আধুনিক বাঙালি বিজ্ঞানী হতে চায় না, কেউ কেউ হয়ে যায়। তাই আমাদের গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমায় বিষয় হিসাবে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানী বিরল।
আকাশের লক্ষ লক্ষ তারার মধ্যে একটা হল সূর্য। সেই সূর্যের আটটা গ্রহ, তার একটা হল পৃথিবী। সেই পৃথিবীর একটা ছোট্ট জায়গা হল আকাশগঞ্জ। সেখানকার একটা স্কুলের একটা পরীক্ষায় যদি আমি ফেল করি, তাহলে কি আমি বিজ্ঞানী হতে পারব না? সৌকর্য ঘোষালের পক্ষীরাজের ডিম ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রীমান ঘোতন ওরফে সার্থক (মহাব্রত বসু) তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আপন মনে এই প্রশ্ন তোলে মাধ্যমিকের টেস্টে, বিজ্ঞান পড়তে গেলে যা না জানলে একেবারেই চলে না, সেই অঙ্কে শূন্য পাওয়ার পরে।
নিজের অস্তিত্বকে এভাবে প্রশ্ন করতে একমাত্র মানুষই পারে – একথা একাধিকবার নানাভাবে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর এই মহাবিশ্বের সাপেক্ষে মানুষের ক্ষুদ্রতার কথা লিখেছেন বিশ্বখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান। তাঁর একখানা বিখ্যাত বইয়ের নাম পেল ব্লু ডট: এ ভিশন অফ দ্য হিউম্যান ফিউচার ইন স্পেস। সেই বইয়ের এক জায়গায় তিনি যা লিখেছেন তার বাংলা তরজমা করলে এরকম দাঁড়ায় ‘ওই বিন্দুটাকে আবার দেখুন। ওটাই এই জায়গাটা। আমাদের বাড়ি। ওটাই আমরা। ওর মধ্যেই আপনি যাদের ভালবাসেন, যাদের চেনেন, যাদের কথা কোনোদিন শুনেছেন, যত মানুষ কোনোদিন ছিল, জীবন কাটিয়েছিল, তারা সকলে আছে…পৃথিবীটা এক বিরাট ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে একটা ছোট্ট মঞ্চ।’ সেগানের জন্মের সাত বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ‘আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,/তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান…’। এই লাইনগুলো রবীন্দ্রনাথের কলম থেকে আসা খুবই স্বাভাবিক। কারণ তাঁর বিশেষ বন্ধু ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু আর স্নেহভাজন ছিলেন আরেক বিশ্ববিশ্রুত বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ছোটদের বিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ দিতে বিশ্বপরিচয় বইখানা লিখে সত্যেন্দ্রনাথকেই উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু কী আশ্চর্য! বাঙালির ‘কালচার’ চর্চায় কোনোদিন বিজ্ঞানীদের জায়গা হল না! আমাদের সাংস্কৃতিক মহীরুহ কারা জিজ্ঞেস করলে কোনো বাঙালিকে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র, সত্যেন্দ্রনাথ বা মেঘনাদ সাহার নাম করতে শোনা যায় না। বোধহয় তাই, বাঙালি বাবা-মায়েরা বহুকাল ধরে ছেলেমেয়েদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার করতে চাইলেও বিজ্ঞানী হয়ে উঠতে উৎসাহ দেন না। আধুনিক বাঙালি বিজ্ঞানী হতে চায় না, কেউ কেউ হয়ে যায়। তাই আমাদের গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমায় বিষয় হিসাবে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানী বিরল; যদি না সেটা কল্পবিজ্ঞান হয়। সৌকর্য কিন্তু এমন এক ছবি তৈরি করেছেন যার কেন্দ্রে আছে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানে আগ্রহ, বিজ্ঞান গবেষণা, এক কিশোরের বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন।
বিশ্বপরিচয়ে সত্যেন্দ্রনাথের উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘মানুষ একমাত্র জীব যে আপনার সহজ বোধকেই সন্দেহ করেছে, প্রতিবাদ করেছে, হার মানাতে পারলেই খুশি হয়েছে। মানুষ সহজশক্তির সীমানা ছাড়াবার সাধনায় দূরকে করেছে নিকট, অদৃশ্যকে করেছে প্রত্যক্ষ, দুর্বোধকে দিয়েছে ভাষা। প্রকাশলোকের অন্তরে আছে যে অপ্রকাশলোক, মানুষ সেই গহনে প্রবেশ করে বিশ্বব্যাপারের মূলরহস্য কেবলই অবারিত করছে। যে সাধনায় এটা সম্ভব হয়েছে তার সুযোগ ও শক্তি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষেরই নেই। অথচ যারা এই সাধনার শক্তি ও দান থেকে একেবারেই বঞ্চিত হল তারা আধুনিক যুগের প্রত্যন্তদেশে একঘরে হয়ে রইল।’ যেন ঘোতনের কথাই লিখেছেন!
শুধু যে ঘোতন বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখে তা নয়, তার অঙ্কের মাস্টারমশাই বটব্যালও (অনির্বাণ ভট্টাচার্য) মনেপ্রাণে বিজ্ঞানী, তাঁর বাবাও ছিলেন বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান গবেষণা করতে বিদেশ যাওয়ার অভিলাষ পূরণ হয়নি, তবু বটব্যাল স্যার বিজ্ঞান-পাগল। আকাশগঞ্জ হাইস্কুলের ছাত্রদের ঘর্ষণ ব্যাপারটা হাতেনাতে বোঝাতে বারান্দায় মোবিল ঢেলে দেন, তার উপর পিছলে পড়েন একের পর এক মাস্টারমশাই। শেষমেশ হেডস্যারও। ফলে বটব্যাল স্যারকে চাকরিটি খোয়াতে হয়। স্যারের ঘরে বড় বড় দুটো ছবিতে আছেন জগদীশচন্দ্র; আর অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, যিনি আলো যে সবসময় সরলরেখায় চলে না তা প্রমাণ করতে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন। এখানেই শেষ নয়, যেভাবে সৌমিক হালদারের মায়াবী ক্যামেরায় ক্লোজ আপে ধরা পড়ে সামান্য ফড়িংও, তাতে মনে পড়ে আরেক বাঙালি বিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যকে। ছোটদের বোধগম্য করে কীটপতঙ্গদের নিয়েও বাংলায় বই লেখার যত্ন ছিল যাঁর। ছোটদের ভাল লাগার জন্যে একটা ছবিতে যা যা দরকার, সেসব মশলা দিয়েও এমন বিজ্ঞানকেন্দ্রিক ছবি তৈরি করার জন্যে নির্দেশক সৌকর্যের প্রশংসা প্রাপ্য। সন্দীপ রায়ের বিস্মরণযোগ্য প্রফেসর শঙ্কুকে (ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়) বাদ দিলে বাংলা ছবির পর্দায় শেষ মনে রেখে দেওয়ার মত বিজ্ঞানী চরিত্র পাতালঘর (২০০৩) ছবির অঘোর সেন (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) আর ভূতনাথ (জয় সেনগুপ্ত)। কিন্তু সেই ছবিতে বিজ্ঞানের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল ভূত ও রূপকথা, যেমনটা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের যে কোনো কাহিনিতে থাকে। এখানে কিন্তু পক্ষীরাজের রূপকথাকে বিজ্ঞানমনস্কতার দিকে ঠেলে দেয় চিত্রনাট্য।
সৌকর্যের ২০১৮ সালের ছবি রেনবো জেলি যাঁরা দেখেছেন (স্বতঃপ্রণোদিত অবাঞ্ছিত পরামর্শ দিচ্ছি – না দেখে থাকলে দেখে নিন), তাঁদের অতি পরিচিত ঘোতন আর তার বন্ধু পপিন্স (অনুমেঘা ব্যানার্জি)। এই ছবিতে তারা আর শিশু নেই, কিশোর-কিশোরী। তার সঙ্গে তাল রেখে সম্পর্কের রসায়নেও বয়ঃসন্ধিসুলভ পরিবর্তন এসেছে, যা ছবিতে অন্য এক রস যোগ করেছে। রেনবো জেলির পরে সৌকর্যের গতবছর মুক্তি পাওয়া ভূতপরী (২০২৪) ছবিতে মজা, ভূত, রূপকথার সঙ্গে মিশেছিল অনিবার্য বিষাদ। এই ছবিতে তার চেয়ে মৃদু অথচ গভীর বিষাদ আছে। সে কারণেই ছবি শেষ হওয়ার পরেও বেশ খানিকক্ষণ রেশ থেকে যায়। দুই খুদে অভিনেতাই চমৎকার কাজ করেছে। ‘মার্জিনাল আই কিউ’ থাকলেই যে মানুষের কৌতূহলের অভাব হয় না, আগ্রহের অভাব হয় না, অনুভূতির অভাব হয় না, তা মহাব্রতর অভিনয়ে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। রেনবো জেলির পর এই ছবি দেখলে মনে হয় মহাব্রতর সহজাত অভিনয় ক্ষমতা আছে। পপিন্সের সঙ্গে একান্ত দৃশ্যগুলোতে তার শরীরী ভাষায়, গলার স্বরে যে আকুতি ফুটে ওঠে তা এখনো বয়ঃসন্ধির স্মৃতি আছে যাঁদের, তাঁরা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে পারবেন। অনুমেঘার সংলাপ বলার ধরনে রেনবো জেলিতে খানিকটা কবিতা আবৃত্তির ঢং ছিল, যার ক্ষতিপূরণ হয়ে গিয়েছিল শৈশবের মিষ্টতায়। এই ছবিতে তার অভিনয়ে প্রয়োজনীয় পরিণতি দেখা গেছে। জগদীশচন্দ্রের বন্ধুর লেখা লাগসই গানটা গাওয়ার সময়ে বোঝা গেছে, অনুমেঘার গানের গলাটাও বেশ।
মজাদার সংলাপ আর সুরেলা গান এই ছবির জোরের জায়গা। বিশেষত সৌকর্যের কথায় এবং নবারুণ বোসের সুরে ‘অঙ্কে জিরো, কিসের হিরো, খ্যাপা স্যারের বিশেষ গেরো’ গানখানা যেমন ছবির গল্প আর মেজাজের সঙ্গে দারুণ খাপ খায়, তেমনি একবার শুনলে চট করে ভুলতে পারাও শক্ত। অবশ্য ওই গানে একটা চালু বাঙালি ভ্রান্তি ঢুকে পড়েছে। ম্যাজিকের সঙ্গে কিন্তু ম্যাজিক রিয়ালিজমের কোনো সম্পর্ক নেই। ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ ব্যাপারটা আসলে কী তা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের নোবেল প্রাপ্তি বক্তৃতা পড়লে পরিষ্কার বোঝা যায়।
গানখানা চমৎকার গেয়েছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য, কিন্তু হতাশ করেছে তাঁর অভিনয়। অনির্বাণকে নিজের বয়সের থেকে অনেক বেশি বয়সী একখানা চরিত্র দেওয়া হয়েছিল। তা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তিনি একটা বিশেষ কণ্ঠস্বর, কতকগুলো মুদ্রাদোষের সাহায্য নিয়েছেন। তাতে হাস্যরসের উৎপাদন হয়েছে বটে, কিন্তু উৎপাদনের চেষ্টা বড় বেশি করে ধরা পড়েছে। বরং যেসব দৃশ্যে তিনি বাবার স্মৃতিতে, প্রয়াত বন্ধুর স্মৃতিতে বিষণ্ণ – সেখানে অভিনেতা অনির্বাণকে চেনা গেছে। অতি অভিনয়ে দুষ্ট আরেক বিশিষ্ট অভিনেতা, পঞ্চায়েত প্রধানের চরিত্রে, দেবেশ রায়চৌধুরীও। প্যাংলার চরিত্রে শ্যামল চক্রবর্তী আর বিল্টুর চরিত্রে অনুজয় চট্টোপাধ্যায়ের মত দুজন চমৎকার অভিনেতার বিশেষ কিছু করার ছিল না।
এইখানেই এসে পড়ে চিত্রনাট্যের দুর্বলতার প্রশ্ন। এই দুজন যেমন অনেকখানি অব্যবহৃত রয়ে গেছেন, তেমনি বটব্যাল স্যারের বিজ্ঞান-পাগলামিও আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার ছিল বলে মনে হয়। বটব্যাল স্যারের অল্পবয়সের যে চেহারা দেখানো হয়েছে তার সঙ্গে বেশি বয়সের চেহারা আর হাবভাবের তফাতও চোখে লাগার মত। হয়ত দুজন আলাদা অভিনেতাকে ব্যবহার করলে ব্যাপারটা তত বিসদৃশ লাগত না। এছাড়া যে জিনিসটা এই ছবিতে বেখাপ্পা লাগে তা হল পঞ্চায়েত প্রধানের পিছনের দেওয়ালের ছবিগুলো। এমন কোনো রাজনৈতিক নেতা কি এদেশে আছেন যিনি পাশাপাশি টাঙিয়ে রাখেন লেনিন, জোসেফ স্তালিন, জওহরলাল নেহরু আর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ছবি?
তবে এসব ত্রুটিকে ছাপিয়ে গেছে এই ছবির আদর্শগত দিক। আকাশগঞ্জে কোনো উঁচু নিচু ভেদ নেই। বিজ্ঞানীর বাড়ির চাকর প্যাংলা অঙ্কে যথেষ্ট দড়। সে-ই ঘোতনের পরীক্ষা নিয়ে নিতে পারে। গ্রামের স্কুলে পাশ করতে গলদঘর্ম ঘোতনের গোটা দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় বন্ধু হল কলকাতার স্কুলে ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া পপিন্স। বটব্যাল স্যার তো বটেই, হেডস্যার গুণধর বাগচী (সুব্রত সেনগুপ্ত) পর্যন্ত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়াই জীবন সার্থক হওয়ার একমাত্র নিদর্শন বলে মনে করেন না। দুর্নীতিগ্রস্ত, আত্মরতিপ্রবণ পঞ্চায়েত প্রধানের মাথায় বন্দুক ধরার সুযোগ পেয়ে তাঁরা কী দাবি করেন? স্কুলে লাইব্রেরি আর ল্যাবরেটরি বানিয়ে দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, অনুভূতিপ্রবণ মন না থাকলে ডিগ্রি, বুদ্ধি, পরীক্ষার নম্বর যে বৃথা – এই কথাটা এই ছবির কোষে কোষে।
এসব দেখলে মনে পড়ে, আকাশগঞ্জ আমাদের আশপাশেই ছিল। আমাদেরই অবহেলায় হারিয়ে গেছে। সৌকর্য কল্পনাশক্তির জোরে তাকে ভারি সহজ, সুন্দর করে আবার আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছেন। আমাদের ছেলেমেয়েদের সেই আকাশগঞ্জ দেখানোর সুযোগ না ছাড়াই ভাল। অন্তত তাদের স্বপ্নে আকাশগঞ্জ ঢুকে পড়ুক। তারপর কে বলতে পারে? ভোরের স্বপ্ন, মিথ্যে না-ও তো হতে পারে।
নয়ের দশকে যখন ভারত-পাক সম্পর্ক আজকের মত এত খারাপ হয়নি, তখন পাকিস্তানিরা ভারতীয়দের সঙ্গে রসিকতা করত – শচীন তেন্ডুলকর আর মাধুরী দীক্ষিতকে দিয়ে দাও। আমরা কাশ্মীরের দাবি ছেড়ে দেব।
গতবছর জুবিলি নামের এক ওয়েব সিরিজে গত শতকের পাঁচের দশকের মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে সত্যাশ্রয়ী গল্প ফাঁদা হয়েছিল। সেই প্লট অনুযায়ী, পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতে কমিউনিস্ট প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জন্যে বম্বের সিনেমা জগতের একটা অংশকে অর্থের জোগান দিত। জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন ভারত সরকারও তাতে মদত দিত। সেই প্রকল্পে সায় না দেওয়ায় অন্য এক অংশের ছবির গান অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বাজানো বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারই মোকাবিলায় সেই অংশ মার্কিনি সহায়তায় রেডিও সিলোন থেকে হিন্দি ছবির গান বাজানোর ব্যবস্থা করা হয়। এই কাহিনির কতটা সত্যি কতটা মিথ্যা তা নিয়ে আলোচনা করার মানে হয় না, কারণ নির্মাতারা প্রথমেই হাত ধুয়ে ফেলেছিলেন পর্দায় ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ জাতীয় বিবৃতি দিয়ে। কিন্তু শাস্ত্রে জল থেকে দুধ আলাদা করে খাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন যে রাজহাঁসের কথা আছে, আমরা যদি তেমন করে এই গপ্পোটাকে দেখি, তাহলে বুঝতে পারব – সদ্যস্বাধীন ভারতের হিন্দি ছবির আন্তর্জাতিক আবেদন ছিল। সেই আবেদন আজও অনেকের বুকে জ্বালা ধরায়। ‘সফট পাওয়ার’ কথাটা ইদানীং খুব ব্যবহৃত হয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায়। স্বাধীন ভারতের সফট পাওয়ার কিন্তু প্রথম থেকেই সবচেয়ে বেশি বলিউডি ছবিতেই (বলিউড নামটা অবশ্য অনেক পরে এসেছে)।
উজ্জ্বল গৌরবর্ণ এবং ভারতীয়দের মধ্যে বিরল রঙের চোখের মণির অধিকারী রাজ কাপুরের ছবি যে পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রবল জনপ্রিয় ছিল তা সর্বজনবিদিত। আওয়ারা (১৯৫১) দিনের পর দিন মস্কোর সিনেমা হলে হাউজফুল হত এবং রাজকে দেখতে প্রায় মারামারি লেগে যেত – এরকম একাধিক জবানবন্দি পাওয়া যায়। শ্রী ৪২০ (১৯৫৫) ছবিতে মুকেশের কণ্ঠে রাজের ঠোঁটে ‘মেরা জুতা হ্যায় জাপানি/ইয়ে পাতলুন ইংলিশস্তানী/সর পে লাল টোপি রুশি/ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানী’ যতখানি নেহরুর ভারতের জোট নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিকতাবাদের ঘোষণা, ততটাই আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে পৌঁছবার চেষ্টা। কমিউনিস্ট রাশিয়ায় রাজের বিপুল ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণেই নেহরুর মৃত্যুর ছবছর পরেও মেরা নাম জোকার (১৯৭০) ছবির জন্য একগুচ্ছ রুশ অভিনেতা, অভিনেত্রীকে রাজ ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান লেনিন শিল্পমাধ্যম হিসাবে সিনেমার অমিত শক্তি বিলক্ষণ বুঝতেন। সেই কারণেই সদ্যোজাত কমিউনিস্ট রাষ্ট্র টানাটানির সংসারেও সের্গেই আইজেনস্টাইনের ছবির পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। অনেকটা বামমনস্ক নেহরুও সিনেমার শক্তি বুঝতেন। সেই সময়কার বম্বের তিন প্রধান তারকা – রাজ, দিলীপকুমার আর দেব আনন্দ – নেহরুর প্রিয়পাত্র ছিলেন।
আজকাল পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে বাংলা জাতীয়তাবাদের হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে। সেই জাতীয়তাবাদীরা যুগপৎ আফসোস এবং অভিযোগ করেন যে নেহরু তথা কংগ্রেসের পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই হিন্দি ছবি গোড়া থেকেই আন্তর্জাতিক বাজার পেয়েছে, বাংলা ছবি পায়নি। কথাটার মধ্যে কিছু সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে, তবে ভুললে চলবে না যে বাংলা ছবি কিন্তু নিজগুণে আন্তর্জাতিক বাজার না হোক, বিস্তর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে একসময়। সত্যজিৎ রায় আর মৃণাল সেনের ছবি বিদেশের বিভিন্ন ফিল্মোৎসবে সমাদৃত ও পুরস্কৃত হয়েছে। উত্তমকুমার হিন্দি ছবি করতে গিয়ে মোটেই সফল হননি, কিন্তু নায়ক (১৯৬৬) ছবিতে অভিনয়ের জন্য আন্তর্জাতিক প্রশংসা পেয়েছেন। জীবদ্দশায় প্রাপ্য সম্মান না পাওয়া ঋত্বিক ঘটকের ছবি যত দিন যাচ্ছে তত বেশি করে আলোচিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। বিখ্যাত ফিল্ম পত্রিকা সাইট অ্যান্ড সাউন্ড এখনো ঋত্বিকের ছবি নিয়ে আলোচনা প্রকাশ করে। অর্থাৎ বিশ্বজয় করার নানা পথ আছে এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলেই সব পথ বন্ধ হয়ে যায় না। বিশেষ করে সিনেমার ক্ষেত্রে, যার নিজস্ব ভাষা আছে। সেই ভাষা দিয়ে পৃথিবীর যে কোনো দেশের দর্শককেই মোহিত করা সম্ভব, সিনেমার সংলাপের ভাষা সে বুঝুক আর না-ই বুঝুক।
যেমন বারাক ওবামা হিন্দি জানেন না, কিন্তু শাহরুখ খানের দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে ছবি এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে তার সংলাপ মার্কিন রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে তাঁর কানেও পৌঁছে গেছিল। তিনি (বা তাঁর বক্তৃতালেখকরা) জানতেন যে ভারত সফরে এসে শাহরুখের সংলাপ বললে বড় অংশের ভারতীয়কে মুগ্ধ করে দেওয়া যাবে। নিঃসন্দেহে বলিউড ছবির দৌড় অতদূর হওয়ার পিছনে একটা কারণ অনাবাসী ভারতীয়দের মধ্যে হিন্দিভাষীদের আধিক্য। নয়ের দশক থেকে দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রে বলিউড তাঁদের কথা মাথায় রেখেই ছবি করেছে। শাহরুখেরই একাধিক ছবি আছে যার প্রধান পাত্রপাত্রীরা অনাবাসী ভারতীয়। শাহরুখের ঘনিষ্ঠ বন্ধু করণ জোহর প্রায় আলাদা জঁরই বানিয়ে ফেলেছিলেন অনাবাসী ভারতীয়দের দিকে মুখ করে থাকা ছবির। তা বলে একথা ভাবলে ভুল হবে যে বম্বের ছবি কেবল বিদেশবাসী ভারতীয়রাই দেখে। আমার এক সুইটজারল্যান্ডবাসী বন্ধু গতবছর অ্যাটলি নির্দেশিত শাহরুখের জওয়ান দেখতে গিয়ে ও দেশের আফগান, শ্রীলঙ্কান বাসিন্দাদেরও দেখা পেয়েছিল। তারা তবু এই উপমহাদেশের লোক। ইউরোপ, আমেরিকায় বসবাসকারী ভারতীয়রা অনেকেই হলে হিন্দি ছবি দেখতে গিয়ে শ্বেতাঙ্গদেরও দেখা পায়।
সিনেমা সীমান্ত তো বটেই, রাজনৈতিক বৈরিতার বেড়াও যে টপকাতে পারে তার প্রমাণ পাকিস্তানে হিন্দি ছবির জনপ্রিয়তা। নয়ের দশকে যখন ভারত-পাক সম্পর্ক আজকের মত এত খারাপ হয়নি, তখন পাকিস্তানিরা ভারতীয়দের সঙ্গে রসিকতা করত – শচীন তেন্ডুলকর আর মাধুরী দীক্ষিতকে দিয়ে দাও। আমরা কাশ্মীরের দাবি ছেড়ে দেব। এক দশক আগেও তো পাকিস্তানের ফওয়াদ খান, মাহিরা খানরা বলিউডি ছবিতে অভিনয় করে গেছেন। মাহিরা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাঁর মা যখন জানতে পারেন মাহিরা একটা ছবিতে (রঈস, ২০১৭) শাহরুখের নায়িকা হচ্ছেন তখন তিনি এমন আচরণ করেছিলেন যেন কৃতার্থ হয়ে গেছেন। মাহিরা রসিকতা করে বলেছিলেন – মা এমন করল, মনে হল, আমি যে পাকিস্তানের একজন নামকরা নায়িকা সেটা যেন কিছুই না।
তবে হিন্দি ছবি কতরকম মানুষকে জয় করতে পারে সে সম্পর্কে চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার এক অগ্রজ সাংবাদিকের। বেজিং অলিম্পিক কভার করতে গিয়ে যে অল্পবয়সী চীনা স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে তাঁরা আলাপ হয়, তারা চোস্ত ইংরিজি বলতে পারত না। আবার এই সাংবাদিক মোটেই চীনা ভাষা জানেন না। কিন্তু ওই ছেলেমেয়েরা তাঁর সঙ্গে শাহরুখের ছবি নিয়ে গল্প করত। তিনি কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন, ওরা ওঁর চেয়ে বেশি ছবি দেখেছে শাহরুখের। অথচ চীনে বসে ভারতীয় ছবি দেখা নাকি খুব সহজ কাজ ছিল না সেইসময়, কারণ ইন্টারনেটের উপর সরকারের বিস্তর নজরদারি ছিল। ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ইত্যাদি লাগত। সেসব বাধা পেরিয়েই তারা শাহরুখের ভক্ত হয়েছে। নিজের দেশের যে কোনো ক্ষেত্রে জয়ের কথা শুনতে এবং পড়তে কার না ভাল লাগে? তবে আনন্দ করার সময়ে পা মাটিতে রাখা ভাল। যে জয়ে আমার কোনো কৃতিত্বই নেই তা নিয়ে কলার তোলা আমাদের মজ্জাগত। যেমন এবারের কান ফিল্মোৎসবে নির্দেশক পায়েল কাপাডিয়ার ছবি, কলকাতার মেয়ে অনসূয়া সেনগুপ্তের অভিনয় পুরস্কৃত হওয়ার পরে এগুলোকে ‘ভারতের জয়’ বলে তুলে ধরা হয়েছে। পায়েল যে প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী, সেই ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন কর্তা গজেন্দ্র চৌহান পর্যন্ত ছাত্রীর জন্যে তিনি গর্বিত বলে সোশাল মিডিয়ায় দাবি করেছেন। অথচ পায়েল যখন ছাত্রী ছিলেন, তখন তাঁকে মোটেই আদর করা হয়নি। প্রতিবাদী চরিত্রের ফল হিসাবে এখনো তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলছে। বলিউডের বিশিষ্ট সিনেমাশিল্পী অনুরাগ কাশ্যপ অপ্রিয় সত্য বলার জন্য বিখ্যাত। তিনি বলেই দিয়েছেন, কানে যে ভারতীয়রা পুরস্কৃত হয়েছে তাদের জন্য ভারতের গর্বিত হওয়ার কিছু নেই। পুরো কৃতিত্বই তাদের নিজেদের। কারণ ভারত তাদের জন্য কিচ্ছু করেনি। পায়েলের ছবির প্রযোজনা করেছেন অনেকে মিলে, সকলে ভারতীয় নন। এমনকি ছবিটা ভারতে দেখানোর ব্যবস্থা পর্যন্ত করা যায়নি এখনো।
অদূর ভবিষ্যতে এদেশে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সত্যজিৎও গণশত্রু বলে চিহ্নিত হবেন হয়ত।
চার্লস চ্যাপলিনকে কি সত্যিই অ্যাডলফ হিটলারের মত দেখতে ছিল? একেবারেই না। আসলে চ্যাপলিন দাড়িগোঁফহীন অত্যন্ত সুপুরুষ একজন লোক। বাংলায় যাকে বলে রমণীমোহন, উচ্চতার ব্যাপারটা বাদ দিলে তিনি তাই। বেশিরভাগ ছবিতেই অবশ্য ঐ মাছি গোঁফটাসুদ্ধই চ্যাপলিনকে দেখা যায়; কিন্তু সে চেহারাও চোখের ভাষায়, চুলের ছাঁটে, বেশভূষায় টোমেনিয়ার একনায়ক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেলের থেকে বহুযোজন দূরে। বলাই বাহুল্য যে চ্যাপলিন ইচ্ছে করেই হিঙ্কেলকে হিটলারের আদল দিয়েছিলেন। কিন্তু হিটলার কি হিঙ্কেলের মত হাস্যকর একজন লোক ছিল? তা তো নয়। বেলুন নিয়ে খেলা করার মত ছেলেমানুষি তার ছিল না, পর্দা বেয়ে ওঠার মত জোকারসুলভ কাজও সে করত বলে তার ঘনিষ্ঠ কারোর স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায় না। তাহলে চ্যাপলিন কেন এরকম হাস্যকর করে দেখালেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খুনেটাকে?
দ্য গ্রেট ডিক্টেটর ছবির ৪০ বছর পর মুক্তি পায় হীরক রাজার দেশে। আরেক একনায়কের গল্প। হীরক রাজার চরিত্রে উৎপল দত্তকে মনে করে দেখুন। বিশাল চেহারা, লম্বা গোঁফ, মোটা গলা – বেশ ভয় ধরানো চেহারা। হিঙ্কেলের ঠিক উলটো। কিন্তু মুখের ভাষাটা? প্রথমত সে কথা বলে ছড়া কেটে। যা শুনে হাসি পেতে বাধ্য। দ্বিতীয়ত, উৎপল দত্ত পরে বলেছিলেন, শুটিংয়ের সময়ে সত্যজিৎ রায় তাঁকে বলেন ‘হীরক রাজার সংলাপগুলো গ্রাম্য উচ্চারণে বলো। যারা পড়াশোনা বিশেষ জানে না, তাদের মত। লোকটাকে দর্শকের কাছে হাস্যাস্পদ করে দাও।’
চল্লিশ বছরের ব্যবধানে দুই একনায়ককে পর্দায় দেখাতে গিয়ে দুই জিনিয়াসই দেখালেন হাস্যকর করে, অর্থাৎ ভয়ানক লোকেদের সম্পর্কে ভয় ভেঙে দিলেন। দুই স্রষ্টা একটা ব্যাপারে একমত – একনায়করা সবচেয়ে অপছন্দ করে তাদের নিয়ে হাসাহাসি, কারণ আমাদের ভয়ই তাদের শক্তি। হাসাহাসিতে ভয় কেটে যায়।
চ্যাপলিন বা সত্যজিতের সময়ে ইন্টারনেট ছিল না, মিম ছিল না। ব্যঙ্গ ছিল, শ্লেষ ছিল, একনায়ক ছিল। চ্যাপলিনের সময়ে হিটলার, সত্যজিতের সময়ে ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে, হিটলারের কুকীর্তির সবটা তখনো জার্মানির বাইরের মানুষ জানেন না। কিন্তু দ্রষ্টা চ্যাপলিন ফ্যাসিবাদের বিপদ বুঝেছেন, তাকে নিয়ে প্রবল ঠাট্টা করছেন, বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষকে অন্য ভবিষ্যতের কথা বলছেন। ১৯৮০ সালে সত্যজিৎ যখন হীরক রাজার দেশে আমাদের নিয়ে গেলেন তখন ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ফেরত এসেছেন। ততদিনে বিশ্ববন্দিত পরিচালক ছোটদের দেখার মত রূপকথার এমন এক গল্প নিয়ে এলেন পর্দায়, যাকে উৎপল পরে বলবেন জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে সত্যজিতের প্রতিবাদ। শুধু কি তাই করেছেন সত্যজিৎ? নাকি যে স্রষ্টারা দ্রষ্টা হন, তাঁদের মতই ভবিষ্যতের একনায়কদেরও একহাত নিয়েছেন, ভবিষ্যতের প্রতিবাদীদের ভাষা জুগিয়েছেন?
গত কয়েক বছরে সোশাল মিডিয়ায় যতবার মমতা ব্যানার্জিকে হীরক রানী আর নরেন্দ্র মোদীকে হীরক রাজা বলা হয়েছে, হীরক রাজার সঙ্গে তার সভাসদদের কথোপকথনের অনুকরণে যত পোস্ট তৈরি হয়েছে – তা প্রমাণ করে সত্যজিৎ এখনো আমাদের প্রতিবাদের ভাষা। মৃত্যুর তিন দশক পরেও তাঁর কাজ আমরা ফিরে দেখব কেন? অভ্যাসবশত? না। সত্যজিৎ শুধু অভ্যাসে পরিণত হওয়ার মত শিল্পী নন, তার চেয়ে অনেক বড়। তিনি দারুণভাবে সমকালীন, তাই চিরকালীন। যেমনটা বলেছেন উৎপল, এই বক্তৃতায়
One has a sneaking suspicion that all this talk of Renaissance ideas may well be a ruse to remove from sight the living contemporaneity of Ray’s ideas and relegate him to a museum of ancient statuary which has ceased to bother us now. This suspicion is strengthened when we consider a film like Ray’s Hirak Rajar Deshe (Kingdom of Diamonds, 1980) which was his response to Mrs Gandhi’s Emergency decree. This film in the guise of a fairytale is a blast against all forms of dictatorship which believes in thought-control, prison for the workers, arrests and deportations but which all the while is preparing its own ultimate destruction.
Renaissance is an inadequate term for Ray. He was a moment in the conscience of man.
এই বক্তৃতার উপলক্ষ ছিল সাহিত্য আকাদেমি, সঙ্গীতনাটক আকাদেমি আর ললিতকলা আকাদেমির যৌথ প্রচেষ্টায় আয়োজিত এক সেমিনার। সত্যজিৎ মারা যাওয়ার ১৩ দিন পরে। মৃত্যুর পর সমস্ত সরকারি মহল থেকে – দূরদর্শনে, রেডিওতে, এমনকি এই সেমিনারে বিলি করা কাগজেও তাঁকে উল্লেখ করা হচ্ছিল “representative of Indian Renaissance” বলে। সেই তকমার বিরুদ্ধে এখানে গর্জে উঠেছেন উৎপল। বলছেন এটা আসলে প্রতিবাদীর প্রতিবাদী চরিত্র ভুলিয়ে দেওয়ার সরকারি চক্রান্ত। ভারতীয় রেনেসাঁ আবার কী জিনিস? খায় না মাথায় দেয়? ঐতিহাসিকরা যেটার কথা বলতেন তা হল বাংলার রেনেসাঁ – হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও আর তাঁর ছাত্রদের দিয়ে যার শুরু আর রবীন্দ্রনাথে যার পূর্ণতা। কিন্তু সেটাও রেনেসাঁ বলতে যা বোঝায়, সেই স্তরে পৌঁছয়নি। সমাজের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে নতুন সমাজ গড়া হয়নি। তাই পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকরা এর নাম দিয়েছেন বাংলার সংস্কার আন্দোলন। কিন্তু সত্যজিৎ শুধু সেই সংস্কারের সন্তান নন, তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি।
তাহলে? আজ সত্যজিতের জন্মদিনে আমরা, আত্মবিস্মৃত বাঙালিরা, তাঁকে স্মরণ করব কি শুধু মোদী, মমতার বিরুদ্ধে তিনি আমাদের মিম বানানোর সুযোগ দিয়েছেন বলে? আজকে আমাদের সামনে, গোটা ভারতের সামনে, গোটা পৃথিবীর সামনে কি দুটো মাত্র বিপদ – মোদী আর মমতা? তা তো নয়। গোটা পৃথিবী জুড়েই এখন একনায়কত্বের উত্থানের যুগ। ভারতে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী নরেন্দ্র মোদীর চেহারায়, ইজরায়েলে হানাদারি বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর চেহারায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্পোরেট মুঘল ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেহারায়, রাশিয়ায় যুদ্ধবাজ জাতীয়তাবাদী ভ্লাদিমির পুতিনের চেহারায়, তুরস্কে রচপ তায়িপ এর্দোগানের চেহারায়। এই লড়াইয়ে আমাদের ভাষা যোগাতে পারেন কি সত্যজিৎ?
যতবার হীরক রাজার দেশে দেখি ততবার মনে হয় সারাজীবনে এমন বৈপ্লবিক ছবি সত্যজিৎ আর বোধহয় বানাননি। বিজ্ঞানের উপর আক্রমণের প্রতিবাদে খোদ মার্কিন মুলুকে বিজ্ঞানীরা মিছিল করেছিলেন ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে। এদেশেও বিজ্ঞানীরা এবং বিজ্ঞানচর্চা আক্রমণের মুখে পড়েছে প্রবলভাবেই, যতই চন্দ্রযান আর মঙ্গলযান পাঠানো হোক মহাকাশে। আমাদের দেশে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অপবিজ্ঞানের চর্চা চালু করা হচ্ছে। মোদীরাজের প্রথম দিকে বিজ্ঞান কংগ্রেসে আলোচনা হত প্রাচীন ভারতের পরমাণু বোমা নিয়ে, ক্রমশ বিজ্ঞান কংগ্রেস বন্ধই করে দেওয়া হল। এখন রামলালার কপালে সূর্যতিলক এঁকে দেওয়াই বিজ্ঞানের বিরাট অর্জন বলে প্রচার করা হচ্ছে। এক বাবাজি করোনার ওষুধ, ক্যান্সারের ওষুধ – সবই আবিষ্কার করে ফেলেছেন, এমন অবৈজ্ঞানিক দাবি করে কোটিপতি হয়ে যান সরকারি মদতে।
এদিকে পিএইচডি স্কলারদের ভাতা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, প্রতিবাদের ঘাঁটি জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ধাক্কায় আটশোর কাছাকাছি পিএইচডি আসন লোপ করে দেওয়ার ঘটনাও বাসি হয়ে গেছে। কারণ ‘এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।’ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালা। দিনের পর দিন কারারুদ্ধ থাকছেন জিএন সাইবাবার মত অধ্যাপক আর উমর খালিদের মত ছাত্ররা। বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই যে অতিকায় সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি আসলে কার মূর্তি। আমাদের গোটা দেশটাই এখন মূর্তির মাঠ।
কিন্তু হীরক রাজার দেশে আটকে থাকলে ভুল করবেন। ১৯৫৫ সালের পথের পাঁচালী থেকে ১৯৯১ সালের আগন্তুক পর্যন্ত ওই একটিমাত্র ছবিই সত্যজিৎ করে গেছেন যা এই দুঃসময়ে আমাদের সম্বল – তা নয়। মনে রাখবেন, সত্যজিৎ সেই পরিচালক যাঁর প্রথম ছবি দেখে এক রাষ্ট্রপতি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন পর্দায় এত দারিদ্র্য দেখালে বিশ্বের কাছে দেশের অসম্মান হবে না? সত্যজিতের সপাট প্রতিপ্রশ্ন ছিল ‘দেশে এত দারিদ্র্য আছে সেটা সহ্য করা যদি আপনার পক্ষে অন্যায় না হয়, আমার পক্ষে সেই দারিদ্র্য দেখানো অন্যায় হবে কেন?’ একের পর এক দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডা ছবির যুগে, ইন্টারনেট ট্রোলদের প্রশ্নের মুখে এমন শিল্পীই তো আমাদের ধ্রুবতারা।
তিনি মারা যান ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে আর ধর্মান্ধ রাজনীতি এদেশে সবচেয়ে বড় সাফল্য পায় ডিসেম্বরে – বাবরি মসজিদ ভেঙে। তার ঠিক ৩২ বছর পরে, আজ, ধর্মান্ধতা এদেশে ফ্যাশনে পরিণত। বাবারা জাঁকিয়ে বসেছেন, দিনকে রাত রাতকে দিন করছেন, গোমূত্র দিয়ে ক্যান্সার সারানোর নিদান দিচ্ছেন, মুখ্যমন্ত্রীও হয়ে বসছেন। লেখাপড়া না জানা, গাঁইয়া, গরীব মানুষ নয়; এই বাবাদের ভক্ত এবং শক্তি সম্ভ্রান্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিপ্রাপ্ত ক্ষমতাশালীরা। মনে পড়ে না বিরিঞ্চিবাবার ভক্তদের? কিন্তু এহেন মহাপুরুষরা শেষ কথা বলেন না। যদি ভরসা হারিয়ে ফেলে থাকেন, একবার দেখুন, বারবার দেখুন কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫)। যমুনাবক্ষে মোচ্ছব করে নদীর বারোটা বাজান এক বাবা আর তাঁর কাছে উপঢৌকন হিসাবে সরকারি আশীর্বাদ নিয়ে পৌঁছন রাষ্ট্রনেতা, দেশের শ্রেষ্ঠ ধনীরা। আমার-আপনার নিরাপত্তার জন্য তৈরি সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হয় ব্যক্তিগত ভৃত্যবাহিনী হিসাবে। মনে হয় না, আমাদের যদি একজন ফেলুদা থাকত, যে বাবাকে গারদে পাঠিয়ে, ধনী ভক্তকে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড় করিয়ে সার্কাসের খেল দেখাত, তবে বেশ হত?
আমরা কি হঠাৎ পৌঁছেছি এই অন্ধকার সময়ে? এক হ্যাঁচকা টানে সংঘ পরিবার আমাদের প্রগতিশীল সমাজকে উল্টোদিকে টেনে নিয়ে গেছে? না। ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ে ফাঁকি ছিল বরাবর। ছিল বলেই ১৯৮৭ সালেও রূপ কানোয়ার সতী হয়, শাস্তি হয় না একজনেরও। ছিল বলেই শাহ বানো সুবিচার পাননি, এত বছর পরেও তিন তালাককে হাতিয়ার করে মুসলমান বিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছে হীরক রাজার লোকেরা। ধর্মের হাতে মেয়েদের এহেন লাঞ্ছনার কালে, অ্যান্টি-রোমিও স্কোয়াডের নামে, লাভ জিহাদের নামে মেয়েদের অধিকারকে অস্বীকার করার দিনে মনে না পড়ে উপায় নেই সত্যজিতের ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি দেবী। সেখানে জমিদার বাড়ির তরুণী বউ দয়াময়ীকে কালীভক্ত শ্বশুরের অন্ধবিশ্বাসের ভারে দেবী হয়ে উঠতে হচ্ছে, যার পরিণতি তার সাজানো জীবন তছনছ হয়ে যাওয়ায়।
বারবার উৎপলের যে বক্তৃতার উল্লেখ করছি, এই অন্ধকারে সত্যজিৎকে খুঁজতে গিয়ে যে বক্তৃতা আমাদের জোরালো টর্চ হতে পারে, সেখানে দেবী সম্পর্কে উৎপল বলছেন
“A proper tribute to Ray would have been… to make arrangements for Devi to be shown all over the country at cheaper rates. Devi is a revolutionary film in the Indian context. It challenges religion as it has been understood in the depths of the Indian countryside for hundreds of years. It is a direct attack on the black magic that is passed off as divinity in this country. Instead of the vulgarized Ramayana and Mahabharata, the Indian TV could have telecast Devi again and again; then perhaps today we would not have to discuss the outrages of the monkey brigade in Ayodhya.”
বুঝতেই পারছেন হীরক রাজার কত বড় শত্রু আমাদের সত্যজিৎ। অদূর ভবিষ্যতে এদেশে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সত্যজিৎও গণশত্রু বলে চিহ্নিত হবেন হয়ত। এমন একজন গণশত্রুকে আমরা এখন গোয়েন্দায় বেঁধে রাখলে তা হবে রবীন্দ্রনাথের সেই গানটার মত – তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি।
জওয়ান ছবিতে শাহরুখ অভিনীত একটা চরিত্রের নাম আজাদ। সে মেয়েদের নিয়ে নিজের এক ফৌজ গড়ে তোলে। সে ফৌজের লক্ষ্য দেশের ভাল করা। এক অর্থে আজাদ হিন্দ ফৌজই বটে।
অসংখ্য ছবি হয়, তাই বহু মানুষ নায়ক হন। তাঁদের অনেকেই জনপ্রিয় হন, কিন্তু মাত্র কয়েকজন এমন উচ্চতায় পৌঁছন যে নিজের ইন্ডাস্ট্রিটাকে কাঁধে তুলে নিতে পারেন – একসময় টলিউডকে যেভাবে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন উত্তমকুমার। আরও কম সংখ্যক শিল্পী এত বড় হয়ে ওঠেন যে সিনেমাজগৎ ছাড়িয়ে যে সমাজে, যে দেশে দাঁড়িয়ে আছেন তাকে প্রভাবিত করতে পারেন। পারলেও সাহস করে সে দায়িত্ব পালন করেন আরও কম শিল্পী। এমনকি উত্তমকুমারও পালন করেননি। তাঁর সময়ের পশ্চিমবঙ্গে ঘটে চলা রাজনৈতিক, সামাজিক সংঘর্ষ কোনোদিন তাঁর ছবিতে ঢেউ তোলেনি। সরোজ দত্তের হত্যাও কোনোদিন তাঁর কাজে উঁকি মারেনি। শাহরুখ খান সেই বিরল শিল্পী যিনি দুঃসময়ে দাঁড়িয়ে এই দায়িত্ব পালন করলেন জওয়ান ছবিতে। তিনি যখন অতখানি সাহস করেছেন, তখন আমি সামান্য সাহস দেখাই। বলেই ফেলি – এই ছবি একবার দেখার ছবি নয়, বলিউডের ইতিহাসে মাইলফলক হিসাবে যে ছবিগুলোকে ধরা হয় তাদের পাশে জায়গা হবে এই ছবির। যদি ভারত বা ইন্ডিয়া নামের দেশটা বাঁচে, আমার মৃত্যুর বহুকাল পরে এবং যাঁরা এ লেখা পড়ছেন তাঁদের সকলের মৃত্যুর পরেও মেহবুব খানের মাদার ইন্ডিয়া ছবির সঙ্গে এক বাক্যে উচ্চারিত হবে অ্যাটলির এই ছবির নাম।
না, সিনেমাবোদ্ধারা ‘মাস্টারপিস’ বলতে যা বোঝেন এ ছবি তার ত্রিসীমানায় যায়নি। এমন একটা শটও নেই যা স্রেফ দৃশ্য হিসাবেই সিনেমাবোদ্ধার চোখে লেগে থাকবে। এ ছবিতে আর পাঁচটা নাচ-গান-মারামারির ছবির মতই গাড়ি উড়ে গিয়ে পড়ে, নায়ক একাই জনা বিশেক দুর্বৃত্তকে শেষ করে দেন। এসব অপছন্দ হলে বা ঘন্টা তিনেকের জন্য বিশ্বাস করে নিতে আপত্তি থাকলে (যাকে শিল্প সমালোচনার ভাষায় সাহেবরা বলে “willing suspension of disbelief”, অর্থাৎ স্বেচ্ছায় অবিশ্বাস স্থগিত রাখা) এ ছবি না দেখাই শ্রেয়। কিন্তু ঘটনা হল এ ছবি যে ঘরানার, সেই ঘরানায় এগুলো অবাস্তব নয়। নির্দেশক অ্যাটলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রযোজক গৌরী খান আর শাহরুখ কোনো চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার জিতবেন বলে ছবি করেননি। এখানে তাঁদের লক্ষ্য যত বেশি সম্ভব দর্শকের কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দেওয়া। সেই বার্তা দিতে তাঁরা সেই চলচ্চিত্রভাষাই ব্যবহার করেছেন যে ভাষা তাঁরা গুলে খেয়েছেন এবং এ দেশের আপামর দর্শক যার সঙ্গে কয়েক প্রজন্ম ধরে পরিচিত। এ “ভাষা এমন কথা বলে/বোঝে রে সকলে/ উঁচা নিচা ছোট বড় সমান।” তাহলে এমন কী করা হল এই ছবিতে, যার জন্য বলছি এই ছবি বলিউড ছবির মাইলফলক? সেই আলোচনায় আসব। শুরুতেই বলে দিই, সাদা চোখে অন্তত চারটে স্তর দেখতে পেয়েছি এই ছবির। সেই স্তরগুলোর আলোচনাই আলাদা আলাদা করে করব। কেউ আরও বেশি স্তরের খোঁজ পেতে পারেন, যদি তাঁর উঁচু নাক, চোখ ছাড়িয়ে মস্তিষ্ককেও ঢেকে না ফেলে।
প্রথম স্তর:ইশতেহার
এই স্তর নিয়েই সবচেয়ে কম শব্দ খরচ করব। কারণ ছবির মুক্তির দিনই ভাইরাল হয়ে যাওয়া ক্লিপের দৌলতে সবাই জেনে ফেলেছে কীভাবে সরাসরি শাহরুখ দেশের মানুষের উদ্দেশে গণতন্ত্রের সার কথাগুলো বলেছেন, যা অনেকের মতেই দেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বার্তা। কিন্তু ওই ক্লিপটাই শেষ কথা নয়। আসলে জওয়ান এক আদ্যন্ত রাজনৈতিক ছবি। আমরা প্রায় ভুলে গেছি যে রাজনীতি মানে শুধু এই দল আর ওই দল নয়। পরিচালক অ্যাটলি আর শাহরুখ দলাদলি বা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বাইরেও যতরকম রাজনীতি আছে প্রায় সবকটা নিয়ে দর্শককে ভাবতে বাধ্য করেছেন। লিঙ্গ রাজনীতি থেকে পরিবেশ রাজনীতি – সবই এই ছবির বিষয়বস্তু।
নব্য উদারবাদী অর্থনীতির যুগে, ভারতের ইতিহাসে ক্রোনি পুঁজিবাদের সেরা সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জনপ্রিয়তম তারকার ছবিতে খলনায়ক হিসাবে দেখানো হল একজন শিল্পপতিকে। কালী গায়কোয়াড় (বিজয় সেতুপথী) সমস্তরকম পরিবেশ সংক্রান্ত নিয়মকানুনকে কাঁচকলা দেখিয়ে কারখানা তৈরি করেন, অনুমতি না পাওয়া গেলে মানুষ খুন করতেও দ্বিধা করেন না। স্থানীয় মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর হওয়ায় গোটা পঞ্চাশেক কারখানায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হল – ভারতের বহু এলাকার মানুষের এই ইচ্ছাপূরণের দৃশ্যও দেখিয়ে দিয়েছেন অ্যাটলি। শুধু এই কারণেই জওয়ানকে ঐতিহাসিক বলতে দ্বিধা থাকার কথা নয়। তবে যে কথা কেউ বলছেন না, তা হল এই ছবি শুধু নানাভাবে বিজেপিকে আক্রমণ করেনি। এ ছবিতে শুধু গৌতম আদানি বা নরেন্দ্র মোদীর ছায়া পড়েনি, রেয়াত করা হয়নি কংগ্রেস আমলকেও। এসে পড়েছে ১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, ছায়া পড়েছে বোফর্স কেলেঙ্কারিরও।
সূক্ষ্মতর রাজনৈতিক প্রসঙ্গ পরবর্তী স্তরগুলোর আলোচনায় আসবে। আপাতত এটুকু বলে শেষ করা যাক যে সম্ভবত এতখানি সোচ্চার রাজনীতি শাহরুখের ছবিতে এসে পড়তে পারত না প্রযোজক হিসাবে তামিল ছবির নির্দেশককে না নিলে। ইদানীং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দৌলতে এবং বেশকিছু ছবি হিন্দিতে ডাব হয়ে বিশ্বজুড়ে মুক্তি পাওয়ার ফলে আমরা জানি যে তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম ভাষার ছবিতে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে আনা বা রাজনীতিকেই কেন্দ্রে বসিয়ে দেওয়া চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে জলভাত। সে রজনীকান্তের নাচ-গান-মারামারির ছবিই হোক, আর জয় ভীম কিম্বা কান্তারা। দক্ষিণ ভারতের ছবির এই গুণ বলিউডি ব্লকবাস্টারে নিয়ে আসা হল।
দ্বিতীয় স্তর: ভারততীর্থ
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষকে ‘আমাদের’ মত দেখতে নয়, সুতরাং ‘ওরা’ ভারতীয় নয়। এই ধারণা আমাদের অনেকেরই চেতনে বা অবচেতনে বদ্ধমূল। দেশের রাজধানী দিল্লিতে অনবরত ওঁদের ‘চিঙ্কি’ শব্দটা শুনতে হয়। কলকাতার লোকেরা অনেক বেশি পরিশীলিত, বুদ্ধিমান। তাই ‘নাক চ্যাপটা’ ইত্যাদি কথাগুলো ওঁদের সামনে বলা হয় না, একান্ত আলোচনায় হয়। মণিপুর যে ভারতের মধ্যে পড়ে না তার প্রমাণ তো গত তিন মাসে ভারত সরকারের আচরণেই পাওয়া যাবে। অথচ এ ছবি শুরুই হয় চীনের সীমান্তবর্তী অরুণাচল প্রদেশে। নায়কের প্রাণ বাঁচে প্রত্যন্ত এলাকার গ্রামে, আধুনিক চিকিৎসার সুযোগসুবিধা থেকে বহু দূরে আদিবাসী চিকিৎসা পদ্ধতিতে। সারা দেশকে যখন রামভক্ত হতে বাধ্য করা হচ্ছে, তখন মরণ হতে নায়ক জেগে ওঠেন ভীষণদর্শন, বাকি ভারতের কাছে অনেকাংশে অপরিচিত, বৌদ্ধ দেবতা মহাকালের মূর্তির সামনে গ্রামের মানুষের কাতর প্রার্থনায়। চীনা সেনাবাহিনীর অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করেন গ্রামকে (জাতীয়তাবাদী সেন্সর বোর্ডের সদস্যরা বোধহয় ওখানেই কাত। বাকি ছবিতে তাঁদের পক্ষে আপত্তিকর যা কিছু দেখানো হয়েছে, ক্ষমাঘেন্না করে দিয়েছেন)।
প্রান্তিক, সংখ্যালঘু মানুষকে কাহিনির কেন্দ্রে স্থাপন করার এই ধারা বজায় থেকেছে গোটা ছবি জুড়ে। অরুণাচলের ওই গ্রামের এক বাসিন্দা চিত্রনাট্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গত শতকের আটের দশক পর্যন্তও হিন্দি ছবিতে আমরা যা দেখে অভ্যস্ত ছিলাম, সেই ধারা মেনে এই ছবিতে শাহরুখের ঘনিষ্ঠরা সবাই ভারতের নানা সংখ্যালঘু বা নিপীড়িত সম্প্রদায়ের মানুষ। মুসলমান, শিখ, গরিব কৃষক পরিবারের সন্তান অথবা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষ। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের আগে পর্যন্ত হিন্দি ছবিতে নায়ক হিন্দু হলেও তার প্রাণের বন্ধু হবে একজন মুসলমান – এটা প্রায় নিয়ম ছিল। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের পর থেকে হিন্দি ছবির মুসলমানরা হয়ে গেলেন দুরকম – হয় সন্ত্রাসবাদী, নয় অতিমাত্রায় দেশভক্ত পুলিসকর্মী বা সৈনিক। যে ভারততীর্থের স্বপ্ন দেখতেন রবীন্দ্রনাথ, তা বাস্তবে না থাক, অন্তত বলিউডি ছবিতে দেখা যেত। বহুকাল পরে এই ছবিতে ফেরত এসেছে।
আজকের ভারতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত যেসব জনগোষ্ঠী, তাদের মধ্যে অবশ্যই পড়েন মেয়েরা। শুধু যে অনেক জায়গায় ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি জলভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে তা নয়। এতকাল ধরে অর্জিত মেয়েদের সামাজিক অধিকারগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলাও আরম্ভ হয়ে গেছে। জিনস পরা, চাউমিন খাওয়া খারাপ মেয়ের লক্ষণ – এমন হাস্যকর কথা বলার পাশাপাশি বিরুদ্ধ মতের মহিলাদের কুৎসিত ভাষায় সংগঠিত ট্রোলিং, বেছে বেছে মুসলমান মেয়েদের অনলাইন নিলাম – এসবও চালু হয়েছে। ক্রমশ পিছন দিকে হাঁটতে থাকা, বিষাক্ত পৌরুষের উদযাপনে জবজবে এই ভারতে শাহরুখ তাঁর অতিমানবিক কাজকর্ম করেন এক দল মেয়েকে নিয়ে। তাঁর দুই নায়িকার এক নায়িকা ঐশ্বর্য (দীপিকা পাড়ুকোন) কুস্তিতে তুলে আছাড় মারেন শাহরুখকে। অন্য নায়িকা নর্মদা (নয়নতারা) একজন কুমারী মা। ‘ভারতমাতা কি জয়’ বলা যে দেশে ফ্যাশন সে দেশে ‘মা’ শব্দের অনুষঙ্গে মুসলমানবিদ্বেষের বিরুদ্ধে বার্তাও দেওয়া হয়েছে ছবির গোড়ার দিকেই। কীভাবে? সে আলোচনায় যাব না, কারণ তাতে স্পয়লার দেওয়া হবে।
এমন ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা’ বলিউডি ছবিতে আর কখনো দেখা যাবে না – এ আশঙ্কা গত দু-তিন দশকে জোরালো হয়ে উঠেছিল, এখনো সে আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আসমুদ্রহিমাচলকে ৫৭ বছর বয়সেও উদ্বেল করতে পারা নায়ক অন্তত শেষবার করে দেখালেন।
তৃতীয় স্তর: বলিউড অমনিবাস
অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, প্রস্থেটিক মেক আপ, ঝাঁ চকচকে সেট সত্ত্বেও এই ছবির আত্মার খোঁজ করলে দেখা যাবে সেটা জওহরলাল নেহরুর আমলের বিনোদনমূলক অথচ সামাজিক বার্তা দেওয়া, এমনকি ভেদাভেদহীন দেশ গঠনের, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখানো ছবির আত্মা।
মনে রাখা ভাল যে নেহরু-ঘনিষ্ঠ রাজ কাপুর, দিলীপকুমার, দেব আনন্দরা সেই হিন্দি সিনেমার মুখ হলেও চিত্রনাট্য, পরিচালনা, গান লেখা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় স্বমহিমায় ছিলেন ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত একগুচ্ছ মানুষ। অর্থাৎ হিন্দি সিনেমা শাসন করতেন নেহরুর মত নরম সমাজবাদীর কাছের লোকেরা আর সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষ। ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে ক্রমশ সেই প্রভাব কমতে শুরু করে। ভারতীয় বামপন্থীরা ক্রমশ যাহা জনপ্রিয় তাহাই নিকৃষ্ট – শিল্প সম্পর্কে এই অবৈজ্ঞানিক ধারণায় নিজেদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেন। যেহেতু এ দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় বলিউড, সেহেতু ওটাই যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট তাতে আর সন্দেহ কী? ফলে বামপন্থীরা বলিউড দখলে রাখার কথা স্বপ্নেও ভাবেননি। বলিউড যে দেশের গরিবগুরবো মানুষের ভাবনা তৈরি করায় বড় ভূমিকা নেয় সেসব তাঁরা বোঝেননি। তবু দেশের রাজনীতির সার্বিক ঝোঁক বাঁদিকে ছিল বলে এবং বলিউডে একদা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের তখনো উপস্থিতি ছিল বলেই হয়ত আটের দশকেও রেলের কুলিকে নায়ক বানিয়ে ছবি হয়েছে এবং কুলি (১৯৮৩) ছবির পোস্টারে দেখা গেছে অমিতাভ বচ্চনের হাতে কাস্তে, হাতুড়ি – একেবারে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতীক যে বিন্যাসে থাকে সেই বিন্যাসেই।
কিন্তু শাহরুখ যতদিনে বলিউডে এসেছেন ততদিনে সেসব প্রভাব প্রায় অদৃশ্য। দেশের রাজনীতিও ডানদিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। ১৯৯১ সালে নেহরুর সমাজবাদকে তাঁর দলই আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলে বাজার অর্থনীতি চালু করে। পরের বছর জুন মাসে মুক্তি পায় শাহরুখের প্রথম ছবি দিওয়ানা। তার ছমাসের মধ্যেই ধূলিসাৎ করা হয় বাবরি মসজিদকে। হিন্দি সিনেমা থেকে ক্রমশ উধাও হতে শুরু করে গরিব, মধ্যবিত্ত। তারপর থেকে নায়করা বিত্তশালী। প্রাসাদোপম বাড়ি, গাড়ি, নিজস্ব হেলিকপ্টার, অনেকে আবার অনাবাসী ভারতীয়। অথচ সাবেকি হিন্দু ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি সেই নায়করা ভারি বিশ্বস্ত। মেয়ের বাবার অমতে প্রেমিকাকে বিয়ে করে না। অন্তরঙ্গ মেয়ে বন্ধু প্যান্ট পরলে, খেলাধুলো করলে তাকে বিয়ে করার যোগ্য মনে করে না। করে যখন সে ‘মেয়েলি’ হয়ে যায় তখন। পালক পিতা নিজের পরিবারের চেয়ে নিচু শ্রেণির মেয়েকে বিয়ে করতে চাওয়ায় বাড়ি থেকে বার করে দিলেও শ্রদ্ধা টোল খায় না। শাহরুখ নিজের সেরা সময়ে সেইসব ছবিতেই অভিনয় করে এসেছেন। আজ, তিন দশকের বেশি সময় ইন্ডাস্ট্রিতে কাটানোর পর যখন নিজের মনোমত সিনেমায় অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছেন, তখন কিন্তু শাহরুখ দেখালেন নেহরুর আমলের হিন্দি ছবি। একেবারে প্রান্তিক অবস্থানে জন্ম নেওয়া, ছোটবেলাতেই অনাথ নায়ক। নিশ্চয়ই সমাপতন নয় যে এই ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছে ১৯৬২ সালে মুক্তি পাওয়া বিস সাল বাদ ছবির দারুণ জনপ্রিয় গান ‘বেকরার কর কে হমে য়ুঁ ন যাইয়ে’ আর ১৯৫৫ সালের রাজ কাপুর অভিনীত শ্রী ৪২০ ছবির ‘রামাইয়া ওয়স্তাওয়ইয়া’।
এখানেই শেষ নয়। বস্তুত, যদি আপনার স্মৃতি ঠিকঠাক কাজ করে, জওয়ান ছবির মধ্যে আপনি দেখতে পাবেন বলিউডের এতকালের কিছু আইকনিক ছবিকে। শাহরুখের চরিত্রে খুঁজে পাবেন তাঁর পূর্বসূরিদের। জিস দেশ মেঁ গঙ্গা বহতি হ্যায় (১৯৬০) ছবির রাজ কাপুর, আরাধনা (১৯৬৯) ছবির রাজেশ খান্না, দিওয়ার (১৯৭৫) ছবির শশী কাপুর, শাহেনশাহ (১৯৮৮) ছবির অমিতাভকে খুঁজে পেতে খুব অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। যাঁরা দেখে ফেলেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন জওয়ানের শরীরে শোলে (১৯৭৫) ছবির চিহ্নগুলোও। বলা বাহুল্য, শাহরুখ মাঝেমধ্যেই উস্কে দিয়েছেন নিজের রোম্যান্টিক নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করা ছবিগুলোর স্মৃতিও।
অথচ যা নেই তা হল এই শতকের হিন্দি ছবির কোনো প্রভাব, কোনো সংযোগ। মধ্যবিত্ত ঘর থেকে উঠে আসা আদর্শবাদী পুলিস অফিসারকে হিন্দি ছবিতে আমরা শেষ দেখেছি সম্ভবত মনোজ বাজপেয়ী অভিনীত শূল (১৯৯৯) ছবিতে। এই শতকের বলিউডি পুলিস অফিসার মানেই তো ট্রিগারমত্ত, যা আজকের বুলডোজার রাজের মঞ্চ তৈরি করেছে। অব তক ছপ্পন (২০০৪) ছবির নানা পাটেকর, শুটআউট অ্যাট লোখাণ্ডওয়ালা (২০০৭) ছবির সঞ্জয় দত্ত, সুনীল শেঠি, আরবাজ খানরা আইন-আদালতের ধার ধারেন না। তাঁরা ‘শুট টু কিল’ নীতিতে বিশ্বাসী। আর আছেন দাবাং সিরিজের সলমান খান, সিঙ্ঘম সিরিজের অজয় দেবগনরা। জওয়ান ছবির পুলিস অফিসার কিন্তু একেবারেই গত শতকের হিন্দি ছবির পুলিস অফিসারদের মত। সমাপতন কিনা জানি না, উইকিপিডিয়া বলছে শূল ছবিটার স্বত্ব এখন গৌরী-শাহরুখের রেড চিলিজ এন্টারটেনমেন্টের হাতেই। এ ছবিতে অবশ্য আছেন এক দেশপ্রেমিক বিক্রম রাঠোর, যাঁর মানুষ খুন করতে হাত কাঁপে না। কিন্তু তিনি অক্ষয় কুমার অভিনীত রাউডি রাঠোর (২০১২) ছবির সমনামী নায়কের মত পুলিস অফিসার নন। তরুণ নির্দেশকের হাত ধরে প্রবীণ শাহরুখ বোধহয় বুঝিয়ে দিলেন তিনি কোন ধরনের ছবির পক্ষে।
বামপন্থীরা বলিউডকে অবজ্ঞা করেছিলেন, দক্ষিণপন্থীরা করেনি। তাই ক্রমশ তাদেরই হাতে চলে যাচ্ছে ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যমের রাশ। ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যায় সাজানো প্রোপাগান্ডা ছবি তৈরি হচ্ছে। কাশ্মীর ফাইলস, কেরালা স্টোরি-র পর আসছে দ্য ভ্যাক্সিন ওয়ার। ২০২৪ সালে বিজেপি ফের জয়যুক্ত হলে বলিউডি ছবিকে যে আর চেনাই যাবে না তাতে সন্দেহ নেই। জওয়ানের গুরুত্ব সেক্ষেত্রে হয়ে যাবে দ্বিগুণ, কারণ এই একখানা ছবিতে ধরা রইল হিন্দি ছবির সেই সমস্ত বৈশিষ্ট্য যা তাকে স্বাধীনোত্তর ভারতের অন্যতম ঐক্য বিধায়ক করে তুলেছিল। এমনি এমনি জওয়ানকে মাইলফলক বলিনি। এখানেই অবশ্য বলতে হবে এই ছবির একমাত্র ব্যর্থতার কথা। সমস্ত আইকনিক হিন্দি ছবির প্রাণ ছিল গান। সঙ্গীত পরিচালক অনিরুধ রবিচন্দর কিন্তু গানগুলোকে সেই উচ্চতার ধারে কাছে নিয়ে যেতে পারেননি। এমন একটা গানও নেই যা মনে গেঁথে যায়।
চতুর্থ স্তর: যা ব্যক্তিগত তাই সর্বজনীন
ছবির আলোচনায় এখন পর্যন্ত একবারও শাহরুখের চরিত্রের নাম করিনি। তার একটা কারণ অবশ্যই স্পয়লার দিতে না চাওয়া। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় কারণ ছবিটা নিজে। এখানে ব্যক্তি শাহরুখ একাধিকবার চরিত্রের খোলস ত্যাগ করে বেরিয়ে এসেছেন। প্রসেনিয়াম থিয়েটারে চরিত্রের দর্শকাসনে নেমে আসার মত ব্যতিক্রম ঘটিয়ে একেবারে শেষ পর্বে যে তিনি পর্দার বেড়া ভেঙে সরাসরি দর্শকদের উদ্দেশে কথা বলার উপক্রম করেছেন তা তো সবাই জেনেই গেছেন। কিন্তু তার আগেই বেশ কয়েকবার যখনই ক্যামেরা তাঁকে ক্লোজ আপে ধরেছে, তিনি ভক্তদের উদ্বেল করে দেওয়ার মত কোনো অঙ্গভঙ্গি করেছেন, তখন নেপথ্যে ঝাঁ ঝাঁ করে বেজেছে কয়েকটা কলি যার সবটা বুঝতে পারা শক্ত। বোঝার আগ্রহও প্রেক্ষাগৃহের কারোর তেমন ছিল না। এটুকুই যথেষ্ট যে তার মধ্যে ‘কিং খান’ কথাটা ছিল। শাহরুখ অভিনীত চরিত্রের নামে কিন্তু খান নেই।
এইভাবে নিজের ব্যক্তিসত্তাকে সামনে এনেছেন বলেই, না ভেবে উপায় থাকে না যে নিজের ব্যক্তিজীবনকে এই ছবির আখ্যান বোনার সুতো হিসাবে ব্যবহার করেছেন শাহরুখ। তাঁর ভক্তরা নিশ্চয়ই জানেন, যাঁরা জানেন না তাঁরা ফরীদা জালালের নেওয়া এই সাক্ষাৎকার শুনলে জানতে পারবেন যে শাহরুখের বাবা মীর তাজ মহম্মদ খান স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের জেনারেল শাহনওয়াজ খান মীরের ঘনিষ্ঠ এবং আত্মীয়।
জওয়ান ছবিতে শাহরুখ অভিনীত একটা চরিত্রের নাম আজাদ। সে মেয়েদের নিয়ে নিজের এক ফৌজ গড়ে তোলে। সে ফৌজের লক্ষ্য দেশের ভাল করা। এক অর্থে আজাদ হিন্দ ফৌজই বটে। মজার কথা, এ দেশের ইতিহাসে সেনাবাহিনীতে মেয়েদের নিয়ে আলাদা ব্রিগেড গড়ে তোলার ঘটনা আজাদ হিন্দ ফৌজেই প্রথম। নেতাজি সুভাষচন্দ্রের রানী লক্ষ্মীবাঈ ব্রিগেডের সঙ্গে শাহরুখের মহিলা ব্রিগেডের আরও একটা সাদৃশ্য ছবিটা দেখামাত্রই ধরা পড়বে। সেকথা উহ্য রাখলাম স্পয়লার দেব না বলেই।
শাহরুখের একখানা সংলাপ নিয়ে বিজেপিবিরোধীরা বিশেষ উল্লসিত এবং বলা হচ্ছে ওটা তাঁর ছেলে আরিয়ানকে যারা গ্রেফতার করেছিল তাদের উদ্দেশে বলা – ‘বেটে কো হাথ লগানে সে পহলে বাপ সে বাত কর’। এমন হওয়া অসম্ভব নয় যে সেকথা ভেবেই ওই সংলাপ লেখা হয়েছে, কিন্তু উপরের সাক্ষাৎকার শুনলে মনে হয় জওয়ান ছবিটা অনেক বেশি করে নিজের বাবার প্রতি শাহরুখের শ্রদ্ধাঞ্জলি। সাক্ষাৎকারের শেষ ৩-৪ মিনিটে বাবা দেশ এবং স্বাধীনতা সম্পর্কে কী কী বলেছিলেন শাহরুখ তার বিবরণ দেন। সে বিবরণে জওয়ানের পদশব্দ শোনা যায়। নেহাত ঠাট্টা করেই ছবির শেষের দিকে আনা হয়েছে লায়ন কিংপ্রসঙ্গ। কিন্তু ঠাট্টার আড়ালে লুকিয়ে আছে চোখের জল। সিম্বার মত ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছিলেন শাহরুখ। অ্যাটলির মুনশিয়ানায় বার্ধক্যের দ্বারে পৌঁছে মহাতারকা প্রায় দর্শকের অলক্ষ্যে পূরণ করে নিলেন বাবার সঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার অপূর্ণ ইচ্ছা। স্বাধীনতা সংগ্রামী বাবার থেকে যা শিখেছেন সবটুকু নিংড়ে দিলেন দর্শকের জন্য, দেশের দারুণ দুঃসময়ে।
শিল্পীরাই এসব করতে পারেন। একজন শিল্পী এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা পারেন?
মোহন ভাগবত বলেছিলেন ধর্ষণের মত অপরাধ ভারতে প্রায় ঘটেই না, ওসব হয় ইন্ডিয়ায়। কারণ ভারত প্রাচীন দিশি মূল্যবোধে চলে, ইন্ডিয়া চলে পাশ্চাত্য শিক্ষা অনুযায়ী। সেটাই ধর্ষণের কারণ। দেশের নাম ইংরিজিতেও ইন্ডিয়া থেকে ভারত করে দেওয়ার প্রয়াসকে এই আলোয় দেখতে হবে।
যা রটে তার কিছু
যেদিন বিজেপিবিরোধী জোটের নামকরণ হল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স, সংক্ষেপে ইন্ডিয়া, সেদিন সঙ্ঘ পরিবারের প্রবল বিরোধী এক অগ্রজ বন্ধু বলেছিলেন “সবই ভাল, কিন্তু সেই অ্যাংলোফাইল নামটাই ধরে থাকতে হল? ইন্ডিয়া না করে কোনোভাবে ভারত করা গেল না নামটা?” তিনিও অবশ্য স্বীকার করেছিলেন, গত এক দশকে ভারতীয় রাজনীতিতে যেভাবে বিজেপিই ঠিক করে দিয়েছে ইস্যু কোনটা আর বিরোধীরা কেবল তার বিরোধিতা করে গেছে, সেই ধারা উলটে দিয়েছে ওই নাম। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল, সরকারি দলের মুখপাত্র এবং তাদের কুখ্যাত আই টি সেল হিমশিম খাচ্ছে। কারণ রাজনৈতিক আলোচনার যে মানদণ্ড তারাই তৈরি করেছে, তাতে ইন্ডিয়া নামধারী কাউকে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ বলা চলে না। বললেই পালটা আক্রমণ হবে “তার মানে আপনি অ্যান্টি-ইন্ডিয়া?” নাম যে সবকিছু নয়, চরম দেশদ্রোহী কোনো দলও নিজের নামের সঙ্গে দেশের নাম জুড়তেই পারে – এই যুক্তির বাজার বিজেপি নিজেই বন্ধ করে দিয়েছে বহুকাল হল। বিজেপিশাসিত উত্তরপ্রদেশে এলাহাবাদের নাম বদলে প্রয়াগরাজ রাখা হয়েছে, মোগলসরাই হয়ে গেছে দীনদয়াল উপাধ্যায় নগর। এগুলো তো প্রাচীন জায়গা, সাম্প্রতিককালে ঝাঁ চকচকে শহর হয়ে ওঠা গুরগাঁওয়ের নাম পর্যন্ত বদলে গুরুগ্রাম করে দেওয়া হয়েছে। দিল্লির ঔরঙ্গজেব রোডেরও নাম বদলে গেছে। কারণ বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবার মনে করে নাম ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এখন প্যাঁচে পড়ে শেক্সপিয়র সাহেবের মত নামে কী আসে যায় বললে নিজেদের সমর্থকরাই শুনবে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখনিঃসৃত বাণী সমর্থকদের কাছে অমৃতসমান। তাই তিনি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের নামেও ইন্ডিয়া থাকে বলে খেলা ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। লাভ হল না দেখে শেষ চেষ্টা ছিল ইন্ডিয়ার সঙ্গে মিলিয়ে ‘ঘমন্ডিয়া’ বলা। কিন্তু দেখা গেল, ওটা ‘মিত্রোঁ’ বা ‘ভাইয়োঁ ঔর বহনোঁ’-র অর্ধেক জনপ্রিয়তাও অর্জন করতে পারল না। ফলে নামের লড়াইটা তখনকার মত ইন্ডিয়া জোট জিতেই গিয়েছিল।
কিন্তু হার স্বীকার করে নেওয়া বিজেপির স্বভাব নয়। হলে একাধিক রাজ্যে ভোটে না জিতেও তারা সরকার গঠন করতে পারত না। তাছাড়া সত্যোত্তর পৃথিবীর বাস্তবতা বিজেপির মত করে কেউ বোঝে না। তারা জানে, আজকের দুনিয়ায় বাস্তবে কী ঘটছে তা নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে বড় কাজ হল মানুষ কী জানছে এবং জেনে কী ভাবছে তা নিয়ন্ত্রণ করা। অতএব যা ভাবলে আমার সুবিধা লোককে সেটাই ভাবাতে হবে, অন্য কথা ভাবার ফুরসত দেওয়া চলবে না। সুতরাং অবিলম্বে চলে এল জল্পনা কল্পনা চালানোর মত বিষয় – এক দেশ, এক নির্বাচন। আচমকা সংসদের বিশেষ অধিবেশন বসবে ঘোষণা করা হল এবং কী নিয়ে আলোচনা হবে তা সংসদীয় প্রথায় প্রকাশ না করে গোদি মিডিয়াকে দিয়ে সম্ভাবনা হিসাবে ভাসিয়ে দেওয়া হল এক দেশ, এক নির্বাচনের কথা। এতে বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ল এই পরিকল্পনার বিরোধিতায়, নিজেদের সরকারবিরোধী বক্তব্যগুলো আর মানুষের সামনে তুলে ধরার সময় রইল না। জনপরিসর থেকে হারিয়ে গেল মণিপুর, হরিয়ানার দাঙ্গা, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, বিদেশের সংবাদমাধ্যমে আদানি গ্রুপের আর্থিক দুর্নীতির নতুন প্রমাণ সামনে আসায় তাদের বিরুদ্ধে ফের ওঠা যৌথ সংসদীয় তদন্তের দাবি। এক দেশ, এক নির্বাচন নিয়ে হইচই না কাটতেই সরকারপক্ষ নিয়ে এসেছে আরেক অনন্ত জল্পনার বিষয় – দেশের নাম ইংরেজিতেও ইন্ডিয়া থেকে বদলে ভারত করে দেওয়া হবে কি?
এমনিতে বিজেপির ভোটসর্বস্বতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। স্রেফ ভোটে জেতার জন্যে তারা করতে পারে না এমন কাজ নেই। ফলে এক দেশ, এক নির্বাচন চালু করা অথবা দেশের নাম বদলানোর দিকেও এগোতেই পারে। বিজেপির পুরনো বন্ধু এবং উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে ইদানীং অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়া মায়াবতী যেভাবে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন রাজনৈতিক সংগঠন বা জোটের নামে ইন্ডিয়া ও ভারত শব্দ ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করার আবেদন নিয়ে, হাস্যকরভাবে ইন্ডিয়া জোটকে দায়ী করেছেন বিজেপিকে দেশের নাম বদলে দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য, তাতে এই সন্দেহ জোরদার হয়। কিন্তু এহ বাহ্য। আলোচনাটা আরেকটু গভীরে গিয়ে করা দরকার।
যেখানে বাঘের ভয়
লক্ষণীয় যে এক দেশ, এক নির্বাচন এখনো স্রেফ জল্পনার বিষয় হলেও (প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে একটা কমিটি তৈরি করা ছাড়া আর কিছু করা হয়নি) দেশের নাম সরকারিভাবে ইন্ডিয়ার বদলে ভারত করে দেওয়ার প্রক্রিয়া কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই জি-২০ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়ে ভারত সরকারের তরফ থেকে যে চিঠি পাঠানো হয়েছে তাতে রাষ্ট্রপতিকে ‘প্রেসিডেন্ট অফ ভারত’ লিখে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাপারটা স্রেফ কারোর স্বপ্নার্দ্র বিছানার জিনিস হয়ে নেই, সরকারি কাগজপত্রে লিখিত আকারে এসে পড়েছে। সুতরাং সাধারণ মানুষের এ নিয়ে আলোচনা না করে উপায় নেই। কারণ এতে আমার-আপনার – জনপ্রিয় লব্জে বললে করদাতার – টাকা জড়িয়ে আছে। মানে সমস্ত সরকারি কাগজপত্রে যদি কাল থেকে ‘গভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া’ হয়ে দাঁড়ায় ‘গভমেন্ট অফ ভারত’, তাহলে স্রেফ লেটারহেড ছাপাতে কত কোটি টাকা খরচ হবে ভাবুন।
ইদানীং সরকার এবং তার ন্যাওটা সংবাদমাধ্যম, অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বিখ্যাত ক্রিকেটার, চিত্রতারকা ইত্যাদি বিশেষ অজ্ঞরা সরকারের যে কোনো কার্যকলাপের উপকারিতা প্রমাণ করতে প্রথমেই বোঝায় কাজটা করলে করদাতাদের কত টাকা বাঁচবে। ১৯৯১ সালের পর থেকে যেমন সরকার এবং তার ন্যাওটারা অহোরাত্র বোঝাত ‘বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে’, এ খানিকটা সেইরকম। যেমন ‘এক দেশ এক নির্বাচন ভাল, কারণ করদাতাদের অনেক টাকা বাঁচবে’, ‘ভর্তুকি তুলে দেওয়া ভাল, কারণ করদাতাদের অনেক টাকা বাঁচে’। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় ওটাই সরকারের কাজের ভালমন্দের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড, তাহলে কিন্তু সর্বত্র ‘ইন্ডিয়া’ বদলে ‘ভারত’ করার পরিকল্পনাকে কোনোভাবেই ভাল বলা যাবে না। কারণ এতে করদাতাদের টাকা তো বাঁচবেই না, উলটে একগাদা টাকা খরচ হবে। টাকার কথা যখন উঠলই, তখন খেয়াল করিয়ে দেওয়া যাক – শুধু গভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া নেই, আছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াও। সেটাও কি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ভারত হবে? হলে টাকা কি নতুন করে ছাপা হবে? সেক্ষেত্রে পুরনো নোটগুলোকে কি চলতে দেবে সরকার? নাকি আরও একচোট নোটবন্দির খাঁড়া ঝুলছে আমাদের মাথার উপরে?
কথাটাকে সোশাল মিডিয়া জোক মনে হচ্ছে? মনে রাখবেন, দেশের বর্তমান সরকার জোকারের মত সব এলোমেলো করে দিতেই ভালবাসে। তাতে মানুষের প্রাণ গেলেও কুছ পরোয়া নেই। রাজ কাপুর অভিনীত জোকার নয়, হিথ লেজার বা জোয়াকিন ফিনিক্স অভিনীত জোকার। তার অন্তত দুটো প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে – নোটবন্দি আর চার ঘন্টার নোটিসে দেশব্যাপী লকডাউন।
ভারত এক খোঁজ
অবশ্যই শুধু করদাতাদের টাকা খরচ হবে বলে ভারত নাম ব্যবহারে বিরোধিতা করা চলে না। ও রাস্তায় হাঁটলে শেষমেশ অনেক ভাল কাজেরই বিরোধিতায় গিয়ে পৌঁছতে হবে। ঠিক যে রাস্তায় মোদী সরকার হাঁটছে। দেশে এত ঘন ঘন নির্বাচন হয়, তাতে করদাতাদের বিপুল টাকা খরচ হয়। অতএব গোটা দেশে একসঙ্গে লোকসভা আর বিধানসভা নির্বাচন হোক – টাকা বাঁচবে। গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন কমিয়ে টাকা বাঁচানো যদি ঠিক হয়, তাহলে কিছুদিন পরে বলা যেতেই পারে, নির্বাচন ব্যাপারটারই দরকার নেই। একশো শতাংশ টাকা বেঁচে যাবে। পঞ্চায়েত, পৌরসভা, কর্পোরেশনগুলোর ব্যাপারে নিশ্চয়ই অদূর ভবিষ্যতেই তাই বলা হবে। সুতরাং অন্য যুক্তিতে আসি।
এতদিন যাঁরা জানতেন না, তাঁরাও গত কয়েকদিনের আলোচনায় নিশ্চয়ই জেনে গেছেন যে আমাদের দেশটার নাম সাংবিধানিকভাবেই ইন্ডিয়া এবং ভারত – দুটোই। সংবিধানের একেবারে প্রথম অনুচ্ছেদেই পরিষ্কার লেখা আছে “India, that is Bharat, shall be a Union of States.”
বস্তুত সংবিধান সভার বিতর্কে নাম নিয়েও বিতর্ক হয়েছিল এবং সবাই যে ইন্ডিয়া শব্দটা ব্যবহার করা নিয়ে একমত ছিলেন তা নয়। শেষমেশ দুটো নামই থেকে যায়। এমন নয় যে ভারত নামটাকে ব্রাত্য করে দিয়ে স্রেফ বিদেশি লব্জের ইন্ডিয়াকেই দেশের সরকারি নাম করে দেওয়া হয়েছিল, যা এখন দক্ষিণপন্থীরা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, আদৌ ইন্ডিয়া কেন? সব ভাষাতেই ভারত নয় কেন? আমার বন্ধু যা বলেছেন সেটা কি সত্যি? ইন্ডিয়া শব্দটা কেবল ভারতের অ্যাংলোফাইলরা, অর্থাৎ ইংরেজি ভাষাসর্বস্ব উচ্চকোটির লোকেরা ব্যবহার করেন? ও নাম আপামর ভারতবাসীর পছন্দের নাম নয়?
এ প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে মনে রাখা ভাল, বহু ভাষাভাষী এবং ভাষার ভিত্তিতে তৈরি প্রদেশগুলো নিয়ে গঠিত দেশ ভারতে এক রাজ্যের মানুষের সঙ্গে অন্য রাজ্যের মানুষের সংযোগের ভাষা কী হওয়া উচিত, সরকারি কাজের ভাষা কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে স্বাধীনতার আগে থেকেই বিতর্ক চলছে। এমনকি সংবিধানের ৩৪৩ নম্বর অনুচ্ছেদের ১ নম্বর ধারায় লেখা আছে দেশের সরকারি ভাষা হবে দেবনাগরী লিপিতে লেখা হিন্দি।
তারপর ২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ১ নম্বরে যা-ই লেখা থাক, এই সংবিধান চালু হওয়ার পরে ১৫ বছর দেশের সরকারি ভাষা হিসাবে ইংরিজির ব্যবহার চলতে থাকবে। আবার ৩ নম্বর ধারাতেই বলা হয়েছে, বর্তমান অনুচ্ছেদে (অর্থাৎ ৩৪৩ নম্বরে) যা-ই বলা থাক, ওই ১৫ বছর কেটে গেলে ইংরিজি ভাষার ব্যবহার চালিয়ে যাওয়ার জন্য সংসদ আইন প্রণয়ন করতে পারে। ৩৪৩-৩৫১ অনুচ্ছেদগুলো পড়লে হিন্দি ভাষার প্রতি সংবিধানের পক্ষপাত দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়। ৩৫১ নম্বরে তো হিন্দি ভাষার প্রসারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই অনুচ্ছেদের শেষাংশে একেবারে হেডমাস্টারি কায়দায় বলা হচ্ছে শব্দভাণ্ডার প্রসারিত করার প্রয়োজনে প্রধানত সংস্কৃতের কাছে হাত পাততে হবে (“…for its vocabulary, primarily on Sanskrit and secondarily on other languages”)। ঘটনা হল, ভারত শব্দটা এসেছে সংস্কৃত থেকে এবং ব্যবহার হয় মূলত হিন্দি ও উত্তর ভারতীয় ভাষাগুলোতে। ফলে বিন্ধ্য পর্বতের ওপারের মানুষের সঙ্গত কারণেই এই শব্দটাকে দেশের নাম বলে মেনে নিতে আপত্তি আছে। প্রাচীন শাস্ত্র ও পৌরাণিক সাহিত্যে যে ভারতের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে কিন্তু দাক্ষিণাত্য পড়ে না। মহাভারতে কটা কথা আছে দক্ষিণ ভারত নিয়ে? বাঙালিদের মধ্যে অনেকেরই ধারণা, তামিল, মালয়ালমের সঙ্গে সংস্কৃতের অনেক মিল। অতএব ওগুলো সংস্কৃত থেকেই এসেছে। কিন্তু তামিলরা অনেকেই মনে করেন তাঁদের ভাষা সংস্কৃত থেকে আসেনি। বরং দাক্ষিণাত্যের সমস্ত ভাষার জন্ম তামিল থেকে। আর্য সভ্যতার থেকে দ্রাবিড় সভ্যতা একেবারেই পৃথক। সাম্প্রতিক অতীতে তামিলনাড়ুর শিবগঙ্গা জেলায় ২৬০০ বছরের পুরনো এক সভ্যতার খোঁজ মেলার পর তাকে ‘ভারতম’ সভ্যতা বলা হবে, নাকি ‘দ্রাবিড়ম’ – এই নিয়ে উত্তপ্ত হয়েছিল ওই রাজ্যের রাজনীতি।
অর্থাৎ আমরা বিন্ধ্য পর্বতের এপারে আছি বলেই আমাদের ভাষা, সংস্কৃতিতে ভারত শব্দটার প্রাঞ্জল উপস্থিতি। কিন্তু কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত সমস্ত ভারতবাসী ভারত বলেই দেশটাকে চেনেন বা চিনতে পছন্দ করেন – এরকম ভাবনায় গলদ আছে। এমনকি বাঙালিরা সকলে ভারত শব্দটাই ভাবে – এমন ধারণাও প্রশ্নের মুখে পড়ে যাবে ১৮ জানুয়ারি ১৯৬৯ তারিখে সাপ্তাহিক কালান্তর-এ প্রকাশিত দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রিপোর্টাজ ‘আমি ইন্ডিয়া’ পড়লে
এই বয়েসে আবার উদ্বাস্তু। বন্যার তিনমাস পরেও একটা তাঁবু জোটাতে পারেন নি। সমর্থ মেয়ে-জামাই আর বছর দশেকের ছেলেটাকে নিয়ে চারদিক খোলা একটা ছাউনির তলায় খড় বিছিয়ে রাত কাটাচ্ছেন। অথচ এখনও ওঁর মাথা ছুঁয়ে পূর্ণিমার চাঁদ।
‘পাকিস্তান ছেড়ে কবে এসেছিলেন?’ আশ্চর্য উত্তর দিলেন বুধেশ্বরী। ছাউনি থেকে হাত নামিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বেশ গর্বের সঙ্গে বললেন ‘আমি ইন্ডিয়া। আমি পাকিস্তান না থাকিস।’
অমোঘ সেই অভিজ্ঞতা। পাটকাঠির চাল ছাড়িয়ে প্রায় আকাশ ছুঁয়ে যে রমণী দাঁড়িয়ে, সে বলছে সে উদ্বাস্তু নয় – ভারতবাসী। সে বলছে সে ‘ইন্ডিয়া’।
আরও বড় কথা, ভারতের কেন্দ্রস্থলের যে হিন্দিভাষী রাজ্যগুলো সবচেয়ে জনবহুল, সেখানকার গরিব-গুরবো মানুষের মধ্যেও দেশের নাম হিসাবে ভারতের চেয়ে বেশি প্রচলিত এমন একটা শব্দ যা ভারত বনাম ইন্ডিয়া বিতর্কে বিজেপিবিরোধীদেরও উল্লেখ করতে দেখছি না – হিন্দুস্তান। স্বাধীনোত্তর দেশে আসমুদ্রহিমাচল সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করেছে (দক্ষিণ ভারতে কিছুটা কম, কিন্তু একেবারে পারেনি তা নয়) যে জিনিসটা তা যে মুম্বাইয়ে তৈরি হিন্দি ছবি – সে নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। বাংলায় সে ছবির জনপ্রিয়তাও কোনোদিন কম ছিল না। ভেবে দেখুন তো, হিন্দি সিনেমার সংলাপে বা গানে কতবার শুনেছেন ভারত বা ভারতীয় শব্দটা? বরং বারবার শোনা যায় হিন্দুস্তান এবং হিন্দুস্তানি শব্দ দুটো। হম হিন্দুস্তানী ছবির ‘ছোড়ো কল কি বাতেঁ, কল কি বাত পুরানি/নয়ে দওর মে লিখেঙ্গে/দিল পর নয়ী কহানী/হম হিন্দুস্তানী’ গানটা একসময় প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল। সে গানে আবার আরএসএস-বিজেপির প্রবল অপছন্দের লোক জওহরলাল নেহরুকে দেখানো হয়েছিল।
বলিউডের সর্বকালের জনপ্রিয়তম শিল্পীদের একজন অমিতাভ বচ্চন। তাঁর প্রথম ছবির নাম সাত হিন্দুস্তানী (১৯৬৯)। তিনি বুড়ো বয়সে অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের আমলে তৈরি বেশকিছু খাজা জাতীয়তাবাদী ছবির একটায় অভিনয় করেছিলেন। সেই ছবির নাম হিন্দুস্তান কি কসম (১৯৯৯)। ওই একই নামে ১৯৭৩ সালেও একটা ছবি হয়েছিল। চেতন আনন্দ সেই ছবি বানিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ভারত-পাক যুদ্ধ নিয়ে। বর্তমানে যাঁকে বলিউডের বাদশা বলা হয়, সেই শাহরুখ খানের একটা ফ্লপ কিন্তু অন্যরকম ছবির নাম ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানী (২০০০)। আরও অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। হিন্দিভাষী সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা না থাকলে বলিউড হিন্দুস্তান শব্দটাকে এই প্রাধান্য দিত না। আরএসএস-বিজেপির প্রভাবে ইদানীং হয়ত বদল এসেছে, কিন্তু গত শতকের আট-নয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গে বিহার, উত্তরপ্রদেশ ইত্যাদি রাজ্যের যেসব শ্রমজীবী মানুষ বসবাস করতেন তাঁদের কদাচিৎ ভারত শব্দটা ব্যবহার করতে দেখা যেত। তাঁরা হিন্দুস্তানই বলতেন। যদিও হিন্দুস্তান শব্দটার আক্ষরিক অর্থ হিন্দুদের ভূমি – হিন্দু, মুসলমান সকলেই কিন্তু দেশের নাম হিসাবে এই শব্দটাই নির্দ্বিধায় ব্যবহার করে এসেছেন। আজকাল কথাগুলো লেখার প্রয়োজন পড়ছে, পড়ে সন্দেহও হচ্ছে হয়ত, কিন্তু আমাদের শৈশবে স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস বা নেতাজির জন্মজয়ন্তীতে যে গানটা পাড়ায় পাড়ায় মাইকে বাজতই, সেটা হল ‘সারে জহাঁ সে আচ্ছা/হিন্দুস্তান হমারা’। সেই গানের রচয়িতা মীর ইকবাল একসময় পাকিস্তানপন্থী হয়ে যান। সম্ভবত সেই অপরাধেই, আমাদের অখেয়ালে, ওই গানটাকে বিজেপি আমলে ব্রাত্য করে দেওয়া হয়েছে। ইকবালের লেখাপত্র পাঠ্য থেকে বাদ দেওয়াও শুরু হয়েছে, কিন্তু সে অন্য আলোচনা। এই আলোচনায় এটুকুই বলার যে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ভারতের বিরাট অংশের মানুষ দেশকে হিন্দুস্তান নামে চিনে এসেছেন অন্তত কয়েক হাজার বছর ধরে, ভারত নামে নয়, ইন্ডিয়া নামেও নয়। ফলে ইন্ডিয়া যদি অভিজাত ভারতের লব্জ হয়, ভারতও অভিজাত ভারতেরই অন্য এক অংশের লব্জ।
‘ভারত’ আর ‘ইন্ডিয়া’ বলে অনেক আরএসএসবিরোধীও আসলে যা বোঝাতে চান তা হল দুস্তর আর্থসামাজিক ব্যবধান। ওটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, প্রয়োজনও নেই। তাঁরা বলতে চান এ দেশের মধ্যে আসলে দুটো দেশ আছে। ইন্ডিয়া অংশটা লেখাপড়া শেখা, শহুরে, পেট ভরে খাওয়া দেশ। ভারত মূলত গ্রামে বাস করে, লেখাপড়া শিখবে কী, অনশনে অর্ধাশনেই তার দিন কাটে। কথাটা ঠিক, আবার ভুলও। কারণ দুটো কেন? একটু ঘোরাফেরা করলেই স্পষ্ট দেখা যায় এ দেশের মধ্যে আসলে অনেকগুলো দেশ আছে। পেশাগত কারণে এক সময় বারবার ঝাড়খণ্ড যেতাম। রাঁচি আর কলকাতা যে একই দেশের দুটো রাজ্যের রাজধানী একথা বিশ্বাস হত না কিছুতেই। কারণ প্রচণ্ড অব্যবস্থা, প্রবল অনুন্নয়ন দেখেছি। আবার সিকিম আর কেরালা বেড়াতে গিয়ে অবাক হয়ে ভেবেছি, পশ্চিমবঙ্গ এই রাজ্যগুলোর সঙ্গে একই দেশে আছে কেমন করে? এ তো গেল ভিনরাজ্যের কথা। সম্প্রতি জঙ্গলমহল ঘুরে এলাম। বুঝতে বাকি রইল না যে আমি আর কাঁকড়াঝোর বা আমলাশোলের বাসিন্দারা একই দেশে বাস করি না। কিন্তু তার সঙ্গে ইন্ডিয়া আর ভারত শব্দ দুটোর কী সম্পর্ক?
আরএসএস-বিজেপি কিন্তু ওই ফারাক বোঝাতে ইন্ডিয়া আর ভারত বলে না। তারা ওই দুটো শব্দ দিয়ে কী বোঝাতে চায় তা ২০১৩ সালে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত আসামের শিলচরে যা বলেছিলেন তা খেয়াল করলেই পরিষ্কার হবে। তিনি বলেছিলেন ধর্ষণের মত অপরাধ ভারতে প্রায় ঘটেই না, ওসব হয় ইন্ডিয়ায়। কারণ ভারত প্রাচীন দিশি মূল্যবোধে চলে, ইন্ডিয়া চলে পাশ্চাত্য শিক্ষা অনুযায়ী। সেটাই ধর্ষণের কারণ। দেশের নাম ইংরিজিতেও ইন্ডিয়া থেকে ভারত করে দেওয়ার প্রয়াসকে এই আলোয় দেখতে হবে। নারী স্বাধীনতা, নারী অধিকার ইত্যাদি নিয়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা জানেন ভাগবতের ওই মন্তব্য সর্বৈব মিথ্যা। আসল কথা হল গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের বিরুদ্ধে ঘটানো অধিকাংশ অপরাধের অভিযোগই দায়ের হয় না। সুতরাং ইন্ডিয়াকে ভারত বানাতে চাওয়া মানে, হয় গোটা দেশটাকেই এমন করে ফেলা যেখানে পরম্পরাগত চিন্তায় ধর্ষিতারা আদৌ অভিযোগ দায়ের করবেন না, অথবা আরও সরল সমাধান – রাষ্ট্র বলবে ভারত প্রাচীন সংস্কার মেনে চলা দেশ। এখানে ধর্ষণ হয় না। এটা একটা উদাহরণ। আরও কী কী হওয়া সম্ভব ভারতে তার মাত্র একটা উদাহরণ।
আসল কথা
দেশকে মা বলে শুধু দক্ষিণপন্থীরাই কল্পনা করে তা তো নয়, ঋত্বিক ঘটকও করতেন। এ দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ করে থাকেন। কারণ দেশ আসলে একটা আবেগ, অর্থাৎ বিমূর্ত ধারণা। রাষ্ট্র হল সেই বিমূর্ত ভিতের উপর গেঁথে তোলা মূর্ত ইমারত। নিজের মাকে যার যা ইচ্ছা সে তাই বলে ডাকে। ওটা বেঁধে দেওয়া অসম্ভব। বাঙালিরা মা বলে, তামিলরা আম্মা বলে, গুজরাটিরা আবার বা বলে। এমনকি বাঙালিদের মধ্যেও অনেকে মামণি বলে। এক পরিবারের কথা জানি, সেখানে দুই ছেলে তাদের মাকে বৌমা বলে ডাকত। কারণ কথা বলতে শেখার বয়সে ঠাকুমাকে শুনত তাদের মাকে বৌমা বলে ডাকছেন, সেই অভ্যাস ছাড়তে পারেনি। তামিল বা গুজরাটি পরিবারগুলোর মধ্যেও খুঁজে দেখলে নির্ঘাত এরকম বিকল্প ডাকের সন্ধান পাওয়া যাবে। ও নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, কারণ ওটা আবেগের বিষয়। সন্তানের যা বলে ডাকতে ভাল লাগে, সে তাই বলবে। কেউ ভারত বলবে, কেউ হিন্দুস্তান বলবে, কেউ ইন্ডিয়া বললেও তেড়ে যাওয়ার কিছু নেই। সংবিধানপ্রণেতারা ইন্ডিয়া আর ভারত লিখেছিলেন, কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন নাম হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুস্তান শব্দটা রাখেননি। হয়ত ধর্মের ভিত্তিতে সদ্য ভাগ হওয়া এবং নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে ঘোষণা করা দেশের সরকারি নাম হিন্দুস্তান হওয়া ভাল বার্তা দেবে না মনে করা হয়েছিল। কিন্তু সে নামের ব্যবহার একেবারে নিষিদ্ধ করার জন্যেও কোনো ব্যবস্থা নেননি। ভারত রাষ্ট্র পরবর্তীকালেও সরকার ছাড়া অন্য কে কোন নাম ব্যবহার করছে তা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। এখন ঘামাতে চায় বলেই এত কাণ্ড করছে।
এমনিতে নাম বদলালে কী-ই বা এসে যায়? উপরে যে ব্যবহারিক অসুবিধার কথা উল্লেখ করেছি সেটা ছাড়া? লক্ষ করে দেখছি, শেখানো বুলির মত কিছু কথা আওড়াচ্ছেন বিখ্যাতরা। সুনীল গাভস্কর প্রমুখ বলছেন, বর্মার নামও তো বদলে মায়ানমার হয়েছে। তাতে ক্ষতি কী? এর উত্তর খুঁজলেই আসল ক্ষতে চোখ পড়বে। বর্মার নাম বদলে মায়ানমার করা হয়েছিল ১৯৮৯ সালে এবং তা কোনো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাজ ছিল না। কাজটা করেছিল জুন্টা সরকার। আসল আপত্তির জায়গাটা এইখানে। ভারত সরকার যদি সত্যিই মনে করে থাকে দেশের সরকারি নাম ইংরিজিতেও ভারত করার কোনো বিশেষ প্রয়োজন আছে, তাহলে সংসদে আলোচনা করে নিয়মকানুন মেনে সংবিধান সংশোধন করে বদলাতে পারত। কিন্তু সরকারি কাগজে চুপিসাড়ে বদল করে দেওয়া অগণতান্ত্রিক। কাজটা অবশ্য বিলক্ষণ চতুরতার। কারণ এখন সংসদের বাইরে বিজেপি মুখপাত্ররা যা-ই বলুন, সংসদে আলোচনা হলে হয়ত অমিত শাহ বলবেন, বদলাইনি তো! ভারত নামটা তো সংবিধানেই আছে।
আসলে সংগঠনের শতবর্ষে দেশটা হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে গেল অথচ দুনিয়াসুদ্ধ লোক ইন্ডিয়া বলে ডাকছে – এ জিনিস আরএসএসের হজম হবে না। কারণ ‘ইন্ডিয়া’ নামটা এসেছে পারস্যের লোকেদের মুখের ‘হিন্দুস্তান’ ইউরোপিয় জবানে বদলে গিয়ে। ইংরেজদের এ দেশে আসতে তখনো কয়েক হাজার বছর দেরি, যীশুখ্রিস্টেরই জন্ম হয়নি। এ নাম কি সঙ্ঘ মেনে নিতে পারে? বস্তুত ‘হিন্দু’ শব্দটাও বেদ, বেদান্ত, রামায়ণ, মহাভারত – কোথাও নেই। বরং জরাথ্রুষ্টের ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র গ্রন্থ আবেস্তা-য় আছে। সঙ্ঘ তাই পারলেই তাদের বয়ানে ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটা গুঁজে দেয়। এমনি তো আর দয়ানিধি স্ট্যালিন সনাতন ধর্মের বিনাশের ডাক দেওয়ায় বিজেপি নেতারা রণচণ্ডী হয়ে ওঠেননি। বস্তুত যে ভাষাটার প্রতি আমাদের সংবিধানের বিশেষ পক্ষপাত, যা গত শতকের ছয়ের দশকে কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার গোটা দেশের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং এখন বিজেপি ফের চাপিয়ে দেওয়ার তালে আছে, সেই ‘হিন্দি’ ভাষাও আদতে ছিল হিন্দুস্তানি (আমির খুসরো বলতেন হিন্দভি) ভাষা। সুলতানি আমল থেকে দিল্লি ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মধ্য এশিয়া এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা ভাগ্যান্বেষী মানুষের মুখের ভাষার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের ভাষা মিশে তা গড়ে উঠেছিল। এই ভাষা দেবনাগরী আর ফারসি – দুরকম লিপিতেই লেখা চলত। হিন্দি আর উর্দু – এই বিভাজন হয়েছে মাত্র শ দুয়েক বছর আগে এবং তার পিছনে ইংরেজদের ভূমিকা কম নয়।
অর্থাৎ সঙ্ঘ পরিবারের এক ভাষা, এক জাতি, এক রাষ্ট্রের স্লোগান – হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তান – গোটাটাই বিদেশি লব্জ ধার করা। অবশ্য জাতীয়তাবাদ, জাতিরাষ্ট্র ধারণাগুলোই ইউরোপিয়। কস্মিনকালে ভারতে ছিল না। আগাগোড়া ধার করা জিনিস নিয়ে চললে হীনমন্যতা আসাই স্বাভাবিক, ধারের চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টাও প্রত্যাশিত।
শেষ নাহি যে
বুধেশ্বরী দীপেন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘হামারলা মরিলে কি দ্যাশ বাঁচিবে?’ দেশের মানুষ না বাঁচলে দেশ বাঁচে না। এখন আশু লড়াইটা দেশ বাঁচানোর, নাম বাঁচানোর নয়। যেহেতু দেশের মানুষের জন্য বিজেপি সরকার কিছুই করেনি, তাই দেশের মানুষকে ঝুটো গর্ব দিয়ে এবং বিরোধীদের সে গর্ব সামলানোর কাজে ব্যস্ত রেখেই তারা উতরোবার চেষ্টা করছে। যুগপৎ নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত করছে। অর্থাৎ রথ দেখা এবং কলা বেচা। ২০২৪ নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদীরা পুনর্নির্বাচিত হলে দেশের নাম কেন, দেশের লোকেদের নামও বদলে দিতে পারে। কেউ আটকাতে পারবে না। ফলে এখন বিরোধীদের দায়িত্ব এক দেশ এক নির্বাচন বা নাম পরিবর্তনের মত কাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন থেকেও সরকারের অকর্মণ্যতা এবং বিপজ্জনক কাজগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো, বিকল্প হাজির করা। নইলে প্রতিক্রিয়ার রাজনীতির ঘূর্ণিতে ডুবে মরতে হবে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেত্রী সোনিয়া গান্ধী অবশ্য নির্বাচন এবং নাম নিয়ে ডামাডোলের ঊর্ধ্বে উঠে আসন্ন বিশেষ অধিবেশনে সংসদে আলোচনার জন্য নটা বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন। কিন্তু বিজেপি যে বিনা আলোচনায় সংসদ চালাতে এবং নিজেদের পছন্দের বিল পাস করাতে সিদ্ধহস্ত তা আমরা জেনে গেছি। ইন্ডিয়া জোট তাদের একতা বাইরের মত সংসদের ভিতরেও দেখাতে পারে কিনা, দেখিয়ে বিজেপির যা ইচ্ছা তাই করা আটকাতে পারে কিনা, তার উপরে নির্ভর করছে আমরা আগামী বছর কীরকম নির্বাচন দেখব। তার চেয়েও বড় কথা, দেশের ভিতটা থাকবে কিনা। ভিত না থাকলে ইমারত টেকে না।
প্রশ্ন একটাই— ভারত এক ধর্ম এক ভাষার দেশ হবে, নাকি নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানের দেশ থাকবে। প্রথমটার মুখ নরেন্দ্র মোদী, দ্বিতীয়টার রাহুল গান্ধী।
সেই কোন কালে চকোলেট কোম্পানি ক্যাডবেরি’জ অমিতাভ বচ্চনকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করে একগুচ্ছ বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিল। তার একটায় তিনি পাপ্পু নামে একটি ছেলের বাবা, যার বয়স বেড়েই চলেছে কিন্তু সে স্কুলের গণ্ডি আর পেরোতে পারছেন না। তা পাপ্পুর হতাশ দোকানদার বাবাকে ছেলের বন্ধুরা এসে খবর দিল, পাপ্পু পাশ করে গেছে। অতএব তারা চকোলেট খাবে, পয়সা পাপ্পু দেবে। বাবা মহানন্দে সকলকে বিনিপয়সায় চকোলেট বিলোতে লাগলেন। এমন খুশির খবরে কি মিষ্টিমুখ না করে থাকা যায়? ওই সিরিজেরই আরেকটি বিজ্ঞাপনে অমিতাভ কলেজের অধ্যাপক। সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে দেখেন, ছেলেমেয়েরা সব ঊর্ধ্বশ্বাসে কোথায় যেন দৌড়চ্ছে। একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন, পাপ্পুর নাকি পরীক্ষা, তাই তারা সবাই দৌড়চ্ছে। অবাক অধ্যাপক সরেজমিনে তদন্ত করতে গিয়ে দেখেন পরীক্ষা মানে হল, একটি সুন্দরী মেয়ে (রাইমা সেন) কলেজে ঢুকছে আর মোটা কাচের চশমা পরা, সচরাচর যাদের ক্যাবলা বলা হয় তেমন ছেলে পাপ্পু প্রেম নিবেদন করবে বলে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি এল, দেখল এবং পাপ্পুকে জয়যুক্ত করল। ফলে সকলে মিলে পাপ্পু পাশ করে গেছে বলে ফের নাচানাচি শুরু করল। এ খবরেও মিষ্টিমুখ না-করে থাকা যায় না, অতএব ফের চকোলেট খাওয়া হল। এই পাপ্পু যে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে জায়গা করে নিতে চলেছে, তখন কে জানত!
আরএসএস-বিজেপির প্রচারযন্ত্র তুলনাহীন। আজ না হয় যাবতীয় টিভি চ্যানেল এবং অধিকাংশ সর্বভারতীয় খবরের কাগজের উপর আম্বানি-আদানির সহায়তায় তাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, নরেন্দ্র মোদীর সর্বভারতীয় উত্থানের সময়ে তো এতখানি আধিপত্য ছিল না। তবু বিজেপি নেতারা বারবার আউড়ে এবং হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকের বিপুল ব্যবহারের মাধ্যমে জনমনে প্রতিষ্ঠা করে দিতে পেরেছিলেন এই কথা যে, হার্ভার্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া রাহুল গান্ধি হলেন ওই বিজ্ঞাপন সিরিজের অকর্মণ্য, অজস্রবার ফেল করা পাপ্পু। অন্যদিকে তথ্যের অধিকার আইন ব্যবহার করে যাঁর পাশ করার বছরের তথ্য জানতে চাইলে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে মুখে কুলুপ আঁটে, সেই মোদী হলেন এক প্রাজ্ঞ ব্যক্তি, বিশ্বগুরু হওয়ার উপযুক্ত। যেহেতু মোদীর শিক্ষাগত যোগ্যতা সন্দেহজনক (গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত তাঁর মার্কশিটে অধ্যয়নের বিষয় লেখা ছিল “entire political science”), সেহেতু ডিগ্রি ব্যাপারটাই যে অপ্রয়োজনীয় তা প্রমাণ করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে আরএসএস-বিজেপির প্রচারযন্ত্র। বারো ক্লাসের গণ্ডি না-পেরনো স্মৃতি ইরানিকে মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী করা হয়েছিল এবং ডিগ্রি যে কিছুই প্রমাণ করে না তা প্রমাণ করতে দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র মতো বিরাট কাগজ রীতিমত গ্রাফিক্স তৈরি করেছিল— যাতে দেখানো হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-সহ বহু ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বেরই ডিগ্রির বালাই ছিল না। মনে রাখতে হবে, এই স্মৃতি সংসদে পৌঁছেছিলেন অমেঠি কেন্দ্রে রাহুলকে পরাজিত করে। অর্থাৎ স্মৃতিকে মাথায় তোলার পিছনেও অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল রাহুলকে পাপ্পু প্রমাণ করা।
স্বীকার্য যে, প্রচুর লেখাপড়া জেনেও রাজনীতিতে কেউ অকর্মণ্য হতেই পারেন। আবার বেশিদূর লেখাপড়া না-করেও ক্ষুরধার বুদ্ধি, সাহস এবং পরিশ্রমের জোরে একজন রাজনীতিবিদ দারুণ সফল হতে পারেন। সাফল্য বলতে কী বোঝানো হচ্ছে সেটা অবশ্য গুরুতর প্রশ্ন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেমন স্পষ্টতই মনে করেন, চা বিক্রেতার ছেলে হয়েও দেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসাই সাফল্য। কীভাবে সে চেয়ার অবধি পৌঁছনো হল এবং চেয়ারে বসে কী করা হচ্ছে তার তেমন গুরুত্ব নেই। তিনি যে গত আট বছরে এমনকি কাশ্মিরি পণ্ডিতদের জন্যও গঠনমূলক কিছু করে উঠতে পারেননি, তা তাঁর কাছে ব্যর্থতা বলে প্রতিভাত হয় বলে তো মনে হয় না। উলটে সারাক্ষণ নিজেই নিজেকে শংসাপত্র দিয়ে বেড়াচ্ছেন— “সব চঙ্গা সি”। এহেন প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দলের মানদণ্ডে রাহুল যা-ই করুন, প্রধানমন্ত্রী না-হতে পারলে পাপ্পুই থাকবেন। তাতে কিছু এসে যায় না। মুশকিল হল, পাপ্পু মিথ নির্মাণ এতই সফল হয়েছে যে, বিজেপিবিরোধী মানুষও কিছুতেই ওই মিথ ভুলে রাহুলকে দেখে উঠতে পারছেন না। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁদের এই ভুল না ভাঙলে বিপদ।
গত কয়েক দিনে যে চরম অন্যায় অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে সম্পন্ন করে রাহুলকে লোকসভা থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে, বহু উদারপন্থী, এমনকি বামপন্থী মানুষও তাতে তেমন দোষ দেখছেন না। বিজেপি বাদে সব দলের নেতৃস্থানীয়রাই অবশ্য এর নিন্দা করেছেন, কিন্তু তার অনেকটাই “চাচা আপন প্রাণ বাঁচা” যুক্তিতে। কারণ, আজ এর প্রতিবাদ না-করলে কাল এত বড় দেশের কোনও এক নিম্ন আদালতে তাঁদের কারও কোনও প্রধানমন্ত্রীবিরোধী মন্তব্যকে হাতিয়ার করে কেউ যদি মানহানির মামলা ঠুকে দেয় আর আদালত তুরন্ত দুবছরের কারাদণ্ড দিয়ে দেয়, তাহলে তাঁদের সাংসদ বা বিধায়ক পদও নিমেষে খারিজ হয়ে যাবে। কিছু বলার মুখ থাকবে না। এই নেতা-নেত্রীদের কে কে ভারতের গণতন্ত্রের এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সত্যিই চিন্তিত তা আরও কিছুদিন না কাটলে, তাঁদের দলের কার্যকলাপ না দেখলে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। যেমন ধরুন, এর পরেও যদি আম আদমি পার্টি মধ্যপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী ধ্বজা উড়িয়ে কংগ্রেসের ভোট কাটতে যায়, তা হলে বুঝতে হবে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের লুকোবার মতো আরও অনেক কিছু আছে। সেসবের গুরুত্ব ভারতের গণতন্ত্র বাঁচানোর চেয়ে বেশি।
কিন্তু ইতিমধ্যেই দলগুলোর সাধারণ সদস্য, সমর্থকদের অনেকেরই দেখা যাচ্ছে রাহুল পাদপ্রদীপের আলোয় চলে এসেছেন এবং অনেকে তাঁর মধ্যে আশার আলো দেখছেন বলে প্রবল গাত্রদাহ। এর কারণ রাহুলের কার্যকলাপ তাঁরা এত বছর ধরে ভাল করে লক্ষই করেননি। নিজেদের অজান্তেই সরকারি প্রচারযন্ত্রের চোখ দিয়ে রাহুলকে দেখেছেন। তাই এখন চোখকান যা বলছে, মস্তিষ্ক কিছুতেই তা মানতে চাইছে না। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ভারত জোড়ো যাত্রার পরে রাহুল সর্বক্ষণের রাজনীতিবিদ নন— এই অভিযোগ আর করা যাচ্ছে না। লৌহমানব মোদীর বিপরীতে তিনি যে ঠুনকো পুতুল নন, তা সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরেছেন। কংগ্রেসেও যে নেতৃত্বের সঙ্কট দীর্ঘকাল ধরে চলছিল তার নিষ্পত্তি ঘটেছে। গুলাম নবি আজাদের মতো সুযোগসন্ধানীরা বিদায় হয়েছেন। কপিল সিব্বলের মতো অতিবৃদ্ধ, জনসংযোগহীন আইনজীবী নেতারা পথপার্শ্বে পড়ে আছেন। সুদর্শন, সাহেবদের মতো ইংরেজি বলায় দক্ষ শশী থারুর টিভি স্টুডিও আর টুইটার আলো করেই বসে আছেন। মল্লিকার্জুন খড়গেকে সর্বভারতীয় সভাপতির দায়িত্ব দিয়ে ঝাড়া হাত-পা রাহুল জনপ্রিয়তায় অনেক এগিয়ে গেছেন।
কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। দেশ কীভাবে চালানো উচিত, ভারতের আগামীদিনের অর্থনীতি কেমন হওয়া উচিত, আজকের দুনিয়ায় জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণার পুনঃপ্রয়োগ কীভাবে করা সম্ভব— এসব নিয়ে গত কয়েক বছরে মৌলিক চিন্তাভাবনার পরিচয় দিয়েছেন রাহুল। কিন্তু গোদি মিডিয়া আর বিজেপি-র আইটি সেল সেসব দিকে আলো ফেলেনি। কেবলই পাপ্পু ভাবমূর্তি তুলে ধরেছে এবং জওহরলাল নেহরুর চিন-নীতির ব্যর্থতা থেকে শুরু করে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা জারির স্বৈরতান্ত্রিকতা— এগুলোকে রাহুল গান্ধীর সমার্থক করে দিয়েছে। দুঃখের বিষয়, বহু বিজেপি-বিরোধী, বিশেষত বামপন্থীরা, এই চশমা দিয়েই রাহুলকে দেখেছেন এবং এখনও দেখে চলেছেন। তাঁরা খেয়ালই করেন না, ২০১৯ নির্বাচনের প্রাক্কালে রাহুল সকলের জন্য ন্যূনতম আয়ের যে প্রস্তাব রেখেছিলেন তা এই মুহূর্তে যে নব্য উদারবাদী অর্থনীতির কবলে আমরা পড়েছি তার প্রেক্ষিতে বৈপ্লবিক, এবং বলা বাহুল্য, বামপন্থী। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ও মনে করেন ভারতে অমন একটা প্রকল্প দারুণ কাজে দেবে। এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ অবশ্যই আছে। কিন্তু অন্তত এই শতকে ভারতের কোনও বামপন্থী দলের নেতাকে অর্থনীতি নিয়ে এরকম বিকল্প চিন্তা করতে দেখা যায়নি। পশ্চিমবঙ্গের শেষ বামফ্রন্ট সরকার বরং অনেকাংশে নব্য উদারবাদী অর্থনীতি নিয়ে চলছিল, কেরলের বাম সরকারও যে মৌলিকভাবে আলাদা কোনও পথ দেখাতে পারছে এমন নয়। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো যেমন (যাকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে মোদী সরকার) তাতে কেন্দ্রীয় সরকারের চেয়ে খুব আলাদা কোনও পথ নেওয়া হয়তো কোনও রাজ্য সরকারের পক্ষে সম্ভবও নয়। কিন্তু প্রস্তাব হিসেবে, পরিকল্পনা হিসেবেও ডি রাজা, পিনারাই বিজয়ন বা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যরা কোনও মৌলিক অর্থনৈতিক নীতির কথা বলেছেন কি? সরকারে এলে কী করবেন সে তো পরের কথা, রাহুল অন্তত অন্য কিছু ভাবার এবং বলার সাহস তো দেখিয়েছেন।
ভারত জোড়ো যাত্রা চলাকালীন রাহুল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজনের সঙ্গে আলাপচারিতায় বসেছিলেন। সেই আলোচনা শুনলে বোঝা যায় গোটা বিশ্বের অর্থনীতিকে রাহুল কীভাবে দেখেন এবং ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অসাম্যকে কতটা গভীরভাবে জানেন। বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পের সাফল্য কীভাবে এল, ভারতে সেরকম কিছু করা সম্ভব কিনা জানতে চান এবং সেই প্রসঙ্গে জিএসটি ও নোটবন্দির ফলে কর্নাটকের বেল্লারির রমরমা জিনস শিল্পের অপূরণীয় ক্ষতির কথা জানান। দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লবের সম্ভাবনা নিয়েও সুনির্দিষ্ট আলোচনা করেন। কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মির পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে তিনি সাধারণ মানুষের জীবনকে কতটা গভীরভাবে দেখেছেন তা মিনিট পঁচিশেকের ওই ভিডিওতে বেশ বোঝা যায়। রঘুরাম কিন্তু ঘোর পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদ। রাহুল আলোচনার এক জায়গায় প্রশ্ন করেন, “দেখতে পাচ্ছি স্টক এক্সচেঞ্জে টাকা লাগিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে আপনার কী মত?”
দিল্লির রাজনৈতিক মহলে সকলেই জানেন, রাহুলকে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতাদের অপছন্দ হওয়ার অন্যতম কারণ তাঁর এই বামপন্থী প্রবণতা। তিনি যেভাবে নাম করে দেশের সবচেয়ে বড় দুই ধনী— মুকেশ আম্বানি আর গৌতম আদানিকে আক্রমণ করেন, তা অনেকেরই পছন্দ নয়। কারণ অর্থনীতির দিক থেকে কংগ্রেসের ক্রমশ ডাইনে সরে যাওয়া আরম্ভ হয়েছিল রাহুলের বাবা রাজীব গান্ধীর আমলে, যা তুঙ্গে পৌঁছয় নরসিংহ-মনমোহন জুটির নেতৃত্বে। সেই কারণেই নরসিংহ বিজেপির বিশেষ পছন্দের লোক। শেখর গুপ্তার মত দক্ষিণপন্থী সাংবাদিকরা তাঁকে ‘ভারতের প্রথম বিজেপি প্রধানমন্ত্রী’ আখ্যাও দিয়ে থাকেন। সেই দলের নেতা হয়ে রাহুলের এভাবে বৃহৎ পুঁজিকে আক্রমণ, বারবার ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ নিয়ে কথা বলা অনেক কংগ্রেসিরই না-পসন্দ।
তা বলে রাহুল বিপ্লবী নন, লেনিন বা মাও জে দং নন। কিন্তু তাঁকে অমন হতে হবে— এমন প্রত্যাশা করবই বা কেন? এ দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও যখন বহুধাবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর মধ্যে থেকে তেমন কেউ উঠে এলেন না, তখন বহুত্ববাদী ভারত থাকবে কি থাকবে না— এই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে কমিউনিজমের দাঁড়িপাল্লায় রাহুলকে মাপার মূঢ়তা ক্ষমার অযোগ্য। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি আর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রায় একই সময়ে। একশো বছর পূর্ণ করার আগেই আরএসএস ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করার পরিকল্পনায় চূড়ান্ত সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সেখানে ভারতীয় কমিউনিস্টরা দারুণ শুরু করেও ১৯৬৪ সালের পর থেকে নিজেদের ভাঙতে-ভাঙতে এমন জায়গায় নিয়ে এসেছেন যে, অস্তিত্বেরই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। ১৯৮৯ থেকে সংঘের শক্তি দ্রুত বেড়েছে, অথচ কমিউনিস্টরা সম্মুখসমরে যাওয়ার শক্তি ক্রমশ হারিয়েছেন। নব্বইয়ের দশকে তবু বিকল্প সরকার তৈরি করার ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা নেওয়ার শক্তি ছিল, ২০০৯ সালের পর থেকে তা-ও আর অবশিষ্ট নেই।
স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় রাজনীতির বাস্তুতন্ত্র মানে ছিল বামপন্থা বনাম মধ্যপন্থার লড়াই। সংঘ পরিবার সফলভাবে অটলবিহারী বাজপেয়ির আমল থেকে সেই বাস্তুতন্ত্রকে মধ্যপন্থা বনাম দক্ষিণপন্থার লড়াইয়ে পরিণত করতে শুরু করে। ২০২৪ নির্বাচনে রাহুল তথা কংগ্রেসকে উড়িয়ে দিয়ে জিততে পারলে ব্যাপারটা পুরোপুরি দক্ষিণপন্থা বনাম দক্ষিণপন্থা হয়ে দাঁড়াবে। কেবল মমতা ব্যানার্জি, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, নবীন পট্টনায়করাই যদি বিরোধী দল হিসেবে টিঁকে থাকেন তা হলে বনাম শব্দটারও আর প্রয়োজন থাকবে কি না, সন্দেহ। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় যেমন শাসক-বিরোধী সংঘাত বলে কিছু হয় না। যা হয় সব বিধানসভার বাইরে টিভি ক্যামেরার সামনে। সুতরাং গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী ভারতকে বাঁচাতে হলে ভারতের আরএসএসবিরোধী শক্তিগুলোর হাতে কংগ্রেসের পাশে দাঁড়ানো ছাড়া কোনও বিকল্প নেই। বামপন্থীদের সামনেও নেই। নেহরুর নাম্বুদ্রিপাদ সরকারকে অকারণে বরখাস্ত করা, ইন্দিরার জরুরি অবস্থা, মনমোহনের অপারেশন গ্রিন হান্ট ইত্যাদি কারণে কংগ্রেস সম্পর্কে যত বিতৃষ্ণাই থাক, রাজনীতিতে আশু বিপদের চেয়ে বড় কোনও বিপদ নেই, কোনওদিন ছিল না। সে কারণেই ইন্দিরা যখন দেশের গণতন্ত্রের জন্য মূর্তিমান বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছিলেন তখন জ্যোতি বসুর মতো প্রবাদপ্রতিম বাম নেতারা সংঘ-ঘেঁষা শক্তির উপস্থিতি সত্ত্বেও জয়প্রকাশ নারায়ণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
রাহুল আরও একটা জায়গায় দেশের অন্য সব বিরোধী নেতার চেয়ে এগিয়ে আছেন, তা হল সরাসরি সংঘ-বিরোধিতা। অন্য সব দলের নেতাদেরই বিজেপির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা যায়। একমাত্র রাহুলই বারবার বলেন, লড়াইটা আরএসএসের বিরুদ্ধে। দেশের মাটিতে জনসভায় বলেন, সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন। আবার কেমব্রিজে বক্তৃতা দিতে গিয়েও বলেন। এ দেশের কমিউনিস্টদের চিরকালীন বদভ্যাস, তাঁরা অর্থনৈতিক বিভাজন ছাড়া আর কোনও বিভাজন স্বীকারই করতে চান না। গত শতকের তিনের দশকে এই কারণেই গিরনি কামগর ইউনিয়নের ধর্মঘটে শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গের নেতৃত্বাধীন শ্রমিকদের সঙ্গে বাবাসাহেব ভীমরাও অম্বেডকরের নেতৃত্বাধীন দলিত শ্রমিকদের ঐক্য হয়নি। একশো বছর হতে চলল, কমিউনিস্টরা নিজেদের অবস্থানে অনড়। তাই রামমন্দির, হিজাব পরার জন্য মেয়েদের শিক্ষায়তনে ঢুকতে না-দেওয়া কিংবা গোমাংস ভক্ষণ বা পাচারের অভিযোগে মুসলমান হত্যার মতো ঘটনাগুলোকে বামপন্থীরা বলেন— আসল ইস্যু থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। আসল ইস্যুগুলো কী? না বেকারত্ব, দারিদ্র্য, মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি। তাঁরা কিছুতেই মানবেন না, আরএসএস-বিজেপি মন্দির-মসজিদ, শিবাজি-মোগল ইত্যাদিকেই বৃহদংশের মানুষের কাছে আসল ইস্যু বলে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছে। সে কারণেই উত্তরভারতের বিভিন্ন জায়গায় ধর্ম সংসদ আয়োজিত হয়, যেখানে প্রকাশ্যে গণহত্যার ডাক দেওয়া হয়। প্রশাসন যে কিছুই করে না সে তো প্রত্যাশিত, কিন্তু আমার-আপনার মতো সাধারণ মানুষই যে এইসব সংসদে যান তা সম্ভবই হত না তাঁদের কাছে বামপন্থীরা যেগুলোকে আসল ইস্যু বলেন সেগুলো নকল ইস্যু হয়ে না-গিয়ে থাকলে।
রাহুল কিন্তু এই কথাটা বোঝেন। তিনি জানেন, আসলে লড়াইটা সাংস্কৃতিক। সংঘ মানুষের মস্তিষ্কের দখল নিয়ে ফেলেছে। ভারত জোড়ো যাত্রায় তিনি যে বারবার বলছিলেন “নফরত কে বাজার মে মহব্বত কা দুকান খোলনে আয়া হুঁ” (ঘৃণার বাজারে ভালবাসার দোকান খুলতে এসেছি) তা স্রেফ কাব্যি নয়, সচেতন রাজনৈতিক স্লোগান। এই সময়ের প্রয়োজনীয় স্লোগান। সম্প্রতি এক আলোচনাসভায় নাগরিকত্ব আইন-বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবাস করে আসা লেখক মনীশ আজাদের কথা শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। শ্রোতাদের একজন প্রশ্ন করলেন, হাথরসের সেই ভয়ঙ্কর ধর্ষণ ও খুনের পরেও সেখানকার নির্বাচনে বিজেপি কেন জেতে? লখিমপুর খেড়িতে বিজেপি নেতার ছেলে গাড়ির চাকার তলায় কৃষকদের পিষে দেওয়ার পরেও সেখানে বিজেপি কী করে জেতে? মনীশ বললেন, ৪০-৫০ বছরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সংঘ মানুষের মধ্যে এই ভাবনা প্রোথিত করতে সক্ষম হয়েছে যে, আসল ইস্যু হল ধর্ম, বর্ণ, জাতি— এইসব। অন্যান্য ইস্যুতে তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারো, রেগেও যেতে পারো। কিন্তু ভোট দেওয়ার সময়ে সেসব ভুলে ধর্মের ভিত্তিতে দেবে। উদাহরণ দিয়ে বললেন, জিএসটি নিয়ে ক্ষুব্ধ গুজরাতের ব্যবসায়ীরা কয়েকদিন প্রবল আন্দোলন করার পরেই একটা শহরের রাজপথের ফেস্টুন ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন, “হম নারাজ হ্যাঁয়, গদ্দার নহি” (আমরা বিরক্ত, কিন্তু বিশ্বাসঘাতক নই)। তারপর গুজরাত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি যথারীতি জেতে। সুতরাং বিজেপিকে হারাতে হলে এই মানসিকতাকে হারাতে হবে। অর্থনৈতিক অভাব অনটনই আসল ইস্যু, বাকি সবই নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা— এই বালখিল্য রাজনীতি ফল দেবে না। কারণ, অপ্রিয় হলেও এটাই সত্য যে, বাজারটা ঘৃণার। রাহুল তাই ভালবাসার দোকান খোলার কথা বলেছেন। দোকানে কতজন খদ্দের আসবে, সে তো পরের কথা। কিন্তু যত বেশি দোকান খোলা হবে বাজারের পরিবেশ যে তত বদলাবে, তাতে তো সন্দেহ নেই। সত্যিকারের বিজেপি-বিরোধীরা এ কথা যত তাড়াতাড়ি বোঝেন তত ভাল। রাহুল মহাপুরুষ নন, সাধুসন্ত নন, বিপ্লবী তো ননই। তিনি একা কতটুকু পারবেন? তাঁর ক্ষয়িষ্ণু পার্টিই বা কতটা পারবে?
২০২৪ সালের নির্বাচন বস্তুত গণভোটে পরিণত হতে যাচ্ছে। প্রশ্ন একটাই— ভারত এক ধর্ম এক ভাষার দেশ হবে, নাকি নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানের দেশ থাকবে। প্রথমটার মুখ নরেন্দ্র মোদী, দ্বিতীয়টার রাহুল গান্ধী। কার সঙ্গে কার কোথায় নির্বাচনী আসন সমঝোতা হবে না-হবে সেসব পরের কথা, পাটিগাণিতিক আলোচনার বিষয়। রাজনৈতিক প্রশ্ন ওই একটাই। এ কথা অস্বীকার করলে আত্মপ্রতারণা হবে।
এমন বাইনারি নিঃসন্দেহে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়। কিন্তু আমাদের সামনে আশু বিপদটা যে একদলীয় শাসন।
আমাদের অনেকেরই সন্দেহ ছিল, আপনি ক্রমঅপসৃয়মান ভারতকে আদৌ খুঁজতে চান কিনা। ভারত জোড়ো যাত্রায় প্রমাণ হল, চান।
মাননীয় রাহুল গান্ধী,
মহাত্মা গান্ধীর শহিদ হওয়ার দিনে ভারত জোড়ো যাত্রার শেষ বিন্দুতে পৌঁছে শ্রীনগরে আপনি যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে অন্তত একটি চমৎকার কাজ হয়েছে। যারা বলে ব্যক্তিগত জীবন আর রাজনীতিকে আলাদা আলাদা বাক্সে রাখা উচিত, রাজনৈতিক কারণে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতি কাম্য নয়, তারা যে আসলে ব্যক্তিগত জীবনকে রাজনীতি কীভাবে প্রভাবিত করে তা বোঝে না অথবা কোনো উদ্দেশ্যে অন্যদের বুঝতে দিতে চায় না – তা আরও একবার পরিষ্কার হয়ে গেছে।
রাজনৈতিক আলোচনা মানেই তা নৈর্ব্যক্তিক হতে হবে – এই সংস্কার উদারপন্থী ও বাম রাজনীতিতে স্বতঃসিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নৈর্ব্যক্তিক, অর্থাৎ আবেগশূন্য। অথচ আবেগ বাদ দিয়ে মানুষ হয় না, মানুষ যা যা করে তার প্রায় কোনোটাই আবেগ বাদ দিয়ে করে না। রাজনীতি তো নয়ই। কিন্তু রাজনীতি তো বটেই, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা – সবই আবেগশূন্য হওয়াই যে অভিপ্রেত তা আমাদের জনজীবনে বহুকাল হল প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। সম্ভবত সেই কারণেই দক্ষিণপন্থীদের পক্ষে সহজ হয়েছে একেবারে উল্টো মেরুতে দাঁড়িয়ে আবেগসর্বস্বতা দিয়ে মানুষের মাথা খেয়ে দেশটার সর্বনাশ করা। আমরা সরকারি অফিসে, হাসপাতালে, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেগশূন্য ব্যবহার পাই, নেতাদের কাছ থেকে এবং আদালতে আবেগশূন্য ব্যবহার পাই। কারণ গোটা ব্যবস্থাটা অনবরত শিখিয়ে চলেছে, মানুষকে মানুষ হিসাবে ভাবা অন্যায়। তাকে দেখতে হবে নৈর্ব্যক্তিকভাবে। সকলকে ৪৭ফ বা ৬৯ঙ হিসাবে দেখাই নিরপেক্ষতা, ন্যায়বিচার। যে যেখানে ক্ষমতার বিন্যাসে উপরে থাকবে, সে ন্যায় করলেও মায়াদয়াহীনভাবেই করবে – এই আমাদের আজন্মলালিত সংস্কার। উল্টোদিকের মানুষটির সাথে মানুষ হিসাবে নয়, তার প্রাসঙ্গিক তকমার হিসাবে ব্যবহার করাই যেন ন্যায়। এভাবে চললে যা হওয়ার কথা আমাদের দেশে ঠিক তাই হয়েছে। ন্যায় আর হয় না, অধিকাংশ সময় অন্যায়ই হয় সাধারণ মানুষের প্রতি। তাই বোধহয় দক্ষিণপন্থীরা কাজের কথা বাদ দিয়ে কারোর হিন্দু আবেগ, কারোর অসমিয়া আবেগ, কারোর বাঙালি আবেগ, কারোর দলিত আবেগ, কারোর আদিবাসী আবেগে সুড়সুড়ি দিলে ভুল করে মনে হয় “এই তো আমাকে আমি হিসাবে দেখছে।” অতএব সমস্ত মনপ্রাণ তারই দিকে ধাবিত হয়। আপনার শ্রীনগরের বক্তৃতা শুনে মনে হল, আপনি এই কথাটা ধরে ফেলেছেন।
দুই দশকের সাংবাদিক জীবন বাদ দিন, প্রায় সাড়ে তিন দশকের রাজনৈতিক বক্তৃতা শোনার জীবনে মনে করতে পারছি না আর কোনো ভারতীয় রাজনীতিবিদকে কোনো জনসভার প্রতিটি মানুষের সঙ্গে আলাদা করে অথচ একত্রে কথা বলতে দেখেছি। কাশ্মীরের মানুষ এবং সেখানে মোতায়েন আধাসামরিক বাহিনী ও সেনাবাহিনীর জওয়ানদের যে এক পংক্তিতে দাঁড় করানো সম্ভব, একই বাক্যে তাঁদের সকলের যন্ত্রণা ছুঁয়ে ফেলা সম্ভব তা নরেন্দ্র মোদীর ভারতে কেন, রাজীব গান্ধীর ভারতেও আমরা কোনোদিন কল্পনা করতে পারিনি। কারণ সৈনিক বা সাধারণ কাশ্মীরি – এই গোষ্ঠীনামের পিছনের ব্যক্তিগুলির বেদনা বা আনন্দ নিয়ে ভাবার কথা রাজনীতিবিদ দূরে থাক, আমাদেরও মনে আসেনি। আপনি ফোনে নিজের ঠাকুমা এবং বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার স্মৃতি উল্লেখ করে বললেন, এ যন্ত্রণা মোদী-অমিত শাহ বুঝবেন না। কাশ্মীরের মানুষ বুঝবেন; সিআরপিএফ, বিএসএফ, সেনাবাহিনীর জওয়ানদের আত্মীয়রা বুঝবেন। কারণ তাঁরা এরকম ফোন কল পেয়ে থাকেন। ভারত জোড়ো যাত্রার উদ্দেশ্য এই ফোন কলগুলো আসা বন্ধ করা।
এভাবে বড়জোর শিল্পী, সাহিত্যিকদের কেউ কেউ ভাবতে পেরেছেন। কথাগুলো শুনেই মনে পড়ে গেল আজাজ খান নির্দেশিত হামিদ ছায়াছবিটির কথা। একমাত্র সেখানেই দেখেছিলাম ভারতীয় সেনার হাতে গুম হয়ে যাওয়া বাবার সন্ধানে থাকা আট বছরের ছেলে আর জন্মের পর থেকে সন্তানের মুখ না দেখা জওয়ানের যন্ত্রণাকে পাশাপাশি রাখা হয়েছিল। মোদী-শাহের নিষ্ঠুর পরিহাসে ২০১৯ সালে ওই ছবির নাম ভূমিকায় অভিনয় করা তালহা আর্শাদ রেশিকে নির্দেশক বেশ কিছুদিন জানাতেই পারেননি যে সে দেশের সেরা শিশুশিল্পীর পুরস্কার পেয়েছে। কারণ তখন গোটা কাশ্মীরের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে রেখেছিল ভারত সরকার, যা কাশ্মীরের মানুষেরও সরকার।
এই সংকট তো কেবল কাশ্মীরের মানুষের নয়। দেশের যেখানেই রাষ্ট্র অতিমাত্রায় শক্তিধর হয়ে উঠেছে, নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সংঘাত রাষ্ট্রের সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছে, সেখানেই এই সংকট স্বাধীনতার পর থেকে বারবার ঘটেছে, আজও ঘটে চলেছে। ঠিক যেমন রাষ্ট্রের হাতে ধর্ষিত হওয়া অথবা ধর্ষিত হয়ে রাষ্ট্রশক্তির কাছ থেকে নৈর্ব্যক্তিক (একজন ধর্ষিতার পক্ষে যা অমানবিকের নামান্তর) ব্যবহার পাওয়া এ দেশের মেয়েদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ কোনো নেতাকে কখনো জনসভায় বলতে শুনিনি – “আপনারা হয়ত দেখেছেন আমি যখন হাঁটছিলাম, বেশকিছু মহিলা কাঁদছিলেন। জানেন ওঁরা কেন কাঁদছিলেন? কয়েকজন আমার সাথে দেখা করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে কাঁদছিলেন ঠিকই, কিন্তু এমন অনেকেও ছিলেন যাঁরা কাঁদছিলেন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে। কেউ কেউ বলছিলেন ওঁদের যৌন হয়রানি হয়েছে, কয়েকজনের আত্মীয়ই কাণ্ডটা ঘটিয়েছে। শুনে আমি যখন বলতাম, আমি পুলিসকে বলি তাহলে? ওঁরা বলতেন, রাহুলজি, পুলিসকে বলবেন না। আমরা আপনাকে বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পুলিসকে বলবেন না। বললে আমাদের আরও ক্ষতি হবে। এই হল আমাদের দেশের বাস্তব।”
এ দেশ কত মহান তা নিয়ে কেবল সংঘ পরিবার তো নয়, আমাদের সকলেরই গর্বের শেষ নেই। সেই গর্বের আখ্যানে এই বাস্তব খাপ খায় না বলে আমরা এড়িয়ে যাই, রাজনৈতিক নেতারা তো এড়িয়ে যান বটেই। যে দলের যেখানে সরকার আছে সেখানে সে দলের নেতারা আরও বেশি করে এড়িয়ে যান, কারণ তাঁরা মনে মনে একে সমস্যা বলে জানলেও স্রেফ আইনশৃঙ্খলার সমস্যা বলেই ভাবেন। ফলে এসব কথা তুললে নিজের দলের সরকারের ঘাড়ে দোষ এসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেন। তার উপর পুলিসকে বললে সমস্যা বাড়বে – এ তো সরাসরি রাষ্ট্রবিরোধী কথা। সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলও তো রাষ্ট্রব্যবস্থার অঙ্গ। ব্যবস্থার মধ্যে থেকে তার বিরুদ্ধে কথা বলা চলে কখনো? অথচ আপনি বললেন। এখনো ভারতের বেশ বড় বড় তিনটে রাজ্যে আপনার দলের সরকার, অর্থাৎ সেখানকার পুলিস আপনার দলেরই হাতে। তার উপর আপনি, আপনার মা এবং বোন সারাক্ষণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকেন। তবু যে আপনি এসব কথা বললেন, এ কথা চট করে ভোলা যাবে না। যেখানে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বললেন, সেখান থেকে কুনান পোশপোরা ঠিক কত কিলোমিটার দূরে তা জানি না। তবে এটুকু বুঝতে পারি, আপনার কথাগুলো কেবল ওই কাণ্ডের ধর্ষিতাদের নয়, স্পর্শ করবে মণিপুরের সেই মহিলাদেরও, যাঁরা ২০০৪ সালে একদা উলঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন ইম্ফলের রাস্তায়, সঙ্গে ছিল ফেস্টুন। তাতে লাল অক্ষরে লেখা ছিল – INDIAN ARMY RAPE US। কথাগুলো নিশ্চয়ই ছুঁয়ে ফেলবে ছত্তিসগড়ের সোনি সোরিকে, বেঁচে থাকলে ছুঁয়ে ফেলত অর্চনা গুহকেও। সংবাদমাধ্যম যাকে নির্ভয়া নাম দিয়েছিল সেই মেয়েটিকে তো বটেই। এইসব কুকীর্তির সময়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল আপনার দলই। তবু আপনি এসব কথা বলেছেন বলে, বা সেইজন্যেই আরও বেশি করে আপনি ধন্যবাদার্হ, রাহুল। মানহারা মানবীর দ্বারে এসে দাঁড়ানোর সাহস খুব কম পুরুষের হয়। তাকে মানবী হওয়ার সম্মানটুকু দেওয়ার ক্ষমতাও অনেক শাসকেরই হয় না, নিজে মহিলা হলেও। আমি যে রাজ্যের বাসিন্দা সে রাজ্যের মহিলা মুখ্যমন্ত্রীই তো ধর্ষণ হলেই হয় ধর্ষিতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, নয় প্রতিবাদী মহিলাদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে তেড়ে যান, নতুবা ছেলেটি ও মেয়েটির মধ্যে প্রেম ছিল কিনা তার খোঁজ করেন। ভারতের রাজনীতিবিদদের থেকে এমন ব্যবহার পেয়েই ভারতীয় মেয়েরা অভ্যস্ত।
আপনার বক্তৃতায় আপনি আরও অনেক কথা বলেছেন যেগুলো ভাল কথা, প্রয়োজনীয় কথা, বহুবার বলা কথা। তবু আবার বলা প্রয়োজন, কারণ কেউ বলছে না। যেমন আপনি ‘গঙ্গা-যমুনী তহজীব’-এর কথা, অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমানের যৌথ সভ্যতার কথা বলেছেন। কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত আপনার যাত্রার তুলনায় এনেছেন কাশ্মীর থেকে এলাহাবাদে নেহরু পরিবারের যাত্রার প্রসঙ্গ। সাংস্কৃতিকভাবে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী কেমন একই সূত্রে গাঁথা তা দেখাতে ব্যক্তিগত ইতিহাসের এই ব্যবহার যে একজন পাকা বক্তার লক্ষণ। কিন্তু যা আপনার গোটা বক্তৃতায় সারাক্ষণ ছেয়ে থেকেছে তা হল সংবেদনশীলতা। আরও সহজ করে বললে, কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষকে ছোঁয়ার ইচ্ছা। আপনি যেমন ধর্ষিত মহিলাদের কথা বলেছেন, তেমনই বলেছেন দুটি হতদরিদ্র ছেলের কথা, যাদের গায়ে জামা পর্যন্ত ছিল না, দেহ ছিল ধূলিমলিন। বলেছেন তাদের দেখেই মনে হয়েছিল উত্তর ভারতের শীতেও শুধু টি-শার্ট পরেই কাটিয়ে দেবেন। সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে কথাগুলো বানানো মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আপনার বক্তৃতার দিনেই নাগরিক ডট নেটে মনীষা ব্যানার্জি লিখেছেন “কথিত আছে চম্পারণে কস্তুরবা দেখেছিলেন, একটি ঝুপড়িতে দুই মহিলার মাত্র একটি কাপড়। একসঙ্গে দুজনে বাইরে বেরোতে পারেন না। এই কাহিনি গান্ধীকে কটিবস্ত্র ধারণে বাধ্য করে…”। ফলে সন্দেহ করা অমূলক নয়, যে এই কাহিনি আপনার জানা এবং আসলে তা থেকেই টি-শার্ট পরার সিদ্ধান্ত। যদি তাও হয়, তবু আজকের ভারতে একজন রাজনীতিবিদ সচেতনভাবে গান্ধীকে অনুকরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং গান্ধীর এমন একটি কাজ অনুকরণ করছেন যা করতে গেলে নিজেকে শারীরিক কষ্ট ভোগ করতে হয় – এ বড় কম কথা নয়। আমরা তো শুনে এসেছি আপনি ‘শাহজাদা’। আপনি নিজেও এই ভাষণে বলেছেন আজন্ম কোনো না কোনো সরকারি বাড়িতে থেকেছেন। শুধু সমালোচকের চোখ দিয়ে দেখলেও সেই লোকের এই ভূমিকার প্রশংসা না করে উপায় নেই। ঘৃণার ব্যাপারীদের কথা অবশ্য আলাদা।
ধূলিমলিন ছেলেদুটির কথা বলতে গিয়ে আপনি ফের তুলে এনেছেন আমাদের পালিশ করা ভারতবর্ষের কদাকার দিকটি। আপনারই এক সঙ্গী যে আপনাকে বলেছিলেন ওদের সাথে গলাগলি করা উচিত হয়নি, ওরা নোংরা – সেকথা বলে দিয়েছেন সর্বসমক্ষে। জানিয়েছেন, আপনার উত্তর ছিল “ওরা আমার এবং আপনার থেকে পরিষ্কার।” আবার বলি, একথা বানানো হওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু বানানো হলেও দোষের নয়। প্রথমত, একজন নেতা জনসভায় না ভেবেচিন্তে যা খুশি বলবেনই বা কেন? দ্বিতীয়ত, অস্পৃশ্যতা আজও আমাদের দেশে ইতিহাস হয়ে যায়নি। যাঁরা ভুক্তভোগী তাঁদের একথা যেভাবে ছোঁবে, আমার মত উচ্চবর্গীয় সাংবাদিককে সেভাবে স্পর্শ করবে না বলাই বাহুল্য। কয়েক হাজার বছর ধরে কোণঠাসা হয়ে থাকা সেইসব মানুষ ভারত জুড়ে গত আট বছরে আরও কোণঠাসা হয়েছেন, যতই একজন দলিতের পর একজন আদিবাসী রাষ্ট্রপতি হয়ে থাকুন। যেসব গালাগালি স্বাধীন ভারতে অন্তত তাঁরা পিছন ফিরলে ছুঁড়ে দেওয়া হত, আজকাল প্রকাশ্যেই দেওয়া হয়। তাঁরা জানলেন, নিদেনপক্ষে একজন নেতা আছেন ভারতীয় রাজনীতিতে, যিনি ওই ভাবনার, ওই ব্যবহারের বিরুদ্ধে।
আজকের ভারত যেমন হয়েছে, তাতে সারাক্ষণ কথাবার্তা চলে নাগরিকত্ব নিয়ে। অনেকদিন পরে কাউকে ভারতীয়ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে শুনলাম। ছোটবেলায় ইতিহাস বইতে পড়া “বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য” কথাটাকে আজ বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। সেই ঐক্য কীভাবে ভারতের সর্বত্র বিচিত্র ভাষায় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চিন্তায় ধরা পড়েছে আপনি সেকথা বলেছেন। গুজরাটের গান্ধী, আসামের শঙ্করদেব, কর্ণাটকের বাসবেশ্বর বা বাসবান্না, কেরালার নারায়ণ গুরু, মহারাষ্ট্রের জ্যোতিবা ফুলে – এঁদের সকলকেই আপনি ভারতীয়ত্বের নির্মাতা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামটা শুনতে না পেয়ে রাগ করব ভাবছিলাম। কারণ এমনকি জওহরলাল নেহরুও তাঁর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া গ্রন্থে ভারতীয়ত্বের নির্মাণে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ বলে মতপ্রকাশ করেছেন, গান্ধীর সঙ্গে তাঁকে একাসনে বসিয়েছেন (“Tagore and Gandhi have undoubtedly been the two outstanding and dominating figures of India in the first half of the twentieth century… Tagore and Gandhi bring us to our present age.”)। সেই রবীন্দ্রনাথের নাম করলেন না দেখে সত্যিই রাগ করতে যাচ্ছিলাম। তারপর খেয়াল হল, রবীন্দ্রনাথের নাম তো বহু নেতার মুখে শুনেছি। এমনকি মোদীও শালগ্রাম শিলার মত করে তাঁর নাম নিয়ে নেন, অসহ্য উচ্চারণে তাঁর কবিতার পংক্তি আউড়ে বাঙালিদের মোহিত করার চেষ্টা করেন ভোটের মুখে। কিন্তু নারায়ণ গুরু আর ফুলের মত দুজন বর্ণবাদবিরোধী মানুষের নাম ভারতের কোনো উচ্চবর্গীয় শীর্ষস্থানীয় নেতার মুখে কোনোদিন শুনেছি কি? এমনকি আপনার পূর্বপুরুষ নেহরুর উপর্যুক্ত বইটিতেও বর্ণাশ্রম শুরুতে ভাল উদ্দেশ্যেই চালু করা হয়েছিল, পরে মন্দ হয়ে যায় – এই জাতীয় মতামত প্রকাশ করা হয়েছে। গান্ধীও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে ছিলেন, বর্ণাশ্রমের বিরুদ্ধে নয়।
উপরন্তু আমরা যারা বিন্ধ্য পর্বতের এপাশে বাস করি এবং তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালির তফাত করতে পারি না; ওদিককার লোক হলেই দক্ষিণ ভারতীয় বলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হই, তাদের অনেকের কাছে তো নামদুটোই নতুন। সে নাম আপনি করলেন ভারতের একেবারে উত্তর প্রান্তে দাঁড়িয়ে। এমনটি না করলে “দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে” স্বপ্ন সত্যি হবে কী করে? স্বাধীনতার পর ৭৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এই আদানপ্রদান তো ঘটেনি, তাই তো সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরে মঙ্গলঘট ভরা হয়নি। আপনি কি পারবেন সেই ঘট ভরতে?
সে বড় কঠিন কাজ, সম্ভবত অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ। আজকের ভারতে যখন সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে, তখন এ কাজ আরও শক্ত। সত্যি কথা বলতে কি, আপনি সে কাজের যোগ্য লোক কিনা তার পরীক্ষা আপনি ক্ষমতায় না পৌঁছলে শুরুই হবে না। আপনি যতই বলুন, ভারত জোড়ো যাত্রা কংগ্রেসের জন্য করেননি, কংগ্রেসকে বাদ দিয়েও আপনি যা করতে চান তা করতে পারবেন না। আর সেই দলে আজও গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসাবে আছেন কমলনাথের মত লোক, যিনি এই সেদিন অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণে কৃতিত্বের ভাগীদার হতে চেয়েছেন। যোগ করেছেন, আসল কৃতিত্ব আপনার বাবা রাজীব গান্ধীর, কারণ ১৯৮৫ সালে তিনিই বাবরির তালা খুলিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়াও আছেন শশী থারুর, যিনি কে জানে কোন অধিকারে কদিন আগে ঘোষণা করে দিলেন, ভারতের মুসলমানরা পর্যন্ত আর গুজরাট ২০০২ নিয়ে ভাবতে চান না।
এঁদের নিয়ে কী করে ভারত জুড়বেন সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ভার আপনার। নেহরু যে গণতন্ত্রের কথা বলতেন সেই গণতন্ত্রের রীতি মেনে আপনার উপর সাগ্রহ কিন্তু সন্দিগ্ধ নজর রাখব আমরা, যারা এখনো প্রশ্ন তোলা এবং সমালোচনা করা সংবাদমাধ্যমের কাজ বলে মনে করি। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে ভারতের আজ এমন এক নেতা দরকার যাঁর ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি না হলেও বুকের ভিতরে কিছুটা পাথর আছে। যে কোনো ভারতবাসী ধ্বনি দিলে প্রতিধ্বনি পাবে। আপনার শ্রীনগরের বক্তৃতা শোনার পর মনে না করে পারছি না, আপনি তেমনই একজন।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতিকে উপযুক্ত স্থান দিতে হবে। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকলে কেউ এগোতে পারে না। কেবল রাজনীতি নয়, সাংবাদিকতাতেও তার ঊর্ধ্বে উঠতে হয়, তবেই সত্যের সন্ধান পাওয়া যায়। আমাদের হারিয়ে যাওয়া বা কখনো খুঁজে না পাওয়া ভারতের সন্ধানও সেভাবেই পাওয়া যাবে সম্ভবত। দূরদর্শনে যখন নেহরুর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া অবলম্বনে শ্যাম বেনেগালের ভারত এক খোঁজ ধারাবাহিক শুরু হয়, তখন আমার বয়স ছয়। আপনার বোধহয় ১৮। তখন না হলেও, এখন নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে সুপণ্ডিত নেহরু বইয়ের নামে দাবি করেছেন তিনি ভারতকে ‘আবিষ্কার’ করেছেন। অন্যদিকে বেনেগাল ওই বইয়ের মধ্যে দিয়ে ভারত দেশটাকে খুঁজে বেড়িয়েছেন। এতদিন আমাদের অনেকেরই সন্দেহ ছিল, আপনি ক্রমঅপসৃয়মান ভারতকে আদৌ খুঁজতে চান কিনা। ভারত জোড়ো যাত্রায় প্রমাণ হল, চান। আশা করি এ খোঁজ শ্রীনগরে শেষ হয়নি, শুরু হল।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অন্তত একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। বলেছিলেন, খেলা হবে। তা সারাক্ষণই খেলা হচ্ছে। কেবল রাজনীতিবিদ নয়, সত্যিকারের খেলোয়াড়দেরও টেনে আনা হচ্ছে এই খেলায়। বাংলার ক্রিকেট দলের দুই প্রাক্তন অধিনায়ক লক্ষ্মীরতন শুক্লা আর মনোজ তিওয়ারি আগেই তৃণমূল কংগ্রেসের ঘর আলো করে ছিলেন। লক্ষ্মী মন্ত্রী হয়েছেন, মনোজ বিধায়ক। প্রবীণ ফুটবলার প্রসূন ব্যানার্জি সাংসদ হয়েছেন, অপেক্ষাকৃত নবীন দীপেন্দু বিশ্বাসও তৃণমূলের টিকিটে বিধায়ক হয়েছেন। পরে দলে থেকে কাজ করতে না পেরে বিজেপিতে চলে গেছেন। কোনোদিন হয়ত, প্রয়াত অশোক মিত্রের ভাষায়, সন্ধের কনে দেখা আলোয় ফিরেও আসবেন। কিন্তু গতকাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা করেছেন, তার তুল্য ঘটনা খুব বেশি নেই। অলিম্পিকে ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদক জেতা ভারতীয়ের সংখ্যা হাতে গোনা। ওই কৃতিত্ব প্রথম যিনি অর্জন করেছিলেন, সেই লিয়েন্ডার পেজকে মমতা নিজের পার্টিতে নিয়ে এসেছেন।
লন্ডন অলিম্পিকে বোঞ্জ পদক জয়ী কুস্তিগির যোগেশ্বর দত্ত বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। বেজিং অলিম্পিকে ব্রোঞ্জজয়ী বক্সার বিজেন্দর সিং আবার কংগ্রেসে। এথেন্স অলিম্পিকে শুটিংয়ে রুপো জেতা রাজ্যবর্ধন সিং রাঠোর শুধু বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন নয়, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন। কিন্তু এঁরা কেউই কংগ্রেস আর বিজেপির বাইরে যাননি। লিয়েন্ডারকে মমতা একটি আঞ্চলিক দলে নিয়ে এলেন।
এলেন তো, কিন্তু করবেন কী? কেবল অলিম্পিয়ান নয়, ভারতের ফুটবল, ক্রিকেট দলের বহু তারকাই রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন; মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক হয়েছেন। শচীন তেণ্ডুলকরের মত কেউ কেউ কোনো দলে যোগ না দিলেও রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য হয়েছেন। কিন্তু করেছেন কী? দেশের মানুষের কী উপকার হয়েছে তাঁদের রাজনীতির ময়দানে আসায়? প্রাক্তন ক্রিকেটারদের রাজনীতিতে অবদান তো মনে করাই মুশকিল। মনসুর আলি খান পতৌদি খোদ ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়ে পরাজিত হয়েছিলেন। কুড়ি বছর পরে ইন্দিরার পার্টির টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও সুবিধা হয়নি। কীর্তি আজাদ, চেতন চৌহান রাজনীতিতে যোগ দিয়ে দিল্লির ক্রিকেটের রাজনীতিবিদদের উদরস্থ হওয়া পর্যন্ত বাঁচাতে পারেননি। মহম্মদ আজহারউদ্দিন সাংসদ হিসাবে স্মরণীয় কিছু করেছিলেন এমন দাবি নিজেও করবেন না। হালের নভজ্যোৎ সিং সিধু এখনো বেশি জনপ্রিয় ইন্ডিয়ান লাফটার চ্যালেঞ্জের বিচারক হিসাবে।
স্রেফ হিসাব রাখার স্বার্থে বাইচুং ভুটিয়া, পারগত সিংয়ের মত অনেকের নাম করা যায়। পদাধিকারী হওয়া যদি রাজনীতিতে সাফল্য বলে ধরা হয় তাহলে অবশ্য প্রাক্তন খেলোয়াড়দের অনেকেই সফল। হয়ত সেই সাফল্যই তাঁদের লক্ষ্য ছিল। তাই কোনো ছোট দলে নয়, হয় কংগ্রেসে বা বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। বড় দলের টিকিটে জেতার সম্ভাবনা বেশি, জিতলে মন্ত্রী হওয়ার সুযোগও আসতে পারে। সেই যুক্তিতে লিয়েন্ডার বঙ্গ তৃণমূলে যোগ দিলে না হয় বোঝা যেত। গোয়া বিধানসভায় তৃণমূলের টিকিটে জিতে কি মন্ত্রী হওয়া যাবে? ভবিষ্যৎ বলবে।
খেলা থেকে রাজনীতিতে গিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছেন, এমন লোকের কথা ভাবতে গেলে আজও কিন্তু একজনের কথাই মনে আসে — আদিবাসী মহাসভার প্রতিষ্ঠাতা জয়পাল সিং মুন্ডা। ১৯০৩ সালে তৎকালীন বিহারের খুঁটি জেলায় জন্মানো এই আদিবাসী নেতা ১৯২৮ অলিম্পিকে সোনা জয়ী ভারতীয় দলকে লিগ স্তরে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যদিও নকআউট ম্যাচগুলোতে খেলেননি। রাজনীতিতে যোগ দিয়ে স্বাধীনতার আগে থেকে তিনি আদিবাসীদের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবি জানিয়ে গেছেন। সে দাবি পূর্ণ হয়েছে তাঁর মৃত্যুরও তিন দশক পরে। ভারতের সংবিধান সভার সদস্য হিসাবে এক স্মরণীয় বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, আমার মত মানুষদের পুরো ইতিহাসটাই হল অনাদিবাসীদের দ্বারা অবিরাম শোষিত ও স্থানচ্যুত হওয়ার ইতিহাস। মাঝে মাঝে কিছু বিদ্রোহ আর বিশৃঙ্খলার ইতিহাস। তবু আমি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর কথায় বিশ্বাস রাখছি। আপনাদের সবার এই কথায় বিশ্বাস রাখছি, যে আমরা স্বাধীন ভারতে একটা নতুন অধ্যায় শুরু করব, যেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে, আর কেউ অবহেলিত হবে না।
বিনা বিতর্কে পছন্দের কাজগুলো হয়ে যাক – এটা এদেশে কে না চায়? যে কোনো বড় শহরের জনবহুল মোড়ে দাঁড়িয়ে যাদের ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা বলে মনে হয় তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন। কতজন যে বলবে “গণতন্ত্রের সীমা থাকা উচিৎ”, “মিলিটারি রুল হচ্ছে বেস্ট”!
সে এক সংসদ ছিল। প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসতেন জহরলাল নেহরু বলে একজন। সাহিত্যিক ই এম ফর্স্টারের ধারণা ছিল, ফরাসী দার্শনিক ভলতেয়ারের যদি পুনর্জন্ম হয় আর তিনি বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে একটা চিঠি লিখবেন ঠিক করেন, তাহলে একমাত্র যে রাষ্ট্রনেতা সেটা পাওয়ার যোগ্য, তিনি নেহরু। আর বিরোধী দলনেতার আসনে বসতেন অসামান্য বাগ্মী এবং পণ্ডিত, অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। একটু দূরেই ছিলেন হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনিও কম বড় বক্তা নন। একবার শ্যামাপ্রসাদ বক্তৃতা দিচ্ছেন, নেহরু উঠে বললেন “What nonsense are you talking?” শ্যামাপ্রসাদ জবাব দিলেন “There’s no monopoly of yours in talking nonsense, sir.”
ঘটনাটা শুনেছিলাম হাওড়ার এক সময়কার সিপিএম সাংসদ প্রয়াত সুশান্ত চক্রবর্তীর মুখে। তিনি আরও একটা সংসদীয় বিতর্কের গল্প শুনিয়েছিলেন। সেটা ওরকম মান্ধাতার আমলের ঘটনা নয়, আমাদের সময়ের অনেক কাছাকাছি। কংগ্রেস নেতা এ আর আন্তুলের বিরুদ্ধে সিমেন্ট নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ। তা নিয়ে বিরোধীরা সংসদে জোর চেপে ধরেছেন সরকারকে। বিতর্কে এক মন্ত্রী দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন, তারপর বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং বলতে উঠেছেন। শুরুতেই বললেন “The minister spoke at length, trying to cement his argument. But failed.”
এই গল্পগুলো শুনি ২০০০ সাল নাগাদ। তখন ক্লাস টুয়েলভে পড়ি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তরুণ মাস্টারমশাই বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠিক করলেন আমাদের দিয়ে মক পার্লামেন্ট করাবেন। যেদিন অনুষ্ঠানটা হল সেদিন অতিথি হিসাবে এসে সুশান্তবাবু শুনিয়েছিলেন গল্পগুলো। ওগুলো অবশ্য লোকসভা, রাজ্যসভার অধিবেশনের সরাসরি টিভি সম্প্রচার শুরু হওয়ার আগের ঘটনা। আমি যে প্রজন্মের লোক, তারাই প্রথম টিভিতে ওসব দেখতে পায়। তখনো কিন্তু সংসদের বিতর্কগুলোর একটা ন্যূনতম মান ছিল।
আমরা ট্রেজারি বেঞ্চে অটলবিহারী বাজপেয়ীর কথার চেয়ে লম্বা বিরামযুক্ত বক্তৃতা শুনেছি, সাথে তাঁর স্বরচিত কবিতা। যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে আছে আস্থাভোটে জয়যুক্ত হওয়ার আগে বলা “কর্তব্য পথ পর / ইয়ে ভি সহি, উয়ো ভি সহি।” আমরা লালকৃষ্ণ আদবানির সংস্কৃতাশ্রয়ী হিন্দি বক্তৃতা শুনেছি, বিরোধী আসন থেকে জলদগম্ভীর সোমনাথ চ্যাটার্জিকে শুনেছি, পূর্ণ সাংমাকে মনে আছে, ভোজপুরী হিন্দি আর টুকরো রসিকতায় গুরু বিষয়কে লঘু করে বলতে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন লালুপ্রসাদকেও মনে আছে। আরও পরে সরকারপক্ষের পি চিদম্বরম, কপিল সিবাল আর বিরোধীপক্ষের অরুণ জেটলি, সুষমা স্বরাজ, সীতারাম ইয়েচুরির বক্তব্যও কান পেতে শোনার মত ছিল। তার চেয়েও বড় কথা ওয়াক আউট, বিলের প্রিন্ট আউট ছেঁড়া, ওয়েলে নেমে স্লোগান দেওয়া — এসব সত্ত্বেও খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বিতর্ক হত। তাতে সব পক্ষের প্রধান নেতারা অংশগ্রহণও করতেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা দেবেন না, এটা কল্পনাতীত ছিল।
তারপর আচ্ছে দিন এল। কার জানি না, তবে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে নয় তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিন সংসদ ভবনে ঢোকার সময় সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন, বলেছিলেন “এটাই তো আমার মন্দির।” এবং তারপর থেকেই ক্রমশ সংসদের অধিবেশন বসার দিন কমেছে, মন্দিরের প্রধান সেবায়েতের উপস্থিতিও কমেছে। অনেক দেশদ্রোহী বলে উনি সংসদ এড়িয়ে যান কারণ মেঠো বক্তৃতায় হাত-পা নেড়ে, চোখের জল ফেলে উতরে গেলেও সংসদে জোরালো বক্তৃতা দেওয়া ওঁর কম্ম নয়। তবে আমি একথা বিশ্বাস করি না। এটা নেহাতই কুৎসা। আসলে ভদ্রলোক দিনে মোটে চার ঘন্টা ঘুমোন তো। আমার ধারণা সেই চার ঘন্টা হল দুপুর বারোটা থেকে চারটে। তা ঐ সময়টা কি সংসদে বসে নষ্ট করা যায়? ওটুকু না ঘুমোলে মানুষটা অসুস্থ হয়ে পড়বে না?
কিন্তু দেশদ্রোহীরা তো এসব শুনবে না, তারা উল্টোপাল্টা বলবেই। সেটা বন্ধ করতে সরকার ভাল বুদ্ধি বার করেছেন – কোনো বিতর্ক হওয়ারই দরকার নেই সংসদে। এই প্রবণতা শুরু থেকেই অল্প অল্প দেখা যাচ্ছিল। বিমুদ্রাকরণের মত বড় বিষয় নিয়েও বিরোধীরা চেঁচামেচি করার পর সরকার আলোচনায় রাজি হয়েছিল। তাও চেয়েছিল যেন সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়, ভোটাভুটির ব্যাপার না থাকে। এবং যেভাবেই আলোচনা হোক না কেন, প্রধানমন্ত্রী কিন্তু বক্তব্য রাখবেন না।
এবারে আরেক কাঠি সরেস। একটা লোক দেশের এত টাকা মেরে দিয়ে পালিয়ে গেল যে এখনো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কত টাকা, অথচ সরকারের মনেই হল না এটা নিয়ে সংসদে আলোচনার প্রয়োজন আছে। বিরোধীরা আলোচনার দাবীতে বিস্তর চেঁচামেচি করছেন (বেশ করছেন), এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানাচ্ছেন সরকার সবকিছু নিয়ে আলোচনায় রাজি। কিন্তু একথা বলছেন কবে? না বিনা বিতর্কে অর্থ বিল পাশ হয়ে যাওয়ার পরে। যা যা ছিল তাতে তার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর বিদেশের টাকায় পুষ্ট হওয়াকে আইনসম্মত করে নেওয়াও আছে। এতবড় কান্ড হয়ে গেল কোনো বিতর্ক ছাড়াই। সরকারের যেন কোনো দায় নেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সংসদ সচল করার। ফ্লোর ম্যানেজমেন্ট কথাটার যেন কোনো অস্তিত্বই নেই।
আসলে বিনা বিতর্কে পছন্দের কাজগুলো হয়ে যাক – এটা এদেশে কে না চায়? যে কোনো বড় শহরের জনবহুল মোড়ে দাঁড়িয়ে যাদের ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা বলে মনে হয় তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন। কতজন যে বলবে “গণতন্ত্রের সীমা থাকা উচিত”, “মিলিটারি রুল হচ্ছে বেস্ট”!
যাঁরা মনে করেন কথাগুলো ঠিকই, তাঁদের জন্যে একটা ঐতিহাসিক ঘটনা বলে শেষ করি। ঘটনাটার সাথে আমাদের দেশের কোন ঘটনার মিল আছে কিনা আপনারাই ভেবে দেখুন।
ঘটনাটা ঘটে ২১ মার্চ, ১৯৩৩ তারিখে। সেদিন নাজি পার্টির নেতা হিটলার পটসডাম গ্যারিসন চার্চের বাইরে তদানীন্তন জার্মান রাষ্ট্রপতি পল ফান হিন্ডেনবার্গকে হাঁটু মুড়ে অভিবাদন জানায় এবং করমর্দন করে। উপলক্ষটা ছিল নব নির্বাচিত রাইখস্ট্যাগের (জার্মান সংসদ আর কি) প্রথম অধিবেশন। যেহেতু হিন্ডেনবার্গ রাষ্ট্রপ্রধান আর দিনটা হল রাইখস্ট্যাগের অধিবেশন শুরুর দিন, তাই অনেকে মনে করেছিল হিটলার জার্মান সংবিধান ইত্যাদির প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ করল। এর পরের বারো বছর প্রমাণ করেছে তাদের ভাবনাটা সঠিক ছিল কিনা।