ক্রিকেটার তুমি কার?

এই দল আর ভারতের কৃষকদের হয়ে খেলে না। প্রবল অর্থনৈতিক মন্দায় গত এক বছরে যারা চাকরি খুইয়েছে, এ দল তাদেরও নয়।

১৯৯৯-এর জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে কলকাতার আশেপাশে এ বারের মত হাড় কাঁপানো ঠান্ডা ছিল না। চেন্নাইতে অবশ্য বছরের কোন সময়েই ঠান্ডা বলে কিছু থাকে কিনা তা বিতর্কের বিষয়। সেখানকার চিপকে চলছিল ভারত বনাম পাকিস্তান টেস্ট ম্যাচ। ৩০শে জানুয়ারি, অর্থাৎ ম্যাচের তৃতীয় দিন, বিকেলে যখন খেলা শেষ হল তখন চতুর্থ ইনিংসে জয়ের জন্য ২৭১ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ভারতের দুই ওপেনার আউট, ক্রিজে রাহুল দ্রাবিড়। এবং আমাদের নয়নের মণি শচীন তেণ্ডুলকার। “জেতালে ও-ই জেতাবে” — সকলের এমনটাই ধারণা। ওয়াসিম আক্রাম, ওয়াকার ইউনিস, সাকলেন মুস্তাককে সামলে আর কে জেতাতে পারে? রাহুল বড়জোর ম্যাচ বাঁচাতে পারেন। আজহার পারেন না, এমনকি সৌরভ পারেন বলেও আমরা কেউ ভাবছিলাম না। পরদিন দেখা গিয়েছিল, আমরা ভুল ভাবছিলাম না।

আমরা মানে রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরের ছাত্ররা। বেলুড় মঠের ঠিক পাশেই আমাদের আবাসিক কলেজ; স্বামী বিবেকানন্দের নাকি স্বপ্ন ছিল এই কলেজ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু আমাদের স্বভাব চরিত্র মোটেই অপাপবিদ্ধ ব্রহ্মচারীসুলভ ছিল না। আমরা বিলক্ষণ ক্লাস পালাতাম, স্টাডি আওয়ারে পাঁচিল টপকাতাম নানা কারণে। ক্রিকেট দেখা তার মধ্যে অবশ্যই একটা। ৩১শে জানুয়ারি ম্যাচের ফয়সালা হবে। সেদিন অবশ্য ক্লাস পালাবার দরকার ছিল না। কারণ দিনটা রবিবার। আমরা এক দঙ্গল সেদিন সকালেই হোস্টেল থেকে পলাতক। বেলুড় বাজারের আশেপাশে একগাদা ক্লাব। কোনটা সদ্যনির্মিত তৃণমূল কংগ্রেস প্রভাবিত, কোনটার বাইরে ঝোলে কাস্তে হাতুড়ি আঁকা লাল পতাকা। কোনটা অমুক গ্রামরক্ষী বাহিনী, কোনটা তমুক সংঘ। আমাদের মত হোস্টেল পালানো ক্রীড়ামোদীদের জন্য সকলেরই অবারিত দ্বার। কারণ পার্টি যার যার, ক্রিকেট সবার। ভারতীয় ক্রিকেটাররাও সবার।

সেদিন সকাল থেকে আবার বেলুড়ের সর্বত্র প্রবল বিদ্যুৎ বিভ্রাট। বামপন্থী আমি, আমার এক বিজেপি সমর্থক বন্ধু আর মোটের উপর অরাজনৈতিক জনা দুয়েক — এই চারজন টিভির খোঁজে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছুটে চলেছি। এই এখানে বসে শচীনের স্কোয়ার কাট দেখে মুগ্ধ হচ্ছি, পরক্ষণেই দৌড়তে হচ্ছে অন্য কোথাও, কারণ কারেন্ট চলে গেছে। শুধু আমরা চারজন নয়, একযোগে দৌড়ে বেড়াচ্ছে আমাদের কলেজের বিভিন্ন ব্যাচের জনা পঞ্চাশেক। কেউ এ ক্লাবে অন্ধ ভি কে রামস্বামীর দুবার ড্রপ পড়া বলে সৌরভকে আউট দেওয়া দেখেছে, কেউ ও ক্লাবে দেখে বুঝেছে আজহারের এল বি ডব্লিউ সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না।

এইভাবে সারা দুপুর অক্লান্ত দৌড়াদৌড়ি করে আমরা শচীন আর নয়ন মোঙ্গিয়ার জুটিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছি। ধর্মসঙ্কট উপস্থিত হল শচীন নব্বইয়ের ঘরে ঢুকে পড়ার পর। দেখা গেল গোটা এলাকা একসাথে বিদ্যুৎহীন। আমরা আক্ষরিক অর্থে পথে বসে পড়েছি। তারপর কোন একজন সিনিয়র ছুটতে ছুটতে এসে খবর দিল, ঐ মোড়ে কংগ্রেসের পার্টি অফিসে টিভি চলছে। সে রাস্তা থেকে দেখেছে। কিন্তু ওরা কি যাকে তাকে ঢুকতে দেবে? দল বেঁধে দৌড়নো হল ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের অফিসের দিকে। একজন বুক ঠুকে দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, কাকু, একটু খেলা দেখা যাবে? মাথা দোলানোর অপেক্ষা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সদলবলে কংগ্রেস ত্যাগ করার পর অতগুলো ছেলে একত্রে সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের কোন কংগ্রেস অফিসে ঢোকেনি। কিন্তু আমি আর আমার বিজেপি বন্ধু ইতস্তত করছি। তখনো বামেদের সমর্থনে কেন্দ্রে ইউ পি এ সরকার হয়নি, বরং কয়েক বছর আগেই সিপিএমের তাত্ত্বিক নেতারা কংগ্রেসের সমর্থনে সরকারে যাবেন না জেদ করে জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া আটকে দিয়েছেন। সেই কংগ্রেস অফিসে ঢুকব? আমার বিজেপি বন্ধু আবার দাবি করে সে আসলে গুজরাটি, মাত্র কয়েক পুরুষ আগেই তার পূর্বপুরুষ গুজরাট থেকে বাংলায় এসেছিলেন। সবচেয়ে বিখ্যাত গুজরাটি মহাত্মা থেকে সোনিয়া পর্যন্ত সব গান্ধীকেই সে ঘৃণা করে। তাদের ছবিওলা পার্টি অফিসে সে ঢোকে কী করে? শেষ পর্যন্ত দুজনেই অবশ্য বুক ঠুকে ঢুকে পড়লাম। শচীন জিতে গেলেন, পতাকাগুলো হেরে গেল। কারণ ওগুলো বিভিন্ন দলের পতাকা, শচীনের হাতে যে ভারতের পতাকা।

ম্যাচটা অবশ্য শচীন জেতাতে পারেননি। শেষের দিকে পিঠের ব্যথায় কাবু হয়ে চটজলদি খেলা শেষ করার চেষ্টায় বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উইকেট দিয়ে আসেন। তাঁর চারজন টিমমেট মিলে বাকি এক মুঠো রান করে উঠতে পারেননি। সেই হারের ধাক্কা এত প্রবল ছিল যে আমরা অনেকেই সেদিন সন্ধ্যায় পড়াশোনা করতে পারিনি। কেউ কেউ রাতে খেতেও যায়নি ডাইনিং হলে। এই বিষাদ কেন? কারণ ভারতীয় ক্রিকেট দল সবার হয়ে খেলে। শচীন যখন ব্যাট করতেন, আমাদের সবার হয়ে ব্যাট করতেন। বিরাট কোহলি, অজিঙ্ক রাহানে, চেতেশ্বর পুজারা, ঋষভ পন্থ — সকলেই সব ভারতীয়ের প্রতিনিধি। এমনটাই আমরা জানতাম। এবার বোধহয় মেনে নিতে হবে, ভুল জানতাম। ওঁরা আসলে বি সি সি আই নামে এক প্রাইভেট কোম্পানির কর্মচারী। সে কোম্পানির মালিকানা এখন বিজেপি নেতা তথা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সুপুত্র জয় শাহের হাতে। অতএব ক্রিকেটাররা এবং ক্রিকেট এখন কেবল বিজেপি আর তার সমর্থকদের। তা নাহলে ব্যতিক্রমহীনভাবে সকলে কৃষক আন্দোলন নিয়ে সরকারের পাশে দাঁড়িয়ে টুইট করতে যাবেন কেন? শুভমান গিল বাদে সকলেই তো এতদিন চুপ করে ছিলেন। এমনিতে তো এঁরা দেশের কোন ব্যাপারে মুখ খোলেন না, স্বর্গের দেবতাদের মত থাকেন। হঠাৎ এই বেলা একযোগে মর্ত্যে অবতরণের দরকার পড়ল কেন?

তথ্যের খাতিরে স্বীকার করতেই হয় যে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড ২০০৪ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে বলেছিল, ভারতীয় ক্রিকেট দল হল “the official team of BCCI, not the official team of India”. কিন্তু তারপর আরব সাগর দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্ট রীতিমত কমিশন বসিয়ে বোর্ড ভেঙে দিয়ে অ্যাড হক কমিটি দিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট চালিয়েছেন বেশ কিছুদিন। তারপর নতুন বোর্ড গঠন হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে অভূতপূর্ব বদল হয়েছে। রাজনীতিবিদদের ক্রিকেট প্রশাসনে অংশগ্রহণ চিরকাল ছিল। মাধবরাও সিন্ধিয়া, এন কে পি সালভে, শরদ পাওয়ারের মত কংগ্রেস নেতারা বোর্ডের সর্বোচ্চ পদেও থেকেছেন। তা বলে স্টেডিয়ামের বাইরে অরুণ জেটলির মত তাঁদের বিশাল মূর্তি বসানো হয়নি। ক্রিকেটারদের দিয়ে সরকারের প্রচার চালানো হয়নি। এখন নোটবন্দি হতে না হতেই বিরাট কোহলি পণ্ডিতের মত বলে দেন স্বাধীন ভারতে এটাই সবচেয়ে বিপ্লবী পদক্ষেপ। পুলওয়ামা বিস্ফোরণ, যার তদন্তে সরকার আদৌ মাথা ঘামাল না, সেই বিস্ফোরণে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভারতীয় দল খেলতে নামে আর্মি ক্যামোফ্লাজ ক্যাপ পরে। যদি তারপর ভারতীয় ক্রিকেটাররা বা অধিনায়ক বিরাট সরকারকে প্রশ্ন করতেন পুলওয়ামার শহীদদের মৃত্যুর জন্য কারা দায়ী তার তদন্ত হল না কেন? ধৃত দাবিন্দর সিং কেন জামিন পেল? তাহলে তবু ঐ শ্রদ্ধাজ্ঞাপনকে বিশ্বাস করা যেত। যেহেতু তা করা হয়নি, সেহেতু ভারতীয় ক্রিকেট দলকে সরকারী মুখপাত্র ছাড়া কিছু ভাবা শক্ত।

এই দল আর ভারতের কৃষকদের হয়ে খেলে না। প্রবল অর্থনৈতিক মন্দায় গত এক বছরে যারা চাকরি খুইয়েছে, এ দল তাদেরও নয়। কারণ তাদের সম্বন্ধে ক্রিকেটাররা টুইট করেন না। হঠাৎ লকডাউনে কাজ হারিয়ে যে প্রবাসী শ্রমিকরা কয়েকশো মাইল পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরেছেন, অনাহারে অর্ধাহারে বেঁচেছেন বা মারা গেছেন, তাঁদের নিয়ে টুইট করার সময়ও বাবুদের হয় না। যতই মহম্মদ সিরাজ বাবার মৃত্যু ভুলে থেকে প্রাণপণ বোলিং করে বিদেশের মাঠে জয়ের রাস্তা দেখান, এই দল নিজেকে ভারতের প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি মনে করে কিনা তা-ও সন্দেহজনক। কারণ অস্ট্রেলিয়ায় নিজেদের ক্রিকেটাররা বর্ণবৈষম্যমূলক মন্তব্যের স্বীকার হওয়ার আগে পর্যন্ত এরা #BlackLivesMatter আন্দোলনের প্রতি কোন সমর্থন জানায়নি। জর্জ ফ্লয়েড কাণ্ডের পর শুরু হওয়া ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে খেলোয়াড়রা এক হাঁটু মুড়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত মাথার উপরে তুলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, কিন্তু আই পি এল শুরু হয়েছিল ওসব ছাড়াই। ১৯ সেপ্টেম্বর আরম্ভ হওয়া প্রতিযোগিতায় ২৬ অক্টোবর হার্দিক পান্ডিয়া প্রথম ওভাবে প্রতিবাদ করেন, তাও একক প্রয়াসে। অথচ ভারত সরকারের যে কোন সিদ্ধান্ত সমর্থন করতে এই ক্রিকেটাররাই এক পায়ে খাড়া। সুতরাং এই ভারতীয় ক্রিকেট দলকে সেই ১৯৯৯-এর মত আমি আর আমার বিজেপি সমর্থক বন্ধু — দুজনেই নিজের দল বলে দাবি করতে পারি না বোধহয়। আমার মত লোকেরা এখন সেই বন্ধুর চোখে তো বটেই, ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের চোখেও দেশদ্রোহী।

আরো দুঃখের কথা, সেদিন যে ক্রিকেটারদের সাফল্যকে নিজেদের সাফল্য বলে আমরা মনে করতাম, যাঁদের ব্যর্থতায় আমরা কান্নায় ভেঙে পড়তাম, তাঁরাও আর আমাদের সকলের নন। বিরাট নাহয় বি সি সি আই-এর চাকুরে, শচীন তো তা নন। অনিল কুম্বলেও নন। তবু তাঁরা বাকি পৃথিবীর নিন্দার হাত থেকে সরকারকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছেন। সে কি এঁরা আম্বানিদের বেতনভুক কর্মচারী বলে? এই দুজনের বিতর্ক এড়িয়ে চলা কিন্তু জগদ্বিখ্যাত। শচীন তো বিতর্ক থেকে এতটাই দূরে থাকতে পছন্দ করতেন যে ম্যাচ ফিক্সিং কাণ্ডে অপরাধীদের শাস্তি হয়ে যাওয়ার পরেও বলেছিলেন তিনি নাকি ঐ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না, কিছুই দ্যাখেননি। হঠাৎ মধ্যবয়সে এসে বিতর্কের ভয় উধাও! আর আমাদের প্রথম যৌবনের বিপ্লবী অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির কথা যত কম বলা যায় তত ভাল। তিনি এখন শালগ্রাম শিলা। পদ ধরে রাখতে নিজের মেয়েকেও সোশাল মিডিয়া পোস্ট ডিলিট করতে বাধ্য করেন। অসুস্থ শরীরেও গতকাল শচীন, কুম্বলের টুইট রিটুইট করেছেন, কর্তব্যে অবহেলা নেই।

এতদিন জানতাম দুঃসময়ে বন্ধু চেনা যায়। দেখা গেল দুঃসময়ে আইকনও চেনা যায়।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে।

নিশীথিনী-সম

দোর্দণ্ডপ্রতাপ স্টিভ ওয়কে টসের জন্য অপেক্ষা করানো সৌরভ ছিলেন অরুণ খুনের তরুণ, মেয়েকে দিয়ে টুইট ডিলিট করানো সৌরভ নেহাতই মধ্যবয়স্ক পিতা।

বাঙালি আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে, আমরা শত বীণা বেণু রবে হইহই করব— এই অভিলাষেই উনবিংশ শতকের নবজাগরণের আলোকপ্রাপ্ত বাঙালির দিন এই একবিংশ শতাব্দীতেও কাটে। শ্রেষ্ঠ আসন কোনটা, তা চিহ্নিত করার ব্যাপারেও আমরা বেশ উদার, মোটেই গোঁড়া নই। আপাতত আমাদের মতে শ্রেষ্ঠ আসন হল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের পদ। কদিন কী হয় কী হয় চলল, আভাস ছিল বাংলার গৌরব সৌরভ নতুন চেয়ারম্যান হবেন। কিন্তু হব হব করেও কিছুতেই হয়ে উঠছে না। ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ডের দাদাগিরির চোটে আইসিসি এমন এক কোমরভাঙা সংগঠনে পরিণত যে, নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচনের পদ্ধতি কী হবে তা নিয়ে পর্যন্ত বিবাদ বিসম্বাদ। খবরে প্রকাশ, পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড চাইছে, আগের মতো দুই-তৃতীয়াংশ ভোটেই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হোন। দাদারা বিমুখ, তাঁরা চান সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়ম। এ বিবাদ না-মিটলে নতুন চেয়ারম্যানের নির্বাচন হবে না। ফলে, এক্ষুণি বাঙালির শ্রেষ্ঠ আসন লাভ সম্ভব হচ্ছে না।

না-ই বা হল পারে যাওয়া। আইসিসি চেয়ারম্যান না হলে কি সৌরভ গাঙ্গুলি বেহালার বাসিন্দা হয়েই থেকে যাবেন? ভারতীয় ক্রিকেটের মহারাজ থাকবেন না? তা তো নয়। ভারত অধিনায়ক হিসাবে ক্রিকেট ইতিহাসে তাঁর উজ্জ্বল অবদান মুছে দেওয়ার সাধ্য এমনকী অমিত শাহেরও নেই। টেস্ট ক্রিকেটে না-হলেও, একদিনের ক্রিকেটে সর্বকালের সেরা দশজন ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তাঁকে, স্রেফ পরিসংখ্যানের বিচারেও, না-রেখে উপায় নেই। অতএব উনি অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব ক্রিকেটের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হবেন কিনা, সে আলোচনা এখন থাক। এই লকডাউনারামে (থুড়ি, আনলকারামে) ঠান্ডা মাথায় বরং সৌরভের ‘বিবর্তন’ নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করা যাক।

দাদা যা ছিলেন, যা হইয়াছেন

সে এক সৌরভ গাঙ্গুলি ছিলেন। এই সহস্রাব্দের গোড়ায় যখন তাঁকে গড়াপেটা কলঙ্কিত ভারতীয় দলের অধিনায়ক করা হল, ক্রিকেট সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্য লিখেছিলেন অধিনায়ক হলে হবে না, সংস্কারক চাই। দাবিটা তখন অনেকেরই বাড়াবাড়ি মনে হয়েছিল, এমনকী ভক্ত বাঙালিদেরও কারও কারও বুক কেঁপেছিল। কুড়ির ঘরে বয়স একটা ছেলের, এমনিতেই তার ঘাড়ে এমন একটা সময়ে অমন গুরুদায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার ওপর আবার এতটা প্রত্যাশার ভার চাপিয়ে দেওয়া কি উচিত? অবাঙালিরা গৌতমবাবুর সে লেখা পড়তে পারেনি তাই, পারলে নির্ঘাত বলত ‘আদিখ্যেতা’। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ২০০৫-এ দায়িত্ব চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত অধিনায়ক সৌরভ যা যা করেছেন সেগুলো সংস্কারের চেয়েও বেশি। কেবল বিদেশের মাঠে ম্যাচ জেতানো নয়, কেবল লর্ডসের ব্যালকনিতে জামা খুলে মাথার উপর ঘুরিয়ে ইংরেজ আভিজাত্যের নাকে ঝামা ঘষে দেওয়া নয়, কেবল ভারতকে একগুচ্ছ ম্যাচ উইনার উপহার দেওয়া নয়। তিনি ভারতীয় ক্রিকেট দলের সংস্কৃতিই বদলে দিয়েছিলেন।

পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ বাহান্ন সেকেন্ডের বেশি একসঙ্গে মনে রাখার দরকার নেই— এ কথা ভারতীয় ক্রিকেটে সবাই জানত। কখনও মনসুর আলি খান পতৌদি, কখনও কপিলদেব কিছুটা অন্যরকম করার চেষ্টা করেছেন, দীর্ঘমেয়াদি ফল হয়নি। এ লবি বনাম সে লবির ঝগড়া রমরমিয়ে চলেছে, দলের হারজিতে কিছু এসে যায়নি। প্রত্যেক নির্বাচনী সভার আগে পরে ঢাকঢাক গুড়গুড় না-রেখেই আলোচনা হয়েছে— অমুকের তমুকের কোটায় দলে ঢুকেছে। ওই ছেলেটি অধিনায়কের রাজ্যের খেলোয়াড়, অতএব ওকে না-নিয়ে আর উপায় কী? এইসব দোষ থেকে ভারতীয় ক্রিকেটের প্রায় কোনও তারকা মুক্ত ছিলেন না। গাভাসকর অধিনায়ক থাকার সময় কপিল একটা টেস্টে ব্যর্থতার পর বাদ গিয়ে অধিনায়ককে দুষেছেন, কপিল অধিনায়ক থাকার সময় আজীবন ওপেনার গাভাসকর চার নম্বরে ব্যাট করার আবদার করেছেন। স্বয়ং শচীন তেন্ডুলকরের দিকেও আঙুল উঠেছে বাল্যবন্ধু বিনোদ কাম্বলিকে ফর্ম না-থাকলেও খেলিয়ে যাওয়ার জন্য। সৌরভের বেলায় হল উলটপুরাণ।

বাংলার সৌরভ জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমি থেকে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বিতাড়িত পাঞ্জাবের ছেলে হরভজন সিংকে দলের স্ট্রাইক বোলার করে ফেললেন। ভাল করে দাড়িগোঁফ না-ওঠা বরোদার জাহির খান নতুন বল হাতে আগুন ঝরানোর টানা সুযোগ পেলেন। দিল্লির নড়বড়ে ফিটনেসের নওজওয়ান আশিস নেহরা বারবার ফিরে আসার সুযোগ পেলেন। কর্নাটকের জাভাগল শ্রীনাথ অবসর নিয়ে ফেলেছিলেন, একদিনের ক্রিকেটে তাঁকে কেউ তখন ভরসা করে না। সৌরভ বললেন, ওঁকে ছাড়া বিশ্বকাপের দল হবে না। শ্রীনাথের রাজ্যেরই রাহুল দ্রাবিড়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মন্থর ব্যাটিং করেন, বাদ দিলে প্রাইম টাইম টিভিতে অর্ণব গোস্বামীর মতো চেঁচানোর কেউ ছিল না। সৌরভ তাঁকেও উইকেটরক্ষকের গ্লাভস ধরিয়ে দলে রেখে দিলেন। দিল্লির বীরেন্দ্র সহবাগ মিডল অর্ডারে হঠকারী ব্যাটিং করে, ওকে দিয়ে টেস্ট ক্রিকেট হবে না— সিদ্ধান্ত হয়েই গিয়েছিল। সৌরভ তাঁকে বাদ তো দিলেনই না, ইনিংস শুরু করতে পাঠিয়ে দিলেন। কেবল কোনও মাঝারি মানের বাংলা ক্রিকেটার সৌরভের দলে ঠাঁই পেলেন না।

অর্থাৎ তিনি যোগ্যতা দেখতেন, প্রতিভা দেখতেন, রাজ্য দেখতেন না। এই কারণেই সৌরভ কেবল বাংলার সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার হয়ে কেরিয়ার শেষ করেননি, সারা দেশের ক্রিকেটের জনগণমনঅধিনায়ক হয়ে অবসর নিয়েছিলেন। গড়াপেটা কাণ্ডে বীতশ্রদ্ধ বহু মানুষ সৌরভের দলের জন্য ক্রিকেটের কাছে ফিরে এসেছিলেন। সে কৃতিত্ব তাঁর একার নয় নিশ্চয়ই। তেন্ডুলকর, দ্রাবিড়, কুম্বলে, লক্ষ্মণদের মতো ভদ্রলোক সিনিয়র ক্রিকেটাররা না-থাকলে হয়তো সেই কেলেঙ্কারির প্রভাব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হত না। কিন্তু সৌরভই যে তাঁদের মধ্যমণি, সে কথা অনস্বীকার্য।

আর এখন?

সৌরভ যখন বোর্ড সভাপতি হলেন, তখন আমরা আহ্লাদে আটখানা হয়ে অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সমমর্যাদায় স্থাপন করেছি ঘটনাটাকে। এমন একজন দায়িত্ব নিলেন যিনি খেলোয়াড় জীবনে ভারতীয় ক্রিকেটকে অতল গহ্বর থেকে উদ্ধার করেছিলেন। ক্রিকেটের অচ্ছে দিন তাহলে এসেই পড়ল। কেবল আমাদের মতো অর্বাচীনরা নয়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা, তাঁদের দ্বারা নিযুক্ত অস্থায়ী কর্তা বিনোদ রাই পর্যন্ত এমনটাই ভেবেছিলেন। দেশের যেমন ‘স্ট্রং লিডার’ দরকার, দেশের ক্রিকেটেরও তো দরকার। কিন্তু দেখা যাচ্ছে দিল্লির রেসকোর্স রোডের বাসিন্দা কিসে স্ট্রং তা যেমন দুর্বোধ্য, কলকাতার বীরেন রায় রোডের বাসিন্দা কিসে স্ট্রং, দুর্বোধ্য তাও।

বলিউড আর ক্রিকেটের উপাদেয় খিচুড়ি আইপিএল-এ গড়াপেটার ছায়া পড়ল, মহেন্দ্র সিং ধোনি পর্যন্ত বিচারপতির সামনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন। ঘটনার জল গড়াতে গড়াতে সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছল, মহামান্য আদালত দেশের ক্রিকেটের খোলনলচে বদলে ফেলার নির্দেশ দিলেন। দেখা গিয়েছিল, বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা। স্বয়ং বোর্ড সভাপতি এন শ্রীনিবাসনকে বাণপ্রস্থে যেতে হল। আমাদের সৌরভ, সুপ্রিম কোর্টের আস্থাভাজন সৌরভ, সিএবি সভাপতি থেকে এক লাফে বিসিসিআই সভাপতি হলেন কাদের সমর্থনে? শ্রীনিবাসনের সমর্থনে। বিতাড়িত শ্রীনিবাসন স্বয়ং ঘোষণা করলেন তাঁর নাম। স্ট্রং লিডার।

ক্রিকেট খেলায় বেনিফিট অফ ডাউট চালু আছে। সবসময় ব্যাটসম্যানকেই তা দেওয়া নিয়ম। বাংলার গৌরবকেও তাই দিতে মন চাইছে নিশ্চয়ই? বোর্ডের অচলাবস্থা কাটাতে তাঁর মতো একজন দিকপাল ক্রিকেটার যদি সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হন তাতে ওটুকু দোষ না-ধরাই উচিত, তাই না? কিন্তু কাকে বেনিফিট দেবেন? যিনি নিজের ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য একবার বদলানো সংবিধান আবার বদলানোর আবেদন করেছেন?

একজন সৌরভ গাঙ্গুলি ছিলেন। তিনি দারুণ ফর্মে থাকতে থাকতে হঠাৎ একদিন বললেন, “এবার আসি।” আমরা সবাই হায় হায় করে উঠেছিলাম। তিনি কিন্তু চিরশত্রু গ্রেগ চ্যাপেলের দাদা ইয়ানের পরামর্শ শিরোধার্য করে চলেই গিয়েছিলেন। ইয়ানের বিখ্যাত মন্তব্য, এমন সময়ে যেতে হয় যখন সবাই জিজ্ঞেস করে “কেন?” “কেন নয়” জিজ্ঞেস করা অবধি অপেক্ষা করা উচিত নয়। আজকের সৌরভ গাঙ্গুলির বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কবিতা পড়ার অভ্যাস হয়েছে কিনা, জানা নেই। হয়তো শক্তি চাটুজ্জের ভক্ত হয়েছেন, ঘুমের মধ্যেও আওড়ান, “যেতে পারি, কিন্তু কেন যাব?” স্ট্রং লিডারের ভাবমূর্তিতে দাগ পড়া অতএব আটকানো যাচ্ছে না।

অবশ্য বয়স বাড়লে কে-ই বা যৌবনের মতো স্ট্রং থাকতে পারেন? রথযাত্রার আদবানি আর মার্গদর্শক আদবানি কি একই লোক? দোর্দণ্ডপ্রতাপ স্টিভ ওয়কে টসের জন্য অপেক্ষা করানো সৌরভ ছিলেন অরুণ খুনের তরুণ, মেয়েকে দিয়ে টুইট ডিলিট করানো সৌরভ নেহাতই মধ্যবয়স্ক পিতা। তিনি বিধির দর্পহারী হওয়ার স্বপ্নও দেখেন না। ও কথা থাক। খেলার মধ্যে রাজনীতি টেনে আনা বদভ্যাস বলে আমরা সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়েছি অনেককাল হল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যতই নিজে উদ্যোগ নিয়ে বোর্ড সভাপতি কে হবেন তা নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করুন, যতই তাঁর সুপুত্র বোর্ডের পদাধিকারী হোন, ক্রিকেট একটা খেলা বই তো নয়। সৌরভ গাঙ্গুলির সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি প্রাক্তন ক্রিকেটার, অতএব তিনি ক্রিকেটের জন্য কী করছেন, ক্রিকেটারদের জন্য কী করছেন তা নিয়েই কথা হোক।

কোভিড-১৯ এর জ্বালায় পৃথিবীজুড়ে ক্রিকেট বন্ধ ছিল অনেকদিন, সম্প্রতি আবার শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এখনও ইংল্যান্ডের বাইরে শুরু হয়নি, ঘরোয়া ক্রিকেট শ্রীলঙ্কায় শুরু হয়ে গেছে। ইংল্যান্ডেও কাউন্টি ক্রিকেট চালু হয়েছে আবার। আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট এখনও ভোঁ ভাঁ। দেরি করে শুরু হবে বলা হয়েছে। তাও শুধু কুড়ি-বিশের প্রতিযোগিতা সৈয়দ মুস্তাক আলি আর রঞ্জি ট্রফি। বিজয় হাজারে বাদ, দলীপ ট্রফি বাদ, ইরানিও বাদ। বোর্ড সভাপতির অনেক কাজ আছে, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট নিয়ে এর বেশি মাথা ঘামানোর সময় নেই। তিনি ইউএই প্রিমিয়ার লিগ, থুড়ি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের আয়োজন করতে ব্যস্ত। একগাদা দল আর তাদের বিরাট দলবলকে অন্য দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যাচ্ছে, মহিলা ক্রিকেট দলকে ইংল্যান্ডে পাঠানোর ব্যবস্থা করা গেল না? এদিকে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটাররা তাঁদের প্রাপ্য টাকাপয়সা পাননি বলে অভিযোগ, বিরাট কোহলিদেরও নাকি মাইনে বাকি। সকলে স্ট্রং লিডারের দিকে তাকিয়ে আছে।

আমার-আপনার অবশ্য সে ভাবনা না-ভাবলেও চলবে। কপাল ভালো থাকলে টিভি খুললেই দেখতে পাবেন, সৌরভ বলছেন জমিয়ে খেলতে। তিনি সফল অধিনায়ক, তাঁর দলের সঙ্গে নিজের দল মেলাতে পারলেই একেবারে এক কোটি টাকা পাওয়া যাবে। সে কালে দাদা গড়াপেটার অন্ধকার থেকে ক্রিকেটকে বের করে এনেছিলেন, এ কালে আমাদের বাজি ধরতে বলছেন। সে কালের বাণী ছিল, “তমসো মা জ্যোতির্গময়”। অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে চলো। এ কাল ভরিল সৌরভে। নিশীথিনী-সম।

আসলে দোষ, সৌরভের নয়। হেরাক্লিটাসের নাম না-শুনে থাকলেও সৌরভ বিলক্ষণ বোঝেন, মানুষ এক নদীতে দুবার ডুব দিতে পারে না। তিনি নদীতে সাঁতরে সাগরের দিকে চলেছেন, আমরা বাঙালিরা নস্টালজিয়ার বদ্ধ জলায় বারবার ডুব দিচ্ছি।

তথ্যসূত্র:

https://4numberplatform.com/ এ প্রকাশিত

টুপির আমি টুপির তুমি?

খেলোয়াড়রা বা দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক চাওয়া পাওয়া, ইতিহাস, ক্ষোভ, রাগ ইত্যাদি খেলার মাঠে প্রকাশ করে শাস্তি না পেলে মাঠে ক্রমশ রাজনীতিই হতে থাকবে, খেলা নয়।

২৬শে নভেম্বর ২০০৮। ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদী হামলা। হতাহতের সংখ্যা, আক্রমণের ব্যাপকতা, দৈর্ঘ্য — যেদিক দিয়েই বিচার করুন। সেই ঘটনার ঠিক দু সপ্তাহ পরে, এগারোই ডিসেম্বর, চেন্নাইয়ের এম এ চিদম্বরম স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের একটি টেস্ট ম্যাচ শুরু হয়। গোটা ম্যাচে পিঠ দেওয়ালে ঠেকে থাকার পর, চতুর্থ দিন বিকেলে ৬৮ বলে ৮৩ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে বীরেন্দ্র সেওয়াগ ম্যাচ জেতার পথ খুলে দিয়ে যান। পঞ্চম দিন সকালে ভারতের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজন, তখন দেশের নয়নমণি শচীন তেন্ডুলকর অপরাজিত শতরান করে ভারতীয় দলকে জেতান। খেলার পরে তিনি বলেন

What happened in Mumbai was extremely unfortunate and I don’t think by India winning or me scoring a hundred, people who have lost their loved ones will feel any better. It’s a terrible loss for all of them and our hearts are with them, but whatever manner we can contribute to making them feel better we’ll make that effort.

(www.telegraph.co.uk)

শোক প্রকাশে যে পরিমিতি জরুরী, তাঁর কথায় শুধু যে তা ছিল তা-ই নয়, ঐ কথাগুলোর মধ্যে এই উপলব্ধিও রয়েছে যে ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত একটা খেলাই, তার বেশি কিছু নয়। কোন জয়, কোন শতরান মানুষের মৃত্যুর ক্ষতি পূরণ করতে পারে না।

মাঝে এগারো বছর কেটে গেছে। “আশাটাও পণ্য এখন বাজার দরে / বিকোতে পারলে টাকা আসবে ঘরে।“ শুধু আশা নয়, শোকও এখন বিক্রয়যোগ্য। দেশপ্রেম তো বটেই।

তাই দেশসুদ্ধ দেশপ্রেমিকরা হাততালি দিলেন, হর্ষিত হলেন এই দেখে যে বিরাট কোহলি তাঁর দলবল নিয়ে ক্রিকেট মাঠে নামলেন সেনাবাহিনীর টুপি পরে, যে টুপিতে আবার বহুজাতিক ব্যবসায়িক সংস্থা নাইকির লোগো। অর্থাৎ ভারতীয় ক্রিকেটাররা পুলওয়ামার শহীদদের, সেনাবাহিনীর জওয়ানদের এত সম্মান করেন যে তাঁদের সম্মান জানানোর জন্যেও একটা দিন সেলসম্যান হওয়া বন্ধ রাখতে পারলেন না। স্পনসরের লোগো লাগানো টুপি যদ্দিন তৈরি হয়নি তদ্দিন ওঁরা শোকপালন স্থগিত রেখেছিলেন। পুলওয়ামায় হামলা হয়েছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি। এমন নয় যে তারপর থেকে ভারতীয় দল আর মাঠে নামেনি। অথচ শহীদদের সম্মানে একটা ম্যাচের ফি দিয়ে দেব, জওয়ানদের মত ক্যামোফ্লাজ টুপি পরব — এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ধোনি, কোহলির মত বিরাট দেশপ্রেমিকদের লেগে গেল প্রায় এক মাস। আচ্ছা, সিদ্ধান্তটা এমন হল না কেন যে এই দিনটায় যেহেতু সেনাবাহিনীর টুপি পরছি, সেহেতু আমাদের জামা, জুতো, টুপি, ব্যাট, প্যাড কোত্থাও কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের লোগো থাকবে না? যাঁরা জীবন দিলেন তাঁদের জন্যে এটুকু ত্যাগ করতে পারি না, অথচ দেশপ্রেম আমার উপচে পড়ছে? দেশ ভর্তি দেশপ্রেমিক বলিউড তারকা, রাজনীতিবিদ, খোদ প্রধানমন্ত্রী, তাঁর আই টি সেল — সকলে কী করে মেনে নিলেন সেনাবাহিনীর টুপির এই বেসাতি? এরপর তো কোনদিন দেখব তেরঙার মাঝখানে অশোকচক্রের পাশে জিও লোগো। দেশপ্রেমিকরা মেনে নেবেন তো? অবশ্য এতে আপত্তির আছেটাই বা কী? লালকেল্লা তো ইতিমধ্যেই ডালমিয়া রেড ফোর্ট। দেশপ্রেম তো শুধু বিরোধী কণ্ঠ রোধ করার সময়ে পবিত্র, ধরা ছোঁয়ার ঊর্ধ্বে।

ক্রিকেটাররা নিজেদের এক দিনের বেতন দিয়ে দিলেন জাতীয় নিরাপত্তা তহবিলে। চমৎকার খবর। গত বছর কেরালায় ভয়াবহ বন্যা হল, সচরাচর এত বড় বন্যা হয় না। তখন ক্রিকেটাররা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে কদিনের বেতন দিয়েছিলেন মনে করতে পারছি না। আমার মত দেশদ্রোহীরা অবশ্য দেশের ভাল কাজ দেখতে পান না। দেশপ্রেমিকরা কেউ মনে করিয়ে দিলে ভাল হয়। অবশ্য ত্রাণ তহবিলে দান ঠিক ফোটোজিনিক নয়। নিহত জওয়ানদের স্ত্রীরা যা-ই বলুন না কেন, সেনাবাহিনীর নাম করে কিছু করার মধ্যে যে মাচোপনা আছে বন্যাদুর্গতদের সাহায্য করার মধ্যে তা কোথায়?
তাছাড়া ক্রিকেটারদের মাথায় তুলতে তুলতে আমরা যে কৈলাসে তুলেছি, সেখানে বসে গঞ্জিকা সেবন না করেও তাঁদের মনে হতেই পারে ক্রিকেট শুধু খেলা নয়, তাঁরাও নেহাত খেলোয়াড় নন। সকলেই সাক্ষাৎ যোদ্ধা একেকজন। বিরাট ভাবতেই পারেন তাঁর ব্যাটটা এক্কেবারে এ কে ৪৭, ধোনির হেলিকপ্টার শটে চাপিয়ে অভিনন্দন বর্তমানকে পাঠানো হলে তিনি পাক সেনার হাতে ধরা পড়তেন না। ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা যে নিজেদের দেবতা গন্ধর্ব বলে মনে করেন তা তো আমরা দেখেছিই কিছুদিন আগে, যখন দুই তরুণ ক্রিকেটার নিজেদের কার্তিক আর কেষ্ট জ্ঞানে টেলিভিশনের প্রাইম টাইম অনুষ্ঠানে বসে লীলা বর্ণনা করছিলেন। অতএব সেনাবাহিনীর জীবন নিংড়ে নেওয়া ট্রেনিং না নিয়েও, মাসের পর মাস সমস্ত শারীরিক, মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে কাজ না করেও যদি ক্রিকেটাররা মনে করেন তাঁরা আর্মি ক্যাপ পরার যোগ্য, তাঁদের ঠেকাবে কে? “সিয়াচেনে আমাদের জওয়ানরা লড়ছে” বলে যাঁরা সমালোচনার মুখ বন্ধ করেন, নিরীহ লোককে ঠ্যাঙান বা ভোট ভিক্ষা করেন — বিরাটবাহিনীর এই ধ্যাষ্টামোতে তাঁদের আহ্লাদ প্রমাণ করে সত্যিকারের জওয়ানদের প্রতি এঁদের বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই।

বিরাট কোহলি আজ নিজেকে সৈনিক ভেবে আমোদিত হচ্ছেন, তাঁর ব্যর্থতা এবং তাঁর দলের ব্যর্থতাকে যেদিন দেশের মানুষ সেনাবাহিনীর পরাজয়ের মতই মরণবাঁচন সমস্যা মনে করবেন, সেদিন কিন্তু হেরে গেলে গালিগালাজ, মারধোর, বাড়িতে ইঁট পড়া — কোনটাকেই অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ খেলা যে শুধু খেলা নয়, ভারতীয় ক্রিকেট দল যে সেনাবাহিনীর মতই দেশরক্ষার কাজে নিযুক্ত সেটা বিরাটরা নিজেরাই তো প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হয়েছেন। ইতালিতে বিয়ে করতে যাওয়া যায়, সেই সঙ্কটে ওখানে ক্রিকেট খেলতে চলে গেলে লাভ হবে তো?

এসব কেনা বেচার বাইরেও অবশ্য কালকের দিনটা অন্য এক বিপদের জন্ম দিয়ে গেল। বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল ভারতীয় ক্রিকেট সংস্থার কাছে কাঞ্চনমূল্যে আত্মবিক্রীত। তাদের ঠুঁটোপনার কারণেই সম্ভবত খেলার মাঠে সামরিক তথা রাজনৈতিক প্রতীকের প্রবেশ অনুমতি পেয়েছে। পৃথিবীর অন্য কোন খেলায় এ ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে বলে মনে হয় না। কারণ খেলার মাঠকে রাজনৈতিক, সামরিক বিষয়ে মত প্রকাশের মঞ্চ হয়ে উঠতে দিলে খেলাধুলোর রক্তাক্ত শত্রুতা হয়ে উঠতে বিশেষ সময় লাগবে না।

ফুটবলপ্রেমীদের নিশ্চয়ই মনে আছে গত ফুটবল বিশ্বকাপে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে গোল করার পর আলবানিয়ার পতাকায় যে দুমুখো ঈগল থাকে সেটার সম্পর্কে ইঙ্গিত করায় ফিফা সুইজারল্যান্ডের গ্রানিত ঝাকা আর ঝেরদান শাকিরিকে জরিমানা দিতে বাধ্য করেছিল। ঐ দুজনের উদ্বাস্তু জীবন, একজনের বাবার পূর্বতন যুগোস্লাভিয়ায় নির্যাতিত হওয়ার ইতিহাসের কারণে বিশ্বজুড়ে এই সিদ্ধান্তের জন্যে ফিফা সমালোচিতও হয়। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, খেলোয়াড়রা বা দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক চাওয়া পাওয়া, ইতিহাস, ক্ষোভ, রাগ ইত্যাদি খেলার মাঠে প্রকাশ করে শাস্তি না পেলে মাঠে ক্রমশ রাজনীতিই হতে থাকবে, খেলা নয়। ক্রিকেটে সেই সম্ভাবনা গতকাল তৈরি হয়ে গেল। এরপর ভারত বনাম শ্রীলঙ্কার খেলায় যদি শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা রাজীব গান্ধী প্রেরিত শান্তি বাহিনীর হাতে নিহতদের স্মৃতিতে লুঙ্গি ছাপ টুপি পরে খেলতে চায় আই সি সি না বলবে কোন যুক্তিতে? এই কষ্টকল্পনারও প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের খেলায় যদি বাংলাদেশ দল পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন গণহত্যায় মৃতদের স্মরণে দেখতে রক্তের ছিটের মত এমন নকশার জার্সি পরতে চায়, আটকানো হবে কোন যুক্তিতে? রাজনীতি খেলার অ্যাজেন্ডা নির্ধারণ করতে শুরু করলে অচিরেই খেলা রাজনীতির অ্যাজেন্ডা নির্ধারণ করবে। সে বড় সুখের সময় নয়, সে বড় আনন্দের সময় নয়। হন্ডুরাস আর এল সালভাদোরের যুদ্ধ লেগেছিল সামান্য একটা ফুটবল ম্যাচ নিয়ে। আমরা আধুনিক রাষ্ট্রের মানুষ নিশ্চয়ই এই ধ্বংসাত্মক ছেলেমানুষীর পুনরাবৃত্তি চাইব না।

শেষে একটা কথা বলার আছে। অনেকেই বলেন, খেলা কি তার পারিপার্শ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন? খেলাধুলোর ইতিহাসে কখনো কি রাজনীতি ঢুকে পড়েনি? বিশ্বকাপ ফুটবলে আমরা কাকে সমর্থন করছি তার পেছনে কি রাজনীতি থাকে না কখনোই?

সত্যি কথা। খেলা বা খেলোয়াড় তার চারপাশ বাদ দিয়ে নয়। বিশ্বকাপ ফুটবলে আমাদের সমর্থনও প্রায়শই রাজনৈতিক কারণে হয়। খেলাধুলোর ইতিহাসেও বহু রাজনৈতিক ঘটনার পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ প্রভাব আছে।

কিন্তু এই আলোচনায় আমাদের সমর্থনের প্রশ্নটা প্রথমেই বাদ দিতে হবে। কারণ মাঠ থেকে বহু দূরে থাকা সমর্থকের রাজনৈতিক বা সামাজিক পছন্দ অপছন্দ খেলায় প্রভাব ফ্যালে না। যাঁরা মাঠে থাকেন তাঁদের ব্যবহার নিঃসন্দেহে প্রভাব ফ্যালে। সেই কারণেই তাঁদের ব্যবহারেরও নিয়মকানুন আছে। সে নিয়ম ভাঙলে তাঁরা যে ক্লাবকে বা দেশকে সমর্থন করেন তাদের শাস্তি দেওয়ার নিয়মও আছে প্রায় সব খেলাতে। সেই কারণেই চেলসি সমর্থকরা বর্ণবিদ্বেষী গালাগালি দিলে চেলসি পার পায় না।

এবার খেলোয়াড়দের প্রসঙ্গে আসা যাক। রাজনৈতিক বিবৃতির কতকগুলো অবিস্মরণীয়, উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত খেলার মাঠে আছে। কিন্তু সেই বিবৃতি এসেছে খেলার মধ্যে দিয়েই, আক্রমণাত্মক সামরিক পোশাকের মধ্যে দিয়ে নয়। আমার সবচেয়ে প্রিয় দৃষ্টান্তটা দিয়ে শেষ করি।

বার্লিন অলিম্পিক, ১৯৩৬। অ্যাডলফ হিটলার ভেবেছিল আর্য রক্তের বিশুদ্ধতা প্রমাণের সবচেয়ে বড় মঞ্চ তৈরি করবে অলিম্পিকটাকে। অথচ তার নাজি গর্ব গুঁড়িয়ে গিয়েছিল একজন কালো মানুষের পায়ের তলায়। তাঁর নাম জেসি আওয়েন্স। নাজিবাদকে খেলার মাঠে হারিয়ে দিয়েছিল চারটে সোনার মেডেল। মার্কিন সেনাবাহিনীর পোশাক নয়।

ঐ অলিম্পিকেই হকি ফাইনালে হিটলারের জার্মানিকে ভানুমতীর খেল কাকে বলে দেখিয়ে দিয়েছিলেন এক ভারতীয়। তাঁর নাম ধ্যানচাঁদ। পরাধীন দেশের কালো চামড়ার লোকেদের দলের কাছে সেদিন আট গোল খেয়েছিল হিটলারের আর্য রক্তের বীরপুঙ্গবরা। শোনা যায় হিটলার নাকি ধ্যানচাঁদকে জার্মানিতে রেখে দিতে চেয়েছিল৷ হকির জাদুকর পাত্তা দেননি। তাঁর কিন্তু শস্তার জার্সি ছাড়া কিচ্ছু ছিল না।

বিরাট রাজার দরবারে

আপনি কে বিরাট? মোদীজির মত আপনিও কি নিজেকে ভারতবর্ষের মূর্ত প্রতীক মনে করেন?

A lovely day for cricket
Blue skies and gentle breeze
The Indians are awaiting now
To play the West Indies
A signal from the umpire
The match is going to start
The cricketers come on the field
They all look very smart …
Erapalli Prasanna
Jeejeebhoy and Wadekar
Krishnamurthy and Vishnoo (sic) Mankad
Them boys could real play cricket
On any kinda wicket
They make the West Indies team look so bad
We was in all kinda trouble
Joey Carew pull a muscle
Clive Lloyd get ’bout three run out
We was in trouble without a doubt
It was Gavaskar
De real master
Just like a wall
We couldn’t out Gavaskar at all, not at all
You know the West Indies couldn’t out Gavaskar at all
Ven-kat-a-ra-ghavan
Bedi, in a turban
Vijay Jaisimha, Jayantilal
They help to win the series
Against the West Indies
At Sabina Park and Queen’s Park Oval
A hundred and fifty-eight by Kanhai
Really sent our hopes up high
Noriega nine for ninety-five
The Indian team they still survive
It was Gavaskar
De real master
Just like a wall
We couldn’t out Gavaskar at all, not at all
You know the West Indies couldn’t out Gavaskar at all
Govindraj and Durani
Solkar, Abid Ali
Dilip Sardesai and Viswanath
They make West Indies bowlers
Look like second raters
When those fellas came out here to bat
West Indies tried Holder and Keith Boyce
They had no other choice
They even try with Uton Dowe
But ah sure that they sorry they bring him now
It was Gavaskar
De real master
Just like a wall
We couldn’t out Gavaskar at all, not at all
You know the West Indies couldn’t out Gavaskar at all
Little Desmond Lewis
Also Charlie Davis
Dey take a little shame from out we face
But Sobers as the captain
He want plenty coachin’
Before we cricket end up in a disgrace
Bedi hear that he became a father
So he catch out Holford in the covers
But when Sobers hear he too had a son
He make duck and went back in the pavilion
It was Gavaskar
De real master
Just like a wall
We couldn’t out Gavaskar at all, not at all
You know the West Indies couldn’t out Gavaskar at all

মহামান্য বিরাট রাজা সমীপেষু,
ক্রিকেট আর ভদ্রলোকের খেলা নেই আমরা সকলেই জানি। তাই আজকাল ক্রিকেটারদের থেকে মাঠে বা মাঠের বাইরে ভদ্রলোকসুলভ ব্যবহার কেউ আশাও করে না। আজকাল মাঠে যে ক্রিকেটার যত বেশি গালাগালি দেন তিনি তত বেশি ডাকাবুকো। ক্ষিপ্ত বাঁদরের মত দাঁত না খিঁচোলে যে আগ্রাসন প্রকাশ পায় না তা এখন সদ্য প্লাস্টিকের ব্যাট হাতে নেওয়া শিশুও জানে। অতএব আপনি শতরানের পর শতরান করে ভক্তদের রানের ক্ষিদে বাড়িয়ে দিলেও আপনার থেকে দৃষ্টান্তমূলক ভদ্রজনোচিত ব্যবহার কেউ আশা করে না। বস্তুত তেমন কিছু কখনো করে ফেললে আপনার অনেক ভক্ত হয়ত ঈষৎ রুষ্টই হবেন। আপনার অধীনস্থ সৈনিক যজুবেন্দ্র চহল যেমন কিছুদিন আগে এক পাকিস্তানি ক্রিকেটারের জুতোর ফিতে বেঁধে দিয়ে অপ্রয়োজনীয় হাততালির সঙ্গে বেশকিছু নিন্দেমন্দও শুনলেন। ভক্তরা যা আশা করেন তা হল খেলোয়াড়োচিত মনোভাব, লোকদেখানো হলেও। সেটুকুরও অভাব ঘটা পীড়াদায়ক।
সোশাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যে সংক্রমিত ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে কোন এক ক্রিকেটমোদী লিখেছেন তিনি মনে করেন আপনি “overrated” এবং আপনার ব্যাটিঙে কোন বিশেষত্ব নেই। তিনি আপনার ব্যাটিঙের চেয়ে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং দেখতে বেশি পছন্দ করেন। সন্দেহ নেই লোকটি/মহিলাটি নিতান্ত বেরসিক। কিন্তু আপনি নিদান দিয়েছেন অন্য দেশের খেলোয়াড়দের বেশি পছন্দ হলে সেই দেশেই চলে যাওয়া উচিৎ। অদূর অতীতে আপনার নানা আপত্তিকর ব্যবহারের উত্তরে কিছু লিখব ভেবেও লিখিনি। এবার কিন্তু আত্মসংবরণ অন্যায় বলে মনে হচ্ছে। তাই দু কলম না লিখে পারলাম না।
সবে গতকাল আপনাদের ভারতীয় ক্রিকেট দল নির্বিষ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিষ ঝেড়ে উঠল। কুড়ি বিশের সিরিজের ঠিক আগে হওয়া পঞ্চাশ ওভারের সিরিজে আপনি প্রবল ব্যাটিং বিক্রমে আরো একবার ক্রিকেটমোদীদের মুগ্ধ করলেন। ধরে নেওয়া অযৌক্তিক হবে না যে তার ফলে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে আপনার ভক্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন যতই সবার পিছে সবার নীচে জায়গা হোক না কেন, আপনি নিশ্চয়ই জানেন ঐ দ্বীপপুঞ্জের ক্রিকেট দল একদা অবধ্য ছিল। তাদের হাড়ে কাঁপন ধরানো জোরে বোলার আর নির্দয় ব্যাটসম্যানরা বিশ্ব ক্রিকেট শাসন করতেন। এই লেখার শুরুতে রোমান হরফে যে দীর্ঘ অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতাটা দেখা যাচ্ছে সেটা আসলে একটা গান, ক্যারিবিয়ানরা যাকে বলেন ক্যালিপসো। এই ক্যালিপসো রচিত হয়েছিল সুনীল গাভাসকরের বন্দনায়। ১৯৭১ এর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়ে যখন অজিত ওয়াড়েকরের ভারতীয় দল সিরিজ জেতে তখন ওখানকার ক্রিকেটপ্রেমীরা এই গান রচনা করেন। এই গানে প্রায় প্রত্যেকটি ভারতীয় ক্রিকেটারের প্রশংসা করা হয়েছে। কি সৌভাগ্য আমাদের যে সেই সফরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক গারফিল্ড সোবার্স গানটা শুনে বলেননি, ভারতীয় ক্রিকেটারদের অত পছন্দ হলে ভারতে চলে যাওয়া উচিৎ। যদি বলতেন তাহলে এরকম অমর ক্যালিপসো আর আমরা পেতাম না। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট আজ মরণাপন্ন হলেও ক্যালিপসো বেঁচে আছে। ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটারদের পাশাপাশি অন্য দেশের ক্রিকেটারদের নিয়ে একইরকম ভালবাসায় গান লিখেও বেঁচে আছে। খুঁজলে হয়ত আপনাকে নিয়ে লেখা গানও পাওয়া যাবে।
সোবার্সের অবশ্য অমন কথা বলার একটা ব্যবহারিক অসুবিধাও ছিল। তিনি কোন দেশের লোককে ভারতে যেতে বলতেন? ইতিমধ্যে কয়েকবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর করে আসার সূত্রে আপনি নিশ্চয়ই জানেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ বলে একটা ক্রিকেট দল থাকলেও কোন দেশ নেই। ত্রিনিদাদ ও টোব্যাগো, জামাইকা, গায়ানা, লিওয়ার্ড আইল্যান্ড, উইন্ডওয়ার্ড আইল্যান্ড, অ্যান্টিগা প্রভৃতি দ্বীপগুলো প্রত্যেকটাই একেকটা দেশ। ১৯৯৬ বিশ্বকাপের প্রাক্কালে যেমন ভারত আর পাকিস্তানের সম্মিলিত ক্রিকেট দল শ্রীলঙ্কায় খেলতে গিয়েছিল, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল আসলে তেমনই একটা দল। প্রত্যেক ম্যাচের শুরুতে আপনারা আম্পায়ারদের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান, তারপর জনগণমন গান। এতে নাকি দেশের হয়ে খেলার জন্যে আলাদা উৎসাহ পাওয়া যায়, যথোপযুক্ত অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ হয় — এসব আজকাল শুনতে পাই। যখন জেসন হোল্ডার, কার্লোস ব্রাথওয়েটদের পালা আসে তাঁরা কিন্তু কোন জাতীয় সঙ্গীতে গলা মেলান না। কারণ তাঁরা সকলে এক দেশের নাগরিক নন। তাঁরা একটা ক্যালিপসোতে গলা মেলান। চিরকাল ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্ষেত্রে তাই-ই হয়ে আসছে। যে দেশপ্রেমকে আপনি ক্রিকেটের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন তা যে আসলে একটি কাল্পনিক আবেগমাত্র, তার এর চেয়ে বড় প্রমাণ হয় না। ঐ আবেগটির অভাব যে ভাল ক্রিকেট খেলায় বাধা সৃষ্টি করে তাও বলার উপায় নেই। কারণ ক্লাইভ লয়েডের প্রায় অপরাজেয় দলটাও জাতীয় পতাকা বা জাতীয় স্তোত্র ছাড়াই অমন দুর্দমনীয় হয়ে উঠতে পেরেছিল। অর্থাৎ জিততে দেশপ্রেম লাগে না, যোগ্যতা লাগে, প্রতিভা লাগে, ইচ্ছাশক্তি লাগে।
অবশ্য কাল্পনিক হলেও দেশপ্রেম খারাপ কিছু নয় যতক্ষণ তা অকারণে অন্যকে আঘাত করার অস্ত্র হয়ে উঠছে। যখন তা ঘটে তখন আর ওটা দেশপ্রেম থাকে না, হয়ে ওঠে উগ্র জাতীয়তাবাদ। সম্প্রতি জনপ্রিয় যে তুলনাটা সেটা দিয়েই বোঝানো যাক।
“জানি নে তোর ধনরতন আছে কিনা রানীর মতন, শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে।“ এই হল দেশপ্রেম।
“সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।“ এই হল জাতীয়তাবাদ।
আমার দেশ আমার বড় প্রিয়, অন্য দেশের সাথে তুলনা করি না। অর্থাৎ আমি দেশপ্রেমিক। কিন্তু অন্য দেশের সাথে তুলনা না করে আমার চলে না এবং সে তুলনা কখনোই তথ্যনিষ্ঠ হয় না কারণ আমি আগে থেকেই সিদ্ধান্ত করেছি আমার দেশ সব দেশের চেয়ে ভাল — এই মূঢ়তারই অপর নাম জাতীয়তাবাদ।
মাননীয় বিরাট রাজা, আপনি বাংলা পড়তে পারুন বা না-ই পারুন, এ লেখা আপনার চোখে পড়ুক বা না-ই পড়ুক, আপনার অগণিত ভারতীয় ভক্তকুল থেকে অবিলম্বে আওয়াজ উঠবে “কেন? জাতীয়তাবাদী হলে অসুবিধাটা কোথায়?” অসুবিধা এই যে সেক্ষেত্রে নিজের দেশের ত্রুটিগুলো কখনোই আপনার নজরে পড়বে না, ফলে সেগুলোর সংশোধনও হবে না। সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে দুর্বল ইংল্যান্ড দলের সাথে ৪-১ এ সিরিজ হেরেও আপনি দাবী করবেন সিরিজটা আরেকটু হলেই জিতে গেছিলেন। আপনার দলের প্রাজ্ঞ কোচ বলবেন আপনারাই এতাবৎকালের সেরা সফরকারী দল। কোন সাংবাদিক যদি বলেন তথ্য অন্যরকম বলছে তাহলে “It’s your opinion” বলে উড়িয়ে দেবেন। এ কথা চিরকাল প্রকাশ্যে গোপন থাকবে যে এ বছর আপনার দল বিদেশে মাত্র দুটি টেস্ট জিতেছে আর আপনাদের ঠিক পরেই রয়েছে যে দল তার নাম জিম্বাবোয়ে। তারা জিতেছে একটি টেস্ট।
এতৎসত্ত্বেও আপনার মন্তব্যে তত আপত্তি করতাম না যদি তার মধ্যে প্রকট রাজনৈতিক ঘৃণার প্রভাব লক্ষ্য না করতাম। আপনি যে ক্রিকেটজগতের বাইরের ঘটনা সম্পর্কে শচীন তেন্ডুলকরের মত উদাসীন নন, বরং যথেষ্ট আগ্রহী তার যথেষ্ট প্রমাণ আপনি নিজেই দিয়েছেন। নোটবন্দীকে স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ বলে অভিনন্দিত করেছিলেন। নোটবন্দীর সর্বৈব ব্যর্থতা প্রমাণ হওয়ার পরে অবশ্য সুচিন্তিত নীরবতা পালন করেছেন। আপনি টুইটারেও যথেষ্ট সক্রিয়। ফলত এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয় যে “না পোষায় অন্য দেশে চলে যাও” একথা গত কয়েক বছরে কাদের উদ্দেশ্যে কারা প্রয়োগ করেছে তা আপনি জানেন না।
আপনার ও অনুষ্কা শর্মার সুবিজ্ঞাপিত বিবাহবাসরের প্রধান অতিথি নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি, তাঁর সরকার আর দেশ সমার্থক হয়ে গেছে তাঁর সমর্থকদের কাছে। জওহরলাল নেহরু থেকে মনমোহন সিং পর্যন্ত সব প্রধানমন্ত্রীর যথেচ্ছ সমালোচনা হয়েছে, আমার আপনার প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে “গলি গলি মে শোর হ্যায়, রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়” স্লোগান শুনতে শুনতে, অথচ মোদীজির ন্যূনতম সমালোচনা করলেও দেশদ্রোহী হয়ে যেতে হয় এবং শুনতে হয় “Go to Pakistan”। প্রচ্ছন্ন থাকে এই ইঙ্গিত যে ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা মনে প্রাণে ভারতীয় নন বলেই তাঁরা এদেশের সব খারাপ দ্যাখেন। যারা সমালোচনা করে তারাও ঐ দলে এবং এদেশ তাদের দেশ নয়, তাদের দেশ পাকিস্তান। সেখানেই তাদের যাওয়া উচিৎ।
প্রকাশিত ভিডিওতে আপনি যে সুরে, যে ভাষায় জনৈক ক্রিকেটপ্রেমীকে বলছেন আপনার ব্যাটিং ভাল না লাগলে অন্য দেশে চলে যাওয়া উচিৎ, তাতে “Go to Pakistan” এর গগনবিদারী প্রতিধ্বনি। আপনি কে বিরাট? মোদীজির মত আপনিও কি নিজেকে ভারতবর্ষের মূর্ত প্রতীক মনে করেন? মুখঢাকা বিজ্ঞাপন যা-ই বলুক না কেন, শেষপর্যন্ত আপনি একজন খেলোয়াড়। বড়জোর আপনার ব্যাটিং নৈপুণ্যের সুবাদে আপনাকে একজন উঁচুদরের শিল্পী বলা যেতে পারে। কিন্তু ভারতবর্ষ এত বড় একটা দেশ, এত বড় একটা ধারণা যার সামনে আপনি সর্দার প্যাটেলের মূর্তির পদতলে দাঁড়ানো মোদীর মতই ক্ষুদ্র।
হ্যাঁ, ব্যাট হাতে আজ আপনি রাজা কিন্তু নিশ্চিত জানবেন এ রাজত্বের আয়ু বড় অনিশ্চিত। আজ আছে কাল নেই। ক্রিকেট খেলাটাও আপনার চেয়ে অনেক অনেক বড়। যাঁর সঙ্গে প্রায়ই আপনার তুলনা করা হয়, যাঁকে একবাক্যে সব দেশের (আপনার দেশেরও) ক্রিকেটভক্তরা বলতেন “কিং রিচার্ডস”, সেই ভিভকেও অবসর নিতে হয়েছিল নেহাত পদাতিকের মত। তবু যে তিনি আজও অ্যান্টিগার বাইরেও বহু মানুষের হৃদয়ের রাজা হয়ে আছেন তা কিন্তু শুধু তাঁর রানগুলোর জন্যে নয়। রানগুলো থাকে না, মাঠে এবং মাঠের বাইরে ব্যবহারটা থেকে যায়। মাঠের ভেতর খেলার উত্তেজনায় অনেক বাড়াবাড়ি তবু মানা যায়, মাঠের বাইরের অভব্যতা দুর্নামের কারণ হয়।
অবশ্য আপনার চিন্তা নেই। কাউচে বসা এই অসভ্যতা হয়ত অনেক ভক্তের চোখে আপনাকে আরো বড় করবে। আমার শুধু চিন্তা হচ্ছে শচীন ভোগট বলে অস্ট্রেলিয় ছেলেটির জন্যে। তার তেন্ডুলকরভক্ত বাবা-মা সাধ করে ঐ নামটা রেখেছিলেন। এবার অস্ট্রেলিয়া সফরে যদি কোনভাবে সে আপনার সামনে পড়ে যায় তাকে আবার ঘাড় ধরে ভারতে নিয়ে এসে যোগীজিকে দিয়ে নাম বদলিয়ে দেবেন না তো?

ইতি

এক দুর্বিনীত ক্রিকেটপ্রেমী।

[portfolio]

ক্রিকেট লেখক

এখন তো আর কেউ সেঞ্চুরি করে আউট হওয়া ব্যাটসম্যান সম্পর্কে লিখবে না “গ্রেটদের মধ্যে জায়গা পেতে গেলে ম্যাচ শেষ করে আসতে হয়”

তখনো সৌরভ গাঙ্গুলি লর্ডসে লাটসাহেবি করেননি। অস্ট্রেলিয়া সফরে মাত্র একটা খেলায় সুযোগ পেয়ে গোড়াতেই এল বি ডব্লিউ হয়ে মাথা নীচু করে ঘরে ফিরে এসেছেন। “বাঙালি ক্রিকেট খেলতে পারে না” এটাকে স্বতঃসিদ্ধ করে নিয়েছে গোটা ভারত। তখন সদ্য পাড়ার মাঠে বড়দের সঙ্গে ক্যাম্বিস বলে খেলার লাইসেন্স পেয়েছি। বড়রা কেউ কেউ কলার তুলে আজহারকে নকল করে। আমার চেয়ে সামান্য ছোট একটি ছেলে, গোলগাল চেহারা, বয়সের তুলনায় একটু বেশিই ভাল ব্যাট করে। বড় ছেলেরাও আউট করতে ঘেমে ওঠে। তাকে “শচীন” বলে ডাকা শুরু হয়ে গেছে। বাড়ির উল্টোদিকে লাইব্রেরি। লাইব্রেরির গায়েই আমাদের খেলার মাঠ। আমাদের শচীন চার, ছয় মারলে বারবার সেই লাইব্রেরিতে বল ঢুকে যায়। লাইব্রেরিয়ান পিসির বকা কানে না তুলে আমরা চুপচাপ বল নিয়ে আসি। ঐ লাইব্রেরি থেকেই নিয়ে এসে গোগ্রাসে গিলি মতী নন্দীর ‘ননীদা নট আউট’। শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্রিকেট শেখার বই পড়ে ওখানে যেমন ছবি আঁকা আছে তেমন করে ধরার চেষ্টা করি ব্যাটটা। রঞ্জি সিং এর মত গ্লান্স করার চেষ্টা করি, কিছুতেই ব্যাটে বলে হয় না। কিন্তু মনের উড়ান ঠেকাবে কে? আমাকে উড়ি। যে দুজনের ডানায় ভর দিয়ে সবচেয়ে বেশি উড়ি তাঁদের একজন ধীমান দত্ত, অন্যজন গোপাল বসু।
নির্মেদ গদ্যে জিওফ্রে বয়কট থেকে সাগরময় সেনশর্মা — সকলকে ঘরের লোক করে তোলেন ঐ দুজন, আজকালের খেলার পাতায় আর ‘খেলা’ নামের খেলাধুলোর পত্রিকায়৷ প্রতিদিন বিকেলে নিজের খেলা শেষ হওয়ার পরেও ওঁদের টানে ততক্ষণ কাটাই লাইব্রেরির রিডিং রুমে, যতক্ষণ না বাড়ির জানলা থেকে কড়া গলায় মায়ের ডাক আসে।
অনেকদিন পর্যন্ত জানতামই না গোপাল বসু একজন প্রাক্তন ক্রিকেটার, এবং নেহাত হেলাফেলা করার মত খেলোয়াড় ছিলেন না। খুঁটিনাটি বিশ্লেষণে এবং কেউই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন (সৌরভ ছাড়া) — এই প্রত্যয়ে ততদিনে গোপাল বসু আমার চোখে ক্রিকেট লেখক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত।
বহু বছর পরে খবরের কাগজের খেলার পাতায় যখন কাজ করতে এসেছি, তখন অগ্রজ ক্রিকেট সাংবাদিকদের মুখে তাঁর খেলোয়াড় জীবনের গল্প শুনেছি। তিনি কতবড় ক্রিকেটার ছিলেন না ছিলেন তার নৈর্ব্যক্তিক বিচার করা হয়ত সম্ভব নয়, কারণ তিনি সারা বছর টিভিতে নানা স্তরের ক্রিকেট লাইভ দেখানো যখন শুরু হয় তার অনেক আগের যুগের লোক। পরিসংখ্যান আছে কিন্তু নেভিল কার্ডাস তো কবেই লিখে গেছেন “স্কোরবোর্ড একটা গাধা” (এই উক্তিটাও গোপাল বসুর লেখাতেই প্রথম পড়েছিলাম)। অতটা চরমপন্থী না হলেও স্কোরবোর্ড যে সবটা বলে না সেটা অস্বীকার করা যুক্তিযুক্ত নয়। অতএব সেকথা থাক। গোপাল বসু ক্রিকেট লেখক হিসাবে যা, আমার কাছে সেই যথেষ্ট।
এই তারকাবন্দনার যুগে গোপাল বসুদের অভাব বোধ করি। এখন তো আর কেউ সেঞ্চুরি করে আউট হওয়া ব্যাটসম্যান সম্পর্কে লিখবে না “গ্রেটদের মধ্যে জায়গা পেতে গেলে ম্যাচ শেষ করে আসতে হয়।”

আক্রমণে মৃণাল, রক্ষণে নীতা

পেশায় যৌনকর্মী হওয়ায় আত্মত্যাগের প্রাপ্য প্রতিদান হিসাবে তাঁর নামে রঙ্গালয়ের নামকরণ সে যুগে করা হয়নি। তার প্রায়শ্চিত্ত হিসাবে এই দলের ক্যাপ্টেনস আর্ম ব্যান্ড নটী বিনোদিনীর পুরোবাহুতেই থাক

সোশাল মিডিয়ায় কদিন হল ভাইরাল হয়েছে একটা ফুটবল দলের ছক। যে দলের সদস্য আমাদের বাংলা সাহিত্যের কিছু জনপ্রিয় চরিত্র। হয় তারা খেলছে বা দলের সঙ্গে অন্য নানা ভূমিকায় যুক্ত আছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের ময়দান থেকে বহুদূরে থাকা আমরা এভাবেই দুধের সাধ ঘোলে মেটাই।
দলটার দিকে তাকিয়ে কল্পনার পাখা মেলে দিতে গিয়ে খেয়াল হল, ফিফা ক্রমতালিকায় ৯৭ নম্বরে থাকা ভারতের পুরুষদের জাতীয় দলের তুলনায় মেয়েদের দল কিন্তু অনেক এগিয়ে। এই মুহূর্তে আমাদের মেয়েরা ৬০ নম্বরে। উত্তর আমেরিকায় ২০২৬ থেকে পুরুষদের বিশ্বকাপ ৪৮ দলের হয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে তেমন হলে (এই মুহূর্তে ২৪ দলের প্রতিযোগিতা) ভারতের বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
তখনই মনে হল, আমাদের সাহিত্যের জ্বলজ্বলে নারী চরিত্রদের নিয়েও একটা জবরদস্ত ফুটবল দল বানানো যেতেই পারে। তবে সে দল অতটা মজার হবে না, বরং লড়াকু হবে। আমাদের দেশের কজন মেয়েরই বা মজায় বাঁচার সুযোগ হয়।
এখানে স্বীকার্য যে আমার পড়ার পরিধি খুব ছোট। তার উপরে ওপার বাংলার সাহিত্য প্রায় কিছুই পড়া হয়নি। ফলে যাঁরা বেশি পড়েন তাঁরা নিশ্চয়ই আরো ভাল দল বানাতে পারবেন। আরো বলা প্রয়োজন যে খেলোয়াড় ঠিক করার সময়ে সাহিত্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্রে যেভাবে এদের কারো কারো চরিত্রচিত্রণ হয়েছে তা ভুলতে পারিনি। সার্থক বাংলা ছবির অনেকগুলোই তো সাহিত্যাশ্রয়ী। ফলে আশা করি মহাপাতক হয়নি।
গোলে রাখলাম বাণী বসুর গান্ধর্বী উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অপালাকে। প্রতিকূল অবস্থাতেও সবদিক সামলে সঙ্গীতের প্রতি নিবেদিত প্রাণ এই মহিলাকে দুর্গ সামলানোর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। ম্যানুয়েল নয়ারের মত মাল্টি টাস্কিং গোলরক্ষা এঁর পক্ষেই সম্ভব।
দুই সাইড ব্যাকের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথের কুমুদিনী আর আশাপূর্ণা দেবীর আইকনিক চরিত্র সুবর্ণলতা। সে যুগে দোর্দণ্ডপ্রতাপ স্বামীর সাথে দূরত্ব রেখে জীবন কাটানো ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসের নায়িকা কুমুদিনী আর আশাপূর্ণা দেবীর ট্রিলজির সুবর্ণলতা রক্ষণে যেমন আঁটোসাটো, তেমনি কাফু আর রবার্তো কার্লোসের মত ওভারল্যাপে গিয়ে বিপক্ষকে তছনছ করে দিতেও পারে। মনে করে দেখুন স্বদেশী আন্দোলনের সমর্থনে সুবর্ণ কেমন বাড়ির উঠোনে বিলিতি জামাকাপড় পুড়িয়ে দিয়েছিল।
সেন্ট্রাল ডিফেন্সে আমাদের দরকার তুলনায় কম দুঃসাহসী কিন্তু দৃঢ়চেতা দুজনকে। তাই রইলেন আশাপূর্ণারই ‘অনাচার’ গল্পের সুভাষ কাকিমা, যিনি অসুস্থ, মৃতপ্রায় শ্বশুরমশাইকে মানসিক আঘাত থেকে বাঁচাতে স্বামীর মৃত্যুর খবর গোপন করে সধবার জীবন কাটিয়েছিলেন দীর্ঘকাল, সামাজিক গঞ্জনা বা শাস্ত্রের ভয়কে তোয়াক্কা করেননি। ইনিই আমাদের ফ্রাঙ্কো বারেসি।
এঁর পাশেই থাকবেন শক্তিপদ রাজগুরুর নীতা, পরিবারের জন্যে যার সর্বস্ব ত্যাগকে পর্দায় অমর করে রেখেছেন ঋত্বিক ঘটক। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে এমন নিঃস্বার্থ সৈনিক আর পাব কোথায়?
মাঝমাঠে আমাদের জেনারেল হিসাবে থাকবেন নটী বিনোদিনী। ওখানে দরকার এমন একজনকে যিনি দলের স্বার্থে ডিফেন্সে নেমে আসবেন, আবার স্ট্রাইকারদের ডিফেন্স চেরা পাসও বাড়াবেন প্রয়োজনে। বাংলার সাধারণ রঙ্গালয় তৈরি করার জন্যে যিনি অভিনয় করা ছেড়ে দিয়েছিলেন প্রবল ব্যথা সহ্য করে, যিনি অমর হয়ে আছেন ব্রজেন দের নাটকে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসে, সেই নটীই এই কাজের উপযুক্ত। পেশায় যৌনকর্মী হওয়ায় আত্মত্যাগের প্রাপ্য প্রতিদান হিসাবে তাঁর নামে রঙ্গালয়ের নামকরণ সে যুগে করা হয়নি। তার প্রায়শ্চিত্ত হিসাবে এই দলের ক্যাপ্টেনস আর্ম ব্যান্ড তাঁর পুরোবাহুতেই থাক।
বিনোদিনীর দুপাশে মাঠ আলো করে থাকবে পথের পাঁচালীর দুর্গা আর শেষের কবিতার লাবণ্য।
ভীষণ দুরন্ত দুর্গা এনগোলো কান্তের মত সারামাঠ দৌড়ে ব্যস্তিব্যস্ত করে দেবে প্রতিপক্ষকে। আর অকল্পনীয় পাসে মাঠে ফুল ফোটাবে লাবণ্য। দিয়েগো মারাদোনার মতই যাকে ছকে বাঁধা যায় না, যে দীঘির জল, ঘড়ার জল নয়, সে-ই তো লাবণ্য।
ত্রিফলা আক্রমণে স্ত্রীর পত্রের মৃণাল, দহনের ঝিনুক, আর বঙ্কিমের দেবী চৌধুরানি।
প্রথম জনের সাথে আজীবন শ্বশুরবাড়ির মূল্যবোধের লড়াই চলেছে। শেষে সে পুরী থেকে চিঠি লিখে স্বামীকে জানিয়ে দিয়েছে যে সে শুধু মেজোবউ নয়, জগৎ এবং জগদীশ্বরের সঙ্গে তার যে অন্য সম্পর্কও আছে তা সে আবিষ্কার করেছে। সুতরাং সে আর সংসারের শিকলে বাঁধা পড়বে না। দ্বিতীয় জন গোটা দুনিয়ার বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে লড়েছে পুরুষের দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে। আর তৃতীয় জন নিরীহ বধূ থেকে ডাকাত সর্দার হয়ে একদা প্রভুত্ব করা পুরুষদের পদানত করেছে। এই আক্রমণভাগ দেখে যে কোন ডিফেন্স কাঁপতে বাধ্য।
আমাদের শক্তিশালী রিজার্ভ বেঞ্চে থাকছে সামাজিক রীতিনীতির বিপরীতে দাঁড়ানোর সাহস রাখে এরকম চারজন — তারাশঙ্করের মহাশ্বেতা, চোখের বালির নায়িকা বিনোদিনী, কাপালিকের কাছে বেড়ে ওঠা বঙ্কিমের কপালকুণ্ডলা এবং শরৎচন্দ্রের রাজলক্ষ্মী।
লীলা মজুমদারের রসিক, প্রবল বুদ্ধিমতী পদিপিসী এই দলকে চালনা করবেন। টেকনিক্যাল পরামর্শ দিয়ে তাঁকে সাহায্য করবে হাঁটুর বয়সী কলাবতী — মতি নন্দীর চরিত্র। এখানে কোচ আর টিডির অশান্তির কোন সম্ভাবনা নেই। পিসী সম্ভবত ৪-৩-৩ ছকেই খেলাবেন কারণ যাদের হারাবার কিছু নেই, জয় করার জন্যে আছে গোটা জগৎ তাদের রক্ষণাত্মক হয়ে লাভ নেই।

গোলরক্ষক: অপালা। রক্ষণ: কুমুদিনী, সুভাষ কাকিমা, নীতা, সুবর্ণলতা। মাঝমাঠ: লাবণ্য, নটী বিনোদিনী, দুর্গা। আক্রমণ: মৃণাল, ঝিনুক, দেবী চৌধুরানী। অতিরিক্ত: মহাশ্বেতা (গোলরক্ষক), বিনোদিনী, কপালকুণ্ডলা, রাজলক্ষ্মী। কোচ: পদিপিসী। টেকনিক্যাল ডিরেক্টর: কলাবতী।

বড়লোকের খেলা

ছোটবেলা থেকে আমরা যে শুনে এসেছি ফুটবল হল গরীবলোকের খেলা সেটাকে এখন ছোটবেলার পরিত্যক্ত খেলনাগুলোর মত আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াই ভাল। সারা পৃথিবীতেই ফুটবল এখন বড়লোকের খেলা — বড়লোকেরাই দ্যাখে, বড়লোকেরাই খেলে

saltlake

মাসখানেক আগে একদিন একটা ওয়েবসাইটের সাহায্যে হিসাব করে জানলাম আমি একবছরে যা রোজগার করি, প্যারিস সাঁ জা ফুটবল ক্লাবের ব্রাজিলীয় মহাতারকা নেমারের তা রোজগার করতে লাগে ছ ঘন্টার কিছু বেশি। মনে রাখতে হবে, মোদী সরকার যতই নানা ফন্দিফিকিরে আমার হকের টাকা থেকে আমায় বঞ্চিত করুক, আমি ভারতবর্ষের বেশিরভাগ লোকের চেয়ে সচ্ছল অবস্থাতেই আছি। অর্থাৎ আমার পরিবারের কাউকে আধপেটা খেয়ে থাকতে হয় না, আমার নিজের বাসস্থান আছে, প্রয়োজন পড়লে এবং না পড়লেও জামাকাপড় কেনার সংস্থান আছে, সন্তানকে স্কুলে পড়ানোর জন্যে সরকারী অনুদানের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে না, বাড়ির কেউ অসুস্থ হলে এ রাজ্যের সেরা বেসরকারী চিকিৎসা তাকে দেওয়ার মত আর্থিক সঙ্গতি আছে এবং এতকিছুর পরেও ইচ্ছে হলে সিনেমা দেখতে যাওয়া, রেস্তোরাঁয় খাওয়া, দরকার না হলেও বইপত্র কেনা এবং বছরে একবার সপরিবারে বেড়াতে যাওয়ার ক্ষমতা আছে। তা এই আমার বাৎসরিক রোজগারই যদি নেমার মোটে ছ ঘন্টায় আয় করে ফেলেন, তাহলে ভেবে দেখুন ভারতের মত একটা তৃতীয় বিশ্বের দেশের মহানগরগুলোর বস্তিতে যারা থাকে তাদের জীবনযাত্রার সাথে নেমারের জীবনযাত্রার ফারাক কতটা। একজন বস্তিবাসী যদি পৃথিবী হন, নেমার তাহলে মহাবিশ্ব।
কয়েকমাস আগেই নেমারের প্রাক্তন টিমমেট লায়োনেল মেসি বাল্যবন্ধু আনতোনেলাকে বিয়ে করলেন আর্জেন্টিনায় নিজের যে শহরে জন্ম সেই রোজারিও এক বিলাসবহুল হোটেলে। সংবাদসংস্থাগুলো আকাশ থেকে তোলা একটা ছবি পাঠিয়েছিল হোটেলটার, অনেক কাগজে ছাপাও হয়েছিল। সেই ছবিতে দেখা যায় হোটেলটার ঠিক বাইরেই বিস্তৃত এলাকাজুড়ে বস্তি। দেখতেই মনে পড়েছিল বিজন ভট্টাচার্য নামে এক পাগলের লেখা ‘নবান্ন’ বলে একটা নাটকের কথা। তার একটা দৃশ্য আমাদের পাঠ্য ছিল কোন এক সুদূর অতীতে। সেই দৃশ্যে এক বড়লোকের বাড়ির বিয়ে হচ্ছে। সেখানকার আসবাবপত্রের গা দিয়ে “আলো চুঁইয়ে পড়ছে” আর বিয়েবাড়ির বাইরে ময়লার ভ্যাটে একদল মানুষ কুকুরের সঙ্গে কামড়াকামড়ি করছে খাবারের জন্যে। আপনি বলবেন মেসি, নেমার তাঁদের জন্মগত প্রতিভা এবং অধ্যবসায়ের জোরে ঐ রোজগারে পৌঁছেছেন। কথাটা মিথ্যে নয়। একইসঙ্গে এটাও মিথ্যে নয় যে অনাহার ছাড়া অত্যাহার থাকতে পারে না।
যাই হোক, সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায় ছোটবেলা থেকে আমরা যে শুনে এসেছি ফুটবল হল গরীবলোকের খেলা সেটাকে এখন ছোটবেলার পরিত্যক্ত খেলনাগুলোর মত আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াই ভাল। সারা পৃথিবীতেই ফুটবল এখন বড়লোকের খেলা — বড়লোকেরাই দ্যাখে, বড়লোকেরাই খেলে। বিশ্বাস হচ্ছে না? ইন্টারনেটে খুঁজে দেখুন প্রিমিয়ার লিগের খেলাগুলোর টিকিটের দাম নিয়ে কত সমর্থক অসন্তুষ্ট। এন্ড্রু ফ্লিন্টফকে মনে পড়ে? তিনি তো নেহাত গরীব লোক নন, সিপিএম নন, বিজন ভট্টাচার্যের মত পাগলও নন। ইউটিউবে খুঁজে দেখুন, একটা রেডিও স্টেশনে বসে ফ্লিন্টফ প্রশ্ন তুলছেন আর্সেনালের খেলার টিকিটের দাম নিয়ে। বলছেন যে এওয়ে ম্যাচটা আর্সেনাল খেলতে যায় বিলাসবহুল প্লেনে করে, সে ম্যাচটা তো বাসে চড়েও খেলতে যাওয়া যায়। যে সমর্থক কষ্ট করে আয় করা পয়সা খরচ করে টিউবরেলে চড়ে খেলা দেখতে আসেন তিনি কুড়ি মিনিটের ফ্লাইটে যাতে সিনেমা দেখা যায়, ভিডিও গেম খেলা যায়, স্নানবিলাসী হওয়া যায় — তার জন্যে বেশি দামের টিকিট কিনতে বাধ্য হবেন কেন? গানাররা কেন বাসে করে খেলতে গিয়ে টিকিটের দাম কমানোর ব্যবস্থা করবে না?
তা এহেন ফুটবল খেলার ভবিষ্যতের তারকাদের আপনি দেখতে পাবেন আপনার দেশেই। আর কয়েকদিন পরেই আমাদের চিরচেনা (সাংবাদিক বন্ধুদের মুখে শুনছি আর চেনা যাচ্ছে না) সল্টলেক স্টেডিয়ামে তারা দাপিয়ে বেড়াবে। সেই স্টেডিয়ামের আশেপাশে কখনো বস্তি থাকতে দেওয়া যায়! ভাবলেন কী করে? পৃথিবীর সর্বত্রই তো দরিদ্র কুৎসিত, দারিদ্র্য নয়। অতএব বড়লোকেদের মোচ্ছবের জন্যে কিছু গরীবকে তো ঘরছাড়া হতেই হবে। আমাদের দেশটা কত সুজলাং সুফলাং সেটা দেখাতে হবে না দুনিয়াসুদ্ধু লোককে? হীরকরাজার মোচ্ছবের আগে লোকের ভিটেমাটি চাটি করার সেই দৃশ্য মনে নেই?
আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে এতবড় খেলাধুলোর আয়োজন মানেই তো এই। ব্রাজিলে যখন ফুটবল বিশ্বকাপ হল তখনো এই একই ঘটনা ঘটেছিল তো। ব্রাজিল তো তবু ফুটবলের পীঠস্থান, আমাদের তো ফুটবলের বিশ্ব মানচিত্রের পিঠে স্থান খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। তবু আমরা এই মহাযজ্ঞ করছি। করার সুযোগ যে পেয়েছি সেও ফুটবল আর গরীবের খেলা নেই বলেই। মাঠের ভেতরে আমরা যা-ই করি না কেন, বাইরে আমাদের মত বড় বাজার আর কোথায় আছে? ফিফা আর তার স্পনসররা সেই বাজারে ব্যবসা করার এমন সুযোগ ছাড়বে কেন? আমাদের আম্বানি ইত্যাদিরাও সেই সুযোগে যারপরনাই কামিয়ে নেবেন না কেন? আর আমাদের শাসকরাই বা দুনিয়াকে দেখানোর এমন সুযোগ ছাড়বেন কেন যে আমাদের দেশে সবার পেটে ভাত না থাক, দারুণ দারুণ সব স্টেডিয়াম আছে, মোচ্ছব করতে আমরা ভারী ওস্তাদ। তাই অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপই শেষ নয়, প্রধানমন্ত্রীর সস্নেহ প্রশ্রয়ে অনূর্ধ্ব-২০ আয়োজন করার আব্দারও করে ফেলেছি আমরা। হরির লুট ভাল জমেছে বুঝলে ফিফা সে আব্দার রক্ষা করতেও পারে। চাই কি, ভবিষ্যতে সিনিয়র বিশ্বকাপও আমরা আয়োজন করতে চাইতে পারি। এক ফুয়েরারের বার্লিন অলিম্পিক দরকার হয়েছিল শক্তি প্রদর্শন করতে, আরেকজনের একটা ফুটবল বিশ্বকাপ তো লাগতেই পারে।
যাও বস্তির ছেলে, যাও। যেখানে পার পালিয়ে যাও, ফুটবল তোমার খেলা নয়। বস্তিতে ন্যাকড়া দিয়ে বল বানিয়ে খেলতে খেলতে ফুটবলের রাজা হয়ে ওঠা দিয়েগো মারাদোনা যখন তোমার শহরের আদরের প্রাক্তন ক্রিকেটারের সাথে বল লাথাবেন, তুমি তখন আসন্ন শীতে কোথায় মাথা গুঁজবে সেটা ভেবো। জগতের আনন্দযজ্ঞে তোমার নিমন্ত্রণ নেই, থাকতে পারে না।

পুনশ্চ: বন্ধুরা আমার ভন্ডামিতে ভুলবেন না যেন। আমি কিন্তু সত্যি সত্যি এই খেলার বিপক্ষে নই। হতেই পারি না। আগামী একমাস সাজিয়ে গুছিয়ে ফলাও করে এই খেলারই খবর যারা আপনাদের সকালের কাগজে পরিবেশন করবে আমি তাদেরই একজন।

আমাদের মেয়েরা

indianteam

লক্ষ লক্ষ অন্য শুক্রাণুর সঙ্গে লড়াই করে আপনাকে মায়ের জরায়ুতে ঢুকতে হয়েছিল। তারপর আট-ন মাসের নিশ্চিন্ত বিশ্রাম, মায়ের শরীর থেকে পুষ্ট হওয়া, অবশেষে ভূমিষ্ঠ হওয়া। তারপর অন্তত এক-দেড় দশক জীবনযুদ্ধ কী আপনি টের পাননি কারণ আপনার হয়ে যুদ্ধটা করেছেন আপনার বাবা-মা, নিকটাত্মীয় — যদি আপনি পুরুষ হন। যদি আপনি ভারতে জন্মানো মহিলা হন, তাহলে কিন্তু আপনার লড়াইটা মায়ের জরায়ুতে ঢুকে পড়েই শেষ হয়নি। আপনি যে ভূমিষ্ঠ হবেনই তার কোন নিশ্চয়তা ছিল না। দেশের আইন আছে, তার ফাঁকও আছে। সেই ফাঁক দিয়ে কোন অসাধু ডাক্তারের সাহায্যে আপনাকে যে কোনদিন হত্যা করা হতেই পারত। এরকম রোজ, প্রতি সেকেন্ডে ভারতে ঘটছে। এখনো ঘটছে।
অর্থাৎ কাল লর্ডসে আপনি যে এগারোজনকে আকাশনীল জার্সি গায়ে লড়তে দেখলেন, তারা আসলে এগারোটি কন্যাভ্রূণ যাদের হত্যা করা হয়নি। এগারোটি শিশুকন্যা যাদের জন্মানোর পরেই মুখে ধান পুরে দিয়ে বা গরম দুধে চুবিয়ে মেরে ফেলা হয়নি। এগারোটি শিশু যারা, কি ভাগ্যিস, তিনবছর বয়সেই কোন তথাকথিত বাবার লালসার শিকার হয়ে প্রাণ হারায়নি। এগারোটা মেয়ে যারা ঋতুমতী হওয়ার আগে থেকেই ট্রেনে বাসে বাপের বয়সী লোকের কনুইয়ের গুঁতো খেয়েছে। এগারোটা মেয়ে যাদের খেলোয়াড় হয়ে ওঠা দেখে কেউ না কেউ বাপ-মাকে বলেছে “কেমন ব্যাটাছেলেদের মত চেহারা হয়েছে। এর আর বিয়ে দিতে পারবে?” এগারোটা মেয়ে যাদের নিয়ে গত পরশু অব্দি আমাদের কারো তেমন আগ্রহ ছিল না কিন্তু কাল জিতে গেলে “আমাদের মেয়েরা” বলে দাবী করতাম এবং এখন উড়িয়ে দিতে গিয়ে বলছি “কেন নিন্দে করব না? এটা একটা টিম? এখানেও মেয়ে বলে রিজার্ভেশন নাকি?”
নিশ্চিত জানবেন, মিতালী, ঝুলনরা জিতলে আমাদের অবদান তাতে ঘন্টা আর হারলেও আমাদের কোন অধিকার নেই নিন্দা করার। কারণ আমরা এরপরেও বাড়ির মেয়েটা ক্রিকেট খেলতে চাইলে বলব “ছেলেদের সঙ্গে মেয়েরা খেলে না।”

 

এই পথ যদি না শেষ হয়

Rogers Cup presented by National Bank - Day 10

১৯ নম্বর গ্র‍্যান্ড স্ল্যাম খেতাব জয়ের অনেক আগে থেকেই আমরা জানি রজার ফেডরার এমন একজন পুরুষ যিনি প্রকাশ্যে কাঁদেন।
গ্রীক দেবতা আপোলোপ্রতিম চেহারা, তবু আজ অব্দি তাঁর ঢেউখেলানো পেশি আমরা কেউ দেখিনি। কারণ তিনি দেখান না।
যে যুগে সম্পর্কগুলো সুদিনের প্রতিশ্রুতির মতই ভঙ্গুর, সেই যুগে তিনি সেই কবে আলাপ হওয়া মির্কার প্রেমে আজও বিভোর। চার ছেলেমেয়ের জন্মের পরেও। আমাদের মধ্যে কেউ যদি স্ত্রীর প্রতি ভালবাসায় এর অর্ধেকও হয়, তাকে এদেশে আজও আড়ালে স্ত্রৈণ বলা হয়।
অপরকে মাড়িয়ে উপরে ওঠার দর্শনে বুঁদ হয়ে থাকা সময়ে রজার তাঁর ছোটবেলার অকালমৃত্যুর শিকার কোচকে এখনো ভোলেননি। তার বাবা-মাকে নিজের সঙ্গে রাখেন প্রত্যেক গ্র্যান্ড স্ল্যামে।
আগ্রাসন ছাড়া সফল হওয়া যায় না — শেখায় যে পৃথিবী, সেই পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে রজার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী নাদাল সম্পর্কে বলেন “ওর থেকে আমি অনেক শিখেছি। রাফা, তুমি আরো অনেকদিন খেলো। টেনিসের তোমাকে দরকার।”
নিও লিবারেল অর্থনীতির স্বর্ণযুগে বিভিন্ন খেলার অতিধনী তারকারা নিজের নিজের দেশ ছেড়ে মোনাকোয় ঘাঁটি গেড়েছেন ওটা ট্যাক্স হাভেন বলে, অথচ রজার রয়ে গেছেন কল্যাণময় রাষ্ট্রের পতাকা ধরে রাখা মাতৃভূমি সুইটজারল্যান্ডে, গাদা ট্যাক্স দিয়ে।
অধিকাংশ কিংবদন্তী ক্রীড়াবিদ আমাদের দিয়ে যান শেষবার চোখ বোজার আগেও মনে পড়বে এমন কিছু শট আর অবিস্মরণীয় কিছু জয়ের মুহূর্ত। ভেবে দেখুন, রজার এরমধ্যেই তার চেয়ে অনেক বেশি দিয়েছেন। তবু মন ভরেনি। আরো কিছুদিন থাকুন, রজার। “প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে” ফোরহ্যান্ডের অলস মায়া আরো কিছুদিন চলুক।

দেশপ্রেম না ছাই

বাস্তবটা হল আপনি যতবড় ক্রিকেটপ্রেমীই হোন, বি সি সি আই একটি স্বশাসিত সংস্থা। আপনি তার ঘন্টা করতে পারেন। আর ক্রিকেটাররা সেই সংস্থার বেতনভুক কর্মচারী। তারা বি সি সি আই এর কাছে দায়বদ্ধ। আপনার জাত্যভিমানের বন্দুক আপনি তাদের ঘাড়ে রাখেন কোন অধিকারে?

ভারতের হয়ে খেলতে নামা ১১ জন ক্রিকেটারকে কেন আপনার জাত্যভিমান রক্ষার দায়িত্ব নিতে হয় বলুন তো? আপনি কে? ওদের কাউকে আপনি দলে নির্বাচিত করেছেন? সে যোগ্যতা আছে? ক্রিকেটাররা তো জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন। যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত তাদের কাছে দায়িত্ববোধ দাবী করলে, প্রত্যেকটা কাজের জবাবদিহি চাইলে তো বলবেন দেশবিরোধী কাজ হচ্ছে। তাহলে যাদের মাইনেকড়ি আপনি দেন না, যাদের যোগ্যতার বিকাশে আপনার কোন প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই, যারা জাতীয় দলে নির্বাচিত হয়েছে নিজেদের যোগ্যতায় (যদি ঘুরপথেও হয়ে থাকে তাতেও তো আপনার কোন ভূমিকা নেই) তারা কেন দেখতে যাবে ম্যাচ জিতে আপনার কোন অহঙ্কার বজায় থাকল কিনা বা হেরে গিয়ে আপনার সম্মানে আঘাত লাগল কিনা?
আপনি বলবেন “আমি দেখি, পয়সা খরচা করি, সেইজন্যই ক্রিকেটে এত টাকা। তাই ওরা ধনী।” তা দ্যাখেন কেন? কেউ আপনাকে বাধ্য করেছে দেখতে? মোদীজি মাইনে পান আপনার আমার আয়করের টাকা থেকে। আইন অনুযায়ী আমি সেটা দিতে বাধ্য, তার বিনিময়ে মোদীজির সরকার আমাকে বিভিন্ন পরিষেবা দিতে বাধ্য, আমার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। কিন্তু আইন আপনাকে ক্রিকেট দেখতে বাধ্য করে না। আপনার ভাল না লাগলে আপনি ক্রিকেট দেখবেন না। পয়সা খরচ করবেন না। চুকে গেল। এভাবে যদি অনেকেই না দেখেন তাহলে বি সি সি আই, মানে কোহলি যে কোম্পানির কর্মচারী, তাদের রোজগার নিঃসন্দেহে কমবে। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে কোহলির দামও কমবে। ফলে তার আয় কমবে। কিন্তু কতটা আয় হলে তার মাইনে বাড়বে বা কমবে কিম্বা কমবে কিনা সেসব কিস্যু আপনার হাতে নেই। কারণ তাকে টাকা দেয় কতকগুলো কোম্পানি। কোহলির দায় অতএব তাদের কাছে, আপনার কাছে নয়।আপনি আসলে ভাবেন বি সি সি আই আপনার সম্পত্তি তাই ক্রিকেটাররাও আপনার সম্পত্তি। এরকম ভাবেন কারণ আপনাকে ভাবানো হয়। চতুর হোটেলমালিক যেমন হোটেলে পা রাখামাত্রই বলেন “নিজের মতন করে থাকবেন, স্যার। আপনাদেরই তো হোটেল।” কিন্তু বাস্তবটা হল আপনি যতবড় ক্রিকেটপ্রেমীই হোন, বি সি সি আই একটি স্বশাসিত সংস্থা। আপনি তার ঘন্টা করতে পারেন। আর ক্রিকেটাররা সেই সংস্থার বেতনভুক কর্মচারী। তারা বি সি সি আই এর কাছে দায়বদ্ধ। আপনার জাত্যভিমানের বন্দুক আপনি তাদের ঘাড়ে রাখেন কোন অধিকারে?
জাত্যভিমান না ছাই। আসলে তো জাতিবিদ্বেষ। ভাগ্যিস রবীন্দ্র জাদেজার নাম রবিউজ্জামান নয়। তাহলেই তো নিজের দেশের ক্রিকেটারকেও বাপ চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করে মীরজাফরের আত্মীয় বানিয়ে ফেলতেন। এমন ভাব করতেন যেন ঐ রান আউটটা না হলেই ভারত হৈ হৈ করে জিতে যেত। তা কোটি কোটি ভারতবাসীর অবদমিত ক্যানিবালিজম চরিতার্থ করার দায় বারবার ক্রিকেটারদের কেন নিতে হবে? শুধু ক্রিকেটারদেরই বা কেন?
 

%d bloggers like this: