লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ: আমাদের ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’ দেশের মুখ

রবি শাস্ত্রীর বরাবরই জনপ্রিয়তার কারণ ছিল অতিকথন আর গলা সপ্তমে চড়িয়ে কথা বলা, ইদানীং উত্তেজনার বশে খেলোয়াড়দের নামও ভুল করেন। টসে গিয়ে কার সঙ্গে কথা বলছেন গুলিয়ে ফেলেন, তবু তিনিই টসে যাবেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জয়ী প্রাক্তন অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি ২০২০ সালে ক্রিকেট দুনিয়ায় হইচই ফেলে দিয়েছিলেন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ খেলার সময়ে বর্ণবৈষম্যবাদী কথা শুনতে হয়েছে অভিযোগ তুলে। স্যামি বলেছিলেন, ২০১৩ আর ২০১৪ মরশুমে তিনি যখন সানরাইজার্স হায়দরাবাদে খেলতেন, তখন ইশান্ত শর্মা তাঁর নামকরণ করেছিলেন ‘কালু’। দলের অনেকেই তাঁকে ওই নামেই সম্বোধন করতেন। স্যামি তখন জানতেও পারেননি, যত আদর করেই ওই নাম রাখা হয়ে থাক, ওটা আসলে তাঁর গায়ের রং নিয়ে নোংরা রসিকতা। ২০২০ সালে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েড শ্বেতাঙ্গ পুলিসকর্মীর হাতে খুন হওয়ার পরে পৃথিবীজুড়ে বর্ণবৈষম্য নিয়ে প্রকাশ্যে কথাবার্তা চালু হয়ে যায়, তখন স্যামি ইশান্তের কীর্তি প্রকাশ্যে আনেন। তখনকার সতীর্থদের উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন, আমাকে কালু বলে তোমরা কী বোঝাতে চাইতে? এরপর কী হয়? কিচ্ছু না। এই ঘটনা ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মত শ্বেতাঙ্গপ্রধান দেশে প্রকাশ্যে এলে হয়তো সানরাইজার্স বা আইপিএল কর্তৃপক্ষ অথবা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) কোনো তদন্ত শুরু করে দিত, যেমনটা আজীম রফিকের অভিযোগ নিয়ে ইয়র্কশায়ার কাউন্টি করেছিল। কিন্তু আমরা তো ভারতীয়, আমাদের তো ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’, আরও নানা বকম বকম। অতএব আমরা বর্ণবৈষম্যবাদী হতেই পারি না। তাই স্রেফ ইশান্ত স্যামির সঙ্গে কথা বলে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন

কেন আবার এতদিন পরে এসব কথা? কারণ সম্প্রতি প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ ঘোষণা করেছেন যে তিনি আর ধারাভাষ্যকারের কাজ করবেন না। তিনি সোশাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন এর কারণ— তিনি গায়ের রঙের কারণে বৈষম্যের শিকার হতে হতে ক্লান্ত। কালো বলে তাঁকে এত বছর ধারাভাষ্য দেওয়ার পরেও কোনোদিন টসের সময়ে মাঠে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

একথা অবিশ্বাস করার কারণ আছে, যেহেতু ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রাক্তন জোরে বোলার ইয়ান বিশপ এবং জিম্বাবোয়ের প্রাক্তন ক্রিকেটার পুমেলেলো বাঙ্গোয়াকে প্রায়ই টসে দেখা যায়। কিন্তু গতকাল দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের দুই সাংবাদিক – শ্রীরাম বীরা ও আর ভেঙ্কট কৃষ্ণ – এক দীর্ঘ প্রতিবেদন লিখেছেন শিবরামকৃষ্ণণের সঙ্গে কথা বলে। সেই প্রতিবেদন পড়লে পরিষ্কার হয়, শিবরামকৃষ্ণণ নেহাত আন্দাজে এই অভিযোগ তোলেননি। আটের দশকে বিরল প্রতিভা হিসাবে চিহ্নিত এই লেগস্পিনার সেই খেলোয়াড় জীবন থেকেই গায়ের রঙের কারণে নিজের দেশে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। সুতরাং শিকারি বেড়াল যে তিনি গোঁফ দেখলেই চিনতে পারবেন— এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। আমরা চিনি বা না-ই চিনি। তাছাড়া নিজেদের দিকে ভালো করে তাকালেই টের পাওয়া যাবে— আমরা আফ্রিকা-জাত খেলোয়াড়দের প্রতি যে সম্ভ্রম নিয়ে তাকাই, তা আমাদের আশপাশের কালো মানুষদের জন্য বরাদ্দ করি না। একদা কলকাতা ফুটবল মাতানো চিমা ওকোরি, ক্রিস্টোফার, প্রয়াত চিবুজোর, ওমোলো, ওডাফা ওকোলিদের নিয়ে আমরা নাচানাচি করতাম ঠিকই; তা বলে পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে ‘অমুক মেয়েটা কালো হলেও সুন্দর’ বলা বন্ধ করিনি। মজার কথা, ভারতীয়দের বর্ণবৈষম্য এমন বহুমাত্রিক যে তার মধ্যে এমন লিঙ্গবৈষম্যও মিশে থাকে যার শিকার ছেলেরা! কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে মেয়ে বন্ধুদের আলোচনা করতে শুনতাম ‘অত ফরসা ছেলে আমার ভালো লাগে না, একেবারে মেয়েদের মত টুকটুকে গায়ের রং।’ সুতরাং শিবরামকৃষ্ণণকে যে টিভি প্রোডিউসার বলেছেন ‘বসরা আপনাকে টসে বা প্রেজেন্টেশনে না রাখতে’, তিনি খুব অবিশ্বাস্য কিছু বলেননি।

ক্রিকেট মাঠ যে ভারতীয় সমাজের বাইরে নয় তা বুঝতে হলে শিবরামকৃষ্ণণের এই আখ্যান অবশ্যপাঠ্য। মাত্র ১৭ বছর বয়সে টেস্ট অভিষেক (শচীন তেন্ডুলকরের আগে সবচেয়ে কম বয়সে অভিষেকের রেকর্ড) হওয়ার আগেই শিবরামকৃষ্ণণকে নেট বোলার থাকার সময়ে ভারতীয় দলের এক সিনিয়র ক্রিকেটার তাঁর জুতো পালিশ করে দিতে বলেছিলেন। টেস্ট দলে ঢুকে পড়ার পর এবং নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখার পরে কটুকাটব্য আরও বাড়ে। পাকিস্তান সফরে গিয়ে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে অধিনায়ক সুনীল গাভস্কর চকোলেট কেক আনান দলের সকলে মিলে জন্মদিন পালন করার জন্য। সেখানে দলের এক ক্রিকেটার বলেন ‘সানি, তুমি ঠিক রঙের কেক আনিয়েছ। কালো ছেলের জন্যে ডার্ক চকোলেট কেক।’ শিবরামকৃষ্ণণ বলেছেন, তিনি কেঁদে ফেলেন এবং কেক কাটতে চাননি। গাভস্কর বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাঁকে শান্ত করেন, কেক কাটা হয়।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট: জাহান্নামের আগুনে পুষ্পের হাসি

আমরা শিবরামকৃষ্ণণের খেলা দেখেছি পরে সোশাল মিডিয়ার ক্লিপে বা ইউটিউবে, কারণ আমাদের জন্মের আগেই তাঁর স্বল্পমেয়াদি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটজীবন শেষ হয়ে গিয়েছিল। যাঁরা দেখেছেন এবং তাঁর প্রতিভায় চমৎকৃত হয়েছেন, তাঁরা বরাবরই বলেন যে শিবরামকৃষ্ণণের কেরিয়ার লম্বা না হওয়ার পিছনে দায়ী তিনি নিজেই। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মুখেও শুনেছি— শিবরামকৃষ্ণণ প্রথমে মদ খেতেন, পরে মদ তাঁকে খেয়েছে। কিন্তু এত বছর পরে তিনি বলছেন, ক্রমাগত টিটকিরি শুনতে শুনতে ওই ১৮-১৯ বছর বয়সে তিনি হীনমন্যতায় ভুগতেন এবং যখন স্বাভাবিক কারণেই ব্যর্থ হতে শুরু করেন, তখন কেউ পিঠে হাত দিয়ে ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়নি। উলটে তিনি খুব মদ খান— এই গল্প ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আরও চমৎকৃত হওয়ার মত কথা হল, ওই ছোট্ট আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে শিবরামকৃষ্ণণ নিজের দলের ড্রেসিং রুমের চেয়ে বেশি স্বস্তি পেতেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ড্রেসিং রুমে। বলেছেন তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলেন ডেসমন্ড হেইনস। অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েড তাঁকে সর্বদা স্বাগত জানাতেন। মনে পড়ে যায় মহম্মদ আলির কথা, যিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকার করে বলেছিলেন ‘ভিয়েত কংদের সঙ্গে আমার কোনো ঝগড়া নেই। কোনো ভিয়েত কং আমাকে কখনো নিগার বলেনি।’

শিবরামকৃষ্ণণ অবশ্য আলির মত সিংহহৃদয় লড়াকু কেউ নন। তিনি খুবই সাধারণ লোক, ফলে এই মানসিক চাপ সহ্য করতে পারেননি। ছিটকে গিয়েছিলেন। সোশাল মিডিয়া পোস্ট থেকে তাঁর রাজনৈতিক ভাবনাচিন্তা যেটুকু জানা যায়, তাও বেশ গোলমেলে। কিন্তু এখানে সে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক। দুর্ভাগ্যজনক হল— পরে ধারাভাষ্যকার হিসাবে যখন তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে আসেন, তখনো তাঁকে একই ব্যবহার সহ্য করতে হয়েছে। ভারতীয় সমাজ যে এগোবার বদলে পিছিয়ে যাচ্ছে তা আমরা আজকাল অনেক ঘটনাতেই বুঝতে পারি, শিবরামকৃষ্ণণ আরও একটা প্রমাণ জুগিয়ে দিলেন।

ভারতীয় ক্রিকেটের ধারাভাষ্য বেশ কিছুদিন হল আবর্জনায় পরিণত হয়েছে। চমৎকার ইংরিজি এবং গভীর বিশ্লেষণে একসময় মোহিত করে দেওয়া গাভস্কর, শিবরামকৃষ্ণণকে বুক দিয়ে আগলানো অধিনায়ক গাভস্কর এখন চটুল কথাবার্তা বলে নিজেকে জাতীয়তাবাদী বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন সারাক্ষণ। রবি শাস্ত্রীর বরাবরই জনপ্রিয়তার কারণ ছিল অতিকথন আর গলা সপ্তমে চড়িয়ে কথা বলা, ইদানীং উত্তেজনার বশে খেলোয়াড়দের নামও ভুল করেন। টসে গিয়ে কার সঙ্গে কথা বলছেন গুলিয়ে ফেলেন, তবু তিনিই টসে যাবেন। একদা মুগ্ধ করে দেওয়া হর্ষ ভোগলেও এখন ভারতীয় ক্রিকেটার আর বিসিসিআইয়ের চাটুকারিতা ছাড়া কিছু করে উঠতে পারেন না। মহেন্দ্র সিং ধোনির অসন্তোষের কারণ হয়ে একবার ধারাভাষ্যের চুক্তি খুইয়েছিলেন, ফের কেন ঝুঁকি নিতে যাবেন? ঠেকে শেখেননি বলে সঞ্জয় মঞ্জরেকর তো ধারাভাষ্যের চুক্তি হারিয়েছেন চোখের সামনেই। রিকি পন্টিং, ম্যাথু হেডেনরাও হাওয়া বুঝে ভীষণ ভারতপ্রেমী হয়ে যান মাইক হাতে নিলেই। ফলে নিশ্চিত হওয়া যায়, শিবরামকৃষ্ণণের ব্যাপারটা নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা হবে না। ফ্লয়েড হত্যার পরে ইংল্যান্ড বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের প্রথম টেস্টের প্রথম দিন মাইকেল হোল্ডিং স্কাই স্পোর্টসের সরাসরি সম্প্রচারে বর্ণবৈষম্য নিয়ে এক অবিস্মরণীয় আলোচনা করেছিলেন। তাঁর সঙ্গী ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত, কিন্তু সাহেবদের মত ফরসা নাসের হুসেন, আর শ্বেতাঙ্গ এবোনি রেনফোর্ড-ব্রেন্ট।

অমনটা আমাদের এখানে হবে না। কারণ ভারতীয় সমাজে কোনো বৈষম্য নেই। আমরা পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র, আমাদের দেশ একেবারে ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’। তাই ফ্লয়েডের স্মৃতিতে সেবারের আইপিএলে কিছু করার কথা ভাবেনি কর্তৃপক্ষ। এক হাঁটু মুড়ে বসে মুষ্টিবদ্ধ হাত উপরে তোলার যে রীতি তখন প্রায় গোটা ক্রিকেট বিশ্বে চালু হয়েছিল, তা একক উদ্যোগে পালন করেছিলেন হার্দিক পান্ডিয়া। তাও ১৯ সেপ্টেম্বর চালু হওয়া আইপিএলে ২৬ অক্টোবরের ম্যাচে। এই হার্দিককে আবার ভারতীয় ক্রিকেটভক্তরা সোশাল মিডিয়ায় প্রায়ই ‘ছাপড়ি’ বলে গালি দেন। সদ্য কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জেতার পরেও দিয়েছেন। হার্দিকের অপরাধ? তিনি বান্ধবীকে খোলা মাঠেই চুমু খাচ্ছিলেন। ভেবে দেখুন, অন্যের বান্ধবীও নয়। নিজের বান্ধবীকেই চুমু খাচ্ছিলেন। অত্যন্ত অশ্লীল আচরণ সন্দেহ নেই। বান্ধবী বা বউকে প্রকাশ্যে চুলের মুঠি ধরে পেটানো যেতে পারে, চুমু খাওয়া কি কোনো ভদ্রলোকের কাজ? ওসব যারা ‘ছাপড়ি’, তারাই করে। কথাটার মানে জানেন তো? ছাপরবন্দ বলে এক ‘ডি-নোটিফায়েড’ জনগোষ্ঠীর মানুষ। ওঁদের সংস্কৃতি আর অসভ্যতা সমার্থক। বুঝলেন কিনা?

এতদ্বারা প্রমাণিত হইল যে, শিবরামকৃষ্ণণ বাজে কথা বলেছেন। আমরা ভারতীয়রা কোনোরকম বৈষম্যে বিশ্বাস করি না।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

তুমি আর নেই সে সানি

যুদ্ধ করা সৈনিকদের কাজ। ক্রিকেটাররা সৈনিক নন, সন্ত্রাসবাদীও নন। আজ পর্যন্ত কোনও দেশের ক্রিকেটারই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন— এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। সুতরাং দুই দেশের সৈনিকদের মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে বলে দুই দেশের ক্রিকেটারদেরও মুখ দেখাদেখি বন্ধ করতে হবে— এ হল উন্মাদের যুক্তি।

বিশ্ব একাদশের খেলোয়াড়রা, বিশেষ করে [হিলটন] অ্যাকারম্যান, এই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে মজার মজার ঘটনা কল্পনা করত। যেমন ইন্তিখাব [আলম] আর ফারুক [ইঞ্জিনিয়ার] বেয়নেট হাতে মুখোমুখি; আমি যুদ্ধবিমান নিয়ে উড়ছি, আমাকে আরেকটা যুদ্ধবিমানে তাড়া করছে আসিফ মাসুদ; বিষেণ [সিং বেদি] আর জাহির [আব্বাস] পালানোর চেষ্টা করছে। আমরা খুব হাসতাম। অস্ট্রেলিয় খেলোয়াড়রা এমনিতে এই বিষয়টা নিয়ে আমাদের সঙ্গে মজা না করার ব্যাপারে সতর্ক থাকত। কিন্তু রিচার্ড হাটন ওর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে একবার বলেছিল যে ফারুক যদি ইন্তিখাবের পেটে আগে বেয়নেট ঢুকিয়েও দেয়, ইন্তিখাব [আলম] বেঁচে যাবে। কারণ ওর পেটে এত চর্বি যে তাতেই আঘাতটা সামলে দেবে।

বলতেই হবে যে, সেই সময়ে যা চলছিল তাতেও ভারতীয় আর পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়নি। প্রায় প্রত্যেক সন্ধেবেলা আমরা একজন পাকিস্তানি মালিকের রেস্তোরাঁয় খেতে যেতাম। উনি বিভিন্ন রেডিও বুলেটিন থেকে খবর শুনতেন আর একটা পেপার ন্যাপকিনে উর্দুতে লিখে ইন্তিখাবকে দিতেন। ও সেটা ভালো করে দেখতও না, মুচড়ে ফেলে দিত।

উপরের অংশটা সুনীল গাভস্করের স্মৃতিকথা সানি ডেজ (প্রথম প্রকাশ ১৯৭৬) বইয়ে রয়েছে (ভাষান্তর আমার)। এই ঘটনাবলি ১৯৭১ সালের, যখন তিনি গারফিল্ড সোবার্সের নেতৃত্বাধীন বিশ্ব একাদশের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সিরিজ খেলতে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। তখন ভারত-পাক যুদ্ধ চলছে। ভেবে দেখুন, সেই যুদ্ধ চলাকালীন দেশপ্রেমিক গাভস্কর পাক ক্রিকেটারদের সঙ্গে একই দলে খেলছিলেন! শুধু তাই নয়, যে যুদ্ধে ভারতীয় সৈনিকরা জীবনমরণ লড়াই করছিলেন, সেই যুদ্ধ নিয়ে শ্বেতাঙ্গ ক্রিকেটারদের রসিকতায় হাসাহাসিও করছিলেন! সেখানেই শেষ হলে কথা ছিল, পাক ক্রিকেটারদের সঙ্গে সন্ধেবেলা একজন পাকিস্তানির রেস্তোরাঁয় খেতেও যাচ্ছিলেন! কোনও সন্দেহ নেই— আজ এমন করলে তিনি যে কেবল সোশাল মিডিয়ায় ট্রোলবাহিনীর শিকার হতেন তা-ই নয়, তাঁর নামে দেশদ্রোহের মামলাও হয়ে যেত দেশের কোনও না কোনও আদালতে। দেশে ফিরতেই হয়তো বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হয়ে যেতেন।

একেবারেই অন্যায় হত, কারণ যুদ্ধ করা সৈনিকদের কাজ। ক্রিকেটাররা সৈনিক নন, সন্ত্রাসবাদীও নন। আজ পর্যন্ত কোনও দেশের ক্রিকেটারই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন— এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। সুতরাং দুই দেশের সৈনিকদের মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে বলে দুই দেশের ক্রিকেটারদেরও মুখ দেখাদেখি বন্ধ করতে হবে— এ হল উন্মাদের যুক্তি। ভারত আজ উন্মাদের যুক্তিতে চলে, ১৯৭১ সালে চলত না। তাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে মদত দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জব্বর লড়াই করে তাদের হারিয়ে দিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষুরও পরোয়া করেনি। আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলার আগেই মার্কিন রাষ্ট্রপতির সোশাল মিডিয়া পোস্ট থেকে জানা যাচ্ছে যে, ভারতের সৈনিকরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অপারেশন সিঁদুর থামিয়ে দিয়েছেন। এদিকে বৃদ্ধ সুনীল গাভস্কর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের হায়দ্রাবাদ ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিককে আক্রমণ করছেন, কারণ তিনি পাকিস্তানি ক্রিকেটার আবরার আহমেদকে ইংল্যান্ডের দ্য হান্ড্রেড প্রতিযোগিতার নিলাম থেকে নিজের মালিকানাধীন দলের জন্য কিনেছেন।

অর্থাৎ আজকের গাভস্কর ১৯৭১ সালের গাভস্করকে ট্রোল করছেন। নিজের মন্তব্যের যুক্তি হিসাবে গাভস্কর যা বলেছেন, তার সঙ্গে ট্রোলদের কথাবার্তার কোনও তফাত নেই। পাকিস্তানি ক্রিকেটারকে নাকি দলে নেওয়া উচিত নয়, কারণ তিনি যে টাকা আয় করবেন সে টাকা পাকিস্তানে যাবে। পাকিস্তানের টাকা ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদত দিতে খরচ হয়। সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপে ভারতের সৈনিক এবং সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়। দেশের স্বার্থের চেয়ে একটা সামান্য লিগ জেতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়, অতএব সানরাইজার্স লিডস দলের মালিক কাব্যা মারানের উচিত ছিল আবরারকে নিলাম থেকে না কেনা।

সন্ত্রাসবাদের এই অদ্ভুত ফ্লো চার্ট হাজির করেছেন গাভস্কর। সাংবাদিক মহলে প্রায় সবাই জানেন যে গাভস্কর চিরকাল বইপ্রেমী। কিন্তু এসব কথা শুনলে সন্দেহ হয়, ইদানীং বই পড়া ছেড়ে বোধহয় ধুরন্ধর জাতীয় বলিউডি সিনেমায় মন দিয়েছেন। যে কোনও পাকিস্তানি নাগরিক পৃথিবীর যে কোনও জায়গা থেকে যা রোজগার করেন, সবই পাকিস্তান থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ চালাতে ব্যবহৃত হয়— এই ঘৃণায় বাঁধানো অতি সরল আজগুবি তত্ত্ব আর কোথা থেকে শেখা সম্ভব? তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই পাকিস্তানি মানেই সন্ত্রাসবাদী, তাহলে আবার গাভস্কর নিজেই বিপদে পড়ে যাবেন। এবং সেটা শুধু ১৯৭১ সালের কার্যকলাপের জন্য নয়।

আরও পড়ুন রাষ্ট্রীয় ক্রিকেট-সেবক সংঘ

মাত্র কয়েকদিন আগে প্রাক্তন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেলের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের ১৪ জন প্রাক্তন ক্রিকেটার পাকিস্তান সরকারকে চিঠি লিখেছিলেন কারাবন্দি ইমরান খানের স্বাস্থ্যের যথাযথ যত্ন এবং তাঁর প্রতি যথাযথ ব্যবহার দাবি করে।[1] সেই ১৪ জনের মধ্যে ছিলেন আমাদের কপিলদেব এবং গাভস্কর। সব পাকিস্তানিই যদি সন্ত্রাসবাদী হয়, তাহলে গাভস্কর একজন সন্ত্রাসবাদীর প্রতি দরদে পাকিস্তান সরকারকে চিঠি লিখেছিলেন বলতে হয়। ইমরানের বিরুদ্ধে গাভস্কর যখন খেলেছেন তখনও তো পাকিস্তানের মাটি থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চলেছে। এমনকি ইমরান যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, তখনও যে ভারত-পাক সীমান্তে উত্তেজনা একেবারে শূন্যে নেমে এসেছিল তা নয়। তাহলে গাভস্কর সেসব ভুলে ইমরানের জন্যে মুখ খুলতে গেলেন কেন?

এর একটাই উত্তর হয়। গাভস্কর ভালো করেই জানেন যে পাকিস্তানি মানেই সন্ত্রাসবাদী নয়। ফলে পৃথিবীর যেখানে যে পাকিস্তানি টাকা রোজগার করবে, সেই টাকাই পাকিস্তানে ফেরত গিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে— এ-কথার কোনও ভিত্তি নেই। গাভস্কর অবশ্য আত্মপক্ষ সমর্থনে বলতেই পারেন যে তিনি বলেছেন “indirectly contributes”, অর্থাৎ “পরোক্ষভাবে” ওই টাকার অবদান থাকে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে। কিন্তু এই কথাটা দলে পাকিস্তানি ক্রিকেটার না নেওয়ার যুক্তিকে আরও দুর্বল করে। যদি একজন করদাতা না-ই জানতে পারেন তাঁর করের টাকা পরোক্ষভাবে কোথায় কোথায় ব্যবহৃত হয়, তাহলে অপব্যবহারের জন্যে তো তাঁকে দোষী ঠাওরানো যায় না। তাঁর রোজগারের পথ বন্ধ করাও চলে না।

এর চেয়েও বড় কথা, কোনও কোম্পানি যে দেশে ব্যবসা করে তাকে সে দেশের নিয়মকানুন মেনেই চলতে হয়। সান গ্রুপ ব্যবসা করছে ইংল্যান্ডে, আর চলবে ভারতীয়দের আবেগ অনুভূতি অনুযায়ী— এমন মামাবাড়ির আবদার কেমন করে করা যায়? তাছাড়া ভারতীয়দের টাকা পরোক্ষভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়া নিয়ে গাভস্করের এতই যদি মাথাব্যথা, তিনি সদ্যসমাপ্ত কুড়ি-বিশের বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হওয়ার বিরোধিতা করলেন না কেন? আবরার দ্য হান্ড্রেড প্রতিযোগিতায় সানরাইজার্স লিডসের হয়ে খেলে পারিশ্রমিক পাবেন ১,৯০,০০০ পাউন্ড, অর্থাৎ প্রায় আট কোটি পাকিস্তানি টাকা। তার কয়েকশো গুণ টাকা ভারত-পাক ম্যাচ থেকে কামিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। গাভস্কর একবারও বলেননি এটা হওয়া উচিত নয়। উলটে সে ম্যাচের ধারাভাষ্যে নিজে যুক্ত ছিলেন, মানে নিজেও ওই ম্যাচ থেকে রোজগার করেছেন। তাঁর সঙ্গে ধারাভাষ্যে ছিলেন ওয়াসিম আক্রম, রামিজ রাজার মতো পাকিস্তানি প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও। তাঁরাও ওই ম্যাচ থেকে রোজগার করেছেন। গাভস্করের যুক্তি মানলে সে টাকাও পরোক্ষভাবে বেশ কিছু ভারতীয়ের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সেসব আটকানোর কথা তিনি একবারও মুখ ফুটে বলেননি কেন?

তাহলে কি বুঝতে হবে, ১৯৯২ সালে মুম্বইয়ের দাঙ্গায় হিন্দু দাঙ্গাবাজদের সামনে এক মুসলমান পরিবারের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়া গাভস্কর আজ হিন্দুত্ববাদী দক্ষ বাজিকরের হাতের পুতুল মাত্র? তাই যে ম্যাচ থেকে আরএসএস শাখা হয়ে দাঁড়ানো বিসিসিআইয়ের বিপুল আয় হয়, সেই ম্যাচে পাকিস্তানিদের অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁর আপত্তি নেই, অথচ ইংল্যান্ডের লিগে ভারতীয় মালিকের দলে পাকিস্তানের ক্রিকেটার খেললে তিনি খড়্গহস্ত?

জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে ভারতীয়দের অনেক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন উপহার দিয়েছিলেন যে গাভস্কর, তিনি অস্ত গিয়েছেন। এখন ধান্দাবাজ ধর্মান্ধতায় ঢাকা তাঁর মুখ।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি একাদশ – যে ফুল না ফুটিতে ঝরেছে ধরণীতে

গত শতকের নয়ের দশকটাকে ভারতীয় ক্রিকেটে বিস্ময়বালকদের দশক বললে খুব ভুল হবে না। সবচেয়ে বড় নাম অবশ্যই শচীন তেন্ডুলকর। কিন্তু তাছাড়াও উঠে এসেছিলেন শচীনের স্কুলের বন্ধু বিনোদ কাম্বলি। সাড়ে ষোলো বছরে জাতীয় দলে না ঢুকলেও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে রানের বন্যা বইয়ে দিচ্ছিলেন শুরু থেকেই। তখন সংবাদমাধ্যম ওই স্তরের ক্রিকেটকে গুরুত্ব দিত, ক্রিকেটপ্রেমীরাও আগ্রহী ছিলেন। তাই কাম্বলি কবে ভারতীয় দলে ঢুকবে – তা নিয়ে আলোচনা হত। দুজনে সারা দেশে পরিচিত হয়ে যান স্কুল ক্রিকেট খেলার সময়েই। হ্যারিস শিল্ডের ম্যাচে সারদাশ্রম বিদ্যামন্দিরের হয়ে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলের বিরুদ্ধে দুজনে ৬৬৪ রান করে যে কোনো ধরনের ক্রিকেটে জুটিতে সর্বোচ্চ রানের বিশ্বরেকর্ড গড়েন। রেকর্ডটা বহুদিন ভাঙেনি।

সেই কাম্বলি ২০ বছর বয়সে ভারতীয় দলে এসে ইংল্যান্ড আর জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে পরপর দুটো দ্বিশতরান করে ফেললেন। সেই কীর্তি তখন পর্যন্ত ডন ব্র্যাডম্যান আর ওয়াল্টার হ্যামন্ড ছাড়া কারোর ছিল না। কিন্তু কী হল শেষমেশ? প্রথমে কোর্টনি ওয়ালশ তাঁর গলদ ধরে ফেললেন ভারত সফরে এসে। তারপর রান না পেতে পেতে যেই আত্মবিশ্বাস কমে এল, অমনি আরও হাজারটা ত্রুটি ধরা পড়ে গেল। কাম্বলি শোধরাতে পারলেন না। মাত্র ১৭ খানা টেস্ট আর ১০৪ খানা একদিনের ম্যাচ খেলেই তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ার সমাপ্ত হল। টেস্টে ১,০৮৪ রান আর একদিনের ক্রিকেটে ২,৪৭৭। মোটে আধ ডজন শতরান।

দুই বাল্যবন্ধুর ক্রিকেটজীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত পরিণাম বোধহয় সেই কথাটার প্রমাণ – প্রতিভা হল ১% সহজাত ক্ষমতা আর ৯৯% পরিশ্রম। কথাটা মানুষ চিরকালই কম বিশ্বাস করে, আজকাল বিশ্বাস করানো আরও শক্ত। ফলে এক-আধটা ইনিংসের পরেই একজন ক্রিকেটার সম্পর্কে উচ্ছ্বাস আকাশ ছোঁয়। বৈভব সূর্যবংশী, যাঁর নাকি বয়স সবে ১৪, তিনি আইপিএলে ৩৫ বলে শতরান করে ফেলতেই শচীনের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত পর্যন্ত ছেলেটিকে শচীনের সঙ্গে তুলনা করে ফেলেছেন। সারা দেশের ক্রিকেটপ্রেমী আবেগে ভাসছেন। আবার পরপর কয়েকটা ম্যাচে ব্যর্থ হলেই হয়ত বলা শুরু হয়ে যাবে ‘অল্প বয়সে এত টাকা দেখে ফেলেছে, খেলা আর হবে?’ ইত্যাদি।

এমন খামখেয়ালিপনার সবচেয়ে টাটকা শিকার পৃথ্বী শ। ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেকে শতরান করার আগেই অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতে ফেলেছিলেন অধিনায়ক হিসাবে। তিন-চারটে আইপিএলে ধুন্ধুমার খেলার পাশাপাশি অমন টেস্ট অভিষেকের পর তাঁকে নিয়ে প্রত্যাশার পারদ চড়ছিল। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে বারবার বোল্ড হলেন, তারপর সঙ্গত কারণেই দল থেকে বাদ। এখন পৃথ্বীকে এখন মুম্বাই দলে ঢুকতেও লড়তে হচ্ছে।

কাম্বলি তবু সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছিলেন, প্রায় তাঁরই বয়সী অমল মজুমদারের তো কোনোদিন ভারতীয় দলের পোশাক পরাই হল না। অমল বছর কুড়ি বয়সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট শুরুই করেন দ্বিশতরান করে। ফি মরশুম এত রান করতেন যে একসময় মনে করা হত, তাঁর ভারতীয় দলে ঢোকা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু সে অপেক্ষা কোনোদিন শেষ হল না। অমল কিন্তু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৪৮ গড়ে ১১ হাজারের বেশি রান করেছেন। আসলে দলগত খেলার একটা ট্র্যাজেডি হল – কেবল নিজে সফল হলে হয় না, অন্যের ব্যর্থতার জন্যেও অপেক্ষা করতে হয়। অমলের পূজা হয়ত সেজন্যেই সারা হল না।

প্রায় অমলের মতই দুর্ভাগ্যের শিকার তামিলনাড়ুর সুব্রহ্মণ্যম বদ্রীনাথ। কুড়ি বছর বয়সে শুরু করে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রায় ৫৫ গড়ে ১০,২৪৫ রান করেও খেলতে পেরেছেন মাত্র দুটো টেস্ট আর সাতটা একদিনের ম্যাচ। কোথায় খেলবেন? তাঁর সময়ে ভারতের মিডল অর্ডার মানে রাহুল দ্রাবিড়, শচীন, সৌরভ গাঙ্গুলি, ভিভিএস লক্ষ্মণরা। একদিনের ক্রিকেটে এঁদের সঙ্গে যুবরাজ সিং, মহম্মদ কাইফরা।

প্রবীণ আমরে আবার সুযোগ পেয়েও সদ্ব্যবহার করতে পারেননি। তাঁর এক অসামান্য কীর্তি আছে – টেস্ট অভিষেকে বিদেশের মাঠে শতরান। চব্বিশ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভয় ধরানো বোলিং আক্রমণের মুখে তিনি ১০৩ রান করেন। অমন সূচনার পরেও যে কেউ মাত্র ১১ খানা টেস্ট খেলে হারিয়ে যেতে পারে তা আমরেকে না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত।

২০১২ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী ভারত অধিনায়ক, দিল্লির উন্মুক্ত চন্দকে নিয়েও অনেকের আশা ছিল। স্কুলে থাকতেই উন্মুক্ত রঞ্জি ট্রফিতে তাঁর প্রথম শতরান হাঁকিয়ে ফেলেন। আঠারো বছর বয়সে আইপিএলে অভিষেক হওয়া উন্মুক্তের কেরিয়ার তারপর আর কোথাও পৌঁছল না। কোনোদিন ধারাবাহিক হতে পারলেন না, অধুনা ক্রিকেট কেরিয়ারের মায়া ছেড়ে আমেরিকাবাসী।

আটের দশকেও অন্তত দুজন বিস্ময়বালক ছিলেন। একজন লেগস্পিনার লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ, অন্যজন বাঁহাতি স্পিনার মণিন্দর সিং। সতেরোয় পা দেওয়ার আগে ভারতীয় দলে ঢুকে পড়েন শিবরামকৃষ্ণণ। প্রথম দিকে মনে হত জাদুকর। ১৯৮৪-৮৫ মরশুমে অস্ট্রেলিয়ায় ভারতের বেনসন অ্যান্ড হেজেস কাপ জয়ের অন্যতম স্থপতি ছিলেন ইনি। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটা ঘরোয়া টেস্ট সিরিজে ২৩ খানা উইকেট নেন। কিন্তু বছর তিনেক যেতে না যেতেই দেখা গেল ব্যাটাররা অনায়াসে তাঁকে খেলে দিচ্ছেন।

মণিন্দরকে মনে করা হয়েছিল বিষাণ সিং বেদির উত্তরাধিকারী। ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডের মাঠে এবং ঘরের মাঠে পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে প্রতিভার প্রমাণও দেন। কিন্তু ৩৫ খানা টেস্ট আর ৫৯ খানা একদিনের ম্যাচেই প্রতিভা ফুরিয়ে গেল। কারো কারো হয়ত তাঁকে মনে আছে ১৯৮৭ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে তিনটে উইকেট নেওয়া বা মাদ্রাজের টাই টেস্টে আউট হওয়া শেষ ব্যাটার হিসাবে।

সদানন্দ বিশ্বনাথকে আবার মনে করা হয়েছিল সৈয়দ কিরমানির যোগ্য উত্তরসূরি। এখনো ইউটিউবে বেনসন অ্যান্ড হেজেস সিরিজে শিবার বোলিংয়ের সঙ্গে বিশ্বনাথের উইকেটরক্ষা দেখলে শিহরিত হতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মাত্র তিনটে টেস্ট আর ২২ খানা একদিনের ম্যাচের পরে আর এগোতে পারেননি তিনি।

এঁদের সকলের চেয়ে বেশি প্রতিভার প্রমাণ রেখে এগোচ্ছিলেন ইরফান পাঠান। এই বাঁ হাতি পেসার মাত্র ১৯ বছর বয়সে যখন টেস্ট ক্রিকেটে এলেন তখন বেশ ভাল গতিতে দুদিকে সুইং করাতে পারেন। অস্ট্রেলিয়ায় অভিষেকেই অ্যাডাম গিলক্রিস্টকে অপূর্ব ইয়র্কারে বোকা বানালেন। ২০০৬ সালে করাচিতে হ্যাটট্রিক করে বসলেন। তাঁর ইনসুইং খেলতে গিয়ে সব ক্রিকেটেই নাজেহাল ডানহাতিরা। ব্যাটের হাতটা ভাল হওয়ায় অনেকে বলল – এসে গেছে পরবর্তী কপিলদেব। গ্রেগ চ্যাপেলও তাঁকে অলরাউন্ডার করে তুলতে ব্যাটিং অর্ডারে প্রায়ই প্রোমোশন দিতেন। ইরফান রান করে দিতেন, কিন্তু নিশ্চয়ই বোলিং অনুশীলন কমছিল। তারপর এল চোট-আঘাত। কপিল হওয়া হল না, সুইং হারিয়ে ফেলে ইরফানও রইলেন না।

আরও পড়ুন শীর্ষে উঠেও গলি-ক্রিকেট না ভোলা অশ্বিন

খানিকটা একইরকম আশাভঙ্গের কারণ মুনাফ প্যাটেল। কৈশোরে এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশনে থাকার সময় থেকেই বিরল গতির বোলার, ২০০৬ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেকে আগুন ঝরান ৯৭ রানে সাত উইকেট নিয়ে। পরবর্তী কিছুদিন দারুণ গতিময় বোলিং করে বিশ্বত্রাস বোলার হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু দলে নিয়মিত হয়ে যাওয়ার পরেই চোট-আঘাত, অস্ত্রোপচারের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গতি কমতে থাকে। ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ী দলে তিনি ছিলেন ঠিকই, মন্দ বলও করেননি। কিন্তু সে নিতান্তই তৃতীয় পেসার হিসাবে।

প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারা একটা ভারতীয় একাদশ এরকম হতে পারে

পৃথ্বী শ, অমল মজুমদার, বিনোদ কাম্বলি, প্রবীণ আমরে, উন্মুক্ত চন্দ, সুব্রহ্মণ্যম বদ্রীনাথ, সদানন্দ বিশ্বনাথ, ইরফান পাঠান, মুনাফ প্যাটেল, মানিন্দর সিং, লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

আইপিএল: ১৮ বছর বয়স কী দুঃসহ

ভারতীয় বোর্ডের চোটপাটে আইপিএলের দৈর্ঘ্য বেড়ে চলায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়ে যাচ্ছে আইসিসি। ফলে দুনিয়ার যেখানে যত কুড়ি বিশের লিগ গজাচ্ছে, সবেতেই ঘাড় নাড়তে হচ্ছে।

‘আঠারো বছর বয়স’ নামে একখানা কবিতা লিখেছিলেন তরুণ বয়সেই চলে যাওয়া কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর জীবনের সবটুকুই পরাধীন দেশে কেটেছিল। সেই দেশে ক্ষুদিরাম বসুর মতো ১৮ বছরের ছেলেও ফাঁসি যাওয়ার ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করত না। স্বভাবতই সুকান্তর কবিতায় ওই বয়সে পৌঁছোনো মানুষ যে নির্ভয়ে অনেক কিছু ওলট-পালট করার ক্ষমতা রাখে, সেকথা লেখা হয়েছে। কিন্তু আমরা দাঁড়িয়ে আছি স্বাধীনতার ৭৫ বছর অতিক্রম করে যাওয়া দেশে। এখন আর ওই বয়সের ছেলেমেয়েদের কোনও কিছুর জন্য প্রাণ দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। বরং আজ যারা তাদের বাবা-মা, তাদের অনেকে ওই বয়সে চালু করেছিল ‘বার খেয়ে ক্ষুদিরাম’ কথাটা। অর্থাৎ ক্ষুদিরাম নাকি আদতে বোকা। এমন দেশে আঠারোয় পা দেওয়ার আলাদা তাৎপর্য কী জানি না। তবে ভারতীয় ক্রিকেটের মোচ্ছব আইপিএল আঠারোয় পা দেওয়ায় ক্রিকেট মহলে বিলক্ষণ আলোড়ন তৈরি হয়েছে। সুতরাং আমরা ভেবে দেখি, গত ১৮ বছরে আইপিএল আমাদের কী দিল।

বাঞ্ছিত
১। অলরাউন্ডার: শেন ওয়ার্ন যদি প্রথম আইপিএলেই রবীন্দ্র জাদেজাকে আবিষ্কার না করতেন, বা হার্দিক পান্ডিয়া আইপিএলে নজর কাড়তে না পারতেন, তাহলে কি ভারতীয় দলের নির্বাচকরা তাঁদের নিজ গুণে চিনে নিতেন? সন্দেহ হয়। আইপিএল চালু হওয়ার পর থেকে যেভাবে ক্রমশ তিন ধরনের ক্রিকেটের জাতীয় দল নির্বাচনেই আইপিএলের পারফরমেন্সকে গুরুত্ব দেওয়া বেড়েছে আর রনজি ট্রফি, দলীপ ট্রফি, ইরানি ট্রফি, বিজয় হাজারে ট্রফির গুরুত্ব কমেছে; দেওধর ট্রফি উঠে গিয়েছে, তাতে মনে হয় এঁদের উত্থান এবং ভারতীয় দলে স্থায়ী হওয়ার কৃতিত্ব আইপিএলকে না দিয়ে উপায় নেই।

২। ছেঁড়া কাঁথা থেকে লাখ টাকা: ২০০৮ সালের প্রথম আইপিএল থেকেই বেশ কিছু ক্রিকেটারকে পাওয়া গেছে যাঁরা নিম্নমধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মে অনেক কষ্ট করে ক্রিকেট জগতে প্রবেশ করেছেন, পুরো পরিবারকেও অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। আইপিএলের অর্থ তাঁদের দারিদ্র্য দূর করেছে। ছত্তিশগড়ের কুলদীপ সেন বা উত্তরপ্রদেশের রিঙ্কু সিং ক্রিকেটার হিসাবে হয়তো স্মরণীয় হয়ে থাকবেন না, কিন্তু মানুষ হিসাবে তাঁদের জীবনযাত্রার উন্নতির কৃতিত্ব আইপিএলেরই।

৩। ভারতীয় ফিল্ডিংয়ের দলগত উন্নতি: তরুণদের কাছে ব্যাপারটা তেমন চোখে পড়ার মতো না-ও মনে হতে পারে, কিন্তু আমরা যারা নরেন্দ্র হিরওয়ানি, ভেঙ্কটপতি রাজুদের দেখেছি; মহম্মদ আজহারউদ্দিন, অজয় জাদেজা, মাঝেমধ্যে কপিলদেব বা শচীন তেন্ডুলকর দারুণ ফিল্ডিং করলেও দল হিসাবে ভারতকে অতি সাধারণ ফিল্ডিং করতে দেখেছি, তারা মানতে বাধ্য যে আইপিএল তথা কুড়ি বিশের ক্রিকেটের কল্যাণে ভারতীয়দের ফিল্ডিংয়ের সাধারণ মানই অনেক উঁচুতে উঠেছে।

৪। ভয়হীন তরুণ ভারতীয় ক্রিকেটার: অনেকদিন যাবৎ টেস্ট ক্রিকেট খেলিয়ে দেশগুলোর মধ্যে জাতীয় দলে আগামীদিনে আসতে পারেন বা বাদ পড়ে গেছেন, ফিরতে পারেন– এমন ক্রিকেটারদের নিয়ে ‘এ’ দলের খেলা চালু ছিল। তাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আসার প্রস্তুতি হত। কিন্তু আইপিএলে যেভাবে অন্য দেশের সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে এবং বিপক্ষে খেলার সুযোগ পায় একেবারে কচিকাঁচারা, সে সুযোগ ওখানে ছিল না। আজ যে যশস্বী জয়সওয়াল, নীতীশ রেড্ডিদের জাতীয় দলে প্রথম ম্যাচেই অকুতোভয় মনে হয়, তার কৃতিত্ব আইপিএলের।

৫। সেরা লোকের থেকে সেরা জিনিস শেখার সুযোগ: জম্মুর ছেলে উমরান মালিক বিদ্যুৎ গতির ইয়র্কারে ব্যাটারের উইকেট ছিটকে দিলেন আর ডাগ আউটে নিজে উইকেট পাওয়ার মতো উল্লাসে ফেটে পড়লেন একদা বিশ্বত্রাস দক্ষিণ আফ্রিকার ডেল স্টেইন– এ দৃশ্য আমরা আইপিএলে দেখেছি। উমরানের গতি অনেক আশা জাগালেও ভারতীয় দলের হয়ে তেমন কিছু করতে পারেননি। খুব বেশি সুযোগও পাননি। কিন্তু স্টেইনের চেয়ে ভালো জোরে বোলিং কোচ তিনি পেতেন কোথায়? আর আইপিএল না থাকলে স্টেইনের ধারেকাছেও পৌঁছানো হত না উমরানের। এমন উদাহরণ অসংখ্য।

আরও পড়ুন গোট কত বেড়া খেয়ে যাচ্ছে

অবাঞ্ছিত
১। যা বদলায় সেটাই নিয়ম: কম সময়ের খেলা হিসাবেই যে কুড়ি ওভারের খেলার উৎপত্তি, তাতে অনন্তকাল ধরে ফিল্ডিং সাজিয়ে, ওভার রেটের তোয়াক্কা না করেও বহুবার কোনও শাস্তি হয়নি মহাতারকা অধিনায়কদের। কে এই সুবিধা পেয়েছেন আর কে পাননি তা নিয়ে অনলাইনে বিস্তর চুলোচুলি চলে এঁদের ভক্তদের মধ্যে। আইপিএল কর্তৃপক্ষ অবশ্য সে অশান্তি মিটিয়ে ফেলেছেন। আগে তবু তিনটে ম্যাচে নির্ধারিত সময়ে ওভার শেষ করতে না পারলে অধিনায়ককে একটা ম্যাচে সাসপেন্ড করা হত। এবার থেকে আর সে ঝক্কি থাকছে না। কেবল ‘ডিমেরিট পয়েন্ট’ দেওয়া হবে। অমন অনেক পয়েন্ট জমলে তবে সাসপেনশনের প্রশ্ন। নতুন করে নিলাম হবে, ছয়জনের বেশি ক্রিকেটারকে ধরে রাখা যাবে না, আবার অতজনকে রাখার খরচ বিস্তর, ওদিকে মহেন্দ্র সিং ধোনি চেন্নাই সুপার কিংস ছেড়ে নড়বেন না। অতএব নিয়ম বদলে ধোনিকে কোনওদিন দেশের হয়ে না খেলা ক্রিকেটারদের মতো ‘আনক্যাপড’ হওয়ার, মানে শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢোকার, সুযোগ করে দেওয়া হল।

২। মহাতারকাদের মুখ বাঁচানোর সুযোগ: ধরুন, আপনি অনেকদিন হল টেস্টে সুবিধা করতে পারছেন না। বল বেশি লাফালে বা সুইং হলে অথবা স্পিন হলেই আপনাকে সর্বকালের সেরা তো দূরের কথা, নিজের কালের মাঝারিও মনে হচ্ছে না। কুছ পরোয়া নেই। আইপিএল মাস দুয়েকের লম্বা প্রতিযোগিতা। রান আপনি পাবেনই। অমনি সকলে ভুলে যাবে টেস্টে কতকাল রান করেননি, ড্যাং ড্যাং করে পরের সিরিজেও খেলতে নামবেন।

৩। ঘরোয়া ক্রিকেটের সাড়ে সর্বনাশ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও বন্ধ হয়নি ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা রনজি ট্রফি। কিন্তু করোনা অতিমারির সময়ে বন্ধ হয়ে রইল। কেবল ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে সংসার চলে যে ক্রিকেটারদের, তাঁদের আক্ষরিক অর্থে হাঁড়ির হাল হল। কিন্তু উপায় কী? ওতে খরচ আর আইপিএলে আয়। তাই ক্রিকেট বোর্ড ব্যস্ত ছিল আইপিএলের আয়োজন করতে।

৪। সব ক্রিকেটের ঊর্ধ্বে: ক্রিকেট ১১ জনের খেলা, কিন্তু আইপিএল ১২ জনের খেলা। এগারোজনের মধ্যে যথেষ্ট ধুন্ধুমার ব্যাটার ঢোকানো যাচ্ছে না? আচ্ছা, ব্যাটিংয়ের সময়ে একজন বোলারকে বসিয়ে ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ হিসাবে আরেকজন ব্যাটারকে ঢুকিয়ে নেবেন। বোলার কম পড়ছে? অসুবিধা নেই। ফিল্ডিং করার সময়ে ব্যাটারদের একজনকে বসিয়ে আরেকজন বোলারকে খেলাবেন।

৫। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্তর্জলিযাত্রা: নিজের দেশে আসন্ন মরশুমে এবারের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠা দক্ষিণ আফ্রিকা একটাও টেস্ট খেলবে না, খেলবে শুধু পাঁচখানা টি টোয়েন্টি। ভারতীয় বোর্ডের চোটপাটে আইপিএলের দৈর্ঘ্য বেড়ে চলায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়ে যাচ্ছে আইসিসি। ফলে দুনিয়ার যেখানে যত কুড়ি বিশের লিগ গজাচ্ছে, সবেতেই ঘাড় নাড়তে হচ্ছে। ক্রিকেট দুনিয়ার বড়, মেজো, সেজো ভাই ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড আবার ঠিক করেছে টেস্ট নিজেদের মধ্যেই খেলবে, অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ক্ষমাঘেন্না করে একটা-দুটো। এদিকে, আইসিসির আয়ের বেশিরভাগটাও ওরাই নেয়। ফলে বাকি বোর্ডগুলোর অবস্থা সঙ্গিন। তারাও টিকে থাকতে কুড়ি বিশের লিগ আয়োজনেই মন দিচ্ছে। খেলোয়াড়রাও ৩০-৩২ বছরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফেলছেন। পাঁচদিন নয়, এমনকি ৬-৭ ঘণ্টাও নয়, ঘণ্টা চারেক খেলেই যদি মেলা রোজগার করা যায় তো কে বেশি খাটতে যাবে? এরপর হয়তো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট হবে সারাবছর আর মাস দুয়েক আন্তর্জাতিক। খেলাটা ক্রিকেট থাকবে না ডাংগুলি হয়ে যাবে– সেটা অন্য আলোচনার বিষয়।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

আন্দোলন, ন্যায়বিচার, পুজো: একটি অরোম্যান্টিক বয়ান

একটা রাজ্যের সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে, বা নিদেনপক্ষে অপদার্থতায়, একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে আন্দোলন করা দরকার। তা বলে সবাইকে সবকিছু থামিয়ে যারা এই অপরাধে কোনওভাবেই যুক্ত নয়, তাদের শাস্তি দিতে হবে? এ আবার কী আহ্লাদ? প্রতিবাদে পথনাটিকা হতে পারে, প্রেক্ষাগৃহে নাটকের শো করা যাবে না? হলে সিনেমা মুক্তি পেতে পারবে না? যে শিশুরা এখনও জানে না বাবা মায়ের কে হয়— তাদেরও পুজোয় মুখ ভার করে থাকতে হবে? এ তো চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া।

কদিন হল বৃষ্টির পরে বেশ মিঠে রোদ উঠছে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা-টেলা ভেসে বেড়াচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে শরৎকাল এসে পড়ল বলে। এই সময়ে বাংলার বাঙালির মন উড়ু উড়ু হয়, আর প্রবাসী বাঙালির মন ঘুরু ঘুরু হয়। অর্থাৎ ঘুরতে ঘুরতে বাড়ি চলে আসতে ইচ্ছে করে। তা এমন দিনে যদি পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেন উৎসবে ফিরে আসতে – তাহাতে এ জগতে ক্ষতি কার? অন্যান্য বছরে তো কেউ গোঁসা করে না। মুখ্যমন্ত্রী চারদিনের পুজোকে টানতে টানতে এক সপ্তাহের করেছেন, লোকে সোৎসাহে মহালয়া থেকেই সপরিবারে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পড়ছে, সরকারি টাকায় পুজোগুলোর বাজেট বছর বছর বাড়ছে। দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক কার্নিভাল বানিয়ে ফেলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। কার প্যান্ডেল কত বড়, কার ঠাকুর এত লম্বা যে চাঁদ থেকে দেখা যায়— এসবের বাৎসরিক প্রতিযোগিতা হয়। বছরে একদিন রেড রোডে বসে মুসলমানরা নমাজ পড়ে বলে যাদের বাকি ৩৬৪ দিন ঘুম হয় না, তারাও রেড রোড জুড়ে দশমীর পরের কার্নিভাল হাঁ করে ইউটিউবে লাইভ দেখে। স্কুল কলেজে পুজোর ছুটি বাড়তে বাড়তে একমাস পেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। তা নিয়েও ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, শিক্ষকদের বেশিরভাগকেই উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় না। প্রায় দেড় দশক ধরে এই মজা পুরোদমে উপভোগ করছে যে রাজ্যের মানুষ, তারা যে এবারে পুজোর নাম শুনেই খচে বোম হবে, বেচারি মমতা ব্যানার্জি বুঝবেন কী করে? আমরা জানি তিনি উকিল, তিনি বহুভাষাবিদ, তিনি সাহিত্যিক, তিনি চিত্রশিল্পী। তা বলে তো জ্যোতিষী নন।

জননেতাদের অবশ্য অঙ্কে ভাল হতে হয়, কে কী ভাবতে পারে সেটা পাকা দাবা খেলোয়াড়দের মতো আগে থেকে হিসাব করে ফেলতে হয়। মমতা ব্যানার্জিও অঙ্কে ভালই ছিলেন অ্যাদ্দিন, নইলে এতবছর আন্দোলন করে ক্ষমতায় আসা যায় না। ক্ষমতায় টিকে থাকাও যায় না। তবে বয়স বাড়ায় বিশ্বনাথন আনন্দের ধার কমে গেছে, আর মমতার কমবে না তা কি হয়? আরজিকর-কাণ্ডের পর থেকেই নিজের চালে অন্যপক্ষের প্রতিক্রিয়া তাঁকে চমকে দিচ্ছে। আমোদগেঁড়ে বাঙালির আমোদগেঁড়েমির মাত্রাটা কেবল মমতা নয়, প্রতিবাদীরাও অনেকেই বেশি ভেবে ফেলেছিলেন। ফলে এখন মহা মুশকিল হয়েছে।

একটা জলজ্যান্ত মেয়ে ওভাবে মরেছে। এ নিয়ে বারবার নানারকম বিশ্লেষণ করতে ভালও লাগে না। নিজের উপরেই রাগ হতে থাকে। তাই চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে টুক করে লাইনে নেমে পালিয়ে যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু টিকিট-কালেক্টর সোমেনদা যে মোবাইল চেকিং করে গ্রেফতার করবেন সেটা ঠাহর করতে পারিনি। অগত্যা বর্তমান ও অদূর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমার ধারণা লিখতে গিয়ে রীতিমতো রচনা হয়ে গেল। পর্শ গাড়িতে চেপে কাউকে চাপা না দিয়েও এত বড় শাস্তি আমায় ভোগ করতে হল। অতএব পাঠককেও শাস্তির ভাগ না দিয়ে ছাড়ব না। এর যা প্রতিক্রিয়া হবে, তার দায়িত্ব সোমেনদার। সরকারি হাসপাতালে হওয়া ঘটনার দায়িত্ব যদি স্বাস্থ্যমন্ত্রী এড়াতে পারেন, আমিও আমার লেখার দায়িত্ব এড়াব।

 

আন্দোলন

অনেকে অনেকরকম প্রত্যাশা নিয়ে এই আন্দোলনে নেমেছিলেন। রাজ্যজুড়ে মানুষের মনে যে এত ক্ষোভ জমে আছে তা সরকারও ভাবেনি, যাঁরা আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাঁরাও ভাবেননি। ফলে ১৪ আগস্ট রাতদখল কর্মসূচিকে রাজ্য সরকার বা তৃণমূল কংগ্রেস একেবারেই বাধা দেয়নি। অনেক জায়গায় পুলিশ নিজে গিয়ে দোকানদারদের বলে এসেছিল ‘আজ সারারাত দোকান খোলা রাখবি। আন্দোলন আছে।’ পশ্চিমবঙ্গে আগের আমল থেকেই যা হয়— অটোচালক, টোটোচালক ইউনিয়নগুলো সরকারি দলের অনুগত। তারাও সব চালু রেখেছিল। মানে নিজেদের ইচ্ছা ছিল না বলছি না। কিন্তু নিজেদের ইচ্ছা থাকলেও, দাদাদের ইচ্ছা না থাকলে এ কাজ করার মতো গণতান্ত্রিক পরিবেশ যদি পশ্চিমবঙ্গে থাকত, তাহলে এই আন্দোলন এত বড় হয়ে উঠত না। কেন্দ্রের শাসক দল এবং রাজ্যের বিরোধী দল বিজেপিও ভেবেছিল ‘দ্যাখ কেমন লাগে’। ফলে তাদের অধীন মেট্রো পরিষেবাও আন্দোলনকারীদের দাবিতে আন্দোলনের সুবিধার্থে সে রাতে দীর্ঘায়িত হয়েছিল। আবার কলকাতার অ্যাপ ক্যাব চালকদের মধ্যে যাদের ইউনিয়ন আছে, সেই সিপিএমের বদান্যতায় ওলা, উবেরও সারারাত চলেছিল। এরকম সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা কেন? উত্তরটা সহজ।

মমতার সরকার ও তাঁর দল ভেবেছিল সোশাল মিডিয়ায় ডাকা আন্দোলন, কত বড় আর হবে? লোকে খেপেছে যখন, রাস্তায় বেরিয়ে একটু চেঁচামেচি করে নিক। তাহলেই ভিতরের ক্ষোভ সব বেরিয়ে যাবে, তারপর স্বাধীনতা দিবসে ছুটি কাটিয়ে ১৬ তারিখ ঢেঁকুর তুলতে তুলতে সবাই অফিস চলে যাবে। আন্দোলন খতম। আন্দোলনের অভিমুখ নিয়েও আন্দোলনকারীরা যারপরনাই আশ্বস্ত করেছিলেন সরকারকে। আহ্বায়করা মা সারদার মতো আধ্যাত্মিক বাণী দিয়েছিলেন— কোনও দলকে এর ফায়দা তুলতে দেওয়া হবে না, কেউ কোনও দলের পক্ষ থেকে এলে তাকে ফেরত পাঠানো হবে। আন্দোলনটা তাহলে কার বিরুদ্ধে আর কার পক্ষে? এসব পার্থিব প্রশ্নের অনেক ঊর্ধ্বে ওঁরা। কোনও আহ্বায়ক আবার বেগম রোকেয়া শাখাওয়াতের স্তরের। তাঁর বক্তব্য হল তিনি ‘সিস্টেমিক চেঞ্জ’ করতে নেমেছেন, তার মধ্যে আরজিকরের মৃতা মেয়েটির জন্যে ‘জাস্টিস’ চাওয়াও আছে। ফলে সরকারের উতলা হওয়ার কিছু ছিল না। তাই মুখ্যমন্ত্রী ১৬ আগস্ট নিজেও আন্দোলনে নেমে পড়েছিলেন। কার বিরুদ্ধে জিজ্ঞাসা করিয়া লজ্জা দিবেন না, কারণ আন্দোলন ইস্যুর চেয়ে বড়।

কিন্তু হিসাবে ভুল ছিল। সকলের হিসাবেই। যাঁরা রাতদখল আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তাঁরাও বোঝেননি যে আরজিকর কেবল বন্দুকের ঘোড়া টেপার কাজটা করেছে। বহুবছর ধরে সংগঠিত গণআন্দোলনের অভাবে রাজ্যের মানুষের, বিশেষত মহিলাদের, যত ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছিল সবটাই রাস্তায় উপচে পড়বে।

আমাদের মফস্বলের বিয়েবাড়িতে ক্যাটারিং ব্যবসার রমরমা হওয়ার আগে পাড়ার সেরা রাঁধুনিই রান্নার কাজে নিযুক্ত হতেন আর পাড়ার জোয়ানরা প্যান্টের উপর গামছা বেঁধে নিয়ে পরিবেশন করতেন। যদি তিনশো লোককে নেমন্তন্ন করা হত, রান্না করা হত আড়াইশো লোকের। কারণ জানা কথা যে জনা পঞ্চাশেক অনুপস্থিত থাকবে। শেষমেশ আসত ২৪০-৪৫ জন। যে ৫-১০ জনের রান্না বেঁচে যেত, তা দিয়ে বড় পরিবারের নিজেদেরই পরের দিনের খাওয়াদাওয়া সারা হত। ছোট পরিবার প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দিত। কিন্তু কোনও কোনও বিয়েবাড়িতে একটা ঝামেলা বেধে যেত। হয়তো ২৮০-৯০ জন চলে এল। তখন দুম করে আরও ৪০-৪৫ জনের রান্না হবে কী করে? রান্না করতে গেলে অত পিস মাছ, মাংসও তো লাগবে? মিষ্টিও আনতে হবে। তখন হুলুস্থূল বেধে যেত। দেখা যেত একজন বসে থেকে থেকে পরের পদটা না পেয়ে রেগে উঠে যাচ্ছে, তাকে শান্ত করার চেষ্টায় আয়োজক বাড়ির লোকজন হয়রান। আরেক নামকরা খাইয়ে রসগোল্লার হাঁড়ি হাতে ছেলেটা তার ধারেকাছে আসছে না দেখে চেঁচামেচি করছে। ওদিকে যাকে কতজন খাচ্ছে তা দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সে বেপাত্তা। গৃহকর্তা অপমানে মুখ লাল করে রাঁধুনির উপর চোটপাট করছেন ‘এতদিন কাজ করছ, হিসাবে এত বড় ভুল কী করে হয়?’ সে বেচারা সাহস করে বলতে পারছে না ‘আপনিও তো এর আগে তিনটে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। মালমশলার হিসাব করার সময়ে আপনিও তো বলতে পারতেন, এত কমে হবে না।’

১৪ আগস্টের পর ব্যাপারটা অনেকটা সেইরকম দাঁড়াল। ফেসবুক আহ্বায়করা নিজেদের ফলোয়ারের সংখ্যা দিয়ে বিচার করেছিলেন কতজন আসবে, কারা আসবে। তাদের স্লোগান-টোগান নিজেদের সুবিধামতো সামলে নেওয়া যাবে। সরকার ভেবেছিল ব্যাপারটা প্রেশারকুকারের সেফটিভালভের মতো কাজ করবে। সমাজের ভিতরে যত রাগ জমেছে, কয়েকটা সিটি মেরে উড়ে যাবে। কিন্তু না! পরিকল্পনা ছিল কেবল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘জাস্টিস ফর আরজিকর’ ইত্যাদি স্লোগান দেওয়া হবে। কিন্তু দেখা গেল যার যা প্রাণ চায় বলছে। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান সমর্থকদের ‘এক হয়েছে বাঙাল ঘটি/ভয় পেয়েছে হাওয়াই চটি’ স্লোগানও এসে পড়েছে। আন্দোলনকারী অরাজনৈতিক (থুড়ি, অদলীয়) নেতৃত্ব বুঝলেন যে জনতা তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। কাণ্ড দেখে মুখ্যমন্ত্রী আর তাঁর দলও বুঝলেন, লক্ষণ ভাল নয়। ফলে গত একমাসে আন্দোলনের দিকে বারবার ধেয়ে এসেছে তৃণমূলের উপর থেকে তলা পর্যন্ত নানাজনের নানাবিধ আক্রমণ। কখনও মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তারদের হুমকি দিচ্ছেন— এখনও এফআইআর ঠুকিনি, ঠুকলে কিন্তু কেরিয়ারের সাড়ে বারোটা বেজে যাবে। কখনও কোনও মন্ত্রী বলছেন আন্দোলনকারীরা সব নেশাখোর। কখনও মুখপাত্ররা বলছেন বিরোধীরা সাধারণ মানুষের আন্দোলন হাইজ্যাক করছে, কখনও স্থানীয় নেতা গিয়ে রাস্তায় লেখা আন্দোলনের স্লোগান মুছে দিচ্ছে।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত’ আন্দোলনের মধুচন্দ্রিমা শেষ। আগে মুখ্যমন্ত্রী হুমকি দিয়েছিলেন, এবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিও সাবধান করেছেন— জুনিয়র ডাক্তাররা কাজে না ফিরলে রাজ্য সরকারকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া থেকে আটকাবেন না। যে কোনও আন্দোলনের বিরুদ্ধেই যে অভিযোগ তোলা হয়, জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের বিরুদ্ধেও সেই আপত্তিই রাষ্ট্র তুলছে এবার— মানুষের অসুবিধা হচ্ছে, তাদের পরিষেবা বন্ধ করে আন্দোলন করা চলবে না। রাজ্যের কৌঁসুলি কপিল সিবাল কোত্থেকে কিছু সংখ্যাও জোগাড় করে ফেলেছেন। ইতিমধ্যেই নাকি জুনিয়র ডাক্তাররা কাজ করছেন না বলে সারা রাজ্যে ২৩ জন রোগী মারা গেছেন। এই সংখ্যার উৎস কী? মুখ্যমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনে দেখলাম স্বাস্থ্যসচিব বলছেন— সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী। কী অপূর্ব স্বাস্থ্যমন্ত্রক! টিভি দেখে, কাগজ পড়ে জানতে পারে কতজন রোগী মারা গেছেন। যা-ই হোক, সরকার যখন বলেছে ২৩ জন, তখন অঙ্ক ঠিক মিলিয়ে দেওয়া হবে। যেমন দুর্ঘটনায় প্রবল আঘাত পাওয়া কোন্নগরের বিক্রম ভট্টাচার্যের মৃত্যু সম্পর্কে আরজিকর হাসপাতালের ডাক্তাররা যা-ই বলুন না কেন, ওটাকে জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতির ফলে হওয়া মৃত্যু হিসাবে ধরতেই হবে। আন্দোলনরত ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁরা বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের কথামতো কাজে ফিরবেন না। ফলে এরপর থেকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে হওয়া প্রত্যেকটা মৃত্যুর দায় যে তাঁদের ঘাড়েই চাপবে— এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। এতদিন যে কর্পোরেট সংবাদমাধ্যম স্বভাববিরুদ্ধভাবে তাঁদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছে, তারাও এবার ক্রমশ আন্দোলনবিরোধী হয়ে উঠবে ধরে নেওয়া যায়। কারণ এতদিন ছিল মধ্যবিত্ত দর্শক/পাঠক ধরে রাখার তাগিদ। তা বলে তো আর কর্পোরেটরা কোনও আন্দোলনের পক্ষে থাকার চিজ নয়। তার উপর এবার ক্রমশ গ্রাম, শহরের নিম্নবিত্ত দর্শককে/পাঠককে ধরে রাখার তাগিদ বড় হয়ে দেখা দেবে। কারণ?

এক জেলা হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সে বলল ‘দাদা, এই আন্দোলন এখন এলিটদের ইন্ধনে চলছে। গ্রামের লোক আমাদের উপর ক্ষিপ্ত।’ ডাক্তার ভাইটির ভয়— এরপর এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে শারীরিক আক্রমণ চালাতে পারে তৃণমূল। ভয়টা যে অমূলক নয় তা তৃণমূলের অনেকের সোশাল মিডিয়ায় এসে পড়া কথাবার্তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এই আন্দোলন যে বৈধ, কেবল ডাক্তার বা নার্স নয়, এই পচাগলা ব্যবস্থা চলতে দিলে যে হাসপাতালে ভর্তি অসুস্থ মহিলারাও ধর্ষণ, খুনের শিকার হতে পারেন— এটা কেন রোগীদের বোঝাতে পারছ না? সব হাসপাতালে তো আরজিকরের মতো নিরাপত্তা দিতে সিআইএসএফ হাজির হয়নি, হওয়া সম্ভবও নয়। এটা গ্রামাঞ্চলের রোগীদের কেন বোঝানো যাচ্ছে না? প্রশ্নের উত্তরে আমার ডাক্তার ভাই যা বলল, তা মোক্ষম।

‘আসলে আমরা খুব অসংগঠিত।’

বাইরের আন্দোলনের যে অরাজনৈতিক, সংগঠনহীনতার রোম্যান্টিকতা— তা দিয়ে ডাক্তাররা বাঁচতে পারবেন না। বাইরের আন্দোলনকারীরা ওঁদের বাঁচাতেও পারবে না। মেডিকেল কলেজগুলোতে যে হুমকি সংস্কৃতি সন্দীপ ঘোষ, বিরূপাক্ষ বিশ্বাসরা চালু করেছেন গত ১৩ বছরে (যার কিছুই আমাদের বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানতেন না), তার ফলে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ ছাড়া অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর অস্তিত্ব প্রায় বিলুপ্ত করে দেওয়া গিয়েছিল। তার উপর বাঙালি বাবা-মায়েরা তো ছেলেমেয়েদের এমনিতেই শিখিয়ে এসেছেন ‘কলেজে গিয়ে লেখাপড়া করবে। পলিটিক্স করার দরকার নেই।’ এখন প্রাণের দায়ে রাজনীতি করতে হচ্ছে, সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ও জিনিস কি দু-একদিনে শেখা যায়? স্বাস্থ্যবিভাগের যে ভয়ঙ্কর চেহারা এখন প্রকাশিত হচ্ছে (আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক সোমা মুখোপাধ্যায়ের ধারাবাহিক প্রতিবেদন লক্ষণীয়), তার মধ্যেও এত বছর ধরে যেসব দুঃসাহসী ছেলেমেয়ে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছে, তারাই এখন ভরসা। তাদেরই এখন ঠিক করতে হবে কী করে রোগীদের বিশ্বাস অর্জন করেও এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া যায়। কারণ টালিগঞ্জের তারকারা যে যত জনপ্রিয়ই হোন, আর তথাকথিত নাগরিক সমাজের দলহীন নেতা-নেত্রীদের সোশাল মিডিয়ায় যত ফলোয়ারই থাকুক, ডাক্তাররা আন্দোলন বন্ধ করে দিলে বাইরের আন্দোলন এমনিই ঠান্ডা হয়ে যাবে। সোম থেকে শুক্র অফিস করে শনি, রবিবারে আন্দোলন করবেন— সে গুড়ে বালি। কারণ এবার গুন্ডাবাহিনি আসবে মারতে, যেমনটা নৈহাটিতে এসেছিল ৮ সেপ্টেম্বর রাতে। খান্না মোড়ের মহিলাদের মতো জবাব দিতে যাঁরা পারবেন না, তাঁদের এবার আন্দোলন গুটিয়ে ফেলা ছাড়া উপায় থাকবে না।

 

ন্যায়বিচার

শব্দটা নতুন লাগছে? অস্বাভাবিক নয়। কারণ আরজিকর নিয়ে আন্দোলনটা যেহেতু আমরা শুরু করেছি— আমরা যারা ইংরেজি বলতে পারি এবং ছেলেমেয়েকে বাংলা মাধ্যম স্কুল থেকে সবসময় হাত পঞ্চাশেক দূরে রাখি, যাদের একাধিক আত্মীয় বা বন্ধু বিদেশে আছে, তরুণ আত্মীয়রা প্রায় সবাই রাজ্যের বাইরে আছে— সেহেতু প্রথম থেকেই এই আন্দোলনে সরকার ও পুলিশের কাছে ন্যায়বিচারের দাবি না তুলে আকাশের দিকে মুখ করে #WeWantJustice, #JusticeforRGKar স্লোগান ছোড়া হচ্ছে। যার গায়ে লাগে লাগুক, আমার স্লোগান দেওয়ার আমি দিলাম, আমার বিবেক পরিষ্কার— ভাবখানা এইরকম। যদ্দিন সরকারের গায়ে লাগছিল না, তদ্দিন মাঝরাত্তিরেও মনের সুখে এই স্লোগান দিয়ে নির্বিঘ্নে বাড়ি ফেরা গেছে। এখন যে আর যাবে না সে-কথা আগেই প্রকাশ করেছি। এবার বলি, ন্যায়বিচার আদায় করতে গেলে যারা ইংরেজি জানে না, শহরে থাকে না, যাদের বাড়ির লোক রাজ্য বা দেশের বাইরে যায় কেবল শস্তার শ্রমিক হিসাবে— তাদের সমর্থন লাগবে। তার জন্যে আন্দোলনকে তাদের কাছে নিয়ে যেতে হবে। যদি ন্যায়বিচারের চেয়েও সহজ কোনও শব্দ ব্যবহার করলে তা সম্ভব হয়, তাহলে সেই শব্দটাই খুঁজে বার করতে হবে। তা করার তাগিদ অবশ্য আমাদের নেই, থাকার কথাও নয়। সে তাগিদ থাকার কথা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর, কারণ তাদের ভোটে জিততে হবে। আমাদের এবং আমাদের মহান অরাজনৈতিক নেতানেত্রীরা ভোট-রাজনীতিকে ঘৃণা করেন, কারণ ভোট না দিলেও তাঁদের বেঁচে থাকতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না। গরিব মানুষের হয়। গ্রামের গরিব মানুষের তো হয়ই। যদি তাঁদের বোঝানো যায় যে সন্দীপ, বিরূপাক্ষরা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে যেদিকে নিয়ে গেছে তার প্রতিকার করতে না পারলে আগামীদিনে বেঘোরে তাঁরাই মরবেন বেশি; একমাত্র তাহলেই জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতিতে আজকের অসুবিধা সয়ে নিতে তাঁরা রাজি হবেন।

এটা বোঝানো শক্ত কাজ। কেবল আমার ডাক্তার ভাই যে কারণে বলেছে সে কারণে নয়। ভাইয়ের সিনিয়ররা গত ৩০-৩৫ বছর ধরে যেভাবে ডাক্তারি করেছেন তার জন্যেও। ২০১৯ সালে রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর পরিবার-পরিজনের হাতে ডাক্তারদের নিগ্রহ বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল এবং নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ঘটনার পরে রাজ্যজুড়ে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা ধর্মঘট করেছিলেন। তখন একাধিক ডাক্তার আত্মীয়-বন্ধুকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যে যতদিন না নার্সদের এবং রোগীদের ভালমন্দ সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ডাক্তাররা কথা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে চাকরি করে কর্পোরেট হাসপাতালের দাসত্ব করা বন্ধ করছেন, ঢালাও নার্সিংহোম খোলা আর পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে ওঠা প্যাথলজিকাল সেন্টারগুলোকে টাকার বিনিময়ে সই বিলিয়ে যাওয়া বন্ধ করছেন, ততদিন রোগীরা ডাক্তারদের প্রতিপক্ষ ভাবা বন্ধ করবেন না। সেসব ব্যাপার আজও বদলায়নি।

শুধু তাই নয়। ২০১৯ সালের জুন মাসে সরকারি গোঁয়ার্তুমির চোটে পরিস্থিতি যখন হাতের বাইরে চলে গেল, ডাক্তাররা সিনিয়র জুনিয়র নির্বিশেষে দলে দলে পদত্যাগ করতে লাগলেন, তখন অবস্থা সামাল দিতে মমতা নবান্নে জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে টিভিক্যামেরার সামনে ঘটা করে এক সভা করেন এবং ছাত্রনেতাদের প্রায় সব দাবিই মেনে নেন। সুরক্ষা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। সেদিন যা যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সব পূরণ হয়ে থাকলে আরজিকরের মেয়েটার ধর্ষণ ও মৃত্যু হয়তো ঘটত না। ১৪ আগস্ট রাতে আরজিকরে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে তা তো অবশ্যই আটকানো যেত। এই নজরদারিটুকুও সিনিয়র ডাক্তাররা গত পাঁচ বছরে করেছেন কি? প্রশ্নটা কাউকে করতে দেখছি না। উত্তর বোধহয় স্বস্তিদায়ক হবে না।

এখন কথা হল, এর সঙ্গে তিলোত্তমার ন্যায়বিচারের সম্পর্ক কী?

নারীবাদীরা যত ইচ্ছে রাগ করুন। এটা বোঝা দরকার যে একজন নেশাড়ু হাসপাতালে ঢুকে সেখানকারই একজন ডাক্তারকে ধর্ষণ করে খুন করে দিয়েছে— ঘটনা যদি এইটুকু হত, তাহলে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্যে এত আন্দোলন করার দরকার হত না। ন্যায়বিচার আদৌ পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছে সকলের মনে— তাও ঘটত না। কারণ অভিযুক্ত সঞ্জয় রাইয়ের দ্রুত গ্রেফতারি প্রমাণ করছে যে তার বিরাট কোনও দাদা দিদি নেই। কিন্তু যে কলকাতা পুলিশ তাকে ঘটনার চারদিনের মধ্যেই গ্রেফতার করেছে, তারই কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করছে ডাক্তারদের আন্দোলন। কারণ ওই পুলিশই প্রাণপণে প্রমাণ লোপাট করেছে, ময়নাতদন্তে কারচুপি করেছে, সাততাড়াতাড়ি মৃতার দেহ পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে; এমনকি মেয়ের বাবা-মাকে টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করতে চেয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এগুলো তো আর সঞ্জয়কে বাঁচানোর জন্যে করা হয়নি। সুতরাং এই ঘটনায় বৃহত্তর অপরাধ খুন, সে খুনের কারণ পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি। এতকিছু ঢাকতেই এমনভাবে প্রমাণ লোপাট করা হয়েছে, সাধারণ নিয়মকানুনও অগ্রাহ্য করা হয়েছে। যে মুখ্যমন্ত্রী সিবিআই শব্দটা শুনলেই প্রায় সিপিএম শব্দটা শোনার মতোই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন, তিনি প্রথম থেকেই সিবিআইয়ের হাতে এই মামলা তুলে দেওয়ার জন্যে উদগ্রীব ছিলেন। কলকাতা পুলিশকে সাতদিন সময় দিয়েছিলেন।

কেন সাতদিন? এখন দেখা যাচ্ছে আদালত আগেই হস্তক্ষেপ করায় যে চারদিন সময় বিনীত গোয়েলের বাহিনি পেয়েছিল, তার মধ্যেই সাক্ষ্যপ্রমাণের এমন হাল করা হয়েছে যে সিবিআই আন্তরিক তদন্ত চালালেও সত্য উদ্ঘাটিত হবে কিনা সন্দেহ। ফলে ন্যায়বিচার বিশ বাঁও জলে। সিবিআই আন্তরিক হোক বা না হোক, সুপ্রিম কোর্ট যথাযথ ভূমিকা নিক বা না নিক, সুপ্রিম কোর্টে শুনানির আগের রাতে পথে নামলে আদালত প্রভাবিত হবে— এসব যাঁরা ভাবছেন তাঁরা ভারতের বিচারব্যবস্থার ইতিহাস সম্পর্কে খবর রাখেন না। সত্যি কথা বলতে, জনমত মাথায় রেখে কাজ করা আদালতের উচিতও নয়। কারণ তা করলে আইনের শাসনের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হবে জনতার আবেগের শাসন, যা অনেক ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচারের বিপরীতে দাঁড়ায়।

তাহলে ন্যায়বিচার পেতে গরিব মানুষ, বিশেষত গ্রামের মানুষের সমর্থন দরকার কেন বলছি? কারণ আরজিকরের ঘটনায় ন্যায়বিচার বলতে যা পাওয়া সম্ভব তা হল— ১) যারা এই প্রমাণ লোপাটের কাজ করেছে তাদের শাস্তি (এটা ঘটলে ধর্ষণ, খুনের রহস্যভেদ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে); ২) ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনার বিনাশ। এ দুটো সম্ভব একমাত্র ২০২৬ সালে সরকার বদল হলে, নচেৎ নয়।

আরও পড়ুন অরাজনীতির হাত থেকে কবে স্বাধীন হবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ?

অনেকেই এ-কথায় মহা ক্ষেপে উঠবেন। প্রশ্ন তুলবেন— সরকার বদলালেই যে দুর্নীতি আর হবে না তার গ্যারান্টি কী? এ কেবল রাজনৈতিক অভিসন্ধির প্রকাশ। ঠিক কথা। কোনও গ্যারান্টি নেই যে আবার দুর্নীতি হবে না, নতুন র‍্যাকেট গড়ে উঠবে না। কিন্তু যে বাচ্চা জন্মায়নি তাকে যেমন স্কুলে ভর্তি করা যায় না, তেমনি যে সরকার এখনও ক্ষমতায় আসেনি তাকে দুর্নীতির জন্যে শাস্তি দেওয়াও যায় না। শাস্তি যে সরকার আছে তাকেই দিতে হয় আর গণতান্ত্রিক শাস্তির দৃষ্টান্ত ১৯৭৭ সালের কংগ্রেস বা ২০১১ সালের বামফ্রন্ট। এখন যদি বলেন ‘এদের সরকারে কী হয় আগে দেখেছি, এদের বিশ্বাস করি না’ তাহলে কাজটা হয়ে দাঁড়াবে আরও কঠিন। একটা বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প সংগঠন (অর্থাৎ রাজনৈতিক দল) গড়ে তুলতে হবে, তারপর এখন যারা সরকারে আছে তাদের হারাতে হবে। এমনও যে হয় না তা নয়। আন্দোলন থেকে দল উঠে আসার হাতেগরম ইতিহাস রয়েছে আম আদমি পার্টির। তবে দিল্লি কিন্তু রাজ্য হিসাবে ছোট্ট, পশ্চিমবঙ্গ অনেক বড় রাজ্য। যাদবপুর এইট-বি মোড়ে বা শ্যামবাজারে নাচ করা, গান গাওয়া, ছবি আঁকা বা কবিতা বলার চেয়ে অনেক কঠিন কাজ দিল্লির মতো ওইটুকু রাজ্যে একটা দল গড়ে ভোটে জেতা। পশ্চিমবঙ্গে যে কাজটা আরও বহুগুণ কঠিন তা বলাই বাহুল্য। পারলে লেগে পড়ুন আজ থেকেই, কারণ রাজনীতি করা ৩৬৫ দিনের কাজ।

অনেকে দিন গুনছেন দেখছি। ‘বিচারহীন ২৯ দিন, ৩০ দিন, ৩১ দিন…’ ইত্যাদি। ভুলেও এই ভুলটি করবেন না। দীর্ঘসূত্রিতা করলে যেমন ন্যায়বিচার হয় না, তেমন তাড়াহুড়ো করলেও ন্যায়বিচার হয় না। যত দিন গুনবেন, তত হতাশ হবেন। যত বেশি মানুষ হতাশ হবেন, তত আন্দোলনের জোর কমবে। আপনার চেয়েও বেশি তাড়া আছে রাজ্য সরকারের। তাই তড়িঘড়ি নিজেদের উদ্যোগ দেখাতে একটা অর্থহীন নতুন আইন পাশ করানো হয়েছে। এরপর কোনওমতে সঞ্জয় রাইকে দোষী প্রমাণ করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে। মমতা, অভিষেক এবং তাঁদের পারিষদরা বলবেন ‘উন্নাও, হাথরাসে শাস্তি হয়নি। বানতলা, ধানতলায় শাস্তি হলেও ফাঁসি হয়নি। আমরা অপরাধীকে ধরে ফাঁসি দিয়ে দিয়েছি। বিরোধীরা চক্রান্ত করে খামোখা আমাদের বদনাম করল।’ ইতিমধ্যে দুর্নীতির মামলায় কিছুদিন বিচারাধীন বন্দি হিসাবে হাজতবাস করে অথবা শাস্তিপ্রাপ্ত বন্দি হিসাবে কারাবাস করে সন্দীপও বেরিয়ে পড়বেন। তারপর সব যেমন চলছিল তেমনই চলবে। আমি, আপনি মাথা চুলকে ভাবব— কী হল কেসটা? তারপর একদিন সন্দীপদের ব্যবস্থার উৎপাদন কোনও এক ডাক্তার আপনার কোনও প্রিয়জনের কিডনি অপারেশন করতে গিয়ে লিভারটা কেটে বাদ দিয়ে দেবেন।

মানে ন্যায়বিচার পেতে গেলে টেস্ট ম্যাচ খেলার ধৈর্য থাকতে হবে। কিন্তু সরকার জানে আপনি আইপিএলের ভক্ত।

 

পুজো

আচ্ছা, পুজো হবে না এ-কথা পশ্চিমবঙ্গের একজন মানুষও বলেছে কি? পুজো হলেই যে উৎসব হবে তাও তো জানা কথা। তাহলে মমতা হঠাৎ উৎসবে ফেরার কথা বলতে গেলেন কেন? ওই যে শুরুতেই বলেছি, বয়স বাড়লে আনন্দেরও ভুল হয়। কিন্তু ওটাই একমাত্র কারণ নয়।

১৯৯৪ বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনাল সম্পর্কে এক প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন ‘লোকে এত ব্রাজিল ব্রাজিল করে। কিন্তু ভাব, রোমারিও আর বেবেতোকে ১২০ মিনিট গোল করতে দেয়নি বুড়ো ফ্রাঙ্কো বারেসি। অথচ বারেসি তখন, প্লেয়িং এন্টায়ারলি ফ্রম মেমরি।’ মানে একজন জাত রক্ষণভাগের খেলোয়াড় স্রেফ অভিজ্ঞতার জোরে বয়সের কারণে জোয়ান স্ট্রাইকারদের চেয়ে শারীরিকভাবে পিছিয়ে থেকেও তাদের আটকে দিতে পারেন। মমতা এখন বারেসির খেলাই খেলছেন। তিনি জানেন, সোশাল মিডিয়ার যুগে সবকিছুই হুজুগ হয়ে দাঁড়ায়। এই আন্দোলনের একটা বড় অংশ যেহেতু অসংগঠিত মানুষের আন্দোলন, সেহেতু হুজুগ আছে বইকি। হোয়াটস্যাপ গ্রুপগুলোতে চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে কেউ জিজ্ঞেস করছে ‘কী শাড়ি পরা উচিত বল তো? সাদা, না কালো?’ কেউ আবার ফেসবুকে প্রতিবাদী কবিতা পোস্ট করে লাইক গুনতে ব্যস্ত। মমতা জানেন, এই আন্দোলনকারীদের অন্য হুজুগে মাতিয়ে দিতে পারলেই সমস্যা অনেকটা মিটে যাবে। ইতিমধ্যে ডাক্তারদের যদি কোনওভাবে কাজে ফিরতে বাধ্য করা যায়, তাহলে তো কথাই নেই। এদের উৎসাহ আরও কমে যাবে। অতএব এই তো সময় পুজোর কথা মনে করিয়ে দেওয়ার।

তাছাড়া মমতাকে নির্ঘাত চিন্তায় ফেলেছে বহু ক্লাবের সরকারি অনুদান প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত। সরকার কেন একটা ধর্মের উৎসবে টাকা দেবে— এই প্রশ্ন করার সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গ থেকে উঠেই গেছে। এমনকি কেউ একথাও জিজ্ঞেস করে না যে ক্লাবগুলো সরকারের থেকে টাকা পাওয়ার পরেও এলাকার লোকের থেকে চাঁদা তোলে কেন? কারণ অন্নপ্রাশন থেকে শ্রাদ্ধ— কোনওকিছুই বিরাট করে করতে না পারলে আমাদের আজকাল চলে না। সুতরাং দুর্গাপুজো যত বড় হয় তত ভাল। এমন এক গিগ-অর্থনীতিতে বাস করি আমরা, যে মানুষের ভোগ করার ইচ্ছে যত বাড়ে তত ভাল। ভোগ কমলেই সঙ্কট। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একটুও লজ্জা না পেয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, পুজোর সময়ে ঢাকিদের রোজগার হয়। বাকি বছরটা তারা কী করে সংসার চালায় সে প্রশ্ন একবার মনেও আসে না তাঁর? আজকাল পুজোগুলোর যা বাজেট হয় তার তুলনায় ঢাকিরা কতটুকু রোজগার করে সে খবর কি রাখেন মুখ্যমন্ত্রী? আসলে তাঁর দুশ্চিন্তা ওসব নিয়ে নয়। তিনি ক্লাবগুলোকে টাকা দেন যাতে সভ্যরা তাঁকে ভোট দেয়, যাদের উপর তাদের প্রভাব আছে তাদেরও দিতে বলে। বিশেষত পঞ্চায়েত বা পৌরসভার নির্বাচন যাঁরা মন দিয়ে অনুসরণ করেন, তাঁরা জানেন এই কৌশলের সাফল্য বিরাট। ফলে ক্লাবগুলো বেঁকে বসলে মুশকিল। সুতরাং উৎসবে ফিরে আসার পরামর্শ আসলে ক্লাবগুলোকে টাকা নিয়ে যেতে বলা।

অনেকে দেখছি ছোট ব্যবসায়ীদের কী হবে তা নিয়ে খুব চিন্তিত। চিন্তা প্রকাশ করার পরের বাক্যেই বলছেন ‘পুজোর সময়ে এ রাজ্যে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জিএসটি কালেকশন হয়। পুজো না হলে কী হবে?’ তথ্যটা সঠিক কিনা জানি না, কিন্তু তত্ত্বটা মজাদার। জিএসটি যে জমিদারি ট্যাক্স হয়ে উঠেছে তা এখন গোটা দেশের মানুষ জানেন। কেন্দ্রীয় সরকার পর্যন্ত এমন লজ্জায় পড়েছে যে জুলাই মাসে কত টাকা জিএসটি উঠেছে তা আর প্রকাশই করেনি। কারণ ধরা পড়ে যেত যে ছোট ব্যবসায়ীদের রক্ত চোষা হচ্ছে। এদিকে আমার পুজোবাদীরা জিএসটি কালেকশনকে রাজ্যের ছোট ব্যবসায়ীদের সমৃদ্ধির লক্ষণ বলে ধরছেন। গত কয়েক বছর ধরেই যে পুজোর সময়েও দোকানে তেমন ভিড় হচ্ছে না, কারণ মানুষের হাতে খরচ করার মতো পয়সা নেই— তা চোখ কান খোলা থাকলে, ছোট দোকানিদের সঙ্গে কথা বলার অভ্যাস থাকলেই জানা যায়।

কিন্তু আবার ওই প্রশ্নে ফিরে আসি। পুজো একেবারে করব না— এ-কথা কে বলেছে? কেউ না। জামাকাপড় কিনবই না— এমন ধনুর্ভঙ্গ পণ কে করেছে? কেউ না। কেনই বা করতে হবে? একটা রাজ্যের সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে, বা নিদেনপক্ষে অপদার্থতায়, একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে আন্দোলন করা দরকার। তা বলে সবাইকে সবকিছু থামিয়ে যারা এই অপরাধে কোনওভাবেই যুক্ত নয়, তাদের শাস্তি দিতে হবে? এ আবার কী আহ্লাদ? প্রতিবাদে পথনাটিকা হতে পারে, প্রেক্ষাগৃহে নাটকের শো করা যাবে না? হলে সিনেমা মুক্তি পেতে পারবে না? যে শিশুরা এখনও জানে না বাবা মায়ের কে হয়— তাদেরও পুজোয় মুখ ভার করে থাকতে হবে? এ তো চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া। যদি আমরা পুজোর হুজুগে তিলোত্তমার জন্য ন্যায়বিচার ছিনিয়ে আনার কথা ভুলে না যাই, পুজোর ছুটিতে আন্দোলন থেকেও ছুটি নিয়ে না ফেলি, তাহলেই যথেষ্ট। বরং এই অবসরে পুজোর আড়ম্বর যদি একটু কমে, তাহলে অত্যধিক আলোয় চারপাশে জমে ওঠা যেসব অন্ধকার আমরা ঢেকে রাখি সেগুলো চোখে পড়বে। সরকারের পক্ষে সেটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। তাই হুজুগান্তরে যাওয়ার তাড়া দেওয়া। এখন আমাদেরই প্রমাণ করতে হবে— এই আন্দোলন আমাদের আরেকটা হুজুগমাত্র নয়।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

হিন্দুরাষ্ট্রের ক্রিকেট দলের কোচ হিসাবে গম্ভীর সেরা পছন্দ

২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন।

ভালমানুষ রাহুল দ্রাবিড় আর পেরে উঠছেন না। তাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড পুরুষদের জাতীয় দলের নতুন কর্ণধারের খোঁজ করছে। শোনা যাচ্ছে বোর্ড একজন শাঁসালো কোচ চায়। স্টিফেন ফ্লেমিংকে নাকি মহেন্দ্র সিং ধোনি রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। রিকি পন্টিংকে নাকি বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি রাজি নন। জাস্টিন ল্যাঙ্গারও রাজি হচ্ছেন না বলে শোনা যাচ্ছে। এসব অবশ্য নেহাত গুজব বলে বিবৃতি দিয়েছেন বোর্ডের সর্বেসর্বা জয় শাহ। তবে গৌতম গম্ভীরের নাম যে উঠে এসেছে, এই প্রচার সম্পর্কে কিছু বলেননি। এই কাজের জন্যে ওই নামটি কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক।

গৌতম সত্যিই গম্ভীর। তাঁকে চট করে হাসতে দেখা যায় না। সম্প্রতি রবিচন্দ্রন অশ্বিনের পডকাস্টে এসে গৌতম বলেছেন ‘লোকে আমার হাসি দেখতে আসে না। আমার জয় দেখতে আসে।’ ফুর্তিবাজ রবি শাস্ত্রীর সঙ্গে এতবছর ঘর করার পরে রোহিত শর্মা, বিরাটরা কি এত গম্ভীর লোকের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারবেন? গুরুতর প্রশ্ন।

গম্ভীরের কথা উঠলেই এসে পড়ে বিরাটের কথাও। দুজনেই দিল্লির ছেলে। শুধু জাতীয় দল নয়, রঞ্জি দলেও একসঙ্গে খেলেছেন। কিন্তু সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়। প্রাক্তন ক্রিকেটারদের যে কজন আজও বিরাটের ব্যাটিংয়ের সমালোচনা করার সাহস দেখান, গম্ভীর তাঁদের একজন। গতবছর আইপিএলে গম্ভীরের তখনকার দল লখনৌ সুপার জায়ান্টস আর বিরাটের রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর ম্যাচের পর তো হাতাহাতির উপক্রম হয়েছিল। ভারতীয় ক্রিকেটের বর্তমান মহাতারকার সঙ্গে এমন সম্পর্ক যাঁর, তিনি কী করে দল চালাবেন? কুম্বলের সময়ে  অবশ্য বিরাট অধিনায়ক ছিলেন, এখন সে ঝামেলা নেই। কিন্তু এই প্রজন্ম তো আবার সৌরভ গাঙ্গুলিদের প্রজন্ম নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাত্র হাজার নয়েক রানের মালিক জন রাইট তাঁর ইন্ডিয়ান সামার্স বইয়ে লিখেছেন, ভারতীয় দলের কোচ থাকার সময়ে তিনি একবার খারাপ শট খেলে আউট হওয়ার জন্যে রাগের চোটে বীরেন্দ্র সেওয়াগের কলার ধরেছিলেন, মারতে গিয়েছিলেন। অথচ সেই ঘটনা দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার বহুবছর পরে রাইট নিজেই লেখার আগে কেউ জানতেও পারেনি। আজ এর অর্ধেক ঘটলেও সোশাল মিডিয়ায় ‘সূত্রের খবর’ বলে ঘটনাটা ভাইরাল হবে, বোর্ড বিবৃতি দেবে এমন কিচ্ছু ঘটেনি। কিন্তু কোচের চাকরিটি চলে যাবে।

গম্ভীর যে কোচ হওয়ার যোগ্য তাতে সন্দেহ নেই। ২০০৭ আর ২০১১ – দুই ধরনের ক্রিকেটে ভারতের দুই বিশ্ব খেতাব জয়েই তাঁর বড় অবদান ছিল। দুটো ফাইনালেই তিনি সর্বোচ্চ রান করেন। আটান্নটা টেস্ট ম্যাচেও তাঁর কীর্তি ফেলে দেওয়ার মত নয়। আর কিচ্ছু না করে শুধু যদি ২০০৯ সালে নিউজিল্যান্ডের নেপিয়ারে এগারো ঘন্টা ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচানো ইনিংসটাই খেলতেন, তাহলেও তাঁর নাম ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে লেখা থাকত। তার উপর তিনি দুবার কলকাতা নাইট রাইডার্স অধিনায়ক হিসাবে আইপিএল খেতাব জিতেছেন। লখনৌ সুপার জায়ান্টস তাঁর মেন্টরশিপে আইপিএলে যোগ দিয়েই শেষ চারে পৌঁছেছিল। ফলে দল চালানোর ক্ষমতা যে তাঁর আছে, তা নিয়েও সংশয় নেই।

কিন্তু ভারতীয় দল আর পাঁচটা দলের চেয়ে আলাদা। অস্ট্রেলিয় ল্যাঙ্গার অতশত বোঝেন না। তিনি সরল মনে সংবাদমাধ্যমকে বলে বসেছেন, কে এল রাহুল নাকি তাঁকে বলেছেন – আইপিএলের দলে যদি চাপ আর রাজনীতি আছে বলে মনে করো, সেটাকে হাজার দিয়ে গুণ করলে তবে ভারতীয় দলের কোচিং কীরকম চাপের সেটা বুঝতে পারবে। তাই ল্যাঙ্গার ঠিক করেছেন ও কাজ তাঁর জন্যে নয়।

বলে ফেলার জন্যে রাহুলের হয়ত গর্দান যাবে, কিন্তু কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। প্রসিদ্ধ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পত্রিকা উইজডেন-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায় বর্ষীয়ান সাংবাদিক শারদা উগ্রা ‘মোদী অপারেন্ডি: দ্য পলিটিসাইজেশন অফ ইন্ডিয়ান ক্রিকেট’ শীর্ষক নিবন্ধে সবিস্তারে লিখেছেন, কীভাবে ক্রিকেট বোর্ডকে বিজেপি দলের একটা ইউনিটে পরিণত করা হয়েছে। ২০২৩ বিশ্বকাপকেও কীভাবে বিজেপির স্বার্থে চালানো হচ্ছিল। সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা – ২০২৩ বিশ্বকাপে পাকিস্তান ম্যাচে নীল জার্সির বদলে সম্পূর্ণ গেরুয়া জার্সি পরতে বলা হয়েছিল ভারতীয় দলকে। কিন্তু ক্রিকেটাররা বেঁকে বসেন। কেন? শারদা দুটো সূত্র থেকে দুরকম খবর পেয়েছেন। একটা বলছে, ক্রিকেটাররা ওই জার্সি বাতিল করেন জার্সিটা হল্যান্ডের মত দেখতে বলে। দ্বিতীয়টা বলছে, ক্রিকেটাররা বলেন – এ কাজ আমরা করব না। এতে আমাদের দলের ক্রিকেটারদেরই অসম্মান করা হবে। কারণ ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ দৃশ্যতই হয়ে দাঁড়াবে হিন্দু বনাম মুসলমান ম্যাচ। অথচ ভারতীয় দলে আছেন মহম্মদ শামি আর মহম্মদ সিরাজ। অনেক পাঠকের হয়ত খেয়াল আছে, ওই গেরুয়া জার্সির ছবি সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিল। তখন বোর্ডের হিসাবরক্ষক বলেছিলেন, ওটা ভুয়ো। কিন্তু শারদা লিখেছেন, দল, ক্রিকেট বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক নিয়ামক সংস্থা আইসিসি – তিনটে সূত্র থেকে তিনি খবর পেয়েছেন যে এমন পরিকল্পনা সত্যিই নেওয়া হয়েছিল।

আগামী ৪ জুন নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় ফিরলে হয়ত ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা জার্সির রং বদল আর আটকাতে পারবেন না। এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়, গম্ভীরই দ্রাবিড়ের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার উপযুক্ত লোক। কারণ তিনি ‘মোদী কা পরিবার’-এর গর্বিত সদস্য, বিদায়ী লোকসভায় বিজেপি সাংসদও ছিলেন। জাতীয় ক্রিকেট দলের লাগাম নিজেদের হাতে রাখতে গেলে মোদীর তো গম্ভীরকেই দরকার। যদি মোদী ক্ষমতায় না ফেরেন তাহলে গম্ভীরের গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে। কারণ একটা নির্বাচনে হার হলেই দেশের জন্যে মোদীর এক হাজার বছরের পরিকল্পনার পরিসমাপ্তি ঘটবে না। ভারতীয় সংস্কৃতির সমস্ত অভিজ্ঞান শরীরে ধারণ করা ক্রিকেট দল যাতে বেপথু না হয়ে যায়, তার জন্যে তো গম্ভীরের মত নির্ভরযোগ্য লোককেই দরকার। ভুললে চলবে না, ২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন। এক সাংবাদিক দাহিয়াকে বলেছিলেন যে কাণ্ডটা দেখে ইনজামাম উল হকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান দলের মাঠেই নমাজ পড়ার মত হয়ে যাচ্ছে। দাহিয়া বলেছিলেন, মোটেই তা নয়। সূর্যপ্রণামটা নাকি ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। ওতে চাপ কমে, মন শান্ত হয়।

সরকার হাতে থাক আর না-ই থাক, এই ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন’ তো বজায় রাখতে হবে জাতীয় ক্রিকেট দলে। তার জন্যে গম্ভীরের চেয়ে উপযুক্ত আর কে আছে?

এই সময় কাগজে প্রকাশিত

কেন আমি আইপিএল নাস্তিক?

প্রতিবছর ঘটা করে নিলাম হয়, বাবুরা দাসী বাঁদি কেনার মত পছন্দের ক্রিকেটার কেনেন। খেলার সময়েও কেবল খেলা হয় না। গ্যালারিতে এবং আফটার পার্টিতে বলিউড সুন্দরীরা আসেন, মাঠের ধারে চিয়ারলিডার নাম দিয়ে স্বল্পবাস মেম নাচানো হয়।

সদ্য দ্বিতীয়বার বাবা হওয়া বিরাট কোহলি মাঠে নামার জন্যে মুখিয়ে আছেন। মহেন্দ্র সিং ধোনির নাকি ব্র্যাড পিট অভিনীত বেঞ্জামিন বাটনের মত বয়স বাড়ার বদলে কমছে। হার্দিক পান্ডিয়ার কাছে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের অধিনায়কত্ব হারানোয় রোহিত শর্মা কি রেগে আছেন, নাকি হালকা বোধ করছেন?

খবরের কাগজের খেলার পাতা থেকে সোশ্যাল মিডিয়া– সর্বত্র ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন এসব নিয়েই আলোচনা করছেন। কারণ শীত চলে যেতেই এসে পড়েছে ভারতীয় ক্রিকেটের বৃহত্তম রিয়েলিটি শো। পেশাগত বাধ্যবাধকতা সরে যাওয়ার পর থেকে আইপিএল দেখি টিভির চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে কখনও চোখে পড়ে গেলে দু-এক ওভার। উপরন্তু কাগজে, টিভিতে বা হাতের মোবাইলে শিরোনাম পেরিয়ে আইপিএলের খবরেও ঢুকি না। প্রশ্ন হচ্ছে, ক্রিকেটপ্রেমিক হয়েও আইপিএল দেখতে যাই না কেন? যুক্তিগুলো সাজানো যাক।

ক্রিকেটের কাঠিন্য নেইআছে আমোদ 

২০০৮ সালের প্রথম আইপিএলের সময়ে যে কাগজের ক্রীড়া সাংবাদিক ছিলাম, সেই কাগজের মালিক আইপিএলের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিরও মালিক ছিলেন। প্রথম খেলার দিনই মাঠে গিয়ে দেখি– অবাক কাণ্ড! বাউন্ডারির দড়ির বাইরে যতটা জায়গা পড়ে, তা একত্র করলে আরেকটা ছোটখাটো মাঠ হয়ে যায়। খেলা শুরু হতেই দেখা গেল, রোহিত শর্মা স্পিনারের বল চামচের মত করে পিছন দিকে তুলে দিলেও মাত্র একবার ড্রপ খেয়ে মাঠের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমাদের উপর কিন্তু কাগজের কর্তাদের কড়া নির্দেশ ছিল, বাউন্ডারি যে ছোট করে দেওয়া হয়েছে সেকথা কোনও কারণেই লেখা যাবে না।

গত দেড় দশকে অবশ্য এসব লুকোচুরি আর নেই। এখন সবাই জানে, ৫০ ওভারের খেলাতেও বাউন্ডারি ছোট করে ফেলা হয় চার-ছয়ের সংখ্যা বাড়াতে। স্বীকার্য যে, আজকাল এমন বড় বড় ছয় মারা হয় যে বল গিয়ে পড়ে গ্যালারিতে। তার কারণ ব্যাটগুলোর গঠন এবং ওজন, বাউন্ডারির দৈর্ঘ্য নয়। কিন্তু একইসঙ্গে লক্ষ করে দেখবেন, সীমানার ধারে রোমাঞ্চকর ক্যাচের সংখ্যা কত বেড়ে গিয়েছে। পৃথিবীর যে কোনও দেশে কুড়ি ওভারের লিগ চললেই প্রায় প্রতিদিন কোনও না কোনও ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে একজন ফিল্ডার অপূর্ব কায়দায় শূন্যে শরীর ছুড়ে দিয়ে বা অন্য একজন ফিল্ডারের সাহায্যে সীমানার বাইরে থেকে ফিরে ক্যাচ নিচ্ছেন। এমনটা সম্ভব হয় সীমানার বাইরে অনেকখানি জায়গা থাকে বলেই।

ইউটিউবে প্রাক-আইপিএল যুগের সাদা বলের ক্রিকেটই দেখুন– সীমানার পরে মাঠ শেষ। সেখানে এসব করতে গেলে ভারতীয় স্টেডিয়ামগুলোর গ্রিলে ধাক্কা খেতে হত। আরও লক্ষ করুন, বাউন্ডারি ছোট করে দেওয়ায় রানিং বিটুইন দ্য উইকেটসে কত কম শক্তি খরচ হচ্ছে ব্যাটারের। তিন রান প্রায় হয়ই না, কারণ ফিল্ডারের বল তাড়া করে চার আটকে বল ফেরত পাঠানোর অবকাশ কম। তার আগেই বল সীমানা পেরিয়ে যাবে।

সাধারণভাবে পরিশ্রমের দিক থেকে দেখলেও যে আইপিএল বা টি২০ ক্রিকেট একজন ক্রিকেটারের পক্ষে তুলনায় আরামদায়ক তা নিশ্চয়ই আলাদা করে বলে দেওয়ার দরকার নেই। বোলারকে চার ওভারের বেশি বল করতে হয় না, একজন ব্যাটার প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত খেলে শতরান করলেও বড়জোর ৬০-৭০ বল খেলবেন। টেস্ট ক্রিকেটের কথা বাদ দিন, ৪২ বছর বয়সে পঞ্চাশ ওভারের খেলা খেলতে হলেও টের পাওয়া যেত ধোনির বয়স কমছে না বাড়ছে। জেমস অ্যান্ডারসন একজনই হয়, তিনিও বেছে বেছে ম্যাচ খেলেন।

বড়লোকের বেড়ালের বিয়ে

সদ্য প্রকাশিত এক সমীক্ষায় পাওয়া গিয়েছে, ভারতের উপরতলার ১% লোকের হাতে দেশের ২২.৬% আয় আর ৪০% সম্পদ রয়েছে। তা এমন এক দেশে বাবুরা বেড়ালের বিয়ে দেবেন না মোচ্ছব করে? প্রতিবছর ঘটা করে নিলাম হয়, বাবুরা দাসী বাঁদি কেনার মত পছন্দের ক্রিকেটার কেনেন। খেলার সময়েও কেবল খেলা হয় না। গ্যালারিতে এবং আফটার পার্টিতে বলিউড সুন্দরীরা আসেন, মাঠের ধারে চিয়ারলিডার নাম দিয়ে স্বল্পবাস মেম নাচানো হয়। কোন কোন বছর কোন ক্রিকেটার কোন চিয়ারলিডারের সঙ্গে কী ধরনের যৌনতায় লিপ্ত হয়েছিলেন তা নিয়ে রসালো কাহিনীও প্রকাশিত হয় সংবাদমাধ্যমে।

একবার যেমন প্রাক্তন দক্ষিণ আফ্রিকা অধিনায়ক গ্রেম স্মিথের কীর্তিকলাপ মুখরোচক হয়েছিল, আরেকবার ক্রিস গেল আর শেরলিন চোপড়ার নাচানাচি কলকাতার কাগজের প্রথম পাতায় জায়গা করে নিয়েছিল। আজ থেকে ঠিক এক যুগ আগে পুনে ওয়ারিয়র্স দলের ক্রিকেটাররা রেভ পার্টিতে গিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ে ক্যাচ কট কটও হয়েছিলেন। নেহাত তাঁরা শাহরুখ খানের ছেলে নন, তাই বেশি হয়রানি হয়নি।

কবি বলেছেন, শীত এসে পড়লে বসন্ত খুব পিছিয়ে থাকতে পারে না। তেমনই ফুর্তির উপাদান হিসাবে মদ, মেয়েমানুষ এসে পড়লে জুয়াও পিছিয়ে থাকে না। তবে ভারতের সরকার, সাংবাদিক, ভাষ্যকার, সর্বোপরি ক্রিকেটপ্রেমী জনতা অত্যন্ত ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলেন। তাই ম্যাচ ফিক্সিংয়ের ঘটনা ধরা পড়ে গেলে শান্তাকুমারণ শ্রীসান্ত, অজিত চান্ডিলার মত কয়েকজনকে শাস্তি দিয়ে মিটিয়ে ফেলা হয়। চেন্নাই সুপার কিংস দল সাসপেন্ড হয়ে যায় তাদের মালিকদের অন্যতম গুরুনাথ মেইয়াপ্পন অবৈধ বাজি ধরায় যুক্ত ছিলেন বলে, অথচ তৎকালীন অধিনায়ক ধোনি নাকি কিছুই জানতেন না। এক ফ্রেমে একাধিক ছবি থাকলেও তিনি নাকি এন শ্রীনিবাসনের জামাইকে আদৌ চিনতেন না। অথচ ধোনি নিজে শ্রীনিবাসনের স্নেহভাজন, তাঁর কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্টও নিযুক্ত হয়েছিলেন।

আইপিএলের উদ্গাতা ললিত মোদি বিস্তর আর্থিক কেলেঙ্কারি করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে ২০১০ সালে। নিজের লোকদের কম পয়সায় ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা পাইয়ে দেওয়া, আইপিএলের মিডিয়া স্বত্ব বিক্রির টাকা থেকে কাটমানি নেওয়া, বিদেশে গোপন অ্যাকাউন্টে টাকা সরানো– কী ছিল না তার মধ্যে? প্যান্ডোরার বাক্স খুলেছিলেন ললিত নিজেই। যখন তিনি অভিযোগ করেন যে, তৎকালীন মন্ত্রী শশী থারুর নিজের প্রভাব খাটিয়ে সুনন্দা পুষ্করকে কোচি টাস্কার্স ফ্র্যাঞ্চাইজি কিনিয়ে দিয়েছেন। তা থেকে আরও নানা অভিযোগ উঠেছিল– আইপিএলের সব ফ্র্যাঞ্চাইজিতেই নাকি বেনামে অনেকের টাকা খাটে। অন্য কোনও দেশে হয়তো এত কাণ্ডের পর এই লিগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু যারা দেশ চালায়, তাদের মোচ্ছব থামায় কার সাধ্যি? ‘দ্য শো মাস্ট গো অন’।

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগসত্যি?

কবি বলেছেন নামে কী আসে যায়? আইপিএলের বেলায় সেকথা মনে রাখা খুব জরুরি। এ এমনই ভারতীয় লিগ যে, ২০০৯ সালে সাধারণ নির্বাচনের সময়ে ম্যাচের আয়োজন করা যাবে না বলে দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলা হয়েছিল। পরেও সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে খেলা হয়েছে। অতএব দরকার পড়লে উত্তর মেরুতে বা চাঁদেও খেলা যেতে পারে। কিন্তু খেলা হওয়া চাই, কারণ সম্প্রচার স্বত্ব বেচে পকেট ভারী হচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের। সেটাই লক্ষ্য, ক্রিকেট উপলক্ষ্য।

বোর্ড ধনী হলে তা কি ভারতীয় ক্রিকেটের লাভ নয়? এর উত্তর দেওয়া বেজায় শক্ত। ভারতীয় ক্রিকেটারদের, এমনকি ঘরোয়া ক্রিকেটারদেরও যে আইপিএল যুগে পারিশ্রমিক অনেক বেড়েছে তা অনস্বীকার্য। কিন্তু মুশকিল হল, কর্তা এবং ক্রিকেটারদের লক্ষ্য, মোক্ষ সবই হয়ে গিয়েছে আইপিএল। অতিমারির সময়ে আইপিএলটা যেন হতে পারে তার সযত্ন ব্যবস্থা করেছিল সৌরভ গাঙ্গুলির নেতৃত্বাধীন বোর্ড। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও চালু ছিল যে রনজি ট্রফি, তা চালু রাখার উদ্যোগ নেয়নি। ঘরোয়া ক্রিকেটারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও হয় অনেক পরে।

আরো পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট মানে ফলাফল নিরপেক্ষ ব্যবসা

দেওধর ট্রফি, চ্যালেঞ্জার ট্রফির মত গুরুত্বপূর্ণ ঘরোয়া প্রতিযোগিতা প্রায় তুলে দেওয়া হয়েছে। শুধু টি২০ নয়, পঞ্চাশ ওভারের জাতীয় দল বা টেস্ট দল বাছার সময়েও যে আইপিএলের পারফরমেন্সকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তা এখন সুনীল গাভাসকারের মত শান্তশিষ্ট লোকও বলতে শুরু করেছেন। কেএল রাহুলের মত প্রতিষ্ঠিত তারকা তো বটেই, ঈশান কিষান বা শ্রেয়স আয়ারের মত তরুণ তুর্কিরাও এখন আইপিএল ছাড়া অন্য কিছুকে পাত্তা দিচ্ছেন না। কেউ মানসিক সমস্যার দোহাই দিয়ে আইপিএলের আগের টেস্ট সিরিজ থেকেও পালাচ্ছেন, কেউ চোট আছে বলে রনজি না খেলে বসে থাকছেন।

তাহলে আইপিএল থেকে ভারতীয় ক্রিকেট টাকা ছাড়া পেল কী? মনে রাখা ভাল, পৃথিবীর সেরা টি ২০ লিগের আয়োজক হওয়া নিয়ে গুমর থাকলেও ভারত সেই ২০০৭ সালের পরে আর ওয়ার্ল্ড টি২০ও জেতেনি। এই লিগ কেন দেখব? হাতে নষ্ট করার মত সময় থাকলে না হয় কোনও ওয়েব সিরিজ দেখা যাবে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

বাংলার ক্রিকেটের রূপ খুঁজিতে যাই না আর

কলকাতা নাইট রাইডার্স আইপিএল জেতায় রাজ্যের রাজধানীতে এ রাজ্যের করদাতাদের টাকায় ঘটা করে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছিল। তাতে বাংলার ক্রিকেটের কী উপকার হয়েছে?

শিল্পপতি সৌরভ গাঙ্গুলির শালবনির প্রস্তাবিত ইস্পাত কারখানা সফল হবে কিনা তা ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল কর্তা সৌরভের ভিশন ২০-২০ প্রোজেক্ট যে মুখ থুবড়ে পড়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সিএবি প্রধান হয়েই ভারতের সর্বকালের সেরা ক্রিকেট অধিনায়কদের অন্যতম সৌরভ বাংলার ক্রিকেটকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতির জোরে ব্যাটারদের জন্যে ভাঙ্গিপুরাপ্পু ভেঙ্কটসাই লক্ষ্মণ, জোরে বোলারদের জন্যে ওয়াকার ইউনিস, স্পিনারদের জন্যে মুথাইয়া মুরলীথরন বাংলা দলের নেট আলো করে ছিলেন বেশ কিছুদিন। কিন্তু সেসবই ক্ষণিকের হাসিকান্না। তাতে বাংলার ক্রিকেট দলের বা রাজ্যের ক্রিকেটের কোনো দীর্ঘমেয়াদি লাভ হয়েছে বলে এই ২০২৪ সালের শেষ শীতে এসে তো দেখা যাচ্ছে না। এই বাক্য এমন একটা সময়ে লিখতে হচ্ছে যখন ভারতীয় দলে একসঙ্গে দুজন বাংলা দলের বোলার রয়েছেন, রাঁচি টেস্টে আকাশ দীপের অভিষেকও মন্দ হয়নি। মহম্মদ শামি এই মুহূর্তে চোটের জন্যে বিশ্রামে থাকলেও দীর্ঘকাল ধরে তিনি ভারতীয় বোলিংয়ের স্তম্ভ। ফিরে এলে অদূর ভবিষ্যতে যশপ্রীত বুমরার বিশ্রামের ম্যাচে যদি বাংলার তিন পেসারকে একসঙ্গে খেলতে দেখা যায় তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অভিমন্যু ঈশ্বরণ যে হারে রান করে চলেছেন ঘরোয়া ক্রিকেটে এবং ভারত এ দলের হয়ে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে তাঁকেও ভারতীয় দলে খেলতে দেখা যেতেই পারে। তাহলে বাংলার ক্রিকেটের কোনো লাভ হয়নি বলছি কেন? কারণ একাধিক।

এগুলো ব্যক্তিগত সাফল্য মাত্র। শামি, মুকেশ কুমার আর আকাশকে রঞ্জি ট্রফিতে বাংলার হয়ে একসঙ্গে খেলতে দেখা যাবে – এমন সম্ভাবনা কম। ভারতীয় দল এত বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে যে একবার জাতীয় দলে থিতু হয়ে গেলে রঞ্জি ম্যাচ খেলার আর অবকাশ থাকে না। তার উপর সময়, সুযোগ থাকলেও ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার আগ্রহ এখন ক্রিকেটারদের মধ্যে ক্রমহ্রাসমান। আইপিএলে নিয়মিত হয়ে যেতে পারলে তো কথাই নেই। বাংলার প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের ঈশান কিষণ তো টেস্টও খেলতে চাইছেন না। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের মাঝপথ থেকে পলাতক ছবির অনুপকুমার হয়ে গেলেন। ঝাড়খণ্ড দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও তাঁকে খুঁজে পাচ্ছেন না। ফলে রাজ্য থেকে কোনো ক্রিকেটার জাতীয় দলে সুযোগ পেলে এখন বেল পাকলে কাকের কী বলাই সমীচীন। দেখা দরকার, রাজ্য দল সাফল্য পাচ্ছে কি? সে প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক।

শীত শেষ হওয়ার আগেই বাংলার রঞ্জি দলের অভিযান শেষ হয়ে গেছে এবারে। এলিট গ্রুপ বি-তে তৃতীয় স্থানে শেষ করেছে বাংলা। ফলে নক আউট পর্যায়ে পৌঁছনো হয়নি। গত মরসুমে ফাইনালে পৌঁছে থাকলেও সৌরাষ্ট্রের কাছে শোচনীয় হার হয়েছিল। তার আগেরবার সেমিফাইনালে মধ্যপ্রদেশের বিরুদ্ধেও একই ঘটনা ঘটে। অতিমারীর আগের শেষ রঞ্জি ট্রফিতেও ফাইনালে সৌরাষ্ট্রের কাছেই ইনিংসে হার হয়েছিল বাংলার। অর্থাৎ ঘরোয়া ক্রিকেটে যে দলগুলো ধারাবাহিকভাবে সফল, তাদের সামনে পড়লেই ব্যবধান অনেকখানি হয়ে যাচ্ছে। মুম্বাইয়ের মত ঘরোয়া ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা দল দূর অস্ত, কর্ণাটক বা তামিলনাড়ুর স্তরেও পৌঁছয়নি বাংলা। সাফল্যের লেখচিত্র ঊর্ধ্বগামী হওয়ার বদলে নিম্নগামী বললেও ভুল হয় না। পঞ্চাশ ওভারের প্রতিযোগিতা বিজয় হাজারে ট্রফিতেও সাম্প্রতিককালে বলার মত সাফল্য নেই। কুড়ি ওভারের মুস্তাক আলি ট্রফি নিয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন, কারণ ওটা বস্তুত আইপিএলের প্রতিভা অন্বেষণ পরীক্ষা। সেখান থেকে আকাশ দীপ, শাহবাজ আহমেদদের ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো খুঁজে নিচ্ছে।

বাংলার ক্রিকেটের আরেকটা দিকও আলোচনার যোগ্য। শামি, মুকেশ, আকাশরা নিজেদের রাজ্যে ক্রিকেট খেলার পরিবেশ না পেয়ে কলকাতায় এসে পরিশ্রম করে জাতীয় দলে খেলার যোগ্যতা অর্জন করছেন। অথচ সৌরভের পর ঋদ্ধিমান সাহা ছাড়া কোনো স্থানীয় ক্রিকেটার কিন্তু ভারতীয় দলে নিয়মিত হয়ে উঠতে পারেননি। তাহলে নয়ের দশক থেকে সৌরভের দৃষ্টান্তে পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে ওঠা কোচিং সেন্টারগুলো কী অবদান রাখল? না, বাংলা পক্ষ মার্কা বাঙালির প্রতি বঞ্চনার অভিযোগ তুলছি না। বলছি ছেলের কিটব্যাগ বয়ে নিয়ে যাওয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাঙালি বাবা-মায়েরা ভিনরাজ্য থেকে আসা ছেলেগুলোকে দেখে শিখতে পারেন – সাফল্যের খিদে আসলে কী জিনিস এবং পরিশ্রম কাকে বলে।

পরিশ্রমী বাঙালিকে অবশ্য বাঙালিরাও যে প্রাপ্য সম্মান দেন তা নয়। নইলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটে মনোজ তিওয়ারির চেয়ে অনেক বেশি সফল ঋদ্ধিমান সাহাকে বাংলা ছেড়ে ত্রিপুরায় চলে যেতে হত না। তাঁর অপরাধ কী ছিল? অনেক ভেবেও সৌরভ-ঘনিষ্ঠ এক সাংবাদিককে চটিয়ে ফেলা ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া যাবে না। অথচ মনোজ গত মরসুমের শেষে আর খেলব না বলায় কান্নাকাটি পড়ে গিয়েছিল। শেষমেশ সিএবি সচিব স্নেহাশিস গাঙ্গুলির অনুরোধে তিনি এ মরসুমেও খেলতে রাজি হয়ে যান। তরুণ ক্রিকেটারদের উঠে আসার সুযোগ দিতে হবে ইত্যাদি যুক্তি কারোর মাথায় আসেনি। এবারে বিহারের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচ খেলে চূড়ান্ত অবসর ঘোষণা করার পর মনোজকে রীতিমত সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছে। অবশ্য ঋদ্ধিমান এমন ব্যবহার আশা করতে পারেন না। তাঁর চোদ্দ পুরুষে কেউ কখনো সিএবি কর্তা ছিলেন না। তার উপর তিনি কলকাতার অভিজাত পরিবারের সন্তান নন। তিনি হলেন শিলিগুড়ির ছেলে, যেখান দিয়ে কলকাতার বাবু বিবিরা দার্জিলিং, কালিম্পং, গ্যাংটক বেড়াতে যান। খেলতে খেলতেই রাজনীতিতে নেমে পড়ে কেউকেটা হতে পারলে অন্য কথা ছিল। অন্যথায় ঋদ্ধিমান বাংলার ক্রিকেটের কতটা সেবা করেছেন না করেছেন তার হিসাব করা বৃথা।

আরও পড়ুন কুস্তিগীরদের আন্দোলন: মহাতারকাদের মহাকাপুরুষতা

আরও একটা কথা ভেবে দেখার মত। শাহরুখ খান ধুতি পাঞ্জাবি পরে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে মালা দিয়ে, ভুল বাংলায় থিম সং গেয়ে ইডেন উদ্যানে যে দলটার তাঁবু ফেলেছেন, সেই কলকাতা নাইট রাইডার্সকে দিয়ে বাংলার ক্রিকেটের কী উপকার হচ্ছে? ওটা কাল রাজকোট নাইট রাইডার্স বা অযোধ্যা নাইট রাইডার্স হয়ে গেলেই বা কী ক্ষতি হবে? সে দল আইপিএল জেতায় রাজ্যের রাজধানীতে এ রাজ্যের করদাতাদের টাকায় ঘটা করে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছিল। তাতে বাংলার ক্রিকেটের কী উপকার হয়েছে? আইপিএল যখন চালু হয়, তখন বলা হয়েছিল ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো যে এলাকায়, সেই এলাকার ক্রিকেটের উন্নতিকল্পে তারা কাজ করবে। সে কাজের কোনো হিসাব আছে? রাজ্য সরকারের এ রাজ্যের সমস্ত খেলায় যেরকম কড়া নজর, তাতে কলকাতা নাইট রাইডার্সের জবাবদিহি চাইতে পারে কিন্তু।

মনোজ নিজেই মন্ত্রিসভার সদস্য। সুতরাং চাইলে স্বয়ং এ কাজ করতে পারেন। কিন্তু বাংলার ক্রিকেটের যে আর গুরুত্ব নেই তা তো তিনি ভালই বুঝে ফেলেছেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দশ হাজারের বেশি রানের মালিক মনোজ বিদায়কালে বলেছেন, তরুণ খেলোয়াড়রা আইপিএলকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে হতাশ হয়ে এক্সে পোস্ট করে ফেলেছিলেন যে পরের মরসুম থেকে রঞ্জি ট্রফি বন্ধই করে দেওয়া উচিত। তার জন্যে বোর্ডকে জরিমানাও দিতে হয়েছে। কিন্তু কথাটা তো ভুল বলেননি। আগামী দিনে বাংলার ক্রিকেট বলে আদৌ কিছু থাকবে কিনা কে জানে? সুতরাং আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজকে চটিয়ে কী লাভ? তাদের বিরুদ্ধে কিছু করে, লড়েই জেতার আশা নেই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হল কি এই বিশ্বকাপে?

গতবছর অস্ট্রেলিয়ায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের সিরিজেও গ্যালারিতে মাছি তাড়ানোর লোক ছিল না ঠিক ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির পরেই। এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ভারতেও ভারত না খেললে মাঠ ভরানো দুষ্কর।

পৃথিবীর যে কোনো দলগত খেলায় বিশ্বকাপ হয় চার বছর অন্তর। দর্শকরা ওই এক-দেড় মাসের অপেক্ষায় থাকেন, খেলোয়াড়রাও আজীবন স্বপ্ন দেখেন – বিশ্বকাপে খেলব, দেশকে জেতাব, ক্রীড়াপ্রেমীদের চোখের মণি হব। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বয়স প্রায় দেড়শো বছর হলেও বিশ্বকাপটা অন্য অনেক খেলার চেয়ে নবীন। বিশ্বকাপ ফুটবল সাত বছর পরেই শতবর্ষে পড়বে, অথচ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের বয়স এখনো পঞ্চাশ হয়নি। ইতিমধ্যেই তার রমরমা কমে এল। চার বছর পরে বিশ্বকাপ হলে যে প্রতীক্ষা আর প্রত্যাশা বিশ্বকাপকে বিরাট করে তোলে তা বেশ খানিকটা লঘু করে ফেলেছে ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল, নিজেই। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি হয় এক বছর অন্তর এবং দুটো পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপের মাঝের বছরগুলোতে। ফলে সব দলকে একই প্রতিযোগিতায় খেলতে দেখার যে অভিনবত্ব তা কমে গেছে। খেলোয়াড়দের নায়ক হওয়ার সুযোগও বেড়েছে।

আমরা যারা পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট ভালবাসি, তারা বুঝতে পারি যে টেস্ট ক্রিকেটের ধাঁচে এই খেলাতেও দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর ফিরে আসা যায়। এই ধিকিধিকি জ্বলতে জ্বলতে শেষে ফেটে পড়ার রোমাঞ্চ টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে নেই। সেরা টি টোয়েন্টি ইনিংসও গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে করা দ্বিশতরানের মত মহাকাব্যিক হওয়া সম্ভব নয়, কারণ মহাকাব্য হয়ে ওঠার সময়টাই নেই ওখানে। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয়তায় একদিনের ক্রিকেট অনেক পিছিয়ে পড়েছে। তার কোনো সুরাহা এই বিশ্বকাপ করতে পারল বলে মনে হয় না।

একদিনের ক্রিকেট বা তার বিশ্বকাপ চালু হয়েছিল টেস্ট ক্রিকেট সম্পর্কে শীতল হয়ে পড়া দর্শকদের মাঠে ফেরানোর প্রয়োজনে। টি টোয়েন্টি আর তার বিশ্বকাপের জন্ম কিন্তু একদিনের ক্রিকেটে অনীহা এসে যাওয়া দর্শককে মাঠে ফেরাতে হয়নি। ২০০৭ সাল নাগাদ সারা পৃথিবীর দর্শক মোটেই একদিনের ক্রিকেট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি। সেই সমস্যা ছিল মূলত ইংল্যান্ডে, যেখানে ক্রিকেটের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রিমিয়ার লিগ ফুটবল। বস্তুত সে বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে কুড়ি ওভারের ক্রিকেট জিনিসটা ঠিক কী, তা অনেক ক্রিকেট খেলিয়ে দেশেরই খুব একটা জানা ছিল না। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড, বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া, টি টোয়েন্টি সম্পর্কে প্রথম দিকে রীতিমত অনাগ্রহী ছিল। ব্যবসায়িক সম্ভাবনার দিকটা তাদের চোখে পড়ে মহেন্দ্র সিং ধোনির দল প্রথম ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি খেতাব জিতে ফেলার পর। সেটাই কাল হল একদিনের ক্রিকেটের। ২০০৭-০৮ সালে বিসিসিআই প্রথমে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগে খেলার অপরাধে এক দল ভারতীয় ক্রিকেটারকে নির্বাসন দেয় (সেই তালিকায় অন্যতম পরিচিত নাম হল আম্বাতি রায়ুডু), পরে নিজেরাই ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ খুলে বসে। ২০১১ সালে ভারত একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপও জিতে ফেলে। সে বছর অক্টোবরে চালু হয় একদিনের ক্রিকেটে দু প্রান্ত থেকে দুটো বলে খেলার নিয়ম, টি টোয়েন্টির দেখাদেখি বাউন্ডারির দড়ি ক্রমশ ঢুকে আসতে শুরু করে মাঠের ভিতর। ব্যাট, বলের লড়াই একতরফা করে দিয়ে ছোটে রানের ফুলঝুরি আর একদিনের ক্রিকেট ক্রমশ একঘেয়ে হয়ে উঠতে থাকে।

আরও পড়ুন বিশ্বকাপে কী হবে ভুলে যান, আইপিএল দেখুন

সেই ধারায় কোনো পরিবর্তন এল কি এই বিশ্বকাপে? যে কোনো খেলায় বিশ্বকাপের কাছে সবসময় ক্রীড়াপ্রেমীদের প্রত্যাশা থাকে নতুন কিছুর – নতুন তারকা, নতুন কৌশল, খেলার দর্শনের কোনো নতুন দিক, ভবিষ্যতের নতুন দিশা। তেমন কিছু কি পাওয়া গেল? যা যা নতুন দেখা গেল সেগুলো কি খুব আশাব্যঞ্জক?

ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকায় যে একদিনের ক্রিকেট দেখতে মাঠে লোক হয় না, সে খবর অনেকদিন হল ঠোঙা হয়ে গেছে। গতবছর অস্ট্রেলিয়ায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের সিরিজেও গ্যালারিতে মাছি তাড়ানোর লোক ছিল না ঠিক ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির পরেই। এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ভারতেও ভারত না খেললে মাঠ ভরানো দুষ্কর। চেন্নাই, বেঙ্গালুরুর মত দু-একটা কেন্দ্র ছাড়া ভারত নেই অথচ গ্যালারি ভর্তি – এ দৃশ্য প্রায় দেখাই যায়নি। পৃথিবীর বৃহত্তম স্টেডিয়াম বলে ঢাকঢোল পিটিয়ে উদ্বোধিত আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামই উদ্বোধনী ম্যাচে ছিল শুনশান। একই দৃশ্য ধরমশালার মত জায়গাতেও দেখা গেছে। আরও গণ্ডগোলের ব্যাপার হল, গ্যালারি শূন্য থাকলেও যে সাইট থেকে টিকিট বিক্রি করা হয়েছে সেই সাইট দেখিয়েছে প্রায় সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। এ কি ভুল, নাকি কেলেঙ্কারি? ভারতে অবশ্য কেলেঙ্কারির যুগ অতীত। অমিত শাহ, জয় শাহদের আমলে কোনো কেলেঙ্কারি হয় না।

আরেকটা নতুন জিনিসও দেখা গেল এবার বিশ্বকাপে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বলে কিছু হয় না, হয় আয়োজকদের পছন্দের ম্যাচে নাচগান। এবারে সেই ম্যাচ ছিল ১৭ অক্টোবর আমেদাবাদে অনুষ্ঠিত ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ। সে ম্যাচের নাচগান আবার এমন স্বর্গীয় জিনিস যে টিভিতে তার সরাসরি সম্প্রচার হয় না, কেবল মাঠে যাওয়া দর্শকরা দেখতে পান। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আরও দুটো জিনিস পরিষ্কার করে দিয়েছে। প্রথমত, খেলা উপলক্ষ, মোচ্ছবই লক্ষ্য। দ্বিতীয়ত, বিশ্বকাপ মানে সব দলের সমান গুরুত্ব নয়। আয়োজক দেশ অন্যদের দয়া করে যতটা আপ্যায়ন করবে, তাতেই মানিয়ে নিতে হবে।

প্রথমটার প্রমাণ খেলার মাঝেই মাঠ অন্ধকার করে লেজার শো। ব্যাপারটা দর্শকদের জন্যে যতই আমোদের হোক, খেলোয়াড়দের জন্যে যে অসুবিধাজনক সেকথা ম্যাক্সওয়েল বলেও দিলেন দিল্লিতে নেদারল্যান্ডসে বনাম অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের পর। কিন্তু কেউ কান দিল না। লেজার শো চলছে, চলবে। নির্ঘাত ফাইনালেও হবে।

অবশ্য এখানেই চলে আসছে দ্বিতীয় ব্যাপারটা। ভারত ফাইনালে উঠেছে যখন, তখন মাঠের দর্শকদের জন্য আরেক দফা এক্সক্লুসিভ নাচগান, লেজার শো ইত্যাদি হবে হয়ত। কিন্তু রোহিত শর্মারা ফাইনালে না উঠলে কী হত? মানে আয়োজক ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড কি সব দলের ম্যাচ নিয়ে সমান উৎসাহী ছিল এই বিশ্বকাপে? বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেলে যে কোনো দেশকে নিয়ামক সংস্থার সঙ্গে একটা চুক্তি স্বাক্ষর করতে হয়, ভারতীয় বোর্ডও করেছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী কেবল বিভিন্ন দেশের দল নয়, সে দেশের সাংবাদিক এবং ক্রীড়াপ্রেমীদের সহজে ভিসা দেওয়া, খেলার টিকিটের ব্যবস্থা ইত্যাদি করতে হয়। এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ভারতীয় বোর্ড সেসবের তোয়াক্কা করেনি। ফলে বহু দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা আসতেই পারেননি। কর্তারা, প্রাক্তন ক্রিকেটাররা এবং দিশি ক্রিকেটভক্তরা অবশ্য উল্লসিত গ্যালারিতে নীল সমুদ্র তৈরি হচ্ছে বলে। বাড়তি উল্লাসের কারণ, পাকিস্তানের অতি অল্প সংখ্যক সাংবাদিককে ভিসা দেওয়া হয়েছিল। অনেক সমর্থক এবং সাংবাদিক এসে পৌঁছন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হয়ে যাওয়ার পরে। পাকিস্তানিদের অপছন্দ হওয়ায় এই ব্যবস্থায় অনেকেই খুশি। মুশকিল হল, আগামী বিশ্বকাপগুলোতে কোনো আয়োজক দেশের যদি ভারতীয়দের অপছন্দ হয়, তখন এরকম ব্যবহারের প্রতিবাদ করলে তারা পাত্তা দেবে না।

নিজের দেশের ক্রিকেটারদের মত অন্য দেশের ক্রিকেটারদের ভাল খেলাতেও আনন্দ পাওয়া এবং বাহবা দেওয়ার সংস্কৃতি সংকুচিত হয়ে ভারতীয় দর্শকদের মধ্যে যে একচোখা উগ্রতা এসে পড়েছে তারও একাধিক নিদর্শন এবারের বিশ্বকাপে দেখা গেছে। ভারতীয় ব্যাটার চার, ছয় মারলে গ্যালারি উত্তাল আর বিপক্ষের ব্যাটার মারলে পিন পতনের স্তব্ধতা অনেকদিনই নিয়ম হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মত দুর্বল দলের সমর্থকের প্রতিও গ্যালারিতে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার দৃশ্য নতুন। এতেও অসুবিধা একটাই। এই দৃষ্টান্ত অন্যেরা অনুসরণ করলে কী হবে? ভবিষ্যতের বিশ্বকাপগুলো কি খুব আনন্দের হবে সেক্ষেত্রে?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ক্রিকেট জেনেশুনে বিশ করেছে পান

কর্তাদের কাছে একদিনের ক্রিকেট এখন পরের ছেলে পরমানন্দ, যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ। কারণ সেক্ষেত্রে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের জন্য আরও বেশি সময় পাওয়া যাবে।

শোয়েব আখতার যখন বল করতেন, মনে হত গোলাবর্ষণ করছেন। এখন বিশেষজ্ঞের মতামত দেওয়ার সময়েও প্রায় একই মেজাজে থাকেন। আজকাল প্রাক্তন ক্রিকেটাররা ভারতীয় ক্রিকেট সম্পর্কে কথা বলার সময়ে অতি মাত্রায় সাবধানী। কারণ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড চটে গেলে এ দেশে ধারাভাষ্যের মহার্ঘ সুযোগ পাওয়া যাবে না, কোনো একটা ভূমিকায় আইপিএলের কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজে ঢুকে সারা বছরের রোজগার দু-আড়াই মাসে করার সুযোগও হাতছাড়া হবে। শোয়েব পাকিস্তানি হওয়ায় ও দুটো দরজাই তাঁর জন্যে বন্ধ। সম্ভবত সে কারণেই নিজের দেশের বাবর আজম সম্পর্কে যেরকম তীর্যক মন্তব্য করেন, বিরাট কোহলি সম্পর্কেও সেভাবেই কথা বলেন। কোহলিকে আক্রমণ করে কদিন আগে বলেছেন “আমি কোহলিকে অনুরোধ করব ও যেন ৪৩ বছর বয়স পর্যন্ত খেলে। তাহলে আরও ৮-৯ বছর সময় পাবে। ভারত ওকে হুইলচেয়ারে বসা অবস্থাতেও খেলাবে এবং একশোটা শতরান করা পর্যন্ত খেলতে দেবে। আমার মনে হয় ও অবসর পর্যন্ত অন্তত ১১০ খানা শতরান করে ফেলবে।”

কোনো সন্দেহ নেই ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যক্তিপূজা এমন প্রবল, যে কপিলদেবকে রিচার্ড হেডলির টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ড ভাঙার জন্য, আর শচীন তেন্ডুলকরকে শততম শতরান করতে দেওয়ার জন্য, খেলোয়াড় হিসাবে ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও খেলতে দেওয়া হয়েছিল। মহেন্দ্র সিং ধোনি অবশ্য রেকর্ড ভাঙার জন্য খেলে যাননি। তাঁর ফিনিশ করার ক্ষমতা ফিনিশ হয়ে গিয়ে থাকলেও বোর্ড সভাপতি এন শ্রীনিবাসনের কোম্পানির ডিরেক্টরকে বাদ দেয় কোন নির্বাচকের সাধ্যি? বরং সেই ২০১১ সালে নির্বাচক কমিটির বৈঠকে ধোনিকে টেস্ট থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ায় নির্বাচক মহিন্দর অমরনাথের চাকরিই নট হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং কোহলিও যদ্দিন ইচ্ছা খেলে যেতেই পারেন। কিন্তু শোয়েবের ভুল হয়েছে অন্য জায়গায়।

কোহলির এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শতরানের সংখ্যা ৭৫ (টেস্ট ২৮, একদিনের ক্রিকেট ৪৬, আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টি ১)। যতদিন পর্যন্তই খেলুন, আরও ২৫ খানা শতরান কোথা থেকে আসতে পারে ভেবে দেখুন। পরপর দুটো ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে ব্যর্থ হওয়ার পর (পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্মরণীয় ইনিংসটা বাদ দিলে) ৩৪ বছরের কোহলিকে আর ওই ফরম্যাটে খেলানো হবে কিনা দেবা ন জানন্তি। বয়স বাড়লে টেস্টে শতরান করা যে ক্রমশ কঠিন হয়ে যায় তা তো কোহলির গত চার বছরের খেলা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তাহলে হাতে রইল পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট, যাতে কোহলিকে এখনো মাঝে মধ্যে স্বমহিমায় দেখা যায়। কিন্তু ওই ফরম্যাটটির নিজেরই যে বাঁচা দায়।

শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে। মাত্র ছমাস পরেই পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপ, তাও আবার ভারতে। যেখানে পঞ্চাশ গ্রাম ওজনের প্লাস্টিক বল দিয়ে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হলেও খেলা দেখতে লোক জমে যায়। এই তো কদিন আগে ভারত-অস্ট্রেলিয়া একদিনের সিরিজ হয়ে গেল, তার আগে বাংলাদেশে সিরিজ হল। সেখানে গুরুত্বহীন ম্যাচে হলেও ঈশান কিষণ দ্বিশতরান করলেন, কোহলি শতরানের খরা কাটালেন। এমন সময়ে পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট নিয়ে এমন কথা কেন? ঘটনা হল, যথেষ্ট চিন্তার কারণ আছে। সারা পৃথিবীতে টি টোয়েন্টি লিগগুলোর, মানে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের যত রমরমা হচ্ছে, পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটের দর্শক তত কমছে। মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে, যে কর্মকর্তারাও চান না ওটা বেঁচে বর্তে থাক। নইলে ১৩ নভেম্বর ২০২২ ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি ফাইনালের পর ১৭, ১৯ আর ২২ তারিখ কেন তিনটে একদিনের ম্যাচ খেলবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড? মাত্র চারদিন আগে দাপটে কুড়ি ওভারের বিশ্ব খেতাব জয় করা ইংল্যান্ড তিনটে ম্যাচেই গোহারা হারে। সেই ফলাফলকে গুরুত্ব না দিলেও হয়ত চলে, ইংল্যান্ডের পর্যুদস্ত হওয়ার দায় ক্লান্তির উপর চাপানো তো একেবারেই চলে না, কারণ ইংল্যান্ডের একদিনের দলের অনেকেই ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির দলে ছিলেন না। কিন্তু আসল কথা হল অস্ট্রেলিয়ার মাঠে ইংল্যান্ড খেলছে আর গ্যালারিতে মাছি তাড়ানোরও লোক নেই – এ জিনিস দুদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আগে কখনো ঘটেনি। খেলাগুলোর টিভি রেটিংয়ের অবস্থাও ছিল শোচনীয়।

এটা একমাত্র দৃষ্টান্ত নয়। ভারতেও যে কোনো দলের সঙ্গে খেলা থাকলেই মাঠ ভরে যাওয়ার দিন চলে গেছে। আইপিএলে টিকিটের জন্য কাড়াকাড়ি পড়ে, সাংবাদিকরা সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে বাধ্য হন “দয়া করে কেউ টিকিট চাইবেন না।” কিন্তু পঞ্চাশ ওভারের ম্যাচে অন্তত কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরুর মত বড় শহরে সে সমস্যা হয় না। শুধু যে দর্শকদের আগ্রহ কমছে তা নয়, খেলোয়াড়দেরও আগ্রহ কমছে। এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার, ইংল্যান্ডের টেস্ট অধিনায়ক বেন স্টোকস ইতিমধ্যেই একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে বসে আছেন। মানে গত বিশ্বকাপ ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় এবার বিশ্বকাপে খেলবেন না। তাঁর বয়স কিন্তু মাত্র ৩১। গতবছর জুলাই মাসে অবসরের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর ডিসেম্বরে অবশ্য স্টোকস বলেছিলেন তিনি শুধু বিশ্বকাপটা খেলার কথা ভেবে দেখতেও পারেন। কিন্তু অবসর নেওয়ার যে কারণগুলো দেখিয়েছিলেন, সেগুলো লক্ষ করার মত। তিনি পরিষ্কার বলেছিলেন, বড্ড বেশি ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। তিন ধরনের ক্রিকেটের ধকল তাঁর শরীর নিতে পারছে না।

এই সমস্যা একা স্টোকসের নয়। ইংল্যান্ডের জোরে বোলার জোফ্রা আর্চার চোট পেয়ে মাঠের বাইরে বসেছিলেন বেশ কয়েক বছর, চলতি আইপিএলে মাঠে ফিরলেন। ভারতের যশপ্রীত বুমরা কবে ফিরবেন এখনো পরিষ্কার নয়। বিশ্ব ক্রিকেটে প্রায় সব দলের শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররাই বারবার চোট পাচ্ছেন, বিরাম নিতে হচ্ছে। কারণ আইপিএল দিয়ে যা শুরু হয়েছিল, সেই ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের জয়যাত্রা এখন ম্যাগেলানের মত পৃথিবী পরিক্রমায় বেরিয়েছে। পাকিস্তান সুপার লিগ, লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগ, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ, অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশের সঙ্গে এ বছর থেকে যোগ হল দক্ষিণ আফ্রিকার এসএ টোয়েন্টি আর সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর আইএল টি টোয়েন্টি। শেষের দুটো আবার ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক দেওয়ার ব্যাপারে আইপিএলের ঠিক পরেই। দুটো লিগেই দল কিনেছেন চেন্নাই সুপার কিংস, মুম্বাই ইন্ডিয়ানস, কলকাতা নাইট রাইডার্স, দিল্লি ক্যাপিটালস, লখনৌ সুপার জায়ান্টস, সানরাইজার্স হায়দরাবাদ, রাজস্থান রয়ালসের মত দলের মালিকরা। ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলো খেলোয়াড়দের যা পারিশ্রমিক দিচ্ছে তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ডের কম্ম নয়। ফলে ছাড়তে হলে একজন ক্রিকেটার জাতীয় দলের হয়ে খেলাই যে ছাড়বেন, ফ্র্যাঞ্চাইজের খেলা নয়, তা বলাই বাহুল্য। টেস্টের প্রতি স্টোকসের ভালবাসা আছে বলে একদিনের ক্রিকেট ছেড়েছেন, কেউ টেস্ট খেলাও ছাড়তে পারেন।

ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ডের বোর্ড মিলে বিশ্ব ক্রিকেটকে যে ছাঁচে ঢেলেছে ২০১৪ সাল থেকে, তাতে অনেক ক্রিকেট বোর্ডেরই দিন আনি দিন খাই অবস্থা। ফলে ক্রিকেটারদের ইচ্ছার কাছে মাথা নোয়ানো ছাড়া উপায় নেই। এমনকি নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ডও বাধ্য হয়েছে ফর্মের তুঙ্গে থাকা ট্রেন্ট বোল্টকে কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে অব্যাহতি দিতে। অর্থাৎ তিনি হয়ত টেস্ট ক্রিকেট আর খেলবেনই না, একদিনের ক্রিকেট কতটা খেলবেন তাতেও সন্দেহ আছে। আইপিএলের পারিশ্রমিকের সঙ্গে অবশ্য ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বোর্ডও এঁটে উঠতে পারবে না অদূর ভবিষ্যতে। ইংল্যান্ডের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ কাগজের প্রতিবেদক টিম উইগমোর গত সপ্তাহেই লিখেছেন, আইপিএলের ক্রিকেটাররা যে পারিশ্রমিক পান তা আরও তিনগুণ বাড়ানো সম্ভব। কারণ এত বড় ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়া লিগ পৃথিবীর অন্য যেসব খেলায় আছে, সেখানে দলগুলো মোট রাজস্বের অর্ধেক বা তারও বেশি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক হিসাবে দিয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনবিএ (বাস্কেটবল লিগ) এনএফএল (আমেরিকান ফুটবল লিগ) এবং এমএলএসে (বেসবল লিগ) অন্তত ৪৮% দেওয়া হয়। ইংল্যান্ড ফুটবলের প্রিমিয়ার লিগ ২০২০-২১ আর্থিক বর্ষে রাজস্বের ৭১% খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকের পিছনে ব্যয় করেছিল। সেখানে আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো ব্যয় করে ১৮% বা তারও কম।

আরও পড়ুন বিশ্বকাপে কী হবে ভুলে যান, আইপিএল দেখুন

অতএব বুঝতেই পারছেন, শুধু পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট কেন, সারা বছর ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ খেলে বেড়িয়ে ভবিষ্যতে টেস্ট ক্রিকেট খেলার উৎসাহও কজন ক্রিকেটারের থাকবে সন্দেহ। স্বভাবতই খেলার গুণমানের তফাত হবে, দর্শকদের আগ্রহেও ভাঁটা পড়বে। যেমন এই মুহূর্তে পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটের ক্ষেত্রে হচ্ছে। টেস্টের দর্শক ভারতেও কমে গেছে বেশ কিছুদিন হল। সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে সপ্তাহান্তে কোহলির শতরান পূর্ণ করার দিনেও গ্যালারিতে মানুষের চেয়ে চেয়ার বেশি দেখা যাচ্ছিল। তবু কৌলীন্য আছে বলে কোহলি, স্টোকস, জো রুটের মত খেলোয়াড়রা এখনো ওই ক্রিকেটটা খেলতে চান। পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটের কিন্তু অবস্থা সঙ্গীন। বাঁচিয়ে রাখতে কী করা যায়? স্টোকস বলেছিলেন, সম্প্রতি রবি শাস্ত্রীও বলেছেন খেলাটাকে চল্লিশ ওভারে নামিয়ে আনার কথা। রোহিত বলেছেন নয়ের দশকের মত ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট ফিরিয়ে আনা যায় কিনা ভেবে দেখা উচিত। কিন্তু খেলোয়াড়দের ম্যাচ খেলার সংখ্যা যদি না কমে, ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের পরিমাণ কমানোর দিকে যদি কর্তারা নজর না দেন, তাহলে চল্লিশ ওভারের ম্যাচ খেলতেই বা সেরা খেলোয়াড়দের কী করে পাওয়া যাবে?

কর্তাদের কাছে একদিনের ক্রিকেট এখন পরের ছেলে পরমানন্দ, যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ। কারণ সেক্ষেত্রে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের জন্য আরও বেশি সময় পাওয়া যাবে। ওখানেই তো যত মধু। আইপিএলে দল বাড়িয়ে ম্যাচের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, কারণ মিডিয়া স্বত্ব বেচে পাওয়া টাকার পরিমাণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ২০১৮-২২ আইপিএলের মিডিয়া স্বত্ব বিক্রি হয়েছিল ১৬,৩৪৭.৫০ কোটি টাকায়, আর ২০২৩-২৭ আইপিএলের মিডিয়া স্বত্ব বিক্রি হয়েছে ৪৮,৩৯০ কোটি টাকায়। আইপিএল নামক এই সোনার ডিম পাড়া হাঁসটির জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল নিজেদের সূচিতে প্রতি বছর আড়াই মাস খালি রেখেছে। কারণ আইপিএলে ম্যাচের সংখ্যা আরও বাড়ানো হচ্ছে। বাড়তে বাড়তে ২০২৭ সালে তা পৌঁছবে ৯৪-তে। সঙ্গে থাকবে অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ। তারপর পঞ্চাশ (বা চল্লিশ ওভারের) খেলা খেলবেন কারা? সে বছর বিশ্বকাপেই বা কতজনকে ফিট অবস্থায় পাওয়া যাবে? তাই বলছিলাম, কোহলি যদি ২০৩১ অব্দি খেলেও ফেলেন, শতরানের সেঞ্চুরির জন্য সবচেয়ে লাগসই ফরম্যাটটার অস্তিত্ব থাকবে কিনা সন্দেহ।

এই সময় কাগজের অধুনালুপ্ত রাবিবারিক ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত