আলতো ফ্লিক: ক্রিকেট নিয়ে ব্যতিক্রমী বই

‘দাস্তান-এ ফাস্ট বোলিং’ লেখাটায় লেখক কলিন কাউড্রের একখানা মাত্র ২২ রানের ইনিংসের কথা লিখেছেন, যার মূল্য সংখ্যায় ধরা পড়ে না। এই বইটাও মাত্র ৬৬ পাতার। কিন্তু এমন বই মোটা হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

পশ্চিমবঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার চিরকালই বিরল। তা বলে ক্রিকেট নিয়ে লিখিত বইয়ের সংখ্যা কম নয়। আসন্ন কলকাতা বইমেলায় আরও কয়েক বস্তা বই বেরোবে ক্রিকেট নিয়ে। ফেসবুকে চোখ রাখলেই তা দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ বইতেই প্রথিতযশা সাংবাদিকদের তারকাদের সঙ্গে ওঠাবসার কাহিনি অথবা স্বঘোষিত ক্রিকেটবোদ্ধাদের আবেগসর্বস্ব গদ্যের মোড়কে পরিবেশিত আজগুবি কথাবার্তা ছাড়া বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় যখন এমন একটা বই হাতে এসে পৌঁছয় যার প্রায় প্রত্যেকটা পাতাই উদ্ধৃত করতে ইচ্ছা করে, তখন চমকে উঠতে হয়। ক্রিকেট এমন একটা খেলা, যা নিয়ে ক্রিকেট খেলিয়ে দেশগুলোর সাহিত্যিকরাও বিস্তর লেখালিখি করেছেন। আবার সিএলআর জেমস, নেভিল কার্ডাস, পিটার রোবাক, গিডেয়ন হাইয়ের মত সাংবাদিকদের লেখা সাহিত্যে উত্তীর্ণ হয়েছে। বাংলাতেও একসময় অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, শঙ্করীপ্রসাদ বসু, মতি নন্দীরা ক্রিকেট নিয়ে লিখেছেন। শেষেরজন তো বেশি সাংবাদিক না বেশি সাহিত্যিক তা বলা বেশ কঠিন। অথচ ইদানীং ক্রিকেট নিয়ে গন্ডা গন্ডা বই বেরোলেও, বুক ঠুকে কটাকে আর সেই ধারার উত্তরসূরী বলা যায়? অরিজিৎ সেনের আলতো ফ্লিক – এক চিলতে ক্রিকেটের গল্প কিন্তু ক্রিকেটারদের হাঁড়ির খবর লেখা আর দর্শক হিসাবে ক্রিকেট দেখে বিশেষজ্ঞ হিসাবে বই লেখার চলতি হাওয়ার পন্থী না হয়ে, ক্রিকেটের ইতিহাস খুঁড়ে সচরাচর অনালোচিত ক্রিকেটারদের কথা বলেছে। ক্রিকেট যেভাবে জীবনকে প্রতিফলিত করে আর জীবন যে অলৌকিক কায়দায় ক্রিকেট মাঠে এসে বসে, তার সন্ধানে বহুদূর গেছে এই বই। তাই সৃষ্টি হয়েছে খাঁটি সাহিত্য।

এ বইকে যদি কেউ ব্যক্তিগত গদ্যের বই আখ্যা দেন, তাতেও লেখকের কৃতিত্ব এতটুকু কমে না। বস্তুত ফ্ল্যাপের লেখক পরিচিতিতে লেখাই রয়েছে “ক্রিকেট নিয়ে লেখার জন্য যে যে যোগ্যতা লাগে… মানে শচীন তেন্ডুলকরের সাথে হোটেল লাউঞ্জে ছবি বা গোপাল বসুর সাথে আড্ডার স্মৃতি বা নিদেনপক্ষে ক্লাব হাউসে যাতায়াত… কোনটাই ঝুলিতে নেই। একবার দূর থেকে উরকেরি রামনকে দেখা আর একবার কাছ থেকে রাসেল আর্নল্ডকে… ব্যাস…”। মুশকিল হল, এসব তথাকথিত যোগ্যতা ছাড়া যাঁরা ক্রিকেট নিয়ে লেখেন আজকাল, তাঁরা আবার সগর্বে ফেনা পরিবেশন করেন। কিন্তু অরিজিৎ একেবারেই সেরকম ‘জিয়া নস্ট্যাল’ করে দিয়ে বাজিমাত করার চেষ্টা করেননি। অথচ স্মৃতি এ বইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অসম্ভব সংবেদনশীল স্মৃতি না থাকলে ‘ফেলুকে নিয়ে মোনোলগ’ শীর্ষক রচনার এই অনুচ্ছেদগুলো লেখা অসম্ভব

এদিকে ওয়াসিম জাফর ব্যাটে [ব্যাট হাতে?] দাঁড়িয়ে আছে। দুটো ছায়া [,] নিজের আর ব্যাটের। দুটোই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হছে [হচ্ছে]। কত রান করেছে জাফর… একশ [।] একশ চল্লিশ, একদিনে এত? এখনো খেলা বাকি, ইস্ কেন সকাল থেকে নেই আমি! আমি এভাবে অন্য কাজে আটকে গেলাম? সারা জীবনই আমি অন্য কাজে আটকে গেছি। যখন আমার সেখানে [যেখানে?] থাকার কথা, আমি তার থেকে কয়েক যোজন দূরে থেকেছি, পরে হাঁফাতে হাঁফাতে পৌঁছে গেছি সেখানে। তখন আর কিছু করার নেই। আমি যখন আমার পেশেন্টের বাড়ির লোকেদের বলি – আর কিছু করার নেই… কিস্যু না, আমি তখনও জানি একটা জিনিস করা বাকি… ক্ষমা চাওয়া, এখন কিছু করার নেই কিন্তু যখন করার ছিল, আমি করতে পারিনি। আমি শুধু আমিই, নার্স না, আয়া না, অন্য ডাক্তার না শুধু আমিই পারতাম বাবু তোমাকে বাঁচাতে। কিন্তু তখন আমি অন্য কোথাও ছিলাম, অন্য কিছু ভাবছিলাম। …

তুমি যখন শত মুহূর্ত আমায় উপহার দিয়েছ, দুচোখ ভরে তোমার কভার ড্রাইভ [,] ফ্লিক, গ্লান্স দেখার জন্য… তোমাকে বাঁচানোর… তোমাকে লুকিয়ে রাখার জন্য, “ফেলু”… তখন আমি পাগলের মত এগারো নম্বর গেট খুঁজে বেড়াচ্ছি। আর যখন পেলাম… রোদ পড়তে শুরু করেছে। তোমার ছায়া, ব্যাটের ছায়া বাড়তে বাড়তে পুরো সবুজ মাঠ গ্রাস করে নিয়েছে।

এই ছায়াভরা মাঠে আর কাউকে দেখতে পাব না আমি। ওয়াসিম জাফর… তেন্ডুলকার… ফেলু কাউকে না। আমি শুধু আমাকেই দেখতে পাচ্ছি। এই সঙ্গঁ [সঙ্গ] আমার আর সহ্য হচ্ছে না। সব শান্ত হয়ে গেল কেন? তেন্ডুলকার আউট… বিরাশি রানে। একশ ছেচল্লিশ মিনিট মাঠে ছিল, দু-ঘন্টা ছাব্বিশ মিনিট। তাতেই এত থম্ মেরে গেল সবাই। ফেলু দু-বছর ছিল – দুবছর প্লাস আরও কিছু দিন… কত দিন এক্স্যাক্ট্… মনে পড়ে… মনে পড়ে না।

কে এই ফেলু? রজনী সেন রোডের বাসিন্দা জনপ্রিয় গোয়েন্দা নয়। ওইসব চর্বিতচর্বণ থেকে এ বই বহু দূরে। ফেলু কে, জাফরের ম্যারাথন ইনিংস দেখতে দেরিতে মাঠে পৌঁছে, অথবা ইউসুফ ইউহানা আর ইউনিস খানের লম্বা জুটি দেখতে দেখতে পেশায় চিকিৎসক লেখকের কেন ফেলুকে মনে পড়ে – তা জানতে গেলে পড়তে হবে বইটা। উৎসুক পাঠকের জন্যে এই কাজটুকু তোলা থাক।

অরিজিৎ অনেক লেখাতেই নিজের আর পাঠকের মাঝে একজন কথককে রেখেছেন বড় বা ছোট ভূমিকায়। কোথাও সেই কথক লেখকের বাবা, কোথাও কোনো মাস্টারমশাই। সেভাবেই আলোচনায় এসে পড়েছেন ক্রিকেট-ইতিহাসের অনেক বিস্মৃত চরিত্র। যেমন শ্রীলঙ্কার জোরে বোলার ডিএস জয়সুন্দরা। শ্রীলঙ্কার জোরে বোলারদের সম্পর্কে লেখার সংকল্প নিয়ে বসে যাঁর নাম শুনে লেখকের প্রতিক্রিয়া “জয়বর্ধনে ইয়েস। জয়সূর্য ইয়েস। কিন্তু হু অন আর্থ ইজ জয়সুন্দরা?”

লেখকের বাবা তখন বলেন “তবে? তুমি বাংলা গদ্য নিয়ে গবেষণা করছ অথচ বিদ্যাসাগরের কথা জানো না… ছোটগল্পের ছাত্র – কিন্তু মঁপাসা পড়নি – এভাবে হয়?”

এরপর ডন সুমিগেন জয়সুন্দরা সম্পর্কে জানা যায় যতটুকু জানা সম্ভব। মহম্মদ নিসার আর অমর সিংকে মনে রেখেও, তিনি অনেকের মতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে উপমহাদেশের দ্রুততম বোলার। এমনিতেই শ্রীলঙ্কা তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনো শক্তি নয়। তার উপর তাঁর কেরিয়ারের অর্ধেক চলে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গ্রাসে। কেরিয়ারের শুরুর দিকে চাকিং করায় সাসপেন্ডও হয়েছিলেন। কিন্তু যেটুকু তথ্য আছে তা থেকে জানা যায় ক্লাব ক্রিকেটে পাঁচবার হ্যাটট্রিক করেছেন, তিনবার ইনিংসে দশ উইকেট নিয়েছেন। ১৯৪০-৪১ সালে শ্রীলঙ্কার একটা দলের সঙ্গে ভারত সফরে এসেছিলেন জয়সুন্দরা। দুটো বেসরকারি টেস্টে খেলেছিলেন। তার একটা ভারত জেতে, অন্যটা ড্র হয়। মাদ্রাজের বিপক্ষে একটা টুর গেমে জেতে জয়সুন্দরার দল এবং তিনি সে ম্যাচে ছয় উইকেট নেন।

জয়সুন্দরার কাহিনি লেখকের বাবা শেষ করেন একটি নিদারুণ মন্তব্যে

অন্য বিষয় বাছো বাবু। ইতিহাস বড় বিশ্বাসঘাতক। কোন ডন সিংহাসন পায়… কোন ডন নীরবে বয়ে চলে… বয়েই চলে…

আরও পড়ুন এটা যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট; ওঁরা গ্ল্যাডিয়েটর নন, ক্রিকেটার

যারা সিংহাসন পায়নি, জয়সুন্দরার মত যারা রয়ে গেছে নিষ্ফলের, হতাশের দলে; তাদের প্রতি লেখকের মমতা আগাগোড়া বহমান। পত্রপত্রিকায় কাল্পনিক একাদশ তো কতই তৈরি হয়, কে আর বসে বসে কোনোদিন টেস্ট খেলতে না পাওয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সফল ভারতীয় ক্রিকেটারদের একাদশ তৈরি করে? লেখকের তৈরি একাদশটা এইরকম – সুরেন্দ্র ভাবে (সহ-অধিনায়ক), এমভি শ্রীধর, বিবি নিম্বলকর, অমল মজুমদার, কেপি ভাস্কর, সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (অধিনায়ক), দেবরাজ গোবিন্দরাজ, পান্ডুরাং সালগাঁওকর, দুর্গাশঙ্কর মুখার্জী, পদ্মাকর শিভালকর, কানোয়ালজিৎ সিং। ১৯০৭ সালের ইংল্যান্ড সফরে দক্ষিণ আফ্রিকা দলে খেলা চার গুগলি বোলারকে নিয়েই বা কে আলাদা করে লিখতে যায়?

তবে এ বই একবার পড়ে, আবার পড়তে হবে, বারবার পড়তে হবে অজানা ইতিহাস বা সংবেদনশীলতা বা মহম্মদ আজহারউদ্দিনের একটা ফ্লিকের বিশ্লেষণে গভীরতার জন্যে নয়। পড়তে হবে ক্রিকেটকে ব্যক্তিগত আর ব্যক্তিগতকে ক্রিকেট করে তোলার দক্ষতার টানে। যা শিখরে পৌঁছেছে ‘১৯.৪.২০২৩’ শীর্ষক লেখায়। শুরুর দিকটা উদ্ধৃত না করলে চলে না

বাবাকে দিয়ে এলাম। মানে গঙ্গায় দিয়ে এলাম। ছ-ফুটের লোকটা বিনা প্রতিবাদে ভেসে গেল।

বন্ধুরা দুহাতে আমায় ধরে বাবুঘাটের সিঁড়ি দিয়ে তুলল। জানি না কেন ওরা আমায় ধরে আছে… এমন সময় তো একা থাকতে হয়… এমন সময়ের মুখোমুখি তো একা হতে হয়… নেভিল কার্ডাস সেই কবে বলে গেছেন

“… terrible are the emotions of long on when the ball is driven high towards him and when he waits for it – alone in the world…”

হঠাৎ মনে হল অরুণ লালের কথা। ক্যানসার সার্জারির রাতে। ম্যাচ ৫০-৫০। মানে রাত কাটতেও পারে… নাও পারে। অরুণ লাল ডান হাতে পায়ে টোকা মেরে মনে মনে বললেন “লালজী… আজ রাতে উইকেটটা দিও না…”

আমিও মনে মনে বলতে লাগলাম “আজ রাতে উইকেটটা দিও না… নো সফ্ট ডিসমিসল… আমায় আউট করুক এসে… আমি উইকেট দেব না।”

‘দাস্তান-এ ফাস্ট বোলিং’ লেখাটায় লেখক কলিন কাউড্রের একখানা মাত্র ২২ রানের ইনিংসের কথা লিখেছেন, যার মূল্য সংখ্যায় ধরা পড়ে না। এই বইটাও মাত্র ৬৬ পাতার। কিন্তু এমন বই মোটা হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

তবে বই নির্মাণে আরও যত্নবান হওয়া দরকার ছিল। র আর ড় প্রয়োগে ভুল হয়েছে প্রায়শই, যতিচিহ্নের গোলমাল আর শব্দের মাঝের ফাঁক অজায়গায় পড়ার বিভ্রাটও বিরল নয়। সর্বোপরি চিন্ময় মুখোপাধ্যায়ের প্রচ্ছদ একেবারেই বইয়ের নামের এবং লেখার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারেনি। তবে এ বইকে মলাট দিয়ে বিচার করতে গেলে নেহাতই অবিচার হবে।

আলতো ফ্লিক – এক চিলতে ক্রিকেটের গল্প
লেখক: অরিজিৎ সেন
প্রকাশক: কুবোপাখি প্রকাশন
মূল্য: ২৫০ টাকা

ওয়াসিম জাফর: ক্রিকেটের গৌরবহীন একা

ওয়াসিমের দীর্ঘ কেরিয়ারের টিমমেটদের অধিকাংশের নীরবতা দেখিয়ে দিচ্ছে, তাঁদের কাছে ওঁর শেষ পরিচয় একজন ভিন্নধর্মী মানুষের।

ওয়াসিম জাফর কিন্তু মুনাওয়ার ফারুকি নন। তিনি হিন্দু দেবদেবী বা অমিত শাহ – নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে মস্করা করতে পারেন এমন কোন সম্ভাবনা নেই। করেছেন এমন কোন ইউটিউব ভিডিও-ও নেই। কারণ ওটা ওয়াসিমের পেশা নয়। তাঁর পেশা ক্রিকেট। তিনি প্রাক্তন ক্রিকেটার, অবসর নেওয়ার পর উত্তরাখণ্ড রঞ্জি দলের হেড কোচের চাকরি করছিলেন। পদত্যাগ করেছেন, কারণ তাঁর মতে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ উত্তরাখণ্ডের (সিএইউ) কর্তারা তাঁর কাজে অন্যায় হস্তক্ষেপ করছিলেন, নিজেদের পছন্দের ক্রিকেটারদের যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও দলে নিচ্ছিলেন। ব্যাপারটা এ দেশের খেলার জগতের চিরপরিচিত ঘটনাগুলোর একটা হয়েই থেকে যেত, যদি না টিম ম্যানেজার নবনীত মিশ্র ওয়াসিমের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আনতেন।

ওয়াসিমের পদত্যাগের পর এক হিন্দি কাগজের কাছে তাঁর নামে বিষোদগার করতে গিয়ে নবনীত বলেন হেড কোচ নাকি দল নির্বাচন করছিলেন ধর্মের ভিত্তিতে। অর্থাৎ মুসলমান হলে দলে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছিল। আরো গুরুতর অভিযোগ, টিম হাডলে (পরস্পরের কাঁধে হাত রেখে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আলোচনা করার সেই যে প্রথা জন রাইট আর সৌরভ গাঙ্গুলি ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারতীয় ক্রিকেটে চালু করেছিলেন) “রামভক্ত হনুমান কি জয়” বলতে বারণ করেছিলেন। শুধু কি তাই? বায়ো বাবল ভেঙে এক মৌলবীকে নিয়ে এসেছিলেন সাজঘরে। শিশুর আত্মার উপর এমন নরকের দুঃস্বপ্ন চাপিয়ে দেওয়ার পরে কি আর…?

আর কী? ওয়াসিমের প্রত্যুত্তর এই প্রশ্নটাই। বলেছেন তিনি যদি সত্যিই সাম্প্রদায়িক হয়ে থাকেন, তাহলে আগেই তাড়িয়ে দেওয়া হয়নি কেন? উপরন্তু বলেছেন সাম্প্রদায়িক হলে তিনি হিন্দু জয় বিস্তাকে অধিনায়ক করতে চাইতেন না। কর্তারাই বরং তাঁর কথা না মেনে ইসলাম ধর্মাবলম্বী ইকবাল আবদুল্লাকে অধিনায়ক করেন। ওয়াসিম উল্লেখ করেছেন কোন কোন মুসলমান ক্রিকেটারকে তিনি ভাল খেলতে না পারার কারণে প্রথম একাদশ থেকে বাদ দিয়েছেন। এ-ও বলেছেন যে দলের কাউকে হনুমানের বা রামের জয়ধ্বনি দিতে তিনি শোনেননি। বরং শিখদের প্রিয় একটি জয়ধ্বনি দেওয়া হচ্ছিল। তিনি তার বদলে “গো উত্তরাখণ্ড” বা “লেট’স ডু ইট উত্তরাখণ্ড” কিংবা “কাম অন উত্তরাখণ্ড” বলতে পরামর্শ দেন। কারণ দলটা কোন সম্প্রদায়ের হয়ে খেলছে না, খেলছে রাজ্যের হয়ে। সাম্প্রদায়িক মানসিকতার লোক হলে তো দলকে দিয়ে “আল্লা হো আকবর” বলাতেন। মৌলবীকেও তিনি সাজঘরে আনেননি, এনেছিলেন ইকবাল — ওয়াসিমের বক্তব্য এই।

ওয়াসিমের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে এখনো সিএইউ কর্তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করে উঠতে পারেননি। ইতিমধ্যে ইকবাল বলেছেন তিনিই মৌলবীকে জুম্মার নমাজের জন্য নিয়ে এসেছিলেন বটে, তবে ওয়াসিমের কাছ থেকে অনুমতি পাননি। তিনি বরং টিম ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করতে বলেছিলেন। হেড কোচের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আনা নবনীত স্বয়ং মৌলবী সাহেবকে নিয়ে আসার অনুমতি দেন। বারণ করলে তাঁকে আনা হত না। সত্যি কথা বলতে, ইকবালের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে মৌলবী সাহেবের সাথে ক্রিকেটারদের যে ছবি রয়েছে তার ত্রিসীমানায় ওয়াসিম নেই। এই প্রবন্ধ লেখার সময় পরিস্থিতি এই, যে সিএইউ সচিব মহিম বর্মা (ওয়াসিম পদত্যাগপত্রে মূলত এই ভদ্রলোকের বিরুদ্ধেই হস্তক্ষেপের অভিযোগ এনেছেন) প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছেন বায়ো বাবল লঙ্ঘন করা সম্বন্ধে ম্যানেজারের থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। সেই বিজ্ঞপ্তিতে ওয়াসিমের কিন্তু নামগন্ধ নেই।

এতখানি এসে নিশ্চয়ই ভাবছেন, এর মধ্যে মুনাওয়ার ফারুকির কথা উঠছে কেন? উঠছে এই জন্য যে শেষ বিচারে মুনাওয়ারের দোষ যা, ওয়াসিমের দোষও তাই। মুসলমান পরিচিতি। ওয়াসিম তবু ভাগ্যবান। স্রেফ বদনামের ভাগী হতে হয়েছে, দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইট তার চরিত্রানুসারে ঘটনা আর রটনার তফাত না করে ট্রোলবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছে। মুনাওয়ারের মত নির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও মাস খানেক হাজতবাস তো করতে হয়নি।

যদি মনে হয় তুলনাটা অহেতুক, তাহলে লক্ষ করুন ক্রিকেট প্রশাসকদের বিরুদ্ধে ওয়াসিমের পদত্যাগপত্রে লেখা অভিযোগগুলো নস্যাৎ করতে কী কী বলা হয়েছে। বলা যেতেই পারত ওয়াসিম অযোগ্য, ওঁর কোচিং-এ দল কিছুই জেতেনি, তাই উনি কর্তাদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে পালিয়ে গেছেন। অথবা বলা যেতে পারত খেলোয়াড়রা ওয়াসিমকে পছন্দ করছিল না, তাই উনি পালিয়ে বাঁচলেন। কোচের চলে যাওয়ার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে এইসব কথাই ভারতের বিভিন্ন খেলার কর্মকর্তারা চিরকাল বলে থাকেন। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকদের তো এসব শুনে শুনে কান পচে গেছে। উত্তরাখণ্ডের কর্তারা তেমন বললেন না কিন্তু। বললেন এমন কিছু কথা, যা একমাত্র মুসলমানদের সম্বন্ধে বললেই মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা যায় এবং সব প্রশ্ন ভুলিয়ে দেওয়া যায়। ভেবে দেখুন, যদি উত্তরাখণ্ডের হেড কোচের নাম ওয়াসিম জাফর না হয়ে অসীম জৈন হত, তার সম্বন্ধে যদি বলা হত, “বেছে বেছে হিন্দু ক্রিকেটারদের খেলায়”, “টিম হাডলে আল্লা হো আকবর বলতে বারণ করেছিল”, “বায়ো বাবল লঙ্ঘন করে সাজঘরে স্থানীয় মন্দিরের পুরোহিতকে ডেকে এনে প্রার্থনা করেছে” — তাহলে সবাই বলতেন না, ঠিকই করেছে? যারা “হিন্দু খতরে মে হ্যায়” বলে, শুধু তারা নয়, বাকিরাও কি মনে করতেন না বিনা দোষে লোকটার পিছনে লাগা হচ্ছে?

সদ্য সমাপ্ত অস্ট্রেলিয়া সফরেই কয়েকজন ভারতীয় ক্রিকেটার বায়ো বাবল ভেঙে রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে এক ভক্তের ক্যামেরাবন্দী হয়েছিলেন এবং, ভক্তটির বয়ান অনুযায়ী, তাঁকে আলিঙ্গন করেছিলেন। সেকথা প্রকাশ্যে আসার পর এ দেশের আপামর ক্রিকেটপ্রেমী এবং ক্রিকেট সাংবাদিক ভক্তটিকেই আক্রমণ করেন। ক্রিকেটাররা নাকি অবোধ শিশু। উপরন্তু তাঁরা বৃষ্টি এসে যাওয়ায় নিরুপায় হয়ে রেস্তোরাঁয় ঢুকেছিলেন। ক্রিকেট বোর্ডও ক্রিকেটারদেরই পাশে দাঁড়ায়। বলে বাবলটি তো তেমনি আছে, কমেনি এক রত্তি। আজ হঠাৎ মৌলবী সাজঘরে আসায় সকলের খেয়াল হয়েছে সবার উপরে বাবল সত্য, তাহার উপরে নাই।

ঘটনাটায় ওয়াসিমের যোগ তো এখন অব্দি প্রমাণিতই নয়। তাঁর অন্য কথাগুলো ভেবে দেখুন। ক্রিকেটজীবনের শেষ দিক থেকে তিনি লম্বা দাড়ি রাখেন বলে তাঁকে দেখে আপনার আসাদুদ্দিন ওয়েসির কথা মনে পড়তেই পারে, পাকিস্তানি বলতেও ইচ্ছা করতে পারে, কিন্তু তিনি টিম হাডলে যে যুক্তিতে শিখ ধর্মের জয়ধ্বনিরও বিরোধিতা করেছেন, সেটাই প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা নয় কি? খেলছি উত্তরাখণ্ডের হয়ে, তাই উত্তরাখণ্ডের নামে ধ্বনি দাও, কোন ধর্মের নামে দিও না। এর চেয়ে যুক্তিযুক্ত পরামর্শ কিছু আছে? ভারত কি পাকিস্তানের মত এক ধর্মের দেশ যে এখানে কোন একটা ধর্মের জয়ধ্বনিকে দলের জয়ধ্বনি করে দেওয়া হবে, আর অন্য ধর্মের খেলোয়াড়দেরও তা মেনে চলতে হবে? উঠতে বসতে ইসলামের একেশ্বরবাদকে বলব গোঁড়ামি আর হিন্দুদের বহুত্ববাদকে বলব উদারতা, তারপর সামাজিক জীবনে নিজের ঈশ্বরকেই চাপিয়ে দেব?

সত্যি কথাটা সহজ করেই বলা যাক। এ দেশে এই মুহূর্তে একজন মুসলমানের মুসলমান হওয়াই সবচেয়ে বড় সমস্যা। তিনি মুনাওয়ারের মত দাড়ি গোঁফ কামানো হালফ্যাশানের তরুণ হলেও সমস্যা, ওয়াসিমের মত লম্বা দাড়ি রাখা, ইকবালের মত মৌলবী ডেকে জুম্মার নামাজ পড়া মুসলমান হলেও সমস্যা। একজন লোক হাসিয়ে আয় করছে, যেভাবে হাসাচ্ছে তা আমার পছন্দ নয়। আমি না শুনলেই পারি। কিন্তু তাতে আমি থামব কেন? মুসলমান পরিচিতিটাকে হাতিয়ার করি। তাহলেই তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া যাবে। উপরি জেলের ঘানিও টানানো যাবে। একজন দেশের হয়ে দিব্যি ক্রিকেট খেলেছে, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সকলের চেয়ে বেশি রান করেছে, এখন কোচিং করাচ্ছে, আবার আমার দোষও ধরছে। সেটা আমার পছন্দ নয়। কী করা যায়? খুব সোজা। মুসলমান পরিচিতিটাকে হাতিয়ার করি। তাহলেই তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া যাবে।

এই দেশ কোনদিনই নিখুঁত ছিল না, স্বাধীন হওয়ার সময় থেকেই সহস্র স্ববিরোধিতা। সংবিধান সব নাগরিককে সমান চোখে দেখেছে, অথচ সমাজ সকলকে সমান মনে করে না। এই বৈপরীত্য সম্পর্কে স্বয়ং ভীমরাও আম্বেদকর সচেতন ছিলেন। সংবিধান সভার শেষ বক্তৃতায় তিনি সেকথা উল্লেখও করেছেন। এই বৈপরীত্য দূর করার দায়িত্ব যাঁদের হাতে ন্যস্ত ছিল, তাঁরা দায়িত্ব পালন করেননি। ফলে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের থানায় কালীপুজো হয়েছে, আমরা শিখেছি এটা সাম্প্রদায়িক নয়, কারণ অন্য ধর্মের লোকেরা তো আপত্তি করেনি। স্কুলে সরস্বতীপুজো হয়েছে, আমরা জেনেছি এটাও সাম্প্রদায়িকতা নয়। কই অন্য ধর্মের ছাত্রছাত্রী বা তাদের বাবা-মায়েরা তো আপত্তি করেনি? ময়দানে ফুটবল মরসুম শুরু হয়েছে বারপুজো দিয়ে, আমরা সাম্প্রদায়িকতা দেখিনি। আই পি এল ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রমাগত হারের দোষ কাটাতে স্টেডিয়ামে পুজো করেছে, তাতেও কেউ সাম্প্রদায়িকতা দেখেনি। ২০১৫-১৬ মরসুমে দিল্লীর রঞ্জি দলকে দিয়ে প্রতিদিন খেলার আগে সূর্য নমস্কার করাতেন কোচ বিজয় দাহিয়া আর অধিনায়ক গৌতম গম্ভীর। যুক্তি ছিল “A team that prays together stays together.” । তখনো কারোর মনে হয়নি ব্যাপারটা সাম্প্রদায়িক।

আসলে বরাবর আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা এবং মানদণ্ড ঠিক করেছে সংখ্যাগুরু। আজ অবস্থার এমন অবনতি হয়েছে যে দেশের যে জায়গাটায় ধর্ম বা জাতপাতের পরিচিতি কোন ইস্যু ছিল না বলে আমরা জানতাম, সেই খেলার মাঠেও তফাত করা শুরু হয়েছে।

যদি কেবল কর্মকর্তারাই এমনটা করতেন, তাহলে তবু কথা ছিল। কারণ ভারতের খেলাধুলো চালান আসলে রাজনীতির ব্যাপারীরা। আর এই মুহূর্তে যাদের পাল্লা ভারী, তাদের তো মানুষে মানুষে ভেদ করাটাই রাজনীতি। আমরা অন্তত এই ভেবে সান্ত্বনা পেতাম যে আমাদের খেলোয়াড়রা এভাবে ভাবেন না। তাঁদের কাছে সহখেলোয়াড়ের একটাই পরিচয় — খেলোয়াড়। কিন্তু এখন আর তেমনটা ভাবা যাচ্ছে না। এই লেখা শেষ করা পর্যন্ত অনিল কুম্বলে ছাড়া এ দেশের প্রবাদপ্রতিম ক্রিকেটারদের একজনও ওয়াসিমের পক্ষ নিয়ে একটি শব্দও খরচ করেননি। প্রাক্তনদের মধ্যে দোদ্দা গণেশ, অমল মজুমদার, ইরফান পাঠান আর বর্তমান ক্রিকেটারদের মধ্যে মনোজ তিওয়ারির মত দু একজন ছাড়া সবাই চুপ। ইকবাল আবদুল্লা, বা ওয়াসিমের বিদর্ভের হয়ে খেলার সময়কার টিমমেট ফয়েজ ফজলের সহমর্মিতায় কী-ই বা এসে যায়? ওয়াসিমের দীর্ঘ কেরিয়ারের টিমমেটদের অধিকাংশের নীরবতা দেখিয়ে দিচ্ছে, তাঁদের কাছে ওঁর শেষ পরিচয় একজন ভিন্নধর্মী মানুষের।

মনে রাখা দরকার, ওয়াসিম জাফর যে সে ক্রিকেটার নন। বেশিরভাগ ম্যাচ খেলেছেন ভারতীয় ক্রিকেটের কুলীন দল মুম্বাইয়ের হয়ে। শুধু যে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর তর্কাতীত সাফল্য তা নয়, ভারতের হয়ে ৩১টা টেস্ট ম্যাচে প্রায় ৩৫ গড়ে হাজার দুয়েক রান করেছেন। মাত্র চারজন ভারতীয় ওপেনার ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে দ্বিশতরান করতে পেরেছেন। ওয়াসিম তাঁদের একজন। অন্যরা সুনীল গাভস্কর, দিলীপ সরদেশাই আর নভজ্যোৎ সিং সিধু। এ হেন ক্রিকেটারকে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য কোণঠাসা করা হচ্ছে, আর চুপ করে আছেন মুম্বাইয়ের সব মহীরুহ। তাঁদের একজন, অজিঙ্ক রাহানে, এখন ভারতীয় টেস্ট দলের সহ-অধিনায়ক। চেন্নাইতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট শুরুর আগের দিন সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল এই নিয়ে। রাহানে বলেছেন তিনি ব্যাপারটা ঠিক জানেন না। এই রাহানেই সপ্তাহখানেক আগে কৃষক আন্দোলন সম্বন্ধে যথেষ্ট জানতেন। দেশকে এক থাকার বার্তা দিয়েছিলেন আরো অনেক ক্রিকেটারের সঙ্গে মিলে। এঁরা সবাই এখন স্পিকটি নট। রোহিত শর্মা চুপ, গাভস্করেরও সাড়াশব্দ নেই।

এবং শচীন তেন্ডুলকর। আজও ইউটিউবে দেখা যায় নব্বইয়ের দশকে তৈরি একটা ভিডিও ক্যাম্পেন। সারা দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার আবেদন করতে গিয়ে শচীন সেখানে বলছেন “When we play for India, we’re a team. It doesn’t matter if you’re a Hindu or a Muslim on the field. Don’t let it matter off the field.” সেই ভিডিওতে অমিতাভ ও অভিষেক বচ্চন, অপর্ণা সেন, অনুপম খের, শাবানা আজমির মত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাথে শচীনও যে অভিনয়ই করছিলেন তা কে জানত?

নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না। সুতরাং ধর্মীয় বিভাজন মাঠে নেমে পড়ায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে কষ্ট হয় মহম্মদ সিরাজের মত যাঁরা একসাথে পিতা আর পিতৃভূমির জন্য কাঁদেন, তাঁদের জন্য। ভারতীয় ক্রিকেট ঐ অশ্রুর যোগ্য থাকবে তো?

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত