কতটা পথ পেরোলে পরে ভারত পাওয়া যায়?

আমাদের অনেকেরই সন্দেহ ছিল, আপনি ক্রমঅপসৃয়মান ভারতকে আদৌ খুঁজতে চান কিনা। ভারত জোড়ো যাত্রায় প্রমাণ হল, চান।

মাননীয় রাহুল গান্ধী,

মহাত্মা গান্ধীর শহিদ হওয়ার দিনে ভারত জোড়ো যাত্রার শেষ বিন্দুতে পৌঁছে শ্রীনগরে আপনি যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে অন্তত একটি চমৎকার কাজ হয়েছে। যারা বলে ব্যক্তিগত জীবন আর রাজনীতিকে আলাদা আলাদা বাক্সে রাখা উচিত, রাজনৈতিক কারণে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতি কাম্য নয়, তারা যে আসলে ব্যক্তিগত জীবনকে রাজনীতি কীভাবে প্রভাবিত করে তা বোঝে না অথবা কোনো উদ্দেশ্যে অন্যদের বুঝতে দিতে চায় না – তা আরও একবার পরিষ্কার হয়ে গেছে।

রাজনৈতিক আলোচনা মানেই তা নৈর্ব্যক্তিক হতে হবে – এই সংস্কার উদারপন্থী ও বাম রাজনীতিতে স্বতঃসিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নৈর্ব্যক্তিক, অর্থাৎ আবেগশূন্য। অথচ আবেগ বাদ দিয়ে মানুষ হয় না, মানুষ যা যা করে তার প্রায় কোনোটাই আবেগ বাদ দিয়ে করে না। রাজনীতি তো নয়ই। কিন্তু রাজনীতি তো বটেই, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা – সবই আবেগশূন্য হওয়াই যে অভিপ্রেত তা আমাদের জনজীবনে বহুকাল হল প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। সম্ভবত সেই কারণেই দক্ষিণপন্থীদের পক্ষে সহজ হয়েছে একেবারে উল্টো মেরুতে দাঁড়িয়ে আবেগসর্বস্বতা দিয়ে মানুষের মাথা খেয়ে দেশটার সর্বনাশ করা। আমরা সরকারি অফিসে, হাসপাতালে, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেগশূন্য ব্যবহার পাই, নেতাদের কাছ থেকে এবং আদালতে আবেগশূন্য ব্যবহার পাই। কারণ গোটা ব্যবস্থাটা অনবরত শিখিয়ে চলেছে, মানুষকে মানুষ হিসাবে ভাবা অন্যায়। তাকে দেখতে হবে নৈর্ব্যক্তিকভাবে। সকলকে ৪৭ফ বা ৬৯ঙ হিসাবে দেখাই নিরপেক্ষতা, ন্যায়বিচার। যে যেখানে ক্ষমতার বিন্যাসে উপরে থাকবে, সে ন্যায় করলেও মায়াদয়াহীনভাবেই করবে – এই আমাদের আজন্মলালিত সংস্কার। উল্টোদিকের মানুষটির সাথে মানুষ হিসাবে নয়, তার প্রাসঙ্গিক তকমার হিসাবে ব্যবহার করাই যেন ন্যায়। এভাবে চললে যা হওয়ার কথা আমাদের দেশে ঠিক তাই হয়েছে। ন্যায় আর হয় না, অধিকাংশ সময় অন্যায়ই হয় সাধারণ মানুষের প্রতি। তাই বোধহয় দক্ষিণপন্থীরা কাজের কথা বাদ দিয়ে কারোর হিন্দু আবেগ, কারোর অসমিয়া আবেগ, কারোর বাঙালি আবেগ, কারোর দলিত আবেগ, কারোর আদিবাসী আবেগে সুড়সুড়ি দিলে ভুল করে মনে হয় “এই তো আমাকে আমি হিসাবে দেখছে।” অতএব সমস্ত মনপ্রাণ তারই দিকে ধাবিত হয়। আপনার শ্রীনগরের বক্তৃতা শুনে মনে হল, আপনি এই কথাটা ধরে ফেলেছেন।

দুই দশকের সাংবাদিক জীবন বাদ দিন, প্রায় সাড়ে তিন দশকের রাজনৈতিক বক্তৃতা শোনার জীবনে মনে করতে পারছি না আর কোনো ভারতীয় রাজনীতিবিদকে কোনো জনসভার প্রতিটি মানুষের সঙ্গে আলাদা করে অথচ একত্রে কথা বলতে দেখেছি। কাশ্মীরের মানুষ এবং সেখানে মোতায়েন আধাসামরিক বাহিনী ও সেনাবাহিনীর জওয়ানদের যে এক পংক্তিতে দাঁড় করানো সম্ভব, একই বাক্যে তাঁদের সকলের যন্ত্রণা ছুঁয়ে ফেলা সম্ভব তা নরেন্দ্র মোদীর ভারতে কেন, রাজীব গান্ধীর ভারতেও আমরা কোনোদিন কল্পনা করতে পারিনি। কারণ সৈনিক বা সাধারণ কাশ্মীরি – এই গোষ্ঠীনামের পিছনের ব্যক্তিগুলির বেদনা বা আনন্দ নিয়ে ভাবার কথা রাজনীতিবিদ দূরে থাক, আমাদেরও মনে আসেনি। আপনি ফোনে নিজের ঠাকুমা এবং বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার স্মৃতি উল্লেখ করে বললেন, এ যন্ত্রণা মোদী-অমিত শাহ বুঝবেন না। কাশ্মীরের মানুষ বুঝবেন; সিআরপিএফ, বিএসএফ, সেনাবাহিনীর জওয়ানদের আত্মীয়রা বুঝবেন। কারণ তাঁরা এরকম ফোন কল পেয়ে থাকেন। ভারত জোড়ো যাত্রার উদ্দেশ্য এই ফোন কলগুলো আসা বন্ধ করা।

এভাবে বড়জোর শিল্পী, সাহিত্যিকদের কেউ কেউ ভাবতে পেরেছেন। কথাগুলো শুনেই মনে পড়ে গেল আজাজ খান নির্দেশিত হামিদ ছায়াছবিটির কথা। একমাত্র সেখানেই দেখেছিলাম ভারতীয় সেনার হাতে গুম হয়ে যাওয়া বাবার সন্ধানে থাকা আট বছরের ছেলে আর জন্মের পর থেকে সন্তানের মুখ না দেখা জওয়ানের যন্ত্রণাকে পাশাপাশি রাখা হয়েছিল। মোদী-শাহের নিষ্ঠুর পরিহাসে ২০১৯ সালে ওই ছবির নাম ভূমিকায় অভিনয় করা তালহা আর্শাদ রেশিকে নির্দেশক বেশ কিছুদিন জানাতেই পারেননি যে সে দেশের সেরা শিশুশিল্পীর পুরস্কার পেয়েছে। কারণ তখন গোটা কাশ্মীরের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে রেখেছিল ভারত সরকার, যা কাশ্মীরের মানুষেরও সরকার।

এই সংকট তো কেবল কাশ্মীরের মানুষের নয়। দেশের যেখানেই রাষ্ট্র অতিমাত্রায় শক্তিধর হয়ে উঠেছে, নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সংঘাত রাষ্ট্রের সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছে, সেখানেই এই সংকট স্বাধীনতার পর থেকে বারবার ঘটেছে, আজও ঘটে চলেছে। ঠিক যেমন রাষ্ট্রের হাতে ধর্ষিত হওয়া অথবা ধর্ষিত হয়ে রাষ্ট্রশক্তির কাছ থেকে নৈর্ব্যক্তিক (একজন ধর্ষিতার পক্ষে যা অমানবিকের নামান্তর) ব্যবহার পাওয়া এ দেশের মেয়েদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ কোনো নেতাকে কখনো জনসভায় বলতে শুনিনি – “আপনারা হয়ত দেখেছেন আমি যখন হাঁটছিলাম, বেশকিছু মহিলা কাঁদছিলেন। জানেন ওঁরা কেন কাঁদছিলেন? কয়েকজন আমার সাথে দেখা করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে কাঁদছিলেন ঠিকই, কিন্তু এমন অনেকেও ছিলেন যাঁরা কাঁদছিলেন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে। কেউ কেউ বলছিলেন ওঁদের যৌন হয়রানি হয়েছে, কয়েকজনের আত্মীয়ই কাণ্ডটা ঘটিয়েছে। শুনে আমি যখন বলতাম, আমি পুলিসকে বলি তাহলে? ওঁরা বলতেন, রাহুলজি, পুলিসকে বলবেন না। আমরা আপনাকে বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পুলিসকে বলবেন না। বললে আমাদের আরও ক্ষতি হবে। এই হল আমাদের দেশের বাস্তব।”

এ দেশ কত মহান তা নিয়ে কেবল সংঘ পরিবার তো নয়, আমাদের সকলেরই গর্বের শেষ নেই। সেই গর্বের আখ্যানে এই বাস্তব খাপ খায় না বলে আমরা এড়িয়ে যাই, রাজনৈতিক নেতারা তো এড়িয়ে যান বটেই। যে দলের যেখানে সরকার আছে সেখানে সে দলের নেতারা আরও বেশি করে এড়িয়ে যান, কারণ তাঁরা মনে মনে একে সমস্যা বলে জানলেও স্রেফ আইনশৃঙ্খলার সমস্যা বলেই ভাবেন। ফলে এসব কথা তুললে নিজের দলের সরকারের ঘাড়ে দোষ এসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেন। তার উপর পুলিসকে বললে সমস্যা বাড়বে – এ তো সরাসরি রাষ্ট্রবিরোধী কথা। সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলও তো রাষ্ট্রব্যবস্থার অঙ্গ। ব্যবস্থার মধ্যে থেকে তার বিরুদ্ধে কথা বলা চলে কখনো? অথচ আপনি বললেন। এখনো ভারতের বেশ বড় বড় তিনটে রাজ্যে আপনার দলের সরকার, অর্থাৎ সেখানকার পুলিস আপনার দলেরই হাতে। তার উপর আপনি, আপনার মা এবং বোন সারাক্ষণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকেন। তবু যে আপনি এসব কথা বললেন, এ কথা চট করে ভোলা যাবে না। যেখানে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বললেন, সেখান থেকে কুনান পোশপোরা ঠিক কত কিলোমিটার দূরে তা জানি না। তবে এটুকু বুঝতে পারি, আপনার কথাগুলো কেবল ওই কাণ্ডের ধর্ষিতাদের নয়, স্পর্শ করবে মণিপুরের সেই মহিলাদেরও, যাঁরা ২০০৪ সালে একদা উলঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন ইম্ফলের রাস্তায়, সঙ্গে ছিল ফেস্টুন। তাতে লাল অক্ষরে লেখা ছিল – INDIAN ARMY RAPE US। কথাগুলো নিশ্চয়ই ছুঁয়ে ফেলবে ছত্তিসগড়ের সোনি সোরিকে, বেঁচে থাকলে ছুঁয়ে ফেলত অর্চনা গুহকেও। সংবাদমাধ্যম যাকে নির্ভয়া নাম দিয়েছিল সেই মেয়েটিকে তো বটেই। এইসব কুকীর্তির সময়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল আপনার দলই। তবু আপনি এসব কথা বলেছেন বলে, বা সেইজন্যেই আরও বেশি করে আপনি ধন্যবাদার্হ, রাহুল। মানহারা মানবীর দ্বারে এসে দাঁড়ানোর সাহস খুব কম পুরুষের হয়। তাকে মানবী হওয়ার সম্মানটুকু দেওয়ার ক্ষমতাও অনেক শাসকেরই হয় না, নিজে মহিলা হলেও। আমি যে রাজ্যের বাসিন্দা সে রাজ্যের মহিলা মুখ্যমন্ত্রীই তো ধর্ষণ হলেই হয় ধর্ষিতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, নয় প্রতিবাদী মহিলাদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে তেড়ে যান, নতুবা ছেলেটি ও মেয়েটির মধ্যে প্রেম ছিল কিনা তার খোঁজ করেন। ভারতের রাজনীতিবিদদের থেকে এমন ব্যবহার পেয়েই ভারতীয় মেয়েরা অভ্যস্ত।

আরও পড়ুন রাহুলে না, বাবুলে হ্যাঁ: তৃণমূলের প্রকৃত এজেন্ডা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

আপনার বক্তৃতায় আপনি আরও অনেক কথা বলেছেন যেগুলো ভাল কথা, প্রয়োজনীয় কথা, বহুবার বলা কথা। তবু আবার বলা প্রয়োজন, কারণ কেউ বলছে না। যেমন আপনি ‘গঙ্গা-যমুনী তহজীব’-এর কথা, অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমানের যৌথ সভ্যতার কথা বলেছেন। কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত আপনার যাত্রার তুলনায় এনেছেন কাশ্মীর থেকে এলাহাবাদে নেহরু পরিবারের যাত্রার প্রসঙ্গ। সাংস্কৃতিকভাবে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী কেমন একই সূত্রে গাঁথা তা দেখাতে ব্যক্তিগত ইতিহাসের এই ব্যবহার যে একজন পাকা বক্তার লক্ষণ। কিন্তু যা আপনার গোটা বক্তৃতায় সারাক্ষণ ছেয়ে থেকেছে তা হল সংবেদনশীলতা। আরও সহজ করে বললে, কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষকে ছোঁয়ার ইচ্ছা। আপনি যেমন ধর্ষিত মহিলাদের কথা বলেছেন, তেমনই বলেছেন দুটি হতদরিদ্র ছেলের কথা, যাদের গায়ে জামা পর্যন্ত ছিল না, দেহ ছিল ধূলিমলিন। বলেছেন তাদের দেখেই মনে হয়েছিল উত্তর ভারতের শীতেও শুধু টি-শার্ট পরেই কাটিয়ে দেবেন। সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে কথাগুলো বানানো মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আপনার বক্তৃতার দিনেই নাগরিক ডট নেটে মনীষা ব্যানার্জি লিখেছেন “কথিত আছে চম্পারণে কস্তুরবা দেখেছিলেন, একটি ঝুপড়িতে দুই মহিলার মাত্র একটি কাপড়। একসঙ্গে দুজনে বাইরে বেরোতে পারেন না। এই কাহিনি গান্ধীকে কটিবস্ত্র ধারণে বাধ্য করে…”। ফলে সন্দেহ করা অমূলক নয়, যে এই কাহিনি আপনার জানা এবং আসলে তা থেকেই টি-শার্ট পরার সিদ্ধান্ত। যদি তাও হয়, তবু আজকের ভারতে একজন রাজনীতিবিদ সচেতনভাবে গান্ধীকে অনুকরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং গান্ধীর এমন একটি কাজ অনুকরণ করছেন যা করতে গেলে নিজেকে শারীরিক কষ্ট ভোগ করতে হয় – এ বড় কম কথা নয়। আমরা তো শুনে এসেছি আপনি ‘শাহজাদা’। আপনি নিজেও এই ভাষণে বলেছেন আজন্ম কোনো না কোনো সরকারি বাড়িতে থেকেছেন। শুধু সমালোচকের চোখ দিয়ে দেখলেও সেই লোকের এই ভূমিকার প্রশংসা না করে উপায় নেই। ঘৃণার ব্যাপারীদের কথা অবশ্য আলাদা।

ধূলিমলিন ছেলেদুটির কথা বলতে গিয়ে আপনি ফের তুলে এনেছেন আমাদের পালিশ করা ভারতবর্ষের কদাকার দিকটি। আপনারই এক সঙ্গী যে আপনাকে বলেছিলেন ওদের সাথে গলাগলি করা উচিত হয়নি, ওরা নোংরা – সেকথা বলে দিয়েছেন সর্বসমক্ষে। জানিয়েছেন, আপনার উত্তর ছিল “ওরা আমার এবং আপনার থেকে পরিষ্কার।” আবার বলি, একথা বানানো হওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু বানানো হলেও দোষের নয়। প্রথমত, একজন নেতা জনসভায় না ভেবেচিন্তে যা খুশি বলবেনই বা কেন? দ্বিতীয়ত, অস্পৃশ্যতা আজও আমাদের দেশে ইতিহাস হয়ে যায়নি। যাঁরা ভুক্তভোগী তাঁদের একথা যেভাবে ছোঁবে, আমার মত উচ্চবর্গীয় সাংবাদিককে সেভাবে স্পর্শ করবে না বলাই বাহুল্য। কয়েক হাজার বছর ধরে কোণঠাসা হয়ে থাকা সেইসব মানুষ ভারত জুড়ে গত আট বছরে আরও কোণঠাসা হয়েছেন, যতই একজন দলিতের পর একজন আদিবাসী রাষ্ট্রপতি হয়ে থাকুন। যেসব গালাগালি স্বাধীন ভারতে অন্তত তাঁরা পিছন ফিরলে ছুঁড়ে দেওয়া হত, আজকাল প্রকাশ্যেই দেওয়া হয়। তাঁরা জানলেন, নিদেনপক্ষে একজন নেতা আছেন ভারতীয় রাজনীতিতে, যিনি ওই ভাবনার, ওই ব্যবহারের বিরুদ্ধে।

আজকের ভারত যেমন হয়েছে, তাতে সারাক্ষণ কথাবার্তা চলে নাগরিকত্ব নিয়ে। অনেকদিন পরে কাউকে ভারতীয়ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে শুনলাম। ছোটবেলায় ইতিহাস বইতে পড়া “বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য” কথাটাকে আজ বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। সেই ঐক্য কীভাবে ভারতের সর্বত্র বিচিত্র ভাষায় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চিন্তায় ধরা পড়েছে আপনি সেকথা বলেছেন। গুজরাটের গান্ধী, আসামের শঙ্করদেব, কর্ণাটকের বাসবেশ্বর বা বাসবান্না, কেরালার নারায়ণ গুরু, মহারাষ্ট্রের জ্যোতিবা ফুলে – এঁদের সকলকেই আপনি ভারতীয়ত্বের নির্মাতা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামটা শুনতে না পেয়ে রাগ করব ভাবছিলাম। কারণ এমনকি জওহরলাল নেহরুও তাঁর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া গ্রন্থে ভারতীয়ত্বের নির্মাণে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ বলে মতপ্রকাশ করেছেন, গান্ধীর সঙ্গে তাঁকে একাসনে বসিয়েছেন (“Tagore and Gandhi have undoubtedly been the two outstanding and dominating figures of India in the first half of the twentieth century… Tagore and Gandhi bring us to our present age.”)। সেই রবীন্দ্রনাথের নাম করলেন না দেখে সত্যিই রাগ করতে যাচ্ছিলাম। তারপর খেয়াল হল, রবীন্দ্রনাথের নাম তো বহু নেতার মুখে শুনেছি। এমনকি মোদীও শালগ্রাম শিলার মত করে তাঁর নাম নিয়ে নেন, অসহ্য উচ্চারণে তাঁর কবিতার পংক্তি আউড়ে বাঙালিদের মোহিত করার চেষ্টা করেন ভোটের মুখে। কিন্তু নারায়ণ গুরু আর ফুলের মত দুজন বর্ণবাদবিরোধী মানুষের নাম ভারতের কোনো উচ্চবর্গীয় শীর্ষস্থানীয় নেতার মুখে কোনোদিন শুনেছি কি? এমনকি আপনার পূর্বপুরুষ নেহরুর উপর্যুক্ত বইটিতেও বর্ণাশ্রম শুরুতে ভাল উদ্দেশ্যেই চালু করা হয়েছিল, পরে মন্দ হয়ে যায় – এই জাতীয় মতামত প্রকাশ করা হয়েছে। গান্ধীও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে ছিলেন, বর্ণাশ্রমের বিরুদ্ধে নয়।

উপরন্তু আমরা যারা বিন্ধ্য পর্বতের এপাশে বাস করি এবং তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালির তফাত করতে পারি না; ওদিককার লোক হলেই দক্ষিণ ভারতীয় বলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হই, তাদের অনেকের কাছে তো নামদুটোই নতুন। সে নাম আপনি করলেন ভারতের একেবারে উত্তর প্রান্তে দাঁড়িয়ে। এমনটি না করলে “দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে” স্বপ্ন সত্যি হবে কী করে? স্বাধীনতার পর ৭৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এই আদানপ্রদান তো ঘটেনি, তাই তো সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরে মঙ্গলঘট ভরা হয়নি। আপনি কি পারবেন সেই ঘট ভরতে?

সে বড় কঠিন কাজ, সম্ভবত অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ। আজকের ভারতে যখন সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে, তখন এ কাজ আরও শক্ত। সত্যি কথা বলতে কি, আপনি সে কাজের যোগ্য লোক কিনা তার পরীক্ষা আপনি ক্ষমতায় না পৌঁছলে শুরুই হবে না। আপনি যতই বলুন, ভারত জোড়ো যাত্রা কংগ্রেসের জন্য করেননি, কংগ্রেসকে বাদ দিয়েও আপনি যা করতে চান তা করতে পারবেন না। আর সেই দলে আজও গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসাবে আছেন কমলনাথের মত লোক, যিনি এই সেদিন অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণে কৃতিত্বের ভাগীদার হতে চেয়েছেন। যোগ করেছেন, আসল কৃতিত্ব আপনার বাবা রাজীব গান্ধীর, কারণ ১৯৮৫ সালে তিনিই বাবরির তালা খুলিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়াও আছেন শশী থারুর, যিনি কে জানে কোন অধিকারে কদিন আগে ঘোষণা করে দিলেন, ভারতের মুসলমানরা পর্যন্ত আর গুজরাট ২০০২ নিয়ে ভাবতে চান না।

এঁদের নিয়ে কী করে ভারত জুড়বেন সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ভার আপনার। নেহরু যে গণতন্ত্রের কথা বলতেন সেই গণতন্ত্রের রীতি মেনে আপনার উপর সাগ্রহ কিন্তু সন্দিগ্ধ নজর রাখব আমরা, যারা এখনো প্রশ্ন তোলা এবং সমালোচনা করা সংবাদমাধ্যমের কাজ বলে মনে করি। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে ভারতের আজ এমন এক নেতা দরকার যাঁর ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি না হলেও বুকের ভিতরে কিছুটা পাথর আছে। যে কোনো ভারতবাসী ধ্বনি দিলে প্রতিধ্বনি পাবে। আপনার শ্রীনগরের বক্তৃতা শোনার পর মনে না করে পারছি না, আপনি তেমনই একজন।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতিকে উপযুক্ত স্থান দিতে হবে। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকলে কেউ এগোতে পারে না। কেবল রাজনীতি নয়, সাংবাদিকতাতেও তার ঊর্ধ্বে উঠতে হয়, তবেই সত্যের সন্ধান পাওয়া যায়। আমাদের হারিয়ে যাওয়া বা কখনো খুঁজে না পাওয়া ভারতের সন্ধানও সেভাবেই পাওয়া যাবে সম্ভবত। দূরদর্শনে যখন নেহরুর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া অবলম্বনে শ্যাম বেনেগালের ভারত এক খোঁজ ধারাবাহিক শুরু হয়, তখন আমার বয়স ছয়। আপনার বোধহয় ১৮। তখন না হলেও, এখন নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে সুপণ্ডিত নেহরু বইয়ের নামে দাবি করেছেন তিনি ভারতকে ‘আবিষ্কার’ করেছেন। অন্যদিকে বেনেগাল ওই বইয়ের মধ্যে দিয়ে ভারত দেশটাকে খুঁজে বেড়িয়েছেন। এতদিন আমাদের অনেকেরই সন্দেহ ছিল, আপনি ক্রমঅপসৃয়মান ভারতকে আদৌ খুঁজতে চান কিনা। ভারত জোড়ো যাত্রায় প্রমাণ হল, চান। আশা করি এ খোঁজ শ্রীনগরে শেষ হয়নি, শুরু হল।

ধন্যবাদান্তে

জনৈক সাংবাদিক।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

কী ঢাকছে সরকারি চোলি? কেনই বা ঢাকছে?

আজ বিবিসির তথ্যচিত্র মুছে দেওয়া হচ্ছে, কাল ২০০২ সালে গুজরাটে আদৌ কোনো দাঙ্গা হয়েছিল বলে পোস্ট করলেই তা মুছে দেওয়া হবে। আহসান জাফরি খুন হননি – ওটি ভুয়ো খবর। বিলকিস ধর্ষিত হননি – ওটিও ভুয়ো খবর।

চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়
চোলি কে পিছে?
চুনরী কে নীচে কেয়া হ্যায়
চুনরী কে নীচে?

আমাদের তখন সবে গোঁফের রেখা উঠছে। সন্ধেবেলা দূরদর্শনের ‘সুপারহিট মুকাবলা’ অনুষ্ঠানে খলনায়ক ছবির এই গান পরপর কয়েক সপ্তাহ বেজেছিল এবং আমাদের উদ্বেল করেছিল। তখনো বাঙালি ছেলেমেয়েরা ভূমিষ্ঠ হয়েই হিন্দিতে পণ্ডিত হয়ে যেত না, ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের বাবা-মায়েরাও দলে দলে হিন্দিকে তাদের দ্বিতীয় ভাষা করে তুলতে উদগ্রীব হতেন না। ফলে চোলি আর চুনরী শব্দদুটির অর্থ জানতে আমাদের কিঞ্চিৎ সময় লেগেছিল। জানার পর আমাদের রোমাঞ্চ কোন মাত্রায় পৌঁছেছিল তা আজকের স্মার্টফোন প্রজন্ম কল্পনা করতে পারবে না। কিছুদিন পরে সে রোমাঞ্চে জল ঢেলে দিতে কেউ বা কারা আদালতে মামলা ঠুকে দিল। গানটি শ্লীল না অশ্লীল তা নিয়ে প্রবল তর্কাতর্কি লেগে গেল, কিছুদিন পরে দেখা গেল জনপ্রিয়তায় একসময় এক নম্বরে উঠে যাওয়া ওই গান আর ‘সুপারহিট মুকাবলা’ অনুষ্ঠানে বাজানো হচ্ছে না। ইলা অরুণের গাওয়া ওই চারটি লাইন মোটেই অশালীন নয় – এই যুক্তির পক্ষে যারা, তাদের হাতিয়ার ছিল অলকা ইয়াগনিকের গাওয়া পরের কয়েক লাইন

চোলি মে দিল হ্যায় মেরা
চুনরী মে দিল হ্যায় মেরা
ইয়ে দিল ম্যায় দুঙ্গি মেরে ইয়ার কো, পেয়ার কো।

অকাট্য যুক্তি। ছবিতে দেখা যেত এক নাচাগানার আসরে নীনা গুপ্তা গানের প্রথম চার লাইনের প্রশ্নটি তুলছেন, আর লাস্যময়ী মাধুরী দীক্ষিত স্পষ্ট উত্তর দিয়ে দিচ্ছেন। অতএব অন্য কিছু ভাবার তো কোনো কারণ নেই। যতদূর মনে পড়ে আদালতে গানটির অশ্লীলতা প্রমাণ হয়নি, তাই প্রায় একই যুগের খুদ্দার ছবির অন্য একটি গান ‘সেক্সি সেক্সি সেক্সি মুঝে লোগ বোলে’-র মত আদালতের নির্দেশে গানের কথা বদল করে নতুন করে প্রকাশ করতে হয়নি। কিন্তু ঘটনা হল, চোলির পিছনে আর চুনরীর নিচে যা আছে তা নিয়ে আমাদের রোমাঞ্চে জল ঢালা সম্ভব হয়নি। আমরা যে যার মত করে বুঝে নিয়েছিলাম কী আছে – দিল না অন্য কিছু।

২০০২ সালে গুজরাটে গোধরায় ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের পর কী ঘটেছিল, তাতে নরেন্দ্র মোদীর কতখানি দায় ছিল, আদৌ ছিল কি ছিল না – এ প্রশ্ন উঠলেই আমার ওই গানটির কথাই মনে পড়ে। হৃদয় তো অনেক গভীরে গেলে পাওয়া যায়। বয়ঃসন্ধির ছেলেপুলেদের অতদূর যাওয়ার ধৈর্য থাকে না। আমরা, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘স্কিন ডিপ’, ওই গানের সে অর্থটুকু ভেবেই আহ্লাদিত হতাম। দূরবর্তী কোনো মাইক থেকে গানটি ভেসে এলে বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে চোখ মারামারি চলত, ঠোঁটে থাকত দুষ্টু হাসি। তা বলে কি আমাদের মধ্যে একটিও সুবোধ বালক ছিল না? তারা আমাদের অসভ্য উল্লাস দেখে যারপরনাই বিরক্ত হত। দু-একজন খাঁটি সাত্ত্বিক মানসিকতায় আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করত, আমরা গানটির একেবারে ভুল অর্থ ভেবে নিচ্ছি। একই গানের কথার যে একাধিক অর্থ হওয়া সম্ভব সে শিক্ষা আমরা তখনই পাই – রবীন্দ্রসঙ্গীতের গভীরতা বা ভারতচন্দ্রের ব্যাজস্তুতিকে স্পর্শ করার আগেই।

বিলিতি কবিতার রোম্যান্টিক যুগের কবিরা মনে করতেন মানুষ অমৃতের সন্তান। জন্মের পরেও বেশ কিছুদিন সে নিষ্পাপ থাকে, তারপর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তার মধ্যে পাপ প্রবেশ করে, পবিত্রতা বিদায় নেয়। কবি উইলিয়াম ব্লেক Songs of Innocence আর Songs of Experience নামে দুটি পরিপূরক কবিতার বই লিখে ফেলেছিলেন, আর উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ লিখেছিলেন এ জগৎ হল কারাগার। একটি ছেলে যত বড় হয় তত তার চতুর্দিকে ঘনিয়ে আসে সে কারাগারের গরাদ (“Shades of the prison-house begin to close/Upon the growing Boy”)। ২০০২ সালের মত ঘটনা যখন ঘটে তখন মানুষ অমৃতের সন্তান না মৃত্যুর সওদাগর তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ দেখা দেয়। তবে এখন পিছন ফিরে মনে হয় মাধুরীর চোলি যেমন আমাদের নিষ্পাপ নাবালকত্ব থেকে অভিজ্ঞ সাবালকত্বে পৌঁছে দিয়েছিল, তেমনই গুজরাট ২০০২ ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে রাম জন্মভূমি নিয়ে গণহিস্টিরিয়া তৈরি করা আর মসজিদ ভাঙার রাজনীতির নাবালকত্ব থেকে শাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে অভীষ্ট লক্ষ্যপূরণের সাবালকত্বে পৌঁছে দিয়েছিল।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত একাধিক মামলায় রায় দিয়েছে – কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু, ধর্ষণ, বাস্তুচ্যুতির পিছনে কোনো বৃহত্তর অপরাধমূলক চক্রান্ত ছিল না। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মোদীরও কোনো প্রত্যক্ষ দায় ছিল না। এর উপরে আর কথা কী? কে না জানে, ভারতের বিচারব্যবস্থার মত নিখুঁত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা পৃথিবীর কোথাও নেই? সেই কারণেই তো বিচারপতি নিয়োগের কলেজিয়াম ব্যবস্থাকে বাতিল করার দাবিতে উঠেপড়ে লেগেছে মোদী সরকার। তাদের অভিযোগ – ব্যবস্থাটি অগণতান্ত্রিক। আইনমন্ত্রী কিরেন রিজিজু আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশবন্ত চন্দ্রচূড় প্রায় বাগযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন প্রতিদিন। কী কাণ্ড! যে ব্যবস্থা মোদীর বিরুদ্ধে যাবতীয় রাজনৈতিক চক্রান্ত নস্যাৎ করে তাঁকে পদ্মফুলের মত নিষ্পাপ প্রমাণ করেছে, সেই ব্যবস্থাকে কিনা তাঁর সরকারই মনে করে অগণতান্ত্রিক!

এমন সময়, হাঁউ মাউ খাঁউ, গণহত্যার গন্ধ পাঁউ বলে এসে পড়ল বিবিসির তথ্যচিত্র ইন্ডিয়া: দ্য মোদী কোয়েশ্চেন। নতুন করে উঠে পড়ল চোলির পিছনে কী আছে সেই প্রশ্ন। এইবেলা পরিষ্কার করে দেওয়া যাক, উদাহরণ হিসাবে শুধুমাত্র বিপরীতকামী পুরুষদের মধ্যে চালু থাকা নারীদেহ সম্পর্কে একটি রগরগে আলোচনাকে কেন টেনে এনেছি। কারণটি খুব সোজা। ওই যে বললাম, আমরা যে যার মত করে বুঝে নিয়েছিলাম? লক্ষ করলে দেখা যাবে, গুজরাটে ঠিক কী হয়েছিল বিজেপির ভোটাররাও ঠিক একইভাবে যে যার মত করে বুঝে নিয়েছে। ওই যে বললাম, গানটি ভেসে এলেই আমাদের মধ্যে চোখ মারামারি চলত? ঠিক একই ব্যাপার বিজেপি ও তার ভোটারদের মধ্যে চলে। বিবিসির তথ্যচিত্রে যা যা দেখানো হয়েছে তার কিছুই কিন্তু নতুন নয়। নতুন খবর বলতে এটুকুই, যে ব্রিটিশ সরকার এক নিজস্ব তদন্ত চালিয়েছিল, যার সিদ্ধান্ত হল মোদী স্বয়ং দায়ী। যে সমস্ত প্রমাণ, যেসব সাক্ষীকে এই তথ্যচিত্রের দর্শকরা দেখছেন তাঁদের কথা ভারতের বহু ছোটবড় সংবাদমাধ্যমে গত দুই দশকে প্রকাশিত হয়েছে। রাকেশ শর্মার তথ্যচিত্র ফাইনাল সলিউশন দেখলে বিবিসির তথ্যচিত্রের চেয়েও বেশি ঠান্ডা স্রোত নামবে শিরদাঁড়া বেয়ে। সেই তথ্যচিত্রটি যখন ইউটিউবে প্রথম আপলোড করা হয়, তখন সরকারের হাতে তা ব্লক করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু দলে দলে লোক বারবার রিপোর্ট করে ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড’-কে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করে সাময়িকভাবে ব্লক করিয়ে দিয়েছিল।

ফলে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। উঠলেই প্রত্যেকবার বিজেপি নেতা ও সমর্থকদের থেকে দুরকম উত্তর পাওয়া যায়। এক দল বলে, সব বানানো গল্প। সুপ্রিম কোর্ট ক্লিনচিট দিয়েছে। আরেক দল বলে, যা করেছে বেশ করেছে। মুসলমানদের বেশি বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। অমিত শাহ স্বয়ং যেমন সংবাদসংস্থা এএনআইকে বলেছিলেন, মোদীজির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত অভিযোগ করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সেই অভিযোগকারীদের ক্ষমা চাওয়া উচিত। আবার সম্প্রতি হিমাচল প্রদেশে নির্বাচনী প্রচারে বলেছেন, ২০০২ সালে মোদীজি যারা হিংসা ছড়ায় তাদের উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন। ফলে গুজরাটে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যার যা পছন্দ সে তাই বুঝে নেবে।

আমরাও ঠিক এমনই করতাম। এক দল মাধুরীর হৃদয় নিয়ে ভাবত, আরেক দল মাংসপিণ্ড নিয়ে। এমন চোলিকেন্দ্রিক পৌরুষই যে গুজরাট ২০০২-এর অভিজ্ঞান তা আর কেউ না জানলেও বিলকিস বানো বিলক্ষণ জানেন।

ভারত সরকার ইউটিউবে বিবিসির তথ্যচিত্রের যত লিঙ্ক আছে সব ব্লক করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিবিসির তথ্যচিত্রের লিঙ্ক শেয়ার করায় বেশকিছু টুইটও মুছে দিতে বলেছে। যদি বলি এই সাবালক জীবনের চেয়ে সেই নাবালক জীবন ভাল ছিল, তাহলে স্রেফ স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়ছি বলা যাবে কি? তখন ভারত রাষ্ট্র স্রেফ যৌনতাকেই অশ্লীল বলে বিবেচনা করত, ঢেকেঢুকে রেখে, গানের কথা বদলে দিয়ে বা কোনো ফিল্মের গোটা দু-চার চুম্বন দৃশ্য বাদ দিয়েই নিজের ক্ষমতা জানান দিত। তাও কেউ আদালতে দৌড়লে তবে। এখন তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে নিজের অপছন্দের কিছু দেখলেই তাকে অসত্য বলে দেগে দিয়ে ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে দিতে পারে। ঠিক সেই কাজটিই করা হয়েছে এক্ষেত্রে। কদিন আগেই, গত মঙ্গলবার, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের ওয়েবসাইটে আপলোড হওয়া সংশোধনীর এক খসড়ায় দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো যে খবরকে ভুয়ো খবর বলে ঘোষণা করবে সে খবর কোনো সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করা যাবে না। শেয়ার হলে তার দায়িত্ব বর্তাবে সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মটির উপর।

অর্থাৎ আজ বিবিসির তথ্যচিত্র মুছে দেওয়া হচ্ছে, কাল ২০০২ সালে গুজরাটে আদৌ কোনো দাঙ্গা হয়েছিল বলে পোস্ট করলেই তা মুছে দেওয়া হবে। আহসান জাফরি খুন হননি – ওটি ভুয়ো খবর। বিলকিস ধর্ষিত হননি – ওটিও ভুয়ো খবর। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো হয়ত এমনই বলবে। তা সরকার বা সরকারি সংস্থাগুলি বলতেই পারে। কিন্তু যত বলবে ততই চোলির পিছনে কী আছে সে প্রশ্ন জোরালো হবে। সরকারের এখনো চোলি কেন প্রয়োজন – সে প্রশ্নও উঠবে নির্ঘাত। কারণ গুজরাট দাঙ্গায় অভিযুক্ত, এমনকি শাস্তিপ্রাপ্তরাও তো এখন মুক্ত। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাব্যের সত্যতা প্রমাণ করে গারদ ঘনিয়ে এসেছে কেবল উমর খালিদ, শার্জিল ইমামদের মত নাবালকদের উপর – যারা গালভর্তি দাড়ি গজিয়ে যাওয়ার পরেও মানুষকে মৃত্যুর সওদাগর ভাবার সাবালকত্বে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

আরও পড়ুন অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

সামান্য আশাবাদী অবশ্য হওয়া যায় একথা ভেবে, যে সরকারের এখনো খানিক লজ্জাশরম আছে বলেই চোলির প্রয়োজন পড়ছে। তবে ইন্টারনেটের যুগে চোলি যথাস্থানে রাখা লৌহকঠিন সরকারের পক্ষেও কষ্টসাধ্য। শীত বড়জোর আর এক মাস। তারপর বসন্ত সমীরণে ভোরের দিকে হাওড়ার ফেরিঘাট থেকে যদি বাগবাজার অভিমুখে নৌকাবিহারে বেরিয়ে পড়েন, তাহলে দেখতে পাবেন ভাগীরথীর পাড়ে প্রাতঃকৃত্য করতে বসেছেন অনেকে। তাঁরা বসেন নদীর দিকে পিছন ফিরে। তাতে সুবিধা হল, আপনি তাঁদের উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে পেলেও তাঁরা আপনাকে দেখতে পান না। ফলে ভেবে নেওয়া সহজ হয় যে আপনিও তাঁদের দেখতে পাচ্ছেন না। ইন্টারনেটে একটি দেশের মধ্যে তথ্য ও তথ্যচিত্র ব্লক করা এমনই ব্যাপার। অবশ্য আত্মপ্রতারণা ছাড়া একনায়কত্ব বাঁচে কেমন করে?

পুনশ্চ: বিবিসির তথ্যচিত্রের নামে পার্ট ওয়ান কথাটি রয়েছে। কঙ্গনা রানাওয়াতের হিট ছবির সংলাপের ভাষায় “অভি তো হমে ঔর জলীল হোনা হ্যায়।”

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

অমর্ত্য সেন, ক্লিকটোপ আর মাদাম তুসো

অমর্ত্যকে গালি দেওয়ার কাজটাও কেবল বাঙালিরাই করছেন। বিজেপির মধ্যেও কেবল তথাগত, দিলীপ ঘোষরাই। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।

আনন্দবাজার পত্রিকা স্মরণীয় শিরোনাম দেওয়ার জন্য বিখ্যাত। এই তো সেদিন পেলের প্রয়াণে শিরোনাম হল ‘আমার সম্রাট স্বপ্নে থাক’। শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’ পড়া থাকলে পাঠকের কাছে এই শিরোনামের রস কিঞ্চিৎ ঘনীভূত হবে সন্দেহ নেই, কিন্তু না থাকলেও রসে তিনি পুরোপুরি বঞ্চিত হবেন না। খবরের কাগজে এই ধরনের শিরোনামকেই সেরা বলে ধরা হয়ে এসেছে চিরকাল। অমর্ত্য সেন যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন, তখন আমার মত যাদের সবে গোঁফদাড়ি গজিয়েছিল, তাদের নির্ঘাত এই মধ্যবয়সে এসেও মনে আছে সেই অবিস্মরণীয় শিরোনাম – ‘মর্তের সেরা পুরস্কার বাংলার অমর্ত্যর’। তখন ইন্টারনেট থাকলেও সোশাল মিডিয়া ছিল না, সংবাদমাধ্যমের ঘাড়ে ক্লিক আদায় করার চাপ ছিল না, ক্লিকটোপের প্রয়োজন ছিল না। এখন আছে। অনিবার্যভাবে ওয়েব মাধ্যমের এই কৌশল অন্য মাধ্যমগুলোতেও ঢুকে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে খবরের কাগজের সাংবাদিকদের কাজের মূল্যায়নও মালিকরা করছেন কোন প্রতিবেদনে ওয়েবে কতগুলো হিট হল তা দিয়ে। কোনো কোনো কাগজ অনলাইন সংস্করণের জন্য আলাদা কর্মীবাহিনী না রেখে এক মাইনেয় দুটো কাজই করিয়ে নিচ্ছে সাংবাদিকদের দিয়ে। ফলে খবরের কাগজের শিরোনামেও সত্যনিষ্ঠা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, বুদ্ধির দীপ্তি, ভাষার নৈপুণ্য গুরুত্ব হারাচ্ছে, প্রাধান্য পাচ্ছে শিরোনামে “অশ্বত্থামা হত” বলে চোখ টেনে নিয়ে প্রতিবেদনে বেশ পরের দিকে “ইতি গজ” বলার প্রবণতা। সেই ধারাতেই দিন তিনেক আগে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন নিয়ে শীতের বাংলা কদিন উত্তপ্ত। তার শিরোনাম – মমতা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য, বলেই দিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ‘ভারতরত্ন’ অমর্ত্য সেন।

এই শিরোনামে চোখ পড়া মাত্রই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে অমর্ত্য মমতা ব্যানার্জিকে একটা শংসাপত্র দিয়েছেন। এমনকি যে পাঠক মমতার অনুরাগী এবং/অথবা তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক, তাঁর পক্ষে এমন ভেবে নেওয়াও অসম্ভব নয় যে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে অমর্ত্য মমতাকেই যোগ্যতম বলেছেন। কারণ অমর্ত্যের বিজেপিবিরোধিতা সর্বজনবিদিত; তিনি তো আর নরেন্দ্র মোদীকে যোগ্যতম বলবেন না। এই ধারণা আরও দৃঢ় হবে মমতার প্রতিক্রিয়া জানলে। তিনি বলেছেন “অমর্ত্য সেন বিশ্ববরেণ্য পণ্ডিত, আমাদের অন্যতম গর্ব। তাঁর পর্যবেক্ষণ আমাদের পথ দেখায়। তাঁর উপদেশ আমাদের কাছে আদেশ। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন নিশ্চয় সবাইকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।” যেন অমর্ত্য তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার উপদেশ দিয়েছেন।

অথচ আনন্দবাজারের প্রতিবেদনটা পড়তে গেলে একেবারে অন্য সত্যের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। আসলে সংবাদসংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া (পিটিআই)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অমর্ত্য অনেক কথাবার্তা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটা ছিল ইংরেজিতে। দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার ব্যাপারে মমতার ক্ষমতা সম্পর্কে অমর্ত্যের নিজের ব্যবহৃত শব্দগুলো হল, “It’s not that she does not have the ability to do it. She clearly has the ability. On the other hand, it’s yet not established that Mamata can pull the forces of public dismay against the BJP in an integrated way to make it possible for her to have the leadership to put an end to the fractionalisation in India.”

এই ability শব্দটার বাংলা তর্জমা ক্ষমতা এবং যোগ্যতা – দুইই হতে পারে। অমর্ত্য যদি qualification শব্দটা ব্যবহার করতেন তাহলে তিনি যে যোগ্যতাই বুঝিয়েছেন তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকত না। কিন্তু তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় তিনি যোগ্যতাই বুঝিয়েছেন, তাহলেও পরের শব্দগুলো অমর্ত্যের অনাস্থার ইঙ্গিত। নিজের মত করে তর্জমা না করে বরং আনন্দবাজারের প্রতিবেদন থেকেই গোটা উক্তিটা তুলে দেওয়া যাক – “এমন নয় যে তাঁর এটা করার ক্ষমতা নেই। এটা খুব স্পষ্ট, তাঁর সেই ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু অন্য দিকে, এটা এখনও প্রতিষ্ঠিত নয় যে, মমতা বিজেপির বিরুদ্ধে জনগণের হতাশার জায়গাগুলোকে এক ছাতার তলায় এনে ভারতে বিভেদের রাজনীতির অবসান ঘটাতে নেতৃত্ব দেবেন।”

কিমাশ্চর্যম তৎপরম! শিরোনামের ‘যোগ্য’ প্রতিবেদনে এসে ‘ক্ষমতা’ হয়ে গেল! অর্থাৎ মমতার যোগ্যতা হল অশ্বত্থামা। সে যে মৃত সে খবর শিরোনামে দিয়ে অনলাইনে ক্লিক এবং অফলাইনে জোর আলোচনা নিশ্চিত করার পর প্রতিবেদনে ক্ষমতার কথা বলা হল, পাঠককে নিচু স্বরে জানিয়ে দেওয়া হল, যে মারা গেছে সে দ্রোণাচার্যের পুত্র নয়, একটা হাতি মাত্র। এ যে সম্পাদকমণ্ডলীর সচেতন সিদ্ধান্ত তাতে সন্দেহ নেই, কারণ অমর্ত্য ability শব্দটা কোন অর্থে ব্যবহার করেছেন তা নিয়ে অত বড় কাগজের সম্পাদকমণ্ডলী তো দূরের কথা, কোনো সাধারণ পাঠকেরও সন্দেহ থাকবে না প্রসঙ্গ জানা থাকলে। সোশাল মিডিয়ার যুগে অপ্রাসঙ্গিকভাবে মহাপুরুষদের উদ্ধৃত করা অতিমারীতে পরিণত হয়েছে অনেকদিন হল। এই কৌশলে কেউ প্রমাণ করতে চান রবীন্দ্রনাথ বা আম্বেদকর মুসলমান, খ্রিস্টানদের মোটেই সুবিধের লোক মনে করতেন না। কেউ আবার স্বামী বিবেকানন্দকে বামপন্থী প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। সেই কুঅভ্যাসকে প্রশ্রয় না দিয়ে আমরা বরং আনন্দবাজারের তর্জমা থেকেই দেখে নিই অমর্ত্য কী প্রসঙ্গে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে ওই মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন “আমার মনে হচ্ছে, একাধিক আঞ্চলিক দল আগামী দিনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে। আমার মনে হয়, ডিএমকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দল। তৃণমূলও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজবাদী পার্টির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু আমি জানি না, এই মুহূর্তে তারা কী অবস্থায় রয়েছে।”

স্পষ্টতই অমর্ত্যের মাথায় রয়েছে তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল এবং তার সাপেক্ষে লোকসভায় ডিএমকে, তৃণমূল কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টি লোকসভায় কত আসন পেতে পারে সেই হিসাব। এই রাজ্যগুলোর সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে ওই তিন দলের প্রাপ্ত আসন যোগ করলে দাঁড়ায় ৪৮৫ (তৃণমূল ২১৫ + ডিএমকে ১৫৯ + সমাজবাদী পার্টি ১১১)। এই তিন রাজ্যে মোট লোকসভা আসনের সংখ্যা ১৬১ (পশ্চিমবঙ্গ ৪২ + তামিলনাড়ু ৩৯ + উত্তরপ্রদেশ ৮০)। সাধারণত একটা লোকসভা আসনের মধ্যে থাকে সাতটা বিধানসভা আসন। আন্দাজ পাওয়ার জন্য তৃণমূল, ডিএমকে, সমাজবাদী পার্টির ৪৮৫ আসনকে সাত দিয়ে ভাগ করলে দাঁড়ায় প্রায় ৭০। এই সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য আগেই বলেছেন ২০২৪ নির্বাচন বিজেপি একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে জিতে যাবে বলে তিনি মনে করেন না। তিনি সঠিক প্রমাণিত হলে বিজেপির আসন সংখ্যা এখনকার চেয়ে কমে যাবে, ত্রিশঙ্কু লোকসভা হওয়াও অসম্ভব নয়। বলা বাহুল্য, সেক্ষেত্রে ৭০টা আসন অমূল্য। সেই কারণেই আঞ্চলিক দলগুলোর কথা বলা।

কিন্তু বিধানসভা আর লোকসভা নির্বাচন যে এক নয় সেকথা অমর্ত্য বিলক্ষণ জানেন। উপরন্তু লোকসভা নির্বাচন আসতে আসতে এই রাজ্যগুলোর ভোটারদের এই দলগুলো সম্পর্কে মতও বদলাতে পারে নানা কারণে, হয়ত ইতিমধ্যে বদলেও গেছে। সেসব মাথায় রেখেই তিনি যোগ করেছেন “কিন্তু আমি জানি না, এই মুহূর্তে তারা কী অবস্থায় রয়েছে।” এতৎসত্ত্বেও ক্লিকটোপ ফেলতে এবং নিঃসন্দেহে সম্পাদকীয় নীতির কারণে শিরোনামে এসে গেল, অমর্ত্য বলেছেন মমতা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য। অন্যান্য সংবাদমাধ্যমও পত্রপাঠ এই নিয়ে হইচই শুরু করে দিল।

এ পর্যন্ত তবু ঠিক ছিল। সংবাদমাধ্যম এমনটাই করে থাকে, করা তাদের ব্যবসায়িক স্বাধীনতা। হয়ত বাকস্বাধীনতাও। আমাদের বাকস্বাধীনতা হল এমন আচরণের সমালোচনা করা। মুশকিল হল, ব্যাপার সেখানে থেমে থাকেনি। বামপন্থী এবং দক্ষিণপন্থী বাঙালিরা ৮৯ বছরের লোকটাকে গালাগাল দিতে নেমে পড়েছেন। তথাগত রায়ের মত দক্ষিণপন্থী, যাঁরা প্রায়শই বলে থাকেন অমর্ত্য অর্থনীতি কিস্যু জানেন না (অর্থাৎ প্রযুক্তিবিদ তথাগত অর্থনীতি জানেন), তাঁরা ওঁকে নিজের বিষয়ের বাইরে কথা বলতে নিষেধ করছেন। এদিকে তৃণমূল শাসনে তিতিবিরক্ত অনেক বামপন্থী অমর্ত্যকে ‘চটিচাটা’ তকমা দিচ্ছেন। ঠিক যেভাবে বিজেপির সমালোচনা করলেই অমর্ত্যকে তাদের ট্রোলবাহিনী কংগ্রেসের ধামাধরা বলে অভিহিত করে। নোবেলজয়ী হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, যাঁর এ দেশে কোনোদিন পা না রাখলেও চলে, তাঁর যে কারোর ধামা ধরার বা চটি চাটার প্রয়োজন নেই তা এদের বোঝাবে কে?

আরও পড়ুন রেউড়ি সংস্কৃতি: যে গল্পে ডান-বাম গুলিয়ে গিয়েছে

সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী কিন্তু মমতার ক্ষমতা সম্পর্কে অমর্ত্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন। তারপর নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বলেছেন, বিজেপিবিরোধী শক্তিগুলিকে এক করা দূরের কথা, মমতা বরং তাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে চেষ্টা করবেন।

#EISAMAY “অমর্ত্য সেন সঠিক সংশয় প্রকাশ করছেন যে বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলিকে কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একজোট করতে পারবেন? আমরা বলছি একজোট করার বদলে বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলি যাতে একজোট না হতে পারে তৃণমূল তার চেষ্টা করছে” মন্তব্য সুজন চক্রবর্তীর ⁦@SUJAN_SPEAK⁩ #CPIM #TMC #BJP PIC.TWITTER.COM/IJZIID5DZY— prasenjit bera (@prasenjitberaES) January 14, 2023

কিন্তু তাতে কী? কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর বিখ্যাত (বা কুখ্যাত) গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মুখে ছাই দিয়ে সোশাল মিডিয়ার যুগে সব বাম দলেই কমবেশি ‘গো অ্যাজ ইউ লাইক’ চালু হয়ে গেছে। সেই প্রথা মেনে সিপিএম কর্মী, সমর্থকরা বিভিন্ন মাত্রায় অমর্ত্যের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেই চলেছেন। তাঁদের সবচেয়ে ভদ্র অংশ বলছে, বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে। কেউ কেউ আবার গভীর পর্যবেক্ষণের পর মন্তব্য করছে অমর্ত্য নাকি বেশ কিছুদিন হল মমতার ধামা ধরেছেন। কারোর বক্তব্য, এসব শান্তিনিকেতনে নিজের জমি, বাড়ি বাঁচাতে হার্ভার্ডের অধ্যাপকের মরিয়া চেষ্টা। বিজেপি সমর্থক বাঙালিরাও মোটামুটি এইসব অভিযোগই তুলছে বৃদ্ধের বিরুদ্ধে। অমর্ত্য সেনের চোদ্দ পুরুষের ভাগ্য যে মেম বিয়ে করেছেন বলে নোবেল পেয়েছেন – এই পুরনো অভিযোগটা এখনো ট্রাঙ্ক থেকে বের করে মাঘের রোদে মেলে দেওয়া হয়নি।

পরিতাপের বিষয়, যদিও পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকার নিয়ে সারা দেশের সংবাদমাধ্যমে লেখালিখি হয়েছে এবং প্রায় একই সময়ে দ্য ওয়ার ওয়েবসাইটের সাংবাদিক করণ থাপারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারকে আরও বিশদে এবং কঠোরতম ভাষায় তুলোধোনা করেছেন, তা নিয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ায় প্রায় কোনো আলোচনা নেই।

অমর্ত্যকে গালি দেওয়ার কাজটাও কেবল বাঙালিরাই করছেন। বিজেপির মধ্যেও কেবল তথাগত, দিলীপ ঘোষরাই। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এমনকি বিজেপিবিরোধী বিদ্বানদের গাল না পাড়লে যাঁর ভাত হজম হয় না, সেই অমিত মালব্য পর্যন্ত এখন পর্যন্ত একটা টুইট করেননি। অথচ শেষ জীবিত পৃথিবীবিখ্যাত বাঙালিকে বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী বাঙালিরা স্রেফ অপছন্দের রাজনৈতিক নেতা সম্পর্কে একটি মন্তব্যের কারণে যা খুশি তাই বলে চলেছেন।

বাঙালি মেধার এহেন অবনমন কৌতুককর। আনন্দবাজার ক্লিকটোপ ফেলেছে এবং সে টোপ গেলা মানুষের সংখ্যাধিক্য প্রমাণ করছে, শিরোনাম পেরিয়ে প্রতিবেদন অবধি যাওয়া লোকেরা আজকাল ব্যতিক্রম। আরও মজার কথা হল, ওই কাগজটাকে যাঁরা বাজারি কাগজ বলে হেলা শ্রদ্ধা করেন চিরকাল, সেই বামপন্থীরাও এই টোপ কম গেলেননি। অর্থাৎ প্রকাশ্যে বাজারি বলে গাল দিলেও পড়ার বেলায় ওই কাগজটাই পড়েন। শুধু তাই নয়, সম্ভবত কেবল ওটাই পড়েন। নইলে অন্য একাধিক জায়গায় প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারের প্রতিবেদন থেকেই জেনে ফেলতে পারতেন, অমর্ত্য মমতাকে কোনো শংসাপত্র দেননি।

অমর্ত্য সেন ভগবান নন। দুনিয়ার সব ব্যাপারে তিনি যা বলবেন তাই মেনে নিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বস্তুত সমাজবিজ্ঞানে ঠিক আর ভুলের সীমারেখা স্থির নয়, ফলে অত বড় পণ্ডিতের বক্তব্যকে একজন কলেজপড়ুয়াও চ্যালেঞ্জ জানাতেই পারে। কিন্তু যা খুশি বলা আর ভিন্নমত পোষণ করা এক জিনিস নয়। বামফ্রন্ট আমলে বেশ কয়েকবার অমর্ত্য সেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমালোচনা করেছিলেন, সরকার একমত হয়নি। একবার তো অমর্ত্যকে ভুল প্রমাণ করতে গণশক্তির পাতায় কলম ধরেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত।

আজকের পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য এসব কথা স্মরণ করিয়ে লাভ নেই। ডান, বাম নির্বিশেষে মাদাম তুসো মার্কা মৃণাল সেনে মজে থাকা বাঙালি ভিন্নমত হতে গেলে যে লিখতে হয়, নিদেনপক্ষে প্রতিপক্ষের বক্তব্য পুরোটা পড়তে হয় – সেকথা কেন বিশ্বাস করতে যাবে?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

খাড়া বড়ি থোড় বললেই উড়ে যাবে না নতুন ফেলুদা ছবি

সন্তোষ দত্তের জন্মশতবর্ষে যে ফেলুদা ছবি মুক্তি পাবে তাতে যদি জটায়ুর অভিনয়টা ভাল হয় তাহলে তাঁকে যথার্থ শ্রদ্ধা জানানো হবে।

বুঝে দেখ জটায়ুর কলমের জোর
ঘুরে গেছে রহস্য কাহিনীর মোড়
থোড় বড়ি খাড়া
লিখে তাড়াতাড়া
এইবারে লিখেছেন খাড়া বড়ি থোড়।

ফেলু মিত্তিরের ভক্তরা জানেন, এই পাঁচ লাইনের রচয়িতা প্রদোষচন্দ্র মিত্র স্বয়ং। হত্যাপুরী গল্পের শুরুতেই ফেলুদা রচিত এই লিমেরিক তোপসে পাঠকের কাছে হাজির করেছে। সন্দীপ রায়ের হত্যাপুরী ছবির বর্ণনাতেও এই ছড়া দিব্যি খেটে যায়। তবে ফেলুদাকে নিয়ে নতুন কিছু করা হয়েছে এমন প্রত্যাশা নিয়ে কে-ই বা সিনেমা হলে যাচ্ছে? শীতের ছুটির মধ্যে কোনো একটা দিন সপরিবারে খানিকটা স্মৃতিমেদুর সময় কাটানো – ফেলুদার ছবি দেখতে যাওয়ার এই তো আসল উদ্দেশ্য। সুতরাং সে ছবি অভিনব না হয়ে যত পরিচিত হয় ততই ভাল। তাছাড়া ফেলুদার ছবির সব দর্শকই গল্পগুলো পড়ে ফেলেছে – একথা বুকে হাত দিয়ে বলা ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এখনকার স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের অনেকেরই ফেলুদার কথা বাবা-মায়ের মুখে শোনা। তারা বই পড়ে কম, বাংলা পড়ে আরও কম। ফলে ছবিগুলো এমনিতেই তাদের কাছে অভিনব। আমরা চল্লিশোর্ধ্বরা কনুইটা সিটের হাতলে ঠেকিয়ে হাতটা থুতনিতে রেখে যতই ভুরু কুঁচকে বিচার করি সন্দীপ সত্যজিতের ফেলুদাকে পর্দায় আনতে গিয়ে কোথায় কতটুকু সরলেন বা সরলেন না, সরলে সেটা রসোত্তীর্ণ হল কিনা; তরুণতর দর্শকদের অনেকের কাছেই কেবল গল্পটা নয়, ফেলু-তোপসে-জটায়ুর গোটা জগৎটাই নতুন। যতবার ফেলুদা চলচ্চিত্রায়িত হচ্ছে, ততবার তাদের নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে। বাঙালির সাংস্কৃতিক শিকড় যতখানি আলগা হয়ে গেছে, তাতে স্রেফ আর্কাইভ করে রাখার কথা ভেবে যদি সত্তর ছুঁই ছুঁই সন্দীপ এখনো পুরনো ফর্মুলাতেই ফেলুদা ছবি বানিয়ে যান তাহলে তাঁকে দোষ দেওয়া চলে না।

ছবির বিচার করতে গিয়ে এসব কথাও ভাবতে হচ্ছে – এটা নিশ্চয়ই দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু বাংলা ছবি, শুধু ছবিই বা কেন, বাংলার সংস্কৃতিই যে কপাল চাপড়ানোর মত অবস্থায় পৌঁছেছে তা নিয়ে তো আর ঢাকঢাক গুড়গুড় করার কিছু নেই। বাংলা ছবির দুরবস্থা যে নেহাত নিন্দুকের কল্পনা নয় তার ব্যবসায়িক ও শৈল্পিক – দু ধরনের প্রমাণই উপস্থিত। ২০২২ সালে গোটা চারেক ছবি প্রেক্ষাগৃহে লোক টানতে পেরেছে, যার মধ্যে একটা আবার বাংলাদেশের ছবি। এতেই প্রযোজক থেকে শুরু করে দর্শক অব্দি সকলেই আহ্লাদে আটখানা – এই হল ব্যবসায়িক প্রমাণ। আর শৈল্পিক প্রমাণ তো প্রায় এক দশক ধরে গোয়েন্দা ছবির প্রাবল্যেই পাওয়া যাচ্ছে।

এমন নয় যে পৃথিবীর আর কোনো ভাষায় জনপ্রিয় গোয়েন্দা গল্প নিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি ছবি বা সিরিজ হয় না। বাঙালিরা যে ভাষার সিনেমা, সিরিজের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি পরিচিত সেই ইংরেজি ভাষাতেই শার্লক হোমস, আর্কুল পয়রো, মিস মার্পল প্রমুখ গোয়েন্দাকে নিয়ে গুচ্ছ গুচ্ছ বড় পর্দার ছবি, টিভি সিরিজ হয়েছে; ওটিটির যুগে ওয়েব সিরিজও হয়ে চলেছে। কিন্তু প্রায় সমস্ত প্রযোজনাতেই নতুন কিছু করার প্রয়াস দেখা যায়, কখনো কখনো তার ফলে বিবিসির শার্লক সিরিজের মত চমকপ্রদ কিছুও তৈরি হয়।

সন্দীপ সত্যজিতের ছেলে হওয়ার সুযোগ নিয়ে নিজে ফেলুদার হাতে মোবাইল ফোন ধরিয়ে দিয়ে গল্পগুলোকে আজকের দিনে নিয়ে আসা ছাড়া কোনোরকম সৃজনশীলতা দেখাচ্ছেন না, ওদিকে কপিরাইট ধরে রেখে অন্য কাউকে আরও সৃজনশীল হওয়ার সুযোগও দিচ্ছেন না বলে আমরা – ফেলুদা পড়ে বড় হওয়া প্রজন্ম – অনুযোগ করতাম গত দশকে। সন্দীপ সে গুড়ে বালি দিয়েছেন অনেকদিন হল। তাঁর হাঁটুর বয়সী পরিচালকরা ফেলুদাকে নিয়ে ওয়েব সিরিজ করছেন। কিন্তু তাতেই বা ফেলুদা নব নব রূপে প্রাণে আসতে পারছে কই? তরুণ পরিচালকদের উদ্ভাবনী শক্তির নমুনা দেখে তো উল্লসিত হওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য শেয়াল দেবতা রহস্য আর ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা নিয়ে ওয়েব সিরিজ করেছিলেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। শেষমেশ সেখানে কলকাতার ঢাকা হয়ে যাওয়া আর তোপসের লেখা বইয়ের বদলে ব্লগে প্রকাশিত হওয়া ছাড়া কোনো যুগান্তকারী পরিবর্তন দেখা যায়নি। ও জিনিসটিও স্টিভেন মফাট আর মার্ক গ্যাটিস শার্লক সিরিজে আগেই করে ফেলেছেন এবং সেখানে আর্থার কোনান ডয়েলের আখ্যানকে তাঁরা যতদূর নিয়ে গেছেন ততখানি পরীক্ষামূলক হওয়ার সাহস পরমব্রত দেখিয়ে উঠতে পারেননি। উপরন্তু স্বয়ং ফেলুদার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসে ঘুরঘুটিয়ার ঘটনার ক্লাইম্যাক্সে রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে পরিচিত দুটো লাইন আওড়াতে গিয়ে গুবলেট করেছেন। শেয়াল দেবতা রহস্যে ফেলুদার একটি সাংবাদিক প্রেমিকা প্রায় জুটিয়ে ফেলেছিলেন (শারলিন ফারজানা), শেষ অব্দি বোধহয় সন্দেশ পড়া প্রাচীন পাঠক-পাঠিকারা রেগে যাবেন ভেবে পিছিয়ে যান।

পরমব্রত তবু নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন, বাংলা ছবির রিমেক সম্রাট সৃজিত মুখোপাধ্যায় তো ফেলুদাকে নিয়ে পিরিয়ড পিস বানাতে গিয়ে ১৯৮০-র দশকের দমদম বিমানবন্দরে ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া ক্যাম্পেনের পোস্টার সেঁটে ফেলেছেন। মুক্তি পেতে চলেছে অরিন্দম শীল নির্দেশিত আরও একটা ফেলুদা ওয়েব সিরিজ। সেখানে আবার গ্যাংটকে এ জাতীয় গন্ডগোল দেখা না গেলেই হয়। পরিচালক অবশ্য এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন এখানে ফেলুদা আধুনিক – স্মার্টফোন, স্মার্টওয়াচ ব্যবহার করেন। তবে সেটাই প্রধান আকর্ষণ হয়ে থাকলে খাড়া বড়ি থোড়ই ভবিতব্য।

সন্দীপের হত্যাপুরীকে এই পরিস্থিতি মনে রেখে বিচার করা ভাল।

তিনি প্রথম যখন বড় পর্দার জন্যে ফেলুদার ছবি তৈরি করতে শুরু করেন তখন যে ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশি হতাশ করত তা হল কে অপরাধী তা গোড়াতেই দেখিয়ে দেওয়া। সত্যজিৎ নিজে সোনার কেল্লা আর জয়বাবা ফেলুনাথ – দুটো ক্ষেত্রেই তা করেছিলেন। কিন্তু গল্পের তুলনায় সে দুটো প্রায় আমূল পরিবর্তিত চিত্রনাট্য। ফলে বইয়ের ‘হু ডান ইট’ পর্দায় থ্রিলারে পরিণত হয়ে অন্যরকম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। সন্দীপ আবার আমূল পরিবর্তন করতে চান না কখনোই, ফলে ছবির অবস্থা হত ন যযৌ ন তস্থৌ। হত্যাপুরীতে সে দ্বিধা নেই। চিত্রনাট্য মোটের উপর গল্পকেই অনুসরণ করেছে, ‘হু ডান ইট’ উৎকণ্ঠা বজায় রাখা হয়েছে। শুরুতে যে ফেলুদা আবিষ্কারক দর্শক প্রজন্মের কথা বলছিলাম, তাদের এই চিত্রনাট্য আকর্ষণ করবে। গল্প থেকে চোখে পড়ার মত পরিবর্তন বলতে জটায়ুর ড্রাইভার হরিপদবাবুকে বাদ দেওয়া। তাতে অবশ্য কোনো ক্ষতি হয়নি।

এ ছবির সেরা অভিনেতা দুজন – সাহেব চ্যাটার্জী আর শুভাশিষ মুখোপাধ্যায়। সুপুরুষ সাহেবের শিশুর মত সরল হাসি বিলাস মজুমদারকে দারুণ বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। হারবার্টের চরিত্রে অভিনয় করা শুভাশিস যে লক্ষ্মণ ভট্টাচার্যের চরিত্র ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও করে ফেলতে পারেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (দুর্গাগতি সেন) সম্ভবত অভিনয় জীবনের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছেন যেখানে খেলার মাঠে যাকে ‘প্লেয়িং ফ্রম মেমরি’ বলে, তা করলেও দেখার মত হবে। ঠিক ফ্রাঙ্কো বারেসি যেভাবে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে ওটুকু করেই সেরা সময়ের রোমারিও, বেবেতোকে আটকে দিয়েছিলেন।

কিন্তু যে কোনো ফেলুদা ছবির আসল আকর্ষণ তো ওই তিনজন – গোয়েন্দা, তাঁর খুড়তুতো ভাই আর রহস্য রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলী। তাঁদের অভিনয়ে গোলমাল হলে দারুণ চিত্রনাট্য, অসামান্য সিনেমাটোগ্রাফি – কোনোকিছুই ছবিকে বাঁচাতে পারে না। যে কোনো গোয়েন্দা গল্পের চলচ্চিত্রায়ণেই অবশ্য তাই। বেনেডিক্ট কামবারবাচ আর মার্টিন ফ্রিম্যান যথাক্রমে শার্লক হোমস আর ডাক্তার ওয়াটসনের চরিত্রে মারকাটারি অভিনয় না করলে বিবিসির শার্লক সিরিজ তাক লাগানো ভাবনা, চিত্রনাট্য, প্রযুক্তির ব্যবহার সত্ত্বেও মুখ থুবড়ে পড়তই। হত্যাপুরী ছবিতে তিন কেন্দ্রীয় চরিত্রের অভিনেতাদের সন্দীপ এই প্রথম ব্যবহার করলেন। বস্তুত, ছবিটা যেমনই হয়ে থাক, সন্দীপের প্রশংসা প্রাপ্য এই ২০২২ সালে দাঁড়িয়ে প্রবল প্রতাপশালী প্রযোজকের সঙ্গে কাস্টিং নিয়ে আপোস করেননি বলে। একই প্রযোজকের ব্যানারে অন্য পরিচালক যে কাস্ট নিয়ে কাজ করেছেন তাঁকেও সেই কাস্ট নিয়েই কাজ করতে হবে – এই অন্যায় আবদার মানবেন না বলে সন্দীপ প্রযোজকই বদলে ফেলেছেন। ছবিটা হতে পারত অনেক আগেই, কিন্তু পিছিয়ে গেছে। এখন কথা হল, তাঁর এই লড়াইকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে পারলেন কি তাঁর পছন্দের অভিনেতারা?

ফেলুদার কথায় শেষে আসব, কারণ ওটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তোপসেকে দিয়ে শুরু করা যাক। সন্দেহ নেই, সেই সোনার কেল্লার সিদ্ধার্থ চ্যাটার্জির পরে এই প্রথম একজন তোপসেকে দেখে কচি ছেলে বলে মনে হয়েছে। সন্দীপ রায়ের টেলিফিল্মগুলোতে এবং সিনেমায় শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় আর পরমব্রত যখন ওই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, তাঁদের মোটেই বছর পনেরোর ছেলে মনে হয়নি। বরং পরমব্রত নির্দেশিত ওয়েব সিরিজে ঋদ্ধি সেনকে কিছুটা বইয়ের তোপসে মনে হয়েছিল। হয়ত আগের ছবিগুলোতে সন্দীপ তোপসেকে একটু বড় ছেলে হিসাবেই দেখাতে চেয়েছিলেন। হত্যাপুরীতে আয়ুশ দাসকে কিন্তু সদ্য দাড়িগোঁফ ওঠা তোপসেই মনে হচ্ছে। কিন্তু মুশকিল অন্যত্র। সংলাপ বলায় তাঁর নিজেকে কচিতর করে তোলার চেষ্টা ভীষণ চোখে লাগে। উপরন্তু মেগাসিরিয়ালের অভিনেতাদের মত উত্তেজনা প্রকাশ করতে গেলে তিনি চোখ বড় বড় করে কথা বলেন। বড় পর্দায় স্বভাবতই সে চোখ আরও বড় বড় লাগে।

আরও পড়ুন টলমলে ট্রিবিউটে ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি গুবলেট

সন্দীপ রায় নিজে বলেছেন শিগগির আরও ফেলুদা ছবি করবেন, অন্য পরিচালকরাও ময়দানে নেমে পড়েছেন। ফলে আশা করা যায় ২০২৫ সালেও কোনো না কোনো ফেলুদা ছবি মুক্তি পাবে। বছরটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেবার সন্তোষ দত্ত একশোয় পড়বেন। বাষট্টি বছরের জীবনে যতগুলো ছবিতে কাজ করেছেন কোনোটাতেই একেবারে ফেলে দেওয়ার মত অভিনয় করেননি। তবু বেশিরভাগ দর্শক তাঁকে মনে রেখেছেন জটায়ু হিসাবে। তাঁর জন্মশতবর্ষে যে ফেলুদা ছবি মুক্তি পাবে তাতে যদি জটায়ুর অভিনয়টা ভাল হয় তাহলে তাঁকে যথার্থ শ্রদ্ধা জানানো হবে। কিন্তু লক্ষণ ভাল নয়। ওই চরিত্রের অভিনয় সন্তোষ দত্তের মৃত্যুর পর থেকে যেন ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। রবি ঘোষ আর অনুপকুমার তবু একরকম ছিলেন, অকালমৃত্যু না হলে হয়ত আরও ভাল করতেন। বিভু ভট্টাচার্যের আমল থেকে শুরু হয়েছে লালমোহনবাবুকে কমিক রিলিফে পরিণত করা। সন্দীপ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জটায়ু ভাঁড় নন, বন্ধু। এই কথাটা যে কোনো ফেলুদারসিকই বোঝেন, কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে ওই চরিত্রের অভিনেতারা সন্তোষ দত্তের প্রয়াণের পর সাড়ে তিন দশকেও বুঝে উঠতে পারলেন না। সৃজিতের দার্জিলিং জমজমাট সিরিজে অনির্বাণ চক্রবর্তী তো প্রায় গোপাল ভাঁড় হয়ে দাঁড়িয়েছেন। সে না হয় অন্য পরিচালকের ছবি, কিন্তু সন্দীপের নিজের ছবির জটায়ুরা কেন নিজেদের ভাঁড় মনে করছেন? হত্যাপুরীর জটায়ু অভিজিৎ গুহ নিজেও একজন পরিচালক, অথচ তিনিও এ দোষ কাটিয়ে উঠতে পারেননি। সারাক্ষণই অতি-অভিনয় করে গেছেন। হোটেলের ঘরের একটা দৃশ্যে তো মনে হয়েছে তিনি ফেলুদাকেও ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

যে অভিনেতার কাস্টিং নিয়ে অনেকের মনেই সন্দেহ ছিল, সেই ইন্দ্রনীল সেনগুপ্তই কিন্তু সবচেয়ে জমাট অভিনয় করেছেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর সব্যসাচী চক্রবর্তীর বাচনভঙ্গি আর উচ্চারণ ফেলুদাকে এমন খাঁটি বাঙালি চেহারা দিয়েছে যে প্রবাসী ইন্দ্রনীলের ঈষৎ টানওলা বাংলা অভ্যস্ত কানে কোথাও কোথাও একটু অস্বস্তি তৈরি করে, কিন্তু তাঁর অতীতের অভিনয় দেখা থাকলে বোঝা যায় সেখানেও অনেকটা উন্নতি করেছেন। তাছাড়া কেবল বাচনভঙ্গীই তো অভিনয় নয়। হাঁটাচলায়, স্থৈর্যে, সাহসে ইন্দ্রনীল ফেলুদা হয়ে উঠতে সমর্থ হয়েছেন। তিনি আবীর চ্যাটার্জির মত সংলাপসর্বস্ব ফেলুদা নন, টোটা রায়চৌধুরীর মত বচ্চনপ্রতিম ফেলুদাও নন। ইন্দ্রনীলকে সত্যিই মগজাস্ত্র-নির্ভর গোয়েন্দা বলে মনে হয়েছে। জটায়ুকে হ্যাটা করার প্রবণতা, যা সব্যসাচী পরবর্তী ফেলুদাদের অভিজ্ঞান হয়ে উঠেছিল, তাও ইন্দ্রনীলের মধ্যে নেই।

সম্প্রতি বাংলা ছবি, ওয়েব সিরিজে গোয়েন্দার ছড়াছড়ি। রোগা ভূত, মোটা ভূত, বাবা ভূত, ছানা ভূতের মত নানারকমের গোয়েন্দায় ভরে গেছে দ্বিগ্বিদিক। অথচ রহস্যের তেমন বৈচিত্র্য নেই। সোনাদা একের পর এক ছবিতে গুপ্তধনই উদ্ধার করে চলেছেন, একেনবাবুর জটায়ুসুলভ হিন্দি বলা আর বাংলা প্রবাদ ব্যবহারে ভুল করায় বৈচিত্র্য থাকলেও ঘুরে ফিরে সেই খুনের রহস্যের কিনারা করছেন। তার মধ্যে সন্দীপ ফেলুদার এমন একটা গল্প বেছে নিয়ে ছবি করেছেন যেখানে সোনাদানা নয়, অপরাধের লক্ষ্য প্রাচীন পুঁথি। খুনোখুনি যা হয়েছে সেগুলোও পুঁথির কারণেই। এ জন্যেও বোধ করি তাঁর ধন্যবাদ প্রাপ্য। পুঁথিকে ধন মনে করার বাঙালি সংস্কৃতি লুপ্তপ্রায়। দুর্গাগতি আর সিধুজ্যাঠার মত মানুষ, পাহাড়প্রমাণ টাকা যাঁদের কিনতে পারে না – তাঁরাও মিসিং লিঙ্কে পরিণত হয়েছেন। হত্যাপুরী নিদেনপক্ষে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রমাণ রেখে দিল যে এমন মানুষও একদা এই পশ্চিমবঙ্গে ছেল।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

When Pele visited Kolkata with Cosmos

Two sets of fans often pit their nostalgia against each other, but Pele fans have one big advantage – the king of football played a match in Kolkata.

Vast swathes of West Bengal went into mourning last month when Luka Modric’s Croatia knocked Brazil out of the World Cup. But there are other parts, equally big, which are still celebrating Lionel Messi & Co.’s triumph. However, both sets of fans were anxious about the health of the world’s most famous Brazilian – Pele – who passed away in Sao Paolo on December 29. Perhaps, excluding their own continent, Pele and Diego Maradona, friends and foes now together up above, have their most passionate following in West Bengal. The two sets of fans often pit their nostalgia against each other, but Pele fans have one big advantage – the king of football played a match in Kolkata, the maverick Argentine could only wave to the gallery and show off some moves he was born with. He was 48 and long retired when he landed in Kolkata.

“Credit [for Pele’s first visit in September 1977] goes to Dhirenda (legendary Mohun Bagan official Dhiren De),” says former India footballer Subrata Bhattacharya, who led Mohun Bagan in that famous exhibition match against Cosmos Club at Eden Gardens. “Dhirenda took the initiative to make Cosmos, and thereby Pele, play in our city. I can’t forget the excitement when he first informed us that we were going to play against Pele. That team had some other World Cuppers, too, like Carlos Alberto. But we were so overwhelmed by Pele that we stopped warming up before that match just to watch him warm up.”

Bhattacharya’s enthusiasm was shared by Pradeep Chowdhury, who was one of the two footballers trusted with marking Pele that day by Coach PK Banerjee.

“Whenever I remember I’ve played a match against Pele, I feel I’ve lived my dream,” Chowdhury says. “Pradipda (PK Banerjee) had planned zonal marking for the great man. Gautam (Sarkar) was supposed to mark him in his own half and I had that responsibility in our half. To know we mostly succeeded (the match ended 2-2) makes me happy even after so many years.”

In fact, Mohun Bagan were leading 2-1 with goals from Shyam Thapa and Mohammed Habib for a long time before Cosmos equalised via a controversial penalty. But that is for the record. The emotions Pele generated that day – 24 September, to be specific – at Eden are still felt in the voice of Amit Kumar Basu. The 75-year-old die-hard Mohun Bagan and Brazil supporter watched Pele from the stands that day.

“I was fortunate that my uncle was a member of Mohun Bagan and I got the chance to watch the king of football from so close in my late twenties,” he says. Basu clearly remembers the atmosphere at the ground. “Unlike one of those matches against East Bengal or Mohammedan Sporting, the crowd was vociferous for the home team yet friendly towards the opponents. Because everyone was there to watch Pele. Each one of us realised it was the chance of a lifetime, even though Pele was in his twilight years.”

It is important to remember that television was still a novelty in this part of the world and Kolkata Doordarshan started its journey only a year before the Cosmos match. What prompted the fascination for Pele then? Basu credits the recordings of 1958, 1962 and 1970 World Cup matches. “Sometimes they (Doordarshan) used to telecast some matches long after they were played. Instead of whetting our appetite they used to make us hungrier but thank heavens, we came to know of the greatness of Pele and that Brazil side.” That is how, he explains, hordes of Bengalis became Brazil fans. Hence the urge to see Pele in the flesh.

Different accounts of that match suggest there were close to 75,000 spectators at Eden Gardens that day but in fact, almost all of West Bengal had its eyes and ears glued to Pele.

“Live sport was a rare thing on TV in those days,” recalls Debasish Bose, a retired engineer. “But we came to know from newspaper ads that the Pele match would be shown live. We were eager to watch it.”

As luck would have it, Bose had to go to a party meeting far from his home in Shibpur, on the other side of Ganga. “Some of us had gone to Hedua (north Kolkata) for a political programme but somehow we got into a community hall where the match could be watched. I had just started my engineering course at Shibur BE College. There were around 30 people, mostly young, in front of the TV. We thoroughly enjoyed the action. Pele’s lob to Carlos Alberto for the first goal is still fresh in my memory.”

Bose, however, feels the Brazilian could hardly show what he was famous for. Pradeep Chowdhury partially blames the underfoot conditions for that.
“There’s no denying Pele was not the same force in 1977,” he says. “But one has to admit the ground was not very playable either. There had been heavy rain a day or two before the match and the state of the ground didn’t impress Pele’s insurance agents. But the man was so magnanimous that he said he couldn’t disappoint so many people who had turned up to watch him.”

Read Messi, Mbappe, Pele and Maradona in grand finale

Subrata Bhattacharya described how Pele appreciated Mohun Bagan’s performance and that motivated them.

“Dhirenda took me to their hotel after the match as I was the captain. Pele hugged me and congratulated us for our show on the field. Truly, from goalkeeper Shivaji Banerjee (who is no more) to Habib, Akbar, late Subhas Bhowmik, Pradeep, Sudhir Karmakar, Dilip Palit – everyone was excellent in that match. Till then the season was not going well for Mohun Bagan. We had lost to arch-rivals East Bengal a few days back and fans were very upset. The performance against Cosmos charged us up and we defeated East Bengal in the IFA Shield final four days later.”

Bhattacharya has a picture of himself with Pele at the toss framed on his drawing room wall. Obviously it is an unforgettable moment of his life. But Pele has penetrated much deeper into Bengali collective memory. In Satyajit Ray’s last film Agantuk (1991), Ranjan Rakshit (played by the inimitable Rabi Ghosh) comes to meet globetrotter Manomohon Mitra (Utpal Dutt) and asks him about the places he has been to. The moment Manomohan says his last stay was in Brazil, Ranjan gets palpably excited. The globetrotter does not understand the reason, so the husband of his niece explains “O bodhoy Peler kotha bhabche” (He’s perhaps thinking about Pele). Ranjan is agitated that somebody coming from Brazil does not know who Pele is. Manohoman, on the move since early youth, can recall with some effort that Pele is some footballer. He admits he does not know much about football: “Mohun Bagan, East Bengal. The limit of my knowledge.”

It seems Bengal’s most famous filmmaker thought you can take a Bengali out of Pele, but not Pele out of a Bengali.

Originally published on Outlook online

আজ জুটেছে, কাল কী হবে লাতিন আমেরিকার ফুটবলের?

জিদান প্রয়াত সক্রেটিসের মত কমিউনিস্ট পার্টি করতেন না। মারাদোনার মত ফিদেল কাস্ত্রো বা কিউবাপ্রীতিও নেই। সুতরাং ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই যে জিদানের মনুষ্যত্বের কাছেই টাকার অঙ্কটা অশ্লীল বলে মনে হয়েছিল।

ফরাসি সম্রাট পঞ্চদশ লুই নাকি বলেছিলেন, আমার পরেই আসবে প্লাবন। লিওনেল মেসি এখন পর্যন্ত তেমন কিছু বলেছেন বলে জানা যায়নি। তবে বিশ্বকাপ ফাইনালই যে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর শেষ ম্যাচ ছিল সেকথা তো জানা গেছে। এখন প্রশ্ন হল, আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের ভবিষ্যৎ কী? দিয়েগো মারাদোনা ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ থেকে ডোপ টেস্টে ধরা পড়ে বহিষ্কৃত হন। পরে পাকাপাকিভাবে অবসর নেওয়ার সময়ে বলেন, আমার পরে অনেকদিন বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছবে না আর্জেন্টিনা। তাঁর কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল। ১৯৯০ সালে রোমে তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার ২৪ বছর পরে আবার আর্জেন্টিনা ফাইনালে পৌঁছয় ২০১৪ সালে রিও দি জেনেইরোতে। মারাদোনার মত মেসির আমলেও আর্জেন্টিনা দুবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলল। আবার কবে ফাইনালে পৌঁছবে? প্রশ্নটার পরিসর আরেকটু বড় করে নেওয়া যাক? লাতিন আমেরিকার কোনও দল আবার কবে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলবে? বা লাতিন আমেরিকার দলগুলোর ভবিষ্যৎ কী? প্রশ্নগুলো বৈধ, কারণ বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিলও শেষবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছে কুড়ি বছর হয়ে গেল। কেবল ফাইনালে পৌঁছনোকেই সাফল্যের প্রমাণ হিসাবে ধরে নিয়ে অবশ্য কোনও আলোচনা করা যায় না। কিন্তু ঘটনা হল গত তিন দশকে সামগ্রিকভাবেই লাতিন আমেরিকা বিশ্বকাপে ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে ইউরোপের তুলনায়।

এমনিতেই চিলে, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা বা প্যারাগুয়ের মত দলে মাঝেমধ্যে কয়েকজন চোখ টানার মত ফুটবলার আসেন, তখন তাঁদের নিয়ে হইচই হয়। কিন্তু দল শেষপর্যন্ত বিশ্বকাপে বেশিদূর এগোতে পারে না। উরুগুয়ে দুবার বিশ্বকাপ জিতেছিল সেই গত শতকের প্রথমার্ধে, স্মরণকালে তাদের সেরা বিশ্বকাপ ২০১০। মূলত দিয়েগো ফোরলানের নৈপুণ্যে আর লুই সুয়ারেজের আক্ষরিক অর্থে হাতযশে সেমিফাইনালে উঠে তারা হেরে যায় এবং প্লে অফে জার্মানির কাছে হেরে চতুর্থ স্থান দখল করে। তাই বিশ্বকাপে লাতিন আমেরিকার ফুটবল মানে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাই। সেই ব্রাজিল পরপর তিনটে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলে দুবার চ্যাম্পিয়ন হয় দুই সহস্রাব্দের সন্ধিকালে। তারপর ২০১৪ সালের আগে আর সেমিফাইনালেও উঠতে পারেনি এবং ঘরের মাঠে মারাকানা স্টেডিয়ামের সেই সেমিফাইনাল ব্রাজিল সমর্থকদের পক্ষে বিভীষিকা হয়ে আছে। এবারের ব্রাজিলকে অনেক বেশি জমাট দেখাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল নেইমার-নির্ভরতাও নেই। কিন্তু সেই ব্রাজিলও কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিল। আর্জেন্টিনা ১৯৯০ আর ২০১৪— এই দুই ফাইনালের মাঝে একবারও শেষ চারে পৌঁছয়নি। স্বভাবতই আর্জেন্টিনার এবারের সাফল্যে ইউরোপের আধিপত্য খর্ব হল বলে ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে অনেকের যে উল্লাস, তার স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দিহান হওয়ার কারণ আছে। আধিপত্য আদৌ খর্ব হয়েছে কিনা তা নিয়েই সন্দেহ আছে। আগামীবার থেকে বিশ্বকাপ ৪৮ দলের হয়ে গেলে ইউরোপের প্রাধান্য উল্টে বেড়েও যেতে পারে। প্রশ্ন হল, এমন হচ্ছে কেন? ২০০২ থেকে ২০২২— এই দুই দশকে এমন কী ঘটল যে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা ক্রোয়েশিয়ার চেয়েও কম ধারাবাহিক হয়ে পড়ল? ইতালি, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড তো বটেই, গত ২০ বছরে বুলগেরিয়া, রোমানিয়ার মত বিশ্বকাপে অনিয়মিত দলের সামনে পড়লেও কেন হেরে যায় লাতিন আমেরিকার দানবরা? এইসব প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরও। সে উত্তর মাঠের ভিতরে খুঁজলে অগভীর জবাব পাওয়া যাবে।

বিশ্বকাপে ইউরোপের বাইরের যে দলগুলো খেলতে এসেছিল, তাদের সকলের খেলোয়াড় তালিকার দিকে তাকালেই একটা জিনিস চোখে পড়ে। প্রত্যেক দলেই ইউরোপে ক্লাব ফুটবল খেলা খেলোয়াড়দের সংখ্যা প্রচুর। বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনার ২৬ জনের দলে রিজার্ভ বেঞ্চের গোলরক্ষক ফ্রাঙ্কো আর্মানি আর মাঝমাঠের খেলোয়াড় থিয়াগো আলমাদা ছাড়া সকলেই ইউরোপের কোনও না কোনও ক্লাবের খেলোয়াড়। একমাত্র আর্মানিই খেলেন নিজের দেশের ক্লাব রিভার প্লেটে। ব্রাজিল দলের ছবিটাও খুব আলাদা নয়। অতিরিক্ত গোলরক্ষক ওয়েভার্তন খেলেন সাও পাওলোর পালমেইরাসে আর মাঝমাঠের এভের্তোন রিবেইরো, আক্রমণভাগের পেদ্রো খেলেন রিও দি জেনেইরোর ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গোতে। এছাড়া রক্ষণভাগের দানি আলভেস খেলেন মেক্সিকোর উনিভার্সিদাদ নাসিওনাল এসিতে। আর সবাই ইউরোপে খেলেন। আফ্রিকার দেশগুলোর দল ঘাঁটলেও একই ব্যাপার দেখা যাবে। এমনকি এবার চমকে দিল যে জাপান দল, তাদেরও ২৬ জনের মধ্যে শুধু জার্মানির লিগেই খেলেন আটজন। এর সরাসরি ফলাফল হল, ফুটবলে ঘরানা বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। আফ্রিকা বা এশিয়ার ক্ষেত্রে সেটা খুব বড় কথা নয়। কারণ বিশ্ব ফুটবলে এই দুই মহাদেশ এতটাই পিছিয়ে থেকে শুরু করেছে যে তাদের এখনও নিজস্ব ঘরানা বলে কিছু তৈরি হয়নি। ইউরোপে খেলতে খেলতে বরং তাদের লাভই হয়। কবি লিখেছিলেন “দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে”। এশিয়া, আফ্রিকার এখনও নেওয়ার পালা চলছে। অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে হয়ত দেওয়ার পালা আরম্ভ হবে। কিন্তু লাতিন আমেরিকার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তা নয়। লাতিন আমেরিকার নিজস্ব ঘরানা ছিল। সারা পৃথিবীর লাতিন আমেরিকান ফুটবলের ভক্তরা তাতেই মোহিত হয়েছিলেন। সেই ঘরানার প্রাণ হল ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, যা চোখের আরাম। সে খেলাকেই ‘জোগো বোনিতো’ অর্থাৎ ‘বিউটিফুল গেম’ বলা চলে। কিন্তু ফুটবল তো মানুষ খেলে। দেবতারা খেলে না, রোবটরাও নয়। ফলে সারা বছর যেভাবে খেলছেন একজন ফুটবলার, তিনি কালেভদ্রে জাতীয় দলের হয়ে একেবারে অন্য দর্শনে, অন্য কায়দায় খেলবেন কী করে? সেকথা জাতীয় দলের কোচকেও বুঝতে হয়, গা জোয়ারি চলে না। ফলে লাতিন আমেরিকান ফুটবলের রহস্য নষ্ট হয়ে গেছে। সারা পৃথিবীই আসলে খেলে ইউরোপের খেলা। সে খেলায় ইউরোপকে হারাতে যে কালঘাম ছুটে যাবে আর সকলের তাতে আর আশ্চর্য কী? কিন্তু ক্ষতি শুধু ওটুকু নয়।

কিলিয়ান এমবাপের একটা মন্তব্যে নাকি বেজায় চটেছেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। সেই কারণেই দুর্ভেদ্য গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ফাইনাল শেষ হওয়ার পর থেকে এমবাপেকে বিদ্রুপ করেই চলেছেন, একেকসময় তা শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করছে। এমবাপে কিছুদিন আগে বলেছিলেন “ইউরোপে আমাদের সুবিধা হল সারাক্ষণ নিজেদের মধ্যে নেশনস লিগের মত উচ্চমানের ম্যাচ খেলি। ফলে আমরা যখন বিশ্বকাপে যাই তখন তৈরি হয়ে যাই। কিন্তু ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আমেরিকায় এইরকম সুযোগ পায় না। সেখানকার ফুটবল ইউরোপের মত উন্নত নয়। সেই কারণেই গত কয়েকটা বিশ্বকাপে ইউরোপিয়ানরাই জিতেছে।” এমিলিয়ানোর অসভ্যতাকে সমর্থন না করেও তাঁর আবেগকে ধরতে পারা সম্ভব। শুধু তো আর্জেন্টিনা নয়, গোটা লাতিন আমেরিকার ফুটবল সম্পর্কেই একটা বড় কথা বলেছেন এমবাপে। খোদ ফ্রান্সকেই হারিয়ে দিয়ে মুখের মত জবাব দেওয়া হয়েছে বলে ভাবতেই পারেন এমিলিয়ানো। কিন্তু এমবাপের কথাটা ভেবে দেখার মত।

ইউরোপের চেয়ে লাতিন আমেরিকার ফুটবল যে পিছিয়ে পড়েছে তার পরিসংখ্যানগত প্রমাণ ইতিমধ্যেই দিয়েছি। তবে এমবাপে উদাহরণ দিতে গিয়ে একটু ভুল করেছেন। উয়েফা নেশনস লিগ চালু করেছে সদ্য। উদ্দেশ্য ক্লাব ফুটবলের দাপটে আন্তর্জাতিক ফুটবলের আকর্ষণ কমে যাওয়ার সমস্যা সামলানো। কিন্তু তাতে একটা বড় জিনিস স্বীকার করে নেওয়া হয়, সেটা হল ফুটবল খেলাটাকে চালায় আসলে ক্লাব ফুটবল। আরও নির্দিষ্ট করে বললে ইউরোপের ক্লাব ফুটবল। লাতিন আমেরিকা পিছিয়ে পড়েছে বছর বিশেক হল, আর নেশনস লিগের বয়স মাত্র তিন। লাতিন আমেরিকা পিছিয়ে পড়েছে কারণ তাদের ক্লাব ফুটবল পিছিয়ে পড়েছে। কেন পিছিয়ে পড়ল? কারণটা বিশুদ্ধ অর্থনীতি। ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি, জার্মানির দ্বিতীয় সারির ক্লাবগুলোও যে পারিশ্রমিক দিতে পারে তার ধারেকাছে পৌঁছতে পারে না আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় দুই ক্লাব চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিভার প্লেট আর বোকা জুনিয়র্সও। নেইমারকে খেলানোর কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না ব্রাজিলের ফ্ল্যামেঙ্গো বা পালমেইরাস। আফ্রিকার ক্লাবগুলোর সঙ্গে তো আরও দুস্তর ব্যবধান।

এমন নয় যে লাতিন আমেরিকার খেলোয়াড়দের ইউরোপে চলে যাওয়া এই সহস্রাব্দেই শুরু হয়েছে। মারাদোনা, ক্যারেকা, রোমারিও, বেবেতো, রোনাল্ডো, রোনাল্ডিনহো, রবার্তো কার্লোসরাও বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, নাপোলি, জুভেন্তাস বা এসি মিলানে খেলেছেন। কিন্তু তাঁদের সার, জল দিয়ে বড় করে তুলত আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের ফুটবলব্যবস্থাই। তারপর তাঁদের খেলা দেখে চড়া দামে কিনে নিত ইউরোপের ক্লাবগুলো। মারাদোনার মারাদোনা হওয়া শুরু বোকা জুনিয়র্সে। কেরিয়ারের শেষ প্রান্তে তিনি ফিরেও যান নিজের দেশে, তাঁর শেষ ক্লাব নেউয়েলস ওল্ড বয়েজ। কিন্তু ফুটবলের অর্থনীতি যেভাবে বদলে গেছে তাতে মেসি নিজের মাইনে কমাতে রাজি হয়েও বার্সেলোনাতেই থাকতে পারলেন না, আর্জেন্টিনায় ফিরে যাওয়া তো দূরের কথা। অবশ্য মেসি আর্জেন্টিনা ছেড়েছেন অনেক ছোট বয়সে। চে গুয়েভারার জন্মস্থান রোজারিওর রুগ্ন শিশু মেসির প্রতিভা ছোটবেলাতেই চিনে নিয়ে বিশ্বখ্যাত লা মাসিয়ায় তুলে এনেছিলেন বার্সেলোনার স্পটাররা। মেসি ও তাঁর পরিবারের হয়ত কিছুটা কৃতিত্ব প্রাপ্য তিনি স্পেনের নাগরিকত্ব গ্রহণ না করে আর্জেন্টিনার হয়েই সারাজীবন খেললেন বলে। কিন্তু ঘটনা হল পৃথিবী জুড়ে বেড়ে চলা অর্থনৈতিক বৈষম্যের সুযোগে কচি বয়সেই ইউরোপে চলে যাচ্ছে লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার ফুটবল প্রতিভা। মেসির মত ছোট বয়সে না হলেও, কেরিয়ার শুরু করার কয়েক বছরের মধ্যেই। তারপর আর কিসের ঘরানা? গোটা পৃথিবীকে এক অর্থনীতির ছাঁচে ঢালাই করার যে পরিকল্পনা বিশ্বায়ন বা নব্য উদারনীতিবাদী অর্থনীতির, তারই ফলশ্রুতিতে গোটা পৃথিবীর ফুটবলই আসলে হয়ে দাঁড়াচ্ছে ইউরোপের ফুটবল। জার্সির রংটুকুই যা আলাদা। মেসির মত জন্মগত প্রতিভা সকলের থাকে না, ফলে ফুটবলের সৌন্দর্য সিস্টেম ছাপিয়ে সকলের পায়ে জায়গা করে নিতেও পারে না। যে তরুণ আর্জেন্টাইন বা ব্রাজিলিয়ানের ফুটবল শিক্ষা হবে ইউরোপের কোচের হাতে, সারাবছর খেলবেন ইউরোপে, তিনি ড্রিবল করায় বিশ্বাস করবেন কম। এটাই স্বাভাবিক।

আরও পড়ুন বোর্ডের ঘরে যে ধন আছে, ক্রিকেটের ঘরে সে ধন আছে?

ফুটবলের আলোচনায় অর্থনীতি শব্দটা দেখেই যাঁরা নাক কুঁচকে ভাবছেন অপ্রাসঙ্গিকভাবে রাজনীতি এনে ফেলা হচ্ছে বা ইউরোপ কেবল টাকার জোরে সবাইকে পিছনে ফেলে দিচ্ছে বলায় যাঁরা রাগ করছেন তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিই ২০১৩ সালের কথা। সে বছর ওয়েলশ ফুটবলার গ্যারেথ বেলকে ইংল্যান্ডের টটেনহ্যাম হটস্পার থেকে ১০০ মিলিয়ন ইউরো (১৩১.৮৬ মিলিয়ন ডলার) দাম দিয়ে কিনে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ। সেটা তখনকার রেকর্ড ট্রান্সফার ফি। বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন এবং সেইসময় রিয়ালে কার্লো আনচেলোত্তির সহকারী জিনেদিন জিদান বলেই ফেলেন “আমাকে দশ বছর আগে কেনা হয়েছিল ৭৫ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার) দিয়ে আর আমি বলেছিলাম আমি অত দাম পাওয়ার যোগ্য নই। এখন আমার মনে হয় কোনও খেলোয়াড়ই এত দাম পাওয়ার যোগ্য নয়। এটা স্রেফ ফুটবল। দুর্ভাগ্যজনক, দুর্বোধ্য যে এত টাকা কেন খরচ করা হচ্ছে।” জিদান প্রয়াত ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার সক্রেটিসের মত কমিউনিস্ট পার্টি করতেন বলে তো শোনা যায় না। মারাদোনার মত ফিদেল কাস্ত্রো বা কিউবাপ্রীতিরও খবর নেই। সুতরাং ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই যে আলজিরীয় অভিবাসীদের সন্তান জিদানের মনুষ্যত্বের কাছেই কোথাও টাকার অঙ্কটা অশ্লীল বলে মনে হয়েছিল। এখন ২০২২, সর্বকালের সবচেয়ে দামি ট্রান্সফারের তালিকায় প্রথম দশেরও বাইরে চলে গেছেন বেল।

পুরো তালিকাটা দেখুন এখানে। তারপর ভেবে দেখুন, মার্কিনি মদতে বারবার নির্বাচিত সরকার পড়ে যায়, অর্থনীতির দফারফা হয়ে যায় যে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, ভেনিজুয়েলা, পেরুতে— সেখানকার ফুটবল কী করে লড়বে ইউরোপের সঙ্গে? কুড়ি বছর পরে একবার একটা দলের বিশ্বকাপ জয় কি সত্যিই কিছু প্রমাণ করে? এ মাসেই আর্জেন্টিনায় মুদ্রাস্ফীতির হার ৯৯ শতাংশে পৌঁছবে বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। বুয়েনস এয়ার্সের রাস্তা ভরিয়ে মেসির দলকে অভিবাদন জানিয়েছে যে হবু ফুটবলাররা, তাদের কজন ওই নীল-সাদা জার্সি গায়ে চাপানোর সঙ্কল্প বজায় রাখতে পারবে? প্রশ্নটা শুধু আবেগের নয়। মারাদোনার দল যখন বিশ্বকাপ জিতেছিল তখনও আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অবস্থা ভাল ছিল না। কিন্তু দুনিয়াটা বদলে গেছে। বার্সেলোনা ছেড়ে কোনও নিঃস্ব নাপোলিকে ইতালি, ইউরোপের রাজা করতে যাননি মেসি। গেছেন কাতারি ধনকুবেরদের অর্থে পুষ্ট প্যারিসের ক্লাবে। যেখানে তাঁর পাশে খেলেন নেইমার আর এমবাপে— সবচেয়ে দামি ট্রান্সফারের তালিকায় যথাক্রমে এক আর দুই নম্বরে থাকা ফুটবলার।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত

মেসি বিশ্বকাপ জিতলেন, শিল্প বিশ্বজয়ী হল আবার

মেসি কানায় কানায় ভরে উঠলেন। তিনি কী ভাবছিলেন জানি না, কিন্তু কাল টিভির পর্দাজোড়া উল্লাসে মনে হচ্ছিল কে যেন নেই।

আলতামিরার গুহাবাসীরা কি প্লেনে চড়ে দেশ দেশান্তরে যেতে পারত? না। তারা কি কম্পিউটার ব্যবহার করত? না। তারা কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মানুষের কাজ যন্ত্রকে দিয়ে করাতে পারত? তাও নয়। তারা কি একটা বোতাম টিপে কয়েক হাজার মাইল দূরের জনপদ ধ্বংস করার প্রযুক্তি আবিষ্কার করে ফেলেছিল? মোটেই না। তারা কি ক্যান্সারাক্রান্ত মানুষের মৃত্যু পিছিয়ে দেওয়ার উপায় জানত? একেবারেই না। কিন্তু তারা বাইসন আঁকতে পারত। সে বাইসন দেখতে অর্থ আর সামর্থ থাকলে আজও সারা পৃথিবীর মানুষ ছুটে যায়। মানুষের আর কিছুই থাকে না, শিল্পটুকুই থেকে যায়। যতদিন না আমাদের এই গ্রহটা মহাবিশ্বের অনিবার্যতায় জীবজগৎহীন জড়পিণ্ডে পরিণত হচ্ছে, ততদিন আর সব কিছু বদলে যাবে, ফুরিয়ে যাবে। থেকে যাবে আমাদের শিল্প।

সেইজন্যেই সাফল্যের চেয়েও শিল্প আমাদের চোখ টানে বেশি, স্মৃতির বেশি জায়গা অধিকার করে। দিয়েগো মারাদোনা তাই অনেকের চেয়ে কম গোল করে, অনেকের চেয়ে কম ট্রফি জিতেও বহু মানুষের হৃদয়সম্রাট হয়ে রয়েছেন। ক্লাবের হয়ে লিওনেল মেসির চেয়ে বেশি খেতাব ভবিষ্যতে জিততেই পারেন কোনো ফুটবলার, ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোই তো খুব পিছিয়ে ছিলেন না। মেসির চেয়ে বেশি গোল হয়ত কিলিয়ান এমবাপেও করে ফেলবেন। কিন্তু যেসব দৃশ্যের জন্ম দিয়েছেন দেড় দশকের বেশি সময়, কাতারের ফুটবল মাঠে যেসব ছবি এঁকেছেন গত একমাস – সেগুলো দিয়েই স্মৃতির মণিকোঠায় মেসির জায়গা পাকা হয়ে গেছে, মারাদোনার মতই। আর কে না জানে স্মৃতির কোনো লেবেল লাগে না, শিল্পে কোনো GOAT হয় না, কোনো র‍্যাঙ্কিং চলে না। এমন কোনো সঙ্গীতরসিক আছেন কি যিনি ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খানের গান শুনতে ভালবাসেন বলে পণ্ডিত ভীমসেন যোশীর গান শোনেন না, হিসাব করেন দুজনের মধ্যে কে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ? আমাদের স্মৃতি তো নাজি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগামী ভিড়ে গাদাগাদি ট্রেনের কামরা নয়, যেখানে উত্তমকুমারের চকিত চাহনির পাশে জায়গা হবে না সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের দীপ্তির।পথের পাঁচালী পড়ে কাঁদলে পুতুলনাচের ইতিকথা-র নির্লিপ্তিতে মুগ্ধ হওয়ার জায়গা থাকবে না – এত সীমিত নয় মানবিক আবেগ।

আর যদি শিল্প জয়যুক্ত হয়? কাল তেমন এক রাত ছিল।

বার্সেলোনার জার্সিতে তিনি যত ফুল ফুটিয়েছেন ইউরোপের মাঠে মাঠে, আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে লাতিন আমেরিকায়, দক্ষিণ আফ্রিকায়, রাশিয়ায় – সব সত্ত্বেও থেকে যাচ্ছিল অপূর্ণতা। রত্নখচিত মুকুটে যে কোহ-ই-নূর না থাকলে আর সবই বৃথা মনে হয়। শুধু আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মনে হয় তা নয়, মেসির মুখ দেখলে বোঝা যেত তাঁর নিজেরও মনে হয়। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের পর সর্বত্রগামী হয়েছিল মেসির অশ্রুসিক্ত ছবি।

আরও পড়ুন বড়লোকের খেলা

পৃথিবীর মানচিত্রে আর্জেন্টিনার একেবারে অন্য প্রান্তে থাকা ফুটবলে অনুন্নত দেশ ভারতের বাসিন্দা আমরা বিশ্বকাপ দেখি স্রেফ আনন্দের খোঁজে। আমরা প্রাক্তন উপনিবেশ, আমরা তৃতীয় বিশ্ব। স্বভাবতই এ দেশের বেশিরভাগ মানুষের সমর্থন সফল ইউরোপের চেয়ে বেশি ঝুঁকে থাকে শিল্পী লাতিন আমেরিকার দিকে। ভারতে যখন থেকে বিশ্বকাপ লাইভ দেখা যায় তখন থেকেই নিখুঁত জার্মানি, ইতালি বা লড়াকু চেক রিপাবলিক, ক্রোয়েশিয়ার চেয়ে আমাদের আবেগকে বেশি উস্কে দেয় ক্যামেরুন বা নাইজেরিয়া। আজও কি বেশ কাছের মানুষ মনে হয় না রজার মিল্লাকে? এ দেশে যারা ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বা স্পেনের সমর্থক তাদের মনও তো আসলে কেড়ে নিয়েছিলেন ডেভিড বেকহ্যাম, জিনেদিন জিদান, ইনিয়েস্তার মত বল প্লেয়াররা – ছবি আঁকার নৈপুণ্যে। মানুষ হিংসুটে, মানুষ দাঙ্গাবাজ, মানুষ অকারণে মানুষকে অপমান করে। আইজ্যাক আসিমভ যথার্থই লক্ষ করেছিলেন, মানুষ একমাত্র জীব যারা অন্য জীবকে খাঁচায় পোরে। তবু তো মানুষ যে আনন্দ দেয় তার আনন্দ কামনা করে। খেলার মাঠে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেন শিল্পী ফুটবলাররা। তাই তাঁদের প্রতি পক্ষপাত থাকবেই। বহু মানুষ তাই চেয়েছিলেন, মেসির হাতে যেন একবার বিশ্বকাপটা ওঠে। য়োহান ক্রয়েফ কখনো বিশ্বকাপ ছুঁতে পারেননি, জর্জ বেস্টের সে সুযোগই ছিল না। সে দুর্ভাগ্য যেন মেসির না হয়।

হয়নি। কাল সেই উদ্দাম হাওয়ার রাত ছিল। অন্তত গত চল্লিশ বছরের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্বকাপের ফাইনাল। যেখানে ৩৫ বছরের মেসি প্রথমার্ধেই পেনাল্টি থেকে গোল করলেন, মাঠজুড়ে খেললেন। মাঝমাঠে নিজেদের গোলের দিকে মুখ করে বল পেলেন মেসি, মেসি থেকে জুলিয়ান আলভারেজ, আলভারেজ থেকে ম্যাক অ্যালিস্টার, ম্যাক অ্যালিস্টার থেকে আংহেল দি মারিয়া – ছবির মত গোল হল। আশি মিনিট একতরফা খেলা হওয়ার পর মেসির এক হাত যখন বিশ্বকাপে, তখন ৯৭ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটো গোল করে ফ্রান্সকে ম্যাচে ফেরালেন এরপর যিনি বিশ্বের অবিসংবাদী সেরা ফুটবলার হয়ে উঠবেন, সেই এমবাপে।

তারপর অতিরিক্ত সময়ের শেষ প্রান্তে ফের গোল দিয়ে মেসি যখন উচ্ছ্বাসে ভাসছেন, ভাবছেন সোনার পরী এবার তাঁর হাতের মুঠোয়, তখনই সামান্য ভুলে পেনাল্টি। হাওয়া ঘুরে গেল আবার। তারপর যদি বনস্পতির বিরাট ছায়া না দিতেন সোনার দস্তানার অধিকারী এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, হয়ত প্যারিসেই উড়ে যেত সোনার পরী।

নিঃসন্দেহে সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ ফাইনাল, এ যুগের সেরা ফুটবল শিল্পীর মুকুটে কোহ-ই-নূর বসিয়ে দেওয়ার ফাইনাল।

মেসি কানায় কানায় ভরে উঠলেন। তিনি কী ভাবছিলেন জানি না, কিন্তু কাল টিভির পর্দাজোড়া উল্লাসে মনে হচ্ছিল কে যেন নেই। সেই তিনি, যিনি ২০১০ সালে মেসির দলের কোচ হয়েও এমন অস্থির পদচারণা করতেন সাইডলাইনে যে মনে হত নিজেই নেমে পড়বেন। যিনি গত বিশ্বকাপেও গ্যালারিতে ছেলেমানুষের মত হাসতেন, কাঁদতেন, চিৎকার করতেন আর্জেন্টিনার ম্যাচে। যিনি ভিআইপি, তবু ভিআইপি নন। যাঁর সঙ্গে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের ফুটবল খেলতে না জানা একজন সাধারণ আর্জেন্টিনা সমর্থকের কোনো তফাত থাকত না, উদ্বিগ্ন সঙ্গীসাথীরা পিছন থেকে জামা ধরে টেনে রাখতেন – পাছে মানুষটা টাল সামলাতে না পেরে নিচে পড়ে যায়। ১৯৮৬ সালে প্রায় একা দেশকে বিশ্বকাপ জেতানোর পর যিনি জীবদ্দশায় আর আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় দেখতে পেলেন না, আমূল বদলে যাওয়া ইউরোপকেন্দ্রিক বিশ্ব ফুটবলে ২০ বছর পর লাতিন আমেরিকার বিশ্বজয়ের রাতে সেই আকাশলীন দিয়েগোকে বলতে ইচ্ছে করছিল

ফিরে এসো মারাদোনা;
নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে;
ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার…

মেসি
ছবি @ElDiegoPics টুইটার হ্যান্ডেল থেকে

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

বিশ্বকাপ ফুটবলে মাঠ ও মাঠের বাইরে সেরা ১০ দিগন্ত

বিশ্বকাপ ফিফার সোনার ডিম পাড়া হাঁস। ২০২৬ সালে তাকে খাইয়ে দাইয়ে মোটা করা হবে আরও বেশি ডিমের আশায় – দলের সংখ্যা বাড়বে। চার বছর অন্তর হয় বলেই বিশ্বকাপ বহু অবিস্মরণীয় মুহূর্তের জন্ম দেয়, অনেক নতুন জিনিস দেখা যায়। মাঠে ও মাঠের বাইরে কী কী নতুন দেখলাম এবার? একটি অসম্পূর্ণ তালিকা:

মাঠে

১। এই প্রথম আন্তর্জাতিক ক্লাব ফুটবল মরসুমের শেষে নয়, বিশ্বকাপ হল মাঝপথে। দামি খেলোয়াড়দের গত কয়েকটা বিশ্বকাপের তুলনায় অনেক তরতাজা দেখাল।

২। নয়ের দশক থেকে ক্রমোন্নতির পর আফ্রিকার ফুটবল ফের পিছিয়ে পড়ছে – এমন আশঙ্কার মেঘ সরিয়ে ক্যামেরুন, ঘানার মত অতীতে সাফল্য পাওয়া দেশ ব্যর্থ হলেও প্রথম আফ্রিকান দল হিসাবে সেমিফাইনালে পৌঁছল মরক্কো।

৩। অতদূর যেতে না পারলেও গতিময় ফুটবল খেলে মুগ্ধ করল জাপান। প্রথম রাউন্ডে জার্মানিকে হারানোর পর দ্বিতীয় রাউন্ডেও আগেরবারের ফাইনালিস্ট লুকা মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়াকে টেনে নিয়ে গেল পেনাল্টি শুটআউট অবধি। এশিয়ার অন্য প্রতিযোগীদের মধ্যে সৌদি আরবও চমকে দিল আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারিয়ে। দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিলের কাছে শোচনীয়ভাবে হারলেও এশিয়ার অন্য দেশ দক্ষিণ কোরিয়া প্রথম রাউন্ডে হারিয়ে দেয় পর্তুগালের মত ভারি দলকে।

৪। রেফারিংয়ের মান খুশি করতে পারল না কাউকেই। প্রথম রাউন্ড থেকেই ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির অফসাইড দেওয়া নিয়ে বিভিন্ন দলের সমর্থকরা অখুশি ছিলেন। কোনো দল সহজেই পেনাল্টি পেয়ে যাচ্ছে, আবার কেউ ন্যায্য পেনাল্টি পাচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠছিল। অসন্তোষ মাত্রা ছাড়িয়ে গেল আর্জেন্টিনা বনাম নেদারল্যান্ডস ম্যাচে। দু দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে হাতাহাতির উপক্রম হল, ১৮ জনকে হলুদ, একজনকে লাল কার্ড দেখালেন স্প্যানিশ রেফারি আন্তোনিও মাতেউ লাহোস। ম্যাচের পর প্রকাশ্যে তাঁর নিন্দা করলেন মেসি।

৫। স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্বকাপ। এমনকি তৃতীয় স্থান দখলের ম্যাচেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।

আরো পড়ুন কাতারে বিশ্বকাপ: নিরোর অতিথি আমরা সবাই

মাঠের বাইরে

১। ফিফা বিশ্বকাপে রাজনীতি পছন্দ করে না, কিন্তু প্রতিবাদ আটকাতে স্বয়ং ফিফা সভাপতি রাজনৈতিক বক্তৃতা দিতেও পিছপা নন। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই সাংবাদিক সম্মেলনে তা বুঝিয়ে দিয়েছেন।

২। ইউরোপের দেশগুলো নিরাপদ প্রতিবাদে বিশ্বাসী। ফিফা হলুদ কার্ডের ভয় দেখাতেই ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেন ‘ওয়ান লাভ’ আর্মব্যান্ড পরার পরিকল্পনা ত্যাগ করলেন। জার্মানিও শুধু ম্যাচের আগে টিম ফটো তোলার সময়ে হাত দিয়ে মুখ চেপে প্রতিবাদ সারল।

৩। হাজার চেষ্টাতেও বিশ্বকাপকে অরাজনৈতিক করে ফেলা যায় না। মরক্কোর ফুটবলাররা স্পেনকে হারিয়ে আনন্দ উদযাপন করলেন প্যালেস্তাইনের পতাকা হাতে।

৪। পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সমেত অনেকে আবার হাস্যকরভাবে দাবি করলেন, এ জয় মুসলিম দুনিয়ার জয়। যেন বিশ্বকাপের আর কোনো দলে ইসলাম ধর্মাবলম্বী ফুটবলার নেই।

৫। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন জাতিরাষ্ট্র ব্যাপারটা কৃত্রিম, কার্ল মার্কস চাইতেন সীমান্তহীন পৃথিবী। কাতারে দেখা গেল সীমান্তগুলো ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। বত্রিশ দলের ৮৩০ জন ফুটবলারের মধ্যে ১৩৭ জন যে দেশে জন্মেছেন সে দেশের হয়ে খেলেননি। নিকো উইলিয়ামস আর তাঁর ভাই ইনাকি খেলেছেন যথাক্রমে স্পেন ও ঘানার হয়ে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

অমিতাভ মুখ খুললেন, তবে শরশয্যায়

এই বাজারে কোনো প্রোডাকশন হাউস মহাভারতের মত বিশাল প্রকল্প হাতে নেবে এমন সম্ভাবনা কম। তবু যদি তেমন কিছু হয়, পিতামহ ভীষ্মের চরিত্রের জন্য অমিতাভ বচ্চনের চেয়ে ভাল কাউকে ভাবা যায় কি?

একসময় খবরের কাগজের বিনোদনের পাতায় নিয়মিত ব্যবধানে খবর বেরোত, বলিউডে বা টলিউডে অমুক নির্দেশক মহাভারত বা মহাভারত অবলম্বনে কোনো বড় বাজেটের ছবি করছেন। তার কটা শেষপর্যন্ত মুক্তি পেয়েছে বা বক্স অফিসে সফল হয়েছে জানি না। তবে ওরকম খবর বেরোলে কদিন প্রকাশিত কাস্টিং নিয়ে সিনেমাভক্তদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা চলত। কে কোন চরিত্রে অভিনয় করছে আর কোনটা করলে ভাল হত – এই আলোচনায় দিব্যি সময় কাটত। অতিমারীর সময় থেকেই এ দেশের সিনেমাশিল্প সংকটে। বলিউড রীতিমত বেকায়দায়। এক ওটিটিতে রক্ষা নেই, বয়কট দোসর। তার উপর হিন্দিতে ডাব হয়ে বলিউডকে টেক্কা দিচ্ছে তামিল, মালয়ালম, কন্নড় ভাষার ছবি। এই বাজারে কোনো প্রোডাকশন হাউস মহাভারতের মত বিশাল প্রকল্প হাতে নেবে এমন সম্ভাবনা কম। তবু যদি তেমন কিছু হয়, পিতামহ ভীষ্মের চরিত্রের জন্য অমিতাভ বচ্চনের চেয়ে ভাল কাউকে ভাবা যায় কি? ইংরেজিতে ‘এল্ডার স্টেটসম্যান’ বলে একটা কথা আছে। মহাভারতের আখ্যানে সেই এল্ডার স্টেটসম্যান নিঃসন্দেহে ভীষ্ম। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরব পক্ষে যোগ দিলেও পাণ্ডব পক্ষের কাছে তিনি শ্রদ্ধাভাজন তাঁর প্রজ্ঞা, প্রবীণতা এবং বহু বিষয়ে নিরপেক্ষ বিচারক্ষমতার কারণে। অমিতাভ এখন যে বয়সে পৌঁছেছেন, সিনেমার জগতে তাঁর অভিজ্ঞতার যা দৈর্ঘ্য এবং বৈচিত্র্য, ওই জগতের বাইরেও ভারতের সব ক্ষেত্রের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে তাঁর যা গ্রহণযোগ্যতা, তাতে আর কাকে এল্ডার স্টেটসম্যান বলা যায়?

এহেন অমিতাভ ২৮তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছেন তা নিয়ে হইহই পড়ে গেছে। হ্যারি পটারের ভক্তরা জানেন, জাদুর দুনিয়ায় ভল্ডেমর্টের নামোচ্চারণ বারণ। আজকের ভারতে তেমনি বাকস্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করা বারণ, করলেই ঝামেলা হয়। আজকের ভারতে বিখ্যাত কেউ যদি বলেন বাকস্বাধীনতা আছে, তাহলেই সরকারপক্ষের লোকেরা উদ্দাম নৃত্য শুরু করেন, যাঁরা বলেন নেই তাঁদের এই সুযোগে আরেকবার মিথ্যাবাদী, দেশদ্রোহী ইত্যাদি বলে নেন। ফলে অভিযুক্ত দেশদ্রোহীরা বিখ্যাতকে বলেন “ব্রুটাস, তুমিও”? আর যদি অমিতাভের মত কেউ বলে ফেলেন বাকস্বাধীনতা নেই, তাহলে তো মহাপ্রলয়। সরকারপক্ষ বলেন, এত বড় কথা! বাকস্বাধীনতা নেই? “আমি আছি, গিন্নী আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে – /সবাই মিলে কামড়ে দেব মিথ্যে অমন ভয় পেলে।” কিন্তু অমিতাভের মন্তব্যের পরে কিঞ্চিৎ উলটপুরাণ দেখা গেছে। কামড় পরিবার, থুড়ি, সঙ্ঘ পরিবারের ট্রোলবাহিনীর মাথা অমিত মালব্য অমিতাভের প্রশংসা করেই টুইট করেছেন। কারণ মন্তব্যটা কলকাতায় করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে। অতএব মালব্যের ব্যাখ্যা, অমিতাভ ‘টাইর‍্যান্ট’ মমতার মুখের সামনে আয়না ধরেছেন। এমন টাইর‍্যান্ট যার রাজত্বে নির্বাচনোত্তর হিংসা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের প্রাক-নির্বাচন হিংসা বা নির্বাচনোত্তর হিংসা নিঃসন্দেহে বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী, কিন্তু বাকস্বাধীনতা ব্যাপারটার সীমা ওটুকুর মধ্যেই বেঁধে দেওয়ার চালাকি বিজেপির আই টি সেলের প্রধান ছাড়া আর কে-ই বা করবেন? আই টি সেলের আর যে দোষই থাক না কেন, সোশাল মিডিয়ার যুগে কোন জিনিসটা লোকে ভাল ‘খায়’ তা বুঝতে ওদের মত কেউ পারে না। অমিতাভের ভক্তকুল যে এখনো বিজেপির ভক্তকুলের চেয়ে বড়, ফলে এই মন্তব্যের জন্য চিরাচরিত প্রথায় তাঁকে আক্রমণ করলে যে হিতে বিপরীত হতে পারে তা চট করে বুঝে নিয়ে বন্দুকের নল মমতার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন মালব্য। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন অর্ধসত্য প্রচার করার সহজাত ক্ষমতায় তৈরি অরিজিৎ সিংয়ের গান গাওয়ার ভিডিও ক্লিপ। সে ক্লিপে সুকৌশলে কেটে দেওয়া হয়েছে ‘বোঝে না সে বোঝে না’ গানের লাইন দুটো, রয়েছে শুধু ‘রং দে তু মোহে গেরুয়া’। যাতে দেখলেই মনে হয়, মমতার অনুরোধে গান গেয়ে অরিজিৎ বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি গৈরিক বাহিনীর লোক। অরিজিৎ তা হতেই পারেন, হওয়া তাঁর বাকস্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার অন্তর্গত। কিন্তু ঘটনা হল, ওই চতুর এডিটিং ছাড়া শুধু সেদিনের ঘটনা দিয়ে অরিজিতের সমর্থন প্রমাণ হয় না।

এ শুধু বিজেপি প্রোপাগান্ডা। স্বভাবতই পাল্টা প্রচারে নেমে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস, নেতৃত্বে সোশাল মিডিয়ার মুক্তিসূর্য মহুয়া মৈত্র। দু পক্ষে যা চলছে তাকে আমরা গেঁয়ো লোকেরা বলি প্যাঁচাল পাড়া। আমাদের রাজনৈতিক বিতর্ক এখন প্যাঁচাল পাড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। নইলে অমিতাভের বক্তৃতা নিয়ে নিবিষ্ট আলোচনার অবকাশ ছিল। তিনি সিনেমার লোক, সিনেমার কথাই বলেছেন। সিনেমার বহু আগে আমাদের দেশের নাচ, গান, নাটকের মত শিল্পমাধ্যমগুলোর উৎস ছিল ধর্মস্থানগুলো, সেকথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। সিনেমা আসার পর পরাধীন ভারতে কীভাবে সেন্সরকে ফাঁকি দিয়ে ইংরেজবিরোধী বক্তব্য ছবিতে ঢুকিয়ে দিতেন শিল্পীরা – সে ইতিহাস টেনে এনেছেন। ১৯৫২ সালের সিনেমাটোগ্রাফ আইনের কথা বলেছেন এবং তারপরেই বলেছেন “মঞ্চে উপবিষ্ট আমার সহকর্মীরা নিশ্চয়ই একমত হবেন যে আজও নাগরিক স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে।” সহকর্মী বলতে সেখানে তখন উপস্থিত বলিউডের শাহরুখ খান, রানী মুখার্জির মত তারকারা। টলিউডের কে নয়?

সাম্প্রতিককালে ধর্মীয় ভাবাবেগের দোহাই দিয়ে কীভাবে একের পর এক ফিল্ম, ওয়েব সিরিজকে আক্রমণ করেছে হিন্দুত্ববাদীরা – সেকথা কারোর অজানা নয়। মাত্র কয়েকদিন হল প্রকাশিত হয়েছে শাহরুখ ও দীপিকা পাড়ুকোনের মুক্তির অপেক্ষায় থাকা পাঠান ছবির বেশরম রঙ্গ গানের ভিডিও। সোয়া তিন মিনিটের ভিডিওতে দীপিকার বিকিনির রং বদলেছে বারবার, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাঁকে কেন গেরুয়া (নাকি কমলা?) বিকিনিতে ইসলাম ধর্মাবলম্বী শাহরুখের বাহুবন্ধনে দেখা গেছে তা নিয়ে তোলপাড় চলছে। এ বছরের গোড়ায় লাল সিং চাড্ডা মুক্তি পাওয়ার আগে থেকেই সোশাল মিডিয়ায় ছবিটাকে বয়কট করার ডাক দেওয়া হয়ে গিয়েছিল।

কারণ আমির খান একবার বলেছিলেন দেশের যা অবস্থা হচ্ছে তাতে স্ত্রী কিরণ রাও একদিন আলোচনা করেছিলেন, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত কিনা। এরকম অসংখ্য উদাহরণ গত কয়েক বছরের ঘটনাবলী থেকে দেওয়া যায়। পদ্মাবত ছবি নিয়ে কী কাণ্ড হয়েছিল নিশ্চয়ই কেউ ভোলেননি। ছবির শুটিং চলাকালীন সেটে আগুন ধরিয়ে দেওয়া দিয়ে শুরু, দীপিকার নাক কেটে নেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল। ছবির নাম প্রথমে ছিল ‘পদ্মাবতী’, রাজপুত বীরদের দৌরাত্ম্যে শেষমেশ নাম বদলে ছবির মুক্তি নিশ্চিত করতে হয়েছিল পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনশালীকে। অথচ ছবিটা রীতিমত হিন্দুত্ববাদী। একে প্রচলিত কাহিনিকে ইতিহাস বলে দেখানো হয়েছে, তার উপর আলাউদ্দিন খিলজী যেন নরখাদক। অর্থাৎ এই ছবি জলজ্যান্ত প্রমাণ যে ভারতে বাকস্বাধীনতা এমন বিপন্ন, সকলকে খুশি না করে সিনেমা বানানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে কতিপয় প্রযোজক, নির্দেশকের এক বিশেষ ধরনের ছবি সরাসরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। এই আবহে অমিতাভ ওই কথাগুলো বলেছেন। মালব্য মোটেই বোকা লোক নন। অমিতাভের কথা প্রসঙ্গে এসব আলোচনা যে অনিবার্য তা তিনি ভালই জানেন। সে আলোচনা গুলিয়ে দিতেই অপ্রাসঙ্গিকভাবে নির্বাচনী হিংসার কথা টেনে এনেছেন।

মুক্তকণ্ঠে অমিতাভের প্রশংসা করা যেত দেশের আজকের অবস্থায় এই কথাগুলো বলার জন্য, কারণ তাঁর কথার দাম যে সকলের চেয়ে বেশি তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কিছু অসুবিধা আছে। বিজেপির প্রোপাগান্ডার জবাবে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল যা যা বলছে ‘তাতে ঠাকুরঘরে কে রে, আমি তো কলা খাইনি’ মনোভাব স্পষ্ট। মুক্তিসূর্য মহুয়াও অমিতাভকে বাংলার জামাই-টামাই বলে আলোচনার গভীরে না গিয়ে তুই বেড়াল না মুই বেড়াল স্তরেই থাকার চেষ্টা করেছেন। কারণ সিনেমার কৈলাস পর্বতের বাসিন্দা অমিতাভ খবর না রাখলেও মহুয়া বিলক্ষণ জানেন রাজনৈতিক বিরোধীদের উপর আক্রমণ বাদ দিলেও পশ্চিমবঙ্গে বাকস্বাধীনতা কী দারুণ স্বাস্থ্যের অধিকারী। ফ্যাসিবাদের সাত-সতেরো লক্ষণ তাঁর কণ্ঠস্থ, তাই তিনি জানেন ভবিষ্যতের ভূত বলে একটা বাংলা ছবি সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশনের ছাড়পত্র পাওয়ার পরেও পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ হলে দেখানো হচ্ছিল না। নির্মাতাদের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত দৌড়তে হয়েছিল।

সেই ছবির পরিচালক অনীক দত্ত তার আগের কলকাতা চলচ্চিত্রোৎসবে চতুর্দিকে বাংলা ছবির দিকপালদের ছবির বদলে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি থাকার নিন্দা করেছিলেন।

অমিতাভের প্রশংসা করা যাচ্ছে না ঠিক এই কারণেই। তিনি জরুরি কথা বলেছেন, কিন্তু কায়দাটা ধরি মাছ না ছুঁই পানি। কারোর নাম না করে কিছু ভাল ভাল কথা বলা যে যুগপৎ শিরোনামে আসা নিশ্চিত করা আর বিপদসীমার বাইরে থাকার কৌশল তা তাঁর মত শোম্যান ভাল করেই জানে। উপরন্তু পিতামহ ভীষ্মের সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্য প্রবীণতা আর অভিজ্ঞতাতেই শেষ নয়। আমরা জানি দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময়ে ভীষ্ম টুঁ শব্দটি করেননি। না, একটু ভুল হল। দ্রৌপদী নিজের সম্মানরক্ষার শেষ চেষ্টা হিসাবে প্রশ্ন করেন, পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির কি নিজের আগে পাঞ্চালীকে বাজি রেখে হেরেছিলেন, নাকি পরে? যদি নিজেকে আগে বাজি রেখে হেরে থাকেন তাহলে তো দ্রৌপদীর উপর অধিকার আগেই হারিয়েছেন। সুতরাং পাঞ্চালী বিজিত নন। এ প্রশ্নের উত্তরে ভীষ্ম বলেছিলেন এসব কূটতর্কের বিষয়। এ দিয়ে মীমাংসা হতে পারে না। তাছাড়া যুধিষ্ঠির নিজেই তো ধর্মপুত্তুর। তাঁর মত করে ধর্ম আর কে বোঝে? অমিতাভও কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশে যা যা ঘটেছে তা নিয়ে কখনো মুখ খোলেননি। যে বলিউডের তিনি বেতাজ বাদশা, তার উপর একের পর এক আক্রমণেও নিশ্চুপ ছিলেন। সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর গোটা বলিউডকে মাদকাসক্ত বলে প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছে বিজেপির তরফে, অমিতাভ-পত্নী জয়া রাজ্যসভায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন, অমিতাভ কিন্তু মুখ খোলেননি। আজ হঠাৎ চৈতন্যোদয় কী কারণে তা বোঝা শক্ত।

অবশ্য কবি বলেছেন “প্রভাত কি রাত্রির অবসানে।/যখনি চিত্ত জেগেছে, শুনেছ বাণী,/তখনি এসেছে প্রভাত।” অমিতাভের চিত্ত যদি শেষমেশ জেগে থাকে তাতে ক্ষতি নেই। তবে যুগে যুগে অবতারের রূপ বদলানোর মত কংগ্রেস আমলে যিনি কংগ্রেসি, উত্তরপ্রদেশে মুলায়ম সিং যাদবের রমরমার কালে অমর সিংয়ের মিত্রতায় যিনি সপরিবারে সমাজবাদী, যিনি কুছ দিন তো গুজারো গুজরাত মেঁ ক্যাম্পেনে দেশের বারোটা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা জ্যোতির্লিঙ্গকেই দেশের একতার প্রতীক বলতে আপত্তি করেন না, তাঁর চিত্ত হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে ঝলমল করছে এ কথা সহজে বিশ্বাস হতে চায় না, এই আর কি।

আরও পড়ুন ক্রিকেটার তুমি কার?

মঞ্চে অন্য যাঁরা ছিলেন তাঁদের উপস্থিতিও যে বিশ্বাস উৎপাদনে সহায়ক নয় তা বলাই বাহুল্য। মুখ্যমন্ত্রী বা কলকাতার মহানাগরিকের কথা বাদই দিলাম। অমিতাভ যখন বক্তৃতা দিচ্ছেন, ঠিক পিছনেই দেখতে পেলাম পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর মুখ। অমিত শাহের মত প্রবল গণতান্ত্রিক মানুষ কলকাতায় এসে যাঁর আতিথ্য গ্রহণ করেন, সঙ্গীতের ব্যাপারে বিশুদ্ধবাদী, প্রচারবিমুখ সেই অজয়বাবু সিনেমার উৎসবে কী করছিলেন কে জানে! এঁদের মধ্যে দাঁড়িয়ে বাকস্বাধীনতার জন্য হা হুতাশ করেছেন অমিতাভ। অবশ্য শরশয্যাই তো ভীষ্মের নিয়তি।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

Messi, Mbappe, Pele and Maradona in grand finale

Believers could hold this as proof that matches are made in heaven because there could not have been a more fitting finale to the most competitive World Cup in memory.

One can only see Pele’s Brazil up against Diego Maradona’s Argentina in the FIFA video game, but reality has refused to be left too far behind. It has set up Kylian Mbappe’s France against Lionel Messi’s Argentina. Believers could hold this as proof that matches are made in heaven because there could not have been a more fitting finale to the most competitive World Cup in memory. Japan have beaten Germany; Saudi Arabia have defeated Argentina and Tunisia have beaten France in this edition. Africa got its first World Cup semifinalist in Morocco, who got rid of Spain and Portugal. In short, this World Cup has made the glorious uncertainties of the game the only certainty. In such a World Cup, to have two finalists who started the tournament as favourites feels like a twist in the tale.

There could not be a better final for a neutral. On one hand is Messi, compared both fairly and unfairly to Maradona, in what would be his last World Cup match going by his own assertion. On the other is the obvious heir to Messi’s throne as the best footballer in the world – Mbappe.

Just as Pele was a boy wonder when Brazil won their first World Cup in 1958, Mbappe was an eye-catching teen when France won it in Russia four years back. One could already see his brilliance and wonder what he could become. Today, Mbappe is the scariest predator in attacking third since Brazil’s Ronaldo in 1998 and 2002. The French has scored nine World Cup goals so far and he is just 23. Thus he has broken Pele’s record for most World Cup goals before turning 24. His place among the all-time World Cup greats seems inevitable, especially if he scores in the final. And we are not even discussing his assists, his sheer presence on the field which makes the opposition lose track of threats like Olivier Giroud, Antoine Griezmann or Ousmane Dembele.

How incredible Didier Deschamps’ lot is can be gauged from the fact that they have had all bases covered without having Karim Benzema in attack, Paul Pogba and Ngolo Kante in the midfield. Not that the French defenders have not fluffed their lines at all – they conceded two penalties against England for example – but the imposing figure of Hugo Lloris under the bar has not let them concede many.

This French side has looked unbeatable (not counting the Tunisia loss when Deschamps basically fielded his reserve bench) but they are up against Argentina. Messi’s Argentina. If football is more art than a game for you, it is difficult not to love Messi, no matter which team you support. This, by far, has been his best show at a World Cup. Like Mbappe, Messi has scored five goals so far. But even more captivating has been his overall control of the game, the culmination of which was his hypnotism of Croatian defender Josko Gvardiol in the semifinal. The resultant assist to young sensation Julian Alvarez sealed the final berth and this happened when people were not finished discussing Messi’s final pass to Nahuel Molina for Argentina’s first goal against the Netherlands in the quarterfinal.

Unlike his previous World Cups, Messi, at 35, has looked like a free bird in the company of talents like Alvarez, Lautaro Martinez, Alexis Mac Allister, Rodrigo de Paul et al. They have been so efficient that Lionel Scaloni could give a player of Angel de Maria’s calibre breaks. The defence of Nicolas Otamendi, Cristian Romero, Nicolas Tagliafico, Marcos Acuna et al has been solid after the Saudi disaster. Even more solid has been Emiliano Martinez with the gloves. Two saves in the penalty shootout against the Dutch reminded one of Sergio Goycochea, who kept rescuing Maradona’s side from one shootout after another in Italia 90. Having someone like that under the bar is reassuring for those who think Messi deserves to sign off with the World Cup in his hand, for the joy he has provided millions with for almost two decades.

Read IPL auction: Where privilege holds court

But is Messi really up against France or is he up against Maradona? The emotional genius who took Argentina to glory almost single-handedly in 1986, set the bar so high that even Messi has found it beyond reach till now. The bar shall not be lowered and to be honest, nobody deserves the World Cup more for what he has done over the years. The team that plays better over the all-important 90 minutes deserves it. That was West Germany in 1990 and Germany in 2014. That is why Maradona and Messi had to end those evenings in tears. Maradona is remembered as much for his success as his imperfections. Can squeaky clean Messi script the perfect ending?

Originally published in The Meghalayan