ভারতীয় দলের জার্সি এখন বিজেপির সম্পত্তি

সেওয়াগের মত কেউ কেউ এতই উগ্র যে অভব্য ট্রোলিংয়েও পিছপা হন না। কিন্তু বিজেপির পতাকা তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয় না। ফ্যাসিবাদী কৌশল হিসাবে এটি বেশি কার্যকরী, কারণ এতে অনেক বেশি মানুষ প্রভাবিত হন। ওর গায়ে জার্সি নেই, অতএব ও নিরপেক্ষ – অধিকাংশ মানুষ এরকম সরলরেখাতেই ভাবতে পছন্দ করেন।

জার্সি

“দাদা আমি সাতে পাঁচে থাকি না।” অরাজনৈতিক হওয়ার ভান করা সুখী বিত্তশালীদের ব্যঙ্গ করে লেখা এই ছড়া ২০২০ সালে রীতিমত ভাইরাল হয়েছিল। আজীবন অভিনয়ের পেশায় যুক্ত থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের চেয়ারম্যান হয়ে যাওয়া রুদ্রনীল ঘোষের তীব্র শ্লেষ কতজনকে বিঁধেছিল তার হিসাব নেই, কিন্তু ছড়াকার হিসাবে রুদ্রনীলের সততাকে সন্দেহ করা যাবে না। অচিরেই প্রমাণ করে দিয়েছিলেন তিনি সাতেও থাকেন, পাঁচেও থাকেন। তৃণমূল কংগ্রেসে থেকে সরকারি আধিকারিক হয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেও ঠিক সময়ে জার্সি বদলে বিজেপিতে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু অরাজনৈতিক হয়ে থাকেননি। এ রাজ্যে সেই ২০১১ সাল থেকে আপনি অভিনেতা বা খেলোয়াড় – যা-ই হোন না কেন, বিখ্যাত হলেই জার্সি পরা বাধ্যতামূলক। যারা কিছুতেই কোনো জার্সি পরেনি তাদের কার্যকলাপ দেখে অন্তর্বাসের রং আন্দাজ করার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। অবস্থা এমন যে যাদের জার্সির চাহিদা নেই তারা কদিন আগেই যাদের অন্তর্বাস “নির্ঘাত সবুজ” বলে গাল দিয়েছে, তাদেরই “ওরটা লাল না হয়ে যায় না” বলে গলা জড়িয়ে ধরছে।

এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। জনপ্রিয় মুখগুলোকে নিজের জার্সি না পরালে ফ্যাসিবাদের চলে না, কারণ তা ফ্যাসিবাদী শক্তিকে বৃহত্তর সামাজিক স্বীকৃতি দেয়। ভোটবাক্সেও তার প্রভাব পড়ে। যে দু-একজন পরতে চায় না তাদের গায়ে বিপক্ষের জার্সি চাপিয়ে না দিলেও চলে না। কারণ তারা ফ্যাসিবাদের সামাজিক স্বীকৃতিকে বিপন্ন করে। কেবল রাজনীতিকে নয়, গোটা সমাজটাকেই এ হেন বাইনারিতে ফেলতে না পারলে ফ্যাসিবাদ বাঁচতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা, নাটক ও খেলার জগতের পরিচিত মুখগুলোকে (সরলমতি মিডিয়া যাদের একদা নাম দিয়েছিল সুশীল সমাজ, এখন নাম রেখেছে বুদ্ধিজীবী) সফলভাবে দলে টেনে অথবা শত্রুপক্ষে ঠেলে দিয়ে ফ্যাসিবাদ অভিপ্রেত সামাজিক স্বীকৃতি আদায় করতে শতকরা একশো ভাগ সফল হয়েছে। রূপোলি পর্দার দেব অধিকারী, নুসরত জাহান, মিমি চক্রবর্তী থেকে শুরু করে ক্রিকেটার মনোজ তিওয়ারি, লক্ষ্মীরতন শুক্লা – সকলেই শাসক দলের জার্সি পরেছেন। আবার রুদ্রনীল, অনিন্দ্যদের মত অতি বুদ্ধিমানরা প্রতি মরসুমে জার্সি বদলে বেড়াচ্ছেন। এসবই ফ্যাসিবাদের সামান্য লক্ষণ। সে প্রসঙ্গে সেটিং আছে না নেই, থাকলে কাদের মধ্যে আছে – তা নিয়ে আলোচনা করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়।

পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলকে ফ্যাসিবাদী শক্তি বললে অনেকে রে রে করে ওঠেন অথবা নানা সূক্ষ্ম তর্কের অবতারণা হয়। সে তর্কে যাব না। কিন্তু কেন্দ্রের শাসক দল যে ফ্যাসিবাদী তা সব বিরোধীই মোটামুটি মেনে নিয়েছেন। সেই সুবাদে কিছু কথা বলতেই এই নিবন্ধের অবতারণা। পশ্চিমবঙ্গে যেমন বিভিন্ন ক্ষেত্রের পরিচিত মুখগুলোকে দলে টেনে বৃহত্তর সামাজিক স্বীকৃতি আদায় করা হয়েছে, ফ্যাসিবাদ সারা দেশেই সেই পন্থা নিয়েছে বেশ কিছুদিন হল। কাজটা যে করা হচ্ছে তা কিন্তু এখনো অনেকেই মানতে পারেন না, কারণ ভারতীয় জনতা পার্টি এই কাজ তৃণমূল কংগ্রেসের মত গোদা পথে করেনি এতদিন। উদাহরণস্বরূপ, বলিউড এবং ক্রিকেট জগতের জনপ্রিয় মুখগুলো বিভিন্ন ইস্যুতে বিজেপির পক্ষ নিয়ে টুইট করলে বা বক্তৃতা দিলেও তাদের সাংসদ বা বিধায়ক করা হয়নি। মন্ত্রী তো নয়ই। অনুপম খের, কঙ্গনা রানাওয়াত, অক্ষয় কুমাররা এখনো বিজেপির পার্টি সদস্য নন। বিরাট কোহলি, শচীন তেন্ডুলকর, অনিল কুম্বলে, বীরেন্দ্র সেওয়াগরা যে কোনো ইস্যুতে বিজেপি সরকারের পক্ষ নিয়ে প্রয়োজন পড়লেই টুইট করে দেন (অনেক সময় দেখা যায় বয়ানটা দাঁড়ি, কমা সুদ্ধ এক)। সেওয়াগের মত কেউ কেউ এতই উগ্র যে অভব্য ট্রোলিংয়েও পিছপা হন না। কিন্তু বিজেপির পতাকা তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয় না। ফ্যাসিবাদী কৌশল হিসাবে এটি বেশি কার্যকরী, কারণ এতে অনেক বেশি মানুষ প্রভাবিত হন। ওর গায়ে জার্সি নেই, অতএব ও নিরপেক্ষ – অধিকাংশ মানুষ এরকম সরলরেখাতেই ভাবতে পছন্দ করেন। ফলে একই কথা গৌতম গম্ভীর বা ভোজপুরি সিনেমার নায়ক মনোজ তিওয়ারি বললে বিজেপি সমর্থক বাদে অন্যরা মানতে চাইবেন না, সন্দেহ করবেন। কারণ ওঁরা বিজেপির সাংসদ। কিন্তু কোহলি বা অক্ষয় বললে অনেক বেশি মানুষ মেনে নেবেন। বিজেপি একথা জানে বলেই ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখগুলোকে ভোটে দাঁড় করানোর জন্য বা নির্বাচনী প্রচারে হাজির করানোর জন্য আদেখলেপনা নেই। গম্ভীর বা তিওয়ারির জনপ্রিয়তা বিরাট বা অক্ষয়ের মত দেশব্যাপী নয়, বিভিন্ন মতের মানুষের মধ্যেও নয়। ফলে তাঁদের কাজে লাগানো হয় সূক্ষ্মতর উপায়ে লোকের মাথা খেতে।

এই প্রক্রিয়ার সাফল্য কতদূর সে আলোচনায় আসব। তার আগে বলে নিই, আসন্ন গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে এমন একটা কাণ্ড ঘটেছে যাতে ফ্যাসিবাদ যে সামাজিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য জনপ্রিয় মুখগুলোকে ব্যবহার করার স্তর অতিক্রম করে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করতে শুরু করেছে তা প্রমাণ হয়ে গেছে। এ জিনিসও আসলে আগেই শুরু হয়েছে, কিন্তু প্রায় কেউই বিশ্বাস করছিলেন না। আমি নিজেই অন্তত গোটা তিনেক লেখায় এ বিষয়ে লিখেছি এবং ঘোর বামপন্থীরাও হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। এবার আর উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ চোটের কারণে এই মুহূর্তে ভারতীয় ক্রিকেট দলের বাইরে থাকা অলরাউন্ডার রবীন্দ্র জাদেজা গত মঙ্গলবার (২২ নভেম্বর) বিজেপির হয়ে জামনগর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের প্রচারে নেমেছিলেন। রীতিমত রোড শো করেছেন। এমনিতে ব্যক্তি জাদেজা এমনটা করতেই পারেন। আইনত কোনো বাধা তো নেই বটেই, নীতিগতভাবেও আপত্তি করা চলে না, সমালোচনা করা চলে। আমেরিকার মহিলা ফুটবল দলের অধিনায়িকা মেগান র‍্যাপিনো যদি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থন করতে পারেন, জাদেজাই বা কেন তাঁর পছন্দসই দলের হয়ে প্রচার করতে পারবেন না? কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। বিজেপি এই রোড শোয়ের প্রচার করতে যে পোস্টার তৈরি করেছে তাতে জাদেজার গায়ে ভারতীয় দলের জার্সি। অর্থাৎ ওই কেন্দ্রের বাসিন্দা ক্রিকেটার জাদেজা বিজেপিকে ভোট দিতে বলছেন – শুধু এটুকু বক্তব্য নয়। ভারতীয় দল, যা আমার আপনার প্রতিনিধি হিসাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে, তাদের একজন প্রতিনিধি বলছেন বিজেপিকে ভোট দিতে।

বিজেপি অবশ্য ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করে থাকে সাবলীলভাবে। গত লোকসভা নির্বাচনের আগে পুলওয়ামায় বোমা বিস্ফোরণে যে সিআরপিএফ জওয়ানরা শহিদ হয়েছিলেন তার জন্য কারা দোষী তা উদ্ঘাটন করার উদ্যোগ আজ অবধি দেখা গেল না। অথচ প্রধানমন্ত্রীর দল সেবার প্রায় গোটা নির্বাচনটাই লড়ল শহিদদের নাম করে। কেউ তদন্তের দাবি করলেই তাদের দেশদ্রোহী বলা হয়েছিল, আজও হয়। প্রয়াত সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াত যে ভাষায় কথা বলতেন তাতে প্রায়শই বোঝা শক্ত হত তিনি সেনাবাহিনীর লোক না শাসক দলের লোক। সেনাবাহিনীর জওয়ানরা নিজেদের হতশ্রী অবস্থার কথা প্রকাশ করলে কিন্তু উন্নতির প্রয়াস হয় না, উল্টে জওয়ানদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। অবসরপ্রাপ্ত সেনানীরা ‘ওয়ান র‍্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন’ দাবি করতে গিয়ে যে অমিত শাহের অধীন পুলিসের গলাধাক্কা খেয়েছিলেন সেকথা অগ্নিবীর প্রকল্পের যুগে আর কে-ই বা মনে রেখেছে? কিন্তু সেনাবাহিনীর রাজনীতিকরণ যতখানি বিপজ্জনক, তার চেয়ে কম বিপজ্জনক নয় সরকারের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আত্মসাৎ করে নেওয়া।

ভাল হোক মন্দ হোক, আবালবৃদ্ধবনিতার ভোটাধিকারসম্পন্ন ভারতে গণতন্ত্রের অনুশীলন চলেছে সাড়ে সাত দশক। তার কিছু দীর্ঘমেয়াদি লাভ রয়েছে। যেমন এখনো দেশের আধিপত্যবাদী সরকারকে কিছু জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালিয়ে যেতে হচ্ছে এবং নির্বাচনের প্রাক্কালে ঘোষণা করতে হচ্ছে, জিতলে এই দেব বা ওই দেব। কারণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোটাররা জেনে এসেছেন গণতন্ত্রে তাঁদের কিছু প্রাপ্য আছে। এই ধারণা বদল করার প্রক্রিয়া স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শুরু করেছেন বটে, কিন্তু তাঁর নিজের দলকেও “রেউড়ি কালচার” মানতেই হচ্ছে। এটুকুই ভারতীয় গণতন্ত্রের অর্জন। তেমনই এক অর্জন এই ধারণা, যে ভারতের হয়ে খেলে যে দল, সে দল সব ভারতীয়ের। কংগ্রেসের নয়, বিজেপির নয়, সিপিএমের নয়, তৃণমূলের নয়, এমনকি সরকারেরও নয়। আবার এই তালিকার সকলেরই। এমন নয় যে স্বাধীনতার আগে বা পরে ফুটবল, ক্রিকেট বা অন্যান্য খেলার প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো রাজনৈতিক দল নাক গলায়নি বা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেনি। এনকেপি সালভে, মাধবরাও সিন্ধিয়া, শরদ পাওয়ারের মত কংগ্রেস, এনসিপি নেতারা ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হয়েছেন। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী, প্রফুল প্যাটেল সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সর্বোচ্চ পদে আসীন থেকেছেন দীর্ঘকাল। ভারতীয় অলিম্পিক সংস্থার শীর্ষ পদে কংগ্রেসি সুরেশ কালমাদির কার্যকলাপ নিয়ে তো যত কম বলা যায় তত ভাল। রাজ্য স্তরে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের মাথায় পুলিস কর্তা প্রসূন মুখার্জিকে বসানোর জন্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের অতিসক্রিয়তাও ভোলার নয়। কিন্তু কোনো নেতা, কোনো রাজনৈতিক দলই কখনো ভারতীয় দলকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেননি।

চলতি ফুটবল বিশ্বকাপ রাজতান্ত্রিক কাতারে হওয়ায় অতীতের ফ্যাসিবাদী বা জুন্টা সরকার চালিত রাষ্ট্রগুলোতে বিশ্বকাপ, অলিম্পিকের মত প্রতিযোগিতা বা জাতীয় দলকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর ইতিহাস নিয়ে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে। মনে রাখা ভাল, তেমন ঘটনা কিন্তু ভারতের কোনো সরকার কখনো ঘটায়নি। জাদেজার ঘটনা স্পষ্ট দেখিয়ে দিল, এবার আমরা ইতিহাসের সেই বিপজ্জনক অধ্যায়ে ঢুকে পড়েছি যখন শুধু রাজনীতি নয়, দেশের সবকিছুর উপরেই সরকার নিজের মালিকানা কায়েম করে, সাধারণ মানুষের আবেগের সঙ্গে সম্পৃক্ত জাতীয় দলের উপরেও।

কেন করে? ঠিক যে কারণে সেনাবাহিনী আর নিজেদের দলকে এক করে দেখায়, সেই কারণেই। অর্থাৎ দেশের জন্যে প্রাণ দিতে উদ্যত সৈনিকরা, দেশের প্রতিনিধি খেলোয়াড়রা আমাদের লোক। তারা মনে করে আমরাই সেরা – এই ধারণা সাধারণ মানুষের মনে প্রতিষ্ঠা করতে। যে কোনো একনায়ক বা একনায়ক হয়ে উঠতে চাওয়া শাসকের এটিই অভিজ্ঞান। সম্প্রতি ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হেরে অপসারিত হওয়া জেয়ার বলসোনারোও একই চেষ্টা করেছিলেন। সারা বিশ্বের ব্রাজিল ভক্তদের প্রিয় হলুদ-সবুজ জার্সিকে নিজের প্রচারে এমনভাবে ব্যবহার করেছিলেন বলসোনারো, যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগেই বিশ্বকাপ দলের কোচ তিতে বলে রেখেছেন, খেতাব জিতলেও ১৯৫০ সাল থেকে চলে আসা প্রথা ভেঙে তিনি দলের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করতে যাবেন না। ১৯৫২ সালে ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের সময়ে পাশ্চাত্যের পণ্ডিতরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সেটাই হবে ভারতের প্রথম এবং শেষ নির্বাচন। তাঁদের মুখে ছাই দিয়ে আমাদের দেশে পাকিস্তানের মত জুন্টা সরকার বা সেনাবাহিনীর অঙ্গুলিহেলনে চালিত নড়বড়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলেই জাতীয় দলের জার্সি নিয়ে ওরকম নোংরা রাজনীতি কখনো হয়নি। সি কে নাইডু থেকে শচীন তেন্ডুলকর পর্যন্ত সব ক্রিকেট তারকাই আমাদের সকলের হয়েছেন। ১৯৭১ সালে ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজে প্রথম সিরিজ জয় বা ১৯৮৩, ২০০৭, ২০১১ সালের বিশ্বকাপ জয়ে দলমত নির্বিশেষে সব ভারতীয়ই গর্বিত হতে পেরেছে। সে সুদিন ফুরোতে চলল।

সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকাদের কাজে লাগানোর ছক ব্রাজিলেও দেখা গেছে। নির্বাচনের কদিন আগে নেইমার বলসোনারোকে সরাসরি সমর্থন করেন। কিন্তু বিজেপির অভিভাবক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। ফলে বলসোনারো বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে এসব ব্যাপারে বিজেপি সূক্ষ্মতর, সুতরাং সফলতর। এই মুহূর্তে ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব বিরাট ডিমনেটাইজেশনের পরেই সাংবাদিক সম্মেলনে বলে দেন, ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে ওই সিদ্ধান্ত সর্বশ্রেষ্ঠ। একেবারে আরএসএসের সুরেই ২০১৮ সালে এক ক্রিকেটভক্তকে বলেন অন্য দেশের ক্রিকেটারদের পছন্দ করলে অন্য দেশেই চলে যেতে। অথচ আজও ভারতের উদারবাদী, প্রগতিশীলরা বিরাট বলতে অজ্ঞান। তাঁর ব্যাটিং নিয়ে অভিভূত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু বিরাটকে দক্ষিণপন্থী বললে প্রবল বামপন্থীরাও বেজায় রেগে যান। এমনকি বিরাটের হাত থেকে অধিনায়কত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে মহম্মদ শামির পক্ষ নিয়ে কথা বলার ফলে – এমন কষ্টকল্পনাও তাঁরা করে ফেলতে পারেন। অথচ বিরাট তাঁর টিমমেটের পাশে দাঁড়িয়ে কিছু সোশাল মিডিয়া ট্রোলকে জবাব দিয়েছিলেন, ক্ষমতার বিরুদ্ধে মোটেই দাঁড়াননি। তাঁর নিজের শহর দিল্লিতে যখন গরীব মুসলমানদের বাড়ি, দোকান বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয় তখন তাঁকে বলতে শোনা যায়নি “ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এই সিদ্ধান্ত সবচেয়ে লজ্জাজনক।”

বিরাটকে নিয়ে ভারতের অনেক নারীবাদীও উচ্ছ্বসিত, কারণ নিজের সাফল্যের মুহূর্তে তিনি সবসময় স্ত্রী অনুষ্কাকে কৃতিত্ব দেন, নিজের ব্যর্থতায় অনুষ্কা ট্রোলড হলে সোচ্চারে পাশে দাঁড়ান। কী নিষ্পাপ মুগ্ধতায় এই নারীবাদীরা গ্রাহ্যই করেন না, বক্সার বিজেন্দর সিং, প্রাক্তন ক্রিকেটার আশিস নেহরা, বর্তমান ক্রিকেটার শিখর ধাওয়ানের মত বিরাটও গুরমীত রাম রহিম সিং ইনসানের আশীর্বাদধন্য। এই গুরুদেব যে সে লোক নন, ইনি ধর্ষণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের বক্তব্য পড়লে শিউরে উঠতে হয়। বলা যেতেই পারে, বিরাট বহু বছর আগে যখন গুরমীতের কাছে গিয়েছিলেন তখন এসব জানতেন না বা তখনো হয়ত ওসব ঘটেনি। কিন্তু বিরাট অর্থনীতি জানেন, ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস জানেন, কেবল অস্বস্তিকর তথ্যগুলো জানেন না – এ কেমন করে সম্ভব? গুরমীতের কীর্তিকলাপ পরে প্রকাশ্যে এসেছে, এমনটা অবশ্য খুবই সম্ভব। কিন্তু বিরাট কি তখন দুঃখপ্রকাশ করেছেন অতীতে ওই লোকের আশীর্বাদ নিতে গিয়েছিলেন বলে? ২০১৭ সালে একবারই তিনি গুরমীত সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। তাতে কিন্তু বলেননি যে গুরমীতের কাছে কখনো যাননি। শুধু রসিকতা করে বলেছিলেন “Funniest part was him calling Jagdish Nehra and Jousuf Pathan??”

গেরুয়া জার্সিটি না পরে বিরাট এসব কাণ্ড করে বেড়ান বলে গেরুয়া রাজনীতির বিরোধীদের চোখে তিনি একইরকম প্রিয় থেকে যান এবং তাঁদের অজান্তেই তাঁদের মধ্যে বিভাজনের বিষ ঢুকে পড়ে। তারই প্রতিফলন দেখা যায় দুই বন্ধু বিরাট বড় না রোহিত শর্মা বড় তা নিয়ে ঝগড়া করতে করতে খুন করে ফেলায়। ওই খুনের জন্য বিরাট দায়ী নন, দায়ী যে বিভাজনের রাজনীতির প্রচারে তিনি নিজের খ্যাতিকে ব্যবহার করেন সেই রাজনীতি। এমন বিদ্বেষে দীর্ণ সমাজই ফ্যাসিবাদের প্রার্থিত।

ভারতীয় ক্রিকেট দলের দক্ষিণপন্থী রাজনীতির মুখপাত্র হয়ে ওঠার কাজটা কিন্তু আজ শুরু হয়নি। হয়েছিল ২০১৯ সালের ৮ মার্চ, যখন পুলওয়ামায় নিহত জওয়ানদের শ্রদ্ধা জানাতে ভারতীয় দল সেনাবাহিনীর মত ক্যামোফ্লাজ ক্যাপ পরে মাঠে নেমেছিল রাঁচিতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে একদিনের ম্যাচে। সেখানে রাজনীতিকরণকে ক্যামোফ্লাজ করা হয়েছিল শহিদদের নাম করে। কিন্তু ক্রিকেট দলের সামরিকীকরণও যে অন্যায় সেকথা ভারতে কেউ বলেনি, উদারপন্থী বা বামপন্থী ক্রিকেটভক্তরাও বলেননি। কারণ তাঁরা খেলা রাজনীতির বাইরের বিষয় বলে মনে করেন। এই বালখিল্য মানসিকতার সুযোগ নিয়েই ভারতীয় ফ্যাসিবাদ সামাজিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। লক্ষণীয়, ভারতের অন্যতম ঐতিহ্যশালী ক্রিকেট মাঠ ফিরোজ শাহ কোটলার নামকরণ করা হয়েছে অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম। ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মত বড় দলের ভারত সফরের সূচিতে জায়গা পাচ্ছে না ক্রিকেটের নন্দনকানন ইডেন গার্ডেন্স বা মুম্বাইয়ের ঐতিহ্যশালী ওয়াংখেড়ে আর ব্র্যাবোর্ন স্টেডিয়াম। তালিকায় থাকছে জীবিত প্রধানমন্ত্রীর নামাঙ্কিত আমেদাবাদের স্টেডিয়ামটি।

আরও পড়ুন টুপির আমি টুপির তুমি?

আজ ভারতীয় দলের জার্সি বিজেপির নির্বাচনী প্রচারে কাজে লাগানো হচ্ছে, কাল খেলোয়াড়দের জয়-পরাজয় বিজেপিরই জয়-পরাজয় বলে গণ্য হবে। ইতিমধ্যেই সে অভিজ্ঞতা ভারতের অলিম্পিক খেলার ক্রীড়াবিদদের হয়ে গেছে। কমনওয়েলথ গেমস, এশিয়ান গেমস বা অলিম্পিকের প্রোমো ভিডিও জুড়ে থেকেছেন ক্রীড়ামন্ত্রীরা। পদকজয়ীদের সংবর্ধনা সভায় প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এভাবেই চলবে, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে খেলাধুলো এভাবেই চলে। মুশকিল হল, জুন্টা সরকার বা এ ধরনের আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রে যতক্ষণ মাঠে জয় আসে ততক্ষণ সব ঠিক থাকে। পরাজয়ের ফল হয় ভয়ংকর। যে ক্রীড়াবিদরা আজ জল্লাদের উল্লাসমঞ্চে উঠছেন এবং যে ক্রীড়াপ্রেমীরা হাততালি দিচ্ছেন, তাঁরা কিন্তু সেদিন কেঁদে কূল পাবেন না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: