রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ৪২ বছর

অনেকসময় দার্জিলিঙে হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেভাবে নিজেকে উদ্ঘাটন করে, সেভাবে কোনো ঘটনায় আচমকা জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের একেকটা লাইন।

মা মারা গেছেন খুব বেশিদিন হয়নি। তবু এবছর মায়ের মৃত্যুদিনটা ভুলে গিয়েছিলাম। বেলার দিকে বোন ফোন করে মনে না করালে মনে পড়ত না। আসলে ওই দিনটার চেয়ে মাকে অনেক বেশি মনে পড়ে প্রতিবছর পঁচিশে বৈশাখে। আমার মায়ের বেশ বেলা করেই ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস ছিল, কিন্তু বছরে ওই একটা দিন ঘুম থেকে উঠে পড়তেন খুব ভোরে। দূরদর্শনে জোড়াসাঁকো আর রবীন্দ্র সদনের কবিপ্রণাম দেখবেন বলে। বাড়িতে টিভি এসেছিল আটের দশকের শেষ দিকে। তখন থেকেই এই রুটিন চলছিল। মা যথারীতি ঈশ্বরে বিশ্বাসী, একসময় বাড়িতে ঠাকুরের আসন পেতে পুজোও করতেন। কিন্তু মহালয়ার দিন ভোর ভোর উঠতেই হবে, উঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ শুনতেই হবে – ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নিয়ে এত গদগদ ছিলেন না। কোনোবার উঠতেন, কোনোবার উঠতেন না। কিন্তু পঁচিশে বৈশাখে ছাড়াছাড়ি নেই। খুব ইচ্ছা ছিল, একবার জোড়াসাঁকো বা রবীন্দ্র সদনের অনুষ্ঠানে গিয়ে ওখানে বসে গোটাটা দেখবেন। আমার কাছে আবদার ছিল, যখন বড় হয়ে চাকরি করব, তখন যেন নিয়ে যাই। আমি চাকরি পাওয়ার পরেও মা ১৬ বছর বেঁচেছিলেন। তখন আর মুখ ফুটে বলেননি, আমারও খেয়াল হয়নি। মুনীর নিয়াজি যথার্থই লিখেছেন “হমেশা দের কর দেতা হুঁ ম্যায়…” (সর্বদা দেরি করে ফেলি আমি)।

মা মারা গিয়েছিলেন শীতের শেষ দিকে। সেবার পঁচিশে বৈশাখে আমার ভোর ভোর ঘুম ভেঙে গেল, যদিও আমার বরাবর বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা অভ্যাস। মা কবিপ্রণাম দেখতে উঠে পড়তেন, আমি বিছানা ছাড়তাম না। ঘুমটা পাতলা হয়ে গেলে গান, আবৃত্তি, ভাষ্যপাঠের আওয়াজ কানে ভেসে আসত। মা মারা যাওয়ার বছরের রবীন্দ্র জয়ন্তীতে তেমন আওয়াজ কানে আসতেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসেছিলাম। কিন্তু উঠে বসতেই সে আওয়াজ মিলিয়ে গেল। না, কোথাও তো টিভি চলছে না! না আমাদের ফ্ল্যাটে, না পাশের বাড়িটায়, যেখান থেকে মেগা সিরিয়ালের সংলাপ বা ইউটিউবে চালানো হিন্দি সিনেমার গান ভেসে আসে প্রায়শই। বুঝলাম, স্বপ্ন দেখছিলাম। স্বপ্ন তো আসলে ইচ্ছাপূরণ – সিগমুন্ড ফ্রয়েড কবেই বলে গেছেন।

আমার একেবারে ছোটবেলায় বাড়িতে টিভি ছিল না, কেনার সামর্থ্য ছিল না বলে। এক নিকটাত্মীয় রঙিন টিভি কেনার সময়ে সাদাকালো টিভিটা যখন আমাদের দিয়ে দেন, তখন আমার বয়স ছয় কি সাত। তার আগে পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে বিনোদন বলতে ছিল বই আর আমার অদেখা ঠাকুর্দার রেকর্ড প্লেয়ার। আমার হাতেখড়ির আগে থেকে টিভি আসার সময় পর্যন্ত সন্ধেবেলা আমার প্রিয় বিনোদন ছিল মায়ের মুখে সঞ্চয়িতার কোনো কবিতা পাঠ শোনা, বা মায়ের গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত। গীতবিতানটা খুলে রাখতেন পাশে, কিন্তু কোনোদিন দেখতে হয়েছে বলে মনে পড়ে না। শুনে শুনে বেশকিছু কবিতা আর গানের প্রতি আমার পক্ষপাত জন্মেছিল। বারবার সেগুলোই শুনতে চাইতাম।

যেমন পলাতকা কাব্যগ্রন্থের ‘নিষ্কৃতি’ কবিতাটা। কুলীন এবং নিষ্ঠুর বাপের মেয়ে মঞ্জুলিকার কষ্টের কথা পড়তে পড়তে মায়ের চোখ দিয়ে জল গড়াত, আমার চোখ দিয়েও। পথের পাঁচালী পড়েছি অনেক পরে। অপরের দুঃখে কষ্ট পাওয়ার শুরু মঞ্জুলিকার জন্যে কাঁদতে কাঁদতেই।

মায়ের নিজের বেশি প্রিয় ছিল “ডাক্তারে যা বলে বলুক নাকো,/রাখো রাখো খুলে রাখো,/শিয়রের ওই জানলা দুটো, – গায়ে লাগুক হাওয়া।/ওষুধ? আমার ফুরিয়ে গেছে ওষুধ খাওয়া।” বড় হয়ে সকৌতুকে লক্ষ করেছি, বাবার সঙ্গে ঝগড়া-টগড়া হলে এই কবিতাটা বেশি পড়তেন। মনোমালিন্য ২৪ ঘন্টার বেশি স্থায়ী হলে আবার পড়তেন ‘সাধারণ মেয়ে’।

লোডশেডিং তখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল, আর লোডশেডিং হয়ে গেলে হ্যারিকেন বা মোমবাতির আলোয় শুয়ে শুয়ে কবিতা পড়া যায় না। সেরকম পরিস্থিতিতে মা গান ধরতেন। আমার প্রায় ৪২ বছরের জীবনে আর কোনো অগায়কের এতগুলো রবীন্দ্রসঙ্গীত সুর সমেত মুখস্থ আছে বলে দেখিনি। অক্ষর পরিচয় হওয়ার আগেই রবীন্দ্রসঙ্গীত যে অন্য গানের চেয়ে আলাদা – এটা বুঝতে শিখেছিলাম মায়ের গান শুনে। কথাগুলোর মানে বোঝার বয়স তখন হয়নি, কিন্তু বারবার শুনে প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল মায়ের প্রিয় গানগুলো – “তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে”, “আমি রূপে তোমায় ভোলাব না”, “আমার সকল নিয়ে বসে আছি”, “সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি”

সুচিত্রা মিত্র আর কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লং প্লেয়িং রেকর্ড বেশ কয়েকটা ছিল আমাদের। বাগবাজারে মায়ের বড়মাসির বাড়ি যাওয়া হলেই ফেরার সময়ে মেট্রোরেলের জন্যে খুঁড়ে ফেলা এবড়োখেবড়ো রাস্তা অগ্রাহ্য করে, লাইন দিয়ে যে রেকর্ডের দোকানগুলো ছিল মা সেখানে খোঁজ করতেন নতুন কী এসেছে। ঋতু গুহ আর পূর্বা দামের নাম জানতে পারি তখনই। তবে অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও ঋতুর গলায় “তোমার  সোনার থালায় সাজাব আজ” খুঁজে পাননি মা। যে রেকর্ডটা কিনে এনেছিলেন তার দুটো গান কে জানে কী কারণে আমার খুব প্রিয় হয়ে গিয়েছিল – “এরা  পরকে আপন করে, আপনারে পর”, “পেয়েছি ছুটি বিদায় দেহ ভাই”। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমার কাছে বুদ্ধদেব গুহ ঋতু গুহর স্বামী। আর কিছু নন।

বাবার অতখানি রাবীন্দ্রিক হওয়ার সময় ছিল না। বছর বিশেক বয়সে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পেয়েছিলেন। মৃত্যুর আড়াই মাস আগে শয্যাশায়ী হয়ে যাওয়া পর্যন্ত দিনের বেশিরভাগ সময়টা পার্টির কাজেই কাটাতেন। তার উপর আমার শৈশবে প্রশাসনিক দায়িত্বেও ছিলেন। তবু একবার বিবাহবার্ষিকীতে মাকে উপহার দিলেন একটা এলপি রেকর্ড, যার এক পিঠে কণিকা, অন্য পিঠে দেবব্রত বিশ্বাস। সুচিত্রার গান বাবার তত পছন্দ ছিল না। রেকর্ডে দেবব্রতর গলায় সম্ভবত প্রথম গানটাই ছিল ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’। তখন আমার বয়স সাত বা আট। শুনেই মনে হল, এ কী আশ্চর্য গান রে বাবা! এমন কথা হয় গানের! এমন গলা হয় মানুষের! সেই বিস্ময় আমার আজও কাটেনি।

পার্টি সংগঠন, প্রশাসন, পরিবার সামলেও বাবা যে সুযোগটা পারতপক্ষে ছাড়তেন না সেটা হল অপেশাদার যাত্রায়, নাটকে অভিনয় করার সুযোগ। বাবা আর তাঁর বন্ধুরা কয়েকজন মিলে যাত্রা ক্লাব খুলেছিলেন, বছরে অন্তত একটা যাত্রা হত। আজকাল যাকে ‘টল, ডার্ক অ্যান্ড হ্যানসাম’ চেহারা বলে, তেমন চেহারা থাকার সুবাদে বাবা বেশ কয়েকবার নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। কিন্তু চেহারা নয়, যাত্রায় অভিনয় করতে গেলে যা অপরিহার্য, তা হল শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। সেরিবেল্লা ডিজেনারেশন নামে এক আরোগ্যহীন রোগে গলাটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগে বাবার দারুণ একখানা কণ্ঠস্বরও ছিল। সেই সুবাদে বাবা চমৎকার কবিতা আবৃত্তিও করতেন। বহুকাল চর্চা না থাকলেও অনর্গল আবৃত্তি করতে পারতেন নজরুলের ‘আমার কৈফিয়ত’। বাড়িটা গমগম করত। রবীন্দ্রনাথের কবিতার মধ্যে বাবা বারবার আবৃত্তি করতেন ‘ছেলেটা’ আর ‘বাঁশি’। বাবার অনেকটা সময় বাড়িতে থাকা আমাদের দুই ভাইবোনের কাছে অনেকদিন পর্যন্ত ছিল লটারি পাওয়ার মত ব্যাপার। তেমন দিনে মনমেজাজ বিশেষ রকমের ভাল থাকলে বাবা সঞ্চয়িতা টেনে নিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে পড়তেন “যদি  পরজন্মে পাই রে হতে/ব্রজের রাখাল বালক/তবে  নিবিয়ে দেব নিজের ঘরে/সুসভ্যতার আলোক।” মা পড়তেন ‘পুরাতন ভৃত্য’ বা ‘দুই বিঘা জমি’। বাবা মাঝে মাঝে গেয়েও উঠতেন। সবই দেবব্রতর গলায় শোনা গান – ‘আমি যখন তাঁর দুয়ারে ভিক্ষা নিতে যাই’, ‘তোরা যে যা বলিস ভাই’, ‘যেতে যেতে একলা পথে/নিবেছে মোর বাতি,’ ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’।

একসময় রেকর্ড প্লেয়ারটার দিন ফুরোল। গানহীন দীর্ঘ কয়েকটা বছরের পরে বাড়িতে এল ফিলিপসের ক্যাসেট প্লেয়ার, যাকে আমরা বলতাম টেপ রেকর্ডার। তখন উঁচু ক্লাসে পড়ি। এক ছুটির দিনে মা ঠিক করলেন, আমাদের চারজনের গলা টেপে ধরে রাখা হবে। ব্ল্যাঙ্ক ক্যাসেট ছিল না, কিন্তু যখন ঝোঁক চেপেছে তখন করতেই হবে কাজটা। উনিশ বছর বয়সী এ আর রহমানের সৃষ্টি রোজা-র সাউন্ড ট্র‍্যাকের খানিকটা ধ্বংস করে রেকর্ড করা হল – বাবার গলায় ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’, মায়ের গলায় “সন্ন্যাসী উপগুপ্ত/মথুরাপুরীর প্রাচীরের তলে/একদা ছিলেন সুপ্ত – ”। ধরে রাখা হয়েছিল, কিন্তু সংরক্ষণ করা হয়নি। ক্যাসেটের যুগ চলে গেছে, ওই কণ্ঠস্বরগুলো আমাদের সন্তানদের শোনার জন্যে এ যুগের উপযোগী ফর্ম্যাটে রাখা হয়নি। আমার মায়ের আরেকটা প্রিয় গান “যা  হারিয়ে যায় তা আগলে বসে/রইব কত আর?”

গত সহস্রাব্দের শেষে প্রাপ্তবয়স্ক হলাম। জন্মদিনে বাবা-মা বরাবরই বই দিতেন, জামাকাপড় বা খেলনা নয়। আঠারোতম জন্মদিনের আগেরদিন দেখি মা রিকশা করে এসে বাড়ির সামনে নামলেন আর রিকশাকাকু একটা ইয়াব্বড় প্যাকিং বাক্স ঘরে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। কী আছে তাতে? সেবারের জন্মদিনের উপহার – বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলীর প্রথম ১৫ খণ্ড। বারো তারিখের আগে মাইনে হত না বাবার। সাত-আট তারিখে অত দামি জিনিস বাড়িতে এসে পড়ায় দেখলাম বাবার ভুরু সামান্য কুঁচকে গেছে। দাম শুনে চোখ কপালে। তখনই বোধহয় ১৭০০-১৮০০ টাকা দাম ছিল। কিন্তু একটু পরেই বাবার রাগ পড়ে গেল। বললেন “যাকগে, এ জিনিস তো জীবনে একবারই কেনা। আমরা যখন থাকব না তখনো ওর কাজে লাগবে এরকম একটা জিনিস দেওয়া গেল।” পরবর্তী এক বছরে সমস্ত কবিতা পড়ে ফেলেছিলাম। তারপর ক্রমশ গল্প, উপন্যাস, নাটক। প্রবন্ধগুলো পড়তে ভারি আলস্য লাগত। সে আলস্য কাটাতে কাটাতে বাবা, মা দুজনেই বিদায় নিলেন; আমার চশমাটা বাইফোকাল হয়ে গেল। রাশিয়ার চিঠি, কালান্তর, শান্তিনিকেতন, মহাত্মা গান্ধী, ইতিহাস, ভারতবর্ষ – এসব পড়তে পড়তে এতদিন যে জিনিস যে চোখে দেখে এসেছি তা বদলে যায় আর মনে পড়ে বাবার মন্তব্য “আমরা যখন থাকব না তখনো ওর কাজে লাগবে এরকম একটা জিনিস দেওয়া গেল।”

বাবার যখন শেষ সময় – মানে অসুখটা জেনে গেছি, বাবাও টের পেয়ে গেছে, চোখে আর ভাল দেখতে পাচ্ছে না, গলা দিয়ে স্বর বেরনো একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে, তখনো শ্রবণেন্দ্রিয় ঠিক ছিল। একদিন সন্ধেবেলা কোনো কারণে আমি, মা, বোন বাবাকে ঘিরে বসে একসঙ্গে গাইছিলাম “আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।” “ব্যথা মোর/উঠবে জ্বলে/ঊর্ধ্ব-পানে” পংক্তিতে এসে এক অদ্ভুত অনুভূতি হল। মনে হল, জীবনটা যদি সিনেমা হত তাহলে এই শটটার পরের শটে দেখা যেত – বিছানাটা খালি, বাবা নেই। সাউন্ড ট্র্যাকে গানটা চলতে থাকত। রবীন্দ্রনাথের আর সব থেমে গেলেও গান কখনো থামে না, জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে চলতেই থাকে। সেই হাতেখড়ির আগের যুগে রান্নাঘরে আটা মাখতে মাখতে গাওয়ার মাঝে মা বলেছিলেন “জীবনের সব পরিস্থিতির জন্যেই দেখবি রবীন্দ্রনাথের একটা না একটা গান আছে।” তখন মনে হয়েছিল, এই কয়েকবছর আগেও মনে হত, মা রবীন্দ্রভক্ত বলে বাড়িয়ে বলেছেন। কিন্তু বয়স যত বাড়ছে, ততই কথাটা বিশ্বাস না করে উপায় থাকছে না। বরং এখন মনে হয় মা একটু রক্ষণশীল হয়েই কথাটা বলেছিলেন। কেবল রবীন্দ্রনাথের গান নয়, বোধহয় রবীন্দ্রনাথের কাব্যের ক্ষেত্রেও কথাটা সত্যি। কোভিড হাসপাতাল থেকে যখন মায়ের মৃতদেহ নিয়ে বাড়ি আসছিলাম, রাস্তা খুঁড়ে পৌরসভা কোনো কাজ করছিল বলে সোজা পথে না এসে ঘুরপথে আসতে হয়েছিল। তখন মা রবীন্দ্রনাথের যে কবিতা আমাকে একেবারে ছোটবেলায় আবৃত্তি করতে শিখিয়েছিলেন, তার প্রথম কয়েক লাইন মনে পড়ছিল “মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে/মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।”

অনেককাল হল, শ্মশানে গেলেই আমার কানে বাজতে থাকে দেবব্রতর গলায় “আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।” সদ্যমৃত কোনো কাছের মানুষকে দাহ করতে শ্মশানে গিয়ে দ্বিতীয় লাইনটা অবিশ্বাস্য, অবাস্তব মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার দিব্যি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। কারণ যে বছর বাবা মারা গেলেন, সেবছরই আমার মেয়ে জন্মাল। যে বছর মা মারা গেলেন, সে বছরই আমার ভাগ্নী জন্মাল। কোনো সন্দেহ নেই – “নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ,  নাহি নাহি দৈন্যলেশ।”

মাস দেড়েক পরেই বিয়াল্লিশে পা দেব। জীবনের কাছে এখনো যা যা প্রত্যাশা আছে তার অন্যতম হল রবীন্দ্রনাথের যেসব লাইনের অর্থ আজও বুঝিনি সেগুলোর মর্মোদ্ধার। বুঝে গেছি, সবসময় বুঝতে চেষ্টা করলেই বোঝা যায় না। অনেকসময় দার্জিলিঙে হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেভাবে নিজেকে উদ্ঘাটন করে, সেভাবে কোনো ঘটনায় আচমকা জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের একেকটা লাইন। নইলে ভেনেজুয়েলার জগদ্বিখ্যাত নেতা উগো শাভেজ, জাপানের সাংবাদিক জুনিচি কোদামা আর তার স্ত্রী রিয়েকো আসাতোর সঙ্গে ভারতের এক নগণ্য মফস্বলের ছাপোষা প্রতীক যে বিশ্বসাথে যোগে যুক্ত – তা কখনো আমার বুঝে ওঠা হত না।

সত্যজিৎ রায়কে পূজার ছলে ভুলে থাকা চলে না

অদূর ভবিষ্যতে এদেশে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সত্যজিৎও গণশত্রু বলে চিহ্নিত হবেন হয়ত।

চার্লস চ্যাপলিনকে কি সত্যিই অ্যাডলফ হিটলারের মত দেখতে ছিল? একেবারেই না। আসলে চ্যাপলিন দাড়িগোঁফহীন অত্যন্ত সুপুরুষ একজন লোক। বাংলায় যাকে বলে রমণীমোহন, উচ্চতার ব্যাপারটা বাদ দিলে তিনি তাই। বেশিরভাগ ছবিতেই অবশ্য ঐ মাছি গোঁফটাসুদ্ধই চ্যাপলিনকে দেখা যায়; কিন্তু সে চেহারাও চোখের ভাষায়, চুলের ছাঁটে, বেশভূষায় টোমেনিয়ার একনায়ক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেলের থেকে বহুযোজন দূরে। বলাই বাহুল্য যে চ্যাপলিন ইচ্ছে করেই হিঙ্কেলকে হিটলারের আদল দিয়েছিলেন। কিন্তু হিটলার কি হিঙ্কেলের মত হাস্যকর একজন লোক ছিল? তা তো নয়। বেলুন নিয়ে খেলা করার মত ছেলেমানুষি তার ছিল না, পর্দা বেয়ে ওঠার মত জোকারসুলভ কাজও সে করত বলে তার ঘনিষ্ঠ কারোর স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায় না। তাহলে চ্যাপলিন কেন এরকম হাস্যকর করে দেখালেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খুনেটাকে?

দ্য গ্রেট ডিক্টেটর ছবির ৪০ বছর পর মুক্তি পায় হীরক রাজার দেশে। আরেক একনায়কের গল্প। হীরক রাজার চরিত্রে উৎপল দত্তকে মনে করে দেখুন। বিশাল চেহারা, লম্বা গোঁফ, মোটা গলা – বেশ ভয় ধরানো চেহারা। হিঙ্কেলের ঠিক উলটো। কিন্তু মুখের ভাষাটা? প্রথমত সে কথা বলে ছড়া কেটে। যা শুনে হাসি পেতে বাধ্য। দ্বিতীয়ত, উৎপল দত্ত পরে বলেছিলেন, শুটিংয়ের সময়ে সত্যজিৎ রায় তাঁকে বলেন ‘হীরক রাজার সংলাপগুলো গ্রাম্য উচ্চারণে বলো। যারা পড়াশোনা বিশেষ জানে না, তাদের মত। লোকটাকে দর্শকের কাছে হাস্যাস্পদ করে দাও।’

চল্লিশ বছরের ব্যবধানে দুই একনায়ককে পর্দায় দেখাতে গিয়ে দুই জিনিয়াসই দেখালেন হাস্যকর করে, অর্থাৎ ভয়ানক লোকেদের সম্পর্কে ভয় ভেঙে দিলেন। দুই স্রষ্টা একটা ব্যাপারে একমত – একনায়করা সবচেয়ে অপছন্দ করে তাদের নিয়ে হাসাহাসি, কারণ আমাদের ভয়ই তাদের শক্তি। হাসাহাসিতে ভয় কেটে যায়।

চ্যাপলিন বা সত্যজিতের সময়ে ইন্টারনেট ছিল না, মিম ছিল না। ব্যঙ্গ ছিল, শ্লেষ ছিল, একনায়ক ছিল। চ্যাপলিনের সময়ে হিটলার, সত্যজিতের সময়ে ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে, হিটলারের কুকীর্তির সবটা তখনো জার্মানির বাইরের মানুষ জানেন না। কিন্তু দ্রষ্টা চ্যাপলিন ফ্যাসিবাদের বিপদ বুঝেছেন, তাকে নিয়ে প্রবল ঠাট্টা করছেন, বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষকে অন্য ভবিষ্যতের কথা বলছেন। ১৯৮০ সালে সত্যজিৎ যখন হীরক রাজার দেশে আমাদের নিয়ে গেলেন তখন ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ফেরত এসেছেন। ততদিনে বিশ্ববন্দিত পরিচালক ছোটদের দেখার মত রূপকথার এমন এক গল্প নিয়ে এলেন পর্দায়, যাকে উৎপল পরে বলবেন জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে সত্যজিতের প্রতিবাদ। শুধু কি তাই করেছেন সত্যজিৎ? নাকি যে স্রষ্টারা দ্রষ্টা হন, তাঁদের মতই ভবিষ্যতের একনায়কদেরও একহাত নিয়েছেন, ভবিষ্যতের প্রতিবাদীদের ভাষা জুগিয়েছেন?

গত কয়েক বছরে সোশাল মিডিয়ায় যতবার মমতা ব্যানার্জিকে হীরক রানী আর নরেন্দ্র মোদীকে হীরক রাজা বলা হয়েছে, হীরক রাজার সঙ্গে তার সভাসদদের কথোপকথনের অনুকরণে যত পোস্ট তৈরি হয়েছে – তা প্রমাণ করে সত্যজিৎ এখনো আমাদের প্রতিবাদের ভাষা। মৃত্যুর তিন দশক পরেও তাঁর কাজ আমরা ফিরে দেখব কেন? অভ্যাসবশত? না। সত্যজিৎ শুধু অভ্যাসে পরিণত হওয়ার মত শিল্পী নন, তার চেয়ে অনেক বড়। তিনি দারুণভাবে সমকালীন, তাই চিরকালীন। যেমনটা বলেছেন উৎপল, এই বক্তৃতায়

One has a sneaking suspicion that all this talk of Renaissance ideas may well be a ruse to remove from sight the living contemporaneity of Ray’s ideas and relegate him to a museum of ancient statuary which has ceased to bother us now. This suspicion is strengthened when we consider a film like Ray’s Hirak Rajar Deshe (Kingdom of Diamonds, 1980) which was his response to Mrs Gandhi’s Emergency decree. This film in the guise of a fairytale is a blast against all forms of dictatorship which believes in thought-control, prison for the workers, arrests and deportations but which all the while is preparing its own ultimate destruction.

Renaissance is an inadequate term for Ray. He was a moment in the conscience of man.

এই বক্তৃতার উপলক্ষ ছিল সাহিত্য আকাদেমি, সঙ্গীতনাটক আকাদেমি আর ললিতকলা আকাদেমির যৌথ প্রচেষ্টায় আয়োজিত এক সেমিনার। সত্যজিৎ মারা যাওয়ার ১৩ দিন পরে। মৃত্যুর পর সমস্ত সরকারি মহল থেকে – দূরদর্শনে, রেডিওতে, এমনকি এই সেমিনারে বিলি করা কাগজেও তাঁকে উল্লেখ করা হচ্ছিল “representative of Indian Renaissance” বলে। সেই তকমার বিরুদ্ধে এখানে গর্জে উঠেছেন উৎপল। বলছেন এটা আসলে প্রতিবাদীর প্রতিবাদী চরিত্র ভুলিয়ে দেওয়ার সরকারি চক্রান্ত। ভারতীয় রেনেসাঁ আবার কী জিনিস? খায় না মাথায় দেয়? ঐতিহাসিকরা যেটার কথা বলতেন তা হল বাংলার রেনেসাঁ – হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও আর তাঁর ছাত্রদের দিয়ে যার শুরু আর রবীন্দ্রনাথে যার পূর্ণতা। কিন্তু সেটাও রেনেসাঁ বলতে যা বোঝায়, সেই স্তরে পৌঁছয়নি। সমাজের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে নতুন সমাজ গড়া হয়নি। তাই পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকরা এর নাম দিয়েছেন বাংলার সংস্কার আন্দোলন। কিন্তু সত্যজিৎ শুধু সেই সংস্কারের সন্তান নন, তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি।

তাহলে? আজ সত্যজিতের জন্মদিনে আমরা, আত্মবিস্মৃত বাঙালিরা, তাঁকে স্মরণ করব কি শুধু মোদী, মমতার বিরুদ্ধে তিনি আমাদের মিম বানানোর সুযোগ দিয়েছেন বলে? আজকে আমাদের সামনে, গোটা ভারতের সামনে, গোটা পৃথিবীর সামনে কি দুটো মাত্র বিপদ – মোদী আর মমতা? তা তো নয়। গোটা পৃথিবী জুড়েই এখন একনায়কত্বের উত্থানের যুগ। ভারতে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী নরেন্দ্র মোদীর চেহারায়, ইজরায়েলে হানাদারি বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর চেহারায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্পোরেট মুঘল ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেহারায়, রাশিয়ায় যুদ্ধবাজ জাতীয়তাবাদী ভ্লাদিমির পুতিনের চেহারায়, তুরস্কে রচপ তায়িপ এর্দোগানের চেহারায়। এই লড়াইয়ে আমাদের ভাষা যোগাতে পারেন কি সত্যজিৎ?

যতবার হীরক রাজার দেশে দেখি ততবার মনে হয় সারাজীবনে এমন বৈপ্লবিক ছবি সত্যজিৎ আর বোধহয় বানাননি। বিজ্ঞানের উপর আক্রমণের প্রতিবাদে খোদ মার্কিন মুলুকে বিজ্ঞানীরা মিছিল করেছিলেন ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে। এদেশেও বিজ্ঞানীরা এবং বিজ্ঞানচর্চা আক্রমণের মুখে পড়েছে প্রবলভাবেই, যতই চন্দ্রযান আর মঙ্গলযান পাঠানো হোক মহাকাশে। আমাদের দেশে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অপবিজ্ঞানের চর্চা চালু করা হচ্ছে। মোদীরাজের প্রথম দিকে বিজ্ঞান কংগ্রেসে আলোচনা হত প্রাচীন ভারতের পরমাণু বোমা নিয়ে, ক্রমশ বিজ্ঞান কংগ্রেস বন্ধই করে দেওয়া হল। এখন রামলালার কপালে সূর্যতিলক এঁকে দেওয়াই বিজ্ঞানের বিরাট অর্জন বলে প্রচার করা হচ্ছে। এক বাবাজি করোনার ওষুধ, ক্যান্সারের ওষুধ – সবই আবিষ্কার করে ফেলেছেন, এমন অবৈজ্ঞানিক দাবি করে কোটিপতি হয়ে যান সরকারি মদতে।

এদিকে পিএইচডি স্কলারদের ভাতা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, প্রতিবাদের ঘাঁটি জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ধাক্কায় আটশোর কাছাকাছি পিএইচডি আসন লোপ করে দেওয়ার ঘটনাও বাসি হয়ে গেছে। কারণ ‘এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।’ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালা। দিনের পর দিন কারারুদ্ধ থাকছেন জিএন সাইবাবার মত অধ্যাপক আর উমর খালিদের মত ছাত্ররা। বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই যে অতিকায় সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি আসলে কার মূর্তি। আমাদের গোটা দেশটাই এখন মূর্তির মাঠ।

কিন্তু হীরক রাজার দেশে আটকে থাকলে ভুল করবেন। ১৯৫৫ সালের পথের পাঁচালী থেকে ১৯৯১ সালের আগন্তুক পর্যন্ত ওই একটিমাত্র ছবিই সত্যজিৎ করে গেছেন যা এই দুঃসময়ে আমাদের সম্বল – তা নয়। মনে রাখবেন, সত্যজিৎ সেই পরিচালক যাঁর প্রথম ছবি দেখে এক রাষ্ট্রপতি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন পর্দায় এত দারিদ্র্য দেখালে বিশ্বের কাছে দেশের অসম্মান হবে না? সত্যজিতের সপাট প্রতিপ্রশ্ন ছিল ‘দেশে এত দারিদ্র্য আছে সেটা সহ্য করা যদি আপনার পক্ষে অন্যায় না হয়, আমার পক্ষে সেই দারিদ্র্য দেখানো অন্যায় হবে কেন?’ একের পর এক দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডা ছবির যুগে, ইন্টারনেট ট্রোলদের প্রশ্নের মুখে এমন শিল্পীই তো আমাদের ধ্রুবতারা।

আরও পড়ুন টলমলে ট্রিবিউটে ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি গুবলেট

তিনি মারা যান ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে আর ধর্মান্ধ রাজনীতি এদেশে সবচেয়ে বড় সাফল্য পায় ডিসেম্বরে – বাবরি মসজিদ ভেঙে। তার ঠিক ৩২ বছর পরে, আজ, ধর্মান্ধতা এদেশে ফ্যাশনে পরিণত। বাবারা জাঁকিয়ে বসেছেন, দিনকে রাত রাতকে দিন করছেন, গোমূত্র দিয়ে ক্যান্সার সারানোর নিদান দিচ্ছেন, মুখ্যমন্ত্রীও হয়ে বসছেন। লেখাপড়া না জানা, গাঁইয়া, গরীব মানুষ নয়; এই বাবাদের ভক্ত এবং শক্তি সম্ভ্রান্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিপ্রাপ্ত ক্ষমতাশালীরা। মনে পড়ে না বিরিঞ্চিবাবার ভক্তদের? কিন্তু এহেন মহাপুরুষরা শেষ কথা বলেন না। যদি ভরসা হারিয়ে ফেলে থাকেন, একবার দেখুন, বারবার দেখুন কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫)। যমুনাবক্ষে মোচ্ছব করে নদীর বারোটা বাজান এক বাবা আর তাঁর কাছে উপঢৌকন হিসাবে সরকারি আশীর্বাদ নিয়ে পৌঁছন রাষ্ট্রনেতা, দেশের শ্রেষ্ঠ ধনীরা। আমার-আপনার নিরাপত্তার জন্য তৈরি সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হয় ব্যক্তিগত ভৃত্যবাহিনী হিসাবে। মনে হয় না, আমাদের যদি একজন ফেলুদা থাকত, যে বাবাকে গারদে পাঠিয়ে, ধনী ভক্তকে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড় করিয়ে সার্কাসের খেল দেখাত, তবে বেশ হত?

আমরা কি হঠাৎ পৌঁছেছি এই অন্ধকার সময়ে? এক হ্যাঁচকা টানে সংঘ পরিবার আমাদের প্রগতিশীল সমাজকে উল্টোদিকে টেনে নিয়ে গেছে? না। ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ে ফাঁকি ছিল বরাবর। ছিল বলেই ১৯৮৭ সালেও রূপ কানোয়ার সতী হয়, শাস্তি হয় না একজনেরও। ছিল বলেই শাহ বানো সুবিচার পাননি, এত বছর পরেও তিন তালাককে হাতিয়ার করে মুসলমান বিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছে হীরক রাজার লোকেরা। ধর্মের হাতে মেয়েদের এহেন লাঞ্ছনার কালে, অ্যান্টি-রোমিও স্কোয়াডের নামে, লাভ জিহাদের নামে মেয়েদের অধিকারকে অস্বীকার করার দিনে মনে না পড়ে উপায় নেই সত্যজিতের ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি দেবী। সেখানে জমিদার বাড়ির তরুণী বউ দয়াময়ীকে কালীভক্ত শ্বশুরের অন্ধবিশ্বাসের ভারে দেবী হয়ে উঠতে হচ্ছে, যার পরিণতি তার সাজানো জীবন তছনছ হয়ে যাওয়ায়।

বারবার উৎপলের যে বক্তৃতার উল্লেখ করছি, এই অন্ধকারে সত্যজিৎকে খুঁজতে গিয়ে যে বক্তৃতা আমাদের জোরালো টর্চ হতে পারে, সেখানে দেবী সম্পর্কে উৎপল বলছেন

“A proper tribute to Ray would have been… to make arrangements for Devi to be shown all over the country at cheaper rates. Devi is a revolutionary film in the Indian context. It challenges religion as it has been understood in the depths of the Indian countryside for hundreds of years. It is a direct attack on the black magic that is passed off as divinity in this country. Instead of the vulgarized Ramayana and Mahabharata, the Indian TV could have telecast Devi again and again; then perhaps today we would not have to discuss the outrages of the monkey brigade in Ayodhya.”

বুঝতেই পারছেন হীরক রাজার কত বড় শত্রু আমাদের সত্যজিৎ। অদূর ভবিষ্যতে এদেশে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সত্যজিৎও গণশত্রু বলে চিহ্নিত হবেন হয়ত। এমন একজন গণশত্রুকে আমরা এখন গোয়েন্দায় বেঁধে রাখলে তা হবে রবীন্দ্রনাথের সেই গানটার মত – তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

রামদাসী, লালদাসের ধর্ম এবং রামমন্দির

রামদাসী রক্তচক্ষু দেখিয়ে বলেন, হিন্দুর ছেলে হয়ে ঠাকুরের নামে এইসব কথা বলছ! মুসলমানের ছেলে আমি ঠাকুরঘরে লুকিয়ে রাখব? দারোগা ব্রাহ্মণীর অভিশাপের ভয়ে মানে মানে কেটে পড়ে।

আমার মায়ের দিদিমা রামদাসী চক্রবর্তী অধুনা বাংলাদেশের যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার আঠারোখাদা গ্রামের এক সম্পন্ন পরিবারের ধর্মপ্রাণ গৃহবধূ ছিলেন। রোজ গৃহদেবতার পুজো করতেন নিজের হাতে এবং সে দেবতার মূর্তি পরিবারের সচ্ছলতার সঙ্গে মানানসই আকারে বড় ছিল। রামদাসীর মেজ ছেলে জগন্নাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এক মুসলমান, যিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে স্থানীয় কংগ্রেসের সক্রিয় কর্মী। একদিন তাঁকে এবং অন্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গ্রেফতার করতে গোটা গ্রাম চষে ফেলছে পুলিস। জগন্নাথ বন্ধুকে লুকিয়ে রাখার জায়গা ভেবে না পেয়ে নিয়ে এলেন মায়ের কাছে। যথাসময়ে পুলিস চক্রবর্তী বাড়িতেও হানা দিল, কারণ সে বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সভা-টভা হত। বাড়ির ছেলেমেয়েদেরও কংগ্রেসের সঙ্গে কিঞ্চিৎ যোগাযোগ আছে বলে খবর। কিন্তু গোটা বাড়ি তল্লাশ করেও পুলিস সেদিন যাকে খুঁজছিল, তাকে পেল না। কেন? কারণ রামদাসী তাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন ঠাকুরঘরে, গৃহদেবতার পিছনে। এই পর্যন্ত ইতিহাস। আমাদের পারিবারিক কিংবদন্তি বলে, বাঙালি দারোগার নাকি সন্দেহ হয়েছিল। সে রামদাসীকে হালকা চালে জিজ্ঞাসাও করে, ঠাকুরঘরটা দেখলাম না যে মাসিমা? রামদাসী রক্তচক্ষু দেখিয়ে বলেন, হিন্দুর ছেলে হয়ে ঠাকুরের নামে এইসব কথা বলছ! মুসলমানের ছেলে আমি ঠাকুরঘরে লুকিয়ে রাখব? দারোগা ব্রাহ্মণীর অভিশাপের ভয়ে মানে মানে কেটে পড়ে।

বলা বাহুল্য, রামদাসী ধর্মনিরপেক্ষতা কথাটা জানতেন না। পরবর্তী জীবনে তিনি একজন হিন্দু বিধবার যা যা শাস্ত্র নির্ধারিত কর্তব্য তা থেকে এক চুল বিচ্যুত হননি। অথচ যাঁরা তাঁকে স্বচক্ষে দেখেছেন তাঁদের মুখে শুনেছি, ওই ঘটনা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র পাপবোধ ছিল না। আবার ফলাও করে বলেও বেড়াতেন না। স্পষ্টতই তিনি মনে করতেন তাঁর ভগবানের ঘর একজন বিধর্মীর স্পর্শে অপবিত্র হয়ে যায় না। তাই একজন মুসলমানকে ঠাকুরঘরে বসালে পাপ হয় না।

আনন্দ পট্টবর্ধনের ‘রাম কে নাম’ তথ্যচিত্রে বিতর্কিত রাম জন্মভূমির আদালত নিযুক্ত পূজারী লালদাসকে দেখানো হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন হিন্দুধর্ম অনুযায়ী ভগবান যে বাড়িতে থাকেন সেটাই মন্দির। আলাদা করে ভগবানকে কোথাও নিয়ে গিয়ে মন্দির বানানোর প্রয়োজন পড়ে না, ভগবান যেখানে আছেন সেই ঘর ভেঙে দেওয়ারও প্রশ্ন ওঠে না।

বোঝা যায়, আমার প্রমাতামহী রামদাসী কোনো ব্যতিক্রম নন। ভারতবর্ষ মুসলমানদের দেশ এবং রামদাসী, লালদাসের মত কোটি কোটি হিন্দুর দেশ। এঁরা নাস্তিক নন, সঙ্ঘ পরিবার যাকে ভারতীয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী পাশ্চাত্য থেকে শেখা ধর্মনিরপেক্ষতা বলে, এঁরা তার আওতাতেও পড়েন না। এঁদের ধর্মবিশ্বাস এমন আত্মবিশ্বাসী যে অন্যকে আক্রমণ করে সে বিশ্বাস জাহির করতে হয় না। অন্যের ধর্মস্থান দখল করে নিজের দেবতার বিগ্রহও স্থাপন করতে হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, ভগবানকে এঁরা এত ছোট মনে করেন না, যে তাঁকে কোনো নির্দিষ্ট মন্দিরে জায়গা না দিলে তিনি গৃহহীন হয়ে থাকবেন।

আরও পড়ুন হিন্দুরাষ্ট্রের হিন্দু নাগরিকের পিঠ বাঁচানোর চিঠি

রাম এঁদের সকলের আরাধ্য নন। সেই কারণেই সকলকে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা বা ভারতে থাকতে হলে জয় শ্রীরাম বলতেই হবে এমন দাবি অসঙ্গত, অন্যায়। অযোধ্যায় ঝাঁ চকচকে রামমন্দির নির্মাণ, দিশি পিস্তলের গুলিতে হত লালদাসের ভাষায় বললে “রাজনৈতিক মুদ্দা” (রাজনৈতিক বিষয়)। আমরা চাইলেই অন্যের ধর্মস্থান গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজেদের ধর্মস্থান গড়ে তুলতে পারি – এই অহঙ্কার প্রকাশ করা ছাড়া এর অন্য কোনো সার্থকতা নেই। অবশ্য এই অহঙ্কার সার্বিক প্রচারে মোহিত হয়ে যাওয়া সাধারণ হিন্দুদের দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষার অভাব, জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম, চিকিৎসার নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার যন্ত্রণা ভুলে থাকতে আফিম হিসাবে কাজ করবে। আফিম খেয়ে সাধারণ হিন্দু ঝিমোবেন আর সেই সুযোগে তাঁদের ভোটগুলো পাওয়া যাবে – এই হল মহত্তর উদ্দেশ্য। মুসলমানদের তো আগেই অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়েছে। তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির অবাঞ্ছিত নাগরিক করে দেওয়ার চেষ্টায় ত্রুটি রাখা হয়নি। তা দেখিয়ে উল্লাসে উন্মাদ করে দেওয়া হয়েছে সাধারণ হিন্দুদের। তাঁরা খেয়ালও করছেন না, প্রাচীন শহর অযোধ্যার ছোটখাটো হিন্দু ব্যবসায়ীর দোকানপাটও উড়িয়ে দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এক রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য।

কাশীর বিশ্বনাথ মন্দিরের বংশানুক্রমিক মহন্ত রাজেন্দ্রপ্রসাদ তিওয়ারি তাই বলেছেন, “অযোধ্যায় ওটা মন্দির নয়, মল। ওই ধরনের প্রথম মল ছিল কাশী বিশ্বনাথ মন্দির। তৃতীয়টা হবে মথুরায়।”

প্রতর্ক ব্লগে প্রকাশিত

ঘ্যাচাং ফু: আমার বিশ্বাসঘাতক চোখে যেটুকু ধরা পড়ল

যে যুগে কমিউনিস্টরাও দুর্নীতি বলতে শুধু ঘুষ খাওয়া বোঝেন আর ২২ লাখ টাকার গাড়ি কেনা বৈধ বলে গলা ফাটান, যেহেতু সেটা কালো টাকায় কেনা হয়নি – সে যুগে পর্দায় যৌনতা নিংড়ে নীতিহীনতা দেখানো ঘ্যাচাং ফু পরিচালকের সবচেয়ে প্রশংসনীয় কাজ।

ছোটবেলা থেকে ‘কমরেড’, ‘বিপ্লব’, ‘ক্যাপিটালিজম’ ইত্যাদি শব্দগুলোর সঙ্গে ওঠাবসা করলে (কেবল ওঠাবসাই করলে) যা হয়, তা হল মাঝবয়সে এসেও শব্দগুলো শুনলেই চোখদুটো নিভু নিভু হয়ে আসে, মাথাটা একদিকে হেলে পড়ে, গালটাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্যে হাতটা উঠে আসে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ছবিটার মত। জয়রাজ ভট্টাচার্য নির্দেশিত ঘ্যাচাং ফু ছবিটা দেখতে শুরু করার কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্য গালে এমন একটা চড় পড়ল যে পিঠ সোজা করে উঠে বসতে হল। ছোটবেলায় ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসে ঝিমোলে আমার কমিউনিস্ট পার্টি করা বাবা এরকম চড় কষাতেন। জয়রাজ দেখলাম জানেন, যে এক চড়ে ঝিমুনি উধাও হয়ে যায় না। খানিক পরেই আবার ফিরে আসে। তখন কানমলা দিতে হয়। গোটা ছবি জুড়ে সে কাজটাই করে গেছেন ক্রমাগত। ফলে ঘ্যাচাং ফু দেখা মোটেই সুখকর অভিজ্ঞতা নয়, বরং বেজায় অস্বস্তিকর।

এদেশে কোনোদিন বিপ্লব হয়নি। তা বলে মুখেন মারিতং জগৎ মার্কসবাদী দেখার সুযোগ আমরা পাইনি এমন নয়। বরং মার্কসবাদীদের রাজনৈতিক কার্যকলাপ যত কমেছে, জনবিচ্ছিন্নতা যত বেড়েছে, ততই এই ছবির সুরজিৎ সেনের মত ধপধপে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরা তত্ত্ব কপচানো মার্কসবাদীতে ভরে গেছে আমাদের চারপাশ। এই ছবির সবকটি চরিত্র রীতিমত বইপড়া মার্কসবাদী, বিপ্লবে নিবেদিতপ্রাণ পার্টিকর্মী। কিন্তু কেউ শ্রমজীবী নয়, সকলেই উচ্চশ্রেণিভুক্ত। দামি মদ, দামি খাবার, রবীন্দ্রসঙ্গীত (পিচ কারেক্টর সমেত) ছাড়া এদের চলে না। কিন্তু ও গান তাদের মরমে প্রবেশ করে না। রবীন্দ্রসঙ্গীতটির ইতিহাস জানা থাকলেও তারা বুঝতে পারে না কেন ওই গান ওখানে গাওয়া হল। দেখে মনে পড়ে যায় উৎপল দত্তের প্রতিবিপ্লব বইয়ে উল্লিখিত সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির উনবিংশ পার্টি কংগ্রেসের কথা

… পার্টির ম্যাণ্ডেট কমিশন গর্ব ক’রে রিপোর্ট দিচ্ছেন:
প্রতিনিধি সংখ্যা: ১১৯২। এদের মধ্যে
৭০৯ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট।
৮৪ জন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত।
২২৩ জন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত।
১৭৬ জন আংশিক স্কুলে শিক্ষিত।
২৮২ জন ইঞ্জিনিয়ার।
৬৮ জন কৃষি বিশেষজ্ঞ।
৯৮ জন অধ্যাপক।
১৮ জন অর্থনীতিবিদ।
১১ জন ডাক্তার।
৭ জন উকীল।

শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি-কংগ্রেসে শ্রমিক ক’জন ছিলেন তার উল্লেখ করারও প্রয়োজন দেখেন নি সংশোধনবাদী নেতারা। দেখা যাচ্ছে কংগ্রেসের শতকরা ৬০ জন প্রতিনিধি এসেছেন নূতন শিক্ষিত সুবিধাভোগী শ্রেণী থেকে।

ঔতরখানভ লিখেছেন:

“এই সূত্র-অনুসারে যে কমিউনিস্ট পার্টি এককালে শ্রমিকের পার্টি বলে গর্ব করত, তা আজ ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক ও আমলাদের পার্টি হয়ে গেছে, নানা পেশায় নিযুক্ত কর্মচারীদের পার্টি হয়ে গেছে।”

এই ছবির চরিত্রেরা বাবাকে ডাকে ‘কমরেড বাবা’, স্বামী ‘ডার্লিং’ বা ‘সুইটহার্ট’ বলে ডাকলে শুনতে পায় না, শুনতে পায় ‘কমরেড’ বলে ডাকলে। তবে পেটে দু পাত্তর পড়লেই বেরিয়ে আসে আসল কথা – আমাদের কথায় সাধারণ লোকে বিশ্বাস করল কি না করল, কিছু আসে যায় না। কারণ আমরা নিজেরাই নিজেদের কথাগুলো বিশ্বাস করি না।

আদ্যন্ত নীতিহীনতা বোঝাতে সাধারণত সিনেমায় দেখানো হয় আর্থিক দুর্নীতিকে। আমার কাছে এই ছবির শ্রেষ্ঠ দিক হল নীতিহীনতা, ভণ্ডামিকে ল্যাংটো করতে আগাগোড়া যৌনতার ব্যবহার। ছবির শুরুতেই, চরিত্রগুলো কারা, কী বৃত্তান্ত তা বুঝতে পারারও আগে দেখা যায় লিফটে চোরাগোপ্তা এর হাত ওর কোমরে, কার আঙুল যেন কার প্যান্টের চেন খুলছে। পরে লম্বা টেবিলের এক প্রান্তে যখন বাকুনিন বনাম এঙ্গেলস বনাম লেনিন বনাম অমুক বনাম তমুক চলছে, তখন অন্য প্রান্তে এক কমরেড আরেক কমরেডের পাছা দেখতে ব্যস্ত থাকেন। বিপ্লবোত্তর সমাজে যৌনতার ভূমিকা কী হবে সে আলোচনাই করতে দিতে চান না যে কমরেড (সুদীপা বসু), তিনি যত্রতত্র হস্তমৈথুনে লিপ্ত হন। প্রত্যেকটা চরিত্রই অতৃপ্ত যৌনক্ষুধায় ভুগছে। তাদের যৌন অবদমনেরই প্রকাশ অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাওয়ায়। কেউ কেউ যৌন তৃপ্তির রাস্তা খুঁজে নেয় – খোলা ছাদে অর্জিতে অথবা নির্জন ডাইনিং রুমে পায়ুমৈথুনে। যারা পায় না, তারা কিউয়ের মত প্রবল বিক্রমে ঘড়িগুলোকে হাতুড়ি পেটা করতে থাকে। সত্যিই তো আমাদের বহু হিংসার পিছনেই অবদমিত কাম। নইলে যে মন্ত্রীর ফ্ল্যাট থেকে নগদ ৫০ কোটি টাকা বেরোয়, তার ক্ষমতার অপব্যবহারের থেকেও ক্রমশ কেন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে অল্পবয়সী সুন্দরীর সঙ্গে তার সম্পর্ক? যে যুগে কমিউনিস্টরাও দুর্নীতি বলতে শুধু ঘুষ খাওয়া বোঝেন আর ২২ লাখ টাকার গাড়ি কেনা বৈধ বলে গলা ফাটান, যেহেতু সেটা কালো টাকায় কেনা হয়নি – সে যুগে পর্দায় যৌনতা নিংড়ে নীতিহীনতা দেখানো ঘ্যাচাং ফু পরিচালকের সবচেয়ে প্রশংসনীয় কাজ। এমনটা না করে যদি পরিচালক সরাসরি নিজের সময়টা দেখাতেন, সেই সময়ের কোনো কমিউনিস্ট কবিকে দেখাতেন, যিনি এক হাতে দক্ষিণপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে কবিতা লেখেন আর অন্য হাতে সেই সরকারের অনুষ্ঠানে যাওয়ার আমন্ত্রণপত্রটা ফেসবুকে পোস্ট করেন – তাহলে কোনো অভিঘাতই তৈরি হত না। কারণ অমন আমরা রোজ দেখছি।

এ পর্যন্ত পড়ে অনেকেই রে রে করে তেড়ে আসবেন, বলবেন আলোচক নেহাত বদমাইশ। নিজের গায়ের ঝাল মেটাতে একটা শিল্পকর্মকে ব্যবহার করছে। পার্থ চ্যাটার্জির ফ্ল্যাট থেকে টাকা উদ্ধার হওয়া এবং শতরূপ ঘোষের গাড়ি বিতর্কের বহু আগেই ঘ্যাচাং ফু নির্মিত। তাহলে এটা সে যুগের ছবি কী করে হয়? কথা হল, যুগ মানে স্রেফ কয়েকটা বছর নয়। ছবিটা যদি নির্মাণের সময়কালটুকুর বাইরে কোনোকিছু সম্পর্কে কোনো সন্দর্ভ হয়ে উঠতে না পারত, তাহলে নির্মাণের এত বছর পরে তা নিয়ে আলোচনাই করতাম না। প্রগতির মুখোশ পরে থাকা প্রতিক্রিয়াশীলরা কোনো দেশে কোনো যুগেই ঘোষিত প্রতিক্রিয়াশীলদের চেয়ে কিছু কম বিপজ্জনক নয়। এক কাল্পনিক সময়ের বয়ানে নিজের সময়ের সেই প্রতিক্রিয়াশীলদের উলঙ্গ করতে পেরেছে বলেই ঘ্যাচাং ফু গুরুত্বপূর্ণ। এ ছবি যদি অন্য কোনো দেশে বানানো হত, তাহলে হয়ত যৌনতাকে ভণ্ডামির মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা আলাদা করে প্রশংসনীয় হত না। কিন্তু দেশটা ভারতবর্ষ বলেই এ কাজ অত্যন্ত জরুরি। এ দেশেই তো কমিউনিস্টদের যৌনতা, মদ্যপান ইত্যাদি ব্যাপারে চিন্তাভাবনা দক্ষিণপন্থীদের সবচেয়ে কাছাকাছি। এই শতকের শুরুতেও এ দেশের বড় অংশের কমিউনিস্ট সমকামিতাকে মনে করতেন পুঁজিবাদী বিকৃতি। এখনো এমন মার্কসবাদী দল আছে যারা ওই ধারণাতেই অনড়। একগামিতার সূক্ষ্মতর প্রশ্ন (যা এ ছবিতে বেণীর চরিত্র তুলেছে) না হয় বাদই দেওয়া গেল।

এই ডিসটোপিয়া ঘনীভূত হয়েছে পরিচালকের ঠাট্টার গুণে। মাঝেমাঝেই তিনি এবং ক্যামেরার পিছনের অন্য কুশীলবরা কণ্ঠস্বর হয়ে ঢুকে পড়েছেন ছবিতে, মরা মানুষকে জ্যান্ত করে তোলার মত কাণ্ডও ঘটিয়েছেন। সে ঘটনার ব্যাখ্যা বস্তুবাদী হল কি হল না, তা নিয়ে জবরদস্ত রসিকতাও করা হয়েছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে যা ঘটছে তা আসলে স্রেফ খেলা, ভিডিও গেমের মতই। ফলে শেষদিকে যখন মত্ত অবস্থায় এক বিশেষ যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি বলে কেঁদে ভাসায় একটা চরিত্র আর তার বউয়ের চরিত্রে কমলিকা শতকরা দুশো ভাগ আবেগ ঢেলে বলে ফেলেন ছবির সবচেয়ে রসিক সংলাপ, তখন টেবিলে বসা অনির্বাণ আর অরিত্রীর মত আমিও খ্যাকখ্যাক করে হেসেই ফেললাম।

আকাশে থুতু ছেটালে সে থুতু নিজের গায়েই পড়ে। এ হাসিও কি নিজের দিকেই ফিরে এল? কেন বাপু? আমি তো কমিউনিস্ট নই, পার্টিও করি না। আমি বড়জোর বিশ্বাসঘাতক। অতএব কমিউনিস্ট সাজা বুর্জোয়াদের নিয়ে কেউ হাসাহাসি করলে আমার কী এসে যায়? এসে যাওয়া উচিত নয়, কিন্তু ওই যে গোড়াতেই বললাম – কেন জানি না আগাগোড়া মনে হয় পরিচালক ধরে ধরে তাঁর উদ্দিষ্ট দর্শককে চড়াচ্ছেন, কান মুলে দিচ্ছেন। এক নাগাড়ে মারতে থাকলে খানিক পরে ব্যাপারটা সয়ে যায়, ততটা ব্যথা লাগে না। কিন্তু মারের তীব্রতা বজায় রাখতে পরিচালক কিছুটা নিষ্পাপ সারল্য মিশিয়ে দিয়েছেন। যেমন সেই বাচ্চা মেয়েটা, যে বড়দের তাত্ত্বিক ভাঁড়ামি ছেড়ে উঠে গিয়ে একা ঘুরতে ঘুরতে পেয়ে যায় ধুলো জমে যাওয়া লেনিনকে, যে ফাঁস করে দেয় নীতিবাগীশ মায়ের কামুকতার কাহিনি।

এবং অনির্বাণ, অরিত্রী। একমাত্র তাদের স্মৃতিতেই ক্যামেরা বদ্ধ ইনডোর ছেড়ে বেরিয়ে যায় ফাঁকা মাঠের নরম সকালে, পেলব আবহসঙ্গীতে। তারাই কেবল মার্কস, এঙ্গেলস হ্যানো ত্যানো কপচায় না। শুধু তাদের চোখেই আসে জল, তাদেরই রক্তপাত হয়। কিন্তু ওই পেলবতায় শেষ করা হয়নি ছবিটা। শেষের জন্যেই সবচেয়ে বড় আঘাতটা তুলে রেখেছিলেন জয়রাজ। একেবারে ঘ্যাচাং ফু।

ছবিটা কি নিখুঁত? অত বোঝার বিদ্যে আমার নেই বাপু। তবে ফ্রিজে কাটা হাতখানা না রাখলে কি কোনো তফাত হত?

বিঃ দ্রঃ ঘ্যাচাং ফু কোথায় দেখা যাবে? এ প্রশ্ন আমাকে করবেন না। অনেকেই বেছে বেছে যৌনদৃশ্যগুলো দেখেছেন। কেবল যৌনদৃশ্য দেখতে হলে ইন্টারনেটে ক্লিপ খুঁজে নেওয়াই ভাল। পুরো ছবি দেখতে চাইলে অনুসন্ধান করুন। ও দায়িত্ব নিচ্ছি না।

আলতো ফ্লিক: ক্রিকেট নিয়ে ব্যতিক্রমী বই

‘দাস্তান-এ ফাস্ট বোলিং’ লেখাটায় লেখক কলিন কাউড্রের একখানা মাত্র ২২ রানের ইনিংসের কথা লিখেছেন, যার মূল্য সংখ্যায় ধরা পড়ে না। এই বইটাও মাত্র ৬৬ পাতার। কিন্তু এমন বই মোটা হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

পশ্চিমবঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার চিরকালই বিরল। তা বলে ক্রিকেট নিয়ে লিখিত বইয়ের সংখ্যা কম নয়। আসন্ন কলকাতা বইমেলায় আরও কয়েক বস্তা বই বেরোবে ক্রিকেট নিয়ে। ফেসবুকে চোখ রাখলেই তা দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ বইতেই প্রথিতযশা সাংবাদিকদের তারকাদের সঙ্গে ওঠাবসার কাহিনি অথবা স্বঘোষিত ক্রিকেটবোদ্ধাদের আবেগসর্বস্ব গদ্যের মোড়কে পরিবেশিত আজগুবি কথাবার্তা ছাড়া বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় যখন এমন একটা বই হাতে এসে পৌঁছয় যার প্রায় প্রত্যেকটা পাতাই উদ্ধৃত করতে ইচ্ছা করে, তখন চমকে উঠতে হয়। ক্রিকেট এমন একটা খেলা, যা নিয়ে ক্রিকেট খেলিয়ে দেশগুলোর সাহিত্যিকরাও বিস্তর লেখালিখি করেছেন। আবার সিএলআর জেমস, নেভিল কার্ডাস, পিটার রোবাক, গিডেয়ন হাইয়ের মত সাংবাদিকদের লেখা সাহিত্যে উত্তীর্ণ হয়েছে। বাংলাতেও একসময় অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, শঙ্করীপ্রসাদ বসু, মতি নন্দীরা ক্রিকেট নিয়ে লিখেছেন। শেষেরজন তো বেশি সাংবাদিক না বেশি সাহিত্যিক তা বলা বেশ কঠিন। অথচ ইদানীং ক্রিকেট নিয়ে গন্ডা গন্ডা বই বেরোলেও, বুক ঠুকে কটাকে আর সেই ধারার উত্তরসূরী বলা যায়? অরিজিৎ সেনের আলতো ফ্লিক – এক চিলতে ক্রিকেটের গল্প কিন্তু ক্রিকেটারদের হাঁড়ির খবর লেখা আর দর্শক হিসাবে ক্রিকেট দেখে বিশেষজ্ঞ হিসাবে বই লেখার চলতি হাওয়ার পন্থী না হয়ে, ক্রিকেটের ইতিহাস খুঁড়ে সচরাচর অনালোচিত ক্রিকেটারদের কথা বলেছে। ক্রিকেট যেভাবে জীবনকে প্রতিফলিত করে আর জীবন যে অলৌকিক কায়দায় ক্রিকেট মাঠে এসে বসে, তার সন্ধানে বহুদূর গেছে এই বই। তাই সৃষ্টি হয়েছে খাঁটি সাহিত্য।

এ বইকে যদি কেউ ব্যক্তিগত গদ্যের বই আখ্যা দেন, তাতেও লেখকের কৃতিত্ব এতটুকু কমে না। বস্তুত ফ্ল্যাপের লেখক পরিচিতিতে লেখাই রয়েছে “ক্রিকেট নিয়ে লেখার জন্য যে যে যোগ্যতা লাগে… মানে শচীন তেন্ডুলকরের সাথে হোটেল লাউঞ্জে ছবি বা গোপাল বসুর সাথে আড্ডার স্মৃতি বা নিদেনপক্ষে ক্লাব হাউসে যাতায়াত… কোনটাই ঝুলিতে নেই। একবার দূর থেকে উরকেরি রামনকে দেখা আর একবার কাছ থেকে রাসেল আর্নল্ডকে… ব্যাস…”। মুশকিল হল, এসব তথাকথিত যোগ্যতা ছাড়া যাঁরা ক্রিকেট নিয়ে লেখেন আজকাল, তাঁরা আবার সগর্বে ফেনা পরিবেশন করেন। কিন্তু অরিজিৎ একেবারেই সেরকম ‘জিয়া নস্ট্যাল’ করে দিয়ে বাজিমাত করার চেষ্টা করেননি। অথচ স্মৃতি এ বইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অসম্ভব সংবেদনশীল স্মৃতি না থাকলে ‘ফেলুকে নিয়ে মোনোলগ’ শীর্ষক রচনার এই অনুচ্ছেদগুলো লেখা অসম্ভব

এদিকে ওয়াসিম জাফর ব্যাটে [ব্যাট হাতে?] দাঁড়িয়ে আছে। দুটো ছায়া [,] নিজের আর ব্যাটের। দুটোই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হছে [হচ্ছে]। কত রান করেছে জাফর… একশ [।] একশ চল্লিশ, একদিনে এত? এখনো খেলা বাকি, ইস্ কেন সকাল থেকে নেই আমি! আমি এভাবে অন্য কাজে আটকে গেলাম? সারা জীবনই আমি অন্য কাজে আটকে গেছি। যখন আমার সেখানে [যেখানে?] থাকার কথা, আমি তার থেকে কয়েক যোজন দূরে থেকেছি, পরে হাঁফাতে হাঁফাতে পৌঁছে গেছি সেখানে। তখন আর কিছু করার নেই। আমি যখন আমার পেশেন্টের বাড়ির লোকেদের বলি – আর কিছু করার নেই… কিস্যু না, আমি তখনও জানি একটা জিনিস করা বাকি… ক্ষমা চাওয়া, এখন কিছু করার নেই কিন্তু যখন করার ছিল, আমি করতে পারিনি। আমি শুধু আমিই, নার্স না, আয়া না, অন্য ডাক্তার না শুধু আমিই পারতাম বাবু তোমাকে বাঁচাতে। কিন্তু তখন আমি অন্য কোথাও ছিলাম, অন্য কিছু ভাবছিলাম। …

তুমি যখন শত মুহূর্ত আমায় উপহার দিয়েছ, দুচোখ ভরে তোমার কভার ড্রাইভ [,] ফ্লিক, গ্লান্স দেখার জন্য… তোমাকে বাঁচানোর… তোমাকে লুকিয়ে রাখার জন্য, “ফেলু”… তখন আমি পাগলের মত এগারো নম্বর গেট খুঁজে বেড়াচ্ছি। আর যখন পেলাম… রোদ পড়তে শুরু করেছে। তোমার ছায়া, ব্যাটের ছায়া বাড়তে বাড়তে পুরো সবুজ মাঠ গ্রাস করে নিয়েছে।

এই ছায়াভরা মাঠে আর কাউকে দেখতে পাব না আমি। ওয়াসিম জাফর… তেন্ডুলকার… ফেলু কাউকে না। আমি শুধু আমাকেই দেখতে পাচ্ছি। এই সঙ্গঁ [সঙ্গ] আমার আর সহ্য হচ্ছে না। সব শান্ত হয়ে গেল কেন? তেন্ডুলকার আউট… বিরাশি রানে। একশ ছেচল্লিশ মিনিট মাঠে ছিল, দু-ঘন্টা ছাব্বিশ মিনিট। তাতেই এত থম্ মেরে গেল সবাই। ফেলু দু-বছর ছিল – দুবছর প্লাস আরও কিছু দিন… কত দিন এক্স্যাক্ট্… মনে পড়ে… মনে পড়ে না।

কে এই ফেলু? রজনী সেন রোডের বাসিন্দা জনপ্রিয় গোয়েন্দা নয়। ওইসব চর্বিতচর্বণ থেকে এ বই বহু দূরে। ফেলু কে, জাফরের ম্যারাথন ইনিংস দেখতে দেরিতে মাঠে পৌঁছে, অথবা ইউসুফ ইউহানা আর ইউনিস খানের লম্বা জুটি দেখতে দেখতে পেশায় চিকিৎসক লেখকের কেন ফেলুকে মনে পড়ে – তা জানতে গেলে পড়তে হবে বইটা। উৎসুক পাঠকের জন্যে এই কাজটুকু তোলা থাক।

অরিজিৎ অনেক লেখাতেই নিজের আর পাঠকের মাঝে একজন কথককে রেখেছেন বড় বা ছোট ভূমিকায়। কোথাও সেই কথক লেখকের বাবা, কোথাও কোনো মাস্টারমশাই। সেভাবেই আলোচনায় এসে পড়েছেন ক্রিকেট-ইতিহাসের অনেক বিস্মৃত চরিত্র। যেমন শ্রীলঙ্কার জোরে বোলার ডিএস জয়সুন্দরা। শ্রীলঙ্কার জোরে বোলারদের সম্পর্কে লেখার সংকল্প নিয়ে বসে যাঁর নাম শুনে লেখকের প্রতিক্রিয়া “জয়বর্ধনে ইয়েস। জয়সূর্য ইয়েস। কিন্তু হু অন আর্থ ইজ জয়সুন্দরা?”

লেখকের বাবা তখন বলেন “তবে? তুমি বাংলা গদ্য নিয়ে গবেষণা করছ অথচ বিদ্যাসাগরের কথা জানো না… ছোটগল্পের ছাত্র – কিন্তু মঁপাসা পড়নি – এভাবে হয়?”

এরপর ডন সুমিগেন জয়সুন্দরা সম্পর্কে জানা যায় যতটুকু জানা সম্ভব। মহম্মদ নিসার আর অমর সিংকে মনে রেখেও, তিনি অনেকের মতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে উপমহাদেশের দ্রুততম বোলার। এমনিতেই শ্রীলঙ্কা তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনো শক্তি নয়। তার উপর তাঁর কেরিয়ারের অর্ধেক চলে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গ্রাসে। কেরিয়ারের শুরুর দিকে চাকিং করায় সাসপেন্ডও হয়েছিলেন। কিন্তু যেটুকু তথ্য আছে তা থেকে জানা যায় ক্লাব ক্রিকেটে পাঁচবার হ্যাটট্রিক করেছেন, তিনবার ইনিংসে দশ উইকেট নিয়েছেন। ১৯৪০-৪১ সালে শ্রীলঙ্কার একটা দলের সঙ্গে ভারত সফরে এসেছিলেন জয়সুন্দরা। দুটো বেসরকারি টেস্টে খেলেছিলেন। তার একটা ভারত জেতে, অন্যটা ড্র হয়। মাদ্রাজের বিপক্ষে একটা টুর গেমে জেতে জয়সুন্দরার দল এবং তিনি সে ম্যাচে ছয় উইকেট নেন।

জয়সুন্দরার কাহিনি লেখকের বাবা শেষ করেন একটি নিদারুণ মন্তব্যে

অন্য বিষয় বাছো বাবু। ইতিহাস বড় বিশ্বাসঘাতক। কোন ডন সিংহাসন পায়… কোন ডন নীরবে বয়ে চলে… বয়েই চলে…

আরও পড়ুন এটা যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট; ওঁরা গ্ল্যাডিয়েটর নন, ক্রিকেটার

যারা সিংহাসন পায়নি, জয়সুন্দরার মত যারা রয়ে গেছে নিষ্ফলের, হতাশের দলে; তাদের প্রতি লেখকের মমতা আগাগোড়া বহমান। পত্রপত্রিকায় কাল্পনিক একাদশ তো কতই তৈরি হয়, কে আর বসে বসে কোনোদিন টেস্ট খেলতে না পাওয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সফল ভারতীয় ক্রিকেটারদের একাদশ তৈরি করে? লেখকের তৈরি একাদশটা এইরকম – সুরেন্দ্র ভাবে (সহ-অধিনায়ক), এমভি শ্রীধর, বিবি নিম্বলকর, অমল মজুমদার, কেপি ভাস্কর, সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (অধিনায়ক), দেবরাজ গোবিন্দরাজ, পান্ডুরাং সালগাঁওকর, দুর্গাশঙ্কর মুখার্জী, পদ্মাকর শিভালকর, কানোয়ালজিৎ সিং। ১৯০৭ সালের ইংল্যান্ড সফরে দক্ষিণ আফ্রিকা দলে খেলা চার গুগলি বোলারকে নিয়েই বা কে আলাদা করে লিখতে যায়?

তবে এ বই একবার পড়ে, আবার পড়তে হবে, বারবার পড়তে হবে অজানা ইতিহাস বা সংবেদনশীলতা বা মহম্মদ আজহারউদ্দিনের একটা ফ্লিকের বিশ্লেষণে গভীরতার জন্যে নয়। পড়তে হবে ক্রিকেটকে ব্যক্তিগত আর ব্যক্তিগতকে ক্রিকেট করে তোলার দক্ষতার টানে। যা শিখরে পৌঁছেছে ‘১৯.৪.২০২৩’ শীর্ষক লেখায়। শুরুর দিকটা উদ্ধৃত না করলে চলে না

বাবাকে দিয়ে এলাম। মানে গঙ্গায় দিয়ে এলাম। ছ-ফুটের লোকটা বিনা প্রতিবাদে ভেসে গেল।

বন্ধুরা দুহাতে আমায় ধরে বাবুঘাটের সিঁড়ি দিয়ে তুলল। জানি না কেন ওরা আমায় ধরে আছে… এমন সময় তো একা থাকতে হয়… এমন সময়ের মুখোমুখি তো একা হতে হয়… নেভিল কার্ডাস সেই কবে বলে গেছেন

“… terrible are the emotions of long on when the ball is driven high towards him and when he waits for it – alone in the world…”

হঠাৎ মনে হল অরুণ লালের কথা। ক্যানসার সার্জারির রাতে। ম্যাচ ৫০-৫০। মানে রাত কাটতেও পারে… নাও পারে। অরুণ লাল ডান হাতে পায়ে টোকা মেরে মনে মনে বললেন “লালজী… আজ রাতে উইকেটটা দিও না…”

আমিও মনে মনে বলতে লাগলাম “আজ রাতে উইকেটটা দিও না… নো সফ্ট ডিসমিসল… আমায় আউট করুক এসে… আমি উইকেট দেব না।”

‘দাস্তান-এ ফাস্ট বোলিং’ লেখাটায় লেখক কলিন কাউড্রের একখানা মাত্র ২২ রানের ইনিংসের কথা লিখেছেন, যার মূল্য সংখ্যায় ধরা পড়ে না। এই বইটাও মাত্র ৬৬ পাতার। কিন্তু এমন বই মোটা হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

তবে বই নির্মাণে আরও যত্নবান হওয়া দরকার ছিল। র আর ড় প্রয়োগে ভুল হয়েছে প্রায়শই, যতিচিহ্নের গোলমাল আর শব্দের মাঝের ফাঁক অজায়গায় পড়ার বিভ্রাটও বিরল নয়। সর্বোপরি চিন্ময় মুখোপাধ্যায়ের প্রচ্ছদ একেবারেই বইয়ের নামের এবং লেখার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারেনি। তবে এ বইকে মলাট দিয়ে বিচার করতে গেলে নেহাতই অবিচার হবে।

আলতো ফ্লিক – এক চিলতে ক্রিকেটের গল্প
লেখক: অরিজিৎ সেন
প্রকাশক: কুবোপাখি প্রকাশন
মূল্য: ২৫০ টাকা

ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হল কি এই বিশ্বকাপে?

গতবছর অস্ট্রেলিয়ায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের সিরিজেও গ্যালারিতে মাছি তাড়ানোর লোক ছিল না ঠিক ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির পরেই। এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ভারতেও ভারত না খেললে মাঠ ভরানো দুষ্কর।

পৃথিবীর যে কোনো দলগত খেলায় বিশ্বকাপ হয় চার বছর অন্তর। দর্শকরা ওই এক-দেড় মাসের অপেক্ষায় থাকেন, খেলোয়াড়রাও আজীবন স্বপ্ন দেখেন – বিশ্বকাপে খেলব, দেশকে জেতাব, ক্রীড়াপ্রেমীদের চোখের মণি হব। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বয়স প্রায় দেড়শো বছর হলেও বিশ্বকাপটা অন্য অনেক খেলার চেয়ে নবীন। বিশ্বকাপ ফুটবল সাত বছর পরেই শতবর্ষে পড়বে, অথচ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের বয়স এখনো পঞ্চাশ হয়নি। ইতিমধ্যেই তার রমরমা কমে এল। চার বছর পরে বিশ্বকাপ হলে যে প্রতীক্ষা আর প্রত্যাশা বিশ্বকাপকে বিরাট করে তোলে তা বেশ খানিকটা লঘু করে ফেলেছে ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল, নিজেই। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি হয় এক বছর অন্তর এবং দুটো পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপের মাঝের বছরগুলোতে। ফলে সব দলকে একই প্রতিযোগিতায় খেলতে দেখার যে অভিনবত্ব তা কমে গেছে। খেলোয়াড়দের নায়ক হওয়ার সুযোগও বেড়েছে।

আমরা যারা পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট ভালবাসি, তারা বুঝতে পারি যে টেস্ট ক্রিকেটের ধাঁচে এই খেলাতেও দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর ফিরে আসা যায়। এই ধিকিধিকি জ্বলতে জ্বলতে শেষে ফেটে পড়ার রোমাঞ্চ টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে নেই। সেরা টি টোয়েন্টি ইনিংসও গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে করা দ্বিশতরানের মত মহাকাব্যিক হওয়া সম্ভব নয়, কারণ মহাকাব্য হয়ে ওঠার সময়টাই নেই ওখানে। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয়তায় একদিনের ক্রিকেট অনেক পিছিয়ে পড়েছে। তার কোনো সুরাহা এই বিশ্বকাপ করতে পারল বলে মনে হয় না।

একদিনের ক্রিকেট বা তার বিশ্বকাপ চালু হয়েছিল টেস্ট ক্রিকেট সম্পর্কে শীতল হয়ে পড়া দর্শকদের মাঠে ফেরানোর প্রয়োজনে। টি টোয়েন্টি আর তার বিশ্বকাপের জন্ম কিন্তু একদিনের ক্রিকেটে অনীহা এসে যাওয়া দর্শককে মাঠে ফেরাতে হয়নি। ২০০৭ সাল নাগাদ সারা পৃথিবীর দর্শক মোটেই একদিনের ক্রিকেট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি। সেই সমস্যা ছিল মূলত ইংল্যান্ডে, যেখানে ক্রিকেটের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রিমিয়ার লিগ ফুটবল। বস্তুত সে বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে কুড়ি ওভারের ক্রিকেট জিনিসটা ঠিক কী, তা অনেক ক্রিকেট খেলিয়ে দেশেরই খুব একটা জানা ছিল না। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড, বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া, টি টোয়েন্টি সম্পর্কে প্রথম দিকে রীতিমত অনাগ্রহী ছিল। ব্যবসায়িক সম্ভাবনার দিকটা তাদের চোখে পড়ে মহেন্দ্র সিং ধোনির দল প্রথম ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি খেতাব জিতে ফেলার পর। সেটাই কাল হল একদিনের ক্রিকেটের। ২০০৭-০৮ সালে বিসিসিআই প্রথমে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগে খেলার অপরাধে এক দল ভারতীয় ক্রিকেটারকে নির্বাসন দেয় (সেই তালিকায় অন্যতম পরিচিত নাম হল আম্বাতি রায়ুডু), পরে নিজেরাই ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ খুলে বসে। ২০১১ সালে ভারত একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপও জিতে ফেলে। সে বছর অক্টোবরে চালু হয় একদিনের ক্রিকেটে দু প্রান্ত থেকে দুটো বলে খেলার নিয়ম, টি টোয়েন্টির দেখাদেখি বাউন্ডারির দড়ি ক্রমশ ঢুকে আসতে শুরু করে মাঠের ভিতর। ব্যাট, বলের লড়াই একতরফা করে দিয়ে ছোটে রানের ফুলঝুরি আর একদিনের ক্রিকেট ক্রমশ একঘেয়ে হয়ে উঠতে থাকে।

আরও পড়ুন বিশ্বকাপে কী হবে ভুলে যান, আইপিএল দেখুন

সেই ধারায় কোনো পরিবর্তন এল কি এই বিশ্বকাপে? যে কোনো খেলায় বিশ্বকাপের কাছে সবসময় ক্রীড়াপ্রেমীদের প্রত্যাশা থাকে নতুন কিছুর – নতুন তারকা, নতুন কৌশল, খেলার দর্শনের কোনো নতুন দিক, ভবিষ্যতের নতুন দিশা। তেমন কিছু কি পাওয়া গেল? যা যা নতুন দেখা গেল সেগুলো কি খুব আশাব্যঞ্জক?

ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকায় যে একদিনের ক্রিকেট দেখতে মাঠে লোক হয় না, সে খবর অনেকদিন হল ঠোঙা হয়ে গেছে। গতবছর অস্ট্রেলিয়ায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের সিরিজেও গ্যালারিতে মাছি তাড়ানোর লোক ছিল না ঠিক ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির পরেই। এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ভারতেও ভারত না খেললে মাঠ ভরানো দুষ্কর। চেন্নাই, বেঙ্গালুরুর মত দু-একটা কেন্দ্র ছাড়া ভারত নেই অথচ গ্যালারি ভর্তি – এ দৃশ্য প্রায় দেখাই যায়নি। পৃথিবীর বৃহত্তম স্টেডিয়াম বলে ঢাকঢোল পিটিয়ে উদ্বোধিত আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামই উদ্বোধনী ম্যাচে ছিল শুনশান। একই দৃশ্য ধরমশালার মত জায়গাতেও দেখা গেছে। আরও গণ্ডগোলের ব্যাপার হল, গ্যালারি শূন্য থাকলেও যে সাইট থেকে টিকিট বিক্রি করা হয়েছে সেই সাইট দেখিয়েছে প্রায় সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। এ কি ভুল, নাকি কেলেঙ্কারি? ভারতে অবশ্য কেলেঙ্কারির যুগ অতীত। অমিত শাহ, জয় শাহদের আমলে কোনো কেলেঙ্কারি হয় না।

আরেকটা নতুন জিনিসও দেখা গেল এবার বিশ্বকাপে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বলে কিছু হয় না, হয় আয়োজকদের পছন্দের ম্যাচে নাচগান। এবারে সেই ম্যাচ ছিল ১৭ অক্টোবর আমেদাবাদে অনুষ্ঠিত ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ। সে ম্যাচের নাচগান আবার এমন স্বর্গীয় জিনিস যে টিভিতে তার সরাসরি সম্প্রচার হয় না, কেবল মাঠে যাওয়া দর্শকরা দেখতে পান। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আরও দুটো জিনিস পরিষ্কার করে দিয়েছে। প্রথমত, খেলা উপলক্ষ, মোচ্ছবই লক্ষ্য। দ্বিতীয়ত, বিশ্বকাপ মানে সব দলের সমান গুরুত্ব নয়। আয়োজক দেশ অন্যদের দয়া করে যতটা আপ্যায়ন করবে, তাতেই মানিয়ে নিতে হবে।

প্রথমটার প্রমাণ খেলার মাঝেই মাঠ অন্ধকার করে লেজার শো। ব্যাপারটা দর্শকদের জন্যে যতই আমোদের হোক, খেলোয়াড়দের জন্যে যে অসুবিধাজনক সেকথা ম্যাক্সওয়েল বলেও দিলেন দিল্লিতে নেদারল্যান্ডসে বনাম অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের পর। কিন্তু কেউ কান দিল না। লেজার শো চলছে, চলবে। নির্ঘাত ফাইনালেও হবে।

অবশ্য এখানেই চলে আসছে দ্বিতীয় ব্যাপারটা। ভারত ফাইনালে উঠেছে যখন, তখন মাঠের দর্শকদের জন্য আরেক দফা এক্সক্লুসিভ নাচগান, লেজার শো ইত্যাদি হবে হয়ত। কিন্তু রোহিত শর্মারা ফাইনালে না উঠলে কী হত? মানে আয়োজক ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড কি সব দলের ম্যাচ নিয়ে সমান উৎসাহী ছিল এই বিশ্বকাপে? বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেলে যে কোনো দেশকে নিয়ামক সংস্থার সঙ্গে একটা চুক্তি স্বাক্ষর করতে হয়, ভারতীয় বোর্ডও করেছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী কেবল বিভিন্ন দেশের দল নয়, সে দেশের সাংবাদিক এবং ক্রীড়াপ্রেমীদের সহজে ভিসা দেওয়া, খেলার টিকিটের ব্যবস্থা ইত্যাদি করতে হয়। এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ভারতীয় বোর্ড সেসবের তোয়াক্কা করেনি। ফলে বহু দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা আসতেই পারেননি। কর্তারা, প্রাক্তন ক্রিকেটাররা এবং দিশি ক্রিকেটভক্তরা অবশ্য উল্লসিত গ্যালারিতে নীল সমুদ্র তৈরি হচ্ছে বলে। বাড়তি উল্লাসের কারণ, পাকিস্তানের অতি অল্প সংখ্যক সাংবাদিককে ভিসা দেওয়া হয়েছিল। অনেক সমর্থক এবং সাংবাদিক এসে পৌঁছন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হয়ে যাওয়ার পরে। পাকিস্তানিদের অপছন্দ হওয়ায় এই ব্যবস্থায় অনেকেই খুশি। মুশকিল হল, আগামী বিশ্বকাপগুলোতে কোনো আয়োজক দেশের যদি ভারতীয়দের অপছন্দ হয়, তখন এরকম ব্যবহারের প্রতিবাদ করলে তারা পাত্তা দেবে না।

নিজের দেশের ক্রিকেটারদের মত অন্য দেশের ক্রিকেটারদের ভাল খেলাতেও আনন্দ পাওয়া এবং বাহবা দেওয়ার সংস্কৃতি সংকুচিত হয়ে ভারতীয় দর্শকদের মধ্যে যে একচোখা উগ্রতা এসে পড়েছে তারও একাধিক নিদর্শন এবারের বিশ্বকাপে দেখা গেছে। ভারতীয় ব্যাটার চার, ছয় মারলে গ্যালারি উত্তাল আর বিপক্ষের ব্যাটার মারলে পিন পতনের স্তব্ধতা অনেকদিনই নিয়ম হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মত দুর্বল দলের সমর্থকের প্রতিও গ্যালারিতে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার দৃশ্য নতুন। এতেও অসুবিধা একটাই। এই দৃষ্টান্ত অন্যেরা অনুসরণ করলে কী হবে? ভবিষ্যতের বিশ্বকাপগুলো কি খুব আনন্দের হবে সেক্ষেত্রে?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

নজরুলকে নিয়ে রহমানাতঙ্ক: বাঙালি সংস্কৃতি কারে কয়?

বাঙালির সংস্কৃতির পিণ্ডি যে বাঙালিই সবচেয়ে বেশি চটকাচ্ছে সেটা খেয়াল করুন, তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করুন। নইলে অন্যদের আক্রমণ আটকাবেন কী করে? ভেবে দেখুন তো, পাড়ায় পাড়ায় মে-জুন মাসে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা (কোথাও কোথাও জুড়ে যেতেন সুকান্তও) বন্ধ হয়ে গেছে কতদিন হল?

নজরুল
ছবি পিনটারেস্ট থেকে

ক্যালেন্ডার বলছে ফেব্রুয়ারি মাস আসতে এখনো ঢের দেরি, বৈশাখ মাস তো আরও দূরে। এবার বাঙালি ভাবাবেগ (আজকাল বাঙালিরা হিন্দিভাষী নেতাদের বক্তৃতা শুনে শুনে যেটাকে ‘অস্মিতা’ বলে আর কি) মরসুম অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। কোনো সন্দেহ নেই যে প্রায় এক দশক ধরে সঙ্ঘ পরিবারের হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান প্রকল্পের প্রকাশ্য ও গোপন আক্রমণ বাঙালি জাতির উপর চলছে। ফলে সাংস্কৃতিকভাবে আক্রান্ত জাতির মধ্যে যেসব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির মধ্যেও সেসব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার উৎসাহ হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া বিশেষ কারোর মধ্যে দেখা যায় না। না, একটু ভুল হল। সোশাল মিডিয়া খুললে মনে হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিই লড়ার জন্যে কোমর বেঁধে তৈরি। কিন্তু লড়তে গেলে ঠিক কী যে করতে হবে তার কোনো নীল নকশা কারোর কাছে নেই। যারা কিঞ্চিৎ সংগঠিত তারা ঠিক করেছে হিন্দিভাষী মানুষকে ধমকানো চমকানোই একমাত্র রাস্তা। তার বাইরে যে কয়েকজনের মাথায় দু-একটা পরিকল্পনা আছে, তাদের সঙ্গ দিতে গেলে নিজের জীবনচর্যায় বেশকিছু পরিবর্তন আনতে হবে, বেশকিছু ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অধিকাংশ বাঙালি সেসব করতে তৈরি নয়। না করার একগুচ্ছ অজুহাতও পকেটে বা হাতব্যাগে সবসময় থাকে। বলামাত্রই বার করে ফেলে। এদিকে সোজাসুজি “পারব না বাপু বাঙালিয়ানা করতে। অনেক কাজ আছে” বলে হাত ঝেড়ে ফেলার ক্ষমতাও নেই। কারণ কতকগুলো বিগ্রহ বাড়িতে এবং/অথবা জীবনে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন গুরুজনেরা। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক ইত্যাদি। বিগ্রহগুলোর নিয়মিত পুজো করতে হয়, নইলে মনে পাপবোধ তৈরি হয়। কিন্তু বিগ্রহের তো চর্চা বলে কিছু হয় না। ফলে যে সংস্কৃতি বিগ্রহনির্ভর তার চর্চা বলে কিছু থাকা সম্ভব নয়, আর যে সংস্কৃতির চর্চা নেই তাকে শেষ করতে বেশি শক্তির প্রয়োজন হয় না। তাই হিন্দি সাম্রাজ্যবাদও প্রায় ফাঁকা মাঠে জিতে যাচ্ছে। বাঙালি কী করছে? অবাঙালিদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে। যদি বাঙালি সংস্কৃতি মানে রবীন্দ্র-নজরুল সংস্কৃতি হয়, তাহলে এই প্রবণতা সেই সংস্কৃতির ঠিক উলটো পিঠ।

হ্যাঁ, আল্লারাখা রহমান সুরারোপিত ‘কারার ওই লৌহকপাট’ গানের সূত্রেই এত কথা বলছি। প্রথম চোটে গোটা ১৫ সেকেন্ড শুনে বন্ধ করে দিয়েছিলাম ভাল লাগছিল না বলে। কিন্তু ওই গান এবং তা নিয়ে বাঙালির প্রতিক্রিয়া সংবাদ হয়ে উঠেছে আর কোনো ওয়েবসাইট যা সংবাদ তাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। ফলে লিখতে হবে, তাই শুনতে হল। অন্য অনেকের মত আমার কানেও মোটেই সুবিধের লাগল না। রহমান মহান শিল্পী, কিন্তু তাঁর সুরারোপিত কিছু হিন্দি গান আছে যেগুলো শুনলে মনে হয় তিনি কথাগুলোকে ঠিক সামলে উঠতে পারেননি, তাই কিছু অর্থহীন ধ্বনি ঢুকিয়ে দিয়ে ছেঁড়া মশারিতে তালি মেরেছেন (স্বদেশ ছবির ‘ইয়ে যো দেস হ্যায় তেরা’, লগান ছবির ‘কোঈ হম সে জিত ন পাওয়ে’ স্মর্তব্য)। এই গান শুনেও তেমনটাই মনে হল। আরও বড় গোলমাল হল, কথা যাচ্ছে লন্ডন আর সুর যাচ্ছে টোকিও। নজরুলের গানের কথায় বিদ্রোহে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রবল উদ্যম এবং গনগনে রাগ আছে।

কিন্তু রহমানের সুর শুনলে মনে হচ্ছে এ গান ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’ জাতীয় আনন্দের গান। সবাই মিলে বেশ নেচেকুঁদে নেওয়া যায় এই গান শুনতে শুনতে। যাঁরা গেয়েছেন তাঁদের হাসি হাসি মুখগুলোও যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল। ফলে জ্ঞানত এই সুরারোপকে ব্যর্থ বলা ছাড়া উপায় নেই। সুরকার এবং তাঁর গায়েনরা গানের কথাগুলো বুঝে উঠতে পারেননি বলে সন্দেহ হয়।

গান ভাল না লাগলে নিন্দা করার অধিকার মানুষের জন্মগত, ভাল লাগলে প্রশংসা করার অধিকারের মতই। সুতরাং যখন কোনো শিল্পী নিজের কাজ জনসমক্ষে নিয়ে আসেন তখন তাঁকে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্যে তৈরি থাকতে হয়। নইলে অবস্থা হয় বিবেক অগ্নিহোত্রীর মত। ছবি ফ্লপ হলে বলতে হয়, গীতার চেয়ে তো প্লেবয় বেশি বিক্রি হয়। তা বলে কি গীতাকে ফ্লপ বলব? কিন্তু অমুক গান আমার ভাল লাগেনি বলা এক জিনিস, আর অমুক গান তৈরি করাই অনুচিত হয়েছে, নজরুলকে অপমান করা হয়েছে, বাঙালি জাতিকে অপমান করা হয়েছে, অবাঙালি বলেই এমন করতে পারল, বাঙালিরা কিছু বলে না বলে… ইত্যাদি চেঁচামেচি করা আরেক জিনিস। এই কোলাহল কিছুদূর পর্যন্ত স্রেফ হাস্যকর, তারপর ক্ষতিকর। ইতিমধ্যেই এত বেশি ধুলো ওড়ানো হয়েছে যে পিপ্পা ছবির নির্মাতারা বিবৃতি দিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। সেই বিবৃতিতে অবশ্য একটি মোক্ষম কথা বলা হয়েছে “আমাদের উদ্দেশ্য ছিল আমাদের চুক্তির শর্তাবলী অনুযায়ী গানটির সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে শ্রদ্ধা জানানো, যে চুক্তি আমাদের গানের কথাগুলিকে নতুন নির্মাণে ব্যবহার করার অধিকার দিয়েছিল” (Our intent was to pay homage to the cultural significance of the song while adhering to the terms set forth in our agreement, which permitted us to use the lyrics with a new composition)।

বিবৃতিতে প্রকাশ, চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন নজরুলের পুত্রবধূ প্রয়াত কল্যাণী কাজী এবং পৌত্র অনির্বাণ কাজী। এখন বাঙালির আবেগের বিস্ফোরণ দেখে অনির্বাণ এবং তাঁর ভাইবোনেরা আমতা আমতা করছেন। জল্পনা চলছে ‘পরিবারেরই ভুলে কি বিকৃতি নজরুল-গীতে?’ কবির পরিবারের সদস্যরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এই দায় ঝেড়ে ফেলতে। গোটা দুনিয়ার বাঙালির চোখে তাঁরা এখন অভিযুক্ত। অপরাধ কী? না নজরুলের রচিত একটি গানকে অন্য সুরে গাওয়ার অনুমতি দিয়ে ফেলেছেন। এখন নজরুলের নাতনি খিলখিল কাজীকেও বলতে হচ্ছে “যা হয়েছে তা শুধু নজরুল ইসলামকে নয়, বাংলা সংস্কৃতি, বাঙালি জাতিকে অপমান!”

কী হয়েছে? না নজরুলের একটি একদা জনপ্রিয় গানকে অন্যরকম সুরে গাওয়া হয়েছে এবং সে সুর বাঙালির পছন্দ হয়নি। এতদ্বারা বাঙালি দুনিয়াসুদ্ধ লোককে জানিয়ে দিল, নজরুলের গান বেদ, কোরান, বাইবেল বা আবেস্তার মত একটি অপরিবর্তনীয় বস্তু। এদিক ওদিক করলে মহাপাতক হয়। এ স্রেফ শিল্প নয়, যে তুমি পুনর্নির্মাণ করবে। চুক্তি-টুক্তিতে চিঁড়ে ভিজবে না। কপিরাইট আইনকে মারো গুলি। আমাদের বিগ্রহের লেখা গান আমাদের সবার সম্পত্তি। দেশের আইন যা-ই বলুক। আবেগের কাছে আইন, শিল্পের ইতিহাস – এসবের আবার কোনো দাম আছে নাকি? ঠিক যেমন ইতিহাসে রামের অস্তিত্ব থাক আর না-ই থাক, আমাদের আবেগ যখন বলছে ওখানে রাম জন্মেছিলেন, তখন মন্দির ওয়হি বনায়েঙ্গে।

নজরুলের প্রতি অন্যায় করা হল বলে যারা চোখের জল ধরে রাখতে পারছে না, তারা খেয়ালও করছে না, একজন শিল্পীর প্রতি সবচেয়ে বড় অন্যায় হল তাঁর কপিরাইটকে সম্মান না করা। স্লোগান সকলের সম্পত্তি, গান অবশ্যই শিল্পীর একার। কারণ তিনি একাই তা সৃষ্টি করেন। ‘কারার ওই লৌহকপাট’-এর মত মহান সৃষ্টির পিছনে যে পরিশ্রম এবং যন্ত্রণা থাকে তার তুলনা একমাত্র প্রসববেদনা। ও জিনিসের ভাগ হয় না। শিশুকে যে যতই আদর করুক, সে একমাত্র তার মায়ের সন্তান। মায়ের মৃত্যুর পরেও। একজন শিল্পী অন্য এক শিল্পীর কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে তা নিয়ে নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাতেই পারেন। সফল হলে প্রশংসা করা আর বিফল হলে নিন্দা করার বেশি অধিকার শ্রোতা, দর্শক বা পাঠকের নেই। যা করা হয়েছে তা শিল্প হিসাবে ভাল-খারাপ ছাড়িয়ে ক্ষতিকর মনে হলে অন্যকে সে কথা বলতে পারেন, পয়সা দিয়ে ও জিনিসের পৃষ্ঠপোষকতা করা থেকে নিরস্ত করার চেষ্টা করতে পারেন। ব্যাস।

এরপরেও একটা কথা আছে। সারা পৃথিবীতে প্রতিবাদী শিল্পের যে ধারা (protest art), তাতে অনেক সময় কোনো গানের রচয়িতা খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ে, অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থেই সেই গানটা সকলের হয়ে যায়। সে গানের অসংখ্য সংস্করণ তৈরি হয়ে যায়। নজরুলের গানের যে পবিত্রতা নষ্ট হয়েছে বলে হাত-পা ছোড়া হচ্ছে, সেই পবিত্রতা তখন চুলোয় যায়। সেখানেই গানটার সাফল্য। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ আর ‘বেলা চাও’। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় এই গানদুটোর নানা রূপ। সাধারণত দেখা যায় সুর এক আছে, কথা পালটে গেছে। কেবল বাংলা ভাষাতেই ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ গানের অন্তত দুটো রূপ (‘আমরা করব জয়’, ‘একদিন সূর্যের ভোর’) পাওয়া যায়। এ যদি অন্যায় না হয়, তাহলে সুর বদল হলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? নাকি রাগের কারণ আসলে একটা আশঙ্কা, যে নজরুলের উপর আমাদের মৌরসি পাট্টা নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি আর কেবল বাঙালির থাকবেন না?

তার মানে! যে যেমন ইচ্ছা আমাদের সংস্কৃতির পিণ্ডি চটকাবে আর বাঙালি চুপচাপ বসে দেখবে?

তা কেন? বাঙালির সংস্কৃতির পিণ্ডি যে বাঙালিই সবচেয়ে বেশি চটকাচ্ছে সেটা খেয়াল করুন, তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করুন। নইলে অন্যদের আক্রমণ আটকাবেন কী করে? ভেবে দেখুন তো, পাড়ায় পাড়ায় মে-জুন মাসে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা (কোথাও কোথাও জুড়ে যেতেন সুকান্তও) বন্ধ হয়ে গেছে কতদিন হল? ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নজরুলের ‘ঝিঙে ফুল’ কবিতাটা জানে? বাবুদের তালপুকুরে হাবুদের ডালকুকুরে কী কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছিল সে খবর আজকালকার কনভেন্ট শিক্ষিত, সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসাবে হিন্দি পড়া ছেলেমেয়েদের জানানোর জন্যে কী উদ্যোগ নিচ্ছে নজরুলপ্রেমী বাঙালি সমাজ? গোঁফের রেখা ওঠা ছেলেরা আর মেয়ে থেকে মহিলা হয়ে ওঠার পথে পা বাড়ানো মেয়েরা এখনো ‘বিদ্রোহী’ বা ‘আমার কৈফিয়ৎ’ পড়ছে? মেগা সিরিয়াল থেকে শুরু করে রাস্তার সিগনাল – সর্বত্র রবীন্দ্রসঙ্গীত তো বাজছে, নজরুলগীতি গাওয়া হয় কটা জায়গায়?

মেগা সিরিয়াল বলতে খেয়াল হল – কেবল আবহসঙ্গীতে নয়, মেগায় যে পরিস্থিতির সঙ্গে লাগসই আস্ত হিন্দি ছবির গান বাজানো হয় তাতে হিন্দি আগ্রাসন দেখতে পান না? কোনো প্রতিবাদ হয়? মহিলা পুরুত দিয়ে করানো প্রগতিশীল বাঙালির বিয়েতে বর-কনের শেরওয়ানি আর ঘাগরা কি বাঙালি সংস্কৃতির পিণ্ডি চটকায় না? কোন এ আর রহমান এসে বাঙালি মেয়েদের মাথায় বন্দুকে ঠেকিয়ে বিয়ের আগে মেহেন্দি অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলক করে তুলেছেন? ধনতেরাস উপলক্ষে ঝাঁটা না কিনলে মানসম্মান থাকছে না বাঙালি সংস্কৃতির কোন ধারা অনুযায়ী?

এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে সোশাল মিডিয়ায় রে রে করে কোনো শিল্পীর দিকে তেড়ে যাওয়া অনেক সহজ। তাতে অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ, নিজের সংস্কৃতি বাঁচাতে লড়াই করার আনন্দ পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের ক্ষেত্রে আবার উপরি পাওনা বিগ্রহের মান বাঁচাতে লড়াই করার আনন্দ। ধর্মান্ধরা কোনোদিনই বোঝে না যে তাদের দেবতা তাদের চেয়ে অনেক বড়। তিনি নিজেকে নিজেই বাঁচাতে পারেন, চুনোপুঁটি ভক্তদের মুখাপেক্ষী নন। সাংস্কৃতিক বিগ্রহের পূজারী বাঙালিও বোঝে না, রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল এত সামান্য শিল্পী নন যে তাঁদের বাঁচাতে হবে। ১৯৯১ সালে যখন আইন মোতাবেক রবীন্দ্রনাথের কপিরাইট উঠে যাওয়ার কথা ছিল, তখন কেবল বিশ্বভারতী নয়, প্রায় সমস্ত শিক্ষিত (ডিগ্রিধারী অর্থে) বাঙালি গেল গেল রব তুলেছিল। কপিরাইট উঠে গেলেই নাকি সর্বনাশ হয়ে যাবে। রবীন্দ্রনাথের গানের সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দেবে লোকে, লেখাগুলোর কী যেন একটা ভয়ঙ্কর ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেবার এত দাপাদাপি শুরু হল যে ভারতের সংসদ দেশের আইন পরিবর্তন করে ফেলল। কপিরাইটের মেয়াদ ছিল স্রষ্টার মৃত্যুর ৫০ বছর পর পর্যন্ত। তা বাড়িয়ে করা হল ৬০ বছর পর পর্যন্ত। শেষমেশ ২০০১ সালে রবীন্দ্রনাথের লেখাপত্র কপিরাইটের আওতার বাইরে এসেছে। গত ২২ বছরে বিশ্বভারতী ছাড়া রবীন্দ্রনাথের আর কোন সৃষ্টি তিনি যেমন ছেড়ে গিয়েছিলেন তার চেয়ে নিকৃষ্ট মানের হয়ে গেছে? একথা ঠিক, আজকাল একেকজন এত বাজনা সহযোগে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে থাকেন যে গান ছাড়া আর সবকিছু শোনা যায়। কেউ আবার কালোয়াতি করে বোঝাতে চান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তিনি একজন ওস্তাদ। কেউ বা বাহাদুরি করে মাঝখান থেকে গান শুরু করেন। কিন্তু তাতে কী? যার যেমন রুচি সে তেমনই শোনে। যার যেটা ভাল লাগে না, সে সেটা শোনে না। এসবে গীতিকার রবীন্দ্রনাথের কী ক্ষতি হয়েছে?

প্রগতিশীল বাঙালিরা নিজস্ব দেবতাকুল বানিয়ে নিয়েছেন, তাতে নতুন নতুন বিগ্রহও যোগ করে যাচ্ছেন। গত বিশ বছরে যোগ হওয়া এক বিগ্রহের নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ। তিনি কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে একটা পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেছিলেন টিভির জন্যে (প্রযোজকদের সঙ্গে গোলমালে নাকি সে কাজে শেষ পর্যন্ত থাকেননি)। শাশুড়ি-বউমার কোন্দল আর এক পুরুষের দুই নারী ছকের বাইরে সে ছিল এক ব্যতিক্রমী মেগা সিরিয়াল – গানের ওপারে। রবীন্দ্রনাথকে যারা বিগ্রহ বানিয়ে রাখে তাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আধুনিকীকরণের দ্বন্দ্ব ছিল সেই সিরিয়ালের মূল উপজীব্য। সেখানে বেশকিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত এমনভাবে গাওয়া হয়েছিল যা অভ্যস্ত কানে মোটেই সইবে না।

তাতে রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়ত সমৃদ্ধ হয়নি, কিন্তু দরিদ্রতর হয়ে গিয়েছিল এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঋতুপর্ণকেও আজ আর সে কাজের জন্যে কেউ রহমানের মত আক্রমণ করে না। তখন যারা করেছিল তারাও ক্ষমা করে দিয়েছে। সে কি তিনি বাঙালি বলে, নাকি তিনি নিজেই বিগ্রহে পরিণত হয়েছেন বলে?

আরও পড়ুন সলিল চৌধুরী স্মরণে একটি মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যা

মজা হল, বাঙালির এই শতকের বিগ্রহরা কেউ বাংলার সঙ্গে হিন্দি, ইংরিজির মিশেল ছাড়া চলতে পারেন না। সৌরভ গাঙ্গুলির মুখের ভাষা শুনলেই টের পাওয়া যায়। বাংলা ভাষার সাংবাদিকতায় বিগ্রহ হতে চলা গৌতম ভট্টাচার্যের একটি বই প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। তার নাম আবার বিশ্বকাপ তুঝে সেলাম। এসবে তাঁদের কারোর জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়ছে না, কেউ বাংলার সংস্কৃতির সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করছে না। যত দোষ এ আর রহমানের। যেহেতু তিনি বাঙালি নন, যেহেতু আক্রমণকারী বনাম আক্রান্তের বয়ান খাড়া করার পক্ষে ব্যাপারটা সুবিধাজনক।

ব্যর্থ শিল্পপ্রচেষ্টাকে ব্যর্থ বলে বুঝে নিয়ে অন্য জিনিসে মন দেওয়ার নির্লিপ্তি না থাকলে, শিল্পে পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পর্কে অনমনীয় হলে যা হয়, পশ্চিমবঙ্গে ঠিক তাই হচ্ছে। গড়ে উঠেছে পুনরাবৃত্তির সংস্কৃতি। সাহিত্য ভূতে, গোঁজামিল ইতিহাসে আর রহস্য রোমাঞ্চে ছয়লাপ। কারণ ‘ওটা পাবলিক খায়’। সিনেমার বড় অংশ জনপ্রিয় গোয়েন্দা গল্পের চলচ্চিত্রায়ন। তাও আবার একই গল্পকে একবার, দুবার, তিনবার পর্দায় আনা হচ্ছে। আরেকটা অংশ? এই শতকের প্রথম দিকে চলছিল দক্ষিণ ভারতীয় ছবির পুনরাবৃত্তি, তারপর থেকে চলছে পুরনো জনপ্রিয় বাংলা ছবির পুনরাবৃত্তি। পুনর্নির্মাণ বলা যাবে না। কারণ এসব ছবি মূল বয়ানে নতুন কিছু যোগ করে না, কোনো নতুন ব্যাখ্যা দেয় না।

এরই পিছু পিছু এসে পড়েছে জেরক্স সংস্কৃতি।

‘অপরাজিত ছবিটা দারুণ হয়েছে।’

কেন? না সত্যজিৎ রায়ের চরিত্রে যে অভিনয় করেছে তাকে দেখতে অবিকল সত্যজিতের মত। পথের পাঁচালীর দৃশ্যগুলো একেবারে পথের পাঁচালীর মত। এদিকে পরিচালক অনীক দত্ত সাহস করে চরিত্রের নামটাই সত্যজিৎ রাখতে পারেননি, সে চরিত্রের তৈরি পুরস্কৃত ছবির নামও করে দিয়েছেন পথের পদাবলী।

‘মৃণাল সেনের বায়োপিকটা দারুণ হবে।’

কেন? না টিজারে দেখা গেছে মৃণালের চরিত্রাভিনেতাকে অবিকল তাঁর মত দেখাচ্ছে।

নির্দেশকরা কেনই বা এই ছকের বাইরে যেতে যাবেন? ছক ভাঙতে গিয়ে রহমানাতঙ্কের মত কিছুর কবলে পড়ার ঝুঁকি কে নেবে বাপু?

বাঙালি সংস্কৃতিকে এই বিষচক্র থেকে এবং হিন্দি, ইংরেজি ইত্যাদি আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে পারে একমাত্র বাঙালি। কিন্তু তা করতে হলে রহমানাতঙ্ক কাটিয়ে উঠে বাঙালি সংস্কৃতি জিনিসটা ঠিক কী সে প্রশ্ন তুলতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির একদা সভাপতি তথাগত রায়, সোশাল মিডিয়ায় হিন্দি আগ্রাসনবিরোধী বাঙালির বাপ বাপান্ত করাই ইদানীং যাঁর জীবনের ব্রত, প্রায়ই মন্তব্য করেন যে বাঙালির সর্বনাশ করেছে ‘রসুন’ সংস্কৃতি। অর্থাৎ রবীন্দ্র-সুকান্ত-নজরুল। তৃতীয়জনকে নিয়ে তথাগতবাবুর আপত্তির কারণ অতি সহজবোধ্য আর বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসাবে সুকান্ত ভট্টাচার্যের স্থান আদৌ রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের পাশে নয়। তাই ও নিয়ে আলোচনা করা সময় নষ্ট। কিন্তু বাকি দুজন যে বাঙালি সংস্কৃতির অনেকখানি তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। আরএসএসের দীক্ষায় দীক্ষিত তথাগতবাবুর ওই দুজনকে প্রবল অপছন্দ প্রমাণ করে তাঁরা স্রেফ শৈল্পিক উৎকর্ষে নয়, সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবনায় এবং কার্যকলাপেও যথার্থ মানবতাবাদী, অতএব প্রয়োজনীয়। কথা হল, ওঁদের নিয়ে আমাদের যে উথাল পাথাল আবেগ প্রকাশ পায় ক্ষণে ক্ষণে, তা কি খাঁটি? যদি খাঁটি হয়, তাহলে সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারে লাইন দিয়ে অযোধ্যার রামমন্দিরের আদলে তৈরি প্যান্ডেল দেখতে গিয়েছিল কারা? যারা নজরুলের অপমান নিয়ে বেজায় উত্তেজিত তাদেরই ভাই বেরাদররা তো। রহমানের বিরুদ্ধে বিবৃতি, ফেসবুক পোস্ট, আইনি ব্যবস্থার হুমকি কত কী দেওয়া হচ্ছে এখন। বিখ্যাতরাও দিচ্ছেন। তখন এত প্রতিবাদ ছিল কোথায়? নাকি রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের গান, কবিতাই কেবল বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ; তাঁদের সামাজিক, রাজনৈতিক ভাবনা নয়, জীবনচর্যাও নয়?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ইতিহাসের হদ্দমুদ্দ ও আধসেদ্ধ মার্কসবাদে চিঁড়েচ্যাপটা ব্যোমকেশ

ইদানীং পশ্চিমবাংলার সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে প্রবল ইতিহাসপ্রীতি তৈরি হয়েছে। ফলে ইতিহাসাশ্রিত গল্প, উপন্যাস, ছায়াছবি, ওয়েব সিরিজের আধিক্য। ইতিহাসের প্রেমে গুণী বাঙালিরা এতই ডগমগ যে গোয়েন্দা কাহিনি নিয়ে ছবিও তৈরি করা হচ্ছে পিরিয়ড পিস হিসাবে। সেই কাহিনিগুলির মধ্যে আবার পরিচালকদের বিশেষ পছন্দ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বক্সীকে। ইতিহাস শরদিন্দুর অতি প্রিয় লেখার বিষয়। একাধিক ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন, ঐতিহাসিক গল্পও লিখেছেন অনেকগুলি। ব্যোমকেশের গল্প, উপন্যাসেও ইতিহাস টেনে এনেছেন অনেক জায়গাতেই। তেমনই একটি উপন্যাস দুর্গরহস্য। টালিগঞ্জ পাড়ার রাঘব বোয়ালদের ইতিহাসপ্রীতি ও গোয়েন্দাপ্রীতির ঠ্যালায় একই বছরে সেই দুর্গরহস্য নিয়ে দু-দুটো ছবি (একটি বড় পর্দার জন্যে, অন্যটি ওয়েব সিরিজ হিসাবে) তৈরি হয়ে গেল। ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে বাংলা ছবির যা অবস্থা তাতে দিবাকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী (২০১৫) ছবির মত নিখুঁত সেট তৈরি করে যে সময়কাল দেখানো হচ্ছে তখনকার কলকাতা শহর বানিয়ে ফেলা অসম্ভব। কারণ অত রেস্ত নেই। তা সত্ত্বেও টালিগঞ্জের অকুতোভয় পরিচালকরা পিরিয়ড পিস বানিয়ে চলেছেন। ব্যাপারটি খুবই প্রশংসাযোগ্য হতে পারত, যদি ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে গেলে ইতিহাস যে মন দিয়ে পড়তেও হয় – একথা তাঁরা মাথায় রাখতেন। সচরাচর রাখেন না, হইচই অ্যাপে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত দুর্গ রহস্য (উপন্যাসের নামটিকে দুই শব্দে ভাঙার নিশ্চয়ই কোনো গূঢ় তাৎপর্য আছে যা প্রাজ্ঞ দর্শক ধরে ফেলবেন) ওয়েব সিরিজের পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ও রাখেননি।

শিল্পীর স্বাধীনতা প্রয়োগ করে উপন্যাসের ঘটনাবলীকে তিনি বিশ শতকের প্রথমার্ধের বদলে ছয়ের দশকে স্থাপন করেছেন, যখন পশ্চিমবঙ্গ তথা সাঁওতাল পরগণায় নকশালবাড়ি আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে অসুবিধা ছিল না, গোলমাল বেধেছে যেখানে উপন্যাসের অনুসরণেই সিপাহী বিদ্রোহ দেখানো হয়। সেই অংশে দুর্গ দখল করে নেওয়া সিপাহীদের দলের নেতা এক বাঙালি। ইতিহাস বলছে ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের হাত দিয়ে শুরু হয়ে থাকলেও বাংলায় সিপাহী বিদ্রোহ বিশেষ প্রভাব ফেলেনি। তবু শিল্পীর স্বাধীনতার খাতিরে বাঙালি নেতাকে না হয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু সেই নেতা ১৮৫৭ সালে বসে “বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক” বলেন কী করে? একথা সর্বজনবিদিত যে ওই স্লোগানটির উৎস ফরাসী বিপ্লবের ‘ভিভা লা রেভল্যুসিওন’। ওই স্লোগান ভারতে এসে হসরত মোহানির কল্যাণে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-এ পরিণত হয় বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ভারতীয় বামপন্থীদের লব্জে। আর সব স্লোগানের মতই ওই স্লোগানকে জনপ্রিয় করে তোলায় অনেকের ভূমিকা আছে, যাঁদের মধ্যে ভগৎ সিংও একজন। বাংলা ভাষায় ওই স্লোগান নিজস্ব চেহারা পেয়েছে হয় একই সময়ে অথবা আরও পরে। সিপাহী বিদ্রোহ তো এসবের ৭০-৮০ বছর আগেকার কথা। সেই বিদ্রোহের নেতার মুখে “বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক” স্লোগান মেনে নেওয়া যায় বামপন্থীদের ব্যঙ্গ করে তৈরি কোনো ওয়েব সিরিজে, পিরিয়ড পিসে নয়।

পরিচালক শুধু ইতিহাসের হদ্দমুদ্দ করলেও কথা ছিল, এই স্লোগানটি ব্যবহার করে তিনি রাজনীতিরও সাড়ে বারোটা বাজিয়েছেন। কারণ কোনো মতের ঐতিহাসিকই সিপাহী বিদ্রোহের কোনো বিপ্লবী উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে করেননি। জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন “এই সিদ্ধান্ত এড়ানো শক্ত যে তথাকথিত প্রথম জাতীয় স্বাধীনতার যুদ্ধ না প্রথম, না জাতীয়, না স্বাধীনতার যুদ্ধ।” [ভাষান্তর আমার] রমেশচন্দ্রের ইতিহাস পাঠ অবশ্য মার্কসবাদীদের সঙ্গে মেলে না, আর সৃজিত এই ছবিতে প্রবল মার্কসবাদী (হয়ত মৃণাল সেনের বায়োপিক তৈরির মহড়া হিসাবে)। কিন্তু মার্কসবাদী হলে তো ‘বিদ্রোহ’ আর ‘বিপ্লব’ শব্দদুটির অর্থগত ফারাক বোঝা উচিত। বিশেষত মার্কসবাদীরা বিপ্লব বলতে যা বোঝেন তার সঙ্গে সিপাহী বিদ্রোহের লক্ষ্য যে একেবারেই মেলে না, সেকথা বোঝাও খুব শক্ত নয়। সিপাহী বিদ্রোহের নেতৃবৃন্দ ছিলেন লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতির ফলে শাসনক্ষমতা হারানো বা কোণঠাসা হয়ে যাওয়া রাজন্যবর্গ। ওই বিদ্রোহের অন্যতম ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে স্বমহিমায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। স্কুলপাঠ্য ইতিহাস বইয়ের এই তথ্যগুলি জানলেও বোধহয় নকশাল আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল পরিচালক ওই স্লোগান সিপাহীদের মুখে বসাতেন না। পড়াশোনা করার সময় না থাকলে সত্যজিৎ রায়ের শতরঞ্জ কে খিলাড়ি (১৯৭৭) ছবিটা দেখে নিলেও চলত। সত্যজিৎ অ্যানিমেশন ব্যবহার করে প্রায় শিশুদের বোঝার যোগ্য করে ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি এবং তার ফলাফল বুঝিয়েছেন। কোথায় ইংরেজদের তাড়িয়ে দেশিয় রাজন্যবর্গের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার বিদ্রোহ আর কোথায় জোতদার জমিদার উচ্ছেদ করতে, ভারতে সমাজবিপ্লব আনতে নকশালবাড়ি আন্দোলন!

অবশ্য এই ওয়েব সিরিজের পরিচালক সত্যজিতের ছবি দেখতে যাবেন কোন দুঃখে? তিনি তো গোড়াতেই বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তিনি সত্যজিতের প্রতিস্পর্ধী। তাঁর ব্যোমকেশও (অনির্বাণ ভট্টাচার্য) স্বয়ং উত্তমকুমারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ তার গিন্নী সত্যবতী (সোহিনী সরকার) আর বন্ধু অজিতকে নিয়ে চিড়িয়াখানা (১৯৬৭) ছবিটি দেখতে গেছে। তারপর অজিত (রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জি) বেরিয়ে এসেই রেগেমেগে ঘোষণা করে দেয় যে সে আর কোনোদিন সত্যজিৎ, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ – কাউকেই ব্যোমকেশ নিয়ে ছবি করতে দেবে না। কারণ সত্যজিৎ ব্যোমকেশকে চশমা পরিয়েছেন। এতদ্বারা সৃজিত আগের সবকটি সিজনের চশমা পরা ব্যোমকেশ অনির্বাণের চশমা হরণের একটি যুক্তি খাড়া করলেন (এত বকবকানির পরেও একটি বাহারি রোদচশমা কিন্তু পরানো হয়েছে)। এই কর্মটি ছাড়া, আর অনির্বাণকে উত্তমকুমারের সঙ্গে এক ফ্রেমে দাঁড় করিয়ে বাঙালির নস্ট্যালজিয়ায় সুড়সুড়ি দেওয়া ছাড়া, ওই দৃশ্যের আর যে কী সার্থকতা তা ছটি পর্বের আগাপাশতলা দেখেও বোঝা গেল না। পরিচালকের কেন যে মনে হল বাংলা ছবির প্রবাদপ্রতিম পরিচালকদের একালের লোকেদের মত গোয়েন্দা গল্প নিয়ে ছবি করার উৎসাহ ছিল – তাও বোঝা শক্ত। ইতিহাস তো বলছে সত্যজিৎ চিড়িয়াখানা ছবিটিও বানিয়েছিলেন তাঁর ইউনিটের দীর্ঘকালীন সহকর্মীরা বিপদে পড়ে গিয়েছিলেন বলে। এমনকি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে বলতে শুনেছি, জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৯) ছবিটিও সত্যজিৎ করেছিলেন বিশেষ প্রয়োজনে। একমাত্র সোনার কেল্লা (১৯৭৪)-ই ভালবেসে তৈরি করা। ইতিহাসের কথা আর না বাড়ানোই ভাল, কারণ ওটি কোনোকালেই সৃজিতের জোরের জায়গা নয়। অনতি অতীতে দার্জিলিং দেখাতে গিয়ে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের ভুল পতাকা দেখিয়ে ফেলেছিলেন, আটের দশকের কলকাতা বিমানবন্দরে ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়ার পোস্টার দেখিয়েছিলেন। গুমনামী নামের আস্ত ছবিটিই তো অনুজ ধর নামক এক ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিককে ঐতিহাসিক বানিয়ে করা। পরে সত্যিকারের ঐতিহাসিক সুগত বসুর মুখোমুখি হয়ে ছবির ইতিহাসের দিকটি সম্পর্কে উত্তর দিতে গিয়ে সৃজিত বিস্তর খাবি খেয়েছিলেন। অতএব এই ওয়েব সিরিজের অন্য দিকগুলি নিয়ে কথা বলা যাক।

সত্যতা থাকুক আর না থাকুক, তেলেভাজার দোকান সম্পর্কে একটি কথা খুব চালু। দোকানিরা নাকি একই তেলে দিনের পর দিন চপ, বেগুনি ইত্যাদি বানিয়ে যায়। সৃজিতের বরাবরের মুনশিয়ানা এই কাজটিতে। তিনি বিদেশি ছবির, জনপ্রিয় পুরনো বাংলা ছবির, অধুনা নিজের ছবিরও রিমেক, সিকুয়েল, প্রিকুয়েল ইত্যাদি বানাতে ওস্তাদ। তিনি পুরনো তেলেই ঈষৎ পরিবর্তিত রন্ধন প্রণালীতে তেলেভাজা বানান মাত্র কয়েক মাসে আর দর্শক তা লাইন দিয়ে খায় – এই হল তাঁর সাফল্যের ইতিহাস। তা দুর্গ রহস্যে কী কী পরিবর্তন এল? প্রথমত, সত্যবতীকে দিয়ে বেশকিছু নারীবাদী সংলাপ বলানো হল। অগাস্ট মাসে মুক্তি পাওয়া বিরসা দাশগুপ্তের ব্যোমকেশ ও দুর্গরহস্য ছবির মতই এখানেও সত্যবতী শরদিন্দুর অভিপ্রায় অনুযায়ী অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দাদা সুকুমারের জিম্মায় না থেকে, ব্যোমকেশ আর অজিতের সঙ্গে রহস্যের অকুস্থলে গেছে। শুধু তাই নয়, বিরসা গর্ভবতী সত্যবতীকে দুর্গে পাঠিয়েছিলেন একেবারে শেষে। সৃজিতের সত্যবতী আরও তেজিয়ান, তার ব্যোমকেশের প্রতি প্রেম আরও প্রবল। তাই সে গর্ভাবস্থাতেও দুর্গে পৌঁছে যায়। বিরসা একটি অহেতুক রবীন্দ্রসঙ্গীত ঢুকিয়েছিলেন ব্যোমকেশ-সত্যবতীর প্রেম বোঝাতে, সৃজিত সঙ্গীতের সঙ্গে লাজুক যৌনতাও এনেছেন। স্বদেশ মিশ্র রচিত, তমালিকা গোলদার সুরারোপিত গানের মধ্যে দিয়ে সেসব এমনি এমনি এসেছে। সবই ঠিক ছিল, কেবল প্রসববেদনা ওঠার পরে নারীবাদী সত্যবতী কেন দুম করে সেকালের রাজপুত মহিলাদের মত “আগে ধর্ম, তারপর সহধর্মিণী। আগে সত্য, তারপর সত্যবতী” বাণী দিয়ে দিল তা দুর্বোধ্য। এই ওয়েব সিরিজের পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ রচয়িতা সৃজিত একজন পুরুষ। ফলত প্রসববেদনা অনুভব করা তাঁর পক্ষে যে সম্ভব নয় তা জানা কথা। কিন্তু সংবেদনশীলতা বলে একটি জিনিস আছে, যা যে কোনো মাধ্যমের শিল্পী হওয়ার প্রাথমিক শর্ত। সেটুকু থাকলেই বোঝা যায়, গর্ভধারণের শেষ পর্যায়ে যখন ব্যথার চোটে ঘাম দিচ্ছে, তখন একজন গর্ভবতীর পক্ষে দার্শনিক হয়ে ওঠা অসম্ভব। তবে রদ্দি হিন্দি ছবির নায়ক-নায়িকাদের বেদনা সহ্য করার ক্ষমতা অন্য স্তরের। সেই কবে আমরা অমিতাভ বচ্চনকে দেখেছি, অমৃতা সিং অনবরত চাবুক মেরে যাচ্ছেন, ক্ষতে নুন ছড়িয়ে মারছেন, তবুও অমিতাভ অনড়। অমৃতা রাগে গরগর করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন, কী হল? ব্যথা লাগছে না? অমিতাভ উত্তর দিলেন “মর্দ কো দর্দ নহি হোতা।” সৃজিত যদি সত্যবতীর চরিত্রটি সেই আদর্শে লিখে থাকেন, তাহলে অবশ্য কিছু বলার নেই। তবে কিনা ওইরকম অতিনাটকীয় সংলাপ হিন্দি ছবিতেও লেখা হয় না আজ বিশ বছর।

হিন্দি ওয়েব সিরিজে আজকাল নায়িকা হয় মারকুটে পুলিস অফিসার (দহাড় সিরিজে সোনাক্ষী সিনহা)। সে বিয়ে করতে চায় না, কিন্তু প্রেমিকের সঙ্গে নিয়মিত যৌনতা নিয়ে অপরাধবোধ নেই। গর্ভসঞ্চার আটকাতে গর্ভনিরোধক পিল খেয়ে নেয়। প্রেমিক অন্য শহরে চলে গেলে সেই সম্পর্ক যে রাখা সম্ভব হবে না তা মুখোমুখি বলে দিতেও সংকোচ বোধ করে না। মেয়ে গোয়েন্দা (চার্লি চোপড়া অ্যান্ড দ্য মিস্ট্রি অফ সোলাং ভ্যালি ওয়েব সিরিজে ওয়ামিকা গাব্বি) প্রেমিকের সঙ্গে যৌনতার ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেলে প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে দেয়, অপমানে কান্নাকাটি করে। কিন্তু কয়েকদিন পরেই ফের সেই খুনের তদন্তে নেমে পড়ে, যাতে প্রেমিকটি বিনা দোষে অভিযুক্ত। কারণ কেসের নিষ্পত্তি না করে সে ছাড়বে না। এইসব করতে এই চরিত্রগুলিকে নারীবাদী বুলি আওড়াতে হয় না। তবে পুরনো তেলে চপ ভেজে গেলে অমন চরিত্র তৈরি করা সম্ভব হয় না।

শরদিন্দুর কাহিনিতে আরও একটি স্বকীয় মোচড় একেবারে শেষে দিয়েছেন সৃজিত, তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে স্পয়লার দেওয়া হয়ে যাবে। শুধু এটুকু বলা যাক, যে ও জিনিসও একমাত্র রদ্দি বলিউডি ছবিতেই সম্ভব। বিরসা আর সৃজিত – দুজনের কেউই নিজস্ব মোচড় দিয়ে শরদিন্দুর চেয়ে উন্নত ক্লাইম্যাক্স তৈরি করতে পারেননি। কেবল পরিবর্তনের স্বার্থে পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। শরদিন্দুর খলনায়কদের যে মেধা, যে কুটিলতা থাকে, সৃজিতের খলনায়কে তাও ফোটেনি। চিত্রনাট্যে সে সুযোগই রাখা হয়নি। এত দ্রুত ভাজতে হলে হয়ত তেলেভাজার স্বাদে অত সূক্ষ্মতা আনাও যায় না। মা দুর্গার মত দশখানা হাত না থাকা সত্ত্বেও এক পুজোয় সৃজিত দুখানা ছবি বাজারে নামিয়ে দিলেন (বড় পর্দায় দশম অবতার, ওটিটিতে আলোচ্য ওয়েব সিরিজটি) – এতেই বোধহয় আমাদের কৃতার্থ থাকা উচিত। মণিলাল চরিত্রের অভিনেতা দেবরাজ ভট্টাচার্যের বেশভূষা অবিকল বল্লভপুরের রূপকথা ছবিতে তাঁর চরিত্রটির মত হয়ে যাওয়া মেনে নেওয়া উচিত। ব্যস্ত পরিচালক সবেতে বদল ঘটানোর সময় পাবেন কখন? দেবরাজকে যেভাবে মেগা সিরিয়ালের গৃহবধূদের মত সকালে, বিকেলে, মাঝরাতে ফুলহাতা শার্ট আর গ্যালিস দেওয়া প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে তাও নিশ্চয়ই পরিচালকের ব্যস্ততার পরিণাম।

সঞ্জীব
বল্লভপুরের রূপকথা ছবিতে সঞ্জীবের চরিত্রে দেবরাজ ভট্টাচার্য
ব্যোমকেশ
দুর্গ রহস্য ওয়েব সিরিজে মণিলালের চরিত্রে দেবরাজ ভট্টাচার্য

প্রথম পর্বে ব্যোমকেশকে সত্যজিতের চশমা পরানো নিয়ে অজিত যেখানে চটে ওঠে, সেখানে মূল কাহিনিতে পরিবর্তন আনার সপক্ষে ব্যোমকেশকে দিয়ে সৃজিত এমন সংলাপ বলিয়েছেন যাতে বোঝা যায়, তিনি ‘ওয়ার্ল্ড সিনেমা’ দেখেন এবং বোঝেন। যে দর্শকরা দেখে না তাদের শিক্ষিত করার প্রয়াস ধরা পড়েছে ওই সংলাপে। পরিচালকের এই আত্মরতি মেনে নেওয়া যেত যদি তিনি মাস্টারপিস না হলেও, অন্তত যত্নে নির্মিত একটি সিরিজ উপহার দিতেন। এত অযত্নে নির্মিত শিল্পকর্মের স্রষ্টার এহেন রেলা হজম করা শক্ত। বস্তুত, কাহিনির পরিবর্তনগুলি কাহিনিতে নতুন মাত্রা যোগ করলে দর্শকদেরও বেমানান মনে হয় না, পরিচালককেও তার পিছনে যুক্তি তৈরি করে ছবির মধ্যে ঢোকাতে হয় না। হইচই প্ল্যাটফর্মের জন্যই এর আগে সৃজন নির্দেশক (creative director) অনির্বাণ আর পরিচালক সুদীপ্ত রায় ব্যোমকেশ ও পিঁজরাপোল বানিয়েছেন। সেখানে কাহিনির অনেক বেশি পরিবর্তন করা হয়েছিল। সৃজিতের সিরিজে ব্যোমকেশের কেবল চশমা নেই, সেখানে ছিল আরও বড় পরিবর্তন। ব্যোমকেশ চিরাচরিত ধুতি পাঞ্জাবির বদলে আগাগোড়া শার্ট, প্যান্ট পরেছিল। কেবল একেবারে শেষে ভোটদানের সময়ে তাকে ধুতি পাঞ্জাবি পরে দেখা যায়। এসবের যুক্তি দেওয়ার জন্যে আলাদা দৃশ্যনির্মাণের প্রয়োজন হয়নি, একটিও সংলাপ খরচ হয়নি। ওয়ার্ল্ড সিনেমায় পণ্ডিত সৃজিতবাবু এইটুকু আত্মবিশ্বাস দেখাতে পারলেন না কেন কে জানে। বেদেদের দিয়ে মঙ্গলকাব্য উচ্চারণ করানোর কাজটা তো বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই করেছেন।

এত গোলমাল এবং মন্থর চিত্রনাট্য সত্ত্বেও সিরিজটি যে একটিবার দেখা যায় তার কারণ অভিনেতারা। বংশীধর, মুরলীধর, হরিপ্রিয়া, গদাধর, তুলসীর মত চরিত্রগুলির পর্দায় উপস্থিতি সামান্য। অন্য সব অভিনেতাই নিজের সামর্থ্যের সদ্ব্যবহার করেছেন।

বিরসার ব্যোমকেশরূপী দেব গোয়েন্দাগিরি কম করেছিলেন, সুপার হিরোগিরি বেশি। সৃজিতের ব্যোমকেশরূপী অনির্বাণকে একাধারে উত্তমকুমার, প্রেমিক স্বামী, গোয়েন্দা, সাপুড়ে – সবই হতে হয়েছে। অথচ সে চিড়িয়াখানা দেখে বেরিয়ে বেশ রং নিয়ে বলেছিল, উত্তমকুমারের মত সাপ ধরতে যাবে না। কারণ “আমি সাপুড়ে নই”। সেকথা কি পরিচালক সাপ ধরার দৃশ্য রচনা করার সময়ে ভুলে গিয়েছিলেন? নাকি বিরসার ব্যোমকেশ সাপ ধরেছে বলে সৃজিতের ব্যোমকেশকেও সাপ ধরতেই হত?। যা-ই হোক, এত ভার বইতে হওয়ায় অনির্বাণকে কখনো কখনো ক্লান্ত দেখিয়েছে। গোয়েন্দা হিসাবে নয়, বেশি বিশ্বাসযোগ্য লেগেছে রোম্যান্টিক নায়ক হিসাবেই। সোহিনী সরকারের সঙ্গে তাঁর চোখের ভাষা যতখানি মিলেছে তা আগের কোনো সিজনে রিধিমা ঘোষের সঙ্গে দরজা বন্ধ করে প্রেম করার দৃশ্যগুলোতেও মেলেনি।

আরও পড়ুন দেব দেবী মহাদেব আছেন, সত্যান্বেষী নিরুদ্দেশ

এর কৃতিত্ব অবশ্য অনেকখানি সোহিনীরও। সেকেলে বউদের অতিপরিচিত সুরে কথা বলাই হোক আর উঁচু হয়ে থাকা পেট নিয়ে অস্বস্তি সামলে হাঁটাচলা করার অভিনয়ই হোক – কে বলবে তিনি সত্যি সত্যি সত্যবতী নন? গর্ভবতীর অভিনয় মানে যে কেবল পা ফাঁক করে হাঁটা নয়, তা যাঁদের প্রয়োজন তাঁরা এই অভিনয় দেখে শিখতে পারেন। কেবল অনির্বাণের সঙ্গে নয়, অজিতরূপী রাহুলের সঙ্গেও সোহিনী চমৎকার রসায়ন তৈরি করেছেন। চটে যাওয়া দেওরকে “ও-ও ঠাকুরপো” বলে ডেকে মান ভাঙানো দেখলে অনেক দর্শকেরই প্রয়াত জেঠিমা, মাসিমা, ঠাকুমা, দিদিমাদের মনে পড়বে।

প্রথমবার অজিতের চরিত্রে অভিনয় করা রাহুল একটি জিনিস ঘটিয়েছেন যা অতীতের কোনো অজিতরূপী অভিনেতাই সম্ভবত পারেননি। তিনি ব্যোমকেশ আর সত্যবতী, দুজনের সঙ্গেই দারুণ রসায়ন তৈরি করেছেন। ফলে স্রেফ ব্যোমকেশের উপগ্রহ হয়ে থাকেননি, সত্যিই শরদিন্দুর বর্ণনামাফিক বক্সী পরিবারের একজন অপরিহার্য সদস্য হয়ে উঠেছেন। ব্যোমকেশকে বাদ দিলেও অজিতের সঙ্গে যে সত্যবতীর একটি মিষ্টিমধুর সম্পর্ক আছে – এই একান্ত বাঙালিয়ানা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন রাহুল। উস্কোখুস্কো চুল, কখনো কখনো দিশেহারা ভাব সত্ত্বেও তিনি একবারের জন্যও কমিক রিলিফে পরিণত হন না। এর কৃতিত্ব পরিচালককেও দিতে হবে। কারণ ইদানীং ফেলুদার ছবিতে লালমোহনবাবুকে আর ব্যোমকেশের ছবিতে অজিতকে ভাঁড়ে পরিণত করা প্রায় সব পরিচালকেরই বদভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিনেতারাও ভাঁড়ের অভিনয়েই উৎকর্ষ অর্জনের চেষ্টা করে থাকেন। এই সিরিজটি ব্যতিক্রম। এর কৃতিত্ব অবশ্যই চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক সৃজিতেরও।

এই পরিমিতিবোধ সার্বিক হলে সৃজিত কিছু অতি বুদ্ধিমান সংলাপের সাহায্যে ব্যোমকেশকে বামপন্থী প্রতিপন্ন করার হাস্যকর চেষ্টাটি করতেন না। শেষে ব্যোমকেশ-সত্যবতীর সন্তানের জন্মকে নকশালদের থানা দখলের সঙ্গে এক করে দিয়ে বিপ্লবের প্রতীকী সাফল্য বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাও করতেন না। ঘটনা হল, নকশালবাড়ি আন্দোলন বিপ্লব আনতে পারেনি। পারেনি বলেই হয়ত যত দিন যাচ্ছে নস্ট্যালজিয়া হিসাবে তার দাম বাঙালি ভদ্রলোক ভদ্রমহিলাদের মধ্যে ক্রমশ বাড়ছে। সৃজিত পুরনো তেলে ব্যোমকেশভাজা বানাতে গিয়ে রন্ধনে এই মশলাটি যোগ করেছেন।

প্রযোজক দেব আর পরিচালক বিরসার তেলেভাজার মশলাটি ছিল হিন্দুত্ববাদ, প্রযোজক শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস আর পরিচালক সৃজিতেরটি আধসেদ্ধ মার্কসবাদ। বেচারা ব্যোমকেশ।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

দুঃসময়ে নিজের সবটুকু নিংড়ে দিলেন জওয়ান শাহরুখ

জওয়ান ছবিতে শাহরুখ অভিনীত একটা চরিত্রের নাম আজাদ। সে মেয়েদের নিয়ে নিজের এক ফৌজ গড়ে তোলে। সে ফৌজের লক্ষ্য দেশের ভাল করা। এক অর্থে আজাদ হিন্দ ফৌজই বটে।

অসংখ্য ছবি হয়, তাই বহু মানুষ নায়ক হন। তাঁদের অনেকেই জনপ্রিয় হন, কিন্তু মাত্র কয়েকজন এমন উচ্চতায় পৌঁছন যে নিজের ইন্ডাস্ট্রিটাকে কাঁধে তুলে নিতে পারেন – একসময় টলিউডকে যেভাবে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন উত্তমকুমার। আরও কম সংখ্যক শিল্পী এত বড় হয়ে ওঠেন যে সিনেমাজগৎ ছাড়িয়ে যে সমাজে, যে দেশে দাঁড়িয়ে আছেন তাকে প্রভাবিত করতে পারেন। পারলেও সাহস করে সে দায়িত্ব পালন করেন আরও কম শিল্পী। এমনকি উত্তমকুমারও পালন করেননি। তাঁর সময়ের পশ্চিমবঙ্গে ঘটে চলা রাজনৈতিক, সামাজিক সংঘর্ষ কোনোদিন তাঁর ছবিতে ঢেউ তোলেনি। সরোজ দত্তের হত্যাও কোনোদিন তাঁর কাজে উঁকি মারেনি। শাহরুখ খান সেই বিরল শিল্পী যিনি দুঃসময়ে দাঁড়িয়ে এই দায়িত্ব পালন করলেন জওয়ান ছবিতে। তিনি যখন অতখানি সাহস করেছেন, তখন আমি সামান্য সাহস দেখাই। বলেই ফেলি – এই ছবি একবার দেখার ছবি নয়, বলিউডের ইতিহাসে মাইলফলক হিসাবে যে ছবিগুলোকে ধরা হয় তাদের পাশে জায়গা হবে এই ছবির। যদি ভারত বা ইন্ডিয়া নামের দেশটা বাঁচে, আমার মৃত্যুর বহুকাল পরে এবং যাঁরা এ লেখা পড়ছেন তাঁদের সকলের মৃত্যুর পরেও মেহবুব খানের মাদার ইন্ডিয়া ছবির সঙ্গে এক বাক্যে উচ্চারিত হবে অ্যাটলির এই ছবির নাম।

না, সিনেমাবোদ্ধারা ‘মাস্টারপিস’ বলতে যা বোঝেন এ ছবি তার ত্রিসীমানায় যায়নি। এমন একটা শটও নেই যা স্রেফ দৃশ্য হিসাবেই সিনেমাবোদ্ধার চোখে লেগে থাকবে। এ ছবিতে আর পাঁচটা নাচ-গান-মারামারির ছবির মতই গাড়ি উড়ে গিয়ে পড়ে, নায়ক একাই জনা বিশেক দুর্বৃত্তকে শেষ করে দেন। এসব অপছন্দ হলে বা ঘন্টা তিনেকের জন্য বিশ্বাস করে নিতে আপত্তি থাকলে (যাকে শিল্প সমালোচনার ভাষায় সাহেবরা বলে “willing suspension of disbelief”, অর্থাৎ স্বেচ্ছায় অবিশ্বাস স্থগিত রাখা) এ ছবি না দেখাই শ্রেয়। কিন্তু ঘটনা হল এ ছবি যে ঘরানার, সেই ঘরানায় এগুলো অবাস্তব নয়। নির্দেশক অ্যাটলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রযোজক গৌরী খান আর শাহরুখ কোনো চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার জিতবেন বলে ছবি করেননি। এখানে তাঁদের লক্ষ্য যত বেশি সম্ভব দর্শকের কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দেওয়া। সেই বার্তা দিতে তাঁরা সেই চলচ্চিত্রভাষাই ব্যবহার করেছেন যে ভাষা তাঁরা গুলে খেয়েছেন এবং এ দেশের আপামর দর্শক যার সঙ্গে কয়েক প্রজন্ম ধরে পরিচিত। এ “ভাষা এমন কথা বলে/বোঝে রে সকলে/ উঁচা নিচা ছোট বড় সমান।” তাহলে এমন কী করা হল এই ছবিতে, যার জন্য বলছি এই ছবি বলিউড ছবির মাইলফলক? সেই আলোচনায় আসব। শুরুতেই বলে দিই, সাদা চোখে অন্তত চারটে স্তর দেখতে পেয়েছি এই ছবির। সেই স্তরগুলোর আলোচনাই আলাদা আলাদা করে করব। কেউ আরও বেশি স্তরের খোঁজ পেতে পারেন, যদি তাঁর উঁচু নাক, চোখ ছাড়িয়ে মস্তিষ্ককেও ঢেকে না ফেলে।

প্রথম স্তর: ইশতেহার

এই স্তর নিয়েই সবচেয়ে কম শব্দ খরচ করব। কারণ ছবির মুক্তির দিনই ভাইরাল হয়ে যাওয়া ক্লিপের দৌলতে সবাই জেনে ফেলেছে কীভাবে সরাসরি শাহরুখ দেশের মানুষের উদ্দেশে গণতন্ত্রের সার কথাগুলো বলেছেন, যা অনেকের মতেই দেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বার্তা। কিন্তু ওই ক্লিপটাই শেষ কথা নয়। আসলে জওয়ান এক আদ্যন্ত রাজনৈতিক ছবি। আমরা প্রায় ভুলে গেছি যে রাজনীতি মানে শুধু এই দল আর ওই দল নয়। পরিচালক অ্যাটলি আর শাহরুখ দলাদলি বা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বাইরেও যতরকম রাজনীতি আছে প্রায় সবকটা নিয়ে দর্শককে ভাবতে বাধ্য করেছেন। লিঙ্গ রাজনীতি থেকে পরিবেশ রাজনীতি – সবই এই ছবির বিষয়বস্তু।

নব্য উদারবাদী অর্থনীতির যুগে, ভারতের ইতিহাসে ক্রোনি পুঁজিবাদের সেরা সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জনপ্রিয়তম তারকার ছবিতে খলনায়ক হিসাবে দেখানো হল একজন শিল্পপতিকে। কালী গায়কোয়াড় (বিজয় সেতুপথী) সমস্তরকম পরিবেশ সংক্রান্ত নিয়মকানুনকে কাঁচকলা দেখিয়ে কারখানা তৈরি করেন, অনুমতি না পাওয়া গেলে মানুষ খুন করতেও দ্বিধা করেন না। স্থানীয় মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর হওয়ায় গোটা পঞ্চাশেক কারখানায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হল – ভারতের বহু এলাকার মানুষের এই ইচ্ছাপূরণের দৃশ্যও দেখিয়ে দিয়েছেন অ্যাটলি। শুধু এই কারণেই জওয়ানকে ঐতিহাসিক বলতে দ্বিধা থাকার কথা নয়। তবে যে কথা কেউ বলছেন না, তা হল এই ছবি শুধু নানাভাবে বিজেপিকে আক্রমণ করেনি। এ ছবিতে শুধু গৌতম আদানি বা নরেন্দ্র মোদীর ছায়া পড়েনি, রেয়াত করা হয়নি কংগ্রেস আমলকেও। এসে পড়েছে ১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, ছায়া পড়েছে বোফর্স কেলেঙ্কারিরও।

সূক্ষ্মতর রাজনৈতিক প্রসঙ্গ পরবর্তী স্তরগুলোর আলোচনায় আসবে। আপাতত এটুকু বলে শেষ করা যাক যে সম্ভবত এতখানি সোচ্চার রাজনীতি শাহরুখের ছবিতে এসে পড়তে পারত না প্রযোজক হিসাবে তামিল ছবির নির্দেশককে না নিলে। ইদানীং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দৌলতে এবং বেশকিছু ছবি হিন্দিতে ডাব হয়ে বিশ্বজুড়ে মুক্তি পাওয়ার ফলে আমরা জানি যে তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম ভাষার ছবিতে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে আনা বা রাজনীতিকেই কেন্দ্রে বসিয়ে দেওয়া চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে জলভাত। সে রজনীকান্তের নাচ-গান-মারামারির ছবিই হোক, আর জয় ভীম কিম্বা কান্তারা। দক্ষিণ ভারতের ছবির এই গুণ বলিউডি ব্লকবাস্টারে নিয়ে আসা হল।

দ্বিতীয় স্তর: ভারততীর্থ

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষকে ‘আমাদের’ মত দেখতে নয়, সুতরাং ‘ওরা’ ভারতীয় নয়। এই ধারণা আমাদের অনেকেরই চেতনে বা অবচেতনে বদ্ধমূল। দেশের রাজধানী দিল্লিতে অনবরত ওঁদের ‘চিঙ্কি’ শব্দটা শুনতে হয়। কলকাতার লোকেরা অনেক বেশি পরিশীলিত, বুদ্ধিমান। তাই ‘নাক চ্যাপটা’ ইত্যাদি কথাগুলো ওঁদের সামনে বলা হয় না, একান্ত আলোচনায় হয়। মণিপুর যে ভারতের মধ্যে পড়ে না তার প্রমাণ তো গত তিন মাসে ভারত সরকারের আচরণেই পাওয়া যাবে। অথচ এ ছবি শুরুই হয় চীনের সীমান্তবর্তী অরুণাচল প্রদেশে। নায়কের প্রাণ বাঁচে প্রত্যন্ত এলাকার গ্রামে, আধুনিক চিকিৎসার সুযোগসুবিধা থেকে বহু দূরে আদিবাসী চিকিৎসা পদ্ধতিতে। সারা দেশকে যখন রামভক্ত হতে বাধ্য করা হচ্ছে, তখন মরণ হতে নায়ক জেগে ওঠেন ভীষণদর্শন, বাকি ভারতের কাছে অনেকাংশে অপরিচিত, বৌদ্ধ দেবতা মহাকালের মূর্তির সামনে গ্রামের মানুষের কাতর প্রার্থনায়। চীনা সেনাবাহিনীর অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করেন গ্রামকে (জাতীয়তাবাদী সেন্সর বোর্ডের সদস্যরা বোধহয় ওখানেই কাত। বাকি ছবিতে তাঁদের পক্ষে আপত্তিকর যা কিছু দেখানো হয়েছে, ক্ষমাঘেন্না করে দিয়েছেন)।

প্রান্তিক, সংখ্যালঘু মানুষকে কাহিনির কেন্দ্রে স্থাপন করার এই ধারা বজায় থেকেছে গোটা ছবি জুড়ে। অরুণাচলের ওই গ্রামের এক বাসিন্দা চিত্রনাট্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গত শতকের আটের দশক পর্যন্তও হিন্দি ছবিতে আমরা যা দেখে অভ্যস্ত ছিলাম, সেই ধারা মেনে এই ছবিতে শাহরুখের ঘনিষ্ঠরা সবাই ভারতের নানা সংখ্যালঘু বা নিপীড়িত সম্প্রদায়ের মানুষ। মুসলমান, শিখ, গরিব কৃষক পরিবারের সন্তান অথবা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষ। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের আগে পর্যন্ত হিন্দি ছবিতে নায়ক হিন্দু হলেও তার প্রাণের বন্ধু হবে একজন মুসলমান – এটা প্রায় নিয়ম ছিল। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের পর থেকে হিন্দি ছবির মুসলমানরা হয়ে গেলেন দুরকম – হয় সন্ত্রাসবাদী, নয় অতিমাত্রায় দেশভক্ত পুলিসকর্মী বা সৈনিক। যে ভারততীর্থের স্বপ্ন দেখতেন রবীন্দ্রনাথ, তা বাস্তবে না থাক, অন্তত বলিউডি ছবিতে দেখা যেত। বহুকাল পরে এই ছবিতে ফেরত এসেছে।

আজকের ভারতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত যেসব জনগোষ্ঠী, তাদের মধ্যে অবশ্যই পড়েন মেয়েরা। শুধু যে অনেক জায়গায় ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি জলভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে তা নয়। এতকাল ধরে অর্জিত মেয়েদের সামাজিক অধিকারগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলাও আরম্ভ হয়ে গেছে। জিনস পরা, চাউমিন খাওয়া খারাপ মেয়ের লক্ষণ – এমন হাস্যকর কথা বলার পাশাপাশি বিরুদ্ধ মতের মহিলাদের কুৎসিত ভাষায় সংগঠিত ট্রোলিং, বেছে বেছে মুসলমান মেয়েদের অনলাইন নিলাম – এসবও চালু হয়েছে। ক্রমশ পিছন দিকে হাঁটতে থাকা, বিষাক্ত পৌরুষের উদযাপনে জবজবে এই ভারতে শাহরুখ তাঁর অতিমানবিক কাজকর্ম করেন এক দল মেয়েকে নিয়ে। তাঁর দুই নায়িকার এক নায়িকা ঐশ্বর্য (দীপিকা পাড়ুকোন) কুস্তিতে তুলে আছাড় মারেন শাহরুখকে। অন্য নায়িকা নর্মদা (নয়নতারা) একজন কুমারী মা। ‘ভারতমাতা কি জয়’ বলা যে দেশে ফ্যাশন সে দেশে ‘মা’ শব্দের অনুষঙ্গে মুসলমানবিদ্বেষের বিরুদ্ধে বার্তাও দেওয়া হয়েছে ছবির গোড়ার দিকেই। কীভাবে? সে আলোচনায় যাব না, কারণ তাতে স্পয়লার দেওয়া হবে।

এমন ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা’ বলিউডি ছবিতে আর কখনো দেখা যাবে না – এ আশঙ্কা গত দু-তিন দশকে জোরালো হয়ে উঠেছিল, এখনো সে আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আসমুদ্রহিমাচলকে ৫৭ বছর বয়সেও উদ্বেল করতে পারা নায়ক অন্তত শেষবার করে দেখালেন।

তৃতীয় স্তর: বলিউড অমনিবাস

অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, প্রস্থেটিক মেক আপ, ঝাঁ চকচকে সেট সত্ত্বেও এই ছবির আত্মার খোঁজ করলে দেখা যাবে সেটা জওহরলাল নেহরুর আমলের বিনোদনমূলক অথচ সামাজিক বার্তা দেওয়া, এমনকি ভেদাভেদহীন দেশ গঠনের, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখানো ছবির আত্মা।

মনে রাখা ভাল যে নেহরু-ঘনিষ্ঠ রাজ কাপুর, দিলীপকুমার, দেব আনন্দরা সেই হিন্দি সিনেমার মুখ হলেও চিত্রনাট্য, পরিচালনা, গান লেখা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় স্বমহিমায় ছিলেন ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত একগুচ্ছ মানুষ। অর্থাৎ হিন্দি সিনেমা শাসন করতেন নেহরুর মত নরম সমাজবাদীর কাছের লোকেরা আর সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষ। ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে ক্রমশ সেই প্রভাব কমতে শুরু করে। ভারতীয় বামপন্থীরা ক্রমশ যাহা জনপ্রিয় তাহাই নিকৃষ্ট – শিল্প সম্পর্কে এই অবৈজ্ঞানিক ধারণায় নিজেদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেন। যেহেতু এ দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় বলিউড, সেহেতু ওটাই যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট তাতে আর সন্দেহ কী? ফলে বামপন্থীরা বলিউড দখলে রাখার কথা স্বপ্নেও ভাবেননি। বলিউড যে দেশের গরিবগুরবো মানুষের ভাবনা তৈরি করায় বড় ভূমিকা নেয় সেসব তাঁরা বোঝেননি। তবু দেশের রাজনীতির সার্বিক ঝোঁক বাঁদিকে ছিল বলে এবং বলিউডে একদা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের তখনো উপস্থিতি ছিল বলেই হয়ত আটের দশকেও রেলের কুলিকে নায়ক বানিয়ে ছবি হয়েছে এবং কুলি (১৯৮৩) ছবির পোস্টারে দেখা গেছে অমিতাভ বচ্চনের হাতে কাস্তে, হাতুড়ি – একেবারে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতীক যে বিন্যাসে থাকে সেই বিন্যাসেই।

কিন্তু শাহরুখ যতদিনে বলিউডে এসেছেন ততদিনে সেসব প্রভাব প্রায় অদৃশ্য। দেশের রাজনীতিও ডানদিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। ১৯৯১ সালে নেহরুর সমাজবাদকে তাঁর দলই আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলে বাজার অর্থনীতি চালু করে। পরের বছর জুন মাসে মুক্তি পায় শাহরুখের প্রথম ছবি দিওয়ানা। তার ছমাসের মধ্যেই ধূলিসাৎ করা হয় বাবরি মসজিদকে। হিন্দি সিনেমা থেকে ক্রমশ উধাও হতে শুরু করে গরিব, মধ্যবিত্ত। তারপর থেকে নায়করা বিত্তশালী। প্রাসাদোপম বাড়ি, গাড়ি, নিজস্ব হেলিকপ্টার, অনেকে আবার অনাবাসী ভারতীয়। অথচ সাবেকি হিন্দু ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি সেই নায়করা ভারি বিশ্বস্ত। মেয়ের বাবার অমতে প্রেমিকাকে বিয়ে করে না। অন্তরঙ্গ মেয়ে বন্ধু প্যান্ট পরলে, খেলাধুলো করলে তাকে বিয়ে করার যোগ্য মনে করে না। করে যখন সে ‘মেয়েলি’ হয়ে যায় তখন। পালক পিতা নিজের পরিবারের চেয়ে নিচু শ্রেণির মেয়েকে বিয়ে করতে চাওয়ায় বাড়ি থেকে বার করে দিলেও শ্রদ্ধা টোল খায় না। শাহরুখ নিজের সেরা সময়ে সেইসব ছবিতেই অভিনয় করে এসেছেন। আজ, তিন দশকের বেশি সময় ইন্ডাস্ট্রিতে কাটানোর পর যখন নিজের মনোমত সিনেমায় অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছেন, তখন কিন্তু শাহরুখ দেখালেন নেহরুর আমলের হিন্দি ছবি। একেবারে প্রান্তিক অবস্থানে জন্ম নেওয়া, ছোটবেলাতেই অনাথ নায়ক। নিশ্চয়ই সমাপতন নয় যে এই ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছে ১৯৬২ সালে মুক্তি পাওয়া বিস সাল বাদ ছবির দারুণ জনপ্রিয় গান ‘বেকরার কর কে হমে য়ুঁ ন যাইয়ে’ আর ১৯৫৫ সালের রাজ কাপুর অভিনীত শ্রী ৪২০ ছবির ‘রামাইয়া ওয়স্তাওয়ইয়া’।

এখানেই শেষ নয়। বস্তুত, যদি আপনার স্মৃতি ঠিকঠাক কাজ করে, জওয়ান ছবির মধ্যে আপনি দেখতে পাবেন বলিউডের এতকালের কিছু আইকনিক ছবিকে। শাহরুখের চরিত্রে খুঁজে পাবেন তাঁর পূর্বসূরিদের। জিস দেশ মেঁ গঙ্গা বহতি হ্যায় (১৯৬০) ছবির রাজ কাপুর, আরাধনা (১৯৬৯) ছবির রাজেশ খান্না, দিওয়ার (১৯৭৫) ছবির শশী কাপুর, শাহেনশাহ (১৯৮৮) ছবির অমিতাভকে খুঁজে পেতে খুব অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। যাঁরা দেখে ফেলেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন জওয়ানের শরীরে শোলে (১৯৭৫) ছবির চিহ্নগুলোও। বলা বাহুল্য, শাহরুখ মাঝেমধ্যেই উস্কে দিয়েছেন নিজের রোম্যান্টিক নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করা ছবিগুলোর স্মৃতিও।

অথচ যা নেই তা হল এই শতকের হিন্দি ছবির কোনো প্রভাব, কোনো সংযোগ। মধ্যবিত্ত ঘর থেকে উঠে আসা আদর্শবাদী পুলিস অফিসারকে হিন্দি ছবিতে আমরা শেষ দেখেছি সম্ভবত মনোজ বাজপেয়ী অভিনীত শূল (১৯৯৯) ছবিতে। এই শতকের বলিউডি পুলিস অফিসার মানেই তো ট্রিগারমত্ত, যা আজকের বুলডোজার রাজের মঞ্চ তৈরি করেছে। অব তক ছপ্পন (২০০৪) ছবির নানা পাটেকর, শুটআউট অ্যাট লোখাণ্ডওয়ালা (২০০৭) ছবির সঞ্জয় দত্ত, সুনীল শেঠি, আরবাজ খানরা আইন-আদালতের ধার ধারেন না। তাঁরা ‘শুট টু কিল’ নীতিতে বিশ্বাসী। আর আছেন দাবাং সিরিজের সলমান খান, সিঙ্ঘম সিরিজের অজয় দেবগনরা। জওয়ান ছবির পুলিস অফিসার কিন্তু একেবারেই গত শতকের হিন্দি ছবির পুলিস অফিসারদের মত। সমাপতন কিনা জানি না, উইকিপিডিয়া বলছে শূল ছবিটার স্বত্ব এখন গৌরী-শাহরুখের রেড চিলিজ এন্টারটেনমেন্টের হাতেই। এ ছবিতে অবশ্য আছেন এক দেশপ্রেমিক বিক্রম রাঠোর, যাঁর মানুষ খুন করতে হাত কাঁপে না। কিন্তু তিনি অক্ষয় কুমার অভিনীত রাউডি রাঠোর (২০১২) ছবির সমনামী নায়কের মত পুলিস অফিসার নন। তরুণ নির্দেশকের হাত ধরে প্রবীণ শাহরুখ বোধহয় বুঝিয়ে দিলেন তিনি কোন ধরনের ছবির পক্ষে।

আরও পড়ুন বল্লভপুরের রূপকথা: খাঁটি বাংলা ছবি

বামপন্থীরা বলিউডকে অবজ্ঞা করেছিলেন, দক্ষিণপন্থীরা করেনি। তাই ক্রমশ তাদেরই হাতে চলে যাচ্ছে ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যমের রাশ। ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যায় সাজানো প্রোপাগান্ডা ছবি তৈরি হচ্ছে। কাশ্মীর ফাইলসকেরালা স্টোরি-র পর আসছে দ্য ভ্যাক্সিন ওয়ার। ২০২৪ সালে বিজেপি ফের জয়যুক্ত হলে বলিউডি ছবিকে যে আর চেনাই যাবে না তাতে সন্দেহ নেই। জওয়ানের গুরুত্ব সেক্ষেত্রে হয়ে যাবে দ্বিগুণ, কারণ এই একখানা ছবিতে ধরা রইল হিন্দি ছবির সেই সমস্ত বৈশিষ্ট্য যা তাকে স্বাধীনোত্তর ভারতের অন্যতম ঐক্য বিধায়ক করে তুলেছিল। এমনি এমনি জওয়ানকে মাইলফলক বলিনি। এখানেই অবশ্য বলতে হবে এই ছবির একমাত্র ব্যর্থতার কথা। সমস্ত আইকনিক হিন্দি ছবির প্রাণ ছিল গান। সঙ্গীত পরিচালক অনিরুধ রবিচন্দর কিন্তু গানগুলোকে সেই উচ্চতার ধারে কাছে নিয়ে যেতে পারেননি। এমন একটা গানও নেই যা মনে গেঁথে যায়।

চতুর্থ স্তর: যা ব্যক্তিগত তাই সর্বজনীন

ছবির আলোচনায় এখন পর্যন্ত একবারও শাহরুখের চরিত্রের নাম করিনি। তার একটা কারণ অবশ্যই স্পয়লার দিতে না চাওয়া। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় কারণ ছবিটা নিজে। এখানে ব্যক্তি শাহরুখ একাধিকবার চরিত্রের খোলস ত্যাগ করে বেরিয়ে এসেছেন। প্রসেনিয়াম থিয়েটারে চরিত্রের দর্শকাসনে নেমে আসার মত ব্যতিক্রম ঘটিয়ে একেবারে শেষ পর্বে যে তিনি পর্দার বেড়া ভেঙে সরাসরি দর্শকদের উদ্দেশে কথা বলার উপক্রম করেছেন তা তো সবাই জেনেই গেছেন। কিন্তু তার আগেই বেশ কয়েকবার যখনই ক্যামেরা তাঁকে ক্লোজ আপে ধরেছে, তিনি ভক্তদের উদ্বেল করে দেওয়ার মত কোনো অঙ্গভঙ্গি করেছেন, তখন নেপথ্যে ঝাঁ ঝাঁ করে বেজেছে কয়েকটা কলি যার সবটা বুঝতে পারা শক্ত। বোঝার আগ্রহও প্রেক্ষাগৃহের কারোর তেমন ছিল না। এটুকুই যথেষ্ট যে তার মধ্যে ‘কিং খান’ কথাটা ছিল। শাহরুখ অভিনীত চরিত্রের নামে কিন্তু খান নেই।

এইভাবে নিজের ব্যক্তিসত্তাকে সামনে এনেছেন বলেই, না ভেবে উপায় থাকে না যে নিজের ব্যক্তিজীবনকে এই ছবির আখ্যান বোনার সুতো হিসাবে ব্যবহার করেছেন শাহরুখ। তাঁর ভক্তরা নিশ্চয়ই জানেন, যাঁরা জানেন না তাঁরা ফরীদা জালালের নেওয়া এই সাক্ষাৎকার শুনলে জানতে পারবেন যে শাহরুখের বাবা মীর তাজ মহম্মদ খান স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের জেনারেল শাহনওয়াজ খান মীরের ঘনিষ্ঠ এবং আত্মীয়।

জওয়ান ছবিতে শাহরুখ অভিনীত একটা চরিত্রের নাম আজাদ। সে মেয়েদের নিয়ে নিজের এক ফৌজ গড়ে তোলে। সে ফৌজের লক্ষ্য দেশের ভাল করা। এক অর্থে আজাদ হিন্দ ফৌজই বটে। মজার কথা, এ দেশের ইতিহাসে সেনাবাহিনীতে মেয়েদের নিয়ে আলাদা ব্রিগেড গড়ে তোলার ঘটনা আজাদ হিন্দ ফৌজেই প্রথম। নেতাজি সুভাষচন্দ্রের রানী লক্ষ্মীবাঈ ব্রিগেডের সঙ্গে শাহরুখের মহিলা ব্রিগেডের আরও একটা সাদৃশ্য ছবিটা দেখামাত্রই ধরা পড়বে। সেকথা উহ্য রাখলাম স্পয়লার দেব না বলেই।

শাহরুখের একখানা সংলাপ নিয়ে বিজেপিবিরোধীরা বিশেষ উল্লসিত এবং বলা হচ্ছে ওটা তাঁর ছেলে আরিয়ানকে যারা গ্রেফতার করেছিল তাদের উদ্দেশে বলা – ‘বেটে কো হাথ লগানে সে পহলে বাপ সে বাত কর’। এমন হওয়া অসম্ভব নয় যে সেকথা ভেবেই ওই সংলাপ লেখা হয়েছে, কিন্তু উপরের সাক্ষাৎকার শুনলে মনে হয় জওয়ান ছবিটা অনেক বেশি করে নিজের বাবার প্রতি শাহরুখের শ্রদ্ধাঞ্জলি। সাক্ষাৎকারের শেষ ৩-৪ মিনিটে বাবা দেশ এবং স্বাধীনতা সম্পর্কে কী কী বলেছিলেন শাহরুখ তার বিবরণ দেন। সে বিবরণে জওয়ানের পদশব্দ শোনা যায়। নেহাত ঠাট্টা করেই ছবির শেষের দিকে আনা হয়েছে লায়ন কিংপ্রসঙ্গ। কিন্তু ঠাট্টার আড়ালে লুকিয়ে আছে চোখের জল। সিম্বার মত ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছিলেন শাহরুখ। অ্যাটলির মুনশিয়ানায় বার্ধক্যের দ্বারে পৌঁছে মহাতারকা প্রায় দর্শকের অলক্ষ্যে পূরণ করে নিলেন বাবার সঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার অপূর্ণ ইচ্ছা। স্বাধীনতা সংগ্রামী বাবার থেকে যা শিখেছেন সবটুকু নিংড়ে দিলেন দর্শকের জন্য, দেশের দারুণ দুঃসময়ে।

শিল্পীরাই এসব করতে পারেন। একজন শিল্পী এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা পারেন?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

অনন্ত আনন্দধারার খানিকটা ধরা পড়েছে নীহারিকা ছবিতে

নীহারিকা এমন একটা কাজ করেছে যা বাংলা সিনেমা শুধু নয়, বাংলা সাহিত্য থেকেও আমাদের কালে উবে গেছে। তা হল জীবন সম্পর্কে কিছু মৌলিক প্রশ্ন তোলা। কাকে বলে আনন্দ? কোনটা স্বাধীনতা? ভাল থাকা বেশি জরুরি, নাকি সাফল্যে থাকা? এসব প্রশ্ন আমার সময়ের কোন বাংলা ছবিকে তুলতে দেখেছি? মনে পড়ে না।

বেশ কিছুকাল হল, পশ্চিমবঙ্গে বসে বাংলা ছবি দেখা বেশ শক্ত। কারণ বাংলা ছবি তৈরি হয় কম। টালিগঞ্জ পাড়া থেকে প্রধানত দুরকম ছবি বেরোয় – ‘wannabe হিন্দি’ ছবি আর ‘wannabe ইংরিজি’ ছবি। সেসব ছবির বাঙালিয়ানা বলতে সংলাপটুকু। দ্বিতীয় ধরনের ছবিতে আবার সংলাপও বেশ খানিকটা ইংরিজি। অতি সাম্প্রতিককালে তৃতীয় এক ধরনের ছবি তৈরি হচ্ছে, সেগুলো ‘wannabe সর্বভারতীয়’। ফলে নীহারিকা কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাংলা ছবি দেখতে তৃষিত হৃদয় জয় করে ফেলে, কারণ প্রথম ফ্রেম থেকেই পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য একখানা খাঁটি বাংলা ছবি দেখান।

এ ছবির গৃহবধূরা গা ভর্তি গয়না পরে থাকে না, কাঞ্জিভরম পরে শুতে যায় না। স্কুলপড়ুয়া মেয়ের মা পরনের সাধারণ শাড়ির আঁচলটা কোমরে বেঁধে নিয়ে নাচ শেখান। যেমনটা চিরকাল বাঙালি মায়েদের করে আসতে দেখেছি। কয়েক মিনিট যেতেই পরিষ্কার হয়ে যায়, পরিচালক ইন্দ্রাশিস এবং ক্যামেরার দায়িত্বে থাকা শান্তনু দে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ঘরের সব জায়গায় সমান আলো পৌঁছনোর দরকার নেই। ইন্টেরিয়র ডেকরেটরের হাতে সাজানো ছবির মত ঘর তাঁরা দেখাতে চান না। কলকাতার পুরনো বাড়ির সেইসব সিঁড়ি, যেগুলো দিনের বেলাতেও অন্ধকার থাকে, সেগুলোকে সেভাবেই পর্দায় আনা হয়েছে। এখানে স্নান করে খালি গায়ে গামছা পরেই ঘরে আসেন ভুঁড়িওলা জ্যাঠামশাই। পরিচালক সিক্স প্যাক খুঁজতে বেরোননি। এখানে মাতাল বাবা বাইরে থেকে নেশা করে এসে মাকে পাড়া জানিয়ে নোংরা কথা বলে এবং দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে পেটায়। ঢুলুঢুলু আলোয় ড্রইংরুমে বসে স্কচ খেয়ে চার অক্ষরের ইংরিজি গালি দেয় না।

চারিদিকের ঝলমলে আলোয় যাঁদের ক্লান্ত লাগে, আজকের জীবনযাত্রার প্রচণ্ড গতিতে যাঁদের হাঁসফাস লাগে – নীহারিকা ছবিটা তাঁদের জন্য। প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকারে পর্দার নরম আলোর উপশম পেতে হলে এই ছবি দেখে ফেলুন। ক্রমশ গতি বাড়িয়ে চলা জীবনের নানাবিধ শব্দে যদি আপনার কান এবং মস্তিষ্ক পরিশ্রান্ত হয়ে থাকে, তাহলেও ঘন্টা দুয়েক সময় বার করে এই ছবি দেখে আসা ভাল। শান্তনু যেমন আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেননি, সঙ্গীত পরিচালক জয় সরকারও নেপথ্য সঙ্গীতের ব্যবহার করেছেন অতি সামান্য। নৈঃশব্দ্য কথা বলেছে দর্শকের কানে কানে, যার জন্যে সাউন্ড ডিজাইনার সুকান্ত মজুমদারেরও বাহবা প্রাপ্য। শব্দ পরিহার করার এই সংযমও আজকের বাংলা ছবিতে সুলভ নয়। তবে এসব তো খুঁটিনাটি। সবচেয়ে বড় কথা, নীহারিকা এমন একটা কাজ করেছে যা বাংলা সিনেমা শুধু নয়, বাংলা সাহিত্য থেকেও আমাদের কালে উবে গেছে। তা হল জীবন সম্পর্কে কিছু মৌলিক প্রশ্ন তোলা। কাকে বলে আনন্দ? কোনটা স্বাধীনতা? ভাল থাকা বেশি জরুরি, নাকি সাফল্যে থাকা? এসব প্রশ্ন আমার সময়ের কোন বাংলা ছবিকে তুলতে দেখেছি? মনে পড়ে না। ইতিমধ্যেই বহু আলোচিত এই ছবির যৌনতার দিকটা। সেখানেও বেশকিছু মৌলিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন পরিচালক। কোনটা সম্মতি, কোনটা স্বাভাবিকতা, কোনটাই বা বিকৃতি? এসবের উত্তর যে সাদায় কালোয় হয় না সবসময়, শান্তনুর ক্যামেরায় ফুটে ওঠা আলো আর আঁধারের মাঝখানেও লুকিয়ে থাকতে পারে – তা সাহস করে দেখিয়েছেন।

বছর বিশেক আগেও কাহিনিচিত্র কথাটা বাংলায় রীতিমত ব্যবহৃত হত। শনি বা রবিবার দূরদর্শনে বাংলা ছবি শুরু হওয়ার আগে ঘোষক/ঘোষিকা বলতেন “আজ দেখবেন বিজ্ঞাপনদাতা দ্বারা আয়োজিত কাহিনিচিত্র…”। ইদানীং যে শব্দটা আমরা ভুলে গেছি, তার একটা কারণ বোধহয় এই, যে আমাদের পরিচালকরা সিনেমায় গল্প কীভাবে বলতে হয় তা ভুলে গেছেন। যদি এমন হত যে তাঁরা বাংলা সিনেমাকে গল্পের ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছেন, এমন সব অবিস্মরণীয় ফ্রেম তৈরি করছেন যে কেবল তার জন্যেই ছবিটা দেখা যায় – তাহলেও কথা ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে যে কয়েকটা হাতে গোনা ছবি ‘হিট’ হয়েছে সেগুলোর সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্যের কথা বলতে বললেও একাধিকবার ছবিটা দেখা দর্শক মাথা চুলকোবেন। অথচ ক্যামেরা, আলো, সম্পাদনা – সবেরই তো মান বেড়েছে প্রযুক্তির উন্নতির কারণে। নীহারিকা কিন্তু এদিক থেকেও ব্যতিক্রমী। এর গল্প (সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে ইন্দ্রাশিসের রচনা) যেমন বাঁধা গতের নয়, তেমনই একাধিক নয়নাভিরাম দৃশ্য তৈরি করেছেন পরিচালক।

শান্ত জনপদ শিমুলতলায় সন্ধেবেলা লোডশেডিং হয়ে যাওয়ার পর দীপার ঘুরঘুট্টি অন্ধকার মামাবাড়ি জেগে থাকে পর্দা জুড়ে। তারপর একতলায় জ্বলে ওঠে দুটো আলোর বিন্দু – সম্ভবত হ্যারিকেন। একটা আলোর বিন্দু কয়েক সেকেন্ডের জন্যে চলে যায় চোখের আড়ালে, শেষে আবির্ভূত হয় দোতলায়। এ দৃশ্য মনে রাখার মত। আবার অনেক দর্শক নিশ্চয়ই বাড়ি যাবেন সিলুয়েটে দীপার (অনুরাধা মুখার্জি) নাচের রেশ নিয়ে। সংলাপ নয়, স্রেফ ছবি দিয়ে গল্প বলা যে শক্ত কাজ তা গত কয়েক বছরের বাংলা ছবি দেখলে বেশ টের পাওয়া যায়। পরিচালকের পরিমিতিবোধ না থাকলে এ জিনিস অসম্ভব। ইন্দ্রাশিসের সেই পরিমিতিবোধে চমৎকার সঙ্গত করেছেন সম্পাদক লুব্ধক চ্যাটার্জি। বিশেষত কোনো কান্নাকাটি, হইচই ছাড়াই দীপার মায়ের মৃত্যু নিঃশব্দে স্রেফ দুটো শটে দেখিয়ে ফেলার মুনশিয়ানা ভোলার নয়।

আরও পড়ুন মায়ার জঞ্জাল: যে কলকাতা দেখতে পাই না, দেখতে চাই না

যে ছবিতে চাকচিক্য বর্জন করা হয় সে ছবি দাঁড়িয়ে থাকে অভিনয় ক্ষমতার উপর ভর দিয়ে। নীহারিকা ছবিতে সেই গুরুদায়িত্ব যথাযথ পালন করেছেন অভিনেতারা। কেন্দ্রীয় চরিত্রে অনুরাধা ব্যক্তিগত জীবনের অশান্তি এবং শান্তিময়তা দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন, যদিও স্বামী রঙ্গনের (অনিন্দ্য সেনগুপ্ত) উপর ফোনে চেঁচানোর সময়ে তাঁকে কিঞ্চিৎ বেশি কোমল মনে হয়েছে। ছবির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র দীপার ছোটমামা। অভিনেতা শিলাজিৎ সিনেমায় অভিনয় করছেন কম দিন হল না। কিন্তু ঋতুপর্ণ ঘোষ থেকে সন্দীপ রায় – কেউই তাঁকে এত বড় অথচ আপাত বিশেষত্বহীন চরিত্রে ভাবেননি। স্বনামধন্য শিলাজিৎ কিন্তু অনায়াসে ঘুমন্ত মফস্বলের ব্যস্ত ডাক্তার হয়ে গেছেন, যাঁর চরিত্রের তলদেশে আবার ঘুমিয়ে আছে এমন একটা জিনিস যাকে অন্তত তিনি নিজে বলেন বিকৃতি। পরিচালক নিথর দাম্পত্যের একাকিত্ব বোঝাতে শিলাজিৎকে দিয়ে অন্ধকার বারান্দায় ‘কবে তৃষিত এ মরু ছাড়িয়া যাইব’ গাইয়ে নিয়েছেন। ওই অমূল্য মুহূর্ত সৃষ্টি করার কৃতিত্ব যতখানি পরিচালকের, ঠিক ততটাই শিলাজিতের।

চমকে উঠতে হয় অবশ্য ছোটমামীর চরিত্রে মল্লিকা মজুমদারকে দেখে। গোটা ছবিতে তিনি টানা টানা চোখ ব্যবহার করে যে অভিনয় করে যান (যা তুঙ্গে ওঠে ‘মলয় বাতাসে’ গানে) তাতে স্রেফ চরিত্রটা নয়, মানুষটার জন্যেও কষ্ট হয়। কারণ উপলব্ধি করা যায়, নিম্নমেধার সিরিয়াল/মেগা সিরিয়াল একজন শিল্পীর ক্ষমতার প্রতি কতটা অবিচার করে।

এতকিছু সত্ত্বেও দু-একটা খটকা থেকে যায়। যেমন ছবিতে কোন সময় দেখানো হচ্ছে তা নিয়ে ধন্দ তৈরি হয়। কারণ শিমুলতলার জীবনে এমনকি ব্যস্ত ডাক্তারবাবুকেও মোবাইলে কথা বলতে দেখা যায় না, কিন্তু বিয়ের পর দীপা আর রঙ্গন কলকাতায় চলে আসতেই মোবাইল ফোন তো বটেই, ল্যাপটপেরও ব্যবহার দেখা যায়। এ যদি বর্তমানের গল্প হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, শিমুলতলা কি এখনো এতটা প্রযুক্তিবর্জিত? নাকি বেশ আগে লেখা বইয়ের গল্পকে পর্দায় নিয়ে আসতে গিয়ে এই বিভ্রাট হয়েছে? দেওঘরের প্যাথোলজিস্ট পরিচিত ডাক্তারকে “মিস্টার চ্যাটার্জি” বলে সম্বোধন করেন – এই ব্যাপারটাও একটু অদ্ভুত লাগে। সাধারণত তো ডাক্তারবাবুদের “ডক্টর” বলেই সম্বোধন করা হয়। আরেকটি প্রশ্নও না করে থাকা যায় না। দীপা পূর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ পেল – নিজের সঙ্গে থাকার স্বাধীনতা। কিন্তু তা করতে গেলে তো অর্থনৈতিক স্বাধীনতারও প্রয়োজন হয়। সে সম্পর্কে কোনো সংবাদ কিন্তু পেলাম না। দীপা এম এ করেছে, তারপর গবেষণা করবে – এই পর্যন্ত জানা গিয়েছিল রঙ্গনের সঙ্গে বিয়ের আগে। তারপর সোজা বিয়ে, মা হওয়া দেখলাম। ওরই মধ্যে বা পরে কি সে কোনো কাজে যোগ দিয়েছিল? তার হদিশ পেলাম না।

কেউ বলতেই পারেন এ নেহাত ছিদ্রান্বেষণ। কিন্তু ছবিটা এত বেশি প্রত্যাশা জাগায় এবং পূরণ করে বলেই কথাগুলো মনে আসে। বাজার চলতি বাংলা ছবির মত একখানা পরিচিত রবীন্দ্রসঙ্গীতকে যেখানে পারা যায় গুঁজে না দিয়ে যে পরিচালক নায়িকাকে দিয়ে দ্বিজেন্দ্রগীতি গাওয়ান, তাঁর কোথাও ভুলচুক হয়ে গেল কিনা তা নিয়ে তো উদ্বেগ তৈরি হবেই। রবীন্দ্রসঙ্গীতও আছে অবশ্য। কিন্তু সে গানের এর চেয়ে উপযুক্ত ব্যবহার অসম্ভব ছিল।

পপকর্ন খেতে খেতে দেখে ভুলে যেতে চাইলে নীহারিকা আপনার জন্যে নয়। যদি প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে আসার বহুক্ষণ পরেও দেখা ছবির রোমন্থন করতে ভাল লাগে, তাহলে এই ছবি আপনার।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত