অমর্ত্য সেন, ক্লিকটোপ আর মাদাম তুসো

অমর্ত্যকে গালি দেওয়ার কাজটাও কেবল বাঙালিরাই করছেন। বিজেপির মধ্যেও কেবল তথাগত, দিলীপ ঘোষরাই। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।

আনন্দবাজার পত্রিকা স্মরণীয় শিরোনাম দেওয়ার জন্য বিখ্যাত। এই তো সেদিন পেলের প্রয়াণে শিরোনাম হল ‘আমার সম্রাট স্বপ্নে থাক’। শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’ পড়া থাকলে পাঠকের কাছে এই শিরোনামের রস কিঞ্চিৎ ঘনীভূত হবে সন্দেহ নেই, কিন্তু না থাকলেও রসে তিনি পুরোপুরি বঞ্চিত হবেন না। খবরের কাগজে এই ধরনের শিরোনামকেই সেরা বলে ধরা হয়ে এসেছে চিরকাল। অমর্ত্য সেন যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন, তখন আমার মত যাদের সবে গোঁফদাড়ি গজিয়েছিল, তাদের নির্ঘাত এই মধ্যবয়সে এসেও মনে আছে সেই অবিস্মরণীয় শিরোনাম – ‘মর্তের সেরা পুরস্কার বাংলার অমর্ত্যর’। তখন ইন্টারনেট থাকলেও সোশাল মিডিয়া ছিল না, সংবাদমাধ্যমের ঘাড়ে ক্লিক আদায় করার চাপ ছিল না, ক্লিকটোপের প্রয়োজন ছিল না। এখন আছে। অনিবার্যভাবে ওয়েব মাধ্যমের এই কৌশল অন্য মাধ্যমগুলোতেও ঢুকে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে খবরের কাগজের সাংবাদিকদের কাজের মূল্যায়নও মালিকরা করছেন কোন প্রতিবেদনে ওয়েবে কতগুলো হিট হল তা দিয়ে। কোনো কোনো কাগজ অনলাইন সংস্করণের জন্য আলাদা কর্মীবাহিনী না রেখে এক মাইনেয় দুটো কাজই করিয়ে নিচ্ছে সাংবাদিকদের দিয়ে। ফলে খবরের কাগজের শিরোনামেও সত্যনিষ্ঠা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, বুদ্ধির দীপ্তি, ভাষার নৈপুণ্য গুরুত্ব হারাচ্ছে, প্রাধান্য পাচ্ছে শিরোনামে “অশ্বত্থামা হত” বলে চোখ টেনে নিয়ে প্রতিবেদনে বেশ পরের দিকে “ইতি গজ” বলার প্রবণতা। সেই ধারাতেই দিন তিনেক আগে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন নিয়ে শীতের বাংলা কদিন উত্তপ্ত। তার শিরোনাম – মমতা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য, বলেই দিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ‘ভারতরত্ন’ অমর্ত্য সেন।

এই শিরোনামে চোখ পড়া মাত্রই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে অমর্ত্য মমতা ব্যানার্জিকে একটা শংসাপত্র দিয়েছেন। এমনকি যে পাঠক মমতার অনুরাগী এবং/অথবা তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক, তাঁর পক্ষে এমন ভেবে নেওয়াও অসম্ভব নয় যে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে অমর্ত্য মমতাকেই যোগ্যতম বলেছেন। কারণ অমর্ত্যের বিজেপিবিরোধিতা সর্বজনবিদিত; তিনি তো আর নরেন্দ্র মোদীকে যোগ্যতম বলবেন না। এই ধারণা আরও দৃঢ় হবে মমতার প্রতিক্রিয়া জানলে। তিনি বলেছেন “অমর্ত্য সেন বিশ্ববরেণ্য পণ্ডিত, আমাদের অন্যতম গর্ব। তাঁর পর্যবেক্ষণ আমাদের পথ দেখায়। তাঁর উপদেশ আমাদের কাছে আদেশ। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন নিশ্চয় সবাইকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।” যেন অমর্ত্য তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার উপদেশ দিয়েছেন।

অথচ আনন্দবাজারের প্রতিবেদনটা পড়তে গেলে একেবারে অন্য সত্যের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। আসলে সংবাদসংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া (পিটিআই)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অমর্ত্য অনেক কথাবার্তা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটা ছিল ইংরেজিতে। দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার ব্যাপারে মমতার ক্ষমতা সম্পর্কে অমর্ত্যের নিজের ব্যবহৃত শব্দগুলো হল, “It’s not that she does not have the ability to do it. She clearly has the ability. On the other hand, it’s yet not established that Mamata can pull the forces of public dismay against the BJP in an integrated way to make it possible for her to have the leadership to put an end to the fractionalisation in India.”

এই ability শব্দটার বাংলা তর্জমা ক্ষমতা এবং যোগ্যতা – দুইই হতে পারে। অমর্ত্য যদি qualification শব্দটা ব্যবহার করতেন তাহলে তিনি যে যোগ্যতাই বুঝিয়েছেন তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকত না। কিন্তু তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় তিনি যোগ্যতাই বুঝিয়েছেন, তাহলেও পরের শব্দগুলো অমর্ত্যের অনাস্থার ইঙ্গিত। নিজের মত করে তর্জমা না করে বরং আনন্দবাজারের প্রতিবেদন থেকেই গোটা উক্তিটা তুলে দেওয়া যাক – “এমন নয় যে তাঁর এটা করার ক্ষমতা নেই। এটা খুব স্পষ্ট, তাঁর সেই ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু অন্য দিকে, এটা এখনও প্রতিষ্ঠিত নয় যে, মমতা বিজেপির বিরুদ্ধে জনগণের হতাশার জায়গাগুলোকে এক ছাতার তলায় এনে ভারতে বিভেদের রাজনীতির অবসান ঘটাতে নেতৃত্ব দেবেন।”

কিমাশ্চর্যম তৎপরম! শিরোনামের ‘যোগ্য’ প্রতিবেদনে এসে ‘ক্ষমতা’ হয়ে গেল! অর্থাৎ মমতার যোগ্যতা হল অশ্বত্থামা। সে যে মৃত সে খবর শিরোনামে দিয়ে অনলাইনে ক্লিক এবং অফলাইনে জোর আলোচনা নিশ্চিত করার পর প্রতিবেদনে ক্ষমতার কথা বলা হল, পাঠককে নিচু স্বরে জানিয়ে দেওয়া হল, যে মারা গেছে সে দ্রোণাচার্যের পুত্র নয়, একটা হাতি মাত্র। এ যে সম্পাদকমণ্ডলীর সচেতন সিদ্ধান্ত তাতে সন্দেহ নেই, কারণ অমর্ত্য ability শব্দটা কোন অর্থে ব্যবহার করেছেন তা নিয়ে অত বড় কাগজের সম্পাদকমণ্ডলী তো দূরের কথা, কোনো সাধারণ পাঠকেরও সন্দেহ থাকবে না প্রসঙ্গ জানা থাকলে। সোশাল মিডিয়ার যুগে অপ্রাসঙ্গিকভাবে মহাপুরুষদের উদ্ধৃত করা অতিমারীতে পরিণত হয়েছে অনেকদিন হল। এই কৌশলে কেউ প্রমাণ করতে চান রবীন্দ্রনাথ বা আম্বেদকর মুসলমান, খ্রিস্টানদের মোটেই সুবিধের লোক মনে করতেন না। কেউ আবার স্বামী বিবেকানন্দকে বামপন্থী প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। সেই কুঅভ্যাসকে প্রশ্রয় না দিয়ে আমরা বরং আনন্দবাজারের তর্জমা থেকেই দেখে নিই অমর্ত্য কী প্রসঙ্গে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে ওই মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন “আমার মনে হচ্ছে, একাধিক আঞ্চলিক দল আগামী দিনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে। আমার মনে হয়, ডিএমকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দল। তৃণমূলও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজবাদী পার্টির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু আমি জানি না, এই মুহূর্তে তারা কী অবস্থায় রয়েছে।”

স্পষ্টতই অমর্ত্যের মাথায় রয়েছে তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল এবং তার সাপেক্ষে লোকসভায় ডিএমকে, তৃণমূল কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টি লোকসভায় কত আসন পেতে পারে সেই হিসাব। এই রাজ্যগুলোর সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে ওই তিন দলের প্রাপ্ত আসন যোগ করলে দাঁড়ায় ৪৮৫ (তৃণমূল ২১৫ + ডিএমকে ১৫৯ + সমাজবাদী পার্টি ১১১)। এই তিন রাজ্যে মোট লোকসভা আসনের সংখ্যা ১৬১ (পশ্চিমবঙ্গ ৪২ + তামিলনাড়ু ৩৯ + উত্তরপ্রদেশ ৮০)। সাধারণত একটা লোকসভা আসনের মধ্যে থাকে সাতটা বিধানসভা আসন। আন্দাজ পাওয়ার জন্য তৃণমূল, ডিএমকে, সমাজবাদী পার্টির ৪৮৫ আসনকে সাত দিয়ে ভাগ করলে দাঁড়ায় প্রায় ৭০। এই সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য আগেই বলেছেন ২০২৪ নির্বাচন বিজেপি একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে জিতে যাবে বলে তিনি মনে করেন না। তিনি সঠিক প্রমাণিত হলে বিজেপির আসন সংখ্যা এখনকার চেয়ে কমে যাবে, ত্রিশঙ্কু লোকসভা হওয়াও অসম্ভব নয়। বলা বাহুল্য, সেক্ষেত্রে ৭০টা আসন অমূল্য। সেই কারণেই আঞ্চলিক দলগুলোর কথা বলা।

কিন্তু বিধানসভা আর লোকসভা নির্বাচন যে এক নয় সেকথা অমর্ত্য বিলক্ষণ জানেন। উপরন্তু লোকসভা নির্বাচন আসতে আসতে এই রাজ্যগুলোর ভোটারদের এই দলগুলো সম্পর্কে মতও বদলাতে পারে নানা কারণে, হয়ত ইতিমধ্যে বদলেও গেছে। সেসব মাথায় রেখেই তিনি যোগ করেছেন “কিন্তু আমি জানি না, এই মুহূর্তে তারা কী অবস্থায় রয়েছে।” এতৎসত্ত্বেও ক্লিকটোপ ফেলতে এবং নিঃসন্দেহে সম্পাদকীয় নীতির কারণে শিরোনামে এসে গেল, অমর্ত্য বলেছেন মমতা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য। অন্যান্য সংবাদমাধ্যমও পত্রপাঠ এই নিয়ে হইচই শুরু করে দিল।

এ পর্যন্ত তবু ঠিক ছিল। সংবাদমাধ্যম এমনটাই করে থাকে, করা তাদের ব্যবসায়িক স্বাধীনতা। হয়ত বাকস্বাধীনতাও। আমাদের বাকস্বাধীনতা হল এমন আচরণের সমালোচনা করা। মুশকিল হল, ব্যাপার সেখানে থেমে থাকেনি। বামপন্থী এবং দক্ষিণপন্থী বাঙালিরা ৮৯ বছরের লোকটাকে গালাগাল দিতে নেমে পড়েছেন। তথাগত রায়ের মত দক্ষিণপন্থী, যাঁরা প্রায়শই বলে থাকেন অমর্ত্য অর্থনীতি কিস্যু জানেন না (অর্থাৎ প্রযুক্তিবিদ তথাগত অর্থনীতি জানেন), তাঁরা ওঁকে নিজের বিষয়ের বাইরে কথা বলতে নিষেধ করছেন। এদিকে তৃণমূল শাসনে তিতিবিরক্ত অনেক বামপন্থী অমর্ত্যকে ‘চটিচাটা’ তকমা দিচ্ছেন। ঠিক যেভাবে বিজেপির সমালোচনা করলেই অমর্ত্যকে তাদের ট্রোলবাহিনী কংগ্রেসের ধামাধরা বলে অভিহিত করে। নোবেলজয়ী হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, যাঁর এ দেশে কোনোদিন পা না রাখলেও চলে, তাঁর যে কারোর ধামা ধরার বা চটি চাটার প্রয়োজন নেই তা এদের বোঝাবে কে?

আরও পড়ুন রেউড়ি সংস্কৃতি: যে গল্পে ডান-বাম গুলিয়ে গিয়েছে

সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী কিন্তু মমতার ক্ষমতা সম্পর্কে অমর্ত্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন। তারপর নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বলেছেন, বিজেপিবিরোধী শক্তিগুলিকে এক করা দূরের কথা, মমতা বরং তাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে চেষ্টা করবেন।

#EISAMAY “অমর্ত্য সেন সঠিক সংশয় প্রকাশ করছেন যে বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলিকে কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একজোট করতে পারবেন? আমরা বলছি একজোট করার বদলে বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলি যাতে একজোট না হতে পারে তৃণমূল তার চেষ্টা করছে” মন্তব্য সুজন চক্রবর্তীর ⁦@SUJAN_SPEAK⁩ #CPIM #TMC #BJP PIC.TWITTER.COM/IJZIID5DZY— prasenjit bera (@prasenjitberaES) January 14, 2023

কিন্তু তাতে কী? কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর বিখ্যাত (বা কুখ্যাত) গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মুখে ছাই দিয়ে সোশাল মিডিয়ার যুগে সব বাম দলেই কমবেশি ‘গো অ্যাজ ইউ লাইক’ চালু হয়ে গেছে। সেই প্রথা মেনে সিপিএম কর্মী, সমর্থকরা বিভিন্ন মাত্রায় অমর্ত্যের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেই চলেছেন। তাঁদের সবচেয়ে ভদ্র অংশ বলছে, বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে। কেউ কেউ আবার গভীর পর্যবেক্ষণের পর মন্তব্য করছে অমর্ত্য নাকি বেশ কিছুদিন হল মমতার ধামা ধরেছেন। কারোর বক্তব্য, এসব শান্তিনিকেতনে নিজের জমি, বাড়ি বাঁচাতে হার্ভার্ডের অধ্যাপকের মরিয়া চেষ্টা। বিজেপি সমর্থক বাঙালিরাও মোটামুটি এইসব অভিযোগই তুলছে বৃদ্ধের বিরুদ্ধে। অমর্ত্য সেনের চোদ্দ পুরুষের ভাগ্য যে মেম বিয়ে করেছেন বলে নোবেল পেয়েছেন – এই পুরনো অভিযোগটা এখনো ট্রাঙ্ক থেকে বের করে মাঘের রোদে মেলে দেওয়া হয়নি।

পরিতাপের বিষয়, যদিও পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকার নিয়ে সারা দেশের সংবাদমাধ্যমে লেখালিখি হয়েছে এবং প্রায় একই সময়ে দ্য ওয়ার ওয়েবসাইটের সাংবাদিক করণ থাপারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারকে আরও বিশদে এবং কঠোরতম ভাষায় তুলোধোনা করেছেন, তা নিয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ায় প্রায় কোনো আলোচনা নেই।

অমর্ত্যকে গালি দেওয়ার কাজটাও কেবল বাঙালিরাই করছেন। বিজেপির মধ্যেও কেবল তথাগত, দিলীপ ঘোষরাই। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এমনকি বিজেপিবিরোধী বিদ্বানদের গাল না পাড়লে যাঁর ভাত হজম হয় না, সেই অমিত মালব্য পর্যন্ত এখন পর্যন্ত একটা টুইট করেননি। অথচ শেষ জীবিত পৃথিবীবিখ্যাত বাঙালিকে বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী বাঙালিরা স্রেফ অপছন্দের রাজনৈতিক নেতা সম্পর্কে একটি মন্তব্যের কারণে যা খুশি তাই বলে চলেছেন।

বাঙালি মেধার এহেন অবনমন কৌতুককর। আনন্দবাজার ক্লিকটোপ ফেলেছে এবং সে টোপ গেলা মানুষের সংখ্যাধিক্য প্রমাণ করছে, শিরোনাম পেরিয়ে প্রতিবেদন অবধি যাওয়া লোকেরা আজকাল ব্যতিক্রম। আরও মজার কথা হল, ওই কাগজটাকে যাঁরা বাজারি কাগজ বলে হেলা শ্রদ্ধা করেন চিরকাল, সেই বামপন্থীরাও এই টোপ কম গেলেননি। অর্থাৎ প্রকাশ্যে বাজারি বলে গাল দিলেও পড়ার বেলায় ওই কাগজটাই পড়েন। শুধু তাই নয়, সম্ভবত কেবল ওটাই পড়েন। নইলে অন্য একাধিক জায়গায় প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারের প্রতিবেদন থেকেই জেনে ফেলতে পারতেন, অমর্ত্য মমতাকে কোনো শংসাপত্র দেননি।

অমর্ত্য সেন ভগবান নন। দুনিয়ার সব ব্যাপারে তিনি যা বলবেন তাই মেনে নিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বস্তুত সমাজবিজ্ঞানে ঠিক আর ভুলের সীমারেখা স্থির নয়, ফলে অত বড় পণ্ডিতের বক্তব্যকে একজন কলেজপড়ুয়াও চ্যালেঞ্জ জানাতেই পারে। কিন্তু যা খুশি বলা আর ভিন্নমত পোষণ করা এক জিনিস নয়। বামফ্রন্ট আমলে বেশ কয়েকবার অমর্ত্য সেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমালোচনা করেছিলেন, সরকার একমত হয়নি। একবার তো অমর্ত্যকে ভুল প্রমাণ করতে গণশক্তির পাতায় কলম ধরেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত।

আজকের পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য এসব কথা স্মরণ করিয়ে লাভ নেই। ডান, বাম নির্বিশেষে মাদাম তুসো মার্কা মৃণাল সেনে মজে থাকা বাঙালি ভিন্নমত হতে গেলে যে লিখতে হয়, নিদেনপক্ষে প্রতিপক্ষের বক্তব্য পুরোটা পড়তে হয় – সেকথা কেন বিশ্বাস করতে যাবে?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

অমিতাভ মুখ খুললেন, তবে শরশয্যায়

এই বাজারে কোনো প্রোডাকশন হাউস মহাভারতের মত বিশাল প্রকল্প হাতে নেবে এমন সম্ভাবনা কম। তবু যদি তেমন কিছু হয়, পিতামহ ভীষ্মের চরিত্রের জন্য অমিতাভ বচ্চনের চেয়ে ভাল কাউকে ভাবা যায় কি?

একসময় খবরের কাগজের বিনোদনের পাতায় নিয়মিত ব্যবধানে খবর বেরোত, বলিউডে বা টলিউডে অমুক নির্দেশক মহাভারত বা মহাভারত অবলম্বনে কোনো বড় বাজেটের ছবি করছেন। তার কটা শেষপর্যন্ত মুক্তি পেয়েছে বা বক্স অফিসে সফল হয়েছে জানি না। তবে ওরকম খবর বেরোলে কদিন প্রকাশিত কাস্টিং নিয়ে সিনেমাভক্তদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা চলত। কে কোন চরিত্রে অভিনয় করছে আর কোনটা করলে ভাল হত – এই আলোচনায় দিব্যি সময় কাটত। অতিমারীর সময় থেকেই এ দেশের সিনেমাশিল্প সংকটে। বলিউড রীতিমত বেকায়দায়। এক ওটিটিতে রক্ষা নেই, বয়কট দোসর। তার উপর হিন্দিতে ডাব হয়ে বলিউডকে টেক্কা দিচ্ছে তামিল, মালয়ালম, কন্নড় ভাষার ছবি। এই বাজারে কোনো প্রোডাকশন হাউস মহাভারতের মত বিশাল প্রকল্প হাতে নেবে এমন সম্ভাবনা কম। তবু যদি তেমন কিছু হয়, পিতামহ ভীষ্মের চরিত্রের জন্য অমিতাভ বচ্চনের চেয়ে ভাল কাউকে ভাবা যায় কি? ইংরেজিতে ‘এল্ডার স্টেটসম্যান’ বলে একটা কথা আছে। মহাভারতের আখ্যানে সেই এল্ডার স্টেটসম্যান নিঃসন্দেহে ভীষ্ম। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরব পক্ষে যোগ দিলেও পাণ্ডব পক্ষের কাছে তিনি শ্রদ্ধাভাজন তাঁর প্রজ্ঞা, প্রবীণতা এবং বহু বিষয়ে নিরপেক্ষ বিচারক্ষমতার কারণে। অমিতাভ এখন যে বয়সে পৌঁছেছেন, সিনেমার জগতে তাঁর অভিজ্ঞতার যা দৈর্ঘ্য এবং বৈচিত্র্য, ওই জগতের বাইরেও ভারতের সব ক্ষেত্রের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে তাঁর যা গ্রহণযোগ্যতা, তাতে আর কাকে এল্ডার স্টেটসম্যান বলা যায়?

এহেন অমিতাভ ২৮তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছেন তা নিয়ে হইহই পড়ে গেছে। হ্যারি পটারের ভক্তরা জানেন, জাদুর দুনিয়ায় ভল্ডেমর্টের নামোচ্চারণ বারণ। আজকের ভারতে তেমনি বাকস্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করা বারণ, করলেই ঝামেলা হয়। আজকের ভারতে বিখ্যাত কেউ যদি বলেন বাকস্বাধীনতা আছে, তাহলেই সরকারপক্ষের লোকেরা উদ্দাম নৃত্য শুরু করেন, যাঁরা বলেন নেই তাঁদের এই সুযোগে আরেকবার মিথ্যাবাদী, দেশদ্রোহী ইত্যাদি বলে নেন। ফলে অভিযুক্ত দেশদ্রোহীরা বিখ্যাতকে বলেন “ব্রুটাস, তুমিও”? আর যদি অমিতাভের মত কেউ বলে ফেলেন বাকস্বাধীনতা নেই, তাহলে তো মহাপ্রলয়। সরকারপক্ষ বলেন, এত বড় কথা! বাকস্বাধীনতা নেই? “আমি আছি, গিন্নী আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে – /সবাই মিলে কামড়ে দেব মিথ্যে অমন ভয় পেলে।” কিন্তু অমিতাভের মন্তব্যের পরে কিঞ্চিৎ উলটপুরাণ দেখা গেছে। কামড় পরিবার, থুড়ি, সঙ্ঘ পরিবারের ট্রোলবাহিনীর মাথা অমিত মালব্য অমিতাভের প্রশংসা করেই টুইট করেছেন। কারণ মন্তব্যটা কলকাতায় করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে। অতএব মালব্যের ব্যাখ্যা, অমিতাভ ‘টাইর‍্যান্ট’ মমতার মুখের সামনে আয়না ধরেছেন। এমন টাইর‍্যান্ট যার রাজত্বে নির্বাচনোত্তর হিংসা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের প্রাক-নির্বাচন হিংসা বা নির্বাচনোত্তর হিংসা নিঃসন্দেহে বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী, কিন্তু বাকস্বাধীনতা ব্যাপারটার সীমা ওটুকুর মধ্যেই বেঁধে দেওয়ার চালাকি বিজেপির আই টি সেলের প্রধান ছাড়া আর কে-ই বা করবেন? আই টি সেলের আর যে দোষই থাক না কেন, সোশাল মিডিয়ার যুগে কোন জিনিসটা লোকে ভাল ‘খায়’ তা বুঝতে ওদের মত কেউ পারে না। অমিতাভের ভক্তকুল যে এখনো বিজেপির ভক্তকুলের চেয়ে বড়, ফলে এই মন্তব্যের জন্য চিরাচরিত প্রথায় তাঁকে আক্রমণ করলে যে হিতে বিপরীত হতে পারে তা চট করে বুঝে নিয়ে বন্দুকের নল মমতার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন মালব্য। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন অর্ধসত্য প্রচার করার সহজাত ক্ষমতায় তৈরি অরিজিৎ সিংয়ের গান গাওয়ার ভিডিও ক্লিপ। সে ক্লিপে সুকৌশলে কেটে দেওয়া হয়েছে ‘বোঝে না সে বোঝে না’ গানের লাইন দুটো, রয়েছে শুধু ‘রং দে তু মোহে গেরুয়া’। যাতে দেখলেই মনে হয়, মমতার অনুরোধে গান গেয়ে অরিজিৎ বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি গৈরিক বাহিনীর লোক। অরিজিৎ তা হতেই পারেন, হওয়া তাঁর বাকস্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার অন্তর্গত। কিন্তু ঘটনা হল, ওই চতুর এডিটিং ছাড়া শুধু সেদিনের ঘটনা দিয়ে অরিজিতের সমর্থন প্রমাণ হয় না।

এ শুধু বিজেপি প্রোপাগান্ডা। স্বভাবতই পাল্টা প্রচারে নেমে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস, নেতৃত্বে সোশাল মিডিয়ার মুক্তিসূর্য মহুয়া মৈত্র। দু পক্ষে যা চলছে তাকে আমরা গেঁয়ো লোকেরা বলি প্যাঁচাল পাড়া। আমাদের রাজনৈতিক বিতর্ক এখন প্যাঁচাল পাড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। নইলে অমিতাভের বক্তৃতা নিয়ে নিবিষ্ট আলোচনার অবকাশ ছিল। তিনি সিনেমার লোক, সিনেমার কথাই বলেছেন। সিনেমার বহু আগে আমাদের দেশের নাচ, গান, নাটকের মত শিল্পমাধ্যমগুলোর উৎস ছিল ধর্মস্থানগুলো, সেকথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। সিনেমা আসার পর পরাধীন ভারতে কীভাবে সেন্সরকে ফাঁকি দিয়ে ইংরেজবিরোধী বক্তব্য ছবিতে ঢুকিয়ে দিতেন শিল্পীরা – সে ইতিহাস টেনে এনেছেন। ১৯৫২ সালের সিনেমাটোগ্রাফ আইনের কথা বলেছেন এবং তারপরেই বলেছেন “মঞ্চে উপবিষ্ট আমার সহকর্মীরা নিশ্চয়ই একমত হবেন যে আজও নাগরিক স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে।” সহকর্মী বলতে সেখানে তখন উপস্থিত বলিউডের শাহরুখ খান, রানী মুখার্জির মত তারকারা। টলিউডের কে নয়?

সাম্প্রতিককালে ধর্মীয় ভাবাবেগের দোহাই দিয়ে কীভাবে একের পর এক ফিল্ম, ওয়েব সিরিজকে আক্রমণ করেছে হিন্দুত্ববাদীরা – সেকথা কারোর অজানা নয়। মাত্র কয়েকদিন হল প্রকাশিত হয়েছে শাহরুখ ও দীপিকা পাড়ুকোনের মুক্তির অপেক্ষায় থাকা পাঠান ছবির বেশরম রঙ্গ গানের ভিডিও। সোয়া তিন মিনিটের ভিডিওতে দীপিকার বিকিনির রং বদলেছে বারবার, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাঁকে কেন গেরুয়া (নাকি কমলা?) বিকিনিতে ইসলাম ধর্মাবলম্বী শাহরুখের বাহুবন্ধনে দেখা গেছে তা নিয়ে তোলপাড় চলছে। এ বছরের গোড়ায় লাল সিং চাড্ডা মুক্তি পাওয়ার আগে থেকেই সোশাল মিডিয়ায় ছবিটাকে বয়কট করার ডাক দেওয়া হয়ে গিয়েছিল।

কারণ আমির খান একবার বলেছিলেন দেশের যা অবস্থা হচ্ছে তাতে স্ত্রী কিরণ রাও একদিন আলোচনা করেছিলেন, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত কিনা। এরকম অসংখ্য উদাহরণ গত কয়েক বছরের ঘটনাবলী থেকে দেওয়া যায়। পদ্মাবত ছবি নিয়ে কী কাণ্ড হয়েছিল নিশ্চয়ই কেউ ভোলেননি। ছবির শুটিং চলাকালীন সেটে আগুন ধরিয়ে দেওয়া দিয়ে শুরু, দীপিকার নাক কেটে নেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল। ছবির নাম প্রথমে ছিল ‘পদ্মাবতী’, রাজপুত বীরদের দৌরাত্ম্যে শেষমেশ নাম বদলে ছবির মুক্তি নিশ্চিত করতে হয়েছিল পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনশালীকে। অথচ ছবিটা রীতিমত হিন্দুত্ববাদী। একে প্রচলিত কাহিনিকে ইতিহাস বলে দেখানো হয়েছে, তার উপর আলাউদ্দিন খিলজী যেন নরখাদক। অর্থাৎ এই ছবি জলজ্যান্ত প্রমাণ যে ভারতে বাকস্বাধীনতা এমন বিপন্ন, সকলকে খুশি না করে সিনেমা বানানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে কতিপয় প্রযোজক, নির্দেশকের এক বিশেষ ধরনের ছবি সরাসরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। এই আবহে অমিতাভ ওই কথাগুলো বলেছেন। মালব্য মোটেই বোকা লোক নন। অমিতাভের কথা প্রসঙ্গে এসব আলোচনা যে অনিবার্য তা তিনি ভালই জানেন। সে আলোচনা গুলিয়ে দিতেই অপ্রাসঙ্গিকভাবে নির্বাচনী হিংসার কথা টেনে এনেছেন।

মুক্তকণ্ঠে অমিতাভের প্রশংসা করা যেত দেশের আজকের অবস্থায় এই কথাগুলো বলার জন্য, কারণ তাঁর কথার দাম যে সকলের চেয়ে বেশি তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কিছু অসুবিধা আছে। বিজেপির প্রোপাগান্ডার জবাবে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল যা যা বলছে ‘তাতে ঠাকুরঘরে কে রে, আমি তো কলা খাইনি’ মনোভাব স্পষ্ট। মুক্তিসূর্য মহুয়াও অমিতাভকে বাংলার জামাই-টামাই বলে আলোচনার গভীরে না গিয়ে তুই বেড়াল না মুই বেড়াল স্তরেই থাকার চেষ্টা করেছেন। কারণ সিনেমার কৈলাস পর্বতের বাসিন্দা অমিতাভ খবর না রাখলেও মহুয়া বিলক্ষণ জানেন রাজনৈতিক বিরোধীদের উপর আক্রমণ বাদ দিলেও পশ্চিমবঙ্গে বাকস্বাধীনতা কী দারুণ স্বাস্থ্যের অধিকারী। ফ্যাসিবাদের সাত-সতেরো লক্ষণ তাঁর কণ্ঠস্থ, তাই তিনি জানেন ভবিষ্যতের ভূত বলে একটা বাংলা ছবি সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশনের ছাড়পত্র পাওয়ার পরেও পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ হলে দেখানো হচ্ছিল না। নির্মাতাদের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত দৌড়তে হয়েছিল।

সেই ছবির পরিচালক অনীক দত্ত তার আগের কলকাতা চলচ্চিত্রোৎসবে চতুর্দিকে বাংলা ছবির দিকপালদের ছবির বদলে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি থাকার নিন্দা করেছিলেন।

অমিতাভের প্রশংসা করা যাচ্ছে না ঠিক এই কারণেই। তিনি জরুরি কথা বলেছেন, কিন্তু কায়দাটা ধরি মাছ না ছুঁই পানি। কারোর নাম না করে কিছু ভাল ভাল কথা বলা যে যুগপৎ শিরোনামে আসা নিশ্চিত করা আর বিপদসীমার বাইরে থাকার কৌশল তা তাঁর মত শোম্যান ভাল করেই জানে। উপরন্তু পিতামহ ভীষ্মের সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্য প্রবীণতা আর অভিজ্ঞতাতেই শেষ নয়। আমরা জানি দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময়ে ভীষ্ম টুঁ শব্দটি করেননি। না, একটু ভুল হল। দ্রৌপদী নিজের সম্মানরক্ষার শেষ চেষ্টা হিসাবে প্রশ্ন করেন, পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির কি নিজের আগে পাঞ্চালীকে বাজি রেখে হেরেছিলেন, নাকি পরে? যদি নিজেকে আগে বাজি রেখে হেরে থাকেন তাহলে তো দ্রৌপদীর উপর অধিকার আগেই হারিয়েছেন। সুতরাং পাঞ্চালী বিজিত নন। এ প্রশ্নের উত্তরে ভীষ্ম বলেছিলেন এসব কূটতর্কের বিষয়। এ দিয়ে মীমাংসা হতে পারে না। তাছাড়া যুধিষ্ঠির নিজেই তো ধর্মপুত্তুর। তাঁর মত করে ধর্ম আর কে বোঝে? অমিতাভও কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশে যা যা ঘটেছে তা নিয়ে কখনো মুখ খোলেননি। যে বলিউডের তিনি বেতাজ বাদশা, তার উপর একের পর এক আক্রমণেও নিশ্চুপ ছিলেন। সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর গোটা বলিউডকে মাদকাসক্ত বলে প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছে বিজেপির তরফে, অমিতাভ-পত্নী জয়া রাজ্যসভায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন, অমিতাভ কিন্তু মুখ খোলেননি। আজ হঠাৎ চৈতন্যোদয় কী কারণে তা বোঝা শক্ত।

অবশ্য কবি বলেছেন “প্রভাত কি রাত্রির অবসানে।/যখনি চিত্ত জেগেছে, শুনেছ বাণী,/তখনি এসেছে প্রভাত।” অমিতাভের চিত্ত যদি শেষমেশ জেগে থাকে তাতে ক্ষতি নেই। তবে যুগে যুগে অবতারের রূপ বদলানোর মত কংগ্রেস আমলে যিনি কংগ্রেসি, উত্তরপ্রদেশে মুলায়ম সিং যাদবের রমরমার কালে অমর সিংয়ের মিত্রতায় যিনি সপরিবারে সমাজবাদী, যিনি কুছ দিন তো গুজারো গুজরাত মেঁ ক্যাম্পেনে দেশের বারোটা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা জ্যোতির্লিঙ্গকেই দেশের একতার প্রতীক বলতে আপত্তি করেন না, তাঁর চিত্ত হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে ঝলমল করছে এ কথা সহজে বিশ্বাস হতে চায় না, এই আর কি।

আরও পড়ুন ক্রিকেটার তুমি কার?

মঞ্চে অন্য যাঁরা ছিলেন তাঁদের উপস্থিতিও যে বিশ্বাস উৎপাদনে সহায়ক নয় তা বলাই বাহুল্য। মুখ্যমন্ত্রী বা কলকাতার মহানাগরিকের কথা বাদই দিলাম। অমিতাভ যখন বক্তৃতা দিচ্ছেন, ঠিক পিছনেই দেখতে পেলাম পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর মুখ। অমিত শাহের মত প্রবল গণতান্ত্রিক মানুষ কলকাতায় এসে যাঁর আতিথ্য গ্রহণ করেন, সঙ্গীতের ব্যাপারে বিশুদ্ধবাদী, প্রচারবিমুখ সেই অজয়বাবু সিনেমার উৎসবে কী করছিলেন কে জানে! এঁদের মধ্যে দাঁড়িয়ে বাকস্বাধীনতার জন্য হা হুতাশ করেছেন অমিতাভ। অবশ্য শরশয্যাই তো ভীষ্মের নিয়তি।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

এনডিটিভি প্রথম নেটওয়ার্ক নয় যা সরকারের মুখপত্র হতে চলেছে, শেষ নেটওয়ার্ক। বিপদটা সেইখানে।

এনডিটিভির দখল এশিয়ার সবচেয়ে বড় ধনী গৌতম আদানির হাতে চলে যাওয়া নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রণয়-রাধিকার হাত থেকে লাগাম ছুটে যাওয়া মাত্রই পদত্যাগ করেছেন ম্যাগসাসে পুরস্কার জয়ী সাংবাদিক রবীশ কুমার। এই খবরটা আরও বেশি পীড়া দিচ্ছে অনেককে। কারণটা শুধুমাত্র কিছু মানুষের প্রিয় টিভি নেটওয়ার্ক অপ্রিয় লোকের হাতে চলে যাওয়া বা সেখান থেকে প্রিয় অ্যাঙ্করের প্রস্থান নয়। এনডিটিভির আদানিকরণ নিয়ে সারা পৃথিবীতে আলোচনা হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় থাকা লোকেদের হাতে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ার মালিকানা চলে যাওয়া যে গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর, বাকস্বাধীনতার বারোটা বাজানোর পক্ষে যথেষ্ট, তা সারা পৃথিবীর গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষ বুঝে ফেলেছেন। উপরন্তু আদানি এনডিটিভিকে নিয়ে কী করবেন তা নিয়েও কোনো সংশয় রাখেননি। তিনি ফাইন্যানশিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন “স্বাধীনতা মানে হল সরকার ভুল কিছু করলে তা বলার স্বাধীনতা। কিন্তু একইসঙ্গে সরকার যখন রোজ ঠিক কাজ করে তখন সেটা বলার সাহসও থাকা উচিত। সেটাও আপনাকে বলতে হবে।” পৃথিবীর সবচেয়ে জনদরদী সরকারও যে রোজ ঠিক কাজ করে না তা বোঝার জন্য নোবেল পুরস্কার প্রাপকদের মত বুদ্ধিমান হওয়ার দরকার নেই আর আদানির মত সফল ব্যবসায়ী নির্বোধও নন। ফলে তিনি যে আসলে বলতে চাইছেন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা সংবাদমাধ্যমের কাজ নয় – তা স্পষ্ট। একটা সাড়ে তিন দশকের পুরনো মিডিয়া নেটওয়ার্কের মালিকানা এমন লোকের হাতে চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

কিন্তু এনডিটিভি কি প্রথম চ্যানেল যা শাসকের মুখপাত্র হতে বসেছে? নাকি এনডিটিভি ছিল বলে ভারতের গণতন্ত্র জীবন্ত ছিল, আর আদানির নিয়ন্ত্রণে চলে গেলেই নিমেষে তার মৃত্যু হবে? যদি দুটো প্রশ্নের উত্তরই ‘না’ হয়, তাহলে এত কান্নাকাটির কী আছে? নাগরিক ডট নেটের মত একটা বিকল্প সংবাদমাধ্যমে আমারই বা এ নিয়ে প্রবন্ধ ফেঁদে বসার কী আছে? রবীশ কিছুদিন আগেই, সম্ভবত কী হতে চলেছে জেনে, নিজের ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। সাবস্ক্রাইবারের যথারীতি অভাব হয়নি, তাঁর পদত্যাগের কথা চাউর হওয়ার পর সংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে। সুতরাং সেই চ্যানেল থেকে যে বিস্তর আয় হবে তাতে সন্দেহ নেই। রবীশের সে আয়ের ভাগ তো আমি পাব না, নাগরিক ডট নেটও পাবে না। তাহলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মত “কিসের শোক করিস ভাই/আবার তোরা মানুষ হ” বলে অন্য কাজে লেগে পড়লেই তো হয়। কী দরকার এ বিষয়ে ভাবনাচিন্তার?

এসব কথা অনেকেই বলাবলি করছেন। আরও বলাবলি হচ্ছে, এনডিটিভির ভারতীয় সাংবাদিকতায় এমন কিছু অবদান নেই যে তাদের জন্য চোখের জল ফেলতে হবে। তারাও আর পাঁচটা সংবাদমাধ্যমের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। যাঁরা মনে করছেন এনডিটিভি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা শেষ চ্যানেল ছিল, তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এনডিটিভি কেন্দ্রের শাসককে প্রশ্ন করলেও বহু রাজ্যের শাসককে ছাড় দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারই সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সুতরাং শোকার্ত হয়ে পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আবার কংগ্রেসের অনেক সদস্য, সমর্থক এনডিটিভির উপর চটে আছেন অন্য কারণে। তাঁদের বক্তব্য এরা বিজেপিকে যত প্রশ্ন করেছে, বিরোধী আসনে থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেসকে তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন করেছে। নরেন্দ্র মোদীর চেয়ে বেশি আক্রমণ করেছে রাহুল গান্ধীকে। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে দিনরাত আলোচনা করেছে, বিজেপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই।

উপরের সবকটা অভিযোগেরই কিছু না কিছু সারবত্তা আছে। ঠিক সেজন্যেই এনডিটিভির আদানিকরণ নিয়ে আলোচনা অপরিহার্য।

প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার, অনেকেই একটা কথা ভুল বুঝেছেন। এনডিটিভির নিয়ন্ত্রণ এখনো প্রণয় রায় ও তাঁর স্ত্রী রাধিকা রায়ের হাত থেকে বেরিয়ে যায়নি। তাঁরা এখনো এনডিটিভির বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সে আছেন, থাকতে বাধাও নেই। কারণ দুজনের হাতেই এনডিটিভির বেশকিছু শেয়ার রয়েছে।

কিন্তু এনডিটিভির প্রোমোটার হল আরআরপিআর হোল্ডিং নামক সংস্থা। তাঁরা পদত্যাগ করেছেন সেই সংস্থার ডিরেক্টরের পদ থেকে, কারণ আরআরপিআরের দখল অগাস্ট মাসেই আদানি গ্রুপের হাতে চলে গেছে, ফলে এনডিটিভির ২৯.১৮% শেয়ারও এখন আদানি গ্রুপেরই হাতে। এনডিটিভির আরও ২৬% শেয়ার দখল করার জন্য গৌতম আদানি ২২ নভেম্বর এক ওপেন অফার লঞ্চ করেছেন, যার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ। আদানির লক্ষ্যপূরণ হলে এনডিটিভির বেশিরভাগ শেয়ার চলে যাবে আদানি গ্রুপের হাতে। পূরণ না হলেও অন্য যারা শেয়ার কিনে নেবে তাদের শেয়ারগুলো আরও বেশি দামে কিনে নেওয়ার রেস্ত আদানির আছে, রায় দম্পতির নেই। ফলে আদানির এনডিটিভির ম্যানেজমেন্টের সম্পূর্ণ দখল নিয়ে নেওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা। ইতিমধ্যেই আদানি গ্রুপের চিফ টেকনোলজি অফিসার সুদীপ্ত ভট্টাচার্য, সাংবাদিক সঞ্জয় পুগলিয়া ও সেন্থিল চেঙ্গলবরায়ন আরআরপিআরের ডিরেক্টর নিযুক্ত হয়েছেন। প্রণয়-রাধিকার এনডিটিভি থেকে বিদায় অনিবার্য – একথাও বলাই যায়। কারণ আদানির চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে ওপেন অফারে যারা শেয়ার কিনেছে তাদের শেয়ারগুলো ফের কিনে নেওয়ার অবস্থা রায় দম্পতির থাকলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টিই হত না। তাঁরা ২০০৯-১০ সালে বিশ্বপ্রধান কমার্শিয়াল প্রাইভেট লিমিটেড নামে এক সংস্থা থেকে ৪০৩ কোটি টাকা ধার নিয়েছিলেন। সে ঋণের শর্তই ছিল, ঋণ শোধ করতে না পারলে আরআরপিআরের ৯৯.৯% শেয়ার বিশ্বপ্রধান দখল করে নিতে পারবে। আদানি প্রথমে ওই বিশ্বপ্রধানেরই প্রধান হয়ে বসেন টাকার জোরে, তারপর অনাদায়ী ঋণের দায়ে এনডিটিভির দখল নেওয়ার কাজ শুরু করেন।

শোধ দিতে পারবেন না এমন ঋণ নিলেন কেন, তা-ও আবার ২০০৮ সালে তৈরি হওয়া বিশ্বপ্রধানের মত এক গোলমেলে ‘হোলসেল ট্রেডিং ফার্ম’ থেকে, যার মালিকানা হাত বদলাতেই থাকে, যার মালিকানা একসময় ছিল রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের হাতে, পরে মুকেশ আম্বানিরই ঘনিষ্ঠ মহেন্দ্র নাহাতার হাতে চলে যায়? এসব প্রশ্ন তুলে এনডিটিভির আজকের অবস্থার জন্য রায় দম্পতিকে দায়ী করাই যায়। এমনকি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া (সেবি)-ও এ নিয়ে প্রণয়-রাধিকাকে শোকজ করেছিল। এনডিটিভিতে কাজ করেই বিখ্যাত হওয়া বরখা দত্তের মত কেউ কেউ এখন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তির্যক ভাষায় টুইট করতে লেগেছেন, এনডিটিভি আগে আম্বানির হাতে ছিল। তখন যদি স্বাধীন থেকে থাকে, এখন আদানির হাতে গেলেই পরাধীন হবে কেন? আসলে ইস্যুটা হল টিভির রেভিনিউ মডেলটাই ভেঙে পড়েছে।

AM CONFUSED. WHEN MUKESH AMBANI OWNED 30% OF NDTV IT WAS FREE AND WHEN GAUTAM ADANI PURCHASES THAT 30% ITS OBITUARY TIME? PRAY, HOW? SO MUCH POLITICKING & HUMBUG IN THE DISCOURSE BOTH FOR OR AGAINST, BOTH NARRATIVES IGNORE THE ELEPHANT IN THE ROOM- REVENUE MODEL OF TV IS BROKEN.— barkha dutt (@BDUTT) December 1, 2022

এতদ্বারা বরখা আম্বানিকে গণতান্ত্রিক বললেন, নাকি আদানিকে গণতান্ত্রিক বললেন? নাকি দুজনের কেউই বাকস্বাধীনতার পক্ষে বিপজ্জনক নন বললেন? বোঝা কঠিন। কিন্তু ঘটনা হল কর্পোরেট মিডিয়ার রেভিনিউ মডেল যে গোলমেলে তা কোনো নতুন কথা নয়। আয়ের জন্যে বিজ্ঞাপন নির্ভরতা এবং বিজ্ঞাপনের জন্য টিআরপি নির্ভরতা বহুকালের সত্য। বরখা যখন স্বয়ং কর্পোরেট মিডিয়ার হর্তাকর্তা ছিলেন তখনো তাই ছিল। ভারতে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর সংবাদমাধ্যমে, বিশেষত ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমে, দুটো জিনিস ক্রমান্বয়ে ঘটেছিল। এক, সংবাদমাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক চাকরি চালু হওয়া আর সাংবাদিকদের পারিশ্রমিক অনেকখানি বেড়ে যাওয়া। এককথায় অন্যদের ঘাড়ে পা দিয়ে সাংবাদিকদের স্বর্গারোহণ আরম্ভ হয়। যে সাংবাদিক যত উপরে আছেন তাঁর মাইনে তত বাড়ে। রাজস্ব বেড়েছে কিনা, এত মাইনের টাকা আসবে কোথা থেকে – এসব প্রশ্ন তখন বরখার মত শীর্ষস্থানীয়রা করেননি। ২০০৮-০৯ বা ২০১০, অর্থাৎ যে সময়ে প্রণয়-রাধিকা ওই বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছিলেন, ঠিক সেই সময়টাতে এই মাইনে বাড়ার হার চরমে পৌঁছয় সারা দেশের সংবাদমাধ্যমে। কেবল টিভি চ্যানেলগুলোতে নয়, খবরের কাগজেও।

আমার নিজের অভিজ্ঞতাই বলি। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার ধুঁকতে থাকা দ্য স্টেটসম্যান কাগজের চাকরি ছেড়ে পাড়ি দিই হায়দরাবাদে, ২৮,০০০ টাকা মাস মাইনেয়। সেখানে যে কাগজে যোগ দিই, সেখানে কয়েক মাসের মধ্যেই কোনো অজ্ঞাত কারণে বেতন কাঠামোর পুনর্বিন্যাস হয়। নিউজরুমের বড়, মেজ, সেজ, ছোট সকলেরই বেতনের বিপুল বৃদ্ধি হয়। যাদের পদোন্নতি হয়নি তাদেরও বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়। আমার মত যাদের পদোন্নতি হয়েছিল তাদের বৃদ্ধি হয় চোখ কপালে তোলার মত। আমার বেতন গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মাসিক ৭০,০০০ টাকায়। আমি তখন নেহাতই মাঝের স্তরের সাংবাদিক, সবে সিনিয়র সাব-এডিটর থেকে চিফ সাব হয়েছি। অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, এক্সিকিউটিভ এডিটর বা এডিটরদের মাইনে কোথায় পৌঁছেছিল তা কেবল কল্পনাই করতে পারি। আমরা কেউ কি খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম কাগজের আয় বেড়েছে কিনা? অথচ সকলেই জানতাম কাগজের বিক্রি কিন্তু রাতারাতি বাড়েনি।

সেটা ২০০৮ সালের কথা। তখন সারা ভারতের ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে প্রতিযোগিতা চলছে সাংবাদিকদের মাইনে বাড়ানোর। আবার ২০১০ সালে পশ্চিমবঙ্গে সারদা গ্রুপের বাংলা কাগজ চালু হওয়ার সময়ে একইরকম জিনিস দেখা গিয়েছিল। সে কাগজ বছর দুয়েকের বেশি না চললেও বাংলা ভাষার সাংবাদিকদের সঙ্গে ইংরেজির সাংবাদিকদের পারিশ্রমিকের যে লজ্জাজনক ব্যবধান ছিল, তা কমাতে ঘটনাটা কিছুটা সাহায্য করেছিল।

এখন কথা হল, টিআরপির খোঁজে বহুকাল ধরেই ভূত পেত্নী দত্যি দানো তাবিজ কবচ দেখায় বহু হিন্দি চ্যানেল। সে কাজ রবীশরা কখনো করেননি। ২০১২-১৩ সাল থেকে ওসবের সঙ্গে হিন্দি, ইংরেজি সব চ্যানেলেই যুক্ত হয়েছে প্রায় আঁচড়ে কামড়ে দেওয়ার মত সান্ধ্য মজলিশ, মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানো, উদারনৈতিক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে লোক ক্ষ্যাপানো, সব ধরনের বামপন্থীদের দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া, ভুয়ো খবর প্রচার, বিজেপির অলিখিত মুখপত্রের কাজ করা। এনডিটিভি এগুলোর কোনোটাই করেনি। অথচ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে বাজারের চলতি হারের কমে মাইনে দেওয়া চলে না। উপরন্তু সাংবাদিকদের মাইনে একটা সংবাদমাধ্যমের খরচের একটা অংশ মাত্র। তথ্যপ্রমাণ বলছে খুব বড় অংশও নয়। তার চেয়ে খবর সংগ্রহ করা এবং টিভির ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ক্রমোন্নয়নের খরচ অনেক বেশি। সেখানেও প্রতিযোগীদের সঙ্গে তাল মেলাতে টাকার প্রয়োজন হয়। আমরা যারা স্বাধীন সংবাদমাধ্যম চাই, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে এমন সংবাদমাধ্যম চাই, তারা কি টিআরপি বাড়িয়ে বেশি বিজ্ঞাপন পাওয়ার দিকে মন না দিয়ে যেনতেনপ্রকারেণ ঋণ নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টাকে বেশি অপরাধ বলে গণ্য করব? বরখার টুইটসূত্রে খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এনডিটিভির শেয়ার হোল্ডাররা মন্তব্য করছেন, ওটা বাজে কোম্পানি। আমাদের কী করে ডিভিডেন্ড দেওয়া যায় তার দিকে কোনোদিন নজর দেয়নি। একটা সংবাদমাধ্যমকে স্রেফ কোম্পানি হিসাবে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গিই কি আমাদের মূল্যায়নের মাপকাঠি হওয়া উচিত? ভেবে দেখা প্রয়োজন। আমরা তো কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার নই। আমরা বরং, পুঁজিবাদী লবজে, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের স্টেক হোল্ডার।

এনডিটিভি প্রথম নেটওয়ার্ক নয় যা সরকারের মুখপত্র হতে চলেছে, শেষ নেটওয়ার্ক। বিপদটা সেইখানে। ভারতে যতগুলো বড় বড় টিভি নেটওয়ার্ক আছে তার প্রায় সবকটাই ইতিমধ্যেই শাসক দলের গর্ভে চলে গেছে। বাকি ছিল এনডিটিভি। বলতে দ্বিধা নেই, এনডিটিভিও একটি পুঁজিবাদী সংস্থা। সে পুঁজিবাদের নিয়মেই চলেছে। এমন নয় যে সারা ভারতের সংবাদমাধ্যমে যখন ছাঁটাই চলেছে, এনডিটিভি তখন সমস্ত কর্মচারীর স্বার্থরক্ষা করেছে। কিন্তু রায় দম্পতি কখনো কারাত দম্পতির মত নিজেদের বিপ্লবী বলে দাবি করেছেন বলে তো মনে পড়ে না। তাঁরাও ব্যবসাই করছিলেন। ব্যবসা প্রায় তিন দশক ক্রমশ বড় হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের যা কাজ তা করতে নিতান্ত ব্যর্থ হয়নি, দায়িত্ব অস্বীকারও করেনি। কোনো সন্দেহ নেই, সব ইস্যুতেই এনডিটিভির অবস্থান ন্যায়ের পক্ষে বা দুর্বলের পক্ষে ছিল না। থাকার কথাও নয়। অন্তত বামপন্থীদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যে সংবাদমাধ্যম শেষপর্যন্ত মালিকের শ্রেণিস্বার্থেরই প্রতিভূ। এনডিটিভি তার চেয়ে আলাদা হবে এরকম প্রত্যাশা ছিল কি? থাকলে কেন ছিল? তবে এই একটি নেটওয়ার্কে কিন্তু বুলডোজার দিয়ে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ বা আসামে প্রতিবাদীদের ঘর ভেঙে দেওয়ার জন্যে বিজেপি নেতাদের দিকে আঙুল তোলা চলত। উমর খালিদ, ভারভারা রাও, স্ট্যান স্বামী, জি এন সাইবাবা, গৌতম নওলাখারা যে খলনায়ক নন সেটা বলা চলত। বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে পরে লিবারেশন নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হত। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য নিয়ে কথা হত। আজ দেশের যা অবস্থা, তাতে এমন একটা মঞ্চের গুরুত্ব কম নয়। এই মঞ্চের অবলুপ্তিতে শোকাহত না হলেও উল্লসিত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

ভারতীয় সাংবাদিকতায় এনডিটিভির অবদান কী, সে সম্পর্কে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলেছেন অনিন্দ্য চক্রবর্তী। এনডিটিভি নেটওয়ার্কের দু-দুটো চ্যানেলের একদা ম্যানেজিং এডিটর এই সাংবাদিক রায় দম্পতির আরও অনেক অবদানের কথা লেখার সঙ্গে সঙ্গে লিখেছেন, ভারতের আর সব প্রতিষ্ঠানের মতই এনডিটিভিতেও বিলক্ষণ লুটিয়েন্স এলিটসুলভ ব্যাপার-স্যাপার আছে। কিন্তু অন্য কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠান একজন রবীশ তৈরি করতে পারেনি। কারণ একজন হিন্দি ভাষার সাংবাদিককে অতখানি জায়গা এবং কাজের স্বাধীনতাই কেউ দেয়নি।

এ কথার মাহাত্ম্য বোঝানো শক্ত। কারণ আমরা বাঙালি অ্যাংলোফাইলরা বুঝে উঠতে পারি না আঞ্চলিক ভাষার সাংবাদিকতার গুরুত্ব কতখানি। স্বাধীনতার পর ৭৫ বছর কেটে গেল, অথচ আজও ভারতে প্রগতিশীলতার ভাষা ইংরেজি। আমরা দ্য ওয়্যার, নিউজলন্ড্রি, ক্যারাভ্যান, অল্টনিউজ, বুম লাইভ ইত্যাদি ইংরেজি ভাষার বিকল্প সংবাদমাধ্যম পড়ি/দেখি বলে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির বাইরের সত্য জানতে পারি। কিন্তু এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইংরেজি পড়তে পারেন না, বলতে পারেন না, শুনে বুঝতেও পারেন না। তাঁদের কাছে উদারনৈতিক মতবাদ, ভুয়ো খবর পেরিয়ে সত্য পৌঁছে দেওয়ার দায় আমরা নিই না। আমরা কেবল তাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করেই খালাস। যে কারণে বাংলায় বিকল্প সংবাদমাধ্যম তৈরি করার তেমন প্রয়াস নেই। বাংলার টিভি চ্যানেলগুলোও দুর্গাপুজোয় অ্যাঙ্করদের শাড়ি পরিয়ে, তৃণমূল-বিজেপি তরজা দেখিয়ে, শোভন-বৈশাখী কেচ্ছা দেখিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। যে দক্ষিণপন্থীদের আমরা ঘোর অপছন্দ করি, তারা কিন্তু আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্ব বোঝে। তাই রিপাবলিক হিন্দি খুলে গেছে, রিপাবলিক বাংলাও চলে এসেছে। এই আবহে রবীশকে রায় দম্পতি যে স্থান দিয়েছিলেন তার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের সময়ের কোনো বাঙালি সম্পাদক বাংলায় সাংবাদিকতা করে বিশ্বমানের পুরস্কার পেতে পারবেন? পুরস্কার পাওয়া অবশ্য সবচেয়ে বড় কথা নয়। কিন্তু কলকাতার যে সম্পাদকদের ইদানীং আমরা প্রবাদপ্রতিম বলে মনে করি, রবীশের মত জনগণের দুঃখ দুর্দশা সাংবাদিকতায় নিয়ে আসার ব্যাপারেও তো তাঁদের অবদান শূন্য। ফলে রবীশের মত বিস্তীর্ণ এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষের উপর ইতিবাচক তো নয়ই, নেতিবাচক প্রভাব ফেলার ক্ষমতাও তাঁদের নেই। এঁদের প্রভাব হাওড়া ব্রিজ পেরোলেই শেষ বললে ভুল হয় না।

তার উপর আছে ম্যানেজারি করে সম্পাদক হওয়ার ভান। যে কারণে দেবেশ রায় অশোক দাশগুপ্তের কলামের সংকলনের আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন “এক সময় বাংলা খবরের কাগজে সম্পাদকের সক্রিয় সাংবাদিক হওয়ার বাধ্যতা ছিল। তাঁদের লিখতে হত – চাকরির কারণে নয়, নিজেদের মত দশজনকে জানানোর দরকারে ও দশজনের মত তৈরি করে তোলার দায় স্বীকার করে। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় থেকে সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার বাংলা সাংবাদিকতার সেই ইতিহাস তৈরি করেছেন। বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় শেষ সম্পাদক যিনি নিজে লিখতেন। যদিও তাঁর লেখা তাঁর নামে বেরোত না, তবু পাঠক এমনই চিনত তাঁর লেখা যে সম্পাদকীয়র নৈর্ব্যক্তিকে তিনি হারিয়ে যেতেন না। তারপর বাংলা কাগজে সম্পাদকের লেখালেখি উঠে গেছে।” বাংলার টিভি চ্যানেলের সম্পাদকরা আরও কম সাংবাদিক। তাঁরা সুটেড বুটেড হয়ে সান্ধ্য বিতর্ক পরিচালনা করা আর বিশিষ্টদের সাক্ষাৎকার নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করেন না। রবীশের মত আবর্জনার মধ্যে দাঁড়িয়ে “প্লিজ টেল মনমোহন সিং টু ওয়াচ রবীশ কি রিপোর্ট। ইংলিশ মে ওয়সে ভি ইন্ডিয়া ডেভেলপড লগতা হ্যায়” বলা এঁদের কল্পনাতীত। এই রবীশ টিভি মিডিয়ার বাইরে চলে গেলেন। এতে সত্যিই হয়ত তাঁর ক্ষতি নেই, কিন্তু টিভির দর্শকদের ক্ষতি। টিভির মাধ্যমে তিনি যত হিন্দিভাষী দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারতেন, যত ইংরেজি না জানা মানুষকে বিষাক্ত দক্ষিণপন্থার উল্টো ছবি দেখাতে পারতেন, ইউটিউব চ্যানেল দিয়ে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। কারণ ভারতে মোবাইল ডেটার দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে।

শেষ প্রশ্নে আসব, অর্থাৎ এসব নিয়ে নাগরিক ডট নেট কেন ভাবছে? তার আগে সংক্ষেপে কংগ্রেসি বন্ধুদের এনডিটিভির প্রতি রাগ নিয়ে দু-চার কথা বলে নিই। এনডিটিভি যে উদারনীতির অনুশীলন করেছে সেই ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’-এর সময় থেকে, তা কিন্তু আসলে নেহরুসুলভ উদারনীতি। জওহরলাল নেহরু যে গণতান্ত্রিক উদারতার ধারণায় বিশ্বাসী হয়ে বিদ্যায়তনিক ইতিহাস চর্চায় বামপন্থীদের জায়গা দিয়েছিলেন, ললিতকলা আকাদেমি বা সাহিত্য আকাদেমি নির্মাণ করেছিলেন – সেই উদারতা। ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ঋত্বিক ঘটকের মত ঘোর বামপন্থী, যাঁকে কমিউনিস্ট পার্টি নিজেই হজম করতে পারেনি, তিনি পড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন যে উদারনৈতিক ধারাবাহিকতায়, এনডিটিভি বস্তুত তারই অনুশীলন করেছে। ফলে তা মনমোহনী অর্থনীতির পক্ষ নেয়, আবার গান্ধী পরিবারের সমালোচনাও করে। এই জাতীয় উদারবাদীদের সঙ্ঘ পরিবারের কাছে কোনো প্রত্যাশা নেই, যত প্রত্যাশা কংগ্রেসের কাছে। স্বভাবতই কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন যখন দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে কোনো আগ্রহের বিষয়ই নয়, তখন এনডিটিভি ঘন্টার পর ঘন্টা শশী থারুর আর মল্লিকার্জুন খড়গের সাক্ষাৎকার দেখিয়ে গেছে। মোদী সারাক্ষণের রাজনীতিবিদ, রাহুলের কেন মাঝে মাঝেই ছুটির দরকার হয় – এ কথাও এনডিটিভির মঞ্চ থেকে বহুবার উঠেছে সম্ভবত এই কারণেই। কংগ্রেস এইসব সমালোচনা খোলা মনে নিতে পারলে তাদেরই লাভ হত। সমর্থকরা না নিলেও, রাহুল স্বয়ং বোধহয় নিয়েছেন। ভারত জোড়ো যাত্রা দেখে অন্তত সেরকমই মনে হয়।

দীর্ঘ লেখা এবার শেষ করব কেন এত দীর্ঘ লেখা, কেন আদৌ এ লেখা – সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে।

এ দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সবকটাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা চলছে। শুধু ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী এজেন্ডা তার কারণ নয়। একুশ শতকের পুঁজিবাদ কোনো প্রতিষ্ঠান পছন্দ করে না। সবকিছুকেই কোম্পানি করে তোলাই তার উদ্দেশ্য। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় হবে কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল কোম্পানি – লেখাপড়া হোক আর না-ই হোক। সেটা লাভজনক থাকলে চালানো হবে, নয়ত বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ শিক্ষা পণ্য। খবর এবং/অথবা তথ্য তো পণ্য বটেই। ফলে সংবাদমাধ্যমকেও প্রতিষ্ঠান থাকতে দেওয়া চলে না, তাকেও হতে হবে কোম্পানি। লাভজনক হলে চলবে, নইলে বন্ধ করে দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী হওয়া ভাল, যদি প্রতিস্পর্ধী প্রতিষ্ঠান তৈরি করার দম থাকে। সেসব যখন আমাদের নেই, তখন আজকের পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়া উদযাপন করা মূর্খামি। এতে গণতন্ত্রের পরিসরই যে সংকুচিত হচ্ছে সেকথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

অনেকেই দেখছি বিকল্প সংবাদমাধ্যমের উপর যাবতীয় দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হচ্ছেন। নাগরিক ডট নেটের সদস্য হিসাবে তা দেখে মন্দ লাগে না। কিন্তু মনে রাখা ভাল, ‘বিকল্প’ কথাটা অতি গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্পের ক্ষমতা সীমিত। যাঁরা পড়বেন তাঁরাই টাকা দেবেন, বিজ্ঞাপনের পরোয়া করতে হবে না – এই বিকল্প তৈরি হয়েছে বরখা কথিত অচল রেভিনিউ মডেলের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে। ইংরেজিতে এই মডেল (পোশাকি নাম ক্রাউড-ফান্ডেড মিডিয়া) অনেক ক্ষেত্রেই বেশ সফল, বাংলাতেও এই মডেল নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হবে নির্ঘাত। নাগরিক ডট নেট তো করবেই, আরও অনেকে করলে ভাল। কিন্তু এই মডেলের একটা সীমাবদ্ধতা আছে। বিজ্ঞাপন মডেলের মতই এই ব্যবস্থাতেও যিনি টাকা দেবেন নির্ঘাত তাঁর নিয়ন্ত্রণ থাকবে কনটেন্টের উপর। এক্ষেত্রে যেহেতু টাকা দিচ্ছেন অনেকে, সেহেতু একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ চলবে না বলে কনটেন্টে ভারসাম্য বজায় থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি অবশ্য। কিন্তু যিনি একেবারেই টাকা দিতে পারবেন না, তাঁর কথা কতটা উঠে আসবে? বাজারের যে সবজি বিক্রেতা পাঁচ টাকা দিয়ে দোকানে একটা কাগজ রাখেন বা যে রিকশাচালক বাড়ির টিভিতে দিনে অন্তত একবার খবর দেখেন, তিনি কি মোবাইলে নাগরিক ডট নেট পড়বেন টাকা দিয়ে? যদি না পড়েন, নাগরিক ডট নেট কি তাঁর সুখ দুঃখ তুলে আনার পরিশ্রম করতে পারবে? শ্রমের তো মূল্য আছে। অন্তত থাকা উচিত।

এছাড়াও আছে ঝুঁকির প্রশ্ন। ভারতের সব রাজ্যেই সাংবাদিক ও তাঁর পরিবার পরিজনদের উপর আক্রমণ ক্রমশ বাড়ছে, যে কোনো সমীক্ষায় উঠে আসছে সেই তথ্য। এনডিটিভির মত মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক তবু বিপদে পড়লে সংগঠনের আইনি ও সাংগঠনিক সাহায্য পান। নাগরিক ডট নেটের কেউ বিপদে পড়লে কার সাহায্য পাবে?

বিকল্প সংবাদমাধ্যম বা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যেই বেশ প্রতিষ্ঠিত যারা, সেই নিউজক্লিকের দপ্তরেও কারণে অকারণে সরকারি সংস্থার রেড হয়ে থাকে। মামলা ঠুকে হয়রানি চলে নিয়মিত। এই ধরনের মিডিয়ার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় দ্য ওয়্যার। তারা কিছুদিন আগে এক কেলেঙ্কারি করে বসেছিল। বিরাট খবর করছে মনে করে বিজেপির আই টি সেলের কর্তা অমিত মালব্য এবং ফেসবুককে জড়িয়ে সম্পূর্ণ ভুল খবর পরিবেশন করেছিল। সেই খবর পরে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ন্যক্কারজনক ঘটনা, কিন্তু সাংবাদিকতার ইতিহাসে অভূতপূর্ব নয়। যে কোনো কাজ করতে গেলেই ভুল হয়, খবর করতে গেলেও। কিন্তু সরকারবিরোধী সংবাদমাধ্যম হওয়া এখন এ দেশে বিরাট অপরাধ। তাদের ভুল অমার্জনীয়। তাই কেবল দপ্তরে নয়, দ্য ওয়্যারের প্রধান সিদ্ধার্থ বরদারাজনের বাড়িতেও পুলিস হানা দিয়ে তাঁর ল্যাপটপ, ফোন ইত্যাদি বাজেয়াপ্ত করে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই। এনডিটিভি গেল তো কী হল, বিকল্প সংবাদমাধ্যম দিয়েই কাজ চলে যাবে এই স্বপ্নে যাঁরা বুঁদ হয়ে আছেন তাঁরা এগুলো খেয়াল রাখবেন দয়া করে। এখানেই শেষ নয়। তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে অনলাইন কনটেন্টের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের রাস্তাও পরিষ্কার করা হয়েছে।

ফলে নাগরিক ডট নেটের মত ওয়েবসাইটও খুব নিরাপদ নয়। অতএব স্বাধীন তথা বিকল্প সংবাদমাধ্যমের উপর ভরসা রাখুন, পাশে থাকুন। পকেটের পয়সা দিয়ে এবং আরও যে যে উপায়ে পারেন। কিন্তু পা মাটিতে রাখুন। কোনো মূলধারার সংবাদ প্রতিষ্ঠানের পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজনের হাতে চলে যাওয়ার ঘটনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়, উল্লাস করার তো নয়ই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

সিপিএম পথে ফিরেছে, কিন্তু ব্যালটে ফিরবে কি?

আইএসএফের সঙ্গে সিপিএম তথা বামফ্রন্টের এখন ঠিক কী সম্পর্ক? কংগ্রেসের সঙ্গে কি আবার জোট করা হবে?

খবরে প্রকাশ, সিপিএম নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জি শিলিগুড়িতে এক সভায় বলেছেন, শিলিগুড়ি পৌর নিগম বামেদের হাতছাড়া হয়েছে সবে কয়েক মাস। কিন্তু এর মধ্যেই তা দুর্বৃত্তদের হাতে চলে গেছে। সিপিএম তথা বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত প্রশাসনিক কার্যকলাপ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ধুতি পাঞ্জাবির মত শ্বেতশুভ্র ছিল, কোথাও দুর্নীতির লেশমাত্র ছিল না – এমনটা নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই, দুর্নীতির যে পরিমাণ এবং দুর্নীতি করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানোর যে নির্লজ্জা এ রাজ্যে দেখা যাচ্ছে তা একান্তই তৃণমূল কংগ্রেসের দান। তার মধ্যে কংগ্রেসের উত্তরাধিকার খুঁজতে যাওয়াও বৃথা। আবু বরকত আলি গনিখান চৌধুরীরা সেকালের জমিদারদের কায়দায় রাজনীতি করতেন, অধীর চৌধুরীর মত লোকেরা তার সঙ্গে মিশিয়েছিলেন পেশিশক্তির ব্যবহার। কিন্তু সেখানেও পরিমাণ মত দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করে রবিন হুড মার্কা ভাবমূর্তি তৈরি করার প্রয়াস থাকত। বাম আমলেও রাজনৈতিক মদতপুষ্ট সমাজবিরোধীরা অন্তত নিজের এলাকায় গরীবের মেয়ের বিয়ে দেওয়া, অমুক বড়লোককে ‘চমকে’ দিয়ে তমুক গরীবকে একটু স্বস্তি দেওয়া – এসব করত।

কিন্তু মাত্র এগারো বছরের শাসনেই দেখা যাচ্ছে তৃণমূলের শীর্ষনেতাদের ফ্ল্যাট থেকে নগদ কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হচ্ছে, তদন্ত এগোলে অগাধ গোপন সম্পত্তির হদিশ পাওয়া যাচ্ছে। অনুব্রত মন্ডলের মত বাহুবলীরা নিজেরাই নেতা হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে তো বটেই, এমনকি দেশের বাইরেও নেতাদের সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এতৎসত্ত্বেও স্বয়ং মমতা ব্যানার্জি প্রকাশ্যে অনুব্রতর মত নেতার পাশে দাঁড়াচ্ছেন, ববি হাকিম বাঘ বেরিয়ে এলেই শেয়ালরা পালাবে ইত্যাদি আক্রমণাত্মক কথাবার্তা বলছেন। সাধারণ মানুষ টিভির পর্দায় পাহাড়প্রমাণ টাকা দেখে ফেলায় কদিন নিচু হয়ে থাকা শাসকের গলা আবার সপ্তমে চড়েছে। সুতরাং সাধারণ মানুষ যদি ভেবে নেন, শীর্ষ নেতৃত্বের আশীর্বাদেই এত দুর্নীতি চলছে রাজ্যে, তাহলে দোষ দেওয়া যাবে না। উপরন্তু মহারাষ্ট্র বা তামিলনাড়ুর মত পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অর্থনীতির রাজ্যে দুর্নীতি সাধারণ মানুষের যতটা চোখে লাগে, কর্মসংস্থানের হাহাকার পড়ে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গে শাসক দলের নেতাদের বিপুল সম্পত্তি এবং তা নিয়ে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধের অভাব অনেক বেশি গায়ে লাগাই স্বাভাবিক।

ফলে মীনাক্ষীর কথা বেশকিছু শ্রোতাকে স্পর্শ করতে পারলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সম্ভবত পারছেও। সেই কারণেই ইদানীং সিপিএমের মিছিল, মিটিংয়ে আবার ভিড় হতে দেখা যাচ্ছে। স্রেফ কৌতূহলী জনতার ভিড় নয়, মধ্যবয়স্ক বা পাকা চুলের মানুষের ভিড় নয় – তরুণ তরুণীদের ভিড়। স্কুল নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে বছর দশেক হতে চলল, কিন্তু গত এক বছরে যে তীব্রতা এসেছে আন্দোলনে – তাও আগে দেখা যায়নি। এর পিছনেও যে সিপিএমের সক্রিয়তা বৃদ্ধি অন্যতম কারণ, তা এই আন্দোলনকে নিয়মিত নজরে রাখা সাংবাদিকরা সকলেই জানেন। মীনাক্ষী, ইন্দ্রজিৎ ঘোষ, কলতান দাশগুপ্তের মত সিপিএমের ছাত্র, যুব সংগঠনের নেতারা যে এই আন্দোলন নিয়ে পথে নেমে পড়েছেন, কম্পাস ঠিক করতে সাহায্য করছেন তা তো কারোর কাছেই অবিদিত নেই। যে রাত্রে করুণাময়ী থেকে আন্দোলনকারীদের বলপূর্বক তুলে দেওয়া হল কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশকে সাক্ষী গোপাল করে, সে রাত্রেও এঁরা পৌঁছে গিয়েছিলেন উচ্ছেদ আটকাতে। চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন সম্পর্কে সিপিএমের হাবভাব বদল চোখে পড়ার মত। পূর্বতন রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রের আমলে এই আন্দোলন চলছিল নিজের মত করে। কলকাতার মাঝখানে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে চাকরিপ্রার্থীরা যখন অনশন করছিলেন, তখন পথচারীরা পর্যন্ত উঁকি মেরে দেখতেন না এরা কারা, কেন এখানে বসে আছে। সিপিএম বলত তারা আন্দোলনটাকে হাইজ্যাক করতে চায় না বলে ওর মধ্যে প্রবেশ করছে না, কিন্তু আন্দোলনকারীদের পাশে আছে। পাশে থাকা মানে কোনোদিন বিমান বসু, কোনোদিন অন্য কোনো নেতার মেয়ো রোড গমনের ফেসবুক লাইভ। মহম্মদ সেলিম রাজ্য সম্পাদক হওয়ার পর থেকে স্বয়ং বেশ কয়েকবার আন্দোলনকারীদের কাছে গেছেন, এই ইস্যু নিয়ে পার্টির পতাকা নিয়ে অথবা নাগরিক মিছিলের নাম দিয়ে একাধিক কর্মসূচি পালন হয়েছে। বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের কড়া রায় তৃণমূল সরকারকে বিপদে ফেলেছে আদালতের ভিতরে। কিন্তু আদালতের লড়াইকে রাস্তায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব অবশ্যই সিপিএমের।

কিন্তু রাজ্যের পরিস্থিতির সাপেক্ষে যে প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ, তা হল পথে ঘাটে সিপিএমের প্রতি সমর্থন ফেরত এলেও, ব্যালট বাক্সে আসবে কি? কোনো সন্দেহ নেই, কলকাতার ধর্মতলায় সারা রাজ্যের ছাত্র, যুবদের একত্র করে শক্তি প্রদর্শন আর ভোট আদায় এক জিনিস নয়। ২০২৪ এখনো ঢের দেরি, সামনেই পঞ্চায়েত নির্বাচন। সে নির্বাচনে চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন কতটা প্রভাব ফেলবে বলা মুশকিল। হয়ত বেশি প্রভাবশালী হবে সিপিএমের হেল্পলাইন, যেখানে মানুষ ফোন করে স্থানীয় দুর্নীতির কথা বলতে পারেন। সিপিএম নেতাদের দাবি দারুণ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া রাজ্যের প্রত্যেক পঞ্চায়েত এলাকায় গোটা নভেম্বর মাস জুড়ে পদযাত্রা এবং ডেপুটেশনের কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে, যা শুভেন্দু-অভিষেক কাদা ছোড়াছুড়ি এবং রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব পেরিয়ে কলকাতার সংবাদমাধ্যমে এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি।

রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে, তৃণমূলের স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজ্য নেতাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ক্ষোভ জমেছে। কিন্তু তেমন ক্ষোভ ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগেও ছিল। সে নির্বাচন অনেকটা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সম্পর্কে গণভোটে পরিণত হওয়ায় এবং দুয়ারে সরকার আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের কল্যাণে তৃণমূল শেষপর্যন্ত হইহই করে জিতেছিল। কিন্তু পঞ্চায়েত ভোট অন্য ব্যাপার। ইতিমধ্যে দুয়ারে সরকার নিয়েও দুর্নীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। তৃণমূলেরই একাধিক গোষ্ঠীকে কারা কী পেল, কারা পেল না তা নিয়ে প্রকাশ্যে ঝগড়া করতে দেখা যাচ্ছে। বিজেপি এখন পর্যন্ত নিষ্প্রভ। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে কি পারবে সিপিএম?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে উঠে আসবে আরেকটি জরুরি প্রশ্ন। বামফ্রন্ট, তুমি আজিও আছ কি? কারণ সিপিএম যখন মধ্যগগনে, তখনো বহু জায়গায় তাদের চেয়ে ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপির মত ফ্রন্টের অন্য দলগুলোরই আধিপত্য বেশি ছিল। তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি যেমন হয়েছে, তেমনি নির্বাচনের সময়ে এই সমীকরণ বামফ্রন্টের হাত শক্তও করেছে। মুর্শিদাবাদে কী অবস্থা আরএসপির? কোচবিহারে উদয়ন গুহর প্রস্থানের পর কেমন আছে ফরোয়ার্ড ব্লক? প্রবাদপ্রতিম চিত্ত বসুর পার্টির উত্তর ২৪ পরগণাতেই বা কী হাল? বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে যে সংযুক্ত মোর্চা তৈরি হয়েছিল তাতে ছিল কংগ্রেস আর ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টও। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ মুসলমান এবং হিন্দু নিম্নবর্গীয় মানুষের হাত ধরার জন্যই নাকি শেষোক্ত দলটিকে নেওয়া হয়েছিল। তাদের সঙ্গেই বা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের এখন ঠিক কী সম্পর্ক? কংগ্রেসের সঙ্গে কি আবার জোট করা হবে?

আরও পড়ুন সেলিব্রিটি কাল্ট দরদী সিপিএমকে খোলা চিঠি

এইসব প্রশ্নেই লুকিয়ে আছে বামেরা এ রাজ্যে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা তার উত্তর। কারণ এ রাজ্যে যেভাবে ভোট হয়, তাতে সবকিছু ঠিকঠাক করেও নির্বাচনের দিন খড়্গ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা উন্নয়নের মোকাবিলা করতে না পারলে ভোটে জেতা যায় না। গোটা রাজ্যে একা তার মোকাবিলা করার মত সংগঠন সিপিএমের এখন নেই, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে হবেও না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

টুইটার, বাইজু’স আঁধারে ছাঁটাই সম্পর্কে কয়েকটি কথা

ভারতের সাদা কলারের কর্মীদের কাছে গত তিরিশ বছরে ইউনিয়ন এমন একটি শব্দে পরিণত হয়েছে যা শুনলে কানে গঙ্গাজল দিতে হয়, অবেলায় স্নান করতে হয়।

দিকে দিকে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে, টুইটারে ছাঁটাই পর্ব উঠেছে চরমে। এতদিনে সবাই জেনে গেছেন, প্রায় হাজার চারেক লোককে ইতিমধ্যেই ছাঁটাই করেছেন ইলন মাস্ক। চুয়াল্লিশ বিলিয়ন ডলারে টুইটার কিনে নেওয়ার পর কর্মীদের ইমেল করে তিনি জানিয়েছেন টুইটারের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে গেলে নাকি ছাঁটাই করা ছাড়া উপায় নেই। কারণ, শুক্রবার তাঁর করা একটি টুইট থেকে জানা যাচ্ছে, টুইটার প্রতিদিন চার মিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সান্ত্বনা দেওয়ার ঢঙে সেই টুইটে যোগ করেছেন, যাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে তাদের তিন মাসের বিদায়ী ভাতা (severance) দেওয়া হচ্ছে। আইনত যা দেওয়ার কথা, সে ভাতা নাকি তার ৫০% বেশি। যে কোম্পানি দৈনিক চার মিলিয়ন ডলার ক্ষতিতে চলে সে কোম্পানি কেনার জন্য ইলন এত লাফালাফি কেন করেছিলেন সে প্রশ্ন থাক। তিনি যে টুইট মডারেশনে যুক্ত আস্ত বিভাগগুলোকেই কর্মী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে তুলে দিচ্ছেন, তার ভুয়ো খবর, হিংসাত্মক বাচনের উপর কী প্রভাব পড়বে এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কী হবে – সে আলোচনাও অন্য দিনের জন্য তোলা থাক। বরং আরেকটি ছাঁটাইয়ের ঘটনার দিকে নজর দেওয়া যাক।

শাহরুখ খানের ওকালতি এবং বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মাদের জামায় জ্বলজ্বলে লোগোর কারণে বাইজু’স নামটি এখন কারোর জানতে বাকি নেই। অনলাইনে লেখাপড়া করিয়ে ছেলেমেয়েদের সব পরীক্ষায় দারুণ নম্বর পাইয়ে দেবে – এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাইজু রবীন্দ্রনের এই এডটেক স্টার্টআপ চালু হয়েছে মাত্র কয়েক বছর হল। এরই মধ্যে এত উন্নতি করেছে যে ভারতীয় ক্রিকেট দলের শার্ট স্পনসর হয়েছে, চলতি ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির অ্যাসোশিয়েট স্পনসর হয়েছে। উপরন্তু, দিন দুয়েক হল নিজেদের এক ‘নন-প্রফিট’ উদ্যোগের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করেছে লায়োনেল মেসিকে। খেয়াল করুন, সুনীল ছেত্রীকে নয়, ক্রিকেট তারকাদের কাউকেও নয়, একেবারে মেসি। মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার যাকে বলে। অথচ এই বাইজু’সই সেপ্টেম্বর মাসে ঘোষণা করেছিল তারা আড়াই হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে। কারণ গত চার বছরে কোম্পানির যে বিপুল বৃদ্ধি হয়েছে তার ফলে কোম্পানির বৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে এছাড়া উপায় নেই। এই যুক্তি গত সোমবার (৩১ অক্টোবর) এক লিঙ্কডইন পোস্টে বাইজু’স দিয়েছিল। এই টেকসই করে তোলার অঙ্গ হিসাবেই তিরুবনন্তপুরমের টেকনোপার্কে বাইজু’সের অফিস তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এতে ১৪০ জন কর্মীর চাকরি যেত। কিন্তু কোম্পানির সংগঠিত কর্মীরা এবং কেরালা সরকার সে গুড়ে বালি দিয়ে দিয়েছেন। বুধবার (২ নভেম্বর) মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এবং রাজ্যের লেবার কমিশনার ডক্টর বাসুকির সাথে বাইজু রবীন্দ্রনের বৈঠকের পর ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। টেকনোপার্কের কর্মী সংগঠন প্রতিধ্বনি টেকনোপার্ক হপ্তাখানেক আগে কেরালার শ্রমমন্ত্রী ভি শিবনকুট্টির সঙ্গে নিজেদের পরিস্থিতি জানিয়ে সাক্ষাৎ করে। এক সপ্তাহের মধ্যেই হাতেনাতে ফল পাওয়া গেল।

টুইটার আর বাইজু’সের ছাঁটাইয়ের ঘটনা পরপর ঘটায় একটি সুবিধা হয়েছে। এ দেশের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত মানুষ ছাঁটাইয়ের বিভীষিকা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছেন, অনবরত কথাবার্তা বলছেন সোশাল মিডিয়ায়। ফলে সচরাচর ছাঁটাইয়ের পক্ষে যেসব যুক্তি তাঁরা দিয়ে থাকেন সেগুলোর বৈধতা নিয়ে আলোচনা করার পরিসর তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক উদারীকরণের যুগে সারা ভারতে (কেবল পশ্চিমবঙ্গে নয়) বহু কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ঠিক কত শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন তার হিসাব কোনো রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমমন্ত্রকও দিতে পারবে বলে মনে হয় না। ঠিক কত মানুষ কৃষিকাজ অলাভজনক হয়ে যাওয়ায় প্রবাসী শ্রমিক (পরিযায়ী শ্রমিক কথাটা অশ্লীল। কলকাতাবাসী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বেঙ্গালুরুতে চাকরি করতে গেলে তাকে পরিযায়ী ইঞ্জিনিয়ার বলি কি?) হয়ে গেছেন তার হিসাবও যেমন দেশের সরকার রাখে না। ভাগ্যিস অতিমারী এল! নইলে তো আমরা মনে করতাম শ্রমিকদের জীবন মৃত্যুর হিসাব রাখে দেশের সরকার। ঘটনা হল, ও হিসাব আমরাও রাখি না। ফলে ছাঁটাইয়ের হিসাব রাখারও প্রশ্ন ওঠে না। কারণ আমরা যারা গাঁটের কড়ি খরচ করে খবরের কাগজ পড়ি, টিভিতে খবর দেখি বা হাতের স্মার্টফোনে ফেসবুক টুইটার দেখি এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে খবর সংগ্রহ করি – তাদের বাড়ির লোকেরা সাধারণত কারখানার লে অফে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, পশ্চিমবঙ্গ থেকে মহারাষ্ট্রে নির্মাণ শ্রমিক হয়েও তাদের যেতে হয় না। কিন্তু আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরাই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাঙ্কার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট ইত্যাদি হয়। মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা, টুইটার বা অ্যামাজনে চাকরি পেলে আমরা শতমুখে তা বলে বেড়াই। সুন্দর পিচাই, সত্য নাডেলা বা পরাগ আগরওয়ালকে দেখে আমাদের চোখ চকচক করে। মনে হয় আমার বাড়ির ছেলেটিও তো একদিন ওই উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। ফলে যে লে অফ দেশের হাজার হাজার বন্ধ কারখানার শ্রমিকের দরজায় আতঙ্কের উপর্যুপরি ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়তে পড়তে অবশেষে গা সওয়া হয়ে গেছে গত ৩০ বছরে, সেই লে অফ ইলনের কল্যাণে অবশেষে হ্যাশট্যাগ হয়ে আমাদের ঘুম কেড়ে নিতে পেরেছে।

ঘুম ছুটে যাওয়া অনেকসময় ভাল, কারণ তাতে গা ঝাড়া দিয়ে জেগে ওঠা যায়। আমরা সাদা কলারের শ্রমিকরা (হ্যাঁ, শ্রমিকই। সেটা ছাঁটাই হওয়া মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পান) সেই নয়ের দশক থেকে ছাঁটাই সম্বন্ধে যা জেনে এবং বিশ্বাস করে এসেছি, টুইটার ও বাইজু’সের ছাঁটাইয়ের আঁধারে আসুন সেগুলিকে প্রশ্ন করি। প্রথমত, আমরা জানি যে ছাঁটাই কখনো এমনি এমনি করা হয় না। করা হয় ব্যবসার প্রয়োজনে। কীরকম প্রয়োজন? ইলন বলছেন কোম্পানি বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বলে ছাঁটাই করা প্রয়োজন, বাইজু বলেছেন কোম্পানির বিপুল বৃদ্ধি হয়েছে বলে ছাঁটাই করা প্রয়োজন। দুজনেই সত্যবাদী যুধিষ্ঠির ধরে নিয়েই এগোনো যাক।

প্রথম জন স্বেচ্ছায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে একটি কোম্পানিকে কবজা করলেন, তারপর আবিষ্কার করলেন সে কোম্পানি লাভজনক নয়। তাই তিনি লে অফ করবেন। দ্বিতীয় জনের বয়ান অনুযায়ী, ব্যবসা প্রত্যাশার চেয়ে বড় হয়ে গেছে, তাই মুনাফা করতে হলে ছাঁটাই করা ছাড়া উপায় নেই। ইলনের ইচ্ছে হয়েছিল বলে টুইটার কিনেছিলেন, এখন দেখছেন সামলাতে পারবেন না। তার খেসারত দিতে হবে হাজার চারেক কর্মচারীকে। বাইজুর ইচ্ছে হয়েছিল বলে গত বছর আকাশ ইনস্টিটিউট কিনে নিয়েছিলেন। তার মার্কেটিং এবং ক্যাম্পেনের জন্য ৭.৫% হারে ৩০০ কোটি টাকা ধারও নিয়েছেন গত মাসে। তার আগে বর্তমান লগ্নিকারীদের থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থও সংগ্রহ করেছেন। এদিকে রাজস্ব আদায় নাকি আগের বছরের ১,৯১৮.২৫ কোটি টাকা থেকে কমে ২০২১ আর্থিক বর্ষে ১,৩৭৮.৫১ কোটি টাকা হয়ে গেছে। অথচ মেসির পারিশ্রমিক দেওয়া যাচ্ছে, কর্মীদের চাকরি না খেলে চলছে না। অর্থাৎ দুই ধনকুবের কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত গানের মত “খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে/বিরাট শিশু আনমনে”। তাঁরা কেবল নিজের টাকা নিয়ে নয়, হাজার হাজার কর্মচারীর বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও খেলবেন। খেলতে খেলতে যখন মনে হবে যথেষ্ট মজা (অর্থাৎ মুনাফা) হচ্ছে না, তখনই ছাঁটাই করবেন। যুক্তিটা নিজের মত করে বানিয়ে নেবেন আর আপনি যেহেতু বিশ্বাস করেন ছাঁটাই বিনা কারণে হয় না, তাই আপনি নিজে লেড অফ হলেও মাথা নেড়ে বলবেন “সত্যিই তো। ব্যবসার স্বার্থে তো এটা করতেই হবে।”

কর্মী ছাঁটাই করে বা ‘পে কাট’ করে বৃহৎ পুঁজির ব্যবসার কতখানি স্বার্থরক্ষা হয় সে সম্পর্কে আরেকটি উদাহরণ দিই। এই উদাহরণ অতীতেও দিয়েছি, কিন্তু বধিরদের শোনাতে বিস্ফোরণের প্রয়োজন হয়। এক বিস্ফোরণে কাজ না হলে বারবার বিস্ফোরণ ঘটাতে হয়। ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি ভারতের অন্যতম বৃহৎ মিডিয়া হাউসের মালিকানাধীন একটি খবরের কাগজ সম্পাদকীয় পাতায় এক দীর্ঘ প্রবন্ধে লিখেছিল, সংবাদপত্র শিল্প বিপন্ন এবং তাকে বাঁচাতে হলে সরকারি সাহায্য প্রয়োজন এবং কর্মী সংকোচন ছাড়া উপায় নেই। কারণ কর্মচারীদের মাইনে দিতে বিপুল খরচ হচ্ছে। ২১ তারিখে দিল্লির সাংবাদিকদের সংগঠন দিল্লি ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টসের সভাপতি এস কে পাণ্ডে এবং সাধারণ সম্পাদক সুজাতা মাধোক এক লিখিত বিবৃতিতে জানান, ভারত সরকারের কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রককে কোম্পানিগুলি যে হিসাবপত্র জমা দেয় তাতে দেখা যাচ্ছে, ওই মিডিয়া হাউসের বাৎসরিক আয় আনুমানিক ৪৮০০ কোটি টাকা আর বেতন বাবদ খরচ করে প্রায় ৫৫১ কোটি টাকা, অর্থাৎ আয়ের মাত্র ১১%। উপরন্তু ওই ৫৫১ কোটির ১০২ কোটি খরচ হয় মাত্র ৪০ জনকে মাইনে দিতে। এই মিডিয়া হাউসটি পরে অতিমারীর সময়ে এক বড় অংশের সাংবাদিক এবং অসাংবাদিক কর্মীদের ছাঁটাই করে এবং যাদের ছাঁটাই করা হয়নি তাদেরও মাইনে কমিয়ে দেয়।

যে কোনো কর্পোরেট, তার ব্যবসা যা-ই হোক, এরকম বেতন কাঠামোতেই চলে। তাহলেই বুঝুন, কর্মী ছাঁটাই করলে ব্যবসার কতটুকু স্বার্থরক্ষা হয়।

এবার ছাঁটাই সম্বন্ধে দ্বিতীয় বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা যাক – ছাঁটাই হয় উদ্বৃত্ত, অযোগ্য লোকেরা।

আগেই বলেছি, লে অফ খেলা ছাড়া কিছুই নয়। বুঝে নেওয়া দরকার, যে এ খেলার গোলপোস্ট বসায় মালিক পক্ষ, ইচ্ছা অনুযায়ী বড় ছোটও করে মালিক পক্ষই। সুতরাং কে প্রয়োজনীয় আর কে উদ্বৃত্ত, কে যোগ্য আর কে অযোগ্য – তা-ও ঠিক হয় মালিক পক্ষের ইচ্ছানুযায়ী। সে ইচ্ছা যে নিতান্ত যুক্তিহীন, তা অবশ্য নয়। যুক্তিটা কী? যুক্তি হল মালিক সে বছর কতটা মুনাফা করতে চাইছেন। যদি চাহিদা খুব বেশি হয়, তাহলে প্রমাণ করা হবে উঁচু পদের বিরাট অঙ্কের বেতন পাওয়া কর্মচারীরা উদ্বৃত্ত। নইলে প্রমাণ করা হবে নিচুতলার এবং মাঝের সারির কর্মীরা উদ্বৃত্ত। এই কারণেই ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক মন্দার সময়ে ভারতের বহু তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিতে উচ্চপদস্থদেরই চাকরি গিয়েছিল। আবার ২০১৯-২১ সময়কালে ভারতের সংবাদমাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ ছাঁটাই হয় সেখানে কোনো মিডিয়া হাউস বিদায় করেছিল মাসে কয়েক লক্ষ টাকা মাইনে পাওয়া সম্পাদকদের, কোনো হাউস আবার ওসব বাছবিচার না করে কাগজের আস্ত সংস্করণ, আস্ত চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছিল।

এ তো গেল উদ্বৃত্তের কথা। আর যোগ্যতা? আমাদের অনেকেরই ধারণা, ছাঁটাই হয় কেবল অযোগ্য কর্মীরা। কখনো ভেবে দেখেছেন, যে অযোগ্য তাকে চাকরিতে নেওয়া হয়েছিল কেন? অতীতে ভারতে যখন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সমস্ত শিল্পেই জোরদার ছিল, তখন বলা হত ট্রেড ইউনিয়নের চাপে নাকি দরকারের চেয়ে বেশি লোক নিতে হয়েছিল, অযোগ্য লোক নিতে হয়েছিল। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তো সরাসরি অভিযোগ, স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনৈতিক কারণে বহু উদ্বৃত্ত কর্মচারী নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর থেকে সাদা কলারের চাকরিতে ইউনিয়ন তো কার্যত উঠে গেছে। সমস্ত কর্পোরেট অফিসে বাহারি এইচ আর ডিপার্টমেন্ট রয়েছে। তারা প্রায় সেকালের পাত্রী দেখার মত “চুল খুলে দেখাও তো মা”, “হেঁটে দেখাও তো মা” পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ করে। এতৎসত্ত্বেও এত অযোগ্য কর্মী আসে কোথা থেকে? তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক, তারা ইন্টারভিউয়ে চালাকি করে ঢুকে পড়ে। যদি বা পড়ে, তারা যে অযোগ্য সে কথা কোম্পানির মুনাফার ক্ষিদে বেড়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত কারোর খেয়াল হয় না কেন? অনেকসময় ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সর্বশেষ আভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে যে কর্মচারী ভাল রেটিং পেয়েছে সে-ও ছাঁটাই হয়ে গেল। কী করে এমন ঘটে?

আসলে যোগ্যতার গোলপোস্টও মালিক পক্ষের মর্জিমাফিক সরিয়ে ফেলা হয়। নইলে পৃথিবীর সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করা এবং প্রশিক্ষণ নেওয়া যে ইঞ্জিনিয়াররা এত বছর ধরে টুইটার চালাচ্ছিলেন তাঁরা রাতারাতি এই শুক্রবার অযোগ্য হয়ে গেলেন কী করে?

আরও পড়ুন যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে

ছাঁটাই সম্পর্কে আমাদের ধারণার পরিবর্তন প্রয়োজন – এই মর্মে এত দীর্ঘ আলোচনা ফেঁদেছি কেন? কারণ এর পরিবর্তন না ঘটালে যাঁরা এখনো ছাঁটাই হননি তাঁরাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন অদূর ভবিষ্যতে। অতিমারীর সময়ে যখন চারদিকে বিভিন্ন শিল্পে লে অফ আর পে কাট চলছে, আমার এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার প্রতিবেশী সগর্বে বলেছিলেন “আমার চিন্তা নেই। আমি জানি আমার যোগ্যতা আছে। একটা গেলে আরেকটা ঠিক পেয়ে যাব।” কেবল অযোগ্য লোকেরা ছাঁটাই হয় – এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে গেলে ওরকম অকারণ নিরাপত্তায় ভোগা অসম্ভব নয়। টুইটার, গুগল, মেটা ইত্যাদি হল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় কোম্পানি। তারা যে দৃষ্টান্ত তৈরি করে তা-ই বিশ্বের সর্বত্র অনুসরণ করে থাকে ছোট, বড়, মাঝারি কোম্পানিগুলি। সুতরাং কোনো কর্পোরেটের কোনো কর্মচারীই যে নিরাপদ নন তা বুঝে নেওয়ার সময় এসেছে। অনুসিদ্ধান্ত হিসাবেই বুঝতে পারা উচিত যে লে অফের আসল কারণ, কোনো শিল্পেই, ব্যবসা বাঁচানো নয়। দীর্ঘকাল বলা হত শ্রমিক আন্দোলনের জন্য, ধর্মঘট, পেন ডাউন ইত্যাদির জন্য ব্যবসার ক্ষতি হয়। ফলে ছাঁটাই করতে হয়, শিল্প তুলে দিতে হয়। তা তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে বা সংবাদমাধ্যমে তো ওসব বালাই নেই। ধর্মঘটই বা কোথায়? তবু কেন শিল্প নড়বড়ে? কেন ছাঁটাই করতে হচ্ছে?

সুতরাং ছাঁটাইয়ের আসল কারণ হল মুনাফা বাড়ানো। কত বাড়ানো? এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই, কারণ মালিকের লোভের কোনো শেষ নেই। যে কোনো স্তরের কর্পোরেট কর্মচারীই জানেন, আজকাল পরের আর্থিক বর্ষের ব্যবসার লক্ষ্যমাত্রা স্থির হয় আগের বছরের মুনাফা অনুযায়ী। আগেরবারের চেয়ে বেশি মুনাফা না করা গেলেই হিসাবে ক্ষতি লেখা হয়। অর্থাৎ লাভ-ক্ষতির সংজ্ঞাই বদলে ফেলা হয়েছে পুঁজির হাঙরের ক্ষিদে মেটানোর জন্য। এই ক্ষিদে যে কোনোদিন আপনাকেও গিলে নেবে। আপনার যোগ্যতা আপনার বর্ম নয়।

লোক কমিয়ে মুনাফা বাড়ানোর আরও উৎকৃষ্ট পন্থা মালিকদের নজরে পড়ে গেছে ইতিমধ্যেই। তার নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। বিজ্ঞান, প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে স্বয়ংক্রিয়তা (automation)। সেই ধারাবাহিকতাতেই এসে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কম্পিউটারের আগমনে কিছু মানুষের কাজ গিয়েছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলেও যাবে। সবাইকে তৈরি থাকতে হবে। যে প্রশ্নের উত্তর নেই সে প্রশ্ন তোলা চলবে না – এরকম গা জোয়ারি চিন্তায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। সে অভ্যাস থেকে বেরোতে আমাদের বাধ্য করবে অদূর ভবিষ্যৎ। তখন নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে, কোথাও কি থামা উচিত? প্রযুক্তি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ প্রযুক্তির জন্য? স্বয়ংক্রিয়তা তো আবিষ্কৃত হয়েছিল মানুষের ভার লাঘব করার জন্য? মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়া কি স্বয়ংক্রিয়তার কাজ? এসব প্রশ্ন তখন তুলে কোনো লাভ হবে না, কারণ অর্থনীতি এবং শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা আমরা অনেকদিন হল ছেড়ে দিয়েছি।

একা একা মৌলিক প্রশ্ন তুলে অবশ্য কোনোদিনই কোনো লাভ হয়নি। তিরুবনন্তপুরমের বাইজু’স কর্মীরা ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করাতে পেরেছেন একজোট হয়েছেন বলে। সম্প্রতি আমাদের স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় অ্যামাজনের কর্মীরাও লড়াই করে ইউনিয়ন করার অধিকার আদায় করেছেন। কিন্তু ভারতের সাদা কলারের কর্মীদের কাছে গত তিরিশ বছরে ইউনিয়ন এমন একটি শব্দে পরিণত হয়েছে যা শুনলে কানে গঙ্গাজল দিতে হয়, অবেলায় স্নান করতে হয়। ইউনিয়ন করবে চটকলের শ্রমিকরা; বড়জোর সুইগি, জোম্যাটো, ফ্লিপকার্টের ডেলিভারি বয়রা; উবের, ওলার ড্রাইভাররা। সাদা কলারের সম্ভ্রান্তবংশীয়রা হাড়িকাঠে গলা দিয়ে বেচারা জল্লাদের বাঁচার প্রয়োজন বিবেচনা করে সসম্মানে বলি হবেন।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

সেতু ভাঙলেও টাল খায় না গুজরাট মডেল

সারা দেশের ভদ্রলোক শ্রেণি গুজরাট বলতে অজ্ঞান। কি চমৎকার রাস্তা! সবরমতীর ধারটা কি দারুণ করেছে! লোকের কত টাকা! দিল্লি থেকে কন্যাকুমারী – সর্বত্রই মুগ্ধতার কারণগুলো মোটামুটি এক। বাঙালি ভদ্রজনের মুগ্ধতার দুটো অতিরিক্ত কারণ আছে – ১) ওখানে কত ইন্ডাস্ট্রি, ২) ওখানে কেউ চাকরি বাকরি নিয়ে মাথায় ঘামায় না, সবাই ব্যবসা করে। এই মুগ্ধ জনতার সাথে খানিকক্ষণ কথা বললেই টের পাওয়া যায় এঁরা গুজরাট বলতে বোঝেন আমেদাবাদ, বড়জোর ভদোদরা। তলিয়ে জিজ্ঞেস করলে বেরিয়ে পড়ে বেড়াতে গিয়ে আমেদাবাদের বাইরে কেবল গির অরণ্যের সিংহ দেখেছেন। অবশ্য পশ্চিমবঙ্গ বলতেও এঁরা কলকাতাই বোঝেন, মহারাষ্ট্র বলতে মুম্বাই। ফলে বামপন্থী বা ডানপন্থী যা-ই হোন, গুজরাট মডেলে এঁদের অগাধ আস্থা। তবে স্বপ্নের গুজরাটে বেমক্কা সেতু ভেঙে পড়লে কিঞ্চিৎ ফাঁপরে পড়েন।

মোরবিতে মেরামতির জন্য সাত মাস বন্ধ থাকা সেতু দিন পাঁচেক হল খোলা হয়েছিল, রবিবার ভর সন্ধেবেলা ভেঙে পড়েছে। এখন শোনা যাচ্ছে খুলে দেওয়ার আগে নাকি সুরক্ষা শংসাপত্রও নেওয়া হয়নি। উন্নয়নের গুজরাট বলে কথা, উন্নয়ন কি আর লাল ফিতের ফাঁসে আটকে রাখা যায়? কর্মবীর নরেন্দ্র মোদীর রাজ্য। কয়েক হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি ডুবে যাবে জেনেও যেখানে সর্দার সরোবর বাঁধ তৈরি করা হয় বহু বছরের আন্দোলন দুরমুশ করে দিয়ে।

এই লেখা যখন লিখতে বসেছি, তখন পর্যন্ত শ দেড়েক মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। তাতে কী-ই বা এসে গেল? গুজরাটে অনেক কাজ হয়, তার মধ্যে খানিকটা দুর্নীতি তো হবেই। আমাদের এখানে তো কাজই হয় না – এমন ধারণা দিয়েই অনেকে এ ঘটনার ব্যাখ্যা করবেন সন্দেহ নেই। আসলে উন্নয়ন মানে যে শহরের উন্নয়ন; অর্থাৎ ফ্লাইওভার, রাস্তা, সেতু, পার্ক, রেলিং, ফুটপাথ নির্মাণ – একথাই আমরা শিখেছি। অমর্ত্য সেন বাঙালি বলে আমাদের দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না। কিন্তু তিনি উন্নয়নের যে অন্যতর সংজ্ঞা দিয়েছেন তাতে আমাদের আগ্রহ নেই। তাঁর কাজের ভিত্তিতে অর্থনীতিবিদ মহবুব উল হকের তৈরি হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে গুজরাট সচরাচর মাঝের সারির উপরে উঠতে পারে না। ২০২১ সালেও অন্ধ্রপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ সমেত ১৯ রাজ্যের সঙ্গে গুজরাট মিডিয়াম এইচডিআই ক্যাটেগরিতেই ছিল। সে রাজ্যের অনেক জায়গায় যে ছেলেমেয়েরা সাঁতরে নদী পেরিয়ে স্কুলে যায়, শিক্ষার হাল ভাল নয়, স্বাস্থ্যের হাল ভাল নয় – এসব খবরও বাসি। কিন্তু ওসবে আমরা আমল দেব কেন? পেল্লাই কারখানা হলেই যে প্রচুর কর্মসংস্থান হয় না, উন্নয়ন হয় না সেসব আমরা এখনো টের পাইনি যে। তাই তো পশ্চিমবঙ্গে সিঙ্গুর এখনো রাজনৈতিক চাপান উতোরের বিষয়।

আরও পড়ুন কী ঢাকছে সরকারি চোলি? কেনই বা ঢাকছে?

সংবাদসংস্থা আইএএনএস জুন মাসে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, গুজরাটে বেকার সমস্যা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে গ্রাম পঞ্চায়েতের এক্সিকিউটিভ প্রধানের ৩৪০০ শূন্য পদে চাকরির জন্য ১৭ লক্ষ আবেদন পত্র জমা পড়েছিল। কিন্তু গুজরাট বিধানসভার আসন্ন নির্বাচনের প্রচারের দিকে নজর রাখলেই বোঝা যায় ওসব কোনো ইস্যু নয়। ইস্যু হল হিন্দুত্ব। অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলছেন টাকায় লক্ষ্মী, গণেশের ছবি ছাপানো উচিত আর বিজেপির বিদায়ী মন্ত্রিসভা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লাগু করার জন্য কমিটি গঠন করছে। সেতু ভেঙে পড়া এমন কী ব্যাপার? জীবন মৃত্যু তো ভগবানের হাতে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা তুলে দেওয়াই কি উদ্দেশ্য?

পশ্চিমবঙ্গের কাগজ, টিভি চ্যানেলের মালিক, সম্পাদক, উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিশেষজ্ঞ ও বিখ্যাতদের ছেলেপুলেরা প্রায় কেউই সরকারি স্কুলে পড়ে না। ফলে দিব্যি ওসব স্কুলের রোগবালাইকে অগ্রাহ্য করে থাকা গিয়েছিল।

ঘটনাচক্রে আমার পিতৃকুল, মাতৃকুলের অধিকাংশ আত্মীয় পেশায় শিক্ষক। তাঁরা অনেকেই আজ প্রয়াত। রাজনৈতিকভাবে সরকারি, বিরোধী, দুয়ের মাঝামাঝি— নানারকম দলের সদস্য, সমর্থক হলেও গত শতকের নয়ের দশকের শেষদিকে দেখতাম সকলেই একটি ব্যাপারে একমত— পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলো ক্রমশ উঠে যাবে। কারণ ওই স্কুলগুলো ভরে থাকত মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেমেয়েতে, যাদের বাবা-মায়েরা ক্রমশ তাদের বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। আমার শিক্ষক আত্মীয়রা বলতেন এই প্রবণতা বাড়তে বাড়তে একসময় সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলোতে পড়ে থাকবে কেবল তারা, যাদের বাবা-মায়েরা বেসরকারি স্কুলের খরচ পোষাতে পারবেন না। তাদের পড়াশোনা হল কি হল না তা নিয়ে শিক্ষকদেরও বিশেষ মাথাব্যথা থাকবে না, সরকারও দায়সারা স্কুল চালাবে। তখন কথাগুলো বিশ্বাস করিনি, কিন্তু আজ পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষার অবস্থা দেখে সেই আত্মীয়দের বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ দর্শনের পারদর্শিতা স্বীকার না করে উপায় নেই।

আমাদের ছাত্রাবস্থাতেই সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলো ধুঁকতে শুরু করেছিল। তার জন্যে দায়ী করা হয় বামফ্রন্ট সরকারের প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে। কিন্তু এই শতকে কী কারণে মধ্যবিত্ত বাবা-মায়েরা সরকারি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক স্কুলগুলোকে ত্যাগ করলেন তা অত সহজে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। একটা কারণ অবশ্যই কোন মাধ্যমে পড়ানো হচ্ছে তা নিয়ে বাঙালির অত্যধিক মাথাব্যথা। শিক্ষার গুণমান নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে অনেক বাবা-মাই ছেলেমেয়ের ইংরেজিতে গড়গড়িয়ে কথা বলতে পারা নিশ্চিত করতে চান। অর্থাৎ স্কুল তাঁদের কাছে প্রকৃতপক্ষে সারাদিনব্যাপী স্পোকেন ইংলিশ ক্লাস। সঙ্গে অন্য বিষয়গুলো পড়িয়ে দিলেই হল। ফলে সাধ্যাতীত এবং বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা নেই এমন মাইনে দিয়েও বেসরকারি স্কুলেই তাঁরা ছেলেমেয়েকে পাঠান। সে ধরনের অনেক স্কুলেরই শিক্ষকদের যোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয়, ফলে অনেকসময় ওই অভিভাবকরাই পড়াশোনার মান নিয়ে একান্ত আলোচনায় সন্দেহ প্রকাশ করেন। অথচ পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলোতে যাঁরা পড়ান, তাঁরা অন্তত ১৯৯৭-৯৮ সাল থেকে একটা প্রতিযোগিতামূলক লিখিত পরীক্ষা এবং ইন্টারভিউতে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে নিযুক্ত হচ্ছিলেন। তা সত্ত্বেও মধ্যবিত্তের বেসরকারি স্কুলে ছোটার পিছনে কি ‘বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে’ কুসংস্কার? নাকি বাজার অর্থনীতির ‘যা পয়সা দিয়ে কিনতে হয় না তা ভাল নয়’ আদর্শে আস্থা? উত্তর যা-ই হোক, মধ্যবিত্ত ছেলেমেয়েরা সরে যাওয়ায় স্কুলের প্রতি শিক্ষকদের এবং সরকারের আগ্রহ যে কমে গেছে তাতে সন্দেহ নেই। কিছুদিন আগেই তো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ স্কুল। বহু জায়গায় স্কুল চালু রাখতে শিক্ষকরা এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রছাত্রী ধরে আনছেন।

শিক্ষকসমাজ অবশ্যই কোনও মনোলিথ নয়। পশ্চিমবঙ্গের সব শিক্ষক একইরকম ভাবেন বা সকলেই ফাঁকিবাজ, বসে বসে মাইনে পান— এমন একটা মত ইদানীং রীতিমত জনপ্রিয় হয়েছে। সে মতে সায় দিচ্ছি না। কারণ ফাঁকিবাজ সব পেশাতেই ছিল, আছে এবং থাকবে। তা বলে একটা গোটা পেশার সকলেই অলস, অনিচ্ছুক কর্মী হয়ে যান না। কিন্তু যা বলার, তা হল স্কুলের পঠনপাঠন নিয়ে শিক্ষকদের নিরুৎসাহ করার সবরকম চেষ্টা সরকারি তরফে করা হয়েছে। মন দিয়ে পড়াতে চান এমন অনেক শিক্ষকই সখেদে বলেন, সিলেবাস শেষ করানো অতিমারির আগেও রীতিমত কঠিন ছিল। কারণ তাঁদের অনেকখানি সময় চলে যায় বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের জন্য ছেলেমেয়েদের তথ্যাবলি সংগ্রহ ও নথিবদ্ধ করতে, জিনিসপত্র বিলি করতে। স্কুলগুলো প্রায় রেশন দোকানের চেহারা নেয়, ক্লাস কাটছাঁট করতে হয়। তার উপর বর্তমান সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ছুটি কত বেড়েছে তা নিয়েও আলাদা গবেষণা হতে পারে। পুজোর ছুটি ফুরোতেই চায় না, গরমের ছুটি প্রায়শই নির্ধারিত দিনের আগেই শুরু হয়ে যায়, তারপর বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আগে ছুটির তালিকার বেশিরভাগটা ঠিক করতেন স্কুল কর্তৃপক্ষ, এখন চলে অঘোষিত এক-রাজ্য-এক-ছুটি নীতি। ফলে দক্ষিণবঙ্গ গরমে পুড়লে শীতল উত্তরবঙ্গেও স্কুল বন্ধ থাকে। কোনও স্কুল কর্তৃপক্ষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সরকারি ছুটি অগ্রাহ্য করে পঠনপাঠন চালু রাখতে চাইলে শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়। এর উপর আছে শূন্য পদের বিপদ। বহু স্কুলে অশিক্ষক কর্মীদের পদ ফাঁকা পড়ে আছে। সে কাজও শিক্ষকদেরই করতে হয়। এতসব করে আর কতটুকু পড়ানো সম্ভব?

এসব অভিভাবকদেরও বিলক্ষণ চোখে পড়ে। ছেলেমেয়েকে সরকারি স্কুলমুখো না করার পিছনে এসব কারণও কাজ করে এবং সেজন্য তাঁদের দোষ দেওয়া চলে না। উপর্যুক্ত বিপত্তিগুলোর চেয়েও শিক্ষকদের কাজকর্মে বেশি প্রভাব ফেলছে শিক্ষকের অভাব। যেসব স্কুলে এখনও ছাত্রছাত্রীর অভাব নেই, সেখানেও শিক্ষকের অভাব প্রকট। স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের যে স্বচ্ছ ও নিয়মিত ব্যবস্থা তৃণমূল সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল তাকে লাটে তুলে দেওয়ার ফলে বহু স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। উপরন্তু ইচ্ছামত বদলির ব্যবস্থায় কোথাও একই বিষয়ের শিক্ষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি, অথচ অন্য কোনও বিষয়ের একজন শিক্ষকও নেই।

অর্থাৎ শুধু যে রাস্তায় বসে থাকা (এবং মধ্যরাতে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যাওয়া) হবু শিক্ষকরাই অবিচারের শিকার, তা নয়। যাঁরা স্কুলে পড়াচ্ছেন তাঁরাও ভাল নেই। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সেইসব ছাত্রছাত্রীদের, যাদের বাবা-মা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্কুলের মাইনে জোগাতে পারেন না। অতিমারির সময়ে সরকার স্কুল খোলার নামই করছিল না, যেনতেনপ্রকারেণ বন্ধ রাখছিল দেখে অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন স্কুলগুলোকে লাটে তুলে দেওয়াই উদ্দেশ্য। সে কাজে অতিমারিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা যথার্থ। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, নিয়োগের পরীক্ষা নিয়ে বেলাগাম দুর্নীতি এবং চালু চাকরির পরীক্ষাটাকে অকেজো করে দেওয়া যে কেবল কর্মসংস্থান সংক্রান্ত ইস্যু নয়, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা লাটে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনারও অংশ সেকথা গত এগারো বছরে কারও মনে হয়নি। সেই ২০১৩ সালেই যখন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু পরিষ্কার বলেছিলেন, এসএসসি কি দুর্গাপুজো যে প্রতি বছর করতে হবে? একথা যে স্কুলশিক্ষার উপরে কুঠারাঘাত সেকথা রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীরা ছাড়া কেউ তখন বলেননি। পরবর্তীকালে যখন তদানীন্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় ঘোষণা করলেন এসএসসি, টেট ইত্যাদি পরীক্ষার মেধাতালিকা প্রকাশ করা হবে না, পাশ করলে প্রার্থীর কাছে এসএমএস যাবে কেবল, তখনও রাজ্যের লেখাপড়া জানা মানুষ কোনও উচ্চবাচ্য করেননি। একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হবে সরকারি উদ্যোগে অথচ তার মেধাতালিকা প্রকাশ করা হবে না— এ যে দুর্নীতির পথ প্রস্তুত করা, তা তখন কোন সাংবাদিক লিখেছিলেন? কোন শিক্ষাবিদ একটি উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লিখেছিলেন? আজকের দুর্নীতির নিন্দা করতে গিয়ে অনেকেই বাম আমলের নিয়োগ দুর্নীতি টেনে আনছেন। এতে হয়ত নিরপেক্ষতা প্রমাণ হয়, কিন্তু অস্বীকার করা হয় যে এসএসসি, টেট দুর্নীতির সঙ্গে প্রাক-এসএসসি যুগে টাকা দিয়ে চাকরি পাওয়ার তুলনা বস্তুত আলুর সঙ্গে আপেলের তুলনা। কারণ সেখানে স্থানীয় স্তরে দুর্নীতি হত, যা বন্ধ করতে সরকার কেন্দ্রীয় পরীক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিল। এখানে সরকার সচেতনভাবে একটি চালু ব্যবস্থা ধাপে ধাপে তুলে দিয়েছে যাতে কেন্দ্রীয়ভাবে দুর্নীতি করা সম্ভব হয়। যাঁরা বলেন পাঁচ টাকার দুর্নীতিও দুর্নীতি আর পাঁচ কোটি টাকার দুর্নীতিও দুর্নীতি, তাঁদের দেখলে সশরীরে ঈশ্বর দর্শনের মত অনুভূতি হতে পারে। কিন্তু তাতে একথা অপ্রমাণ হয় না যে তাঁরা যে কোনও কারণেই হোক স্থিতাবস্থার সমর্থক। পরিস্থিতির চাপে বর্তমান সরকারকে খানিকটা গাল দিচ্ছেন মাত্র। হয়ত কিছুটা বিবেকের দায়ে, কিছুটা নইলে লোকে খারাপ বলবে বলে।

আরও পড়ুন শিক্ষক দিবসের প্রশ্ন: শিক্ষকদের বাঁচাবে কে?

তৃণমূল সরকারের বরাবরের সমর্থক কেউ কেউ যেমন রাতের অন্ধকারে মহিলাসুদ্ধ আন্দোলনকারীদের পুলিসের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দৃশ্যে আর স্থির থাকতে পারেননি। বলেছেন বলপ্রয়োগ কাম্য নয়, আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যা মিটিয়ে ফেলা হোক। এসব বিবৃতি দিলে হয়ত বিবেকের ডাকে সাড়া দেওয়া হয় বা সাধারণ মানুষের কাছে নিজের ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল করা যায়। কিন্তু এগুলির বক্তব্য দুর্বোধ্য। ভাবখানা এমন যেন সরকার বাহাদুর এ দুর্নীতিতে যুক্তই নন। তৃতীয় পক্ষ টাকা নিয়ে চাকরি দিয়ে যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করেছে। এখন সরকার এদের অভিভাবকের আসনে বসে বুঝিয়েসুঝিয়ে মিটিয়ে দিলেই সব মিটে যায়। যেন সরকার মেধাতালিকা প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয়নি, প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী এই মামলায় হাজতবাস করছেন না, যেন আদালত কান ধরার আগে সরকার নিজেই দোষীদের খুঁজে খুঁজে শাস্তি দেওয়া শুরু করেছিল।

হিন্দিভাষীরা বলে থাকেন “দাল মে কুছ কালা নেহি হ্যায়, পুরা দাল হি কালা হ্যায়।” পশ্চিমবঙ্গের নিয়োগ দুর্নীতির ব্যাপারটাও যে তাই তা এখনও অনেকেই বুঝতে পারছেন না বা বুঝতে চাইছেন না। কারণ এই সত্য তাঁদের রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। কিন্তু চুপ করে থাকতেও পারছেন না, কারণ যে ছেলেমেয়েগুলোকে লাঞ্ছিত হতে দেখা গেছে তারা মোটের উপর নিজের শ্রেণির। এরা মইদুল ইসলাম মিদ্যার মত বিরোধী দলের মিছিলে আসা বা আনিস খানের মত দলীয় রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া গেঁয়ো মুসলমান নয় যে তাদের মৃত্যুতে চোখ ফিরিয়ে থাকা যাবে। পশ্চিমবঙ্গের কাগজ, টিভি চ্যানেলের মালিক, সম্পাদক, উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিশেষজ্ঞ ও বিখ্যাতদের ছেলেপুলেরা প্রায় কেউই সরকারি স্কুলে পড়ে না। ফলে দিব্যি ওসব স্কুলের রোগবালাইকে অগ্রাহ্য করে থাকা গিয়েছিল। কিন্তু এখন যারা মার খাচ্ছে তাদের মুখের ভাষা শুনে, বেশভূষা দেখে পরের ছেলে পরমানন্দ, যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ ভেবে আর থাকা যাচ্ছে না। এতদিনে সত্যিই গা শিরশির করছে— এরপর কোনও ইস্যুতে যদি আমাদের ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গেই সরকার এরকম ব্যবহার করে! এতদিন যারা মার খেয়েছে, নানাভাবে অত্যাচারিত হয়েছে তাদের অবস্থা এবং অবস্থানকে নানা যুক্তিতে আমল না দেওয়া এই মানুষদের জন্যই বোধহয় কবি লিখেছিলেন “যাদের করেছ অপমান/অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।”

চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন হয়ত শেষ অবধি ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে সরকারি প্রতাপে বা কৌশলে, হয়ত সব যেমন চলছিল তেমনই চলবে। কিন্তু তারা অন্তত সাতে পাঁচে না থাকা বাঙালির হাড়ে ঠকঠকানি ধরানোর কাজটুকু করতে পেরেছে বলে ধন্যবাদার্হ।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

মমতা ও পশ্চিমবঙ্গ: মাঝির হাতেই নৌকাডুবি?

মঙ্গলবার দুপুরে যখন সরকার নির্ধারিত স্থান উপচে ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে গিয়ে পড়েছে সিপিএমের ছাত্র ও যুব সংগঠনের মিটিং, সেইসময় একটি জনপ্রিয় বাংলা খবরের চ্যানেল সে মিটিং না দেখিয়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সুবীরেশ ভট্টাচার্যের গ্রেপ্তারের খবর দেখাচ্ছিল। অ্যাঙ্কর, নিউজরুমে দাঁড়ানো এক সাংবাদিক এবং আরও এক প্রতিবেদকের মধ্যে এসএসসি দুর্নীতির চর্বিতচর্বণ চলছিল। অনিবার্যভাবে এসে পড়ছিল অর্পিতা-পার্থ সম্পর্কের আলোচনা। তার খানিকক্ষণ আগেই ওই চ্যানেলে ফ্লোরা সাইনি বলে কোনো এক মডেলের চেহারা ফটোশুটের আগে কীভাবে বদলে যায় তা-ও দেখানো হচ্ছিল বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে। কোন চ্যানেলে ‘ইনসাফ’ আন্দোলন কীভাবে দেখানো হচ্ছে দেখতে গিয়ে ওই চ্যানেলটিতে গিয়েই বারবার হতাশ হতে হচ্ছিল। এমনকি মাঝে মাঝে প্রধান খবর বলে পরপর যে খবরগুলোর ঝলক দেখানো হয়, সেখানেও ইনসাফ সভার সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হচ্ছিল, সাক্ষাৎকারে ধর্মাবতার অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় কেমন তিনমাস জেলের ভয় দেখিয়েছেন অভিষেক ব্যানার্জিকে।

হঠাৎই সেই চ্যানেলেও লাইভ হয়ে গেল সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বক্তৃতা। সমস্তটাই লাইভ হল। শুধু ওই একটি চ্যানেল নয়, কোনো চ্যানেলেই কমিউনিস্টরা আবার সেকালের মত কলকাতাকে অচল করে দিয়েছে, নৈরাজ্যের দিন ফিরিয়ে আনছে, পুলিসের কথা না শুনে ঘোর অন্যায় করছে – এরকম অভিযোগ উঠতে দেখলাম না। ওই জমায়েতের জন্য কোন রাস্তায় কত বড় যানজট তৈরি হয়েছে, কার প্লেন মিস হয়ে যাচ্ছে, কে ইন্টারভিউতে পৌঁছতে পারল না – এই নিয়ে অশ্রু বিসর্জনও চোখে পড়ল না। বরং বিজেপি মনোনীত প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদের চ্যানেলের স্টুডিও যেভাবে সাজানো হয়েছিল এবং অ্যাঙ্কররা যেরকম উদ্দীপ্ত ছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল গণশক্তি নতুন চ্যানেল খুলেছে। কলকাতার যে খবরের কাগজটি মিটিং মিছিলে সাধারণ নাগরিকের অসুবিধা নিয়ে সাধারণত সবচেয়ে বেশি অসন্তোষ প্রকাশ করে থাকে, তাদের বুধবার সকালের সংস্করণেও ইনসাফ সভার প্রতিবেদনে ওসব নিয়ে একটি শব্দ নেই।

কলকাতার সংবাদমাধ্যম দারুণ বিরোধী-বান্ধব – এমন অভিযোগ মমতা ব্যানার্জিও করবেন না। তাহলে এ হেন আচরণের কারণ কী? একটা কারণ নির্ঘাত প্রস্তুতির অভাব। জনতা যে আসলে চিড়িয়াখানা দেখতে এসেছিল, সে স্টোরির প্রস্তুতি থাকে ব্রিগেডে মিটিং হলে। যানজট ইত্যাদিও খেয়াল রাখা হয় সেইসব দিনে। কিন্তু ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে হওয়ার কথা যে জমায়েত, তা যে গোটা ধর্মতলা দখল করে নেবে তা বোধহয় কোনো প্রথিতযশা চ্যানেল সম্পাদক আন্দাজ করতে পারেননি। কিন্তু প্রস্তুতি না থাকলে খুঁত ধরতে অসুবিধা হতে পারে, প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে হবে কেন? মাসখানেক আগে ওই ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে থেকেই চাকরির দাবিতে ৫০০ দিন ধরে মেয়ো রোডে বসে থাকা ছেলেমেয়েদের কাছ পর্যন্ত একটি নাগরিক মিছিলের ডাক দিয়েছিল বামেরা। লেখার প্রয়োজনে এবং কিছুটা নিজের প্রতিবাদ জানানোর তাগিদে সেদিন গিয়েছিলাম। সেই মিছিলে নেতারা এবং বিখ্যাতরা ছিলেন, কিন্তু প্রাণ ছিল না। লাভ বলতে এক প্রাক্তন সহকর্মীর সঙ্গে অনেকদিন পরে সাক্ষাৎ। সে গিয়েছিল নিজের কাগজ থেকে মিছিল কভার করতে। বলেছিল, কলকাতার সংবাদমাধ্যম নাকি এখন বামেদের প্রতি কিছুটা নরম হয়েছে। চাইছে বামেদের হাল ফিরুক। সেদিন কথাটা খুব একটা বিশ্বাস করিনি। কিন্তু মঙ্গলবারের পর বিশ্বাস না করে উপায় নেই।

কথা হল, সংবাদমাধ্যমের নরম হওয়ার প্রয়োজন কী? বিজ্ঞাপনের রাশ তো এখনো নবান্নের হাতেই। সিবিআই আর ইডি যতই জ্বালাতন করুক, সাংবাদিকদের প্রয়োজনে টাইট দেওয়ার জন্য কেস দিতে রাজ্য পুলিস তো আছেই। আসলে হাজার হোক, চ্যানেলের টিআরপি চাই। কাগজেরও পাঠকের মর্জি কিছুটা খেয়াল রাখতেই হয়। বহু দর্শক/পাঠকেরই মর্জি যে গত কয়েক মাসে সরকারবিরোধী হয়ে উঠেছে তা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়া, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাজারে আলু পটল ঝিঙে মাছ মাংস কিনতে যাওয়া সম্পাদকরাও দিব্যি টের পাচ্ছেন।

বিধানসভার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে যে বিশ্লেষণ এ রাজ্যে প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল, তা হল কোনো সরকারবিরোধী হাওয়া আদপেই ছিল না। সবটাই বিরোধীদের কল্পনা। বিজেপির ভোট ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচন থেকে এক লাফে ২৮.১৩% বাড়ল। মুখ্যমন্ত্রী নিজে হেরে গেছেন কিন্তু তাঁর পার্টি জিতেছে – এমন ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। ঠিক তাই ঘটল, অথচ প্রাজ্ঞ সম্পাদক এবং তৃণমূল সমর্থকরা ঘোষণা করলেন সরকারের বিরুদ্ধে কোনো হাওয়া ছিল না। কেউ কেউ বললেন মমতা হেরেছেন শুভেন্দু অধিকারীর ধর্মীয় মেরুকরণমূলক প্রচারের কারণে, তার সঙ্গে সরকারের প্রতি অসন্তোষের কোনো সম্পর্ক নেই। আশ্চর্য! জ্যোতি বসুর পরে বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা নাকি স্রেফ ধর্মীয় মেরুকরণের কারণে হেরে গেছেন। এসব বলে আসলে যা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে, তা হল সরকারবিরোধী হাওয়া টেনে নিয়েছিল বিজেপি। সাধারণ ভোটার তৃণমূল নেতা, মন্ত্রীদের দুর্নীতি নিয়ে যথেষ্ট অসন্তুষ্ট ছিলেন। বিজেপির পরাজিত প্রার্থীদের তালিকায় তৃণমূলাগতদের বিরাট উপস্থিতিই তার প্রমাণ। কিন্তু মমতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ছিল অটুট। দলীয় রাজনীতির বাইরের মানুষের সাথে কথা বললেই শোনা যেত, তাঁরা মনে করেন অমুক নেতাটা বদমাইশ কিন্তু দিদি ভাল। তমুক মন্ত্রী চোর কিন্তু দিদি ভাল। অনেকের মতেই ভাইপোও সুবিধের লোক নয়, কিন্তু মমতা ভাল। তাঁর দুর্ভাগ্য, এইসব আজেবাজে লোককে নিয়ে চলতে হয়। ফলে দুর্নীতিগ্রস্তরা “দলে থেকে কাজ করতে পারছি না” বলে বিজেপিতে চলে যাওয়ায় মমতার জনপ্রিয়তা বরং বেড়েই গিয়েছিল। তিনি নন্দীগ্রামে হারলেন স্থানীয় বটগাছ শুভেন্দুর কাছে, অন্য কেউ প্রার্থী হলেই হয়ত জিতে জেতেন। কিন্তু এ কথা তো সত্যি, যে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকেই মমতা আসলে ২৯৪ আসনেই প্রার্থী। ভোটাররা যাদের অপছন্দ করছিলেন তারা দল ছেড়ে চলে যাওয়ায় প্রসন্ন চিত্তে আবার মমতাকেই ভোট দিয়েছিলেন। এই গগনচুম্বী ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও কিন্তু আজ টলমল করছে।

ইনসাফ সভায় লোক টানতে মীনাক্ষী মুখার্জি, কলতান দাশগুপ্তরা স্থানীয় স্তরে অসংখ্য ছোট ছোট সভা করেছেন বলে জানা যাচ্ছে। অর্থাৎ সংগঠনের একেবারে নিচের স্তর থেকে ইমারত গড়ে তোলার চেষ্টা। এ মাসে সিপিএম রাজ্যের প্রত্যেকটা পঞ্চায়েতে ডেপুটেশন দেওয়ার কর্মসূচিও নিয়েছে। সেই ডেপুটেশনের প্রস্তুতি হিসাবে আবার প্রত্যেক পঞ্চায়েত এলাকার প্রত্যেক পাড়ায় স্ট্রিট কর্নার হচ্ছে। এর আগে হয়েছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসংযোগ অভিযান। এই সক্রিয়তা শুধু যে গত ১১ বছরে দেখা যায়নি তা-ই নয়, শ্বেতশুভ্র বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে জনসংযোগে এমনই ভাঁটা পড়েছিল যে লেখাপড়া জানা শহুরে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত ছাড়া অধিকাংশ মানুষেরই মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর দলকে দূর গ্রহের বাসিন্দা বলে মনে হত। তার বিপরীতে মমতা কাছের লোক। যে ভাষা বিভ্রাটের জন্য মমতা নাক উঁচু সিপিএম কর্মী সমর্থকদের হাসির পাত্র, সে ভাষা একজন রিকশাচালক বা পরিচারিকাকে মনে করাত তিনি কাছের মানুষ। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে মমতার দেবীপ্রতিম জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল এভাবেই। সেই জনপ্রিয়তা তাঁর দলকে নিঃসন্দেহে ২০২১ উতরে দিতে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। কিন্তু ইদানীং সব ধরনের মানুষের বিশ্বাসেই চিড় ধরার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কেন?

একসময় হিট বাংলা ছবির রিমেক হত বলিউডে এবং সে ছবিও হিট হত। সেভাবেই অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের নিশি পদ্ম শক্তি সামন্তের হাতে হয়েছিল অমর প্রেম। সে ছবির গান তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল। গীতিকার আনন্দ বক্সী একটি গানে তুলেছিলেন মোক্ষম প্রশ্ন – মাঝনদীতে নৌকো দুললে তো মাঝি সামলে-সুমলে পারে নৌকো ভেড়ায়, কিন্তু মাঝি নিজেই নৌকো ডুবিয়ে দেবে ঠিক করলে সে নৌকোকে বাঁচাবে কে (মজধার মে নইয়া ডোলে/তো মাঝি পার লগায়ে।/মাঝি জো নাও ডুবোয়ে/উসে কৌন বচায়ে)? অতি সাম্প্রতিককালে সম্ভবত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে এই জাতীয় সংশয় তৈরি হয়েছে মানুষের মনে। এসএসসি দুর্নীতি অবধি তবু ঠিক ছিল। মুখ্যমন্ত্রী বিশেষ সমর্থন করতে যাননি, বরং ঝটপট মন্ত্রিসভা থেকে পার্থকে ছেঁটে ফেলা হয়েছিল। ফলে ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হওয়া কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি দিদি সমর্থন করেন – এমন ভাবার অবকাশ তৈরি হয়নি। কিন্তু অনুব্রত মণ্ডলের বেলায় দিদির একেবারে অন্য রূপ। কেষ্টবাবুর ঘরে নোটের পাহাড় দেখা যায়নি বটে, কিন্তু রোজই তাঁর বিপুল পরিমাণ ফিক্সড ডিপোজিট, জমিজমা, সাদা-কালো ব্যবসার কাহিনি প্রকাশিত হচ্ছে। দিদি কিন্তু বরাভয় নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। বলেছেন যেদিন ফিরে আসবে, সেদিন বীরের সম্মান দিয়ে নিয়ে আসতে হবে। যে মানুষ নিশ্চিন্তে ছিলেন এই ভেবে, যে আশেপাশে চোর ডাকাত থাকলেও নৌকার হাল দিদির হাতে, তিনি এরপর কী ভাবছেন কে জানে? একথা ঠিক যে নারদ কেলেঙ্কারির অভিযুক্তদেরও মমতা একইভাবে সমর্থন করেছিলেন, তাতে জনপ্রিয়তা কমেনি। কিন্তু মানুষের ধৈর্যেরও সীমা থাকে, আর সে সীমা কখন লঙ্ঘিত হয় কেউ জানে না। হয়ত বিরোধীদের সক্রিয়তার মাত্রাও সেই সীমা নিয়ন্ত্রণ করে। নারদ কেলেঙ্কারির পর পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীরা সাংবাদিক সম্মেলন ছাড়া আর কী করেছিলেন মনে করতে বেশ কষ্ট হবে।

কারণ যা-ই থাক, গত কয়েক মাসে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটছে। দোকানে বাজারে মানুষ মমতার সততা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। একজন রিকশাচালক এমনকি তাঁর হাওয়াই চটি, নীল পাড় সাদা শাড়িতেও দুর্নীতির গন্ধ পাচ্ছেন। সেসবের দাম সম্পর্কে এমন সব কথা উড়ে বেড়াচ্ছে যেগুলো নিঃসন্দেহে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির অবদান। নতুনত্ব এইখানে, যে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটি এর আগে মমতাকে মমতাজ বলত, আরও নানা অশ্লীল ব্যক্তিগত আক্রমণ করত। কিন্তু মমতা দুর্নীতিগ্রস্ত বললে ভাইরাল হওয়া যাবে না – ইউনিভার্সিটির অধ্যাপকদের কাছে বোধহয় এরকমই তথ্য ছিল। সে তথ্য কি বদলে গেল?

একা রামে রক্ষে নেই, সুগ্রীব দোসর। রাজ্যে চাকরি-বাকরি নেই; চাকরি সংক্রান্ত কেলেঙ্কারির তদন্তেই সিবিআই, ইডির রমরমা। ওদিকে মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং জড়িয়ে পড়লেন ভুয়ো চাকরি বিলোবার কাণ্ডে। ঘটা করে সভা ডেকে চাকরির নিয়োগপত্র বলে যা বিলোলেন তা প্রথমত বেসরকারি চাকরির। তারপর জানা গেল ওগুলো সঠিক অর্থে চাকরিও নয়, শিক্ষানবিশির সুযোগ মাত্র। পশ্চিমবঙ্গে কর্মসংস্থানের যা অবস্থা তাতে অসহায় যুবকরা ওই মোটা অফারই মাথায় তুলে নিতেন নিশ্চয়ই, কিন্তু অতঃপর ঝুলি থেকে বেরোল প্রফেসর শঙ্কুর ‘মরুরহস্য’ গল্পের বিজ্ঞানী ডিমেট্রিয়াসের পোষ্যের আকারের একটি বেড়াল। যে সংস্থার অফার লেটার দেওয়া হয়েছে সেই সংস্থা আদৌ ওগুলি ইস্যু করেনি। চিঠিতে যাঁর সই রয়েছে সেই বেদপ্রকাশ সিং সটান বলে দিলেন চিঠিগুলি ভুয়ো। ঘটনার পর বেশ কয়েকদিন পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম গান্ধীজির তিন বাঁদর হয়ে বসেছিল। তারপর থেকে মন্ত্রী, আমলা যাকেই এ নিয়ে প্রশ্ন করেছে তিনিই বলেছেন তিনি কিছু জানেন না। জানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। ফলে মাঝির নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ার ভয় ঢুকে পড়ল এখানেও।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এমন মানুষও আছেন যাঁরা তৃণমূলে দুর্নীতি আছে, শঠতা আছে জেনে, তৃণমূল নেতারা সন্ত্রাস চালান মেনে, মমতাকে ভক্তি না করেও তাঁর মুখ চেয়ে ভোট দিয়ে এসেছেন। কারণ তিনি ধর্মনিরপেক্ষ, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করেন। অধুনা তাঁরাও মাঝির হাতে নৌকাডুবির ভয় পাচ্ছেন, পেতে বাধ্য। গত বছর এ রাজ্যের নির্বাচনী প্রচার রাজ্য সরকারের কাজকর্ম সম্পর্কে হয়নি বলা যায়। যদি বলা হয় ভোটটাকে করে তোলা হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে গণভোট, তাহলে ভুল হবে না। সেই ভোটে জিতলেন মমতা। তারপর থেকে গত এক বছরে তিনি কী কী করেছেন? বিজেপির দুই নেতাকে দলে নিয়ে একজনকে সাংসদ, আরেকজনকে বিধায়ক তথা মন্ত্রী করেছেন। আরেকজন প্রবীণ বিজেপি নেতাকে দলে নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী করে সারা ভারতের বিরোধীদের সমর্থন জোগাড় করেছেন। তারপর শেষ মুহূর্তে বলেছেন আগে জানলে বিজেপি মনোনীত প্রার্থীকেই সমর্থন করতেন। তারপর উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধীদের সম্মিলিতভাবে মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন করেননি। সেখানেই শেষ নয়। কদিন আগে বলেছেন বিজেপি খারাপ, আরএসএস খারাপ নয়। শেষমেশ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভাল, অন্য বিজেপি নেতারা ইডি, সিবিআইকে কাজে লাগাচ্ছেন। ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ তো মাঝির হাতে নৌকাডুবির ভয় করবেনই।

আরও পড়ুন রাহুলে না, বাবুলে হ্যাঁ: তৃণমূলের প্রকৃত এজেন্ডা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

এমন হতেই পারে যে এরপরেও মমতা তথা তাঁর দল হইহই করে নির্বাচনে জিতবে। তবে মনে রাখা ভাল, রাজনীতিতে অমর প্রেম বলে কিছু হয় না।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কেবল গুণী মানুষ নন, তাঁর প্রতিভা বহুমুখী। তিনি সাহিত্য রচনা করেন, ছবি আঁকেন, গান লেখেন। তার উপর রাজ্যের প্রশাসন চালাতে হয়। একজন মানুষকে এত কাজ করতে হলে কাগজ পড়ার সময়ের অভাব ঘটা খুবই স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই প্রতিদিন কাগজ পড়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী পান না। পেলে চোখে পড়ত কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজের একটা খবর, যার শিরোনাম ‘RSS yet to clear air on bombing claim affidavit’। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের প্রধান পবন খেরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) এক প্রাক্তন প্রচারকের মহারাষ্ট্রের নানদেড় জেলা ও সেশনস আদালতে জমা দেওয়া হলফনামা প্রকাশ্যে এনেছেন। সেই হলফনামায় যশবন্ত শিন্ডে নামক ওই লোকটি দাবি করেছে, সংঘ পরিবারের সদস্য সংগঠনগুলো দেশের বিভিন্ন জায়গায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সংবাদমাধ্যমের একাংশ এবং পুলিস প্রশাসনের সহযোগিতায় তার দোষ মুসলমান সম্প্রদায়ের ঘাড়ে চাপিয়েছে। ফলে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি লাভবান হয়েছে।

খবরটা মুখ্যমন্ত্রীর চোখ এড়িয়ে গিয়ে থাকতেই পারে, কারণ এ নিয়ে কোনো চ্যানেলে কোনো বিতর্কসভা বসেনি। কলকাতার অন্যান্য তথাকথিত উদার খবরের কাগজগুলোতেও আতসকাচ দিয়ে খুঁজে দেখতে হবে এই খবর। তাছাড়া কংগ্রেস তো বানিয়েও বলতে পারে। কারণ তারা তৃণমূল কংগ্রেসকে বিজেপির প্রধান বিরোধী হয়ে উঠতে দিতে চায় না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর শক্তিশালী সোশাল মিডিয়া টিম আছে। টুইটারে তাঁর সাত মিলিয়ন ফলোয়ার, ফেসবুকে ৪.৯ মিলিয়ন। সেই সোশাল মিডিয়া টিমের সাহায্য নিলেই মুখ্যমন্ত্রী জানতে পারবেন যে ওই মর্মে হলফনামা সত্যিই ফাইল করা হয়েছে। চাইলে স্বয়ং যশবন্তের মুখ থেকেই হলফনামায় লিখিত অভিযোগগুলো সংক্ষেপে শুনে নিতেও পারবেন। মারাঠি যশবন্তের ভিডিও ইংরেজি সাবটাইটেল সমেত সোশাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

যশবন্তের হলফনামার কথা প্রকাশ্যে এল বৃহস্পতিবার, কলকাতার কাগজের প্রথম পাতায় সে খবর বেরোল শুক্রবার সকালে। সেদিনই সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বললেন “আরএসএস এত খারাপ ছিল না, এবং এত খারাপ বলে আমি বিশ্বাস করি না।” মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই খবরটা জানতে পারেননি বলেই ওরকম বলেছেন। স্বীকার্য যে যশবন্তের কথাগুলো অভিযোগ মাত্র। কিন্তু যে সংগঠনের একদা প্রচারকরা এই মুহূর্তে দেশের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বহু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী – তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ যে মারাত্মক, সে কথা না বোঝার মত রাজনীতিবিদ মমতা ব্যানার্জি নন। তাছাড়া তিনদিন হয়ে গেল, এখন পর্যন্ত আরএসএস যশবন্তকে মিথ্যাবাদী বলে কোনো বিবৃতি দেয়নি। অবশ্য জবাবদিহি না চাইলে বিবৃতি দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। ২০০৬ সালের নানদেড় বিস্ফোরণ কাণ্ডে সরকারি সাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হতে চেয়ে আবেদন করেছিল যশবন্ত। আদালত সবেমাত্র সেই আবেদন গ্রহণ করেছে, আরএসএসকে জবাবদিহি করতে তো ডাকেনি। সাংবাদিকদেরই বা ঘাড়ে কটা মাথা, যে এ নিয়ে মোহন ভাগবতকে প্রশ্ন করবে? অতএব আরএসএসের বয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা বলে ঘোষণা করতে। কথায় আছে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। মুখ্যমন্ত্রী তো বিশ্বাসই করেন না আরএসএস খারাপ। ফলে যতক্ষণ তারা নিজেরা না বলছে “হ্যাঁ, আমরা খারাপ”, মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চিন্ত। কিন্তু খটকা অন্যত্র।

“এত খারাপ ছিল না”। এত খারাপ মানে কত খারাপ? তার মানে মুখ্যমন্ত্রী জানেন যে আরএসএস একটু একটু খারাপ? সেই পরিমাণটা কি তাঁর পক্ষে সুবিধাজনক? খারাপ ছিল না মানেই বা কী? আগে যতটুকু খারাপ ছিল তাতে তাঁর আপত্তি ছিল না, এখন বেশি খারাপ হয়ে গেছে – এ কথাই কি বলতে চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী? তাঁর কাছে কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ তা অবশ্য আমাদের জানা নেই। মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা কি খারাপ? সে হত্যায় আরএসএস যোগ প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ হয়নি বটে, তবে সেই ঘটনার পরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লিখেছিলেন, আরএসএস নেতাদের ভাষণগুলো যে বিষ ছড়িয়েছে তারই পরিণতি গান্ধীহত্যা। তাই ভারত সরকার আরএসএসকে নিষিদ্ধ করে। কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন? সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। জওহরলাল নেহরুর বদলে যিনি প্রধানমন্ত্রী হলে ভারত সোনার দেশ হত বলে আরএসএস এখন দিনরাত ঘোষণা করে। মুখ্যমন্ত্রী নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাই ধরে নিচ্ছি অতকাল আগের ব্যাপার তাঁর মনে নেই। তাই তার ভালমন্দ ভেবে দেখেননি। তবে যেহেতু তিনি একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী এবং নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করেন, সেহেতু ধরে নিতে দোষ নেই যে যশবন্ত শিন্ডে তার হলফনামায় যে ধরনের কার্যকলাপের কথা লিখেছে সেগুলো আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর চোখে খারাপই। কারণ কাজগুলো বেআইনি এবং সাম্প্রদায়িক।

এখন কথা হল, যশবন্ত যে অভিযোগ করেছে আরএসএসের বিরুদ্ধে, সে অভিযোগও কিন্তু এই প্রথম উঠল তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী কাগজ পড়ারই সময় পান না যখন, বই পড়ার সুযোগ না পাওয়ারই কথা। তবে তাঁর তো পড়ুয়া পারিষদের অভাব নেই। তাঁরা কেউ কেউ নির্ঘাত মহারাষ্ট্র পুলিসের প্রাক্তন ইন্সপেক্টর জেনারেল এস এম মুশরিফের লেখাপত্র পড়েছেন। তাঁর লেখা আরএসএস: দেশ কা সবসে বড়া আতঙ্কবাদী সংগঠন বইতে ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত মোট ১৮টা বোমা বিস্ফোরণে আরএসএস, অভিনব ভারত, জয় বন্দেমাতরম, বজরং দল এবং সনাতন সংস্থা – এই পাঁচটা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনকে দায়ী করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর পার্ষদরা কেন যে এসব কথা তাঁকে জানাননি! জানলে নিশ্চয়ই আরএসএস খারাপ “ছিল না” – একথা মুখ্যমন্ত্রী অতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলতেন না। অবশ্য মুশরিফ যা লিখেছেন তার সমস্তই তো স্রেফ অভিযোগ। মালেগাঁও বিস্ফোরণের প্রধান অভিযুক্ত সাধ্বী প্রজ্ঞা যেভাবে ছাড়া পেয়ে সাংসদ হয়ে গেছেন, তাতে ওসব অভিযোগকে আর আমল দেওয়া চলে কিনা সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে আরএসএসের উপর অত্যন্ত জোরালো বিশ্বাস না থাকলে এসব জেনে সংঘ পরিবারের সদস্য নয় এমন এক রাজনৈতিক দলের সর্বময় নেত্রীর কিছুটা সন্দিহান হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিজের বিশ্বাসে অটল।

রাজনীতিতে দুজন ব্যক্তি, দুটো সংগঠন বা একজন ব্যক্তির সঙ্গে একটা সংগঠনের সম্পর্ক চোখ বন্ধ করে ভরসা করার মত পর্যায়ে পৌঁছনো চাট্টিখানি কথা নয়। বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস না থাকলে তেমনটা হওয়া শক্ত। সেদিক থেকে মমতার আরএসএসের প্রতি এই বিশ্বাস বুঝতে অসুবিধা হয় না। আজকের মুখ্যমন্ত্রী গত শতকের শেষ দশকে যখন ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন এককালের স্বয়ংসেবক অটলবিহারী বাজপেয়ী আর লালকৃষ্ণ আদবানির স্নেহ না পেলে মমতার পক্ষে আস্ত একখানা রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা সম্ভব হত কি? হলেও সদ্যোজাত দলটাই মধ্যগগনে থাকা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের বিরোধী হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে – এ বিশ্বাস কংগ্রেসের ভোটার তথা কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা যেত কি? মাত্র আটজন সাংসদ যে দলের, সেই দলের নেত্রীকে রেল মন্ত্রকের দায়িত্ব দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের প্রভাবিত করার মহার্ঘ সুযোগ দিয়েছিল বিজেপি। শুধু কি তাই? তেহেলকা কাণ্ড প্রকাশিত হওয়ার পরেই সততার প্রতীক মমতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এনডিএ ত্যাগ করেন। তা সত্ত্বেও ২০০৩ সালে তাঁকে দপ্তরহীন মন্ত্রী করে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। আরএসএস আর বিজেপি আলাদা – এই তত্ত্বে এখনো বিশ্বাস করেন যাঁরা, তাঁদের কথা আলাদা। বাকিরা নিশ্চয়ই মানবেন, এভাবে পাশে থাকার পরেও যদি মমতা আরএসএসকে বিশ্বাস না করতেন তাহলে ভারি অন্যায় হত।

আসলে মমতার আরএসএসে বিশ্বাস ততটা অসুবিধাজনক নয়। তাঁর বারংবার আরএসএস প্রীতি ঘোষণা সত্ত্বেও দেশসুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের কেষ্টবিষ্টুদের মমতায় বিশ্বাস বরং বৃহত্তর বিপদের কারণ। গত বছর বিধানসভা নির্বাচনে যখন বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানোই মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াল, তখন বামপন্থীদের মধ্যে লেগে গেল প্রবল ঝগড়া। সিপিএম নেতৃত্বাধীন বাম দলগুলো বলতে শুরু করল বিজেপি আর তৃণমূল অভিন্ন, তাই তৃণমূলকে ভোট দেওয়া আর বিজেপিকে ভোট দেওয়া একই কথা। উঠে এল একটা নতুন শব্দ – বিজেমূল। অন্যদিকে নকশালপন্থীরা বলতে লাগল, যেখানে যে প্রার্থী বিজেপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী তাকে ভোট দিতে। বিজেমূল তত্ত্বের প্রমাণ হিসাবে সিপিএম “দলে থেকে কাজ করতে পারছি না” বলে লাইন দিয়ে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়া শীর্ষস্থানীয় নেতা, মন্ত্রীদের দেখাতে লাগল। আর যত না তৃণমূল, তার চেয়েও বেশি করে নকশালরা তার জবাবে তালিকা দিতে থাকল, কোন ব্লক স্তরের সিপিএম নেতা বিজেপিতে গেছে, কোন জেলা স্তরের নেত্রী বিজেপিতে যোগ দিলেন। অর্থাৎ দুপক্ষের কেউই তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতি কী, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকলে কেন আছে বা না থাকলে কেন নেই – সে আলোচনায় গেল না। অথচ ঠিক তখনই ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে বসে লাইভ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন “আমি সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়ছি না। ওরা তো নির্বাচনে লড়ে না। ওরা বিজেপিকে সমর্থন করে। আমি লড়ছি বিজেপির সঙ্গে।” এই নেত্রীর দল জয়যুক্ত হল, একমাত্র বিরোধী দল হিসাবে উঠে এল বিজেপি। অর্থাৎ ঘোষিতভাবে আরএসএসের বন্ধু দুটো দলের হাতে চলে গেল বাংলার আইনসভা। অথচ পশ্চিমবঙ্গের ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিমানরা উল্লসিত হয়ে ঘোষণা করলেন, বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য জিতে গেল। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ জিতে গেলেন, ইত্যাদি।

আরও মজার কথা, নির্বাচনে গোল্লা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিপিএমও পরিত্যাগ করল বিজেমূল তত্ত্ব। আরও এক ধাপ এগিয়ে এ বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দেশের একমাত্র যে নেতা সর্বদা নাম করে আরএসএসকে আক্রমণ করেন, সেই রাহুল গান্ধীর দল কংগ্রেস থেকে শুরু করে সিপিএম, লিবারেশন সমেত সমস্ত বাম দল সমর্থন করে বসল মমতার পছন্দের প্রার্থীকে। সে আরেক যশবন্ত – বিজেপি থেকে তৃণমূলে এসেছেন। এ থেকে যা প্রমাণিত হয় তা হল, মমতার মত আরএসএস-বান্ধব নয় যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো, তারাও ব্যাপারটাকে নির্বাচনী লড়াইয়ের বেশি কিছু ভাবে না।

আরএসএসের কাছে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করে তোলা মতাদর্শগত মরণপণ লড়াই। সে লক্ষ্যে পৌঁছতে তারা সাংবিধানিক, অসাংবিধানিক – সবরকম পথই নিতে রাজি। প্রয়োজনে আদবানির মত আগুনে নেতাকে বঞ্চিত করে বাজপেয়ীর মত নরমপন্থীকে প্রধানমন্ত্রী করতে রাজি ছিল। জমি শক্ত হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদীর মত কড়া হিন্দুত্ববাদীকে নেতা করেছে, ভবিষ্যতে তাঁকেও আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে আরও গোঁড়া আদিত্যনাথকে সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসাতে পারে। বিরোধীরা ওই বিস্তারে ভেবেই উঠতে পারেনি এখনো। এমনকি তথাকথিত কমিউনিস্ট দলগুলোও কেবল স্ট্র্যাটেজি সন্ধানে ব্যস্ত। কোথায় কাকে সমর্থন করলে বা কার সাথে নির্বাচনী জোট গড়লে বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানো যাবে – এটুকুই তাদের চিন্তার গণ্ডি। সে কারণেই বিজেমূল শব্দটা নির্বাচনের আগে ভেসে ওঠে, পরাজয়ের পর মিলিয়ে যায়। যদি সিপিএমের পক্ষ থেকে সংঘমূল কথাটা বলা হত এবং শূন্য হয়ে যাওয়ার পরেও বলে যাওয়া হত, তাহলে জনমানসে সত্যি সত্যি প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হতে পারত। হিন্দুরাষ্ট্র কী, তা হওয়া আটকানো কেন দরকার, আটকানোর ক্ষেত্রে মমতাকে সত্যিই প্রয়োজন, নাকি তিনি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া – শতকরা ৮০-৯০ জন মানুষ এই মুহূর্তে এসব নিয়ে ভাবছেন না (সোশাল মিডিয়া দেখে যা-ই মনে হোক)। সংঘ পরিবারকে সরাসরি রাজনৈতিক ভাষণে, কর্মসূচিতে আক্রমণ করা হলে ভাবতে বাধ্য হতেন।

বিহারে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুযোগ আসা মাত্রই সমস্ত বাম দল একজোট হয়ে নীতীশকুমারকে সমর্থন করেছে। কেবল লিবারেশন নয়, সিপিএমও। সে জোটে কংগ্রেসও আছে। অথচ নীতীশও মমতার মতই বিজেপির সঙ্গে ঘর করেছেন। শুধু তা-ই নয়, মমতার বিজেপির সাথে শেষ জোট ছিল ২০০৬ সালে। নীতীশ কিন্তু ২০১৬ বিধানসভা ভোটে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সঙ্গে লড়ে জিতেও বিশ্বাসঘাতকতা করে বিজেপির কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। কেন নীতীশ আরএসএস-বিরোধী বাম দল এবং কংগ্রেসের কাছে গ্রহণযোগ্য আর কেন মমতা নন, তা নিয়ে কোনো আলোচনাই শুনলাম না আমরা। আলোচনাটা হল না সম্ভবত এইজন্যে, যে বামেরা বা কংগ্রেস নিজেরাই ওসব নিয়ে ভাবে না। বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পারলেই খুশি, শেষমেশ আরএসএসের প্রকল্পই সফল হয়ে যাবে কিনা তা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। অথবা ‘যখন হবে তখন দেখা যাবে’ নীতি নিয়ে চলছে।

আসলে কিন্তু মমতায় আর নীতীশে তফাত বড় কম নয়। নীতীশ সুযোগসন্ধানী, ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ। তারই অনিবার্য ফল হিসাবে ভূতপূর্ব জনতা দলের সঙ্গে, একদা সতীর্থ লালুপ্রসাদের সাথে তাঁর বিচ্ছেদ হয়েছিল। কিন্তু তাঁর রাজনীতির সূতিকাগার হল সমাজবাদী রাজনীতি, নিম্নবর্গীয় মানুষের রাজনীতি। সে কারণেই নীতীশ কখনো বিজেপিকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি, বিজেপিও পারেনি। নীতীশ কখনো মমতার মত সোচ্চার আরএসএস বন্দনাও করেননি। কারণ আরএসএস হল ব্রাহ্মণদের দ্বারা পরিচালিত, হিন্দু সমাজের উপর ব্রাহ্মণ আধিপত্য বজায় রাখার জন্য গঠিত সংস্থা। নীতীশের দলের নিম্নবর্গীয় সদস্য, সমর্থকদের সঙ্গে আরএসএসের আড়চোখে দেখার সম্পর্কটুকুই হওয়া সম্ভব। তার বেশি নয়।

অন্যদিকে মমতা ব্রাহ্মণকন্যা। তাঁকে দুর্গা বলে সম্বোধন করতে আরএসএসের কোথাও বাধে না। মমতার রাজনীতির ইতিহাস অন্য দিক থেকেও নীতীশের সঙ্গে মেলে না। বস্তুত যুগপৎ কংগ্রেস বিরোধিতা এবং কমিউনিস্ট বিরোধিতার ইতিহাস সম্ভবত মমতা ছাড়া ভারতের কোনো আঞ্চলিক দলের নেই। তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় রাজনীতির ভিত্তিতে তৈরি দলগুলোর স্বভাবতই প্যাথোলজিকাল বাম বিরোধিতা নেই, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেস বিরোধিতা ছিল। তেলুগু দেশম, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি, জগন্মোহন রেড্ডির দল বা ওড়িশার বিজু জনতা দলের জন্ম তৃণমূলের মতই কংগ্রেস ভেঙে। কিন্তু তাদেরও বামেদের সাথে ধুন্ধুমার সংঘাতের ইতিহাস নেই। তাদের এলাকায় বামেদের দুর্বলতা তার কারণ হতে পারে, কিন্তু এ কি নেহাত সমাপতন যে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তর দিকে আরএসএস বাদ দিলে তৃণমূলই একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি, কমিউনিস্ট এবং কংগ্রেস, দু পক্ষই যাদের ঘোষিত শত্রু? লক্ষণীয়, ২০১১ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল আর কংগ্রেসের জোট গড়তে দারুণ উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখা গেল, তিনি আরএসএসের বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন। সেই জোট বামফ্রন্টকে হারাতে পেরেছিল বটে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ভাঙনের গতিও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

তাহলে আরএসএসের সাথে সম্পর্ক মমতাকে কী কী দিয়েছে তা বোঝা গেল। এবার আরএসএস কী কী পেয়েছে সে আলোচনায় আসা যাক? রাজনীতিতে তো কেউ “আমি   নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি,/ তুমি   অবসরমত বাসিয়ো” গায় না। আরএসএস যা যা পেয়েছে সবকটাই অমূল্য।

১) আরএসএসের দুই ঘোষিত শত্রু মুসলমান আর কমিউনিস্ট। তৃণমূলের উদ্যোগে কমিউনিস্টরা প্রথমে তাদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি থেকে ক্ষমতাচ্যুত, পরে ছত্রভঙ্গ হয়েছে। তার জন্যে আরএসএসের আগমার্কা কোম্পানি বিজেপিকে বিন্দুমাত্র কসরত করতে হয়নি। মুসলমানরা আগে প্রান্তিক ছিলেন, তৃণমূল আমলে বাংলার হিন্দুদের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত হয়ে গেছেন। মমতা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে ইমাম ভাতা চালু করলেন, বিজেপি প্রায় বিনা আয়াসেই হিন্দুদের বোঝাতে সক্ষম হল, মুসলমানরা মমতার দুধেল গাই। পরে মমতা নিজেই অনবধানবশত (নাকি সচেতনভাবেই?) সেকথা বললেনও। এখন পরিস্থিতি এমন, যে বাম আমলে মুসলমানরা বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ভাড়া পেতেন না, এখন খোদ সল্টলেকে হোটেলের ঘর ভাড়া পান না।

২) মুসলমান তোষণ হচ্ছে – এই প্রোপাগান্ডা হিন্দুদের একটা বড় অংশের বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয়েছে তৃণমূল শাসনের ১১ বছরে। ইতিমধ্যে বেলাগাম হিন্দু তোষণ চলছে। বিজেপি আজগুবি অনলাইন প্রচার শুরু করল “পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো করতে দেওয়া হয় না”, তৃণমূল সরকার দুর্গাপুজোগুলোকে নগদ অনুদান দিতে শুরু করল। আরএসএস শুরু করল রামনবমীতে অস্ত্র মিছিল, তৃণমূল আরম্ভ করল বজরংবলী পুজো। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরির পথ খুলে গেল, আরএসএসের প্রতিশ্রুতি পূরণ হল। এদিকে দিদি দীঘায় জগন্নাথ মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা নিলেন। রাজ্যে বিজেপির সরকার থাকলেও এভাবে হিন্দুত্বকে রাজনীতির এজেন্ডায় নিয়ে আসতে পারত কিনা সন্দেহ।

৩) ভারতের একেক রাজ্যের একেকটা বিশিষ্ট গুণ আছে, যা সেই রাজ্যের মানুষের মূলধন। গুজরাটের যেমন ব্যবসা, পাঞ্জাবের কৃষিকাজ। বাংলার ছিল লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা ইত্যাদি। অন্য রাজ্যের লোকেরা যাকে কটাক্ষ করে এককথায় বলে কালচার। এই কালচার আরএসএসের হিন্দুত্বের একেবারে বিপরীত মেরুর জিনিস। তৃণমূল আমলে সবচেয়ে নির্বিঘ্নে সাড়ে সর্বনাশ ঘটানো গেছে এই কালচারের। বাংলার ছেলেমেয়েরা ফড়ফড় করে ইংরেজি বলতে না পারলেও দেশে বিদেশে গবেষক, অধ্যাপক হিসাবে তাদের দাম ছিল। এখনো সর্বভারতীয় বিজ্ঞান পুরস্কারগুলোর প্রাপকদের তালিকা মাঝে মাঝে সেকথা জানান দেয়। সে দাম ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে স্কুল, কলেজের চাকরি বিক্রি করে লেখাপড়া লাটে তুলে দিয়ে। নায়ক, নায়িকা, গায়ক, গায়িকারা কাতারে কাতারে বিধায়ক আর সাংসদ হয়ে গেছেন। লেখকরা ব্যস্ত পুষ্পাঞ্জলি দিতে আর চরণামৃত পান করতে। সিনেমার কথা না বলাই ভাল। শৈল্পিক উৎকর্ষ বাদ দিন, পারিশ্রমিকের হাল এত খারাপ যে কলকাতার শিল্পীরা স্রেফ বাংলা ছবিতে, ওয়েব সিরিজে কাজ করে টিকে থাকতে পারবেন কিনা সন্দেহ। মন্ত্রীর বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়ার ছবি দেখে প্রথম সারির অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য হা-হুতাশ করছেন, ওই পরিমাণ টাকার অর্ধেক পেলেও বাংলা ছবিগুলো অনেক ভাল করে করা যেত।

কিন্তু এসব গোল্লায় যাওয়ার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে। লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা মিলিয়ে যে বাঙালি মনন ছিল সেটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আসল ক্ষতি সেটা। বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকের অন্তত একটা ভান ছিল, যে সে ভারতের অন্য অনেক রাজ্যের লোকেদের মত ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না। দুর্গাপুজো এলে কদিন পাগলামি করে; নিজের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো, সত্যনারায়ণের সিন্নি চলে। কিন্তু বাইরে সে একজন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। এখন সেসব গেছে। নতুন ফ্ল্যাটবাড়ি হলে তার গায়ে খোদাই করা হচ্ছে গণেশের মুখ, শিবলিঙ্গ বা স্বস্তিকা। কলিং বেলে বেজে উঠছে “ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ”। অক্ষয় তৃতীয়ায় এখনো গণেশপুজো এবং হালখাতা হয় এমন দোকান খুঁজে পাওয়া দায়, অথচ গণেশ চতুর্থী এক দশকের মধ্যে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। শিগগির পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনন্ত ছুটির তালিকায় যোগ হবে নির্ঘাত। অল্পবয়সী বাঙালি কথা বলছে হিন্দি মিশিয়ে, ছোটরা স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে শিখছে হিন্দি। বঙ্গভঙ্গের নাম করতেই লর্ড কার্জনের ঘুম কেড়ে নেওয়া বাঙালি নিজে নিজেই প্রায় উত্তর ভারতীয় হিন্দু হয়ে গেল তৃণমূল আমলে। এই সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ তামিলনাড়ুতে কিছুতেই হয়ে উঠছে না আরএসএসের দ্বারা। কেরালায় মার খেতে হচ্ছে, এমনকি নিজেদের হাতে থাকা কর্ণাটকেও করতে গিয়ে অনবরত সংঘাত হচ্ছে। বাংলায় কিন্তু ওসবের দরকারই হচ্ছে না। বিনা রক্তপাতে বাঙালি বাঙালিয়ানা বিসর্জন দিচ্ছে।

আরও পড়ুন শাহেনশাহ ও ফ্যাসিবিরোধী ইশতেহার

এর বেশি আর কী চাইতে পারত আরএসএস? মমতা হিন্দুরাষ্ট্রের জন্য রুক্ষ, পাথুরে বাংলার মাটিতে হাল চালিয়ে নরম তুলতুলে করে দিয়েছেন। বীজ বপনও সারা। ফসল তোলার কাজটা শুধু বাকি।

এটা যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট; ওঁরা গ্ল্যাডিয়েটর নন, ক্রিকেটার

বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, এশিয়া কাপের সময়ে কি জওয়ানরা লড়েন না? তা যদি হয় তাহলে তো আরও বেশি করে ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ হওয়া উচিত।

ম্যাচে তখন টানটান উত্তেজনা। টিভির পর্দায় দেখা গেল ওভারের মাঝখানে দীর্ঘদেহী হার্দিকের খর্বকায় রিজওয়ানকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য। চমকে যাওয়ার পর রিজওয়ানও ভালবেসে টেনে নিলেন হার্দিকের হাত। ম্যাচের আগের কদিন টুইটারে ভাইরাল হয়েছিল একটা ভিডিও। চোটের কারণে এশিয়া কাপ ক্রিকেট থেকে ছিটকে যাওয়া শাহীন আফ্রিদি মনমরা হয়ে প্র্যাকটিসের মাঠের ধারে বসেছিলেন। বিরাট কোহলিকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়ালেন। বিরাট জিজ্ঞেস করলেন পা কেমন আছে। আফ্রিদি বললেন, আমরা আপনার জন্য প্রার্থনা করছি, যেন আপনার ফর্ম ফিরে আসে।

এই আবহে খেলা হল রবিবারের ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ। এর আগের ম্যাচ হয়েছিল ২৪ অক্টোবর ২০২১, ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি উপলক্ষে। সে ম্যাচ দাপটে জিতেছিল পাকিস্তান। এবারে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হল। শেষপর্যন্ত তফাত গড়ে দিলেন পান্ড্য, ভারত জিতল। কিন্তু কোনো ম্যাচেই কোনো অবাঞ্ছিত উত্তাপ তৈরি হয়নি। বরং সাম্প্রতিককালে ভারত বনাম ইংল্যান্ড খেলা হলে ম্যাচের আগে, পরে এবং মাঝে বেশ কিছু অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে দেখা গেছে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রতিবেশীর খেলা বরং ঠিক সেভাবেই হল যেভাবে হওয়া উচিত – ব্যাট বলের লড়াইতে কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়ল না, কিন্তু মুখের হাসিটি বজায় রইল। শুধু তা-ই নয়, পাক ব্যাটার ফখর জমান আউটের আবেদন না হলেও বল ব্যাটে লেগেছে বুঝতে পেরে নিজেই হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। তবু কিন্তু এই দুই দলের মধ্যে সিরিজ খেলা হবে না।

আরও পড়ুন টুপির আমি টুপির তুমি?

শেষ ভারত-পাকিস্তান টেস্ট খেলা হয়েছিল ২০০৭ সালে আর শেষ একদিনের ম্যাচ ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে। দীর্ঘকাল হল ভারত বহুদলীয় প্রতিযোগিতার বাইরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে না। আবার আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ বহুদলীয় হওয়া সত্ত্বেও সেখানে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে না। কেন খেলে না? কারণ স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান কুণাল কামরার ভাষায় “জওয়ান সীমা পে লড় রহে হ্যাঁয়”। তাহলে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, এশিয়া কাপের সময়ে কি জওয়ানরা লড়েন না? শান্ত হয়ে বসে টিভিতে খেলা দেখেন? তা যদি হয় তাহলে তো আরও বেশি করে ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ হওয়া উচিত। প্রক্সি ওয়ারে সীমান্তের এপারে ওপারে নিয়মিত যে জওয়ানদের প্রাণ যায়, সেগুলো বেঁচে যাবে। আসল কথা, নিয়মিত খেলা হলে প্রত্যেকটা ম্যাচ নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ পরিবেশ তৈরি করা আর সম্ভব হবে না। মাঠে ক্রিকেটারদের হাসিঠাট্টা, স্বাভাবিক ব্যবহার দেখতে দেখতে এপারের দেড়শো কোটি আর ওপারের কোটি পঁচিশেক মানুষ যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে, প্রতিবেশী দেশের মানুষ মানেই ইবলিশের বাচ্চা বা রক্তপিপাসু জেহাদি সন্ত্রাসবাদী নয়, তাহলে সমূহ বিপদ দুই দেশের শাসকদেরই। তখন দেশের বেকারত্ব, দেশের মুদ্রাস্ফীতি, দেশের সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি নিয়ে জবাবদিহি করতে হবে। সে বিপদ এড়াতে কালেভদ্রে ম্যাচ হবে, পিচে পপিং ক্রিজ চিহ্নিত করতে টানা লাইনটাকে নিয়ন্ত্রণরেখার সাথে তুলনা করে সম্প্রচারকারী সংস্থা বিজ্ঞাপন দেবে আর প্রগলভ রবি শাস্ত্রীর কণ্ঠে শোনানো হবে – এটা স্টেডিয়াম নয়, কলিসিয়াম। ওরা ক্রিকেটার নয়, গ্ল্যাডিয়েটর। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই খেলার মাঠ লড়াইয়ের মাঠ হয়ে উঠবে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত