স্পিরিট অফ ক্রিকেট খায় না মাথায় দেয়?

আইনকানুন দুরকম করলে অবশ্য খেলাধুলো চলে না; কিন্তু পরিবেশটা, কালচারটা রাজকীয় থাকা চাই। তাই আইনের ঊর্ধ্বে স্পিরিট অফ ক্রিকেট নামক একটি সোনার পাথরবাটি রেখে দেওয়া।

ফুটবল আর ক্রিকেট – দুটোই আমরা শিখেছি সাহেবদের থেকে। তাদের কাছে প্রথমটা স্রেফ খেলা, কিন্তু দ্বিতীয়টা ‘জেন্টলম্যান’স গেম’। আমরা বাঙালিরাও ফুটবল নিয়ে গদগদ, জনপ্রিয় গানে লেখা হয়ে গেছে “সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল”। কিন্তু ‘ভদ্রলোকের খেলা’ বলি ক্রিকেটকে। কারণ ক্রিকেটে আছে এমন একটা জিনিস যা আর কোনো খেলায় নেই – স্পিরিট অফ ক্রিকেট। ‘জেন্টলম্যান’স গেম’ কথাটার সর্বজনমান্য বাংলা ‘ভদ্রলোকের খেলা’ তৈরি হয়ে আছে বহুকাল ধরে। কিন্তু ‘স্পিরিট অফ ক্রিকেট’ কথাটার বাংলা কী? কাউকে তো লিখতে বা বলতে দেখি না। কথাটার হিন্দিও কোথাও দেখি না। রবিচন্দ্রন অশ্বিন আইপিএল ম্যাচে জস বাটলার বল হওয়ার আগেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন দেখে তাঁকে রান আউট করে দিলে বা ভারতের দীপ্তি শর্মা ইংল্যান্ডের শার্লট ডীনকে একইভাবে রান আউট করে দিলে ভারতের সব ভাষাভাষী লোক (বিদেশিরাও) যা নিয়ে আলোচনা করে তা ওই ‘স্পিরিট অফ ক্রিকেট’।

কথাটার বাংলা, হিন্দি, গুজরাটি, মারাঠি, তামিল, মালয়ালম – কোনো অনুবাদই পাওয়া দুষ্কর। কারণ জিনিসটা খেতে হয় না মাখতে হয় – তা এই ক্রিকেটপাগল দেশের কোনো জাতির একজন ক্রিকেটবোদ্ধারও বোধহয় হৃদয়ঙ্গম হয়নি। যা হৃদয়ঙ্গম হয় তাকে মানুষ নিজের ভাষায় ডাকে। আমাদের বাঙাল পাড়ার কাকা জ্যাঠারা অনেকেই ফুটবল খেলাকে বলতেন ‘জাম্বুরা লাথান’। ক্রিকেট খেলার ঝিঁঝি নামটা তো বাঙাল, ঘটি সকলেই জানে। ঘোর পশ্চিমবঙ্গীয় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ‘ক্রিকেট মানে ঝিঁঝি’ নামে একখানা আস্ত গল্প লিখে গেছেন।

হৃদয়ঙ্গম হবে কী করে? স্পিরিট অফ ফুটবল বা স্পিরিট অফ টেনিস শুনেছেন কখনো? সকলেই জানে এই খেলাগুলোর কিছু নিয়মকানুন আছে। সেই অনুযায়ী খেলা চলে, নিয়ম ভাঙলে ভুলের ওজন অনুযায়ী মাশুল দিতে হয়। দিয়েগো মারাদোনার হাত দিয়ে গোল করা অন্যায় হয়েছিল, কারণ নিয়ম অনুযায়ী হাত দিয়ে গোল দেওয়া চলে না। সে গোলের সমর্থনে মারাদোনা নানারকম মন্তব্য করেছিলেন, ফুটবল রোম্যান্টিকরাও নানা কথা বলে। কিন্তু অতি বড় আর্জেন্টিনা সমর্থকও বলে না, গোলটা বৈধ কারণ ওটা স্পিরিট অফ ফুটবল অনুযায়ী ঠিক। কোনো ইংল্যান্ড ভক্তও কখনো বলেনি, গোলটা অবৈধ কারণ ওটা স্পিরিট অফ ফুটবলের বিরুদ্ধে। স্বীকার্য যে সব খেলারই কিছু সহবত আছে যেগুলো নিয়ম হিসাবে লিপিবদ্ধ নেই। যেমন ফুটবলে একজনকে ট্যাকল করে মাটিতে ফেলে দিয়েই আবার হাত বাড়িয়ে দিই উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করার জন্যে। কিন্তু তা না করলে কেউ স্পিরিট অফ ফুটবল লঙ্ঘন হল বলে তেড়ে আসে না। যদি বাড়াবাড়ি করে যাকে মাটিতে ফেলেছি তাকে ফের লাথি মারি, তাহলে শাস্তির বিধান আইনেই আছে। আলাদা করে স্পিরিটের দোহাই দেওয়ার দরকার পড়ে না।

কিন্তু ক্রিকেটের কথা আলাদা। ফুটবলের মত সাধারণ চাকুরে, শ্রমিক প্রমুখ মিলে ক্রিকেট ক্লাবগুলোর গোড়াপত্তন করেননি বিলেতে। সায়েবসুবোদের মধ্যেও উচ্চকোটির লোকেরাই নিজেদের মধ্যে খেলত ধপধপে সাদা জামাপ্যান্ট পরে। রাজারাজড়ার খেলায় যখন অন্যরা ঢুকে পড়ল, তখন আবার শ্রেণিবিভাগ করা হল – জেন্টলমেন আর প্লেয়ার্স। আইনকানুন দুরকম করলে অবশ্য খেলাধুলো চলে না; কিন্তু পরিবেশটা, কালচারটা রাজকীয় থাকা চাই। তাই আইনের ঊর্ধ্বে স্পিরিট অফ ক্রিকেট নামক একটি সোনার পাথরবাটি রেখে দেওয়া। ক্রিকেট ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে যে দেশে গেছে সেদেশেই উচ্চকোটির মানুষের খেলা হয়ে থেকেছে বহুকাল। নিজের সময়ের অন্যতম সেরা স্পিনার হওয়া সত্ত্বেও পলওয়ঙ্কর বালু দলিত বলে বম্বের কোয়াড্রেনিয়ালে খেলতে কতটা বেগ পেয়েছেন সে ইতিহাস রামচন্দ্র গুহ সবিস্তারে লিখেছেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজেও ব্যাপারটা একইরকম ছিল অনেকদিন। সেখানকার নন্দিত লেখক সিএলআর জেমস লিখেছেন, ইংল্যান্ডে যাওয়ার আগে তিনি বুঝতেই পারেননি, যে কোনটা ক্রিকেটিয় আর কোনটা ক্রিকেটিয় নয় তার যে ধারণা তাঁর মাথায় তৈরি হয়েছিল, তা আসলে দ্বীপপুঞ্জের ব্রিটিশ শাসকদের তৈরি করে দেওয়া। মজার কথা, যে কোর্টনি ওয়ালশকে ঢাল করে আজ শাকিব আল হাসানকে দুয়ো দেওয়া চলছে, সেই ওয়ালশের জামাইকার প্রবাদপ্রতিম ক্রিকেটার জর্জ হেডলি আদর্শ অধিনায়ক মনে করতেন বডিলাইন সিরিজের কুখ্যাত ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিনকে।

আরও পড়ুন কুস্তিগীরদের আন্দোলন: মহাতারকাদের মহাকাপুরুষতা

স্পিরিট অফ ক্রিকেট নামক ভদ্রলোকের সুবিধাটি (privilege) একবার করে ধাক্কা খায়, খানিকটা খসে পড়ে। তখন নিয়ামকরা অগত্যা আইন বদলে একই অধিকার সকলকে দেন। ভারতে জন্মানো স্কটিশ (ব্রিটিশ নয় কিন্তু) জার্ডিন বড় ধাক্কা মেরেছিলেন। ডন ব্র্যাডম্যানের রান আটকাতে তিনি ব্যাটারদের শরীর লক্ষ করে বল করানো শুরু করেন আইন মোতাবেক। ফলে নিয়ামকরা আইন বদলে লেগ আম্পায়ার আর উইকেটরক্ষকের মাঝে দুজনের বেশি ফিল্ডার রাখা নিষিদ্ধ করেন। আউট করতে গিয়ে ব্যাটারকে আঘাত করা চলবে না – এটা এতদ্বারা আইনের মধ্যে এসে পড়ে। তার আগে অবধি বাবুদের ভদ্রলোকসুলভ ব্যবহারে বিশ্বাস ছিল, অর্থাৎ কারোর শরীর লক্ষ করে বল ছোড়া হবে না।

রাজছত্র ভেঙে পড়ে, ভদ্রলোকের সুবিধা কিন্তু টিকে থাকে। কারণ ওটা যাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্যে তৈরি হয়নি, তাদের মাথাতেও বেদবাক্য হয়ে ঢুকে পড়ে। সমাজবিজ্ঞানে যাকে ‘হেজিমনি’ বলে। তাই অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ ভাবেন মাঠে নামার আগে দেখে নেওয়ার দরকার নেই হেলমেটটা খেলার যোগ্য আছে কিনা। মাঠে নেমেও ভাবেন যত খুশি সময় নিতে পারেন, স্পিরিট অফ ক্রিকেট বাঁচিয়ে দেবে। আর শাকিব কোনো অন্যায় না করেও দুনিয়াসুদ্ধ লোকের গাল খান। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের লোকের, কারণ এ রাজ্যে ক্রিকেট তো সত্যিই আজও ভদ্রলোকের খেলা। বাংলা থেকে ভারতীয় দলে খেলা ক্রিকেটারদের অধিকাংশ কলকাতার বনেদি পরিবারগুলোর সন্তান। ছোটলোকেরা বাংলার ক্রিকেটে এখনো প্রান্তিক।

এই সময় কাগজে প্রকাশিত

বেদি আর ববিকে ভোলা বিবেকের কাছে অপরাধ

ভারতীয় জোরে বোলারদের মধ্যে কপিলদেব নয়, যশপ্রীত বুমরাই গোট – একথাও এখনই বলা শুরু হয়ে গেছে। স্পিনারদের মধ্যে অশ্বিন গোট। ফলে বিষাণ সিং বেদিকে আর কে মনে রাখবে?

বিরাট কোহলি একটা করে শতরান করেন আর নতুন করে তর্ক শুরু হয় – সর্বকালের সেরা কে? কোহলি নাকি শচীন তেন্ডুলকর? চলতি বিশ্বকাপে বিরাট ইতিমধ্যেই একটা শতরান করে ফেলায় এবং আরেকটা শতরানেরও খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় সোশাল মিডিয়ায় দুজনের ভক্তরা এ নিয়ে ধুন্ধুমার চালিয়ে যাচ্ছেন। দুপক্ষই প্রধানত পরিসংখ্যানকেন্দ্রিক। ক্রিকেট খেলার পরিসংখ্যান আজকাল মোবাইল ফোনের কল্যাণে সকলের আঙুলের ডগায়। তার উপর ক্রিকেট যত বাড়ছে, পরিসংখ্যানগুলো তত ফুলে ফেঁপে উঠছে। ফলে ও নিয়ে তর্ক করাই সুবিধাজনক। যে কোনো খেলাই খেলে মানুষ। ফলে খেলার পরিবেশ, পরিস্থিতি, একজন খেলোয়াড়ের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা এবং অবস্থানের মত বিষয় যে পরিসংখ্যানের সমান, বা ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়েও বেশি, গুরুত্বপূর্ণ তা বেশিরভাগ আলোচনাতেই উঠে আসে না। কেবল সাধারণ ভক্তরা নন, বিশেষজ্ঞরাও আজকাল এই দোষে দুষ্ট। ফলে যা সাম্প্রতিক তা-ই সবচেয়ে ভাল – এই অলিখিত বাক্যটা প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। GOAT (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম) বলে একটা আশ্চর্য শব্দ দিনরাত ছোড়াছুড়ি হয় আজকাল। হয় কোহলি নয় তেন্ডুলকর গোট। ভারতীয় ক্রিকেটের বহু যুদ্ধের একক নায়ক সুনীল গাভস্করের নামও ক্রিকেটভক্তদের আলোচনায় ধারাভাষ্য বাদে আসে না আর। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দৃষ্টিপথের বাইরে চলে গেছে, তাই ভিভিয়ান রিচার্ডসের মত ব্যাটারও আলোচনার বাইরে। ভারতীয় জোরে বোলারদের মধ্যে কপিলদেব নয়, যশপ্রীত বুমরাই গোট – একথাও এখনই বলা শুরু হয়ে গেছে। স্পিনারদের মধ্যে অশ্বিন গোট। ফলে বিষাণ সিং বেদিকে আর কে মনে রাখবে?

ভারতের বিখ্যাত স্পিন চতুষ্টয়ের অন্যতম এবং প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক, জাতীয় দলের প্রাক্তন কোচ বেদি ক্রিকেট বিশ্বকাপের মধ্যে মারা গেলেন। অথচ এখন পর্যন্ত কোনো ম্যাচের আগে এক মিনিট নীরবতা পালন হয়নি, কোনো দলের ক্রিকেটার কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামেননি। হয়ত আগামী রবিবার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে রোহিত শর্মারা সে কাজটা করবেন। কিন্তু প্রবল প্রতাপান্বিত ভারতীয় বোর্ড চাইলে অন্য দলগুলোও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে দ্বিধা করত না। কেনই বা করবে? ক্রিকেটের সমঝদারদের কাছে বেদির এখনো যথেষ্ট দাম আছে। ইয়ান চ্যাপেল, জিওফ্রে বয়কটরা এখনো বোঝেন বেদির ২৬৬টা টেস্ট উইকেটের মূল্য। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর ঝুলিতে ১,৫৬০টা উইকেট। অথচ নিজের দেশের ক্রিকেটভক্তরাই বেদিকে ভুলে বসে আছেন।

সেদিক থেকে ববি চার্লটন ভাগ্যবান। ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্ব ফুটবল খেতাব জয়ের অন্যতম স্থপতির নামও যে ইদানীংকালের ইংল্যান্ড সমর্থক বা ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের তরুণ ভক্তরা দিনরাত আলোচনা করেন তা নয়। কিন্তু ও দেশের খেলাধুলোর সংস্কৃতি আলাদা। এখানকার মত রাজনৈতিক নেতাদের নামে স্টেডিয়াম হয় না চট করে, স্টেডিয়ামের বাইরে মূর্তি বসানো হয় প্রবাদপ্রতিম খেলোয়াড়দের। তাই ববির মৃত্যুর পর তাঁর ক্লাব ইউনাইটেড চ্যাম্পিয়নস লিগ ম্যাচের সাংবাদিক সম্মেলনের আগে এক মিনিট নীরবতা পালন করেছে। আরও নানা অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ফুটবলপ্রেমীরা লাইন দিয়ে ফুলের তোড়া হাতে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছেন। এক ভক্ত তো তাঁর মূর্তি বেয়ে উঠে গলায় পর্যন্ত শ্রদ্ধাজ্ঞাপনকারী স্কার্ফ জড়িয়ে দিয়েছেন।

ববি বা বেদি এক অন্য জগতের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁরা সারাজীবনে শুধু খেলোয়াড় হিসাবে যা আয় করেছেন, আজকের লায়োনেল মেসি বা কোহলি সম্ভবত এক দিনে তা আয় করেন। কিন্তু তাঁরা কিছু আদর্শ নিয়ে চলতেন। বেদি যেমন শুধু স্পিনকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছিলেন বলেই স্মরণীয় নন। ১৯৭৬ সালে কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে অধিনায়ক বেদি মাত্র ৩০৬ রানে ছয় উইকেট পড়ার পরেই ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করে দেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা ভারতীয় ব্যাটারদের আউট করতে নয়, আহত করতে নেমেছিলেন। যা বিশ্বাস করেন তা নিয়ে অকপট থাকা ববিরও অভিজ্ঞান। নিজের যোগ্যতা নিঃসংশয়ে প্রমাণ করার পরেও তিনি বলতেন, ১৯৫৮ সালের মিউনিখ বিমান দুর্ঘটনায় ম্যাট বাজবির সোনার ছেলেরা মারা না গেলে তিনি বড় ফুটবলার হয়ে উঠতেন না।

আরও পড়ুন বেলা ফুরোতে আর বসে রইলেন না শেন ওয়ার্ন

আজকাল অনেক প্রিয় খেলোয়াড়ের মাঠের বাইরের আচরণ আমাদের আহত করে। কারণ দেখা যায়, মাঠে দারুণ লড়াকু আমাদের নায়ক মাঠের বাইরে ক্ষমতার সামনে একেবারে নতজানু। এঁরা কিন্তু কাঁড়ি কাঁড়ি উইকেট নিলে বা ঝুড়ি ঝুড়ি রান করলেও শিরদাঁড়ার দিক থেকে বেদির ধারেকাছে আসতে পারবেন না। আজীবন দিল্লিতে ক্রিকেট খেলা, দিল্লির হয়ে দুবার রঞ্জি ট্রফি খেতাব জেতা বেদির নামে ফিরোজ শাহ কোটলার একটা স্ট্যান্ডের নামকরণ করা হয়েছিল। কিন্তু কর্মকর্তারা যেই স্টেডিয়ামের নাম বদলে অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম করে দিলেন, আর কেউ কোনো প্রতিবাদ না করলেও বেদি কর্তাদের চিঠি দিয়ে জানান তাঁর নামাঙ্কিত স্ট্যান্ডটার নাম যেন বদলে দেওয়া হয়। দিল্লির ক্রিকেট সংস্থার সদস্যপদও তাঁর আর দরকার নেই। ভারতের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজনকে কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমী যেন স্মরণে রাখেন, তার জন্যে যে বোর্ডের দিক থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেই তার কিন্তু এটাও অন্যতম কারণ। বেদিকে মনে থাকলেই তো এসবও মনে থাকবে ভক্তদের।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

দায়সারা বিশ্বকাপ, শেষ বিশ্বকাপ?

কর্তারা যে ৫০ ওভারের খেলাটাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচেন তা সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির প্রাক্তন অধিনায়ক এবং সদ্য পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রিকেট ক্লাব এমসিসির সভাপতি হওয়া মার্ক নিকোলাস।

১৯৮৭ সালে যখন প্রথমবার এদেশে ক্রিকেট বিশ্বকাপ হয় তখন দুনিয়াটাই অন্যরকম ছিল। তাই সেকথা থাক, বরং ১৯৯৬ সালের কথা ভাবা যাক। আজ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের খেলা আর আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করে যে টাকার হিমালয়ে চড়েছে তা টেথিস সাগরের মত উঁচু হতে শুরু করেছিল ওই সময় থেকেই। প্রয়াত জগমোহন ডালমিয়া বুঝতে পেরেছিলেন ভারতের ক্রিকেটপাগল জনতার বাজার কত লোভনীয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে। সেই বাজারে তাদের প্রবেশাধিকার দিয়ে এত টাকা কামাতে পারে ভারতীয় বোর্ড, যে গোটা ক্রিকেট দুনিয়া শাসন করা যাবে। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার চোখরাঙানি সহ্য করার বদলে তাদেরই চোখ রাঙানো যাবে। তবে ডালমিয়া ছিলেন খাঁটি ব্যবসায়ী। কামানোর জন্য খরচ করতে তাঁর আপত্তি ছিল না। বিশেষত টাকা যখন বোর্ডের, নিজের পকেটের নয়। ফলে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে হওয়া সেবারের বিশ্বকাপে জাঁকজমকের খামতি ছিল না। সেই বিশ্বকাপ থেকে বিস্তর আয় হয়েছিল এবং তার অনেকটা ডালমিয়া পকেটে পুরেছেন – এমন অভিযোগ পরে উঠেছিল। সেসব মামলা মোকদ্দমার জেরেই একসময় তাঁকে বোর্ডছাড়া হতে হয়, পরে আবার ফিরেও আসেন। কিন্তু বিশ্বকাপের আয়োজন যে জবরদস্ত হয়েছিল তা কেউ অস্বীকার করে না। ইডেন উদ্যানে বহু অর্থ খরচ করে বিরাট উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল, গঙ্গার হাওয়া এসে অদৃষ্টপূর্ব লেজার শোকে অভূতপূর্ব বিপর্যয়ে পরিণত করেছিল। ভারত সেমিফাইনালে শোচনীয়ভাবে শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে যাওয়ার পরে লেখালিখি হয়েছিল, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি মঞ্চটাই নাকি যত নষ্টের গোড়া। ওটা তৈরি করতে গিয়েই নাকি পিচের বারোটা বেজে গিয়েছিল, ফলে সেমিফাইনালের দিন অরবিন্দ ডি সিলভা আর মুথাইয়া মুরলীধরন এক জাতের বোলার হয়ে গিয়েছিলেন। ২০১১ সালে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কায় হওয়া বিশ্বকাপেও জাঁকজমক কম ছিল না। সেবার ঢাকার বঙ্গবন্ধু ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল। তদ্দিনে ভারত হিমালয়ে উঠে পড়েছে, বোর্ডের টাকার অভাব নেই। ফলে বাকি বিশ্বকাপটাও হয়েছিল বিশ্বকাপের মত। আর এবার?

আজ গতবারের দুই ফাইনালিস্ট ইংল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপ শুরু করবে। কিন্তু তার আগে কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে না, কারণ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড খুবই মিতব্যয়ী। চোখধাঁধানো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করে শুধু আইপিএল শুরুর দিনে। ১৯৯৬ সালে বোর্ড সভাপতি ছিলেন শিল্পপতি ডালমিয়া, এখন শিল্পপতি জয় শাহ। ও না! ভুল হল। বোর্ড সভাপতি ১৯৮৩ বিশ্বকাপ জয়ী ভারতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রজার বিনি, জয় হলেন সচিব। আসলে বিনিকে দেখা যায় কম, শোনা যায় আরও কম। তাই খেয়াল থাকে না। মানে তাঁর অবস্থা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর মত। তিনি সাংবিধানিক প্রধান বটে, সবেতেই তাঁর স্বাক্ষর লাগে বটে, কিন্তু নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনে তাঁকে ডাকাই হয় না। রাজদণ্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন মোদীজি। ক্রিকেট বোর্ডের সর্বেসর্বাও এখন শাহজি, বিনিজি অন্তঃপুরবাসী। যাঁর নাম জয় আর পদবি শাহ, তিনি সর্বেসর্বা হবেন না তো হবে কে? সে যতই তিনি এশিয়ান গেমসে মহিলাদের ক্রিকেটে স্মৃতি মান্ধনা একাই সোনা জিতেছেন মনে করুন না কেন।

কথা হল, জগমোহনের বিশ্বকাপ আয়োজন করা নিয়ে যা উৎসাহ ছিল, জয়ের তার অর্ধেকও দেখা যাচ্ছে না। তাই এবারের বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা হয়েছে মাত্র ১০০ দিন আগে, যেখানে পৃথিবীর যে কোনো খেলায় বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা হয়ে যায় বছরখানেক আগে। আগামী বছর জুন মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির সূচি যেমন প্রকাশিত হয়েছে গত মাসে। কারণ বিভিন্ন দেশের মানুষকে খেলা দেখতে একটা নির্দিষ্ট সময়ে একটা দেশে পৌঁছতে হবে। যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে, থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। সেসব প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য যত কম সময় পাওয়া যাবে খরচ বেড়ে যাবে ততই। অব্যবস্থা দেখা দেবে, যে দেশে খেলা সেই দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হবে। কিন্তু ওসব ভাবনা রাজা বাদশাহরা কবেই বা করলেন? তাঁরা চলেন নিজের নিয়মে, বাকি সকলকে মানিয়ে নিতে হয়। বিশ্বকাপ এমনিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রতিযোগিতা, ফলে সূচি ঘোষণা করার কথা তাদের। কিন্তু আয়োজক দেশকেই ঠিক করতে হয় সূচিটা। একথাও কারোর জানতে বাকি নেই যে ফুটবল দুনিয়াকে ফিফা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, আইসিসির মুরোদ নেই তা করার। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অর্থবল এত বেশি যে আইসিসি এখন ঠুঁটো জগন্নাথ। অনতি অতীতে আইসিসির ফিউচার টুরস প্রোগ্রামে (অর্থাৎ পরবর্তী কয়েক বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নির্ধারিত সূচিতে) আইপিএলের জন্য যে আরও বেশি ফাঁক রাখা হবে তা ঘোষণা করে দিয়েছেন শাহজিই, আইসিসি নয়। তা নিয়ে আইসিসি ট্যাঁ ফোঁ করতে পারেনি। ফলে এত দেরিতে বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণার দায় আইসিসির ঘাড়ে চাপানো চলে না।

তবে অস্বাভাবিক দেরিতে সূচি ঘোষণাতেই অব্যবস্থার শেষ নয়, বরং সূচনা। কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা গেল বিভিন্ন আয়োজক রাজ্য সংস্থা তাদের স্টেডিয়ামে যেদিন ম্যাচ দেওয়া হয়েছে সেদিন আয়োজন সম্ভব নয় বলছে। খোদ কলকাতাতেই যেমন কালীপুজোর দিন ইংল্যান্ড বনাম পাকিস্তান ম্যাচ রাখা হয়েছিল। ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজনের অভিজ্ঞতা না থাকা মানুষও বোঝেন যে সেদিন ম্যাচ আয়োজন করা অসম্ভব, কিন্তু দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র বোঝেন না। ক্রীড়াসূচি তৈরি করার সময়ে যে যেখানে খেলা সেখানকার আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়, সম্ভবত তাও তিনি বোঝেন না। নইলে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের আয়োজকরা নিশ্চয়ই এত বোকা নন যে কালীপুজোর দিন ম্যাচ করতে রাজি হবেন? জয় শাহীর মজা হল, হিন্দুত্ববাদী দলের নেতা অমিত শাহের পুত্র সর্বেসর্বা হলেও বিশ্বকাপের সূচি বানানোর সময়ে বোর্ডের খেয়ালই ছিল না যে ১৫ অক্টোবর নবরাত্রি উৎসবের সূচনা, সেদিন আমেদাবাদ শহরে ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ করা সম্ভব নয়। এহেন প্রশাসনিক নৈপুণ্যের কারণে অনেক দেরিতে সূচি ঘোষণা করার পরেও সব মিলিয়ে গোটা দশেক ম্যাচের দিনক্ষণ বদল করতে হয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি নিয়ে যা চলছে তা প্রাক-২০১৪ ভারতে সম্ভবত তদন্তযোগ্য কেলেঙ্কারি বলে গণ্য হত এবং সমস্ত খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেলে দিনরাত এ নিয়েই তর্কাতর্কি চলত। একে তো টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম, তার উপর বিশ্বকাপের টিকিট অনলাইনে কিনতে গিয়ে অনেকেই তাজ্জব বনে গেছেন। ঘন্টা চারেক ‘কিউ’-তে পড়ে থেকেও টিকিট পাননি অনেকে। আইসিসি এখন পর্যন্ত বলেনি কত টিকিট বিক্রি হওয়ার কথা ছিল আর কত টিকিট বিক্রি হয়েছে। বিক্রির দায়িত্বে থাকা বুকমাইশো সোশাল মিডিয়ায় জানিয়েছে, তাদের হাতে নাকি সীমিত সংখ্যক টিকিটই আছে। এত টিকিট গেল কোথায়? এসব নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে যত লেখালিখি হয়েছে, ভারতের সংবাদমাধ্যমে তত হয়নি। ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমে তবু খানিকটা হয়েছে, বাংলার কথা না বলাই ভাল। একদিকে টিকিটের আকাল, অন্যদিকে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, আজকে উদ্বোধনী ম্যাচে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে নাকি ৪০,০০০ মহিলাকে দর্শক হিসাবে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেছে গুজরাট বিজেপি। আমেদাবাদের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে হোয়াটস্যাপে আমন্ত্রণ পাঠিয়ে নাকি এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাহলে কি বিশ্বকাপের টিকিট পেতে গেলে বিজেপির সদস্য বা সমর্থক হতে হবে? সেকথা যদি ঠিক না-ও হয়, এই বিশ্বকাপে হক যে অন্য সব রাজ্যের চেয়ে গুজরাটের বেশি, তাতে কিন্তু সন্দেহ নেই। ভারতে এর আগে অনুষ্ঠিত তিনটে বিশ্বকাপে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম, কলকাতার ইডেন উদ্যান, দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা বা চেন্নাইয়ের চিদম্বরম স্টেডিয়ামের মত ঐতিহ্যশালী মাঠের যে সৌভাগ্য হয়নি সেই সৌভাগ্যই এবার হয়েছে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ ওখানে, ফাইনাল ওখানে, আবার ক্রিকেটবিশ্বের সকলের চোখ থাকে যে ম্যাচের দিকে – সেই ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচও ওই মাঠেই।

কেন ঘটছে এসব? জলের মত সরল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন বহুদিনের ক্রীড়া সাংবাদিক শারদা উগ্রা, সম্প্রতি দ্য ক্যারাভ্যান পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর দীর্ঘ প্রতিবেদনে, যার শিরোনাম Shah’s playground: BJP’s Control of Cricket in India। সেই প্রতিবেদনে বোর্ডের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন, অমিতপুত্র বোর্ড চালান একেবারেই একনায়কত্বের ঢঙে। মিনমিনে বিনির সময় থেকে নয়, সৌরভ গাঙ্গুলি বোর্ড সভাপতি থাকার সময় থেকেই। অনেকসময় তিনি বোর্ডের অন্যদের সৌরভের ফোন ধরতে বারণ করতেন। যদি সৌরভ বলতেন অমুক ম্যাচটা ওইদিন হতে হবে, অবধারিতভাবে অন্য কোনোদিন ধার্য করা হত। জয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে কাঁচকলা দেখিয়ে নিজের সভাপতি পদের মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া সৌরভ এসব মেনে নিয়েই পদ আঁকড়ে পড়েছিলেন। বোঝা শক্ত নয়, কেন বিশ্বকাপ আয়োজনে এত ডামাডোল। যাঁর কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নেই, তিনি যদি একনায়কের কায়দায় এত বড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন তাহলে এর চেয়ে উন্নত আর কী হওয়া সম্ভব?

আরও পড়ুন ক্রিকেট জেনেশুনে বিশ করেছে পান

যোগ্যতার অভাবের পাশাপাশি সদিচ্ছার অভাবটাও অবশ্য উড়িয়ে দেওয়ার নয়। ১৯৯৬ সালে একদিনের ক্রিকেটের রমরমা ছিল, এখন বিশ্বজুড়েই ৫০ ওভারের খেলা অবাঞ্ছিত। ১৯৭০-এর দশকে একদিনের ক্রিকেটের দরকার হয়েছিল টেস্টের একঘেয়েমি কাটিয়ে মাঠে দর্শক ফেরাতে। সেই চেষ্টা সফল হয়। পরে খেলায় আরও বিনোদন আনতে কেরি প্যাকার চালু করেন রঙিন জামা, সাদা বলে দিনরাতের একদিনের ম্যাচ। প্রথম দিকে তিনি বিদ্রোহী তকমা পেলেও শেষপর্যন্ত কর্তারা বোঝেন এতে বিপুল মুনাফার সম্ভাবনা। প্যাকারের ক্রিকেটই হয়ে দাঁড়ায় মান্য একদিনের ক্রিকেট। এখন আর সে দিন নেই। বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট। ক্রিকেটের কর্তাব্যক্তিরা তাকে যথেচ্ছ বাড়তেও দিচ্ছেন, কারণ ওতেই পকেট ভরে যাচ্ছে। যদি একদিনের ক্রিকেটের প্রতি মমতা থাকত, তাহলে ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলোতে লাগাম দিতেন। টি টোয়েন্টির মত একদিনের ক্রিকেটেও দুই প্রান্ত থেকে দুটো বলে খেলা চালু করে, মাঠের সীমানা দৃষ্টিকটুভাবে ছোট করে এনে, ইনিংসের সবকটা ওভারকেই ফিল্ডিং সাজানোর নানাবিধ নিষেধের আওতায় নিয়ে এসে ব্যাট-বলের লড়াইকে দুদলের ব্যাটারদের চার, ছয় মারার প্রতিযোগিতায় পরিণত করতেন না। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। কথায় কথায় সাড়ে তিনশো-চারশো রান হচ্ছে, দ্বিশতরান হচ্ছে মুহুর্মুহু। পুরুষদের একদিনের ক্রিকেটে ২০১০ সালে শচীন তেন্ডুলকার প্রথম দ্বিশতরান করার পর থেকে গত ১৩ বছরে আরও নখানা দ্বিশতরান হয়ে গেছে, একা রোহিত শর্মার ঝুলিতেই তিনখানা। অথচ একদিনের ক্রিকেটের প্রতি দর্শকদের আগ্রহ কমে গেছে পৃথিবীর সর্বত্র। ঘন্টা তিনেক লাগাতার চার-ছক্কা দেখতে ভাল লাগে, ছ-সাত ঘন্টা ধরে ও জিনিস দেখা সাধারণত ক্লান্তিকর। শেষের দিকের ওভারগুলোতে পুরনো বলে রিভার্স সুইং করিয়ে ব্যাটারদের কাজ কঠিন করে দেওয়া বোলারদের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। স্পিনারদেরও চকচকে নতুন বলে চার, ছয় না খাওয়ার দিকেই মনোযোগ দিতে হচ্ছে। ওয়াসিম আক্রাম, শেন ওয়ার্নরা এখন খেললে কোনো তফাত গড়ে দিতে পারতেন কিনা বলা মুশকিল।

খেলোয়াড়রাও ইদানীং ৫০ ওভারের ক্রিকেট খেলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। অনেক কম পরিশ্রমে অনেক বেশি টাকা রোজগার করা যাচ্ছে কুড়ি বিশের ক্রিকেট খেলে। ফলে ওটাকেই তাঁরা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। টেস্ট ক্রিকেট আর ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট খেলে শরীরেও আর এত তাগদ থাকছে না যে একদিনের ক্রিকেট খেলবেন। গত বিশ্বকাপের সেরা ক্রিকেটার বেন স্টোকস তো গতবছর একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসরই নিয়ে ফেলেছিলেন। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটকর্তারা অনেক বলে কয়ে তাঁকে শুধুমাত্র ২০২৩ বিশ্বকাপ খেলতে রাজি করিয়েছেন। বিশ্বকাপের পর কী হবে কেউ জানে না। নিউজিল্যান্ডের সেরা বোলার ট্রেন্ট বোল্টও নিজের দেশের বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। অর্থাৎ দেশের হয়ে খেলার আগ্রহ কমে গেছে, ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের দিকে ঝুঁকছেন। ভারতের সাদা বলের অধিনায়ক রোহিত শর্মা আর বিরাট কোহলিও সাম্প্রতিককালে একদিনের ম্যাচের সিরিজে একটা ম্যাচ খেলেন তো দুটো ম্যাচে বিশ্রাম নেন। বিশ্বকাপের আগে শেষ দুটো সিরিজ ছিল এশিয়া কাপ আর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। তারও সব ম্যাচ খেললেন না।

কর্তারা যে ৫০ ওভারের খেলাটাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচেন তা সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির প্রাক্তন অধিনায়ক এবং সদ্য পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রিকেট ক্লাব এমসিসির সভাপতি হওয়া মার্ক নিকোলাস। ইএসপিএন ক্রিকইনফো ওয়েবসাইটকে তিনি বলেছেন, একদিনের ক্রিকেট আগামীদিনে বিশ্বকাপের বাইরে আর হওয়ার মানে হয় না। এমসিসি এখন আর ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা নয়, কিন্তু ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে এখনো তাদের মতামতের বিস্তর গুরুত্ব আছে আর ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার বোর্ডগুলোই জয় শাহের বোর্ডের পরে সবচেয়ে ধনী বোর্ড। বস্তুত তারা ভারতীয় বোর্ডের নন্দী, ভৃঙ্গী। অনেকের ধারণা ভারতই ৫০ ওভারের খেলাটাকে ধরে রেখেছে এবং এবারের বিশ্বকাপটা জমজমাট হলে খেলাটা বেঁচে যাবে। এককথায়, ভারতই পারে বাঁচাতে। পারে হয়ত, কিন্তু বিশ্বকাপ আয়োজনে যে অযত্ন প্রকট তাতে বাঁচানোর ইচ্ছা আছে বলে তো মনে হয় না। আগামী কয়েক মরসুমে আইপিএলকে আরও লম্বা করার যে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলা হয়েছে সেটাও একদিনের ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসার লক্ষণ নয়। অতএব ২০২৭ সালে আর ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ না হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এতখানি অনিশ্চয়তা নিয়ে সম্ভবত কোনো খেলার বিশ্বকাপ শুরু হয়নি এর আগে।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

যত দোষ ক্রিকেট খেললে: ভারত-পাক বৈরিতার আজব শর্তাবলী

বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি বা এশিয়া কাপের মত প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা পড়লে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিস্ময়করভাবে সিয়াচেনের জওয়ানদের খরচের খাতায় ফেলে দেয়।

 

শচীন তেন্ডুলকর-পরবর্তী প্রজন্মের সেরা ভারতীয় টেস্ট ব্যাটার বিরাট কোহলি যে খেলোয়াড়জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ আজ পর্যন্ত চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাঁর একটি টেস্টও খেলা হয়নি। এই মুহূর্তে পাকিস্তানের টেস্ট দল যথেষ্ট সমীহ করার মত। বাঁহাতি পেসার শাহীন আফ্রিদি তিন ধরনের ক্রিকেটেই নতুন বলে উইকেট তুলে নেওয়ার ব্যাপারে দারুণ ধারাবাহিক। সঙ্গে আছেন তরুণ গতিময় পেসার নাসিম শাহ আর জীবনের প্রথম ছটা টেস্টেই ৩৮ উইকেট নিয়ে ফেলা লেগস্পিনার অবরার আহমেদ। এই বোলিংয়ের বিরুদ্ধে বিরাটদের দাঁড় করিয়ে দিলে খেলা কতটা চিত্তাকর্ষক হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার পাকিস্তান অধিনায়ক বাবর আজম এই মুহূর্তে সব ধরনের ক্রিকেটে বিশ্বের সবচেয়ে ধারাবাহিক এবং নয়নাভিরাম ব্যাটারদের একজন। মহম্মদ রিজওয়ান ব্যাট হাতে এত সফল যে এখন তিনি কখনো কখনো স্রেফ ব্যাটার হিসাবে খেলছেন, উইকেটরক্ষা করছেন প্রাক্তন অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদ। পাকিস্তান বহুকাল পরে পেয়ে গেছে একজন ওপেনারকে, যাঁর বয়স এখন মাত্র ২৩, কিন্তু এমন কিছু কাণ্ড করে বসে আছেন যা অতীতে শুধুমাত্র সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। যেমন প্রথম ছটা টেস্টে তিনি যত রান করেছিলেন তার চেয়ে বেশি রানের রেকর্ড আছে শুধুমাত্র সুনীল গাভস্কর, ডন ব্র্যাডম্যান আর জর্জ হেডলির। এই মুহূর্তে ১৪টা টেস্ট খেলে শফিকের রান ১২২০। এর মধ্যেই চারটে শতরান করে ফেলেছেন, যার একটা আবার দ্বিশতরান। এই পাক ব্যাটিংয়ের বিরুদ্ধে যশপ্রীত বুমরা, মহম্মদ শামি, মহম্মদ সিরাজ বা অশ্বিন-জাদেজার একটা লড়াইয়ের কথা ভাবলে জিভে জল আসবে যে কোনো ক্রিকেটরসিকের। আস্ত সিরিজ হলে তো কথাই নেই। কিন্তু এখানেই মুশকিল।

কোনো অতিনাটকীয় ঘটনা না ঘটলে কোহলি অবসর নেওয়ার আগে এরকম সিরিজ হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। যদি দুই দলই ২০২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠে তাহলে হয়ত একবার এই ঘটনা ঘটতে দেখা যেতে পারে, কারণ বহুদলীয় প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত খেললে ভারত সরকার বা ভারতীয় বোর্ড আপত্তি করে না। বিশেষত যদি খেলাটা হয় তৃতীয় কোনো দেশে। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক সিরিজ? নৈব নৈব চ। কেন? এককথায় উত্তর দিতে গেলে বলতে হবে “সিয়াচেন মেঁ জওয়ান হমারে লিয়ে লড় রহে হ্যাঁয়।”

ব্যাপারটার সূত্রপাত ২০০৮ সালে। সে বছর ১৮ অগাস্ট বিরাট প্রথমবার ভারতের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন আর ২৬ নভেম্বর মুম্বইয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের ঘটনায় দেড়শোর বেশি মানুষের প্রাণ যায়। আক্রমণকারীদের পাক যোগ প্রমাণিত হয়। পরের বছর, অর্থাৎ ২০০৯ সালে, ভারতীয় ক্রিকেট দলের পাকিস্তান সফরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের পর ভারতে প্রায় সব মহল একমত হয় যে ওই পরিবেশে ক্রিকেট খেলা হওয়া সঙ্গত নয়। ফলে মহেন্দ্র সিং ধোনির দলের আর পাকিস্তানে যাওয়া হয়নি। সেবছরই লাহোরে সফররত শ্রীলঙ্কা দলের টিম বাস এবং আম্পায়ার, ম্যাচ রেফারিদের গাড়ির উপর সন্ত্রাসবাদীরা গুলি চালায়। বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার, রিজার্ভ আম্পায়ার এহসান রাজা এবং শ্রীলঙ্কার সহকারী কোচ পল ফারব্রেস আহত হন। আটজন পাকিস্তানি নাগরিক মারাও যান। স্বভাবতই তারপর বহুবছর কোনো দেশের দলই পাকিস্তানে ক্রিকেট খেলতে যেতে রাজি হয়নি। তারপর থেকে দীর্ঘকাল সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর দুবাই বা শারজার মাঠই হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানের ‘হোম গ্রাউন্ড’।

তারপর কিন্তু গঙ্গা এবং সিন্ধু দিয়ে বিস্তর জল গড়িয়ে গেছে। পাকিস্তানের টালমাটাল রাজনীতির নিয়ম মেনে অসংখ্যবার সরকার বদল হয়েছে, পাক আদালতের রায়ে জামাত-উদ দাওয়া প্রধান হাফীজ সঈদের মত কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদীর কারাবাস হয়েছে। ভারতে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদলেছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা পাকিস্তান সম্পর্কে খড়্গহস্ত হলেও তাদের প্রিয় নেতা নরেন্দ্র মোদী আচমকা পাক প্রধানমন্ত্রীর নাতনির বিয়েতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইকে অভূতপূর্ব স্বাধীনতা দিয়ে ভারতের পাঠানকোট সেনা ছাউনিতে ‘তদন্ত’ করতে দিয়েছে ভারত সরকার। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনের কথা উঠলেই – সিয়াচেন… । এই পর্বে পাকিস্তান দল ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ভারতে এসে একদিনের ম্যাচ এবং টি টোয়েন্টি সিরিজ খেলে গেছে। তবে তখনো ভারতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। মোদীজি ক্ষমতায় আসার পর থেকে আর দ্বিপাক্ষিক সফর হয়নি। বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি বা এশিয়া কাপের মত প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা পড়লে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিস্ময়করভাবে সিয়াচেনের জওয়ানদের খরচের খাতায় ফেলে দেয়। সম্ভবত বহুকাল পরে এই দুই দলের একটা ম্যাচের টিকিট ও বিজ্ঞাপন থেকে যত টাকা রোজগার করে যতগুলো পক্ষ, তাতে আদিগন্ত বরফের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা জওয়ানের কষ্ট চাপা পড়ে যায়।

ব্যবস্থাটা ততদিন দিব্যি চলছিল যতদিন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ভারত পাকিস্তানে যাবে না, কিন্তু প্রয়োজনে তাদের ভারতে এসে খেলতে হবে – এটা সুবোধ বালকের মত মেনে নিচ্ছিল। এখন আর মানতে চাইছে না। কারণ সাত বছর হল সফলভাবে পাকিস্তান সুপার লিগ আয়োজিত হচ্ছে, যেখানে ভারত ছাড়া আর সব দেশের ক্রিকেটাররা খেলতে যান। উপরন্তু গত দুবছরে নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মত দেশও পাকিস্তানে এসে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলে গেছে। ফলে টাকার জোরে এবং/অথবা রাজনৈতিক কারণে ভারতীয় বোর্ড তাদের যেখানে ইচ্ছে খেলতে বাধ্য করবে, অথচ নিজেরা পাকিস্তানে খেলতে যাবে না – এ জিনিস পাক বোর্ড মানবে কেন? তাই সম্প্রতি এশিয়া কাপ নিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। বহুকাল আগে থেকে ঠিক ছিল এবারের এশিয়া কাপ হবে পাকিস্তানে। কিন্তু ভারতীয় দল কিছুতেই পাকিস্তানে যাবে না। বিস্তর দড়ি টানাটানির পর পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচটা বাদে অন্যগুলো নিজের দেশে খেলবে আর ভারত খেলবে শ্রীলঙ্কায়; সুপার ফোর স্তরের খেলাগুলো দুই দেশ মিলিয়ে খেলা হবে এবং ফাইনালও হবে শ্রীলঙ্কায় – এরকম দোআঁশলা ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব অন্যায় আবদার চিরকাল চলবে না।

চলার প্রয়োজন কী – সে প্রশ্নটাও তোলার সময় এসেছে। ২৬/১১-র পরেও বহুবার অন্য খেলার পাকিস্তান দল ভারত সফরে এসেছে, ভারতীয় দলও পাকিস্তানে গেছে। ২০২০ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়ে এক মজার কাণ্ড হয়েছিল। ভারতের ক্রীড়ামন্ত্রক এবং সর্বভারতীয় সংস্থা দাবি করেছিল তারা নাকি কোনো দলকে পাঠায়নি, ওদিকে ওয়াগা সীমান্ত পার হয়ে আস্ত একটি দল পাকিস্তানে হাজির হয়।

এ মাসেই চেন্নাইয়ে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস ট্রফি হকিতে পাকিস্তান খেলে গেল। এসবে বোধহয় সিয়াচেনের বরফও গলে না, ২৬/১১-তে মৃত মানুষদের স্মৃতিকেও অসম্মান করা হয় না। মজার এখানেই শেষ নয়। আসন্ন এশিয়ান গেমসে সোনা জিতলে ভারতীয় হকি দল সরাসরি প্যারিস অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। কিন্তু না পারলে যোগ্যতার্জন পর্বের খেলায় যোগ দিতে হবে, যা হবে পাকিস্তানে। হকি ইন্ডিয়ার প্রধান দিলীপ তিরকে ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছেন, সেরকম হলে দল পাকিস্তানে খেলতে যাবে।

আরও পড়ুন এটা যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট; ওঁরা গ্ল্যাডিয়েটর নন, ক্রিকেটার

তাহলে কি অলিম্পিক টিকিটের চেয়ে জওয়ান, শহিদ, মৃত নাগরিকদের প্রাণের দাম কম? নাকি একমাত্র ক্রিকেট দলেরই দায়িত্ব তাঁদের প্রাণের দাম দেওয়া? সে দায়িত্বও বিশ্বকাপ-টাপ এসে পড়লে কদিনের জন্য ভুলে থাকার লাইসেন্স দেওয়া আছে নাকি বোর্ডকে? এ তো বড় রঙ্গ জাদু!

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

টেস্ট পরীক্ষায় আবার ফেল: একটি পূর্ণাঙ্গ প্রহসন

এই সময়কালে টেস্ট দল পরপর দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা ছাড়া বিদেশের কোথাও সিরিজ জেতেনি। বিদেশে খেলা হলেই রোহিত, চেতেশ্বর পূজারা, কোহলি, অজিঙ্ক রাহানে ধ্যাড়াবেন আর কখনো ঋষভ পন্থ, কখনো জাদেজা, কখনো শার্দূল, কখনো ওয়াশিংটন সুন্দর রান করে মুখরক্ষা করবেন – এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথম অঙ্ক: সব ব্যাটাকে ছেড়ে টস ব্যাটাকে ধর

ভারত কেন ওভালে হারল? টসে জিতে রোহিত শর্মা অস্ট্রেলিয়াকে ব্যাট করতে ডাকলেন বলে। ধারাভাষ্যকার অথবা খবরের কাগজে কলাম লেখা বিশেষজ্ঞ প্রাক্তন ক্রিকেটার, ক্রিকেট সাংবাদিক এবং জনতা – সকলে মিলে এই উত্তরটা তৈরি করে ফেলেছিলেন বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম দিনের খেলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। কারণ অস্ট্রেলিয়া দিনের শেষে তিন উইকেটে ৩২৭ রানে পৌঁছে গিয়েছিল। রানের অযোধ্যা পাহাড় যে পরদিন হিমালয়ে পরিণত হবে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। তবু তো শেষমেশ অস্ট্রেলিয়া এভারেস্টে উঠতে পারেনি, কারাকোরামে পৌঁছেই থেমে গিয়েছিল। অতএব স্রেফ প্রথম দিনের আবহাওয়া দেখেই কেন ফিল্ডিং নেবে – এ সমালোচনা করা ভারি সহজ হয়ে গেল। কেউ আসল কথাটাই বললেন না। টস করতে যাওয়ার সময়ে তো অধিনায়ককে হাতে যে ১১ জন খেলবেন তাদের তালিকাটা নিয়ে যেতে হয়। সেখানে বাঘা বাঘা চারজন জোরে বোলারের নাম লেখা হয়ে গেছে। তারপর টস জিতে আর ব্যাটিং নেওয়া যায় নাকি? যদি ইংল্যান্ডের মাঠে প্রথম দিনের তাজা পিচে বল করার সুযোগই না নেব, তাহলে আর চারজন জোরে বোলারকে নিলাম কেন? সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার পর টস জিতে ব্যাটিং নেওয়ার মত আহাম্মকি আর আছে নাকি?

এমন নয় যে এই কথাটা একমাত্র আমিই বুঝেছি আর সুনীল গাভস্কর, রবি শাস্ত্রী, আকাশ চোপড়া প্রমুখ তাবড় প্রাক্তন ক্রিকেটার ধরতে পারেননি। কিন্তু তাঁরা সেকথা বলেননি। তাঁরা বলেছেন বটে, যে পৌনে পাঁচশো উইকেট নিয়ে ফেলা রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে খেলানো উচিত ছিল। কিন্তু কেন বিদেশের মাঠে একের পর এক টেস্টে একমাত্র স্পিনার হিসাবে তাঁর বদলে দলে থাকেন রবীন্দ্র জাদেজা – তার যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিতেও তাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। ব্যাখ্যাটা হল, জাদেজার ব্যাটিং অশ্বিনের চেয়ে ভাল। অথচ ব্যাপারটা কিন্তু মোটেই প্রশ্নাতীত নয়।

এই ম্যাচে জাদেজা প্রথম ইনিংসে ৪৮ রান করেছেন, যা না করলে ভারতের হারের ব্যবধানটা আরও বড় হত। দ্বিতীয় ইনিংসে স্কট বোল্যান্ডের সামনে দু বলের বেশি টিকতেই পারেননি। স্কোরারদের কাজ না বাড়িয়ে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তার জন্যে তাঁকে উড়িয়ে দেব না। কোনো খেলোয়াড়ই সব ম্যাচে সফল হন না। ঘটনা হল অশ্বিন আর জাদেজার গোটা কেরিয়ারের ব্যাটিং পাশাপাশি রাখলে পরিষ্কার দেখা যায় অলরাউন্ডার হিসাবে অশ্বিন মোটেই খুব পিছিয়ে নেই। এখন পর্যন্ত ৬৫ টেস্টে ২৬৮ উইকেটের সঙ্গে জাদেজার রান ২৭০৬, গড় ৩৫.৬০, ১৮ অর্ধশতরানে সঙ্গে শতরান তিনটে। অশ্বিন ৯২ টেস্টে ৪৭৪ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ২৬.৯৭ গড়ে ৩১২৯ রানও করে ফেলেছেন। তেরোটা অর্ধশতরানের পাশাপাশি পাঁচ-পাঁচটা শতরানও আছে তাঁর। এর উপর আছে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে সিডনিতে সারাদিন ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচানো ৩৯, যার দাম একটা দ্বিশতরানের চেয়েও বেশি। অতি বড় জাদেজাভক্তও ম্যাচের উপর ওর চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে এমন কোনো ইনিংসের কথা বলতে পারবেন না।

তাছাড়া জাদেজা দেশের মাঠের ঘূর্ণি পিচে যতখানি প্রভাবশালী বোলার, বিদেশে ততটাই নির্বিষ। তিনি ওভালে বিষাণ সিং বেদীকে টপকে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী বাঁহাতি স্পিনার হয়ে গেছেন বটে, কিন্তু ২৬৮ উইকেটের মধ্যে ১৯৪ খানা উইকেটই এসেছে দেশের মাটিতে (৪০ টেস্টে), উইকেট পিছু মাত্র ২০.৪৫ রান খরচ করে। কিন্তু বিদেশে গেলেই জাদেজা অন্য বোলার। পঁচিশটা টেস্ট খেলে পেয়েছেন মাত্র ৭৪ খানা উইকেট। একেকটার জন্যে খরচ হয়েছে ৩৪.৩২ রান। ওভাল টেস্টেও দেখা গেল প্রথম ইনিংসে তিনি কোনো প্রভাবই ফেলতে পারলেন না। দ্বিতীয় ইনিংসে যখন বল রীতিমত ঘুরছে এবং লাফাচ্ছে তখন তিনটে উইকেট পেলেন বটে, কিন্তু স্টিভ স্মিথ আর ট্রেভিস হেডের দ্রুত রান তোলার তাড়া না থাকলে এবং ক্যামেরন গ্রীন স্কুল ক্রিকেটারের মত করে ডিফেন্স না করলে সেগুলো জুটত না। মহেন্দ্র সিং ধোনি অধিনায়ক থাকাকালীন একবার ইংল্যান্ডেই একটা টেস্টে জাদেজার স্পিন এতটাই পানসে হয়ে গিয়েছিল যে ধোনি উইকেট থেকে পিছিয়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে দিয়ে মিডিয়াম পেস বোলিং করিয়েছিলেন। তবু একমাত্র স্পিনার হিসাবে জাদেজাই খেলবেন, অশ্বিন নয়। তাঁরও বিদেশের রেকর্ড (৩৭ ম্যাচে ১৩৭ উইকেট, গড় ৩১.৪৫) দেশের তুলনায় সাধারণ, কিন্তু গত কয়েকটা বিদেশে সফরে অনেকখানি উন্নতি দেখা গিয়েছিল। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া সফরে এ যুগের সম্ভবত সেরা টেস্ট ব্যাটার স্মিথকে তিনি বোতলবন্দি করে ফেলেছিলেন।

এই অশ্বিনের চেয়ে শার্দূল ঠাকুর আর উমেশ যাদবকেও বেশি প্রয়োজনীয় মনে করা হয়েছে। উমেশ সেই ২০১১ সাল থেকে টেস্ট খেলছেন। সাতান্নটা টেস্ট খেলার পরেও তাঁর বোলিংয়ে অভিজ্ঞতার কোনো ছাপ দেখা যায় না। আজও গড় তিরিশের নিচে নামল না, ওভার পিছু সাড়ে তিনের বেশি রানও দিয়ে ফেলেন। কোনো ওভারে একটাও চার মারার বল না দিলে ধারাভাষ্যকাররা আপ্লুত হয়ে পড়েন। কিন্তু তিনি নাকি দারুণ রিভার্স সুইং করান – এরকম একটা যুক্তি ওভালে তাঁর নির্বাচনের সপক্ষে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন শাস্ত্রীরা। ইংল্যান্ডের আবহাওয়ার কারণে সাধারণত বল এমনিই সারাদিন সুইং করে। সেখানে যে রিভার্স সুইং বিশেষজ্ঞের বিশেষ দরকার পড়বে না, তা কি ওই বোদ্ধারা জানেন না? আর দরকার পড়লেই বা। উমেশ তো ওয়াকার ইউনিসের মাপের বোলার নন। শার্দূলেরও না আছে গতি, না বিরাট সুইং। যতই নটা টেস্টে ২৯ খানা উইকেট পেয়ে থাকুন, দারুণ বোলিং সহায়ক পরিবেশ না পেলে তিনি নেহাত সাধারণ। ব্যাটেও এমন কিছু ধারাবাহিক নন, গড় মোটে ২০.৩৩। ত্রিশোর্ধ্ব এই ক্রিকেটারদের কাছ থেকে যে নতুন কিছু পাওয়ার থাকতে পারে না, সেকথা রোহিত আর সারাক্ষণ মনোযোগী ছাত্রের মত খাতায় নোট নেওয়া রাহুল দ্রাবিড় বোঝেন না কেন?

বোঝেন না যে সেকথা কিন্তু গাভস্কররা বলেন না। তাঁরা বরং টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তগুলোর সপক্ষে যুক্তি খাড়া করার চেষ্টা করেন। কারণ নুন খেলে গুণ গাইতেই হয়। নইলে নুন খাওয়া ছাড়তে হয়। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড শুধু পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী বোর্ডই নয়, একমাত্র বোর্ড যারা জাতীয় দল এবং আইপিএলের সম্প্রচারের সুতোও নিজেদের হাতে রাখে। ধারাভাষ্যকাররা তার হাতের পুতুল। অপছন্দের কথা বলেছ কি চুক্তি বাতিল। অতএব বোর্ড যা করে সব ভাল, টিম ম্যানেজমেন্টও সবসময় ভালই করে, তবে মাঝেমধ্যে দু-একটা ভুল হয়ে যায় আর কি। যেমন টস জিতে ফিল্ডিং নিতে গিয়ে ব্যাটিং নেওয়া হয়ে যায়। তা বলে কি আর অচল ক্রিকেটার দলে নেওয়া হয়? মোটেই তা বলা যায় না।

দ্বিতীয় অঙ্ক: ভাঙব তবু মচকাব না

যাঁরা মন দিয়ে ওভাল টেস্ট দেখেছেন এবং পঞ্চম দিন সকাল সকাল ভারত হেরে যাওয়ার পরেও ভগ্ন হৃদয়ে অস্ট্রেলিয়ার ট্রফি হাতে নেওয়া পর্যন্ত সম্প্রচার দেখেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই দুটো কথা ভাবছেন। প্রথমত, ডুবিয়েছে ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা। খামোকা প্রাক্তন ক্রিকেটারদের সমালোচনা করা কেন? দ্বিতীয়ত, অন্য সময়ে যা-ই করুন, ওভাল টেস্টের পরে তো আমাদের প্রাক্তনরা যারপরনাই সমালোচনা করেছেন। গাভস্কর তো এত রেগে গিয়েছিলেন যে স্টার স্পোর্টসের অ্যাঙ্কর ভদ্রমহিলাকে দেখে মনে হচ্ছিল পালাতে পারলে বাঁচেন। দ্রাবিড়ের দুই পুরনো বন্ধু সৌরভ গাঙ্গুলি আর হরভজন সিংও তাঁকে বিস্তর চোখা চোখা প্রশ্নে বিদ্ধ করেছেন। তাহলে এঁদের সমালোচনা করা কেন?

ঠিক কথা। প্রথম প্রশ্নের উত্তরে আসতে একটু সময় লাগবে। আগে দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নিই। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের চুক্তি যতই মহার্ঘ হোক, চোখের চামড়া তো কিনতে পারে না। ফলে ২০৯ রানে টেস্ট হারার পরে মিষ্টি কথা বলা কী করে সম্ভব? তাছাড়া হাজার হোক, গাভস্কর, সৌরভদের ক্রিকেট দুনিয়ায় তাঁদের খেলোয়াড় জীবনের অর্জনগুলোর জন্য বিশেষ সম্মান আছে। সে সম্মান তাঁরা বিসর্জন দেন কী করে? তাঁরা তো আর রাহুল কাঁওয়াল বা অর্ণব গোস্বামী নন যে বিজেপির গোহারা হারকে লাইভ টিভিতে ‘সম্মানজনক হার’ বলে চালানোর চেষ্টা করবেন অন্য দেশের লোকে কী ভাবল সেসবের তোয়াক্কা না করে। ক্রিকেটার গাভস্করের নামে গান বাঁধা হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজে, অধিনায়ক সৌরভকে এখনো সমীহ করে সারা বিশ্বের ক্রিকেটমহল। সেগুলোর মূল্য ক্রিকেট বোর্ডের মহাত্মা গান্ধীর ছবিওয়ালা কাগজ এখনো পুরোপুরি ভুলিয়ে দিতে পারেনি। তার উপর ধৈর্যচ্যুতির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিদেশের মাঠে ভারত এই প্রথম হারল না, এর চেয়ে লজ্জাজনকভাবেও হেরেছে। কিন্তু একটা সাধারণ পিচে পাঁচদিন সবদিক থেকে পর্যুদস্ত হয়ে সেই সৌরভের আমল থেকে কতবার হেরেছে তা হাতে গুণে বলা যাবে। ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদানই হল বিদেশে জিততে শেখানো। গাভস্করও বিদেশে বহু যুদ্ধের নায়ক। ওই ওভালেই তাঁর মহাকাব্যিক ২২১ রান আছে চতুর্থ ইনিংসে। সেদিন চারশোর বেশি রান তাড়া করে ভারত আরেকটু হলে জিতেই যাচ্ছিল। ফলে এই হার তাঁদের হজম না হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু…

এই কিন্তুর মধ্যেই আছে দ্বিতীয় উত্তর। রাগত প্রাক্তনরা কী বলেছেন তা কি খেয়াল করেছেন? বিরাট কোহলির আউট সম্পর্কে মতামত চাইলে ক্রুদ্ধ গাভস্কর বলেছেন, ওকেই জিজ্ঞেস করুন চতুর্থ-পঞ্চম স্টাম্পের বল কেন তাড়া করতে গেছিল। সৌরভ দ্রাবিড়কে প্রশ্ন করেছেন, প্রথমে ব্যাট করার কী যুক্তি ছিল? তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে ভারতের প্রথম পাঁচ ব্যাটার দীর্ঘদিন হল রান করতে পারছেন না। ব্যাটিংয়ে কি রদবদলের দরকার নেই? হরভজন জিজ্ঞেস করেন, ভারতীয় দলের মহাতারকারা বিদেশের পিচে কেন রান করতে পারেন না? বোলাররাই বা সুবিধা করতে পারেন না কেন?

প্রশ্নগুলো চোখা বটে, কিন্তু বেশি চোখা লাগছে এই কারণে যে ভারতের প্রাক্তনদের মুখ থেকে বর্তমান ক্রিকেটারদের স্তুতি শুনতেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ব্যর্থ হলে সমালোচনা করা, প্রশ্ন করাই যে তাঁদের কাজ – একথা আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম। এমনটা কিন্তু অন্য দেশে হয় না। ২০২১-২৩ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গোড়ার দিকে ইংল্যান্ড জঘন্য খেলছিল। অধিনায়ক জো রুট ছাড়া প্রায় কেউই রান করতে পারছিলেন না, বোলারদের অবস্থাও ছিল তথৈবচ। রুটের অধিনায়কত্বও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছিল না। এমনকি দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছেও শোচনীয় পরাজয় ঘটে ইংল্যান্ডের। সেইসময় নাসের হুসেন, মার্ক বুচারের মত প্রাক্তনরা কিন্তু টিম ম্যানেজমেন্টকে ছেড়ে কথা বলেননি। তাঁর ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে পরিষ্কার বলতেন রুটকে দিয়ে আর অধিনায়কত্ব হবে না। রুট শেষপর্যন্ত দায়িত্ব ছেড়ে দেন, ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেন ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে জাতীয় দল এবং আরও অনেককিছুর দায়িত্বে থাকা অ্যান্ড্রু স্ট্রস। তাঁর জায়গায় আসেন রবার্ট কী। তারপর টেস্ট দলের কোচ ক্রিস সিলভারউডকে সরিয়ে নিয়ে আসা হয় ব্রেন্ডন ম্যাককালামকে, অধিনায়ক হন বেন স্টোকস। দলেও বেশকিছু রদবদল করা হয়। তারপর থেকে ইংল্যান্ড যে ক্রিকেট খেলছে তাতে শুধু যে তারা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে তাই নয়, তারা টেস্ট ক্রিকেটকে নতুন যুগে নিয়ে যাচ্ছে কিনা সেটাই এখন আলোচনার বিষয়। ম্যাককালামের আদরের নাম ব্যাজ। সেই থেকে তাদের খেলার ধরনের নামকরণ হয়েছে ব্যাজবল।

অথচ আমাদের প্রবাদপ্রতিম প্রাক্তনদের দেখুন। পৃথিবীর সেরা মানের পারিশ্রমিক, অনুশীলনের সুযোগসুবিধা ইত্যাদি পেয়েও সেই ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর থেকে আর কোনো আইসিসি ট্রফি জেতেনি ভারত। উপরন্তু এই সময়কালে টেস্ট দল পরপর দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা ছাড়া বিদেশের কোথাও সিরিজ জেতেনি। বিদেশে খেলা হলেই রোহিত, চেতেশ্বর পূজারা, কোহলি, অজিঙ্ক রাহানে ধ্যাড়াবেন আর কখনো ঋষভ পন্থ, কখনো জাদেজা, কখনো শার্দূল, কখনো ওয়াশিংটন সুন্দর রান করে মুখরক্ষা করবেন – এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। দশ বছর ধরে এই ঘটনা বারবার ঘটে চললেও এখনো গাভস্কর, সৌরভরা নাম করে বলতে পারছেন না অমুককে বাদ দেওয়া উচিত। ২০১৩ সালে যখন ভারত বহুকাল পরে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের কাছে সিরিজ হারল, তখন জিওফ্রে বয়কট আর কপিলদেব কিন্তু রাখঢাক না রেখেই বলেছিলেন, শচীন তেন্ডুলকর উন্নতি করতে না পারলে অবসর নিন। আজ বিরাটের নাম মুখে আনতে পারছেন না আমাদের প্রাক্তনরা, বহু ভারতীয় গিন্নী যেমন কর্তার নাম মুখে আনেন না। অথচ একা কোহলিই যে কতখানি ডুবিয়ে দিচ্ছেন ভারতকে, তার স্পষ্ট পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন ক্রিকেট অ্যানালিটিক্স সংস্থা ক্রিকভিজের সিনিয়র ব্রডকাস্ট অ্যানালিস্ট সোহম সরখেল। নিচের এই টুইটসূত্রে চোখ রাখলেই দেখতে পাবেন, সদ্য শেষ হওয়া টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অন্য ব্যাটারদের ব্যর্থতা সত্ত্বেও ভারতের চার নম্বর ব্যাটার বাদে সব জায়গার ব্যাটাররাই বিপক্ষের ব্যাটারদের চেয়ে গড়ে ভাল রান করেছেন। কিন্তু একা কোহলির ব্যর্থতাই এত বিরাট যে তা অন্য সবার কাজে জল ঢেলে দিয়েছে। ২০২০ সালে তাঁর গড় ছিল ১৯, ২০২১ সালে ২৮ আর ২০২২ সালে ২৬। এ বছর এখন পর্যন্ত ৪৫, কিন্তু তার কারণ আমেদাবাদের ঢ্যাবঢেবে পিচে ১৮৬। ওই ইনিংস বাদে চলতি বছরেও তাঁর গড় ২৫।

তৃতীয় অঙ্ক: মানুষের তৃতীয় হাত

জিততে পারুন আর না-ই পারুন, ভারতীয় দলের ক্রিকেটার বা কোচের মুখে সবসময় খই ফোটে। এ জিনিসটা শিখিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব অবশ্যই ধোনি আর শাস্ত্রীর। ধোনি ইংরেজি অভিধান থেকে একটি চমৎকার শব্দ চয়ন করেছিলেন – প্রোসেস। হেরে গেলেই বলতেন, আমরা হারজিত নিয়ে চিন্তিত নই। প্রোসেস ‘ফলো’ করা হয়েছে কিনা সেটাই বড় কথা। সেটা করা হলে ‘রেজাল্ট’ ঠিক এসে যাবে। কথাগুলো চমৎকার। বেশ একটা মহাত্মা গান্ধীসুলভ প্রশান্তি রয়েছে কথাগুলোর মধ্যে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ধোনি বাবা হয়ে গেলেন, চুল পেকে গেল, ভারতীয় দল থেকে অবসর নিয়ে ফেললেন, ‘রেজাল্ট’ তো আজও এসে পৌঁছল না। তাঁর উত্তরসূরী কোহলি আর ভারতীয় দলের তৎকালীন কোচ শাস্ত্রী প্রোসেসের সঙ্গে যোগ করেছিলেন আরেকটি শব্দ – ইনটেন্ট। বারবার সাংবাদিক সম্মেলনে এসে দুজনেই বলতেন, ইনটেন্টই হচ্ছে আসল। ওটা যার আছে তার উপর টিম ম্যানেজমেন্টের ভরসা আছে। ইনটেন্ট দেখিয়ে হারলে কোনো দুঃখ নেই। এই ইনটেন্ট নেই বলে পূজারা যখন ধারাবাহিক ছিলেন তখনো বারবার বাদ পড়তে হয়েছে, ফর্মে থাকা রাহানেকে বসিয়ে রেখে নড়বড়ে রোহিতকে টেস্ট খেলানো হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়।

এইবার দ্বিতীয় অঙ্কে উত্থাপিত প্রথম প্রশ্নের জবাবটা দিয়ে ফেলা যাক। ভারতীয় ক্রিকেট দলের ব্যর্থতায় প্রাক্তনদের সমালোচনা করছি কেন?

এই যে ইনটেন্ট নামক ধাষ্টামো, এর টেস্ট ক্রিকেটে কোনো মানেই হয় না জেনেও আমাদের প্রাক্তনরা কিন্তু সেসময় অধিনায়ক কোহলি আর কোচ শাস্ত্রীকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন, দুহাত তুলে সমর্থন করেছিলেন। ২০১৫ সালের শ্রীলঙ্কা সফরে প্রথম দুটো টেস্টে পূজারাকে বসিয়ে রাখা হয়, কারণ তার আগের অস্ট্রেলিয়া সিরিজে তাঁর মধ্যে ইনটেন্ট দেখা যায়নি। তৃতীয় টেস্টে দুই ওপেনারের অভাব ঘটায় অগত্যা তাঁকে খেলানো হয় এবং তিনি ১৪৫ রানে অপরাজিত থাকেন। বস্তুত, দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য রানে আউট হলেও, কম রানের সেই ম্যাচে ওই ইনিংসই তফাত গড়ে দেয় এবং ভারত জেতে। পূজারা প্রথম ইনিংসে যখন পঞ্চাশ পেরোন, তখন ধারাভাষ্যকার সঞ্জয় মঞ্জরেকর গাভস্করকে জিজ্ঞেস করেন পূজারা কি দলে নিজের জায়গা পাকা করতে পারলেন, নাকি শতরান করলে জায়গা পাকা হবে? সানি উত্তর দেন, এই দলে যা প্রতিভার ছড়াছড়ি তাতে আলোচনায় থাকতে গেলে পূজারাকে দেড়শোর বেশি করতে হবে। বিরক্ত কলামনিস্ট মুকুল কেশবন দ্য টেলিগ্রাফ-এ লেখেন “A century and a half…what team of Titans was this, what bastion of Bradmans was Pujara trying to breach?” সেই ইনটেন্টের ভূত যে পূজারাকে আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে, তার প্রমাণ ওভালের দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর চরিত্রবিরোধী এবং খেলার পরিস্থিতি অনুযায়ী সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় শট খেলতে গিয়ে আউট হওয়া। ক্রিজে জমে যাওয়া রোহিতের হঠাৎ নাথান লায়নের সোজা বলকে সুইপ করতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হওয়া বা কোহলির কয়েকটা ডট বল হতেই বহুদূরের বল তাড়া করে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যাওয়ার পিছনেও ইনটেন্টের ভূমিকা নিশ্চয়ই আছে।

ভারতীয় ক্রিকেটের একেবারে ভাবনার জায়গায় এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিগুলো যখন করা হয়েছে, তখন হাততালি দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ প্রাক্তনরা। কোহলির জিম-পাগল হওয়া এবং গোটা দলকে জিম-পাগল করে তোলাকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন আমাদের প্রাক্তনরা, হর্ষ ভোগলেরা এবং প্রাতঃস্মরণীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা। অথচ মাইকেল হোল্ডিং, ওয়াসিম আক্রাম, কপিলদেবের মত নমস্য জোরে বোলাররা চিরকাল বলে এসেছেন, ক্রিকেটার মানে কুস্তিগীর নয়। তাদের পেশি ওরকম হওয়ার দরকার নেই। তাদের শরীর তৈরি করতে সেরা প্র্যাকটিস হল নেট প্র্যাকটিস। বিশেষ করে জোরে বোলারদের উচিত যত বেশি সম্ভব বোলিং করা। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এঁরা বারবার বলেছেন, এমনকি অফ সিজনেও কয়েকশো ওভার বল করতেন নেটে। সেভাবেই চোট-আঘাত মুক্ত অবস্থায় টানা প্রায় দুই দশক ভারতের হয়ে খেলে গেছেন কপিল। অথচ এখন আমাদের জিম করা ক্রিকেটারদের এমন অবস্থা যে ব্যাটাররাই অনেকে টানা দুটো সিরিজ খেলে উঠতে পারেন না। আর বোলাররা? যশপ্রীত বুমরা সেই যে আহত হয়েছেন, কিছুতেই মাঠে ফিরতে পারছেন না। বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন কিনা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ, নভদীপ সাইনি – যাঁকেই ভবিষ্যৎ বলে ভাবা হয়, কিছুদিন পরেই দেখা যায় তিনি আহত। অতএব ঘুরে ফিরে বুড়িয়ে যাওয়া উমেশ আর মাঝারি মানের শার্দূলকেই খেলাতে হয়। অর্থাৎ গোলমালটা প্রথম একাদশ নির্বাচন থেকে শুরু হয়নি। দেশের কয়েকশো খেলোয়াড়ের মধ্যে থেকে ১৪-১৫ জন বেছে নেওয়ার সময়েই গোড়ায় গলদ হয়ে গেছে।

ব্যাটার বেছে নেওয়ায় গলদ তো আরও গভীর। কারণ টপ অর্ডার এবং মিডল অর্ডারের নিষ্কর্মাদের সরানো যাবে না। পূজারা, রাহানেদের তবু বাদ দেওয়া গেছে। তাঁদের কাউন্টি ক্রিকেটে বা ঘরোয়া ক্রিকেটে রান করে ফিরতে হয়েছে। কিন্তু রোহিত আর কোহলির আছে বিপুল বিজ্ঞাপনী সমর্থন। অর্থাৎ তাঁদের উপর কোটি কোটি টাকা লগ্নি করে রেখেছে বহু কোম্পানি। তার মধ্যে আছে ঘুরিয়ে নাক দেখিয়ে জুয়া খেলার কোম্পানিগুলোও। তাদের কেউ কেউ এমনকি জাতীয় দলের শার্ট স্পনসর, অমুক স্পনসর তমুক স্পনসর। তাদের আর্থিক ক্ষতি হয় এমন কাজ মোটেই করা চলে না। অতএব রান করতে না পারলেও শালগ্রাম শিলার মত এদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ তারকাদের দলে রাখতেই হবে। রঞ্জি ট্রফিতে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করা সরফরাজ খানরা যদ্দিন আইপিএলে রানের বন্যা বইয়ে শাঁসালো স্পনসর জোগাড় করতে না পারছেন তদ্দিন বাড়ির টিভিতে টেস্ট ম্যাচ দেখা ছাড়া কিছুই করতে পারবেন না। এর ফলে দলের যে ক্রিকেটিয় ক্ষতি, তা পূরণ করতেই টেস্ট দল নির্বাচনের সময়ে বোলারদের বেলাতেও দেখা হয় ভাল ব্যাট করতে পারে কিনা, উইকেটরক্ষক বাছার সময়েও তাই।

অগ্রাধিকারের এই উলটপুরাণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ওভাল টেস্টে কে এল রাহুলকে উইকেটরক্ষক হিসাবে খেলানোর নিদান দিয়ে ফেলেছিলেন বহু বোর্ড ঘনিষ্ঠ ক্রিকেট সাংবাদিক। রাহুল ফিট থাকলে বোধহয় সেটাই ঘটত। যদিও সকলেই জানেন ইংল্যান্ডে উইকেটরক্ষা ভীষণ শক্ত কাজ কারণ বল ব্যাটারকে অতিক্রম করার পরেও সুইং করে অনেকসময়, পিচে অসমান বাউন্সও থাকতে পারে। সেখানে পাঁচদিনের খেলায় রাহুলের মত ঠেকনা দেওয়া উইকেটরক্ষক খেলানো আর খাদের ধারে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলা একই কথা। ওভালে কোনা শ্রীকর ভরত প্রশংসনীয় উইকেটরক্ষা করেছেন। তারপরেও সোশাল মিডিয়ায় “ওকে দিয়ে হবে না” লিখে চলেছেন বহু বোদ্ধা সাংবাদিক। পন্থ থাকলে আলাদা কথা ছিল। তিনি অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও বেচারা ভরত শান্তিতে খেলতে পারবেন না। ঋদ্ধিমান সাহাকে যখন দ্রাবিড় ডেকে বলে দিয়েছিলেন, তাঁর বয়স হয়েছে বলে আর টেস্ট দলে না নেওয়ার কথা ঠিক করেছে টিম ম্যানেজমেন্ট, তখন মনে হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার মত নতুন খেলোয়াড় তুলে আনার প্রগতিশীল পথে এগোচ্ছে ভারতীয় দল। এখন বোঝা যাচ্ছে, ওসব কিছু নয়। ঋদ্ধিমানের দরকার ছিল অমুক ডট কমের একটা এনডর্সমেন্ট চুক্তি। তাহলেই বয়সটা বাড়তি না হয়ে কমতি হয়ে যেত।

দল নির্বাচনে এইসব শর্তাবলী প্রযোজ্য বলেই বোধহয় বোর্ড পাঁচজনের নির্বাচন সমিতিতে চারজনকে রেখে, অস্থায়ী চেয়ারম্যান রেখে দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে সেই ২০২০ সাল থেকে। তাঁদের আর গুরুত্ব কী? রাজ সিং দুঙ্গারপুরের মত বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো সাড়ে ষোলো বছরের ছেলেকে দলে ঢুকিয়ে দেওয়া বা যাঁকে ভবিষ্যতের অধিনায়ক বলে কেউ ভাবছেই না, তাকে গিয়ে “মিয়াঁ, ক্যাপ্টেন বনো গে?” বলার অধিকারই আজকের নির্বাচকদের নেই। তাঁরা স্রেফ দক্ষ বাজিকরের হাতের পুতুল।

সমস্ত ক্রিকেট ব্যবস্থাটাই যে অব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে সেকথা বলার কাজ তো বিশেষজ্ঞ, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিকদেরই। যিনি যত বড় নাম, তাঁর দায়িত্ব তত বেশি। অথচ সকলেই সুকুমার রায়ের ছড়ার মত “এই দুনিয়ার সকল ভাল, আসল ভাল নকল ভাল” বলে চালিয়ে যাচ্ছেন এক দশক যাবৎ। কারণ কেউ ধারাভাষ্য দেওয়ার চুক্তির লোভ সামলাতে পারছেন না, কারোর চাকরি বোর্ডের জো হুজুরি না করলে চলে যাবে। যেমন স্মৃতি ইরানিকে প্রশ্ন করায় এক সাংবাদিকের চাকরি গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিকরা না হয় চাকরি বাঁচাতে ব্যস্ত, কিন্তু ভারতের হয়ে খেলা এবং এত বছর মোটা মাইনের ধারাভাষ্যের কাজ করা বিশেষজ্ঞরা এখনো জো হুজুরি করে যাবেন আর দুকথা শুনবেন না তা কি হয়?

আজ ভারতীয় ক্রিকেটে যে হারজিতের যে কোনো মূল্য নেই, রোহিত-কোহলিরা যে বারবার ব্যর্থতার পরেও কলার তুলে ‘গ্রেট’ অভিধা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারেন এবং প্রত্যেকটা হারের পর নতুন নতুন অজুহাত খাড়া করতে পারেন তার জন্যে তো ভারতীয় ক্রিকেটের গোটা বাস্তুতন্ত্র দায়ী। এমন বাস্তুতন্ত্র তৈরি করায় সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন প্রাক্তনরা। ওভালের পরাজয়ের পরেও একগুচ্ছ অজুহাত খাড়া করেছেন অধিনায়ক রোহিত। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল আইপিএল ফাইনালের পরে কেন হবে? জুনের বদলে মার্চে কেন হবে না? হলেই তো প্রস্তুতি নেওয়ার যথেষ্ট সময় পাওয়া যেত। এত বড় প্রতিযোগিতার ফাইনাল তিন ম্যাচের হওয়া উচিত – এমন দাবিও করেছেন। হেরোদের ঘ্যানঘ্যান শুনতে কারই বা ভাল লাগে? অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্স তাই বিদ্রুপ করেছেন “পঞ্চাশটা ম্যাচের সিরিজ হচ্ছে আদর্শ। কিন্তু অলিম্পিকে সোনার মেডেল জেতার জন্যে একটাই রেস হয়। এএফএল, এনআরএল সিরিজগুলোরও ফাইনাল থাকে। একেই খেলা বলে।”

চতুর্থ অঙ্ক: সাধের লাউ

পৃথিবীর সমস্ত খেলার নিয়ামক সংস্থার মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল সংস্থার নাম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল, অর্থাৎ আইসিসি। তাদের টিকি বাঁধা আছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কাছে, কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি টাকার জোগান দেয় আইসিসিকে। বিনিময়ে সবচেয়ে বেশি লাভের গুড়ও নেয়। ফলে ভারতীয় বোর্ড চাইলে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালও তিন ম্যাচের হতেই পারে, ইংল্যান্ডের বদলে আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে হতে পারে। সেখানে এমন পিচ বানিয়ে দেওয়া হবে যে আমি-আপনি গিয়ে বল করলেও এক হাত ঘুরবে। কিন্তু কথা হল, ভারতীয় বোর্ড কি অতটা মাথা ঘামাবে?

তার সোনার ডিম পাড়া হাঁস হল আইপিএল। সেই আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব থেকে এত টাকা আয় হয় যে আগামী দিনে প্রতিযোগিতাটাকে টেনে আরও লম্বা করা হচ্ছে। আইসিসি তাতে মাথা নেড়ে সায়ও দিয়ে ফেলেছে। আইপিএল সম্পর্কে আমাদের সমস্ত বর্তমান ও প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার এবং প্রাতঃস্মরণীয় সাংবাদিকরা উচ্ছ্বসিত। তাঁদের কথাবার্তায়, লেখাপত্রে মনে হয় মানবজাতি এই প্রথম একটি জিনিস আবিষ্কার করতে পেরেছে যার কোনো নেতিবাচক দিক নেই। সমালোচনা করার মত একখানা বৈশিষ্ট্যও নেই। অথচ ওভাল টেস্টে হারের পর হঠাৎ সকলের মনে পড়েছে, যে আইপিএলটা না থাকলে এই ফাইনালের জন্যে যথেষ্ট প্রস্তুতির সময় পাওয়া যেত।

আরও পড়ুন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে মরে প্রমাণ করতে হবে সে মরেনি

অনেকে বলছেন এই হারের পর নাকি দ্রাবিড়ের চাকরি নিয়ে টানাটানি হতে পারে। হয়ত সেটা আন্দাজ করে মরিয়া হয়ে অথবা চাকরিটা যাবেই ধরে নিয়ে তিনি বলেছেন ক্রীড়াসূচি নিয়ে তিনি কখনোই খুশি হতে পারেন না। ফাইনালের দিন কুড়ি আগে যদি ইংল্যান্ডে পৌঁছনো যেত আর দু-তিনটে সাইড ম্যাচ পাওয়া যেত, তাহলে চমৎকার প্রস্তুতি হত। শুনলে মনে হয় ইনি রিপ ভ্যান দ্রাবিড়। নিজের খেলোয়াড় জীবন শেষ হওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, এইমাত্র জেগে উঠেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যা ঠাসা ক্রীড়াসূচি তাতে সাইড ম্যাচ ব্যাপারটা তো বন্ধ হয়ে গেছে বহুদিন। বিশেষ করে ভারতীয় দলের অফ সিজন বলে কিছু নেই দ্রাবিড় যখন ক্রিকেটার তখন থেকেই। তিনি যখন অবসর নেন আইপিএল তখনো চারাগাছ। এখন সে বটবৃক্ষ, দুর্জনে বলছে ছদ্মবেশী সেপ্টোপাস। তার খিদে ক্রমশ বাড়ছে, বিশ্বের অন্যত্র তার বীজ থেকে আরও নানা মাংসাশী লিগের জন্ম হচ্ছে যারা ক্রমশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে গিলে নেবে। এমন দিনে ভারত অধিনায়ক চাইছেন তিন ম্যাচের ফাইনাল, কোচ সাইড ম্যাচের কথা বলছেন। এসব কি প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি টাকা রোজগার করার অপরাধবোধের প্রকাশ, নাকি আমাদের দেশের পরিচালকদের মত বৈদিক যুগে ফিরে যাওয়ার সাধ?

গত ইংল্যান্ড সফরে ভারতীয় দলের কোচ থাকা অবস্থায় যে শাস্ত্রী কোভিড পরিস্থিতির মধ্যে সিরিজটা ভালয় ভালয় শেষ করার চেয়ে নিজের বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তিনি আবার জ্ঞান দিয়েছেন, আইপিএল বাদ দিয়ে টেস্টের জন্যে প্রস্তুতি নেওয়ার কাজটা খেলোয়াড়দের নিজ দায়িত্বেই করা উচিত। যোগ করেছেন, ভারতীয় বোর্ডের ফ্র্যাঞ্চাইজদের সঙ্গে চুক্তিতে একটা শর্ত রাখা উচিত যাতে খেলোয়াড়রা ভবিষ্যতে এত বড় ম্যাচের জন্যে এরকম সুযোগ পায়। এত উত্তম প্রশাসনিক পরিকল্পনা তিনি জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময়ে কোথায় ছিল কে জানে? তিনি দায়িত্বে থাকতেই ভারত প্রথমবার বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠে। তখন এমন কোনো প্রয়াস তিনি করেননি, হার থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন কোনো পরামর্শই বোর্ডকে দিয়ে যাননি। এখন অসংখ্য ভাল ভাল ধারণা তাঁর মাথায় গিজগিজ করছে।

পঞ্চম অঙ্ক: যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ

ক্রিকেট এখন আগে অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা, পরে খেলা। সে ব্যবসার সবচেয়ে কম চাহিদার মালটির নাম টেস্ট ক্রিকেট। অতএব আপনি আরও একটা আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারত জিততে পারল না বলে যতই দুঃখ পান, জানবেন কর্তারা বা ক্রিকেটাররা আপনার দুঃখের ভাগী নয়। ভারতীয় ক্রিকেটারদের দুঃখে প্রাণ যাচ্ছে এমন মনে করার কারণ নেই, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররাও টেস্ট ক্রিকেটের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত বলে ভাববেন না। প্রমাণ চান? ওভাল টেস্টের একটা মিনিটও ইংল্যান্ডের বিখ্যাত বা কুখ্যাত খামখেয়ালি আবহাওয়ার জন্যে নষ্ট হয়নি। অথচ পাঁচদিন মিলিয়ে মোট ৪৪ ওভার কম খেলা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো দলেরই দিনে যতগুলো ওভার বল করা সম্ভব ততগুলো সম্পূর্ণ করার গরজ ছিল না।

সুতরাং যদি পাঁচদিনের খেলার প্রতি ভালবাসা থেকে থাকে, তাহলে বয়স্ক ঠাকুমার ফোকলা হাসি যেভাবে লোকে শেষ কয়েকদিন প্রাণভরে দেখে নেয়, সেইভাবে উপভোগ করে নিন। এ খেলা বাঁচুক তা কর্তারা চান না, সম্ভবত খেলোয়াড়রাও নয়। নইলে নিউজিল্যান্ডের ট্রেন্ট বোল্ট, ইংল্যান্ডের জেসন রয়রা স্বেচ্ছায় দেশের বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতেন না ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ খেলবেন বলে। কর্তারা ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ খোলায় লাগাম দিতেন, টেস্ট ক্রিকেটকে আকর্ষণীয় করে তুলতে গোলাপি বলের দিন-রাতের টেস্ট আয়োজন ক্রমশ বাড়াতেন। হচ্ছে ঠিক উল্টো – বোল্টরা দলে ভারি হচ্ছেন। শোনা যাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার সৌদি আরবেও বিপুল অর্থকরী ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু হবে। আর দিন-রাতের টেস্টের কেউ নামোচ্চারণ করছে না।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

দল হারলেও গুহার চিচিং বনধ হতে দেবে না ক্রিকেট বোর্ড

এঁদের সময় শেষ। সেকথা এঁদের ভক্তরা মানবেন না, তার চেয়েও বড় কথা ক্রিকেট বোর্ড মানবে না। কারণ এই তারকাদের পিছনে টাকার থলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একগুচ্ছ স্পনসর।

রবিচন্দ্রন অশ্বিন খেললেই কি ভারত ওভালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল জিতে যেত? যশপ্রীত বুমরা যদি ফিট থাকতেন এবং খেলতেন, তাহলে কি ভারত জিতে যেত? ঋষভ পন্থ যদি প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে অন্যের এবং নিজের জীবন বিপন্ন করে শয্যাশায়ী না হতেন, তাহলে কি শেষ ইনিংসে ৪৪৪ রান তাড়া করার বিশ্বরেকর্ড করে জিতিয়ে দিতেন? এগুলোর কোনো ঠিক বা ভুল উত্তর হয় না, কারণ কী হলে কী হত কেউ বলতে পারে না। তবে তথ্য বলছে, ২০২১ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে এই তিনজনই খেলেছিলেন। তবু ভারত হেরেছিল। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সময়ে এই তিনজনের উল্লেখযোগ্য অবদান সত্ত্বেও ভারত সেই ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরে আর কোনো আইসিসি টুর্নামেন্টেই খেতাব জেতেনি। শুধু টেস্ট ক্রিকেটের কথাই যদি বলি, গত দশ বছরে দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা ছাড়া ভারতের আর কোনো বলার মত সাফল্য নেই। দেশের মাঠে দাপটে যে কোনো দলকে হারিয়ে দেওয়ার রেকর্ড ভারতের টেস্ট ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। কিন্তু অতীতে একাধিক ভারতীয় দল ইংল্যান্ডে টেস্ট সিরিজ জিতেছে, নিউজিল্যান্ডে জিতেছে। এর একটাও রবি শাস্ত্রী-বিরাট কোহলি, রাহুল দ্রাবিড়-কোহলি বা দ্রাবিড়-রোহিত শর্মার দ্বারা হয়ে ওঠেনি। এমনকি গত দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ভাঙাচোরা, নতুন মুখদের নিয়ে তৈরি দলটার কাছেও হেরে এসেছে এই দল। সুতরাং এই একটা ম্যাচে অমুক, অমুক আর অমুক থাকলেই ভারত জিতে যেত কিনা সে প্রশ্ন না তুলে বরং অন্য কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর জানা আছে কিনা দেখুন।

১) কোন টেস্ট খেলিয়ে দেশের নির্বাচন সমিতিতে যতজন নির্বাচক থাকার কথা ততজন নেই
২) কোন টেস্ট খেলিয়ে দেশের নির্বাচন সমিতিতে প্রধান নির্বাচক বলে কেউ নেই?
৩) কোন টেস্ট খেলিয়ে দেশের জাতীয় দল নির্বাচনের পর কোনো সাংবাদিক সম্মেলন হয় না?

জানেন কি, এই তিনটে প্রশ্নেরই উত্তর ভারত? যে কোনো খেলার আন্তর্জাতিক স্তরটাকে যাঁরা পেশাদার এবং সর্বোচ্চ গুরুত্বের ব্যাপার বলে মনে করেন, তাঁরা নিশ্চয়ই বুঝবেন যে দিনের পর দিন এই ফাজলামি চালিয়ে গিয়ে বিশ্ব খেতাব কেন, কোনো সিরিজই জেতার আশা করা উচিত নয়।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী পাঁচজন নির্বাচক থাকার কথা। কিন্তু আছেন চারজন – শিবসুন্দর দাস, সুব্রত ব্যানার্জি, সলিল আঙ্কোলা আর শ্রীধরণ শরথ। এ বছর জানুয়ারি মাসে পাঁচ সদস্যের নির্বাচক কমিটিই ঘোষণা করা হয়েছিল, তার একজন চেয়ারম্যানও ছিলেন – চেতন শর্মা। কিন্তু পরের মাসেই তাঁকে পদত্যাগ করতে হয় একটা স্টিং অপারেশনে নির্বাচন সংক্রান্ত কিছু তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার ফলে। তারপর চার মাস কেটে গেছে। ভারত দেশের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট ও একদিনের সিরিজ খেলল। প্রথম দুটো টেস্টের দল নির্বাচনের সময়ে চেতন ছিলেন। তারপর থেকে দল নির্বাচন করেছেন ওই ভাঙাচোরা নির্বাচন সমিতি এবং তার অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ারম্যান শিবসুন্দর। মনে রাখা ভাল, এ বছর অক্টোবর-নভেম্বরে ভারতে একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ। ফলে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একদিনের সিরিজটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার দল নির্বাচনও করে ওই ভাঙা নির্বাচন কমিটি। বলা বাহুল্য, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের দল নির্বাচনের সময়েও পঞ্চম নির্বাচককে নিয়োগ করার কথা ভাবেনি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড। এভাবে বোধহয় পয়সা বাঁচানো হচ্ছে। বোর্ড সভাপতি জয় শাহের ক্রিকেটবুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, গত কয়েক বছরে তাঁর সম্পত্তি যেভাবে কয়েক হাজার গুণ বেড়েছে তাতে তাঁর ব্যবসাবুদ্ধি নিয়ে তো আর প্রশ্ন তোলা চলে না।

মজার কথা, নির্বাচন সমিতি নিয়ে এই ধাষ্টামোর সূচনা কিন্তু চেতনের পদত্যাগ থেকে শুরু হয়নি। গত নভেম্বরে কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ থেকে ভারত বিদায় নেওয়ার পর এর আগের নির্বাচন সমিতিকে ঘটা করে বরখাস্ত করে বোর্ড। সেই নির্বাচন সমিতিতেও চারজন সদস্যই ছিলেন, এবং কী আশ্চর্য! তখনো চেয়ারম্যান ছিলেন চেতনই। অর্থাৎ যে ব্যর্থতার দায় ঘাড়ে চাপিয়ে অন্য তিন নির্বাচক সুনীল যোশী, দেবাশিস মোহান্তি আর হরবিন্দর সিংকে বিদায় করে দেওয়া হল; সেই ব্যর্থতার কাণ্ডারী চেতনকে আবার নির্বাচন সমিতির চেয়ারম্যান করে নিয়ে আসা হয়েছিল।

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ক্রিকেট বোর্ড দল নির্বাচনকে তেমন জরুরি ব্যাপার বলে মনে করে না। সেটা দল ঘোষণার ভঙ্গিতেও পরিষ্কার। ভারতীয় ক্রিকেটে দস্তুর ছিল প্রধান নির্বাচক সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে দল ঘোষণা করেন। ক্রিকেটজীবনে অতি সাধারণ এমএসকে প্রসাদ, প্রশাসক হিসাবে বিশালকায় রাজ সিং দুঙ্গারপুর বা ক্রিকেটার হিসাবেও যথেষ্ট সফল দিলীপ ভেংসরকার – কেউ প্রধান নির্বাচক হয়ে এর অন্যথা করেননি। কিন্তু সেসব বন্ধ হয়ে গেছে জয় বোর্ড সভাপতি হওয়ার পর থেকে। এখন দিনের কোনো একটা সময়ে বোর্ড প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে খেলোয়াড় তালিকা জানিয়ে দেয়। তারপর কে বাদ পড়লেন আর কাকে বিশ্রাম দেওয়া হল তা নিয়ে গুজব পল্লবিত হয়।

সবচেয়ে শোচনীয় ব্যাপার হল, ঘরোয়া ক্রিকেটে দিনের পর দিন ভাল খেলেও যে তরুণ ক্রিকেটাররা দলে সুযোগ পান না, তাঁদের কেন নেওয়া হল না তার জন্য জবাবদিহি করা হয় না। ভারতীয় ব্যাটিংয়ের টপ অর্ডার ফর্মে নেই কোভিড অতিমারীর আগে থেকে। কালে ভদ্রে এক-আধটা অর্ধশতরান বা শতরান করে উদ্ধার করেন। অধিকাংশ ইনিংসে শেষদিকে পন্থ, রবীন্দ্র জাদেজা বা শার্দূল ঠাকুর সম্মানজনক স্কোরে পৌঁছে দেন দলকে। সেই কারণেই বোলার হিসাবে বিদেশের মাঠে কল্কে না পেলেও ওঁদেরই খেলানো হয় সেরা বোলার অশ্বিনকে বসিয়ে রেখে। যেদিন জাদেজা, শার্দূলরাও পেরে ওঠেন না, সেদিন মধ্যাহ্নভোজনের আগেই খেলা শেষ হয়ে যায়, যেমন রবিবার ওভালে হল। অথবা দল খটখটে রোদের দিনেও ৩৬ অল আউট হয়ে যায়, যেমনটা ঘটেছিল ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর অ্যাডিলেডে।

এভাবে সিরিজ বা বড় ম্যাচ জেতা সম্ভব নয় বলেই ভারত অধিকাংশ ক্ষেত্রে জেতে না। অথচ ঘুরে ফিরে সেই রোহিত, সেই চেতেশ্বর পূজারা, সেই অজিঙ্ক রাহানে, সেই কোহলি খেলেই চলেছেন। এদিকে মুম্বাইয়ের ২৫ বছরের ছেলে সরফরাজ খান ৩৭ প্রথম শ্রেণির ম্যাচে সাড়ে তিন হাজার রান করে বসে আছেন প্রায় ৮০ গড়ে। তিনি কেন সুযোগ পান না জবাব দেওয়ার কেউ নেই। বাংলা দলের অভিমন্যু ঈশ্বরন (৮৭ ম্যাচে ৬৫৫৬ রান, গড় প্রায় ৪৮) পরপর বেশ কয়েকটা রঞ্জি ট্রফিতে ধারাবাহিকভাবে রান করে যাচ্ছেন। তাঁরও মেঘে মেঘেই বেলা বাড়ছে। এরকম আরও নাম আছে।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট বয়স ঢেকে ফেলছে বিজ্ঞাপনে

বাদ গিয়ে ফেরত আসা রাহানে ওভালে দুই ইনিংসেই ভারতের সেরা ব্যাটার ছিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে রোহিত আর কোহলিও বেশ ভাল ব্যাট করলেন। কিন্তু দেখা গেল, তাঁদের যথেষ্ট ভাল ফর্মও আর দলের জন্য যথেষ্ট নয়। ভারত দুশোর বেশি রানে হারল। ক্রিকেট জগতে একথার একটাই মানে হয়। এঁদের সময় শেষ। সেকথা এঁদের ভক্তরা মানবেন না, তার চেয়েও বড় কথা ক্রিকেট বোর্ড মানবে না। কারণ এই তারকাদের পিছনে টাকার থলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একগুচ্ছ স্পনসর। খেলা সরাসরি সম্প্রচারকারীদের প্রাণ তাদের হাতে, আর সম্প্রচারই হল বোর্ডের ধনরত্নে ভরা গুহা। হারজিতের কথা ভেবে কি আর ও গুহার চিচিং বনধ হতে দেওয়া যায়? যায় না বলেই বয়সের যুক্তিতে ঋদ্ধিমান সাহাকে রাহুল দ্রাবিড় বলে দিতে পেরেছিলেন, এবার তুমি এসো। কিন্তু কোহলিদের বয়স চোখে দেখতে পান না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

শুধু কুস্তির পদক নয়, দেবতার গ্রাসে আজ সবার সন্তান

যেমন সৌরভ গাঙ্গুলি, তেমন এম সি মেরি কম আর পিটি ঊষা। তাঁরা নিজেদের পদক জেতার কষ্ট বুঝেছিলেন নিশ্চয়ই, কিন্তু সহখেলোয়াড়দের কষ্ট যে বোঝেন না তা তো দেখাই যাচ্ছে।

অলিম্পিক নয়, এশিয়ান গেমস নয়, কমনওয়েলথ গেমস নয়, এমনকি সাফ গেমসও নয়। স্রেফ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে জেতা একখানা পদকের পিছনেও কত বছরের পরিশ্রম, কত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ত্যাগস্বীকার থাকে তা যে কোনো ক্রীড়াবিদকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যায়। আরও বেশি করে টের পাওয়া যায় একটুর জন্য পদক জিততে পারেননি যাঁরা, তাঁদের সঙ্গে কথা বললে। প্রয়াত মিলখা সিং জানতেন, কলকাতার ছেলে জয়দীপ কর্মকার জানেন, আগরতলার মেয়ে দীপা কর্মকারও জানেন সারাজীবনের পরিশ্রমের পর তীরে এসে তরী ডুবলে কেমন লাগে। অথচ গোটা দুনিয়ায় চতুর্থ হওয়াও সারাজীবনের সাধনা ছাড়া সম্ভব নয়।

সেই ১৮৯৬ সালে শুরু হয়েছিল আধুনিক অলিম্পিক। সোয়াশো বছরের বেশি পেরিয়ে গেছে। অথচ হকি দলের পদকগুলো বাদ দিলে কতজন ভারতীয় অলিম্পিক পদক জিতেছেন তা আজও এক হাতের কড়ে গুনে ফেলা যায়। এ দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয় যে ১৪ বছরের বাচ্চা মেয়ে শ্যানন মিলার একটা অলিম্পিক থেকেই পাঁচটা পদক জিতে নেবেন বা একা মাইকেল ফেল্পসের আলমারিতেই থাকবে প্রায় আড়াই ডজন অলিম্পিক পদক। দেশটা চীনও নয় যে ছোটবেলা থেকে পদকজয়ী অলিম্পিয়ান তৈরি করতে যত্ন নেবে দেশের সরকার। এমন দেশের ক্রীড়াবিদরা যখন ঠিক করেন আন্তর্জাতিক স্তরে জেতা পদক জলে ফেলে দেবেন, তখন বুঝতে হবে পৃথিবীর সব রং মুছে গেছে তাঁদের চোখের সামনে থেকে। সূর্য নিভে গেছে।

‘দেবতার গ্রাস’ কবিতায় যে মা রাগের মাথায় সন্তানকে বলে ফেলেছিলেন “চল তোরে দিয়ে আসি সাগরের জলে”, নিজের কথা কানে যেতে যে অনুতাপবাণে তাঁর প্রাণ কেঁদে উঠেছিল, একজন পদকজয়ী ক্রীড়াবিদের “মেডেল গঙ্গায় ফেলে দেব” বলার সময়ে তার চেয়ে কম যন্ত্রণা হয় না। কারণ একটা পদক জিততে হলে সন্তান পেটে ধরার মতই দীর্ঘ শারীরিক ও মানসিক বেদনা সহ্য করতে হয়। ভারতের কুস্তিগীররা, বিশেষ করে মহিলা কুস্তিগীররা, আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন তা বুঝতে চাইলে আগে এই কথাটা স্পষ্ট বোঝা দরকার।

ক্রীড়াবিদরা সফল হওয়ার পরে সমস্ত আলো তাঁদের উপর এসে পড়ে। সাফল্যের পথটার উপরে আলো ফেলা হয় না সচরাচর। ফলে স্বীকার্য যে পদক জয়ের সলতে পাকানোর পর্ব খুব বেশি মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। কিন্তু যাঁরা মতি নন্দীর কাহিনি অবলম্বনে সরোজ দে পরিচালিত কোনি বা শিমিত আমীন পরিচালিত চক দে ইন্ডিয়া দেখেছেন, তাঁদের বলে দিতে হবে না যে স্রেফ প্রতিভায় চিঁড়ে ভেজে না। পেশাদার খেলোয়াড়ের জীবন বস্তুত ব্যথার পূজা। এমন ভয়ঙ্কর ব্যথা, যে খেলার জগতের বাস্তবতা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা না থাকা কিছু ফিল্ম সমালোচকের মনে হয়েছিল, গীতা ও ববিতা ফোগত এবং তাঁদের বাবা মহাবীর ফোগতের জীবন নিয়ে তৈরি দঙ্গল ছবিতে নারীত্বের অবমাননা দেখানো হয়েছে। মহাবীর মেয়েদের উপরে নিজের মতামত চাপিয়ে দিয়েছেন, সেখানে ‘ফিমেল এজেন্সি’-র অভাব ইত্যাদি। এঁরা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাঁশ নিয়ে তাড়া করার দৃশ্য সম্পর্কে কী ভাবেন কে জানে! যা-ই ভাবুন, পৃথিবীর সমস্ত ক্রীড়াবিদের সাফল্য ওই পথেই এসেছে। নির্মম মমতা ছাড়া সফল ক্রীড়াবিদ হওয়া যায় না।

তাহলে ভাবুন, পছন্দের খাবার খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে, নিজের বয়সী আর পাঁচটা ছেলেমেয়ের মত আনন্দ ফুর্তি বাদ দিয়ে, কোচের চোখরাঙানি হজম করে, খাটতে খাটতে আধমরা হয়ে গিয়ে যে পদক জেতেন একজন ক্রীড়াবিদ – সেই পদক বিসর্জন দিতে চান কোন অসহায়তায়।

ভিনেশ ফোগত, সঙ্গীতা ফোগত, সাক্ষী মালিক, বজরং পুনিয়ারা সেই অসহায়তায় পৌঁছেছেন। আপাতত হরিয়ানার কৃষক নেতাদের অনুরোধে গঙ্গায় পদক বিসর্জন দেওয়ার পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন। কিন্তু কী হবে পাঁচদিন পরে?

হবে অশ্বডিম্ব – এই মনোভাব নিয়েই এই ইস্যুতে এখন পর্যন্ত চলেছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। তাই এই চরম সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হয়েছে আমাদের কুস্তিগীরদের। সাধারণভাবে একটা তৃতীয় বিশ্বের দেশের ক্রীড়াবিদদের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, ভারতের ক্রীড়াবিদদের ঘাড়ে সেসব তো আছেই। আছে একগাদা উপরি পাওনাও। বরাবরই দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের মেজাজ মর্জি অনুযায়ী চলতে হয় তাঁদের। দেশের আর সবকিছুর মত খেলার জন্য বরাদ্দ টাকাও চলে যায় কর্মকর্তাদের পকেটে। আর কিছু মনে না থাকলেও কমনওয়েলথ গেমস কেলেঙ্কারি আর সুরেশ কালমাদির কথা কার না মনে আছে? ফলে অনেকেরই ধারণা ছিল, প্রাক্তন খেলোয়াড়দের খেলা চালানোর দায়িত্ব দিলে সব ম্যাজিকের মত বদলে যাবে। ক্রিকেট বোর্ডের দুর্নীতি, ইন্ডিয়ান অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের দুর্নীতি – সবই আদালত পর্যন্ত গড়ানোর ফলে এসে পড়েছিল সেই সুযোগ। কিন্তু মোদী সরকারের আমলে দেখা গেল, রাজনীতিবিদদের বশংবদ প্রাক্তন খেলোয়াড়রা কিছু কম যান না। যেমন সৌরভ গাঙ্গুলি, তেমন এম সি মেরি কম আর পিটি ঊষা। তাঁরা নিজেদের পদক জেতার কষ্ট বুঝেছিলেন নিশ্চয়ই, কিন্তু সহখেলোয়াড়দের কষ্ট যে বোঝেন না তা তো দেখাই যাচ্ছে।

ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে প্রথম যখন লাগাতার যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন ভিনেশ, সাক্ষীরা – তখন একটা ওভারসাইট কমিটি গড়ে দেওয়া হয়েছিল, যার কর্ণধার ছিলেন মেরি কম এবং আরেক অলিম্পিক পদকজয়ী কুস্তিগীর যোগেশ্বর দত্ত। সেই কমিটি অশ্বডিম্বই প্রসব করেছিল। নইলে যন্তর মন্তরে ধরনায় বসতেই হত না সাক্ষীদের।

মেরি কম, ঊষারা একে খেলোয়াড় তায় মহিলা। তবু তাঁরা যৌন হয়রানির অভিযোগকে পাত্তা দিচ্ছেন না, ভিনেশদের চোখের জলের দাম তাঁদের কাছে মিনারেল ওয়াটারের চেয়ে বেশি নয়। হয়ত ব্রিজভূষণের মত তাঁরাও মনে করেন ওসব পদকের দাম ১৫ টাকা। নতুন সংসদ ভবনের বর্ণাঢ্য উদ্বোধন নির্বিঘ্ন করতে কুস্তিগীরদের উপর পুলিসি আক্রমণ সম্পর্কে তাঁদের নীরবতা, ব্রিজভূষণের প্রতি মৌন সমর্থন প্রমাণ করে ক্ষমতার মদের নেশা অন্য সব নেশার চেয়ে কড়া। হাজার হোক, মেরি কম মণিপুরের নির্বাচনে বিজেপির তারকা প্রচারক ছিলেন। যোগেশ্বর তো রীতিমত বিজেপি দলের সদস্য। অর্থাৎ ভারতের ক্রীড়াপ্রেমীদের অরাজনীতির সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল।

কুস্তিগীরদের প্রতি সহানুভূতিশীল অনেকেরও রাজনীতি ব্যাপারটা প্রবল অপছন্দ। তাঁরা কোমলমতি। শাসক দলের সাংসদ যৌন হয়রানির একাধিক অভিযোগ সত্ত্বেও গ্রেফতার হন না, সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ না করলে, অলিম্পিক পদকজয়ীরা ধরনায় না বসলে এফআইআর পর্যন্ত দায়ের হয় না। তবু বিরোধী দলের নেতারা কুস্তিগীরদের পাশে দাঁড়ালে কোমলমতি ক্রীড়াপ্রেমীরা নাক কোঁচকান। তাঁদের জন্য উল্লেখ থাক, আজকের অপমানিত কুস্তিগীররা কিন্তু কখনো অরাজনৈতিক ছিলেন না। ২০১৪ সালের পর থেকে চালু হওয়া ধারা অনুযায়ী তাঁরা সোশাল মিডিয়ায় মোদী সম্পর্কে এবং তাঁর সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত ছিলেন দীর্ঘকাল। হিন্দুত্বের রাজনীতিও তাঁদের অনেকেরই পছন্দের। মে মাসের গোড়ার দিকেও বজরং ইনস্টাগ্রামে বজরং দলকে সমর্থন করে পোস্ট করেছিলেন, পরে মুছে দেন।

তা বলে বজরংদের এই আন্দোলনকে বাঁকা চোখে দেখার কোনো কারণ নেই। হরিয়ানার রক্ষণশীল, খাপ পঞ্চায়েত নিয়ন্ত্রিত সমাজ থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের ফ্যাসিবাদের ক্রীড়নক হয়ে যাওয়া খুব আশ্চর্যের নয়। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের জাতিভুক্ত এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের প্রাক্তনী সৌরভেরই যদি অমিত শাহের অনুগ্রহে আপত্তি না থাকে তো বজরংদের দোষ কী? কে লড়ছেন তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোন দাবিতে লড়ছেন। যে দেশের মেয়েদের ছোট থেকে নিকটাত্মীয়ের হাতে যৌন হয়রানি অভ্যাস করে নিতে হয়, ধর্ষক বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর অত্যাচারিত মেয়েটির পরিবার লোকলজ্জায় মুখ লুকোয় – সে দেশে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মহিলা ক্রীড়াবিদরা তাঁদের যৌন হয়রানির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছেন; পাশে রয়েছেন পুরুষ ক্রীড়াবিদরা – একে ঐতিহাসিক বলে মানতেই হবে। কর্পোরেট পেশাদার মহিলারাও জানেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগুলো বহু জায়গাতেই এখনো দায়সারা। এই আন্দোলন তেমন অনেক কর্তৃপক্ষকেই তটস্থ করে তুলছে। ইতিমধ্যেই এসে পড়েছে কুস্তির আন্তর্জাতিক নিয়ামক সংস্থার হুঁশিয়ারি।

আরও পড়ুন কুস্তিগীরদের আন্দোলন: মহাতারকাদের মহাকাপুরুষতা

বিজেপির রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির চেয়ে এসব অনেক দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। যদিও রাকেশ ও মহেশ টিকায়েতের মত খাপ পঞ্চায়েতের নেতার উপস্থিতি, বরাবরের বিজেপি সমর্থক ফোগত পরিবারের প্রধান মহাবীরের বিবৃতি এবং হরিয়ানার বিজেপি নেতাদের উল্টো গাওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এ ব্যাপারে রাজনৈতিকভাবে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ক্রমশ কোণঠাসা হচ্ছে। মোদীর দেবতাপ্রতিম ভাবমূর্তি বিশেষ কাজে আসছে না।

অনির্বাচিত মনুবাদী সাধুসন্তরা ঢুকে পড়েছেন ভারতের সংসদে, অযোধ্যার মহন্তরা অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন আক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে যে আইন (Protection of Children from Sexual Offences Act, 2012) আছে তা বদলানোর দাবিতে সভা করতে চলেছেন ব্রিজভূষণের সমর্থনে। বলা বাহুল্য, তাঁদের কথার ওজন আজকের ভারত সরকারের কাছে অসীম। ফলে সরকার যে তাঁদের প্রণাম জানিয়ে অর্ডিন্যান্স এনে আইন বদলে ফেলবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তা ঘটলে বুক ফুলিয়ে ঘুরতে পারবে আমাদের সকলের সন্তানের ধর্ষকরা। সুতরাং ভিনেশ, সাক্ষী, বজরংদের লড়াই এখন শুধু পদকজয়ী ক্রীড়াবিদদের লড়াই নয়, সমস্ত ভারতীয়ের লড়াই। সব মেয়েকে, সব শিশুকে দেবতার গ্রাস থেকে বাঁচানোর লড়াই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

নাসার আর ব্রিজভূষণ: যৌন নির্যাতনের আমরা ওরা

নাসার কাণ্ডের বেলায় কিন্তু ইউ এস অলিম্পিক কমিটির প্রেসিডেন্ট সারা হির্শল্যান্ড একবারও বলেননি জিমন্যাস্টরা দেশের বদনাম করছেন। বরং জিমন্যাস্টদের বলেছিলেন, তাঁদের এই দুর্ব্যবহার প্রাপ্য নয়।

ইন্টারনেটের যুগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অলিগলির খবর পর্যন্ত আমরা যেভাবে রাখি, আমেরিকানরাও ভারতের খবর সেভাবে রাখেন কিনা জানি না। মার্কিন জেলগুলোতে বন্দিদের ইন্টারনেট ব্যবহার করার অধিকার আছে কিনা তাও জানি না। তবে যদি থেকে থাকে, তাহলে নির্ঘাত সেখানে বসে ল্যারি নাসার আফসোস করছে ভারতে তার জন্ম হয়নি বলে। নামটা অচেনা? সেটাই স্বাভাবিক। বাংলা খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেলে খেলার খবর বলতে তো আইপিএল আর আইএসএল। আন্তর্জাতিক খেলা মানে বড়জোর ভারতীয় দলের ক্রিকেট আর ইউরোপের বিভিন্ন ফুটবল লিগ, চার বছরে একবার বিশ্বকাপ। ফলে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে দেড়শোর বেশি জিমন্যাস্টের সাক্ষ্যদানের পর দুই দশক ধরে যৌন নির্যাতন চালানোর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত নাসারের ৪০ থেকে ১৭৫ বছরের কারাদণ্ডের খবর হয়ত অনেকেরই চোখে পড়েনি বা স্মরণ নেই। নাসার ছিল ইউএসএ জিমন্যাস্টিক্স, ইউ এস অলিম্পিক কমিটি এবং মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির অগ্রগণ্য ডাক্তার। সেই মওকায় চিকিৎসার নাম করে সে মহিলা জিমন্যাস্টদের যথেচ্ছ যৌন নিপীড়ন করত।

এমনিতে একজন আমেরিকানের ভারতীয় হয়ে জন্মাতে চাওয়ার কোনো কারণ নেই, বরং ভারতীয়রাই অনেকে আমেরিকান হয়ে জন্মাতে পারলে খুশি হত। কিন্তু নাসার মনে করতেই পারে, ভারতে জন্মালে সে স্রেফ ডাক্তার হয়ে না থেকে ইউএসএ জিমন্যাস্টিক্সের শীর্ষ কর্তা হয়ে বসতে পারত। এমনিতেই তার বিকৃতির শিকার হওয়া মহিলাদের মুখ খুলতে বছর বিশেক সময় লেগেছে, কর্মকর্তা হলে নিশ্চয়ই তারা আরও ভয় পেত। ফলে আরও দেরিতে মুখ খুলত। খুললেও সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত না গেলে, অলিম্পিক পদকজয়ীরা রাস্তায় বসে না পড়লে পুলিস এফআইআর পর্যন্ত নিত না। নিলেও নাসার বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারত, সাংবাদিক সম্মেলন করতে পারত, যদি সে শাসক দলের টিকিটে নির্বাচিত সেনেটর হতে পারত। সেসব কিছুই হল না নাসার মার্কিন দেশে জন্মেছিল বলে। এসবের জন্যে যদি সে ব্রিজভূষণ শরণ সিংকে হিংসা করে, তাকে দোষ দেওয়া চলে কি? বিশেষ করে যখন দুজন কুস্তিগির ব্রিজভূষণের সম্পর্কে পুলিসের কাছে যে অভিযোগগুলো করেছেন তার সঙ্গে নাসারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্পষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে।

এমন নয় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মেয়েদের জন্যে একেবারে স্বর্গরাজ্য। ২০২১ সালে ইংল্যান্ডের দ্য গার্ডিয়ান কাগজের মার্কিন কলামনিস্ট ময়রা ডোনেগান দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লিখেছিলেন নাসার কাণ্ডে ফেডেরাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) অপদার্থতার কথা। হলিউডি থ্রিলার দেখার অভ্যাস যাঁদের আছে তাঁরা জানেন, এই এফবিআইকে প্রায়শই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তদন্তকারী সংস্থা হিসাবে দেখানো হয়। ব্যতিক্রমী ছবি না হলে এফবিআইয়ের গোয়েন্দাদের এত তৎপর, এত সৎ বলে দেখানো হয় যেন তাঁদের চোখ এড়িয়ে মাছি গলতে পারে না। কিন্তু ডোনেগান লিখেছেন ২০১৫ সালে অলিম্পিয়ান ম্যাককেলা ম্যারোনি নাসারের নামে এফবিআইয়ের কাছে অভিযোগ জানানোর পরেও তারা নড়েচড়ে বসেনি। তারা তদন্ত শুরু করে ২০১৬ সালে যখন স্থানীয় পুলিস নাসারের একটা হার্ড ড্রাইভ থেকে ৩৭,০০০ শিশু নির্যাতনের ছবি বাজেয়াপ্ত করে। নাসারের নামে এফবিআইয়ের কাছে জমা পড়া প্রথম অভিযোগ থেকে শুরু করে তার বিরুদ্ধে প্রথম ব্যবস্থা নেওয়ার সময়টুকুতেও সে প্রায় ৭০ জন মহিলা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের উপরে নির্যাতন চালিয়েছে। নাসারের ঘটনা নিয়ে মার্কিন সেনেটে শুনানির সময়ে এফবিআই ডিরেক্টর ক্রিস রে স্বীকার করেন যে তাঁর সংস্থার গাফিলতি ছিল। কিন্তু তিনি দাবি করেন সেটা সংশ্লিষ্ট এজেন্টদের ব্যক্তিগত গাফিলতি, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপার নয়। অথচ ডোনেগান লিখেছেন স্থানীয় পুলিস থেকে শুরু করে এফবিআই পর্যন্ত সর্বত্রই যৌন নির্যাতনের অভিযোগকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। গোটা আমেরিকা জুড়ে বহু মেয়ের অভিজ্ঞতাই তা বলে। সেদিক থেকে আমাদের মেয়েদের চেয়ে মার্কিন মেয়েদের অবস্থা বিশেষ উন্নত নয় বলতে হবে। কিন্তু তাহলেও তফাত বিস্তর। কোথায় তফাত?

এফবিআইয়ের গড়িমসির কথা প্রকাশ্যে এল কী করে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের ইনস্পেক্টর জেনারেল নাসার কাণ্ডের তদন্ত সম্পর্কে যে অন্তর্তদন্ত চালিয়েছিলেন তার নির্মম রিপোর্ট থেকে। উপরন্তু যে তিনটে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নাসার যুক্ত ছিল, সেগুলোকেও ফল ভোগ করতে হয়েছে। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ চাপের মুখে অ্যাটর্নি জেনারেলকে দিয়ে সংগঠনের প্রতিক্রিয়া সঠিক ছিল কিনা সে সম্পর্কে তদন্ত করায়। ইউ এস অলিম্পিক কমিটি একসময় ইউএসএ জিমন্যাস্টিক্সের অনুমোদন বাতিল করে দেবে ঠিক করেছিল। অলিম্পিক কমিটির চাপে তাদের সিইও এবং প্রেসিডেন্ট কেরি পেরিকে পদত্যাগ করতে হয়। এমনকি তাঁর স্থলাভিষিক্ত অন্তর্বর্তীকালীন সিইও এবং প্রেসিডেন্ট মেরি বনোকেও পদত্যাগ করতে হয় চারদিনের মাথায়, কারণ জিমন্যাস্টরা তাঁকে ওই পদে দেখতে চাননি। আসলে বনো এমন এক ল ফার্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন যা নাসারকে সাহায্য করেছিল।

অর্থাৎ ও দেশে এক প্রতিষ্ঠানের দোষ দেখে অন্য প্রতিষ্ঠান শাক দিয়ে মাছ ঢাকেনি। অলিম্পিকে সোনা জয়ী সিমোন বাইলস, অ্যালি রাইসম্যান বা ম্যারোনি, ম্যাগি নিকলদের কথা সেনেট শুনেছে, আদালতও ধৈর্য ধরে শুনেছে। তার জন্যে তাঁদের ওয়াশিংটন ডিসি বা নিউইয়র্কের ফুটপাথে গিয়ে বসতে হয়নি। একথা সত্যি, যে ব্রিজভূষণ দোষী কি দোষী নন সেকথা বিচার করবে আদালত। কিন্তু তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতের সামনে হাজির করার দায়িত্বটুকু নিতেও তো এ দেশের পুলিস বা সরকার রাজি নয়। এমনকি ভারতীয় অলিম্পিক কমিটির সভাপতি পিটি ঊষা কদিন আগে বলে বসেছিলেন, যৌন নির্যাতনের প্রতিবাদ করে বিনেশ ফোগত, বজরং পুনিয়া, সাক্ষী মালিকের মত কুস্তিগিররা নাকি দেশের বদনাম করছেন। নাসার কাণ্ডের বেলায় কিন্তু ইউ এস অলিম্পিক কমিটির প্রেসিডেন্ট সারা হির্শল্যান্ড একবারও বলেননি জিমন্যাস্টরা দেশের বদনাম করছেন। বরং জিমন্যাস্টদের বলেছিলেন, তাঁদের এই দুর্ব্যবহার প্রাপ্য নয়।

আরও পড়ুন হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

নাসার জেল খাটছেন, ইউএসএ জিমন্যাস্টিক্সের সেই কর্তারাও বিতাড়িত, জিমন্যাস্টরা আছেন স্বমহিমায়। বাইলস আরও একটা অলিম্পিকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, গোটা পৃথিবী অপেক্ষা করে আছে আবার কোন রুদ্ধশ্বাস দেহভঙ্গিমায় তিনি তাক লাগিয়ে দেবেন। এদিকে ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে তিন সদস্যের অ্যাড হক কমিটির হাতে। নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে, এই অ্যাড হক কমিটি নাকি আসন্ন এশিয়ান গেমসের সংগঠকদের কাছে ভারত থেকে যে কুস্তিগিররা প্রতিযোগী হতে পারেন তার এক প্রাথমিক তালিকা পাঠিয়েছে। সেই তালিকায় প্রতিবাদী কুস্তিগিরদের মধ্যে থেকে বজরং, ভিনেশ আছেন। তাছাড়াও আছেন রবি দাহিয়া, দীপক পুনিয়া, অংশু মালিক, সোনম মালিক। কিন্তু অলিম্পিকে ব্রোঞ্জজয়ী সাক্ষী বাদ। কেন তিনিই বাদ? সরাসরি প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য স্মৃতি ইরানির জবাবদিহি দাবি করেছিলেন বলে কি?

দেখে শুনে মনে হয়, কদিন আগে রাতের অন্ধকারে দিল্লি পুলিসের গলাধাক্কা খাওয়ার পর ভিনেশ কাঁদতে কাঁদতে ক্যামেরার সামনে যা বলেছেন তার চেয়ে ন্যায্য কথা নেই – দেশের মেডেল জেতার পরেও যদি এত অপমান সহ্য করতে হয়, তাহলে আর কারোর কখনো মেডেল না জেতাই ভাল।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

কুস্তিগীরদের আন্দোলন: মহাতারকাদের মহাকাপুরুষতা

‘ভগবান’ শচীন তেন্ডুলকর কোনোদিনই গোলযোগ সইতে পারেন না, রাজ্যসভার গোলযোগ ছাড়া। বাঙালির গর্ব সৌরভ গাঙ্গুলিও দিল্লি ক্যাপিটালস নিয়ে খুব ব্যস্ত। মহিলা কুস্তিগীরদের দুর্দশা নিয়ে ভাববেন কখন?

এ দেশের ক্রিকেটমহল এখন ভীষণ ব্যস্ত। ক্রিকেট ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা আইপিএল চলছে। নিজ নিজ ফ্র্যাঞ্চাইজের জন্য জান লড়িয়ে দিচ্ছেন তাঁরা। লখনৌ সুপারজায়ান্টস অধিনায়ক কে এল রাহুল তো এতটাই নিবেদিতপ্রাণ যে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের বিরুদ্ধে ম্যাচে ফিল্ডিং করতে গিয়ে গুরুতর চোট পাওয়ার পরে হার নিশ্চিত জেনেও দশ নম্বরে ব্যাট করতে নেমেছিলেন। অতঃপর চোটের প্রভাবে বাকি টুর্নামেন্টে আর খেলতে পারবেন না, সামনের মাসে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেও খেলতে পারবেন না। এমন বীরত্বের জন্যই তো জাতীয় নায়কের মর্যাদা পান ক্রিকেটাররা। মুশকিল হল, দেশের জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে পদকজয়ী কুস্তিগীর ভিনেশ ফোগত এতেও সন্তুষ্ট নন। তাঁর দাবি, মহিলা কুস্তিগীরদের উপর যৌন আক্রমণের অভিযোগে ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের মাথা ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন চলছে, ক্রিকেটারদের তার পাশে দাঁড়ানো উচিত।

গত ২৮ এপ্রিল ভিনেশ বলেন, ক্রিকেটারদের তো আমাদের দেশে পুজো করা হয়। তাঁরা আমাদের পক্ষ যদি না-ও নেন, অন্তত একটা নিরপেক্ষ বার্তা দিয়েও তো বলতে পারেন যে দোষীদের শাস্তি পাওয়া উচিত। কেবল ক্রিকেটার নয় অবশ্য, সব খেলার তারকাদের কাছেই আবেদন ছিল ভিনেশের। তারপর থেকে অভিনব বিন্দ্রা আর নীরজ চোপড়া – ভারতের ইতিহাসে যে দুজন অলিম্পিকে ব্যক্তিগত সোনা জিতেছেন, দুজনেই ওই আবেদনে সাড়া দিয়েছেন। সদ্যপ্রাক্তন টেনিস তারকা সানিয়া মির্জাও দোষীদের শাস্তি চেয়েছেন। কিন্তু ক্রিকেটারদের বিশেষ হেলদোল নেই। বর্তমান ক্রিকেটারদের মধ্যে একমাত্র মহিলাদের জাতীয় দলের শিখা পাণ্ডে মুখ খুলেছেন। সদ্য চালু হওয়া মহিলাদের প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে দামী ক্রিকেটার স্মৃতি মান্ধনার কোনো বক্তব্য নেই। জাতীয় দলের অধিনায়িকা হরমনপ্রীত কৌরও চুপ। প্রাক্তনদের মধ্যে হরভজন সিং, বীরেন্দ্র সেওয়াগ, ইরফান পাঠান সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন। একমাত্র নভজ্যোৎ সিং সিধু সশরীরে ভিনেশ, সাক্ষী মালিক, বজরং পুনিয়াদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিংবদন্তি ক্রিকেটারদের মধ্যে কেবল কপিলদেব ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করে প্রশ্ন তুলেছেন, এরা কবে ন্যায়বিচার পাবে?

স্পষ্ট বক্তা হওয়ার জন্য যাঁর বিপুল খ্যাতি, সেই বিরাট কোহলি স্পিকটি নট। যাবতীয় বাহাদুরি গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ে খরচ করছেন। নারীবাদীরা প্রায়শই বিরাটকে নিয়ে গদগদ হয়ে পড়েন তিনি জীবনে স্ত্রী অনুষ্কা শর্মার অবদান স্বীকার করেন বলে, তাঁর ব্যর্থতায় ট্রোলরা অনুষ্কাকে টার্গেট করলে বিরাট মুখ খোলেন বলে। দেখে মনে হয়, পৃথিবীতে বিরাটই একমাত্র পুরুষ যিনি নিজের বউকে ভালবাসেন। তাঁর ধারে কাছে আসতে পারেন একমাত্র অস্কার মঞ্চে বউকে নিয়ে কটূক্তি করায় ক্রিস রককে ঘুঁষি মেরে দেওয়া উইল স্মিথ। দেখা যাচ্ছে, স্ত্রীর প্রতি বিরাটের ভালবাসা আমাদের পাড়ার রানাদার পর্ণা বউদির প্রতি ভালবাসার চেয়ে মহত্তর কিছু মোটেই নয়। বরং হয়ত কিছুটা নিকৃষ্টতরই। কারণ রানাদা রাস্তাঘাটে অন্য কোনো মহিলার সঙ্গে কাউকে বিশ্রীভাবে কথা বলতে দেখলে অন্তত একটু ধমকা-ধমকি করেন। কিন্তু দেশের লাঞ্ছিত মহিলা কুস্তিগীরদের নিয়ে বিরাটের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই।

মনে রাখা ভাল, অনুষ্কা নিজেও কম নারীবাদী নন। তিনি একদা সুনীল গাভস্করের বিরুদ্ধে নারীবিদ্বেষী হওয়ার অভিযোগ এনেছিলেন, কারণ গাভস্কর বলেছিলেন অনুষ্কার বোলিংয়ে অনুশীলন করে বিরাটের লাভ হবে না। সেই অনুষ্কাও আজ চুপ। চুপ মানে অন্তঃপুরবাসিনী হয়ে গেছেন তা কিন্তু নয়। দুটিতে কেমন জীবন উপভোগ করছেন তার তত্ত্বতাল্লাশ দিব্যি দিয়ে যাচ্ছেন টুইটার বা ইনস্টাগ্রামে। তবে গাভস্করের বিরুদ্ধে লম্বা বিবৃতি দিয়েছিলেন, অলিম্পিয়ান মহিলাদের প্রতিবাদ নিয়ে এক লাইনও লেখেননি। অবশ্য পরীক্ষায় আনকমন প্রশ্ন এসে গেলে আমরাও সে প্রশ্ন ছেড়ে আসতাম।

গম্ভীর আবার দিল্লি থেকে নির্বাচিত সাংসদ। সেই দিল্লির যন্তর মন্তরেই কুস্তিগীরদের অবস্থান বিক্ষোভ চলছে। যদিও ওই এলাকা গম্ভীরের কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত নয়, তবু তিনি একজন জনপ্রতিনিধি তো বটেন। অবশ্য উনি সাংসদের দায়িত্ব খুব মন দিয়ে কোনোদিন পালন করেছেন বলে অভিযোগ নেই। উনি সারাবছর ক্রিকেটের ধারাভাষ্য দিয়ে বেড়ান, আইপিএলের সময়ে যোগী আদিত্যনাথের রাজধানীর ফ্র্যাঞ্চাইজের দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকেন। কদিন পরে হয়ত ওই দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে সারাবছরই বিশ্বভ্রমণ করে বেড়াবেন। কারণ লখনৌ সুপারজায়ান্টসে তাঁর পদটির নাম গ্লোবাল মেন্টর, আর ওই ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিকরা ইতিমধ্যেই দক্ষিণ আফ্রিকার টি টোয়েন্টি লিগে দল কিনে বসে আছেন। আর কোথায় কোথায় কিনবেন কে বলতে পারে? এমন বিশ্বনাগরিকের কি আর যন্তর মন্তরের অবস্থান বিক্ষোভ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার কূপমণ্ডূকতা মানায়?

পিভি সিন্ধু, সায়না নেহওয়ালদেরও মুখে কুলুপ। ছবারের বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়ন মেরি কম তো পিটি ঊষা গোত্রের, অর্থাৎ ভারতীয় জনতা পার্টির অতি ঘনিষ্ঠ, তাই নীরব। গত কয়েকদিন অবশ্য তাঁর রাজ্য মণিপুরে লঙ্কাকাণ্ড চলছে। বিজেপি তাঁকে এত গুরুত্ব দেয় যে টুইট করে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, রাজনাথ সিংকে ট্যাগ করে বলতে হচ্ছে “মাই স্টেট ইজ বার্নিং, কাইন্ডলি হেল্প”। যে নিখাত জারীনকে একসময় স্রেফ জ্যেষ্ঠত্বের অধিকারে অবজ্ঞা করতেন মেরি, সেই দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নিখাত কিন্তু সরব হয়েছেন।

প্রাক্তন সাংসদ ভারতরত্ন ‘ভগবান’ শচীন তেন্ডুলকর মুম্বাই ইন্ডিয়ানস ডাগআউটে নিদ্রা গিয়েছেন। তিনি অবশ্য কোনোদিনই গোলযোগ সইতে পারেন না, রাজ্যসভার গোলযোগ ছাড়া। বাঙালির গর্ব সৌরভ গাঙ্গুলিও দিল্লি ক্যাপিটালস নিয়ে খুব ব্যস্ত। মহিলা কুস্তিগীরদের দুর্দশা নিয়ে ভাববেন কখন? তবু তো দয়া করে শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে মুখ খুলেছেন। লর্ডসের ব্যালকনির চিরস্মরণীয় ঔদ্ধত্য ত্যাগ করে ভারী বিনীতভাবে বলেছেন, ওদের লড়াই ওরা লড়ুক। আমি তো খবরের কাগজে পড়ছি, যা জানি না তা নিয়ে তো কথা বলা উচিত নয়।

এদিকে শচীন, সৌরভ দুজনেই কন্যাসন্তানের পিতা।

সত্যি কথা বলতে, ভারতীয় তারকা খেলোয়াড়দের যা ইতিহাস, তাতে এঁরা মহম্মদ আলি হয়ে উঠবেন বলে কেউ আশা করে না। সাম্প্রতিক অতীতে তাঁরা কিন্তু সাতে পাঁচে না থাকার নীতি অনেকটাই ত্যাগ করেছেন। ওঁরা এখন শচীন বা ঊষার মত শাসক দলের প্রসাদ গ্রহণ করে রাজ্যসভার সদস্য হচ্ছেন, এ পদ সে পদ গ্রহণ করছেন, গম্ভীরের মত ভোটে লড়ে সাংসদ বা বিধায়কও হচ্ছেন। যাঁদের অত এলেম নেই তাঁরাও কোহলির মত করে নোটবন্দি হওয়া মাত্রই তা কত বড় ঐতিহাসিক পদক্ষেপ তা নিয়ে মতামত দিয়েছিলেন, কৃষক আন্দোলন চলাকালীন তার বিরোধিতা করে টুইট করেছিলেন। সেওয়াগের মত কেউ কেউ আরও এককাঠি সরেস। শহিদ হওয়া সৈনিকের মেয়েকে যুদ্ধবিরোধী কথা বলার জন্য ট্রোল করতেও ছাড়েননি। কেবল সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খোলার দরকার পড়লেই এঁরা কেউ নীরব হয়ে যান, কেউ এক-দু লাইনে কাজ সারেন। সেওয়াগ, কপিলদেব, হরভজন দিল্লি, হরিয়ানা, পাঞ্জাবের মানুষ। কুস্তিগীরদের আন্দোলনের সামনের সারিতে আছেন হরিয়ানার কুস্তিগীররাই। তা না হলে এতেও ওই তিন প্রাক্তন মুখ খুলতেন কিনা সন্দেহ।

আরও পড়ুন ক্রিকেটার তুমি কার?

যে পদকজয়ী অলিম্পিয়ানরা আজ রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁরা কিন্তু এই সেদিন পর্যন্ত বিজেপি-ঘনিষ্ঠই ছিলেন। নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিনে বা জয়ে তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে টুইট করতে এঁদেরও কামাই ছিল না। এখন চোখের জলে সেসবের দাম দিতে হচ্ছে। এখনো যে মহাতারকারা নীরব, তাঁদের দেখে একটাই ভয় হয়। জার্মান যাজক মার্টিন নিয়মোলারের অনুসরণে এঁদের না কোনোদিন আওড়াতে হয়, প্রথমে ওরা এসেছিল কুস্তিগীরদের জন্যে। আমি কিছু বলিনি, কারণ আমি কুস্তিগীর নই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ক্রিকেট জেনেশুনে বিশ করেছে পান

কর্তাদের কাছে একদিনের ক্রিকেট এখন পরের ছেলে পরমানন্দ, যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ। কারণ সেক্ষেত্রে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের জন্য আরও বেশি সময় পাওয়া যাবে।

শোয়েব আখতার যখন বল করতেন, মনে হত গোলাবর্ষণ করছেন। এখন বিশেষজ্ঞের মতামত দেওয়ার সময়েও প্রায় একই মেজাজে থাকেন। আজকাল প্রাক্তন ক্রিকেটাররা ভারতীয় ক্রিকেট সম্পর্কে কথা বলার সময়ে অতি মাত্রায় সাবধানী। কারণ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড চটে গেলে এ দেশে ধারাভাষ্যের মহার্ঘ সুযোগ পাওয়া যাবে না, কোনো একটা ভূমিকায় আইপিএলের কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজে ঢুকে সারা বছরের রোজগার দু-আড়াই মাসে করার সুযোগও হাতছাড়া হবে। শোয়েব পাকিস্তানি হওয়ায় ও দুটো দরজাই তাঁর জন্যে বন্ধ। সম্ভবত সে কারণেই নিজের দেশের বাবর আজম সম্পর্কে যেরকম তীর্যক মন্তব্য করেন, বিরাট কোহলি সম্পর্কেও সেভাবেই কথা বলেন। কোহলিকে আক্রমণ করে কদিন আগে বলেছেন “আমি কোহলিকে অনুরোধ করব ও যেন ৪৩ বছর বয়স পর্যন্ত খেলে। তাহলে আরও ৮-৯ বছর সময় পাবে। ভারত ওকে হুইলচেয়ারে বসা অবস্থাতেও খেলাবে এবং একশোটা শতরান করা পর্যন্ত খেলতে দেবে। আমার মনে হয় ও অবসর পর্যন্ত অন্তত ১১০ খানা শতরান করে ফেলবে।”

কোনো সন্দেহ নেই ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যক্তিপূজা এমন প্রবল, যে কপিলদেবকে রিচার্ড হেডলির টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ড ভাঙার জন্য, আর শচীন তেন্ডুলকরকে শততম শতরান করতে দেওয়ার জন্য, খেলোয়াড় হিসাবে ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও খেলতে দেওয়া হয়েছিল। মহেন্দ্র সিং ধোনি অবশ্য রেকর্ড ভাঙার জন্য খেলে যাননি। তাঁর ফিনিশ করার ক্ষমতা ফিনিশ হয়ে গিয়ে থাকলেও বোর্ড সভাপতি এন শ্রীনিবাসনের কোম্পানির ডিরেক্টরকে বাদ দেয় কোন নির্বাচকের সাধ্যি? বরং সেই ২০১১ সালে নির্বাচক কমিটির বৈঠকে ধোনিকে টেস্ট থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ায় নির্বাচক মহিন্দর অমরনাথের চাকরিই নট হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং কোহলিও যদ্দিন ইচ্ছা খেলে যেতেই পারেন। কিন্তু শোয়েবের ভুল হয়েছে অন্য জায়গায়।

কোহলির এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শতরানের সংখ্যা ৭৫ (টেস্ট ২৮, একদিনের ক্রিকেট ৪৬, আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টি ১)। যতদিন পর্যন্তই খেলুন, আরও ২৫ খানা শতরান কোথা থেকে আসতে পারে ভেবে দেখুন। পরপর দুটো ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে ব্যর্থ হওয়ার পর (পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্মরণীয় ইনিংসটা বাদ দিলে) ৩৪ বছরের কোহলিকে আর ওই ফরম্যাটে খেলানো হবে কিনা দেবা ন জানন্তি। বয়স বাড়লে টেস্টে শতরান করা যে ক্রমশ কঠিন হয়ে যায় তা তো কোহলির গত চার বছরের খেলা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তাহলে হাতে রইল পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট, যাতে কোহলিকে এখনো মাঝে মধ্যে স্বমহিমায় দেখা যায়। কিন্তু ওই ফরম্যাটটির নিজেরই যে বাঁচা দায়।

শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে। মাত্র ছমাস পরেই পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপ, তাও আবার ভারতে। যেখানে পঞ্চাশ গ্রাম ওজনের প্লাস্টিক বল দিয়ে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হলেও খেলা দেখতে লোক জমে যায়। এই তো কদিন আগে ভারত-অস্ট্রেলিয়া একদিনের সিরিজ হয়ে গেল, তার আগে বাংলাদেশে সিরিজ হল। সেখানে গুরুত্বহীন ম্যাচে হলেও ঈশান কিষণ দ্বিশতরান করলেন, কোহলি শতরানের খরা কাটালেন। এমন সময়ে পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট নিয়ে এমন কথা কেন? ঘটনা হল, যথেষ্ট চিন্তার কারণ আছে। সারা পৃথিবীতে টি টোয়েন্টি লিগগুলোর, মানে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের যত রমরমা হচ্ছে, পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটের দর্শক তত কমছে। মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে, যে কর্মকর্তারাও চান না ওটা বেঁচে বর্তে থাক। নইলে ১৩ নভেম্বর ২০২২ ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি ফাইনালের পর ১৭, ১৯ আর ২২ তারিখ কেন তিনটে একদিনের ম্যাচ খেলবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড? মাত্র চারদিন আগে দাপটে কুড়ি ওভারের বিশ্ব খেতাব জয় করা ইংল্যান্ড তিনটে ম্যাচেই গোহারা হারে। সেই ফলাফলকে গুরুত্ব না দিলেও হয়ত চলে, ইংল্যান্ডের পর্যুদস্ত হওয়ার দায় ক্লান্তির উপর চাপানো তো একেবারেই চলে না, কারণ ইংল্যান্ডের একদিনের দলের অনেকেই ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির দলে ছিলেন না। কিন্তু আসল কথা হল অস্ট্রেলিয়ার মাঠে ইংল্যান্ড খেলছে আর গ্যালারিতে মাছি তাড়ানোরও লোক নেই – এ জিনিস দুদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আগে কখনো ঘটেনি। খেলাগুলোর টিভি রেটিংয়ের অবস্থাও ছিল শোচনীয়।

এটা একমাত্র দৃষ্টান্ত নয়। ভারতেও যে কোনো দলের সঙ্গে খেলা থাকলেই মাঠ ভরে যাওয়ার দিন চলে গেছে। আইপিএলে টিকিটের জন্য কাড়াকাড়ি পড়ে, সাংবাদিকরা সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে বাধ্য হন “দয়া করে কেউ টিকিট চাইবেন না।” কিন্তু পঞ্চাশ ওভারের ম্যাচে অন্তত কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরুর মত বড় শহরে সে সমস্যা হয় না। শুধু যে দর্শকদের আগ্রহ কমছে তা নয়, খেলোয়াড়দেরও আগ্রহ কমছে। এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার, ইংল্যান্ডের টেস্ট অধিনায়ক বেন স্টোকস ইতিমধ্যেই একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে বসে আছেন। মানে গত বিশ্বকাপ ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় এবার বিশ্বকাপে খেলবেন না। তাঁর বয়স কিন্তু মাত্র ৩১। গতবছর জুলাই মাসে অবসরের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর ডিসেম্বরে অবশ্য স্টোকস বলেছিলেন তিনি শুধু বিশ্বকাপটা খেলার কথা ভেবে দেখতেও পারেন। কিন্তু অবসর নেওয়ার যে কারণগুলো দেখিয়েছিলেন, সেগুলো লক্ষ করার মত। তিনি পরিষ্কার বলেছিলেন, বড্ড বেশি ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। তিন ধরনের ক্রিকেটের ধকল তাঁর শরীর নিতে পারছে না।

এই সমস্যা একা স্টোকসের নয়। ইংল্যান্ডের জোরে বোলার জোফ্রা আর্চার চোট পেয়ে মাঠের বাইরে বসেছিলেন বেশ কয়েক বছর, চলতি আইপিএলে মাঠে ফিরলেন। ভারতের যশপ্রীত বুমরা কবে ফিরবেন এখনো পরিষ্কার নয়। বিশ্ব ক্রিকেটে প্রায় সব দলের শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররাই বারবার চোট পাচ্ছেন, বিরাম নিতে হচ্ছে। কারণ আইপিএল দিয়ে যা শুরু হয়েছিল, সেই ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের জয়যাত্রা এখন ম্যাগেলানের মত পৃথিবী পরিক্রমায় বেরিয়েছে। পাকিস্তান সুপার লিগ, লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগ, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ, অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশের সঙ্গে এ বছর থেকে যোগ হল দক্ষিণ আফ্রিকার এসএ টোয়েন্টি আর সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর আইএল টি টোয়েন্টি। শেষের দুটো আবার ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক দেওয়ার ব্যাপারে আইপিএলের ঠিক পরেই। দুটো লিগেই দল কিনেছেন চেন্নাই সুপার কিংস, মুম্বাই ইন্ডিয়ানস, কলকাতা নাইট রাইডার্স, দিল্লি ক্যাপিটালস, লখনৌ সুপার জায়ান্টস, সানরাইজার্স হায়দরাবাদ, রাজস্থান রয়ালসের মত দলের মালিকরা। ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলো খেলোয়াড়দের যা পারিশ্রমিক দিচ্ছে তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ডের কম্ম নয়। ফলে ছাড়তে হলে একজন ক্রিকেটার জাতীয় দলের হয়ে খেলাই যে ছাড়বেন, ফ্র্যাঞ্চাইজের খেলা নয়, তা বলাই বাহুল্য। টেস্টের প্রতি স্টোকসের ভালবাসা আছে বলে একদিনের ক্রিকেট ছেড়েছেন, কেউ টেস্ট খেলাও ছাড়তে পারেন।

ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ডের বোর্ড মিলে বিশ্ব ক্রিকেটকে যে ছাঁচে ঢেলেছে ২০১৪ সাল থেকে, তাতে অনেক ক্রিকেট বোর্ডেরই দিন আনি দিন খাই অবস্থা। ফলে ক্রিকেটারদের ইচ্ছার কাছে মাথা নোয়ানো ছাড়া উপায় নেই। এমনকি নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ডও বাধ্য হয়েছে ফর্মের তুঙ্গে থাকা ট্রেন্ট বোল্টকে কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে অব্যাহতি দিতে। অর্থাৎ তিনি হয়ত টেস্ট ক্রিকেট আর খেলবেনই না, একদিনের ক্রিকেট কতটা খেলবেন তাতেও সন্দেহ আছে। আইপিএলের পারিশ্রমিকের সঙ্গে অবশ্য ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বোর্ডও এঁটে উঠতে পারবে না অদূর ভবিষ্যতে। ইংল্যান্ডের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ কাগজের প্রতিবেদক টিম উইগমোর গত সপ্তাহেই লিখেছেন, আইপিএলের ক্রিকেটাররা যে পারিশ্রমিক পান তা আরও তিনগুণ বাড়ানো সম্ভব। কারণ এত বড় ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়া লিগ পৃথিবীর অন্য যেসব খেলায় আছে, সেখানে দলগুলো মোট রাজস্বের অর্ধেক বা তারও বেশি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক হিসাবে দিয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনবিএ (বাস্কেটবল লিগ) এনএফএল (আমেরিকান ফুটবল লিগ) এবং এমএলএসে (বেসবল লিগ) অন্তত ৪৮% দেওয়া হয়। ইংল্যান্ড ফুটবলের প্রিমিয়ার লিগ ২০২০-২১ আর্থিক বর্ষে রাজস্বের ৭১% খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকের পিছনে ব্যয় করেছিল। সেখানে আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো ব্যয় করে ১৮% বা তারও কম।

আরও পড়ুন বিশ্বকাপে কী হবে ভুলে যান, আইপিএল দেখুন

অতএব বুঝতেই পারছেন, শুধু পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট কেন, সারা বছর ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ খেলে বেড়িয়ে ভবিষ্যতে টেস্ট ক্রিকেট খেলার উৎসাহও কজন ক্রিকেটারের থাকবে সন্দেহ। স্বভাবতই খেলার গুণমানের তফাত হবে, দর্শকদের আগ্রহেও ভাঁটা পড়বে। যেমন এই মুহূর্তে পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটের ক্ষেত্রে হচ্ছে। টেস্টের দর্শক ভারতেও কমে গেছে বেশ কিছুদিন হল। সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে সপ্তাহান্তে কোহলির শতরান পূর্ণ করার দিনেও গ্যালারিতে মানুষের চেয়ে চেয়ার বেশি দেখা যাচ্ছিল। তবু কৌলীন্য আছে বলে কোহলি, স্টোকস, জো রুটের মত খেলোয়াড়রা এখনো ওই ক্রিকেটটা খেলতে চান। পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটের কিন্তু অবস্থা সঙ্গীন। বাঁচিয়ে রাখতে কী করা যায়? স্টোকস বলেছিলেন, সম্প্রতি রবি শাস্ত্রীও বলেছেন খেলাটাকে চল্লিশ ওভারে নামিয়ে আনার কথা। রোহিত বলেছেন নয়ের দশকের মত ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট ফিরিয়ে আনা যায় কিনা ভেবে দেখা উচিত। কিন্তু খেলোয়াড়দের ম্যাচ খেলার সংখ্যা যদি না কমে, ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের পরিমাণ কমানোর দিকে যদি কর্তারা নজর না দেন, তাহলে চল্লিশ ওভারের ম্যাচ খেলতেই বা সেরা খেলোয়াড়দের কী করে পাওয়া যাবে?

কর্তাদের কাছে একদিনের ক্রিকেট এখন পরের ছেলে পরমানন্দ, যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ। কারণ সেক্ষেত্রে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের জন্য আরও বেশি সময় পাওয়া যাবে। ওখানেই তো যত মধু। আইপিএলে দল বাড়িয়ে ম্যাচের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, কারণ মিডিয়া স্বত্ব বেচে পাওয়া টাকার পরিমাণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ২০১৮-২২ আইপিএলের মিডিয়া স্বত্ব বিক্রি হয়েছিল ১৬,৩৪৭.৫০ কোটি টাকায়, আর ২০২৩-২৭ আইপিএলের মিডিয়া স্বত্ব বিক্রি হয়েছে ৪৮,৩৯০ কোটি টাকায়। আইপিএল নামক এই সোনার ডিম পাড়া হাঁসটির জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল নিজেদের সূচিতে প্রতি বছর আড়াই মাস খালি রেখেছে। কারণ আইপিএলে ম্যাচের সংখ্যা আরও বাড়ানো হচ্ছে। বাড়তে বাড়তে ২০২৭ সালে তা পৌঁছবে ৯৪-তে। সঙ্গে থাকবে অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ। তারপর পঞ্চাশ (বা চল্লিশ ওভারের) খেলা খেলবেন কারা? সে বছর বিশ্বকাপেই বা কতজনকে ফিট অবস্থায় পাওয়া যাবে? তাই বলছিলাম, কোহলি যদি ২০৩১ অব্দি খেলেও ফেলেন, শতরানের সেঞ্চুরির জন্য সবচেয়ে লাগসই ফরম্যাটটার অস্তিত্ব থাকবে কিনা সন্দেহ।

এই সময় কাগজের অধুনালুপ্ত রাবিবারিক ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত