না।

বিরাট রাজার দরবারে

A lovely day for cricket
Blue skies and gentle breeze
The Indians are awaiting now
To play the West Indies
A signal from the umpire
The match is going to start
The cricketers come on the field
They all look very smart …
Erapalli Prasanna
Jeejeebhoy and Wadekar
Krishnamurthy and Vishnoo (sic) Mankad
Them boys could real play cricket
On any kinda wicket
They make the West Indies team look so bad
We was in all kinda trouble
Joey Carew pull a muscle
Clive Lloyd get ’bout three run out
We was in trouble without a doubt
It was Gavaskar
De real master
Just like a wall
We couldn’t out Gavaskar at all, not at all
You know the West Indies couldn’t out Gavaskar at all
Ven-kat-a-ra-ghavan
Bedi, in a turban
Vijay Jaisimha, Jayantilal
They help to win the series
Against the West Indies
At Sabina Park and Queen’s Park Oval
A hundred and fifty-eight by Kanhai
Really sent our hopes up high
Noriega nine for ninety-five
The Indian team they still survive
It was Gavaskar
De real master
Just like a wall
We couldn’t out Gavaskar at all, not at all
You know the West Indies couldn’t out Gavaskar at all
Govindraj and Durani
Solkar, Abid Ali
Dilip Sardesai and Viswanath
They make West Indies bowlers
Look like second raters
When those fellas came out here to bat
West Indies tried Holder and Keith Boyce
They had no other choice
They even try with Uton Dowe
But ah sure that they sorry they bring him now
It was Gavaskar
De real master
Just like a wall
We couldn’t out Gavaskar at all, not at all
You know the West Indies couldn’t out Gavaskar at all
Little Desmond Lewis
Also Charlie Davis
Dey take a little shame from out we face
But Sobers as the captain
He want plenty coachin’
Before we cricket end up in a disgrace
Bedi hear that he became a father
So he catch out Holford in the covers
But when Sobers hear he too had a son
He make duck and went back in the pavilion
It was Gavaskar
De real master
Just like a wall
We couldn’t out Gavaskar at all, not at all
You know the West Indies couldn’t out Gavaskar at all

মহামান্য বিরাট রাজা সমীপেষু,
ক্রিকেট আর ভদ্রলোকের খেলা নেই আমরা সকলেই জানি। তাই আজকাল ক্রিকেটারদের থেকে মাঠে বা মাঠের বাইরে ভদ্রলোকসুলভ ব্যবহার কেউ আশাও করে না। আজকাল মাঠে যে ক্রিকেটার যত বেশি গালাগালি দেন তিনি তত বেশি ডাকাবুকো। ক্ষিপ্ত বাঁদরের মত দাঁত না খিঁচোলে যে আগ্রাসন প্রকাশ পায় না তা এখন সদ্য প্লাস্টিকের ব্যাট হাতে নেওয়া শিশুও জানে। অতএব আপনি শতরানের পর শতরান করে ভক্তদের রানের ক্ষিদে বাড়িয়ে দিলেও আপনার থেকে দৃষ্টান্তমূলক ভদ্রজনোচিত ব্যবহার কেউ আশা করে না। বস্তুত তেমন কিছু কখনো করে ফেললে আপনার অনেক ভক্ত হয়ত ঈষৎ রুষ্টই হবেন। আপনার অধীনস্থ সৈনিক যজুবেন্দ্র চহল যেমন কিছুদিন আগে এক পাকিস্তানি ক্রিকেটারের জুতোর ফিতে বেঁধে দিয়ে অপ্রয়োজনীয় হাততালির সঙ্গে বেশকিছু নিন্দেমন্দও শুনলেন। ভক্তরা যা আশা করেন তা হল খেলোয়াড়োচিত মনোভাব, লোকদেখানো হলেও। সেটুকুরও অভাব ঘটা পীড়াদায়ক।
সোশাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যে সংক্রমিত ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে কোন এক ক্রিকেটমোদী লিখেছেন তিনি মনে করেন আপনি “overrated” এবং আপনার ব্যাটিঙে কোন বিশেষত্ব নেই। তিনি আপনার ব্যাটিঙের চেয়ে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং দেখতে বেশি পছন্দ করেন। সন্দেহ নেই লোকটি/মহিলাটি নিতান্ত বেরসিক। কিন্তু আপনি নিদান দিয়েছেন অন্য দেশের খেলোয়াড়দের বেশি পছন্দ হলে সেই দেশেই চলে যাওয়া উচিৎ। অদূর অতীতে আপনার নানা আপত্তিকর ব্যবহারের উত্তরে কিছু লিখব ভেবেও লিখিনি। এবার কিন্তু আত্মসংবরণ অন্যায় বলে মনে হচ্ছে। তাই দু কলম না লিখে পারলাম না।
সবে গতকাল আপনাদের ভারতীয় ক্রিকেট দল নির্বিষ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিষ ঝেড়ে উঠল। কুড়ি বিশের সিরিজের ঠিক আগে হওয়া পঞ্চাশ ওভারের সিরিজে আপনি প্রবল ব্যাটিং বিক্রমে আরো একবার ক্রিকেটমোদীদের মুগ্ধ করলেন। ধরে নেওয়া অযৌক্তিক হবে না যে তার ফলে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে আপনার ভক্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন যতই সবার পিছে সবার নীচে জায়গা হোক না কেন, আপনি নিশ্চয়ই জানেন ঐ দ্বীপপুঞ্জের ক্রিকেট দল একদা অবধ্য ছিল। তাদের হাড়ে কাঁপন ধরানো জোরে বোলার আর নির্দয় ব্যাটসম্যানরা বিশ্ব ক্রিকেট শাসন করতেন। এই লেখার শুরুতে রোমান হরফে যে দীর্ঘ অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতাটা দেখা যাচ্ছে সেটা আসলে একটা গান, ক্যারিবিয়ানরা যাকে বলেন ক্যালিপসো। এই ক্যালিপসো রচিত হয়েছিল সুনীল গাভাসকরের বন্দনায়। ১৯৭১ এর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়ে যখন অজিত ওয়াড়েকরের ভারতীয় দল সিরিজ জেতে তখন ওখানকার ক্রিকেটপ্রেমীরা এই গান রচনা করেন। এই গানে প্রায় প্রত্যেকটি ভারতীয় ক্রিকেটারের প্রশংসা করা হয়েছে। কি সৌভাগ্য আমাদের যে সেই সফরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক গারফিল্ড সোবার্স গানটা শুনে বলেননি, ভারতীয় ক্রিকেটারদের অত পছন্দ হলে ভারতে চলে যাওয়া উচিৎ। যদি বলতেন তাহলে এরকম অমর ক্যালিপসো আর আমরা পেতাম না। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট আজ মরণাপন্ন হলেও ক্যালিপসো বেঁচে আছে। ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটারদের পাশাপাশি অন্য দেশের ক্রিকেটারদের নিয়ে একইরকম ভালবাসায় গান লিখেও বেঁচে আছে। খুঁজলে হয়ত আপনাকে নিয়ে লেখা গানও পাওয়া যাবে।
সোবার্সের অবশ্য অমন কথা বলার একটা ব্যবহারিক অসুবিধাও ছিল। তিনি কোন দেশের লোককে ভারতে যেতে বলতেন? ইতিমধ্যে কয়েকবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর করে আসার সূত্রে আপনি নিশ্চয়ই জানেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ বলে একটা ক্রিকেট দল থাকলেও কোন দেশ নেই। ত্রিনিদাদ ও টোব্যাগো, জামাইকা, গায়ানা, লিওয়ার্ড আইল্যান্ড, উইন্ডওয়ার্ড আইল্যান্ড, অ্যান্টিগা প্রভৃতি দ্বীপগুলো প্রত্যেকটাই একেকটা দেশ। ১৯৯৬ বিশ্বকাপের প্রাক্কালে যেমন ভারত আর পাকিস্তানের সম্মিলিত ক্রিকেট দল শ্রীলঙ্কায় খেলতে গিয়েছিল, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল আসলে তেমনই একটা দল। প্রত্যেক ম্যাচের শুরুতে আপনারা আম্পায়ারদের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান, তারপর জনগণমন গান। এতে নাকি দেশের হয়ে খেলার জন্যে আলাদা উৎসাহ পাওয়া যায়, যথোপযুক্ত অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ হয় — এসব আজকাল শুনতে পাই। যখন জেসন হোল্ডার, কার্লোস ব্রাথওয়েটদের পালা আসে তাঁরা কিন্তু কোন জাতীয় সঙ্গীতে গলা মেলান না। কারণ তাঁরা সকলে এক দেশের নাগরিক নন। তাঁরা একটা ক্যালিপসোতে গলা মেলান। চিরকাল ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্ষেত্রে তাই-ই হয়ে আসছে। যে দেশপ্রেমকে আপনি ক্রিকেটের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন তা যে আসলে একটি কাল্পনিক আবেগমাত্র, তার এর চেয়ে বড় প্রমাণ হয় না। ঐ আবেগটির অভাব যে ভাল ক্রিকেট খেলায় বাধা সৃষ্টি করে তাও বলার উপায় নেই। কারণ ক্লাইভ লয়েডের প্রায় অপরাজেয় দলটাও জাতীয় পতাকা বা জাতীয় স্তোত্র ছাড়াই অমন দুর্দমনীয় হয়ে উঠতে পেরেছিল। অর্থাৎ জিততে দেশপ্রেম লাগে না, যোগ্যতা লাগে, প্রতিভা লাগে, ইচ্ছাশক্তি লাগে।
অবশ্য কাল্পনিক হলেও দেশপ্রেম খারাপ কিছু নয় যতক্ষণ তা অকারণে অন্যকে আঘাত করার অস্ত্র হয়ে উঠছে। যখন তা ঘটে তখন আর ওটা দেশপ্রেম থাকে না, হয়ে ওঠে উগ্র জাতীয়তাবাদ। সম্প্রতি জনপ্রিয় যে তুলনাটা সেটা দিয়েই বোঝানো যাক।
“জানি নে তোর ধনরতন আছে কিনা রানীর মতন, শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে।“ এই হল দেশপ্রেম।
“সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।“ এই হল জাতীয়তাবাদ।
আমার দেশ আমার বড় প্রিয়, অন্য দেশের সাথে তুলনা করি না। অর্থাৎ আমি দেশপ্রেমিক। কিন্তু অন্য দেশের সাথে তুলনা না করে আমার চলে না এবং সে তুলনা কখনোই তথ্যনিষ্ঠ হয় না কারণ আমি আগে থেকেই সিদ্ধান্ত করেছি আমার দেশ সব দেশের চেয়ে ভাল — এই মূঢ়তারই অপর নাম জাতীয়তাবাদ।
মাননীয় বিরাট রাজা, আপনি বাংলা পড়তে পারুন বা না-ই পারুন, এ লেখা আপনার চোখে পড়ুক বা না-ই পড়ুক, আপনার অগণিত ভারতীয় ভক্তকুল থেকে অবিলম্বে আওয়াজ উঠবে “কেন? জাতীয়তাবাদী হলে অসুবিধাটা কোথায়?” অসুবিধা এই যে সেক্ষেত্রে নিজের দেশের ত্রুটিগুলো কখনোই আপনার নজরে পড়বে না, ফলে সেগুলোর সংশোধনও হবে না। সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে দুর্বল ইংল্যান্ড দলের সাথে ৪-১ এ সিরিজ হেরেও আপনি দাবী করবেন সিরিজটা আরেকটু হলেই জিতে গেছিলেন। আপনার দলের প্রাজ্ঞ কোচ বলবেন আপনারাই এতাবৎকালের সেরা সফরকারী দল। কোন সাংবাদিক যদি বলেন তথ্য অন্যরকম বলছে তাহলে “It’s your opinion” বলে উড়িয়ে দেবেন। এ কথা চিরকাল প্রকাশ্যে গোপন থাকবে যে এ বছর আপনার দল বিদেশে মাত্র দুটি টেস্ট জিতেছে আর আপনাদের ঠিক পরেই রয়েছে যে দল তার নাম জিম্বাবোয়ে। তারা জিতেছে একটি টেস্ট।
এতৎসত্ত্বেও আপনার মন্তব্যে তত আপত্তি করতাম না যদি তার মধ্যে প্রকট রাজনৈতিক ঘৃণার প্রভাব লক্ষ্য না করতাম। আপনি যে ক্রিকেটজগতের বাইরের ঘটনা সম্পর্কে শচীন তেন্ডুলকরের মত উদাসীন নন, বরং যথেষ্ট আগ্রহী তার যথেষ্ট প্রমাণ আপনি নিজেই দিয়েছেন। নোটবন্দীকে স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ বলে অভিনন্দিত করেছিলেন। নোটবন্দীর সর্বৈব ব্যর্থতা প্রমাণ হওয়ার পরে অবশ্য সুচিন্তিত নীরবতা পালন করেছেন। আপনি টুইটারেও যথেষ্ট সক্রিয়। ফলত এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয় যে “না পোষায় অন্য দেশে চলে যাও” একথা গত কয়েক বছরে কাদের উদ্দেশ্যে কারা প্রয়োগ করেছে তা আপনি জানেন না।
আপনার ও অনুষ্কা শর্মার সুবিজ্ঞাপিত বিবাহবাসরের প্রধান অতিথি নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি, তাঁর সরকার আর দেশ সমার্থক হয়ে গেছে তাঁর সমর্থকদের কাছে। জওহরলাল নেহরু থেকে মনমোহন সিং পর্যন্ত সব প্রধানমন্ত্রীর যথেচ্ছ সমালোচনা হয়েছে, আমার আপনার প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে “গলি গলি মে শোর হ্যায়, রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়” স্লোগান শুনতে শুনতে, অথচ মোদীজির ন্যূনতম সমালোচনা করলেও দেশদ্রোহী হয়ে যেতে হয় এবং শুনতে হয় “Go to Pakistan”। প্রচ্ছন্ন থাকে এই ইঙ্গিত যে ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা মনে প্রাণে ভারতীয় নন বলেই তাঁরা এদেশের সব খারাপ দ্যাখেন। যারা সমালোচনা করে তারাও ঐ দলে এবং এদেশ তাদের দেশ নয়, তাদের দেশ পাকিস্তান। সেখানেই তাদের যাওয়া উচিৎ।
প্রকাশিত ভিডিওতে আপনি যে সুরে, যে ভাষায় জনৈক ক্রিকেটপ্রেমীকে বলছেন আপনার ব্যাটিং ভাল না লাগলে অন্য দেশে চলে যাওয়া উচিৎ, তাতে “Go to Pakistan” এর গগনবিদারী প্রতিধ্বনি। আপনি কে বিরাট? মোদীজির মত আপনিও কি নিজেকে ভারতবর্ষের মূর্ত প্রতীক মনে করেন? মুখঢাকা বিজ্ঞাপন যা-ই বলুক না কেন, শেষপর্যন্ত আপনি একজন খেলোয়াড়। বড়জোর আপনার ব্যাটিং নৈপুণ্যের সুবাদে আপনাকে একজন উঁচুদরের শিল্পী বলা যেতে পারে। কিন্তু ভারতবর্ষ এত বড় একটা দেশ, এত বড় একটা ধারণা যার সামনে আপনি সর্দার প্যাটেলের মূর্তির পদতলে দাঁড়ানো মোদীর মতই ক্ষুদ্র।
হ্যাঁ, ব্যাট হাতে আজ আপনি রাজা কিন্তু নিশ্চিত জানবেন এ রাজত্বের আয়ু বড় অনিশ্চিত। আজ আছে কাল নেই। ক্রিকেট খেলাটাও আপনার চেয়ে অনেক অনেক বড়। যাঁর সঙ্গে প্রায়ই আপনার তুলনা করা হয়, যাঁকে একবাক্যে সব দেশের (আপনার দেশেরও) ক্রিকেটভক্তরা বলতেন “কিং রিচার্ডস”, সেই ভিভকেও অবসর নিতে হয়েছিল নেহাত পদাতিকের মত। তবু যে তিনি আজও অ্যান্টিগার বাইরেও বহু মানুষের হৃদয়ের রাজা হয়ে আছেন তা কিন্তু শুধু তাঁর রানগুলোর জন্যে নয়। রানগুলো থাকে না, মাঠে এবং মাঠের বাইরে ব্যবহারটা থেকে যায়। মাঠের ভেতর খেলার উত্তেজনায় অনেক বাড়াবাড়ি তবু মানা যায়, মাঠের বাইরের অভব্যতা দুর্নামের কারণ হয়।
অবশ্য আপনার চিন্তা নেই। কাউচে বসা এই অসভ্যতা হয়ত অনেক ভক্তের চোখে আপনাকে আরো বড় করবে। আমার শুধু চিন্তা হচ্ছে শচীন ভোগট বলে অস্ট্রেলিয় ছেলেটির জন্যে। তার তেন্ডুলকরভক্ত বাবা-মা সাধ করে ঐ নামটা রেখেছিলেন। এবার অস্ট্রেলিয়া সফরে যদি কোনভাবে সে আপনার সামনে পড়ে যায় তাকে আবার ঘাড় ধরে ভারতে নিয়ে এসে যোগীজিকে দিয়ে নাম বদলিয়ে দেবেন না তো?

ইতি

এক দুর্বিনীত ক্রিকেটপ্রেমী।

[portfolio]

দেশপ্রেম না ছাই

ভারতের হয়ে খেলতে নামা ১১ জন ক্রিকেটারকে কেন আপনার জাত্যভিমান রক্ষার দায়িত্ব নিতে হয় বলুন তো? আপনি কে? ওদের কাউকে আপনি দলে নির্বাচিত করেছেন? সে যোগ্যতা আছে? ক্রিকেটাররা তো জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন। যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত তাদের কাছে দায়িত্ববোধ দাবী করলে, প্রত্যেকটা কাজের জবাবদিহি চাইলে তো বলবেন দেশবিরোধী কাজ হচ্ছে। তাহলে যাদের মাইনেকড়ি আপনি দেন না, যাদের যোগ্যতার বিকাশে আপনার কোন প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই, যারা জাতীয় দলে নির্বাচিত হয়েছে নিজেদের যোগ্যতায় (যদি ঘুরপথেও হয়ে থাকে তাতেও তো আপনার কোন ভূমিকা নেই) তারা কেন দেখতে যাবে ম্যাচ জিতে আপনার কোন অহঙ্কার বজায় থাকল কিনা বা হেরে গিয়ে আপনার সম্মানে আঘাত লাগল কিনা?
আপনি বলবেন “আমি দেখি, পয়সা খরচা করি, সেইজন্যই ক্রিকেটে এত টাকা। তাই ওরা ধনী।” তা দ্যাখেন কেন? কেউ আপনাকে বাধ্য করেছে দেখতে? মোদীজি মাইনে পান আপনার আমার আয়করের টাকা থেকে। আইন অনুযায়ী আমি সেটা দিতে বাধ্য, তার বিনিময়ে মোদীজির সরকার আমাকে বিভিন্ন পরিষেবা দিতে বাধ্য, আমার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। কিন্তু আইন আপনাকে ক্রিকেট দেখতে বাধ্য করে না। আপনার ভাল না লাগলে আপনি ক্রিকেট দেখবেন না। পয়সা খরচ করবেন না। চুকে গেল। এভাবে যদি অনেকেই না দেখেন তাহলে বি সি সি আই, মানে কোহলি যে কোম্পানির কর্মচারী, তাদের রোজগার নিঃসন্দেহে কমবে। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে কোহলির দামও কমবে। ফলে তার আয় কমবে। কিন্তু কতটা আয় হলে তার মাইনে বাড়বে বা কমবে কিম্বা কমবে কিনা সেসব কিস্যু আপনার হাতে নেই। কারণ তাকে টাকা দেয় কতকগুলো কোম্পানি। কোহলির দায় অতএব তাদের কাছে, আপনার কাছে নয়।আপনি আসলে ভাবেন বি সি সি আই আপনার সম্পত্তি তাই ক্রিকেটাররাও আপনার সম্পত্তি। এরকম ভাবেন কারণ আপনাকে ভাবানো হয়। চতুর হোটেলমালিক যেমন হোটেলে পা রাখামাত্রই বলেন “নিজের মতন করে থাকবেন, স্যার। আপনাদেরই তো হোটেল।” কিন্তু বাস্তবটা হল আপনি যতবড় ক্রিকেটপ্রেমীই হোন, বি সি সি আই একটি স্বশাসিত সংস্থা। আপনি তার ঘন্টা করতে পারেন। আর ক্রিকেটাররা সেই সংস্থার বেতনভুক কর্মচারী। তারা বি সি সি আই এর কাছে দায়বদ্ধ। আপনার জাত্যভিমানের বন্দুক আপনি তাদের ঘাড়ে রাখেন কোন অধিকারে?
জাত্যভিমান না ছাই। আসলে তো জাতিবিদ্বেষ। ভাগ্যিস রবীন্দ্র জাদেজার নাম রবিউজ্জামান নয়। তাহলেই তো নিজের দেশের ক্রিকেটারকেও বাপ চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করে মীরজাফরের আত্মীয় বানিয়ে ফেলতেন। এমন ভাব করতেন যেন ঐ রান আউটটা না হলেই ভারত হৈ হৈ করে জিতে যেত। তা কোটি কোটি ভারতবাসীর অবদমিত ক্যানিবালিজম চরিতার্থ করার দায় বারবার ক্রিকেটারদের কেন নিতে হবে? শুধু ক্রিকেটারদেরই বা কেন?