কুস্তিগীরদের আন্দোলন: মহাতারকাদের মহাকাপুরুষতা

‘ভগবান’ শচীন তেন্ডুলকর কোনোদিনই গোলযোগ সইতে পারেন না, রাজ্যসভার গোলযোগ ছাড়া। বাঙালির গর্ব সৌরভ গাঙ্গুলিও দিল্লি ক্যাপিটালস নিয়ে খুব ব্যস্ত। মহিলা কুস্তিগীরদের দুর্দশা নিয়ে ভাববেন কখন?

এ দেশের ক্রিকেটমহল এখন ভীষণ ব্যস্ত। ক্রিকেট ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা আইপিএল চলছে। নিজ নিজ ফ্র্যাঞ্চাইজের জন্য জান লড়িয়ে দিচ্ছেন তাঁরা। লখনৌ সুপারজায়ান্টস অধিনায়ক কে এল রাহুল তো এতটাই নিবেদিতপ্রাণ যে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের বিরুদ্ধে ম্যাচে ফিল্ডিং করতে গিয়ে গুরুতর চোট পাওয়ার পরে হার নিশ্চিত জেনেও দশ নম্বরে ব্যাট করতে নেমেছিলেন। অতঃপর চোটের প্রভাবে বাকি টুর্নামেন্টে আর খেলতে পারবেন না, সামনের মাসে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেও খেলতে পারবেন না। এমন বীরত্বের জন্যই তো জাতীয় নায়কের মর্যাদা পান ক্রিকেটাররা। মুশকিল হল, দেশের জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে পদকজয়ী কুস্তিগীর ভিনেশ ফোগত এতেও সন্তুষ্ট নন। তাঁর দাবি, মহিলা কুস্তিগীরদের উপর যৌন আক্রমণের অভিযোগে ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের মাথা ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন চলছে, ক্রিকেটারদের তার পাশে দাঁড়ানো উচিত।

গত ২৮ এপ্রিল ভিনেশ বলেন, ক্রিকেটারদের তো আমাদের দেশে পুজো করা হয়। তাঁরা আমাদের পক্ষ যদি না-ও নেন, অন্তত একটা নিরপেক্ষ বার্তা দিয়েও তো বলতে পারেন যে দোষীদের শাস্তি পাওয়া উচিত। কেবল ক্রিকেটার নয় অবশ্য, সব খেলার তারকাদের কাছেই আবেদন ছিল ভিনেশের। তারপর থেকে অভিনব বিন্দ্রা আর নীরজ চোপড়া – ভারতের ইতিহাসে যে দুজন অলিম্পিকে ব্যক্তিগত সোনা জিতেছেন, দুজনেই ওই আবেদনে সাড়া দিয়েছেন। সদ্যপ্রাক্তন টেনিস তারকা সানিয়া মির্জাও দোষীদের শাস্তি চেয়েছেন। কিন্তু ক্রিকেটারদের বিশেষ হেলদোল নেই। বর্তমান ক্রিকেটারদের মধ্যে একমাত্র মহিলাদের জাতীয় দলের শিখা পাণ্ডে মুখ খুলেছেন। সদ্য চালু হওয়া মহিলাদের প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে দামী ক্রিকেটার স্মৃতি মান্ধনার কোনো বক্তব্য নেই। জাতীয় দলের অধিনায়িকা হরমনপ্রীত কৌরও চুপ। প্রাক্তনদের মধ্যে হরভজন সিং, বীরেন্দ্র সেওয়াগ, ইরফান পাঠান সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন। একমাত্র নভজ্যোৎ সিং সিধু সশরীরে ভিনেশ, সাক্ষী মালিক, বজরং পুনিয়াদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিংবদন্তি ক্রিকেটারদের মধ্যে কেবল কপিলদেব ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করে প্রশ্ন তুলেছেন, এরা কবে ন্যায়বিচার পাবে?

স্পষ্ট বক্তা হওয়ার জন্য যাঁর বিপুল খ্যাতি, সেই বিরাট কোহলি স্পিকটি নট। যাবতীয় বাহাদুরি গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ে খরচ করছেন। নারীবাদীরা প্রায়শই বিরাটকে নিয়ে গদগদ হয়ে পড়েন তিনি জীবনে স্ত্রী অনুষ্কা শর্মার অবদান স্বীকার করেন বলে, তাঁর ব্যর্থতায় ট্রোলরা অনুষ্কাকে টার্গেট করলে বিরাট মুখ খোলেন বলে। দেখে মনে হয়, পৃথিবীতে বিরাটই একমাত্র পুরুষ যিনি নিজের বউকে ভালবাসেন। তাঁর ধারে কাছে আসতে পারেন একমাত্র অস্কার মঞ্চে বউকে নিয়ে কটূক্তি করায় ক্রিস রককে ঘুঁষি মেরে দেওয়া উইল স্মিথ। দেখা যাচ্ছে, স্ত্রীর প্রতি বিরাটের ভালবাসা আমাদের পাড়ার রানাদার পর্ণা বউদির প্রতি ভালবাসার চেয়ে মহত্তর কিছু মোটেই নয়। বরং হয়ত কিছুটা নিকৃষ্টতরই। কারণ রানাদা রাস্তাঘাটে অন্য কোনো মহিলার সঙ্গে কাউকে বিশ্রীভাবে কথা বলতে দেখলে অন্তত একটু ধমকা-ধমকি করেন। কিন্তু দেশের লাঞ্ছিত মহিলা কুস্তিগীরদের নিয়ে বিরাটের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই।

মনে রাখা ভাল, অনুষ্কা নিজেও কম নারীবাদী নন। তিনি একদা সুনীল গাভস্করের বিরুদ্ধে নারীবিদ্বেষী হওয়ার অভিযোগ এনেছিলেন, কারণ গাভস্কর বলেছিলেন অনুষ্কার বোলিংয়ে অনুশীলন করে বিরাটের লাভ হবে না। সেই অনুষ্কাও আজ চুপ। চুপ মানে অন্তঃপুরবাসিনী হয়ে গেছেন তা কিন্তু নয়। দুটিতে কেমন জীবন উপভোগ করছেন তার তত্ত্বতাল্লাশ দিব্যি দিয়ে যাচ্ছেন টুইটার বা ইনস্টাগ্রামে। তবে গাভস্করের বিরুদ্ধে লম্বা বিবৃতি দিয়েছিলেন, অলিম্পিয়ান মহিলাদের প্রতিবাদ নিয়ে এক লাইনও লেখেননি। অবশ্য পরীক্ষায় আনকমন প্রশ্ন এসে গেলে আমরাও সে প্রশ্ন ছেড়ে আসতাম।

গম্ভীর আবার দিল্লি থেকে নির্বাচিত সাংসদ। সেই দিল্লির যন্তর মন্তরেই কুস্তিগীরদের অবস্থান বিক্ষোভ চলছে। যদিও ওই এলাকা গম্ভীরের কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত নয়, তবু তিনি একজন জনপ্রতিনিধি তো বটেন। অবশ্য উনি সাংসদের দায়িত্ব খুব মন দিয়ে কোনোদিন পালন করেছেন বলে অভিযোগ নেই। উনি সারাবছর ক্রিকেটের ধারাভাষ্য দিয়ে বেড়ান, আইপিএলের সময়ে যোগী আদিত্যনাথের রাজধানীর ফ্র্যাঞ্চাইজের দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকেন। কদিন পরে হয়ত ওই দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে সারাবছরই বিশ্বভ্রমণ করে বেড়াবেন। কারণ লখনৌ সুপারজায়ান্টসে তাঁর পদটির নাম গ্লোবাল মেন্টর, আর ওই ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিকরা ইতিমধ্যেই দক্ষিণ আফ্রিকার টি টোয়েন্টি লিগে দল কিনে বসে আছেন। আর কোথায় কোথায় কিনবেন কে বলতে পারে? এমন বিশ্বনাগরিকের কি আর যন্তর মন্তরের অবস্থান বিক্ষোভ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার কূপমণ্ডূকতা মানায়?

পিভি সিন্ধু, সায়না নেহওয়ালদেরও মুখে কুলুপ। ছবারের বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়ন মেরি কম তো পিটি ঊষা গোত্রের, অর্থাৎ ভারতীয় জনতা পার্টির অতি ঘনিষ্ঠ, তাই নীরব। গত কয়েকদিন অবশ্য তাঁর রাজ্য মণিপুরে লঙ্কাকাণ্ড চলছে। বিজেপি তাঁকে এত গুরুত্ব দেয় যে টুইট করে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, রাজনাথ সিংকে ট্যাগ করে বলতে হচ্ছে “মাই স্টেট ইজ বার্নিং, কাইন্ডলি হেল্প”। যে নিখাত জারীনকে একসময় স্রেফ জ্যেষ্ঠত্বের অধিকারে অবজ্ঞা করতেন মেরি, সেই দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নিখাত কিন্তু সরব হয়েছেন।

প্রাক্তন সাংসদ ভারতরত্ন ‘ভগবান’ শচীন তেন্ডুলকর মুম্বাই ইন্ডিয়ানস ডাগআউটে নিদ্রা গিয়েছেন। তিনি অবশ্য কোনোদিনই গোলযোগ সইতে পারেন না, রাজ্যসভার গোলযোগ ছাড়া। বাঙালির গর্ব সৌরভ গাঙ্গুলিও দিল্লি ক্যাপিটালস নিয়ে খুব ব্যস্ত। মহিলা কুস্তিগীরদের দুর্দশা নিয়ে ভাববেন কখন? তবু তো দয়া করে শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে মুখ খুলেছেন। লর্ডসের ব্যালকনির চিরস্মরণীয় ঔদ্ধত্য ত্যাগ করে ভারী বিনীতভাবে বলেছেন, ওদের লড়াই ওরা লড়ুক। আমি তো খবরের কাগজে পড়ছি, যা জানি না তা নিয়ে তো কথা বলা উচিত নয়।

এদিকে শচীন, সৌরভ দুজনেই কন্যাসন্তানের পিতা।

সত্যি কথা বলতে, ভারতীয় তারকা খেলোয়াড়দের যা ইতিহাস, তাতে এঁরা মহম্মদ আলি হয়ে উঠবেন বলে কেউ আশা করে না। সাম্প্রতিক অতীতে তাঁরা কিন্তু সাতে পাঁচে না থাকার নীতি অনেকটাই ত্যাগ করেছেন। ওঁরা এখন শচীন বা ঊষার মত শাসক দলের প্রসাদ গ্রহণ করে রাজ্যসভার সদস্য হচ্ছেন, এ পদ সে পদ গ্রহণ করছেন, গম্ভীরের মত ভোটে লড়ে সাংসদ বা বিধায়কও হচ্ছেন। যাঁদের অত এলেম নেই তাঁরাও কোহলির মত করে নোটবন্দি হওয়া মাত্রই তা কত বড় ঐতিহাসিক পদক্ষেপ তা নিয়ে মতামত দিয়েছিলেন, কৃষক আন্দোলন চলাকালীন তার বিরোধিতা করে টুইট করেছিলেন। সেওয়াগের মত কেউ কেউ আরও এককাঠি সরেস। শহিদ হওয়া সৈনিকের মেয়েকে যুদ্ধবিরোধী কথা বলার জন্য ট্রোল করতেও ছাড়েননি। কেবল সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খোলার দরকার পড়লেই এঁরা কেউ নীরব হয়ে যান, কেউ এক-দু লাইনে কাজ সারেন। সেওয়াগ, কপিলদেব, হরভজন দিল্লি, হরিয়ানা, পাঞ্জাবের মানুষ। কুস্তিগীরদের আন্দোলনের সামনের সারিতে আছেন হরিয়ানার কুস্তিগীররাই। তা না হলে এতেও ওই তিন প্রাক্তন মুখ খুলতেন কিনা সন্দেহ।

আরও পড়ুন ক্রিকেটার তুমি কার?

যে পদকজয়ী অলিম্পিয়ানরা আজ রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁরা কিন্তু এই সেদিন পর্যন্ত বিজেপি-ঘনিষ্ঠই ছিলেন। নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিনে বা জয়ে তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে টুইট করতে এঁদেরও কামাই ছিল না। এখন চোখের জলে সেসবের দাম দিতে হচ্ছে। এখনো যে মহাতারকারা নীরব, তাঁদের দেখে একটাই ভয় হয়। জার্মান যাজক মার্টিন নিয়মোলারের অনুসরণে এঁদের না কোনোদিন আওড়াতে হয়, প্রথমে ওরা এসেছিল কুস্তিগীরদের জন্যে। আমি কিছু বলিনি, কারণ আমি কুস্তিগীর নই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ভারত-পাক না হলে যাদের লাভ, হলে তাদের বেশি লাভ

তবে কি রাজনৈতিক ক্ষতি স্বীকার করে ব্যবসায়িক লাভ করার রাস্তা তৈরি করা হয় ভারত-পাক ম্যাচে? মোটেই না।

১৯৭১ সালের ভারত-পাক যুদ্ধে যখন সীমান্তে আমাদের জওয়ানরা লড়ছিল, তখন আপনি কোথায় ছিলেন?

সুনীল গাভস্করকে যদি কেউ এই প্রশ্নটা করে বসে, তাহলে ভদ্রলোকের দেশপ্রেম বর্তমান সংজ্ঞা অনুযায়ী প্রমাণ করা মুশকিল হবে। কারণ তিনি তখন অস্ট্রেলিয়ায় অবশিষ্ট বিশ্ব একাদশের হয়ে খেলছিলেন। শুধু তা-ই নয়, সেই দলে গাভস্কর, বিষাণ সিং বেদি আর ফারোখ ইঞ্জিনিয়ার যেমন ছিলেন, তেমনি পাকিস্তানের ইন্তিখাব আলম, আসিফ মাসুদ, জাহির আব্বাসরাও ছিলেন। এমনকি যুদ্ধ নিয়ে সেই দলে রসিকতাও হত। যেমন সহখেলোয়াড় রিচার্ড হাটন (ইংল্যান্ড) বলেছিলেন যুদ্ধ করতে করতে ফারোখ যদি ইন্তিখাবের পেটে বেয়নেট ঢুকিয়ে দেন, তাহলেও ইন্তিখাব মরবেন না। ওঁর পেটে চর্বি এতই বেশি, যে বেয়নেট ওখানেই আটকে যাবে। এসব কথা গাভস্কর ‘সানি ডেজ’ নামে তাঁর বইতে সকৌতুকে লিখেছেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তিনি বহু স্মরণীয় ইনিংস খেলেছেন, এমনকি শেষ টেস্ট ইনিংসেও অসম্ভব কঠিন পিচে প্রায় শতরান করে ফেলেছিলেন। অর্থাৎ ব্যাটসম্যান গাভস্কর পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের যারপরনাই জ্বালাতন করেছেন। তবু, সত্যিকারের যুদ্ধ চলাকালীনও পাক ক্রিকেটারদের সাথে কী ধরনের বন্ধুত্ব বজায় ছিল তা এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়। আরও বোঝা যায়, ভারত বা পাকিস্তানের সরকারও এই ক্রিকেটারদের একসাথে খেলা নিয়ে মাথা ঘামাননি। তাঁদের কাজ তখন যুদ্ধ পরিচালনা করা। তা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। ক্রিকেটারদের কাজ ক্রিকেট খেলা, তাঁরাও সেটাই করছিলেন। যে দেশের সাথে যুদ্ধ হচ্ছে সে দেশের ক্রিকেটারদের সাথে খেললে মহাভারত অশুদ্ধ হবে — এমন ভাবার ফুরসত ছিল না কারোর।

কিন্তু যুগ বদলেছে। ১৯৯৯ সালের পর থেকে ভারত-পাক যুদ্ধ আর হয়নি (প্রক্সি ওয়ার ১৯৪৭ থেকে কখনো থেমেছে কিনা সন্দেহ)। তবু পাকিস্তানের সাথে ক্রিকেটীয় সম্পর্ক রাখলে সীমান্তের জওয়ানদের অসম্মান করা হবে — এমন বলা হয়। পাকিস্তানের ছায়া মাড়ানোও বারণ। তাই আইপিএলে পর্যন্ত পাকিস্তানের ক্রিকেটার বা কোচ নেই বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। দু দেশের মধ্যে শেষবার সাদা বলের সিরিজ খেলা হয়েছিল ২০১২-১৩ মরসুমে আর শেষ টেস্ট সিরিজ ২০০৭ সালে। যখন কোনো আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে, তখন কিন্তু জওয়ানদের অসম্মান করা হল বলে ভারত সরকার মনে করেন না। ফলে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি বা বিশ্বকাপে ম্যাচটা হয়। এই ম্যাচে আইসিসির লক্ষ্মীর ভান্ডার উপচে পড়ে। পৃথিবীর যেখানেই খেলা হোক, অনাবাসী ভারতীয় ও পাকিস্তানিরা মাঠ ভরিয়ে দেন। সরাসরি টিভি সম্প্রচারের সেদিন মোচ্ছব। যে প্রবল দেশপ্রেমিকরা এমনিতে দু দেশের মধ্যে খেলাধুলোর তীব্র বিরোধী, তাঁরা কেউ ম্যাচটা বয়কট করার ডাক দেন না। টুইটারে টিভি বন্ধ রাখার কোনো হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেনও চলে না।

আসলে সবার উপরে ব্যবসা সত্য, তাহার উপরে নাই। খেলা না হলে রাজনৈতিক লাভ, কিন্তু নিয়মিত খেলা হয় না বলেই আইসিসি টুর্নামেন্টে খেলা হলে ব্যবসায়িক লাভ দ্বিগুণ। আর সে লাভে হস্তক্ষেপ করলে মহাশক্তিধর নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহও অসুবিধায় পড়বেন। তাই রাত পোহালে ওয়ার্ল্ড টি২০-তে যে ভারত-পাক ম্যাচ, কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী হানার প্রতিবাদে সেই ম্যাচে খেলা উচিত নয় — এমন বিবৃতি দেন গিরিরাজ সিংয়ের মত কম গুরুত্বপূর্ণ বিজেপি নেতারা। অনুরাগ ঠাকুর বা অমিত শাহ নন। অমিতবাবুর সুপুত্র নিজেই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের হর্তাকর্তা, চাইলেই তো ম্যাচ বয়কট করাতে পারতেন। বিরাট কোহলিদের মাত্র কয়েকটা পয়েন্টের লোকসান হত। কিন্তু পিতা পুত্রকে অমন করতে বলবেন না, কারণ আসল লোকসান হত কয়েকশো কোটি টাকার। কেবল বোর্ড নয়, সরকার-বান্ধব বহু ব্যবসায়ীর।

আরো পড়ুন টুপির আমি টুপির তুমি?

তবে কি রাজনৈতিক ক্ষতি স্বীকার করে ব্যবসায়িক লাভ করার রাস্তা তৈরি করা হয় ভারত-পাক ম্যাচে? মোটেই না। জর্জ অরওয়েল খেলাধুলো সম্পর্কে বলেছিলেন, এ হল গুলিবর্ষণ না করে যুদ্ধ। কালেভদ্রে হওয়া ভারত-পাক ম্যাচে দু দেশের ক্রিকেটমোদীদের মধ্যে ঘৃণার বান ডাকে, সোশাল মিডিয়ায় খিস্তির ঢল নামে। দু দেশের সরকার তো তেমনটাই চান। বরং অন্য সময় এই ঘৃণা জিইয়ে রাখতে বাড়তি প্রয়াসের দরকার হয়, এই ম্যাচের আগে, পরে পায়ের উপর পা তুলে মজা দেখা যায়।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ওয়াসিম জাফর: ক্রিকেটের গৌরবহীন একা

ওয়াসিমের দীর্ঘ কেরিয়ারের টিমমেটদের অধিকাংশের নীরবতা দেখিয়ে দিচ্ছে, তাঁদের কাছে ওঁর শেষ পরিচয় একজন ভিন্নধর্মী মানুষের।

ওয়াসিম জাফর কিন্তু মুনাওয়ার ফারুকি নন। তিনি হিন্দু দেবদেবী বা অমিত শাহ – নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে মস্করা করতে পারেন এমন কোন সম্ভাবনা নেই। করেছেন এমন কোন ইউটিউব ভিডিও-ও নেই। কারণ ওটা ওয়াসিমের পেশা নয়। তাঁর পেশা ক্রিকেট। তিনি প্রাক্তন ক্রিকেটার, অবসর নেওয়ার পর উত্তরাখণ্ড রঞ্জি দলের হেড কোচের চাকরি করছিলেন। পদত্যাগ করেছেন, কারণ তাঁর মতে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ উত্তরাখণ্ডের (সিএইউ) কর্তারা তাঁর কাজে অন্যায় হস্তক্ষেপ করছিলেন, নিজেদের পছন্দের ক্রিকেটারদের যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও দলে নিচ্ছিলেন। ব্যাপারটা এ দেশের খেলার জগতের চিরপরিচিত ঘটনাগুলোর একটা হয়েই থেকে যেত, যদি না টিম ম্যানেজার নবনীত মিশ্র ওয়াসিমের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আনতেন।

ওয়াসিমের পদত্যাগের পর এক হিন্দি কাগজের কাছে তাঁর নামে বিষোদগার করতে গিয়ে নবনীত বলেন হেড কোচ নাকি দল নির্বাচন করছিলেন ধর্মের ভিত্তিতে। অর্থাৎ মুসলমান হলে দলে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছিল। আরো গুরুতর অভিযোগ, টিম হাডলে (পরস্পরের কাঁধে হাত রেখে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আলোচনা করার সেই যে প্রথা জন রাইট আর সৌরভ গাঙ্গুলি ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারতীয় ক্রিকেটে চালু করেছিলেন) “রামভক্ত হনুমান কি জয়” বলতে বারণ করেছিলেন। শুধু কি তাই? বায়ো বাবল ভেঙে এক মৌলবীকে নিয়ে এসেছিলেন সাজঘরে। শিশুর আত্মার উপর এমন নরকের দুঃস্বপ্ন চাপিয়ে দেওয়ার পরে কি আর…?

আর কী? ওয়াসিমের প্রত্যুত্তর এই প্রশ্নটাই। বলেছেন তিনি যদি সত্যিই সাম্প্রদায়িক হয়ে থাকেন, তাহলে আগেই তাড়িয়ে দেওয়া হয়নি কেন? উপরন্তু বলেছেন সাম্প্রদায়িক হলে তিনি হিন্দু জয় বিস্তাকে অধিনায়ক করতে চাইতেন না। কর্তারাই বরং তাঁর কথা না মেনে ইসলাম ধর্মাবলম্বী ইকবাল আবদুল্লাকে অধিনায়ক করেন। ওয়াসিম উল্লেখ করেছেন কোন কোন মুসলমান ক্রিকেটারকে তিনি ভাল খেলতে না পারার কারণে প্রথম একাদশ থেকে বাদ দিয়েছেন। এ-ও বলেছেন যে দলের কাউকে হনুমানের বা রামের জয়ধ্বনি দিতে তিনি শোনেননি। বরং শিখদের প্রিয় একটি জয়ধ্বনি দেওয়া হচ্ছিল। তিনি তার বদলে “গো উত্তরাখণ্ড” বা “লেট’স ডু ইট উত্তরাখণ্ড” কিংবা “কাম অন উত্তরাখণ্ড” বলতে পরামর্শ দেন। কারণ দলটা কোন সম্প্রদায়ের হয়ে খেলছে না, খেলছে রাজ্যের হয়ে। সাম্প্রদায়িক মানসিকতার লোক হলে তো দলকে দিয়ে “আল্লা হো আকবর” বলাতেন। মৌলবীকেও তিনি সাজঘরে আনেননি, এনেছিলেন ইকবাল — ওয়াসিমের বক্তব্য এই।

ওয়াসিমের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে এখনো সিএইউ কর্তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করে উঠতে পারেননি। ইতিমধ্যে ইকবাল বলেছেন তিনিই মৌলবীকে জুম্মার নমাজের জন্য নিয়ে এসেছিলেন বটে, তবে ওয়াসিমের কাছ থেকে অনুমতি পাননি। তিনি বরং টিম ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করতে বলেছিলেন। হেড কোচের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আনা নবনীত স্বয়ং মৌলবী সাহেবকে নিয়ে আসার অনুমতি দেন। বারণ করলে তাঁকে আনা হত না। সত্যি কথা বলতে, ইকবালের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে মৌলবী সাহেবের সাথে ক্রিকেটারদের যে ছবি রয়েছে তার ত্রিসীমানায় ওয়াসিম নেই। এই প্রবন্ধ লেখার সময় পরিস্থিতি এই, যে সিএইউ সচিব মহিম বর্মা (ওয়াসিম পদত্যাগপত্রে মূলত এই ভদ্রলোকের বিরুদ্ধেই হস্তক্ষেপের অভিযোগ এনেছেন) প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছেন বায়ো বাবল লঙ্ঘন করা সম্বন্ধে ম্যানেজারের থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। সেই বিজ্ঞপ্তিতে ওয়াসিমের কিন্তু নামগন্ধ নেই।

এতখানি এসে নিশ্চয়ই ভাবছেন, এর মধ্যে মুনাওয়ার ফারুকির কথা উঠছে কেন? উঠছে এই জন্য যে শেষ বিচারে মুনাওয়ারের দোষ যা, ওয়াসিমের দোষও তাই। মুসলমান পরিচিতি। ওয়াসিম তবু ভাগ্যবান। স্রেফ বদনামের ভাগী হতে হয়েছে, দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইট তার চরিত্রানুসারে ঘটনা আর রটনার তফাত না করে ট্রোলবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছে। মুনাওয়ারের মত নির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও মাস খানেক হাজতবাস তো করতে হয়নি।

যদি মনে হয় তুলনাটা অহেতুক, তাহলে লক্ষ করুন ক্রিকেট প্রশাসকদের বিরুদ্ধে ওয়াসিমের পদত্যাগপত্রে লেখা অভিযোগগুলো নস্যাৎ করতে কী কী বলা হয়েছে। বলা যেতেই পারত ওয়াসিম অযোগ্য, ওঁর কোচিং-এ দল কিছুই জেতেনি, তাই উনি কর্তাদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে পালিয়ে গেছেন। অথবা বলা যেতে পারত খেলোয়াড়রা ওয়াসিমকে পছন্দ করছিল না, তাই উনি পালিয়ে বাঁচলেন। কোচের চলে যাওয়ার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে এইসব কথাই ভারতের বিভিন্ন খেলার কর্মকর্তারা চিরকাল বলে থাকেন। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকদের তো এসব শুনে শুনে কান পচে গেছে। উত্তরাখণ্ডের কর্তারা তেমন বললেন না কিন্তু। বললেন এমন কিছু কথা, যা একমাত্র মুসলমানদের সম্বন্ধে বললেই মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা যায় এবং সব প্রশ্ন ভুলিয়ে দেওয়া যায়। ভেবে দেখুন, যদি উত্তরাখণ্ডের হেড কোচের নাম ওয়াসিম জাফর না হয়ে অসীম জৈন হত, তার সম্বন্ধে যদি বলা হত, “বেছে বেছে হিন্দু ক্রিকেটারদের খেলায়”, “টিম হাডলে আল্লা হো আকবর বলতে বারণ করেছিল”, “বায়ো বাবল লঙ্ঘন করে সাজঘরে স্থানীয় মন্দিরের পুরোহিতকে ডেকে এনে প্রার্থনা করেছে” — তাহলে সবাই বলতেন না, ঠিকই করেছে? যারা “হিন্দু খতরে মে হ্যায়” বলে, শুধু তারা নয়, বাকিরাও কি মনে করতেন না বিনা দোষে লোকটার পিছনে লাগা হচ্ছে?

সদ্য সমাপ্ত অস্ট্রেলিয়া সফরেই কয়েকজন ভারতীয় ক্রিকেটার বায়ো বাবল ভেঙে রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে এক ভক্তের ক্যামেরাবন্দী হয়েছিলেন এবং, ভক্তটির বয়ান অনুযায়ী, তাঁকে আলিঙ্গন করেছিলেন। সেকথা প্রকাশ্যে আসার পর এ দেশের আপামর ক্রিকেটপ্রেমী এবং ক্রিকেট সাংবাদিক ভক্তটিকেই আক্রমণ করেন। ক্রিকেটাররা নাকি অবোধ শিশু। উপরন্তু তাঁরা বৃষ্টি এসে যাওয়ায় নিরুপায় হয়ে রেস্তোরাঁয় ঢুকেছিলেন। ক্রিকেট বোর্ডও ক্রিকেটারদেরই পাশে দাঁড়ায়। বলে বাবলটি তো তেমনি আছে, কমেনি এক রত্তি। আজ হঠাৎ মৌলবী সাজঘরে আসায় সকলের খেয়াল হয়েছে সবার উপরে বাবল সত্য, তাহার উপরে নাই।

ঘটনাটায় ওয়াসিমের যোগ তো এখন অব্দি প্রমাণিতই নয়। তাঁর অন্য কথাগুলো ভেবে দেখুন। ক্রিকেটজীবনের শেষ দিক থেকে তিনি লম্বা দাড়ি রাখেন বলে তাঁকে দেখে আপনার আসাদুদ্দিন ওয়েসির কথা মনে পড়তেই পারে, পাকিস্তানি বলতেও ইচ্ছা করতে পারে, কিন্তু তিনি টিম হাডলে যে যুক্তিতে শিখ ধর্মের জয়ধ্বনিরও বিরোধিতা করেছেন, সেটাই প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা নয় কি? খেলছি উত্তরাখণ্ডের হয়ে, তাই উত্তরাখণ্ডের নামে ধ্বনি দাও, কোন ধর্মের নামে দিও না। এর চেয়ে যুক্তিযুক্ত পরামর্শ কিছু আছে? ভারত কি পাকিস্তানের মত এক ধর্মের দেশ যে এখানে কোন একটা ধর্মের জয়ধ্বনিকে দলের জয়ধ্বনি করে দেওয়া হবে, আর অন্য ধর্মের খেলোয়াড়দেরও তা মেনে চলতে হবে? উঠতে বসতে ইসলামের একেশ্বরবাদকে বলব গোঁড়ামি আর হিন্দুদের বহুত্ববাদকে বলব উদারতা, তারপর সামাজিক জীবনে নিজের ঈশ্বরকেই চাপিয়ে দেব?

সত্যি কথাটা সহজ করেই বলা যাক। এ দেশে এই মুহূর্তে একজন মুসলমানের মুসলমান হওয়াই সবচেয়ে বড় সমস্যা। তিনি মুনাওয়ারের মত দাড়ি গোঁফ কামানো হালফ্যাশানের তরুণ হলেও সমস্যা, ওয়াসিমের মত লম্বা দাড়ি রাখা, ইকবালের মত মৌলবী ডেকে জুম্মার নামাজ পড়া মুসলমান হলেও সমস্যা। একজন লোক হাসিয়ে আয় করছে, যেভাবে হাসাচ্ছে তা আমার পছন্দ নয়। আমি না শুনলেই পারি। কিন্তু তাতে আমি থামব কেন? মুসলমান পরিচিতিটাকে হাতিয়ার করি। তাহলেই তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া যাবে। উপরি জেলের ঘানিও টানানো যাবে। একজন দেশের হয়ে দিব্যি ক্রিকেট খেলেছে, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সকলের চেয়ে বেশি রান করেছে, এখন কোচিং করাচ্ছে, আবার আমার দোষও ধরছে। সেটা আমার পছন্দ নয়। কী করা যায়? খুব সোজা। মুসলমান পরিচিতিটাকে হাতিয়ার করি। তাহলেই তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া যাবে।

এই দেশ কোনদিনই নিখুঁত ছিল না, স্বাধীন হওয়ার সময় থেকেই সহস্র স্ববিরোধিতা। সংবিধান সব নাগরিককে সমান চোখে দেখেছে, অথচ সমাজ সকলকে সমান মনে করে না। এই বৈপরীত্য সম্পর্কে স্বয়ং ভীমরাও আম্বেদকর সচেতন ছিলেন। সংবিধান সভার শেষ বক্তৃতায় তিনি সেকথা উল্লেখও করেছেন। এই বৈপরীত্য দূর করার দায়িত্ব যাঁদের হাতে ন্যস্ত ছিল, তাঁরা দায়িত্ব পালন করেননি। ফলে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের থানায় কালীপুজো হয়েছে, আমরা শিখেছি এটা সাম্প্রদায়িক নয়, কারণ অন্য ধর্মের লোকেরা তো আপত্তি করেনি। স্কুলে সরস্বতীপুজো হয়েছে, আমরা জেনেছি এটাও সাম্প্রদায়িকতা নয়। কই অন্য ধর্মের ছাত্রছাত্রী বা তাদের বাবা-মায়েরা তো আপত্তি করেনি? ময়দানে ফুটবল মরসুম শুরু হয়েছে বারপুজো দিয়ে, আমরা সাম্প্রদায়িকতা দেখিনি। আই পি এল ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রমাগত হারের দোষ কাটাতে স্টেডিয়ামে পুজো করেছে, তাতেও কেউ সাম্প্রদায়িকতা দেখেনি। ২০১৫-১৬ মরসুমে দিল্লীর রঞ্জি দলকে দিয়ে প্রতিদিন খেলার আগে সূর্য নমস্কার করাতেন কোচ বিজয় দাহিয়া আর অধিনায়ক গৌতম গম্ভীর। যুক্তি ছিল “A team that prays together stays together.” । তখনো কারোর মনে হয়নি ব্যাপারটা সাম্প্রদায়িক।

আসলে বরাবর আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা এবং মানদণ্ড ঠিক করেছে সংখ্যাগুরু। আজ অবস্থার এমন অবনতি হয়েছে যে দেশের যে জায়গাটায় ধর্ম বা জাতপাতের পরিচিতি কোন ইস্যু ছিল না বলে আমরা জানতাম, সেই খেলার মাঠেও তফাত করা শুরু হয়েছে।

যদি কেবল কর্মকর্তারাই এমনটা করতেন, তাহলে তবু কথা ছিল। কারণ ভারতের খেলাধুলো চালান আসলে রাজনীতির ব্যাপারীরা। আর এই মুহূর্তে যাদের পাল্লা ভারী, তাদের তো মানুষে মানুষে ভেদ করাটাই রাজনীতি। আমরা অন্তত এই ভেবে সান্ত্বনা পেতাম যে আমাদের খেলোয়াড়রা এভাবে ভাবেন না। তাঁদের কাছে সহখেলোয়াড়ের একটাই পরিচয় — খেলোয়াড়। কিন্তু এখন আর তেমনটা ভাবা যাচ্ছে না। এই লেখা শেষ করা পর্যন্ত অনিল কুম্বলে ছাড়া এ দেশের প্রবাদপ্রতিম ক্রিকেটারদের একজনও ওয়াসিমের পক্ষ নিয়ে একটি শব্দও খরচ করেননি। প্রাক্তনদের মধ্যে দোদ্দা গণেশ, অমল মজুমদার, ইরফান পাঠান আর বর্তমান ক্রিকেটারদের মধ্যে মনোজ তিওয়ারির মত দু একজন ছাড়া সবাই চুপ। ইকবাল আবদুল্লা, বা ওয়াসিমের বিদর্ভের হয়ে খেলার সময়কার টিমমেট ফয়েজ ফজলের সহমর্মিতায় কী-ই বা এসে যায়? ওয়াসিমের দীর্ঘ কেরিয়ারের টিমমেটদের অধিকাংশের নীরবতা দেখিয়ে দিচ্ছে, তাঁদের কাছে ওঁর শেষ পরিচয় একজন ভিন্নধর্মী মানুষের।

মনে রাখা দরকার, ওয়াসিম জাফর যে সে ক্রিকেটার নন। বেশিরভাগ ম্যাচ খেলেছেন ভারতীয় ক্রিকেটের কুলীন দল মুম্বাইয়ের হয়ে। শুধু যে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর তর্কাতীত সাফল্য তা নয়, ভারতের হয়ে ৩১টা টেস্ট ম্যাচে প্রায় ৩৫ গড়ে হাজার দুয়েক রান করেছেন। মাত্র চারজন ভারতীয় ওপেনার ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে দ্বিশতরান করতে পেরেছেন। ওয়াসিম তাঁদের একজন। অন্যরা সুনীল গাভস্কর, দিলীপ সরদেশাই আর নভজ্যোৎ সিং সিধু। এ হেন ক্রিকেটারকে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য কোণঠাসা করা হচ্ছে, আর চুপ করে আছেন মুম্বাইয়ের সব মহীরুহ। তাঁদের একজন, অজিঙ্ক রাহানে, এখন ভারতীয় টেস্ট দলের সহ-অধিনায়ক। চেন্নাইতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট শুরুর আগের দিন সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল এই নিয়ে। রাহানে বলেছেন তিনি ব্যাপারটা ঠিক জানেন না। এই রাহানেই সপ্তাহখানেক আগে কৃষক আন্দোলন সম্বন্ধে যথেষ্ট জানতেন। দেশকে এক থাকার বার্তা দিয়েছিলেন আরো অনেক ক্রিকেটারের সঙ্গে মিলে। এঁরা সবাই এখন স্পিকটি নট। রোহিত শর্মা চুপ, গাভস্করেরও সাড়াশব্দ নেই।

এবং শচীন তেন্ডুলকর। আজও ইউটিউবে দেখা যায় নব্বইয়ের দশকে তৈরি একটা ভিডিও ক্যাম্পেন। সারা দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার আবেদন করতে গিয়ে শচীন সেখানে বলছেন “When we play for India, we’re a team. It doesn’t matter if you’re a Hindu or a Muslim on the field. Don’t let it matter off the field.” সেই ভিডিওতে অমিতাভ ও অভিষেক বচ্চন, অপর্ণা সেন, অনুপম খের, শাবানা আজমির মত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাথে শচীনও যে অভিনয়ই করছিলেন তা কে জানত?

নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না। সুতরাং ধর্মীয় বিভাজন মাঠে নেমে পড়ায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে কষ্ট হয় মহম্মদ সিরাজের মত যাঁরা একসাথে পিতা আর পিতৃভূমির জন্য কাঁদেন, তাঁদের জন্য। ভারতীয় ক্রিকেট ঐ অশ্রুর যোগ্য থাকবে তো?

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত