ভারতীয় ক্রিকেট: জাহান্নামের আগুনে পুষ্পের হাসি

কেবল টি টোয়েন্টি নয়। রোহিত, শিখর ধাওয়ান, কোহলিরা একদিনের ক্রিকেটে যে ব্যাটিংটা করেন সেটাও প্রায় প্রাক-জয়সূর্য-কালু যুগের ব্যাটিং।

হে (ক্রিকেট) অতীত, তুমি হৃদয়ে আমার…

রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলিরা সোশাল মিডিয়া প্রজন্মের ক্রিকেটার। তাঁরা খুব ইতিহাসের তোয়াক্কা করবেন এমন ভাবা অন্যায়। কিন্তু ভারতীয় দলের কোচ রাহুল দ্রাবিড়ের খেলোয়াড় জীবন থেকেই একটা ব্যাপারে দারুণ সুনাম। তিনি নাকি নিজের প্রজন্মের ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে পড়ুয়া। যে কোনো সফরে তিনি কিছু না কিছু পড়েন। সেসব বইয়ের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে ক্রিকেটের ইতিহাস। বিভিন্ন ক্রিকেট সাংবাদিক একাধিকবার এসব কথা লিখেছেন, তাই বিশ্বাস না করার কোনো কারণ নেই। উপরন্তু দ্রাবিড় যে সুবক্তা তা আমরা সকলেই জানি। শুধু ইংরেজিটা চমৎকার বলেন তা নয়, বক্তব্যও থাকে জোরালো। দ্রাবিড়ের ২০১১ সালের ‘স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান ওরেশন’ এত উৎকৃষ্ট ছিল যে তা নিয়ে বিস্তর লেখালিখি হয়েছিল। যে লোক বই পড়ে না তার পক্ষে অত সুন্দর কথা বলা সম্ভব নয়।

এহেন পড়ুয়া এবং ক্রিকেট ইতিহাস সচেতন দ্রাবিড় কি জানেন না যে অস্ট্রেলিয়া যেমন গ্লেন ম্যাকগ্রা, ডেনিস লিলি, জেফ থমসন, ব্রেট লি-র দেশ তেমনই রিচি বেনো আর শেন ওয়ার্নেরও দেশ? বল ঘোরাতে জানেন এমন লেগস্পিনাররা বরাবরই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সফল হন, কারণ সে দেশের পিচের অতিরিক্ত বাউন্স তাঁদের ঘূর্ণিকে আরও বিষাক্ত করে তোলে। এই মুহূর্তে পায়ে গুলি খেয়ে হুইলচেয়ারে বন্দি ইমরান খান জানেন, ১৯৯২ সালে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ জয়ে কত বড় ভূমিকা ছিল লেগস্পিনার মুস্তাক আহমেদের। নটা ম্যাচে ১৬ খানা উইকেট নিয়েছিলেন ১৯.৪৩ গড়ে, ওভার পিছু রান দিয়েছিলেন চারেরও কম। সেরা বোলিং করেছিলেন একেবারে ফাইনালে। মেলবোর্নের বিশাল মাঠে ইংল্যান্ড অধিনায়ক গ্রাহাম গুচ আর অলরাউন্ডার ডারমট রিভ মুস্তাককে মারতে গিয়ে আউটফিল্ডে ক্যাচ তুলে আউট হন। গ্রেম হিক ঠকে যান মুস্তাকের গুগলিতে।

লেগস্পিনারদের কথা বলে আলোচনা শুরু করলাম কেন? ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি ফাইনালে ১৯৯২ সালের মতই আবার পাকিস্তান আর ইংল্যান্ড মুখোমুখি বলে? না। ভাগবত চন্দ্রশেখর আর অনিল কুম্বলের দেশ ভারত একজন পরীক্ষিত ও সফল লেগস্পিনারকে ডাগআউটেই বসিয়ে রেখে প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিল বলে। যজুবেন্দ্র চহলের অস্ট্রেলিয়া সফর বেঞ্চে বসে শেষ হয়ে যাওয়াই ভারতের এবারের অভিযানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কারণ ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট যে আগাগোড়া ভুল পরিকল্পনা নিয়ে বিশ্ব খেতাব জিততে গিয়েছিল, তার এর চেয়ে বড় প্রমাণ নেই। মাঠে নেমে যেসব ভুলভ্রান্তি হয়েছে সেসবের আলোচনা তো হবেই। কিন্তু পরিকল্পনাতেই ভুল থাকলে মাঠে নেমে আর ঠিক কাজটা করা হবে কী করে?

ভারতের মত দেশে ক্রিকেট বোঝে না এরকম লোকের সংখ্যা খুবই কম। ফলে অগণিত ক্রিকেটবোদ্ধাদের মধ্যে কেউ বলে বসতেই পারেন, ১৯৯২ সালের বস্তাপচা ৫০ ওভারের ক্রিকেটের ধারণা দিয়ে আজকের টি টোয়েন্টি ক্রিকেটকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া বোকামি। আচ্ছা, ইতিহাস চুলোয় যাক। এবারে ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে লেগস্পিনাররা কী করেছেন সেটাই না হয় দেখা যাক।

সুপার ১২ স্তর থেকে ফাইনালের আগে পর্যন্ত মোট নজন লেগস্পিনার খেলেছেন (ইংল্যান্ডের দুজন; আফগানিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবোয়ের একজন করে)। এঁরা মোট ১৩১ ওভার বল করে তুলে নিয়েছেন ৪১টা উইকেট। উইকেট পিছু খরচ করতে হয়েছে মাত্র ২২.২৯ রান, ওভার পিছু রান দিয়েছেন সাতেরও কম। একজনও লেগস্পিনারকে খেলায়নি ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস আর বাংলাদেশ – ঠিক যে চারটে দেশ সেমিফাইনালে পৌঁছতে পারেনি।

যা শত্রু পরে পরে

এই আলোচনা শুরুতেই সেরে নেওয়ার আরেকটা কারণ হল, ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা সেমিফাইনালে গোহারা হারার পর সটান দোষ চাপিয়ে দিয়েছেন বোলারদের ঘাড়ে। স্বয়ং অধিনায়ক সমেত ব্যাটাররা কী করেছেন সে প্রশ্নে যাওয়ার আগে তাই বলে নেওয়া দরকার যে ঠিকঠাক বোলারদের খেলানোই হয়নি। অস্ট্রেলিয়ায় খেলা হলেই সমস্ত আলোচনা জোরে বোলারদের নিয়ে হয়ে থাকে। কারণ সবাই জানে সে দেশের পিচ অন্য দেশের তুলনায় গতিময় হয়, বাউন্স বেশি থাকে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে অস্ট্রেলিয়ায় জিততে হলে দলে ভাল স্পিনার থাকা একইরকম জরুরি, বিশেষ করে সীমিত ওভারের খেলায়। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রিকেটমাঠগুলো অস্ট্রেলিয়াতেই। যাঁরা নিয়মিত টি টোয়েন্টি ক্রিকেট দেখে অভ্যস্ত তাঁরা জানেন, এই ফরম্যাটে সর্বত্রই বাউন্ডারি ছোট করে ফেলা হয়। ফলে দৌড়ে তিন রান নেওয়ার ঘটনা প্রায় দেখাই যায় না ভারত বা সংযুক্ত আরব আমীরশাহীর মাঠে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাঠগুলো এতটাই বড় যে বাউন্ডারি কমিয়ে আনার পরেও এবারের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে প্রচুর তিন রান হতে দেখা গেছে। ভারতের সঙ্গে সেমিফাইনালে মহম্মদ শামির অবিমৃশ্যকারিতায় জস বাটলার একবার দৌড়ে চার রান পর্যন্ত নিয়ে ফেলেছেন। তা এত বড় বড় মাঠে স্পিনারকে চার, ছয় মারতে গেলে আউট হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই টি টোয়েন্টি যুগের আগেও যে দলে ভাল স্পিনার আছে তারা অস্ট্রেলিয়ায় ভাল ফল করেছে।

১৯৯২ সালে কেবল পাকিস্তানের মুস্তাক নয়, নিউজিল্যান্ডের অফস্পিনার দীপক প্যাটেলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন এই কারণে। স্পিনার যে বোলিং ওপেন করতে পারে তার আগে কেউ কখনো ভাবেনি। প্রয়াত মার্টিন ক্রোয়ের ওই চাল প্রতিপক্ষকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়েছিল। প্যাটেল বেশি উইকেট নিতে পারেননি, কিন্তু ওভার পিছু রান দিয়েছিলেন ৩.১০। আরও আগে ১৯৮৫ সালে ভারত যখন অস্ট্রেলিয়ায় বেনসন অ্যান্ড হেজেস কাপ জেতে, সেই জয়েরও অন্যতম স্থপতি ছিলেন লেগস্পিনার লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ।

অথচ এবার চহলের বদলে খেলে গেলেন অক্ষর প্যাটেল। যিনি উচ্চতার কারণে পিচ থেকে বাউন্স আদায় করতে পারেন বটে, কিন্তু বল ঘোরাতে হলে তাঁর দরকার স্লো টার্নার। অস্ট্রেলিয়ায় অমন পিচ পাওয়া যায় না, বরং সমান বাউন্সের পিচ হওয়ায় অক্ষরের মত বোলারকে মনের সুখে প্রহারেণ ধনঞ্জয় করা যায়। হয়েছেও তাই। অক্ষর প্রায় ৪০ গড়ে পাঁচ ম্যাচে মোটে তিনটে উইকেট নিয়েছেন, ওভার পিছু সাড়ে আটের বেশি রান দিয়েছেন। কিন্তু বোলিং আক্রমণের একমাত্র সমস্যা তিনি নন। দীর্ঘদিন সাদা বলের ক্রিকেটে টিম ম্যানেজমেন্টের অপছন্দের বোলার হয়ে থাকার পর রোহিত-দ্রাবিড়ের আমলে অশ্বিন হঠাৎই প্রিয় হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তিনি প্রায় কোনো ম্যাচেই কোনো প্রভাব ফেলতে পারেননি। অথচ পিচে স্পিনারদের জন্য যথেষ্ট সাহায্য ছিল। সেমিফাইনালের অ্যাডিলেডে তো ছিলই। চহলের চেয়ে অক্ষরের ব্যাটিং ক্ষমতা বেশি, তাই তাঁকে খেলানোই সমীচীন – এমন একটা যুক্তি টিম ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অথচ দেখা গেল প্রায়ই তাঁর আগে ব্যাট করতে নামছেন অশ্বিন। তাহলে আর চহল খেললে কী ক্ষতি ছিল?

পেস বোলিং বিভাগে আবার গোড়ায় গলদ। তড়িঘড়ি আহত যশপ্রীত বুমরাকে ফেরানোর চেষ্টা হয়েছিল, সে চেষ্টা সফল হয়নি। শামি অতীতে টি টোয়েন্টিতে ভাল করেননি, তা সত্ত্বেও তাঁকেই বুমরার জায়গায় নেওয়া হল। সুপার ১২-তে তবু ঠিকঠাক চলছিল, সেমিফাইনালে যখন তাঁরই বোলিং আক্রমণকে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা, তখনই শামি ব্যর্থ হলেন। তরুণ অর্শদীপ (১০ উইকেট, ওভার পিছু ৭.৮০ রান) আর অভিজ্ঞ ভুবনেশ্বর কুমার (মাত্র চার উইকেট, কিন্তু ওভার পিছু ৬.১৬) গোটা প্রতিযোগিতায় নেহাত খারাপ বল করেননি। কিন্তু সমস্যা হল তাঁরা একইরকম গতির সুইং বোলার। যেদিন বল তত সুইং করে না, সেদিন দু প্রান্ত থেকে দুজনকে খেলতে হলে ব্যাটারদের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। শামির গতি এঁদের চেয়ে বেশি, কিন্তু সুইং না হলেও ব্যাটারকে ঘামিয়ে তোলার মত নয়; যা পাকিস্তানের হ্যারিস রউফ, ইংল্যান্ডের মার্ক উড বা দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যানরিখ নর্খ্যে পারেন। ফলে ভারতের বোলিং হয়ে গেল বৈচিত্র্যহীন। ভারতের দ্রুততম বোলার হয়ে গেলেন অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডিয়া, যিনি আবার বিশেষ ফর্মে ছিলেন না। আসলে বিশেষ করে বুমরা অনুপস্থিত বলেই দরকার ছিল একজন এক্সপ্রেস গতির পেসার। কিন্তু ঘন্টায় ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করতে পারা উমরান মালিক বা মহসীন খানকে তো স্কোয়াডেই রাখা হয়নি।

শশী তারকায় তপনে

নির্বাচক এবং টিম ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনার অভাব বোলারদের ঘাড়ে চাপিয়ে রোহিত আসলে যাদের আড়াল করেছেন, এবার তাদের আলোচনায় আসা যাক। ক্রিকেটের যে ফরম্যাটে মাত্র ১২০টা বল খেলার জন্য হাতে দশখানা উইকেট থাকে, সেখানে বোলারদের ভূমিকা যে স্রেফ সহায়কের – একথা বোঝার জন্য ক্রিকেট বোদ্ধা হওয়ার দরকার পড়ে না। টি টোয়েন্টি জেতানোর দায়িত্ব সর্বদা মূলত ব্যাটারদের কাঁধে। যে দলের ব্যাটিং লাইন আপ বাংলাদেশ, জিম্বাবোয়ে, নেদারল্যান্ডসের মত দলের সঙ্গেও ২০০ রান করতে পারে না; পার্থের সবচেয়ে গতিময় পিচে ১৪০ পর্যন্তও পৌঁছতে পারে না – সেই দলের অধিনায়ক যখন স্রেফ সেমিফাইনাল ম্যাচটা দশ উইকেটে হারার জন্য বোলারদের দিকে আঙুল তোলেন তখন হেসে ফেলা ছাড়া উপায় থাকে না।

অধিনায়ক নিজে ছটা ম্যাচে মাত্র ১১৬ রান করেছেন, গড় ১৯.৩৩। তাঁর নির্ভরযোগ্য ওপেনিং পার্টনার কে এল রাহুলের গড় ২১.৩৩। দুটো অর্ধশতরান করেছেন জিম্বাবোয়ে আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। তাসকিন আহমেদকে খেলতে গিয়েই তাঁর গলদঘর্ম অবস্থা। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, রোহিত আর রাহুলের স্ট্রাইক রেট যথাক্রমে ১০৬.৪২ আর ১২০.৭৫। এই দুই বীরপুঙ্গবের কল্যাণে ওপেনিং জুটির ওভার পিছু রান করার দিক থেকে ভারত সুপার ১২-তে খেলা দলগুলোর মধ্যে সবার নিচে, সবার পিছে (৪.৯৮, অর্থাৎ ১০৬ বল খেলে ৮৮ রান)।

যোগ্যতার্জন পর্ব পেরিয়ে সুপার ১২-তে উঠতে পারেনি যারা, তাদের মধ্যেও একমাত্র নামিবিয়া এক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে (৪.৪৪)।

এবার সবচেয়ে অপ্রিয় প্রসঙ্গে আসা যাক – বিরাট কোহলি। তিনি প্রতিযোগিতা শেষ করেছেন ব্র্যাডম্যানোচিত ৯৮.৬৬ গড়ে, স্ট্রাইক রেট ১৩৬.৪০। অতএব কোহলির ভক্তরা এবং তিনি যে শুধু ভারতের নয় পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ব্যাটার তা প্রমাণ করতে ব্যস্ত বিশেষজ্ঞরা, বলে চলেছেন – আর কী করবে লোকটা? ঘটনা হল সূর্যকুমার যাদব গোটা প্রতিযোগিতায় অবিশ্বাস্য স্ট্রাইক রেটে (১৮৯.৬৮) ব্যাট না করলে এবং সেমিফাইনালে হার্দিক একই কাজ (১৯০.৯০) না করলে কোহলির ওই অর্ধশতরানগুলো সত্ত্বেও ভারত সম্ভবত আরও আগেই প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিত। কারণ মোট রান জেতার মত হত না। একমাত্র ব্যতিক্রম পাকিস্তান ম্যাচ। সত্যিই ওই হারা ম্যাচটা কোহলি একা হাতে জিতিয়েছেন। একথাও সত্যি যে শেষ দু ওভারে কোনোদিন ভুলতে না পারার মত দুটো ছক্কা মারার প্রতিভা এই মুহূর্তে বিশ্বের আর কোনো ব্যাটারের নেই। কিন্তু প্রথম ওভারে ব্যাট করতে নেমে ১৬০ রান তুলতে তাঁকে শেষ ওভার অবধি খেলতে হয়েছে এবং শেষ ওভারেও ম্যাচের লাগাম নিজের হাতে রাখতে পারেননি। শেষ বল খেলে উইনিং স্ট্রোক নিতে হয়েছে টেল এন্ডার অশ্বিনকে। সেদিন যা ঘটেছিল তা এককথায় কামাল। কিন্তু কামাল একবারই ঘটে। কামাল ভুল প্রণালীকে সঠিক বলে প্রমাণ করে না। শেষ দু ওভারে গোটা তিরিশেক রান বারবার তোলা যায় না। সুতরাং ‘আগে ধরে খেলব, পরে মেরে পুষিয়ে দেব’ নীতি অচল। ইংল্যান্ড ম্যাচই তা প্রমাণ করে দিয়েছে। পঞ্চাশ করতে ৪০ বল খরচ করে ফেলার পর কোহলি ১৮তম ওভারে আউট হয়ে গেলেন, দলের রান তখন মাত্র ১৩৬।

কোহলির এই নীতির সপক্ষে যুক্তি হল – ওপেনাররা ডুবিয়েছে, তিনে নেমে খেলাটা ধরতে হবে না? নইলে তো ইনিংস আগেই শেষ হয়ে যেত। পাটীগণিত কিন্তু এই ধরাধরি সমর্থন করে না। হিসাবটা একেবারে সোজা। টি টোয়েন্টিতে একটা দলের জন্য বরাদ্দ ১২০টা বল, হাতে দশটা উইকেট। মানে উইকেট পিছু মাত্র ১২টা বল। একজন ব্যাটার ওর চেয়ে বেশি বল না খেললে কিচ্ছু এসে যায় না, বরং সেক্ষেত্রে পরের ব্যাটার বেশি সুযোগ পেয়ে যাবেন রান করতে। সুতরাং বারোটা বলে যত বেশি সম্ভব রান করার চেষ্টা করা উচিত, তার চেয়ে বেশি বল খেললে আরও বেশি রান করার চেষ্টা করা দরকার। তা না করে ১৩৬.৪০ স্ট্রাইক রেটে পুরো ইনিংস ব্যাট করা মানে পরের ব্যাটারদের কাজ কঠিন করে দেওয়া, হাতে থাকা উইকেটের অপচয়। মনে রাখা ভাল, এই প্রতিযোগিতায় পাওয়ার প্লে-তে ওভার পিছু রান করায় শেষ থেকে দ্বিতীয় হয়েছে ভারত (৫.৯৭; প্রথম স্থানে নেদারল্যান্ডস)।

পাওয়ার প্লে-তে অত কম রান করে টি টোয়েন্টি খেতাব জেতা যায় না। এতে কোহলির দায় কিন্তু কম নয়। কারণ তিনি প্রায়শই পাওয়ার প্লে চলাকালীনই ব্যাট করতে নেমেছেন। টি টোয়েন্টি একেবারেই স্ট্রাইক রেটের খেলা। কোহলির কেরিয়ার স্ট্রাইক রেট ১৩৭.৯৬। মোট রান আর গড়ে যত উপরেই থাকুন, এতে তিনি পৃথিবীর প্রথম ৭০ জনের মধ্যেও নেই। নিজে অধিনায়ক থাকার সময়ে কোহলি টেস্ট ম্যাচের ব্যাটিং নিয়ে বলতে গিয়েও ‘ইনটেন্ট’ শব্দটা বারবার ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ পিচ যেমনই হোক, পরিস্থিতি যা-ই হোক, প্রতিপক্ষের বোলিং সবল না দুর্বল সেসব দেখা চলবে না। সারাক্ষণ রান করার চেষ্টা করে যেতে হবে, মন্থর গতিতে রান করা মানেই নাকি নিজের দলের উপর চাপ তৈরি করা। কথাটা অবশ্য চালু করেছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। এই ইনটেন্টের অভাবেই তো অজিঙ্ক রাহানের সাদা বলের কেরিয়ার বলে কিছু হল না। চেতেশ্বর পূজারাকে বহুবার শতরান করেও শুনতে হয়েছে তাঁর ইনটেন্টের অভাব আছে। আশ্চর্যের কথা, ক্রিকেটের সবচেয়ে ছোট ফরম্যাটে কোহলির নিজের ইনটেন্টের দেখা পাওয়া যায় না। সুনীল গাভস্কর, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ, শচীন তেন্ডুলকর, মহম্মদ আজহারউদ্দিন, ভিভিএস লক্ষ্মণের দেশের কোহলি অ্যাডাম জাম্পা, লিয়াম লিভিংস্টোন, আদিল রশিদের মত স্পিনারকেও পিটিয়ে উঠতে পারেন না।

ঘটনা হল, এসব দোষ এবারের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে প্রথম জানা গেল এমন নয়। গত বছর সংযুক্ত আরব আমীরশাহীর ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে এইসব দোষেই ভারত সেমিফাইনালেও পৌঁছতে পারেনি। এ বছর এশিয়া কাপেও এইসব কারণেই আফগানিস্তান ছাড়া কারোর সঙ্গেই পরাক্রম দেখানো সম্ভব হয়নি। তা সত্ত্বেও কেন এই তারকাদের বাদ দেওয়া যায় না, কীভাবে ভারতীয় ক্রিকেটের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে আইপিএল – সেসব নিয়ে এই ওয়েবসাইটেই আগে লিখেছি, পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। বরং অন্য কয়েকটা প্রশ্ন নিয়ে নাড়াচাড়া করা যাক।

কচি তারা, কথা ফোটে নাই

২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পরে ভারত আর কোনো খেতাব জেতেনি। আজ দ্রাবিড়-রোহিতের ব্যর্থতায় শাস্ত্রী-কোহলির যে ভক্তরা উল্লসিত, তাঁরাও নিশ্চয়ই এ তথ্য ভুলে যাননি। সর্বগ্রাসী মিডিয়া হাইপ আর মনভোলানো বিজ্ঞাপনী চাকচিক্য এতদিন সব ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল, ইংল্যান্ড একেবারে দশ উইকেটে জিতল বলেই সম্ভবত আর সামলাতে পারা যাচ্ছে না। বহু চাটুকারেরও মুখ খুলে গেছে। তবু এই চূড়ান্ত পণ্যায়নের যুগে যেহেতু ক্রিকেট তারকাদের একেকজনের উপর কোটি কোটি টাকা লগ্নি হয়ে আছে, সেহেতু এঁদের ঢাল হয়ে এখনো কিছু সংবাদমাধ্যম, ক্রিকেট লেখক এবং অতশত না বোঝা নিষ্পাপ ভক্ত দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তাঁরা ভাঙবেন তবু মচকাবেন না। নরেন্দ্র মোদীর সরকারের একটা ব্যর্থতাও অস্বীকার করতে না পেরে যেমন এক শ্রেণির মানুষ বলেন “ইফ নট মোদী, দেন হু”, তেমনি এঁরাও বলতে শুরু করেছেন, এদের বাদ দিলে খেলবে কারা?

ঘটনা হল, এই মুহূর্তে ভারতীয় ক্রিকেটে এর চেয়ে অবান্তর প্রশ্ন নেই। মুম্বাইয়ের পৃথ্বী শ দেশের হয়ে এখন পর্যন্ত একটাই টি টোয়েন্টি খেলেছেন এবং কোনো রান করতে পারেননি। কিন্তু আইপিএল এবং ঘরোয়া টি টোয়েন্টিতে ৯২ ম্যাচে তিনি করে ফেলেছেন ২৪০১ রান; স্ট্রাইক রেট ১৫১.৬৭; সর্বোচ্চ ১৩৪। ওই ১৩৪ রান তিনি করেছেন মাত্র ৬১ বলে, গত মাসে আসামের বিরুদ্ধে সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে। ওই প্রতিযোগিতাটি হল ভারতের ঘরোয়া টি টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা। তাহলে আইপিএল কী? এ প্রশ্ন উত্থাপন করিয়া লজ্জা দিবেন না।

ভারতীয় দলের তারকারা ইদানীং যত খেলেন তার সমান বা হয়ত তার চেয়েও বেশি বিশ্রাম নেন। সেই সুবাদে ঝাড়খণ্ডের উইকেটকিপার ব্যাটার ঈশান কিষণকে তো অনেকেই চিনে গেছেন। ভারতের হয়ে যে কটা টি টোয়েন্টি আর একদিনের ম্যাচ তিনি এখন অব্দি খেলেছেন তাতে ধোনির মত অভাবনীয় কিছু না করলেও প্রমাণ হয়েছে তাঁর আরও সুযোগ প্রাপ্য। স্রেফ ওপেনিং ব্যাটার হিসাবেও তিনি খেলেছেন এবং খেলতে পারেন।

কিন্তু কাব্যে সবচেয়ে উপেক্ষিত কেরালার সঞ্জু স্যামসন। তিনি যে সিরিজে দলে সুযোগ পান সেখানে একটা-দুটো ম্যাচে খেলেন, সেখানে সফল বা ব্যর্থ যা-ই হোন, পরের সিরিজে বাদ পড়ে যান। আবার হয়ত তার পরের সিরিজে ফেরত আসেন। তারকাদের ট্র্যাফিক জ্যামে মাথা গলাতে পারেন না আর কি। এ পর্যন্ত ভারতের হয়ে ১৬টা টি টোয়েন্টিতে ১৩৫.১৫ স্ট্রাইক রেটে ২৯৬ রান করেছেন। উইকেটের পিছনে সাতটা ক্যাচ নিয়েছেন, দুটো স্টাম্পিং করেছেন। সঞ্জুর বয়স ইতিমধ্যেই ২৮, ঈশান ২৪, পৃথ্বী ২৩। এছাড়াও আছেন শ্রেয়স আয়ার, শুভমান গিলরা। আছেন আইপিএলে সাফল্য পাওয়া ঋতুরাজ গায়কোয়াড় (২৫), রাহুল ত্রিপাঠী (৩১), ফিনিশার হিসাবে একাধিকবার চমকে দেওয়া রাহুল টেওয়াটিয়া (২৯)। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের মত বহু দেশ টি টোয়েন্টিতে এমন অনেককে খেলায় যাঁরা অন্য কোনো ফরম্যাটে সুযোগ পান না। ভারতও চাইলে তেমন করতেই পারে। টি টোয়েন্টি অন্যরকম, তার চাহিদাও অন্যরকম।

মাঝখানে নদী ওই

উপরের নামগুলো গত কয়েক মাসে তারকাদের অনুপস্থিতিতে যেটুকু সুযোগ পাওয়া গেছে তার সদ্ব্যবহার করা ক্রিকেটারদের। কিন্তু ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি থেকে শুকনো মুখে ফেরা দলের মধ্যেই এমন দুজন আছেন যাঁরা উপর্যুপরি ব্যর্থ হওয়া তারকাদের জায়গা নিতে পারেন। একজন ঋষভ পন্থ। টেস্ট ক্রিকেটে মাত্র ৩১ ম্যাচের কেরিয়ারেই যেসব ইনিংস তিনি খেলে ফেলেছেন তাতে তাঁর প্রতিভাকে সন্দেহ করার আর উপায় নেই। কিন্তু তার সঙ্গে মানানসই সাফল্য সাদা বলের কেরিয়ারে এখনো দেখা যায়নি। তার অনেকখানি দায় শাস্ত্রী-কোহলি এবং দ্রাবিড়-রোহিতের। পাঁচ বছর হয়ে গেল, ব্যাটিং অর্ডারে ঋষভের জায়গা কোথায় তা এখনো স্থির হল না। অথচ সাদা চোখেই দেখা যায়, তাঁর মত আক্রমণাত্মক ব্যাটার যত বেশি বল খেলার সুযোগ পায় দলের পক্ষে তত ভাল। ইংল্যান্ডে একটা ম্যাচে ওপেনার হিসাবে খেলিয়েই সে পরীক্ষায় দাঁড়ি টেনে দিলেন দ্রাবিড়-রোহিত; আগের কোচ, অধিনায়ক তো সে চেষ্টাও করেননি। ভাবলে শিউরে উঠতে হয়, শচীন একদিনের ক্রিকেটে কত নম্বরে ব্যাট করবেন তা নিয়ে অজিত ওয়াড়েকর-আজহার ১৯৯৪ সালে অকল্যান্ডের সেই ইনিংসের পরেও এমন টালবাহানা করলে কী হত।

অন্যজন দীপক হুড়া। বরোদার এই ২৭ বছর বয়সী ব্যাটার ভারতের হয়ে ১৩টা টি টোয়েন্টিতে ১৫৩.৪০ স্ট্রাইক রেটে শ তিনেক রান করে ফেলেছেন। জুন মাসে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৫৭ বলে ১০৪ করেছেন। তবু তাঁর জায়গা পাকা নয়, কারণ ওই ট্র্যাফিক জ্যাম। ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে মাত্র একটা ম্যাচ খেলতে পেলেন পার্থে সবচেয়ে কঠিন উইকেটে।

বলে রাখা ভাল, কেবল টি টোয়েন্টি নয়। রোহিত, শিখর ধাওয়ান, কোহলিরা একদিনের ক্রিকেটে যে ব্যাটিংটা করেন সেটাও প্রায় প্রাক-জয়সূর্য-কালু যুগের ব্যাটিং। বিশেষত ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের পর থেকে ও ব্যাটিং সব দল বাতিল করে দিয়েছে। সে কারণেই ভারত ৫০ ওভারের ক্রিকেটেও ঝুড়ি ঝুড়ি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জিতেছে গত ন বছরে, কিন্তু বড় প্রতিযোগিতা এলেই ব্যর্থ। কারণ কোনো বড় দল, বিশেষ করে নক আউট স্তরের ম্যাচে, শেষের দিকের ওভারে এত লুজ বল ফেলে না বা ফিল্ডিংয়ে এত ভুলভ্রান্তি করে না যে পাওয়ার প্লে-তে কম রান করার ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া যাবে। বরং সে সময় আসার আগেই আউট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ২০১৯ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে যেমন নতুন বলেই রোহিত, রাহুল, কোহলি আউট হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে শুধু খেলোয়াড় পরিবর্তন নয়, পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তন না আনলে সামনের বছর ঘরের মাঠে ৫০ ওভারের বিশ্বকাপেও একইরকম বিপর্যয় ঘটবে।

আরও পড়ুন বিরাট, রোহিত, রাহুলদের সত্য রচনা চলছে চলবে

একই প্রণালী বারবার প্রয়োগ করে যদি ভারতীয় বোর্ড ভিন্ন ফলের আশা করে তাহলে বলতে হয় জেতা হারায় তাদের কিছু এসে যায় না। তেমনটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়, কারণ আইপিএল আর ভারতীয় ক্রিকেট দলের ম্যাচের সম্প্রচার সত্ত্ব থেকে এত বিপুল অর্থ আয় হয় যে দলের জয় পরাজয়ে কেবল ক্রিকেটপ্রেমীদেরই উত্তেজিত হওয়া সাজে। বোর্ডকর্তারা অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স দেখে নিয়ে সুখে নিদ্রা যেতে পারেন।

এতক্ষণে অরিন্দম…

কারা যেন ভারতের টি টোয়েন্টি ক্রিকেট দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিষম চিন্তিত হয়ে দ্রাবিড়কে প্রশ্ন করে ফেলেছিল, ভারতীয় ক্রিকেটারদের কি অন্য দেশের টি টোয়েন্টি লিগে খেলতে দেওয়া উচিত? ইংল্যান্ডের ক্রিকেটাররা তো অনেকেই অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ লিগে খেলেন। হয়ত তারই সুবিধা পেয়ে গেলেন। দ্রাবিড়, ভারতের সর্বকালের সেরা টেস্ট ক্রিকেটারদের একজন, মহা উদ্বিগ্ন হয়ে বলেছেন, সে তো ভারি মুশকিলের ব্যাপার হবে। অন্য দেশের লিগগুলোর সময়ে আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট চলে যে! ভারতীয়রা ওখানে খেলতে গেলে আমাদের রঞ্জি ট্রফিটা উঠে যাবে যে! শুনে মাইকেল মধুসূদন মনে পড়ে: “এতক্ষণে” –অরিন্দম কহিলা বিষাদে / “জানিনা কেমনে আসি লক্ষণ পশিল/রক্ষঃপুরে!…”

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আর্থিক পেশির জোরে যখন আইপিএলের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের ফিউচার টুরস প্রোগ্রামে জায়গা খালি করিয়েছে তখন আর পাঁচজন অনুগত প্রাক্তন ক্রিকেটারের মতই দ্রাবিড় চুপচাপ ছিলেন। ইতিমধ্যে বোর্ড আইপিএলে আরও দুটো দল যোগ করেছে, সম্প্রচার সত্ত্বের দাম যত বাড়ানো হচ্ছে তত টাকা পাওয়া যাচ্ছে দেখে আগামী কয়েক বছরে ম্যাচের সংখ্যাও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এখন সারা পৃথিবীতে একের পর এক ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ গজাচ্ছে। সেসব দেশের ক্রিকেট বোর্ড নিজেদের খেলোয়াড়দের এতকাল আইপিএলের জন্য ছেড়ে এসেছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বন্ধ রেখে আইপিএল চলবে – এ ব্যবস্থাও মেনে নিয়েছে। এখন যদি বিস্মিত দ্রাবিড় বলেন – হায়, তাত, উচিত কি তব/একাজ – তাতে তো চিড়ে ভিজবে না। উচিত-অনুচিতের সীমা তো ক্রিকেট কবেই পেরিয়ে এসেছে।

ইনস্ক্রিপ্ট-এ প্রকাশিত

টুইটার, বাইজু’স আঁধারে ছাঁটাই সম্পর্কে কয়েকটি কথা

ভারতের সাদা কলারের কর্মীদের কাছে গত তিরিশ বছরে ইউনিয়ন এমন একটি শব্দে পরিণত হয়েছে যা শুনলে কানে গঙ্গাজল দিতে হয়, অবেলায় স্নান করতে হয়।

দিকে দিকে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে, টুইটারে ছাঁটাই পর্ব উঠেছে চরমে। এতদিনে সবাই জেনে গেছেন, প্রায় হাজার চারেক লোককে ইতিমধ্যেই ছাঁটাই করেছেন ইলন মাস্ক। চুয়াল্লিশ বিলিয়ন ডলারে টুইটার কিনে নেওয়ার পর কর্মীদের ইমেল করে তিনি জানিয়েছেন টুইটারের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে গেলে নাকি ছাঁটাই করা ছাড়া উপায় নেই। কারণ, শুক্রবার তাঁর করা একটি টুইট থেকে জানা যাচ্ছে, টুইটার প্রতিদিন চার মিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সান্ত্বনা দেওয়ার ঢঙে সেই টুইটে যোগ করেছেন, যাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে তাদের তিন মাসের বিদায়ী ভাতা (severance) দেওয়া হচ্ছে। আইনত যা দেওয়ার কথা, সে ভাতা নাকি তার ৫০% বেশি। যে কোম্পানি দৈনিক চার মিলিয়ন ডলার ক্ষতিতে চলে সে কোম্পানি কেনার জন্য ইলন এত লাফালাফি কেন করেছিলেন সে প্রশ্ন থাক। তিনি যে টুইট মডারেশনে যুক্ত আস্ত বিভাগগুলোকেই কর্মী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে তুলে দিচ্ছেন, তার ভুয়ো খবর, হিংসাত্মক বাচনের উপর কী প্রভাব পড়বে এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কী হবে – সে আলোচনাও অন্য দিনের জন্য তোলা থাক। বরং আরেকটি ছাঁটাইয়ের ঘটনার দিকে নজর দেওয়া যাক।

শাহরুখ খানের ওকালতি এবং বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মাদের জামায় জ্বলজ্বলে লোগোর কারণে বাইজু’স নামটি এখন কারোর জানতে বাকি নেই। অনলাইনে লেখাপড়া করিয়ে ছেলেমেয়েদের সব পরীক্ষায় দারুণ নম্বর পাইয়ে দেবে – এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাইজু রবীন্দ্রনের এই এডটেক স্টার্টআপ চালু হয়েছে মাত্র কয়েক বছর হল। এরই মধ্যে এত উন্নতি করেছে যে ভারতীয় ক্রিকেট দলের শার্ট স্পনসর হয়েছে, চলতি ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির অ্যাসোশিয়েট স্পনসর হয়েছে। উপরন্তু, দিন দুয়েক হল নিজেদের এক ‘নন-প্রফিট’ উদ্যোগের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করেছে লায়োনেল মেসিকে। খেয়াল করুন, সুনীল ছেত্রীকে নয়, ক্রিকেট তারকাদের কাউকেও নয়, একেবারে মেসি। মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার যাকে বলে। অথচ এই বাইজু’সই সেপ্টেম্বর মাসে ঘোষণা করেছিল তারা আড়াই হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে। কারণ গত চার বছরে কোম্পানির যে বিপুল বৃদ্ধি হয়েছে তার ফলে কোম্পানির বৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে এছাড়া উপায় নেই। এই যুক্তি গত সোমবার (৩১ অক্টোবর) এক লিঙ্কডইন পোস্টে বাইজু’স দিয়েছিল। এই টেকসই করে তোলার অঙ্গ হিসাবেই তিরুবনন্তপুরমের টেকনোপার্কে বাইজু’সের অফিস তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এতে ১৪০ জন কর্মীর চাকরি যেত। কিন্তু কোম্পানির সংগঠিত কর্মীরা এবং কেরালা সরকার সে গুড়ে বালি দিয়ে দিয়েছেন। বুধবার (২ নভেম্বর) মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এবং রাজ্যের লেবার কমিশনার ডক্টর বাসুকির সাথে বাইজু রবীন্দ্রনের বৈঠকের পর ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। টেকনোপার্কের কর্মী সংগঠন প্রতিধ্বনি টেকনোপার্ক হপ্তাখানেক আগে কেরালার শ্রমমন্ত্রী ভি শিবনকুট্টির সঙ্গে নিজেদের পরিস্থিতি জানিয়ে সাক্ষাৎ করে। এক সপ্তাহের মধ্যেই হাতেনাতে ফল পাওয়া গেল।

টুইটার আর বাইজু’সের ছাঁটাইয়ের ঘটনা পরপর ঘটায় একটি সুবিধা হয়েছে। এ দেশের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত মানুষ ছাঁটাইয়ের বিভীষিকা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছেন, অনবরত কথাবার্তা বলছেন সোশাল মিডিয়ায়। ফলে সচরাচর ছাঁটাইয়ের পক্ষে যেসব যুক্তি তাঁরা দিয়ে থাকেন সেগুলোর বৈধতা নিয়ে আলোচনা করার পরিসর তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক উদারীকরণের যুগে সারা ভারতে (কেবল পশ্চিমবঙ্গে নয়) বহু কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ঠিক কত শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন তার হিসাব কোনো রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমমন্ত্রকও দিতে পারবে বলে মনে হয় না। ঠিক কত মানুষ কৃষিকাজ অলাভজনক হয়ে যাওয়ায় প্রবাসী শ্রমিক (পরিযায়ী শ্রমিক কথাটা অশ্লীল। কলকাতাবাসী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বেঙ্গালুরুতে চাকরি করতে গেলে তাকে পরিযায়ী ইঞ্জিনিয়ার বলি কি?) হয়ে গেছেন তার হিসাবও যেমন দেশের সরকার রাখে না। ভাগ্যিস অতিমারী এল! নইলে তো আমরা মনে করতাম শ্রমিকদের জীবন মৃত্যুর হিসাব রাখে দেশের সরকার। ঘটনা হল, ও হিসাব আমরাও রাখি না। ফলে ছাঁটাইয়ের হিসাব রাখারও প্রশ্ন ওঠে না। কারণ আমরা যারা গাঁটের কড়ি খরচ করে খবরের কাগজ পড়ি, টিভিতে খবর দেখি বা হাতের স্মার্টফোনে ফেসবুক টুইটার দেখি এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে খবর সংগ্রহ করি – তাদের বাড়ির লোকেরা সাধারণত কারখানার লে অফে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, পশ্চিমবঙ্গ থেকে মহারাষ্ট্রে নির্মাণ শ্রমিক হয়েও তাদের যেতে হয় না। কিন্তু আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরাই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাঙ্কার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট ইত্যাদি হয়। মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা, টুইটার বা অ্যামাজনে চাকরি পেলে আমরা শতমুখে তা বলে বেড়াই। সুন্দর পিচাই, সত্য নাডেলা বা পরাগ আগরওয়ালকে দেখে আমাদের চোখ চকচক করে। মনে হয় আমার বাড়ির ছেলেটিও তো একদিন ওই উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। ফলে যে লে অফ দেশের হাজার হাজার বন্ধ কারখানার শ্রমিকের দরজায় আতঙ্কের উপর্যুপরি ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়তে পড়তে অবশেষে গা সওয়া হয়ে গেছে গত ৩০ বছরে, সেই লে অফ ইলনের কল্যাণে অবশেষে হ্যাশট্যাগ হয়ে আমাদের ঘুম কেড়ে নিতে পেরেছে।

ঘুম ছুটে যাওয়া অনেকসময় ভাল, কারণ তাতে গা ঝাড়া দিয়ে জেগে ওঠা যায়। আমরা সাদা কলারের শ্রমিকরা (হ্যাঁ, শ্রমিকই। সেটা ছাঁটাই হওয়া মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পান) সেই নয়ের দশক থেকে ছাঁটাই সম্বন্ধে যা জেনে এবং বিশ্বাস করে এসেছি, টুইটার ও বাইজু’সের ছাঁটাইয়ের আঁধারে আসুন সেগুলিকে প্রশ্ন করি। প্রথমত, আমরা জানি যে ছাঁটাই কখনো এমনি এমনি করা হয় না। করা হয় ব্যবসার প্রয়োজনে। কীরকম প্রয়োজন? ইলন বলছেন কোম্পানি বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বলে ছাঁটাই করা প্রয়োজন, বাইজু বলেছেন কোম্পানির বিপুল বৃদ্ধি হয়েছে বলে ছাঁটাই করা প্রয়োজন। দুজনেই সত্যবাদী যুধিষ্ঠির ধরে নিয়েই এগোনো যাক।

প্রথম জন স্বেচ্ছায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে একটি কোম্পানিকে কবজা করলেন, তারপর আবিষ্কার করলেন সে কোম্পানি লাভজনক নয়। তাই তিনি লে অফ করবেন। দ্বিতীয় জনের বয়ান অনুযায়ী, ব্যবসা প্রত্যাশার চেয়ে বড় হয়ে গেছে, তাই মুনাফা করতে হলে ছাঁটাই করা ছাড়া উপায় নেই। ইলনের ইচ্ছে হয়েছিল বলে টুইটার কিনেছিলেন, এখন দেখছেন সামলাতে পারবেন না। তার খেসারত দিতে হবে হাজার চারেক কর্মচারীকে। বাইজুর ইচ্ছে হয়েছিল বলে গত বছর আকাশ ইনস্টিটিউট কিনে নিয়েছিলেন। তার মার্কেটিং এবং ক্যাম্পেনের জন্য ৭.৫% হারে ৩০০ কোটি টাকা ধারও নিয়েছেন গত মাসে। তার আগে বর্তমান লগ্নিকারীদের থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থও সংগ্রহ করেছেন। এদিকে রাজস্ব আদায় নাকি আগের বছরের ১,৯১৮.২৫ কোটি টাকা থেকে কমে ২০২১ আর্থিক বর্ষে ১,৩৭৮.৫১ কোটি টাকা হয়ে গেছে। অথচ মেসির পারিশ্রমিক দেওয়া যাচ্ছে, কর্মীদের চাকরি না খেলে চলছে না। অর্থাৎ দুই ধনকুবের কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত গানের মত “খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে/বিরাট শিশু আনমনে”। তাঁরা কেবল নিজের টাকা নিয়ে নয়, হাজার হাজার কর্মচারীর বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও খেলবেন। খেলতে খেলতে যখন মনে হবে যথেষ্ট মজা (অর্থাৎ মুনাফা) হচ্ছে না, তখনই ছাঁটাই করবেন। যুক্তিটা নিজের মত করে বানিয়ে নেবেন আর আপনি যেহেতু বিশ্বাস করেন ছাঁটাই বিনা কারণে হয় না, তাই আপনি নিজে লেড অফ হলেও মাথা নেড়ে বলবেন “সত্যিই তো। ব্যবসার স্বার্থে তো এটা করতেই হবে।”

কর্মী ছাঁটাই করে বা ‘পে কাট’ করে বৃহৎ পুঁজির ব্যবসার কতখানি স্বার্থরক্ষা হয় সে সম্পর্কে আরেকটি উদাহরণ দিই। এই উদাহরণ অতীতেও দিয়েছি, কিন্তু বধিরদের শোনাতে বিস্ফোরণের প্রয়োজন হয়। এক বিস্ফোরণে কাজ না হলে বারবার বিস্ফোরণ ঘটাতে হয়। ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি ভারতের অন্যতম বৃহৎ মিডিয়া হাউসের মালিকানাধীন একটি খবরের কাগজ সম্পাদকীয় পাতায় এক দীর্ঘ প্রবন্ধে লিখেছিল, সংবাদপত্র শিল্প বিপন্ন এবং তাকে বাঁচাতে হলে সরকারি সাহায্য প্রয়োজন এবং কর্মী সংকোচন ছাড়া উপায় নেই। কারণ কর্মচারীদের মাইনে দিতে বিপুল খরচ হচ্ছে। ২১ তারিখে দিল্লির সাংবাদিকদের সংগঠন দিল্লি ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টসের সভাপতি এস কে পাণ্ডে এবং সাধারণ সম্পাদক সুজাতা মাধোক এক লিখিত বিবৃতিতে জানান, ভারত সরকারের কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রককে কোম্পানিগুলি যে হিসাবপত্র জমা দেয় তাতে দেখা যাচ্ছে, ওই মিডিয়া হাউসের বাৎসরিক আয় আনুমানিক ৪৮০০ কোটি টাকা আর বেতন বাবদ খরচ করে প্রায় ৫৫১ কোটি টাকা, অর্থাৎ আয়ের মাত্র ১১%। উপরন্তু ওই ৫৫১ কোটির ১০২ কোটি খরচ হয় মাত্র ৪০ জনকে মাইনে দিতে। এই মিডিয়া হাউসটি পরে অতিমারীর সময়ে এক বড় অংশের সাংবাদিক এবং অসাংবাদিক কর্মীদের ছাঁটাই করে এবং যাদের ছাঁটাই করা হয়নি তাদেরও মাইনে কমিয়ে দেয়।

যে কোনো কর্পোরেট, তার ব্যবসা যা-ই হোক, এরকম বেতন কাঠামোতেই চলে। তাহলেই বুঝুন, কর্মী ছাঁটাই করলে ব্যবসার কতটুকু স্বার্থরক্ষা হয়।

এবার ছাঁটাই সম্বন্ধে দ্বিতীয় বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা যাক – ছাঁটাই হয় উদ্বৃত্ত, অযোগ্য লোকেরা।

আগেই বলেছি, লে অফ খেলা ছাড়া কিছুই নয়। বুঝে নেওয়া দরকার, যে এ খেলার গোলপোস্ট বসায় মালিক পক্ষ, ইচ্ছা অনুযায়ী বড় ছোটও করে মালিক পক্ষই। সুতরাং কে প্রয়োজনীয় আর কে উদ্বৃত্ত, কে যোগ্য আর কে অযোগ্য – তা-ও ঠিক হয় মালিক পক্ষের ইচ্ছানুযায়ী। সে ইচ্ছা যে নিতান্ত যুক্তিহীন, তা অবশ্য নয়। যুক্তিটা কী? যুক্তি হল মালিক সে বছর কতটা মুনাফা করতে চাইছেন। যদি চাহিদা খুব বেশি হয়, তাহলে প্রমাণ করা হবে উঁচু পদের বিরাট অঙ্কের বেতন পাওয়া কর্মচারীরা উদ্বৃত্ত। নইলে প্রমাণ করা হবে নিচুতলার এবং মাঝের সারির কর্মীরা উদ্বৃত্ত। এই কারণেই ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক মন্দার সময়ে ভারতের বহু তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিতে উচ্চপদস্থদেরই চাকরি গিয়েছিল। আবার ২০১৯-২১ সময়কালে ভারতের সংবাদমাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ ছাঁটাই হয় সেখানে কোনো মিডিয়া হাউস বিদায় করেছিল মাসে কয়েক লক্ষ টাকা মাইনে পাওয়া সম্পাদকদের, কোনো হাউস আবার ওসব বাছবিচার না করে কাগজের আস্ত সংস্করণ, আস্ত চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছিল।

এ তো গেল উদ্বৃত্তের কথা। আর যোগ্যতা? আমাদের অনেকেরই ধারণা, ছাঁটাই হয় কেবল অযোগ্য কর্মীরা। কখনো ভেবে দেখেছেন, যে অযোগ্য তাকে চাকরিতে নেওয়া হয়েছিল কেন? অতীতে ভারতে যখন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সমস্ত শিল্পেই জোরদার ছিল, তখন বলা হত ট্রেড ইউনিয়নের চাপে নাকি দরকারের চেয়ে বেশি লোক নিতে হয়েছিল, অযোগ্য লোক নিতে হয়েছিল। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তো সরাসরি অভিযোগ, স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনৈতিক কারণে বহু উদ্বৃত্ত কর্মচারী নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর থেকে সাদা কলারের চাকরিতে ইউনিয়ন তো কার্যত উঠে গেছে। সমস্ত কর্পোরেট অফিসে বাহারি এইচ আর ডিপার্টমেন্ট রয়েছে। তারা প্রায় সেকালের পাত্রী দেখার মত “চুল খুলে দেখাও তো মা”, “হেঁটে দেখাও তো মা” পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ করে। এতৎসত্ত্বেও এত অযোগ্য কর্মী আসে কোথা থেকে? তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক, তারা ইন্টারভিউয়ে চালাকি করে ঢুকে পড়ে। যদি বা পড়ে, তারা যে অযোগ্য সে কথা কোম্পানির মুনাফার ক্ষিদে বেড়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত কারোর খেয়াল হয় না কেন? অনেকসময় ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সর্বশেষ আভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে যে কর্মচারী ভাল রেটিং পেয়েছে সে-ও ছাঁটাই হয়ে গেল। কী করে এমন ঘটে?

আসলে যোগ্যতার গোলপোস্টও মালিক পক্ষের মর্জিমাফিক সরিয়ে ফেলা হয়। নইলে পৃথিবীর সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করা এবং প্রশিক্ষণ নেওয়া যে ইঞ্জিনিয়াররা এত বছর ধরে টুইটার চালাচ্ছিলেন তাঁরা রাতারাতি এই শুক্রবার অযোগ্য হয়ে গেলেন কী করে?

আরও পড়ুন যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে

ছাঁটাই সম্পর্কে আমাদের ধারণার পরিবর্তন প্রয়োজন – এই মর্মে এত দীর্ঘ আলোচনা ফেঁদেছি কেন? কারণ এর পরিবর্তন না ঘটালে যাঁরা এখনো ছাঁটাই হননি তাঁরাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন অদূর ভবিষ্যতে। অতিমারীর সময়ে যখন চারদিকে বিভিন্ন শিল্পে লে অফ আর পে কাট চলছে, আমার এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার প্রতিবেশী সগর্বে বলেছিলেন “আমার চিন্তা নেই। আমি জানি আমার যোগ্যতা আছে। একটা গেলে আরেকটা ঠিক পেয়ে যাব।” কেবল অযোগ্য লোকেরা ছাঁটাই হয় – এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে গেলে ওরকম অকারণ নিরাপত্তায় ভোগা অসম্ভব নয়। টুইটার, গুগল, মেটা ইত্যাদি হল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় কোম্পানি। তারা যে দৃষ্টান্ত তৈরি করে তা-ই বিশ্বের সর্বত্র অনুসরণ করে থাকে ছোট, বড়, মাঝারি কোম্পানিগুলি। সুতরাং কোনো কর্পোরেটের কোনো কর্মচারীই যে নিরাপদ নন তা বুঝে নেওয়ার সময় এসেছে। অনুসিদ্ধান্ত হিসাবেই বুঝতে পারা উচিত যে লে অফের আসল কারণ, কোনো শিল্পেই, ব্যবসা বাঁচানো নয়। দীর্ঘকাল বলা হত শ্রমিক আন্দোলনের জন্য, ধর্মঘট, পেন ডাউন ইত্যাদির জন্য ব্যবসার ক্ষতি হয়। ফলে ছাঁটাই করতে হয়, শিল্প তুলে দিতে হয়। তা তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে বা সংবাদমাধ্যমে তো ওসব বালাই নেই। ধর্মঘটই বা কোথায়? তবু কেন শিল্প নড়বড়ে? কেন ছাঁটাই করতে হচ্ছে?

সুতরাং ছাঁটাইয়ের আসল কারণ হল মুনাফা বাড়ানো। কত বাড়ানো? এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই, কারণ মালিকের লোভের কোনো শেষ নেই। যে কোনো স্তরের কর্পোরেট কর্মচারীই জানেন, আজকাল পরের আর্থিক বর্ষের ব্যবসার লক্ষ্যমাত্রা স্থির হয় আগের বছরের মুনাফা অনুযায়ী। আগেরবারের চেয়ে বেশি মুনাফা না করা গেলেই হিসাবে ক্ষতি লেখা হয়। অর্থাৎ লাভ-ক্ষতির সংজ্ঞাই বদলে ফেলা হয়েছে পুঁজির হাঙরের ক্ষিদে মেটানোর জন্য। এই ক্ষিদে যে কোনোদিন আপনাকেও গিলে নেবে। আপনার যোগ্যতা আপনার বর্ম নয়।

লোক কমিয়ে মুনাফা বাড়ানোর আরও উৎকৃষ্ট পন্থা মালিকদের নজরে পড়ে গেছে ইতিমধ্যেই। তার নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। বিজ্ঞান, প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে স্বয়ংক্রিয়তা (automation)। সেই ধারাবাহিকতাতেই এসে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কম্পিউটারের আগমনে কিছু মানুষের কাজ গিয়েছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলেও যাবে। সবাইকে তৈরি থাকতে হবে। যে প্রশ্নের উত্তর নেই সে প্রশ্ন তোলা চলবে না – এরকম গা জোয়ারি চিন্তায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। সে অভ্যাস থেকে বেরোতে আমাদের বাধ্য করবে অদূর ভবিষ্যৎ। তখন নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে, কোথাও কি থামা উচিত? প্রযুক্তি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ প্রযুক্তির জন্য? স্বয়ংক্রিয়তা তো আবিষ্কৃত হয়েছিল মানুষের ভার লাঘব করার জন্য? মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়া কি স্বয়ংক্রিয়তার কাজ? এসব প্রশ্ন তখন তুলে কোনো লাভ হবে না, কারণ অর্থনীতি এবং শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা আমরা অনেকদিন হল ছেড়ে দিয়েছি।

একা একা মৌলিক প্রশ্ন তুলে অবশ্য কোনোদিনই কোনো লাভ হয়নি। তিরুবনন্তপুরমের বাইজু’স কর্মীরা ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করাতে পেরেছেন একজোট হয়েছেন বলে। সম্প্রতি আমাদের স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় অ্যামাজনের কর্মীরাও লড়াই করে ইউনিয়ন করার অধিকার আদায় করেছেন। কিন্তু ভারতের সাদা কলারের কর্মীদের কাছে গত তিরিশ বছরে ইউনিয়ন এমন একটি শব্দে পরিণত হয়েছে যা শুনলে কানে গঙ্গাজল দিতে হয়, অবেলায় স্নান করতে হয়। ইউনিয়ন করবে চটকলের শ্রমিকরা; বড়জোর সুইগি, জোম্যাটো, ফ্লিপকার্টের ডেলিভারি বয়রা; উবের, ওলার ড্রাইভাররা। সাদা কলারের সম্ভ্রান্তবংশীয়রা হাড়িকাঠে গলা দিয়ে বেচারা জল্লাদের বাঁচার প্রয়োজন বিবেচনা করে সসম্মানে বলি হবেন।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

সেতু ভাঙলেও টাল খায় না গুজরাট মডেল

সারা দেশের ভদ্রলোক শ্রেণি গুজরাট বলতে অজ্ঞান। কি চমৎকার রাস্তা! সবরমতীর ধারটা কি দারুণ করেছে! লোকের কত টাকা! দিল্লি থেকে কন্যাকুমারী – সর্বত্রই মুগ্ধতার কারণগুলো মোটামুটি এক। বাঙালি ভদ্রজনের মুগ্ধতার দুটো অতিরিক্ত কারণ আছে – ১) ওখানে কত ইন্ডাস্ট্রি, ২) ওখানে কেউ চাকরি বাকরি নিয়ে মাথায় ঘামায় না, সবাই ব্যবসা করে। এই মুগ্ধ জনতার সাথে খানিকক্ষণ কথা বললেই টের পাওয়া যায় এঁরা গুজরাট বলতে বোঝেন আমেদাবাদ, বড়জোর ভদোদরা। তলিয়ে জিজ্ঞেস করলে বেরিয়ে পড়ে বেড়াতে গিয়ে আমেদাবাদের বাইরে কেবল গির অরণ্যের সিংহ দেখেছেন। অবশ্য পশ্চিমবঙ্গ বলতেও এঁরা কলকাতাই বোঝেন, মহারাষ্ট্র বলতে মুম্বাই। ফলে বামপন্থী বা ডানপন্থী যা-ই হোন, গুজরাট মডেলে এঁদের অগাধ আস্থা। তবে স্বপ্নের গুজরাটে বেমক্কা সেতু ভেঙে পড়লে কিঞ্চিৎ ফাঁপরে পড়েন।

মোরবিতে মেরামতির জন্য সাত মাস বন্ধ থাকা সেতু দিন পাঁচেক হল খোলা হয়েছিল, রবিবার ভর সন্ধেবেলা ভেঙে পড়েছে। এখন শোনা যাচ্ছে খুলে দেওয়ার আগে নাকি সুরক্ষা শংসাপত্রও নেওয়া হয়নি। উন্নয়নের গুজরাট বলে কথা, উন্নয়ন কি আর লাল ফিতের ফাঁসে আটকে রাখা যায়? কর্মবীর নরেন্দ্র মোদীর রাজ্য। কয়েক হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি ডুবে যাবে জেনেও যেখানে সর্দার সরোবর বাঁধ তৈরি করা হয় বহু বছরের আন্দোলন দুরমুশ করে দিয়ে।

এই লেখা যখন লিখতে বসেছি, তখন পর্যন্ত শ দেড়েক মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। তাতে কী-ই বা এসে গেল? গুজরাটে অনেক কাজ হয়, তার মধ্যে খানিকটা দুর্নীতি তো হবেই। আমাদের এখানে তো কাজই হয় না – এমন ধারণা দিয়েই অনেকে এ ঘটনার ব্যাখ্যা করবেন সন্দেহ নেই। আসলে উন্নয়ন মানে যে শহরের উন্নয়ন; অর্থাৎ ফ্লাইওভার, রাস্তা, সেতু, পার্ক, রেলিং, ফুটপাথ নির্মাণ – একথাই আমরা শিখেছি। অমর্ত্য সেন বাঙালি বলে আমাদের দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না। কিন্তু তিনি উন্নয়নের যে অন্যতর সংজ্ঞা দিয়েছেন তাতে আমাদের আগ্রহ নেই। তাঁর কাজের ভিত্তিতে অর্থনীতিবিদ মহবুব উল হকের তৈরি হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে গুজরাট সচরাচর মাঝের সারির উপরে উঠতে পারে না। ২০২১ সালেও অন্ধ্রপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ সমেত ১৯ রাজ্যের সঙ্গে গুজরাট মিডিয়াম এইচডিআই ক্যাটেগরিতেই ছিল। সে রাজ্যের অনেক জায়গায় যে ছেলেমেয়েরা সাঁতরে নদী পেরিয়ে স্কুলে যায়, শিক্ষার হাল ভাল নয়, স্বাস্থ্যের হাল ভাল নয় – এসব খবরও বাসি। কিন্তু ওসবে আমরা আমল দেব কেন? পেল্লাই কারখানা হলেই যে প্রচুর কর্মসংস্থান হয় না, উন্নয়ন হয় না সেসব আমরা এখনো টের পাইনি যে। তাই তো পশ্চিমবঙ্গে সিঙ্গুর এখনো রাজনৈতিক চাপান উতোরের বিষয়।

আরও পড়ুন কী ঢাকছে সরকারি চোলি? কেনই বা ঢাকছে?

সংবাদসংস্থা আইএএনএস জুন মাসে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, গুজরাটে বেকার সমস্যা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে গ্রাম পঞ্চায়েতের এক্সিকিউটিভ প্রধানের ৩৪০০ শূন্য পদে চাকরির জন্য ১৭ লক্ষ আবেদন পত্র জমা পড়েছিল। কিন্তু গুজরাট বিধানসভার আসন্ন নির্বাচনের প্রচারের দিকে নজর রাখলেই বোঝা যায় ওসব কোনো ইস্যু নয়। ইস্যু হল হিন্দুত্ব। অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলছেন টাকায় লক্ষ্মী, গণেশের ছবি ছাপানো উচিত আর বিজেপির বিদায়ী মন্ত্রিসভা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লাগু করার জন্য কমিটি গঠন করছে। সেতু ভেঙে পড়া এমন কী ব্যাপার? জীবন মৃত্যু তো ভগবানের হাতে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

বল্লভপুরের রূপকথা: খাঁটি বাংলা ছবি

হাস্যরস উৎপাদনের জন্যও ওপরচালাক কথার খেল, এলিটিস্ট বিদ্রূপ অথবা অধুনা জনপ্রিয় খিস্তির উপর নির্ভর করতে হয়নি।

এক গল্প হাজারবার বললে সে আর এক গল্প থাকে না, পালটে পালটে যায়। মানুষের জীবনের মত। এক চরিত্রের মুখ দিয়ে এই কথাটি পরিচালক ছবির শুরুতেই বলে দিয়েছেন। তাই বাদল সরকারের নাটক দেখা না থাকলেও বল্লভপুরের রূপকথা দেখতে অসুবিধা হয় না। আমরা দুর্ভাগা প্রজন্ম। বাদল সরকারের নামটুকুই শুনেছি, কেউ কেউ তা-ও শুনিনি। আমরা কেবল সত্যজিৎ রায়কে চিনি। পরিচালক অনির্বাণ ভট্টাচার্য যথার্থই অনুমান করেছিলেন, হলে ঢুকে আমরা কেউ সঙ্গের দর্শককে জিজ্ঞেস করে ফেলতেই পারি “বাদল সরকারটা আবার কে?” তাই গোড়াতেই সেসব দেখিয়ে দিয়েছেন। প্রফেসর শঙ্কুর মত দেখতে লোকটি যে একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নাট্যশিল্পী তা সিনেমা দেখতে গিয়ে জানা হয়ে গেল।

পরিচালকের বুকের পাটা দেখে অবাক হতে হয়। মেগাসিরিয়ালে অভ্যস্ত দর্শককে তিনি একে তো বাদল সরকার চেনাচ্ছেন, তার উপর আবার আখ্যান সম্বন্ধে সচেতন করছেন! মিশকালো অন্ধকারে নৌকো বাইতে বাইতে যে মাঝি আখ্যান সম্পর্কে ওই চিরসত্য উচ্চারণ করছে তার নাম রসিক। অরসিকের কাছে রস নিবেদন করার দুর্ভাগ্য যেন আমার না হয় – বিধাতার কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন প্রাচীন কবি। অনির্বাণ সে ঝুঁকি নিয়েছেন। তাঁর এত আয়োজন বৃথা যেত যদি বিদেশি ছবি থেকে বাদল সরকারের হাত ঘুরে তাঁর কাছে আসা আখ্যানটিকে রসোত্তীর্ণ করতে না পারতেন। সে পরীক্ষায় তিনি সফল। তাঁর আখ্যান রসে টইটম্বুর। হলভর্তি দর্শক প্রায়ই হেসে গড়াগড়ি খেয়েছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, এ ছবি একটিমাত্র রস পরিবেশন করেনি। এমনকি হাস্যরস উৎপাদনের জন্যও ওপরচালাক কথার খেল (pun), এলিটিস্ট বিদ্রূপ অথবা অধুনা জনপ্রিয় খিস্তির উপর নির্ভর করতে হয়নি।

ভারতের সর্বকালের সেরা ক্রিকেট অধিনায়কদের একজন, সৌরভ গাঙ্গুলি, একটা কথা খুব বলে থাকেন – একজন অধিনায়ক ততটাই ভাল, যতটা ভাল তাঁর দল। কথাটা চলচ্চিত্র পরিচালকের বেলাতেও বোধহয় খানিকটা খাটে। যে পরিচালকের হাতে বাদল সরকারের লেখা সংলাপ, সত্যম ভট্টাচার্য (ভূপতি), শ্যামল চক্রবর্তী (মনোহর), দেবরাজ ভট্টাচার্যের (সঞ্জীব) মত উৎকৃষ্ট অভিনেতা থাকেন, তাঁকে হাস্যরসের জন্য ইদানীংকালের বাংলা ছবিতে ব্যবহৃত উপরে উল্লিখিত মধ্যমেধার কৌশলগুলোর কাছে হাত পাততে হবেই বা কেন? তবে ক্রিকেট দলের অধিনায়কের একটা সুবিধা থাকে যা পরিচালকের নেই। দলের ব্যর্থতায় নেহাত প্যাঁচে পড়লে অধিনায়ক নির্বাচকদের ঘাড়েও কিছুটা দায় চাপিয়ে দিতে পারেন, পরিচালকের সে উপায় নেই। অনির্বাণ থিয়েটারের অভিনেতাদের নিয়ে সিনেমা বানিয়েছেন। ফেল করলে কারোর দিকে আঙুল তোলার উপায় থাকত না। কিন্তু তাঁর নির্বাচিত অভিনেতারা প্রত্যেকেই চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়ের মত খেলেছেন।

অনিবার্যভাবে মনে পড়ে সদ্যপ্রয়াত তরুণ মজুমদারের কথা। উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের যুগে অনুপকুমারকে নায়কের চরিত্রে রেখে তিনি বানিয়ে ফেলেছিলেন বাংলা ছবির ইতিহাসে সর্বকালের সেরা হিট ছবিগুলোর অন্যতম – পলাতক (১৯৬৩)। স্রেফ শক্তিশালী চিত্রনাট্য আর অভিনয় দক্ষতা হিট ছবির রসায়ন হতে পারে তার অকাট্য প্রমাণ। অনির্বাণও তারকাবিহীন, এমনকি রুপোলি পর্দার অভিনেতাবিহীন ছবি করেছেন। তরুণের সময়ে তবু টলিউড সংকটাপন্ন ছিল না। এখন কিন্তু স্বাস্থ্যের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ছবি যদি শেষপর্যন্ত বিপুল সংখ্যক দর্শকের আশীর্বাদধন্য হয়, তাহলে কী করলে ছবি হিট হয়, সে প্রশ্ন নতুন করে ভাবতে হবে সকলকেই। শীর্ষ মন্তাজেই ইঙ্গিত রয়েছে – গোয়েন্দা, ভূত, নস্ট্যালজিয়া সবই কপচানো হয়ে গেছে। কোনোটাই বিশেষ কাজ দেয়নি। তরুণ পারতেন রুচিসম্মত অথচ জনপ্রিয় ছবি তৈরি করতে। সে ছবি সত্যজিৎ, ঋত্বিক ঘটক বা মৃণাল সেনের উচ্চতার শিল্প হত না হয়ত। কিন্তু স্রেফ শহুরে ও অনাবাসী বাঙালি দর্শকের জন্য তৈরি চলচ্চিত্রোৎসবমুখী ভানও তাতে থাকত না। একইসঙ্গে গ্রাম ও শহরের দর্শকের মনোরঞ্জন করতে পারে, এমন বাংলা ছবি বিশ-তিরিশ বছর হল তৈরিই হয় না। অভিজ্ঞরা বলেন অমন ছবি নাকি সম্ভবই নয়, কারণ গ্রাম আর শহরের দর্শকের রুচির তফাত বিস্তর। অথচ বিশ্বায়নের যুগে গোটা দুনিয়াটাই গ্লোবাল ভিলেজ – এমনটাই তো জেনে আসছি। বাস্তবিক দার্জিলিং থেকে মেদিনীপুর – সর্বত্রই তো পৌঁছে গেছে ওটিটি। তবু? বল্লভপুরের রূপকথা আখ্যানে এবং উপস্থাপনে গ্রাম, শহরের সেতুবন্ধনের চেষ্টা করেছে। দেখা যাক তা সফল হয় কিনা।

অভিনয়ের কথা হচ্ছিল। ছবি দাঁড়িয়ে আছে ভূপতি, ছন্দা (সুরঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়), মনোহর আর সঞ্জীবের চরিত্রের উপর ভর দিয়ে। তাঁদের অভিনয় তো নিখুঁত বটেই, ছোটখাটো চরিত্রগুলোতেও এত নির্মেদ অভিনয় আজকাল বাংলা ছবিতে সুলভ নয়। ভূপতির তিন পাওনাদার সাহা (কৃপাবিন্দু চৌধুরী), শ্রীনাথ (সুরজিৎ সরকার) আর পবনের (সুমন্ত রায়) সংলাপ বলার ঢং, হাঁটাচলা, তাকানো – সবকিছুই হাসির উদ্রেক করেছে। অথচ যথেষ্ট অবকাশ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা অতি-অভিনয় করেননি। ইংরেজিতে যাকে কমিক টাইমিং বলে তাতে অবশ্য সবার উপরে মনোহর চরিত্রে শ্যামল। গোটা ছবিতে তিনি ভাবলেশহীন মুখে আর সকলকে হাসিয়ে গেলেন।

সত্যম চারশো বছর আগেকার রোম্যান্টিক, কালিদাস আওড়ানো, জমকালো পোশাক পরা রাজপুত্রের চরিত্রে যতটা সাবলীল, ততটাই দেনার দায়ে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকা রায়বাড়ির প্রথম গামছা পরে ঘুমনো রাজা হিসাবে। এমনকি শুধু ভূপতির চরিত্রেও তিনি প্রয়োজনমাফিক সপ্রতিভ এবং অপ্রতিভ। কাজটা মোটেই সহজ নয়। বিশেষ করে ব্যোমকেশ আর ফেলুদার চরিত্রের একইরকম অভিনয় দেখে অভ্যস্ত চোখে সত্যমকে দেখে বলতে ইচ্ছে করে “বড় বিস্ময় লাগে হেরি তোমারে”।

দেবরাজ ভূতের ভয়ে কাবু, মিসেস হালদারের বকুনিতে ক্যাবলা অথচ বন্ধুর প্রতি আনুগত্যে অবিচল চরিত্রে দারুণ বিশ্বাসযোগ্য। অমন অভিনয় করতে পারেন আবার চমৎকার গাইতেও পারেন – এমন শিল্পী কজন পাওয়া যায়?

ওপেন টি বায়োস্কোপ ছবির নেহাত বালিকা সুরঙ্গনা এ ছবিতে গত শতকের ছয়ের দশকের লাবণ্যময়ী বাঙালি মেয়ে ছন্দার চরিত্রে দারুণ মানিয়ে গেছেন। সে শুধু তাঁর সৌন্দর্য, শাড়ি পরার ধরন বা চুল বাঁধার কায়দার জন্যে নয়। যে চোখের ভাষা সেরা সময়ের রোম্যান্টিক বাংলা ছবির নায়িকাদের অব্যর্থ অস্ত্র ছিল, সেই ভাষায় সুরঙ্গনার চোখ বারবার কথা বলেছে। পাশে দাঁড়ানো পুরুষটিকে নিজের ভাললাগা জানানোর জন্য বেশি কিছু নয়, স্রেফ তার মত দেখতে পূর্বপুরুষের পোর্ট্রেটের সামনে দাঁড়িয়ে “সুপুরুষ” বলে আড়চোখে তাকিয়ে নেওয়ার নৈপুণ্য সুরঙ্গনা চমৎকার রপ্ত করেছেন। বাঙালির প্রেমের অভিজ্ঞান, অন্তত সিনেমার পর্দায়, একসময় ছিল তার সূক্ষ্মতা। নায়িকারা সরাসরি নায়কের দিকে তাকাতেন না বা আগ বাড়িয়ে চুমু খেতেন না বলে যে ন্যাকা ছিলেন তা নয়। পাঁচের দশকেই শাপমোচন ছবিতে অবিবাহিতা সুচিত্রা সেন সটান বাবার সামনে দাদাকে জানিয়ে দিচ্ছেন উত্তমকুমারের সঙ্গে দেখা করতে যান কারণ “তিনি আমার স্বামী”। আবার পথে হল দেরী ছবিতে তাঁর চেয়ে নায়কের দৃষ্টিই লজ্জায় বেশি থরোথরো। সত্যমকে ধমকে দেওয়ার দৃশ্যে সুরঙ্গনাকেও তেমনই দৃঢ়চেতা দেখিয়েছে।

আরও পড়ুন অহৈতুকী পার্টিজানপ্রীতি

বল্লভপুরের রূপকথা ছবিটির এই এক মজা। আপাতদৃষ্টিতে নতুন কিছুই নেই। যা আছে তা হল বাংলা ছবির, বাংলার সংস্কৃতির চিরনতুন কিছু উপাদান যা মানুষের সর্বদা ভাল লাগে। নায়ক, নায়কের অভিভাবকসুলভ বৃদ্ধ চাকর, প্রাণের বন্ধু, নায়িকার শৌখিন এবং আধক্ষ্যাপা বাবা, জাঁদরেল মা, বাবার সঙ্গে রেষারেষি থাকা এক বুড়ো ধনী – এর কোনোটাই কি বাংলা ছবির দর্শকের কাছে নতুন? পরিচালক অনির্বাণ বা অন্যরা প্রচার পর্বে কোথাও বলেননি, অথচ দেখা গেল ছবিটি পিরিয়ড পিসও বটে। মূল নাটকের মত গত শতকের ছয়ের দশকই দেখানো হয়েছে। সেই সময়কার পোশাক-আশাক, কথা বলার ধরন, গাড়ির মডেল সবই নিখুঁত। এমনকি ছবির সঙ্গীত পর্যন্ত বাংলা গানের হারিয়ে যাওয়া মেলডির সন্ধান দেয়। অনির্বাণ, দেবরাজ, শুভদীপের সৃষ্টি ‘সাজো সাজাও এমন করে’ সাহানা বাজপেয়ীর গলায় এমন মধু ঝরায় যে সুরটি ছবি শেষ হওয়ার বহুক্ষণ পরেও কোথা থেকে যেন কানে ভেসে আসে। যন্ত্রসঙ্গীতের ঝমঝম আওয়াজে পূর্ণ খোনা গলার আধুনিক বাংলা সিনেমার গান তো শুনি আর ভুলে যাই প্রায় সহজেই। ছবির আবহসঙ্গীত পর্যন্ত আজকের বলে মনে হয় না, ভয়ের ছবির পরিবেশ সৃষ্টিকারী চেনা শব্দসম্ভারই ফিরে ফিরে আসে। যদিও তাতে ভয়ের পরিবেশ কতটা তৈরি করা গেছে তাতে সন্দেহ আছে। এই এক সমালোচনার জায়গা।

তবে চলচ্চিত্র তো শেষপর্যন্ত চিত্র। মনে রাখার মত কিছু শট না থাকলে চলে না। সেখানে সোনা ফলিয়েছেন সিনেমাটোগ্রাফার সৌমিক হালদার। তাঁর তৈরি অন্ধকার ঘুরঘুট্টি বটে, কিন্তু তার মধ্যেও জঙ্গলের প্রত্যেকটি গাছ আলাদা করে দেখা যায়। দিনের বেলার শটগুলোতেও আউটডোর লোকেশনের সৌন্দর্য তাঁর ক্যামেরা চেটেপুটে নিয়েছে। তবে ভোলা যায় না বল্লভপুরের রাজবাড়িতে প্রথম পদক্ষেপের সময়ে সিনেমার পর্দা জুড়ে থাকা অন্ধকারের মধ্যে উদ্ভাসিত ছন্দার মুখের ক্লোজ আপ।

বল্লভপুরের রূপকথা শস্তা নয়, সহজ। চটকদার নয়, রংদার। নতুন নয়, চিরচেনা। পরিচালক অনির্বাণের সবচেয়ে বড় গুণ – তিনি একটি খাঁটি বাংলা ছবি বানিয়েছেন। এখানে বাঙালিকে বাঙালি বলে চেনা যায়। বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল হাইরাইজ, হাইওয়ে, স্কচ আর পরকীয়ায় হারিয়ে যায়নি। হৃদয় ঘেঁটে দেখা গেছে কোথায় পাতা শীতলপাটি। ছবির শুরুতে আখ্যান সম্পর্কে যে চিরসত্য মাঝি রসিক তার পীর ঠাকুর্দার উক্তি বলে উল্লেখ করেছে, সেই সত্যই আবার শেষে দোকানদার পবন তার সন্ন্যাসীপ্রতিম ঠাকুর্দার উক্তি বলে ঘোষণা করেছে। অতি সহজে, প্রায় অলক্ষ্যে পরিচালক বাংলার হিন্দু-মুসলমানের সাংস্কৃতিক সমন্বয় দেখিয়ে দিলেন। পুরনো কথাও বারবার বলতে হয়, বলতে বলতে নতুন হয়ে ওঠে। সেই নতুনত্বের খোঁজে বেরিয়েছেন অনির্বাণ। একেবারে শেষে দেখা গেছে তিনি নিজেকে নিয়েও রসিকতা করতে পারেন। এই ক্ষমতা যদি ধরে রাখতে পারেন তাহলে ভবিষ্যতে আরও ভাল কিছু আশা করা যায়।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাঙালি কাহারে কয়, সে কি কেবলি সৌরভময়?

ভুল হয়ে গেছে বিলকুল
আর সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে
ভাগ হয়নিকো নজরুল।
সেই ভুলটুকু বেঁচে থাক
বাঙালি বলতে একজন আছে
দুর্গতি তাঁর ঘুচে যাক।

অন্নদাশঙ্কর রায় এসব লিখেছেন বহুকাল হয়ে গেল। কিন্তু আজও কলকাতা ও তার শহরতলির ভদ্রজন বলে থাকেন “বাঙালি আর মুসলমান”। বোঝা শক্ত নয় যে বাঙালি বলতে তাঁরা বোঝেন হিন্দু বাংলাভাষীদের। মুশকিল হল, পশ্চিমবঙ্গের কাগজ, টিভি, এমনকি সরকারও চালান মূলত কলকাতা এবং সংলগ্ন অঞ্চলের ভদ্রজনই। কোনটা বাঙালি ভাবাবেগকে আহত করে (ইদানীং আবার ভাবাবেগ না লিখে অস্মিতা লেখা চালু হয়েছে), কোনটা করে না তাও ঠিক করে দেন ওঁরাই। ফলে শেষমেশ দেখা যায় বাঙালি বলতে সব বাঙালি হিন্দুও নয়, কেবল তাঁদেরই বোঝাচ্ছে। সুতরাং দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের সময়ে মাল নদীতে হড়পা বান এসে নিরীহ মানুষের প্রাণহানি হলে বাঙালির ভাবাবেগ আহত হয় না, কলকাতায় ড্যাং ড্যাং করে কার্নিভাল চলে। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড নামক এক লাভজনক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদ বেহালার গাঙ্গুলিবাড়ির ছোট ছেলেটির হাতছাড়া হলে বাঙালির ভাবাবেগ এতদূর আহত হয়, যে মুখ্যমন্ত্রীকে ময়দানে নামতে হয়। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের নেতাকে বলতে হয়, মহারাজকে সম্মান দিতে চাইলে শাহরুখ খানকে সরিয়ে তাঁকেই রাজ্যের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করুন না। বামপন্থীরাও বলেন, এসব হল দেশের সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে বিজেপির কুক্ষিগত করার চক্রান্ত। কেন সব রাজনৈতিক দলকেই কিছু না কিছু বলতেই হয়? কারণ নজরুল-টজরুল আজকাল আর কে পড়ে? এখন বাঙালি বলতে একজন আছে – সৌরভ গাঙ্গুলি।

অর্থাৎ বাঙালি মানে দাঁড়াল কলকাতা ঘেঁষা ভদ্রজন। তাঁদের আবেগ জড়িত বলেই তো ইস্টবেঙ্গল আইএসএলে দল নামাতে পারল কিনা তা মুখ্যমন্ত্রীকে তদারক করতে হয়, কিন্তু মহমেডান স্পোর্টিং থাকল কি উঠে গেল তা নিয়ে কারোর মাথাব্যথা থাকে না। দু-একদিন হইচইয়ের পরেই সংবাদমাধ্যম এবং ক্রীড়াপ্রেমীদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যান জাতীয় গেমসে ফুটবলে সোনা জয়ী বাংলা দলের ফুটবলাররা। দুদিন দুরাত ট্রেনে করে ফিরতে না হলে আদৌ তাঁদের নিয়ে কেউ আলোচনা করত কিনা তাতেও সন্দেহ আছে। একই কারণে জাতীয় গেমসে বাংলা কোথায় শেষ করল, কেন করল – সেসব নিয়ে রাজ্যের সর্বাধিক প্রচারিত খবরের কাগজগুলোতে কয়েক সেন্টিমিটার জায়গাও খরচ করা হয় না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অমিত শাহের প্রসাদে ক্রিকেট বোর্ডের সর্বোচ্চ পদে বসে থাকা সৌরভ কত বড় বঞ্চনার শিকার হলেন তা নিয়ে বিস্তারিত লেখা হয় একেবারে প্রথম পাতায়।

ঘটনাচক্রে সৌরভ যে বছর ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হলেন সে বছরই অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে বাঙালি বলে দাবি করতে উৎসাহের খামতি হয়নি জনমত গঠনকারী বাবুদের। সে তবু একরকম, কিন্তু বাঙালি ভাবাবেগ এত সহজপাচ্য যে কলকাতার ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসের ধারে অভিজিৎ আর সৌরভকে বাঙালির গর্ব হিসাবে পাশাপাশি রেখে হোর্ডিং টাঙিয়েছিল কে বা কারা। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সমাজবিজ্ঞানে মৌলিক গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রদত্ত পৃথিবীর সেরা পুরস্কার অর্জনের কৃতিত্ব কী করে এক ব্যবসায়িক সংস্থার আভ্যন্তরীণ রাজনীতির ছক্কা পাঞ্জায় সফল হয়ে পাওয়া চেয়ারের সমান হয়, তা বাঙালিই জানে। কিন্তু কী আর করা যাবে? মহাজনেরা দেগে দিয়েছেন, বাঙালি বলতে একজনই আছে।

দাগানোর কাজটা আজ হয়নি, হয়েছে সৌরভের খেলোয়াড় জীবনেই। লর্ডসে টেস্ট অভিষেকের পর থেকে কোনো ম্যাচে প্রথম একাদশ থেকে সৌরভ বাদ গেলেই বাংলায় বসে মনে হত নেতাজি সুভাষচন্দ্র কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হওয়ার পরে এত বড় অন্যায় আর কোনো বাঙালির সঙ্গে করা হয়নি। আজকের মুখ্যমন্ত্রী সৌরভকে পদ পাইয়ে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানান, আগের সরকারও কিছু কম যেত না। ১৯৯৭ সালে ঢাকায় ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ ফাইনালে সৌরভ একটি অবিস্মরণীয় ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পর পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁর প্রকাশ্য সংবর্ধনার আয়োজন করে। অবাক কাণ্ড! জিতিয়েছেন একটি ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল, বিশ্বকাপ ফাইনাল নয়। তার জন্যে সরকারি সংবর্ধনা পাওয়ার সৌভাগ্য পৃথিবীর কজন ক্রিকেটারের হয়েছে বলা মুশকিল। অন্তত শচীন তেন্ডুলকরের যে হয়নি তা হলফ করে বলা যায়। তিনি পরের বছরেই শারজায় প্রায় একক কৃতিত্বে একই সপ্তাহে দুবার স্টিভ ওয়র অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ভারতকে খেতাব জেতান। এমন ব্যাট করেছিলেন যে ওয় বলেন ডন ব্র্যাডম্যানের পরে শচীনই সেরা। তবু কিন্তু মহারাষ্ট্র সরকার তাঁর বর্ণাঢ্য সংবর্ধনার ব্যবস্থা করেনি।

আরও পড়ুন ক্রিকেটার তুমি কার?

বাঙালি ক্রীড়াবিদকে বাংলার সরকার সম্মান জানিয়েছে – এর নিন্দা করলে আবার অনেকে রেগে যেতে পারেন। পক্ষ সমর্থনে এমনও বলা যেতে পারে, যে বাঙালিদের মধ্যে থেকে তো আর মুম্বাইয়ের মত কাঁড়ি কাঁড়ি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার বেরোয় না, আমাদের সবেধন নীলমণি সৌরভই আছেন। তাই আমরা, আমাদের সরকার একটু বাড়াবাড়ি করলে ক্ষতি কী? কথা হল, ক্ষতি কিছু হত না, যদি সব বাঙালি ক্রীড়াবিদ সম্পর্কেই এমন মহৎ চিন্তা গোটা বাংলার মানুষের এবং মানুষের দ্বারা নির্বাচিত সরকারগুলোর থাকত। বাংলার রঞ্জি ট্রফি দলের সুলুকসন্ধান কজন বাঙালি রাখেন তার ঠিক নেই, কিন্তু কলকাতা নাইট রাইডার্স আইপিএল জিতলে ঘটা করে ইডেন উদ্যানে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংবর্ধনার ব্যবস্থা হয়। সৌরভকে দল থেকে বাদ দিলে গেল গেল রব উঠত, এখন প্রশাসনিক পদে থাকতে না দিলেও বাঙালির জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ কলকাতার বৃত্তের বাইরের লোক, শিলিগুড়ির ছেলে ঋদ্ধিমান সাহা ফর্ম না হারিয়েও স্রেফ আহত হয়ে দলের বাইরে যাওয়ার জন্যেই যখন ভারতীয় দলে তাঁর জায়গা খোয়ালেন, তখন তেমন আলোড়ন উঠল না। উঠল তখন যখন ঋদ্ধিমানের স্থলাভিষিক্ত তরুণ ঋষভ পন্থ দুরন্ত ব্যাটিংয়ে তাঁর জায়গা পাকা করে ফেলেছেন, স্বভাবতই কোচ রাহুল দ্রাবিড় ঋদ্ধিমানের দীর্ঘ কেরিয়ারকে সম্মান করে আলাদা করে ডেকে বলে দিয়েছেন তাঁকে আর টেস্ট দলের জন্য ভাবা হবে না। হপ্তাখানেক কলকাতার সংবাদমাধ্যম ঋদ্ধিমানের প্রতি অবিচারের জন্য দ্রাবিড়কে খলনায়ক বানিয়ে অশ্রুপাত করল। আগে উচ্চবাচ্য করা হয়নি। সম্ভবত তার কারণ তখন খলনায়ক খুঁজতে হলে প্রথমেই স্বয়ং সৌরভের দিকে আঙুল তুলতে হত। কারণ তিনি তখন বোর্ড সভাপতি তো বটেই, তার চেয়েও বড় কথা ঋষভ আইপিএলে দিল্লি ক্যাপিটালসের ক্রিকেটার আর সৌরভ সেই দলেরই পরামর্শদাতা ছিলেন বোর্ডকর্তা হওয়ার আগে পর্যন্ত।

ক্রিকেটিয় কারণে ঋদ্ধিমানের ভারতীয় দলের জন্য আর বিবেচিত না হওয়া তবু মেনে নেওয়া যায়, বোর্ড সভাপতি সৌরভ যে দল নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না সে কথাও না হয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু ঋদ্ধিমানের মত বর্ষীয়ান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন খেলোয়াড় তো বাংলার তরুণ ক্রিকেটারদের কাছে অমূল্য সম্পদ হতে পারতেন। তাঁকে কেন ত্রিপুরায় চলে যেতে হল বাংলার ক্রিকেটকর্তাদের অপমানজনক ব্যবহারে? এ নিয়ে সরাসরি আঙুল ওঠা উচিত ছিল সৌরভের দিকে। তিনি বোর্ড সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের প্রতিনিধি হিসাবেই। সুতরাং এ ব্যাপারে তাঁর হস্তক্ষেপ করা বেআইনিও হত না। কিন্তু এসব পশ্চিমবঙ্গে কোনো আলোচনার বিষয়ই নয়। কারণ সম্ভবত সৌরভ যতটা বাঙালি, ঋদ্ধিমান ততটা বাঙালি নন।

এশিয়ান গেমসে হেপ্টাথলনে সোনা জয়ী স্বপ্না বর্মনও সৌরভের মত বাঙালি নন নিশ্চয়ই। নইলে স্বপ্নার মধ্যপ্রদেশে চলে যাওয়া আটকাতে মুখ্যমন্ত্রী নিজে আসরে নামলেন না কেন? কোথায় গেল বাঙালির ভাবাবেগ?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা তুলে দেওয়াই কি উদ্দেশ্য?

পশ্চিমবঙ্গের কাগজ, টিভি চ্যানেলের মালিক, সম্পাদক, উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিশেষজ্ঞ ও বিখ্যাতদের ছেলেপুলেরা প্রায় কেউই সরকারি স্কুলে পড়ে না। ফলে দিব্যি ওসব স্কুলের রোগবালাইকে অগ্রাহ্য করে থাকা গিয়েছিল।

ঘটনাচক্রে আমার পিতৃকুল, মাতৃকুলের অধিকাংশ আত্মীয় পেশায় শিক্ষক। তাঁরা অনেকেই আজ প্রয়াত। রাজনৈতিকভাবে সরকারি, বিরোধী, দুয়ের মাঝামাঝি— নানারকম দলের সদস্য, সমর্থক হলেও গত শতকের নয়ের দশকের শেষদিকে দেখতাম সকলেই একটি ব্যাপারে একমত— পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলো ক্রমশ উঠে যাবে। কারণ ওই স্কুলগুলো ভরে থাকত মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেমেয়েতে, যাদের বাবা-মায়েরা ক্রমশ তাদের বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। আমার শিক্ষক আত্মীয়রা বলতেন এই প্রবণতা বাড়তে বাড়তে একসময় সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলোতে পড়ে থাকবে কেবল তারা, যাদের বাবা-মায়েরা বেসরকারি স্কুলের খরচ পোষাতে পারবেন না। তাদের পড়াশোনা হল কি হল না তা নিয়ে শিক্ষকদেরও বিশেষ মাথাব্যথা থাকবে না, সরকারও দায়সারা স্কুল চালাবে। তখন কথাগুলো বিশ্বাস করিনি, কিন্তু আজ পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষার অবস্থা দেখে সেই আত্মীয়দের বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ দর্শনের পারদর্শিতা স্বীকার না করে উপায় নেই।

আমাদের ছাত্রাবস্থাতেই সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলো ধুঁকতে শুরু করেছিল। তার জন্যে দায়ী করা হয় বামফ্রন্ট সরকারের প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে। কিন্তু এই শতকে কী কারণে মধ্যবিত্ত বাবা-মায়েরা সরকারি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক স্কুলগুলোকে ত্যাগ করলেন তা অত সহজে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। একটা কারণ অবশ্যই কোন মাধ্যমে পড়ানো হচ্ছে তা নিয়ে বাঙালির অত্যধিক মাথাব্যথা। শিক্ষার গুণমান নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে অনেক বাবা-মাই ছেলেমেয়ের ইংরেজিতে গড়গড়িয়ে কথা বলতে পারা নিশ্চিত করতে চান। অর্থাৎ স্কুল তাঁদের কাছে প্রকৃতপক্ষে সারাদিনব্যাপী স্পোকেন ইংলিশ ক্লাস। সঙ্গে অন্য বিষয়গুলো পড়িয়ে দিলেই হল। ফলে সাধ্যাতীত এবং বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা নেই এমন মাইনে দিয়েও বেসরকারি স্কুলেই তাঁরা ছেলেমেয়েকে পাঠান। সে ধরনের অনেক স্কুলেরই শিক্ষকদের যোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয়, ফলে অনেকসময় ওই অভিভাবকরাই পড়াশোনার মান নিয়ে একান্ত আলোচনায় সন্দেহ প্রকাশ করেন। অথচ পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলোতে যাঁরা পড়ান, তাঁরা অন্তত ১৯৯৭-৯৮ সাল থেকে একটা প্রতিযোগিতামূলক লিখিত পরীক্ষা এবং ইন্টারভিউতে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে নিযুক্ত হচ্ছিলেন। তা সত্ত্বেও মধ্যবিত্তের বেসরকারি স্কুলে ছোটার পিছনে কি ‘বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে’ কুসংস্কার? নাকি বাজার অর্থনীতির ‘যা পয়সা দিয়ে কিনতে হয় না তা ভাল নয়’ আদর্শে আস্থা? উত্তর যা-ই হোক, মধ্যবিত্ত ছেলেমেয়েরা সরে যাওয়ায় স্কুলের প্রতি শিক্ষকদের এবং সরকারের আগ্রহ যে কমে গেছে তাতে সন্দেহ নেই। কিছুদিন আগেই তো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ স্কুল। বহু জায়গায় স্কুল চালু রাখতে শিক্ষকরা এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রছাত্রী ধরে আনছেন।

শিক্ষকসমাজ অবশ্যই কোনও মনোলিথ নয়। পশ্চিমবঙ্গের সব শিক্ষক একইরকম ভাবেন বা সকলেই ফাঁকিবাজ, বসে বসে মাইনে পান— এমন একটা মত ইদানীং রীতিমত জনপ্রিয় হয়েছে। সে মতে সায় দিচ্ছি না। কারণ ফাঁকিবাজ সব পেশাতেই ছিল, আছে এবং থাকবে। তা বলে একটা গোটা পেশার সকলেই অলস, অনিচ্ছুক কর্মী হয়ে যান না। কিন্তু যা বলার, তা হল স্কুলের পঠনপাঠন নিয়ে শিক্ষকদের নিরুৎসাহ করার সবরকম চেষ্টা সরকারি তরফে করা হয়েছে। মন দিয়ে পড়াতে চান এমন অনেক শিক্ষকই সখেদে বলেন, সিলেবাস শেষ করানো অতিমারির আগেও রীতিমত কঠিন ছিল। কারণ তাঁদের অনেকখানি সময় চলে যায় বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের জন্য ছেলেমেয়েদের তথ্যাবলি সংগ্রহ ও নথিবদ্ধ করতে, জিনিসপত্র বিলি করতে। স্কুলগুলো প্রায় রেশন দোকানের চেহারা নেয়, ক্লাস কাটছাঁট করতে হয়। তার উপর বর্তমান সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ছুটি কত বেড়েছে তা নিয়েও আলাদা গবেষণা হতে পারে। পুজোর ছুটি ফুরোতেই চায় না, গরমের ছুটি প্রায়শই নির্ধারিত দিনের আগেই শুরু হয়ে যায়, তারপর বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আগে ছুটির তালিকার বেশিরভাগটা ঠিক করতেন স্কুল কর্তৃপক্ষ, এখন চলে অঘোষিত এক-রাজ্য-এক-ছুটি নীতি। ফলে দক্ষিণবঙ্গ গরমে পুড়লে শীতল উত্তরবঙ্গেও স্কুল বন্ধ থাকে। কোনও স্কুল কর্তৃপক্ষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সরকারি ছুটি অগ্রাহ্য করে পঠনপাঠন চালু রাখতে চাইলে শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়। এর উপর আছে শূন্য পদের বিপদ। বহু স্কুলে অশিক্ষক কর্মীদের পদ ফাঁকা পড়ে আছে। সে কাজও শিক্ষকদেরই করতে হয়। এতসব করে আর কতটুকু পড়ানো সম্ভব?

এসব অভিভাবকদেরও বিলক্ষণ চোখে পড়ে। ছেলেমেয়েকে সরকারি স্কুলমুখো না করার পিছনে এসব কারণও কাজ করে এবং সেজন্য তাঁদের দোষ দেওয়া চলে না। উপর্যুক্ত বিপত্তিগুলোর চেয়েও শিক্ষকদের কাজকর্মে বেশি প্রভাব ফেলছে শিক্ষকের অভাব। যেসব স্কুলে এখনও ছাত্রছাত্রীর অভাব নেই, সেখানেও শিক্ষকের অভাব প্রকট। স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের যে স্বচ্ছ ও নিয়মিত ব্যবস্থা তৃণমূল সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল তাকে লাটে তুলে দেওয়ার ফলে বহু স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। উপরন্তু ইচ্ছামত বদলির ব্যবস্থায় কোথাও একই বিষয়ের শিক্ষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি, অথচ অন্য কোনও বিষয়ের একজন শিক্ষকও নেই।

অর্থাৎ শুধু যে রাস্তায় বসে থাকা (এবং মধ্যরাতে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যাওয়া) হবু শিক্ষকরাই অবিচারের শিকার, তা নয়। যাঁরা স্কুলে পড়াচ্ছেন তাঁরাও ভাল নেই। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সেইসব ছাত্রছাত্রীদের, যাদের বাবা-মা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্কুলের মাইনে জোগাতে পারেন না। অতিমারির সময়ে সরকার স্কুল খোলার নামই করছিল না, যেনতেনপ্রকারেণ বন্ধ রাখছিল দেখে অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন স্কুলগুলোকে লাটে তুলে দেওয়াই উদ্দেশ্য। সে কাজে অতিমারিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা যথার্থ। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, নিয়োগের পরীক্ষা নিয়ে বেলাগাম দুর্নীতি এবং চালু চাকরির পরীক্ষাটাকে অকেজো করে দেওয়া যে কেবল কর্মসংস্থান সংক্রান্ত ইস্যু নয়, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা লাটে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনারও অংশ সেকথা গত এগারো বছরে কারও মনে হয়নি। সেই ২০১৩ সালেই যখন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু পরিষ্কার বলেছিলেন, এসএসসি কি দুর্গাপুজো যে প্রতি বছর করতে হবে? একথা যে স্কুলশিক্ষার উপরে কুঠারাঘাত সেকথা রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীরা ছাড়া কেউ তখন বলেননি। পরবর্তীকালে যখন তদানীন্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় ঘোষণা করলেন এসএসসি, টেট ইত্যাদি পরীক্ষার মেধাতালিকা প্রকাশ করা হবে না, পাশ করলে প্রার্থীর কাছে এসএমএস যাবে কেবল, তখনও রাজ্যের লেখাপড়া জানা মানুষ কোনও উচ্চবাচ্য করেননি। একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হবে সরকারি উদ্যোগে অথচ তার মেধাতালিকা প্রকাশ করা হবে না— এ যে দুর্নীতির পথ প্রস্তুত করা, তা তখন কোন সাংবাদিক লিখেছিলেন? কোন শিক্ষাবিদ একটি উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লিখেছিলেন? আজকের দুর্নীতির নিন্দা করতে গিয়ে অনেকেই বাম আমলের নিয়োগ দুর্নীতি টেনে আনছেন। এতে হয়ত নিরপেক্ষতা প্রমাণ হয়, কিন্তু অস্বীকার করা হয় যে এসএসসি, টেট দুর্নীতির সঙ্গে প্রাক-এসএসসি যুগে টাকা দিয়ে চাকরি পাওয়ার তুলনা বস্তুত আলুর সঙ্গে আপেলের তুলনা। কারণ সেখানে স্থানীয় স্তরে দুর্নীতি হত, যা বন্ধ করতে সরকার কেন্দ্রীয় পরীক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিল। এখানে সরকার সচেতনভাবে একটি চালু ব্যবস্থা ধাপে ধাপে তুলে দিয়েছে যাতে কেন্দ্রীয়ভাবে দুর্নীতি করা সম্ভব হয়। যাঁরা বলেন পাঁচ টাকার দুর্নীতিও দুর্নীতি আর পাঁচ কোটি টাকার দুর্নীতিও দুর্নীতি, তাঁদের দেখলে সশরীরে ঈশ্বর দর্শনের মত অনুভূতি হতে পারে। কিন্তু তাতে একথা অপ্রমাণ হয় না যে তাঁরা যে কোনও কারণেই হোক স্থিতাবস্থার সমর্থক। পরিস্থিতির চাপে বর্তমান সরকারকে খানিকটা গাল দিচ্ছেন মাত্র। হয়ত কিছুটা বিবেকের দায়ে, কিছুটা নইলে লোকে খারাপ বলবে বলে।

আরও পড়ুন শিক্ষক দিবসের প্রশ্ন: শিক্ষকদের বাঁচাবে কে?

তৃণমূল সরকারের বরাবরের সমর্থক কেউ কেউ যেমন রাতের অন্ধকারে মহিলাসুদ্ধ আন্দোলনকারীদের পুলিসের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দৃশ্যে আর স্থির থাকতে পারেননি। বলেছেন বলপ্রয়োগ কাম্য নয়, আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যা মিটিয়ে ফেলা হোক। এসব বিবৃতি দিলে হয়ত বিবেকের ডাকে সাড়া দেওয়া হয় বা সাধারণ মানুষের কাছে নিজের ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল করা যায়। কিন্তু এগুলির বক্তব্য দুর্বোধ্য। ভাবখানা এমন যেন সরকার বাহাদুর এ দুর্নীতিতে যুক্তই নন। তৃতীয় পক্ষ টাকা নিয়ে চাকরি দিয়ে যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করেছে। এখন সরকার এদের অভিভাবকের আসনে বসে বুঝিয়েসুঝিয়ে মিটিয়ে দিলেই সব মিটে যায়। যেন সরকার মেধাতালিকা প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয়নি, প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী এই মামলায় হাজতবাস করছেন না, যেন আদালত কান ধরার আগে সরকার নিজেই দোষীদের খুঁজে খুঁজে শাস্তি দেওয়া শুরু করেছিল।

হিন্দিভাষীরা বলে থাকেন “দাল মে কুছ কালা নেহি হ্যায়, পুরা দাল হি কালা হ্যায়।” পশ্চিমবঙ্গের নিয়োগ দুর্নীতির ব্যাপারটাও যে তাই তা এখনও অনেকেই বুঝতে পারছেন না বা বুঝতে চাইছেন না। কারণ এই সত্য তাঁদের রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। কিন্তু চুপ করে থাকতেও পারছেন না, কারণ যে ছেলেমেয়েগুলোকে লাঞ্ছিত হতে দেখা গেছে তারা মোটের উপর নিজের শ্রেণির। এরা মইদুল ইসলাম মিদ্যার মত বিরোধী দলের মিছিলে আসা বা আনিস খানের মত দলীয় রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া গেঁয়ো মুসলমান নয় যে তাদের মৃত্যুতে চোখ ফিরিয়ে থাকা যাবে। পশ্চিমবঙ্গের কাগজ, টিভি চ্যানেলের মালিক, সম্পাদক, উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিশেষজ্ঞ ও বিখ্যাতদের ছেলেপুলেরা প্রায় কেউই সরকারি স্কুলে পড়ে না। ফলে দিব্যি ওসব স্কুলের রোগবালাইকে অগ্রাহ্য করে থাকা গিয়েছিল। কিন্তু এখন যারা মার খাচ্ছে তাদের মুখের ভাষা শুনে, বেশভূষা দেখে পরের ছেলে পরমানন্দ, যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ ভেবে আর থাকা যাচ্ছে না। এতদিনে সত্যিই গা শিরশির করছে— এরপর কোনও ইস্যুতে যদি আমাদের ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গেই সরকার এরকম ব্যবহার করে! এতদিন যারা মার খেয়েছে, নানাভাবে অত্যাচারিত হয়েছে তাদের অবস্থা এবং অবস্থানকে নানা যুক্তিতে আমল না দেওয়া এই মানুষদের জন্যই বোধহয় কবি লিখেছিলেন “যাদের করেছ অপমান/অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।”

চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন হয়ত শেষ অবধি ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে সরকারি প্রতাপে বা কৌশলে, হয়ত সব যেমন চলছিল তেমনই চলবে। কিন্তু তারা অন্তত সাতে পাঁচে না থাকা বাঙালির হাড়ে ঠকঠকানি ধরানোর কাজটুকু করতে পেরেছে বলে ধন্যবাদার্হ।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বিপুল ক্ষমতা ভোগ করেও মিস্টার বেচারা বাংলার সৌরভ?

সুযোগ পেলে যা ইচ্ছে তাই করতে প্রাক্তন খেলোয়াড়রা যে কম যান না তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ফরাসি ফুটবলের কিংবদন্তি মিশেল প্লাতিনি।

পি সতশিবম আর রঞ্জন গোগোইয়ের বেশ নিন্দা হয়েছিল। কারণ তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসাবে অবসর নেওয়ার পর যথাক্রমে কেরালার রাজ্যপাল আর রাজ্যসভার মনোনীত সদস্যের পদ গ্রহণ করেছিলেন। নিজেরে করিতে গৌরব দান নিজেরে কেবলই করি অপমান – এ কথার এমন জলজ্যান্ত উদাহরণ আমাদের দেশেও বিরল। সব পেশাতেই কিছু কাজ আছে যা বেআইনি না হলেও অশোভন বলে সাধারণত কেউ করেন না। যেমন মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ার পর পাঞ্জাব বা অসমের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের টিকিটে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হতে যাননি। কাল মুখ্যমন্ত্রিত্ব চলে গেলে মমতা ব্যানার্জিও কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে তৃণমূলের মেয়র পদপ্রার্থী হবেন না সম্ভবত। কিন্তু সতশিবম আর গোগোই শোভনতার ধার ধারেননি। তাঁদের সিদ্ধান্তে ভারতের বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে প্রশ্ন আলাদা, কিন্তু ক্ষমতার জন্য তাঁরা কতখানি লালায়িত তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। স্বেচ্ছায় পদাবনতিও যে কারোর অভীষ্ট হতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত হত। বিশ্বাস করা আরও সহজ করে দিলেন আমাদের ঘরের ছেলে সৌরভ গাঙ্গুলি। আরও ছোট পরিসরে আরও ছোট একটা পদের জন্য তিনি ঝাঁপিয়েছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী তথা শক্তিশালী ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি পদে প্রায় তিন বছর কাটানোর পর এখন তিনি ঘোষণা করেছেন ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের সভাপতি পদের প্রার্থী হবেন।

সৌরভ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডে পৌঁছেছিলেন সিএবি হয়েই। কিন্তু সিএবির মসনদে তাঁকে বসিয়ে দিয়েছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। দীর্ঘদেহী সৌরভ খর্বকায় মুখ্যমন্ত্রীর পিছনে লক্ষ্মী ছেলের মত দাঁড়িয়ে আছেন আর মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বিশাল ছায়া দিয়ে সৌরভকে আড়াল করে সিএবি সভাপতি হিসাবে তাঁর নাম ঘোষণা করছেন – এ দৃশ্য অনেকেরই এখনো মনে আছে। দুর্জনে বলে মুখ্যমন্ত্রী ওভাবে হাতে ধরে চেয়ারে বসিয়ে না দিলে সৌরভের পক্ষে সিএবি সভাপতি হওয়া শক্ত ছিল। কারণ খেলার মাঠে অধিনায়ক হিসাবে তিনি দলের মধ্যে যতটা জনপ্রিয় ছিলেন, মাঠের বাইরে বাংলার ক্রিকেট প্রশাসকদের মধ্যে ততটাই অপ্রিয়। কারণটাও সহজবোধ্য। সৎ বা দুর্নীতিগ্রস্ত যা-ই হোন, ময়দানে যাঁরা ক্লাব চালান তাঁরা বছরের পর বছর বহু সময় ব্যয় করে নিজেদের ব্যবসা বা চাকরির খানিকটা ক্ষতি করেই কাজটা করেন। সেই কাজের মধ্যে দিয়ে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করে অ্যাসোসিয়েশনের রাজনীতিতে সফল হয়ে সিএবির পদাধিকারী হতে হয়। কথাটা বিশ্বনাথ দত্ত বা জগমোহন ডালমিয়ার মত প্রবাদপ্রতিম প্রশাসকদের ক্ষেত্রে যতটা সত্যি, একদা সিএবির যুগ্ম সচিব প্রয়াত শরদিন্দু পাল বা গৌতম দাশগুপ্তের ক্ষেত্রেও ততটাই সত্যি। তাঁরা যথাক্রমে কুমোরটুলি আর শ্যামবাজার ক্লাব চালিয়েছেন কয়েক দশক। অথচ সৌরভ সেসব কিছুই করলেন না। খেলা ছাড়ার পরের কয়েক বছর ধারাভাষ্য, বিজ্ঞাপনে মুখ দেখানো, টিভির পর্দায় দাদাগিরি করতে করতেই সিএবির যুগ্ম সচিব হয়ে গেলেন। তারপর স্রেফ মুখ্যমন্ত্রীর আশীর্বাদে ডালমিয়ার মৃত্যুর পর সিএবি সভাপতি হয়ে বসলেন।

সৌরভভক্তরা স্বভাবতই রেগে যাবেন, বলবেন খেলাটা যখন ক্রিকেট, তখন সৌরভ কত বড় ক্রিকেটার সেটাই তো আসল কথা। মাঠে অত বড় বড় কীর্তি যার, তাকেও প্রশাসনে আসতে হলে আগে ক্লাবের হেঁশেল ঠেলতে হবে – এ অন্যায় দাবি। শরদিন্দু, গৌতমরা ক্রিকেটের কী জানেন? কত হাজার রান আছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে? তাঁদের মত দীর্ঘকাল লড়তে হবে কেন সৌরভকে? এই মনোভাব কেবল ভক্তদের নয়। সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত কমিটি অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর্সের প্রধান বিনোদ রাইও নবগঠিত বোর্ডের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে যাওয়ার সময়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন সৌরভের মত মানুষ বোর্ড সভাপতি হলেন বলে। রাই বলেছিলেন সৌরভই ওই পদের পক্ষে যোগ্যতম। স্বাধীনতার আগে থেকে মূলত অক্রিকেটার লোকেদের দ্বারা চালিত ভারতীয় বোর্ডে যে পরিমাণ অব্যবস্থা এবং দুর্নীতি চলেছে, যার ফলে সুপ্রিম কোর্ট এন শ্রীনিবাসনকে পদচ্যুত করে বোর্ডের আমূল সংস্কার করার নির্দেশ দিয়েছিল, তাতে প্রাক্তন ক্রিকেটারদের উপরে অত্যধিক ভরসা করা হয়ত স্বাভাবিক। কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রাক্তন খেলোয়াড়রা প্রশাসনে এলেই প্রশাসন দুর্নীতিমুক্ত হবে, স্বেচ্ছাচার চলবে না – এমনটা পৃথিবীর কোথাও প্রমাণিত হয়নি। সুযোগ পেলে যা ইচ্ছে তাই করতে প্রাক্তন খেলোয়াড়রা যে কম যান না তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ফরাসি ফুটবলের কিংবদন্তি মিশেল প্লাতিনি। যদিও তিনি কোনো মুখ্যমন্ত্রীর প্রসাদে ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের সর্বোচ্চ পদে আসীন হননি, দস্তুরমত ফুটবল রাজনীতি করেই অতদূর উঠতে হয়েছিল। আসলে ফিফা প্রাক্তন খেলোয়াড় মানেই ঈশ্বরপ্রেরিত প্রশাসক – এমনটা বিশ্বাস করে না। প্রাক্তন ফুটবলারদের জন্য আলাদা করে জায়গা সংরক্ষণও ফিফার নীতিবিরুদ্ধ। সম্প্রতি যে যে কারণে ফিফা সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনকে নির্বাসন দিয়েছিল, তার অন্যতম হল সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত কমিটি অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর্সের প্রস্তাবিত সংবিধানে প্রাক্তন ফুটবলারদের জন্য আলাদা করে পদের ব্যবস্থা। ফিফার সাফ কথা – প্রাক্তন ফুটবলার প্রশাসনে স্বাগত, কিন্তু তাকে আসতে হবে রাজ্য অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমেই। অর্থাৎ ফুটবলারকে প্রশাসক হয়ে উঠতে হবে, প্রাক্তন বলে প্রশাসনকে বাইপাস করা চলবে না।

সৌরভ যেরকম মসৃণভাবে অফ সাইডে ফিল্ডিংয়ের ফাঁক দিয়ে বাউন্ডারি খুঁজে ফেলতেন, সেরকমভাবেই ক্ষমতায় পৌঁছনোর বাইপাস খুঁজে নেন। নবান্নে ধরনা দিয়ে সিএবি সভাপতি হয়েছিলেন, বোর্ড সভাপতি হয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের প্রসাদে। তাঁকে ওই পদে থাকতে দেওয়া হল না বলে এই মুহূর্তে ডান, বাম নির্বিশেষে বাঙালি ক্ষুব্ধ। সেই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরে আর কোনো ঘটনায় বোধহয় বাঙালিকে এতখানি ঐক্যবদ্ধ করা যায়নি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে পরিষ্কার, যাঁর প্রসাদে বোর্ডের সভাপতি হওয়া গিয়েছিল, তাঁর বিরক্তিতেই পদ হাতছাড়া হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে তো সবিস্তারে লেখা হয়েছে, ৬ অক্টোবর গভীর রাতে অমিত শাহের বাড়িতে এক বৈঠকে ঠিক হয় সৌরভকে এবার সরিয়ে দেওয়া হবে। মজার কথা, সেখানে সৌরভের কার্যকলাপ নিয়ে নানা আপত্তি তোলেন শ্রীনিবাসন এবং উপস্থিত অন্য বোর্ডকর্তারা তাঁর কথায় সায় দেন। কোন শ্রীনিবাসন? যাঁর কুকীর্তির ফলে বোর্ডে ওলোট-পালট হয়ে সর্বোচ্চ আদালতের নজরদারিতে সংস্কার হয়েছিল। সেই শ্রীনিবাসন দেখা যাচ্ছে আজও যথেষ্ট ক্ষমতাশালী। কে বোর্ড সভাপতি হবে তা তিনি এখনো নির্ধারণ করতে পারেন। বস্তুত ২০১৯ সালে সৌরভের সভাপতি হওয়ার পিছনেও তাঁর সম্মতি ছিল। তাহলে কী লাভ হল লোধা কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সংস্কার করে? কী লাভ হল সৌরভের মত প্রবাদপ্রতিম ক্রিকেটার বোর্ড সভাপতি হয়ে?

সংবাদমাধ্যমে জোর জল্পনা, সৌরভকে নাকি অমিত শাহ সরিয়ে দিলেন তিনি বিজেপিতে যোগ দিতে রাজি হননি বলে। একথা পাতে পড়তে না পড়তেই ভারতের বিজেপিবিরোধী, উদারপন্থী মানুষ একেবারে টপ করে গিলে নিয়েছেন। সৌরভের কেমন শক্ত মেরুদণ্ড তা গ্রেগ চ্যাপেলের পর অমিত শাহও টের পেয়ে গেলেন ইত্যাদি মর্মে সোশাল মিডিয়া বিদীর্ণ করছেন অনেকেই। এরপর ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে যদি সৌরভের দিদি তাঁকে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে প্রার্থী করে ফেলেন তাহলে ‘লিবারেল’ হিসাবে সৌরভের দর আকাশছোঁয়া হয়ে যাবে। সকলে ইতিমধ্যেই ভুলে গেছেন, সৌরভ এতদিন চেয়ারে বসেছিলেন দেশের দু নম্বর বিজেপি নেতা অমিত শাহ ও তদীয় পুত্র জয় শাহের সৌজন্যেই। শুধু তা-ই নয়, বোর্ডের নতুন সংবিধান অনুযায়ী সৌরভের কার্যকাল সভাপতি হওয়ার দশ মাস পরেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। বর্তমান কর্মকর্তাদের মেয়াদ বাড়ানো হোক – সুপ্রিম কোর্টে এই সংবিধানবিরোধী আর্জি জানিয়ে ফেভিকলের বিজ্ঞাপনের নেতার মত নিজ নিজ চেয়ারে এতদিন বসেছিলেন সৌরভ, জয়রা। সুপ্রিম কোর্ট এত ব্যস্ত যে সে আর্জির শুনানির দিন কেবলই পিছিয়েছে। আড়াই বছর পর গত মাসে বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় (যিনি আগামী মাসে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসাবে কার্যভার গ্রহণ করবেন) ও হিমা কোহলি রায় দিলেন, তিন বছর নয়, বোর্ড সভাপতি, যুগ্ম সচিব ও অন্যরা একটানা ছ বছর বহাল থাকতে পারবেন। অর্থাৎ ২০১৮ সালের রায়ের একেবারে উল্টো পথে হেঁটে নতুন সংবিধান বদলে অনেকাংশে পুরনো জায়গায় ফিরে যাওয়া হল। এ হেন ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ করে নেওয়া সৌরভ আজ বাংলার চোখে মিস্টার বেচারা। এতটাই বেচারা যে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে বলবেন, সৌরভকে যেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের পদের জন্য লড়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। সৌরভের পদচ্যুতি বাঙালির জাতীয় সংকট। মুখ্যমন্ত্রী কি চুপ করে থাকতে পারেন?

তবে রবীন্দ্রনাথের পরে বাঙালিকে সবচেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছেন যিনি, সেই সৌরভ দেখা যাচ্ছে কম রাবীন্দ্রিক নন। বিপদে মোরে রক্ষা করো, দিদির কাছে এ নহে তাঁর প্রার্থনা। তিনি চন্দ্রচূড়-কোহলির রায় নির্ঘাত খুঁটিয়ে দেখেছেন, আইনের ফাঁক খুঁজে ক্ষমতা ধরে রাখার বুদ্ধিতে তিনি সুপ্রিম কোর্টের দুই প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সতশিবম আর গোগোইয়ের উপর দিয়ে যান। রায়ে বলা আছে, ক্রিকেট প্রশাসনের একেক স্তরে ছ বছর ক্ষমতায় থাকার পরে কুলিং অফ পিরিয়ড থাকবে, স্তর বদলে গেলে নয়। ফলে সিএবি সভাপতি হয়ে তিনি আরও কিছুদিন নিশ্চিন্তে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন; বোর্ড সভাপতি হওয়ার পরে রাজ্য সংস্থার সভাপতি হওয়া দু-চারজনের যতই দৃষ্টিকটু মনে হোক।

এতে বাংলার ক্রিকেটের কী লাভ হবে সে প্রশ্ন অবান্তর। সৌরভ এর আগেও সিএবি সভাপতি ছিলেন, তাতে বাংলার ক্রিকেট কতটা উন্নত হয়েছে সে হিসাব কেউ দেন না। বোর্ড সভাপতি হয়ে ভারতীয় ক্রিকেটের কেমন ছন্নছাড়া অবস্থা করে ছেড়েছেন তা তো চোখের সামনেই দেখা যাচ্ছে। সাফল্য বলতে অতিমারীর মধ্যেও আইপিএল আয়োজন। অবশ্য আইপিএল চালানো ছাড়া অন্য কাজ আছে বলে হয়ত সৌরভ-জয় মনেই করেননি। তাই আইপিএল চালু ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও চালু থাকা রঞ্জি ট্রফি বন্ধ ছিল। ওদিকে জাতীয় দলে বিশৃঙ্খলার চূড়ান্ত। বিরাট কোহলির অধিনায়কত্ব যাওয়া নিয়ে নাটক; বিরাট প্রধান নির্বাচক চেতন শর্মা, সভাপতি সৌরভসুদ্ধ গোটা বোর্ডকে সাংবাদিকদের সামনে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করলেন, কিন্তু কোনো শাস্তি হল না। সমস্ত ক্রিকেট খেলিয়ে দেশে জাতীয় দল ঘোষণা হলে তা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন নির্বাচকরা। কে আহত, কাকে বাদ দেওয়া হল তা নিয়ে পরিষ্কার বিবৃতি দেন। ভারতেও বরাবর এমন ব্যবস্থাই চালু ছিল। সৌরভের আমলে সেসব উঠে গেছে। কে যে কখন বিশ্রাম নিচ্ছেন আর কে চোটের জন্য বাইরে থাকছেন তা বোঝা দুষ্কর। নানারকম খবর সংবাদমাধ্যমে ভাসতে থাকে আর যে ক্রিকেটপ্রেমীর যা বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে তিনি তা-ই মেনে নেন।

আরও পড়ুন নিশীথিনী-সম

সৌরভের নিজের আচরণও প্রশ্নের ঊর্দ্ধে নয়। বোর্ড সভাপতির বিজ্ঞাপনী মডেল হওয়া ক্রিকেট-পৃথিবীর অষ্টমাশ্চর্য। তাও আবার বোর্ডের সাথে স্পনসরশিপ চুক্তিতে আবদ্ধ সংস্থার প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থার বিজ্ঞাপনে। এসব প্রশ্ন গত তিন বছরে বোর্ডের সভায় উঠেছে, কিন্তু লাভ হয়নি। কারণ সৌরভের ঢাল ছিলেন জয় শাহ। তাছাড়া যে দেশে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং অমুক কোম্পানি, তমুক কোম্পানির বিজ্ঞাপন আলো করে খবরের কাগজগুলোর প্রথম পাতায় বসতে পারেন, সেখানে ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতিকে আটকাবে কে?

এইভাবে দুহাতে কামানো সৌরভ বাংলার আপামর মানুষ ও মুখ্যমন্ত্রীর চোখে আজ বঞ্চিত, নিপীড়িত। সেই নিপীড়নের অবসান হবে কী হলে? সৌরভকে বিশ্বক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থার প্রধানের নির্বাচনে প্রার্থী হতে দিলে। তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কাছে সৌরভের হয়ে আর্জি জানিয়েছেন। ক্রিকেটের এহেন গণতন্ত্রীকরণ গভীর আশাব্যঞ্জক। বোর্ডটা তুলে দিয়ে সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের হাতে দিয়ে দিলে হয় না? সংসদে তো আজকাল রাজনৈতিক বিতর্ক বিশেষ হয় না। না হয় ক্রিকেট দল নির্বাচনটা ওখানে হবে।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

জাতীয় ফুটবল দলের ইতিহাসের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত

মুখবন্ধে সম্পাদক জয়দীপ বসু ও তাঁর সহকারী সায়ন মুখার্জি নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, স্রেফ প্রচ্ছদ দেখলেও টের পাওয়া যাচ্ছে যে এ বই ততটা ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস নয়, যতটা ভারতীয় ফুটবল দলের ইতিহাস।

ভারতের ফুটবল এখন কোথায় দাঁড়িয়ে তা সংক্ষেপে বোঝাতে হলে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে ইন্ডিয়ান সুপার লিগের দলগুলো ঝাঁ চকচকে হোটেলে সর্বোচ্চ মানের সুযোগসুবিধা নিয়ে থাকে, বিমানে যাতায়াত করে; জাতীয় গেমসে সোনার পদক জয়ী বাংলা দলের ফুটবলাররা বাড়ি ফেরেন দু রাত ট্রেনে কাটিয়ে। ট্রেনে চড়ায় কোনো অন্যায় নেই, অপমানও নেই। কিন্তু দু ধরনের ফুটবলের দুস্তর ব্যবধান এতে স্পষ্ট হয়। ভারতীয় ফুটবল অবশ্য এভাবেই চলে। রাজ্য দল দূরের কথা, জাতীয় দলও ক্লাব দলগুলোর মত সুযোগসুবিধা ভোগ করে না। ভারতের জাতীয় দলের পরিচর্যায় ইদানীং বিপুল উন্নতি হয়ে থাকলেও দীর্ঘকাল জাতীয় দলে খেলা সম্মানের, সেখানে দেশপ্রেম জড়িত – এই আবেগের শাক দিয়ে পারিশ্রমিকের মাছ ঢেকে রেখেছিলেন ফুটবল কর্তারা। তখন থেকেই ভারত আন্তর্জাতিক ফুটবলে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর সমস্ত ফুটবলোন্নত দেশেই ক্লাব ফুটবল বেশি অর্থকরী, তার গ্ল্যামারও বেশি। তা বলে জাতীয় দল হেলা শ্রদ্ধার পাত্র নয়। সুনীল ছেত্রী ব্যক্তিগত দক্ষতায় লায়োনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর পাশে জায়গা করে নিলেও আন্তর্জাতিক ফুটবল মানচিত্রে কিন্তু ভারতীয় দল কোথাও নেই। অথচ ফুটবলে যখন বিশ্বকাপ নয়, অলিম্পিককেই মনে করা হত সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতার মঞ্চ, তখন এই ভারতই ১৯৫৬ সালের মেলবোর্ন অলিম্পিকে চতুর্থ হয়েছিল। এই অবনমনের ইতিহাস ধরা পড়েছে ভারতীয় ফুটবল দলের ৭৫ বছরের ইতিহাস নিয়ে লেখা বক্স টু বক্স বইতে।

মুখবন্ধে সম্পাদক জয়দীপ বসু ও তাঁর সহকারী সায়ন মুখার্জি নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, স্রেফ প্রচ্ছদ দেখলেও টের পাওয়া যাচ্ছে যে এ বই ততটা ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস নয়, যতটা ভারতীয় ফুটবল দলের ইতিহাস। তরুণ ফুটবলপ্রেমীদের প্রায়শই হা হুতাশ করতে দেখা যায় ভারত বিশ্বকাপ ফুটবলের ত্রিসীমানায় পৌঁছতে পারে না বলে। অথচ তাঁদের ধ্যান জ্ঞান ক্লাব ফুটবল। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল আইএসএল খেলতে পারল কি না পারল তা নিয়ে যত আগ্রহ তার ছিটেফোঁটাও জাতীয় ফুটবল দল নিয়ে দেখা যায় না। সুনীল ছেত্রী যদি বর্তমান প্রজন্মের খেলোয়াড় না হয়ে প্রাক্তন হতেন তাহলে তাঁর কীর্তি নিয়ে কার কতটা আগ্রহ থাকত যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সন্দেহ নেই এর জন্যে অনেকখানি দায়ী ভারতীয় ফুটবল দলের সাফল্যের অভাব। ১৯৭০ সালের এশিয়ান গেমস আর মারডেকা কাপে ব্রোঞ্জ মেডেলের পর বলার মত সাফল্য আর কোথায়? সাফ কাপ বা এশিয়ান চ্যালেঞ্জ কাপের খেতাব যে খুব বড় কোনো সাফল্য নয় তার প্রমাণ পাওয়া যায় এশিয়ান কাপের মূলপর্ব বা বিশ্বকাপের যোগ্যতামান পর্বের খেলা এসে পড়লেই। কিন্তু ব্যর্থতার ইতিহাসও তো জানা জরুরি। সম্ভবত সাফল্যের ইতিহাস জানার চেয়েও বেশি জরুরি, কারণ ব্যর্থতার সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসই সাফল্যের ইমারত গড়ার মশলা। আইএসএলে মত্ত ফুটবলপ্রেমীদের সামনে সেই ইতিহাস তুলে ধরার কাজ করেছে বক্স টু বক্স। ফুটবলপ্রেমীদের প্রেম কতটা এ বইয়ের কপালে জুটবে তা বলা শক্ত, কিন্তু নথি হিসাবে এ বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।

তথ্য সংকলন করা পরিশ্রমসাধ্য হতে পারে, অসম্ভব নয়। কিন্তু কেবল তথ্য ইতিহাস হয়ে ওঠে না। পাহাড়প্রমাণ তথ্য ঘেঁটে একজন বা দুজন যদি ভারতীয় ফুটবল দলের ইতিহাস লিখতেন তাহলে গভীরতায় ঘাটতি থাকতে পারত, একপেশে ইতিহাস তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই বইয়ের সবচেয়ে বড় গুণ হল দুই সম্পাদক এবং পরিসংখ্যানবিদ গৌতম রায় ছাড়া আরও ১৪ জন ফুটবল সাংবাদিকের বয়ানে ইতিহাসকে তুলে ধরা। বাকি পৃথিবীর সাংবাদিকতায় ‘সুপার স্পেশালাইজেশন’-ই দস্তুর। কিন্তু ভারতে তা নানা কারণে অসম্ভব। অতিমারীর আগে পর্যন্ত তবু ফুটবল সাংবাদিক, ক্রিকেট সাংবাদিক, টেনিস সাংবাদিক – কাজের এরকম বিভাজন অন্তত বড় সংবাদমাধ্যমগুলোতে দেখা যেত। করোনার ধাক্কা থেকে নিজেদের লাভের কড়ি বাঁচাতে গিয়ে মালিকরা ওটুকুও লাটে তুলে দিয়েছেন। এমন আবহে এই বইয়ে হায়দরাবাদের ফুটবল নিয়ে লিখেছেন সেখানকার সাংবাদিক (এন গণেশন ও জি রাজারমণ), বাংলার ফুটবল নিয়ে কলকাতার সাংবাদিক (পুলকেশ মুখোপাধ্যায়), কেরালা (লেসলি জেভিয়ার), গোয়া (মার্কাস মারগুলহাও), মুম্বাই (মারিও রডরিগেজ) সম্বন্ধে লিখছেন সেখানকার অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা; পাঞ্জাব (এস এস শ্রীকুমার) ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল (বৈভব রঘুনন্দন) নিয়ে বিশেষজ্ঞরা – এই ব্যবস্থার জন্য সম্পাদকদের আলাদা প্রশংসা প্রাপ্য। ভারতীয় ফুটবল দলের সাফল্য-ব্যর্থতার ইতিহাস নথিবদ্ধ করতে হলে যে এইসব এলাকার ফুটবল নিয়ে স্বতন্ত্র আলোচনা দরকার, এই ভাবনাও প্রশংসার যোগ্য।

এত বড় দেশের খেলা নিয়ে আলোচনা বিকেন্দ্রীভূত হলে তবেই যে গভীর হয় তার বড় প্রমাণ পুলকেশবাবুর প্রবন্ধ ‘Royal or Not, Bengal’। পিকে ব্যানার্জি, অমল দত্ত বা বাঘা সোমের কোচিংয়ের খ্যাতি তো দেশজোড়া। কিন্তু কজন জানেন হুগলী-ব্যান্ডেল এলাকার অশ্বিনী বরাটের কথা? পুলকেশবাবু লিখেছেন, সুরজিৎ সেনগুপ্তের বাঁ পা প্রথম দিকে তেমন সচল ছিল না। অশ্বিনী (নিজের অঞ্চলে ভোলাদা নামে খ্যাত) বেশ কিছুদিন প্র্যাকটিসের প্রথম আধ ঘন্টা সুরজিৎকে ডান পায়ে বল ছুঁতে বারণ করে দিয়েছিলেন। তার ফলে ১৯৭৩ সালের রোভার্স কাপের প্রথম প্র্যাকটিস সেশনের পরেই সুরজিতের ক্লাব কোচ পিকে স্ত্রীকে চিঠিতে লেখেন তাঁর নতুন ছাত্রটির মধ্যে এক বিরল গুণ দেখা যাচ্ছে। তার দুটো পা-ই সমান সচল।

এমন মণিমুক্তো ছড়িয়ে আছে রাজ্যভিত্তিক প্রবন্ধগুলোর সবকটাতেই। তবে ভারতীয় দলের সর্বকালের সেরা কোচ সৈয়দ আব্দুল রহিমের শহর এবং মহম্মদ হাবিব, আকবর, সাবির আলির মত ফুটবলারের জায়গা হায়দরাবাদ নিয়ে প্রবন্ধটি অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন থেকে অন্ধ্রপ্রদেশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এই শতকের গোড়ায় দশ বছর সাসপেন্ড থাকার অনুল্লেখে। ভারতীয় ফুটবলে হায়দরাবাদের যে স্থান ছিল সেখান থেকে আজ স্রেফ এক আইএসএল ফ্র্যাঞ্চাইজে পরিণত হওয়ার ঘটনাক্রমে দেশের ফুটবল মানচিত্রে ওই দীর্ঘ অনুপস্থিতি অবশ্যই বড় কারণ।

ভারতীয় ফুটবল দল কীভাবে অলিম্পিক আবির্ভাবেই ইউরোপকে চমকে দিয়েছিল, এক অজ্ঞাতনামা ব্রিটিশ সাংবাদিকের কলমে সেই বয়ান দিয়ে আরম্ভ হয়েছে বক্স টু বক্স, আর বইয়ের দ্বিতীয় অংশ শুরু হয়েছে জয়দীপবাবুর লেখা ‘Doomsday: Cash vs Country’ দিয়ে। জাতীয় দলের পাতাল প্রবেশের সেই শুরু। এ লেখার শুরুতেই দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে যেমন তেমনভাবে ফুটবলারদের জাতীয় দলের খেলিয়ে নেওয়ার যে প্রচেষ্টার কথা লিখেছি, তার সূচনাবিন্দু রয়েছে জয়দীপবাবুর ওই প্রবন্ধে।

১৯৮২ এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতি হিসাবে ১৯৮১ থেকেই লম্বা শিবির এবং মারডেকা কাপে অংশগ্রহণ ছাড়াও জাতীয় দলের জন্য একাধিক টুরের বন্দোবস্ত করেছিল সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ)। কিন্তু ফুটবলারদের জন্য যথাযোগ্য পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করা হয়নি। ১৯৮১ সালের গোড়ায় সল্টলেক স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের শিবির বসে। খেলোয়াড়দের রাখা হয়েছিল নির্মীয়মান স্টেডিয়ামে মশামাছিতে ভর্তি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। তার উপর তাঁদের ১৯৮১-৮২ মরসুমে ক্লাবের হয়ে খেলার অনুমতিও দেওয়া হচ্ছিল না। বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন খেলোয়াড়রাও নাছোড়বান্দা। ফুটবল ফেডারেশন তখন তাঁদের লিখিত বিবৃতি দিতে বলে, যে তাঁরা ক্যাম্প ছেড়ে ক্লাবের হয়ে খেলতে যেতে চান এবং জাতীয় দলের টুর্নামেন্টের আগে আবার ফেরত আসবেন। জয়দীপবাবু লিখেছেন, ওই মর্মে দেওয়া বিবৃতিতে সই করে বেরিয়ে যাওয়া খেলোয়াড়দের ‘রেবেলস’, ‘ডেজার্টার্স’, ‘অ্যান্টি-ন্যাশনালস’ আখ্যা দেয় সংবাদমাধ্যমগুলো। ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার এবং জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার ওই ফুটবলারদের কড়া নিন্দা করে। জ্যোতিবাবু স্বয়ং বিধানসভায় মুলতুবি প্রস্তাবের জবাবে এঁদের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন। এসবের জেরে ভাস্কর গাঙ্গুলি, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, সুব্রত ভট্টাচার্য, প্রসূন ব্যানার্জি, প্রশান্ত ব্যানার্জির মত ফুটবলাররা প্রায় একমাস বাড়ি থেকে বেরোতে পারেননি বলে উল্লেখ করেছেন জয়দীপবাবু। কলকাতার তিন প্রধান, যারা ওই খেলোয়াড়দের উস্কেছিল, তারাও পাশে দাঁড়ায়নি। শেষমেশ খেলোয়াড়দের বাবা-মায়েরা ফেডারেশন সেক্রেটারি অশোক ঘোষের কাছে ক্ষমা চান, কিন্তু ফেডারেশন অনমনীয় মনোভাব বজায় রাখে। নিয়ম করা হয়, জাতীয় শিবিরে সুযোগ পেলে মেডিকাল কারণ না থাকলে বা বাদ না পড়লে শিবির ছেড়ে যাওয়া চলবে না।

তখনো ভারতীয় ফুটবলে পেশাদারি কাঠামো তৈরি হয়নি। কিন্তু খেলোয়াড়রা অনেকেই যে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসেন এবং ক্লাবগুলোর কাছ থেকে যথেষ্ট ভাল পারিশ্রমিক পান তা গোপন ছিল না। ফেডারেশন সেই ব্যবস্থাকে আইনি কাঠামোয় নিয়ে এসে কোনো বিকল্পের কথা ভাবতে পারত। তা না করে গা জোয়ারি ব্যবস্থা করা হয়। শেষপর্যন্ত অধুনালুপ্ত ন্যাশনাল স্পোর্টস কাউন্সিলের কর্তা প্রয়াত ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশর মধ্যস্থতায় দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া ফুটবলাররা সে মরসুমে ক্লাবের হয়ে খেলার অনুমতি পান এবং মরসুমের পর থেকে এশিয়ান গেমসের শিবিরে থাকবেন বলে ঠিক হয়। জাতীয় শিবিরে থাকলে মাসে ২,০০০ টাকা করে পারিশ্রমিক দেওয়া হবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়। জয়দীপবাবু যথার্থই লিখেছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠা হলেও সম্মানহানি আটকানো গেল না। জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার সম্মান, ফুটবলারদের সম্মান।

অবশ্য জাতীয় দলের খেলার গুরুত্ব লঘু করে দেওয়ার সর্বনাশা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল আগেই। তা নিয়ে বিশেষ কাউকে লেখালিখি করতে দেখা যায় না। জয়দীপবাবু এই একই প্রবন্ধে সবিস্তারে সে সম্পর্কে লিখেছেন। বস্তুত প্রবন্ধটি শুরুই হয় ১ জুন, ১৯৭৩ তারিখের ঘটনা দিয়ে। সেদিন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় সশরীরে দিল্লি গিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী (খেলাধুলো তখন ওই মন্ত্রকের অধীনে) নুরুল হাসানকে জানিয়ে আসেন, কলকাতার তিন প্রধানের পক্ষে মারডেকা কাপের জন্য জাতীয় শিবিরে খেলোয়াড় পাঠানো সম্ভব নয়। কারণ তখন কলকাতা ফুটবল লিগ পুরোদমে চলবে। সে বছর মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহমেডান স্পোর্টিংয়ের খেলোয়াড়দের ছাড়াই ভারত মারডেকা কাপে যায় এবং ষষ্ঠ স্থানে শেষ করে। জয়দীপবাবুর মতে, নকশাল আন্দোলন পরবর্তী বাংলার যুবসমাজকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সিদ্ধার্থশঙ্কর কলকাতার ফুটবলকে ব্যবহার করেন। আদতে ক্ষতি হয় ভারতীয় ফুটবলের। ক্লাবের স্বার্থে জাতীয় দলের স্বার্থকে বিসর্জন দেওয়া চলে – এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা পায় একজন মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরে। এসব পড়তে পড়তে তির্যক হাসি না হেসে পারা যায় না। কারণ যে কলকাতা লিগের খেলার জন্য জাতীয় দলের খেলাকে তুচ্ছ করা হয়েছিল, সেই কলকাতা লিগ আজ ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে। মোহনবাগান সগর্বে বলে দিতে পারছে তারা লিগে খেলবে না। সেকালের কর্মকর্তারা মনে করতেন কলকাতা লিগ খেতাবের চেয়ে বড় পুরস্কার ফুটবল বিশ্বে নেই, আজকের কর্তারা মনে করেন আইএসএল খেললেই মোক্ষলাভ, কলকাতা লিগ ফালতু। মাঝখান থেকে ভারতীয় ফুটবল গোলকধাঁধায় ঘুরে মরছে, এগোতে পারছে না।

ঠিক সে কথাই লিখেছেন ধীমান সরকার। তাঁর প্রবন্ধের নাম ‘Going Around In Circles’। তিনি শুরুতেই অপ্রিয় সত্যটা বলে দিয়েছেন। ১৯৯৮ থেকে ২০২২ – এই আড়াই দশকে শুটিং, বক্সিং, ভারোত্তোলন, ব্যাডমিন্টন, কুস্তির মত যেসব খেলায় ভারত অলিম্পিকে যেত স্রেফ অংশগ্রহণ করতে; সেসবে পদক জিতে ফেলেছে, বিশ্বনাথন আনন্দ প্রথম ভারতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার হিসাবে শুরু করে পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে গেছেন। অথচ ভারতীয় ফুটবল দল লুই ক্যারলের থ্রু দ্য লুকিং গ্লাস গল্পের অ্যালিসের মত প্রাণপণ দৌড়েও সেই দক্ষিণ এশিয়ার এক শক্তিশালী দলই হয়ে রয়েছে। আই লিগকে দুয়োরানিতে পরিণত করা আইএসএল যে ভারতীয় ফুটবলে কোনো যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারেনি, বরং ভারতের ক্লাব ব্যবস্থার আরও ক্ষতিই করেছে তা ধীমানবাবুর লেখায় স্পষ্ট। এমতাবস্থায় জাতীয় দলের উন্নতির আশাও যে দুরাশা তা উচ্চারণ করতে তিনি কসুর করেননি।

আরও পড়ুন বড়লোকের খেলা

বক্স টু বক্স এভাবে ইতিহাস আলোচনার মধ্যে দিয়ে বর্তমান বিশ্লেষণ ছাড়া আরও একটা জরুরি কাজ করেছে, তা হল ভারতীয় দলের হয়ে অবিস্মরণীয় খেলা দেখানো যে কিংবদন্তীরা আজকের প্রজন্মের অচেনা, তাঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। ডাঃ টি আওকে নিয়ে লিখেছেন শারদা উগ্রা, তুলসীদাস বলরামকে নিয়ে সিদ্ধার্থ সাক্সেনা, রহিম সাহেবকে নিয়ে জয়দীপবাবু। অত্যন্ত মূল্যবান অরুণ সেনগুপ্তের নেওয়া সুধীর কর্মকারের সাক্ষাৎকারও। নিজের খেলা, নিজের প্রজন্মের খেলা এবং বর্তমান প্রজন্মের খেলার মান সম্পর্কে এত নির্মোহ মূল্যায়ন করতে আজকাল কোনো খেলার প্রাক্তনদেরই দেখা যায় না।

দু মলাটের মধ্যে শ আড়াই পাতায় ভারতীয় ফুটবল দলের ইতিহাসের নানা দিক জানতে চাইলে, বর্তমানকে ভাল করে বুঝতে চাইলে বক্স টু বক্স চমৎকার। ভুয়ো খবরের যুগে ভারতীয় ফুটবল দলের ১৯৫০ বিশ্বকাপে না খেলা নিয়ে নিয়মিত ব্যবধানে যে গুজবটা ছড়ানো হয়ে থাকে সোশাল মিডিয়ায়, তা খণ্ডন করতেও সাহায্য করবে কাশীনাথ ভট্টাচার্য এবং জয়দীপবাবুর লেখা দুটো প্রবন্ধ। তবে কিছু অসঙ্গতি এড়ানো গেলে ভাল হত। যেমন সায়নবাবুর ‘Golden Quarter’ বলছে ১৯৪৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকের পর ইউরোপ টুরে একটা ম্যাচে আজাক্স আমস্টারডামকে ভারতীয় দল হারিয়েছিল ৫-১ ব্যবধানে। কিন্তু শারদা উগ্রার লেখায় ব্যবধানটা হয়ে গেছে ২-১। প্রথম তথ্যটাই সঠিক, কিন্তু এই অসঙ্গতি পাঠককে দিগভ্রান্ত করবে। যে বইতে যত্ন করে ভারতীয় দলের ৭৫ বছরের গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান পর্যন্ত সৃজন করা হয়েছে, ছাপা হয়েছে একগুচ্ছ মূল্যবান ছবি, সে বইতে এ ধরনের ভুল কাম্য নয়।

বক্স টু বক্স
সম্পাদনা: জয়দীপ বসু
প্রকাশক: আইএমএইচ
দাম: ৬৫০ টাকা

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

অলক্ষ্মী না হলে বাঁচবে না আমাদের লক্ষ্মী মেয়েরা

পুলিস যেখানে মিটিং করার অনুমতি দেয়নি ঠিক সেখানটাই পার্টিকর্মী, সমর্থকদের দিয়ে ভরিয়ে ফেলে ম্যাটাডোরের উপর দাঁড়িয়ে বলতে পারেন, মিটিং কোথায় হবে মানুষ ঠিক করবে। পুলিস ঠিক করবে না। এমন দস্যি মেয়েদেরই আমরা লক্ষ্মীছাড়া বলতে অভ্যস্ত।

লক্ষ্মীপুজো কবে? দুর্গাপুজোর পরেই তো? নাকি দিওয়ালি নাগাদ? প্রশ্নটা এই পুজোর মরসুমে রীতিমত ভাবিয়েছে। দিনকাল যেভাবে বদলাচ্ছে। হাফপ্যান্ট পরা বয়স থেকে দেখে আসছি বাঙালি গণেশপুজো করে অক্ষয় তৃতীয়ায়। কিছু দোকান হালখাতা পয়লা বৈশাখে করে না, করে সেইদিন। এখন চুল পাকতে শুরু করার পর দেখছি বাঙালির ঘরে ঘরে, ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে গণেশ চতুর্থীর হিড়িক। দুর্গাপুজোর ঢাকের বাদ্যিও শুরু হয়ে যাচ্ছে অকালবোধনের একমাস আগে। পঞ্চমী তো বটেই, আমাদের আমলে জাঁদরেল বাবা-মায়েরা ষষ্ঠীর দিনও সকালে পড়তে বসাতেন, বিকেল থেকে ছুটি। এখনকার বাবা-মা মহালয়ার দিনই ছেলেমেয়েকে সাজিয়ে গুজিয়ে বাতানুকূল গাড়িতে চাপিয়ে ঠাকুর দেখতে নিয়ে যাচ্ছেন। এতকিছু যখন বদলাচ্ছে, তখন মেঝেতে সারি সারি লক্ষ্মীর পায়ের আলপনা দেওয়ার পুজো ধনতেরাসে বিলীন হতেই পারে। তাই চোখকান খোলা রাখতে হয়। আগে অবশ্য আমাদের বছরে একদিন লক্ষ্মীপুজো করে আশ মিটত না, বাড়িতে লক্ষ্মী মেয়ে তৈরি করার প্রকল্প চলত সারাবছর। শ্বশুরবাড়িতে লক্ষ্মী মেয়েদের চাহিদা এখনো কম নয়, তবে বাবা-মায়েদের কাছে আজকাল অলক্ষ্মী মেয়েদের যথেষ্ট আদর হয়েছে। ছেলের মত বা ছেলের চেয়েও বেশি করে বংশের মুখ উজ্জ্বল করতে যে অলক্ষ্মীরাই পারে, তার ভুরি ভুরি প্রমাণ পাওয়া গেছে। সুতরাং কাল পর্যন্ত যাদের অলক্ষ্মী বলা আমাদের অভ্যাস ছিল, এখন তাদেরই লক্ষ্মী মেয়ে বলে মেনে নেওয়ার দিন। যেমন

মীরাবাঈ চানু, পিভি সিন্ধু, লভলীনা বরগোহাঁই: পিটি ঊষা বা অঞ্জু ববি জর্জ মান্ধাতার আমলের মহিলা নন, কিন্তু কেরিয়ারের সেরা সময়েও তাঁদের যদি বলা হত, আর মাত্র দুই দশকের মধ্যেই কোনো অলিম্পিকে ভারতের জেতা পদকের অর্ধেক জিতবে মেয়েরা, ঊষা আর অঞ্জু নিশ্চয়ই হেসে উড়িয়ে দিতেন। কিন্তু ভারোত্তোলক চানু, ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় সিন্ধু আর মুষ্টিযোদ্ধা লভলীনা ঠিক সেটাই করে দেখিয়ে দিয়েছেন গত বছরের টোকিও অলিম্পিকে। একজন পেশি ফুলিয়ে লোহা তোলেন, একজন জনসমক্ষে ছোট ছোট জামাকাপড় পরে লম্ফঝম্প করে ঠাঁই ঠাঁই করে শাটল পেটান। তৃতীয় জন আরও এক কাঠি সরেস – ঘুঁষোঘুঁষি করেন। কী ভীষণ অলক্ষ্মী! আরেকটু হলে মেয়েদের হকি দলও পদক জিতে ফেলছিল। ভারতীয় মেয়েরা এখনো অলিম্পিকে সোনা জেতেননি। অলক্ষ্মীরা এভাবে দলে ভারি হতে থাকলে ২০২৪ সালে প্যারিসে সে অভাবও মিটে যেতে পারে।

দীপ্তি শর্মা, হরমনপ্রীত কৌর: ক্রিকেট খেলার জন্ম বিলেতে আর বিলেতে খেলার দেবভূমি হল লর্ডসের মাঠ। সেই মাঠে সাহেবদের জব্দ করে দিতে পারা কত বড় কাণ্ড তা আজ থেকে কুড়ি বছর আগে জামা খুলে মাথার উপর বনবন করে ঘুরিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের পুরুষদের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি। কদিন আগে সেই লর্ডসেই ইতিহাসে প্রথমবার মেমদের তিনটে একদিনের ম্যাচের তিনটেতেই হারিয়ে দিল ভারতের মহিলা ক্রিকেট দল। উপরন্তু ইংরেজদের কাটা ঘায়ে ঠান্ডা মাথায় নুন ঘষে দিলেন অফস্পিনার দীপ্তি আর অধিনায়িকা হরমনপ্রীত। ইংল্যান্ড ব্যাটার চার্লি ডিন বারবার আগেভাগেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। দীপ্তি বল করতে গিয়ে বেল ফেলে দিলেন। তৃতীয় আম্পায়ার খতিয়ে দেখে জানালেন এখন যে নিয়ম বলবৎ হয়েছে সে নিয়ম অনুযায়ী চার্লি আউট, ম্যাচ খতম। কিন্তু ব্যাপারটা কেবল ইংরেজ নয়, আরও অনেকেরই হজম হয়নি। সাহেবদের তৈরি খেলা, ফলে তারা দাবি করে আইনটাই শেষ কথা নয়, কেতাও বজায় রাখতে হবে (কেতার গালভরা নাম ‘স্পিরিট অফ ক্রিকেট’)। দীপ্তি যদি কাণ্ডটা করেও থাকেন, হরমনপ্রীতের উচিত ছিল আউটের আবেদন ফিরিয়ে নেওয়া। ক্যাপ্টেন বলে কথা। ম্যাচের শেষে টিভির প্রতিনিধি হরমনপ্রীতকে এ নিয়ে প্রশ্নও করলেন। দেখা গেল হরমনপ্রীত, ‘বসন্ত বিলাপ’ ছবির অপর্ণা সেনের মতই, ‘অত্যন্ত ইমপোলাইট’। বললেন যা করা হয়েছে আইন মেনেই হয়েছে। এরকম হলে আমি আমার বোলারকেই সমর্থন করব। ২৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় ইংরেজরা মনে এত ব্যথা পেয়েছে যে পুরুষদের একদিনের দলের অধিনায়ক জস বাটলার হপ্তাখানেক পরেও বলেছেন, আমি হলে কখনো এমন হতে দিতাম না। বিশ্বকাপ ফাইনালে আমার দলের কোনো বোলার এমন করলেও আমি আউট হওয়া ব্যাটারকে ফিরিয়ে আনব।

মীনাক্ষী মুখার্জি: ইনি যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি বা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী নন, বিদেশ থেকে ডিগ্রি বা ব্র্যান্ডেড হাতব্যাগ – কোনোটাই নিয়ে আসেননি। রবীন্দ্রসঙ্গীত বা ‘বেলা চাও’ গাইতে পারেন না, ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’ গানে নাচতেও পারেন না। কলকাতার ভদ্রলোকেদের বাংলায় কথা বলতে পারেন না, চোস্ত ইংরেজি বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। কী পারেন তাহলে? পুলিস লক আপে মার খেয়েও সোজা থাকতে পারেন, যেখানে তাঁর পার্টির তেমন সংগঠন নেই সেখানে দাঁড়িয়েও পুলিসকে ধমকাতে পারেন, জনতাকে উদ্বেল করতে পারেন। পুলিস যেখানে মিটিং করার অনুমতি দেয়নি ঠিক সেখানটাই পার্টিকর্মী, সমর্থকদের দিয়ে ভরিয়ে ফেলে ম্যাটাডোরের উপর দাঁড়িয়ে বলতে পারেন, মিটিং কোথায় হবে মানুষ ঠিক করবে। পুলিস ঠিক করবে না। এমন দস্যি মেয়েদেরই আমরা লক্ষ্মীছাড়া বলতে অভ্যস্ত। পশ্চিমবঙ্গের দশ বছর ধরে মিইয়ে থাকা শান্ত বিরোধী রাজনীতিতে অশান্তি হানতে পেরেছেন মীনাক্ষী। মধ্যবিত্তপ্রধান সিপিএমে গরীব ঘর থেকে উঠে আসা এই মেয়ে নূতন যৌবনের দূত। যে পথে এ রাজ্যের বামপন্থীরা আর কোনোদিন হাঁটতে পারবে না বলে মনে হচ্ছিল, সে পথের হদিশ যে পাওয়া গেছে বলে মনে হচ্ছে তাতে রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের অবদান অনেকখানি, কিন্তু মীনাক্ষীর অবদানও কম নয়।

আরও পড়ুন ঝুলন সেরা বাঙালি ক্রিকেটার? মোটেই না

রিয়া কুমারী: প্রচলিত অর্থে লক্ষ্মী মেয়ে বোধহয় বিহারের মহিলা উন্নয়ন কর্পোরেশনের চেয়ারপার্সন হরজোৎ কৌর ভামরা। বহুদূর লেখাপড়া করে আইএএস পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পায় যে মেয়ে তাকেই তো লক্ষ্মী মেয়ে বলে। কিন্তু সম্প্রতি বিহার সরকারের উদ্যোগে মেয়েদের ক্ষমতায়ন নিয়ে এক কর্মশালায় ধরা পড়ে গেছে, যে হরজোৎ মানসিকতায় একজন প্রবল পিতৃতান্ত্রিক পুরুষমানুষ। তাঁকে ধরে ফেলেছেন ১৯ বছর বয়সী ঠোঁটকাটা রিয়া কুমারী, যাঁকে কেউ লক্ষ্মী মেয়ে বলবে না হয়ত। রিয়া জানতে চেয়েছিল সরকার ২০-৩০ টাকায় স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবস্থা করতে পারে কিনা। হরজোৎ বলেছেন, এরপর তোমরা সরকারের কাছে জিনস চাইবে। তারপর সুন্দর জুতো চাইবে। তারপর কি কন্ডোমও চাইবে? রিয়া তাতে দমে যায়নি। আমলাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, সরকার নির্বাচিত হয় নাগরিকদের ভোটে। নাগরিকদের দাবিদাওয়া থাকতেই পারে।

ভারত রাষ্ট্র যে পথে চলেছে তাতে রিয়া নয়, রাষ্ট্র্বের কাছে হরজোৎই লক্ষ্মী মেয়ে। কিন্তু ভারতীয় মেয়েদের বাঁচতে হলে রিয়ার মত অবাধ্য, অলক্ষ্মী হতে হবে। লক্ষ্মীঠাকুরে যাঁদের বিশ্বাস আছে তাঁরা বরং প্রার্থনা করতে পারেন, এ দেশের মেয়েদের যেন ইরানের মেয়েদের মত লক্ষ্মীছাড়া হয়ে উঠে প্রাণ দিতে না হয়।

সলিল চৌধুরী স্মরণে একটি মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যা

গত তিরিশ বছরে বাঙালির সংস্কৃতি চর্চা ক্রমশ যে কোনো উপলক্ষে গোটা দশেক রবীন্দ্রসঙ্গীত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাওয়া আর সত্যজিৎ রায়ের গোটা পাঁচেক ছবির চর্বিতচর্বণের কানাগলিতে ঢুকে পড়েছে। যে ‘কালচার’ নিয়ে বাঙালির গর্বের শেষ নেই, তাতে যে গর্ব করার মত আর কোনো পাত্র-পাত্রী আছেন বা সঙ্গীত, নাটক, সিনেমা ইত্যাদির আর কোনো ধারা আছে তা টের পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এমন নয় যে রবীন্দ্রচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে বা সত্যজিতের ছবির চর্চা অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে। আসলে ক্রমিক আত্মবিস্মৃতির ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিতের উইকেট দুটোই এখনো টিকে আছে, বাকিরা জনমন থেকে ক্রমশ কতিপয় রসিকের বৈঠকখানায় অবসৃত হয়েছেন। ওরই মধ্যে সলিল চৌধুরীর অবস্থা কিছুটা ভাল। একসময় পাড়ার রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যায় গান গেয়ে, আবৃত্তি করে সংস্কৃতি চর্চায় হাতেখড়ি হত বঙ্গসন্তানদের। গত শতকের নয়ের দশক থেকে বুগি উগি সেই সন্ধ্যাগুলোকে স্থানচ্যুত করতে শুরু করে। এখন নানা বয়সের গানের রিয়্যালিটি শোয়ে বিখ্যাত হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষাই বাঙালি শিশু, কিশোরদের সংস্কৃতি চর্চার পথ নির্ধারণ করে। সেসব শোয়ে সলিলের গানের বেশ খানিকটা দাম আছে। তার একটা বড় কারণ তিনি একদা হিন্দি সিনেমা দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, লতা মঙ্গেশকরের মত শিল্পী তাঁর সুরে, কথায় বাংলা গানও গেয়েছেন। নইলে ওই দামও আজ সলিল পেতেন কিনা সন্দেহ।

ওটুকুর উপর ভরসা করে কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠন শহরাঞ্চলের প্রেক্ষাগৃহ ভাড়া করে সপ্তাহের মাঝখানে গোটা সন্ধে সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে – এ কথা চট করে বিশ্বাস হতে চায় না। ফলে যখন জানা যায় উত্তরপাড়ার ‘মীড়’ এই কাণ্ডটি ঘটাতে চলেছে ২২ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যায়, তখনই চট করে গুগল করে নিতে হয় সেদিন সলিলের জন্মদিন বা মৃত্যুদিন কিনা। শুধু সঙ্গীতচর্চা নয়, যে কোনো চর্চাই যে আসলে ৩৬৫ দিনের কাজ সেকথা আজকাল মনে রাখা শক্ত। গুগল সার্চ যখন জানিয়ে দিল সলিলের মৃত্যুদিন চলে গেছে সপ্তাহ দুয়েক আগেই আর জন্মদিনের মাস দুয়েক দেরি আছে, তখন বোঝা গেল আবেগ কাজে লাগিয়ে নাম কেনা মীড়ের সদস্যদের উদ্দেশ্য নয়। তাঁরা শ্রোতাদের ‘অতল সলিলে’ নিয়ে যেতে চান নিতান্ত সলিল চৌধুরীর গানের টানেই।

গান নির্বাচনেও দেখা গেল পরিশ্রমের ছাপ। মীড়ের কচিকাঁচারা সমবেত সঙ্গীতে ‘শ্রাবণ অঝোর ঝরে’, ‘ঝিলিক ঝিলিক ঝিনুক খুঁজে পেলাম’ ইত্যাদি গানে অন্য স্বাদ এনে দিয়েছে। বাংলা ভাষার এই দুর্দিনেও এক ঝাঁক বাঙালি কিশোর-কিশোরী নিখুঁত উচ্চারণে ‘দুপুরের রৌদ্রের নিঃঝুম শান্তি শান্তি/নীল কপোতাক্ষীর কান্তি’ গাইছে – এই দৃশ্য, এই ধ্বনি মনোমুগ্ধকর। কিন্তু পরিচালক সৌরভ চক্রবর্তী চমকে দিয়েছেন তাঁর ছাত্রীদের গাইতে দেওয়া একক গানের পছন্দে। ১৯৫৬ সালে জাগতে রহো ছবিতে আশা ভোঁসলের গাওয়া ‘ঠান্ডি ঠান্ডি সাওন কি পুহার’ গানটি আজ কতজনেরই বা পরিচিত? আরও বড় চমক লহনা ভট্টাচার্যের কণ্ঠে সলিল রচিত ও সুরারোপিত ‘সেই মেয়ে’। রবীন্দ্রনাথের ময়নাপাড়ার মেয়ে কৃষ্ণকলিকে শিল্পী সলিলের চোখ দেখেছিল ছেচল্লিশের মন্বন্তরে শীর্ণ বাহু তুলে কলকাতায় যারা ফ্যান ভিক্ষা করত তাদের মধ্যে। সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠে গায়ে কাঁটা দেওয়ার মত সেই গান কৈশোর না পেরনো লহনাকে গাইতে দিয়ে অনুষ্ঠানের নির্দেশক বিরাট ঝুঁকি নিয়েছিলেন। কিন্তু লহনা যে অনায়াস দক্ষতায় অত লম্বা এবং দুরূহ গানটি গেয়েছেন তা ঝুঁকি সার্থক করেছে।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে তথাগত ভট্টাচার্য অন্য স্বাদ এনে দিয়েছেন ‘মোর মতন আর দেশপ্রেমিক নাই’, বাড়ি থেকে পালিয়ে ছবির ‘আমি অনেক ঘুরিয়া শ্যাষে আইলাম রে কইলকাত্তা’, গঙ্গা ছবির ‘ইচ্ছা করে পরাণডারে’ ইত্যাদি গানগুলি গেয়ে।

শেষ শিল্পী ছিলেন সৌরভ স্বয়ং। ‘পাগল হাওয়া’, ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’ শিল্পী হিসাবে তাঁর জাত চেনায়। তবে এই সন্ধের পবিত্রতম মুহূর্ত তিনি তৈরি করতে পেরেছেন ‘যদি কিছু আমারে শুধাও’ গানে। সলিলের মত অত বড় শিল্পীর শিল্পকর্মেও অমন বিশুদ্ধ গানের সংখ্যা হয়ত খুব বেশি নয়। ওই গান গেয়ে আক্ষরিক অর্থে শ্রোতাদের অতল সলিলে নিয়ে যেতে পেরেছেন সৌরভ।

আরও পড়ুন সকল অহঙ্কার হে আমার

অনুষ্ঠানের মেজাজ যে তারে বাঁধা ছিল তাতে ঈষৎ বেসুরো ঠেকেছে ‘শপথ’ কবিতা অবলম্বনে নাচ এবং সমবেত কণ্ঠে ‘পথে এবার নামো সাথী’ গানটি। বিশেষত, গানটি যে সময়ে রচিত তার তুলনায় যুগ এতটাই বদলে গেছে, আমাদের পথে নামার অভ্যাস এতটাই কমে গেছে, নামার উদ্দেশ্যেরও এত তারতম্য ঘটেছে যে গানটি এখন নিজেই নিজের প্যারডি বলে মনে হয় অনেকসময়। দোষটা অবশ্য প্রতিবেদকের সিনিসিজমেরও হতে পারে। বরং অনেক বেশি কালজয়ী ‘রানার’। সৌরভের মত দরাজ গলার কোনো শিল্পীর কণ্ঠে ওই গান হয়ত মধুরতর স্মৃতি হয়ে উঠতে পারত।

সেদিন উত্তরপাড়া গণভবনে তিলধারণের জায়গা ছিল না লিখতে পারলে চমৎকার হত, কিন্তু ঘটনা হল বহু দর্শকের চেয়ে মনোযোগী দর্শক সঙ্গীতানুষ্ঠানের রসগ্রহণের পক্ষে বেশি সুবিধাজনক। সেদিক থেকেও ‘অতল সলিলে’ তৃপ্তিদায়ক। ইদানীং যে কোনো প্রেক্ষাগৃহে মোবাইল ফোনের আওয়াজ শিল্পী এবং অন্য দর্শকদের যতখানি বিরক্তি উদ্রেক করে, এদিন তার অর্ধেকও করেনি।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত