যুদ্ধ করা সৈনিকদের কাজ। ক্রিকেটাররা সৈনিক নন, সন্ত্রাসবাদীও নন। আজ পর্যন্ত কোনও দেশের ক্রিকেটারই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন— এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। সুতরাং দুই দেশের সৈনিকদের মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে বলে দুই দেশের ক্রিকেটারদেরও মুখ দেখাদেখি বন্ধ করতে হবে— এ হল উন্মাদের যুক্তি।
বিশ্ব একাদশের খেলোয়াড়রা, বিশেষ করে [হিলটন] অ্যাকারম্যান, এই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে মজার মজার ঘটনা কল্পনা করত। যেমন ইন্তিখাব [আলম] আর ফারুক [ইঞ্জিনিয়ার] বেয়নেট হাতে মুখোমুখি; আমি যুদ্ধবিমান নিয়ে উড়ছি, আমাকে আরেকটা যুদ্ধবিমানে তাড়া করছে আসিফ মাসুদ; বিষেণ [সিং বেদি] আর জাহির [আব্বাস] পালানোর চেষ্টা করছে। আমরা খুব হাসতাম। অস্ট্রেলিয় খেলোয়াড়রা এমনিতে এই বিষয়টা নিয়ে আমাদের সঙ্গে মজা না করার ব্যাপারে সতর্ক থাকত। কিন্তু রিচার্ড হাটন ওর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে একবার বলেছিল যে ফারুক যদি ইন্তিখাবের পেটে আগে বেয়নেট ঢুকিয়েও দেয়, ইন্তিখাব [আলম] বেঁচে যাবে। কারণ ওর পেটে এত চর্বি যে তাতেই আঘাতটা সামলে দেবে।
বলতেই হবে যে, সেই সময়ে যা চলছিল তাতেও ভারতীয় আর পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়নি। প্রায় প্রত্যেক সন্ধেবেলা আমরা একজন পাকিস্তানি মালিকের রেস্তোরাঁয় খেতে যেতাম। উনি বিভিন্ন রেডিও বুলেটিন থেকে খবর শুনতেন আর একটা পেপার ন্যাপকিনে উর্দুতে লিখে ইন্তিখাবকে দিতেন। ও সেটা ভালো করে দেখতও না, মুচড়ে ফেলে দিত।
উপরের অংশটা সুনীল গাভস্করের স্মৃতিকথা সানি ডেজ (প্রথম প্রকাশ ১৯৭৬) বইয়ে রয়েছে (ভাষান্তর আমার)। এই ঘটনাবলি ১৯৭১ সালের, যখন তিনি গারফিল্ড সোবার্সের নেতৃত্বাধীন বিশ্ব একাদশের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সিরিজ খেলতে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। তখন ভারত-পাক যুদ্ধ চলছে। ভেবে দেখুন, সেই যুদ্ধ চলাকালীন দেশপ্রেমিক গাভস্কর পাক ক্রিকেটারদের সঙ্গে একই দলে খেলছিলেন! শুধু তাই নয়, যে যুদ্ধে ভারতীয় সৈনিকরা জীবনমরণ লড়াই করছিলেন, সেই যুদ্ধ নিয়ে শ্বেতাঙ্গ ক্রিকেটারদের রসিকতায় হাসাহাসিও করছিলেন! সেখানেই শেষ হলে কথা ছিল, পাক ক্রিকেটারদের সঙ্গে সন্ধেবেলা একজন পাকিস্তানির রেস্তোরাঁয় খেতেও যাচ্ছিলেন! কোনও সন্দেহ নেই— আজ এমন করলে তিনি যে কেবল সোশাল মিডিয়ায় ট্রোলবাহিনীর শিকার হতেন তা-ই নয়, তাঁর নামে দেশদ্রোহের মামলাও হয়ে যেত দেশের কোনও না কোনও আদালতে। দেশে ফিরতেই হয়তো বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হয়ে যেতেন।
একেবারেই অন্যায় হত, কারণ যুদ্ধ করা সৈনিকদের কাজ। ক্রিকেটাররা সৈনিক নন, সন্ত্রাসবাদীও নন। আজ পর্যন্ত কোনও দেশের ক্রিকেটারই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন— এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। সুতরাং দুই দেশের সৈনিকদের মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে বলে দুই দেশের ক্রিকেটারদেরও মুখ দেখাদেখি বন্ধ করতে হবে— এ হল উন্মাদের যুক্তি। ভারত আজ উন্মাদের যুক্তিতে চলে, ১৯৭১ সালে চলত না। তাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে মদত দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জব্বর লড়াই করে তাদের হারিয়ে দিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষুরও পরোয়া করেনি। আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলার আগেই মার্কিন রাষ্ট্রপতির সোশাল মিডিয়া পোস্ট থেকে জানা যাচ্ছে যে, ভারতের সৈনিকরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অপারেশন সিঁদুর থামিয়ে দিয়েছেন। এদিকে বৃদ্ধ সুনীল গাভস্কর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের হায়দ্রাবাদ ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিককে আক্রমণ করছেন, কারণ তিনি পাকিস্তানি ক্রিকেটার আবরার আহমেদকে ইংল্যান্ডের দ্য হান্ড্রেড প্রতিযোগিতার নিলাম থেকে নিজের মালিকানাধীন দলের জন্য কিনেছেন।
অর্থাৎ আজকের গাভস্কর ১৯৭১ সালের গাভস্করকে ট্রোল করছেন। নিজের মন্তব্যের যুক্তি হিসাবে গাভস্কর যা বলেছেন, তার সঙ্গে ট্রোলদের কথাবার্তার কোনও তফাত নেই। পাকিস্তানি ক্রিকেটারকে নাকি দলে নেওয়া উচিত নয়, কারণ তিনি যে টাকা আয় করবেন সে টাকা পাকিস্তানে যাবে। পাকিস্তানের টাকা ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদত দিতে খরচ হয়। সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপে ভারতের সৈনিক এবং সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়। দেশের স্বার্থের চেয়ে একটা সামান্য লিগ জেতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়, অতএব সানরাইজার্স লিডস দলের মালিক কাব্যা মারানের উচিত ছিল আবরারকে নিলাম থেকে না কেনা।
সন্ত্রাসবাদের এই অদ্ভুত ফ্লো চার্ট হাজির করেছেন গাভস্কর। সাংবাদিক মহলে প্রায় সবাই জানেন যে গাভস্কর চিরকাল বইপ্রেমী। কিন্তু এসব কথা শুনলে সন্দেহ হয়, ইদানীং বই পড়া ছেড়ে বোধহয় ধুরন্ধর জাতীয় বলিউডি সিনেমায় মন দিয়েছেন। যে কোনও পাকিস্তানি নাগরিক পৃথিবীর যে কোনও জায়গা থেকে যা রোজগার করেন, সবই পাকিস্তান থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ চালাতে ব্যবহৃত হয়— এই ঘৃণায় বাঁধানো অতি সরল আজগুবি তত্ত্ব আর কোথা থেকে শেখা সম্ভব? তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই পাকিস্তানি মানেই সন্ত্রাসবাদী, তাহলে আবার গাভস্কর নিজেই বিপদে পড়ে যাবেন। এবং সেটা শুধু ১৯৭১ সালের কার্যকলাপের জন্য নয়।
মাত্র কয়েকদিন আগে প্রাক্তন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেলের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের ১৪ জন প্রাক্তন ক্রিকেটার পাকিস্তান সরকারকে চিঠি লিখেছিলেন কারাবন্দি ইমরান খানের স্বাস্থ্যের যথাযথ যত্ন এবং তাঁর প্রতি যথাযথ ব্যবহার দাবি করে।[1] সেই ১৪ জনের মধ্যে ছিলেন আমাদের কপিলদেব এবং গাভস্কর। সব পাকিস্তানিই যদি সন্ত্রাসবাদী হয়, তাহলে গাভস্কর একজন সন্ত্রাসবাদীর প্রতি দরদে পাকিস্তান সরকারকে চিঠি লিখেছিলেন বলতে হয়। ইমরানের বিরুদ্ধে গাভস্কর যখন খেলেছেন তখনও তো পাকিস্তানের মাটি থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চলেছে। এমনকি ইমরান যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, তখনও যে ভারত-পাক সীমান্তে উত্তেজনা একেবারে শূন্যে নেমে এসেছিল তা নয়। তাহলে গাভস্কর সেসব ভুলে ইমরানের জন্যে মুখ খুলতে গেলেন কেন?
এর একটাই উত্তর হয়। গাভস্কর ভালো করেই জানেন যে পাকিস্তানি মানেই সন্ত্রাসবাদী নয়। ফলে পৃথিবীর যেখানে যে পাকিস্তানি টাকা রোজগার করবে, সেই টাকাই পাকিস্তানে ফেরত গিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে— এ-কথার কোনও ভিত্তি নেই। গাভস্কর অবশ্য আত্মপক্ষ সমর্থনে বলতেই পারেন যে তিনি বলেছেন “indirectly contributes”, অর্থাৎ “পরোক্ষভাবে” ওই টাকার অবদান থাকে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে। কিন্তু এই কথাটা দলে পাকিস্তানি ক্রিকেটার না নেওয়ার যুক্তিকে আরও দুর্বল করে। যদি একজন করদাতা না-ই জানতে পারেন তাঁর করের টাকা পরোক্ষভাবে কোথায় কোথায় ব্যবহৃত হয়, তাহলে অপব্যবহারের জন্যে তো তাঁকে দোষী ঠাওরানো যায় না। তাঁর রোজগারের পথ বন্ধ করাও চলে না।
এর চেয়েও বড় কথা, কোনও কোম্পানি যে দেশে ব্যবসা করে তাকে সে দেশের নিয়মকানুন মেনেই চলতে হয়। সান গ্রুপ ব্যবসা করছে ইংল্যান্ডে, আর চলবে ভারতীয়দের আবেগ অনুভূতি অনুযায়ী— এমন মামাবাড়ির আবদার কেমন করে করা যায়? তাছাড়া ভারতীয়দের টাকা পরোক্ষভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়া নিয়ে গাভস্করের এতই যদি মাথাব্যথা, তিনি সদ্যসমাপ্ত কুড়ি-বিশের বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হওয়ার বিরোধিতা করলেন না কেন? আবরার দ্য হান্ড্রেড প্রতিযোগিতায় সানরাইজার্স লিডসের হয়ে খেলে পারিশ্রমিক পাবেন ১,৯০,০০০ পাউন্ড, অর্থাৎ প্রায় আট কোটি পাকিস্তানি টাকা। তার কয়েকশো গুণ টাকা ভারত-পাক ম্যাচ থেকে কামিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। গাভস্কর একবারও বলেননি এটা হওয়া উচিত নয়। উলটে সে ম্যাচের ধারাভাষ্যে নিজে যুক্ত ছিলেন, মানে নিজেও ওই ম্যাচ থেকে রোজগার করেছেন। তাঁর সঙ্গে ধারাভাষ্যে ছিলেন ওয়াসিম আক্রম, রামিজ রাজার মতো পাকিস্তানি প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও। তাঁরাও ওই ম্যাচ থেকে রোজগার করেছেন। গাভস্করের যুক্তি মানলে সে টাকাও পরোক্ষভাবে বেশ কিছু ভারতীয়ের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সেসব আটকানোর কথা তিনি একবারও মুখ ফুটে বলেননি কেন?
তাহলে কি বুঝতে হবে, ১৯৯২ সালে মুম্বইয়ের দাঙ্গায় হিন্দু দাঙ্গাবাজদের সামনে এক মুসলমান পরিবারের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়া গাভস্কর আজ হিন্দুত্ববাদী দক্ষ বাজিকরের হাতের পুতুল মাত্র? তাই যে ম্যাচ থেকে আরএসএস শাখা হয়ে দাঁড়ানো বিসিসিআইয়ের বিপুল আয় হয়, সেই ম্যাচে পাকিস্তানিদের অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁর আপত্তি নেই, অথচ ইংল্যান্ডের লিগে ভারতীয় মালিকের দলে পাকিস্তানের ক্রিকেটার খেললে তিনি খড়্গহস্ত?
জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে ভারতীয়দের অনেক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন উপহার দিয়েছিলেন যে গাভস্কর, তিনি অস্ত গিয়েছেন। এখন ধান্দাবাজ ধর্মান্ধতায় ঢাকা তাঁর মুখ।
নেদারল্যান্ডস একের পর এক বিশ্বকাপে নজরকাড়া ক্রিকেট খেললেও তাদের খেলা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয় না আইসিসি। নেপালও আটকে আছে একই জায়গায়, অথচ সেখানে ক্রিকেটের বিপুল জনপ্রিয়তা। এসব হচ্ছে, কারণ আইসিসি ফিফার মত শক্তিমান নিয়ামক সংস্থা নয়, তাকে ঘাড় ধরে চালাচ্ছে বিসিসিআই।
ব্যাট, বল, উইকেট, প্যাড, গ্লাভস, এমনকি মাঠের মালিকও আপনি হতে পারেন। কিন্তু খেলতে হলে আরেকটা দল লাগে। কথাটা বাচ্চারাও বোঝে, কিন্তু বড়রা ভুলে যায়— টাকার গরমে, এবং অনেক টাকা যে বিপুল ক্ষমতা দেয় তার মদে মত্ত হয়ে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) ঠিক তাই হয়েছে। অসুখটা আজকের নয়, অনেকদিনের। কিন্তু চলতি বছরের আগে টাকা আছে এবং ক্ষমতা আছে বলে যা ইচ্ছে তাই করার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ হয়নি, ফলে সেরকম ল্যাজেগোবরেও হতে হয়নি, যা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে হল। আপনি হাঁই হাঁই করে উঠতে পারেন এই বলে যে, মোটেই বিসিসিআই ল্যাজেগোবরে হয়নি। হয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। আপনার দোষ নেই। আপনার সন্ধেবেলার টিভি চ্যানেল, সকালবেলার খবরের কাগজ আর হাতের মোবাইল ফোন আপনাকে একথাই বোঝাচ্ছে। অনেক প্রথিতযশা সাংবাদিক তো এমনও লিখছেন এবং বলছেন যে প্রথমে রেলা নিয়ে খেলবে না বলার পর, শেষমেশ পাকিস্তান ম্যাচটা খেলার জন্য ভিখারির মত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে ছুটে গেছে। কথাগুলো ঠিক কিনা তা বিচার করার জন্যে আমরা স্রেফ সেটুকু নিয়েই আলোচনা করব যা প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ ‘সূত্রের খবর’ কথাটার কী পরিমাণ অপব্যবহার এদেশের সাংবাদিকরা করে থাকেন তা এখন প্রায় সবাই জানেন। অতএব ওসব থাক।
তথ্য বনাম মনগড়া তত্ত্ব
প্রথমেই খেয়াল করুন, পাকিস্তানই রবিবারের ম্যাচটা খেলতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল (বা ভিক্ষা চেয়েছিল আইসিসির কাছে)— এমন বলার মত কোনো ঘটনা আমরা দেখিনি। ভিক্ষা চাইতে ভিখারিকেই যেতে হয়। কোনোদিন এমন হয়েছে, আপনি কোনো ভিখারির বাড়ি খুঁজতে বেরিয়েছেন ভিক্ষা দেবেন বলে? খুঁজে বের করে ভিখারির হাতে পায়ে ধরেছেন ‘ওগো, আমার থেকে ভিক্ষা নাও গো’? পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে খেলব না বলার পরে আমরা কী দেখলাম? পিসিবির কোনো কর্তাকে দুবাইতে আইসিসির দফতরে যেতে দেখলাম কি? না, বরং উলটোটা ঘটল। আইসিসি চিফ এক্সিকিউটিভ সংযোগ গুপ্তাই পাকিস্তানে উড়ে গেলেন পিসিবি প্রধান মহসীন নকভির সঙ্গে কথা বলতে। সেই বৈঠকে গেলেন বিশ্বকাপ থেকে আগেই বিতাড়িত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল।
সেই বৈঠকে কে কী বলেছিল, পাকিস্তান কী কী দাবি করেছিল আর আইসিসি ফুৎকারে কোন কোন দাবি উড়িয়ে দিয়েছে— তা নিয়ে এখন বাজার গরম করছেন বিভিন্ন প্রথিতযশা ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিক। অন্যদিকে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম বোঝানোর চেষ্টা করছে— তাদের ক্রিকেট বোর্ড যা চেয়েছিল তাই পেয়েছে। আমরা এই আকচা-আকচির মধ্যে ঢুকবই না। এদের কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই, কারণ বৈঠকটা ছিল রুদ্ধদ্বার। কোনো সাংবাদিকই সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। অতএব এ ওকে ভিক্ষা দিল, না ও একে— সে তর্ক ট্রোলরা করুক গে। বরং দেখা যাক, সেই বৈঠকের পরে কী কী ঘটল।
প্রথমত, আমিনুল দেশে ফিরে একখানা বিবৃতি দিলেন। সেই বিবৃতিতে তিনি পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানালেন সংকট মুহূর্তে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, কামনা করলেন— এই সৌভ্রাতৃত্ব যেন দিন দিন বাড়ে। তারপর ‘সম্পূর্ণ ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের সুবিধার্থে’ অনুরোধ করলেন ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচটা খেলতে। দ্বিতীয়ত, আইসিসি একখানা লম্বা বিবৃতি দিল। সেই বিবৃতিতে দেখা যাচ্ছে, সংযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন যে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না থাকা দুঃখজনক।
বাংলাদেশ সম্পর্কে আরও অনেক ভালো ভালো কথা বলার পাশাপাশি এই বিবৃতিতে লেখা হয়েছে যে বাংলাদেশকে কোনো শাস্তি দেওয়া হবে না বা জরিমানা করা হবে না। বরং তারা চাইলে আইসিসির ‘ডিসপিউট রেজলিউশন কমিটি’-র কাছেও আবেদন করতে পারে এই গোলমাল নিয়ে। উপরন্তু ২০৩১ ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগেই তাদের কোনো একটা আইসিসি প্রতিযোগিতা আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হবে। সোজা কথায়, বিশ্বকাপ না খেলতে পারায় বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা খানিকটা পূরণ করার ব্যবস্থা হল। দোষটা বাংলাদেশেরই ছিল— এমনটা মানলে নিশ্চয়ই তা করা হত না। আইসিসির গোটা বিবৃতিতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নামগন্ধ নেই। স্রেফ বলা আছে, আইসিসি, পিসিবি ও বিসিবি অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে মিলে খেলাটার স্বার্থে আলাপ আলোচনা, সহযোগিতা এবং গঠনমূলক ব্যবস্থাপনার প্রতি দায়বদ্ধ।
অপারেশন সিঁদুরের সময়ে একদিন রাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম লাহোর, করাচি, ইসলামাবাদ দখল করে ফেলেছিল। অনেকটা সেই কায়দায় ৯ তারিখের ওই বৈঠকের আগে পর্যন্ত ভারতের প্রায় গোটা ক্রিকেট মিডিয়া বলে যাচ্ছিল— বাংলাদেশ নিজেদের কত বড় ক্ষতি করল জানে না। এরপর ওদের দেশে কেউ খেলতে যাবে না। ভারত তো যাবেই না। ওদের সমস্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে আইসিসি নিষিদ্ধও করে দিতে পারে ইত্যাদি। একইভাবে পাকিস্তান যেই বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে ভারত ম্যাচ খেলতে চাইল না, অমনি বলা হচ্ছিল, না খেললে পাকিস্তান বিরাট বিপদে পড়বে। বিশ্বকাপের সম্প্রচারকারীকে অনেক টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল)-কে আইসিসি নিষিদ্ধ করে দেবে, সমস্ত আইসিসি প্রতিযোগিতা থেকে ওদের বাদ দিয়ে দেবে ইত্যাদি প্রভৃতি।
তথ্য অগ্রাহ্য না করলে এবং ইতিহাস-বিস্মৃত না হলে এসব দিনের পর দিন বলে/লিখে যাওয়া মুশকিল। কারণ প্রথমত, সম্প্রচারকারীর চুক্তি হয় আইসিসির সঙ্গে। কেবল কোনো প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে নয়। যদি ধরেও নিই ক্ষতিপূরণের টাকা আইসিসি পাকিস্তানের থেকেই আদায় করত, তাহলেও আইসিসিকে প্রমাণ করতে হত যে পিসিবি অকারণে ম্যাচ বয়কট করছে। খেলব না— এই ঘোষণা কিন্তু এসেছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে। কোনো দেশের কোনো খেলার ফেডারেশনই সেদেশের সরকারের নির্দেশ অমান্য করতে পারে না।
ভারত এই যুক্তিতেই পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলে না, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হিসাবে পাকিস্তান ভারতে আসে না বা ভারত পাকিস্তানে যায় না। সে কারণেই বাংলাদেশ নিজের সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী ‘ভারতে খেলতে যাব না’ বলায় তাদের বাদ দেওয়া আইসিসির অন্যায় হয়েছে বলা হচ্ছে। আইসিসি বলতে পারে না— ক যা করলে ঠিক, খ আর গ করলে সেটা বেঠিক। আর যেকথা গত কয়েকদিনে কোনো ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলতে দেখলাম না, সেটা হল, আইসিসি তেমন কিছু বললেও বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের কাছে এমন একটা জায়গার দরজা খোলা থাকত, যেখানে বিসিসিআই বা আইসিসির বিশেষ প্রভাব নেই। জায়গাটার নাম কোর্ট অফ আরবিট্রেশন ফর স্পোর্ট (ক্যাস)। এই ঝামেলা সেখানে চলে গেলে কী হত বলা যায় না। একথা ঠিক যে আইসিসি এখন পর্যন্ত নিজেদের ‘ডিসপিউট রেজলিউশন কমিটি’-কেই সর্বোচ্চ বলে মানে এবং ক্রিকেটের ঝামেলা ক্যাস পর্যন্ত কখনো নিয়ে যাওয়া হয়নি, কিন্তু ক্রিকেট এখন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির আওতায় এসে পড়েছে। ২০২৮ লস এঞ্জেলস অলিম্পিকে খেলা হবে। এমতাবস্থায় ক্যাসকে মানব না বলা যায় কি?
দ্বিতীয়ত, ১৯৯৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে যায়নি। তার জন্যে তাদের পয়েন্ট কেটে নেওয়া ছাড়া আর কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি। ২০০৩ বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ড জিম্বাবোয়েতে খেলতে যায়নি, নিউজিল্যান্ড কেনিয়ায় যায়নি। সেক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। মামলা মোকদ্দমা হলে এসব দৃষ্টান্ত আইসিসির বিপক্ষেই যেত। আর পিএসএল? সেটা ঘরোয়া লিগ, তাকে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা আইসিসির নেই। যেমন আইপিএলকেও আইসিসি নিষিদ্ধ করতে পারে না। যা-ই হোক, এত আইনি জটিলতার দরকার পড়েনি, কারণ আইসিসির সঙ্গে পিসিবি আর বিসিবির বৈঠক সফল হয়েছে।
রাজনৈতিক হার
কে জিতল কে হারল তা নিয়ে কাজিয়ার মধ্যে মহসীন ১০ ফেব্রুয়ারি বলেছেন, ভারতের ম্যাচ বয়কট করার পিছনে তাঁদের একটাই লক্ষ্য ছিল— বাংলাদেশের সঙ্গে যে অবিচার হয়েছে তার প্রতিকার করা। তাই বাংলাদেশের দাবিই তাঁদের দাবি, নিজেদের অন্য কোনো দাবি ছিল না। বাংলাদেশের সম্মান পুনরুদ্ধার হয়েছে বলেই তাঁরা খেলতে রাজি হয়েছেন। কথাটা বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থরক্ষা যে হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই, আর পাকিস্তান এই কাণ্ড না করলেও যে স্বার্থরক্ষা হত তার গ্যারান্টি নেই। কিন্তু ভেবে দেখুন, পিসিবি এ জিনিস করল কেন? পাকিস্তান এক মহান দেশ বলে? নাকি বাংলাদেশের ক্রিকেটার ও ক্রিকেটভক্তদের দুঃখে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বুকের ভিতরটা হু হু করছিল বলে? দুটোর কোনোটাই নয়। পাকিস্তান যে কোনো মহান দেশ নয় তা আমরা ভারতীয়রা ভালো করেই জানি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুলে না যাওয়া বাংলাদেশীরাও জানেন।
আসলে মহসীন একজন দুঁদে রাজনীতিবিদ। তিনি পাকিস্তানের মন্ত্রিসভার সদস্য। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো পুরোপুরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, এবং ক্রিকেট নিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে দেবজিৎ শইকিয়াদের ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড রাজনীতিতেই ল্যাজেগোবরে হল। স্রেফ সোশাল মিডিয়া ট্রোলদের কথায় কান দিয়ে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে তাড়ানো হয়েছিল। অথচ এর কোনো রাজনৈতিক যুক্তি ছিল না, কারণ পাকিস্তানের মত বাংলাদেশ আমাদের শত্রু রাষ্ট্র নয়। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনোদিন যুদ্ধ হয়নি, বরং তাদের ইতিহাসের একমাত্র যুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমরাই সহায়তা করেছিলাম। বাংলাদেশে যে দলের সরকারই এসে থাক, কোনোদিন আমাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে পড়েনি। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে ভারতই আশ্রয় দিয়েছে, আবার বর্তমান তদারক সরকারের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক বজায় আছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরে শোকপ্রকাশ করতে আমাদের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর স্বয়ং বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। সেই দেশের ক্রিকেটারকে আমাদের দেশের লিগে খেলতে দেওয়া হল না কোন যুক্তিতে?
মুসলমানবিদ্বেষ, এবং বোর্ডের সেক্রেটারি দেবজিৎ যে রাজ্যের লোক সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার স্পষ্ট বাঙালিবিদ্বেষ— এছাড়া আর কোনো যুক্তিই খাটে না। সেই যুক্তি প্রয়োগ করেই গণ্ডগোলটা পাকাল বিসিসিআই। জবাবে বিসিবি ভারতে খেলতে আসতে অস্বীকার করল। আইসিসি যে বিসিসিআইয়ের দুবাই শাখা মাত্র, সেকথা নিতান্ত বোকা আর ন্যাকা ছাড়া ক্রিকেট-দুনিয়ার সবাই জানে। তা যদি না হত, তাহলে আইসিসি বাংলাদেশের দাবি মেনে নিয়ে তাদের শ্রীলঙ্কায় খেলতে দিত। ঠিক যেমন গতবছর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতকে পাকিস্তানের বদলে সংযুক্ত আরব আমীরশাহীতে খেলতে দিয়েছিল। বাংলাদেশের নিরাপত্তার অভাববোধ করার দাবি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, আইসিসির নিরাপত্তা দল যা-ই বলে থাক। কারণ ততদিনে কলকাতা নাইট রাইডার্সে মুস্তাফিজুরকে নেওয়ার জন্যে শাহরুখ খানকে এবং মুস্তাফিজুরকে ভারতের শাসক দলের নেতারা হুমকি দিয়ে ফেলেছেন। শেষ মুহূর্তে সূচি পরিবর্তন করা মোটেই কঠিন নয়।
কিন্তু তাতে ভারত আর বাংলাদেশকে সমানভাবে দেখা হয়ে যেত। আইসিসি মানে তো আসলে বিসিসিআই। নইলে আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ ভারত জিতলে বাচ্চা ছেলের মত লাফালাফি করেন কেন? সেই লোকের অধীন আইসিসি মুড়ি মিছরি এক দর করে দিতে পারে না। ফলে বাংলাদেশের দাবি মানা হল না। ক্রিকেটপাগল দেশের জনগণ, যাদের মধ্যে এমনিতেই রাজনৈতিক কারণে ভারতবিরোধিতা দিন দিন বাড়ছে, তাদের বাদ দিয়ে দেওয়া হল বিশ্বকাপ থেকে। এই সুযোগটাই নিলেন মহসীন। গোটা ঘটনাবলীতে সবচেয়ে ক্ষতি হল ভারতের বিদেশনীতির। ‘বিজেপিচালিত’ ক্রিকেট বোর্ড এবং আইসিসির নৈপুণ্যে আমাদের পশ্চিম সীমান্তের শত্রু রাষ্ট্রটির সঙ্গে পূর্ব সীমান্তের বন্ধু রাষ্ট্রটির গলাগলি হয়ে গেল। এবার বাংলাদেশের নির্বাচনে যে দলই জিতুক, তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করতে ভারত সরকারকে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হবে।
কেলোর কীর্তি এখানেই শেষ নয়। দক্ষিণদিকের প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক মোটের উপর বরাবরই ভালো, এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত না থাকায় শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক যৎসামান্য। একসময় বরং একটু গোলমেলেই হয়ে গিয়েছিল, কারণ ২০০৯ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তানে খেলতে গিয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলার শিকার হয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা। এবারে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হচ্ছে কলম্বোয়, সেহেতু ম্যাচটা না হলে শ্রীলঙ্কার ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল। তাই তারাও পাকিস্তানকে অনুরোধ করেছিল ম্যাচটা খেলতে। পাকিস্তান শেষপর্যন্ত রাজি হয়ে যাওয়ার পরে শ্রীলঙ্কার বিদেশমন্ত্রী ও পর্যটন মন্ত্রী সোশাল মিডিয়া পোস্টে ধন্যবাদ জানিয়েছেন কাকে? পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ আর পিসিবিকে। উপরন্তু লিখেছেন, পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্ত খেলোয়াড়ি মনোভাব, মিত্রতা এবং দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের শক্তির নিদর্শন। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কার থেকেও হাততালি কুড়িয়ে নিল পাকিস্তান, আইসিসি নয়।
অতি দর্পে…
সেই জগমোহন ডালমিয়ার আমলে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ একত্রে বিশ্ব ক্রিকেটে উপমহাদেশের আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা শুরু করেছিল এবং সফল হয়েছিল। কারণটা ব্যবসায়িক। যতগুলো দেশ ক্রিকেট খেলে, তার মধ্যে খেলাটার জনপ্রিয়তা এই অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি এবং প্রত্যেকটা জনবহুল দেশ। এখন যুক্ত হয়েছে নেপাল আর আফগানিস্তান। ফলে এই উপমহাদেশই স্পনসরদের জন্যে সবচেয়ে বড় বাজার। অন্যান্য কুড়ি বিশের লিগের তুলনায় আইপিএলের রমরমাও এই কারণেই বেশি, বিসিসিআইও এই কারণেই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড হতে পেরেছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের হাত থেকে বিশ্ব ক্রিকেটের রাশ কেড়ে নেওয়ার পরে ডালমিয়া চেষ্টা করেছিলেন ক্রিকেটকে আরও ছড়িয়ে দিতে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনা, বাংলাদেশকে টেস্ট ক্রিকেটের আঙিনায় নিয়ে আসা সেই চেষ্টারই অংশ। সে আমলেই অ্যাসোসিয়েট দেশগুলোর মধ্যে ক্রিকেট আরও ছড়াচ্ছিল। কেনিয়া ভাগ্যের সামান্য সহায়তা পেয়ে ২০০৩ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিল। সিঙ্গাপুর, টরন্টো, নাইরোবির মত নতুন নতুন জায়গায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আসর বসছিল। কিন্তু এন শ্রীনিবাসনের আমল থেকে, বলা ভালো, আইপিএলের টাকায় পকেট ভীষণ গরম হওয়ার পর থেকে, উপমহাদেশীয় ঐক্যের তোয়াক্কা না করে বিসিসিআই এককালে সকলের উপর ছড়ি ঘোরানো অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ডের সঙ্গেই জোট বেঁধে তৈরি করেছে ‘বিগ থ্রি’ মডেল।
এই মডেল অনুযায়ী, আইসিসির আয়ের সিংহভাগ নিয়ে নেয় এই তিন দেশের ক্রিকেট বোর্ড। বাকিদের দিকে কাঁটা কুটো ছুড়ে দেওয়া হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার মত জায়গায় একাধিক কারণে ক্রিকেটের নাভিশ্বাস উঠে গেছে গত ১০-১৫ বছরে। অ্যাসোসিয়েট দেশগুলোর অবস্থা স্বভাবতই আরও সঙ্গীন। দুর্বল দেশগুলোকে বেশি সাহায্য করাই তো যে কোনো খেলার নিয়ামক সংস্থার দায়িত্ব হওয়ার কথা। কিন্তু ত্রিদেবের যুক্তি হল— আমাদের এখান থেকে আইসিসির সবচেয়ে বেশি টাকা আয় হয়, অতএব আমরাই সবচেয়ে বেশি টাকা নেব।
অর্থাৎ পুঁজিবাদের যতরকম মডেল হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে শোষণমূলক মডেলটাতেই চালানো হচ্ছে বিশ্ব ক্রিকেট। টাকার নেশায় চুর এই ক্রিকেট প্রশাসকদের মাথায় ঢোকে না যে, পুঁজিবাদের যুক্তি অনুযায়ীই বাজার ক্রমাগত বড় করে যেতে হয়, ছোট করলে ব্যবসার পঞ্চত্বপ্রাপ্তির পথ খুলে দেওয়া হয়। ফলে বিসিসিআই তার দুই স্যাঙাতের সঙ্গেই বারবার খেলছে, বেশি ম্যাচের সিরিজ খেলছে। নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকাকেও বিশেষ পাত্তা দিচ্ছে না। আফগানিস্তান আর আয়ারল্যান্ডকে তো টেস্ট খেলার অধিকার দেওয়া হয়েছে নামেই। তারা টেস্ট দূরের কথা, বড় দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বা কুড়ি বিশ বা একদিনের ম্যাচের সিরিজ খেলারও সুযোগ পায় না। নেদারল্যান্ডস একের পর এক বিশ্বকাপে নজরকাড়া ক্রিকেট খেললেও তাদের খেলা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয় না আইসিসি। নেপালও আটকে আছে একই জায়গায়, অথচ সেখানে ক্রিকেটের বিপুল জনপ্রিয়তা। এসব হচ্ছে, কারণ আইসিসি ফিফার মত শক্তিমান নিয়ামক সংস্থা নয়, তাকে ঘাড় ধরে চালাচ্ছে বিসিসিআই। তার যাতে আগ্রহ নেই, আইসিসি তা করতে পারবে না।
এই ব্যবস্থায় বিসিসিআই ফুলে ফেঁপে উঠছে, ফলে তার গোদি মিডিয়া (প্রাক্তন ক্রিকেটার সমেত) আপনাকে সারা বছর বোঝাচ্ছে— এটাই ঠিক ব্যবস্থা। যখন সাহেবদের ক্ষমতা ছিল সাহেবরা যা করত, আমরাও তাই করছি। একে তো খ-এর আজকের খারাপ কাজটা ক আগে করত বলেই সেটা ভালো কাজ হয়ে যায় না, তার উপর একথা সম্পূর্ণ চেপে যাওয়া হচ্ছে যে সাহেবদের সঙ্গে গলাগলি করেই ব্যাপারটা করছি। এটা মোটেই তাদের বিরুদ্ধে কোনো জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নয়। যা-ই হোক, ব্যাপারটা চলছিল ভালোই। কিন্তু এক মাঘে যে শীত যায় না সেটা ভুলে গিয়েই গোলমাল হয়ে গেল। ক্রিকেটের অর্থনীতি যে ভিতর থেকে ফোঁপরা হয়ে গেছে, তা প্রকাশ হয়ে গেল পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে খেলতে অস্বীকার করতেই। দেখা গেল, যে যার নিজের দেশে কুড়ি বিশের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু করে নিজেদের পকেট যতটা পারছে ভরাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভিতেই উই ধরে গেছে। বাকি ম্যাচগুলোকে অবহেলা করতে করতে আর ভারত-পাক ম্যাচের বেলুনে ফুঁ দিতে দিতে (২০২৩ বিশ্বকাপে কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করা হয়নি। মনে আছে তো? ঝলমলে নাচাগানা হয়েছিল ভারত-পাক ম্যাচের দিন) এত বড় করা হয়েছে যে ওই ম্যাচের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে সকলের আয়। কোনো কোনো হিসাব বলছে, আইসিসি প্রতিযোগিতায় একটা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ থেকে ২,২০০ কোটি টাকার বেশি উঠে আসে (প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার)। মানে ভারত-পাক রাজনৈতিক উত্তেজনার আগুনেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রান্নাবাড়ি চলছে। আচ্ছা তা-ও নাহয় মানা গেল। কিন্তু কথাটা যখন জানাই আছে, তখন ম্যাচটা খেলতে গেলে যে পাকিস্তানকে লাগবে একথা তো বোঝা উচিত ছিল। সেক্ষেত্রে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার কী প্রয়োজন ছিল?
দেশপ্রেম বনাম ডলার-প্রেম
এই প্রশ্নটা শুনেই অনেকে তেড়ে এসে বলবেন ‘পাকিস্তান আমাদের দেশের এত ক্ষতি করেছে, ওদের সঙ্গে কি গলাগলি করতে হবে?’ আজ্ঞে না, গলাগলি করা একেবারেই অনুচিত। দেশপ্রেমের যুক্তি বলে, পহলগামের সন্ত্রাসবাদী হানার পরে খেলাই উচিত নয় তাদের সঙ্গে। মানে ভারতেরই বরং পাকিস্তান ম্যাচ বয়কট করা উচিত। কী হবে তাতে? দুটো পয়েন্ট কাটা যাবে। আমাদের তো বিশ্বসেরা দল, তারা সে ক্ষতি পুষিয়ে দিয়ে খেতাব জিততে পারবে না? নির্ঘাত পারবে। তাহলে আমরা খেলি কেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে?
শুধু খেলি তা নয়। বিসিসিআই যে আইসিসির ঘাড় ধরে দুনিয়ার ক্রিকেট চালায়, সেটা আমাদের অনেকেরই গর্বের বিষয়। অথচ তা সত্ত্বেও সব আইসিসি প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানকে আমাদের গ্রুপেই রাখা হয়, যাতে নিদেনপক্ষে একবার ভারত-পাক ম্যাচ হয়। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এসিসি) আয়োজিত এশিয়া কাপে তো ভারত-পাক ম্যাচ হতেই হবে, এড়ানোর উপায় নেই। কিন্তু ২০২৫ এশিয়া কাপে এমন ব্যবস্থা করা হল যে ফাইনালের আগেই দু-দুবার এই দুই দলের খেলা হল, ফাইনালে আরও একবার।
রাজনৈতিক কারণে এক দেশের আরেক দেশের বিরুদ্ধে না খেলা কিন্তু পৃথিবীর কোনো খেলাতেই বিরল ব্যাপার নয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনা নামানোর প্রতিবাদে ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিক বয়কট করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমেত ৬০ খানার বেশি দেশ। তার বদলা নিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার বন্ধু দেশগুলো ১৯৮৪ সালের লস এঞ্জেলস অলিম্পিক বয়কট করে। আস্ত অলিম্পিক বয়কট করতে পেরেছে অতগুলো দেশ, আমরা একটা ম্যাচ বয়কট করতে পারি না?
কেন পারি না? উত্তর একটাই। ওই ২৫০ মিলিয়ন ডলার। ও হিসাবটা তবু পাওয়া যায়, এই খেলা ঘিরে যে উন্মাদনা তাকে ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যম, তথাকথিত স্বাধীন সাংবাদিক, সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা যে কত টাকা রোজগার করেন তার হিসাব পাওয়াও সম্ভব নয়। ওই ভাগটা কেউই ত্যাগ করতে রাজি নয়। তাই পাকিস্তান বয়কটের কথা বলতেই, বিসিসিআইয়ের চেয়েও বেশি উৎসাহে এই ম্যাচ না খেলা কেন পাকিস্তানের অন্যায়, তা আপনার মাথায় ঢোকাতে কদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করলেন আপনার প্রিয় সাংবাদিকরা। এদিকে দেশপ্রেমও দেখাতে হবে। তাই কী বুদ্ধি বের করেছিল বিসিসিআই?
খেলব, কিন্তু খেলার মাঠের দস্তুর অনুযায়ী পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে আমাদের ক্রিকেটাররা হাত মেলাবেন না। উপরন্তু আমাদের অধিনায়ক সাংবাদিক সম্মেলনে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা দেবেন। গোদি মিডিয়া হাততালি দেবে, আপনাকে জানাবে যে পহলগামের মুখের মত জবাব এইটাই। সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নয়। এক বাংলা কাগজে তো লেখা হয়েছিল, ভারত এতদ্বারা পাকিস্তানকে বলল ‘চল ফোট’।
এই নাটুকেপনা পৃথিবীর অন্য কোনো খেলার নিয়ামক সংস্থা করতে দিত না। তার প্রমাণ— এশিয়া কাপে যেদিন (২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫) সূর্যকুমার যাদবের দল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার খেলেছিল, সেদিনই কাঠমান্ডুতে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলে ভারত বনাম পাকিস্তানের খেলা ছিল। সেই ম্যাচ ভারত ৩-০ জেতে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দন করেই মাঠ ছাড়ে। কিন্তু এশিয়া কাপে ফাইনালের পরে আরও বড় নাটক করে ভারতীয় দল। তারা নাকি কোনো পাকিস্তানির হাত থেকে কাপ নেবে না। অথচ আগে থেকেই জানা ছিল যে, এসিসির প্রধান এখন মহসীন নকভি। ফলে কাপ জিতলে তাঁর হাত থেকেই নিতে হবে। জেদ করে সেই কাপ না নিয়েই ফিরে এসেছিলেন সূর্যকুমাররা।
তখনো ভারতের প্রথিতযশা ক্রিকেট সাংবাদিকরা এবারকার মতই প্রবল জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠেছিলেন এবং রেলা নিয়ে লিখেছিলেন, ও কাপ নাকি দিয়ে যেতে বাধ্য হবেন নকভি। পাঁচ মাস হয়ে গেল, আজও সে কাপ এল না। বিসিসিআই এ নিয়ে আইসিসির কাছে, মানে প্রবল পরাক্রমশালী জয় শাহের কাছে, ছুটে গিয়েছিল। তিনিও সুবিধা করতে পারেননি। তাঁর আইসিসি মধ্যস্থতা করার জন্যে একখানা কমিটি গড়ে দিয়েছিল, সেই কমিটি ততটাই সফল হয়েছে যতটা গাজার গণহত্যা থামাতে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ সফল। মহসীন বলেছেন, কাপটা রাখাই আছে। একখানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারি, এসে নিয়ে যেতে হবে এসিসি অফিস থেকে। হয়ত বিসিসিআই ভিখারি নয় বলেই হকের কাপ নিতেও ক্রিকেটারদের পাঠাতে রাজি নয়।
এসব অসোয়াস্তি এড়ানো যায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মায়া ছাড়তে পারলে। কিন্তু তা তো হয় না, গোটা ক্রিকেট-দুনিয়ার দায়িত্ব যেখানে আমাদের ঘাড়ে। এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আর কী কী যে করতে হবে? দেখুন আবার, আজ থেকে ফের পাকিস্তানিদের সঙ্গে করমর্দন শুরু করতে হয় কিনা। গতকাল সাংবাদিক সম্মেলনে করমর্দনের প্রশ্ন উঠতেই সূর্যকুমার যেভাবে সরাসরি উত্তর না দিয়ে স্মার্ট সাজার চেষ্টা করেছেন, তাতে সন্দেহ হয়, তাঁকেও বলা হয়েছে ‘জো আপ উচিত সমঝো।’ তাঁকে অবশ্য এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দিতে পারে কলম্বোর বৃষ্টি।
দেশের আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মত জাতীয় ক্রিকেট দলগুলোও এখন বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা, যার সদর দফতর আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেট স্টেডিয়াম।
সূর্যকুমার যাদবের প্রতিযোগী বেড়ে গেল সম্ভবত। ভবিষ্যতে বিজেপির টিকিটে সাংসদ বা বিধায়ক হওয়ার দৌড়ে ঢুকে পড়লেন হরমনপ্রীত কৌরও। ভারত আর শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে মেয়েদের ৫০ ওভারের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ হচ্ছে এবারে। যদি প্রবল পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়া আর শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বাধা টপকে হরমনপ্রীতরা বিশ্বকাপটা জিতে ফেলতে পারেন, তাহলে বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাঁদের দলকে নিয়ে নির্ঘাত দেশজুড়ে বিপুল প্রচার করা হবে। পোস্টারে অপারেশন সিঁদুরের সময়ে যাঁদের সামনে আনা হয়েছিল, সেই কর্নেল সোফিয়া কুরেশি আর উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিংয়ের পাশেও বসিয়ে দেওয়া হতে পারে অধিনায়িকাকে। পাকিস্তানকে হারানো আর পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে করমর্দন না করা – দুটো কাজই করে ফেলেছেন হরমনপ্রীত, স্মৃতি মান্ধনা, দীপ্তি শর্মা, জেমিমা রডরিগসরা। এবার যেনতেনপ্রকারেণ বিহার বিধানসভা করায়ত্ত করার লড়াইয়ে নরেন্দ্র মোদীর দলকে সঙ্গ দিলেই নানাবিধ উপঢৌকন বাঁধা। পহলগামে যে পর্যটকরা খুন হয়েছিলেন তাঁদের হত্যাকারীদের শাস্তি প্রদান (যা ২০০৮ সালের মুম্বাই সন্ত্রাসবাদী হানার বেলায় আজমল কাসভ ও তার সঙ্গীদের ক্ষেত্রে হয়েছিল) দূর অস্ত, অপারেশন সিঁদুরে দেশ ঠিক কতটা লাভবান হয়েছে সেটাই এখনো ঠিক করে বলে উঠতে পারল না মোদী সরকার। চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ সেইসময় বলে ফেলেছিলেন আমাদের ক্ষতি হয়েছে, আবার এখন সেনাবাহিনির প্রধান বলছেন ওসব নাকি ছেলে-ভোলানো গল্প। মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারবার বলেন অপারেশন সিঁদুর থেমেছিল তাঁর কথায়, ভারত সরকার প্রতিবাদ করে না। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তো স্পিকটি নট, অন্য মন্ত্রীরা এবং তাঁর দলের মেজ সেজ রাঙা নেতারা বাহারি শব্দে ঢেকেঢুকে বলেন – যখন যুদ্ধ থামে তখন নাকি ভারতই জিতছিল। তাহলে যুদ্ধ থামল কেন, কে থামাল – এসবের আজও উত্তর নেই। ফলে মোদীজির লৌহপুরুষ ভাবমূর্তি ধাক্কা খাচ্ছে স্পষ্টতই। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত রাহুল গান্ধী ভোট চুরির অভিযোগ তুলে, রীতিমত কাগজপত্তর দেখিয়ে পরিস্থিতি ঘোরালো করে তুলেছেন। কিন্তু ভোটে যে জিততেই হবে শতবর্ষে পা দেওয়া রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের রোজগেরে সন্তান বিজেপিকে। অতএব ক্রিকেটের ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে ফেলো যাবতীয় সরকারি অকর্মণ্যতা।
আজকের ভারতের জনতার আফিম হল ক্রিকেট, তাই ওই খেলার দলকেই হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা দরকার। সুতরাং পুরুষদের এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে টিভি থেকে আয় হওয়া কোটি কোটি টাকা নিশ্চিত করাও চাই; আবার ম্যাচের শেষে করমর্দন না করে, অধিনায়ককে দিয়ে গরম গরম কথা বলিয়ে ভোটের প্রচার করাও চাই। তাতেও চিত্রনাট্য যথেষ্ট নাটকীয় হল না মনে করে ট্রফি হাতে তুলে দেবেন কে, তা নিয়েও গা জোয়ারি করা হল। কেবল বিহার নির্বাচনে জেতার জন্যে এতসব কাণ্ড করে এখন ফাটা বাঁশের মধ্যে পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) কর্মকর্তা তথা পাক মন্ত্রী বলছেন, তোমাদের ট্রফি দেওয়ার জন্যে তো মঞ্চ সাজিয়ে বসাই হয়েছিল। নাওনি কেন? অফিসে রাখা আছে, এসে নিয়ে যাও।
এদিকে এখন সে কাজ করলে ধরা পড়ে যায় যে অকারণে ধুলো ওড়ানো হয়েছিল। সত্যিই তো! এসিসি সভাপতি হিসাবে বিজয়ী দলের হাতে ট্রফিটা যে মহসীন নকভিই তুলে দেবেন তা তো প্রতিযোগিতার আগে থেকেই ঠিক ছিল। ভারতীয় দল জানত না? ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত রাম শ্যাম যদু মধু সকলেই, এমনকি বোর্ডের গোদি মিডিয়ার সাংবাদিকরাও, সগর্বে বলে থাকেন যে কেবল এশিয়া নয়, গোটা বিশ্বের ক্রিকেটকে নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই)। তাদের এটুকু ক্ষমতা নেই যে কোনো পাকিস্তানির এসিসি সভাপতি হওয়া আটকায়? আগে থাকতে সে কাজটা করলেই তো আর অপছন্দের লোকের হাত থেকে ট্রফি নেওয়ার ব্যাপার থাকত না। নাকি তখন বোঝা যায়নি যে অপারেশন সিঁদুর সম্বন্ধে যাবতীয় প্রচার মুখ থুবড়ে পড়বে এবং ক্রিকেট দলকে কাজে লাগাতে হবে ভোটারদের পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা চাগিয়ে তুলে ভোটে জিততে? ব্যাপারটা কি এরকম, যে বিশ্ব ক্রিকেটের ভাগ্যনিয়ন্তা জয় শাহের বাবা অমিত শাহ আর নরেনজেঠু ভেবেছিলেন লোকে পুলওয়ামার মত পহলগামও ভুলে যাবে শিগগির, তারপর আবিষ্কার করলেন – নিজেদের একনিষ্ঠ ভক্তরাও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলা বয়কট করা হচ্ছে না বলে খচে বোম? এমতাবস্থায় নিজেদের খাসতালুক হিন্দি বলয়ের অন্যতম বৃহৎ রাজ্য বিহারে ভোট। বল মা তারা দাঁড়াই কোথা!
পাকিস্তানের দিকে কথায় কথায় আঙুল তুলে এতদিন পরম সন্তোষে দেশের মানুষকে নিজেদের কুকীর্তি ভুলিয়ে রেখেছেন। সেটাই যে কাল হয়ে দাঁড়াবে তা মোদী-শাহ কী করেই বা জানবেন? ফ্যাসিবাদীরা কবে আর নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়? অবস্থা সামলাতে ১৪ সেপ্টেম্বর সূর্যকুমারের দলকে দিয়ে ম্যাচের পর করমর্দন না করার নাটক করানো হল পৃথিবীর সমস্ত খেলার সমস্ত আদবকায়দা শিকেয় তুলে দিয়ে। ক্রিকেট দলের কাছ থেকে যদি এটুকু সেবা না পাওয়া যায়, তাহলে আর ক্ষমতায় আসার পর থেকে ক্রমশ ক্রিকেট বোর্ডের দখল নেওয়া, প্রাক্তন ও বর্তমান ক্রিকেটারদের রামমন্দিরের উদ্বোধনে নেমন্তন্ন করা, কৃষক আন্দোলনের বিরুদ্ধে বা মোদীজির জন্মদিন উপলক্ষে তাঁদের দিয়ে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করানো, নিজেদের দলের প্রাক্তন সাংসদ গৌতম গম্ভীরকে দলের কোচ বানানো – এসব করা কেন? এত কাজ থোড়াই ক্রিকেটের স্বার্থে করা হয়েছে। তবে ব্যাপারটা সেখানেও থামেনি। সাংবাদিক সম্মেলনে এসে ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার লম্বা চওড়া বক্তৃতা দিলেন। পহলগামে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছেন, অপারেশন সিঁদুরে যুক্ত সেনাবাহিনির জওয়ানদের উদ্দেশে জয় উৎসর্গ করছেন, নিজের পারিশ্রমিক পর্যন্ত কৃতজ্ঞতা হিসাবে তাঁদের দিয়ে দেবেন ইত্যাদি।
চট করে শুনতে চমৎকার লাগে। খেলার ময়দানে কতখানি রাজনীতি ঢুকতে পারে বা ঢোকা উচিত তা নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে যদি ধরেও নিই সূর্য যা বলেছেন বেশ করেছেন (আইসিসির ম্যাচ রেফারি রিচি রিচার্ডসন অবশ্য তা ভাবেননি, বরং আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ৩০% ম্যাচ ফি জরিমানা করেছেন), তাহলেও কথাগুলো নিয়ে তলিয়ে ভাবতে গেলে ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া কিছু মনে হবে না। পহলগামে মৃত মানুষজনের পরিবারের পাশে থাকতে গেলে তো সরকারকে প্রশ্ন করতে হবে – পহলগামের আততায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? সূর্যকুমারের ঘাড়ে কটা মাথা যে সে প্রশ্ন করবেন? গত ২৯ জুলাই সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন বটে, চারজন সন্ত্রাসবাদীর তিনজন সেনাবাহিনির সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে। কিন্তু চতুর্থ জনকে কি মহামতি ভারত সরকার ক্ষমা করে দিয়েছেন? তাকে নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই কেন? যে তিনজন মরেছে তারা আবার পকেটে পাকিস্তানি পরিচয়পত্র এবং পাকিস্তানি চকলেট নিয়ে ঘুরছিল। এমন সুবোধ বালক সন্ত্রাসবাদীদের কেন জীবন্ত অবস্থায় হিড়হিড় করে টানতে টানতে আদালতে, নিদেন জনসমক্ষে, নিয়ে আসা গেল না – সে প্রশ্নও সূর্যকুমার করে উঠতে পারবেন না। সেপ্টেম্বর মাসের ক্রিকেট ম্যাচে মে মাসের অপারেশনে অংশ নেওয়া সেনাবাহিনিকে টেনে আনার যে কী মানে তাও বোঝা শক্ত। পুরোদস্তুর যুদ্ধ হয়নি, সাময়িক সংঘর্ষ কয়েকদিনের মধ্যে থেমেও গিয়েছিল। তার জন্যে এতদিন পরে সেনাবাহিনিকে সম্মান জানানো! ১৯৯৯ সালে যখন বিশ্বকাপে ম্যানচেস্টারে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হয়, তখন কিন্তু কার্গিলে যুদ্ধ চলছিল। ভারতে তখনো বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার, প্রধানমন্ত্রীর নাম অটলবিহারী বাজপেয়ী। সে ম্যাচ নিয়েও দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছিল, খেলার মধ্যেও উত্তেজনার অভাব হয়নি। তবে ম্যাচের পর আলাদা করে নাটক করার দরকার হয়নি। ভারত কিন্তু সে ম্যাচও জিতেছিল। অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিন গুরুত্বপূর্ণ ৫৯ রান করেন, ভেঙ্কটেশ প্রসাদ পাঁচ উইকেট নেন।
আসলে তখন সরকার দেশ চালাত, ক্রিকেট চালাত ক্রিকেট বোর্ড। এখন দুটোই চালায় বিজেপি। ফলে বিজেপির নীতিই ক্রিকেট দলের নীতি। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে যুদ্ধের চেহারা দেওয়ার নীতি তারা এই এশিয়া কাপে প্রথম নিল তা নয়। ২০২৩ সালে ভারতে আয়োজিত পুরুষদের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপেই এই পরিকল্পনা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। যাঁরা চোখ বন্ধ করেছিলেন, তাঁরা দেখতে পাননি। সেই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হল না, দুই ইনিংসের মাঝে মোচ্ছব হল আমেদাবাদে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে। যেন বিশ্বকাপটা গৌণ, আসল হল ভারত-পাক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। বহুদিন ধরে ক্রিকেট মাঠকে বিদ্বেষ ছড়ানোর কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল সেই বিরাট কোহলির আমলে। ২০১৯ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর দল একদিনের ম্যাচ খেলতে নামেন টিম ক্যাপের বদলে সেনাবাহিনির ক্যামোফ্লাজ ক্যাপ পরে। কেন? না পুলওয়ামার শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো দরকার ছিল। সে এমন শ্রদ্ধা, যে ক্যাপ থেকে নাইকির লোগোটা বাদ দেওয়া হয়নি। সন্ত্রাসবাদী হানায় নিহত মানুষের স্মৃতি নিয়ে এমন নির্লজ্জ বেওসার দৃষ্টান্ত মেলা ভার। কিন্তু ততদিনে আমরা এমন অনুভূতিশূন্য নির্বোধের দেশে পরিণত হয়েছি, যে কারোর আচরণটা অন্যায় মনে হয়নি। জাতীয় দলের সামরিকীকরণ তখনই হয়ে গিয়েছিল। ম্যাচটা পাকিস্তানের সঙ্গে ছিল না বলেই করমর্দন না করার নাটকটা সেদিন করা হয়নি। তবে তখনো কিন্তু অনতিদূরে ছিল লোকসভা নির্বাচন। আজ অন্তত কারোর বুঝতে না পারার কথা নয়, যে সেদিন ভারতীয় দল আসলে বিজেপির নির্বাচনী প্রচার সারছিল। এবারেও তাই করছে।
কাজটা শুরু করা হল সূর্যকুমারদের দিয়ে, এখন হরমনপ্রীতদেরও নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্রিকেট খেলায় ভারতের টাকার গরম এতটাই যে এসব করে যাওয়া যাচ্ছে। অন্য কোনো খেলায় কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই ধাষ্টামো চলতে দেওয়া হয় না। ২১ সেপ্টেম্বর, যেদিন সূর্যকুমাররা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার খেললেন এশিয়া কাপে, কাঠমান্ডুতে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলে ভারত বনাম পাকিস্তানের খেলা ছিল। সেই ম্যাচ ভারত ৩-০ জেতে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দন করেই মাঠ ছাড়ে। কারণ ফিফার সঙ্গে আইসিসির তফাত আকাশের সূর্য আর বিজেপি সাংসদ তেজস্বী সূর্যের মত। ফুটবলে খেলার মাঠের নিয়ম না মানলে সরাসরি সাসপেন্ড করে দেওয়া হতে পারে। যথার্থ দেশপ্রেম থাকলে সেই ঝুঁকি নেওয়া উচিত। বিজেপি নেতা কল্যাণ চৌবের নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন যে সে ঝুঁকি নেয়নি, তাতেই প্রমাণ হয় যে দেশপ্রেম-টেম বাজে কথা। আসলে এরা শক্তের ভক্ত, নরমের যম। উপরন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে গোটা নাটকটাই নির্বাচনমুখী। বিহার কেন, ভারতের কোনো রাজ্যের ভোটারেরই অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবল নিয়ে মাথাব্যথা নেই। অতএব ওখানে দেশপ্রেম দেখানোর আয়োজন নেই। নিজেরাই অশান্তি শুরু করে খেলার পরিবেশ নষ্ট করে দেওয়ার পর পাক ক্রিকেটাররা অসভ্যতা করলে হাত-পা ছুড়ে কান্নাকাটি করার ব্যাপার নেই। কার হাত থেকে পুরস্কার নেব সেটা ঠিক করতে চাওয়ার অন্যায় আবদারও নেই। খেতাব জিতলে প্রধানমন্ত্রী সোশাল মিডিয়ায় জ্বালাময়ী পোস্টও করবেন না, অধিনায়কও বলবেন না – সিঁদুর-স্পন্দিত ব্যাটে, মনে হয় আমিই পিএম।
রাজনৈতিক কারণে বহু খেলাতেই এক দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশ খেলতে চায় না। যেমন এই মুহূর্তে পৃথিবীর বহু দেশ দাবি করছে, আগামী বছরের ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে যেন ইজরায়েলকে বাদ দেওয়া হয় গাজায় গণহত্যা চালানোর অপরাধে। ফিফা সভাপতি অবশ্য বলে দিয়েছেন, তাঁরা এ দাবি মানবেন না। না মানলে এবং ইজরায়েল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলে, কোনো দেশ তাদের বিরুদ্ধে না খেলার সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। তাতে তাদের পয়েন্ট কাটা যাবে। নীতিগত অবস্থান নিতে হলে এই ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ক্রিকেটেই এমন দৃষ্টান্ত আছে। ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড জিম্বাবোয়েতে খেলতে যায়নি রবার্ট মুগাবের বর্ণবিদ্বেষী শাসনের প্রতিবাদে, নিউজিল্যান্ড কেনিয়ায় খেলতে যায়নি নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে আবার অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় খেলতে যায়নি সন্ত্রাসবাদী হানার আশঙ্কায়। সব ক্ষেত্রেই যে দেশ খেলতে যায়নি, তাদের পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী দেশ মনে করলে বা তাদের ক্রিকেটারদের সন্ত্রাসবাদী মনে করলে ভারতের সম্পূর্ণ অধিকার আছে তাদের সঙ্গে না খেলার। কিন্তু ভারত সরকারের সমার্থক আজকের ক্রিকেট বোর্ডের এই ‘গাছেরও খাব, তলারও কুড়োব’ মানসিকতা আর যা-ই হোক জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা হলে যে বিপুল পরিমাণ টাকা আয় হয় বিজ্ঞাপন বাবদ – তার লোভ বিসিসিআই ছাড়তে রাজি নয়। তাই ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলেন কেন’ জিজ্ঞেস করলেই বোর্ড কর্তা তথা বিজেপি নেতারা আমতা আমতা করতে থাকেন। ওদিকে নিজেদের উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখাতে, ভোটারদের ‘বিকাশ’ ভুলিয়ে পাকিস্তান আর মুসলমানে ব্যস্ত রাখতে খেলাটাও আর খেলার নিয়মে হতে দিচ্ছেন না।
দেশের আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মত জাতীয় ক্রিকেট দলগুলোও এখন বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা, যার সদর দফতর আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেট স্টেডিয়াম। নইলে প্রত্যেকবার মাঠে মাছি তাড়ানোর লোক কম পড়লেও বারবার ওখানেই টেস্ট ম্যাচ হয়, আর ২০০১ সালের পর থেকে ইডেন উদ্যানে ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট দেওয়া যায় না কেন?
সুনীল গাভস্কর, শচীন তেন্ডুলকরের মত মহীরুহ আগেই সংঘের কাছে নাকখত দিয়েছেন। সেখানে সূর্যকুমারের আর কী-ই বা ইয়ে বলুন? যে দেশে মনসুর আলি খান পতৌদির মত নেতার ইতিহাস মুছে ফেলা হয় আর বর্তমান ও প্রাক্তন ক্রিকেটাররা ইনিয়ে বিনিয়ে সেই সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ান, সে দেশের ক্রিকেট দলের সূর্যকুমারের মত মোসাহেব নেতাই প্রাপ্য।
আমি মনে মনে ভাবি, চিন্তা তো নাই, কলিকাতা যাক নাকো সোজা বোম্বাই। দিল্লী লাহোরে যাক, যাক না আগরা— মাথায় পাগড়ি দেব পায়েতে নাগরা।
সহজ পাঠ দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হওয়ার সময়ে ভাগ্যিস স্মার্টফোন, সোশাল মিডিয়া, দিনরাতের টিভি চ্যানেল, আর তাদের চিল্লানোসরাস অ্যাংকর— এসব কিছুই ছিল না। নইলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি ফেসবুকে উপরের পংক্তিগুলো লিখে ফেলতেন, তাহলে কী কেলেঙ্কারিটাই না হত! নোবেল পুরস্কারজয়ী কবি বলে কথা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যেত এবং ভারতের বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দি টিভি চ্যানেলগুলো ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে দেখাত—
‘কলকাতাকে রাতের অন্ধকারে লাহোরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা পাকিস্তানের’, ‘ভারতীয় মিসাইলের আক্রমণে দিল্লিতেই অভিযান শেষ
রাতে কবিতাটি পোস্ট করে রবীন্দ্রনাথ যতক্ষণে সকালে ঘুম থেকে উঠতেন, ততক্ষণে দেখতেন কলকাতা যে কলকাতাতেই আছে, সে-কথা আর কেউ বিশ্বাস করছে না। এমনকি কলকাতা হারানোয় কেউ শোকপ্রকাশও করছে না। চারপাশে লাহোর, করাচি দখলের উল্লাস দেখতে দেখতে শান্তিনিকেতনে বসে তাঁরও হয়তো দুপুরের দিকে সন্দেহ হত— ‘কলকাতা সত্যি সত্যি কলকাতাতেই আছে তো?’ স্নেহভাজন কাজী নজরুল ইসলামকে হয়তো ফোন করতেন উদ্বিগ্ন হয়ে, তারপর তাঁর মুখ থেকে কলকাতা যথাস্থানে আছে শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন। ততক্ষণে তাঁর কাছে প্রতিক্রিয়া চেয়ে পৌঁছে যেত বিশিষ্ট নিউজ অ্যাংকরদের জুম কল। বিশ্বকবি প্রাণপণ চেষ্টা করতেন বোঝাতে যে ওটা তাঁর কল্পনা, কলকাতা যেখানে থাকার সেখানেই আছে। একচুলও নড়েনি, নড়া সম্ভবও নয়। একখানা আস্ত শহর যাবে কোথায়? কিন্তু বিশিষ্ট অ্যাংকররা এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। রবীন্দ্রনাথের কাছে কলকাতা অবিচল থাকার প্রমাণ চাওয়া হত নিশ্চয়ই। তিনি হয়তো বলতেন, একটু আগে নজরুলের সঙ্গে কথা হয়েছে, তিনি জানিয়েছেন যে দুশ্চিন্তার কোনও কারণ ঘটেনি। বলামাত্রই ঝাঁপিয়ে পড়তেন জাতীয়তাবাদী অ্যাংকর, ‘আর কতদিন কুসুম কুসুম কবিদের কথায় ভুলে নিজের অস্তিত্ব যে বিপন্ন সেটা গোপন করবেন? এসব সেকুলারিজমের দিন শেষ। এত সেকুলার হওয়ার ইচ্ছে হলে পাকিস্তানে চলে যান।’ সালটা ১৯৩০, ফলে রবীন্দ্রনাথ হয়তো বেচারাথেরিয়ামের মতো মুখ করে ভাবতেন— সেটা আবার কোন দেশ রে বাবা!
হাসবেন না। ব্যাপারটা মোটেই হাস্যকর নয়। ১৯৭১ সালের পর ফের ভারত-পাকিস্তানের পূরোদস্তুর যুদ্ধ লাগার উপক্রম হয়েছিল এ-মাসের গোড়ায়। সেই বাজারে দেশের টিভি চ্যানেলগুলো যে কাণ্ড করেছে, তাতে পরিষ্কার বোঝা গেছে— যুদ্ধ করার উৎসাহ ভারতীয় সেনাবাহিনীর চেয়েও তাদের বেশি এবং সে অভিলাষ চরিতার্থ করতে তারা আক্ষরিক অর্থেই দিনকে রাত আর রাতকে দিন করতে প্রস্তুত।
একদিন রাতে ভিডিও গেমের দৃশ্য, লস এঞ্জেলসে বিমান ভেঙে পড়ার দৃশ্য, ইজরায়েলের চার বছরের পুরনো ভিডিও ইত্যাদি দেখিয়ে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো প্রায় গোটা পাকিস্তানই ভারতের দখলে চলে এসেছে বলে জানিয়েছিল। পরদিন কিছু চ্যানেল ভালমানুষ সেজে ভুয়ো খবর ছড়ানোর বিরুদ্ধে বাণী দিয়েছিল বটে, কিন্তু এমন চ্যানেলও আছে যারা ওসবেরও তোয়াক্কা করেনি। করতে যাবেই বা কেন? কেন্দ্রীয় শাসক দলই তো নিজেদের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করে জানিয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে দেশের সরকার বা সেনাবাহিনীকে নিয়ে তো বটেই, মিডিয়ার এসব কীর্তি নিয়েও হাসাহাসি করা চলবে না। কারণ অনেক খবরের মধ্যে দু-চারটে ভুল খবর দেখিয়ে দিলে এমন কিছু দোষ হয় না, কিন্তু ভুল খবরকে ভুল খবর বললে দেশের মনোবল নষ্ট হয়। যুদ্ধ মানে হল ‘ন্যারেটিভ ওয়ার’। ভুয়ো খবর চিহ্নিত করা মানে সেই যুদ্ধে নিজের দেশকে হারিয়ে দেওয়া।
पाकिस्तान कभी नहीं सुधरेगा और हो सकता है कि युद्ध भी हो, लेकिन क्या ऐसे लड़ेगा भारत?
ऐसे भारत विरोधी तत्वों को पहचानिए, जिन्होंने #OperationSindoor के समय अपने देश, देश की मीडिया और देश की सेना का मजाक बनाया था…
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ছড়ানো ভুয়ো খবরের পক্ষে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়ে যাওয়া এই ভিডিওতে ভাষণ দিয়েছেন কে? টাইমস নাও নবভারতের কনসাল্টিং এডিটর সুশান্ত সিনহা। বুঝতেই পারছেন, তিনি কত বড় সাংবাদিক। অতএব, মোটেই হাসাহাসি করবেন না। নইলে কখনও দেখবেন, সরকারের সমালোচনা করার জন্য নয়, মোদিজি বা শাহজিকে নিয়ে রসিকতা করার জন্যও নয়, মিডিয়াকে নিয়ে হাসাহাসি করার জন্য অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আলি খান মাহমুদাবাদের মতো আপনিও গ্রেপ্তার হয়ে যাবেন।
অ্যাঁ, কী বললেন? উনি মুসলমান না হলে ওই পোস্টের জন্য গ্রেপ্তার হতেন না? আজ্ঞে, ঠিক ধরেছেন। কথাটা উমর খালিদের বেলায় সত্যি, গুলফিশা ফতিমার ক্ষেত্রে সত্যি, যে রিপোর্ট লেখাই হয়নি তার জন্য গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পানের ক্ষেত্রেও সত্যি, আরও অনেকের ক্ষেত্রেই সত্যি।
সুতরাং, মোটেই হাসাহাসি করবেন না আমাদের লড়াকু টিভি চ্যানেল আর তাদের মহামহিম অ্যাংকরদের নিয়ে। এঁদের হাত কত লম্বা, জানেন তো? মৃত লোকও এঁদের আওতার বাইরে নন। কাশ্মিরের পুঞ্চে সীমান্তের ওপার থেকে আসা গোলায় নিহত মৌলানা মহম্মদ ইকবালকে এই মহান সাংবাদিকরা সন্ত্রাসবাদী বলে দেগে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, পুঞ্চ পুলিশের চেয়েও এঁরা বেশি জানেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর চেয়ে তো বটেই। পাকিস্তানের কিরানা হিলসে পরমাণু বোমার কেন্দ্রেও নাকি ভারতের বিমান বোম ফেলেছে বলে তাঁরা জানিয়েছিলেন। এদিকে সরকারি ব্রিফিংয়ে তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, এয়ার মার্শাল একে ভারতী প্রশ্নকর্তা সাংবাদিককে বলেন, ‘আপনাকে ধন্যবাদ ওখানে পাকিস্তানের পরমাণু বোমা আছে এ-কথা আমাদের জানানোর জন্যে। আমরা কখনও বলিনি যে আমরা কিরানা হিলসে বোম ফেলেছি।’
তাহলে বুঝলেন তো, সাংবাদিকদের চটালে মরেও শান্তি পাবেন না, মরার পরেও সন্ত্রাসবাদী হয়ে যেতে পারেন! বিশ্বকবিই যখন বলে গেছেন, ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি’, তখন নিউজ চ্যানেল আর তাদের জাতীয়তাবাদী অ্যাংকরদের নিয়ে খবরদার হাসাহাসি করবেন না। ভুয়ো খবর বলে যে কিছু হয়, তা ভুলে যান।
গত কয়েকদিনে যা বুঝলাম, মোদিজি যতই স্লোগান দিন ‘বেটি বচাও, বেটি পঢ়াও’, এদেশের প্রগতিশীলরাও সিঁদুরকেই মেয়েদের সবচেয়ে দামি সম্পত্তি বলে মনে করেন।
২০২৫ সালের ৭ মে তারিখটা এ-জীবনে আর ভুলতে পারব বলে মনে হয় না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই খবর পেলাম— বিশ্ব যখন নিদ্রামগন গগন অন্ধকার, তখন পহলগামে পাক-মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদীদের হাতে মৃত ২৬ জনের হয়ে শোধ তুলে নিয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনা। পাড়ার দোকানে, মোড়ের মাথায় জোর আলোচনা— পাকিস্তানকে টের পাইয়ে দেওয়া গেছে। যে-সব দোকানে খদ্দের কম হলেও আমদানি বেশি, সেখানে দেয়ালে লাগানো টিভিতে পাড়া কাঁপিয়ে চিৎকার করছেন বিভিন্ন চ্যানেলের অ্যাঙ্কররা। শুনে মনে হল, তাঁরাই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বোম ফেলে এসেছেন সীমান্তের ওপারে। বায়ুসেনার অফিসাররা নন। ভালো লাগল সকাল সকাল, মনে হল— আমিও পারি। আমরা যারা জীবনে কিছুই পারি না, ফ্ল্যাট কেনার পর ২-৩ বছর কেটে গেলেও প্রোমোটার লিফট লাগাচ্ছে না দেখে ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলা ঠুকতেও ভয় পাই, তাদের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে তুলে দিতে পারেন একমাত্র টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকরা।
তবে এখানেই শেষ নয়। দিনটা আরও স্মরণীয় হয়ে গেল বেলা দশটার পরে, যখন নতুন দিল্লিতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে সংবাদমাধ্যমকে জানানো হল ঠিক কী ঘটানো হয়েছে এবং কীভাবে। চারপাশে খুশির পরিবেশ তৈরি হলে নিজেরও ভাল লাগে। দেখলাম ব্রিফিং শেষ না হতেই আমার আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু— সকলেই দারুণ খুশিয়াল হয়ে উঠেছে। না, সরকারের সমর্থকদের কথা বলছি না। যারা সরকারবিরোধী তাদের কথাই বলছি। যারা ধর্মনিরপেক্ষ তাদের খুশির কারণ মূলত দুটো। বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রি এ-কথা বলেননি যে পহলগামে হিন্দুদের আলাদা করে মারা হয়েছে। তার উপর তিনি বলেছেন যে সন্ত্রাসবাদীদের অনেক লক্ষ্যের মধ্যে একটা ছিল জম্মু ও কাশ্মীরে এবং বাকি ভারতে সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টি করা।
তবে! এই যে ধর্মনিরপেক্ষ বন্ধুদের সেদিন থেকে সেকু বলে গাল দেওয়া হচ্ছিল, এখন হল তো? ভারত সরকার নিজেই বলল তো, যে ধর্মনিরপেক্ষ লোকেদের কোনও দোষ নেই, বরং মানুষে মানুষে ধর্মের ভিত্তিতে ভেদাভেদ করা সন্ত্রাসবাদীদের কাজ? এত বড় সরকারি সিলমোহর ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ সেই ২০১৪ সাল থেকে পাননি। আহ্লাদ হবে না? পরিষেবা বেসরকারি হলে ভালো হবে জানি, কিন্তু স্বীকৃতিটা যে সরকারি না হলে আমাদের চলে না। তা পেয়ে গিয়ে আমারও গর্বে বুকটা ফুলে উঠল। ময়ূখ ঘোষ যা-ই বলুন, এতদ্বারা আমরা সেকুরাই জিতে গেলাম শেষমেশ। নরেন্দ্র মোদির মতো লোকের সরকার পর্যন্ত মানতে বাধ্য হল— ধর্মনিরপেক্ষতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। নেহাত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রতিভা নিয়ে জন্মাইনি, নইলে গেয়েই উঠতাম ‘কী মিষ্টি, দেখো মিষ্টি/কী মিষ্টি এ সকাল’।
ওটুকু মিষ্টিতেই গোটা দিনটা কেটে যেতে পারত। কিন্তু আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ পাতে রসগোল্লার পরে কালাকাঁদের ব্যবস্থাও করে রেখেছিল সরকার। বিক্রমবাবুর দুইদিকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল দুই মহিলা সেনা অফিসারকে— ব্যোমিকা সিং আর সোফিয়া কুরেশি। একজন হিন্দু, একজন মুসলমান। আহা! কী বুদ্ধিই না করেছেন বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্করবাবু। পাকিস্তানের লক্ষ্য ছিল ভারতীয় হিন্দু আর ভারতীয় মুসলমানের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা। কিন্তু জয়শঙ্করবাবু কি সোজা লোক? জেএনইউয়ের প্রাক্তনী বলে কথা। না হয় মন্ত্রী-টন্ত্রী হবেন বলে বিজেপিতে ভিড়েছেন। তা বলে কি আর অ্যালমা মাটারকে ভারতমাতার চেয়ে কম গুরুত্ব দেন? বিশ্বগুরুর মন্ত্রিসভায় ঢোকার অনেক আগেই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বাঙালি সেকু, মাকু বন্ধুদের মুখে নির্ঘাত কবিগুরুর কবিতা শুনেছিলেন। তাই তো প্রেস ব্রিফিংয়ে একেবারে ‘ভারততীর্থ’ দেখিয়ে দিলেন পাকিস্তানকে। ওঃ! মাস্টারস্ট্রোক। বিজেপি সমর্থকদের চেয়েও জোরে জোরে সমস্বরে আমার ধর্মনিরপেক্ষ বন্ধুরাই বলতে শুরু করলেন।
এখানেই শেষ নয়। আনন্দ আরও বেড়ে গেল নারীবাদী বন্ধুদের আনন্দ দেখে। এরকম একটা গুরুতর সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের জবাব দেওয়ার অপারেশনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন সিঁদুর’। মানে যে মহিলাদের সিঁদুর সেদিন সন্ত্রাসবাদীরা মুছে দিয়েছে তাদের সরকার সম্মান জানাল। তাও আবার দায়সারাভাবে নয়, প্রত্যাঘাতের ব্রিফিংয়ে দুই মহিলা অফিসারকে পাঠিয়ে। এমন ‘সিম্বলিজম’ অতুলনীয়। পাকিস্তান পারবে এরকম? পারবে যে না, তা নিয়ে দেখলাম বিজেপিবিরোধী নারীবাদী আর বিজেপি সমর্থকরা একমত। দুই পক্ষেরই বক্তব্য মোটামুটি এক— পাকিস্তানের মেয়েরা বোরখায় বন্দি, এদিকে আমাদের মেয়েরা যুদ্ধে যাচ্ছে শুধু নয়, নেতৃত্বও দিচ্ছে। মোদি সরকার যতই খারাপ হোক, এই ব্যাপারটা হেব্বি দিয়েছে।
আনন্দে ভাসতে ভাসতেই দেখলাম একে একে ভারতের সংসদীয় মার্কসবাদী দলগুলোর বিবৃতিও এসে পড়েছে। সকলেই সেনাবাহিনীকে বাহবা দিয়েছে। লিবারেশন ছাড়া কেউ যুদ্ধ যেন না হয় সে চেষ্টা করতে হবে— এ-কথা বলেনি। পাকিস্তান সরকারকে অনেক পরামর্শ-টরামর্শ দিয়েছে সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটি ভেঙে দেওয়া, দোষীদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে। কিন্তু ভারত সরকারের কাছে পহলগামের ঘটনার তদন্তের কী হল— সে প্রশ্ন তোলেনি। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে কদিন আগেই অভিযোগ করেছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আগে থেকেই খবর ছিল যে কাশ্মীরে পর্যটকদের উপর হামলা হতে পারে। সেই কারণেই নাকি তিনি কাশ্মীর সফর বাতিল করেন। তাহলে নিরস্ত্র মানুষগুলোর প্রাণ বাঁচানো গেল না কেন? সে-প্রশ্নের জবাবও কোনও মার্কসবাদী দলের বিবৃতিতে চাওয়া হয়নি। এমনকি এতজন নিরপরাধ, নিরস্ত্র ভারতীয়ের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে যে দুটো সর্বদলীয় বৈঠক হল তার একটাতেও প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকলেন না কেন— সে-প্রশ্নও মাত্র দ্বিতীয় বৈঠকের পরে তোলা হয়েছে। সিপিআই দলের বিবৃতিতে তবু দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমিত করার দাবি জানানো হয়েছে, সিপিএমের বিবৃতিতে কেবলই ভারত সরকারের জন্যে হাততালি আর পাকিস্তানের উপর চাপ বজায় রাখার পরামর্শ। দ্বিতীয় বৈঠকে সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাসের বক্তব্যে তবু খানিকটা সরকারের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।
দেখে শুনে বুঝলাম, আমার মার্কসবাদী বন্ধুরাও খুবই আনন্দ পেয়েছে। অ্যাদ্দিন জানতাম তারা উল্লসিত হলে ‘লাল সেলাম’ বলে। এবার দেখলাম ‘জয় হিন্দ’ চালু হয়েছে। ‘ভারত মাতা কি জয়’ নেই দেখে অবাক হলাম। কারণ অনেকে বলেই দিয়েছে— রাজনৈতিকভাবে বিজেপির সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু দেশের সুরক্ষার প্রশ্নে সবাই এক। সিঁদুরকৌটোর ছবিওলা পোস্টারও অনেক কমরেড সগর্বে শেয়ার করেছেন।
সত্যি বলছি, বামে-ডানে এমন ঐক্য জন্মে দেখিনি। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পড়েছিলাম হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির দ্বারোদ্ঘাটনের অনেককাল আগে। তাতেও এমন ঐক্যের গল্প পাইনি। তাই খুব আনন্দ হল। এই যে সবকিছুতে রাজনীতি করার অভ্যাসের ঊর্ধ্বে উঠে সকলে এক হতে পেরেছে— এই তো আমাদের শক্তি। এইজন্যেই তো আমরা সভেরেন সোশালিস্ট সেকুলার ডেমোক্র্যাটিক, আরও কী কী সব, রিপাবলিক।
তবে এসব হল ছোটখাটো আনন্দের কারণ। বেশি আনন্দ পেয়েছি অপারেশন সিঁদুরের সুদূরপ্রসারী ফলগুলো টের পেয়ে। যেমন ধরুন, সোফিয়া ব্রিফিংয়ে এসে বসার পর থেকে ভারতে মুসলমানদের বাড়িঘরের উপর দিয়ে বুলডোজার চালানো বন্ধ হয়ে গেছে। মুসলমান ডেলিভারি বয়ের কাছ থেকে খাবার না নেওয়ার বদভ্যাস সকলে ত্যাগ করেছে। মুসলমান মানেই সন্ত্রাসবাদী— এ-কথা তো আর ভুলেও কেউ উচ্চারণ করছে না। ব্যোমিকা আর সোফিয়াকে দেখামাত্র দেশের যেখানে যত ক্লিনিক বেআইনিভাবে ভ্রূণের লিঙ্গ পরীক্ষা করে কন্যাভ্রূণ হত্যা করত, সবকটার ব্যবসা লাটে উঠেছে। এপিজে আব্দুল কালামের পর আবার এতদিনে সোফিয়ার দেখা পেয়ে হিন্দুত্ববাদীদের বিশ্বাস হয়েছে যে মুসলমানরা ভারি দেশপ্রেমিক।
অপারেশন সিঁদুর যখন এত ভালো ভালো ব্যাপার একসঙ্গে ঘটিয়ে ফেলেছে, তখন অনুমান করছি মুনমুন সেনের শেষ হয়ে যাওয়া কেরিয়ারও নতুন করে শুরু করিয়ে দেবে। হয়ত ব্যবধান ছবির একখানা দেশপ্রেমিক হিন্দি রিমেক তৈরি হবে। আশা ভোঁসলের বয়সটা বড্ড বেশি হয়ে গেছে, তাই বৃদ্ধা মুনমুনের ঠোঁটে কণ্ঠদান করবেন শ্রেয়া ঘোষাল। সঙ্ঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ ভিক্টর ব্যানার্জিকে হয়তো শহিদ-টহিদ হিসাবে দেখানো হবে। তাঁর ছবির দিকে তাকিয়ে মুনমুন সেই ‘কত না ভাগ্যে আমার এ জীবন ধন্য হল/সিঁথির এই একটু সিঁদুরে সবকিছু বদলে গেল’-র হিন্দিটা ধরবেন। হয়তো গীতিকার হবেন প্রসূন জোশি আর সুর দিয়ে দেবেন এআর রহমান। তাহলেই বেশ ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে যাবে ব্যাপারটা। গত কয়েকদিনে যা বুঝলাম, মোদিজি যতই স্লোগান দিন ‘বেটি বচাও, বেটি পঢ়াও’, এদেশের প্রগতিশীলরাও সিঁদুরকেই মেয়েদের সবচেয়ে দামি সম্পত্তি বলে মনে করেন। আজকের বাজারে ছবিটা চলবেও ভালো, প্রযোজক পেতেও অসুবিধা হবে না। কারণ ‘অপারেশন সিঁদুর’ ট্রেডমার্কের জন্যে একাধিক আবেদন জমা পড়ে গেছে। আবেদনকারীদের মধ্যে রিলায়েন্স গ্রুপও ছিল, তবে মুকেশ আম্বানি লোক ভালো। তিনি আবেদন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, বলেছেন কোনও অপোগণ্ড নিচুতলার কর্মচারী নাকি ভুল করে আবেদনটা করে ফেলেছিল তা সে যা-ই হোক, ট্রেডমার্ক কেউ নিক আর না-ই নিক, নামটার বিক্রয়যোগ্যতা তো প্রমাণ হয়ে গেল। এরপর ছবির প্রযোজক পেতে কি আর অসুবিধা হবে? আমরা ধর্মনিরপেক্ষ, বামপন্থী, প্রগতিশীল লোকেরা দল বেঁধে দেখতে যাব। কারণ ওই যে— রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু দেশের প্রশ্নে আমরা সকলে এককাট্টা।
অর্থাৎ আগামীদিনে ভারতের আনন্দযজ্ঞে সবার নিমন্ত্রণ। তবে এই যজ্ঞে পুঞ্চে যে ১৫ জন ভারতীয়কে পাকিস্তান বোম ফেলে মেরেছে আর যে ৪৩ জনকে আহত করেছে বলে খবর, তাদের পরিবার-পরিজন যোগ দেবে কিনা ঠিক বুঝতে পারছি না। অবশ্য কাশ্মীর আমাদের বলেই যে কাশ্মীরিদেরও আমাদের লোক বলে ধরতে হবে এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি। কাশ্মীরিরা যেহেতু ঘরপোড়া গরু, তারা সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরাতে পারে। আমরা আনন্দ করব না কেন?
যদি এই লেখায় তথ্যের গুরুতর ভ্রান্তি বা সত্যের অপলাপ আছে বলে মনে হয়, তার জন্যে নিবন্ধকার দায়ী নন। কারণ সব সত্যি লেখা লেখকের পক্ষে বিপজ্জনক
কাশ্মীরের পহলগামে মঙ্গলবারের ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী হানার পরে দুদিন হতে চলল। এখনো প্রধানমন্ত্রী রাহুল গান্ধী সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারলেন না সরকার এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে। অবশ্য একটি জনসভায় তিনি বলেছেন যে সন্ত্রাসবাদীদের কড়া জবাব দেওয়া হবে, তারা যা করেছে তার বহুগুণ তীব্র জবাব তারা ফেরত পাবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধীদের দাবি মেনে এই ইস্যুতে যে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা হয়েছিল নিউ দিল্লিতে, সেই বৈঠকে রাহুল উপস্থিত ছিলেন না। এমনি এমনি তো আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা রাজনীতিকে তিনি সত্যিই কতখানি গুরুত্ব দেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। এই সেদিন সৌদি আরব থেকে ফিরলেন, আবার হয়ত কয়েকদিন পরেই দেখা যাবে অন্য কোনো দেশে চলে গেছেন।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অখিলেশ যাদব এই ঘটনায় নিজের মন্ত্রকের ব্যর্থতা নিয়ে একটি কথাও বলেননি। অথচ অন্য অনেক ব্যাপারেই তিনি সদা সরব। যখনই আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া আদালতের নির্দেশে কোনো মসজিদের নিচে কী ছিল তা জানার জন্যে খোঁড়াখুঁড়ি করতে যায়, তখন অখিলেশ এবং তাঁর দল সমাজবাদী পার্টির অন্যান্য নেতারা তাতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে বিপুল অশান্তি সৃষ্টি হয়। অথচ দেশের নিরীহ, নিরস্ত্র নাগরিকদের উপরে এই ভয়াবহ হামলার পরে অখিলেশ চুপ। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর নোটবন্দির পর, ২০১৯ সালের ৫ অগাস্ট সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বিলোপ এবং জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার পর রাহুল-অখিলেশের সরকার বলেছিল – কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদের কোমর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আর কোনোদিন সন্ত্রাসবাদীরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। সেক্ষেত্রে পৃথিবীর সর্বাধিক সেনা মোতায়েন থাকা অঞ্চলে এই ঘটনা ঘটল কী করে – সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর অখিলেশ এখন পর্যন্ত দিতে পারেননি। কাশ্মীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি যে বৈঠক করেছেন তাতে আবার মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাকে ডাকা হয়নি। এর কারণ কী? ভবিষ্যতে এরকম কোনো ঘটনা ঘটলে ওমর যাতে নিজের দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন, অখিলেশ কি সেই ব্যবস্থা করছেন? ইন্ডিয়া জোটের শরিকের স্বার্থরক্ষা করতে তিনি কি দেশের সাধারণ নাগরিকদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন না?
ভারতের সেকুলার নেতাদের এইসব আচরণের মাশুল অতীতেও হিন্দুদের দিতে হয়েছে, এভাবে চললে ভবিষ্যতেও দিতে হবে। এই সেকুলার সরকারের আমলে একটার পর একটা ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনা ঘটেই চলেছে, অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে অখিলেশের স্থান নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলছে না। অথচ ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ের ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হানার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিবরাজ পাতিল পদত্যাগ করেছিলেন। এই সরকারের আমলে বারবার ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীরা ভারতের উপর হামলা চালাচ্ছে, বিশেষত কাশ্মীরে। ২০১৬ সালের ২-৫ জানুয়ারি পাঞ্জাবের পাঠানকোটে ভারতীয় বায়ুসেনার ছাউনিতে জৈশ-ই-মহম্মদের সন্ত্রাসবাদীরা হানা দেয়। তিনদিন লেগেছিল চারজন সন্ত্রাসবাদীকে হত্যা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে। রাহুল আর অখিলেশের সরকার সেই ঘটনার কড়া জবাব দেওয়ার বদলে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটায়। পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলকে পাঠানকোটের সেনা ছাউনিতে গিয়ে ঘটনা সম্পর্কে সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করার অধিকার দেওয়া হয়। পাকিস্তান যে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিল ২৯ মার্চ, তাতে কুখ্যাত পাক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের এক সদস্যও ছিলেন। পাঠানকোটে ওই হামলার সপ্তাহখানেক আগেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাহুল আচমকা পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নাতনির বিয়েতে গিয়ে হাজির হন। সেইসময় সরকার পক্ষ এই পদক্ষেপকে একজন সত্যিকারের রাষ্ট্রনেতার ব্যবহার বলে প্রশংসা করেছিল। ওই ব্যবহারের কী প্রতিদান দিয়েছিল পাকিস্তান? এক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের মাটিতে পুষ্ট জঙ্গি সংগঠন ভারতের সেনা ছাউনি আক্রমণ করে এবং তাদের সঙ্গে লড়াইয়ে সাতজন ভারতীয় জওয়ানের প্রাণ যায়।
সেবছরের ১৮ সেপ্টেম্বর উরিতে হামলা চালিয়ে ১৯ জন ভারতীয় সৈনিককে হত্যা করে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীরা। তার জবাব হিসাবে ২৯ সেপ্টেম্বর নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’ করে ভারতীয় সেনাবাহিনি।
তবে এসবের চেয়ে অনেক বড় আঘাত ছিল ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামার ঘটনা। আড়াই হাজার সিআরপিএফ জওয়ানকে নিয়ে জম্মু-শ্রীনগর হাইওয়ে দিয়ে যাচ্ছিল ৭৮ খানা বাসের লম্বা কনভয়। পুলওয়ামা জেলার লেথাপোরার কাছে এক আত্মঘাতী জঙ্গি, পরে যাকে চিহ্নিত করা হয় আদিল আহমেদ দার বলে, সে ৩৫০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরকে ঠাসা গাড়ি নিয়ে ওই কনভয়ের একটি বাসে ভিড়িয়ে দেয়। ফলে ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ানের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার প্রত্যাঘাত হিসাবে ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের বালাকোটে বোম ফেলা হয়। কিন্তু ওই বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক নিয়ে একটি গাড়ি কী করে সশস্ত্র বাহিনির কনভয়ের কাছে পৌঁছতে পারল, সে প্রশ্নের জবাব আজ পর্যন্ত রাহুল-অখিলেশের সরকার দিতে পারেনি। এই ঘটনার কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পর্যন্ত হয়েছে বলে খবর নেই। দাভিন্দর সিং নামে জম্মু-কাশ্মীর পুলিসের এক ডিএসপিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল ২০২০ সালের ১১ জানুয়ারি। তাঁর বিরুদ্ধে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ), ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর চেষ্টা এবং অন্যান্য অভিযোগে ইউএপিএ আইনে মামলা দায়ের করে। তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্তও করা হয়। তিনি এই মুহূর্তে এনআইএ-র দায়ের করা মামলায় বিচারবিভাগীয় হেফাজতে আছেন বটে, কিন্তু দুটি মামলার একটিতে জামিন হয়ে বসে আছে, অন্য মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। পুলওয়ামার ঘটনায় আর একটিও গ্রেফতার হয়নি।
এদিকে পহলগামের ঘটনার পরে এই সরকারের দীর্ঘদিনের গুণমুগ্ধ প্রাক্তন সেনাকর্তা মেজর জেনারেল জি ডি বক্সী রিপাবলিক টিভিতে বসে প্রধানমন্ত্রীর ভক্ত সাংবাদিক অর্ণব গোস্বামীর মুখের উপর বলে দিয়েছেন, কোভিডের সময়ে নাকি তিন বছর ধরে সেনাবাহিনিতে কোনো নিয়োগ হয়নি। টাকা বাঁচানোর জন্যে ভারতীয় সেনার সংখ্যা ১,৮০,০০০ কমিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে আগে যতজন সেনা কাশ্মীরে একটা সেক্টরে নজরদারি করত, এখন ততজনকেই দুটো সেক্টরে নজরদারি করতে হচ্ছে। এই তথ্য সত্য না মিথ্যা তা আমরা জানি না, কিন্তু এই বক্তব্যকে খণ্ডন করে এখন পর্যন্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রী তেজস্বী যাদব কোনো বিবৃতি দেননি।
পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং বাংলার সংবাদমাধ্যম আশ্চর্যভাবে সেকুলার সরকারের অযোগ্যতা সম্পর্কে একটি কথাও বলছে না। দেশের অন্য ভাষার মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলিও প্রায় রাহুল-অখিলেশের সরকারের গেলানো ভাষ্যই উগরে যাচ্ছে। তবে অন্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তফাত হল, যদি অন্য রাজ্যগুলির দিকে তাকাই তাহলে দেখব, ক্ষমতাসীন সেকুলার দলগুলির নেতারা যেখানেই পহলগামে নিহত মানুষদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন, সেখানেই ক্ষোভের সম্মুখীন হচ্ছেন। একটি ছয় বছরের শিশু, যে বাবাকে হারিয়েছে, সে-ও সটান টিভি ক্যামেরার সামনে বলে দিচ্ছে – সরকার কিছুই জানে না, সরকার প্রায় অস্তিত্বহীন। বড়দের উদাহরণও দেখে নিন নিচের লিংকগুলিতে
Breaking ‼️ Residents of Mumbai (Dombivali) out on streets protesting against Modi Govt. ▪️Why is Z security provided to ministers and not to ordinary citizens. ▪️If you had prior intelligence input why was no security in Pahalgam ▪️Where was the PM when attack happened. ▪️Each… pic.twitter.com/6ff9m1gg8A
অন্যদিকে কাশ্মীর থেকে যে হিন্দু পর্যটকরা বেঁচে ফিরেছেন তাঁদের দিয়ে কাশ্মীরি মুসলমানদের সম্পর্কে খারাপ কথা বলাতে ঘাম ছুটে যাচ্ছে অমিশ দেবগনের মত সরকারপন্থী সাংবাদিকদের।
ये भाई साहब B&D @AMISHDEVGAN की नौकरी खा जाएँगे। बताइये अमीष नफ़रत ढूंड रहा है और ये कश्मीरियों की इंसानियत और मोहब्बत बता रहे है। “गोली आएगी तो पहले हमे लगेगी” pic.twitter.com/lejV9HCrt3
Maharashtrian, Gujarati and Kannadiga women who received help, hospitality and affection from Kashmiri Muslims after the #PahalgamTerroristAttack speak a language totally alien to hate mongers whipping up passions with an eye on the nearest EVMs. pic.twitter.com/YqAofJR0RZ
এই প্রবণতা বিপজ্জনক, কারণ এ থেকে মনে হচ্ছে, রাহুল-অখিলেশ-তেজস্বী প্রমুখের অপদার্থতা সত্যেও সেকুলারিজমের ভূত এই লোকগুলির মাথাতেও ঢুকে যাচ্ছে। চোখের সামনে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের নগ্ন রূপ দেখার পরেও, সন্ত্রাসবাদীরা বেছে বেছে হিন্দুদের খুন করেছে জানার পরেও।
এই যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ভারতের হচ্ছে, এর দায় কেবল সেকুলার নেতাদের নয়, দলবিহীন সেকুলার ব্যক্তিদেরও নিতে হবে। সেই ২০১৪ সাল থেকে যতগুলি সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে এদেশে এবং তাতে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে – সবকিছুর দায় এই সেকুলারদের। এদের জন্যেই আজ ভারতে কোনো শক্তিশালী সরকার নেই। থাকলে এভাবে বারবার দেশের মানুষকে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীদের হাতে অসহায়ভাবে প্রাণ দিতে হত না। ওই ছয় বছরের পিতৃহারা ছেলেটির সামনেও এদের জবাব দিতে হবে।
ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন?
নহবত বসেছিল, গায়ে গোলাপ জল ছেটানোর জন্যে লোক তৈরি ছিল, হেঁশেলের দিক থেকে ভেসে আসছিল বেগুনির সুগন্ধ, বরকে অভ্যর্থনা করার জন্যে কনে কর্তা জমাটি পোশাক পরে তৈরি, কিন্তু শেষপর্যন্ত বর এসে পৌঁছল না। ফলে সব আয়োজন ভেস্তে গেল। কনে কর্তা ব্যাজার মুখ করে অতিথিদের কোনোমতে নমস্কার করে খাইয়ে দাইয়ে বাড়ি পাঠিয়ে কর্তব্য সমাধা করলেন।
এই ছিল ২০২৩ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের অবস্থা। ভারত জিতে গেলে গোটা দলকে নিয়ে কী বিপুল নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালাত বিজেপি, সে পরিকল্পনা কোথাও কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল। কংগ্রেস মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনেত দাবি করেছিলেন, রাজস্থানের এক বিজেপি নেতা তাঁকে বলেছিলেন যে বিজেপির সমস্ত হোর্ডিংয়ে বিশ্বকাপ হাতে মোদীর ছবি দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি ছিল। কিন্তু সে গুড়ে বালি ছড়িয়ে দিয়েছিল প্যাট কামিন্সের বাহিনি। ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি অবশ্য রোহিত শর্মারা জিতেছিলেন, কিন্তু ততদিনে লোকসভা নির্বাচন মিটে গেছে। ক্রমশ বিরাট হয়ে ওঠা নরেন্দ্র মোদীকে কেটে ছেঁটে দেশের অন্য নেতাদের মাপে এনে দিয়েছেন ভোটাররা। তখন আর হইচই করে কী লাভ?
সেই শোক বুঝি এতদিনে দূর হল। বিশ্বকাপ ফাইনালের পরে মোদীর পিছনে যেরকম বেচারা ভঙ্গিতে হাঁটছিলেন তৎকালীন বিসিসিআই যুগ্ম সচিব জয় শাহ, তাতে মনে হচ্ছিল বাবার বন্ধু নরেনজেঠু প্রচণ্ড ধমকেছেন ‘একটা কাজ যদি তোকে দিয়ে হয়!’ কিন্তু তাঁর নামও জয় শাহ। তিনি পরাজয় মেনে নিয়ে চুপ করে বসে থাকার লোক নন। ইতিমধ্যে আইসিসির শীর্ষপদ দখল করে জেঠুকে এবার তিনি যে উপহার দিলেন তা একেবারে নিখুঁত।
নিজে মাঠে নেমে তো খেলতে পারেন না, কিন্তু রোহিতদের সর্বোচ্চ সুযোগসুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ১৯৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ইতালিকে জেতানোর জন্যে বেনিতো মুসোলিনি কী করেছিলেন বা ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনাকে জেতাতে সে দেশের জুন্টা সরকার কত কলকাঠি নেড়েছিল তা আজ খুব গোপন তথ্য নয়। কিন্তু সেই দুই বিশ্বকাপেও ইতালি আর আর্জেন্টিনা সে আরাম পায়নি যা এবারে রোহিতরা পেলেন।
আইসিসি চেয়ারম্যান হিসেবে ভারতের জয়ে মাঠে তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশও অত্যন্ত দৃষ্টিকটু, হাসির খোরাক। ডালমিয়া, শ্রীনিবাসন, শশাঙ্ক মনোহররা অতীতে এই পদে থেকেছেন, এমন বালখিল্যসুলভ আচরণ করেননি কোনওদিন। আরও অবাক কাণ্ড, ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন? শোয়েব আখতারের ক্ষোভ প্রকাশ স্বাভাবিক। বৈষম্য তো আরও আছে!
প্রতিযোগিতার অন্য সব দল খেলল পাকিস্তানের একাধিক মাঠে ঘুরে ঘুরে, ভারতীয় দল একেবারে অন্য দেশের একটা শহরেই পায়ের উপর পা তুলে বসে রইল। অন্য দলগুলোকে পাকিস্তান থেকে উড়ে আসতে হল, আবার ফিরে যেতে হল। এই কাণ্ড করতে গিয়ে সবচেয়ে বিরক্তিকর অবস্থা হল দক্ষিণ আফ্রিকার। ভারত কোন সেমিফাইনালে উঠবে তা জানা না থাকায় অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তাদেরও দুবাই যেতে হল সেমিফাইনালের আগে। তারপর যখন বোঝা গেল ভারতের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ারই সেমিফাইনাল হবে, তখন ফেরত আসতে হল পাকিস্তানে। বিশ্রাম নেওয়ার বিশেষ সময় না পেয়েই নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল। সেই সেমিফাইনালে হারলেও, ৬৭ বলে অপরাজিত ১০০ রান করা ডেভিড মিলার বিরক্তি প্রকাশ করেই ফেললেন।
ভারত অন্যায় সুবিধা পেয়েছে – একথা বলার সাহস ক্রিকেট দুনিয়ায় কারোর হয় না। যেমন বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধমকানোর সাহস এই সেদিন পর্যন্ত কারোর হত না। কারণটা একই – সোজা কথায় টাকার গরম। আমরা আইসিসিকে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা দিই, অতএব আইসিসির আয়ের বেশিরভাগটা আমরাই নেব – এই গা জোয়ারি যুক্তিতে ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড দীর্ঘদিন হল বাকি ক্রিকেট দুনিয়াকে শুকিয়ে মারছে।
এরা যেটুকু উচ্ছিষ্ট ছুড়ে দেয় বাকিদের প্রতি, তা নিয়েই তাদের চলতে হয়। তাই কোনো বোর্ড মুখ খোলে না। বোর্ডের বারণ আছে বলে ক্রিকেটাররাও কিছু বলেন না। কিন্তু পাকিস্তানে চলল চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর ভারত খেলল দুবাই ট্রফি – এটা বোধহয় সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই বোর্ডগুলো কিছু না বললেও অনেক বিদেশি সাংবাদিক ও প্রাক্তন ক্রিকেটার এবার এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফেলেছেন, মিলারও মুখ খুলেছেন। সুবোধ বালক ভারতীয় মিডিয়া আর ধারাভাষ্যকাররা অবশ্য মানছেন না। তাঁরা দিল্লির প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক, অধুনা ভারতীয় দলের কোচ গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে একমত। কিন্তু মহম্মদ শামি সোজা সরল লোক, তিনি মেনে নিয়েছেন যে সব ম্যাচ একই মাঠে খেলায় ভারত বিশেষ সুবিধা পেয়েছে।
বস্তুত, ক্রিকেটের অ আ ক খ জানলে এবং অন্ধ ভক্ত না হলে যে কেউ মানবেন যে সব ম্যাচ এক মাঠে খেললে সুবিধা হয়। কারণ ক্রিকেট অন্য যে কোনো খেলার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করে আবহাওয়া এবং পিচের উপরে। চার স্পিনার খেলানোর জন্যে বিস্তর হাততালি কুড়োচ্ছেন গম্ভীর, রোহিত আর প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর। এই সিদ্ধান্ত তাঁরা নিতে পেরেছেন কারণ জানতেন, একই মাঠে ভারত সব ম্যাচ খেলবে আর সে মাঠের পিচ হবে স্পিন সহায়ক। অন্য সব দলকে কিন্তু একাধিক মাঠের পিচের কথা ভেবে দল গড়তে হয়েছিল।
একথা বললেই যা বলা হচ্ছে, তা হল – আর কী উপায় ছিল? ভারত তো পাকিস্তানে খেলতে যেতে পারত না। কারণটা রাজনৈতিক, অর্থাৎ ভারত সরকারের বারণ। কথাটা ঠিক। কিন্তু সেক্ষেত্রে ভারতের গ্রুপের সবকটা খেলাই সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে করা যেতে পারত, দুবাই আর শারজা মিলিয়ে। তাহলে অন্তত গ্রুপের অন্য দলগুলোও একই ধরনের পিচে একাধিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেত।
পাকিস্তানে খেলতে না যাওয়ার রাজনৈতিক কারণটাকেও প্রশ্ন করা দরকার। ২০০৮ সালের সন্ত্রাসবাদী হানার কথা তুলে আর কত যুগ দুই দেশের ক্রিকেটিয় সম্পর্ক অস্বাভাবিক করে রাখা হবে? মোদীর আচমকা নওয়াজ শরীফের নাতনির বিয়েতে খেতে যাওয়া, পাঠানকোটের সন্ত্রাসবাদী হানার তদন্ত করতে পাক গোয়েন্দা বিভাগকে ভারতের সেনা ছাউনিতে ঢুকতে দেওয়া – এসব তো ২০০৮ সালের অনেক পরে ঘটেছে। এমনকি গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে ডেভিস কাপে ভারতের টেনিস দল ইসলামাবাদে গিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে এসেছে। কেবল ক্রিকেট দল পাকিস্তানে গেলেই মহাভারত অশুদ্ধ হবে?
আজ্ঞে না, পুলওয়ামা ভুলিনি। সে ঘটনা যারা ঘটিয়েছিল তাদের শাস্তি হয়েছে? কোনো জোরদার তদন্ত হয়েছে? দাভিন্দর সিং বলে এক ভারতীয় পুলিস অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনিও জামিন পেয়ে গেছেন ২০২০ সালে। তাহলে ক্রিকেট দলের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জাতীয়তাবাদের নাটক করা কেন? আর সত্যিই যদি পাকিস্তান অচ্ছুত হয়, তাহলে প্রত্যেক আইসিসি প্রতিযোগিতায় ভারত আর পাকিস্তানকে এক গ্রুপে রাখাই বা কেন?
ধরা যাক, রাখা হয় না। ওটা এমনিই হয়ে যায়। তাহলেই বা ভারতীয় দল ম্যাচটা খেলে কেন? বোর্ড তো বলতে পারে – পাকিস্তানের সঙ্গে আমরা খেলব না, ওই ম্যাচের পয়েন্ট পাকিস্তানকে দিয়ে দেওয়া হোক। কেন বলে না? টিভি সম্প্রচার থেকে যে বিপুল টাকা আয় হয় তার নেশা তাহলে জাতীয়তাবাদের চেয়েও বেশি তো?
উত্তরগুলো অস্বস্তিকর। ফলে যিনি ভিন্নমত হবেন, তিনি সহজ রাস্তাটা নেবেন। বলবেন – এসব বলে ভারতের জয়কে ছোট করবেন না। ওরা পাকিস্তানে খেললেও জিতত। দুবাইতেও জিততে তো হয়েছে। আজ্ঞে হ্যাঁ, সেকথা ঠিক। তবে কথা হচ্ছে, আমাদের দেশের নির্বাচনগুলোতে যেসব দল রিগিং করে, অনেক ক্ষেত্রে রিগিং না করলেও তারাই জিতত। তাহলে কি ‘আহা! কী সুন্দর রিগিং করে!’ বলে হাততালি দিতে হবে?
একজন-দুজন নয়, গোটা ক্লাসই ফেল। এরপরেও রোহিত বুক ফুলিয়ে বললেন, কাটাছেঁড়া করার দরকার নেই।
মনে করুন আপনি একটা ক্লাসের ক্লাস টিচার। আপনার ক্লাসের সবকটা ছাত্রছাত্রী বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করেছে। হেডমাস্টার আপনার কাছে কৈফিয়ত চাইলেন। আপনি বললেন “এ নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। এতবছর তো সবাই পাস করেছে। একদিন তো এই রেকর্ড ভাঙতই, না হয় এবছরই ভাঙল।” কী ফল হবে? স্কুল বেসরকারি হলে চাকরিটি যাবে। সরকারি স্কুলে তা হবে না, কিন্তু বিলক্ষণ গালমন্দ হজম করতে হবে। ঘটনা হল, নিউজিল্যান্ডের কাছে একটা টেস্ট বাকি থাকতেই সিরিজ হেরে যাওয়ার পরে ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা প্রায় এই কথাগুলোই বলেছেন।
বলেছেন, এত কাটাছেঁড়া করার কী আছে? বারো বছর পরে একটা সিরিজ (ঘরের মাঠে) তো দল হারতেই পারে। যা চেপে গেছেন, তা হল দল সমানে সমানে লড়াই করে হারেনি, ল্যাজেগোবরে হয়েছে। প্রথম টেস্টের প্রথম দিনে ভিজে আবহাওয়ায় বল সুইং করতেই রোহিত বাহিনী ৪৬ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে ঋষভ পন্থ আর সরফরাজ খান দুর্দান্ত ব্যাটিং করায় ইনিংস হার বেঁচেছে। পুনের দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে স্পিনারদের পিচেও দেড়শো রানেই জারিজুরি শেষ। দ্বিতীয় ইনিংসেও যশস্বী জয়সোয়াল ছাড়া সব ব্যাটার ব্যর্থ। নিচের দিকে রবীন্দ্র জাদেজা কিছু রান না করলে আবার দুশোর নিচে ইনিংস গুটিয়ে যেত। শুধু কি তাই? প্রথম টেস্টে জোরে বোলিং সহায়ক পিচকে বুঝতে ভুল করে তিন স্পিনারে খেলা হল। ফলে আবহাওয়া যেমনই থাকুক, টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া ছাড়া উপায় রইল না। ওদিকে এখনই যাঁকে কপিলদেবের চেয়েও ভাল বলা শুরু হয়ে গেছে, সেই যশপ্রীত বুমরা ওই পিচে বিশেষ কিছু করতে পারলেন না। আরেক ‘গোট’ (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম) রবিচন্দ্রন অশ্বিনকেও নির্বিষ দেখাল। জাদেজা আর কুলদীপ যাদব তিনটে করে উইকেট নিলেন বটে, কিন্তু নিউজিল্যান্ড চারশো রান তুলে ফেলল। দ্বিতীয় টেস্টেও ভারতের আটশোর বেশি উইকেট নিয়ে ফেলা ‘রবি-অ্যাশ’ জুটি ব্যর্থ। এক ব্যাগ অভিজ্ঞতা নিয়ে, ওয়াশিংটন সুন্দর আর মিচেল স্যান্টনারের বোলিং দেখেও, তাঁরা বুঝেই উঠতে পারলেন না যে এই পিচে আস্তে বল করতে হবে। জোরে জোরে বল করে লাভ নেই। বুমরা এখানেও রিভার্স সুইং-টুইং করাতে পারলেন না। মানে একজন-দুজন নয়, গোটা ক্লাসই ফেল। এরপরেও রোহিত বুক ফুলিয়ে বললেন, কাটাছেঁড়া করার দরকার নেই।
আসলে রোহিত জানেন, তিনি যে ক্রিকেট বোর্ডের কর্মচারী তারা টাকা দিয়ে কিনে রেখেছে যাদের কাটাছেঁড়া করা কাজ তাদের এক বড় অংশকে। প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার আর সাংবাদিকদের কথা বলছি। আরেকটা অংশ ভয়েই চুপ করে থাকবে। কারণ সত্যি কথা বলে/লিখে ফেললে ক্রিকেট বোর্ড ধারাভাষ্যের চুক্তি থেকে বাদ দিয়ে দেবে বা আর মাঠে ঢুকতে দেবে না। হাতে না মেরে ভাতে মারা যাকে বলে আর কি। রোহিত নির্ভুল আন্দাজ করেছেন। একই দিনে পাকিস্তানে, অর্থাৎ বিদেশের মাঠে, ইংল্যান্ডের হারের পর নাসের হুসেন, মাইকেল আথারটনরা চুলচেরা সমালোচনা করছেন বেন স্টোকসের দলের। অন্যদিকে সুনীল গাভস্কর, রবি শাস্ত্রী, সঞ্জয় মঞ্জরেকর, অনিল কুম্বলেরা ‘আহা! ওরা তো খারাপ খেলোয়াড় নয়। খেলায় হার জিত তো আছেই। ঘরের মাঠে টানা ১২ বছর, ১৮ খানা সিরিজ জিতেছে। সেটা তো মনে রাখতে হবে’ – এই জাতীয় কথাবার্তা বলছেন। বেশ, ওঁদের কথাও থাক। অত বড় ক্রিকেটারদের তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই ১২ বছর অপরাজিত থাকার রেকর্ডটা নিয়েই বরং কাটাছেঁড়া করা যাক।
ভারত কি কোনোদিন ঘরের মাঠে দুর্বল দল ছিল, বা মাঝেমধ্যেই এর তার কাছে সিরিজ হারত? সোজা উত্তর – না। এই শতাব্দীর ইতিহাসে ২০১২ সালে অ্যালাস্টেয়ার কুকের ইংল্যান্ডের আগে ভারত শেষ সিরিজে হেরেছিল আরও আট বছর আগে, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট-রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার কাছে। অর্থাৎ আড়াই দশকে মোটে চারটে সিরিজ হার। তার আগের সিরিজ হার ছিল ২০০০ সালে, হ্যানসি ক্রোনিয়ের দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। আর গত শতকের ইতিহাস?
অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। সেই অস্ট্রেলিয়া ২০০৪-০৫ মরশুমের ওই জয়ের আগে ভারতে শেষ জিতেছিল ১৯৬৯-৭০ সালে। ইংল্যান্ডের ভারতের মাঠে কুকের দলের আগে শেষ সিরিজ জয় ছিল ১৯৮৪-৮৫ মরশুমে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ দেশে এসে শেষবার সিরিজ জিতেছে ১৯৮৩-৮৪ মরশুমে। শ্রীলঙ্কা আজ পর্যন্ত জেতেনি, নিউজিল্যান্ড যে আগে কখনো জেতেনি তা তো এখন সকলেই জানেন। তারা শেষবার এ দেশে একটা টেস্ট ম্যাচই জিতেছিল সেই ১৯৮৮ সালে, তাও ১৯৬৯ সালের পর প্রথমবার। এমনকি পাকিস্তান, যাদের সঙ্গে আমাদের আবহাওয়া এবং পিচের চরিত্র সবচেয়ে বেশি মেলে, তারাও ১৯৫২-৫৩ থেকে ২০০৭-০৮ পর্যন্ত ভারত সফরে এসে সিরিজ জিততে পেরেছিল মাত্র একবার – ১৯৮৬-৮৭ মরশুমে। সুতরাং ভারত চিরকালই নিজের দেশে বাঘ। কোহলি, রোহিতরা নতুন কিছু করেননি। বস্তুত, সব দলই নিজের দেশে বাঘ। তাই যে কোনো টেস্ট দলেরই উৎকর্ষ বিচার করা হয় বিদেশে তারা কেমন তাই দিয়ে। অজিত ওয়াড়েকরের ভারতীয় দল শ্রদ্ধেয়, কারণ ১৯৭১ সালে তারা ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং ইংল্যান্ডে সিরিজ জিতেছিল। সৌরভ গাঙ্গুলির দল ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে চিরকাল উঁচু জায়গায় থাকবে, কারণ তারা নিয়মিত বিদেশে টেস্ট ম্যাচ জেতা শুরু করেছিল। গত এক দশকে কোহলির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের কলার তোলার মত সাফল্যও দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা। দেশের মাঠে একের পর এক দলকে দুরমুশ করা নয়।
এর সঙ্গে আরেকটা কথা না বললেই নয়, যা এক পডকাস্টে বলে বিস্তর ট্রোলড হয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে। কথাটা হল, গত ১০-১২ বছরে টেস্ট ক্রিকেট সম্ভবত খেলাটার ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। ২০১১ বিশ্বকাপের পর থেকে ধাপে ধাপে অবসর নিলেন শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের মহীরুহরা। ছোট্ট দেশে চট করে সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেটার পাওয়া শক্ত, ফলে দলটা একেবারে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক কারণে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলেনি। মাঝেমধ্যে এক-আধটা অঘটন ছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজও অতি দুর্বল হয়ে পড়েছে এইসময়। ওখানে বাস্কেটবল, বেসবলের দিকেই বেশি ধাবিত হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বিপদে পড়েছিল কালো মানুষদের জন্য সংরক্ষণ নীতির প্রভাবে বহু ক্রিকেটার দেশত্যাগ করায়। অর্থাৎ ভাল মানের আন্তর্জাতিক দল ছিল ভারতকে নিয়ে বড়জোর চারটে। সুতরাং ১২ বছর দেশে হারিনি – এই নিয়ে উদ্বাহু না হয়ে বরং মনে রাখা ভাল, এই যুগেও কিন্তু আমরা দক্ষিণ আফ্রিকাকে ও দেশে হারাতে পারিনি, ইংল্যান্ডে সিরিজ জিততে পারিনি, নিউজিল্যান্ডেও নয়। এমনকি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শুধু ফাইনালটা ইংল্যান্ডে হতেই পরপর দুবার হেরে বসেছি।
বাংলাদেশকে দুদিনে হারিয়েছি বলে পেশি ফোলানোর ফল এই সিরিজে দেখা যাচ্ছে। এখনো ভুল কারণে নাচানাচি চালু রাখলে অদূর ভবিষ্যতে আরও আঘাত পেতে হবে। অবশ্য সেটা প্রায় অনিবার্য। কারণ এই সিরিজ ৩-০ হারলে, এমনকি আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সফরে ৫-০ হারলেও, কিছু বদলানোর আশা কম। কারণ ২০১১-১২ মরশুমে পরপর আটটা টেস্ট হারার পরেও মহেন্দ্র সিং ধোনির অধিনায়কত্ব যায়নি, শচীনকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়নি। ফলাফলকে সেদিনই গুরুত্বহীন করে দেওয়া হয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটে।
দেবতোষ দাশ থ্রিলার লেখেন (থ্রিলার লেখেন! ছিঃ!)। দেবতোষ দাশ জনপ্রিয় লেখক (এ মা! জনপ্রিয়!)।
এত বড় বড় অভিযোগ আজকাল পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষার খুব কম লেখক সম্পর্কেই করা যায়। দুটো অভিযোগই প্রমাণিত। তা সত্ত্বেও দেবতোষ দাশ কোনো এক প্রণোদনায় ছোটগল্পও লেখেন, যার পাঠক দিনদিন কমছে। ফেসবুকের বিভিন্ন গল্প লেখার গ্রুপে কমছে না, কিন্তু বইয়ের পাঠকদের মধ্যে কমছে। তা কি ফেসবুক গ্রুপের মত বইতে নিজেও লিখে লাইক পাওয়া যায় না বলে, নাকি বইয়ের গল্প মোবাইলে পড়ার সুবিধা নেই বলে? নাকি সত্যিই এমন গল্প পর্যাপ্ত পরিমাণে লেখা হচ্ছে না এই বাংলায়, যা পাঠককে টানে? পাঠককে কোন লেখা টানে, কেন টানে – এসবও গুরুতর প্রশ্ন বটে। এত প্রশ্নের সম্মুখীন সাহিত্যের এক ধারায় দেবতোষবাবু সাঁতরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একটি কাঁঠাল ও পাকিস্তানের গল্প নামক তাঁর দ্বিতীয় গল্প সংকলন ধরে।
নামের মতই এই বইয়ের অধিকাংশ গল্পও কৌতূহলোদ্দীপক। লেখক যেমন বাংলা গল্পে সচরাচর অপরিচিত বিষয় নিয়ে লিখেছেন, তেমন পরিচিত পরিবেশ, পরিস্থিতিকেও এমন এক চোখ দিয়ে দেখেছেন যা গল্পে নতুনত্ব আনে। তিব্বতে চীন রাষ্ট্রের হানাদারি নিয়ে বাংলায় কি নিয়মিত লেখা হয়? গল্প উপন্যাস দূরের কথা, প্রতিবেদনই বা কটা লেখা হয়? হয় না যে, তাতে হয়ত লেখকদের অধ্যয়ন আর কল্পনাশক্তির অভাবের পাশাপাশি এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারত-চীনের সম্পর্কেরও ভূমিকা আছে। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী রাজনীতির যেসব ধারা বহমান, সেগুলোর সঙ্গে বাংলা ভাষার লেখকদের বিভিন্ন সময়ের ঘনিষ্ঠতা এবং তজ্জনিত গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতি পক্ষপাতও সম্ভবত খানিকটা দায়ী। যাঁরা দেবতোষবাবুর অন্য লেখার সঙ্গে পরিচিত, তাঁরা কিন্তু জানেন যে তিব্বতের রাজনীতি এই লেখকের প্রিয় বিষয়। এই সংকলনের ‘দখল’ গল্পেও সেই হানাদারির কাহিনি রয়েছে।
অফিসারের প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে সে একটা বাক্যই বলেছিল – কীসের পারমিট, এই দেশ তো আমার!
গল্পের এই শেষ বাক্য যে বাস্তবের সামনে পাঠককে দাঁড় করায়, তাতে তিব্বতের মানুষের সঙ্গে তফাতের চেয়ে মিলের দিকটাই বেশি প্রকট হয়। সেই মিল হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার মত হয়ে ওঠে সংকলনের শেষ গল্পে, যার নাম ‘এনআরসি ও আমাদের অভিজ্ঞানপত্র’। পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা বাঙাল বৃদ্ধ সুনীল ফোনে খবর পান – তাঁর আসামের অধিবাসী দিদির নাম ওঠেনি এনআরসিতে। তা নিয়ে তাঁর নিরাপত্তাহীনতা, দুশ্চিন্তা এই গল্পের কেন্দ্রে। মানুষকে রাষ্ট্রের কাছে অনবরত প্রমাণ করে যেতে হবে তার অস্তিত্বের বৈধতা, মানুষের তৈরি রাষ্ট্র মানুষকেই অবৈধ ঘোষণা করবে – বিশ্বজুড়ে অতিমারী হয়ে উঠেছে এই ব্যবস্থা। তার শিকার যেমন নামহীন তিব্বতি যুবক, তেমনই ৬০-৭০ বছর আগে পূর্ববাংলা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমে চলে আসা বাঙালি বৃদ্ধ। লেখক তিব্বতি যুবকের জন্যে কোনো উপশম রাখেননি। তবে সুনীলের জন্য, কাল্পনিক হলেও, এক স্বস্তির পরিসর তৈরি করে দিয়েছেন।
‘দিদি, তর নাম নাই রেজিস্টারে আর আমিও ছিঁড়ি উড়াই দিসি কাগজ! আমরা আর হিন্দুস্তানের না, দিদি চল চলি যাই ফেনী। আমগো ফেনী। মধুপুর! নিব না আমগোরে? নিব না? নিব না?’
স্বামীর বিড়বিড়ানি শুনে এগিয়ে আসেন মণিমালা। হাত রাখেন পিঠে।
হালকা হয়ে যান সুনীল। মাধ্যাকর্ষণটুকু যেন এখন অগ্রাহ্য করতে পারছেন। সীমানাও তিনি পেরিয়ে যেতে পারছেন সহজেই।
এই বিপন্নতাকে লেখক একেবারে নতুন প্রকরণে পেশ করেছেন ‘কাগজ’ গল্পে। সাংবাদিক আইরিন যা লিখতে চায় তা লিখতে দেওয়া হচ্ছে না। কারণ তা ‘পলিসির বিরুদ্ধে’। সেই চাকরি থেকে বেরিয়ে এসে যখন স্বাধীন সাংবাদিক হয়ে গেল সে, তখন
অফিস থেকে বেরিয়েই টের পেল স্বস্তি, যা পা থেকে মাথা পর্যন্ত পিলপিল করে উঠে আসছে।
কিন্তু অচিরেই
ইনডিপেন্ডেন্ট প্রেস বলে যে কিছু হয় না, কিছুদিন একা-একা কাজ করেই বুঝে গেল। আবার হয় না বললেও ভুল বলা হয়, হয়, একটু কায়দা করে প্রকাশ করলেই যা-বলার ইচ্ছে, বলা যায়। আর্ট অব ডাইভারশন।
কীভাবে এই ‘আর্ট অব ডাইভারশন’ ব্যবহার করে যা বলতে চায় তা বলে আইরিন – সেটাই গল্প। কিন্তু লেখক সে গল্প বলতে যেমন চলে গেছেন ‘আর্ট অব ডাইভারশন’-এর ইতিহাসে, তেমন ব্যবহার করেছেন চিত্রনাট্যের স্টোরি বোর্ডও। এভাবে গল্পের প্রকরণ বাদ দিয়ে একেবারে অন্য প্রকরণে গল্প লেখা যে সহজ নয় তা যাঁরা চেষ্টা করেছেন তাঁরা জানেন। যাঁরা কারদানি দেখানোর জন্য করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন, তাঁরা হয়ত আরও বেশি জানেন। কিন্তু সে তো গেল লেখকদের কথা। পাঠককে এই নিরীক্ষার সামনে এসে থমকে দাঁড়াতেই হবে। সাহিত্য পড়া মানে যে এমন এক অভিজ্ঞতা যা পাঠককেও বদলে দেয়, তা টের পাওয়া যাবে। কারণ এই অভিজ্ঞতা নতুন।
লক্ষণীয় যে এই সংকলনের যে গল্পগুলো ছুঁয়ে যায়, ভাবায় – তার প্রত্যেকটাই নানাবিধ বিপন্নতার গল্প। যেগুলো তেমন ছাপ ফেলে না, সেগুলোতে বরং লেখক কিছু নিস্তরঙ্গ জীবনের আখ্যান পেশ করেছেন। সেসব গল্পের যে সংকট, সেগুলো হয় চরিত্রদের একান্ত ব্যক্তিগত অথবা আরোপিত। ‘শান’, ‘জন্মদিনের সেলফি’ বা ‘রি-ইউনিয়ন’ সেই ধরনের গল্প। বই বন্ধ করা মাত্রই ওই গল্পগুলো সম্ভবত বিস্মৃত হবেন পাঠক। কিন্তু ভোলা যাবে না ‘ম্যানিকিনের শরীর’-এর অটোচালক নন্দকে, যার উপলব্ধিতে ‘ম্যানিকিন হলেও, বলাৎকার তো বলাৎকারই!’ সংবেদনহীন সমাজ, সংবাদমাধ্যম এবং সোশাল মিডিয়ার যুগে একজন বোকা নন্দ যে যুগপৎ অমূল্য এবং মূল্যহীন – তা লেখক উন্মোচন করেছেন পরতে পরতে
দেয়ালে দেয়ালে ঘুঁটের মতো আছড়ে পড়ে জনতার বিভিন্ন বয়ান।…
রাত আটটার টক-শোয়ে, উজ্জ্বল আলো ও ক্যামেরার সামনে এনে বসানো হয় নন্দকে। সেই অনুষ্ঠানে হাজির আরও একজন। এক ম্যানিকিন। নগ্নিকা। নন্দকে হতবাক করে, সঞ্চালক তাকে অভিনয় করে দেখাতে বলেন, কীভাবে সে ম্যানিকিনের সম্মান বাঁচাতে চেষ্টা করেছিল। তিনি নন্দ’র দিকে এগিয়ে দেন নগ্ন ম্যানিকিনের শরীর।…
‘শেষ ট্রেনের আলো’ বা ‘অনলাইন অফলাইন’-এর মত আপাত নিরীহ এবং ‘এরকম আগেও পড়েছি’ মনে হওয়া গল্পেও মানুষের বিপন্নতার আখ্যান বলতে ছাড়েননি লেখক। এমনকি এই সংকলনের সবচেয়ে পেলব যে গল্প, যার নামে বইয়ের নামকরণ হয়েছে, সেখানেও লেখক যেন এক নিষ্ঠুর শল্য চিকিৎসক। লোকাল অ্যানাস্থেশিয়া ছাড়াই পাঠককে পড়িয়ে দেন
বেরং সেই প্রাচীন মানুষটির কাছে গিয়ে আজ দাঁড়াবেন বহুদিন পরে যিনি গল্পে গল্পে বলবেন, যেন অবধারিত, বয়স বাড়ার লগে লগে পাকিস্তানের কথা ক্যান এত মনে পড়ে কইতে পার বউমা!
‘চামরমনি চালের ভাত ও বোয়ালের ঝাল’ এমন একটা গল্প, যেখানে কাহিনির কথককে সুখস্মৃতি আর নিশ্চিত মৃত্যুর সম্ভাবনার মাঝে বাঁধা এক দড়ির তৈরি সাঁকো দিয়ে হাঁটতে বাধ্য করেন লেখক।
ভাতের গন্ধ নাকে আসে আমার। এদিকে প্রশস্ত করিডোর জুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে নীরব শৈত্যপ্রবাহ। প্রতিটি প্রশ্বাস ক্রমাগত শীতল। মৃত্যুপ্রবণ।
এই তিনটি লাইনে ধরা আছে গল্পের দোলাচল। হাঁটছে কথক। ক্যান্সার হয়েছে কি হয়নি সে খবর জানতে গিয়ে দেখা হয়ে গেছে বহুকাল আগে পরিচিত, আজ মৃত্যুপথযাত্রী উমাদার সঙ্গে, মানুষের ঘরে ফেরা যাঁর বিশেষ পছন্দের। কথক বাঁচল কি বাঁচল না, তা পাঠক পড়ে নেবেন। কিন্তু এই আলোচনায় যা বলার তা হল, এই অত্যন্ত সুখপাঠ্য খাঁটি গল্পটাতেও ঘুরে ফিরে ঘরে ফেরার অভিলাষ, ফিরতে না পারার আশঙ্কা ও বিপন্নতার কথাই বলেছেন লেখক।
এত কথার পর বলা বাহুল্য যে, এই সংকলন বর্তমান আলোচকের ভাল লেগেছে। কিন্তু এই বই নিয়ে আলোচনা করার এক মস্ত বিপদ আছে। তা হল, এই বইয়ের সেরা গল্প সম্পর্কে বেশি কিছু লেখা যাবে না। কারণ মুগ্ধতা প্রকাশ করতে গেলেই গল্পটার বিশেষত্ব একেবারে ফাঁস হয়ে যাবে। শুধু এইটুকু বলা যাক, যৌন ঈর্ষা নিয়ে এরকম ভয় ধরিয়ে দেওয়া গল্প চট করে পাওয়া যায় না। গল্পের নাম ‘ৎ’। এরপরে বর্ণমালাতেও কেবল অনুস্বার, বিসর্গ আর চন্দ্রবিন্দু পড়ে থাকে। তাই লেখা শেষ করা যাক ওই গল্পের সামান্য উদ্ধৃতি দিয়ে, যাতে গল্পটার বিপজ্জনক গতিপথ খানিকটা বোঝা যায়।
নিষ্ক্রিয় এই দু’বছর সময়কালের আগে তাদের যে ছিল এক-দেড় বছরের বিবাহিত জীবন, ভুলতেই বসেছিল সে! সোহাগে-সংরাগে বাঁচতে বাঁচতে যখন সংসারে তৃতীয় জীবন আনার ইচ্ছা জাগ্রত, দু-জনেই সম্মত, এমনকি রথের মেলা থেকে দুটো ছোট্ট লাল জুতো কিনে আনে তারা, তখনই পরিমলের পতন। জগৎসংসার অচল। ভুবনজোড়া আকাশ ভেঙে পড়ে ঝুম্পার ছোট্ট মাথায়। দু’পায়ের ওপর বসে, বালতি থেকে মগ কেটে, ঝপঝপ করে জল ঢালে গায়ে-মাথায়। তলপেটে হাত বোলায়। মায়ার হাত। ঠান্ডা করে শরীর। শরীরের ভিতর মন। মনের ভিতর বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছাটুকুও পায় জল।
একটি কাঁঠাল ও পাকিস্তানের গল্প লেখক: দেবতোষ দাশ প্রকাশক: বৈভাষিক প্রচ্ছদ: মৃণাল শীল দাম: ২৮০ টাকা
নয়ের দশকে যখন ভারত-পাক সম্পর্ক আজকের মত এত খারাপ হয়নি, তখন পাকিস্তানিরা ভারতীয়দের সঙ্গে রসিকতা করত – শচীন তেন্ডুলকর আর মাধুরী দীক্ষিতকে দিয়ে দাও। আমরা কাশ্মীরের দাবি ছেড়ে দেব।
গতবছর জুবিলি নামের এক ওয়েব সিরিজে গত শতকের পাঁচের দশকের মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে সত্যাশ্রয়ী গল্প ফাঁদা হয়েছিল। সেই প্লট অনুযায়ী, পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতে কমিউনিস্ট প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জন্যে বম্বের সিনেমা জগতের একটা অংশকে অর্থের জোগান দিত। জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন ভারত সরকারও তাতে মদত দিত। সেই প্রকল্পে সায় না দেওয়ায় অন্য এক অংশের ছবির গান অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বাজানো বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারই মোকাবিলায় সেই অংশ মার্কিনি সহায়তায় রেডিও সিলোন থেকে হিন্দি ছবির গান বাজানোর ব্যবস্থা করা হয়। এই কাহিনির কতটা সত্যি কতটা মিথ্যা তা নিয়ে আলোচনা করার মানে হয় না, কারণ নির্মাতারা প্রথমেই হাত ধুয়ে ফেলেছিলেন পর্দায় ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ জাতীয় বিবৃতি দিয়ে। কিন্তু শাস্ত্রে জল থেকে দুধ আলাদা করে খাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন যে রাজহাঁসের কথা আছে, আমরা যদি তেমন করে এই গপ্পোটাকে দেখি, তাহলে বুঝতে পারব – সদ্যস্বাধীন ভারতের হিন্দি ছবির আন্তর্জাতিক আবেদন ছিল। সেই আবেদন আজও অনেকের বুকে জ্বালা ধরায়। ‘সফট পাওয়ার’ কথাটা ইদানীং খুব ব্যবহৃত হয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায়। স্বাধীন ভারতের সফট পাওয়ার কিন্তু প্রথম থেকেই সবচেয়ে বেশি বলিউডি ছবিতেই (বলিউড নামটা অবশ্য অনেক পরে এসেছে)।
উজ্জ্বল গৌরবর্ণ এবং ভারতীয়দের মধ্যে বিরল রঙের চোখের মণির অধিকারী রাজ কাপুরের ছবি যে পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রবল জনপ্রিয় ছিল তা সর্বজনবিদিত। আওয়ারা (১৯৫১) দিনের পর দিন মস্কোর সিনেমা হলে হাউজফুল হত এবং রাজকে দেখতে প্রায় মারামারি লেগে যেত – এরকম একাধিক জবানবন্দি পাওয়া যায়। শ্রী ৪২০ (১৯৫৫) ছবিতে মুকেশের কণ্ঠে রাজের ঠোঁটে ‘মেরা জুতা হ্যায় জাপানি/ইয়ে পাতলুন ইংলিশস্তানী/সর পে লাল টোপি রুশি/ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানী’ যতখানি নেহরুর ভারতের জোট নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিকতাবাদের ঘোষণা, ততটাই আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে পৌঁছবার চেষ্টা। কমিউনিস্ট রাশিয়ায় রাজের বিপুল ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণেই নেহরুর মৃত্যুর ছবছর পরেও মেরা নাম জোকার (১৯৭০) ছবির জন্য একগুচ্ছ রুশ অভিনেতা, অভিনেত্রীকে রাজ ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান লেনিন শিল্পমাধ্যম হিসাবে সিনেমার অমিত শক্তি বিলক্ষণ বুঝতেন। সেই কারণেই সদ্যোজাত কমিউনিস্ট রাষ্ট্র টানাটানির সংসারেও সের্গেই আইজেনস্টাইনের ছবির পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। অনেকটা বামমনস্ক নেহরুও সিনেমার শক্তি বুঝতেন। সেই সময়কার বম্বের তিন প্রধান তারকা – রাজ, দিলীপকুমার আর দেব আনন্দ – নেহরুর প্রিয়পাত্র ছিলেন।
আজকাল পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে বাংলা জাতীয়তাবাদের হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে। সেই জাতীয়তাবাদীরা যুগপৎ আফসোস এবং অভিযোগ করেন যে নেহরু তথা কংগ্রেসের পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই হিন্দি ছবি গোড়া থেকেই আন্তর্জাতিক বাজার পেয়েছে, বাংলা ছবি পায়নি। কথাটার মধ্যে কিছু সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে, তবে ভুললে চলবে না যে বাংলা ছবি কিন্তু নিজগুণে আন্তর্জাতিক বাজার না হোক, বিস্তর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে একসময়। সত্যজিৎ রায় আর মৃণাল সেনের ছবি বিদেশের বিভিন্ন ফিল্মোৎসবে সমাদৃত ও পুরস্কৃত হয়েছে। উত্তমকুমার হিন্দি ছবি করতে গিয়ে মোটেই সফল হননি, কিন্তু নায়ক (১৯৬৬) ছবিতে অভিনয়ের জন্য আন্তর্জাতিক প্রশংসা পেয়েছেন। জীবদ্দশায় প্রাপ্য সম্মান না পাওয়া ঋত্বিক ঘটকের ছবি যত দিন যাচ্ছে তত বেশি করে আলোচিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। বিখ্যাত ফিল্ম পত্রিকা সাইট অ্যান্ড সাউন্ড এখনো ঋত্বিকের ছবি নিয়ে আলোচনা প্রকাশ করে। অর্থাৎ বিশ্বজয় করার নানা পথ আছে এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলেই সব পথ বন্ধ হয়ে যায় না। বিশেষ করে সিনেমার ক্ষেত্রে, যার নিজস্ব ভাষা আছে। সেই ভাষা দিয়ে পৃথিবীর যে কোনো দেশের দর্শককেই মোহিত করা সম্ভব, সিনেমার সংলাপের ভাষা সে বুঝুক আর না-ই বুঝুক।
যেমন বারাক ওবামা হিন্দি জানেন না, কিন্তু শাহরুখ খানের দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে ছবি এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে তার সংলাপ মার্কিন রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে তাঁর কানেও পৌঁছে গেছিল। তিনি (বা তাঁর বক্তৃতালেখকরা) জানতেন যে ভারত সফরে এসে শাহরুখের সংলাপ বললে বড় অংশের ভারতীয়কে মুগ্ধ করে দেওয়া যাবে। নিঃসন্দেহে বলিউড ছবির দৌড় অতদূর হওয়ার পিছনে একটা কারণ অনাবাসী ভারতীয়দের মধ্যে হিন্দিভাষীদের আধিক্য। নয়ের দশক থেকে দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রে বলিউড তাঁদের কথা মাথায় রেখেই ছবি করেছে। শাহরুখেরই একাধিক ছবি আছে যার প্রধান পাত্রপাত্রীরা অনাবাসী ভারতীয়। শাহরুখের ঘনিষ্ঠ বন্ধু করণ জোহর প্রায় আলাদা জঁরই বানিয়ে ফেলেছিলেন অনাবাসী ভারতীয়দের দিকে মুখ করে থাকা ছবির। তা বলে একথা ভাবলে ভুল হবে যে বম্বের ছবি কেবল বিদেশবাসী ভারতীয়রাই দেখে। আমার এক সুইটজারল্যান্ডবাসী বন্ধু গতবছর অ্যাটলি নির্দেশিত শাহরুখের জওয়ান দেখতে গিয়ে ও দেশের আফগান, শ্রীলঙ্কান বাসিন্দাদেরও দেখা পেয়েছিল। তারা তবু এই উপমহাদেশের লোক। ইউরোপ, আমেরিকায় বসবাসকারী ভারতীয়রা অনেকেই হলে হিন্দি ছবি দেখতে গিয়ে শ্বেতাঙ্গদেরও দেখা পায়।
সিনেমা সীমান্ত তো বটেই, রাজনৈতিক বৈরিতার বেড়াও যে টপকাতে পারে তার প্রমাণ পাকিস্তানে হিন্দি ছবির জনপ্রিয়তা। নয়ের দশকে যখন ভারত-পাক সম্পর্ক আজকের মত এত খারাপ হয়নি, তখন পাকিস্তানিরা ভারতীয়দের সঙ্গে রসিকতা করত – শচীন তেন্ডুলকর আর মাধুরী দীক্ষিতকে দিয়ে দাও। আমরা কাশ্মীরের দাবি ছেড়ে দেব। এক দশক আগেও তো পাকিস্তানের ফওয়াদ খান, মাহিরা খানরা বলিউডি ছবিতে অভিনয় করে গেছেন। মাহিরা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাঁর মা যখন জানতে পারেন মাহিরা একটা ছবিতে (রঈস, ২০১৭) শাহরুখের নায়িকা হচ্ছেন তখন তিনি এমন আচরণ করেছিলেন যেন কৃতার্থ হয়ে গেছেন। মাহিরা রসিকতা করে বলেছিলেন – মা এমন করল, মনে হল, আমি যে পাকিস্তানের একজন নামকরা নায়িকা সেটা যেন কিছুই না।
তবে হিন্দি ছবি কতরকম মানুষকে জয় করতে পারে সে সম্পর্কে চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার এক অগ্রজ সাংবাদিকের। বেজিং অলিম্পিক কভার করতে গিয়ে যে অল্পবয়সী চীনা স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে তাঁরা আলাপ হয়, তারা চোস্ত ইংরিজি বলতে পারত না। আবার এই সাংবাদিক মোটেই চীনা ভাষা জানেন না। কিন্তু ওই ছেলেমেয়েরা তাঁর সঙ্গে শাহরুখের ছবি নিয়ে গল্প করত। তিনি কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন, ওরা ওঁর চেয়ে বেশি ছবি দেখেছে শাহরুখের। অথচ চীনে বসে ভারতীয় ছবি দেখা নাকি খুব সহজ কাজ ছিল না সেইসময়, কারণ ইন্টারনেটের উপর সরকারের বিস্তর নজরদারি ছিল। ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ইত্যাদি লাগত। সেসব বাধা পেরিয়েই তারা শাহরুখের ভক্ত হয়েছে। নিজের দেশের যে কোনো ক্ষেত্রে জয়ের কথা শুনতে এবং পড়তে কার না ভাল লাগে? তবে আনন্দ করার সময়ে পা মাটিতে রাখা ভাল। যে জয়ে আমার কোনো কৃতিত্বই নেই তা নিয়ে কলার তোলা আমাদের মজ্জাগত। যেমন এবারের কান ফিল্মোৎসবে নির্দেশক পায়েল কাপাডিয়ার ছবি, কলকাতার মেয়ে অনসূয়া সেনগুপ্তের অভিনয় পুরস্কৃত হওয়ার পরে এগুলোকে ‘ভারতের জয়’ বলে তুলে ধরা হয়েছে। পায়েল যে প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী, সেই ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন কর্তা গজেন্দ্র চৌহান পর্যন্ত ছাত্রীর জন্যে তিনি গর্বিত বলে সোশাল মিডিয়ায় দাবি করেছেন। অথচ পায়েল যখন ছাত্রী ছিলেন, তখন তাঁকে মোটেই আদর করা হয়নি। প্রতিবাদী চরিত্রের ফল হিসাবে এখনো তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলছে। বলিউডের বিশিষ্ট সিনেমাশিল্পী অনুরাগ কাশ্যপ অপ্রিয় সত্য বলার জন্য বিখ্যাত। তিনি বলেই দিয়েছেন, কানে যে ভারতীয়রা পুরস্কৃত হয়েছে তাদের জন্য ভারতের গর্বিত হওয়ার কিছু নেই। পুরো কৃতিত্বই তাদের নিজেদের। কারণ ভারত তাদের জন্য কিচ্ছু করেনি। পায়েলের ছবির প্রযোজনা করেছেন অনেকে মিলে, সকলে ভারতীয় নন। এমনকি ছবিটা ভারতে দেখানোর ব্যবস্থা পর্যন্ত করা যায়নি এখনো।