জাতীয় ফুটবল দলের ইতিহাসের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত

মুখবন্ধে সম্পাদক জয়দীপ বসু ও তাঁর সহকারী সায়ন মুখার্জি নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, স্রেফ প্রচ্ছদ দেখলেও টের পাওয়া যাচ্ছে যে এ বই ততটা ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস নয়, যতটা ভারতীয় ফুটবল দলের ইতিহাস।

ফুটবল

ভারতের ফুটবল এখন কোথায় দাঁড়িয়ে তা সংক্ষেপে বোঝাতে হলে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে ইন্ডিয়ান সুপার লিগের দলগুলো ঝাঁ চকচকে হোটেলে সর্বোচ্চ মানের সুযোগসুবিধা নিয়ে থাকে, বিমানে যাতায়াত করে; জাতীয় গেমসে সোনার পদক জয়ী বাংলা দলের ফুটবলাররা বাড়ি ফেরেন দু রাত ট্রেনে কাটিয়ে। ট্রেনে চড়ায় কোনো অন্যায় নেই, অপমানও নেই। কিন্তু দু ধরনের ফুটবলের দুস্তর ব্যবধান এতে স্পষ্ট হয়। ভারতীয় ফুটবল অবশ্য এভাবেই চলে। রাজ্য দল দূরের কথা, জাতীয় দলও ক্লাব দলগুলোর মত সুযোগসুবিধা ভোগ করে না। ভারতের জাতীয় দলের পরিচর্যায় ইদানীং বিপুল উন্নতি হয়ে থাকলেও দীর্ঘকাল জাতীয় দলে খেলা সম্মানের, সেখানে দেশপ্রেম জড়িত – এই আবেগের শাক দিয়ে পারিশ্রমিকের মাছ ঢেকে রেখেছিলেন ফুটবল কর্তারা। তখন থেকেই ভারত আন্তর্জাতিক ফুটবলে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর সমস্ত ফুটবলোন্নত দেশেই ক্লাব ফুটবল বেশি অর্থকরী, তার গ্ল্যামারও বেশি। তা বলে জাতীয় দল হেলা শ্রদ্ধার পাত্র নয়। সুনীল ছেত্রী ব্যক্তিগত দক্ষতায় লায়োনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর পাশে জায়গা করে নিলেও আন্তর্জাতিক ফুটবল মানচিত্রে কিন্তু ভারতীয় দল কোথাও নেই। অথচ ফুটবলে যখন বিশ্বকাপ নয়, অলিম্পিককেই মনে করা হত সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতার মঞ্চ, তখন এই ভারতই ১৯৫৬ সালের মেলবোর্ন অলিম্পিকে চতুর্থ হয়েছিল। এই অবনমনের ইতিহাস ধরা পড়েছে ভারতীয় ফুটবল দলের ৭৫ বছরের ইতিহাস নিয়ে লেখা বক্স টু বক্স বইতে।

মুখবন্ধে সম্পাদক জয়দীপ বসু ও তাঁর সহকারী সায়ন মুখার্জি নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, স্রেফ প্রচ্ছদ দেখলেও টের পাওয়া যাচ্ছে যে এ বই ততটা ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস নয়, যতটা ভারতীয় ফুটবল দলের ইতিহাস। তরুণ ফুটবলপ্রেমীদের প্রায়শই হা হুতাশ করতে দেখা যায় ভারত বিশ্বকাপ ফুটবলের ত্রিসীমানায় পৌঁছতে পারে না বলে। অথচ তাঁদের ধ্যান জ্ঞান ক্লাব ফুটবল। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল আইএসএল খেলতে পারল কি না পারল তা নিয়ে যত আগ্রহ তার ছিটেফোঁটাও জাতীয় ফুটবল দল নিয়ে দেখা যায় না। সুনীল ছেত্রী যদি বর্তমান প্রজন্মের খেলোয়াড় না হয়ে প্রাক্তন হতেন তাহলে তাঁর কীর্তি নিয়ে কার কতটা আগ্রহ থাকত যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সন্দেহ নেই এর জন্যে অনেকখানি দায়ী ভারতীয় ফুটবল দলের সাফল্যের অভাব। ১৯৭০ সালের এশিয়ান গেমস আর মারডেকা কাপে ব্রোঞ্জ মেডেলের পর বলার মত সাফল্য আর কোথায়? সাফ কাপ বা এশিয়ান চ্যালেঞ্জ কাপের খেতাব যে খুব বড় কোনো সাফল্য নয় তার প্রমাণ পাওয়া যায় এশিয়ান কাপের মূলপর্ব বা বিশ্বকাপের যোগ্যতামান পর্বের খেলা এসে পড়লেই। কিন্তু ব্যর্থতার ইতিহাসও তো জানা জরুরি। সম্ভবত সাফল্যের ইতিহাস জানার চেয়েও বেশি জরুরি, কারণ ব্যর্থতার সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসই সাফল্যের ইমারত গড়ার মশলা। আইএসএলে মত্ত ফুটবলপ্রেমীদের সামনে সেই ইতিহাস তুলে ধরার কাজ করেছে বক্স টু বক্স। ফুটবলপ্রেমীদের প্রেম কতটা এ বইয়ের কপালে জুটবে তা বলা শক্ত, কিন্তু নথি হিসাবে এ বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।

তথ্য সংকলন করা পরিশ্রমসাধ্য হতে পারে, অসম্ভব নয়। কিন্তু কেবল তথ্য ইতিহাস হয়ে ওঠে না। পাহাড়প্রমাণ তথ্য ঘেঁটে একজন বা দুজন যদি ভারতীয় ফুটবল দলের ইতিহাস লিখতেন তাহলে গভীরতায় ঘাটতি থাকতে পারত, একপেশে ইতিহাস তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই বইয়ের সবচেয়ে বড় গুণ হল দুই সম্পাদক এবং পরিসংখ্যানবিদ গৌতম রায় ছাড়া আরও ১৪ জন ফুটবল সাংবাদিকের বয়ানে ইতিহাসকে তুলে ধরা। বাকি পৃথিবীর সাংবাদিকতায় ‘সুপার স্পেশালাইজেশন’-ই দস্তুর। কিন্তু ভারতে তা নানা কারণে অসম্ভব। অতিমারীর আগে পর্যন্ত তবু ফুটবল সাংবাদিক, ক্রিকেট সাংবাদিক, টেনিস সাংবাদিক – কাজের এরকম বিভাজন অন্তত বড় সংবাদমাধ্যমগুলোতে দেখা যেত। করোনার ধাক্কা থেকে নিজেদের লাভের কড়ি বাঁচাতে গিয়ে মালিকরা ওটুকুও লাটে তুলে দিয়েছেন। এমন আবহে এই বইয়ে হায়দরাবাদের ফুটবল নিয়ে লিখেছেন সেখানকার সাংবাদিক (এন গণেশন ও জি রাজারমণ), বাংলার ফুটবল নিয়ে কলকাতার সাংবাদিক (পুলকেশ মুখোপাধ্যায়), কেরালা (লেসলি জেভিয়ার), গোয়া (মার্কাস মারগুলহাও), মুম্বাই (মারিও রডরিগেজ) সম্বন্ধে লিখছেন সেখানকার অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা; পাঞ্জাব (এস এস শ্রীকুমার) ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল (বৈভব রঘুনন্দন) নিয়ে বিশেষজ্ঞরা – এই ব্যবস্থার জন্য সম্পাদকদের আলাদা প্রশংসা প্রাপ্য। ভারতীয় ফুটবল দলের সাফল্য-ব্যর্থতার ইতিহাস নথিবদ্ধ করতে হলে যে এইসব এলাকার ফুটবল নিয়ে স্বতন্ত্র আলোচনা দরকার, এই ভাবনাও প্রশংসার যোগ্য।

এত বড় দেশের খেলা নিয়ে আলোচনা বিকেন্দ্রীভূত হলে তবেই যে গভীর হয় তার বড় প্রমাণ পুলকেশবাবুর প্রবন্ধ ‘Royal or Not, Bengal’। পিকে ব্যানার্জি, অমল দত্ত বা বাঘা সোমের কোচিংয়ের খ্যাতি তো দেশজোড়া। কিন্তু কজন জানেন হুগলী-ব্যান্ডেল এলাকার অশ্বিনী বরাটের কথা? পুলকেশবাবু লিখেছেন, সুরজিৎ সেনগুপ্তের বাঁ পা প্রথম দিকে তেমন সচল ছিল না। অশ্বিনী (নিজের অঞ্চলে ভোলাদা নামে খ্যাত) বেশ কিছুদিন প্র্যাকটিসের প্রথম আধ ঘন্টা সুরজিৎকে ডান পায়ে বল ছুঁতে বারণ করে দিয়েছিলেন। তার ফলে ১৯৭৩ সালের রোভার্স কাপের প্রথম প্র্যাকটিস সেশনের পরেই সুরজিতের ক্লাব কোচ পিকে স্ত্রীকে চিঠিতে লেখেন তাঁর নতুন ছাত্রটির মধ্যে এক বিরল গুণ দেখা যাচ্ছে। তার দুটো পা-ই সমান সচল।

এমন মণিমুক্তো ছড়িয়ে আছে রাজ্যভিত্তিক প্রবন্ধগুলোর সবকটাতেই। তবে ভারতীয় দলের সর্বকালের সেরা কোচ সৈয়দ আব্দুল রহিমের শহর এবং মহম্মদ হাবিব, আকবর, সাবির আলির মত ফুটবলারের জায়গা হায়দরাবাদ নিয়ে প্রবন্ধটি অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন থেকে অন্ধ্রপ্রদেশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এই শতকের গোড়ায় দশ বছর সাসপেন্ড থাকার অনুল্লেখে। ভারতীয় ফুটবলে হায়দরাবাদের যে স্থান ছিল সেখান থেকে আজ স্রেফ এক আইএসএল ফ্র্যাঞ্চাইজে পরিণত হওয়ার ঘটনাক্রমে দেশের ফুটবল মানচিত্রে ওই দীর্ঘ অনুপস্থিতি অবশ্যই বড় কারণ।

ভারতীয় ফুটবল দল কীভাবে অলিম্পিক আবির্ভাবেই ইউরোপকে চমকে দিয়েছিল, এক অজ্ঞাতনামা ব্রিটিশ সাংবাদিকের কলমে সেই বয়ান দিয়ে আরম্ভ হয়েছে বক্স টু বক্স, আর বইয়ের দ্বিতীয় অংশ শুরু হয়েছে জয়দীপবাবুর লেখা ‘Doomsday: Cash vs Country’ দিয়ে। জাতীয় দলের পাতাল প্রবেশের সেই শুরু। এ লেখার শুরুতেই দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে যেমন তেমনভাবে ফুটবলারদের জাতীয় দলের খেলিয়ে নেওয়ার যে প্রচেষ্টার কথা লিখেছি, তার সূচনাবিন্দু রয়েছে জয়দীপবাবুর ওই প্রবন্ধে।

১৯৮২ এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতি হিসাবে ১৯৮১ থেকেই লম্বা শিবির এবং মারডেকা কাপে অংশগ্রহণ ছাড়াও জাতীয় দলের জন্য একাধিক টুরের বন্দোবস্ত করেছিল সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ)। কিন্তু ফুটবলারদের জন্য যথাযোগ্য পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করা হয়নি। ১৯৮১ সালের গোড়ায় সল্টলেক স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের শিবির বসে। খেলোয়াড়দের রাখা হয়েছিল নির্মীয়মান স্টেডিয়ামে মশামাছিতে ভর্তি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। তার উপর তাঁদের ১৯৮১-৮২ মরসুমে ক্লাবের হয়ে খেলার অনুমতিও দেওয়া হচ্ছিল না। বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন খেলোয়াড়রাও নাছোড়বান্দা। ফুটবল ফেডারেশন তখন তাঁদের লিখিত বিবৃতি দিতে বলে, যে তাঁরা ক্যাম্প ছেড়ে ক্লাবের হয়ে খেলতে যেতে চান এবং জাতীয় দলের টুর্নামেন্টের আগে আবার ফেরত আসবেন। জয়দীপবাবু লিখেছেন, ওই মর্মে দেওয়া বিবৃতিতে সই করে বেরিয়ে যাওয়া খেলোয়াড়দের ‘রেবেলস’, ‘ডেজার্টার্স’, ‘অ্যান্টি-ন্যাশনালস’ আখ্যা দেয় সংবাদমাধ্যমগুলো। ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার এবং জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার ওই ফুটবলারদের কড়া নিন্দা করে। জ্যোতিবাবু স্বয়ং বিধানসভায় মুলতুবি প্রস্তাবের জবাবে এঁদের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন। এসবের জেরে ভাস্কর গাঙ্গুলি, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, সুব্রত ভট্টাচার্য, প্রসূন ব্যানার্জি, প্রশান্ত ব্যানার্জির মত ফুটবলাররা প্রায় একমাস বাড়ি থেকে বেরোতে পারেননি বলে উল্লেখ করেছেন জয়দীপবাবু। কলকাতার তিন প্রধান, যারা ওই খেলোয়াড়দের উস্কেছিল, তারাও পাশে দাঁড়ায়নি। শেষমেশ খেলোয়াড়দের বাবা-মায়েরা ফেডারেশন সেক্রেটারি অশোক ঘোষের কাছে ক্ষমা চান, কিন্তু ফেডারেশন অনমনীয় মনোভাব বজায় রাখে। নিয়ম করা হয়, জাতীয় শিবিরে সুযোগ পেলে মেডিকাল কারণ না থাকলে বা বাদ না পড়লে শিবির ছেড়ে যাওয়া চলবে না।

তখনো ভারতীয় ফুটবলে পেশাদারি কাঠামো তৈরি হয়নি। কিন্তু খেলোয়াড়রা অনেকেই যে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসেন এবং ক্লাবগুলোর কাছ থেকে যথেষ্ট ভাল পারিশ্রমিক পান তা গোপন ছিল না। ফেডারেশন সেই ব্যবস্থাকে আইনি কাঠামোয় নিয়ে এসে কোনো বিকল্পের কথা ভাবতে পারত। তা না করে গা জোয়ারি ব্যবস্থা করা হয়। শেষপর্যন্ত অধুনালুপ্ত ন্যাশনাল স্পোর্টস কাউন্সিলের কর্তা প্রয়াত ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশর মধ্যস্থতায় দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া ফুটবলাররা সে মরসুমে ক্লাবের হয়ে খেলার অনুমতি পান এবং মরসুমের পর থেকে এশিয়ান গেমসের শিবিরে থাকবেন বলে ঠিক হয়। জাতীয় শিবিরে থাকলে মাসে ২,০০০ টাকা করে পারিশ্রমিক দেওয়া হবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়। জয়দীপবাবু যথার্থই লিখেছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠা হলেও সম্মানহানি আটকানো গেল না। জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার সম্মান, ফুটবলারদের সম্মান।

অবশ্য জাতীয় দলের খেলার গুরুত্ব লঘু করে দেওয়ার সর্বনাশা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল আগেই। তা নিয়ে বিশেষ কাউকে লেখালিখি করতে দেখা যায় না। জয়দীপবাবু এই একই প্রবন্ধে সবিস্তারে সে সম্পর্কে লিখেছেন। বস্তুত প্রবন্ধটি শুরুই হয় ১ জুন, ১৯৭৩ তারিখের ঘটনা দিয়ে। সেদিন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় সশরীরে দিল্লি গিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী (খেলাধুলো তখন ওই মন্ত্রকের অধীনে) নুরুল হাসানকে জানিয়ে আসেন, কলকাতার তিন প্রধানের পক্ষে মারডেকা কাপের জন্য জাতীয় শিবিরে খেলোয়াড় পাঠানো সম্ভব নয়। কারণ তখন কলকাতা ফুটবল লিগ পুরোদমে চলবে। সে বছর মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহমেডান স্পোর্টিংয়ের খেলোয়াড়দের ছাড়াই ভারত মারডেকা কাপে যায় এবং ষষ্ঠ স্থানে শেষ করে। জয়দীপবাবুর মতে, নকশাল আন্দোলন পরবর্তী বাংলার যুবসমাজকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সিদ্ধার্থশঙ্কর কলকাতার ফুটবলকে ব্যবহার করেন। আদতে ক্ষতি হয় ভারতীয় ফুটবলের। ক্লাবের স্বার্থে জাতীয় দলের স্বার্থকে বিসর্জন দেওয়া চলে – এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা পায় একজন মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরে। এসব পড়তে পড়তে তির্যক হাসি না হেসে পারা যায় না। কারণ যে কলকাতা লিগের খেলার জন্য জাতীয় দলের খেলাকে তুচ্ছ করা হয়েছিল, সেই কলকাতা লিগ আজ ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে। মোহনবাগান সগর্বে বলে দিতে পারছে তারা লিগে খেলবে না। সেকালের কর্মকর্তারা মনে করতেন কলকাতা লিগ খেতাবের চেয়ে বড় পুরস্কার ফুটবল বিশ্বে নেই, আজকের কর্তারা মনে করেন আইএসএল খেললেই মোক্ষলাভ, কলকাতা লিগ ফালতু। মাঝখান থেকে ভারতীয় ফুটবল গোলকধাঁধায় ঘুরে মরছে, এগোতে পারছে না।

ঠিক সে কথাই লিখেছেন ধীমান সরকার। তাঁর প্রবন্ধের নাম ‘Going Around In Circles’। তিনি শুরুতেই অপ্রিয় সত্যটা বলে দিয়েছেন। ১৯৯৮ থেকে ২০২২ – এই আড়াই দশকে শুটিং, বক্সিং, ভারোত্তোলন, ব্যাডমিন্টন, কুস্তির মত যেসব খেলায় ভারত অলিম্পিকে যেত স্রেফ অংশগ্রহণ করতে; সেসবে পদক জিতে ফেলেছে, বিশ্বনাথন আনন্দ প্রথম ভারতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার হিসাবে শুরু করে পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে গেছেন। অথচ ভারতীয় ফুটবল দল লুই ক্যারলের থ্রু দ্য লুকিং গ্লাস গল্পের অ্যালিসের মত প্রাণপণ দৌড়েও সেই দক্ষিণ এশিয়ার এক শক্তিশালী দলই হয়ে রয়েছে। আই লিগকে দুয়োরানিতে পরিণত করা আইএসএল যে ভারতীয় ফুটবলে কোনো যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারেনি, বরং ভারতের ক্লাব ব্যবস্থার আরও ক্ষতিই করেছে তা ধীমানবাবুর লেখায় স্পষ্ট। এমতাবস্থায় জাতীয় দলের উন্নতির আশাও যে দুরাশা তা উচ্চারণ করতে তিনি কসুর করেননি।

আরও পড়ুন বড়লোকের খেলা

বক্স টু বক্স এভাবে ইতিহাস আলোচনার মধ্যে দিয়ে বর্তমান বিশ্লেষণ ছাড়া আরও একটা জরুরি কাজ করেছে, তা হল ভারতীয় দলের হয়ে অবিস্মরণীয় খেলা দেখানো যে কিংবদন্তীরা আজকের প্রজন্মের অচেনা, তাঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। ডাঃ টি আওকে নিয়ে লিখেছেন শারদা উগ্রা, তুলসীদাস বলরামকে নিয়ে সিদ্ধার্থ সাক্সেনা, রহিম সাহেবকে নিয়ে জয়দীপবাবু। অত্যন্ত মূল্যবান অরুণ সেনগুপ্তের নেওয়া সুধীর কর্মকারের সাক্ষাৎকারও। নিজের খেলা, নিজের প্রজন্মের খেলা এবং বর্তমান প্রজন্মের খেলার মান সম্পর্কে এত নির্মোহ মূল্যায়ন করতে আজকাল কোনো খেলার প্রাক্তনদেরই দেখা যায় না।

দু মলাটের মধ্যে শ আড়াই পাতায় ভারতীয় ফুটবল দলের ইতিহাসের নানা দিক জানতে চাইলে, বর্তমানকে ভাল করে বুঝতে চাইলে বক্স টু বক্স চমৎকার। ভুয়ো খবরের যুগে ভারতীয় ফুটবল দলের ১৯৫০ বিশ্বকাপে না খেলা নিয়ে নিয়মিত ব্যবধানে যে গুজবটা ছড়ানো হয়ে থাকে সোশাল মিডিয়ায়, তা খণ্ডন করতেও সাহায্য করবে কাশীনাথ ভট্টাচার্য এবং জয়দীপবাবুর লেখা দুটো প্রবন্ধ। তবে কিছু অসঙ্গতি এড়ানো গেলে ভাল হত। যেমন সায়নবাবুর ‘Golden Quarter’ বলছে ১৯৪৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকের পর ইউরোপ টুরে একটা ম্যাচে আজাক্স আমস্টারডামকে ভারতীয় দল হারিয়েছিল ৫-১ ব্যবধানে। কিন্তু শারদা উগ্রার লেখায় ব্যবধানটা হয়ে গেছে ২-১। প্রথম তথ্যটাই সঠিক, কিন্তু এই অসঙ্গতি পাঠককে দিগভ্রান্ত করবে। যে বইতে যত্ন করে ভারতীয় দলের ৭৫ বছরের গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান পর্যন্ত সৃজন করা হয়েছে, ছাপা হয়েছে একগুচ্ছ মূল্যবান ছবি, সে বইতে এ ধরনের ভুল কাম্য নয়।

বক্স টু বক্স
সম্পাদনা: জয়দীপ বসু
প্রকাশক: আইএমএইচ
দাম: ৬৫০ টাকা

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: