বিবিসিকে বাদ দিয়ে বিশ্বগুরু থাকতে পারবেন মোদী?

বিবিসি যতখানি সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ভোগ করে এসেছে চিরকাল, ততখানি আমাদের দূরদর্শন বা অল ইন্ডিয়া রেডিও কোনো দলের সরকারের আমলেই ভোগ করেনি

এই লেখা যখন লিখতে বসেছি, তখন টানা তৃতীয় দিন ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের দিল্লি ও মুম্বাই অফিস জুড়ে বসে আছেন আয়কর আধিকারিকরা। বিবিসি কর্তৃপক্ষ কর্মচারীদের ইমেল পাঠিয়ে জানিয়েছেন আপাতত যেন দফতরে না এসে বাড়ি থেকেই তাঁরা কাজ চালিয়ে যান। এডিটর্স গিল্ড অফ ইন্ডিয়া, ভারতের সম্পাদকদের একটি অগ্রগণ্য সংগঠন, এবং প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়ার মত সাংবাদিকদের সংগঠন একে সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর প্রচেষ্টা হিসাবে দেখছে জানিয়ে প্রথম দিনেই (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিবৃতি দিয়েছে। কিন্তু সরকারপক্ষ কিন্তু বলেই যাচ্ছে, এটা বিবিসির দফতরে হানা নয়, সমীক্ষা (সার্ভে) মাত্র। এ এক আইনানুগ নিয়মিত প্রক্রিয়া। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে বলেই নাকি এই সার্ভে করা হচ্ছে।

বলা বাহুল্য, বিবিসি এ দেশের কোনো আইন ভেঙে থাকলে তদন্তের স্বার্থে তাদের দফতরে সার্ভে করা বা হানা দেওয়া এবং তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি দেওয়া ভারত সরকারের আয়কর বিভাগের অধিকার এবং কর্তব্য। কিন্তু মুশকিল হল, এরকম সার্ভে আয়কর বিভাগ এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট গত কয়েক বছরে একাধিকবার দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমের দফতরে চালিয়েছে। অথচ একবারও কোনো সার্ভে বা হানা থেকে কোনো সংবাদমাধ্যমের অপরাধের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এডিটর্স গিল্ডের বিবৃতিতেই উল্লেখ করা হয়েছে নিউজক্লিক, নিউজলন্ড্রি, দৈনিক ভাস্কর এবং ভারত সমাচারের দফতরে আয়কর ও ইডি হানার কথা। তার বাইরেও বেশকিছু সংবাদমাধ্যমের দফতরে এমন ঘটনা ঘটেছে। কাশ্মীরের সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের কাছে তো এসব জলভাত। তাঁরা কথায় কথায় কাগজ বন্ধ করে দেওয়া, নিগ্রহ, ইউএপিএ আইনে কারাবাস – এসবে অভ্যস্ত। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা টিভির অফিসেও ডিসেম্বর মাসে ইডি হানা দিয়েছিল। এই সবকটি সংবাদমাধ্যমই আবার কেন্দ্রীয় সরকারকে অসুবিধায় ফেলে এমন প্রতিবেদন বা বিরোধী মতামত প্রকাশ করার জন্য বিখ্যাত (বা সরকারের কাছে কুখ্যাত)। এ যদি নেহাত কাকতালীয় ব্যাপার হয়, তাহলে বলতেই হবে এই কাক আর এই তাল একেবারে রাজযোটক। ফলে বিবিসির দফতরে যা চলছে তিনদিন ধরে, তাকে বাঁকা নজরে না দেখে উপায় নেই।

এডিটর্স গিল্ডের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০২ সালের গুজরাটের ঘটনাবলী এবং নরেন্দ্র মোদীর রাজত্বে দেশজুড়ে সংখ্যালঘু মানুষের উপর আক্রমণ নিয়ে বিবিসির দুই পর্বের তথ্যচিত্রের পরেই এই সার্ভে। সে তথ্যচিত্র দেশের মানুষকে দেখতে না দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল এই সরকার। ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটারকে দিয়ে ওই তথ্যচিত্রের সমস্ত লিঙ্ক ব্লকও করানো হয়েছিল। ফলে দুয়ে দুয়ে চার করতে কোনো অসুবিধা নেই।

তা বাদেও সরকার যে আসলে বিবিসির উপর ওই তথ্যচিত্রের শোধ তুলছে, আর্থিক অনিয়ম স্রেফ ছুতো – এমন মনে করার কারণ ঘটিয়ে দিচ্ছে নিজেই। কারণ বিবিসি দফতরে হানা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ‘সরকারি’ ভাষ্য নেই। একটি আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থার দফতরে এইরকম হানা (আচ্ছা সার্ভেই হল) আন্তর্জাতিক খবরে পরিণত হয়ে গেছে, অথচ আয়কর বিভাগের কোনো শীর্ষস্থানীয় আধিকারিক বা অর্থমন্ত্রকের কোনো সচিব স্তরের আধিকারিক এ নিয়ে কোনো প্রেস বিবৃতি দেননি। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের দুটি টুইটার হ্যান্ডেলের একটিতেও এ নিয়ে একটি লাইন দেখলাম না। তাহলে প্রথম অনুচ্ছেদে লিখলাম কেন, সরকারপক্ষ বলেই যাচ্ছে…? সেখানেই মজা। ২০০২ সালে গুজরাটে ঠিক কী হয়েছিল, তা নিয়ে সঙ্ঘ পরিবার কখনো এক স্বরে কথা বলে না। একটি অংশ বলে, যা হয়েছিল বেশ হয়েছিল। সন্ত্রাসবাদীদের উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন মোদী। আরেকটি অংশ বলে, খোদ সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে মোদীজির কোনো দোষ ছিল না। এর উপর আর কথা হয় নাকি? সব বিরোধীদের অপপ্রচার।

আরো পড়ুন এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার দেশ

বিবিসির দফতরে আয়কর বিভাগের বিচরণ সম্পর্কেও একই পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। এক দল সাংবাদিকের কাছে কিছু তথ্য পাঠিয়ে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। একদা সরকারবিরোধী বলে পরিচিত, রায় দম্পতির প্রস্থানের পর সরকারি হয়ে ওঠা এনডিটিভির সাংবাদিক সংকেত উপাধ্যায়ই যেমন। তিনি টুইট করে এই অভিযোগের কথা জনসমক্ষে এনেছেন। অথচ এই তথ্যের সূত্র কী জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানিয়েছেন, সরকার প্রেস নোট হিসাবে ওই তথ্যগুলি জানিয়েছে। সরকার মানে কে? প্রেস নোটের উপর লেটারহেড কার ছিল? নিচের স্বাক্ষরটি কার? কোন মন্ত্রক থেকে পাঠানো হয়েছে এই নোট? এসবের কোনো উত্তর এই সাংবাদিকরা দিতে পারেননি। অন্যদিকে বিজেপির মুখপাত্ররা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সময়ে বিবিসিকে তেড়ে গাল পাড়ছেন। বিবিসি দুর্নীতিগ্রস্ত, মিথ্যের ঝাঁপি খুলে বসেছে – এরকম নানা অভিযোগ করছেন। ঠিক যে অভিযোগগুলো ‘ইন্ডিয়া: দ্য মোদী কোয়েশ্চেন’ তথ্যচিত্র মুক্তি পাওয়ার পরেও তাঁরা করেছিলেন। এই অভিযোগগুলো সত্যি হতেই পারে। কিন্তু তার সঙ্গে আয়কর বিভাগের কী সম্পর্ক? এর কোনো উত্তর তাঁদের কাছে নেই। অর্থাৎ প্রকারান্তরে মেনে নেওয়া হচ্ছে, আর্থিক অনিয়ম নয়। আপত্তি বিবিসি কী দেখাচ্ছে তা নিয়ে।

স্বাভাবিকভাবেই ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলি এক সুরে সরকারকে সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধের অভিযোগে অভিযুক্ত করছে। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ থেকে শুরু করে সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য পর্যন্ত সকলেই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সরকারের নিন্দা করেছেন। কিন্তু তাতে মোদী সরকারের কী-ই বা এসে যায়? দেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম হয় ভক্তিতে নয় ভয়ে সরকারকে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিয়েছে। এনডিটিভির মত দু-একটি নাছোড়বান্দা সংবাদমাধ্যমকে মুকেশ আম্বানি বা গৌতম আদানি কিনে ফেলছেন – চুকে গেল ঝামেলা। কিন্তু বিবিসির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে তার কিছু অন্তত প্রমাণ করতে না পারলে অন্য ক্ষতির সম্ভাবনা। আজকের দুনিয়ায় নিজের দেশের সাড়ে বারোটা বাজিয়েও রাষ্ট্রনেতা হিসাবে বিদেশে নাম কুড়ানো অসম্ভব নয়। বিশেষ করে ভারতের মত দেশ, যার বিরাট বাজার বহুজাতিকদের দরকার এবং যে দেশ পরমাণু শক্তিধর – সে দেশের ভিতরে সংখ্যালঘুরা বাঁচল কি মরল, জনা দুয়েক পুঁজিপতি মিলে দেশের সমস্ত সম্পদের দখল নিয়ে নিল কিনা তা নিয়ে অন্য কোনো দেশ মাথা ঘামাতে যায় না। কিন্তু সেসব দেশের সংবাদমাধ্যমের গায়ে হাত পড়লে যা হয়, তা হল গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে পরিচিতির বারোটা বাজে। সে পরিচিতি নিয়ে কমিউনিস্ট চীনের রাষ্ট্রপ্রধান বিশেষ মাথা ঘামান না। শি জিনপিং নিজের দেশের সকলকে নিজের ইচ্ছামত চালাতে পারলে খুশি, বিশ্বগুরু হতে চান না। কিন্তু মোদী তো চান। তাঁকে যদি ব্রিটেন, আমেরিকার সংবাদমাধ্যম ভ্লাদিমির পুতিন আর জিনপিংয়ের সঙ্গে একাসনে বসিয়ে একনায়ক বলে দেগে দেয় – তা কী পছন্দ হবে মোদীজির?

বিবিসি ব্রিটেনের রাজকীয় সনদের মাধ্যমে গঠিত সরকারের একটি মন্ত্রকের অধীন অথচ স্বায়ত্তশাসিত কর্পোরেশন। একে আমাদের প্রসার ভারতীর সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে। বিবিসি যতখানি সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ভোগ করে এসেছে চিরকাল, ততখানি আমাদের দূরদর্শন বা অল ইন্ডিয়া রেডিও কোনো দলের সরকারের আমলেই ভোগ করেনি। ফলে ব্রিটেনে কনজারভেটিভ বা লেবার – যার সরকারই থাক, ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মোদী যতই দহরম মহরম করুন, বিবিসি চটলে তারা আরও বেশি করে ভারত সরকার সম্পর্কে বিরূপ প্রচার করবে। বিবিসির দেখাদেখি অন্য বিদেশি সংবাদমাধ্যমও করবে। বিশ্বগুরুর ভাবমূর্তিতে অনবরত আঁচড় পড়তে থাকলে কি খুশি হবেন মোদী? বিবিসি ধোয়া তুলসীপাতা নয়, তবে মনে রাখা ভাল, তারা কিন্তু নিজেদের দেশের ইতিহাসের বিশালকায় রাষ্ট্রনেতা উইনস্টন চার্চিলকেও ছেড়ে কথা বলে না। কথাটা বুঝতেন বলেই ইন্দিরা গান্ধী একসময়ে বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি খড়্গহস্ত হয়েও পরে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ শুরু করেন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

কতটা পথ পেরোলে পরে ভারত পাওয়া যায়?

আমাদের অনেকেরই সন্দেহ ছিল, আপনি ক্রমঅপসৃয়মান ভারতকে আদৌ খুঁজতে চান কিনা। ভারত জোড়ো যাত্রায় প্রমাণ হল, চান।

মাননীয় রাহুল গান্ধী,

মহাত্মা গান্ধীর শহিদ হওয়ার দিনে ভারত জোড়ো যাত্রার শেষ বিন্দুতে পৌঁছে শ্রীনগরে আপনি যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে অন্তত একটি চমৎকার কাজ হয়েছে। যারা বলে ব্যক্তিগত জীবন আর রাজনীতিকে আলাদা আলাদা বাক্সে রাখা উচিত, রাজনৈতিক কারণে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতি কাম্য নয়, তারা যে আসলে ব্যক্তিগত জীবনকে রাজনীতি কীভাবে প্রভাবিত করে তা বোঝে না অথবা কোনো উদ্দেশ্যে অন্যদের বুঝতে দিতে চায় না – তা আরও একবার পরিষ্কার হয়ে গেছে।

রাজনৈতিক আলোচনা মানেই তা নৈর্ব্যক্তিক হতে হবে – এই সংস্কার উদারপন্থী ও বাম রাজনীতিতে স্বতঃসিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নৈর্ব্যক্তিক, অর্থাৎ আবেগশূন্য। অথচ আবেগ বাদ দিয়ে মানুষ হয় না, মানুষ যা যা করে তার প্রায় কোনোটাই আবেগ বাদ দিয়ে করে না। রাজনীতি তো নয়ই। কিন্তু রাজনীতি তো বটেই, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা – সবই আবেগশূন্য হওয়াই যে অভিপ্রেত তা আমাদের জনজীবনে বহুকাল হল প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। সম্ভবত সেই কারণেই দক্ষিণপন্থীদের পক্ষে সহজ হয়েছে একেবারে উল্টো মেরুতে দাঁড়িয়ে আবেগসর্বস্বতা দিয়ে মানুষের মাথা খেয়ে দেশটার সর্বনাশ করা। আমরা সরকারি অফিসে, হাসপাতালে, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেগশূন্য ব্যবহার পাই, নেতাদের কাছ থেকে এবং আদালতে আবেগশূন্য ব্যবহার পাই। কারণ গোটা ব্যবস্থাটা অনবরত শিখিয়ে চলেছে, মানুষকে মানুষ হিসাবে ভাবা অন্যায়। তাকে দেখতে হবে নৈর্ব্যক্তিকভাবে। সকলকে ৪৭ফ বা ৬৯ঙ হিসাবে দেখাই নিরপেক্ষতা, ন্যায়বিচার। যে যেখানে ক্ষমতার বিন্যাসে উপরে থাকবে, সে ন্যায় করলেও মায়াদয়াহীনভাবেই করবে – এই আমাদের আজন্মলালিত সংস্কার। উল্টোদিকের মানুষটির সাথে মানুষ হিসাবে নয়, তার প্রাসঙ্গিক তকমার হিসাবে ব্যবহার করাই যেন ন্যায়। এভাবে চললে যা হওয়ার কথা আমাদের দেশে ঠিক তাই হয়েছে। ন্যায় আর হয় না, অধিকাংশ সময় অন্যায়ই হয় সাধারণ মানুষের প্রতি। তাই বোধহয় দক্ষিণপন্থীরা কাজের কথা বাদ দিয়ে কারোর হিন্দু আবেগ, কারোর অসমিয়া আবেগ, কারোর বাঙালি আবেগ, কারোর দলিত আবেগ, কারোর আদিবাসী আবেগে সুড়সুড়ি দিলে ভুল করে মনে হয় “এই তো আমাকে আমি হিসাবে দেখছে।” অতএব সমস্ত মনপ্রাণ তারই দিকে ধাবিত হয়। আপনার শ্রীনগরের বক্তৃতা শুনে মনে হল, আপনি এই কথাটা ধরে ফেলেছেন।

দুই দশকের সাংবাদিক জীবন বাদ দিন, প্রায় সাড়ে তিন দশকের রাজনৈতিক বক্তৃতা শোনার জীবনে মনে করতে পারছি না আর কোনো ভারতীয় রাজনীতিবিদকে কোনো জনসভার প্রতিটি মানুষের সঙ্গে আলাদা করে অথচ একত্রে কথা বলতে দেখেছি। কাশ্মীরের মানুষ এবং সেখানে মোতায়েন আধাসামরিক বাহিনী ও সেনাবাহিনীর জওয়ানদের যে এক পংক্তিতে দাঁড় করানো সম্ভব, একই বাক্যে তাঁদের সকলের যন্ত্রণা ছুঁয়ে ফেলা সম্ভব তা নরেন্দ্র মোদীর ভারতে কেন, রাজীব গান্ধীর ভারতেও আমরা কোনোদিন কল্পনা করতে পারিনি। কারণ সৈনিক বা সাধারণ কাশ্মীরি – এই গোষ্ঠীনামের পিছনের ব্যক্তিগুলির বেদনা বা আনন্দ নিয়ে ভাবার কথা রাজনীতিবিদ দূরে থাক, আমাদেরও মনে আসেনি। আপনি ফোনে নিজের ঠাকুমা এবং বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার স্মৃতি উল্লেখ করে বললেন, এ যন্ত্রণা মোদী-অমিত শাহ বুঝবেন না। কাশ্মীরের মানুষ বুঝবেন; সিআরপিএফ, বিএসএফ, সেনাবাহিনীর জওয়ানদের আত্মীয়রা বুঝবেন। কারণ তাঁরা এরকম ফোন কল পেয়ে থাকেন। ভারত জোড়ো যাত্রার উদ্দেশ্য এই ফোন কলগুলো আসা বন্ধ করা।

এভাবে বড়জোর শিল্পী, সাহিত্যিকদের কেউ কেউ ভাবতে পেরেছেন। কথাগুলো শুনেই মনে পড়ে গেল আজাজ খান নির্দেশিত হামিদ ছায়াছবিটির কথা। একমাত্র সেখানেই দেখেছিলাম ভারতীয় সেনার হাতে গুম হয়ে যাওয়া বাবার সন্ধানে থাকা আট বছরের ছেলে আর জন্মের পর থেকে সন্তানের মুখ না দেখা জওয়ানের যন্ত্রণাকে পাশাপাশি রাখা হয়েছিল। মোদী-শাহের নিষ্ঠুর পরিহাসে ২০১৯ সালে ওই ছবির নাম ভূমিকায় অভিনয় করা তালহা আর্শাদ রেশিকে নির্দেশক বেশ কিছুদিন জানাতেই পারেননি যে সে দেশের সেরা শিশুশিল্পীর পুরস্কার পেয়েছে। কারণ তখন গোটা কাশ্মীরের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে রেখেছিল ভারত সরকার, যা কাশ্মীরের মানুষেরও সরকার।

এই সংকট তো কেবল কাশ্মীরের মানুষের নয়। দেশের যেখানেই রাষ্ট্র অতিমাত্রায় শক্তিধর হয়ে উঠেছে, নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সংঘাত রাষ্ট্রের সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছে, সেখানেই এই সংকট স্বাধীনতার পর থেকে বারবার ঘটেছে, আজও ঘটে চলেছে। ঠিক যেমন রাষ্ট্রের হাতে ধর্ষিত হওয়া অথবা ধর্ষিত হয়ে রাষ্ট্রশক্তির কাছ থেকে নৈর্ব্যক্তিক (একজন ধর্ষিতার পক্ষে যা অমানবিকের নামান্তর) ব্যবহার পাওয়া এ দেশের মেয়েদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ কোনো নেতাকে কখনো জনসভায় বলতে শুনিনি – “আপনারা হয়ত দেখেছেন আমি যখন হাঁটছিলাম, বেশকিছু মহিলা কাঁদছিলেন। জানেন ওঁরা কেন কাঁদছিলেন? কয়েকজন আমার সাথে দেখা করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে কাঁদছিলেন ঠিকই, কিন্তু এমন অনেকেও ছিলেন যাঁরা কাঁদছিলেন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে। কেউ কেউ বলছিলেন ওঁদের যৌন হয়রানি হয়েছে, কয়েকজনের আত্মীয়ই কাণ্ডটা ঘটিয়েছে। শুনে আমি যখন বলতাম, আমি পুলিসকে বলি তাহলে? ওঁরা বলতেন, রাহুলজি, পুলিসকে বলবেন না। আমরা আপনাকে বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পুলিসকে বলবেন না। বললে আমাদের আরও ক্ষতি হবে। এই হল আমাদের দেশের বাস্তব।”

এ দেশ কত মহান তা নিয়ে কেবল সংঘ পরিবার তো নয়, আমাদের সকলেরই গর্বের শেষ নেই। সেই গর্বের আখ্যানে এই বাস্তব খাপ খায় না বলে আমরা এড়িয়ে যাই, রাজনৈতিক নেতারা তো এড়িয়ে যান বটেই। যে দলের যেখানে সরকার আছে সেখানে সে দলের নেতারা আরও বেশি করে এড়িয়ে যান, কারণ তাঁরা মনে মনে একে সমস্যা বলে জানলেও স্রেফ আইনশৃঙ্খলার সমস্যা বলেই ভাবেন। ফলে এসব কথা তুললে নিজের দলের সরকারের ঘাড়ে দোষ এসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেন। তার উপর পুলিসকে বললে সমস্যা বাড়বে – এ তো সরাসরি রাষ্ট্রবিরোধী কথা। সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলও তো রাষ্ট্রব্যবস্থার অঙ্গ। ব্যবস্থার মধ্যে থেকে তার বিরুদ্ধে কথা বলা চলে কখনো? অথচ আপনি বললেন। এখনো ভারতের বেশ বড় বড় তিনটে রাজ্যে আপনার দলের সরকার, অর্থাৎ সেখানকার পুলিস আপনার দলেরই হাতে। তার উপর আপনি, আপনার মা এবং বোন সারাক্ষণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকেন। তবু যে আপনি এসব কথা বললেন, এ কথা চট করে ভোলা যাবে না। যেখানে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বললেন, সেখান থেকে কুনান পোশপোরা ঠিক কত কিলোমিটার দূরে তা জানি না। তবে এটুকু বুঝতে পারি, আপনার কথাগুলো কেবল ওই কাণ্ডের ধর্ষিতাদের নয়, স্পর্শ করবে মণিপুরের সেই মহিলাদেরও, যাঁরা ২০০৪ সালে একদা উলঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন ইম্ফলের রাস্তায়, সঙ্গে ছিল ফেস্টুন। তাতে লাল অক্ষরে লেখা ছিল – INDIAN ARMY RAPE US। কথাগুলো নিশ্চয়ই ছুঁয়ে ফেলবে ছত্তিসগড়ের সোনি সোরিকে, বেঁচে থাকলে ছুঁয়ে ফেলত অর্চনা গুহকেও। সংবাদমাধ্যম যাকে নির্ভয়া নাম দিয়েছিল সেই মেয়েটিকে তো বটেই। এইসব কুকীর্তির সময়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল আপনার দলই। তবু আপনি এসব কথা বলেছেন বলে, বা সেইজন্যেই আরও বেশি করে আপনি ধন্যবাদার্হ, রাহুল। মানহারা মানবীর দ্বারে এসে দাঁড়ানোর সাহস খুব কম পুরুষের হয়। তাকে মানবী হওয়ার সম্মানটুকু দেওয়ার ক্ষমতাও অনেক শাসকেরই হয় না, নিজে মহিলা হলেও। আমি যে রাজ্যের বাসিন্দা সে রাজ্যের মহিলা মুখ্যমন্ত্রীই তো ধর্ষণ হলেই হয় ধর্ষিতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, নয় প্রতিবাদী মহিলাদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে তেড়ে যান, নতুবা ছেলেটি ও মেয়েটির মধ্যে প্রেম ছিল কিনা তার খোঁজ করেন। ভারতের রাজনীতিবিদদের থেকে এমন ব্যবহার পেয়েই ভারতীয় মেয়েরা অভ্যস্ত।

আরও পড়ুন রাহুলে না, বাবুলে হ্যাঁ: তৃণমূলের প্রকৃত এজেন্ডা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

আপনার বক্তৃতায় আপনি আরও অনেক কথা বলেছেন যেগুলো ভাল কথা, প্রয়োজনীয় কথা, বহুবার বলা কথা। তবু আবার বলা প্রয়োজন, কারণ কেউ বলছে না। যেমন আপনি ‘গঙ্গা-যমুনী তহজীব’-এর কথা, অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমানের যৌথ সভ্যতার কথা বলেছেন। কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত আপনার যাত্রার তুলনায় এনেছেন কাশ্মীর থেকে এলাহাবাদে নেহরু পরিবারের যাত্রার প্রসঙ্গ। সাংস্কৃতিকভাবে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী কেমন একই সূত্রে গাঁথা তা দেখাতে ব্যক্তিগত ইতিহাসের এই ব্যবহার যে একজন পাকা বক্তার লক্ষণ। কিন্তু যা আপনার গোটা বক্তৃতায় সারাক্ষণ ছেয়ে থেকেছে তা হল সংবেদনশীলতা। আরও সহজ করে বললে, কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষকে ছোঁয়ার ইচ্ছা। আপনি যেমন ধর্ষিত মহিলাদের কথা বলেছেন, তেমনই বলেছেন দুটি হতদরিদ্র ছেলের কথা, যাদের গায়ে জামা পর্যন্ত ছিল না, দেহ ছিল ধূলিমলিন। বলেছেন তাদের দেখেই মনে হয়েছিল উত্তর ভারতের শীতেও শুধু টি-শার্ট পরেই কাটিয়ে দেবেন। সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে কথাগুলো বানানো মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আপনার বক্তৃতার দিনেই নাগরিক ডট নেটে মনীষা ব্যানার্জি লিখেছেন “কথিত আছে চম্পারণে কস্তুরবা দেখেছিলেন, একটি ঝুপড়িতে দুই মহিলার মাত্র একটি কাপড়। একসঙ্গে দুজনে বাইরে বেরোতে পারেন না। এই কাহিনি গান্ধীকে কটিবস্ত্র ধারণে বাধ্য করে…”। ফলে সন্দেহ করা অমূলক নয়, যে এই কাহিনি আপনার জানা এবং আসলে তা থেকেই টি-শার্ট পরার সিদ্ধান্ত। যদি তাও হয়, তবু আজকের ভারতে একজন রাজনীতিবিদ সচেতনভাবে গান্ধীকে অনুকরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং গান্ধীর এমন একটি কাজ অনুকরণ করছেন যা করতে গেলে নিজেকে শারীরিক কষ্ট ভোগ করতে হয় – এ বড় কম কথা নয়। আমরা তো শুনে এসেছি আপনি ‘শাহজাদা’। আপনি নিজেও এই ভাষণে বলেছেন আজন্ম কোনো না কোনো সরকারি বাড়িতে থেকেছেন। শুধু সমালোচকের চোখ দিয়ে দেখলেও সেই লোকের এই ভূমিকার প্রশংসা না করে উপায় নেই। ঘৃণার ব্যাপারীদের কথা অবশ্য আলাদা।

ধূলিমলিন ছেলেদুটির কথা বলতে গিয়ে আপনি ফের তুলে এনেছেন আমাদের পালিশ করা ভারতবর্ষের কদাকার দিকটি। আপনারই এক সঙ্গী যে আপনাকে বলেছিলেন ওদের সাথে গলাগলি করা উচিত হয়নি, ওরা নোংরা – সেকথা বলে দিয়েছেন সর্বসমক্ষে। জানিয়েছেন, আপনার উত্তর ছিল “ওরা আমার এবং আপনার থেকে পরিষ্কার।” আবার বলি, একথা বানানো হওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু বানানো হলেও দোষের নয়। প্রথমত, একজন নেতা জনসভায় না ভেবেচিন্তে যা খুশি বলবেনই বা কেন? দ্বিতীয়ত, অস্পৃশ্যতা আজও আমাদের দেশে ইতিহাস হয়ে যায়নি। যাঁরা ভুক্তভোগী তাঁদের একথা যেভাবে ছোঁবে, আমার মত উচ্চবর্গীয় সাংবাদিককে সেভাবে স্পর্শ করবে না বলাই বাহুল্য। কয়েক হাজার বছর ধরে কোণঠাসা হয়ে থাকা সেইসব মানুষ ভারত জুড়ে গত আট বছরে আরও কোণঠাসা হয়েছেন, যতই একজন দলিতের পর একজন আদিবাসী রাষ্ট্রপতি হয়ে থাকুন। যেসব গালাগালি স্বাধীন ভারতে অন্তত তাঁরা পিছন ফিরলে ছুঁড়ে দেওয়া হত, আজকাল প্রকাশ্যেই দেওয়া হয়। তাঁরা জানলেন, নিদেনপক্ষে একজন নেতা আছেন ভারতীয় রাজনীতিতে, যিনি ওই ভাবনার, ওই ব্যবহারের বিরুদ্ধে।

আজকের ভারত যেমন হয়েছে, তাতে সারাক্ষণ কথাবার্তা চলে নাগরিকত্ব নিয়ে। অনেকদিন পরে কাউকে ভারতীয়ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে শুনলাম। ছোটবেলায় ইতিহাস বইতে পড়া “বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য” কথাটাকে আজ বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। সেই ঐক্য কীভাবে ভারতের সর্বত্র বিচিত্র ভাষায় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চিন্তায় ধরা পড়েছে আপনি সেকথা বলেছেন। গুজরাটের গান্ধী, আসামের শঙ্করদেব, কর্ণাটকের বাসবেশ্বর বা বাসবান্না, কেরালার নারায়ণ গুরু, মহারাষ্ট্রের জ্যোতিবা ফুলে – এঁদের সকলকেই আপনি ভারতীয়ত্বের নির্মাতা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামটা শুনতে না পেয়ে রাগ করব ভাবছিলাম। কারণ এমনকি জওহরলাল নেহরুও তাঁর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া গ্রন্থে ভারতীয়ত্বের নির্মাণে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ বলে মতপ্রকাশ করেছেন, গান্ধীর সঙ্গে তাঁকে একাসনে বসিয়েছেন (“Tagore and Gandhi have undoubtedly been the two outstanding and dominating figures of India in the first half of the twentieth century… Tagore and Gandhi bring us to our present age.”)। সেই রবীন্দ্রনাথের নাম করলেন না দেখে সত্যিই রাগ করতে যাচ্ছিলাম। তারপর খেয়াল হল, রবীন্দ্রনাথের নাম তো বহু নেতার মুখে শুনেছি। এমনকি মোদীও শালগ্রাম শিলার মত করে তাঁর নাম নিয়ে নেন, অসহ্য উচ্চারণে তাঁর কবিতার পংক্তি আউড়ে বাঙালিদের মোহিত করার চেষ্টা করেন ভোটের মুখে। কিন্তু নারায়ণ গুরু আর ফুলের মত দুজন বর্ণবাদবিরোধী মানুষের নাম ভারতের কোনো উচ্চবর্গীয় শীর্ষস্থানীয় নেতার মুখে কোনোদিন শুনেছি কি? এমনকি আপনার পূর্বপুরুষ নেহরুর উপর্যুক্ত বইটিতেও বর্ণাশ্রম শুরুতে ভাল উদ্দেশ্যেই চালু করা হয়েছিল, পরে মন্দ হয়ে যায় – এই জাতীয় মতামত প্রকাশ করা হয়েছে। গান্ধীও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে ছিলেন, বর্ণাশ্রমের বিরুদ্ধে নয়।

উপরন্তু আমরা যারা বিন্ধ্য পর্বতের এপাশে বাস করি এবং তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালির তফাত করতে পারি না; ওদিককার লোক হলেই দক্ষিণ ভারতীয় বলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হই, তাদের অনেকের কাছে তো নামদুটোই নতুন। সে নাম আপনি করলেন ভারতের একেবারে উত্তর প্রান্তে দাঁড়িয়ে। এমনটি না করলে “দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে” স্বপ্ন সত্যি হবে কী করে? স্বাধীনতার পর ৭৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এই আদানপ্রদান তো ঘটেনি, তাই তো সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরে মঙ্গলঘট ভরা হয়নি। আপনি কি পারবেন সেই ঘট ভরতে?

সে বড় কঠিন কাজ, সম্ভবত অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ। আজকের ভারতে যখন সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে, তখন এ কাজ আরও শক্ত। সত্যি কথা বলতে কি, আপনি সে কাজের যোগ্য লোক কিনা তার পরীক্ষা আপনি ক্ষমতায় না পৌঁছলে শুরুই হবে না। আপনি যতই বলুন, ভারত জোড়ো যাত্রা কংগ্রেসের জন্য করেননি, কংগ্রেসকে বাদ দিয়েও আপনি যা করতে চান তা করতে পারবেন না। আর সেই দলে আজও গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসাবে আছেন কমলনাথের মত লোক, যিনি এই সেদিন অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণে কৃতিত্বের ভাগীদার হতে চেয়েছেন। যোগ করেছেন, আসল কৃতিত্ব আপনার বাবা রাজীব গান্ধীর, কারণ ১৯৮৫ সালে তিনিই বাবরির তালা খুলিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়াও আছেন শশী থারুর, যিনি কে জানে কোন অধিকারে কদিন আগে ঘোষণা করে দিলেন, ভারতের মুসলমানরা পর্যন্ত আর গুজরাট ২০০২ নিয়ে ভাবতে চান না।

এঁদের নিয়ে কী করে ভারত জুড়বেন সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ভার আপনার। নেহরু যে গণতন্ত্রের কথা বলতেন সেই গণতন্ত্রের রীতি মেনে আপনার উপর সাগ্রহ কিন্তু সন্দিগ্ধ নজর রাখব আমরা, যারা এখনো প্রশ্ন তোলা এবং সমালোচনা করা সংবাদমাধ্যমের কাজ বলে মনে করি। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে ভারতের আজ এমন এক নেতা দরকার যাঁর ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি না হলেও বুকের ভিতরে কিছুটা পাথর আছে। যে কোনো ভারতবাসী ধ্বনি দিলে প্রতিধ্বনি পাবে। আপনার শ্রীনগরের বক্তৃতা শোনার পর মনে না করে পারছি না, আপনি তেমনই একজন।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতিকে উপযুক্ত স্থান দিতে হবে। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকলে কেউ এগোতে পারে না। কেবল রাজনীতি নয়, সাংবাদিকতাতেও তার ঊর্ধ্বে উঠতে হয়, তবেই সত্যের সন্ধান পাওয়া যায়। আমাদের হারিয়ে যাওয়া বা কখনো খুঁজে না পাওয়া ভারতের সন্ধানও সেভাবেই পাওয়া যাবে সম্ভবত। দূরদর্শনে যখন নেহরুর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া অবলম্বনে শ্যাম বেনেগালের ভারত এক খোঁজ ধারাবাহিক শুরু হয়, তখন আমার বয়স ছয়। আপনার বোধহয় ১৮। তখন না হলেও, এখন নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে সুপণ্ডিত নেহরু বইয়ের নামে দাবি করেছেন তিনি ভারতকে ‘আবিষ্কার’ করেছেন। অন্যদিকে বেনেগাল ওই বইয়ের মধ্যে দিয়ে ভারত দেশটাকে খুঁজে বেড়িয়েছেন। এতদিন আমাদের অনেকেরই সন্দেহ ছিল, আপনি ক্রমঅপসৃয়মান ভারতকে আদৌ খুঁজতে চান কিনা। ভারত জোড়ো যাত্রায় প্রমাণ হল, চান। আশা করি এ খোঁজ শ্রীনগরে শেষ হয়নি, শুরু হল।

ধন্যবাদান্তে

জনৈক সাংবাদিক।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

কী ঢাকছে সরকারি চোলি? কেনই বা ঢাকছে?

আজ বিবিসির তথ্যচিত্র মুছে দেওয়া হচ্ছে, কাল ২০০২ সালে গুজরাটে আদৌ কোনো দাঙ্গা হয়েছিল বলে পোস্ট করলেই তা মুছে দেওয়া হবে। আহসান জাফরি খুন হননি – ওটি ভুয়ো খবর। বিলকিস ধর্ষিত হননি – ওটিও ভুয়ো খবর।

চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়
চোলি কে পিছে?
চুনরী কে নীচে কেয়া হ্যায়
চুনরী কে নীচে?

আমাদের তখন সবে গোঁফের রেখা উঠছে। সন্ধেবেলা দূরদর্শনের ‘সুপারহিট মুকাবলা’ অনুষ্ঠানে খলনায়ক ছবির এই গান পরপর কয়েক সপ্তাহ বেজেছিল এবং আমাদের উদ্বেল করেছিল। তখনো বাঙালি ছেলেমেয়েরা ভূমিষ্ঠ হয়েই হিন্দিতে পণ্ডিত হয়ে যেত না, ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের বাবা-মায়েরাও দলে দলে হিন্দিকে তাদের দ্বিতীয় ভাষা করে তুলতে উদগ্রীব হতেন না। ফলে চোলি আর চুনরী শব্দদুটির অর্থ জানতে আমাদের কিঞ্চিৎ সময় লেগেছিল। জানার পর আমাদের রোমাঞ্চ কোন মাত্রায় পৌঁছেছিল তা আজকের স্মার্টফোন প্রজন্ম কল্পনা করতে পারবে না। কিছুদিন পরে সে রোমাঞ্চে জল ঢেলে দিতে কেউ বা কারা আদালতে মামলা ঠুকে দিল। গানটি শ্লীল না অশ্লীল তা নিয়ে প্রবল তর্কাতর্কি লেগে গেল, কিছুদিন পরে দেখা গেল জনপ্রিয়তায় একসময় এক নম্বরে উঠে যাওয়া ওই গান আর ‘সুপারহিট মুকাবলা’ অনুষ্ঠানে বাজানো হচ্ছে না। ইলা অরুণের গাওয়া ওই চারটি লাইন মোটেই অশালীন নয় – এই যুক্তির পক্ষে যারা, তাদের হাতিয়ার ছিল অলকা ইয়াগনিকের গাওয়া পরের কয়েক লাইন

চোলি মে দিল হ্যায় মেরা
চুনরী মে দিল হ্যায় মেরা
ইয়ে দিল ম্যায় দুঙ্গি মেরে ইয়ার কো, পেয়ার কো।

অকাট্য যুক্তি। ছবিতে দেখা যেত এক নাচাগানার আসরে নীনা গুপ্তা গানের প্রথম চার লাইনের প্রশ্নটি তুলছেন, আর লাস্যময়ী মাধুরী দীক্ষিত স্পষ্ট উত্তর দিয়ে দিচ্ছেন। অতএব অন্য কিছু ভাবার তো কোনো কারণ নেই। যতদূর মনে পড়ে আদালতে গানটির অশ্লীলতা প্রমাণ হয়নি, তাই প্রায় একই যুগের খুদ্দার ছবির অন্য একটি গান ‘সেক্সি সেক্সি সেক্সি মুঝে লোগ বোলে’-র মত আদালতের নির্দেশে গানের কথা বদল করে নতুন করে প্রকাশ করতে হয়নি। কিন্তু ঘটনা হল, চোলির পিছনে আর চুনরীর নিচে যা আছে তা নিয়ে আমাদের রোমাঞ্চে জল ঢালা সম্ভব হয়নি। আমরা যে যার মত করে বুঝে নিয়েছিলাম কী আছে – দিল না অন্য কিছু।

২০০২ সালে গুজরাটে গোধরায় ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের পর কী ঘটেছিল, তাতে নরেন্দ্র মোদীর কতখানি দায় ছিল, আদৌ ছিল কি ছিল না – এ প্রশ্ন উঠলেই আমার ওই গানটির কথাই মনে পড়ে। হৃদয় তো অনেক গভীরে গেলে পাওয়া যায়। বয়ঃসন্ধির ছেলেপুলেদের অতদূর যাওয়ার ধৈর্য থাকে না। আমরা, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘স্কিন ডিপ’, ওই গানের সে অর্থটুকু ভেবেই আহ্লাদিত হতাম। দূরবর্তী কোনো মাইক থেকে গানটি ভেসে এলে বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে চোখ মারামারি চলত, ঠোঁটে থাকত দুষ্টু হাসি। তা বলে কি আমাদের মধ্যে একটিও সুবোধ বালক ছিল না? তারা আমাদের অসভ্য উল্লাস দেখে যারপরনাই বিরক্ত হত। দু-একজন খাঁটি সাত্ত্বিক মানসিকতায় আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করত, আমরা গানটির একেবারে ভুল অর্থ ভেবে নিচ্ছি। একই গানের কথার যে একাধিক অর্থ হওয়া সম্ভব সে শিক্ষা আমরা তখনই পাই – রবীন্দ্রসঙ্গীতের গভীরতা বা ভারতচন্দ্রের ব্যাজস্তুতিকে স্পর্শ করার আগেই।

বিলিতি কবিতার রোম্যান্টিক যুগের কবিরা মনে করতেন মানুষ অমৃতের সন্তান। জন্মের পরেও বেশ কিছুদিন সে নিষ্পাপ থাকে, তারপর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তার মধ্যে পাপ প্রবেশ করে, পবিত্রতা বিদায় নেয়। কবি উইলিয়াম ব্লেক Songs of Innocence আর Songs of Experience নামে দুটি পরিপূরক কবিতার বই লিখে ফেলেছিলেন, আর উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ লিখেছিলেন এ জগৎ হল কারাগার। একটি ছেলে যত বড় হয় তত তার চতুর্দিকে ঘনিয়ে আসে সে কারাগারের গরাদ (“Shades of the prison-house begin to close/Upon the growing Boy”)। ২০০২ সালের মত ঘটনা যখন ঘটে তখন মানুষ অমৃতের সন্তান না মৃত্যুর সওদাগর তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ দেখা দেয়। তবে এখন পিছন ফিরে মনে হয় মাধুরীর চোলি যেমন আমাদের নিষ্পাপ নাবালকত্ব থেকে অভিজ্ঞ সাবালকত্বে পৌঁছে দিয়েছিল, তেমনই গুজরাট ২০০২ ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে রাম জন্মভূমি নিয়ে গণহিস্টিরিয়া তৈরি করা আর মসজিদ ভাঙার রাজনীতির নাবালকত্ব থেকে শাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে অভীষ্ট লক্ষ্যপূরণের সাবালকত্বে পৌঁছে দিয়েছিল।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত একাধিক মামলায় রায় দিয়েছে – কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু, ধর্ষণ, বাস্তুচ্যুতির পিছনে কোনো বৃহত্তর অপরাধমূলক চক্রান্ত ছিল না। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মোদীরও কোনো প্রত্যক্ষ দায় ছিল না। এর উপরে আর কথা কী? কে না জানে, ভারতের বিচারব্যবস্থার মত নিখুঁত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা পৃথিবীর কোথাও নেই? সেই কারণেই তো বিচারপতি নিয়োগের কলেজিয়াম ব্যবস্থাকে বাতিল করার দাবিতে উঠেপড়ে লেগেছে মোদী সরকার। তাদের অভিযোগ – ব্যবস্থাটি অগণতান্ত্রিক। আইনমন্ত্রী কিরেন রিজিজু আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশবন্ত চন্দ্রচূড় প্রায় বাগযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন প্রতিদিন। কী কাণ্ড! যে ব্যবস্থা মোদীর বিরুদ্ধে যাবতীয় রাজনৈতিক চক্রান্ত নস্যাৎ করে তাঁকে পদ্মফুলের মত নিষ্পাপ প্রমাণ করেছে, সেই ব্যবস্থাকে কিনা তাঁর সরকারই মনে করে অগণতান্ত্রিক!

এমন সময়, হাঁউ মাউ খাঁউ, গণহত্যার গন্ধ পাঁউ বলে এসে পড়ল বিবিসির তথ্যচিত্র ইন্ডিয়া: দ্য মোদী কোয়েশ্চেন। নতুন করে উঠে পড়ল চোলির পিছনে কী আছে সেই প্রশ্ন। এইবেলা পরিষ্কার করে দেওয়া যাক, উদাহরণ হিসাবে শুধুমাত্র বিপরীতকামী পুরুষদের মধ্যে চালু থাকা নারীদেহ সম্পর্কে একটি রগরগে আলোচনাকে কেন টেনে এনেছি। কারণটি খুব সোজা। ওই যে বললাম, আমরা যে যার মত করে বুঝে নিয়েছিলাম? লক্ষ করলে দেখা যাবে, গুজরাটে ঠিক কী হয়েছিল বিজেপির ভোটাররাও ঠিক একইভাবে যে যার মত করে বুঝে নিয়েছে। ওই যে বললাম, গানটি ভেসে এলেই আমাদের মধ্যে চোখ মারামারি চলত? ঠিক একই ব্যাপার বিজেপি ও তার ভোটারদের মধ্যে চলে। বিবিসির তথ্যচিত্রে যা যা দেখানো হয়েছে তার কিছুই কিন্তু নতুন নয়। নতুন খবর বলতে এটুকুই, যে ব্রিটিশ সরকার এক নিজস্ব তদন্ত চালিয়েছিল, যার সিদ্ধান্ত হল মোদী স্বয়ং দায়ী। যে সমস্ত প্রমাণ, যেসব সাক্ষীকে এই তথ্যচিত্রের দর্শকরা দেখছেন তাঁদের কথা ভারতের বহু ছোটবড় সংবাদমাধ্যমে গত দুই দশকে প্রকাশিত হয়েছে। রাকেশ শর্মার তথ্যচিত্র ফাইনাল সলিউশন দেখলে বিবিসির তথ্যচিত্রের চেয়েও বেশি ঠান্ডা স্রোত নামবে শিরদাঁড়া বেয়ে। সেই তথ্যচিত্রটি যখন ইউটিউবে প্রথম আপলোড করা হয়, তখন সরকারের হাতে তা ব্লক করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু দলে দলে লোক বারবার রিপোর্ট করে ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড’-কে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করে সাময়িকভাবে ব্লক করিয়ে দিয়েছিল।

ফলে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। উঠলেই প্রত্যেকবার বিজেপি নেতা ও সমর্থকদের থেকে দুরকম উত্তর পাওয়া যায়। এক দল বলে, সব বানানো গল্প। সুপ্রিম কোর্ট ক্লিনচিট দিয়েছে। আরেক দল বলে, যা করেছে বেশ করেছে। মুসলমানদের বেশি বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। অমিত শাহ স্বয়ং যেমন সংবাদসংস্থা এএনআইকে বলেছিলেন, মোদীজির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত অভিযোগ করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সেই অভিযোগকারীদের ক্ষমা চাওয়া উচিত। আবার সম্প্রতি হিমাচল প্রদেশে নির্বাচনী প্রচারে বলেছেন, ২০০২ সালে মোদীজি যারা হিংসা ছড়ায় তাদের উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন। ফলে গুজরাটে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যার যা পছন্দ সে তাই বুঝে নেবে।

আমরাও ঠিক এমনই করতাম। এক দল মাধুরীর হৃদয় নিয়ে ভাবত, আরেক দল মাংসপিণ্ড নিয়ে। এমন চোলিকেন্দ্রিক পৌরুষই যে গুজরাট ২০০২-এর অভিজ্ঞান তা আর কেউ না জানলেও বিলকিস বানো বিলক্ষণ জানেন।

ভারত সরকার ইউটিউবে বিবিসির তথ্যচিত্রের যত লিঙ্ক আছে সব ব্লক করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিবিসির তথ্যচিত্রের লিঙ্ক শেয়ার করায় বেশকিছু টুইটও মুছে দিতে বলেছে। যদি বলি এই সাবালক জীবনের চেয়ে সেই নাবালক জীবন ভাল ছিল, তাহলে স্রেফ স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়ছি বলা যাবে কি? তখন ভারত রাষ্ট্র স্রেফ যৌনতাকেই অশ্লীল বলে বিবেচনা করত, ঢেকেঢুকে রেখে, গানের কথা বদলে দিয়ে বা কোনো ফিল্মের গোটা দু-চার চুম্বন দৃশ্য বাদ দিয়েই নিজের ক্ষমতা জানান দিত। তাও কেউ আদালতে দৌড়লে তবে। এখন তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে নিজের অপছন্দের কিছু দেখলেই তাকে অসত্য বলে দেগে দিয়ে ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে দিতে পারে। ঠিক সেই কাজটিই করা হয়েছে এক্ষেত্রে। কদিন আগেই, গত মঙ্গলবার, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের ওয়েবসাইটে আপলোড হওয়া সংশোধনীর এক খসড়ায় দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো যে খবরকে ভুয়ো খবর বলে ঘোষণা করবে সে খবর কোনো সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করা যাবে না। শেয়ার হলে তার দায়িত্ব বর্তাবে সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মটির উপর।

অর্থাৎ আজ বিবিসির তথ্যচিত্র মুছে দেওয়া হচ্ছে, কাল ২০০২ সালে গুজরাটে আদৌ কোনো দাঙ্গা হয়েছিল বলে পোস্ট করলেই তা মুছে দেওয়া হবে। আহসান জাফরি খুন হননি – ওটি ভুয়ো খবর। বিলকিস ধর্ষিত হননি – ওটিও ভুয়ো খবর। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো হয়ত এমনই বলবে। তা সরকার বা সরকারি সংস্থাগুলি বলতেই পারে। কিন্তু যত বলবে ততই চোলির পিছনে কী আছে সে প্রশ্ন জোরালো হবে। সরকারের এখনো চোলি কেন প্রয়োজন – সে প্রশ্নও উঠবে নির্ঘাত। কারণ গুজরাট দাঙ্গায় অভিযুক্ত, এমনকি শাস্তিপ্রাপ্তরাও তো এখন মুক্ত। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাব্যের সত্যতা প্রমাণ করে গারদ ঘনিয়ে এসেছে কেবল উমর খালিদ, শার্জিল ইমামদের মত নাবালকদের উপর – যারা গালভর্তি দাড়ি গজিয়ে যাওয়ার পরেও মানুষকে মৃত্যুর সওদাগর ভাবার সাবালকত্বে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

আরও পড়ুন অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

সামান্য আশাবাদী অবশ্য হওয়া যায় একথা ভেবে, যে সরকারের এখনো খানিক লজ্জাশরম আছে বলেই চোলির প্রয়োজন পড়ছে। তবে ইন্টারনেটের যুগে চোলি যথাস্থানে রাখা লৌহকঠিন সরকারের পক্ষেও কষ্টসাধ্য। শীত বড়জোর আর এক মাস। তারপর বসন্ত সমীরণে ভোরের দিকে হাওড়ার ফেরিঘাট থেকে যদি বাগবাজার অভিমুখে নৌকাবিহারে বেরিয়ে পড়েন, তাহলে দেখতে পাবেন ভাগীরথীর পাড়ে প্রাতঃকৃত্য করতে বসেছেন অনেকে। তাঁরা বসেন নদীর দিকে পিছন ফিরে। তাতে সুবিধা হল, আপনি তাঁদের উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে পেলেও তাঁরা আপনাকে দেখতে পান না। ফলে ভেবে নেওয়া সহজ হয় যে আপনিও তাঁদের দেখতে পাচ্ছেন না। ইন্টারনেটে একটি দেশের মধ্যে তথ্য ও তথ্যচিত্র ব্লক করা এমনই ব্যাপার। অবশ্য আত্মপ্রতারণা ছাড়া একনায়কত্ব বাঁচে কেমন করে?

পুনশ্চ: বিবিসির তথ্যচিত্রের নামে পার্ট ওয়ান কথাটি রয়েছে। কঙ্গনা রানাওয়াতের হিট ছবির সংলাপের ভাষায় “অভি তো হমে ঔর জলীল হোনা হ্যায়।”

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

অমর্ত্য সেন, ক্লিকটোপ আর মাদাম তুসো

অমর্ত্যকে গালি দেওয়ার কাজটাও কেবল বাঙালিরাই করছেন। বিজেপির মধ্যেও কেবল তথাগত, দিলীপ ঘোষরাই। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।

আনন্দবাজার পত্রিকা স্মরণীয় শিরোনাম দেওয়ার জন্য বিখ্যাত। এই তো সেদিন পেলের প্রয়াণে শিরোনাম হল ‘আমার সম্রাট স্বপ্নে থাক’। শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’ পড়া থাকলে পাঠকের কাছে এই শিরোনামের রস কিঞ্চিৎ ঘনীভূত হবে সন্দেহ নেই, কিন্তু না থাকলেও রসে তিনি পুরোপুরি বঞ্চিত হবেন না। খবরের কাগজে এই ধরনের শিরোনামকেই সেরা বলে ধরা হয়ে এসেছে চিরকাল। অমর্ত্য সেন যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন, তখন আমার মত যাদের সবে গোঁফদাড়ি গজিয়েছিল, তাদের নির্ঘাত এই মধ্যবয়সে এসেও মনে আছে সেই অবিস্মরণীয় শিরোনাম – ‘মর্তের সেরা পুরস্কার বাংলার অমর্ত্যর’। তখন ইন্টারনেট থাকলেও সোশাল মিডিয়া ছিল না, সংবাদমাধ্যমের ঘাড়ে ক্লিক আদায় করার চাপ ছিল না, ক্লিকটোপের প্রয়োজন ছিল না। এখন আছে। অনিবার্যভাবে ওয়েব মাধ্যমের এই কৌশল অন্য মাধ্যমগুলোতেও ঢুকে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে খবরের কাগজের সাংবাদিকদের কাজের মূল্যায়নও মালিকরা করছেন কোন প্রতিবেদনে ওয়েবে কতগুলো হিট হল তা দিয়ে। কোনো কোনো কাগজ অনলাইন সংস্করণের জন্য আলাদা কর্মীবাহিনী না রেখে এক মাইনেয় দুটো কাজই করিয়ে নিচ্ছে সাংবাদিকদের দিয়ে। ফলে খবরের কাগজের শিরোনামেও সত্যনিষ্ঠা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, বুদ্ধির দীপ্তি, ভাষার নৈপুণ্য গুরুত্ব হারাচ্ছে, প্রাধান্য পাচ্ছে শিরোনামে “অশ্বত্থামা হত” বলে চোখ টেনে নিয়ে প্রতিবেদনে বেশ পরের দিকে “ইতি গজ” বলার প্রবণতা। সেই ধারাতেই দিন তিনেক আগে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন নিয়ে শীতের বাংলা কদিন উত্তপ্ত। তার শিরোনাম – মমতা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য, বলেই দিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ‘ভারতরত্ন’ অমর্ত্য সেন।

এই শিরোনামে চোখ পড়া মাত্রই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে অমর্ত্য মমতা ব্যানার্জিকে একটা শংসাপত্র দিয়েছেন। এমনকি যে পাঠক মমতার অনুরাগী এবং/অথবা তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক, তাঁর পক্ষে এমন ভেবে নেওয়াও অসম্ভব নয় যে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে অমর্ত্য মমতাকেই যোগ্যতম বলেছেন। কারণ অমর্ত্যের বিজেপিবিরোধিতা সর্বজনবিদিত; তিনি তো আর নরেন্দ্র মোদীকে যোগ্যতম বলবেন না। এই ধারণা আরও দৃঢ় হবে মমতার প্রতিক্রিয়া জানলে। তিনি বলেছেন “অমর্ত্য সেন বিশ্ববরেণ্য পণ্ডিত, আমাদের অন্যতম গর্ব। তাঁর পর্যবেক্ষণ আমাদের পথ দেখায়। তাঁর উপদেশ আমাদের কাছে আদেশ। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন নিশ্চয় সবাইকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।” যেন অমর্ত্য তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার উপদেশ দিয়েছেন।

অথচ আনন্দবাজারের প্রতিবেদনটা পড়তে গেলে একেবারে অন্য সত্যের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। আসলে সংবাদসংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া (পিটিআই)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অমর্ত্য অনেক কথাবার্তা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটা ছিল ইংরেজিতে। দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার ব্যাপারে মমতার ক্ষমতা সম্পর্কে অমর্ত্যের নিজের ব্যবহৃত শব্দগুলো হল, “It’s not that she does not have the ability to do it. She clearly has the ability. On the other hand, it’s yet not established that Mamata can pull the forces of public dismay against the BJP in an integrated way to make it possible for her to have the leadership to put an end to the fractionalisation in India.”

এই ability শব্দটার বাংলা তর্জমা ক্ষমতা এবং যোগ্যতা – দুইই হতে পারে। অমর্ত্য যদি qualification শব্দটা ব্যবহার করতেন তাহলে তিনি যে যোগ্যতাই বুঝিয়েছেন তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকত না। কিন্তু তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় তিনি যোগ্যতাই বুঝিয়েছেন, তাহলেও পরের শব্দগুলো অমর্ত্যের অনাস্থার ইঙ্গিত। নিজের মত করে তর্জমা না করে বরং আনন্দবাজারের প্রতিবেদন থেকেই গোটা উক্তিটা তুলে দেওয়া যাক – “এমন নয় যে তাঁর এটা করার ক্ষমতা নেই। এটা খুব স্পষ্ট, তাঁর সেই ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু অন্য দিকে, এটা এখনও প্রতিষ্ঠিত নয় যে, মমতা বিজেপির বিরুদ্ধে জনগণের হতাশার জায়গাগুলোকে এক ছাতার তলায় এনে ভারতে বিভেদের রাজনীতির অবসান ঘটাতে নেতৃত্ব দেবেন।”

কিমাশ্চর্যম তৎপরম! শিরোনামের ‘যোগ্য’ প্রতিবেদনে এসে ‘ক্ষমতা’ হয়ে গেল! অর্থাৎ মমতার যোগ্যতা হল অশ্বত্থামা। সে যে মৃত সে খবর শিরোনামে দিয়ে অনলাইনে ক্লিক এবং অফলাইনে জোর আলোচনা নিশ্চিত করার পর প্রতিবেদনে ক্ষমতার কথা বলা হল, পাঠককে নিচু স্বরে জানিয়ে দেওয়া হল, যে মারা গেছে সে দ্রোণাচার্যের পুত্র নয়, একটা হাতি মাত্র। এ যে সম্পাদকমণ্ডলীর সচেতন সিদ্ধান্ত তাতে সন্দেহ নেই, কারণ অমর্ত্য ability শব্দটা কোন অর্থে ব্যবহার করেছেন তা নিয়ে অত বড় কাগজের সম্পাদকমণ্ডলী তো দূরের কথা, কোনো সাধারণ পাঠকেরও সন্দেহ থাকবে না প্রসঙ্গ জানা থাকলে। সোশাল মিডিয়ার যুগে অপ্রাসঙ্গিকভাবে মহাপুরুষদের উদ্ধৃত করা অতিমারীতে পরিণত হয়েছে অনেকদিন হল। এই কৌশলে কেউ প্রমাণ করতে চান রবীন্দ্রনাথ বা আম্বেদকর মুসলমান, খ্রিস্টানদের মোটেই সুবিধের লোক মনে করতেন না। কেউ আবার স্বামী বিবেকানন্দকে বামপন্থী প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। সেই কুঅভ্যাসকে প্রশ্রয় না দিয়ে আমরা বরং আনন্দবাজারের তর্জমা থেকেই দেখে নিই অমর্ত্য কী প্রসঙ্গে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে ওই মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন “আমার মনে হচ্ছে, একাধিক আঞ্চলিক দল আগামী দিনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে। আমার মনে হয়, ডিএমকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দল। তৃণমূলও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজবাদী পার্টির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু আমি জানি না, এই মুহূর্তে তারা কী অবস্থায় রয়েছে।”

স্পষ্টতই অমর্ত্যের মাথায় রয়েছে তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল এবং তার সাপেক্ষে লোকসভায় ডিএমকে, তৃণমূল কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টি লোকসভায় কত আসন পেতে পারে সেই হিসাব। এই রাজ্যগুলোর সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে ওই তিন দলের প্রাপ্ত আসন যোগ করলে দাঁড়ায় ৪৮৫ (তৃণমূল ২১৫ + ডিএমকে ১৫৯ + সমাজবাদী পার্টি ১১১)। এই তিন রাজ্যে মোট লোকসভা আসনের সংখ্যা ১৬১ (পশ্চিমবঙ্গ ৪২ + তামিলনাড়ু ৩৯ + উত্তরপ্রদেশ ৮০)। সাধারণত একটা লোকসভা আসনের মধ্যে থাকে সাতটা বিধানসভা আসন। আন্দাজ পাওয়ার জন্য তৃণমূল, ডিএমকে, সমাজবাদী পার্টির ৪৮৫ আসনকে সাত দিয়ে ভাগ করলে দাঁড়ায় প্রায় ৭০। এই সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য আগেই বলেছেন ২০২৪ নির্বাচন বিজেপি একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে জিতে যাবে বলে তিনি মনে করেন না। তিনি সঠিক প্রমাণিত হলে বিজেপির আসন সংখ্যা এখনকার চেয়ে কমে যাবে, ত্রিশঙ্কু লোকসভা হওয়াও অসম্ভব নয়। বলা বাহুল্য, সেক্ষেত্রে ৭০টা আসন অমূল্য। সেই কারণেই আঞ্চলিক দলগুলোর কথা বলা।

কিন্তু বিধানসভা আর লোকসভা নির্বাচন যে এক নয় সেকথা অমর্ত্য বিলক্ষণ জানেন। উপরন্তু লোকসভা নির্বাচন আসতে আসতে এই রাজ্যগুলোর ভোটারদের এই দলগুলো সম্পর্কে মতও বদলাতে পারে নানা কারণে, হয়ত ইতিমধ্যে বদলেও গেছে। সেসব মাথায় রেখেই তিনি যোগ করেছেন “কিন্তু আমি জানি না, এই মুহূর্তে তারা কী অবস্থায় রয়েছে।” এতৎসত্ত্বেও ক্লিকটোপ ফেলতে এবং নিঃসন্দেহে সম্পাদকীয় নীতির কারণে শিরোনামে এসে গেল, অমর্ত্য বলেছেন মমতা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য। অন্যান্য সংবাদমাধ্যমও পত্রপাঠ এই নিয়ে হইচই শুরু করে দিল।

এ পর্যন্ত তবু ঠিক ছিল। সংবাদমাধ্যম এমনটাই করে থাকে, করা তাদের ব্যবসায়িক স্বাধীনতা। হয়ত বাকস্বাধীনতাও। আমাদের বাকস্বাধীনতা হল এমন আচরণের সমালোচনা করা। মুশকিল হল, ব্যাপার সেখানে থেমে থাকেনি। বামপন্থী এবং দক্ষিণপন্থী বাঙালিরা ৮৯ বছরের লোকটাকে গালাগাল দিতে নেমে পড়েছেন। তথাগত রায়ের মত দক্ষিণপন্থী, যাঁরা প্রায়শই বলে থাকেন অমর্ত্য অর্থনীতি কিস্যু জানেন না (অর্থাৎ প্রযুক্তিবিদ তথাগত অর্থনীতি জানেন), তাঁরা ওঁকে নিজের বিষয়ের বাইরে কথা বলতে নিষেধ করছেন। এদিকে তৃণমূল শাসনে তিতিবিরক্ত অনেক বামপন্থী অমর্ত্যকে ‘চটিচাটা’ তকমা দিচ্ছেন। ঠিক যেভাবে বিজেপির সমালোচনা করলেই অমর্ত্যকে তাদের ট্রোলবাহিনী কংগ্রেসের ধামাধরা বলে অভিহিত করে। নোবেলজয়ী হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, যাঁর এ দেশে কোনোদিন পা না রাখলেও চলে, তাঁর যে কারোর ধামা ধরার বা চটি চাটার প্রয়োজন নেই তা এদের বোঝাবে কে?

আরও পড়ুন রেউড়ি সংস্কৃতি: যে গল্পে ডান-বাম গুলিয়ে গিয়েছে

সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী কিন্তু মমতার ক্ষমতা সম্পর্কে অমর্ত্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন। তারপর নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বলেছেন, বিজেপিবিরোধী শক্তিগুলিকে এক করা দূরের কথা, মমতা বরং তাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে চেষ্টা করবেন।

#EISAMAY “অমর্ত্য সেন সঠিক সংশয় প্রকাশ করছেন যে বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলিকে কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একজোট করতে পারবেন? আমরা বলছি একজোট করার বদলে বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলি যাতে একজোট না হতে পারে তৃণমূল তার চেষ্টা করছে” মন্তব্য সুজন চক্রবর্তীর ⁦@SUJAN_SPEAK⁩ #CPIM #TMC #BJP PIC.TWITTER.COM/IJZIID5DZY— prasenjit bera (@prasenjitberaES) January 14, 2023

কিন্তু তাতে কী? কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর বিখ্যাত (বা কুখ্যাত) গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মুখে ছাই দিয়ে সোশাল মিডিয়ার যুগে সব বাম দলেই কমবেশি ‘গো অ্যাজ ইউ লাইক’ চালু হয়ে গেছে। সেই প্রথা মেনে সিপিএম কর্মী, সমর্থকরা বিভিন্ন মাত্রায় অমর্ত্যের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেই চলেছেন। তাঁদের সবচেয়ে ভদ্র অংশ বলছে, বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে। কেউ কেউ আবার গভীর পর্যবেক্ষণের পর মন্তব্য করছে অমর্ত্য নাকি বেশ কিছুদিন হল মমতার ধামা ধরেছেন। কারোর বক্তব্য, এসব শান্তিনিকেতনে নিজের জমি, বাড়ি বাঁচাতে হার্ভার্ডের অধ্যাপকের মরিয়া চেষ্টা। বিজেপি সমর্থক বাঙালিরাও মোটামুটি এইসব অভিযোগই তুলছে বৃদ্ধের বিরুদ্ধে। অমর্ত্য সেনের চোদ্দ পুরুষের ভাগ্য যে মেম বিয়ে করেছেন বলে নোবেল পেয়েছেন – এই পুরনো অভিযোগটা এখনো ট্রাঙ্ক থেকে বের করে মাঘের রোদে মেলে দেওয়া হয়নি।

পরিতাপের বিষয়, যদিও পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকার নিয়ে সারা দেশের সংবাদমাধ্যমে লেখালিখি হয়েছে এবং প্রায় একই সময়ে দ্য ওয়ার ওয়েবসাইটের সাংবাদিক করণ থাপারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারকে আরও বিশদে এবং কঠোরতম ভাষায় তুলোধোনা করেছেন, তা নিয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ায় প্রায় কোনো আলোচনা নেই।

অমর্ত্যকে গালি দেওয়ার কাজটাও কেবল বাঙালিরাই করছেন। বিজেপির মধ্যেও কেবল তথাগত, দিলীপ ঘোষরাই। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এমনকি বিজেপিবিরোধী বিদ্বানদের গাল না পাড়লে যাঁর ভাত হজম হয় না, সেই অমিত মালব্য পর্যন্ত এখন পর্যন্ত একটা টুইট করেননি। অথচ শেষ জীবিত পৃথিবীবিখ্যাত বাঙালিকে বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী বাঙালিরা স্রেফ অপছন্দের রাজনৈতিক নেতা সম্পর্কে একটি মন্তব্যের কারণে যা খুশি তাই বলে চলেছেন।

বাঙালি মেধার এহেন অবনমন কৌতুককর। আনন্দবাজার ক্লিকটোপ ফেলেছে এবং সে টোপ গেলা মানুষের সংখ্যাধিক্য প্রমাণ করছে, শিরোনাম পেরিয়ে প্রতিবেদন অবধি যাওয়া লোকেরা আজকাল ব্যতিক্রম। আরও মজার কথা হল, ওই কাগজটাকে যাঁরা বাজারি কাগজ বলে হেলা শ্রদ্ধা করেন চিরকাল, সেই বামপন্থীরাও এই টোপ কম গেলেননি। অর্থাৎ প্রকাশ্যে বাজারি বলে গাল দিলেও পড়ার বেলায় ওই কাগজটাই পড়েন। শুধু তাই নয়, সম্ভবত কেবল ওটাই পড়েন। নইলে অন্য একাধিক জায়গায় প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারের প্রতিবেদন থেকেই জেনে ফেলতে পারতেন, অমর্ত্য মমতাকে কোনো শংসাপত্র দেননি।

অমর্ত্য সেন ভগবান নন। দুনিয়ার সব ব্যাপারে তিনি যা বলবেন তাই মেনে নিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বস্তুত সমাজবিজ্ঞানে ঠিক আর ভুলের সীমারেখা স্থির নয়, ফলে অত বড় পণ্ডিতের বক্তব্যকে একজন কলেজপড়ুয়াও চ্যালেঞ্জ জানাতেই পারে। কিন্তু যা খুশি বলা আর ভিন্নমত পোষণ করা এক জিনিস নয়। বামফ্রন্ট আমলে বেশ কয়েকবার অমর্ত্য সেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমালোচনা করেছিলেন, সরকার একমত হয়নি। একবার তো অমর্ত্যকে ভুল প্রমাণ করতে গণশক্তির পাতায় কলম ধরেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত।

আজকের পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য এসব কথা স্মরণ করিয়ে লাভ নেই। ডান, বাম নির্বিশেষে মাদাম তুসো মার্কা মৃণাল সেনে মজে থাকা বাঙালি ভিন্নমত হতে গেলে যে লিখতে হয়, নিদেনপক্ষে প্রতিপক্ষের বক্তব্য পুরোটা পড়তে হয় – সেকথা কেন বিশ্বাস করতে যাবে?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

অমিতাভ মুখ খুললেন, তবে শরশয্যায়

এই বাজারে কোনো প্রোডাকশন হাউস মহাভারতের মত বিশাল প্রকল্প হাতে নেবে এমন সম্ভাবনা কম। তবু যদি তেমন কিছু হয়, পিতামহ ভীষ্মের চরিত্রের জন্য অমিতাভ বচ্চনের চেয়ে ভাল কাউকে ভাবা যায় কি?

একসময় খবরের কাগজের বিনোদনের পাতায় নিয়মিত ব্যবধানে খবর বেরোত, বলিউডে বা টলিউডে অমুক নির্দেশক মহাভারত বা মহাভারত অবলম্বনে কোনো বড় বাজেটের ছবি করছেন। তার কটা শেষপর্যন্ত মুক্তি পেয়েছে বা বক্স অফিসে সফল হয়েছে জানি না। তবে ওরকম খবর বেরোলে কদিন প্রকাশিত কাস্টিং নিয়ে সিনেমাভক্তদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা চলত। কে কোন চরিত্রে অভিনয় করছে আর কোনটা করলে ভাল হত – এই আলোচনায় দিব্যি সময় কাটত। অতিমারীর সময় থেকেই এ দেশের সিনেমাশিল্প সংকটে। বলিউড রীতিমত বেকায়দায়। এক ওটিটিতে রক্ষা নেই, বয়কট দোসর। তার উপর হিন্দিতে ডাব হয়ে বলিউডকে টেক্কা দিচ্ছে তামিল, মালয়ালম, কন্নড় ভাষার ছবি। এই বাজারে কোনো প্রোডাকশন হাউস মহাভারতের মত বিশাল প্রকল্প হাতে নেবে এমন সম্ভাবনা কম। তবু যদি তেমন কিছু হয়, পিতামহ ভীষ্মের চরিত্রের জন্য অমিতাভ বচ্চনের চেয়ে ভাল কাউকে ভাবা যায় কি? ইংরেজিতে ‘এল্ডার স্টেটসম্যান’ বলে একটা কথা আছে। মহাভারতের আখ্যানে সেই এল্ডার স্টেটসম্যান নিঃসন্দেহে ভীষ্ম। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরব পক্ষে যোগ দিলেও পাণ্ডব পক্ষের কাছে তিনি শ্রদ্ধাভাজন তাঁর প্রজ্ঞা, প্রবীণতা এবং বহু বিষয়ে নিরপেক্ষ বিচারক্ষমতার কারণে। অমিতাভ এখন যে বয়সে পৌঁছেছেন, সিনেমার জগতে তাঁর অভিজ্ঞতার যা দৈর্ঘ্য এবং বৈচিত্র্য, ওই জগতের বাইরেও ভারতের সব ক্ষেত্রের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে তাঁর যা গ্রহণযোগ্যতা, তাতে আর কাকে এল্ডার স্টেটসম্যান বলা যায়?

এহেন অমিতাভ ২৮তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছেন তা নিয়ে হইহই পড়ে গেছে। হ্যারি পটারের ভক্তরা জানেন, জাদুর দুনিয়ায় ভল্ডেমর্টের নামোচ্চারণ বারণ। আজকের ভারতে তেমনি বাকস্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করা বারণ, করলেই ঝামেলা হয়। আজকের ভারতে বিখ্যাত কেউ যদি বলেন বাকস্বাধীনতা আছে, তাহলেই সরকারপক্ষের লোকেরা উদ্দাম নৃত্য শুরু করেন, যাঁরা বলেন নেই তাঁদের এই সুযোগে আরেকবার মিথ্যাবাদী, দেশদ্রোহী ইত্যাদি বলে নেন। ফলে অভিযুক্ত দেশদ্রোহীরা বিখ্যাতকে বলেন “ব্রুটাস, তুমিও”? আর যদি অমিতাভের মত কেউ বলে ফেলেন বাকস্বাধীনতা নেই, তাহলে তো মহাপ্রলয়। সরকারপক্ষ বলেন, এত বড় কথা! বাকস্বাধীনতা নেই? “আমি আছি, গিন্নী আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে – /সবাই মিলে কামড়ে দেব মিথ্যে অমন ভয় পেলে।” কিন্তু অমিতাভের মন্তব্যের পরে কিঞ্চিৎ উলটপুরাণ দেখা গেছে। কামড় পরিবার, থুড়ি, সঙ্ঘ পরিবারের ট্রোলবাহিনীর মাথা অমিত মালব্য অমিতাভের প্রশংসা করেই টুইট করেছেন। কারণ মন্তব্যটা কলকাতায় করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে। অতএব মালব্যের ব্যাখ্যা, অমিতাভ ‘টাইর‍্যান্ট’ মমতার মুখের সামনে আয়না ধরেছেন। এমন টাইর‍্যান্ট যার রাজত্বে নির্বাচনোত্তর হিংসা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের প্রাক-নির্বাচন হিংসা বা নির্বাচনোত্তর হিংসা নিঃসন্দেহে বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী, কিন্তু বাকস্বাধীনতা ব্যাপারটার সীমা ওটুকুর মধ্যেই বেঁধে দেওয়ার চালাকি বিজেপির আই টি সেলের প্রধান ছাড়া আর কে-ই বা করবেন? আই টি সেলের আর যে দোষই থাক না কেন, সোশাল মিডিয়ার যুগে কোন জিনিসটা লোকে ভাল ‘খায়’ তা বুঝতে ওদের মত কেউ পারে না। অমিতাভের ভক্তকুল যে এখনো বিজেপির ভক্তকুলের চেয়ে বড়, ফলে এই মন্তব্যের জন্য চিরাচরিত প্রথায় তাঁকে আক্রমণ করলে যে হিতে বিপরীত হতে পারে তা চট করে বুঝে নিয়ে বন্দুকের নল মমতার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন মালব্য। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন অর্ধসত্য প্রচার করার সহজাত ক্ষমতায় তৈরি অরিজিৎ সিংয়ের গান গাওয়ার ভিডিও ক্লিপ। সে ক্লিপে সুকৌশলে কেটে দেওয়া হয়েছে ‘বোঝে না সে বোঝে না’ গানের লাইন দুটো, রয়েছে শুধু ‘রং দে তু মোহে গেরুয়া’। যাতে দেখলেই মনে হয়, মমতার অনুরোধে গান গেয়ে অরিজিৎ বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি গৈরিক বাহিনীর লোক। অরিজিৎ তা হতেই পারেন, হওয়া তাঁর বাকস্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার অন্তর্গত। কিন্তু ঘটনা হল, ওই চতুর এডিটিং ছাড়া শুধু সেদিনের ঘটনা দিয়ে অরিজিতের সমর্থন প্রমাণ হয় না।

এ শুধু বিজেপি প্রোপাগান্ডা। স্বভাবতই পাল্টা প্রচারে নেমে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস, নেতৃত্বে সোশাল মিডিয়ার মুক্তিসূর্য মহুয়া মৈত্র। দু পক্ষে যা চলছে তাকে আমরা গেঁয়ো লোকেরা বলি প্যাঁচাল পাড়া। আমাদের রাজনৈতিক বিতর্ক এখন প্যাঁচাল পাড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। নইলে অমিতাভের বক্তৃতা নিয়ে নিবিষ্ট আলোচনার অবকাশ ছিল। তিনি সিনেমার লোক, সিনেমার কথাই বলেছেন। সিনেমার বহু আগে আমাদের দেশের নাচ, গান, নাটকের মত শিল্পমাধ্যমগুলোর উৎস ছিল ধর্মস্থানগুলো, সেকথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। সিনেমা আসার পর পরাধীন ভারতে কীভাবে সেন্সরকে ফাঁকি দিয়ে ইংরেজবিরোধী বক্তব্য ছবিতে ঢুকিয়ে দিতেন শিল্পীরা – সে ইতিহাস টেনে এনেছেন। ১৯৫২ সালের সিনেমাটোগ্রাফ আইনের কথা বলেছেন এবং তারপরেই বলেছেন “মঞ্চে উপবিষ্ট আমার সহকর্মীরা নিশ্চয়ই একমত হবেন যে আজও নাগরিক স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে।” সহকর্মী বলতে সেখানে তখন উপস্থিত বলিউডের শাহরুখ খান, রানী মুখার্জির মত তারকারা। টলিউডের কে নয়?

সাম্প্রতিককালে ধর্মীয় ভাবাবেগের দোহাই দিয়ে কীভাবে একের পর এক ফিল্ম, ওয়েব সিরিজকে আক্রমণ করেছে হিন্দুত্ববাদীরা – সেকথা কারোর অজানা নয়। মাত্র কয়েকদিন হল প্রকাশিত হয়েছে শাহরুখ ও দীপিকা পাড়ুকোনের মুক্তির অপেক্ষায় থাকা পাঠান ছবির বেশরম রঙ্গ গানের ভিডিও। সোয়া তিন মিনিটের ভিডিওতে দীপিকার বিকিনির রং বদলেছে বারবার, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাঁকে কেন গেরুয়া (নাকি কমলা?) বিকিনিতে ইসলাম ধর্মাবলম্বী শাহরুখের বাহুবন্ধনে দেখা গেছে তা নিয়ে তোলপাড় চলছে। এ বছরের গোড়ায় লাল সিং চাড্ডা মুক্তি পাওয়ার আগে থেকেই সোশাল মিডিয়ায় ছবিটাকে বয়কট করার ডাক দেওয়া হয়ে গিয়েছিল।

কারণ আমির খান একবার বলেছিলেন দেশের যা অবস্থা হচ্ছে তাতে স্ত্রী কিরণ রাও একদিন আলোচনা করেছিলেন, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত কিনা। এরকম অসংখ্য উদাহরণ গত কয়েক বছরের ঘটনাবলী থেকে দেওয়া যায়। পদ্মাবত ছবি নিয়ে কী কাণ্ড হয়েছিল নিশ্চয়ই কেউ ভোলেননি। ছবির শুটিং চলাকালীন সেটে আগুন ধরিয়ে দেওয়া দিয়ে শুরু, দীপিকার নাক কেটে নেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল। ছবির নাম প্রথমে ছিল ‘পদ্মাবতী’, রাজপুত বীরদের দৌরাত্ম্যে শেষমেশ নাম বদলে ছবির মুক্তি নিশ্চিত করতে হয়েছিল পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনশালীকে। অথচ ছবিটা রীতিমত হিন্দুত্ববাদী। একে প্রচলিত কাহিনিকে ইতিহাস বলে দেখানো হয়েছে, তার উপর আলাউদ্দিন খিলজী যেন নরখাদক। অর্থাৎ এই ছবি জলজ্যান্ত প্রমাণ যে ভারতে বাকস্বাধীনতা এমন বিপন্ন, সকলকে খুশি না করে সিনেমা বানানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে কতিপয় প্রযোজক, নির্দেশকের এক বিশেষ ধরনের ছবি সরাসরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। এই আবহে অমিতাভ ওই কথাগুলো বলেছেন। মালব্য মোটেই বোকা লোক নন। অমিতাভের কথা প্রসঙ্গে এসব আলোচনা যে অনিবার্য তা তিনি ভালই জানেন। সে আলোচনা গুলিয়ে দিতেই অপ্রাসঙ্গিকভাবে নির্বাচনী হিংসার কথা টেনে এনেছেন।

মুক্তকণ্ঠে অমিতাভের প্রশংসা করা যেত দেশের আজকের অবস্থায় এই কথাগুলো বলার জন্য, কারণ তাঁর কথার দাম যে সকলের চেয়ে বেশি তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কিছু অসুবিধা আছে। বিজেপির প্রোপাগান্ডার জবাবে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল যা যা বলছে ‘তাতে ঠাকুরঘরে কে রে, আমি তো কলা খাইনি’ মনোভাব স্পষ্ট। মুক্তিসূর্য মহুয়াও অমিতাভকে বাংলার জামাই-টামাই বলে আলোচনার গভীরে না গিয়ে তুই বেড়াল না মুই বেড়াল স্তরেই থাকার চেষ্টা করেছেন। কারণ সিনেমার কৈলাস পর্বতের বাসিন্দা অমিতাভ খবর না রাখলেও মহুয়া বিলক্ষণ জানেন রাজনৈতিক বিরোধীদের উপর আক্রমণ বাদ দিলেও পশ্চিমবঙ্গে বাকস্বাধীনতা কী দারুণ স্বাস্থ্যের অধিকারী। ফ্যাসিবাদের সাত-সতেরো লক্ষণ তাঁর কণ্ঠস্থ, তাই তিনি জানেন ভবিষ্যতের ভূত বলে একটা বাংলা ছবি সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশনের ছাড়পত্র পাওয়ার পরেও পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ হলে দেখানো হচ্ছিল না। নির্মাতাদের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত দৌড়তে হয়েছিল।

সেই ছবির পরিচালক অনীক দত্ত তার আগের কলকাতা চলচ্চিত্রোৎসবে চতুর্দিকে বাংলা ছবির দিকপালদের ছবির বদলে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি থাকার নিন্দা করেছিলেন।

অমিতাভের প্রশংসা করা যাচ্ছে না ঠিক এই কারণেই। তিনি জরুরি কথা বলেছেন, কিন্তু কায়দাটা ধরি মাছ না ছুঁই পানি। কারোর নাম না করে কিছু ভাল ভাল কথা বলা যে যুগপৎ শিরোনামে আসা নিশ্চিত করা আর বিপদসীমার বাইরে থাকার কৌশল তা তাঁর মত শোম্যান ভাল করেই জানে। উপরন্তু পিতামহ ভীষ্মের সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্য প্রবীণতা আর অভিজ্ঞতাতেই শেষ নয়। আমরা জানি দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময়ে ভীষ্ম টুঁ শব্দটি করেননি। না, একটু ভুল হল। দ্রৌপদী নিজের সম্মানরক্ষার শেষ চেষ্টা হিসাবে প্রশ্ন করেন, পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির কি নিজের আগে পাঞ্চালীকে বাজি রেখে হেরেছিলেন, নাকি পরে? যদি নিজেকে আগে বাজি রেখে হেরে থাকেন তাহলে তো দ্রৌপদীর উপর অধিকার আগেই হারিয়েছেন। সুতরাং পাঞ্চালী বিজিত নন। এ প্রশ্নের উত্তরে ভীষ্ম বলেছিলেন এসব কূটতর্কের বিষয়। এ দিয়ে মীমাংসা হতে পারে না। তাছাড়া যুধিষ্ঠির নিজেই তো ধর্মপুত্তুর। তাঁর মত করে ধর্ম আর কে বোঝে? অমিতাভও কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশে যা যা ঘটেছে তা নিয়ে কখনো মুখ খোলেননি। যে বলিউডের তিনি বেতাজ বাদশা, তার উপর একের পর এক আক্রমণেও নিশ্চুপ ছিলেন। সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর গোটা বলিউডকে মাদকাসক্ত বলে প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছে বিজেপির তরফে, অমিতাভ-পত্নী জয়া রাজ্যসভায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন, অমিতাভ কিন্তু মুখ খোলেননি। আজ হঠাৎ চৈতন্যোদয় কী কারণে তা বোঝা শক্ত।

অবশ্য কবি বলেছেন “প্রভাত কি রাত্রির অবসানে।/যখনি চিত্ত জেগেছে, শুনেছ বাণী,/তখনি এসেছে প্রভাত।” অমিতাভের চিত্ত যদি শেষমেশ জেগে থাকে তাতে ক্ষতি নেই। তবে যুগে যুগে অবতারের রূপ বদলানোর মত কংগ্রেস আমলে যিনি কংগ্রেসি, উত্তরপ্রদেশে মুলায়ম সিং যাদবের রমরমার কালে অমর সিংয়ের মিত্রতায় যিনি সপরিবারে সমাজবাদী, যিনি কুছ দিন তো গুজারো গুজরাত মেঁ ক্যাম্পেনে দেশের বারোটা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা জ্যোতির্লিঙ্গকেই দেশের একতার প্রতীক বলতে আপত্তি করেন না, তাঁর চিত্ত হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে ঝলমল করছে এ কথা সহজে বিশ্বাস হতে চায় না, এই আর কি।

আরও পড়ুন ক্রিকেটার তুমি কার?

মঞ্চে অন্য যাঁরা ছিলেন তাঁদের উপস্থিতিও যে বিশ্বাস উৎপাদনে সহায়ক নয় তা বলাই বাহুল্য। মুখ্যমন্ত্রী বা কলকাতার মহানাগরিকের কথা বাদই দিলাম। অমিতাভ যখন বক্তৃতা দিচ্ছেন, ঠিক পিছনেই দেখতে পেলাম পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর মুখ। অমিত শাহের মত প্রবল গণতান্ত্রিক মানুষ কলকাতায় এসে যাঁর আতিথ্য গ্রহণ করেন, সঙ্গীতের ব্যাপারে বিশুদ্ধবাদী, প্রচারবিমুখ সেই অজয়বাবু সিনেমার উৎসবে কী করছিলেন কে জানে! এঁদের মধ্যে দাঁড়িয়ে বাকস্বাধীনতার জন্য হা হুতাশ করেছেন অমিতাভ। অবশ্য শরশয্যাই তো ভীষ্মের নিয়তি।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

এনডিটিভি প্রথম নেটওয়ার্ক নয় যা সরকারের মুখপত্র হতে চলেছে, শেষ নেটওয়ার্ক। বিপদটা সেইখানে।

এনডিটিভির দখল এশিয়ার সবচেয়ে বড় ধনী গৌতম আদানির হাতে চলে যাওয়া নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রণয়-রাধিকার হাত থেকে লাগাম ছুটে যাওয়া মাত্রই পদত্যাগ করেছেন ম্যাগসাসে পুরস্কার জয়ী সাংবাদিক রবীশ কুমার। এই খবরটা আরও বেশি পীড়া দিচ্ছে অনেককে। কারণটা শুধুমাত্র কিছু মানুষের প্রিয় টিভি নেটওয়ার্ক অপ্রিয় লোকের হাতে চলে যাওয়া বা সেখান থেকে প্রিয় অ্যাঙ্করের প্রস্থান নয়। এনডিটিভির আদানিকরণ নিয়ে সারা পৃথিবীতে আলোচনা হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় থাকা লোকেদের হাতে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ার মালিকানা চলে যাওয়া যে গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর, বাকস্বাধীনতার বারোটা বাজানোর পক্ষে যথেষ্ট, তা সারা পৃথিবীর গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষ বুঝে ফেলেছেন। উপরন্তু আদানি এনডিটিভিকে নিয়ে কী করবেন তা নিয়েও কোনো সংশয় রাখেননি। তিনি ফাইন্যানশিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন “স্বাধীনতা মানে হল সরকার ভুল কিছু করলে তা বলার স্বাধীনতা। কিন্তু একইসঙ্গে সরকার যখন রোজ ঠিক কাজ করে তখন সেটা বলার সাহসও থাকা উচিত। সেটাও আপনাকে বলতে হবে।” পৃথিবীর সবচেয়ে জনদরদী সরকারও যে রোজ ঠিক কাজ করে না তা বোঝার জন্য নোবেল পুরস্কার প্রাপকদের মত বুদ্ধিমান হওয়ার দরকার নেই আর আদানির মত সফল ব্যবসায়ী নির্বোধও নন। ফলে তিনি যে আসলে বলতে চাইছেন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা সংবাদমাধ্যমের কাজ নয় – তা স্পষ্ট। একটা সাড়ে তিন দশকের পুরনো মিডিয়া নেটওয়ার্কের মালিকানা এমন লোকের হাতে চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

কিন্তু এনডিটিভি কি প্রথম চ্যানেল যা শাসকের মুখপাত্র হতে বসেছে? নাকি এনডিটিভি ছিল বলে ভারতের গণতন্ত্র জীবন্ত ছিল, আর আদানির নিয়ন্ত্রণে চলে গেলেই নিমেষে তার মৃত্যু হবে? যদি দুটো প্রশ্নের উত্তরই ‘না’ হয়, তাহলে এত কান্নাকাটির কী আছে? নাগরিক ডট নেটের মত একটা বিকল্প সংবাদমাধ্যমে আমারই বা এ নিয়ে প্রবন্ধ ফেঁদে বসার কী আছে? রবীশ কিছুদিন আগেই, সম্ভবত কী হতে চলেছে জেনে, নিজের ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। সাবস্ক্রাইবারের যথারীতি অভাব হয়নি, তাঁর পদত্যাগের কথা চাউর হওয়ার পর সংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে। সুতরাং সেই চ্যানেল থেকে যে বিস্তর আয় হবে তাতে সন্দেহ নেই। রবীশের সে আয়ের ভাগ তো আমি পাব না, নাগরিক ডট নেটও পাবে না। তাহলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মত “কিসের শোক করিস ভাই/আবার তোরা মানুষ হ” বলে অন্য কাজে লেগে পড়লেই তো হয়। কী দরকার এ বিষয়ে ভাবনাচিন্তার?

এসব কথা অনেকেই বলাবলি করছেন। আরও বলাবলি হচ্ছে, এনডিটিভির ভারতীয় সাংবাদিকতায় এমন কিছু অবদান নেই যে তাদের জন্য চোখের জল ফেলতে হবে। তারাও আর পাঁচটা সংবাদমাধ্যমের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। যাঁরা মনে করছেন এনডিটিভি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা শেষ চ্যানেল ছিল, তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এনডিটিভি কেন্দ্রের শাসককে প্রশ্ন করলেও বহু রাজ্যের শাসককে ছাড় দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারই সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সুতরাং শোকার্ত হয়ে পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আবার কংগ্রেসের অনেক সদস্য, সমর্থক এনডিটিভির উপর চটে আছেন অন্য কারণে। তাঁদের বক্তব্য এরা বিজেপিকে যত প্রশ্ন করেছে, বিরোধী আসনে থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেসকে তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন করেছে। নরেন্দ্র মোদীর চেয়ে বেশি আক্রমণ করেছে রাহুল গান্ধীকে। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে দিনরাত আলোচনা করেছে, বিজেপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই।

উপরের সবকটা অভিযোগেরই কিছু না কিছু সারবত্তা আছে। ঠিক সেজন্যেই এনডিটিভির আদানিকরণ নিয়ে আলোচনা অপরিহার্য।

প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার, অনেকেই একটা কথা ভুল বুঝেছেন। এনডিটিভির নিয়ন্ত্রণ এখনো প্রণয় রায় ও তাঁর স্ত্রী রাধিকা রায়ের হাত থেকে বেরিয়ে যায়নি। তাঁরা এখনো এনডিটিভির বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সে আছেন, থাকতে বাধাও নেই। কারণ দুজনের হাতেই এনডিটিভির বেশকিছু শেয়ার রয়েছে।

কিন্তু এনডিটিভির প্রোমোটার হল আরআরপিআর হোল্ডিং নামক সংস্থা। তাঁরা পদত্যাগ করেছেন সেই সংস্থার ডিরেক্টরের পদ থেকে, কারণ আরআরপিআরের দখল অগাস্ট মাসেই আদানি গ্রুপের হাতে চলে গেছে, ফলে এনডিটিভির ২৯.১৮% শেয়ারও এখন আদানি গ্রুপেরই হাতে। এনডিটিভির আরও ২৬% শেয়ার দখল করার জন্য গৌতম আদানি ২২ নভেম্বর এক ওপেন অফার লঞ্চ করেছেন, যার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ। আদানির লক্ষ্যপূরণ হলে এনডিটিভির বেশিরভাগ শেয়ার চলে যাবে আদানি গ্রুপের হাতে। পূরণ না হলেও অন্য যারা শেয়ার কিনে নেবে তাদের শেয়ারগুলো আরও বেশি দামে কিনে নেওয়ার রেস্ত আদানির আছে, রায় দম্পতির নেই। ফলে আদানির এনডিটিভির ম্যানেজমেন্টের সম্পূর্ণ দখল নিয়ে নেওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা। ইতিমধ্যেই আদানি গ্রুপের চিফ টেকনোলজি অফিসার সুদীপ্ত ভট্টাচার্য, সাংবাদিক সঞ্জয় পুগলিয়া ও সেন্থিল চেঙ্গলবরায়ন আরআরপিআরের ডিরেক্টর নিযুক্ত হয়েছেন। প্রণয়-রাধিকার এনডিটিভি থেকে বিদায় অনিবার্য – একথাও বলাই যায়। কারণ আদানির চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে ওপেন অফারে যারা শেয়ার কিনেছে তাদের শেয়ারগুলো ফের কিনে নেওয়ার অবস্থা রায় দম্পতির থাকলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টিই হত না। তাঁরা ২০০৯-১০ সালে বিশ্বপ্রধান কমার্শিয়াল প্রাইভেট লিমিটেড নামে এক সংস্থা থেকে ৪০৩ কোটি টাকা ধার নিয়েছিলেন। সে ঋণের শর্তই ছিল, ঋণ শোধ করতে না পারলে আরআরপিআরের ৯৯.৯% শেয়ার বিশ্বপ্রধান দখল করে নিতে পারবে। আদানি প্রথমে ওই বিশ্বপ্রধানেরই প্রধান হয়ে বসেন টাকার জোরে, তারপর অনাদায়ী ঋণের দায়ে এনডিটিভির দখল নেওয়ার কাজ শুরু করেন।

শোধ দিতে পারবেন না এমন ঋণ নিলেন কেন, তা-ও আবার ২০০৮ সালে তৈরি হওয়া বিশ্বপ্রধানের মত এক গোলমেলে ‘হোলসেল ট্রেডিং ফার্ম’ থেকে, যার মালিকানা হাত বদলাতেই থাকে, যার মালিকানা একসময় ছিল রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের হাতে, পরে মুকেশ আম্বানিরই ঘনিষ্ঠ মহেন্দ্র নাহাতার হাতে চলে যায়? এসব প্রশ্ন তুলে এনডিটিভির আজকের অবস্থার জন্য রায় দম্পতিকে দায়ী করাই যায়। এমনকি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া (সেবি)-ও এ নিয়ে প্রণয়-রাধিকাকে শোকজ করেছিল। এনডিটিভিতে কাজ করেই বিখ্যাত হওয়া বরখা দত্তের মত কেউ কেউ এখন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তির্যক ভাষায় টুইট করতে লেগেছেন, এনডিটিভি আগে আম্বানির হাতে ছিল। তখন যদি স্বাধীন থেকে থাকে, এখন আদানির হাতে গেলেই পরাধীন হবে কেন? আসলে ইস্যুটা হল টিভির রেভিনিউ মডেলটাই ভেঙে পড়েছে।

AM CONFUSED. WHEN MUKESH AMBANI OWNED 30% OF NDTV IT WAS FREE AND WHEN GAUTAM ADANI PURCHASES THAT 30% ITS OBITUARY TIME? PRAY, HOW? SO MUCH POLITICKING & HUMBUG IN THE DISCOURSE BOTH FOR OR AGAINST, BOTH NARRATIVES IGNORE THE ELEPHANT IN THE ROOM- REVENUE MODEL OF TV IS BROKEN.— barkha dutt (@BDUTT) December 1, 2022

এতদ্বারা বরখা আম্বানিকে গণতান্ত্রিক বললেন, নাকি আদানিকে গণতান্ত্রিক বললেন? নাকি দুজনের কেউই বাকস্বাধীনতার পক্ষে বিপজ্জনক নন বললেন? বোঝা কঠিন। কিন্তু ঘটনা হল কর্পোরেট মিডিয়ার রেভিনিউ মডেল যে গোলমেলে তা কোনো নতুন কথা নয়। আয়ের জন্যে বিজ্ঞাপন নির্ভরতা এবং বিজ্ঞাপনের জন্য টিআরপি নির্ভরতা বহুকালের সত্য। বরখা যখন স্বয়ং কর্পোরেট মিডিয়ার হর্তাকর্তা ছিলেন তখনো তাই ছিল। ভারতে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর সংবাদমাধ্যমে, বিশেষত ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমে, দুটো জিনিস ক্রমান্বয়ে ঘটেছিল। এক, সংবাদমাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক চাকরি চালু হওয়া আর সাংবাদিকদের পারিশ্রমিক অনেকখানি বেড়ে যাওয়া। এককথায় অন্যদের ঘাড়ে পা দিয়ে সাংবাদিকদের স্বর্গারোহণ আরম্ভ হয়। যে সাংবাদিক যত উপরে আছেন তাঁর মাইনে তত বাড়ে। রাজস্ব বেড়েছে কিনা, এত মাইনের টাকা আসবে কোথা থেকে – এসব প্রশ্ন তখন বরখার মত শীর্ষস্থানীয়রা করেননি। ২০০৮-০৯ বা ২০১০, অর্থাৎ যে সময়ে প্রণয়-রাধিকা ওই বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছিলেন, ঠিক সেই সময়টাতে এই মাইনে বাড়ার হার চরমে পৌঁছয় সারা দেশের সংবাদমাধ্যমে। কেবল টিভি চ্যানেলগুলোতে নয়, খবরের কাগজেও।

আমার নিজের অভিজ্ঞতাই বলি। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার ধুঁকতে থাকা দ্য স্টেটসম্যান কাগজের চাকরি ছেড়ে পাড়ি দিই হায়দরাবাদে, ২৮,০০০ টাকা মাস মাইনেয়। সেখানে যে কাগজে যোগ দিই, সেখানে কয়েক মাসের মধ্যেই কোনো অজ্ঞাত কারণে বেতন কাঠামোর পুনর্বিন্যাস হয়। নিউজরুমের বড়, মেজ, সেজ, ছোট সকলেরই বেতনের বিপুল বৃদ্ধি হয়। যাদের পদোন্নতি হয়নি তাদেরও বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়। আমার মত যাদের পদোন্নতি হয়েছিল তাদের বৃদ্ধি হয় চোখ কপালে তোলার মত। আমার বেতন গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মাসিক ৭০,০০০ টাকায়। আমি তখন নেহাতই মাঝের স্তরের সাংবাদিক, সবে সিনিয়র সাব-এডিটর থেকে চিফ সাব হয়েছি। অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, এক্সিকিউটিভ এডিটর বা এডিটরদের মাইনে কোথায় পৌঁছেছিল তা কেবল কল্পনাই করতে পারি। আমরা কেউ কি খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম কাগজের আয় বেড়েছে কিনা? অথচ সকলেই জানতাম কাগজের বিক্রি কিন্তু রাতারাতি বাড়েনি।

সেটা ২০০৮ সালের কথা। তখন সারা ভারতের ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে প্রতিযোগিতা চলছে সাংবাদিকদের মাইনে বাড়ানোর। আবার ২০১০ সালে পশ্চিমবঙ্গে সারদা গ্রুপের বাংলা কাগজ চালু হওয়ার সময়ে একইরকম জিনিস দেখা গিয়েছিল। সে কাগজ বছর দুয়েকের বেশি না চললেও বাংলা ভাষার সাংবাদিকদের সঙ্গে ইংরেজির সাংবাদিকদের পারিশ্রমিকের যে লজ্জাজনক ব্যবধান ছিল, তা কমাতে ঘটনাটা কিছুটা সাহায্য করেছিল।

এখন কথা হল, টিআরপির খোঁজে বহুকাল ধরেই ভূত পেত্নী দত্যি দানো তাবিজ কবচ দেখায় বহু হিন্দি চ্যানেল। সে কাজ রবীশরা কখনো করেননি। ২০১২-১৩ সাল থেকে ওসবের সঙ্গে হিন্দি, ইংরেজি সব চ্যানেলেই যুক্ত হয়েছে প্রায় আঁচড়ে কামড়ে দেওয়ার মত সান্ধ্য মজলিশ, মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানো, উদারনৈতিক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে লোক ক্ষ্যাপানো, সব ধরনের বামপন্থীদের দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া, ভুয়ো খবর প্রচার, বিজেপির অলিখিত মুখপত্রের কাজ করা। এনডিটিভি এগুলোর কোনোটাই করেনি। অথচ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে বাজারের চলতি হারের কমে মাইনে দেওয়া চলে না। উপরন্তু সাংবাদিকদের মাইনে একটা সংবাদমাধ্যমের খরচের একটা অংশ মাত্র। তথ্যপ্রমাণ বলছে খুব বড় অংশও নয়। তার চেয়ে খবর সংগ্রহ করা এবং টিভির ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ক্রমোন্নয়নের খরচ অনেক বেশি। সেখানেও প্রতিযোগীদের সঙ্গে তাল মেলাতে টাকার প্রয়োজন হয়। আমরা যারা স্বাধীন সংবাদমাধ্যম চাই, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে এমন সংবাদমাধ্যম চাই, তারা কি টিআরপি বাড়িয়ে বেশি বিজ্ঞাপন পাওয়ার দিকে মন না দিয়ে যেনতেনপ্রকারেণ ঋণ নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টাকে বেশি অপরাধ বলে গণ্য করব? বরখার টুইটসূত্রে খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এনডিটিভির শেয়ার হোল্ডাররা মন্তব্য করছেন, ওটা বাজে কোম্পানি। আমাদের কী করে ডিভিডেন্ড দেওয়া যায় তার দিকে কোনোদিন নজর দেয়নি। একটা সংবাদমাধ্যমকে স্রেফ কোম্পানি হিসাবে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গিই কি আমাদের মূল্যায়নের মাপকাঠি হওয়া উচিত? ভেবে দেখা প্রয়োজন। আমরা তো কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার নই। আমরা বরং, পুঁজিবাদী লবজে, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের স্টেক হোল্ডার।

এনডিটিভি প্রথম নেটওয়ার্ক নয় যা সরকারের মুখপত্র হতে চলেছে, শেষ নেটওয়ার্ক। বিপদটা সেইখানে। ভারতে যতগুলো বড় বড় টিভি নেটওয়ার্ক আছে তার প্রায় সবকটাই ইতিমধ্যেই শাসক দলের গর্ভে চলে গেছে। বাকি ছিল এনডিটিভি। বলতে দ্বিধা নেই, এনডিটিভিও একটি পুঁজিবাদী সংস্থা। সে পুঁজিবাদের নিয়মেই চলেছে। এমন নয় যে সারা ভারতের সংবাদমাধ্যমে যখন ছাঁটাই চলেছে, এনডিটিভি তখন সমস্ত কর্মচারীর স্বার্থরক্ষা করেছে। কিন্তু রায় দম্পতি কখনো কারাত দম্পতির মত নিজেদের বিপ্লবী বলে দাবি করেছেন বলে তো মনে পড়ে না। তাঁরাও ব্যবসাই করছিলেন। ব্যবসা প্রায় তিন দশক ক্রমশ বড় হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের যা কাজ তা করতে নিতান্ত ব্যর্থ হয়নি, দায়িত্ব অস্বীকারও করেনি। কোনো সন্দেহ নেই, সব ইস্যুতেই এনডিটিভির অবস্থান ন্যায়ের পক্ষে বা দুর্বলের পক্ষে ছিল না। থাকার কথাও নয়। অন্তত বামপন্থীদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যে সংবাদমাধ্যম শেষপর্যন্ত মালিকের শ্রেণিস্বার্থেরই প্রতিভূ। এনডিটিভি তার চেয়ে আলাদা হবে এরকম প্রত্যাশা ছিল কি? থাকলে কেন ছিল? তবে এই একটি নেটওয়ার্কে কিন্তু বুলডোজার দিয়ে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ বা আসামে প্রতিবাদীদের ঘর ভেঙে দেওয়ার জন্যে বিজেপি নেতাদের দিকে আঙুল তোলা চলত। উমর খালিদ, ভারভারা রাও, স্ট্যান স্বামী, জি এন সাইবাবা, গৌতম নওলাখারা যে খলনায়ক নন সেটা বলা চলত। বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে পরে লিবারেশন নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হত। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য নিয়ে কথা হত। আজ দেশের যা অবস্থা, তাতে এমন একটা মঞ্চের গুরুত্ব কম নয়। এই মঞ্চের অবলুপ্তিতে শোকাহত না হলেও উল্লসিত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

ভারতীয় সাংবাদিকতায় এনডিটিভির অবদান কী, সে সম্পর্কে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলেছেন অনিন্দ্য চক্রবর্তী। এনডিটিভি নেটওয়ার্কের দু-দুটো চ্যানেলের একদা ম্যানেজিং এডিটর এই সাংবাদিক রায় দম্পতির আরও অনেক অবদানের কথা লেখার সঙ্গে সঙ্গে লিখেছেন, ভারতের আর সব প্রতিষ্ঠানের মতই এনডিটিভিতেও বিলক্ষণ লুটিয়েন্স এলিটসুলভ ব্যাপার-স্যাপার আছে। কিন্তু অন্য কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠান একজন রবীশ তৈরি করতে পারেনি। কারণ একজন হিন্দি ভাষার সাংবাদিককে অতখানি জায়গা এবং কাজের স্বাধীনতাই কেউ দেয়নি।

এ কথার মাহাত্ম্য বোঝানো শক্ত। কারণ আমরা বাঙালি অ্যাংলোফাইলরা বুঝে উঠতে পারি না আঞ্চলিক ভাষার সাংবাদিকতার গুরুত্ব কতখানি। স্বাধীনতার পর ৭৫ বছর কেটে গেল, অথচ আজও ভারতে প্রগতিশীলতার ভাষা ইংরেজি। আমরা দ্য ওয়্যার, নিউজলন্ড্রি, ক্যারাভ্যান, অল্টনিউজ, বুম লাইভ ইত্যাদি ইংরেজি ভাষার বিকল্প সংবাদমাধ্যম পড়ি/দেখি বলে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির বাইরের সত্য জানতে পারি। কিন্তু এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইংরেজি পড়তে পারেন না, বলতে পারেন না, শুনে বুঝতেও পারেন না। তাঁদের কাছে উদারনৈতিক মতবাদ, ভুয়ো খবর পেরিয়ে সত্য পৌঁছে দেওয়ার দায় আমরা নিই না। আমরা কেবল তাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করেই খালাস। যে কারণে বাংলায় বিকল্প সংবাদমাধ্যম তৈরি করার তেমন প্রয়াস নেই। বাংলার টিভি চ্যানেলগুলোও দুর্গাপুজোয় অ্যাঙ্করদের শাড়ি পরিয়ে, তৃণমূল-বিজেপি তরজা দেখিয়ে, শোভন-বৈশাখী কেচ্ছা দেখিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। যে দক্ষিণপন্থীদের আমরা ঘোর অপছন্দ করি, তারা কিন্তু আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্ব বোঝে। তাই রিপাবলিক হিন্দি খুলে গেছে, রিপাবলিক বাংলাও চলে এসেছে। এই আবহে রবীশকে রায় দম্পতি যে স্থান দিয়েছিলেন তার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের সময়ের কোনো বাঙালি সম্পাদক বাংলায় সাংবাদিকতা করে বিশ্বমানের পুরস্কার পেতে পারবেন? পুরস্কার পাওয়া অবশ্য সবচেয়ে বড় কথা নয়। কিন্তু কলকাতার যে সম্পাদকদের ইদানীং আমরা প্রবাদপ্রতিম বলে মনে করি, রবীশের মত জনগণের দুঃখ দুর্দশা সাংবাদিকতায় নিয়ে আসার ব্যাপারেও তো তাঁদের অবদান শূন্য। ফলে রবীশের মত বিস্তীর্ণ এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষের উপর ইতিবাচক তো নয়ই, নেতিবাচক প্রভাব ফেলার ক্ষমতাও তাঁদের নেই। এঁদের প্রভাব হাওড়া ব্রিজ পেরোলেই শেষ বললে ভুল হয় না।

তার উপর আছে ম্যানেজারি করে সম্পাদক হওয়ার ভান। যে কারণে দেবেশ রায় অশোক দাশগুপ্তের কলামের সংকলনের আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন “এক সময় বাংলা খবরের কাগজে সম্পাদকের সক্রিয় সাংবাদিক হওয়ার বাধ্যতা ছিল। তাঁদের লিখতে হত – চাকরির কারণে নয়, নিজেদের মত দশজনকে জানানোর দরকারে ও দশজনের মত তৈরি করে তোলার দায় স্বীকার করে। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় থেকে সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার বাংলা সাংবাদিকতার সেই ইতিহাস তৈরি করেছেন। বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় শেষ সম্পাদক যিনি নিজে লিখতেন। যদিও তাঁর লেখা তাঁর নামে বেরোত না, তবু পাঠক এমনই চিনত তাঁর লেখা যে সম্পাদকীয়র নৈর্ব্যক্তিকে তিনি হারিয়ে যেতেন না। তারপর বাংলা কাগজে সম্পাদকের লেখালেখি উঠে গেছে।” বাংলার টিভি চ্যানেলের সম্পাদকরা আরও কম সাংবাদিক। তাঁরা সুটেড বুটেড হয়ে সান্ধ্য বিতর্ক পরিচালনা করা আর বিশিষ্টদের সাক্ষাৎকার নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করেন না। রবীশের মত আবর্জনার মধ্যে দাঁড়িয়ে “প্লিজ টেল মনমোহন সিং টু ওয়াচ রবীশ কি রিপোর্ট। ইংলিশ মে ওয়সে ভি ইন্ডিয়া ডেভেলপড লগতা হ্যায়” বলা এঁদের কল্পনাতীত। এই রবীশ টিভি মিডিয়ার বাইরে চলে গেলেন। এতে সত্যিই হয়ত তাঁর ক্ষতি নেই, কিন্তু টিভির দর্শকদের ক্ষতি। টিভির মাধ্যমে তিনি যত হিন্দিভাষী দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারতেন, যত ইংরেজি না জানা মানুষকে বিষাক্ত দক্ষিণপন্থার উল্টো ছবি দেখাতে পারতেন, ইউটিউব চ্যানেল দিয়ে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। কারণ ভারতে মোবাইল ডেটার দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে।

শেষ প্রশ্নে আসব, অর্থাৎ এসব নিয়ে নাগরিক ডট নেট কেন ভাবছে? তার আগে সংক্ষেপে কংগ্রেসি বন্ধুদের এনডিটিভির প্রতি রাগ নিয়ে দু-চার কথা বলে নিই। এনডিটিভি যে উদারনীতির অনুশীলন করেছে সেই ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’-এর সময় থেকে, তা কিন্তু আসলে নেহরুসুলভ উদারনীতি। জওহরলাল নেহরু যে গণতান্ত্রিক উদারতার ধারণায় বিশ্বাসী হয়ে বিদ্যায়তনিক ইতিহাস চর্চায় বামপন্থীদের জায়গা দিয়েছিলেন, ললিতকলা আকাদেমি বা সাহিত্য আকাদেমি নির্মাণ করেছিলেন – সেই উদারতা। ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ঋত্বিক ঘটকের মত ঘোর বামপন্থী, যাঁকে কমিউনিস্ট পার্টি নিজেই হজম করতে পারেনি, তিনি পড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন যে উদারনৈতিক ধারাবাহিকতায়, এনডিটিভি বস্তুত তারই অনুশীলন করেছে। ফলে তা মনমোহনী অর্থনীতির পক্ষ নেয়, আবার গান্ধী পরিবারের সমালোচনাও করে। এই জাতীয় উদারবাদীদের সঙ্ঘ পরিবারের কাছে কোনো প্রত্যাশা নেই, যত প্রত্যাশা কংগ্রেসের কাছে। স্বভাবতই কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন যখন দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে কোনো আগ্রহের বিষয়ই নয়, তখন এনডিটিভি ঘন্টার পর ঘন্টা শশী থারুর আর মল্লিকার্জুন খড়গের সাক্ষাৎকার দেখিয়ে গেছে। মোদী সারাক্ষণের রাজনীতিবিদ, রাহুলের কেন মাঝে মাঝেই ছুটির দরকার হয় – এ কথাও এনডিটিভির মঞ্চ থেকে বহুবার উঠেছে সম্ভবত এই কারণেই। কংগ্রেস এইসব সমালোচনা খোলা মনে নিতে পারলে তাদেরই লাভ হত। সমর্থকরা না নিলেও, রাহুল স্বয়ং বোধহয় নিয়েছেন। ভারত জোড়ো যাত্রা দেখে অন্তত সেরকমই মনে হয়।

দীর্ঘ লেখা এবার শেষ করব কেন এত দীর্ঘ লেখা, কেন আদৌ এ লেখা – সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে।

এ দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সবকটাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা চলছে। শুধু ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী এজেন্ডা তার কারণ নয়। একুশ শতকের পুঁজিবাদ কোনো প্রতিষ্ঠান পছন্দ করে না। সবকিছুকেই কোম্পানি করে তোলাই তার উদ্দেশ্য। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় হবে কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল কোম্পানি – লেখাপড়া হোক আর না-ই হোক। সেটা লাভজনক থাকলে চালানো হবে, নয়ত বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ শিক্ষা পণ্য। খবর এবং/অথবা তথ্য তো পণ্য বটেই। ফলে সংবাদমাধ্যমকেও প্রতিষ্ঠান থাকতে দেওয়া চলে না, তাকেও হতে হবে কোম্পানি। লাভজনক হলে চলবে, নইলে বন্ধ করে দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী হওয়া ভাল, যদি প্রতিস্পর্ধী প্রতিষ্ঠান তৈরি করার দম থাকে। সেসব যখন আমাদের নেই, তখন আজকের পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়া উদযাপন করা মূর্খামি। এতে গণতন্ত্রের পরিসরই যে সংকুচিত হচ্ছে সেকথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

অনেকেই দেখছি বিকল্প সংবাদমাধ্যমের উপর যাবতীয় দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হচ্ছেন। নাগরিক ডট নেটের সদস্য হিসাবে তা দেখে মন্দ লাগে না। কিন্তু মনে রাখা ভাল, ‘বিকল্প’ কথাটা অতি গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্পের ক্ষমতা সীমিত। যাঁরা পড়বেন তাঁরাই টাকা দেবেন, বিজ্ঞাপনের পরোয়া করতে হবে না – এই বিকল্প তৈরি হয়েছে বরখা কথিত অচল রেভিনিউ মডেলের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে। ইংরেজিতে এই মডেল (পোশাকি নাম ক্রাউড-ফান্ডেড মিডিয়া) অনেক ক্ষেত্রেই বেশ সফল, বাংলাতেও এই মডেল নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হবে নির্ঘাত। নাগরিক ডট নেট তো করবেই, আরও অনেকে করলে ভাল। কিন্তু এই মডেলের একটা সীমাবদ্ধতা আছে। বিজ্ঞাপন মডেলের মতই এই ব্যবস্থাতেও যিনি টাকা দেবেন নির্ঘাত তাঁর নিয়ন্ত্রণ থাকবে কনটেন্টের উপর। এক্ষেত্রে যেহেতু টাকা দিচ্ছেন অনেকে, সেহেতু একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ চলবে না বলে কনটেন্টে ভারসাম্য বজায় থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি অবশ্য। কিন্তু যিনি একেবারেই টাকা দিতে পারবেন না, তাঁর কথা কতটা উঠে আসবে? বাজারের যে সবজি বিক্রেতা পাঁচ টাকা দিয়ে দোকানে একটা কাগজ রাখেন বা যে রিকশাচালক বাড়ির টিভিতে দিনে অন্তত একবার খবর দেখেন, তিনি কি মোবাইলে নাগরিক ডট নেট পড়বেন টাকা দিয়ে? যদি না পড়েন, নাগরিক ডট নেট কি তাঁর সুখ দুঃখ তুলে আনার পরিশ্রম করতে পারবে? শ্রমের তো মূল্য আছে। অন্তত থাকা উচিত।

এছাড়াও আছে ঝুঁকির প্রশ্ন। ভারতের সব রাজ্যেই সাংবাদিক ও তাঁর পরিবার পরিজনদের উপর আক্রমণ ক্রমশ বাড়ছে, যে কোনো সমীক্ষায় উঠে আসছে সেই তথ্য। এনডিটিভির মত মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক তবু বিপদে পড়লে সংগঠনের আইনি ও সাংগঠনিক সাহায্য পান। নাগরিক ডট নেটের কেউ বিপদে পড়লে কার সাহায্য পাবে?

বিকল্প সংবাদমাধ্যম বা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যেই বেশ প্রতিষ্ঠিত যারা, সেই নিউজক্লিকের দপ্তরেও কারণে অকারণে সরকারি সংস্থার রেড হয়ে থাকে। মামলা ঠুকে হয়রানি চলে নিয়মিত। এই ধরনের মিডিয়ার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় দ্য ওয়্যার। তারা কিছুদিন আগে এক কেলেঙ্কারি করে বসেছিল। বিরাট খবর করছে মনে করে বিজেপির আই টি সেলের কর্তা অমিত মালব্য এবং ফেসবুককে জড়িয়ে সম্পূর্ণ ভুল খবর পরিবেশন করেছিল। সেই খবর পরে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ন্যক্কারজনক ঘটনা, কিন্তু সাংবাদিকতার ইতিহাসে অভূতপূর্ব নয়। যে কোনো কাজ করতে গেলেই ভুল হয়, খবর করতে গেলেও। কিন্তু সরকারবিরোধী সংবাদমাধ্যম হওয়া এখন এ দেশে বিরাট অপরাধ। তাদের ভুল অমার্জনীয়। তাই কেবল দপ্তরে নয়, দ্য ওয়্যারের প্রধান সিদ্ধার্থ বরদারাজনের বাড়িতেও পুলিস হানা দিয়ে তাঁর ল্যাপটপ, ফোন ইত্যাদি বাজেয়াপ্ত করে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই। এনডিটিভি গেল তো কী হল, বিকল্প সংবাদমাধ্যম দিয়েই কাজ চলে যাবে এই স্বপ্নে যাঁরা বুঁদ হয়ে আছেন তাঁরা এগুলো খেয়াল রাখবেন দয়া করে। এখানেই শেষ নয়। তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে অনলাইন কনটেন্টের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের রাস্তাও পরিষ্কার করা হয়েছে।

ফলে নাগরিক ডট নেটের মত ওয়েবসাইটও খুব নিরাপদ নয়। অতএব স্বাধীন তথা বিকল্প সংবাদমাধ্যমের উপর ভরসা রাখুন, পাশে থাকুন। পকেটের পয়সা দিয়ে এবং আরও যে যে উপায়ে পারেন। কিন্তু পা মাটিতে রাখুন। কোনো মূলধারার সংবাদ প্রতিষ্ঠানের পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজনের হাতে চলে যাওয়ার ঘটনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়, উল্লাস করার তো নয়ই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

সিপিএম পথে ফিরেছে, কিন্তু ব্যালটে ফিরবে কি?

আইএসএফের সঙ্গে সিপিএম তথা বামফ্রন্টের এখন ঠিক কী সম্পর্ক? কংগ্রেসের সঙ্গে কি আবার জোট করা হবে?

খবরে প্রকাশ, সিপিএম নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জি শিলিগুড়িতে এক সভায় বলেছেন, শিলিগুড়ি পৌর নিগম বামেদের হাতছাড়া হয়েছে সবে কয়েক মাস। কিন্তু এর মধ্যেই তা দুর্বৃত্তদের হাতে চলে গেছে। সিপিএম তথা বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত প্রশাসনিক কার্যকলাপ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ধুতি পাঞ্জাবির মত শ্বেতশুভ্র ছিল, কোথাও দুর্নীতির লেশমাত্র ছিল না – এমনটা নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই, দুর্নীতির যে পরিমাণ এবং দুর্নীতি করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানোর যে নির্লজ্জা এ রাজ্যে দেখা যাচ্ছে তা একান্তই তৃণমূল কংগ্রেসের দান। তার মধ্যে কংগ্রেসের উত্তরাধিকার খুঁজতে যাওয়াও বৃথা। আবু বরকত আলি গনিখান চৌধুরীরা সেকালের জমিদারদের কায়দায় রাজনীতি করতেন, অধীর চৌধুরীর মত লোকেরা তার সঙ্গে মিশিয়েছিলেন পেশিশক্তির ব্যবহার। কিন্তু সেখানেও পরিমাণ মত দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করে রবিন হুড মার্কা ভাবমূর্তি তৈরি করার প্রয়াস থাকত। বাম আমলেও রাজনৈতিক মদতপুষ্ট সমাজবিরোধীরা অন্তত নিজের এলাকায় গরীবের মেয়ের বিয়ে দেওয়া, অমুক বড়লোককে ‘চমকে’ দিয়ে তমুক গরীবকে একটু স্বস্তি দেওয়া – এসব করত।

কিন্তু মাত্র এগারো বছরের শাসনেই দেখা যাচ্ছে তৃণমূলের শীর্ষনেতাদের ফ্ল্যাট থেকে নগদ কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হচ্ছে, তদন্ত এগোলে অগাধ গোপন সম্পত্তির হদিশ পাওয়া যাচ্ছে। অনুব্রত মন্ডলের মত বাহুবলীরা নিজেরাই নেতা হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে তো বটেই, এমনকি দেশের বাইরেও নেতাদের সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এতৎসত্ত্বেও স্বয়ং মমতা ব্যানার্জি প্রকাশ্যে অনুব্রতর মত নেতার পাশে দাঁড়াচ্ছেন, ববি হাকিম বাঘ বেরিয়ে এলেই শেয়ালরা পালাবে ইত্যাদি আক্রমণাত্মক কথাবার্তা বলছেন। সাধারণ মানুষ টিভির পর্দায় পাহাড়প্রমাণ টাকা দেখে ফেলায় কদিন নিচু হয়ে থাকা শাসকের গলা আবার সপ্তমে চড়েছে। সুতরাং সাধারণ মানুষ যদি ভেবে নেন, শীর্ষ নেতৃত্বের আশীর্বাদেই এত দুর্নীতি চলছে রাজ্যে, তাহলে দোষ দেওয়া যাবে না। উপরন্তু মহারাষ্ট্র বা তামিলনাড়ুর মত পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অর্থনীতির রাজ্যে দুর্নীতি সাধারণ মানুষের যতটা চোখে লাগে, কর্মসংস্থানের হাহাকার পড়ে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গে শাসক দলের নেতাদের বিপুল সম্পত্তি এবং তা নিয়ে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধের অভাব অনেক বেশি গায়ে লাগাই স্বাভাবিক।

ফলে মীনাক্ষীর কথা বেশকিছু শ্রোতাকে স্পর্শ করতে পারলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সম্ভবত পারছেও। সেই কারণেই ইদানীং সিপিএমের মিছিল, মিটিংয়ে আবার ভিড় হতে দেখা যাচ্ছে। স্রেফ কৌতূহলী জনতার ভিড় নয়, মধ্যবয়স্ক বা পাকা চুলের মানুষের ভিড় নয় – তরুণ তরুণীদের ভিড়। স্কুল নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে বছর দশেক হতে চলল, কিন্তু গত এক বছরে যে তীব্রতা এসেছে আন্দোলনে – তাও আগে দেখা যায়নি। এর পিছনেও যে সিপিএমের সক্রিয়তা বৃদ্ধি অন্যতম কারণ, তা এই আন্দোলনকে নিয়মিত নজরে রাখা সাংবাদিকরা সকলেই জানেন। মীনাক্ষী, ইন্দ্রজিৎ ঘোষ, কলতান দাশগুপ্তের মত সিপিএমের ছাত্র, যুব সংগঠনের নেতারা যে এই আন্দোলন নিয়ে পথে নেমে পড়েছেন, কম্পাস ঠিক করতে সাহায্য করছেন তা তো কারোর কাছেই অবিদিত নেই। যে রাত্রে করুণাময়ী থেকে আন্দোলনকারীদের বলপূর্বক তুলে দেওয়া হল কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশকে সাক্ষী গোপাল করে, সে রাত্রেও এঁরা পৌঁছে গিয়েছিলেন উচ্ছেদ আটকাতে। চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন সম্পর্কে সিপিএমের হাবভাব বদল চোখে পড়ার মত। পূর্বতন রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রের আমলে এই আন্দোলন চলছিল নিজের মত করে। কলকাতার মাঝখানে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে চাকরিপ্রার্থীরা যখন অনশন করছিলেন, তখন পথচারীরা পর্যন্ত উঁকি মেরে দেখতেন না এরা কারা, কেন এখানে বসে আছে। সিপিএম বলত তারা আন্দোলনটাকে হাইজ্যাক করতে চায় না বলে ওর মধ্যে প্রবেশ করছে না, কিন্তু আন্দোলনকারীদের পাশে আছে। পাশে থাকা মানে কোনোদিন বিমান বসু, কোনোদিন অন্য কোনো নেতার মেয়ো রোড গমনের ফেসবুক লাইভ। মহম্মদ সেলিম রাজ্য সম্পাদক হওয়ার পর থেকে স্বয়ং বেশ কয়েকবার আন্দোলনকারীদের কাছে গেছেন, এই ইস্যু নিয়ে পার্টির পতাকা নিয়ে অথবা নাগরিক মিছিলের নাম দিয়ে একাধিক কর্মসূচি পালন হয়েছে। বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের কড়া রায় তৃণমূল সরকারকে বিপদে ফেলেছে আদালতের ভিতরে। কিন্তু আদালতের লড়াইকে রাস্তায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব অবশ্যই সিপিএমের।

কিন্তু রাজ্যের পরিস্থিতির সাপেক্ষে যে প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ, তা হল পথে ঘাটে সিপিএমের প্রতি সমর্থন ফেরত এলেও, ব্যালট বাক্সে আসবে কি? কোনো সন্দেহ নেই, কলকাতার ধর্মতলায় সারা রাজ্যের ছাত্র, যুবদের একত্র করে শক্তি প্রদর্শন আর ভোট আদায় এক জিনিস নয়। ২০২৪ এখনো ঢের দেরি, সামনেই পঞ্চায়েত নির্বাচন। সে নির্বাচনে চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন কতটা প্রভাব ফেলবে বলা মুশকিল। হয়ত বেশি প্রভাবশালী হবে সিপিএমের হেল্পলাইন, যেখানে মানুষ ফোন করে স্থানীয় দুর্নীতির কথা বলতে পারেন। সিপিএম নেতাদের দাবি দারুণ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া রাজ্যের প্রত্যেক পঞ্চায়েত এলাকায় গোটা নভেম্বর মাস জুড়ে পদযাত্রা এবং ডেপুটেশনের কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে, যা শুভেন্দু-অভিষেক কাদা ছোড়াছুড়ি এবং রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব পেরিয়ে কলকাতার সংবাদমাধ্যমে এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি।

রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে, তৃণমূলের স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজ্য নেতাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ক্ষোভ জমেছে। কিন্তু তেমন ক্ষোভ ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগেও ছিল। সে নির্বাচন অনেকটা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সম্পর্কে গণভোটে পরিণত হওয়ায় এবং দুয়ারে সরকার আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের কল্যাণে তৃণমূল শেষপর্যন্ত হইহই করে জিতেছিল। কিন্তু পঞ্চায়েত ভোট অন্য ব্যাপার। ইতিমধ্যে দুয়ারে সরকার নিয়েও দুর্নীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। তৃণমূলেরই একাধিক গোষ্ঠীকে কারা কী পেল, কারা পেল না তা নিয়ে প্রকাশ্যে ঝগড়া করতে দেখা যাচ্ছে। বিজেপি এখন পর্যন্ত নিষ্প্রভ। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে কি পারবে সিপিএম?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে উঠে আসবে আরেকটি জরুরি প্রশ্ন। বামফ্রন্ট, তুমি আজিও আছ কি? কারণ সিপিএম যখন মধ্যগগনে, তখনো বহু জায়গায় তাদের চেয়ে ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপির মত ফ্রন্টের অন্য দলগুলোরই আধিপত্য বেশি ছিল। তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি যেমন হয়েছে, তেমনি নির্বাচনের সময়ে এই সমীকরণ বামফ্রন্টের হাত শক্তও করেছে। মুর্শিদাবাদে কী অবস্থা আরএসপির? কোচবিহারে উদয়ন গুহর প্রস্থানের পর কেমন আছে ফরোয়ার্ড ব্লক? প্রবাদপ্রতিম চিত্ত বসুর পার্টির উত্তর ২৪ পরগণাতেই বা কী হাল? বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে যে সংযুক্ত মোর্চা তৈরি হয়েছিল তাতে ছিল কংগ্রেস আর ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টও। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ মুসলমান এবং হিন্দু নিম্নবর্গীয় মানুষের হাত ধরার জন্যই নাকি শেষোক্ত দলটিকে নেওয়া হয়েছিল। তাদের সঙ্গেই বা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের এখন ঠিক কী সম্পর্ক? কংগ্রেসের সঙ্গে কি আবার জোট করা হবে?

আরও পড়ুন সেলিব্রিটি কাল্ট দরদী সিপিএমকে খোলা চিঠি

এইসব প্রশ্নেই লুকিয়ে আছে বামেরা এ রাজ্যে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা তার উত্তর। কারণ এ রাজ্যে যেভাবে ভোট হয়, তাতে সবকিছু ঠিকঠাক করেও নির্বাচনের দিন খড়্গ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা উন্নয়নের মোকাবিলা করতে না পারলে ভোটে জেতা যায় না। গোটা রাজ্যে একা তার মোকাবিলা করার মত সংগঠন সিপিএমের এখন নেই, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে হবেও না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

টুইটার, বাইজু’স আঁধারে ছাঁটাই সম্পর্কে কয়েকটি কথা

ভারতের সাদা কলারের কর্মীদের কাছে গত তিরিশ বছরে ইউনিয়ন এমন একটি শব্দে পরিণত হয়েছে যা শুনলে কানে গঙ্গাজল দিতে হয়, অবেলায় স্নান করতে হয়।

দিকে দিকে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে, টুইটারে ছাঁটাই পর্ব উঠেছে চরমে। এতদিনে সবাই জেনে গেছেন, প্রায় হাজার চারেক লোককে ইতিমধ্যেই ছাঁটাই করেছেন ইলন মাস্ক। চুয়াল্লিশ বিলিয়ন ডলারে টুইটার কিনে নেওয়ার পর কর্মীদের ইমেল করে তিনি জানিয়েছেন টুইটারের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে গেলে নাকি ছাঁটাই করা ছাড়া উপায় নেই। কারণ, শুক্রবার তাঁর করা একটি টুইট থেকে জানা যাচ্ছে, টুইটার প্রতিদিন চার মিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সান্ত্বনা দেওয়ার ঢঙে সেই টুইটে যোগ করেছেন, যাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে তাদের তিন মাসের বিদায়ী ভাতা (severance) দেওয়া হচ্ছে। আইনত যা দেওয়ার কথা, সে ভাতা নাকি তার ৫০% বেশি। যে কোম্পানি দৈনিক চার মিলিয়ন ডলার ক্ষতিতে চলে সে কোম্পানি কেনার জন্য ইলন এত লাফালাফি কেন করেছিলেন সে প্রশ্ন থাক। তিনি যে টুইট মডারেশনে যুক্ত আস্ত বিভাগগুলোকেই কর্মী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে তুলে দিচ্ছেন, তার ভুয়ো খবর, হিংসাত্মক বাচনের উপর কী প্রভাব পড়বে এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কী হবে – সে আলোচনাও অন্য দিনের জন্য তোলা থাক। বরং আরেকটি ছাঁটাইয়ের ঘটনার দিকে নজর দেওয়া যাক।

শাহরুখ খানের ওকালতি এবং বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মাদের জামায় জ্বলজ্বলে লোগোর কারণে বাইজু’স নামটি এখন কারোর জানতে বাকি নেই। অনলাইনে লেখাপড়া করিয়ে ছেলেমেয়েদের সব পরীক্ষায় দারুণ নম্বর পাইয়ে দেবে – এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাইজু রবীন্দ্রনের এই এডটেক স্টার্টআপ চালু হয়েছে মাত্র কয়েক বছর হল। এরই মধ্যে এত উন্নতি করেছে যে ভারতীয় ক্রিকেট দলের শার্ট স্পনসর হয়েছে, চলতি ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির অ্যাসোশিয়েট স্পনসর হয়েছে। উপরন্তু, দিন দুয়েক হল নিজেদের এক ‘নন-প্রফিট’ উদ্যোগের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করেছে লায়োনেল মেসিকে। খেয়াল করুন, সুনীল ছেত্রীকে নয়, ক্রিকেট তারকাদের কাউকেও নয়, একেবারে মেসি। মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার যাকে বলে। অথচ এই বাইজু’সই সেপ্টেম্বর মাসে ঘোষণা করেছিল তারা আড়াই হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে। কারণ গত চার বছরে কোম্পানির যে বিপুল বৃদ্ধি হয়েছে তার ফলে কোম্পানির বৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে এছাড়া উপায় নেই। এই যুক্তি গত সোমবার (৩১ অক্টোবর) এক লিঙ্কডইন পোস্টে বাইজু’স দিয়েছিল। এই টেকসই করে তোলার অঙ্গ হিসাবেই তিরুবনন্তপুরমের টেকনোপার্কে বাইজু’সের অফিস তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এতে ১৪০ জন কর্মীর চাকরি যেত। কিন্তু কোম্পানির সংগঠিত কর্মীরা এবং কেরালা সরকার সে গুড়ে বালি দিয়ে দিয়েছেন। বুধবার (২ নভেম্বর) মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এবং রাজ্যের লেবার কমিশনার ডক্টর বাসুকির সাথে বাইজু রবীন্দ্রনের বৈঠকের পর ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। টেকনোপার্কের কর্মী সংগঠন প্রতিধ্বনি টেকনোপার্ক হপ্তাখানেক আগে কেরালার শ্রমমন্ত্রী ভি শিবনকুট্টির সঙ্গে নিজেদের পরিস্থিতি জানিয়ে সাক্ষাৎ করে। এক সপ্তাহের মধ্যেই হাতেনাতে ফল পাওয়া গেল।

টুইটার আর বাইজু’সের ছাঁটাইয়ের ঘটনা পরপর ঘটায় একটি সুবিধা হয়েছে। এ দেশের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত মানুষ ছাঁটাইয়ের বিভীষিকা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছেন, অনবরত কথাবার্তা বলছেন সোশাল মিডিয়ায়। ফলে সচরাচর ছাঁটাইয়ের পক্ষে যেসব যুক্তি তাঁরা দিয়ে থাকেন সেগুলোর বৈধতা নিয়ে আলোচনা করার পরিসর তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক উদারীকরণের যুগে সারা ভারতে (কেবল পশ্চিমবঙ্গে নয়) বহু কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ঠিক কত শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন তার হিসাব কোনো রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমমন্ত্রকও দিতে পারবে বলে মনে হয় না। ঠিক কত মানুষ কৃষিকাজ অলাভজনক হয়ে যাওয়ায় প্রবাসী শ্রমিক (পরিযায়ী শ্রমিক কথাটা অশ্লীল। কলকাতাবাসী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বেঙ্গালুরুতে চাকরি করতে গেলে তাকে পরিযায়ী ইঞ্জিনিয়ার বলি কি?) হয়ে গেছেন তার হিসাবও যেমন দেশের সরকার রাখে না। ভাগ্যিস অতিমারী এল! নইলে তো আমরা মনে করতাম শ্রমিকদের জীবন মৃত্যুর হিসাব রাখে দেশের সরকার। ঘটনা হল, ও হিসাব আমরাও রাখি না। ফলে ছাঁটাইয়ের হিসাব রাখারও প্রশ্ন ওঠে না। কারণ আমরা যারা গাঁটের কড়ি খরচ করে খবরের কাগজ পড়ি, টিভিতে খবর দেখি বা হাতের স্মার্টফোনে ফেসবুক টুইটার দেখি এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে খবর সংগ্রহ করি – তাদের বাড়ির লোকেরা সাধারণত কারখানার লে অফে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, পশ্চিমবঙ্গ থেকে মহারাষ্ট্রে নির্মাণ শ্রমিক হয়েও তাদের যেতে হয় না। কিন্তু আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরাই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাঙ্কার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট ইত্যাদি হয়। মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা, টুইটার বা অ্যামাজনে চাকরি পেলে আমরা শতমুখে তা বলে বেড়াই। সুন্দর পিচাই, সত্য নাডেলা বা পরাগ আগরওয়ালকে দেখে আমাদের চোখ চকচক করে। মনে হয় আমার বাড়ির ছেলেটিও তো একদিন ওই উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। ফলে যে লে অফ দেশের হাজার হাজার বন্ধ কারখানার শ্রমিকের দরজায় আতঙ্কের উপর্যুপরি ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়তে পড়তে অবশেষে গা সওয়া হয়ে গেছে গত ৩০ বছরে, সেই লে অফ ইলনের কল্যাণে অবশেষে হ্যাশট্যাগ হয়ে আমাদের ঘুম কেড়ে নিতে পেরেছে।

ঘুম ছুটে যাওয়া অনেকসময় ভাল, কারণ তাতে গা ঝাড়া দিয়ে জেগে ওঠা যায়। আমরা সাদা কলারের শ্রমিকরা (হ্যাঁ, শ্রমিকই। সেটা ছাঁটাই হওয়া মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পান) সেই নয়ের দশক থেকে ছাঁটাই সম্বন্ধে যা জেনে এবং বিশ্বাস করে এসেছি, টুইটার ও বাইজু’সের ছাঁটাইয়ের আঁধারে আসুন সেগুলিকে প্রশ্ন করি। প্রথমত, আমরা জানি যে ছাঁটাই কখনো এমনি এমনি করা হয় না। করা হয় ব্যবসার প্রয়োজনে। কীরকম প্রয়োজন? ইলন বলছেন কোম্পানি বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বলে ছাঁটাই করা প্রয়োজন, বাইজু বলেছেন কোম্পানির বিপুল বৃদ্ধি হয়েছে বলে ছাঁটাই করা প্রয়োজন। দুজনেই সত্যবাদী যুধিষ্ঠির ধরে নিয়েই এগোনো যাক।

প্রথম জন স্বেচ্ছায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে একটি কোম্পানিকে কবজা করলেন, তারপর আবিষ্কার করলেন সে কোম্পানি লাভজনক নয়। তাই তিনি লে অফ করবেন। দ্বিতীয় জনের বয়ান অনুযায়ী, ব্যবসা প্রত্যাশার চেয়ে বড় হয়ে গেছে, তাই মুনাফা করতে হলে ছাঁটাই করা ছাড়া উপায় নেই। ইলনের ইচ্ছে হয়েছিল বলে টুইটার কিনেছিলেন, এখন দেখছেন সামলাতে পারবেন না। তার খেসারত দিতে হবে হাজার চারেক কর্মচারীকে। বাইজুর ইচ্ছে হয়েছিল বলে গত বছর আকাশ ইনস্টিটিউট কিনে নিয়েছিলেন। তার মার্কেটিং এবং ক্যাম্পেনের জন্য ৭.৫% হারে ৩০০ কোটি টাকা ধারও নিয়েছেন গত মাসে। তার আগে বর্তমান লগ্নিকারীদের থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থও সংগ্রহ করেছেন। এদিকে রাজস্ব আদায় নাকি আগের বছরের ১,৯১৮.২৫ কোটি টাকা থেকে কমে ২০২১ আর্থিক বর্ষে ১,৩৭৮.৫১ কোটি টাকা হয়ে গেছে। অথচ মেসির পারিশ্রমিক দেওয়া যাচ্ছে, কর্মীদের চাকরি না খেলে চলছে না। অর্থাৎ দুই ধনকুবের কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত গানের মত “খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে/বিরাট শিশু আনমনে”। তাঁরা কেবল নিজের টাকা নিয়ে নয়, হাজার হাজার কর্মচারীর বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও খেলবেন। খেলতে খেলতে যখন মনে হবে যথেষ্ট মজা (অর্থাৎ মুনাফা) হচ্ছে না, তখনই ছাঁটাই করবেন। যুক্তিটা নিজের মত করে বানিয়ে নেবেন আর আপনি যেহেতু বিশ্বাস করেন ছাঁটাই বিনা কারণে হয় না, তাই আপনি নিজে লেড অফ হলেও মাথা নেড়ে বলবেন “সত্যিই তো। ব্যবসার স্বার্থে তো এটা করতেই হবে।”

কর্মী ছাঁটাই করে বা ‘পে কাট’ করে বৃহৎ পুঁজির ব্যবসার কতখানি স্বার্থরক্ষা হয় সে সম্পর্কে আরেকটি উদাহরণ দিই। এই উদাহরণ অতীতেও দিয়েছি, কিন্তু বধিরদের শোনাতে বিস্ফোরণের প্রয়োজন হয়। এক বিস্ফোরণে কাজ না হলে বারবার বিস্ফোরণ ঘটাতে হয়। ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি ভারতের অন্যতম বৃহৎ মিডিয়া হাউসের মালিকানাধীন একটি খবরের কাগজ সম্পাদকীয় পাতায় এক দীর্ঘ প্রবন্ধে লিখেছিল, সংবাদপত্র শিল্প বিপন্ন এবং তাকে বাঁচাতে হলে সরকারি সাহায্য প্রয়োজন এবং কর্মী সংকোচন ছাড়া উপায় নেই। কারণ কর্মচারীদের মাইনে দিতে বিপুল খরচ হচ্ছে। ২১ তারিখে দিল্লির সাংবাদিকদের সংগঠন দিল্লি ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টসের সভাপতি এস কে পাণ্ডে এবং সাধারণ সম্পাদক সুজাতা মাধোক এক লিখিত বিবৃতিতে জানান, ভারত সরকারের কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রককে কোম্পানিগুলি যে হিসাবপত্র জমা দেয় তাতে দেখা যাচ্ছে, ওই মিডিয়া হাউসের বাৎসরিক আয় আনুমানিক ৪৮০০ কোটি টাকা আর বেতন বাবদ খরচ করে প্রায় ৫৫১ কোটি টাকা, অর্থাৎ আয়ের মাত্র ১১%। উপরন্তু ওই ৫৫১ কোটির ১০২ কোটি খরচ হয় মাত্র ৪০ জনকে মাইনে দিতে। এই মিডিয়া হাউসটি পরে অতিমারীর সময়ে এক বড় অংশের সাংবাদিক এবং অসাংবাদিক কর্মীদের ছাঁটাই করে এবং যাদের ছাঁটাই করা হয়নি তাদেরও মাইনে কমিয়ে দেয়।

যে কোনো কর্পোরেট, তার ব্যবসা যা-ই হোক, এরকম বেতন কাঠামোতেই চলে। তাহলেই বুঝুন, কর্মী ছাঁটাই করলে ব্যবসার কতটুকু স্বার্থরক্ষা হয়।

এবার ছাঁটাই সম্বন্ধে দ্বিতীয় বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা যাক – ছাঁটাই হয় উদ্বৃত্ত, অযোগ্য লোকেরা।

আগেই বলেছি, লে অফ খেলা ছাড়া কিছুই নয়। বুঝে নেওয়া দরকার, যে এ খেলার গোলপোস্ট বসায় মালিক পক্ষ, ইচ্ছা অনুযায়ী বড় ছোটও করে মালিক পক্ষই। সুতরাং কে প্রয়োজনীয় আর কে উদ্বৃত্ত, কে যোগ্য আর কে অযোগ্য – তা-ও ঠিক হয় মালিক পক্ষের ইচ্ছানুযায়ী। সে ইচ্ছা যে নিতান্ত যুক্তিহীন, তা অবশ্য নয়। যুক্তিটা কী? যুক্তি হল মালিক সে বছর কতটা মুনাফা করতে চাইছেন। যদি চাহিদা খুব বেশি হয়, তাহলে প্রমাণ করা হবে উঁচু পদের বিরাট অঙ্কের বেতন পাওয়া কর্মচারীরা উদ্বৃত্ত। নইলে প্রমাণ করা হবে নিচুতলার এবং মাঝের সারির কর্মীরা উদ্বৃত্ত। এই কারণেই ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক মন্দার সময়ে ভারতের বহু তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিতে উচ্চপদস্থদেরই চাকরি গিয়েছিল। আবার ২০১৯-২১ সময়কালে ভারতের সংবাদমাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ ছাঁটাই হয় সেখানে কোনো মিডিয়া হাউস বিদায় করেছিল মাসে কয়েক লক্ষ টাকা মাইনে পাওয়া সম্পাদকদের, কোনো হাউস আবার ওসব বাছবিচার না করে কাগজের আস্ত সংস্করণ, আস্ত চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছিল।

এ তো গেল উদ্বৃত্তের কথা। আর যোগ্যতা? আমাদের অনেকেরই ধারণা, ছাঁটাই হয় কেবল অযোগ্য কর্মীরা। কখনো ভেবে দেখেছেন, যে অযোগ্য তাকে চাকরিতে নেওয়া হয়েছিল কেন? অতীতে ভারতে যখন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সমস্ত শিল্পেই জোরদার ছিল, তখন বলা হত ট্রেড ইউনিয়নের চাপে নাকি দরকারের চেয়ে বেশি লোক নিতে হয়েছিল, অযোগ্য লোক নিতে হয়েছিল। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তো সরাসরি অভিযোগ, স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনৈতিক কারণে বহু উদ্বৃত্ত কর্মচারী নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর থেকে সাদা কলারের চাকরিতে ইউনিয়ন তো কার্যত উঠে গেছে। সমস্ত কর্পোরেট অফিসে বাহারি এইচ আর ডিপার্টমেন্ট রয়েছে। তারা প্রায় সেকালের পাত্রী দেখার মত “চুল খুলে দেখাও তো মা”, “হেঁটে দেখাও তো মা” পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ করে। এতৎসত্ত্বেও এত অযোগ্য কর্মী আসে কোথা থেকে? তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক, তারা ইন্টারভিউয়ে চালাকি করে ঢুকে পড়ে। যদি বা পড়ে, তারা যে অযোগ্য সে কথা কোম্পানির মুনাফার ক্ষিদে বেড়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত কারোর খেয়াল হয় না কেন? অনেকসময় ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সর্বশেষ আভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে যে কর্মচারী ভাল রেটিং পেয়েছে সে-ও ছাঁটাই হয়ে গেল। কী করে এমন ঘটে?

আসলে যোগ্যতার গোলপোস্টও মালিক পক্ষের মর্জিমাফিক সরিয়ে ফেলা হয়। নইলে পৃথিবীর সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করা এবং প্রশিক্ষণ নেওয়া যে ইঞ্জিনিয়াররা এত বছর ধরে টুইটার চালাচ্ছিলেন তাঁরা রাতারাতি এই শুক্রবার অযোগ্য হয়ে গেলেন কী করে?

আরও পড়ুন যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে

ছাঁটাই সম্পর্কে আমাদের ধারণার পরিবর্তন প্রয়োজন – এই মর্মে এত দীর্ঘ আলোচনা ফেঁদেছি কেন? কারণ এর পরিবর্তন না ঘটালে যাঁরা এখনো ছাঁটাই হননি তাঁরাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন অদূর ভবিষ্যতে। অতিমারীর সময়ে যখন চারদিকে বিভিন্ন শিল্পে লে অফ আর পে কাট চলছে, আমার এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার প্রতিবেশী সগর্বে বলেছিলেন “আমার চিন্তা নেই। আমি জানি আমার যোগ্যতা আছে। একটা গেলে আরেকটা ঠিক পেয়ে যাব।” কেবল অযোগ্য লোকেরা ছাঁটাই হয় – এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে গেলে ওরকম অকারণ নিরাপত্তায় ভোগা অসম্ভব নয়। টুইটার, গুগল, মেটা ইত্যাদি হল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় কোম্পানি। তারা যে দৃষ্টান্ত তৈরি করে তা-ই বিশ্বের সর্বত্র অনুসরণ করে থাকে ছোট, বড়, মাঝারি কোম্পানিগুলি। সুতরাং কোনো কর্পোরেটের কোনো কর্মচারীই যে নিরাপদ নন তা বুঝে নেওয়ার সময় এসেছে। অনুসিদ্ধান্ত হিসাবেই বুঝতে পারা উচিত যে লে অফের আসল কারণ, কোনো শিল্পেই, ব্যবসা বাঁচানো নয়। দীর্ঘকাল বলা হত শ্রমিক আন্দোলনের জন্য, ধর্মঘট, পেন ডাউন ইত্যাদির জন্য ব্যবসার ক্ষতি হয়। ফলে ছাঁটাই করতে হয়, শিল্প তুলে দিতে হয়। তা তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে বা সংবাদমাধ্যমে তো ওসব বালাই নেই। ধর্মঘটই বা কোথায়? তবু কেন শিল্প নড়বড়ে? কেন ছাঁটাই করতে হচ্ছে?

সুতরাং ছাঁটাইয়ের আসল কারণ হল মুনাফা বাড়ানো। কত বাড়ানো? এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই, কারণ মালিকের লোভের কোনো শেষ নেই। যে কোনো স্তরের কর্পোরেট কর্মচারীই জানেন, আজকাল পরের আর্থিক বর্ষের ব্যবসার লক্ষ্যমাত্রা স্থির হয় আগের বছরের মুনাফা অনুযায়ী। আগেরবারের চেয়ে বেশি মুনাফা না করা গেলেই হিসাবে ক্ষতি লেখা হয়। অর্থাৎ লাভ-ক্ষতির সংজ্ঞাই বদলে ফেলা হয়েছে পুঁজির হাঙরের ক্ষিদে মেটানোর জন্য। এই ক্ষিদে যে কোনোদিন আপনাকেও গিলে নেবে। আপনার যোগ্যতা আপনার বর্ম নয়।

লোক কমিয়ে মুনাফা বাড়ানোর আরও উৎকৃষ্ট পন্থা মালিকদের নজরে পড়ে গেছে ইতিমধ্যেই। তার নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। বিজ্ঞান, প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে স্বয়ংক্রিয়তা (automation)। সেই ধারাবাহিকতাতেই এসে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কম্পিউটারের আগমনে কিছু মানুষের কাজ গিয়েছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলেও যাবে। সবাইকে তৈরি থাকতে হবে। যে প্রশ্নের উত্তর নেই সে প্রশ্ন তোলা চলবে না – এরকম গা জোয়ারি চিন্তায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। সে অভ্যাস থেকে বেরোতে আমাদের বাধ্য করবে অদূর ভবিষ্যৎ। তখন নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে, কোথাও কি থামা উচিত? প্রযুক্তি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ প্রযুক্তির জন্য? স্বয়ংক্রিয়তা তো আবিষ্কৃত হয়েছিল মানুষের ভার লাঘব করার জন্য? মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়া কি স্বয়ংক্রিয়তার কাজ? এসব প্রশ্ন তখন তুলে কোনো লাভ হবে না, কারণ অর্থনীতি এবং শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা আমরা অনেকদিন হল ছেড়ে দিয়েছি।

একা একা মৌলিক প্রশ্ন তুলে অবশ্য কোনোদিনই কোনো লাভ হয়নি। তিরুবনন্তপুরমের বাইজু’স কর্মীরা ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করাতে পেরেছেন একজোট হয়েছেন বলে। সম্প্রতি আমাদের স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় অ্যামাজনের কর্মীরাও লড়াই করে ইউনিয়ন করার অধিকার আদায় করেছেন। কিন্তু ভারতের সাদা কলারের কর্মীদের কাছে গত তিরিশ বছরে ইউনিয়ন এমন একটি শব্দে পরিণত হয়েছে যা শুনলে কানে গঙ্গাজল দিতে হয়, অবেলায় স্নান করতে হয়। ইউনিয়ন করবে চটকলের শ্রমিকরা; বড়জোর সুইগি, জোম্যাটো, ফ্লিপকার্টের ডেলিভারি বয়রা; উবের, ওলার ড্রাইভাররা। সাদা কলারের সম্ভ্রান্তবংশীয়রা হাড়িকাঠে গলা দিয়ে বেচারা জল্লাদের বাঁচার প্রয়োজন বিবেচনা করে সসম্মানে বলি হবেন।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

সেতু ভাঙলেও টাল খায় না গুজরাট মডেল

সারা দেশের ভদ্রলোক শ্রেণি গুজরাট বলতে অজ্ঞান। কি চমৎকার রাস্তা! সবরমতীর ধারটা কি দারুণ করেছে! লোকের কত টাকা! দিল্লি থেকে কন্যাকুমারী – সর্বত্রই মুগ্ধতার কারণগুলো মোটামুটি এক। বাঙালি ভদ্রজনের মুগ্ধতার দুটো অতিরিক্ত কারণ আছে – ১) ওখানে কত ইন্ডাস্ট্রি, ২) ওখানে কেউ চাকরি বাকরি নিয়ে মাথায় ঘামায় না, সবাই ব্যবসা করে। এই মুগ্ধ জনতার সাথে খানিকক্ষণ কথা বললেই টের পাওয়া যায় এঁরা গুজরাট বলতে বোঝেন আমেদাবাদ, বড়জোর ভদোদরা। তলিয়ে জিজ্ঞেস করলে বেরিয়ে পড়ে বেড়াতে গিয়ে আমেদাবাদের বাইরে কেবল গির অরণ্যের সিংহ দেখেছেন। অবশ্য পশ্চিমবঙ্গ বলতেও এঁরা কলকাতাই বোঝেন, মহারাষ্ট্র বলতে মুম্বাই। ফলে বামপন্থী বা ডানপন্থী যা-ই হোন, গুজরাট মডেলে এঁদের অগাধ আস্থা। তবে স্বপ্নের গুজরাটে বেমক্কা সেতু ভেঙে পড়লে কিঞ্চিৎ ফাঁপরে পড়েন।

মোরবিতে মেরামতির জন্য সাত মাস বন্ধ থাকা সেতু দিন পাঁচেক হল খোলা হয়েছিল, রবিবার ভর সন্ধেবেলা ভেঙে পড়েছে। এখন শোনা যাচ্ছে খুলে দেওয়ার আগে নাকি সুরক্ষা শংসাপত্রও নেওয়া হয়নি। উন্নয়নের গুজরাট বলে কথা, উন্নয়ন কি আর লাল ফিতের ফাঁসে আটকে রাখা যায়? কর্মবীর নরেন্দ্র মোদীর রাজ্য। কয়েক হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি ডুবে যাবে জেনেও যেখানে সর্দার সরোবর বাঁধ তৈরি করা হয় বহু বছরের আন্দোলন দুরমুশ করে দিয়ে।

এই লেখা যখন লিখতে বসেছি, তখন পর্যন্ত শ দেড়েক মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। তাতে কী-ই বা এসে গেল? গুজরাটে অনেক কাজ হয়, তার মধ্যে খানিকটা দুর্নীতি তো হবেই। আমাদের এখানে তো কাজই হয় না – এমন ধারণা দিয়েই অনেকে এ ঘটনার ব্যাখ্যা করবেন সন্দেহ নেই। আসলে উন্নয়ন মানে যে শহরের উন্নয়ন; অর্থাৎ ফ্লাইওভার, রাস্তা, সেতু, পার্ক, রেলিং, ফুটপাথ নির্মাণ – একথাই আমরা শিখেছি। অমর্ত্য সেন বাঙালি বলে আমাদের দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না। কিন্তু তিনি উন্নয়নের যে অন্যতর সংজ্ঞা দিয়েছেন তাতে আমাদের আগ্রহ নেই। তাঁর কাজের ভিত্তিতে অর্থনীতিবিদ মহবুব উল হকের তৈরি হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে গুজরাট সচরাচর মাঝের সারির উপরে উঠতে পারে না। ২০২১ সালেও অন্ধ্রপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ সমেত ১৯ রাজ্যের সঙ্গে গুজরাট মিডিয়াম এইচডিআই ক্যাটেগরিতেই ছিল। সে রাজ্যের অনেক জায়গায় যে ছেলেমেয়েরা সাঁতরে নদী পেরিয়ে স্কুলে যায়, শিক্ষার হাল ভাল নয়, স্বাস্থ্যের হাল ভাল নয় – এসব খবরও বাসি। কিন্তু ওসবে আমরা আমল দেব কেন? পেল্লাই কারখানা হলেই যে প্রচুর কর্মসংস্থান হয় না, উন্নয়ন হয় না সেসব আমরা এখনো টের পাইনি যে। তাই তো পশ্চিমবঙ্গে সিঙ্গুর এখনো রাজনৈতিক চাপান উতোরের বিষয়।

আরও পড়ুন কী ঢাকছে সরকারি চোলি? কেনই বা ঢাকছে?

সংবাদসংস্থা আইএএনএস জুন মাসে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, গুজরাটে বেকার সমস্যা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে গ্রাম পঞ্চায়েতের এক্সিকিউটিভ প্রধানের ৩৪০০ শূন্য পদে চাকরির জন্য ১৭ লক্ষ আবেদন পত্র জমা পড়েছিল। কিন্তু গুজরাট বিধানসভার আসন্ন নির্বাচনের প্রচারের দিকে নজর রাখলেই বোঝা যায় ওসব কোনো ইস্যু নয়। ইস্যু হল হিন্দুত্ব। অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলছেন টাকায় লক্ষ্মী, গণেশের ছবি ছাপানো উচিত আর বিজেপির বিদায়ী মন্ত্রিসভা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লাগু করার জন্য কমিটি গঠন করছে। সেতু ভেঙে পড়া এমন কী ব্যাপার? জীবন মৃত্যু তো ভগবানের হাতে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা তুলে দেওয়াই কি উদ্দেশ্য?

পশ্চিমবঙ্গের কাগজ, টিভি চ্যানেলের মালিক, সম্পাদক, উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিশেষজ্ঞ ও বিখ্যাতদের ছেলেপুলেরা প্রায় কেউই সরকারি স্কুলে পড়ে না। ফলে দিব্যি ওসব স্কুলের রোগবালাইকে অগ্রাহ্য করে থাকা গিয়েছিল।

ঘটনাচক্রে আমার পিতৃকুল, মাতৃকুলের অধিকাংশ আত্মীয় পেশায় শিক্ষক। তাঁরা অনেকেই আজ প্রয়াত। রাজনৈতিকভাবে সরকারি, বিরোধী, দুয়ের মাঝামাঝি— নানারকম দলের সদস্য, সমর্থক হলেও গত শতকের নয়ের দশকের শেষদিকে দেখতাম সকলেই একটি ব্যাপারে একমত— পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলো ক্রমশ উঠে যাবে। কারণ ওই স্কুলগুলো ভরে থাকত মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেমেয়েতে, যাদের বাবা-মায়েরা ক্রমশ তাদের বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। আমার শিক্ষক আত্মীয়রা বলতেন এই প্রবণতা বাড়তে বাড়তে একসময় সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলোতে পড়ে থাকবে কেবল তারা, যাদের বাবা-মায়েরা বেসরকারি স্কুলের খরচ পোষাতে পারবেন না। তাদের পড়াশোনা হল কি হল না তা নিয়ে শিক্ষকদেরও বিশেষ মাথাব্যথা থাকবে না, সরকারও দায়সারা স্কুল চালাবে। তখন কথাগুলো বিশ্বাস করিনি, কিন্তু আজ পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষার অবস্থা দেখে সেই আত্মীয়দের বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ দর্শনের পারদর্শিতা স্বীকার না করে উপায় নেই।

আমাদের ছাত্রাবস্থাতেই সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলো ধুঁকতে শুরু করেছিল। তার জন্যে দায়ী করা হয় বামফ্রন্ট সরকারের প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে। কিন্তু এই শতকে কী কারণে মধ্যবিত্ত বাবা-মায়েরা সরকারি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক স্কুলগুলোকে ত্যাগ করলেন তা অত সহজে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। একটা কারণ অবশ্যই কোন মাধ্যমে পড়ানো হচ্ছে তা নিয়ে বাঙালির অত্যধিক মাথাব্যথা। শিক্ষার গুণমান নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে অনেক বাবা-মাই ছেলেমেয়ের ইংরেজিতে গড়গড়িয়ে কথা বলতে পারা নিশ্চিত করতে চান। অর্থাৎ স্কুল তাঁদের কাছে প্রকৃতপক্ষে সারাদিনব্যাপী স্পোকেন ইংলিশ ক্লাস। সঙ্গে অন্য বিষয়গুলো পড়িয়ে দিলেই হল। ফলে সাধ্যাতীত এবং বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা নেই এমন মাইনে দিয়েও বেসরকারি স্কুলেই তাঁরা ছেলেমেয়েকে পাঠান। সে ধরনের অনেক স্কুলেরই শিক্ষকদের যোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয়, ফলে অনেকসময় ওই অভিভাবকরাই পড়াশোনার মান নিয়ে একান্ত আলোচনায় সন্দেহ প্রকাশ করেন। অথচ পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলোতে যাঁরা পড়ান, তাঁরা অন্তত ১৯৯৭-৯৮ সাল থেকে একটা প্রতিযোগিতামূলক লিখিত পরীক্ষা এবং ইন্টারভিউতে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে নিযুক্ত হচ্ছিলেন। তা সত্ত্বেও মধ্যবিত্তের বেসরকারি স্কুলে ছোটার পিছনে কি ‘বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে’ কুসংস্কার? নাকি বাজার অর্থনীতির ‘যা পয়সা দিয়ে কিনতে হয় না তা ভাল নয়’ আদর্শে আস্থা? উত্তর যা-ই হোক, মধ্যবিত্ত ছেলেমেয়েরা সরে যাওয়ায় স্কুলের প্রতি শিক্ষকদের এবং সরকারের আগ্রহ যে কমে গেছে তাতে সন্দেহ নেই। কিছুদিন আগেই তো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ স্কুল। বহু জায়গায় স্কুল চালু রাখতে শিক্ষকরা এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রছাত্রী ধরে আনছেন।

শিক্ষকসমাজ অবশ্যই কোনও মনোলিথ নয়। পশ্চিমবঙ্গের সব শিক্ষক একইরকম ভাবেন বা সকলেই ফাঁকিবাজ, বসে বসে মাইনে পান— এমন একটা মত ইদানীং রীতিমত জনপ্রিয় হয়েছে। সে মতে সায় দিচ্ছি না। কারণ ফাঁকিবাজ সব পেশাতেই ছিল, আছে এবং থাকবে। তা বলে একটা গোটা পেশার সকলেই অলস, অনিচ্ছুক কর্মী হয়ে যান না। কিন্তু যা বলার, তা হল স্কুলের পঠনপাঠন নিয়ে শিক্ষকদের নিরুৎসাহ করার সবরকম চেষ্টা সরকারি তরফে করা হয়েছে। মন দিয়ে পড়াতে চান এমন অনেক শিক্ষকই সখেদে বলেন, সিলেবাস শেষ করানো অতিমারির আগেও রীতিমত কঠিন ছিল। কারণ তাঁদের অনেকখানি সময় চলে যায় বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের জন্য ছেলেমেয়েদের তথ্যাবলি সংগ্রহ ও নথিবদ্ধ করতে, জিনিসপত্র বিলি করতে। স্কুলগুলো প্রায় রেশন দোকানের চেহারা নেয়, ক্লাস কাটছাঁট করতে হয়। তার উপর বর্তমান সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ছুটি কত বেড়েছে তা নিয়েও আলাদা গবেষণা হতে পারে। পুজোর ছুটি ফুরোতেই চায় না, গরমের ছুটি প্রায়শই নির্ধারিত দিনের আগেই শুরু হয়ে যায়, তারপর বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আগে ছুটির তালিকার বেশিরভাগটা ঠিক করতেন স্কুল কর্তৃপক্ষ, এখন চলে অঘোষিত এক-রাজ্য-এক-ছুটি নীতি। ফলে দক্ষিণবঙ্গ গরমে পুড়লে শীতল উত্তরবঙ্গেও স্কুল বন্ধ থাকে। কোনও স্কুল কর্তৃপক্ষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সরকারি ছুটি অগ্রাহ্য করে পঠনপাঠন চালু রাখতে চাইলে শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়। এর উপর আছে শূন্য পদের বিপদ। বহু স্কুলে অশিক্ষক কর্মীদের পদ ফাঁকা পড়ে আছে। সে কাজও শিক্ষকদেরই করতে হয়। এতসব করে আর কতটুকু পড়ানো সম্ভব?

এসব অভিভাবকদেরও বিলক্ষণ চোখে পড়ে। ছেলেমেয়েকে সরকারি স্কুলমুখো না করার পিছনে এসব কারণও কাজ করে এবং সেজন্য তাঁদের দোষ দেওয়া চলে না। উপর্যুক্ত বিপত্তিগুলোর চেয়েও শিক্ষকদের কাজকর্মে বেশি প্রভাব ফেলছে শিক্ষকের অভাব। যেসব স্কুলে এখনও ছাত্রছাত্রীর অভাব নেই, সেখানেও শিক্ষকের অভাব প্রকট। স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের যে স্বচ্ছ ও নিয়মিত ব্যবস্থা তৃণমূল সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল তাকে লাটে তুলে দেওয়ার ফলে বহু স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। উপরন্তু ইচ্ছামত বদলির ব্যবস্থায় কোথাও একই বিষয়ের শিক্ষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি, অথচ অন্য কোনও বিষয়ের একজন শিক্ষকও নেই।

অর্থাৎ শুধু যে রাস্তায় বসে থাকা (এবং মধ্যরাতে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যাওয়া) হবু শিক্ষকরাই অবিচারের শিকার, তা নয়। যাঁরা স্কুলে পড়াচ্ছেন তাঁরাও ভাল নেই। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সেইসব ছাত্রছাত্রীদের, যাদের বাবা-মা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্কুলের মাইনে জোগাতে পারেন না। অতিমারির সময়ে সরকার স্কুল খোলার নামই করছিল না, যেনতেনপ্রকারেণ বন্ধ রাখছিল দেখে অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন স্কুলগুলোকে লাটে তুলে দেওয়াই উদ্দেশ্য। সে কাজে অতিমারিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা যথার্থ। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, নিয়োগের পরীক্ষা নিয়ে বেলাগাম দুর্নীতি এবং চালু চাকরির পরীক্ষাটাকে অকেজো করে দেওয়া যে কেবল কর্মসংস্থান সংক্রান্ত ইস্যু নয়, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা লাটে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনারও অংশ সেকথা গত এগারো বছরে কারও মনে হয়নি। সেই ২০১৩ সালেই যখন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু পরিষ্কার বলেছিলেন, এসএসসি কি দুর্গাপুজো যে প্রতি বছর করতে হবে? একথা যে স্কুলশিক্ষার উপরে কুঠারাঘাত সেকথা রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীরা ছাড়া কেউ তখন বলেননি। পরবর্তীকালে যখন তদানীন্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় ঘোষণা করলেন এসএসসি, টেট ইত্যাদি পরীক্ষার মেধাতালিকা প্রকাশ করা হবে না, পাশ করলে প্রার্থীর কাছে এসএমএস যাবে কেবল, তখনও রাজ্যের লেখাপড়া জানা মানুষ কোনও উচ্চবাচ্য করেননি। একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হবে সরকারি উদ্যোগে অথচ তার মেধাতালিকা প্রকাশ করা হবে না— এ যে দুর্নীতির পথ প্রস্তুত করা, তা তখন কোন সাংবাদিক লিখেছিলেন? কোন শিক্ষাবিদ একটি উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লিখেছিলেন? আজকের দুর্নীতির নিন্দা করতে গিয়ে অনেকেই বাম আমলের নিয়োগ দুর্নীতি টেনে আনছেন। এতে হয়ত নিরপেক্ষতা প্রমাণ হয়, কিন্তু অস্বীকার করা হয় যে এসএসসি, টেট দুর্নীতির সঙ্গে প্রাক-এসএসসি যুগে টাকা দিয়ে চাকরি পাওয়ার তুলনা বস্তুত আলুর সঙ্গে আপেলের তুলনা। কারণ সেখানে স্থানীয় স্তরে দুর্নীতি হত, যা বন্ধ করতে সরকার কেন্দ্রীয় পরীক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিল। এখানে সরকার সচেতনভাবে একটি চালু ব্যবস্থা ধাপে ধাপে তুলে দিয়েছে যাতে কেন্দ্রীয়ভাবে দুর্নীতি করা সম্ভব হয়। যাঁরা বলেন পাঁচ টাকার দুর্নীতিও দুর্নীতি আর পাঁচ কোটি টাকার দুর্নীতিও দুর্নীতি, তাঁদের দেখলে সশরীরে ঈশ্বর দর্শনের মত অনুভূতি হতে পারে। কিন্তু তাতে একথা অপ্রমাণ হয় না যে তাঁরা যে কোনও কারণেই হোক স্থিতাবস্থার সমর্থক। পরিস্থিতির চাপে বর্তমান সরকারকে খানিকটা গাল দিচ্ছেন মাত্র। হয়ত কিছুটা বিবেকের দায়ে, কিছুটা নইলে লোকে খারাপ বলবে বলে।

আরও পড়ুন শিক্ষক দিবসের প্রশ্ন: শিক্ষকদের বাঁচাবে কে?

তৃণমূল সরকারের বরাবরের সমর্থক কেউ কেউ যেমন রাতের অন্ধকারে মহিলাসুদ্ধ আন্দোলনকারীদের পুলিসের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দৃশ্যে আর স্থির থাকতে পারেননি। বলেছেন বলপ্রয়োগ কাম্য নয়, আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যা মিটিয়ে ফেলা হোক। এসব বিবৃতি দিলে হয়ত বিবেকের ডাকে সাড়া দেওয়া হয় বা সাধারণ মানুষের কাছে নিজের ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল করা যায়। কিন্তু এগুলির বক্তব্য দুর্বোধ্য। ভাবখানা এমন যেন সরকার বাহাদুর এ দুর্নীতিতে যুক্তই নন। তৃতীয় পক্ষ টাকা নিয়ে চাকরি দিয়ে যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করেছে। এখন সরকার এদের অভিভাবকের আসনে বসে বুঝিয়েসুঝিয়ে মিটিয়ে দিলেই সব মিটে যায়। যেন সরকার মেধাতালিকা প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয়নি, প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী এই মামলায় হাজতবাস করছেন না, যেন আদালত কান ধরার আগে সরকার নিজেই দোষীদের খুঁজে খুঁজে শাস্তি দেওয়া শুরু করেছিল।

হিন্দিভাষীরা বলে থাকেন “দাল মে কুছ কালা নেহি হ্যায়, পুরা দাল হি কালা হ্যায়।” পশ্চিমবঙ্গের নিয়োগ দুর্নীতির ব্যাপারটাও যে তাই তা এখনও অনেকেই বুঝতে পারছেন না বা বুঝতে চাইছেন না। কারণ এই সত্য তাঁদের রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। কিন্তু চুপ করে থাকতেও পারছেন না, কারণ যে ছেলেমেয়েগুলোকে লাঞ্ছিত হতে দেখা গেছে তারা মোটের উপর নিজের শ্রেণির। এরা মইদুল ইসলাম মিদ্যার মত বিরোধী দলের মিছিলে আসা বা আনিস খানের মত দলীয় রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া গেঁয়ো মুসলমান নয় যে তাদের মৃত্যুতে চোখ ফিরিয়ে থাকা যাবে। পশ্চিমবঙ্গের কাগজ, টিভি চ্যানেলের মালিক, সম্পাদক, উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিশেষজ্ঞ ও বিখ্যাতদের ছেলেপুলেরা প্রায় কেউই সরকারি স্কুলে পড়ে না। ফলে দিব্যি ওসব স্কুলের রোগবালাইকে অগ্রাহ্য করে থাকা গিয়েছিল। কিন্তু এখন যারা মার খাচ্ছে তাদের মুখের ভাষা শুনে, বেশভূষা দেখে পরের ছেলে পরমানন্দ, যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ ভেবে আর থাকা যাচ্ছে না। এতদিনে সত্যিই গা শিরশির করছে— এরপর কোনও ইস্যুতে যদি আমাদের ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গেই সরকার এরকম ব্যবহার করে! এতদিন যারা মার খেয়েছে, নানাভাবে অত্যাচারিত হয়েছে তাদের অবস্থা এবং অবস্থানকে নানা যুক্তিতে আমল না দেওয়া এই মানুষদের জন্যই বোধহয় কবি লিখেছিলেন “যাদের করেছ অপমান/অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।”

চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন হয়ত শেষ অবধি ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে সরকারি প্রতাপে বা কৌশলে, হয়ত সব যেমন চলছিল তেমনই চলবে। কিন্তু তারা অন্তত সাতে পাঁচে না থাকা বাঙালির হাড়ে ঠকঠকানি ধরানোর কাজটুকু করতে পেরেছে বলে ধন্যবাদার্হ।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত