Messi, Mbappe, Pele and Maradona in grand finale

Believers could hold this as proof that matches are made in heaven because there could not have been a more fitting finale to the most competitive World Cup in memory.

One can only see Pele’s Brazil up against Diego Maradona’s Argentina in the FIFA video game, but reality has refused to be left too far behind. It has set up Kylian Mbappe’s France against Lionel Messi’s Argentina. Believers could hold this as proof that matches are made in heaven because there could not have been a more fitting finale to the most competitive World Cup in memory. Japan have beaten Germany; Saudi Arabia have defeated Argentina and Tunisia have beaten France in this edition. Africa got its first World Cup semifinalist in Morocco, who got rid of Spain and Portugal. In short, this World Cup has made the glorious uncertainties of the game the only certainty. In such a World Cup, to have two finalists who started the tournament as favourites feels like a twist in the tale.

There could not be a better final for a neutral. On one hand is Messi, compared both fairly and unfairly to Maradona, in what would be his last World Cup match going by his own assertion. On the other is the obvious heir to Messi’s throne as the best footballer in the world – Mbappe.

Just as Pele was a boy wonder when Brazil won their first World Cup in 1958, Mbappe was an eye-catching teen when France won it in Russia four years back. One could already see his brilliance and wonder what he could become. Today, Mbappe is the scariest predator in attacking third since Brazil’s Ronaldo in 1998 and 2002. The French has scored nine World Cup goals so far and he is just 23. Thus he has broken Pele’s record for most World Cup goals before turning 24. His place among the all-time World Cup greats seems inevitable, especially if he scores in the final. And we are not even discussing his assists, his sheer presence on the field which makes the opposition lose track of threats like Olivier Giroud, Antoine Griezmann or Ousmane Dembele.

How incredible Didier Deschamps’ lot is can be gauged from the fact that they have had all bases covered without having Karim Benzema in attack, Paul Pogba and Ngolo Kante in the midfield. Not that the French defenders have not fluffed their lines at all – they conceded two penalties against England for example – but the imposing figure of Hugo Lloris under the bar has not let them concede many.

This French side has looked unbeatable (not counting the Tunisia loss when Deschamps basically fielded his reserve bench) but they are up against Argentina. Messi’s Argentina. If football is more art than a game for you, it is difficult not to love Messi, no matter which team you support. This, by far, has been his best show at a World Cup. Like Mbappe, Messi has scored five goals so far. But even more captivating has been his overall control of the game, the culmination of which was his hypnotism of Croatian defender Josko Gvardiol in the semifinal. The resultant assist to young sensation Julian Alvarez sealed the final berth and this happened when people were not finished discussing Messi’s final pass to Nahuel Molina for Argentina’s first goal against the Netherlands in the quarterfinal.

Unlike his previous World Cups, Messi, at 35, has looked like a free bird in the company of talents like Alvarez, Lautaro Martinez, Alexis Mac Allister, Rodrigo de Paul et al. They have been so efficient that Lionel Scaloni could give a player of Angel de Maria’s calibre breaks. The defence of Nicolas Otamendi, Cristian Romero, Nicolas Tagliafico, Marcos Acuna et al has been solid after the Saudi disaster. Even more solid has been Emiliano Martinez with the gloves. Two saves in the penalty shootout against the Dutch reminded one of Sergio Goycochea, who kept rescuing Maradona’s side from one shootout after another in Italia 90. Having someone like that under the bar is reassuring for those who think Messi deserves to sign off with the World Cup in his hand, for the joy he has provided millions with for almost two decades.

Read IPL auction: Where privilege holds court

But is Messi really up against France or is he up against Maradona? The emotional genius who took Argentina to glory almost single-handedly in 1986, set the bar so high that even Messi has found it beyond reach till now. The bar shall not be lowered and to be honest, nobody deserves the World Cup more for what he has done over the years. The team that plays better over the all-important 90 minutes deserves it. That was West Germany in 1990 and Germany in 2014. That is why Maradona and Messi had to end those evenings in tears. Maradona is remembered as much for his success as his imperfections. Can squeaky clean Messi script the perfect ending?

Originally published in The Meghalayan

শাহীনবাগ: কী পাইনি তার হিসাব মেলাতে…

ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে। দুটিই একই গোত্রের বাক্য – এমন ধারণা নিয়েই আমরা বুড়োধাড়ি হয়ে উঠেছিলাম। আমরা, মানে যাদের জন্ম স্বাধীনতার অনেক পরে। সূর্যের পূর্ব দিকে ওঠা নিয়ে যেমন আলোচনা করার কিছু নেই, তেমন ধর্মনিরপেক্ষতাও কোনো আলোচ্য বিষয় নয় – এমনটাই আমরা শিখেছিলাম। ধর্মনিরপেক্ষতা যে চর্চা করার জিনিস, তা ভাবিনি। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধূলিসাৎ হওয়ার পরেও সমাজ, রাষ্ট্র বা বিদ্যায়তন এই অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করেনি। অমুক অমুক রাজ্যে দাঙ্গা হয়, আমাদের রাজ্যে হয় না – এই তথ্যটুকুতেই আমাদের প্রয়োজন মিটে গিয়েছিল। অথচ ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র বানাতে চায় যারা, তারা যে একদিনের জন্যও নিজেদের মতাদর্শের চর্চা বন্ধ করেনি বাবরি ধ্বংস তার প্রথম প্রমাণ। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতেই ভারতের নাগরিকত্ব আইন বদলে ফেলা সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

ধর্মনিরপেক্ষতা চর্চার অভাবকে নরেন্দ্র মোদী সরকারের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের মত করে ভরা বাজারে উলঙ্গ করে দিতে পারেনি আর কিছুই। ২০১৯ সালে যখন ওই আইনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হল, তখন প্রথমবার ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা, তার ভালমন্দ নিয়ে খোলাখুলি বিতর্ক শুরু হল। সরকারের উদ্দেশ্য তা ছিল না। কিন্তু এত বড় দেশের সব মানুষকে নিজের মর্জি মত চালাতে মহম্মদ বিন তুঘলক বা ঔরঙ্গজেবই পারেননি, মোদী কোন ছার। দিল্লির শাহীনবাগে পথে বসে পড়লেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, দেশের আরও নানা জায়গায় তৈরি হল অনুরূপ শাহীনবাগ। সে আন্দোলনের দুটি সবচেয়ে ইতিবাচক দিক – মহিলা, বিশেষ করে রক্ষণশীল মুসলমান পরিবারের মহিলারা আন্দোলনের নেতৃত্ব হাতে তুলে নিলেন; আর তরুণ-তরুণীরা পথে নেমে এল। আমরা যারা জরুরি অবস্থা দেখিনি, তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিনি, তারা তো অল্পবয়সীদের রাজনৈতিক উদাসীনতাতেই অভ্যস্ত। নিজেরাও উদাসীন ছিলাম।

কোভিড-১৯ এসে না পড়লে দেশের অযুত শাহীনবাগ থেকে কী প্রাপ্তি হতে পারত সে আলোচনায় আজ আর লাভ নেই। কিন্তু মানতেই হবে, নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলনে আর কিছু না হোক, সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। সংখ্যার জোরে আইন পাস করিয়েও আজ পর্যন্ত নাগরিকত্ব দেওয়ার নিয়মকানুন ধার্য করে দেশব্যাপী কাজটা শুরু করতে পারেনি। এনপিআর-এনআরসির জুজু এখনো দেখানো চলছে, কিন্তু আসামের বিভীষিকাময় কর্মসূচির জাতীয়করণ আজও সম্ভব হয়নি।

আরো পড়ুন বিজেপি মুখপাত্র বিতাড়ন: হিন্দুত্বের টাইম আউট, খেলা শেষ নয়

নিঃসন্দেহে অপ্রাপ্তি অনেক। শাহীনবাগ ও তদ্রূপ আন্দোলনগুলোর পাশে মৌখিকভাবে দাঁড়ালেও বিজেপি বাদে দেশের অন্য দলগুলো সক্রিয় অবস্থান নিতে পারেনি। ফলে আন্দোলন অলিগলিতে ছড়াল না। ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা না থাকার ফলস্বরূপ সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ ভাবলেন, ওটা মুসলমানদের আন্দোলন। নাগরিকত্ব গেলে ওদের যাবে, আমাদের কী? ধর্মনিরপেক্ষতা চর্চার যে সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল তা হাত গলে ম্যানহোলে তলিয়ে গেল।

তবে থেকে যাবে কিছু দৃশ্য, যাদের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। মিছিলে পাশাপাশি আম্বেদকর আর গান্ধীর ছবি হাতে হাঁটছে যুবক-যুবতী। ‘কলকাতার শাহীনবাগ’ পার্ক সার্কাসে ঠিক মাঝখানে বসানো হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে, সমবেত জনতা গাইছে ‘জনগণমন’। তাছাড়া শাহীনবাগের নামে মিথ্যে দোষারোপ করে লাগিয়ে দেওয়া দিল্লি দাঙ্গায় নিষ্ক্রিয়তা থেকে, এমনকি নিজের দলের মুসলমান নেতাকেও বিসর্জন দেওয়া থেকে চেনা গেল আসল অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে। জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা। আমীর আজীজের ভাষায় ‘সব ইয়াদ রখখা যায়েগা’।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

‘রাজ, দিলীপ, দেব: যুগের স্বপ্ন সাফল্য ব্যর্থতার ধারক’

এখনকার অক্ষয় কুমার ইত্যাদিদের ছবি থেকে তো ভারতবর্ষের দারিদ্র্যের ইতিহাসটাকেই মুছে দেওয়া হয়েছে। কুষ্ঠরোগীর সঙ্গে যেমন এককালে মানুষ অস্পৃশ্যের মত ব্যবহার করত, এখনকার হিন্দি সিনেমা দরিদ্রের প্রতি সেই মনোভাব নিয়েছে।

আজ রাজ কাপুরের জন্মদিন, তাঁর শতবর্ষ হবে ২০২৪ সালে। গত রবিবার শতবর্ষে পড়লেন দিলীপকুমার। দেব আনন্দও শতবর্ষ পূর্ণ করবেন বছর ঘুরলে। স্বাধীনোত্তর ভারতে হিন্দি ছবির বিপুল জনপ্রিয়তার পিছনে এই তিনজনের অবদান অতুলনীয়। আজ আসমুদ্রহিমাচলে বলিউড নামে পরিচিত মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ভূমিকা যেখানে এসে পৌঁছেছে, তাতে ওই ত্রয়ীর কাজকে ফিরে দেখা প্রয়োজন মনে করে নাগরিক ডট নেট সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের দ্বারস্থ হয়েছিল। তিনি যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর তো দিলেনই, উপরন্তু আলোচনায় এসে পড়লেন উত্তমকুমার, এল দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে। যেমন ঢুকে পড়লেন ইউরি গ্যাগারিন, তেমনি এসে গেল কহো না পেয়ার হ্যায়। নাগরিকের পক্ষ থেকে কথা বলেছেন প্রতীক।

রাজ

স্বাধীনতার পর থেকে হিন্দি সিনেমার যে বিপুল জনপ্রিয়তা, হিন্দিভাষী নন এমন মানুষকেও যেভাবে তা প্রভাবিত করেছে তাতে এই তিনজনেরই তো অনস্বীকার্য প্রভাব। আজকের জনপ্রিয় হিন্দি ছবি যে পথে চলেছে তার সাপেক্ষে ওঁদের কীভাবে দেখেন?

প্রশ্নটা খুব আকর্ষণীয় এবং কিছুটা দূরপ্রসারী। যে মুহূর্তে ভারতীয় চলচ্চিত্রে রাজ কাপুর, দিলীপকুমার এবং দেব আনন্দ প্রবেশ করছেন তখন যে ধরনের সাংস্কৃতিক বাতাবরণ ছিল, একটা সদ্য স্বাধীন দেশে যে ধরনের গঠন প্রক্রিয়া চলছিল এবং আমাদের রাজনীতি যেভাবে আবর্তিত হচ্ছিল, তার সমস্তটাই জনপ্রিয়তার আবরণ সরিয়ে দিলে দিলীপকুমার, দেব আনন্দ এবং রাজ কাপুরের মধ্যে দেখা যায়। একথা অনস্বীকার্য যে পাঁচের দশকে মেলোড্রামার পৃথিবীতে একইসঙ্গে পশ্চিমে দিলীপকুমার, রাজ কাপুর ও দেব আনন্দ; দক্ষিণে শিবাজী গণেশন এবং পূর্বে উত্তমকুমার যে মায়াবী সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন তার কোনো পুনরাবৃত্তি ভারতীয় সিনেমায় আর হবে না সম্ভবত।

মুম্বাইয়ের ত্রয়ীর মধ্যে দিলীপকুমার অবশ্য একটু আলাদা, কারণ রাজ আর দেব প্রোডাকশন হাউসের মালিক হয়ে উঠেছিলেন। দিলীপকুমারের তেমন কোনো ঠিকানা ছিল না। কিন্তু মোদ্দা ব্যাপারটা এইরকম যে যা ছিল রানীর কণ্ঠহার, মানে ‘কুইন’স গোল্ডেন নেকলেস’, তা ওই সময়ে অস্তমায়ায় করুণ রঙিন; উপনিবেশের স্মৃতি ক্রমশ আবছা হয়ে জেগে উঠছে নির্বাচিত সাধারণতন্ত্র; বিদায় নিচ্ছেন অশোককুমার, বলরাজ সাহনিরা। এই সময়ে তাঁদের নায়কোচিত অবস্থানে এসে পড়লেন দিলীপকুমার; সঙ্গে সঙ্গে রাজ কাপুর আর দেব আনন্দ। কিন্তু ব্যাপারটা যে শুধুই ঘটনা হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ তা নয়। সমাজতাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলেও সে সময় ক্রমশ গ্রাম এসে শহরে ভিড় করছে। নানারকম অবসিত পল্লী শহরের আনাচে কানাচে। তখন আমাদের অজান্তেই জাতি গঠনের রূপকথা নানারকম বাঁক নিচ্ছিল। মনে রাখতে হবে, সত্যজিৎ রায়ের অপূর্ব কুমার রায় যখন কলকাতায় প্রবেশ করে নবীন নাগরিক হওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে, প্রায় তখনই শাপমোচন ছবির নায়ক উত্তমকুমার গ্রাম থেকে কলকাতায় চলে আসেন। এই স্থানান্তর উপলক্ষে উত্তমকুমার জনসাধারণের মন লুঠ করে নেন।

আপনি বলছেন একই ব্যাপার রাজ কাপুরদের ক্ষেত্রেও হিন্দি ছবিতে ঘটেছিল?

ঠিক তাই। কলকাতার মতই তৎকালীন বম্বে শহরের মধ্যেও এক অলীক গ্রাম তৈরি হয় সিনেমার পর্দায়। উত্তমকুমারের মতই রাজ কাপুর এবং দিলীপকুমার শহুরে লোকগাথার অবিসংবাদী সম্রাট হয়ে উঠেছিলেন। এই হল মেলোড্রামার আদর্শ মুহূর্ত, যেখানে বুর্জোয়া সভ্যতার ট্র্যাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে কিছু বাধ্যতামূলক নৈতিকতা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। বস্তুত দেশভাগ, গ্রাম-শহরের দ্বন্দ্ব, নগরায়নের দোলাচল কিছু আধিক্য তৈরি করে, অতিশয়োক্তিই প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। আমার মতে সেই অতিশয়োক্তির আদর্শ দৃষ্টান্ত দিলীপকুমার।

রাজ কাপুর তাহলে কী? বলা যায় উনি সরকারি সিলমোহর। প্রায় শাস্ত্রানুমোদিত, নেহরু যুগের জাতি গঠনের স্মারক। অন্যদিকে দেব আনন্দ স্বাধীনোত্তর লাগামছাড়া যৌবনের দূত। রাজকে দেখলে আমরা বুঝতে পারি যে একদিকে যখন সাহিত্যসমর্পিত বাস্তববাদ চলচ্চিত্রের জন্য একটি মানচিত্র তৈরি করতে ব্যস্ত, তখন তিনি মেলোড্রামার আদলে গ্রাম থেকে শহরে আসার অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্রীয় বিধিসমূহ পরীক্ষা করে চলেছেন সেলুলয়েডে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর গণতান্ত্রিক সমাজবাদ ও মিশ্র অর্থনীতির ধারণায় এক ধরনের জাতি গঠনের প্রয়াস মূর্ত হয়ে উঠেছিল। আওয়ারা (১৯৫১), বুট পলিশ (১৯৫৪), শ্রী ৪২০ (১৯৫৫) এবং জিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায় (১৯৬০) উত্তর-স্বাধীনতা পর্বে ভারতীয় জনজীবনে আধুনিকতার নিশ্চিত দলিল হিসাবে চিহ্নিত হতে পারে। আরেকটু তলিয়ে ভাবলে, প্রমথেশ বড়ুয়ার অধিকার সেই ১৯৩৯ সালে তথাকথিত অবৈধ সন্তানের উত্তরাধিকার নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিল রাজ কাপুর সেই উত্তরাধিকার কৃতজ্ঞ চিত্তে বহন করে নেন আওয়ারাতে। অথচ তিনিই আবার সামাজিক প্রসঙ্গ আড়াল করে সিক্ত যূথীর গন্ধবেদনে আখ্যানের গহনে চলে যান শ্রী ৪২০ ছবিতে। শাড়ির অন্তরালে একটি ছাতার তলায় নার্গিস ও নিজেকে অমর করে দেন সঙ্গীতের চরণে, ‘পেয়ার হুয়া ইকরার হুয়া’ মেলডিতে। নিজেকে জীবনের যাবতীয় বাসনার আড়ালে রেখে জানান, ওই রজনীতে ঝড় বয়ে যাবে রজনীগন্ধা বনে।

ওখান থেকেই তো ওই জুটি অন্য মাত্রা পেল?

হ্যাঁ, এরপর কিংবদন্তী হয়ে গেলেন রাজ-নার্গিস যুগল। রিচার্ড বার্টন-এলিজাবেথ টেলরের সম্পর্ক যদি গবেষণার বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে রুপোলি পর্দায় তার পরিশিষ্টে রাজ কাপুর-নার্গিসের জীবনকথাও নক্ষত্রলোকের জিনিস। বম্বেভিত্তিক হিন্দি ছায়াছবির জগৎ গত শতকের নয়ের দশক থেকে বলিউড নামে চিহ্নিত হয়। সেখানে সবচেয়ে শক্তিশালী কাপুর পরিবারের মধ্যমণি রাজ, যেন রামায়ণে ইক্ষ্বাকু বংশের শ্রীরামচন্দ্র। অবিভক্ত ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে পেশোয়ার শহরে তাঁর জন্ম। বাবা পৃথ্বীরাজ জীবিকার কারণে বম্বে শহরে চলে আসেন। ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের প্রথম সারির এই নেতা শুধু যে সপরিবারে ভারতের নানা শহরে আস্তানা গেড়েছিলেন তাই নয়, নিজের সন্তানদের মধ্যেও সংক্রমিত করেছিলেন গরীব ও নিচুতলার মানুষকে খোলা চোখে দেখার ঘরানা। এই সুবাদে কিছুদিন কলকাতাতেও ছিলেন বালক রাজ কাপুর। ছোটবেলা থেকেই যে বাংলা ভাষার উত্তম ব্যবহার জানতেন তার কারণও এই শহরের মায়াবী স্মৃতি।

এই কলকাতার সংযোগটা আরেকটু খুলে বলবেন?

এটা সবিস্তারে বলার মত ব্যাপারই বটে। একটা মজার তথ্য অনেকেই হয়ত জানেন না। রাজের প্রথম ছবির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কলকাতা। ছবিটার নাম ইনকিলাব (১৯৩৫)। সেখানে তাঁর আবির্ভাব হয় শিশুশিল্পী হিসাবে। সে ছবির পরিচালক দেবকী বসু আর প্রযোজনা নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওর। যদিও ডানা মেলতে রাজ সময় নিয়েছেন আরও অনেকদিন। ইনকিলাবের এক যুগ পরে নীলকমল (১৯৪৭) ছবিতে মধুবালার বিপরীতে নায়ক হিসাবে তাঁর আত্মপ্রকাশ। কিন্তু ১৯৪৯ সালের অন্দাজ ছবিতে যে মেলোড্রামার কথা এত করে বলছি তা এক বিশেষ স্তরে উন্নীত হয়। তবে সেখানেও রাজ আর দিলীপ একত্রে ছিলেন। রাজ প্রথম মেঘমুক্ত হলেন আওয়ারার সাফল্যে। ভারতবর্ষ তো বটেই, তখনকার সোভিয়েত ভূমিও প্লাবিত হয়েছিল আওয়ারা হুঁ গানে। এতটাই যে মানুষের প্রথম মহাকাশ যাত্রায় ইউরি গ্যাগারিনের মহাকাশযানে এই গান গুঁজে দেওয়া হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নে তো রাজ কাপুরের অনেক ছবিই প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল। এই প্রসঙ্গ যখন এসেই গেল তখন জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে, রাজ কাপুরের ছবির যে রাজনীতি সেটাই কি ভারতের মত কমিউনিস্ট রাশিয়াতেও জনপ্রিয় হওয়ার কারণ?

শুধু তা হয়ত নয়। আওয়ারা ছবিতে নারী ও শিশুর সঙ্গে আদালত এবং আইনের যে সংঘর্ষ পরবর্তী বুট পলিশ ছবি (যাকে টাইম ম্যাগাজিন ‘ক্ষুদ্রাকার মহাকাব্য’ বলেছিল) বা শ্রী ৪২০ ছবিতেও দেখা যায়, তা থেকে বোঝা যায় রাজ কাপুর একটি দেশের গ্রাম থেকে শহরে রূপান্তরের পথে যে উত্থান পতন, যে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, যে অশ্বখুরের ধ্বনি, সেগুলোকে এক ধরনের রূপকথার আঙ্গিকে প্রকাশ করছেন। তিনি সমাজের কথা বলছেন, কিন্তু প্রেম আর গান সেখানে যেভাবে জড়িয়ে থাকছে তাতে অনেকসময়েই একরকম ব্যালাডের রূপ নিচ্ছে। যেমন মেরা জুতা হ্যায় জাপানি গানটা একসময় প্রায় জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পেয়ে গিয়েছিল। তার পিছনে আবার রাজনীতি অন্যতম কারণ, যেহেতু তখন ভারত পঞ্চশীল রাজনীতির চর্চা শুরু করেছিল। সুতরাং রাজ কাপুরের রাজনীতি ব্যালাডের রূপ ধরে পর্দায় আসে বলেই সত্যজিতের অপরাজিত (১৯৫৬) ছবির চেয়ে অনেক বেশি জনচিত্তহারী হতে পেরেছিল সর্বত্রই। মেহবুব খানের মাদার ইন্ডিয়া (১৯৫৭) ছবির মতই রাজের জিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায় উত্তর ভারতের সম্পন্ন চাষির চোখ দিয়ে ভারতীয় নব্য জীবনগাথা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।

আপনি সম্প্রতি এক জায়গায় বলেছেন, দিলীপকুমারের উত্থান নেহরুজাত সমাজতান্ত্রিক যুগের সূচক আর শাহরুখ খানের উত্থান মনমোহনী বাজার অর্থনীতির সূচক। দিলীপকুমার থেকে শাহরুখ অব্দি পৌঁছতে গিয়ে হিন্দি সিনেমা তো ভোল পালটে অনেক বেশি করে উত্তর ভারতীয় এবং অনাবাসী ভারতীয়কেন্দ্রিক হয়ে পড়ল, যেখানে বাঙালি বা তামিল চরিত্র শুধুমাত্র হাস্যরস উৎপাদন করে। এমনটা তো বরাবর ছিল না। স্বয়ং অমিতাভ বচ্চনের প্রথম হিট ছবি তো আনন্দ, যেখানে কথকের চরিত্রটাই একজন বাঙালি ডাক্তারের। এই সারা ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করার সংস্কৃতি যে হিন্দি ছবিতে আর রইল না, এটাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করেন?

এখানেই আসতে চাইছিলাম। এই যে আমরা দিলীপকুমারের কথা বলছি। তিনি তো একজন আর্কিটাইপাল বিরহী এবং অতিনাটক তাঁর কাছে শকুন্তলার হাতের আংটির মত। কিন্তু দিলীপকুমার কেন কিংবদন্তী? কারণ নবীন ভারতীয় প্রজাতন্ত্র যে সমস্ত মিথ জনসাধারণের জন্য ছড়িয়েছিল, সেগুলো দিলীপকুমার আশ্চর্যভাবে নিজের শরীরে মুদ্রিত করতে পারতেন। যেমন বড়ে গোলাম আলি খাঁ সাহেবের কণ্ঠমাধুর্যে ভেসে যেতে যেতে যে প্রেম পথের মধ্যে পেতেছিল নিজের সিংহাসন, তা দর্শককুলকে স্বপ্নপুরীতে নিয়ে যায়। সে দ্যাখে সকরুণ দীর্ঘশ্বাসে দিলীপকুমারের যন্ত্রণাতাড়িত মুখ। পাঁচের দশকে দেবদাস হয়ে তিনি মদের পেয়ালায় ঠোঁট ছোঁয়ালে তা একটা আস্ত প্রজন্মের অশ্রুলিপি হয়ে ওঠে। অর্থাৎ দিলীপকুমার নক্ষত্রলোকে সময়ের আশ্চর্য মুখপাত্র। ধরো আমরা যখন মধুমতী (১৯৫৮) দেখি বা অন্দাজে রাজ কাপুরের বিপরীতে দিলীপকুমারকে দেখি, তখন বুঝি যে এই নায়করা “assure the passage from awe to charm”। কথাটা আমার নয়, রলাঁ বার্থের। কথাটা এঁদের প্রসঙ্গে খাটে। এঁদের সময় সম্পর্কে আগেই যা বললাম – একদিকে যুগ যুগ ধরে জমে থাকা মাটির টান, অন্যদিকে শাসক প্ররোচিত শিল্পসভ্যতার দায়ে বদলে যাওয়ার সমস্ত ক্ষতচিহ্ন উৎকীর্ণ হয়ে আছে নাগরিক সভ্যতার গায়ে। ফলে দিলীপকুমারের সমকালীন যুবসমাজ ফলের বাগিচা এবং লেদ মেশিনের আর্তনাদের মধ্যে ছিন্নভিন্ন হতে হতে যে উন্মাদনা এবং প্রতিস্থাপনকে খেয়াল করে, তা যদি অপরাজিত বা জলসাঘর (১৯৫৮) চিত্রিত বাস্তবতার ইশতেহারকে পরিহার করে, তবে তাতে এক ধরনের মাত্রাছাড়া ঢেউ থাকবেই। ফলে বলা যেতে পারে দিলীপকুমার, রাজ কাপুর আর দেব আনন্দ ইতিহাসের একরকম সরলীকৃত ব্যাখ্যার মূর্ত রূপ।

এবার শাহরুখের কথা বলি। আমাদের ওই ত্রয়ীর সকলেই, চলতি কথায় যাকে বলে ‘সুদর্শন’। তাঁরা যুবতীদের হৃদয় হরণ করতেন। পুরুষরাও তাঁদের দেখে এক মায়াবী লাবণ্য অনুভব করেন। শাহরুখকে আমরা যখন দেখতে পেলাম ততদিনে কিন্তু আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা অপসৃয়মান, নবীনের সঙ্গে প্রাচীনের দ্বন্দ্বও অনেক বদলে গেছে। নেহরু যুগের অবসানে আমরা বুঝতে পারছি সাবেকি সমাজতন্ত্রের পতাকা পথপ্রান্তে লুটোপুটি খাচ্ছে। এ দেশে যেমন নেহরুর অর্থনীতি বাতিল হয়ে যাচ্ছে, তেমনি বিশ্ব রাজনীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনও আসন্ন। ফলে শাহরুখ আসেন এক সাধারণ ‘অপর’-এর প্রতিনিধি হয়ে। তিনি আমাদের জয় করলেন কিন্তু কোনো মতাদর্শগত বার্তা দিয়ে নয়, যে বার্তা রাজ বা দিলীপের চরিত্রগুলো দিতে পারত। শাহরুখ এই কারণেই বিশ শতকের শেষ বড় নায়ক হয়ে উঠলেন যে তিনি আর পাঁচজনের মতই এবং তিনি কোনো বৃহত্তর স্বপ্নের ফেরিওয়ালা নন। ফলে এই শতাব্দীতে পৌঁছে ওম শান্তি ওম (২০০৭) ছবিতে তিনি মুম্বাইয়ের ছবির প্রায় গোটা ইতিহাসটারই নতুন রকম ব্যাখ্যা করে নিজেকে তার কেন্দ্রে স্থাপন করেন, খানিকটা ব্যঙ্গই করেন। অর্থাৎ এখানে কিন্তু তাঁর একটা পাল্টা রাজনীতি উঠে এল।

রাজ কাপুরের একটা দিক নিয়ে আমার কৌতূহল নিরসন করতে চাই। উনি ১৯৫৬ সালে জাগতে রহো ছবিতে অভিনয় করেছেন, যেখানে গ্রামের একজন তৃষ্ণার্ত কৃষক শহরে এসে একটু জল পাচ্ছে না কারোর কাছে, উল্টে চোর সন্দেহে তাড়া খাচ্ছে। এই ছবির পরিচালক শম্ভু মিত্র, অমিত মৈত্র। সঙ্গীত পরিচালক সলিল চৌধুরী। অর্থাৎ ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সাথে যুক্ত লোকেরা। পরে যখন রাজ কাপুর আর কে ফিল্মসের ব্যানারে নাচে গানে ভরপুর ছবি করছেন, তখনো জাগতে রহোর প্রভাব যেন থেকেই যাচ্ছে। সেই কপর্দকশূন্য মানুষ, যাকে চার্লি চ্যাপলিনের ছবির আলোচনায় আমরা ট্র‍্যাম্প বলি, সে জাগতে রহোর আগেই মুক্তি পাওয়া শ্রী ৪২০-এ তো প্রায় চ্যাপলিনের চেহারাতেই ছিল, কিন্তু বহু পরে ১৯৭০ সালে যখন রাজ মেরা নাম জোকার করেন, তখনো সেই ট্র্যাম্পসুলভ একটা চরিত্রই কেন্দ্রে। ১৯৬৬ সালে বাসু ভট্টাচার্য পরিচালিত তিসরি কসম এমনিতে একটা প্রেমের ছবি। কিন্তু সে ছবির রাজ অভিনীত চরিত্র, গাড়োয়ান হীরামন, সেও প্রায় সব হারানো একজন মানুষ। বারবার এইরকম চরিত্র রাজের কাজে ফিরে আসত কি স্রেফ চার্লি চ্যাপলিন তাঁর প্রিয় শিল্পী ছিলেন বলে, নাকি ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের কোনো স্থায়ী প্রভাব ওঁর উপর রয়ে গিয়েছিল বলা যায়?

মেরা নাম জোকার, তারপর ববি (১৯৭৩) বা রাম তেরি গঙ্গা ময়লি (১৯৮৫)-র সময়ে রাজ কাপুর এমন এক বাণিজ্যিক সিনেমা উৎপাদন করছেন যেখানে লক্ষ্মী আর সরস্বতীর মধ্যে প্রথমজনের দিকেই পাল্লা ভারি। মজার কথা, ববির চিত্রনাট্যকারদের একজন, খাজা আহমেদ আব্বাস ছিলেন ১৯৪৬ সালে তৈরি ধরতি কে লাল ছবির পরিচালক। সে ছবির প্রেরণা বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন। অর্থাৎ সেই লোক এই যুগে ববির চিত্রনাট্যকার হয়ে গেছেন। তেমনি রাজ কাপুরও ববিতে আপাতভাবে শ্রেণিবৈষম্যের কথা বলছেন বটে, কিন্তু আসলে রজার ভাদিম যেভাবে ফরাসী নবতরঙ্গে ব্রিজিত বারদোকে ব্যবহার করেন সেইভাবে ডিম্পল কাপাডিয়াকে প্রদর্শনযোগ্য নারীত্বের মডেল হিসাবে ব্যবহার করছেন। একই ঘটনা ঘটাচ্ছেন জিনত অমনকে নিয়ে সত্যম শিবম সুন্দরম (১৯৭৮) আর মন্দাকিনীকে নিয়ে রাম তেরি গঙ্গা রাম তেরি গঙ্গা ময়লি ছবিতে।

তবে তা সত্ত্বেও এটা ঠিকই, তিনি যে গণনাট্য সঙ্ঘের আদর্শ নিয়ে শুরু করেছিলেন, তার ছাপ শেষদিকেও দেখা যায়। মেরা নাম জোকারে এসে তাঁর উপর নব বাস্তববাদের প্রভাব দেখা যায়। ফলে শুধু চ্যাপলিনকে পছন্দ করতেন বলেই যে ট্র্যাম্প বারবার ফিরে এসেছে তাঁর কাজে, তা বোধহয় নয়। যদিও রাজের চ্যাপলিন প্রীতি সর্বজনবিদিত। কিন্তু শুধু কাজ নয়, রাজের ব্যক্তিগত জীবনের দিকে তাকালে প্রশস্তি না করেও বলা যায়, তাঁর মধ্যে সেই গণনাট্য সঙ্ঘের আমলের লোকেদের সারল্য কিছুটা রয়ে গিয়েছিল। যেমন একবার ইরানের এক বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক পিএইচডি দিয়েছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, আমি তো কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকিনি, এখানে এই কালো পোশাক পরে অধ্যাপকদের মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে কত বড় হয়ে গেছি! অত বড় তারকার এত সরল কথা বলা হয়ত বামপন্থী বাবার প্রভাবই হবে। তাঁর সব ছবিতেই কিন্তু রাজ এক ধরনের সারল্যের প্ররোচনা দিয়েছেন। ফলে মনস্তাত্ত্বিকভাবে একেবারে ছাপোষা ভারতীয়ের সঙ্গে তিনি সংযোগ স্থাপন করতে পারতেন। ববির মত ছবিতেও দারিদ্র্যকে একটু অলঙ্কার পরিয়ে দেওয়া তাঁর স্বধর্মে পর্যবসিত হয়েছিল। আমার ধারণা এটা চ্যাপলিনের প্রভাব নয়, গণনাট্য সঙ্ঘে আদি যুগ কাটানোরই ফল।

এবার একটা প্রশ্ন করব যেটা হয়ত অযৌক্তিক, কিন্তু লোভ সামলাতে পারছি না। রাজ কাপুর, দিলীপকুমারের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ক্রমশ অক্ষয় কুমারের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি হয়ে যাওয়া – এর পিছনে কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ, তার ফলে মূলধারার শিল্প থেকে গণনাট্য সঙ্ঘের প্রভাব ক্রমে অপসৃত হওয়াকে কতটা দায়ী করা যায়? কারণ প্রভাবটা তো সে আমলে নেহাত কম ছিল না। জাগতে রহো বা বিমল রায়ের দো বিঘা জমিন তো বিষয়বস্তুর দিক থেকেই অন্যরকম, কিন্তু মধুমতীর মত তথাকথিত রোম্যান্টিক ছবির চিত্রনাট্যও তো ঋত্বিক ঘটকের লেখা। সে জিনিস যে বন্ধ হয়ে গেল, তাতে কি বামপন্থীদের একেবারে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরি করার কাজটার ক্ষতি হল? ঘটনাচক্রে আজ আবার হেমাঙ্গ বিশ্বাসেরও জন্মদিন। যিনি একেবারে সাধারণ মানুষের চেনা আঙ্গিকে বামপন্থী রাজনৈতিক আখ্যান সৃষ্টি করতে পারতেন। যেমন মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য তৈরি করেছিলেন। 

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আধুনিক বলিউডে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের দর্পিত পদক্ষেপ ঘটেছে। সেখানে শুধুই শপিং মল সংস্কৃতি রয়েছে, যেখানে গরীবকেও সাজিয়ে গুছিয়ে দেখানো হয়। সিনেমার এমন হয়ে যাওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে সুনিশ্চিত হয়ে যায় একমেরু পৃথিবীতে। বলিউড তখন আমাদের বোঝাতে শুরু করে যে আমরাই শুধু হলিউডের নকল করি না, ওরাও আমাদের ‘ছম্মা ছম্মা’ গান নেয় (নিকোল কিডম্যান অভিনীত মুলাঁ রুজ ছবিতে)। মানে অর্থনৈতিক উদারীকরণের নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়ে বলিউড আমাদের সামনে হাজির হয়। এটা ক্ষতি তো বটেই। কিন্তু এতে আমাদের একটা উপকার হয়েছে। সেটা হল এককালে হিন্দি ছবির যেসব বাড়াবাড়ি নিয়ে আমরা হাসাহাসি করতাম, যেমন বড়লোকের ছেলের সঙ্গে গরীবের মেয়ের প্রেম বা উল্টোটা, সেগুলোরও যে দরকার ছিল তা আমরা উপলব্ধি করতে পারলাম।

আরও পড়ুন শ্রদ্ধেয়

কেন এরকম বলছেন?

আচ্ছা দিলীপকুমারের শতবর্ষ তো, তাঁর মেলোড্রামার উদাহরণ দিয়েই বলি। তিনি কী আশ্চর্য দক্ষতায় বাঙালি বিরহী দেবদাস আর মোগল যুবরাজ সেলিম – দুটো ভূমিকাই পালন করেছেন। এই দুটো চরিত্রের দূরত্ব কতটা? একবার দিলীপ হালকা মেজাজে বলেছিলেন – ৫০ ফুট। কারণ আসলে আন্ধেরির মোহন স্টুডিওতে এই দুটো ছবির সেট পড়েছিল মুখোমুখি। ফলে দিলীপ মাত্র কয়েক গজ হেঁটে ব্যথিত মাতাল থেকে গর্বোদ্ধত যুবরাজ হয়ে যেতেন। এই যে বিমল রায়ের পরামর্শে দেবদাস চরিত্রটার সঙ্গে হাড়ে মজ্জায় মিশে যাওয়া… কী মর্মান্তিকভাবে বলেছিলেন সেই সংলাপ ‘কৌন কমবখত হ্যায় জো বরদাশ্ৎ করনে কে লিয়ে পীতা হ্যায়?’ এ তো এক অবাস্তব জগৎ তৈরি করছিলেন। মুঘল-এ-আজমে যখন ‘যব পেয়ার কিয়া তো ডরনা কেয়া’ গানের মুহূর্ত তৈরি হচ্ছে, তখনো ভারত এক অসম প্রেমকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। যা বাস্তবে ঘটে না, ঘটা সম্ভব নয়। বলা চলে এসব গরীবের আকাশকুসুম কল্পনাকে প্রশ্রয় দেওয়া। কিন্তু এখন তো ছবি থেকে গরীব উধাও হয়ে গেছে।

এখনকার অক্ষয় কুমার ইত্যাদিদের ছবি থেকে তো ভারতবর্ষের দারিদ্র্যের ইতিহাসটাকেই মুছে দেওয়া হয়েছে। কুষ্ঠরোগীর সঙ্গে যেমন এককালে মানুষ অস্পৃশ্যের মত ব্যবহার করত, এখনকার হিন্দি সিনেমা দরিদ্রের প্রতি সেই মনোভাব নিয়েছে। ওটাকে ঢেকে দেওয়া হয়। আমেদাবাদে যেমন বিদেশি নেতারা এলে গরীবদের পাড়ার সামনে পাঁচিল তুলে দেওয়া হয়, অনেকটা সেইরকম। এখন দরিদ্র হওয়া অপরাধ। সেই কহো না পেয়ার হ্যায় (২০০০) আমল থেকে খেয়াল করলে দেখা যাবে, এখনকার ছবিতে ভিখারিরাও যেন সাজানো গোছানো, ব্র্যান্ডেড। অথচ শোলে (১৯৭৩) পর্যন্তও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে পর্দায় দেখতে পাওয়া যেত। নিয়মমাফিক মুসলমানের উপস্থিতি, শিখের উপস্থিতি থাকত। আমাদের জাতীয় সঙ্গীতে যে প্রজাতন্ত্রের কথা বলা হয়, প্রায় তারই চেহারা দেখা যেত মুম্বাইয়ের হিন্দি ছবিতে।

আজ তার ঠিক উল্টো ঘটছে, এক ধরনের কেন্দ্রীকরণ চলছে। যেমন বিয়ে – একটা সামাজিক মিলনোৎসব। সেই দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে (১৯৯৫) থেকে পাঞ্জাবি বিয়েই ভারতীয় বিয়ে হয়ে উঠল। ভারতের অন্যান্য প্রান্তে অন্য কোনোরকম বিয়ে হয় কিনা সেকথা আমরা যেন ভুলেই গেছি। হিন্দি ছবি গোটা দেশটার একটা সিন্থেটিক কোডিফিকেশন করেছে। যেন কম্পিউটার, যেখানে ক্লিক করলেই মুশকিল আসান।

সেইজন্যেই বলছি, অল্প বয়সে আমরা তথাকথিত আর্ট সিনেমার পাল্লায় পড়ে রাজ কাপুর, দিলীপকুমার, দেব আনন্দদের নিয়ে ঠাট্টা ইয়ার্কি করতাম। আজ মনে হয় তাঁরা একটা যুগের স্বপ্ন, সাফল্য এবং ব্যর্থতাকে ধারণ করার চেষ্টা তো অন্তত চালিয়েছিলেন। যোগ্যতার আলোচনায় যাবই না, কারণ দিলীপকুমারের মত অভিনয় প্রতিভা, রাজ কাপুরের মত জাদুকর বা দেব আনন্দের মত রোম্যান্টিক অভিনয় করার ক্ষমতাসম্পন্ন নায়ক যে আজকের বলিউডে নেই তা বুঝতে কোনো মেধা লাগে না।

কিন্তু আসল কথা হল তাঁদের নিজের কাজের প্রতি যে বিশ্বাস, যে অধ্যবসায় ছিল সেটাই আজ লুপ্তপ্রায়। বিশেষ করে বাঙালি ছবির সমালোচকরা, যাঁরা জনপ্রিয় সিনেমা নিয়ে আলোচনা করা একেবারেই অপছন্দ করেন, তাঁদের হিন্দি ছবির ওই ত্রয়ীকে প্রাপ্য সম্মান জানানো দরকার। সেটা করা হয়নি, কারণ মনে করা হত জনপ্রিয় সিনেমার আলোচনায় ঢুকে পড়া উত্তর কলকাতার একটি কুখ্যাত পাড়ায় ঢুকে পড়ার সমান। এই উন্নাসিকতার ফল ভোগ করছে আজকের টলিউড, যেখানে আর অজয় কর বা নির্মল দে-র মত পরিচালক নেই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

এনডিটিভি প্রথম নেটওয়ার্ক নয় যা সরকারের মুখপত্র হতে চলেছে, শেষ নেটওয়ার্ক। বিপদটা সেইখানে।

এনডিটিভির দখল এশিয়ার সবচেয়ে বড় ধনী গৌতম আদানির হাতে চলে যাওয়া নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রণয়-রাধিকার হাত থেকে লাগাম ছুটে যাওয়া মাত্রই পদত্যাগ করেছেন ম্যাগসাসে পুরস্কার জয়ী সাংবাদিক রবীশ কুমার। এই খবরটা আরও বেশি পীড়া দিচ্ছে অনেককে। কারণটা শুধুমাত্র কিছু মানুষের প্রিয় টিভি নেটওয়ার্ক অপ্রিয় লোকের হাতে চলে যাওয়া বা সেখান থেকে প্রিয় অ্যাঙ্করের প্রস্থান নয়। এনডিটিভির আদানিকরণ নিয়ে সারা পৃথিবীতে আলোচনা হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় থাকা লোকেদের হাতে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ার মালিকানা চলে যাওয়া যে গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর, বাকস্বাধীনতার বারোটা বাজানোর পক্ষে যথেষ্ট, তা সারা পৃথিবীর গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষ বুঝে ফেলেছেন। উপরন্তু আদানি এনডিটিভিকে নিয়ে কী করবেন তা নিয়েও কোনো সংশয় রাখেননি। তিনি ফাইন্যানশিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন “স্বাধীনতা মানে হল সরকার ভুল কিছু করলে তা বলার স্বাধীনতা। কিন্তু একইসঙ্গে সরকার যখন রোজ ঠিক কাজ করে তখন সেটা বলার সাহসও থাকা উচিত। সেটাও আপনাকে বলতে হবে।” পৃথিবীর সবচেয়ে জনদরদী সরকারও যে রোজ ঠিক কাজ করে না তা বোঝার জন্য নোবেল পুরস্কার প্রাপকদের মত বুদ্ধিমান হওয়ার দরকার নেই আর আদানির মত সফল ব্যবসায়ী নির্বোধও নন। ফলে তিনি যে আসলে বলতে চাইছেন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা সংবাদমাধ্যমের কাজ নয় – তা স্পষ্ট। একটা সাড়ে তিন দশকের পুরনো মিডিয়া নেটওয়ার্কের মালিকানা এমন লোকের হাতে চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

কিন্তু এনডিটিভি কি প্রথম চ্যানেল যা শাসকের মুখপাত্র হতে বসেছে? নাকি এনডিটিভি ছিল বলে ভারতের গণতন্ত্র জীবন্ত ছিল, আর আদানির নিয়ন্ত্রণে চলে গেলেই নিমেষে তার মৃত্যু হবে? যদি দুটো প্রশ্নের উত্তরই ‘না’ হয়, তাহলে এত কান্নাকাটির কী আছে? নাগরিক ডট নেটের মত একটা বিকল্প সংবাদমাধ্যমে আমারই বা এ নিয়ে প্রবন্ধ ফেঁদে বসার কী আছে? রবীশ কিছুদিন আগেই, সম্ভবত কী হতে চলেছে জেনে, নিজের ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। সাবস্ক্রাইবারের যথারীতি অভাব হয়নি, তাঁর পদত্যাগের কথা চাউর হওয়ার পর সংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে। সুতরাং সেই চ্যানেল থেকে যে বিস্তর আয় হবে তাতে সন্দেহ নেই। রবীশের সে আয়ের ভাগ তো আমি পাব না, নাগরিক ডট নেটও পাবে না। তাহলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মত “কিসের শোক করিস ভাই/আবার তোরা মানুষ হ” বলে অন্য কাজে লেগে পড়লেই তো হয়। কী দরকার এ বিষয়ে ভাবনাচিন্তার?

এসব কথা অনেকেই বলাবলি করছেন। আরও বলাবলি হচ্ছে, এনডিটিভির ভারতীয় সাংবাদিকতায় এমন কিছু অবদান নেই যে তাদের জন্য চোখের জল ফেলতে হবে। তারাও আর পাঁচটা সংবাদমাধ্যমের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। যাঁরা মনে করছেন এনডিটিভি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা শেষ চ্যানেল ছিল, তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এনডিটিভি কেন্দ্রের শাসককে প্রশ্ন করলেও বহু রাজ্যের শাসককে ছাড় দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারই সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সুতরাং শোকার্ত হয়ে পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আবার কংগ্রেসের অনেক সদস্য, সমর্থক এনডিটিভির উপর চটে আছেন অন্য কারণে। তাঁদের বক্তব্য এরা বিজেপিকে যত প্রশ্ন করেছে, বিরোধী আসনে থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেসকে তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন করেছে। নরেন্দ্র মোদীর চেয়ে বেশি আক্রমণ করেছে রাহুল গান্ধীকে। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে দিনরাত আলোচনা করেছে, বিজেপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই।

উপরের সবকটা অভিযোগেরই কিছু না কিছু সারবত্তা আছে। ঠিক সেজন্যেই এনডিটিভির আদানিকরণ নিয়ে আলোচনা অপরিহার্য।

প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার, অনেকেই একটা কথা ভুল বুঝেছেন। এনডিটিভির নিয়ন্ত্রণ এখনো প্রণয় রায় ও তাঁর স্ত্রী রাধিকা রায়ের হাত থেকে বেরিয়ে যায়নি। তাঁরা এখনো এনডিটিভির বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সে আছেন, থাকতে বাধাও নেই। কারণ দুজনের হাতেই এনডিটিভির বেশকিছু শেয়ার রয়েছে।

কিন্তু এনডিটিভির প্রোমোটার হল আরআরপিআর হোল্ডিং নামক সংস্থা। তাঁরা পদত্যাগ করেছেন সেই সংস্থার ডিরেক্টরের পদ থেকে, কারণ আরআরপিআরের দখল অগাস্ট মাসেই আদানি গ্রুপের হাতে চলে গেছে, ফলে এনডিটিভির ২৯.১৮% শেয়ারও এখন আদানি গ্রুপেরই হাতে। এনডিটিভির আরও ২৬% শেয়ার দখল করার জন্য গৌতম আদানি ২২ নভেম্বর এক ওপেন অফার লঞ্চ করেছেন, যার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ। আদানির লক্ষ্যপূরণ হলে এনডিটিভির বেশিরভাগ শেয়ার চলে যাবে আদানি গ্রুপের হাতে। পূরণ না হলেও অন্য যারা শেয়ার কিনে নেবে তাদের শেয়ারগুলো আরও বেশি দামে কিনে নেওয়ার রেস্ত আদানির আছে, রায় দম্পতির নেই। ফলে আদানির এনডিটিভির ম্যানেজমেন্টের সম্পূর্ণ দখল নিয়ে নেওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা। ইতিমধ্যেই আদানি গ্রুপের চিফ টেকনোলজি অফিসার সুদীপ্ত ভট্টাচার্য, সাংবাদিক সঞ্জয় পুগলিয়া ও সেন্থিল চেঙ্গলবরায়ন আরআরপিআরের ডিরেক্টর নিযুক্ত হয়েছেন। প্রণয়-রাধিকার এনডিটিভি থেকে বিদায় অনিবার্য – একথাও বলাই যায়। কারণ আদানির চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে ওপেন অফারে যারা শেয়ার কিনেছে তাদের শেয়ারগুলো ফের কিনে নেওয়ার অবস্থা রায় দম্পতির থাকলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টিই হত না। তাঁরা ২০০৯-১০ সালে বিশ্বপ্রধান কমার্শিয়াল প্রাইভেট লিমিটেড নামে এক সংস্থা থেকে ৪০৩ কোটি টাকা ধার নিয়েছিলেন। সে ঋণের শর্তই ছিল, ঋণ শোধ করতে না পারলে আরআরপিআরের ৯৯.৯% শেয়ার বিশ্বপ্রধান দখল করে নিতে পারবে। আদানি প্রথমে ওই বিশ্বপ্রধানেরই প্রধান হয়ে বসেন টাকার জোরে, তারপর অনাদায়ী ঋণের দায়ে এনডিটিভির দখল নেওয়ার কাজ শুরু করেন।

শোধ দিতে পারবেন না এমন ঋণ নিলেন কেন, তা-ও আবার ২০০৮ সালে তৈরি হওয়া বিশ্বপ্রধানের মত এক গোলমেলে ‘হোলসেল ট্রেডিং ফার্ম’ থেকে, যার মালিকানা হাত বদলাতেই থাকে, যার মালিকানা একসময় ছিল রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের হাতে, পরে মুকেশ আম্বানিরই ঘনিষ্ঠ মহেন্দ্র নাহাতার হাতে চলে যায়? এসব প্রশ্ন তুলে এনডিটিভির আজকের অবস্থার জন্য রায় দম্পতিকে দায়ী করাই যায়। এমনকি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া (সেবি)-ও এ নিয়ে প্রণয়-রাধিকাকে শোকজ করেছিল। এনডিটিভিতে কাজ করেই বিখ্যাত হওয়া বরখা দত্তের মত কেউ কেউ এখন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তির্যক ভাষায় টুইট করতে লেগেছেন, এনডিটিভি আগে আম্বানির হাতে ছিল। তখন যদি স্বাধীন থেকে থাকে, এখন আদানির হাতে গেলেই পরাধীন হবে কেন? আসলে ইস্যুটা হল টিভির রেভিনিউ মডেলটাই ভেঙে পড়েছে।

AM CONFUSED. WHEN MUKESH AMBANI OWNED 30% OF NDTV IT WAS FREE AND WHEN GAUTAM ADANI PURCHASES THAT 30% ITS OBITUARY TIME? PRAY, HOW? SO MUCH POLITICKING & HUMBUG IN THE DISCOURSE BOTH FOR OR AGAINST, BOTH NARRATIVES IGNORE THE ELEPHANT IN THE ROOM- REVENUE MODEL OF TV IS BROKEN.— barkha dutt (@BDUTT) December 1, 2022

এতদ্বারা বরখা আম্বানিকে গণতান্ত্রিক বললেন, নাকি আদানিকে গণতান্ত্রিক বললেন? নাকি দুজনের কেউই বাকস্বাধীনতার পক্ষে বিপজ্জনক নন বললেন? বোঝা কঠিন। কিন্তু ঘটনা হল কর্পোরেট মিডিয়ার রেভিনিউ মডেল যে গোলমেলে তা কোনো নতুন কথা নয়। আয়ের জন্যে বিজ্ঞাপন নির্ভরতা এবং বিজ্ঞাপনের জন্য টিআরপি নির্ভরতা বহুকালের সত্য। বরখা যখন স্বয়ং কর্পোরেট মিডিয়ার হর্তাকর্তা ছিলেন তখনো তাই ছিল। ভারতে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর সংবাদমাধ্যমে, বিশেষত ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমে, দুটো জিনিস ক্রমান্বয়ে ঘটেছিল। এক, সংবাদমাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক চাকরি চালু হওয়া আর সাংবাদিকদের পারিশ্রমিক অনেকখানি বেড়ে যাওয়া। এককথায় অন্যদের ঘাড়ে পা দিয়ে সাংবাদিকদের স্বর্গারোহণ আরম্ভ হয়। যে সাংবাদিক যত উপরে আছেন তাঁর মাইনে তত বাড়ে। রাজস্ব বেড়েছে কিনা, এত মাইনের টাকা আসবে কোথা থেকে – এসব প্রশ্ন তখন বরখার মত শীর্ষস্থানীয়রা করেননি। ২০০৮-০৯ বা ২০১০, অর্থাৎ যে সময়ে প্রণয়-রাধিকা ওই বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছিলেন, ঠিক সেই সময়টাতে এই মাইনে বাড়ার হার চরমে পৌঁছয় সারা দেশের সংবাদমাধ্যমে। কেবল টিভি চ্যানেলগুলোতে নয়, খবরের কাগজেও।

আমার নিজের অভিজ্ঞতাই বলি। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার ধুঁকতে থাকা দ্য স্টেটসম্যান কাগজের চাকরি ছেড়ে পাড়ি দিই হায়দরাবাদে, ২৮,০০০ টাকা মাস মাইনেয়। সেখানে যে কাগজে যোগ দিই, সেখানে কয়েক মাসের মধ্যেই কোনো অজ্ঞাত কারণে বেতন কাঠামোর পুনর্বিন্যাস হয়। নিউজরুমের বড়, মেজ, সেজ, ছোট সকলেরই বেতনের বিপুল বৃদ্ধি হয়। যাদের পদোন্নতি হয়নি তাদেরও বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়। আমার মত যাদের পদোন্নতি হয়েছিল তাদের বৃদ্ধি হয় চোখ কপালে তোলার মত। আমার বেতন গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মাসিক ৭০,০০০ টাকায়। আমি তখন নেহাতই মাঝের স্তরের সাংবাদিক, সবে সিনিয়র সাব-এডিটর থেকে চিফ সাব হয়েছি। অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, এক্সিকিউটিভ এডিটর বা এডিটরদের মাইনে কোথায় পৌঁছেছিল তা কেবল কল্পনাই করতে পারি। আমরা কেউ কি খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম কাগজের আয় বেড়েছে কিনা? অথচ সকলেই জানতাম কাগজের বিক্রি কিন্তু রাতারাতি বাড়েনি।

সেটা ২০০৮ সালের কথা। তখন সারা ভারতের ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে প্রতিযোগিতা চলছে সাংবাদিকদের মাইনে বাড়ানোর। আবার ২০১০ সালে পশ্চিমবঙ্গে সারদা গ্রুপের বাংলা কাগজ চালু হওয়ার সময়ে একইরকম জিনিস দেখা গিয়েছিল। সে কাগজ বছর দুয়েকের বেশি না চললেও বাংলা ভাষার সাংবাদিকদের সঙ্গে ইংরেজির সাংবাদিকদের পারিশ্রমিকের যে লজ্জাজনক ব্যবধান ছিল, তা কমাতে ঘটনাটা কিছুটা সাহায্য করেছিল।

এখন কথা হল, টিআরপির খোঁজে বহুকাল ধরেই ভূত পেত্নী দত্যি দানো তাবিজ কবচ দেখায় বহু হিন্দি চ্যানেল। সে কাজ রবীশরা কখনো করেননি। ২০১২-১৩ সাল থেকে ওসবের সঙ্গে হিন্দি, ইংরেজি সব চ্যানেলেই যুক্ত হয়েছে প্রায় আঁচড়ে কামড়ে দেওয়ার মত সান্ধ্য মজলিশ, মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানো, উদারনৈতিক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে লোক ক্ষ্যাপানো, সব ধরনের বামপন্থীদের দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া, ভুয়ো খবর প্রচার, বিজেপির অলিখিত মুখপত্রের কাজ করা। এনডিটিভি এগুলোর কোনোটাই করেনি। অথচ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে বাজারের চলতি হারের কমে মাইনে দেওয়া চলে না। উপরন্তু সাংবাদিকদের মাইনে একটা সংবাদমাধ্যমের খরচের একটা অংশ মাত্র। তথ্যপ্রমাণ বলছে খুব বড় অংশও নয়। তার চেয়ে খবর সংগ্রহ করা এবং টিভির ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ক্রমোন্নয়নের খরচ অনেক বেশি। সেখানেও প্রতিযোগীদের সঙ্গে তাল মেলাতে টাকার প্রয়োজন হয়। আমরা যারা স্বাধীন সংবাদমাধ্যম চাই, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে এমন সংবাদমাধ্যম চাই, তারা কি টিআরপি বাড়িয়ে বেশি বিজ্ঞাপন পাওয়ার দিকে মন না দিয়ে যেনতেনপ্রকারেণ ঋণ নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টাকে বেশি অপরাধ বলে গণ্য করব? বরখার টুইটসূত্রে খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এনডিটিভির শেয়ার হোল্ডাররা মন্তব্য করছেন, ওটা বাজে কোম্পানি। আমাদের কী করে ডিভিডেন্ড দেওয়া যায় তার দিকে কোনোদিন নজর দেয়নি। একটা সংবাদমাধ্যমকে স্রেফ কোম্পানি হিসাবে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গিই কি আমাদের মূল্যায়নের মাপকাঠি হওয়া উচিত? ভেবে দেখা প্রয়োজন। আমরা তো কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার নই। আমরা বরং, পুঁজিবাদী লবজে, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের স্টেক হোল্ডার।

এনডিটিভি প্রথম নেটওয়ার্ক নয় যা সরকারের মুখপত্র হতে চলেছে, শেষ নেটওয়ার্ক। বিপদটা সেইখানে। ভারতে যতগুলো বড় বড় টিভি নেটওয়ার্ক আছে তার প্রায় সবকটাই ইতিমধ্যেই শাসক দলের গর্ভে চলে গেছে। বাকি ছিল এনডিটিভি। বলতে দ্বিধা নেই, এনডিটিভিও একটি পুঁজিবাদী সংস্থা। সে পুঁজিবাদের নিয়মেই চলেছে। এমন নয় যে সারা ভারতের সংবাদমাধ্যমে যখন ছাঁটাই চলেছে, এনডিটিভি তখন সমস্ত কর্মচারীর স্বার্থরক্ষা করেছে। কিন্তু রায় দম্পতি কখনো কারাত দম্পতির মত নিজেদের বিপ্লবী বলে দাবি করেছেন বলে তো মনে পড়ে না। তাঁরাও ব্যবসাই করছিলেন। ব্যবসা প্রায় তিন দশক ক্রমশ বড় হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের যা কাজ তা করতে নিতান্ত ব্যর্থ হয়নি, দায়িত্ব অস্বীকারও করেনি। কোনো সন্দেহ নেই, সব ইস্যুতেই এনডিটিভির অবস্থান ন্যায়ের পক্ষে বা দুর্বলের পক্ষে ছিল না। থাকার কথাও নয়। অন্তত বামপন্থীদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যে সংবাদমাধ্যম শেষপর্যন্ত মালিকের শ্রেণিস্বার্থেরই প্রতিভূ। এনডিটিভি তার চেয়ে আলাদা হবে এরকম প্রত্যাশা ছিল কি? থাকলে কেন ছিল? তবে এই একটি নেটওয়ার্কে কিন্তু বুলডোজার দিয়ে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ বা আসামে প্রতিবাদীদের ঘর ভেঙে দেওয়ার জন্যে বিজেপি নেতাদের দিকে আঙুল তোলা চলত। উমর খালিদ, ভারভারা রাও, স্ট্যান স্বামী, জি এন সাইবাবা, গৌতম নওলাখারা যে খলনায়ক নন সেটা বলা চলত। বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে পরে লিবারেশন নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হত। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য নিয়ে কথা হত। আজ দেশের যা অবস্থা, তাতে এমন একটা মঞ্চের গুরুত্ব কম নয়। এই মঞ্চের অবলুপ্তিতে শোকাহত না হলেও উল্লসিত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

ভারতীয় সাংবাদিকতায় এনডিটিভির অবদান কী, সে সম্পর্কে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলেছেন অনিন্দ্য চক্রবর্তী। এনডিটিভি নেটওয়ার্কের দু-দুটো চ্যানেলের একদা ম্যানেজিং এডিটর এই সাংবাদিক রায় দম্পতির আরও অনেক অবদানের কথা লেখার সঙ্গে সঙ্গে লিখেছেন, ভারতের আর সব প্রতিষ্ঠানের মতই এনডিটিভিতেও বিলক্ষণ লুটিয়েন্স এলিটসুলভ ব্যাপার-স্যাপার আছে। কিন্তু অন্য কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠান একজন রবীশ তৈরি করতে পারেনি। কারণ একজন হিন্দি ভাষার সাংবাদিককে অতখানি জায়গা এবং কাজের স্বাধীনতাই কেউ দেয়নি।

এ কথার মাহাত্ম্য বোঝানো শক্ত। কারণ আমরা বাঙালি অ্যাংলোফাইলরা বুঝে উঠতে পারি না আঞ্চলিক ভাষার সাংবাদিকতার গুরুত্ব কতখানি। স্বাধীনতার পর ৭৫ বছর কেটে গেল, অথচ আজও ভারতে প্রগতিশীলতার ভাষা ইংরেজি। আমরা দ্য ওয়্যার, নিউজলন্ড্রি, ক্যারাভ্যান, অল্টনিউজ, বুম লাইভ ইত্যাদি ইংরেজি ভাষার বিকল্প সংবাদমাধ্যম পড়ি/দেখি বলে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির বাইরের সত্য জানতে পারি। কিন্তু এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইংরেজি পড়তে পারেন না, বলতে পারেন না, শুনে বুঝতেও পারেন না। তাঁদের কাছে উদারনৈতিক মতবাদ, ভুয়ো খবর পেরিয়ে সত্য পৌঁছে দেওয়ার দায় আমরা নিই না। আমরা কেবল তাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করেই খালাস। যে কারণে বাংলায় বিকল্প সংবাদমাধ্যম তৈরি করার তেমন প্রয়াস নেই। বাংলার টিভি চ্যানেলগুলোও দুর্গাপুজোয় অ্যাঙ্করদের শাড়ি পরিয়ে, তৃণমূল-বিজেপি তরজা দেখিয়ে, শোভন-বৈশাখী কেচ্ছা দেখিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। যে দক্ষিণপন্থীদের আমরা ঘোর অপছন্দ করি, তারা কিন্তু আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্ব বোঝে। তাই রিপাবলিক হিন্দি খুলে গেছে, রিপাবলিক বাংলাও চলে এসেছে। এই আবহে রবীশকে রায় দম্পতি যে স্থান দিয়েছিলেন তার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের সময়ের কোনো বাঙালি সম্পাদক বাংলায় সাংবাদিকতা করে বিশ্বমানের পুরস্কার পেতে পারবেন? পুরস্কার পাওয়া অবশ্য সবচেয়ে বড় কথা নয়। কিন্তু কলকাতার যে সম্পাদকদের ইদানীং আমরা প্রবাদপ্রতিম বলে মনে করি, রবীশের মত জনগণের দুঃখ দুর্দশা সাংবাদিকতায় নিয়ে আসার ব্যাপারেও তো তাঁদের অবদান শূন্য। ফলে রবীশের মত বিস্তীর্ণ এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষের উপর ইতিবাচক তো নয়ই, নেতিবাচক প্রভাব ফেলার ক্ষমতাও তাঁদের নেই। এঁদের প্রভাব হাওড়া ব্রিজ পেরোলেই শেষ বললে ভুল হয় না।

তার উপর আছে ম্যানেজারি করে সম্পাদক হওয়ার ভান। যে কারণে দেবেশ রায় অশোক দাশগুপ্তের কলামের সংকলনের আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন “এক সময় বাংলা খবরের কাগজে সম্পাদকের সক্রিয় সাংবাদিক হওয়ার বাধ্যতা ছিল। তাঁদের লিখতে হত – চাকরির কারণে নয়, নিজেদের মত দশজনকে জানানোর দরকারে ও দশজনের মত তৈরি করে তোলার দায় স্বীকার করে। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় থেকে সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার বাংলা সাংবাদিকতার সেই ইতিহাস তৈরি করেছেন। বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় শেষ সম্পাদক যিনি নিজে লিখতেন। যদিও তাঁর লেখা তাঁর নামে বেরোত না, তবু পাঠক এমনই চিনত তাঁর লেখা যে সম্পাদকীয়র নৈর্ব্যক্তিকে তিনি হারিয়ে যেতেন না। তারপর বাংলা কাগজে সম্পাদকের লেখালেখি উঠে গেছে।” বাংলার টিভি চ্যানেলের সম্পাদকরা আরও কম সাংবাদিক। তাঁরা সুটেড বুটেড হয়ে সান্ধ্য বিতর্ক পরিচালনা করা আর বিশিষ্টদের সাক্ষাৎকার নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করেন না। রবীশের মত আবর্জনার মধ্যে দাঁড়িয়ে “প্লিজ টেল মনমোহন সিং টু ওয়াচ রবীশ কি রিপোর্ট। ইংলিশ মে ওয়সে ভি ইন্ডিয়া ডেভেলপড লগতা হ্যায়” বলা এঁদের কল্পনাতীত। এই রবীশ টিভি মিডিয়ার বাইরে চলে গেলেন। এতে সত্যিই হয়ত তাঁর ক্ষতি নেই, কিন্তু টিভির দর্শকদের ক্ষতি। টিভির মাধ্যমে তিনি যত হিন্দিভাষী দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারতেন, যত ইংরেজি না জানা মানুষকে বিষাক্ত দক্ষিণপন্থার উল্টো ছবি দেখাতে পারতেন, ইউটিউব চ্যানেল দিয়ে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। কারণ ভারতে মোবাইল ডেটার দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে।

শেষ প্রশ্নে আসব, অর্থাৎ এসব নিয়ে নাগরিক ডট নেট কেন ভাবছে? তার আগে সংক্ষেপে কংগ্রেসি বন্ধুদের এনডিটিভির প্রতি রাগ নিয়ে দু-চার কথা বলে নিই। এনডিটিভি যে উদারনীতির অনুশীলন করেছে সেই ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’-এর সময় থেকে, তা কিন্তু আসলে নেহরুসুলভ উদারনীতি। জওহরলাল নেহরু যে গণতান্ত্রিক উদারতার ধারণায় বিশ্বাসী হয়ে বিদ্যায়তনিক ইতিহাস চর্চায় বামপন্থীদের জায়গা দিয়েছিলেন, ললিতকলা আকাদেমি বা সাহিত্য আকাদেমি নির্মাণ করেছিলেন – সেই উদারতা। ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ঋত্বিক ঘটকের মত ঘোর বামপন্থী, যাঁকে কমিউনিস্ট পার্টি নিজেই হজম করতে পারেনি, তিনি পড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন যে উদারনৈতিক ধারাবাহিকতায়, এনডিটিভি বস্তুত তারই অনুশীলন করেছে। ফলে তা মনমোহনী অর্থনীতির পক্ষ নেয়, আবার গান্ধী পরিবারের সমালোচনাও করে। এই জাতীয় উদারবাদীদের সঙ্ঘ পরিবারের কাছে কোনো প্রত্যাশা নেই, যত প্রত্যাশা কংগ্রেসের কাছে। স্বভাবতই কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন যখন দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে কোনো আগ্রহের বিষয়ই নয়, তখন এনডিটিভি ঘন্টার পর ঘন্টা শশী থারুর আর মল্লিকার্জুন খড়গের সাক্ষাৎকার দেখিয়ে গেছে। মোদী সারাক্ষণের রাজনীতিবিদ, রাহুলের কেন মাঝে মাঝেই ছুটির দরকার হয় – এ কথাও এনডিটিভির মঞ্চ থেকে বহুবার উঠেছে সম্ভবত এই কারণেই। কংগ্রেস এইসব সমালোচনা খোলা মনে নিতে পারলে তাদেরই লাভ হত। সমর্থকরা না নিলেও, রাহুল স্বয়ং বোধহয় নিয়েছেন। ভারত জোড়ো যাত্রা দেখে অন্তত সেরকমই মনে হয়।

দীর্ঘ লেখা এবার শেষ করব কেন এত দীর্ঘ লেখা, কেন আদৌ এ লেখা – সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে।

এ দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সবকটাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা চলছে। শুধু ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী এজেন্ডা তার কারণ নয়। একুশ শতকের পুঁজিবাদ কোনো প্রতিষ্ঠান পছন্দ করে না। সবকিছুকেই কোম্পানি করে তোলাই তার উদ্দেশ্য। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় হবে কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল কোম্পানি – লেখাপড়া হোক আর না-ই হোক। সেটা লাভজনক থাকলে চালানো হবে, নয়ত বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ শিক্ষা পণ্য। খবর এবং/অথবা তথ্য তো পণ্য বটেই। ফলে সংবাদমাধ্যমকেও প্রতিষ্ঠান থাকতে দেওয়া চলে না, তাকেও হতে হবে কোম্পানি। লাভজনক হলে চলবে, নইলে বন্ধ করে দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী হওয়া ভাল, যদি প্রতিস্পর্ধী প্রতিষ্ঠান তৈরি করার দম থাকে। সেসব যখন আমাদের নেই, তখন আজকের পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়া উদযাপন করা মূর্খামি। এতে গণতন্ত্রের পরিসরই যে সংকুচিত হচ্ছে সেকথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

অনেকেই দেখছি বিকল্প সংবাদমাধ্যমের উপর যাবতীয় দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হচ্ছেন। নাগরিক ডট নেটের সদস্য হিসাবে তা দেখে মন্দ লাগে না। কিন্তু মনে রাখা ভাল, ‘বিকল্প’ কথাটা অতি গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্পের ক্ষমতা সীমিত। যাঁরা পড়বেন তাঁরাই টাকা দেবেন, বিজ্ঞাপনের পরোয়া করতে হবে না – এই বিকল্প তৈরি হয়েছে বরখা কথিত অচল রেভিনিউ মডেলের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে। ইংরেজিতে এই মডেল (পোশাকি নাম ক্রাউড-ফান্ডেড মিডিয়া) অনেক ক্ষেত্রেই বেশ সফল, বাংলাতেও এই মডেল নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হবে নির্ঘাত। নাগরিক ডট নেট তো করবেই, আরও অনেকে করলে ভাল। কিন্তু এই মডেলের একটা সীমাবদ্ধতা আছে। বিজ্ঞাপন মডেলের মতই এই ব্যবস্থাতেও যিনি টাকা দেবেন নির্ঘাত তাঁর নিয়ন্ত্রণ থাকবে কনটেন্টের উপর। এক্ষেত্রে যেহেতু টাকা দিচ্ছেন অনেকে, সেহেতু একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ চলবে না বলে কনটেন্টে ভারসাম্য বজায় থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি অবশ্য। কিন্তু যিনি একেবারেই টাকা দিতে পারবেন না, তাঁর কথা কতটা উঠে আসবে? বাজারের যে সবজি বিক্রেতা পাঁচ টাকা দিয়ে দোকানে একটা কাগজ রাখেন বা যে রিকশাচালক বাড়ির টিভিতে দিনে অন্তত একবার খবর দেখেন, তিনি কি মোবাইলে নাগরিক ডট নেট পড়বেন টাকা দিয়ে? যদি না পড়েন, নাগরিক ডট নেট কি তাঁর সুখ দুঃখ তুলে আনার পরিশ্রম করতে পারবে? শ্রমের তো মূল্য আছে। অন্তত থাকা উচিত।

এছাড়াও আছে ঝুঁকির প্রশ্ন। ভারতের সব রাজ্যেই সাংবাদিক ও তাঁর পরিবার পরিজনদের উপর আক্রমণ ক্রমশ বাড়ছে, যে কোনো সমীক্ষায় উঠে আসছে সেই তথ্য। এনডিটিভির মত মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক তবু বিপদে পড়লে সংগঠনের আইনি ও সাংগঠনিক সাহায্য পান। নাগরিক ডট নেটের কেউ বিপদে পড়লে কার সাহায্য পাবে?

বিকল্প সংবাদমাধ্যম বা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যেই বেশ প্রতিষ্ঠিত যারা, সেই নিউজক্লিকের দপ্তরেও কারণে অকারণে সরকারি সংস্থার রেড হয়ে থাকে। মামলা ঠুকে হয়রানি চলে নিয়মিত। এই ধরনের মিডিয়ার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় দ্য ওয়্যার। তারা কিছুদিন আগে এক কেলেঙ্কারি করে বসেছিল। বিরাট খবর করছে মনে করে বিজেপির আই টি সেলের কর্তা অমিত মালব্য এবং ফেসবুককে জড়িয়ে সম্পূর্ণ ভুল খবর পরিবেশন করেছিল। সেই খবর পরে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ন্যক্কারজনক ঘটনা, কিন্তু সাংবাদিকতার ইতিহাসে অভূতপূর্ব নয়। যে কোনো কাজ করতে গেলেই ভুল হয়, খবর করতে গেলেও। কিন্তু সরকারবিরোধী সংবাদমাধ্যম হওয়া এখন এ দেশে বিরাট অপরাধ। তাদের ভুল অমার্জনীয়। তাই কেবল দপ্তরে নয়, দ্য ওয়্যারের প্রধান সিদ্ধার্থ বরদারাজনের বাড়িতেও পুলিস হানা দিয়ে তাঁর ল্যাপটপ, ফোন ইত্যাদি বাজেয়াপ্ত করে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই। এনডিটিভি গেল তো কী হল, বিকল্প সংবাদমাধ্যম দিয়েই কাজ চলে যাবে এই স্বপ্নে যাঁরা বুঁদ হয়ে আছেন তাঁরা এগুলো খেয়াল রাখবেন দয়া করে। এখানেই শেষ নয়। তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে অনলাইন কনটেন্টের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের রাস্তাও পরিষ্কার করা হয়েছে।

ফলে নাগরিক ডট নেটের মত ওয়েবসাইটও খুব নিরাপদ নয়। অতএব স্বাধীন তথা বিকল্প সংবাদমাধ্যমের উপর ভরসা রাখুন, পাশে থাকুন। পকেটের পয়সা দিয়ে এবং আরও যে যে উপায়ে পারেন। কিন্তু পা মাটিতে রাখুন। কোনো মূলধারার সংবাদ প্রতিষ্ঠানের পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজনের হাতে চলে যাওয়ার ঘটনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়, উল্লাস করার তো নয়ই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ভারতীয় দলের জার্সি এখন বিজেপির সম্পত্তি

সেওয়াগের মত কেউ কেউ এতই উগ্র যে অভব্য ট্রোলিংয়েও পিছপা হন না। কিন্তু বিজেপির পতাকা তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয় না। ফ্যাসিবাদী কৌশল হিসাবে এটি বেশি কার্যকরী, কারণ এতে অনেক বেশি মানুষ প্রভাবিত হন। ওর গায়ে জার্সি নেই, অতএব ও নিরপেক্ষ – অধিকাংশ মানুষ এরকম সরলরেখাতেই ভাবতে পছন্দ করেন।

“দাদা আমি সাতে পাঁচে থাকি না।” অরাজনৈতিক হওয়ার ভান করা সুখী বিত্তশালীদের ব্যঙ্গ করে লেখা এই ছড়া ২০২০ সালে রীতিমত ভাইরাল হয়েছিল। আজীবন অভিনয়ের পেশায় যুক্ত থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের চেয়ারম্যান হয়ে যাওয়া রুদ্রনীল ঘোষের তীব্র শ্লেষ কতজনকে বিঁধেছিল তার হিসাব নেই, কিন্তু ছড়াকার হিসাবে রুদ্রনীলের সততাকে সন্দেহ করা যাবে না। অচিরেই প্রমাণ করে দিয়েছিলেন তিনি সাতেও থাকেন, পাঁচেও থাকেন। তৃণমূল কংগ্রেসে থেকে সরকারি আধিকারিক হয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেও ঠিক সময়ে জার্সি বদলে বিজেপিতে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু অরাজনৈতিক হয়ে থাকেননি। এ রাজ্যে সেই ২০১১ সাল থেকে আপনি অভিনেতা বা খেলোয়াড় – যা-ই হোন না কেন, বিখ্যাত হলেই জার্সি পরা বাধ্যতামূলক। যারা কিছুতেই কোনো জার্সি পরেনি তাদের কার্যকলাপ দেখে অন্তর্বাসের রং আন্দাজ করার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। অবস্থা এমন যে যাদের জার্সির চাহিদা নেই তারা কদিন আগেই যাদের অন্তর্বাস “নির্ঘাত সবুজ” বলে গাল দিয়েছে, তাদেরই “ওরটা লাল না হয়ে যায় না” বলে গলা জড়িয়ে ধরছে।

এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। জনপ্রিয় মুখগুলোকে নিজের জার্সি না পরালে ফ্যাসিবাদের চলে না, কারণ তা ফ্যাসিবাদী শক্তিকে বৃহত্তর সামাজিক স্বীকৃতি দেয়। ভোটবাক্সেও তার প্রভাব পড়ে। যে দু-একজন পরতে চায় না তাদের গায়ে বিপক্ষের জার্সি চাপিয়ে না দিলেও চলে না। কারণ তারা ফ্যাসিবাদের সামাজিক স্বীকৃতিকে বিপন্ন করে। কেবল রাজনীতিকে নয়, গোটা সমাজটাকেই এ হেন বাইনারিতে ফেলতে না পারলে ফ্যাসিবাদ বাঁচতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা, নাটক ও খেলার জগতের পরিচিত মুখগুলোকে (সরলমতি মিডিয়া যাদের একদা নাম দিয়েছিল সুশীল সমাজ, এখন নাম রেখেছে বুদ্ধিজীবী) সফলভাবে দলে টেনে অথবা শত্রুপক্ষে ঠেলে দিয়ে ফ্যাসিবাদ অভিপ্রেত সামাজিক স্বীকৃতি আদায় করতে শতকরা একশো ভাগ সফল হয়েছে। রূপোলি পর্দার দেব অধিকারী, নুসরত জাহান, মিমি চক্রবর্তী থেকে শুরু করে ক্রিকেটার মনোজ তিওয়ারি, লক্ষ্মীরতন শুক্লা – সকলেই শাসক দলের জার্সি পরেছেন। আবার রুদ্রনীল, অনিন্দ্যদের মত অতি বুদ্ধিমানরা প্রতি মরসুমে জার্সি বদলে বেড়াচ্ছেন। এসবই ফ্যাসিবাদের সামান্য লক্ষণ। সে প্রসঙ্গে সেটিং আছে না নেই, থাকলে কাদের মধ্যে আছে – তা নিয়ে আলোচনা করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়।

পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলকে ফ্যাসিবাদী শক্তি বললে অনেকে রে রে করে ওঠেন অথবা নানা সূক্ষ্ম তর্কের অবতারণা হয়। সে তর্কে যাব না। কিন্তু কেন্দ্রের শাসক দল যে ফ্যাসিবাদী তা সব বিরোধীই মোটামুটি মেনে নিয়েছেন। সেই সুবাদে কিছু কথা বলতেই এই নিবন্ধের অবতারণা। পশ্চিমবঙ্গে যেমন বিভিন্ন ক্ষেত্রের পরিচিত মুখগুলোকে দলে টেনে বৃহত্তর সামাজিক স্বীকৃতি আদায় করা হয়েছে, ফ্যাসিবাদ সারা দেশেই সেই পন্থা নিয়েছে বেশ কিছুদিন হল। কাজটা যে করা হচ্ছে তা কিন্তু এখনো অনেকেই মানতে পারেন না, কারণ ভারতীয় জনতা পার্টি এই কাজ তৃণমূল কংগ্রেসের মত গোদা পথে করেনি এতদিন। উদাহরণস্বরূপ, বলিউড এবং ক্রিকেট জগতের জনপ্রিয় মুখগুলো বিভিন্ন ইস্যুতে বিজেপির পক্ষ নিয়ে টুইট করলে বা বক্তৃতা দিলেও তাদের সাংসদ বা বিধায়ক করা হয়নি। মন্ত্রী তো নয়ই। অনুপম খের, কঙ্গনা রানাওয়াত, অক্ষয় কুমাররা এখনো বিজেপির পার্টি সদস্য নন। বিরাট কোহলি, শচীন তেন্ডুলকর, অনিল কুম্বলে, বীরেন্দ্র সেওয়াগরা যে কোনো ইস্যুতে বিজেপি সরকারের পক্ষ নিয়ে প্রয়োজন পড়লেই টুইট করে দেন (অনেক সময় দেখা যায় বয়ানটা দাঁড়ি, কমা সুদ্ধ এক)। সেওয়াগের মত কেউ কেউ এতই উগ্র যে অভব্য ট্রোলিংয়েও পিছপা হন না। কিন্তু বিজেপির পতাকা তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয় না। ফ্যাসিবাদী কৌশল হিসাবে এটি বেশি কার্যকরী, কারণ এতে অনেক বেশি মানুষ প্রভাবিত হন। ওর গায়ে জার্সি নেই, অতএব ও নিরপেক্ষ – অধিকাংশ মানুষ এরকম সরলরেখাতেই ভাবতে পছন্দ করেন। ফলে একই কথা গৌতম গম্ভীর বা ভোজপুরি সিনেমার নায়ক মনোজ তিওয়ারি বললে বিজেপি সমর্থক বাদে অন্যরা মানতে চাইবেন না, সন্দেহ করবেন। কারণ ওঁরা বিজেপির সাংসদ। কিন্তু কোহলি বা অক্ষয় বললে অনেক বেশি মানুষ মেনে নেবেন। বিজেপি একথা জানে বলেই ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখগুলোকে ভোটে দাঁড় করানোর জন্য বা নির্বাচনী প্রচারে হাজির করানোর জন্য আদেখলেপনা নেই। গম্ভীর বা তিওয়ারির জনপ্রিয়তা বিরাট বা অক্ষয়ের মত দেশব্যাপী নয়, বিভিন্ন মতের মানুষের মধ্যেও নয়। ফলে তাঁদের কাজে লাগানো হয় সূক্ষ্মতর উপায়ে লোকের মাথা খেতে।

এই প্রক্রিয়ার সাফল্য কতদূর সে আলোচনায় আসব। তার আগে বলে নিই, আসন্ন গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে এমন একটা কাণ্ড ঘটেছে যাতে ফ্যাসিবাদ যে সামাজিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য জনপ্রিয় মুখগুলোকে ব্যবহার করার স্তর অতিক্রম করে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করতে শুরু করেছে তা প্রমাণ হয়ে গেছে। এ জিনিসও আসলে আগেই শুরু হয়েছে, কিন্তু প্রায় কেউই বিশ্বাস করছিলেন না। আমি নিজেই অন্তত গোটা তিনেক লেখায় এ বিষয়ে লিখেছি এবং ঘোর বামপন্থীরাও হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। এবার আর উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ চোটের কারণে এই মুহূর্তে ভারতীয় ক্রিকেট দলের বাইরে থাকা অলরাউন্ডার রবীন্দ্র জাদেজা গত মঙ্গলবার (২২ নভেম্বর) বিজেপির হয়ে জামনগর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের প্রচারে নেমেছিলেন। রীতিমত রোড শো করেছেন। এমনিতে ব্যক্তি জাদেজা এমনটা করতেই পারেন। আইনত কোনো বাধা তো নেই বটেই, নীতিগতভাবেও আপত্তি করা চলে না, সমালোচনা করা চলে। আমেরিকার মহিলা ফুটবল দলের অধিনায়িকা মেগান র‍্যাপিনো যদি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থন করতে পারেন, জাদেজাই বা কেন তাঁর পছন্দসই দলের হয়ে প্রচার করতে পারবেন না? কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। বিজেপি এই রোড শোয়ের প্রচার করতে যে পোস্টার তৈরি করেছে তাতে জাদেজার গায়ে ভারতীয় দলের জার্সি। অর্থাৎ ওই কেন্দ্রের বাসিন্দা ক্রিকেটার জাদেজা বিজেপিকে ভোট দিতে বলছেন – শুধু এটুকু বক্তব্য নয়। ভারতীয় দল, যা আমার আপনার প্রতিনিধি হিসাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে, তাদের একজন প্রতিনিধি বলছেন বিজেপিকে ভোট দিতে।

বিজেপি অবশ্য ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করে থাকে সাবলীলভাবে। গত লোকসভা নির্বাচনের আগে পুলওয়ামায় বোমা বিস্ফোরণে যে সিআরপিএফ জওয়ানরা শহিদ হয়েছিলেন তার জন্য কারা দোষী তা উদ্ঘাটন করার উদ্যোগ আজ অবধি দেখা গেল না। অথচ প্রধানমন্ত্রীর দল সেবার প্রায় গোটা নির্বাচনটাই লড়ল শহিদদের নাম করে। কেউ তদন্তের দাবি করলেই তাদের দেশদ্রোহী বলা হয়েছিল, আজও হয়। প্রয়াত সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াত যে ভাষায় কথা বলতেন তাতে প্রায়শই বোঝা শক্ত হত তিনি সেনাবাহিনীর লোক না শাসক দলের লোক। সেনাবাহিনীর জওয়ানরা নিজেদের হতশ্রী অবস্থার কথা প্রকাশ করলে কিন্তু উন্নতির প্রয়াস হয় না, উল্টে জওয়ানদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। অবসরপ্রাপ্ত সেনানীরা ‘ওয়ান র‍্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন’ দাবি করতে গিয়ে যে অমিত শাহের অধীন পুলিসের গলাধাক্কা খেয়েছিলেন সেকথা অগ্নিবীর প্রকল্পের যুগে আর কে-ই বা মনে রেখেছে? কিন্তু সেনাবাহিনীর রাজনীতিকরণ যতখানি বিপজ্জনক, তার চেয়ে কম বিপজ্জনক নয় সরকারের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আত্মসাৎ করে নেওয়া।

ভাল হোক মন্দ হোক, আবালবৃদ্ধবনিতার ভোটাধিকারসম্পন্ন ভারতে গণতন্ত্রের অনুশীলন চলেছে সাড়ে সাত দশক। তার কিছু দীর্ঘমেয়াদি লাভ রয়েছে। যেমন এখনো দেশের আধিপত্যবাদী সরকারকে কিছু জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালিয়ে যেতে হচ্ছে এবং নির্বাচনের প্রাক্কালে ঘোষণা করতে হচ্ছে, জিতলে এই দেব বা ওই দেব। কারণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোটাররা জেনে এসেছেন গণতন্ত্রে তাঁদের কিছু প্রাপ্য আছে। এই ধারণা বদল করার প্রক্রিয়া স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শুরু করেছেন বটে, কিন্তু তাঁর নিজের দলকেও “রেউড়ি কালচার” মানতেই হচ্ছে। এটুকুই ভারতীয় গণতন্ত্রের অর্জন। তেমনই এক অর্জন এই ধারণা, যে ভারতের হয়ে খেলে যে দল, সে দল সব ভারতীয়ের। কংগ্রেসের নয়, বিজেপির নয়, সিপিএমের নয়, তৃণমূলের নয়, এমনকি সরকারেরও নয়। আবার এই তালিকার সকলেরই। এমন নয় যে স্বাধীনতার আগে বা পরে ফুটবল, ক্রিকেট বা অন্যান্য খেলার প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো রাজনৈতিক দল নাক গলায়নি বা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেনি। এনকেপি সালভে, মাধবরাও সিন্ধিয়া, শরদ পাওয়ারের মত কংগ্রেস, এনসিপি নেতারা ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হয়েছেন। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী, প্রফুল প্যাটেল সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সর্বোচ্চ পদে আসীন থেকেছেন দীর্ঘকাল। ভারতীয় অলিম্পিক সংস্থার শীর্ষ পদে কংগ্রেসি সুরেশ কালমাদির কার্যকলাপ নিয়ে তো যত কম বলা যায় তত ভাল। রাজ্য স্তরে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের মাথায় পুলিস কর্তা প্রসূন মুখার্জিকে বসানোর জন্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের অতিসক্রিয়তাও ভোলার নয়। কিন্তু কোনো নেতা, কোনো রাজনৈতিক দলই কখনো ভারতীয় দলকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেননি।

চলতি ফুটবল বিশ্বকাপ রাজতান্ত্রিক কাতারে হওয়ায় অতীতের ফ্যাসিবাদী বা জুন্টা সরকার চালিত রাষ্ট্রগুলোতে বিশ্বকাপ, অলিম্পিকের মত প্রতিযোগিতা বা জাতীয় দলকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর ইতিহাস নিয়ে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে। মনে রাখা ভাল, তেমন ঘটনা কিন্তু ভারতের কোনো সরকার কখনো ঘটায়নি। জাদেজার ঘটনা স্পষ্ট দেখিয়ে দিল, এবার আমরা ইতিহাসের সেই বিপজ্জনক অধ্যায়ে ঢুকে পড়েছি যখন শুধু রাজনীতি নয়, দেশের সবকিছুর উপরেই সরকার নিজের মালিকানা কায়েম করে, সাধারণ মানুষের আবেগের সঙ্গে সম্পৃক্ত জাতীয় দলের উপরেও।

কেন করে? ঠিক যে কারণে সেনাবাহিনী আর নিজেদের দলকে এক করে দেখায়, সেই কারণেই। অর্থাৎ দেশের জন্যে প্রাণ দিতে উদ্যত সৈনিকরা, দেশের প্রতিনিধি খেলোয়াড়রা আমাদের লোক। তারা মনে করে আমরাই সেরা – এই ধারণা সাধারণ মানুষের মনে প্রতিষ্ঠা করতে। যে কোনো একনায়ক বা একনায়ক হয়ে উঠতে চাওয়া শাসকের এটিই অভিজ্ঞান। সম্প্রতি ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হেরে অপসারিত হওয়া জেয়ার বলসোনারোও একই চেষ্টা করেছিলেন। সারা বিশ্বের ব্রাজিল ভক্তদের প্রিয় হলুদ-সবুজ জার্সিকে নিজের প্রচারে এমনভাবে ব্যবহার করেছিলেন বলসোনারো, যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগেই বিশ্বকাপ দলের কোচ তিতে বলে রেখেছেন, খেতাব জিতলেও ১৯৫০ সাল থেকে চলে আসা প্রথা ভেঙে তিনি দলের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করতে যাবেন না। ১৯৫২ সালে ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের সময়ে পাশ্চাত্যের পণ্ডিতরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সেটাই হবে ভারতের প্রথম এবং শেষ নির্বাচন। তাঁদের মুখে ছাই দিয়ে আমাদের দেশে পাকিস্তানের মত জুন্টা সরকার বা সেনাবাহিনীর অঙ্গুলিহেলনে চালিত নড়বড়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলেই জাতীয় দলের জার্সি নিয়ে ওরকম নোংরা রাজনীতি কখনো হয়নি। সি কে নাইডু থেকে শচীন তেন্ডুলকর পর্যন্ত সব ক্রিকেট তারকাই আমাদের সকলের হয়েছেন। ১৯৭১ সালে ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজে প্রথম সিরিজ জয় বা ১৯৮৩, ২০০৭, ২০১১ সালের বিশ্বকাপ জয়ে দলমত নির্বিশেষে সব ভারতীয়ই গর্বিত হতে পেরেছে। সে সুদিন ফুরোতে চলল।

সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকাদের কাজে লাগানোর ছক ব্রাজিলেও দেখা গেছে। নির্বাচনের কদিন আগে নেইমার বলসোনারোকে সরাসরি সমর্থন করেন। কিন্তু বিজেপির অভিভাবক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। ফলে বলসোনারো বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে এসব ব্যাপারে বিজেপি সূক্ষ্মতর, সুতরাং সফলতর। এই মুহূর্তে ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব বিরাট ডিমনেটাইজেশনের পরেই সাংবাদিক সম্মেলনে বলে দেন, ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে ওই সিদ্ধান্ত সর্বশ্রেষ্ঠ। একেবারে আরএসএসের সুরেই ২০১৮ সালে এক ক্রিকেটভক্তকে বলেন অন্য দেশের ক্রিকেটারদের পছন্দ করলে অন্য দেশেই চলে যেতে। অথচ আজও ভারতের উদারবাদী, প্রগতিশীলরা বিরাট বলতে অজ্ঞান। তাঁর ব্যাটিং নিয়ে অভিভূত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু বিরাটকে দক্ষিণপন্থী বললে প্রবল বামপন্থীরাও বেজায় রেগে যান। এমনকি বিরাটের হাত থেকে অধিনায়কত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে মহম্মদ শামির পক্ষ নিয়ে কথা বলার ফলে – এমন কষ্টকল্পনাও তাঁরা করে ফেলতে পারেন। অথচ বিরাট তাঁর টিমমেটের পাশে দাঁড়িয়ে কিছু সোশাল মিডিয়া ট্রোলকে জবাব দিয়েছিলেন, ক্ষমতার বিরুদ্ধে মোটেই দাঁড়াননি। তাঁর নিজের শহর দিল্লিতে যখন গরীব মুসলমানদের বাড়ি, দোকান বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয় তখন তাঁকে বলতে শোনা যায়নি “ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এই সিদ্ধান্ত সবচেয়ে লজ্জাজনক।”

বিরাটকে নিয়ে ভারতের অনেক নারীবাদীও উচ্ছ্বসিত, কারণ নিজের সাফল্যের মুহূর্তে তিনি সবসময় স্ত্রী অনুষ্কাকে কৃতিত্ব দেন, নিজের ব্যর্থতায় অনুষ্কা ট্রোলড হলে সোচ্চারে পাশে দাঁড়ান। কী নিষ্পাপ মুগ্ধতায় এই নারীবাদীরা গ্রাহ্যই করেন না, বক্সার বিজেন্দর সিং, প্রাক্তন ক্রিকেটার আশিস নেহরা, বর্তমান ক্রিকেটার শিখর ধাওয়ানের মত বিরাটও গুরমীত রাম রহিম সিং ইনসানের আশীর্বাদধন্য। এই গুরুদেব যে সে লোক নন, ইনি ধর্ষণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের বক্তব্য পড়লে শিউরে উঠতে হয়। বলা যেতেই পারে, বিরাট বহু বছর আগে যখন গুরমীতের কাছে গিয়েছিলেন তখন এসব জানতেন না বা তখনো হয়ত ওসব ঘটেনি। কিন্তু বিরাট অর্থনীতি জানেন, ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস জানেন, কেবল অস্বস্তিকর তথ্যগুলো জানেন না – এ কেমন করে সম্ভব? গুরমীতের কীর্তিকলাপ পরে প্রকাশ্যে এসেছে, এমনটা অবশ্য খুবই সম্ভব। কিন্তু বিরাট কি তখন দুঃখপ্রকাশ করেছেন অতীতে ওই লোকের আশীর্বাদ নিতে গিয়েছিলেন বলে? ২০১৭ সালে একবারই তিনি গুরমীত সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। তাতে কিন্তু বলেননি যে গুরমীতের কাছে কখনো যাননি। শুধু রসিকতা করে বলেছিলেন “Funniest part was him calling Jagdish Nehra and Jousuf Pathan??”

গেরুয়া জার্সিটি না পরে বিরাট এসব কাণ্ড করে বেড়ান বলে গেরুয়া রাজনীতির বিরোধীদের চোখে তিনি একইরকম প্রিয় থেকে যান এবং তাঁদের অজান্তেই তাঁদের মধ্যে বিভাজনের বিষ ঢুকে পড়ে। তারই প্রতিফলন দেখা যায় দুই বন্ধু বিরাট বড় না রোহিত শর্মা বড় তা নিয়ে ঝগড়া করতে করতে খুন করে ফেলায়। ওই খুনের জন্য বিরাট দায়ী নন, দায়ী যে বিভাজনের রাজনীতির প্রচারে তিনি নিজের খ্যাতিকে ব্যবহার করেন সেই রাজনীতি। এমন বিদ্বেষে দীর্ণ সমাজই ফ্যাসিবাদের প্রার্থিত।

ভারতীয় ক্রিকেট দলের দক্ষিণপন্থী রাজনীতির মুখপাত্র হয়ে ওঠার কাজটা কিন্তু আজ শুরু হয়নি। হয়েছিল ২০১৯ সালের ৮ মার্চ, যখন পুলওয়ামায় নিহত জওয়ানদের শ্রদ্ধা জানাতে ভারতীয় দল সেনাবাহিনীর মত ক্যামোফ্লাজ ক্যাপ পরে মাঠে নেমেছিল রাঁচিতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে একদিনের ম্যাচে। সেখানে রাজনীতিকরণকে ক্যামোফ্লাজ করা হয়েছিল শহিদদের নাম করে। কিন্তু ক্রিকেট দলের সামরিকীকরণও যে অন্যায় সেকথা ভারতে কেউ বলেনি, উদারপন্থী বা বামপন্থী ক্রিকেটভক্তরাও বলেননি। কারণ তাঁরা খেলা রাজনীতির বাইরের বিষয় বলে মনে করেন। এই বালখিল্য মানসিকতার সুযোগ নিয়েই ভারতীয় ফ্যাসিবাদ সামাজিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। লক্ষণীয়, ভারতের অন্যতম ঐতিহ্যশালী ক্রিকেট মাঠ ফিরোজ শাহ কোটলার নামকরণ করা হয়েছে অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম। ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মত বড় দলের ভারত সফরের সূচিতে জায়গা পাচ্ছে না ক্রিকেটের নন্দনকানন ইডেন গার্ডেন্স বা মুম্বাইয়ের ঐতিহ্যশালী ওয়াংখেড়ে আর ব্র্যাবোর্ন স্টেডিয়াম। তালিকায় থাকছে জীবিত প্রধানমন্ত্রীর নামাঙ্কিত আমেদাবাদের স্টেডিয়ামটি।

আরও পড়ুন টুপির আমি টুপির তুমি?

আজ ভারতীয় দলের জার্সি বিজেপির নির্বাচনী প্রচারে কাজে লাগানো হচ্ছে, কাল খেলোয়াড়দের জয়-পরাজয় বিজেপিরই জয়-পরাজয় বলে গণ্য হবে। ইতিমধ্যেই সে অভিজ্ঞতা ভারতের অলিম্পিক খেলার ক্রীড়াবিদদের হয়ে গেছে। কমনওয়েলথ গেমস, এশিয়ান গেমস বা অলিম্পিকের প্রোমো ভিডিও জুড়ে থেকেছেন ক্রীড়ামন্ত্রীরা। পদকজয়ীদের সংবর্ধনা সভায় প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এভাবেই চলবে, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে খেলাধুলো এভাবেই চলে। মুশকিল হল, জুন্টা সরকার বা এ ধরনের আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রে যতক্ষণ মাঠে জয় আসে ততক্ষণ সব ঠিক থাকে। পরাজয়ের ফল হয় ভয়ংকর। যে ক্রীড়াবিদরা আজ জল্লাদের উল্লাসমঞ্চে উঠছেন এবং যে ক্রীড়াপ্রেমীরা হাততালি দিচ্ছেন, তাঁরা কিন্তু সেদিন কেঁদে কূল পাবেন না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

কোরোকোরো কোমিক্কু কমিক্স এবং বিশ্বকাপে এশিয়া

আইএসএলের কথা ভেবে স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছা করছে? জাপান কিন্তু স্রেফ জে-লিগ চালু করে ক্ষান্ত হয়নি। গোড়া কেটে আগায় জল দেওয়া তাদের স্বভাব নয়। জাপানে স্কুল ফুটবলকে প্রচণ্ড গুরুত্ব দেওয়া হয়।

“চীন, ব্রহ্মদেশ, অসভ্য জাপান,/তারাও স্বাধীন, তারাও প্রধান” কিন্তু ভারত ঘুমিয়ে আছে – এমন বিলাপ করেছিলেন কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সে শ দেড়েক বছর আগেকার কথা। আজকের বাঙালি চীন, জাপানকে অসভ্য দেশ ভাবার ভুল করে না। কিন্তু চারবারের বিশ্বকাপ জয়ী জার্মানিকে জাপান এক গোলে পিছিয়ে পড়েও হারিয়ে দিল দেখে ভারতের ঘুমিয়ে থাকা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস যে পড়ে না – এমন কথা হলফ করে বলা যায় না।

অবশ্য এবারের বিশ্বকাপ যেভাবে আরম্ভ হয়েছে, তাতে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে শুরু করলে আর থামা শক্ত হবে। আয়োজক কাতার বাদে এশিয়া মহাদেশের সব দেশই রীতিমত সাড়া জাগিয়ে শুরু করেছে। শুক্রবার রাতে নেদারল্যান্ডস আর ইকুয়েডরের খেলা ড্র হওয়া মাত্রই কাতারের বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেছে। কিন্তু তার কিছুক্ষণ আগেই বিশ্বখ্যাত গ্যারেথ বেলের ওয়েলসের বিরুদ্ধে রোমহর্ষক জয় হাসিল করেছে ইরান।

ইরান কিন্তু প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আধ ডজন গোল হজম করেছিল। খেলা নয়, প্রশংসিত হয়েছিল ইরান দলের জাতীয় সঙ্গীত গাইতে অস্বীকার করা। মাহসা আমীনীর রাষ্ট্রীয় হত্যার পর ইরান এখন আন্দোলনে উত্তাল। কেবল মহিলারা নন, বহু পুরুষও গ্রেপ্তার হচ্ছেন। ইরান যখন একের পর এক গোল খাচ্ছিল গ্যারেথ সাউথগেটের দলের কাছে, তখন বহু শহরে উল্লাসে ফেটে পড়ছিলেন মানুষ। কারণ জাতীয় দল, স্বভাবতই, তাঁদের কাছে দেশের সরকারের প্রতীক। তৎসত্ত্বেও ম্যাচের পর ইরান অধিনায়ক এহসান হজসফি জানান, তাঁরা সরকার নয়, দেশের মানুষেরই পাশে আছেন। এই দুঃসাহসের কী ফল হজসফি ও তাঁর সতীর্থরা পরিবার সমেত ভোগ করবেন তা দেশে ফিরলে হয়ত টের পাওয়া যাবে। বলা বাহুল্য, ইরান সরকার পিঠ চাপড়ে দেওয়ার জন্য বসে নেই।

ইতিমধ্যেই খানিক প্রতিক্রিয়া হয়েছে নিশ্চয়ই, ফলে ওয়েলসের বিরুদ্ধে ম্যাচে জাতীয় সঙ্গীতে গলা মিলিয়েছেন হজসফিরা। কিন্তু সেসব চাপ সামলেও ‘খেলতে পারে না, শুধু প্রতিবাদ করতে পারে’ এই বিদ্রূপ কড়ায় গণ্ডায় চুকিয়ে দিয়ে নব্বই মিনিট আপ্রাণ লড়াই করার পর শেষ মুহূর্তে দুটো গোল দিয়ে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। ইংল্যান্ড বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হওয়ায় ইরানের সামনে এখনো পরের রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ২০১৪ আর ২০১৮ বিশ্বকাপেও যথাক্রমে আর্জেন্টিনা এবং স্পেনের মত দলের সঙ্গে জোরদার লড়াই করেছিল তারা, হেরেছিল ১-০ গোলে। সুতরাং এবার দ্বিতীয় রাউন্ডে পৌঁছলে তা হবে দীর্ঘ পরিশ্রমের ফল।

ইতালিয়া ৯০-এর ক্যামেরুন থেকে শুরু হয়েছিল আফ্রিকার দলগুলোর বিশ্বকাপ মাতিয়ে দেওয়া খেলা। কোনোবার নাইজেরিয়া, কোনোবার সেনেগাল চমকে দিয়েছে। ২০১০ বিশ্বকাপে শেষ মুহূর্তে লুই সুয়ারেজ হাত দিয়ে গোল আটকে না দিলে হয়ত প্রথম আফ্রিকান দল হিসাবে ঘানা সেমিফাইনালেও পৌঁছে যেত। সেই আফ্রিকা এবারে এখনো নিষ্প্রভ, বরং এশিয়া চমকে দিচ্ছে।

এমনিতে দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে এশিয়ার সবচেয়ে ধারাবাহিক দল। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন আর জার্মানি ছাড়া তারাই একমাত্র দল যারা গত দশটা বিশ্বকাপেই খেলেছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। একমাত্র ২০০২ সালে ঘরের মাঠে সেমিফাইনালে পৌঁছনো ছাড়া তাদের বলার মত কোনো সাফল্য নেই। এবারে যথেষ্ট শক্তিশালী উরুগুয়ের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র দিয়ে শুরু করা আশাব্যঞ্জক। যদিও গ্রুপ এইচ বেশ কঠিন।

কোচ হার্ভে রেনার্ড ছাড়া সৌদি আরব আর সকলকেই চমকে দিয়েছে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে। চমক আরও বাকি আছে কিনা সময় বলবে, তবে সৌদির সাফল্যে তাদের কোচের অবদান কিন্তু অনেকখানি। রেনার্ড কোনো কুলীন ইউরোপিয় ক্লাবের কোচ ছিলেন না কখনো, কিন্তু আফ্রিকা, এশিয়ার খেলোয়াড়দের মনমেজাজ, শক্তি-দুর্বলতা তাঁর নখদর্পনে। জাম্বিয়া আর আইভরি কোস্টকে আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস খেতাব জিতিয়েছিলেন। সে কারণেই তৈল ধনে ধনী সৌদি কর্তারা তাঁকে জাতীয় দলের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

জাপানের চমক কিন্তু এক ম্যাচে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ তাদের এই সাফল্যের সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল ১৯৯৩ সালে তৎকালীন লিগের খোলনলচে বদলে ফেলে জে-লিগ চালু করার মাধ্যমে। বয়স্ক বাঙালি ফুটবলপ্রেমীদের বিলক্ষণ মনে আছে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ব্রাজিলিয় ট্র‍্যাজিক নায়ক জিকোর জাপানের লিগে খেলতে আসার কথা। আরও বহু ফুটবলোন্নত দেশের তারকাই সেসময় জাপানে খেলতে আসেন। তবু জাপান এশিয় ফুটবলে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠলেও বিশ্ব স্তরে তেমন ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেনি তখনই। আজকের অবস্থায় পৌঁছতে সময় লেগেছে।

আইএসএলের কথা ভেবে স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছা করছে? জাপান কিন্তু স্রেফ জে-লিগ চালু করে ক্ষান্ত হয়নি। গোড়া কেটে আগায় জল দেওয়া তাদের স্বভাব নয়। জাপানে স্কুল ফুটবলকে প্রচণ্ড গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিশু বয়স থেকে শুরু হয় স্কাউটিং। ‘নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ কাগজের এক প্রতিবেদন বলছে, জাপানি শিশুদের মধ্যে ফুটবল ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ ৩৫ বছর ধরে করে চলেছেন টম বায়ার বলে এক আমেরিকান। আটের দশকে অবসর নেওয়ার পর তিনি জাপানেরই বাসিন্দা হয়ে যান। ছোটদের জন্য একগুচ্ছ ফুটবল স্কুল খোলেন দেশের বিভিন্ন জায়গায়। আরও মজার কথা, সে যুগে ছোটদের মধ্যে প্রবল জনপ্রিয় কমিক্সে ‘কোরোকোরো কোমিক্কু’-তে ফুটবল শেখার কায়দাকানুন শিশুপাঠ্য করে লিখতে থাকেন। সেদিন জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে দিল যে জাপান দল, তাদের তিনজন ফুটবলার – মিনামিনো, দোয়ান আর এন্দো – বায়ারের সেই স্কুলগুলোর ছাত্র ছিলেন।

আরও পড়ুন জাতীয় ফুটবল দলের ইতিহাসের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত

এত কাঠখড় পুড়িয়ে জাপানি ফুটবল এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যে বিশ্বকাপের ২৬ জনের দলের সাতজন খেলেন বুন্দেশলিগায় আর একজন জার্মানির দ্বিতীয় ধাপের লিগে। এঁদের মধ্যে জার্মান লিগে সবচেয়ে বেশি সমীহ করা হয় মাঝমাঠের খেলোয়াড় দাইচি কামাদাকে। তিনি খেলেন এইন্ট্রাখট ফ্র‍্যাঙ্কফুর্টে। জার্মানির বিখ্যাত ক্লাব ভিএফবি স্টুটগার্টের স্কাউটরা কদিন আগেই জাপানের শোশি হাইস্কুলের ছাত্র আনরি চেইসুকে সই করিয়েছে। সে ইতিমধ্যেই জাপানের অনূর্ধ্ব-১৭ ও ২৩ দলে খেলে ফেলেছে।

অর্থাৎ জাপান ফুটবলে সূর্যোদয় সবে শুরু হয়েছে। চলতি বিশ্বকাপেই তারা সাফল্যে দক্ষিণ কোরিয়াকে টপকে গেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আবার বাকি তিনটে ম্যাচে তেমন কিছু করতে না পারলেও আগামীদিনে বিশ্ব ফুটবলে সমীহ করার মত এশিয় শক্তি হয়ে ওঠার পথে তারাই সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

জাতীয় সঙ্গীত এবং নেশন: ইরান যা ভাবায়

নেশন যে একটা বানিয়ে তোলা ধারণা – রবীন্দ্রনাথের এই মতের চমৎকার প্রমাণ পাওয়া যায় ভারত বনাম বাংলাদেশ খেলা হলে। একই কবির একই ভাষায় লেখা দুটো গান গায় দুই আলাদা নেশনের মানুষ।

জাতীয় সঙ্গীত না গাওয়ার কী কী ফল হতে পারে? ইসলামিক আইনে চালিত, এই মুহূর্তে গনগনে বিদ্রোহের আগুনে ঝলসাতে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে কী হতে পারে জানি না, তবে সাংবিধানিকভাবে এখনো ধর্মনিরপেক্ষ এবং তথাকথিত আধুনিক আইনকানুন মেনে চলা দেশ ভারতে কী হতে পারে তার বেশকিছু দৃষ্টান্ত আছে।

২০১৮ সালের দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন নিজেদের দেশের সবচেয়ে সংস্কৃতিবান এবং প্রগতিশীল জনগোষ্ঠী বলে দাবি করা কলকাতার বাসিন্দারা স্টার থিয়েটারে ন জন দর্শকের দিকে তেড়ে যান সিনেমা শুরু হওয়ার আগে ‘জনগণমন’ চলার সময়ে উঠে দাঁড়িয়ে গান না করার অপরাধে। অথচ সে বছরের জানুয়ারিতেই সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টেরই জারি করা সিনেমা হলে জাতীয় স্তোত্র বাজানো বাধ্যতামূলক করার আদেশ বাতিল করে দিয়ে বলেছিল, “The interim order passed on November 30, 2016 is modified that playing of national anthem prior to screening of a film is not mandatory or directory”। কিন্তু দেশের অবস্থা তখনই এমন, যে ওই আদেশ পুরোপুরি বাতিল করার সাহস সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদেরও হয়নি। বর্তমান প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড় সে সময়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বটে “should we wear our patriotism on our sleeves”? কিন্তু আদালত এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্কোয়্যার পাস দিয়েছিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভাকে।

সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের পর ৯ জানুয়ারি দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া কলকাতার বিভিন্ন সিনেমা হলের মালিকদের মতামত প্রকাশ করেছিল এক প্রতিবেদনে। সেই প্রতিবেদন পড়লে বোঝা যায়, ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাতিরাষ্ট্র এবং জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে যে মনোভাবই থেকে থাকুক, কলকাতার হলমালিকরা ব্যবসার মত জাতীয়তাবাদের প্রতিযোগিতাতেও হারতে রাজি নন।

প্রিয়া সিনেমার মালিক অরিজিৎ দত্ত বলেছিলেন “সুপ্রিম কোর্টের এই আদেশে আমার এখানে কোনো তফাত হবে না। আমি জাতীয় সঙ্গীতের বদলে বন্দে মাতরম বাজাব। আশা করব দর্শকরা উঠে দাঁড়াবেন। তবে আমি কাউকে জোর করব না।” মিনার, বিজলী, ছবিঘরের মালিক সুরঞ্জন পাল বলেছিলেন “সুপ্রিম কোর্টের নতুন অর্ডার জাতীয় স্তোত্র বাজানো বাধ্যতামূলক নয় বললেও আমি বাজাতেই থাকব। আমি এ-ও আশা করব যে গান চলার সময়ে দর্শকরা উঠে দাঁড়াবেন।” নবীনার মালিক নবীন চৌখানি আবার একটা নতুন কথা বলেছিলেন। “আগের অর্ডারটা বৈষম্যমূলক ছিল। কেবল সিনেমা হলগুলোকে জাতীয় স্তোত্র বাজানোর জন্যে বেছে নেওয়া হল কেন? রেস্তোরাঁ, খেলার মাঠ – এসব জায়গায় তো বাজাতে বলা হয়নি।”

অর্থাৎ দিনের যে কোনো সময়ে যে কোনো উদ্দেশ্যে আপনি যেখানেই যান না কেন, রাষ্ট্রের ইচ্ছা হলেই আপনাকে সাবধান পজিশনে দাঁড় করিয়ে জাতীয় স্তোত্র বাজিয়ে দেওয়া হবে আর আপনাকেও সুবোধ বালক/বালিকা হয়ে গাইতে হবে। এই ব্যবস্থায় বিশেষ কারোর আপত্তি নেই। শুধু তাই নয়, কেউ ভিন্নমত হলে তাকেও মেরে ধরে দাঁড় করিয়ে গাওয়ানোর উদ্যোগ নেবে লোকে।

চেন্নাই, বেঙ্গালুরুতেও সেসময় সিনেমা হলে এ নিয়ে বিস্তর গোলমাল, হাতাহাতি হয়েছিল, গৌহাটিতে হুইলচেয়ারে বসা এক শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষকেও জাতীয়তাবাদী দর্শকরা উঠে না দাঁড়ানোর জন্য গালাগালি করেছিলেন। উল্লেখ্য, জাতীয় সঙ্গীত বা জাতীয় পতাকার অবমাননা আইনত অপরাধ বলে গণ্য হলেও আইনে কোথাও বলা নেই উঠে না দাঁড়ানো মানে অবমাননা করা। যা-ই হোক, আজও রমরমিয়ে সিনেমা হলে জাতীয় স্তোত্র বেজে চলেছে, অধিকাংশ নাগরিক উঠে দাঁড়িয়ে গান গেয়েও থাকেন। ইদানীং অবশ্য যারা উঠে দাঁড়ায় না তাদের দিকে তেড়ে যাওয়ার ঘটনা তত শোনা যায় না। অনেকে ওসব ঝামেলা এড়াতে গান বেজে যাওয়ার পরে হলে ঢোকেন। তার মানে ঝামেলা যে হতে পারে সে আতঙ্ক সফলভাবে সকলের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া গেছে। সিনেমা হলে জাতীয়তাবাদ প্রদর্শন কর্তব্য বলে স্বীকৃত হয়েছে। সে কর্তব্য পালন না করলে গারদে পুরে দেওয়ার আইন এখনো পাস হয়নি বটে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কদিন আগে বলে দিয়েছেন, শুধু বন্দুকধারী নয়, কলমধারী নকশালদেরও সমূলে উৎপাটিত করতে হবে। তেমন কিছুদিন পরে বলতেই পারেন, শুধু রাজনীতি করা অ্যান্টি-ন্যাশনাল নয়, জাতীয় স্তোত্র না গাওয়া অ্যান্টি-ন্যাশনালদেরও গ্রেপ্তার করতে হবে। কে না জানে, প্রধানমন্ত্রী যে সে লোক নন? তিনি বিষ্ণুর একাদশ অবতার। অতএব তাঁর কথাই আইন। তিনি বললেই জাতীয় স্তোত্র গাইতে যারা উঠে দাঁড়ায় না তাদের হাজতবাস করানোর জন্য সিনেমা হলে কাতারে কাতারে পুলিস মোতায়েন হয়ে যাবে নিশ্চয়ই।

তবু না মেনে উপায় নেই, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর আয়াতোল্লা খোমেইনি হয়ে উঠতে বাকি আছে। অনুসিদ্ধান্ত – ভারতের ইরান হয়ে উঠতে বাকি আছে। তাই ভাবছিলাম, ভারতেই যদি সাধারণ নাগরিক সিনেমা হলে জাতীয় স্তোত্র না গাইলে এত কাণ্ড হতে পারে, তাহলে কাতারের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে ইরানের যে ফুটবলাররা জাতীয় সঙ্গীত গাইলেন না, তাঁদের কী অবস্থা হবে। ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে ইরান অধিনায়ক এহসান হজসফি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন কেন তাঁরা জাতীয় সঙ্গীত গাননি। জানিয়েছেন দেশে যা চলছে তা যে ভাল হচ্ছে না তা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই এবং তাঁর দল দেশের মানুষের পাশেই আছে। তাদের জন্যেই ভাল খেলার চেষ্টা, গোল করার চেষ্টা।

⚡️ BREAKING: #IRAN FOOTBALL TEAM CAPTAIN DEFIES REGIME, BACKS PROTESTS: “WE HAVE TO ACCEPT THAT CONDITIONS IN OUR COUNTRY ARE NOT RIGHT & OUR PEOPLE ARE NOT HAPPY. THEY SHOULD KNOW THAT WE ARE WITH THEM. AND WE SUPPORT THEM. AND WE SYMPATHIZE WITH THEM REGARDING THE CONDITIONS.” PIC.TWITTER.COM/SX4KENXITZ— Hillel Neuer (@HillelNeuer) November 21, 2022

কী চলছে তাঁর দেশে? কারোর জানতে বাকি নেই। ১৬ সেপ্টেম্বর মাহসা আমীনী রাষ্ট্রের হাতে খুন হওয়ার পর থেকে ইরানের মহিলাদের হিজাববিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। তাঁরা প্রকাশ্যে আসছেন ইসলামিক রাষ্ট্রের হিজাব, বোরখা পরার আইন অমান্য করে। পুড়িয়ে দিচ্ছেন সেসব, চুল কেটে ফেলছেন। মিছিলে মিছিলে ছয়লাপ গোটা দেশ। পাল্লা দিয়ে চলছে সরকারি দমননীতি – মারধোর, হত্যা, পুলিসি হেফাজতে যৌন নির্যাতন। ইরানের পুরুষদের একটা বড় অংশ যে এই আন্দোলনের পাশে এসে গেছেন তার প্রমাণ পাওয়া গেল বিশ্বকাপের মঞ্চে ফুটবল দলের প্রতিবাদে।

পৃথিবীর কোথাও কোনো নারী আন্দোলনের পাশে এভাবে পুরুষদের জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা দাঁড়িয়েছেন কিনা জানি না, নারীবাদ নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন তাঁরা বলতে পারবেন। কিন্তু হজসফি ও তাঁর দল একইসঙ্গে অন্য একটা প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন যা আজকের পৃথিবীতে, ভারতে তো বটেই, প্রাসঙ্গিক। ভারতের জাতীয় স্তোত্রের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ নেশন (বাংলাতেও এই শব্দই লিখেছেন) ব্যাপারটাকেই ভাল চোখে দেখতেন না। স্বাধীন দেশে কী করলে নেশনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয় তার কিছু মানদণ্ড আমরা ঠিক করেছি, সব দেশই করে থাকে। তার অন্যতম জাতীয় সঙ্গীত। ইরানের ফুটবলাররা জাতীয় সঙ্গীত গাইলেন না, বললেন দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতেই এই সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ দেশ মানে মানুষ, কতকগুলো প্রতীক নয়। তাহলে কি প্রতীকের প্রয়োজন শুধু দেশের উপর নেশনের আধিপত্য বজায় রাখতে?

১৯৩২ সালের এপ্রিল মাসে রবীন্দ্রনাথ ইরানে যান শাসক রেজা শাহ পহলভির আমন্ত্রণে। কিন্তু তাঁর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক হজসফিদের জানার কথা নয়। তবু তাঁদের আচরণে যেন উঠে এসেছে নেশন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথেরই অনাস্থা।

আরও পড়ুন ‘ন্যাশনাল আর্কাইভের অবলুপ্তি দেশটাকে শপিং মল বানানোর চক্রান্ত’

১৯১৬ সালের মে মাস থেকে ১৯১৭ সালের এপ্রিল – এই সময়ের মধ্যে জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রবীন্দ্রনাথ বক্তৃতা দেন। যেসব কথাবার্তা তিনি বলেন তা জাতীয়তাবাদীদের (বা নেশনবাদীদের) সেদিনও পছন্দ হয়নি, আজও হয় না। যেমন জাপান সম্পর্কে তিনি বলেন “জাপানে দেখেছি গোটা দেশের মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেদের মস্তিষ্ক এবং স্বাধীনতা সরকারের হাতে খর্ব হতে দিয়েছে। আর সরকার নানারকম শিক্ষার ব্যবস্থার দ্বারা মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের অনুভূতি নির্মাণ করছে, মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিলে সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়ে নজরদারি চালাচ্ছে। এক সংকীর্ণ পথ দিয়ে সত্যের দিকে নয়, মানুষকে সেই দিকে চালিত করছে যেদিকে নিয়ে গেলে মানুষকে একেবারে ভেঙে গড়ে নিজের ইচ্ছানুযায়ী এক সমসত্ত্ব জড়পিণ্ডে পরিণত করা যাবে। মানুষ এই সর্বগ্রাসী মানসিক দাসত্ব সানন্দে এবং সগর্বে মেনে নেয় কারণ তাদের মধ্যে নেশন নামক ক্ষমতার যন্ত্রে পরিণত হওয়ার উত্তেজক অভিলাষ কাজ করে…”। [ভাষান্তর আমার]

(I have seen in Japan the voluntary submission of the whole people to the trimming of their minds and clipping of their freedom by their government, which through various educational agencies regulates their thoughts, manufactures their feelings, becomes suspiciously watchful when they show signs of inclining toward the spiritual, leading them through a narrow path not toward what is true but what is necessary for the complete welding of them into one unform mass according to its own recipe. The people accept this all-pervading mental slavery with cheerfulness and pride because of their nervous desire to turn themselves into a machine of power, called the Nation…)

পড়লে মনে হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে দাঁড়িয়েই রবীন্দ্রনাথ ইসলামিক বিপ্লব পরবর্তী ইরানের মত নেশন বা একবিংশ শতাব্দীর বিরাট ডিসটোপিয়াসুলভ নেশনগুলোর চেহারা দেখতে পাচ্ছিলেন, যা তাঁর অন্তত দেড় দশক পরে ইউরোপের টোটালিটেরিয়ান রাষ্ট্রগুলোকে দেখে কল্পনা করবেন অলডাস হাক্সলি (Brave New World; প্রকাশকাল ১৯৩২), তিন দশক পরে জর্জ অরওয়েল (1984; প্রকাশকাল ১৯৪৯)।

নেশন যে একটা বানিয়ে তোলা ধারণা – রবীন্দ্রনাথের এই মতের চমৎকার প্রমাণ পাওয়া যায় ভারত বনাম বাংলাদেশ খেলা হলে। একই কবির একই ভাষায় লেখা দুটো গান গায় দুই আলাদা নেশনের মানুষ। রবীন্দ্রনাথকে এ জিনিস দেখতে হয়নি। ১৯১৬-১৭ সালের সেই বক্তৃতামালায় ভারত সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন “যদিও শৈশবকাল থেকে আমাকে শেখানো হয়েছিল যে নেশনকে পুজো করা প্রায় ঈশ্বরকে এবং মানবতাকে শ্রদ্ধা করার চেয়েও ভাল, আমার মনে হয় আমি সেই শিক্ষার প্রভাব কাটিয়ে উঠেছি। আমার বিশ্বাস আমার দেশের মানুষ তাঁদের সত্যিকারের ভারত লাভ করতে পারবেন সেই শিক্ষার বিরুদ্ধে লড়াই করলে, যা শেখায় একটা দেশ মানবতার আদর্শের চেয়ে বড়।”

(Even though from childhood I had been taught that idolatry of the Nation is almost better than reverence for God and humanity, I believe I have outgrown that teaching, and it is my conviction that my countrymen will truly gain their India by fighting against the education which teaches them that a country is greater than the ideals of humanity.) [ভাষান্তর আমার]

রবীন্দ্রনাথ যে লড়াই করতে বলেছিলেন আমরা তাতে ব্যর্থ হওয়ার ফলেই দেশভাগ হয়, উপরন্তু খণ্ডিত ভারতবর্ষ আজও ভাগ হয়ে চলেছে। ইরানের ফুটবল দল নেশন নির্ধারিত প্রতীককে অস্বীকার করে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন, ভারতীয় ক্রীড়াবিদরা যত দিন যাচ্ছে তত নেশনের বশংবদ হয়ে পড়ছেন। আগে সাতে পাঁচে থাকতেন না, ইদানীং সবার আগে রাষ্ট্রের পক্ষ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন সোশাল মিডিয়ায়। এসব বললেই একটা কথা বলা হয় – আমাদের দেশের খেলোয়াড়দের থেকে ওসব আশা করা উচিত নয়, কারণ আমাদের সমাজ ইউরোপ বা আমেরিকার মত গণতান্ত্রিক নয়। আমাদের খেলোয়াড়রা রাজনৈতিক প্রতিবাদ করলে নাকি নানাবিধ চাপের মুখে পড়বেন। ইরানের ফুটবলারদের দেখার পর এ কথায় আর কান দেওয়ার প্রয়োজন নেই বোধহয়। কারণ আমরা তো ইরানের চেয়ে বেশি গণতান্ত্রিক দেশ বলেই নিজেদের দাবি করে থাকি। তাহলে তাদের ফুটবলাররা এবং তাঁদের পরিজন যে সংকটের কল্পনায় ম্রিয়মান না হয়ে এমন প্রতিবাদ করেছেন তার চেয়ে বড় কোন বিপদে আমাদের খেলোয়াড়রা পড়তে পারেন স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসবে?

পুনশ্চ: বিশ্বকাপ জ্বরে আমাদের অনেকেরই হয়ত চোখ এড়িয়ে গেছে একটা খবর। বিজেপির আইনজীবী নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায় দিল্লি হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা করে দাবি করেছেন ‘জনগণমন’ আর ‘বন্দে মাতরম’-কে সমান মর্যাদা দিতে হবে। তার উত্তরে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক জানিয়েছে, দুটো গান একই স্তরের এবং দেশের প্রত্যেক নাগরিকের দুটোকেই সমান শ্রদ্ধা জানানো উচিত। উপাধ্যায় নিজের পিটিশনে দাবি জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারগুলোকে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুটো গানই প্রত্যেক কাজের দিনে বাজানো নিশ্চিত করতে হবে।

দেশ যত দুর্বল হয় নেশনকে তত শক্তিশালী করার দরকার হয়। যে গানে নেশন কম জনগণমন বেশি, সে গান ঠেকায় পড়ে সহ্য করে নিতে হয়। কিন্তু আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের কাছে অবশ্যই সেই গান বেশি শ্রেয়, যেখানে মাতৃমূর্তির সাহায্যে জনমনে অভিন্ন নেশন প্রতিভাত হয়। 

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

সিপিএম পথে ফিরেছে, কিন্তু ব্যালটে ফিরবে কি?

আইএসএফের সঙ্গে সিপিএম তথা বামফ্রন্টের এখন ঠিক কী সম্পর্ক? কংগ্রেসের সঙ্গে কি আবার জোট করা হবে?

খবরে প্রকাশ, সিপিএম নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জি শিলিগুড়িতে এক সভায় বলেছেন, শিলিগুড়ি পৌর নিগম বামেদের হাতছাড়া হয়েছে সবে কয়েক মাস। কিন্তু এর মধ্যেই তা দুর্বৃত্তদের হাতে চলে গেছে। সিপিএম তথা বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত প্রশাসনিক কার্যকলাপ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ধুতি পাঞ্জাবির মত শ্বেতশুভ্র ছিল, কোথাও দুর্নীতির লেশমাত্র ছিল না – এমনটা নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই, দুর্নীতির যে পরিমাণ এবং দুর্নীতি করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানোর যে নির্লজ্জা এ রাজ্যে দেখা যাচ্ছে তা একান্তই তৃণমূল কংগ্রেসের দান। তার মধ্যে কংগ্রেসের উত্তরাধিকার খুঁজতে যাওয়াও বৃথা। আবু বরকত আলি গনিখান চৌধুরীরা সেকালের জমিদারদের কায়দায় রাজনীতি করতেন, অধীর চৌধুরীর মত লোকেরা তার সঙ্গে মিশিয়েছিলেন পেশিশক্তির ব্যবহার। কিন্তু সেখানেও পরিমাণ মত দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করে রবিন হুড মার্কা ভাবমূর্তি তৈরি করার প্রয়াস থাকত। বাম আমলেও রাজনৈতিক মদতপুষ্ট সমাজবিরোধীরা অন্তত নিজের এলাকায় গরীবের মেয়ের বিয়ে দেওয়া, অমুক বড়লোককে ‘চমকে’ দিয়ে তমুক গরীবকে একটু স্বস্তি দেওয়া – এসব করত।

কিন্তু মাত্র এগারো বছরের শাসনেই দেখা যাচ্ছে তৃণমূলের শীর্ষনেতাদের ফ্ল্যাট থেকে নগদ কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হচ্ছে, তদন্ত এগোলে অগাধ গোপন সম্পত্তির হদিশ পাওয়া যাচ্ছে। অনুব্রত মন্ডলের মত বাহুবলীরা নিজেরাই নেতা হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে তো বটেই, এমনকি দেশের বাইরেও নেতাদের সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এতৎসত্ত্বেও স্বয়ং মমতা ব্যানার্জি প্রকাশ্যে অনুব্রতর মত নেতার পাশে দাঁড়াচ্ছেন, ববি হাকিম বাঘ বেরিয়ে এলেই শেয়ালরা পালাবে ইত্যাদি আক্রমণাত্মক কথাবার্তা বলছেন। সাধারণ মানুষ টিভির পর্দায় পাহাড়প্রমাণ টাকা দেখে ফেলায় কদিন নিচু হয়ে থাকা শাসকের গলা আবার সপ্তমে চড়েছে। সুতরাং সাধারণ মানুষ যদি ভেবে নেন, শীর্ষ নেতৃত্বের আশীর্বাদেই এত দুর্নীতি চলছে রাজ্যে, তাহলে দোষ দেওয়া যাবে না। উপরন্তু মহারাষ্ট্র বা তামিলনাড়ুর মত পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অর্থনীতির রাজ্যে দুর্নীতি সাধারণ মানুষের যতটা চোখে লাগে, কর্মসংস্থানের হাহাকার পড়ে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গে শাসক দলের নেতাদের বিপুল সম্পত্তি এবং তা নিয়ে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধের অভাব অনেক বেশি গায়ে লাগাই স্বাভাবিক।

ফলে মীনাক্ষীর কথা বেশকিছু শ্রোতাকে স্পর্শ করতে পারলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সম্ভবত পারছেও। সেই কারণেই ইদানীং সিপিএমের মিছিল, মিটিংয়ে আবার ভিড় হতে দেখা যাচ্ছে। স্রেফ কৌতূহলী জনতার ভিড় নয়, মধ্যবয়স্ক বা পাকা চুলের মানুষের ভিড় নয় – তরুণ তরুণীদের ভিড়। স্কুল নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে বছর দশেক হতে চলল, কিন্তু গত এক বছরে যে তীব্রতা এসেছে আন্দোলনে – তাও আগে দেখা যায়নি। এর পিছনেও যে সিপিএমের সক্রিয়তা বৃদ্ধি অন্যতম কারণ, তা এই আন্দোলনকে নিয়মিত নজরে রাখা সাংবাদিকরা সকলেই জানেন। মীনাক্ষী, ইন্দ্রজিৎ ঘোষ, কলতান দাশগুপ্তের মত সিপিএমের ছাত্র, যুব সংগঠনের নেতারা যে এই আন্দোলন নিয়ে পথে নেমে পড়েছেন, কম্পাস ঠিক করতে সাহায্য করছেন তা তো কারোর কাছেই অবিদিত নেই। যে রাত্রে করুণাময়ী থেকে আন্দোলনকারীদের বলপূর্বক তুলে দেওয়া হল কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশকে সাক্ষী গোপাল করে, সে রাত্রেও এঁরা পৌঁছে গিয়েছিলেন উচ্ছেদ আটকাতে। চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন সম্পর্কে সিপিএমের হাবভাব বদল চোখে পড়ার মত। পূর্বতন রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রের আমলে এই আন্দোলন চলছিল নিজের মত করে। কলকাতার মাঝখানে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে চাকরিপ্রার্থীরা যখন অনশন করছিলেন, তখন পথচারীরা পর্যন্ত উঁকি মেরে দেখতেন না এরা কারা, কেন এখানে বসে আছে। সিপিএম বলত তারা আন্দোলনটাকে হাইজ্যাক করতে চায় না বলে ওর মধ্যে প্রবেশ করছে না, কিন্তু আন্দোলনকারীদের পাশে আছে। পাশে থাকা মানে কোনোদিন বিমান বসু, কোনোদিন অন্য কোনো নেতার মেয়ো রোড গমনের ফেসবুক লাইভ। মহম্মদ সেলিম রাজ্য সম্পাদক হওয়ার পর থেকে স্বয়ং বেশ কয়েকবার আন্দোলনকারীদের কাছে গেছেন, এই ইস্যু নিয়ে পার্টির পতাকা নিয়ে অথবা নাগরিক মিছিলের নাম দিয়ে একাধিক কর্মসূচি পালন হয়েছে। বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের কড়া রায় তৃণমূল সরকারকে বিপদে ফেলেছে আদালতের ভিতরে। কিন্তু আদালতের লড়াইকে রাস্তায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব অবশ্যই সিপিএমের।

কিন্তু রাজ্যের পরিস্থিতির সাপেক্ষে যে প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ, তা হল পথে ঘাটে সিপিএমের প্রতি সমর্থন ফেরত এলেও, ব্যালট বাক্সে আসবে কি? কোনো সন্দেহ নেই, কলকাতার ধর্মতলায় সারা রাজ্যের ছাত্র, যুবদের একত্র করে শক্তি প্রদর্শন আর ভোট আদায় এক জিনিস নয়। ২০২৪ এখনো ঢের দেরি, সামনেই পঞ্চায়েত নির্বাচন। সে নির্বাচনে চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন কতটা প্রভাব ফেলবে বলা মুশকিল। হয়ত বেশি প্রভাবশালী হবে সিপিএমের হেল্পলাইন, যেখানে মানুষ ফোন করে স্থানীয় দুর্নীতির কথা বলতে পারেন। সিপিএম নেতাদের দাবি দারুণ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া রাজ্যের প্রত্যেক পঞ্চায়েত এলাকায় গোটা নভেম্বর মাস জুড়ে পদযাত্রা এবং ডেপুটেশনের কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে, যা শুভেন্দু-অভিষেক কাদা ছোড়াছুড়ি এবং রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব পেরিয়ে কলকাতার সংবাদমাধ্যমে এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি।

রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে, তৃণমূলের স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজ্য নেতাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ক্ষোভ জমেছে। কিন্তু তেমন ক্ষোভ ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগেও ছিল। সে নির্বাচন অনেকটা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সম্পর্কে গণভোটে পরিণত হওয়ায় এবং দুয়ারে সরকার আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের কল্যাণে তৃণমূল শেষপর্যন্ত হইহই করে জিতেছিল। কিন্তু পঞ্চায়েত ভোট অন্য ব্যাপার। ইতিমধ্যে দুয়ারে সরকার নিয়েও দুর্নীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। তৃণমূলেরই একাধিক গোষ্ঠীকে কারা কী পেল, কারা পেল না তা নিয়ে প্রকাশ্যে ঝগড়া করতে দেখা যাচ্ছে। বিজেপি এখন পর্যন্ত নিষ্প্রভ। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে কি পারবে সিপিএম?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে উঠে আসবে আরেকটি জরুরি প্রশ্ন। বামফ্রন্ট, তুমি আজিও আছ কি? কারণ সিপিএম যখন মধ্যগগনে, তখনো বহু জায়গায় তাদের চেয়ে ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপির মত ফ্রন্টের অন্য দলগুলোরই আধিপত্য বেশি ছিল। তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি যেমন হয়েছে, তেমনি নির্বাচনের সময়ে এই সমীকরণ বামফ্রন্টের হাত শক্তও করেছে। মুর্শিদাবাদে কী অবস্থা আরএসপির? কোচবিহারে উদয়ন গুহর প্রস্থানের পর কেমন আছে ফরোয়ার্ড ব্লক? প্রবাদপ্রতিম চিত্ত বসুর পার্টির উত্তর ২৪ পরগণাতেই বা কী হাল? বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে যে সংযুক্ত মোর্চা তৈরি হয়েছিল তাতে ছিল কংগ্রেস আর ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টও। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ মুসলমান এবং হিন্দু নিম্নবর্গীয় মানুষের হাত ধরার জন্যই নাকি শেষোক্ত দলটিকে নেওয়া হয়েছিল। তাদের সঙ্গেই বা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের এখন ঠিক কী সম্পর্ক? কংগ্রেসের সঙ্গে কি আবার জোট করা হবে?

আরও পড়ুন সেলিব্রিটি কাল্ট দরদী সিপিএমকে খোলা চিঠি

এইসব প্রশ্নেই লুকিয়ে আছে বামেরা এ রাজ্যে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা তার উত্তর। কারণ এ রাজ্যে যেভাবে ভোট হয়, তাতে সবকিছু ঠিকঠাক করেও নির্বাচনের দিন খড়্গ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা উন্নয়নের মোকাবিলা করতে না পারলে ভোটে জেতা যায় না। গোটা রাজ্যে একা তার মোকাবিলা করার মত সংগঠন সিপিএমের এখন নেই, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে হবেও না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

কাতারে বিশ্বকাপ: নিরোর অতিথি আমরা সবাই

এমন নয় যে কেবল একখানা জমকালো বিশ্বকাপ আয়োজন করতে হবে বলেই তারা হঠাৎ শ্রমিকদের এভাবে নিংড়ে নেওয়া শুরু করেছে। দুনিয়াসুদ্ধ লোকের জানা ছিল কাতারে নিয়মকানুন সর্বনেশে।

রোম যখন পুড়ছিল, সম্রাট নিরো তখন বেহালা বাজাচ্ছিলেন – এ কথা খুবই প্রচলিত। উইলিয়ম শেক্সপিয়র অবশ্য অন্য আরেকটা বাজনার কথা লিখেছেন। কিন্তু সে বিতর্ক থাক। কথা হল, বাজনদার হওয়া ছাড়াও নিরোর নানারকম গুণ ছিল। যেমন তিনি নিজের বাগানে অতিথিদের জন্যে এলাহি নৈশ পার্টির আয়োজন করতেন। সে পার্টির আলোর ব্যবস্থা করা হত অভিনব কায়দায়। কিছু অসহায় লোককে আলকাতরায় চুবিয়ে কাঠের গুঁড়ির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হত, তারপর আগুন ধরিয়ে দেওয়া হত। জ্যান্ত মানুষগুলো পুড়ত আর আলোয় আলো হয়ে উঠত নিরোর বাগান। সেসব কয়েক হাজার বছর আগেকার কথা। তখনকার মানুষ এখনকার তুলনায় অসভ্য ছিল – এই বলে নিরোর অতিথিদের মাফ করে দেওয়া যেতে পারে হয়ত। কিন্তু আমাদের মাফ করা হবে কোন অজুহাতে? আমাদের যুগেও তো আনন্দের আয়োজনগুলো, বিশেষ করে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ আখ্যা দেওয়া হয় যে মোচ্ছবগুলোকে, সেগুলো নিরোর পার্টির মতই বহু মানুষের জীবন, জীবিকা, স্বাধীনতার বিনিময়ে আয়োজিত হচ্ছে। কলকাতায় অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল বিশ্বকাপ হলে বস্তি উচ্ছেদ হয়, আমেদাবাদে ডোনাল্ড ট্রাম্প এলে গরীব মানুষগুলোকে লুকিয়ে ফেলতে উঁচু পাঁচিল তুলে দেওয়া হয়। কাতারে আজ থেকে যে বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে তার আয়োজন করতে যা যা করা হয়েছে সেসবও তো গোপন নেই। তবু তো আমরা মেতে উঠব, তাই না?

কী হয়েছে জানেন না বলছেন? তা না জানতেও পারেন। কারণ এ যুগের নিরোরা সভ্য মানুষ। তাঁরা অমন বুক ফুলিয়ে অতিথিদের দেখিয়ে দেখিয়ে ওসব করেন না। অতিথিদের নজর যাতে কেবল ভাল ভাল জিনিসে পড়ে তার বন্দোবস্ত করার জন্য গাদাগুচ্ছের সংবাদমাধ্যমও আছে। তারা আর কতটুকু জানতে দেয় এসব? তবে বিদেশি সংবাদমাধ্যম এসে পড়লে হাটে হাঁড়ি ভেঙে যায় অনেক সময়। তাই একবার বলে দিই যতটুকু জানা গেছে।

কাতারের রাজপরিবার এবং ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছেন ২০১০ সালে বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব পাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত নির্মাণকাজ করতে গিয়ে মারা গেছেন মোটে তিনজন শ্রমিক। কিন্তু ফেয়ার স্কোয়ার নামের মানবাধিকার সংগঠন বলেছে ওই সংখ্যাটা নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। তাদের সুপ্রিম কমিটির বক্তব্য, আরও ৩৬ জন বিভিন্ন নির্মাণস্থলে দিনের কাজ শেষ করার খানিকক্ষণ পরেই মারা গেছেন। কিন্তু কাতার সরকার এবং ফিফা তাঁদের হিসাবের মধ্যে রাখেনি, বলে দিয়েছে ওগুলো “প্রাকৃতিক কারণে মৃত্যু”। অবশ্য এ-ও হিমশৈলের চূড়া। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নামে যে বিশ্বখ্যাত মানবাধিকার সংস্থা আছে, তাদের বিশ্বাস করলে বলতে হয় আসলে কয়েক হাজার শ্রমিক মারা গেছেন গত ১২ বছরে।

বিশ্বকাপ আরম্ভের দিন সকালে মেসি, নেইমার, রোনাল্ডো, এমবাপে, লেওয়ানডস্কিদের নিয়ে সুস্বাদু লেখা উপহার দেওয়ার বদলে তেতো সত্যের ঝাঁপি খুলে বসার জন্যে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। মৃত শ্রমিকদের কথা না তুলে পারলাম না। তার কারণ ইংল্যান্ডের দ্য গার্ডিয়ান কাগজের তদন্তমূলক প্রতিবেদনে বছর খানেক আগেই উঠে এসেছে এই তথ্য, যে স্রেফ ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ আর শ্রীলঙ্কারই ৬,৫০০ প্রবাসী শ্রমিক মারা গেছেন কাতারের আনন্দযজ্ঞে। সবে বছর দুয়েক হল, নিজের দেশের রাজপথ দিয়ে প্রবাসী শ্রমিকদের হাজার হাজার মাইল হেঁটে যেতে দেখেছি নিরম্বু উপবাসে। হাঁটতে হাঁটতে মরে যেতে দেখেছি, ক্লান্ত হয়ে রেললাইনের উপর ঘুমিয়ে পড়ে ট্রেনের চাকায় পিষে যেতে দেখেছি। সে স্মৃতি টাটকা থাকতেও বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার উত্তেজনায় প্রবাসী শ্রমিকদের দুরবস্থা কী করে ভুলে যাই বলুন?

তবে হ্যাঁ, যত শ্রমিকেরই মৃত্যু হয়ে থাক আর যত শ্রমিকই কাতারের অতি দুর্বল শ্রম আইনের সুযোগে চরম শোষিত হয়ে থাকুন (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে সংখ্যাটা এক লক্ষের বেশি), দেখার মত একটা জিনিস যে দেখা যাবে আগামী একমাস, তাতে সন্দেহ নেই। অনেক শ্রমিক বলেছেন তাঁদের দিয়ে দিনে ১৪-১৮ ঘন্টা কাজ করানো হয়েছে। এত পরিশ্রম কি আর বৃথা যাবে? শুধু কাতারকে দোষ দিয়ে অবশ্য লাভ নেই। এমন নয় যে কেবল একখানা জমকালো বিশ্বকাপ আয়োজন করতে হবে বলেই তারা হঠাৎ শ্রমিকদের এভাবে নিংড়ে নেওয়া শুরু করেছে। দুনিয়াসুদ্ধ লোকের জানা ছিল কাতারে নিয়মকানুন সর্বনেশে। ফিফার সদস্যরা সব জেনেশুনেই তাদের বিশ্বকাপ আয়োজনের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। কিসের বিনিময়ে তাঁদের এহেন বদান্যতা সে আবার আরেক কাহিনি।

আপনি বলতেই পারেন, এসব রাজনীতির কথা, ফুটবল কোথায়? কিন্তু মনে রাখবেন, এবারের বিশ্বকাপ থেকে রাশিয়াকে বাদ দেওয়া হয়েছে ইউক্রেন আক্রমণ করার জন্যে। সুতরাং আর ফুটবল অরাজনৈতিক, বিশ্বকাপ অরাজনৈতিক – এসব বলার অধিকার ফিফা বা কাতারের নেই। ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন নতুন কাতারে নতুন শ্রম আইন বলবৎ করা এবং মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স সেন্টার তৈরি করানোর জন্য ফিফাকে চাপ দেবে বলে ঘোষণা করেছে। আটটা দলের অধিনায়ক মাঠে নামবেন সমপ্রেমী, তৃতীয় লিঙ্গ ইত্যাদি বিবিধ লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষের সমর্থনে রামধনু রংয়ের ‘ওয়ানলাভ’ আর্মব্যান্ড পরে। বেশকিছু দল কাতারের সমপ্রেমবিরোধী দমনমূলক আইনের প্রতিবাদে ফ্যান জোন করবে না ঠিক করেছে। এছাড়াও বেশ কয়েকজন ফুটবলার ও কোচ বলেছেন কাতারে বিশ্বকাপের আয়োজন করাই উচিত হয়নি। সুতরাং অন্তত এবারের বিশ্বকাপের আর অরাজনৈতিক হয়ে থাকার উপায় নেই। সেকথা বুঝেই বোধহয় ইনফান্তিনো হঠাৎ দারুণ কাতারি, আরব, আফ্রিকান, সমপ্রেমী, প্রতিবন্ধী, প্রবাসী শ্রমিক হয়ে উঠেছেন। এমনকি বলেছেন কাতারের নিন্দে করার আগে ইউরোপের নিজেদের তিন হাজার বছরের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত। আহা, এমন ভাল ভাল কথা যদি সারা বছর বিশ্বের বড় বড় পুঁজির অধিকারীরা ভাবতেন!

তবে একথা বললে সত্যের অপলাপ হবে যে এই প্রথম এত বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এতখানি রাজনৈতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একনায়কতান্ত্রিক যে কোনো সরকার চিরকাল এরকম প্রতিযোগিতাকে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচারের কাজে লাগায়। রুশ একনায়ক ভ্লাদিমির পুতিন ২০১৮ বিশ্বকাপকে ব্যবহার করেছিলেন, আর্জেন্টিনার একনায়ক হর্হে রাফালে ভিদেলা একইভাবে ব্যবহার করেছিলেন ১৯৭৮ বিশ্বকাপকে, বেনিতো মুসোলিনি ১৯৩৪ বিশ্বকাপকে। কর্তৃত্ববাদী শাসকরা ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে আর্য রক্তের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে অ্যাডলফ হিটলারকে যেভাবে ল্যাজে গোবরে হতে হয়েছিল জেসি ওয়েন্সের দাপটে, সে ইতিহাস মনে রাখেন না। রাখার দরকার নেই। কারণ মুসোলিনি আর ভিদেলার আমলে যথাক্রমে ইতালি আর আর্জেন্টিনায় ঠিক কী কী ঘটেছিল ইতিহাসে তা স্পষ্ট লেখা থাকলেও ওই দুই বিশ্বকাপে যে ফুটবলাররা খেলেছিলেন, তাঁরা সকলেই যে অংশগ্রহণের জন্য লজ্জিত বা তাঁদের জয় রক্তলাঞ্ছিত মনে করেন তা কিন্তু নয়। কারোর মতে তাঁরা খেলেছিলেন দেশের মানুষের জন্য, দেশের শাসকের জন্য তো নয়। কেউ আবার বলেন মাঠের বাইরে কী ঘটছে সে সম্পর্কে তাঁদের সম্যক ধারণা ছিল না। কিছু ফুটবলার সৎভাবে স্বীকার করেন সবকিছুই জানা ছিল, কিন্তু তাঁরা কী-ই বা করতে পারতেন? এই তিন দলের কেউই যে সম্পূর্ণ ভুল তা বলা চলে না। কারণ খেলোয়াড়দের ক্ষমতার সীমা আছে। বল পায়ে অতিমানবিক দেখতে লাগে বলেই তাঁরা কেউ সত্যি সত্যি অতিমানব নন।

আরও পড়ুন বড়লোকের খেলা

সত্যি কথা বলতে মুসোলিনি আর ভিদেলা আয়োজিত বিশ্বকাপে যা যা ঘটেছিল, তার তুলনায় কাতারে যা হতে চলেছে সেটা বড়জোর নোংরামি। কাতারে অন্তত কোনো স্টেডিয়াম থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে ডিটেনশন ক্যাম্প নেই, আর্জেন্টিনায় কিন্তু ছিল। উপরন্তু মুসোলিনি যেভাবে ফাইনালের রেফারিকে পর্যন্ত চোখ রাঙিয়ে ইতালির বিশ্বকাপ জয় নিশ্চিত করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে, কাতারের রাজার পক্ষে তা করা প্রায় অসম্ভব। কাতার যদি গ্রুপ এ থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে পৌঁছয় তাহলেই যথেষ্ট। কারণ তাদের গ্রুপে আছে নেদারল্যান্ডস আর আফ্রিকান সিংহ সেনেগাল। সাদিও মানে শেষ মুহূর্তে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেলেও তারা যথেষ্ট শক্তিশালী দল।

গ্যারেথ সাউথগেটের ইংল্যান্ডের পক্ষে গ্রুপ বি মোটেই কঠিন হওয়ার কথা নয়। হ্যারি কেন ও তাঁর দলবল ইতিমধ্যেই ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা দলগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে, কারণ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে (২০১৮) পৌঁছবার পরের ইউরোতেই (২০২০) ফাইনাল খেলার বিরল কৃতিত্ব এই দল অর্জন করেছে। তবে ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড দলের বিশ্বজয়ের কৃতিত্ব এখনো অধরা। এফ এ-র সঙ্গে সাউথগেটের চুক্তির মেয়াদ ২০২৪ পর্যন্ত। কিন্তু তিনি ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছেন, যে জানা আছে এবার ট্রফি জিততে না পারলে ওই চুক্তি কাজে আসবে না। গত কয়েক বছরে ক্রমাগত উন্নতি করে চলা এই দলটা কেনই বা গ্যারেথ বেলের ওয়েলস, নড়বড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানকে নিয়ে চিন্তিত হতে যাবে?

একই কথা প্রযোজ্য গ্রুপ সি-র আর্জেন্টিনার জন্য। এমনকি দিয়েগো মারাদোনার খেলোয়াড় জীবনেও আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হত অস্থিরভাবে। এই প্রথম ওই বিরল প্রতিভার মানুষটি না থাকবেন ড্রেসিংরুমে, না থাকবেন শিশুসুলভ উদ্দীপনা নিয়ে সমর্থক হিসাবে গ্যালারিতে। অনেকদিন পরে এবার আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ খেলতে নামছে ফেভারিটদের মধ্যেও ফেভারিট হিসাবে, যদিও লায়োনেল মেসি সেকথা মানতে চাইছেন না এখনো। কদিন আগেই তিনি দাবি করেছেন আর্জেন্টিনা মোটেই ফেভারিট নয়। কথাটা নিঃসন্দেহে দলের উপর চাপ তৈরি হতে না দেওয়ার জন্য বলা। টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত একটা দল যদি ফেভারিট না হয় তাহলে শব্দটার মানে কী? এবারের বিশ্বকাপ মেসির জন্যে শেষ সুযোগ। ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে যতরকম খেতাব জেতা সম্ভব প্রায় সবই জিতে ফেলেছেন একাধিকবার, বিশ্বের সর্বকালের সেরাদের মধ্যেও তাঁর নাম লিখে ফেলেছেন অগণিত মানুষ। তবুও মারাদোনা নামক একটা দেওয়ালের সামনে এসে বারবার থমকে দাঁড়াতে হয়েছে মেসিকে। আর্জেন্টিনার সমর্থকরা এবং সারা পৃথিবীর সমালোচকরা বারবার বলে এসেছেন, বার্সেলোনার মেসি আর আর্জেন্টিনার মেসি এক নয়। তিনি নীল-সাদা জার্সিতে তো কিছুই জেতেননি। মারাদোনা প্রয়াত হলেন ২০২০ সালে, আর পরের বছরই মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে কোপা আমেরিকা জিতে ফেললেন। এবার তাঁর সামনে মারাদোনার ১৯৮৬ সালের কীর্তি ছুঁয়ে ফেলার সুযোগ। মারাদোনা অবশ্য প্রায় একা হাতে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন ভরা যৌবনে, মেসি এখনই ৩৫। ইতিমধ্যেই বার্সেলোনা ছেড়ে তাঁকে প্যারিস সাঁ জা-য় সরে যেতে হয়েছে, ২০২৬ সালে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকোর বিশ্বকাপে মেসি মাঠে নামার অবস্থায় থাকেন, তাহলেও বিশ্বকাপ জেতার অবস্থায় থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাছাড়া এত শক্তিশালী দলই বা প্রতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা পাবে কোথায়? সাধারণত আর্জেন্টিনা গোল করেও নিশ্চিন্ত হতে পারে না। কিন্তু এবার লায়োনেল স্ক্যালোনির দলে অন্তত একজন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো আছেন রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডারের ভূমিকায়।

গ্রুপ ডি-র প্রথম স্থানের লড়াইটা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স আর বিপজ্জনক ডেনমার্কের মধ্যেই থাকার কথা, যদি না অস্ট্রেলিয়া কোনো চমক দেয়। এই নিয়ে পরপর পাঁচটা বিশ্বকাপ খেলবে তারা, কিন্তু এবারের বিশ্বকাপটা আরেকটু হলেই ফসকে যাচ্ছিল। শেষমেশ আন্তঃমহাদেশিয় প্লে অফে পেরুকে হারিয়ে কাতারে পৌঁছতে হয়েছে। ইউরো ২০২০-তে ডেনমার্ক সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল। সেইসময় মাঠেই অসুস্থ হয়ে পড়া ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেন নিজের ফর্ম ফিরে পেয়েছেন, সম্প্রতি ফ্রান্সকে ডেনমার্ক দুবার হারিয়েছেও বটে। তবু দিদিয়ের দেশঁর ছেলেরা বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা দল। পল পোগবা আর এনগোলো কান্তে অবশ্য মাঝমাঠে থাকছেন না, কিন্তু গত বিশ্বকাপের বিস্ময়বালক কিলিয়ান এমবাপে এখন ২৩ বছরের ভয়ঙ্কর গোলশিকারী। সঙ্গে থাকার কথা ছিল করিম বেনজেমার। কিন্তু তিনি আবার উরুর চোটে ছিটকে গেলেন গতকাল। ফ্রান্সের গোলে অবশ্য নির্ভরযোগ্য উগো লরিস থাকছেন।

গ্রুপ ই থেকে যে দুই দলের দ্বিতীয় রাউন্ডে না ওঠাই অঘটন হবে, সেই স্পেন আর জার্মানির বেশ মিল আছে। দুটো দলই প্রাক্তন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, কিন্তু বেশ কিছুদিন কোনো ট্রফি জিততে পারেনি। জার্মান ফুটবল ইতিহাসের সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ সময় গত চারটে বছর। রাশিয়া বিশ্বকাপে গ্রুপ থেকেই তাদের বিদায় সকলকে চমকে দিয়েছিল। তারপর ইউরো ২০২০-তেও তারা দ্বিতীয় রাউন্ডের গন্ডি টপকাতে পারেনি। কিন্তু হান্সি ফ্লিকের দলে আবার একগুচ্ছ পৃথিবীর প্রথম সারির ফুটবলার এসে গেছেন। গোল করার জন্য সার্জিও ন্যাব্রি, লেরয় সেন, কাই হ্যাভের্তজ, টিমো ওয়ার্নারের পরেও আছেন ৩৩ বছরের থমাস মুলার। পুরনো চাল ভাতে বাড়ে। ম্যানুয়েল নয়ারকেও ভুলে গেলে চলবে না, তিনি তো শুধুই গোলরক্ষক নন।

লুই এনরিকের স্পেনেও প্রতিভাবান আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ের ছড়াছড়ি। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বড় তারকা এই মুহূর্তে পেদ্রি, যাঁর বয়স মাত্র ১৯, বিশ্বকাপ চলাকালীন কুড়িতে পা দেবেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই বার্সেলোনার জার্সি গায়ে প্রায় ১০০ ম্যাচ খেলা হয়ে গেছে। বার্সেলোনার আরেক তরুণ আনসু ফাতিকে নিয়েও অনেকের বিরাট আশা। ফিট থাকলে তিনি একাই বিশ্বকাপ মাতিয়ে দিতে পারেন বলে কারো কারো ধারণা। ইউরো ২০২০-তে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়া স্পেন বিশ্বকাপের যোগ্যতার্জন পর্ব পেরিয়ে এসেছে বেশ অনায়াসেই। তবে পেদ্রি, ফাতিদের করা গোল এনরিকের রক্ষণ ধরে রাখতে পারবে কিনা সেটাই বড় কথা। বটবৃক্ষের মত সার্জিও বুস্কেৎস অবশ্য থাকবেন ওই তরুণদের পিছনে।

গত বিশ্বকাপের রানার্স আপ ক্রোয়েশিয়ার জন্য গ্রুপ এফ সহজ হওয়ার কথা। কারণ এই গ্রুপে তাদের চ্যালেঞ্জ করার মত দল একমাত্র বেলজিয়াম, যাদের কেবলই শক্তিক্ষয় হয়েছে গত চার বছরে। অন্যদিকে জ্লাটকো ডেলিচের অধীন ক্রোয়েশিয়ার ক্রমোন্নতি হয়েছে। ২০১৮ বিশ্বকাপের বেলজিয়াম দলকে বলা হয়েছিল সোনালি প্রজন্ম। সেই প্রজন্ম প্রায় শেষ। ভিনসেন্ট কম্পানি অবসর নিয়েছেন, রোমেলু লুকাকু আগের মত বিপজ্জনক নেই আর ইডেন হ্যাজার্ডের চোটে জর্জরিত সময় কেটেছে রিয়াল মাদ্রিদে। এখনো প্রথম দলে নিয়মিত নন। একমাত্র কেভিন ডি ব্রুইন আর গোলরক্ষক থিবাউ কুতোয়া আগের বিশ্বকাপের ফর্মেই আছেন বলা যায়।

গ্রুপ জি-র ক্যামেরুন উচ্চাকাঙ্ক্ষী দল। রিগোবার্ট সংয়ের ছেলেরা যখন মার্চ মাসে আলজেরিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ছাড়পত্র আদায় করলেন, তখন ক্যামেরুনের কিংবদন্তি প্রাক্তন ফুটবলার স্যামুয়েল এটোয়ো দলকে বলেছিলেন “আমরা কাতারে যাব বিশ্বকাপ জিততে।” স্বপ্ন সবসময় বড় করে দেখাই ভাল। কিন্তু এটোয়োর স্বপ্ন সফল করতে ক্যামেরুনকে প্রথম রাউন্ডেই সার্বিয়া আর সুইটজারল্যান্ডের মত শক্ত বাধা ডিঙোতে হবে। দ্রাগান স্তোইকোভিচের অধীনে সার্বিয়া শুধু জিততে চায় না, অনেক গোল করতে চায়। তাদের হারানো মোটেই সহজ নয়। কিন্তু দল হিসাবে আরও জমাট মুরাত ইয়াকিনের সুইটজারল্যান্ড, যাদের প্রাণভোমরা গ্রানিৎ ঝাকা। এই দল ইউরোর দ্বিতীয় রাউন্ডে ফ্রান্সকে ১-৩ পিছিয়ে পড়েও শুটআউটে হারিয়েছিল, কোয়ার্টার ফাইনালেও স্পেনকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল পেনাল্টি শুটআউট অব্দি।

এমন একটা গ্রুপ হয়ত তিতের ব্রাজিলের পক্ষেও নেহাত সহজ হবে না, যদিও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এই গ্রুপ থেকে প্রথম হয়ে উঠবে বলেই সকলে আশা করবে। মেসির মত নেইমারও এবার যে দলে খেলবেন তাঁর খেলোয়াড় জীবনে সেটাই সম্ভবত ব্রাজিলের সবচেয়ে শক্তিশালী দল। রাফিনিয়া, রিচার্লিসন, লুকাস পাকেতা – নেইমার ছাড়াও তিতের হাতে গোল করার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য এতজন হাজির। তার উপর মাঝমাঠে আছেন ক্যাসেমিরো আর রক্ষণভাগে বর্ষীয়ান থিয়াগো সিলভা। কার তাতে কী, তিতে যদি ষষ্ঠ খেতাবের স্বপ্ন দেখেন?

ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোরও এটাই শেষ বিশ্বকাপ। পিয়ার্স মর্গানের সঙ্গে যে সাক্ষাৎকারের জন্যে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তাঁকে ক্লাব থেকে তাড়াতে চলেছে বলে খবর, সেখানেই তিনি জানিয়েছেন আর ২-৩ বছর খেলে চল্লিশে অবসর নিতে চান। সেক্ষেত্রে বিশ্বকাপের মুখে অমন একখানা সাক্ষাৎকার কেন দিতে গেলেন তা বিস্ময়কর। এমনিতেই পর্তুগাল পড়েছে শক্ত গ্রুপে। গ্রুপ এইচে তাদের প্রতিপক্ষ ঘানা, উরুগুয়ে আর দক্ষিণ কোরিয়া। ঘানা অবশ্য শেষ ১২ ম্যাচের মাত্র দুটো জিতেছে, কিন্তু হেড কোচ ওটো অ্যাডো যথার্থই বলেছেন, ঘানা হল বড় প্রতিযোগিতার দল। তারা ২০১০ সালে বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালের স্বাদ পেয়ে গেছে। ফলে তাদের হালকাভাবে নেওয়া যায় না। আবার উরুগুয়ে শুধু যে দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন (যদিও বহুকাল আগে – ১৯৩০, ১৯৫০) তা নয়, এবারে তাদের দল যথেষ্ট শক্তিশালী। লুই সুয়ারেজ আর এডিনসন কাভানি তো আছেন বটেই, আছেন দিয়েগো গোদিন। এঁদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে থাকবে রিয়াল মাদ্রিদের ফেদেরিকো ভ্যালভের্দের তারুণ্যের দীপ্তি। কোচ দিয়েগো আলোনসোর বিশ্বাস এই দল তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জিততে পারে। সে বিশ্বাসের শক্ত পরীক্ষা গ্রুপেই হয়ে যাবে। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত এই গ্রুপে আছে দক্ষিণ কোরিয়া – এশিয়ার সবচেয়ে ধারাবাহিক দল। এমনকি ব্রাজিল, জার্মানি, আর্জেন্টিনা আর স্পেনকে বাদ দিলে একমাত্র দক্ষিণ কোরিয়াই টানা দশটা বিশ্বকাপ খেলতে চলেছে। তাদেরও বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। টটেনহ্যামের সন হিউং-মিন সুস্থ থাকলে এবং ফিট থাকলে কোরিয়াও বেগ দিতে পারে।

এমতাবস্থায় রোনাল্ডো ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ফর্ম হারিয়ে বসলেন, একটা ম্যাচের মধ্যেই মাঠ ছেড়ে চলে গেলেন, বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে বললেন ইউনাইটেড ম্যানেজার এরিক টেন হ্যাগকে মোটেই শ্রদ্ধা করেন না। ওই ক্লাব এবং ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ফুটবলার ওয়েন রুনিকে অকারণেই ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বসলেন। পর্তুগালের আর যে ফুটবলার যেমনই খেলুন না কেন, বলাই বাহুল্য রোনাল্ডো স্বমহিমায় না থাকলে ২০১৬ ইউরো জয় আর ২০১৯ উয়েফা নেশনস লিগ জয় সম্ভব হত না।

পাঠক, আপনি যদি পর্তুগালের ভক্ত হন, তাহলে রোনাল্ডোর জন্য প্রার্থনা করুন। যদি অন্য কোনো দলের সমর্থক হন তাহলে তাদের জন্য প্রার্থনা করুন। কিন্তু বিনীত অনুরোধ, সঙ্গে কাতারের মৃত এবং অত্যাচারিত মানুষের জন্যও প্রার্থনা করুন। প্রার্থনায় কিছু হয় না, কিন্তু এছাড়া আর কী-ই বা করতে পারবেন? আমরা সকলেই তো নিরোর অতিথি হয়ে গেছি, কেউ বাদ নেই। কারণ আজ বিশ্বজুড়ে অনেক নিরো।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

World Cup: We are all Nero’s guests

Authoritarian rulers never seem to learn from Adolf Hitler’s Berlin Olympics experience, when his bid to showcase Aryan supremacy boomeranged as Jesse Owens reigned supreme.

It is said that in ancient Rome, Emperor Nero used to hold extravagant garden parties. Poor people were smeared in tar and bound to wooden stakes. Then they were set alight to illuminate the garden. With all that is happening around us, it would not be insane to ask if we are all becoming Nero’s guests. Because all the greatest shows on earth are unearthing some kind of cruelty or the other. Nero’s guests could be excused for being ancient, therefore backward, but what is our excuse for keeping eyes wide shut to the cruelties done in Qatar for the World Cup commencing on Sunday?

While authorities in Qatar and FIFA president Gianni Infantino insist only three workers have died in the last 12 years during preparation work for the World Cup, human rights organisations like Fair Square say that number is a “willful attempt to mislead”. Their Supreme Committee claims 36 more from construction sites have died after a day’s work, but those deaths were not counted, blaming “natural causes”. If Human Rights Watch is to be believed, the number actually runs into thousands.

Forgive me, dear reader, if you are feeling cheated by the first couple of paras of this curtain raiser. You were expecting mouth-watering dishes made of Messi, Neymar, Mbappe, Lewandowski et al but the starter tasted like bitter gourd.I could not help bringing up the dead workers as England’s The Guardian newspaper’s investigation says 6,500 migrant workers from India, Pakistan, Bangladesh and Sri Lanka have died in Qatar since 2010. Coming just a couple ofyears after we saw migrant workers walking thousands of miles through our own country and dying on the road, it is impossible to ignore these facts in the excitement of a sporting spectacle.

Spectacle it shall be, no matter how many workers (Amnesty International says more than100,000) have been exploited and abused by lax labour laws of Qatar. Many have reportedly worked 14-18 working hours a day. To be fair, Qatar did not change their laws overnight to get the World Cup job done cheaply. Entire world knew how things were in that country and members of FIFA still voted for their bid. What role cash and kinds played is another story.

One can justifiably argue that this is all politics, not football. But having excluded Russia from this World Cup for attacking Ukraine, it would be rich of FIFA to dismiss the above criticism as just politics. The English FA has vowed to push for new labour laws and Migrant Workers’ Centre in Qatar. As many as eight captains are planning to wear rainbow-coloured ‘One Love’ armbands in support of LGBTQIA+ community during the matches, many teams have cancelled fan zones protesting the oppressive laws about homosexuality in Qatar. Also, many footballers and coaches are on record saying the World Cup should not have been held in that country. World Cup 2022, therefore, cannot escape politics.

However, this is not the first world event to be underscored by politics. Dictators have always exploited sporting events to prove their supremacy. Vladimir Putin did that with the 2018 World Cup, Argentine dictator Jorge Rafale Videla with the1978 edition and Benito Mussolini with the 1934 edition. Authoritarian rulers never seem to learn from Adolf Hitler’s Berlin Olympics experience, when his bid to showcase Aryan supremacy boomeranged as Jesse Owens reigned supreme. They have good reason not to. Those who played in Italy (1934) and Argentina (1978) remain divided in their opinion about the glory. Some believe they played and won for the people of their country, not the ruler. Some feign ignorance about what was happening at that point in time while others declare helplessness. None of them is fully wrong.

Considering what was going on in Mussolini and Videla’s regime, Qatar would just be dirty. Hopefully, there is no detention camp within walking distance of one of the stadiums, as was the case in Argentina. Moreover, Qatar cannot possibly lift the trophy on December 18, thereby further glorifying the monarchy. In fact, it would be an achievement if they progress from Group A, which has the always fascinating Netherlands and African giants Senegal.

Read Falling from the sky: The insignificance of being human

Gareth Southgate’s ever-improving England should find it easy in Group B. Harry Kane& Co. have already made it to a World Cup semifinal and a Euro final, surpassing all the English sides of the past but one. Southgate has already said he knows the contract till 2024 cannot protect him if he fails to lift this trophy. Why should such a team be worried about Wales, United States and Iran?

Same for Argentina in Group C. An Argentine World Cup campaign, even during the days of Diego Maradona, used to be tumultuous. This is the first time the genius would neither be in the dressing room, nor in the stands looking like a child desperate to see his favourite side win. This is also the first time Argentina are coming into the tournament as firm favourites even though Messi refuses to acknowledge it. That is a good way to deflect pressure because who can be a favourite if a team that has not lost 35 games on the trot isn’t? Messi, for all his exploits in European club football, has always hit a wall called Maradona. Fans back home and critics world over always pointed out Messi has not won anything for Argentina. Maradona passed away in 2020 and Argentina won Copa America next year. That monkey is off Messi’s back now. It is highly unlikely that he will get another opportunity to emulate Maradona’s 1986. There could not be a better opportunity, too, as Lionel Scaloni’s team is the best Argentine side in a longtime. When was the last time they had a defender of Cristian Romero’s calibre?

The fight for top spot in Group D would be a competition between defending champions France and dangerous Denmark, unless Australia, struggling in the qualifiers, spring a surprise. Didier Deschamps’s side is a good unit even without Paul Pogbaand N’Golo Kante in the midfield. A mature Kylian Mbappe and in-form Karim Benzema could be nightmarish for any defence and the reliable Hugo Lloris is still in goal.

Luis Enrique’s Spain and Hansi Flick’s Spain in Group E are rich in history and have been poor in recent past. Germany, perhaps, have never been poorer in big tournaments. Their group stage exit from the last World Cup was followed by a second-round loss to England in Euro 2020. But this German side is again overflowing with top performers. If the striking power of Serge Gnabry, Leroy Sane, Kai Havertz, Timo Werner is not enough, there is still the old fox –Thomas Mueller. And Manuel Neuer remains one of the best to guard the goal.

Likewise Spain have talented attackers and young ones at that. Pedri, perhaps their biggest star at the moment, will turn only 20 during the World Cup. But he has already played almost 100 matches for Barcelona. Ansu Fati, another young Barcelona recruit, could light up the World Cup if he is fit enough. They would have the calmness of elder statesman Sergio Busquets behind them.

Group F should be a cakewalk for last World Cup’s runners up Croatia, with deteriorating Belgium as the only challenge for the top spot. While Croatia havegrown in the last four years and look a set team under Zlatko Dalic, Belgium’s golden generation seems to be over. Roberto Martinez does not have the services of a stalwart like Vincent Kompany anymore, Romelu Lukaku has lost some edge and Eden Hazard has been plagued by injuries, not being a regular for Real Madrid. Only Kevin de Bruyne and Thibaus Courtois remain the same force.

Cameroon have high hopes in Group G. When Rigobert Song’s boys beat Algeria in March to ensure qualification, legend Samuel Eto’o, now the head of Cameroonian Football Federation, told the team “We go to Qatar to win the World Cup.” Dreams are good but Cameroon will have to get past decent European teams Serbia and Switzerland first, assuming Tite’s Brazil will not have problems topping that group. Neymar, like Messi, never had a better team with him. Raphinha, Richarlison, Lucas Paqueta – coach Tite is spoilt for choice as far as attackers are concerned. Then there is Casemiro in the midfield and Thiago Silva at the back. Dreaming of the sixth title is not outrageous.

Cristiano Ronaldo, in his last World Cup, has landed in a tough group with his side. The other teams in Group H are Ghana, Uruguay and South Korea. Ghana played a World Cup quarterfinal in 2010, Uruguay are two-time champions and South Korea, apart from being the most regular Asian team in the quadrennial show, have been in the semi-final. In fact, it is Portugal whose best World Cup performance came way back in 1966, when they finished third. But Ronaldo has taken them through their best ever period, winning Euro 2016 and the inaugural UEFA Nations League in 2019.

However, Ronaldo’s form and fitness have become a concern now. For the last few days, he has been in the news for all the wrong reasons. Ronaldo claims he has not been given enough respect at Old Trafford either by Manchester United manager Erik ten Hag or the management. He has also spoken ill of Wayne Rooney unprovoked. Did Ronaldo need this distraction to charge himself up before the big event or will it further dent his team’s chances? Whatever it is, the campaign will be doubly difficult for Portugal if CR7 is not at his best.

Pray for him if you are a Portugal fan, pray for whichever team you support. But do keep the dead and the persecuted of Qatar in your prayers. We can do only that much because we cannot help becoming Nero’s guests. Today’s world does not have one Nero.

Originally published in The Meghalayan