অবহেলিত বিজ্ঞান আর কৈশোরকে ভালবেসে এল পক্ষীরাজের ডিম

আধুনিক বাঙালি বিজ্ঞানী হতে চায় না, কেউ কেউ হয়ে যায়। তাই আমাদের গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমায় বিষয় হিসাবে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানী বিরল।

আকাশের লক্ষ লক্ষ তারার মধ্যে একটা হল সূর্য। সেই সূর্যের আটটা গ্রহ, তার একটা হল পৃথিবী। সেই পৃথিবীর একটা ছোট্ট জায়গা হল আকাশগঞ্জ। সেখানকার একটা স্কুলের একটা পরীক্ষায় যদি আমি ফেল করি, তাহলে কি আমি বিজ্ঞানী হতে পারব না? সৌকর্য ঘোষালের পক্ষীরাজের ডিম ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রীমান ঘোতন ওরফে সার্থক (মহাব্রত বসু) তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আপন মনে এই প্রশ্ন তোলে মাধ্যমিকের টেস্টে, বিজ্ঞান পড়তে গেলে যা না জানলে একেবারেই চলে না, সেই অঙ্কে শূন্য পাওয়ার পরে।

নিজের অস্তিত্বকে এভাবে প্রশ্ন করতে একমাত্র মানুষই পারে – একথা একাধিকবার নানাভাবে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর এই মহাবিশ্বের সাপেক্ষে মানুষের ক্ষুদ্রতার কথা লিখেছেন বিশ্বখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান। তাঁর একখানা বিখ্যাত বইয়ের নাম পেল ব্লু ডট: এ ভিশন অফ দ্য হিউম্যান ফিউচার ইন স্পেস। সেই বইয়ের এক জায়গায় তিনি যা লিখেছেন তার বাংলা তরজমা করলে এরকম দাঁড়ায় ‘ওই বিন্দুটাকে আবার দেখুন। ওটাই এই জায়গাটা। আমাদের বাড়ি। ওটাই আমরা। ওর মধ্যেই আপনি যাদের ভালবাসেন, যাদের চেনেন, যাদের কথা কোনোদিন শুনেছেন, যত মানুষ কোনোদিন ছিল, জীবন কাটিয়েছিল, তারা সকলে আছে…পৃথিবীটা এক বিরাট ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে একটা ছোট্ট মঞ্চ।’ সেগানের জন্মের সাত বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ‘আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,/তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান…’। এই লাইনগুলো রবীন্দ্রনাথের কলম থেকে আসা খুবই স্বাভাবিক। কারণ তাঁর বিশেষ বন্ধু ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু আর স্নেহভাজন ছিলেন আরেক বিশ্ববিশ্রুত বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ছোটদের বিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ দিতে বিশ্বপরিচয় বইখানা লিখে সত্যেন্দ্রনাথকেই উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু কী আশ্চর্য! বাঙালির ‘কালচার’ চর্চায় কোনোদিন বিজ্ঞানীদের জায়গা হল না! আমাদের সাংস্কৃতিক মহীরুহ কারা জিজ্ঞেস করলে কোনো বাঙালিকে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র, সত্যেন্দ্রনাথ বা মেঘনাদ সাহার নাম করতে শোনা যায় না। বোধহয় তাই, বাঙালি বাবা-মায়েরা বহুকাল ধরে ছেলেমেয়েদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার করতে চাইলেও বিজ্ঞানী হয়ে উঠতে উৎসাহ দেন না। আধুনিক বাঙালি বিজ্ঞানী হতে চায় না, কেউ কেউ হয়ে যায়। তাই আমাদের গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমায় বিষয় হিসাবে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানী বিরল; যদি না সেটা কল্পবিজ্ঞান হয়। সৌকর্য কিন্তু এমন এক ছবি তৈরি করেছেন যার কেন্দ্রে আছে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানে আগ্রহ, বিজ্ঞান গবেষণা, এক কিশোরের বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন।

বিশ্বপরিচয়ে সত্যেন্দ্রনাথের উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘মানুষ একমাত্র জীব যে আপনার সহজ বোধকেই সন্দেহ করেছে, প্রতিবাদ করেছে, হার মানাতে পারলেই খুশি হয়েছে। মানুষ সহজশক্তির সীমানা ছাড়াবার সাধনায় দূরকে করেছে নিকট, অদৃশ্যকে করেছে প্রত্যক্ষ, দুর্বোধকে দিয়েছে ভাষা। প্রকাশলোকের অন্তরে আছে যে অপ্রকাশলোক, মানুষ সেই গহনে প্রবেশ করে বিশ্বব্যাপারের মূলরহস্য কেবলই অবারিত করছে। যে সাধনায় এটা সম্ভব হয়েছে তার সুযোগ ও শক্তি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষেরই নেই। অথচ যারা এই সাধনার শক্তি ও দান থেকে একেবারেই বঞ্চিত হল তারা আধুনিক যুগের প্রত্যন্তদেশে একঘরে হয়ে রইল।’ যেন ঘোতনের কথাই লিখেছেন!

শুধু যে ঘোতন বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখে তা নয়, তার অঙ্কের মাস্টারমশাই বটব্যালও (অনির্বাণ ভট্টাচার্য) মনেপ্রাণে বিজ্ঞানী, তাঁর বাবাও ছিলেন বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান গবেষণা করতে বিদেশ যাওয়ার অভিলাষ পূরণ হয়নি, তবু বটব্যাল স্যার বিজ্ঞান-পাগল। আকাশগঞ্জ হাইস্কুলের ছাত্রদের ঘর্ষণ ব্যাপারটা হাতেনাতে বোঝাতে বারান্দায় মোবিল ঢেলে দেন, তার উপর পিছলে পড়েন একের পর এক মাস্টারমশাই। শেষমেশ হেডস্যারও। ফলে বটব্যাল স্যারকে চাকরিটি খোয়াতে হয়। স্যারের ঘরে বড় বড় দুটো ছবিতে আছেন জগদীশচন্দ্র; আর অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, যিনি আলো যে সবসময় সরলরেখায় চলে না তা প্রমাণ করতে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন। এখানেই শেষ নয়, যেভাবে সৌমিক হালদারের মায়াবী ক্যামেরায় ক্লোজ আপে ধরা পড়ে সামান্য ফড়িংও, তাতে মনে পড়ে আরেক বাঙালি বিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যকে। ছোটদের বোধগম্য করে কীটপতঙ্গদের নিয়েও বাংলায় বই লেখার যত্ন ছিল যাঁর। ছোটদের ভাল লাগার জন্যে একটা ছবিতে যা যা দরকার, সেসব মশলা দিয়েও এমন বিজ্ঞানকেন্দ্রিক ছবি তৈরি করার জন্যে নির্দেশক সৌকর্যের প্রশংসা প্রাপ্য। সন্দীপ রায়ের বিস্মরণযোগ্য প্রফেসর শঙ্কুকে (ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়) বাদ দিলে বাংলা ছবির পর্দায় শেষ মনে রেখে দেওয়ার মত বিজ্ঞানী চরিত্র পাতালঘর (২০০৩) ছবির অঘোর সেন (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) আর ভূতনাথ (জয় সেনগুপ্ত)। কিন্তু সেই ছবিতে বিজ্ঞানের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল ভূত ও রূপকথা, যেমনটা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের যে কোনো কাহিনিতে থাকে। এখানে কিন্তু পক্ষীরাজের রূপকথাকে বিজ্ঞানমনস্কতার দিকে ঠেলে দেয় চিত্রনাট্য।

সৌকর্যের ২০১৮ সালের ছবি রেনবো জেলি যাঁরা দেখেছেন (স্বতঃপ্রণোদিত অবাঞ্ছিত পরামর্শ দিচ্ছি – না দেখে থাকলে দেখে নিন), তাঁদের অতি পরিচিত ঘোতন আর তার বন্ধু পপিন্স (অনুমেঘা ব্যানার্জি)। এই ছবিতে তারা আর শিশু নেই, কিশোর-কিশোরী। তার সঙ্গে তাল রেখে সম্পর্কের রসায়নেও বয়ঃসন্ধিসুলভ পরিবর্তন এসেছে, যা ছবিতে অন্য এক রস যোগ করেছে। রেনবো জেলির পরে সৌকর্যের গতবছর মুক্তি পাওয়া ভূতপরী (২০২৪) ছবিতে মজা, ভূত, রূপকথার সঙ্গে মিশেছিল অনিবার্য বিষাদ। এই ছবিতে তার চেয়ে মৃদু অথচ গভীর বিষাদ আছে। সে কারণেই ছবি শেষ হওয়ার পরেও বেশ খানিকক্ষণ রেশ থেকে যায়। দুই খুদে অভিনেতাই চমৎকার কাজ করেছে। ‘মার্জিনাল আই কিউ’ থাকলেই যে মানুষের কৌতূহলের অভাব হয় না, আগ্রহের অভাব হয় না, অনুভূতির অভাব হয় না, তা মহাব্রতর অভিনয়ে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। রেনবো জেলির পর এই ছবি দেখলে মনে হয় মহাব্রতর সহজাত অভিনয় ক্ষমতা আছে। পপিন্সের সঙ্গে একান্ত দৃশ্যগুলোতে তার শরীরী ভাষায়, গলার স্বরে যে আকুতি ফুটে ওঠে তা এখনো বয়ঃসন্ধির স্মৃতি আছে যাঁদের, তাঁরা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে পারবেন। অনুমেঘার সংলাপ বলার ধরনে রেনবো জেলিতে খানিকটা কবিতা আবৃত্তির ঢং ছিল, যার ক্ষতিপূরণ হয়ে গিয়েছিল শৈশবের মিষ্টতায়। এই ছবিতে তার অভিনয়ে প্রয়োজনীয় পরিণতি দেখা গেছে। জগদীশচন্দ্রের বন্ধুর লেখা লাগসই গানটা গাওয়ার সময়ে বোঝা গেছে, অনুমেঘার গানের গলাটাও বেশ।

মজাদার সংলাপ আর সুরেলা গান এই ছবির জোরের জায়গা। বিশেষত সৌকর্যের কথায় এবং নবারুণ বোসের সুরে ‘অঙ্কে জিরো, কিসের হিরো, খ্যাপা স্যারের বিশেষ গেরো’ গানখানা যেমন ছবির গল্প আর মেজাজের সঙ্গে দারুণ খাপ খায়, তেমনি একবার শুনলে চট করে ভুলতে পারাও শক্ত। অবশ্য ওই গানে একটা চালু বাঙালি ভ্রান্তি ঢুকে পড়েছে। ম্যাজিকের সঙ্গে কিন্তু ম্যাজিক রিয়ালিজমের কোনো সম্পর্ক নেই। ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ ব্যাপারটা আসলে কী তা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের নোবেল প্রাপ্তি বক্তৃতা পড়লে পরিষ্কার বোঝা যায়।

গানখানা চমৎকার গেয়েছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য, কিন্তু হতাশ করেছে তাঁর অভিনয়। অনির্বাণকে নিজের বয়সের থেকে অনেক বেশি বয়সী একখানা চরিত্র দেওয়া হয়েছিল। তা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তিনি একটা বিশেষ কণ্ঠস্বর, কতকগুলো মুদ্রাদোষের সাহায্য নিয়েছেন। তাতে হাস্যরসের উৎপাদন হয়েছে বটে, কিন্তু উৎপাদনের চেষ্টা বড় বেশি করে ধরা পড়েছে। বরং যেসব দৃশ্যে তিনি বাবার স্মৃতিতে, প্রয়াত বন্ধুর স্মৃতিতে বিষণ্ণ – সেখানে অভিনেতা অনির্বাণকে চেনা গেছে। অতি অভিনয়ে দুষ্ট আরেক বিশিষ্ট অভিনেতা, পঞ্চায়েত প্রধানের চরিত্রে, দেবেশ রায়চৌধুরীও। প্যাংলার চরিত্রে শ্যামল চক্রবর্তী আর বিল্টুর চরিত্রে অনুজয় চট্টোপাধ্যায়ের মত দুজন চমৎকার অভিনেতার বিশেষ কিছু করার ছিল না।

আরো পড়ুন ছবিটা

এইখানেই এসে পড়ে চিত্রনাট্যের দুর্বলতার প্রশ্ন। এই দুজন যেমন অনেকখানি অব্যবহৃত রয়ে গেছেন, তেমনি বটব্যাল স্যারের বিজ্ঞান-পাগলামিও আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার ছিল বলে মনে হয়। বটব্যাল স্যারের অল্পবয়সের যে চেহারা দেখানো হয়েছে তার সঙ্গে বেশি বয়সের চেহারা আর হাবভাবের তফাতও চোখে লাগার মত। হয়ত দুজন আলাদা অভিনেতাকে ব্যবহার করলে ব্যাপারটা তত বিসদৃশ লাগত না। এছাড়া যে জিনিসটা এই ছবিতে বেখাপ্পা লাগে তা হল পঞ্চায়েত প্রধানের পিছনের দেওয়ালের ছবিগুলো। এমন কোনো রাজনৈতিক নেতা কি এদেশে আছেন যিনি পাশাপাশি টাঙিয়ে রাখেন লেনিন, জোসেফ স্তালিন, জওহরলাল নেহরু আর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ছবি?

তবে এসব ত্রুটিকে ছাপিয়ে গেছে এই ছবির আদর্শগত দিক। আকাশগঞ্জে কোনো উঁচু নিচু ভেদ নেই। বিজ্ঞানীর বাড়ির চাকর প্যাংলা অঙ্কে যথেষ্ট দড়। সে-ই ঘোতনের পরীক্ষা নিয়ে নিতে পারে। গ্রামের স্কুলে পাশ করতে গলদঘর্ম ঘোতনের গোটা দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় বন্ধু হল কলকাতার স্কুলে ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া পপিন্স। বটব্যাল স্যার তো বটেই, হেডস্যার গুণধর বাগচী (সুব্রত সেনগুপ্ত) পর্যন্ত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়াই জীবন সার্থক হওয়ার একমাত্র নিদর্শন বলে মনে করেন না। দুর্নীতিগ্রস্ত, আত্মরতিপ্রবণ পঞ্চায়েত প্রধানের মাথায় বন্দুক ধরার সুযোগ পেয়ে তাঁরা কী দাবি করেন? স্কুলে লাইব্রেরি আর ল্যাবরেটরি বানিয়ে দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, অনুভূতিপ্রবণ মন না থাকলে ডিগ্রি, বুদ্ধি, পরীক্ষার নম্বর যে বৃথা – এই কথাটা এই ছবির কোষে কোষে।

এসব দেখলে মনে পড়ে, আকাশগঞ্জ আমাদের আশপাশেই ছিল। আমাদেরই অবহেলায় হারিয়ে গেছে। সৌকর্য কল্পনাশক্তির জোরে তাকে ভারি সহজ, সুন্দর করে আবার আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছেন। আমাদের ছেলেমেয়েদের সেই আকাশগঞ্জ দেখানোর সুযোগ না ছাড়াই ভাল। অন্তত তাদের স্বপ্নে আকাশগঞ্জ ঢুকে পড়ুক। তারপর কে বলতে পারে? ভোরের স্বপ্ন, মিথ্যে না-ও তো হতে পারে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ঘ্যাচাং ফু: আমার বিশ্বাসঘাতক চোখে যেটুকু ধরা পড়ল

যে যুগে কমিউনিস্টরাও দুর্নীতি বলতে শুধু ঘুষ খাওয়া বোঝেন আর ২২ লাখ টাকার গাড়ি কেনা বৈধ বলে গলা ফাটান, যেহেতু সেটা কালো টাকায় কেনা হয়নি – সে যুগে পর্দায় যৌনতা নিংড়ে নীতিহীনতা দেখানো ঘ্যাচাং ফু পরিচালকের সবচেয়ে প্রশংসনীয় কাজ।

ছোটবেলা থেকে ‘কমরেড’, ‘বিপ্লব’, ‘ক্যাপিটালিজম’ ইত্যাদি শব্দগুলোর সঙ্গে ওঠাবসা করলে (কেবল ওঠাবসাই করলে) যা হয়, তা হল মাঝবয়সে এসেও শব্দগুলো শুনলেই চোখদুটো নিভু নিভু হয়ে আসে, মাথাটা একদিকে হেলে পড়ে, গালটাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্যে হাতটা উঠে আসে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ছবিটার মত। জয়রাজ ভট্টাচার্য নির্দেশিত ঘ্যাচাং ফু ছবিটা দেখতে শুরু করার কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্য গালে এমন একটা চড় পড়ল যে পিঠ সোজা করে উঠে বসতে হল। ছোটবেলায় ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসে ঝিমোলে আমার কমিউনিস্ট পার্টি করা বাবা এরকম চড় কষাতেন। জয়রাজ দেখলাম জানেন, যে এক চড়ে ঝিমুনি উধাও হয়ে যায় না। খানিক পরেই আবার ফিরে আসে। তখন কানমলা দিতে হয়। গোটা ছবি জুড়ে সে কাজটাই করে গেছেন ক্রমাগত। ফলে ঘ্যাচাং ফু দেখা মোটেই সুখকর অভিজ্ঞতা নয়, বরং বেজায় অস্বস্তিকর।

এদেশে কোনোদিন বিপ্লব হয়নি। তা বলে মুখেন মারিতং জগৎ মার্কসবাদী দেখার সুযোগ আমরা পাইনি এমন নয়। বরং মার্কসবাদীদের রাজনৈতিক কার্যকলাপ যত কমেছে, জনবিচ্ছিন্নতা যত বেড়েছে, ততই এই ছবির সুরজিৎ সেনের মত ধপধপে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরা তত্ত্ব কপচানো মার্কসবাদীতে ভরে গেছে আমাদের চারপাশ। এই ছবির সবকটি চরিত্র রীতিমত বইপড়া মার্কসবাদী, বিপ্লবে নিবেদিতপ্রাণ পার্টিকর্মী। কিন্তু কেউ শ্রমজীবী নয়, সকলেই উচ্চশ্রেণিভুক্ত। দামি মদ, দামি খাবার, রবীন্দ্রসঙ্গীত (পিচ কারেক্টর সমেত) ছাড়া এদের চলে না। কিন্তু ও গান তাদের মরমে প্রবেশ করে না। রবীন্দ্রসঙ্গীতটির ইতিহাস জানা থাকলেও তারা বুঝতে পারে না কেন ওই গান ওখানে গাওয়া হল। দেখে মনে পড়ে যায় উৎপল দত্তের প্রতিবিপ্লব বইয়ে উল্লিখিত সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির উনবিংশ পার্টি কংগ্রেসের কথা

… পার্টির ম্যাণ্ডেট কমিশন গর্ব ক’রে রিপোর্ট দিচ্ছেন:
প্রতিনিধি সংখ্যা: ১১৯২। এদের মধ্যে
৭০৯ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট।
৮৪ জন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত।
২২৩ জন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত।
১৭৬ জন আংশিক স্কুলে শিক্ষিত।
২৮২ জন ইঞ্জিনিয়ার।
৬৮ জন কৃষি বিশেষজ্ঞ।
৯৮ জন অধ্যাপক।
১৮ জন অর্থনীতিবিদ।
১১ জন ডাক্তার।
৭ জন উকীল।

শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি-কংগ্রেসে শ্রমিক ক’জন ছিলেন তার উল্লেখ করারও প্রয়োজন দেখেন নি সংশোধনবাদী নেতারা। দেখা যাচ্ছে কংগ্রেসের শতকরা ৬০ জন প্রতিনিধি এসেছেন নূতন শিক্ষিত সুবিধাভোগী শ্রেণী থেকে।

ঔতরখানভ লিখেছেন:

“এই সূত্র-অনুসারে যে কমিউনিস্ট পার্টি এককালে শ্রমিকের পার্টি বলে গর্ব করত, তা আজ ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক ও আমলাদের পার্টি হয়ে গেছে, নানা পেশায় নিযুক্ত কর্মচারীদের পার্টি হয়ে গেছে।”

এই ছবির চরিত্রেরা বাবাকে ডাকে ‘কমরেড বাবা’, স্বামী ‘ডার্লিং’ বা ‘সুইটহার্ট’ বলে ডাকলে শুনতে পায় না, শুনতে পায় ‘কমরেড’ বলে ডাকলে। তবে পেটে দু পাত্তর পড়লেই বেরিয়ে আসে আসল কথা – আমাদের কথায় সাধারণ লোকে বিশ্বাস করল কি না করল, কিছু আসে যায় না। কারণ আমরা নিজেরাই নিজেদের কথাগুলো বিশ্বাস করি না।

আদ্যন্ত নীতিহীনতা বোঝাতে সাধারণত সিনেমায় দেখানো হয় আর্থিক দুর্নীতিকে। আমার কাছে এই ছবির শ্রেষ্ঠ দিক হল নীতিহীনতা, ভণ্ডামিকে ল্যাংটো করতে আগাগোড়া যৌনতার ব্যবহার। ছবির শুরুতেই, চরিত্রগুলো কারা, কী বৃত্তান্ত তা বুঝতে পারারও আগে দেখা যায় লিফটে চোরাগোপ্তা এর হাত ওর কোমরে, কার আঙুল যেন কার প্যান্টের চেন খুলছে। পরে লম্বা টেবিলের এক প্রান্তে যখন বাকুনিন বনাম এঙ্গেলস বনাম লেনিন বনাম অমুক বনাম তমুক চলছে, তখন অন্য প্রান্তে এক কমরেড আরেক কমরেডের পাছা দেখতে ব্যস্ত থাকেন। বিপ্লবোত্তর সমাজে যৌনতার ভূমিকা কী হবে সে আলোচনাই করতে দিতে চান না যে কমরেড (সুদীপা বসু), তিনি যত্রতত্র হস্তমৈথুনে লিপ্ত হন। প্রত্যেকটা চরিত্রই অতৃপ্ত যৌনক্ষুধায় ভুগছে। তাদের যৌন অবদমনেরই প্রকাশ অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাওয়ায়। কেউ কেউ যৌন তৃপ্তির রাস্তা খুঁজে নেয় – খোলা ছাদে অর্জিতে অথবা নির্জন ডাইনিং রুমে পায়ুমৈথুনে। যারা পায় না, তারা কিউয়ের মত প্রবল বিক্রমে ঘড়িগুলোকে হাতুড়ি পেটা করতে থাকে। সত্যিই তো আমাদের বহু হিংসার পিছনেই অবদমিত কাম। নইলে যে মন্ত্রীর ফ্ল্যাট থেকে নগদ ৫০ কোটি টাকা বেরোয়, তার ক্ষমতার অপব্যবহারের থেকেও ক্রমশ কেন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে অল্পবয়সী সুন্দরীর সঙ্গে তার সম্পর্ক? যে যুগে কমিউনিস্টরাও দুর্নীতি বলতে শুধু ঘুষ খাওয়া বোঝেন আর ২২ লাখ টাকার গাড়ি কেনা বৈধ বলে গলা ফাটান, যেহেতু সেটা কালো টাকায় কেনা হয়নি – সে যুগে পর্দায় যৌনতা নিংড়ে নীতিহীনতা দেখানো ঘ্যাচাং ফু পরিচালকের সবচেয়ে প্রশংসনীয় কাজ। এমনটা না করে যদি পরিচালক সরাসরি নিজের সময়টা দেখাতেন, সেই সময়ের কোনো কমিউনিস্ট কবিকে দেখাতেন, যিনি এক হাতে দক্ষিণপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে কবিতা লেখেন আর অন্য হাতে সেই সরকারের অনুষ্ঠানে যাওয়ার আমন্ত্রণপত্রটা ফেসবুকে পোস্ট করেন – তাহলে কোনো অভিঘাতই তৈরি হত না। কারণ অমন আমরা রোজ দেখছি।

এ পর্যন্ত পড়ে অনেকেই রে রে করে তেড়ে আসবেন, বলবেন আলোচক নেহাত বদমাইশ। নিজের গায়ের ঝাল মেটাতে একটা শিল্পকর্মকে ব্যবহার করছে। পার্থ চ্যাটার্জির ফ্ল্যাট থেকে টাকা উদ্ধার হওয়া এবং শতরূপ ঘোষের গাড়ি বিতর্কের বহু আগেই ঘ্যাচাং ফু নির্মিত। তাহলে এটা সে যুগের ছবি কী করে হয়? কথা হল, যুগ মানে স্রেফ কয়েকটা বছর নয়। ছবিটা যদি নির্মাণের সময়কালটুকুর বাইরে কোনোকিছু সম্পর্কে কোনো সন্দর্ভ হয়ে উঠতে না পারত, তাহলে নির্মাণের এত বছর পরে তা নিয়ে আলোচনাই করতাম না। প্রগতির মুখোশ পরে থাকা প্রতিক্রিয়াশীলরা কোনো দেশে কোনো যুগেই ঘোষিত প্রতিক্রিয়াশীলদের চেয়ে কিছু কম বিপজ্জনক নয়। এক কাল্পনিক সময়ের বয়ানে নিজের সময়ের সেই প্রতিক্রিয়াশীলদের উলঙ্গ করতে পেরেছে বলেই ঘ্যাচাং ফু গুরুত্বপূর্ণ। এ ছবি যদি অন্য কোনো দেশে বানানো হত, তাহলে হয়ত যৌনতাকে ভণ্ডামির মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা আলাদা করে প্রশংসনীয় হত না। কিন্তু দেশটা ভারতবর্ষ বলেই এ কাজ অত্যন্ত জরুরি। এ দেশেই তো কমিউনিস্টদের যৌনতা, মদ্যপান ইত্যাদি ব্যাপারে চিন্তাভাবনা দক্ষিণপন্থীদের সবচেয়ে কাছাকাছি। এই শতকের শুরুতেও এ দেশের বড় অংশের কমিউনিস্ট সমকামিতাকে মনে করতেন পুঁজিবাদী বিকৃতি। এখনো এমন মার্কসবাদী দল আছে যারা ওই ধারণাতেই অনড়। একগামিতার সূক্ষ্মতর প্রশ্ন (যা এ ছবিতে বেণীর চরিত্র তুলেছে) না হয় বাদই দেওয়া গেল।

এই ডিসটোপিয়া ঘনীভূত হয়েছে পরিচালকের ঠাট্টার গুণে। মাঝেমাঝেই তিনি এবং ক্যামেরার পিছনের অন্য কুশীলবরা কণ্ঠস্বর হয়ে ঢুকে পড়েছেন ছবিতে, মরা মানুষকে জ্যান্ত করে তোলার মত কাণ্ডও ঘটিয়েছেন। সে ঘটনার ব্যাখ্যা বস্তুবাদী হল কি হল না, তা নিয়ে জবরদস্ত রসিকতাও করা হয়েছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে যা ঘটছে তা আসলে স্রেফ খেলা, ভিডিও গেমের মতই। ফলে শেষদিকে যখন মত্ত অবস্থায় এক বিশেষ যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি বলে কেঁদে ভাসায় একটা চরিত্র আর তার বউয়ের চরিত্রে কমলিকা শতকরা দুশো ভাগ আবেগ ঢেলে বলে ফেলেন ছবির সবচেয়ে রসিক সংলাপ, তখন টেবিলে বসা অনির্বাণ আর অরিত্রীর মত আমিও খ্যাকখ্যাক করে হেসেই ফেললাম।

আকাশে থুতু ছেটালে সে থুতু নিজের গায়েই পড়ে। এ হাসিও কি নিজের দিকেই ফিরে এল? কেন বাপু? আমি তো কমিউনিস্ট নই, পার্টিও করি না। আমি বড়জোর বিশ্বাসঘাতক। অতএব কমিউনিস্ট সাজা বুর্জোয়াদের নিয়ে কেউ হাসাহাসি করলে আমার কী এসে যায়? এসে যাওয়া উচিত নয়, কিন্তু ওই যে গোড়াতেই বললাম – কেন জানি না আগাগোড়া মনে হয় পরিচালক ধরে ধরে তাঁর উদ্দিষ্ট দর্শককে চড়াচ্ছেন, কান মুলে দিচ্ছেন। এক নাগাড়ে মারতে থাকলে খানিক পরে ব্যাপারটা সয়ে যায়, ততটা ব্যথা লাগে না। কিন্তু মারের তীব্রতা বজায় রাখতে পরিচালক কিছুটা নিষ্পাপ সারল্য মিশিয়ে দিয়েছেন। যেমন সেই বাচ্চা মেয়েটা, যে বড়দের তাত্ত্বিক ভাঁড়ামি ছেড়ে উঠে গিয়ে একা ঘুরতে ঘুরতে পেয়ে যায় ধুলো জমে যাওয়া লেনিনকে, যে ফাঁস করে দেয় নীতিবাগীশ মায়ের কামুকতার কাহিনি।

এবং অনির্বাণ, অরিত্রী। একমাত্র তাদের স্মৃতিতেই ক্যামেরা বদ্ধ ইনডোর ছেড়ে বেরিয়ে যায় ফাঁকা মাঠের নরম সকালে, পেলব আবহসঙ্গীতে। তারাই কেবল মার্কস, এঙ্গেলস হ্যানো ত্যানো কপচায় না। শুধু তাদের চোখেই আসে জল, তাদেরই রক্তপাত হয়। কিন্তু ওই পেলবতায় শেষ করা হয়নি ছবিটা। শেষের জন্যেই সবচেয়ে বড় আঘাতটা তুলে রেখেছিলেন জয়রাজ। একেবারে ঘ্যাচাং ফু।

ছবিটা কি নিখুঁত? অত বোঝার বিদ্যে আমার নেই বাপু। তবে ফ্রিজে কাটা হাতখানা না রাখলে কি কোনো তফাত হত?

বিঃ দ্রঃ ঘ্যাচাং ফু কোথায় দেখা যাবে? এ প্রশ্ন আমাকে করবেন না। অনেকেই বেছে বেছে যৌনদৃশ্যগুলো দেখেছেন। কেবল যৌনদৃশ্য দেখতে হলে ইন্টারনেটে ক্লিপ খুঁজে নেওয়াই ভাল। পুরো ছবি দেখতে চাইলে অনুসন্ধান করুন। ও দায়িত্ব নিচ্ছি না।

বৃদ্ধতন্ত্র নয়, সিপিএমের সমস্যা মধ্যবিত্ততন্ত্র

মিঠুদা (নাম পরিবর্তিত) পেশাদার ড্রাইভার। বাসচালক ছিলেন, এখন প্রাইভেট গাড়ি চালান। সম্প্রতি যে শতাধিক পৌরসভায় নির্বাচন হল, উনি তারই একটার বাসিন্দা। পার্টি সদস্য না হলেও, সক্রিয় সিপিএম সমর্থক। নির্বাচনের ফল বেরোবার আগের দিন দেখা হল, বললেন “দাদা, মনে হচ্ছে অন্তত আমাদের ওয়ার্ডটায় জিতে যাব। ওরা অনেক চেষ্টা করেছিল, ভয় দেখিয়েছিল, কিন্তু আমরা বুক দিয়ে বুথ আগলেছি।” মিঠুদার আশা পূর্ণ হয়নি। রাজ্যের অন্য অনেক পৌরসভার মত ওঁদের পৌরসভাও বিরোধীশূন্য হয়েছে। দিন সাতেক পরে আবার দেখা। দুঃখ করে বললেন “কাজকর্ম ফেলে, টিএমসির গালাগাল খেয়ে ভোটের আগে কদিন রাত জেগে পোস্টারিং করলাম। এখন ভোটের পরে পার্টি অফিসে গেলে নেতারা ভাব করছে যেন চেনেই না। আর ওদের কাছে যাবই না ভাবছি। আগেও দেখেছি, মিছিলে লোক দরকার হলে আমাকে ডাকে। আর এসডিও অফিসে ডেপুটেশন দিতে যাওয়ার সময়ে ফরসা দেখতে লেখাপড়া জানা ছেলেগুলোকে ডাকে। আমি পাশে দাঁড়িয়ে থাকি, একবার বলেও না ‘মিঠু, তুইও যাস।’ কেন বলবে? আমার কালোকোলো চেহারা, লেখাপড়া জানি না অত, আমার আর কী দাম?”

পশ্চিমবঙ্গে বিধায়ক, সাংসদ নেই; ভোটও দু-আড়াই শতাংশে নেমে এসেছে সিপিএমের। তবু যে তারা এখনো কয়েক হাজার মানুষের মিছিল করতে পারে, আনিস খান হত্যার যথাযথ বিচার চেয়ে যে মাঝে কয়েকদিন রাজ্য তোলপাড় করে দিতে পেরেছিল, তা এই মিঠুদাদের জন্যই। মিঠুদার পেশায় মাস মাইনে নেই, ডি এ নেই, টি এ নেই, অবসরের পর পেনশন নেই, প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। গাড়ি চালালে রোজগার, না চালালে হাত খালি। সেই মানুষ ভোটের আগে গাড়ি না চালিয়ে দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগিয়ে বেড়িয়েছেন। একথা জানতে পারলে যে কোনো মানুষের মনে হতে বাধ্য, বর্তমান যেমনই হোক, সিপিএমের এখনো ভবিষ্যৎ আছে। কোনো পার্টির যদি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে নিবেদিতপ্রাণ কর্মী সমর্থক থাকে, তাহলে তার কিসের অভাব?

অভাব আছে। মিঠুদাদের উপযুক্ত মর্যাদার অভাব। সিপিএমে বৃদ্ধতন্ত্র চলছে বলে প্রায়ই হইচই হয়। রাজ্য সম্মেলন চলাকালীন কয়েকজন বয়স্ক নেতা ঝিমোচ্ছেন — এই ছবি প্রকাশ হওয়ার পর আরও বেশি করে হচ্ছে। চাপা পড়ে যাচ্ছে যে কথা, তা হল বিমান বসু এখনো যে কোনো ২৫-৩০ বছরের ছেলের চেয়ে বেশি হাঁটতে পারেন মিছিলে, হান্নান মোল্লা দিল্লির রাস্তায় বসে এক বছরের বেশি কৃষক আন্দোলন করলেন সদ্য, তপন সেন এখনো গোটা ভারত চষে শ্রমিক সংগঠনের কাজ করেন। যা সত্যিই সিপিএমের সমস্যা, তাকে বলা চলে মধ্যবিত্ততন্ত্র। মিঠুদার অভিজ্ঞতা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। মূলত শ্রমিক-কৃষকের পার্টি হওয়ার কথা যে দলের, সেই দলের রাজ্য নেতৃত্বে দীর্ঘকাল ছাত্র, যুব নেতারা প্রাধান্য পাচ্ছেন। চক্রান্ত করে শ্রমিক নেতা, কৃষক নেতাদের সামনে আসতে দেওয়া হচ্ছে না এমন হয়ত নয়। আসলে পার্টিতে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে। যাঁরা আসতে চাইছেন তাঁরা মিঠুদার মত ব্যবহার পাচ্ছেন। গুরুত্ব পাচ্ছেন লেখাপড়া জানা চাকুরীজীবী বা ব্যবসায়ীরা। মিঠুদার মত লোকেদের আদর দল ভারী করার সময়ে, অন্য সময়ে তারা অপ্রয়োজনীয়।

মিঠুদা মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন বা মায়াকভস্কি পড়েননি। তিনজনের সংসারের খাওয়া, পরা আর ছেলের লেখাপড়ার সংস্থান করতে উদয়াস্ত খেটে ওসব পড়াও যায় না। কিন্তু না পড়েই মার্কসবাদ যাকে শ্রেণিচরিত্র বলে, তার ধারণা ওঁর কাছে পরিষ্কার। বলেই দিলেন “চাকরি করা ফ্যামিলির ছেলেকে যতই তোল্লাই দিক, সে ভাল কেরিয়ার পেলেই চলে যাবে। পার্টির জন্যে আমরাই থাকব।” কিন্তু পার্টি এঁদের জন্য থাকবে কিনা এঁরা বুঝতে পারছেন না।  আশা করা যায় সিপিএমের নবনির্বাচিত রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম জানেন, এই মুহূর্তে তাঁর পার্টির এ এক বড় সংকট। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ছিল মুসলমান, নিম্নবর্গীয় মানুষের হাতে। মুজফফর আহমেদ, আব্দুল হালিম, মহম্মদ ইসমাইলের মত নেতারা প্রবাদপ্রতিম। স্বাধীনতার পর থেকে, বিশেষত পার্টি ভাগ হওয়ার পর থেকে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সব কমিউনিস্ট পার্টিই ক্রমশ হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চবর্গীয় হিন্দুদের দল। ভারতের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে যার অর্থ গরীব, প্রান্তিক মানুষের থেকে দূরে সরে যাওয়া। এখন কি মাটির টানে ফিরতে পারবে সিপিএম?

তারুণ্য নেই এমন কথা আর বলা যাবে না। বিধানসভা নির্বাচনে এক ঝাঁক অল্পবয়সীকে প্রার্থী করা হয়েছিল, সদ্যগঠিত নতুন রাজ্য কমিটিতেও অনেক নতুন মুখ। আনিসের জন্য বিচার চেয়ে আন্দোলনের নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জি বহুকাল পরে মনে করিয়ে দিলেন সেই স্লোগান “পুলিসের লাঠি ঝাঁটার কাঠি/ভয় করে না কমিউনিস্ট পার্টি”। কিন্তু আশ্চর্য! তাঁকে এবং আরও একগুচ্ছ পার্টিকর্মীকে হাস্যকর অভিযোগে হপ্তা দুয়েক আটকে রাখা হল, উপরন্তু শারীরিক নির্যাতন চলল; সিপিএম আইনের উপর আস্থা রেখে নিরামিষ প্রতিবাদ ছাড়া কিছুই করল না!

আরও পড়ুন সেলিব্রিটি কাল্ট দরদী সিপিএমকে খোলা চিঠি

এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী রাজনীতির জন্যে ইস্যুর কিন্তু অভাব নেই। দেউচা পাঁচামিতে খনি করতে দেবেন না – এই দাবিতে স্থানীয় মানুষ আন্দোলনে, স্কুলের নিয়োগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, পুলিস আনিসের পর ঝালদার কংগ্রেস কাউন্সিলরের হত্যাতেও প্রশ্নের মুখে, শাসক দলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এমন পর্যায়ে যে নির্বাচিত কাউন্সিলর খুন হয়ে যাচ্ছেন, নেতৃত্ব মনোনীত চেয়ারম্যানকে বিজেপির সমর্থনে হারিয়ে দিয়ে পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়ে যাচ্ছেন অন্য একজন, ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজা ধরে সরকারে ফিরে মার্কামারা সাম্প্রদায়িক প্রাক্তন বিজেপিদের নির্বাচনে প্রার্থী করছে তৃণমূল। অথচ সিপিএম কিছুতেই মমতার কপালে ভাঁজ ফেলার মত বিরোধিতা করে উঠতে পারছে না। অন্য সবকিছু ভুলে সম্মেলন নিয়ে মেতে থাকা দেখে সন্দেহ হয়, পার্টির জন্য সম্মেলন নয়, সম্মেলনের জন্য পার্টি। বিপ্লবকেও ওয়েটিং রুমে বসিয়ে রাখা যেতে পারে, সম্মেলনটা লগ্ন মেনে ষোড়শোপচারে করতে হয়।

বোধ করি কমিউনিস্ট পার্টিতে মধ্যবিত্ততন্ত্র চালু হয়ে গেলে এমনটাই ঘটে। পশ্চিমবঙ্গে আন্দোলন হয় না, এ অভিযোগ স্বয়ং হান্নান মোল্লা মাসখানেক আগে করেছেন। আসলে আন্দোলন হবে কি হবে না — তা ঠিক করছেন মাথায় ছোট বহরে বড় ভদ্রসন্তানরা, এবং অধিকাংশ সময়েই সিদ্ধান্ত হচ্ছে, হবে না। লড়াকু, গরীব কর্মী সমর্থকরা আছেন কেবল হুকুম তামিল করতে। অথচ মাস দশেক আগে নির্বাচনের প্রচারে টুম্পাসোনা গানের প্যারডি প্রকাশ করে বলা হয়েছিল সাধারণ মানুষের ভাষায় তাঁদের কাছে পৌঁছবার চেষ্টা চলছে। সিপিএমের ভোটের ফলাফলে বোঝা গিয়েছিল, সাধারণ মানুষের ভাষা সিপিএম আদৌ বোঝেনি। লাভের লাভ এই, পার্টির শিল্পবোধও এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে শুভেন্দু মাইতির মত প্রবীণ গণশিল্পী তথা পার্টিকর্মীকে নেতৃত্ব মনে করছেন হুকুমের চাকর।

সিপিএমের ভবিষ্যৎ যদি এঁদের হাতেই থাকে, সে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল নয়।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত