রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন দলের কর্মীদের লড়তে হচ্ছে মার্কেট রিসার্চ কোম্পানির সঙ্গে? গরিব মানুষের গণতন্ত্র ভারতের জন্য এটা কি ভালো লক্ষণ?
অতি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রশান্ত কিশোর বলেছেন, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস এমন কিছু উন্নতি করেনি। কারণ দেশের ২০% মানুষ সংখ্যালঘু – ১৮% মুসলমান আর অন্যান্য সংখ্যালঘু আরও ২%। তারা কংগ্রেসের ‘ফ্রি ভোটব্যাংক’, আর কংগ্রেস পেয়েছে ২৩ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ সংখ্যালঘু বাদে মাত্র ৩% ভোটারের ভোট আদায় করতে পেরেছে রাহুল গান্ধির দল। এই তত্ত্বের আগাগোড়া সবটাই ভুল তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। যেহেতু তথ্যগুলোই ভুল, সেহেতু তত্ত্বটির একমাত্র ঠিকানা বাজে কাগজের ঝুড়ি।
প্রথমত, কংগ্রেস পেয়েছে ২১.১৯% ভোট (২০১৯ সালে পেয়েছিল ১৯.৪৬%)। দ্বিতীয়ত, সর্বশেষ আদমশুমারি অনুসারে মুসলমানরা এদেশের জনসংখ্যার ১৪.২%। তার সঙ্গে খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, আরও ছোট ছোট ধর্মের মানুষ এবং যাঁরা নিজেদের কোনও ধর্মের সঙ্গে যুক্ত বলেননি তাঁদের যোগ করলে তবে হয় ২০.২%। কিন্তু সংখ্যালঘুরা গোটা দেশে কংগ্রেস ছাড়া কাউকে ভোট দেন না – একথা একেবারে ভুল। পশ্চিমবঙ্গেই যেমন সেই ২০১১ সাল থেকে বেশিরভাগ সংখ্যালঘু মানুষ ভোট দিয়ে আসছেন তৃণমূল কংগ্রেসকে, তার আগে দিতেন বামফ্রন্টকে। তামিলনাডু সহ অনেক রাজ্যেই আঞ্চলিক দলগুলো বেশিরভাগ সংখ্যালঘুর ভোট পেয়ে থাকে। এবারেও পেয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা, জনসংখ্যার সকলেই ভোটার নাকি? শিশুরাও ভোট দেয়? তার উপর কংগ্রেস এবার লড়েছে ৩২৮ আসনে, কিন্তু ২০১৯ সালে লড়েছিল ৪২৩ আসনে। প্রায় একশো কম আসনে লড়ে কংগ্রেস ভোট বাড়িয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। আসন যে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। অতএব এটা ফেলে দেওয়ার মতো সাফল্য নয়।
এখন কথা হল, প্রশান্তের তত্ত্বটি যখন নেহাত আবর্জনা, তখন লেখার শুরুতেই এতগুলো শব্দ তা নিয়ে খরচ করলাম কেন? কারণ প্রশান্তকে যে ভারতীয় রাজনীতির একজন বিশেষজ্ঞ বলে মনে করা হয়, করণ থাপারের হাতে ল্যাজেগোবরে হওয়ার পরেও যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে এখনও উদ্গ্রীব, তার কারণ ভোট কুশলী হিসাবে তাঁর কীর্তি। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে প্রশান্ত বিখ্যাত হয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, ওই জয়ের কারিগর তিনিই। প্রশান্তের খ্যাতির সূত্রে ভারতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল এক নতুন পেশা, যার নাম ইংরেজিতে ‘ইলেকশন স্ট্র্যাটেজিস্ট’। বাংলায় ভোট কুশলী বলতে পারি।
ভোট কুশলী ব্যাপারটা দেখতে শুনতে এত ভালো যে বঙ্গে দিশেহারা বামপন্থীদের মধ্যেও কথাবার্তা শুরু হয়েছে – একজন প্রশান্ত বা সুনীল কানুগোলু (কংগ্রেসের ভোট কুশলী সংস্থা মাইন্ডশেয়ার অ্যানালিটিক্সের কর্ণধার) দরকার। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, তামিলনাডু, উত্তরপ্রদেশের মতো যথেষ্ট সংখ্যালঘু থাকা রাজ্যে কাজ করা সংস্থার একদা কর্ণধার প্রশান্তের মূর্খামি দেখে সেই বামপন্থীরা কী বুঝবেন জানি না, আমি যা বুঝলাম বলি।
হয় প্রশান্ত এতটাই কংগ্রেসবিদ্বেষী ও মুসলমানবিদ্বেষী যে বিদ্বেষে তাঁর বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়েছে। নয় তাঁর সাফল্যের পিছনে ১০০% কৃতিত্ব আইপ্যাকের সেইসব কর্মীদের, যাঁদের নাম কেউ জানে না। তিনি শুধু মাইনে করা কর্মীদের পরিশ্রম আত্মসাৎ করে নাম কিনেছেন। কিন্তু কর্পোরেট দুনিয়ায় এ তো প্রায় নিয়ম। ফলে তেমন হয়ে থাকলে রাজনীতির দিক থেকে ভাবনার কিছু নেই। তৃতীয় একটা সম্ভাবনা আছে, যা বেশি চিন্তার।
ব্যাপারটা কি আসলে এরকম, যে এই সংস্থাগুলো যা করে তা আসলে বিজ্ঞাপন জগতে যাকে ‘মার্কেট রিসার্চ’ বলে তার বেশি কিছুই নয়? লক্ষণীয়, আইপ্যাক বা মাইন্ডশেয়ার সেইসব মক্কেলকেই জেতাতে পেরেছে যারা জেতার অবস্থায় ছিল। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচন বিজেপি জিততই, কারণ ইউপিএ সরকারের প্রতি বিপুল অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। ২০২১ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন বিজেপি জিতে যাবে বলে যতই হাওয়া তৈরি হয়ে থাক, বিজেপির না ছিল সংগঠন, না ছিল মমতার সমতুল্য কোনও মুখ।
২০০৫ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে নীতীশ কুমারের সরকার যে অনেক কাজ করেছিল তা তাঁর অতি বড় শত্রুও অস্বীকার করে না। ফলে ২০১৫ সালে জেডিইউ-আরজেডি জোটের জয়ও এমন কিছু অত্যাশ্চর্য ব্যাপার ছিল না, খিঁচ ছিল নীতীশ মহাগঠবন্ধনে যোগ দেওয়ায়। তামিলনাডুর মানুষ পরপর দু’বার একই দলকে জেতান না। ১৯৮৪ সাল থেকে চলে আসা সেই ধারা ভেঙে এমনিতেই ২০১৬ সালে এআইএডিএমকে পরপর দু’বার জিতে গিয়েছিল। সুতরাং ২০২১ সালে ডিএমকের জয় প্রায় অনিবার্য ছিল। ২০১৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে কিন্তু সংগঠনহীন, কর্মসূচিহীন কংগ্রেস আইপ্যাকের সাহায্য নিয়েও সাতটার বেশি আসন জেতেনি। সুনীলও কি কংগ্রেসকে তেলেঙ্গানা জেতাতে পারতেন সংগঠন এবং রেবন্ত রেড্ডির মতো আক্রমণাত্মক নেতা না থাকলে? কর্ণাটক জেতা হত সিদ্দারামাইয়া আর ডিকে শিবকুমার ছাড়া?
অনেকে অবশ্য স্বীকার করেন যে এই সংস্থাগুলো বা তাদের কর্ণধাররা জাদুকর নন। কিন্তু তাঁদের মতে, এরা ‘ভ্যালু অ্যাড করে’। সে ভ্যালু কি পরিমাপযোগ্য? হলে প্রশান্তের মতো মহাপণ্ডিত কি ভ্যালু অ্যাড করেন? যদি পরিমাপযোগ্য না হয়, তাহলে কীসের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করছে এদের পিছনে? দলগুলোর টাকা মানে তো আসলে নাগরিকদেরই টাকা। কর্পোরেটগুলো পিছন দরজা দিয়ে যে চাঁদা দলগুলোকে দেয় (নির্বাচনি বন্ডেই হোক আর নগদেই হোক) সে টাকাও তো তারা উশুল করে নেয় নাগরিকদের পকেট থেকেই। শুধু তাই নয়, এই সংস্থাগুলোর পরামর্শেই তো আজকাল ক্ষমতাসীন দলগুলোর, অর্থাৎ রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ হচ্ছে। তাহলে কি কতকগুলো মার্কেট রিসার্চ কোম্পানি নির্ধারণ করছে আমাদের গণতন্ত্রের অভিমুখ?
এদের কাজের সীমা কতটুকু? কেউ বলেন, এরাই নাকি দলের প্রার্থীতালিকা থেকে নির্বাচনি প্রচার – সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আবার কিছুদিন আগে মমতা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আইপ্যাকের ভূমিকা নেহাতই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালানো। এসব গোপনীয় ব্যাপার, ফলে সম্যক জানা অসম্ভব। কিন্তু একটা ব্যাপারে সকলেই একমত। ভোট কুশলী সংস্থার আবশ্যিক কাজ হল মক্কেল পার্টির জন্য ভোটারদের সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ। তথ্য কাটাছেঁড়া করেই তারা দলগুলোকে পরামর্শ দেয় – এটা বলুন, ওটা বলবেন না। অমুক প্রকল্প চালু করুন, তমুক কাজে পার্টির ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।
সন্দেহ নেই, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে রাজনীতিতে সাফল্য পেতে গেলে তথ্য আর প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। সে কারণেই তো আইপ্যাকের প্রস্থানের পর ডিএমকে ভোট কুশলী হিসাবে নিযুক্ত করেছে পপুলাস এমপাওয়ারমেন্ট নেটওয়ার্ক (পেন)-কে। তবে আইপ্যাক বা মাইন্ডশেয়ারের সঙ্গে পেনের তফাত আছে। পেনের কর্ণধার এমকে স্ট্যালিনের জামাই ভি সবরীসন। এখনও পর্যন্ত পেন অন্য কোনও দলের হয়ে কাজ করেনি। তারা মূলত পার্টি এবং ডিএমকে সরকারের বার্তা ডিজিটাল উপায়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে। সেই লক্ষ্যে স্ট্যালিনের মোবাইল অ্যাপ বানিয়েছে তারা এবং মুখ্যমন্ত্রীর নিয়মিত পডকাস্ট চালু করেছে। কীভাবে মানুষের কাছ থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করে রাজনৈতিক কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে প্রশিক্ষণও দেয় ডিএমকে কর্মীদের। কিন্তু ডিএমকের রাজনীতি তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে, এমন অভিযোগ বা প্রশংসা এখনও অবধি শোনা যায়নি। অথচ তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আইপ্যাক নিচ্ছে – এমন অভিযোগ উঠেছে প্রশান্ত ছেড়ে যাওয়ার আগে ও পরে।
আবার মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থানের নির্বাচনে সুনীল কাজ করুন – এমনটা নাকি সেখানকার কংগ্রেস নেতারা চাননি। তাহলে রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন দলের কর্মীদের লড়তে হচ্ছে মার্কেট রিসার্চ কোম্পানির সঙ্গে? গরিব মানুষের গণতন্ত্র ভারতের জন্য এটা কি ভালো লক্ষণ?
হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর গ্রামে-মফস্সলে ছড়িয়ে আছেন আরও অনেকে, যাঁদের ফলোয়ার রবীশ, ধ্রুব, আকাশ, কুণাল, সমদীশদের চেয়ে অনেক কম। তাঁদের কারও একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে, কারও স্রেফ একটা ফেসবুক পেজ। কিন্তু গ্রামের যে সামান্য লেখাপড়া জানা বা নিরক্ষর মানুষের কাছে ইংরেজি ভাষায় কাজ করা প্রগতিশীলরা পৌঁছতে পারেন না, তাঁদের মধ্যে বিষ ঢোকা আটকাতে বা বিষ ঝাড়তে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই অখ্যাত মানুষগুলোর।
বেঙ্গালুরু নিবাসী আমার এক বন্ধুপত্নীর অভিজ্ঞতা বলি। সে একটি বাচ্চাদের স্কুলের দিদিমণি। বছর ছয়েকের এক ছাত্রীকে তার একটু বেশি মিষ্টি লাগে, মেয়েটিরও দিদিমণিকে বেশ পছন্দ। একই রুটের বাসে তাদের বাড়ি ফেরা। ফলে দু’জনের মধ্যে স্কুলের বাইরেও কথাবার্তা হয়। সেই মেয়েটি হঠাৎ একদিন দিদিমণিকে অনুরোধ করে বসল– ‘আমার একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে। আপনি প্লিজ সাবস্ক্রাইব করুন।’ হতচকিত দিদিমণি পরে করবেন বলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরদিন আবার মেয়েটি ধরল, তার পরদিন আবার। কতবার না বলা যায়? একটা ছোট মেয়েকে প্রত্যাখ্যান করতে খারাপও লাগে। কিন্তু শেষমেশ বিরক্তি জিতে গেল। দিদিমণি বলতে বাধ্য হলেন– ‘আমাকে এই অনুরোধ কোরো না।’
এমন অভিজ্ঞতা আজকাল পশ্চিমবঙ্গেও অনেকের হয়। ইউটিউব ঘাঁটলেও দেখা যায়, সারা পৃথিবীর দুধের শিশু থেকে লোলচর্ম বৃদ্ধ পর্যন্ত সকলেরই নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল আছে। যার চ্যানেলে যা আপলোড করা হয়, তা যতই অপ্রয়োজনীয় হোক, দেখার লোকও আছে। ব্যাপারটা স্রেফ অপ্রয়োজনীয়তায় আটকে থাকলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু ইউটিউব এমন এক মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দিয়ে ফেসবুক বা টুইটারের মতোই ঘৃণা ছড়ানোর কাজও করা হচ্ছে। সাংবাদিক কুণাল পুরোহিত আস্ত একখানা বই লিখেছেন, কীভাবে কিছু ইউটিউব চ্যানেল মুসলমানবিদ্বেষে পরিপূর্ণ গানের ভিডিও তৈরি করে প্রত্যন্ত এলাকাতেও অসংখ্য মানুষকে প্রতিদিন আরও হিংস্র করে তুলছে, তা নিয়ে। বইয়ের নাম ‘H-POP: THE SECRETIVE WORLD OF HINDUTVA POP STARS’। এ জিনিসটা কেবল ভারতেই হচ্ছে এমন নয়। সব দেশেই ইউটিউব ঘৃণা ছড়ানোর চমৎকার অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়।
২০১৬ সালে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন দেখা গিয়েছিল যে ইউটিউব সমেত সোশাল মিডিয়া তাঁর প্রচারে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তারা বর্ণবিদ্বেষ এবং কুৎসা তো আটকাচ্ছেই না; উল্টে ওসব ছড়াতে সাহায্য করছে। ফেসবুকের মালিক মেটা আর ইউটিউবের মালিক গুগল– দুই কোম্পানির বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ আছে; যেমন আছে আড়ি পাতার অভিযোগ, ব্যবহারকারীদের অজান্তে তাদের তথ্য বিক্রি করে মুনাফা করার অভিযোগ। এসব প্রায় সবাই জানে। তবু বহু মানুষ ইউটিউবকে ব্যবহার করেই কিছু বৃহত্তর ভালো কাজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সারা পৃথিবীতেই নির্বাচনী গণতন্ত্রের সংকট চলছে, বড় বড় দেশগুলোর শাসকদের মধ্যে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁরা সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করছেন, ভারতের মতো দেশে সংবাদমাধ্যমগুলোও মুনাফার লোভে সরকারের মুখপত্রে পরিণত হচ্ছে। দিনরাত মিথ্যাচার এবং ঘৃণাভাষণের এই ঢেউয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সত্য তুলে ধরার কাজে ঋজু বিদূষক এবং স্বাধীন সাংবাদিকরা ব্যবহার করছেন ইউটিউবকে। বস্তুত বিদূষক আর সাংবাদিকের সীমানা মুছে যাচ্ছে। ট্রাম্পের আমলে তাঁর অন্যতম শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জন অলিভার, হাসান মিনহাজ, ট্রেভর নোয়ার মতো বিদূষকরা। তাঁদের শো প্রায় নিউজ বুলেটিনই। লোক হাসাতেও তাঁরা খবরকেই ব্যবহার করেন। ২০২৪ সাধারণ নির্বাচনে ভারতেও ঠিক তাই ঘটতে দেখা গেল।
সত্যি কথা বলতে, এবারের নির্বাচনে ধ্রুব রাঠি, রবীশ কুমার, আকাশ ব্যানার্জি, কুণাল কামরারা তাঁদের চ্যানেলের মাধ্যমে যে কাজ করলেন, তা মার্কিন দেশের ইউটিউবারদের থেকে ঢের বেশি কঠিন ছিল। কারণ ও দেশে ট্রাম্পের আমলে আদালত, নির্বাচন কমিশন, সেনাবাহিনী এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যম রামলালার সামনে মোদির সাষ্টাঙ্গ প্রণামের মতো ট্রাম্পের সামনে শুয়ে পড়েনি। ট্রাম্পকে পদে পদে প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ফলে বাকস্বাধীনতা এ দেশের মতো অতখানি বিপদে পড়েনি, বিদূষক বা সাংবাদিকদের পদে পদে গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে থাকতে হয়নি। কিন্তু এদেশে কুণালের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে, একাধিক বিদূষকের শো বাতিল করতে হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক গুন্ডাদের আক্রমণে, নিত্য তাঁদের হুমকি সহ্য করতে হয়েছে। মুনাওয়ার ফারুকির মতো ঋজু বিদূষক গ্রেফতারও হয়েছেন। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত মোট কতজন সাংবাদিক গ্রেফতার হয়েছেন, খুন হয়েছেন তার তালিকা করতে বসলে রামায়ণে কুলোবে না, মহাভারত হয়ে যাবে। সিদ্দিক কাপ্পানের মতো কেউ কেউ যে প্রতিবেদন লেখাই হয়নি, তার জন্যও গ্রেফতার হয়েছেন। সাতবছর আগে খুন হওয়া গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকারীরা আজও অধরা। রবীশের মতো সাংবাদিকদের চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্য আস্ত চ্যানেল কিনে নিয়েছে সরকারবান্ধব পুঁজিপতিরা।
এতৎসত্ত্বেও রবীশ কেবল তাঁর চ্যানেলের গ্রাহকদের টাকায়, সামান্য সংস্থান আর ছোট্ট একটা দল নিয়ে যে সাংবাদিকতার নিদর্শন রাখলেন, তা ঐতিহাসিক। কুণাল আর আকাশ তো নির্বাচনের আগে পুরোদস্তুর সাংবাদিক হয়ে গেলেন। কুণাল দশবছর ধরে মোদি সরকার কী কী করেছে আর করেনি, তা নিয়ে রিপোর্ট কার্ড সিরিজ করলেন। পর্বগুলোর শেষে তিনি মনে করাতেন– যেভাবে দেশ চালানো হয়েছে তাতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদির জায়গায় খালি চেয়ার রাখলেও চলবে। নতুন টেলিকম আইনে কীভাবে বিকল্প সংবাদমাধ্যম, ইউটিউবার, ইনস্টাগ্রামারদেরও কণ্ঠরোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা নিয়ে আকাশের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। সেই ভাইরাল ভিডিওতে তিনি ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) সম্পর্কেও দর্শকদের সচেতন করেন। তারপর ধ্রুবর প্রচণ্ড ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে তাঁর সাক্ষাৎকার নেন, যথার্থ সাংবাদিকের মতোই তাঁকে ব্যাখ্যা করতে বলেন– কেন তিনি বলছেন ভারত একনায়কতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে। আর ধ্রুব যা করেছেন, তা নিয়ে তো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলাদা করে চর্চা হচ্ছে। বিপুল জনপ্রিয় ইউটিউবার তো অনেকেই আছেন, কিন্তু দেশের বিপদ দেখে নিজের নিশ্চিন্ত কোণ ছেড়ে বেরিয়ে এসে সরাসরি ক্ষমতাকে আক্রমণ করার ঝুঁকি কি সকলে নেয়?
এখনও তিরিশে পা না দেওয়া ধ্রুব যদিও জার্মানিতে থাকেন, তিনি ভারতের নাগরিক। তাঁর পরিবার পরিজনও এখানে আছেন। সেক্ষেত্রে এতখানি ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি মোদির বিরুদ্ধে রীতিমতো প্রচারাভিযান চালানো কম সাহসের কাজ নয়। ধ্রুব এমনিতে তেমন বৈপ্লবিক চিন্তাধারার লোক নন, অতীতে অনেক ব্যাপারেই তিনি বিজেপিকে সমর্থন করে ভিডিও বানিয়েছেন। সংবিধানের ৩৭০ নং অনুচ্ছেদ বাতিল করাও তিনি সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু এই নির্বাচনে তাঁর অবদান ভোলার নয়।
পাঞ্জাবি যুবক সমদীশ ভাটিয়া ইউটিউবার হিসাবে প্রথম জনপ্রিয় হন ২০২০-’২১ সালে দিল্লি শহরকে ঘিরে কৃষক আন্দোলনের সময়ে। আন্দোলনকারীদের ভিতরে চলে গিয়ে তাঁদের কথা তিনি তুলে আনতেন। মাঝে কিছুদিন সিনেমা জগতের বিখ্যাতদের লম্বা লম্বা সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন, যার জন্য তাঁর শো-তে এসে নির্দেশক দিবাকর ব্যানার্জি ঈষৎ ক্ষোভও প্রকাশ করেন। এবার নির্বাচনের মুখে সমদীশ আবার স্টুডিও ছেড়ে ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ভারত খুঁজতে। কখনও সে ভারত দিল্লি শহরের একেবারে মাঝখানে, অথচ মানুষ সেখানে জঞ্জালের মধ্যে বেঁচে আছে। কখনও সে ভারত বিহারের এক গ্রাম, যেখানে হরিজনরা এখনও হ্যান্ড পাম্পে হাত দিলে হাঙ্গামা বেধে যায়।
এমন আরও অনেকে আছেন। হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর গ্রামে-মফস্সলে ছড়িয়ে আছেন আরও অনেকে, যাঁদের ফলোয়ার রবীশ, ধ্রুব, আকাশ, কুণাল, সমদীশদের চেয়ে অনেক কম। তাঁদের কারও একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে, কারও স্রেফ একটা ফেসবুক পেজ। কিন্তু গ্রামের যে সামান্য লেখাপড়া জানা বা নিরক্ষর মানুষের কাছে ইংরেজি ভাষায় কাজ করা প্রগতিশীলরা পৌঁছতে পারেন না, তাঁদের মধ্যে বিষ ঢোকা আটকাতে বা বিষ ঝাড়তে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই অখ্যাত মানুষগুলোর। তাঁদের অনেকের ইউটিউবার বা সাংবাদিক তকমা নেই। কেউ কেউ দিন গুজরান করেন আসলে দিল্লি, মুম্বইয়ের বড় সংবাদমাধ্যমকে খবর সরবরাহ করার বিনিময়ে অতি সামান্য টাকা পেয়ে। সেই টাকায় সংসার চালিয়ে, তা থেকেই খরচ করে এসব করেন কোন তাগিদে, তা আমাদের মতো আলোকপ্রাপ্ত বাঙালিদের পক্ষে বোঝা প্রায় অসম্ভব।
পশ্চিমবঙ্গে কি ইউটিউবার নেই? কয়েক হাজার ইউটিউবার আছেন। তবে তাঁদের অধিকাংশ হাসি-মশকরায় ব্যস্ত। কেউ ক্রমশ ছোট হয়ে আসা টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কেষ্টবিষ্টুদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ফলোয়ার বাড়ান, রোজগার করেন। বাংলার যে প্রবীণ সাংবাদিকরা ইউটিউব চ্যানেল চালান তাঁদের মধ্যেও রবীশের মতো মেরুদণ্ড এবং অধ্যবসায় বিরল। তবু সাংবাদিকদের মধ্যে আছেন দু’-একজন, কিন্তু বিশুদ্ধ ইউটিউবারদের কথা না বলাই ভালো। ফলে বাঙালির ইউটিউব চ্যানেল মানে সাধারণত রান্নার চ্যানেল বা বেড়ানোর জায়গার সুলুকসন্ধান দেওয়ার চ্যানেল। নয়তো সংস্কৃতির ঢাক তেরে কেটে তাক তাক। বাঙালি তো শিল্পী হয়েই জন্মায়। ফলে গান, নাচ, আবৃত্তিতে ইউটিউব ভরিয়ে দেয় বুকের দুধ খাওয়ার বয়সটা পার হলেই। এছাড়া যা আছে তা স্রেফ আবর্জনা। হয় অর্থহীন, নয় ঘৃণা ছড়ানোর প্রয়াস।
এমনিতেই ভারতের বিরাট অংশের মানুষের ভাষা হিন্দি। তাঁদের প্রভাবিত করতে না পারলে যে ভালো বা মন্দ কোনও কাজই এদেশে করা সম্ভব নয়, তা বলা বাহুল্য। কিন্তু সেকথা এদেশের আলোকপ্রাপ্তদের সচরাচর মনে থাকে না। অথচ গণতন্ত্র বাঁচানোর জন্যে যে শহর থেকে, সংবাদমাধ্যম থেকে সবচেয়ে দূরে থাকা মানুষটার কাছেও সত্য পৌঁছে দিতে হবে, সব ভাষার মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে– তা রবীশ, ধ্রুবরা বুঝতে পেরেছিলেন। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হিন্দি বাদে অন্য ভাষাতেও নিজেদের ভিডিও প্রকাশ করেছেন। আবার যে হিন্দিতে সংবাদমাধ্যমের কথাবার্তা চালানো হয়, সেই হিন্দি সকলের বোধগম্য নয় বুঝে রবীশ আলাদা করে ভোজপুরী ভাষাতেও ভিডিও প্রকাশ করেছেন।
এই সুদূরপ্রসারী চিন্তা, এই যত্ন বাংলায় কোথায়? বাঙালিরা কেবল রবীশদের বাংলা ভিডিও দেখে হিন্দি আগ্রাসনের তত্ত্ব কপচাতে পারে। নিজেরা নিজের ভাষাকে বুকনি ছাড়া আর কিছু দিতে রাজি নয়।
এই লেখা যখন লিখছি, ততক্ষণে প্রমাণ হয়ে গেছে যে মোদীর গ্যারান্টিতে খুব বেশি ভারতীয় নাগরিক বিশ্বাস করেননি। হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্নেও খুব বেশি মানুষের গায়ে পুলক লেগে চোখে ঘোর ঘনায়নি। একাই তিনশোর বেশি এবং জোটে সাড়ে তিনশোর বেশি আসনের কৈলাস পর্বত থেকে ভোটাররা পরমাত্মা নরেন্দ্র মোদীকে টেনে নামিয়েছেন জোট রাজনীতির মাটিতে। তবে যেহেতু বিজেপি নেতৃত্বাধীন প্রাক-নির্বাচনী জোট ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) ২৭২ আসনের বেশি পাচ্ছে, তাই হয়ত ফের মোদী তাঁর প্রিয় আসনে বসতে পারবেন। অবশ্য মোদী-অমিত শাহের ভয়ে যাঁরা এতদিন এনডিএতে ছিলেন, তাঁরা ভয় কমে যেতেই যদি কেটে পড়ার তাল করেন তাহলে অনেককিছু ঘটতে পারে। তা যদি না-ও ঘটে, বিজেপিই যে একক বৃহত্তম দল হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই একে তারা জয় বলে দাবি করতেই পারে, যতই তাদের তৈরি আলেখ্য স্পষ্টত প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাক। কিন্তু এ লেখা ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে যারা হেরে ভূত হয়ে গেছে তাদের কথা বলার জন্যে। মূলধারার সংবাদমাধ্যম, বিশেষত জনপ্রিয় খবরের চ্যানেলগুলোর কথা বলছি।
২০১৪ সাল থেকে কারা গোদি মিডিয়া হয়ে গেছে তা আজ কাউকে নতুন করে বলে দেওয়ার দরকার নেই। যেসব সংবাদমাধ্যমকে সচরাচর ওই তালিকায় ফেলা হয় না, আজও নিরপেক্ষ বলেই মনে করেন বিজেপিবিরোধী দর্শকরা, তারাও গত এক-দেড় বছরে ভোল বদলেছে। গোদি মিডিয়ার হত্তাকত্তারা নিউজক্লিকের দিকে, অন্য বিকল্প সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের দিকে সিবিআই, ইডিকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের নির্যাতনে উল্লসিত হয়ে নানা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব প্রচার করে আহ্লাদিত হয়েছিলেন। আর তথাকথিত নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম প্রবীর পুরকায়স্থের মত সাংবাদিকদের সমর্থনে টুঁ শব্দ করেনি। বাংলায় তো রিপাবলিক বাংলা ছাড়া গোদি মিডিয়া নেই বলা হয়। নিন্দুকেরা বলে এখানে দিদি মিডিয়া আছে। তা সত্যি মিথ্যা যা-ই হোক, কোনো মিডিয়াই আর পাঁচটা গ্রেফতারির খবরের মত করে সংবাদটি পাঠক/দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বেশি তেমন কিছু করেনি। বাংলার স্বনামধন্য (অনেকের মত কিংবদন্তি) সাংবাদিকরা নিজেদের ব্লগে বা ভ্লগে, মায় ফেসবুক পোস্টেও এর প্রতিবাদ করেননি। সংবাদমাধ্যমের উপর রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের কালে নীরবতা অবশ্যই সম্মতির লক্ষণ। কারা নীরব ছিলেন মনে করে দেখুন। গোদি মিডিয়া সমেত তাঁদেরও উলঙ্গ করে দিল নির্বাচনের ফল, কারণ মাত্র তিনদিন আগে তাঁদেরই চ্যানেলে চ্যানেলে বুথফেরত সমীক্ষায় ৩০০-৪০০ আসন দিয়ে জিতিয়ে দেওয়া হয়েছিল মহামতি মোদীকে।
কেবল জিতিয়ে দেওয়া হয়েছিল বললে অবশ্য কিছুই বলা হয় না। বুথফেরত সমীক্ষা আর পাঁচটা সমীক্ষার মতই একটা সমীক্ষা মাত্র। তাতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই। আজ যখন ইন্ডিয়া টুডের স্টুডিওতে অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়া সংস্থার প্রধান প্রদীপ গুপ্তা এসে নিজের পাহাড়প্রমাণ ভুলের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কেঁদেই ফেললেন, তখন রাজদীপ সরদেশাই, রাহুল কাঁওয়ালরা পরম স্নেহে তাঁর গায়ে হাত বুলিয়ে তাঁকে বোঝাচ্ছিলেনও বটে, যে মানুষ মাত্রেই ভুল করে।
Watch the moment when Axis My India chief @PradeepGuptaAMI broke down.
কিন্তু মুশকিল হল, এর চেয়ে অনেক ছোট ভুলে টিভি চ্যানেলে বা খবরের কাগজে একজন সাংবাদিককে বিস্তর কৈফিয়ত দিতে হয়, লিখিত শোকজের জবাব দিতে হতে পারে, চাকরি পর্যন্ত চলে যেতে পারে। ২০২০-২১ সালে ভারতের যেসব সংবাদমাধ্যম করোনা অতিমারীর দোহাই দিয়ে কয়েক হাজার সাংবাদিককে ব্যবস্থা উদ্বৃত্ত ঘোষণা করে ছাঁটাই করেছিল, তারাই টাকা খরচ করে এইসব বুথফেরত সমীক্ষা করিয়েছে এবং প্রচার করিয়েছে। যে সাংবাদিকরা ছাঁটাই হয়েছিলেন, তাঁরা কেউই কখনো অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়ার প্রদীপ বা সি-ভোটারের যশবন্ত দেশমুখের চেয়ে বড় ভুল করেননি। করলে চাকরি আগেই যেত। অবশ্য যদি গুপ্তা, দেশমুখরা সত্যিই ভুল করে থাকেন।
একসঙ্গে সমস্ত বুথফেরত সমীক্ষাকারী সংস্থাই ভুল করতে পারে, যেমন ২০০৪ সালে করেছিল। আবার সব সংস্থা এক ভুলও করতে পারে। কিন্তু সব সমীক্ষাকারী সংস্থা একসঙ্গে একই ভুল করলে সেটা কাকতালীয় ঘটনা হিসাবে বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। বিশেষ করে সব সমীক্ষাতেই যদি স্রেফ কোথায় কটা আসন আছে সেই তথ্যে ভুল থাকে বা কোন দল কটা আসনে লড়ছে সেই তথ্যে ভুল থাকে। গোদি মিডিয়া অবশ্য সেখানেও থামেনি। প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা বা বুথফেরত সমীক্ষা যে কোনোভাবেই নির্বাচনের ফল নয়, সেকথা বারবার করে দর্শকদের বলাই দস্তুর। অথচ এবারের বুথফেরত সমীক্ষায় ইন্ডিয়া জোট তথা কংগ্রেস গোহারান হারছে দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে মোদী তৃতীয় মেয়াদে কী কী করবেন, ভারতকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন – এসব গভীর আলোচনাও চালানো হয়েছে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে। আজ তক নেটওয়ার্কের বিখ্যাত গোদি অ্যাঙ্কর অঞ্জনা ওম কাশ্যপ রীতিমত নাকের পাটা ফুলিয়ে লাইভ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তাঁদের মত বড় চ্যানেলে বিরোধীদের কোনো পরিসরই দেওয়া উচিত নয়।
Anjana Om Kashyap: Hume Aaj Tak jaise channel pe Opposition ke issues space nahi Dena chahiye.
এই সাংবাদিকের যে সাংবাদিকতা করা উদ্দেশ্য নয়, তার এর চেয়ে বড় কোনো প্রমাণ হয় না। লোকসভায় বিরোধীদের শক্তিবৃদ্ধির পর কী করবেন অঞ্জনা? সে তিনি ভাববেন, কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না যে অঞ্জনা বরং সরল বা বোকা বা উদ্ধত। তাই প্রকাশ্যে ওকথা বলেছেন। তাঁর চেয়ে চালাক চতুর সাংবাদিকরাও একই উদ্দেশ্যে কাজ করেন, তবে ভান করতে জানেন। গত এক দশকে ভারতের প্রায় প্রত্যেক সংবাদমাধ্যমের মালিক এই ধরনের মেধাহীন, অর্ধশিক্ষিত সাংবাদিকদেরই দায়িত্বপূর্ণ পদে উন্নীত করেছেন। সত্যিকারের সাংবাদিকদের হয় রবীশ কুমার বা পুণ্য প্রসূন বাজপেয়ীর মত নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল খুলতে হয়েছে, নয় মুখ বুজে পরিবার পরিজনের কথা চিন্তা করে ফ্যাসিবাদীদের হয়ে দিনরাত মিথ্যা প্রচারের কাজই করে যেতে হয়েছে। তৎসত্ত্বেও ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়েছে, কখন মুনাফাখোর মালিকের মনে হয় – এত সাংবাদিক আমার দরকার নেই। শেষ দফার নির্বাচনের পরে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা ভিডিওতে রবীশ বলেছেন যে চ্যানেলগুলোতে খরচ কমাতে রিপোর্টার যত কমানো হয়েছে, তত রমরমা হয়েছে অঞ্জনা জাতীয় অ্যাঙ্করদের। অর্থাৎ খবরকে এক ধরনের অসুস্থ বিনোদনে পরিণত করে মানুষের মন বিষিয়ে দেওয়া এবং সরকারকে, মোদীকে দোষগুণের অতীত এক সত্তা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার কাজই করে গেছে টিভি চ্যানেলগুলো। দিনরাত মোদীকে দেখানো, বিরোধীদের প্রায় না দেখানো, দেখালেও তাদের বক্তব্য এমনভাবে বিকৃত করা যাতে মোদীর সুবিধা হয় – এইসব কৌশল ইদানীং মোদীভক্তরাও বুঝে ফেলছিলেন। পুরাণে নির্মোক নৃত্যের কথা লেখা আছে, আজকাল যাকে বলা হয় স্ট্রিপটিজ। ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের এক দশকব্যাপী এই স্ট্রিপটিজে কোমরে যে সরু অন্তর্বাসটুকু বাকি ছিল, সেটুকুও খুলে ফেলা হল এবারের বুথফেরত সমীক্ষায়।
আসল ফল যে অন্যরকম হবে, একথা প্রায় সব সাংবাদিক জানতেন। কিন্তু নিজের সংস্থার সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা ও নৈপুণ্যকে পাত্তা না দিয়ে বিপুল টাকা খরচ করে (নাকি অন্য কারোর অর্থানুকূল্যে?) এই বুথফেরত সমীক্ষাগুলো করিয়ে প্রকাশ করা হয়েছিল ১ জুন ২০২৪। অঞ্জনা, সুধীর চৌধুরী বা রাহুল কাঁওয়ালের মত অন্ধ সাংবাদিক ভেকধারীদের অবশ্য অভিজ্ঞতা বা নৈপুণ্য – কোনোটাই নেই। তাঁরা অত উপরে উঠেছেন মেধাহীন বদমাইশি নির্লজ্জভাবে করতে পারেন বলেই। ৪ জুন ২০২৪ কেবল প্রদীপ বা যশবন্ত নন, কেবল গোদি সাংবাদিকরাও নন, উদোম হয়ে গেলেন তাঁদের নিয়োগকারীরা। সবার চোখে ধরা পড়ে গেল, তাঁরা আসলে কিসের ব্যবসা করেন।
তবে ও ব্যবসায় কিন্তু কেবল মার্কামারা গোদি মিডিয়াই যুক্ত তা নয়। যদি তা হত, তাহলে গত কয়েক মাসে তৃণমূল কংগ্রেসের সবেতেই দোষ দেখা এবং বিজেপির সবেতেই গুণ দেখা অতি বুদ্ধিমান সুটবুট পরা বাঙালি বাবু সুমন দে ওই বুথফেরত সমীক্ষা নিজের চ্যানেলে নিশ্চয়ই দেখাতে দিতেন না। মনে রাখবেন, সুমন দে-র মত বিভিন্ন চ্যানেলে সর্বেসর্বা যে অ্যাঙ্কররা আছেন তাঁরা প্রায় প্রত্যেকে কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের অংশ। সাধারণ কর্মচারী নন। রাজদীপ সরদেশাইদের প্রজন্ম মাথার সব চুল পেকে গেলেও মুশাহারদের গ্রামে চলে যান খবর করতে। আজকের রাহুল কাঁওয়াল বা সুমন দে-রা রিপোর্টিং বলতে বোঝেন ঠান্ডা ঘরে বসে অমুক নেতা, তমুক নেতার সাক্ষাৎকার নেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে সেই সাক্ষাৎকারে বিশেষ কিছুই করার থাকে না। কারণ আগেই স্থির করা থাকে যে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ভান করতে করতে আসলে নেতা আপন মনে শেক্সপিয়ারের চরিত্রের মত যা খুশি বলে যাবেন, সাংবাদিক ক্লাসের ফার্স্ট বয়ের মত মুখ করে শুনে যাবেন আর মাঝে মাঝে দন্তবিকাশ করে গল্প হলেও সত্যি ছবির ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত জানান দেবেন ‘থেমো না দাদা, বলে যাও। বড় ভাল বলছ।’
এ কাজ যে যত ভাল করতে পারে, মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এখন তার তত দাম। সংসদে বিরোধীদের শক্তি বেড়ে যাওয়ায় এবার কিন্তু এই জাতের সাংবাদিকতা বিপদে পড়বে। কারণ দর্শকদের মধ্যে ইতিমধ্যেই ক্লান্তি এসেছে। সরকারভক্ত দর্শক/পাঠকরাও ইদানীং সেই কারণেই বিকল্প সংবাদমাধ্যম – অর্থাৎ ছোট-বড় ওয়েবসাইট, ইউটিউবার, ফেসবুকারদের দিকে ঝুঁকছেন। সরকারের শক্তি কমে যাওয়ার একটা মানে হল উলটো বয়ান শুনতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। আরেকটা মানে হল, আগামীদিনে ওই সংখ্যা আরও বাড়বে। কেবল ময়ূখ ঘোষদের নয়, সুমন দে-দেরও সাবধান হওয়ার সময় বোধহয় এসে পড়ল।
২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন।
ভালমানুষ রাহুল দ্রাবিড় আর পেরে উঠছেন না। তাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড পুরুষদের জাতীয় দলের নতুন কর্ণধারের খোঁজ করছে। শোনা যাচ্ছে বোর্ড একজন শাঁসালো কোচ চায়। স্টিফেন ফ্লেমিংকে নাকি মহেন্দ্র সিং ধোনি রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। রিকি পন্টিংকে নাকি বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি রাজি নন। জাস্টিন ল্যাঙ্গারও রাজি হচ্ছেন না বলে শোনা যাচ্ছে। এসব অবশ্য নেহাত গুজব বলে বিবৃতি দিয়েছেন বোর্ডের সর্বেসর্বা জয় শাহ। তবে গৌতম গম্ভীরের নাম যে উঠে এসেছে, এই প্রচার সম্পর্কে কিছু বলেননি। এই কাজের জন্যে ওই নামটি কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক।
গৌতম সত্যিই গম্ভীর। তাঁকে চট করে হাসতে দেখা যায় না। সম্প্রতি রবিচন্দ্রন অশ্বিনের পডকাস্টে এসে গৌতম বলেছেন ‘লোকে আমার হাসি দেখতে আসে না। আমার জয় দেখতে আসে।’ ফুর্তিবাজ রবি শাস্ত্রীর সঙ্গে এতবছর ঘর করার পরে রোহিত শর্মা, বিরাটরা কি এত গম্ভীর লোকের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারবেন? গুরুতর প্রশ্ন।
গম্ভীরের কথা উঠলেই এসে পড়ে বিরাটের কথাও। দুজনেই দিল্লির ছেলে। শুধু জাতীয় দল নয়, রঞ্জি দলেও একসঙ্গে খেলেছেন। কিন্তু সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়। প্রাক্তন ক্রিকেটারদের যে কজন আজও বিরাটের ব্যাটিংয়ের সমালোচনা করার সাহস দেখান, গম্ভীর তাঁদের একজন। গতবছর আইপিএলে গম্ভীরের তখনকার দল লখনৌ সুপার জায়ান্টস আর বিরাটের রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর ম্যাচের পর তো হাতাহাতির উপক্রম হয়েছিল। ভারতীয় ক্রিকেটের বর্তমান মহাতারকার সঙ্গে এমন সম্পর্ক যাঁর, তিনি কী করে দল চালাবেন? কুম্বলের সময়ে অবশ্য বিরাট অধিনায়ক ছিলেন, এখন সে ঝামেলা নেই। কিন্তু এই প্রজন্ম তো আবার সৌরভ গাঙ্গুলিদের প্রজন্ম নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাত্র হাজার নয়েক রানের মালিক জন রাইট তাঁর ইন্ডিয়ান সামার্স বইয়ে লিখেছেন, ভারতীয় দলের কোচ থাকার সময়ে তিনি একবার খারাপ শট খেলে আউট হওয়ার জন্যে রাগের চোটে বীরেন্দ্র সেওয়াগের কলার ধরেছিলেন, মারতে গিয়েছিলেন। অথচ সেই ঘটনা দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার বহুবছর পরে রাইট নিজেই লেখার আগে কেউ জানতেও পারেনি। আজ এর অর্ধেক ঘটলেও সোশাল মিডিয়ায় ‘সূত্রের খবর’ বলে ঘটনাটা ভাইরাল হবে, বোর্ড বিবৃতি দেবে এমন কিচ্ছু ঘটেনি। কিন্তু কোচের চাকরিটি চলে যাবে।
গম্ভীর যে কোচ হওয়ার যোগ্য তাতে সন্দেহ নেই। ২০০৭ আর ২০১১ – দুই ধরনের ক্রিকেটে ভারতের দুই বিশ্ব খেতাব জয়েই তাঁর বড় অবদান ছিল। দুটো ফাইনালেই তিনি সর্বোচ্চ রান করেন। আটান্নটা টেস্ট ম্যাচেও তাঁর কীর্তি ফেলে দেওয়ার মত নয়। আর কিচ্ছু না করে শুধু যদি ২০০৯ সালে নিউজিল্যান্ডের নেপিয়ারে এগারো ঘন্টা ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচানো ইনিংসটাই খেলতেন, তাহলেও তাঁর নাম ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে লেখা থাকত। তার উপর তিনি দুবার কলকাতা নাইট রাইডার্স অধিনায়ক হিসাবে আইপিএল খেতাব জিতেছেন। লখনৌ সুপার জায়ান্টস তাঁর মেন্টরশিপে আইপিএলে যোগ দিয়েই শেষ চারে পৌঁছেছিল। ফলে দল চালানোর ক্ষমতা যে তাঁর আছে, তা নিয়েও সংশয় নেই।
কিন্তু ভারতীয় দল আর পাঁচটা দলের চেয়ে আলাদা। অস্ট্রেলিয় ল্যাঙ্গার অতশত বোঝেন না। তিনি সরল মনে সংবাদমাধ্যমকে বলে বসেছেন, কে এল রাহুল নাকি তাঁকে বলেছেন – আইপিএলের দলে যদি চাপ আর রাজনীতি আছে বলে মনে করো, সেটাকে হাজার দিয়ে গুণ করলে তবে ভারতীয় দলের কোচিং কীরকম চাপের সেটা বুঝতে পারবে। তাই ল্যাঙ্গার ঠিক করেছেন ও কাজ তাঁর জন্যে নয়।
বলে ফেলার জন্যে রাহুলের হয়ত গর্দান যাবে, কিন্তু কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। প্রসিদ্ধ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পত্রিকা উইজডেন-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায় বর্ষীয়ান সাংবাদিক শারদা উগ্রা ‘মোদী অপারেন্ডি: দ্য পলিটিসাইজেশন অফ ইন্ডিয়ান ক্রিকেট’ শীর্ষক নিবন্ধে সবিস্তারে লিখেছেন, কীভাবে ক্রিকেট বোর্ডকে বিজেপি দলের একটা ইউনিটে পরিণত করা হয়েছে। ২০২৩ বিশ্বকাপকেও কীভাবে বিজেপির স্বার্থে চালানো হচ্ছিল। সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা – ২০২৩ বিশ্বকাপে পাকিস্তান ম্যাচে নীল জার্সির বদলে সম্পূর্ণ গেরুয়া জার্সি পরতে বলা হয়েছিল ভারতীয় দলকে। কিন্তু ক্রিকেটাররা বেঁকে বসেন। কেন? শারদা দুটো সূত্র থেকে দুরকম খবর পেয়েছেন। একটা বলছে, ক্রিকেটাররা ওই জার্সি বাতিল করেন জার্সিটা হল্যান্ডের মত দেখতে বলে। দ্বিতীয়টা বলছে, ক্রিকেটাররা বলেন – এ কাজ আমরা করব না। এতে আমাদের দলের ক্রিকেটারদেরই অসম্মান করা হবে। কারণ ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ দৃশ্যতই হয়ে দাঁড়াবে হিন্দু বনাম মুসলমান ম্যাচ। অথচ ভারতীয় দলে আছেন মহম্মদ শামি আর মহম্মদ সিরাজ। অনেক পাঠকের হয়ত খেয়াল আছে, ওই গেরুয়া জার্সির ছবি সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিল। তখন বোর্ডের হিসাবরক্ষক বলেছিলেন, ওটা ভুয়ো। কিন্তু শারদা লিখেছেন, দল, ক্রিকেট বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক নিয়ামক সংস্থা আইসিসি – তিনটে সূত্র থেকে তিনি খবর পেয়েছেন যে এমন পরিকল্পনা সত্যিই নেওয়া হয়েছিল।
আগামী ৪ জুন নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় ফিরলে হয়ত ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা জার্সির রং বদল আর আটকাতে পারবেন না। এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়, গম্ভীরই দ্রাবিড়ের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার উপযুক্ত লোক। কারণ তিনি ‘মোদী কা পরিবার’-এর গর্বিত সদস্য, বিদায়ী লোকসভায় বিজেপি সাংসদও ছিলেন। জাতীয় ক্রিকেট দলের লাগাম নিজেদের হাতে রাখতে গেলে মোদীর তো গম্ভীরকেই দরকার। যদি মোদী ক্ষমতায় না ফেরেন তাহলে গম্ভীরের গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে। কারণ একটা নির্বাচনে হার হলেই দেশের জন্যে মোদীর এক হাজার বছরের পরিকল্পনার পরিসমাপ্তি ঘটবে না। ভারতীয় সংস্কৃতির সমস্ত অভিজ্ঞান শরীরে ধারণ করা ক্রিকেট দল যাতে বেপথু না হয়ে যায়, তার জন্যে তো গম্ভীরের মত নির্ভরযোগ্য লোককেই দরকার। ভুললে চলবে না, ২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন। এক সাংবাদিক দাহিয়াকে বলেছিলেন যে কাণ্ডটা দেখে ইনজামাম উল হকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান দলের মাঠেই নমাজ পড়ার মত হয়ে যাচ্ছে। দাহিয়া বলেছিলেন, মোটেই তা নয়। সূর্যপ্রণামটা নাকি ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। ওতে চাপ কমে, মন শান্ত হয়।
সরকার হাতে থাক আর না-ই থাক, এই ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন’ তো বজায় রাখতে হবে জাতীয় ক্রিকেট দলে। তার জন্যে গম্ভীরের চেয়ে উপযুক্ত আর কে আছে?
মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধি, নির্বাচনী বন্ডের মত ইস্যু নিয়ে কথা বললে নিজেরই ফাঁপরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা – একথা বুঝেই কি মমতা শেষ দু-তিন দফার নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তুললেন ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে?
গোপালকৃষ্ণ গোখেলের একটা বাক্যকে সম্বল করে আমরা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা প্রায় একশো বছর ধরে রেলা নিয়েই চলেছি – ‘হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো’ (বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত কাল তা ভাবে)। অথচ কথাটা বহুদিন হল অর্থহীন হয়ে গেছে। একে তো গোখেল যে বাংলার কথা বলেছিলেন, সে বাংলার অর্ধেকটা এখন আলাদা দেশ। তার উপর বাংলার রাজনীতির সর্বভারতীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও দীর্ঘকাল হল অন্তর্হিত। বাংলার সাংসদদের সমর্থন ছাড়া সরকার পড়ে যাবে – এমন সরকার দিল্লিতে শেষবার হয়েছিল ২০০৪ সালে। বাংলার রাজনীতিতে যোগ্য রাজনীতিবিদের এখন এতই আকাল, যে প্রধান বিরোধী দল তো বটেই, পরপর তিনবার বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা শাসক দলকেও নির্বাচনে প্রার্থী বেছে নিতে বারবার বাংলা সিনেমা বা বাংলার ক্রিকেট, ফুটবলের দ্বারস্থ হতে হয়। সব কুড়িয়ে কাচিয়েও ৪২ খানা আসনে বাংলা থেকে প্রার্থী দিয়ে উঠতে পারেনি বাঙালির শাসক দল, কিছু শূন্যস্থান রয়েই গিয়েছিল। সেগুলো পূরণ করতে বিহার থেকে প্রাক্তন বলিউড অভিনেতা, গুজরাট থেকে প্রাক্তন ক্রিকেটার ডেকে আনতে হয়েছে। অথচ ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে এই দলেরই প্রচারের অন্যতম অভিমুখ ছিল – তৃণমূল কংগ্রেসই বাঙালির দল। দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয়েছিল স্লোগান – ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’। এখন দেখা যাচ্ছে, কয়েকজন ‘পরের ছেলে’-কে পাশে দাঁড় না করালে নিজের মেয়ের কাজ চলে না।
এ অবস্থাতেও গত এক দশকে বাঙালি বামপন্থী ও উদারপন্থীদের গর্বের শেষ ছিল না কিছু ব্যাপার নিয়ে – এ রাজ্যের রাজনীতি গোবলয়ের মত নয়। এখানে নাকি জাতপাতের রাজনীতি চলে না, হিন্দুত্ব চলে না, ধর্ম নির্বাচনে কোনো ইস্যু হয় না, আরও নানা ভাল ভাল ব্যাপার।
কিন্তু সেই ২০১১ সাল থেকেই দেখা গেছে যে মতুয়ারা বাংলার ভোটে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখা যাচ্ছে কুড়মিরাও আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ।
হিন্দুত্বও দিব্যি চলে। নইলে রামনবমী এলেই দাঙ্গা, বকরি ঈদ এসে পড়লেই সোশাল মিডিয়ায় হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষদের নিরীহ গবাদি পশুদের জন্যে প্রাণ কেঁদে ওঠা, সর্বোপরি বিধানসভায় ৭৭ খানা আসন পেয়ে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির প্রধান বিরোধী দল হয়ে বসা সম্ভব হত না। ২০২১ সালের ফলাফল দেখে যে সরলমতি ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিরা হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে আটকে দিলেন ভেবে প্রবল আত্মপ্রসাদ অনুভব করেছেন, তাঁরা আসলে কল্পনার জগতে বাস করেন। নইলে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখে নিতে পারতেন – কতগুলো আসনে কয়েকশো, হাজার দুয়েক, হাজার তিনেক – এরকম ব্যবধানে ফয়সালা হয়েছিল। একটা আসনে তো সাত ভোটের ব্যবধানেও ফয়সালা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে তৃণমূল কংগ্রেসকে জিতিয়েছিল জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি আর আতঙ্কিত সংখ্যালঘু মানুষের ভোট। সংখ্যাগুরু বাঙালির দুর্গাপুজোর সময়ে চাগাড় দিয়ে ওঠা ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ মার্কা বাছাই করা ধর্মনিরপেক্ষতা নয়।
ধর্মকে যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ইস্যু করে তোলা যায় তা গত দেড় দশকে নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হয়েছে। গত বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে শুভেন্দু অধিকারীর বিষাক্ত প্রচার জয়যুক্ত হওয়ার পর আর বাঙালিদের বড় বড় কথা না বলাই ভাল। বিজেপি আইটি সেলের তৈরি মমতাকে ‘মমতাজ’ নাম দিয়ে নানারকম রসিকতা যেভাবে কট্টর সিপিএম সমর্থকরাও হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকে শেয়ার করেন তাতে ধর্মের মদ এক চুমুকও খায় না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া যে দুষ্কর হয়ে উঠেছে তা অস্বীকার করা মানে নিজেকে ঠকানো।
সুতরাং গুজরাট-রাজস্থান-উত্তরপ্রদেশ-মধ্যপ্রদেশ-বিহার-ঝাড়খণ্ডের নাগরিকদের যে জাতপাত নির্ভরতা, যে রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব, যে ধর্মসর্বস্বতায় অভিযুক্ত করে এসেছে সুমিত, প্রমিত বাঙালি; এবারের নির্বাচনে গোটা দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেই সেই দোষগুলো সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। বাকি দেশের সঙ্গে ব্যবধান চোখে পড়ার মত বেশি। কী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারে, কী মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর অবস্থানে, গোটা দেশের প্রবণতার বিপরীতে চলছে বাংলার ভোট।
বাকি দেশের নির্বাচনী প্রচারের দিকে তাকালে সাদা চোখেই দেখা যাচ্ছে, নরেন্দ্র মোদী ২০১৪ আর ২০১৯ সালের মত আলেখ্য নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ করার খেলায় হেরে গেছেন। মোদী কি গ্যারান্টি নামের ইশতেহার প্রকাশ করে বিকশিত ভারতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরুটা ভালই করেছিলেন। কিন্তু অনতিবিলম্বেই – কংগ্রেসের ইশতেহারে সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার কথা আছে, ওটা মুসলিম লিগ মার্কা ইশতেহার, ওরা হিন্দুদের সম্পত্তি শুধু নয় মহিলাদের মঙ্গলসূত্র পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়ে মুসলমানদের দিয়ে দেবে – এইসব আষাঢ়ে গল্প বলতে শুরু করেন। শেষপর্যন্ত নির্বাচনে ফলাফল যা-ই হোক,
এইসব ভুয়ো তথ্য ছড়িয়েও যে মোদী প্রত্যাশিত মাত্রায় ভোট আদায় করতে পারছেন না, তার প্রমাণ হল তিনি আবার মাঝে এক সাক্ষাৎকারে বলে বসেছেন, যে তিনি কখনো সাম্প্রদায়িক প্রচার করেন না। যেদিন করবেন সেদিন জনজীবনে থাকার অধিকার হারাবেন। পরদিন আবার জনসভায় ঘৃণা ছড়ানোর কাজে ফিরে গেছেন। ফলে রাহুল গান্ধী বলতে বাধ্য হয়েছেন, মোদীজি কি গজনী হয়ে গেছেন? কিছুই মনে থাকে না!
কিন্তু এত আক্রমণ সত্ত্বেও কংগ্রেস বা তার জোটসঙ্গী রাষ্ট্রীয় জনতা দল, সমাজবাদী পার্টি, ডিএমকে, জেএমএম, সিপিআই, সিপিএম, লিবারেশন এই সাম্প্রদায়িক কাদা ছোড়াছুড়িতে প্রশ্রয় দেয়নি। তারা কেবলই সংবিধান বাঁচানোর কথা, জাতভিত্তিক আদমশুমারির প্রতিশ্রুতির কথা, বিপুল বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষকদের দুর্দশার কথা বলে যাচ্ছে। নিজেরা ক্ষমতায় এলে এসবের কী সমাধান করবে তার উত্তরও বেশ বিস্তারিতভাবেই কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলো দিয়ে চলেছে। উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের রাজত্বে চাকরির পরীক্ষা হলেই প্রশ্ন ফাঁস হয় যায় বলে অভিযোগ, কিন্তু আদিত্যনাথ প্রিয় মোদীজির জন্যে যে বিরোধীদের এই প্রশ্নপত্র আসতে চলেছে তা আগে থেকে জেনে উঠতে পারেননি বোধহয়। ফলে তথাকথিত দারুণ বক্তা মোদীকে এবার নির্বাচনে আক্ষরিক অর্থেই কান্নাকাটি করতে হচ্ছে। মাতৃগর্ভে জন্মাননি, পরমাত্মা থেকে সরাসরি জন্ম হয়েছে – এসব রূপকথার গল্পই তাঁর নির্বাচনী প্রচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ডিসেম্বর মাসে বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরোবার পর যেসব নির্বাচন-জ্যোতিষী এবং সাংবাদিক ঘোষণা করে দিয়েছিলেন বিজেপি ২০২৪ জিতেই গেছে, তাঁরা এখন সাবধানী সুরে কথা বলছেন।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারের দিকে তাকিয়ে দেখুন। নীতীশ কুমার কেটে পড়ার পরে ইন্ডিয়া ব্লককে তাসের ঘরের মত মনে হচ্ছিল। কিন্তু অতি গুরুত্বপূর্ণ তিনটে রাজ্যেই শেষপর্যন্ত জমাট জোট হয়েছে – উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র। বিশ্লেষকরা প্রায় সকলেই একমত যে এবারের ভোটের ফল নির্ধারিত হবে পাঁচটা রাজ্যের ফল দিয়ে। উপরিলিখিত তিনটে, কর্ণাটক আর পশ্চিমবঙ্গ। কর্ণাটকে কংগ্রেস সদ্য বিপুল ভোটে বিধানসভা নির্বাচনে জিতে সরকারে এসেছে, তার উপর বিজেপির জোটসঙ্গী জেডিএসের হাসান কেন্দ্রের সাংসদ প্রোজ্জ্বল রেবন্নর পর্যায়ক্রমিক ধর্ষণের কাণ্ড প্রকাশ্যে এসে যাওয়ায় বিজেপি বিপাকে। উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব আর রাহুল যেভাবে একসঙ্গে একের পর এক জনসভা করছেন তাতে বিজেপির বিরুদ্ধে যে আন্তরিক লড়াই করছে ইন্ডিয়া ব্লক, তাতে সন্দেহ থাকে না। একই দৃশ্য বিহারেও। সেখানে আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব আর রাহুলের রসায়ন যে দারুণ জমেছে তা বিরাট বিরাট জনসভায় দেখা গেছে। মহারাষ্ট্রেও শেষপর্যন্ত উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা আর শরদ পাওয়ারের এনসিপির সঙ্গে কংগ্রেসের জোট জমাট বেঁধেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মমতা বলে দিয়েছিলেন ‘এখানে তৃণমূলই ইন্ডিয়া’।
তেরো বছর ক্ষমতায় থাকা মমতা মনেই করেননি তাঁর বিরুদ্ধে রাজ্যের মানুষের কোনো অংশের কোনো অসন্তোষ থাকতে পারে। টানা এতদিন ক্ষমতায় থাকলে যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার মনোভাব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক তাও তিনি বিশ্বাস করেননি। তাই যখন জোটের কথাবার্তা চলছিল তখনো তিনি এবং তাঁর দলের মুখপাত্ররা কংগ্রেস বিজেপিকে হারাতে কত অযোগ্য, রাহুল কতবার সর্বভারতীয় নেতা হয়ে ওঠার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন – এইসব বলে নিজেদের ওজনের ভারে কংগ্রেসকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বিজেপিশাসিত মণিপুর আর আসাম বাদ দিলে এই রাজ্যের সরকারই রাহুলের ন্যায় যাত্রার সময়ে সবচেয়ে বেশি অসুবিধা সৃষ্টি করেছিল। অমুক জায়গায় রাত্রিবাস করা যাবে না, তমুক জায়গা দিয়ে যাওয়া যাবে না – এসব নানাবিধ বায়নাক্কা ছিল প্রশাসনের। এমনকি ন্যায় যাত্রার পালের হাওয়া কেড়ে নিতে ঠিক ন্যায় যাত্রার এলাকাতেই পদযাত্রা করেছিলেন মমতা স্বয়ং। শেষমেশ একতরফা ৪২ আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করে দেওয়া হয় ব্রিগেডের জনগর্জন সভা থেকে। তখনো মমতা রীতিমত খড়্গহস্ত ছিলেন কংগ্রেস বা ইন্ডিয়া ব্লকের প্রতি। যুক্তি ছিল, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস আর সিপিএম তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপির সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করে। তাই তাদের সঙ্গে জোট করা যায় না। উপরন্তু তৃণমূল একাই বিজেপিকে হারিয়ে দিতে পারে, বিধানসভায় হারিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এতৎসত্ত্বেও মমতা সম্পর্কে কড়া মন্তব্য করেননি। মমতাকে যা আক্রমণ করার তা করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতারা, বিশেষত সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী। মমতা সেটাকেই বিজেপির সহায়তা করা বলে গণ্য করেছেন।
এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। এত প্রবীণ এবং পোড়খাওয়া একজন জননেত্রী যদি মনে করেন তিনি একাই একশো, তাতে আপত্তির কিছু নেই। মুশকিল হল প্রচার শুরু হতেই বাকি ভারতে যে কৌশলে বিজেপিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে বিরোধীরা, মমতা তার উল্টো পথে হেঁটেছেন। ফলে রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কের মান ক্রমশ নিম্নগামী হয়েছে। বাকি ভারতের চেয়েও নিম্নগামী।
বিজেপির কৌশলে অবশ্য কিছুমাত্র বদল হয়নি। তাদের ১৮ জন সাংসদ বলার মত কোনো কাজ করেননি, প্রচারে কী আর বলবেন? বিজেপির সেই ২০১৯ সাল থেকে একটাই কাজ – তৃণমূলকে হিন্দুবিরোধী দল হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাওয়া। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এ কাজে এবার তারা ব্যবহার করল সন্দেশখালির ঘটনাবলীকে। মূল অভিযুক্ত যেহেতু শাহজাহান, তাই তাদের কাজটা সহজ হয়ে গিয়েছিল। প্রচার পর্বের প্রথম দিকটা তৃণমূলকে কেবলই আত্মপক্ষ সমর্থন করে যেতে হয়েছে। বিজেপি কর্মী গঙ্গাধর কয়ালের ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর তৃণমূল আক্রমণে যাওয়ার সুযোগ পায়। কে সত্যি বলছে কে মিথ্যে বলছে তা আমরা জানি না। কিন্তু কোনো পক্ষ অবলম্বন না করেও নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বিজেপি ফাঁপরে পড়েছে ওই ভিডিও নিয়ে। বিশেষত যখন মহিলারা একের পরে এক মামলা প্রত্যাহার করতে শুরু করলেন, ভিডিও ক্যামেরার সামনে বললেন তাঁদের ভুল বুঝিয়ে সাদা কাগজে সই করিয়ে পুলিসে অভিযোগ করানো হয়েছিল। বসিরহাট কেন্দ্রের প্রার্থী রেখা পাত্র স্বয়ং বলে বসলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে ধর্ষিতা বলে যে মেয়েদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদের তিনি চেনেন না। শুভেন্দু অধিকারী, যিনি এই চক্রান্তের মাথা বলে তৃণমূল অভিযোগ করেছে, তিনিও কোনো সদুত্তর দিয়ে উঠতে পারেননি। না পারার আক্রোশে সাংবাদিকদের খিস্তি দিতে পেরেছিলেন কেবল।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বামাল সমেত যদি বিজেপির চক্রান্তকারীরা ধরা পড়েই থাকে, তাহলে তারা গ্রেফতার হল না কেন? গঙ্গাধরবাবু মন মজায়ে লুকালেন কোথায়? পুলিস তাঁকে এই জঘন্য চক্রান্তের জন্য গ্রেফতার করেছে বলে তো আমাদের জানা নেই। আমরা সংবাদমাধ্যম থেকে জেনেছিলাম তিনি নাকি পুলিসের কাছে কাদের বিরুদ্ধে কীসব অভিযোগ জানিয়েছিলেন তাঁকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে। সেই অভিযোগেরই বা কী হল? কদিন সন্দেশখালি নিয়ে প্রচণ্ড হইচই হওয়ার পরে, দুই প্রধান প্রতিপক্ষের সমস্ত নির্বাচনী সভায় সন্দেশখালি নিয়ে বাদানুবাদ হওয়ার পরে দুপক্ষই কি ঠিক করল সন্দেশখালিতে সন্দেশ নাই? কজন মহিলার অভিযোগ সত্যি, কজনের অভিযোগ মিথ্যা, আদৌ কোনোটা সত্যি কিনা – তা তো আমাদের জানা হল না। লাভের লাভ যা হল, তা হচ্ছে রাজ্য সরকারের কাজের খতিয়ান বিজেপি চাইল না, কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ বা অকাজ নিয়েও তৃণমূলের প্রচারে কথাবার্তা কমে গেল। নির্বাচনী বন্ড নিয়ে কটা সভায় কথা বলেছেন মমতা বা অভিষেক? কর্মসংস্থানের অভাব নিয়েই বা কবার আক্রমণ করেছেন মোদীকে? মোদী, শাহরাই বা পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে এসে গোদাভাবে তৃণমূলকে চোর বলা ছাড়া কী সমালোচনা করেছেন? নির্দিষ্ট করে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়েই বা কতটা কথা বলেছেন? মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তো কোনো পক্ষই পারতপক্ষে কথা বলছে না। সেসব আলোচনা কেবল শোনা যাচ্ছে বাম, কংগ্রেস জোটের প্রার্থীদের মিটিং মিছিলে।
সাংসদের সংখ্যার বিচারে রাজ্যের দুই বৃহত্তম শক্তি কী নিয়ে তর্ক চালাচ্ছে? প্রথমে চলল সন্দেশখালিতে ধর্ষণ হয়েছে নাকি হয়নি। তারপর চলল রাজ্যপালের রিপুকর্ম নিয়ে বাদানুবাদ। সে বাদানুবাদও কোনো গুরুত্বপূর্ণ অভিমুখ নিল না। মুখ্যমন্ত্রী একবার রাজ্যপালের পদত্যাগের দাবি তুললেন, প্রধানমন্ত্রী মুখই খুললেন না, রাজ্যপাল অভিযোগকারিণী মহিলার সম্মান এবং প্রাইভেসির অধিকারের তোয়াক্কা না করে সাংবাদিকদের রাজভবনে ডেকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখিয়ে দিলেন। সংবাদমাধ্যমগুলো রাজ্য পুলিসের ‘সূত্র’ উদ্ধৃত করে জানাল, পুলিসের কাছে নাকি বিস্ফোরক তথ্য আছে। এবিপি আনন্দের মত সদ্য গোদি মিডিয়া হয়ে ওঠা টিভি চ্যানেলের বিশেষজ্ঞ ও সঞ্চালকরা আবার, কোন জাদুতে কে জানে, নিঃসন্দেহে বলে গেলেন সবটাই রাজ্যপালের বিরুদ্ধে তৃণমূলের চক্রান্ত। এমতাবস্থায় শ্লীলতাহানিতে অভিযুক্ত রাজ্যপালকে সরে দাঁড়াতে বলার সভ্যতা যে বিজেপির নেই, তা জানতে কারোর বাকি নেই। আর সেই নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সময় ও সদিচ্ছা যে ভোটের মরশুমে তৃণমূলের নেই তাও পরিষ্কার হয়ে গেল।
তাহলে? সন্দেশখালি বা রাজ্যপাল – কোনোটাই নির্বাচনের ইস্যু নয়, তাই তো? কিন্তু দিব্যি ভোটারদের ওই আলোচনাতেই ব্যস্ত রাখা গেল। অতঃপর মুখ্যমন্ত্রী চালু করলেন সেই খেলা, যা মোদীর ভীষণ পছন্দের। মমতা মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের সন্ন্যাসী কার্তিক মহারাজের নাম করে বললেন, ওঁকে সাধু বলেই মনে করেন না। কারণ ওঁর কাছে খবর আছে, ওই সন্ন্যাসী ভোটে তৃণমূলের এজেন্ট বসতে দেন না। মানে পুরোদস্তুর রাজনীতি করেন। একইসঙ্গে ইস্কন আর রামকৃষ্ণ মিশনও নিজেদের ভক্তদের বিজেপিকে ভোট দিতে বলছে বলে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করে বসলেন।
হিন্দুপ্রধান ভারতে ইসলামিক ধর্মীয় সংগঠন মানেই সন্ত্রাসবাদীদের আখড়া – এই ধারণা সমস্ত রাষ্ট্রীয় শক্তি, সিনেমা আর সংবাদমাধ্যম মিলে বহু যুগ ধরে জনমানসে গেঁথে দিয়েছে। কিন্তু হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনগুলো যে ধোয়া তুলসীপাতা নয়, সেকথা চট করে কেউ বলে না। গেরুয়া সন্ত্রাস নিয়ে এস এম মুশরিফের বইগুলোর কথা এখনো বিশেষ আলোচিত না হলেও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস যে বহুকাল ধরে তলে তলে এদেশের অনেককিছুতে ছড়ি ঘুরিয়েছে তা এখন অনেকের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। এই মুহূর্তে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বহু কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, উপরাষ্ট্রপতি, বিজেপিশাসিত সমস্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আরএসএসের শিক্ষায় শিক্ষিত। উপরন্তু কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি চিত্তরঞ্জন দাশ অবসর নেওয়ার সময়ে বিদায়ী ভাষণে খোশমেজাজে জানিয়েছেন, তিনি বরাবর আরএসএসের সঙ্গে ছিলেন। আরেক বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় তো আজ অবসর নিয়ে কাল বিজেপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে গেছেন। তাঁর মুখের ভাষা এমন, যে ঠুঁটো জগন্নাথ নির্বাচন কমিশনও চক্ষুলজ্জার খাতিরে মমতার বিরুদ্ধে অশালীন মন্তব্যের কারণে অভিজিৎকে ২৪ ঘন্টা প্রচারে নিরস্ত করেছে।
ভারত সেবাশ্রমের কার্তিক মহারাজ মুখ্যমন্ত্রীকে আইনি নোটিস পাঠিয়ে বলেছেন তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই তার মুখের মত জবাব দেবেন, নতুবা ক্ষমা চাইবেন। কিন্তু কার্তিক মহারাজ যে ওই তল্লাটে রীতিমত রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান তার পর্যাপ্ত ভিডিও প্রমাণ রয়েছে। সেসব ভিডিওতে তাঁকে মোটেই সর্বত্যাগী, সংসারে আসক্তিহীন সন্ন্যাসী বলে মনে হয় না। বরং তাঁর শরীরী ভাষা ও মুখের ভাষা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বসা গোরক্ষ মঠের যোগীর বেশি কাছাকাছি।
বিদেশি মুদ্রায় বলীয়ান আন্তর্জাতিক সংগঠন ইস্কন তার ভক্তমণ্ডলীকে বিজেপিকে ভোট দিতে বলছে কিনা সে খবর মুখ্যমন্ত্রীর কাছে থাকতেই পারে। তেমনটা ঘটা আদৌ অসম্ভব নয়। কারণ আরএসএস এক আদ্যন্ত বাঙালিবিদ্বেষী সংগঠন, আর ইস্কনের মধ্যে যে বাঙালিবিদ্বেষ পুরোমাত্রায় আছে তার প্রমাণ একবছর আগেই পাওয়া গিয়েছিল, যখন অমোঘ লীলা দাস বলে ওই সংগঠনের এক সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দকে সিদ্ধপুরুষ বলে মানতে অস্বীকার করেন তিনি আমিষ খেতেন, চুরুট খেতেন বলে। ইস্কন কী ব্যবস্থা নিয়েছিল লোকটির বিরুদ্ধে? কয়েকদিন মুখ বন্ধ করে থাকতে বলা হয়েছিল। ব্যাস!
আসলে বাঙালির মান-অপমান বোধ সম্পর্কে কারোরই খুব উচ্চ ধারণা নেই। বাঙালির আদরের সংগঠন রামকৃষ্ণ মিশনেরও নেই। থাকলে সেইসময় তারা অমোঘ লীলাকে বুঝিয়ে দিত শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মাচরণে কেন আমিষ-নিরামিষ ভেদ নেই। শ্রীরামকৃষ্ণ আদতে একজন ধর্মগুরু হলেও সত্যের সন্ধান করেছেন গবেষকের মত। শিষ্যদের মধ্যেও অনুসন্ধিৎসা উস্কে দিতেন, বলতেন ‘সাধুকে দিনে দেখবি, রাতে দেখবি’। অর্থাৎ পরখ করে নিবি, লোকটা সত্যিই সাধু কিনা। ফলে ‘যত মত তত পথ’ কথাটা তিনি স্রেফ বাণী বিতরণ করার জন্যে বলেননি। কলমা পড়ে মুসলমান হয়েছিলেন, খ্রিস্টধর্মও অবলম্বন করে দেখেছিলেন। তিনি খুঁজছিলেন আধ্যাত্মিক সত্য। নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যেখানে যেখানে তা পাওয়া গেছে, সেই সব পথকেই সত্য বলতে তাঁর কোথাও বাধেনি। ফলে আমিষাশী তন্ত্রসাধক বা নিরামিষাশী বৈষ্ণব – কেউই তাঁর কাছে ব্রাত্য নয়, অহিন্দুও নয়। সেই কারণেই রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের আমিষ খাওয়ায় বারণ নেই। সিদ্ধপুরুষ কী করে হতে হয় বা আদৌ হওয়া যায় কিনা তা অন্য তর্ক। কিন্তু রামকৃষ্ণের তত্ত্বানুযায়ী, তাঁর কোনো শিষ্যের এই কারণেই আমিষ খেয়েও সিদ্ধপুরুষ হতে বাধা নেই।
মিশন কিন্তু এসব ধর্মালোচনায় যায়নি। কারণ হিন্দু উদারপন্থী – এমনকি বামপন্থী – বাঙালির ন্যাকা আবদার রক্ষা করে ধর্মীয়, অথচ ধর্মনিরপেক্ষ, জগাখিচুড়ি হওয়ার কোনো দায় রামকৃষ্ণ মিশনের নেই। তারা পুরোদস্তুর ধর্মীয় সংগঠন এবং বিশাল আকারের কারণে রীতিমত ব্যবসায়িক সংগঠন বললেও ভুল হয় না। বউবাজারের গয়নার দোকানগুলো যেমন নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করে না, রামকৃষ্ণ মিশনও ইস্কন বা ভারত সেবাশ্রমের সঙ্গে কোনোরকম তর্কে জড়ায় না। উপরন্তু দেশে হিন্দু আধিপত্যবাদী সরকার হলে এরা সকলেই খুশি হয়, কারণ কলাটা মুলোটা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। কেন্দ্রে অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকার থাকার সময়েই সুদৃশ্য বেলুড় মঠ স্টেশন তৈরি করে হাওড়া-বেলুড় মঠ লোকাল ট্রেন চালু হয়েছিল। বিশেষ উৎসবের দিন ছাড়া সে ট্রেনে কাকপক্ষীও চাপত না। অথচ অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিক্রি করে দেওয়ায় উৎসাহী একটা সরকারও ওই লাইন তুলে দেওয়ার কথা ভাবেনি। রামকৃষ্ণ মিশনের সাধুদের মোদীমুগ্ধতাও এমন কিছু ঢাকঢাক গুড়গুড় করার জিনিস নয়। তিনি যখন বেলুড় মঠে এসে রাত্রিযাপন করেছিলেন, সেইসময় তাঁর সঙ্গে দন্তবিকাশ করে সন্ন্যাসীদের সেলফি তোলার বহর আমরা সকলেই দেখেছি। একজন রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে মিশনের সন্ন্যাসীদের এমন নালে ঝোলে অম্বলে হতে দেখলে কী মনে করতেন মিশনের সেইসব প্রতিষ্ঠাতা সন্ন্যাসীরা, যাঁদের জন্যে ভগিনী নিবেদিতাকে মিশনের সংস্রব ত্যাগ করতে হয়েছিল, কারণ তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সক্রিয়ভাবে সাহায্য করছিলেন?
যা-ই মনে করুন, মোদ্দাকথা হল, মমতা পশ্চিমবঙ্গের তিনটে জনপ্রিয় ধর্মীয় সংগঠনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছেন তা মোটেই পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়ার জিনিস নয়। কিন্তু ঘটনাগুলো তো আজ ঘটতে শুরু করেনি। কার্তিক মহারাজের দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়ার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে তা বেআইনি কাজ, তাঁর বিরুদ্ধে পুলিসি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু কোনো সংগঠনের নিজেদের সদস্যদের কোনো বিশেষ দলকে ভোট দিতে বলা তো বেআইনি নয়। তাছাড়া মমতা নিজেই তো রাজ্যে ইমাম ভাতা, পুরোহিত ভাতা চালু করেছেন, সরকারি টাকায় দীঘায় বিরাট মন্দির বানাচ্ছেন। আবার ঈদের নমাজে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতাও দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে ধর্মীয় সংগঠনগুলো রাজনীতি বিযুক্ত হয়ে থাকবে – এমনটা আশা করা কি যৌক্তিক? তাহলে নির্বাচনে এই কথাগুলো মমতা কেন বললেন? মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধি, নির্বাচনী বন্ডের মত ইস্যু নিয়ে কথা বললে নিজেরই ফাঁপরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা – একথা বুঝেই কি মমতা শেষ দু-তিন দফার নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তুললেন ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে? তাহলে গোটা দেশে অনর্গল মিথ্যাভাষণ আর ধর্মীয় মেরুকরণ করে মোদী নির্বাচনটাকে যেভাবে নিজের দিকে টেনে আনতে চাইছেন, সেভাবেই কি মমতাও চাইছেন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন হয়ে দাঁড়াক হিন্দু বনাম মুসলমানের? ভারত সেবাশ্রম, ইস্কন ও রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে অসন্তোষ জ্ঞাপন করেছেন আর বিজেপি নেতারা মহানন্দে প্রচার করে বেড়াচ্ছেন – মমতা সংখ্যালঘু তোষণ করার জন্যে এখন হিন্দু সাধু সন্তদের আক্রমণ করছেন। পশ্চিমবঙ্গকে মনে হচ্ছে নয়ের দশকের উত্তরপ্রদেশ, যেখানে রাজনৈতিক আলেখ্য আবর্তিত হয় অমুক স্বামী, তমুক সরস্বতী, অমুক শঙ্করাচার্যকে ঘিরে।
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে এই তবে বাঙালির সবচেয়ে বড় অবদান।
২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে ঋজু বিদূষক কুণাল কামরা তাঁর কমেডি রুটিনের একখানা ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। ততদিনে মুকেশ আম্বানি কীভাবে ভারতের অর্থনীতির উপরে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করছেন তা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু গৌতম আদানির নাম তখনো মুখে মুখে ফেরার পর্যায়ে পৌঁছয়নি। সেই ভিডিওর শুরুতেই কুণাল বলেন ‘আমার আর আম্বানিজির মধ্যে মোদীজি কী করছেন? আমি সোজাসুজি আম্বানিকে কেন ভোট দিতে পারব না? আমাদের আম্বানির সঙ্গে কোনো ঝামেলা আছে? বানাও না পিএম।’ তারপর বলেন ‘আমার সত্যিই মনে হয় কর্পোরেশনগুলোর ভোটে লড়া উচিত। যেমন মুকেশ আম্বানি বনাম রতন টাটা – লড়ো ২০১৯। সত্যিই দারুণ ভোট হবে। ওরা তো একটা বিষয় নিয়েই কথা বলবে – ডেভেলপমেন্ট। বিকাশ। ওরা তো আর কিছু জানেই না। ধরুন রতন টাটা তো আর উত্তরপ্রদেশে গিয়ে ঘর ভর্তি লোকের দিকে তাকিয়ে বলবে না, মন্দির ইয়হি বনেগা।’ বলা বাহুল্য কথাগুলো ঠাট্টা করে বলা, লোক হাসাতে বলা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, বিদূষকরা চিরকাল রসিকতা করতে করতে তেতো সত্যও বলে এসেছেন। তা করতে না পারলে বিদূষক হওয়ার মানে হয় না। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিদূষক গল্প দ্রষ্টব্য। উপরন্তু আমাদের দেশে গত এক দশক ধরে কুণাল, আকাশ ব্যানার্জিরা যে কাজ করছেন তা বিদূষকের সীমায় আটকে নেই। রীতিমত সাংবাদিকতা হয়ে উঠেছে। ঠিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে কাজ জন অলিভার, হাসান মিনহাজ, ট্রেভর নোয়ারা করে থাকেন। সুতরাং কুণালের রসিকতাতেও খুঁজলে হাসির আড়ালের সত্যগুলো অনায়াসেই পাওয়া যাবে।
আসলে কুণাল ঠাট্টা করে যা বলেছিলেন তা পৃথিবী জুড়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ভালমন্দ নিয়ে যে আলোচনা চলছে তারই অঙ্গ। কোনো দেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রই কোনোদিন অতিধনীদের প্রভাবমুক্ত ছিল না। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রায় সব দেশের গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের মনেই এই সন্দেহ দেখা দিয়েছে, যে অতিধনীরাই হয়ত গণতন্ত্রের রাশ হাতে তুলে নিয়েছে। প্রকাশ্য রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থা, সোশাল মিডিয়া আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জনমত প্রভাবিত করার উপায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে বিপুল টাকা দেওয়ার ক্ষমতা মিলিয়ে বড় বড় কর্পোরেশনগুলোই কোথায় কে সরকার গড়বে আর কে সরকার চালাবে তা নিয়ন্ত্রণ করছে কিনা – এ নিয়ে সারা পৃথিবীতেই কথা হচ্ছে। কুণাল যে কাল্পনিক নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলেছিলেন তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার আগেই অর্ধেক বাস্তবে পরিণত হয়েছে। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প আম্বানির মতই একজন ধনকুবের। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত তাঁকে কোনোভাবেই রাজনীতিবিদদের সারিতে বসানো যেত না। আমাদের দেশে ব্যাপারটা অতদূর না গেলেও সরকারি নীতি নির্ধারণে যে কর্পোরেট শক্তি বড় ভূমিকা নিচ্ছে তার একাধিক প্রমাণ তো আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। যাদের সন্দেহ ছিল তারাও দেখে ফেলেছে নির্বাচনী বন্ডে কোথা থেকে কে কত টাকা পেয়েছে। কর্পোরেট স্বার্থে আইন বদলে আদিবাসীদের জমির অধিকার কেড়ে নেওয়া, কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় শাসন কায়েম করার মত বহু ঘটনা ঘটেছে। কতগুলো বন্দর, বিমানবন্দর আদানির হাতে গেছে; আম্বানি কীভাবে খুচরো ব্যবসা থেকে শুরু করে খনিজ তেল – দেশের সমস্ত ব্যবসায় জাল বিছিয়েছেন তা-ও অনেকেরই জানা। ফলে কিছুদিন আগে অবধি ক্রোনি পুঁজিবাদ কথাটা যার শোনা ছিল না, সেও জেনে গেছে।
কোনো সন্দেহ নেই, এদেশে ক্রোনি পুঁজিবাদকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করে তোলায় সবচেয়ে বেশি অবদান যাঁর, তাঁর নাম রাহুল গান্ধী। সপ্তদশ লোকসভায় বামপন্থী দলগুলোর সাংসদ ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন, সংসদের বাইরেও তাঁদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। এমন অবস্থায় পুঁজিবাদ বা ক্রোনি পুঁজিবাদ নিয়ে দিনরাত আওয়াজ তোলার মত কেউ ছিলেন না। সংসদের ভিতরে তো নয়ই। রাহুলই প্রথমে সংসদের বাইরে নাম করে আম্বানি, আদানি দেশের সম্পদ কীভাবে লুটেপুটে খাচ্ছেন তা বলা শুরু করলেন। তারপর সংসদের ভিতরে আদানি আর নরেন্দ্র মোদীর একত্র ছবি এনলার্জ করে দেশের সামনে তুলে ধরলেন। মোদীর প্রাণভোমরা যে সত্যিই আরএসএস নয়, কর্পোরেটের হাতে – তা প্রমাণ হয়ে যায় কিছুদিন পরেই রাহুলকে সংসদ থেকে সাসপেন্ড করার ঘটনায়। রাহুল আদালত ঘুরে সংসদে ফিরে আসার পরেও আম্বানি, আদানিকে আক্রমণ করা ছাড়েননি। তবু এবারের নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন কিন্তু সেই মোদী। ক্রোনি পুঁজিবাদ নিয়ে সারা পৃথিবীতে যতই আলোচনা হোক, এত বড় গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনে দুজন পুঁজিপতির নাম নির্বাচনী প্রচারে সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে – এমন ঘটনা বিরল।
মিথ্যা বলা, সত্যকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা এবারের নির্বাচনে জলভাত করে ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে কংগ্রেসের ইশতেহার সম্পর্কে বানিয়ে বানিয়ে নানা কথা বলে চলেছেন সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করতে। অনেকেই বলছিলেন নিজের দলের ইশতেহার সম্পর্কে একটিও বাক্য খরচ না করে কেবলই কংগ্রেসের ইশতেহার সম্পর্কে অপপ্রচার আসলে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের প্রকাশ। তিনি সংসদের ভিতরে দাঁড়িয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসে ৪০০ আসন পার করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ভোটের ময়দানে যে প্রবণতার খোঁজ তিনি পাচ্ছেন তা ৫৬ ইঞ্চি বুকে ভরসা জোগাচ্ছে না। তাই সেই লালকৃষ্ণ আদবানির আমল থেকে বিজেপির যে পরীক্ষিত জয়ের ফর্মুলা, তাতেই ফিরে গেছেন – মুসলমানের ভয় দেখিয়ে হিন্দুদের ভোট কুড়াও।
এর না হয় তবু একটা ব্যাখ্যা হয়। কিন্তু তৃতীয় দফার ভোটের পরে তেলেঙ্গানার ওয়ারাঙ্গলে বক্তৃতা দিতে গিয়ে যে কথা মোদী বললেন, তার পিছনে যুক্তি কী? পাঁচ বছর ধরে কংগ্রেসের শাহজাদা সকাল থেকে মালা জপার মত আম্বানি, আদানির নাম বলতেন। ভোট ঘোষণা হতেই কেন এদের নাম বলা বন্ধ হয়ে গেল? নির্ঘাত আম্বানি, আদানির কাছ থেকে টেম্পো করে বস্তা বস্তা মাল কংগ্রেসের কাছে গেছে? শাহজাদা জবাব দিন – এই তাঁর বক্তব্য। রাজনীতিতে তো বটেই, নির্বাচনী প্রচারেও প্রত্যেকটা শব্দ মেপে খরচ করাই নিয়ম। তার উপর দশ বছর ধরে শুনে আসছি মোদী ভারতের সর্বকালের সেরা প্রধানমন্ত্রী। তিনি কি না ভেবেচিন্তে কিছু বলতে পারেন? তাহলে হঠাৎ নিজের সবচেয়ে বড় বন্ধুদের এভাবে বিরোধী দলকে গোপনে টাকা দেওয়ায় অভিযুক্ত করতে গেলেন কেন? অতীতে সংসদে রাহুল তথা বিরোধীরা আদানির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তাঁকে বারবার আক্রমণ করা সত্ত্বেও তিনি তো মুখ খোলেননি। তাহলে ভোটের ভরা বাজারে কেন এমন করলেন? ওই বক্তৃতার পরে বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, ওই কথায় বিজেপির সদস্য সমর্থকদের মধ্যে কোনো নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার তো হয়নি বটেই, উল্টে রাহুলের ভিডিও জবাব ভাইরাল হয়ে গেছে। সমস্ত মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও মোদীর কথার সঙ্গে সমান গুরুত্বে সেই জবাব সম্প্রচারিত হয়েছে এবং রাহুলের জবাবে রক্ষণাত্মক হওয়ার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা নেই। বরং তিনি পালটা আক্রমণের রাস্তায় গিয়ে ফের ক্রোনি পুঁজিবাদ চালানোয় অভিযুক্ত করেছেন মোদী সরকারকে। বলেছেন, মোদী সরকার ২২ জন অতিধনী তৈরি করেছে, আমরা কয়েক কোটি লাখপতি বানাব। শুক্রবার উত্তরপ্রদেশে এক সভায় আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, যখন কেউ ভয় পেয়ে যায় তখন আপন লোকেদের ডাকাডাকি করতে থাকে। মোদী হারের ভয় পেয়েছেন। তাই আম্বানি, আদানির নাম করছেন যাতে তাঁরা ওঁকে বাঁচান।
আমরা রাহুলের এসব কথায় বিশ্বাস করব না। কারণ নির্বাচনী প্রচারে গরম গরম কথা বলতেই হয়, বিশেষ করে বিরোধী পক্ষের নেতা হলে। আমরা খানিকক্ষণের জন্য একথাও ভুলে যাই, যে মোদী এক্ষেত্রেও মিথ্যাভাষণ করেছেন। রাহুল মোটেই ভোটের প্রচারে আম্বানি, আদানির নাম বলা বন্ধ করে দেননি। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এই প্রতিবেদনে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পর থেকে রাহুল সাতবার সাতটা বক্তৃতায় ওই দুজনের নাম করেছেন।
আমরা বরং তর্কের খাতিরে ধরে নিই, মোদী সত্যি কথাই বলছেন। আমরা ধরে নিচ্ছি টেম্পোয় করে টাকা পাঠানোর কথাটা লোকের বুঝতে সুবিধা হবে বলে মোদী বলেছেন। মোদ্দাকথা হল, আম্বানি আর আদানি কংগ্রেসকে টাকা দিচ্ছেন এই নির্বাচনে। যদি একথা সত্যি হয়, তাও কিন্তু বিজেপির পক্ষে দুঃসংবাদ। কর্পোরেটবান্ধব মোদী সরকারের মাথার উপর থেকে যদি ভারতের সবচেয়ে ধনী দুই ব্যবসায়ীর হাত সরে গিয়ে থাকে তাহলে মোদীর সমূহ বিপদ। কারণ তাহলে বুঝতে হবে, তাঁরা হাওয়া খারাপ বুঝে পরবর্তী সরকারে নির্ণায়ক শক্তি হবে যারা, তাদের তুষ্ট করবেন ঠিক করেছেন। বস্তুত, অনেকেই খেয়াল করেছেন যে মোদীর এই বক্তব্য ধামাচাপা দেওয়ার জন্যে আদানির মালিকানাধীন চ্যানেল এনডিটিভি সেদিন মাতামাতি করছিল স্যাম পিত্রোদার মন্তব্য নিয়ে, যে মন্তব্যের সঙ্গে কংগ্রেস একমত নয় বলে পত্রপাঠ জানায়। তারপর পিত্রোদাকে কংগ্রেসের বৈদেশিক শাখার কর্তার পদ ছাড়তেও বাধ্য করা হয় সেইদিনই। কিন্তু পরদিন এনডিটিভি যা করেছে তা আরও কৌতূহলোদ্দীপক। সন্দেশখালির বিজেপি নেতা গঙ্গাধর কয়ালের গোপন ক্যামেরার সামনে শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করানোর চক্রান্ত যেদিন ফাঁস হল, সেদিন থেকে সমস্ত গোদি মিডিয়ার মত এনডিটিভিও খবরটা যথাসম্ভব চেপে গিয়েছিল। কিন্তু বুধবার মোদীর ওই বক্তৃতার পরে বৃহস্পতিবার যখন রেখা পাত্রের ভিডিও প্রকাশ্যে এল, সে খবর এনডিটিভি দেখিয়েছে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে।
এ কিন্তু মোদীর পক্ষে অশনি সংকেত। আদানি আর আম্বানি মিলে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের অনেকখানি দখল করে আছেন। ক্রোনি পুঁজিবাদ ভারতের সংবাদমাধ্যমেও মোদীর আমলে কাজ করেছে পুরোদমে। নিজের চা বিক্রেতার অতীত থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির মত বহু নড়বড়ে সত্যের উপরে মোদীর যে বিশালকায় ভাবমূর্তি নির্মিত হয়েছে তা সম্ভব হত না এতগুলো সংবাদমাধ্যমের শতকরা একশো ভাগ সমর্থন না থাকলে। সেই সমর্থন যদি সরতে শুরু করে, ওই ভাবমূর্তি ভেঙে পড়তে বিশেষ সময় লাগবে না। এখন সোশাল মিডিয়ার যুগ, সবকিছু ঘটে বড্ড তাড়াতাড়ি। নির্বাচন কমিশনের বদান্যতায় এক দীর্ঘ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখনো চারটে দফা বাকি, প্রথম তিন দফায় বিজেপি দারুণ ফল করবে এমনটা মোদীর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে না। সে ভরসা থাকলে তাঁকে মরিয়া হয়ে আম্বানি, আদানির নাম করে রাহুলকে আক্রমণ করতে হত না। এমতাবস্থায় টিভি কভারেজ কমে গেলে মোদী যাবেন কোথায়? বিশেষত জি নেটওয়ার্কের মালিক এবং মোদীর একদা ঘনিষ্ঠ সুভাষ চন্দ্র যখন আগে থেকেই চটে আছেন ফের রাজ্যসভার টিকিট না পেয়ে। তিনি ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে উপলক্ষে বলে বসেছেন যে ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা মোটেই ভাল জায়গায় নেই। তার চেয়েও বড় কথা, গোদি মিডিয়ার অন্যতম মুখ দীপক চৌরাসিয়াকে জি নিউজ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। সুধীর চৌধুরীর মত লোকও হঠাৎই মোদীর বক্তৃতার মিথ্যা দর্শকদের সামনে উদ্ঘাটন করতে শুরু করেছেন। এ সময় আম্বানি, আদানিকে কেউ চটায়?
এই যে ভারতের মত এত বড় দেশের নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছেন দুজন পুঁজিপতি – এটাই প্রমাণ করে একবিংশ শতাব্দীর গণতন্ত্র পুঁজিপতিদের উপরে কতখানি নির্ভরশীল। বিজেপি মুখপাত্ররা অনেকে প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের বক্তৃতার পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে বলছেন – ঠিকই বলছেন – যে রাহুল উঠতে বসতে আম্বানি-আদানির চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার করেন, সেই রাহুলের দলের মুখ্যমন্ত্রীরাই ওই দুজনের শিল্প নিজের রাজ্যে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই দ্বিচারিতা কেন? কথা হল, পুঁজিবাদ নয়া উদারবাদী অর্থনীতির সাহায্যে এই শতকে গণতন্ত্রের ঘাড়ে এমনই চেপে বসেছে যে এই দ্বিচারিতা না করে কোনো সরকারে থাকা দলের উপায় নেই। সরকারি সম্পত্তি, সরকারি শিল্পগুলোর বারোটা বাজিয়ে দেওয়া শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সাল থেকেই। সেই প্রকল্পের দ্রুততা বাড়িয়ে মোদী সরকার প্রায় সমস্ত রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিই তুলে দিয়েছে কর্পোরেটের হাতে। এখন যে সরকার জনকল্যাণমুখী হতে চায়, তার নিজের টাকা রোজগারের পথ এত সংকীর্ণ হয়েছে যে পুঁজিপতিদের উপরে নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। অথচ তারা তা হতে দেবে না। কারণ রাষ্ট্র নাগরিকে পরিষেবা দিতে সক্ষম হলে কর্পোরেটের থেকে পরিষেবা কিনবে কে? সরকারি হাসপাতাল ঝকঝকে তকতকে হলে, ভাল চিকিৎসা শস্তায় করে দিলে বেসরকারি হাসপাতালে কে যাবে?
সুতরাং রাহুলের আসল পরীক্ষা শুরু হবে সরকারে আসতে পারলে। এখন মোদীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে কয়েক কোটি লাখপতি তৈরি করার কথা বলা সোজা। কিন্তু মোদীর চেয়ারে বসার সুযোগ পাওয়া গেলে দলের ইশতেহারে যে গুচ্ছ গুচ্ছ জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা পূরণ করতে গেলে আম্বানি, আদানিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে হবে। চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়, বিরোধিতা হবে তাঁর নিজের দলের ভিতর থেকেও। সেসব সামলে কি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হবে? পারলে তা গোটা পৃথিবীতে উদাহরণ হয়ে থাকবে। কারণ ক্রোনি পুঁজিবাদের হাত থেকে উদ্ধারের পথ এখন সব দেশেই খোঁজা হচ্ছে। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ঋজু বিদূষক কুণাল তাঁর সাম্প্রতিক এক ভিডিওতে মোদীর বদলে কে – এই প্রশ্নের যে উত্তর দিয়েছেন, তা এখন অনেক দেশেরই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের মনের কথা – ‘খালি চেয়ারও চলবে’।
ভারত জুড়ে মহিলা ভোটারদের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গেই বিধানসভা নির্বাচন আছে অন্ধ্রপ্রদেশে। প্রায় সব বিশ্লেষক বলছেন, ওই রাজ্যে কে ক্ষমতায় আসবে তা নির্ধারিত হবে মহিলাদের হাতে। পশ্চিমবঙ্গেও যে মহিলাদের ভোট অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা জানতে কারোর বাকি নেই। নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গে এখন ৩.৭৩ কোটি মহিলা ভোটার। পুরুষদের চেয়ে মাত্র ১২ লক্ষ কম। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে আমাদের রাজ্যে পুরুষদের চেয়ে বেশি মহিলা ভোট দিয়েছিলেন। বলা হয়, তৃণমূল কংগ্রেসের বারবার ভোটে জেতার অন্যতম কারণ মমতা ব্যানার্জির মহিলা ভোটব্যাঙ্ক। সেই ভোটব্যাঙ্ককে আরও জোরদার করতেই নাকি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের কথা ভাবা হয়েছিল। সাধারণ বুদ্ধি বলে, এমন একটা রাজ্যে ভোটের সময়ে মহিলাদের গুরুত্ব সব দলের কাছেই আকাশছোঁয়া হবে। নির্বাচনী প্রচার ভরে থাকবে মহিলাদের দাবিদাওয়া নিয়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ভারত এমন একটা দেশ যে দেশে সাধারণ বুদ্ধি বিশেষ কাজে লাগে না। এখানে সারাক্ষণই অসাধারণ ব্যাপারস্যাপার ঘটতে থাকে। এখন যেমন পশ্চিমবঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রে মহিলারাই, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো তাঁদের ভোট পাওয়ার জন্যে ‘এই করব, সেই দেব, তাই বানিয়ে দেব’ বলছে বলে নয়। বরং দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল মহিলাদের সম্মানকে দড়ি টানাটানির বিষয়বস্তু করে তুলেছে বলে।
আমরা যখন কলেজে পড়ি, তখন গরীবের সম্মান নামের এক বাংলা ছবির পোস্টার লেগেছিল আমাদের হোস্টেলের পাড়ার বেশকিছু দেওয়ালে। তা দেখে আমার এক বন্ধু বলেছিল, ‘এ থেকেই বোঝা যায় যে দেশে গরিবের কোনো সম্মান নেই।’ পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে বহু আলোচিত মহিলাদের সম্মান সম্পর্কে একই কথা প্রযোজ্য। তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপি – দুপক্ষ থেকেই যত ফিল্মি সংলাপ ছোড়া হচ্ছে, তত পরিষ্কার হচ্ছে আসলে মহিলাদের সম্মান নয়, তাঁদের ভোটই অভীষ্ট লক্ষ্য। সন্দেশখালিতে আসলে কোনো ধর্ষণ হয়নি, বিজেপি মহিলাদের দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করিয়েছে – এই মর্মে বিজেপিরই অঞ্চল সভাপতি গঙ্গাধর কয়ালের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সোমবার এক সভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন ‘মেয়েদের কাছে টাকার চেয়ে শাড়ির আঁচল অনেক গুরুত্বপূর্ণ, সম্মান গুরুত্বপূর্ণ। বেশি চক্রান্ত করো না। সব কিছু পরিকল্পনা (করে) করেছে।’ পালটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন ‘মমতা দিদি আপনার লজ্জা হওয়া উচিত। আপনি মহিলা মুখ্যমন্ত্রী, আপনার নাকের ডগায় হাজার হাজার বোনের উপর অত্যাচার, ধর্ষণ হয়েছে। কিন্তু আমি আজ বলতে চাই, সন্দেশখালিতে যে অত্যাচার করেছে, সে যদি পাতালেও লুকিয়ে থাকে… মমতা দিদি তাঁদের পাতালে লুকিয়ে রাখলেও সেখান থেকে খুঁজে বের করে জেলে ঢোকাব।’
শাহের বক্তব্যের পুরোটাই ফেনা, অতএব তা নিয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। মুখ্যমন্ত্রীর নাটকীয় প্রথম বাক্য বাদ দিয়ে বাকিটা বিচার করা যাক। তাঁর বক্তব্য সত্যি হওয়া মোটেই অসম্ভব নয়। নাগরিক ডট নেট যেহেতু বিজেপি নেতার ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে তদন্ত করেনি, করার উপযুক্তও নয়, সেহেতু ওতে প্রযুক্তিগত কারিকুরি আছে কিনা তা আমরা বলতে পারি না। কিন্তু যেভাবে ভিডিও প্রকাশ্যে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই এক খবরের চ্যানেলে গঙ্গাধর স্বীকার করেছিলেন – ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে সেই ব্যক্তি উনিই এবং ওই কথোপকথন সত্যিই হয়েছিল, তাতে পরবর্তীকালে স্পষ্টতই দলের নির্দেশে তিনি যে ভিডিও বিবৃতি দিয়েছেন তাকে বিশ্বাস করা শক্ত হয়ে পড়ে।
"I am Visible in the Video" "It's My Voice in the Video"
These were the ADMISSIONs of Ganghadhar Koyal, BJP Mandal President earlier this morning.
If you see any BJ Party Supporter calling the Video fake, Please send him this confession. pic.twitter.com/UASfmt0RYq
তিনি এখানে কোনোমতে আত্মপক্ষ সমর্থনে এটুকুই বলতে পেরেছেন যে তাঁকে দিয়ে কথাগুলো বলানো হয়েছিল। কীভাবে? প্রলোভন দেখিয়ে, নাকি ভয় দেখিয়ে? সে ব্যাপারেও কিছু বলেননি তখন। এমনকি পরে বিবৃতি বদলে ফেলেও তা বলেননি, বলেছেন এতে যান্ত্রিক কারচুপি আছে। অর্থাৎ দুটো বিবৃতি পরস্পরবিরোধী। গঙ্গাধরের কথা অনুযায়ী যে ব্যক্তি এসবের পরিকল্পনা করেছিলেন, সেই শুভেন্দু অধিকারীও এই ভিডিও অসত্য – এ কথার অকাট্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত দিতে পারেননি। যাঁরা ধর্ষণের অভিযোগে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাঁদের অন্যতম এবং বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী রেখা পাত্র তবু টিভি ক্যামেরার সামনে বলেছেন, গঙ্গাধরকে ভয় দেখিয়ে তৃণমূল এসব করে থাকতে পারে। কিন্তু সে তো তাঁর বিশ্বাস। এখন কথা হল, মুখ্যমন্ত্রী যদি মনে করেন এই ভিডিও বিজেপির ষড়যন্ত্রের অকাট্য প্রমাণ, তাহলে নির্বাচনী প্রচারে তাদের বদমাইশি ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হচ্ছে না কেন? ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করিয়ে একটা এলাকায় অশান্তি সৃষ্টি করা, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চেষ্টা করা – এগুলো তো মারাত্মক অপরাধ। কেউ এই অপরাধ করেছেন জানলে স্রেফ বাদানুবাদে থেমে থাকবে কেন একটা রাজ্যের সরকার? কেনই বা যে মহিলারা ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেছেন, পুলিস তাঁরা কী বলছেন তা জানার চেষ্টা করবে না? একথা তো সত্যি, যে আইনত গঙ্গাধর সত্যি বলে থাকলেও প্রমাণ হয় না সব সাজানো। একজন অভিযোগকারী মহিলা কী বলছেন সেটাই বিচার্য।
এখানেই সন্দেহ হয়, সন্দেশখালিতে সত্যিই মহিলারা ধর্ষিত হয়েছেন কি হননি তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ততটা মাথাব্যথা নেই। তিনি শুধু রাজ্যের মহিলা ভোটারদের কাছে একথা প্রমাণ করতে চান যে বিজেপি এতই হীন একটা দল, যে মহিলাদের মানসম্মানের তোয়াক্কা করে না। রাজনৈতিক ফায়দার জন্যে তাঁদের দিয়ে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ করাতেও পিছপা হয় না। রাজ্যের আরেকটা ঘটনাতেও এই একই সন্দেহ হয় মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে। সেটাও চমকে দেওয়ার মত ঘটনা।
রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনেছেন রাজভবনের এক অস্থায়ী কর্মচারী। হেয়ার স্ট্রিট থানায় এফআইআর করেছেন। এই খবর প্রকাশ হওয়ার পর থেকে রাজ্যপাল এমন একটা কাজও করেননি যাতে তিনি যে নির্দোষ তা প্রমাণ করার আন্তরিকতা বোঝা যায়। তিনি কেবল রাজভবনে পুলিসের আর মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের প্রবেশ নিষেধ করেছেন। বিবৃতি দিয়ে বলেছেন এটা রাজনৈতিক চক্রান্ত। এমন নয় যে অতীতে কখনো কোনো রাজ্যের রাজ্যপালের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠেনি। কিন্তু তাঁদের প্রতিক্রিয়া আনন্দ বোসের মত হয়নি।
২০০৯ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্যপাল পদ ছাড়তে হয়েছিল নারায়ণ দত্ত তিওয়ারিকে। কারণ রাজভবনে তাঁর যৌন কীর্তিকলাপের টেপ প্রকাশ্যে এসেছিল এবং বিরোধীরা সমস্বরে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছিল। সিপিএম নেত্রী বৃন্দা কারাত রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিলকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, যদি তিওয়ারি পদত্যাগ করতে রাজি না হন তাহলে তাঁকে বরখাস্ত করা উচিত। অভিযোগ ওঠার পরে আনন্দ বোসের মত বুক ফুলিয়ে চলা তিওয়ারির পক্ষে সম্ভব হয়নি। অনস্বীকার্য যে অভিযোগ উঠেছে মানেই বোস অপরাধী তা নয়। অপরাধ প্রমাণিত হতে হয়। কিন্তু সে তো তদন্তসাপেক্ষ, আর রাজ্যপাল পদের সাংবিধানিক রক্ষাকবচ থাকায় বোসের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করাও সম্ভব নয়। কিন্তু নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পদত্যাগ করার নামটি নেই; উল্টে রাজভবনের কর্মীদেরও এ বিষয়ে শমন অগ্রাহ্য করার নির্দেশ দেওয়া, পুলিসকে সিসিটিভি ফুটেজ না দেওয়ার আদেশ করার মত ঔদ্ধত্য রাজ্যপালের আসে কোথা থেকে?
উত্তরটা খুব শক্ত নয়। তিওয়ারির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার সময়ে কেন্দ্রে ছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পরামর্শে রাজ্যপাল নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। তিওয়ারি অবশ্যই বুঝেছিলেন যে কেন্দ্রের সরকার তাঁর পদ বাঁচানোর চেষ্টা করবে না। তাই মানে মানে কেটে পড়েন। বোস নির্ঘাত জানেন, এই অভিযোগের কারণে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের পরামর্শে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁকে সরে যেতে বলবেন না। শুধু বোস কেন, আপনি-আমিও জানি যে যৌন অপরাধের অভিযোগ বিজেপির কাছে কোনো অভিযোগের মধ্যেই পড়ে না। তাদের সরকার বিলকিস বানোর ধর্ষক বলে শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষমা করে দেয়, জেল থেকে বেরোবার পর মালা পরিয়ে বরণ করে। ওই দলের নেতা আট বছরের মেয়ে আসিফাকে ধর্ষণ করে খুন করায় অভিযুক্তদের সমর্থনে মিছিল করে। পদক জয়ী অলিম্পিয়ানরা রাস্তায় বসে আন্দোলন করলেও ব্রিজভূষণ শরণ সিং গ্রেফতার হন না। ঝামেলা খুব বেড়ে যাওয়ায় তাঁকে কুস্তি ফেডারেশনের সর্বোচ্চ পদ থেকে সরিয়ে তাঁরই ডানহাতকে ওই পদে বসানোর ব্যবস্থা করে দেওয়া হয় আর নির্বাচনের টিকিটটা তাঁকে না দিয়ে তাঁর ছেলেকে দেওয়া হয়। উত্তরপ্রদেশের হাথরাসের মেয়েটার কী হাল করা হয়েছিল তাও আমরা জানি। সোমবার উত্তরবঙ্গ সংবাদ কাগজের প্রথম পাতায় এক প্রতিবেদনে রূপায়ণ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, তার পরিবারকে আজও নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে আর ধর্ষকরা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কর্ণাটকে তো বিজেপির নেতাই অভিযোগ করেছেন, প্রোজ্জ্বল রেবন্ন নামক নরকের কীটটি সম্পর্কে তিনি আগেই নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন এবং জেডিএসের সঙ্গে জোটে থাকা উচিত হচ্ছে না বলেছিলেন। কেউ কান দেয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, যে প্রধানমন্ত্রী এক বছরে একবারও মণিপুরে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি, কুকি মহিলাদের উলঙ্গ করে হাঁটানোর নিন্দা করতে সময় নেন আড়াই মাস, তিনি সামান্য শ্লীলতাহানির অভিযোগেই একজন রাজ্যপালকে সরতে বলবেন? যাঃ!
প্রমাণ হয়ে গেছে, বোসের অনুমান নির্ভুল। প্রধানমন্ত্রী ওই অভিযোগ ওঠার পরে পরেই পশ্চিমবঙ্গে এসে ভোটের প্রচার করে গেছেন, রাজভবনের আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সেখানকার কর্মচারীর অভিযোগ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। মানে সন্দেশখালির প্রধান অভিযুক্তের নাম শাহজাহান না হলে বা সে বিজেপির সদস্য হলে সিবিআই তদন্তের কথা হয়ত উঠত না। গঙ্গাধর সত্যি বলছেন না মিথ্যে, তা নিয়েও মাথা ঘামানোর দরকার হত না। কিন্তু এখন নির্বাচনের মরসুম, সন্দেশখালিতে বিজেপির ‘দোনো হাথ মে লাড্ডু’ হয়ে গেছে। একে হিন্দু বনাম মুসলমান বয়ান তৈরি করা গেছে (গোদি মিডিয়ার সহায়তায় দিব্যি চেপে যাওয়া গেছে যে শাহজাহানের দুই প্রধান স্যাঙাতই হিন্দু), তার উপর ভোটের বাজারে পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ভোটারদের সামনে তৃণমূলকে নারীবিরোধী প্রমাণ করার সুযোগ পাওয়া গেছে। সত্যিই নারীর সম্মান মূল্যবান মনে করলে আনন্দ বোসকে আপাতত পদ ছেড়ে দিতে বলা হত।
কিন্তু এ তো বিজেপির সন্দেহাতীত ব্যবহার। এই ঘটনাতেও মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ আছে বলছি কেন? তার কারণ মুখ্যমন্ত্রী প্রচারে এই কাণ্ড নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন, এরকম আরও অনেক ঘটনা সম্পর্কে তিনি আগেই জানতেন। প্রশ্ন হল, জানলে আগেই কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়ে এই রাজ্যপালকে সরানোর ব্যবস্থা করেননি কেন? তাহলে কি তিনি নির্বাচনের অপেক্ষায় ছিলেন? রাজভবনের কর্মচারী মহিলার অভিযোগকে কি তিনি স্রেফ বিজেপিকে মহিলাবিরোধী এবং নিজের দলকে মহিলাবান্ধব প্রমাণ করার কাজে লাগাচ্ছেন? অর্থাৎ সন্দেহ হয়, এখানেও উদ্দেশ্য সেই মহিলাদের ভোট, মহিলাদের সম্মানরক্ষা নয়।
আলোচনাটা এখানেই শেষ করে দিলে বিজেপি-তৃণমূল বাইনারিকে উৎসাহ দেওয়া হয়ে যাবে হয়ত। যারা রাজ্যের তৃতীয় শক্তি এবং এই নির্বাচনে আরও শক্তিশালী তৃতীয় শক্তি হয়ে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের ভূমিকা সম্পর্কেও কিছু বলা দরকার।
বামফ্রন্টের বড় শরিক সিপিএম, আর কংগ্রেস, দুই দলের নির্বাচনী ইশতেহারেই মহিলাদের সম্পর্কে প্রচুর পরিকল্পনার কথা আছে। সিপিএমের ইশতেহারে ‘women’ শব্দটা আছে ৪৯ বার, কংগ্রেসের ইশতেহারে ৪০ বার। দুই দলেরই ক্ষমতায় এলে মহিলাদের জন্যে অনেক ভাল ভাল পরিকল্পনা আছে, যা পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদেরও যে কাজে লাগবে তা বলাই বাহুল্য। সিপিএম এবারে মহিলা ভোটারদের গুরুত্ব দিয়ে আলাদা করে সাংবাদিক সম্মেলনও করেছে। কিন্তু এখানে আমরা যে দুটো ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছি, সেগুলো সম্পর্কে দুই দলেরই অবস্থান অস্পষ্ট বা আপত্তিকর।
সন্দেশখালির শাহজাহানবিরোধী আন্দোলনে সিপিএম তথা সিপিএম-কংগ্রেস জোটের বসিরহাট কেন্দ্রের প্রার্থী নিরাপদ সর্দার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। পুলিস তাঁকে গ্রেফতারও করেছিল। মীনাক্ষী মুখার্জি সমেত অন্যান্য বাম নেতৃত্বকে সন্দেশখালি যেতে বাধাও দেওয়া হয়েছিল। বিজেপির মত কেবল হিন্দু মহিলা ধর্ষিত হয়েছেন এমন দাবি না করে থাকলেও মহিলাদের উপর নির্যাতন নিয়ে সিপিএমও সরব ছিল। কংগ্রেস ওই এলাকায় প্রায় অস্তিত্বহীন। কিন্তু তারাও ওই আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। এখন গঙ্গাধরকে নিয়ে কী করা হবে সেটা দুই দলের নেতৃত্ব কি বুঝে উঠতে পারছেন না?
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি এবং বহরমপুর কেন্দ্রের প্রার্থী অধীররঞ্জন চৌধুরী ভিডিওর প্রতিক্রিয়ায় ঘুরে ফিরে মমতাকেই দায়ী করেছেন। কেন তা বোঝা শক্ত। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক তথা মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রের প্রার্থী মহম্মদ সেলিম বলেছেন রাজ্যের যেখানে যা কুকর্ম হয় সবেতেই হয় তৃণমূল, নয় বিজেপি অথবা দুই দলই যুক্ত থাকে। বিজেপি নিজের সুবিধা করতে গিয়ে তৃণমূলের দুঃশাসনের সুবিধা করে দিয়েছে গত দশ বছরে। এ কথারই বা মানে কী? গঙ্গাধরের কথায় সিপিএম বিশ্বাস করছে, নাকি ওটা তৃণমূলের চক্রান্ত বলেই ধরছে? সত্যিই ধর্ষণ হয়নি, নাকি হয়েছিল? স্থানীয় সিপিএম জানে না সত্যিটা কী? কিছুই পরিষ্কার হল না। বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা এবং দমদম কেন্দ্রের কংগ্রেস সমর্থিত প্রার্থী সুজন চক্রবর্তী যা বলেছেন তা আরও অদ্ভুত।
সেলিমের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, তিনি জিমন্যাস্টের মত ব্যালান্স বিমের উপরে রয়েছেন। একটু এদিক ওদিক হলেই পড়ে যাবেন, প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যাবেন। আইন এবং সহবত বলে, তদন্ত ছাড়াই কোনো মহিলার লাঞ্ছনার অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। তার উপর রাজ্যের প্রায় অর্ধেক ভোটার মহিলা। তাই সেলিম ধর্ষণের অভিযোগগুলোকে এখনই মিথ্যে বলতে পারছেন না। ওদিকে গঙ্গাধরের ভিডিওটাও যে উড়িয়ে দেওয়া যায় না তা না বোঝার লোক তিনি নন। এর উপর আছে তৃণমূল ও বিজেপি, দুপক্ষই খারাপ – এই অবস্থান বজায় রাখার দায়িত্ব। সুজন যা বলেছেন তাতে আবার মনে হয় তিনি সেলিমের সঙ্গে একমত নন। তিনি নিশ্চিত জানেন যে গঙ্গাধরের ভিডিও ভুয়ো। একই পার্টির দুজন নেতা যদি এরকম প্রায় পরস্পরবিরোধী বিবৃতি দেন, তাহলে পার্টির মত কোনটা তা বোঝা দায় হয়ে পড়ে। যদি স্রেফ ভোট বৈতরণী পার হওয়াই উদ্দেশ্য হয়, তাহলেও এমন গোলমেলে অবস্থান কোনো দলের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়।
তবে এ নিয়ে তবু বাম-কংগ্রেস কোনো একটা অবস্থান নিয়েছে। রাজভবনের কাণ্ডে তাদের অবস্থান কী তা এখন পর্যন্ত অজানা। একমাত্র বিমান বসু ‘অন রেকর্ড’ মতামত দিয়েছেন, যদি একে কোনো মতামত বলা যায় – ‘রাজ্যপালের ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক। সবটা না জেনে এখনই কোনো মন্তব্য করব না।’ অধীর চৌধুরীর রাজ্যপালকে আক্রমণ না করা তবু মেনে নেওয়া যায়। হাজার হোক তিনি কংগ্রেস নেতা। কেন্দ্রে কংগ্রেসের সরকার থাকার সময়ে রাজ্যপালদের দিয়ে কী কী করানো হয়েছে তা হয়ত তাঁর মনে আছে। তাই তিনি রাজ্যপালের খুব একটা দোষ ধরেন না। কিন্তু সিপিএম নেতাদের রাজ্যপালের প্রতি এত সম্ভ্রম কৌতূহলোদ্দীপক।
ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর থেকেই বঙ্গ সিপিএমের নেতারা রাজ্যপালদের সম্পর্কে খুব সাবধানী হয়ে উঠেছেন। বরাবর কিন্তু এমন ছিল না। সিপিএম দল একসময় রাজ্যপাল পদটারই অবলুপ্তি দাবি করত। এবারের ইশতেহারেও লেখা রয়েছে ‘It [CPI(M)] stands for a Governor to be chosen out of a panel of three eminent persons proposed by the chief minister…’। অর্থাৎ সিপিএম চায়, রাজ্যপাল বেছে নিক মুখ্যমন্ত্রী দ্বারা প্রস্তাবিত তিন বিশিষ্ট ব্যক্তির এক প্যানেল। কেরালার রাজ্যপালের সঙ্গে গত কয়েকমাস ধরে ধুন্ধুমার চলছে সে রাজ্যের সিপিএম নেতৃত্বাধীন সরকারের। পার্টির ছাত্র সংগঠন রাজ্যপালের বিরুদ্ধে একের পর এক কর্মসূচি গ্রহণ করে চলেছে। অথচ এ রাজ্যের সিপিএম নেতারা সেই জগদীপ ধনখড়ের আমল থেকেই রাজ্য সরকার আর রাজ্যপালের সংঘাত হলে দুপক্ষই খারাপ – একথা বলতে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জ্যোতি বসু আর তাঁর প্রথম অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতে রাজ্যের পক্ষ নিতেন। বিরোধীশাসিত রাজ্যগুলোকে একজোট করে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের জন্য তাঁরা দীর্ঘদিন পরিশ্রম করেছেন। সারকারিয়া কমিশন অনেকটা সেই পরিশ্রমের ফসল। মোদী সরকারের আমলে যে রাজ্যপাল আর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের লেফটেন্যান্ট গভর্নররা সাংবিধানিক অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করেছেন বারবার, সেকথা কিন্তু সিপিএমের নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যন্ত লেখা হয়েছে। অথচ মমতা সরকারের সঙ্গে যতবার ধনখড়ের সংঘাত হয়েছে, সিপিএম নেতারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন দোষ যে দুজনেরই তা প্রমাণ করতে। বোস আসার পরেও প্রথম দিকে ব্যাপারটা বদলায়নি, ইদানীং অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। বোস যখন গতবছর রাজনৈতিক হিংসায় আক্রান্তদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখন সেলিম বলেছিলেন, এটা রাজ্যপালের কাজ নয়। রাজ্যপাল শাহের নির্দেশে বিজেপি নেতা হওয়ার চেষ্টা করছেন। রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতি এবং হিংসা চলছে অভিযোগ করে বোস বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন গতমাসে। কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল একযোগে বলে – রাজ্যপালের এ কাজ করার এক্তিয়ার নেই।
সেসব না হয় সাংবিধানিক অধিকারের ব্যাপার। বোসের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ নিয়ে মতামত দেওয়া তো তুলনায় সহজ। যে সহবতের কারণে সেলিম সন্দেশখালির মহিলাদের অভিযোগ উড়িয়ে দিতে পারছেন না, সেই সহবত অনুযায়ীই বলতে পারার কথা যে রাজ্যপালের উচিত সরে গিয়ে তদন্তের পথ করে দেওয়া। তিনি দোষী না নির্দোষ তা পরে দেখা যাবে। রাজ্যের প্রায় ৫০% মহিলা ভোটারের কথা ভেবেও বাম, কংগ্রেস নেতারা এইটুকু বলে উঠতে পারছেন না।
রাম পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পেয়েছে জানলে শ্যাম এসএসসির উপর হামলা করতে যাবে কেন? ১৯৯৮ সাল থেকে তো তেমন কিছু ঘটেনি।
ছোটবেলায় এক নিকটাত্মীয়কে দেখতাম ‘গনি খান’ বলতে অজ্ঞান। তখনো আবু বরকত আলি গনি খান চৌধুরী কংগ্রেসের কত বড় নেতা, কোথাকার নেতা, কী তাঁর দোষ বা গুণ – সেসব জানার বয়স আমার হয়নি। এটুকু জানতাম যে তিনি কংগ্রেস নেতা এবং কংগ্রেস আমাদের শত্রু। কারণ কংগ্রেস আমলে আমার বাবাকে অন্য পার্টি করার অপরাধে জেল খাটতে হয়েছে, পরিবারের অন্যদের উপরেও দমনপীড়ন চলেছে। ফলে ওই আত্মীয়ের গনি-মুগ্ধতা দেখে রাগে ফুলতাম। একদিন আমার মা বোঝালেন ‘আরে রাগ করিস কেন? গনি খানের জন্যে চাকরি পেয়েছেন উনি। নুন খাবেন আর গুণ গাবেন না?’ বড় হয়ে জেনেছি, গনি খান রেলমন্ত্রী থাকার সময়ে অনেক বঙ্গসন্তানকেই রেলে চাকরি দিয়েছিলেন এবং সেজন্যে বহু পরিবার আজীবন তাঁকে ভগবানের মত ভক্তি করত। তাঁর ভাইপো ঈশা খান যদি মালদা দক্ষিণ কেন্দ্রে জেতেন, তাতেও ওই কাজের কিছুটা অবদান থাকবে। সেই বঙ্গসন্তানরা সকলেই কি যোগ্য ছিল? আমার আত্মীয় কি যোগ্য ছিলেন? জানি না। তখন যোগ্যতার মাপকাঠি কী ছিল, আদৌ কিছু ছিল কিনা – তাও জানি না। মোদ্দাকথা গনি খান যে বিস্তর লোককে ক্ষমতা প্রয়োগ করে চাকরি পাইয়ে দিয়েছিলেন তা একটি সর্বজনবিদিত গোপনীয় তথ্য। শুনেছি কলকাতার শিয়ালদা অঞ্চলেও বহু পরিবার আছে যারা একসময় সোমেন মিত্র বলতে অজ্ঞান ছিল অনেকটা একই কারণে। বামফ্রন্ট আমলেও পার্টি-ঘনিষ্ঠ বলেই যে অনেকে চাকরি পেয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার উদাহরণও আমার পরিচিতদের মধ্যে আছে। তারা সকলে যে অযোগ্য তা নয়, কিন্তু পার্টি-ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তারা যে অগ্রাধিকার পেয়েছিল তাতে ভুল নেই। কিন্তু ওসবের সঙ্গে এখন যে নিয়োগ দুর্নীতির রায় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল, সেই দুর্নীতির কোনো তুলনা চলে না।
কেন চলে না সে ব্যাখ্যায় আসব, তার আগে বলে নিই প্রথম অনুচ্ছেদেই কংগ্রেস আমল, বাম আমলের পিছন দরজা দিয়ে নিয়োগের কথা কেন বললাম। বনলতা সেনগিরি (‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’) যে কোনো আলোচনাকে লাইনচ্যুত করে। ওই বিড়ালটি প্রথম রাত্রে মেরে রাখার জন্যেই বললাম। বিচারপতিদের কলমের এক আঁচড়ে পঁচিশ হাজারের বেশি স্কুলশিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি চলে গেল যে দুর্নীতির জেরে, তার সঙ্গে অতীতে কোনো আমলে শাসকের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে পাওয়া চাকরির তুলনা চলে না প্রথমত এই কারণে, যে সেখানে শাসক চাকরি বিক্রির ব্যবসা ফেঁদে বসেনি। এখন অবধি যতটুকু আদালতে প্রমাণিত এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত, তাতেই দেখা যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা স্কুলের চাকরি কেনাবেচার রাজ্যজোড়া বাজার খুলে বসেছিলেন। ও জিনিস এ রাজ্যে অভূতপূর্ব। মধ্যপ্রদেশের ব্যাপম কেলেঙ্কারির সঙ্গে হয়ত তুলনা চলতে পারে।
দ্বিতীয়ত, মাপকাঠির প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গে বহুকাল ধরে কলেজে শিক্ষক নিয়োগের জন্য কলেজ সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা চালু থাকলেও স্কুলশিক্ষক নিয়োগের কোনো মাপকাঠি ছিল না। স্কুলগুলো শূন্য পদ থাকলে নিজেরাই বিজ্ঞাপন দিত, ইন্টারভিউ নিত, নিয়োগ করত। এই ব্যবস্থারই সুযোগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে নিয়োগ চলত। সে রাস্তা বন্ধ করতেই স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু করা হয়েছিল। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য সর্বভারতীয় নেট (National Eligibility Test) বা রাজ্যস্তরের স্লেট (State Level Eligibility Test) পরীক্ষার মত ১৯৯৭ সালে আইন করে পশ্চিমবঙ্গে চালু হয় স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা (প্রথম পরীক্ষা ১৯৯৮ সালে)। অর্থাৎ রাজ্যের সব সরকারপোষিত স্কুলে শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগের জন্য একটিই পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষা এবং কমিশনের বিশেষজ্ঞদের কাছে ইন্টারভিউতে পাস করলেই স্কুলের চাকরির পাকাপাকি ব্যবস্থা।
বাম আমলের শেষ দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা জানত, এ রাজ্যে তাদের জন্যে আর কিছু না থাক, একটা সরকারি চাকরি আছেই – স্কুলের চাকরি। ১৯৯৮-২০১০ – এক যুগ এই পরীক্ষা হয়েছে, মেধা তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, নিয়োগ হয়েছে। যোগ্যতার যে মাপকাঠি এসএসসি ঠিক করেছিল সেটাই সঠিক কিনা, যারা এই পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি তারাই যে অযোগ্য তার প্রমাণ কী – এসব সূক্ষ্ম তর্ক করাই যায়। কিন্তু ওই বছরগুলোতে অমুককে টপকে তমুক চাকরি পেয়ে গেল কী করে, অমুক তমুকের থেকে কম নম্বর পেয়েছে তাও আগে চাকরি পেল কী করে – এইসব অভিযোগ নিয়ে থানা পুলিস মামলা মোকদ্দমা হয়নি। অন্যায়ভাবে বাদ পড়ার অভিযোগ করে কাউকে রাজপথে বসে থাকতে হয়নি একদিনও। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু অবশ্য গতবছর মার্চে বলেছিলেন যে সিএজি রিপোর্টে উল্লেখ আছে, বাম আমলেও ৪৬,০০০ নিয়োগে অনিয়ম ছিল। তাঁদের সরকার ভদ্রতাবশত সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে যেভাবে তৃণমূল সরকারের নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে রাজনীতি করছে বিরোধীরা, তাতে এইবার মুখ্যমন্ত্রীকে জানানো হবে। তিনি যা বলবেন তাই হবে। ব্রাত্যবাবু কি আজও জানাননি, নাকি মুখ্যমন্ত্রী এখনো চিরশত্রু বামেদের সঙ্গে ভদ্রতা করছেন? জানি না। সেইসময় ব্রাত্যবাবু বলেছিলেন ১৯৯৭ থেকে পশ্চিমবঙ্গে স্কুলে যত নিয়োগ হয়েছে তা নিয়ে শ্বেতপত্রও প্রকাশ করবে রাজ্য সরকার। সেই শ্বেতপত্রই বা কোথায় গেল?
এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না যা-ই হোক, এসএসসি পরীক্ষা চালু রেখেই কীভাবে চাকরি বিক্রির বাজার খোলা যায়, সে বুদ্ধি সম্ভবত তৃণমূল সরকারের আমলে কেউ জোগাড় করে উঠতে পারেনি। তাই ব্যবস্থাটাকেই ধসিয়ে দেওয়া হল ক্রমশ। ২০১৩-১৪ থেকেই নানা অভিযোগ উঠতে শুরু করে, ২০১৬ থেকে অভিযোগের বন্যা। এখন যে ছেলেমেয়েরা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে তাদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায় যে শিক্ষক হওয়ার প্রত্যাশা তারা অনেকেই ত্যাগ করেছে। এসএসসি পরীক্ষা আর কখনো সুষ্ঠুভাবে হয়ে স্কুলে তাদের চাকরি হবে বলে তারা মনে করে না। এই হতাশা নেহাত যুক্তিহীন বলা যাবে না। কারণ আজকাল নিজের ঘরে আগুন লাগার আগে পর্যন্ত কেউ কোথাও আগুন লেগেছে দেখলে গা করে না, আর স্কুলে নিয়োগের সংকট শেষ বিচারে খুব বেশি সংখ্যক পশ্চিমবঙ্গবাসীর সংকট নয়। যাদের চাকরি গেল তাদের সংকট, যারা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল তাদের সংকট, হয়ত যারা দেবে ভেবেছিল তাদের মানসিক হতাশার কারণ। আর সংকট স্কুল চালাতে নাকের জলে চোখের জলে হওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাদের, যাঁরা আদালতের সাম্প্রতিকতম রায়ের পরে আরও বিপদে পড়ে গেলেন। কারণ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে আমরা জেনে গেছি যে অনেক স্কুলে আর কোনো স্থায়ী শিক্ষকই থাকবেন না ২০১৬ সালে এসএসসি পাস করা ব্যক্তিরা বরখাস্ত হওয়ার পর। অনেক স্কুলে কোনো কোনো বিষয় আর পড়ানো যাবে না শিক্ষক নেই বলে। বিচারপতি দেবাংশু বসাক আর বিচারপতি মহম্মদ শব্বর রশীদি এই রায় দেওয়ার অনেক আগে থেকেই তো জানা যাচ্ছিল, কোথাও মাসিক তিন-চার হাজার টাকা বেতনে আংশিক সময়ের শিক্ষক চাইছে স্কুল, কোথাও আবার স্থানীয় মানুষের কাছে আবেদন জানানো হচ্ছে – যদি কোনো সহৃদয় ব্যক্তি এসে অমুক বিষয়টা বিনামূল্যে পড়িয়ে দিয়ে যান তো ভাল হয়। স্কুলে ওই বিষয়ের শিক্ষক নেই, অথচ ছাত্রছাত্রী আছে।
কিন্তু এসব স্কুলশিক্ষার সঙ্গে জড়িত মানুষের সমস্যা। যাঁরা পড়ান তাঁদের সমস্যা, যারা পড়ে তাদের আর তাদের বাবা-মায়েদের সমস্যা। এ নিয়ে নিয়মিত সান্ধ্য টিভি বিতর্ক হয় না। আজকাল তো এতরকম সমীক্ষা হয়। কেউ যদি সমীক্ষা করে, কলকাতার সম্পাদকদের কতজনের ছেলেমেয়ে সরকারপোষিত স্কুলে পড়ে আর যাঁরা স্টুডিওতে এসে গলা ফাটান তাঁদের কতজনের সন্তান ওসব স্কুলে পড়ে – তাহলেই বোঝা যাবে কেন সান্ধ্য বিতর্ক হয় না। এবারে নির্বাচন পর্বের মধ্যে এতগুলো লোকের চাকরি গেছে তাই, নইলে রাজ্যের মূলধারার সংবাদমাধ্যম কতদূর পাত্তা দিত সন্দেহ আছে। কলকাতা নাকি প্রতিবাদের শহর। সেখানে কয়েকশো ছেলেমেয়ে হাজার দিনের বেশি রাস্তায় বসে আছে (সকলে চাকরির দাবি করেও নয়, অনেকে যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ দাবি করে), অথচ সরকারি স্কুলশিক্ষায় কিছু এসে যায় না এমন কজন মানুষ একবার গিয়ে দাঁড়িয়েছেন সেখানে? টিভি ক্যামেরাও পৌঁছয় কখনো সরকার বা বিরোধী পক্ষের কোনো নেতার কথায়, কি আদালতের খোঁচায় এই ইস্যু উঠে এলে তবেই। এমনকি এই ১১০০ দিন পেরিয়ে যাওয়া আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর কথা চাকরি পেয়ে যাওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও কোনোদিন মনে পড়েনি। তাঁরা বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের উদ্যোগে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বসলেন কখন? যখন রাজ্য সরকার মহার্ঘ ভাতার দাবি উড়িয়ে দিল। তার আগে চাকরিপ্রার্থীদের হয়ে একটাও মিছিল করেছেন এসএসসির যুগে চাকরি পাওয়া নবীন বা তার আগের যুগে চাকরি পাওয়া প্রবীণ শিক্ষকরা? একদিনও আন্দোলনের সঙ্গে সহমর্মিতা জানাতে গিয়ে বসেছেন পথে?
২০১৯ সালে যখন ধর্মতলায় প্রায় একমাস ধরে অনশন করেছিলেন চাকরিপ্রার্থীরা, তখন একদিন অফিস যাওয়ার পথে গিয়েছিলাম সেখানে। সেদিনও প্রবল গরম আর অদূরে ইডেন উদ্যানে আইপিএলের প্রথম খেলা। কাতারে কাতারে মানুষ ইডেনমুখো। তার মধ্যে ভরদুপুরে মুখ অন্ধকার করে শহরের একেবারে মধ্যিখানে বসেছিল কতকগুলো ছেলেমেয়ে। কখনো বিমান বসু গেছেন বলে টিভি ক্যামেরা গেছে, কখনো কোনো বিজেপি নেতা গেছেন বলে গেছে। সেবার ব্যাপারটা একটু বিপজ্জনক দিকে চলে যাওয়ায় (আসলে বোধহয় সেটাও নির্বাচনের বছর হওয়ায়) শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজে গিয়ে চাকরি হবে আশ্বাস দিয়ে অনশন ভাঙিয়েছিলেন। চাকরি হয়নি। কিন্তু সেকথা কে মনে রেখেছিল এতদিন? যে কোনো আন্দোলন অবশ্য এ রাজ্যে এমন প্রতিক্রিয়াই পায়। ছন্দা সাহা, রেবতী রাউত, তাপস বর – এই মানুষগুলোর কারোর মনে আছে আজ? করুণাময়ী মোড় থেকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে যখন রাস্তা দিয়ে টেনে হিঁচড়ে আন্দোলনকারীদের নিয়ে গেছে পুলিস, তখন মনে করতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। কারণ টিভিতে দেখা গেছে, কাগজে ছবি বেরিয়েছে। ব্যাস ওটুকুই।
এখন হাজার পঁচিশেক মানুষের চাকরি গেছে শুনে প্রায় অর্ধশতক আগের বেকারত্বের হারে পৌঁছে যাওয়া দেশের কিছু মানুষ আশ্চর্য রকম খুশি। কেন খুশি জানি না। এদের অনেককেই তো বেকারত্ব নিয়ে অন্য সময়ে চিন্তিত দেখি। ওই যে অটোর পিছনে লেখা থাকে ‘দ্যাখ কেমন লাগে’ – তেমন কোনো ধর্ষকাম মানসিকতা ছাড়া এর কোনো ব্যাখ্যা নেই বলেই মনে হয়। অবশ্য যে মানুষ পাশের বাড়িতে আগুন লেগেছে দেখে বালতি ভরে জল নিয়ে দৌড়ে যাওয়া দূরে থাক, হায় হায় বলে আর্তনাদও করে না, সে যে ধর্ষকাম তাতে আর সন্দেহ কী? এ যুগে ক্ষেত্রবিশেষে আমরা সবাই ধর্ষকাম। সুতরাং আমাদের তৈরি রাষ্ট্র যে ধর্ষকাম হবে তা বলাই বাহুল্য। আদালত বারবার চাইলেও নিয়ামক সংস্থা কারা পাস করেছিল আর কারা টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছে তা ঝাড়াই বাছাই করার জন্যে প্রয়োজনীয় ওএমআর শিট জমা দেয় না। সরকার ওএমআর শিট তিনবছর রেখে দেওয়ার নিয়ম বদলে একবছর করে দেয়, তারপর বিপদ বুঝে বলে – এবার থেকে দশবছর রাখা থাকবে। আর আদালত ঝাড়াই বাছাই করা যাচ্ছে না বলে সকলেরই চাকরি খায়।
এমনিতে যে ভারতীয় আদালতে কোনো মামলার নিষ্পত্তি হওয়ার গতি সবচেয়ে বেশি, সেটা হল হিন্দি সিনেমার আদালত – আড়াই থেকে তিন ঘন্টায় পুলিস তদন্ত শেষ করে আদালতে রিপোর্ট দাখিল করে, বিচারপতি সাক্ষী সাবুদ যাচাই করে রায় দিয়ে দেন। এদেশের অন্য সব আদালতই রাবীন্দ্রিক – এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না। কিন্তু এই মামলায় দেখা গেল আদালত রীতিমত ‘ফাস্ট ট্র্যাক’। গত ৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট নিয়োগ সংক্রান্ত সব মামলার একত্রে বিচার করার জন্য কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করতে অনুরোধ করেছিল। তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায়ে যাদের চাকরি গিয়েছিল তাদের বরখাস্ত করার নির্দেশও ছমাসের জন্য রদ করে দিয়েছিল, যাতে ইতিমধ্যে বিশেষ বেঞ্চ বিচারের কাজ শেষ করতে পারে। পাঁচ মাস ২১ দিনের মাথায় রায় ঘোষণা করে দিলেন মহামান্য বিচারপতিরা। এমন নির্দিষ্ট তারিখ মেনে দেশে খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাসবাদী হামলার অভিযোগের বিচারও যদি হত! বোঝা যাচ্ছে আদালতের তাড়া ছিল। এত তাড়া ছিল যে তিনবার বৈধ চাকুরেদের তালিকা দিতে বলা সত্ত্বেও যখন স্কুল সার্ভিস কমিশন দিল না, তখন তার চেয়ারম্যানকে গ্রেফতার করানো বা বরখাস্ত করার সময় পেল না আদালত। গোটা কেলেঙ্কারিতে ক্যাবিনেটের দায় আছে বোঝা সত্ত্বেও যিনি এ রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী তাঁকেও তখনই ধরতে বলা হল না সিবিআইকে। ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার মামলায় ঘুষ কে বা কারা নিয়েছে তার খোঁজ পরে হবে, আগে বরখাস্ত হল যারা ঘুষ দিয়েছে তারা। সঙ্গে যারা ঘুষ দেয়নি বলে আদালতেরও বিশ্বাস, তারাও।
পরের ছেলে পরমানন্দ বিচারকদের তাড়া থাকতেই পারে। কার রাজ্যপাল হওয়ার তাড়া, কার সাংসদ হওয়ার তাড়া তা আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। আমরা আইন-টাইনও তত বুঝি না। কিন্তু আশ্চর্য লাগে যখন দেখি ঘুষ নেওয়ার চেয়েও বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ঘুষ দেওয়া। আমাদের উদাসীনতা বা ধর্ষকাম মানসিকতা স্বীকার করে নিয়ে মনে করিয়ে দিই, আমরা এমন এক রাজ্যে বাস করি যেখানে কয়েক বছর আগে যথেষ্ট নম্বর পেয়েও কলেজে ভর্তি হতে গেলে শাসক দলের ছাত্র সংসদকে মোটা টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছিল। সেই রাজ্যে ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়াকে ঠিক কতখানি অপরাধ বলে গণ্য করা উচিত, সেই নৈতিক প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেকে দিয়ে উঠতে পারছি না। আইনে সবকিছু মোটা হরফে লেখা আছে, নীতি ব্যাপারটা তো অত সোজা নয়। পশ্চিমবঙ্গে বসে সন্দেহ করা আদৌ অন্যায় নয় যে যাঁরা টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছেন তাঁদের মধ্যেও এমন প্রার্থী আছেন, যিনি সসম্মানে পরীক্ষায় পাস করেছিলেন। কিন্তু অমুক দাদা বা তমুক দিদি হয়ত ডেকে বলেছিলেন, অমুক পরিমাণ টাকা না দিলে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে না।
এমন কোনো মতলব না থাকলে পার্থ চ্যাটার্জি শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মেধা তালিকা প্রকাশ না করে এসএমএসে যোগ্য প্রার্থীদের জানানো হবে বলেছিলেন কেন? পাবলিক পরীক্ষায় কে কে পাস করেছে সে তথ্য প্রাইভেট হবে কেন? এ তো নির্বাচনী বন্ডের মত হয়ে গেল – কে টাকা দিল, কাকে টাকা দিল তা তৃতীয় ব্যক্তি যেন জানতে না পারে। শুধু যে টাকা পেল সে জানবে আর যে দিল সে জানবে। এক্ষেত্রেও যে চাকরি পেল শুধু সে-ই জানল আর যে চাকরি দিল সে জানল। নির্বাচনী বন্ডে ওই ব্যবস্থা করার পক্ষে তবু একটা অজুহাত ছিল। কোন দলকে কে চাঁদা দিচ্ছে জানলে অন্য দল দাতার উপর হামলা করতে পারে। কিন্তু রাম পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পেয়েছে জানলে শ্যাম এসএসসির উপর হামলা করতে যাবে কেন? ১৯৯৮ সাল থেকে তো তেমন কিছু ঘটেনি। বরং বহু চাকরিপ্রার্থীই একবার পাস করতে না পেরে আবার পরীক্ষা দিয়েছেন, দ্বিতীয় বা তৃতীয় বারে উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি পেয়েছেন। আর এখন হাজার জোরাজুরিতেও কমিশন জানিয়ে উঠতে পারছে না যে কারা উত্তীর্ণ হয়েছিলেন? এ তো বড় রঙ্গ যাদু।
এই কারণেই না ভেবে উপায় নেই যে আদালতকে যোগ্য-অযোগ্য আলাদা করতে সাহায্য না করার কারণ আসলে অনুত্তীর্ণরা। কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মজুমদার জোর দিয়ে বলছেন চাকরি যাওয়া ২৫,৭৫৩ জনের মধ্যে মাত্র ৫,২৫০ জন অযোগ্য। অথচ ‘(বাকিরা যে প্রত্যেকে যোগ্য) সেই বিষয়ে নিশ্চিত নই। পুরোপুরি শংসাপত্র দিতে পারব না।’ কেন পারবেন না? ওএমআর শিট নেই বলে? কেন নেই? ঠিক ২০১৬ সালেই নিয়ম বদলে ওএমআর শিট তিন বছরের বদলে এক বছর রাখলেই চলবে এই নিয়ম করা হয়েছিল বলে? সেই নিয়ম কি করাই হয়েছিল ওএমআর শিট পুড়িয়ে দেওয়া হবে বলে? পুড়িয়ে দেওয়ার তাড়াহুড়ো কি আজকের মত পরিস্থিতির কথা ভেবে করা হয়েছিল? যদি আদালতকে ২০,৫০৩ জন যোগ্য প্রার্থীর নাম জানিয়ে দেওয়া হত তাহলে তাঁদের চাকরি যেত না। যেত কেবল বাকিদের। তখন ওই হাজার পাঁচেক মানুষ সদলবলে যাঁদের হাতে টাকা দিয়েছেন তাঁদের কাছে টাকা ফেরত চাইতেন এবং ব্যাপারটা একেবারে অহিংস থাকত, এমন সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ আদালতের রায়ে এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অপরাধের কারবারীদের পিঠ আক্ষরিক অর্থে বেঁচে গেল। এখন মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর ভাইপো, শিক্ষামন্ত্রী, এসএসসি চেয়ারম্যান – সকলেই সুপ্রিম কোর্ট দেখিয়ে বলতে পারছেন, এই তো আবেদন করেছি। কোনো চিন্তা নেই।
ঘটনা হল, আবেদন করলেও চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। হাইকোর্টের এই বিশেষ বেঞ্চ গঠিতই হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের অনুরোধে (পড়ুন নির্দেশে)। সেই বেঞ্চের রায় কি একেবারে উল্টে দেবেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা? বড়জোর তমলুকের বিজেপি প্রার্থী, থুড়ি প্রাক্তন বিচারপতি, অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায়ের যেমন প্রয়োগ আটকে দেওয়া হয়েছিল কিছুদিনের জন্যে, তেমন কিছু হতে পারে। নির্বাচন পর্ব শেষ হওয়ার আগেই তা হলে তৃণমূলের লাভ, না হলে বিজেপির। যাঁদের চাকরি গেল তাঁদের অবস্থা উনিশ-বিশ হবে আর যাঁরা রাস্তায় বসে আছেন তাঁদের দুর্দশারও কোনো সুরাহা হবে না। ইতিমধ্যে যারা ঘুষ নিয়েছিল তারা হয়ত বাঙ্কার-টাঙ্কার বানাবে অথবা য পলায়তি স জীবতি উপদেশ শিরোধার্য করবে।
আর আমরা? কদিন পরেই যোগ্য, অযোগ্য, যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ না পাওয়া – সকলের কথাই ভুলে যাব। তারপর হয়ত একদিন সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোবে। তাতে যদি রায় উল্টে যায় তাহলে যাঁদের চাকরি বেঁচে গেল তাঁদের এবং তাঁদের পরিবার পরিজনের কাছে তৃণমূল স্বচ্ছ দল হয়ে যাবে; যদি হাইকোর্টের রায় বহাল থাকে তাঁরা সুদ্ধ সকলের কাছে তৃণমূল চোর বলে প্রমাণিত হবে। বাংলার লক্ষ স্কুল নিরাশায়, আলোহীনতায় ডুবে নিস্তব্ধ নিস্তেল হয়ে গেলে তৃণমূলের কী, বিজেপির কী, আদালতের কী আর আমাদেরই বা কী? আমাদের ছেলেমেয়েরা তো আর ওসব স্কুলে পড়ে না। ওগুলো না হয় কদিন পরে উঠে যাবে বা বেসরকারি হয়ে যাবে। সকলেই জানে – বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে।
অতএব ও নিয়ে ভেবে লাভ নেই। নির্বাচনে কে জিতল সেটাই আসল কথা।
মোদী ম্যাজিক কথাটা তো সেই ২০১৪ সাল থেকে শুনে আসছেন। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, ম্যাজিকটা ঠিক কী? এমনিতে বাঙালি পি সি সরকারের জাত। হাত-পা বেঁধে গালা দিয়ে সিল করা প্যাকিং বাক্সে পুরে সমুদ্রে ফেলে দিলেও সাঁতরে পাড়ে এসে ওঠা, লোকের চোখে সামনে আস্ত ট্রেন বা তাজমহল ভ্যানিশ করে দেওয়াই যে ম্যাজিকের সর্বোচ্চ স্তর তা আমরা ছোটবেলা থেকে জানি। ফলে জাত জাদুকর চিনতে আমাদের ভুল হয় না। পি সি সরকার জুনিয়র যে দলের প্রার্থী হয়েছিলেন একদা, সেই দলের সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা নরেন্দ্র মোদীর ম্যাজিকগুলো এইবেলা চিনে নেওয়া আমাদের কর্তব্য। কারণ প্রথম দু দফা ভোটদানের পরে অনেক বিশ্লেষক বলছেন ২০১৪ আর ২০১৯ সালের মত মোদী ম্যাজিক নাকি হচ্ছে না। এঁদের বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে ৪ জুন মোদী চারশো পার করে ফেলতেই পারেন। তখন এঁরা কী বলবেন? আমরা বরং একটু এগিয়ে থাকার চেষ্টা করি। ইন্দ্রজাল কেমন করে হয় তা তো শুধু জাদুকর জানেন। আমাদের সাধ্য কী বুঝে ফেলি? আমরা কেবল জাদুকর মঞ্চের উপরে যা যা করেন সেগুলো চিহ্নিত করতে পারি। সেটাই করা যাক।
ছিল নির্বাচন কমিশন, হল ঠুঁটো জগন্নাথ
এবারের ভোটে সোজা পথে জেতা সহজ হবে না আন্দাজ করে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বেছে নেওয়ার কমিটিতে দেশের প্রধান বিচারপতির বদলে একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে রাখার আইন পাস করা হয়েছে। তারপর সেই আইন অনুযায়ী এমন লোকেদের বেছে নেওয়া হয়েছে যাঁরা মোদীর গত রবিবারের ঘৃণাভাষণ নিয়ে মন্তব্য করতেও ভয় পান। সতেরো হাজার নাগরিক স্বাক্ষরিত চিঠি বা মোদীর মন্তব্য নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সমালোচনাও নির্বাচন কমিশনের মুখ খোলাতে পারেনি। এর জন্যে নির্বাচন কমিশনারদের আবার রামভক্ত বলে বসবেন না। তাঁরা কুম্ভকর্ণের ভক্ত। তবে চক্ষুলজ্জা বলে তো একটা জিনিস আছে। তাই তাঁরা নিরপেক্ষতা দেখাতে রাহুল গান্ধী আর মোদী – দুজনের বক্তব্যেই আপত্তি জানিয়ে দুই ব্যক্তিকে নয়, তাঁদের পার্টিকে নোটিস পাঠিয়েছেন। অভূতপূর্ব ঘটনা, অর্থাৎ ম্যাজিক।
প্রার্থী ভ্যানিশ
যে কোনো বড় ঐন্দ্রজালিকের মত মোদীর ঝুলিতে আরও অনেক তাস আছে। তাঁর খাসতালুক গুজরাটের সুরাটে যাতে এই গরমে ভোটারদের ভোট দিতে বেরোতে না হয় তার ব্যবস্থা করে ফেলেছে দল। কংগ্রেস প্রার্থী নীলেশ কুম্ভানির প্রস্তাবকদের সই নিয়ে সন্দেহ আছে বলে অভিযোগ করেছিল বিজেপি। রিটার্নিং অফিসার সৌরভ পাড়হি সেই অভিযোগে সায় দেন। বলেন প্রস্তাবকরা নাকি হলফনামা জমা দিয়ে জানিয়েছেন যে ওগুলো তাঁদের সই নয়। কংগ্রেস অভিযোগ করেছে সেই প্রস্তাবকদের অপহরণ করা হয়েছিল, যাতে প্রার্থী তাঁদের সশরীরে রিটার্নিং অফিসারের সামনে হাজির করতে না পারেন। ঘটনা এইটুকু হলেও না হয় কথা ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের বিকল্প প্রার্থী সুরেশ পাড়সালার মনোনয়নও বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। শুধু কি তাই? সুরাট কেন্দ্রের নির্দল প্রার্থীরাও কোনো অজ্ঞাত কারণে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন। ফলে বিজেপি প্রার্থী মুকেশ দালাল ইতিমধ্যেই হাসি হাসি মুখে রিটার্নিং অফিসারের হাত থেকে জয়ীর শংসাপত্র নিয়ে ছবি তুলে ফেলেছেন। এদিকে কুম্ভানি নিজেও সোমবারের পর উধাও। কংগ্রেসের কেউ কেউ মনে করছেন উনি কয়েকদিনের মধ্যেই বিজেপিতে যোগ দেবেন। গুজরাট প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি তাঁকে ছ বছরের জন্য দল থেকে বহিষ্কারও করেছে বিজেপির সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ করে।
এর আগেই আমেদাবাদ পূর্ব আসনের কংগ্রেস প্রার্থী রোহন গুপ্তা নাম ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পর বাবার অসুস্থতার দোহাই দিয়ে ভোটে দাঁড়াবেন না বলেন, তারপর দলত্যাগ করেন। আগামী কয়েক দফার নির্বাচনে আরও কত আসনে এরকম ঘটবে কে বলতে পারে?
এক পার্টি থেকে দুই, দুই থেকে চার
কংগ্রেস মোদীর ঘৃণাভাষণ এবং সুরাটের ঘটনার প্রতিবাদ করে নির্বাচন কমিশনে লম্বা চিঠি দিয়ে এসেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কী করবে? অনেক আগেই মহারাষ্ট্রের দুই শক্তিশালী দল শিবসেনা আর এনসিপিকে ভেঙে দিয়েছে মোদীর বিকাশ। তারপর বিজেপির সঙ্গে চলে যাওয়া অংশকেই আসল দল তকমা দিয়ে তাদেরই দলীয় প্রতীক ব্যবহারের ক্ষমতা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। মোদী সাত্ত্বিক মানুষ, মদ্যপান করেন না। তাই দীপ জ্বেলে যাই ছবির অনিল চ্যাটার্জির মত জলের বোতল হাতে নিয়ে গাইতেই পারেন ‘এমন বন্ধু আর কে আছে?’
লোকাল ট্রেনে দশ টাকায় দশখানা কলম বিক্রি করা হকারদের দেখেছেন তো? তাঁরা একটা করে কলম বার করেন আর এমন বিশদে তার গুণাবলী বর্ণনা করেন যে মনে হয় এটাই শেষ কলম। তারপর বলেন ‘এখানেই শেষ নয়…’। মোদীর চারশো পারের ম্যাজিকও সেইরকম।
যেমন সিপিএম অভিযোগ করেছে, ত্রিপুরা পশ্চিম কেন্দ্রের সরকারি নথিই বলছে কোথাও কোথাও ১০০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে।
নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র…
এখানেই শেষ নয়। আছে ইভিএম। মোদীভক্তদের কথা আলাদা। তার বাইরে যাঁরা কাল অবধিও ইভিএমে কারচুপি আছে শুনলেই বিরোধীদের ছিঁচকাঁদুনে বলতেন, তাঁরাও এখন ব্যাপারটাকে নেহাত ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব বলে উড়িয়ে দিতে পারছেন না। কারণ নির্বাচন কমিশন ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই যা করে, তাকে বাংলায় বহুকাল ধরে বলা হয় ‘ঠাকুরঘরে কে রে? আমি তো কলা খাইনি’।
নির্বাচনী বন্ড নিয়ে যাঁরা মামলা করেছিলেন তাঁদের অন্যতম, অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রাইটস (এডিআর), এবং আরও অনেকে মিলে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ইভিএম নিয়ে। ইভিএম বাতিল করার দাবি করা হয়নি। দাবি ছিল ইভিএমের ভোট যে ভোটারের মতই প্রতিফলিত করছে তা নিশ্চিত করতে সমস্ত ভোটার ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেল (ভিভিপ্যাট) স্লিপ গোনা হোক। নির্বাচন কমিশন সেটুকুও এড়াতে মরিয়া। ভিভিপ্যাট গোনার জন্যে নয়, গুনতে গেলে পাঁচদিন লেগে যাবে ইত্যাদি অদ্ভুত যুক্তি দেওয়া হয়েছিল কমিশনের পক্ষ থেকে। কোনো প্রযুক্তিগত গোলমাল যে নেই তাও কেবল মুখের কথায় বিশ্বাস করতে হবে – এরকমই দাবি নির্বাচন কমিশনের। শুনানি চলাকালীনই কেরালার কসরগোড় থেকে খবর আসে যে মক পোলে বিজেপির প্রতীকে একটা করে অতিরিক্ত ভোট চলে যাচ্ছে কিছু ইভিএমে। বিচারপতি সঞ্জীব খান্না ও বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের বেঞ্চ কমিশনকে খতিয়ে দেখতে বলে। কমিশন বলে দেয় খবরটাই নাকি মিথ্যে।
মজার কথা, নির্বাচন কমিশনের যে চার বিশেষজ্ঞের দল আছে ইভিএম-ভিভিপ্যাট ব্যবস্থা সুরক্ষিত আছে কিনা তা দেখার জন্য, তার সদস্যরা নিজেরাই ভিভিপ্যাট নির্মাণ করেছেন। দ্য নিউজ মিনিট ওয়েবসাইটের এই তাক লাগানো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গত সোমবার। মানে আপনার বানানো মেশিন যে ঠিক কাজ করছে তার সার্টিফিকেট দিচ্ছেন আপনিই। এরকম একটা ব্যবস্থায় চলছে গোটা দেশের লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন। কখনো কোনো বাইরের লোককে পরীক্ষা করে দেখতে দেওয়া হয়নি এই ব্যবস্থায় কোনো গলদ আছে কিনা। কিন্তু শেষমেশ বিচারপতিরা রায় দিয়েছেন, সমস্ত ভিভিপ্যাট স্লিপ গোনার কোনো দরকার নেই। তবে যে কম্পিউটার থেকে ইভিএমে পার্টিগুলোর প্রতীক ঢোকানো হয়, সেগুলোকেও ইভিএম আর ভিভিপ্যাট মেশিনের সঙ্গে ফল ঘোষণার ৪৫ দিন পর পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে। পরাজিত প্রার্থীরা ৫% ইভিএম যাচাই করতে চাইতে পারবেন স্বখরচায়।
বিচারপতি খান্না আর বিচারপতি দত্ত এই রায় দিতে গিয়ে বলেছেন, সবসময় অন্ধভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অবিশ্বাস করলে অপ্রীতিকর সন্দেহ তৈরি হতে পারে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি। এতদিন জানতাম বিশ্বাস অন্ধ হয়। বিচারপতিদ্বয় আমাদের শেখালেন, অবিশ্বাসও অন্ধ হয়।
ট্রেন ভ্যানিশ
এখানেও শেষ নয়। অভিযোগ উঠেছে যে আসামের প্রবাসী শ্রমিকরা (যাঁদের বড় অংশ মুসলমান) যাতে ভোট দিতে আসতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যে আসামগামী ছটা ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।
A huge number of voters, mostly Muslim, were going to Karimganj to cast their vote.
জাদুকর মোদী যখন ঝুলি থেকে এত পায়রা, খরগোশ ইত্যাদি বার করতে পারেন তখন তাঁর চারশো পার করা কি নিশ্চিত?
মোটেই না। গত কয়েক বছর ধরে যেভাবে বিরোধী মতের রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, ছাত্রনেতা এবং সাংবাদিকদের কারারুদ্ধ করা হচ্ছে; গত কয়েক মাসে যেভাবে বিরোধী দলের মুখ্যমন্ত্রীদেরও জেলে পোরা হয়েছে; গত কয়েক দিন ধরে মোদী যেভাবে কংগ্রেসকেও মাওবাদী বলে দেগে দিচ্ছেন তাঁর বক্তৃতায় এবং তাঁর ডান হাত শাহ যেভাবে বলেছেন এবার ক্ষমতায় এলে দুবছরের মধ্যে ভারতে মাওবাদ শেষ করে দেওয়া হবে, তার সঙ্গে অনেকটা মিলে যায় ১৯৩৩ সালে জার্মানির ফেডারেল ইলেকশনের আগে নাজি সরকারের কার্যকলাপ। অত কাণ্ড করেও কিন্তু তারা সেবার নির্বাচনে একা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। জার্মান ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (ডিএনভিপি) মদত দরকার হয়েছিল। সেই দলকে অনতিবিলম্বেই গিলে নেয় অ্যাডলফ হিটলারের দল এবং প্রতিষ্ঠিত হয় একনায়কতান্ত্রিক শাসন। মোদীর দলেরও জোটসঙ্গী আছে। ২০১৯ সালের চেয়ে কম, কারণ অনেকেই বিপদের আশঙ্কা করে কেটে পড়েছে। তবু আছে। তার বাইরেও আছে কিছু দল, যাদের দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে ভ্যানিশ করার জন্যে মোদীর হাতে আছে আয়কর বিভাগ, ইডি, সিবিআই। গত সোমবারই যেমন কলকাতা হাইকোর্টের এসএসসি মামলার রায়ে সিবিআই তদন্তের আওতায় চলে এসেছে মমতা ব্যানার্জির পুরো ক্যাবিনেট। অর্থাৎ এই রায়ে আর কিছু হোক না হোক, অন্তত লোকসভা ত্রিশঙ্কু হলে মোদীর তৃণমূলের সমর্থন আদায় করার ব্যবস্থা হয়ে রইল।
১৯৩৩ সালের পর জার্মানিতে আর বহুদলীয় নির্বাচন হয়নি দেড় দশক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাজি জার্মানির শোচনীয় পরাজয় না হলে আরও কতদিন হত না তা বলা কঠিন। সুতরাং যে ভারতীয় ভোট দেওয়ার অধিকারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, তিনি যে দলেরই সমর্থক হোন, এই নির্বাচনে তাঁর একটাই কাজ – আর পাঁচটা দলের সমর্থন নিয়েও মোদীর ক্ষমতায় ফিরতে না পারা নিশ্চিত করা। ম্যাজিক মঞ্চেই ভাল। কারণ সে ম্যাজিকে যারা ভ্যানিশ হয় তাদের জাদুকর আবার ফিরিয়ে আনেন। নাজিরা যাদের ভ্যানিশ করে দিয়েছিল তারা কিন্তু আর ফেরেনি। তাদের মধ্যে কেবল কমিউনিস্ট, সোশালিস্ট আর নাজিবিরোধী, ইহুদি আর সমকামীরা ছিল না।
রাকেশ শর্মা কেবল ভারতের একমাত্র মহাকাশচারীর নাম নয়। একই নামে একজন তথ্যচিত্র নির্মাতাও আছেন। তাঁর নির্মিত সবচেয়ে আলোচিত ও পুরস্কৃত তথ্যচিত্রের নাম ফাইনাল সলিউশন (২০০৪)। এই মুহূর্তে ইউটিউব অথবা ভাইমিও ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখে নেওয়া সম্ভব, তবে দুটো জায়গাতেই মোটামুটি আড়াই ঘন্টার ছবি রয়েছে। কিন্তু ২০০৪ লোকসভা নির্বাচনের কিছুদিন আগে রাকেশ শর্মার এক বাঙালি সহকারীর সৌজন্যে যাদবপুর এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই তথ্যচিত্রের দুটো প্রদর্শনী হয়েছিল। তাতে ঘন্টা চারেকের ছবি দেখেছিলাম আমরা অনেকে। দেখেছিলাম বলেই গত রবিবার রাজস্থানের বনসোয়াড়ায় নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতা শুনে একটুও অবাক হইনি। ‘মুসলমানদের বেশি বাচ্চা হয়’ বলা বা মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী বলা মোদীর পক্ষে অস্বাভাবিক তো নয়ই, নতুনও নয়। নতুন হল প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে নির্বাচনী প্রচারে বলা। ২০০২ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে মোদী এই ভাষাতেই কথা বলতেন বিজেপির সমাবেশে। বস্তুত আরও প্ররোচনামূলক, বর্বর ভাষায় কথা বলতেন। জানি না আড়াই ঘন্টার সম্পাদিত তথ্যচিত্রে তার কতটুকু দেখা যায়, তবে মনে হয় না রাকেশ খুব বেশি কাটছাঁট করেছিলেন। কারণ ছবিটাকে অটলবিহারী বাজপেয়ীর এনডিএ সরকারের আমলে অনুপম খেরের নেতৃত্বাধীন সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন (চালু লব্জে সেন্সর বোর্ড) প্রথমে ভারতে প্রদর্শনের অনুমতি দিতে চায়নি। কীভাবে রাকেশ সে ছবি সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তা নিজেই এক রোমাঞ্চকর কাহিনি। পরে মনমোহন সিংয়ের ইউপিএ সরকার ক্ষমতায় এলে সেন্সরের ছাড়পত্র পাওয়া গিয়েছিল। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে যখন মোদীর নতুন ভাবমূর্তি তৈরি করা হচ্ছিল, আজকের অনেক মোদীবিরোধীও লিখতে/বলতে শুরু করেছিলেন – এদেশে চণ্ডাশোক ধর্মাশোক হয়েছিলেন, মোদীও বদলে গেছেন; তখন রাকেশ তাঁর ছবি থেকে কেটে রাখা বেশকিছু ক্লিপ আলাদা করে প্রকাশ করেছিলেন। আগ্রহীরা সেগুলোও খুঁজে দেখতে পারেন।
এই ইতিহাস স্মরণ করানো এই কারণে, যে মোদীর বনসোয়াড়ার কুরুচিকর বক্তৃতা নিয়ে মোদীবিরোধীদের মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া খুব বেশি মাত্রায় দেখা যাচ্ছে। তা হল, প্রথম দফার নির্বাচনের পর মোদী বুঝেছেন যে হাওয়া ভাল নয়। ভোট আসছে না। চারশো পার দূরের কথা, দুশো পার হবে কিনা সন্দেহ। তাই ‘মোদী কি গ্যারান্টি’, ‘বিকাশ’ ইত্যাদি ছেড়ে দিয়ে চূড়ান্ত ধর্মীয় মেরুকরণের খেলা খেলেই ভোট কুড়োতে হবে। তাতে রক্তগঙ্গা বয়ে গেলেও কিছু যায় আসে না। এই ব্যাখ্যা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ হঠাৎ দেখা যাচ্ছে সুধীর চৌধুরীর মত গোদি মিডিয়ার তারকা মোদীর বনসোয়াড়ার বক্তৃতায় মনমোহনের বক্তব্যকে যে বিকৃত করা হয়েছে তা ঘোষণা করে অনুষ্ঠান করছেন।
Big Breaking
BJP leaning journalist Sudhir Chaudhary has done full fact check of Dr. Manmohan Singh's speech regarding first rights on resources of India
Yesterday Modi had spread lies against Dr. Manmohan Singh and Congress. This is a must watch. Spread as much as possible pic.twitter.com/gbdHa7Ai4W
আনন্দবাজার পত্রিকার ঈশানী দত্ত রায় আর দেবাশিস চৌধুরী তো অমিতকে সিএএ থেকে মণিপুর পর্যন্ত নানা বিষয়ে চোখা চোখা প্রশ্ন করে একেবারে ল্যাজেগোবরে করে দিয়েছেন। ২০১৪ সাল থেকে দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যম যেভাবে চলছে তার বিচারে এসব সাহস নয়, রীতিমত দুঃসাহস। শুধু তাই নয়। কদিন আগেও যেসব সেফোলজিস্ট (বাংলা কি ভোটজ্যোতিষী?) বিজেপি একাই ৩৫০-৩৮০ পেয়ে যাবে বলছিলেন জোর গলায়, তাঁরাও কেমন কিন্তু কিন্তু করছেন। অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়া সংস্থার কর্ণধার প্রদীপ গুপ্ত একটা ওয়েবসাইটকে বলেছেন ১৩টা গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে (মহারাষ্ট্র, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, গুজরাট, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিসগড়, হরিয়ানা, দিল্লি, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, গোয়া) এবং কিছু কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এনডিএ-র পক্ষে ২০১৯ সালের সমান আসন ধরে রাখা শক্ত। সেই খবরের লিঙ্ক অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়ার এক্স হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করা হয়, প্রদীপ নিজে তা রিপোস্টও করেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সেই পোস্ট ডিলিট করে দেওয়া হয়। তারপর প্রদীপের সংস্থার করা সমীক্ষা বলে কিছু কম্পিউটার প্রিন্ট আউটের ছবি ভাইরাল হয়, যেখানে দেখা যাচ্ছে এনডিএ আর ইন্ডিয়া প্রায় সমান ভোট পাবে এবং আসন সংখ্যাতেও খুব বেশি হেরফের হবে না। তা নিয়ে অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়া এফআইআর দায়ের করেছে। সংস্থার দাবি ওগুলো ভুয়ো, আদৌ তেমন কোনো সমীক্ষা করা হয়নি। তারা প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা করেই না, শুধু বুথফেরত সমীক্ষা করে। কিন্তু তাহলে প্রদীপ কিসের ভিত্তিতে বললেন, ১৩ রাজ্যে কী হবে? সে প্রশ্ন রয়েই গেল। ওদিকে সিভোটার সংস্থার কর্ণধার যশবন্ত দেশমুখ বলেছেন পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ুর মত রাজ্যে প্রথম দফায় এমন হয়ে থাকতেই পারে যে বিজেপির ভোটাররা অনেকে ভোট দিতে আসেননি। ভেবেছেন বিজেপির ওসব জায়গায় জেতার সম্ভাবনা নেই, তাই ভোট দিতে গিয়ে লাভ নেই।
"BJP/AIADMK voters in Tamil Nadu and the BJP voters in Bengal might have felt that as we are not winning in these states, why should we step out and vote."
এঁদের চেয়েও মানুষ কোন দিকে ঝুঁকছে তা ঢের ভাল বোঝে আরএসএস-বিজেপির সংগঠন। তাদের নয়নের মণি মোদী নিজেই ১৯ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটদানের পরে এক সমাবেশে ভোটারদের বলেছিলেন ভোট না দেওয়া ভাল নয়, ভোট দেওয়া নাগরিক কর্তব্য ইত্যাদি। অর্থাৎ তিনিও কম ভোট পড়া নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। সুতরাং এমন হতেই পারে যে তারই প্রভাবে ২০০২ সালের মোদীকে ভিতর থেকে বার করে এনেছেন। রবিবারের পরে সোমবারই যেভাবে উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ে ভোল বদলে ফেলে সৌদি আরবের যুবরাজের সঙ্গে কথা বলে ভারতীয় মুসলমানদের হজ করতে যাওয়ার কোটা কত বাড়িয়েছেন সেকথা ফলাও করে বলেছেন, তাতে আরও বেশি সন্দেহ হয় – মোদী বুঝতে পারছেন না এই নির্বাচনে জিততে গেলে কোনটা করলে বেশি ভাল হবে। মুসলমানদের যথাসম্ভব গালাগালি দিয়ে ২০০২ সালের মূর্তি ধরা, নাকি আপাতত হিন্দুত্বকে ঝুড়ি চাপা দিয়ে মুসলমানদের ভোটও যাতে পাওয়া যায় তা নিশ্চিত করা।
BREAKING NEWS ⚡
Narendra Modi speech given yesterday has backfired BJP badly on ground
Today he is saying that he wants Indian Muslims to go to Saudi Arab and perform Haj in good numbers.
" I want my Minorities brothers and Sisters to get good facilities and quota for going… pic.twitter.com/2V5qIPZUdt
সবই সত্যি। কিন্তু এসব দেখে উল্লসিত হওয়া বোকামি হবে। কেবল এ জন্যে নয় যে এগুলো অনুমান মাত্র। এ জন্যেও যে রবিবারের মোদীই আসল মোদী এবং মোদীর জনপ্রিয়তা মূলত ওই মোদীরই জনপ্রিয়তা। গণতন্ত্রে মানুষের উপর বিশ্বাস রাখা ছাড়া যেমন কোনো উপায় নেই, তেমন বিনা প্রমাণে মানুষকে স্বর্গীয় জীব বলে ভেবে নেওয়ারও কোনো কারণ নেই। আপনার চারপাশের মানুষের মধ্যে গত এক যুগ বা তারও বেশি সময় ধরে যে সংখ্যালঘুবিদ্বেষ দেখেছেন তা হঠাৎ কমে গেছে – এমন কোনো লক্ষণ দেখছেন কি? যদি না দেখেন, তাহলে মোদীর মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার তাঁকে ভোটারদের কাছে আরও অপ্রিয় করবে এমন ভেবে নেওয়া অর্থহীন। মোদীর সাফল্যের রহস্যই হল, সংখ্যাগুরু মানুষ আগে যা নিজস্ব আড্ডায় চুপিচুপি বলাবলি করত তিনি তা প্রকাশ্যে বলা ফ্যাশনে পরিণত করেছেন। প্রথমে করেছিলেন গুজরাটে, ২০১৪ সালের পর ক্রমশ সারা ভারতে। একমাত্র কেরালা আর তামিলনাড়ুই এই সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন অনেকখানি প্রতিহত করতে পেরেছে। তাই সেখানে আজও বিজেপি রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক শক্তি। তামিলনাড়ুতে বিজেপির রাজ্য সভাপতিকে বলতে হয় তিনি রাজদীপ সরদেশাইয়ের সঙ্গে মুরগি খাবেন, আমিষ-নিরামিষ নিয়ে তাঁর বাছবিচার নেই। কেরালায় আবার এক বিজেপি প্রার্থী ২০১৭ সালে উপনির্বাচনের প্রচারে বলেছিলেন, জিতলে ভাল মানের গোমাংসের সরবরাহ নিশ্চিত করবেন। আগামী ৪ জুনও ওই রাজ্যগুলোর ছবি বদলানোর সম্ভাবনা কম। কিন্তু ভারতের আর কোনো অংশই সংঘের ঘৃণার রাজনীতির আওতার বাইরে নেই।
মুসলমানদের চারটে বউ আর চল্লিশটা বাচ্চা – একথা আমার, আপনার মামা কাকা পিসে জ্যাঠা মাসি পিসিরাই প্রবলভাবে বিশ্বাস করে আজকাল। অথচ জিজ্ঞেস করলে দেখা যায় এমন কোনো মুসলমানকে তাঁরা চেনেন না যার একাধিক স্ত্রী। অনেকে জীবনে কখনো কোনো মুসলমান মহিলা বা পুরুষের সঙ্গে আলাপই করেননি। অথচ মোদী এ বিশ্বাস তাঁদের মধ্যে গেঁথে দিতে পেরেছেন যে তেমন মুসলমান দেশের কোথাও না কোথাও আছে। বামপন্থী দলের কর্মী, সমর্থকদেরও কত সহজে সোশাল মিডিয়ায় ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সঙ্গে জোট ভেঙে গেলে বলতে দেখা যায় – মুসলমানদের কখনো বিশ্বাস করা উচিত নয়। মুসলমানরাই ভোটের দিন মারামারি করে, বিভিন্ন দলের হয়ে তারাই বোমা ছোড়ে – এসব বিজেপিবিরোধী ভোটাররাও ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েই বলেন। নিজে কানেই পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়ে শুনেছি একজন বলছেন, আমাদের এলাকায় মুসলমান নেই বলেই ভোটে অশান্তি হয় না, অনেকে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ছেন। গত পুজোতেই তো মুসলমান মানেই সন্ত্রাসবাদী – এমন বক্তব্যের একখানা বাংলা ছবি দিব্যি হিট হয়ে গেল।
এইসব প্রবণতাই ইংরেজ আমলের সমান বেকারত্ব আর আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধির যুগেও মোদীর রক্ষাকবচ। তিনি ভাল করেই জানেন, যখন আর কিছু কাজ করবে না তখনো মুসলমানদের সম্পর্কে ভয় দেখানো কাজে লাগবে। হিন্দু মহিলাদের গলার মঙ্গলসূত্রটা পর্যন্ত কংগ্রেস ছিনিয়ে নিয়ে তাদের দিয়ে দেবে যাদের বাচ্চা বেশি হয় – হয়ত আপনি আশা করছেন এ তত্ত্ব হিন্দি বলয়ে আর কাজে লাগবে না। হয়ত আপনি ঠিকই ভাবছেন। কারণ যে ন্যাড়া আগে বেলতলায় গেছে সে যাওয়া থামাবে অন্যদের আগে – এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হয়ত দেখলেন আপনার উচ্চশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ার মামাই বিশ্বাস করে ফেলেছেন কথাটা। কারণ তিনি সারাদিনে পড়ার মধ্যে পড়েন হোয়াটস্যাপ আর তাতে দশ বছর ধরে পড়ে চলেছেন যে গোপাল পাঁঠা ছিলেন বলে তিনি আছেন, প্রেরক আছেন, হাওড়া ব্রিজ আছে।
এঁরা আদিবাসী নন, দলিত নন, সংখ্যালঘু নন। এঁরা আশৈশব কল্যাণকামী ভারত রাষ্ট্রের সমস্ত সুযোগসুবিধা পেয়ে সরকারি স্কুল কলেজে পড়াশোনা করে মোটা মাইনের চাকরি বাগিয়েছেন। ভারতের গলতিওলা গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সুবাদে যা ইচ্ছে খেয়েছেন, যা ইচ্ছে পরেছেন, যেখানে ইচ্ছে বেড়িয়েছেন। তারপর মনমোহনী আমল থেকে ছেলেমেয়েদের শিখিয়েছেন – ‘বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে’, ‘গান্ধী, নেহরু মহা বদমাইশ’, ‘মুসলমানদের বিশ্বাস করতে নেই’, ‘ভাল ছেলেমেয়েরা সাইন্স পড়ে, সাইন্সে চান্স না পেলে আর্টস পড়তে হয়’, ‘ইতিহাস ফালতু সাবজেক্ট’ ইত্যাদি। এখন এঁরা ধেড়ে বয়সে এবং এঁদের সন্তানরা কচি বয়সে হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রছাত্রী। এখন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়া বিজ্ঞান ভুলে, স্কুলে মুখস্থ করে খাতায় উগরে দিয়ে ভুলে যাওয়া ইতিহাস আর নাক সিঁটকে এড়িয়ে যাওয়া রাষ্ট্রবিজ্ঞান টপাটপ শিখে ফেলছেন হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক থেকে। সেখান থেকেই শিখেছেন – হিন্দু ঘরে জন্মে এতদিন তাঁরা অত্যাচারিত, নিপীড়িত ছিলেন। মোদীর আমলে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারছেন। ভারতের অন্য সব রাজনৈতিক দলই মুসলমানদের তোষণ করে গেছে চিরকাল। অতএব বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির তৈরি করা বহুযুগের অন্যায়ের প্রতিশোধ। রামনবমীতে অস্ত্র মিছিল করা অন্যায় নয়। ক্রুদ্ধ রাম আর ক্রুদ্ধ হনুমান বাঙালির দেবতা।
এই বাঙালিরা এখনো রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ কপচান। নিজেদের ভারতের অন্য সব জাতির লোকেদের চেয়ে শিক্ষিত মনে করেন, কিন্তু হতে চান মাড়োয়ারিদের মত ধনী। হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয় এঁদের শিখিয়েছে যে সেটা হওয়ার পথে একমাত্র বাধা বাংলাদেশ থেকে আসা কাতারে কাতারে মুসলমান, যাদের মোদী বনসোয়াড়ায় বলেছেন ‘ঘুসপেটিয়া’। আপনি যতই এই বাঙালিদের দ্য হিন্দু কাগজের এই প্রতিবেদনের মত তথ্য দিয়ে বোঝান যে মুসলমানদের গাদা গাদা বাচ্চা হয় আর হিন্দুরা সব একটি-দুটিতে থেমে থাকে এমনটা ঘটনা নয়, বা কাতারে কাতারে মুসলমান বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়েছে এমনটাও নয়, এঁরা চোখ বন্ধ করে থাকবেন।
নিজেদের সুরক্ষিত অতীত আর আরামদায়ক বর্তমানে হেলান দিয়ে এঁরা ইদানীং হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্ন সফল করতে ভোট দেন, যাতে আমাদের এবং আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়। ইরান, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের মত ধর্মকেন্দ্রিক রাষ্ট্র যে খুব খারাপ তা এঁরা হোয়াটস্যাপ থেকে বিলক্ষণ শিখেছেন। কিন্তু হিন্দুরাষ্ট্র নিয়ে গদগদ হওয়ার বেলায় সেসব মনে থাকে না। এঁদের মধ্যে যাঁদের বয়স কম, হিন্দুরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে তাঁদের জন্যেও বেদনাদায়ক হবে। কিন্তু কালিদাসের উত্তরাধিকারী তো এদেশে কম নেই। এই বাঙালিদের মোদী বিলক্ষণ চেনেন আর এও জানেন যে এরকম মানুষ কেবল বাংলায় নয়, সারা ভারতে রয়েছে। তাঁর বনসোয়াড়ার ভাষণের লক্ষ্য তারাই।
অর্থাৎ এবারের ভোট কেবল আপনার সাংসদ বেছে নেওয়ার বা কোন দল সরকার চালাবে তা বেছে নেওয়ার ভোট নয়। ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ারও। উন্নয়ন ইত্যাদি ঢক্কানিনাদে এখন আর মোদীও সময় ব্যয় করছেন না। ‘মোদী কি গ্যারান্টি’ কথাটাও আর বলছেন না। এখন স্রেফ মুসলমানকে হিন্দুর শত্রু হিসাবে খাড়া করে, নিজের দলকে হিন্দুদের দল আর বিরোধী দলগুলোকে মুসলমানদের দল প্রতিপন্ন করেই ভোট চাইছেন। এবার আপনাকে বেছে নিতে হবে, আপনি সোশাল মিডিয়া থেকে গেলা বিষ পান করে আরও বিষ পান করার জন্যে ভোট দেবেন, না নিজের এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য ভোট দেবেন। এবার মোদীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে অনেক বিষাক্ত আপনজনের বিরুদ্ধে যেতে হবে। অথচ আপনজনদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হলে তাছাড়া উপায় নেই। কবি তো ভরসা দিয়েছেন ‘তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে/তা ব’লে ভাবনা করা চলবে না’।