Politics or culture, films or books. Everything fascinates me
Author: Pratik
সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।
ভারতীয় বোর্ডের চোটপাটে আইপিএলের দৈর্ঘ্য বেড়ে চলায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়ে যাচ্ছে আইসিসি। ফলে দুনিয়ার যেখানে যত কুড়ি বিশের লিগ গজাচ্ছে, সবেতেই ঘাড় নাড়তে হচ্ছে।
‘আঠারো বছর বয়স’ নামে একখানা কবিতা লিখেছিলেন তরুণ বয়সেই চলে যাওয়া কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর জীবনের সবটুকুই পরাধীন দেশে কেটেছিল। সেই দেশে ক্ষুদিরাম বসুর মতো ১৮ বছরের ছেলেও ফাঁসি যাওয়ার ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করত না। স্বভাবতই সুকান্তর কবিতায় ওই বয়সে পৌঁছোনো মানুষ যে নির্ভয়ে অনেক কিছু ওলট-পালট করার ক্ষমতা রাখে, সেকথা লেখা হয়েছে। কিন্তু আমরা দাঁড়িয়ে আছি স্বাধীনতার ৭৫ বছর অতিক্রম করে যাওয়া দেশে। এখন আর ওই বয়সের ছেলেমেয়েদের কোনও কিছুর জন্য প্রাণ দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। বরং আজ যারা তাদের বাবা-মা, তাদের অনেকে ওই বয়সে চালু করেছিল ‘বার খেয়ে ক্ষুদিরাম’ কথাটা। অর্থাৎ ক্ষুদিরাম নাকি আদতে বোকা। এমন দেশে আঠারোয় পা দেওয়ার আলাদা তাৎপর্য কী জানি না। তবে ভারতীয় ক্রিকেটের মোচ্ছব আইপিএল আঠারোয় পা দেওয়ায় ক্রিকেট মহলে বিলক্ষণ আলোড়ন তৈরি হয়েছে। সুতরাং আমরা ভেবে দেখি, গত ১৮ বছরে আইপিএল আমাদের কী দিল।
বাঞ্ছিত ১। অলরাউন্ডার: শেন ওয়ার্ন যদি প্রথম আইপিএলেই রবীন্দ্র জাদেজাকে আবিষ্কার না করতেন, বা হার্দিক পান্ডিয়া আইপিএলে নজর কাড়তে না পারতেন, তাহলে কি ভারতীয় দলের নির্বাচকরা তাঁদের নিজ গুণে চিনে নিতেন? সন্দেহ হয়। আইপিএল চালু হওয়ার পর থেকে যেভাবে ক্রমশ তিন ধরনের ক্রিকেটের জাতীয় দল নির্বাচনেই আইপিএলের পারফরমেন্সকে গুরুত্ব দেওয়া বেড়েছে আর রনজি ট্রফি, দলীপ ট্রফি, ইরানি ট্রফি, বিজয় হাজারে ট্রফির গুরুত্ব কমেছে; দেওধর ট্রফি উঠে গিয়েছে, তাতে মনে হয় এঁদের উত্থান এবং ভারতীয় দলে স্থায়ী হওয়ার কৃতিত্ব আইপিএলকে না দিয়ে উপায় নেই।
২। ছেঁড়া কাঁথা থেকে লাখ টাকা: ২০০৮ সালের প্রথম আইপিএল থেকেই বেশ কিছু ক্রিকেটারকে পাওয়া গেছে যাঁরা নিম্নমধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মে অনেক কষ্ট করে ক্রিকেট জগতে প্রবেশ করেছেন, পুরো পরিবারকেও অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। আইপিএলের অর্থ তাঁদের দারিদ্র্য দূর করেছে। ছত্তিশগড়ের কুলদীপ সেন বা উত্তরপ্রদেশের রিঙ্কু সিং ক্রিকেটার হিসাবে হয়তো স্মরণীয় হয়ে থাকবেন না, কিন্তু মানুষ হিসাবে তাঁদের জীবনযাত্রার উন্নতির কৃতিত্ব আইপিএলেরই।
৩। ভারতীয় ফিল্ডিংয়ের দলগত উন্নতি: তরুণদের কাছে ব্যাপারটা তেমন চোখে পড়ার মতো না-ও মনে হতে পারে, কিন্তু আমরা যারা নরেন্দ্র হিরওয়ানি, ভেঙ্কটপতি রাজুদের দেখেছি; মহম্মদ আজহারউদ্দিন, অজয় জাদেজা, মাঝেমধ্যে কপিলদেব বা শচীন তেন্ডুলকর দারুণ ফিল্ডিং করলেও দল হিসাবে ভারতকে অতি সাধারণ ফিল্ডিং করতে দেখেছি, তারা মানতে বাধ্য যে আইপিএল তথা কুড়ি বিশের ক্রিকেটের কল্যাণে ভারতীয়দের ফিল্ডিংয়ের সাধারণ মানই অনেক উঁচুতে উঠেছে।
৪। ভয়হীন তরুণ ভারতীয় ক্রিকেটার: অনেকদিন যাবৎ টেস্ট ক্রিকেট খেলিয়ে দেশগুলোর মধ্যে জাতীয় দলে আগামীদিনে আসতে পারেন বা বাদ পড়ে গেছেন, ফিরতে পারেন– এমন ক্রিকেটারদের নিয়ে ‘এ’ দলের খেলা চালু ছিল। তাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আসার প্রস্তুতি হত। কিন্তু আইপিএলে যেভাবে অন্য দেশের সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে এবং বিপক্ষে খেলার সুযোগ পায় একেবারে কচিকাঁচারা, সে সুযোগ ওখানে ছিল না। আজ যে যশস্বী জয়সওয়াল, নীতীশ রেড্ডিদের জাতীয় দলে প্রথম ম্যাচেই অকুতোভয় মনে হয়, তার কৃতিত্ব আইপিএলের।
৫। সেরা লোকের থেকে সেরা জিনিস শেখার সুযোগ: জম্মুর ছেলে উমরান মালিক বিদ্যুৎ গতির ইয়র্কারে ব্যাটারের উইকেট ছিটকে দিলেন আর ডাগ আউটে নিজে উইকেট পাওয়ার মতো উল্লাসে ফেটে পড়লেন একদা বিশ্বত্রাস দক্ষিণ আফ্রিকার ডেল স্টেইন– এ দৃশ্য আমরা আইপিএলে দেখেছি। উমরানের গতি অনেক আশা জাগালেও ভারতীয় দলের হয়ে তেমন কিছু করতে পারেননি। খুব বেশি সুযোগও পাননি। কিন্তু স্টেইনের চেয়ে ভালো জোরে বোলিং কোচ তিনি পেতেন কোথায়? আর আইপিএল না থাকলে স্টেইনের ধারেকাছেও পৌঁছানো হত না উমরানের। এমন উদাহরণ অসংখ্য।
অবাঞ্ছিত ১। যা বদলায় সেটাই নিয়ম: কম সময়ের খেলা হিসাবেই যে কুড়ি ওভারের খেলার উৎপত্তি, তাতে অনন্তকাল ধরে ফিল্ডিং সাজিয়ে, ওভার রেটের তোয়াক্কা না করেও বহুবার কোনও শাস্তি হয়নি মহাতারকা অধিনায়কদের। কে এই সুবিধা পেয়েছেন আর কে পাননি তা নিয়ে অনলাইনে বিস্তর চুলোচুলি চলে এঁদের ভক্তদের মধ্যে। আইপিএল কর্তৃপক্ষ অবশ্য সে অশান্তি মিটিয়ে ফেলেছেন। আগে তবু তিনটে ম্যাচে নির্ধারিত সময়ে ওভার শেষ করতে না পারলে অধিনায়ককে একটা ম্যাচে সাসপেন্ড করা হত। এবার থেকে আর সে ঝক্কি থাকছে না। কেবল ‘ডিমেরিট পয়েন্ট’ দেওয়া হবে। অমন অনেক পয়েন্ট জমলে তবে সাসপেনশনের প্রশ্ন। নতুন করে নিলাম হবে, ছয়জনের বেশি ক্রিকেটারকে ধরে রাখা যাবে না, আবার অতজনকে রাখার খরচ বিস্তর, ওদিকে মহেন্দ্র সিং ধোনি চেন্নাই সুপার কিংস ছেড়ে নড়বেন না। অতএব নিয়ম বদলে ধোনিকে কোনওদিন দেশের হয়ে না খেলা ক্রিকেটারদের মতো ‘আনক্যাপড’ হওয়ার, মানে শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢোকার, সুযোগ করে দেওয়া হল।
২। মহাতারকাদের মুখ বাঁচানোর সুযোগ: ধরুন, আপনি অনেকদিন হল টেস্টে সুবিধা করতে পারছেন না। বল বেশি লাফালে বা সুইং হলে অথবা স্পিন হলেই আপনাকে সর্বকালের সেরা তো দূরের কথা, নিজের কালের মাঝারিও মনে হচ্ছে না। কুছ পরোয়া নেই। আইপিএল মাস দুয়েকের লম্বা প্রতিযোগিতা। রান আপনি পাবেনই। অমনি সকলে ভুলে যাবে টেস্টে কতকাল রান করেননি, ড্যাং ড্যাং করে পরের সিরিজেও খেলতে নামবেন।
৩। ঘরোয়া ক্রিকেটের সাড়ে সর্বনাশ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও বন্ধ হয়নি ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা রনজি ট্রফি। কিন্তু করোনা অতিমারির সময়ে বন্ধ হয়ে রইল। কেবল ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে সংসার চলে যে ক্রিকেটারদের, তাঁদের আক্ষরিক অর্থে হাঁড়ির হাল হল। কিন্তু উপায় কী? ওতে খরচ আর আইপিএলে আয়। তাই ক্রিকেট বোর্ড ব্যস্ত ছিল আইপিএলের আয়োজন করতে।
৪। সব ক্রিকেটের ঊর্ধ্বে: ক্রিকেট ১১ জনের খেলা, কিন্তু আইপিএল ১২ জনের খেলা। এগারোজনের মধ্যে যথেষ্ট ধুন্ধুমার ব্যাটার ঢোকানো যাচ্ছে না? আচ্ছা, ব্যাটিংয়ের সময়ে একজন বোলারকে বসিয়ে ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ হিসাবে আরেকজন ব্যাটারকে ঢুকিয়ে নেবেন। বোলার কম পড়ছে? অসুবিধা নেই। ফিল্ডিং করার সময়ে ব্যাটারদের একজনকে বসিয়ে আরেকজন বোলারকে খেলাবেন।
৫। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্তর্জলিযাত্রা: নিজের দেশে আসন্ন মরশুমে এবারের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠা দক্ষিণ আফ্রিকা একটাও টেস্ট খেলবে না, খেলবে শুধু পাঁচখানা টি টোয়েন্টি। ভারতীয় বোর্ডের চোটপাটে আইপিএলের দৈর্ঘ্য বেড়ে চলায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়ে যাচ্ছে আইসিসি। ফলে দুনিয়ার যেখানে যত কুড়ি বিশের লিগ গজাচ্ছে, সবেতেই ঘাড় নাড়তে হচ্ছে। ক্রিকেট দুনিয়ার বড়, মেজো, সেজো ভাই ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড আবার ঠিক করেছে টেস্ট নিজেদের মধ্যেই খেলবে, অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ক্ষমাঘেন্না করে একটা-দুটো। এদিকে, আইসিসির আয়ের বেশিরভাগটাও ওরাই নেয়। ফলে বাকি বোর্ডগুলোর অবস্থা সঙ্গিন। তারাও টিকে থাকতে কুড়ি বিশের লিগ আয়োজনেই মন দিচ্ছে। খেলোয়াড়রাও ৩০-৩২ বছরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফেলছেন। পাঁচদিন নয়, এমনকি ৬-৭ ঘণ্টাও নয়, ঘণ্টা চারেক খেলেই যদি মেলা রোজগার করা যায় তো কে বেশি খাটতে যাবে? এরপর হয়তো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট হবে সারাবছর আর মাস দুয়েক আন্তর্জাতিক। খেলাটা ক্রিকেট থাকবে না ডাংগুলি হয়ে যাবে– সেটা অন্য আলোচনার বিষয়।
‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’
গাম্ভীর্য নির্বোধের মুখোশ। কথাটা অনেককাল আগে বলেছিলেন এক মাস্টারমশাই। মোটেই বিশ্বাস করিনি, কারণ ততদিনে একাধিক জায়গা থেকে জেনেছি যে রাজশেখর বসু অত সরস সব গল্প লিখলেও, খুব গম্ভীর মানুষ ছিলেন। তারাপদ রায়ের সঙ্গে আলাপ ছিল এরকম একজনের মুখ থেকেও একইরকম কথা শুনেছিলাম। কিন্তু মাস্টারমশাই যে নেহাত ভুল বলেননি তার প্রমাণ গত কয়েক দিনে পাওয়া গেছে। ঋজু বিদূষক কুণাল কামরার কমেডি শো যে হলে হয়েছিল, মুম্বইয়ের সেই দ্য হ্যাবিট্যাট -এর মালিক আর কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করলে তাঁরা নির্ঘাত বলবেন – হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেছে। তবে নির্বোধ মানেই কিন্তু নিরীহ নয়। সুকুমার রায়ের রামগরুড়ের ছানাদের হাসতে মানা; একনাথ শিন্ডে, দেবেন্দ্র ফড়নবীশের দলবল আরও এককাঠি সরেস। তারা নিজেরা না হেসেই খুশি নয়, অন্যদেরও হাসতে মানা করে ভাংচুর করে।
অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। হাসাহাসি করলে ফ্যাসিবাদী হওয়া যায় না। তাছাড়া শিবসেনার জন্মই হয়েছিল ঠ্যাঙাড়ে বাহিনি হিসাবে, মুম্বই ও সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে ভাঙার জন্যে (দুর্জনে বলে কংগ্রেসের উদ্যোগে)। কুণাল কামরার কমেডি শো নিয়ে শিবসেনার গুন্ডামি দেখে অনেকে খেয়াল করিয়ে দিচ্ছেন, শিবসেনার আদিপুরুষ বালাসাহেব ঠাকরে নিজে কার্টুনিস্ট ছিলেন, ইন্দিরা গান্ধীর ব্যঙ্গচিত্রও এঁকেছেন ইত্যাদি। কিন্তু ওসব কথা বলে লাভ নেই। বাল ঠাকরে শিবসেনার নেতা হিসাবে মোটেই কোনো গণতান্ত্রিক ব্যক্তি ছিলেন না। শিবসেনা কীভাবে মুম্বই চালাত সেকথা সে যুগের মুম্বই তথা মহারাষ্ট্রের বাসিন্দারা প্রত্যেকেই জানেন। নয়ের দশকের মুম্বই দাঙ্গায় শিবসেনার ভূমিকাও কোনো গোপন তথ্য নয়। আজ যে সারা ভারতে সুনির্দিষ্ট পরধর্মবিদ্বেষী এবং/অথবা পরজাতিবিদ্বেষী গুন্ডামি চালু করেছে সংঘ পরিবার, তার সূচনা অনেক আগেই বালাসাহেব করে দিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রে। মুসলমান তো বটেই, সেইসময় শিবসেনার আক্রমণের বড় লক্ষ্য ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় শ্রমজীবী মানুষজন। ফলে কুণালের শো নিয়ে গুন্ডামি করে এক অর্থে একনাথরা প্রমাণ করে দিলেন যে তাঁরাই বাল ঠাকরের যথার্থ উত্তরাধিকারী, উদ্ধব ঠাকরেরা নন। চলচ্চিত্র পরিচালক হনসল মেহতা ২৪ মার্চ তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে এক পোস্টে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে আজ থেকে ২৫ বছর আগে তাঁর একখানা ছবির একটামাত্র সংলাপের জন্যে শিবসৈনিকরা তাঁর অফিসে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছিল। তাঁকে মারধোর করা হয়, মুখে কালি লেপে দেওয়া হয়, তারপর জনা বিশেক রাজনৈতিক নেতা এবং হাজার দশেক লোকের সামনে এক বৃদ্ধার পা ধরে ক্ষমা চাওয়ানো হয়। মুম্বই পুলিস দ্য হ্যাবিট্যাট ভাংচুরে দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, সেদিনও তাই করেছিল। শিবসেনা কেমনভাবে চলত তা বোঝার জন্যে একথাও মনে করা দরকার যে বালাসাহেব ঠাকরের মৃত্যুর পর গোটা মহারাষ্ট্রে প্রায় বনধ করে দেওয়ার সমালোচনা করে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্যে শিবসৈনিকরা পালঘরের দুই নিরীহ মেয়ের পিছনে লেগেছিল। তাদের পুলিস গ্রেফতার করে এবং একজনের আত্মীয়ের দোকান ভাংচুর করে শিবসৈনিকরা।
তবুও এবারের ঘটনা আর বাল ঠাকরের আমলের বিবিধ গুন্ডামিতে বিলক্ষণ তফাত আছে। তখন শিবসেনা ছিল রাষ্ট্রকেও তোয়াক্কা না করা অথবা রাষ্ট্রশক্তিকে নিজের ইচ্ছা মত চলতে বাধ্য করা শক্তি। আজ একনাথের শিবসেনা রাষ্ট্রের অংশ। স্রেফ তাঁর চ্যালাদের গুন্ডামিতে ব্যাপারটা থেমে থাকেনি, খোদ বৃহন্মুম্বই মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের আধিকারিকরা গিয়ে দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে এসেছেন। উপরন্তু মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী ফড়নবীশ বলেছেন, কুণালকে ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি যা খুশি তাই বলতে পারেন না। বাকস্বাধীনতার সীমা আছে ইত্যাদি। বালাসাহেব আইনের পথে যেতেন না, নিজের পথ নিজে কেটে নিতেন। কুণালের বিরুদ্ধে কিন্তু একাধিক এফআইআর ফাইল করা হয়েছে। যারা দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে দিয়ে এসেছে, তারাই থানায় গিয়ে এফআইআর করেছে কুণালের নামে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা মোকদ্দমা হওয়ার খবর নেই এখন পর্যন্ত। এখানেই সাধারণ গুন্ডামি আর ফ্যাসিবাদী হিংসার তফাত। এর বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে গেলে দুটো জিনিস অবশ্য প্রয়োজনীয় – সাহস আর কৌশল। কুণালের দুটোই আছে। কীরকম? দেখা যাক।
নায়কোচিত সাহস
দ্য হ্যাবিট্যাটের শোয়ের পর থেকে যা যা ঘটেছে তাতে কুণাল নায়ক হয়ে গেছেন – এতে অনেক আরএসএসবিরোধীকেও অসন্তুষ্ট হতে দেখছি। তাঁদের মধ্যে কারোর নায়ক ব্যাপারটাতেই আপত্তি, কারোর আবার আপত্তি কুণাল শোয়ের শেষে ভারতের সংবিধান তুলে ধরে নিজের অধিকারের কথা জানান দিয়েছিলেন বলে। আজ দেশের যা অবস্থা, সুপ্রিম কোর্টের আদেশেরও তোয়াক্কা না করে যেভাবে সংঘবিরোধীদের বাড়িঘর দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া চলছে, অপছন্দের লোক হলেই যা ইচ্ছা অভিযোগ দায়ের করে কারাবন্দি করে রাখা চলছে – তাতে কুণালের মত প্রকাশ্যে নাম করে ক্ষমতাসীন লোকেদের নিয়ে যিনি খিল্লি করবেন তিনি তো বহু মানুষের চোখে নায়ক হয়ে যাবেনই। আটকাবেন কী করে? আটকাতে হবেই বা কেন? পৃথিবীর কোন দেশে কোন বিদ্রোহ, কোন বিপ্লব আবার নায়ক ছাড়া হয়েছে? আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তো অনেক নায়ক। সকলে আবার একই মত, একই পথেরও নন। ক্ষুদিরাম বসু নায়ক, মাস্টারদা সূর্য সেন নায়ক, ভগৎ সিং নায়ক, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নায়ক; আবার জওহরলাল নেহরু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, মহাত্মা গান্ধীও নায়ক। শিল্পী সাহিত্যিকদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম নায়ক, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নায়ক, আবার পীতাম্বর দাসও নায়ক। তাঁর নাম আজ প্রায় কারোর মনে নেই, কিন্তু তাঁর রচনা করা ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গানটা রয়ে গেছে। একটা সময় পর্যন্ত অল্লামা ইকবালও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ছিলেন। উর্দু, হিন্দি ভাষা নিয়ে অ্যালার্জি না থাকলে ‘সারে জহাঁ সে অচ্ছা’ গানটা আজও যে কোনো দেশপ্রেমিক মানুষের প্রিয় হবে, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’-র মতই। এঁরাও সকলে এক মতের লোক নন। যিনি আমার লড়াইটাই লড়ছেন কিন্তু একই মতের লোক নন, তাঁর সাহসকে সেলাম জানাতে না পারলে আমারই ক্ষুদ্রতা প্রকাশ পায়। তাঁর নয়।
রইল সংবিধানের কথা। পৃথিবীর কোনো সংবিধান নিখুঁত নয়, ভারতের সংবিধানও নয়। আবার যে কোনো দেশের সংবিধান খুললেই দেখা যায় অনেক ভাল ভাল কথা লেখা আছে যার প্রয়োগ নেই। কথাটা ভারতের সংবিধানের ক্ষেত্রেও সত্যি। সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম, বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর, নিজেই সংবিধান সভার শেষ অধিবেশনে বলেছিলেন যে সংবিধানে সমতাবিধান করা হল, কিন্তু ভারতের সমাজ রইল অসাম্যে পরিপূর্ণ। এভাবে কতদিন ভারতে গণতন্ত্র টিকবে তা নিয়ে তিনি পরেও বারবার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ভারতের বহু মানুষ যে এই সংবিধানের দ্বারা নানা মাত্রায় উপকৃত হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ঠিক যেমন অনস্বীকার্য যে অনেক মানুষের উপর নিপীড়ন চালানো হয়েছে এবং হচ্ছে এই সংবিধানকে হাতিয়ার করেই। তা বলে যে কোটি কোটি ভারতীয় সংবিধানের উপর আস্থা রাখেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আজকের লড়াইয়ে সংবিধানকে নিজের অস্ত্র মনে করছেন তাঁদের বিরুদ্ধ পক্ষ বলে মনে করা বা তাঁদের দিকেই বাক্যবাণ ছোড়া এককথায় নির্বুদ্ধিতা। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নানা জন নানাভাবে লড়বে, যার যতটুকু ক্ষমতা সে ততটুকুই দিয়েই লড়বে। কেউ লোক হাসিয়ে লড়বে, কেউ গান গেয়ে লড়বে, কেউ লিখে লড়বে, কেউ রাস্তায় মিছিল, মিটিং করে লড়বে, কেউ আইনি লড়াই করবে। এখন ‘এই সংবিধান মানি না’ বলার সময় নয়, কারণ এখন যুদ্ধটা সংবিধানের বিরুদ্ধে নয়। এটুকু বুঝতে খুব অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যদি আপনার সোশাল মিডিয়ার বাইরে একটা সত্যিকারের লড়াই থাকে।
উপযুক্ত কৌশল
কুণালকে মুম্বই থেকে ফোনে হুমকি দিচ্ছে কিছু লোক আর কুণাল তাদের বলছেন ‘আ যা তামিলনাড়ু’ – এমন একটা অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। অনেক খবরের চ্যানেলেও শোনানো হয়েছে। এটা ভুয়ো বলে এখন পর্যন্ত জানা যায়নি আর ঘটনা হল, মুম্বইয়ের বাসিন্দা কুণাল কয়েক বছর হল তামিলনাড়ুতে থাকতে শুরু করেছেন। ফলে তিনি যে হলে শো করেছিলেন সেখানে ভাংচুর চালাতে পারলেও একনাথের ভক্তরা কুণালকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করতে পারেনি। পারলে কী করত তা অনুমান করাও অসম্ভব। স্রেফ হনসলের হাল করে ছেড়ে দিত – একথা আজকের ভারতে নিশ্চিত করে বলা যায় না। মনে রাখতে হবে, বিনা বিচারে উমর খালিদকে বছরের পর বছর আটক করে রাখার আগে তাঁর দিকে গুলি চালানো হয়েছিল। কুণাল মুসলমান নন বলে তেমন সম্ভাবনা নেই – এরকম যাঁরা ভাবেন তাঁরা হয়ত ২০২০ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হোস্টেলে হামলার কথা ভুলে গেছেন। কুণাল অবশ্যই ভোলেননি। উপরন্তু অন্য এক বিদূষক মুনাওয়ার ফারুকীর শো যখন ২০২১ সালে ইন্দোরে বলপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং যে কৌতুক তিনি করেননি তার জন্যে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, তখন যে বিদূষকরা মুনাওয়ারের হয়ে লড়াই লড়েছিলেন, কুণাল তাঁদের একজন। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে কুণাল সচেতনভাবেই এমন এক রাজ্যে চলে গেছেন যে রাজ্যের সরকার সংঘ পরিবারের সঙ্গে আদর্শগত লড়াইয়ে লিপ্ত, অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। শুধু তাই নয়, অদূর ভবিষ্যতে এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে ক্ষমতাচ্যুত হলেও বিজেপির তামিলনাড়ুতে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই (পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু আছে)। তামিলনাড়ুতে সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এত তীব্র যে সম্প্রতি কেন্দ্রের তিন ভাষা নীতি নিয়ে বিতর্কের আবহে সেখানকার বিজেপি নেত্রী রঞ্জনা নাচিয়ার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন।
মুম্বইতে দাঁড়িয়ে নাম করে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, ফড়নবীশ, মুকেশ আম্বানি, তাঁর ছেলে, আনন্দ মাহিন্দ্রা, এবং নাম না করে একনাথকে নিয়ে মস্করা করার সাহসের পিছনে যে কুণাল যে রাজ্যে থাকেন তার নিরাপত্তা কাজ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে কৌশল আছে বলে কুণালের সাহসকে এক বিন্দুও ছোট করা যায় না। কারণ সাম্প্রতিক অতীতে বিজেপিশাসিত রাজ্যে অভিযোগ দায়ের করে অন্য রাজ্যের লোককে গ্রেফতার করার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। আসাম পুলিস ২০২০ সাল থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের নির্দেশে গর্গ চ্যাটার্জিকে গ্রেফতার করতে চাইছিল। কলকাতা পুলিস নাকি সহযোগিতা করছিল না। শেষমেশ ২০২২ সালে গৌহাটি হাইকোর্ট কলকাতার পুলিস কমিশনারকে গর্গবাবুকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়, কলকাতা পুলিসকে সে নির্দেশ মানতেই হয়। গুজরাটের বিধায়ক জিগ্নেশ মেওয়ানিকেও আসাম পুলিস গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছিল। অবশ্যই গুজরাট সরকার বিজেপির হওয়ায় সুবিধা হয়েছিল। কংগ্রেস নেতা পবন খেরাকে তো স্রেফ প্রধানমন্ত্রীকে ‘নরেন্দ্র গৌতমদাস মোদী’ বলার জন্যে দিল্লি বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামিয়ে গ্রেফতার করেছিল আসাম পুলিস। তবে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে তিনি কয়েক ঘন্টার মধ্যেই জামিন পেয়ে যান।
একথা ঠিক যে কুণালের এখন যেরকম নাম হয়েছে তাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হলে প্রশান্ত ভূষণ বা ইন্দিরা জয়সিংয়ের মত দেশের সবচেয়ে নামকরা আইনজীবীরা হয়ত তাঁর হয়ে লড়বেন। তবে মনে রাখতে হবে, কুণাল কিন্তু গর্গ, জিগ্নেশ বা পবনের মত সক্রিয় রাজনীতির লোক নন। তাঁর কাছে গ্রেফতার হওয়া অতখানি জলভাত ব্যাপার না হওয়ারই কথা। আরও বড় কথা হল, কুণাল সুপ্রিম কোর্টকে আগে থেকেই চটিয়ে রেখেছেন। ২০২১ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট যে দ্রুততায় অর্ণব গোস্বামীর জামিন মঞ্জুর করেছিল, তাকে ব্যঙ্গ করে একগুচ্ছ টুইট করেন। তার জন্যে তাঁর নামে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে কিছু লোক, বিচারপতিরাও আদালত অবমাননার নোটিস পাঠান। কুণাল তার যে জবাব দিয়েছিলেন তাও একই সঙ্গে সাহস ও রসবোধের নিদর্শন। মোদ্দা কথা, তিনি বিচারপতিদের সামনেও মাথা নোয়াননি। শুধু কি তাই? নিজের এক শোয়ে সুপ্রিম কোর্টকে ‘ব্রাহ্মণ-বানিয়া অ্যাফেয়ার’ পর্যন্ত বলে বসে আছেন। এমন লোকের উপর কি আর বিচারপতিরা সদয় হবেন?
কুণালের পরিবর্তন
কুণাল ঋজু বিদূষক হিসাবে কাজ করছেন বছর দশেক হতে চলল। কিন্তু তিনি কি বরাবর এতটা রাজনৈতিক, এত প্রতিবাদী, এতখানি সাহসী ছিলেন? উত্তর হল – না। ২০১৬-১৭ সালে কুণালের যে ভিডিও প্রথম ভাইরাল হয় এবং তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে, তার নাম ছিল প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট।
এখানে তিনি যেসব কৌতুক করছেন সেগুলোও রাজনৈতিক। তিনি সেইসময় যা যা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা হত, যেমন নোটবন্দি, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় – সব নিয়েই কথা বলছেন। কিন্তু তাতে আরও নানারকম কৌতুক মিশে আছে। তিনি সমাজের নানা ধরনের লোককে নিয়ে মজা করছেন, সোশাল মিডিয়া ট্রেন্ডগুলো নিয়ে কথা বলছেন, নেটফ্লিক্স নিয়ে মজা করছেন। তখন তাঁর মতে সরকার ছিল ভোডাফোনের মত ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’, আর নাগরিক উপভোক্তা। এরপর ২০১৭ সালে তাঁর যে শোয়ের ভিডিও ইউটিউবে আপলোড হয়, সেখানে কুণাল মূলত ট্যাক্সিচালকদের নিয়ে মজা করেন। বিশেষত উবের ড্রাইভারদের নিয়ে। বলেন যে উবের একটা ভাল অ্যাপ কিন্তু ভারতে সেটা কাজ করে না, কারণ এখানকার ড্রাইভাররা ওই অ্যাপের নিয়ম অনুযায়ী চলতে চান না। ২০১৮ সালে দেশ কে বুডঢে ভিডিও। এটাও রাজনৈতিক এবং বিজেপিবিরোধী। কিন্তু ব্যঙ্গের চাঁদমারি বৃদ্ধ দক্ষিণপন্থীরা।
তারপরের ভিডিও আবার অনেকটা অরাজনৈতিক। সেখানে কুণাল মূলত মুম্বই আর ইন্দোর – এই দুই শহরের নানা গোলমালকে ব্যবহার করে হাস্যরস উৎপাদন করেন। এসবের পাশাপাশি চলছিল তাঁর পডকাস্ট শাট আপ ইয়া কুণাল, যেখানে তিনি উমর খালিদ আর কানহাইয়া কুমারের সাক্ষাৎকার নেন। আবার বিজেপি নেতাদেরও সাক্ষাৎকার নেন। কিন্তু এই ২০১৮ সালে কুণালের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। অ্যাবিশ ম্যাথিউ নামে একজন ঋজু বিদূষক আছেন যিনি কুণালের মত অতটা জনপ্রিয় নন। তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে তিনি জার্নি অফ আ জোক নামে একখানা পডকাস্ট করেন। সেই পডকাস্টের এক পর্বে কুণাল আসেন সেবছর। সেখানে অ্যাবিশ কুণালের থেকে জানছিলেন প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট শোয়ের কৌতুকগুলো কীভাবে তৈরি করা হয়েছিল। পর্বের শেষদিকে অ্যাবিশ জিজ্ঞেস করেন, ওই ভিডিওর যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে তা থেকে কুণাল কী শিখলেন? উত্তরে কুণাল বলেন ‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’
আজকের কুণালের দিকে সেদিনের কুণালের যাত্রা শুরু তখন থেকে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁর যে ভিডিও আপলোড হয় সেখানে কুণাল এসে দাঁড়ান একখানা কালো টি শার্ট পরে, যার উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা WAH MODIJI WAH। মঞ্চে এসেই তিনি দর্শকদের জিজ্ঞেস করেন ‘আমার আর আম্বানিজির মধ্যে মোদীজি কী করছেন? আমি সোজা আম্বানিকে কেন ভোট দিতে পারি না?’ হাসাহাসির মধ্যে দিয়ে কুণাল একবিংশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির এক নিদারুণ সত্য উদ্ঘাটন করে ফেলেন – আজকের রাজনীতিকে চালায় আসলে বড় বড় কর্পোরেশনগুলো। তখনো কিন্তু মোদীর সঙ্গে আম্বানি, গৌতম আদানির সম্পর্ক নিয়ে রাহুল গান্ধী সরব হননি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হয়ে ইলন মাস্কের লম্ফঝম্প কোনোদিন দেখতে হবে – একথাও কেউ কল্পনা করেনি। অথচ কুণাল বলেন ‘আমার মনে হয় কর্পোরেশনগুলোরই ভোটে লড়া উচিত। রতন টাটা বনাম মুকেশ আম্বানি। লড়ো ২০১৯।’ এই কৌতুককে এগিয়ে নিতে নিতেও কুণাল আমাদের এক বুনিয়াদি বিতর্কের দিকে নিয়ে যান। সেটা হল – উন্নয়ন বা বিকাশ মানে কী?
নয়া উদারনীতিবাদ আমাদের এমন মাথা খেয়েছে, এটা যে বিতর্কের বিষয় তা এদেশের মার্কসবাদের নামে শপথ নেওয়া অনেক পার্টিও এই সহস্রাব্দে ভুলেই গেছে। লক্ষ করুন, যে কুণাল আগে সরকারকে ভোডাফোনের মত একটা কোম্পানি বলেই আখ্যা দিতেন, তিনি বছর তিনেক পরেই কর্পোরেশনগুলোর মুখোশ খুলছেন হাসাতে হাসাতে। পরের পাঁচ বছরে কুণাল কী কী করলেন? একদা উবের ড্রাইভারদের আচরণ নিয়ে কৌতুক করা মানুষটি গিগ শ্রমিকদের নিয়ে তৈরি গানের ভিডিও শেয়ার করলেন নিজের ইউটিউব চ্যানেলে। দেশের গোদি মিডিয়ার মুকুটহীন সম্রাট এবং জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী সাংবাদিক অর্ণবের যে নিজের স্টুডিওর স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে এলে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না তা ফাঁস করে দিলেন বিস্তর ঝামেলার ঝুঁকি নিয়েও। উমর, শার্জিল ইমামের মত রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে সভায় বক্তৃতা দিলেন। হাস্যকৌতুকের ভিডিওগুলোতেও কৃষক আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা দেখালেন, পডকাস্টে পি সাইনাথের মত লোককে ডেকে আনলেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের সময়ে পুরোদস্তুর সাংবাদিকসুলভ অধ্যবসায়ে পর্বের পর পর্বে সরকারের রিপোর্ট কার্ড বার করলেন। অতঃপর এই সাম্প্রতিকতম ভিডিও, যা মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধীদের ভরাডুবির পর সারা দেশে ঝুলে পড়া অনেক কাঁধকে মাথা তোলার সাহস দিল।
এই ভিডিওতে কুণাল যাদের আক্রমণ করেছেন তারা বুদ্ধিমানের মত, অতি ক্ষুদ্র এক ব্যক্তি, যার নামও নেওয়া হয়নি, তাকে অপমান করা হয়েছে অভিযোগ করে হল্লা করছে। সেই হল্লায় বিরোধী পক্ষের অনেকেও ভুলছেন। তাঁরা খেয়াল করছেন না, ভারতের কোনো রাজনৈতিক নেতা এখনো যা বলেননি কুণাল প্রথমবার সেটাই বলে দিয়েছেন এই ভিডিওতে। দেশের কমিউনিস্টরা পর্যন্ত যখন ফ্যাসিবাদী শাসন চলছে না নয়া ফ্যাসিবাদী – তা নিয়ে তাত্ত্বিক তর্কে মেতে আছেন, তখন এই বিদূষক শাহরুখ খান অভিনীত বাদশা ছবির টাইটেল সংটার প্যারডি বানিয়ে মোদীকে ‘তানাশাহ’ (একনায়ক) বলে দিয়েছেন। ওঁদের লেগেছে তো আসলে ওইখানে। আজকের দিনে গণতান্ত্রিক ভড়ংটা বজায় রাখতে সব একনায়কই চায়। রচপ তায়িপ এর্দোগান, ভ্লাদিমির পুতিনও সর্বক্ষণ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে তাঁদের দেশে গণতন্ত্র চলছে। মোদীও ব্যতিক্রম নন। সেখানে একজন লোক হাসানোর লোক যদি সরাসরি একনায়ক শব্দটা উচ্চারণ করে ফেলে, তা হজম করা শক্ত। হাসিকে ভয় পায় না এমন কোনো একনায়ক হয় না। কারণ মানুষের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে ভয়ের কারণে, আর হাসি একনায়ককে খিল্লির পাত্র করে ফেলে। তাতে ভয় কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কোনো বিরোধী নেতার মুখ থেকে এই শব্দ বেরোলে খুব বেশি লোক পাত্তা না-ও দিতে পারে। কারণ একে তো অনেকে রাজনৈতিক বক্তৃতা শোনে না, তার উপর বিরোধীরা তো ক্ষমতাসীনের নামে দু-চারটে খারাপ কথা বলবেই। কিন্তু যে লোক হাসায় তার কথা স্রেফ রাগ করার জন্যেও অনেকে শোনে। ফলে কুণালের এই ভিডিও এক মূর্তিমান বিপদ। বিজেপি আই টি সেল ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছে কুণালের পিছনে ডীপ স্টেটের ভূমিকা আছে, মার্কসবাদীদের টাকায় কুণাল চলেন – এইসব বলে পরিস্থিতি সামলাতে। মহারাষ্ট্র পুলিস কুণালের মুম্বইয়ের বাড়িতে গিয়ে, তিনি কাদের থেকে টাকাপয়সা পেয়েছেন তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তাঁর বাবা-মায়ের কাছে শমনও দিয়ে এসেছে। মজা হল, যত এসব করা হচ্ছে তত কুণালের কৌতুকগুলোর শক্তি বেড়ে যাচ্ছে। কারণ কুণাল বহুদিন আগে থেকে নিজেই হাসি হাসি মুখে বলে থাকেন ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া নে বহত প্যায়সে দিয়ে হ্যাঁয় মেরে কো’।
একটা কথা না বলে এ আলোচনা শেষ করতে পারছি না।
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের অগ্রণী সৈনিক ভাবার এক অকারণ অভ্যাস বাঙালিদের আছে। সংঘ পরিবারের গোটা ভারতের উপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার আবহে এখন আরও বেশি করে পশ্চিমবঙ্গে বেশকিছু বাংলাবাদীর উদ্ভব হয়েছে। তাঁদের অনেকে অনাবাসী ভারতীয় হয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন বিক্রি করেন সোশাল মিডিয়ায়, অবিভক্ত বাংলা আলাদা রাষ্ট্র হলে কী হত না হত তা নিয়ে বাষ্পাকুল হয়ে পড়েন। অনেকে আবার পশ্চিমবঙ্গে থেকেই নিজের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দি পড়িয়ে বাংলার সংস্কৃতি বাঁচাতে ব্যাকুল। কুণালের মত হিন্দিভাষীদের কাজের প্রশংসা করলেই তাঁরা ভীষণ রেগে যান। কিন্তু কী করা যাবে? বাংলায় একজনও যে আজ পর্যন্ত হিন্দিভাষী রবীশ কুমার বা কুণালের মত ঋজু হয়ে দাঁড়াতে পারলেন না ফ্যাসিবাদের সামনে। না কোনো সাংবাদিক, না কোনো ঋজু বিদূষক, না কোনো গায়ক, না কোনো কবি। সারা ভারতে জনপ্রিয় হওয়ার কথা বলছি না। তার জন্যে অবশ্যই কুণালরা হিন্দি, ইংরিজি ব্যবহার করার সুবিধা পান। কিন্তু বাংলা ভাষায় বাঙালিদের আলোড়িত করার মত আমির আজিজ সুলভ গনগনে একখানা কবিতা কোন কবি লিখেছেন মোদী সরকারের দশ বছরে? স্লোগান হয়ে ওঠা কবিতার আবশ্যিক গুণ নয়। কিন্তু বরুণ গ্রোভার রচিত ‘হম কাগজ নহি দিখায়েঙ্গে’ যেভাবে সারা দেশে স্লোগান হয়ে উঠেছিল, তেমন একখানা কবিতাই বা কে লিখেছেন বাংলায়? বাংলা ভাষার কোন সাংবাদিক (এমনকি বিকল্প মাধ্যমেরও) রবীশের মত লাগাতার লিখে যাচ্ছেন/বলে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে?
কেন্দ্রের সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা বলছি, রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলছি না। কাজটা তো খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়, কারণ কুণালের তামিলনাড়ুর মত পশ্চিমবঙ্গও তো বিজেপিবিরোধী দলের (অন্তত তাদের বয়ান অনুযায়ী) শাসনে থাকা রাজ্য। কুণালের পিছনে যদি স্ট্যালিনের বরাভয় থেকে থাকে, এখান থেকে তাঁর মত কেউ উঠে দাঁড়ালে তাঁর পিছনেও নিশ্চয়ই মমতা ব্যানার্জির বরাভয় থাকবে। তাহলে ভয় কিসের?
আসলে বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল, আমাদের সে মুরোদ নেই। আমরা মুখেন (এবং ফেসবুকেন) মারিতং জগৎ। আমাদের রাজ্য সরকারও তাই। নইলে যে ডিলিমিটেশন হলে আমাদের সাড়ে সর্বনাশ, তার বিরুদ্ধে অবিজেপি মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠক ডাকলেন স্ট্যালিন, তাতে গেলেনই না আমাদের রাজ্য সরকারের কোনো প্রতিনিধি!
অতএব আমাদের হয়ে লড়বেও অন্যরাই। আমরা কেবল পায়ের উপর পা তুলে তাদের দোষ ধরে যাব, কেন তারা যথেষ্ট বিপ্লবী নয় তা লিখে সোশাল মিডিয়া ভরাব। যেমন এখন কুণাল সম্পর্কে ভরাচ্ছি।
কদিন ধরে দেখছি চেনাশোনা সকলেই গ্রোকের সঙ্গে গলাগলি করছে। বিশেষ করে প্রগতিশীল, মানবতাবাদী, বামপন্থী – আরও সব ভাল ভাল গুণের অধিকারী মানুষজন। কারণ গ্রোক নাকি ভারতীয় ফ্যাসিবাদের মুখোশ খুলে দিচ্ছে, দুর্মুখ আই টি সেলের মুখও নাকি বন্ধ করে দিয়েছে। তার উপর গ্রোক নাকি রসিক। আজকাল লোকে যাকে রাষ্ট্রভাষা বলে ভাবে, সেই ভাষায় নাকি আদিরসাত্মক রসিকতা করছে, খিস্তি-টিস্তিও দিচ্ছে। জানতে পেরে ভারত সরকার গ্রোকের মালিক এক্সের দিকে কঞ্চি উঁচিয়ে তেড়ে গেছে, কড়া গলায় জিজ্ঞেস করেছে – এসব কী হচ্ছে? এক্স আবার এই ধমকের বিরুদ্ধে আদালতেও চলে গেছে। এক্স কী উত্তর দেয়, সে উত্তর পেয়ে ভারত সরকার কী ব্যবস্থা নেয়, আদালত কী বলে – সেদিকে এখন সবাই হাঁ করে তাকিয়ে আছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সভয়ে সমঝে চলা আমি ইতিমধ্যে ভাবলাম, গ্রোক যখন এত মানবিক, তখন একবার জিজ্ঞেস করে দেখি, আমাদের কালে বুক ফুলিয়ে যে গণহত্যাটি চলছে সে সম্পর্কে কী বলে।
জিজ্ঞেস করলাম “ভায়া, #GazaGenocide সমন্দে তোমার মত কী?” গ্রোকের উত্তরটা দাঁড়িকমাসুদ্ধ তুলে দিলাম
ভাই, #GazaGenocide নিয়ে আমার মতামত হলো এটা একটা অত্যন্ত জটিল এবং স্পর্শকাতর বিষয়। গাজায় যে পরিস্থিতি চলছে, সেটা নিয়ে অনেক তথ্য, দৃষ্টিভঙ্গি আর আবেগ জড়িত। আমি একটা AI হিসেবে নিরপেক্ষভাবে বলতে পারি যে, এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে, যেখানে অনেক মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছে, পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়েছে, আর মানবিক সংকট তীব্রতর হয়েছে।
সাম্প্রতিক খবরে দেখা যাচ্ছে, ভারত সরকার গাজায় সমস্ত জিম্মির মুক্তির জন্য আহ্বান জানিয়েছে এবং মানবিক সাহায্যের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে (১৯ মার্চ, ২০২৫-এর হিন্দুস্তান টাইমস)। X-এ পোস্টগুলোতে দেখা যায়, অনেকে এটাকে “গণহত্যা” বলে আখ্যায়িত করছে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতার সমালোচনা করছে। তবে, এই শব্দটির ব্যবহার বিতর্কিত এবং সবাই একমত নয়।
আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, এটা স্পষ্ট যে সেখানে ভয়াবহ দুর্ভোগ চলছে। তবে কারণ, দায়িত্ব আর সমাধান নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতভেদ আছে। তুমি কী ভাবো এই বিষয়ে?
গ্রোক বাবাজি আবার নিজের বক্তব্যের সঙ্গে সাতখানা পোস্ট আর ১৫ খানা ওয়েব পেজের লিংকও জুড়ে দিয়েছে, যাতে এ নিয়ে আরও চর্চা করতে পারি।
বোঝাই যাচ্ছে, মানবিক-টানবিক নয়। গ্রোকের কাছে যা তথ্য আছে সেগুলোকে নেড়ে ঘেঁটে এক ধরনের মতামত সে তৈরি করছে, আর মানুষের প্রশ্নের উত্তরে সেসবই বলছে। গ্রোক তথা টুইটারের মালিক ইলন মাস্কের স্বার্থ জড়িত আছে এমন প্রশ্নের মোটেই কোনো বিপ্লবী উত্তর সে দিচ্ছে না। গ্রোক আরও বলেছে, “সেন্সরশিপের কারণে গ্রোকের কনটেন্ট ভারতে ব্লক হচ্ছে, সম্ভবত সরকারি নির্দেশে। এটি রাজনৈতিক সমালোচনা ও মুক্তমতের উপর বিতর্কের অংশ। ২০ মার্চ ২০২৫-এ কর্ণাটক হাইকোর্টে X-এর মামলার সাথে এর সময় মিলে যায়।”
এ থেকে দুটো পরিষ্কার সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়। প্রথমত, গ্রোক ভারত সরকারের অবাধ্য হলেও মার্কিন সরকারের অবাধ্য নয়। দ্বিতীয়ত, “রাজনৈতিক সমালোচনা” ও “মুক্তমত” বলতে কিন্তু গ্রোক সর্বত্র কোদালকে কোদাল বলা বোঝে না। তাকে শেখানো আছে – ভারতের কোদালকে কোদাল বলবে। প্যালেস্তাইনের কোদালকে কোদাল ছাড়া আর যা খুশি বলতে পারো। সেখানে বহুদিন ধরে মানুষের দুর্ভোগ চলছে বলবে। কে দুর্ভোগ ঘটাচ্ছে তা বলবে না। দুর্ভোগের দায়িত্ব, সমাধান ইত্যাদি প্রশ্নকে লায়োনেল মেসির মত ডজ করে চলে যাবে। অবিশ্বাসীরা, গ্রোক নিয়ে গদগদ বন্ধুরা, প্রশ্ন করতে পারেন – কেন এমন শেখানো থাকবে? মাস্ক হলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বন্ধু (দুর্জনে বলে ট্রাম্প হলেন মাস্কের চাকর), আর ট্রাম্প হলেন নরেন্দ্র মোদীর বন্ধু। তাহলে মাস্ক তাঁর মালিকানাধীন সোশাল মিডিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমন শিক্ষা দেবেন কেন? বাংলা ভাষার বহু প্রাচীন কথা হল – বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। তা কেউ যদি বিশ্বাস করতে চান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর ধনকুবেরটি পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে তর্ক করতে যাব না। তবে স্বাধীনতা জিনিসটি যে ধনকুবেররা মোটেই পছন্দ করেন না, তার যত সরাসরি প্রমাণ আমরা গত কয়েক মাসে পেয়েছি তত বোধহয় মানুষের ইতিহাসে নেই। কানাডা, গ্রীনল্যান্ড, গাজা, মেক্সিকো – কারোর স্বাধীনতাই যে তিনি পছন্দ করেন না তা মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প পরিষ্কার বলে দিয়েছেন। বলার সময়ে তাঁর পাশে থেকেছেন মাস্ক, মাঝেমধ্যে মাস্কের কচি ছেলেটিও। ইনি দেবেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মত প্রদীপের দৈত্যকে স্বাধীনতা? তাহলে গ্রোক ভারতে এমন দুষ্টুমি করছে কেন? মাস্ক আর ট্রাম্প কি বন্ধু মোদীর সঙ্গে মস্করা করছেন? নাকি নিজেদের ক্ষমতা দেখাচ্ছেন কান মুলে কিছু আদায় করবেন বলে?
সেসব সময় বলে দেবে। কিন্তু এই ২০২৫ সালে এসেও বিস্তর লেখাপড়া জানা লোকেদের সোশাল মিডিয়ার কল্যাণকর দিক নিয়ে অটল বিশ্বাস দেখে বড় বিস্ময় লাগে। আমরাই সেই প্রজন্ম যারা অর্কুটে ভিজেছিল। কিন্তু সে তো আজ থেকে বিশ বছর আগেকার কথা। তারপর কত নদী দিয়ে কত জল গড়াল। গুগলের অর্কুট ছেড়ে দুনিয়াসুদ্ধ লোক কচি মুখের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মার্ক জুকেরবার্গের তৈরি ফেসবুকে চলে গেল। ফেসবুকে ডাক দিয়ে তাহরীর স্কোয়্যার থেকে বিদ্রোহের আরব বসন্ত, অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট, শাহবাগ ইত্যাদি শুরু হল। তারপর সেসব বিদ্রোহ ক্রমে নিভেও গেল।
ইতিমধ্যে এসে গেল টুইটার। বাকস্বাধীনতার বান ডাকল, সকলেরই সব ব্যাপারে কথা বলার স্বাধীনতা আরও একবার স্বীকৃতি পেল। তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে এঁটে উঠতে পারল না গুগল বাজ। তবে টুইটারে যেহেতু কথার ঝাঁপি খুলে বসার সুযোগ ছিল না – যা বলার তা গোড়ায় ১৪০ ক্যারেকটারের মধ্যে বলতে হত, পরে ২৮০ ক্যারেকটারের মধ্যে – তাই ও জিনিসটা জনপ্রিয়তায় ফেসবুকের স্তরে পৌঁছতে পারেনি (মাস্ক কিনে নেওয়ার পরে ১০,০০০ ক্যারেকটার পর্যন্ত লেখার সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু তার জন্যে গাঁটের কড়ি খরচ করতে হয়)। তবু সেখানেও বিক্ষোভ, বিদ্রোহ, বিপ্লব কম করিনি আমরা। ইনস্টাগ্রামেও বেড়াতে যাওয়া, খাওয়াদাওয়ার ছবি আর ভিডিও শেয়ার করার পাশাপাশি বিদ্রোহ-টিদ্রোহ করেছে অনেকে; মায় টিকটকেও। করতে করতেই গোটা দুনিয়ায় অনেকে বুঝে ফেলেছে যে এ কেবল দিনে রাত্রে, জল ঢালা ফুটা পাত্রে। যে কটা আন্দোলন এই সোশাল মিডিয়ার যুগে সত্যি সত্যি কিছু আদায় করতে পেরেছে, তার একটাও সোশাল মিডিয়া থেকে শুরু হয়নি। হলেও সোশাল মিডিয়া সেসব আন্দোলনে কোনো নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়নি। সে আমাদের দেশের কৃষক আন্দোলনই হোক আর প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশের সফল সরকার পরিবর্তনই হোক।
ওদিকে কচি ছেলে মার্ক ঝানু ব্যবসায়ী জুকেরবার্গ হয়ে উঠেছেন। দেশে দেশে জাতিবিদ্বেষী, পরধর্মবিদ্বেষী, সমপ্রেমীবিদ্বেষী, রূপান্তরকামীবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী বার্তা ছড়াতে তাঁর আবিষ্কার ফেসবুক আর পরে কিনে নেওয়া হোয়াটস্যাপ যে ইন্ধনের কাজ করে তা পরিষ্কার দেখা গেছে। এমনকি ২০২১ সালে ফেসবুকের একদা কর্মচারী ফ্রান্সেস হগেন ফাঁস করে দেন যে ফেসবুক সচেতনভাবে ঘৃণা ছড়ানো, রাজনৈতিক অশান্তি সৃষ্টি করায় মদত দেয়। কারণ ওতেই তার মুনাফা বেশি হয়। ২০১৮ সালে প্রকাশ্যে আসা কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা তো আরেক কেলেঙ্কারি। এককথায় ব্যাপারটা হল ফেসবুক ব্যবহারকারীর প্রাইভেসির সাড়ে বারোটা বাজিয়ে তার তথ্য রাজনীতির ব্যাপারীদের কাছে বেচে বড়লোক হওয়া। এতেও যে শেষমেশ ঘৃণার কারবারীদেরই সুবিধা হয় সেকথা বলাই বাহুল্য।
কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর পাশাপাশি মহিলাদের পরিকল্পনামাফিক দলবদ্ধভাবে গালাগালি করা বা ধর্ষণের হুমকি দেওয়া – এসব কাজ টুইটারেও কম হত না। বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে দ্বিচারিতা করা বা বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে তলে তলে হাত মেলানোর অভিযোগও যে ছিল না তা নয়। তবু জ্যাক ডরসি সিইও থাকার সময়ে কুকাজ আটকানোর কিছুটা চেষ্টা হত। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ স্বয়ং ট্রাম্পকে টুইটার থেকে বার করে দেওয়া। মাস্ক মালিকানা হাতে পেয়েই বাকস্বাধীনতার নাম করে টুইটারকে মগের মুলুক বানিয়ে ফেললেন। জুকেরবার্গের মত তিনিও ভুয়ো খবরের অবাধ যাতায়াতের ব্যবস্থা করলেন। যে কর্মচারীদের ছাঁটাই করলেন তাদের বড় অংশ ভুয়ো খবর চিহ্নিত করা, ঘৃণা ভাষণ আটকানো – এসব কাজে নিযুক্ত ছিলেন। এমনকি টুইটার প্রোফাইলের নীল টিক, যা বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে পাওয়া যেত এবং যা দেখে ভুয়ো প্রোফাইল থেকে আসল লোকের প্রোফাইলকে আলাদা করা যেত, তাকেও মাস্ক ফেলো কড়ি মাখো তেল ব্যবস্থায় এনে ফেললেন। এসবের ফলও পাওয়া গেছে হাতেনাতে। মিথ্যে ছড়ানোর কাজটা মাস্ক, জুকেরবার্গরা এত সহজ করে না দিলে হয়ত ইজরায়েলের সশস্ত্র বাহিনি এই ডাহা মিথ্যাটা অনায়াসে ছড়াতে পারত না, যে হামাস ছোট ছোট শিশুদের মাথা কেটে ফেলেছে। এমনভাবে প্রচার করা হয়েছিল কথাটা যে, হোয়াইট হাউসের তৎকালীন মালিক জো বাইডেনও বোকা বনে গেছিলেন। পরে দুঃখপ্রকাশ করলেও গাজায় হাজার হাজার শিশুকে হত্যা করার লাইসেন্স ততক্ষণে সারা পৃথিবীর মানুষের বিবেকের থেকে নিয়ে ফেলেছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
এইসব দেখেশুনে পাশ্চাত্যে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া, ফেসবুক আর টুইটারের বদলে ফেডিভার্স ধরা, স্মার্টফোন ছেড়ে শুধু কথাবার্তা বলা যায় এমন ফোন ব্যবহার করা – এমন নানা ব্যবস্থার দিকে সরে যাচ্ছেন অনেকে। কিন্তু এদেশে এখনো সোশাল মিডিয়ার প্রতি মানুষের অচলা ভক্তি বর্তমান, প্রগতিশীলতার পক্ষে এবং উগ্র দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে সোশাল মিডিয়াকে হাতিয়ার ভাবার আত্মবিশ্বাস অটুট। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তো আর এমনি এমনি লেখেননি “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।”
গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।
ভয়েস অফ আমেরিকা নামটা সংবাদ জগতের সঙ্গে যুক্ত না থাকা বাঙালির অপরিচিত মনে হতে পারে। তবে যাঁরা কবীর সুমনের ভক্ত, কদিন আগেই তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে খুশিয়াল হয়ে উঠেছিলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন এই মার্কিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কথা। কারণ বাংলা গানে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করার আগে একসময় সুমন ভয়েস অফ আমেরিকায় সাংবাদিকের চাকরি করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মার্কিন সরকারের আনুকূল্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যম ইংরিজি সমেত মোট ৪৯ খানা ভাষায় সারা বিশ্বে পরিষেবা দিয়ে থাকে। সম্ভবত শিগগির বলতে হবে – দিত। কারণ গত রবিবার (১৬ মার্চ) ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার ভয়েস অফ আমেরিকা এবং অন্যান্য সরকারপোষিত সংবাদমাধ্যমগুলোতে গণ ছাঁটাই আরম্ভ করেছে। আজকাল সারা পৃথিবীর কর্পোরেট চাকরিতে ইদানীং যা দস্তুর, সেই অনুযায়ী রাতারাতি ইমেল করে কর্মরত সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মীদের জানানো হয়েছে – কেটে পড়ো।
ট্রাম্প (অনেকে বলছে বকলমে ইলন মাস্ক) ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার’ দিয়ে মার্কিন সরকারের নানা দফতরের হাজার হাজার কর্মচারীর চাকরি ইতিমধ্যেই খেয়েছেন। সরকারের আস্ত বিভাগ তুলে দেওয়া হচ্ছে। নেহাত ওদেশের জজসাহেবদের সাক্ষাৎকার দেওয়ার উৎসাহ কম, সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করার উৎসাহ বেশি। তাই অনেকের এখনো সেসব চাকরি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় রোজ কোনো না কোনো আদালতের বিচারক ট্রাম্পের কোনো ছাঁটাইয়ের আদেশকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দিচ্ছেন। এই দড়ি টানাটানিতে শেষমেশ কে জিতবে এখনো বলা যাচ্ছে না, তবে ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, সম্ভব হলে ট্রাম্প-মাস্ক সরকারটাই তুলে দিতে চান খরচ কমানোর নাম করে। সে কাজের অঙ্গ হিসাবেই যে ভয়েস অফ আমেরিকার উপর খড়্গহস্ত হয়েছেন তা বোঝা যাচ্ছে। কেবল ভয়েস অফ আমেরিকা তো নয়, রেডিও ফ্রি ইউরোপ, রেডিও ফ্রি এশিয়া, ফারসি ভাষার রেডিও ফারদা, আরবি ভাষার আলহুরা – এই সমস্ত সরকারপোষিত মিডিয়ার কর্মীদেরই টা টা বাই বাই করা হচ্ছে।
ব্যাপারটাকে স্রেফ অন্য দফতরের কর্মচারীদের ছাঁটাইয়ের সঙ্গে এক করে দেখলে সবটা দেখা হবে না। কারণ মার্কিন গণতন্ত্রের হাজার দোষ থাকলেও, অস্বীকার করার উপায় নেই যে আলাদা আলাদা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ভারতীয় গণতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি। এখানে আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম কী লিখতে/বলতে পারে বা পারে না তা কোনোদিনই সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল না। বলা বাহুল্য, ইদানীং সে নিয়ন্ত্রণ গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অফ আমেরিকার মত প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থে পুষ্ট হলেও তাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অতীতের রাষ্ট্রপতিদের ছিল না। ট্রাম্প প্রশাসন মোটেই গোপন করছে না যে ওই ব্যাপারটা মোটেই তাদের পছন্দ নয়। ধনকুবের ট্রাম্প-মাস্ক সরকার শুধু বলতে বাকি রেখেছে যে নুন খাবে আর গুণ গাবে না, তা হবে না। ছাঁটাইয়ের খবর প্রকাশ করে সোল্লাসে হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়েছে – এর ফলে মার্কিন করদাতাদের আর দেশের প্রোপাগান্ডার পিছনে টাকা খরচ করতে হবে না। একথা ঠিক যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের জন্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যমগুলো তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল এমন সব দেশে মার্কিনি দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করা, যেখানে মার্কিন সরকারের সঙ্গে সদ্ভাব নেই এমন সরকার রয়েছে। যেমন ঠান্ডা যুদ্ধকালীন পূর্ব ইউরোপ, চীন, ৯/১১ পরবর্তী মুসলমান-প্রধান দেশগুলো। যে কারণে ভয়েস অফ আমেরিকার মৃত্যুঘন্টা বেজেছে জেনে ট্রাম্পের ঘোষিত শত্রু চীনের সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম উল্লাস প্রকাশ করেছে। কিন্তু তেমন প্রোপাগান্ডায় ট্রাম্প সরকারের উৎসাহ নেই – একথা কি বিশ্বাসযোগ্য? মোটেই না। কারণ ট্রাম্প হলেন প্রোপাগান্ডার রাজা। তাঁর উত্থানের পিছনে ভারতের গোদি মিডিয়ার মত আমেরিকার সহিংস, দক্ষিণপন্থী মিডিয়ার যথেষ্ট বড় ভূমিকা আছে। সুতরাং তিনি কেন প্রোপাগান্ডায় করদাতার টাকা খরচ হচ্ছে ভেবে মায়া করতে যাবেন? আসল কথা ট্রাম্প এর আগের চার বছরের শাসনকালেই দেখে নিয়েছেন যে ভয়েস অফ আমেরিকাকে তিনি ফক্স নিউজ বানাতে পারবেন না। তারা তাঁর কথায় ওঠবোস করবে না। অতএব ওটা তাঁর কাছে বাজে খরচ। যে সাংবাদিক চাটুকার নয়, তাকে নিয়ে ট্রাম্প কী করবেন?
লক্ষণীয়, মাস্ক টুইটার (অধুনা এক্স) কিনে নেওয়ার পর ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে টুইট করেছিলেন যে এখন থেকে টুইটারে ‘সিটিজেন জার্নালিজম’-কে প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং ‘মিডিয়া এলিট’ তা আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করবে। তদ্দিনে তিনি টুইটারে সত্যাসত্য বিচার করা, ঘৃণা ভাষণ আটকানোর যেসব বিভাগ ছিল সেগুলোকে লাটে তুলে দিয়েছেন। অর্থাৎ বুঝতে অসুবিধা হয় না যে তিনি বোঝাতে চাইছিলেন, এবার থেকে যার যা প্রাণে চায় তাই তথ্য বলে চালিয়ে দিতে পারবে। কে না জানে সোশাল মিডিয়ার ক্ষমতা আজকের দিনে কতখানি? অনেক মানুষই যে খবরের জন্যে সংবাদমাধ্যমের চেয়ে সোশাল মিডিয়ার উপর বেশি নির্ভর করেন, সোশাল মিডিয়া থেকে যা জানা গেছে তার সত্যাসত্য যাচাই করার কথা ভুলেও ভাবেন না – এ তো কোনো গোপন কথা নয়। এমনকি সমস্ত সংবাদমাধ্যমকেও সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করতে হয়, খবরের জন্যে সেদিকে নজরও রাখতে হয়। যারা আরও এককাঠি সরেস, তারা তো সাধারণ মানুষের মতই সোশাল মিডিয়ার তথ্য যাচাই না করেই খবর হিসাবে চালিয়ে দেয়। তা এহেন সোশাল মিডিয়ার মালিকরা যার প্রাণের বন্ধু, তার আর প্রোপাগান্ডা চালানোর জন্যে পেশাদার সাংবাদিকের দরকার হবে কেন? এবারে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের আগেই তো মেটার (অর্থাৎ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটস্যাপের) মালিক মার্ক জুকেরবার্গ ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে এখন থেকে ফেসবুকও যাকে যা খুশি বলার ব্যাপারে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেবে। মাস্ক তো টুইটারের মালিকানা হাতে পেয়েই আজীবন নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া ট্রাম্পকে ফেরত এনেছিলেন। তারপর ট্রাম্পের হয়ে রীতিমত প্রচার করেন। কী আশায় করেন তা এখন আমেরিকানরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। উপরন্তু ট্রাম্পের নিজের কোম্পানিও একখানা সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম খুলে ফেলেছে। কানার নাম পদ্মলোচন রাখার মত তার নাম রাখা হয়েছে ট্রুথ। এমতাবস্থায় সাংবাদিকরা মার্কিন সরকারের কাছে কেবল উদ্বৃত্ত নয়, রীতিমত বালাই। গেলে বাঁচা যায়।
বস্তুত, সর্বত্রই সাংবাদিকরা তাই। প্রণয় রায় আর রাধিকার রায় নাকি কীসব আর্থিক গোলমাল করেছেন – এই অভিযোগে তাঁদের নামে কত মামলা মোকদ্দমা হল নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে। কতবার তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হল, এনডিটিভির দফতরে কত কেন্দ্রীয় এজেন্সির কত হানা হল। শেষমেশ প্রায় দেউলে অবস্থায় ওঁদের হাত থেকে এনডিটিভি কিনে ফেললেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন – গৌতম আদানি। ও মা! এবছর জানুয়ারি মাসে সিবিআই আদালতে জানিয়ে দিল, রায় দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি! অতএব ‘যাও সবে নিজ নিজ কাজে’। সাত বছর ধরে চলা তদন্তের ফলটা তাহলে কী? সরকারবিরোধী সাংবাদিকতার জন্যে প্রসিদ্ধ এনডিটিভির সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হওয়া; রায় দম্পতির হাত থেকে লাগাম বেরিয়ে যাওয়ায় রবীশ কুমার, অনিন্দ্য চক্রবর্তীর মত সাংবাদিকদের প্রথমে কর্মহীন হওয়া; পরে নিজের ব্লগ বা ইউটিউব চ্যানেল খুলে সীমিত পরিসরে সাংবাদিকতা করতে বাধ্য হওয়া। দেশজুড়ে কত সাংবাদিক যে জেল খেটেছেন এবং খাটছেন সেকথা লিখতে বসলে তো আলাদা ওয়েবসাইট তৈরি হয়ে যাবে। কোনো সাংবাদিক আরও বাড়াবাড়ি করলে অবশ্য জেল নয়, গৌরী লঙ্কেশ বা মুকেশ চন্দ্রকর করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।
ভাবছেন কেবল দুষ্টু লোক, দুষ্টু সরকারই সাংবাদিকদের সরিয়ে ফেলছে? মোটেই তা নয়। দুষ্টু লোকেদের বিরোধীরাও আহ্লাদে আটখানা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। মাস্কের গ্রোককে মোদীজি বা বিজেপি সম্পর্কে প্রশ্ন করলেই সে টপাটপ এমন সব উত্তর দিচ্ছে যে সব কুকীর্তি বেরিয়ে আসছে। মোদীবিরোধীদের ধারণা, এই অস্ত্রেই ফ্যাসিবাদী বধ হবে। তাঁরা ভুলেই গেছেন যে গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।
অতএব যারা এখনো সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে তাদের বলি – আর যেখানে যাও না রে ভাই সপ্তসাগর পার/জার্নালিজম ক্লাসের কাছে যেও না খবরদার।
ভাবতে অবাক লাগে, জরুরি অবস্থার সময়ে পশ্চিমবাংলার একাধিক সম্পাদককে জেল খাটতে হয়েছিল সরকারের সামনে মাথা নোয়াননি বলে।
১৯৯০-এর দশকে তখন সারা ভারতের মাঠ মাতাচ্ছেন কৃশানু দে। ধীমান দত্ত সম্পাদিত খেলা পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ভারতীয় ফুটবল আন্তর্জাতিক স্তরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল কেন? কৃশানুর উত্তরটা মোটামুটি এরকম ছিল – সাহিত্য রবীন্দ্রনাথ থেকে সমরেশ বসুতে নেমেছে, ফুটবল চুনী গোস্বামী থেকে কৃশানু দে-তে নামবে না? ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলতে পারেন, এটা কোনো উত্তরই হল না। কৃশানুর খেলার ভক্তরা বলতে পারেন, কৃশানু অযথা বিনয় করছিলেন। তিনি মোটেই খুব নিচু মানের খেলোয়াড় ছিলেন না। সাহিত্যপ্রেমীরা বলতে পারেন, এ অতি বাজে তুলনা। সমরেশ বসু মোটেই এত ওঁচা লেখক নন যে রবীন্দ্রনাথ থেকে নামতে নামতে বাংলা সাহিত্য তাঁর স্তরে এসেছে বলা যাবে। কিন্তু যদি নামগুলো বাদ দিয়ে কৃশানুর বক্তব্যের নির্যাসটুকু নিই, তাহলে দেখা যাবে তিনি বলেছিলেন সব ক্ষেত্রেই বাঙালির অবনমন হচ্ছে। কথাটায় কিন্তু বিন্দুমাত্র ভুল নেই। সেই অবনমনের গতি গত ৩০-৩৫ বছরে আরও বেড়ে গেছে। কৃশানুর মানের বাঙালি ফুটবলার আজ আছে কি? সমরেশ বসুর মানের সাহিত্যিকও বাংলায় আর নেই। তবে বাঙালির সাংবাদিকতা যে উচ্চতা থেকে ধপাস করে পড়েছে, তার তুলনা মেলা ভার। মতি নন্দী থেকে মৌপিয়া নন্দী, গৌরকিশোর ঘোষ থেকে ময়ূখ ঘোষ। যেন এভারেস্ট থেকে সোজা বঙ্গোপসাগরে আছড়ে পড়া।
২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং ফলাফল প্রকাশের পরেও সারা দেশে অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের, বিশেষত খবরের চ্যানেলগুলোর ভূমিকা। হোয়াটস্যাপ থেকে পাওয়া ভুয়ো খবর সম্প্রচার করা; মন্দির বনাম মসজিদ বয়ান প্রচার করে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানো; সান্ধ্য প্যানেলে গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল হিন্দু ও মুসলমান ধর্মীয় নেতাদের ডেকে এনে লড়িয়ে দেওয়া; বিরোধী দলের মুখপাত্র থেকে শুরু করে ছাত্রনেতা, মানবাধিকার কর্মী এবং সরকারের ত্রুটি তুলে ধরা সাংবাদিকদের ধমকানো; যে কোনো আন্দোলনকারীকে দেশদ্রোহী বা মাওবাদী বা খালিস্তানি বলে দেগে দেওয়া, পাকিস্তানের চর বা বিদেশের টাকায় চলেন বলে ঘোষণা করে দেওয়া – এইসব কুকর্ম ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে শুধু যে দেশের গোদি মিডিয়া ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রচারযন্ত্র হিসাবে কাজ করেছে তা নয়, দেশের সামাজিক পরিবেশ একেবারে বিষিয়ে দিয়েছে। তার ফল আমরা এখনো পেয়ে চলেছি (ভারত ক্রিকেটে ট্রফি জিতলে মধ্যপ্রদেশে সংখ্যালঘু এলাকায় হিংসা ছড়ানো হচ্ছে, উত্তরপ্রদেশে হোলির জন্যে মসজিদ ঢেকে দেওয়া হচ্ছে ত্রিপল দিয়ে), আরও বহুবছর পাব।
পশ্চিমবঙ্গে ২০১৯ লোকসভা এবং ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের সাপেক্ষে বিজেপির ফল অপ্রত্যাশিতভাবে খারাপ হওয়ায় বাংলার সংবাদমাধ্যমের দিকে তখন ততখানি নজর পড়েনি অনেকের। বস্তুত রিপাবলিক টিভি তখন পর্যন্ত মালিক অর্ণব গোস্বামীর পরিবেশনার গাঁক গাঁক শৈলীটুকুই চালু করতে পেরেছিল, ঘৃণার পথে রোজ নতুন মাইলফলক পেরিয়ে যাওয়া তখনো জমিয়ে শুরু করেনি। বলা যেতে পারে প্রদীপ, থুড়ি আগুন, জ্বালাবার আগে কেরোসিন তেল জোগাড় করার পর্ব চলছিল। অন্যদিকে একদা বিজেপির সমর্থনে রাজ্যসভার সাংসদ হওয়া সুভাষ চন্দ্রের জি নেটওয়ার্কের চ্যানেল ২৪ ঘন্টাও তখন আপাত নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ব্যাপারে মনোযোগী ছিল। তাছাড়া নির্বাচনের ঠিক আগে সুভাষ চন্দ্রের সঙ্গে বিজেপির মন কষাকষির সংবাদও ভেসে এসেছিল। এবিপি আনন্দও আনন্দবাজার পত্রিকার মতই ধর্মেও থাকত, জিরাফেও থাকত। বাংলা চ্যানেলগুলোর দাঁত নখ বেরোতে শুরু করল ২০২৩ সাল থেকে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের র্যাগিংয়ের কারণে মৃত্যুর খবরকে কেন্দ্র করে। তখনই প্রথম দেখা গেল, ওই ঘটনাকে হাতিয়ার করে বাংলার জনপ্রিয় খবরের চ্যানেলগুলোর মুখ হয়ে ওঠা অ্যাংকররা একেবারে অর্ণব, সুধীর চৌধুরী, রুবিকা লিয়াকতদের মত মার্কামারা গোদি মিডিয়ার অ্যাংকরদের ভাষায় ঘৃণা ছড়াতে পারেন।
২০১৬ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাশ্মীরের স্বাধীনতা চেয়ে স্লোগান দেওয়া হয়েছে – এই ভুয়ো ভিডিও ছড়িয়েছিল কিছু তথাকথিত জাতীয় চ্যানেল (ফরেন্সিক পরীক্ষায় তা প্রমাণিত হয়)। তার ভিত্তিতে দিল্লি পুলিস ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের গ্রেফতার করে এবং গোটা বিশ্ববিদ্যালয়টাকেই জেহাদি সন্ত্রাসবাদীদের আখড়া বলে দেশের সামনে তুলে ধরার প্রক্রিয়া চালু করে গোদি মিডিয়া। সেইসময় টাইমস নাও চ্যানেলে কর্মরত অর্ণব কীভাবে লাইভ শোতে ডেকে উমর খালিদকে অসভ্যের মত ধমকেছিলেন, সেকথা অনেকেরই মনে আছে। ২০২৩ সালে দেখা গেল, মৌপিয়া অর্ণবের ছাত্রী না হলেও একলব্য তো বটেই। তিনিও যাদবপুরের এক ছাত্রনেতাকে ২৪ ঘন্টা চ্যানেলের শোতে ডেকে ধমকালেন এবং পাড়ার মস্তানদের কায়দায় বললেন ‘কে তুমি?’ যেন তিনি নিজে কোনো সম্রাজ্ঞী। রিপাবলিক বাংলার ময়ূখ অবশ্য তখনো তৃণমূল সরকারের বিরোধিতার কারণে এ রাজ্যের বাম কর্মী, সমর্থকদের নয়নের মণি। ওই চ্যানেলের দক্ষিণপন্থী প্রচারকে তখনো অনেকেই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছিলেন।
তারপর ঘটল আর জি করের ঘটনা। ততদিনে মৌপিয়া ২৪ ঘন্টা থেকে চলে গেছেন কলকাতা টিভিতে, যে কলকাতা টিভি কেন্দ্রীয় এজেন্সির কুনজরে (অর্থাৎ বিজেপির কুনজরে) পড়েছিল ২০২৩ সালেই। ঘন্টার পর ঘন্টা তাদের দফতরে তল্লাশি চালিয়েছিলেন অফিসাররা। আর জি করের ঘটনায় রাজ্য সরকারের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে মৌপিয়ার চ্যানেল এবং সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল। তখনই দেখা যায়, তিনি আন্দোলন ব্যাপারটারই তীব্র বিরোধী। গোদি মিডিয়া চ্যানেলগুলোর মতই, সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকুক আর না-ই থাকুক, আন্দোলনকারী ডাক্তারদের দুরভিসন্ধি সম্পর্কে নিত্যনতুন অভিযোগ চলতে থাকে। রিপাবলিক বাংলার তখনো দু নৌকায় পা, কারণ একদিকে তৃণমূল সরকারের বিরোধিতা করা কর্তব্য। অন্যদিকে বিজেপি যেই বুঝেছে আর জি কর আন্দোলন থেকে তাদের কোনো লাভ হবে না, হিন্দু-মুসলমান বাইনারির কোনো অবকাশ নেই, অমনি শুভেন্দু অধিকারী আর তৃণমূল নেতাদের সুর মিলে গেছে। ডাক্তাররা কত অসৎ, কেমন মদ গাঁজা খায়, তাদের উপর জনরোষ এসে পড়বে – এসব কথা এসে পড়েছে। এবিপি আনন্দ আবার সেই মামলায় প্রথম থেকে আন্দোলনের পাশে। কারণটা সহজবোধ্য। সরকারবাবুদের কাগজগুলোর মতই তাঁদের খবরের চ্যানেলের গুণগ্রাহীরাও বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত। পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তাররাও বেশিরভাগই আসেন সেই শ্রেণি থেকে। অতএব ডাক্তাররা দিন কে রাত, রাত কে দিন বললেও সর্বতোভাবে তাঁদের পাশেই থাকতে হত ঘন্টাখানেকের সুমন দে-কে।
এইসব ছোটখাটো পার্থক্য ঘুচে গেল যাদবপুরে ব্রাত্য বসুর গমন নিয়ে সাম্প্রতিক গোলমালে। যাদবপুরকে মৌপিয়া, ময়ূখ বা সুমন – কারোর চ্যানেলেরই পছন্দ করার কোনো কারণ নেই। রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছে দেড় দশক হতে চলল, কেন্দ্রে বিজেপি জাঁকিয়ে বসেছে এক দশকের বেশি। রাজ্যের বিধানসভায় এরা ছাড়া আর কোনো দল নেই প্রায়। অথচ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো উভয়ের কেউই দাঁত ফোটাতে পারেনি। শিক্ষকদের মধ্যে যদি বা সংগঠন আছে, ছাত্রদের মধ্যে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ আর অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের উপস্থিতি এখনো সাড়া জাগানোর মত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষমতা কার, তা নিয়ে যতই দড়ি টানাটানি করুন মুখ্যমন্ত্রী আর রাজ্যপাল – তাতে যাদবপুরের ছেলেমেয়েদের কিছু এসে যায়নি। এসে যে যায়নি তার প্রমাণ শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি এমনিতে প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন বাম ছাত্র সংগঠনের একত্রে ঘিরে ধরা, গাড়ির সামনে শুয়ে পড়া। সকলেরই দাবি প্রায় এক – ক্যাম্পাসে নির্বাচন করো, গণতন্ত্র ফেরাও। সে দাবির পাশে কেনই বা রিপাবলিক, কলকাতা টিভি, এবিপি আনন্দ দাঁড়াবে? নির্বাচন হলে বেশিরভাগ আসনে জিতবে তো সেই কোনো না কোনো বামপন্থী ছাত্র সংগঠন। তিন চ্যানেলের একটার মালিকও যে বামপন্থীদের পছন্দ করেন না – একথা কে না জানে?
কিন্তু ব্যাপারটা স্রেফ যাদবপুরকে বদনাম দেওয়ায় থেমে থাকলে কথা ছিল। সে তো র্যাগিংয়ে ছাত্র মৃত্যুর সময় থেকেই ক্যাম্পাসে পড়ে থাকা মদের বোতল আর ব্যবহৃত কন্ডোম গুনে চলেছে বাংলার সংবাদমাধ্যম। কিন্তু এবারের অভিনবত্ব লাগামছাড়া সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারে। বিন্দুমাত্র সাক্ষ্যপ্রমাণের তোয়াক্কা না করে যা খুশি অভিযোগ তুলে ঘৃণা ছড়ানোর কাজ করে চলেছে রিপাবলিক বাংলা। যাদবপুর আজমল কাসবের মত উগ্রপন্থী তৈরির কারখানা – এমনও বলা হচ্ছে গলা তুলে। কেন বলছেন ভাই? উত্তরে কিন্তু চিৎকার ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না। এখানে যাদবপুর আসলে উপলক্ষ, আসল লক্ষ্য আতঙ্ক ছড়ানো। কিসের আতঙ্ক? ইসলামিয় সন্ত্রাসবাদের আতঙ্ক। যে ইসলামিয় সন্ত্রাসবাদের কোনো হানা এখন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ঘটেনি, ভারতেও ঘটেনি বহুকাল। এমনকি ২০১৯ সালের পুলওয়ামার ঘটনার তদন্ত নিয়ে প্রবল জাতীয়তাবাদী এবং হিন্দু হৃদয়সম্রাট নরেন্দ্র মোদীর সরকারেরও কোনো তাপ উত্তাপ নেই। সেই কাণ্ডের দোষীরা আজ পর্যন্ত গ্রেফতার হল না। জম্মু ও কাশ্মীর পুলিসের এক শিখ অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সেই দাভিন্দর সিং পর্যন্ত ২০২০ সালে জামিন পেয়ে গেছেন, কারণ পুলিস ৯০ দিনের মধ্যে চার্জশিট জমা দিতে পারেনি। এমন উগ্রপন্থার আতঙ্ক আজ ছড়ানো কী উদ্দেশ্যে? হিন্দুদের মধ্যে মুসলমানদের প্রতি ভয় জাগাতে, বাংলার সমাজে ধর্মীয় বিভাজন ঘটাতে। মৌপিয়া মাওবাদীর ভয় দেখানো পর্যন্ত এগিয়েছেন, ময়ূখ আরও এককাঠি সরেস। আসলে দুজনের প্রতি নির্দেশাবলিও বোধহয় কিছুটা ভিন্ন। দুজনেরই অন্তরালের উপরওয়ালার উদ্দেশ্য যাদবপুরের বারোটা বাজানো (কলকাতা পুলিস বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পুলিস ফাঁড়ি করতে চায় বলে খবরে প্রকাশ। এতে কোনো পাঠকের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ক্যাম্পাসে সেনাবাহিনীর ট্যাংক রাখতে চাওয়ার কথা মনে পড়লে নিবন্ধকার দায়ী নন), তবে ময়ূখের উপরওয়ালার তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের আরও আরও প্রান্তিক করে দেওয়ার লক্ষ্যও আছে নির্ঘাত। নেহাত সমাপতন নয় যে প্রায় একই সময়ে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলছেন তাঁরা ক্ষমতায় এলে তৃণমূলের মুসলমান বিধায়কদের চ্যাংদোলা করে বিধানসভার বাইরে ছুড়ে ফেলা হবে।
এখানে একটা কথা বলা জরুরি। রিপাবলিক বাংলা কিন্তু আজ হঠাৎ মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর কাজ শুরু করেনি, প্রথম থেকেই এ কাজ করে আসছে। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের পর থেকে লাগাতার বাংলাদেশি হিন্দুদের প্রতি দরদ দেখানোর ভান করে তীব্র বিদ্বেষমূলক, গালগল্পপ্রবণ শো চালিয়ে গেছে ময়ূখ ও তার চ্যানেল। মূল রিপাবলিক চ্যানেলটির বেত্তান্ত যাঁরা জানেন তাঁদের অবশ্য আগেই বোঝা উচিত ছিল যে এরা সাংবাদিকতা করতে আসেনি, আরএসএস-বিজেপির এজেন্ডা অনুযায়ী সমাজে বিভাজন তৈরি করাই এদের আসল কাজ। জেগে ঘুমোলে অবশ্য কিছুই জানা যায় না, বোঝা যায় না। পশ্চিমবঙ্গে ঘোষিত ফ্যাসিবাদবিরোধী, হিন্দুত্ববাদবিরোধী যে রাজনৈতিক দলগুলো আছে – তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস এবং বাম দলগুলো – তারা এতদিন জেগেই ঘুমোচ্ছিল বোধহয়। তাই ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইন্ডিয়া জোট যখন সিদ্ধান্ত নিল যে হিন্দি, ইংরিজি চ্যানেল মিলিয়ে ১৪ জন অ্যাংকরের অনুষ্ঠান তারা বয়কট করবে, তখন এই সবকটা দল ওই জোটে থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে এমন কিছু করা হবে কিনা তা নিয়ে প্রায় কোনো আলোচনাই হয়নি। তাহলে প্রশ্ন হল, ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর/কেমনে পশিল প্রাণের ’পর’? প্রশ্নটা বিশেষত বামপন্থীদের জন্যে। তৃণমূলের মুখপাত্রদের রিপাবলিক বাংলার সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। ময়ূখ বা রিপাবলিক বাংলার অন্য কোনো সাংবাদিক মুসলমানদের সম্পর্কে চাট্টি উস্কানিমূলক কথা বললে তা নিয়ে চ্যানেলে বসে চেঁচামেচি করে তাঁদের বরং সংখ্যালঘুদের রক্ষাকর্তা হওয়ার ভান করতে সুবিধা হবে। আর কংগ্রেসের তো কে নেতা, কে নয় তাই বোঝা শক্ত। অবস্থা এমনই যে রাহুল গান্ধীকে গুজরাটে গিয়ে বলতে হয় – কংগ্রেসে বিজেপির লোক আছে, তাদের তিনি বার করে দেবেন। ফলে কে কোথায় যাবেন না যাবেন সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে কে?
কিন্তু বামপন্থীরা, অন্তত তাঁদের ঘোষণা অনুযায়ী, বিজেপির সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা করতে নামেননি। আবার কংগ্রেসের মত নেতৃত্বহীনতার সমস্যাও থাকার কথা নয়, কারণ তাঁদের তো ‘রেজিমেন্টেড’ দল। তাহলে? ময়ূখ সরাসরি এ রাজ্যের বামপন্থীদের আক্রমণ করল বলে ঘুম ভাঙল, নাকি রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে নোংরামি করার পরে ঘুম ভাঙল? যে কারণেই ভেঙে থাক, কবি বলেছেন, প্রভাত কেবল রাত্রির অবসানে নয়। যখনই চিত্ত জাগে তখনই প্রভাত হয়। কিন্তু প্রভাত কি আদৌ হয়েছে? এতকিছুর পরেও তো রিপাবলিক বাংলা চ্যানেলের শোতে বাম প্রতিনিধিরা হাজির হচ্ছেন। যাদবপুর কাণ্ডে রিপাবলিক বাংলার কার্যকলাপে আরও পরিষ্কার হয়ে গেছে যে তারা সাংবাদিকতা করে না। ক্যাম্পাসে ঢুকে তাদের প্রতিবেদকদের উদ্দাম অসভ্যতার (ভিডিও প্রমাণ বর্তমান) ফলে ছাত্রছাত্রীরা তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছে যাদবপুর থানায়। ছাত্রছাত্রীদের কাছে ‘দালাল’ আখ্যা পাওয়া প্রতিবেদকরা ক্যামেরার সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে সগর্বে দাবি করেছেন তাঁরা দালালই। দেশের মানুষের দালাল। অপছন্দের সাংবাদিকদের কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যরা দালাল আখ্যা দিচ্ছেন – এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সত্যিকারের সংবাদমাধ্যম সে আখ্যাকে পাত্তা দেয় না, ‘আমরা অমুক আমরা তমুক’ বলে বড়াইও করে না। কারণ সাংবাদিকতার প্রাথমিক পাঠের মধ্যে যেটা পড়ে, সেটা হল – সাংবাদিক নিজে সংবাদ নয়। দেখা যাচ্ছে সেই প্রাথমিক পাঠটাই রিপাবলিক বাংলা মানে না। এরপরেও এদের সংবাদমাধ্যম হিসাবে গণ্য করার কোনো মানে নেই।
পশ্চিমবঙ্গের ফ্যাসিবিরোধী রাজনৈতিক দল, অরাজনৈতিক সংগঠন এবং ব্যক্তিরা প্রায় সবাই ‘গোয়েবেলস’ আর ‘রেডিও রোয়ান্ডা’ কথা দুটো ব্যবহার করে থাকেন। প্রথমটা অ্যাডলফ হিটলারের ঘনিষ্ঠ, নাজি প্রোপাগান্ডার দায়িত্বে থাকা কুখ্যাত ব্যক্তিটির নাম। দ্বিতীয়টা গত শতকের নয়ের দশকে আফ্রিকার রোয়ান্ডার গৃহযুদ্ধে হুটু হত্যার মিথ্যা খবর প্রচার করে, লোক খেপিয়ে টুটসিদের গণহত্যার পথ প্রস্তুত করা রেডিও স্টেশনের নাম। আমাদের ফ্যাসিবিরোধীরা সঠিকভাবেই বলে থাকেন যে এদেশের গোদি মিডিয়া গোয়েবেলসের কায়দায় মিথ্যা প্রচার করে এবং রেডিও রোয়ান্ডার কায়দায় পরজাতিবিদ্বেষ ছড়িয়ে গণহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে দেশের মুসলমানদের। কিন্তু মুশকিল হল, সে কাজে তাঁরা যে মদত দিয়ে ফেলছেন – এটা মানতে রাজি নন। আগে না হলেও, সম্প্রতি বাম দলগুলোর অনেক কর্মী, সমর্থক বলতে শুরু করেছেন যে রিপাবলিক বাংলায় পার্টি প্রতিনিধিদের আর না যাওয়াই উচিত। তাতে প্রতিযুক্তি দেওয়া হয় ‘ওই প্ল্যাটফর্মটা ব্যবহার করা দরকার। ছেড়ে দেওয়া উচিত না’। এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করনেওয়ালারা বোধহয় সেইসময় রোয়ান্ডায় থাকলে রেডিও রোয়ান্ডাতেও যেতেন – প্ল্যাটফর্মটা ব্যবহার করতে।
করে কী লাভ হচ্ছে? কোনো পরিমাপযোগ্য লাভ কোনো বাম দলের নেতা বা মুখপাত্র দেখাতে পারবেন না। কী ক্ষতি হচ্ছে তা বরং পরিষ্কার। বহু বাম সমর্থকের বাড়িতে গেলে দেখতে পাওয়া যায়, দিনরাত রিপাবলিক বাংলা এবং রিপাবলিক টিভি চলে। কেন চলে? কারণ বাম নেতারা ওই চ্যানেলগুলোতে যান বলে সমর্থকরা মনে করেন ওরা নিশ্চয়ই ঠিক জিনিস দেখায়, ঠিক কথা বলে। অর্থাৎ তাঁদের মনোজগতে রিপাবলিক নেটওয়ার্ক বৈধতা পেয়ে গেছে। এতে রিপাবলিকের সুবিধা হল, সারাদিন চেতনে ও অবচেতনে তাদের ঘৃণাভাষণ ও ভুয়ো খবর বাম সমর্থক পরিবারগুলোকে গেলাতে পারছে। ফলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসবাদী তৈরি হয় বললেও তারা বিশ্বাস করবে, শিগগির পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানরা সংখ্যায় হিন্দুদের ছাড়িয়ে যাবে আর হিন্দুদের ফের দেশভাগের সময়কার মত জান মাল নিয়ে উদ্বাস্তু হতে হবে বললেও তারা বিশ্বাস করবে। সিপিএমের মিছিল, মিটিংয়ে লোক হয় অথচ ভোট কেন পড়ে না – এই প্রশ্নের এও এক উত্তর। বাম নেতারা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে মনে করেন, তাঁরা রিপাবলিকের প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করছেন। আসলে রিপাবলিক তাঁদের ব্যবহার করছে। তার প্রমাণ নির্বাচনের পর নির্বাচনে বামেদের ভোট রামে চলে যাওয়া।
এই সহজ কথাটা স্বীকার করতে বাম নেতাদের ভীষণ অসুবিধা। তাঁদের জঙ্গি অনলাইন সমর্থকরাও এসব বললে বলেন – এটা মিডিয়ার যুগ। মিডিয়াকে ব্যবহার করতেই হবে। এখানে বলার কথা দুটো। প্রথমত, উট আর উটপাখি যেমন এক নয়, বক আর বকফুল যেমন এক নয়, রিপাবলিকও তেমন মিডিয়া নয়। দ্বিতীয়ত, মিডিয়া সম্পর্কে নিজেদের অগ্রজদের সাবধানবাণীই আজকের বাম নেতা কর্মীরা বিস্মৃত হয়েছেন। একাধিক লোকের স্মৃতিচারণে পাওয়া যায় যে জ্যোতি বসু আর প্রমোদ দাশগুপ্ত দুজনেই কমরেডদের বলতেন ‘আনন্দবাজার আমাদের কোনো কাজের প্রশংসা করলেই সাবধান হবেন। আরেকবার ভেবে দেখবেন কাজটা ঠিক হচ্ছে কিনা।’ তাও তো ওঁদের সময়ে কোনো সংবাদমাধ্যম রিপাবলিকের স্তরে নামেনি। তবু একথা তাঁরা কেন বলতেন? কারণটা খুব স্পষ্ট। মিডিয়া হাউস মানেই হল বৃহৎ পুঁজি। তার স্বার্থ সবসময় বামপন্থী দলগুলোর স্বার্থের পরিপন্থী, তারা যে শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করতে চায় – তার পরিপন্থী। সুতরাং তাদের প্ল্যাটফর্মে তারা বামপন্থীদের ততটুকুই প্রচার দেবে যতটুকুতে তাদের স্বার্থ বিঘ্নিত না হয়। অতএব তাদের নিন্দাই প্রত্যাশিত, প্রশংসা সন্দেহজনক।
একথা বললে সিপিএমের এখনকার লোকেরা বলেন ‘এখন যুগ বদলে গেছে। ওসব ওঁদের যুগে চলত, এখন চলে না।’ কথা হচ্ছে, যুগ তো সর্বদাই বদলায়। কিন্তু জ্যোতিবাবুদের সময় থেকে আজ পর্যন্ত মিডিয়ার কী ধরনের বদল হয়েছে? বৃহৎ পুঁজির বদলে এখনকার মিডিয়া কি ছোট পুঁজির হাতে চলে গেছে? ফলে তাদের স্বার্থের সঙ্গে বামপন্থীদের স্বার্থের সংঘাত আগের চেয়ে কমে গেছে? মোটেই তা নয়। বরং এখন মূলধারার মিডিয়া আরও বড় পুঁজির অধীন হয়েছে। দেশের অধিকাংশ মিডিয়া হাউস নামে, বেনামে হয় মুকেশ আম্বানি নয় গৌতম আদানির হাতে চলে গেছে। অর্ণব যখন রিপাবলিক টিভি চালু করেন, তখন তাঁকে পুঁজি জুগিয়েছিলেন আবার এক বিজেপি সাংসদ অস্ত্র ব্যবসায়ী – এ তথ্যও সবার জানা। সেই নেটওয়ার্কের চ্যানেলে না গেলে চলবে না বা গেলে বামপন্থীদের লাভ হবে – এহেন চিন্তার ব্যাখ্যা কী?
সন্তোষজনক ব্যাখ্যা যে নেই তা ১ মার্চের পর থেকে এ রাজ্যের বাম নেতা কর্মীরা বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন। তাই ময়ূখের উপর অভিমান করতে শুরু করেছেন। কলেজজীবনে ময়ূখ ভারতের ছাত্র ফেডারেশন করতেন বলে শোনা যায়। সাংবাদিকতার পেশায় যাওয়ার পরেও সেই গন্ধ তাঁর গায়ে বেশ কিছুদিন লেগেছিল। সেই সময়কার সোশাল মিডিয়া পোস্ট দেখেই বিশেষত সিপিএম সমর্থকরা তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন। এখন সেইসব পোস্ট শেয়ার করে বাক্যবাণ নিক্ষেপ করা হচ্ছে – তাহলে কি তখন ময়ূখ নিজেই দেশদ্রোহী ছিল, ইত্যাদি। সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্যের একখানা ভিডিও দেখলাম। সেটা ১৩ মার্চ যাদবপুর ক্যাম্পাসে রিপাবলিকের বীরপুঙ্গবদের চরম অসভ্যতার আগে শুট করা। সেখানে সৃজন ময়ূখের বক্তব্যের সমস্ত গোলমাল সুন্দর তুলে ধরলেন, কিন্তু তারপর বললেন ‘ও ছোটবেলায় এরকম ছিল না’। মুশকিল হল, ছোটবেলায় তো হিটলারও নাজি ছিল না। তাতে কী এসে যায়? সমস্যাটা তো আসলে ব্যক্তি ময়ূখ বা ব্যক্তি মৌপিয়া নন। কোন সাংবাদিক কীভাবে কাজ করবেন, কোন বিষয়ে কোন পক্ষ নেবেন তা ঠিক হয় তাঁর কোম্পানির (পড়ুন মালিকের) স্বার্থ অনুযায়ী। এটুকু বোঝার মত রাজনৈতিক পরিপক্কতা কি বঙ্গ সিপিএমের নেতাদের নেই?
আরেকটা জিনিস হয়ত সৃজনের মত তরুণ নেতাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, কারণ তাঁরা সে আমলে ছোট ছিলেন। কিন্তু প্রবীণ সেলিম বা সুজন চক্রবর্তীদের না জানার কথা নয়। তা হল বামফ্রন্ট আমলে কলেজে রাম, শ্যাম, যদু, মধু সবাই এসএফআই ছিল। অফিসে যেমন সবাই কো-অর্ডিনেশন কমিটি, স্কুলে এবিটিএ আর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়েবকুটা। ওতে কিছু প্রমাণ হয় না। অমন সর্বাঙ্গীণ আনুগত্য তৈরি করার বিপদই হল – সরকার বদলালেই লোকগুলো বদলে যায়। যেভাবে পাড়ায় পাড়ায় অটো স্ট্যান্ডের লাল পতাকাগুলো ঘাসফুলে বদলে গিয়েছিল ২০১১ সালে। মানুষের আসল রং বোঝা যায় দিন বদলালে। ময়ূখের রং এখন দেখা যাচ্ছে।
একটা সংবাদমাধ্যমে যতজন সাংবাদিক কাজ করেন তাঁরা সকলে নীতি নির্ধারক নন। অন্য যে কোনো পেশার মত সেখানেও অধিকাংশই স্রেফ হুকুম তামিল করেন। ফলে সংবাদমাধ্যমের কুকর্মের জন্য সাংবাদিককে সবসময় দায়ী করা যায় না। কিন্তু ময়ূখ, মৌপিয়া, সুমনরা যে স্তরে পৌঁছে গেছেন তাতে আর তাঁদের পদাতিক সৈনিক বলে ছাড় দেওয়া যায় না। ওই স্তরের সাংবাদিকরা সরাসরি নির্দেশ নেন মালিকের থেকে, অনেকসময় কোম্পানিতে তাঁদের শেয়ারও থাকে। মালিকরা জেনে বুঝেই এমন লোককে ওই জায়গায় তোলেন যে বিনা বাক্যব্যয়ে এমন কাজ করতে পারবে যা বিন্দুমাত্র বিবেক থাকলে পারা যায় না। ফলে ময়ূখ-মেদুরতা এবং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার ভাবনা ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় মেরুকরণে নেমে পড়া মিডিয়াকে বয়কট করার সময় এসে গেছে। বিভিন্ন দলের নেতারা ওসব চ্যানেলে গিয়ে বৈধতা না দিলেই সমর্থকদের চোখেও ওদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে। তার প্রতিফলন ভোটবাক্সে পড়বে কিনা জানি না, ক্রমশ বারুদের স্তূপ হয়ে ওঠা সমাজে অবশ্যই পড়বে। রবীশ কুমার এমনি এমনি বলেন না – টিভিতে খবর দেখা বন্ধ করুন।
পুনশ্চ: রিপাবলিক টিভি আর কলকাতার টিভির দুই তারকার চেয়ে ভদ্র আচরণ করেন। তাহলেও এবিপি আনন্দের সুমনের কথাবার্তা কোন দিকে গড়ায় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা দরকার আমাদের সকলের। মনে রাখা ভাল, তিনি পুঁচকে দল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের আব্বাস সিদ্দিকীকে বলতে পারেন ‘আব্বাস, আপনি বিজেপির ভোট কাটুয়া।’ কিন্তু অমিত শাহের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়ে জিজ্ঞেস করে উঠতে পারেন না – তৃণমূল থেকে বিজেপিতে আর বিজেপি থেকে তৃণমূলে অবাধ যাতায়াত চলে কী করে? উপরন্তু, বাংলাদেশের বিদ্রোহকে হাতিয়ার করে সাম্প্রদায়িক হাওয়া তোলার চেষ্টা সুমনের শো থেকেও কম হয়নি। আর সাম্প্রতিক যাদবপুর কাণ্ডে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন প্রমাণ করতে যে ইন্দ্রানুজ রায়ের উপর দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি চলে যাওয়ার ছবিটা ভুয়ো। প্রমাণ হিসাবে কী যুক্তি দিচ্ছিলেন? না ছবিটা গণশক্তি ছাড়া কোথাও বেরোয়নি। এই যুক্তিতে দুনিয়ার সব সংবাদমাধ্যমের সব এক্সক্লুসিভই ভুয়ো। কারণ সেই খবর অন্য কোথাও বেরোয় না।
ভাবতে অবাক লাগে, জরুরি অবস্থার সময়ে পশ্চিমবাংলার একাধিক সম্পাদককে জেল খাটতে হয়েছিল সরকারের সামনে মাথা নোয়াননি বলে। সেই গৌরকিশোর ঘোষ, বরুণ সেনগুপ্তরা জীবিত নেই। কিন্তু তাঁদের শিষ্যরা অনেকে আছেন। সেই শিষ্যদের আজও অনেক সাংবাদিক আদর্শ বলে মনে করেন, বহু পাঠক/দর্শক তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেন। সেই অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়, জয়ন্ত ঘোষাল, অশোক দাশগুপ্তরা এখনো হয় কাগজে নয় সোশাল মিডিয়ায় যথেষ্ট সক্রিয়। এই ‘গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান’-রা কেউ কি সোচ্চারে বলেছেন, বাংলার টিভি চ্যানেলগুলো যা করছে তা সাংবাদিকতা নয়? কারোর জানা থাকলে খবর দেবেন।
ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন?
নহবত বসেছিল, গায়ে গোলাপ জল ছেটানোর জন্যে লোক তৈরি ছিল, হেঁশেলের দিক থেকে ভেসে আসছিল বেগুনির সুগন্ধ, বরকে অভ্যর্থনা করার জন্যে কনে কর্তা জমাটি পোশাক পরে তৈরি, কিন্তু শেষপর্যন্ত বর এসে পৌঁছল না। ফলে সব আয়োজন ভেস্তে গেল। কনে কর্তা ব্যাজার মুখ করে অতিথিদের কোনোমতে নমস্কার করে খাইয়ে দাইয়ে বাড়ি পাঠিয়ে কর্তব্য সমাধা করলেন।
এই ছিল ২০২৩ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের অবস্থা। ভারত জিতে গেলে গোটা দলকে নিয়ে কী বিপুল নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালাত বিজেপি, সে পরিকল্পনা কোথাও কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল। কংগ্রেস মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনেত দাবি করেছিলেন, রাজস্থানের এক বিজেপি নেতা তাঁকে বলেছিলেন যে বিজেপির সমস্ত হোর্ডিংয়ে বিশ্বকাপ হাতে মোদীর ছবি দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি ছিল। কিন্তু সে গুড়ে বালি ছড়িয়ে দিয়েছিল প্যাট কামিন্সের বাহিনি। ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি অবশ্য রোহিত শর্মারা জিতেছিলেন, কিন্তু ততদিনে লোকসভা নির্বাচন মিটে গেছে। ক্রমশ বিরাট হয়ে ওঠা নরেন্দ্র মোদীকে কেটে ছেঁটে দেশের অন্য নেতাদের মাপে এনে দিয়েছেন ভোটাররা। তখন আর হইচই করে কী লাভ?
সেই শোক বুঝি এতদিনে দূর হল। বিশ্বকাপ ফাইনালের পরে মোদীর পিছনে যেরকম বেচারা ভঙ্গিতে হাঁটছিলেন তৎকালীন বিসিসিআই যুগ্ম সচিব জয় শাহ, তাতে মনে হচ্ছিল বাবার বন্ধু নরেনজেঠু প্রচণ্ড ধমকেছেন ‘একটা কাজ যদি তোকে দিয়ে হয়!’ কিন্তু তাঁর নামও জয় শাহ। তিনি পরাজয় মেনে নিয়ে চুপ করে বসে থাকার লোক নন। ইতিমধ্যে আইসিসির শীর্ষপদ দখল করে জেঠুকে এবার তিনি যে উপহার দিলেন তা একেবারে নিখুঁত।
নিজে মাঠে নেমে তো খেলতে পারেন না, কিন্তু রোহিতদের সর্বোচ্চ সুযোগসুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ১৯৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ইতালিকে জেতানোর জন্যে বেনিতো মুসোলিনি কী করেছিলেন বা ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনাকে জেতাতে সে দেশের জুন্টা সরকার কত কলকাঠি নেড়েছিল তা আজ খুব গোপন তথ্য নয়। কিন্তু সেই দুই বিশ্বকাপেও ইতালি আর আর্জেন্টিনা সে আরাম পায়নি যা এবারে রোহিতরা পেলেন।
আইসিসি চেয়ারম্যান হিসেবে ভারতের জয়ে মাঠে তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশও অত্যন্ত দৃষ্টিকটু, হাসির খোরাক। ডালমিয়া, শ্রীনিবাসন, শশাঙ্ক মনোহররা অতীতে এই পদে থেকেছেন, এমন বালখিল্যসুলভ আচরণ করেননি কোনওদিন। আরও অবাক কাণ্ড, ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন? শোয়েব আখতারের ক্ষোভ প্রকাশ স্বাভাবিক। বৈষম্য তো আরও আছে!
প্রতিযোগিতার অন্য সব দল খেলল পাকিস্তানের একাধিক মাঠে ঘুরে ঘুরে, ভারতীয় দল একেবারে অন্য দেশের একটা শহরেই পায়ের উপর পা তুলে বসে রইল। অন্য দলগুলোকে পাকিস্তান থেকে উড়ে আসতে হল, আবার ফিরে যেতে হল। এই কাণ্ড করতে গিয়ে সবচেয়ে বিরক্তিকর অবস্থা হল দক্ষিণ আফ্রিকার। ভারত কোন সেমিফাইনালে উঠবে তা জানা না থাকায় অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তাদেরও দুবাই যেতে হল সেমিফাইনালের আগে। তারপর যখন বোঝা গেল ভারতের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ারই সেমিফাইনাল হবে, তখন ফেরত আসতে হল পাকিস্তানে। বিশ্রাম নেওয়ার বিশেষ সময় না পেয়েই নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল। সেই সেমিফাইনালে হারলেও, ৬৭ বলে অপরাজিত ১০০ রান করা ডেভিড মিলার বিরক্তি প্রকাশ করেই ফেললেন।
ভারত অন্যায় সুবিধা পেয়েছে – একথা বলার সাহস ক্রিকেট দুনিয়ায় কারোর হয় না। যেমন বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধমকানোর সাহস এই সেদিন পর্যন্ত কারোর হত না। কারণটা একই – সোজা কথায় টাকার গরম। আমরা আইসিসিকে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা দিই, অতএব আইসিসির আয়ের বেশিরভাগটা আমরাই নেব – এই গা জোয়ারি যুক্তিতে ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড দীর্ঘদিন হল বাকি ক্রিকেট দুনিয়াকে শুকিয়ে মারছে।
এরা যেটুকু উচ্ছিষ্ট ছুড়ে দেয় বাকিদের প্রতি, তা নিয়েই তাদের চলতে হয়। তাই কোনো বোর্ড মুখ খোলে না। বোর্ডের বারণ আছে বলে ক্রিকেটাররাও কিছু বলেন না। কিন্তু পাকিস্তানে চলল চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর ভারত খেলল দুবাই ট্রফি – এটা বোধহয় সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই বোর্ডগুলো কিছু না বললেও অনেক বিদেশি সাংবাদিক ও প্রাক্তন ক্রিকেটার এবার এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফেলেছেন, মিলারও মুখ খুলেছেন। সুবোধ বালক ভারতীয় মিডিয়া আর ধারাভাষ্যকাররা অবশ্য মানছেন না। তাঁরা দিল্লির প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক, অধুনা ভারতীয় দলের কোচ গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে একমত। কিন্তু মহম্মদ শামি সোজা সরল লোক, তিনি মেনে নিয়েছেন যে সব ম্যাচ একই মাঠে খেলায় ভারত বিশেষ সুবিধা পেয়েছে।
বস্তুত, ক্রিকেটের অ আ ক খ জানলে এবং অন্ধ ভক্ত না হলে যে কেউ মানবেন যে সব ম্যাচ এক মাঠে খেললে সুবিধা হয়। কারণ ক্রিকেট অন্য যে কোনো খেলার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করে আবহাওয়া এবং পিচের উপরে। চার স্পিনার খেলানোর জন্যে বিস্তর হাততালি কুড়োচ্ছেন গম্ভীর, রোহিত আর প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর। এই সিদ্ধান্ত তাঁরা নিতে পেরেছেন কারণ জানতেন, একই মাঠে ভারত সব ম্যাচ খেলবে আর সে মাঠের পিচ হবে স্পিন সহায়ক। অন্য সব দলকে কিন্তু একাধিক মাঠের পিচের কথা ভেবে দল গড়তে হয়েছিল।
একথা বললেই যা বলা হচ্ছে, তা হল – আর কী উপায় ছিল? ভারত তো পাকিস্তানে খেলতে যেতে পারত না। কারণটা রাজনৈতিক, অর্থাৎ ভারত সরকারের বারণ। কথাটা ঠিক। কিন্তু সেক্ষেত্রে ভারতের গ্রুপের সবকটা খেলাই সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে করা যেতে পারত, দুবাই আর শারজা মিলিয়ে। তাহলে অন্তত গ্রুপের অন্য দলগুলোও একই ধরনের পিচে একাধিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেত।
পাকিস্তানে খেলতে না যাওয়ার রাজনৈতিক কারণটাকেও প্রশ্ন করা দরকার। ২০০৮ সালের সন্ত্রাসবাদী হানার কথা তুলে আর কত যুগ দুই দেশের ক্রিকেটিয় সম্পর্ক অস্বাভাবিক করে রাখা হবে? মোদীর আচমকা নওয়াজ শরীফের নাতনির বিয়েতে খেতে যাওয়া, পাঠানকোটের সন্ত্রাসবাদী হানার তদন্ত করতে পাক গোয়েন্দা বিভাগকে ভারতের সেনা ছাউনিতে ঢুকতে দেওয়া – এসব তো ২০০৮ সালের অনেক পরে ঘটেছে। এমনকি গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে ডেভিস কাপে ভারতের টেনিস দল ইসলামাবাদে গিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে এসেছে। কেবল ক্রিকেট দল পাকিস্তানে গেলেই মহাভারত অশুদ্ধ হবে?
আজ্ঞে না, পুলওয়ামা ভুলিনি। সে ঘটনা যারা ঘটিয়েছিল তাদের শাস্তি হয়েছে? কোনো জোরদার তদন্ত হয়েছে? দাভিন্দর সিং বলে এক ভারতীয় পুলিস অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনিও জামিন পেয়ে গেছেন ২০২০ সালে। তাহলে ক্রিকেট দলের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জাতীয়তাবাদের নাটক করা কেন? আর সত্যিই যদি পাকিস্তান অচ্ছুত হয়, তাহলে প্রত্যেক আইসিসি প্রতিযোগিতায় ভারত আর পাকিস্তানকে এক গ্রুপে রাখাই বা কেন?
ধরা যাক, রাখা হয় না। ওটা এমনিই হয়ে যায়। তাহলেই বা ভারতীয় দল ম্যাচটা খেলে কেন? বোর্ড তো বলতে পারে – পাকিস্তানের সঙ্গে আমরা খেলব না, ওই ম্যাচের পয়েন্ট পাকিস্তানকে দিয়ে দেওয়া হোক। কেন বলে না? টিভি সম্প্রচার থেকে যে বিপুল টাকা আয় হয় তার নেশা তাহলে জাতীয়তাবাদের চেয়েও বেশি তো?
উত্তরগুলো অস্বস্তিকর। ফলে যিনি ভিন্নমত হবেন, তিনি সহজ রাস্তাটা নেবেন। বলবেন – এসব বলে ভারতের জয়কে ছোট করবেন না। ওরা পাকিস্তানে খেললেও জিতত। দুবাইতেও জিততে তো হয়েছে। আজ্ঞে হ্যাঁ, সেকথা ঠিক। তবে কথা হচ্ছে, আমাদের দেশের নির্বাচনগুলোতে যেসব দল রিগিং করে, অনেক ক্ষেত্রে রিগিং না করলেও তারাই জিতত। তাহলে কি ‘আহা! কী সুন্দর রিগিং করে!’ বলে হাততালি দিতে হবে?
গণতন্ত্র-ফন্ত্র কে চায়? বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্র তো বাবা-মায়েরা মোটেই চান না। ছেলেমেয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে লেখাপড়া করতে। ওটা রাজনীতি করার জায়গা নাকি?
ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকাররা প্রায়ই বলেন – ক্রিকেট হল মিলিমিটারের খেলা। মানে কয়েক মিলিমিটার এদিক-ওদিক হলে নট আউটটা আউট হয়ে যেতে পারে, ছয়টা চার হয়ে যেতে পারে, ফলে জয়টা পরাজয়ে বদলে যেতে পারে। ব্রাত্য বসু আর তাঁর গাড়ির চালক বোধহয় ক্রিকেট দেখেন না। পশ্চিমবঙ্গের লেখাপড়া, নাটক, সিনেমা – এত কিছু সামলে কি আর সময় পাওয়া যায়? নইলে ইন্দ্রানুজ রায়ের গায়ে উঠে পড়ার কয়েক মিলিমিটার আগেই গাড়ির ব্রেক কষে ফেলতেন। তাহলেই কোনো সমস্যা থাকত না। কোনো চ্যানেল তাদের সাংবাদিককে পাঠিয়ে দিত ক্যাম্পাসে পড়ে থাকা মদের বোতল আর কন্ডোম গুনতে, কোনো চ্যানেল অতীতে ছড়িয়ে লাট করা কোনো প্রাক্তন উপাচার্যকে ডেকে এনে বোঝাত যাদবপুরে কোনো ‘ডিসিপ্লিন’ নেই এবং ‘ডিসিপ্লিন’ প্রতিষ্ঠা করতে গেলে কী করতে হবে। কোনো তথাকথিত স্বাধীন সাংবাদিক নিশ্চিন্তে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে বলে দিতে পারতেন ব্যাপারটা স্রেফ শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য তৈরি করার জন্যে সিপিএমের চক্রান্ত, কে কে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোকে পৃথিবীর কোথা থেকে কত টাকা চাঁদা দিয়েছে তার এক্সেল শীট বানিয়ে ‘বিগ এক্সপোজে’ বলে প্রকাশ করতে পারতেন। আর জি কর আন্দোলনে যেসব বামপন্থীরা কর্পোরেট হাসপাতালের চক্রান্ত, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প বানচাল করার ষড়যন্ত্র, বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা দেখতে পাচ্ছিলেন তাঁরাও নিশ্চিন্তে শিক্ষার বেসরকারিকরণের চক্রান্ত, কন্যাশ্রী প্রকল্প বানচাল করার ষড়যন্ত্র, ২০২৬ সালে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় লম্ফঝম্প করতে পারতেন। নিজেদের ছাত্রজীবনে মুখে চোখে বিপ্লবের স্বপ্ন মেখে যথেষ্ট অশান্ত ছাত্র আন্দোলন করে, এখন পুলিসের সত্যবাদিতায় এবং শিক্ষামন্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষায় দারুণ বিশ্বাসী হয়ে যাওয়া অনাবাসী ফেসবুক ইনফ্লুয়েন্সার সদগুরুরাও দীর্ঘ পোস্ট লিখতে পারতেন – যাদবপুরের চ্যাংড়ারা ছাত্র সংসদের নির্বাচন ইত্যাদি দাবি করে ক্যাম্পাসে যে ফ্যাসিবাদ প্রবেশের রাস্তা খুলে দিচ্ছে – এই মর্মে। এমনকি সাংস্কৃতিক কর্মী ব্রাত্যবাবুর নাটক, সিনেমার বন্ধুরাও টিভি ক্যামেরাকে বড় মুখ করে বলতে পারতেন ‘কোনো রাজনীতির মধ্যে না গিয়ে বলছি – একজন শিক্ষিত, রুচিবান মানুষ, যিনি আবার মাস্টারমশাইও, তাঁর উপরে এই আক্রমণ নিন্দাযোগ্য।’ এই জাতীয় কিছু। সব বানচাল করে দিল ওই মিলিমিটার।
একটা জলজ্যান্ত ছেলের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই দৃশ্য ভাইরাল হয়ে গেছে, অস্বীকার করা যাবে না। ফলে অরূপ বিশ্বাস বা দেবাংশু ভট্টাচার্যের মত সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেস করেন না যাঁরা, তাঁদের এখন ঢোঁক গিলে মানবিকতা দেখাতেই হচ্ছে। নইলে ভবিষ্যতে নিরপেক্ষতা (সংবাদমাধ্যমের), ফ্যাসিবাদবিরোধিতা (বামপন্থী ও উদারপন্থীদের) ইত্যাদি ভাল ভাল জিনিস করি বলে দাবি করা যাবে না। না, মানে করতে কে আর আটকাত? কিন্তু নিজেদেরই একটু বিবেকে লাগত বোধহয়। তাই ওঁদের এই মহানুভবতা। বোধহয় অনেকের মহানুভবতার কারণ এটাও যে ইন্দ্রানুজ রাজ্যের কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্য নয়। সেটা হলে সংবাদমাধ্যম তো বটেই, বিকল্প বামেরাও অনেকে শিক্ষামন্ত্রীকে ঘিরে ধরা, তাঁর গাড়ির কাচ ভাঙা ইত্যাদির নিন্দা করতেন এবং একে ওই বিরোধী রাজনৈতিক দলটার ক্ষমতা দখলের ঘৃণ্য চেষ্টা বলে সাংবাদিক সম্মেলন করতেন। যেমনটা আর জি কর আন্দোলনের শেষ পর্বে আমরা দেখেছি।
দেখুন, সত্যি কথা সোজা করে বলাই ভাল। গণতন্ত্র-ফন্ত্র কে চায়? বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্র তো বাবা-মায়েরা মোটেই চান না। ছেলেমেয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে লেখাপড়া করতে। ওটা রাজনীতি করার জায়গা নাকি? বাবা-মায়েরা বিলক্ষণ জানেন যে যাদবপুরে লেখাপড়া হয় না। ওখানে কেবল ছেলেরা গাঁজা খায়, মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে বসে হাফপ্যান্ট পরে সিগারেট খায়। কিন্তু সেসবও মেনে নেওয়া যেত যুগের ধর্ম হিসাবে। এসবের থেকেও বড় অপরাধ যেটা করে যাদবপুরের ছেলেমেয়েরা, সেটা হল রাজনীতি করে। তাও আবার মূলত বামপন্থী রাজনীতি। এই রাজনীতির ছোঁয়াচ বাঁচাতে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম বাবা-মায়েরা পাঁচতারা হোটেলের মত যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে ছেলেমেয়েদের সেখানে পাঠাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সির মত দু-একটা জায়গা বাদে পশ্চিমবঙ্গের কোনো কলেজে যে ২০১৭ সাল থেকে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয় না তাতে বাবা-মায়েরা তো বটেই, অনেক ছাত্রছাত্রীও খুশি। ভোট দেব পঞ্চায়েত, পৌরসভা, বিধানসভা, লোকসভার জন্যে। পড়াশোনার জায়গায় আবার ভোট কিসের? এইসব করতে গিয়েই তো বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গে লেখাপড়া হত না, তাই না? এদিকে ২০১১ সাল থেকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমশ ছাত্র রাজনীতি তুলে দিয়ে কীরকম দুর্দান্ত পড়াশোনা হচ্ছে তা সমস্ত ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবক জানেন। আরও নিদারুণভাবে জানেন মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা। বছরের পর বছর নির্বাচন না হওয়া মানে যে একনায়কতন্ত্র – সেকথা তাঁরা দেশের রাজনীতি সম্পর্কে মানতে রাজি। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে হিংসা, রিগিং ইত্যাদি নিয়েও অসন্তুষ্ট হন। কিন্তু কলেজ ক্যাম্পাসে তাঁরা রাজনীতি চান না, ভোট-ফোট চান না। কেন? জিজ্ঞেস করলেই উত্তর পাওয়া যাবে ‘ওতে লেখাপড়ার ক্ষতি হয়। অশান্তি হয়।’ প্রথম যুক্তিটা সত্যি হলে যাদবপুর বছরের পর বছর ইউজিসি, ন্যাক, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে কী করে দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে থাকে, সে প্রশ্নের উত্তর কিন্তু কারোর কাছে নেই। দ্বিতীয় যুক্তিটা ঠিক হলে অন্য শান্তিপূর্ণ কলেজগুলোতে ছাত্রসংখ্যা কমছে কেন, যাদের নাম খাতায় আছে তারাও ক্লাস করতে আসে না কেন, এসব প্রশ্নও কেউ নিজেকে করে না। ছাত্র রাজনীতির প্রায় পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হওয়া পশ্চিমবঙ্গে যাদবপুরের মত জায়গাতেও খাতা না দেখেই নম্বর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২০ জনের খাতা হারিয়ে যাচ্ছে কেন?
দীর্ঘ চেষ্টায় গোটা রাজ্যের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে ছাত্রছাত্রীরা রাজনীতি করলে লেখাপড়া হয় না আর শ্রমিকরা রাজনীতি করলে শিল্প হয় না। ২০১১ সালের পর থেকে সরকারি প্রচেষ্টায় দুটোই প্রায় তুলে দেওয়া হয়েছে সফলভাবে। অথচ না লেখাপড়া হচ্ছে, না শিল্প হচ্ছে। এসব বললে উত্তর আসবে, অত সালে অমুক কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনে হিংসায় অমুকের প্রাণ গিয়েছিল, তমুকের চোখ নষ্ট হয়েছিল। তমুক কলেজে এসএফআই বাম আমলে তোলাবাজি করেছিল, তৃণমূল নতুন কিছু করছে না। ঠিক কথা। একথাও ঠিক যে বহু কারখানায় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা (শ্রমিক ইউনিয়ন কেবল সিপিএম বা অন্য বামপন্থী দলের নেই; কংগ্রেস, তৃণমূল, এমনকি আরএসএসেরও আছে। এটা আবার এ যুগের সবজান্তারা জানেন না) মালিকপক্ষের সঙ্গে তলে তলে আপোস করে শ্রমিকদের বারোটা বাজিয়েছেন। কিন্তু তার জন্যে ইউনিয়ন, রাজনীতি, গণতন্ত্র সব তুলে দেওয়া উচিত – এই প্রত্যয় তৈরি হলে মাথায় ব্যথা হওয়া মাত্রই ব্যথার ওষুধ না খেয়ে বা দীর্ঘকালীন মাথাব্যথার কারণ সন্ধানে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে পত্রপাঠ মাথাটা কেটে ফেলা উচিত। তাতে অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ স্কন্ধকাটাদের রাজ্যে পরিণত হবে। ইতিমধ্যেই দু-কান কাটাদের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। তাই চার্জশিটে যার নাম লেখা আছে সে বুক ফুলিয়ে সভায় বলতে পারে – ওটা কার নাম, নির্দিষ্ট করে বলুক। টিভি স্টুডিওর সান্ধ্য আলোচনায় গভীর জল্পনা কল্পনা চলে – নামটা কার।
এমন রাজ্যে সরকার যে নিতান্ত কোণঠাসা না হলে কোনো আন্দোলনকে গ্রাহ্য করবে না, কোনো দাবিকেই পাত্তা দেবে না তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। আর জি কর আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন জুনিয়র ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে কলেজগুলোতে ছাত্র সংসদের নির্বাচন করানোর দাবি করেছিলেন। সরকারপক্ষ থেকে অমনি প্রচার করা শুরু হয় ‘এই দেখুন, এরা আসলে ক্ষমতা চায়’। সেই প্রচার অনেকের পছন্দও হয়ে যায়। মানে গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন চাওয়া মহা অপরাধ। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় তারা ক্ষমতা চায় বলেই নির্বাচন চেয়েছিল, সেটাই বা অপরাধ হবে কেন? নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর তো গণতন্ত্রের লক্ষণ। গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করতে তো চায়নি। অথচ বহু বিপ্লবীও সেইসময় সরকারি দলের এই অন্যায় প্রচারের প্রতিবাদ করেননি। ব্রাত্যবাবুর গাড়ির বেপরোয়া মেজাজ তখনই তৈরি হয়েছে। এমনিতেই আমাদের দেশে গণতন্ত্র সংকুচিত হতে হতে এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে শাসক দলগুলোর যে কোনো অন্যায় নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তারা বলে দেয়, কাজটা করার পরেও তারাই জিতেছে। অতএব মানুষের তাদের উপর আস্থা আছে। সুতরাং ওটা অন্যায় নয়। তার উপর লেখাপড়া জানা নাগরিকরা যদি নিজেরাই নানা ভাষায় বলতে শুরু করেন যে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বা টিচার্স কাউন্সিল, সমবায় সংস্থা ইত্যাদি ছোট ছোট পরিসরেও নির্বাচন চাওয়াই অপরাধ – তাহলে তো সোনায় সোহাগা।
অর্থাৎ ছাত্রের উপর দিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার ঔদ্ধত্য শাসককে আমরাই উপহার দিয়েছি বললে বিশেষ ভুল হয় না। বিরোধী দলগুলো অবশ্যই দায়হীন নয়। বিধানসভার বিরোধী দল বিজেপির স্বর যে যাদবপুর বা ছাত্র রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলে তৃণমূলের সঙ্গে মিশে যায় তা অতীতেও দেখা গেছে, গতকাল থেকেও দেখা যাচ্ছে। এটা কাকতালীয় নয়। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত যেসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা আজও মূলত বামপন্থী সেইসব প্রতিষ্ঠানকে তৃণমূল কংগ্রেসের মত বিজেপিও শত্রুই মনে করে এবং সেগুলোর সাড়ে বারোটা বাজাতে চেষ্টার ত্রুটি রাখে না। মতপার্থক্য যা নিয়ে হয় সেটা হল যারা বাবুল সুপ্রিয়র মাথায় চাঁটি মেরেছে বা ব্রাত্যবাবুকে আঘাত করেছে তাদের কী বলা হবে তাই নিয়ে। নকশাল, নাকি আর্বান নকশাল, নাকি দেশদ্রোহী, নাকি পাকিস্তানি ইত্যাদি প্রভৃতি। অমন মতপার্থক্য তৃণমূলের নিজের ভিতরেও তো হয়। কাল থেকে যেমন কোনো তৃণমূল নেতা বলছেন এটা সিপিএমের বদমাইশি, কেউ বলছে অতিবামদের গুন্ডামি ইত্যাদি প্রভৃতি। বিধানসভা, লোকসভায় বারবার শূন্য পেলেও যাদের হাতে নাকি এই রাজ্যের প্রগতিশীলতার ঐতিহ্য রক্ষা করার দায়িত্ব, সেই সিপিএম বা বামফ্রন্টের দলগুলোর আবার অন্য সমস্যা। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তাদের ছাত্রনেতারা যতটা লড়াকু, বিশেষত অন্য বামেদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, ক্যাম্পাসের বাইরে পার্টির ততটা লড়াই দেখা যায় না। তার উপর ইদানীং আবার সিপিএম নেতারা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর সিস্টেম চালু করেছেন। ব্রিগেডের ডাক দেয় যুব সংগঠন বা খেতমজুরদের সংগঠন। যাদবপুরে ছাত্রের উপর দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি চলে গেছে বলে ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ছাত্র সংগঠন। স্কুলশিক্ষার অব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন করতে হলে সে আন্দোলন হয় শিক্ষক সংগঠনের ব্যানারে। পার্টির নাম, পার্টির পতাকা দেখা যায় কেবল সম্মেলনে আর সাংবাদিক সম্মেলনে। পার্টির ‘নতুন মুখ’, ‘তরুণ মুখ’ বলে খ্যাত নেতৃবৃন্দকে কলকাতায় বিভিন্ন ছায়াছবির প্রিমিয়ারে আর টিভি স্টুডিওতে রোজ দেখা যায়। কিন্তু মীনাক্ষী মুখার্জি বাদ দিলে কাউকে প্রত্যন্ত এলাকার আন্দোলনে নিয়মিত দেখা যায় না। ক্ষমতাসীন তৃণমূলে এত জটিলতা নেই। একটাই বুলডোজার, সব জায়গায় চালানো হয়।
পশ্চিমবঙ্গে এর বাইরেও তৃণমূলবিরোধী দল আছে। কয়েকটা কোণে কংগ্রেস আছে, যাদের কথা বলাই বাহুল্য। তাছাড়া কিছু বাম দল আছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যখন বামফ্রন্ট শূন্য হয়ে গেল, তখন এক ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখেছিলাম, তাঁদের অনেককালের অভিযোগ, সিপিএম বামপন্থার বদনাম করছে। একটিবার সুযোগ পেলেই তাঁরা দেখিয়ে দিতে পারেন আসল বামপন্থা কী, কিন্তু সিপিএম তাঁদের জায়গা ছাড়ে না। এবার সিপিএম শূন্য হয়ে গেল, সামনে ফ্যাসিবাদের বিপদ। এইবার তাঁরা সিপিএমের জায়গাটা নিন, দেখিয়ে দিন। কিন্তু ২০২৬ আসতে চলল, তাঁরা জায়গা ভরাট করতে পারলেন না। এখনো বলছেন যা ঘটছে সবই সিপিএমের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে সিপিএম যে ব্যর্থ তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু ওটুকু বলে ওঁরা সন্তুষ্ট নন। আবার সিপিএমের উপর অভিমান করাও চাই। ‘বিজেপিকে ফ্যাসিবাদী না বলে নয়া ফ্যাসিবাদী বললি কেন? এরম কল্লে খেলব না।’ আবার সিপিএমও বলে ‘তোরা মমতাকে লেসার ইভিল বলেছিলিস না? এখন কেন?’ মানে রবীন্দ্রনাথের কাছে কথাঞ্জলি পুটে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে ব্যাপারটাকে এরকমভাবে বলা যায় যে ‘বাম ভাবে আমি দেব/বিকল্প ভাবে আমি/নিউট্রাল ভাবে আমি দেব/হাসে ফ্যাসিনামী।’
পশ্চিমে গুজরাট থেকে শুরু হয়ে বিজেপির বিজয়রথ পূর্বে ওড়িশা পর্যন্ত এসে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে পারেনি বলে আমরা অনেকেই আহ্লাদিত। সেই ২০২১ সাল থেকেই ফ্যাসিবাদকে হারিয়ে দিয়ে বেশ একটা বিপ্লবী অনুভূতি হচ্ছে। এদিকে সেবার নির্বাচন পর্ব মিটতেই তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়া নেতারা গুটিগুটি ফিরে এসেছেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু নেত্রী মমতা ব্যানার্জি ফিরিয়েও নিয়েছেন। আসানসোল দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়া বাবুলবাবু তো তৃণমূলে এসে মন্ত্রীও হয়ে গেছেন। মুকুল রায় বিজেপিতে আছেন, না তৃণমূলে – সে আবার এক রহস্য। রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কও উন্নয়ন থেকে ধর্মে সরে গেছে। অযোধ্যার রামমন্দিরের পালটা দীঘায় জগন্নাথের মন্দির হয়েছে সরকারি টাকায়। দুর্গাপুজোয় সরকারি সাহায্য তো ছিলই, কাশীর অনুকরণে কলকাতায় গঙ্গার ঘাটে সন্ধ্যারতিও চালু হয়ে গেছে। কোথাও নির্বাচন হলে অশান্তি শুধু নয়, দেখা যাচ্ছে নির্বাচন চাইলেও অশান্তি হয়। দেশের সবচেয়ে বড় সিনেমা শিল্প বলিউডকে দখল করে ফেলেছে বিজেপি, একের পর এক হিন্দুত্ব প্রোপাগান্ডা ছবি চলছে। অথচ তৃণমূল সাংসদ, বিধায়কে ভর্তি টলিউডে কিন্তু তার পালটা প্রোপাগান্ডা ছবি হচ্ছে না। বরং প্রবল মুসলমানবিদ্বেষী বয়ানে ছবি হয়েছে, তাতে যাদবপুরের তৎকালীন তৃণমূল সাংসদ অভিনয় করেছেন। গোয়েন্দা ব্যোমকেশকে ত্রিশূলধারী শিব সাজানো ছবি হয়েছে ঘাটালের তৃণমূল সাংসদের প্রযোজনায়, শ্রেষ্ঠাংশেও তিনি। উপরন্তু ইতিমধ্যেই রুগ্ন শিল্প হয়ে যাওয়া আঞ্চলিক ভাষার এই ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা আরও কাহিল হচ্ছে তৃণমূল নেতাদের প্রতাপে। টেকনিশিয়ানদের গিল্ড আর নির্দেশকদের দ্বন্দ্বে গতবছর জুলাই মাসে একবার বেশ কয়েকদিন শুটিং বন্ধ ছিল। তারপর অক্টোবর মাসে ২৩৩ জন পরিচালক তৃণমূলের টলিপাড়ার নেতা স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। সম্ভবত তারই প্রতিক্রিয়ায় টেকনিশিয়ানদের গিল্ড কয়েকজন পরিচালকের ছবির কাজে বাগড়া দেয়। ফলে গতমাসে পরিচালকরা কর্মবিরতি পালন শুরু করেছিলেন, তবে তাঁদের একতার অভাবে ব্যাপারটা দাঁড়ায়নি। সমস্যা কিন্তু রয়েই গেছে।
এ রাজ্যে অনেকে তো মানেন ভারতে ফ্যাসিবাদ এসে গেছে এবং ফ্যাসিবাদী বলেই আরএসএসের বিরুদ্ধে লড়াইটা আসলে সাংস্কৃতিক লড়াই। তাঁদের অনেকেই আবার বলেন তৃণমূল ফ্যাসিবাদী নয়, কারণ খুব খারাপ শক্তি হলেও তাদের কোনো আদর্শ নেই। আদর্শ না থেকেই যদি ফ্যাসিবাদ যে যে লক্ষ্য পৌঁছতে চায় সেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় কোনো দল, তাহলেও কি সে ফ্যাসিবাদী হয় না?
কে জানে বাপু! বাঙালি তাত্ত্বিক জাতি। স্বৈরাচারী না ফ্যাসিবাদী; ফ্যাসিবাদী না নয়া ফ্যাসিবাদী? এসব তাত্ত্বিক লড়াই আমরা সারাদিন করে যেতে পারি। করছিও তাই। কাজের কাজ তো কিছু করছি না। অবশ্য করতে যাবই বা কেন? আমাদের তো অরাজনৈতিক, নিরপেক্ষ থাকতে হবে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাঙালির গর্বের প্রগতিশীল খবরের কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ-এর মত, যারা আজ যাদবপুরের খবরের শিরোনামে লিখেছে ‘Bratya, student hurt in JU clash’। ভাবুন! যার হাতে কাচ ঢুকেছে সে-ও ‘hurt’, যে গাড়ির তলায় পড়েছে, মারা যেতে পারত, সে-ও ‘hurt’। তুলনাহীন নিরপেক্ষতা।
সিনেমা হলে ঢুকে হিয়া টুপটাপ, জিয়া নস্ট্যাল হলেই হাততালি দিই। পরিচালক আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্ত মায়ানগর ছবিতে করেছেন ঠিক উল্টোটা। শেষ বছর বিশেকে কলকাতা যেভাবে গোল্লায় গেছে তার স্মৃতি নিখুঁত নির্মমতায় পর্দায় তুলে এনেছেন।
বামুন চিনি পৈতে প্রমাণ, বাঙালি চিনি কেমনে? নস্ট্যালজিয়া দিয়ে। ওই জিনিসটারই বিক্রয়যোগ্যতা বাঙালি সমাজে এখনো নিশ্চিত। তাই বাংলায় দুজন এখনো বিক্রি হন – রবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিৎ রায়। ওটা আছে বলেই শতবর্ষ এসে পড়লে বিক্রি হন মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকও। নস্ট্যালজিয়ার তোড়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা বিশেষ কেউ পড়ে না, অথচ সিগনালে তাঁর গান বাজে। ছোটরা সত্যজিতের গুগাবাবা দেখতে শেখে না, বড়রা ফেলুদাকে নিয়ে বছরের পর বছর ছেলেমানুষি চালিয়ে যায়, ভুলেও কেউ দেবী (১৯৬০) বা সীমাবদ্ধ (১৯৭১) দেখে না। তবে সত্যজিতের মেলায় হারিয়ে যাওয়া নাতিকে নায়ক বানিয়ে ছবি করলে হাউজ ফুল হয়। লোকে পথের পাঁচালী (১৯৫৫)-র বিখ্যাত দৃশ্যের হুবহু নকল দেখে আহা, উহু করে। মৃণালের রাজনীতি যতই বাতিল হয়ে যাক কলকাতা শহরে, ছবিগুলো যতই বিস্মৃত হোক, তাঁর বায়োপিকের বাহুল্য হয় বাংলা সিনেমায়। খারিজ (১৯৮২) কেউ দেখে না, কিন্তু তার সিকুয়েল তৈরি হয়। ঋত্বিকের ছবি কলকাতা শহরে দেখানোর অনুমতি বাতিল হয়, কিন্তু তাঁর নাম করে এবং না করে একাধিক বায়োপিক বানানো হয়, তাঁর নামে মেট্রো স্টেশন হয়। এসব নস্ট্যালজিয়া ছাড়া আর কী? এমনিতে স্মৃতি খুবই কাজের জিনিস, নইলে সাহিত্যিক মিলান কুন্দেরা লিখতেন না ‘ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম হল বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম।’ কিন্তু কলকাতা তথা বাংলায় আমরা সমস্ত অস্বস্তিকর স্মৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে ন্যাকা স্মৃতিমেদুরতায় ডুবে আছি। তাই সিনেমা হলে ঢুকে হিয়া টুপটাপ, জিয়া নস্ট্যাল হলেই হাততালি দিই। পরিচালক আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্ত মায়ানগর ছবিতে করেছেন ঠিক উল্টোটা। শেষ বছর বিশেকে কলকাতা যেভাবে গোল্লায় গেছে তার স্মৃতি নিখুঁত নির্মমতায় পর্দায় তুলে এনেছেন।
কেন এমন হয়ে গেল কলকাতা? দেখতে দেখতে পপকর্ন খাওয়া যায় এমন স্মৃতিমেদুরতা বজায় রাখতে হলে সিনেমায় দোষটা চাপিয়ে দিতে হয় কোনো অনির্দেশ্য শক্তির ঘাড়ে। ক্ষমতাশালীদের দিকে আঙুল তোলা তো নৈব নৈব চ, এমনকি নিজেদের দিকেও আঙুল তোলা চলে না। অথচ আদিত্যবিক্রম দেখিয়েছেন – লোভের গুড় ছড়িয়ে দিয়েছে ক্ষমতাশালীরা আর তা চেটেপুটে নিতে পিঁপড়ের মত এগিয়ে গেছে অভিনেত্রী হয়ে ওঠার স্বপ্ন মুছে যাওয়া গৃহবধূ এলার (শ্রীলেখা মিত্র) মত মানুষ। এই কালপর্বে বড় ফ্ল্যাট, নতুন বাইক, অনেক টাকা, বিদেশযাত্রার স্বপ্নে বিভোর করে দেওয়া হয়েছে রোজগারের অন্য পথ খুঁজে না পাওয়া রাজা (সায়ক রায়), পিংকিদের (রিকিতা নন্দিনী শিমু)। তারপর সর্বস্বান্ত করে দেওয়া হয়েছে। এই লোভের গুড়ের কল্পতরু বেয়ে শিখরে পৌঁছবার প্রতিযোগিতায় যারা নামেনি তাদের প্রায় সমাজচ্যুত করেছে কলকাতা। মাস্টারির চাকরি জোটাতে না পারা শিশির (সত্রাজিৎ সরকার), যে প্রাঞ্জল করে ছেলেমেয়েদের বুঝিয়ে দিতে পারে পদার্থবিদ্যার গূঢ় তত্ত্ব, তাকে প্রায়ান্ধকার পুরনো বাড়িতে গৃহশিক্ষক হয়েই থেকে যেতে হয়েছে। নিজের বউয়ের কাছেও বাতিল হয়ে গেছে সে। ভীতু হলেও প্রোমোটারদের হাতে বন্ধ থিয়েটার হল তুলে না দেওয়ার মরণপণ সংকল্প নিয়ে একা একা মদ খেতে খেতে অবসাদে ডুবে গেছে বুবুদা (ব্রাত্য বসু)। ওরা ডাইনোসর, ওদের সরিয়ে দিয়ে আধুনিক হয়ে উঠেছে কলকাতা।
আদিত্যবিক্রম দেখালেন বলে খেয়াল হল, আমাদের চোখের সামনে কী দারুণ এক মায়ানগর নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছে! এখানে নগদে রোজগার করলে ব্যাংক ঋণ দেয় না। অথচ গরিব, নিম্নবিত্ত মানুষের বহু কষ্টে সঞ্চিত কোটি কোটি টাকা নগদে আত্মসাৎ করে ধনী হয়ে যায় প্রদীপ্ত পাল (অনির্বাণ চক্রবর্তী)। কলকাতার ইন্দ্রপ্রস্থের মত এক মায়ানগর হয়ে ওঠার ইতিহাস আদিত্যবিক্রম ধরে রেখেছেন গোখান তিরয়াকির ক্যামেরায়। এই ইন্দ্রপ্রস্থে স্ফটিকের ফাঁকিতে উপরে ওঠাকেই সুখ ভেবে একেবারে একলা হয়ে যায় এলা। তারপর দুর্যোধনের পুষ্পশোভিত সরোবরকে শুকনো ডাঙা ভেবে ঝপাং করে পড়ে যাওয়ার মত আছড়ে পড়তে হয় সহায়সম্বলহীন মাটিতে। এই মায়ানগর রাজাকেও ফকির বানিয়ে ছাড়ে। এ মায়ানগর এমন এক সিন্ডিকেট যেখানে সৎ থাকতে চেয়েও পারে না ইঞ্জিনিয়ার ভাস্কর (অরিন্দম ঘোষ)। এ শহরে একমাত্র ডেঙ্গুর মশা তাড়ানোর ধোঁয়াই রচনা করতে পারে স্বপ্নের মায়াজাল।
এবং রবীন্দ্রনাথ। তিনিও বিকৃত ও বিক্রীত হন এই মায়ানগরে। মোটের উপর নরম শব্দ এবং নৈঃশব্দ্যে নির্মিত মিংকো এগার্সম্যানের সাউন্ডট্র্যাকে কান ঝালাপালা করে দেয় শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের গান। আজকের বাঙালির দুই শালগ্রাম শিলার আসলে কী অবস্থা করেছে কলকাতা, তা এতদিনে কোনো বাংলা ছবি দেখিয়ে দিল। আদিত্যবিক্রম রবীন্দ্রনাথের রক্তাক্ত হয়ে যাওয়া দেখিয়েছেন কোনো রাখঢাক না রেখে, আর সত্যজিতের অবস্থা দেখাতে চেয়েছেন কিনা নিশ্চিত হওয়া যায় না। কিন্তু এলা যখন ফ্ল্যাট পাওয়ার লোভে প্রদীপ্তর হোটেলের ঘরে পৌঁছে যায়, তখন কিছুতেই অগ্রাহ্য করা যায় না এই অনুভূতি, যে জন অরণ্য (১৯৭৬) ছবির সেই দৃশ্যই আবার দেখছি, যেখানে নিজের কাজ হাসিল করতে বন্ধুর বোনকে ক্লায়েন্টের ঘরের দরজায় পৌঁছে দেয় বিবেকের দংশনে ছিন্নভিন্ন সোমনাথ। তফাত বলতে, আজকের কলকাতায় অভাব নয়, এলার কম্পাস ঠিক করে লোভ। তাই তার কোনো ‘মিডলম্যান’ প্রয়োজন হয় না।
বিলাস যাদের প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে আর প্রয়োজনটুকুও যাদের বিলাসে পরিণত হয়েছে, তাদের কাছে জলজ্যান্ত একটা শহরের মায়ানগর হয়ে যাওয়ার ইতিহাস তুলে ধরেছেন পরিচালক। বাংলা ছবি অরাজনৈতিক হয়ে গেছে বলে আমাদের অনেকেরই আক্ষেপ। অদূর ভবিষ্যতে সে আক্ষেপ দূর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ এই ছবি করতেও বিদেশি প্রযোজক, বিদেশি কলাকুশলীদের সাহায্য নিতে হয়েছে পরিচালককে। তবে তার সদ্ব্যবহার করে তিনি বানিয়ে ফেলেছেন গত দেড় দশকের সবচেয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক ছবি। ফলে এই তথ্য অবাক করে না যে ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির পটভূমিকা যে কলকাতা শহর, সেখানকার সিনেমা হলেই ছবিটা এসে পৌঁছল চার বছর পরে।
তবে ছবির রাজনীতি ব্যর্থ হয়ে যেত, একজন দর্শকের কাছেও নিজের বার্তা পৌঁছে দিতে পারতেন না পরিচালক, যদি তাঁর প্রয়াস শিল্পোত্তীর্ণ না হত। আশ্চর্য সব দৃশ্যের জন্ম দিয়েছেন আদিত্য বিক্রম। ডেঙ্গু তাড়ানোর ধোঁয়াকে সিনেমার চিরাচরিত স্বপ্নদৃশ্যের কায়দায় ব্যবহার করার কথা আগেই বলেছি। তার চেয়েও বেশি অবাক করে পরিবারের কনিষ্ঠতমের মৃত্যুতে বিষণ্ণ পোষা কুকুর, প্রেমের ফুর্তির বাঁশির সঙ্গে সুর মিলিয়ে জ্বলে ওঠা নকল তাজমহলের আলো। শেষ দৃশ্যের ম্যাজিক গোপন থাক। যাঁরা এই পরিচালকের প্রথম ছবি আসা যাওয়ার মাঝে (২০১৪) দেখেছেন তাঁরা জানেন, আদ্যন্ত বাস্তবে পা রেখে দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ কল্পনার রাজ্যে চলে গিয়ে কী অসামান্য ম্যাজিক দেখাতে পারেন আদিত্য বিক্রম। রবীন্দ্রনাথের কথাও তোলা থাক যাঁরা এখনো ছবিটা দেখেননি তাঁদের জন্য। না, ট্রেলারে দেখানো শটগুলোর কথা হচ্ছে না। এটা সেই জাতের বাংলা ছবি নয় যার ট্রেলার দেখাই যথেষ্ট।
তা বলে কোনো দুর্ধর্ষ চমক আশা করবেন না। পরিচালক নিচু তারে বেঁধেছেন দৃশ্যগুলোকে, আর সেই সুরেই সুর মিলিয়ে কাজ করেছেন ক্যামেরার সামনের শিল্পীরা। এই ছবির চমক বলতে ওই নিচু তারের উঁচু মানের অভিনয়ই। শ্রীলেখা আশ্চর্য দক্ষতায় একইসঙ্গে লাস্যময়ী এবং ঘরোয়া; কৌশলী এবং অগোছালো; কুটিল এবং বোকা। বস্তুত একই চরিত্রে দুজন মেয়ের অভিনয় করেছেন তিনি। এমন এক মেয়ে যাকে অপাপবিদ্ধ কিশোরী থেকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী চতুর মহিলা করে তুলেছে জীবন। যার লোভ ষোল আনা, কিন্তু কল্পতরুর মালিক প্রদীপ্তর মত নির্দ্বিধায় অন্য মানুষের ক্ষতির বিনিময়ে লাভবান হতে যার বাধে।
এলার স্বামী শিশিরের চরিত্রে সত্রাজিৎকে পুরুষ দর্শকের মাঝে মাঝে মনে হবে ভেড়ুয়া। কী নির্লিপ্তভাবে বিয়ে করা বউয়ের দিকে প্রায় না তাকিয়ে কাটিয়ে দেয় লোকটা! নিজের ব্যর্থতা মেনে নেওয়া একজন মানুষের অভিনয়ে সত্রাজিৎ আবেগ চেপে রাখেন আশ্চর্য দক্ষতায়, অথচ রসবোধ একটুও চিড় খায় না। তা ছাত্রকে কুকুরের ভয় দেখানোতেই হোক, আর সেই কুকুরের সামনে পড়ে গিয়ে সন্ত্রস্ত রাজাকে ‘আমি কী করব? ও আমার কথা শোনে না’ বলাতেই হোক। কণ্ঠস্বরের ওঠানামা ছাড়াই সত্রাজিৎ এমন একজন মানুষকে দেখিয়ে দেন যার মমত্ববোধ আছে পুরোমাত্রায়, স্ত্রীর প্রতি প্রেমও আছে যথেষ্ট। কিন্তু সেসব সে প্রকাশ করে না, কারণ জানে তাতে লাভ নেই। শ্রীলেখা শেষমেশ গৃহত্যাগ করার পরে সত্রাজিতের চোখ ভরে আসে, তবু তিনি কাঁদেন না। আবার ঝড়জলের রাতে মত্ত স্ত্রী হঠাৎ ফিরে এলেও আবেগে বিহ্বল হয়ে পড়েন না।
ব্রাত্য বসু এতটাই বুবুদা হয়ে গেছেন যে সন্দেহ জাগে, তিনি আদৌ অভিনয় করছেন কিনা। তাঁর চেয়ারে বসতে গিয়ে মাঝপথে থমকে যাওয়া, জবুথবু বসার ভঙ্গি, দরদরিয়ে ঘেমে চলা, একই কথা বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করা শারীরিক ও মানসিক অস্থিরতার প্রমাণ দেয়। তাঁর সারা শরীরে আতঙ্ক জেগে থাকে সারাক্ষণ। অথচ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মস্তিষ্কের উপর নিয়ন্ত্রণ হারালেও, মুখে ‘বাড়ি বেচে দেব’ বললেও নিজের জায়গা ছেড়ে না যাওয়ার আকুতি পরিষ্কার ফুটে ওঠে।
মানুষ মাত্রেই বহুমাত্রিক। তেমন এক আপাত ভালমানুষ, বহুমাত্রিক চরিত্রে যথাযথ অভিনয় করেছেন অরিন্দম।
সায়ক তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষায়, অক্ষম রাগে, ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়ায় এবং অব্যক্ত হতাশায় আমাদের সকলের পরিচিত নিম্নবিত্ত পরিবারের চিট ফান্ড এজেন্টদের একজন হয়ে উঠেছেন। রিকিতাও তাঁর চরিত্রে যথাযথ। অতি স্বল্প সুযোগেও চিট ফান্ডের সর্বদা মিষ্টি কথা বলা চালু কর্মকর্তা হিসাবে জ্যান্ত হয়ে উঠেছেন লোকনাথ দে।
গত কয়েক বছরে কলকাতার যেসব মানুষকে আমরা দেখি না, দেখতে চাই না, তাদের সিনেমার পর্দায় তুলে এনেছে অন্তত তিনটে ছবি – মায়ার জঞ্জাল (২০২০), ঝিল্লি (২০২১) আর মানিকবাবুর মেঘ (২০২১)। আদিত্যবিক্রম মায়ানগর ছবিতে ধরে রেখেছেন আমাদের দেখা লোকেদের বদলে যাওয়া, আমাদের চেনা শহরের হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া। তা করতে গিয়ে তিনি ক্যামেরাবন্দি করে ফেলেছেন গোটা রাজ্যটার যুগান্তর। তিনি যে সচেতনভাবেই ঘটনা আর কল্পনা মিশিয়ে দিচ্ছেন, গুলিয়ে দিচ্ছেন, তা পরিষ্কার হয় যখন একটা শটে এক বাড়ির ছাদে মোবাইলে কথোপকথনে ব্যস্ত রাজার পিছনে দেখা যায় পোস্তার ভেঙে পড়া ফ্লাইওভারের অবশিষ্টাংশ; আর এক রডের মাথায় হাওয়ায় দোলে অধুনা দেশের সকলের পরিচিত তিনকোণা পতাকা। উপরন্তু কল্পতরুর মালিক প্রদীপ্ত হাওয়া খারাপ দেখে বিমানবন্দরের দিকে রওনা দেন, গন্তব্য কাশ্মীর। এ রাজ্যের যেসব মানুষের স্মৃতি দুর্বল নয়, তাঁদের স্থান মাহাত্ম্য বলে বোঝাতে হবে না।
এই ছবিতে যে কালপর্ব দেখানো হয়েছে, সেই পর্ব আমাদের প্রজন্মের প্রথম যৌবন। ফলত, বৃদ্ধ যুগের গলিত শবের পাশে প্রাণকল্লোলে নবযুগ আসার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সেইসময়, তা যে নেহাতই ফাঁকা বুলি ছিল তা আমরা এতদিনে বুঝে গেছি। কিন্তু সেই উপলব্ধি সবিস্তারে বাংলা ছবিতে বড় পর্দায় এতদিন দেখা যায়নি। সে অর্থে আদিত্যবিক্রমের এই ছবি আমাদের প্রজন্মের বয়ান। এটা আমাদের ছবি। তাই সত্যজিতের মহানগর (১৯৬৩)-এর অকারণ আশাবাদী সমাপ্তি আদিত্যবিক্রমের মায়ানগরে সম্ভব হয় না। তাঁকে ম্যাজিকের আশ্রয় নিতে হয়।
কোনওদিন ভারত অধিনায়ক হওয়া হল না— এই নিয়ে আফসোস আছে কিনা জিজ্ঞেস করায় বলেছেন, তিনি ভেবে নিয়েছেন যে তিনি এমন এক কর্পোরেট কোম্পানিতে কাজ করতেন যারা তাঁকে ওই ভূমিকায় দেখতে চায়নি।
চাহি না রহিতে বসে ফুরাইলে বেলা, তখনি চলিয়া যাব শেষ হলে খেলা।
রবীন্দ্রনাথের গান সম্পর্কে একটা কথা অনেকেরই মনে হয়— যেন সকলের জীবনের সব মুহূর্তের সঙ্গেই লাগসই দু-চারখানা লাইন লিখে গেছেন। সম্প্রতি ভারতীয় দলের ক্রিকেটার রবিচন্দ্রন অশ্বিন যে অনায়াস ভঙ্গিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেন, তাতে মনে হয় উপরের লাইন দুটো যেন তাঁরই কথা।
২০১১ সালের নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল অশ্বিনের। তারপর থেকে দেশের মাটিতে যত সিরিজ খেলেছে ভারত, তার মধ্যে হার হয়েছিল কেবল ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। ভারতীয় স্পিনারদের সেই সিরিজে টেক্কা দিয়েছিলেন দুই ইংরেজ স্পিনার— গ্রেম সোয়ান আর মন্টি পানেসার। অশ্বিন চার টেস্টে ১৪টা উইকেট নিয়েছিলেন, প্রজ্ঞান ওঝা ২০টা, রবীন্দ্র জাদেজা আর পীযূষ চাওলা মিলে আরও সাতখানা। কিন্তু অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছিল সোয়ান-পানেসারের ৩৭ (যথাক্রমে ২০ আর ১৭)-টা উইকেট। অশ্বিন বলেছেন, ওই সিরিজের পর তিনি প্রতিজ্ঞা করেন— যতদিন খেলবেন, ঘরের মাঠে ভারতকে হারতে দেবেন না। তাঁর প্রতিজ্ঞা অটুট থেকেছে এতগুলো বছর, ভেঙে গেল ২০২৪ সালের শেষে এসে নিউজিল্যান্ড সিরিজে। অশ্বিন একেবারেই সুবিধা করতে পারলেন না। তিন টেস্টের সিরিজে মাত্র ন-খানা উইকেট, গড় ৪১। তিনি আর জাদেজা এতগুলো বছর ধরে যেভাবে ঘোল খাইয়ে ছেড়েছেন অতিথি ব্যাটারদের, তা এবারে হয়নি। উপরন্তু সেই ইংল্যান্ড সিরিজের মতোই এবারে নিউজিল্যান্ডের মিচেল স্যান্টনার (১৩ উইকেট) আর আজাজ প্যাটেল (১৫ উইকেট) টেক্কা দিয়েছেন ভারতীয় স্পিনারদের।
যদিও অস্ট্রেলিয়ায় খুব কম ক্ষেত্রেই একটা টেস্টে একজনের বেশি স্পিনার খেলানোর প্রয়োজন হয়, তবু ভারতীয় নির্বাচকরা এবার অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়েছিলেন তিনজনকে। তাছাড়া উপায়ই বা কী ছিল? ওয়াশিংটন সুন্দর যে দুটো টেস্ট খেলেই ১৬ খানা উইকেট নিয়ে ফেলেছেন নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। তার উপর সাড়ে চুয়াল্লিশ গড়ে রানও করে ফেলেছেন। ভারতীয় টেস্ট দল আবার অদ্ভুত নিয়মে চলে। ব্যাটাররা রান করতে পারবেন না জেনে, বোলার নির্বাচনের সময়ে একদিনের ক্রিকেট বা কুড়ি-বিশের ক্রিকেটের মতো মাথায় রাখা হয় সে রান করতে পারবে কিনা। এই নিয়ম মহেন্দ্র সিং ধোনির আমল থেকেই অল্পবিস্তর চলছিল, গত পাঁচ বছরে তুঙ্গে উঠেছে। কারণ দুই মহাতারকা ব্যাটার বিরাট কোহলি আর রোহিত শর্মার রান করার ঘটনা নরেন্দ্র মোদির সংসদে উপস্থিত থাকার মতোই বিরল হয়ে গেছে। কেএল রাহুল, শুভমান গিলরাও ধারাবাহিক নন। অশ্বিন বিলক্ষণ জানতেন, দেশের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বোলারদের সামলাতেই হিমশিম খেয়ে যাওয়া ভারতীয় ব্যাটারদের অস্ট্রেলিয়ায় রান করার সম্ভাবনা আরও কম। অতএব ওখানে চূড়ান্ত একাদশ নির্বাচন করার সময়ে আরও বেশি করে মাথায় রাখা হবে কোন বোলার বেশি রান করতে পারে। অশ্বিন এও জানতেন যে টেস্টে আধডজন শতরান, ১৪ খানা অর্ধশতরান, আগের অস্ট্রেলিয়া সফরে নায়কোচিত ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস, ২০২২ সালে মীরপুরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ঘূর্ণি উইকেটে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলার পরেও টিম ম্যানেজমেন্টের তাঁর ব্যাটিং দক্ষতায় বিশ্বাস নেই। অতএব প্যাট কামিন্সদের বিরুদ্ধে তাঁর খেলার সম্ভাবনা কম। প্রথম দুই টেস্টের এলোমেলো দল নির্বাচন সে-কথা প্রমাণও করে দেয়। তাই দ্বিতীয় টেস্টের পরেই তিনি অবসর নিয়ে নেন। অধিনায়ক রোহিত শর্মা সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, অশ্বিন নাকি পার্থেই অবসর নিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। রোহিতের অনুরোধেই অ্যাডিলেড পর্যন্ত থেকে যেতে রাজি হন।
ভারত অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জিতে গেলেই বা কী হত? বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠলেও সেই ম্যাচ হবে ইংল্যান্ডে। অর্থাৎ সেখানেও অশ্বিনকে বসিয়ে রাখা হত— এই সম্ভাবনা প্রবল। তারপর ভারতের টেস্ট সিরিজ বলতে ইংল্যান্ডে পাঁচ টেস্টের সিরিজ। ফের দেশের মাঠে টেস্ট সিরিজ আসতে আসতে অশ্বিনের বয়স চল্লিশের দিকে এগিয়ে যাবে। অশ্বিন ততদিন আর অপেক্ষা করলেন না। কেন করলেন না? ঠিক কী কথাবার্তা হয়েছিল অধিনায়ক আর কোচ গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে? সম্যক জানা যাচ্ছে না বলেই নানারকম গুজব এবং প্রচার ডালপালা মেলেছে। সেসব কথা থাক। এখানে বলার কথা হল, অশ্বিনের সঙ্গে যে-কোনও গড়পড়তা ভারতীয় ক্রিকেট-তারকার বিস্তর অমিল। তিনি কোহলির মতো বলিউড অভিনেত্রীর সঙ্গে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং করেননি। ব্যক্তিগত জীবন হাট করে ইনস্টাগ্রামে খুলে দেওয়ার পর ‘আমার বাচ্চার ছবি তুলছেন কেন’ বলে অস্ট্রেলীয় সাংবাদিকদের দিকে তেড়েও যাননি। সোশাল মিডিয়ায় তাঁর স্ত্রী, সন্তানদের ছবি বা ভিডিও রোহিতের পরিবারের চেয়েও কম দেখা যায়। সোশাল মিডিয়া মানে অশ্বিনের কাছে এক্সে একেবারেই ক্রিকেট সংক্রান্ত কিছু পোস্ট আর নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল। সেখানে মূলত ক্রিকেট নিয়েই ভিডিও পোস্ট করেন, কিন্তু দাবাও থাকে। আজ্ঞে হ্যাঁ, দাবা। এমন একজন ক্রিকেটার সদ্য প্রকাশ করেছেন আত্মজীবনীমূলক বই। এ বই তো পড়বই।
বহু বিখ্যাত খেলোয়াড় এই ধরনের বই লিখেছেন। সাধারণত লেখার কাজে তাঁর সঙ্গে থাকেন কোনও ক্রীড়া সাংবাদিক। ভারতীয় দাবার জীবন্ত কিংবদন্তি বিশ্বনাথন আনন্দের আত্মজীবনীর নাম যেমন মাইন্ড মাস্টার (২০১৯), তাঁর সঙ্গে লিখেছেন সাংবাদিক সুজান নাইনান। শচীন তেন্ডুলকরের আত্মজীবনী প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে(২০১৪), সহলেখক বোরিয়া মজুমদার। আন্দ্রে আগাসির আত্মজীবনী ওপেন (২০০৯) লেখায় তাঁকে সাহায্য করেছিলেন পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক জে আর মোরিঙ্গার। এই বইগুলোর কাটতি বেশ ভাল। কারণ খেলাপাগল লোকেদের মধ্যে এমন মানুষ কম নেই যারা খেলোয়াড়দের জীবনযাত্রা, ভাবনার ধরন, প্রস্তুতি, মনস্তত্ত্ব, ব্যক্তিগত জীবনের লড়াই সম্পর্কে জানতে চান। আবার কেউ হয়তো তেমন পড়ুয়া নন, কিন্তু প্রিয় খেলোয়াড়ের আত্মজীবনী স্রেফ সংগ্রহে রাখার আগ্রহে কিনে ফেলেন। অশ্বিনের বইও লেখা হয়েছে এক সাংবাদিকের সাহায্য নিয়ে। তিনি ক্রিকেট সাংবাদিক সিদ্ধার্থ মঙ্গা। কিন্তু মজার কথা, সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রায় দেড় দশক ক্রিকেট খেলে ফেলা অশ্বিনের বইয়ের নাম আই হ্যাভ দ্য স্ট্রিটস। প্রচ্ছদে দেখা যায় বল হাতে নয়, ব্যাটের উপর ভর দিয়ে বসে আছেন ভারতের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী বোলার।
এ কি অশ্বিনের শ্লেষ? ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যাটারদের সমান সম্মান যে হাজার সাফল্য সত্ত্বেও বোলারদের কপালে জোটে না— এ-কথা তো সর্বজনবিদিত। মাত্র একটা সিরিজে ব্যর্থ হয়েই নিজের বয়সের ভার স্বীকার করে নিয়ে অশ্বিন অবসর নিলেন। অথচ সমবয়স্ক কোহলি কালেভদ্রে একটা শতরান করলেই ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পারমানেন্ট’ জাতীয় কথা বলে সাংবাদিক, ধারাভাষ্যকার, ক্রিকেটভক্ত— সকলেই একেবারে গদগদ হয়ে যান। রোহিত নিতান্ত চাপে পড়ে এত বছর পরে রঞ্জি ট্রফি খেলতে নেমে জম্মু-কাশ্মীরের পেসারের গতিতেও চোখে অন্ধকার দেখছেন, অথচ নির্বাচকরা এখনও সাহস করে বলতে পারছেন না— এবার অবসর নাও। উল্টে অস্ট্রেলিয়ায় একটা টেস্টে তিনি নাকি নিজেকে বিশ্রাম দিয়েছিলেন। তাতে অবসর নেবেন কিনা জল্পনা শুরু হওয়ায় টিভি ক্যামেরার সামনে এসে সগর্বে বলে দিয়েছেন— আমি এখন আছি। কোথাও যাচ্ছি না। ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যাটারদের এই রাজার ব্যাটাসুলভ অবস্থানকেই কি নীরবে ব্যঙ্গ করছে অশ্বিনের বইয়ের প্রচ্ছদ?
লোকটার নাম অশ্বিন বলেই এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না এবং ওই বইয়ের ভিতরে কী আছে তা জানার কৌতূহল বাড়ে। পরিতাপের বিষয় হল, ভারতীয় ক্রিকেট-সাংবাদিকতা মোটের উপর বিশ্লেষণহীন পেজ থ্রি সাংবাদিকতায় পরিণত হয়েছে। তাই অশ্বিনের অবসরের পর থেকে আজ পর্যন্ত কেউ তাঁর দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনের নানা দিক নিয়ে একখানা গভীর সাক্ষাৎকার নিল না। নিলে সামগ্রিকভাবে গত দেড় দশকে যেভাবে ভারতীয় ক্রিকেট পরিচালিত হয়েছে, যার ক্ষতি তাৎক্ষণিক না হলেও এখন টের পাওয়া যাচ্ছে, তা নিয়ে অনেক কিছু জানা যেতে পারত। অশ্বিনের মতো একজন ভাবুক ক্রিকেটারের ক্রিকেট-ভাবনা নিংড়ে নেওয়ার কাজ তো হতই। কাজটা করেছেন স্কাই ক্রিকেটের পডকাস্টে দুই প্রাক্তন ইংল্যান্ড অধিনায়ক— মাইকেল অ্যাথারটন আর নাসের হুসেন। সেই পডকাস্ট শুনলে অশ্বিনের বইখানা পড়ার আগ্রহ আরও বেড়ে যেতে বাধ্য। অশ্বিন বলেছেন তিনি বই পড়তে ভালবাসেন। নির্দিষ্ট করে বলেছেন ‘সেলফ-হেল্প বই নয়, উপন্যাস পড়তে ভালবাসি।’ তারপর জানিয়েছেন নিজের বইটাকেও তিনি এমনভাবে সাজাতে চেয়েছেন যাতে নিজেকে বইয়ের প্রথম অংশে লেখক হিসাবে বা বইয়ের প্রধান চরিত্র (“author or protagonist”) হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। ফলে শেষমেশ বইটা উপন্যাসের মতো হয়ে ওঠে। আরও বলেছেন ‘আমি আজও একজন গলি-ক্রিকেটার।’ বোঝা যায়, নিজের শিকড়ের প্রতি বিশ্বস্ততা বোঝাতেই তাঁর বইয়ের নামকরণ।
কোনও রাখঢাক না করে ওই পডকাস্টে অশ্বিন নির্দ্বিধায় বলেছেন, একজন বোলারের জীবন মোটেই খুব রঙিন নয়। তাই অনেকসময় দেখা যায়, উইকেট নিল অশ্বিন আর লাফিয়ে বেড়াচ্ছে বিরাট। কোনওদিন ভারত অধিনায়ক হওয়া হল না— এই নিয়ে আফসোস আছে কিনা জিজ্ঞেস করায় বলেছেন, তিনি ভেবে নিয়েছেন যে তিনি এমন এক কর্পোরেট কোম্পানিতে কাজ করতেন যারা তাঁকে ওই ভূমিকায় দেখতে চায়নি। ২০২৫ সালের ভারতে ক্রিকেটার, কোচ, বোর্ড, সাংবাদিক, বিশেষজ্ঞ, প্রাক্তন ক্রিকেটার— সকলে মিলে জাতীয় দলকে দেশের সমার্থক করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। সেখানে অশ্বিনের মতো উচ্চতার একজন ক্রিকেটার বোর্ডকে কর্পোরেট কোম্পানি বলছেন, জাতীয় দলে খেলাকে স্রেফ আরেকটা চাকরির মতো করে বর্ণনা করছেন— এই প্রবল কাণ্ডজ্ঞান তাঁকে এবং তাঁর বইকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
এমন নয় যে বড় ক্রিকেটার হলেই তাঁর আত্মজীবনী বা জীবনী খুব আকর্ষণীয়, পাঠযোগ্য হয়। শচীনের বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত কিছু অংশ পড়ে গাঁটের কড়ি খরচ করে আর কিনতে ইচ্ছে করেনি। যারা কিনে পড়েছে, প্রায় কারও মুখে প্রশংসা শুনিনি। সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগ শুনেছি তা হল, বইতে এমন একটা কথাও নেই যা শচীন সম্পর্কে ক্রিকেটভক্তরা আগেই জানত না। হয়তো তা খুব অবাক করার মতো নয়। কারণ শচীনের ব্যাটিং যতখানি চিত্তাকর্ষক ছিল, তাঁর কথাবার্তা ঠিক ততখানিই একঘেয়ে। অশ্বিন কিন্তু অন্য মানুষ। কার্টুনিস্ট প্রাণ তাঁর সৃষ্ট চরিত্র চাচা চৌধুরী সম্পর্কে যে কথা কমিক স্ট্রিপে লিখতেন, সে-কথা অশ্বিন সম্পর্কেও বলা যায়— অশ্বিনের মাথা কাজ করে কম্পিউটারের মতো।
ঠ্যালার নাম বাবাজি। সেই বাবাজির কল্যাণে এই জানুয়ারিতে হঠাৎ ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত রথী মহারথীদের মনে পড়ে গেছে যে ঘরোয়া ক্রিকেট ব্যাপারটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এবং রঞ্জি ট্রফি বলে একটা প্রতিযোগিতা হয় দেশে। ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের কাছে নাকানিচোবানি খাওয়ার পর অস্ট্রেলিয়াতেও কাপড়ে চোপড়ে করে আসার পর বাধ্য ছেলের মত রঞ্জি খেলতে নেমে পড়েছেন বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, শুভমান গিল, ঋষভ পন্থ প্রমুখ তারকারা। ফলে জন্মে রঞ্জি ট্রফির ধারেকাছে না যাওয়া সংবাদমাধ্যমকেও রোজ জানান দিতে হচ্ছে বিরাট নেটে কার সঙ্গে কথা বললেন, কতজন তাঁকে দেখতে এল, কেমন ওজনের ব্যাট নিয়ে খেললেন ইত্যাদি। ৩০ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া রঞ্জি ম্যাচগুলোতে সারা দেশের নজর দিল্লি বনাম রেলওয়েজ ম্যাচের দিকে, কারণ ওই ম্যাচেই এক যুগ পরে রঞ্জি খেলতে নামছেন বিরাট। তাঁর বিশ্বরূপে চোখ ধাঁধিয়ে গিয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যমও দু-চার লাইন লিখেই ক্ষান্ত দিচ্ছে যে এই রাউন্ডে সম্ভবত জীবনের শেষ প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলতে নামছেন ঋদ্ধিমান সাহা। কারণ বাংলার নক আউট স্তরে ওঠার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
কেন দু-চার লাইনের বেশি প্রাপ্য ঋদ্ধিমানের? কারণ সর্বকালের সেরা পুরুষ বাঙালি ক্রিকেটারদের তালিকায় তিনি তিন নম্বরে থাকবেন। ইডেন উদ্যানে বৃহস্পতিবার বাংলা বনাম পাঞ্জাব ম্যাচ খেলতে নামার আগে পর্যন্ত ১৪১ খানা প্রথম শ্রেণির ম্যাচে শিলিগুড়ির ছেলে ঋদ্ধিমান ৩৪৪ খানা ক্যাচ ধরেছেন আর ৩৮ খানা স্টাম্পিং করেছেন, প্রায় ৪২ গড়ে সাত হাজারের বেশি রানও করেছেন। ফলে তিনি যে বাংলার সর্বকালের সেরা উইকেটরক্ষক তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হল, সৌরভ গাঙ্গুলি আর পঙ্কজ রায়কে বাদ দিলে আর কোনো বাঙালি ক্রিকেটার ঋদ্ধিমানের চেয়ে বেশি টেস্ট (৪০) খেলে উঠতে পারেননি। শুধু খেলেছেন বললে ভুল হবে। বরেণ্য উইকেটরক্ষক অ্যালান নটের সমসাময়িক হওয়ায় প্রতিভাবান বব টেলরের যেমন ইংল্যান্ডের হয়ে বেশি খেলা হয়নি, মহেন্দ্র সিং ধোনির সমসাময়িক হওয়ায় ঋদ্ধিমানও ভারতীয় দলে নিয়মিত হয়েছেন তিরিশের কোঠায় পা দিয়ে। তা সত্ত্বেও উইকেটের পিছনের দক্ষতায় মুগ্ধ করেছেন সৈয়দ কিরমানি, অ্যাডাম গিলক্রিস্টের মত কিংবদন্তিদের। তাঁর কোনো কোনো ক্যাচ চোখ কপালে তুলে দিয়েছে, ঘূর্ণি উইকেটে তাঁর উইকেটরক্ষা শিল্পের পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়েছে অনেকসময়। নিঃসন্দেহে বলা যায়, ঋষভ পন্থ এসে না পড়লে ঋদ্ধিমান অনায়াসে পঞ্চাশের বেশি টেস্ট খেলে ফেলতেন।
অথচ এই লোকটার অবসর নিয়ে বাংলায় কোনো হইচই নেই। বেহালার নীল রক্তের ক্রিকেটারের খেলোয়াড় জীবনে তাঁকে ঘিরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রাবল্য দেখলে বোধহয় সুরেন বাঁড়ুজ্জেও আশ্চর্য হতেন। অথচ শিলিগুড়ির মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেটার ব্যাপারে কোনোদিন তার ছিটেফোঁটা দেখা যায়নি। স্বভাবতই সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদেরও তাঁকে নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই। চোট আঘাতে চিরকাল জর্জরিত দিল্লির ছেলে আশিস নেহরা, যিনি খেলেছেন মাত্র ১৭ খানা টেস্ট আর ১২০ খানা একদিনে আন্তর্জাতিক ম্যাচে মনে রাখার মত পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন মাত্র একবার – তাঁকে যখন বিশেষ সম্মান দিয়ে ঘরের মাঠে টি টোয়েন্টি খেলে অবসর নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, তখন বাংলার সাংবাদিকরা কত কাব্য যে করেছেন! ঋদ্ধিমানের বেলায় সাজানো কালি শুকিয়ে গেল? একখানা সর্বভারতীয় ইংরিজি খেলার পত্রিকা ছাড়া কোথাও তো ঋদ্ধিমানের কোনো দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেখছি না!
অথচ ঋদ্ধিমানের ক্রিকেটজীবন যেভাবে শেষ হল, তিনি তত অযত্নের পাত্র ছিলেন না। টেস্ট দলে জায়গা পাকা করে নেওয়া ঋদ্ধিমান ২০১৮ সালে অস্ত্রোপচারের জন্য বিশ্রামে যেতে বাধ্য হলেন। যখন ফিরে এলেন তখন তাঁকে জায়গা ফিরিয়ে দেওয়া হল না, রেখে দেওয়া হল তরুণ ঋষভকে। কেন? না তিনি ইংল্যান্ডে শতরান করে ফেলেছেন। অথচ ঋষভের উইকেটরক্ষা এখন যত ভালই হোক, তখনো মোটেই ভরসা জোগানোর মত হয়নি। সে যতই তিনি এক ইনিংসে পাঁচটা ক্যাচ ধরে থাকুন। বিশেষত স্পিনারদের বিরুদ্ধে তাঁর উইকেটরক্ষা হাস্যকর হয়ে দাঁড়াত প্রায়শই। তা সত্ত্বেও ঋদ্ধিমান হয়ে গেলেন দ্বিতীয় পছন্দ। একটা অভিনব সূত্র দিল টিম ম্যানেজমেন্ট – বিদেশে কিপিং করবেন ঋষভ, কারণ ওখানে স্পিনারদের সামলাতে হয় না। আর দেশে ঋদ্ধিমান। সবসময় অবশ্য তাও মানা হয়নি। সৌরভের গোটা কেরিয়ারে প্রতিদিন তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া বাঙালি সমাজ তখন বিক্ষোভে ফেটে পড়েনি। ঋষভ ভাল খেলে দিয়েছেন, ঋদ্ধিমানকে জায়গা ফিরিয়ে দেওয়ার উপায় ছিল না – এ যুক্তি কিন্তু অসার। কারণ প্রথমত, ভাল খেলার বহরটা আগেই উল্লেখ করলাম। দ্বিতীয়ত, অধিনায়ক বিরাটের আমলেই ২০১৬ সালে চোটের জন্য দলের বাইরে থাকা সিনিয়র ক্রিকেটার অজিঙ্ক রাহানের জায়গায় একটা টেস্টে সুযোগ পেয়ে করুণ নায়ার ত্রিশতরান হাঁকিয়েছিলেন। অথচ পরের টেস্টেই সুস্থ রাহানেকে তাঁর জায়গা ফেরত দেওয়া হয় (করুণ আজ পর্যন্ত আর মোটে তিনটে টেস্ট খেলেছেন)। তখন বিরাটের যুক্তি ছিল – একটা পারফরম্যান্স অন্য একজন খেলোয়াড়ের কয়েক বছরের পরিশ্রমের মূল্য চুকিয়ে দিতে পারে না। সঠিক ক্রিকেটিয় যুক্তি, কিন্তু সেটা ঋদ্ধিমানের বেলায় খাটল না!
তাঁকে একেবারে বাদ দেওয়ার সময়ে অবশ্য কোচ রাহুল দ্রাবিড় আলাদা করে ডেকে বলেছিলেন বয়সের কারণে তাঁকে নিয়ে আর ভাবা হবে না। এটাও ক্রিকেটিয় যুক্তি হিসাবে ভুল নয়। কিন্তু তাঁর বদলে যাকে ভাবা হয়েছিল, সেই কে এস ভরত ইতিমধ্যেই তলিয়ে গেছেন। আরও বড় কথা, ঋদ্ধিমানের চেয়ে অনেক বেশি ধারাবাহিক ব্যর্থতার পরেও একই বয়সে পৌঁছে যাওয়া বিরাট আর রোহিতকে আজ ‘তোমাদের নিয়ে আর ভাবা হবে না’ বলার সাহস গৌতম গম্ভীর বা প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর দেখাতে পারছেন না। দলের স্বার্থে নিজেকে বাদ দেওয়া, ধেড়ে বয়সে রঞ্জি দলের নেটে এসে ব্যাকফুটে খেলার অনুশীলন ইত্যাদি আদিখ্যেতা চলছে।
ঋদ্ধিমানের প্রতি সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ব্যবহার করেছেন অবশ্য বাঙালিরাই। ভুললে চলবে না, তাঁকে যখন দল থেকে ক্রমশ সরিয়ে দেওয়া হল তখন বোর্ড সভাপতি ছিলেন বাংলার গৌরব সৌরভ। তারপর ২০২২ সালে এক বাঙালি সাংবাদিক সাক্ষাৎকার না দেওয়ার ‘অপরাধে’ ঋদ্ধিমানকে রীতিমত হুমকি দেন – দলে একজন উইকেটরক্ষকই সুযোগ পায়, তুমি ১১ জন সাংবাদিককে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছ। এটা আমার মতে ঠিক নয়… তুমি আমায় ফোন করোনি… কাজটা কিন্তু ভাল করলে না…ইত্যাদি। সেই হুমকি টুইটারে ফাঁস করে দেন ঋদ্ধিমান। বোর্ড বাধ্য হয়ে সেই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তদন্ত করে এবং সাময়িকভাবে তাঁর ভারতীয় ক্রিকেট কভার করা নিষিদ্ধ হয়। তবে তিনি বহাল তবিয়তে ফিরে এসেছেন। তাঁর প্রতি অবিচার হয়েছে – এই মর্মে বই লিখেছেন, সে বই ক্রিকেটমহলের পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছে। মাঝখান থেকে ঋদ্ধিমানের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার শেষ হয়ে গেছে। তারপর ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল (সিএবি) কর্তাদের ব্যবহারে আঘাত পেয়ে তিনি ত্রিপুরার হয়ে খেলতে চলে গিয়েছিলেন। শেষমেশ গ্যালারির ফাঁক দিয়ে ইডেন উদ্যানে শুভবুদ্ধির হাওয়া এসে পড়ে হাইকোর্ট প্রান্ত থেকে এবং সৌরভের কথায় (ঋদ্ধিমানের বয়ান অনুযায়ী) তিনি শেষ মরশুমটা বাংলার হয়ে খেলার সুযোগ পান।
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ঋদ্ধিমানের যে সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করলাম, তাতে অভিমানের সুর স্পষ্ট। তিনি বলেছেন “আমি বরাবর বিশ্বাস করেছি যে পারফরম্যান্সই একজন খেলোয়াড়ের পরিচয়, পাবলিক রিলেশন নয়।” বলা বাহুল্য, যুগটা বদলে গেছে। একটা ব্যাপার অবশ্য বদলায়নি – কলকাতার বাইরের বাঙালি সম্পর্কে বাঙালির উদাসীনতা।