বাঙালির উদাসীনতার প্রমাণ ঋদ্ধিমান

ঠ্যালার নাম বাবাজি। সেই বাবাজির কল্যাণে এই জানুয়ারিতে হঠাৎ ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত রথী মহারথীদের মনে পড়ে গেছে যে ঘরোয়া ক্রিকেট ব্যাপারটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এবং রঞ্জি ট্রফি বলে একটা প্রতিযোগিতা হয় দেশে। ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের কাছে নাকানিচোবানি খাওয়ার পর অস্ট্রেলিয়াতেও কাপড়ে চোপড়ে করে আসার পর বাধ্য ছেলের মত রঞ্জি খেলতে নেমে পড়েছেন বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, শুভমান গিল, ঋষভ পন্থ প্রমুখ তারকারা। ফলে জন্মে রঞ্জি ট্রফির ধারেকাছে না যাওয়া সংবাদমাধ্যমকেও রোজ জানান দিতে হচ্ছে বিরাট নেটে কার সঙ্গে কথা বললেন, কতজন তাঁকে দেখতে এল, কেমন ওজনের ব্যাট নিয়ে খেললেন ইত্যাদি। ৩০ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া রঞ্জি ম্যাচগুলোতে সারা দেশের নজর দিল্লি বনাম রেলওয়েজ ম্যাচের দিকে, কারণ ওই ম্যাচেই এক যুগ পরে রঞ্জি খেলতে নামছেন বিরাট। তাঁর বিশ্বরূপে চোখ ধাঁধিয়ে গিয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যমও দু-চার লাইন লিখেই ক্ষান্ত দিচ্ছে যে এই রাউন্ডে সম্ভবত জীবনের শেষ প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলতে নামছেন ঋদ্ধিমান সাহা। কারণ বাংলার নক আউট স্তরে ওঠার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।

কেন দু-চার লাইনের বেশি প্রাপ্য ঋদ্ধিমানের? কারণ সর্বকালের সেরা পুরুষ বাঙালি ক্রিকেটারদের তালিকায় তিনি তিন নম্বরে থাকবেন। ইডেন উদ্যানে বৃহস্পতিবার বাংলা বনাম পাঞ্জাব ম্যাচ খেলতে নামার আগে পর্যন্ত ১৪১ খানা প্রথম শ্রেণির ম্যাচে শিলিগুড়ির ছেলে ঋদ্ধিমান ৩৪৪ খানা ক্যাচ ধরেছেন আর ৩৮ খানা স্টাম্পিং করেছেন, প্রায় ৪২ গড়ে সাত হাজারের বেশি রানও করেছেন। ফলে তিনি যে বাংলার সর্বকালের সেরা উইকেটরক্ষক তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হল, সৌরভ গাঙ্গুলি আর পঙ্কজ রায়কে বাদ দিলে আর কোনো বাঙালি ক্রিকেটার ঋদ্ধিমানের চেয়ে বেশি টেস্ট (৪০) খেলে উঠতে পারেননি। শুধু খেলেছেন বললে ভুল হবে। বরেণ্য উইকেটরক্ষক অ্যালান নটের সমসাময়িক হওয়ায় প্রতিভাবান বব টেলরের যেমন ইংল্যান্ডের হয়ে বেশি খেলা হয়নি, মহেন্দ্র সিং ধোনির সমসাময়িক হওয়ায় ঋদ্ধিমানও ভারতীয় দলে নিয়মিত হয়েছেন তিরিশের কোঠায় পা দিয়ে। তা সত্ত্বেও উইকেটের পিছনের দক্ষতায় মুগ্ধ করেছেন সৈয়দ কিরমানি, অ্যাডাম গিলক্রিস্টের মত কিংবদন্তিদের। তাঁর কোনো কোনো ক্যাচ চোখ কপালে তুলে দিয়েছে, ঘূর্ণি উইকেটে তাঁর উইকেটরক্ষা শিল্পের পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়েছে অনেকসময়। নিঃসন্দেহে বলা যায়, ঋষভ পন্থ এসে না পড়লে ঋদ্ধিমান অনায়াসে পঞ্চাশের বেশি টেস্ট খেলে ফেলতেন।

অথচ এই লোকটার অবসর নিয়ে বাংলায় কোনো হইচই নেই। বেহালার নীল রক্তের ক্রিকেটারের খেলোয়াড় জীবনে তাঁকে ঘিরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রাবল্য দেখলে বোধহয় সুরেন বাঁড়ুজ্জেও আশ্চর্য হতেন। অথচ শিলিগুড়ির মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেটার ব্যাপারে কোনোদিন তার ছিটেফোঁটা দেখা যায়নি। স্বভাবতই সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদেরও তাঁকে নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই। চোট আঘাতে চিরকাল জর্জরিত দিল্লির ছেলে আশিস নেহরা, যিনি খেলেছেন মাত্র ১৭ খানা টেস্ট আর ১২০ খানা একদিনে আন্তর্জাতিক ম্যাচে মনে রাখার মত পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন মাত্র একবার – তাঁকে যখন বিশেষ সম্মান দিয়ে ঘরের মাঠে টি টোয়েন্টি খেলে অবসর নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, তখন বাংলার সাংবাদিকরা কত কাব্য যে করেছেন! ঋদ্ধিমানের বেলায় সাজানো কালি শুকিয়ে গেল? একখানা সর্বভারতীয় ইংরিজি খেলার পত্রিকা ছাড়া কোথাও তো ঋদ্ধিমানের কোনো দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেখছি না!

আরো পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য আরও আঘাত অপেক্ষা করছে

অথচ ঋদ্ধিমানের ক্রিকেটজীবন যেভাবে শেষ হল, তিনি তত অযত্নের পাত্র ছিলেন না। টেস্ট দলে জায়গা পাকা করে নেওয়া ঋদ্ধিমান ২০১৮ সালে অস্ত্রোপচারের জন্য বিশ্রামে যেতে বাধ্য হলেন। যখন ফিরে এলেন তখন তাঁকে জায়গা ফিরিয়ে দেওয়া হল না, রেখে দেওয়া হল তরুণ ঋষভকে। কেন? না তিনি ইংল্যান্ডে শতরান করে ফেলেছেন। অথচ ঋষভের উইকেটরক্ষা এখন যত ভালই হোক, তখনো মোটেই ভরসা জোগানোর মত হয়নি। সে যতই তিনি এক ইনিংসে পাঁচটা ক্যাচ ধরে থাকুন। বিশেষত স্পিনারদের বিরুদ্ধে তাঁর উইকেটরক্ষা হাস্যকর হয়ে দাঁড়াত প্রায়শই। তা সত্ত্বেও ঋদ্ধিমান হয়ে গেলেন দ্বিতীয় পছন্দ। একটা অভিনব সূত্র দিল টিম ম্যানেজমেন্ট – বিদেশে কিপিং করবেন ঋষভ, কারণ ওখানে স্পিনারদের সামলাতে হয় না। আর দেশে ঋদ্ধিমান। সবসময় অবশ্য তাও মানা হয়নি। সৌরভের গোটা কেরিয়ারে প্রতিদিন তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া বাঙালি সমাজ তখন বিক্ষোভে ফেটে পড়েনি। ঋষভ ভাল খেলে দিয়েছেন, ঋদ্ধিমানকে জায়গা ফিরিয়ে দেওয়ার উপায় ছিল না – এ যুক্তি কিন্তু অসার। কারণ প্রথমত, ভাল খেলার বহরটা আগেই উল্লেখ করলাম। দ্বিতীয়ত, অধিনায়ক বিরাটের আমলেই ২০১৬ সালে চোটের জন্য দলের বাইরে থাকা সিনিয়র ক্রিকেটার অজিঙ্ক রাহানের জায়গায় একটা টেস্টে সুযোগ পেয়ে করুণ নায়ার ত্রিশতরান হাঁকিয়েছিলেন। অথচ পরের টেস্টেই সুস্থ রাহানেকে তাঁর জায়গা ফেরত দেওয়া হয় (করুণ আজ পর্যন্ত আর মোটে তিনটে টেস্ট খেলেছেন)। তখন বিরাটের যুক্তি ছিল – একটা পারফরম্যান্স অন্য একজন খেলোয়াড়ের কয়েক বছরের পরিশ্রমের মূল্য চুকিয়ে দিতে পারে না। সঠিক ক্রিকেটিয় যুক্তি, কিন্তু সেটা ঋদ্ধিমানের বেলায় খাটল না!

তাঁকে একেবারে বাদ দেওয়ার সময়ে অবশ্য কোচ রাহুল দ্রাবিড় আলাদা করে ডেকে বলেছিলেন বয়সের কারণে তাঁকে নিয়ে আর ভাবা হবে না। এটাও ক্রিকেটিয় যুক্তি হিসাবে ভুল নয়। কিন্তু তাঁর বদলে যাকে ভাবা হয়েছিল, সেই কে এস ভরত ইতিমধ্যেই তলিয়ে গেছেন। আরও বড় কথা, ঋদ্ধিমানের চেয়ে অনেক বেশি ধারাবাহিক ব্যর্থতার পরেও একই বয়সে পৌঁছে যাওয়া বিরাট আর রোহিতকে আজ ‘তোমাদের নিয়ে আর ভাবা হবে না’ বলার সাহস গৌতম গম্ভীর বা প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর দেখাতে পারছেন না। দলের স্বার্থে নিজেকে বাদ দেওয়া, ধেড়ে বয়সে রঞ্জি দলের নেটে এসে ব্যাকফুটে খেলার অনুশীলন ইত্যাদি আদিখ্যেতা চলছে।

ঋদ্ধিমানের প্রতি সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ব্যবহার করেছেন অবশ্য বাঙালিরাই। ভুললে চলবে না, তাঁকে যখন দল থেকে ক্রমশ সরিয়ে দেওয়া হল তখন বোর্ড সভাপতি ছিলেন বাংলার গৌরব সৌরভ। তারপর ২০২২ সালে এক বাঙালি সাংবাদিক সাক্ষাৎকার না দেওয়ার ‘অপরাধে’ ঋদ্ধিমানকে রীতিমত হুমকি দেন – দলে একজন উইকেটরক্ষকই সুযোগ পায়, তুমি ১১ জন সাংবাদিককে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছ। এটা আমার মতে ঠিক নয়… তুমি আমায় ফোন করোনি… কাজটা কিন্তু ভাল করলে না…ইত্যাদি। সেই হুমকি টুইটারে ফাঁস করে দেন ঋদ্ধিমান। বোর্ড বাধ্য হয়ে সেই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তদন্ত করে এবং সাময়িকভাবে তাঁর ভারতীয় ক্রিকেট কভার করা নিষিদ্ধ হয়। তবে তিনি বহাল তবিয়তে ফিরে এসেছেন। তাঁর প্রতি অবিচার হয়েছে – এই মর্মে বই লিখেছেন, সে বই ক্রিকেটমহলের পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছে। মাঝখান থেকে ঋদ্ধিমানের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার শেষ হয়ে গেছে। তারপর ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল (সিএবি) কর্তাদের ব্যবহারে আঘাত পেয়ে তিনি ত্রিপুরার হয়ে খেলতে চলে গিয়েছিলেন। শেষমেশ গ্যালারির ফাঁক দিয়ে ইডেন উদ্যানে শুভবুদ্ধির হাওয়া এসে পড়ে হাইকোর্ট প্রান্ত থেকে এবং সৌরভের কথায় (ঋদ্ধিমানের বয়ান অনুযায়ী) তিনি শেষ মরশুমটা বাংলার হয়ে খেলার সুযোগ পান।

সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ঋদ্ধিমানের যে সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করলাম, তাতে অভিমানের সুর স্পষ্ট। তিনি বলেছেন “আমি বরাবর বিশ্বাস করেছি যে পারফরম্যান্সই একজন খেলোয়াড়ের পরিচয়, পাবলিক রিলেশন নয়।” বলা বাহুল্য, যুগটা বদলে গেছে। একটা ব্যাপার অবশ্য বদলায়নি – কলকাতার বাইরের বাঙালি সম্পর্কে বাঙালির উদাসীনতা।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ঝুলন সেরা বাঙালি ক্রিকেটার? মোটেই না

ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস বাংলাকে বাদ দিয়ে লেখা অসম্ভব। কিন্তু গত শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাস বাংলাকে বাদ দিয়ে অনায়াসে লেখা যেত। রেকর্ড বইয়ে সর্বোচ্চ রানের ওপেনিং জুটির তালিকার একেবারে শীর্ষে পঙ্কজ রায়ের নাম ছিল ঠিকই, কিন্তু রেকর্ড বই ইতিহাস নয়। একবিংশ শতাব্দীতে ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে বাংলার পাকাপাকি জায়গা তৈরি করেছেন দুজন। একজন অবসর নেওয়ার দেড় দশক পরেও সারাক্ষণ সংবাদের শিরোনামে, বাঙালির নয়নের মণি। অর্থাৎ সৌরভ গাঙ্গুলি। অন্যজন কে, বাজি রেখে বলতে পারি, আপনি ভুরু কুঁচকে ভাবছেন।

এই শতাব্দীর প্রথম কয়েক বছরে ফিক্সিং কেলেঙ্কারির বিপর্যয় কাটিয়ে অধিনায়ক হিসাবে সৌরভ যখন ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাস বদলে দিচ্ছিলেন, সেই সময়েই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চেন্নাইতে একটি একদিনের ম্যাচে ভারতের হয়ে খেলতে শুরু করেন ঝুলন গোস্বামী। সে বছরই টেস্ট অভিষেক। ঝুলনের শুরুটা সৌরভের মত সাড়া জাগানো হয়নি। প্রথম টেস্টে এই ডানহাতি জোরে বোলার কোনো উইকেট পাননি। কিন্তু গত কুড়ি বছর ধরে ভারতের মহিলা দলের প্রায় সমস্ত স্মরণীয় জয়ে ঝুলনের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। ২০০৬ সালে ভারতীয় মহিলারা ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথম টেস্ট সিরিজ জেতেন। প্রথম টেস্টে লেস্টারে নৈশপ্রহরী হিসাবে ঝুলন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতরান করেন। আর টনটনের দ্বিতীয় টেস্টে তিনি একাই একশো। প্রথম ইনিংসে ৩৩ রানে পাঁচ উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৫ রানে পাঁচ উইকেট। একদিনের ক্রিকেটে ঝুলন প্রকৃতপক্ষে একজন কিংবদন্তি। চলতি বিশ্বকাপে তিনি মহিলাদের বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হলেন, তারপরেই মেয়েদের একদিনের ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম বোলার হিসাবে ২৫০ উইকেটের মালিক হলেন।

যাঁরা মেয়েদের ক্রিকেটের খবর রাখেন তাঁরা জানেন, ভারতের মহিলাদের দলে এই মুহূর্তে দুজন আছেন যাঁরা সর্বকালের সেরাদের মধ্যে পড়েন। কীর্তির দিক থেকে অধিনায়ক মিতালী রাজ যদি মেয়েদের ক্রিকেটের শচীন তেন্ডুলকর হন, ঝুলন অবশ্যই কপিলদেব। দুটো দশক জুড়ে ভারতীয় বোলিংকে নেতৃত্ব দেওয়া কত শক্ত, তা কপিলদেবের চেয়ে ভাল কে-ই বা জানে? ঝুলনের নামটা মাথায় আসেনি বলে জিভ কাটছেন নাকি? কাটবেন না, কারণ দোষ আপনার নয়। শুধু যে মহিলাদের ক্রিকেট টিভিতে অনেক কম দেখানো হয় আর কাগজে অনেক কম লেখা হয় তা-ই নয়, কপিলদেব ১৬ বছরে খেলেছেন ১৩১টা টেস্ট আর ২২৫টা একদিনের ম্যাচ। ঝুলন কুড়ি বছরে ২০১ খানা একদিনের ম্যাচ (২২ মার্চ, ২০২২ তারিখে ভারত বনাম বাংলাদেশ ম্যাচ পর্যন্ত) খেললেও টেস্ট খেলেছেন মাত্র বারোটা। একদিনের ম্যাচের সংখ্যাটাও আসলে কপিলের সাথে তুলনীয় নয়, কারণ কপিলের কেরিয়ারের বেশ খানিকটা সময়ে একদিনের ক্রিকেট ছিল লম্বা টেস্ট সিরিজের শেষ পাতে মিষ্টির মত। কিন্তু ঝুলনের দু বছর আগে অভিষেক হওয়া জাহির খান বারো বছরেই দুশো একদিনের ম্যাচ খেলে ফেলেছিলেন।

ভারতীয় পুরুষদের ক্রিকেটের মহীরুহ যাঁরা, তাঁদের ঝুলিতে একটা জিনিস আছে যা বাংলার গৌরব সৌরভের ঝুলিতে নেই। ২০০৩ সালের ২৩ মার্চ রিকি পন্টিংয়ের অপরাজেয় অস্ট্রেলিয়া সৌরভের হাতে বিশ্বকাপ ওঠার সমস্ত সম্ভাবনা দুরমুশ করে চতুর্থবার বিশ্বকাপ জিতেছিল। কিন্তু কপিলদেব বিশ্বকাপ জিতেছেন, সুনীল গাভস্করও সেই দলে ছিলেন। বিশ্বসেরার মেডেল গলায় ঝুলিয়েছে শচীন তেন্ডুলকর আর মহেন্দ্র সিং ধোনিও। ব্যক্তিগত কৃতিত্বে ঝলমলে কেরিয়ারে ঝুলন আর মিতালীর ও জিনিসটার স্বাদ এখনো পাওয়া হয়নি। পেতে গেলে চলতি বিশ্বকাপে দুজনকেই নিজেদের সেরা ফর্মের কাছাকাছি থাকতে হবে। প্রথম চারটে ম্যাচে নীরব থাকার পর পঞ্চম ম্যাচে মিতালীর ব্যাট কথা বললেও পার্থক্য গড়ে দিতে পারেনি। বাংলাদেশ ম্যাচে দল জিতে গেলেও মিতালী আবার ব্যর্থ। ঝুলন মন্দ খেলছিলেন না, কিন্তু অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে একেবারেই ফ্লপ, সহজ বাংলাদেশ ম্যাচে ছিলেন স্বমহিমায়। গতবার ফাইনালে উঠেও ইংল্যান্ডের কাছে হারতে হয়েছিল। বাকি রইল দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ। সেটা জিততে পারলে এখনো ভারতের সেমিফাইনালে পৌঁছবার সম্ভাবনা আছে। যদি শেষপর্যন্ত স্মৃতি মান্ধনা, পূজা বস্ত্রকর, শেফালি বর্মার মত তরুণদের সাথে মিতালী, ঝুলন, হরমনপ্রীতদের সুর মিলে যায় তাহলে ৩ এপ্রিল ক্রাইস্টচার্চে প্রথম বাঙালি হিসাবে ঝুলন ছুঁয়ে ফেলবেন ক্রিকেট বিশ্বকাপ। সঙ্গে থাকবেন শিলিগুড়ির রিচা ঘোষ।

চিন্তা করবেন না। এখন পর্যন্ত ধারাবাহিকতা দেখাতে না পারা ভারতীয় দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মত ঘটনা ঘটে গেলেও ঝুলনকে আমরা কেউ সেরা বাঙালি ক্রিকেটার বলার ধৃষ্টতা দেখাব না। মহিলাদের ক্রিকেট নিয়ে আমাদের আগ্রহ থাক আর না-ই থাক, শিগগির জেনে যাব যে মেয়েদের ক্রিকেটের বোলারদের গড় গতি ছেলেদের চেয়ে কম। আরও নানা তথ্য থেকে প্রমাণ করা খুব কঠিন হবে না যে মেয়েদের বিশ্বকাপ জয় আর ছেলেদের বিশ্বকাপ জয় এক নয়। সেরেনা উইলিয়ামসকে ও দেশে কেউ রাফায়েল নাদাল, রজার ফেডেরার বা নোভাক জোকোভিচের চেয়ে কম বড় খেলোয়াড় ভাবে না। তা বলে আমাদেরও যে ওভাবে ভাবতে হবে এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি।

আরও পড়ুন কালোর জন্যে কাঁদা, অথচ সাদা মনে কাদা

তাছাড়া সৌরভের বায়োপিক হওয়ার আগেই যে বলিউড ঝুলনের বায়োপিক বানিয়ে ফেলছে, সে কি কম স্বীকৃতি? তাতে আবার ঝুলনের চরিত্রে অভিনয় করছেন ছেলেদের ক্রিকেট দলের অধিনায়কের অভিনেত্রী স্ত্রী। এর চেয়ে বেশি কী-ই বা চাওয়ার থাকতে পারে ঝুলনের মত একজন শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারের? ঢ্যাঙা, কালো মেয়ে মাঠে উইকেট তুলতে পারে, রান করতে পারে। কিন্তু পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে যখন তার জীবন নিয়ে তৈরি সিনেমা দেখতে যাব, তখন পর্দায় একটা টুকটুকে মেয়ে না থাকলে চলবে কেন? আমরা মণিপুরি মেরি কমকে পর্দায় দেখি পাঞ্জাবি অভিনেত্রীর অবয়বে, বাংলার ঝুলনকেও সেভাবেই দেখব। দেখে পপকর্ন খেতে খেতে হাততালিও দেব। দেশের ক্রিকেট বোর্ডই যখন মহিলা ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক পুরুষদের ধারেকাছে হওয়া উচিত বলে মনে করে না, দলটার নিয়মিত খেলতে পাওয়া উচিত বলেও মনে করে না, তখন আমরা সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা সব সমান করে ভাবতে যাব কেন? আমাদের কালো মেয়ের পায়ের তলায় আলোর নাচন দেখার জন্য কেন ছটফট করব?

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত