ইতিহাস মুছে দেওয়ার প্রকল্পের অঙ্গ পতৌদি ট্রফির নাম বদল

আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, শক, হুন, পাঠান, মোগলকে এক দেহে লীন করার যে ক্ষমতা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসেও খুব বেশি নেতা দেখাতে পারেননি; ঠিক সেটাই ছিল ‘টাইগার’ পতৌদির।

২০২২ সালে করোনা অতিমারীর চোটে স্কুল বন্ধ থাকায় ছাত্রছাত্রীদের উপর পাঠ্যক্রমের ভার কমানোর দোহাই দিয়ে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার অঙ্গ হিসাবে ধাপে ধাপে গত তিন বছরে ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি) তাদের বিভিন্ন ক্লাসের ইতিহাস বই থেকে মোগল যুগ একেবারে বাদ দিয়ে দিয়েছে। এর ফল কী? সারা দেশের সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশনের অধীন স্কুল এবং বহু রাজ্যের বোর্ডের স্কুল এনসিইআরটি-র বই পড়ায়। সেইসব স্কুলের ছেলেমেয়েরা মোগল সম্রাটদের শাসন সম্পর্কে জানবে না, তাঁদের ভাল কাজ মন্দ কাজ জানবে না। ভারতের ধর্মীয় সমন্বয়ের ইতিহাসে মোগলদের অবদান সম্পর্কেও কিছু জানবে না। ঋজু বিদূষক বরুণ গ্রোভার সকৌতুকে বলেছেন, তাজমহল কারা বানিয়েছিল – এ প্রশ্নের উত্তর হল ‘ইউ পি পি ডব্লিউ ডি কে এক ইঞ্জিনিয়ার থে… শ্রীবাস্তব সাহব। উনহো নে বিজলি বিভাগ কা এক দফতর বনওয়ায়া থা, ইস লিয়ে মিনার হ্যাঁয়… চার সাইড পে চার মিনার হ্যাঁয়, উস সে চার ফেজ – এ বি সি ডি – নিকলতে হ্যাঁয়। আগ্রা কে চার হিসসোঁ মে বিজলি জাতি থি ইয়হাঁ সে। ১৫২৬ মে পানিপথ কি পহলি লড়াই মে ইব্রাহিম লোদী কো হরা কর ইন্ডিয়া মে শ্রীবাস্তব ডাইনেস্টি আয়ি থি। করীবন তিনসো সাল উনহো নে রাজ কিয়া, ফির ১৮৫৭ মে কুইন ভিক্টোরিয়া আঈ, শ্রীবাস্তব সাহব কো পকড়ি, মুহ দবাঈ, বোলি বিয়া হো গয়া তুমহারা? শ্রীবাস্তব সাহব কি থোড়ি ফট গঈ… বোলি কাঁপ কাহে রহে হো? শ্রীবাস্তব সাহব বোলে অচ্ছা ঠিক হ্যায়, হম নিকল লেতে হ্যাঁয়। আপ দেখ লো আপ কো জো করনা হ্যায়।’

এই কৌতুকের বাংলা তরজমা করার প্রয়োজন নেই, কারণ আজকের বাঙালি এটুকু হিন্দি জানে। কিন্তু একথা বলা এইজন্যে যে ভারতের ইতিহাস থেকে নিজেদের অপছন্দের পর্বগুলো মুছে দেওয়ার যে হাস্যকর কিন্তু ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদী প্রকল্প ভারতে চালু করেছে বিজেপিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার, তা এবার স্কুলপাঠ্য বই থেকে বেরিয়ে পৌঁছে গেছে ক্রিকেট মাঠেও। আপনি যদি বোকা বা ন্যাকা না হন, তাহলে অস্বীকার করবেন না যে বিশ্ব ক্রিকেটকে এখন নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। জাতীয়তাবাদী হলে তো আপনি এ নিয়ে গর্বিতই হবেন। বিসিসিআই বহুদিন ধরেই গোটা ক্রিকেট দুনিয়ার উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে টাকার জোরে, আর এখন তো বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সম্পাদকই হয়ে বসেছেন অমিত শাহের ছেলে জয় শাহ। ঔপনিবেশিক যুগের ইতিহাস যা-ই থাক, এখন কিন্তু ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের লেজুড় ছাড়া কিছুই নয়। তাদের ঘাড়ে কটা মাথা, যে ভারতীয় বোর্ডের অনুমতি ছাড়া ট্রফির নাম বদল করবে? ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠেয় ভারত-ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজের বিজয়ীকে দেয় ট্রফির নাম ২০০৭ সালে রাখা হয়েছিল পতৌদি ট্রফি। সে নাম বদলে ফেলা হয়েছে বেমালুম। ২০ জুন থেকে যে সিরিজ শুরু হতে যাচ্ছে, তাতে জয়ী দলকে দেওয়া হবে তেন্ডুলকর-অ্যান্ডারসন ট্রফি। এটাও ইতিহাস মুছে দেওয়ার চেষ্টা।

২০০৭ সালে কেন ট্রফির নাম রাখা হয়েছিল পতৌদি ট্রফি? কারণ সেবার ভারতীয় দলের ইংল্যান্ড সফরের ৭৫ বছর পূর্তি হল। তাকে স্মরণীয় করে রাখতেই এমন একটা নাম রাখা হয়, যে নামের সঙ্গে দুই দেশের ক্রিকেটই জড়িয়ে আছে। ইফতিকার আলি খান পতৌদি ভারত, ইংল্যান্ড – দুই দেশের হয়েই টেস্ট খেলেছেন। ভারতের অধিনায়কত্বও করেছেন। ক্রিকেটার হিসাবে সাধারণ ছিলেন, কিন্তু ক্রিকেটের ইতিহাসে তাঁর একটা কাজের অসাধারণত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। ১৯৩২-৩৩ সালের অ্যাশেজ সিরিজে যখন ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন বডিলাইন কৌশল (লেগ সাইডে যত বেশি সম্ভব ফিল্ডার রেখে ক্রমাগত ব্যাটারদের শরীর লক্ষ্য করে শর্টপিচ বল করে যাওয়া) অবলম্বন করেন ডন ব্র্যাডম্যানের রান আটকাতে, তখন ইফতিকার বলেন যে ওটা ক্রিকেট নয় এবং তিনি লেগ সাইডে ফিল্ডিং করবেন না। ফলে অধিনায়ক জার্ডিন তাঁকে দল থেকে বাদ দিয়ে দেন এবং কথিত আছে যে হুমকি দিয়েছিলেন, আর কোনোদিন ইফতিকার ইংল্যান্ড দলে জায়গা পাবেন না। ইফতিকার কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত বদল করেননি। মনে রাখা ভাল, ভারতের স্বাধীনতা তখন দূর অস্ত। ফলে আর কখনো টেস্ট খেলা হবে না – এ সম্ভাবনা জেনেই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কেউ বলতেই পারেন, ক্রিকেট ইফতিকারের পেশা ছিল না। তাঁর মত ধনীর দুলালের টেস্ট না খেললে কী-ই বা এসে যেত? তাই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন। যুক্তিটা ভুল নয়, কিন্তু পরাধীন দেশের একজন ক্রিকেটারের শাসক জাতির অধিনায়কের বিরুদ্ধে ওই অবস্থান যে ইংরেজদেরও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল তার প্রমাণ আছে। ১৯৮৪ সালে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন একখানা টিভি মিনি সিরিজ নির্মাণ করে ওই বডিলাইন সিরিজ নিয়ে। সেখানে জার্ডিন আর ইফতিকারের ওই কথোপকথন দেখানো হয়েছে। নয়ের দশকে দূরদর্শনে আমরা কেউ কেউ সেই সিরিজ খানিকটা দেখেছি। আজকের তরুণরা, যাঁরা মনে করেন যা নাই ইন্টারনেটে তা নাই ভুবনে – তাঁরা এই লিংকে ক্লিক করে দৃশ্যটা দেখে নিতে পারেন।

কিন্তু ইফতিকারের চেয়ে ক্রিকেটার এবং ভারত অধিনায়ক হিসাবে অনেক বড় ছিলেন, ঐতিহাসিকভাবে অনেক মহত্তর ভূমিকা পালন করেছেন তাঁর ছেলে মনসুর আলি খান পতৌদি। তাঁরও ইংল্যান্ড, ভারত – দুই দেশের ক্রিকেটের সঙ্গেই সম্পর্ক। ভারতের হয়ে টেস্ট খেলেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন আর সাসেক্স কাউন্টির হয়ে দীর্ঘদিন খেলেছেন। মনসুর মাত্র ২১ বছর বয়সে ভারত অধিনায়ক হন। তার আগেই গাড়ি দুর্ঘটনায় একটা চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাঁর ব্যাটিংয়ের অনেকখানি ক্ষতি হয়। ছেচল্লিশটা টেস্ট খেলে ছটা শতরান সমেত ৩৪.৯১ গড়ে ২৭৯৩ রান একজন সাধারণ ক্রিকেটারের পরিসংখ্যান। কিন্তু যাঁরা তাঁকে ব্যাট করতে দেখেছেন, তাঁরা কেউ কেউ বলেছেন, লিখেছেন যে দুটো চোখই ঠিক থাকলে তিনি হয়ত বিশ্বের সেরা ব্যাটার হতে পারতেন। সেই আমলে ফিল্ডার হিসাবেও তিনি যে অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন, সেকথা বহু প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে পাওয়া যায়। ওসব না হয় বাদই দেওয়া গেল। এটুকুই যথেষ্ট যে মনসুর সেই অধিনায়ক যিনি ভারতকে প্রথমবার বিদেশে সিরিজ জেতান (নিউজিল্যান্ড, ১৯৬৭-৬৮)। বস্তুত ভারতীয় ক্রিকেটে তিনি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটান। বিদেশের মাঠে, যেখানে স্পিন সহায়ক পিচ হয় না, সেখানেও তিন স্পিনার খেলানোর সিদ্ধান্ত তাঁরই। সেটাই ইতিহাস বদলে দেয়। নিউজিল্যান্ডের ওই ঐতিহাসিক জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন অফস্পিনার এরাপল্লি প্রসন্ন, সঙ্গে ছিলেন বিষাণ সিং বেদি। প্রবাদপ্রতিম বেদি কারোর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করার লোক ছিলেন না, কিন্তু তিনিও আজীবন বলেছেন, মনসুর তাঁদের সময়ের সেরা ক্রিকেটার। অন্যত্র তিনি বলেছেন, ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে মনসুর ভারতীয়ত্ব জাগিয়ে তোলেন।

অর্থাৎ আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, শক, হুন, পাঠান, মোগলকে এক দেহে লীন করার যে ক্ষমতা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসেও খুব বেশি নেতা দেখাতে পারেননি; ঠিক সেটাই ছিল ‘টাইগার’ পতৌদির। দুঃখের বিষয়, ভারতের সমাজের কোনো শাখাতেই সুঅভ্যাসগুলো বেশিদিন টেকে না। ফলে মনসুরের প্রস্থানের পর প্রাদেশিকতা, স্বজনপোষণ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো ফিরে এসেছিল। একুশ শতকের শুরুতে আবার সেসব দূর করে জাতীয় দলকে যথার্থ ভারতীয় দল করে তুলতে দেখা গিয়েছিল অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিকে। মনসুর আর সৌরভের যুগের ক্রিকেটারদের মধ্যে যোগ্যতার বিস্তর পার্থক্য ছিল। স্বভাবতই অধিনায়ক সৌরভের সাফল্য অনেক বেশি। সৌরভের পরবর্তীকালের মহেন্দ্র সিং ধোনি বা বিরাট কোহলিরা আরও বেশি সফল হয়েছেন অধিনায়ক হিসাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শিকড় ছাড়া গাছ হয় না; ইতিহাস ছাড়া মানুষ হয় না। ফলে টাইগার ছাড়া আজকের বিরাটও হয় না। কিন্তু এই সত্য স্বীকার করা আজকের ভারতীয় ক্রিকেটের নিয়ামকদের পক্ষে অসম্ভব। ভারত নামক ‘একটি বিরাট হিয়া’ জাগিয়ে তুলতে মোগল শাসকদের ভূমিকার কথা স্বীকার করা সংঘ পরিবারের পক্ষে অসম্ভব, কারণ তাহলে ‘ভারত আসলে একটি হিন্দুরাষ্ট্র’ – এই তত্ত্ব ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ঠিক তেমনি, ভারতীয় ক্রিকেট আজ পত্রে পুষ্পে পল্লবিত হয়ে যে চেহারা নিয়েছে তার শিকড় যে একজন মুসলমান অধিনায়ক – সেকথাও স্বীকার করা চলে না। হিন্দুরাষ্ট্রের জনতার আফিম যে ক্রিকেট, তা যে আদ্যোপান্ত হিন্দুদের হাতেই তৈরি – এমনটা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে চলবে কেন? ইতিহাসে অন্য কিছু থাকলে তা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে হবে।

টাইগার পতৌদিকে ব্যক্তি হিসাবেও অপছন্দ করার কারণ আছে সংঘ পরিবারের। তিনি বিয়ে করেছিলেন বাঙালি বামুনের মেয়ে শর্মিলা ঠাকুরকে। তাঁদের ছেলে সঈফ দুবার বিয়ে করেছেন, দুবারই বউ অমুসলমান। সংঘ পরিবারের আজকের লব্জে যাকে বলে ‘লভ জিহাদ’। টাইগার-শর্মিলার মেয়ে সোহার বর আবার কেবল হিন্দু নন, একেবারে কাশ্মীরী পণ্ডিত। কুণাল খেমুর জন্মও শ্রীনগরে। ভারতের সর্বত্র কাশ্মীরী পণ্ডিতদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেই মুসলমানরা কত খারাপ সেকথা প্রচার করে থাকে হিন্দুত্ববাদীরা, অথচ এই পরিবারের সকলে মিলে সব ধর্মীয় গোঁড়ামির বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছেন। শর্মিলা, অমৃতা বা করিনাকে হিজাব বা বোরখা পরে ঘুরতে দেখা যায়নি। কুণালকেও সোহার সঙ্গে বিয়ের পর দাড়ি রেখে ফেজ পরে ঘুরতে দেখা যায় না। মুসলমানদের যে যে স্টিরিওটাইপ হিন্দুদের সামনে তুলে ধরে ভয় দেখায় সংঘ পরিবার, তাকে এভাবে প্রতিনিয়ত নস্যাৎ করে চলা পরিবারের নাম কী করে জড়িয়ে থাকতে দেওয়া যায় নরেন্দ্র মোদীর ভারতের এক নম্বর জনপ্রিয় খেলার সঙ্গে? পারে না বলেই বোধহয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড ২০১৩ সালে চালু হওয়া বার্ষিক পতৌদি স্মারক বক্তৃতাও বন্ধ করে দিয়েছে ২০২০ সালের পর থেকে।

লক্ষণীয়, বিশেষ করে ২০১৯ সাল থেকে, এদেশের জনপরিসর থেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতি মুছে দেওয়ার সযত্ন প্রচেষ্টা চলছে। বলিউডে ক্রমাগত মুসলমানবিরোধী, ইতিহাসবিকৃত, যুদ্ধবাজ ছবি বানানো হচ্ছে। উপরন্তু বলিউড শাসন করতেন যে তিন খান – তাঁদের বিরুদ্ধেও নানা শক্তি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শাহরুখ খানের ছেলেকে অতি সামান্য অভিযোগে হাজতবাস করানো হয়েছে, সলমন খানকে খুন করার পরিকল্পনা হয়েছে, আমির খানের ছবি মুক্তি পাওয়ার সময় এলেই দক্ষিণপন্থী আই টি সেল বয়কটের ডাক দিয়েছে। এর বাইরে মনসুর-শর্মিলার ছেলেকেও খুনের চেষ্টা হয়েছে কিছুদিন আগে।

এই দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে তিষ্ঠোতে দেওয়া হবে পতৌদি পিতা-পুত্রকে? কক্ষনো না। বরং থাকুন বাধ্য মারাঠি ব্রাহ্মণ তেন্ডুলকর, যিনি হাসিমুখে অযোধ্যার রামমন্দিরের উদ্বোধনে গিয়েছিলেন। সঙ্গে থাকুন সর্বকালের সেরা ইংরেজ ক্রিকেটারদের একজন – জেমস অ্যান্ডারসন। তাহলে সাপও মরে, লাঠিও ভাঙে না।

আরও পড়ুন অপমানে হতে হবে মহম্মদ শামির সমান

যাঁদের এখনো ধারণা ক্রিকেট খেলা হয় শুধু মাঠের ভিতরে, এসব রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে আনা নেহাত বাচালতা (অল্পবয়সীদের ভাষায় ‘ফেসবুকের কাকুদের হ্যাজ’), তাঁরা বলবেন শচীনের মত মহান ক্রিকেটারের নামে ট্রফির নাম রাখা হলে আপত্তির কী আছে? লোকটা টেস্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান এবং শতরান করেছে। সে কি অযোগ্য? নাকি অ্যান্ডারসন অযোগ্য? তিনি তো জোরে বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টেস্ট উইকেট নিয়েছেন (৭০৪)। আজ্ঞে না, দুজনের কেউই অযোগ্য নন। সমস্যা অন্য জায়গায়। সাধারণ গ্র্যাজুয়েট বাবা-মায়ের ছেলে যদি নোবেল পুরস্কার পেয়ে বলে ‘বাড়িটা ওঁদের নামে থাকবে কেন? আমার যোগ্যতা বেশি, বাড়ি আমার নামে করে নেব’, তাহলে কি আমরা হাততালি দেব? অবশ্য আজকের ভারতে দেব হয়ত। কারণ এই ভারতের ইতিহাস তো ২০১৪ সাল থেকে শুরু। তার আগে ভারতীয়রা নাকি খুবই লজ্জা পেতেন নিজেদের ভারতীয় হিসাবে পরিচয় দিতে। ঠিক তেমনি আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসও শুরু করতে হবে ক্রিকেট নামক ধর্মের ভগবান শচীন থেকে।

তাই হোক, তবে তাই হোক। বরাবর কামনা করেছি, লালকৃষ্ণ আদবানি শতায়ু হোন। যাতে তাঁর রথযাত্রার চাকার নিচে গোটা দেশটার তলিয়ে যাওয়া তাঁকে দেখে যেতে হয়। এখন থেকে কামনা করব, শচীনও শতায়ু হোন। যাতে বছর দশেক পরেই তাঁকে দেখতে হয়, এই ট্রফির নাম বদলে হয়ে গেল কোহলি-রুট ট্রফি। তার বছর দশেক পরে হয়ত জয়সোয়াল-ব্রুক ট্রফি। তারপর আর টেস্ট ক্রিকেট বেঁচে থাকুক না থাকুক, শচীন আর বিরাট যেন সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকেন। পূর্বসুরিদের অস্বীকার করার অসম্মান যেন তাঁদেরও ভোগ করতে হয়। যে দেশে ক্রিকেটপ্রেমীদের জীবনের দাম ফুটো পয়সার সমানও নয় আর ক্রিকেটাররা হয়ে গেছেন ভগবান, সেদেশে কোনো ভগবানই যে চিরায়ু নন – এই উপলব্ধি যেন তাঁদের ইহকালেই হয়।

আর দেশটার কী হবে? সেকথা বোধহয় জর্জ সান্তায়ানার এই উক্তিতে আছে ‘Those who cannot remember the past are condemned to repeat it.’ অর্থাৎ যারা ইতিহাস ভুলে যায়, তারা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করার অভিশাপে অভিশপ্ত।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অশ্বিনের অবসর ব্যাটারদের পিঠ বাঁচানোর নীতির গালে চড়

অশ্বিন কেন, যে কোনো বুদ্ধিমান মানুষ বুঝতে পারবেন যে আসলে আমাদের কোচ আর অধিনায়ক দল তৈরি করেন ব্যর্থ ব্যাটারদের পিঠ বাঁচাতে। কাজটা যে আজ নতুন হচ্ছে, তাও নয়। এ জিনিস চালু করে দিয়েছিলেন ধুমধাম ধোনি। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।

ভারতের হয়ে টেস্ট খেলেছেন মাত্র ১৭টা, নিয়েছেন ৪২.৪০ গড়ে ৪৪ খানা উইকেট। একদিনের ম্যাচ খেলেছেন ১২০টা, ৩১.৭২ গড়ে নিয়েছেন ১৫৭ খানা উইকেট। কুড়ি বিশের ম্যাচ খেলেছেন ২৭টা, ২২.২৯ গড়ে নিয়েছেন মোটে ৩৪ খানা উইকেট। না, রবিচন্দ্রন অশ্বিনের কথা হচ্ছে না। বলছি আশিস নেহরার কথা। উপরের পরিসংখ্যান সাধারণ বললেও বেশি বলা হয়। বলা উচিত আলোচনার অযোগ্য। শেষ টেস্ট ম্যাচ খেলেছিলেন ২০০৪ সালে, শেষ একদিনের ম্যাচ ছিল ২০১১ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। সেই নেহরার জন্যে ঘটা করে তাঁর ঘরের মাঠে বিদায়ী ম্যাচের বন্দোবস্ত করেছিল ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) – তারিখটা ছিল ১ নভেম্বর ২০১৭। ভারতের বিজেপি সরকারের মত ক্রিকেট বোর্ডেরও আছে গোদি মিডিয়া। সেই মিডিয়া ভরে গিয়েছিল স্বনামধন্য সাংবাদিকদের লম্বা লম্বা লেখায়। তাঁরা যেনতেনপ্রকারেণ প্রমাণ করেছিলেন – নেহরা মহান ক্রিকেটার, তাই তাঁর এই সম্মান প্রাপ্য। বোর্ডের মাইনে করা প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও নিজেদের শব্দভাণ্ডার উজাড় করে দিয়েছিলেন নেহরার জন্য। তিনি নাকি অসম্ভব সম্ভাবনাময় ছিলেন, কেবল চোট আঘাতের জন্যে বেশি খেলে উঠতে পারলেন না। পারলেই…

হতেও পারে। সম্ভাবনা তো আর মাপা যায় না, আর কী হলে কী হত তা নিয়েও অনন্তকাল আলোচনা চালানো যায়। সুকান্ত ভট্টাচার্য ৮০ বছর বাঁচলে রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বড় কবি হতেন – একথা প্রমাণ করার যেমন উপায় নেই, অপ্রমাণ করারও উপায় নেই। কিন্তু সাফল্য তো পরিমাপযোগ্য। নেহরা যদি বিদায়ী ম্যাচ পাওয়ার যোগ্য হন, তাহলে টেস্টে তিনশোর বেশি, একদিনের ক্রিকেটেও প্রায় তিনশো উইকেট পাওয়া, ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম কাণ্ডারী জাহির খান কী দোষ করেছিলেন? কী দোষ ছিল হরভজন সিংয়ের? তিনি তো টেস্টে চারশোর বেশি উইকেটের মালিক, একদিনের ক্রিকেটেও আড়াইশোর বেশি। বহু স্মরণীয় জয়ের নায়ক। নেহরার তো স্মরণীয় পারফরম্যান্স বলতে ঠিক একটা – ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ডারবানে ২৩ রানে ছয় উইকেট নেওয়া। ভারতীয় ক্রিকেটে মহান হওয়া এত সহজ তাহলে?

এসব পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে হত না, অশ্বিন অস্ট্রেলিয়া সিরিজের মাঝখানেই অবসর নিয়ে না ফেললে। এই ওয়েবসাইটেই নিউজিল্যান্ড সিরিজে ভারত গোহারান হারার পরে লিখেছিলাম অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজা হলেন মাঝারিয়ানার দেবদূত। সেই মত পরিবর্তন করার মত কিছু ঘটেনি। কিন্তু সে মাঝারিয়ানা তো সর্বকালের সেরাদের সাপেক্ষে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে অশ্বিন ভারতের বর্তমান প্রজন্মের সেরা স্পিনার। তাছাড়া মাঝারিয়ানা এক জিনিস, অপকর্ষ আরেক জিনিস। যে দেশে নেহরাকে ধূপধুনো দিয়ে পুজো করে বিদায় জানানো হয়, সেখানে অনিল কুম্বলের পরেই ভারতের সবচেয়ে সফল টেস্ট বোলার, সবচেয়ে বেশিবার সিরিজের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার বিশ্বরেকর্ড করে ফেলা অশ্বিন একটা সিরিজের মাঝখানে এমন চকিতে বিদায় নেবেন – এটা ক্রিকেটপ্রেমীরা নীরবে হজম করবেন? প্রশ্ন করবেন না, কেন এভাবে বিদায় নিলেন অশ্বিন?

যদি আর টেস্ট খেলতে পারবেন না বলেই মনে করে থাকেন, তাহলে তো নিউজিল্যান্ড সিরিজের পরেই অবসর নিতে পারতেন। অথবা বলে দিতে পারতেন – অস্ট্রেলিয়া সিরিজই হবে আমার শেষ সিরিজ। অনেকেই তো এভাবে অবসর নেন। নিউজিল্যান্ডের নির্ভরযোগ্য জোরে বোলার টিম সাউদি অশ্বিনের আগেরদিনই টেস্ট কেরিয়ার শেষ করলেন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের শেষ টেস্ট খেলে। তিনি কিন্তু ম্যাচের আগেই বলে দিয়েছিলেন, ওটাই হতে চলেছে তাঁর শেষ টেস্ট। কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডের জেমস অ্যান্ডারসন আর স্টুয়ার্ট ব্রডও আগে থেকে ঘোষণা করে অবসর নিয়েছেন। যেসব ক্রিকেটারের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ার হয়, ভক্তকুল তৈরি হয় – তাঁরা তো এভাবেই বিদায় নেন। শেষ সময়ে ভক্ত, সহখেলোয়াড়, প্রাক্তনদের অভিবাদন পেতে কার না ভাল লাগে? মানুষ যে পেশাতেই থাকুক, কোনো বয়সেই অবসর নেওয়া সোজা নয়। ভাল হোক, মন্দ হোক, অনেকগুলো সম্পর্ক তৈরি হয় কর্মস্থলে। কাজ থেকে অবসর নিতেই হয়। কারণ শরীর প্রাকৃতিক নিয়মে একসময় কাজের অনুপযোগী হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের মন তো প্রকৃতির নিয়মে চলে না। কাজ ছেড়ে যেতে এবং কাজের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলোকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হয়, বিষণ্ণতা তৈরি হয়। শুধু যে অবসর নিচ্ছে তারই হয় তা নয়, তার সহকর্মীদেরও হয়। অশ্বিনের মত বিখ্যাত খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে যারা কোনোদিন তাঁর ধারেকাছে যেতে পারেনি, কেবল কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে টিভি বা মোবাইলের পর্দায় দেখেছে, তারাও বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। অত মানুষের বিষণ্ণতা, শেষ মুহূর্তের ভালবাসা ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনই আবার অবসরপ্রাপ্ত মানুষটার বাকি জীবনের পাথেয়। এক্ষেত্রে অশ্বিন বা আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই। সেই ভালবাসা গুছিয়ে চেটেপুটে নেওয়ার সুযোগ কে ছাড়তে চায়? চাওয়ায় কোনো দোষও নেই। তাহলে অশ্বিন এমন হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?

ব্রিসবেনে বৃষ্টিতে শেষদিনের খেলা ভেস্তে যাওয়ার পর অধিনায়ক রোহিত শর্মার সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে অশ্বিন কী বলেছেন এতদিনে সবাই জানেন। দু মিনিটেরও কম দৈর্ঘ্যের সেই বক্তব্য শুনলে মনে হয়, সিদ্ধান্তটা চট করে নেওয়া। অথচ অশ্বিনের ক্রিকেটজীবন যাঁরা অনুসরণ করেছেন তাঁরা জানেন, অশ্বিন হুটহাট কাজ করার লোক নন। এমনিতেই স্পিন বোলিং ব্যাপারটায় গায়ের জোরের চেয়ে মস্তিষ্কের কাজ বেশি বৈ কম নয়। তার উপর অশ্বিন এমন একজন ক্রিকেটার, যাঁর মাথা ব্যাট করার সময়েও একইরকম সক্রিয় থাকত। শেন ওয়ার্ন সম্পর্কে একসময় বলা হত ‘the best captain Australia never had’। অশ্বিন সম্পর্কেও বলা যায়, তিনি ভারতের সেরা না-হওয়া অধিনায়ক। এমন লোক আজ ভাবলেন, আর এখুনি অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন – এমনটা না হওয়াই স্বাভাবিক। অশ্বিনের প্রস্থানের পর রোহিত যা বলেছেন, তা থেকে কিন্তু পরিষ্কার যে এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ নেওয়া হয়নি। রোহিত বলেন ‘আমি পার্থে এসে এটা শুনি। এটা তখন থেকেই ওর মাথায় ঘুরছিল। আমি কোনো মতে ওকে গোলাপি বলের টেস্টটা [অ্যাডিলেড] অব্দি থেকে যেতে রাজি করাই। ওর মনে হয়েছে, যদি আমার প্রয়োজন না পড়ে তাহলে আমার বিদায় নেওয়াই ভাল।’

হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে অশ্বিনের বাবা রবিচন্দ্রন মেলবোর্ন আর সিডনির শেষ দুটো টেস্ট দেখতে যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট কেটে ফেলেছিলেন। ছেলে অবসর নেওয়ার খবর জানানোর পরে টিকিটগুলো বাতিল করেন। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রবিচন্দ্রন অবসরের কারণ হিসাবে ছেলের অপমানিত বোধ করার সম্ভাবনাও জানিয়ে ফেলেছেন। তবে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হতেই অশ্বিন এক্স হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করেছেন, তাঁর বাবার মিডিয়া সামলানোর প্রশিক্ষণ নেই। অতএব তাঁকে সবাই দয়া করে ক্ষমা করে দিন। লক্ষ করুন, অশ্বিন বলেছেন, বাবা মিডিয়াকে কী বলতে হয় না হয় জানেন না, তাই ওরকম বলে ফেলেছেন। বাবা ভুল বুঝেছেন, আমি খুশি মনেই অবসর নিয়েছি – এমন কথা বলেননি কিন্তু। পাশাপাশি রোহিত বলেছেন যে পার্থ থেকেই অশ্বিন অবসরের চিন্তা করছিলেন। তার মানে রোহিত অ্যাডিলেডের দ্বিতীয় টেস্ট পর্যন্ত থেকে যাওয়ার কথা না বললে হয়ত পার্থেই অবসর ঘোষণা করে দিতেন। এখানেই ভারতীয় দল যেভাবে চালানো হয় তা নিয়ে একগুচ্ছ প্রশ্ন তোলার অবকাশ তৈরি হয়।

কী হয়েছিল পার্থে? দলে দুজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ স্পিনার থাকা সত্ত্বেও খেলানো হয়েছিল মাত্র চারটে টেস্ট খেলা ওয়াশিংটন সুন্দরকে। ওয়াশিংটনকে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ৫১.২ ওভারের মধ্যে মাত্র দু ওভার বল করতে দেওয়া হয়, দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫ ওভার বল করলেও মিচেল স্টার্ক আর নাথান লায়ন নামে দুই বোলারের উইকেট নেওয়ার বেশি প্রভাব ফেলতে পারেননি। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন ব্যাট হাতে তিনি অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজার চেয়েও বেশি নির্ভরযোগ্য হওয়াই নাকি তাঁর সুযোগ পাওয়ার আসল কারণ। কিন্তু ওয়াশিংটন প্রথম ইনিংসে করেন ৪, দ্বিতীয় ইনিংসে ২৯। তবে তরুণ ক্রিকেটারকে একটা টেস্টে ব্যর্থ হওয়ার জন্য সমালোচনা করা অন্যায়। বিশেষত প্রথম ইনিংসে যেখানে দুই দলের সমস্ত ব্যাটার ব্যর্থ হয়েছিলেন আর ভারতের বোলিংয়ের সময়েও পিচ, আবহাওয়া – সবকিছুই ছিল জোরে বোলারদের জন্যে আদর্শ। কিন্তু কথা হল, ওয়াশিংটনকে তাহলে অ্যাডিলেডের দ্বিতীয় টেস্টে বাদ দেওয়া হল কেন? তাঁর বোলিং ও ব্যাটিং দক্ষতার প্রতি ভরসা রোহিত-গৌতম গম্ভীরের টিম ম্যানেজমেন্ট মাত্র একটা ম্যাচের পরেই হারিয়ে ফেলল? এভাবে কোনো তরুণ ক্রিকেটারকে লম্বা রেসের ঘোড়া করে তোলা যায়?

নাকি ব্যাপারটা আসলে এইরকম, যে অশ্বিন পাঁচশোর বেশি উইকেট নিয়ে ফেলার পরেও বিদেশের মাঠে বারবার বাদ পড়ায় বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যাবেন বলছেন শুনে প্রথম টেস্টে না খেলা অধিনায়ক রোহিত তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন – অ্যাডিলেডে ওঁকেই খেলানো হবে? যদি তা হয়, তাহলে কিন্তু বলতে হবে টিম ম্যানেজমেন্ট অবৈজ্ঞানিক, যুক্তিহীন, আবেগসর্বস্ব পদ্ধতিতে দল চালান। অশ্বিন অ্যাডিলেডে খেললেন এবং মন্দ খেললেন না। প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয়ের মধ্যে ২২ বলে ২২ রান করলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে আর সকলের মত তিনিও ব্যর্থ। তাঁর প্রধান কাজ তো বল করা। তাতে কিন্তু প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হয়েছেন বলা যাবে না। ১৮ ওভার বল করেছেন, অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের বেশি রান করতে দেননি এবং অলরাউন্ডার মিচেল মার্শের উইকেট তুলে নিয়েছেন।

তারপরেও তৃতীয় টেস্টে অশ্বিনকে বাদ দিয়ে জাদেজাকে খেলানো হল কোন যুক্তিতে? একটা যুক্তিই থাকা সম্ভব। প্রথম দুই টেস্টে ব্যাটাররা ডুবিয়েছেন, আবার ডোবাতে পারেন। জাদেজা টেনে তোলার কাজটা ওয়াশিংটন আর অশ্বিনের চেয়েও ভাল পারবেন, তাই। সেই মহেন্দ্র সিং ধোনির আমল থেকে ভারতীয় ক্রিকেটে চালু ধারণা – জাদেজা অশ্বিনের থেকে ভাল ব্যাট করেন। যদিও দুজনের মধ্যে তফাত মোটেই আকাশপাতাল নয়। অশ্বিন বিদেশে ৪০ খানা টেস্ট খেলে ১৪৮৫ রান করেছেন ২৫.৬০ গড়ে, দুটো শতরান আর ছটা অর্ধশতরান সমেত। জাদেজা ২৭ খানা টেস্ট খেলে ১২১০ রান করেছেন ৩৪.৫৭ গড়ে, একটা শতরান আর নটা অর্ধশতরান সমেত। জাদেজার গড় অশ্বিনের চেয়ে নিঃসন্দেহে অনেকটা ভাল হলেও মনে রাখতে হবে, গত অস্ট্রেলিয়া সফরে সিডনিতে হনুমা বিহারীর সঙ্গে অশ্বিন যে ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস খেলেছিলেন, তেমন অবিশ্বাস্য ইনিংস বিশ্বমানের জোরে বোলিংয়ের বিপক্ষে জাদেজা বিদেশে কখনো খেলেননি। ব্রিসবেনে সদ্য যে ৭৭ রানের ইনিংস খেললেন, তা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনজন বিশেষজ্ঞ বোলারের বিরুদ্ধে। কারণ আহত জশ হেজলউড ইনিংসের শুরুর দিকেই মাঠ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

আরো পড়ুন স্বর্গহারা মাঝারিয়ানার দেবদূত: বিরাট, রোহিত ও সম্প্রদায়

তবে এই তুলনামূলক আলোচনা যে করতে হচ্ছে – সেটাই অশ্বিন, জাদেজা, ওয়াশিংটনের প্রতি অবিচার। তুলনা করতে হলে তো করা উচিত তাঁদের বোলিং নিয়ে, কারণ ওঁরা প্রথমত বোলার। ব্যাটের হাত ভাল সেটা বোনাস হিসাবেই ধরা উচিত, কারণ খেলাটা টেস্ট ক্রিকেট। কুড়ি বিশের ক্রিকেট নয়, যেখানে ১ থেকে ১১ সকলেরই রান করতে পারা দরকার। ওয়াশিংটন যেহেতু মোটে ছটা টেস্ট খেলেছেন, সেহেতু তাঁকে আলোচনার বাইরে রেখে অশ্বিন আর জাদেজার বিদেশের মাঠের পরিসংখ্যান দেখি।

অশ্বিন ৪০ টেস্টে ৩০.৫৫ গড়ে ১৫০ খানা উইকেট নিয়েছেন। এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন আটবার, আর ম্যাচে দশ উইকেট দুবার। অন্যদিকে জাদেজা ২৭ টেস্টে ৩৪.০৩ গড়ে মাত্র ৭৬ খানা উইকেট নিতে পেরেছেন। এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট মাত্র দুবার, ম্যাচে দশ উইকেট একবারও নয়। অর্থাৎ বিদেশে জাদেজা কোনো আলোচনার যোগ্য বোলারই নন। উপমহাদেশের বাইরে তাঁর বোলিং এতই পানসে হয়ে যায় যে ২০১৩ ইংল্যান্ড সফরে একটা টেস্টে ধোনি উইকেট থেকে পিছিয়ে দাঁড়িয়ে জাদেজাকে দিয়ে কয়েক ওভার মিডিয়াম পেস বল করিয়েছিলেন। ব্রিসবেনে টেস্টেও দেখা গেল, পিচে কিঞ্চিৎ টার্ন ও বাউন্স থাকলেও জাদেজা কিছুই করতে পারলেন না। বরং ২৩ ওভার বল করে ৯৫ রান দিয়ে ফেললেন।

এসব দেখে অশ্বিন কেন, যে কোনো বুদ্ধিমান মানুষ বুঝতে পারবেন যে আসলে আমাদের কোচ আর অধিনায়ক দল তৈরি করেন ব্যর্থ ব্যাটারদের পিঠ বাঁচাতে। কাজটা যে আজ নতুন হচ্ছে, তাও নয়। এ জিনিস চালু করে দিয়েছিলেন ধুমধাম ধোনি। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। ২০১৪-১৫ মরশুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রথম টেস্টই ছিল অ্যাডিলেডে। অধিনায়ক বিরাট কোহলি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে অশ্বিনকে বসিয়ে রেখে লেগস্পিনার কর্ণ শর্মাকে খেলিয়ে দেন। দুই ইনিংস মিলিয়ে কর্ণ চারটে উইকেট নিলেও বেধড়ক মার খান। প্রথম ইনিংসে ৩৩ ওভার বল করে ১৪৩ রান দেন, দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬ ওভার বল করে ৯৫। ওটাই তাঁর জীবনের প্রথম ও শেষ টেস্ট। মনে রাখবেন, ওই টেস্টে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন লায়ন। পরের তিনটে টেস্টে অশ্বিনই খেলেন এবং ইনিংস পিছু গোটা দু-চার করে উইকেটও নেন। কিন্তু কর্ণ কুন্তীর প্রথম পছন্দ না হলেও ধোনি, কোহলিদের প্রথম পছন্দ হতে পেরেছিলেন কোন গুণে? আইপিএলে কিছু চার, ছয় মারতে পারার সুনাম ছিল বলে।

ওই সিরিজের মাঝখানেই ধোনি অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়ে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। অশ্বিন হয়ত ভেবেছিলেন নতুন আমলে দেশের মত বিদেশেও তিনি প্রথম পছন্দ হয়ে উঠবেন। কিন্তু বিরাট কোহলির আমলেও তা ঘটল না, জাদেজা এসে পড়লেন। পৃথিবীর সর্বত্র সব বোলারের বিরুদ্ধে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করা স্টিভ স্মিথকে ২০২০-২১ সিরিজে বোতলবন্দি করতে পেরে এবং সিডনির সেই ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস খেলার পরে অশ্বিন নির্ঘাত ভেবেছিলেন – আর বিদেশে বেঞ্চে বসে থাকতে হবে না। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তিনি দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় পছন্দ হতে চলেছেন। গত এক দশকে টেমস ইত্যাদি নদী দিয়ে কত জল গড়াল। ধোনি আর বিরাটের অভিভাবক রবি শাস্ত্রী গেলেন, রাহুল দ্রাবিড় এলেন। তাও এই ধারা বদলাল না। বিরাটের বদলে রোহিত টেস্ট অধিনায়ক হলেন। তাতেও অশ্বিন বিদেশে দ্বিতীয় পছন্দই রয়ে গেলেন। দ্রাবিড়ের জায়গায় গম্ভীর এলেন। অশ্বিন যে তিমিরে সেই তিমিরেই। কেন? ক্রিকেটের আদিম যুগের ভাষায় বললে – ভারতীয় দলের জেন্টলম্যান হলেন ব্যাটাররা। তাঁদের বছরের পর বছর ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার অধিকার আছে। সেই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব প্লেয়ারদের, মানে স্পিনারদের, ঘাড়ে। সেই অধিকার রক্ষার্থে সেরা স্পিনারকে নয়, খেলানো হবে স্পিনারদের মধ্যে সেরা ব্যাটারকে। সেটাও আবার তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ঠিক হবে না, হবে অধিনায়ক আর কোচের মতানুসারে। আটত্রিশ বছর বয়সে এসে এই অবিচার আর সহ্য না হওয়ারই কথা। আমাদের অনেককেই বিভিন্ন পেশায় এ জিনিস সহ্য করতে হয়। বহু ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ ভুল লোক ভুল উদ্দেশ্য নিয়ে ‘টিম লিডার’ হয়ে বসে আছে। তাদের কাছে অভিজ্ঞতা, নৈপুণ্যের দাম থাকে না। সিনিয়র কর্মচারীরা মুখ বুজে নিজের যোগ্যতার অবমূল্যায়ন হচ্ছে বুঝেও কাজ চালিয়ে যান। কারণ তাঁদের কাছে আইপিএলের মত বিকল্প নেই। অশ্বিনের মত তুখোড় ইউটিউবার হতেও সবাই পারে না। উনি পারেন। সুতরাং এই ধাষ্টামো কেন মেনে নেবেন?

অশ্বিন এভাবে বিদায় জানিয়ে আরেকটা জরুরি কাজও করে গেলেন। তাঁরই বয়সী রোহিত আর বিরাটের নির্লজ্জতা উন্মোচিত করে দিলেন। দেশের মাঠেও নিউজিল্যান্ডের স্পিনাররা এসে বেশি উইকেট নিয়ে চলে যাচ্ছেন মানে সূর্যাস্তের দিকে যাত্রা যে শুরু হয়ে গেছে সেটা বোঝামাত্রই আর পরের হোম সিরিজের জন্য অপেক্ষা করলেন না অশ্বিন। চলতি সিরিজের পরের দুটো টেস্ট মেলবোর্ন আর সিডনিতে। শোনা যাচ্ছে মেলবোর্নে নাকি স্পিনের দরকার বেশি পড়বে প্রথম তিন টেস্টের তুলনায়, আর সিডনি তো ঐতিহাসিকভাবেই অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে স্পিনারবান্ধব পিচ। তার জন্যেও দাঁড়ালেন না। অথচ রোহিত আর বিরাট প্রায় পাঁচ বছর ধরে পণ করে আছেন, যতক্ষণ না কেরিয়ার ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে ততক্ষণ খেলে যাবেন।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

স্বর্গহারা মাঝারিয়ানার দেবদূত: বিরাট, রোহিত ও সম্প্রদায়

২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজে চূড়ান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরে শচীন তেন্ডুলকর সম্পর্কে কপিলদেব কিন্তু টিভি স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন ‘জিন্দগি ঔর ভি হ্যায়’। অর্থাৎ শচীনের বোঝা উচিত যে ক্রিকেটের বাইরেও জীবন আছে। অথচ নিজের দেশের মাঠে রোহিত, বিরাটের নাকানি চোবানি খাওয়া দেখেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাক্তন বলেননি যে ওদের এবার অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে।

ভারতীয় বোলিংয়ের মাঝারিয়ানার আলোচনা যেখানে শেষ হয়েছিল, ব্যাটিংয়ের মাঝারিয়ানার আলোচনা সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। অর্থাৎ রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজা থেকে। বোলার হিসাবে এঁদের মাঝারিয়ানা আগের লেখায় দেখিয়েছি, কিন্তু ভারতীয় দলের মেগাস্টার ব্যাটারদের মাঝারিয়ানা আরও সরেস। এতটাই সরেস যে এই দুজনের ব্যাটের হাত সাধারণ বোলারদের তুলনায় অস্বাভাবিক ভাল না হলে নিউজিল্যান্ড সিরিজের লজ্জায় ভারতকে অনেক আগেই পড়তে হত। কিন্তু ভারত এমন এক দেশ যেখানে ব্যাটারদের সাত খুন মাফ। তাই বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মারা বছরের পর বছর রান না করেও কলার তুলে ঘুরতে পারেন। ভাগ্যিস নিউজিল্যান্ড ৩-০ করে দিয়ে গেছে। ওয়াংখেড়ের ‘ডেড রাবার’ যদি কোনোমতে ঋষভ পন্থ জিতিয়ে দিতেন, তাহলে এই যে এখন দীনেশ কার্তিকের মত প্রাক্তনরা ঢোঁক গিলে বিরাট, রোহিতকে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে বলছেন – এটুকুও হত না।

দেশে, বিদেশে গত এক যুগ অধিনায়ক মহেন্দ্র সিংহ ধোনি থেকে বিরাট হয়ে রোহিতের আমল পর্যন্ত ভারতীয় ব্যাটিংকে বারবার চরম লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে লোয়ার অর্ডার ব্যাটিং। তার অনেকখানি কৃতিত্ব অশ্বিন আর জাদেজার। বস্তুত গ্যারি সোবার্স, জাক কালিস, ইয়ান বোথাম, কপিলদেব, ইমরান খান, রিচার্ড হেডলির মত কিংবদন্তি অলরাউন্ডারদের বাদ দিলে টেস্টে অশ্বিন আর জাদেজার মত অতগুলো উইকেটের সঙ্গে এত রান করা ক্রিকেটার খুঁজে পাওয়া ভার। ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের কাছে ঘরের মাঠে সিরিজ হারার পর থেকে এই নিউজিল্যান্ড সিরিজে হারের মাঝের যে সময়টা নিয়ে বিস্তর গর্ব আমাদের, সেই সময়কালের প্রায় সমস্ত স্মরণীয় জয় এবং ড্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন ভারতের নিচের দিকের ব্যাটাররা। বিশেষত শেষ ৫-৬ বছরে উইকেটরক্ষক পন্থ আর বোলাররাই ভারতের হয়ে ব্যাট হাতে সবচেয়ে ধারাবাহিক। এমনকি ২০২০-২১ মরশুমে ব্রিসবেনের গাব্বায় যে জয় নিয়ে আমাদের যারপরনাই গর্ব, সেই টেস্টেও ব্যাট হাতে রোহিতের অবদান ছিল ৪৪, ৭। বিরাট সেই টেস্টে খেলেননি। প্রথম ইনিংসে শুভমান গিল, পূজারা, রাহানে, মায়াঙ্ক আগরওয়াল – কেউই সুবিধা করতে পারেননি। ওয়াশিংটন সুন্দর আর শার্দূল ঠাকুর জোড়া অর্ধশতরান না করলে অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসেই বিরাট লিড পেয়ে যেত। দ্বিতীয় ইনিংসেও গিল (৯১) আর পূজারার (৫৬) লড়াই বৃথা যেত পন্থ (অপরাজিত ৮৯) আর ওয়াশিংটন (২২) না থাকলে।

চট করে প্রথম চার-পাঁচটা উইকেট পড়ে যাবে। তারপর কোনো একজন মিডল অর্ডার ব্যাটার অশ্বিন, জাদেজা বা অন্য বোলারদের সঙ্গে নিয়ে ভদ্রস্থ রান তুলে দেবেন বা ম্যাচ জিতিয়ে দেবেন, নিদেনপক্ষে হার বাঁচিয়ে দেবেন – এটাই নিয়ম হয়ে গেছে ভারতীয় ক্রিকেটে। পৃথিবীর সর্বত্র, যে কোনো বোলিংয়ের বিরুদ্ধে, এমনকি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও। অথচ এবার ৩-০ হওয়ার পরে এমন ভান করা হচ্ছে যেন স্রেফ স্পিন খেলতে না পেরেই আমাদের এই অবস্থা হয়েছে এবং ভারি অপ্রত্যাশিত একটা ব্যাপার ঘটেছে। অথচ গত কয়েক বছরে ভারতের বারবার ঘটে চলা ব্যাটিং ব্যর্থতা খেয়াল করলে বোঝা যায় – এটাই প্রত্যাশিত ছিল। আগে কেন ঘটেনি সেটাই আশ্চর্যের।

বেশি পিছোতে হবে না। যে বাংলাদেশকে দুদিনে হারিয়ে দিয়েছি বলে কদিন আগেই পেশি ফোলালাম আমরা, তাদের সঙ্গেই সেপ্টেম্বরে চেন্নাইতে প্রথম টেস্টের প্রথম দিন সকালে ৯৬ রানে চার উইকেট চলে গিয়েছিল আমাদের। তথাকথিত বিশ্বসেরা ওপেনার রোহিত আর তথাকথিত সর্বকালের সেরা ব্যাটার কোহলি আনকোরা হাসান মাহমুদের সুইং সামলাতে না পেরে ছখানা করে রান করে প্যাভিলিয়নের পথ ধরলেন। গিল তো খাতাই খুলতে পারলেন না। পন্থ ৩৯ রান করেছিলেন, সুপ্ত প্রতিভাসম্পন্ন কে এল রাহুল আবার ব্যর্থ। সেদিনও জাদেজা ৮৬ আর অশ্বিন শতরান না করলে শ দুয়েক রানেই গুটিয়ে যেত ভারতের ইনিংস। বিপক্ষ দলের মান বাংলাদেশের চেয়ে ভাল হলে কী হত সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেল নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বেঙ্গালুরুর প্রথম টেস্টে। প্রথম দিন বৃষ্টিতে খেলা না হওয়ার পর দ্বিতীয় দিন জোরে বোলিং সহায়ক আবহাওয়ায় ম্যাট হেনরি আর বাচ্চা ছেলে উইলিয়াম ও’রুর্ক ৪৬ রানে গুটিয়ে দিলেন ভারতের ইনিংস। স্কোরবোর্ড জুড়ে শূন্য আর দুইয়ের ছড়াছড়ি। রোহিত সুইং সামলাতে পারবেন না বুঝে স্টেপ আউট করে মারতে গিয়ে দুই রানে বোল্ড, আর কোহলি দীর্ঘকায় ও’রুর্কের বাউন্স সামলাতে না পেরে লেগ স্লিপের হাতে বল জমা দিয়ে শূন্য রানে আউট। দ্বিতীয় ইনিংসের ভাল ব্যাটিং ইনিংস হার বাঁচানোর কাজটুকু করতে পেরেছিল। তাও রোহিত যেভাবে আউট হলেন, তাতে বোঝা যায় তিনি সেই স্তরে পৌঁছেছেন যেখানে শরীর চলে তো মাথা কাজ করে না। নইলে নিজের ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ স্ট্রোকে মুগ্ধ হয়ে থেকে বলটা গড়িয়ে উইকেটে যাচ্ছে কিনা তা খেয়াল করতে ভুলে যাবেন কেন?

ভারতীয় দল এবার অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছে বর্ডার-গাভস্কর ট্রফির অঙ্গ হিসাবে পাঁচখানা টেস্ট খেলতে। অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। তার একটা বড় কারণ – দীর্ঘ সময় ধরে ব্যর্থ কোনো ক্রিকেটারকে প্রতিভাবান, বা সম্ভাবনাময়, বা সিনিয়র, বা অধিনায়ক, বা রেকর্ড করবে – এই অজুহাতে তারা বয়ে বেড়ায়নি কোনোদিন। বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক স্টিভ ওয়কেও ২০০৩ বিশ্বকাপের একবছর আগে একদিনের দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, কারণ তাঁর বয়স তখন ৩৭। ফর্ম নেহাত খারাপ ছিল না, অর্থাৎ বর্তমান ছিল, কিন্তু ভবিষ্যৎ ছিল না। আর এদেশে আমরা কী করছি? স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ৩৭ বছরের রোহিতের না শরীর চলছে, না মাথা ঠিকমত কাজ করছে (সদ্যসমাপ্ত সিরিজে অধিনায়কত্বে অজস্র ভুলও স্মর্তব্য)। তাঁর চেয়ে বছর দেড়েকের ছোট বিরাটও সোজা ফুলটসে ক্রস ব্যাট চালিয়ে বোল্ড হচ্ছেন, বেশিক্ষণ ক্রিজে টিকতেই পারছেন না। অথচ এতদিনে এঁদের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ওসব পরামর্শ ৩০-৩২ বছরের ব্যাটারদের দিতে হয়, কারণ তাঁদের বয়স অনুযায়ী খেলা বদলে নিয়ে ফিরে আসার সময় থাকে। রোহিত, বিরাটের বয়সটা সটান বলে দেওয়ার সময় – বাপু, এবার মানে মানে বিদায় হও। কিন্তু আমাদের বিশেষজ্ঞরা, সাংবাদিকরা, নির্বাচকরা – কেউ সেকথা বলবেন না।

কোনোদিনই যে কেউ বলতেন না তা কিন্তু নয়। ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজে চূড়ান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরে শচীন তেন্ডুলকর সম্পর্কে কপিলদেব কিন্তু টিভি স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন ‘জিন্দগি ঔর ভি হ্যায়’। অর্থাৎ শচীনের বোঝা উচিত যে ক্রিকেটের বাইরেও জীবন আছে। আর ঠোঁটকাটা জিওফ্রে বয়কট আরও সরাসরি বলেছিলেন ‘হি শুড ইম্প্রুভ অর রিটায়ার’। মানে উন্নতি করতে না পারলে ওর অবসর নেওয়া উচিত। অথচ নিজের দেশের মাঠে রোহিত, বিরাটের নাকানি চোবানি খাওয়া দেখেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাক্তন বলেননি যে ওদের এবার অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে। বরং বলা হচ্ছে – কে জানে! হয়ত অস্ট্রেলিয়ার পিচে ওদের সুবিধাই হবে। এই আজগুবি তত্ত্বটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সব মহল থেকে বলা হচ্ছে, ভারতীয় ব্যাটাররা স্পিন খেলতে ভুলে গেছে। কথাটা সত্যি। কিন্তু ভাবখানা এমন, যেন জোরে বোলিং আমাদের ব্যাটাররা চমৎকার খেলেন।

অস্ট্রেলিয়ায় রোহিতদের স্বাগত জানাতে বসে আছেন মিচেল স্টার্ক, জশ হেজলউড আর প্যাট কামিন্স। এই অস্ট্রেলিয়াতেই গত সফরে অ্যাডিলেডে ভরদুপুরে ৩৬ অল আউট হয়ে গিয়েছিলেন আমাদের বিশ্বসেরা, সর্বকালের সেরা প্রমুখরা। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়েছিল মেলবোর্নে পরের টেস্টে অস্থায়ী অধিনায়ক রাহানের শতরানের পাশে জাদেজার অর্ধশতরানের জন্যে। তবে তারপরেও সিডনিতেই ভারত হেরে যেত দুজন ক্রিকেটার অতিমানবিক ইনিংস না খেললে। একজনের নাম হনুমা বিহারী, অন্যজন সেই অশ্বিন। প্রথম জন পায়ে চোট নিয়ে দৌড়তে পারছিলেন না, দ্বিতীয় জন পিঠের ব্যথায় কাবু ছিলেন। সেভাবেই দুজনে মিলে মোট ২৮৯ খানা বল, অর্থাৎ প্রায় ৫০ ওভার, কেবল ব্লক করে আর বল ছেড়ে অস্ট্রেলিয়াকে আটকে দিয়েছিলেন। অন্য যে কোনো দেশে ওই টেস্টের পর থেকে যে কোনো ম্যাচে নির্বাচন সমিতির সভা শুরু হত বিহারীর নামটা প্রথমে লিখে। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট কেবল ক্রিকেটিয় যুক্তিতে চলে না। তাই তারপর বিহারী খেলেছেন আর মাত্র চারখানা টেস্ট। সেগুলোতে তাঁর রান যথাক্রমে ২০, অপরাজিত ৪০, ৫৮, ৩১, ৩৫, ২০, ১১। মানে অসাধারণ নয়, কিন্তু একেবারে ফেলে দেওয়ার মতও নয়। কিন্তু উনি তো আইপিএলে খেলতে পারেন না, পকেটে বিজ্ঞাপনী চুক্তিও নেই। অতএব ২০২২ সালের পর থেকে তিনি আর আলোচনায় নেই। ওই গর্বের সিরিজ জয়ে কিন্তু ব্যাটিংয়ের দুই মহাতারকার অবদান যৎসামান্য। কোহলি একটা ম্যাচ খেলে দুই ইনিংস মিলিয়ে ৭৮ রান করেছিলেন আর রোহিত দুটো ম্যাচ খেলে সোয়া বত্রিশ গড়ে ১২৯ রান। ওই সিরিজে ব্যাট হাতে নায়ক ছিলেন পন্থ আর পূজারা, সঙ্গতে গিল। পূজারার গড় ছিল মোটে ৩৩.৮৭। কিন্তু দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়া আর ভারতের মধ্যে, খেলেছিলেন ৯২৮ খানা বল।

মাঝারি শব্দটা ব্যবহার করলে আবার আমাদের দেশের ক্রিকেটতারকাদের ভক্তরা বেজায় রেখে যান। তার উপর রোহিত আর কোহলির ভক্তকুল রীতিমত সহিংস। বছর কয়েক আগে এক কোহলিভক্ত তার রোহিতভক্ত বন্ধুর সঙ্গে তর্কাতর্কি করতে করতে বন্ধুটিকে খুনই করে ফেলে শেষপর্যন্ত। তাই এঁদের মাঝারি বলে প্রমাণ করতে গেলে আটঘাট বেঁধে এগোতে হবে। আগে রোহিতের ব্যাপারটাই আলোচনা করা যাক। কারণ একে টেস্টে তাঁর রান বিরাটের চেয়ে অনেক কম, তার উপর তাঁকে বিশ্বসেরা ওপেনার বলে দাবি করলেও সর্বকালের সেরাদের পাশে বসায় না আমাদের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র। যাঁকে বসায় তাঁকে নিয়ে তো আরও বেশি শব্দ খরচ করতে হবে।

বস্তুত, আজ ফর্ম পড়ে গেছে বলে নয়, রোহিত কোনোদিনই টেস্টে অসাধারণ ছিলেন না। যে যুগে পিচ ঢাকা থাকত না, হেলমেট ছিল না, সে যুগের কথা আলাদা। কিন্তু নয়ের দশকের পর থেকে পঞ্চাশের ঘরে গড় না থাকলে কোনো ব্যাটারকে বিশ্বসেরাদের মধ্যে ধরা হয় না। রোহিতের গড় ৬৪ খানা টেস্ট খেলে ফেলার পরেও ৪২.২৭-এ আটকে আছে। বিদেশে তাঁর ব্যাটিংকে মাঝারি বললেও বাড়াবাড়ি করা হবে। এগারো বছর খেলে গড় ৩৩.৬০, শতরান মাত্র দুটো। তার একটা আবার আজকের দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজে। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকায় কখনো তিন অঙ্কে পৌঁছতে পারেননি। ইংল্যান্ডে শতরান করলেন ২০২১ সালে পৌঁছে। পাঁচ টেস্টের ওই সিরিজটা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছিল। কোভিড বিধি মানা হয়েছে না হয়নি, আইপিএল খেলার তাড়া আছে না নেই – এই নিয়ে এক আশ্চর্য বিতর্কে বিরাট-শাস্ত্রীর দল দেশে ফেরত চলে আসে শেষ টেস্ট না খেলেই। পরের বছর ফেরত যায় পঞ্চম টেস্ট খেলতে এবং হেরে বসে। কিন্তু বলার কথাটা হল, ওই সিরিজেও বারবার ভারত ব্যাটিং বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। হেডিংলির তৃতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৭৮ অল আউট হয়ে গিয়েছিল, ওভালে চতুর্থ টেস্টের প্রথম ইনিংসেও ২০০ পেরোতে পারেনি।

টেস্ট ক্রিকেটে রোহিতের শুরুটা নিঃসন্দেহে সাড়া জাগিয়ে হয়েছিল। অভিষেকে ইডেন উদ্যানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ১৭৭, পরের টেস্টে ওয়াংখেড়েতেও শতরান। তবে দুটোই ছ নম্বরে ব্যাট করে। তারপর দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছেই কিন্তু দেখা গেল রোহিত অকুল পাথারে পড়েছেন। জোহানেসবার্গ আর ডারবানের চারটে ইনিংসে দুবার বোল্ড, একবার এলবিডব্লিউ। পরের দেড় বছরে নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ঘুরে তিনি মাত্র চারটে অর্ধশতরান করেন। তৃতীয় টেস্ট শতরান আসে ২০১৭ সালে নাগপুরে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে। অন্য কেউ হলে ততদিনে দল থেকে বাদ পড়ে যেতেন। কিন্তু ভারতের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের সকলেই রোহিতের ‘ট্যালেন্ট’ সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। তার উপর সাদা বলের ক্রিকেটে, বিশেষত আইপিএলে, তিনি ততদিনে তারকা। ফলে দামি ব্র্যান্ড হয়ে গেছেন। উপরন্তু ধোনি শিখিয়েছিলেন ‘ইনটেন্ট’ নামক একটা পবিত্র জিনিস ব্যাটিংয়ে থাকতেই হবে। শাস্ত্রী আর বিরাটও মনে প্রাণে তা বিশ্বাস করতেন। ওটা না থাকার যুক্তিতে পূজারা, রাহানেকে বারবার বাদ দিয়েছেন। রোহিতের জিনিসটা ছিল। তাই তিনি অপরিহার্য।

যা-ই হোক, ২০১৭ সালের সেই শ্রীলঙ্কা সিরিজটায় রোহিত আরও দুটো অর্ধশতরান করেন। তারপর কিন্তু আবার খরা। সেবছর আর একটামাত্র অর্ধশতরান করেন বছরের শেষ টেস্টে মেলবোর্নে। তাঁকে দিয়ে যে চলবে না তার এর থেকে বেশি প্রমাণের দরকার হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যিনি ব্র্যান্ড এবং যাঁর ট্যালেন্ট আর ইনটেন্ট আছে তাঁকে তো যে করেই হোক দলে রাখতে হবে। অতএব নতুন বছরে রোহিত হয়ে গেলেন ওপেনার। তখন ভারত সফরে এসেছে ভাঙাচোরা দক্ষিণ আফ্রিকা। সে দলে আন্তর্জাতিক মানের বোলার বলতে কাগিসো রাবাদা। অ্যানরিখ নর্খের সবে প্রথম সিরিজ। রোহিত প্রথম টেস্টের দুই ইনিংসেই বেধড়ক পিটিয়ে শতরান করলেন। দ্বিতীয় টেস্টে পুনেতে রান পাননি, রাঁচিতে পৌঁছেই একেবারে ২১২। আর পায় কে? বলা শুরু হয়ে গেল, একদিনের ক্রিকেটের মত টেস্টেও উনি বিশ্বসেরা ওপেনার। এমন আর দুটো হয় না। দুঃখের বিষয়, রোহিতের এরপরের রানের বহর কিন্তু সেকথা বলছে না। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে দুটো টেস্টে সর্বোচ্চ রান ২১। অতিমারী পেরিয়ে যখন আবার টেস্ট খেললেন অস্ট্রেলিয়ায়, চারটে ইনিংসে একবার ৫০ পেরোলেন। দেশে ফিরে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সাত ইনিংসে একটা বড় শতরান আর একটা অর্ধশতরান। তারপর থেকে কেবলই মাঝেমধ্যে একটা শতরান বা গোটা দুয়েক অর্ধশতরানের কাহিনি। বাকিটা ব্যর্থতার গল্প।

গত এক বছরে রোহিতকে দেখে মনে হয়, তিনিও জানেন যে বয়সের কারণে তাঁর লম্বা ইনিংস খেলার ক্ষমতা কমেছে। রিফ্লেক্স তো কমেছেই। অতএব তিনি এখন ঠিক করে নিয়েছেন অনেক বেশি ঝুঁকি নেবেন, তাতে যা রান হয়। এই পরিকল্পনা টি টোয়েন্টি এবং একদিনের ক্রিকেটে কার্যকরী, কারণ সাদা বল সুইং করে লাল বলের চেয়ে কম এবং ফিল্ডিং দলও অনেক বেশি রক্ষণাত্মক ফিল্ড সাজাতে বাধ্য। উপরন্তু নিজের দলের পক্ষেও এই কৌশল উপকারী। গতবছর ভারতের বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছবার পিছনে রোহিতের ঝোড়ো ইনিংসগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু ও জিনিস টেস্টে ভাল বোলিংয়ের বিরুদ্ধে যে চলবে না তা নিউজিল্যান্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। এমনকি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও ওই কৌশল খাটেনি। চারটে ইনিংসে রোহিতের সর্বোচ্চ রান ছিল ২৩। এ যদি মাঝারিয়ানা না হয়, তবে মাঝারিয়ানা বলে কাকে? কোনো দলের ওপেনার তথা অধিনায়ক এত মাঝারি হলে সে দলের কপালে অনেক দুঃখ। সেই ধোনির আমল থেকে শাস্ত্রী বুক ফুলিয়ে বলে গেছেন, এই দলটা নাকি ভারতের সেরা সফরকারী দল। অথচ এই আমলে না নিউজিল্যান্ডে সিরিজ জেতা হয়েছে, না ইংল্যান্ডে – যা অতীতে একাধিক ভারতীয় দল করে দেখিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ধোনির দল অন্তত একবার সিরিজ ড্র রেখে আসতে পেরেছিল। কোহলির দল দুবার সুযোগ পেয়ে সেটুকুও করতে পারেনি। এমন নড়বড়ে ওপেনার থাকলে পারা প্রায় অসম্ভব। অথচ ঘরোয়া ক্রিকেটে সাই সুদর্শন বা অভিমন্যু ঈশ্বরনরা যতই রান করুন, তাঁদের দলে নেওয়া যাবে না। রোহিতের মত ব্র্যান্ডের মূল্য কি আর রান দিয়ে মাপা চলে?

আরও পড়ুন বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

বিরাট কিন্তু মাঝারিয়ানায় রোহিত-সুলভ নন। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর শুরুটা রোহিতের মত হয়নি। টেস্ট জীবনের প্রথম বারোটা ইনিংসে দেশের মাঠে দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দুটো অর্ধশতরান ছাড়া বলার মত কিছুই ছিল না। ২০১১-১২ মরশুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রথম দুটো টেস্টে রান করতে না পেরে প্রায় বাদ পড়ে গিয়েছিলেন। পার্থ টেস্ট ছিল শেষ সুযোগ। সেখানে দুই ইনিংসেই রান করেন, পরের টেস্টে অ্যাডিলেডে প্রথম শতরান। তারপর থেকে সাফল্যের লেখচিত্র ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছিল। এটা পরিসংখ্যানের যুগ, সোশাল মিডিয়ার যুগ। তরুণ ক্রিকেটপ্রেমীরা মনে করেন ক্রিকেটারদের উৎকর্ষ, অপকর্ষ পুরোটাই স্কোরবোর্ডে আর ডেটা অ্যানালিটিক্সে ধরা থাকে। নেভিল কার্ডাস লিখেছিলেন – স্কোরবোর্ড একটা গাধা। আমাদের দেশে তাঁর এমন কোনো উত্তরসূরি নেই যিনি ধরিয়ে দেবেন, যে স্কোরবোর্ড একেবারে গাধা না হলেও তার দৈর্ঘ্য প্রস্থের সীমাবদ্ধতা আছে। ক্রিকেট খেলার মানবিক প্রয়াসের দিকটার অনেককিছুই স্কোরবোর্ডের পরিসরে ধরা পড়ে না। ফলে গোটা কেরিয়ারে অস্তগামী মিচেল জনসন ছাড়া একজনও সারাক্ষণ ৯০ মাইল+/ঘন্টার বোলারকে না খেললেও, নাথান লায়ন ছাড়া কোনো উঁচু দরের স্পিনারকে খেলতে না হলেও বিরাটকে ভিভিয়ান রিচার্ডস, শচীন, রিকি পন্টিংদের পাশে বসানো হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞাপন জগৎ বুদ্ধিমানের মত সর্বকালের সেরার (GOAT) মুকুটও সোশাল মিডিয়ার সাহায্যে বিরাটের মাথায় পরিয়ে দিয়েছিল।

খেয়াল করা হয়নি, যে কোনো ব্যাটারের অন্যতম কঠিন পরীক্ষাগার ইংল্যান্ডে বিরাট একাধিকবার সফরে গিয়েও মূলত অসফল। সতেরোটা টেস্ট খেলে মাত্র দুটো শতরান, গড় মাত্র ৩৩.২১। আসলে বিরাটের সাফল্যকে বিরাটতর করে তুলেছিল তিনটে জিনিস – ১) একদিনের ক্রিকেটে শতরান করে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় শচীনের রেকর্ডকে ধাওয়া করা, ২) ২০১৩-১৪ মরশুমের অস্ট্রেলিয়া সফরের অপ্রতিরোধ্য ফর্ম থেকে শুরু করে বছর পাঁচেক টেস্টে রানের বন্যা, ৩) এই সময়কালে তাঁর অধিনায়কত্বে যশপ্রীত বুমরা, মহম্মদ শামি, অশ্বিন-জাদেজার কল্যাণে দেশ বিদেশে শচীন, রাহুল দ্রাবিড়দের যুগের চেয়ে ভারতের বেশি ম্যাচ জেতা। লোভনীয় ব্র্যান্ডকে সে যত বড় তার চেয়েও বড় করে দেখানোর যে প্যাঁচ পয়জার চলে এবং এখনো চলছে তা নিয়ে আর আলাদা করে বলব না, কারণ তা পৃথক আলোচনা দাবি করে। সে আলোচনা আগেই করেছি এই লেখায়। কিন্তু ঘটনা হল, বিরাটের সমকক্ষ অন্তত তিনজন ব্যাটার যে তাঁর নিজের প্রজন্মেই রয়েছেন – সেকথাকে পাত্তা না দিয়ে বিরাটকে আকাশে তুলে দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে তাঁর দ্রুত পতন হয়েছে গত ৫-৬ বছরে। আগেই বলেছি, নয়ের দশকের পর থেকে অন্তত ৫০ গড় না হলে আর বিশ্বসেরাদের দলে ঢোকার ছাড়পত্র পাওয়া যায় না। সর্বকালের সেরা হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। বিরাটের গড় এখন নামতে নামতে ৪৭.৮৩। নিজের প্রজন্মের প্রতিদ্বন্দ্বী জো রুট প্রায় ১৩,০০০ রান করে ফেলেছেন, গড় ৫১.০১। স্টিভ স্মিথও অতিমারীর আগের ফর্মে নেই, তবু তাঁর গড় ৫৬.৯৭ – এখনো অসাধারণ। মোট রানের দিক থেকে একমাত্র কেন উইলিয়ামসনই এখনো বিরাটের থেকে পিছিয়ে, তবে তিনি ম্যাচও খেলেছেন কম। গড় যেহেতু ৫৪.৪৮, তাই বিরাটকে টপকে যাওয়া সময়ের অপেক্ষা।

তবে এসব পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় কথা হল, সেই ২০১৯ সালের নভেম্বরে ইডেন উদ্যানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শতরান করার পর থেকে বিরাটের ফর্ম সেই যে পড়তে শুরু করেছে, সে পতন থামছে না। তার ফল ভুগছে দল। ওই শতরানের পর থেকে ৩৪ খানা টেস্টের ৬০ ইনিংসে তিনি মাত্র ১৮৩৮ রান করেছেন ৩১.৬৮ গড়ে। শতরান মাত্র দুটো, অর্ধশতরান নটা, পাঁচবার শূন্য রানে আউট হয়েছেন। উপরন্তু প্রমাণ হয়ে গেছে যে ঘূর্ণি উইকেটে সাধারণ স্পিনারদের মাথায় চেপে বসার ক্ষমতাও তাঁর নেই। তাইজুল ইসলাম থেকে মিচেল স্যান্টনার – সবাই বিরাটের পক্ষে একইরকম দমবন্ধ করা, বিপজ্জনক। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাদা বলের ক্রিকেটেও তাঁকে বেঁধে রাখতে স্পিনারদের ব্যবহার করা শুরু করেছে দলগুলো। সুইং সামলাতেও যে বিরাট তেমন দড় নন তা তাঁর ইংল্যান্ডের রেকর্ড প্রমাণ করে। আজকাল তো দেশের মাঠেও ঘেমে উঠছেন বেঙ্গালুরুর মত। এই বয়সে শচীন কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ডেল স্টেইন আর মর্নি মর্কেলের বিরুদ্ধে তিনটে টেস্টে দুটো শতরান করেছেন। সুনীল গাভস্কর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জীবনের শেষ টেস্টে এমন একটা ইনিংস খেলেছেন, যাকে বলা হয় ঘূর্ণি পিচে স্পিন খেলার টিউটোরিয়াল।

সোজা কথা হল, যেরকম ব্যর্থতার কারণে পূজারা আর রাহানেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেরকম ব্যর্থতা সত্ত্বেও বিরাট আর রোহিত এখনো নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছেন। কারণ তাঁদের মাঝারিয়ানা কেউ স্বীকার করবে না। বিশেষজ্ঞরা কেন বলছেন না? সাংবাদিকরা কেন লিখছেন না? কারণ কিন্তু এটা নয় যে ভবিষ্যতের কথা কেউ বলতে পারে না, দুই হুজুর অস্ট্রেলিয়ায় ফের রান করে দিতে পারেন। সে তো পারেনই, কিন্তু তাতে তো গত ৫-৬ বছরের টানা ব্যর্থতা মিথ্যে হয়ে যাবে না। কিন্তু ওই যে – ব্র্যান্ড মূল্য। টিভি খুললে, ওটিটি চালালে কতশত বিজ্ঞাপনে দুজনকে দেখতে পান তা খেয়াল করবেন। ক্রিকেট খেলা ভারতে যত বড় ব্যবসা, পৃথিবীর আর কোনো দেশে তত বড় নয়। ফলে অত্যন্ত মাঝারি রাহুলকে (৫৩ টেস্ট খেলে ফেলার পর গড় ৩৩.৮৭) যেনতেনপ্রকারেণ দলে রাখার চেষ্টার পিছনেও এনডর্সমেন্ট। এঁরা খেললে এঁদের বিজ্ঞাপন দেখানোর মানে থাকবে। থাকলে বিজ্ঞাপনদাতাদের টাকায় বিসিসিআইয়ের সঙ্গে যে সম্প্রচারের চুক্তি করেছে টিভি/ওটিটি নেটওয়ার্ক, তা উসুল হবে।

উপরন্তু ভারতের মাটিতে ভারতীয় দলের ম্যাচগুলোর প্রযোজনার দায়িত্বে থাকে বিসিসিআই নিজে। নিজেদের ব্র্যান্ড সম্পর্কে মন্দ কথা তারা মেনে নেবে না। অতএব ভারতীয় ক্রিকেটারদের দোষগুণ নিয়ে নির্মোহ আলোচনা করলে ধারাভাষ্যকারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে দেবে। সম্প্রচার সংস্থাকেও বাধ্য করতে পারে তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কাউকে বাদ দিতে। সে তিনি যত বড় বিশেষজ্ঞই হোন। টাকার পাহাড়ে বসে থাকা নিয়োগকর্তা বিসিসিআইয়ের কাছে গাভস্কর আর মুরলী কার্তিকের দর একই। তার উপর সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ট্রোলবাহিনী লেলিয়ে দেওয়ার কায়দাও আজকের ক্রিকেটারদের জানা আছে। সেভাবেও ধারাভাষ্যকারদের ভাতে মারা যায়। ব্যাপারটা একবার টের পেয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে, আরেকবার সঞ্জয় মঞ্জরেকর। এই কারণেই ২০১৩ সালে ইয়ান চ্যাপেল ভারতে ধারাভাষ্য দেওয়ার চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন

আরেকটা কারণ হল খারাপ দৃষ্টান্ত। এই দৃষ্টান্ত তৈরি করে দিয়ে গেছেন পৃথিবীর সর্বকালের সেরা দুজন ক্রিকেটার – শচীন আর ধোনি। ২০১১ সালের ২ এপ্রিল বিশ্বকাপ জেতার পর বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে ভারতীয় দল পরপর আটটা টেস্টে হারে। স্পষ্ট বোঝা যায়, যাঁরা আছেন তাঁদের দিয়ে আর চলবে না। অথচ একমাত্র দ্রাবিড় আর ভাঙ্গিপুরাপ্পু ভেঙ্কটসাই লক্ষ্মণ ছাড়া কেউ এই সত্য মেনে নিলেন না। ওঁরা দুজন অবসর নিলেন, শচীন রয়ে গেলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শততম শতরান আর দুশোতম টেস্ট খেলার রেকর্ড করার জন্যে। উইকেটরক্ষক ব্যাটার হিসাবে, অধিনায়ক হিসাবে ব্যর্থ ধোনিকে বাঁচিয়ে দিলেন তাঁর গডফাদার এন শ্রীনিবাসন। শচীন বহাল তবিয়তে ২০১৩ পর্যন্ত খেলে গেলেন আর ধোনি অধিনায়কত্ব চালিয়ে গেলেন ২০১৩-১৪ অস্ট্রেলিয়া সফর পর্যন্ত। তারপর টেস্ট সিরিজের মাঝখানে দুম করে অবসর নিলেন।

যাঁরা আট টেস্টে হারের পরেও ধোনিকে রেখে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন, তাঁরা সেইসময় বলতেন ‘এখন ছাড়লে ক্যাপ্টেন হবে কে?’ সত্যিই তেমন কেউ ছিলেন না, কারণ প্রজন্ম বদলের কোনো পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়নি বোর্ড। তাই ধোনি বহাল তবিয়তে যতদিন ইচ্ছা খেলে যেতে পেরেছিলেন। এখন ভারতীয় ক্রিকেট ফের সেই জায়গায় এসে পৌঁছেছে। যে রাহুলকে বছর দুয়েক আগে ভবিষ্যৎ অধিনায়ক বলে ভাবা হচ্ছিল, তিনি এখন দলে নিজের জায়গা ধরে রাখতেই খাবি খাচ্ছেন। ‘এ’ দলের হয়ে খেলতে নেমেও হাস্যকর কায়দায় আউট হচ্ছেন। গিল ধারাবাহিকতা হারিয়েছেন, পন্থ প্রতিভাবান কিন্তু এখনই নেতৃত্ব দিতে কি তৈরি? কেউ নিশ্চিত নয়।

অর্থাৎ গত এক যুগে এত জয় সত্ত্বেও ভারতীয় ক্রিকেট যে তিমিরে সেই তিমিরেই আছে। ব্র্যান্ড সর্বস্বতা, বিশেষত মাঝারিয়ানা সর্বস্বতা, এভাবেই প্রগতি আটকায়।

সমস্ত পরিসংখ্যান ক্রিকইনফো থেকে

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য আরও আঘাত অপেক্ষা করছে

একজন-দুজন নয়, গোটা ক্লাসই ফেল। এরপরেও রোহিত বুক ফুলিয়ে বললেন, কাটাছেঁড়া করার দরকার নেই।

মনে করুন আপনি একটা ক্লাসের ক্লাস টিচার। আপনার ক্লাসের সবকটা ছাত্রছাত্রী বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করেছে। হেডমাস্টার আপনার কাছে কৈফিয়ত চাইলেন। আপনি বললেন “এ নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। এতবছর তো সবাই পাস করেছে। একদিন তো এই রেকর্ড ভাঙতই, না হয় এবছরই ভাঙল।” কী ফল হবে? স্কুল বেসরকারি হলে চাকরিটি যাবে। সরকারি স্কুলে তা হবে না, কিন্তু বিলক্ষণ গালমন্দ হজম করতে হবে। ঘটনা হল, নিউজিল্যান্ডের কাছে একটা টেস্ট বাকি থাকতেই সিরিজ হেরে যাওয়ার পরে ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা প্রায় এই কথাগুলোই বলেছেন।

বলেছেন, এত কাটাছেঁড়া করার কী আছে? বারো বছর পরে একটা সিরিজ (ঘরের মাঠে) তো দল হারতেই পারে। যা চেপে গেছেন, তা হল দল সমানে সমানে লড়াই করে হারেনি, ল্যাজেগোবরে হয়েছে। প্রথম টেস্টের প্রথম দিনে ভিজে আবহাওয়ায় বল সুইং করতেই রোহিত বাহিনী ৪৬ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে ঋষভ পন্থ আর সরফরাজ খান দুর্দান্ত ব্যাটিং করায় ইনিংস হার বেঁচেছে। পুনের দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে স্পিনারদের পিচেও দেড়শো রানেই জারিজুরি শেষ। দ্বিতীয় ইনিংসেও যশস্বী জয়সোয়াল ছাড়া সব ব্যাটার ব্যর্থ। নিচের দিকে রবীন্দ্র জাদেজা কিছু রান না করলে আবার দুশোর নিচে ইনিংস গুটিয়ে যেত। শুধু কি তাই? প্রথম টেস্টে জোরে বোলিং সহায়ক পিচকে বুঝতে ভুল করে তিন স্পিনারে খেলা হল। ফলে আবহাওয়া যেমনই থাকুক, টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া ছাড়া উপায় রইল না। ওদিকে এখনই যাঁকে কপিলদেবের চেয়েও ভাল বলা শুরু হয়ে গেছে, সেই যশপ্রীত বুমরা ওই পিচে বিশেষ কিছু করতে পারলেন না। আরেক ‘গোট’ (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম) রবিচন্দ্রন অশ্বিনকেও নির্বিষ দেখাল। জাদেজা আর কুলদীপ যাদব তিনটে করে উইকেট নিলেন বটে, কিন্তু নিউজিল্যান্ড চারশো রান তুলে ফেলল। দ্বিতীয় টেস্টেও ভারতের আটশোর বেশি উইকেট নিয়ে ফেলা ‘রবি-অ্যাশ’ জুটি ব্যর্থ। এক ব্যাগ অভিজ্ঞতা নিয়ে, ওয়াশিংটন সুন্দর আর মিচেল স্যান্টনারের বোলিং দেখেও, তাঁরা বুঝেই উঠতে পারলেন না যে এই পিচে আস্তে বল করতে হবে। জোরে জোরে বল করে লাভ নেই। বুমরা এখানেও রিভার্স সুইং-টুইং করাতে পারলেন না। মানে একজন-দুজন নয়, গোটা ক্লাসই ফেল। এরপরেও রোহিত বুক ফুলিয়ে বললেন, কাটাছেঁড়া করার দরকার নেই।

আসলে রোহিত জানেন, তিনি যে ক্রিকেট বোর্ডের কর্মচারী তারা টাকা দিয়ে কিনে রেখেছে যাদের কাটাছেঁড়া করা কাজ তাদের এক বড় অংশকে। প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার আর সাংবাদিকদের কথা বলছি। আরেকটা অংশ ভয়েই চুপ করে থাকবে। কারণ সত্যি কথা বলে/লিখে ফেললে ক্রিকেট বোর্ড ধারাভাষ্যের চুক্তি থেকে বাদ দিয়ে দেবে বা আর মাঠে ঢুকতে দেবে না। হাতে না মেরে ভাতে মারা যাকে বলে আর কি। রোহিত নির্ভুল আন্দাজ করেছেন। একই দিনে পাকিস্তানে, অর্থাৎ বিদেশের মাঠে, ইংল্যান্ডের হারের পর নাসের হুসেন, মাইকেল আথারটনরা চুলচেরা সমালোচনা করছেন বেন স্টোকসের দলের। অন্যদিকে সুনীল গাভস্কর, রবি শাস্ত্রী, সঞ্জয় মঞ্জরেকর, অনিল কুম্বলেরা ‘আহা! ওরা তো খারাপ খেলোয়াড় নয়। খেলায় হার জিত তো আছেই। ঘরের মাঠে টানা ১২ বছর, ১৮ খানা সিরিজ জিতেছে। সেটা তো মনে রাখতে হবে’ – এই জাতীয় কথাবার্তা বলছেন। বেশ, ওঁদের কথাও থাক। অত বড় ক্রিকেটারদের তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই ১২ বছর অপরাজিত থাকার রেকর্ডটা নিয়েই বরং কাটাছেঁড়া করা যাক।

ভারত কি কোনোদিন ঘরের মাঠে দুর্বল দল ছিল, বা মাঝেমধ্যেই এর তার কাছে সিরিজ হারত? সোজা উত্তর – না। এই শতাব্দীর ইতিহাসে ২০১২ সালে অ্যালাস্টেয়ার কুকের ইংল্যান্ডের আগে ভারত শেষ সিরিজে হেরেছিল আরও আট বছর আগে, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট-রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার কাছে। অর্থাৎ আড়াই দশকে মোটে চারটে সিরিজ হার। তার আগের সিরিজ হার ছিল ২০০০ সালে, হ্যানসি ক্রোনিয়ের দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। আর গত শতকের ইতিহাস?

অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। সেই অস্ট্রেলিয়া ২০০৪-০৫ মরশুমের ওই জয়ের আগে ভারতে শেষ জিতেছিল ১৯৬৯-৭০ সালে। ইংল্যান্ডের ভারতের মাঠে কুকের দলের আগে শেষ সিরিজ জয় ছিল ১৯৮৪-৮৫ মরশুমে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ দেশে এসে শেষবার সিরিজ জিতেছে ১৯৮৩-৮৪ মরশুমে। শ্রীলঙ্কা আজ পর্যন্ত জেতেনি, নিউজিল্যান্ড যে আগে কখনো জেতেনি তা তো এখন সকলেই জানেন। তারা শেষবার এ দেশে একটা টেস্ট ম্যাচই জিতেছিল সেই ১৯৮৮ সালে, তাও ১৯৬৯ সালের পর প্রথমবার। এমনকি পাকিস্তান, যাদের সঙ্গে আমাদের আবহাওয়া এবং পিচের চরিত্র সবচেয়ে বেশি মেলে, তারাও ১৯৫২-৫৩ থেকে ২০০৭-০৮ পর্যন্ত ভারত সফরে এসে সিরিজ জিততে পেরেছিল মাত্র একবার – ১৯৮৬-৮৭ মরশুমে। সুতরাং ভারত চিরকালই নিজের দেশে বাঘ। কোহলি, রোহিতরা নতুন কিছু করেননি। বস্তুত, সব দলই নিজের দেশে বাঘ। তাই যে কোনো টেস্ট দলেরই উৎকর্ষ বিচার করা হয় বিদেশে তারা কেমন তাই দিয়ে। অজিত ওয়াড়েকরের ভারতীয় দল শ্রদ্ধেয়, কারণ ১৯৭১ সালে তারা ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং ইংল্যান্ডে সিরিজ জিতেছিল। সৌরভ গাঙ্গুলির দল ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে চিরকাল উঁচু জায়গায় থাকবে, কারণ তারা নিয়মিত বিদেশে টেস্ট ম্যাচ জেতা শুরু করেছিল। গত এক দশকে কোহলির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের কলার তোলার মত সাফল্যও দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা। দেশের মাঠে একের পর এক দলকে দুরমুশ করা নয়।

আরও পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে

এর সঙ্গে আরেকটা কথা না বললেই নয়, যা এক পডকাস্টে বলে বিস্তর ট্রোলড হয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে। কথাটা হল, গত ১০-১২ বছরে টেস্ট ক্রিকেট সম্ভবত খেলাটার ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। ২০১১ বিশ্বকাপের পর থেকে ধাপে ধাপে অবসর নিলেন শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের মহীরুহরা। ছোট্ট দেশে চট করে সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেটার পাওয়া শক্ত, ফলে দলটা একেবারে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক কারণে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলেনি। মাঝেমধ্যে এক-আধটা অঘটন ছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজও অতি দুর্বল হয়ে পড়েছে এইসময়। ওখানে বাস্কেটবল, বেসবলের দিকেই বেশি ধাবিত হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বিপদে পড়েছিল কালো মানুষদের জন্য সংরক্ষণ নীতির প্রভাবে বহু ক্রিকেটার দেশত্যাগ করায়। অর্থাৎ ভাল মানের আন্তর্জাতিক দল ছিল ভারতকে নিয়ে বড়জোর চারটে। সুতরাং ১২ বছর দেশে হারিনি – এই নিয়ে উদ্বাহু না হয়ে বরং মনে রাখা ভাল, এই যুগেও কিন্তু আমরা দক্ষিণ আফ্রিকাকে ও দেশে হারাতে পারিনি, ইংল্যান্ডে সিরিজ জিততে পারিনি, নিউজিল্যান্ডেও নয়। এমনকি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শুধু ফাইনালটা ইংল্যান্ডে হতেই পরপর দুবার হেরে বসেছি।

বাংলাদেশকে দুদিনে হারিয়েছি বলে পেশি ফোলানোর ফল এই সিরিজে দেখা যাচ্ছে। এখনো ভুল কারণে নাচানাচি চালু রাখলে অদূর ভবিষ্যতে আরও আঘাত পেতে হবে। অবশ্য সেটা প্রায় অনিবার্য। কারণ এই সিরিজ ৩-০ হারলে, এমনকি আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সফরে ৫-০ হারলেও, কিছু বদলানোর আশা কম। কারণ ২০১১-১২ মরশুমে পরপর আটটা টেস্ট হারার পরেও মহেন্দ্র সিং ধোনির অধিনায়কত্ব যায়নি, শচীনকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়নি। ফলাফলকে সেদিনই গুরুত্বহীন করে দেওয়া হয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদ কাগজে প্রকাশিত

হিন্দুরাষ্ট্রের ক্রিকেট দলের কোচ হিসাবে গম্ভীর সেরা পছন্দ

২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন।

ভালমানুষ রাহুল দ্রাবিড় আর পেরে উঠছেন না। তাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড পুরুষদের জাতীয় দলের নতুন কর্ণধারের খোঁজ করছে। শোনা যাচ্ছে বোর্ড একজন শাঁসালো কোচ চায়। স্টিফেন ফ্লেমিংকে নাকি মহেন্দ্র সিং ধোনি রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। রিকি পন্টিংকে নাকি বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি রাজি নন। জাস্টিন ল্যাঙ্গারও রাজি হচ্ছেন না বলে শোনা যাচ্ছে। এসব অবশ্য নেহাত গুজব বলে বিবৃতি দিয়েছেন বোর্ডের সর্বেসর্বা জয় শাহ। তবে গৌতম গম্ভীরের নাম যে উঠে এসেছে, এই প্রচার সম্পর্কে কিছু বলেননি। এই কাজের জন্যে ওই নামটি কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক।

গৌতম সত্যিই গম্ভীর। তাঁকে চট করে হাসতে দেখা যায় না। সম্প্রতি রবিচন্দ্রন অশ্বিনের পডকাস্টে এসে গৌতম বলেছেন ‘লোকে আমার হাসি দেখতে আসে না। আমার জয় দেখতে আসে।’ ফুর্তিবাজ রবি শাস্ত্রীর সঙ্গে এতবছর ঘর করার পরে রোহিত শর্মা, বিরাটরা কি এত গম্ভীর লোকের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারবেন? গুরুতর প্রশ্ন।

গম্ভীরের কথা উঠলেই এসে পড়ে বিরাটের কথাও। দুজনেই দিল্লির ছেলে। শুধু জাতীয় দল নয়, রঞ্জি দলেও একসঙ্গে খেলেছেন। কিন্তু সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়। প্রাক্তন ক্রিকেটারদের যে কজন আজও বিরাটের ব্যাটিংয়ের সমালোচনা করার সাহস দেখান, গম্ভীর তাঁদের একজন। গতবছর আইপিএলে গম্ভীরের তখনকার দল লখনৌ সুপার জায়ান্টস আর বিরাটের রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর ম্যাচের পর তো হাতাহাতির উপক্রম হয়েছিল। ভারতীয় ক্রিকেটের বর্তমান মহাতারকার সঙ্গে এমন সম্পর্ক যাঁর, তিনি কী করে দল চালাবেন? কুম্বলের সময়ে  অবশ্য বিরাট অধিনায়ক ছিলেন, এখন সে ঝামেলা নেই। কিন্তু এই প্রজন্ম তো আবার সৌরভ গাঙ্গুলিদের প্রজন্ম নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাত্র হাজার নয়েক রানের মালিক জন রাইট তাঁর ইন্ডিয়ান সামার্স বইয়ে লিখেছেন, ভারতীয় দলের কোচ থাকার সময়ে তিনি একবার খারাপ শট খেলে আউট হওয়ার জন্যে রাগের চোটে বীরেন্দ্র সেওয়াগের কলার ধরেছিলেন, মারতে গিয়েছিলেন। অথচ সেই ঘটনা দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার বহুবছর পরে রাইট নিজেই লেখার আগে কেউ জানতেও পারেনি। আজ এর অর্ধেক ঘটলেও সোশাল মিডিয়ায় ‘সূত্রের খবর’ বলে ঘটনাটা ভাইরাল হবে, বোর্ড বিবৃতি দেবে এমন কিচ্ছু ঘটেনি। কিন্তু কোচের চাকরিটি চলে যাবে।

গম্ভীর যে কোচ হওয়ার যোগ্য তাতে সন্দেহ নেই। ২০০৭ আর ২০১১ – দুই ধরনের ক্রিকেটে ভারতের দুই বিশ্ব খেতাব জয়েই তাঁর বড় অবদান ছিল। দুটো ফাইনালেই তিনি সর্বোচ্চ রান করেন। আটান্নটা টেস্ট ম্যাচেও তাঁর কীর্তি ফেলে দেওয়ার মত নয়। আর কিচ্ছু না করে শুধু যদি ২০০৯ সালে নিউজিল্যান্ডের নেপিয়ারে এগারো ঘন্টা ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচানো ইনিংসটাই খেলতেন, তাহলেও তাঁর নাম ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে লেখা থাকত। তার উপর তিনি দুবার কলকাতা নাইট রাইডার্স অধিনায়ক হিসাবে আইপিএল খেতাব জিতেছেন। লখনৌ সুপার জায়ান্টস তাঁর মেন্টরশিপে আইপিএলে যোগ দিয়েই শেষ চারে পৌঁছেছিল। ফলে দল চালানোর ক্ষমতা যে তাঁর আছে, তা নিয়েও সংশয় নেই।

কিন্তু ভারতীয় দল আর পাঁচটা দলের চেয়ে আলাদা। অস্ট্রেলিয় ল্যাঙ্গার অতশত বোঝেন না। তিনি সরল মনে সংবাদমাধ্যমকে বলে বসেছেন, কে এল রাহুল নাকি তাঁকে বলেছেন – আইপিএলের দলে যদি চাপ আর রাজনীতি আছে বলে মনে করো, সেটাকে হাজার দিয়ে গুণ করলে তবে ভারতীয় দলের কোচিং কীরকম চাপের সেটা বুঝতে পারবে। তাই ল্যাঙ্গার ঠিক করেছেন ও কাজ তাঁর জন্যে নয়।

বলে ফেলার জন্যে রাহুলের হয়ত গর্দান যাবে, কিন্তু কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। প্রসিদ্ধ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পত্রিকা উইজডেন-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায় বর্ষীয়ান সাংবাদিক শারদা উগ্রা ‘মোদী অপারেন্ডি: দ্য পলিটিসাইজেশন অফ ইন্ডিয়ান ক্রিকেট’ শীর্ষক নিবন্ধে সবিস্তারে লিখেছেন, কীভাবে ক্রিকেট বোর্ডকে বিজেপি দলের একটা ইউনিটে পরিণত করা হয়েছে। ২০২৩ বিশ্বকাপকেও কীভাবে বিজেপির স্বার্থে চালানো হচ্ছিল। সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা – ২০২৩ বিশ্বকাপে পাকিস্তান ম্যাচে নীল জার্সির বদলে সম্পূর্ণ গেরুয়া জার্সি পরতে বলা হয়েছিল ভারতীয় দলকে। কিন্তু ক্রিকেটাররা বেঁকে বসেন। কেন? শারদা দুটো সূত্র থেকে দুরকম খবর পেয়েছেন। একটা বলছে, ক্রিকেটাররা ওই জার্সি বাতিল করেন জার্সিটা হল্যান্ডের মত দেখতে বলে। দ্বিতীয়টা বলছে, ক্রিকেটাররা বলেন – এ কাজ আমরা করব না। এতে আমাদের দলের ক্রিকেটারদেরই অসম্মান করা হবে। কারণ ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ দৃশ্যতই হয়ে দাঁড়াবে হিন্দু বনাম মুসলমান ম্যাচ। অথচ ভারতীয় দলে আছেন মহম্মদ শামি আর মহম্মদ সিরাজ। অনেক পাঠকের হয়ত খেয়াল আছে, ওই গেরুয়া জার্সির ছবি সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিল। তখন বোর্ডের হিসাবরক্ষক বলেছিলেন, ওটা ভুয়ো। কিন্তু শারদা লিখেছেন, দল, ক্রিকেট বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক নিয়ামক সংস্থা আইসিসি – তিনটে সূত্র থেকে তিনি খবর পেয়েছেন যে এমন পরিকল্পনা সত্যিই নেওয়া হয়েছিল।

আগামী ৪ জুন নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় ফিরলে হয়ত ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা জার্সির রং বদল আর আটকাতে পারবেন না। এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়, গম্ভীরই দ্রাবিড়ের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার উপযুক্ত লোক। কারণ তিনি ‘মোদী কা পরিবার’-এর গর্বিত সদস্য, বিদায়ী লোকসভায় বিজেপি সাংসদও ছিলেন। জাতীয় ক্রিকেট দলের লাগাম নিজেদের হাতে রাখতে গেলে মোদীর তো গম্ভীরকেই দরকার। যদি মোদী ক্ষমতায় না ফেরেন তাহলে গম্ভীরের গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে। কারণ একটা নির্বাচনে হার হলেই দেশের জন্যে মোদীর এক হাজার বছরের পরিকল্পনার পরিসমাপ্তি ঘটবে না। ভারতীয় সংস্কৃতির সমস্ত অভিজ্ঞান শরীরে ধারণ করা ক্রিকেট দল যাতে বেপথু না হয়ে যায়, তার জন্যে তো গম্ভীরের মত নির্ভরযোগ্য লোককেই দরকার। ভুললে চলবে না, ২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন। এক সাংবাদিক দাহিয়াকে বলেছিলেন যে কাণ্ডটা দেখে ইনজামাম উল হকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান দলের মাঠেই নমাজ পড়ার মত হয়ে যাচ্ছে। দাহিয়া বলেছিলেন, মোটেই তা নয়। সূর্যপ্রণামটা নাকি ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। ওতে চাপ কমে, মন শান্ত হয়।

সরকার হাতে থাক আর না-ই থাক, এই ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন’ তো বজায় রাখতে হবে জাতীয় ক্রিকেট দলে। তার জন্যে গম্ভীরের চেয়ে উপযুক্ত আর কে আছে?

এই সময় কাগজে প্রকাশিত

কেন আমি আইপিএল নাস্তিক?

প্রতিবছর ঘটা করে নিলাম হয়, বাবুরা দাসী বাঁদি কেনার মত পছন্দের ক্রিকেটার কেনেন। খেলার সময়েও কেবল খেলা হয় না। গ্যালারিতে এবং আফটার পার্টিতে বলিউড সুন্দরীরা আসেন, মাঠের ধারে চিয়ারলিডার নাম দিয়ে স্বল্পবাস মেম নাচানো হয়।

সদ্য দ্বিতীয়বার বাবা হওয়া বিরাট কোহলি মাঠে নামার জন্যে মুখিয়ে আছেন। মহেন্দ্র সিং ধোনির নাকি ব্র্যাড পিট অভিনীত বেঞ্জামিন বাটনের মত বয়স বাড়ার বদলে কমছে। হার্দিক পান্ডিয়ার কাছে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের অধিনায়কত্ব হারানোয় রোহিত শর্মা কি রেগে আছেন, নাকি হালকা বোধ করছেন?

খবরের কাগজের খেলার পাতা থেকে সোশ্যাল মিডিয়া– সর্বত্র ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন এসব নিয়েই আলোচনা করছেন। কারণ শীত চলে যেতেই এসে পড়েছে ভারতীয় ক্রিকেটের বৃহত্তম রিয়েলিটি শো। পেশাগত বাধ্যবাধকতা সরে যাওয়ার পর থেকে আইপিএল দেখি টিভির চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে কখনও চোখে পড়ে গেলে দু-এক ওভার। উপরন্তু কাগজে, টিভিতে বা হাতের মোবাইলে শিরোনাম পেরিয়ে আইপিএলের খবরেও ঢুকি না। প্রশ্ন হচ্ছে, ক্রিকেটপ্রেমিক হয়েও আইপিএল দেখতে যাই না কেন? যুক্তিগুলো সাজানো যাক।

ক্রিকেটের কাঠিন্য নেইআছে আমোদ 

২০০৮ সালের প্রথম আইপিএলের সময়ে যে কাগজের ক্রীড়া সাংবাদিক ছিলাম, সেই কাগজের মালিক আইপিএলের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিরও মালিক ছিলেন। প্রথম খেলার দিনই মাঠে গিয়ে দেখি– অবাক কাণ্ড! বাউন্ডারির দড়ির বাইরে যতটা জায়গা পড়ে, তা একত্র করলে আরেকটা ছোটখাটো মাঠ হয়ে যায়। খেলা শুরু হতেই দেখা গেল, রোহিত শর্মা স্পিনারের বল চামচের মত করে পিছন দিকে তুলে দিলেও মাত্র একবার ড্রপ খেয়ে মাঠের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমাদের উপর কিন্তু কাগজের কর্তাদের কড়া নির্দেশ ছিল, বাউন্ডারি যে ছোট করে দেওয়া হয়েছে সেকথা কোনও কারণেই লেখা যাবে না।

গত দেড় দশকে অবশ্য এসব লুকোচুরি আর নেই। এখন সবাই জানে, ৫০ ওভারের খেলাতেও বাউন্ডারি ছোট করে ফেলা হয় চার-ছয়ের সংখ্যা বাড়াতে। স্বীকার্য যে, আজকাল এমন বড় বড় ছয় মারা হয় যে বল গিয়ে পড়ে গ্যালারিতে। তার কারণ ব্যাটগুলোর গঠন এবং ওজন, বাউন্ডারির দৈর্ঘ্য নয়। কিন্তু একইসঙ্গে লক্ষ করে দেখবেন, সীমানার ধারে রোমাঞ্চকর ক্যাচের সংখ্যা কত বেড়ে গিয়েছে। পৃথিবীর যে কোনও দেশে কুড়ি ওভারের লিগ চললেই প্রায় প্রতিদিন কোনও না কোনও ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে একজন ফিল্ডার অপূর্ব কায়দায় শূন্যে শরীর ছুড়ে দিয়ে বা অন্য একজন ফিল্ডারের সাহায্যে সীমানার বাইরে থেকে ফিরে ক্যাচ নিচ্ছেন। এমনটা সম্ভব হয় সীমানার বাইরে অনেকখানি জায়গা থাকে বলেই।

ইউটিউবে প্রাক-আইপিএল যুগের সাদা বলের ক্রিকেটই দেখুন– সীমানার পরে মাঠ শেষ। সেখানে এসব করতে গেলে ভারতীয় স্টেডিয়ামগুলোর গ্রিলে ধাক্কা খেতে হত। আরও লক্ষ করুন, বাউন্ডারি ছোট করে দেওয়ায় রানিং বিটুইন দ্য উইকেটসে কত কম শক্তি খরচ হচ্ছে ব্যাটারের। তিন রান প্রায় হয়ই না, কারণ ফিল্ডারের বল তাড়া করে চার আটকে বল ফেরত পাঠানোর অবকাশ কম। তার আগেই বল সীমানা পেরিয়ে যাবে।

সাধারণভাবে পরিশ্রমের দিক থেকে দেখলেও যে আইপিএল বা টি২০ ক্রিকেট একজন ক্রিকেটারের পক্ষে তুলনায় আরামদায়ক তা নিশ্চয়ই আলাদা করে বলে দেওয়ার দরকার নেই। বোলারকে চার ওভারের বেশি বল করতে হয় না, একজন ব্যাটার প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত খেলে শতরান করলেও বড়জোর ৬০-৭০ বল খেলবেন। টেস্ট ক্রিকেটের কথা বাদ দিন, ৪২ বছর বয়সে পঞ্চাশ ওভারের খেলা খেলতে হলেও টের পাওয়া যেত ধোনির বয়স কমছে না বাড়ছে। জেমস অ্যান্ডারসন একজনই হয়, তিনিও বেছে বেছে ম্যাচ খেলেন।

বড়লোকের বেড়ালের বিয়ে

সদ্য প্রকাশিত এক সমীক্ষায় পাওয়া গিয়েছে, ভারতের উপরতলার ১% লোকের হাতে দেশের ২২.৬% আয় আর ৪০% সম্পদ রয়েছে। তা এমন এক দেশে বাবুরা বেড়ালের বিয়ে দেবেন না মোচ্ছব করে? প্রতিবছর ঘটা করে নিলাম হয়, বাবুরা দাসী বাঁদি কেনার মত পছন্দের ক্রিকেটার কেনেন। খেলার সময়েও কেবল খেলা হয় না। গ্যালারিতে এবং আফটার পার্টিতে বলিউড সুন্দরীরা আসেন, মাঠের ধারে চিয়ারলিডার নাম দিয়ে স্বল্পবাস মেম নাচানো হয়। কোন কোন বছর কোন ক্রিকেটার কোন চিয়ারলিডারের সঙ্গে কী ধরনের যৌনতায় লিপ্ত হয়েছিলেন তা নিয়ে রসালো কাহিনীও প্রকাশিত হয় সংবাদমাধ্যমে।

একবার যেমন প্রাক্তন দক্ষিণ আফ্রিকা অধিনায়ক গ্রেম স্মিথের কীর্তিকলাপ মুখরোচক হয়েছিল, আরেকবার ক্রিস গেল আর শেরলিন চোপড়ার নাচানাচি কলকাতার কাগজের প্রথম পাতায় জায়গা করে নিয়েছিল। আজ থেকে ঠিক এক যুগ আগে পুনে ওয়ারিয়র্স দলের ক্রিকেটাররা রেভ পার্টিতে গিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ে ক্যাচ কট কটও হয়েছিলেন। নেহাত তাঁরা শাহরুখ খানের ছেলে নন, তাই বেশি হয়রানি হয়নি।

কবি বলেছেন, শীত এসে পড়লে বসন্ত খুব পিছিয়ে থাকতে পারে না। তেমনই ফুর্তির উপাদান হিসাবে মদ, মেয়েমানুষ এসে পড়লে জুয়াও পিছিয়ে থাকে না। তবে ভারতের সরকার, সাংবাদিক, ভাষ্যকার, সর্বোপরি ক্রিকেটপ্রেমী জনতা অত্যন্ত ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলেন। তাই ম্যাচ ফিক্সিংয়ের ঘটনা ধরা পড়ে গেলে শান্তাকুমারণ শ্রীসান্ত, অজিত চান্ডিলার মত কয়েকজনকে শাস্তি দিয়ে মিটিয়ে ফেলা হয়। চেন্নাই সুপার কিংস দল সাসপেন্ড হয়ে যায় তাদের মালিকদের অন্যতম গুরুনাথ মেইয়াপ্পন অবৈধ বাজি ধরায় যুক্ত ছিলেন বলে, অথচ তৎকালীন অধিনায়ক ধোনি নাকি কিছুই জানতেন না। এক ফ্রেমে একাধিক ছবি থাকলেও তিনি নাকি এন শ্রীনিবাসনের জামাইকে আদৌ চিনতেন না। অথচ ধোনি নিজে শ্রীনিবাসনের স্নেহভাজন, তাঁর কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্টও নিযুক্ত হয়েছিলেন।

আইপিএলের উদ্গাতা ললিত মোদি বিস্তর আর্থিক কেলেঙ্কারি করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে ২০১০ সালে। নিজের লোকদের কম পয়সায় ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা পাইয়ে দেওয়া, আইপিএলের মিডিয়া স্বত্ব বিক্রির টাকা থেকে কাটমানি নেওয়া, বিদেশে গোপন অ্যাকাউন্টে টাকা সরানো– কী ছিল না তার মধ্যে? প্যান্ডোরার বাক্স খুলেছিলেন ললিত নিজেই। যখন তিনি অভিযোগ করেন যে, তৎকালীন মন্ত্রী শশী থারুর নিজের প্রভাব খাটিয়ে সুনন্দা পুষ্করকে কোচি টাস্কার্স ফ্র্যাঞ্চাইজি কিনিয়ে দিয়েছেন। তা থেকে আরও নানা অভিযোগ উঠেছিল– আইপিএলের সব ফ্র্যাঞ্চাইজিতেই নাকি বেনামে অনেকের টাকা খাটে। অন্য কোনও দেশে হয়তো এত কাণ্ডের পর এই লিগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু যারা দেশ চালায়, তাদের মোচ্ছব থামায় কার সাধ্যি? ‘দ্য শো মাস্ট গো অন’।

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগসত্যি?

কবি বলেছেন নামে কী আসে যায়? আইপিএলের বেলায় সেকথা মনে রাখা খুব জরুরি। এ এমনই ভারতীয় লিগ যে, ২০০৯ সালে সাধারণ নির্বাচনের সময়ে ম্যাচের আয়োজন করা যাবে না বলে দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলা হয়েছিল। পরেও সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে খেলা হয়েছে। অতএব দরকার পড়লে উত্তর মেরুতে বা চাঁদেও খেলা যেতে পারে। কিন্তু খেলা হওয়া চাই, কারণ সম্প্রচার স্বত্ব বেচে পকেট ভারী হচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের। সেটাই লক্ষ্য, ক্রিকেট উপলক্ষ্য।

বোর্ড ধনী হলে তা কি ভারতীয় ক্রিকেটের লাভ নয়? এর উত্তর দেওয়া বেজায় শক্ত। ভারতীয় ক্রিকেটারদের, এমনকি ঘরোয়া ক্রিকেটারদেরও যে আইপিএল যুগে পারিশ্রমিক অনেক বেড়েছে তা অনস্বীকার্য। কিন্তু মুশকিল হল, কর্তা এবং ক্রিকেটারদের লক্ষ্য, মোক্ষ সবই হয়ে গিয়েছে আইপিএল। অতিমারির সময়ে আইপিএলটা যেন হতে পারে তার সযত্ন ব্যবস্থা করেছিল সৌরভ গাঙ্গুলির নেতৃত্বাধীন বোর্ড। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও চালু ছিল যে রনজি ট্রফি, তা চালু রাখার উদ্যোগ নেয়নি। ঘরোয়া ক্রিকেটারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও হয় অনেক পরে।

আরো পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট মানে ফলাফল নিরপেক্ষ ব্যবসা

দেওধর ট্রফি, চ্যালেঞ্জার ট্রফির মত গুরুত্বপূর্ণ ঘরোয়া প্রতিযোগিতা প্রায় তুলে দেওয়া হয়েছে। শুধু টি২০ নয়, পঞ্চাশ ওভারের জাতীয় দল বা টেস্ট দল বাছার সময়েও যে আইপিএলের পারফরমেন্সকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তা এখন সুনীল গাভাসকারের মত শান্তশিষ্ট লোকও বলতে শুরু করেছেন। কেএল রাহুলের মত প্রতিষ্ঠিত তারকা তো বটেই, ঈশান কিষান বা শ্রেয়স আয়ারের মত তরুণ তুর্কিরাও এখন আইপিএল ছাড়া অন্য কিছুকে পাত্তা দিচ্ছেন না। কেউ মানসিক সমস্যার দোহাই দিয়ে আইপিএলের আগের টেস্ট সিরিজ থেকেও পালাচ্ছেন, কেউ চোট আছে বলে রনজি না খেলে বসে থাকছেন।

তাহলে আইপিএল থেকে ভারতীয় ক্রিকেট টাকা ছাড়া পেল কী? মনে রাখা ভাল, পৃথিবীর সেরা টি ২০ লিগের আয়োজক হওয়া নিয়ে গুমর থাকলেও ভারত সেই ২০০৭ সালের পরে আর ওয়ার্ল্ড টি২০ও জেতেনি। এই লিগ কেন দেখব? হাতে নষ্ট করার মত সময় থাকলে না হয় কোনও ওয়েব সিরিজ দেখা যাবে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

আবার ফাইনালে হার, ফাটানো যাক দু-একটা বুদ্বুদ এবার

ভারতীয় ক্রিকেটের গোটা বাস্তুতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে সত্যকে অস্বীকার করে। বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর একাধিক ক্রিকেট ওয়েবসাইট এবং পরিসংখ্যানবিদ সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন একটা পরিসংখ্যান – ভারত গত তিনটে বিশ্বকাপে মাত্র চারটে ম্যাচ হেরেছে। এমন অনর্থক পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে বা এদেশের অন্য কোনো খেলায় হয় না।

সপ্তাহের অর্ধেক কেটে গেল, বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের শোকপালন এখনো শেষ হল না। সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের খোঁজ নিয়েছেন কিনা জানি না, তবে ফাইনালের পর পরাজিত ভারতীয় দলের সদস্যদের পিঠ চাপড়ে দিতে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং সাজঘরে গেছেন। দলের প্রত্যেককে আলাদা করে সান্ত্বনা দিয়েছেন, মহম্মদ শামির মাথাটাকে নিজেদের কাঁধে ঠেসে ধরেছেন, তারপর স্লো মোশনে আবেগাকুল আবহসঙ্গীত সহকারে বেরিয়ে এসেছেন – এই ভিডিও মুক্তি পেয়েছে। অতএব এই শোক পর্ব নির্ঘাত দীর্ঘায়িত হবে। আগে মানুষ শোকে নিস্তব্ধ হয়ে যেত, আজকাল আক্রমণাত্মক হয়ে যায়। শোকের জন্যে যাকে দায়ী করে তার মেয়ে, বউকে ধর্ষণের হুমকি দেয়। অন্তত সেইটা আশা করা যায় আজ সন্ধে থেকে বন্ধ হয়ে যাবে, কারণ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে কুড়ি বিশের সিরিজ শুরু হয়ে যাচ্ছে। সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বাধীন দল যদি অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিতে পারে তাহলে তো কথাই নেই। গলার শির ফুলিয়ে সেই কথা বলা যাবে যা এখন বিনীতভাবে বলা হচ্ছে – আমাদের দলটাই সেরা, ওই দিনটা খারাপ গেছিল আর কি। মোদ্দাকথা, কেন আরও একবার একটা আইসিসি ট্রফি জিততে ব্যর্থ হলাম তার কোনো ক্রিকেটিয় বিশ্লেষণ হবে না।

কে-ই বা সেটা চায়? ভারতের কোনো প্রাক্তন ক্রিকেটার কোনো ত্রুটি তুলে ধরেছেন? গত কয়েকদিন বাংলা কাগজ-টাগজ ঘেঁটেও কোথাও রবিবারের হারের কোনো বিশ্লেষণ চোখে পড়ল না। কার চোখে কত জল কেবলই তা মাপা চলছে। সব সংবাদমাধ্যম ‘খলনায়ক’ খুঁজতে শুরু করেনি এটা যতখানি স্বস্তিদায়ক, ততটাই অস্বস্তির কারোর কোনো ক্রিকেটিয় ব্যাখ্যায় না যাওয়া। দল জেতে ক্রিকেটারদের মুনশিয়ানায় আর হারে কপালের দোষে – এই যদি ক্রিকেটভক্ত, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক এবং টিম ম্যানেজমেন্টের মিলিত সিদ্ধান্ত হয় তাহলে দশ বছর কেন; বিশ বছরেও ট্রফির খরা কাটা শক্ত।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি, বিশ্বকাপ – একটা করে প্রতিযোগিতার কোনো একটা স্তরে ভারতীয় দল মুখ থুবড়ে পড়ে আর ভারতের তাবড় প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার আর সাংবাদিকরা মূলত দুটো কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে থাকেন – ১) একটা খারাপ দিন একটা ভাল দলকে রাতারাতি খারাপ করে দেয় না, ২) ভাগ্য খারাপ, তাই খারাপ দিনটা ফাইনালেই এল। কী আর করা যাবে?

সব দেশেই খেলা সম্পর্কে সাধারণ দর্শকের মতামত গঠনে প্রধান ভূমিকা নেন বিশেষজ্ঞ আর সাংবাদিকরা। তাঁরাই দিনের পর দিন এসব বলে চললে ক্রিকেটভক্তদের দোষ দেওয়া যায় না। সবাই তো আর দেখতে পান না অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড বা নিউজিল্যান্ডের প্রাক্তনরা নিজেদের দল হারলে (এমনকি জিতলেও) কীরকম চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন, ছোট ছোট ত্রুটিকেও রেয়াত করেন না ধারাভাষ্যে। ভারতের বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিককুল বিসিসিআই প্রযোজিত টিভি সম্প্রচারের আমলে, কর্তাদের চটালে মাঠে ঢোকার অনুমোদন না পাওয়ার যুগে দেশসুদ্ধু লোককে শিখিয়ে দিয়েছেন যে জিতলে সমালোচনা করা হল ছিদ্রান্বেষণ আর হারলে সমালোচনা করতে নেই। দলের পাশে দাঁড়াতে হয়। মুশকিল হল, বারবার ব্যর্থতার ফলে ব্যাপারটা বাংলা ছবির পাশে দাঁড়ানোর মত কঠিন হয়ে যাচ্ছে। পরপর দশটা ম্যাচ জেতার পরে একটা ম্যাচ হেরেছে বলে একথা একটু বেশি কটু শোনাতে পারে। কিন্তু আসলে তো একটা ম্যাচ নয়, ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর থেকে কোনো আইসিসি টুর্নামেন্ট জিততে পারেনি ভারত। দ্বিপাক্ষিক সিরিজের বাইরে জয় বলতে ২০২৩ এশিয়া কাপ। কিন্তু ক্রিকেট বহির্ভূত কারণে (ক্রিকেটিয় কারণ বাদই দিলাম) পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশের যা অবস্থা তাতে ওটাও না জিতলে আর দল রাখার মানে কী?

আসলে ভারতীয় ক্রিকেটের গোটা বাস্তুতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে সত্যকে অস্বীকার করে। বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর একাধিক ক্রিকেট ওয়েবসাইট এবং পরিসংখ্যানবিদ সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন একটা পরিসংখ্যান – ভারত গত তিনটে বিশ্বকাপে মাত্র চারটে ম্যাচ হেরেছে। এমন অনর্থক পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে বা এদেশের অন্য কোনো খেলায় হয় না। প্রাথমিক স্তরের ম্যাচের সংখ্যা নক আউট পর্যায়ের চেয়ে কম তো হবেই। প্রাথমিক স্তরের বেশিরভাগ ম্যাচ না জিতলে নক আউটে ওঠা যায় না। সেমিফাইনাল তো দুটোই হয়, ফাইনাল একটা। জগতে যতদিন পাটিগণিত আছে, ততদিন এমনটাই হবে। পিভি সিন্ধু কোনো প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালে বা ফাইনালে হারলে তাঁর পক্ষ নিয়ে কেউ বলে না, অধিকাংশ ম্যাচই তো জিতেছিল। অতএব চ্যাম্পিয়ন না হলেও ও-ই সেরা খেলোয়াড়। ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজিত দলের সমর্থকরা ঝরঝরিয়ে কাঁদেন, অনেকে ক্ষিপ্তও হয়ে ওঠেন। কিন্তু তাঁরা বা তাঁদের দেশের প্রাক্তন ফুটবলাররা কখনো বলেন না, অধিকাংশ ম্যাচ জিতেছি। অতএব চ্যাম্পিয়ন না হলেও আমরাই সেরা দল। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটে এই জাতীয় নির্বুদ্ধিতার প্রদর্শনী দশ বছর ধরে প্রত্যেক প্রতিযোগিতার পরেই হয়ে থাকে। মায়াবাদের দেশ ভারতবর্ষে কেউ একথা স্বীকার করতে রাজি নন, যে নক আউটে বারবার হার অঘটন হতে পারে না। নিজেদের মধ্যে গলদ আছে, সে গলদ খুঁজে বার করতে হবে এবং সংশোধন করতে হবে। আসলে স্বীকার করতে গেলেই একগাদা অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, অনেক সযত্নলালিত বুদ্বুদ দুম ফটাস হয়ে যাবে। তাতে এই যে কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্রিকেট বাণিজ্য, তার সঙ্গে যুক্ত বিবিধ কায়েমি স্বার্থে ঘা লাগবে।

সেই বুদ্বুদগুলোর আলোচনায় যাওয়ার আগে বলে নেওয়া যাক, ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের কেউ কেউ কখনো কখনো স্বীকার করেন যে বারবার আইসিসি টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হওয়া একটা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। কিন্তু তাঁরাও ব্যাপারটাকে স্রেফ মানসিক বলে আখ্যা দেন। যদি সেটাই ঠিক হয়, তাহলে খেলোয়াড়দের মানসিক সমস্যা দূর করার যেসব অত্যাধুনিক ব্যবস্থা আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞানে আছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ডকে সেগুলো ব্যবহার করতে আটকাচ্ছে কে? নাকি সেসব করেও ফল একই থেকে যাচ্ছে? এসব প্রশ্ন ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের লোকেরা তোলেন না।

এবার বুদ্বুদগুলোর দিকে তাকানো যাক।

১. বেশিরভাগ ম্যাচে জয়

এবারের মত বিশ্বকাপে পরপর দশটা ম্যাচ ভারত কখনো জেতেনি, তার চেয়েও বড় কথা এমন দাপটে জেতেনি। সেই কারণে এই দলের বাহবা প্রাপ্য, কিন্তু সেই সুবাদে ২০১৫ আর ২০১৯ সালের ভারতীয় দলগুলোকেও স্রেফ বেশিরভাগ ম্যাচ জেতার জন্য একইরকম ভাল বলে প্রমাণ করতে চাইলে কিছু অপ্রিয় প্রসঙ্গ না তুলে উপায় থাকে না।

২০০৭ সালে ভারত ভীষণ সহজ গ্রুপে ছিল (অন্য দলগুলো বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং বারমুডা)। তা সত্ত্বেও গ্রুপ স্তর থেকেই বিদায় নেয়। ভারত যেহেতু সবচেয়ে জনপ্রিয় দল, তাই তারা বিদায় নিলে মাঠ ভরে না। তার চেয়েও বড় কথা টিভি রেটিংয়ের বারোটা বেজে যায়। বিজ্ঞাপনদাতাদের বিপুল লোকসান হয়। আইসিসি সেবার বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ফলে ভবিষ্যতে ভারতের দ্রুত বিদায়ের সম্ভাবনা নির্মূল করতেই হত। তাই ২০১১ বিশ্বকাপে ফরম্যাটই বদলে ফেলা হয়। ১৯৯৯ সাল থেকে চালু হয়েছিল গ্রুপ লিগের পর সুপার সিক্স (২০০৭ সালে সুপার এইট) স্তর, তারপর সেমিফাইনাল, ফাইনাল। ২০১১ সালে ফিরে যাওয়া হল ১৯৯৬ সালের ফরম্যাটে। প্রথমে থাকল গ্রুপ স্তর (সাত দলের), তারপর কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল, ফাইনাল। অর্থাৎ একটা দল (পড়ুন ভারত) কমপক্ষে ছটা ম্যাচ খেলবেই গ্রুপ স্তরে, ফাইনাল পর্যন্ত গেলে নটা। ২০১৫ সালে ভারত ছিল পুল বি-তে। সেখানে বাকি ছটা দলের মধ্যে তিনটের নাম আয়ারল্যান্ড, জিম্বাবোয়ে আর সংযুক্ত আরব আমীরশাহী। বাকি তিনটে দলের মধ্যে ছিল ক্ষয়িষ্ণু ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এই পুলের সব ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার জন্যেও আলাদা হাততালি প্রাপ্য? কোয়ার্টার ফাইনালে আবার প্রতিপক্ষ ছিল বাংলাদেশ। সেমিফাইনালে কঠিন প্রতিপক্ষের সামনে পড়ামাত্রই মহেন্দ্র সিং ধোনির দল দুরমুশ হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়া জেতে ৯৫ রানে।

পরের বিশ্বকাপে ফের ফরম্যাট বদলে ফেলা হয়, অনিশ্চয়তা আরও কমিয়ে আনা হয়। বিশ্বকাপ ফুটবল জিততে হলে চার-চারটে নক আউট ম্যাচ জিততে হয়। কিন্তু ২০১৯ থেকে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিততে হলে মোটে দুটো – সেমিফাইনাল আর ফাইনাল। ২০০৭ সালের ১৬ দলের বিশ্বকাপকে ছোট করতে করতে করে দেওয়া হল দশ দলের। সবাই সবার বিরুদ্ধে খেলবে, অর্থাৎ কমপক্ষে নটা ম্যাচ খেলা নিশ্চিত হল। প্রথম চারে থাকলেই সোজা সেমিফাইনাল, সেখান থেকে দুটো ম্যাচ জিতলেই কেল্লা ফতে। এই ব্যবস্থায় ভারত আর নিউজিল্যান্ডের লিগের ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেস্তে যায়, ইংল্যান্ড বেশ সহজেই ভারতকে পরাস্ত করে। সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ড ভারতকে হারিয়ে দেয়।

আগের লেখাতেই লিখেছি, কীভাবে ত্রিদেব শুকিয়ে মারছে বাকি ক্রিকেট দুনিয়াকে। যাঁদের সত্যিই শুধু ক্রিকেটার নয়, ক্রিকেটের প্রতিও ভালবাসা আছে এবং দশ বছরেরও বেশি আগের ক্রিকেট সম্পর্কে জানা আছে, তাঁরা নিশ্চয়ই মানবেন যে ২০১১ সালের পর থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান যেখানে পৌঁছেছে তাতে বিশ্ব ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে তিন-চারটে দলের মধ্যে। এবারের বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখাল, কিন্তু ২০১৯ সালে তাদের অবস্থা ছিল টালমাটাল। ফলে আসলে বিশ্বকাপের দাবিদার ছিল ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ড। ভারত একমাত্র অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পেরেছিল। বাকি দুই দলের কাছেই হারে। ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে গ্রুপের খেলায় হারতে হয়েছিল শ্রীলঙ্কার কাছে আর ফাইনালে শোচনীয় হার হয়েছিল পাকিস্তানের কাছে। ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির আলোচনায় যাওয়া অর্থহীন, কারণ সেখানে ২০০৭ সালে খেতাব জয় বাদ দিলে ভারতের অবস্থা আরও করুণ।

সুতরাং বেশিরভাগ ম্যাচে জেতার তথ্যকে গলার মালা করে লাভ নেই। সমস্যাটাও মোটেই স্রেফ মানসিক নয়, দক্ষতাজনিত।

২. দক্ষতার দিক থেকে বিশ্বসেরা

বিশ্বসেরার শিরোপা যে নেই তা তো বলাই বাহুল্য, কিন্তু দক্ষতার দিক থেকে বিশ্বসেরা – এই ধারণাও দাঁড়িয়ে আছে নরম মাটির উপরে। ক্রিকেটে কোনোদিনই দক্ষতা মানে কেবল ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং করার পারদর্শিতা নয়। সঠিক পরিকল্পনার দক্ষতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। আজকের ভিডিও অ্যানালিসিস ইত্যাদি অতি উন্নত প্রযুক্তির যুগে সঠিক পরিকল্পনার গুরুত্ব ও ক্ষমতা আরও বেড়ে গেছে। ভারতীয় দল কি সেইখানে অন্য দলগুলোর সমতুল্য? স্মৃতিতে এখনো টাটকা এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল দিয়েই দেখা যাক।

ফাইনালে

ম্যাচের প্রথম বল থেকেই পরিষ্কার হয় যে অস্ট্রেলিয়া একবার ভারতের সঙ্গে খেলা হয়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয়বার খেলতে এসেছে অনুপুঙ্খ পরিকল্পনা নিয়ে। প্রত্যেক ভারতীয় ব্যাটারের জন্যে ছিল আলাদা আলাদা পরিকল্পনা।

রোহিত শর্মা প্রত্যেক ম্যাচে ঝোড়ো সূচনা করেছেন, তাঁর বেশিরভাগ চার ছয় হয়েছে অফ সাইডে পয়েন্টের পর থেকে মিড অফ পর্যন্ত এলাকা দিয়ে আর লেগ সাইডে স্কোয়্যার লেগ দিয়ে। অস্ট্রেলিয়া ঠিক ওই দুই জায়গায় সীমানার ধারে ফিল্ডার রেখে বল করা শুরু করে। তার উপর আগের ম্যাচগুলো ভারত যেসব মাঠে খেলেছে তার তুলনায় নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের মাঠ বড়। অন্য ম্যাচে যেসব শটে চার বা ছয় হচ্ছিল, সেগুলোতে এক-দুই রান হতে শুরু করল। ফলে প্রথম দু-এক ওভার রোহিতকে কিছুটা হতাশ করে। তিনি অবশ্য একটু পরেই এই পরিকল্পনাকে পরাস্ত করে মারতে শুরু করেন। তখন আসে দ্বিতীয় পরিকল্পনা। পাওয়ার প্লে শেষ না হতেই গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে দিয়ে স্পিন করানো, যাতে জোরে বোলারের গতি রোহিতকে বড় শট নিতে সাহায্য না করে। তাঁকে যেন অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করতে হয়, ভুল করার সম্ভাবনা বাড়ে। ম্যাক্সওয়েল প্রথমে মার খেলেও শেষপর্যন্ত এই পরিকল্পনায় ফল হয়, রোহিত বড় শট নিতে গিয়ে আউট হয়ে যান।

শুভমান গিলের মূল শক্তি পয়েন্ট থেকে কভার পর্যন্ত অঞ্চল দিয়ে সামনের পায়ে ড্রাইভ করে বাউন্ডারি পাওয়া আর সামান্য খাটো লেংথের বলে একটুখানি হাত খোলার জায়গা পেলেই স্কোয়্যার কাট করা। তাঁকে কাট করার কোনো সুযোগই দেওয়া হল না এবং অফ সাইডে ফিল্ডারের ভিড় জমিয়ে দেওয়া হল। গিল নিজেও জানেন তাঁর ড্রাইভ কখনো কখনো কিছুটা পথ হাওয়ায় যাত্রা করে, তার উপর সেদিনের পিচটা ছিল মন্থর। ফলে তেমন হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি। সেই ভাবনায় বিব্রত রাখতে শর্ট কভার দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল মুখের সামনে। গিল রান করার জায়গা খুঁজে না পেয়ে হাঁসফাঁস করলেন, তারপর অফের বল জোর করে লেগে ঘুরিয়ে মারতে গিয়ে মিড অনে ক্যাচ দিয়ে আউট হলেন।

বিরাট কোহলিকে চটপট আউট করতে হলে ক্রিজে এসেই তিনি যে খুচরো রান নিতে শুরু করেন তা আটকাতে হয়। লখনৌতে পিচ ছিল আমেদাবাদের মতই মন্থর। সেখানে ইংল্যান্ড কভারে, মিড উইকেট, মিড অফ, মিড অনে লোক দাঁড় করিয়ে সফলভাবে আট বল কোনো রান করতে দেয়নি। নবম বলে তিনি ধৈর্য হারিয়ে জোরে ড্রাইভ করতে গিয়ে মিড অফে ক্যাচ দিয়ে আউট হন। অস্ট্রেলিয়াও তাঁকে মোটামুটি চুপ রাখছিল, কিন্তু মিচেল স্টার্ক একটা ওভারে নো বল করার পর খেই হারিয়ে ফেললেন। কোহলি পরপর তিনটে চার মেরে দিলেন। পরিকল্পনা ব্যর্থ হল। তবু অস্ট্রেলিয়া কোনো সময়েই তাঁকে শট নেওয়ার জন্যে বেশি জায়গা দেয়নি, হাফভলি প্রায় পাননি। যে পিচে বল ব্যাটে আসছে না, সেখানে কোহলির পছন্দের খেলা – বলের গতিকে ব্যবহার করে ফিল্ডারদের ফাঁকে বল ঠেলে দিয়ে দৌড়ে রান নেওয়া – বেশ শক্ত। অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্স সমেত সব জোরে বোলারই স্লোয়ারের উপর জোর দিচ্ছিলেন। মোটেই দরকার অনুযায়ী রান হচ্ছিল না। উলটো দিকে কে এল রাহুল তো সেদিন বিশ্বকাপের মন্থরতম অর্ধশতরান করেছেন। ফলে কোহলির উপর চাপ বাড়ছিল। যতই মনে হোক তিনি নিশ্চিত শতরানের দিকে এগোচ্ছিলেন আর কপাল দোষে কামিন্সের বলটা ব্যাটে লেগে উইকেটে পড়ল, আসলে কোহলি কখনোই স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। ওই পিচে বারবার স্কোয়্যারে বল ঠেলে রান নিতে থাকলে গায়ের দিকে আসা খাটো লেংথের বলে ওভাবে প্লেড অন হওয়া মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়।

রাহুলের জন্যে কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন পড়েনি হয়ত। তিনি বেশ কিছুদিন হল একদিনের ক্রিকেট তো বটেই, কুড়ি বিশের ক্রিকেটেও এমনভাবে ব্যাট করেন যা দেখে মনে পড়ে কবীর সুমনের গান “ও গানওলা, আরেকটা গান গাও। আমার আর কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই।” সেমিফাইনালে যেরকম নির্ভেজাল পাটা উইকেট পাওয়া গিয়েছিল এবং দেরিতে ব্যাট করতে নামার সুযোগ পেয়েছিলেন, একমাত্র সেরকম ক্ষেত্রেই রাহুলকে চার ছয় মারতে ইচ্ছুক দেখা যায়। অন্যথায় তিনি ওরকম মন্থর ব্যাটিংই করেন, তারপর হয় স্টার্কের বলটার মত একটা দারুণ বলে আউট হয়ে যান, নয়ত উপায়ান্তর নেই দেখে মারতে গিয়ে আউট হন।

মধ্যে ছিলেন শ্রেয়স আয়ার। তাঁর জন্যেও স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল। সাংবাদিক সম্মেলনে শর্ট বল নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি যতই রাগ করুন আর শ্রীলঙ্কা বা নিউজিল্যান্ডের বোলারদের বিরুদ্ধে যতই শতরান হাঁকান; কামিন্স, স্টার্ক, জশ হেজলউডের মত দীর্ঘদেহী জোরে বোলারদের বিরুদ্ধে তিনি যে সামনের পায়ে আসতে ইতস্তত করেন তা সাদা চোখেই দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক তাঁকে গুড লেংথে বল করলেন, তিনি সামনের পায়ে না এসে দোনামোনা করে খেলে খোঁচা দিয়ে ফেললেন।

সূর্যকুমার যাদবের শক্তি হল বোলারদের গতিকে কাজে লাগিয়ে মাঠের দুরূহ কোণে বল পাঠানো। আমেদাবাদের পিচে সে কাজটা এমনিতেই শক্ত ছিল। তার উপর অস্ট্রেলিয়া তাঁকে কোনো গতিই দেয়নি। যে বলে আউট হলেন সেটাও ছিল হেজলউডের মন্থর গতির খাটো লেংথের বল।

রবীন্দ্র জাদেজা টেস্টে ব্যাট হাতে দিব্যি ধারাবাহিক, একদিনের ক্রিকেটে মোটেই তা নন। তবু কেন তাঁকে সূর্যকুমারের আগে পাঠানো হয়েছিল তা রোহিত আর রাহুল দ্রাবিড়ই জানেন। কিন্তু তিনিও অলরাউন্ডারসুলভ কিছু করে উঠতে পারেননি। অনেকগুলো বল খেলে মোটে নয় রান করে অসহায়ের মত আউট হন।

এত পরিকল্পনার বিপরীতে ভারতের পরিকল্পনা কীরকম ছিল?

দুনিয়াসুদ্ধ লোক জানে ডানহাতি জোরে বোলার রাউন্ড দ্য উইকেট বল করলে ডেভিড ওয়ার্নার অস্বস্তি বোধ করেন। ইংল্যান্ডের স্টুয়ার্ট ব্রড সব ধরনের ক্রিকেটেই তাঁকে ওইভাবে বল করে বহুবার আউট করেছেন। অথচ মহম্মদ শামি শুরু করলেন যথারীতি ওভার দ্য উইকেট এবং চার হল। ওয়ার্নার ভাগ্যিস আত্মঘাতী শট খেলে আউট হয়ে গেলেন।

ট্রেভিস হেডের অস্বস্তি যে শরীর লক্ষ করে ধেয়ে আসা খাটো লেংথের বলে, তাও সুবিদিত। কিন্তু শামি আর যশপ্রীত বুমরা – দুজনেই তাঁকে অফস্টাম্পের বাইরে বল দিয়ে গেলেন, তিনিও বলের লেংথ অনুযায়ী কখনো সামনের পায়ে কখনো পিছনের পায়ে কভার, মিড অফ দিয়ে রান করে গেলেন। যতক্ষণে মহম্মদ সিরাজ তাঁকে শরীর লক্ষ করে বল করা শুরু করলেন ততক্ষণে ট্রেভিস হেড ক্রিজে জমে গেছেন।

মারনাস লাবুশেন আরেকটু হলে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ দলে সুযোগই পেতেন না। কারণ তিনি বড় শট নিতে পারেন না বললেই হয়। তাই তাঁর কাজ একটা দিক ধরে থাকা, খুচরো রান নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখা। এটাও গোপন তথ্য নয়। খুচরো রান নিতে না পারলেই যে লাবুশেন হাঁকপাক করেন, বিশেষ করে স্পিনারের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক শট নিতে গিয়ে বিপদে পড়েন তা চেন্নাইয়ের ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচেও দেখা গিয়েছিল। অথচ ফাইনালে তিনি ব্যাট করতে আসার পরে তাঁর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করার কোনো চেষ্টা হয়েছিল কি? এক প্রান্ত থেকে স্পিনার এনে মুখের সামনে ফিল্ডার দাঁড় করিয়েও অন্যরকম চেষ্টা করা যেত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে যে দল পরিকল্পনার দক্ষতায় প্রতিপক্ষের থেকে এতখানি পিছিয়ে থাকে, তাকে দক্ষতায় বিশ্বসেরা কী করে বলা যায়?

. এক দিনের ভুল

কেউ বলতেই পারেন, একটা ম্যাচ হারলেই এত কিছুকে ভুল বলে দেগে দেওয়া অন্যায়। ওই পরিকল্পনা নিয়েই তো টানা দশটা ম্যাচ জিতেছে। ঘটনা হল, ফাইনাল আর দশটা ম্যাচের মতই আরেকটা ম্যাচ – একথা মাইকের সামনে বলতে ভাল, শুনতে আরও ভাল। কিন্তু কোনো ভাল দল ওই কথা বিশ্বাস করে বসে থাকে না। ফাইনালে তো বটেই, যে কোনো নক আউট ম্যাচেই সকলে বেশি তৈরি হয়ে আসে। অস্ট্রেলিয়াই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। আর গত দশ বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, ভারত আলাদা প্রস্তুতি নেয় না। সেই কারণেই বারবার অপ্রস্তুত হয়।

এই প্রস্তুতিহীনতা অবশ্য কেবল নক আউটের ব্যাপার নয়, এই বিশ্বকাপের ব্যাপারও নয়। মহেন্দ্র সিং ধোনির আমল থেকেই স্টেজে মেরে দেওয়ার প্রবণতা আর কিছু গোঁড়ামি ভারতীয় দলের মজ্জাগত হয়ে গেছে। সেগুলো কী কী কারণে নক আউটের আগে ভারতকে অসুবিধায় ফেলে না তা যাঁরা এতদূর পড়ে ফেলেছেন তাঁরা বুঝে ফেলেছেন। এবার প্রবণতাগুলো কী তা দেখে নেওয়া যাক:

বিশ্বকাপের দল তৈরি করতে হয় চার বছর ধরে। কিন্তু ২০১৫ বিশ্বকাপের পরের চার বছরেও ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট একজন চার নম্বর ব্যাটার ঠিক করতে পারেনি। ২০১৮ সালে অধিনায়ক কোহলি বলে দিয়েছিলেন, আম্বাতি রায়ুডুই হবেন বিশ্বকাপের চার নম্বর। শেষমেশ যখন বিশ্বকাপের দল ঘোষণা হল তখন দেখা গেল রায়ুডু আদৌ দলে নেই। বিজয়শঙ্কর বলে একজন হঠাৎ টিম ম্যানেজমেন্টের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিলেন। কেন তা আজও বোঝা যায়নি। প্রায় খেলা ছেড়ে দেওয়া দীনেশ কার্তিকও বিশ্বকাপ খেলতে চলে গেলেন, রায়ুডু বাদ। দলের অত গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা নিয়ে অমন ফাজলামি করে কোনো দল কোনোদিন বিশ্বকাপ জেতেনি। পরের চার বছরেও বিস্তর কাটা জোড়ার পরে শ্রেয়সে মনস্থির করতে পারল টিম ম্যানেজমেন্ট, কিন্তু হার্দিক পান্ডিয়া ছাড়া অলরাউন্ডার পাওয়া গেল না। তাঁর বদলে কাজ চালাতে পারেন ভেবে যাঁকে নেওয়া হয়েছিল, সেই শার্দূল ঠাকুরকে বল হাতে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। ব্যাটেও তিনি বিশেষ সুবিধা করতে পারেন না। সেই যে অস্ট্রেলিয়ায় একটা টেস্টে রান করে দিয়েছিলেন, সেই ভরসাতেই আজও তাঁকে অলরাউন্ডার বলে চালানো হচ্ছে। এ সমস্যার একটা সহজ সমাধান হতে পারত, যদি ভারতের ব্যাটাররা কেউ কেউ কাজ চালানোর মত বোলিং করতে পারতেন। এই বিশ্বকাপে যেখানে উইকেটে বল ঘুরেছে, অস্ট্রেলিয়ার হয়ে কাজ চালানোর চেয়ে বেশি কাজই করেছেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল আর হেড। নিউজিল্যান্ডেরও ছিলেন গ্লেন ফিলিপস, ড্যারিল মিচেল, মিচেল স্যান্টনার, রচিন রবীন্দ্ররা। দক্ষিণ আফ্রিকার এইডেন মারক্রামের অফস্পিনও মন্দ নয়। কিন্তু রোহিতের হাতে ঠিক পাঁচজন বোলার। তাঁদের একজন মার খেয়ে গেলে সমূহ বিপদ। ওই পাঁচজন এতটাই ভাল বল করেছেন ফাইনাল পর্যন্ত, যে এই ফাঁকটা ধরা পড়েনি। কিন্তু একদিনের ক্রিকেটে এ ফাঁক বড় ফাঁকি। এ নিয়েই বিশ্বকাপ জিতে গেলে সেও এক ইতিহাস হত। ফাইনালে হেড আর লাবুশেন জমে যেতেই ফাঁকি ধরা পড়ে গেল, অধিনায়ক নিরুপায়।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট মানে ফলাফল নিরপেক্ষ ব্যবসা

আমাদের ব্যাটাররা বল করতে পারেন না কেন? বোলারদের ব্যাটের হাতেরই বা কেন উন্নতি হচ্ছে না? এসব প্রশ্ন করলেই মহাতারকাদের মহা ইগোর কথা উঠে আসবে। রোহিত নিজে দীর্ঘকাল কাজ চালানোর মত অফস্পিন বল করতেন, অনেকদিন হল ছেড়ে দিয়েছেন। কোহলিও মিডিয়াম পেস বল করতেন, তিনিও ছেড়ে দিয়েছেন। কেন ছাড়লেন? দলের প্রয়োজন থাকতেও কেন আবার শুরু করেননি? দেবা ন জানন্তি। এঁদের কি এমন কোনো চোট আছে যা বল করলে বেড়ে যেতে পারে? তেমন কোনো খবর নেই কিন্তু।

শচীন তেন্ডুলকরের (ম্যাচ ৪৭০, বল ৮০৫৪, ওভার পিছু রান ৫.১০, উইকেট ১৫৪, সেরা বোলিং ৫/৩২) টেনিস এলবো হয়েছিল, একসময় কোমরে বেল্ট পরে ব্যাট করতে নামতে হয়েছিল, তারপর সেই চোট মাস ছয়েকের জন্যে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তার আগে পরে বল করেছেন, ম্যাচ জিতিয়েছেন। বীরেন্দ্র সেওয়াগও (ম্যাচ ২৫১, বল ৪৩৯২, ওভার পিছু রান ৫.২৬, উইকেট ৯৬, সেরা বোলিং ৪/৬) চোটমুক্ত ছিলেন না, কিন্তু বল করতেন। সৌরভ গাঙ্গুলির (ম্যাচ ৩১১, বল ৪৫৬১, ওভার পিছু রান ৫.০৬, উইকেট ১০০, সেরা বোলিং ৫/১৬) ফিটনেস তো হাস্যকৌতুকের বিষয় ছিল। অথচ বল করে একাধিক স্মরণীয় জয় এনে দিয়েছেন।

সুরেশ রায়না (ম্যাচ ২২৬, বল ২১২৬, ওভার পিছু রান ৫.১১, উইকেট ৩৬, সেরা বোলিং ৩/৩৪) এঁদের মত অত উঁচু দরের ব্যাটার ছিলেন না, কিন্তু মিডল অর্ডারে ভরসা দিয়েছেন একসময়। দরকারে অফস্পিনটাও করে দিতেন।

এদিকে আজকের মহাতারকা ব্যাটারদের কেবল ফিটনেস নিয়েই কয়েকশো প্রবন্ধ লেখা হয়েছে, রোজ লক্ষ লক্ষ গদগদ পোস্ট হয় সোশাল মিডিয়ায়। কিন্তু ওঁরা বল করতে পারেন না। কেদার যাদব বলে একজন ছিলেন। মারকুটে ব্যাট আর খুব নিচ থেকে বল ছেড়ে অফস্পিন করতেন, মারা সোজা ছিল না। বিরাটের সঙ্গে শতরান করে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটা স্মরণীয় ম্যাচ জিতিয়েছিলেন। তিনি হঠাৎ কোনো অজ্ঞাত কারণে নির্বাচক ও টিম ম্যানেজমেন্টের বিষনজরে পড়ে বাদ চলে যান ২০২০ সালে।

২০১৪ সালের ইংল্যান্ড সফরে দেখা গিয়েছিল ভুবনেশ্বর কুমারের ব্যাটের হাত রীতিমত ভাল। ট্রেন্টব্রিজ টেস্টের দুই ইনিংসেই অর্ধশতরান করেছিলেন। আবার ২০১৭ সালে পাল্লেকেলেতে যখন শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ১৩১ রানে সাত উইকেট পড়ে যায়, তখন অপরাজিত ৫৩ রান করে মহেন্দ্র সিং ধোনির সঙ্গে জুটিতে ১০০ রান তুলে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন। মাঝে বেশ কিছুদিন একদিনের দলের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিলেন ভুবনেশ্বর। অথচ তাঁকে গড়েপিটে অলরাউন্ডার করে তুলতে পারেননি সর্বকালের সেরা ভারতীয় দল তৈরি করার কৃতিত্ব যিনি দিনরাত দাবি করেন, সেই রবি শাস্ত্রী, আর তাঁর আদরের দুই অধিনায়ক ধোনি, কোহলি।

এখনকার বোলারদের মধ্যে শামি আর বুমরা দুজনেই যে ব্যাটিং উপভোগ করেন তা টেস্ট ক্রিকেটে স্পষ্ট দেখা যায়। শামি দিব্যি কয়েকটা বড় শট নিয়ে ফেলতে পারেন। বুমরা আরও এক ধাপ এগিয়ে। স্টুয়ার্ট ব্রডকে ঠেঙিয়ে টেস্টে এক ওভারে সবচেয়ে বেশি রান দেওয়ার রেকর্ড করিয়ে নিয়েছেন তিনি।

এঁদের ব্যাটের হাতটা যত্ন করে আরেকটু ভাল করে দেওয়ার কাজটুকুও যদি না পারেন, তাহলে রাহুল দ্রাবিড় আর ব্যাটিং কোচ বিক্রম রাঠোর করেনটা কী? রোহিত, কোহলিকে তো আর হাতে ধরে ব্যাটিং শেখাতে হয় না।

আসলে এসব করতে গেলে নমনীয়তা দরকার। কিন্তু ভারতীয় দলের একদিনের ক্রিকেটের ব্যাটিং আর গোঁড়ামি সমার্থক। বেশিরভাগ পাঠক রে রে করে তেড়ে আসবেন জেনেও না বলে উপায় নেই, শচীন আর সেওয়াগের প্রস্থানের পর থেকে ভারত একদিনের ক্রিকেটে যে ব্যাটিংটা করছিল এতকাল, সেটা গত শতাব্দীর ব্যাটিং। রোহিত আর শিখর ধাওয়ান যেভাবে ইনিংস শুরু করতেন – একজন মারতেন, আরেকজন ধরে ধরে খেলতেন – সেটা করা হত ১৯৯৬ বিশ্বকাপের আগে পর্যন্ত। সনৎ জয়সূর্য আর রমেশ কালুভিথরনা সেই ধারা বদলে দেন। শচীন-সৌরভ, সৌরভ-সেওয়াগ, শচীন-সেওয়াগ মান্ধাতার আমলের ছকে ফেরত যাননি। ২০০০ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে ওঠা, ২০০২ ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি জয়, ২০০৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা, ২০১১ বিশ্বকাপ জয় – এসবের পিছনে ভারতের ওপেনিং জুটির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।

এদিকে বিশ্বজয়ী অধিনায়ক ধোনি নিজে ‘ফিনিশার’, বিশ্বাস করতেন যে কোনো জায়গা থেকে ম্যাচ জিতিয়ে দেবেন। সম্ভবত সে কারণেই ২০১২ সালে শচীন আর ২০১৩ সালে সেওয়াগের প্রস্থানের পর উইকেট হাতে রেখে খেলার নীতি তিনি চালু করেন। রোহিতের যতদিন বয়স ছিল, ধৈর্য আর রিফ্লেক্স দুটোই ভাল ছিল, ততদিন লম্বা ইনিংস খেলে পরের দিকে স্ট্রাইক রেটের ঘাটতি পুষিয়ে দিতেন। কোহলির তখন স্বাভাবিক খেলাতেই অতি দ্রুত রান হত। ওই ক্ষমতাই তাঁকে রান তাড়া করার রাজায় পরিণত করেছিল। তার প্রমাণ ২০১২ সালে হোবার্টে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে, ২০১৩ সালে জয়পুরে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বা ২০১৭ সালে পুনেতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলা ইনিংসে রয়েছে। ধোনিও সত্যিই শেষ লগ্নে যে কোনো রান তুলে দিতে পারতেন। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে ধোনির বড় শট নেওয়ার ক্ষমতা ক্রমশ কমে আসে। তাঁর মত রিফ্লেক্স-নির্ভর, চোখ আর হাতের সমন্বয়ের উপর নির্ভরশীল ব্যাটারের ক্ষেত্রে ওই বয়সে সেটা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি ততদিনে ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বশক্তিমান তারকা। বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? মহিন্দর অমরনাথ ২০১১ সালের শেষদিকে টেস্ট ক্রিকেটে বাঁধতে চেয়েছিলেন, ধোনির গডফাদার এন শ্রীনিবাসন তাঁকে হেলিকপ্টার শট মেরে গ্যালারিতে পাঠিয়ে দেন।

যা-ই হোক, ঘটনা হল দুই প্রান্ত থেকে দুটো নতুন বল আর আগাগোড়া পাওয়ার প্লের যুগে বেশি ঝুঁকি নিয়ে অনেক বেশি রান করাটাই ব্যাটিং। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড সে খেলাই খেলছে গত এক দশক। তারাই জিতেছে বিশ্বকাপ, ভারত ২০১৩ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জেতার পর থেকে জিতেছে শুধু কিছু অর্থহীন দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। ধোনির বয়স যত বেড়েছে তিনি সত্যকে অস্বীকার করে সেই পুরনো খেলাই খেলে গেছেন এবং যে ম্যাচেই অন্য কেউ বড় শট নিতে পারেনি, সেখানে ধোনি শেষ অবধি ক্রিজে থেকেও ‘ফিনিশ’ করতে পারেননি। ওই চক্করে ২০১৯ বিশ্বকাপটাই ফিনিশ করে দিয়ে গেছেন। ধোনিভক্তরা আজও বীরবিক্রমে বলেন, মার্টিন গাপ্টিলের ওই থ্রোটা উইকেটে না লাগলেই নাকি…। অথচ ওই বিশ্বকাপেই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ধোনি শেষ ওভার পর্যন্ত ক্রিজে ছিলেন (৩১ বলে অপরাজিত ৪২), ভারত দুই কি পাঁচ রানেও নয়, ৩১ রানে হেরেছিল। ওই ম্যাচের স্কোরকার্ডের দিকে তাকালেই দুই দলের ব্যাটিং ভাবনার তফাতটা দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে যায় এবং ওই ভাবনাই যে তফাত গড়ে দিচ্ছে তাও স্পষ্ট বোঝা যায়।

২০১৯ সালের পর থেকে কোহলি, রোহিতেরও বয়স বাড়ছে। পাওয়ার প্লের নিয়ম বদলাচ্ছে, আরও বেশি রান উঠছে। রোহিত তো ধোনির আমলে ইনিংস শুরু করার সময় থেকে বরাবরই প্রথমে রক্ষণ, পরে আক্রমণ নীতিতে খেলে এসেছেন। সেভাবেই তিনবার দ্বিশতরান করেছেন। তিনি বদলাবেন কেন? এদিকে কোহলিরও ক্ষমতা কমছে। যত কমছে তিনি তত সাবধানী হচ্ছেন। আজকের একদিনের ক্রিকেটে ঝুঁকি না নিলে কোহলির দরের ব্যাটার রোজ অর্ধশতরান করতে পারেন। তাও মাঝে তিন-চার বছর তাঁর সব ধরনের ক্রিকেটেই সময় খারাপ যাচ্ছিল। পঁচিশ ইনিংস পরে একদিনের ক্রিকেটে শতরান এল গত বছর ডিসেম্বরে চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। মনে রাখা ভাল, সিরিজটা ভারত আগেই হেরে গিয়েছিল। কোহলির শতরানটা আসে সিরিজ হেরে যাওয়ার পরের ম্যাচে। অতঃপর কোহলি ছন্দে ফিরেছেন, বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও হলেন। কিন্তু দেখা গেল তিনি ধোনিসুলভ সাবধানী ব্যাটিং করছেন। ধোনির চেয়ে কোহলি অনেক উঁচু দরের ব্যাটার, তাছাড়া নামেনও অনেক আগে। তাই রান করছেন বেশি, কিন্তু দ্রুত রান তোলার দায়িত্ব অন্য কাউকে নিতে হচ্ছে। ফাইনালে সে দায়িত্ব রাহুল পালন করতে পারেননি। পরিসংখ্যান বলছে, ফাইনালে প্রথম দশ ওভারের পরে ভারত মাত্র চারটে চার মেরেছে। ২০০৫ সালের পর পুরুষদের একদিনের ম্যাচে এটা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এই ব্যাটিং কোনো ম্যাচ জেতাতে পারে না, বিশ্বকাপ ফাইনালে জেতা তো অসম্ভব। এমন ইনিংসে মহাতারকা পঞ্চাশ, একশো যা-ই করুন; কী এসে যায়?

সত্যিকারের বিশ্লেষণ করলে স্বীকার করতে হবে, ফাইনালে ভারতকে হারিয়েছে মিডল অর্ডার ব্যাটিং। বোলিং নয়। বস্তুত, গত চার-পাঁচ বছরে ভারতীয় বোলাররা টেস্টে এবং একদিনের ক্রিকেটে এত বেশি হারা ম্যাচ জিতিয়ে দিয়েছেন যে ব্যাটারদের এরকম মন্থর ব্যাটিং, সার্বিক ব্যর্থতা – সবই ঢেকে গেছে বারবার। এবারের ইংল্যান্ড ম্যাচও অমন হইহই করে জেতার কথা নয় ওই কটা রান নিয়ে। কিন্তু ঐন্দ্রজালিক জুটি শামি-বুমরা ফর্মে থাকলে সবই সম্ভব। তার উপর আছেন মহম্মদ সিরাজ আর রহস্যময় কুলদীপ যাদব, যাঁর কোনটা গুগলি আর কোনটা সাধারণ লেগ ব্রেক তা বুঝতে ফাইনালে ট্রেভিস হেড আর মারনাস লাবুশেনের আগে পর্যন্ত সব দলের ব্যাটাররা হিমশিম খেলেন। এঁদের সঙ্গে রবীন্দ্র জাদেজা। কিন্তু এঁরা কোনোদিন ব্যর্থ হবেন না এমন দাবি করা চলে না। তাই হাতে রান থাকা দরকার। কথাটা আর কেউ না বুঝুক, অধিনায়ক রোহিত বুঝেছিলেন। তাই বিশ্বকাপে এসে নিজের ব্যাটিং বদলে ফেললেন। কিন্তু দলের সবচেয়ে বড় তারকাকে বদলানোর সাধ্য তাঁরও নেই। কোহলি ঠিক তিনটে শতরান সমেত ৭৬৫ রান করলেন। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপের প্রথম দশজন রান সংগ্রাহকের মধ্যে একমাত্র তাঁর আর রাহুলের স্ট্রাইক রেটই একশোর নিচে

অস্ট্রেলিয়াকে ফাইনালে জেতাল হেড আর লাবুশেনের চতুর্থ উইকেট জুটি, ভারতকে হারাল কোহলি আর রাহুলের শম্বুক গতির চতুর্থ উইকেট জুটি। অথচ ভারত এমন আজব দেশ, তারকা সাংবাদিক থেকে ফেসবুক পণ্ডিত – সকলে এখনো প্রশ্ন করে যাচ্ছেন, রোহিত কেন ওই শটটা খেলতে গেল? ফাইনালে কেউ ওরকম খেলে? সাক্ষ্যপ্রমাণ বলছে ফাইনালে রোহিত ওই ব্যাটিং না করলে অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্যটা আরও কম হত, ম্যাচটা আরও আগে শেষ হত।

তারকা থেকে ক্রিকেটপ্রেমী – গোটা বাস্তুতন্ত্রের গোঁড়ামি না কাটলে ভারতীয় ক্রিকেট, দেশটার মতই, পিছন দিকে এগোতে থাকবে।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ভারতীয় ক্রিকেট বয়স ঢেকে ফেলছে বিজ্ঞাপনে

অ্যালাস্টেয়ার কুককে নিশ্চয়ই ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে আছে। টেস্ট ক্রিকেটে বারো হাজারের বেশি রান করা ব্যাটারকে এমনিতেই কোনো ক্রিকেটপ্রেমী ভোলেন না। তার উপর কুক জীবনের প্রথম এবং শেষ টেস্ট খেলেছিলেন ভারতের বিরুদ্ধেই, আর দুটোতেই তিন অঙ্কের রান করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, ২০১১ সালে ভারতের অভিশপ্ত ইংল্যান্ড সফরের সময়ে এজবাস্টন টেস্টে ক্রিকেটজীবনের সর্বোচ্চ স্কোরেও (২৯৪) পৌঁছন। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফেলা কুক এখনো দাপটে কাউন্টি ক্রিকেট খেলছেন। এ মরসুমে এসেক্সের এই ওপেনারের গড় এখন ৬০। পাঁচটা ম্যাচেই তিনটে শতরান করে ফেলেছেন এবং দুই দশকব্যাপী প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট কেরিয়ারে আগে কখনো যা পারেননি, তা ঘটিয়ে ফেলেছেন গত ম্যাচে। দুই ইনিংসেই শতরান করেছেন।

এদিকে কুক অবসর নেওয়ার পর থেকে ইংল্যান্ডের টেস্ট দলের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হয়েছে। জো রুটের কাছে ইংল্যান্ডের কর্মকর্তা, ক্রিকেটপ্রেমী – সকলেরই বিরাট আশা ছিল। কিন্তু ব্যাটার হিসাবে যথেষ্ট সফল হলেও অধিনায়ক হিসাবে রুট একেবারে ব্যর্থ হয়েছেন। গত আঠারোটা টেস্টের মধ্যে মাত্র একটা জিতেছে ইংল্যান্ড। ফলে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। যে যে কারণে ইংল্যান্ডের এমন হাঁড়ির হাল, তার অন্যতম হল ওপেনারদের ব্যর্থতা। কুক অবসর নেওয়ার পর থেকে অনেককে নির্বাচকরা সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু কেউই ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেননি। কুক ইতিমধ্যে স্যার অ্যালাস্টেয়ার কুক হয়ে গেছেন। মানে ক্রিকেট মাঠে তাঁর কীর্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন স্বয়ং রানী এলিজাবেথ। জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড সম্প্রতি খোলনলচে বদলে ফেলেছে। নতুন ডিরেক্টর অফ ক্রিকেট হয়েছেন প্রাক্তন ক্রিকেটার রব কী, নতুন টেস্ট অধিনায়ক বেন স্টোকস আর টেস্ট দলের কোচের দায়িত্বে এসেছেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। দেশটার নাম ভারত হলে এতদিনে হাউস অফ কমন্সে সব দলের সাংসদরা মিলে রেজলিউশন পাস করাতেন, নতুন অধিনায়ক আর কোচকে কুককে অবসর ভেঙে ফিরে আসতে বলতেই হবে। কুক নিজেও শতমুখে সংবাদমাধ্যমকে বলে বেড়াতেন, তিনি এখনো দারুণ ফিট এবং জীবনের সেরা ফর্মে রয়েছেন।

কিন্তু দেশটার নাম ইংল্যান্ড। কয়েকদিন আগে কুককে এক সাক্ষাৎকারে রব কীর নিয়োগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি বলেছেন, ভালই তো। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটের এখন একেবারে নতুন করে শুরু করা উচিত। নিজের সম্পর্কে কোনো কথাই বলেননি। বরং বলেই দিলেন যে পুরনো সবকিছু ভুলে এগোনো উচিত।

স্নেহময় জ্যাঠামশাইরা পরীক্ষায় ফেল করা ভাইপোদের উৎসাহ দেওয়ার জন্যে এরকম বলতেন। তা কুকজেঠুর বয়স কত? সাঁইত্রিশ বছর চার মাস। চলতি আইপিএলে গত ম্যাচটা (তা-ও বিপক্ষের দ্রুততম বোলার লকি ফার্গুসন কোনো অজ্ঞাত কারণে বল করতে এলেন বিরাট আর ফ্যাফ দু প্লেসি সেট হয়ে যাওয়ার পর এবং মাত্র দু ওভার বল করলেন) বাদ দিলে চূড়ান্ত ব্যর্থ (তিনটে ম্যাচে প্রথম বলে আউট; ১৪ ম্যাচে ৩০৯ রান, গড় ২৩.৭৬) বিরাট কোহলির বয়স কত? সাড়ে তেত্রিশ। অর্থাৎ কুক বিরাটের বয়সেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছিলেন। তাঁর এখনকার ফর্ম দেখে মনে করা অমূলক নয় যে অবসর না নিলে তিনি এতদিনে শচীন তেন্ডুলকরের টেস্ট ক্রিকেটে মোট রানের রেকর্ড (১৫,৯২১) আর সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলার রেকর্ড (২০০) – দুটোরই কাছাকাছি পৌঁছে যেতেন। অথচ এখন কনিষ্ঠরা পারছে না দেখেও ফিরে আসার নাম করছেন না। বোর্ডও এখন পর্যন্ত তাঁর নাম করেনি। ভক্তরা কেউ কেউ সোশাল মিডিয়ায় কুকের নাম ভাসিয়ে দিয়েছে, কিন্তু প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও তা নিয়ে বিশেষ উৎসাহ প্রকাশ করছেন না। এদিকে বিরাটকে ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক – অনেকেই একটু বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি নাকি একটানা অনেকদিন খেলে ফেলেছেন, কদিন বিশ্রাম নিলেই হইহই করে রানে ফিরবেন। বিরাটও গ্রুপ লিগের শেষ ম্যাচের আগে আইপিএলের সরাসরি সম্প্রচারকারী সংস্থাকে সাক্ষাৎকারে বললেন তাঁর উপর দিয়ে সত্যিই অনেক ধকল গেছে, তাই বিশ্রাম নিলে ভালই হয়। মজার কথা, বিশ্রাম নেওয়া যে প্রয়োজন সেটা তাঁর আইপিএলের শেষ লগ্নে এসে খেয়াল হল। বিরাট মনে করেন আমাদের প্রাক্তন ডিরেক্টর অফ ক্রিকেট রবি শাস্ত্রীর চেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁর নেই। তিনি শুধু বিরাটকে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেননি, বলেছেন বিশ্রামের পর বিরাট আরও ছ বছর খেলতে পারে। অর্থাৎ কুক যে বয়সে ফর্মে থেকেও জ্যাঠামশাইয়ের ভূমিকা উপভোগ করছেন, বিরাট সেই বয়সেও খেলে যাবেন। অথচ বিরাটের ফর্ম কিন্তু এবারের আইপিএলে হঠাৎ উধাও হয়েছে এমন নয়। এই সাইটেই আগে লিখেছি, কোনো ধরনের ক্রিকেটেই তিনি তেমন প্রভাব ফেলতে পারছেন না অনেকগুলো বছর হয়ে গেল।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড নতুন করে শুরু করার কাজটা আগেই করেছে, কারণ আইসিসি টুর্নামেন্টে বারবার ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা দরকার। শাস্ত্রীর জায়গায় এসেছেন রাহুল দ্রাবিড় আর সাদা বলের অধিনায়ক করা হয়েছিল রোহিত শর্মাকে। বিরাট টি টোয়েন্টি ক্রিকেট ছাড়া অন্যগুলোর লাগাম নিজের হাতে রাখতে চেয়েছিলেন, বোর্ড সে গুড়ে বালি দিয়ে পরে টেস্ট ক্রিকেটেও রোহিতকেই নেতা করে দিয়েছে। তা রোহিতের বয়স কত? পঁয়ত্রিশ। টেস্ট ক্রিকেট কোনোদিনই রোহিতের সেরা মঞ্চ ছিল না। ন বছর আগে টেস্ট অভিষেক হলেও এতদিনে মোটে পঁয়তাল্লিশটা টেস্ট খেলেছেন, শতরান মাত্র আটটা। বিদেশে প্রথম শতরান পেলেন গত ইংল্যান্ড সফরে। তিনি আসলে সাদা বলের যম। অথচ গত ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে বিরাটের পাশাপাশি তিনিও ব্যর্থ হয়েছিলেন, এবার আইপিএলেও মোটেই রানের মধ্যে নেই (১৩ ম্যাচে ২৪৮ রান; গড় ২০.৪৬)। একাধিকবার আইপিএল খেতাব জয়ী মুম্বাই ইন্ডিয়ানস যে এবার পয়েন্ট টেবিলের একেবারে তলায় পড়ে আছে, তার অন্যতম কারণ রোহিতের খারাপ ফর্ম।

এ বছর ফের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি। স্বয়ং অধিনায়ক এরকম ফর্মে থাকলে দলের অবস্থা কী হবে? উপরন্তু দলের সবচেয়ে বড় তারকা বিরাটকে দীর্ঘদিন ধরে টি টোয়েন্টির উপযোগী দেখাচ্ছে না। তিনি ইদানীং এত সাবধানে ব্যাট করছেন (বৃহস্পতিবার গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে ৫৪ বলে ৭৩ রান করার আগে অব্দি স্ট্রাইক রেট ছিল ১১৩.৪৬), যে তিনি বড় রান করলে দলের মোট রান ভাল জায়গায় পৌঁছনো শক্ত। অথচ এই দুই তারকা থাকতে ঋতুরাজ গায়কোয়াড়, রাহুল ত্রিপাঠী, রাহুল টেওটিয়াদের মত বড় শট নিতে পারা ব্যাটারদের দলে জায়গা হবে না।

তবে ভারতীয় ক্রিকেট যে ভারত দেশটার মতই পিছন দিকে এগোতে চাইছে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ এই দুজন নন। সাঁইত্রিশ বছরের কুক যদি জেঠু হন, আগামী ৭ জুলাই একচল্লিশে পা দিতে চলা মহেন্দ্র সিং ধোনি নিঃসন্দেহে পিতামহ ভীষ্ম। তাঁর যে ইচ্ছামৃত্যু, তা সেই ২০১১ সালেই প্রমাণ হয়ে গেছে। দল পরপর আটটা টেস্ট হারার পরেও ধোনির অধিনায়কত্ব যায়নি, বরং সে প্রস্তাব নির্বাচন কমিটির মিটিংয়ে তোলার পরে মোহিন্দর অমরনাথের নির্বাচকের চাকরি গিয়েছিল। ভারতের একদিনের ক্রিকেটের দলও ধোনিকে বয়ে বেড়িয়েছে বছর চারেক। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল আর বড় শট নিতে পারেন না, অন্য প্রান্ত থেকে কেউ সে কাজটা করলে তিনি বড়জোর এক-দুই রান নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখতে পারেন, যা অনেকসময় জেতার পক্ষে যথেষ্ট নয়। তবু তাঁকে অবসর নিয়ে প্রশ্ন করলে বেজায় রেগে যেতেন। ২০১৬ ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি থেকে ভারতের বিদায়ের পর তো নির্লজ্জতার শিখরে উঠেছিলেন। এক অস্ট্রেলিয় সাংবাদিক এই প্রশ্ন করায় তাঁকে সাংবাদিক সম্মেলনের ডায়াসে ডেকে পাশে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি ধোনির অবসর দেখতে চান কিনা। তিনি তো আর ভারতীয় নন, যে কোনো আত্মীয় পরিজন থাকবে যে ধোনির জায়গায় খেলতে পারে।

এন শ্রীনিবাসনের থেকে ইচ্ছামৃত্যুর বর পেয়েছিলেন বলেই ধোনি একদিনের ক্রিকেট খেলতে পেরেছেন ২০১৯ বিশ্বকাপ অব্দি। অথচ ২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে চার, ছয় মারার ক্ষমতা তো বটেই, গড়ও কমে গিয়েছিল। কেরিয়ারের ব্যাটিং গড় যেখানে পঞ্চাশ, সেখানে এই চার বছরের গড় নেমে এসেছিল চুয়াল্লিশে। চারে নেমে খেলতে না পারলে টিভি স্টুডিওতে বসে বিশেষজ্ঞ প্রাক্তন ক্রিকেটাররা বলতেন ধোনিকে পাঁচে খেলানো উচিত। পাঁচে না পারলে বলতেন ছয়ে। অর্থাৎ দল তাঁকে বয়ে বেড়াত। কালে ভদ্রে একটা ম্যাচে উইনিং স্ট্রোক নিলেই ফের সবাই মনে করিয়ে দিত, ধোনি সর্বকালের সেরা ফিনিশার। আর ধোনিকে এসব জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বারবার বলতেন, আগের মত অত ছয় মারেন না তো কী হয়েছে? তিনি তো ফিট আছেন। যেন খেলাটা ক্রিকেট নয়, জিমন্যাস্টিক্স।

আসলে প্রচারযন্ত্র অনুকূল হলে অনেক সমস্যা মিটে যায়। তাই ধোনি নির্বিঘ্নেই খেলে ফেলেন আরও একটা বিশ্বকাপ। কিছু বিশেষজ্ঞ আর অন্ধ ভক্ত আজও বলেন “যদি গাপ্টিলের থ্রোটা উইকেটে না লাগত…”। ভুলে যান যে ধোনি সেদিন পঞ্চাশে পৌঁছতে লাগিয়েছিলেন বাহাত্তরটা বল, মাত্র একটা চার আর একটা ছয় মেরেছিলেন। রবীন্দ্র জাদেজা ৫৯ বলে ৭৭ রান করেছিলেন বলে নিউজিল্যান্ডের জয়ের ব্যবধান আরও বড় হয়নি – এটুকুই সান্ত্বনা। নইলে শেষ ওভারে ধোনির ভেলকি দেখানোর সম্ভাবনা আরও আগেই শেষ হয়ে যেত। রাজনীতিতে প্রচারযন্ত্র অনুকূল হলে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করা যায়। কিন্তু খেলার মাঠে পরিণাম বদলানো যায় না।

আরও পড়ুন টুপির আমি টুপির তুমি?

এতদিন পরে হৃদয় খুঁড়ে আবার এসব বেদনা জাগাতে হচ্ছে, কারণ এবারের আইপিএলে ধোনি ওই জাদেজাকেই হাসির পাত্র বানিয়ে ছেড়েছেন। এমনিতে চেন্নাই সুপার কিংসের মালিক শ্রীনিবাসনের কোম্পানি ইন্ডিয়া সিমেন্টসের অন্যতম ডিরেক্টর ধোনি। সুপার কিংস দলটা সে অর্থে তাঁর নিজের সম্পত্তি। যার ব্যাট, যার উইকেট তাকেই খেলতে নেব না – এ জিনিস পাড়া ক্রিকেটেই চলে না, আইপিএলে কী করে চলবে? ফলে ধোনির উইকেটরক্ষায় যতই শিথিলতা আসুক, ব্যাট হাতে ধারাবাহিকতা যতই কমে যাক, এ দলে তিনি যতদিন খেলতে চাইবেন ততদিনই খেলবেন। সমস্যা হল, তিনি কেবল খেলছেন না, খেলতে গিয়ে অন্যদের কোণঠাসা করছেন। আইপিএল শুরু হওয়ার মুখে ঘটা করে ঘোষণা করা হয়েছিল, পিতামহ অধিনায়কের সিংহাসনটি স্নেহভাজন জাদেজার হাতে ছেড়ে দিচ্ছেন। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হতেই দেখা গেল ফিল্ডিং সাজানো, বোলিং পরিবর্তন – সবকিছুতেই ধোনির কথাই শেষ কথা। জাদেজা নেহাতই রাবার স্ট্যাম্প। অবশ্য তাতেও সুপার কিংস দলের ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা হওয়া আটকায়নি। কিন্তু ব্যাটে, বলে ব্যর্থ জাদেজা নটা খেলার মধ্যে ছটা হারার পর অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিতে চাইলেন। ধোনি মুকুট ফিরিয়েও নিলেন, ভবিষ্যতের কথা ভেবে ঋতুরাজ সিংয়ের মত তরুণতর কাউকে দায়িত্ব দিলেন না। তাহলে মরসুমের শুরুতে নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়ারই বা কী প্রয়োজন ছিল? জাদেজাও তো তেত্রিশ পেরিয়েছেন, কচি খোকাটি নন। তাঁর হাতে নেতৃত্ব তুলে দিয়ে কোন মহৎ উদ্দেশ্যসাধনের আশা ছিল? জাদেজা এই মুহূর্তে চোট-আঘাতের কারণে মাঠের বাইরে। এই টানাপোড়েনে তাঁর আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরল কিনা তিনি মাঠে না ফেরা পর্যন্ত জানা যাবে না। যদি ধরে থাকে, তাহলে সুপার কিংসের চেয়ে বেশি ক্ষতি কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট দলের।

আসলে বাকি পৃথিবী সামনের দিকে তাকাতে চায়, আর আমরা চাই অতীতের গৌরবে বুঁদ হয়ে থাকতে। এ আমাদের জাতীয় চরিত্র। তাই বয়সের সঙ্গে সঙ্গে যে অতি বড় ক্রিকেটারেরও ক্ষমতা কমে আসে, আজ না কমে থাকলেও পরের বড় টুর্নামেন্টটা আসতে আসতে যে কমে যেতে পারে – এসব কথা না তাঁরা নিজেরা মানেন, না তাঁদের ভক্তকুল মানে। তারকারা আয়নায় মুখ দেখতে পান না, কারণ মুখ ঢেকেছে বিজ্ঞাপনে। ফলে ব্যাটে বলে হচ্ছে না, পা বলের লাইনে যাচ্ছে না, রিফ্লেক্স কমে গেছে, বহু বছর ধরে অতিমাত্রায় জিম করার ফলে টানা দু ঘন্টা ব্যাট করলেই পেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ছে – এসব যখন ক্রিকেটার নিজে বুঝতে শুরু করেন, তখনো সবাই মিলে কানের কাছে বলতে থাকে “ও কিছু নয়। কদিন ব্রেক নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।” এমনটাই এনডর্সমেন্টের যুগে ভারতীয় ক্রিকেটে হয়ে আসছে। যেনতেনপ্রকারেণ চল্লিশ অব্দি খেলে যাওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন শচীন। ধোনি ভাবলেন তিনিই বা কম কিসে? হয়ত পঁয়তাল্লিশকে পাখির চোখ করে এগোচ্ছেন। বিরাট ভাবছেন তিনি তো কোনো অংশে ধোনির চেয়ে কম যান না। রোহিত সবে অধিনায়ক হলেন, পঞ্চাশ ওভার আর কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে তাঁরও ঝুড়ি ঝুড়ি রান আছে। তিনিই বা চল্লিশ অব্দি খেলার কথা ভাববেন না কেন? “ক্রিকেটের ঈশ্বর” তো শচীন, কুক তো নন। ফলে টেওয়াটিয়া, ত্রিপাঠীদের বেলা মেঘে মেঘেই বাড়বে।

ঋদ্ধিমান সাহার বেলায় দ্রাবিড় ভদ্রভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এই ছেলেখেলা তিনি চলতে দেবেন না। এই ২০২২ সালেও উনবিংশ শতকের সংস্কার আন্দোলনের গন্ধে মাতাল বাঙালি তা নিয়ে বিস্তর গোল করেছিল। এবারের আইপিএলে গুজরাট টাইটান্সের ওপেনার হিসাবে ঋদ্ধিমানের সাফল্যে আবার গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির দল নির্বাচনের সময়ে যদি তরুণদের সুযোগ দেওয়ার নীতি ভুলে গিয়ে তারকাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়, তাহলে কিন্তু মানতেই হবে, পোর্টফোলিওতে যথেষ্ট পরিমাণ এনডর্সমেন্ট থাকলে ঋদ্ধিমানের বয়সও ঢেকে যেত।

*সব পরিসংখ্যান ১৯ মে, বৃহস্পতিবারের গুজরাট টাইটান্স বনাম রয়াল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর ম্যাচ পর্যন্ত

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

বিরাট অপসারণ: দুই পুরনো বন্ধুর অস্ট্রেলিয় সিদ্ধান্ত

রবি শাস্ত্রী আর বিরাট একদিনের ক্রিকেটের দলের জন্য এত বছরেও একজন চার নম্বর খুঁজে পাননি; কুলদীপ যাদব, যজুবেন্দ্র চহলকে তাঁদের আজ মনে হয়েছে দারুণ প্রতিভা, কাল ভেবেছেন আবর্জনা।

এই মুহূর্তে ভারতীয় ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে। ভারত আপাতত টেস্টে এক নম্বর দল, টি টোয়েন্টিতে দু নম্বর। একমাত্র একদিনের ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়া তিন, ভারত চার। এবারের টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার ঝুলিতে তেমন বড় সাফল্য নেই অনেকদিন হল। নিজের দেশে পরপর দুবার ভারতের কাছে টেস্ট সিরিজ হেরেছে। বল ট্যাম্পারিং, অশ্লীল এস এম এসে জর্জরিত। সুতরাং বলাই যায়, অস্ট্রেলিয়ার সে রাম নেই। কিন্তু সে অযোধ্যাও নেই বললে ভুল হবে। ব্যক্তির চেয়ে দল বড় — তাদের ক্রিকেট সংস্কৃতি বদলায়নি। ওটাই দীর্ঘমেয়াদি দলগত সাফল্যের চাবিকাঠি। ওভাবেই পরপর তিনটে বিশ্বকাপ জেতা দল গড়ে ওঠে।

ভারতীয় ক্রিকেটে এ সংস্কৃতি কোনোদিন ছিল না। এখানে শচীন তেন্ডুলকরের অবসর বর্ণময় করে তুলতে আলাদা সিরিজের আয়োজন হয়। এই তারকাকেন্দ্রিক সংস্কৃতিকে জোর ধাক্কা দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয় গ্রেগ চ্যাপেল। যে দুজন ঘটনার কেন্দ্রে ছিলেন, তাঁদের একজন এখন ভারতীয় দলের কোচ। অন্যজন বোর্ড সভাপতি। সেই রাহুল দ্রাবিড় আর সৌরভ গাঙ্গুলির যুগলবন্দিতে বিরাট কোহলির দুটো মুকুট গেছে, পড়ে আছে একটা

মনে রাখা ভাল, সৌরভ অধিনায়ক হওয়ার আগে টিম ইন্ডিয়া কথাটার প্রচলন হয়নি। সবাই জানত দিল্লি লবি, মুম্বাই লবি ইত্যাদির কথা। প্রতিভাবান ক্রিকেটাররা ‘টিম’ হয়ে উঠতেন না, যা বিদেশে মুখ থুবড়ে পড়ার বড় কারণ ছিল। সে ঐতিহ্য ভেঙে নতুন উত্তরাধিকার তৈরি করেছিলেন সৌরভই। ফলে সে কালের বঙ্গ মিডিয়া সৌরভের অধিনায়কত্ব চলে যাওয়ায় রাহুলকে যতই মিচকে শয়তান বা বিশ্বাসঘাতক প্রতিপন্ন করে থাক, সৌরভ বিলক্ষণ বুঝতেন দলের স্বার্থ সবার উপরে। আর সে স্বার্থ রাহুলের হাতে নিরাপদ। না বুঝলে ওই ঘটনার পরেও এত বছর দুজনের বন্ধুত্ব অম্লান থাকত না। বোর্ড সভাপতি হয়ে সৌরভ রাহুলকে প্রথমে ‘এ’ দলের দায়িত্বে, পরে সিনিয়র দলের দায়িত্বে আনতেন না।

র‍্যাঙ্কিং যা-ই বলুক, সাদা বলের ক্রিকেটে একগুচ্ছ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জিতে একের পর এক আইসিসি প্রতিযোগিতায় যে দল ব্যর্থ, সে দলের নেতৃত্ব বদলের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। সৌরভ, রাহুলদের সময় হলে হয়ত সেমিফাইনাল, ফাইনালে উঠলেই প্রশংসা করা যেত। গত এক দশকে সাফল্যের যে খতিয়ান মহেন্দ্র সিং ধোনি, বিরাট, রোহিত নিজেরাই তৈরি করেছেন — তাতে এখন আর সেমিফাইনালে উঠলেই হাততালি দাবি করা চলে না।

রবি শাস্ত্রী আর বিরাট একদিনের ক্রিকেটের দলের জন্য এত বছরেও একজন চার নম্বর খুঁজে পাননি; কুলদীপ যাদব, যজুবেন্দ্র চহলকে তাঁদের আজ মনে হয়েছে দারুণ প্রতিভা, কাল ভেবেছেন আবর্জনা। এরকম অনেক উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করা যায়, কেন সাদা বলের ক্রিকেটে তাঁদের উত্তরাধিকার বলতে পড়ে থাকবে অশ্বডিম্ব। সে আলোচনা বড় পরিসরের জন্য তোলা থাক।

আপাতত যা বলার, তা হল সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯৯ বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক স্টিভ ওয়কেও অস্ট্রেলিয়া ২০০৩ বিশ্বকাপের দলে রাখেনি। কারণ তিনি মন্থর হয়ে যাচ্ছিলেন, ব্যাটে রান ছিল না। আমাদের বিরাট আন্তর্জাতিক ম্যাচে শেষ শতরান করেছেন ২৩ নভেম্বর ২০১৯,  কলকাতায়। একদিনের ক্রিকেটে শেষ শতরান ১৪ আগস্ট ২০১৯, পোর্ট অফ স্পেনে। তাঁর সামগ্রিক গড় যেখানে প্রায় ষাট, সেখানে ওই শতরানের পর থেকে গড় ৪৩.২৬। অধিনায়কত্ব থাক, উনি বরং ব্যাটিংয়ে মন দিয়ে শচীনের শতরানের রেকর্ড ভাঙুন। মাত্র সাত পা দূরে আছেন।

আরও পড়ুন বিরাট, রোহিত, রাহুলদের সত্য রচনা চলছে চলবে

বিরাটভক্তদের অভিমান হচ্ছে, এই কড়া সিদ্ধান্তটা নিদেন পক্ষে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে ঘোষণা করা হল না বলে। অন্যায় অভিমান নয়, তবে কিনা বিরাট নিজেও সাংবাদিক সম্মেলনের বিশেষ ভক্ত নন। অপ্রিয় প্রশ্ন এলে কেমন রেগে যান, ইন্টারনেট ঘাঁটলেই দেখতে পাবেন। তাঁকে সরানোর সিদ্ধান্ত সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা করলে অপ্রিয় প্রশ্নই বেশি আসত নির্ঘাত। প্রধান নির্বাচক চেতন শর্মার বয়স হয়েছে। তাঁর সুস্থ শরীরকে ব্যস্ত করার ঝুঁকি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি হওয়া বোর্ড সভাপতি না নিয়ে ভালই করেছেন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ভারতীয় ক্রিকেট মানে ফলাফল নিরপেক্ষ ব্যবসা

জয় যা প্রকাশ করে তার চেয়ে বেশি লুকিয়ে ফেলে, পরাজয় যা ধামাচাপা রয়েছে সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে ভারতের সত্বর বিদায়ে মুহ্যমান ক্রিকেটপ্রেমীরা এভাবে ভেবে দেখতে পারেন। বিশ্বের সেরা টি টুয়েন্টি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বলে যে দেশ দাবি করে থাকে, ২০০৭ সালের পর থেকে তাদের একবারও চ্যাম্পিয়ন হতে না পারা এবং ২০১৪ সালের পর আর ফাইনালের মুখ না দেখার পিছনে গভীরতর অসুখ খুঁজে দেখার এই তো সুযোগ। কোভিড যুগের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দলগুলোর মত বুদ্বুদের মধ্যে বাঁচার ইচ্ছা প্রবল না হলে এ-ও ভেবে দেখা দরকার, সমস্যা কি কেবল দল নির্বাচন আর রণকৌশলে, নাকি গোটা ক্রিকেট কাঠামোটাই একদা জনপ্রিয় টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনে দেখানো অসুস্থ মাড়ির মত “ভাল দেখায় বাইরে, পচে গেছে ভিতরে?”

এসব হিং টিং ছট প্রশ্ন যদি মাথার মধ্যে কামড়াতে শুরু করে, তাহলে বিশেষত বাঙালি ক্রিকেটপ্রেমী বিপদে পড়বেন। কারণ সৎভাবে এগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রথমেই উঠে আসবে এক বঙ্গসন্তানের অনাচারের কথা। দেড়-দুশো বছর আগে মাইকেল মধুসূদন লিখেছিলেন “হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে বিবিধ রতন”। সেসব দিন চলে গেছে, এখন ভাঁড়ে মা ভবানী। সৌরভ গাঙ্গুলিই যে আমাদের সর্বশেষ রত্ন, তা কলকাতার কাগজ ও টিভি চ্যানেলের চিৎকৃত প্রচারে গত শতাব্দীর শেষ দিক থেকেই আমরা মেনে নিয়েছি। তিনি শতরান করলে বাঙালি আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ, বাদ পড়লে কেন্দ্রের বঞ্চনা। স্টিভ ওয়কে ইডেন টেস্টে টসের জন্য অপেক্ষা করিয়ে রাখা আমাদের কাছে বিদ্যাসাগরের সাহেবের টেবিলে খড়ম পরিহিত পা তুলে বসার চেয়ে কম নয়। সে যুগে আমরা আরেকটু হলেই লর্ডসের ব্যালকনিতে জামা খুলে মাথার উপর বনবন করে ঘোরানোর কীর্তিকে শিকাগো ধর্মমহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দের বক্তৃতার পাশে বসিয়ে দিতাম। এহেন তেজস্বী বাঙালি আইকন কিনা ক্রিকেট বোর্ড সভাপতি হওয়ার জন্য সমর্থন নিলেন এন শ্রীনিবাসনের। কে শ্রীনিবাসন? যাঁর অনাচার ভারতীয় ক্রিকেটে চূড়ান্ত অচলাবস্থার সূচনা করে। এমন অচলাবস্থা, যে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বোর্ডের সংবিধানই নতুন করে লিখতে হয়েছিল। বোর্ডের দায়িত্ব দীর্ঘদিন ন্যস্ত ছিল সর্বোচ্চ আদালত নিযুক্ত অ্যাড-হক কমিটির হাতে। সেই অ্যাড-হক কমিটির প্রধান বিনোদ রাই, সব জেনেও, সৌরভের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়ে বিদায় নেওয়ার সময়ে বলেছিলেন, সৌরভের চেয়ে যোগ্যতর কোনো ব্যক্তি নেই এই পদের জন্য।

যোগ্যতম হলেও, নতুন সংবিধান অনুযায়ী এই ২০২১ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত সৌরভের বোর্ড প্রেসিডেন্ট পদে থাকারই কথা নয়। ২০১৯ সালের অক্টোবরে ওই চেয়ারে বসার আগেই ক্রিকেটে অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের কর্তা হিসাবে তিনি দু দফায় পাঁচ বছরের বেশি কাটিয়ে ফেলেছিলেন। তাই বোর্ড প্রেসিডেন্ট হিসাবে তাঁর মেয়াদ ছিল ন মাস। ছ বছর পদাধিকারী থাকার পর তিন বছরের কুলিং অফ পিরিয়ড, যখন সৌরভ কেবল বোর্ড নয়, বোর্ডের অধীন কোনো রাজ্য ক্রিকেট সংস্থার পদাধিকারীও থাকতে পারেন না। কিন্তু ভ্লাদিমির পুতিনের মত সৌরভও বোধহয় মনে করেন দেশোদ্ধারের পথে আইনকে বাধা হতে দেওয়া চলে না। তাই তাঁর নেতৃত্বাধীন বোর্ড সুপ্রিম কোর্টে সংশোধিত সংবিধান পুনরায় সংশোধনের আর্জি জানিয়ে বসল। অতঃপর “তারিখ পে তারিখ”।

তা-ও না হয় মানা গেল, কিন্তু যোগ্যতমের আমলে কেমন উদ্বর্তন হল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের? যে ঘরোয়া ক্রিকেটের শক্তিবৃদ্ধির জন্যই শাস্ত্রী-কোহলির দল গত কয়েক বছরে বিশ্ব ক্রিকেট শাসন করতে পেরেছে বলে শোনা যায়, সেই ঘরোয়া ক্রিকেটারদের অতিমারীর আমলে হাঁড়ির হাল। ২০২০ সালের মে-জুন নাগাদ প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অনেকেরই বোর্ডের কাছে এক নয়, দুই নয়, তিন বছরের টাকা পাওনা। আম্পায়ার, স্কোরার, কিউরেটার প্রমুখ খেলা চালানোর জন্য অপরিহার্য ব্যক্তিদেরও একই অবস্থা। সবে এ বছর সেপ্টেম্বরে বোর্ড বর্ধিত ফি এবং ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছে। দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের প্রধানতম প্রতিযোগিতা রঞ্জি ট্রফি, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও বন্ধ থাকেনি, আদৌ খেলা হয়নি ২০২০-২১ মরসুমে। বোর্ডের বক্তব্য ছিল, দু মাসের বায়ো বাবল তৈরি করে সংক্ষিপ্ত রঞ্জি ট্রফি আয়োজনও অসম্ভব। তার চেয়ে সাদা বলের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা ভাল। প্রেসিডেন্ট সৌরভ আর তাঁর যোগ্য সহকারী জয় শাহ কিন্তু ইতিমধ্যে আপ্রাণ চেষ্টায় আইপিএল সম্পূর্ণ করেছেন। ভারতীয় ক্রিকেটের সাথে যুক্ত কর্মকর্তা, সাংবাদিক, ভাষ্যকার — সকলেই আইপিএলকে বুক দিয়ে আগলে রাখেন। কারণ ওতেই নাকি বোর্ডের সংসার চলে, ওটি না বাঁচলে ঘরোয়া ক্রিকেট বাঁচবে না। অথচ কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে আইপিএল ফুলে ফেঁপে উঠছে, ঘরোয়া ক্রিকেটকে সতীনের সন্তানের মত দয়ার দানে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড অধুনা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী বোর্ড; ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে বলে ইদানীং এক ধরনের জাতীয়তাবাদী গর্বও প্রচারিত হয়। কিন্তু সে গর্বে মহিলাদের কোনো ভাগ নেই। কন্যাসন্তানের পিতা সৌরভের আমলে অস্ট্রেলিয়ার মহিলাদের বিগ ব্যাশের আদলে মহিলাদের আইপিএল কিন্তু চালু হল না। অথচ ভারতের মহিলারা গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে অস্ট্রেলিয়ায় টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিলেন। তবু, যে আইপিএল নাকি সর্বরোগহর বড়ি, মহিলাদের জন্য তার ব্যবস্থা করার সুযোগ হয় না পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী বোর্ডের।

সব মিলিয়ে বলা চলে, গোড়া কেটে আগায় জল দেওয়া চলছে। আইনকানুনকে কাঁচকলা দেখানো বাহাদুরিতে পরিণত, কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট বদ রসিকতায়। বোর্ড প্রেসিডেন্ট স্বয়ং এমন এক বাণিজ্যিক সংস্থার বিজ্ঞাপনে মুখ দেখান, যারা জাতীয় দলের শার্ট স্পনসরের প্রতিদ্বন্দ্বী। আবার প্রেসিডেন্ট যুক্ত, এমন সংস্থা আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজ কিনে ফেলে। স্পষ্টতই সৌরভ শ্রীনিবাসনের পথেই হাঁটছেন। ইন্ডিয়া সিমেন্টসের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ওই মালিক একইসঙ্গে বোর্ড প্রেসিডেন্ট এবং চেন্নাই সুপার কিংসের মালিক ছিলেন। দলের অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনিকে ইন্ডিয়া সিমেন্টসের ভাইস-প্রেসিডেন্টও করেছিলেন। সৌরভ সে তুলনায় আর এমন কী করেছেন?

আরও পড়ুন বোর্ডের ঘরে যে ধন আছে, ক্রিকেটের ঘরে সে ধন আছে?

নিয়ম ভাঙা ক্ষমতা প্রদর্শনের উপায় হয়ে দাঁড়ালে ভাল কাজও বাঁকা পথে করতে ভাল লাগে। ঠিক সেভাবেই ভারতীয় দলের কোচ হিসাবে নিয়োগ করা হল রাহুল দ্রাবিড়কে। আইনে যেমন বলা আছে সেভাবে ক্রিকেট অ্যাডভাইসরি কমিটি (সদস্য মদনলাল, রুদ্রপ্রতাপ সিং ও সুলক্ষণা নায়েক) বসিয়ে প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে কোচ নির্বাচন করলেও দ্রাবিড় যোগ্যতম প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত হতেই পারতেন। কিন্তু তাতে গুণময় বাগচীর মত পেশি ফোলানো যায় না। তাই প্রথমে খবর ছড়িয়ে দেওয়া হল, দ্রাবিড় কোচ হতে পারেন। ফলত আর কেউ প্রার্থী হলেন না। অতঃপর ঘোষণা করা হল, আর কোনো প্রার্থী নেই, অতএব দ্রাবিড়ই কোচ হলেন। জনপ্রিয় প্রার্থীকে রিগিং করে জিতিয়ে দিলে তাঁর যোগ্যতাকে কতটা সম্মান দেওয়া হয় তা অশোক ভট্টাচার্যের একদা ঘনিষ্ঠ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশীর্বাদধন্য এবং অমিত শাহের পুত্রবন্ধু সৌরভ জানেন আশা করা যায়।

অবশ্য এত কথা তাঁর না ভাবলেও চলবে। কারণ ভারতীয় ক্রিকেট এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যেখানে জাতীয় দলের ব্যর্থতাতেও কিছু এসে যায় না। কদিন পরেই আইপিএলের খেলোয়াড় নিলাম হবে। আপামর ক্রিকেটভক্ত, সাংবাদিক, বিশ্লেষক টাকার অঙ্ক নিয়ে আলোচনা করবেন। তারপর আসবে বসন্ত — আইপিএলের আরও একটি মরসুম। দখিনা হাওয়ায় ভেসে যাবে আরও একটি আইসিসি টুর্নামেন্ট থেকে শূন্য হাতে ফেরার দুঃখ। ক্রিকেট খেলার ফলাফল নিরপেক্ষ ব্যবসায় পরিণত হতে আর বেশি দেরি নেই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত