রেউড়ি সংস্কৃতি: যে গল্পে ডান-বাম গুলিয়ে গিয়েছে

১৯৯১ পরবর্তী যুগে দিনরাত মন্ত্রের মত কানের কাছে বলে বলে যে কয়েকটি কথা আমাদের মর্মে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার অন্যতম হল, কোনও পরিষেবা বা পণ্য বাজার থেকে পয়সা দিয়ে না কিনে পাচ্ছে মানেই সেটা দান।

আমি কোন পথে যে চলি, কোন কথা যে বলি
তোমায় সামনে পেয়েও খুঁজে বেড়াই মনের চোরা গলি।

এই প্রকল্প বারবার বিরোধীদের ফাঁপরে ফেলতে সমর্থ হয়। এমন গতিতে এমন এক লেংথে পিচ পড়ে মোদি সরকারের সিদ্ধান্তগুলো, যাতে ব্যাকফুটে যাব না ফ্রন্টফুটে খেলব ঠিক করতে করতেই বিরোধীদের ব্যাট-প্যাডের ফাঁক দিয়ে বল গলে গিয়ে উইকেট ভেঙে দেয়। এই মুহূর্তে যেমন কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের যে শেষ চিহ্নটুকু ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে, সেটুকুও মুছে ফেলতে সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু হয়েছে।

প্রাক্তন বিজেপি মুখপাত্র অশ্বিনী উপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন নির্বাচনী প্রচারে যেসব রাজনৈতিক দল ভোটারদের আকর্ষণ করতে “freebies” দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাদের নির্বাচনী প্রতীক ফ্রিজ করে দেওয়া এবং রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার দাবিতে। পিটিশনার বলেছেন “irrational freebies” অর্থাৎ মুফতে অযৌক্তিক সুযোগসুবিধা বিলোবার আগে তার অর্থনৈতিক প্রভাব আলোচনা করতে হবে। এই মামলার শুনানিতে ১১ আগস্ট মহামান্য প্রধান বিচারপতি এন ভি রামান্না বলে বসলেন, অর্থনীতির ক্ষতি আর মানুষের কল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার। অবশ্য তিনি যোগ করেছেন “আমি রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার দিকটা দেখতে চাই না। সেটা অগণতান্ত্রিক। হাজার হোক, ভারত তো একটা গণতন্ত্র।” তার আগেই ৩ আগস্ট বিচারকরা বলেছিলেন, ব্যাপারটা গুরুতর। অতএব নীতি আয়োগ, অর্থ কমিশন, আইন কমিশন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং শাসক ও বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা কমিটি তৈরি হোক মুফতের সুযোগসুবিধার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতে। ১৭ আগস্ট ছিল এ যাবৎ এই মামলার শেষ শুনানি, আগামী সপ্তাহে ফের শুনানি হওয়ার কথা। মজার ব্যাপার, ১১ তারিখ প্রধান বিচারপতি নিজেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, এ বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ করার কতটুকু অধিকার আছে তা নিয়ে। অথচ সেই যুক্তিতে পিটিশন বাতিল করে দেননি।

এই মামলার শুনানিতে দেশের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার কিছু মন্তব্য একবার দেখে নেওয়া যাক। “এই ফ্রিবি কালচারটাকে এখন শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আর নির্বাচন এখন এই নিয়ে লড়া হয়। ফ্রিবিগুলোকে যদি জনকল্যাণ বলে ধরা হয়, তাহলে বিপর্যয় ঘটবে। এটাই যদি নর্ম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মাননীয় বিচারকরা নর্মগুলো ঠিক করে দিন। আইনসভা যতক্ষণ না কিছু করছে, মাননীয় বিচারকরা কিছু নর্ম ঠিক করে দিতেই পারেন।”

এই বিতর্কে দুটো জিনিস বিশেষভাবে লক্ষ করার মত। প্রথমত, ফ্রিবি বলতে স্পষ্টতই বোঝানো হচ্ছে সরকার সাধারণ মানুষকে যেসব সুযোগসুবিধা দেয় সেগুলোকে। কারণ প্রধান বিচারপতি বলেছেন অর্থনীতির ক্ষতি (“economy losing money”) আর মানুষের কল্যাণ (“welfare of the people”)— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা দরকার। অর্থাৎ বলেই দেওয়া হল অর্থনীতির কাজ মানুষের কল্যাণ করা নয়। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি তুষার ইঙ্গিত দিয়েছেন আইনসভা ফ্রিবি সম্পর্কে কিছু করবে। অর্থাৎ কোনও আইন প্রণয়ন করবে। সে করতেই পারে। লোকসভায় যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বিজেপির, তাকে ব্যবহার করে এবং রাজ্যসভায় বিল পাশ করাতে অসুবিধা হলে বিরোধী সাংসদদের সাসপেন্ড করে দিয়ে যে কোনও আইনই কেন্দ্রীয় সরকার করে ফেলতে পারে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সরকারের সে পর্যন্তও তর সইছে না। তুষার চাইছেন তার আগেই আদালত কিছু নিয়মকানুন ঘোষণা করুক।

এই জনস্বার্থ মামলা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ এই মামলা দায়ের হওয়ার কিছুদিন আগেই, গত মাসের শেষদিকে, উত্তরপ্রদেশে বুন্দেলখণ্ড এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশে “রেউড়ি কালচার” চালু হয়েছে। রেউড়ি, অর্থাৎ মিষ্টি, বিতরণ করে ভোট কিনে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। দেশের পক্ষে এই সংস্কৃতি খুব বিপজ্জনক। দেশের মানুষকে, বিশেষ করে যুবসমাজকে, এই কালচার সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। রেউড়ি কালচারের লোকেরা এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দর বা ডিফেন্স করিডোর বানাতে পারবে না।

রেউড়ি মন্তব্যের পিছনের ছকটা খুব পরিষ্কার। প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের সংজ্ঞা ঘোর নব্য-উদারবাদী। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য— এসবের উন্নতি হল কি হল না তা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। উন্নয়ন বলতে তিনি বোঝেন এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দর, ডিফেন্স করিডোর। নব্য উদারবাদী অর্থনীতিতে ভর্তুকি যেমন একটি অশ্লীল শব্দ, তেমনই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সরকারগুলো গরিব নাগরিকদের জন্য যেসব আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করেছে বা বিভিন্ন পরিষেবার মূল্যে বিশেষ ছাড় দিয়ে থাকে— সেগুলোও ক্ষতিকর, অবান্তর। তাই ওগুলোকে রেউড়ি বলা। মতাদর্শগতভাবেই মোদি সরকার ওসবের বিরোধী। সেটা বুঝতে অবশ্য কারও বাকি নেই। ২০১৪ সালের পর থেকে মহাত্মা গান্ধি ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিমকে যেরকম হেলাছেদ্দা করা হয়েছে সেদিকে নজর রাখলেই বোঝা যায়। নতুন কথাটা হল, এবার অন্য দলগুলোর সরকার ও পথে হাঁটতে না চাইলে আইন করে, পারলে আদালতের নির্দেশকে শিখণ্ডী করে তাদের শায়েস্তা করা হবে। এক দেশ, এক অর্থনীতি কায়েম করতে চাইছে মোদি সরকার। সে দেশে রেউড়ি জাতীয় প্রকল্পের কোনো স্থান নেই।

তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক কারণটাও সহজবোধ্য। সাম্প্রতিককালে যে কটা রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপিকে হারতে হয়েছে, তার প্রায় প্রত্যেকটাতেই তাদের পথ আটকে দাঁড়িয়েছে এই কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো, যা রেউড়ি – প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়। আরএসএস-বিজেপির নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি আর ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে দিল্লি আর পাঞ্জাবে আম আদমি পার্টির সস্তায় বিদ্যুৎ, চাষিদের ঋণ মকুবের প্রতিশ্রুতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ভর্তুকি এবং সরকারের সক্রিয়তায় সরকারি স্কুল ও মহল্লা ক্লিনিকের উন্নতির সামনে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের জন্য প্রায় সব বিশ্লেষকই কৃতিত্ব দিয়েছেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, দুয়ারে সরকারের মত পদক্ষেপকে। কন্যাশ্রীর মত প্রকল্প তো আগে থেকেই চলছিল। স্তালিনের দল দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমও ক্ষমতায় এলে যে গৃহবধূদের রেশন কার্ড আছে তাঁদের মাসে ১০০০ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সুতরাং নির্বাচনের ময়দানেও এই একটা বাধা বিজেপি কিছুতেই টপকাতে পারছে না। ফলে বিরোধীদের হাতে পড়ে থাকা এই শেষ অস্ত্রটা কেড়ে না নিলেই নয়। তাই এই আক্রমণ।

এবার শুরুতেই যে দ্বিধার কথা বলেছিলাম, সেই আলোচনায় আসি। বিজেপি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক, দুদিক থেকেই যে একটি দক্ষিণপন্থী দল তাতে সন্দেহ নেই। সেই কারণেই কয়েক লক্ষ কোটি টাকার কর্পোরেট কর মকুব করে দেওয়া তাদের মতে ফ্রিবি নয়। কিন্তু কর্মসংস্থানহীন বা দরিদ্র মহিলাদের হাতে সরকার মাসে মাসে নগদ টাকা দিলে অর্থনীতির ক্ষতি হয়ে যাবে, বিপর্যয় সৃষ্টি হবে বলে তাদের চিন্তা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাম দলগুলো, বিধানসভায় শূন্য হলেও যাদের রাস্তাঘাটে প্রধান বিরোধী হিসাবে দেখা যাচ্ছে, তারা প্রায় মোদির সুরেই গত দশ বছর ধরে তৃণমূল সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো সম্পর্কে কথা বলে আসছে কেন? সিপিএমের যে কোনও স্তরের সদস্য এবং সমর্থকরা কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ইত্যাদি প্রকল্প সম্পর্কে “খয়রাতি”, “দয়ার দান”, “টাকা দিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ রাখছে”, “মানুষকে দয়ার পাত্র করে দিয়েছে” ইত্যাদি বাক্যবন্ধ ব্যবহার করেন। মানুষ বসে বসে টাকা পেতে ভালবাসে, তাই তৃণমূলকে ভোট দিয়ে যাচ্ছে— এতদূরও বলা হয়। গরিব মানুষ রাজনীতি বোঝেন না, ভিক্ষা পেলেই খুশি— এই জাতীয় অপমানকর মন্তব্যও প্রকাশ্যেই করা হয়। স্রেফ সোশাল মিডিয়ার বিপ্লবীরা নন, শতরূপ ঘোষের মত সংবাদমাধ্যমে দলের প্রতিনিধি হিসাবে নিয়মিত মুখ দেখানো নেতারাও সামান্য পালিশ করা ভাষায় এসব বলে থাকেন।

স্বভাবতই সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির টুইট ছাড়া রেউড়ি বিতর্কে সিপিএমের কোনও সুসংহত বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্গাপুজোর জন্য ক্লাবগুলোকে টাকা দেওয়া আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে টাকা দেওয়াকে তাঁরা এক করে দেখেন কিনা— তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট আলোচনা সিপিএম নেতারা করেন কি? অথচ এই আলোচনা জরুরি। এ রাজ্যে জনমত বলতে যে শ্রেণির মানুষের বক্তব্যকে বোঝানো হয় সাধারণত, সেই শ্রেণির মধ্যে জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে দানখয়রাতি বলে ভাবার মানসিকতা কিন্তু সুদূরপ্রসারী। ভদ্রলোক শ্রেণির যেসব ভোটার তৃণমূলকে ভোট দেন, তাঁরাও “এই শ্রী, ওই শ্রী” না থাকলেই খুশি হতেন। সরকারি কর্মচারীদের ডিএ দিতে রাজ্য সরকারের যে অনীহা তার বিপরীতে ওই প্রকল্পগুলোকে রেখে আলোচনা করতে বাঙালি মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তরা বিলক্ষণ ভালবাসেন। তৃণমূলের নেতা, মন্ত্রীদের দুর্নীতি ফাঁস হলে “এই টাকাগুলো দিয়ে ডিএ দেওয়া যেত না?”— এ প্রশ্ন শোনা যায়। কিন্তু কাউকে বলতে শোনা যায় না “এই টাকা দিয়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে এক হাজার টাকা করে দেওয়া যায় না?” অথচ এঁরা এমনিতে ভাল করেই জানেন পাঁচশো টাকায় আজকাল কিছুই হয় না। আসলে মনে করা হয়, ডিএ পাওয়া অধিকার কিন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দয়ার দান।

এর কারণ ১৯৯১ পরবর্তী যুগে দিনরাত মন্ত্রের মত কানের কাছে বলে বলে যে কয়েকটি কথা আমাদের মর্মে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার অন্যতম হল, কোনও পরিষেবা বা পণ্য বাজার থেকে পয়সা দিয়ে না কিনে পাচ্ছে মানেই সেটা দান। সরকার দিচ্ছে মানেই দান করছে। আরেকটি কথা হল, চাকুরিজীবীরা করদাতা, গরিব শ্রমজীবী মানুষ করদাতা নয়। তারা করদাতাদের টাকায় বেঁচে থাকা পরজীবী।

এই দুটিই যে সর্বৈব মিথ্যা, তা বোঝানোর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল বামপন্থীদের। কিন্তু সে দায়িত্ব তাঁরা মোটেই পালন করেননি, এখনও করেন না। ভর্তুকি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পণ্য— একথা বলে নব্য-উদারনীতিবাদ। অন্যদিকে, যে কোনও ধরনের বামপন্থার খাতায় এগুলো অধিকার। এটুকু বুঝতে এবং বোঝাতে বামপন্থীদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বঙ্গ সিপিএমের এই অ আ ক খ প্রবলভাবে গুলিয়ে গেছে। ফলে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের সাফল্যের তালিকা দিতে গিয়ে তাঁরা দিব্যি নানা কল্যাণমূলক প্রকল্পের কথা বলেন। স্কুলের মেয়েদের সাইকেল দেওয়া যে তাঁদের আমলেই চালু হয়ে গিয়েছিল— সেকথাও বলেন। নিজেরা গরিব মানুষের জন্য কম টাকায় খাওয়ার ব্যবস্থা করতে কমিউনিটি ক্যান্টিনও চালান। কিন্তু সরকারি প্রকল্পগুলোকে বলেন দানখয়রাতি।

আমি যেমন করদাতা, আমার বাড়ির পরিচারিকাও করদাতা। তফাত হল আমি আয়কর দিই, তিনি দেন না। কারণ করের আওতায় আসার মত আয় তাঁর নেই। কিন্তু তিনি নিজের আয়ের টাকায় যা যা কেনেন সবেতেই কর দেন। আগের প্রত্যক্ষ করের যুগেও দিতেন, এখন পণ্য ও পরিষেবা করের (GST) যুগেও দেন। সুতরাং লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে যে টাকা পান বা দু টাকা কিলো চালে যে ভর্তুকি পান তাতে তাঁরও অবদান আছে, তিনি পরজীবী নন। ব্যতিক্রম বাদ দিলে এই কথাগুলো সিপিএমের সদস্য, সমর্থকরা নিজেরাই বোঝেন না বা বুঝতে অস্বীকার করেন। অন্যদের আর বোঝাবেন কী করে?

পশ্চিমবঙ্গে বাম দল বলতে অবশ্য শুধু সিপিএম বা বামফ্রন্টের দলগুলোকে বোঝায় না। কিন্তু বিকল্প বামেদের সংগঠন, অন্তত চাক্ষুষ প্রমাণে, আরও সীমিত। কিন্তু তাঁরাও যে রেউড়ি বিতর্কে খুব সোচ্চার এমন নয়। দশ বছর ধরে রাস্তায় নামার মত একাধিক ইস্যু থাকা সত্ত্বেও পথে না নামা সিপিএম অবশেষে পার্থ চ্যাটার্জি, অনুব্রত মণ্ডলের গ্রেফতারির পর বিরোধীসুলভ সক্রিয়তা দেখাচ্ছে। আর বিকল্প বামেরা সক্রিয়তা দেখাচ্ছেন ইডি-সিবিআই যেহেতু বিজেপি সরকারের হাতে, সেহেতু তৃণমূল নেতাদের বিপুল দুর্নীতি নিয়ে কেন পথে নামা উচিত নয় সেই তর্কে। উন্নয়ন মানে কী বা কী হওয়া উচিত— সে আলোচনাতেও মাঝেমধ্যে দেখা যায় ভারতীয় বামপন্থীদের। যে কারণে বেশিরভাগ বামপন্থী দলের কাছেই আজও পরিবেশ কোনও রাজনৈতিক ইস্যু নয়। নব্য-উদারবাদীদের মতই তাঁরা ভাবেন পরিবেশের সামান্য ক্ষতি করে যদি শিল্প হয়, কর্মসংস্থান হয় তাহলে তেমন ক্ষতি নেই। পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের নানা গাঢ়ত্বের লালেরা কিন্তু এ পথে হাঁটছেন না। অর্থাৎ পথ সামনে রয়েছে, কিন্তু উত্তমকুমার অভিনীত অবিনাশের মতই আমাদের বামপন্থীরাও নিজেদের চোরাগলিতে দিশেহারা।

বামেরা কী করছেন, কী বলছেন, তা কেন গুরুত্বপূর্ণ? এই জন্যে, যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার চিরকাল থাকবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের গা জোয়ারিতেই হোক বা নাগরিকদের ভোটে, প্রাকৃতিক নিয়মেই এই সরকার একদিন চলে যাবে। তখন যে দলের সরকারই আসুক, সরকারি নীতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে দক্ষিণপন্থী ভাবনার যে আসন তৈরি হয়েছে তা ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যতেও মানবিক সরকার দেখতে পাব না আমরা। এই ভাঙার দাবি কাদের কাছে করা যায়? বিজেপির কাছে তো নয়। রামচন্দ্র গুহ নিজেকে বলেন “ল্যাপ্সড মার্ক্সিস্ট”। আমারও এক বয়োজ্যেষ্ঠ ল্যাপ্সড মার্ক্সিস্ট বন্ধু আছেন। তিনি সর্বদাই বলেন, বামপন্থীদের থেকে কিছু আশা করা উচিত নয়। কিন্তু বামেদের বাদ দিলে যদি পড়ে থাকে বিজেপি, তাহলে আর উপায় কী? আশা করা বেঁচে থাকার জন্য জরুরি একটা কাজ। সে কাজ তো ছাড়া যায় না।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সততা ও বাংলার সংবাদমাধ্যম: কোনো প্রশ্ন নয়

যাদবেন্দ্র পাঁজা
কংগ্রেস করতেন, বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। শঙ্খ ঘোষ এই মানুষটিকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা লিখে রেখেছেন। বাঘা যতীনের শিষ্য, স্বাধীনতা সংগ্রামী কিরণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ১৯৫০ সালে থাকতেন কলেজ স্ট্রিটে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের পিছনে এক গলিতে এক অকিঞ্চিৎকর বাড়ির দোতলা কি তেতলার একটি ঘরে। সে ঘরের বর্ণনা এরকম “এক প্রান্তে একটা শতরঞ্চি বিছানো, অন্য প্রান্তে আরেকখানা। শতরঞ্চির ওপর অল্পস্বল্প শয্যাসম্বল আর পাশে একখানা টিনের সুটকেস, দু-প্রান্তেই।” একদিকে বসে কিরণচন্দ্র অন্য দিকে শুয়ে থাকা একজনকে হেঁকে বলেন “সময় হয়নি? যেতে হবে না?” সেই মানুষটি উঠলেন, ব্র্যাকেটে ঝোলানো একখানা আধময়লা পাঞ্জাবি পরে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। শঙ্খ ঘোষ তাঁকে চিনতেন না। কিরণচন্দ্রের মুখে পরিচয় শুনে বিস্মিত হলেন। তারপর:

যাদবেন্দ্র পাঁজা? মন্ত্রী?
আমার চোখে বিস্ময় লক্ষ করে কিরণদা বলেন: ‘মন্ত্রী তো কী হলো, সেটা কোনো কথা নয়, ও হলো যাদবেন্দ্র পাঁজা। এখন বেরিয়ে গিয়ে রাইটার্সে যাবে, হয়তো হেঁটে হেঁটেই।’

সুবোধ ব্যানার্জি
প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের শ্রমমন্ত্রী। এঁর বিষয়ে ১৯৯৭ সালে লিখেছিলেন বিখ্যাত আমলা দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। সুবোধবাবু যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন কংগ্রেস সরকারের শ্রমমন্ত্রী গোপাল দাস নাগের মহানুভবতায় বিদেশ থেকে একটি অত্যন্ত দামি এবং এ দেশে পাওয়াই যায় না এমন ওষুধ আনানো হয়েছিল। ডাক্তারদের মতে সেই ওষুধের কয়েকটা ডোজ নিতে পারলে সুবোধবাবুর আয়ু খানিকটা বেড়ে যেতে পারত। কিন্তু বাণিজ্যিক সংস্থার আনুকূল্যে আনানো সেই ওষুধ ফিরিয়ে দেন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটি, তাঁর স্ত্রী এবং কন্যা।

বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যে বিনয় চৌধুরী বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জীবনযাত্রার সারল্য, সততার কথা আজ অবধি মুখে মুখে ফেরে। জ্যোতি বসু স্কচ খেতে ভালবাসতেন, অভিজাত ক্লাবের সদস্য ছিলেন, প্রাসাদোপম সরকারি বাড়িতে থাকতেন। তাঁর ছেলে পিতৃপরিচয় ব্যবহার করে শিল্পপতি হয়েছেন কিনা তা নিয়ে বিস্তর নিউজপ্রিন্ট খরচ হয়েছে একসময়, কিন্তু জ্যোতিবাবুর বিরুদ্ধেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠেনি। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র প্রফুল্ল সেনের বিরুদ্ধেই বিরোধীরা (বামপন্থীরা) দুর্নীতির অভিযোগ এনেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে, সে অভিযোগও মিথ্যা।

উদাহরণের তালিকা আরও দীর্ঘ করা সম্ভব, কিন্তু নিষ্প্রয়োজন। কারণ এই নাতিদীর্ঘ তালিকাই এটুকু প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট, যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে প্রথম ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদ নন যিনি সততার পরাকাষ্ঠা বা সাদাসিধে জীবন কাটান। অথচ পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম গত এক দশকে তেমনটাই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে গেছে ক্রমাগত। আজ যদি আপামর পশ্চিমবঙ্গবাসীর ধারণা হয়ে থাকে, তৃণমূল কংগ্রেসের আর সব নেতা দুর্নীতিগ্রস্ত হলেও দিদি সৎ — তার কৃতিত্ব মমতার চেয়েও এ রাজ্যের সংবাদমাধ্যমের বেশি। জাতীয় স্তরের বেশকিছু সংবাদমাধ্যম মোদী বন্দনার জন্য কুখ্যাত। তাদের প্রচারে তবু একটি সঙ্গতি আছে। তারা কেবল মোদীকে পুরুষোত্তম সত্য হিসাবে উপস্থিত করে না; অনুরাগ ঠাকুর, কিরেণ রিজিজু, স্মৃতি ইরানির মত চুনোপুঁটি বিজেপি নেতা নেত্রী থেকে শুরু করে হেভিওয়েট অমিত শাহ পর্যন্ত সকলকেই সকল গুণের আধার হিসাবে বর্ণনা করে। বাংলার সংবাদমাধ্যম কিন্তু তেমন নয়। অনুব্রত মণ্ডল যে প্রকৃতপক্ষে বাহুবলী, তা দেখাতে এখানকার খবরের চ্যানেলগুলোর আপত্তি নেই। নারদ স্টিং অপারেশনের সময়ে স্টুডিওতে সভা বসিয়ে ফিরহাদ হাকিম, সৌগত রায়, শোভন চ্যাটার্জি, শুভেন্দু অধিকারীদেরও যথেষ্ট নিন্দা করা হয়েছে। গ্রেপ্তারির পর মদন মিত্রের নিন্দাও কাগজে বেরিয়েছে, কুণাল ঘোষ যে দুর্নীতিগ্রস্ত সে কথাও দিবারাত্র উচ্চারিত হয়েছিল যথাসময়ে। আর পার্থ চ্যাটার্জির বেলায়? ইংরেজিতে একটা কথা আছে – washing dirty linen in public। বেলঘরিয়ার ফ্ল্যাট থেকে ২২ কোটি টাকা উদ্ধার হওয়ার পর থেকে তো আক্ষরিক অর্থেই পার্থবাবুর বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড়, অন্তর্বাস জনসমক্ষে ধোলাই করছে মিডিয়া। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রীর দলের আর সকলকে অসৎ বলতে বাংলার সংবাদমাধ্যম রাজি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে। তিনি যেন পদ্মফুল – পাঁকে থাকেন কিন্তু গায়ে পাঁক লাগে না।

নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে যখন রাজ্য উত্তাল, তখন সংবাদমাধ্যম নিয়ে এই আলোচনার কী দরকার? অভিযুক্ত তো রাজ্যের একজন মন্ত্রী এবং তাঁর বান্ধবী। মুখ্যমন্ত্রী তো নন, সংবাদমাধ্যমও নয়।

দরকার কারণ পশ্চিমবঙ্গ অনেকদিন হল কিছু মৌলিক গণতান্ত্রিক রীতিনীতির উল্টো দিকে হাঁটছে। যেমন গণতন্ত্রে সবাই সবার কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কিন্তু এ রাজ্যে সংবাদমাধ্যম সবার (আক্ষরিক অর্থে নেবেন না) কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারলেও তার কার্যকলাপ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না। প্রকাশ্য সভায় সাংবাদিকরা ভাতার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেন মুখ্যমন্ত্রীকে। মুখ্যমন্ত্রীও বলেন সরকারি আধিকারিকরা নজর রাখবেন কে কীরকম খবর করছে। ‘ভাল’ খবর করলে সাহায্য পাওয়া যাবে। এতবড় অগণতান্ত্রিক কাণ্ড নিয়ে কোনো কাগজে কোনো সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় না, কোনো চ্যানেলে সান্ধ্য বিতর্কসভা বসে না। বোঝাই যায়, মুখ্যমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনগুলো লাইভ দেখলে কেন শেক্সপিয়রের নাটকের মনোলগের দৃশ্য দেখছি মনে হয়।

পশ্চিমবঙ্গে অল্টনিউজ বা নিউজলন্ড্রি নেই, সংবাদমাধ্যমের কভারেজের ভালমন্দ উচিত-অনুচিত নিয়ে কোনো মিডিয়া কাটাছেঁড়া করে না। ফলে সংবাদমাধ্যমের দিকে কোনো আঙুল ওঠে না, কিন্তু তারা নিশ্চিন্তে অন্যদের দিকে আঙুল তুলতে পারে। যেমন ২২ জুলাই টালিগঞ্জের ফ্ল্যাট থেকে কুবেরের ধনের প্রথম কিস্তি আবিষ্কারের পর আটদিন পেরিয়ে গেল, এখনো জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকার, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় প্রমুখরা মুখ খুলছেন না বলে তাঁদের দিকে আঙুল তুলছে। সন্দেহ নেই সরকার ঘনিষ্ঠ এই বিখ্যাতরা, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কমিটিতে আসীন এই কৃতীরা, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের পক্ষে কথা বলা এই খ্যাতিমানরা এত বড় কাণ্ডে চুপ করে থাকলে এঁদের বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু মজার কথা, বাংলার সংবাদমাধ্যম কেবল সেই বিখ্যাতদের দিকেই আঙুল তোলে যাঁরা সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য নন। দেব, মিমি চক্রবর্তী, নুসরত জাহান বা সায়নী ঘোষের মত যে বিখ্যাতরা রীতিমত দলে যোগ দিয়েছেন, কেউ কেউ নির্বাচনে জিতে সাংবিধানিক পদ আলো করে আছেন, তাঁদের প্রতিক্রিয়া অগ্রাধিকার পায় না। বগটুই কাণ্ডের পর কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম কোন কোন বিখ্যাত মানুষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি তার আলাদা তালিকা পর্যন্ত প্রকাশ করেছিল। অথচ দেব, মিমি, নুসরতরা প্রতিক্রিয়া না দিলে কেন দিলেন না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় না। অথচ তাঁরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, এসব নিয়ে কথা বলা তাঁদের সাংবিধানিক দায়।

দায়ের কথা বলতে গেলে এ কথাও বলতে হবে, দুর্নীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা তুলে ধরা সংবাদমাধ্যমের দায়। গত আটদিনে বাংলার সংবাদমাধ্যম সে দায় পালন করতে উৎসাহী হয়েছে। পার্থবাবুকে ফোন করে চাকরিপ্রার্থীদের যন্ত্রণা জানিয়ে বেকুব হয়েছিলেন – এরকম এক নীচু তলার তৃণমূল কর্মীর ফোনালাপের অডিও প্রকাশ্যে এনেছে একটি চ্যানেল। সেই কর্মীটিকে সাদরে স্টুডিওতে ডেকে এনে সান্ধ্য বিতর্কসভায় স্থানও দেওয়া হয়েছে একদিন। পাঁচশো তিন দিন ধরে যাঁরা রাস্তায় বসে আছেন তাঁদের কয়েকজনকেও এখন এ চ্যানেল সে চ্যানেলে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে। একটি চ্যানেলে তাঁদের কয়েকজনকে কান্নায় ভেঙে পড়তেও দেখা গেল। যৌবন চুরি হয়ে যাওয়া এই অসহায়, বিধ্বস্ত মানুষেরা এখন চ্যানেলগুলির হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন হয়ে উঠেছেন। ঝকঝকে চেহারার অ্যাঙ্কররা যথাসম্ভব আবেগ সহকারে ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করছেন “আর কতদিন…?” কিন্তু এই চাকরিপ্রার্থীদের কেউ যদি আচমকা অ্যাঙ্করকে জিজ্ঞেস করে বসেন “আপনারা এতদিন কোথায় ছিলেন”, তাহলে পালাবার পথটা দেখে রাখা ভাল। কারণ লেখাপড়া জানা ছেলেমেয়েরা, আমাদের ছেলেমেয়েদের হবু শিক্ষক-শিক্ষিকারা যে রাস্তায় বসে আছেন – এ দৃশ্য বাংলার চ্যানেলওয়ালা, কাগজওয়ালাদের গত আট দিনে চোখে পড়েছে। তার আগের ৪৯০-৯৫ দিন ক্যামেরা আর ল্যাপটপগুলো অন্য কোনো গুরুতর খবর নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কোটি পঞ্চাশেক নগদ টাকা আর গয়নাগাঁটি উদ্ধার না হলে ৫০০ দিন পেরোলেও আন্দোলনকারীদের দিকে নজর পড়ত কিনা সন্দেহ আছে। চক্ষুলজ্জাই এ যাত্রায় ক্যামেরা এবং কম্পিউটারগুলোর মুখ আন্দোলনকারীদের দিকে ঘুরিয়ে দিল হয়ত। গত এগারো বছরে কলকাতার বুকে এসএসসি, টেট, মাদ্রাসা – নানারকম শিক্ষকদের একাধিক অবস্থান বিক্ষোভ হয়েছে, শিক্ষক-হবু শিক্ষকরা পুলিসের লাঠির বাড়ি খেয়েছেন, জলকামান দিয়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার মত ঘটনাও ঘটেছে। মারাও গেছেন বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী। সেসব আন্দোলনকে প্রধান খবরের মর্যাদা দেয়নি কোনো খবরের কাগজ বা চ্যানেল। প্রথম পাতার খবর হয়েছে, যখন দীর্ঘ আন্দোলন ভাঙতে মুখ্যমন্ত্রী গিয়ে আন্দোলনকারীদের শুকনো আশ্বাস দিয়েছেন বা আদালত বলেছে, আপনার অমুক জায়গায় বসবেন না, তমুক জায়গায় বসুন। সাধারণ মানুষের অসুবিধা করে আন্দোলন করা চলবে না।

আরও পড়ুন সত্যান্বেষী পাঠক জাগুন, সরকারি বিজ্ঞাপন পেতে গেলে ইতিবাচক খবর লিখতে হবে

এখনো কভারেজের অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে পার্থ-অর্পিতার সম্পর্কের রসাল খুঁটিনাটি। যে অধ্যবসায়ে কোন গাড়িতে লং ড্রাইভে যেতেন আর কোন বাগানবাড়িতে চেটেপুটে খিচুড়ি খেতেন তা রিপোর্ট করা চলছে, তাতে মনে হচ্ছে বাংলার মিডিয়া স্রেফ একটা সেক্স টেপের অপেক্ষায় আছে। সেটা পাওয়া গেলেই আন্দোলনকারীরা আবার অবজ্ঞার অন্ধকারে তলিয়ে যাবেন, দুর্নীতিও চাপা পড়ে যাবে। এই অধ্যবসায় ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে থাকলে, সত্য উদ্ঘাটন করার এই অদম্য উৎসাহ আগে দেখালে নিয়োগ দুর্নীতি প্রকাশ করতে আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হত না। কাজটা পশ্চিমবঙ্গের সদাজাগ্রত সংবাদমাধ্যমই করতে পারত।

‘বিশ্বাসে মিলায় সততা, তর্কে বহুদূর’ মন্ত্রে বিশ্বাসী মিডিয়া কিন্তু এখনো প্রশ্ন করছে না, মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো আন্দোলনকারীদের আশ্বাস দিতে পারেন কোন প্রশাসনিক অধিকারে? তিনি তো সরকারের কেউ নন। মুখ্যমন্ত্রী নিজে কেন কথা বলছেন না? শুধু কথা বলে কী হবে, সে প্রশ্নও করছে না খুব বেশি মিডিয়া। গত কয়েক দিনে আবার কিছু বর্ষীয়ান সাংবাদিক সোশাল মিডিয়ায় বনলতা সেনগিরি করতে নেমেছেন। বাম আমলে কী হয়েছে, সব জানি। বেশি বাড়াবাড়ি করলে লিখে দেব – এই জাতীয় পোস্ট দেখা যাচ্ছে। এঁরা কি বুঝছেন না, এই উচ্চারণে মিডিয়ার কর্তব্যে অবহেলাই আরও পরিষ্কার হচ্ছে? বাম আমলের দুর্নীতির কথা জানা ছিল, অথচ রিপোর্ট করা হয়নি – এ যদি সত্যি হয়, সে দায় সংবাদমাধ্যম ছাড়া কার?

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার কি এমনি এমনি খায়?

পুরস্কার কেন মূল্যবান? সকলে পায় না বলে। সারা পৃথিবীতে এত বৈজ্ঞানিক গবেষণা হচ্ছে, এত সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে, এত সমাজসেবা হচ্ছে রোজ, অথচ ছশো কোটি মানুষের মধ্যে সবমিলিয়ে জনা দশেক প্রতি বছর নোবেল পুরস্কার পান। তাই ওই পুরস্কার প্রাপকদের সব দেশেই আলাদা সম্মান। একসময় পাড়ার পুজোর ধুনুচি নৃত্য প্রতিযোগিতায় ছোটদের উৎসাহিত করার জন্য সব অংশগ্রহণকারীকেই সান্ত্বনা পুরস্কার হিসাবে থালা, বাটি, চামচ ইত্যাদি দেওয়া হত। তাছাড়া আর কোনো পুরস্কারই রাম শ্যাম যদু মধু – সকলকেই দেওয়ার নজির নেই। আদৌ পুরস্কার বলে কিছু থাকা উচিত কিনা তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। কোনো দেশের বা রাজ্যের সরকারের আদৌ কাউকে পুরস্কার দেওয়া উচিত কিনা তা নিয়েও বিলক্ষণ তর্ক হতে পারে। ভারতের সংবিধান বলে আইনের চোখে, রাষ্ট্রের চোখে সব নাগরিকই সমান। সেক্ষেত্রে সরকারের বিশেষ বিশেষ নাগরিককে পুরস্কার দেওয়া উচিত কিনা তা-ও তর্কাতীত নয়।

এতৎসত্ত্বেও আমাদের দেশে স্বাধীনতার পর থেকেই নানারকম সরকারি পুরস্কার চালু আছে। প্রায় প্রতি বছরই প্রাপকদের তালিকা কোনো না কোনো দিক থেকে সমালোচিত হয় এটা যেমন সত্য, তেমনি প্রাপকদের সামাজিক সম্মান যে বৃদ্ধি পায় তা-ও অস্বীকার করার উপায় নেই। মুশকিল হল সাম্প্রতিককালে পুরস্কারগুলো যেন বড় বেশি সহজলভ্য হয়ে গেছে, ফলে মূল্য হারাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ ইত্যাদি দিয়ে থাকেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর গরীব পশ্চিমবঙ্গ সরকার চালু করেছিলেন বঙ্গবিভূষণ। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন, মহাশ্বেতা দেবীর মত প্রবাদপ্রতিম মানুষ তা পেয়েছেন। এ বছর হঠাৎ ব্যক্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকেও পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। কোন প্রতিষ্ঠান? না কলকাতার তিন ঐতিহ্যশালী ফুটবল ক্লাব – মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল আর মহমেডান স্পোর্টিং।

আরও পড়ুন আকাদেমি সমাচার: সাহিত্য পুরস্কার যার যার, তিরস্কার সবার

এমনিতে ভাল কাজের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করায় দোষ নেই। কিন্তু যে পুরস্কার নোবেল জয়ী অমর্ত্য সেন (তিনি অবশ্য নেবেন না জানিয়েছেন) আর অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া হচ্ছে, সে জিনিস যে কোন যুক্তিতে তিনটি ফুটবল ক্লাবকে দেওয়া যেতে পারে তা দুর্বোধ্য। অর্থনীতিতে অমর্ত্য আর অভিজিৎ বিনায়কের কাজ গোটা বিশ্বে আলোচিত। অন্যদিকে কলকাতার তিন ক্লাবের কর্মকর্তারা নিজেদের অবিমৃশ্যকারিতায়, অপদার্থতায় একসময় যে শহরকে ভারতীয় ফুটবলের মক্কা বলা হত তাকে প্রায় ধাপার মাঠে পরিণত করেছেন। অমর্ত্য, অভিজিৎ আর তাঁদের অবদান যদি একই পুরস্কারের যোগ্য হয়, তাহলে সে পুরস্কারের আর মূল্য থাকল কী? শতাব্দী-প্রাচীন মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল আর এককালে ভারত দাপিয়ে বেড়ানো মহমেডান স্পোর্টিংকে এই পুরস্কার প্রদান যদি তাদের অতীত গৌরবের কথা ভেবে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্য নস্ট্যালজিয়া-কাতর বাঙালির যোগ্য কাজই হয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, এদের অবদান বুঝতে রাজ্য সরকারের এত সময় লাগল কেন? মোহনবাগানের এটিকের মুখাপেক্ষী হওয়া আর ইস্টবেঙ্গলের এই আছি এই নেই অবস্থা না হলে কি তাদের অবদান ঠাওর হচ্ছিল না?

অবশ্য যে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীকে পুরস্কৃত করার জন্যে রাতারাতি নতুন সাহিত্য পুরস্কার চালু হয়ে যায়, সেখানে প্রদানের অর্থ, গুরুত্ব – এসব নিয়ে আলোচনা করা বাতুলতা।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

“কথা বোলো না কেউ শব্দ কোরো না 
ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন 
গোলযোগ সইতে পারেন না।”

মনোজ মিত্রের নরক গুলজার নাটকের এই গান গত শতকের একটা অংশে রীতিমত জনপ্রিয় ছিল। আমাদের এঁদো মফস্বলে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটার দেখার অভ্যাস খুব বেশি লোকের ছিল না। তৎসত্ত্বেও নব্বইয়ের দশকে অন্তত দুবার শখের অভিনেতাদের পাড়ার মঞ্চে এই নাটক করতে দেখেছি আর নারদের চরিত্রে যে-ই থাকুক, তার গলায় সুর থাক বা না থাক, এ গান গাওয়া মাত্রই দর্শকদের মজে যেতে দেখেছি। পিতামহ ব্রহ্মা টেনে ঘুমোচ্ছেন, দেবর্ষি নারদ নেচে নেচে এই গান গাইছেন – এই হল দৃশ্য। নাটকটি আগাগোড়া সরস। এখানে ব্রহ্মা একজন মানুষকে পুনর্জন্ম দেওয়ার জন্য ঘুষ নিতে যান, চিত্রগুপ্ত দেখে ফেলে আর্তনাদ করে ওঠে “উৎকোচ”। ব্রহ্মা ট্যাঁকে টাকা গুঁজতে গুঁজতে বলেন “মেলা ফাজলামি কোরো না। উৎকোচ ছাড়া আমাদের ইনকামটা কী, অ্যাঁ? আমরা কি খাটি, না এগ্রিকালচার করি, না মেশিন বানাই? অতবড় স্বর্গপুরীর এস্ট্যাবলিশমেন্ট কস্ট আসবে কোত্থেকে, অ্যাঁ?” তাছাড়া এই নাটকে একজন বাবাজি আছেন, যিনি ব্রহ্মার কৃপায় কল্পতরু থলি পাওয়া মাত্রই রম্ভাকে চেয়ে বসেন। কিন্তু থলিতে হাত ঢোকালে হাতে উঠে আসে একটি মর্তমান কলা।

আর বেশি লিখব না, কারণ বৃদ্ধ বয়সে মনোজ মিত্রকে হাজতবাস করানো আমার উদ্দেশ্য নয়। কথা হল বিশ-পঁচিশ বছর আগে একশো শতাংশ হিন্দু (নব্বই শতাংশ উচ্চবর্ণ) অভিনেতাদের দ্বারা অভিনীত এই নাটক দেখেছি, আর একশো শতাংশ হিন্দু দর্শককুলকে নাটক দেখে হেসে গড়াগড়ি খেতে দেখেছি। কিন্তু বিস্তর ধস্তাধস্তির পর মহম্মদ জুবের আজ দিল্লি পুলিসের দায়ের করা মামলাতেও জামিন না পেলে এবং জজসাহেব তাঁর রায়ে বাকস্বাধীনতা যে সাংবিধানিক অধিকার সেটি ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে না দিলে সাহস করে এই লেখা লিখতে বসতাম না। কারণ কী লেখা যাবে, কোনটা বলা যাবে সে ব্যাপারে আজকাল আর সংবিধান চূড়ান্ত নয়, সরকারের বকলমে পুলিস চূড়ান্ত। পুলিসের অধিকারের সীমাও বেড়ে গেছে অনেক। একদা পুলিসের হাত এত ছোট ছিল, যে আশিতে আসিও না ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জলে নেমে পড়ে বলেছিলেন তাঁকে আর ধরা যাবে না, কারণ তিনি তখন জলপুলিসের আন্ডারে। আর এ যুগে আসাম পুলিসের হাত গুজরাট পর্যন্ত লম্বা, পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের হাত গোয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দেশটা যে প্রেতপুরীতে পরিণত হয়েছে, এই বোধহয় তার সর্বোত্তম প্রমাণ। কারণ ছোটবেলায় জ্যাঠা-জেঠিদের মুখে কলকাতায় মেসে থেকে চাকরি করা এক গ্রাম্য ভদ্রলোকের গল্প শুনেছিলাম। তিনি বহুকাল পরে বাড়ি গিয়ে খেতে বসেছেন, ডালের সাথে মেখে খাবেন বলে দুটি পাতিলেবুর আবদার করেছেন। করেই দেখেন বউয়ের হাতদুটো ইয়া লম্বা হয়ে নিজের বাড়ির সীমানা পেরিয়ে পাশের বাড়ির গাছ থেকে লেবু পেড়ে নিয়ে এল। আসলে ওলাউঠার মহামারীতে গ্রাম সাফ হয়ে গিয়েছিল। ঘৃণার মহামারীতে আমাদের দেশ সাফ হয়ে গেছে। গল্পের ভদ্রলোক শহরে পালিয়ে বেঁচেছিলেন, আমরা কোথায় পালিয়ে বাঁচব জানি না। ভারত জোড়া ফাঁদ পেতেছ, কেমনে দিই ফাঁকি? আধেক ধরা পড়েছি গো, আধেক আছে বাকি।

আমরা ভারতীয়, আমরা মেনে নিতে জানি। যা যা বলা বারণ, লেখা বারণ সেগুলো মেনে নিয়ে চলব বলেই ঠিক করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম অবাক কাণ্ড! কেবল আমরা মানিয়ে নিলে চলবে না, হাজার ভণ্ডামি ও নোংরামি সত্ত্বেও যে সংসদের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি তার সদস্যদের জন্যেও তালিকা তৈরি হয়েছে। ভগবান, থুড়ি সরকার, যাতে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যেতে পারেন, কেউ গোল করতে না পারে তার নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা করতে কোন কোন শব্দ উচ্চারণ করা যাবে না, অর্থাৎ কোনগুলো অসংসদীয়, তার নতুন ফর্দ প্রকাশিত হয়েছে সংসদের মৌসুমি অধিবেশনের প্রাক্কালে। সেখানেই শেষ নয়, আরও বলা হয়েছে, সংসদ চত্বরে কোনো “ডেমনস্ট্রেশন”, ধর্না, ধর্মঘট করা যাবে না। এমনকি অনশন বা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানও করা যাবে না। অর্থাৎ সমস্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই গণতন্ত্রের মন্দিরে বারণ। এ হল সেই মন্দির, যেখানে প্রথমবার প্রবেশ করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘটা করে সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা যাবে না – এই দারুণ ধর্মনিরপেক্ষ আদেশের কারণ অবশ্য দুর্বোধ্য। কারণ মাত্র কয়েকদিন আগে নতুন সংসদ ভবনে দন্তবিকশিত সিংহের মূর্তি স্থাপন করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে পুজো-আচ্চা করেছেন। তাহলে বক্তব্যটি কি এই, যে পুরনো মন্দিরে পুজো চলবে না, নতুন মন্দিরে চলবে? গণতন্ত্রের মন্দিরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করার অর্থই বা কী? তাহলে কি শান্তিভঙ্গ করে যেসব প্রতিবাদ প্রণালী, সেগুলোর পথ পরিষ্কার করা হচ্ছে? মোদীজির বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর ক্যাপিটল হিলে যেরকম প্রতিবাদ দেখে সারা বিশ্ব শিউরে উঠেছিল, তেমন প্রতিবাদ ছাড়া কি এ দেশে আর কোনো প্রতিবাদ করতে দেওয়া হবে না? করলেই বুলডোজার চালানো হবে? প্রতিবাদের চেহারা অবশ্য বিচিত্র। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কায় আরেক ধরনের প্রতিবাদ হচ্ছে। প্রতিবাদের ধরনধারণ, সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আজ পর্যন্ত কোনো দেশের কোনো শাসকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অবশ্য মোদীজি বালক বয়সে খালি হাতে কুমিরের মুখ থেকে ক্রিকেট বল এবং কুমিরছানা নিয়ে এসেছেন। তাঁর অসাধ্য কী?

মোদীজির সরকার কী কী পারে তা আমরা এতদিনে জেনে ফেলেছি, বিরোধীরা কী পারেন তা দেখা এখনো বাকি আছে। অসংসদীয় শব্দের তালিকার সংযোজনগুলো সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। দু-একজন বিরোধী সাংসদ বলছেন বটে, তাঁরা নির্দেশ অগ্রাহ্য করে ওই শব্দগুলো সংসদে ব্যবহার করবেন, কিন্তু সেই ২০১৪ সাল থেকে তাঁরা যেরকম লক্ষ্মীসোনা হয়ে আছেন, তাতে না আঁচালে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। পালানিয়প্পম চিদম্বরমের মত দু-একজন প্রবীণ সাংসদ তো ইতিমধ্যেই টুইট করে দেখিয়েছেন, ভাষার উপর দখল থাকলেই যে শব্দগুলোকে অসংসদীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়েও সরকারের সমালোচনা করা সম্ভব। সোশাল মিডিয়ায় মস্করাও চালু হয়েছে, শশী থারুরের মত জ্যান্ত থিসরাস থাকতে আর কিসের চিন্তা? এমন সুবোধ বিরোধী থাকতে আমাদের আর কিসের চিন্তা? ইন্টারনেট জোক আর মিম সংস্কৃতি এমন গভীরে পৌঁছেছে যে সাংসদরাও গভীরে ভাবছেন না। তাঁরা বোধহয় ভেবে দেখছেন না, যে কোনো শব্দ অসংসদীয় বলে ঘোষিত হল মানে জোর করে সে শব্দ উচ্চারণ করলেও সংসদের কার্যবিবরণীতে তা নথিবদ্ধ করা হবে না। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে অন্তত সংসদের কার্যবিবরণী থেকে কোনো ইতিহাস লেখক জানতে পারবেন না যে ভারতে ‘স্নুপগেট’ বলে কিছু ঘটেছিল, কেউ ‘ডিক্টেটোরিয়াল’ ছিল বা সরকারের বিরুদ্ধে ‘তানাশাহি’-র অভিযোগ ছিল। মনোমত ইতিহাস লেখার যে ব্যবস্থা ভারতে চলছে, এ-ও যে তারই অঙ্গ, সেকথা বিরোধী দলের কেউ বুঝছেন কি? শুধু ইতিমধ্যেই লিখিত ইতিহাস বিকৃত করা নয়, এই অসংসদীয় শব্দের তালিকা যে ভবিষ্যতে যে ইতিহাস লেখা হবে তা-ও বিকৃত করার প্রচেষ্টা, তা বিরোধীরা কেউ ভেবে দেখেছেন বলে তো মনে হচ্ছে না।

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হলে ক্ষতি নেই বিজেপির

এত সহজে ইতিহাস থেকে সত্য মুছে ফেলা যায় কিনা সে বিতর্ক নেহাতই বিদ্যায়তনিক। তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বিরোধী দলের রাজনীতিবিদদের অধিকার হরণ শুরু হওয়া মাত্রই সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিবাদ করা উচিত। কিন্তু আমাদের বিরোধীরা তেমন করেন না। তাঁদের মধ্যে বিদ্যাসাগর কথিত গোপালরাই দলে ভারি। মাঝেমধ্যে রাহুল গান্ধী রাখাল হয়ে ওঠেন বটে, কিন্তু কদিন না যেতেই ইউরোপে দম নিতে চলে যান। সুললিত ইংরেজি বলতে পারা থারুর বা মহুয়া মৈত্র, ডেরেক ও’ব্রায়েনরাই আজকের সংসদীয় বিরোধিতার মুখ। তাঁরা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত বা সোমনাথ চ্যাটার্জির মত জাঁদরেল নন, সেকালের মমতা ব্যানার্জির মত ওয়েলে নেমে গিয়ে স্পিকারের মুখে কাগজ ছুড়ে মারার মত মেঠো রাজনীতিও তাঁদের আসে না। তেমন কাজ করলেও দল যে তাঁদের পাশে দাঁড়াবেই, তার নিশ্চয়তা নেই। এমন বিরোধী পেলে যে কোনো শাসকেরই পোয়া বারো হয়। তারা কাকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করবে তা নিয়ে অযথা মাথা ঘামায়, শেষ লগ্নে মাথা চুলকে বলে, আগে বললে তো ওনাদের প্রার্থীকেই সমর্থন করতাম। এদিকে সরকার নিশ্চিন্তে একের পর এক অধিকার হরণ করে চলে।

অতএব আমরা, সাধারণ ভারতীয়রা, আধেক ধরা পড়ে বাকি আধেকের আশঙ্কাতেই থাকি। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তৈয়প এর্দোগানের তুরস্কে মানুষ যেমন মুখ বুজে বাঁচে, তেমনভাবে বাঁচা আমাদের শিগগির অভ্যাস করে নিতে হবে। তবে অসংসদীয় শব্দের তালিকার মত হাজতে পোরার যোগ্য শব্দেরও একটা প্রকাশ্য তালিকা থাকলে আমাদের সুবিধা হয়।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

দেশপ্রেমিক সংগঠনে সন্ত্রাসবাদী স্লিপার সেল?

উমর খালিদ, শার্জিল ইমাম, তালিব হুসেন শাহ, রিয়াজ আত্তারি – এদের মধ্যে মিল কোথায়? চারজনেই যে ইসলাম ধর্মাবলম্বী তা তো নামগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তারপর? এরা কি সবাই দেশদ্রোহী সন্ত্রাসবাদী, নাকি দেশপ্রেমিক? আলোচনা করা যাক।

প্রথম দুজন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইটি বম্বের মত প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা এবং অধ্যাপনা করেছেন, রাজনীতি করেছেন। দুজনেই প্রকাশ্য সভায় জনতাকে প্রতিবাদ করতে বলার অপরাধে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ রয়েছেন। উমর নিজেকে কমিউনিস্ট মনে করেন, শার্জিল অন্য পথের পথিক। কিন্তু দুজনেই নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। শার্জিলকে ওই আন্দোলনের অঙ্গ হিসাবেই দেওয়া দুটো বক্তৃতার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অভিযোগ – তিনি হিংসায় প্ররোচনা দিচ্ছিলেন। উমরের বিরুদ্ধে দিল্লি দাঙ্গায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। দুজনের কারোর বিরুদ্ধেই কোনো অভিযোগ আজ অব্দি প্রমাণিত হয়নি, কিন্তু ইউএপিএ আইনের দস্তুর অনুসারে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর এরা কারারুদ্ধ থাকা অবস্থাতেই প্রমাণ জোগাড় করে যাওয়ার অধিকার আছে। তাই শার্জিল ২০২০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে আর উমর ওই বছরেরই সেপ্টেম্বর মাস থেকে গরাদের পিছনে আছেন। জামিন খারিজ হয়েছে কিছু মামলায়, কোথাও জামিন হয়েছে, কোনোটার আবার শুনানিই হয়নি এখনো।

তৃতীয় ব্যক্তি তালিব ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন লস্কর-এ-তৈবার অন্যতম কমান্ডার। তিনি জম্মুর রাজৌরির বাসিন্দা। গত রবিবার রেয়াসি জেলার টুকসানে গ্রামবাসীদের উদ্যোগে বিস্তর অস্ত্রশস্ত্র সমেত ফয়জল আহমেদ দার বলে আরেকজনের সঙ্গে তিনি ধরা পড়েন বলে খবরে প্রকাশ। চতুর্থ ব্যক্তি রিয়াজ মানুষ খুনে অভিযুক্ত। রাজস্থানের উদয়পুরে কানহাইয়া লাল নামে একজনকে সে আর ঘাউস মহম্মদ নৃশংসভাবে খুন করে, সে দৃশ্যের ভিডিও তুলে সগর্বে শেয়ারও করে। এমন করার কারণ কী? কানহাইয়া হজরত মহম্মদ সম্পর্কে বিজেপির সাসপেন্ড হওয়া মুখপাত্র নূপুর শর্মার নোংরা মন্তব্যের সমর্থনে সোশাল মিডিয়ায় কিছু পোস্ট করেছিলেন। রিয়াজ ও ঘাউসের মতে তা মহাপাপ। এ কাজে তাদের দুই স্যাঙাতের সন্ধানও পাওয়া গেছে বলে তদন্তকারী সংস্থার দাবি।

রাজৌরির তালিব আর উদয়পুরের রিয়াজের মধ্যে একটা চমকপ্রদ মিল আছে। দুজনেই বিজেপির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। তালিব নাকি বিজেপির জম্মু এলাকার মাইনরিটি মোর্চার সোশাল মিডিয়ার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। জম্মু ও কাশ্মীরের বিজেপি প্রেসিডেন্ট রবীন্দর রায়না তাঁকে পুষ্পস্তবক দিচ্ছেন, এমন ছবিও পাওয়া গেছে। দেশের প্রবল প্রতাপান্বিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পিছনে অন্য বিজেপি নেতাদের সঙ্গে তালিব দাঁড়িয়ে আছেন, এমন একখানা ছবি আছে বলেও জম্মু ও কাশ্মীরের কংগ্রেস দাবি করেছে। অন্যদিকে রিয়াজ যে উদয়পুরের বিজেপির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন তারও একাধিক লক্ষণ দেখা গেছে। বিজেপির বক্তব্য রিয়াজ তাদের দলে ঢুকতে চাইতেন মাত্র, কিন্তু কানহাইয়া হত্যার বহু আগে থেকেই যে বিজেপির সংখ্যালঘু সেলের নেতাদের সাথে রিয়াজের ঘনিষ্ঠতা ছিল, তার একাধিক প্রমাণ সোশাল মিডিয়া থেকেই উঠে এসেছে।

এমন হতেই পারে যে সত্যিই দেশপ্রেমিক বিজেপি নেতারা কিছু বুঝতে পারেননি, সন্ত্রাসবাদীরা তাঁদের মধ্যে সুকৌশলে সেঁধিয়ে গেছে। গত দু-তিন দশকের হিন্দি সিনেমার মনোযোগী দর্শকদের বলে দিতে হবে না, স্লিপার সেল কী জিনিস। শত্রু সংগঠনে ঢুকে পড়ে ভিতর থেকে সেই সংগঠনের ক্ষতি করার কৌশল তো আরও পুরনো। অক্ষয় কুমারের ভক্তদের দায়িত্ব দিলে তো তাঁরা স্লিপার সেল চিহ্নিত করে তাদের শেষ করে দেওয়ার উপায়ও বাতলে দেবেন সম্ভবত। কিন্তু মুশকিল হল, বিজেপির মত এক নিবেদিতপ্রাণ জাতীয়তাবাদী দলের নেতারা বুঝতেই পারেননি এতবড় কাণ্ড হয়ে গেছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের মত একজন জেমস বন্ডের উপস্থিতি সত্ত্বেও দেশের শাসক দলে সন্ত্রাসবাদীরা দিব্যি ঢুকে পড়ছে – এ বড়ই চিন্তার বিষয়। আমরা প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসবাণীতে ভরসা করেছিলাম। আমরা জানতাম তিনি পোশাক দেখলেই সন্ত্রাসবাদী চিনতে পারেন। তিনি পারেন আর তাঁর দলের অন্যরা পারেন না – এমন তো আমাদের জানা ছিল না! লেখার শুরুতেই একই পংক্তিতে দুজন রাজনৈতিক বন্দীর সঙ্গে একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসবাদী আর একজন সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদীর নাম করেছি, তার কারণ ওরকম নামের লোক মানেই যে নিরপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অপরাধী, তা-ই আমাদের এতদিন শেখানো হয়েছে। কারা দেশদ্রোহী আর কারা দেশপ্রেমিক, তার স্পষ্ট তালিকা আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু তালিব আর রিয়াজ ধরা পড়ায় সব যে গুলিয়ে গেল।

আরও পড়ুন মঈন সম্পর্কে কুৎসিত বিদ্রূপে সন্দেহ জাগে, তসলিমা কি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া? 

তাহলে কি ধরে নিতে হবে ইউএপিএ আইনে অভিযুক্ত উমর, শার্জিল, সিদ্দিক কাপ্পানের মত মুসলমান বা সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নওলাখা, ভারভারা রাওয়ের মত হিন্দু এবং রোনা উইলসন, ফাদার স্ট্যান স্বামীর মত খ্রিস্টানরাই শুধু নয়; ঘোষিত দেশপ্রেমিক সঙ্ঘ পরিবারের মধ্যেও দেশদ্রোহীদের উপস্থিতি আছে? না হয় স্লিপার সেলই হল। দুটো স্লিপার সেলের কথা জানা গেছে, এমন কত স্লিপার সেল যে আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে তার সন্ধান দেবে কে? যে দেশদ্রোহীরা ধরা পড়েছে, তাদের ব্যবস্থা তো হয়েই গেছে। গত বছর আজকের দিনেই তো পারকিনসন্স ডিজিজের রোগী স্ট্যান স্বামী শেষ কটা দিন জল খাওয়ার জন্য স্ট্র পর্যন্ত না পেয়ে কারাগারেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আর গতকাল শার্জিল আদালতকে জানিয়েছেন জেলের মধ্যে ৮-৯ জন বন্দী তাঁকে মারধোর করেছেন, তাঁর নিরাপত্তা সম্পর্কে আর নিশ্চিন্ত থাকা যাচ্ছে না।

কিন্তু দেশপ্রেমিক সর্ষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসবাদী ভূতদের কী হবে?

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

অপরকে সংগঠিত আক্রমণের প্রকল্প ফল দিচ্ছে

“সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে” — উদয়পুরের ছাপোষা দর্জি কানহাইয়া লালের নারকীয় হত্যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আজকের ভারত সম্পর্কে এর চেয়ে সত্যি কথা আর কিছু নেই। স্বাধীনতা লাভ তথা দেশভাগের প্রাক্কালে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার মধ্যে দাঁড়িয়ে ওই লাইন লিখেছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ। আজ আবার আমাদের মধ্যে বিভাজনরেখা স্পষ্ট। এমন নয় যে কানহাইয়া লালের মৃত্যু কোনো শীর্ষবিন্দু বা সূচনাবিন্দু। যেভাবে আমরা সবাই অপরকে ঘৃণা করছি এবং আড়চোখে দেখছি, তাতে স্পষ্ট আমাদের সকলের জামার নীচেই লুকনো আছে অস্ত্রশস্ত্র। কখন কোন প্ররোচনায় বেরিয়ে আসবে আর আমরা কাউকে কনিষ্ঠের মত জেনেও হৃদয়ে কঠিন হয়ে বধ করে ফেলব – তা কেউ বলতে পারে না। এমনটা শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন হল, এবং অতি বড় আশাবাদীও সত্বর থামবে বলে ভরসা করতে পারবেন না।

আসলে স্বীকার করে নেওয়া ভাল, শুধু অপরে অবিশ্বাস নয়, অপরকে সংগঠিতভাবে কথায় এবং কাজে আক্রমণ করার যে প্রকল্প তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এ দেশে চলছে – তার ফল ফলতে শুরু করেছে। ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙার পর দেশজুড়ে যে দাঙ্গা হয়েছিল, তখনো উদয়পুরের মত ঘটনার কথা জানা যায়নি। মহম্মদ সম্পর্কে যে কটূক্তি করেছে তার পোস্ট শেয়ার করা মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য অপরাধ বলে মনে করেছেন দুজন ইসলাম ধর্মাবলম্বী। অথচ সেইসময় খোদ ধর্মস্থান ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরেও কোনো মুসলমান এমন ঘটনা ঘটাননি। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বব্যাপী আল কায়দা, আইসিসের মত সন্ত্রাসবাদী সংগঠন দাপিয়ে বেড়ানোর সময়েও ভারতে যে কটা সন্ত্রাসবাদী হানা হয়েছে তাতে ভারতীয় মুসলমানদের যোগদান প্রায় শূন্য। ভারতকে অশান্ত করতে বরাবরই এই সংগঠনগুলোকে পাকিস্তানের নাগরিকদের সাহায্য নিতে হয়েছে। কিন্তু তাতে ভারতীয় মুসলমানদের দিকে আড়চোখে তাকানো আটকানো যায়নি।

আরও যা মারাত্মক, তা হল একমাত্র ইসলামিক সন্ত্রাসবাদই বিপজ্জনক – এই ভয়ংকর মত শুধু সামাজিক নয়, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। সাধ্বী প্রজ্ঞার মত সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে অভিযুক্তও আইনসভার সদস্য হয়ে গেছেন। আল কায়দা, আইসিসের মতই হিন্দু উগ্রবাদী সংগঠনগুলোও শিশুদের অস্ত্রশিক্ষা দেওয়া শুরু করে দিয়েছে। সাধুসন্তরা বক্তৃতায় হিন্দুদের অস্ত্র তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নির্বাচনী জনসভায় জনতাকে গুলি করতে উৎসাহ দিয়েছেন। রাষ্ট্র এসব কড়া হাতে দমন করেনি, বরং হিংসার বিরুদ্ধে যারা কথা বলেছে তাদেরই দাঙ্গা লাগানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে। হেট স্পীচ প্রকাশ করে দেওয়ায় নিযুক্ত মহম্মদ জুবেরের মত সাংবাদিকদের টুইটার ট্রোলদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুরনো হিন্দি ছবির দৃশ্যের স্ক্রিনশট টুইট করার জন্যে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দেওয়া হয়েছে বলে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ওদিকে রোজ প্রাইম টাইমে দুই ধর্মের উগ্রবাদীদের নিয়ে আসর বসিয়ে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে এক শ্রেণির সংবাদমাধ্যম।

আরও পড়ুন বিজেপি মুখপাত্র বিতাড়ন: হিন্দুত্বের টাইম আউট, খেলা শেষ নয়

অর্থাৎ ভারতে মানুষের ভাবাবেগ, মানুষের জীবনের চেয়ে অনেক বেশি দাম হয়েছে ঠাকুর, দেবতা, পয়গম্বরদের। গোমাংস খাওয়ার, বিক্রি করার অপরাধে মুসলমান খুন হচ্ছেন। পয়গম্বরকে অপমান করার অপরাধে হিন্দু খুন হচ্ছেন। ভারতের বারোটা বাজাতে আর পাকিস্তান বা চীনের প্রয়োজন নেই। আমরা নিজেরাই সে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছি। কবে স্নিগ্ধতা হৃদয়ে জাগবে, সে অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর গতি নেই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

পরমাণু বোমার রাজনৈতিক ক্ষতিসাধনের প্রমাণ এই যুদ্ধ

লক্ষ করে দেখুন, এই মুহূর্তে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি শোষণমূলক, অগণতান্ত্রিক, বুলডোজার-নির্ভর শাসন চলছে।

ইউক্রেনকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সদস্যপদ দিতে উদগ্রীব। ইউরোপিয়ান কমিশন শুক্রবার (১৭ জুন, ২০২২) ভোলোদিমির জেলেনস্কির দেশকে সদস্য করে নেওয়ার সুপারিশ করেছে। সাতাশটা সদস্য দেশের অনুমোদন পেলেই ইউক্রেন পুরোদস্তুর পশ্চিমি দেশ হয়ে উঠবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন দের লেয়েন বলেছেন, ইউরোপ চায় ইউক্রেন “ইউরোপিয়ান ড্রিম” যাপন করুক। কথাগুলো শুনতে চমৎকার। কিন্তু পড়ে কি মনে হচ্ছে, কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের কথা বলা হচ্ছে? অথচ গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর প্রায় চার মাস কেটে গেছে। ক্রমশ একের পর এক এলাকায় যুদ্ধ ছড়িয়েছে এবং সাধারণ মানুষও আক্রান্ত হয়েছেন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে। যত দিন যাচ্ছে সেসব অভিযোগ বেড়েই চলেছে। যদিও ইউক্রেনের মত ছোট্ট একটা দেশ যত সহজে হেরে যাবে বলে মনে করা হয়েছিল, তত সহজে তারা হারছে না। রাশিয়া চার মাসেও আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি। কিন্তু ইউক্রেন বিশ্বের অন্য শক্তিগুলোর কাছ থেকে যতটা সাহায্য আশা করেছিল, তা পেয়েছে কি? এই প্রশ্নটা নিয়ে আলোচনা দরকার। কারণ আমাদের সকলের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত এখান থেকে পাওয়া যাবে।

রাশিয়া যে যে কারণে ইউক্রেন আক্রমণ করেছিল, তার অন্যতম হল গত কয়েক বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটোর সাথে ইউক্রেনের আশনাই। পুতিন যে নির্বাচনী গণতন্ত্রের ভেক ধরে রাশিয়ায় একনায়কতন্ত্র চালান, তা নিয়ে সারা বিশ্বের কোনো রাজনৈতিক মতের লোকেরই বিশেষ সন্দেহ নেই। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর মুখেই মার্কিন বিদেশনীতির ঘোরতর বিরোধী নোয়ম চমস্কি বলেছিলেন, পুতিনের জায়গায় মহাত্মা গান্ধী রাশিয়ার কর্ণধার হলেও ন্যাটোর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে আরও কাছাকাছি, আরও কাছে এসো বলা মেনে নিতেন না। ন্যাটো তৈরি হয়েছিল ঠান্ডা যুদ্ধের আমলে, সোভিয়েত ব্লকের দেশগুলোর প্রতিস্পর্ধী সংগঠন হিসাবে। অথচ সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই আজ তিরিশ বছর, ন্যাটো কিন্তু পূর্ব ইউরোপে ডালপালা বিস্তার করেই চলেছে। তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক, এটা নেহাত মার্কিনবিরোধী বামপন্থী যুক্তি। ইউক্রেন একটা স্বাধীন দেশ। সে যদি মনে করে রাশিয়ার পাড়ায় বাস করেও ভ্লাদিমির পুতিনের অপছন্দের আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের সাথে অভিসারে যাবে, তাতে কার কী বলার থাকতে পারে? কিন্তু কথা হল, রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর থেকে জেলেন্সকি যে বারবার ন্যাটোর সাহায্য প্রার্থনা করলেন, তার ফল কী? ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে তো সারা পৃথিবীর মানুষ মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের কথাবার্তা শুনে আশঙ্কা করছিলেন, ন্যাটো রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যাবে। তেমন কিছু ঘটল না তো!

যুদ্ধ শুরু হওয়ার দু সপ্তাহের মধ্যেই (৯ মার্চ) জেলেন্সকি বলে দিয়েছিলেন ইউক্রেন আর ন্যাটোর সদস্য হতে চায় না। কারণ ন্যাটো ইউক্রেনকে যুক্ত করতে তৈরি নয়। তৎসত্ত্বেও ২৪ মার্চ ব্রাসেলসে ন্যাটোর যে জরুরি বৈঠক হয় সেই বৈঠকে তিনি বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ যথেষ্ট নয়। “আপনাদের এক শতাংশ যুদ্ধবিমান আর এক শতাংশ ট্যাঙ্ক আমাদের দিন। আমাদের কিনে নেওয়ার ক্ষমতা নেই। যদি আমাদের ওগুলো দিয়ে সাহায্য করেন, তাহলে আমরা একশো শতাংশ সুরক্ষিত হতে পারি।” ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রঁ কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন “ন্যাটো ঠিক করেছে এই যুদ্ধে ইউক্রেনকে সাহায্য করবে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে না জড়িয়ে।” ইউক্রেনের প্রেমের এই প্রতিদান দিল ন্যাটো। এ যেন এক পৃথিবী লিখব বলে একটা খাতাও শেষ না করার মত প্রেম। আর এতদিন পরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ‘ক্যান্ডিডেট মেম্বারশিপ’ (চূড়ান্ত সদস্যপদ পেতে সাধারণত বছর দশেক লাগে) দেওয়া হল জড়োয়ার গয়নার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইমিটেশন দুল উপহার দেওয়া।

কেন এমন করল ন্যাটো? এক কথায় এর উত্তর সম্ভবত – পরমাণু শক্তি। মনে করুন পরমাণু বোমা যদি ১৯৩০-এর দশকেই আবিষ্কৃত হত, তাহলে অ্যাডলফ হিটলার একের পর এক অস্ট্রিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে নিল দেখেও ইংল্যান্ড, ফ্রান্স যেমন বিনীতভাবে হাত কচলাচ্ছিল; ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণ করার পরেও হয়ত সেভাবেই চালিয়ে যেত। তাহলে পৃথিবীর ইতিহাস কী হত ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। পরমাণু শক্তি আমাদের কী কী ক্ষতি করেছে তা নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন হিরোশিমা-নাগাসাকি, চেরনোবিল, ফুকুশিমা, তেজষ্ক্রিয়তা – এসব নিয়েই বেশি কথা হয়। কিন্তু পরমাণু বোমার অস্তিত্ব আমাদের যে বিপুল রাজনৈতিক ক্ষতি করেছে তা চট করে স্মরণে আসে না। পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো আজকের বিশ্বে তার প্রতিবেশে যদৃচ্ছা মাস্তানি করতে পারে। ছোট দেশগুলোর পক্ষ নিয়ে কেউ লড়তে আসবে না, কারণ পরমাণু বোমার ভয়। এ এমন এক শক্তি, যার পরিমাণ বাড়লে শক্তি বাড়ে না। ধরুন রাশিয়ার একশোটা পরমাণু বোমা আছে, আমেরিকার আছে পাঁচশোটা। আমেরিকা তবু রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না। কারণ একখানা উড়ে এসে পড়লেই তো যথেষ্ট। তারপর ফিরে পাঁচখানা ছুঁড়লেই বা কী লাভ হবে? হপ্তা দুয়েক আগেই বাইডেন বলে বসেছিলেন, চীন তাইওয়ান আক্রমণ করলে আমেরিকা সামরিকভাবে তার মোকাবিলা করবে। অনতিবিলম্বেই কিন্তু হোয়াইট হাউস এক বিবৃতি দিয়ে জানায়, চীন সম্পর্কে আমেরিকার দীর্ঘকালীন নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। সোজা কথায়, ঢোঁক গেলে। কারণটা একই।

তাহলে আমাদের নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত তো? কারণ ভারত পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র। আমরা তো প্রয়োজন পড়লে এ তল্লাটে যা ইচ্ছে তাই করতেই পারি। আমরা গান্ধী-নেহরুর দেশ বলেই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করাকে অন্যায় মনে করব, সে যুগ চলে গেছে। আমাদের দেশনায়কদের এখন আরাধ্য ইজরায়েল, যাদের অস্তিত্ব ও বিস্তার প্যালেস্তাইনকে গিলে নিয়ে। তাহলে?

আরও পড়ুন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

হাতে বিষের নাড়ুর মত বোমা আছে বলে অত আহ্লাদিত হবেন না। কারণ আমাদের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রও (চীন ও পাকিস্তান) পরমাণু শক্তিধর। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিপদ অন্যখানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হলে ইউরোপের কী হত, বাকি পৃথিবীর কী হত সেকথা থাক। জার্মানির মানুষের কী হত ভাবুন। নাজিদের সবচেয়ে বেশি অত্যাচারের শিকার হয়েছেন তো সে দেশের মানুষই। আরও কত গ্যাস চেম্বার হত, ইহুদী ফুরিয়ে যাওয়ার পর কাদের সেগুলোতে ঢোকানো হত ভেবে দেখুন। যুদ্ধের হাওয়ায় নাজি জার্মানির অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছিল একটা সময়ে। যুদ্ধ মিটে গেলে কী হত? কত মানুষ অনাহারে মারা যেতেন? লক্ষ করে দেখুন, এই মুহূর্তে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি শোষণমূলক, অগণতান্ত্রিক, বুলডোজার-নির্ভর শাসন চলছে। তা নিয়ে অন্য কোনো দেশ সমালোচনা করলেই চট করে বলা হয় “আভ্যন্তরীণ বিষয়”। এ নেহাত কাকতালীয় ঘটনা নয়। এই দেশগুলোর শাসকরা জানে, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, গ্যাস চেম্বার বা তার চেয়েও খারাপ কিছু ঘটে গেলেও অন্য কোনো দেশ সেনাবাহিনী পাঠিয়ে কোনো দেশের মানুষকে মুক্ত করার কথা স্বপ্নেও ভাববে না। কারণ পুতিন, মোদী, জিনপিংদের হাতে আছে একটা সর্বশক্তিমান ব্রিফকেস। সুতরাং পরমাণু শক্তিধর দেশের নাগরিক হিসাবে আমাদের বরং বেশি দুশ্চিন্তায় থাকা উচিত। আমরা স্বাধীন নই, পরমাণু শক্তির অধীন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

সাংবাদিক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছেন, শিক্ষার মাথায় ছাতা ধরবে কে?

বাংলায় দেরিতে হলেও বর্ষা এসে পড়েছে। এই সময়ে ছাতার চাহিদা বাড়ে। কিন্তু সোশাল মিডিয়া দেখে বোধ হচ্ছে এবার বর্ষায় ছাতা নিয়ে কথা বললে বিপদ হবে। এক সাংবাদিক পূর্বজন্মের পাপের ফল হিসাবেই বোধহয় একটি মেয়েকে ছাতার ইংরেজি প্রতিশব্দ umbrella বানান জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলেন। এখন সকলে সাংবাদিকের ‘এলিটিজম’, ‘ক্লাসিজম’, ‘সেক্সিজম’, আরও নানা ইজম নিয়ে দিনরাত শাপ শাপান্ত করছেন। স্বীকার্য যে সাংবাদিকরা কেউ দেবতা, গন্ধর্ব নন। বিভিন্ন চ্যানেলের বুম ধরে কলকাতা শহরে ঘুরে বেড়ান যে সাংবাদিকরা, কাগজগুলো ভরে আছেন যে সাংবাদিকরা তাঁরা অনেকেই আসেন এলিট পরিবার থেকে। ভারতীয় সাংবাদিকতার ধারাটাই এমন। খুব সাধারণ পরিবার থেকে যাঁরা আসেন তাঁরাও তো একই সমাজের উৎপাদন। ‘এলিটিস্ট’, ‘ক্লাসিস্ট’, ‘সেক্সিস্ট’ সমাজ থেকে অন্যরকম সাংবাদিক তো সংখ্যায় কমই বেরোবে। কিন্তু দু-তিনদিন কেটে যাওয়ার পরও বাঙালি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা যেভাবে সাংবাদিকটিকে আক্রমণ করে চলেছেন তাতে “সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধর” মানসিকতাই প্রকট।

সোশাল মিডিয়ার কুপ্রভাব নিয়ে অনেক কথা বলা যায়, অনেকেই আজকাল প্রভাবগুলো সম্পর্কে সচেতন, ফলে সচেতনভাবে সোশাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ কী নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে তা বোঝার জন্য সোশাল মিডিয়া গুরুত্ব আজ অস্বীকার করা যায় না। ফলে সোশাল মিডিয়ায় যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তাকেও “ওটা ভার্চুয়াল দুনিয়া” বলে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। সোশাল মিডিয়ার সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভাব এখন আর গোপন নেই এবং অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না।

হজরত মহম্মদের বিরুদ্ধে নূপুর শর্মা আর নবীন জিন্দালের বক্তব্য এবং তা নিয়ে জায়গায় জায়গায় উত্তেজনা, ভাংচুর থিতিয়ে গেছে। বাঙালি ভদ্রসমাজের বুলডোজারের ব্যাপারে চোখ বুজে থেকে “ওরা এত অসহিষ্ণু কেন” পোস্ট করাও বন্ধ হয়ে গেছে। বর্ষা চলে এল অথচ স্কুলে গরমের ছুটি কেন বাড়িয়ে দেওয়া হল, তা নিয়ে কিছু চুটকি আর কয়েকটা মিম ছাড়া রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঢেউ নেই ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে। মাসের পর মাস স্কুল বন্ধ রাখাকে রাজনৈতিক ইস্যু করে বিরোধী দলগুলো কেন রাজ্যব্যাপী রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে না, সে প্রশ্নও বড় একটা কেউ তুলছেন না। দিল্লিতে গত কয়েকদিন ধরে দেশের অন্যতম বিরোধী দল কংগ্রেসের প্রধানতম নেতা রাহুল গান্ধীকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের অফিসে ডেকে পাঠিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কী যে জেরা করা হচ্ছে কেউ জানে না। কংগ্রেসের অফিসে ঢুকে পড়ছে দিল্লি পুলিস, নেতা কর্মীদের নানা ছুতোয় শারীরিক নিগ্রহ করা হচ্ছে। ভারতীয় গণতন্ত্রে জরুরি অবস্থার সময়টা বাদ দিলে এরকম ঘটনা খুব বেশি পাওয়া যাবে না। ভয়ানক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি হচ্ছে। তা নিয়েও গণতন্ত্রপ্রিয় বাঙালির ফেসবুকে বিশেষ উচ্চবাচ্য নেই। অথচ ইংরেজিতে ফেল করে প্রতিবাদী হয়ে ওঠা একটি মেয়েকে কেন সাংবাদিক আমব্রেলা বানান জিজ্ঞেস করল, তা নিয়ে পোস্ট আর ফুরোচ্ছেই না।

আমাদের রাজ্যে, বিশেষত কলকাতায়, নানা দাবিতে নিয়মিত মিছিল মিটিং হয়ে থাকে (অনেক ভদ্রজনের তাতে বিষম আপত্তি থাকে চিরকালই)। সেইসব আন্দোলনে সাংবাদিকদের যেতে হয় খবর সংগ্রহে। সেখানে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলেন, জিজ্ঞেস করেন কী কী দাবি নিয়ে আন্দোলন, সেই দাবির সপক্ষে যুক্তিগুলো কী কী। অনেকসময় তা করেন না, কেবল অকুস্থল থেকে নিজের (অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসলে চ্যানেলের বা কাগজের) মতামত দর্শককে/পাঠককে গিলিয়ে দেন। সেটা বরং অন্যায়, আন্দোলনকারীর থেকে তাঁদের দাবির ব্যাখ্যা চাওয়া মোটেই অন্যায় নয়। এক্ষেত্রে সাংবাদিক সেই কাজটাই করছিলেন। যে বলে তাকে অন্যায়ভাবে ইংরেজিতে ফেল করানো হয়েছে, তার যোগ্যতার প্রমাণ চাওয়া আদপেই অন্যায় নয়। নইলে এরপর কৃষক আন্দোলন হলে প্রশ্ন করা যাবে না, কোথা থেকে এসেছেন? আপনার কত বিঘা জমি আছে? সেখানে কী চাষ করেন? নতুন কৃষি আইন নিয়ে আপত্তি করছেন কেন? সরকারকে বিশ্বাস করতে অসুবিধা কোথায়? প্রশ্নগুলো করার উদ্দেশ্য আন্দোলন সম্পর্কে তথ্য বের করে আনা। উত্তরে আন্দোলনকারীরা যা বলেন, তা তাঁদের বিরুদ্ধে গেল কিনা তা দেখা কিন্তু সাংবাদিকের কাজ নয়। সাধারণত যদি যা করছেন সে সম্পর্কে আন্দোলনকারীর সম্যক ধারণা থাকে, যদি ইস্যুগুলো সত্যিকারের ইস্যু হয়, তাহলে এমন কিছু বলে ফেলেন না যাতে আন্দোলন লোকের চোখে হাস্যকর হয়ে যায়। তবে হাস্যকর কারণে আন্দোলন করলে উত্তর তো হাস্যকরই হবে।

দাঁড়ান, দাঁড়ান। ক্ষেপে উঠবেন না। কী বলবেন জানি। এক্ষুনি বলবেন, যেভাবে ওই মেয়েটিকে প্রশ্ন করা হয়েছে সেইভাবে সরকারকে প্রশ্ন করতে পারে না? এই দেখুন, বনলতা সেনগিরি হয়ে গেল। সরকারকে যে সংবাদমাধ্যম কড়া কড়া প্রশ্ন করে না তা নিঃসন্দেহে অন্যায়। কিন্তু সেটা পারে না বলে আর কাউকেই কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না? এ-ও তো সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে চাওয়াই হল একরকম। তার মানে মমতা ব্যানার্জি বা নরেন্দ্র মোদীর মত আপনিও চান, সংবাদমাধ্যম একমাত্র আপনার পছন্দের প্রশ্নগুলোই করুক। এমন প্রশ্ন যেন না করে যাতে উত্তরদাতা অস্বস্তিতে পড়ে যায়।

পশ্চিমবঙ্গে তথা ভারতবর্ষে আজকাল নানা অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। একটা ঘটনা প্রায় রোজই ঘটে। সেটা হল কোনো ইস্যুতে যার দায় সবচেয়ে বেশি, তাকে বাদ দিয়ে আর সকলকে আক্রমণ করা। যেমন ধরুন আজকের বেহাল অর্থনীতির জন্য মনমোহন সিংকে আক্রমণ করা, চীন লাদাখে একের পর এক এলাকা দখল করে নিচ্ছে বলে জওহরলাল নেহরুকে আক্রমণ করা, দেশে চাকরি-বাকরি নেই বলে মোগলদের আক্রমণ করা। এগুলো একরকম। আরেকরকম হল এসএসসি নিয়োগে দুর্নীতি নিয়ে সিবিআই তদন্ত হচ্ছে বলে সিপিএমকে আক্রমণ করা, কেকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বলে রূপঙ্কর বাগচীকে আক্রমণ করা, বগটুই কাণ্ড নিয়ে রাজ্য সরকারের চেয়ে বিখ্যাতদের বেশি আক্রমণ করা। এক্ষেত্রেও দেখছি সেই ব্যাপার ঘটছে। সাংবাদিক নয়, অভিযোগের আঙুল ওঠা উচিত ছিল শিক্ষাব্যবস্থার দিকে। প্রশ্ন ওঠা উচিত ছিল, সামান্য আমব্রেলা বানান না জেনে ওই মেয়েটি যে ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত চলে এসেছে সে দায় কার? শিক্ষাব্যবস্থার এমন দুর্দশা হল কী করে? যাঁরা ওই মেয়েটিকে এবং তার সহপাঠীদের ইংরেজি পড়িয়েছেন ছোট থেকে, তাঁরা কেমন শিক্ষক? শিক্ষকদের দিক থেকে এ প্রশ্নের একটা সম্ভাব্য উত্তর – ক্লাস এইট পর্যন্ত পাস-ফেল তুলে দেওয়া হয়েছে। যে কিছুই শিখতে পারেনি তাকে যে আরও এক বছর একই ক্লাসে রেখে দিয়ে শেখাব, তার অবকাশ কোথায়? কথাটা ভেবে দেখার মত। ভাবলে এইট অব্দি পাস-ফেল তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত কিনা সেই আলোচনায় যেতে হবে। চুটকি, মিম, গালাগালি দিয়ে সে আলোচনা চলবে না। সাংবাদিককেও সে আলোচনার চাঁদমারি করা যাবে না।

আরও যে প্রশ্ন ওঠা উচিত ছিল, তা প্রাইভেট টিউশন নিয়ে। দেশের আর কোনো রাজ্যের শিক্ষার্থীরা এত বেশি টিউশনের উপর নির্ভরশীল নয়। ২০২১ সালের Annual Status of Education Report (ASER) অনুযায়ী, আমাদের রাজ্যে ৭৬% ছাত্রছাত্রী প্রাইভেট টিউশনের উপর নির্ভর করে, যা গোটা দেশের গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। গত শতাব্দীর আশি, নব্বইয়ের দশক থেকে এ রাজ্যে প্রাইভেট টিউশন এক সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। সেই ব্যবস্থা কীভাবে মূল শিক্ষাব্যবস্থার কোমর ভেঙে দিল তার কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা স্বল্পমেয়াদি মূল্যায়ন আজ অব্দি হয়নি। অথচ সকলেরই জানা আছে, প্রাইভেট টিউশনের রমরমায় কতরকম নৈতিক ও আইনগত দুর্নীতি শিক্ষাজগতে প্রবেশ করেছে। বাড়িতে টোল খুলে প্রবল পরিশ্রম করে মাস্টারমশাই স্কুলে গিয়ে ঝিমোচ্ছেন – এ দৃশ্য আমাদের ছাত্রাবস্থাতেই বিরল ছিল না। স্কুলের পরীক্ষায় কঠিন প্রশ্ন করে ছেলেমেয়েদের কম নম্বর পাইয়ে দিয়ে অভিভাবকদের নিরুপায় করে দেওয়া হয়েছে। তিনি স্কুলে এসে শিক্ষককে জিজ্ঞেস করেছেন কী করলে সন্তান ওই বিষয়ে উন্নতি করতে পারবে। উত্তরে বলা হয়েছে, আমার কাছে পড়তে পাঠিয়ে দেবেন। এমন ঘটনাও দেখেছি। এ তো গেল স্কুল স্তরের দুর্নীতি। বৃহত্তর ক্ষেত্রে কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে বোর্ডের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ইতিহাসও আছে। সত্যদার কোচিংয়ের কথা সকলেই ভুলে যাননি আশা করি। তা স্কুল আর টিউশন – দুটো জায়গায় পড়াশোনা করেও আমাদের ছেলেমেয়েরা আমব্রেলা বানানটুকুও শিখে উঠতে পারছে না?

আরও পড়ুন প্রখর তপন তাপে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা কাঁপে

ভেবে দেখুন, এতগুলো প্রশ্ন করার পরিসর তৈরি হল ওই সাংবাদিক আপনার অপছন্দের প্রশ্নটা করেছিলেন বলে, এবং এই প্রশ্নগুলো করা উচিত শিক্ষাব্যবস্থা যাঁরা চালান তাঁদের। তা না করে আপনি সাংবাদিকটি কত অযোগ্য তা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। না হয় মেনে নেওয়া গেল, সাংবাদিক অযোগ্য। তাতে কী? আপনি আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারেন, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থার কোনো লাভ হবে কী?

শিক্ষক, অধ্যাপক, শিক্ষা নিয়ে গবেষণারত মানুষজন, ডাক্তার, উকিল নির্বিশেষে মানুষ যেভাবে ফেল করে পাস করিয়ে দেওয়ার আন্দোলনে ব্রতীদের পাশে দাঁড়িয়ে সাংবাদিক খেদাতে নেমেছেন তাতে রাজ্যের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ে বই কমে না। কোনো সন্দেহ নেই যে এক-আধবার ফেল করা মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বস্তুত পরীক্ষায় ভাল নম্বর, খারাপ নম্বর সবকিছুর প্রমাণ নয়। ইংরেজিতে কত নম্বর পেলাম তা দিয়ে যে সবকিছু প্রমাণ হয় না তা-ও ঠিক। পৃথিবীতে কত লোক তো আদৌ লেখাপড়াই করে না, পরীক্ষা দেয় না। তারা কি ফেলনা নাকি? কিন্তু মুশকিল হল, ফেল করলে পাস করিয়ে দেওয়ার দাবিতে পথ অবরোধ করব – এই মানসিকতাকে প্রশ্রয় দিলে সমূহ বিপদ। তাহলে স্কুল, কলেজ থেকে পরীক্ষা ব্যবস্থা তুলে দিলেই তো হয়। আহা বাছা, ফেল করেছ তো কী হয়েছে? তোমার দোষ নয়, দুনিয়ার আর সক্কলের দোষ – এই বলে যদি কারোর পাশে দাঁড়ানো হয়, তাহলে আর সে নিজেকে শুধরে নিয়ে পাস করার চেষ্টা করবে কেন? পাস করা যে প্রয়োজন, এটা অন্তত মানেন তো নাকি? না রবীন্দ্রনাথের উদাহরণ টেনে বলবেন, পাস না করলেই বা কী? তা বলতেই পারেন, তবে মনে রাখবেন, অনেকেই দেবেন্দ্রনাথের মত বিত্তশালী, প্রভাবশালী অভিভাবক নয়। ফলে তাদের ছেলেমেয়েদের পরীক্ষায় পাস করে সার্টিফিকেট, ডিগ্রি ইত্যাদি পাওয়ার প্রয়োজন আছে। যাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তাদেরও দরকার আছে। নইলে রাস্তা অবরোধ করত না।

আসলে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে এসে ঠেকেছে। এমনিতেই ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক প্রাইভেট টিউশনের কল্যাণে এবং বিশ্বায়নের গুণে ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল আগেই, এখন আবার শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকরা দেখে ফেলেছে যে বহু শিক্ষক পরীক্ষা না দিয়ে বা সাদা খাতা জমা দিয়ে, স্রেফ ঘুষ দিয়ে মাস্টার হয়েছে। উপরন্তু বাঙালি ভদ্রসমাজের নীতিবোধে আমূল পরিবর্তন এসেছে। যে ছেলে হল ম্যানেজের কথা বাবা-মা জানতে পারলে কী বলবে তা নিয়ে ভয়ে থাকত, সে এখন বাবা হয়ে ছেলেমেয়ের স্কুলে দাবি জানাচ্ছে অতিমারী কেটে গিয়ে থাকলেও পরীক্ষাটা অনলাইনেই হোক। কেন এই দাবি তা বলে দেওয়ার দরকার নেই। মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সোশাল মিডিয়ায় এবং তার বাইরে খাতা দেখার যেসব অভিজ্ঞতা বিবৃত করছেন সেগুলো খেয়াল করলেই বোঝা যাবে।

পশ্চিমবঙ্গে ছাত্র রাজনীতির সুপ্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইস্যু থেকে শুরু করে জাতীয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইস্যু নিয়েও আন্দোলন করে থাকে। কিন্তু কদিন আগে দেখা গেল আরও এক অভূতপূর্ব ঘটনা। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী আন্দোলন করল অফলাইন পরীক্ষা দেবে না বলে। তাদের অন্যতম যুক্তি ছিল, সিলেবাস শেষ করানো হয়নি। সেক্ষেত্রে পরীক্ষাই বাতিল হোক দাবি করলেও না হয় কথা ছিল। কিন্তু তারা পরীক্ষা দিতে রাজি, শুধু বাড়িতে বসে পরীক্ষা দেওয়ার স্বাধীনতা চায়। এই দাবির কারণ কি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে? এরা তবু কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। বাবা-মা এদের মতামত নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। কিন্তু সদ্য স্কুল ছাড়তে অকৃতকার্য ছেলেমেয়েরা যে বাবা-মায়েদের সম্মতি ছাড়া রাস্তা অবরোধ করার সাহস পেত না, তা বলাই বাহুল্য। অনেক বাবা-মাকে তো সগর্বে ক্যামেরার সামনে বাইট দিতেও দেখা যাচ্ছে। একজন যেমন বলেছেন, যারা মোবাইলে বাংলায় মেসেজ করে তারা ইংরেজিতে পাস করে গেল আর তাঁর মেয়ে ইংরেজিতে মেসেজ করেও পাস করতে পারল না – এ অসম্ভব।

এই পরিস্থিতি হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। রিচার্ড ফাইনম্যান ইংরেজিতে খারাপ ছিলেন, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন স্কুলজীবনে অঙ্কে দুর্বল ছিলেন – এইসব আবোল তাবোল কথা বলে এদের পাশে দাঁড়ালে সাড়ে সর্বনাশ। এই অকৃতকার্য শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া থেকে এক হাড় হিম করা সত্য বেরিয়ে আসছে। তা হল পড়াশোনা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার সংজ্ঞাগুলোই একেবারে উল্টে গেছে এই রাজ্যে। যেনতেনপ্রকারেণ নম্বর পেলেই হয় এবং নম্বর দেওয়া শিক্ষকদের কর্তব্য – এমন ধারণা সমাজের গভীরে প্রোথিত হয়েছে। আমরা সম্ভবত গণটোকাটুকির যুগে ফেরত যেতে চলেছি। এবার আর রাজনৈতিক অশান্তির কারণে নয়, সামাজিক সম্মতিপূর্বক।

২০১৫ সালে বিহারের একটা ছবি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমেরিকার দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, ইংল্যান্ডের দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রভৃতি বিশ্বখ্যাত কাগজ এ নিয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ছবিটা এরকম – পরীক্ষা হচ্ছে একটা স্কুলে, আর পরীক্ষার্থীদের বাবা-মায়েরা দেয়াল বেয়ে উঠে জানলা দিয়ে পরীক্ষার্থীদের সাহায্য করছেন। আগামীদিনে পশ্চিমবঙ্গে এরকম কিছু দেখা গেলে অবাক হবেন না। দয়া করে তখন আলোকচিত্রীকে গাল দেবেন না – এইটুকু অনুরোধ। তিনি সাংবাদিক, তাঁর কাজই ওই।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

বিজেপি মুখপাত্র বিতাড়ন: হিন্দুত্বের টাইম আউট, খেলা শেষ নয়

উত্তরপ্রদেশের বাদাউনের যুবক রেহান শাহের গত কয়েকদিন ধরে বারবার খিঁচুনি ধরছে। বেশ কিছুদিন বুলন্দশহর হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর গত শনিবার (৪ জুন) বাড়ি এসেছেন। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, রেহানের এই অবস্থার কারণ পুলিসি হেফাজতে অকথ্য অত্যাচার। গত ২ মে তাঁকে কাকরালা পুলিস আউটপোস্টে নিয়ে যাওয়া হয়, প্রচণ্ড মারধোর করা হয়, ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয় এবং গুহ্যদ্বারে প্লাস্টিকের পাইপ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটা মাসখানেক আগের হলেও প্রকাশ্যে এসেছে হপ্তাখানেক হল, কারণ রেহানের পরিবারের বক্তব্য, দোষী পুলিসকর্মীরা তাঁদের হুমকি দিয়েছিলেন যে এ নিয়ে মুখ খুললে ফল ভাল হবে না। রেহানের মা নাজমা শাহ শেষপর্যন্ত মরিয়া হয়ে বাদাউনের এসপি ডঃ ওমপ্রকাশ সিংয়ের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। প্রাথমিক তদন্তের পর দাতাগঞ্জের সার্কল অফিসার প্রেমকুমার থাপার সিদ্ধান্ত, রেহানের পরিবার যা বলছে তা সত্যি। ফলে পাঁচ পুলিসকর্মীর বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে।

এমন নয় যে এ দেশে পুলিস হেফাজতে অত্যাচারের এটাই প্রথম ঘটনা। স্মরণকালে সবচেয়ে বেশি হইচই হয়েছিল যে ঘটনা নিয়ে, তা হল ২০২০ সালে তামিলনাড়ুর শান্তাকুলমে ব্যবসায়ী পি জয়রাজ আর তাঁর ছেলে বেনিক্সের লক আপে মারধোর ও ধর্ষণ এবং তার ফলে মৃত্যু। তামিলনাড়ু পুলিস থার্ড ডিগ্রির জন্য কুখ্যাত, যা বহু আলোচিত জয় ভীম ছবিতেও দেখানো হয়েছে। এ বছরের এপ্রিল মাসেও চেন্নাইতে পুলিস হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে ভারতের প্রায় কোনো বড় রাজ্যই পুলিস হেফাজতে বা বিচারবিভাগীয় হেফাজতে অত্যাচার ও মৃত্যুর তালিকায় বাদ নেই। বস্তুত, উত্তরপ্রদেশ ২০২১-২২ সালে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে মৃত্যুর তালিকায় একেবারে শীর্ষে (৪৪৮)। কিন্তু রেহানকে পুলিস যে কারণে জিজ্ঞাসাবাদ করতে নিয়ে গিয়েছিল, তার জন্যই এ ঘটনা আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। পুলিস বলেছে উনি নাকি গোহত্যায় জড়িত। শেষপর্যন্ত তাঁর অপরাধের কোনো প্রমাণ না পেয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়, যদিও রেহানের পরিবার বলেছে ৫০০০ টাকা ঘুষ দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশ তথা সারা ভারতে গত কয়েক বছরে গোহত্যার ‘অপরাধে’ কত ইসলাম ধর্মাবলম্বীকে স্রেফ পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে আমরা জানি। এরকম একটা ঘটনা সামলাতে গিয়ে উন্মত্ত জনতার হাতে বুলন্দশহরের পুলিস অফিসার সুবোধ সিং পর্যন্ত খুন হয়েছিলেন। উপরন্তু উত্তরপ্রদেশে বুলডোজারতন্ত্র চলছে। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে হিংসায় অভিযুক্ত সংখ্যালঘুদের বাড়ি ভেঙে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে শুরু হয়েছে, উত্তরপ্রদেশ তাতেও প্রথম সারিতে রয়েছে। ভারত এমন এক দেশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মধ্যপ্রদেশের ৬৫ বছরের বৃদ্ধ ভওরলাল জৈনকে মরতে হয় কারণ এক বিজেপি কর্মীর সন্দেহ হয়েছিল, তিনি মুসলমান। সুতরাং রেহানের দুর্দশার আসল কারণ যে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়, তা পরিষ্কার।

কিন্তু সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী বা ইরান ভারতজুড়ে গত কয়েক বছর ধরে রেহানের মত ইসলাম ধর্মাবলম্বী সাধারণ মানুষের উপর যে আক্রমণ চলছে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে – তার কোনো প্রতিবাদ করেনি। এমনকি স্পষ্ট ধর্মীয় বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন যখন পাস হয়েছিল, তখনো এই দেশগুলো টুঁ শব্দটি করেনি। হইহই করে উঠেছে কখন? যখন সরকারি দল বিজেপির দুই মুখপাত্র নূপুর শর্মা আর নবীন জিন্দাল হজরত মহম্মদ সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন। স্পষ্টত, সাধারণ মুসলমানের বাঁচা মরা নিয়ে ওই দেশগুলো ভাবিত নয়। তারা বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষায় আগ্রহী, বিশ্বাসীদের প্রাণরক্ষায় আগ্রহী নয়। যুক্তি দিয়ে বিচার করলে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মুসলমানরা মুসলমান ছাড়া কাউকে চেনে না, ওরা সব এক, ওদের উদ্দেশ্য বিশ্বজুড়ে ইসলামিক স্টেট তৈরি করা – এই তত্ত্বে যাদের মাথা ঘুরেছে তাদের কথা আলাদা, কিন্তু সাধারণ বুদ্ধি থাকলেই বোঝা যায় যে পশ্চিমবঙ্গ বা উত্তরপ্রদেশের ছাপোষা মুসলমানের জন্য আরব দেশের আমির ওমরাহের দরদ থাকার কোনো কারণ নেই। চীনের উইঘুর মুসলমান বাঁচল কি মরল তাতে যে আরব হোমরা চোমরাদের কিছু এসে যায় না, তা আগেই দেখা গেছে। এমনকি প্যালেস্তাইনের উপর আমেরিকার মদতপুষ্ট ইজরায়েলের হানাদারি নিয়েও আমেরিকার মিত্র সৌদি আরব কখনো মুখ খোলে না। এমনকি ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধেও মুসলিম দুনিয়া দ্বিধাবিভক্ত। অতিসরল শিয়া-সুন্নি বিভাজন তো আছেই, তা বাদেও নানা ভূ-রাজনৈতিক জটিল অঙ্ক আছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে কোনো দুটো দেশ বা দুটো গোষ্ঠীর দেশের মধ্যেই তা থাকে, দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে ধর্মেরই হোক, দেশটায় গণতন্ত্র বা রাজতন্ত্র – যা-ই চলুক।

কয়েকজন নেহাত মরণশীল ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতা রক্ষা না করলে মর্যাদাহানি হবে, হজরত মহম্মদ বা ইসলাম ধর্ম নিশ্চয়ই এত ঠুনকো নয়। হলেও সে জন্যে কাউকে খুনের হুমকি দেওয়া চলে না, যা অনেকে নূপুর আর নবীনকে দিচ্ছে বলে অভিযোগ। কিন্তু বাকস্বাধীনতার নামে মিথ্যার উপর ভর দিয়ে কুৎসা এবং ঘৃণা ছড়ানো যে চিরকাল চলতে পারে না – সে কথা শেষপর্যন্ত আরব দেশগুলোর ধমকানিতে বিজেপি সরকারকে ঢোঁক গিলে মানতে হল। ফরাসি কার্টুন পত্রিকা শার্লি এবদো কার্টুনের মাধ্যমে নিজেদের মতামত প্রকাশ করে, তাদের বক্তব্য তারা মুসলমানবিদ্বেষী নয়। কিন্তু ইসলাম বা অন্য যে কোনো আদর্শকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা তাদের বাকস্বাধীনতা। অন্তত তাত্ত্বিকভাবে এ কথায় ভুল নেই। ইসলাম, হিন্দুধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, জুডাইজম – যে কোনো ধর্মকে নিয়েই ব্যঙ্গ করার অধিকার সকলের আছে, অন্তত থাকা উচিত। শুধু ধর্মই বা কেন? গান্ধীবাদ, মার্কসবাদ বা হিন্দুত্ববাদ নিয়েও ব্যঙ্গ করা চলে, করা হয়ও। কিন্তু নূপুরদেবী কোনো আদর্শকে ব্যঙ্গ করেননি, গলার জোরে অর্ধসত্য উচ্চারণ করে ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতাকে হেয় করেছেন। ষষ্ঠ শতাব্দীর একজন পুরুষের স্ত্রীর সঙ্গে বয়সের পার্থক্যের কারণে যদি তাঁকে যে কোনো বিশেষণে ভূষিত করা চলে, তাহলে ভারতে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যাবে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে সারদামণির বয়সের তফাতও কম নয়, তাঁদের বিয়ের সময় সারদা নিতান্তই শিশু ছিলেন। অথচ তাঁরা হজরত মহম্মদের প্রায় বারোশো বছর পরের মানুষ। উপরন্তু এ দেশের কুলীন ব্রাহ্মণরা বিয়েকে রীতিমত লাভজনক ব্যবসা করে তুলে মনের সুখে ছোট ছোট মেয়েদের বিয়ে করে বেড়াতেন শ দেড়েক বছর আগেও। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নামক এক অতি দুর্বিনীত পণ্ডিত এ দেশে না জন্মালে সে ব্যবসা বহাল তবিয়তে আরও কতদিন চলত বলা মুশকিল।

দুঃখের বিষয়, ২০২১ সালে ইউনিসেফ প্রকাশিত এক সমীক্ষা বলছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে এখনো ভারতেই হয়। প্রত্যেক বছর প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ১৮ বছরের কমবয়সী মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় এ দেশে। ২০১৬ সালে ইন্ডিয়াস্পেন্ড জনগণনা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে যে সমীক্ষা করেছিল, যদি ইউনিসেফের সমীক্ষার সঙ্গে তা মিলিয়ে পড়েন তাহলে মাথা ঘুরে যাবে। ওই সমীক্ষা বলেছিল, প্রায় ১২ মিলিয়ন ভারতীয় শিশুর ১০ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। তাদের মধ্যে ৮৪% হিন্দু আর ১১% মুসলমান। এই শিশুদের ৬৫% মেয়ে। অতএব বিয়েশাদি নিয়ে কথা না বাড়ানোই ভাল। এই ধর্ম গোঁড়া, ওই ধর্ম উদার – এসব কথাও ধোপে টেকে না। ধর্মকে ধর্মের জায়গায় থাকতে দিয়ে কী করে দেশটা চালানো যায় তাতে মন দিলেই যে সরকারকে অপ্রস্তুতে পড়তে হয় না, এইটুকু সরকার এবং তার সমর্থকরা বুঝলেই যথেষ্ট হয়।

আরও পড়ুন আরএসএসের পছন্দসই অগভীর বিরোধিতার মুখ বাবুল, শত্রুঘ্ন

অবশ্য সে কথা মোদী, অমিত শাহরা বোঝেন না বললে তাঁদের বুদ্ধিসুদ্ধিকে ছোট করা হয়। সমস্যা হল ধর্মীয় জিগির বাদ দিয়ে কী করে রাজনীতি করতে হয় বা সরকার চালাতে হয় তা আজ নতুন করে শিখতে হলে বিজেপি মহা ফাঁপরে পড়বে। সঙ্ঘের একশো বছরের শিক্ষা তাহলে বাতিল করতে হয়, বেহাল অর্থনীতির হাল কী করে ফেরানো যায় তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে হয়। সেসব করবে কে? অরবিন্দ পনগরিয়া বা জগদীশ ভগবতীর মত যেসব দক্ষিণপন্থী অর্থনীতিবিদ প্রথম থেকে প্রবল উৎসাহে বিজেপি সরকারের প্রতিটি নীতির সমর্থনে তত্ত্ব খাড়া করতেন, তাঁরাও বেশ কিছুদিন হল নীরব হয়ে গেছেন। ইতিহাসের ছাত্র শক্তিকান্ত দাসকে দিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক চালাতে হচ্ছে। এমন একজনকে অর্থমন্ত্রী করা হয়েছে, যিনি পেঁয়াজের দাম বাড়ার সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করলে বলেন “আমি তো পেঁয়াজ খাই না, তাই জানি না।” এমন একজনকে বিদেশমন্ত্রী করা হয়েছে, যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সমালোচনা করলে নির্বোধের মত বলেন “ভোটব্যাঙ্ক পলিটিক্স করছে”। যেন জো বাইডেন ২০২৪ সালে বারাণসীতে মোদীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হবেন। এমতাবস্থায় তাজমহল, জ্ঞানবাপী, কুতুব মিনার – সর্বত্র মন্দির প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া বিজেপি অন্য কী রাজনীতি করবে? কিন্তু তাদের এই মুহূর্তে যতই অপরাজেয় মনে হোক, রাজনৈতিক বিরোধীরা যতই ক্ষুদ্র স্বার্থে অন্তর্কলহ বা অকারণ রোম্যান্টিকতায় মগ্ন থাকুন না কেন, এই রাজনীতি যে ক্রমশ হিন্দুত্ববাদীদেরও বড় বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সম্ভবত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তা আন্দাজ করছে। সেই কারণেই সঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত সম্প্রতি বলেছেন, সব মসজিদের তলায় শিবলিঙ্গ খুঁজতে যাওয়ার দরকার নেই। সেই অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমল থেকে দেখা যেত আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের লোকেরা সবচেয়ে উগ্র মন্তব্যগুলো করেন, বিজেপি নেতারা তুলনায় নরমপন্থা দেখান। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল গুজরাট ২০০২, যেখানে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মোদী গরম গরম বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সহসা উলটপুরাণ শুরু হয়েছে। বিজেপি মুখপাত্ররা সরাসরি হজরত মহম্মদকে গাল পাড়ছেন, আর সঙ্ঘের প্রধান বলছেন মারামারিতে কাজ নেই, ইতিহাস কি আর বদলানো যায়?

আসলে সঙ্ঘ বরাবরই মুখেন মারিতং জগৎ। অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠা আর কাশ্মীর থেকে সংবিধানের ৩৭০ নং ধারা প্রত্যাহার তাদের মৌলিক ইস্যুগুলোর মধ্যে পড়ে। প্রথমটা নির্বিঘ্নে মিটে গেলেও দ্বিতীয়টার ফলে কাশ্মীর যে হাতের বাইরে চলে গেছে তা আর লুকনো যাচ্ছে না। বাকি ভারতের হিন্দুদের মুসলমান জুজু দেখানোর জন্য তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যাদের উপেন্দ্রকিশোরের গল্পের কুমিরছানার মত বারবার দেখানো হয়েছে – সেই কাশ্মীরি হিন্দুরা এখন বেঘোরে মারা যাচ্ছে, ‘হিন্দু হৃদয়সম্রাট’ মোদী ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে আছেন। নিজেদের তাঁবে অস্ত্রশিক্ষা দিয়ে বেড়ানো অমুক সেনা, তমুক সেনাকে দিয়ে যে কাশ্মীরে জঙ্গি মোকাবিলা করা যাবে না, তা তাঁরা ভালই বোঝেন। আর হিংসা যে হিংসার জন্ম দেয় তা ভাগবত-মোদী-শাহের চেয়ে ভাল আর কে জানে? কাশ্মীরের জঙ্গিপনা যদি বাকি দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সামলানো কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে সম্ভবত ওঁরা নিজেরাই এখন সন্দিহান। আরব দুনিয়াকে চটালে কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা বাড়বে তা নয়, ইসলামিক মৌলবাদের সমস্যাও বাড়তে পারে। অতএব আপাতত ভালমানুষীর বিকল্প নেই।

নূপুর আর নবীনকে সাসপেন্ড করা যে ভালমানুষীর বেশি কিছু নয়, তা সাদা চোখেই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কারণ তাঁদের সাসপেন্ড করেছে বিজেপি দল, ভারত সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সবকিছু আভ্যন্তরীণ বিষয় বলে চালিয়ে দিয়ে যে বিদেশনীতির ক্ষেত্রে পার পাওয়া যায় না – এটা বুঝতে যেমন দেরি হল, তেমনি দল আর সরকারকে দেশের মানুষ এক বলে মেনে নিলেও অন্য দেশগুলো যে না-ও মানতে পারে, তা কোন মূল্যে বিজেপি সরকার বুঝবে তা গডসেই জানেন। ভারত সরকার যেভাবে চলছে তাতে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় থাকা উচিত সেইসব অনাবাসী ভারতীয়দের, যাঁরা বিভিন্ন আরব দেশে থেকে সোনামুখ করে কোনো বহুজাতিক বা আরব মালিকের কোম্পানিতে কাজ করে দু পয়সা কামান আর সোশাল মিডিয়ায় ভারতীয় মুসলমানদের অহোরাত্র গালি দিয়ে ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হওয়ার অপেক্ষা করেন। কারণ যদিও ভারতীয় মুসলমানের জন্য ও দেশের আমির, মুফতিদের প্রাণ কাঁদে না; ইসলামকে আক্রমণ করলেই তাঁরা কেমন অগ্নিশর্মা হয়ে যান তা একটা ঘটনায় প্রমাণ হয়ে গেল। এসব চলতে থাকলে ওখানকার হিন্দুদের গলাধাক্কা দিতে ওঁরা বেশি সময় নেবেন না। ওই দেশগুলো তো আর ‘মুসলিম এজেন্ট’ গান্ধী, ‘চরিত্রহীন’ নেহরু আর ‘সোনার চাঁদ’ আম্বেদকরের তৈরি গণতান্ত্রিক সংবিধান মেনে চলে না।

যে ভারতীয় উদারপন্থীরা কদিন “দ্যাখ কেমন লাগে” মেজাজে আছেন, তাঁদেরও নিশ্চিন্ত হওয়ার কারণ নেই। আরব দেশগুলো কী বলবে সেই ভাবনায় বুলডোজার থামবে না, বিনা বিচারে সংখ্যালঘু ও বিরোধীদের আটক করে রাখা বন্ধ হবে না, আম্বানি-আদানির হাতে দেশের সমস্ত সম্পদ তুলে দেওয়াও থমকে যাবে না। কারণ বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো নিজের দেশে এবং আশপাশে যথেচ্ছ অনাচার চালাতে পারে। স্রেফ পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়েই অন্য কোনো দেশ কিছু বলবে না। নেহাত কাকতালীয় ঘটনা নয় যে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোতেই দক্ষিণপন্থী স্বৈরাচারী শাসকদের উত্থান হয়েছে; মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রবলভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। বিশ্বায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল পৃথিবীটা ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ হবে। আসলে পৃথিবী এখন কয়েকটা কূপমণ্ডূক গ্রামে বিভক্ত, যেখানে নির্বাচনে জিতে আসা অগণতান্ত্রিক মোড়লরাই শেষ কথা। ন্যাটো ভ্লাদিমির পুতিনের হাত থেকে ইউক্রেনকে বাঁচাতে আসেনি, কাল চীন তাইওয়ান আক্রমণ করলে বাইডেন মোটেই বাঁচাতে আসবেন না, এখন যা-ই বলুন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত কোনো মিত্রপক্ষ বা মুক্তিবাহিনী এসে কাউকে উদ্ধার করবে না। নিজেদের মুক্তির ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

আকাদেমি সমাচার: সাহিত্য পুরস্কার যার যার, তিরস্কার সবার

সাহেবরা বলে থাকে রোম একদিনে তৈরি হয়নি। মমতা ব্যানার্জিকে নিরলস সাহিত্যচর্চার জন্য পুরস্কার দিয়ে মানুষকে হাসির খোরাক জোগানোও একদিনে হয়নি। একে সাহিত্যের অপমান বা সাহিত্যিকদের অপমান – যা-ই বলুন, ঘটনাটি কিন্তু ধারাবাহিকতা মেনে ঘটানো হয়েছে। ২০১৮ সালকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ প্রায়শই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। কারণ ওই বছর পঞ্চায়েত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শাসক দলের প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। যেভাবে এই কাণ্ড ঘটানো হয় তাতে পশ্চিমবঙ্গে আর গণতন্ত্র অবশিষ্ট ছিল না বলে বিরোধীরা অভিযোগ করে থাকেন। কিন্তু রাজ্যের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে যাঁদের আগ্রহ আছে তাঁদের একইসঙ্গে খেয়াল থাকা উচিত, মনোনয়ন পর্বের হিংসা নিয়ে শঙ্খ ঘোষের কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পরে তৃণমূলের বীরভূম জেলার নেতা অনুব্রত মণ্ডল কবিকে কোন ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন।

“বড় বড় কথা বলছেন কবি? এ কোন কবি? আমরা তো কবি বলতে জানতাম রবীন্দ্রনাথ, নজরুল। এ কোন নতুন কবি উঠে এসেছেন, যে আমার উন্নয়ন নিয়ে কথা বলছেন। কবির নাম শঙ্খ রাখা ঠিক হয়নি, শঙ্খ নামের অপমান করেছেন উনি। এখনও বলছি, রাস্তায় উন্নয়ন দাঁড়িয়ে আছে।”

আনন্দবাজার পত্রিকার ১০ মে ২০১৮ তারিখের সংস্করণে এই প্রতিবেদনের সঙ্গেই ছিল আরেকটি প্রতিবেদন, যেখানে অনুব্রতর আক্রমণ সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্টজনদের মতামত প্রকাশিত হয়েছিল। যাঁরা মত দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে আছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির দুই বর্তমান সদস্য – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও জয় গোস্বামী। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর কথা যদি সত্যি হয় (মিথ্যে বলে মনে করার কোনো কারণ ঘটেনি, যেহেতু সে কথার কোনো প্রতিবাদ হয়নি এখনো), তাহলে মমতা ব্যানার্জিকে আকাদেমির সর্বপ্রথম রিট্রিভারশিপ (নাকি সাবভার্সিভ? বলতে গিয়ে ভুল হয়েছে?) পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তে এঁদেরও সম্মতি ছিল। কী বলেছিলেন সেদিন ওই দুজন? শীর্ষেন্দুর বক্তব্য ছিল “এটা রাজনৈতিক চাপানউতোর। আমি যেহেতু রাজনীতি করিনা, তাই এ নিয়ে মন্তব্য করতে পারছি না।” আর জয় বলেছিলেন “পঞ্চাশের দশক থেকে অপ্রতিহত গতিতে কবিতা লিখছেন শঙ্খ ঘোষ। তিনি আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন। জ্ঞানপীঠ পেয়েছেন। এ রকম একজন সম্পর্কে যদি কেউ এ কথা বলেন, তবে কবিতা সম্পর্কে তাঁর কোনও বক্তব্যে মাথা না ঘামানোই ভাল। তাঁর কোনও কথাকে গুরুত্ব দেওয়াই উচিত নয়।”

অর্থাৎ বাংলার শ্রেষ্ঠ জীবিত কবিকে শাসক দলের একজন পদাধিকারী গুন্ডা ব্যক্তিগত আক্রমণ করলে সেটা শীর্ষেন্দুর কাছে রাজনৈতিক চাপান উতোর। যেন শঙ্খ ঘোষ বিরোধী দলের একজন নেতা, সাহিত্য জগতের কেউ নন। অতএব প্রবীণ সাহিত্যিক শীর্ষেন্দুর এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার দায় নেই। আনন্দবাজার পত্রিকার একটি প্রিয় শব্দ আছে – দলদাস। শব্দটি কোনো অজ্ঞাত কারণে শুধুমাত্র বাম দলের সাথে যুক্ত মানুষজনের জন্যই ব্যবহার করা হয়। নইলে দলদাসত্বের এমন চমৎকার উদাহরণ চোখ এড়াত না। পুরোদস্তুর রাজনৈতিক অবস্থান নিলাম, অথচ বললাম আমি রাজনীতি করি না। ভাষার এমন চাতুর্য একমাত্র শীর্ষেন্দুর মত উচ্চাঙ্গের কথাশিল্পীর পক্ষেই সম্ভব।

জয়ের মন্তব্যটিও অতুলনীয়। শঙ্খ ঘোষের মহানতা কোথায়? প্রথমত, অর্ধ শতকের বেশি কবিতা লেখায়। দ্বিতীয়ত, দুটি বড় বড় পুরস্কার পাওয়ায়। অর্থাৎ যদি পনেরো-বিশ বছর কবিতা লিখছেন, কোনো পুরস্কার পাননি – এমন কবি সম্পর্কে অনুব্রত কথাগুলি বলতেন তাহলে তেমন দোষ হত না। তাছাড়া দোষ হয়েছে বলেও জয় মনে করছিলেন কিনা বোঝার উপায় নেই, কারণ তিনি বলছেন যে লোক কবিতা বোঝে না তার কথায় গুরুত্ব দেওয়ার মানে হয় না। অর্থাৎ কথাগুলি কে বলছে তার কোনো গুরুত্ব নেই। জয় এমন এক স্বপ্নলোকে বিচরণ করেন যেখানে ক্ষমতা নেই, ক্ষমতার বিন্যাস নেই। কেবল দু দল মানুষ আছে – এক দল কবিতা বোঝে, আরেক দল কবিতা বোঝে না। যারা বোঝে না তাদের মধ্যে কে কী বলল তা নিয়ে না ভাবলেই মিটে গেল। অর্থাৎ সেদিন পশ্চিমবঙ্গের গদ্য আর পদ্য সাহিত্যের দুই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী শিল্পী অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে ছিলেন। সাহিত্য যে অতি খেলো ব্যাপার – এ কথা পশ্চিমবঙ্গে সেদিনই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর একটি গল্পে ভজহরি নামে এক চাকরের কথা আছে। একদিন বাড়িতে চোর এল, ভজহরি ঠিক করল ব্যাটাকে ধরতে হবে। সে মাথায় শিং বেঁধে, লেজ পরে উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল। তার ধারণা চোর তাকে ছাগল মনে করে চুরি করতে আসবে, অমনি সে চোরকে জড়িয়ে ধরবে। চোর এল, ঘরে ঢুকল, ভজহরি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে শুধু বলল “ম্যা-আ-আ-আ”। চোর সব জিনিসপত্র বার করে এনে নিশ্চিন্তে পুঁটুলি বাঁধল, ভজহরি কেবল আওয়াজ করল “ম্যা-আ-আ-আ”। চোর চুরির মাল নিয়ে আস্তাকুঁড় পেরিয়ে ছুটে পালাল, ভজহরি হেসে খুন। বলল “ব্যাটা কি বোকা, আস্তাকুঁড় মাড়িয়ে গেল, এখন বাড়ি গিয়ে স্নান করতে হবে!” নিজেদের বুদ্ধি সম্পর্কে ভজহরিসুলভ মুগ্ধতায় আকাদেমির সম্মানীয় সদস্যরা নিজেদের, বাংলা আকাদেমির এবং বাংলা সাহিত্যের বিশ্বাসযোগ্যতার বারোটা বাজালেন।

এমনিতে বাঙালি চিরকাল গুণ এবং গুণীর দারুণ কদর করে এসেছে বললে ডাহা মিথ্যা বলা হবে। বাঙালি বরাবরই স্বীকৃতির কাঙাল এবং হুজুগে মাততে পছন্দ করে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন বিশ্বভারতী গড়ে তুলতে বাঙালিরা তাঁকে একটি পয়সা দিয়ে সাহায্য করেনি, শুধু মোহিত সেন নামে এক অধ্যাপক এক হাজার টাকা দিয়েছিলেন। অথচ মৃত্যুর পর স্যুভেনির হিসাবে সেই লোকের দাড়ি ছিঁড়ে নিতে হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল। পথের পাঁচালী বিদেশে সম্মানিত না হলে সত্যজিৎ রায়কে নিয়েও আমরা গদগদ হতাম কিনা সন্দেহ। এ বিষয়ে সেরা উদাহরণ অবশ্য মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অবিস্মরণীয় রিপোর্টাজে লিখেছেন, মাণিক যখন মারা যাচ্ছিলেন তখন কেউ তাঁর খবর নেয়নি। অথচ মারা যাওয়ার পর ফুলে ফুলে ঢেকে যাওয়ার জোগাড়। সে দৃশ্য নিজে চোখে দেখেছিলেন বলেই বোধহয় সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ফুল জমে জমে পাথর হয়। এতকিছু সত্ত্বেও বাঙালি গুণীদের মধ্যে ক্ষমতার প্রসাদ পাওয়ার জন্য এ হেন কাতরতা, যা-ই ঘটুক তা মুখ বুজে মেনে নেওয়ার এমন ব্যগ্রতা নিঃসন্দেহে অভিনব। সুভাষ নিজে বামপন্থী হয়েও বামফ্রন্ট সরকারের পেয়ারের লোক ছিলেন না। মৃত্যুর পর বরং মমতা ব্যানার্জি তাঁকে নিজেদের লোক বলে দাবি করেছিলেন। শঙ্খ ঘোষ কংগ্রেস আমলে তাদের বিরুদ্ধে লিখেছেন, বাম আমলে সিপিএম নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক সত্ত্বেও নন্দীগ্রাম কাণ্ডের পর মিছিলে হেঁটেছিলেন। তফাতের মধ্যে তাঁকে দলে টানতে বিমান বসু তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন, ব্যর্থ হওয়ার পরেও “এ কোন কবি” বলেননি।

অল্পবয়সী, কম বিখ্যাতদের স্বীকৃতির লোভ তবু বোঝা যায়। সারাজীবন পাঠক, সমালোচকদের কাছ থেকে সম্মান পাওয়া এবং গত এক দশকে ফণিভূষণ, মণিভূষণ, বিধুভূষণে ভূষিত কৃতীরা কিসের অনুপ্রেরণায় নিজের সাধনার চরম অসম্মানেও রা কাড়েন না – সে এক রহস্য। কিন্তু সে রহস্য বাদ দিয়েও পশ্চিমবঙ্গে সাহিত্য কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে এবং কোন পথে চলেছে তা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা করার পরিস্থিতি তৈরি করে দিল মুখ্যমন্ত্রীকে পুরস্কার প্রদান। নিজেদের অজান্তে এই কাজটি করার জন্য হয়ত পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিকে ধন্যবাদ দেওয়া যেতে পারে। কারণ বাংলার লেখক, প্রকাশক, পাঠক গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসাতে বিলক্ষণ ভালবাসেন। নিজেদের দোষত্রুটি নিয়ে ভাবতে কেউ রাজি নন। বাংলা সাহিত্য একদিনে এতটা খেলো হয়নি। এই সুযোগে এ বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

রত্না রশিদ বলে এক সাহিত্যিক মুখ্যমন্ত্রীকে পুরস্কার দেওয়ার প্রতিবাদে নিজের পুরস্কার ফিরিয়ে দেবেন বলেছেন। তাতে তৃণমূল কংগ্রেস মুখপাত্র দেবাংশু ভট্টাচার্যের প্রতিক্রিয়ার কাটাছেঁড়া করলেই অনেকগুলি দিক বেরিয়ে আসবে। রত্নাকে ফালতু প্রমাণ করতে দেবাংশুর প্রথম যুক্তি, মমতা ব্যানার্জির বই বেস্টসেলার আর রত্নার বন্ধুবৃত্তেরও নব্বই শতাংশ লোকই তাঁর বইয়ের নাম বলতে পারবে না।

প্রথমত, বাংলার প্রকাশনা জগতের সার্বিক অডিট কে করে? একটি বই কত কপি বিক্রি হলে বেস্টসেলার হয়? আরও বড় প্রশ্ন – বেস্টসেলার মানেই ভাল সাহিত্য, এমনটা কে ঠিক করল? রত্নার বইয়ের নাম কজন জানেন তা দিয়ে কেন ঠিক হবে তিনি কেমন লেখেন? দেবাংশু মমতা ব্যানার্জির দলের লোক, তাই এই পুরস্কার প্রদানের পক্ষ নিয়ে যা পেরেছেন বলেছেন – এই যুক্তিতে তাঁর কথাগুলি উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ বেস্টসেলার মানেই ভাল – এ ধারণায় আজকাল বেশিরভাগ পাঠক ভোগেন। প্রকাশকদের মধ্যেও বেস্টসেলার প্রকাশ করার হুড়োহুড়ি। বিপ্লব করে ফেলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাজারে নামা অনেক ছোট প্রকাশকও চটজলদি রোজগার এবং প্রকাশনা জগতে নাম করার তাগিদে জনপ্রিয় ফেসবুকারদের প্রচুর লাইক পাওয়া পোস্ট একত্র করে বই প্রকাশ করছেন। বেস্টসেলার বই করার তাগিদে কবিরা নিভৃতে সারস্বত সাধনা করার বদলে ফেসবুকেই পরের পর কবিতা প্রকাশ করছেন। এমনকি সাংবাদিকদের মত ঘটনাভিত্তিক কবিতা লিখছেন। বিখ্যাত মানুষদের জন্মদিনে, মৃত্যুদিনে কবিতা; কেউ মারা গিয়ে শ্মশানে পৌঁছবার আগেই কবিতা। সম্পাদনা রুগ্ন শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা লেখা হয় সবই প্রকাশযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। ভুল, ঠিক বলে আর কিছু নেই। বিশিষ্ট লেখকদের পুরনো বইয়ের যেসব নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে দীর্ঘদিনের প্রকাশনা সংস্থা থেকে, সেগুলিতে নতুন নতুন বানান ভুল, যতিচিহ্নের যথেচ্ছ অন্তর্ধান এবং আবির্ভাব দেখা যাচ্ছে।

এর বিপরীতে ‘যাহা বেস্টসেলার, তাহাই বর্জনীয়’ ব্রিগেডও আছে। কোনো লেখকের বই ভাল বিক্রি হচ্ছে জানলেই তাঁরা নিশ্চিত হয়ে যান ওটি আদৌ সাহিত্য নয়। বেস্টসেলার আর লিটারেচার দুটি পৃথক বস্তু – এমন অভূতপূর্ব তত্ত্বও উঠে আসছে। শতাধিক বছরের শেক্সপিয়র চর্চা এই ফল দিচ্ছে জানলে গিরীশ ঘোষ, উৎপল দত্তরা কী করতেন কে জানে! অর্থাৎ প্রকারান্তরে বেস্টসেলার বিরোধীরাও বেস্টসেলার হওয়া বা না হওয়াকেই উৎকর্ষের মাপকাঠি বলে ধরছেন। এভাবে যে ভাষার সাহিত্য চলে, সেখানে আকাদেমি, পুরস্কার – এসব নিয়ে তো ভূতে ফুটবল খেলবেই।

দেবাংশু তাঁর পোস্টে এরপর যা লিখেছেন তা আরও গুরুতর। তিনি লিখেছেন ২০২১ সালে মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় না ফিরলে বাংলায় এন আর সি হত, রত্না রশিদকেও ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে হত ইত্যাদি। অর্থাৎ মমতা বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকেছেন, তাই তাঁর সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্য। মানে সাহিত্য এমন একটি বিষয়, যার পুরস্কার আদৌ সাহিত্যচর্চা না করেও পাওয়া যেতে পারে। কোনো পুলিসকর্মী হয়ত ভাল গুন্ডা দমন করেন, তার পুরস্কার হিসাবেও সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে। এই যে সাহিত্যকে একটি বিশেষ কাজ, বিশেষ শৃঙ্খলা হিসাবে না ভাবা – এটিও কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এখন দারুণ ‘কুল’। ২০১৪ সালে যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হোক কলরব আন্দোলন চলছিল, তখন বাংলার সাংবাদিক কুলচূড়ামণি সুমন চট্টোপাধ্যায় ফেসবুকে লিখেছিলেন যাদবপুর এমন একটি জায়গা, যেখানে তুলনামূলক সাহিত্যের মত অর্থহীন বিষয় পড়ানো হয়। তিনি তবু সাহিত্যের বাইরের লোক, ইদানীং কবিরাও “সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি” বললে রেগে যান। চিরকাল গরীব মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ নিজেদের মত করে গান বাঁধেন, ছড়া কাটেন, শিল্প সৃষ্টি করেন – এই যুক্তিতে যে কেউ কবি হতে পারে এই যুক্তি দেওয়া হয়। যেন গরীব, খেটে খাওয়া মানুষদের মধ্যে যাঁরা এসব করেন তাঁদের সৃজনে কোনো অধ্যবসায় নেই, কোনো শৃঙ্খলা নেই। যাঁরা ছৌ নাচেন তাঁদের যেন নাচ শিখতে হয় না, যেমন তেমন লম্ফঝম্প করলেই চলে। যাঁরা পটশিল্পী তাঁদের গল্পটি সযত্নে গড়ে তুলতে হয় না, ছবিগুলি ভেবেচিন্তে আঁকতে হয় না।

স্বতঃস্ফূর্ততা বলে এক আজব ধারণা তৈরি করা হয়েছে, যা কেবল কবিরা নয়, যাঁরা গল্প, উপন্যাস লেখেন তাঁরাও একমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিস বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। মনে যা এল তা-ই ঝটপট লিখে ফেলা যদি কবিতা বা সাহিত্য হয়, তাহলে সত্যিই মমতার “এপাং ওপাং ঝপাং”-কে কবিতা বলে স্বীকার করতে আপত্তি করা চলে না। অন্নদাশংকর রায়ের সৃষ্টি ছড়া আর মমতা ব্যানার্জির লেখা ছড়া নয়, তার সবচেয়ে বড় কারণ (আর কোনো কারণ দর্শানোর আদৌ প্রয়োজন নেই) যে প্রথমটিতে ছন্দ আছে, দ্বিতীয়টিতে ছন্দের হদ্দমুদ্দ হয়েছে – এ কথাও বলা উচিত নয়। কারণ ছন্দ তো স্বতঃস্ফূর্ত নয়, রীতিমত মাত্রা হিসাব করে অঙ্ক কষে মেলাতে হয়। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর যখন থেকে মুখ্যমন্ত্রীর কাব্যপ্রতিভা প্রকাশ পেয়েছে, তখন থেকে তাঁর লেখা এবং তদনুরূপ লেখা কবিতা হচ্ছে না বললে বা ব্যঙ্গ করলেই বলা শুরু হয়েছে, কবিতা লেখা কি ভদ্রলোকদের মনোপলি নাকি? সবার অধিকার আছে কবিতা লেখার। অর্থাৎ কবিতাকে ভদ্রলোক বনাম সাবল্টার্নের রণভূমিতে পরিণত করা হয়েছে। রাজধানী নিবাসী, বরাবর ক্ষমতার বৃত্তে থাকা ব্রাহ্মণকন্যা কী করে সাবল্টার্ন হন সে প্রশ্ন থাক। কিন্তু সাবল্টার্ন হলেই যে যা-ই লিখুক তাকেই কবিতা বলতে হবে, এমনটা কি গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক লিখেছেন? স্বীকার্য যে কবিতার কোনো সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা নেই। এমনকি অ্যান্টি-পোয়েট্রি বলেও একটি জিনিসের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু ব্যাকরণ ভাঙতে গেলে আগে তো ব্যাকরণ শিখতে হয়, সে ব্যাকরণ ভদ্রলোকদের তৈরি হলেও।

এসব বললে রে রে করে তেড়ে আসার মত লোক এখন পশ্চিমবঙ্গে কম নেই। এই ক্ষতির তুলনায় মুখ্যমন্ত্রীর হাতে সাহিত্য পুরস্কার তুলে দেওয়া সামান্য ক্ষতি। বস্তুত, ওই ক্ষতিগুলো আটকানো গেলে হয়ত এই ক্ষতি দেখতে হত না।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

আরও পড়ুন

পূজার ছলে তোমায় ভুলে