কুড়ি আমাদের ভিত্তি, দশ আমাদের ভবিষ্যৎ

নতুন বছরে আরও টাকা উড়বে ক্রিকেট মাঠে, কুড়ি ওভারের খেলার সঙ্গে যুক্ত হবে দশ ওভারের খেলা। নির্ঘাত আরও কমবে সাদা জামা লাল বলের ক্রিকেট, একদিনের ক্রিকেট আদৌ হবে কিনা কে জানে!

ইংল্যান্ডের প্রাক্তন জোরে বোলার স্টিফেন হার্মিসন বেজায় চটেছেন। কারণ ইংল্যান্ড নতুন বছরে পাঁচ টেস্টের সিরিজ খেলতে ভারতে পা দিচ্ছে হায়দরাবাদে প্রথম টেস্ট শুরু হওয়ার মাত্র তিনদিন আগে। হার্মিসন বলেছেন, এই কান্ড করলে ইংল্যান্ডের ৫-০ হারা উচিত। কারণ ভারত সফরে ‘এলেম, দেখলেম, জয় করলেম’ চলে না। এ বড় কঠিন ঠাঁই। হার্মিসনের মতে, ২০১২-১৩ সালে ভারত থেকে সিরিজ জিতে যাওয়া অ্যালাস্টেয়ার কুক বা কেভিন পিটারসেনকে যদি বলা হয় ইংল্যান্ড মাত্র তিনদিন আগে ভারতে যাচ্ছে, তাঁরা হাসাহাসি করবেন। যে পডকাস্টে হার্মিসন এসব বলেছেন, তার সঞ্চালক তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে দিনকাল বদলে গেছে। হার্মিসন পাত্তা না দিয়ে মন্তব্য করেন, জেতার জন্যে যা যা করতে হয় সেগুলো একটুও বদলায়নি। তাহলে ইংল্যান্ড এমন করছে কেন? তাঁর বক্তব্য, এর কারণ হল বোর্ড ক্রিকেটারদের ভয় পাচ্ছে। ইংল্যান্ড ক্রিকেট এখন সুতোর উপর ঝুলছে। বোর্ড আতঙ্কে আছে যে ক্রিকেটারদের কোনোকিছু মানতে বাধ্য করলেই তারা বোর্ডের চুক্তি ভেঙে বেরিয়ে যাবে। তাই তাদের যাবতীয় আবদার মেনে নেওয়া হচ্ছে।

২০২৪ সালে ক্রিকেট কোনদিকে যাবে তা আন্দাজ করার জন্যে হার্মিসনের এই কথাগুলোই যথেষ্ট। তিনি অবশ্য একটা ভুল করেছেন – ব্যাপারটাকে আখ্যা দিয়েছেন ‘প্লেয়ার পাওয়ার’। আসলে তো এটা খেলোয়াড়দের ক্ষমতার পরিচয় নয়, এ হল টাকার ক্ষমতার পরিচয়। একের পর এক টি টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ তৈরি হচ্ছে দেশে দেশে, আর ক্রিকেটারদের যে টাকা দেওয়া হচ্ছে তা জাতীয় দলে খেলার জন্যে কোনো দেশের বোর্ড দিতে পারবে না। এমনকি ইংল্যান্ডের বোর্ড, যারা বিসিসিআই আর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার পরেই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী বোর্ড, তারাও নয়। এমনিতেই ইংল্যান্ডের ক্রিকেটারদের ইদানীং দেশের হয়ে খেলার উৎসাহে ঘাটতি হচ্ছে। অনিচ্ছুক বেন স্টোকস আর মঈন আলিকে হাতে পায়ে ধরে ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ খেলানো হল। ফল শোচনীয়। আবার বিশ্বকাপ চলাকালীন বোর্ডের সঙ্গে কেন্দ্রীয় চুক্তির জন্যে নির্বাচিত ক্রিকেটারদের তালিকা ঘোষিত হল। তাতে নিজের নাম দেখতে না পেয়ে জোরে বোলার ডেভিড উইলি তুরন্ত বিশ্বকাপের পর জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার কথা ঘোষণা করে দিলেন। সিদ্ধান্তটা নেওয়া মোটেই শক্ত নয়, কারণ তিনি জানেন ইংল্যান্ডের হয়ে ৪৩টা টি টোয়েন্টি ম্যাচে যা খেলেছেন তাতে কোনো না কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের একটা না একটা দলে জায়গা করে নেবেনই। তাহলেই ইংল্যান্ড দলের প্রান্তিক ক্রিকেটার হয়ে যা রোজগার করতেন তার চেয়ে ঢের বেশি টাকা রোজগার করা যাবে।

এমতাবস্থায় ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের কর্তারা যদি টেস্ট দলের খেলোয়াড়দের বলতে ভয় পান, যে ভারতে সিরিজ জেতা খুব গুরুত্বপূর্ণ, তার জন্যে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে হবে, অন্তত দিন দশেক আগে যেতেই হবে, গিয়ে ওখানে প্র্যাকটিস করতে হবে – তাহলে তাঁদের দোষ দেওয়া যায় না। দুনিয়াটা চিরকালই চালায় অর্থবানরা, এখন তো আবার ধনকুবেররা প্রায় সরকার চালায়। ক্রিকেট খেলা এই নিয়মের বাইরে থাকবে কী করে? ফলে টেস্ট সিরিজের গুরুত্ব, সিরিজ জেতার গুরুত্ব ক্রমশ কমবে। যেহেতু টিভি সম্প্রচার থেকে বিস্তর টাকা আসে, সেহেতু উত্তেজক বিজ্ঞাপন দিয়ে বা বিবৃতি দিয়ে ভীষণ গুরুত্ব আছে বোঝানোর চেষ্টা নিশ্চয়ই চলবে। কিন্তু প্রস্তুতি নিয়ে মাথা ঘামাবে না কোনো দল। ইংল্যান্ডের টেস্ট অধিনায়ক স্টোকস তাঁর এক্স হ্যান্ডেল থেকে হার্মিসনের বক্তব্যের প্রতিবাদ করে জানিয়েছেন, তাঁর দল প্রস্তুতির জন্য ভারতে আসার আগে আবু ধাবিতে কিছুদিন থাকবে। এতে কী এসে যায় বোঝা শক্ত। কারণ জানুয়ারি থেকে মার্চের ভারতের সঙ্গে আবু ধাবির আবহাওয়া সংক্রান্ত মিল যদি থেকেও থাকে, পিচের চরিত্রের মিল থাকবে কিনা তা নিয়ে ইংরেজ বিশেষজ্ঞরাও দ্বিধান্বিত। তার চেয়েও বড় কথা, ভারতে এসে কিছু অনুশীলন ম্যাচ খেললে ইংল্যান্ড অনেক বেশি তৈরি থাকতে পারত।

সাহেবরা বলে থাকে, সকালই দিনটা কেমন যাবে দেখিয়ে দেয়। ২০২৪ সালের প্রথম বড় টেস্ট সিরিজ নিয়ে এই বাদানুবাদও বুঝিয়ে দিচ্ছে টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে। পাঁচ টেস্টের সিরিজ দীর্ঘদিন অতীত হয়ে গেছে। ভারত, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া একমাত্র নিজেদের মধ্যেই অতগুলো টেস্ট খেলে। তারও কারণ টিভি সম্প্রচারের টাকা। অন্য দেশগুলোর সঙ্গে টেস্ট সিরিজ নমো নমো করে সারে। প্রস্তুতি ম্যাচের পাট কবেই চুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন হার্মিসনের কথাবার্তাকে অন্যায় আবদারই বলতে হবে।

ভারতকেই দেখুন। দক্ষিণ আফ্রিকায় কখনো সিরিজ জেতা হয়নি, তাই ওটা নাকি ‘ফাইনাল ফ্রন্টিয়ার’। এবারের সফরের আগে এসব নিয়ে কত কথা বলা হল, লেখা হল। এদিকে খেলা হচ্ছে মাত্র দুটো টেস্ট। টেস্টে একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধেও ভারতীয় বোর্ড সে দেশে দুটো টেস্টের বেশি খেলতে চায় না। দক্ষিণ আফ্রিকায় এবারেও সিরিজ জেতা হবে না, কারণ প্রথম টেস্টে ইতিমধ্যেই হেরে ভূত হতে হয়েছে। সেখানেও কিন্তু প্রস্তুতির অভাব স্পষ্ট দেখা গেছে। প্রস্তুতি থাকবে কী করে? দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডই দীর্ঘ ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ শেষ হতে না হতেই টি টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে চেয়েছিল, কারণ নতুন বছরে আবার ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি খেলা হবে। তার আগেই হবে ক্রিকেটবিশ্বের সবচেয়ে অর্থকরী প্রতিযোগিতা – ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ। তার মিনি নিলামে কদিন আগেই খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকের রেকর্ড দু দুবার ভেঙেছে। অতএব ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা/কুড়ি, তোমার পানে, তোমার পানে, তোমার পানে।

আরও পড়ুন ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হল কি এই বিশ্বকাপে?

অবশ্য সেখানেই শেষ নয়। একবিংশ শতকের বৈশিষ্ট্য হল মানুষের যাবতীয় দুঃস্বপ্ন ও রসিকতার বাস্তবায়ন। প্রথমটার উদাহরণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শীতের দেশের লোকের গরমে প্রাণান্তকর অবস্থা; অন্যত্র ঘনঘন ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ইত্যাদি। দ্বিতীয়টার উদাহরণ টি টেন। যখন টি টোয়েন্টি চালু হল, বিশুদ্ধবাদী ক্রিকেটরসিকরা ঠাট্টা করে বলতেন, আর কত কমাবে বাপু? এরপর টি টেন, তারপর এফ ফাইভ। এই করতে করতে তো টস করে জেতা হারায় পৌঁছবে শেষে। ২০০৭ সালে প্রথম ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির পরে দুই দশকও কাটেনি, টি টেন নিয়মিত হতে চলল বলে। ইতিমধ্যেই আবু ধাবিতে একটা ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ হয়। কিন্তু তাতে মূলত প্রাক্তন ক্রিকেটাররা খেলেন। সম্প্রতি জানা গেছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ জয় শাহের নেতৃত্বাধীন বিসিসিআইও দশ ওভারের লিগ চালু করতে চাইছে। অতএব নতুন বছরে আরও টাকা উড়বে ক্রিকেট মাঠে, কুড়ি ওভারের খেলার সঙ্গে যুক্ত হবে দশ ওভারের খেলা। নির্ঘাত আরও কমবে সাদা জামা লাল বলের ক্রিকেট, একদিনের ক্রিকেট আদৌ হবে কিনা কে জানে! সুতরাং বিশ্বকাপ ফাইনালে হার বা সেঞ্চুরিয়নের ইনিংস হার নিয়ে মন খারাপ করবেন না।

এই সময় কাগজে প্রকাশিত

ভুল করেছেন সাক্ষী মালিক

মহম্মদ আলী সাদা চামড়ার আমেরিকানদের বর্ণবৈষম্যবাদী ব্যবহারে অপমানিত হয়ে নিজের অলিম্পিক পদক ওহায়ো নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন। সাক্ষী মালিক এখন নিশ্চয়ই ভাবছেন, সেদিন গঙ্গায় তাঁর অলিম্পিক পদকটাও ফেলে দিলেই ভাল হত। কৃষক নেতাদের কথায় থেমে যাওয়া উচিত হয়নি। ইতিহাসের চাকা ঘোরে। তাই আলীকে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি ১৯৯৬ সালে আটলান্টা অলিম্পিকের সময়ে আরেকটা সোনার পদক দেয়। এই ইতিহাস সাক্ষীকে কোনো আশা দেবে কিনা, আমরা জানি না। ইতিহাসের চাকা সবসময় সামনের দিকে ঘোরে না, পিছনদিকেও যে ঘোরে তার প্রমাণ ইতিহাসেই রয়েছে। কোনো দেশে ইতিহাসের উল্টোদিকে হাঁটা শুরু হলে সে চাকা ফের সামনের দিকে ঘোরা দেখে যাওয়ার সুযোগ সকলের হয় না। উপরন্তু বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই আলীর দেশে তাঁর জন্মের একশো বছর আগে থেকেই চলছিল, আলীর অলিম্পিক সোনা জয়ের একশো বছর আগে তা নিয়ে আস্ত একটা গৃহযুদ্ধও হয়ে গিয়েছিল। ভারতে আজও লিঙ্গবৈষম্য অত বড় সমস্যা বলে কেউ মনে করে না। ফলে সাক্ষীকে পদক জলাঞ্জলি দিতে না দিয়ে কৃষক নেতা নরেশ টিকায়েত সেদিন তাঁর উপকারই করেছিলেন বলতে হবে, কারণ বাকি জীবনটা সাক্ষীর অন্তত পদকটা রইল।

সাক্ষীকে অবশ্য বোকাই বলতে হবে। তিনি কি ভেবেছিলেন তাঁর এবং অন্য কুস্তিগীরদের লড়াইয়ে একজন দোর্দণ্ডপ্রতাপ পুরুষ ক্ষমতাচ্যুত হবে স্রেফ মেয়েদের লাঞ্ছনা করার অভিযোগে? এদেশে ও আবার একটা অভিযোগ নাকি? ‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা’ কথাটা তো আমাদের দেশেই তৈরি। ভোগ করতে না জানলে আর বীর কিসের? আজও সফল পুরুষদের বন্ধুবান্ধবরা (মেয়ে বন্ধুরাও) রসিকতা করে বলেই থাকে “এখনো একটা স্ক্যান্ডাল হল না? তাহলে আর কী সাকসেসফুল হলি?” ভারতে খেলাধুলো করতে তো সাধারণত যান নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েরা। কর্পোরেট চাকরি, যেখানে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলারা চাকরি করতে যান, সেখানকার ‘মি টু’ আন্দোলনই শেষপর্যন্ত মিইয়ে গেল। তখনকার মত চক্ষুলজ্জার খাতিরে যে অভিযুক্ত পুরুষদের পদচ্যুত করা হয়েছিল, তাঁরা অনেকেই নিজের জায়গায় ফিরে এসেছেন যথারীতি। অনেককে তো এমন দায়িত্বে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা কার্যত পদোন্নতি। এমন দেশে সাক্ষী, ফোগত বোনেরা, বজরং পুনিয়া প্রমুখ অন্যরকম পরিণামের আশা করেছিলেনই বা কেন?

আলীর দেশের জিমন্যাস্টদের ল্যারি নাসার বলে একজন ডাক্তার ছিল। সে দুই দশক ধরে মেয়ে জিমন্যাস্টদের উপর যৌন নির্যাতন চালিয়েছিল। শেষমেশ আদালতে দেড়শোর বেশি জিমন্যাস্ট সাক্ষ্য দেওয়ার পরে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে সেই নরাধম ৪০ থেকে ১৭৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়, অর্থাৎ তার বাকি জীবন কারাগারেই কাটবে। এদিকে ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে মহিলা কুস্তিগীরদের অভিযোগের তদন্ত কী হচ্ছে না হচ্ছে তারই ঠিক নেই। সামান্য এফআইআর ফাইল করাতেই দেশের হয়ে পদকজয়ী কুস্তিগীরদের রাস্তায় বসে থাকতে হয়েছে। নাসারের বিরুদ্ধে যাঁরা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তাঁদের পুরোভাগে ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অলিম্পিক পদকজয়ী জিমন্যাস্টরা। অলিম্পিক সোনা জয়ী এবং বিশ্বরেকর্ডধারী সিমোন বাইলসও ছিলেন। শুনানিতে যৌন হয়রানির কথা বলতে গিয়ে তাঁরও অশ্রুপাত হয়েছিল, কিন্তু তাঁকে চোখের জলে জিমন্যাস্টিক্সকে বিদায় জানাতে হয়নি।

সাক্ষী আর তাঁর সঙ্গী কুস্তিগীররা আরও একটা ভুল করেছেন। তাঁদের উচিত ছিল যৌন হয়রানির ভিডিও তুলে রাখা। আজকের ভারতে একমাত্র কোনো অন্যায়ের ভিডিও ভাইরাল হলেই আমরা আলোড়িত হই, প্রশাসন নড়ে চড়ে বসে, প্রধানমন্ত্রী অন্তত সংসদের বাইরে বিবৃতি দেন। পরে অবশ্য কে ভাইরাল করল সে খোঁজ পড়ে। তবু অন্তত নিন্দেমন্দ হয়। মণিপুরের সেই দুজন মহিলার ব্যাপারে তো তাই হয়েছিল। মনে নেই? সেই যাঁদের উলঙ্গ করে গোটা গ্রাম ঘোরানো হয়েছিল, গণধর্ষণ করা হয়েছিল? ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সে ঘটনা অবশ্য প্রকাশিত হয়েছিল অনেকদিন পরে। তাছাড়া ওই দুজনের একজন সৈনিকের বউ। তাঁর সঙ্গে কি আর কুস্তিগীরদের তুলনা চলে? এঁদের তো টিভি ক্যামেরার সামনে দিয়েই রাত্রিবেলা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে পারে পুলিস।

আরও পড়ুন শুধু কুস্তির পদক নয়, দেবতার গ্রাসে আজ সবার সন্তান

সাক্ষী আর কুস্তির আখড়ায় নামবেন না বলেছেন, গোটা লড়াইয়ে মহিলা কুস্তিগীরদের পাশে থাকা পুরুষ কুস্তিগীরদের অন্যতম বজরং পুনিয়া জানিয়েছেন, ২০১৯ সালে পাওয়া পদ্মশ্রী ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু এসবে আমাদের বিশেষ কিছু এসে যাচ্ছে না। সোশাল মিডিয়ায় কিছু পোস্ট হচ্ছে, সাক্ষীর কান্নায় বেঁকেচুরে যাওয়া মুখের ছবি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে – এই পর্যন্ত। অবশ্য কী-ই বা হওয়ার ছিল? সবে মঙ্গলবার গাজিয়াবাদের ধরমবীর চা দিতে দেরি হওয়ায় স্ত্রী সুন্দরীকে তলোয়ারের এক ঘায়ে শেষ করে দিয়েছেন। মাসখানেক হল সিনেমা হল মাতাচ্ছে কথায় কথায় বউয়ের গলা টিপে ধরা আর প্রেমিকাকে দিয়ে নিজের জুতো চাটানো রণবীর কাপুর অভিনীত একটা চরিত্র। এই দেশে সাক্ষীর কান্নার কী দাম? একটা মেয়ের অলিম্পিক পদকেরই বা কী মূল্য? শেষমেশ একটা মেয়েই তো।

মেয়েদের জন্যে দেশটা এমনই ছিল বরাবর, তবে মাঝেমধ্যে কিছু গোলমেলে কাণ্ডও ঘটতে দেখা গেছে অতীতে। এক যুগ আগের এক ডিসেম্বরের কথা মনে পড়ে। পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে বেরনো একটা মেয়েকে ঘন্টার পর ঘন্টা ধর্ষণ এবং অকথ্য অত্যাচার করেছিল কয়েকজন মিলে। মেয়েটা হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছিল অনেকদিন। শেষপর্যন্ত বাঁচেনি। দেশজুড়ে সে কদিন কেবল তারই কথা বলেছিল মানুষ। সারা সন্ধে গলা ফাটিয়েছিলেন টিভি অ্যাঙ্কররা, গর্জে উঠেছিলেন সরকারবিরোধী নেতারা, দিল্লির রাস্তায় পর্যন্ত মানুষের ঢল নেমেছিল। দামিনী, নির্ভয়া – কতশত নামকরণ হয়েছিল মেয়েটার। তার মৃত্যুর পরে ধর্ষণ সংক্রান্ত আইন সংস্কার, মেয়েদের নিরাপত্তা বিধানে নতুন তহবিল তৈরি – সে এক কাণ্ড! এবছর ডিসেম্বরে বোধহয় অনেক বেশি ঠান্ডা পড়েছে, তাই গোটা দেশ শীতল। অথবা শরীরটা একেবারে ক্ষতবিক্ষত না হলে, অত্যাচারিত হয়ে মৃত্যুশয্যায় না পৌঁছলে এদেশের মেয়েদের মানসম্মান নিয়ে ভাবা চলে না। অবশ্য হাথরাসের মেয়েটা মরে যাওয়ার পরেও, পুলিসই রাতের অন্ধকারে দাহকার্য সম্পন্ন করার পরেও আমরা তাকে নিয়ে ভাবিনি। কাঠুয়ার বাচ্চা মেয়েটার মৃত্যুর পরে তার ধর্ষকদের সমর্থনে তো রীতিমত মিছিল করেছি আমরা। সে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

আবার ফাইনালে হার, ফাটানো যাক দু-একটা বুদ্বুদ এবার

ভারতীয় ক্রিকেটের গোটা বাস্তুতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে সত্যকে অস্বীকার করে। বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর একাধিক ক্রিকেট ওয়েবসাইট এবং পরিসংখ্যানবিদ সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন একটা পরিসংখ্যান – ভারত গত তিনটে বিশ্বকাপে মাত্র চারটে ম্যাচ হেরেছে। এমন অনর্থক পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে বা এদেশের অন্য কোনো খেলায় হয় না।

সপ্তাহের অর্ধেক কেটে গেল, বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের শোকপালন এখনো শেষ হল না। সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের খোঁজ নিয়েছেন কিনা জানি না, তবে ফাইনালের পর পরাজিত ভারতীয় দলের সদস্যদের পিঠ চাপড়ে দিতে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং সাজঘরে গেছেন। দলের প্রত্যেককে আলাদা করে সান্ত্বনা দিয়েছেন, মহম্মদ শামির মাথাটাকে নিজেদের কাঁধে ঠেসে ধরেছেন, তারপর স্লো মোশনে আবেগাকুল আবহসঙ্গীত সহকারে বেরিয়ে এসেছেন – এই ভিডিও মুক্তি পেয়েছে। অতএব এই শোক পর্ব নির্ঘাত দীর্ঘায়িত হবে। আগে মানুষ শোকে নিস্তব্ধ হয়ে যেত, আজকাল আক্রমণাত্মক হয়ে যায়। শোকের জন্যে যাকে দায়ী করে তার মেয়ে, বউকে ধর্ষণের হুমকি দেয়। অন্তত সেইটা আশা করা যায় আজ সন্ধে থেকে বন্ধ হয়ে যাবে, কারণ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে কুড়ি বিশের সিরিজ শুরু হয়ে যাচ্ছে। সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বাধীন দল যদি অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিতে পারে তাহলে তো কথাই নেই। গলার শির ফুলিয়ে সেই কথা বলা যাবে যা এখন বিনীতভাবে বলা হচ্ছে – আমাদের দলটাই সেরা, ওই দিনটা খারাপ গেছিল আর কি। মোদ্দাকথা, কেন আরও একবার একটা আইসিসি ট্রফি জিততে ব্যর্থ হলাম তার কোনো ক্রিকেটিয় বিশ্লেষণ হবে না।

কে-ই বা সেটা চায়? ভারতের কোনো প্রাক্তন ক্রিকেটার কোনো ত্রুটি তুলে ধরেছেন? গত কয়েকদিন বাংলা কাগজ-টাগজ ঘেঁটেও কোথাও রবিবারের হারের কোনো বিশ্লেষণ চোখে পড়ল না। কার চোখে কত জল কেবলই তা মাপা চলছে। সব সংবাদমাধ্যম ‘খলনায়ক’ খুঁজতে শুরু করেনি এটা যতখানি স্বস্তিদায়ক, ততটাই অস্বস্তির কারোর কোনো ক্রিকেটিয় ব্যাখ্যায় না যাওয়া। দল জেতে ক্রিকেটারদের মুনশিয়ানায় আর হারে কপালের দোষে – এই যদি ক্রিকেটভক্ত, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক এবং টিম ম্যানেজমেন্টের মিলিত সিদ্ধান্ত হয় তাহলে দশ বছর কেন; বিশ বছরেও ট্রফির খরা কাটা শক্ত।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি, বিশ্বকাপ – একটা করে প্রতিযোগিতার কোনো একটা স্তরে ভারতীয় দল মুখ থুবড়ে পড়ে আর ভারতের তাবড় প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার আর সাংবাদিকরা মূলত দুটো কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে থাকেন – ১) একটা খারাপ দিন একটা ভাল দলকে রাতারাতি খারাপ করে দেয় না, ২) ভাগ্য খারাপ, তাই খারাপ দিনটা ফাইনালেই এল। কী আর করা যাবে?

সব দেশেই খেলা সম্পর্কে সাধারণ দর্শকের মতামত গঠনে প্রধান ভূমিকা নেন বিশেষজ্ঞ আর সাংবাদিকরা। তাঁরাই দিনের পর দিন এসব বলে চললে ক্রিকেটভক্তদের দোষ দেওয়া যায় না। সবাই তো আর দেখতে পান না অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড বা নিউজিল্যান্ডের প্রাক্তনরা নিজেদের দল হারলে (এমনকি জিতলেও) কীরকম চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন, ছোট ছোট ত্রুটিকেও রেয়াত করেন না ধারাভাষ্যে। ভারতের বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিককুল বিসিসিআই প্রযোজিত টিভি সম্প্রচারের আমলে, কর্তাদের চটালে মাঠে ঢোকার অনুমোদন না পাওয়ার যুগে দেশসুদ্ধু লোককে শিখিয়ে দিয়েছেন যে জিতলে সমালোচনা করা হল ছিদ্রান্বেষণ আর হারলে সমালোচনা করতে নেই। দলের পাশে দাঁড়াতে হয়। মুশকিল হল, বারবার ব্যর্থতার ফলে ব্যাপারটা বাংলা ছবির পাশে দাঁড়ানোর মত কঠিন হয়ে যাচ্ছে। পরপর দশটা ম্যাচ জেতার পরে একটা ম্যাচ হেরেছে বলে একথা একটু বেশি কটু শোনাতে পারে। কিন্তু আসলে তো একটা ম্যাচ নয়, ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর থেকে কোনো আইসিসি টুর্নামেন্ট জিততে পারেনি ভারত। দ্বিপাক্ষিক সিরিজের বাইরে জয় বলতে ২০২৩ এশিয়া কাপ। কিন্তু ক্রিকেট বহির্ভূত কারণে (ক্রিকেটিয় কারণ বাদই দিলাম) পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশের যা অবস্থা তাতে ওটাও না জিতলে আর দল রাখার মানে কী?

আসলে ভারতীয় ক্রিকেটের গোটা বাস্তুতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে সত্যকে অস্বীকার করে। বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর একাধিক ক্রিকেট ওয়েবসাইট এবং পরিসংখ্যানবিদ সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন একটা পরিসংখ্যান – ভারত গত তিনটে বিশ্বকাপে মাত্র চারটে ম্যাচ হেরেছে। এমন অনর্থক পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে বা এদেশের অন্য কোনো খেলায় হয় না। প্রাথমিক স্তরের ম্যাচের সংখ্যা নক আউট পর্যায়ের চেয়ে কম তো হবেই। প্রাথমিক স্তরের বেশিরভাগ ম্যাচ না জিতলে নক আউটে ওঠা যায় না। সেমিফাইনাল তো দুটোই হয়, ফাইনাল একটা। জগতে যতদিন পাটিগণিত আছে, ততদিন এমনটাই হবে। পিভি সিন্ধু কোনো প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালে বা ফাইনালে হারলে তাঁর পক্ষ নিয়ে কেউ বলে না, অধিকাংশ ম্যাচই তো জিতেছিল। অতএব চ্যাম্পিয়ন না হলেও ও-ই সেরা খেলোয়াড়। ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজিত দলের সমর্থকরা ঝরঝরিয়ে কাঁদেন, অনেকে ক্ষিপ্তও হয়ে ওঠেন। কিন্তু তাঁরা বা তাঁদের দেশের প্রাক্তন ফুটবলাররা কখনো বলেন না, অধিকাংশ ম্যাচ জিতেছি। অতএব চ্যাম্পিয়ন না হলেও আমরাই সেরা দল। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটে এই জাতীয় নির্বুদ্ধিতার প্রদর্শনী দশ বছর ধরে প্রত্যেক প্রতিযোগিতার পরেই হয়ে থাকে। মায়াবাদের দেশ ভারতবর্ষে কেউ একথা স্বীকার করতে রাজি নন, যে নক আউটে বারবার হার অঘটন হতে পারে না। নিজেদের মধ্যে গলদ আছে, সে গলদ খুঁজে বার করতে হবে এবং সংশোধন করতে হবে। আসলে স্বীকার করতে গেলেই একগাদা অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, অনেক সযত্নলালিত বুদ্বুদ দুম ফটাস হয়ে যাবে। তাতে এই যে কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্রিকেট বাণিজ্য, তার সঙ্গে যুক্ত বিবিধ কায়েমি স্বার্থে ঘা লাগবে।

সেই বুদ্বুদগুলোর আলোচনায় যাওয়ার আগে বলে নেওয়া যাক, ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের কেউ কেউ কখনো কখনো স্বীকার করেন যে বারবার আইসিসি টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হওয়া একটা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। কিন্তু তাঁরাও ব্যাপারটাকে স্রেফ মানসিক বলে আখ্যা দেন। যদি সেটাই ঠিক হয়, তাহলে খেলোয়াড়দের মানসিক সমস্যা দূর করার যেসব অত্যাধুনিক ব্যবস্থা আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞানে আছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ডকে সেগুলো ব্যবহার করতে আটকাচ্ছে কে? নাকি সেসব করেও ফল একই থেকে যাচ্ছে? এসব প্রশ্ন ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের লোকেরা তোলেন না।

এবার বুদ্বুদগুলোর দিকে তাকানো যাক।

১. বেশিরভাগ ম্যাচে জয়

এবারের মত বিশ্বকাপে পরপর দশটা ম্যাচ ভারত কখনো জেতেনি, তার চেয়েও বড় কথা এমন দাপটে জেতেনি। সেই কারণে এই দলের বাহবা প্রাপ্য, কিন্তু সেই সুবাদে ২০১৫ আর ২০১৯ সালের ভারতীয় দলগুলোকেও স্রেফ বেশিরভাগ ম্যাচ জেতার জন্য একইরকম ভাল বলে প্রমাণ করতে চাইলে কিছু অপ্রিয় প্রসঙ্গ না তুলে উপায় থাকে না।

২০০৭ সালে ভারত ভীষণ সহজ গ্রুপে ছিল (অন্য দলগুলো বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং বারমুডা)। তা সত্ত্বেও গ্রুপ স্তর থেকেই বিদায় নেয়। ভারত যেহেতু সবচেয়ে জনপ্রিয় দল, তাই তারা বিদায় নিলে মাঠ ভরে না। তার চেয়েও বড় কথা টিভি রেটিংয়ের বারোটা বেজে যায়। বিজ্ঞাপনদাতাদের বিপুল লোকসান হয়। আইসিসি সেবার বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ফলে ভবিষ্যতে ভারতের দ্রুত বিদায়ের সম্ভাবনা নির্মূল করতেই হত। তাই ২০১১ বিশ্বকাপে ফরম্যাটই বদলে ফেলা হয়। ১৯৯৯ সাল থেকে চালু হয়েছিল গ্রুপ লিগের পর সুপার সিক্স (২০০৭ সালে সুপার এইট) স্তর, তারপর সেমিফাইনাল, ফাইনাল। ২০১১ সালে ফিরে যাওয়া হল ১৯৯৬ সালের ফরম্যাটে। প্রথমে থাকল গ্রুপ স্তর (সাত দলের), তারপর কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল, ফাইনাল। অর্থাৎ একটা দল (পড়ুন ভারত) কমপক্ষে ছটা ম্যাচ খেলবেই গ্রুপ স্তরে, ফাইনাল পর্যন্ত গেলে নটা। ২০১৫ সালে ভারত ছিল পুল বি-তে। সেখানে বাকি ছটা দলের মধ্যে তিনটের নাম আয়ারল্যান্ড, জিম্বাবোয়ে আর সংযুক্ত আরব আমীরশাহী। বাকি তিনটে দলের মধ্যে ছিল ক্ষয়িষ্ণু ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এই পুলের সব ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার জন্যেও আলাদা হাততালি প্রাপ্য? কোয়ার্টার ফাইনালে আবার প্রতিপক্ষ ছিল বাংলাদেশ। সেমিফাইনালে কঠিন প্রতিপক্ষের সামনে পড়ামাত্রই মহেন্দ্র সিং ধোনির দল দুরমুশ হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়া জেতে ৯৫ রানে।

পরের বিশ্বকাপে ফের ফরম্যাট বদলে ফেলা হয়, অনিশ্চয়তা আরও কমিয়ে আনা হয়। বিশ্বকাপ ফুটবল জিততে হলে চার-চারটে নক আউট ম্যাচ জিততে হয়। কিন্তু ২০১৯ থেকে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিততে হলে মোটে দুটো – সেমিফাইনাল আর ফাইনাল। ২০০৭ সালের ১৬ দলের বিশ্বকাপকে ছোট করতে করতে করে দেওয়া হল দশ দলের। সবাই সবার বিরুদ্ধে খেলবে, অর্থাৎ কমপক্ষে নটা ম্যাচ খেলা নিশ্চিত হল। প্রথম চারে থাকলেই সোজা সেমিফাইনাল, সেখান থেকে দুটো ম্যাচ জিতলেই কেল্লা ফতে। এই ব্যবস্থায় ভারত আর নিউজিল্যান্ডের লিগের ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেস্তে যায়, ইংল্যান্ড বেশ সহজেই ভারতকে পরাস্ত করে। সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ড ভারতকে হারিয়ে দেয়।

আগের লেখাতেই লিখেছি, কীভাবে ত্রিদেব শুকিয়ে মারছে বাকি ক্রিকেট দুনিয়াকে। যাঁদের সত্যিই শুধু ক্রিকেটার নয়, ক্রিকেটের প্রতিও ভালবাসা আছে এবং দশ বছরেরও বেশি আগের ক্রিকেট সম্পর্কে জানা আছে, তাঁরা নিশ্চয়ই মানবেন যে ২০১১ সালের পর থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান যেখানে পৌঁছেছে তাতে বিশ্ব ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে তিন-চারটে দলের মধ্যে। এবারের বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখাল, কিন্তু ২০১৯ সালে তাদের অবস্থা ছিল টালমাটাল। ফলে আসলে বিশ্বকাপের দাবিদার ছিল ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ড। ভারত একমাত্র অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পেরেছিল। বাকি দুই দলের কাছেই হারে। ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে গ্রুপের খেলায় হারতে হয়েছিল শ্রীলঙ্কার কাছে আর ফাইনালে শোচনীয় হার হয়েছিল পাকিস্তানের কাছে। ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির আলোচনায় যাওয়া অর্থহীন, কারণ সেখানে ২০০৭ সালে খেতাব জয় বাদ দিলে ভারতের অবস্থা আরও করুণ।

সুতরাং বেশিরভাগ ম্যাচে জেতার তথ্যকে গলার মালা করে লাভ নেই। সমস্যাটাও মোটেই স্রেফ মানসিক নয়, দক্ষতাজনিত।

২. দক্ষতার দিক থেকে বিশ্বসেরা

বিশ্বসেরার শিরোপা যে নেই তা তো বলাই বাহুল্য, কিন্তু দক্ষতার দিক থেকে বিশ্বসেরা – এই ধারণাও দাঁড়িয়ে আছে নরম মাটির উপরে। ক্রিকেটে কোনোদিনই দক্ষতা মানে কেবল ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং করার পারদর্শিতা নয়। সঠিক পরিকল্পনার দক্ষতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। আজকের ভিডিও অ্যানালিসিস ইত্যাদি অতি উন্নত প্রযুক্তির যুগে সঠিক পরিকল্পনার গুরুত্ব ও ক্ষমতা আরও বেড়ে গেছে। ভারতীয় দল কি সেইখানে অন্য দলগুলোর সমতুল্য? স্মৃতিতে এখনো টাটকা এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল দিয়েই দেখা যাক।

ফাইনালে

ম্যাচের প্রথম বল থেকেই পরিষ্কার হয় যে অস্ট্রেলিয়া একবার ভারতের সঙ্গে খেলা হয়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয়বার খেলতে এসেছে অনুপুঙ্খ পরিকল্পনা নিয়ে। প্রত্যেক ভারতীয় ব্যাটারের জন্যে ছিল আলাদা আলাদা পরিকল্পনা।

রোহিত শর্মা প্রত্যেক ম্যাচে ঝোড়ো সূচনা করেছেন, তাঁর বেশিরভাগ চার ছয় হয়েছে অফ সাইডে পয়েন্টের পর থেকে মিড অফ পর্যন্ত এলাকা দিয়ে আর লেগ সাইডে স্কোয়্যার লেগ দিয়ে। অস্ট্রেলিয়া ঠিক ওই দুই জায়গায় সীমানার ধারে ফিল্ডার রেখে বল করা শুরু করে। তার উপর আগের ম্যাচগুলো ভারত যেসব মাঠে খেলেছে তার তুলনায় নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের মাঠ বড়। অন্য ম্যাচে যেসব শটে চার বা ছয় হচ্ছিল, সেগুলোতে এক-দুই রান হতে শুরু করল। ফলে প্রথম দু-এক ওভার রোহিতকে কিছুটা হতাশ করে। তিনি অবশ্য একটু পরেই এই পরিকল্পনাকে পরাস্ত করে মারতে শুরু করেন। তখন আসে দ্বিতীয় পরিকল্পনা। পাওয়ার প্লে শেষ না হতেই গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে দিয়ে স্পিন করানো, যাতে জোরে বোলারের গতি রোহিতকে বড় শট নিতে সাহায্য না করে। তাঁকে যেন অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করতে হয়, ভুল করার সম্ভাবনা বাড়ে। ম্যাক্সওয়েল প্রথমে মার খেলেও শেষপর্যন্ত এই পরিকল্পনায় ফল হয়, রোহিত বড় শট নিতে গিয়ে আউট হয়ে যান।

শুভমান গিলের মূল শক্তি পয়েন্ট থেকে কভার পর্যন্ত অঞ্চল দিয়ে সামনের পায়ে ড্রাইভ করে বাউন্ডারি পাওয়া আর সামান্য খাটো লেংথের বলে একটুখানি হাত খোলার জায়গা পেলেই স্কোয়্যার কাট করা। তাঁকে কাট করার কোনো সুযোগই দেওয়া হল না এবং অফ সাইডে ফিল্ডারের ভিড় জমিয়ে দেওয়া হল। গিল নিজেও জানেন তাঁর ড্রাইভ কখনো কখনো কিছুটা পথ হাওয়ায় যাত্রা করে, তার উপর সেদিনের পিচটা ছিল মন্থর। ফলে তেমন হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি। সেই ভাবনায় বিব্রত রাখতে শর্ট কভার দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল মুখের সামনে। গিল রান করার জায়গা খুঁজে না পেয়ে হাঁসফাঁস করলেন, তারপর অফের বল জোর করে লেগে ঘুরিয়ে মারতে গিয়ে মিড অনে ক্যাচ দিয়ে আউট হলেন।

বিরাট কোহলিকে চটপট আউট করতে হলে ক্রিজে এসেই তিনি যে খুচরো রান নিতে শুরু করেন তা আটকাতে হয়। লখনৌতে পিচ ছিল আমেদাবাদের মতই মন্থর। সেখানে ইংল্যান্ড কভারে, মিড উইকেট, মিড অফ, মিড অনে লোক দাঁড় করিয়ে সফলভাবে আট বল কোনো রান করতে দেয়নি। নবম বলে তিনি ধৈর্য হারিয়ে জোরে ড্রাইভ করতে গিয়ে মিড অফে ক্যাচ দিয়ে আউট হন। অস্ট্রেলিয়াও তাঁকে মোটামুটি চুপ রাখছিল, কিন্তু মিচেল স্টার্ক একটা ওভারে নো বল করার পর খেই হারিয়ে ফেললেন। কোহলি পরপর তিনটে চার মেরে দিলেন। পরিকল্পনা ব্যর্থ হল। তবু অস্ট্রেলিয়া কোনো সময়েই তাঁকে শট নেওয়ার জন্যে বেশি জায়গা দেয়নি, হাফভলি প্রায় পাননি। যে পিচে বল ব্যাটে আসছে না, সেখানে কোহলির পছন্দের খেলা – বলের গতিকে ব্যবহার করে ফিল্ডারদের ফাঁকে বল ঠেলে দিয়ে দৌড়ে রান নেওয়া – বেশ শক্ত। অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্স সমেত সব জোরে বোলারই স্লোয়ারের উপর জোর দিচ্ছিলেন। মোটেই দরকার অনুযায়ী রান হচ্ছিল না। উলটো দিকে কে এল রাহুল তো সেদিন বিশ্বকাপের মন্থরতম অর্ধশতরান করেছেন। ফলে কোহলির উপর চাপ বাড়ছিল। যতই মনে হোক তিনি নিশ্চিত শতরানের দিকে এগোচ্ছিলেন আর কপাল দোষে কামিন্সের বলটা ব্যাটে লেগে উইকেটে পড়ল, আসলে কোহলি কখনোই স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। ওই পিচে বারবার স্কোয়্যারে বল ঠেলে রান নিতে থাকলে গায়ের দিকে আসা খাটো লেংথের বলে ওভাবে প্লেড অন হওয়া মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়।

রাহুলের জন্যে কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন পড়েনি হয়ত। তিনি বেশ কিছুদিন হল একদিনের ক্রিকেট তো বটেই, কুড়ি বিশের ক্রিকেটেও এমনভাবে ব্যাট করেন যা দেখে মনে পড়ে কবীর সুমনের গান “ও গানওলা, আরেকটা গান গাও। আমার আর কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই।” সেমিফাইনালে যেরকম নির্ভেজাল পাটা উইকেট পাওয়া গিয়েছিল এবং দেরিতে ব্যাট করতে নামার সুযোগ পেয়েছিলেন, একমাত্র সেরকম ক্ষেত্রেই রাহুলকে চার ছয় মারতে ইচ্ছুক দেখা যায়। অন্যথায় তিনি ওরকম মন্থর ব্যাটিংই করেন, তারপর হয় স্টার্কের বলটার মত একটা দারুণ বলে আউট হয়ে যান, নয়ত উপায়ান্তর নেই দেখে মারতে গিয়ে আউট হন।

মধ্যে ছিলেন শ্রেয়স আয়ার। তাঁর জন্যেও স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল। সাংবাদিক সম্মেলনে শর্ট বল নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি যতই রাগ করুন আর শ্রীলঙ্কা বা নিউজিল্যান্ডের বোলারদের বিরুদ্ধে যতই শতরান হাঁকান; কামিন্স, স্টার্ক, জশ হেজলউডের মত দীর্ঘদেহী জোরে বোলারদের বিরুদ্ধে তিনি যে সামনের পায়ে আসতে ইতস্তত করেন তা সাদা চোখেই দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক তাঁকে গুড লেংথে বল করলেন, তিনি সামনের পায়ে না এসে দোনামোনা করে খেলে খোঁচা দিয়ে ফেললেন।

সূর্যকুমার যাদবের শক্তি হল বোলারদের গতিকে কাজে লাগিয়ে মাঠের দুরূহ কোণে বল পাঠানো। আমেদাবাদের পিচে সে কাজটা এমনিতেই শক্ত ছিল। তার উপর অস্ট্রেলিয়া তাঁকে কোনো গতিই দেয়নি। যে বলে আউট হলেন সেটাও ছিল হেজলউডের মন্থর গতির খাটো লেংথের বল।

রবীন্দ্র জাদেজা টেস্টে ব্যাট হাতে দিব্যি ধারাবাহিক, একদিনের ক্রিকেটে মোটেই তা নন। তবু কেন তাঁকে সূর্যকুমারের আগে পাঠানো হয়েছিল তা রোহিত আর রাহুল দ্রাবিড়ই জানেন। কিন্তু তিনিও অলরাউন্ডারসুলভ কিছু করে উঠতে পারেননি। অনেকগুলো বল খেলে মোটে নয় রান করে অসহায়ের মত আউট হন।

এত পরিকল্পনার বিপরীতে ভারতের পরিকল্পনা কীরকম ছিল?

দুনিয়াসুদ্ধ লোক জানে ডানহাতি জোরে বোলার রাউন্ড দ্য উইকেট বল করলে ডেভিড ওয়ার্নার অস্বস্তি বোধ করেন। ইংল্যান্ডের স্টুয়ার্ট ব্রড সব ধরনের ক্রিকেটেই তাঁকে ওইভাবে বল করে বহুবার আউট করেছেন। অথচ মহম্মদ শামি শুরু করলেন যথারীতি ওভার দ্য উইকেট এবং চার হল। ওয়ার্নার ভাগ্যিস আত্মঘাতী শট খেলে আউট হয়ে গেলেন।

ট্রেভিস হেডের অস্বস্তি যে শরীর লক্ষ করে ধেয়ে আসা খাটো লেংথের বলে, তাও সুবিদিত। কিন্তু শামি আর যশপ্রীত বুমরা – দুজনেই তাঁকে অফস্টাম্পের বাইরে বল দিয়ে গেলেন, তিনিও বলের লেংথ অনুযায়ী কখনো সামনের পায়ে কখনো পিছনের পায়ে কভার, মিড অফ দিয়ে রান করে গেলেন। যতক্ষণে মহম্মদ সিরাজ তাঁকে শরীর লক্ষ করে বল করা শুরু করলেন ততক্ষণে ট্রেভিস হেড ক্রিজে জমে গেছেন।

মারনাস লাবুশেন আরেকটু হলে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ দলে সুযোগই পেতেন না। কারণ তিনি বড় শট নিতে পারেন না বললেই হয়। তাই তাঁর কাজ একটা দিক ধরে থাকা, খুচরো রান নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখা। এটাও গোপন তথ্য নয়। খুচরো রান নিতে না পারলেই যে লাবুশেন হাঁকপাক করেন, বিশেষ করে স্পিনারের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক শট নিতে গিয়ে বিপদে পড়েন তা চেন্নাইয়ের ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচেও দেখা গিয়েছিল। অথচ ফাইনালে তিনি ব্যাট করতে আসার পরে তাঁর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করার কোনো চেষ্টা হয়েছিল কি? এক প্রান্ত থেকে স্পিনার এনে মুখের সামনে ফিল্ডার দাঁড় করিয়েও অন্যরকম চেষ্টা করা যেত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে যে দল পরিকল্পনার দক্ষতায় প্রতিপক্ষের থেকে এতখানি পিছিয়ে থাকে, তাকে দক্ষতায় বিশ্বসেরা কী করে বলা যায়?

. এক দিনের ভুল

কেউ বলতেই পারেন, একটা ম্যাচ হারলেই এত কিছুকে ভুল বলে দেগে দেওয়া অন্যায়। ওই পরিকল্পনা নিয়েই তো টানা দশটা ম্যাচ জিতেছে। ঘটনা হল, ফাইনাল আর দশটা ম্যাচের মতই আরেকটা ম্যাচ – একথা মাইকের সামনে বলতে ভাল, শুনতে আরও ভাল। কিন্তু কোনো ভাল দল ওই কথা বিশ্বাস করে বসে থাকে না। ফাইনালে তো বটেই, যে কোনো নক আউট ম্যাচেই সকলে বেশি তৈরি হয়ে আসে। অস্ট্রেলিয়াই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। আর গত দশ বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, ভারত আলাদা প্রস্তুতি নেয় না। সেই কারণেই বারবার অপ্রস্তুত হয়।

এই প্রস্তুতিহীনতা অবশ্য কেবল নক আউটের ব্যাপার নয়, এই বিশ্বকাপের ব্যাপারও নয়। মহেন্দ্র সিং ধোনির আমল থেকেই স্টেজে মেরে দেওয়ার প্রবণতা আর কিছু গোঁড়ামি ভারতীয় দলের মজ্জাগত হয়ে গেছে। সেগুলো কী কী কারণে নক আউটের আগে ভারতকে অসুবিধায় ফেলে না তা যাঁরা এতদূর পড়ে ফেলেছেন তাঁরা বুঝে ফেলেছেন। এবার প্রবণতাগুলো কী তা দেখে নেওয়া যাক:

বিশ্বকাপের দল তৈরি করতে হয় চার বছর ধরে। কিন্তু ২০১৫ বিশ্বকাপের পরের চার বছরেও ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট একজন চার নম্বর ব্যাটার ঠিক করতে পারেনি। ২০১৮ সালে অধিনায়ক কোহলি বলে দিয়েছিলেন, আম্বাতি রায়ুডুই হবেন বিশ্বকাপের চার নম্বর। শেষমেশ যখন বিশ্বকাপের দল ঘোষণা হল তখন দেখা গেল রায়ুডু আদৌ দলে নেই। বিজয়শঙ্কর বলে একজন হঠাৎ টিম ম্যানেজমেন্টের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিলেন। কেন তা আজও বোঝা যায়নি। প্রায় খেলা ছেড়ে দেওয়া দীনেশ কার্তিকও বিশ্বকাপ খেলতে চলে গেলেন, রায়ুডু বাদ। দলের অত গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা নিয়ে অমন ফাজলামি করে কোনো দল কোনোদিন বিশ্বকাপ জেতেনি। পরের চার বছরেও বিস্তর কাটা জোড়ার পরে শ্রেয়সে মনস্থির করতে পারল টিম ম্যানেজমেন্ট, কিন্তু হার্দিক পান্ডিয়া ছাড়া অলরাউন্ডার পাওয়া গেল না। তাঁর বদলে কাজ চালাতে পারেন ভেবে যাঁকে নেওয়া হয়েছিল, সেই শার্দূল ঠাকুরকে বল হাতে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। ব্যাটেও তিনি বিশেষ সুবিধা করতে পারেন না। সেই যে অস্ট্রেলিয়ায় একটা টেস্টে রান করে দিয়েছিলেন, সেই ভরসাতেই আজও তাঁকে অলরাউন্ডার বলে চালানো হচ্ছে। এ সমস্যার একটা সহজ সমাধান হতে পারত, যদি ভারতের ব্যাটাররা কেউ কেউ কাজ চালানোর মত বোলিং করতে পারতেন। এই বিশ্বকাপে যেখানে উইকেটে বল ঘুরেছে, অস্ট্রেলিয়ার হয়ে কাজ চালানোর চেয়ে বেশি কাজই করেছেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল আর হেড। নিউজিল্যান্ডেরও ছিলেন গ্লেন ফিলিপস, ড্যারিল মিচেল, মিচেল স্যান্টনার, রচিন রবীন্দ্ররা। দক্ষিণ আফ্রিকার এইডেন মারক্রামের অফস্পিনও মন্দ নয়। কিন্তু রোহিতের হাতে ঠিক পাঁচজন বোলার। তাঁদের একজন মার খেয়ে গেলে সমূহ বিপদ। ওই পাঁচজন এতটাই ভাল বল করেছেন ফাইনাল পর্যন্ত, যে এই ফাঁকটা ধরা পড়েনি। কিন্তু একদিনের ক্রিকেটে এ ফাঁক বড় ফাঁকি। এ নিয়েই বিশ্বকাপ জিতে গেলে সেও এক ইতিহাস হত। ফাইনালে হেড আর লাবুশেন জমে যেতেই ফাঁকি ধরা পড়ে গেল, অধিনায়ক নিরুপায়।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট মানে ফলাফল নিরপেক্ষ ব্যবসা

আমাদের ব্যাটাররা বল করতে পারেন না কেন? বোলারদের ব্যাটের হাতেরই বা কেন উন্নতি হচ্ছে না? এসব প্রশ্ন করলেই মহাতারকাদের মহা ইগোর কথা উঠে আসবে। রোহিত নিজে দীর্ঘকাল কাজ চালানোর মত অফস্পিন বল করতেন, অনেকদিন হল ছেড়ে দিয়েছেন। কোহলিও মিডিয়াম পেস বল করতেন, তিনিও ছেড়ে দিয়েছেন। কেন ছাড়লেন? দলের প্রয়োজন থাকতেও কেন আবার শুরু করেননি? দেবা ন জানন্তি। এঁদের কি এমন কোনো চোট আছে যা বল করলে বেড়ে যেতে পারে? তেমন কোনো খবর নেই কিন্তু।

শচীন তেন্ডুলকরের (ম্যাচ ৪৭০, বল ৮০৫৪, ওভার পিছু রান ৫.১০, উইকেট ১৫৪, সেরা বোলিং ৫/৩২) টেনিস এলবো হয়েছিল, একসময় কোমরে বেল্ট পরে ব্যাট করতে নামতে হয়েছিল, তারপর সেই চোট মাস ছয়েকের জন্যে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তার আগে পরে বল করেছেন, ম্যাচ জিতিয়েছেন। বীরেন্দ্র সেওয়াগও (ম্যাচ ২৫১, বল ৪৩৯২, ওভার পিছু রান ৫.২৬, উইকেট ৯৬, সেরা বোলিং ৪/৬) চোটমুক্ত ছিলেন না, কিন্তু বল করতেন। সৌরভ গাঙ্গুলির (ম্যাচ ৩১১, বল ৪৫৬১, ওভার পিছু রান ৫.০৬, উইকেট ১০০, সেরা বোলিং ৫/১৬) ফিটনেস তো হাস্যকৌতুকের বিষয় ছিল। অথচ বল করে একাধিক স্মরণীয় জয় এনে দিয়েছেন।

সুরেশ রায়না (ম্যাচ ২২৬, বল ২১২৬, ওভার পিছু রান ৫.১১, উইকেট ৩৬, সেরা বোলিং ৩/৩৪) এঁদের মত অত উঁচু দরের ব্যাটার ছিলেন না, কিন্তু মিডল অর্ডারে ভরসা দিয়েছেন একসময়। দরকারে অফস্পিনটাও করে দিতেন।

এদিকে আজকের মহাতারকা ব্যাটারদের কেবল ফিটনেস নিয়েই কয়েকশো প্রবন্ধ লেখা হয়েছে, রোজ লক্ষ লক্ষ গদগদ পোস্ট হয় সোশাল মিডিয়ায়। কিন্তু ওঁরা বল করতে পারেন না। কেদার যাদব বলে একজন ছিলেন। মারকুটে ব্যাট আর খুব নিচ থেকে বল ছেড়ে অফস্পিন করতেন, মারা সোজা ছিল না। বিরাটের সঙ্গে শতরান করে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটা স্মরণীয় ম্যাচ জিতিয়েছিলেন। তিনি হঠাৎ কোনো অজ্ঞাত কারণে নির্বাচক ও টিম ম্যানেজমেন্টের বিষনজরে পড়ে বাদ চলে যান ২০২০ সালে।

২০১৪ সালের ইংল্যান্ড সফরে দেখা গিয়েছিল ভুবনেশ্বর কুমারের ব্যাটের হাত রীতিমত ভাল। ট্রেন্টব্রিজ টেস্টের দুই ইনিংসেই অর্ধশতরান করেছিলেন। আবার ২০১৭ সালে পাল্লেকেলেতে যখন শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ১৩১ রানে সাত উইকেট পড়ে যায়, তখন অপরাজিত ৫৩ রান করে মহেন্দ্র সিং ধোনির সঙ্গে জুটিতে ১০০ রান তুলে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন। মাঝে বেশ কিছুদিন একদিনের দলের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিলেন ভুবনেশ্বর। অথচ তাঁকে গড়েপিটে অলরাউন্ডার করে তুলতে পারেননি সর্বকালের সেরা ভারতীয় দল তৈরি করার কৃতিত্ব যিনি দিনরাত দাবি করেন, সেই রবি শাস্ত্রী, আর তাঁর আদরের দুই অধিনায়ক ধোনি, কোহলি।

এখনকার বোলারদের মধ্যে শামি আর বুমরা দুজনেই যে ব্যাটিং উপভোগ করেন তা টেস্ট ক্রিকেটে স্পষ্ট দেখা যায়। শামি দিব্যি কয়েকটা বড় শট নিয়ে ফেলতে পারেন। বুমরা আরও এক ধাপ এগিয়ে। স্টুয়ার্ট ব্রডকে ঠেঙিয়ে টেস্টে এক ওভারে সবচেয়ে বেশি রান দেওয়ার রেকর্ড করিয়ে নিয়েছেন তিনি।

এঁদের ব্যাটের হাতটা যত্ন করে আরেকটু ভাল করে দেওয়ার কাজটুকুও যদি না পারেন, তাহলে রাহুল দ্রাবিড় আর ব্যাটিং কোচ বিক্রম রাঠোর করেনটা কী? রোহিত, কোহলিকে তো আর হাতে ধরে ব্যাটিং শেখাতে হয় না।

আসলে এসব করতে গেলে নমনীয়তা দরকার। কিন্তু ভারতীয় দলের একদিনের ক্রিকেটের ব্যাটিং আর গোঁড়ামি সমার্থক। বেশিরভাগ পাঠক রে রে করে তেড়ে আসবেন জেনেও না বলে উপায় নেই, শচীন আর সেওয়াগের প্রস্থানের পর থেকে ভারত একদিনের ক্রিকেটে যে ব্যাটিংটা করছিল এতকাল, সেটা গত শতাব্দীর ব্যাটিং। রোহিত আর শিখর ধাওয়ান যেভাবে ইনিংস শুরু করতেন – একজন মারতেন, আরেকজন ধরে ধরে খেলতেন – সেটা করা হত ১৯৯৬ বিশ্বকাপের আগে পর্যন্ত। সনৎ জয়সূর্য আর রমেশ কালুভিথরনা সেই ধারা বদলে দেন। শচীন-সৌরভ, সৌরভ-সেওয়াগ, শচীন-সেওয়াগ মান্ধাতার আমলের ছকে ফেরত যাননি। ২০০০ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে ওঠা, ২০০২ ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি জয়, ২০০৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা, ২০১১ বিশ্বকাপ জয় – এসবের পিছনে ভারতের ওপেনিং জুটির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।

এদিকে বিশ্বজয়ী অধিনায়ক ধোনি নিজে ‘ফিনিশার’, বিশ্বাস করতেন যে কোনো জায়গা থেকে ম্যাচ জিতিয়ে দেবেন। সম্ভবত সে কারণেই ২০১২ সালে শচীন আর ২০১৩ সালে সেওয়াগের প্রস্থানের পর উইকেট হাতে রেখে খেলার নীতি তিনি চালু করেন। রোহিতের যতদিন বয়স ছিল, ধৈর্য আর রিফ্লেক্স দুটোই ভাল ছিল, ততদিন লম্বা ইনিংস খেলে পরের দিকে স্ট্রাইক রেটের ঘাটতি পুষিয়ে দিতেন। কোহলির তখন স্বাভাবিক খেলাতেই অতি দ্রুত রান হত। ওই ক্ষমতাই তাঁকে রান তাড়া করার রাজায় পরিণত করেছিল। তার প্রমাণ ২০১২ সালে হোবার্টে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে, ২০১৩ সালে জয়পুরে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বা ২০১৭ সালে পুনেতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলা ইনিংসে রয়েছে। ধোনিও সত্যিই শেষ লগ্নে যে কোনো রান তুলে দিতে পারতেন। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে ধোনির বড় শট নেওয়ার ক্ষমতা ক্রমশ কমে আসে। তাঁর মত রিফ্লেক্স-নির্ভর, চোখ আর হাতের সমন্বয়ের উপর নির্ভরশীল ব্যাটারের ক্ষেত্রে ওই বয়সে সেটা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি ততদিনে ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বশক্তিমান তারকা। বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? মহিন্দর অমরনাথ ২০১১ সালের শেষদিকে টেস্ট ক্রিকেটে বাঁধতে চেয়েছিলেন, ধোনির গডফাদার এন শ্রীনিবাসন তাঁকে হেলিকপ্টার শট মেরে গ্যালারিতে পাঠিয়ে দেন।

যা-ই হোক, ঘটনা হল দুই প্রান্ত থেকে দুটো নতুন বল আর আগাগোড়া পাওয়ার প্লের যুগে বেশি ঝুঁকি নিয়ে অনেক বেশি রান করাটাই ব্যাটিং। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড সে খেলাই খেলছে গত এক দশক। তারাই জিতেছে বিশ্বকাপ, ভারত ২০১৩ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জেতার পর থেকে জিতেছে শুধু কিছু অর্থহীন দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। ধোনির বয়স যত বেড়েছে তিনি সত্যকে অস্বীকার করে সেই পুরনো খেলাই খেলে গেছেন এবং যে ম্যাচেই অন্য কেউ বড় শট নিতে পারেনি, সেখানে ধোনি শেষ অবধি ক্রিজে থেকেও ‘ফিনিশ’ করতে পারেননি। ওই চক্করে ২০১৯ বিশ্বকাপটাই ফিনিশ করে দিয়ে গেছেন। ধোনিভক্তরা আজও বীরবিক্রমে বলেন, মার্টিন গাপ্টিলের ওই থ্রোটা উইকেটে না লাগলেই নাকি…। অথচ ওই বিশ্বকাপেই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ধোনি শেষ ওভার পর্যন্ত ক্রিজে ছিলেন (৩১ বলে অপরাজিত ৪২), ভারত দুই কি পাঁচ রানেও নয়, ৩১ রানে হেরেছিল। ওই ম্যাচের স্কোরকার্ডের দিকে তাকালেই দুই দলের ব্যাটিং ভাবনার তফাতটা দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে যায় এবং ওই ভাবনাই যে তফাত গড়ে দিচ্ছে তাও স্পষ্ট বোঝা যায়।

২০১৯ সালের পর থেকে কোহলি, রোহিতেরও বয়স বাড়ছে। পাওয়ার প্লের নিয়ম বদলাচ্ছে, আরও বেশি রান উঠছে। রোহিত তো ধোনির আমলে ইনিংস শুরু করার সময় থেকে বরাবরই প্রথমে রক্ষণ, পরে আক্রমণ নীতিতে খেলে এসেছেন। সেভাবেই তিনবার দ্বিশতরান করেছেন। তিনি বদলাবেন কেন? এদিকে কোহলিরও ক্ষমতা কমছে। যত কমছে তিনি তত সাবধানী হচ্ছেন। আজকের একদিনের ক্রিকেটে ঝুঁকি না নিলে কোহলির দরের ব্যাটার রোজ অর্ধশতরান করতে পারেন। তাও মাঝে তিন-চার বছর তাঁর সব ধরনের ক্রিকেটেই সময় খারাপ যাচ্ছিল। পঁচিশ ইনিংস পরে একদিনের ক্রিকেটে শতরান এল গত বছর ডিসেম্বরে চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। মনে রাখা ভাল, সিরিজটা ভারত আগেই হেরে গিয়েছিল। কোহলির শতরানটা আসে সিরিজ হেরে যাওয়ার পরের ম্যাচে। অতঃপর কোহলি ছন্দে ফিরেছেন, বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও হলেন। কিন্তু দেখা গেল তিনি ধোনিসুলভ সাবধানী ব্যাটিং করছেন। ধোনির চেয়ে কোহলি অনেক উঁচু দরের ব্যাটার, তাছাড়া নামেনও অনেক আগে। তাই রান করছেন বেশি, কিন্তু দ্রুত রান তোলার দায়িত্ব অন্য কাউকে নিতে হচ্ছে। ফাইনালে সে দায়িত্ব রাহুল পালন করতে পারেননি। পরিসংখ্যান বলছে, ফাইনালে প্রথম দশ ওভারের পরে ভারত মাত্র চারটে চার মেরেছে। ২০০৫ সালের পর পুরুষদের একদিনের ম্যাচে এটা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এই ব্যাটিং কোনো ম্যাচ জেতাতে পারে না, বিশ্বকাপ ফাইনালে জেতা তো অসম্ভব। এমন ইনিংসে মহাতারকা পঞ্চাশ, একশো যা-ই করুন; কী এসে যায়?

সত্যিকারের বিশ্লেষণ করলে স্বীকার করতে হবে, ফাইনালে ভারতকে হারিয়েছে মিডল অর্ডার ব্যাটিং। বোলিং নয়। বস্তুত, গত চার-পাঁচ বছরে ভারতীয় বোলাররা টেস্টে এবং একদিনের ক্রিকেটে এত বেশি হারা ম্যাচ জিতিয়ে দিয়েছেন যে ব্যাটারদের এরকম মন্থর ব্যাটিং, সার্বিক ব্যর্থতা – সবই ঢেকে গেছে বারবার। এবারের ইংল্যান্ড ম্যাচও অমন হইহই করে জেতার কথা নয় ওই কটা রান নিয়ে। কিন্তু ঐন্দ্রজালিক জুটি শামি-বুমরা ফর্মে থাকলে সবই সম্ভব। তার উপর আছেন মহম্মদ সিরাজ আর রহস্যময় কুলদীপ যাদব, যাঁর কোনটা গুগলি আর কোনটা সাধারণ লেগ ব্রেক তা বুঝতে ফাইনালে ট্রেভিস হেড আর মারনাস লাবুশেনের আগে পর্যন্ত সব দলের ব্যাটাররা হিমশিম খেলেন। এঁদের সঙ্গে রবীন্দ্র জাদেজা। কিন্তু এঁরা কোনোদিন ব্যর্থ হবেন না এমন দাবি করা চলে না। তাই হাতে রান থাকা দরকার। কথাটা আর কেউ না বুঝুক, অধিনায়ক রোহিত বুঝেছিলেন। তাই বিশ্বকাপে এসে নিজের ব্যাটিং বদলে ফেললেন। কিন্তু দলের সবচেয়ে বড় তারকাকে বদলানোর সাধ্য তাঁরও নেই। কোহলি ঠিক তিনটে শতরান সমেত ৭৬৫ রান করলেন। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপের প্রথম দশজন রান সংগ্রাহকের মধ্যে একমাত্র তাঁর আর রাহুলের স্ট্রাইক রেটই একশোর নিচে

অস্ট্রেলিয়াকে ফাইনালে জেতাল হেড আর লাবুশেনের চতুর্থ উইকেট জুটি, ভারতকে হারাল কোহলি আর রাহুলের শম্বুক গতির চতুর্থ উইকেট জুটি। অথচ ভারত এমন আজব দেশ, তারকা সাংবাদিক থেকে ফেসবুক পণ্ডিত – সকলে এখনো প্রশ্ন করে যাচ্ছেন, রোহিত কেন ওই শটটা খেলতে গেল? ফাইনালে কেউ ওরকম খেলে? সাক্ষ্যপ্রমাণ বলছে ফাইনালে রোহিত ওই ব্যাটিং না করলে অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্যটা আরও কম হত, ম্যাচটা আরও আগে শেষ হত।

তারকা থেকে ক্রিকেটপ্রেমী – গোটা বাস্তুতন্ত্রের গোঁড়ামি না কাটলে ভারতীয় ক্রিকেট, দেশটার মতই, পিছন দিকে এগোতে থাকবে।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হল কি এই বিশ্বকাপে?

গতবছর অস্ট্রেলিয়ায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের সিরিজেও গ্যালারিতে মাছি তাড়ানোর লোক ছিল না ঠিক ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির পরেই। এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ভারতেও ভারত না খেললে মাঠ ভরানো দুষ্কর।

পৃথিবীর যে কোনো দলগত খেলায় বিশ্বকাপ হয় চার বছর অন্তর। দর্শকরা ওই এক-দেড় মাসের অপেক্ষায় থাকেন, খেলোয়াড়রাও আজীবন স্বপ্ন দেখেন – বিশ্বকাপে খেলব, দেশকে জেতাব, ক্রীড়াপ্রেমীদের চোখের মণি হব। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বয়স প্রায় দেড়শো বছর হলেও বিশ্বকাপটা অন্য অনেক খেলার চেয়ে নবীন। বিশ্বকাপ ফুটবল সাত বছর পরেই শতবর্ষে পড়বে, অথচ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের বয়স এখনো পঞ্চাশ হয়নি। ইতিমধ্যেই তার রমরমা কমে এল। চার বছর পরে বিশ্বকাপ হলে যে প্রতীক্ষা আর প্রত্যাশা বিশ্বকাপকে বিরাট করে তোলে তা বেশ খানিকটা লঘু করে ফেলেছে ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল, নিজেই। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি হয় এক বছর অন্তর এবং দুটো পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপের মাঝের বছরগুলোতে। ফলে সব দলকে একই প্রতিযোগিতায় খেলতে দেখার যে অভিনবত্ব তা কমে গেছে। খেলোয়াড়দের নায়ক হওয়ার সুযোগও বেড়েছে।

আমরা যারা পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট ভালবাসি, তারা বুঝতে পারি যে টেস্ট ক্রিকেটের ধাঁচে এই খেলাতেও দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর ফিরে আসা যায়। এই ধিকিধিকি জ্বলতে জ্বলতে শেষে ফেটে পড়ার রোমাঞ্চ টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে নেই। সেরা টি টোয়েন্টি ইনিংসও গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে করা দ্বিশতরানের মত মহাকাব্যিক হওয়া সম্ভব নয়, কারণ মহাকাব্য হয়ে ওঠার সময়টাই নেই ওখানে। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয়তায় একদিনের ক্রিকেট অনেক পিছিয়ে পড়েছে। তার কোনো সুরাহা এই বিশ্বকাপ করতে পারল বলে মনে হয় না।

একদিনের ক্রিকেট বা তার বিশ্বকাপ চালু হয়েছিল টেস্ট ক্রিকেট সম্পর্কে শীতল হয়ে পড়া দর্শকদের মাঠে ফেরানোর প্রয়োজনে। টি টোয়েন্টি আর তার বিশ্বকাপের জন্ম কিন্তু একদিনের ক্রিকেটে অনীহা এসে যাওয়া দর্শককে মাঠে ফেরাতে হয়নি। ২০০৭ সাল নাগাদ সারা পৃথিবীর দর্শক মোটেই একদিনের ক্রিকেট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি। সেই সমস্যা ছিল মূলত ইংল্যান্ডে, যেখানে ক্রিকেটের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রিমিয়ার লিগ ফুটবল। বস্তুত সে বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে কুড়ি ওভারের ক্রিকেট জিনিসটা ঠিক কী, তা অনেক ক্রিকেট খেলিয়ে দেশেরই খুব একটা জানা ছিল না। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড, বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া, টি টোয়েন্টি সম্পর্কে প্রথম দিকে রীতিমত অনাগ্রহী ছিল। ব্যবসায়িক সম্ভাবনার দিকটা তাদের চোখে পড়ে মহেন্দ্র সিং ধোনির দল প্রথম ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি খেতাব জিতে ফেলার পর। সেটাই কাল হল একদিনের ক্রিকেটের। ২০০৭-০৮ সালে বিসিসিআই প্রথমে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগে খেলার অপরাধে এক দল ভারতীয় ক্রিকেটারকে নির্বাসন দেয় (সেই তালিকায় অন্যতম পরিচিত নাম হল আম্বাতি রায়ুডু), পরে নিজেরাই ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ খুলে বসে। ২০১১ সালে ভারত একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপও জিতে ফেলে। সে বছর অক্টোবরে চালু হয় একদিনের ক্রিকেটে দু প্রান্ত থেকে দুটো বলে খেলার নিয়ম, টি টোয়েন্টির দেখাদেখি বাউন্ডারির দড়ি ক্রমশ ঢুকে আসতে শুরু করে মাঠের ভিতর। ব্যাট, বলের লড়াই একতরফা করে দিয়ে ছোটে রানের ফুলঝুরি আর একদিনের ক্রিকেট ক্রমশ একঘেয়ে হয়ে উঠতে থাকে।

আরও পড়ুন বিশ্বকাপে কী হবে ভুলে যান, আইপিএল দেখুন

সেই ধারায় কোনো পরিবর্তন এল কি এই বিশ্বকাপে? যে কোনো খেলায় বিশ্বকাপের কাছে সবসময় ক্রীড়াপ্রেমীদের প্রত্যাশা থাকে নতুন কিছুর – নতুন তারকা, নতুন কৌশল, খেলার দর্শনের কোনো নতুন দিক, ভবিষ্যতের নতুন দিশা। তেমন কিছু কি পাওয়া গেল? যা যা নতুন দেখা গেল সেগুলো কি খুব আশাব্যঞ্জক?

ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকায় যে একদিনের ক্রিকেট দেখতে মাঠে লোক হয় না, সে খবর অনেকদিন হল ঠোঙা হয়ে গেছে। গতবছর অস্ট্রেলিয়ায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের সিরিজেও গ্যালারিতে মাছি তাড়ানোর লোক ছিল না ঠিক ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির পরেই। এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ভারতেও ভারত না খেললে মাঠ ভরানো দুষ্কর। চেন্নাই, বেঙ্গালুরুর মত দু-একটা কেন্দ্র ছাড়া ভারত নেই অথচ গ্যালারি ভর্তি – এ দৃশ্য প্রায় দেখাই যায়নি। পৃথিবীর বৃহত্তম স্টেডিয়াম বলে ঢাকঢোল পিটিয়ে উদ্বোধিত আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামই উদ্বোধনী ম্যাচে ছিল শুনশান। একই দৃশ্য ধরমশালার মত জায়গাতেও দেখা গেছে। আরও গণ্ডগোলের ব্যাপার হল, গ্যালারি শূন্য থাকলেও যে সাইট থেকে টিকিট বিক্রি করা হয়েছে সেই সাইট দেখিয়েছে প্রায় সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। এ কি ভুল, নাকি কেলেঙ্কারি? ভারতে অবশ্য কেলেঙ্কারির যুগ অতীত। অমিত শাহ, জয় শাহদের আমলে কোনো কেলেঙ্কারি হয় না।

আরেকটা নতুন জিনিসও দেখা গেল এবার বিশ্বকাপে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বলে কিছু হয় না, হয় আয়োজকদের পছন্দের ম্যাচে নাচগান। এবারে সেই ম্যাচ ছিল ১৭ অক্টোবর আমেদাবাদে অনুষ্ঠিত ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ। সে ম্যাচের নাচগান আবার এমন স্বর্গীয় জিনিস যে টিভিতে তার সরাসরি সম্প্রচার হয় না, কেবল মাঠে যাওয়া দর্শকরা দেখতে পান। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আরও দুটো জিনিস পরিষ্কার করে দিয়েছে। প্রথমত, খেলা উপলক্ষ, মোচ্ছবই লক্ষ্য। দ্বিতীয়ত, বিশ্বকাপ মানে সব দলের সমান গুরুত্ব নয়। আয়োজক দেশ অন্যদের দয়া করে যতটা আপ্যায়ন করবে, তাতেই মানিয়ে নিতে হবে।

প্রথমটার প্রমাণ খেলার মাঝেই মাঠ অন্ধকার করে লেজার শো। ব্যাপারটা দর্শকদের জন্যে যতই আমোদের হোক, খেলোয়াড়দের জন্যে যে অসুবিধাজনক সেকথা ম্যাক্সওয়েল বলেও দিলেন দিল্লিতে নেদারল্যান্ডসে বনাম অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের পর। কিন্তু কেউ কান দিল না। লেজার শো চলছে, চলবে। নির্ঘাত ফাইনালেও হবে।

অবশ্য এখানেই চলে আসছে দ্বিতীয় ব্যাপারটা। ভারত ফাইনালে উঠেছে যখন, তখন মাঠের দর্শকদের জন্য আরেক দফা এক্সক্লুসিভ নাচগান, লেজার শো ইত্যাদি হবে হয়ত। কিন্তু রোহিত শর্মারা ফাইনালে না উঠলে কী হত? মানে আয়োজক ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড কি সব দলের ম্যাচ নিয়ে সমান উৎসাহী ছিল এই বিশ্বকাপে? বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেলে যে কোনো দেশকে নিয়ামক সংস্থার সঙ্গে একটা চুক্তি স্বাক্ষর করতে হয়, ভারতীয় বোর্ডও করেছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী কেবল বিভিন্ন দেশের দল নয়, সে দেশের সাংবাদিক এবং ক্রীড়াপ্রেমীদের সহজে ভিসা দেওয়া, খেলার টিকিটের ব্যবস্থা ইত্যাদি করতে হয়। এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ভারতীয় বোর্ড সেসবের তোয়াক্কা করেনি। ফলে বহু দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা আসতেই পারেননি। কর্তারা, প্রাক্তন ক্রিকেটাররা এবং দিশি ক্রিকেটভক্তরা অবশ্য উল্লসিত গ্যালারিতে নীল সমুদ্র তৈরি হচ্ছে বলে। বাড়তি উল্লাসের কারণ, পাকিস্তানের অতি অল্প সংখ্যক সাংবাদিককে ভিসা দেওয়া হয়েছিল। অনেক সমর্থক এবং সাংবাদিক এসে পৌঁছন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হয়ে যাওয়ার পরে। পাকিস্তানিদের অপছন্দ হওয়ায় এই ব্যবস্থায় অনেকেই খুশি। মুশকিল হল, আগামী বিশ্বকাপগুলোতে কোনো আয়োজক দেশের যদি ভারতীয়দের অপছন্দ হয়, তখন এরকম ব্যবহারের প্রতিবাদ করলে তারা পাত্তা দেবে না।

নিজের দেশের ক্রিকেটারদের মত অন্য দেশের ক্রিকেটারদের ভাল খেলাতেও আনন্দ পাওয়া এবং বাহবা দেওয়ার সংস্কৃতি সংকুচিত হয়ে ভারতীয় দর্শকদের মধ্যে যে একচোখা উগ্রতা এসে পড়েছে তারও একাধিক নিদর্শন এবারের বিশ্বকাপে দেখা গেছে। ভারতীয় ব্যাটার চার, ছয় মারলে গ্যালারি উত্তাল আর বিপক্ষের ব্যাটার মারলে পিন পতনের স্তব্ধতা অনেকদিনই নিয়ম হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মত দুর্বল দলের সমর্থকের প্রতিও গ্যালারিতে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার দৃশ্য নতুন। এতেও অসুবিধা একটাই। এই দৃষ্টান্ত অন্যেরা অনুসরণ করলে কী হবে? ভবিষ্যতের বিশ্বকাপগুলো কি খুব আনন্দের হবে সেক্ষেত্রে?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

প্রিয় স্মৃতির ফাইনাল

ছলছলে চোখে যুবরাজ বললেন “আজ সত্যিই মনে হচ্ছে একটা বড় কিছু করেছি।” তখনো আমরা জানি না, তিনিও জানেন না, শরীরে বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার।

যে কোনো নিরপেক্ষ বিচারে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা ফাইনাল হিসাবে প্রথমেই উঠে আসে ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের কথা। সর্বকালের সেরা একদিনের ম্যাচের তালিকাতেও ওই ম্যাচের স্থান হবে উপর দিকে। কিন্তু তাতে কী? প্রিয় ব্যাপারটা একান্ত ব্যক্তিগত। যে খেলছে না তার কাছে খেলা যেহেতু এক প্রদর্শনী, সেহেতু কোন খেলার কোন মুহূর্ত যে তার কাছে গোটা খেলাটাকে অবিস্মরণীয় করে তুলবে তা বলা মুশকিল। তার উপর আছে স্মৃতির ভূমিকা। যে খেলা দেখতে দেখতে মনে হয় জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না, সামান্য সময় পেরোলেই তা ফিকে হয়ে যায়। আবার যে খেলা দেখার সময়ে অসাধারণ মনে হয়নি, তা বহুকাল পরেও চোখের সামনে ভেসে ওঠে সিনেমার মত। কেন এমন হয় জানি না। কখনো খেলার বাইরের কোনো ঘটনা প্রভাবিত করে স্মৃতিকে, কখনো বা খেলা দেখার সঙ্গীদের স্মৃতিও এমন কাণ্ড ঘটায়। এমনটা না ঘটলে কোনো প্রিয় খেলা থাকত না একা একা জাবর কাটার জন্যে। কোনো আড্ডায় বা লেখায় সেই খেলার গল্প করে আরও অনেকের যে ওই খেলাটা প্রিয়, তা আবিষ্কার করার আনন্দও মাটি হয়ে যেত।

আমার অনেক বেশি প্রিয় ১৯৯২ বিশ্বকাপের ফাইনাল

তখনো ভূগোল বলতে বুঝি জল থেকে কীভাবে মেঘ তৈরি হয় আর মেঘ থেকে কীভাবে বৃষ্টি হয় – এইসব। গ্লোব জিনিসটা দেখেছি কেবল বড়লোক আত্মীয়ের বাড়িতে। ফলে বাবা রাতভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়ে টিভিতে খেলা দেখছেন – এ জিনিস দেখে বিস্মিত হওয়ার বয়স চলে যায়নি। আমার বয়সী অনেকেরই ওই বিশ্বকাপ নিয়ে মুগ্ধতা আজও কাটেনি, কাটবেও না। কারণ ক্রিকেট খেলায় অত রং আগে কখনো দেখিনি। ১৯৮৭ বিশ্বকাপের সময়ে আমাদের বাড়িতে টিভি ছিল না, ’৯২ বিশ্বকাপের সময়ে হয়েছে সাদাকালো পোর্টেবল টিভি। বাড়ির উল্টোদিকের লাইব্রেরিতে স্পোর্টস্টারের পাতায় জাহাজের ডেকে দাঁড়ানো অধিনায়কদের গ্রুপ ফটোতে দেখা জার্সির রংগুলো মনে রেখে দিয়েছিলাম। খেলা দেখার সময়ে সেই রং লাগিয়ে নিতাম খেলোয়াড়দের পোশাকে, মাঠে, আকাশে। কথা ছিল, মহম্মদ আজহারউদ্দিনের দল ফাইনালে উঠলে পাড়ায় যে দু-একজনের বাড়িতে রঙিন টিভি আছে সেখানে গিয়ে খেলা দেখব। কিন্তু সে গুড়ে বালি পড়ে যায় ফাইনালের অনেক আগেই।

বাবার দ্বিতীয় পছন্দের দল ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তারাও সেবার সেমিফাইনালে উঠতে পারেনি। তবে মেরুন জার্সির ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিন্তু দাপটে হারিয়েছিল কচি কলাপাতা জার্সির পাকিস্তানকে – একেবারে ১০ উইকেটে। দিনটা ছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২, জায়গাটা মেলবোর্ন। পরবর্তী এক মাসে ইমরান খান আর তাঁর দলবল যে রূপকথা রচনা করেন তা গল্পের বইয়ের বাইরে একমাত্র পাকিস্তানের ক্রিকেট দলই পারে। আজকের পাকিস্তানিরা তাকে বলেন ‘কুদরত কা নিজাম’, অর্থাৎ প্রকৃতির নিয়ম। ২৭ ফেব্রুয়ারি নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে হোবার্টে দুর্বল জিম্বাবোয়েকে দাপটে হারানোর পর ১ মার্চ অ্যাডিলেড ওভালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাত্র ৭৪ রানে অল আউট হয়ে যান ইমরান, মিয়াঁদাদরা। সেদিন পাকিস্তানকে আক্ষরিক অর্থেই কুদরত বাঁচিয়ে দেয়। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ১৬ ওভারে ৬৩ রান করতে হত জেতার জন্যে। কিন্তু এত বৃষ্টি নামে যে খেলা ভেস্তে যায়, পাকিস্তান পেয়ে যায় একটা মহামূল্যবান পয়েন্ট। তারপর সিডনিতে ভারতের কাছে হার, ব্রিসবেনে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে। পার্থে অস্ট্রেলিয়াকে হারাবার পরেও পাকিস্তানের সেমিফাইনালে যাওয়া অনিশ্চিত ছিল। পয়েন্ট টেবিলে এতটাই পিছিয়ে পড়েছিল যে শ্রীলঙ্কাকে হারানোর পরেও রাউন্ড রবিন লিগের শেষ খেলায় নিউজিল্যান্ডকে না হারালে বিদায় নিতে হত।

বিশ্বকাপে তখন পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডই সবচেয়ে নিখুঁত দল। সব ম্যাচ জিতে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে। শুধু তাই নয়, অধিনায়ক মার্টিন ক্রো ব্যাট করছেন রাজার মত। তাঁর দুটো অভিনব চালে কিস্তিমাত হচ্ছে প্রতিপক্ষ। এক, বোলিং শুরু করাচ্ছেন স্পিনার দীপক প্যাটেলকে দিয়ে। তাঁর বলে বিশেষ রান করা যাচ্ছে না। দুই, ব্যাটিং শুরু করাচ্ছেন প্রথম দুই ম্যাচে বেঞ্চে বসে থাকা মার্ক গ্রেটব্যাচকে দিয়ে। গ্রেটব্যাচ শুরু থেকেই ফিল্ডারদের মাথার উপর দিয়ে মারছেন। ১৯৯২ সালে ওই আক্রমণ অভূতপূর্ব। তার উপর পাকিস্তান দলে ইমরান আর মিয়াঁদাদের মধ্যে গণ্ডগোল। ইমরান নিজে পুরো সুস্থ নন। বোলার ইমরানের থেকে যতটা পাওয়া সম্ভব, তা পাচ্ছে না পাকিস্তান।

ক্রাইস্টচার্চের সেই ম্যাচে তারা অসাধ্য সাধন করল। লেগস্পিনার মুস্তাক আহমেদকে দিয়ে গ্রেটব্যাচকে শান্ত রাখলেন ইমরান। ফর্মে থাকা ক্রো ২০ বল খেলে তিন রানের বেশি করতে পারলেন না, আক্রম তাঁকে সুদ্ধ চারজনকে আউট করলেন। রামিজ রাজার শতরানে সহজেই জিতে গেল পাকিস্তান। অকল্যান্ডের সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফের রোমাঞ্চকর জয়। ২৫ মার্চের ফাইনাল খেলতে সেই মেলবোর্নে ফেরত এল পাকিস্তান। সামনে আবার ইংল্যান্ড। জীবন সকলকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না, পাকিস্তানকে একসঙ্গে দুটো দিল।

ফাইনালেও ইংল্যান্ডেরই পাল্লা ভারি ছিল নিঃসন্দেহে। কারণ সেরা দল নিউজিল্যান্ড ছাড়া আর কেউ তাদের বেগ দিতে পারেনি। জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে হার নেহাতই অঘটন। ব্যাটে বলে বিশ্বকাপ মাতাচ্ছিলেন বুড়ো ইয়ান বোথাম। গ্রেম হিক, অ্যালেক স্টুয়ার্ট, নিল ফেয়ারব্রাদাররা নিয়মিত রান করছিলেন। অলরাউন্ডার ক্রিস লুইস আর মিডিয়াম পেসার ডেরেক প্রিঙ্গলও ফর্মে।

কিন্তু ফাইনাল খেলল অন্য পাকিস্তান। একে অপরকে কোনোদিন পছন্দ না করা ইমরান আর মিয়াঁদাদ তৃতীয় উইকেটে ১৩৯ রান যোগ করলেন। তাও মিয়াঁদাদ সেদিন পুরো ফিট ছিলেন না, শেষদিকে রানার নিতে হয়েছিল। স্লগ ওভারে দারুণ মেরে দলের রান আড়াইশোর কাছে নিয়ে গেলেন ইনজামাম উল হক (৩৫ বলে ৪২) আর দুর্দম আক্রম (১৮ বলে ৩৩)। প্রিঙ্গল তিনটে উইকেট নিলেও বোথাম আর লুইস মার খেয়ে গেলেন।

আমার জ্যাঠতুতো, পিসতুতো দিদিদের মধ্যে তখন সুদর্শন ইমরানের প্রবল জনপ্রিয়তা, তবে দ্রুত তাঁর বাজার দখল করছেন আক্রম। আমাদের বাঙাল পাড়ায় সেই ২৫ মার্চ অনেকেই হয়ে গিয়েছিল পাকিস্তান সমর্থক; আমার বাবাও। সুতরাং আমিও। ইংল্যান্ডের প্রথম চারজন যখন ৬৯ রানের মধ্যে ফিরে গেলেন, তখন আমরা উল্লসিত। কিন্তু উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠলেন ফেয়ারব্রাদার আর অ্যালান ল্যাম্ব। বাবা একের পর এক বিড়ি শেষ করছেন, রান হয়ে যাচ্ছে, উইকেট পড়ছে না। শেষমেশ ইমরান ফেরত আনলেন আক্রমকে। তিনি রাউন্ড দ্য উইকেট দৌড়ে এসে পরপর দুবার ম্যাজিক করলেন। অ্যালান ল্যাম্ব আর ক্রিস লুইসের হতভম্ব স্টাম্পগুলো আমাদের উদ্বেগের অবসান ঘটাল।

ইংল্যান্ড আর বেগ দিতে পারেনি। ইমরান যখন ক্রিস্টালের ট্রফিটা হাতে নিয়ে দলের কথা ভুলে কেবল মা শওকত খানুমের নামে ক্যান্সার হাসপাতাল করার সংকল্প বর্ণনা করে চলেছেন, তখন আমি আর বাবা গিয়ে বসলাম পল্লী মঙ্গল সমিতির মাঠে। সেখানে আক্রমের স্তুতি চলছে, কোনো কাকু আবার বলছেন তাঁর মতে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ ইনজামাম। একজন বললেন “বেল পাকলে কাকের কী?” অন্য এক কাকু রুখে উঠলেন “কেন? কাগজে তো দেখলাম গাভাসকার বলেছে ’৮৩ সালে যখন আমরা কাপ জিতলাম, ওরা খুব আনন্দ করেছিল। আমরা আনন্দ করব না? হাজার হোক এশিয়ার টিম।” এক জেঠুর মন্তব্য “হারাইছে তো ইংল্যান্ড রে। অগো ক্যান সাপোর্ট করুম? করতে অইলে পাকিস্তানরেই করা ভাল।”

আজকাল এই স্মৃতিকেও ছাপিয়ে যায় ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনাল

ততদিনে ক্রিকেটের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা স্রেফ দর্শক আর প্রদর্শনীর নয়। তিনটে খবরের কাগজের খেলার পাতায় কাজ করা হয়ে গেছে, চতুর্থ চাকরিতে সাংবাদিক হিসাবে বিশ্বকাপ কভারেজের সঙ্গে যুক্ত আছি। বাড়িতে রঙিন টিভি এসে গেছে, কিন্তু বাবার সঙ্গে বসে খেলা দেখা আর হয় না। যত বড় খেলা হয়, আমার তত বেশি কাজ থাকে। অফিসের হাই ডেফিনিশন টিভিতেই দেখি বেশিরভাগ খেলা।

সহকর্মীরা অনেকেই একমত হচ্ছিলেন না, কিন্তু আমি শুরু থেকে বলছিলাম, এবার ভারত চ্যাম্পিয়ন না হলে অবাক হব। কারণ আমাদের শচীন শুরু থেকেই ফর্মে। একা শচীনে রক্ষে নেই, বীরেন্দ্র সেওয়াগ দোসর। হেলায় ম্যাচ শুরু করছেন চার মেরে। জাহির খান বল হাতে নিলে উইকেট পড়া যেন সময়ের অপেক্ষা। অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি রান পাচ্ছেন না, কিন্তু ইংল্যান্ডের সঙ্গে টাই হয়ে যাওয়া ম্যাচেও স্নায়ুর চাপে অধিনায়কত্বে ভুলচুক করেননি। মিডল অর্ডারে অভিজ্ঞ গৌতম গম্ভীর ধারাবাহিক। কিন্তু সবচেয়ে বড় সম্পদ যুবরাজ সিং। হয় ব্যাটে নয় বলে তিনি ভরসার জায়গা হয়ে উঠছিলেন। আর কী লাগে বিশ্বকাপ জিততে? ’৯২ বিশ্বকাপে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করতাম বাবাকে, সেবার বাবার প্রশ্ন করার পালা। খেলার পাতায় কাজ করি, অতএব বাবার ধারণা আমি একটু বেশি জানি। আমি আমার এইসব যুক্তি বলি, বাবা নীরবে শোনেন। একমত হলেন কিনা জিজ্ঞেস করার সময়ও আমার থাকে না।

এমন চলতে চলতেই ভারত কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল। আমাকে যেতে হল আমেদাবাদে। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল স্টেডিয়ামে প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, মানে ক্রিকেটের ব্রাজিল। যাদের বিশ্বকাপের যে কোনো স্তরে হারানো প্রায় বিশ্বকাপ জেতার মতই কঠিন। ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারতীয় বোলিংকে ছিঁড়ে খাওয়া রিকি পন্টিং আবার শতরান করলেন। যুবরাজ মোক্ষম সময়ে ব্র্যাড হ্যাডিন আর মাইকেল ক্লার্কের উইকেট না নিলে লক্ষ্য আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারত। সেমিফাইনালে উঠতে দরকার ২৬১, সেওয়াগ বেশিক্ষণ টিকলেন না। শচীন সাবলীল ব্যাট করছেন দেখে শততম শতরানের আলাদা কপি লিখতে শুরু করেছি, এমন সময় শন টেটের বলে উইকেটের পিছনে ক্যাচ দিয়ে তিনি আউট। গম্ভীরের সঙ্গে বেশিক্ষণ থাকতে পারলেন না বিরাট কোহলি। গম্ভীরও কাজ শেষ করে যেতে পারলেন না, ধোনি ফের ব্যর্থ। সিঁদুরে মেঘ দেখছি প্রেস বক্সে বসে, যুবরাজ খেলতে শুরু করলেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস। সুরেশ রায়নাকে সঙ্গে নিয়ে শেষপর্যন্ত আড়াই ওভার আগেই খেলা শেষ করে দিলেন। ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনের ঘরে এসে ঢুকতেই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে সম্মান জানালেন ভারতীয়, অভারতীয় সমস্ত সাংবাদিক। ছলছলে চোখে যুবরাজ বললেন “আজ সত্যিই মনে হচ্ছে একটা বড় কিছু করেছি।” তখনো আমরা জানি না, তিনিও জানেন না, শরীরে বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর জানা যাবে, তিনি গোটা বিশ্বকাপ খেলেছেন শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা – এসব নিয়েই।

আরও পড়ুন দায়সারা বিশ্বকাপ, শেষ বিশ্বকাপ? 

বিশ্বকাপ যত এগোয়, জেতা তত কঠিন হয়। কিন্তু সেমিফাইনালে পাকিস্তান খুব দৃঢ় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারল না। ব্যাটে আর কেউ বেশি রান করতে না পারলেও শচীন আবার খেলে দিলেন, যুবরাজ ব্যাটে ব্যর্থ হলেও দুটো জরুরি উইকেট নিলেন। তবে আজ যে তরুণদের স্মৃতিতে ২০১১ নেই, তারা এখনকার শ্রীলঙ্কাকে দেখে কল্পনা করতে পারবে না সেই ফাইনাল কত কঠিন ছিল। শ্রীলঙ্কা গোটা বিশ্বকাপে হেরেছিল শুধু পাকিস্তানের কাছে। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড আর সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে সহজে হারিয়েছিল। ফাইনালের দিন জাহির যথারীতি নতুন বলে উইকেট নিলেন, কিন্তু মুনাফ প্যাটেল ছাড়া সবাইকে মেরে দিলেন শ্রীলঙ্কার সর্বকালের সেরা ব্যাটারদের অন্যতম মাহেলা জয়বর্ধনে এবং অন্যরা। তবু তো কুমার সাঙ্গাকারাকে ৪৮ রানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন যুবরাজ।

বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌনে তিনশো রান তাড়া করার চাপ অতুলনীয়, আর সেদিনই কিনা প্রথম ওভারে শূন্য রানে আউট হয়ে গেলেন সেওয়াগ। একটু পরেই শচীন। কোহলি তখনো চেজমাস্টার হয়ে ওঠেননি, গম্ভীরের সঙ্গে তাঁর জুটি সেদিন জমল না। এরপর নিজের অধিনায়কত্ব, নিজের কেরিয়ারের তোয়াক্কা না করে ব্যাট করতে নামলেন ধোনি। কোনো ক্রিকেটপ্রেমীকে মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই পরের কয়েকটা ঘন্টা।

খবরের কাগজ তৈরি করে ছাপাখানায় পাঠানো যাদের চাকরি, তারা বাড়ি ফেরে গভীর রাতে। অমন দিনে দেরি হয় আরও বেশি। আমি বাড়ি ফিরলে সাধারণত ঘুম চোখে উঠে দরজা খুলে দিতেন বাবা। সে রাতেও তিনিই খুলে দেন, তবে একেবারে সজাগ। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বললেন “দারুণ দেখলাম, বুঝলি? একেবারে সাধ মিটিয়ে।” তখনো জানি না, বাবাও জানেন না, তাঁর ফুসফুসে বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার। তিনি দেখে ফেলেছেন শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল।

আরও অনেক ফাইনাল হবে, কোনোটা স্মৃতিতে এভাবে অক্ষয় হবে কিনা জানি না। স্মৃতিতেই তো সঞ্চিত থাকে আমাদের সত্তা, ভবিষ্যৎ।

সংবাদ প্রতিদিন কাগজের রোববার পত্রিকায় প্রকাশিত

ভারতের দাপুটে বিশ্বকাপ: কিছু কাঁটা রহিয়া গেল

ক্রিকেট এমন এক আফিম, যে রাজনীতির বামপন্থী এবং উদারপন্থীরাও এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। ন্যায়-অন্যায়ের বিচার যে ফলে নয়, প্রক্রিয়ায় – সেকথা অন্তত ক্রিকেটের ক্ষেত্রে তাঁরা মানতে রাজি নন।

আজ পর্যন্ত অলিম্পিকে সবচেয়ে বেশি পদক জিতেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গড়ের দিক থেকে আবার সবচেয়ে ভাল ফল পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের। দ্রুত এই তালিকায় উপরে উঠছে চীন। প্রত্যেক অলিম্পিকের পরেই পদক তালিকায় চোখ বুলোলে প্রথম চার-পাঁচটা স্থানে যে দেশগুলোর নাম দেখা যায় সেগুলো অর্থনীতিতেও বিশ্বের অগ্রসর দেশগুলোর মধ্যে পড়ে। ফুটবল বিশ্বকাপের প্রায় একশো বছরের ইতিহাসও অনুরূপ। সবচেয়ে ধনী মহাদেশ ইউরোপের পাঁচটা দেশ মিলে বিশ্বকাপ জিতে ফেলেছে ১২ বার (পশ্চিম জার্মানি/জার্মানি ৪, ইতালি ৪, ফ্রান্স ২, ইংল্যান্ড ১, স্পেন ১)। অসামান্য প্রতিভাধর খেলোয়াড়দের উপস্থিতি সত্ত্বেও গরিব লাতিন আমেরিকার তিনটে দেশ বিশ্বকাপ জিতেছে সব মিলিয়ে দশবার (ব্রাজিল ৫, আর্জেন্টিনা ৩, উরুগুয়ে ২)। এশিয়া আর আফ্রিকার কোনো দেশ আজ অবধি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, অদূর ভবিষ্যতেও পারবে এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

আগামীকাল বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল। তার আগে এসব কথা বলা এইজন্যে যে উপরের ঘটনাগুলোর পিছনে সফলতর ধনী দেশগুলোর কোনো চক্রান্ত নেই, সমস্ত খেলোয়াড়কে দিয়ে মাদক সেবন করানো নেই, রেফারি বা জাজদের ঘুষ খাওয়ানো নেই। যা আছে তা হল টাকার জোর। যে কোনো খেলার সর্বোচ্চ স্তরের প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে সফল হতে গেলে একটা দেশকে বিপুল অর্থ খরচ করতে হয়। ২০১৬ অলিম্পিকের পর অভিনব বিন্দ্রা হিন্দুস্তান টাইমস কাগজে এক কলামে লিখেছিলেন, “দেশ হিসাবে আমাদের ঠিক করতে হবে আমরা এমন একটা স্তরে পৌঁছতে চাই কিনা যেখানে পদক তালিকায় প্রথম পাঁচে শেষ করতে পারি। সেটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিনা, মানসম্মানের প্রশ্ন কিনা… আমরা উন্নয়নশীল দেশ, আমাদের দেশে দারিদ্র্য আছে। সুতরাং আমাদের ঠিক করতে হবে অলিম্পিককে আমরা তার চেয়েও বেশি অগ্রাধিকার দেব কিনা। কিন্তু যদি আমরা চাই আমাদের অ্যাথলিটরা জিতুক, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি লগ্নি করা দরকার। ব্যাপারটা জটিল।” বলা বাহুল্য, দলগত খেলায় ব্যাপারটা আরও বেশি জটিল। গত দুই দশক ধরে ভারতীয় ক্রিকেট অর্থের দিক থেকে সমস্ত ক্রিকেট খেলিয়ে দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভাল জায়গায়। এর প্রতিফলন খেলার মাঠে পড়তে বাধ্য। তাই চলতি বিশ্বকাপে ভারতীয় ক্রিকেট দলের আধিপত্যকে ব্যাখ্যা করতে কোনো ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খাড়া করা নেহাতই হাস্যকর। বরং এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবহার করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ভারত যে ২০১৩ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরে আর কোনো বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে পারেনি তা নিতান্তই লজ্জাজনক। আর কোনো ক্রিকেট খেলিয়ে দেশের এত বড় প্রতিভার মানবজমিন নেই, সেই জমিনে গজানো প্রতিভাকে সার জল দিয়ে বড় করার সামর্থ্য নেই। তা সত্ত্বেও যদি এ দেশ থেকে মহম্মদ শামি, যশপ্রীত বুমরা, রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, শুভমান গিলরা উঠে না আসেন তাহলে কোন দেশ থেকে আসবেন?

ক্রিকেট দুনিয়ায় আর্থিকভাবে দু নম্বর এবং তিন নম্বর স্থানে আছে যথাক্রমে অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড। লক্ষ করুন, ফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়াই। ইংল্যান্ডও হয়ত শেষ চারে থাকত, যদি ২০ ওভার আর ৫০ ওভারের খেলায় তফাত করতে ভুলে না যেত, কিছু অনিচ্ছুক বুড়িয়ে যাওয়া ক্রিকেটারকে দলে না রাখত আর তাদের উদ্ধত ক্রিকেট বোর্ড টালবাহানার পর কেন্দ্রীয়ভাবে চুক্তিবদ্ধ করার জন্যে ক্রিকেটারদের এমন এক তালিকা প্রকাশ না করত, যা প্রায় কাউকে খুশি করেনি। যাঁরা আইপিএল নিলামের বাইরেও ক্রিকেটের অর্থনীতির খবর রাখেন তাঁরা জানেন যে গত এক দশকে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের আর্থিক ব্যবধান অস্বাভাবিক বাড়িয়ে তুলে ক্রিকেট দুনিয়াকে ক্রমশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন করে তুলেছে এই ‘বিগ থ্রি’ – ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, সর্বোপরি ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত একদা শক্তিশালী দলগুলোর অনেক পিছিয়ে পড়ার পিছনে এর ভূমিকা কম নয়। ত্রিদেবের এই প্রতাপে বছর বিশেক আগে জিম্বাবোয়ে, কেনিয়ার মত যে দেশগুলো দ্রুত উঠে আসছিল তারাও ক্রিকেট মানচিত্রের বাইরে ছিটকে পড়েছে। অল্প কিছুদিন আগে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া আফগানিস্তান, আয়ারল্যান্ডের সঙ্গেও কেউ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলে না। ফিফা যেখানে ব্যবসা বাড়ানোর জন্যে বিশ্বকাপের মূলপর্বে দেশের সংখ্যা ক্রমশ বাড়াচ্ছে, সেখানে আইসিসি ২০১১ আর ২০১৫ সালের ১৪ দলের বিশ্বকাপকে গত বিশ্বকাপ থেকেই নামিয়ে এনেছে দশ দলের বিশ্বকাপে। শুধুমাত্র ব্যবসা বাড়াতে দলের সংখ্যা বাড়ানো ভাল নয় – এ যুক্তি দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু কমানো হল কার ভালর জন্যে? তাছাড়া ত্রিদেবের সকলের উপর ছড়ি ঘোরানোর পিছনে ব্যবসা ছাড়া আর কোন মহৎ উদ্দেশ্য কাজ করছে? ‘বিগ থ্রি মডেল’ কীভাবে ক্রিকেট দুনিয়ার সংকোচন ঘটাচ্ছে, অনেক দেশকে শুকিয়ে মারছে তা নিয়ে গত একবছর বারবার লিখেছি। বিস্তারিত পাবেন এই লেখায়

শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডগুলো আইসিসির আয় বন্টনের এই অসাম্য থেকে বাঁচতে যে রাস্তা বার করেছে তা হল আইপিএলের আদলে কুড়ি বিশের লিগ আয়োজন করা। যে দেশের ভারতের মত আইপিএলের বাইরেও অনেকগুলো প্রথম শ্রেণির দল নেই, ঘরোয়া পঞ্চাশ ওভারের খেলার পরিকাঠামো তেমন নয়, সে দেশে এর অনিবার্য পরিণতি কী, তা এবারের বিশ্বকাপে দেখা গেছে। এমন বোলার পাওয়া দুষ্কর যারা দশ ওভার ভাল বল করতে পারে। আরও শক্ত এমন ব্যাটার পাওয়া যার গোটা ১৫ বলে চার, ছয় মারতে না পারলেই নিজেকে ব্যর্থ মনে হয় না। আইপিএলের মত রোজগার অন্য দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলো থেকে হয় না। ফলে ওই দেশগুলোর ক্রিকেটাররা সারা পৃথিবী ঘুরে একাধিক লিগে খেলে বেড়ান। এত খেললে গড়ে ঘন্টায় ৯০ মাইলের বেশি গতিতে বল করার বোলার পাওয়া যাবে না, আজকাল যায়ও না। তাছাড়া কুড়ি বিশের আদলে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে যেভাবে মাঠ ছোট করে আনা হয়েছে তাতে অত জোরে বল করে লাভই বা কী? ব্যাটের কানায় লাগলেও ছয় হয়ে যাবে। ব্যাটারদেরও ইনিংস গড়ে তোলার ধৈর্য থাকছে না। সুইং বা স্পিন সামলানোর ক্ষমতাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। কুড়ি ওভারের খেলায় বোলাররা তো সারাক্ষণ রান আটকাতে বৈচিত্র্য আনতে ব্যস্ত। তাই ক্রস সিম, নাকল বল, স্লোয়ার ইত্যাদি চেষ্টা করে যাচ্ছেন। শামি বা বুমরার মত সিম সোজা রেখে খাঁটি সুইং বা সিম করানোর ক্ষমতা থাকছে না। চলতি বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিল, সাদা বলের ক্রিকেটে প্রথম দু-এক ওভারের মধ্যে উইকেট নেওয়ার জন্যে প্রসিদ্ধ শাহীনশাহ আফ্রিদিও নতুন বল সুইং করানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারেন। ট্রেন্ট বোল্টেরও প্রায় একই সমস্যা হল। সারাবছর কুড়ি বিশের ক্রিকেট খেলে হঠাৎ অভ্যাস বদলে ফেলা যায় না। এতকিছু সত্ত্বেও এই বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার সেমিফাইনালে লড়ে যাওয়া এটুকুই প্রমাণ করে যে ক্রিকেটে মহান অনিশ্চয়তা কিছুটা অবশিষ্ট আছে।

ওসব সমস্যা ভারতের ক্রিকেটারদের নেই। তাঁরা ভারতীয় দলের হয়ে খেলে আর আইপিএল খেলেই যা রোজগার করেন তার সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান বা দক্ষিণ আফ্রিকার একজন গড় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের রোজগারের তুলনা চলে না। তাঁদের দেশে দেশে খেলে বেড়াতে হয় না। তার চেয়েও বড় কথা, আইপিএলের ব্র্যান্ড মূল্য বজায় রাখতে বিসিসিআই তাঁদের অন্য লিগে খেলার অনুমতিও দেয় না। ফলে বুমরা, শামি বা মহম্মদ সিরাজ, কুলদীপ যাদবরা ক্রিকেটের সাবেকি দক্ষতাগুলোয় শান দেওয়ার সুযোগ পান। গত একবছর চোটের কারণে না খেলা বুমরার পক্ষে শাপে বর হয়ে দাঁড়িয়েছে। শরীর বিশ্রাম পেয়েছে। শামি আবার ভারতীয় কুড়ি বিশের দলে নিয়মিত নন, একদিনের ম্যাচ আর টেস্ট ম্যাচের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। সেটাও এক্ষেত্রে সুবিধা। আর ব্যাটাররা? কোহলি, রোহিত, রাহুলরা গতবছর পর্যন্ত বলের চেয়ে বেশি রান করার দর্শনকে পাত্তাই দেননি। তাই বারবার দল ব্যর্থ হয়েছে। পাত্তা না দেওয়ার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে আয়ের নিশ্চয়তা। ভারতীয় বোর্ডের অর্থকরী কেন্দ্রীয় চুক্তি আর আইপিএল – দুটোই। এই নিরাপত্তা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই হয়ে যাওয়ায় তাঁরা কুড়ি বিশ বা ৫০ ওভার, কোনো ধরনের খেলাতেই আদৌ ঝুঁকি নিতে রাজি হচ্ছিলেন না। তারই ফল গত দেড়-দুই বছরের হারগুলো। বিশ্বকাপেও সেই ধারা চালু রাখলে ফলাফল অন্যরকম হত না, বোলাররা যতই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠুন। কারণ ভারতীয় বোলিং কয়েকটা খারাপ দিন বাদ দিলে টেস্ট আর একদিনের ম্যাচে বেশ কয়েকবছর ধরেই অসাধারণ। বিশ্বকাপের কিছুদিন আগে থেকে তিন নিরাপদ ব্যাটারের মধ্যে একজন, রোহিত শর্মা, ঠিক করলেন আক্ষরিক অর্থে সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেবেন। আগের কয়েকটা সিরিজে এ জিনিস অনুশীলন করেছেন, অবশেষে বিশ্বকাপে সাফল্য পেতে শুরু করলেন। ফলে বাকিদের নিজেকে কমবেশি না বদলে উপায় রইল না। অর্থাৎ ওই বোলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হল আক্রমণাত্মক ব্যাটিং। তার উপর ঘরের মাঠের চেনা পরিবেশ, চেনা পিচের সুবিধা তো আছেই। এতসব মিলিয়ে অন্য দলগুলোর সঙ্গে এই দুস্তর ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া জিতে গেলেও এগুলো মিথ্যে হয়ে যায় না। এর জন্যে আলাদা করে সমস্ত ম্যাচ ‘ফিক্স’ করার প্রয়োজন পড়ে না। এই দলের যা শক্তি, তাতে পিচ বদল করাও নিষ্প্রয়োজন। এদেশের যে কোনো পিচেই এই দল জিততে পারত। অন্য দেশে বিশ্বকাপ হলে অন্য কথা ছিল।

সুতরাং ভারত আগামীকাল বিশ্বকাপ জিতলে তিনটে খেতাবের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে দাপুটে জয় হবে এটা। কিন্তু সকলের জন্যে সবচেয়ে আনন্দের জয় বলা যাবে কি? বিশ্বকাপ উপলক্ষ, বিজেপি সরকারের মহিমা প্রচার এবং শাসক দলের রাজনৈতিক প্রকল্প অনুযায়ী সবকিছু চালানোই যে লক্ষ্য তা সেই ৫ অক্টোবর থেকেই পরিষ্কার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হল না, এদিকে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে বলিউডি শিল্পীদের ডেকে এনে ধুমধাম হল। আগামীকাল আবার ম্যাচের আগে মোচ্ছব, মাঝে মোচ্ছব, পরে মোচ্ছব। শুধু তাই নয়, দেশের সেনাবাহিনীকেও নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে খেলার আঙিনায় শক্তি প্রদর্শন করতে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিমানবাহিনী খেল দেখাবে।

মজার কথা, আইসিসির এসব আপত্তি নেই। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে ভারতের বোর্ডের সর্বেসর্বা হয়ে বসেছেন, সর্বজনবিদিত যে এই ঘটনায় স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবদান ছিল। তাতেও আইসিসির আপত্তি নেই। অথচ বিশ্বকাপ চলতে চলতেই শ্রীলঙ্কার বোর্ডকে সাসপেন্ড করা হল সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে। যারা স্রেফ ভারতের সাফল্য নিয়ে গদগদ হতে রাজি নয়, ভারতীয় বোর্ডের কার্যকলাপ নিয়ে এখনো প্রশ্ন তুলছে, তাদের ঠিক বিজেপি সরকারের কায়দাতেই ভারতবিরোধী বলে দেগে দেওয়ার সংস্কৃতি দেশের ক্রিকেটমহলে চালু করে দেওয়া হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক সাংবাদিকতার মত ক্রিকেট সাংবাদিকতাও গোদি মিডিয়ার দখলে। প্রথিতযশা সাংবাদিকরা বস্তুত বোর্ড এবং/অথবা বিখ্যাত ক্রিকেটারদের জনসংযোগ আধিকারিকে পরিণত হয়েছেন। তাই ভারতের খুব অল্প সংবাদমাধ্যমেই যথাযোগ্য গুরুত্বে প্রকাশিত হয়েছে এই খবর, যে শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ জয়ী প্রাক্তন অধিনায়ক অর্জুনা রণতুঙ্গা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের দুর্দশার জন্যে দায়ী বিসিসিআই সচিব জয় শাহ। তাঁর অঙ্গুলিহেলনেই নাকি শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট চলে।

অভিযোগটা সত্যি হোক আর মিথ্যেই হোক, ভারতের, বিশেষত বাংলার, নামকরা ক্রিকেট সাংবাদিকদের স্রেফ চেপে যাওয়ার কারণ কী? দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত হয়ে যাওয়া, নাকি বোর্ডের আনুকূল্য বন্ধ হয়ে যাওয়া? ধরে নেওয়াই যেত, রণতুঙ্গা বিশ্বকাপে দেশের ভরাডুবি দেখে হতাশায় প্রলাপ বকেছেন। শ্রীলঙ্কার বিদায়ের পর তাদের এক সাংসদ যেমন বলেছিলেন, ব্যাটিং কোচ মাহেলা জয়বর্ধনে নাকি বিসিসিআইয়ের প্রভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ককে বলেছিলেন টসে জিতে ফিল্ডিং নিতে। মুশকিল হল, শ্রীলঙ্কার সরকার রণতুঙ্গার মন্তব্যের জন্যে বিসিসিআই সচিবের কাছে ক্ষমা চেয়েছে একেবারে সংসদের অধিবেশনে। উপরন্তু পর্যটন মন্ত্রী বলেছেন, স্বয়ং রাষ্ট্রপতি নাকি শাহকে ফোন করে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। যদি ভারতীয় বোর্ডের এত প্রভাব থাকে একেবারে শ্রীলঙ্কা সরকারের উপর, তাহলে ক্রিকেট বোর্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকা আর কী এমন ব্যাপার? বোর্ড প্রভাব না খাটালেও ফল একই হত, আর প্রভাব খাটায়নি – এ দুটো কিন্তু এক নয়। অটো ফন বিসমার্কের সেই বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে যায় – রাজনীতিতে কোনোকিছু বিশ্বাস করবে না, যতক্ষণ না সেটা অস্বীকার করা হচ্ছে। কিন্তু ক্রিকেট এমন এক আফিম, যে রাজনীতির বামপন্থী এবং উদারপন্থীরাও এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। ন্যায়-অন্যায়ের বিচার যে ফলে নয়, প্রক্রিয়ায় – সেকথা অন্তত ক্রিকেটের ক্ষেত্রে তাঁরা মানতে রাজি নন।

ভারত বনাম নিউজিল্যান্ড সেমিফাইনালের পিচ বদলানোর অভিযোগকেও নস্যাৎ করেছেন ভারতের সাংবাদিককুল, প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং ক্রিকেটভক্তরা। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার কিছু সংবাদমাধ্যমের বক্তব্য, আইসিসি থেকে বিশ্বকাপের পিচগুলোর সার্বিক দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যান্ডি অ্যাটকিনসন তাদের ইমেলে জানিয়েছেন, তাঁর অজ্ঞাতসারে সেমিফাইনালে যে পিচে খেলা হওয়ার কথা ছিল তা বদলে দেওয়া হয়। একই ইমেলে অ্যাটকিনসন এই আশঙ্কাও প্রকাশ করেন যে ফাইনালের জন্য তিনি যে পিচ পছন্দ করেছেন তাও ভারতীয় দলের সুবিধার্থে বদলে দেওয়া হতে পারে। এ নিয়ে হইচই পড়ে যাওয়ায় আইসিসি সেমিফাইনাল চলাকালীন একটা বিবৃতি দেয়। সেই বিবৃতিতে কিন্তু বলা হয়নি যে পিচ বদলানোর অভিযোগ মিথ্যা। শুধু বলা হয়েছে, এমনটা করা হয়েই থাকে এবং অ্যাটকিনসনকে জানানো হয়েছিল (“was apprised of the change”)। এই বয়ান যদি সঠিক হয়, তাহলে হয় অ্যাটকিনসন মিথ্যা বলেছেন অথবা তাঁকে জানানো হয়েছিল পিচ বদলে ফেলার পরে। সত্যানুসন্ধান করতে হলে কোনটা ঘটেছে তা অ্যাটকিনসনের কাছে জানতে চাওয়া উচিত ছিল। ভারতের সংবাদমাধ্যম এবং প্রাক্তন ক্রিকেটাররা কিন্তু সেসবের মধ্যে যাননি। তাঁরা আইসিসির বিবৃতিকে তুলে ধরে রায় দিয়ে দিলেন, এসব ভারতের কাছে হেরে যাওয়া লোকেদের মড়াকান্না। যাহা সরকারি বিবৃতি তাহাই সত্য – ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে তলানিতে পড়ে থাকা দেশে এটাই যে নিয়ম তা অবশ্য বলাই বাহুল্য। আরও মজার কথা, সেমিফাইনালে প্রচুর রান হওয়ার ঘটনাকে যুক্তি হিসাবে তুলে ধরা বলা হল – এই তো। নতুন পিচ নয় বলে আপত্তি করার কী ছিল? পিচটা তো মোটেই মন্থর ছিল না। অর্থাৎ নিয়ম মানা হল কি হল না, তা আলোচ্য নয়। আলোচ্য হল ফলাফলটা কী? কোনো সাংবাদিক বা প্রাক্তন ক্রিকেটার কিন্তু আইসিসির নিয়মাবলী তুলে দেখাননি যে অ্যাটকিনসনকে জানিয়েই কাজ করতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। অ্যাটকিনসন রাবার স্ট্যাম্প মাত্র। উলটে নানারকম অক্রিকেটিয় যুক্তি উঠে এসেছে।

কেউ বলেছেন ভারত যে এতদিনে ইংরেজদের প্রভুত্ব নাশ করে ক্রিকেটে শেষ কথা হয়ে উঠেছে এটা অনেকের সহ্য হচ্ছে না, তাই ভারতকে ছোট করতে এসব বাজে কথা বলা। ইংল্যান্ডের ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রাক্তন ক্রিকেটার মার্ক রামপ্রকাশ একথা বলে আবার লিখেছেন, দিল্লির প্রবল বায়ুদূষণ নিয়ে যারা কথা বলছে তারাও নাকি এই উদ্দেশ্যেই ওসব বলছে। এ তো গেল ঋষি সুনকসুলভ ভারতপ্রেমের দৃষ্টান্ত। সুনীল গাভস্করের মত শতকরা একশো ভাগ ভারতীয় আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ভারতকে এদের দরকার কারণ ভারতের সঙ্গে খেললে অনেক টাকা রোজগার হয়। অথচ এরা ভারতের দিকেই আঙুল তোলে। মানে এরা চায় ভারতকে নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে, কিন্তু ভারত নিজের সুবিধা দেখলেই এদের অসুবিধা। আরও বলেছেন, পিচ যদি বদলানো হয়েই থাকে তো আইসিসিকে জানিয়েই হয়েছে। লুকিয়ে চুরিয়ে হয়নি। আইসিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকটার যদি কিছু বলার সাহস না থাকে, তাহলে আইসিসিকে ধরো। বিসিসিআইয়ের দিকে আঙুল তুলো না। সংবাদসংস্থা পিটিআই গতকাল একটি নামহীন বিসিসিআই সূত্রকে উদ্ধৃত করে খবর দিয়েছিল, অ্যাটকিনসনের কাজ নাকি শেষ। তিনি দেশে ফিরে গেছেন। অথচ আজ তাঁকে আমেদাবাদে পিচ পরিদর্শন করতে দেখা গেছে।

বৃদ্ধ কিংবদন্তির এই প্রবল জাতীয়তাবাদ খুবই প্রশংসনীয় হত, যদি হাস্যকর না হত। হাস্যকর এই কারণে, যে বিসিসিআই বাকি দেশগুলোর উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে ওই ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়েই। তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নয়। ঠিক কথাই যে তাদের ভারতকে দরকার, কিন্তু ভারতও ঘুরে ফিরে তাদের সঙ্গেই খেলে। অন্যদের সঙ্গে খেলতে চায় না। কারণ এদের সঙ্গে খেললেই টিভি সম্প্রচার থেকে সবচেয়ে বেশি টাকা আসে।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট: জাহান্নামের আগুনে পুষ্পের হাসি

অর্থাৎ অন্যায় ঢাকতে জাতীয়তাবাদ টেনে আনা, লোক খেপাতে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর বিরুদ্ধে গরম গরম কথা বলা আর ব্যবসায়িক স্বার্থে সেই দেশগুলোর সঙ্গেই হাত মেলানো, পাকিস্তানকে দিনরাত খলনায়ক বলে দাগানো আর টাকা উঠবে বলে তাদের বিরুদ্ধে খেলা নিয়েই উদ্বাহু নৃত্য করা এবং সেই উন্মাদনাকে ব্যবহার করে ঘৃণা ছড়ানো – ভারতের শাসক দলের রাজনীতির সব বৈশিষ্ট্যই ভারতীয় ক্রিকেট শরীরে ধারণ করে ফেলেছে এই বিশ্বকাপে। কাল হবে ফাইনাল। জিতলে জবরদস্ত নির্বাচনী প্রচার। ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি জেয়ার বলসোনারো যেভাবে নির্বাচনে ব্রাজিল ফুটবল দলকে নিজের কাজে লাগিয়েছিলেন, নরেন্দ্র মোদীও সেভাবে ভারতীয় ক্রিকেট দলকে ব্যবহার করা শুরু করবেন নিজের নামাঙ্কিত স্টেডিয়াম থেকেই। নেইমাররা বলসোনারোর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, বিরাটরা তো সেই ২০১৪ সাল থেকেই দাঁড়াচ্ছেন। এবার না হয় নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চেই দাঁড়াবেন। উপরি হিসাবে থাকবেন গাভস্কর, শচীন তেন্ডুলকররা। বারাণসী ক্রিকেট স্টেডিয়ামের শিলান্যাসে চার মারাঠি ব্রাহ্মণ প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক (গাভস্কর, দিলীপ ভেঙসরকর, রবি শাস্ত্রী, তেন্ডুলকর) যেতে পারেন, ভোটের প্রচারে নামতে আর আপত্তি কী?

হারলে কী হবে? যত দোষ শামি, সিরাজদের হবে নিশ্চয়ই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

স্পিরিট অফ ক্রিকেট খায় না মাথায় দেয়?

আইনকানুন দুরকম করলে অবশ্য খেলাধুলো চলে না; কিন্তু পরিবেশটা, কালচারটা রাজকীয় থাকা চাই। তাই আইনের ঊর্ধ্বে স্পিরিট অফ ক্রিকেট নামক একটি সোনার পাথরবাটি রেখে দেওয়া।

ফুটবল আর ক্রিকেট – দুটোই আমরা শিখেছি সাহেবদের থেকে। তাদের কাছে প্রথমটা স্রেফ খেলা, কিন্তু দ্বিতীয়টা ‘জেন্টলম্যান’স গেম’। আমরা বাঙালিরাও ফুটবল নিয়ে গদগদ, জনপ্রিয় গানে লেখা হয়ে গেছে “সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল”। কিন্তু ‘ভদ্রলোকের খেলা’ বলি ক্রিকেটকে। কারণ ক্রিকেটে আছে এমন একটা জিনিস যা আর কোনো খেলায় নেই – স্পিরিট অফ ক্রিকেট। ‘জেন্টলম্যান’স গেম’ কথাটার সর্বজনমান্য বাংলা ‘ভদ্রলোকের খেলা’ তৈরি হয়ে আছে বহুকাল ধরে। কিন্তু ‘স্পিরিট অফ ক্রিকেট’ কথাটার বাংলা কী? কাউকে তো লিখতে বা বলতে দেখি না। কথাটার হিন্দিও কোথাও দেখি না। রবিচন্দ্রন অশ্বিন আইপিএল ম্যাচে জস বাটলার বল হওয়ার আগেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন দেখে তাঁকে রান আউট করে দিলে বা ভারতের দীপ্তি শর্মা ইংল্যান্ডের শার্লট ডীনকে একইভাবে রান আউট করে দিলে ভারতের সব ভাষাভাষী লোক (বিদেশিরাও) যা নিয়ে আলোচনা করে তা ওই ‘স্পিরিট অফ ক্রিকেট’।

কথাটার বাংলা, হিন্দি, গুজরাটি, মারাঠি, তামিল, মালয়ালম – কোনো অনুবাদই পাওয়া দুষ্কর। কারণ জিনিসটা খেতে হয় না মাখতে হয় – তা এই ক্রিকেটপাগল দেশের কোনো জাতির একজন ক্রিকেটবোদ্ধারও বোধহয় হৃদয়ঙ্গম হয়নি। যা হৃদয়ঙ্গম হয় তাকে মানুষ নিজের ভাষায় ডাকে। আমাদের বাঙাল পাড়ার কাকা জ্যাঠারা অনেকেই ফুটবল খেলাকে বলতেন ‘জাম্বুরা লাথান’। ক্রিকেট খেলার ঝিঁঝি নামটা তো বাঙাল, ঘটি সকলেই জানে। ঘোর পশ্চিমবঙ্গীয় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ‘ক্রিকেট মানে ঝিঁঝি’ নামে একখানা আস্ত গল্প লিখে গেছেন।

হৃদয়ঙ্গম হবে কী করে? স্পিরিট অফ ফুটবল বা স্পিরিট অফ টেনিস শুনেছেন কখনো? সকলেই জানে এই খেলাগুলোর কিছু নিয়মকানুন আছে। সেই অনুযায়ী খেলা চলে, নিয়ম ভাঙলে ভুলের ওজন অনুযায়ী মাশুল দিতে হয়। দিয়েগো মারাদোনার হাত দিয়ে গোল করা অন্যায় হয়েছিল, কারণ নিয়ম অনুযায়ী হাত দিয়ে গোল দেওয়া চলে না। সে গোলের সমর্থনে মারাদোনা নানারকম মন্তব্য করেছিলেন, ফুটবল রোম্যান্টিকরাও নানা কথা বলে। কিন্তু অতি বড় আর্জেন্টিনা সমর্থকও বলে না, গোলটা বৈধ কারণ ওটা স্পিরিট অফ ফুটবল অনুযায়ী ঠিক। কোনো ইংল্যান্ড ভক্তও কখনো বলেনি, গোলটা অবৈধ কারণ ওটা স্পিরিট অফ ফুটবলের বিরুদ্ধে। স্বীকার্য যে সব খেলারই কিছু সহবত আছে যেগুলো নিয়ম হিসাবে লিপিবদ্ধ নেই। যেমন ফুটবলে একজনকে ট্যাকল করে মাটিতে ফেলে দিয়েই আবার হাত বাড়িয়ে দিই উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করার জন্যে। কিন্তু তা না করলে কেউ স্পিরিট অফ ফুটবল লঙ্ঘন হল বলে তেড়ে আসে না। যদি বাড়াবাড়ি করে যাকে মাটিতে ফেলেছি তাকে ফের লাথি মারি, তাহলে শাস্তির বিধান আইনেই আছে। আলাদা করে স্পিরিটের দোহাই দেওয়ার দরকার পড়ে না।

কিন্তু ক্রিকেটের কথা আলাদা। ফুটবলের মত সাধারণ চাকুরে, শ্রমিক প্রমুখ মিলে ক্রিকেট ক্লাবগুলোর গোড়াপত্তন করেননি বিলেতে। সায়েবসুবোদের মধ্যেও উচ্চকোটির লোকেরাই নিজেদের মধ্যে খেলত ধপধপে সাদা জামাপ্যান্ট পরে। রাজারাজড়ার খেলায় যখন অন্যরা ঢুকে পড়ল, তখন আবার শ্রেণিবিভাগ করা হল – জেন্টলমেন আর প্লেয়ার্স। আইনকানুন দুরকম করলে অবশ্য খেলাধুলো চলে না; কিন্তু পরিবেশটা, কালচারটা রাজকীয় থাকা চাই। তাই আইনের ঊর্ধ্বে স্পিরিট অফ ক্রিকেট নামক একটি সোনার পাথরবাটি রেখে দেওয়া। ক্রিকেট ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে যে দেশে গেছে সেদেশেই উচ্চকোটির মানুষের খেলা হয়ে থেকেছে বহুকাল। নিজের সময়ের অন্যতম সেরা স্পিনার হওয়া সত্ত্বেও পলওয়ঙ্কর বালু দলিত বলে বম্বের কোয়াড্রেনিয়ালে খেলতে কতটা বেগ পেয়েছেন সে ইতিহাস রামচন্দ্র গুহ সবিস্তারে লিখেছেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজেও ব্যাপারটা একইরকম ছিল অনেকদিন। সেখানকার নন্দিত লেখক সিএলআর জেমস লিখেছেন, ইংল্যান্ডে যাওয়ার আগে তিনি বুঝতেই পারেননি, যে কোনটা ক্রিকেটিয় আর কোনটা ক্রিকেটিয় নয় তার যে ধারণা তাঁর মাথায় তৈরি হয়েছিল, তা আসলে দ্বীপপুঞ্জের ব্রিটিশ শাসকদের তৈরি করে দেওয়া। মজার কথা, যে কোর্টনি ওয়ালশকে ঢাল করে আজ শাকিব আল হাসানকে দুয়ো দেওয়া চলছে, সেই ওয়ালশের জামাইকার প্রবাদপ্রতিম ক্রিকেটার জর্জ হেডলি আদর্শ অধিনায়ক মনে করতেন বডিলাইন সিরিজের কুখ্যাত ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিনকে।

আরও পড়ুন কুস্তিগীরদের আন্দোলন: মহাতারকাদের মহাকাপুরুষতা

স্পিরিট অফ ক্রিকেট নামক ভদ্রলোকের সুবিধাটি (privilege) একবার করে ধাক্কা খায়, খানিকটা খসে পড়ে। তখন নিয়ামকরা অগত্যা আইন বদলে একই অধিকার সকলকে দেন। ভারতে জন্মানো স্কটিশ (ব্রিটিশ নয় কিন্তু) জার্ডিন বড় ধাক্কা মেরেছিলেন। ডন ব্র্যাডম্যানের রান আটকাতে তিনি ব্যাটারদের শরীর লক্ষ করে বল করানো শুরু করেন আইন মোতাবেক। ফলে নিয়ামকরা আইন বদলে লেগ আম্পায়ার আর উইকেটরক্ষকের মাঝে দুজনের বেশি ফিল্ডার রাখা নিষিদ্ধ করেন। আউট করতে গিয়ে ব্যাটারকে আঘাত করা চলবে না – এটা এতদ্বারা আইনের মধ্যে এসে পড়ে। তার আগে অবধি বাবুদের ভদ্রলোকসুলভ ব্যবহারে বিশ্বাস ছিল, অর্থাৎ কারোর শরীর লক্ষ করে বল ছোড়া হবে না।

রাজছত্র ভেঙে পড়ে, ভদ্রলোকের সুবিধা কিন্তু টিকে থাকে। কারণ ওটা যাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্যে তৈরি হয়নি, তাদের মাথাতেও বেদবাক্য হয়ে ঢুকে পড়ে। সমাজবিজ্ঞানে যাকে ‘হেজিমনি’ বলে। তাই অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ ভাবেন মাঠে নামার আগে দেখে নেওয়ার দরকার নেই হেলমেটটা খেলার যোগ্য আছে কিনা। মাঠে নেমেও ভাবেন যত খুশি সময় নিতে পারেন, স্পিরিট অফ ক্রিকেট বাঁচিয়ে দেবে। আর শাকিব কোনো অন্যায় না করেও দুনিয়াসুদ্ধ লোকের গাল খান। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের লোকের, কারণ এ রাজ্যে ক্রিকেট তো সত্যিই আজও ভদ্রলোকের খেলা। বাংলা থেকে ভারতীয় দলে খেলা ক্রিকেটারদের অধিকাংশ কলকাতার বনেদি পরিবারগুলোর সন্তান। ছোটলোকেরা বাংলার ক্রিকেটে এখনো প্রান্তিক।

এই সময় কাগজে প্রকাশিত

বেদি আর ববিকে ভোলা বিবেকের কাছে অপরাধ

ভারতীয় জোরে বোলারদের মধ্যে কপিলদেব নয়, যশপ্রীত বুমরাই গোট – একথাও এখনই বলা শুরু হয়ে গেছে। স্পিনারদের মধ্যে অশ্বিন গোট। ফলে বিষাণ সিং বেদিকে আর কে মনে রাখবে?

বিরাট কোহলি একটা করে শতরান করেন আর নতুন করে তর্ক শুরু হয় – সর্বকালের সেরা কে? কোহলি নাকি শচীন তেন্ডুলকর? চলতি বিশ্বকাপে বিরাট ইতিমধ্যেই একটা শতরান করে ফেলায় এবং আরেকটা শতরানেরও খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় সোশাল মিডিয়ায় দুজনের ভক্তরা এ নিয়ে ধুন্ধুমার চালিয়ে যাচ্ছেন। দুপক্ষই প্রধানত পরিসংখ্যানকেন্দ্রিক। ক্রিকেট খেলার পরিসংখ্যান আজকাল মোবাইল ফোনের কল্যাণে সকলের আঙুলের ডগায়। তার উপর ক্রিকেট যত বাড়ছে, পরিসংখ্যানগুলো তত ফুলে ফেঁপে উঠছে। ফলে ও নিয়ে তর্ক করাই সুবিধাজনক। যে কোনো খেলাই খেলে মানুষ। ফলে খেলার পরিবেশ, পরিস্থিতি, একজন খেলোয়াড়ের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা এবং অবস্থানের মত বিষয় যে পরিসংখ্যানের সমান, বা ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়েও বেশি, গুরুত্বপূর্ণ তা বেশিরভাগ আলোচনাতেই উঠে আসে না। কেবল সাধারণ ভক্তরা নন, বিশেষজ্ঞরাও আজকাল এই দোষে দুষ্ট। ফলে যা সাম্প্রতিক তা-ই সবচেয়ে ভাল – এই অলিখিত বাক্যটা প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। GOAT (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম) বলে একটা আশ্চর্য শব্দ দিনরাত ছোড়াছুড়ি হয় আজকাল। হয় কোহলি নয় তেন্ডুলকর গোট। ভারতীয় ক্রিকেটের বহু যুদ্ধের একক নায়ক সুনীল গাভস্করের নামও ক্রিকেটভক্তদের আলোচনায় ধারাভাষ্য বাদে আসে না আর। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দৃষ্টিপথের বাইরে চলে গেছে, তাই ভিভিয়ান রিচার্ডসের মত ব্যাটারও আলোচনার বাইরে। ভারতীয় জোরে বোলারদের মধ্যে কপিলদেব নয়, যশপ্রীত বুমরাই গোট – একথাও এখনই বলা শুরু হয়ে গেছে। স্পিনারদের মধ্যে অশ্বিন গোট। ফলে বিষাণ সিং বেদিকে আর কে মনে রাখবে?

ভারতের বিখ্যাত স্পিন চতুষ্টয়ের অন্যতম এবং প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক, জাতীয় দলের প্রাক্তন কোচ বেদি ক্রিকেট বিশ্বকাপের মধ্যে মারা গেলেন। অথচ এখন পর্যন্ত কোনো ম্যাচের আগে এক মিনিট নীরবতা পালন হয়নি, কোনো দলের ক্রিকেটার কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামেননি। হয়ত আগামী রবিবার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে রোহিত শর্মারা সে কাজটা করবেন। কিন্তু প্রবল প্রতাপান্বিত ভারতীয় বোর্ড চাইলে অন্য দলগুলোও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে দ্বিধা করত না। কেনই বা করবে? ক্রিকেটের সমঝদারদের কাছে বেদির এখনো যথেষ্ট দাম আছে। ইয়ান চ্যাপেল, জিওফ্রে বয়কটরা এখনো বোঝেন বেদির ২৬৬টা টেস্ট উইকেটের মূল্য। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর ঝুলিতে ১,৫৬০টা উইকেট। অথচ নিজের দেশের ক্রিকেটভক্তরাই বেদিকে ভুলে বসে আছেন।

সেদিক থেকে ববি চার্লটন ভাগ্যবান। ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্ব ফুটবল খেতাব জয়ের অন্যতম স্থপতির নামও যে ইদানীংকালের ইংল্যান্ড সমর্থক বা ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের তরুণ ভক্তরা দিনরাত আলোচনা করেন তা নয়। কিন্তু ও দেশের খেলাধুলোর সংস্কৃতি আলাদা। এখানকার মত রাজনৈতিক নেতাদের নামে স্টেডিয়াম হয় না চট করে, স্টেডিয়ামের বাইরে মূর্তি বসানো হয় প্রবাদপ্রতিম খেলোয়াড়দের। তাই ববির মৃত্যুর পর তাঁর ক্লাব ইউনাইটেড চ্যাম্পিয়নস লিগ ম্যাচের সাংবাদিক সম্মেলনের আগে এক মিনিট নীরবতা পালন করেছে। আরও নানা অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ফুটবলপ্রেমীরা লাইন দিয়ে ফুলের তোড়া হাতে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছেন। এক ভক্ত তো তাঁর মূর্তি বেয়ে উঠে গলায় পর্যন্ত শ্রদ্ধাজ্ঞাপনকারী স্কার্ফ জড়িয়ে দিয়েছেন।

ববি বা বেদি এক অন্য জগতের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁরা সারাজীবনে শুধু খেলোয়াড় হিসাবে যা আয় করেছেন, আজকের লায়োনেল মেসি বা কোহলি সম্ভবত এক দিনে তা আয় করেন। কিন্তু তাঁরা কিছু আদর্শ নিয়ে চলতেন। বেদি যেমন শুধু স্পিনকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছিলেন বলেই স্মরণীয় নন। ১৯৭৬ সালে কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে অধিনায়ক বেদি মাত্র ৩০৬ রানে ছয় উইকেট পড়ার পরেই ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করে দেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা ভারতীয় ব্যাটারদের আউট করতে নয়, আহত করতে নেমেছিলেন। যা বিশ্বাস করেন তা নিয়ে অকপট থাকা ববিরও অভিজ্ঞান। নিজের যোগ্যতা নিঃসংশয়ে প্রমাণ করার পরেও তিনি বলতেন, ১৯৫৮ সালের মিউনিখ বিমান দুর্ঘটনায় ম্যাট বাজবির সোনার ছেলেরা মারা না গেলে তিনি বড় ফুটবলার হয়ে উঠতেন না।

আরও পড়ুন বেলা ফুরোতে আর বসে রইলেন না শেন ওয়ার্ন

আজকাল অনেক প্রিয় খেলোয়াড়ের মাঠের বাইরের আচরণ আমাদের আহত করে। কারণ দেখা যায়, মাঠে দারুণ লড়াকু আমাদের নায়ক মাঠের বাইরে ক্ষমতার সামনে একেবারে নতজানু। এঁরা কিন্তু কাঁড়ি কাঁড়ি উইকেট নিলে বা ঝুড়ি ঝুড়ি রান করলেও শিরদাঁড়ার দিক থেকে বেদির ধারেকাছে আসতে পারবেন না। আজীবন দিল্লিতে ক্রিকেট খেলা, দিল্লির হয়ে দুবার রঞ্জি ট্রফি খেতাব জেতা বেদির নামে ফিরোজ শাহ কোটলার একটা স্ট্যান্ডের নামকরণ করা হয়েছিল। কিন্তু কর্মকর্তারা যেই স্টেডিয়ামের নাম বদলে অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম করে দিলেন, আর কেউ কোনো প্রতিবাদ না করলেও বেদি কর্তাদের চিঠি দিয়ে জানান তাঁর নামাঙ্কিত স্ট্যান্ডটার নাম যেন বদলে দেওয়া হয়। দিল্লির ক্রিকেট সংস্থার সদস্যপদও তাঁর আর দরকার নেই। ভারতের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজনকে কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমী যেন স্মরণে রাখেন, তার জন্যে যে বোর্ডের দিক থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেই তার কিন্তু এটাও অন্যতম কারণ। বেদিকে মনে থাকলেই তো এসবও মনে থাকবে ভক্তদের।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

দায়সারা বিশ্বকাপ, শেষ বিশ্বকাপ?

কর্তারা যে ৫০ ওভারের খেলাটাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচেন তা সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির প্রাক্তন অধিনায়ক এবং সদ্য পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রিকেট ক্লাব এমসিসির সভাপতি হওয়া মার্ক নিকোলাস।

১৯৮৭ সালে যখন প্রথমবার এদেশে ক্রিকেট বিশ্বকাপ হয় তখন দুনিয়াটাই অন্যরকম ছিল। তাই সেকথা থাক, বরং ১৯৯৬ সালের কথা ভাবা যাক। আজ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের খেলা আর আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করে যে টাকার হিমালয়ে চড়েছে তা টেথিস সাগরের মত উঁচু হতে শুরু করেছিল ওই সময় থেকেই। প্রয়াত জগমোহন ডালমিয়া বুঝতে পেরেছিলেন ভারতের ক্রিকেটপাগল জনতার বাজার কত লোভনীয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে। সেই বাজারে তাদের প্রবেশাধিকার দিয়ে এত টাকা কামাতে পারে ভারতীয় বোর্ড, যে গোটা ক্রিকেট দুনিয়া শাসন করা যাবে। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার চোখরাঙানি সহ্য করার বদলে তাদেরই চোখ রাঙানো যাবে। তবে ডালমিয়া ছিলেন খাঁটি ব্যবসায়ী। কামানোর জন্য খরচ করতে তাঁর আপত্তি ছিল না। বিশেষত টাকা যখন বোর্ডের, নিজের পকেটের নয়। ফলে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে হওয়া সেবারের বিশ্বকাপে জাঁকজমকের খামতি ছিল না। সেই বিশ্বকাপ থেকে বিস্তর আয় হয়েছিল এবং তার অনেকটা ডালমিয়া পকেটে পুরেছেন – এমন অভিযোগ পরে উঠেছিল। সেসব মামলা মোকদ্দমার জেরেই একসময় তাঁকে বোর্ডছাড়া হতে হয়, পরে আবার ফিরেও আসেন। কিন্তু বিশ্বকাপের আয়োজন যে জবরদস্ত হয়েছিল তা কেউ অস্বীকার করে না। ইডেন উদ্যানে বহু অর্থ খরচ করে বিরাট উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল, গঙ্গার হাওয়া এসে অদৃষ্টপূর্ব লেজার শোকে অভূতপূর্ব বিপর্যয়ে পরিণত করেছিল। ভারত সেমিফাইনালে শোচনীয়ভাবে শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে যাওয়ার পরে লেখালিখি হয়েছিল, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি মঞ্চটাই নাকি যত নষ্টের গোড়া। ওটা তৈরি করতে গিয়েই নাকি পিচের বারোটা বেজে গিয়েছিল, ফলে সেমিফাইনালের দিন অরবিন্দ ডি সিলভা আর মুথাইয়া মুরলীধরন এক জাতের বোলার হয়ে গিয়েছিলেন। ২০১১ সালে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কায় হওয়া বিশ্বকাপেও জাঁকজমক কম ছিল না। সেবার ঢাকার বঙ্গবন্ধু ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল। তদ্দিনে ভারত হিমালয়ে উঠে পড়েছে, বোর্ডের টাকার অভাব নেই। ফলে বাকি বিশ্বকাপটাও হয়েছিল বিশ্বকাপের মত। আর এবার?

আজ গতবারের দুই ফাইনালিস্ট ইংল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপ শুরু করবে। কিন্তু তার আগে কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে না, কারণ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড খুবই মিতব্যয়ী। চোখধাঁধানো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করে শুধু আইপিএল শুরুর দিনে। ১৯৯৬ সালে বোর্ড সভাপতি ছিলেন শিল্পপতি ডালমিয়া, এখন শিল্পপতি জয় শাহ। ও না! ভুল হল। বোর্ড সভাপতি ১৯৮৩ বিশ্বকাপ জয়ী ভারতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রজার বিনি, জয় হলেন সচিব। আসলে বিনিকে দেখা যায় কম, শোনা যায় আরও কম। তাই খেয়াল থাকে না। মানে তাঁর অবস্থা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর মত। তিনি সাংবিধানিক প্রধান বটে, সবেতেই তাঁর স্বাক্ষর লাগে বটে, কিন্তু নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনে তাঁকে ডাকাই হয় না। রাজদণ্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন মোদীজি। ক্রিকেট বোর্ডের সর্বেসর্বাও এখন শাহজি, বিনিজি অন্তঃপুরবাসী। যাঁর নাম জয় আর পদবি শাহ, তিনি সর্বেসর্বা হবেন না তো হবে কে? সে যতই তিনি এশিয়ান গেমসে মহিলাদের ক্রিকেটে স্মৃতি মান্ধনা একাই সোনা জিতেছেন মনে করুন না কেন।

কথা হল, জগমোহনের বিশ্বকাপ আয়োজন করা নিয়ে যা উৎসাহ ছিল, জয়ের তার অর্ধেকও দেখা যাচ্ছে না। তাই এবারের বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা হয়েছে মাত্র ১০০ দিন আগে, যেখানে পৃথিবীর যে কোনো খেলায় বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা হয়ে যায় বছরখানেক আগে। আগামী বছর জুন মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির সূচি যেমন প্রকাশিত হয়েছে গত মাসে। কারণ বিভিন্ন দেশের মানুষকে খেলা দেখতে একটা নির্দিষ্ট সময়ে একটা দেশে পৌঁছতে হবে। যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে, থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। সেসব প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য যত কম সময় পাওয়া যাবে খরচ বেড়ে যাবে ততই। অব্যবস্থা দেখা দেবে, যে দেশে খেলা সেই দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হবে। কিন্তু ওসব ভাবনা রাজা বাদশাহরা কবেই বা করলেন? তাঁরা চলেন নিজের নিয়মে, বাকি সকলকে মানিয়ে নিতে হয়। বিশ্বকাপ এমনিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রতিযোগিতা, ফলে সূচি ঘোষণা করার কথা তাদের। কিন্তু আয়োজক দেশকেই ঠিক করতে হয় সূচিটা। একথাও কারোর জানতে বাকি নেই যে ফুটবল দুনিয়াকে ফিফা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, আইসিসির মুরোদ নেই তা করার। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অর্থবল এত বেশি যে আইসিসি এখন ঠুঁটো জগন্নাথ। অনতি অতীতে আইসিসির ফিউচার টুরস প্রোগ্রামে (অর্থাৎ পরবর্তী কয়েক বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নির্ধারিত সূচিতে) আইপিএলের জন্য যে আরও বেশি ফাঁক রাখা হবে তা ঘোষণা করে দিয়েছেন শাহজিই, আইসিসি নয়। তা নিয়ে আইসিসি ট্যাঁ ফোঁ করতে পারেনি। ফলে এত দেরিতে বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণার দায় আইসিসির ঘাড়ে চাপানো চলে না।

তবে অস্বাভাবিক দেরিতে সূচি ঘোষণাতেই অব্যবস্থার শেষ নয়, বরং সূচনা। কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা গেল বিভিন্ন আয়োজক রাজ্য সংস্থা তাদের স্টেডিয়ামে যেদিন ম্যাচ দেওয়া হয়েছে সেদিন আয়োজন সম্ভব নয় বলছে। খোদ কলকাতাতেই যেমন কালীপুজোর দিন ইংল্যান্ড বনাম পাকিস্তান ম্যাচ রাখা হয়েছিল। ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজনের অভিজ্ঞতা না থাকা মানুষও বোঝেন যে সেদিন ম্যাচ আয়োজন করা অসম্ভব, কিন্তু দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র বোঝেন না। ক্রীড়াসূচি তৈরি করার সময়ে যে যেখানে খেলা সেখানকার আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়, সম্ভবত তাও তিনি বোঝেন না। নইলে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের আয়োজকরা নিশ্চয়ই এত বোকা নন যে কালীপুজোর দিন ম্যাচ করতে রাজি হবেন? জয় শাহীর মজা হল, হিন্দুত্ববাদী দলের নেতা অমিত শাহের পুত্র সর্বেসর্বা হলেও বিশ্বকাপের সূচি বানানোর সময়ে বোর্ডের খেয়ালই ছিল না যে ১৫ অক্টোবর নবরাত্রি উৎসবের সূচনা, সেদিন আমেদাবাদ শহরে ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ করা সম্ভব নয়। এহেন প্রশাসনিক নৈপুণ্যের কারণে অনেক দেরিতে সূচি ঘোষণা করার পরেও সব মিলিয়ে গোটা দশেক ম্যাচের দিনক্ষণ বদল করতে হয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি নিয়ে যা চলছে তা প্রাক-২০১৪ ভারতে সম্ভবত তদন্তযোগ্য কেলেঙ্কারি বলে গণ্য হত এবং সমস্ত খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেলে দিনরাত এ নিয়েই তর্কাতর্কি চলত। একে তো টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম, তার উপর বিশ্বকাপের টিকিট অনলাইনে কিনতে গিয়ে অনেকেই তাজ্জব বনে গেছেন। ঘন্টা চারেক ‘কিউ’-তে পড়ে থেকেও টিকিট পাননি অনেকে। আইসিসি এখন পর্যন্ত বলেনি কত টিকিট বিক্রি হওয়ার কথা ছিল আর কত টিকিট বিক্রি হয়েছে। বিক্রির দায়িত্বে থাকা বুকমাইশো সোশাল মিডিয়ায় জানিয়েছে, তাদের হাতে নাকি সীমিত সংখ্যক টিকিটই আছে। এত টিকিট গেল কোথায়? এসব নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে যত লেখালিখি হয়েছে, ভারতের সংবাদমাধ্যমে তত হয়নি। ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমে তবু খানিকটা হয়েছে, বাংলার কথা না বলাই ভাল। একদিকে টিকিটের আকাল, অন্যদিকে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, আজকে উদ্বোধনী ম্যাচে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে নাকি ৪০,০০০ মহিলাকে দর্শক হিসাবে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেছে গুজরাট বিজেপি। আমেদাবাদের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে হোয়াটস্যাপে আমন্ত্রণ পাঠিয়ে নাকি এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাহলে কি বিশ্বকাপের টিকিট পেতে গেলে বিজেপির সদস্য বা সমর্থক হতে হবে? সেকথা যদি ঠিক না-ও হয়, এই বিশ্বকাপে হক যে অন্য সব রাজ্যের চেয়ে গুজরাটের বেশি, তাতে কিন্তু সন্দেহ নেই। ভারতে এর আগে অনুষ্ঠিত তিনটে বিশ্বকাপে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম, কলকাতার ইডেন উদ্যান, দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা বা চেন্নাইয়ের চিদম্বরম স্টেডিয়ামের মত ঐতিহ্যশালী মাঠের যে সৌভাগ্য হয়নি সেই সৌভাগ্যই এবার হয়েছে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ ওখানে, ফাইনাল ওখানে, আবার ক্রিকেটবিশ্বের সকলের চোখ থাকে যে ম্যাচের দিকে – সেই ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচও ওই মাঠেই।

কেন ঘটছে এসব? জলের মত সরল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন বহুদিনের ক্রীড়া সাংবাদিক শারদা উগ্রা, সম্প্রতি দ্য ক্যারাভ্যান পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর দীর্ঘ প্রতিবেদনে, যার শিরোনাম Shah’s playground: BJP’s Control of Cricket in India। সেই প্রতিবেদনে বোর্ডের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন, অমিতপুত্র বোর্ড চালান একেবারেই একনায়কত্বের ঢঙে। মিনমিনে বিনির সময় থেকে নয়, সৌরভ গাঙ্গুলি বোর্ড সভাপতি থাকার সময় থেকেই। অনেকসময় তিনি বোর্ডের অন্যদের সৌরভের ফোন ধরতে বারণ করতেন। যদি সৌরভ বলতেন অমুক ম্যাচটা ওইদিন হতে হবে, অবধারিতভাবে অন্য কোনোদিন ধার্য করা হত। জয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে কাঁচকলা দেখিয়ে নিজের সভাপতি পদের মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া সৌরভ এসব মেনে নিয়েই পদ আঁকড়ে পড়েছিলেন। বোঝা শক্ত নয়, কেন বিশ্বকাপ আয়োজনে এত ডামাডোল। যাঁর কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নেই, তিনি যদি একনায়কের কায়দায় এত বড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন তাহলে এর চেয়ে উন্নত আর কী হওয়া সম্ভব?

আরও পড়ুন ক্রিকেট জেনেশুনে বিশ করেছে পান

যোগ্যতার অভাবের পাশাপাশি সদিচ্ছার অভাবটাও অবশ্য উড়িয়ে দেওয়ার নয়। ১৯৯৬ সালে একদিনের ক্রিকেটের রমরমা ছিল, এখন বিশ্বজুড়েই ৫০ ওভারের খেলা অবাঞ্ছিত। ১৯৭০-এর দশকে একদিনের ক্রিকেটের দরকার হয়েছিল টেস্টের একঘেয়েমি কাটিয়ে মাঠে দর্শক ফেরাতে। সেই চেষ্টা সফল হয়। পরে খেলায় আরও বিনোদন আনতে কেরি প্যাকার চালু করেন রঙিন জামা, সাদা বলে দিনরাতের একদিনের ম্যাচ। প্রথম দিকে তিনি বিদ্রোহী তকমা পেলেও শেষপর্যন্ত কর্তারা বোঝেন এতে বিপুল মুনাফার সম্ভাবনা। প্যাকারের ক্রিকেটই হয়ে দাঁড়ায় মান্য একদিনের ক্রিকেট। এখন আর সে দিন নেই। বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট। ক্রিকেটের কর্তাব্যক্তিরা তাকে যথেচ্ছ বাড়তেও দিচ্ছেন, কারণ ওতেই পকেট ভরে যাচ্ছে। যদি একদিনের ক্রিকেটের প্রতি মমতা থাকত, তাহলে ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলোতে লাগাম দিতেন। টি টোয়েন্টির মত একদিনের ক্রিকেটেও দুই প্রান্ত থেকে দুটো বলে খেলা চালু করে, মাঠের সীমানা দৃষ্টিকটুভাবে ছোট করে এনে, ইনিংসের সবকটা ওভারকেই ফিল্ডিং সাজানোর নানাবিধ নিষেধের আওতায় নিয়ে এসে ব্যাট-বলের লড়াইকে দুদলের ব্যাটারদের চার, ছয় মারার প্রতিযোগিতায় পরিণত করতেন না। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। কথায় কথায় সাড়ে তিনশো-চারশো রান হচ্ছে, দ্বিশতরান হচ্ছে মুহুর্মুহু। পুরুষদের একদিনের ক্রিকেটে ২০১০ সালে শচীন তেন্ডুলকার প্রথম দ্বিশতরান করার পর থেকে গত ১৩ বছরে আরও নখানা দ্বিশতরান হয়ে গেছে, একা রোহিত শর্মার ঝুলিতেই তিনখানা। অথচ একদিনের ক্রিকেটের প্রতি দর্শকদের আগ্রহ কমে গেছে পৃথিবীর সর্বত্র। ঘন্টা তিনেক লাগাতার চার-ছক্কা দেখতে ভাল লাগে, ছ-সাত ঘন্টা ধরে ও জিনিস দেখা সাধারণত ক্লান্তিকর। শেষের দিকের ওভারগুলোতে পুরনো বলে রিভার্স সুইং করিয়ে ব্যাটারদের কাজ কঠিন করে দেওয়া বোলারদের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। স্পিনারদেরও চকচকে নতুন বলে চার, ছয় না খাওয়ার দিকেই মনোযোগ দিতে হচ্ছে। ওয়াসিম আক্রাম, শেন ওয়ার্নরা এখন খেললে কোনো তফাত গড়ে দিতে পারতেন কিনা বলা মুশকিল।

খেলোয়াড়রাও ইদানীং ৫০ ওভারের ক্রিকেট খেলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। অনেক কম পরিশ্রমে অনেক বেশি টাকা রোজগার করা যাচ্ছে কুড়ি বিশের ক্রিকেট খেলে। ফলে ওটাকেই তাঁরা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। টেস্ট ক্রিকেট আর ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট খেলে শরীরেও আর এত তাগদ থাকছে না যে একদিনের ক্রিকেট খেলবেন। গত বিশ্বকাপের সেরা ক্রিকেটার বেন স্টোকস তো গতবছর একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসরই নিয়ে ফেলেছিলেন। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটকর্তারা অনেক বলে কয়ে তাঁকে শুধুমাত্র ২০২৩ বিশ্বকাপ খেলতে রাজি করিয়েছেন। বিশ্বকাপের পর কী হবে কেউ জানে না। নিউজিল্যান্ডের সেরা বোলার ট্রেন্ট বোল্টও নিজের দেশের বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। অর্থাৎ দেশের হয়ে খেলার আগ্রহ কমে গেছে, ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের দিকে ঝুঁকছেন। ভারতের সাদা বলের অধিনায়ক রোহিত শর্মা আর বিরাট কোহলিও সাম্প্রতিককালে একদিনের ম্যাচের সিরিজে একটা ম্যাচ খেলেন তো দুটো ম্যাচে বিশ্রাম নেন। বিশ্বকাপের আগে শেষ দুটো সিরিজ ছিল এশিয়া কাপ আর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। তারও সব ম্যাচ খেললেন না।

কর্তারা যে ৫০ ওভারের খেলাটাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচেন তা সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির প্রাক্তন অধিনায়ক এবং সদ্য পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রিকেট ক্লাব এমসিসির সভাপতি হওয়া মার্ক নিকোলাস। ইএসপিএন ক্রিকইনফো ওয়েবসাইটকে তিনি বলেছেন, একদিনের ক্রিকেট আগামীদিনে বিশ্বকাপের বাইরে আর হওয়ার মানে হয় না। এমসিসি এখন আর ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা নয়, কিন্তু ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে এখনো তাদের মতামতের বিস্তর গুরুত্ব আছে আর ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার বোর্ডগুলোই জয় শাহের বোর্ডের পরে সবচেয়ে ধনী বোর্ড। বস্তুত তারা ভারতীয় বোর্ডের নন্দী, ভৃঙ্গী। অনেকের ধারণা ভারতই ৫০ ওভারের খেলাটাকে ধরে রেখেছে এবং এবারের বিশ্বকাপটা জমজমাট হলে খেলাটা বেঁচে যাবে। এককথায়, ভারতই পারে বাঁচাতে। পারে হয়ত, কিন্তু বিশ্বকাপ আয়োজনে যে অযত্ন প্রকট তাতে বাঁচানোর ইচ্ছা আছে বলে তো মনে হয় না। আগামী কয়েক মরসুমে আইপিএলকে আরও লম্বা করার যে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলা হয়েছে সেটাও একদিনের ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসার লক্ষণ নয়। অতএব ২০২৭ সালে আর ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ না হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এতখানি অনিশ্চয়তা নিয়ে সম্ভবত কোনো খেলার বিশ্বকাপ শুরু হয়নি এর আগে।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

যত দোষ ক্রিকেট খেললে: ভারত-পাক বৈরিতার আজব শর্তাবলী

বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি বা এশিয়া কাপের মত প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা পড়লে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিস্ময়করভাবে সিয়াচেনের জওয়ানদের খরচের খাতায় ফেলে দেয়।

 

শচীন তেন্ডুলকর-পরবর্তী প্রজন্মের সেরা ভারতীয় টেস্ট ব্যাটার বিরাট কোহলি যে খেলোয়াড়জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ আজ পর্যন্ত চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাঁর একটি টেস্টও খেলা হয়নি। এই মুহূর্তে পাকিস্তানের টেস্ট দল যথেষ্ট সমীহ করার মত। বাঁহাতি পেসার শাহীন আফ্রিদি তিন ধরনের ক্রিকেটেই নতুন বলে উইকেট তুলে নেওয়ার ব্যাপারে দারুণ ধারাবাহিক। সঙ্গে আছেন তরুণ গতিময় পেসার নাসিম শাহ আর জীবনের প্রথম ছটা টেস্টেই ৩৮ উইকেট নিয়ে ফেলা লেগস্পিনার অবরার আহমেদ। এই বোলিংয়ের বিরুদ্ধে বিরাটদের দাঁড় করিয়ে দিলে খেলা কতটা চিত্তাকর্ষক হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার পাকিস্তান অধিনায়ক বাবর আজম এই মুহূর্তে সব ধরনের ক্রিকেটে বিশ্বের সবচেয়ে ধারাবাহিক এবং নয়নাভিরাম ব্যাটারদের একজন। মহম্মদ রিজওয়ান ব্যাট হাতে এত সফল যে এখন তিনি কখনো কখনো স্রেফ ব্যাটার হিসাবে খেলছেন, উইকেটরক্ষা করছেন প্রাক্তন অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদ। পাকিস্তান বহুকাল পরে পেয়ে গেছে একজন ওপেনারকে, যাঁর বয়স এখন মাত্র ২৩, কিন্তু এমন কিছু কাণ্ড করে বসে আছেন যা অতীতে শুধুমাত্র সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। যেমন প্রথম ছটা টেস্টে তিনি যত রান করেছিলেন তার চেয়ে বেশি রানের রেকর্ড আছে শুধুমাত্র সুনীল গাভস্কর, ডন ব্র্যাডম্যান আর জর্জ হেডলির। এই মুহূর্তে ১৪টা টেস্ট খেলে শফিকের রান ১২২০। এর মধ্যেই চারটে শতরান করে ফেলেছেন, যার একটা আবার দ্বিশতরান। এই পাক ব্যাটিংয়ের বিরুদ্ধে যশপ্রীত বুমরা, মহম্মদ শামি, মহম্মদ সিরাজ বা অশ্বিন-জাদেজার একটা লড়াইয়ের কথা ভাবলে জিভে জল আসবে যে কোনো ক্রিকেটরসিকের। আস্ত সিরিজ হলে তো কথাই নেই। কিন্তু এখানেই মুশকিল।

কোনো অতিনাটকীয় ঘটনা না ঘটলে কোহলি অবসর নেওয়ার আগে এরকম সিরিজ হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। যদি দুই দলই ২০২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠে তাহলে হয়ত একবার এই ঘটনা ঘটতে দেখা যেতে পারে, কারণ বহুদলীয় প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত খেললে ভারত সরকার বা ভারতীয় বোর্ড আপত্তি করে না। বিশেষত যদি খেলাটা হয় তৃতীয় কোনো দেশে। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক সিরিজ? নৈব নৈব চ। কেন? এককথায় উত্তর দিতে গেলে বলতে হবে “সিয়াচেন মেঁ জওয়ান হমারে লিয়ে লড় রহে হ্যাঁয়।”

ব্যাপারটার সূত্রপাত ২০০৮ সালে। সে বছর ১৮ অগাস্ট বিরাট প্রথমবার ভারতের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন আর ২৬ নভেম্বর মুম্বইয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের ঘটনায় দেড়শোর বেশি মানুষের প্রাণ যায়। আক্রমণকারীদের পাক যোগ প্রমাণিত হয়। পরের বছর, অর্থাৎ ২০০৯ সালে, ভারতীয় ক্রিকেট দলের পাকিস্তান সফরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের পর ভারতে প্রায় সব মহল একমত হয় যে ওই পরিবেশে ক্রিকেট খেলা হওয়া সঙ্গত নয়। ফলে মহেন্দ্র সিং ধোনির দলের আর পাকিস্তানে যাওয়া হয়নি। সেবছরই লাহোরে সফররত শ্রীলঙ্কা দলের টিম বাস এবং আম্পায়ার, ম্যাচ রেফারিদের গাড়ির উপর সন্ত্রাসবাদীরা গুলি চালায়। বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার, রিজার্ভ আম্পায়ার এহসান রাজা এবং শ্রীলঙ্কার সহকারী কোচ পল ফারব্রেস আহত হন। আটজন পাকিস্তানি নাগরিক মারাও যান। স্বভাবতই তারপর বহুবছর কোনো দেশের দলই পাকিস্তানে ক্রিকেট খেলতে যেতে রাজি হয়নি। তারপর থেকে দীর্ঘকাল সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর দুবাই বা শারজার মাঠই হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানের ‘হোম গ্রাউন্ড’।

তারপর কিন্তু গঙ্গা এবং সিন্ধু দিয়ে বিস্তর জল গড়িয়ে গেছে। পাকিস্তানের টালমাটাল রাজনীতির নিয়ম মেনে অসংখ্যবার সরকার বদল হয়েছে, পাক আদালতের রায়ে জামাত-উদ দাওয়া প্রধান হাফীজ সঈদের মত কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদীর কারাবাস হয়েছে। ভারতে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদলেছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা পাকিস্তান সম্পর্কে খড়্গহস্ত হলেও তাদের প্রিয় নেতা নরেন্দ্র মোদী আচমকা পাক প্রধানমন্ত্রীর নাতনির বিয়েতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইকে অভূতপূর্ব স্বাধীনতা দিয়ে ভারতের পাঠানকোট সেনা ছাউনিতে ‘তদন্ত’ করতে দিয়েছে ভারত সরকার। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনের কথা উঠলেই – সিয়াচেন… । এই পর্বে পাকিস্তান দল ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ভারতে এসে একদিনের ম্যাচ এবং টি টোয়েন্টি সিরিজ খেলে গেছে। তবে তখনো ভারতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। মোদীজি ক্ষমতায় আসার পর থেকে আর দ্বিপাক্ষিক সফর হয়নি। বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি বা এশিয়া কাপের মত প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা পড়লে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিস্ময়করভাবে সিয়াচেনের জওয়ানদের খরচের খাতায় ফেলে দেয়। সম্ভবত বহুকাল পরে এই দুই দলের একটা ম্যাচের টিকিট ও বিজ্ঞাপন থেকে যত টাকা রোজগার করে যতগুলো পক্ষ, তাতে আদিগন্ত বরফের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা জওয়ানের কষ্ট চাপা পড়ে যায়।

ব্যবস্থাটা ততদিন দিব্যি চলছিল যতদিন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ভারত পাকিস্তানে যাবে না, কিন্তু প্রয়োজনে তাদের ভারতে এসে খেলতে হবে – এটা সুবোধ বালকের মত মেনে নিচ্ছিল। এখন আর মানতে চাইছে না। কারণ সাত বছর হল সফলভাবে পাকিস্তান সুপার লিগ আয়োজিত হচ্ছে, যেখানে ভারত ছাড়া আর সব দেশের ক্রিকেটাররা খেলতে যান। উপরন্তু গত দুবছরে নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মত দেশও পাকিস্তানে এসে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলে গেছে। ফলে টাকার জোরে এবং/অথবা রাজনৈতিক কারণে ভারতীয় বোর্ড তাদের যেখানে ইচ্ছে খেলতে বাধ্য করবে, অথচ নিজেরা পাকিস্তানে খেলতে যাবে না – এ জিনিস পাক বোর্ড মানবে কেন? তাই সম্প্রতি এশিয়া কাপ নিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। বহুকাল আগে থেকে ঠিক ছিল এবারের এশিয়া কাপ হবে পাকিস্তানে। কিন্তু ভারতীয় দল কিছুতেই পাকিস্তানে যাবে না। বিস্তর দড়ি টানাটানির পর পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচটা বাদে অন্যগুলো নিজের দেশে খেলবে আর ভারত খেলবে শ্রীলঙ্কায়; সুপার ফোর স্তরের খেলাগুলো দুই দেশ মিলিয়ে খেলা হবে এবং ফাইনালও হবে শ্রীলঙ্কায় – এরকম দোআঁশলা ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব অন্যায় আবদার চিরকাল চলবে না।

চলার প্রয়োজন কী – সে প্রশ্নটাও তোলার সময় এসেছে। ২৬/১১-র পরেও বহুবার অন্য খেলার পাকিস্তান দল ভারত সফরে এসেছে, ভারতীয় দলও পাকিস্তানে গেছে। ২০২০ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়ে এক মজার কাণ্ড হয়েছিল। ভারতের ক্রীড়ামন্ত্রক এবং সর্বভারতীয় সংস্থা দাবি করেছিল তারা নাকি কোনো দলকে পাঠায়নি, ওদিকে ওয়াগা সীমান্ত পার হয়ে আস্ত একটি দল পাকিস্তানে হাজির হয়।

এ মাসেই চেন্নাইয়ে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস ট্রফি হকিতে পাকিস্তান খেলে গেল। এসবে বোধহয় সিয়াচেনের বরফও গলে না, ২৬/১১-তে মৃত মানুষদের স্মৃতিকেও অসম্মান করা হয় না। মজার এখানেই শেষ নয়। আসন্ন এশিয়ান গেমসে সোনা জিতলে ভারতীয় হকি দল সরাসরি প্যারিস অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। কিন্তু না পারলে যোগ্যতার্জন পর্বের খেলায় যোগ দিতে হবে, যা হবে পাকিস্তানে। হকি ইন্ডিয়ার প্রধান দিলীপ তিরকে ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছেন, সেরকম হলে দল পাকিস্তানে খেলতে যাবে।

আরও পড়ুন এটা যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট; ওঁরা গ্ল্যাডিয়েটর নন, ক্রিকেটার

তাহলে কি অলিম্পিক টিকিটের চেয়ে জওয়ান, শহিদ, মৃত নাগরিকদের প্রাণের দাম কম? নাকি একমাত্র ক্রিকেট দলেরই দায়িত্ব তাঁদের প্রাণের দাম দেওয়া? সে দায়িত্বও বিশ্বকাপ-টাপ এসে পড়লে কদিনের জন্য ভুলে থাকার লাইসেন্স দেওয়া আছে নাকি বোর্ডকে? এ তো বড় রঙ্গ জাদু!

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত