মমতা ও পশ্চিমবঙ্গ: মাঝির হাতেই নৌকাডুবি?

মঙ্গলবার দুপুরে যখন সরকার নির্ধারিত স্থান উপচে ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে গিয়ে পড়েছে সিপিএমের ছাত্র ও যুব সংগঠনের মিটিং, সেইসময় একটি জনপ্রিয় বাংলা খবরের চ্যানেল সে মিটিং না দেখিয়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সুবীরেশ ভট্টাচার্যের গ্রেপ্তারের খবর দেখাচ্ছিল। অ্যাঙ্কর, নিউজরুমে দাঁড়ানো এক সাংবাদিক এবং আরও এক প্রতিবেদকের মধ্যে এসএসসি দুর্নীতির চর্বিতচর্বণ চলছিল। অনিবার্যভাবে এসে পড়ছিল অর্পিতা-পার্থ সম্পর্কের আলোচনা। তার খানিকক্ষণ আগেই ওই চ্যানেলে ফ্লোরা সাইনি বলে কোনো এক মডেলের চেহারা ফটোশুটের আগে কীভাবে বদলে যায় তা-ও দেখানো হচ্ছিল বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে। কোন চ্যানেলে ‘ইনসাফ’ আন্দোলন কীভাবে দেখানো হচ্ছে দেখতে গিয়ে ওই চ্যানেলটিতে গিয়েই বারবার হতাশ হতে হচ্ছিল। এমনকি মাঝে মাঝে প্রধান খবর বলে পরপর যে খবরগুলোর ঝলক দেখানো হয়, সেখানেও ইনসাফ সভার সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হচ্ছিল, সাক্ষাৎকারে ধর্মাবতার অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় কেমন তিনমাস জেলের ভয় দেখিয়েছেন অভিষেক ব্যানার্জিকে।

হঠাৎই সেই চ্যানেলেও লাইভ হয়ে গেল সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বক্তৃতা। সমস্তটাই লাইভ হল। শুধু ওই একটি চ্যানেল নয়, কোনো চ্যানেলেই কমিউনিস্টরা আবার সেকালের মত কলকাতাকে অচল করে দিয়েছে, নৈরাজ্যের দিন ফিরিয়ে আনছে, পুলিসের কথা না শুনে ঘোর অন্যায় করছে – এরকম অভিযোগ উঠতে দেখলাম না। ওই জমায়েতের জন্য কোন রাস্তায় কত বড় যানজট তৈরি হয়েছে, কার প্লেন মিস হয়ে যাচ্ছে, কে ইন্টারভিউতে পৌঁছতে পারল না – এই নিয়ে অশ্রু বিসর্জনও চোখে পড়ল না। বরং বিজেপি মনোনীত প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদের চ্যানেলের স্টুডিও যেভাবে সাজানো হয়েছিল এবং অ্যাঙ্কররা যেরকম উদ্দীপ্ত ছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল গণশক্তি নতুন চ্যানেল খুলেছে। কলকাতার যে খবরের কাগজটি মিটিং মিছিলে সাধারণ নাগরিকের অসুবিধা নিয়ে সাধারণত সবচেয়ে বেশি অসন্তোষ প্রকাশ করে থাকে, তাদের বুধবার সকালের সংস্করণেও ইনসাফ সভার প্রতিবেদনে ওসব নিয়ে একটি শব্দ নেই।

কলকাতার সংবাদমাধ্যম দারুণ বিরোধী-বান্ধব – এমন অভিযোগ মমতা ব্যানার্জিও করবেন না। তাহলে এ হেন আচরণের কারণ কী? একটা কারণ নির্ঘাত প্রস্তুতির অভাব। জনতা যে আসলে চিড়িয়াখানা দেখতে এসেছিল, সে স্টোরির প্রস্তুতি থাকে ব্রিগেডে মিটিং হলে। যানজট ইত্যাদিও খেয়াল রাখা হয় সেইসব দিনে। কিন্তু ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে হওয়ার কথা যে জমায়েত, তা যে গোটা ধর্মতলা দখল করে নেবে তা বোধহয় কোনো প্রথিতযশা চ্যানেল সম্পাদক আন্দাজ করতে পারেননি। কিন্তু প্রস্তুতি না থাকলে খুঁত ধরতে অসুবিধা হতে পারে, প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে হবে কেন? মাসখানেক আগে ওই ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে থেকেই চাকরির দাবিতে ৫০০ দিন ধরে মেয়ো রোডে বসে থাকা ছেলেমেয়েদের কাছ পর্যন্ত একটি নাগরিক মিছিলের ডাক দিয়েছিল বামেরা। লেখার প্রয়োজনে এবং কিছুটা নিজের প্রতিবাদ জানানোর তাগিদে সেদিন গিয়েছিলাম। সেই মিছিলে নেতারা এবং বিখ্যাতরা ছিলেন, কিন্তু প্রাণ ছিল না। লাভ বলতে এক প্রাক্তন সহকর্মীর সঙ্গে অনেকদিন পরে সাক্ষাৎ। সে গিয়েছিল নিজের কাগজ থেকে মিছিল কভার করতে। বলেছিল, কলকাতার সংবাদমাধ্যম নাকি এখন বামেদের প্রতি কিছুটা নরম হয়েছে। চাইছে বামেদের হাল ফিরুক। সেদিন কথাটা খুব একটা বিশ্বাস করিনি। কিন্তু মঙ্গলবারের পর বিশ্বাস না করে উপায় নেই।

কথা হল, সংবাদমাধ্যমের নরম হওয়ার প্রয়োজন কী? বিজ্ঞাপনের রাশ তো এখনো নবান্নের হাতেই। সিবিআই আর ইডি যতই জ্বালাতন করুক, সাংবাদিকদের প্রয়োজনে টাইট দেওয়ার জন্য কেস দিতে রাজ্য পুলিস তো আছেই। আসলে হাজার হোক, চ্যানেলের টিআরপি চাই। কাগজেরও পাঠকের মর্জি কিছুটা খেয়াল রাখতেই হয়। বহু দর্শক/পাঠকেরই মর্জি যে গত কয়েক মাসে সরকারবিরোধী হয়ে উঠেছে তা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়া, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাজারে আলু পটল ঝিঙে মাছ মাংস কিনতে যাওয়া সম্পাদকরাও দিব্যি টের পাচ্ছেন।

বিধানসভার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে যে বিশ্লেষণ এ রাজ্যে প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল, তা হল কোনো সরকারবিরোধী হাওয়া আদপেই ছিল না। সবটাই বিরোধীদের কল্পনা। বিজেপির ভোট ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচন থেকে এক লাফে ২৮.১৩% বাড়ল। মুখ্যমন্ত্রী নিজে হেরে গেছেন কিন্তু তাঁর পার্টি জিতেছে – এমন ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। ঠিক তাই ঘটল, অথচ প্রাজ্ঞ সম্পাদক এবং তৃণমূল সমর্থকরা ঘোষণা করলেন সরকারের বিরুদ্ধে কোনো হাওয়া ছিল না। কেউ কেউ বললেন মমতা হেরেছেন শুভেন্দু অধিকারীর ধর্মীয় মেরুকরণমূলক প্রচারের কারণে, তার সঙ্গে সরকারের প্রতি অসন্তোষের কোনো সম্পর্ক নেই। আশ্চর্য! জ্যোতি বসুর পরে বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা নাকি স্রেফ ধর্মীয় মেরুকরণের কারণে হেরে গেছেন। এসব বলে আসলে যা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে, তা হল সরকারবিরোধী হাওয়া টেনে নিয়েছিল বিজেপি। সাধারণ ভোটার তৃণমূল নেতা, মন্ত্রীদের দুর্নীতি নিয়ে যথেষ্ট অসন্তুষ্ট ছিলেন। বিজেপির পরাজিত প্রার্থীদের তালিকায় তৃণমূলাগতদের বিরাট উপস্থিতিই তার প্রমাণ। কিন্তু মমতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ছিল অটুট। দলীয় রাজনীতির বাইরের মানুষের সাথে কথা বললেই শোনা যেত, তাঁরা মনে করেন অমুক নেতাটা বদমাইশ কিন্তু দিদি ভাল। তমুক মন্ত্রী চোর কিন্তু দিদি ভাল। অনেকের মতেই ভাইপোও সুবিধের লোক নয়, কিন্তু মমতা ভাল। তাঁর দুর্ভাগ্য, এইসব আজেবাজে লোককে নিয়ে চলতে হয়। ফলে দুর্নীতিগ্রস্তরা “দলে থেকে কাজ করতে পারছি না” বলে বিজেপিতে চলে যাওয়ায় মমতার জনপ্রিয়তা বরং বেড়েই গিয়েছিল। তিনি নন্দীগ্রামে হারলেন স্থানীয় বটগাছ শুভেন্দুর কাছে, অন্য কেউ প্রার্থী হলেই হয়ত জিতে জেতেন। কিন্তু এ কথা তো সত্যি, যে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকেই মমতা আসলে ২৯৪ আসনেই প্রার্থী। ভোটাররা যাদের অপছন্দ করছিলেন তারা দল ছেড়ে চলে যাওয়ায় প্রসন্ন চিত্তে আবার মমতাকেই ভোট দিয়েছিলেন। এই গগনচুম্বী ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও কিন্তু আজ টলমল করছে।

ইনসাফ সভায় লোক টানতে মীনাক্ষী মুখার্জি, কলতান দাশগুপ্তরা স্থানীয় স্তরে অসংখ্য ছোট ছোট সভা করেছেন বলে জানা যাচ্ছে। অর্থাৎ সংগঠনের একেবারে নিচের স্তর থেকে ইমারত গড়ে তোলার চেষ্টা। এ মাসে সিপিএম রাজ্যের প্রত্যেকটা পঞ্চায়েতে ডেপুটেশন দেওয়ার কর্মসূচিও নিয়েছে। সেই ডেপুটেশনের প্রস্তুতি হিসাবে আবার প্রত্যেক পঞ্চায়েত এলাকার প্রত্যেক পাড়ায় স্ট্রিট কর্নার হচ্ছে। এর আগে হয়েছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসংযোগ অভিযান। এই সক্রিয়তা শুধু যে গত ১১ বছরে দেখা যায়নি তা-ই নয়, শ্বেতশুভ্র বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে জনসংযোগে এমনই ভাঁটা পড়েছিল যে লেখাপড়া জানা শহুরে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত ছাড়া অধিকাংশ মানুষেরই মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর দলকে দূর গ্রহের বাসিন্দা বলে মনে হত। তার বিপরীতে মমতা কাছের লোক। যে ভাষা বিভ্রাটের জন্য মমতা নাক উঁচু সিপিএম কর্মী সমর্থকদের হাসির পাত্র, সে ভাষা একজন রিকশাচালক বা পরিচারিকাকে মনে করাত তিনি কাছের মানুষ। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে মমতার দেবীপ্রতিম জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল এভাবেই। সেই জনপ্রিয়তা তাঁর দলকে নিঃসন্দেহে ২০২১ উতরে দিতে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। কিন্তু ইদানীং সব ধরনের মানুষের বিশ্বাসেই চিড় ধরার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কেন?

একসময় হিট বাংলা ছবির রিমেক হত বলিউডে এবং সে ছবিও হিট হত। সেভাবেই অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের নিশি পদ্ম শক্তি সামন্তের হাতে হয়েছিল অমর প্রেম। সে ছবির গান তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল। গীতিকার আনন্দ বক্সী একটি গানে তুলেছিলেন মোক্ষম প্রশ্ন – মাঝনদীতে নৌকো দুললে তো মাঝি সামলে-সুমলে পারে নৌকো ভেড়ায়, কিন্তু মাঝি নিজেই নৌকো ডুবিয়ে দেবে ঠিক করলে সে নৌকোকে বাঁচাবে কে (মজধার মে নইয়া ডোলে/তো মাঝি পার লগায়ে।/মাঝি জো নাও ডুবোয়ে/উসে কৌন বচায়ে)? অতি সাম্প্রতিককালে সম্ভবত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে এই জাতীয় সংশয় তৈরি হয়েছে মানুষের মনে। এসএসসি দুর্নীতি অবধি তবু ঠিক ছিল। মুখ্যমন্ত্রী বিশেষ সমর্থন করতে যাননি, বরং ঝটপট মন্ত্রিসভা থেকে পার্থকে ছেঁটে ফেলা হয়েছিল। ফলে ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হওয়া কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি দিদি সমর্থন করেন – এমন ভাবার অবকাশ তৈরি হয়নি। কিন্তু অনুব্রত মণ্ডলের বেলায় দিদির একেবারে অন্য রূপ। কেষ্টবাবুর ঘরে নোটের পাহাড় দেখা যায়নি বটে, কিন্তু রোজই তাঁর বিপুল পরিমাণ ফিক্সড ডিপোজিট, জমিজমা, সাদা-কালো ব্যবসার কাহিনি প্রকাশিত হচ্ছে। দিদি কিন্তু বরাভয় নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। বলেছেন যেদিন ফিরে আসবে, সেদিন বীরের সম্মান দিয়ে নিয়ে আসতে হবে। যে মানুষ নিশ্চিন্তে ছিলেন এই ভেবে, যে আশেপাশে চোর ডাকাত থাকলেও নৌকার হাল দিদির হাতে, তিনি এরপর কী ভাবছেন কে জানে? একথা ঠিক যে নারদ কেলেঙ্কারির অভিযুক্তদেরও মমতা একইভাবে সমর্থন করেছিলেন, তাতে জনপ্রিয়তা কমেনি। কিন্তু মানুষের ধৈর্যেরও সীমা থাকে, আর সে সীমা কখন লঙ্ঘিত হয় কেউ জানে না। হয়ত বিরোধীদের সক্রিয়তার মাত্রাও সেই সীমা নিয়ন্ত্রণ করে। নারদ কেলেঙ্কারির পর পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীরা সাংবাদিক সম্মেলন ছাড়া আর কী করেছিলেন মনে করতে বেশ কষ্ট হবে।

কারণ যা-ই থাক, গত কয়েক মাসে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটছে। দোকানে বাজারে মানুষ মমতার সততা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। একজন রিকশাচালক এমনকি তাঁর হাওয়াই চটি, নীল পাড় সাদা শাড়িতেও দুর্নীতির গন্ধ পাচ্ছেন। সেসবের দাম সম্পর্কে এমন সব কথা উড়ে বেড়াচ্ছে যেগুলো নিঃসন্দেহে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির অবদান। নতুনত্ব এইখানে, যে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটি এর আগে মমতাকে মমতাজ বলত, আরও নানা অশ্লীল ব্যক্তিগত আক্রমণ করত। কিন্তু মমতা দুর্নীতিগ্রস্ত বললে ভাইরাল হওয়া যাবে না – ইউনিভার্সিটির অধ্যাপকদের কাছে বোধহয় এরকমই তথ্য ছিল। সে তথ্য কি বদলে গেল?

একা রামে রক্ষে নেই, সুগ্রীব দোসর। রাজ্যে চাকরি-বাকরি নেই; চাকরি সংক্রান্ত কেলেঙ্কারির তদন্তেই সিবিআই, ইডির রমরমা। ওদিকে মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং জড়িয়ে পড়লেন ভুয়ো চাকরি বিলোবার কাণ্ডে। ঘটা করে সভা ডেকে চাকরির নিয়োগপত্র বলে যা বিলোলেন তা প্রথমত বেসরকারি চাকরির। তারপর জানা গেল ওগুলো সঠিক অর্থে চাকরিও নয়, শিক্ষানবিশির সুযোগ মাত্র। পশ্চিমবঙ্গে কর্মসংস্থানের যা অবস্থা তাতে অসহায় যুবকরা ওই মোটা অফারই মাথায় তুলে নিতেন নিশ্চয়ই, কিন্তু অতঃপর ঝুলি থেকে বেরোল প্রফেসর শঙ্কুর ‘মরুরহস্য’ গল্পের বিজ্ঞানী ডিমেট্রিয়াসের পোষ্যের আকারের একটি বেড়াল। যে সংস্থার অফার লেটার দেওয়া হয়েছে সেই সংস্থা আদৌ ওগুলি ইস্যু করেনি। চিঠিতে যাঁর সই রয়েছে সেই বেদপ্রকাশ সিং সটান বলে দিলেন চিঠিগুলি ভুয়ো। ঘটনার পর বেশ কয়েকদিন পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম গান্ধীজির তিন বাঁদর হয়ে বসেছিল। তারপর থেকে মন্ত্রী, আমলা যাকেই এ নিয়ে প্রশ্ন করেছে তিনিই বলেছেন তিনি কিছু জানেন না। জানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। ফলে মাঝির নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ার ভয় ঢুকে পড়ল এখানেও।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এমন মানুষও আছেন যাঁরা তৃণমূলে দুর্নীতি আছে, শঠতা আছে জেনে, তৃণমূল নেতারা সন্ত্রাস চালান মেনে, মমতাকে ভক্তি না করেও তাঁর মুখ চেয়ে ভোট দিয়ে এসেছেন। কারণ তিনি ধর্মনিরপেক্ষ, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করেন। অধুনা তাঁরাও মাঝির হাতে নৌকাডুবির ভয় পাচ্ছেন, পেতে বাধ্য। গত বছর এ রাজ্যের নির্বাচনী প্রচার রাজ্য সরকারের কাজকর্ম সম্পর্কে হয়নি বলা যায়। যদি বলা হয় ভোটটাকে করে তোলা হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে গণভোট, তাহলে ভুল হবে না। সেই ভোটে জিতলেন মমতা। তারপর থেকে গত এক বছরে তিনি কী কী করেছেন? বিজেপির দুই নেতাকে দলে নিয়ে একজনকে সাংসদ, আরেকজনকে বিধায়ক তথা মন্ত্রী করেছেন। আরেকজন প্রবীণ বিজেপি নেতাকে দলে নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী করে সারা ভারতের বিরোধীদের সমর্থন জোগাড় করেছেন। তারপর শেষ মুহূর্তে বলেছেন আগে জানলে বিজেপি মনোনীত প্রার্থীকেই সমর্থন করতেন। তারপর উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধীদের সম্মিলিতভাবে মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন করেননি। সেখানেই শেষ নয়। কদিন আগে বলেছেন বিজেপি খারাপ, আরএসএস খারাপ নয়। শেষমেশ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভাল, অন্য বিজেপি নেতারা ইডি, সিবিআইকে কাজে লাগাচ্ছেন। ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ তো মাঝির হাতে নৌকাডুবির ভয় করবেনই।

আরও পড়ুন রাহুলে না, বাবুলে হ্যাঁ: তৃণমূলের প্রকৃত এজেন্ডা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

এমন হতেই পারে যে এরপরেও মমতা তথা তাঁর দল হইহই করে নির্বাচনে জিতবে। তবে মনে রাখা ভাল, রাজনীতিতে অমর প্রেম বলে কিছু হয় না।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কেবল গুণী মানুষ নন, তাঁর প্রতিভা বহুমুখী। তিনি সাহিত্য রচনা করেন, ছবি আঁকেন, গান লেখেন। তার উপর রাজ্যের প্রশাসন চালাতে হয়। একজন মানুষকে এত কাজ করতে হলে কাগজ পড়ার সময়ের অভাব ঘটা খুবই স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই প্রতিদিন কাগজ পড়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী পান না। পেলে চোখে পড়ত কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজের একটা খবর, যার শিরোনাম ‘RSS yet to clear air on bombing claim affidavit’। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের প্রধান পবন খেরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) এক প্রাক্তন প্রচারকের মহারাষ্ট্রের নানদেড় জেলা ও সেশনস আদালতে জমা দেওয়া হলফনামা প্রকাশ্যে এনেছেন। সেই হলফনামায় যশবন্ত শিন্ডে নামক ওই লোকটি দাবি করেছে, সংঘ পরিবারের সদস্য সংগঠনগুলো দেশের বিভিন্ন জায়গায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সংবাদমাধ্যমের একাংশ এবং পুলিস প্রশাসনের সহযোগিতায় তার দোষ মুসলমান সম্প্রদায়ের ঘাড়ে চাপিয়েছে। ফলে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি লাভবান হয়েছে।

খবরটা মুখ্যমন্ত্রীর চোখ এড়িয়ে গিয়ে থাকতেই পারে, কারণ এ নিয়ে কোনো চ্যানেলে কোনো বিতর্কসভা বসেনি। কলকাতার অন্যান্য তথাকথিত উদার খবরের কাগজগুলোতেও আতসকাচ দিয়ে খুঁজে দেখতে হবে এই খবর। তাছাড়া কংগ্রেস তো বানিয়েও বলতে পারে। কারণ তারা তৃণমূল কংগ্রেসকে বিজেপির প্রধান বিরোধী হয়ে উঠতে দিতে চায় না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর শক্তিশালী সোশাল মিডিয়া টিম আছে। টুইটারে তাঁর সাত মিলিয়ন ফলোয়ার, ফেসবুকে ৪.৯ মিলিয়ন। সেই সোশাল মিডিয়া টিমের সাহায্য নিলেই মুখ্যমন্ত্রী জানতে পারবেন যে ওই মর্মে হলফনামা সত্যিই ফাইল করা হয়েছে। চাইলে স্বয়ং যশবন্তের মুখ থেকেই হলফনামায় লিখিত অভিযোগগুলো সংক্ষেপে শুনে নিতেও পারবেন। মারাঠি যশবন্তের ভিডিও ইংরেজি সাবটাইটেল সমেত সোশাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

যশবন্তের হলফনামার কথা প্রকাশ্যে এল বৃহস্পতিবার, কলকাতার কাগজের প্রথম পাতায় সে খবর বেরোল শুক্রবার সকালে। সেদিনই সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বললেন “আরএসএস এত খারাপ ছিল না, এবং এত খারাপ বলে আমি বিশ্বাস করি না।” মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই খবরটা জানতে পারেননি বলেই ওরকম বলেছেন। স্বীকার্য যে যশবন্তের কথাগুলো অভিযোগ মাত্র। কিন্তু যে সংগঠনের একদা প্রচারকরা এই মুহূর্তে দেশের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বহু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী – তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ যে মারাত্মক, সে কথা না বোঝার মত রাজনীতিবিদ মমতা ব্যানার্জি নন। তাছাড়া তিনদিন হয়ে গেল, এখন পর্যন্ত আরএসএস যশবন্তকে মিথ্যাবাদী বলে কোনো বিবৃতি দেয়নি। অবশ্য জবাবদিহি না চাইলে বিবৃতি দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। ২০০৬ সালের নানদেড় বিস্ফোরণ কাণ্ডে সরকারি সাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হতে চেয়ে আবেদন করেছিল যশবন্ত। আদালত সবেমাত্র সেই আবেদন গ্রহণ করেছে, আরএসএসকে জবাবদিহি করতে তো ডাকেনি। সাংবাদিকদেরই বা ঘাড়ে কটা মাথা, যে এ নিয়ে মোহন ভাগবতকে প্রশ্ন করবে? অতএব আরএসএসের বয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা বলে ঘোষণা করতে। কথায় আছে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। মুখ্যমন্ত্রী তো বিশ্বাসই করেন না আরএসএস খারাপ। ফলে যতক্ষণ তারা নিজেরা না বলছে “হ্যাঁ, আমরা খারাপ”, মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চিন্ত। কিন্তু খটকা অন্যত্র।

“এত খারাপ ছিল না”। এত খারাপ মানে কত খারাপ? তার মানে মুখ্যমন্ত্রী জানেন যে আরএসএস একটু একটু খারাপ? সেই পরিমাণটা কি তাঁর পক্ষে সুবিধাজনক? খারাপ ছিল না মানেই বা কী? আগে যতটুকু খারাপ ছিল তাতে তাঁর আপত্তি ছিল না, এখন বেশি খারাপ হয়ে গেছে – এ কথাই কি বলতে চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী? তাঁর কাছে কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ তা অবশ্য আমাদের জানা নেই। মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা কি খারাপ? সে হত্যায় আরএসএস যোগ প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ হয়নি বটে, তবে সেই ঘটনার পরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লিখেছিলেন, আরএসএস নেতাদের ভাষণগুলো যে বিষ ছড়িয়েছে তারই পরিণতি গান্ধীহত্যা। তাই ভারত সরকার আরএসএসকে নিষিদ্ধ করে। কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন? সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। জওহরলাল নেহরুর বদলে যিনি প্রধানমন্ত্রী হলে ভারত সোনার দেশ হত বলে আরএসএস এখন দিনরাত ঘোষণা করে। মুখ্যমন্ত্রী নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাই ধরে নিচ্ছি অতকাল আগের ব্যাপার তাঁর মনে নেই। তাই তার ভালমন্দ ভেবে দেখেননি। তবে যেহেতু তিনি একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী এবং নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করেন, সেহেতু ধরে নিতে দোষ নেই যে যশবন্ত শিন্ডে তার হলফনামায় যে ধরনের কার্যকলাপের কথা লিখেছে সেগুলো আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর চোখে খারাপই। কারণ কাজগুলো বেআইনি এবং সাম্প্রদায়িক।

এখন কথা হল, যশবন্ত যে অভিযোগ করেছে আরএসএসের বিরুদ্ধে, সে অভিযোগও কিন্তু এই প্রথম উঠল তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী কাগজ পড়ারই সময় পান না যখন, বই পড়ার সুযোগ না পাওয়ারই কথা। তবে তাঁর তো পড়ুয়া পারিষদের অভাব নেই। তাঁরা কেউ কেউ নির্ঘাত মহারাষ্ট্র পুলিসের প্রাক্তন ইন্সপেক্টর জেনারেল এস এম মুশরিফের লেখাপত্র পড়েছেন। তাঁর লেখা আরএসএস: দেশ কা সবসে বড়া আতঙ্কবাদী সংগঠন বইতে ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত মোট ১৮টা বোমা বিস্ফোরণে আরএসএস, অভিনব ভারত, জয় বন্দেমাতরম, বজরং দল এবং সনাতন সংস্থা – এই পাঁচটা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনকে দায়ী করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর পার্ষদরা কেন যে এসব কথা তাঁকে জানাননি! জানলে নিশ্চয়ই আরএসএস খারাপ “ছিল না” – একথা মুখ্যমন্ত্রী অতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলতেন না। অবশ্য মুশরিফ যা লিখেছেন তার সমস্তই তো স্রেফ অভিযোগ। মালেগাঁও বিস্ফোরণের প্রধান অভিযুক্ত সাধ্বী প্রজ্ঞা যেভাবে ছাড়া পেয়ে সাংসদ হয়ে গেছেন, তাতে ওসব অভিযোগকে আর আমল দেওয়া চলে কিনা সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে আরএসএসের উপর অত্যন্ত জোরালো বিশ্বাস না থাকলে এসব জেনে সংঘ পরিবারের সদস্য নয় এমন এক রাজনৈতিক দলের সর্বময় নেত্রীর কিছুটা সন্দিহান হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিজের বিশ্বাসে অটল।

রাজনীতিতে দুজন ব্যক্তি, দুটো সংগঠন বা একজন ব্যক্তির সঙ্গে একটা সংগঠনের সম্পর্ক চোখ বন্ধ করে ভরসা করার মত পর্যায়ে পৌঁছনো চাট্টিখানি কথা নয়। বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস না থাকলে তেমনটা হওয়া শক্ত। সেদিক থেকে মমতার আরএসএসের প্রতি এই বিশ্বাস বুঝতে অসুবিধা হয় না। আজকের মুখ্যমন্ত্রী গত শতকের শেষ দশকে যখন ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন এককালের স্বয়ংসেবক অটলবিহারী বাজপেয়ী আর লালকৃষ্ণ আদবানির স্নেহ না পেলে মমতার পক্ষে আস্ত একখানা রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা সম্ভব হত কি? হলেও সদ্যোজাত দলটাই মধ্যগগনে থাকা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের বিরোধী হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে – এ বিশ্বাস কংগ্রেসের ভোটার তথা কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা যেত কি? মাত্র আটজন সাংসদ যে দলের, সেই দলের নেত্রীকে রেল মন্ত্রকের দায়িত্ব দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের প্রভাবিত করার মহার্ঘ সুযোগ দিয়েছিল বিজেপি। শুধু কি তাই? তেহেলকা কাণ্ড প্রকাশিত হওয়ার পরেই সততার প্রতীক মমতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এনডিএ ত্যাগ করেন। তা সত্ত্বেও ২০০৩ সালে তাঁকে দপ্তরহীন মন্ত্রী করে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। আরএসএস আর বিজেপি আলাদা – এই তত্ত্বে এখনো বিশ্বাস করেন যাঁরা, তাঁদের কথা আলাদা। বাকিরা নিশ্চয়ই মানবেন, এভাবে পাশে থাকার পরেও যদি মমতা আরএসএসকে বিশ্বাস না করতেন তাহলে ভারি অন্যায় হত।

আসলে মমতার আরএসএসে বিশ্বাস ততটা অসুবিধাজনক নয়। তাঁর বারংবার আরএসএস প্রীতি ঘোষণা সত্ত্বেও দেশসুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের কেষ্টবিষ্টুদের মমতায় বিশ্বাস বরং বৃহত্তর বিপদের কারণ। গত বছর বিধানসভা নির্বাচনে যখন বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানোই মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াল, তখন বামপন্থীদের মধ্যে লেগে গেল প্রবল ঝগড়া। সিপিএম নেতৃত্বাধীন বাম দলগুলো বলতে শুরু করল বিজেপি আর তৃণমূল অভিন্ন, তাই তৃণমূলকে ভোট দেওয়া আর বিজেপিকে ভোট দেওয়া একই কথা। উঠে এল একটা নতুন শব্দ – বিজেমূল। অন্যদিকে নকশালপন্থীরা বলতে লাগল, যেখানে যে প্রার্থী বিজেপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী তাকে ভোট দিতে। বিজেমূল তত্ত্বের প্রমাণ হিসাবে সিপিএম “দলে থেকে কাজ করতে পারছি না” বলে লাইন দিয়ে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়া শীর্ষস্থানীয় নেতা, মন্ত্রীদের দেখাতে লাগল। আর যত না তৃণমূল, তার চেয়েও বেশি করে নকশালরা তার জবাবে তালিকা দিতে থাকল, কোন ব্লক স্তরের সিপিএম নেতা বিজেপিতে গেছে, কোন জেলা স্তরের নেত্রী বিজেপিতে যোগ দিলেন। অর্থাৎ দুপক্ষের কেউই তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতি কী, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকলে কেন আছে বা না থাকলে কেন নেই – সে আলোচনায় গেল না। অথচ ঠিক তখনই ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে বসে লাইভ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন “আমি সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়ছি না। ওরা তো নির্বাচনে লড়ে না। ওরা বিজেপিকে সমর্থন করে। আমি লড়ছি বিজেপির সঙ্গে।” এই নেত্রীর দল জয়যুক্ত হল, একমাত্র বিরোধী দল হিসাবে উঠে এল বিজেপি। অর্থাৎ ঘোষিতভাবে আরএসএসের বন্ধু দুটো দলের হাতে চলে গেল বাংলার আইনসভা। অথচ পশ্চিমবঙ্গের ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিমানরা উল্লসিত হয়ে ঘোষণা করলেন, বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য জিতে গেল। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ জিতে গেলেন, ইত্যাদি।

আরও মজার কথা, নির্বাচনে গোল্লা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিপিএমও পরিত্যাগ করল বিজেমূল তত্ত্ব। আরও এক ধাপ এগিয়ে এ বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দেশের একমাত্র যে নেতা সর্বদা নাম করে আরএসএসকে আক্রমণ করেন, সেই রাহুল গান্ধীর দল কংগ্রেস থেকে শুরু করে সিপিএম, লিবারেশন সমেত সমস্ত বাম দল সমর্থন করে বসল মমতার পছন্দের প্রার্থীকে। সে আরেক যশবন্ত – বিজেপি থেকে তৃণমূলে এসেছেন। এ থেকে যা প্রমাণিত হয় তা হল, মমতার মত আরএসএস-বান্ধব নয় যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো, তারাও ব্যাপারটাকে নির্বাচনী লড়াইয়ের বেশি কিছু ভাবে না।

আরএসএসের কাছে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করে তোলা মতাদর্শগত মরণপণ লড়াই। সে লক্ষ্যে পৌঁছতে তারা সাংবিধানিক, অসাংবিধানিক – সবরকম পথই নিতে রাজি। প্রয়োজনে আদবানির মত আগুনে নেতাকে বঞ্চিত করে বাজপেয়ীর মত নরমপন্থীকে প্রধানমন্ত্রী করতে রাজি ছিল। জমি শক্ত হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদীর মত কড়া হিন্দুত্ববাদীকে নেতা করেছে, ভবিষ্যতে তাঁকেও আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে আরও গোঁড়া আদিত্যনাথকে সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসাতে পারে। বিরোধীরা ওই বিস্তারে ভেবেই উঠতে পারেনি এখনো। এমনকি তথাকথিত কমিউনিস্ট দলগুলোও কেবল স্ট্র্যাটেজি সন্ধানে ব্যস্ত। কোথায় কাকে সমর্থন করলে বা কার সাথে নির্বাচনী জোট গড়লে বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানো যাবে – এটুকুই তাদের চিন্তার গণ্ডি। সে কারণেই বিজেমূল শব্দটা নির্বাচনের আগে ভেসে ওঠে, পরাজয়ের পর মিলিয়ে যায়। যদি সিপিএমের পক্ষ থেকে সংঘমূল কথাটা বলা হত এবং শূন্য হয়ে যাওয়ার পরেও বলে যাওয়া হত, তাহলে জনমানসে সত্যি সত্যি প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হতে পারত। হিন্দুরাষ্ট্র কী, তা হওয়া আটকানো কেন দরকার, আটকানোর ক্ষেত্রে মমতাকে সত্যিই প্রয়োজন, নাকি তিনি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া – শতকরা ৮০-৯০ জন মানুষ এই মুহূর্তে এসব নিয়ে ভাবছেন না (সোশাল মিডিয়া দেখে যা-ই মনে হোক)। সংঘ পরিবারকে সরাসরি রাজনৈতিক ভাষণে, কর্মসূচিতে আক্রমণ করা হলে ভাবতে বাধ্য হতেন।

বিহারে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুযোগ আসা মাত্রই সমস্ত বাম দল একজোট হয়ে নীতীশকুমারকে সমর্থন করেছে। কেবল লিবারেশন নয়, সিপিএমও। সে জোটে কংগ্রেসও আছে। অথচ নীতীশও মমতার মতই বিজেপির সঙ্গে ঘর করেছেন। শুধু তা-ই নয়, মমতার বিজেপির সাথে শেষ জোট ছিল ২০০৬ সালে। নীতীশ কিন্তু ২০১৬ বিধানসভা ভোটে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সঙ্গে লড়ে জিতেও বিশ্বাসঘাতকতা করে বিজেপির কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। কেন নীতীশ আরএসএস-বিরোধী বাম দল এবং কংগ্রেসের কাছে গ্রহণযোগ্য আর কেন মমতা নন, তা নিয়ে কোনো আলোচনাই শুনলাম না আমরা। আলোচনাটা হল না সম্ভবত এইজন্যে, যে বামেরা বা কংগ্রেস নিজেরাই ওসব নিয়ে ভাবে না। বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পারলেই খুশি, শেষমেশ আরএসএসের প্রকল্পই সফল হয়ে যাবে কিনা তা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। অথবা ‘যখন হবে তখন দেখা যাবে’ নীতি নিয়ে চলছে।

আসলে কিন্তু মমতায় আর নীতীশে তফাত বড় কম নয়। নীতীশ সুযোগসন্ধানী, ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ। তারই অনিবার্য ফল হিসাবে ভূতপূর্ব জনতা দলের সঙ্গে, একদা সতীর্থ লালুপ্রসাদের সাথে তাঁর বিচ্ছেদ হয়েছিল। কিন্তু তাঁর রাজনীতির সূতিকাগার হল সমাজবাদী রাজনীতি, নিম্নবর্গীয় মানুষের রাজনীতি। সে কারণেই নীতীশ কখনো বিজেপিকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি, বিজেপিও পারেনি। নীতীশ কখনো মমতার মত সোচ্চার আরএসএস বন্দনাও করেননি। কারণ আরএসএস হল ব্রাহ্মণদের দ্বারা পরিচালিত, হিন্দু সমাজের উপর ব্রাহ্মণ আধিপত্য বজায় রাখার জন্য গঠিত সংস্থা। নীতীশের দলের নিম্নবর্গীয় সদস্য, সমর্থকদের সঙ্গে আরএসএসের আড়চোখে দেখার সম্পর্কটুকুই হওয়া সম্ভব। তার বেশি নয়।

অন্যদিকে মমতা ব্রাহ্মণকন্যা। তাঁকে দুর্গা বলে সম্বোধন করতে আরএসএসের কোথাও বাধে না। মমতার রাজনীতির ইতিহাস অন্য দিক থেকেও নীতীশের সঙ্গে মেলে না। বস্তুত যুগপৎ কংগ্রেস বিরোধিতা এবং কমিউনিস্ট বিরোধিতার ইতিহাস সম্ভবত মমতা ছাড়া ভারতের কোনো আঞ্চলিক দলের নেই। তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় রাজনীতির ভিত্তিতে তৈরি দলগুলোর স্বভাবতই প্যাথোলজিকাল বাম বিরোধিতা নেই, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেস বিরোধিতা ছিল। তেলুগু দেশম, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি, জগন্মোহন রেড্ডির দল বা ওড়িশার বিজু জনতা দলের জন্ম তৃণমূলের মতই কংগ্রেস ভেঙে। কিন্তু তাদেরও বামেদের সাথে ধুন্ধুমার সংঘাতের ইতিহাস নেই। তাদের এলাকায় বামেদের দুর্বলতা তার কারণ হতে পারে, কিন্তু এ কি নেহাত সমাপতন যে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তর দিকে আরএসএস বাদ দিলে তৃণমূলই একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি, কমিউনিস্ট এবং কংগ্রেস, দু পক্ষই যাদের ঘোষিত শত্রু? লক্ষণীয়, ২০১১ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল আর কংগ্রেসের জোট গড়তে দারুণ উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখা গেল, তিনি আরএসএসের বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন। সেই জোট বামফ্রন্টকে হারাতে পেরেছিল বটে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ভাঙনের গতিও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

তাহলে আরএসএসের সাথে সম্পর্ক মমতাকে কী কী দিয়েছে তা বোঝা গেল। এবার আরএসএস কী কী পেয়েছে সে আলোচনায় আসা যাক? রাজনীতিতে তো কেউ “আমি   নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি,/ তুমি   অবসরমত বাসিয়ো” গায় না। আরএসএস যা যা পেয়েছে সবকটাই অমূল্য।

১) আরএসএসের দুই ঘোষিত শত্রু মুসলমান আর কমিউনিস্ট। তৃণমূলের উদ্যোগে কমিউনিস্টরা প্রথমে তাদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি থেকে ক্ষমতাচ্যুত, পরে ছত্রভঙ্গ হয়েছে। তার জন্যে আরএসএসের আগমার্কা কোম্পানি বিজেপিকে বিন্দুমাত্র কসরত করতে হয়নি। মুসলমানরা আগে প্রান্তিক ছিলেন, তৃণমূল আমলে বাংলার হিন্দুদের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত হয়ে গেছেন। মমতা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে ইমাম ভাতা চালু করলেন, বিজেপি প্রায় বিনা আয়াসেই হিন্দুদের বোঝাতে সক্ষম হল, মুসলমানরা মমতার দুধেল গাই। পরে মমতা নিজেই অনবধানবশত (নাকি সচেতনভাবেই?) সেকথা বললেনও। এখন পরিস্থিতি এমন, যে বাম আমলে মুসলমানরা বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ভাড়া পেতেন না, এখন খোদ সল্টলেকে হোটেলের ঘর ভাড়া পান না।

২) মুসলমান তোষণ হচ্ছে – এই প্রোপাগান্ডা হিন্দুদের একটা বড় অংশের বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয়েছে তৃণমূল শাসনের ১১ বছরে। ইতিমধ্যে বেলাগাম হিন্দু তোষণ চলছে। বিজেপি আজগুবি অনলাইন প্রচার শুরু করল “পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো করতে দেওয়া হয় না”, তৃণমূল সরকার দুর্গাপুজোগুলোকে নগদ অনুদান দিতে শুরু করল। আরএসএস শুরু করল রামনবমীতে অস্ত্র মিছিল, তৃণমূল আরম্ভ করল বজরংবলী পুজো। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরির পথ খুলে গেল, আরএসএসের প্রতিশ্রুতি পূরণ হল। এদিকে দিদি দীঘায় জগন্নাথ মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা নিলেন। রাজ্যে বিজেপির সরকার থাকলেও এভাবে হিন্দুত্বকে রাজনীতির এজেন্ডায় নিয়ে আসতে পারত কিনা সন্দেহ।

৩) ভারতের একেক রাজ্যের একেকটা বিশিষ্ট গুণ আছে, যা সেই রাজ্যের মানুষের মূলধন। গুজরাটের যেমন ব্যবসা, পাঞ্জাবের কৃষিকাজ। বাংলার ছিল লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা ইত্যাদি। অন্য রাজ্যের লোকেরা যাকে কটাক্ষ করে এককথায় বলে কালচার। এই কালচার আরএসএসের হিন্দুত্বের একেবারে বিপরীত মেরুর জিনিস। তৃণমূল আমলে সবচেয়ে নির্বিঘ্নে সাড়ে সর্বনাশ ঘটানো গেছে এই কালচারের। বাংলার ছেলেমেয়েরা ফড়ফড় করে ইংরেজি বলতে না পারলেও দেশে বিদেশে গবেষক, অধ্যাপক হিসাবে তাদের দাম ছিল। এখনো সর্বভারতীয় বিজ্ঞান পুরস্কারগুলোর প্রাপকদের তালিকা মাঝে মাঝে সেকথা জানান দেয়। সে দাম ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে স্কুল, কলেজের চাকরি বিক্রি করে লেখাপড়া লাটে তুলে দিয়ে। নায়ক, নায়িকা, গায়ক, গায়িকারা কাতারে কাতারে বিধায়ক আর সাংসদ হয়ে গেছেন। লেখকরা ব্যস্ত পুষ্পাঞ্জলি দিতে আর চরণামৃত পান করতে। সিনেমার কথা না বলাই ভাল। শৈল্পিক উৎকর্ষ বাদ দিন, পারিশ্রমিকের হাল এত খারাপ যে কলকাতার শিল্পীরা স্রেফ বাংলা ছবিতে, ওয়েব সিরিজে কাজ করে টিকে থাকতে পারবেন কিনা সন্দেহ। মন্ত্রীর বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়ার ছবি দেখে প্রথম সারির অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য হা-হুতাশ করছেন, ওই পরিমাণ টাকার অর্ধেক পেলেও বাংলা ছবিগুলো অনেক ভাল করে করা যেত।

কিন্তু এসব গোল্লায় যাওয়ার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে। লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা মিলিয়ে যে বাঙালি মনন ছিল সেটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আসল ক্ষতি সেটা। বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকের অন্তত একটা ভান ছিল, যে সে ভারতের অন্য অনেক রাজ্যের লোকেদের মত ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না। দুর্গাপুজো এলে কদিন পাগলামি করে; নিজের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো, সত্যনারায়ণের সিন্নি চলে। কিন্তু বাইরে সে একজন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। এখন সেসব গেছে। নতুন ফ্ল্যাটবাড়ি হলে তার গায়ে খোদাই করা হচ্ছে গণেশের মুখ, শিবলিঙ্গ বা স্বস্তিকা। কলিং বেলে বেজে উঠছে “ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ”। অক্ষয় তৃতীয়ায় এখনো গণেশপুজো এবং হালখাতা হয় এমন দোকান খুঁজে পাওয়া দায়, অথচ গণেশ চতুর্থী এক দশকের মধ্যে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। শিগগির পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনন্ত ছুটির তালিকায় যোগ হবে নির্ঘাত। অল্পবয়সী বাঙালি কথা বলছে হিন্দি মিশিয়ে, ছোটরা স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে শিখছে হিন্দি। বঙ্গভঙ্গের নাম করতেই লর্ড কার্জনের ঘুম কেড়ে নেওয়া বাঙালি নিজে নিজেই প্রায় উত্তর ভারতীয় হিন্দু হয়ে গেল তৃণমূল আমলে। এই সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ তামিলনাড়ুতে কিছুতেই হয়ে উঠছে না আরএসএসের দ্বারা। কেরালায় মার খেতে হচ্ছে, এমনকি নিজেদের হাতে থাকা কর্ণাটকেও করতে গিয়ে অনবরত সংঘাত হচ্ছে। বাংলায় কিন্তু ওসবের দরকারই হচ্ছে না। বিনা রক্তপাতে বাঙালি বাঙালিয়ানা বিসর্জন দিচ্ছে।

আরও পড়ুন শাহেনশাহ ও ফ্যাসিবিরোধী ইশতেহার

এর বেশি আর কী চাইতে পারত আরএসএস? মমতা হিন্দুরাষ্ট্রের জন্য রুক্ষ, পাথুরে বাংলার মাটিতে হাল চালিয়ে নরম তুলতুলে করে দিয়েছেন। বীজ বপনও সারা। ফসল তোলার কাজটা শুধু বাকি।

এটা যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট; ওঁরা গ্ল্যাডিয়েটর নন, ক্রিকেটার

বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, এশিয়া কাপের সময়ে কি জওয়ানরা লড়েন না? তা যদি হয় তাহলে তো আরও বেশি করে ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ হওয়া উচিত।

ম্যাচে তখন টানটান উত্তেজনা। টিভির পর্দায় দেখা গেল ওভারের মাঝখানে দীর্ঘদেহী হার্দিকের খর্বকায় রিজওয়ানকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য। চমকে যাওয়ার পর রিজওয়ানও ভালবেসে টেনে নিলেন হার্দিকের হাত। ম্যাচের আগের কদিন টুইটারে ভাইরাল হয়েছিল একটা ভিডিও। চোটের কারণে এশিয়া কাপ ক্রিকেট থেকে ছিটকে যাওয়া শাহীন আফ্রিদি মনমরা হয়ে প্র্যাকটিসের মাঠের ধারে বসেছিলেন। বিরাট কোহলিকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়ালেন। বিরাট জিজ্ঞেস করলেন পা কেমন আছে। আফ্রিদি বললেন, আমরা আপনার জন্য প্রার্থনা করছি, যেন আপনার ফর্ম ফিরে আসে।

এই আবহে খেলা হল রবিবারের ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ। এর আগের ম্যাচ হয়েছিল ২৪ অক্টোবর ২০২১, ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি উপলক্ষে। সে ম্যাচ দাপটে জিতেছিল পাকিস্তান। এবারে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হল। শেষপর্যন্ত তফাত গড়ে দিলেন পান্ড্য, ভারত জিতল। কিন্তু কোনো ম্যাচেই কোনো অবাঞ্ছিত উত্তাপ তৈরি হয়নি। বরং সাম্প্রতিককালে ভারত বনাম ইংল্যান্ড খেলা হলে ম্যাচের আগে, পরে এবং মাঝে বেশ কিছু অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে দেখা গেছে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রতিবেশীর খেলা বরং ঠিক সেভাবেই হল যেভাবে হওয়া উচিত – ব্যাট বলের লড়াইতে কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়ল না, কিন্তু মুখের হাসিটি বজায় রইল। শুধু তা-ই নয়, পাক ব্যাটার ফখর জমান আউটের আবেদন না হলেও বল ব্যাটে লেগেছে বুঝতে পেরে নিজেই হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। তবু কিন্তু এই দুই দলের মধ্যে সিরিজ খেলা হবে না।

আরও পড়ুন টুপির আমি টুপির তুমি?

শেষ ভারত-পাকিস্তান টেস্ট খেলা হয়েছিল ২০০৭ সালে আর শেষ একদিনের ম্যাচ ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে। দীর্ঘকাল হল ভারত বহুদলীয় প্রতিযোগিতার বাইরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে না। আবার আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ বহুদলীয় হওয়া সত্ত্বেও সেখানে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে না। কেন খেলে না? কারণ স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান কুণাল কামরার ভাষায় “জওয়ান সীমা পে লড় রহে হ্যাঁয়”। তাহলে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, এশিয়া কাপের সময়ে কি জওয়ানরা লড়েন না? শান্ত হয়ে বসে টিভিতে খেলা দেখেন? তা যদি হয় তাহলে তো আরও বেশি করে ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ হওয়া উচিত। প্রক্সি ওয়ারে সীমান্তের এপারে ওপারে নিয়মিত যে জওয়ানদের প্রাণ যায়, সেগুলো বেঁচে যাবে। আসল কথা, নিয়মিত খেলা হলে প্রত্যেকটা ম্যাচ নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ পরিবেশ তৈরি করা আর সম্ভব হবে না। মাঠে ক্রিকেটারদের হাসিঠাট্টা, স্বাভাবিক ব্যবহার দেখতে দেখতে এপারের দেড়শো কোটি আর ওপারের কোটি পঁচিশেক মানুষ যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে, প্রতিবেশী দেশের মানুষ মানেই ইবলিশের বাচ্চা বা রক্তপিপাসু জেহাদি সন্ত্রাসবাদী নয়, তাহলে সমূহ বিপদ দুই দেশের শাসকদেরই। তখন দেশের বেকারত্ব, দেশের মুদ্রাস্ফীতি, দেশের সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি নিয়ে জবাবদিহি করতে হবে। সে বিপদ এড়াতে কালেভদ্রে ম্যাচ হবে, পিচে পপিং ক্রিজ চিহ্নিত করতে টানা লাইনটাকে নিয়ন্ত্রণরেখার সাথে তুলনা করে সম্প্রচারকারী সংস্থা বিজ্ঞাপন দেবে আর প্রগলভ রবি শাস্ত্রীর কণ্ঠে শোনানো হবে – এটা স্টেডিয়াম নয়, কলিসিয়াম। ওরা ক্রিকেটার নয়, গ্ল্যাডিয়েটর। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই খেলার মাঠ লড়াইয়ের মাঠ হয়ে উঠবে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

রেউড়ি সংস্কৃতি: যে গল্পে ডান-বাম গুলিয়ে গিয়েছে

১৯৯১ পরবর্তী যুগে দিনরাত মন্ত্রের মত কানের কাছে বলে বলে যে কয়েকটি কথা আমাদের মর্মে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার অন্যতম হল, কোনও পরিষেবা বা পণ্য বাজার থেকে পয়সা দিয়ে না কিনে পাচ্ছে মানেই সেটা দান।

আমি কোন পথে যে চলি, কোন কথা যে বলি
তোমায় সামনে পেয়েও খুঁজে বেড়াই মনের চোরা গলি।

এই প্রকল্প বারবার বিরোধীদের ফাঁপরে ফেলতে সমর্থ হয়। এমন গতিতে এমন এক লেংথে পিচ পড়ে মোদি সরকারের সিদ্ধান্তগুলো, যাতে ব্যাকফুটে যাব না ফ্রন্টফুটে খেলব ঠিক করতে করতেই বিরোধীদের ব্যাট-প্যাডের ফাঁক দিয়ে বল গলে গিয়ে উইকেট ভেঙে দেয়। এই মুহূর্তে যেমন কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের যে শেষ চিহ্নটুকু ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে, সেটুকুও মুছে ফেলতে সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু হয়েছে।

প্রাক্তন বিজেপি মুখপাত্র অশ্বিনী উপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন নির্বাচনী প্রচারে যেসব রাজনৈতিক দল ভোটারদের আকর্ষণ করতে “freebies” দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাদের নির্বাচনী প্রতীক ফ্রিজ করে দেওয়া এবং রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার দাবিতে। পিটিশনার বলেছেন “irrational freebies” অর্থাৎ মুফতে অযৌক্তিক সুযোগসুবিধা বিলোবার আগে তার অর্থনৈতিক প্রভাব আলোচনা করতে হবে। এই মামলার শুনানিতে ১১ আগস্ট মহামান্য প্রধান বিচারপতি এন ভি রামান্না বলে বসলেন, অর্থনীতির ক্ষতি আর মানুষের কল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার। অবশ্য তিনি যোগ করেছেন “আমি রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার দিকটা দেখতে চাই না। সেটা অগণতান্ত্রিক। হাজার হোক, ভারত তো একটা গণতন্ত্র।” তার আগেই ৩ আগস্ট বিচারকরা বলেছিলেন, ব্যাপারটা গুরুতর। অতএব নীতি আয়োগ, অর্থ কমিশন, আইন কমিশন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং শাসক ও বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা কমিটি তৈরি হোক মুফতের সুযোগসুবিধার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতে। ১৭ আগস্ট ছিল এ যাবৎ এই মামলার শেষ শুনানি, আগামী সপ্তাহে ফের শুনানি হওয়ার কথা। মজার ব্যাপার, ১১ তারিখ প্রধান বিচারপতি নিজেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, এ বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ করার কতটুকু অধিকার আছে তা নিয়ে। অথচ সেই যুক্তিতে পিটিশন বাতিল করে দেননি।

এই মামলার শুনানিতে দেশের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার কিছু মন্তব্য একবার দেখে নেওয়া যাক। “এই ফ্রিবি কালচারটাকে এখন শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আর নির্বাচন এখন এই নিয়ে লড়া হয়। ফ্রিবিগুলোকে যদি জনকল্যাণ বলে ধরা হয়, তাহলে বিপর্যয় ঘটবে। এটাই যদি নর্ম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মাননীয় বিচারকরা নর্মগুলো ঠিক করে দিন। আইনসভা যতক্ষণ না কিছু করছে, মাননীয় বিচারকরা কিছু নর্ম ঠিক করে দিতেই পারেন।”

এই বিতর্কে দুটো জিনিস বিশেষভাবে লক্ষ করার মত। প্রথমত, ফ্রিবি বলতে স্পষ্টতই বোঝানো হচ্ছে সরকার সাধারণ মানুষকে যেসব সুযোগসুবিধা দেয় সেগুলোকে। কারণ প্রধান বিচারপতি বলেছেন অর্থনীতির ক্ষতি (“economy losing money”) আর মানুষের কল্যাণ (“welfare of the people”)— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা দরকার। অর্থাৎ বলেই দেওয়া হল অর্থনীতির কাজ মানুষের কল্যাণ করা নয়। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি তুষার ইঙ্গিত দিয়েছেন আইনসভা ফ্রিবি সম্পর্কে কিছু করবে। অর্থাৎ কোনও আইন প্রণয়ন করবে। সে করতেই পারে। লোকসভায় যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বিজেপির, তাকে ব্যবহার করে এবং রাজ্যসভায় বিল পাশ করাতে অসুবিধা হলে বিরোধী সাংসদদের সাসপেন্ড করে দিয়ে যে কোনও আইনই কেন্দ্রীয় সরকার করে ফেলতে পারে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সরকারের সে পর্যন্তও তর সইছে না। তুষার চাইছেন তার আগেই আদালত কিছু নিয়মকানুন ঘোষণা করুক।

এই জনস্বার্থ মামলা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ এই মামলা দায়ের হওয়ার কিছুদিন আগেই, গত মাসের শেষদিকে, উত্তরপ্রদেশে বুন্দেলখণ্ড এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশে “রেউড়ি কালচার” চালু হয়েছে। রেউড়ি, অর্থাৎ মিষ্টি, বিতরণ করে ভোট কিনে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। দেশের পক্ষে এই সংস্কৃতি খুব বিপজ্জনক। দেশের মানুষকে, বিশেষ করে যুবসমাজকে, এই কালচার সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। রেউড়ি কালচারের লোকেরা এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দর বা ডিফেন্স করিডোর বানাতে পারবে না।

রেউড়ি মন্তব্যের পিছনের ছকটা খুব পরিষ্কার। প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের সংজ্ঞা ঘোর নব্য-উদারবাদী। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য— এসবের উন্নতি হল কি হল না তা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। উন্নয়ন বলতে তিনি বোঝেন এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দর, ডিফেন্স করিডোর। নব্য উদারবাদী অর্থনীতিতে ভর্তুকি যেমন একটি অশ্লীল শব্দ, তেমনই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সরকারগুলো গরিব নাগরিকদের জন্য যেসব আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করেছে বা বিভিন্ন পরিষেবার মূল্যে বিশেষ ছাড় দিয়ে থাকে— সেগুলোও ক্ষতিকর, অবান্তর। তাই ওগুলোকে রেউড়ি বলা। মতাদর্শগতভাবেই মোদি সরকার ওসবের বিরোধী। সেটা বুঝতে অবশ্য কারও বাকি নেই। ২০১৪ সালের পর থেকে মহাত্মা গান্ধি ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিমকে যেরকম হেলাছেদ্দা করা হয়েছে সেদিকে নজর রাখলেই বোঝা যায়। নতুন কথাটা হল, এবার অন্য দলগুলোর সরকার ও পথে হাঁটতে না চাইলে আইন করে, পারলে আদালতের নির্দেশকে শিখণ্ডী করে তাদের শায়েস্তা করা হবে। এক দেশ, এক অর্থনীতি কায়েম করতে চাইছে মোদি সরকার। সে দেশে রেউড়ি জাতীয় প্রকল্পের কোনো স্থান নেই।

তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক কারণটাও সহজবোধ্য। সাম্প্রতিককালে যে কটা রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপিকে হারতে হয়েছে, তার প্রায় প্রত্যেকটাতেই তাদের পথ আটকে দাঁড়িয়েছে এই কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো, যা রেউড়ি – প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়। আরএসএস-বিজেপির নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি আর ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে দিল্লি আর পাঞ্জাবে আম আদমি পার্টির সস্তায় বিদ্যুৎ, চাষিদের ঋণ মকুবের প্রতিশ্রুতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ভর্তুকি এবং সরকারের সক্রিয়তায় সরকারি স্কুল ও মহল্লা ক্লিনিকের উন্নতির সামনে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের জন্য প্রায় সব বিশ্লেষকই কৃতিত্ব দিয়েছেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, দুয়ারে সরকারের মত পদক্ষেপকে। কন্যাশ্রীর মত প্রকল্প তো আগে থেকেই চলছিল। স্তালিনের দল দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমও ক্ষমতায় এলে যে গৃহবধূদের রেশন কার্ড আছে তাঁদের মাসে ১০০০ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সুতরাং নির্বাচনের ময়দানেও এই একটা বাধা বিজেপি কিছুতেই টপকাতে পারছে না। ফলে বিরোধীদের হাতে পড়ে থাকা এই শেষ অস্ত্রটা কেড়ে না নিলেই নয়। তাই এই আক্রমণ।

এবার শুরুতেই যে দ্বিধার কথা বলেছিলাম, সেই আলোচনায় আসি। বিজেপি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক, দুদিক থেকেই যে একটি দক্ষিণপন্থী দল তাতে সন্দেহ নেই। সেই কারণেই কয়েক লক্ষ কোটি টাকার কর্পোরেট কর মকুব করে দেওয়া তাদের মতে ফ্রিবি নয়। কিন্তু কর্মসংস্থানহীন বা দরিদ্র মহিলাদের হাতে সরকার মাসে মাসে নগদ টাকা দিলে অর্থনীতির ক্ষতি হয়ে যাবে, বিপর্যয় সৃষ্টি হবে বলে তাদের চিন্তা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাম দলগুলো, বিধানসভায় শূন্য হলেও যাদের রাস্তাঘাটে প্রধান বিরোধী হিসাবে দেখা যাচ্ছে, তারা প্রায় মোদির সুরেই গত দশ বছর ধরে তৃণমূল সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো সম্পর্কে কথা বলে আসছে কেন? সিপিএমের যে কোনও স্তরের সদস্য এবং সমর্থকরা কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ইত্যাদি প্রকল্প সম্পর্কে “খয়রাতি”, “দয়ার দান”, “টাকা দিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ রাখছে”, “মানুষকে দয়ার পাত্র করে দিয়েছে” ইত্যাদি বাক্যবন্ধ ব্যবহার করেন। মানুষ বসে বসে টাকা পেতে ভালবাসে, তাই তৃণমূলকে ভোট দিয়ে যাচ্ছে— এতদূরও বলা হয়। গরিব মানুষ রাজনীতি বোঝেন না, ভিক্ষা পেলেই খুশি— এই জাতীয় অপমানকর মন্তব্যও প্রকাশ্যেই করা হয়। স্রেফ সোশাল মিডিয়ার বিপ্লবীরা নন, শতরূপ ঘোষের মত সংবাদমাধ্যমে দলের প্রতিনিধি হিসাবে নিয়মিত মুখ দেখানো নেতারাও সামান্য পালিশ করা ভাষায় এসব বলে থাকেন।

স্বভাবতই সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির টুইট ছাড়া রেউড়ি বিতর্কে সিপিএমের কোনও সুসংহত বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্গাপুজোর জন্য ক্লাবগুলোকে টাকা দেওয়া আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে টাকা দেওয়াকে তাঁরা এক করে দেখেন কিনা— তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট আলোচনা সিপিএম নেতারা করেন কি? অথচ এই আলোচনা জরুরি। এ রাজ্যে জনমত বলতে যে শ্রেণির মানুষের বক্তব্যকে বোঝানো হয় সাধারণত, সেই শ্রেণির মধ্যে জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে দানখয়রাতি বলে ভাবার মানসিকতা কিন্তু সুদূরপ্রসারী। ভদ্রলোক শ্রেণির যেসব ভোটার তৃণমূলকে ভোট দেন, তাঁরাও “এই শ্রী, ওই শ্রী” না থাকলেই খুশি হতেন। সরকারি কর্মচারীদের ডিএ দিতে রাজ্য সরকারের যে অনীহা তার বিপরীতে ওই প্রকল্পগুলোকে রেখে আলোচনা করতে বাঙালি মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তরা বিলক্ষণ ভালবাসেন। তৃণমূলের নেতা, মন্ত্রীদের দুর্নীতি ফাঁস হলে “এই টাকাগুলো দিয়ে ডিএ দেওয়া যেত না?”— এ প্রশ্ন শোনা যায়। কিন্তু কাউকে বলতে শোনা যায় না “এই টাকা দিয়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে এক হাজার টাকা করে দেওয়া যায় না?” অথচ এঁরা এমনিতে ভাল করেই জানেন পাঁচশো টাকায় আজকাল কিছুই হয় না। আসলে মনে করা হয়, ডিএ পাওয়া অধিকার কিন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দয়ার দান।

এর কারণ ১৯৯১ পরবর্তী যুগে দিনরাত মন্ত্রের মত কানের কাছে বলে বলে যে কয়েকটি কথা আমাদের মর্মে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার অন্যতম হল, কোনও পরিষেবা বা পণ্য বাজার থেকে পয়সা দিয়ে না কিনে পাচ্ছে মানেই সেটা দান। সরকার দিচ্ছে মানেই দান করছে। আরেকটি কথা হল, চাকুরিজীবীরা করদাতা, গরিব শ্রমজীবী মানুষ করদাতা নয়। তারা করদাতাদের টাকায় বেঁচে থাকা পরজীবী।

এই দুটিই যে সর্বৈব মিথ্যা, তা বোঝানোর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল বামপন্থীদের। কিন্তু সে দায়িত্ব তাঁরা মোটেই পালন করেননি, এখনও করেন না। ভর্তুকি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পণ্য— একথা বলে নব্য-উদারনীতিবাদ। অন্যদিকে, যে কোনও ধরনের বামপন্থার খাতায় এগুলো অধিকার। এটুকু বুঝতে এবং বোঝাতে বামপন্থীদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বঙ্গ সিপিএমের এই অ আ ক খ প্রবলভাবে গুলিয়ে গেছে। ফলে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের সাফল্যের তালিকা দিতে গিয়ে তাঁরা দিব্যি নানা কল্যাণমূলক প্রকল্পের কথা বলেন। স্কুলের মেয়েদের সাইকেল দেওয়া যে তাঁদের আমলেই চালু হয়ে গিয়েছিল— সেকথাও বলেন। নিজেরা গরিব মানুষের জন্য কম টাকায় খাওয়ার ব্যবস্থা করতে কমিউনিটি ক্যান্টিনও চালান। কিন্তু সরকারি প্রকল্পগুলোকে বলেন দানখয়রাতি।

আমি যেমন করদাতা, আমার বাড়ির পরিচারিকাও করদাতা। তফাত হল আমি আয়কর দিই, তিনি দেন না। কারণ করের আওতায় আসার মত আয় তাঁর নেই। কিন্তু তিনি নিজের আয়ের টাকায় যা যা কেনেন সবেতেই কর দেন। আগের প্রত্যক্ষ করের যুগেও দিতেন, এখন পণ্য ও পরিষেবা করের (GST) যুগেও দেন। সুতরাং লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে যে টাকা পান বা দু টাকা কিলো চালে যে ভর্তুকি পান তাতে তাঁরও অবদান আছে, তিনি পরজীবী নন। ব্যতিক্রম বাদ দিলে এই কথাগুলো সিপিএমের সদস্য, সমর্থকরা নিজেরাই বোঝেন না বা বুঝতে অস্বীকার করেন। অন্যদের আর বোঝাবেন কী করে?

পশ্চিমবঙ্গে বাম দল বলতে অবশ্য শুধু সিপিএম বা বামফ্রন্টের দলগুলোকে বোঝায় না। কিন্তু বিকল্প বামেদের সংগঠন, অন্তত চাক্ষুষ প্রমাণে, আরও সীমিত। কিন্তু তাঁরাও যে রেউড়ি বিতর্কে খুব সোচ্চার এমন নয়। দশ বছর ধরে রাস্তায় নামার মত একাধিক ইস্যু থাকা সত্ত্বেও পথে না নামা সিপিএম অবশেষে পার্থ চ্যাটার্জি, অনুব্রত মণ্ডলের গ্রেফতারির পর বিরোধীসুলভ সক্রিয়তা দেখাচ্ছে। আর বিকল্প বামেরা সক্রিয়তা দেখাচ্ছেন ইডি-সিবিআই যেহেতু বিজেপি সরকারের হাতে, সেহেতু তৃণমূল নেতাদের বিপুল দুর্নীতি নিয়ে কেন পথে নামা উচিত নয় সেই তর্কে। উন্নয়ন মানে কী বা কী হওয়া উচিত— সে আলোচনাতেও মাঝেমধ্যে দেখা যায় ভারতীয় বামপন্থীদের। যে কারণে বেশিরভাগ বামপন্থী দলের কাছেই আজও পরিবেশ কোনও রাজনৈতিক ইস্যু নয়। নব্য-উদারবাদীদের মতই তাঁরা ভাবেন পরিবেশের সামান্য ক্ষতি করে যদি শিল্প হয়, কর্মসংস্থান হয় তাহলে তেমন ক্ষতি নেই। পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের নানা গাঢ়ত্বের লালেরা কিন্তু এ পথে হাঁটছেন না। অর্থাৎ পথ সামনে রয়েছে, কিন্তু উত্তমকুমার অভিনীত অবিনাশের মতই আমাদের বামপন্থীরাও নিজেদের চোরাগলিতে দিশেহারা।

বামেরা কী করছেন, কী বলছেন, তা কেন গুরুত্বপূর্ণ? এই জন্যে, যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার চিরকাল থাকবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের গা জোয়ারিতেই হোক বা নাগরিকদের ভোটে, প্রাকৃতিক নিয়মেই এই সরকার একদিন চলে যাবে। তখন যে দলের সরকারই আসুক, সরকারি নীতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে দক্ষিণপন্থী ভাবনার যে আসন তৈরি হয়েছে তা ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যতেও মানবিক সরকার দেখতে পাব না আমরা। এই ভাঙার দাবি কাদের কাছে করা যায়? বিজেপির কাছে তো নয়। রামচন্দ্র গুহ নিজেকে বলেন “ল্যাপ্সড মার্ক্সিস্ট”। আমারও এক বয়োজ্যেষ্ঠ ল্যাপ্সড মার্ক্সিস্ট বন্ধু আছেন। তিনি সর্বদাই বলেন, বামপন্থীদের থেকে কিছু আশা করা উচিত নয়। কিন্তু বামেদের বাদ দিলে যদি পড়ে থাকে বিজেপি, তাহলে আর উপায় কী? আশা করা বেঁচে থাকার জন্য জরুরি একটা কাজ। সে কাজ তো ছাড়া যায় না।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সততা ও বাংলার সংবাদমাধ্যম: কোনো প্রশ্ন নয়

যাদবেন্দ্র পাঁজা
কংগ্রেস করতেন, বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। শঙ্খ ঘোষ এই মানুষটিকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা লিখে রেখেছেন। বাঘা যতীনের শিষ্য, স্বাধীনতা সংগ্রামী কিরণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ১৯৫০ সালে থাকতেন কলেজ স্ট্রিটে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের পিছনে এক গলিতে এক অকিঞ্চিৎকর বাড়ির দোতলা কি তেতলার একটি ঘরে। সে ঘরের বর্ণনা এরকম “এক প্রান্তে একটা শতরঞ্চি বিছানো, অন্য প্রান্তে আরেকখানা। শতরঞ্চির ওপর অল্পস্বল্প শয্যাসম্বল আর পাশে একখানা টিনের সুটকেস, দু-প্রান্তেই।” একদিকে বসে কিরণচন্দ্র অন্য দিকে শুয়ে থাকা একজনকে হেঁকে বলেন “সময় হয়নি? যেতে হবে না?” সেই মানুষটি উঠলেন, ব্র্যাকেটে ঝোলানো একখানা আধময়লা পাঞ্জাবি পরে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। শঙ্খ ঘোষ তাঁকে চিনতেন না। কিরণচন্দ্রের মুখে পরিচয় শুনে বিস্মিত হলেন। তারপর:

যাদবেন্দ্র পাঁজা? মন্ত্রী?
আমার চোখে বিস্ময় লক্ষ করে কিরণদা বলেন: ‘মন্ত্রী তো কী হলো, সেটা কোনো কথা নয়, ও হলো যাদবেন্দ্র পাঁজা। এখন বেরিয়ে গিয়ে রাইটার্সে যাবে, হয়তো হেঁটে হেঁটেই।’

সুবোধ ব্যানার্জি
প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের শ্রমমন্ত্রী। এঁর বিষয়ে ১৯৯৭ সালে লিখেছিলেন বিখ্যাত আমলা দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। সুবোধবাবু যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন কংগ্রেস সরকারের শ্রমমন্ত্রী গোপাল দাস নাগের মহানুভবতায় বিদেশ থেকে একটি অত্যন্ত দামি এবং এ দেশে পাওয়াই যায় না এমন ওষুধ আনানো হয়েছিল। ডাক্তারদের মতে সেই ওষুধের কয়েকটা ডোজ নিতে পারলে সুবোধবাবুর আয়ু খানিকটা বেড়ে যেতে পারত। কিন্তু বাণিজ্যিক সংস্থার আনুকূল্যে আনানো সেই ওষুধ ফিরিয়ে দেন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটি, তাঁর স্ত্রী এবং কন্যা।

বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যে বিনয় চৌধুরী বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জীবনযাত্রার সারল্য, সততার কথা আজ অবধি মুখে মুখে ফেরে। জ্যোতি বসু স্কচ খেতে ভালবাসতেন, অভিজাত ক্লাবের সদস্য ছিলেন, প্রাসাদোপম সরকারি বাড়িতে থাকতেন। তাঁর ছেলে পিতৃপরিচয় ব্যবহার করে শিল্পপতি হয়েছেন কিনা তা নিয়ে বিস্তর নিউজপ্রিন্ট খরচ হয়েছে একসময়, কিন্তু জ্যোতিবাবুর বিরুদ্ধেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠেনি। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র প্রফুল্ল সেনের বিরুদ্ধেই বিরোধীরা (বামপন্থীরা) দুর্নীতির অভিযোগ এনেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে, সে অভিযোগও মিথ্যা।

উদাহরণের তালিকা আরও দীর্ঘ করা সম্ভব, কিন্তু নিষ্প্রয়োজন। কারণ এই নাতিদীর্ঘ তালিকাই এটুকু প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট, যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে প্রথম ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদ নন যিনি সততার পরাকাষ্ঠা বা সাদাসিধে জীবন কাটান। অথচ পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম গত এক দশকে তেমনটাই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে গেছে ক্রমাগত। আজ যদি আপামর পশ্চিমবঙ্গবাসীর ধারণা হয়ে থাকে, তৃণমূল কংগ্রেসের আর সব নেতা দুর্নীতিগ্রস্ত হলেও দিদি সৎ — তার কৃতিত্ব মমতার চেয়েও এ রাজ্যের সংবাদমাধ্যমের বেশি। জাতীয় স্তরের বেশকিছু সংবাদমাধ্যম মোদী বন্দনার জন্য কুখ্যাত। তাদের প্রচারে তবু একটি সঙ্গতি আছে। তারা কেবল মোদীকে পুরুষোত্তম সত্য হিসাবে উপস্থিত করে না; অনুরাগ ঠাকুর, কিরেণ রিজিজু, স্মৃতি ইরানির মত চুনোপুঁটি বিজেপি নেতা নেত্রী থেকে শুরু করে হেভিওয়েট অমিত শাহ পর্যন্ত সকলকেই সকল গুণের আধার হিসাবে বর্ণনা করে। বাংলার সংবাদমাধ্যম কিন্তু তেমন নয়। অনুব্রত মণ্ডল যে প্রকৃতপক্ষে বাহুবলী, তা দেখাতে এখানকার খবরের চ্যানেলগুলোর আপত্তি নেই। নারদ স্টিং অপারেশনের সময়ে স্টুডিওতে সভা বসিয়ে ফিরহাদ হাকিম, সৌগত রায়, শোভন চ্যাটার্জি, শুভেন্দু অধিকারীদেরও যথেষ্ট নিন্দা করা হয়েছে। গ্রেপ্তারির পর মদন মিত্রের নিন্দাও কাগজে বেরিয়েছে, কুণাল ঘোষ যে দুর্নীতিগ্রস্ত সে কথাও দিবারাত্র উচ্চারিত হয়েছিল যথাসময়ে। আর পার্থ চ্যাটার্জির বেলায়? ইংরেজিতে একটা কথা আছে – washing dirty linen in public। বেলঘরিয়ার ফ্ল্যাট থেকে ২২ কোটি টাকা উদ্ধার হওয়ার পর থেকে তো আক্ষরিক অর্থেই পার্থবাবুর বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড়, অন্তর্বাস জনসমক্ষে ধোলাই করছে মিডিয়া। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রীর দলের আর সকলকে অসৎ বলতে বাংলার সংবাদমাধ্যম রাজি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে। তিনি যেন পদ্মফুল – পাঁকে থাকেন কিন্তু গায়ে পাঁক লাগে না।

নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে যখন রাজ্য উত্তাল, তখন সংবাদমাধ্যম নিয়ে এই আলোচনার কী দরকার? অভিযুক্ত তো রাজ্যের একজন মন্ত্রী এবং তাঁর বান্ধবী। মুখ্যমন্ত্রী তো নন, সংবাদমাধ্যমও নয়।

দরকার কারণ পশ্চিমবঙ্গ অনেকদিন হল কিছু মৌলিক গণতান্ত্রিক রীতিনীতির উল্টো দিকে হাঁটছে। যেমন গণতন্ত্রে সবাই সবার কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কিন্তু এ রাজ্যে সংবাদমাধ্যম সবার (আক্ষরিক অর্থে নেবেন না) কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারলেও তার কার্যকলাপ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না। প্রকাশ্য সভায় সাংবাদিকরা ভাতার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেন মুখ্যমন্ত্রীকে। মুখ্যমন্ত্রীও বলেন সরকারি আধিকারিকরা নজর রাখবেন কে কীরকম খবর করছে। ‘ভাল’ খবর করলে সাহায্য পাওয়া যাবে। এতবড় অগণতান্ত্রিক কাণ্ড নিয়ে কোনো কাগজে কোনো সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় না, কোনো চ্যানেলে সান্ধ্য বিতর্কসভা বসে না। বোঝাই যায়, মুখ্যমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনগুলো লাইভ দেখলে কেন শেক্সপিয়রের নাটকের মনোলগের দৃশ্য দেখছি মনে হয়।

পশ্চিমবঙ্গে অল্টনিউজ বা নিউজলন্ড্রি নেই, সংবাদমাধ্যমের কভারেজের ভালমন্দ উচিত-অনুচিত নিয়ে কোনো মিডিয়া কাটাছেঁড়া করে না। ফলে সংবাদমাধ্যমের দিকে কোনো আঙুল ওঠে না, কিন্তু তারা নিশ্চিন্তে অন্যদের দিকে আঙুল তুলতে পারে। যেমন ২২ জুলাই টালিগঞ্জের ফ্ল্যাট থেকে কুবেরের ধনের প্রথম কিস্তি আবিষ্কারের পর আটদিন পেরিয়ে গেল, এখনো জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকার, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় প্রমুখরা মুখ খুলছেন না বলে তাঁদের দিকে আঙুল তুলছে। সন্দেহ নেই সরকার ঘনিষ্ঠ এই বিখ্যাতরা, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কমিটিতে আসীন এই কৃতীরা, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের পক্ষে কথা বলা এই খ্যাতিমানরা এত বড় কাণ্ডে চুপ করে থাকলে এঁদের বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু মজার কথা, বাংলার সংবাদমাধ্যম কেবল সেই বিখ্যাতদের দিকেই আঙুল তোলে যাঁরা সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য নন। দেব, মিমি চক্রবর্তী, নুসরত জাহান বা সায়নী ঘোষের মত যে বিখ্যাতরা রীতিমত দলে যোগ দিয়েছেন, কেউ কেউ নির্বাচনে জিতে সাংবিধানিক পদ আলো করে আছেন, তাঁদের প্রতিক্রিয়া অগ্রাধিকার পায় না। বগটুই কাণ্ডের পর কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম কোন কোন বিখ্যাত মানুষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি তার আলাদা তালিকা পর্যন্ত প্রকাশ করেছিল। অথচ দেব, মিমি, নুসরতরা প্রতিক্রিয়া না দিলে কেন দিলেন না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় না। অথচ তাঁরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, এসব নিয়ে কথা বলা তাঁদের সাংবিধানিক দায়।

দায়ের কথা বলতে গেলে এ কথাও বলতে হবে, দুর্নীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা তুলে ধরা সংবাদমাধ্যমের দায়। গত আটদিনে বাংলার সংবাদমাধ্যম সে দায় পালন করতে উৎসাহী হয়েছে। পার্থবাবুকে ফোন করে চাকরিপ্রার্থীদের যন্ত্রণা জানিয়ে বেকুব হয়েছিলেন – এরকম এক নীচু তলার তৃণমূল কর্মীর ফোনালাপের অডিও প্রকাশ্যে এনেছে একটি চ্যানেল। সেই কর্মীটিকে সাদরে স্টুডিওতে ডেকে এনে সান্ধ্য বিতর্কসভায় স্থানও দেওয়া হয়েছে একদিন। পাঁচশো তিন দিন ধরে যাঁরা রাস্তায় বসে আছেন তাঁদের কয়েকজনকেও এখন এ চ্যানেল সে চ্যানেলে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে। একটি চ্যানেলে তাঁদের কয়েকজনকে কান্নায় ভেঙে পড়তেও দেখা গেল। যৌবন চুরি হয়ে যাওয়া এই অসহায়, বিধ্বস্ত মানুষেরা এখন চ্যানেলগুলির হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন হয়ে উঠেছেন। ঝকঝকে চেহারার অ্যাঙ্কররা যথাসম্ভব আবেগ সহকারে ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করছেন “আর কতদিন…?” কিন্তু এই চাকরিপ্রার্থীদের কেউ যদি আচমকা অ্যাঙ্করকে জিজ্ঞেস করে বসেন “আপনারা এতদিন কোথায় ছিলেন”, তাহলে পালাবার পথটা দেখে রাখা ভাল। কারণ লেখাপড়া জানা ছেলেমেয়েরা, আমাদের ছেলেমেয়েদের হবু শিক্ষক-শিক্ষিকারা যে রাস্তায় বসে আছেন – এ দৃশ্য বাংলার চ্যানেলওয়ালা, কাগজওয়ালাদের গত আট দিনে চোখে পড়েছে। তার আগের ৪৯০-৯৫ দিন ক্যামেরা আর ল্যাপটপগুলো অন্য কোনো গুরুতর খবর নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কোটি পঞ্চাশেক নগদ টাকা আর গয়নাগাঁটি উদ্ধার না হলে ৫০০ দিন পেরোলেও আন্দোলনকারীদের দিকে নজর পড়ত কিনা সন্দেহ আছে। চক্ষুলজ্জাই এ যাত্রায় ক্যামেরা এবং কম্পিউটারগুলোর মুখ আন্দোলনকারীদের দিকে ঘুরিয়ে দিল হয়ত। গত এগারো বছরে কলকাতার বুকে এসএসসি, টেট, মাদ্রাসা – নানারকম শিক্ষকদের একাধিক অবস্থান বিক্ষোভ হয়েছে, শিক্ষক-হবু শিক্ষকরা পুলিসের লাঠির বাড়ি খেয়েছেন, জলকামান দিয়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার মত ঘটনাও ঘটেছে। মারাও গেছেন বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী। সেসব আন্দোলনকে প্রধান খবরের মর্যাদা দেয়নি কোনো খবরের কাগজ বা চ্যানেল। প্রথম পাতার খবর হয়েছে, যখন দীর্ঘ আন্দোলন ভাঙতে মুখ্যমন্ত্রী গিয়ে আন্দোলনকারীদের শুকনো আশ্বাস দিয়েছেন বা আদালত বলেছে, আপনার অমুক জায়গায় বসবেন না, তমুক জায়গায় বসুন। সাধারণ মানুষের অসুবিধা করে আন্দোলন করা চলবে না।

আরও পড়ুন সত্যান্বেষী পাঠক জাগুন, সরকারি বিজ্ঞাপন পেতে গেলে ইতিবাচক খবর লিখতে হবে

এখনো কভারেজের অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে পার্থ-অর্পিতার সম্পর্কের রসাল খুঁটিনাটি। যে অধ্যবসায়ে কোন গাড়িতে লং ড্রাইভে যেতেন আর কোন বাগানবাড়িতে চেটেপুটে খিচুড়ি খেতেন তা রিপোর্ট করা চলছে, তাতে মনে হচ্ছে বাংলার মিডিয়া স্রেফ একটা সেক্স টেপের অপেক্ষায় আছে। সেটা পাওয়া গেলেই আন্দোলনকারীরা আবার অবজ্ঞার অন্ধকারে তলিয়ে যাবেন, দুর্নীতিও চাপা পড়ে যাবে। এই অধ্যবসায় ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে থাকলে, সত্য উদ্ঘাটন করার এই অদম্য উৎসাহ আগে দেখালে নিয়োগ দুর্নীতি প্রকাশ করতে আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হত না। কাজটা পশ্চিমবঙ্গের সদাজাগ্রত সংবাদমাধ্যমই করতে পারত।

‘বিশ্বাসে মিলায় সততা, তর্কে বহুদূর’ মন্ত্রে বিশ্বাসী মিডিয়া কিন্তু এখনো প্রশ্ন করছে না, মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো আন্দোলনকারীদের আশ্বাস দিতে পারেন কোন প্রশাসনিক অধিকারে? তিনি তো সরকারের কেউ নন। মুখ্যমন্ত্রী নিজে কেন কথা বলছেন না? শুধু কথা বলে কী হবে, সে প্রশ্নও করছে না খুব বেশি মিডিয়া। গত কয়েক দিনে আবার কিছু বর্ষীয়ান সাংবাদিক সোশাল মিডিয়ায় বনলতা সেনগিরি করতে নেমেছেন। বাম আমলে কী হয়েছে, সব জানি। বেশি বাড়াবাড়ি করলে লিখে দেব – এই জাতীয় পোস্ট দেখা যাচ্ছে। এঁরা কি বুঝছেন না, এই উচ্চারণে মিডিয়ার কর্তব্যে অবহেলাই আরও পরিষ্কার হচ্ছে? বাম আমলের দুর্নীতির কথা জানা ছিল, অথচ রিপোর্ট করা হয়নি – এ যদি সত্যি হয়, সে দায় সংবাদমাধ্যম ছাড়া কার?

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার কি এমনি এমনি খায়?

পুরস্কার কেন মূল্যবান? সকলে পায় না বলে। সারা পৃথিবীতে এত বৈজ্ঞানিক গবেষণা হচ্ছে, এত সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে, এত সমাজসেবা হচ্ছে রোজ, অথচ ছশো কোটি মানুষের মধ্যে সবমিলিয়ে জনা দশেক প্রতি বছর নোবেল পুরস্কার পান। তাই ওই পুরস্কার প্রাপকদের সব দেশেই আলাদা সম্মান। একসময় পাড়ার পুজোর ধুনুচি নৃত্য প্রতিযোগিতায় ছোটদের উৎসাহিত করার জন্য সব অংশগ্রহণকারীকেই সান্ত্বনা পুরস্কার হিসাবে থালা, বাটি, চামচ ইত্যাদি দেওয়া হত। তাছাড়া আর কোনো পুরস্কারই রাম শ্যাম যদু মধু – সকলকেই দেওয়ার নজির নেই। আদৌ পুরস্কার বলে কিছু থাকা উচিত কিনা তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। কোনো দেশের বা রাজ্যের সরকারের আদৌ কাউকে পুরস্কার দেওয়া উচিত কিনা তা নিয়েও বিলক্ষণ তর্ক হতে পারে। ভারতের সংবিধান বলে আইনের চোখে, রাষ্ট্রের চোখে সব নাগরিকই সমান। সেক্ষেত্রে সরকারের বিশেষ বিশেষ নাগরিককে পুরস্কার দেওয়া উচিত কিনা তা-ও তর্কাতীত নয়।

এতৎসত্ত্বেও আমাদের দেশে স্বাধীনতার পর থেকেই নানারকম সরকারি পুরস্কার চালু আছে। প্রায় প্রতি বছরই প্রাপকদের তালিকা কোনো না কোনো দিক থেকে সমালোচিত হয় এটা যেমন সত্য, তেমনি প্রাপকদের সামাজিক সম্মান যে বৃদ্ধি পায় তা-ও অস্বীকার করার উপায় নেই। মুশকিল হল সাম্প্রতিককালে পুরস্কারগুলো যেন বড় বেশি সহজলভ্য হয়ে গেছে, ফলে মূল্য হারাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ ইত্যাদি দিয়ে থাকেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর গরীব পশ্চিমবঙ্গ সরকার চালু করেছিলেন বঙ্গবিভূষণ। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন, মহাশ্বেতা দেবীর মত প্রবাদপ্রতিম মানুষ তা পেয়েছেন। এ বছর হঠাৎ ব্যক্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকেও পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। কোন প্রতিষ্ঠান? না কলকাতার তিন ঐতিহ্যশালী ফুটবল ক্লাব – মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল আর মহমেডান স্পোর্টিং।

আরও পড়ুন আকাদেমি সমাচার: সাহিত্য পুরস্কার যার যার, তিরস্কার সবার

এমনিতে ভাল কাজের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করায় দোষ নেই। কিন্তু যে পুরস্কার নোবেল জয়ী অমর্ত্য সেন (তিনি অবশ্য নেবেন না জানিয়েছেন) আর অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া হচ্ছে, সে জিনিস যে কোন যুক্তিতে তিনটি ফুটবল ক্লাবকে দেওয়া যেতে পারে তা দুর্বোধ্য। অর্থনীতিতে অমর্ত্য আর অভিজিৎ বিনায়কের কাজ গোটা বিশ্বে আলোচিত। অন্যদিকে কলকাতার তিন ক্লাবের কর্মকর্তারা নিজেদের অবিমৃশ্যকারিতায়, অপদার্থতায় একসময় যে শহরকে ভারতীয় ফুটবলের মক্কা বলা হত তাকে প্রায় ধাপার মাঠে পরিণত করেছেন। অমর্ত্য, অভিজিৎ আর তাঁদের অবদান যদি একই পুরস্কারের যোগ্য হয়, তাহলে সে পুরস্কারের আর মূল্য থাকল কী? শতাব্দী-প্রাচীন মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল আর এককালে ভারত দাপিয়ে বেড়ানো মহমেডান স্পোর্টিংকে এই পুরস্কার প্রদান যদি তাদের অতীত গৌরবের কথা ভেবে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্য নস্ট্যালজিয়া-কাতর বাঙালির যোগ্য কাজই হয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, এদের অবদান বুঝতে রাজ্য সরকারের এত সময় লাগল কেন? মোহনবাগানের এটিকের মুখাপেক্ষী হওয়া আর ইস্টবেঙ্গলের এই আছি এই নেই অবস্থা না হলে কি তাদের অবদান ঠাওর হচ্ছিল না?

অবশ্য যে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীকে পুরস্কৃত করার জন্যে রাতারাতি নতুন সাহিত্য পুরস্কার চালু হয়ে যায়, সেখানে প্রদানের অর্থ, গুরুত্ব – এসব নিয়ে আলোচনা করা বাতুলতা।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

“কথা বোলো না কেউ শব্দ কোরো না 
ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন 
গোলযোগ সইতে পারেন না।”

মনোজ মিত্রের নরক গুলজার নাটকের এই গান গত শতকের একটা অংশে রীতিমত জনপ্রিয় ছিল। আমাদের এঁদো মফস্বলে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটার দেখার অভ্যাস খুব বেশি লোকের ছিল না। তৎসত্ত্বেও নব্বইয়ের দশকে অন্তত দুবার শখের অভিনেতাদের পাড়ার মঞ্চে এই নাটক করতে দেখেছি আর নারদের চরিত্রে যে-ই থাকুক, তার গলায় সুর থাক বা না থাক, এ গান গাওয়া মাত্রই দর্শকদের মজে যেতে দেখেছি। পিতামহ ব্রহ্মা টেনে ঘুমোচ্ছেন, দেবর্ষি নারদ নেচে নেচে এই গান গাইছেন – এই হল দৃশ্য। নাটকটি আগাগোড়া সরস। এখানে ব্রহ্মা একজন মানুষকে পুনর্জন্ম দেওয়ার জন্য ঘুষ নিতে যান, চিত্রগুপ্ত দেখে ফেলে আর্তনাদ করে ওঠে “উৎকোচ”। ব্রহ্মা ট্যাঁকে টাকা গুঁজতে গুঁজতে বলেন “মেলা ফাজলামি কোরো না। উৎকোচ ছাড়া আমাদের ইনকামটা কী, অ্যাঁ? আমরা কি খাটি, না এগ্রিকালচার করি, না মেশিন বানাই? অতবড় স্বর্গপুরীর এস্ট্যাবলিশমেন্ট কস্ট আসবে কোত্থেকে, অ্যাঁ?” তাছাড়া এই নাটকে একজন বাবাজি আছেন, যিনি ব্রহ্মার কৃপায় কল্পতরু থলি পাওয়া মাত্রই রম্ভাকে চেয়ে বসেন। কিন্তু থলিতে হাত ঢোকালে হাতে উঠে আসে একটি মর্তমান কলা।

আর বেশি লিখব না, কারণ বৃদ্ধ বয়সে মনোজ মিত্রকে হাজতবাস করানো আমার উদ্দেশ্য নয়। কথা হল বিশ-পঁচিশ বছর আগে একশো শতাংশ হিন্দু (নব্বই শতাংশ উচ্চবর্ণ) অভিনেতাদের দ্বারা অভিনীত এই নাটক দেখেছি, আর একশো শতাংশ হিন্দু দর্শককুলকে নাটক দেখে হেসে গড়াগড়ি খেতে দেখেছি। কিন্তু বিস্তর ধস্তাধস্তির পর মহম্মদ জুবের আজ দিল্লি পুলিসের দায়ের করা মামলাতেও জামিন না পেলে এবং জজসাহেব তাঁর রায়ে বাকস্বাধীনতা যে সাংবিধানিক অধিকার সেটি ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে না দিলে সাহস করে এই লেখা লিখতে বসতাম না। কারণ কী লেখা যাবে, কোনটা বলা যাবে সে ব্যাপারে আজকাল আর সংবিধান চূড়ান্ত নয়, সরকারের বকলমে পুলিস চূড়ান্ত। পুলিসের অধিকারের সীমাও বেড়ে গেছে অনেক। একদা পুলিসের হাত এত ছোট ছিল, যে আশিতে আসিও না ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জলে নেমে পড়ে বলেছিলেন তাঁকে আর ধরা যাবে না, কারণ তিনি তখন জলপুলিসের আন্ডারে। আর এ যুগে আসাম পুলিসের হাত গুজরাট পর্যন্ত লম্বা, পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের হাত গোয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দেশটা যে প্রেতপুরীতে পরিণত হয়েছে, এই বোধহয় তার সর্বোত্তম প্রমাণ। কারণ ছোটবেলায় জ্যাঠা-জেঠিদের মুখে কলকাতায় মেসে থেকে চাকরি করা এক গ্রাম্য ভদ্রলোকের গল্প শুনেছিলাম। তিনি বহুকাল পরে বাড়ি গিয়ে খেতে বসেছেন, ডালের সাথে মেখে খাবেন বলে দুটি পাতিলেবুর আবদার করেছেন। করেই দেখেন বউয়ের হাতদুটো ইয়া লম্বা হয়ে নিজের বাড়ির সীমানা পেরিয়ে পাশের বাড়ির গাছ থেকে লেবু পেড়ে নিয়ে এল। আসলে ওলাউঠার মহামারীতে গ্রাম সাফ হয়ে গিয়েছিল। ঘৃণার মহামারীতে আমাদের দেশ সাফ হয়ে গেছে। গল্পের ভদ্রলোক শহরে পালিয়ে বেঁচেছিলেন, আমরা কোথায় পালিয়ে বাঁচব জানি না। ভারত জোড়া ফাঁদ পেতেছ, কেমনে দিই ফাঁকি? আধেক ধরা পড়েছি গো, আধেক আছে বাকি।

আমরা ভারতীয়, আমরা মেনে নিতে জানি। যা যা বলা বারণ, লেখা বারণ সেগুলো মেনে নিয়ে চলব বলেই ঠিক করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম অবাক কাণ্ড! কেবল আমরা মানিয়ে নিলে চলবে না, হাজার ভণ্ডামি ও নোংরামি সত্ত্বেও যে সংসদের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি তার সদস্যদের জন্যেও তালিকা তৈরি হয়েছে। ভগবান, থুড়ি সরকার, যাতে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যেতে পারেন, কেউ গোল করতে না পারে তার নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা করতে কোন কোন শব্দ উচ্চারণ করা যাবে না, অর্থাৎ কোনগুলো অসংসদীয়, তার নতুন ফর্দ প্রকাশিত হয়েছে সংসদের মৌসুমি অধিবেশনের প্রাক্কালে। সেখানেই শেষ নয়, আরও বলা হয়েছে, সংসদ চত্বরে কোনো “ডেমনস্ট্রেশন”, ধর্না, ধর্মঘট করা যাবে না। এমনকি অনশন বা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানও করা যাবে না। অর্থাৎ সমস্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই গণতন্ত্রের মন্দিরে বারণ। এ হল সেই মন্দির, যেখানে প্রথমবার প্রবেশ করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘটা করে সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা যাবে না – এই দারুণ ধর্মনিরপেক্ষ আদেশের কারণ অবশ্য দুর্বোধ্য। কারণ মাত্র কয়েকদিন আগে নতুন সংসদ ভবনে দন্তবিকশিত সিংহের মূর্তি স্থাপন করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে পুজো-আচ্চা করেছেন। তাহলে বক্তব্যটি কি এই, যে পুরনো মন্দিরে পুজো চলবে না, নতুন মন্দিরে চলবে? গণতন্ত্রের মন্দিরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করার অর্থই বা কী? তাহলে কি শান্তিভঙ্গ করে যেসব প্রতিবাদ প্রণালী, সেগুলোর পথ পরিষ্কার করা হচ্ছে? মোদীজির বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর ক্যাপিটল হিলে যেরকম প্রতিবাদ দেখে সারা বিশ্ব শিউরে উঠেছিল, তেমন প্রতিবাদ ছাড়া কি এ দেশে আর কোনো প্রতিবাদ করতে দেওয়া হবে না? করলেই বুলডোজার চালানো হবে? প্রতিবাদের চেহারা অবশ্য বিচিত্র। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কায় আরেক ধরনের প্রতিবাদ হচ্ছে। প্রতিবাদের ধরনধারণ, সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আজ পর্যন্ত কোনো দেশের কোনো শাসকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অবশ্য মোদীজি বালক বয়সে খালি হাতে কুমিরের মুখ থেকে ক্রিকেট বল এবং কুমিরছানা নিয়ে এসেছেন। তাঁর অসাধ্য কী?

মোদীজির সরকার কী কী পারে তা আমরা এতদিনে জেনে ফেলেছি, বিরোধীরা কী পারেন তা দেখা এখনো বাকি আছে। অসংসদীয় শব্দের তালিকার সংযোজনগুলো সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। দু-একজন বিরোধী সাংসদ বলছেন বটে, তাঁরা নির্দেশ অগ্রাহ্য করে ওই শব্দগুলো সংসদে ব্যবহার করবেন, কিন্তু সেই ২০১৪ সাল থেকে তাঁরা যেরকম লক্ষ্মীসোনা হয়ে আছেন, তাতে না আঁচালে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। পালানিয়প্পম চিদম্বরমের মত দু-একজন প্রবীণ সাংসদ তো ইতিমধ্যেই টুইট করে দেখিয়েছেন, ভাষার উপর দখল থাকলেই যে শব্দগুলোকে অসংসদীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়েও সরকারের সমালোচনা করা সম্ভব। সোশাল মিডিয়ায় মস্করাও চালু হয়েছে, শশী থারুরের মত জ্যান্ত থিসরাস থাকতে আর কিসের চিন্তা? এমন সুবোধ বিরোধী থাকতে আমাদের আর কিসের চিন্তা? ইন্টারনেট জোক আর মিম সংস্কৃতি এমন গভীরে পৌঁছেছে যে সাংসদরাও গভীরে ভাবছেন না। তাঁরা বোধহয় ভেবে দেখছেন না, যে কোনো শব্দ অসংসদীয় বলে ঘোষিত হল মানে জোর করে সে শব্দ উচ্চারণ করলেও সংসদের কার্যবিবরণীতে তা নথিবদ্ধ করা হবে না। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে অন্তত সংসদের কার্যবিবরণী থেকে কোনো ইতিহাস লেখক জানতে পারবেন না যে ভারতে ‘স্নুপগেট’ বলে কিছু ঘটেছিল, কেউ ‘ডিক্টেটোরিয়াল’ ছিল বা সরকারের বিরুদ্ধে ‘তানাশাহি’-র অভিযোগ ছিল। মনোমত ইতিহাস লেখার যে ব্যবস্থা ভারতে চলছে, এ-ও যে তারই অঙ্গ, সেকথা বিরোধী দলের কেউ বুঝছেন কি? শুধু ইতিমধ্যেই লিখিত ইতিহাস বিকৃত করা নয়, এই অসংসদীয় শব্দের তালিকা যে ভবিষ্যতে যে ইতিহাস লেখা হবে তা-ও বিকৃত করার প্রচেষ্টা, তা বিরোধীরা কেউ ভেবে দেখেছেন বলে তো মনে হচ্ছে না।

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হলে ক্ষতি নেই বিজেপির

এত সহজে ইতিহাস থেকে সত্য মুছে ফেলা যায় কিনা সে বিতর্ক নেহাতই বিদ্যায়তনিক। তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বিরোধী দলের রাজনীতিবিদদের অধিকার হরণ শুরু হওয়া মাত্রই সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিবাদ করা উচিত। কিন্তু আমাদের বিরোধীরা তেমন করেন না। তাঁদের মধ্যে বিদ্যাসাগর কথিত গোপালরাই দলে ভারি। মাঝেমধ্যে রাহুল গান্ধী রাখাল হয়ে ওঠেন বটে, কিন্তু কদিন না যেতেই ইউরোপে দম নিতে চলে যান। সুললিত ইংরেজি বলতে পারা থারুর বা মহুয়া মৈত্র, ডেরেক ও’ব্রায়েনরাই আজকের সংসদীয় বিরোধিতার মুখ। তাঁরা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত বা সোমনাথ চ্যাটার্জির মত জাঁদরেল নন, সেকালের মমতা ব্যানার্জির মত ওয়েলে নেমে গিয়ে স্পিকারের মুখে কাগজ ছুড়ে মারার মত মেঠো রাজনীতিও তাঁদের আসে না। তেমন কাজ করলেও দল যে তাঁদের পাশে দাঁড়াবেই, তার নিশ্চয়তা নেই। এমন বিরোধী পেলে যে কোনো শাসকেরই পোয়া বারো হয়। তারা কাকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করবে তা নিয়ে অযথা মাথা ঘামায়, শেষ লগ্নে মাথা চুলকে বলে, আগে বললে তো ওনাদের প্রার্থীকেই সমর্থন করতাম। এদিকে সরকার নিশ্চিন্তে একের পর এক অধিকার হরণ করে চলে।

অতএব আমরা, সাধারণ ভারতীয়রা, আধেক ধরা পড়ে বাকি আধেকের আশঙ্কাতেই থাকি। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তৈয়প এর্দোগানের তুরস্কে মানুষ যেমন মুখ বুজে বাঁচে, তেমনভাবে বাঁচা আমাদের শিগগির অভ্যাস করে নিতে হবে। তবে অসংসদীয় শব্দের তালিকার মত হাজতে পোরার যোগ্য শব্দেরও একটা প্রকাশ্য তালিকা থাকলে আমাদের সুবিধা হয়।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

দেশপ্রেমিক সংগঠনে সন্ত্রাসবাদী স্লিপার সেল?

উমর খালিদ, শার্জিল ইমাম, তালিব হুসেন শাহ, রিয়াজ আত্তারি – এদের মধ্যে মিল কোথায়? চারজনেই যে ইসলাম ধর্মাবলম্বী তা তো নামগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তারপর? এরা কি সবাই দেশদ্রোহী সন্ত্রাসবাদী, নাকি দেশপ্রেমিক? আলোচনা করা যাক।

প্রথম দুজন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইটি বম্বের মত প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা এবং অধ্যাপনা করেছেন, রাজনীতি করেছেন। দুজনেই প্রকাশ্য সভায় জনতাকে প্রতিবাদ করতে বলার অপরাধে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ রয়েছেন। উমর নিজেকে কমিউনিস্ট মনে করেন, শার্জিল অন্য পথের পথিক। কিন্তু দুজনেই নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। শার্জিলকে ওই আন্দোলনের অঙ্গ হিসাবেই দেওয়া দুটো বক্তৃতার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অভিযোগ – তিনি হিংসায় প্ররোচনা দিচ্ছিলেন। উমরের বিরুদ্ধে দিল্লি দাঙ্গায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। দুজনের কারোর বিরুদ্ধেই কোনো অভিযোগ আজ অব্দি প্রমাণিত হয়নি, কিন্তু ইউএপিএ আইনের দস্তুর অনুসারে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর এরা কারারুদ্ধ থাকা অবস্থাতেই প্রমাণ জোগাড় করে যাওয়ার অধিকার আছে। তাই শার্জিল ২০২০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে আর উমর ওই বছরেরই সেপ্টেম্বর মাস থেকে গরাদের পিছনে আছেন। জামিন খারিজ হয়েছে কিছু মামলায়, কোথাও জামিন হয়েছে, কোনোটার আবার শুনানিই হয়নি এখনো।

তৃতীয় ব্যক্তি তালিব ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন লস্কর-এ-তৈবার অন্যতম কমান্ডার। তিনি জম্মুর রাজৌরির বাসিন্দা। গত রবিবার রেয়াসি জেলার টুকসানে গ্রামবাসীদের উদ্যোগে বিস্তর অস্ত্রশস্ত্র সমেত ফয়জল আহমেদ দার বলে আরেকজনের সঙ্গে তিনি ধরা পড়েন বলে খবরে প্রকাশ। চতুর্থ ব্যক্তি রিয়াজ মানুষ খুনে অভিযুক্ত। রাজস্থানের উদয়পুরে কানহাইয়া লাল নামে একজনকে সে আর ঘাউস মহম্মদ নৃশংসভাবে খুন করে, সে দৃশ্যের ভিডিও তুলে সগর্বে শেয়ারও করে। এমন করার কারণ কী? কানহাইয়া হজরত মহম্মদ সম্পর্কে বিজেপির সাসপেন্ড হওয়া মুখপাত্র নূপুর শর্মার নোংরা মন্তব্যের সমর্থনে সোশাল মিডিয়ায় কিছু পোস্ট করেছিলেন। রিয়াজ ও ঘাউসের মতে তা মহাপাপ। এ কাজে তাদের দুই স্যাঙাতের সন্ধানও পাওয়া গেছে বলে তদন্তকারী সংস্থার দাবি।

রাজৌরির তালিব আর উদয়পুরের রিয়াজের মধ্যে একটা চমকপ্রদ মিল আছে। দুজনেই বিজেপির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। তালিব নাকি বিজেপির জম্মু এলাকার মাইনরিটি মোর্চার সোশাল মিডিয়ার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। জম্মু ও কাশ্মীরের বিজেপি প্রেসিডেন্ট রবীন্দর রায়না তাঁকে পুষ্পস্তবক দিচ্ছেন, এমন ছবিও পাওয়া গেছে। দেশের প্রবল প্রতাপান্বিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পিছনে অন্য বিজেপি নেতাদের সঙ্গে তালিব দাঁড়িয়ে আছেন, এমন একখানা ছবি আছে বলেও জম্মু ও কাশ্মীরের কংগ্রেস দাবি করেছে। অন্যদিকে রিয়াজ যে উদয়পুরের বিজেপির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন তারও একাধিক লক্ষণ দেখা গেছে। বিজেপির বক্তব্য রিয়াজ তাদের দলে ঢুকতে চাইতেন মাত্র, কিন্তু কানহাইয়া হত্যার বহু আগে থেকেই যে বিজেপির সংখ্যালঘু সেলের নেতাদের সাথে রিয়াজের ঘনিষ্ঠতা ছিল, তার একাধিক প্রমাণ সোশাল মিডিয়া থেকেই উঠে এসেছে।

এমন হতেই পারে যে সত্যিই দেশপ্রেমিক বিজেপি নেতারা কিছু বুঝতে পারেননি, সন্ত্রাসবাদীরা তাঁদের মধ্যে সুকৌশলে সেঁধিয়ে গেছে। গত দু-তিন দশকের হিন্দি সিনেমার মনোযোগী দর্শকদের বলে দিতে হবে না, স্লিপার সেল কী জিনিস। শত্রু সংগঠনে ঢুকে পড়ে ভিতর থেকে সেই সংগঠনের ক্ষতি করার কৌশল তো আরও পুরনো। অক্ষয় কুমারের ভক্তদের দায়িত্ব দিলে তো তাঁরা স্লিপার সেল চিহ্নিত করে তাদের শেষ করে দেওয়ার উপায়ও বাতলে দেবেন সম্ভবত। কিন্তু মুশকিল হল, বিজেপির মত এক নিবেদিতপ্রাণ জাতীয়তাবাদী দলের নেতারা বুঝতেই পারেননি এতবড় কাণ্ড হয়ে গেছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের মত একজন জেমস বন্ডের উপস্থিতি সত্ত্বেও দেশের শাসক দলে সন্ত্রাসবাদীরা দিব্যি ঢুকে পড়ছে – এ বড়ই চিন্তার বিষয়। আমরা প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসবাণীতে ভরসা করেছিলাম। আমরা জানতাম তিনি পোশাক দেখলেই সন্ত্রাসবাদী চিনতে পারেন। তিনি পারেন আর তাঁর দলের অন্যরা পারেন না – এমন তো আমাদের জানা ছিল না! লেখার শুরুতেই একই পংক্তিতে দুজন রাজনৈতিক বন্দীর সঙ্গে একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসবাদী আর একজন সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদীর নাম করেছি, তার কারণ ওরকম নামের লোক মানেই যে নিরপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অপরাধী, তা-ই আমাদের এতদিন শেখানো হয়েছে। কারা দেশদ্রোহী আর কারা দেশপ্রেমিক, তার স্পষ্ট তালিকা আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু তালিব আর রিয়াজ ধরা পড়ায় সব যে গুলিয়ে গেল।

আরও পড়ুন মঈন সম্পর্কে কুৎসিত বিদ্রূপে সন্দেহ জাগে, তসলিমা কি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া? 

তাহলে কি ধরে নিতে হবে ইউএপিএ আইনে অভিযুক্ত উমর, শার্জিল, সিদ্দিক কাপ্পানের মত মুসলমান বা সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নওলাখা, ভারভারা রাওয়ের মত হিন্দু এবং রোনা উইলসন, ফাদার স্ট্যান স্বামীর মত খ্রিস্টানরাই শুধু নয়; ঘোষিত দেশপ্রেমিক সঙ্ঘ পরিবারের মধ্যেও দেশদ্রোহীদের উপস্থিতি আছে? না হয় স্লিপার সেলই হল। দুটো স্লিপার সেলের কথা জানা গেছে, এমন কত স্লিপার সেল যে আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে তার সন্ধান দেবে কে? যে দেশদ্রোহীরা ধরা পড়েছে, তাদের ব্যবস্থা তো হয়েই গেছে। গত বছর আজকের দিনেই তো পারকিনসন্স ডিজিজের রোগী স্ট্যান স্বামী শেষ কটা দিন জল খাওয়ার জন্য স্ট্র পর্যন্ত না পেয়ে কারাগারেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আর গতকাল শার্জিল আদালতকে জানিয়েছেন জেলের মধ্যে ৮-৯ জন বন্দী তাঁকে মারধোর করেছেন, তাঁর নিরাপত্তা সম্পর্কে আর নিশ্চিন্ত থাকা যাচ্ছে না।

কিন্তু দেশপ্রেমিক সর্ষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসবাদী ভূতদের কী হবে?

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

অপরকে সংগঠিত আক্রমণের প্রকল্প ফল দিচ্ছে

“সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে” — উদয়পুরের ছাপোষা দর্জি কানহাইয়া লালের নারকীয় হত্যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আজকের ভারত সম্পর্কে এর চেয়ে সত্যি কথা আর কিছু নেই। স্বাধীনতা লাভ তথা দেশভাগের প্রাক্কালে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার মধ্যে দাঁড়িয়ে ওই লাইন লিখেছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ। আজ আবার আমাদের মধ্যে বিভাজনরেখা স্পষ্ট। এমন নয় যে কানহাইয়া লালের মৃত্যু কোনো শীর্ষবিন্দু বা সূচনাবিন্দু। যেভাবে আমরা সবাই অপরকে ঘৃণা করছি এবং আড়চোখে দেখছি, তাতে স্পষ্ট আমাদের সকলের জামার নীচেই লুকনো আছে অস্ত্রশস্ত্র। কখন কোন প্ররোচনায় বেরিয়ে আসবে আর আমরা কাউকে কনিষ্ঠের মত জেনেও হৃদয়ে কঠিন হয়ে বধ করে ফেলব – তা কেউ বলতে পারে না। এমনটা শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন হল, এবং অতি বড় আশাবাদীও সত্বর থামবে বলে ভরসা করতে পারবেন না।

আসলে স্বীকার করে নেওয়া ভাল, শুধু অপরে অবিশ্বাস নয়, অপরকে সংগঠিতভাবে কথায় এবং কাজে আক্রমণ করার যে প্রকল্প তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এ দেশে চলছে – তার ফল ফলতে শুরু করেছে। ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙার পর দেশজুড়ে যে দাঙ্গা হয়েছিল, তখনো উদয়পুরের মত ঘটনার কথা জানা যায়নি। মহম্মদ সম্পর্কে যে কটূক্তি করেছে তার পোস্ট শেয়ার করা মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য অপরাধ বলে মনে করেছেন দুজন ইসলাম ধর্মাবলম্বী। অথচ সেইসময় খোদ ধর্মস্থান ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরেও কোনো মুসলমান এমন ঘটনা ঘটাননি। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বব্যাপী আল কায়দা, আইসিসের মত সন্ত্রাসবাদী সংগঠন দাপিয়ে বেড়ানোর সময়েও ভারতে যে কটা সন্ত্রাসবাদী হানা হয়েছে তাতে ভারতীয় মুসলমানদের যোগদান প্রায় শূন্য। ভারতকে অশান্ত করতে বরাবরই এই সংগঠনগুলোকে পাকিস্তানের নাগরিকদের সাহায্য নিতে হয়েছে। কিন্তু তাতে ভারতীয় মুসলমানদের দিকে আড়চোখে তাকানো আটকানো যায়নি।

আরও যা মারাত্মক, তা হল একমাত্র ইসলামিক সন্ত্রাসবাদই বিপজ্জনক – এই ভয়ংকর মত শুধু সামাজিক নয়, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। সাধ্বী প্রজ্ঞার মত সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে অভিযুক্তও আইনসভার সদস্য হয়ে গেছেন। আল কায়দা, আইসিসের মতই হিন্দু উগ্রবাদী সংগঠনগুলোও শিশুদের অস্ত্রশিক্ষা দেওয়া শুরু করে দিয়েছে। সাধুসন্তরা বক্তৃতায় হিন্দুদের অস্ত্র তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নির্বাচনী জনসভায় জনতাকে গুলি করতে উৎসাহ দিয়েছেন। রাষ্ট্র এসব কড়া হাতে দমন করেনি, বরং হিংসার বিরুদ্ধে যারা কথা বলেছে তাদেরই দাঙ্গা লাগানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে। হেট স্পীচ প্রকাশ করে দেওয়ায় নিযুক্ত মহম্মদ জুবেরের মত সাংবাদিকদের টুইটার ট্রোলদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুরনো হিন্দি ছবির দৃশ্যের স্ক্রিনশট টুইট করার জন্যে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দেওয়া হয়েছে বলে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ওদিকে রোজ প্রাইম টাইমে দুই ধর্মের উগ্রবাদীদের নিয়ে আসর বসিয়ে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে এক শ্রেণির সংবাদমাধ্যম।

আরও পড়ুন বিজেপি মুখপাত্র বিতাড়ন: হিন্দুত্বের টাইম আউট, খেলা শেষ নয়

অর্থাৎ ভারতে মানুষের ভাবাবেগ, মানুষের জীবনের চেয়ে অনেক বেশি দাম হয়েছে ঠাকুর, দেবতা, পয়গম্বরদের। গোমাংস খাওয়ার, বিক্রি করার অপরাধে মুসলমান খুন হচ্ছেন। পয়গম্বরকে অপমান করার অপরাধে হিন্দু খুন হচ্ছেন। ভারতের বারোটা বাজাতে আর পাকিস্তান বা চীনের প্রয়োজন নেই। আমরা নিজেরাই সে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছি। কবে স্নিগ্ধতা হৃদয়ে জাগবে, সে অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর গতি নেই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

পরমাণু বোমার রাজনৈতিক ক্ষতিসাধনের প্রমাণ এই যুদ্ধ

লক্ষ করে দেখুন, এই মুহূর্তে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি শোষণমূলক, অগণতান্ত্রিক, বুলডোজার-নির্ভর শাসন চলছে।

ইউক্রেনকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সদস্যপদ দিতে উদগ্রীব। ইউরোপিয়ান কমিশন শুক্রবার (১৭ জুন, ২০২২) ভোলোদিমির জেলেনস্কির দেশকে সদস্য করে নেওয়ার সুপারিশ করেছে। সাতাশটা সদস্য দেশের অনুমোদন পেলেই ইউক্রেন পুরোদস্তুর পশ্চিমি দেশ হয়ে উঠবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন দের লেয়েন বলেছেন, ইউরোপ চায় ইউক্রেন “ইউরোপিয়ান ড্রিম” যাপন করুক। কথাগুলো শুনতে চমৎকার। কিন্তু পড়ে কি মনে হচ্ছে, কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের কথা বলা হচ্ছে? অথচ গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর প্রায় চার মাস কেটে গেছে। ক্রমশ একের পর এক এলাকায় যুদ্ধ ছড়িয়েছে এবং সাধারণ মানুষও আক্রান্ত হয়েছেন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে। যত দিন যাচ্ছে সেসব অভিযোগ বেড়েই চলেছে। যদিও ইউক্রেনের মত ছোট্ট একটা দেশ যত সহজে হেরে যাবে বলে মনে করা হয়েছিল, তত সহজে তারা হারছে না। রাশিয়া চার মাসেও আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি। কিন্তু ইউক্রেন বিশ্বের অন্য শক্তিগুলোর কাছ থেকে যতটা সাহায্য আশা করেছিল, তা পেয়েছে কি? এই প্রশ্নটা নিয়ে আলোচনা দরকার। কারণ আমাদের সকলের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত এখান থেকে পাওয়া যাবে।

রাশিয়া যে যে কারণে ইউক্রেন আক্রমণ করেছিল, তার অন্যতম হল গত কয়েক বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটোর সাথে ইউক্রেনের আশনাই। পুতিন যে নির্বাচনী গণতন্ত্রের ভেক ধরে রাশিয়ায় একনায়কতন্ত্র চালান, তা নিয়ে সারা বিশ্বের কোনো রাজনৈতিক মতের লোকেরই বিশেষ সন্দেহ নেই। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর মুখেই মার্কিন বিদেশনীতির ঘোরতর বিরোধী নোয়ম চমস্কি বলেছিলেন, পুতিনের জায়গায় মহাত্মা গান্ধী রাশিয়ার কর্ণধার হলেও ন্যাটোর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে আরও কাছাকাছি, আরও কাছে এসো বলা মেনে নিতেন না। ন্যাটো তৈরি হয়েছিল ঠান্ডা যুদ্ধের আমলে, সোভিয়েত ব্লকের দেশগুলোর প্রতিস্পর্ধী সংগঠন হিসাবে। অথচ সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই আজ তিরিশ বছর, ন্যাটো কিন্তু পূর্ব ইউরোপে ডালপালা বিস্তার করেই চলেছে। তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক, এটা নেহাত মার্কিনবিরোধী বামপন্থী যুক্তি। ইউক্রেন একটা স্বাধীন দেশ। সে যদি মনে করে রাশিয়ার পাড়ায় বাস করেও ভ্লাদিমির পুতিনের অপছন্দের আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের সাথে অভিসারে যাবে, তাতে কার কী বলার থাকতে পারে? কিন্তু কথা হল, রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর থেকে জেলেন্সকি যে বারবার ন্যাটোর সাহায্য প্রার্থনা করলেন, তার ফল কী? ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে তো সারা পৃথিবীর মানুষ মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের কথাবার্তা শুনে আশঙ্কা করছিলেন, ন্যাটো রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যাবে। তেমন কিছু ঘটল না তো!

যুদ্ধ শুরু হওয়ার দু সপ্তাহের মধ্যেই (৯ মার্চ) জেলেন্সকি বলে দিয়েছিলেন ইউক্রেন আর ন্যাটোর সদস্য হতে চায় না। কারণ ন্যাটো ইউক্রেনকে যুক্ত করতে তৈরি নয়। তৎসত্ত্বেও ২৪ মার্চ ব্রাসেলসে ন্যাটোর যে জরুরি বৈঠক হয় সেই বৈঠকে তিনি বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ যথেষ্ট নয়। “আপনাদের এক শতাংশ যুদ্ধবিমান আর এক শতাংশ ট্যাঙ্ক আমাদের দিন। আমাদের কিনে নেওয়ার ক্ষমতা নেই। যদি আমাদের ওগুলো দিয়ে সাহায্য করেন, তাহলে আমরা একশো শতাংশ সুরক্ষিত হতে পারি।” ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রঁ কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন “ন্যাটো ঠিক করেছে এই যুদ্ধে ইউক্রেনকে সাহায্য করবে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে না জড়িয়ে।” ইউক্রেনের প্রেমের এই প্রতিদান দিল ন্যাটো। এ যেন এক পৃথিবী লিখব বলে একটা খাতাও শেষ না করার মত প্রেম। আর এতদিন পরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ‘ক্যান্ডিডেট মেম্বারশিপ’ (চূড়ান্ত সদস্যপদ পেতে সাধারণত বছর দশেক লাগে) দেওয়া হল জড়োয়ার গয়নার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইমিটেশন দুল উপহার দেওয়া।

কেন এমন করল ন্যাটো? এক কথায় এর উত্তর সম্ভবত – পরমাণু শক্তি। মনে করুন পরমাণু বোমা যদি ১৯৩০-এর দশকেই আবিষ্কৃত হত, তাহলে অ্যাডলফ হিটলার একের পর এক অস্ট্রিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে নিল দেখেও ইংল্যান্ড, ফ্রান্স যেমন বিনীতভাবে হাত কচলাচ্ছিল; ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণ করার পরেও হয়ত সেভাবেই চালিয়ে যেত। তাহলে পৃথিবীর ইতিহাস কী হত ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। পরমাণু শক্তি আমাদের কী কী ক্ষতি করেছে তা নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন হিরোশিমা-নাগাসাকি, চেরনোবিল, ফুকুশিমা, তেজষ্ক্রিয়তা – এসব নিয়েই বেশি কথা হয়। কিন্তু পরমাণু বোমার অস্তিত্ব আমাদের যে বিপুল রাজনৈতিক ক্ষতি করেছে তা চট করে স্মরণে আসে না। পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো আজকের বিশ্বে তার প্রতিবেশে যদৃচ্ছা মাস্তানি করতে পারে। ছোট দেশগুলোর পক্ষ নিয়ে কেউ লড়তে আসবে না, কারণ পরমাণু বোমার ভয়। এ এমন এক শক্তি, যার পরিমাণ বাড়লে শক্তি বাড়ে না। ধরুন রাশিয়ার একশোটা পরমাণু বোমা আছে, আমেরিকার আছে পাঁচশোটা। আমেরিকা তবু রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না। কারণ একখানা উড়ে এসে পড়লেই তো যথেষ্ট। তারপর ফিরে পাঁচখানা ছুঁড়লেই বা কী লাভ হবে? হপ্তা দুয়েক আগেই বাইডেন বলে বসেছিলেন, চীন তাইওয়ান আক্রমণ করলে আমেরিকা সামরিকভাবে তার মোকাবিলা করবে। অনতিবিলম্বেই কিন্তু হোয়াইট হাউস এক বিবৃতি দিয়ে জানায়, চীন সম্পর্কে আমেরিকার দীর্ঘকালীন নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। সোজা কথায়, ঢোঁক গেলে। কারণটা একই।

তাহলে আমাদের নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত তো? কারণ ভারত পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র। আমরা তো প্রয়োজন পড়লে এ তল্লাটে যা ইচ্ছে তাই করতেই পারি। আমরা গান্ধী-নেহরুর দেশ বলেই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করাকে অন্যায় মনে করব, সে যুগ চলে গেছে। আমাদের দেশনায়কদের এখন আরাধ্য ইজরায়েল, যাদের অস্তিত্ব ও বিস্তার প্যালেস্তাইনকে গিলে নিয়ে। তাহলে?

আরও পড়ুন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

হাতে বিষের নাড়ুর মত বোমা আছে বলে অত আহ্লাদিত হবেন না। কারণ আমাদের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রও (চীন ও পাকিস্তান) পরমাণু শক্তিধর। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিপদ অন্যখানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হলে ইউরোপের কী হত, বাকি পৃথিবীর কী হত সেকথা থাক। জার্মানির মানুষের কী হত ভাবুন। নাজিদের সবচেয়ে বেশি অত্যাচারের শিকার হয়েছেন তো সে দেশের মানুষই। আরও কত গ্যাস চেম্বার হত, ইহুদী ফুরিয়ে যাওয়ার পর কাদের সেগুলোতে ঢোকানো হত ভেবে দেখুন। যুদ্ধের হাওয়ায় নাজি জার্মানির অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছিল একটা সময়ে। যুদ্ধ মিটে গেলে কী হত? কত মানুষ অনাহারে মারা যেতেন? লক্ষ করে দেখুন, এই মুহূর্তে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি শোষণমূলক, অগণতান্ত্রিক, বুলডোজার-নির্ভর শাসন চলছে। তা নিয়ে অন্য কোনো দেশ সমালোচনা করলেই চট করে বলা হয় “আভ্যন্তরীণ বিষয়”। এ নেহাত কাকতালীয় ঘটনা নয়। এই দেশগুলোর শাসকরা জানে, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, গ্যাস চেম্বার বা তার চেয়েও খারাপ কিছু ঘটে গেলেও অন্য কোনো দেশ সেনাবাহিনী পাঠিয়ে কোনো দেশের মানুষকে মুক্ত করার কথা স্বপ্নেও ভাববে না। কারণ পুতিন, মোদী, জিনপিংদের হাতে আছে একটা সর্বশক্তিমান ব্রিফকেস। সুতরাং পরমাণু শক্তিধর দেশের নাগরিক হিসাবে আমাদের বরং বেশি দুশ্চিন্তায় থাকা উচিত। আমরা স্বাধীন নই, পরমাণু শক্তির অধীন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত