যদি কিছু চাওয়া যায়

প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানে যাকে মোষ তাড়ানো উল্টো স্বভাব বলে, তেমন স্বভাবের জনা ছয়েকের জন্যই এই স্কুল টিকে আছে।

দিল্লি রোডের ও পারে একটা দরকারে যেতে হবে। সাইকেলে চেপে রওনা দিয়েছি বসন্ত পঞ্চমীর ফুরফুরে হাওয়ায়। কোভিডের ছোবলে নিভৃতবাস, তারপর মায়ের মৃত্যু — সব মিলিয়ে পথে বেরনো হয়নি বেশ কিছুদিন। বেরিয়ে টের পেলাম দুর্গম গিরি কান্তার মরু পাড়ি দিয়েছি। নির্বাচন এসে পড়েছে, সঙ্গে এসেছে উন্নয়নের জোয়ার। অতএব আমাদের এঁদো মফসসল স্টেশনের সঙ্গে জাতীয় সড়ককে জুড়েছে যে মূল রাস্তাটা, সেই কিলোমিটার পাঁচেকের সমস্তটা খুঁড়ে এবং বুজিয়ে পাইপ বসানোর কাজ চলছে। তা দেখেই নিভৃতবাসে গিয়েছিলাম, ফিরে এসে দেখছি শেষ হওয়ার বদলে কাজের গভীরতা ও বিস্তার বেড়ে গেছে বহু গুণ। অজানা গলিগুলোর সঙ্গে পথিকের মধুচন্দ্রিমা মিটে গেছে, পড়ে আছে বিরক্তি, কারণ সব জানা হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে স্থানীয় বিধায়ক দলে থেকে কাজ করতে পারছিলেন না বলে অন্য দলে পাড়ি দিয়েছেন। কে জানে, হয়ত পিচ, বালি, রোলারদেরও দম বন্ধ হয়ে আসছে বলে সত্বর কাজ শেষ করতে পারছে না। এসব নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করে লাভ নেই। তাই আধ কিলোমিটার সাইকেলে যাত্রা করার পরই যখন নিজেকে মনোহর আইচের মত প্রবীণ মনে হল, তখন নেমে পড়লাম। চোখে পড়ল রাস্তার উল্টোদিকেই ‘প্রচেষ্টা’।

গুরুচণ্ডালির গুরু বলেছেন, নির্বাচনের জল-হাওয়া-মাটি নিয়ে লিখতে হবে। সেইসব শুঁকতেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছনোর আগেই দম শেষ। বাঁশাই অটো স্ট্যান্ডে ‘প্রচেষ্টা’-র দিকে চোখ পড়তেই মনে হল, নির্বাচন নিয়ে কেবল আমার মত চশমা আঁটা খোঁচা দাড়ির আঁতেলেরই আশা-আশঙ্কা আছে এমন তো নয়, ঐ স্কুলের ছাত্রছাত্রী, যারা একেবারেই আমার মত নয়, তাদেরও কিছু চাওয়ার থাকতে পারে। ২০১১-র জনগণনা বলেছে পশ্চিমবঙ্গে নানারকম প্রতিবন্ধকতা থাকা মানুষের সংখ্যা ২০,১৭,৪০৬। এরা জনসংখ্যার মোটে ২.২১%, নির্ঘাত সে কারণেই এদের কথা মনে পড়ে না সচরাচর। ‘বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন’ — এই আধুনিক তকমা শেষমেশ ওদের ক্ষতিই করেছে কিনা কে জানে! স্কুলটা বাড়ির এত কাছে, একেবারে মেন রোডের উপর। তবু তো কোনদিন চেয়ে দেখিনি! আজও স্কুলের সামনের অটো স্ট্যান্ডে পাঞ্জাবি পাজামা আর শাড়ির রঙিন লাইনের দিকে চোখ না গেলে নীরব স্কুলটা বোধহয় আড়ালেই থেকে যেত। অতএব ঢুকে পড়লাম গ্রিলের দরজা পেরিয়ে।

দীর্ঘদিনের ‘প্রচেষ্টা’। ১৯৯৭ সালে, কে জানে কেন, জনা কয়েক জোয়ানের মাথায় ঢুকেছিল এলাকার নানারকমের প্রতিবন্ধকতা থাকা ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু একটা করা দরকার। যৌবন চলে গেলেও একটা কিছু করার দুরারোগ্য ব্যাধি সারেনি সুবীর ঘোষ, যূথিকা চক্রবর্তী, শিপ্রা সিংহদের। পাঁচজন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে শুরু হওয়া স্কুলের ছাত্রসংখ্যা এখন ৫৯। মূলত মানসিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করা হয় এই স্কুলে। এখানকার ছাত্রছাত্রীদের কেউ সেরিব্রাল পলসিতে ভুগছে, কারোর আছে ডাউনস সিনড্রোম। কারোর আবার একাধিক অসুবিধা। অসুবিধা মানে? এখানে প্রথমবার আসার সময়ে কেউ নিজে হাতে খেতে পারত না, কেউ নিজে জামাকাপড় পরতে পারত না। কেউ কেউ পেচ্ছাপ পায়খানা পেলে সামলাতে পর্যন্ত পারত না। সুবীরবাবুরা আসলে এদের স্বাবলম্বী হতে শেখান। কোন কোন অসুবিধা কোনদিনই কাটবে না, তা বলে স্কুলের সরস্বতীপুজোর আয়োজন করতে অন্যদের সাহায্যের দরকার হয় না এই ছাত্রছাত্রীদের।

“কী করে চলে এই স্কুল? সরকারি সাহায্য কতটা পান?” হাঁদার মত এই প্রশ্নটা করতেই হল।

“মিড ডে মিলের ব্যবস্থা সরকার করেছেন। স্কুলটা চলে আসলে কিছু সহানুভূতিশীল মানুষের টাকায়,” সুবীরবাবু বললেন।

জনগণনার ওয়েবসাইটে দেখেছি, রাজ্যের যে জেলাগুলোতে “people with disability” এক লক্ষের বেশি, আমাদের হুগলি জেলা তার অন্যতম। কানাইপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের আশেপাশেও ৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী এরকম ছেলেমেয়ের সংখ্যা নেহাত কম নয়। সুবীরবাবুর মতে শতাধিক। বহু ছেলেমেয়ের বাবা-মা ওঁদের সাথে যোগাযোগ করেন। তাঁদের ফিরিয়ে দিতে হয়। সুবীরবাবুর ভাষায় “টানাটানির সংসার। ছোট স্কুল। ২০০৩-এ অনেক কষ্টে এই বিল্ডিংটা হয়েছিল, এতদিনে দোতলায় কয়েকটা নতুন ঘর করতে পেরেছি। কোথায় বসাব এতজনকে?”

কেমন টানাটানি? প্রতি মাসে শুভানুধ্যায়ীরা টাকা দিলে বিদ্যুতের বিল মেটানো হয়, সুবীরবাবুদের মাইনে হয়। কত মাইনে? বিস্তর চাপাচাপির পর জানা গেল কষ্টেসৃষ্টে চার অঙ্কেও পৌঁছয় না। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানে যাকে মোষ তাড়ানো উল্টো স্বভাব বলে, তেমন স্বভাবের জনা ছয়েকের জন্যই এই স্কুল টিকে আছে। তাঁরাই সকাল এগারোটা থেকে বেলা তিনটে অব্দি জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ, মানে ক্লাস নেওয়া থেকে বাথরুম পরিষ্কার — সবই করে যাচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, গত বছর লকডাউন শুরু হওয়ার পর মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত টানা ৪৫ দিন চেয়ে চিন্তে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছেন গরীব ছাত্রছাত্রীদের পরিবার এবং সাধারণ মানুষকে। মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের সাথে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ত্রাণ বিলি করেছে এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও।

এমন মানুষদেরও জিজ্ঞেস করতে হয় “কী হলে সুবিধা হয় ছেলেমেয়েদের? বা আপনাদের? কী আশা করেন সরকারের কাছ থেকে? সামনে তো নির্বাচন।”

ওঁদের দাবি স্কুলবাড়িটার মতই আকারে ছোট। কেন্দ্রীয় সরকার বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ছেলেমেয়েদের মাসে ৭৫০/- টাকা ভাতা দিয়ে থাকেন। রাজ্য সরকার দেন ১০০০/- টাকা। এদের ভাতা বাড়ানো হোক, এই মাত্র। এ ধরনের বাচ্চারা অধিকাংশই আসে অতি দরিদ্র পরিবার থেকে। কারণ এরা যে অসুবিধাগুলো নিয়ে জন্মেছে, সেগুলোর প্রধান কারণ পুষ্টির অভাব, টিকাকরণের অভাব। অন্তঃসত্ত্বা থাকাকালীন এইসব পরিবারের মহিলারা অনেকেই ঠিকমত খাওয়া দাওয়া পান না, যথেষ্ট যত্ন পান না। কেউ কেউ সারাদিন না খেয়ে কায়িক পরিশ্রম করেন। অনেকের বিয়ের বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। ফল ভোগ করে ছেলেমেয়েরা।

‘প্রচেষ্টা’-র ৮০% ছাত্রছাত্রীই এসেছে দারিদ্র্যসীমার নীচে থাকা পরিবার থেকে, অধিকাংশই তফসিলি জাতিভুক্ত পরিবারের সন্তান। সুবীরবাবু বললেন, পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে এই ছেলেমেয়েগুলো পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। অন্যরা রোজগার করে, এরা পারে না। তাই সকলের খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর, পুজোয় সকলের জামাকাপড় হয়ে যাওয়ার পর এদের হল কিনা সেকথা আর পরিবারের অন্য সদস্যরা ভাবে না। বাবা-মা মারা গেলে নিতান্ত অসহায় অবস্থায় দিন কাটে। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত আছে আধার কার্ড। যেটুকু ভাতা পাওয়া সম্ভব, অনেকেই আধারের গেরোয় সেটুকুও পাচ্ছে না বলে সুবীরবাবুর অনুযোগ। “অনেকেরই আধার কার্ড নেই। সেরিব্রাল পলসি যাদের, তারা ঠিকমত রেটিনা স্ক্যান করাতে পারে না, হাতের ছাপ ঠিক করে দিতে পারে না। ফলে তাদের আধার কার্ড তৈরি করা যাচ্ছে না, তাই ভাতাও পাচ্ছে না। যিনিই সরকারে আসুন, এই ব্যাপারটা দয়া করে একটু দেখুন। আইনটার সরলীকরণের আবেদন জানাচ্ছি।”

অন্য যে অভিযোগটা পাওয়া গেল, তা এ দেশে নতুন না হলেও গুরুতর। মানসিক প্রতিবন্ধকতাসম্পন্ন ছেলেমেয়েদের যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে পুলিশ প্রথমত অভিযোগ নিতে গড়িমসি করে, দ্বিতীয়ত অনেক সময় আদৌ নেওয়াই হয় না। পুলিশ চায় আপোষ মীমাংসা করে নেওয়া হোক, ক্ষতিপূরণ দিয়ে মিটিয়ে ফেলা হোক। সুতরাং পুলিশি চিন্তা ভাবনারও বদল চাইছেন ওঁরা। চাইছেন ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট। কারণ অভিযোগকারী বাচ্চাকে নিয়ে তার পরিবারের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত আদালতে যাতায়াত প্রায় অসম্ভব। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে ব্যাপারটা ক্রমশ যন্ত্রণাদায়ক বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়।

স্কুল চত্বরে বসে কথাবার্তা বলতে বলতেই আমার দিকে পুজোর প্রসাদ এগিয়ে দিল এক ছাত্রী। কুল খেতে খেতে ভাবছিলাম এসব দাবি শুনে গুরু কী বলবেন আর নির্বাচনে লড়বেন যাঁরা, তাঁদের রাম শ্যাম যদু মধু স্লোগান পেরিয়ে বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের দাবি কানে পৌঁছবার সম্ভাবনা ২.২১% -এর চেয়েও কম কিনা। বেশ বৈরাগ্য আসছিল, ভাবছিলাম গুরুকে বলব ভীষণ ব্যস্ত আছি। তাই আপাতত কিছু লিখে উঠতে পারছি না। এমন সময় সুবীরবাবু একটি মেয়েকে আমার সামনে দাঁড় করালেন। উচ্চতা এবং মুখের গড়ন বলে তার বয়স বছর পঁচিশ, অথচ লাজুক হাসির বয়স কিছুতেই দশের বেশি নয়।

“তুমি তো জানো, আমাদের এখানকার স্টুডেন্টরা খেলাধুলোয় খুব ভাল। নিয়মিত দেশের হয়ে স্পেশাল অলিম্পিকে যায়।” আমি মোটেই জানতাম না, কিন্তু সবজান্তা ভাব বজায় না রাখলে ভদ্রলোক ভাবমূর্তি চিড় খেয়ে যাবে। তাই বিজ্ঞের মত মাথা নাড়লাম। উনি বলে চললেন “এ হচ্ছে মুনমুন। দত্ত। ২০০৯-এর ওয়ার্ল্ড উইন্টার গেমসে ভারতের যে দল ফ্লোর হকিতে রুপো জিতেছিল, ও সেই দলের সদস্য ছিল।”

অতঃপর অজ্ঞানতা প্রকাশ করাই ভাল বোধ হল। তখন জানা গেল, ‘প্রচেষ্টা’-র ছাত্রছাত্রীদের কীর্তি মুনমুনকে দিয়েই শুরু এবং শেষ নয়। আবু ধাবিতে অনুষ্ঠিত ২০১৯ ওয়ার্ল্ড সামার গেমসে এই স্কুলের ছাত্রী হাসি দুলে সাইক্লিং-এ দুটো রুপো জিতেছিল। ভারতের রুপো জয়ী ভলিবল দলেও এই স্কুলের একজন ছাত্র ছিল। ২০০৭ সাল থেকেই এখানকার ছেলেমেয়েরা স্পেশাল অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করছে। ফুটবল, ভলিবল, বাস্কেটবল, সাইক্লিং, সাঁতার, ফ্লোর হকি, ফ্লোর বল — এতগুলো ইভেন্টে এরা জেলা থেকে আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত মেডেল জিতেছে।

নাম হাসি হলেও মেয়েটি নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকত, কারোর সাথে মেলামেশা করত না, কথা বলতে ভয় পেত। এই স্কুলে আসা এবং ক্রমাগত প্রস্তুতি ক্যাম্পে যাতায়াত করতে করতে তার জড়তা কাটে এবং শেষ পর্যন্ত বাড়িঘর ছেড়ে বহু দূরের আবু ধাবিতে গিয়ে সে মেডেল জেতে। গল্প হলেও সত্যি। এমন সব গল্প আমার মত ভদ্রলোকের অজান্তে এখানে ওখানে তৈরি হচ্ছে। তুচ্ছ মানুষ, নির্বাচনের মরসুমে তুচ্ছতর যারা, তাদের এসব কীর্তি গুরুর মনে ধরবে কিনা কে জানে! মফসসলের দুর্গম রাস্তার ধারে কুড়িয়ে পাওয়া এই গল্প না বলে আমার যে উপায় ছিল না।

https://guruchandali.com/ এ প্রকাশিত

ইংরেজি কাগজের বাঙালি সম্পাদক: আমি বলব, তুমি শুনবে

এইসব কাগজের হিন্দিভাষী সম্পাদকরা ধরে নেন যে পাঠকের মাতৃভাষা হিন্দি নয়, সে-ও হিন্দি বোঝে।

এশিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপের শুরুতেই অঘটন। আগের বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের তারকাখচিত দলকে ১-০ গোলে হারিয়ে দিল আফ্রিকা থেকে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে আসা সেনেগাল। পরদিন কলকাতার ‘দ্য স্টেটসম্যান’ খবরের কাগজ প্রথম পাতায় সবচেয়ে বড় হরফে শিরোনাম দিল — David 1 Goliath 0. তখন কলেজে পড়ি। ইংরেজি অনার্সের আমরা কজন মুগ্ধ, বলাবলি করছি “কী দারুন হেডিং দিয়েছে!” হোস্টেলের খবরের কাগজের টেবিলে রাখা কাগজটা সকলেই পড়ে। ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত — কোনও অনার্সের ছেলেই বাদ যায় না। স্পষ্ট দেখতে পেলাম সকলেই আমাদের মত মুগ্ধ হয়নি। কয়েকজন পরিষ্কার জিজ্ঞেস করল “এটার মানে কী?”

ঘটনাটা ২০০২ সালের। তখনো ইন্টারনেট আজকের মত সহজলভ্য নয়, সকলেই ফেসবুকে এবং অনেকেই টুইটারে বা ইন্সটাগ্রামে আছে এমন নয়। ফলে সাংস্কৃতিক বিনিময় এত সহজ ছিল না। ইদানিং বাংলা সংবাদমাধ্যমেও কখনো কখনো অসম লড়াই বোঝাতে ডেভিড-গোলিয়াথের কথা লেখা হয়। কারণ এখন সন্দেশখালির ধর্মপ্রাণ হিন্দুরও জানতে বাকি নেই অনুষঙ্গটা, জানার জন্য বাইবেল পড়তে হয়নি। স্প্যানিশ ভাষা না জেনেও যেমন অনেক ফুটবল পাগল বাঙালি রিয়াল মাদ্রিদের দশম চ্যাম্পিয়নস লিগ খেতাবকে ডেসিমা বলেছিল। কিন্তু যখনকার কথা বলছি তখন বাইবেলের কাহিনির সঙ্গে সামান্য পরিচয় না থাকলে স্টেটসম্যানের ঐ শিরোনাম দুর্বোধ্য হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। দেখা গিয়েছিল ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছাড়া, আমাদের সহপাঠীদের মধ্যে যারা ক্রিশ্চান মিশনারি স্কুলের প্রাক্তনী, নিদেন পক্ষে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করেছে, অথবা পারিবারিকভাবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত, কেবল তারাই ঐ শিরোনামটা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিল। তাই ইংরেজি অনার্সের এক সহপাঠী প্রশ্ন তুলেছিল “খবরের কাগজ কি mass এর জন্য, না class এর জন্য?” তারপর নিজেই উত্তর দিয়েছিল “স্থানীয় ভাষার কাগজ জনতার জন্য, ইংরেজি কাগজ বাছাই করা লোকের জন্য।”

এই যুক্তি সেদিন যতটা অকাট্য মনে হয়েছিল আজ আর ততটা মনে হয় না। কারণ গত ১৮ বছরে দেশের সব রাজ্যেই ইংরেজি জানা লোকের সংখ্যা বেড়েছে, ফলত ইংরেজি কাগজের পাঠকও বেড়েছে। Audit Bureau of Circulations (ABC), অর্থাৎ ভারতে প্রকাশিত পত্রপত্রিকাগুলোর কোনটা কত বিক্রি হয়, পড়া হয় তার হিসাব রাখে যে সংস্থা, তাদের পরিসংখ্যান থেকেই এ কথা প্রমাণিত হয়। তাছাড়া খবরের কাগজের পাঠক টিভি দেখেন না বা মোবাইলে ইন্টারনেট ঘাঁটেন না — এমন মনে করাও অযৌক্তিক। তাই কাগজের পাঠক বুঝবেন না, এমন শব্দ বা চিত্রকল্পের তালিকা ২০০২ এর তুলনায় ছোট হয়ে এসেছে। যেসব শব্দ/শব্দবন্ধ দু দশক আগে ইংরেজি কাগজের পাঠকদের একাংশেরও দুর্বোধ্য মনে হত, তার অনেকগুলোই এখন বাংলা কাগজেও দিব্যি ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে বরং দেখা যায় বাংলা প্রতিশব্দ থাকা সত্ত্বেও ইংরেজি শব্দটাই বাংলা কাগজে, পত্রিকায়, টিভি চ্যানেলে ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র’ কথাটার ব্যবহার যেমন দিন দিন কমে যাচ্ছে, বিপুল বিক্রমে ‘আই টি সেক্টর’ বলা এবং লেখা চলছে। ‘Demonetisation’ কথাটার বাংলা প্রতিশব্দ চালু করার জন্যও বাংলা সংবাদমাধ্যম বেশিদিন লড়ল না। কথাটা বাংলা হরফে লিখে দিয়েই কাজ সারা হল। এতে বাংলা ভাষার লাভ হচ্ছে না ক্ষতি হচ্ছে তা ভিন্ন আলোচনার বিষয়, কিন্তু নিঃসন্দেহে ইংরেজি কাগজ সম্পাদনার কাজ অনেক সহজ হচ্ছে। কিন্তু mass আর class এর তফাতটা কি একেবারে ঘুচে গেছে? পনেরো বছর ইংরেজি কাগজে সম্পাদনার কাজ করতে গিয়ে এই প্রশ্নটার উত্তর প্রায় রোজ খুঁজতে হত।অন্য দেশের কথা জানি না, ভারতে এখনো ইংরেজি কাগজ (বা ওয়েবসাইট) পড়তে পারার সঙ্গে শ্রেণির গভীর যোগাযোগ আছে। ইদানিং ব্যাঙের ছাতার মত পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে ওঠা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের দৌলতে বেশ কম রোজগারের মানুষও সাধ্যের বাইরে গিয়ে ছেলেমেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছেন, কিন্তু বাড়িতে ইংরেজি কাগজ রাখার সাধ তাঁদের চট করে হয় না। ইংরেজি কাগজের বিক্রি বেড়েছে আসলে উদারীকরণের ফলে গত তিরিশ বছরে তৈরি হওয়া উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির কারণে। এখন যে সব্জি বিক্রেতা তাঁর ছেলেমেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছেন, তিনি তাঁর পরিবারে লেখাপড়ার প্রথম বা দ্বিতীয় প্রজন্ম। ফলে ইংরেজি কাগজ পড়ার কথা ভাবতে পারেন না, ছেলেমেয়ের কেন পড়া প্রয়োজন তাও বুঝে উঠতে পারেন না। কিন্তু এখন যিনি বহুজাতিকের কর্মচারী হওয়ায় গাড়ি কিনেছেন, তাঁর বাপ-ঠাকুর্দারা মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত ছিলেন, তবু বাড়িতে লেখাপড়ার চল ছিল। ফলে তিনি জানেন আরো এগোতে হলে আরো বেশি করে ইংরেজি রপ্ত করতে হবে। তাই ইংরেজি কাগজ পড়া। ইংরেজি কাগজের সাব-এডিটররাও আসেন মূলত এই ধরণের পরিবার থেকে। ফলে কাগজের বিষয় নির্বাচন এবং ভাষা — দুটো ক্ষেত্রেই তার প্রতিফলন হয়। সম্পাদনা করার সময় যে পাঠককে লক্ষ্য বলে ধরা হয়, তিনি উচ্চ মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পাঠক।

এই কারণেই বাংলা কাগজের চেয়ে ইংরেজি কাগজের প্রথম পাতায় শেয়ার বাজারের ওঠানামার খবর বেশি প্রকাশিত হতে দেখা যায়। তেমনি একেবারে অন্য বিষয়ের খবর লিখতে গিয়ে “bulls and bears” অনুষঙ্গ ব্যবহার করা ইংরেজি কাগজে জলভাত। পাঠক আর সম্পাদক, উভয়েই বাংলাভাষী হলেও। এরকম অনেক উদাহরণ দেওয়া সম্ভব। হোস্টেলের মত জায়গায় নানা শ্রেণির পাঠক একত্র হওয়ার ফলে ঐ সরল হিসাব সবসময় খাটে না, তাই কোন কোন পাঠককে ছুঁতে পারা যায় না। ইংরেজি কাগজে লেখার ক্ষেত্রে অবশ্য একটা অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া যায় ভারতের সর্বত্রই, কেবল পশ্চিমবঙ্গে নয়। কোন শব্দ বা শব্দবন্ধ বুঝতে না পারলে পাঠক সেটা নিজের অক্ষমতা বলেই ধরে নেন এবং জেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কারণ ঐ কাগজটা পড়ার অনেক কারণের একটা হল ইংরেজি ভাষাটা আরো ভাল করে শেখা। আজ থেকে কুড়ি পঁচিশ বছর আগে তো বড়রা সরাসরিই ছোটদের স্টেটসম্যান পড়ে ইংরেজি শিখতে বলতেন। এখন ইংরেজি পড়ার অভ্যাস সার্বিকভাবে বেড়েছে, ‘দ্য টাইমস’ বা ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ও ঘরে বসেই পড়া যাচ্ছে, তাই হয়ত এখন আর কেউ কাগজ পড়ে ইংরেজি শিখতে বলেন না, তবে ইংরেজি কাগজের কৌলীন্য কমেনি। বাংলা কাগজের ভাষা কিন্তু সর্বজনগ্রাহ্য হতেই হবে।
শিরোনামের কথা বলে শুরু করেছিলাম, শিরোনামের কথা দিয়েই শেষ করি।

সর্বভারতীয় বলে পরিচিত যে ইংরেজি কাগজগুলো, সেগুলোর শিরোনামে প্রায়শই হিন্দি শব্দ/শব্দবন্ধ নিয়ে খেলা লক্ষ্য করা যায়, রোমান হরফে পুরোপুরি হিন্দি শিরোনামও দেখা যায়। নীতীশ কুমারের নেতৃত্বে ২০১০ এর বিহার বিধানসভা নির্বাচনে এন ডি এ জোট জয়ী হওয়ার পর ‘দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ এর শিরোনাম ছিল ‘Rajnitish’। ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ র পাতায় অভিনেত্রী জেসি রনধাওয়া সম্বন্ধে প্রতিবেদনে ‘Jesse jaisi koi nahin’ শিরোনাম ব্যবহৃত হয়েছে। স্পষ্টতই এইসব কাগজের হিন্দিভাষী সম্পাদকরা ধরে নেন যে পাঠকের মাতৃভাষা হিন্দি নয়, সে-ও হিন্দি বোঝে। বাংলা, ওড়িশা বা দক্ষিণ ভারতের পাঠকদের অসুবিধার কথা ভাবা হয় না। অন্যদিকে কলকাতা থেকে প্রকাশিত যে ইংরেজি কাগজগুলোর ইন্টারনেটের বাইরে সর্বভারতীয় উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য নয়, সেসব কাগজে কিন্তু বাংলা শব্দ/শব্দবন্ধ নিয়ে শিরোনামে এরকম খেলা সচরাচর দেখা যায় না। রোমান হরফে লেখা আদ্যন্ত বাংলা শিরোনাম তো নৈব নৈব চ। ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলি যখন মধ্যগগনে তখনো কি কোথাও শিরোনাম হয়েছে “Sourav fills Brisbane”? কোনও নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের পর কলকাতার কোন ইংরেজি কাগজে ব্যানার হেডিং হবে “Mamatar khamata” — এ কথা এখনো অকল্পনীয়। অথচ এই কাগজগুলোর বেশিরভাগ পাঠক বাঙালি, সম্পাদকমণ্ডলীর বড় অংশও তাই।

এমনটা কেন ঘটে? হিন্দিভাষী সম্পাদকদের চেয়ে বাঙালি সম্পাদকদের ইংরেজির উপর দখল কি বেশি, নাকি বাঙালি সম্পাদকরা নিজেদের মাতৃভাষা সম্পর্কে হীনম্মন্যতায় ভোগেন? সমাজবিজ্ঞানের লোকেরা গবেষণা করে দেখতে পারেন।

তথ্যসূত্র
১। http://archive.indianexpress.com/news/rajnitish/715691/
২। https://timesofindia.indiatimes.com/ahmedabad-times/Jesse-jaisi-koi-nahin/articleshow/757540.cms

https://guruchandali.com/ এ প্রকাশিত

সকল অহঙ্কার হে আমার

“আমাদের সময়ে আমরা এইসব স্টলওয়ার্টদের পেয়েছি আর নিংড়ে নিয়েছি। যতটা পারা যায় শিখে নিতাম। ওঁরাও খুব ভালবেসে শেখাতেন, দরকারে বকাঝকাও করতেন। এখন আর আমি কাকে কী শেখাব? আজকাল তো সবাই সব জানে।”

সেদিন যথাসময়ে অফিসে ঢুকে দেখি, অনেক দেরি করে ফেলেছি। নিউজরুম আলো করে বসে আছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

তখন ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ তে কাজ করি। কলকাতা সংস্করণের অধুনা প্রয়াত রেসিডেন্ট এডিটর সুমিত সেন সৌমিত্রবাবুর স্নেহভাজন ছিলেন বলে শুনেছি। সেই সুবাদেই টাইমসের অফিসে আসা। আসবেন জানতাম না। যখন পৌঁছেছি, তখন তাঁর প্রায় ফেরার সময় হয়ে গেছে। ভাগ্যিস আমার মত আরো অনেকেরই আশ মেটেনি সেদিন। তাই কিছুদিন পরেই আরেকবার তিনি আসবেন বলে কথা হল।

সে দিন আসতে আসতে আরো বছর খানেক কি দেড়েক। আগেরবার এসে শুনেছি গটগট করে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠেছিলেন। এবার একতলাতেই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ঐ মানুষটিকে আগে কয়েকবার রবীন্দ্র সদন, বিমানবন্দর ইত্যাদি জায়গায় বহুদূর থেকে দেখেছি। দু হাত দূরত্ব থেকে সেদিন দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আড্ডার মেজাজে কথা হল, অনেকে অনেক প্রশ্ন করলেন, আমারও অনেক কথা জিজ্ঞেস করার ছিল। কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজই বেরোল না। বেরোবে কী করে? কেবল আমার কান তো তাঁর কথা শুনছিল না, আমার প্রতিটি রোমকূপ শুনছিল।

তিনি যা যা বললেন তার মধ্যে অনেক কথা বহুবার বহু জায়গায় বলেছেন বা লিখেছেন। আজকের কাগজগুলোতেও সেসব বিলক্ষণ পাওয়া যাবে। যা আমাকে সবচেয়ে চমৎকৃত করেছিল, সেটা বলি। কারণ সেগুলো আর কোথাও পড়েছি বা শুনেছি বলে মনে পড়ছে না।

বলছিলেন অগ্রজ শিল্পীদের কথা। শিশির ভাদুড়ি, অহীন্দ্র চৌধুরী থেকে ছবি বিশ্বাসে এসে দীর্ঘক্ষণ বললেন। সত্যি কথা বলতে, নিজের অভিনয় নিয়ে যা বললেন সেগুলো সবই নানাজনের প্রশ্নের উত্তরে। তার চেয়ে অনেক বেশি কথা বললেন ছবি বিশ্বাসের সম্বন্ধে। কেবল ছবি বিশ্বাসের অভিনয় প্রতিভা নয়, বললেন তাঁর অসম্ভব পরিশ্রম করার ক্ষমতা নিয়েও। ছবি বিশ্বাসের জীবনের শেষ দিকে কোন এক ছবিতে দুজনের একটা দীর্ঘ দৃশ্য ছিল।

“লম্বা সিন, আর সংলাপগুলোও খুব লম্বা লম্বা। আমি বারবার ভুল করছি আর শট এন জি হয়ে যাচ্ছে। ছবিদার তখন শরীরটা এমনিই বেশ খারাপ। ঐ সিনটাতে আবার সুট বুট পরা, অথচ তখন অসম্ভব গরম। শট ওকে হচ্ছে না বলে ফ্যান চালানোও যাচ্ছে না। ফলে ওঁর আরো শরীর খারাপ লাগছে, ক্রমশ রেগে যাচ্ছেন। শেষে পরিচালক বললেন ‘আমরা একটু ব্রেক নিই, আপনারা একটু রেস্ট নিয়ে নিন। তারপর আবার চেষ্টা করা যাবে।’ আমি ছবিদার সাথে বসে সারেন্ডার করলাম। বললাম ‘দেখছেন তো পারছি না। দিন না বাবা একটু দেখিয়ে?’ উনি সেই বিখ্যাত গম্ভীর গলায় বললেন ‘বুঝতে পেরেছ তাহলে’? তারপর তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন ‘তুমি আমার ডায়লগ বলো, আমি তোমার ডায়লগ বলছি।’ তারপর অতবড় সিন গোটাটা রিহার্সাল করালেন, মুভমেন্টগুলোও শুধরে দিলেন। তারপর নিজের নিজের ডায়লগ বলিয়ে আবার করালেন। শেষে ডিরেক্টরকে ডেকে এনে শট নেওয়ালেন, শট ওকে হল।

আমি অবাক হয়ে গেলাম শরীরের ঐ অবস্থাতেও ওরকম উদ্যম দেখে। তাছাড়া আমার একটা অহঙ্কার ছিল, আমার সংলাপ সবসময় মুখস্থ থাকে। সেই অহঙ্কারটাও চুরমার হয়ে গেল। কারণ দেখলাম ছবিদার শুধু নিজের নয়, আমার ডায়লগও হুবহু মুখস্থ। বরং আমি দু এক জায়গায় ভুল করে ফেলেছিলাম, উনি ধমকালেন ‘কী যে করো তোমরা! ডায়লগ মুখস্থ রাখতে পারো না?”

প্রবাদপ্রতিম অভিনেতার মুখে এই গল্পটা শুনে আশ্চর্য লেগেছিল, কিভাবে আমাদের সামনে নিজের ত্রুটিগুলো অকপটে বললেন! অগ্রজ অভিনেতার কাছ থেকে কত শিখেছেন সেটাও কেমন সবিস্তারে বললেন! অথচ কত সহজ ছিল “আমি এই, আমি তাই, আমি সেই” বলা। সেরকম বলার মত যথেষ্ট কীর্তি তো তাঁর ছিলই। অবশ্য হয়ত আমরা এই প্রজন্মের লোক বলেই আমাদের এত অবাক লাগে। সৌমিত্রবাবু তো বললেনই “আমাদের সময়ে আমরা এইসব স্টলওয়ার্টদের পেয়েছি আর নিংড়ে নিয়েছি। যতটা পারা যায় শিখে নিতাম। ওঁরাও খুব ভালবেসে শেখাতেন, দরকারে বকাঝকাও করতেন। এখন আর আমি কাকে কী শেখাব? আজকাল তো সবাই সব জানে।”

“নিজেরে করিতে গৌরব দান নিজেরে কেবলি করি অপমান” কথাটা আমরা ভুলে গেছি। তাই কলকাতার ফিল্মোৎসবে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় বা মাধবী মুখোপাধ্যায়ের কাট আউট ঝোলে না। ঝোলে আয়োজক প্রধান মুখ্যমন্ত্রীর ছবি। মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীরা অবশ্য আকাশ থেকে পড়েন না, আমাদের মধ্যে থেকেই উঠে আসেন। আমরা সবাই তো এখন আত্মরতিপ্রবণ। নইলে কোন বিখ্যাত মানুষ মারা গেলে সাংবাদিকরা কেন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখবেন, “অমুক সালে যখন আমি তমুক এক্সক্লুসিভটা করে অমুক প্রোমোশনটা পেয়েছি…”? কেনই বা আসবে মৃত মানুষটি কবে কী কারণে লেখকের প্রশংসা করেছিলেন?

ভাগ করলে বাড়ে

একজন স্রষ্টা কিভাবে আরেক স্রষ্টার সৃষ্টি আত্তীকরণ করে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান, বোধহয় এই গান তার এক উজ্জ্বল নিদর্শন

“ও আয় রে ছুটে আয় পুজোর গন্ধ এসেছে / ঢ্যাং কুড়কুড় ঢ্যাং কুড়াকুড় বাদ্যি বেজেছে…” গানটা বেশ জনপ্রিয়। পুজোর মরসুমে বিশেষত ছোটদের নাচ-গানের অনুষ্ঠানে প্রায় সর্বত্র শোনা যায়। ১৯৭৭ সালের পুজোয় সলিল চৌধুরীর এই সৃষ্টি তাঁর কন্যা অন্তরার গলায় প্রথম শোনা গিয়েছিল। গানটার সঞ্চারী এরকম “কাঁদছ কেন আজ ময়নাপাড়ার মেয়ে? / নতুন জামা ফ্রক পাওনি বুঝি চেয়ে? / আমার কাছে যা আছে সব তোমায় দেব দিয়ে / আজ হাসিখুশি মিথ্যে হবে তোমাকে বাদ দিয়ে।”

আনন্দ যে ভাগ করলে বাড়ে, সে কথা আজকাল আর ছোটদের বোঝানোর সময় পাই না আমরা। সলিল চৌধুরীর প্রজন্মের মানুষ প্রাণপণে শেখাতেন। এই স্তবকটা সেদিক থেকে চমকপ্রদ কিছু নয়। কিন্তু বহুবার শোনা এই গানটা কদিন আগে নিজের মেয়ের গলায় শুনে যে কারণে কানটা বেশি খাড়া করতে হল, তা হল দুটো শব্দ — “ময়নাপাড়ার মেয়ে”।

ঐ দুটো শব্দে ঘুমন্ত স্মৃতি সজাগ হয়ে উঠল। আমাদের বাড়িতে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি প্রথম টেপ রেকর্ডার (বা ক্যাসেট প্লেয়ার) আসার পর গোড়ার দিকে কেনা ক্যাসেটগুলোর একটার নাম ছিল ‘হিটস অফ সলিল চৌধুরী’। সেই ক্যাসেটের অধিকাংশ গান সকলের চেনা, সেই বারো-তেরো বছর বয়সে আমারও চেনা। কিন্তু সেই প্রথম শুনেছিলাম এক আশ্চর্য গান — সুচিত্রা মিত্রের গলায় ‘সেই মেয়ে’।

১৯৫০ এ প্রকাশিত সেই গানের শরীরে পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বাংলার গ্রামের মানুষের দুর্দশা আর তেভাগা আন্দোলন। কলকাতায় এসে পড়া অগণিত অভুক্ত, অর্ধভুক্ত মানুষের মধ্যে একটি মেয়েকে দেখে গীতিকার লিখেছেন “হয়ত তাকে কৃষ্ণকলি বলে, কবিগুরু, তুমিই চিনেছিলে।” শীর্ণ বাহু তুলে ক্ষুধায় জ্বলতে দেখে শুরুতেই ভেবেছেন “কে জানে হায়, কোথায় বা ঘর কী নাম কালো মেয়ে?” তারপরই চিহ্নিত করেছেন “হয়ত বা সেই ময়নাপাড়ার মাঠের কালো মেয়ে।” একজন স্রষ্টা কিভাবে আরেক স্রষ্টার সৃষ্টি আত্তীকরণ করে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান, বোধহয় এই গান তার এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

চৌঠা আষাঢ় ১৩০৭ এ রচিত রবীন্দ্রনাথের “কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি” সুচিত্রা মিত্র বা শান্তিদেব ঘোষের গলায় কে না শুনেছে? সেই উৎকৃষ্ট প্রেমের (যদিও ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের এই কবিতা গীতবিতানের প্রেম পর্যায় নয়, বিচিত্র পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত) গানের নায়িকা সলিল চৌধুরীর কলমে ফিরে এল অভুক্ত পল্লীবালা হিসাবে। তেভাগা আন্দোলনে উদ্দীপ্ত গীতিকার নিজের গানের শেষে কবিগুরুকে বললেন “আবার কোনদিন যদি তারে দেখো পথে / বোলো তারে বোলো তারই তরে / ময়নাপাড়া থেকে খবর আসে তারি তরে রে / সে যেন ফিরে যায় রে।”

জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে দুই স্রষ্টার এই সংলাপ কৈশোর থেকেই জানা ছিল। মধ্যবয়সের মুখে এসে খেয়াল করে শিহরিত হলাম যে সেই ময়নাপাড়ার মেয়ে সলিল চৌধুরীকে ১৯৭৭ এও ছেড়ে যায়নি। ১৯৫০ এ তিনি বছর আঠাশের যুবক, সাতাশ বছর পরে প্রায় বৃদ্ধ। তাঁর কল্পনায় রবীন্দ্রনাথের গানের যুবতী ততদিনে ছোট্ট মেয়ে হয়ে গেছে। তেভাগার তাপ এ গানে নেই, সময় বদলেছে বলে, হয়ত শিশুদের জন্য গান বলেও। কিন্তু গানটা যে সচ্ছল পরিবারের শিশুর জবানিতে রচিত, সে নিজে যা উপহার পেয়েছে তার সবই ময়নাপাড়ার মেয়েকে দিয়ে দেবে বলছে, নইলে হাসিখুশি মিথ্যে হয়ে যাবে।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আর সলিল চৌধুরীর সংলাপ বোধহয় এই গানে কেবল ময়নাপাড়ার মেয়েতে শেষ নয়, কারণ সচ্ছল মেয়ের প্রত্যয়ে প্রতিধ্বনি পাচ্ছি ‘শিশু’ কাব্যগ্রন্থের ‘পূজার সাজ’ কবিতার। দরিদ্র কৃষক বাবার দুই ছেলে — বিধু আর মধু। বাবার কিনে আনা সামান্য ছিটের জামা বিধুর পছন্দ হয়েছে, মধু কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী। সে ধনী রায়বাবুর কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করে। রায়বাবু নিজের ছেলেকে ডেকে বলেন “ওরে গুপি, তোর জামা দে তুই মধুকে।” কবিতার মূল প্রতিপাদ্য অবশ্য আত্মসম্মান, তাই বিধু-মধুর মা মধুর ধার করা জামা দেখে দুঃখ পান, বিধুকে বলেন “দরিদ্র ছেলের দেহে দরিদ্র বাপের স্নেহে / ছিটের জামাটি করে আলো।” কিন্তু লক্ষণীয় যে, রায়বাবুও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার পক্ষপাতী।

স্রষ্টারা ভাগ করে নিতে জানেন।

সব পথ এসে মিলে গেল শেষে

কয়েক হাজার নিরস্ত্র প্রতিবাদীকে সন্ত্রাসবাদী বলে মিথ্যা অভিযোগে হাজতে পোরা গেলেও, লোকচক্ষে সন্ত্রাসবাদী বলে প্রমাণ করা বড় শক্ত

মেয়ো রোডের মাঝখানে পুব দিকে মুখ করে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। গতকাল বিকেলে বাল্মিকী সম্প্রদায়ের একটি মেয়ের ধর্ষণ ও নির্মম হত্যা, খোদ সরকারের দ্বারা প্রমাণ লোপাট এবং ভারতীয় বিচার ব্যবস্থা কর্তৃক সত্যকে ধর্ষণ করার প্রতিবাদে একটা মিছিলে যোগ দিয়েছিলাম। সেই মিছিল শেষ হল গান্ধীজির পাদদেশে। তারপর পথসভা। সেই সভায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, পিছন দিক থেকে আসা ডুবন্ত সূর্যের আলোয় গান্ধীজির মুখে যেন প্রসন্ন হাসি। কিসের প্রসন্নতা?

এই বাল্মিকী সম্প্রদায়ের মানুষ চলতি কথায় ভাঙ্গি। যুগ যুগ ধরে এঁদের পেশা মানুষের মল মূত্র পরিষ্কার করা। বাংলায় আমরা এই পেশার লোকেদের বলি মেথর। বলা বাহুল্য, ব্রাহ্মণ্যবাদ বা মনুবাদ অনুসারে এঁরা অস্পৃশ্য। দিল্লীতে এঁদের মহল্লায় গান্ধীজি দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন। শোনা যায় ঐ এলাকার (যার বর্তমান নাম বাল্মিকী কলোনি) লোকেরা আজও মনে করেন, তাঁদের কাছ থেকে গান্ধীজিকে বিড়লা হাউসে সরিয়ে না নিয়ে গেলে নাথুরাম গডসের ঊর্ধ্বতন চতুর্দশ পুরুষের সাধ্য ছিল না তাঁকে হত্যা করে। এ বিষয়ে বিবেক শুক্লার লেখা Gandhi in Delhi বই থেকে আরো বিস্তারিত জানা যেতে পারে। কিন্তু বর্ণবাদ নিয়ে গান্ধীজির সমালোচনা করার অনেক অবকাশ আছে। তিনি যে মনে করতেন নিম্নবর্ণের লোকেদের জোর করে মন্দিরে ঢোকার চেষ্টা করা অনুচিত, উচ্চবর্ণের লোকেদের প্রায়শ্চিত্ত করবার জন্য সেবা করতে দেওয়া উচিৎ — তা সমর্থনযোগ্য মনে হয় না অনেকেরই। বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর নেহাত ব্যক্তিগত আক্রোশে গান্ধীজির সমালোচনা করতেন না। এমনকি এই যে বাল্মিকী সম্প্রদায়ের লোকেদের সাথে থাকা, তা নিয়েও বিতর্ক আছে।

অরুন্ধতী রায় তাঁর ‘The Doctor and the Saint’ নিবন্ধে লিখছেন “In his history of the Balmiki workers of Delhi, the scholar Vijay Prashad says when Gandhi staged his visits to the Balmiki Colony on Mandir Marg (formerly Reading Road) in 1946, he refused to eat with the community:

‘You can offer me goat’s milk,’ he said, ‘but I will pay for it. If you are keen that I should take food prepared by you, you can come here and cook my food for me’… Balmiki elders recount tales of Gandhi’s hypocrisy, but only with a sense of uneasiness. When a dalit gave Gandhi nuts, he fed them to his goat, saying that he would eat them later, in the goat’s milk. Most of Gandhi’s food, nuts and grains, came from Birla House; he did not take these from dalits. Radical Balmikis took refuge in Ambedkarism which openly confronted Gandhi on these issues.”

এতৎসত্ত্বেও নিম্নবর্ণের অনেক মানুষের মনেই গান্ধীজির জন্য জায়গা আছে। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ভারতের বর্তমান মনুবাদী, ফ্যাসিবাদী শাসকের গান্ধীজিকে আক্রমণ না করা। গান্ধীজির একনিষ্ঠ সহচর জওহরলাল নেহরুকে নোংরা ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে তারা ছাড়ে না। কিন্তু গান্ধীজিকে আক্রমণ করার বদলে বরং দেখানোর চেষ্টা করে যে তারা গান্ধীর পথেই চলেছে। তার কারণ “মুসলমান ভোটব্যাঙ্ক” কে ঘৃণা করলেও “দলিত ভোটব্যাঙ্ক” তাদের বিশেষ প্রয়োজন। পাছে গান্ধীজিকে গালাগালি করলে সেই ভোটে ভাঙন ধরে! তাই গডসের মূর্তি আর গান্ধীর মূর্তি — দুয়েই মালা দেওয়া হয়।

গান্ধীর সমালোচনা করার আরো অনেক জায়গা আছে। তিনি নিজেই যখন বলেছেন “আমার জীবনই আমার বাণী”, তখন জীবন আর বাণী — দুটোতেই নানা অসঙ্গতি দেখানো সম্ভব। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালীন তিনি যে গড়পড়তা ভারতীয়দের মতই আফ্রিকানদের ভারতীয়দের চেয়ে নিকৃষ্ট মনে করতেন তার প্রমাণ তাঁর লেখাপত্র, বক্তৃতাতেই আছে।

রাজনীতিতে ধর্মের প্রবেশ কি বিষময় হতে পারে তা আমরা আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি। সে কাজটাও যে গান্ধীর হাত দিয়েই হয়েছে — এমন সমালোচনা বাম ও দক্ষিণ, উভয় দিক থেকেই হয়েছে। বক্তব্যগুলো উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। তাঁর হিন্দ স্বরাজ যে স্বপ্নের রাষ্ট্রের কথা বলে, তার সাথে ধর্মীয় ভাবনা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যদিও হিন্দুত্ববাদের গুরু বিনায়ক দামোদর সাভারকরের সেরকম রাষ্ট্র মোটেই পছন্দ হয়নি, ফলে এখনকার হিন্দুত্ববাদীদের গান্ধীজির পথেই চলার দাবী যে বিশুদ্ধ গঞ্জিকা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

গান্ধীজি যে অহিংসার কথা বলতেন, যাকে তিনি দর্শনে পরিণত করেছিলেন তার সাথেও পুরোপুরি একমত হওয়া শক্ত। পৃথিবীর সর্বত্র বাস্তবতা হল বলপ্রয়োগ না করলে কোন কোন কাজ একেবারেই করা সম্ভব হয় না, অনেক ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ না করলে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচারকে প্রশ্রয়ই দেওয়া হয়। কিন্তু গতকাল বিকেলে গান্ধীজির পায়ের নীচে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে অহিংস আন্দোলন সম্ভবত তাঁর সময়ের চেয়ে আজ বেশি সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে।

আজকের দুনিয়ায় ভারতের মত সুবৃহৎ রাষ্ট্র, যার বিপুল পুলিশ বাহিনী এবং সুবিশাল সেনাবাহিনী আছে, তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কালকের মিছিলের শ খানেক লোক আণুবীক্ষণিক তো বটেই, কয়েক লক্ষ লোকের মিছিলও তেমন বড় কিছু নয়। এত লোকের হাতে অস্ত্র থাকলেও তেমন কিছু এসে যায় না। যদি তা না হত, তাহলে বাইরে থেকে অস্ত্রের যোগান থাকা সত্ত্বেও এভাবে কাশ্মীরের জিভ কেটে নেওয়া সম্ভব হত না। আসলে প্রতিবাদীর হাতে অস্ত্র থাকলে তাদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে, নিজের পীড়নের সপক্ষে মত তৈরি করতে আজকের দুনিয়ায় রাষ্ট্রের আরো সুবিধা হয়। সেই কারণেই প্রতিবাদীদের দলমত নির্বিশেষে জেহাদি বা আর্বান নকশাল বলে দেগে দেওয়া। অথচ কয়েক হাজার নিরস্ত্র প্রতিবাদীকে সন্ত্রাসবাদী বলে মিথ্যা অভিযোগে হাজতে পোরা গেলেও, লোকচক্ষে সন্ত্রাসবাদী বলে প্রমাণ করা বড় শক্ত। তার জন্য বশংবদ সংবাদমাধ্যম লাগে, মাইনে করা আই টি সেল লাগে। সে প্রোপাগান্ডাই বা কতদিন বিশ্বাসযোগ্য থাকে সেটা দেখার। এই দোনলা প্রোপাগান্ডার বয়স কিন্তু এখনো বছর দশেক হয়নি। একটা দেশের ইতিহাসে দশ বছর কতটুকুই বা সময়? তাই আজ বহু মানুষ কানহাইয়া কুমার, উমর খালিদ বা শার্জিল ইমামকে কতিপয় আত্মবিক্রীত নিউজ অ্যাঙ্করের কথায় টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং বলে বিশ্বাস করছেন বলেই যে চিরকাল করবেন — এমনটা নাও হতে পারে। প্রোপাগান্ডা সততই স্বল্পায়ু।

কিন্তু এসবের ফলে যা হয়েছে তা হল আদর্শের দিক থেকে গান্ধীজির শত যোজন দূরে থাকা উমর থেকে শুরু করে কংগ্রেসী রাহুল গান্ধী পর্যন্ত সকলেই তাঁদের বক্তৃতায় একই সুরে বলছেন, আমরা এই শাসককে জমি ছাড়ব না, আমরা সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করব। কিন্তু শান্তিপূর্ণভাবে, সংবিধান মেনে। অর্থাৎ সকলেই গান্ধীগিরি শিরোধার্য করেছেন। গান্ধীর প্রসন্নতা বোধহয় এই কারণে।

ভারতের সংবিধান হিন্দুত্ববাদের রমরমায় অধুনা অনেকের কাছেই একটি ঘৃণিত নথিপত্র। বিশেষত বর্ণহিন্দুরা, যাঁরা হাথরাসের ঘটনাকে স্রেফ ধর্ষণ হিসাবে দেখতে পছন্দ করেন, মেয়েটির দলিত হওয়ার কোন আলাদা গুরুত্ব নেই ভাবতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন, তাঁদের অনেকেরই সংবিধানটা অপছন্দ। কারণ “আম্বেদকর এস সি, এস টি র দিকে ঝোল টেনে দেশটার সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে।” গান্ধীজির হত্যাকারীরা যখন তেমন শক্তিশালী ছিল না, তখনই এঁরা শিখেছেন সংবিধানটা একা আম্বেদকরই লিখে ফেলেছিলেন এবং গায়ের জোরে বামুন, কায়েতদের বঞ্চিত করে গেছেন। সংবিধান সভা বলে কোন কিছুর সম্বন্ধে যে অধিকাংশ মানুষ জানেন না, সংবিধানের প্রত্যেকটি অনুচ্ছেদের দায়িত্ব যতটা আম্বেদকরের ততটাই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির — এ কথা যে বেশিরভাগ নাগরিক বোঝেন না, তার জন্য মধ্যপন্থী বা বামপন্থীরা কম দায়ী নন। কিন্তু মজার কথা, ঘোর দক্ষিণপন্থার আক্রমণে যখন সংবিধান নিয়ে এই প্রথম সচেতন কাটা ছেঁড়া হচ্ছে, তখন গান্ধীর কৌশল সব বিরোধীরই কৌশল হয়ে উঠছে। আর যে নথিকে তাঁরা হাতিয়ার করছেন সেটা গান্ধীর সবচেয়ে বড় সমালোচক আম্বেদকরের সাথে সমার্থক। এ বছরের জানুয়ারি মাসে সি এ এ – এন আর সি – এন পি আর বিরোধী মিছিল মিটিঙেও তো আমরা দেখেছি সেই অভূতপূর্ব দৃশ্য — পাশাপাশি গান্ধী আর আম্বেদকরের ছবি। গান্ধী মূর্তির প্রসন্নতা হয়ত সে কারণেও।

ইতিহাস বোধহয় এভাবেই গড়ে পিটে নেয়। মেয়ো রোডের গান্ধী মূর্তির কাছে অনেকগুলো রাস্তা এসে মিশেছে। সংখ্যায় অল্প হলেও কাল সেখানে এসে মিশেছিলেন নানা পথের বামপন্থীরা — যোগেন্দ্র যাদবের মত ঘোষিত গান্ধীবাদী সমাজবাদের দল স্বরাজ ইন্ডিয়ার মানুষজন; সি পি আই (এম) থেকে নির্বাসিত প্রসেনজিৎ বসুর মত লোক; কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের টগবগে বামপন্থী ছেলেমেয়েরা, যারা নানা দলের বা হয়ত শুধুই ক্যাম্পাস লেফট; আমার মত রাজনীতি না করা বামপন্থীরা। আরো অনেকে আসেননি, কিন্তু আসতে বাধা নেই। সচেতনে বা অবচেতনে গান্ধীজির পথে এমন অনেকেই এসে পড়ছেন, যাঁদের সাথে তাঁর আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক ছিল। সকলে মিলিত হলে যদি দেশের ভাল হয় তাতে গান্ধী, আম্বেদকর, নেহরু, শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে বা জ্যোতি বসু — কেউই আপত্তি করতেন বলে মনে হয় না। গান্ধীজিকে যিনি মহাত্মা বলেছিলেন, সেই রবীন্দ্রনাথ (অমিতাভ চৌধুরীর মতে উনিই প্রথম বলেননি) থাকলে আশা করতেন “ঘৃণা করি দূরে আছে যারা আজও / বন্ধ নাশিবে — তারাও আসিবে দাঁড়াবে ঘিরে।”

নতুন করে পাব বলে

কেবল ঠেলে খনির গভীরে পাঠানো তো নয়, আরেক রকম ব্যবস্থাও আছে

20200508_164038-COLLAGE.jpg

প্রিয় কবি,

আপনার সাথে আমার সংলাপে বিপত্তির অন্ত নেই। এক দিকে খবরদারি, অন্য দিকে দেখনদারি। আপনাকে নিজের করে পাবার জো নেই।

এক দল টিকি নেড়ে বলবে “রবীন্দ্রনাথকে যেখানে সেখানে যেভাবে ইচ্ছে টেনে নিয়ে বসিয়ে দিলেই হল? নিয়ম কানুন নেই? আজ প্রত্যুষে শুকতারাটি অমুক কোণে স্থির হয়ে ছিল কি? না হয়ে থাকলে কোন আক্কেলে গুনগুনিয়ে ‘ধীরে ধীরে ধীরে বও’ গাইছিলে? বলি ভোরের বেলার তারা তুমি পেলে কোথায়?”

আবার বিপক্ষ দল বলবে “কিসব ন্যাকা ন্যাকা ব্যাপার! রবীন্দ্রনাথ কারো বাপের সম্পত্তি নাকি? রবীন্দ্রনাথকে বুকে রেখেচি। বুকে। শালা হৃদয় আমার নাচে রে, পাগল কুত্তার মত নাচে রে।”
প্রথম দলের মত আসলে এরাও মনে করে আপনি এদের পৈতৃক সম্পত্তি। আপনার লেখা নিয়ে যা ইচ্ছে করলেই হল। অন্য কারো লেখা চটকালে তো সহজে বিখ্যাত হওয়া যায় না।

আমাকে তাই বারবার আপনাকে নিয়ে পালাতে হয়। কোলাহল বারণ হলে মন্দ হয় না, আপনার আমার কথা কানে কানে হওয়াই ভাল। গত পঁচিশে বৈশাখের পর থেকে আজ অব্দি যা যা হয়েছে, তাতে আপনার সাথে কিছু নতুন সংলাপের প্রয়োজন হয়েছে। সে কথাই বলি।

কহো মোরে তুমি কে গো মাতঃ!

মহাসঙ্কট উপস্থিত। দেশের রাজার (হ্যাঁ, রাজাই। স্বাধীনতার এত বছর পরে দেশটা একেবারে যক্ষপুরী হয়ে উঠেছে। সে কথায় পরে আসছি) আদেশ, দেশকে মা বলে ভাবতে হবে। কেবল ভাবলে হবে না, আবার চিৎকার করে ডাকতেও হবে। যারা ছাগল ছানাদের মত দিবারাত্র গলা ছেড়ে ডাকবে না, তাদের দেশের শত্রু দেগে দেওয়া হয়েছে। গারদে ভরার ব্যবস্থাও হয়েছে। দেশকে মা বলে ডাকতে হুকুম হয়েছে, এদিকে দেশের লোককে সন্তান ভাবার হুকুম হল না। তারা কেবল প্রজা। রাজা হুকুম করবেন, তারা তামিল করবে। অন্যথা হলেই রাজার পাইক, বরকন্দাজ লাঠিপেটা করবে, গারদে ভরবে। আবার সকলে প্রজা নয়, কেউ কেউ প্রজা। রাজা যাকে প্রজা বলবেন, কেবল সে-ই প্রজা। বাকি সব অনুপ্রবেশকারী শয়তান।

তা দেশ মানে কী? দেশ মানে কে? আপনাকে সে প্রশ্ন করতে গিয়ে কোন মায়ের ছবি তো পেলাম না। পেলাম কেবল মানুষ। ক্লাসঘরে আর ঠাকুরঘরে আপনাকে দেখতে অভ্যস্ত চোখে দেখলাম আমার সাথে প্রতিবাদ মিছিলে। যে মহামানবের সাগরতীর বলে ভারতকে চিনিয়েছেন, দেখলাম সেই মানবসাগরই আপনাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। আপনার বিশ্বভারতী অভ্রভেদী দেবালয় হয়ে গেছে অনেকদিন, তা থেকে আপনার বিগ্রহটুকুও উধাও করে দেওয়া হবে অদূর ভবিষ্যতে। তাতে অবশ্য কিছু এসে যায় না। শিবরাম কবেই সাবধান করেছিলেন, “সঙ্ঘ মানেই সাংঘাতিক।” চুলোয় যাক সেই সঙ্ঘ, তার সাথে আর যত সঙ্ঘ আছে। আপনি তো আমাদেরই লোক। আমরা আমাদের মত করে পেলেই হল। কিন্তু গোলমালের এখানেই শেষ নয়।

দেশকে দিনরাত মা বলে প্রণাম ঠুকতে হবে, অথচ মায়েদের জন্য দেশটা বড় শক্ত ঠাঁই হয়ে উঠেছে। যারা প্রজা হয়ে থাকতে রাজি নয়, যারা আপনার গান শুনে বা না শুনে দাবী করেছে আমরা সবাই রাজা, তাদের মধ্যে মায়েরা বড় কম ছিলেন না। সেই মায়েদের উপর রাজার আঘাত নেমে এসেছে। সাতাশ বছরের সফুরা জারগরের সন্তানের জন্মের প্রথম ক্ষণ শুভ হবে না, হতে দেওয়া হবে না। কারাগারের অন্ধকূপে তাকে মা হতে হবে রাজার আদেশে। পুরাণকে ইতিহাস বলে গেলানো কংস রাজার অনুগত অসুরকুল অবশ্য তাতেও খুশি নয়। তারা প্রশ্ন তুলেছে সফুরা কি বিবাহিতা, নাকি সফুরা কুমারী? মুসলমানবিদ্বেষী, বিকৃত কামনায় হিলহিলে অসুরকুল মায়ের অগ্নিপরীক্ষা চায়। সেই ট্র‍্যাডিশন সমানে চলেছে।

সফুরা কুন্তীর মত কুমারী না হলেও তার সন্তান যেন কর্ণের মতই পাণ্ডব বর্জিত হয় তা নিশ্চিত করতে রাজা রাতে মাত্র চার ঘন্টা ঘুমিয়ে নতুন ভারত গড়েছেন। এ ভারতে সংখ্যালঘুকে গর্ভে থাকতেই নিষ্ফলের, হতাশের দলে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়। কবি, এ দেশে কি আর কেউ অনাথ বিধর্মী শিশুকে নিজের সন্তান বলে মানবে? আর কি কোন সন্তান বলবে “আমি আজ ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান কোনো সমাজের কোনো বিরোধ নেই। আজ এই ভারতবর্ষের সকল জাতই আমার জাত, সকলের অন্নই আমার অন্ন”?
আপনি কি পিছিয়ে পড়লেন, কবি?

৪৭ফ, ৬৯ঙ

“একদিনের পর দুদিন, দুদিনের পর তিনদিন; সুড়ঙ্গ কেটেই চলেছি, এক হাতের পর দু হাত, দু হাতের পর তিন হাত। তাল তাল সোনা তুলে আনছি, এক তালের পর দু তাল, দু তালের পর তিন তাল। যক্ষপুরে অঙ্কের পর অঙ্ক সার বেঁধে চলেছে, কোন অর্থে পৌঁছয় না। তাই ওদের কাছে আমরা মানুষ নই, কেবল সংখ্যা।”

আমাদের কালের কথাই লিখেছেন আপনি। এতখানি বয়সে এসে এই উপলব্ধি হল। যক্ষপুরীর কথা বলছিলাম। শুধু দেশটা কেন? গোটা পৃথিবীটাই যে রক্তকরবীর যক্ষপুরীতে পরিণত। নবীন কোরোনাভাইরাস এসে কদিন খনির দরজা এঁটে দিয়েছে৷ তাই এ কদিনের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে ৪৭ফ আর ৬৯ঙ দের এবার মুখের রক্ত তুলে মরতে হবে। যক্ষপুরীর কবলের মধ্যে ঢুকলে তার হাঁ বন্ধ হয়ে যায়, এখন তার জঠরের মধ্যে যাবার একটি পথ ছাড়া আর পথ নেই। তাই বিল্ডারদের সাথে মিটিং করে সরকার রেলকে বলে “এদের বাড়ি যাবার ট্রেন বাতিল করো হে।” যদিও বিস্তর চেঁচামেচি হওয়ায় ঢোঁক গিলে বলতে হয়েছে “আচ্ছা বাতিল করতে হবে না। এরা যাবেখন।”
কেবল ঠেলে খনির গভীরে পাঠানো তো নয়, আরেক রকম ব্যবস্থাও আছে। বিশেষত আমাদের মত পুঁথি পড়ে চোখ খোয়াতে বসা, সর্দারদের চর বিশু পাগলদের জন্য। চাকরি থেকে ছুটি। ওরা বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছে, কেমনে দিই ফাঁকি?

উত্তর খুঁজছি, পাচ্ছি না। রচনাবলী, গীতবিতান, ছিন্নপত্রাবলী, ইংরেজি বক্তৃতামালা — সর্বত্র খুঁজছি। খুঁজতে খুঁজতে আপনার উপর বেজায় রেগে যাচ্ছি কখনো, কখনো আনন্দে কাঁদছি, আত্মগ্লানিতে হাসছি, বিষাদে চুপ করে থাকছি। সংলাপ চলছে, চলবে। আপনাকে এ জানা আমার ফুরাবে না।

যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে

“কারখানা বন্ধ হয়ে গেল, মেয়েটা হায়ার সেকেন্ডারি দিচ্ছে… কিছু একটা তো করতে হবে… ভাই একটা ডিও নেবে? লেডিস, জেন্টস দুরকমই আছে…”


আজ মে দিবস। সকালে ফ্ল্যাটের নীচে নেমে মাছ কিনছি, এক ভদ্রমহিলা এসে দাঁড়ালেন কিছুটা কুচো চিংড়ি কিনবেন বলে। টাকা হাতেই রাখা এবং বেশভূষা দেখে বোঝা যায় কারোর বাড়িতে কাজ করেন। কথায় কথায় বললেন “কোরোনা হবার হলে হবেই। আমাদের পাড়ায় তিন বাড়িতে তিনজনের। কেউ কারো বাড়ি যাচ্ছে না। কিন্তু হল তো?”

লকডাউন শুরু হয়েছে এক মাসের বেশি হয়ে গেল। আমার ওয়ার্ক ফ্রম হোম, আমার মত ফ্ল্যাটবাসীদের অনেকেরই তাই। যাঁরা বাসন মাজেন, কাপড় কাচেন জীবিকা নির্বাহের জন্য, তাঁদের ওয়ার্ক ফ্রম হোম বলে কিছু হয় না। আর যাদের হয় না তাদের মধ্যে আমার স্ত্রী, আমার অনেক প্রতিবেশীও পড়েন। লকডাউনে আমাদের কারো তেমন অসুবিধা নেই। ঘরে বসেও মাস গেলে মাইনে পাচ্ছি, কারণে অকারণে কর্তৃপক্ষ খানিকটা কেটে নিলেও। কিন্তু ঐ ভদ্রমহিলার মত যাঁরা, তাঁদের কাজে বেরোতেই হচ্ছে। লকডাউন মানলে তাঁরা মাইনে পাবেন না, ভাত খেতে পাবেন না, কেবল গালি খাবেন। বাড়ির কাজের দিদিদের ছুটি দেওয়ার কারণে প্রতিবেশীদের রক্তচক্ষু সহ্য করতে হয়েছে পাড়ার কোন কোন পরিবারকে। অনেকে আবার ছুটি দিয়েছেন নিজের পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে, কিন্তু “কাজ করছে না যখন মাইনে পাবে কেন?” এই যুক্তি প্রয়োগ করছেন। ফলত ভদ্রমহিলাকে আর বললাম না যে “হবার হলে হবেই” কথাটার কোন মানে হয় না, সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ। স্পষ্টত আমার কাছে যে কথার যা মানে ওঁর জীবনে তা নয়। আমার কাছে মে দিবস একটা ঐতিহাসিক দিন, ওঁর কাছে একটা অর্থহীন শব্দবন্ধ।


মার্চ মাসের শেষ দিক থেকেই অফিসে, পাড়ায় তুমুল আলোচনা — কোথায় হ্যান্ড স্যানিটাইজার পাওয়া যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে না। কারো কারো অভিযোগ লিকুইড হ্যান্ড ওয়াশ অ্যামাজনে পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না, ডেটল কিনতেও ঘুরতে হচ্ছে তিন চারটে দোকান। ভদ্রলোকেদের মহাসঙ্কট। আমার বাড়িতে কিন্তু এখনো লিকুইড হ্যান্ড ওয়াশ পর্যাপ্ত। কী করে? সে কথাই বলি।

হুগলী শিল্পাঞ্চল বলতে একসময় যা বোঝাত, আমার বাড়ি সেই এলাকায়। তবে একে একে নিভিয়াছে দেউটি। রেললাইনের ওপারে জি টি রোডের ধারে র‍্যালিস ইন্ডিয়াকে আমি বরাবর অশ্বত্থবেষ্টিত দেখেছি। গদি তৈরির রিলাক্সন কারখানা অনেক দড়ি টানাটানির পর বন্ধ হয়ে গেছে আমি কলেজে ঢোকার আগেই। ন্যালকোর রমরমা রং তৈরির কারখানা, যার পাশ দিয়ে স্কুলে যেতাম, স্থানীয় লব্জে যা অ্যালকালি, তাও প্রেমেন্দ্র মিত্রের তেলেনাপোতা হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘকাল। পরিত্যক্ত যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করতে পাঁচিলের ইঁট সরিয়ে কিছু লোককে তেলেনাপোতায় ঢুকতে দেখতাম স্কুলজীবনের শেষদিকেই। জে কে স্টিল প্রেতপুরী, পূর্ণিমা রাতে ভাঙা দোলনা দিব্যি মেরামত হয়ে যায় আর মধুবালা দোল খেতে খেতে গান করেন “আয়েগা আয়েগা আয়েগা। আয়েগা যো আনেওয়ালা”। শেষ পর্যন্ত একা দাঁড়িয়ে ছিল বিড়লাদের হিন্দমোটর কারখানা। তার ভিতর দিয়ে গেলে এখন মন খারাপ হয়ে যায়। আরো মন খারাপ হয় ট্রেন কোন্নগর স্টেশন ছাড়লে ডানদিকে তাকিয়ে যখন দেখি বন্ধ কারখানার চৌহদ্দিতে আদিগন্ত ঝিলের অনেকটা বুজিয়ে গগনচুম্বী আবাসন তৈরি হচ্ছে। এ শুধু আমার বাড়ির আশপাশের বন্ধ কারখানার ফিরিস্তি। গোটা হুগলী জেলায় ছোট বড় এমন অজস্র কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তা এত সব বন্ধ কারখানার শ্রমিকরা কী করেন? তাঁরা বাড়ি বাড়ি আসেন।

কেউ আমার কাকাদের বয়সী, অপমানে মাটিতে মিশে যেতে যেতে বলেন “কারখানা বন্ধ হয়ে গেল, মেয়েটা হায়ার সেকেন্ডারি দিচ্ছে… কিছু একটা তো করতে হবে… ভাই একটা ডিও নেবে? লেডিস, জেন্টস দুরকমই আছে…”

কেউ আমার চেয়ে বয়সে সামান্য ছোট, চমৎকার কথা বলে, বোঝা যায় লেখাপড়ায় নেহাত খারাপ ছিল না। কিন্তু বোধহয় কোম্পানির মালিকের পাতে মাছের পিস ছোট হয়ে যাচ্ছিল তাকে মাইনে দিতে গিয়ে। তাই সে এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের দরজায়। রবিবার সকালে এসে আমার স্ত্রীকে বলছে “বৌদি, এই সেন্টটা দেখুন, দারুণ গন্ধ… আচ্ছা ফিনাইল লাগবে? বেশি দাম নয়…”

একটা ছেলে প্রতি মাসেই আসে। বয়স খুব বেশি নয় অথচ মাথায় টাক পড়ে গেছে, চোখ দুটো ঢুকে গেছে কোটরে, শীতের দুপুরেও দেখে মনে হয় বৈশাখের কড়া রোদে কয়েক মাইল হেঁটে এসে ধুঁকছে। নামটা যতবার জিজ্ঞেস করি, ততবার ভুলে যাই। “জীবনের ইতর শ্রেণীর মানুষ তো এরা সব”। এদের নাম মনে রাখার অবসর কোথায় আমার মনের? তা সেই ছেলেটার থেকে কী-ই বা কিনব প্রতি মাসে? হ্যান্ড ওয়াশই কিনি। কতটুকুই বা খরচ হয় প্রতি মাসে! রান্নাঘরে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঝকঝকে হ্যান্ড ওয়াশের বোতল, আমার স্ত্রী বলেন “তুমিই এবার হ্যান্ড ওয়াশের দোকান খুলবে।” তা সেই বোতলগুলোই কোরোনার আমলে আমাদের সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এপ্রিল মাস কেটে গেছে, মে মাসের আজ প্রথম দিন। এই ফ্ল্যাটে এসেছি ২০১৬ র দোলের পরদিন। এই প্রথম ছেলেটা এতদিন হয়ে গেল আসেনি। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম “কোথায় বাড়ি তোমার?” আমাদের এখান থেকে অনেক দূরে। লোকাল ট্রেন চালু না হলে সে আসতে পারবে না। জানি না তার মে দিবস কেমন কাটছে। দুর্বল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কেমন তাও জানি না, আশা করি কোভিড-১৯ ধরলেও বয়সের কারণে সে প্রাণে বেঁচে যাবে। আমারই বয়সী ছেলে। কে জানে কবে আমার দন্ডমুন্ডের কর্তার গেলাসে সিঙ্গল মল্ট হুইস্কি কম পড়বে, আমাকেও হ্যান্ড ওয়াশ নিয়ে দাঁড়াতে হবে আপনাদের দরজায়?

কাশ্মীরের ভ্যালেন্টাইন

কাশ্মীরে কি আর্চি’স গ্যালারি আছে? সেখানে লাল টুকটুকে হৃদপিণ্ড কিনতে পাওয়া যায়?

প্রমাণ নেই, তবে সাক্ষী আছে। আমি কাশ্মীর গিয়েছি। তখন ডিজিটাল ক্যামেরার যুগ নয়। বাবা-মা কার থেকে যেন চেয়ে চিন্তে ক্যামেরাও নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু জম্মু থেকে বাসে চাপার পর খেয়াল হয় ফিল্ম কিনে নিয়ে যাওয়া হয়নি। দাম্পত্যের তারুণ্যে যেরকম ভুল হয়ে থাকে আর কি। তখন ভ্যালেন্টাইন্স ডে না থাকলেও প্রেম তো ছিলই।

গল্পটা শোনার পর থেকে কাশ্মীর বললে প্রথমেই প্রেম মনে হয়। তারপর সাদা কালো টিভিতে ‘কাশ্মীর কি কলি’ দেখলাম। বঙ্গললনা শর্মিলার লালিমা সে টিভিতে বিশেষ ধরা পড়েনি। তবু কাশ্মীর মানেই রোম্যান্স, কাশ্মীর মানেই প্রেম — এ একেবারে বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেল। ইংরেজি সাহিত্য পড়তে ঢুকেছি। যে মাস্টারমশাই জর্জ বার্নার্ড শ পড়াবেন তিনি অ্যান্টি রোম্যান্টিক নাটক পড়াবেন বলে ক্লাসে জিজ্ঞেস করলেন রোম্যান্টিক বললেই কী মনে আসে? সশব্দ চরণেই প্রেম এসে পড়ল। তখন জিজ্ঞেস করলেন রোম্যান্টিক ফিল্ম বলতে কার কোনটা মনে পড়ে? ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’, ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ এর মাঝখানে আমি বলে ফেললাম ‘কাশ্মীর কি কলি’। মাস্টারমশাই চোখ কপালে তুলে পরিষ্কার বাংলায় বললেন “এ তো ঠাকুরদাদার আমলের ছবি, বাবা। তুমি কি সেই যুগের লোক নাকি?” সেই গঞ্জনাও আমাকে দাবায়ে রাখতে পারেনি। তার আগে এবং পরেও যার প্রতিই মনটা দ্রব হয়েছে তাকেই বলার চেষ্টা করেছি “বরসোঁ সে খিজা কা মৌসম থা, উইরান বড়ি দুনিয়া থি মেরি।” বেশিরভাগ যে শুনতে পায়নি বা পেলেও আশা ভোঁসলের মত জবাব দিতে রাজি হয়নি সে কথা আলাদা।

ইতিমধ্যে আবার ‘রোজা’ এসে পড়েছে। তার পোস্টারে পর্যন্ত গোলাপ ফুল। তামিল দম্পতির “ইয়ে হসিঁ ওয়াদিয়াঁ ইয়ে খুলা আসমাঁ” তে দুষ্টু মিষ্টি মধুচন্দ্রিমার আত্মার উপর ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের নরকের দুঃস্বপ্ন। উফ! কি রোম্যান্টিক! এক শর্মিলায় রক্ষে নেই, মধু দোসর।
ঐ যে বলে বয়স বাড়া ভাল নয়? ঠিকই বলে। কাশ্মীর নিয়ে মাখো মাখো রোম্যান্স ভেঙে গেল বয়স বাড়তেই। সে-ও অবশ্য নারীঘটিত ব্যাপার। অরুন্ধতী রায়। কে যে ওঁকে কুনান পোশপোরা ইত্যাদি যাচ্ছেতাই ব্যাপার নিয়ে লিখতে বলে! তবু চলে যেত বলিউডে মগ্ন থাকলে, সব মাটি করলেন বিশাল ভরদ্বাজ। উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট পড়ে যদি কেউ কাশ্মীরের কথা ভাবে, তাকে ঠেকানো শক্ত। কি যে বিপদ করেছেন ভরদ্বাজ বামুন আর বাশারাত পীর মিলে! এখন কাশ্মীর বললেই, প্রেম বললেই শর্মিলা নয়, মধুও নয়, শ্রদ্ধা কাপুরের কবর মনে পড়ে।

তা ভাবছিলাম কাশ্মীরে কি আর্চি’স গ্যালারি আছে? সেখানে লাল টুকটুকে হৃদপিণ্ড কিনতে পাওয়া যায়? ছ মাস আগের স্টকে ঝুল পড়ে যায়নি? পোকায় কাটেনি? আচ্ছা ওখানকার ছেলেমেয়েরা হোয়াটস্যাপে প্রেম করছে আবার? কাদের যেন হোয়াটস্যাপ অ্যাকাউন্ট নিজে নিজে বন্ধ হয়ে গেছে শুনেছিলাম?

ও হ্যাঁ, ‘শিকারা’ নামে একটা ছবি বেরিয়েছে। সেটাও প্রেমের ছবি। না বললে লোকে বলবে “কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কথা তো বললেন না?” কী করে বোঝাই প্রেম আর উদ্বাস্তু একসাথে বললে আমার প্রথমেই সুপ্রিয়া দেবীর কথা মনে পড়ে!
আচ্ছা গত ছ মাসে কতজন কাশ্মীরি পণ্ডিত কাশ্মীরে ফেরত গেছে কেউ বলতে পারবেন? যারা গেছে তারা কি ভ্যালেন্টাইন্স ডে পালন করছে? রবাবে বলিউডি গান দারুণ জমে কিন্তু। ধরুন আপনি একজন কাশ্মীরি পণ্ডিত মহিলা, ঝিলামের ধারে বসে চোখ বন্ধ করে শুনছেন একটি সুপুরুষ কাশ্মীরি ছেলে বাজাচ্ছে “এক থা গুল ঔর এক থি বুলবুল।”

আহা! চটছেন কেন? লাভ জিহাদে উস্কানি দিচ্ছি না। ও গানটায় শশী কাপুর আর নন্দা ছিলেন। দুজনের কেউই মুসলমান নন। শশীর দাদা শাম্মিও মুসলমান নন, শর্মিলা তো খোদ ঠাকুরবাড়ির মেয়ে। অতএব ওসব ছবি দেখলে আজও দোষ নেই।

মেঘে মেঘে

কখনো ভাবিনি ঘন নীল আকাশ আর কাশফুলের মত মেঘ দেখে একদিন বিরক্তি আসবে, কান্না পাবে, চেপে রাখা আশঙ্কা চাগাড় দিয়ে উঠবে

কয়েক বছর হল বর্ষাকাল এসে পড়লেই আতঙ্কে ভুগি — যদি এই বর্ষাই শেষ হয়! যদি আগামী বছর থেকে আমাদের জনপদে আর বৃষ্টি না হয়! যদি দেখতে দেখতে আমাদের সুজলাং সুফলাং জায়গাটা মরুভূমি হয়ে যায়!
ছোটবেলায় কত পাখির বাসা দেখেছি বাড়ির আশপাশের নানারকম গাছে। চড়াইয়ের বাসা, শালিকের বাসা, কোকিলের বাসা, কাকের বাসা। আর সবচেয়ে সুন্দর বাবুইয়ের বাসা। আজকাল তো আর দেখি না, আমার মেয়ের সাত বছর বয়স হয়ে গেল। ছবির বাইরে বাবুই পাখির বাসা তো সে দেখে উঠল না! কেমন দেখতে হাঁড়িচাচাকে? মেয়ে জানে কি? যখন আতঙ্ক মাথায় ওঠে, তখন ইতিউতি তাকিয়ে তত পাখি তো দেখি না যত আমার সাত বছর বয়সে দেখেছি! এভাবে পাখিরা যদি হারিয়ে যেতে পারে, বৃষ্টিও তো হারিয়ে যেতেই পারে! পারে না?
আমার আশঙ্কা এত তাড়াতাড়ি এত ভয়ানক সত্যি হয়ে উঠবে আমিও ভাবিনি। বৃষ্টিতে ভেজা আমার বড় প্রিয়। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে অনেক সময় এমন মুহূর্তে বৃষ্টি নামে যখন কিছুতেই ভেজার উপায় নেই। তবু, প্রতি বর্ষায় অন্তত একবার ভিজে চুপচুপে না হয়ে আমি ছাড়ি না। গত কয়েক বছর প্রথম সুযোগেই ভেজার চেষ্টা করি। কেবলই আতঙ্ক — এই যদি আমার জীবনের শেষ বৃষ্টি হয়!
এবার বর্ষায়, কি সৌভাগ্য, সেদিন আমাদের নবগ্রামে ঠিক সন্ধ্যের মুখে আকাশ অন্ধ করে বৃষ্টি এল। ঠিক আমার ছুটির দিনটায়। ঐ দিন আমি বিকেল, সন্ধ্যের বিনিময়ে ভাত-কাপড়ের সংস্থান কিনতে নদীপারের শহরে যাই না। উল্লসিত হয়ে নেমে পড়লাম বাড়ির উল্টোদিকের মাঠে। কড়কড়ে বাজের ধমক অগ্রাহ্য করে বৃষ্টির সাথে আমার নির্লজ্জ অভিসার। আশ মিটিয়ে ভিজে ঘরে ফিরেছি যখন তখনো ঝমঝমিয়ে রমরমিয়ে বৃষ্টি চলছে। ইউটিউবে চালিয়ে দিলাম “আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে।” আমার মতই একা একা উত্তমকুমার ভিজছেন আর লাজুক মাধবী গাছের তলায় বসে গাইছেন। সেদিন মাথা মুছতে মুছতে হৃষ্ট চিত্তে ভেবেছিলাম, যাক, আমরা এবারও বেঁচে গেলাম। আষাঢ়ের গোড়াতেই যখন এমন বৃষ্টি, তখন এ মরসুমে আর মরুভূমি দেখতে হচ্ছে না।
কিন্তু সেই শেষ। তারপর হপ্তাদুয়েক হয়ে গেল, বৃষ্টির আর দেখা নেই। অথচ আকাশে মেঘ আছে, মাঝে মাঝে সূর্যকে ম্লান করে দিয়ে আশা জাগিয়েও ব্যালে নাচের সুন্দরীদের মত হালকা সেসব মেঘ মঞ্চ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে একদিন সকালের দিকে জানলার দিকে চোখ পড়তেই দেখি আকাশের বেশ মাজা রঙ হয়েছে আর ছিটেফোঁটা ঝরছেও বটে। ভাবলাম এই বুঝি প্রতীক্ষার অবসান হল। সবে গুনগুন শুরু করেছি, মেয়ে আমার ফিসফিসিয়ে বলল “বাবা, এখনই গেয়ো না। ভাল করে শুরু হোক আগে।” আমল দিচ্ছিলাম না, কিন্তু মিনিট খানেকের মধ্যেই দেখলাম সাঁইত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতার চেয়ে সাত বছরের আশঙ্কাই বেশি সত্যি। বৃষ্টি থেমে গেল।
সেই থেকে আকাশে মেঘ দেখে অদ্ভুত পীড়া হচ্ছে। কখনো ভাবিনি ঘন নীল আকাশ আর কাশফুলের মত মেঘ দেখে একদিন বিরক্তি আসবে, কান্না পাবে, চেপে রাখা আশঙ্কা চাগাড় দিয়ে উঠবে।
মধ্যরাত পেরিয়ে যখন নির্জনে বাড়ি ফিরি সেই সময় বালি ব্রিজের উপর ভেসে চলা কিছু কৃশকায় মেঘের কাছে এ নিয়ে অভিযোগ জানালাম। বললাম “কেরালায় এত বৃষ্টি, হিমাচলে, অরুণাচলে, আসামে, বিহারে, এমনকি উত্তরবঙ্গের কিছু জেলা বানভাসি আর তোমরা কিনা উড়ে বেড়াচ্ছ, একফোঁটা বৃষ্টি নেই ভাগীরথীর এপারে ওপারে? কিসের অভাব তোমাদের? কী পেলে মোটাসোটা হয়ে ঝরে পড়ে একটু শান্তি দেবে?
কি বেইজ্জত যে হতে হল কী বলব। তারা বলল “যা চাই তা পারবে দিতে? তোমাদের তো আদ্ধেক পুকুর চুরি হয়ে ফ্ল্যাটবাড়ি হয়ে গেছে। যেগুলো আছে সেগুলোতে সক্কলে মিলে আবর্জনা ছুঁড়ে ফেলে মজিয়ে ফেলেছ। গাছ যা ছিল সেসবও সাফ করে কংক্রিট দিয়ে সৌন্দর্যায়ন করেছ। বলি জলীয় বাষ্প কই যে খেয়ে দেয়ে মোটা হব? আমরা কি তোমার বাথরুমের শাওয়ার নাকি, যে ইচ্ছে মত খুললেই জল পড়বে?”
মাথা নীচু করে শোনা ছাড়া উপায় ছিল না। অপমান হজম করে নিয়ে বললাম “তাহলে কি কোনদিন আর আমাদের ছোটবেলার বর্ষা ফেরত পাব না?” তারা হাত উল্টে বলল “সে কথা কি বলা যায়? মৌসুমীর কখন কী মর্জি হবে সে তো আর আমরা বলতে পারি না। সে আমাদের মালকিন বলে কথা। তবে বাপু যা চাইবে ভেবে চেয়ো। কোন বছর আমরা প্রাণ ভরে ঢাললে তো আবার তোমরা এক গলা জলে হাবুডুবু খাবে। জল উপচে পড়ার জায়গাগুলো তো আর কিছু রাখোনি।”
কোন মতে বললাম “তাহলে উপায়? হয় অনাবৃষ্টি নয় অতিবৃষ্টি — এই কি আমাদের ভবিষ্যৎ? আমার মেয়ের তবে রাস্তার জলে কাগজের নৌকো ভাসানো হবে না? বড় হয়ে মাধবী হওয়া হবে না?”
“কালবেলা তো নিজেরাই ডেকে এনেছ। এখন শঙ্খবেলা চাইলে হবে বাছা?” বলতে বলতে তারা কোন দিকে যে উড়ে গেল রাতের অন্ধকারে ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না।

একজন সাব এডিটর

যদি ধরে নিই আমাদের ভাস্করদার, মানে ভাস্করনারায়ণ গুপ্তের, মৃত্যুটাও আমাদের সংবাদজগতে কোথাও রেখামাত্র চিহ্ন রাখিবে না, তাহলে একদমই ভুল হবে না

রোজ সকালে যে কাগজটা পড়েন সেটার মধ্যে ছাপাখানার শ্রমিকদের কায়িক শ্রমের পাশাপাশি অনেক মানুষের মানসিক শ্রম মিশে থাকে। তার মধ্যে যারা নিজেদের ভাল কাজের জন্যে প্রায় কখনোই পুরস্কৃত হয় না, কিন্তু ভুল হলে প্রচণ্ড তিরস্কৃত হয়, তাদের নাম সাব এডিটর। ভাল খবর বেরোলে সম্পাদকের পিঠ চাপড়ানি এবং পাঠকের কাছে নাম — দুইই হয় রিপোর্টারের। বস্তুত পাঠকের কাছে সাব এডিটর বলে কোনকিছুর অস্তিত্বই নেই প্রায়। সাব এডিটর যখনই কোথাও সাংবাদিক হিসাবে নিজের পরিচয় দেন তখনই শুনতে হয় “ও, আপনি রিপোর্টার?” সাংবাদিকতার ইতিহাস, সব দেশে সব যুগেই, রিপোর্ট তথা রিপোর্টারদের ইতিহাস। কাগজের চমকে দেওয়া হেডিং, ছবির স্মরণীয় ক্যাপশন পাঠক ভোলেন না। কিন্তু যিনি ওগুলো দিয়েছেন তাঁর নাম কাগজে ছাপা হয় না বলে পাঠক জানতেও পারেন না। প্রতিভাবান সাংবাদিকরা যখন আত্মজীবনী বা কাল্পনিক কাহিনী লেখেন তখনো সাব এডিটরদের কথা বড় একটা আসে না। বিখ্যাত রিপোর্টার বা কাগজের সম্পাদক মারা গেলে তাঁর কাগজে (তেমন বিখ্যাত হলে অন্য কাগজেও) খবরটা ছাপা হয়। সাব এডিটর, সে তিনি যত উচ্চপদস্থই হোন না কেন, মারা গেলে সাধারণত তা হয় না। অন্য চাকরিতে কর্মরত কেউ মারা গেলে অফিসে একটা স্মরণসভা হয়, খবরের কাগজের অফিসে দৈনন্দিন কাজের এমন চাপ যে সে ফুরসতও নেই।
অতএব যদি ধরে নিই আমাদের ভাস্করদার, মানে ভাস্করনারায়ণ গুপ্তের, মৃত্যুটাও আমাদের সংবাদজগতে কোথাও রেখামাত্র চিহ্ন রাখিবে না, তাহলে একদমই ভুল হবে না। বিশেষ করে যখন মৃত্যুর বেশ আগে থেকেই ভাস্করদার সাব এডিটরবৃত্তি ঘুচে গিয়েছিল।
এক অর্থে খবরের কাগজে সাব এডিটরদের জীবন মৃত্যুর এই যে অকিঞ্চিৎকর অবস্থান, এটাই সবচেয়ে বাস্তবানুগ। যে কোন পেশার মানুষের জীবন মৃত্যুই তো, খুব বড় কিছু না করে থাকলে, এই বিরাট পৃথিবীতে এরকমই অকিঞ্চিৎকর। তবু, সবচেয়ে নগণ্য লোকটা যখন মারা যায় তখনো তার চেনা জানা মানুষরা, কাছের মানুষরা, অন্তত কয়েকটা দিন শোক পালন করে। কবি নাজিম হিকমত লিখেছিলেন বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড় জোর এক বছর। একবিংশ শতাব্দীতে নিশ্চয়ই আরো কম। তাই ভাবলাম এই বেলা স্মৃতিচারণটা সেরে ফেলা যাক। কদিন পরে আমারই লোকটাকে মনে থাকবে কিনা সে কি হলফ করে বলা যায়?
ভাস্করদার সাথে আমার শেষ দেখা ২০০৭ এ, যেদিন স্টেটসম্যান থেকে তার পাওনা টাকা পয়সার তাগাদা দিতে সে অফিসে এসেছিল। তারপর বার দুয়েক ফোনে কথা হয়েছে। শেষ কথা হয় ২০০৯ এ। আমার বিয়ের নেমন্তন্ন করবার জন্যে ফোন করেছিলাম। ভাস্করদা আসবে বলে কথা দিয়েও আসতে পারেনি। সাব এডিটরদের পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক। ভাস্করদা তদ্দিনে হিন্দুস্তান টাইমসের অধুনালুপ্ত সংস্করণের উচ্চপদস্থ সাব এডিটর। উচ্চপদস্থ, কিন্তু সাব এডিটর তো। তারপর থেকে ভাস্করদার সাথে যোগাযোগ আছে যে বন্ধুদের, তাদের কাছ থেকে তার খোঁজখবর নিয়েছি। কারণ ভাস্করদার জীবনে শোনার মত কিছুই ঘটছে না এরকম প্রায় হত না। এক আধবার ইচ্ছে হয়েছে দেখা করার উদযোগ আয়োজন করি, কিন্তু স্বভাবসিদ্ধ আলস্যে সে আর করা হয়ে ওঠেনি। তাহলে এখন লোকটার স্মৃতিচারণ করতে বসলাম কেন? এ কি আদিখ্যেতা নয়? নয়। তার কারণ আমি লিখছি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্যে। কিসের কৃতজ্ঞতা? সেই কথাই বলি।
আমি যখন শিক্ষানবিশ সাংবাদিক হিসাবে ২০০৫ এর জুন মাসে দ্য স্টেটসম্যান কাগজে যোগ দিই তখন বহিরঙ্গ আর অন্তরঙ্গ — দুদিক থেকেই কাগজটার অবস্থা জলসাঘর ছবির জমিদারবাড়িটার মত। কাজ শেখার পক্ষে অবশ্য জায়গাটা তখনো চমৎকার ছিল। কিন্তু সেটা বুঝতে তো সময় লাগে। কী শিখতে হবে, কোনটা আগে শিখতে হবে কোনটা পরে — সেসব বুঝতেও সময় লাগে। আর সেসব বুঝে ওঠার জন্যে মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যের দরকার হয়। সেই স্বাচ্ছন্দ্য যুগিয়ে দেওয়ায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল আমার তৎকালীন বস, ক্রীড়া সম্পাদিকা ইলোরা সেনের। ব্যাপারটা আরো একটু সহজ হয়েছিল ক্রীড়া বিভাগে আমার সহকর্মীদের মধ্যে আমার দুই সহপাঠী সুদীপ্ত আর অরিজিৎ থাকায়। কিন্তু সাংবাদিক মাত্রেই জানেন, আমাদের পেশায় এক কঠিন ঠাঁই আছে যেখানে নবীন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, এবং যেখানে কেউ কোন সাহায্য করতে পারে না। সে ঠাঁইয়ের নাম নাইট ডিউটি। যখন সেই ডিউটিতে থাকতাম, তখন গোড়ার দিকে বাড়ি যাওয়ার সময় ইলোরাদি বলে দিয়ে যেতেন “ভাস্কর, মনো (মনোজিৎ দাশগুপ্ত), ও রইল। প্রথম প্রথম নাইট করছে তো। একটু দেখো।” ঐ দুজনের ব্যবহারে আমরা (শিক্ষানবিশরা) কিছুদিনের মধ্যেই বুঝে গেলাম, ভুল হলেও ভয় নেই। শুধরে দেওয়ার জন্যে ভাস্করদা, মনোদা আছে। আমার কাছে সেদিনের ঐ ভরসাটুকুর দাম, যত বয়স হচ্ছে তত বেড়ে যাচ্ছে।
আমি মফঃস্বলের ছেলে, চোদ্দ পুরুষে কেউ কখনো সাংবাদিক ছিল না। তার উপর স্টেটসম্যান এমন একটা কাগজ যা পড়ে বাবা ইংরিজি শিখতে বলত ছোটবেলায়। ফলে বেশি রাতে অফিস ফাঁকা হয়ে গেলে অন্য ডেস্কের কার সাথে কতটা কথা বলব, কার সাথে হাসিঠাট্টা করা চলে, কার ঠাট্টায় হাসা চলে আর কার ঠাট্টায় হাসলে তিনি রেগে যাবেন — এসব নিয়ে প্রাথমিক দ্বিধা ছিলই। সেই দ্বিধা কাটাতে যে লোকটা সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল, সেও ভাস্করদাই। ফলে কিছুদিন পরেই দেখা গেল তার ভাষায় আমি হয়ে গেছি “কোন্নগরের সিপিএম।” ভাস্করদার কিন্তু সিপিএমকে ঘোর অপছন্দ। অথচ আমার বাবা সিপিএম করে বলে ঐ নামকরণটা করলেও আমাকে বেশ পছন্দ বলেই মনে হয়।
সেইসময় নাইট ডিউটি শেষ হওয়ামাত্রই বাড়ি আসার জন্যে গাড়ির ব্যবস্থা ছিল না। আমাকে অফিসেই অপেক্ষা করতে হত ভোর চারটে অব্দি। তারপর অফিসের গাড়ি আমায় নামিয়ে দিত শেষ রাতের হাওড়া স্টেশনে। দিনের প্রথম ট্রেন ধরে আমি বাড়ি ফিরতাম। রাত দেড়টা দুটো নাগাদ কাজ শেষ হওয়ার পর ঐ যে দুটো ঘন্টা, তা আমার দেখতে দেখতে কেটে যেত ভাস্করদার জন্যেই। হুল্লোড়ে লোকের নিঃসঙ্গতা, বিষণ্ণতা অত কাছ থেকে দেখার সুযোগ জীবনে আর হয়নি। সেই মধ্যরাতের আড্ডাগুলোতেই ভাস্করদাকে ভাল করে দেখার আমার সুযোগ হল। এবং যত দেখলাম, তত অবাক হলাম।
দেখলাম লোকটা যেমন ঝড়ের বেগে টাইপ করে সন্ধ্যেবেলা, তেমনি দুপুর রাতে গড়গড়িয়ে জয় গোস্বামীর কবিতা বলে। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময়ে পাঞ্জাবী বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার গল্প বলতে বলতে খালিস্তানপন্থী আন্দোলন কী এবং কেন, ভিন্দ্রানওয়ালে ইন্দিরা গান্ধীর ফ্র‍্যাঙ্কেনস্টাইন কিনা সেই আলোচনায় ঢুকে পড়ে অনায়াসে। আদবানির প্রশংসা করতে করতে দুম করে ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি, তক্কো আর গপ্প’ শট ধরে ধরে বিশ্লেষণ করতে আরম্ভ করে।
বেশ কয়েকবার এমন হয়েছে, অফিস থেকে বেরনোর সময়ে দেখা গেছে ভাস্করদা, মনোদাকে পৌঁছতে যাবে আবার আমাকেও হাওড়ায় ছাড়তে যাবে, অত গাড়ি মজুত নেই। ওরা তখন আমায় নামিয়ে দিয়ে বাড়ি গেছে।
স্বভাবতই আমার মত নবীনদের অনেকেরই ভাস্করদাকে তখন দারুণ পছন্দ। দেখা গেল অফিসের সমস্যা নিয়ে ভাস্করদার পরামর্শ তো চাইছিই, উপরন্তু কোন সুন্দরীকে মনে ধরেছে কিন্তু বলে উঠতে পারছি না — সে সমস্যার সমাধানও ভাস্করদার কাছেই দাবী করছি। ভাস্করদা হয়ত বলছে “ওরে ****, এর চেয়ে আমিই বলে আসি নাহয়।”
ভাস্করদার সাথে আমার সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত এক নবমীর রাত। জীবনে প্রথম নবমীর দিন নাইট ডিউটি করছি। ব্যাজার মুখে। কাজ শেষ হওয়ার পর ভাস্করদা টানতে টানতে নিয়ে গেল প্রতিদিন অফিসের সামনে। নিজেরা চা খাচ্ছে, আমাকেও খেতেই হবে। যতই বলি আমি চা খাই না, ভাস্করদা বলে “আমি বলছি, তোকে খেতে হবে **।” খাওয়া হল, তারপর বলল “আচ্ছা, এটা আমার ইচ্ছায় খেলি, এবার তোর কী খাওয়ার ইচ্ছে বল। যা বলবি তাই খাওয়াব।” সেটা সুইগি, জোম্যাটোর যুগ নয়। ক্ষিদেও পেয়েছে তেড়ে। কিন্তু কিছু বলতে পারছি না সঙ্কোচে। শেষ অব্দি ভাস্করদাই “আচ্ছা, তুই ডিম ভালবাসিস তো?” বলে রাস্তার ধারের দোকান থেকে ডবল ডিমের ভুর্জি কিনে দিল। নিউজরুমে ফিরে সামনে বসিয়ে সমস্তটা খাওয়াল। রাত আড়াইটেয় খাওয়া সেই ডিমের ভুর্জির স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে।
ওরকম একজন সাব এডিটর হয়ে উঠতে আমরা কেউ পারলাম না। সব বিষয়ে অত আগ্রহ, অত পড়ার শক্তি আমাদের নেই। ওরকম একজন সিনিয়র হয়ে উঠতেও পারিনি। অত মমতাও আমাদের নেই।

ছবি: ভাস্করদার ফেসবুক পেজ থেকে

%d bloggers like this: