হোমবাউন্ড: ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি?

হিন্দু উচ্চবর্গীয়দের পারিবারিক আড্ডা থেকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ হয়ে এখন সরকারি নীতি নির্ধারণেও এরাই দেশের যত নষ্টের গোড়া হিসাবে স্বীকৃত। শোয়েবদের যাওয়ার জন্যে তো গোটা পঞ্চাশেক দেশ আছে। তবু যে তারা কেন এদেশে পড়ে থাকে তা উচ্চবর্গীয় শিক্ষিত মানুষ বুঝেই উঠতে পারেন না। আর সরকার তো চন্দনদের জন্যেই সবকিছু করে, ওদের আর চিন্তা কী?

আলো আঁধারিতে ঢাকা একফালি জায়গা, তার এদিক থেকে ওদিকে হেঁটে যাচ্ছে ছোট ছোট পিঁপড়ে। প্রথম চোটে তাই মনে হয় বটে, তবে কয়েক সেকেন্ড কাটতে না কাটতেই বোঝা যায় – জায়গাটা আসলে গাড়িঘোড়াহীন ফ্লাইওভার। যারা হেঁটে যাচ্ছে তারা নিরুপায়, শ্রান্ত মানুষ। প্রতীক শাহের ক্যামেরায় লকডাউনে ঘরে ফিরতে চাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের এভাবেই দেখিয়েছেন হোমবাউন্ড ছবির পরিচালক নীরজ ঘেওয়ান। মাল্টিপ্লেক্সের ঠান্ডা ঘরে বসে মনে হয়, যেন ধরে ফেলেছেন আমরা আসলে কীভাবে দেখি ওই মানুষগুলোকে, রাষ্ট্র কীভাবে দেখে। ধরে ফেলেছেন বলেই ছবি শুরুর আগের, স্পষ্টতই সেন্সরের চাপে লিখিত, দীর্ঘ ‘ডিসক্লেমার’ দ্বিগুণ হাস্যকর মনে হয় ছবি শেষ হওয়ার পর। তার চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় ডিসক্লেমারের পরেই পর্দায় ভেসে ওঠা সম্পূর্ণ বিপরীতার্থক শব্দবন্ধ, যার অর্থ – সত্য ঘটনা অবলম্বনে।

নীরজ, বরুণ গ্রোভার এবং শ্রীধর দুবে লিখিত এই ছবির সংলাপে করুণ মুহূর্তে নানা সূক্ষ্ম ও স্থূল রসিকতা থাকলেও, হোমবাউন্ড যে হাস্যরস উৎপাদন করে তার গায়ে ভিড়ে ঠাসাঠাসি প্যাসেঞ্জার ট্রেনের যাত্রীদের মত করে লেগে থাকে চোখের জল। ইদানীং এদেশে ঘর ছেড়ে কাজের খোঁজে অন্যত্র যাওয়া মানুষ সর্বত্র খলনায়ক। এই ছবির দুই প্রধান চরিত্র মহম্মদ শোয়েব (ঈশান খট্টর) আর চন্দন কুমার বাল্মীকি (বিশাল জেঠওয়া) আবার সেই শ্রেণিতে পড়ে, যারা সবচেয়ে বেশি ঘৃণার – অর্থাৎ সাদা কলারের কর্মী নয়, একেবারে গায়ে গতরে খেটে খাওয়া মানুষ। অবশ্য শ্রমজীবী না হলেও হয়ত বিশেষ তফাত হত না, কারণ নামেই প্রমাণ – প্রথম জন মুসলমান, দ্বিতীয় জন দলিত। হিন্দু উচ্চবর্গীয়দের পারিবারিক আড্ডা থেকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ হয়ে এখন সরকারি নীতি নির্ধারণেও এরাই দেশের যত নষ্টের গোড়া হিসাবে স্বীকৃত। শোয়েবদের যাওয়ার জন্যে তো গোটা পঞ্চাশেক দেশ আছে। তবু যে তারা কেন এদেশে পড়ে থাকে তা উচ্চবর্গীয় শিক্ষিত মানুষ বুঝেই উঠতে পারেন না। আর সরকার তো চন্দনদের জন্যেই সবকিছু করে, ওদের আর চিন্তা কী? যেমনটা এক সরকারি অফিসার তাকে বলেছে। এই ছবির লেখক দল – বরুণ, বশারত পীর, সুমিত রায় এবং নীরজ স্বয়ং – স্লোগানধর্মিতার দিকে না গিয়েও বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন শোয়েবরা কেন সুযোগ পেলেও দুবাই যেতে চায় না। চন্দনদের বিড়ম্বনাও দেখিয়ে দিয়েছেন। আসল পদবি লিখলে লোকে নিচু নজরে দেখে আর না লিখলে নিজের চোখে ছোট হয়ে যেতে হয়। সরকারি চাকরির পরীক্ষার ফর্মে পদবি লিখব কি লিখব না, ‘সংরক্ষিত’ লেখা বাক্সে টিক দেব কি দেব না – নিজের সঙ্গে এই লড়াইটা লড়তে লড়তেই বয়স বেড়ে যায়।

ন্যাকা লাগছে ব্যাপারগুলো? লাগারই কথা। মানুষের চোখে পিঁপড়ের জীবনসংগ্রাম তো ন্যাকাই লাগে। ‘গেটেড কমিউনিটি’-র মধ্যে কাটানো নিশ্চিন্ত জীবন আর সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন আফ্রিকার সমান দারিদ্র্যে ক্রমশ বিভাজিত হতে থাকা এই দেশে হোমবাউন্ডের পাত্রপাত্রীদের জীবন মাল্টিপ্লেক্সের দর্শকদের চোখে অলীক, অবাস্তব মনে হওয়াই স্বাভাবিক। এ তো সেই রাজ কাপুরের আমল নয় যে সিনেমার পর্দায় চালচুলোহীন শ্রী ৪২০-এর সঙ্গে প্রেম হয়ে যাবে বস্তির বাচ্চাদের লিখতে পড়তে শেখানো সুন্দরী নার্গিসের, আর তা দেখে মোহিত হবে আসমুদ্রহিমাচল হিন্দি সিনেমার দর্শক। নতুন ভারতের মহানগরে শ্রী ৪২০ হয়ে থাকাই যাবে না, আধার কার্ড দেখাতে হবে। শোয়েবের মত মুসলমান হলে সামান্য চাপরাশির চাকরি পাকা করতে কেবল নিজের আধার কার্ড নয়, বাবা-মায়ের আধার কার্ডও দেখাতে হবে। আজকের হিন্দি সিনেমায় বস্তিবাসী কি ফুটপাথবাসী তো দূরের কথা, শোয়েব আর চন্দনের মত গাঁয়ের লোকদেরও দেখা যায় না চট করে। সেই নয়ের দশক থেকে, প্রাসাদোপম বাড়ির মালিক ব্যবসায়ী আর অনাবাসী ভারতীয়রাই তো নায়ক, নায়িকা। ইদানীং আবার প্রাচীন ও অপ্রাচীন যোদ্ধা এবং ধর্মযোদ্ধারা নায়ক, নায়িকা হচ্ছেন। নীরজ উলটো পথের পথিক। এক দশক আগে নিজের প্রথম ছবি মসান-এ তিনি দেখিয়েছিলেন বারাণসীর ডোম পরিবারের ছেলের সঙ্গে উচ্চবর্ণের মেয়ের প্রেমের স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গ। প্রশ্ন তুলেছিলেন – এই দুঃখ কিছুতেই শেষ হয় না কেন? সেই প্রশ্নেরই যেন এবার উত্তর খুঁজেছেন দুই গ্রামের ছেলের কাহিনিতে।

দুঃখ শেষ হয় না, কারণ চন্দনের মায়ের রান্না যতই ভালো হোক, সে মিড ডে মিল রাঁধলে বাবা-মায়েরা স্কুলে পাঠাবেন না ছেলেমেয়েদের। চন্দনের দিদি স্কুলের বাচ্চাদের হেগো পোঁদ ধুইয়ে দেবে – ওই পর্যন্ত ঠিক আছে। ব্যতিক্রমী হেডমাস্টার যতই আইনের ভয় দেখান, তাতে কাজ হবে না। বাবাসাহেব আম্বেদকর দলিতদের বাড়ির বিয়েতে গৌতম বুদ্ধের পাশে যতই পূজিত হোন, সংবিধান বা আইন মানা হবে কিনা, কোথায় কতটুকু মানা হবে, তা ঠিক করবেন উচ্চবর্গীয়রাই। দুঃখ শেষ হয় না, কারণ শোয়েবের মা যতই সুস্বাদু হালুয়া রাঁধুন আর শোয়েবের বিপণন ক্ষমতা যতই অসাধারণ হোক, শেষ কথা হল সে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে কাকে সমর্থন করে এবং সে নিজে যা-ই মনে করুক, সবাই নিশ্চিত যে পাকিস্তান হারলে সে দুঃখ পায়। দুঃখ শেষ হয় না, কারণ পথে অসুস্থ হয়ে পড়া প্রবাসী শ্রমিককে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্যে পুলিশ প্রশাসনের টিকি পাওয়া যায় না। কিন্তু মারা যাওয়ার পর মর্গে নিয়ে যেতে পত্রপাঠ সবাই হাজির। চারতলা পায়ের তলায় রাখবে তিনতলাকে, তিনতলা পায়ের তলায় রাখবে দোতলাকে, দোতলা পায়ের তলায় রাখবে একতলাকে – হাজার হাজার বছরের এই সুবিন্যস্ত শোষণব্যবস্থাকে কোনোরকম তত্ত্ব না কপচিয়ে সিনেমায় তুলে এনেছেন নীরজ। দুই প্রাণের বন্ধুর একজন চাকরির পরীক্ষায় পাশ করল, অন্যজন করল না। অমনি কিন্তু সম্পর্ক চিড় খেল, একে অপরের ধর্মীয় পরিচয় এবং জাতি পরিচয় উল্লেখ করে দাঁত নখ বের করে ফেলল। আবার হতদরিদ্র চন্দনের পরিবার সর্বস্ব পণ করে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে যায় চন্দনের জন্যে, তার দিদির জন্যে নয়। দলিত মেয়ে সুধা ভারতী যতই প্রেমে পড়ুক, সে অন্তত গ্র্যাজুয়েট নয় এমন ছেলেকে – পুলিশের কনস্টেবলকে – বিয়ে করতে রাজি নয়। কারণ বাবার সরকারি চাকরির কল্যাণে সুধার জাত না বদলাক, শ্রেণি বদলে গেছে। এই হল নীরজের ভারত, আমাদের ভারত।

আরও পড়ুন তালিবান শাসন: ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

অভিনেতার কাজই হল তিনি যে লোক নন সেই লোক হয়ে ওঠা। তবু হয়ত চারপাশের পরিস্থিতির কারণেই ঈশানকে মিতভাষী, অপমান বুকে চেপে রাখা গরিব মুসলমান যুবকের চরিত্রে এত বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করতে দেখে একটু বেশিই ভালো লাগে। নীরবে অপমানিত হওয়ার দৃশ্যগুলোতে ঈশান সবচেয়ে বাঙ্ময়। ছবির শেষ প্রান্তে চরম অসহায়তার মুহূর্তে তিনি সবচেয়ে শক্তিশালী অভিনয় করেন। তবে চমকে দেন চন্দনের চরিত্রে বিশাল। তাঁর চেহারার সবচেয়ে চোখে পড়ার মত জিনিস হল অস্বাভাবিক কটা চোখ। ওই চোখদুটোকে তিনি মরদানি ২ ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন নারীবিদ্বেষী সাইকোপ্যাথের হিংস্রতা ফুটিয়ে তুলতে। এখানে প্রায় ম্যাজিকের মত ব্যবহার করেছেন দলিতের গ্লানিকে মুখরতা দিতে। পছন্দের নারীর সামনে প্রেমিকের চিরকালীন ক্যাবলামি করতে করতে, ভেঙে পড়া বন্ধুকে কাঁদার জন্যে কাঁধ এগিয়ে দিতে দিতে ছবি যত এগিয়েছে, বিশাল বিশালতর হয়েছেন।

নীরজের ছবির নায়িকার গ্ল্যামার থাকে না, সুধারও নেই। সেই চরিত্রে জাহ্নবী কাপুর যথাযথ। তবে বিশালের সঙ্গে ঈশানের রসায়ন যত নিখুঁত, জাহ্নবী আর বিশালের রসায়ন ততটা জমেনি। পর্দায় বেশিক্ষণ না থাকলেও মনে থেকে যায় চন্দনের মায়ের চরিত্রে শালিনী বৎস্যা আর ঈশানের বসের চরিত্রে শ্রীধরের অভিনয়। বরুণ অতীতে বহু ছবিতে একবার শুনলে কানে লেগে থাকার মত গান লিখেছেন। যাঁরা তাঁর কবিতার কথা জানেন, তাঁকে ঋজু বিদূষক হিসাবেও চেনেন, তাঁরা আরও ভালো করে জানেন তাঁর ভাষার উপর প্রশ্নাতীত দখলের কথা। সব মিলিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, অমিত ত্রিবেদী সুরারোপিত, জাভেদ আলি আর পাপোনের গাওয়া এই ছবির ‘ইয়ার মেরে’ সেই প্রত্যাশা পূরণ করে না।

ছবি শেষ হওয়ার পরেও চোখে লেগে থাকার মত দৃশ্যের অবশ্য শেষ নেই। তেমনই একটা দৃশ্য দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। পরের দিকে শিশি ভর্তি আচারের, বন্ধুদের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে খাওয়ার জিনিস থেকে বেঁচে থাকার শেষ সম্বল হয়ে পড়ার দৃশ্যও অবিস্মরণীয়। কে জানে সে জন্যেই সচেতনভাবে নীরজ ওই করুণ দৃশ্যে ফ্রেমের মাঝখানে ‘সব ইয়াদ রখখা জায়গা’ কবিতার রচয়িতা আমির আজিজকে রেখেছেন কিনা! এই আলোচককে অবশ্য ছবি দেখার সপ্তাহখানেক পরেও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দুখানা ফাটা পা আর এক জোড়া নতুন চটি। এইসব কারণে নীতিন বৈদের সম্পাদনার কথাও আলাদা করে বলতেই হবে।

ছবি শেষ হওয়ার পরেও চোখে লেগে থাকার মত দৃশ্যের অবশ্য শেষ নেই। তেমনই একটা দৃশ্য দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। পরের দিকে শিশি ভর্তি আচারের, বন্ধুদের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে খাওয়ার জিনিস থেকে বেঁচে থাকার শেষ সম্বল হয়ে পড়ার দৃশ্যও অবিস্মরণীয়। কে জানে সে জন্যেই সচেতনভাবে নীরজ ওই করুণ দৃশ্যে ফ্রেমের মাঝখানে ‘সব ইয়াদ রখখা জায়গা’ কবিতার রচয়িতা আমির আজিজকে রেখেছেন কিনা! এই আলোচককে অবশ্য ছবি দেখার সপ্তাহখানেক পরেও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দুখানা ফাটা পা আর এক জোড়া নতুন চটি। এইসব কারণে নীতিন বৈদের সম্পাদনার কথাও আলাদা করে বলতেই হবে।

নীরজ একজন আশ্চর্য পরিচালক। তিনি গোটা ছবিতে মানুষের শঠতা, অত্যাচার, অনাচার, অবিচার, দুঃখকষ্ট দেখান। তারপরেও এক চিলতে আশায় ছবি শেষ করেন। মসান ছবিতে শ্মশানের বামুনের মেয়ে দেবী পাঠক (রিচা চাড্ডা) আর ডোমের ছেলে দীপক চৌধুরীর (ভিকি কৌশল) সমান্তরালভাবে চলতে থাকা জীবন একসাথে বয়ে গিয়েছিল সঙ্গমের দিকে। এখানেও শেষমেশ দুরকমভাবে ঘরে ফিরেছে দুই বন্ধু। নীরজ শেষপর্যন্ত এমন এক দেশের স্বপ্ন জিইয়ে রেখেছেন, যেখানে হিন্দু বন্ধুর গৃহপ্রবেশে দরজা ফুল দিয়ে সাজায় মুসলমান বন্ধু। এ দৃশ্যই এদেশে স্বাভাবিক ছিল, ক্রমশ অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে – মুসলমান রোগী দেখেন বলে হিন্দু ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ করিয়ে দেওয়া হয়েছে খোদ পশ্চিমবঙ্গে। তাই বুক দুরুদুরু করে। পরিচালককে প্রশ্ন করতে সাধ হয় ‘ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি/হারিয়েছ দেশ কাল জানো না কি?’

অবশ্য হয়ত নীরজই ঠিক, আমরা যারা আশঙ্কিত, তারাই ভুল। সংখ্যাগুরুবাদীদের গত কয়েক বছরের আপ্রাণ চেষ্টার পরেও, প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রচার চালানোর পরেও, হিন্দি সিনেমার দর্শকরা ঘৃণা ছড়ানো সিনেমাকে বাতিল করে দিলেন তো। তাছাড়া ধর্মা প্রোডাকশনসের মত বলিউডের বিরাট প্রযোজনা সংস্থা এ ছবির দায়িত্ব নিল তো। যতই মার্টিন স্করসেসি এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার হোন, অত বড় ব্যানারের ছায়া না থাকলে যে এ ছবি দর্শকের মুখ দেখত না, তা সাম্প্রতিক কিছু উদাহরণ খেয়াল করলেই বোঝা যায়। অতএব হয়ত এখনো আশা করা অযৌক্তিক নয় যে, ক্রিকেট খেলতে খেলতে মুসলমান বন্ধুকে কেউ তার ধর্ম তুলে ‘নিজেদের এলাকায় গিয়ে খেল গে যা’ বললে হিন্দু বন্ধুর মারপিট করতে যাওয়ার দিন এদেশে ফুরোবে না। এ যুগের কোনো কবিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মত ছোটবেলার বন্ধু আনোয়ারকে স্মরণ করে লিখতে হবে না ‘বন্ধু হারালে দুনিয়াটা খাঁ খাঁ করে/ভেঙে যায় গ্রাম, নদীও শুকনো ধূ ধূ/খেলার বয়েস পেরোলেও একা ঘরে/বার বার দেখি বন্ধুরই মুখ শুধু।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভোটচুরির অভিযোগ আমাদের এনে ফেলেছে এক সন্ধিক্ষণে

গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা এবং গণতন্ত্র নষ্ট করার অভিযোগ উঠলে সগর্বে ‘বেশ করেছি’ বলার এই ঔদ্ধত্যই ফ্যাসিবাদ। এর সঙ্গে অন্য কোনও সরকারের অন্যায়ের, অপশাসনের তুলনা চলে না। এ-কথা যাঁরা আজ বুঝবেন না, ফ্যাসিবাদ জাঁকিয়ে বসতে পারলে ভারতের গণতন্ত্রের পাশাপাশি তাঁদেরও ঠাঁই হবে জাদুঘরে।

এক যুগ পরে এমন একটা ঘটনা ঘটল স্বাধীনতা দিবসের ঠিক দুদিন আগে, যা এতদিনের অনভ্যস্ত কানে অবিশ্বাস্য মনে হল— ভারতের শাসক দল আর বিরোধী দল একমত হয়েছে। কোন বিষয়ে? ভোটচুরি সম্বন্ধে। যে সে লোক নয়, দেশের গদ্দারদের দেখলেই গুলি করার পক্ষপাতী যিনি, সেই অনুরাগ ঠাকুর স্বয়ং সাংবাদিক সম্মেলন করে ঠিক তাই বললেন, যা লোকসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় নেতা রাহুল গান্ধী তার হপ্তাখানেক আগে বলেছিলেন— ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপি করে ভোটচুরি করা হয়েছে। সত্যি কথা বলতে, অনুরাগ রাহুলের বক্তব্যকে আরও জোরদার করে দিয়েছেন।

রাহুল তো বলেছিলেন তাঁর দলের লোকেরা নির্বাচন কমিশনের দেওয়া কম্পিউটার স্ক্যানেরও অযোগ্য সাত ফুট উঁচু কাগজ ঘেঁটে ভোটচুরির প্রমাণ বের করেছেন মোটে একখানা লোকসভা কেন্দ্রের একখানা বিধানসভা অঞ্চলে। চাইলে কমিশন বলতেই পারত যে এত বড় দেশে একটা লোকসভা কেন্দ্রে ভুলচুক হয়ে থাকতেই পারে। এ দিয়ে প্রমাণ হয় না যে সারা দেশে এ জিনিস হয়েছে। কিন্তু অনুরাগ আরও গভীরে গবেষণা করেছেন। তিনি সারা দেশের নানা রাজ্যের আধ ডজন লোকসভা আসনের তথ্য তুলে ধরেছেন। সেগুলোতেও দেখা যাচ্ছে রাহুল-চিহ্নিত মাধবপুরা আসনের মতোই কাণ্ড ঘটেছে।

৭ আগস্ট ছিল বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ হিন্দুমতে লক্ষ্মীবার। সেদিন রাহুলের সাংবাদিক সম্মেলন এবং তারপর থেকে যা যা হয়ে চলেছে, তাতে মা লক্ষ্মী হিন্দুত্ববাদীদের উপর অপ্রসন্ন বলেই বোধ হচ্ছে। ২০১৪ সালে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কংগ্রেস, আম আদমি পার্টির মতো একাধিক বিরোধী দল ভোটে কারচুপির অভিযোগ করে যাচ্ছে। প্রায় সব অভিযোগের ক্ষেত্রেই আঙুল উঠেছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের দিকে। কমিশন পাত্তা দেয়নি, বিজেপি তো দেয়নি বটেই। নিজেরা জিতলে বলেছে ‘হেরো পার্টি অজুহাত খুঁজছে’, আর বিরোধীরা জিতলে বলেছে ‘এবার কেন ওরা ইভিএমের কথা বলছে না?’ অথচ ইভিএমের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো মোটেই ফেলে দেওয়ার মতো ছিল না, অভিযোগকারীরা যে শলাপরামর্শ করে অভিযোগ করেছে তা-ও নয়। কেবল বিরোধীরাই অভিযোগ করেছে এমনও নয়। সাংবাদিকরা খবর করেছেন ইভিএম বেপাত্তা, গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন অভিযোগ করেছে যে প্রদত্ত ভোট আর ইভিএমে গোনা ভোটের সংখ্যার তফাত হয়েছে প্রচুর আসনে— সবই মাছি তাড়ানোর মতো করে উড়িয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আদালতে আবেদন করেও লাভ হয়নি। বিজেপিবিরোধী ভোটাররাও বিশ্বাস করেছেন যে বিরোধীরা নিজেদের কাজটা ঠিকমতো করে না, তাই এসব বলে। যতটুকু যা কারচুপি হয় তা চিরকালই হত, যখন যে ক্ষমতায় থাকে সে-ই করে। ফলে হিন্দুত্ববাদীরা বেশ নিশ্চিন্তেই ছিল।

কিন্তু বিষ্যুদবার দুপুরে রাহুল একেবারে অন্যদিক থেকে আক্রমণ করলেন। বললেন, গোড়ায় গলদ। ভোটার তালিকা ঘেঁটে বের করা তথ্য চোখের সামনে তুলে ধরলেন, দিস্তা দিস্তা কাগজ হাতে দেখিয়ে দিলেন— অভূতপূর্ব কারচুপি হচ্ছে। আমাদের গণতন্ত্রের নানা ত্রুটি থাকলেও, সেরা বৈশিষ্ট্য হল— মুকেশ আম্বানির একটা ভোট, আমার বাড়ির কাজের দিদিরও একটাই ভোট। ওটাই ভারতের গণতন্ত্রের জোর, আমাদের গর্বের জায়গা। এই জায়গাটা সেই ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচন থেকেই স্বাধীন ভারতে তৈরি করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রথম দিন থেকে ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-জৈন-পারসিক-মুসলমান-খ্রিস্টান, উঁচু জাত-নিচু জাত— সবার ভোটাধিকার আছে, এই গর্ব করার অধিকার গোটা দুনিয়ায় একমাত্র আমাদের। এমনকি গ্রেট ব্রিটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও এই ইতিহাস নেই। আর ৭৮ বছরের অবহেলায় অর্থবল, বাহুবলের গুরুত্ব বাড়তে বাড়তে ভারতীয় গণতন্ত্র যেখানে পৌঁছেছে তাতে আজ আপামর ভারতবাসীর গণতান্ত্রিক সম্বল বলতে ওই ভোটটুকুই। সেটাই যে চুরি হয়ে যাচ্ছে তা রাহুল আক্ষরিক অর্থে কাগুজে প্রমাণ দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। যতই ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ঢাক বাজানো হোক, দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও মোবাইল ছাড়া আর কোনও ইলেকট্রনিক জিনিসের ব্যবহার জানেন না। তাঁদের কাছে কাগজে ছাপা জিনিসের মর্যাদা এখনও বেশি। এই কথাটা আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না, গরিব মানুষের পার্টি বলে যারা নিজেদের দাবি করে তারাও অনেকে বোঝে না। রাহুল বা কংগ্রেস যে সেটা বুঝেছে, সেদিনের সাংবাদিক সম্মেলন তার প্রমাণ। পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনে দেশের বড় অংশের মানুষকে কিছুই বোঝানো যেত না, যদি রাহুল ইয়া মোটা মোটা বইয়ের মতো করে প্রমাণগুলো চোখের সামনে হাজির না করতেন। লক্ষ করার মতো ব্যাপার হল, সাংবাদিকরা কিন্তু ইভিএম কারচুপির প্রশ্নও তুলেছিলেন। রাহুল সেদিকে গেলেনই না, বললেন আসল গলদ নির্বাচন কমিশনের। ওই জায়গাটা ঠিক না থাকলে ব্যালটেই ভোট হোক আর ইভিএমে— ভোটচুরি হবেই।

আরও পড়ুন বিধবা, পিতৃহীন শিশু – সকলকে জবাব দিতে হবে সেকুলারদের

বিষ্যুদবারের ক্ষত মেরামত করার চেষ্টা করতে করতে এক সপ্তাহ কাটিয়ে ফেলল নির্বাচন কমিশন আর বিজেপি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এ-দেশের নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছে কেশব নাগের অঙ্ক বইয়ের চৌবাচ্চার মতো। রাহুল জল বেরোবার এত বড় গর্ত করে দিয়েছেন যে জল ঢোকার নল দিয়ে কমিশন আর বিজেপি যতই জল ঢোকাক, চৌবাচ্চা দ্রুত খালি হয়ে যাওয়ার দিকে এগোচ্ছে। প্রথমে কমিশন বলল হলফনামা জমা না দিলে রাহুলের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করব না। অবিলম্বে জানা গেল নিয়মানুযায়ী এতে হলফনামা জমা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তারপর নির্বাচন কমিশনের কর্ণাটকের সিইও একখানা হাস্যকর কাজ করে বসলেন। রাহুলকে নোটিস পাঠালেন, তিনি যেন অভিযোগ তথ্যপ্রমাণ-সহ জমা দেন। একে তো যার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ সে-ই দাবি করছে তার কাছে চুরির প্রমাণ দিতে হবে, তার উপর তারই কাছ থেকে নেওয়া নথিকে প্রমাণ বলে মানতে সে রাজি নয়। জনপ্রিয় বাংলা ছবির ফুটো মস্তানের সংলাপই এখানে পরিস্থিতির সবচেয়ে যথার্থ বর্ণনা দিতে পারে— ‘এ কে রে সান্তিগোপাল! এ তো আজব কালেকসন!’

এদিকে রাহুল ভাঙা বেড়া দেখিয়ে দিতেই শেয়ালরা বেরিয়ে এল পালে পালে। মহম্মদ জুবেরের মতো সাংবাদিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজ্যের কংগ্রেস কর্মী, সাধারণ উৎসাহী মানুষ, এমনকি গোদি মিডিয়ার একটা অংশও (যেমন ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপ) তদন্তে নেমে পড়ল এবং দেখা গেল, যেখানে ছাই উড়ছে সেখানেই অমূল্য রতন পাওয়া যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় রেফারির হয়ে মাঠে নামতে হত বিজেপির চাণক্যকে, যদি তিনি সত্যিই চাণক্যের মতো কূটবুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে থাকেন। কিন্তু তিনি স্পিকটি নট, মাঠে নামিয়ে দিলেন অনুরাগকে। তিনি ভাবলেন রাহুল আর প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর জেতা রায়বেরিলি আর ওয়ায়নাড়, তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অভিষেক ব্যানার্জির জেতা ডায়মন্ড হারবার আসনের ভোটার তালিকাতেও গোলমাল আছে দেখালেই সব কোলাহল থেমে যাবে। কিন্তু বাপু তা কী হয়? অতি বুদ্ধিমান বাঙালি ভদ্রলোক আর সারা দেশের অন্ধ ভক্তরা ছাড়া সকলেই বুঝতে পারছে, নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে বিজেপি যে কাণ্ডটি ঘটিয়ে চলেছে বলে মনে হচ্ছে, তা চিরাচরিত ভোটের দিনের রিগিং নয়। পেশিশক্তির জোরে লোককে ভয় দেখিয়ে ভোট দিতে না দেওয়া, নিজের লোক ঢুকিয়ে পরের পর ভোট দেওয়ানো বা ভোটার তালিকা দেখে অনুপস্থিত ভোটারের জায়গায় নিজের লোককে ভোট দেওয়ানো দেশের সব দলই করেছে কোনও না কোনও সময়ে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন নিজেই এমন ব্যবস্থা করে দিচ্ছে যাতে একটা নির্দিষ্ট দলের সমর্থকরা যতবার ইচ্ছে যেখানে ইচ্ছে ভোট দিতে পারে (এখনও আমরা জানি না ব্যাপারটা ঠান্ডা ঘরে বসে মেশিনের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে কিনা), ভোটার তালিকায় নাম যোগ-বিয়োগ করা হচ্ছে একটা দলকে হারা আসনও জিতিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে— এ জিনিস অভূতপূর্ব। এটা চলতে থাকলে দেশে আর ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রও আছে বলা যায় না। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া হয়ে উঠতে আর দেরি নেই আমাদের।

এই সেদিনও রাহুলকে বিজেপির বিরুদ্ধে উপযুক্ত নেতা বলে মনে করত না তৃণমূল কংগ্রেস। সেই অজুহাতে ত্রিপুরা, মণিপুর, মেঘালয়, গোয়ার মতো রাজ্যে জিতবে না জেনেও লড়তে চলে গেছে। সেই তৃণমূলের দু-নম্বর নেতা অভিষেক ৭ তারিখের সাংবাদিক সম্মেলনের পর থেকেই রাহুলের প্রত্যেক কথায় সায় দিচ্ছেন। তাঁর দলের সাংসদরা দৃশ্যতই রাহুলের বাহিনীর সৈনিক হয়ে উঠেছেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেসকে সাবোতাজ করতে গোয়া, গুজরাতের মতো রাজ্যে নির্বাচনে লড়তে চলে যাওয়া আম আদমি পার্টির সাংসদরা দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরে প্রায় উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরাও রাহুলের পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, ১১ তারিখের নির্বাচন সদন অভিযানেও যোগ দিয়েছিলেন। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবের ব্যারিকেড টপকে যাওয়ার স্পর্ধা আর রাষ্ট্রীয় জনতা দলের তেজস্বী যাদবের মারমুখী মেজাজের রাজনৈতিক স্বার্থ সহজবোধ্য। সামনে বিহারে বিধানসভা নির্বাচন, ২০২৭ সালে উত্তরপ্রদেশে। তেজস্বী আর অখিলেশ ওই দুই রাজ্যের প্রধান বিরোধী নেতা, ক্ষমতায় আসতে মরিয়া হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তৃণমূল তো ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনেও হইহই করে জিতবে বলছেন বোদ্ধারা। বিরোধীরাও আড়ালে তা স্বীকার করে। আর আপের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্ঘাত স্বয়ং অরবিন্দ কেজরিওয়ালও আশাবাদী নন, তাই এত বড় কাণ্ড নিয়ে একটা সোশাল মিডিয়া পোস্ট পর্যন্ত করছেন না। তাহলে এই দুই দলের কংগ্রেসের সঙ্গে এমন শক্ত জোট বাঁধার কারণ কী?

কারণ গত এক সপ্তাহে যা ঘটছে তার সঙ্গে বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর নামে যেভাবে মানুষের ভোটাধিকার হরণ চলছে (এরপর পশ্চিমবঙ্গে এবং তারপর গোটা দেশে চলবে), তা মিলিয়ে দেখলে যে কেউ বুঝতে পারে— এরপর থেকে সব ভোটে জিতবে বিজেপিই। এখন বিজেপি বাদে সবাই একজোট না হলে কোনও দলেরই আর অস্তিত্ব থাকবে না। ফলে অসুস্থ হয়ে পড়া তৃণমূল সাংসদ মিতালী বাগকে একদিক থেকে রাহুল, অন্যদিক থেকে সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস ধরে আছেন— এই ভাইরাল ছবি আসলে মানুষের বিপদে জোট বাঁধার আদিম অভ্যাসের চিত্র। সবাই মিলে রাস্তার দখল নিয়ে, পাহাড়প্রমাণ আন্দোলনের ঢেউ তুলে যদি বিজেপির ইমারত ভাঙতে পারেন, তবেই আলাদা আলাদা দল করার মানে থাকবে। তখন কে ভালো কে মন্দ, কে কম রিগিং করে কে বেশি রিগিং করে, কে বুর্জোয়া কে কমিউনিস্ট, কোনটা ফ্যাসিবাদ কোনটা নয়া ফ্যাসিবাদ— এসব নিয়ে তর্কাতর্কি, মারামারি করার ফুরসত পাওয়া যাবে। না পারলে কী হবে? তার ট্রেলার বিজেপি দেখিয়ে দিয়েছে ১১ তারিখেই। প্রায় সমস্ত বিরোধী সাংসদ যখন পথে এবং দিল্লি পুলিশ তাঁদের আটক করেছে, তখন কোনও আলোচনা ছাড়াই একাধিক বিল পাশ করিয়ে নিয়েছে সংসদ থেকে, যার মধ্যে আছে নতুন আয়কর আইনও। এই আইন অনুযায়ী আয়কর বিভাগ যে কোনও করদাতার ইমেল, সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল পর্যন্ত দেখতে পারে। বলা বাহুল্য, এ কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ নয়। আইনের এই ধারা ব্যবহার করে সরকারবিরোধী যে কোনও মানুষকে হয়রান করা সম্ভব, গ্রেপ্তার করাও সম্ভব। এই সরকারের আমলে একবার গ্রেপ্তার হলে আপনি দোষী না নির্দোষ তার বিচার কত কঠিন তা যদি না বুঝে থাকেন, শুধু দুটো নাম মনে করুন— স্ট্যান স্বামী আর উমর খালিদ।

বিরোধীশূন্য সংসদে বিল পাশ করানো সম্পর্কে সেদিন সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু কী বলেছিলেন?

‘কংগ্রেস পার্টি আর বিরোধীরা অনেক সময় নষ্ট করেছে। এখন আমরা আর দেশের সময়, সংসদের সময় নষ্ট করতে দেব না। সরকার গুরুত্বপূর্ণ সব বিল পাশ করাতে চায়। আমরা আজ সেগুলো লোকসভা আর রাজ্যসভা— দুই জায়গাতেই পাশ করাব। দেশ একজন লোকের আর একটা পরিবারের বোকামির জন্যে এত ক্ষতি সহ্য করতে পারে না। অনেক বিরোধী সাংসদও এসে বলেছেন তাঁরা নিরুপায়। তাঁদের নেতারা জোর করে গোলমাল পাকাতে বলে। আমরা প্রতিদিন একটা ইস্যু নিয়ে দেশের সময় আর সংসদের সময় নষ্ট হতে দেব না। সুতরাং আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলো পাশ করাব।’

এই একটা ইস্যু কোনটা? ভোটচুরি। অর্থাৎ যা দিয়ে সংসদ তৈরি হয়েছে, সেটাকেই ফালতু বলে উড়িয়ে দিচ্ছে সরকার। সংসদ ব্যাপারটার গুরুত্বই আসলে স্বীকার করছে না, প্রকারান্তরে বলা হচ্ছে— আমরা যা চাইব সেটাই আইনে পরিণত করব।

গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা এবং গণতন্ত্র নষ্ট করার অভিযোগ উঠলে সগর্বে ‘বেশ করেছি’ বলার এই ঔদ্ধত্যই ফ্যাসিবাদ। এর সঙ্গে অন্য কোনও সরকারের অন্যায়ের, অপশাসনের তুলনা চলে না। এ-কথা যাঁরা আজ বুঝবেন না, ফ্যাসিবাদ জাঁকিয়ে বসতে পারলে ভারতের গণতন্ত্রের পাশাপাশি তাঁদেরও ঠাঁই হবে জাদুঘরে। তবে গণতন্ত্রের এখনও বাঁচার আশা আছে, কারণ এই অতি বুদ্ধিমান অবুঝরা সংখ্যায় কম এবং রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক। রাহুল, অখিলেশ, তেজস্বী, ব্রিটাসরা জানেন কোনটা নির্বাচনী বাধ্যবাধকতা আর কোনটা ঐতিহাসিক প্রয়োজন। তাছাড়া ও পক্ষে আছেন অনুরাগের মতো কালিদাসের বংশধররা।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলা বলে কোনো ভাষা নেই, বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই?

আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ঠিক এক দশক আগের কথা। সদ্য রাজকাহিনী বেরিয়েছে (অবন ঠাকুরের নয়, সৃজিত মুখার্জির)। ইংরিজি জানা বাঙালি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা আপ্লুত হয়ে একটা গান শেয়ার করতে লাগলেন সোশাল মিডিয়ায়। কী গান? ওই যে গানটা আমাদের জাতীয় স্তোত্র। কিন্তু এত আপ্লুত হওয়ার কারণ কী? কারণ রবীন্দ্রনাথের লেখা গানটা আসলে অনেক বড়, অত বড় জাতীয় স্তোত্র রাখা যায় না ব্যবহারিক অসুবিধার কারণেই। তাই আমাদের জাতীয় স্তোত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয় শুরুর দিকের খানিকটা অংশ। ওই ছবিতে সৃজিতবাবু গোটা গানটাই ব্যবহার করেছিলেন। এই নিয়ে আপ্লুত হওয়া অন্যায় নয়। কিন্তু মুশকিল হল, দেখা গেল যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁদের অনেকেই লিখছেন ‘লিসন টু দ্য বেঙ্গলি ভার্শন অফ আওয়ার ন্যাশনাল অ্যান্থেম। ইট’স বিউটিফুল’ – এই জাতীয় কথাবার্তা। সাধারণত সোশাল মিডিয়ায় কারোর কোনো ভুল ধরলে তিনি প্রবল খেপে গিয়ে যিনি ভুল ধরেছেন তাঁকে অপমান করেন। এক্ষেত্রে যেসব বাঙালি মান-অপমানের তোয়াক্কা না করে ওইসব পোস্টে মন্তব্য করেছিলেন বা নিজে পোস্ট করেছিলেন যে গানটা তো বাংলাতেই লিখেছিলেন রবিবাবু, তার আবার বাংলা ভার্শন কী – তাঁদের ‘আঁতেল’, ‘সবজান্তা’ ইত্যাদি বিশেষণ দেওয়া হচ্ছিল। তবে ভারতবর্ষে ইংরিজি জানা মূর্খদের আত্মবিশ্বাস বেশি। তাই সেই মূর্খরা কেউ কেউ আবার যিনি শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁকেই ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল। ব্যাপার দেখে হাসা উচিত না কাঁদা উচিত তা বুঝতে না পারলেও, এটুকু বুঝে গিয়েছিলাম যে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক যে ভদ্রলোক শ্রেণি, তাদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে গেছে। আজ অমিত মালব্যকে যতই গালাগালি দিন, একথা নিশ্চিত হয়ে বলার উপায় নেই যে তাঁর ওই গণ্ডমূর্খ পোস্টের যুক্তিগুলো কোনো ইংরিজি শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকেরই জুগিয়ে দেওয়া নয়।

এই ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের অতি পছন্দের একখানা ধর্মীয় সংগঠন আছে, যাকে তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন বলে ভাবতে ভালবাসেন (মানে আমড়াকে আম বলে ভাবতে ভালবাসেন) – রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। রাজকাহিনীর গান নিয়ে ভদ্রলোক শ্রেণির রাজবোকামির দেড় দশক আগে ওই সংগঠন পরিচালিত একটা কলেজের পড়ুয়া ছিলাম। আমার সহপাঠী ছিল মঠের ভিতরেই গড়ে ওঠা, সন্ন্যাসীদের দ্বারা পরিচালিত বেদ বিদ্যালয়ে ছোট থেকে লেখাপড়া করে আসা কয়েকজন ছাত্র। তারা জনগণমন গাইত সংস্কৃত উচ্চারণে। আমরা কয়েকজন ছাত্র মিলে একদিন তাদের জিজ্ঞেস করলাম ‘ওরকম উচ্চারণে গাস কেন?’ তারা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানাল, ওটা ছোট থেকে শিখেছে। ওটাই শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণ। আমরা জিজ্ঞেস করলাম ‘বাংলা গানের উচ্চারণ সংস্কৃতের মত হবে কেন?’ তারা কিছুতেই মানতে রাজি হল না যে গানটা বাংলায় লেখা। নির্ঘাত তারা আজও জাতীয় স্তোত্র গাওয়ার প্রয়োজন হলে ‘শুদ্ধ সংস্কৃত’ উচ্চারণেই গায়। এরা কেউ কিন্তু প্রান্তিক পরিবারের সন্তান নয়, হিন্দিভাষীও নয়। গ্রাম, শহর – দুরকম জায়গার ছেলেই ছিল সেই দলে। সত্যি কথা বলতে, কেবল এরা নয়। আইসিএসই বা সিবিএসই স্কুলে পড়ে আসা বাঙালি সহপাঠীদেরও দেখেছি সংস্কৃত উচ্চারণে জনগণমন গাইতে। অর্থাৎ আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাই অনিবার্য ছিল।

এখন কথা হচ্ছে, এমনটা হল কেন? বাংলা ভাষা, সংস্কৃতির লাগাম তো চিরকালই এই ভদ্রলোকদের হাতেই থেকেছে। দুই বাংলা ভাগ হওয়ার পরে তো আরওই। বাংলা সিনেমার যত বিখ্যাত অভিনেতা, অভিনেত্রীর নাম মনে করতে পারেন তাদের কজন হিন্দু নিম্নবর্গীয় বা মুসলমান? পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হওয়ার পরে দু-চারজন মুসলমান অভিনেতা, অভিনেত্রী পশ্চিমবঙ্গে অভিনয় করেছেন বটে, কিন্তু মুসলমান চরিত্র কটা এপারের বাংলা সিনেমায়? মুসলমান সমাজের গল্পই বা কটা? পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পত্রপত্রিকার সম্পাদক, সাহিত্যিকদের মধ্যে খুঁজতে গেলেও ঘুরে ফিরে সেই প্রাক-স্বাধীনতা যুগের মীর মোশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দিন, সৈয়দ মুজতবা আলী, এস ওয়াজেদ আলী বা একটু পরের সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের নাম আসবে। কিছু নিবিষ্ট পাঠক হয়ত আবুল বাশার বা আফসার আহমেদের নাম মনে করতে পারবেন। জনপ্রিয় গাইয়ে, বাজিয়েদের মধ্যেও সেই ইংরিজি শিক্ষিত বামুন, কায়েত, বদ্যিরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শিক্ষক, অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ – যেদিকে তাকাবেন সেদিকই তো ভদ্রলোকরা আলো করে আছেন। তাহলে এ অবস্থা হল কেন? স্পষ্টতই পূর্বসুরিরা পতাকা যাদের হাতে দিয়েছেন তাদের বহিবার শকতি দেননি। কিন্তু কেন দেননি, বা দিতে পারেননি?

বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক স্কুল থেকে ইংরিজি তুলে দেওয়ার জন্যে ভদ্রলোকেরা বেসরকারি ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করতে বাধ্য হন আর তা থেকেই শিক্ষিত বাঙালির সঙ্গে বাংলা ভাষার বিযুক্তি শুরু, কারণ ইংরিজিটা তো শিখতেই হবে। নইলে কাজকর্ম পাওয়া যায় কী করে? ওটাই তো কাজের ভাষা।

এরকম একটা তত্ত্ব প্রায়শই খাড়া করা হয়। এই তত্ত্ব নজর করার মত। শিক্ষা মাতৃভাষাতেই হওয়া উচিত – একথা আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ বসু থেকে শুরু করে গোটা দুনিয়ার অনেক বড় বড় পণ্ডিত বলেছেন। আবার বিপক্ষেও যুক্তি আছে। সে বিতর্কে না গিয়ে একথা মেনে নেওয়া যাক যে, কোনো ভাষা কাজের ভাষা হয়ে না থাকলে গুরুত্ব হারায়। বামফ্রন্ট সরকার মাতৃভাষার উপর জোর দিলেও বাংলাকে গোটা রাজ্যের কাজের ভাষা করে তোলার পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেয়নি। পাশাপাশি ভারতের মত বহুভাষিক দেশে ইংরিজির গুরুত্ব বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এবং ভদ্রলোকরা বাংলা ভাষাকে ক্রমশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন – একথা তর্কের খাতিরে নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু কথা হচ্ছে, বাঙালি ভদ্রলোকদের ছেলেমেয়েরা তো ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই। যাঁর বই ছেলেমেয়ের হাতে তুলে না দিলে আজও এমনকি অনাবাসী বাঙালিদেরও ‘বাংলার সংস্কৃতি শেখাচ্ছি না’ ভেবে অপরাধবোধ হয়, সেই লীলা মজুমদার নিজেই কনভেন্টের ছাত্রী ছিলেন। তা ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করলেই ছেলেমেয়েকে বাংলা বইপত্তর পড়ানো, বাংলা গান শোনানো, সিনেমা দেখানো, নাটক দেখানো তুলে দিতে হবে – এ নিয়ম কি বামফ্রন্ট সরকারের তৈরি? আগেকার বাঙালির অমন করার দরকার পড়েনি, হঠাৎ বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ইংরিজি তুলে দিতেই দরকার পড়ল?

সত্যি কথা বলতে, সিপিএম ক্রমশ ভদ্রলোকদের পার্টি হয়ে যাওয়ায় বামফ্রন্টও মেহনতি মানুষের সরকার থেকে ভদ্রলোকদের সরকারেই পরিণত হয়েছিল নয়ের দশকের শেষার্ধে। তাই ভদ্রলোকদের ইংরিজি নিয়ে হাহুতাশের প্রভাবে এই সহস্রাব্দের গোড়ায় কিন্তু প্রাথমিকে ইংরিজি ফিরিয়েও এনেছিল। তারপর কি ভদ্রলোকেরা ছেলেমেয়েদের সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ফিরিয়ে এনেছিলেন? মোটেই না। উলটে মাধ্যমিক স্তরেও বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করার ঝোঁক বেড়ে গিয়েছিল। এখন নাহয় এসএসসি কেলেঙ্কারি ইত্যাদি যুক্তি দিয়ে বলা যায় সরকারি স্কুলগুলো পড়াশোনার অনুপযুক্ত হয়ে গেছে। বাম আমলে তো প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষা হত, রাজ্যের আনাচে কানাচে গজিয়ে ওঠা ইংরিজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর মাস্টারদের চেয়ে অনেক কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোতে যোগও দিতেন। ত্রুটি থাকলেও স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে, পড়াশোনা নিয়ে তখনকার সরকারের আগ্রহ যে বর্তমান সরকারের চেয়ে বেশি ছিল – তা আজকাল অনেক তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকও স্বীকার করেন। তাহলে?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আসলে বাঙালি ভদ্রলোকের অভদ্রতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। বহু ভদ্রলোকের কাছেই আপত্তিকর ছিল বাম আমলে মুটে, মজুর, রিকশাওয়ালা, বাড়ির কাজের লোক, মুচি, মেথরের ছেলেমেয়েদের তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে একই স্কুলে ঢুকে পড়া। আরও বেশি গায়ে লাগত যখন তারা কেউ নিজের ছেলেমেয়ের চেয়ে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়ে যেত। পরীক্ষার ফল বেরোবার পর আমাদের অনেককেই বকুনি খেতে হয়েছে ‘তোর লজ্জা করে না? অমুকের বাড়িতে কোনোদিন কেউ স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি, আর ও অঙ্কে ৮৫ পেয়ে গেল। তুই মাস্টারের ছেলে হয়ে ৫৫? ছিঃ!’ মাস্টারের ছেলে বড় হয়ে মাস্টার; ডাক্তারের ছেলেমেয়ে তো বটেই, ছেলের বউ আর জামাইও ডাক্তার; উকিলের ছেলেমেয়ে উকিল; মুদির ছেলে মুদি, তার মেয়ে অন্য ছোট ব্যবসায়ীর গৃহবধূ; রিকশাওয়ালার ছেলে সবজিওয়ালা – এই সামাজিক স্থিতাবস্থায়, গোবলয়ের লোক বলে বাঙালি ভদ্রলোক যাদের দিকে তাকিয়ে নাক সিঁটকোয়, তাদের মত নিজেরাও অভ্যস্ত ছিল। সেই স্থিতাবস্থা ঘেঁটে যাওয়ার সামান্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বাম আমলে। ওটুকুই ভদ্রলোকদের পক্ষে শিশুর আত্মার উপর নরকের দুঃস্বপ্নের মত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ তারা খুঁজে পায় অনেক টাকা মাইনের বেসরকারি স্কুলে। নয়ের দশক থেকে মনমোহনী অর্থনীতির জোরে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে আমূল পরিবর্তন এসে যায়। তাদের হাতে এসে গেল খরচ করার মত অতিরিক্ত টাকা। ফলে ছোটলোকের ছেলেপুলের সঙ্গে এক স্কুলে পড়ানোর আর দরকার রইল না। পাঠিয়ে দাও ফেলো কড়ি মাখো তেল স্কুলে। এমনকি বামফ্রন্ট সরকারের বদান্যতায় উচ্চমধ্যবিত্ত হয়ে ওঠা সরকারি স্কুলের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরাও নিজেদের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পাঠানো শুরু করেন তখনই। সংখ্যাটা অবশ্যই এখন অনেক বেড়েছে, তার পিছনে বর্তমান সরকারের শিক্ষাজগৎ নিয়ে ছেলেখেলার অবদান কম নয়। কিন্তু আসল কথা হল, ‘ইংরিজি শিখতে হবে বলে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়াচ্ছি’ – এটা স্রেফ অজুহাত। দুর্বল অজুহাত। সেটা বুঝতে পেরেই যুক্তি জোরদার হবে মনে করে নয়ের দশকে অনেক বাবা-মা বলতেন ‘ইংরিজি বলা শিখতে হবে। নইলে কম্পিটিশনে দাঁড়াতে পারবে না। তাই ইংলিশ মিডিয়ামে দিয়েছি।’ এও ভারি মজার কথা। স্কুলটা কি তাহলে ‘স্পোকেন ইংলিশ’ শেখার জায়গা? ওটা জানলেই চাকরিবাকরি পাওয়া যায়? চোস্ত ইংরিজি বলতে পারলেই অঙ্ক, বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস – সব শেখা হয়ে যাবে? অধিকাংশ বাঙালি ভদ্রলোক কিন্তু তেমনই মনে করে আজও। কথা বললেই টের পাওয়া যায়। তবে আজকাল একটা নতুন ব্যাপার ঘটেছে। ইংরেজ আমলে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনের লক্ষ্য ছিল যতটা সম্ভব ইংরেজ হওয়া, স্বাধীনতার পর থেকে – অনাবাসী ভারতীয় হওয়া। আজকের বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে একটা নতুন লক্ষ্য যোগ হয়েছে – মাড়োয়ারি বা গুজরাটি হওয়া। তাই ছেলেপুলেকে ইংরিজি মাধ্যমে পড়িয়ে ইংরিজি বলা শিখিয়েই সে খুশি নয়, দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দিও গুঁজে দিচ্ছে। সুতরাং বাংলা মাঠের বাইরে। গল্পের বই পড়ার এবং পড়ানোর চল বাঙালি ভদ্রলোক বাড়ি থেকে উঠে গেছে বহুকাল, এখন আবার বাবা-মায়েরা খেয়াল রাখেন, ছেলেমেয়ে যেন বাংলা সিরিয়াল বা সিনেমা দেখে না ফেলে।

এমতাবস্থায় বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি কী, কোনটা তার অঙ্গ আর কোনটা নয় – তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকবে কোন চুলোয়? সংজ্ঞাগুলো ঠিক করে দিয়েছি আমরা ভদ্রলোকরা। আমাদের সংজ্ঞায়িত বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিকে আমরাই বাংলার বাইরে বাংলা বলে পরিচিত হতে দিইনি, ওগুলোকে আমাদের সংস্কৃতির বৃত্তে জায়গাই দিইনি। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার ভাষায় লেখা গান আমাদের ‘আধুনিক গান’। বাঙাল ভাষার গানকে তখনই বাংলা গান বলে মেনেছি যখন শচীন দেববর্মণের মত রাজপুত্র গেয়েছেন। গ্রামের মানুষের নিজের গানকে লোকগীতি বলে আলাদা বাক্সে রেখেছি। পনিটেল বাঁধা শহুরে ভদ্রলোকরা গিটার বাজিয়ে ব্যান্ড বানিয়ে গাইলে তবেই সে গানের জায়গা হয়েছে প্রেসিডেন্সি, লেডি ব্র্যাবোর্ন বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস মোচ্ছবে। আচ্ছা তাও নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু নিজেরা যাকে বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি বলে দেগে দিয়েছি তাকে সমাজের নিচের তলায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও কি করেছি? ফিল্ম সোসাইটি বানিয়ে ঋত্বিক ঘটকের উদ্বাস্তুদের নিয়ে তৈরি ছবি দেখেছি আর প্রবন্ধ লিখেছি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা উদ্বাস্তু, যারা এখানে এসে পেটের দায়ে আমাদের বাড়িতে বাসন মাজে বা ঘর ঝাঁট দেয় – তাদের দেখানোর তো চেষ্টা করিনি। সত্যজিৎ রায় বিশ্ববন্দিত পরিচালক বলে জাঁক করেছি, কিন্তু পথের পাঁচালী-র হরিহর রায়ের পরিবারের মত হতদরিদ্র বাঙালিকে ওই ছবি দেখানোর কোনো প্রয়াস তো আমাদের ছিল না। কারণ আমরা নিশ্চিত ছিলাম – ওরা ওসব বুঝবে না। ওদের জন্যে বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না-ই ঠিক আছে। ঘটনা হল, যার দুবেলা পেট ভরে ভাত জোটে না, তারও মনের খিদে থাকে এবং সে খোরাক খুঁজে নেয়। বাংলার গরিব মানুষ, নিম্নবর্গীয় মানুষও তাই করেছে। আমাদের তৈরি সংস্কৃতি যখন তাদের পোষায়নি তখন তারা হিন্দি সিনেমা, হিন্দি গানে মজেছে। অধুনা ইউটিউব শর্টস আর ইনস্টা রিলসে। আমাদের অ্যাকাডেমি, আমাদের নন্দন নিয়ে আমরাই বুঁদ ছিলাম। ও জিনিস আজ কেউ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিলেই বা ওদের কী? এদিকে আমরা, বিশ্বায়িত ভদ্রলোকরাও, হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকেছি। ইংরিজি তো ছিলই। ফলে এখন হঠাৎ আবিষ্কার করছি – হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান তত্ত্বের প্রবক্তারা বলে দিচ্ছে বাংলা বলে আসলে কোনো ভাষা নেই, আর সেটাকেই ঠিক বলছেন বাংলা ভাষায় বইপত্তর লিখে নাম করে ফেলা লেখকরা।

নবজাগরণই বলি আর সমাজ সংস্কার আন্দোলনই বলি, উনিশ শতকে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আলোর সন্ধান যে বাঙালি ভদ্রলোক পেয়েছিল তা অনস্বীকার্য। কিন্তু আলো বাড়াতে গেলে আলো ছড়াতে হয়। ভদ্রলোকরা কী করেছে? প্রদীপ নিজের ঘরেই রেখে দিয়েছে, হাতে নিয়ে যাদের ঘরে আলো নেই তাদের কাছে যায়নি, তারা আমাদের প্রদীপ থেকে নিজেদের প্রদীপ জ্বালিয়ে নিতে পারেনি। এখন আমাদের প্রদীপের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, তাই চারপাশ অন্ধকারে ডুবে যেতে বসেছে। আসলে আমাদের বাংলা ভাষা চর্চা, সংস্কৃতি চর্চা বা যে কোনো চর্চাই বহুকাল হল প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। ওর মধ্যে ঘাম ঝরানোর কোনো ব্যাপার নেই, তাই ও থেকে আমাদের কোনো অর্জনও নেই। কেন এমন হল? ভাবতে গেলে জ্যোতি ভট্টাচার্য ‘কালচার’ ও ‘সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে যে গোলমালের কথা বলেছেন সেটাই মনে পড়ে যাচ্ছে। একবার পড়ে দেখা যাক

ইংরেজি ভাষা থেকে ‘কালচার’ শব্দটার আমরা বাংলা পরিভাষা করেছি ‘সংস্কৃতি’। ঠিক পরিভাষা কী হওয়া উচিত – ‘সংস্কৃতি’ না ‘কৃষ্টি’, তা নিয়ে বিসংবাদ হয়েছে এককালে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কৃষ্টি’ শব্দটা বাংলা ভাষায় কুশ্রী অপজনন। ‘তাসের দেশ’ নাটকে শব্দটা নিয়ে কৌতুকও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরে ‘কৃষ্টি’ শব্দটা ক্রমে লোপ পেয়েছে, ‘সংস্কৃতি’-ই ব্যবহারসিদ্ধ লোকগ্রাহ্য শব্দ হয়ে উঠেছে।

ইংরেজরা ‘কালচার’ শব্দটা নিয়েছিল লাটিন ভাষা থেকে। লাটিন ভাষায় শব্দটার প্রধান অর্থ ছিল কৃষিকর্ম, ‘এগ্রিকালচার’ শব্দের মধ্যে সেই প্রধান অর্থ বাহিত হচ্ছে। এই কারণেই বাংলায় কেউ কেউ ‘কৃষ্টি’ বলতে চেয়েছিলেন, কর্ষণের সঙ্গে তার সম্পর্ক। কৃষিকর্মে কর্ষিত ক্ষেত্রে বীজ বপন করে নতুন শস্য উৎপাদন করা হয়…চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগজীবাণুর প্রতিষেধক জীবাণু ‘কালচার’ করে তৈরি করা হয়; রক্তে রোগজীবাণু বা ক্ষতিকর কোনো পদার্থ থাকলে অণুবীক্ষণে তা দেখতে হলে অনেক সময় রক্তবিন্দুর ‘কালচার’ করে তাকে বর্ধিত করতে হয়। মোট কথা ‘কালচার’ শব্দটার মধ্যে কর্ষণ বা অনুশীলনের দ্বারা নতুন বস্তু অথবা নতুন গুণ সৃষ্টি ইঙ্গিত রয়েছে, এর ঝোঁক উৎপাদনমুখী। কোনো না কোনো রকম বৃদ্ধি এর ফল।

আমাদের ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির শব্দার্থগত ঝোঁক কিন্তু এরকম নয়। এর প্রধান অর্থ রূঢ় অবস্থা থেকে মার্জিত অবস্থায় আনয়ন, স্থূল অবস্থা থেকে বাহুল্যবর্জিত করে সূক্ষ্ম অবস্থায় আনয়ন। নতুন বস্তু সৃষ্টি, নতুন গুণ উৎপাদন, বা সংখ্যাবৃদ্ধি এর অভীপ্সিত লক্ষ্য নয়, যা আছে তাকেই একটা পরিশীলিত সংযত সুসমঞ্জস সুকুমার রূপদান এর লক্ষ্য। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির এই প্রধান ঝোঁক আমাদের আজকের পরিস্থিতিতে খানিকটা বাধাস্বরূপ হয়ে উঠছে – এরকম আশঙ্কা করছি।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি আগে লেখা এই কথাগুলো আজ আবার ভাবাচ্ছে। কারণ সংস্কৃতি শব্দের প্রধান ঝোঁক এখন আর খানিকটা বাধা নয়, গভীর কুয়োর দেওয়াল হয়ে গেছে দেখা যাচ্ছে। সেই কুয়োর ব্যাং হয়ে গেছি আমরা ভদ্রলোকরা; বাইরে রয়ে গেছে বাঙালি মুসলমান, বাঙালি নিম্নবর্গীয় হিন্দু এবং সাধারণভাবে, গরিব বাঙালি। কৃষ্টি শব্দটায় রবীন্দ্রনাথ প্রবল আপত্তি করেছিলেন বটে, তবে ভদ্রলোকদের কূপমণ্ডূকতা ধরে ফেলতে তাঁরও ভুল হয়নি। বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনে প্রথমে নেতৃত্ব দিয়েও তাই সরে গিয়েছিলেন। কারণ ফাঁকিবাজিটা ধরে ফেলেছিলেন। পরেও তাঁর লেখাপত্রে ভদ্রলোকি চালাকির আবরণ উন্মোচন করেছেন বারবার। ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে যেমন লিখেছেন

অল্পবয়সে যখন প্রথম জমিদারি সেরেস্তা দেখতে গিয়েছিলুম তখন দেখলুম, আমাদের ব্রাহ্মণ ম্যানেজার যে তক্তপোষে গদিতে বসে দরবার করেন সেখানে এক ধারে জাজিম তোলা, সেই জায়গাটা মুসলমান প্রজাদের বসবার জন্যে; আর জাজিমের উপর বসে হিন্দু প্রজারা। এইটে দেখে আমার ধিক্কার জন্মেছিল। অথচ এই ম্যানেজার আধুনিক দেশাত্মবোধী দলের। ইংরেজরাজের দরবারে ভারতীয়ের অসম্মান নিয়ে কটুভাষাব্যবহার তিনি উপভোগ করে থাকেন, তবু স্বদেশীয়কে ভদ্রোচিত সম্মান দেবার বেলা এত কৃপণ। এই কৃপণতা সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে অনেকদূর পর্যন্ত প্রবেশ করেছে; অবশেষে এমন হয়েছে যেখানে হিন্দু সেখানে মুসলমানের দ্বার সংকীর্ণ, যেখানে মুসলমান সেখানে হিন্দুর বাধা বিস্তর।

এই ম্যানেজারই বাঙালি ভদ্রলোকের সংস্কৃতি আর কৃষ্টির তফাতের প্রমাণ। এঁর দেশাত্মবোধ হল প্রদর্শনী। ওটার নির্দিষ্ট মঞ্চ আছে, সেখানে নিজের পরিশীলিত দেশাত্মবোধ প্রমাণ করতে ওটা কাজে লাগে। কিন্তু নিজের জীবনে মেনে চলার, মুসলমানও যে তাঁর সমান ভারতীয় তা স্বীকার করার এবং অনুশীলন করার দায় নেই। এমন চরিত্রই এখন হাজারে হাজারে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ এই প্রবন্ধ লিখেছিলেন স্বাধীনতার আগে। স্বাধীনোত্তর ভারতে আবার সারা দেশের উদারপন্থী এবং বাঙালি ভদ্রলোকদের নিজেকে সংস্কৃতিবান প্রমাণ করতে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন দেশের রাজনীতি বদলে যাওয়ায়, পরিবেশ বদলে যাওয়ায় ওটা আর আবশ্যিক নয়। তাই এই ম্যানেজারবাবুর মনের কথা তিলোত্তমা মজুমদার, পবিত্র সরকারদের মুখে উঠে এসেছে, যার মর্মার্থ হল – ভদ্রলোকরাই বাঙালি। মুসলমানরা বাঙালি নয়। ভদ্রলোকদের উপর আক্রমণ হলে তবেই বলা চলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হয়েছে, মুসলমানদের উপর আক্রমণ বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ নয়।

এ হল বাঙালি ভদ্রলোকের অন্তত দুশো বছর ধরে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তৈরি সত্য। এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো সম্পর্ক নেই। এই তিলোত্তমা, এই পবিত্র, এই সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়রাই একুশে ফেব্রুয়ারি এসে পড়লে গদগদ উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন বাংলা ভাষা নিয়ে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, ওগুলো সব প্রদর্শনী। আজকাল যাকে বাংলায় বলে ‘পারফরম্যান্স’। মনের কথা হল – একুশের ভাষা শহিদরা কেউ বাঙালি নয়, তারা ভদ্রলোকদের বাংলা ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়েছিল মাত্র। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও এঁরা বিস্তর লেখালিখি, বলাবলি করে চলেছেন সেই ২০১৪ সাল থেকে। কিন্তু স্পষ্টতই ওসবও পারফরম্যান্স। নইলে বিশাল বিশাল গেটওয়ালা আবাসনে থাকা এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়া লেখক, বুদ্ধিজীবীরা কী করে বলেন যে এই বাংলায় হঠাৎ চতুর্দিকে প্রচুর নতুন লোক দেখতে পাচ্ছেন, যাদের সঙ্গে বাঙালিদের কোনো সংস্কৃতিগত মিল নেই? কোনো পরিসংখ্যানই এই সত্য প্রতিষ্ঠা করে না। এ যে নাজিদের আতঙ্ক সৃষ্টির ধ্রুপদী কৌশল, তা না জানার মত কম লেখাপড়া এঁদের নয়। উপরন্তু, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া যায় চারপাশটা বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গায় ভরে গেছে, তাহলেই বা তাদের সঙ্গে এই ভদ্রমহিলা, ভদ্রলোকদের সংস্কৃতিগত মিলের অভাব হয় কী করে? অনেক বেশি অমিল তো হওয়ার কথা কলকাতা ও শহরতলিতে দ্রুত বেড়ে চলা বহুতলগুলোর বাসিন্দা হয়ে আসা হিন্দিভাষীদের সঙ্গে, যাদের অনেকেই আমিষের গন্ধ পেলে নাক কোঁচকায়। তাদেরই রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ও মুসলমান প্রবাসী শ্রমিকদের বাংলাদেশি দেগে দিয়ে কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, বৈধ কাগজপত্রকে পাত্তা না দিয়ে মারধোর করা হচ্ছে, পে লোডার দিয়ে বাংলাদেশে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।

এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা অবশ্য রোগ নন, রোগাক্রান্তের নমুনা। এই রোগে আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব অনেকেই আক্রান্ত। আমাদের যে কোনো একজনকে দেখলেই বোঝা যায়, বাঙালি ভদ্রলোকের কূপমণ্ডূকতা এবং নীতিহীনতা ঐতিহাসিক হলেও, গত অর্ধ দশকে বিশেষ অবনমন হয়েছে। ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মানসিকতা এরকম থাকলে বাঙালরা উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে এসে হয় অনাগরিক বেগার শ্রমিকে পরিণত হত, বা ভিক্ষা করতে করতে অনাহারে মারা যেত। সেক্ষেত্রে ১৯৭১ সালেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ভারত সরকারকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে যুদ্ধে নামার প্ররোচনা দিত না (অশোক মিত্র লিখিত আপিলা-চাপিলা দ্রষ্টব্য), সাধারণ মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আবেগ তৈরি হত না, বাঙালরা আরও এক দফা উদ্বাস্তু হওয়ার ধাক্কা সামলে এদেশে থিতু হতে পারত না।

মজার কথা, এখন ভদ্রলোকদের যে অংশের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের চিন্তায় রাতে ঘুম হচ্ছে না, তাদের অনেকে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল। এরা বুঝতে পারছে না, বা রিপাবলিক টিভি দেখে দেখে এত অন্ধ হয়ে গেছে যে বুঝতে চাইছে না, যে ভাষাকে বাংলাদেশি ভাষা বলে আজ চালাচ্ছে বিজেপি, সেই ভাষা অনেকাংশে তাদের মা-দিদিমার ভাষা। ওই ভাষাকে অস্বীকার করলেও ওই পরিচিতি যাওয়ার নয়। আগামীদিনে এ কার্ড ও কার্ড সে কার্ড – কোনো কার্ড দিয়েই নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করে ওঠা যাবে না। কারণ কোনটা নাগরিকত্বের প্রমাণ সেটা ঠিক করে রাষ্ট্র। আর ভারত রাষ্ট্রের এই মুহূর্তে প্রকল্প হল বাঙালিদের অনাগরিক প্রমাণ করা।

ভদ্রলোকের ছেলেমেয়েদের স্মৃতিশক্তি তাজা করে দেওয়ার জন্যে বলি, সেই বামফ্রন্ট আমল থেকে – যখন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রথম অভিযোগ তোলেন যে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকিয়ে ভোটে জেতে বামেরা – বঙ্গ বিজেপির বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের শরণার্থী ধরে নিয়ে আশ্রয় দিতে হবে এবং মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী ধরে নিয়ে শাস্তি দিতে হবে, ফেরত পাঠাতে হবে। অধুনা সোশাল মিডিয়ার বাইরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া তথাগত রায় যখন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি ছিলেন, তখন তিনি একাধিক টিভি বিতর্কে বসে একথা বলেছেন। নরেন্দ্র মোদী সরকার যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাশ করে ২০১৯ সালে, তার মর্মবস্তুও এটাই। সে কারণেই এ রাজ্যের হিন্দুদের, বিশেষত ভদ্রলোকদের, ওই আইন খুব পছন্দ হয়েছিল। মতুয়াদের মত বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে চলে আসা নিম্নবর্গীয় জনগোষ্ঠীর মানুষও ওই আইন পাশ হওয়ায় উল্লসিত হয়েছিলেন। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর না বিজেপি দিতে চায়, না সম্প্রতি বিজেপি সমর্থক হয়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গবাসী তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল ভদ্রলোকরা। প্রশ্নটা হল, শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া এবং নাগরিকত্ব দেওয়ার মত মানবিক প্রকল্পের ‘কাট-অফ ডেট’ থাকবে কেন? সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার ‘কাট-অফ ডেট’ হল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪। এর মানে কী? ওই তারিখের পরে কি বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বন্ধ হয়ে গেছে? নাকি ওর পরে যে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে তারা মায়ের ভোগে যাক – এটাই হিন্দু দরদি বিজেপি এবং ভারতের নাগরিকত্ব এতদিনে অধিকারে পরিণত হয়ে গেছে বলে মনে করা বাঙাল ভদ্রলোকদের মনের কথা? এ প্রশ্ন করলেই বিজেপি নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি থেকে শুরু করে বাঙাল ভাষা বলতে না পারা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বাঙাল, সকলেই এক সুরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’

এখন কথা হচ্ছে, এই আজকের বাঙালদের পূর্বপুরুষরা যখন ভিটেমাটি চাটি হয়ে এপারে চলে এসেছিলেন অধুনা বাংলাদেশ থেকে, তখন কি দেশটা ধর্মশালা ছিল? তখনকার শাসকরা মনে করেছিলেন – ছিল। ভাগ্যিস করেছিলেন, তাই আজকের বাঙাল ভদ্রলোকরা কলার তুলে এই প্রশ্ন করতে পারছেন। ওঁরা অবশ্য বলবেন ‘তখনকার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতি কি এক নাকি? ১৯৪৭ সালে তো একটা দেশকে আনতাবড়ি কেটে ভাগ করা হয়েছিল। আমাদের পূর্বপুরুষদের এই ভাগটার উপরে ততখানিই অধিকার, যতখানি আগে থেকেই এ ভাগে থাকা লোকেদের।’ ১৯৭১ সালে কিন্তু দেশভাগ-টাগ হয়নি। তখনো বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের এ দেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেকথা মনে রাখলেও মানতেই হবে, যুক্তিটা সঠিক। কিন্তু মুশকিল হল, একবার যদি বিভাজনে হাততালি দেওয়া শুরু করেন, তখন দেখবেন অনেক চেপে রাখা বিভাজন বেরিয়ে পড়ছে। বাঙালরা এপারে চলে আসায় মোটেই পশ্চিমবঙ্গীয়রা (চলতি কথায় যাদের এদেশি বা ঘটি বলা হয়) সকলে খুব আপ্লুত হয়নি। ‘বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকছে পিলপিল করে, রোহিঙ্গায় চারপাশ ভরে গেছে’ – এই প্রোপাগান্ডায় আপনি যত ধুয়ো দিচ্ছেন, তত সেদিনের উদ্বাস্তুদের প্রতি বিদ্বেষ চেপে রাখা পশ্চিমবঙ্গীয়দের স্মৃতি তাজা হয়ে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে আরএসএস-বিজেপির শক্তি বাড়ার পাশাপাশি ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান সমর্থকদের মধ্যে অনলাইন পা টানাটানির ভাষা যেভাবে বদলেছে, তা খেয়াল করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়। অতএব বাঙাল ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের বোঝা উচিত যে তারা হিন্দিভাষীদের ‘রোহিঙ্গা’, ‘বাংলাদেশি’ বলে চিৎকারে যোগ দিয়ে নিজেদের ডিটেনশন ক্যাম্পের রাস্তা বানাচ্ছে।

বাড়াবাড়ি মনে হল কথাটা? আসামে এনআরসি-র সময়েও দেখেছিলাম সেখানকার বাঙাল ভদ্রলোকরা অনেকে বলছে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’ ঠিক এই কথাটাই যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিদের সম্পর্কে জাতিবিদ্বেষী অসমিয়াদের বক্তব্য, সেকথা তাদের খেয়াল ছিল না। খেয়াল হল, যখন এনআরসি থেকে বাদ পড়ে যাওয়া ১৯ লক্ষ মানুষের মধ্যে সাড়ে ১২ লক্ষ হিন্দু বেরোল এবং তার মধ্যে তারাও পড়ে গেল। নেলি গণহত্যার ইতিহাসও ওই ভদ্রলোকরা ভুলে থাকতে চেয়েছিল, কারণ ওতে যারা মরেছিল তারা মুসলমান। এখন আসামের বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে কারা দিন কাটাচ্ছে সেটা পশ্চিমবঙ্গে চতুর্দিকে রোহিঙ্গা দেখতে পাওয়া বাঙাল ভদ্রলোকরা একটু দেখে নিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করার পরিকল্পনা এখনো সরকারের নেই, কিন্তু এসআইআরের পরিকল্পনা বিলক্ষণ আছে। সেটাও একটা তালিকা, তারও থাকবে ‘কাট-অফ ডেট’। এসব ভদ্রলোকরা ভালই জানেন, কিন্তু কুয়োর ব্যাং তো কুয়োর বাইরের জগতের কথা জানতে পারলেও মানতে চায় না। যেমন নির্বাচন কমিশনের বানানো আরেকটা তালিকা – ভোটার তালিকা – কেমন হয় আজকাল সেকথা রাহুল গান্ধী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও ভদ্রলোকরা চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময়কার ভদ্রলোকদের ফাঁকিবাজিকে রবীন্দ্রনাথ চিহ্নিত করেছিলেন, নিন্দাও করেছিলেন। তবু মানতে হবে, সেই ভদ্রলোকদের অন্য সময়ে না হলেও বিপদের সময়ে বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে জোট বাঁধার বুদ্ধি ছিল। এখনকার ভদ্রলোক শ্রেণির মস্তিষ্ক এত উর্বর যে বিপদের সময়ে আরও বেশি করে নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছে। বিপন্ন বাঙালির পাশে দাঁড়ানোর বদলে ‘আমি স্নান বলি, ও গোসল বলে। অতএব ও বাঙালি না, আমি বাঙালি’ – এসব বোকা বোকা কথা বলে নিজের কুয়োটা আরও গভীর করে খুঁড়ছে। যে হিন্দি আধিপত্যবাদী হিন্দুরা কোনোদিনই বাঙালিকে আপন বলে মনে করেনি এবং করবে না, তারা নিজেদের মনোভাব স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিলেও ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা বুক ফুলিয়ে প্রতিপন্ন করতে চাইছে – বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই। আছে দুটো আলাদা জাতি – বাঙালি হিন্দু আর বাংলাদেশি। বাংলা বলেও কোনো ভাষা নেই। আছে দুটো আলাদা ভাষা – হিন্দুর বাংলা আর বাংলাদেশি বাংলা। এই ঐতিহাসিক মূর্খামি যে দৃশ্যের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে তা এইরকম – ভদ্রলোকরা বাঙালি বলে মার খাচ্ছে হিন্দিভাষীদের হাতে, আর এখন যে বাঙালিদের মার খাওয়া চলছে, যাদের বাঙালি বলে স্বীকার করতেই রাজি নয় ভদ্রলোকরা, তারা দূর থেকে বলছে ‘ওমা! আপনি ভদ্রলোক? আমি ভেবেছিলাম বাঙালি।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ইতিহাস মুছে দেওয়ার প্রকল্পের অঙ্গ পতৌদি ট্রফির নাম বদল

আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, শক, হুন, পাঠান, মোগলকে এক দেহে লীন করার যে ক্ষমতা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসেও খুব বেশি নেতা দেখাতে পারেননি; ঠিক সেটাই ছিল ‘টাইগার’ পতৌদির।

২০২২ সালে করোনা অতিমারীর চোটে স্কুল বন্ধ থাকায় ছাত্রছাত্রীদের উপর পাঠ্যক্রমের ভার কমানোর দোহাই দিয়ে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার অঙ্গ হিসাবে ধাপে ধাপে গত তিন বছরে ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি) তাদের বিভিন্ন ক্লাসের ইতিহাস বই থেকে মোগল যুগ একেবারে বাদ দিয়ে দিয়েছে। এর ফল কী? সারা দেশের সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশনের অধীন স্কুল এবং বহু রাজ্যের বোর্ডের স্কুল এনসিইআরটি-র বই পড়ায়। সেইসব স্কুলের ছেলেমেয়েরা মোগল সম্রাটদের শাসন সম্পর্কে জানবে না, তাঁদের ভাল কাজ মন্দ কাজ জানবে না। ভারতের ধর্মীয় সমন্বয়ের ইতিহাসে মোগলদের অবদান সম্পর্কেও কিছু জানবে না। ঋজু বিদূষক বরুণ গ্রোভার সকৌতুকে বলেছেন, তাজমহল কারা বানিয়েছিল – এ প্রশ্নের উত্তর হল ‘ইউ পি পি ডব্লিউ ডি কে এক ইঞ্জিনিয়ার থে… শ্রীবাস্তব সাহব। উনহো নে বিজলি বিভাগ কা এক দফতর বনওয়ায়া থা, ইস লিয়ে মিনার হ্যাঁয়… চার সাইড পে চার মিনার হ্যাঁয়, উস সে চার ফেজ – এ বি সি ডি – নিকলতে হ্যাঁয়। আগ্রা কে চার হিসসোঁ মে বিজলি জাতি থি ইয়হাঁ সে। ১৫২৬ মে পানিপথ কি পহলি লড়াই মে ইব্রাহিম লোদী কো হরা কর ইন্ডিয়া মে শ্রীবাস্তব ডাইনেস্টি আয়ি থি। করীবন তিনসো সাল উনহো নে রাজ কিয়া, ফির ১৮৫৭ মে কুইন ভিক্টোরিয়া আঈ, শ্রীবাস্তব সাহব কো পকড়ি, মুহ দবাঈ, বোলি বিয়া হো গয়া তুমহারা? শ্রীবাস্তব সাহব কি থোড়ি ফট গঈ… বোলি কাঁপ কাহে রহে হো? শ্রীবাস্তব সাহব বোলে অচ্ছা ঠিক হ্যায়, হম নিকল লেতে হ্যাঁয়। আপ দেখ লো আপ কো জো করনা হ্যায়।’

এই কৌতুকের বাংলা তরজমা করার প্রয়োজন নেই, কারণ আজকের বাঙালি এটুকু হিন্দি জানে। কিন্তু একথা বলা এইজন্যে যে ভারতের ইতিহাস থেকে নিজেদের অপছন্দের পর্বগুলো মুছে দেওয়ার যে হাস্যকর কিন্তু ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদী প্রকল্প ভারতে চালু করেছে বিজেপিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার, তা এবার স্কুলপাঠ্য বই থেকে বেরিয়ে পৌঁছে গেছে ক্রিকেট মাঠেও। আপনি যদি বোকা বা ন্যাকা না হন, তাহলে অস্বীকার করবেন না যে বিশ্ব ক্রিকেটকে এখন নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। জাতীয়তাবাদী হলে তো আপনি এ নিয়ে গর্বিতই হবেন। বিসিসিআই বহুদিন ধরেই গোটা ক্রিকেট দুনিয়ার উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে টাকার জোরে, আর এখন তো বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সম্পাদকই হয়ে বসেছেন অমিত শাহের ছেলে জয় শাহ। ঔপনিবেশিক যুগের ইতিহাস যা-ই থাক, এখন কিন্তু ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের লেজুড় ছাড়া কিছুই নয়। তাদের ঘাড়ে কটা মাথা, যে ভারতীয় বোর্ডের অনুমতি ছাড়া ট্রফির নাম বদল করবে? ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠেয় ভারত-ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজের বিজয়ীকে দেয় ট্রফির নাম ২০০৭ সালে রাখা হয়েছিল পতৌদি ট্রফি। সে নাম বদলে ফেলা হয়েছে বেমালুম। ২০ জুন থেকে যে সিরিজ শুরু হতে যাচ্ছে, তাতে জয়ী দলকে দেওয়া হবে তেন্ডুলকর-অ্যান্ডারসন ট্রফি। এটাও ইতিহাস মুছে দেওয়ার চেষ্টা।

২০০৭ সালে কেন ট্রফির নাম রাখা হয়েছিল পতৌদি ট্রফি? কারণ সেবার ভারতীয় দলের ইংল্যান্ড সফরের ৭৫ বছর পূর্তি হল। তাকে স্মরণীয় করে রাখতেই এমন একটা নাম রাখা হয়, যে নামের সঙ্গে দুই দেশের ক্রিকেটই জড়িয়ে আছে। ইফতিকার আলি খান পতৌদি ভারত, ইংল্যান্ড – দুই দেশের হয়েই টেস্ট খেলেছেন। ভারতের অধিনায়কত্বও করেছেন। ক্রিকেটার হিসাবে সাধারণ ছিলেন, কিন্তু ক্রিকেটের ইতিহাসে তাঁর একটা কাজের অসাধারণত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। ১৯৩২-৩৩ সালের অ্যাশেজ সিরিজে যখন ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন বডিলাইন কৌশল (লেগ সাইডে যত বেশি সম্ভব ফিল্ডার রেখে ক্রমাগত ব্যাটারদের শরীর লক্ষ্য করে শর্টপিচ বল করে যাওয়া) অবলম্বন করেন ডন ব্র্যাডম্যানের রান আটকাতে, তখন ইফতিকার বলেন যে ওটা ক্রিকেট নয় এবং তিনি লেগ সাইডে ফিল্ডিং করবেন না। ফলে অধিনায়ক জার্ডিন তাঁকে দল থেকে বাদ দিয়ে দেন এবং কথিত আছে যে হুমকি দিয়েছিলেন, আর কোনোদিন ইফতিকার ইংল্যান্ড দলে জায়গা পাবেন না। ইফতিকার কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত বদল করেননি। মনে রাখা ভাল, ভারতের স্বাধীনতা তখন দূর অস্ত। ফলে আর কখনো টেস্ট খেলা হবে না – এ সম্ভাবনা জেনেই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কেউ বলতেই পারেন, ক্রিকেট ইফতিকারের পেশা ছিল না। তাঁর মত ধনীর দুলালের টেস্ট না খেললে কী-ই বা এসে যেত? তাই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন। যুক্তিটা ভুল নয়, কিন্তু পরাধীন দেশের একজন ক্রিকেটারের শাসক জাতির অধিনায়কের বিরুদ্ধে ওই অবস্থান যে ইংরেজদেরও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল তার প্রমাণ আছে। ১৯৮৪ সালে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন একখানা টিভি মিনি সিরিজ নির্মাণ করে ওই বডিলাইন সিরিজ নিয়ে। সেখানে জার্ডিন আর ইফতিকারের ওই কথোপকথন দেখানো হয়েছে। নয়ের দশকে দূরদর্শনে আমরা কেউ কেউ সেই সিরিজ খানিকটা দেখেছি। আজকের তরুণরা, যাঁরা মনে করেন যা নাই ইন্টারনেটে তা নাই ভুবনে – তাঁরা এই লিংকে ক্লিক করে দৃশ্যটা দেখে নিতে পারেন।

কিন্তু ইফতিকারের চেয়ে ক্রিকেটার এবং ভারত অধিনায়ক হিসাবে অনেক বড় ছিলেন, ঐতিহাসিকভাবে অনেক মহত্তর ভূমিকা পালন করেছেন তাঁর ছেলে মনসুর আলি খান পতৌদি। তাঁরও ইংল্যান্ড, ভারত – দুই দেশের ক্রিকেটের সঙ্গেই সম্পর্ক। ভারতের হয়ে টেস্ট খেলেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন আর সাসেক্স কাউন্টির হয়ে দীর্ঘদিন খেলেছেন। মনসুর মাত্র ২১ বছর বয়সে ভারত অধিনায়ক হন। তার আগেই গাড়ি দুর্ঘটনায় একটা চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাঁর ব্যাটিংয়ের অনেকখানি ক্ষতি হয়। ছেচল্লিশটা টেস্ট খেলে ছটা শতরান সমেত ৩৪.৯১ গড়ে ২৭৯৩ রান একজন সাধারণ ক্রিকেটারের পরিসংখ্যান। কিন্তু যাঁরা তাঁকে ব্যাট করতে দেখেছেন, তাঁরা কেউ কেউ বলেছেন, লিখেছেন যে দুটো চোখই ঠিক থাকলে তিনি হয়ত বিশ্বের সেরা ব্যাটার হতে পারতেন। সেই আমলে ফিল্ডার হিসাবেও তিনি যে অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন, সেকথা বহু প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে পাওয়া যায়। ওসব না হয় বাদই দেওয়া গেল। এটুকুই যথেষ্ট যে মনসুর সেই অধিনায়ক যিনি ভারতকে প্রথমবার বিদেশে সিরিজ জেতান (নিউজিল্যান্ড, ১৯৬৭-৬৮)। বস্তুত ভারতীয় ক্রিকেটে তিনি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটান। বিদেশের মাঠে, যেখানে স্পিন সহায়ক পিচ হয় না, সেখানেও তিন স্পিনার খেলানোর সিদ্ধান্ত তাঁরই। সেটাই ইতিহাস বদলে দেয়। নিউজিল্যান্ডের ওই ঐতিহাসিক জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন অফস্পিনার এরাপল্লি প্রসন্ন, সঙ্গে ছিলেন বিষাণ সিং বেদি। প্রবাদপ্রতিম বেদি কারোর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করার লোক ছিলেন না, কিন্তু তিনিও আজীবন বলেছেন, মনসুর তাঁদের সময়ের সেরা ক্রিকেটার। অন্যত্র তিনি বলেছেন, ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে মনসুর ভারতীয়ত্ব জাগিয়ে তোলেন।

অর্থাৎ আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, শক, হুন, পাঠান, মোগলকে এক দেহে লীন করার যে ক্ষমতা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসেও খুব বেশি নেতা দেখাতে পারেননি; ঠিক সেটাই ছিল ‘টাইগার’ পতৌদির। দুঃখের বিষয়, ভারতের সমাজের কোনো শাখাতেই সুঅভ্যাসগুলো বেশিদিন টেকে না। ফলে মনসুরের প্রস্থানের পর প্রাদেশিকতা, স্বজনপোষণ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো ফিরে এসেছিল। একুশ শতকের শুরুতে আবার সেসব দূর করে জাতীয় দলকে যথার্থ ভারতীয় দল করে তুলতে দেখা গিয়েছিল অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিকে। মনসুর আর সৌরভের যুগের ক্রিকেটারদের মধ্যে যোগ্যতার বিস্তর পার্থক্য ছিল। স্বভাবতই অধিনায়ক সৌরভের সাফল্য অনেক বেশি। সৌরভের পরবর্তীকালের মহেন্দ্র সিং ধোনি বা বিরাট কোহলিরা আরও বেশি সফল হয়েছেন অধিনায়ক হিসাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শিকড় ছাড়া গাছ হয় না; ইতিহাস ছাড়া মানুষ হয় না। ফলে টাইগার ছাড়া আজকের বিরাটও হয় না। কিন্তু এই সত্য স্বীকার করা আজকের ভারতীয় ক্রিকেটের নিয়ামকদের পক্ষে অসম্ভব। ভারত নামক ‘একটি বিরাট হিয়া’ জাগিয়ে তুলতে মোগল শাসকদের ভূমিকার কথা স্বীকার করা সংঘ পরিবারের পক্ষে অসম্ভব, কারণ তাহলে ‘ভারত আসলে একটি হিন্দুরাষ্ট্র’ – এই তত্ত্ব ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ঠিক তেমনি, ভারতীয় ক্রিকেট আজ পত্রে পুষ্পে পল্লবিত হয়ে যে চেহারা নিয়েছে তার শিকড় যে একজন মুসলমান অধিনায়ক – সেকথাও স্বীকার করা চলে না। হিন্দুরাষ্ট্রের জনতার আফিম যে ক্রিকেট, তা যে আদ্যোপান্ত হিন্দুদের হাতেই তৈরি – এমনটা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে চলবে কেন? ইতিহাসে অন্য কিছু থাকলে তা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে হবে।

টাইগার পতৌদিকে ব্যক্তি হিসাবেও অপছন্দ করার কারণ আছে সংঘ পরিবারের। তিনি বিয়ে করেছিলেন বাঙালি বামুনের মেয়ে শর্মিলা ঠাকুরকে। তাঁদের ছেলে সঈফ দুবার বিয়ে করেছেন, দুবারই বউ অমুসলমান। সংঘ পরিবারের আজকের লব্জে যাকে বলে ‘লভ জিহাদ’। টাইগার-শর্মিলার মেয়ে সোহার বর আবার কেবল হিন্দু নন, একেবারে কাশ্মীরী পণ্ডিত। কুণাল খেমুর জন্মও শ্রীনগরে। ভারতের সর্বত্র কাশ্মীরী পণ্ডিতদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেই মুসলমানরা কত খারাপ সেকথা প্রচার করে থাকে হিন্দুত্ববাদীরা, অথচ এই পরিবারের সকলে মিলে সব ধর্মীয় গোঁড়ামির বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছেন। শর্মিলা, অমৃতা বা করিনাকে হিজাব বা বোরখা পরে ঘুরতে দেখা যায়নি। কুণালকেও সোহার সঙ্গে বিয়ের পর দাড়ি রেখে ফেজ পরে ঘুরতে দেখা যায় না। মুসলমানদের যে যে স্টিরিওটাইপ হিন্দুদের সামনে তুলে ধরে ভয় দেখায় সংঘ পরিবার, তাকে এভাবে প্রতিনিয়ত নস্যাৎ করে চলা পরিবারের নাম কী করে জড়িয়ে থাকতে দেওয়া যায় নরেন্দ্র মোদীর ভারতের এক নম্বর জনপ্রিয় খেলার সঙ্গে? পারে না বলেই বোধহয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড ২০১৩ সালে চালু হওয়া বার্ষিক পতৌদি স্মারক বক্তৃতাও বন্ধ করে দিয়েছে ২০২০ সালের পর থেকে।

লক্ষণীয়, বিশেষ করে ২০১৯ সাল থেকে, এদেশের জনপরিসর থেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতি মুছে দেওয়ার সযত্ন প্রচেষ্টা চলছে। বলিউডে ক্রমাগত মুসলমানবিরোধী, ইতিহাসবিকৃত, যুদ্ধবাজ ছবি বানানো হচ্ছে। উপরন্তু বলিউড শাসন করতেন যে তিন খান – তাঁদের বিরুদ্ধেও নানা শক্তি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শাহরুখ খানের ছেলেকে অতি সামান্য অভিযোগে হাজতবাস করানো হয়েছে, সলমন খানকে খুন করার পরিকল্পনা হয়েছে, আমির খানের ছবি মুক্তি পাওয়ার সময় এলেই দক্ষিণপন্থী আই টি সেল বয়কটের ডাক দিয়েছে। এর বাইরে মনসুর-শর্মিলার ছেলেকেও খুনের চেষ্টা হয়েছে কিছুদিন আগে।

এই দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে তিষ্ঠোতে দেওয়া হবে পতৌদি পিতা-পুত্রকে? কক্ষনো না। বরং থাকুন বাধ্য মারাঠি ব্রাহ্মণ তেন্ডুলকর, যিনি হাসিমুখে অযোধ্যার রামমন্দিরের উদ্বোধনে গিয়েছিলেন। সঙ্গে থাকুন সর্বকালের সেরা ইংরেজ ক্রিকেটারদের একজন – জেমস অ্যান্ডারসন। তাহলে সাপও মরে, লাঠিও ভাঙে না।

আরও পড়ুন অপমানে হতে হবে মহম্মদ শামির সমান

যাঁদের এখনো ধারণা ক্রিকেট খেলা হয় শুধু মাঠের ভিতরে, এসব রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে আনা নেহাত বাচালতা (অল্পবয়সীদের ভাষায় ‘ফেসবুকের কাকুদের হ্যাজ’), তাঁরা বলবেন শচীনের মত মহান ক্রিকেটারের নামে ট্রফির নাম রাখা হলে আপত্তির কী আছে? লোকটা টেস্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান এবং শতরান করেছে। সে কি অযোগ্য? নাকি অ্যান্ডারসন অযোগ্য? তিনি তো জোরে বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টেস্ট উইকেট নিয়েছেন (৭০৪)। আজ্ঞে না, দুজনের কেউই অযোগ্য নন। সমস্যা অন্য জায়গায়। সাধারণ গ্র্যাজুয়েট বাবা-মায়ের ছেলে যদি নোবেল পুরস্কার পেয়ে বলে ‘বাড়িটা ওঁদের নামে থাকবে কেন? আমার যোগ্যতা বেশি, বাড়ি আমার নামে করে নেব’, তাহলে কি আমরা হাততালি দেব? অবশ্য আজকের ভারতে দেব হয়ত। কারণ এই ভারতের ইতিহাস তো ২০১৪ সাল থেকে শুরু। তার আগে ভারতীয়রা নাকি খুবই লজ্জা পেতেন নিজেদের ভারতীয় হিসাবে পরিচয় দিতে। ঠিক তেমনি আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসও শুরু করতে হবে ক্রিকেট নামক ধর্মের ভগবান শচীন থেকে।

তাই হোক, তবে তাই হোক। বরাবর কামনা করেছি, লালকৃষ্ণ আদবানি শতায়ু হোন। যাতে তাঁর রথযাত্রার চাকার নিচে গোটা দেশটার তলিয়ে যাওয়া তাঁকে দেখে যেতে হয়। এখন থেকে কামনা করব, শচীনও শতায়ু হোন। যাতে বছর দশেক পরেই তাঁকে দেখতে হয়, এই ট্রফির নাম বদলে হয়ে গেল কোহলি-রুট ট্রফি। তার বছর দশেক পরে হয়ত জয়সোয়াল-ব্রুক ট্রফি। তারপর আর টেস্ট ক্রিকেট বেঁচে থাকুক না থাকুক, শচীন আর বিরাট যেন সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকেন। পূর্বসুরিদের অস্বীকার করার অসম্মান যেন তাঁদেরও ভোগ করতে হয়। যে দেশে ক্রিকেটপ্রেমীদের জীবনের দাম ফুটো পয়সার সমানও নয় আর ক্রিকেটাররা হয়ে গেছেন ভগবান, সেদেশে কোনো ভগবানই যে চিরায়ু নন – এই উপলব্ধি যেন তাঁদের ইহকালেই হয়।

আর দেশটার কী হবে? সেকথা বোধহয় জর্জ সান্তায়ানার এই উক্তিতে আছে ‘Those who cannot remember the past are condemned to repeat it.’ অর্থাৎ যারা ইতিহাস ভুলে যায়, তারা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করার অভিশাপে অভিশপ্ত।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অপর আর বিজ্ঞানের চিরকালীন ট্র্যাজেডির মঞ্চায়ন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গডফাদার বলা হয় যাঁকে, সেই নোবেল পুরস্কার জয়ী বিজ্ঞানী জিওফ্রে হিন্টনও এখন এআই কোথায় গিয়ে পৌঁছবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তিনি ভয় পাচ্ছেন যে ‘এআই টেকওভার’ হয়ে যেতে পারে যে কোনোদিন। তাঁর কথাবার্তা শুনলে মনে হয় তিনিই এ যুগের ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন।

‘তোমার নাম কী?’
‘জানি না। ও তো কোনো নাম দেয়নি আমায়।’

  • ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন, মেরি শেলি (অনুবাদ – সিদ্ধার্থ বিশ্বাস; লেখনী প্রকাশন, প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ১৯৯৬)

স্রষ্টা ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে উত্তর মেরুর বরফের মধ্যে অদৃশ্য হওয়ার আগে উপন্যাসে এই ছিল দানবের শেষ সংলাপ। অথচ কী ট্র্যাজেডি! এই উপন্যাস প্রকাশের (১৮১৮) দুশো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন শব্দটা আমরা ব্যবহার করি স্রষ্টার ভুলে দানব হয়ে ওঠা মানুষকে বোঝাতে। আসলে স্রষ্টা, ক্ষমতাবান বা সংখ্যাগুরুর বয়ানই প্রতিষ্ঠা পায় সব যুগে। সে-ই নাম করে। তার অপছন্দের পক্ষের হয় বদনাম। নয়ত নামটা স্রেফ হারিয়ে যায়, অথবা যা খুশি একটা নাম চাপিয়ে দেয় ক্ষমতাশালী পক্ষ। আজ যেমন সোশাল মিডিয়ায় সব মুসলমান পুরুষই আবদুল, বহুকাল ধরে বাঙালিদের কাছে সব নেপালিই বাহাদুর।

এই নামহীন দুর্নামই হল ‘অপর’-এর জীবনের, দাসের জীবনের একমাত্র প্রাপ্তি। এর যন্ত্রণা অনুভব করা, যে কখনো অপরত্ব অনুভব করেনি তার পক্ষে বোঝা প্রায় অসম্ভব। রিডলি স্কটের ব্লেড রানার (১৯৮২) ছবিতে যেমন মৃত্যুবরণ করার আগে দাসত্ব কী তা রিক ডেকার্ডকে (হ্যারিসন ফোর্ড) হাতেনাতে দেখিয়ে দেয় কৃত্রিম উপায়ে তৈরি মানুষ – ছবির ভাষায় ‘রেপ্লিক্যান্ট’ – র‍য় ব্যাটি (রাইটজার হাওয়ার)। তবু কেন ডেকার্ডকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে ব্যাটি নিজে নীরবে মৃত্যুবরণ করল শেষপর্যন্ত, তা ডেকার্ডের বোধগম্য হয় না। দাসের বা অপরের, জীবনের প্রতি মমত্ব, তার ভালবাসা, আমরা বুঝে উঠতে পারি না কিছুতেই। অপরকে দানব বা খুনি ভেবে যে স্বস্তি পাই, তা তাকে অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ ভেবে পাই না।

নামহীন অপরের এই ট্র্যাজেডি কলকাতার মঞ্চে জীবন্ত করে তুলেছে থিয়েটার ফাউন্ডেশন পরিবর্তক ও ক্যান্টিন আর্ট স্পেস ইনিশিয়েটিভের নাটক ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’। শ্রাবন্তীর পরিচালনায় মেরির উপন্যাসে উত্থিত মৌলিক প্রশ্নগুলো – সৃষ্টির অনিশ্চয়তা, স্রষ্টার দায়, মনুষ্যত্বের সংজ্ঞা, বিশ্বাসের বাস্তবকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা – সবই মূর্ত হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞান তথা মানবসভ্যতা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আজও হিমশিম খাচ্ছে। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন ঈশ্বর হয়ে ওঠার দুর্দম লোভে, প্রকৃতির রহস্য ভেদ করার প্রবল উত্তেজনায় আবিষ্কারের পরিণাম ভেবে দেখেনি। ফলে ছারখার হয়ে গেছে নিজের, তার প্রিয়জনদের এবং তার সৃষ্টির জীবন। তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গডফাদার বলা হয় যাঁকে, সেই নোবেল পুরস্কার জয়ী বিজ্ঞানী জিওফ্রে হিন্টনও এখন এআই কোথায় গিয়ে পৌঁছবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তিনি ভয় পাচ্ছেন যে ‘এআই টেকওভার’ হয়ে যেতে পারে যে কোনোদিন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বেদখল হয়ে যেতে পারে তার ফলে। তাই তিনি নিজের টাকাপয়সা তিনটে ব্যাংকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখছেন। তাঁর কথাবার্তা শুনলে মনে হয় তিনিই এ যুগের ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন।

এই দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, আতঙ্ক অতি জটিল সংলাপ রচনা না করেও সফলভাবে সাধারণ দর্শকের সামনে উপস্থাপনার কৃতিত্ব শ্রাবন্তীর। পাশাপাশি যার অনুভূতি আছে, যে ভালবাসতে চায়, তাকে মানুষ বলে গণ্য করা যাবে না কেন – সে প্রশ্নও তুলে দেয় এই নাটক। স্কটের ছবিতে ‘রেপ্লিক্যান্ট’ প্রিস (ড্যারিল হানা) দার্শনিক রেনে দেকার্তের বিখ্যাত উক্তি ব্যবহার করে বলেছিল ‘আই থিংক দেয়ারফোর আই একজিস্ট’। শ্রাবন্তীর ‘ক্রিচার’ যেন বলতে চায় ‘আমি অনুভব করি, আমি ভালবাসি। এটাই আমার মনুষ্যত্বের প্রমাণ।’ কিন্তু মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণির বড় তফাত তো এই যে সে ঠান্ডা মাথায় অমানুষ হয়ে উঠতে পারে, মিথ্যে বলতে পারে। তার সৃষ্টিকেও সেই প্রতিহিংসা, সেই শঠতা শিখে নিতেই হয়। ক্রিচারও শিখে ফেলে, স্রষ্টা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের উপর প্রয়োগও করে।

মেরির উনবিংশ শতাব্দীতে লেখা উপন্যাসের এই সৃজনান্তর (adaptation) অনায়াসে সমসাময়িক হয়ে উঠেছে ক্রিচারের প্রতি ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের সন্দেহকে ব্যবহার করে। তার বোন উইলিকে ক্রিচারই হত্যা করেছে – এমন প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন তাকেই সরাসরি অভিযুক্ত করে। কোনো সংশয় থাকে না তার কণ্ঠে। তখনই ক্রিচার (জয়রাজ ভট্টাচার্য) ছুড়ে দেয় সেই সংলাপ, যা সংবেদনশীল পাঠককে নিজের অবস্থান সম্পর্কেও ভাবিয়ে তুলবে – ‘আমি হত্যা করেছি এটা তোমার বিশ্বাস’। এরকম নিঃসংশয় বিশ্বাসে কত মানুষকে আমরা অভিযুক্ত করে চলেছি রোজ! পথে ঘাটে, অফিস কাছারিতে, স্কুল কলেজে, ঘরোয়া আড্ডায় আর সোশাল মিডিয়ায়। অপরাধ না করেও নিরন্তর অবিশ্বাসের শিকার হওয়া, ঘৃণার পাত্র হওয়া মানুষকে সত্যি সত্যি দানব করে তোলার ক্ষমতা ধরে। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন সেই ট্র্যাজেডির মঞ্চায়ন।

এই নাটকে প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত যিনি অভিনয় দিয়ে দর্শককে চুম্বকের মত টেনে রাখেন, তিনি জয়রাজ। নাটকের শুরুতেই প্রাপ্তবয়স্ক শিশুর মত মরণ থেকে জেগে ওঠার সময়ে সারা গায়ে অসংখ্য নল জড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাঁর শরীরী অভিনয় এবং জন্ম পরবর্তী আশ্চর্য আর্তনাদ অলৌকিক মুহূর্ত তৈরি করে। জন্মের অব্যবহিত পরে তাঁর ভাল করে হাঁটতে না শেখা শিশুর মত নড়াচড়া, সদ্যোজাতের মতই মুখ দিয়ে অর্থহীন আওয়াজ করা থেকে ক্রমশ দৃষ্টিহীন বৃদ্ধ ডি ল্যাসির সাহায্যে একটু একটু করে কথা বলতে শেখা, হাঁটাচলা স্বাভাবিক হয়ে আসা – একজন অভিনেতার ধাপে ধাপে এই প্রক্রিয়া পেরনো চোখের সামনে দেখা এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। বৃদ্ধের সঙ্গে দৃশ্যগুলোতে জয়রাজ যে শিশুসুলভ সারল্য দেখিয়েছেন, গাছের পাতা ঝরা বা বরফ পড়ার দৃশ্যে যে অপাপবিদ্ধ আনন্দ দেখা দিয়েছে তাঁর চোখেমুখে, তা বজায় রেখেই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের সঙ্গে বৌদ্ধিক ঠোকাঠুকির দৃশ্যগুলোতে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় এবং দার্শনিক প্রশ্ন তোলা এই অভিনয়কে স্মরণীয় করে রাখে। কেবল ওই অভিনয় দেখার লোভেই এ নাটক একাধিকবার দেখা যেতে পারে।

ক্রিচারের জন্ম, একাকিত্বের যন্ত্রণা, ভালবাসা, প্রতিহিংসা ফুটিয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে শুভঙ্কর, রাজু ধর, বিশ্বজিৎ, প্রীতম, তারক, অক্ষয় ও সুজয়ের আলোকসম্পাত। সময়ে সময়ে, বিশেষত ক্রিচারকে যখন শেষবার দেখা যায়, সে আলো হয়ে উঠেছে অলৌকিক। অন্যান্য চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্ধ বৃদ্ধের চরিত্রে তাপস রায় প্রশংসনীয় অভিনয় করেছেন। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন চরিত্রে ঋদ্ধিবেশ ভট্টাচার্য একটু উচ্চকিত।

তবে নাটকে মঞ্চের পিছনের পর্দার সিনেম্যাটিক ব্যবহার সময়ে সময়ে বাহুল্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, অভিনেতারা যা করছেন তাতে মনোযোগ দেওয়াও কঠিন হয়ে গেছে কোনো কোনো মুহূর্তে। যেখানে মঞ্চের উপরে পাতা ঝরানো হয়েছে বা তুষারপাত দেখানো হয়েছে, সেখানে পিছনের পর্দাতেও একই দৃশ্য দেখানোর প্রয়োজন ছিল না। প্রায় প্রত্যেক দৃশ্যে পিছনের পর্দার ছবি বদলে দেওয়ারও বোধহয় দরকার ছিল না। কোনটা ডি ল্যাসি, ফেলিক্স, আগাথাদের বাড়ি আর কোনটা জঙ্গল বা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের জেনিভার বাড়ি – তা বুঝে নিতে নাটকের দর্শকের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কারণ নাটক তৈরি হয় নির্দেশক, অভিনেতা আর দর্শকের মিলিত কল্পনাশক্তির জোরেই। এই নাটকে সামান্য কয়েকটা কাঠের টুকরো, বাক্স ইত্যাদিকে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের বিয়ের রাতের শয্যা ভেবে নিতে যখন দর্শকের অসুবিধা হচ্ছে না, তখন নির্দেশক আরেকটু বেশি বিশ্বাস রাখতেই পারতেন। আর বেমানান লেগেছে ফেলিক্স-আগাথার কণ্ঠে একদা ভারতের শ্রমিক আন্দোলনে ব্যবহৃত সেই গানটা, যা কোরাস (১৯৭৪) ছবিতে মৃণাল সেন ব্যবহার করেছিলেন। কারণ ইংরিজি উপন্যাসের এই সৃজনান্তরে আর কোথাও ভারতীয়করণের চেষ্টা নেই। চরিত্রগুলোর নাম, স্থানের নাম, পোশাক আশাক – সবকিছুই ইউরোপিয় রাখা হয়েছে। এমনকি জন মিলটনের প্যারাডাইস লস্ট আবৃত্তি করে ক্রিচার তার সংকট, তার একাকিত্বকে আরও জীবন্ত করে তোলে। সেই নাটকে ওই হিন্দি গানের ব্যবহার একেবারেই খাপ খায় না।

আরও পড়ুন জনপ্রিয় বাংলা ছবির সযত্ন সন্ধানে তালমার রোমিও জুলিয়েট

কিন্তু শ্রাবন্তীর সবচেয়ে বড় সাফল্য এই যে, ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন আজকের নাটক হয়ে উঠেছে। বস্তুত, ঠিক এখনই এই নাটক মঞ্চস্থ হওয়া দরকার ছিল। তবে এই সৃজনান্তরকে হয়ত আরও সমসাময়িক করে ফেলার, আরও বেশি দেশি করে তোলার সুযোগ ছিল। কারণ মেরির উপন্যাসে আছে ইংগোলস্টাডে প্লেগের কথা, যা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের পক্ষে বিভিন্ন শবদেহ থেকে দেহাংশ জোগাড় করা সহজ করে দিয়েছিল। আমরাও মাত্র বছর পাঁচেক আগে পেরিয়ে এলাম একটা অতিমারী, যেখানে নদীর পাড়ে পোড়ানো হচ্ছিল শবদেহ। ঠিক কত লোক মারা গেছে তা লুকোবার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল এদেশের সমস্ত সরকার। মরণ থেকে কাউকে জাগিয়ে তোলার সেই তো প্রকৃষ্ট সময়।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

পাখির চোখ বাংলাদেশের হিন্দুর নিরাপত্তা, না পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুর ভোট?

তথাগত রায়, তরুণজ্যোতি তিওয়ারি প্রমুখের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে যেসব কথোপকথন চলে সেগুলোতে চোখ রাখুন। তাঁরা কিন্তু সজলবাবুর মতো আবেগপ্রবণ হয়ে বাংলাদেশ আক্রমণ করার কথা-টথা বলেন না। বরং বিপন্ন হিন্দুদের এ-দেশে জায়গা দেওয়ার কথা উঠলেই তাঁরা এবং তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা বলতে শুরু করেন— ভারতবর্ষ ধর্মশালা নয়।

একটা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

এই কথাটা বলামাত্র সেই ২০১২-১৩ সাল থেকে যেসব আত্মীয়-বন্ধু-সহপাঠী-সহকর্মী রেগে-আগুন তেলেবেগুন হয়েছেন, সম্পর্ক তুলে দিয়েছেন (বা আমিই তুলে দিয়ে বেঁচেছি), হঠাৎ সেদিন আবিষ্কার করলাম তাঁরা সকলে ঠিক ওই কথাটাই বলছেন। দেখে অ্যাইসা ফুর্তি হল যে লতা মঙ্গেশকরের মতো মিহি গলায় শতবর্ষে পা দেওয়া সলিল চৌধুরী রচিত ও সুরারোপিত ‘হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে’ গানটা গাইতে শুরু করলাম। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিজের কানই জানিয়ে দিল যে আমার গলার সঙ্গে লতার গলার তফাত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মহাত্মা গান্ধির মতো। ফলে চুপ করে গেলাম। ফুর্তিটাকেও কান ধরে টেনে নামিয়ে আনন্দের বেঞ্চে বসিয়ে দিলাম। একটু আনন্দ তো করাই উচিত। কারণ কবি বলেছেন— কেবল রাত্রির অবসান হলে প্রভাত হয় না। চিত্ত জাগলেও প্রভাত হয়। তা চারপাশে এত মানুষের চিত্ত জেগেছে মানে প্রভাত হয়েছে, অচিরেই প্রভাতফেরি বেরোবে, তার আওয়াজের ঠ্যালাতেই বাকি অন্ধকার দূরীভূত হবে— এরকম ভাবছিলাম আর কি। কিন্তু সে আনন্দও দিন দুয়েকের বেশি টেকানো গেল না। কেন? সে-কথাই বলব।

গোঁফ গজানোর বয়সে আমরা মাধুরী দীক্ষিত বলতে পাগল ছিলাম। যেহেতু বলিউডের হাত অনেক লম্বা, সেহেতু কেবল ভারতে নয়, গোটা উপমহাদেশেই তখন মাধুরী অধরা বলে নানা বয়সের পুরুষদের হৃদয় দাউদাউ করে জ্বলে। এতটাই, যে কাগজে পড়েছিলাম, পাকিস্তানিরা নাকি সকৌতুকে বলত ‘তোমরা মাধুরী আর শচীন তেন্ডুলকরকে দিয়ে দাও, আমরা কাশ্মিরের দাবি ছেড়ে দেব।’ তা সেই মাধুরী নেপালে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে একখানা কেলেঙ্কারি করে বসেছিলেন। আদর-আপ্যায়নে আহ্লাদিত হয়ে বলে বসেছিলেন— নেপাল তো ভারতেই ছিল… ইত্যাদি। সে অবশ্য ১৯৯৮-৯৯ সালের কথা। তখন ভারত সরকারের সঙ্গে নেপাল সরকারের সম্পর্ক মন্দ ছিল না, ফলে নায়িকা ক্ষমা-টমা চাওয়াতেই ব্যাপারটা মিটে গিয়েছিল। মুশকিল হল, বাংলাদেশের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালিরা অনেকে এখনও মাধুরী হয়ে আছেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ তথা বাংলা ভাগ হয়েছে। পরে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ হয়ে গেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই এখনও ওটাকে আলাদা দেশ বলে মেনে নিতে পারেন না। আরও সমস্যার কথা হল, যেহেতু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, তাই আমাদের অনেকেরই ধারণা— বাংলাদেশের যে-কোনও ব্যাপারে ভারতের ছড়ি ঘোরানোর অধিকার আছে। দুটো দেশের সরকার এবং মানুষের মধ্যে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসারে যেমন সম্পর্ক কাঙ্ক্ষিত, তার বদলে বাংলাদেশের সঙ্গে বড়দাসুলভ ব্যবহার করা উচিত— এমনটাই মনে করেন আমাদের ভাই-বেরাদররা অনেকে। ফলে যে যে-দলেরই সমর্থক হোন, বাংলাদেশে কোনও গোলমাল শুরু হলেই একযোগে আশ্চর্য সব দাবি করতে শুরু করেন এঁরা। যেমন এই মুহূর্তে কলকাতা কর্পোরেশনের বিজেপি কাউন্সিলর সজল ঘোষের মতো অনেক সিপিএম সমর্থককেও ভারতীয় সেনাবাহিনিকে দিয়ে বাংলাদেশ আক্রমণের দাবি তুলতে দেখা যাচ্ছে।

এমনিতে সজলবাবুকে যত গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম দেয় তত গুরুত্ব তাঁর নিজের দলের নেতা অমিত শাহও দেন না। দিলে সজলবাবুর আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও কলকাতায় এসে আরজিকর-কাণ্ডে মৃতার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা না করেই চলে যেতেন না। সুতরাং সজলবাবুর ওই চ্যানেল গরম করা মন্তব্যে যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বা প্রধানমন্ত্রী মোদি কানই দেবেন না তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু দলমতনির্বিশেষে বাঙালিরা যে এই দাবিকে ন্যায্য বলে মনে করছেন— তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। একে তো অন্য একটা দেশ সম্পর্কে এত প্রবল অধিকারবোধ মনের মধ্যে পুষে রেখেছে কয়েক লক্ষ লোক— এই ব্যাপারটাই ভয়ঙ্কর। তার উপর দেখা যাচ্ছে বাম দলগুলোর সমর্থকরাও দাবি করছেন— এখানকার বামপন্থীদের বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্যে পথে নামতে হবে, তৃণমূল সমর্থকরা দাবি করছেন তাঁদের দলকেও পথে নামতে হবে। অবশ্য বামেরা যেহেতু ক্ষমতায় নেই, সেহেতু তাঁরা যেমন প্যালেস্তাইনের মানুষের উপর ইজরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে মিছিল করেন তেমন বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধেও মিছিল করা যেতে পারে (যদিও এখন পর্যন্ত প্যালেস্তাইনে ইজরায়েল যা চালাচ্ছে তার সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির পরিমাণগত বা গুণগত কোনও মিল নেই), তবে দুই মিছিলেরই গুরুত্ব প্রতীকী। কিন্তু বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলকে পথে নামতে হবে— এ আবার কী আবদার? যে-কোনও দলের সরকারকেই ভারতের সংবিধান মেনে চলতে হয় আর সংবিধান অনুসারে বিদেশনীতি কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের তালিকাভুক্ত। নেহাত বাংলাদেশ প্রায় এক শতাব্দী আগে একই প্রদেশ ছিল এবং দুই জায়গার ভাষা অভিন্ন, দুইপারে রক্তের সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা বহু পরিবার রয়েছে, তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্পূর্ণ উদাসীন থাকতে পারে না। সেই কারণে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি একখানা বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু তিনি পথে নামতে যাবেন কেন? সত্যিই তো এ-ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার যা সিদ্ধান্ত নেবে তা মেনে নিতে তিনি বাধ্য। অথচ এই দাবি কেবল আইনকানুনের ধারণাবিহীন সাধারণ মানুষ সোশাল মিডিয়ায় তুলছেন তা নয়। এবিপি আনন্দের মতো জনপ্রিয় চ্যানেলে বসে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তীও এই কিম্ভূত দাবি তুলে ফেলেছেন।

নিজের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কেন এমন কাজ করতে হবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে? রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বনাথবাবুর দর্শানো কারণটি চিত্তাকর্ষক। এতে নাকি মহম্মদ ইউনুসের সরকারের উপরে চাপ তৈরি হবে এবং বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষজন বুকে বল পাবেন। বাংলাদেশ যত ছোট রাষ্ট্রই হোক, পশ্চিমবঙ্গের মতো একটা অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজের রাজ্যে বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে মিছিল করেছেন বলে চাপে পড়বে কেন? বিশেষত ভারত সমেত পৃথিবীর কোনও বড় রাষ্ট্রই যখন এই তদারকি সরকারকে স্বীকৃতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি? আর বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষজনই বা মমতার মিছিলে আলাদা করে সাহস কেন পাবেন? ইসলামিক মৌলবাদীরা তাঁদের আক্রমণ করলে কি মমতার পুলিশ বা অনুব্রত মণ্ডলের ঢাক তাঁদের বাঁচাতে যাবে? নাকি কেন্দ্রীয় সরকারকে না জানিয়ে, মমতা নিজের সিদ্ধান্তে তাঁদের কাউকে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় দিতে পারবেন?

কিমাশ্চর্যম অতঃপরম! মমতা এই হাস্যকর দাবি মেনে নিয়ে পথে নামলেন না বটে, আরও এককাঠি সরেস কাজ করলেন। দাবি করে বসলেন যে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জকে বাংলাদেশে শান্তিরক্ষা বাহিনি পাঠাতে হবে। তাঁর সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে গেল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা এবং মমতার একদা-স্নেহভাজন শুভেন্দু অধিকারীর বয়ান ‘রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে আবেদন করছি, বাংলাদেশে হিন্দুদের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য হস্তক্ষেপ করুক’।

বাংলাদেশে গত কয়েকদিনের নতুন অশান্তিতে ঠিক কত মানুষ নিহত, কটা পরিবার বাস্তুহারা, কোনও নারীনির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে কিনা— এসবের কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য কিন্তু ভারতের সংবাদমাধ্যম আমাদের জানাতে পারেনি। সজলবাবু, বিশ্বনাথবাবু, শুভেন্দুবাবু বা আমাদের মুখ্যমন্ত্রীও জানাননি। অথচ ক্রমাগত এরকম আক্রমণাত্মক মন্তব্য বেড়েই চলেছে। এসবের একটাই ফল— বাংলাদেশ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং তার ফলে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা তৈরি হওয়া। যেহেতু বাংলাদেশে শেখ হাসিনার অপসারণের পর থেকেই হিন্দুরা আক্রান্ত হচ্ছেন বলে খবরে প্রকাশ, তাই পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালি এখন বাংলাদেশ বলতেই মুসলমান ভাবছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকেই দেখা যাচ্ছিল, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতোই এবারেও যে লড়াইয়ে লিপ্ত শক্তিগুলো সমসত্ত্ব নয় তা মেনে নিতে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের ঘোর আপত্তি। ছাত্রনেতাদের মধ্যে হিন্দু নামগুলোর উপস্থিতিকে তাঁরা অগ্রাহ্য করে যাচ্ছেন, তাতে ধুয়ো দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম। যখন বাংলাদেশের রাস্তায় সোজা বুকে গুলি চালিয়ে মানুষ মারছিল হাসিনার পুলিশ, তখনও হাসিনা না থাকলে বাংলাদেশের কী হবে তার আলোচনায় পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করে যাচ্ছিল— ‘বাংলাদেশ আফগানিস্তান হওয়ার দিকে এগোচ্ছে’, ‘বাংলাদেশে তালিবানি শাসন প্রতিষ্ঠা হতে চলেছে’ ইত্যাদি শব্দবন্ধ।

পৃথিবীর ইতিহাসে বিদ্রোহ, তারপর নৈরাজ্য এবং অত্যাচারী শাসনের অজস্র উদাহরণ আছে। যেমন বলা যেতেই পারত বাংলাদেশ রোবসপিয়রের গিলোটিনের ফ্রান্স হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। তুলনায় সাম্প্রতিক উদাহরণ দিতে চাইলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর কথা বলা যেত। আরও সাম্প্রতিক উদাহরণ দেওয়ার ইচ্ছে থাকলে গৃহযুদ্ধোত্তর সিরিয়া হওয়ার দিকে এগোচ্ছে বললেও চলত। তেমন কিছু না বলে আফগানিস্তান এবং তালিবানের কথা বলার উদ্দেশ্য পরিষ্কার— মাথায় ফেজ পরা, গালে লম্বা দাড়িওয়ালা মুসলমানের ছবি তুলে ধরে আতঙ্ক ছড়ানো, যার সঙ্গে অপরিহার্যভাবে এসে পড়বে বোরখা পরা মহিলাদের ছবি। হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানের ঠিক যে স্টিরিওটাইপ হিন্দুদের গেলাতে চায়। অথচ তদারকি সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুস কিন্তু কামানো গালের, মাথায় ফেজ না-পরা পুরুষ। তাঁর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের একজন হলেন সাঈদা রিজওয়ানা হাসান, যিনি ২৯ নভেম্বর সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন যে গ্রেফতার হওয়া সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত হবে, কিন্তু তার জন্যে ইস্কনকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করার কোনও ভাবনা তদারকি সরকারের নেই। রিজওয়ানা বোরখা পরেন না, এমনকি হিজাবও নয়।

নিয়মিত নির্বাচন হচ্ছে মানেই যে একটা দেশ গণতান্ত্রিক পথে আছে তা নয়— এ-কথা বুঝতে আজকের ভারতীয়দের অন্তত কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। দেশদ্রোহবিরোধী আইনের দোহাই দিয়ে উমর খালিদ, শার্জিল ইমাম-সহ আরও বহু মানুষকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখার কাজ এ-দেশের ভোটে জিতে আসা সরকারই করে চলেছে দশ বছর ধরে। রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজও করছে বিভিন্ন রাজ্যের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারগুলোই। কোনও আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, এমনকি সুপ্রিম কোর্টের নিষেধকেও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জঘন্য পলাতক অপরাধীদের মতো করে প্রতিবাদীদের ছবি দেওয়ালে দেওয়ালে সেঁটে দেওয়ার কাজ করছে ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসা উত্তরপ্রদেশের আদিত্যনাথ সরকার। গত দশ বছরে কতজন সংখ্যালঘুকে গোমাংস খাওয়ার, বিক্রি করার বা স্রেফ বহন করার ‘অপরাধে’ মেরে ফেলা হয়েছে এবং রাষ্ট্র হত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়ার বদলে মদত দিয়েছে, তার তালিকা চিনের প্রাচীরের মতো লম্বা হবে। কদিন হল মুসলমানদের উত্যক্ত করার নতুন কায়দা চালু হয়েছে। যে-কোনও মসজিদের নিচেই মন্দির ছিল কিনা মাটি খুঁড়ে দেখার দাবিতে আদালতে মামলা ঠুকে দিচ্ছে হিন্দুত্ববাদীরা, আর আদালত পত্রপাঠ খোঁড়ার নির্দেশও দিয়ে দিচ্ছে। অথচ দেশে স্পষ্ট আইন আছে— ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশের যেখানে যে ধর্মস্থান ছিল সেগুলোর চরিত্র পরিবর্তন করা যাবে না। সে আইনের তোয়াক্কা করছে না এমনকি নিম্ন আদালতগুলোও। এই বেমক্কা রায়ের জেরে হিংসা ছড়িয়ে উত্তরপ্রদেশের সম্ভলে ইতিমধ্যেই কিছু মানুষের প্রাণ গেছে। এখন এমনকি প্রাচীন আজমের শরীফ নিয়েও তেমন একটা মামলা ঠোকা হয়েছে। এমন রায় দেওয়ার পথ কিন্তু খুলে দিয়ে গেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, জ্ঞানবাপী মসজিদে মাটি খুঁড়ে সার্ভে করার অনুমতি দিয়ে। কিন্তু এতে কি প্রমাণ হয় যে ভারতের অধিকাংশ মানুষ, এমনকি অধিকাংশ হিন্দু ভারতীয়, সাম্প্রদায়িক? একেবারেই না।

হাসিনার আমলেও বাংলাদেশে হিন্দু হত্যা ঘটেছে। আর সব ভুলে গিয়ে থাকলেও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের খুনের কথা আশা করি এপারের হিন্দু বা মুসলমান কোনও বাঙালিই ভোলেননি। সেইসময় হিন্দুদের পুজোআচ্চায় আক্রমণ হয়েছে, সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সুতরাং ভোট হত আর হাসিনা জিততেন মানেই বাংলাদেশ দারুণ গণতান্ত্রিক ছিল— এ-কথা বলার কোনও মানে নেই। আবার সেই আমলে বা এই আমলে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণও প্রমাণ করে না যে অধিকাংশ বাংলাদেশি, এমনকি অধিকাংশ মুসলমান বাংলাদেশি, সাম্প্রদায়িক।

কিন্তু সোশাল মিডিয়া আর ভারতের মিডিয়ার কল্যাণে ঠিক উল্টো ছবিটাই গাঢ় রঙে আঁকা হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের বাঙালির মনে। তাই ‘একটা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব’— এই কথাটা তাঁরা আজ যখন বলছেন, তখন বলছেন বাংলাদেশের দিকে মুখ করে। নিজের দেশের দিকে না-তাকিয়ে। তাই আমার আনন্দ টিকল না। দেখলাম বিজেপি সমর্থকরা তো বটেই, সিপিএম সমর্থকরাও গোটা উপমহাদেশে সংখ্যাগুরুবাদের প্রসারের নিন্দা করে পার্টির রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বিবৃতিতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন। বলছেন, এসব চালাকি। বাংলাদেশের ঘটনার নিন্দা করতে গেলেই সঙ্গে এ-দেশের সংখ্যালঘুদের উপর যে আক্রমণ হচ্ছে তার কথা কেন বলতে হবে? গোদা বাংলায় তাঁদের মত হল— বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সে-দেশের সরকারের দায়িত্ব, কিন্তু এ-দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এ-দেশের সরকারের দায়িত্ব নয়।

এই তো সেদিন এ-রাজ্যের মহিলারা রাত দখল করলেন, ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে রাস্তায় নামলেন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীও, পরে নতুন আইনও পাশ করালেন বিধানসভায়। আন্দোলনকারীদের অনেকেরই বক্তব্য ছিল আরজিকর-কাণ্ডে দোষী একজন নয়, অনেকে। তাদের সকলের শাস্তি চাই। তা নিয়েও টানা আন্দোলন হল। অথচ আজ চিন্ময়কৃষ্ণের বিরুদ্ধে যে শিশুদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আছে, সে-অভিযোগে তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তাঁর নিজেরই সংগঠন— তা নিয়ে আলোচনা করতে দেখছি না এমনকি মহিলাদেরও। উনি অবশ্য সেই অভিযোগে গ্রেফতার হননি। কী অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন? তা নিয়েও পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়ায় বা সোশাল মিডিয়ায় বিশেষ আলোচনা নেই। অর্থাৎ হয় এখানকার মানুষ জানার প্রয়োজন বোধ করেন না, নয়তো নিঃসংশয়ে জানেন ব্যাপারটা স্রেফ রাষ্ট্রের বদমাইশি। সেটা হওয়া অবশ্যই অসম্ভব নয়। কিন্তু একইরকম অভিযোগে উমর, শার্জিলের জামিনের তো শুনানিই হয় না এ-দেশে। তা নিয়ে কারও এত মাথাব্যথা নেই তো?

সব মিলিয়ে যা বুঝলাম, ‘হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে’ গানটা আমার নয়, শুভেন্দুবাবুর গাওয়া উচিত। কারণ রাজ্য বিজেপি যতই অন্তর্দ্বন্দ্বে নাজেহাল হোক, যতই লোকসভা নির্বাচনে বা উপনির্বাচনে ভোট কমুক, দেশজুড়ে মোদি-ম্যাজিক যতই ফিকে হয়ে যাক, ঘৃণার জমি এমন চমৎকার চষা হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গে যে, সঙ্ঘ পরিবারের ফসল তোলা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। সে-ফসল ২০২৬ সালে তোলা হবে, নাকি আরও পরে— সে আলাদা কথা। নিজের মালিকানাধীন হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসা বন্ধ করার ঘোষণা করে সজলবাবু আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ২০২৬ সালেই ফসল তুলতে। অনেক ডাক্তারও সগর্বে সোশাল মিডিয়ায় ঘোষণা করছেন বাংলাদেশি রোগী দেখবেন না। বহু ঘোষিত বিজেপিবিরোধীও এই সিদ্ধান্তকে বাহবা দিচ্ছেন। কেন? না দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের পতাকার অবমাননা করা হয়েছে। ক-জন ওই কাজে লিপ্ত আর তাদের অপকর্মের দায় সমস্ত বাংলাদেশির ঘাড়ে চাপবে কেন— এই যুক্তিতর্কের পরিবেশই আর পশ্চিমবঙ্গে নেই। এ-তথ্যও প্রচারিত হচ্ছে না যে ২৮ নভেম্বরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট হলের প্রভোস্ট ‘অতীব জরুরি বিজ্ঞপ্তি’ জারি করে শিক্ষার্থীদের ওই কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

যে রাজনৈতিক বিশ্লেষক বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষকে সাহস দেওয়ার জন্যে মমতাকে মাঠে নামতে হবে বলেছেন, তিনি এই রাজ্যে এমন অমানবিক এবং ডাক্তারি নীতিবোধবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মমতাকে মুখ খুলতে হবে বলে দাবি করেছেন বলে শুনিনি। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে মমতা নিজে থেকেও বলতে পারতেন— এ-জিনিস এখানে করতে দেওয়া হবে না, করলে ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বলেছেন কি? তাঁর দলের নেতা ফিরহাদ হাকিম তবু বলেছেন যে এই সিদ্ধান্ত সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু ফিরহাদ নিজে মুসলমান হওয়ায় যথারীতি তাঁর বক্তব্যকে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরুর প্রতি দরদ বলে দেখা হচ্ছে। সোশাল মিডিয়ায় গালিগালাজ করা হচ্ছে।

এসব থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার। আমাদের রাজ্যে হিন্দুত্ববাদকে আটকাতে তৃণমূল কংগ্রেসের যাবতীয় কুকর্ম সত্ত্বেও তাদের ভোট দেওয়াই যে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য— এ-কথা যে-যুক্তিতে ২০১৯ সাল থেকে বলা হয়ে আসছে, সেই যুক্তিটাকে আর বিশ্বাস করার মানে হয় না। বিজেপি এ-রাজ্যে ক্ষমতায় আসেনি ঠিকই, কিন্তু তাতে সমাজে সঙ্ঘবাদের প্রসারে কোনও বাধা সৃষ্টি হয়নি। সঙ্ঘ একই মডেলে সর্বত্র লড়ে না। পশ্চিমবঙ্গে সম্ভবত ওড়িশা মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে।

ওড়িশায় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি হওয়া বিজু জনতা দলের নেতা নবীন পট্টনায়ক কংগ্রেসকে শেষ করে বিজেপিকেই তাঁর একমাত্র বিকল্প করে তুলেছিলেন। জাতীয় রাজনীতির ইস্যুগুলোতে তিনি বিজেপিকে ঘাঁটাননি। তৃণমূল সাংসদদের মতোই নবীনের দলের সাংসদরাও বহু বিলে ভোটাভুটির সময়ে হয় ভোট দিতেন না, অথবা সরকারের পক্ষে ভোট দিতেন। ওড়িশায় বিজেপিও তাঁর দলকে হারাতে গা লাগায়নি বহুকাল, কেবল নিচুতলায় আরএসএস নিবিড় কাজ চালিয়ে গেছে। শেষমেশ ২০২৪ সালে এসে নবীনের রথ উল্টে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস তো বটেই, তার চেয়েও বড় কথা, কমিউনিস্টদের শেষ করার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি হওয়া তৃণমূল কংগ্রেস। নিচুতলায় আরএসএসের বাড়বাড়ন্ত ঠেকাতেও তারা কোনও ভূমিকা নিয়েছে বলে অভিযোগ নেই। এখন বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-বিজেপির কাজ আরও সহজ করে দেবে। তারপর কবে মমতার রথ উলটানো হবে, কীভাবে হবে— সেসব সিদ্ধান্ত বোধহয় দিল্লি থেকে নেওয়া হবে।

আরো পড়ুন জাতীয় সঙ্গীত এবং নেশন: ইরান যা ভাবায়

তা শুভেন্দুবাবুরা গান-টান করুন, কেবল হিন্দুদের উদ্দেশে একটা কথা বলে যাই। বিজেপি বা সঙ্ঘ পরিবারের আসল লক্ষ্য যে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের ভোট পাওয়া, বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়— তা বুঝতে খুব বেশি কষ্ট করার দরকার নেই। তথাগত রায়, তরুণজ্যোতি তিওয়ারি প্রমুখের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে যেসব কথোপকথন চলে সেগুলোতে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। তাঁরা কিন্তু সজলবাবুর মতো আবেগপ্রবণ হয়ে বাংলাদেশ আক্রমণ করার কথা-টথা বলেন না। বরং বিপন্ন হিন্দুদের এ-দেশে জায়গা দেওয়ার কথা উঠলেই তাঁরা এবং তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা বলতে শুরু করেন— ভারতবর্ষ ধর্মশালা নয়। বাংলাদেশি হিন্দুদের প্রতি সত্যিই টান থাকলে এই উপমহাদেশের মুসলমান বাদে অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য যে আইন তথাগতবাবুদের সরকার তৈরি করেছে, তাতে নির্দিষ্ট এ-দেশে আসার শেষ তারিখটা তুলে দিলেই তো হত। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪-র পরে বিপদে পড়া হিন্দুরা কি যথেষ্ট হিন্দু নন? আজ বাংলাদেশে যে হিন্দুরা বিপন্ন, তাঁদের জন্য তাহলে বিজেপির ভারতে কোনও জায়গা নেই? তাঁরা কেবল এ-দেশের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উৎপাদন করার খেলায় ব্যবহৃত বোড়ে?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

গৌরী লঙ্কেশ এখন অবান্তর স্মৃতি

যেহেতু সাংবাদিকরা আকাশ থেকে পড়েন না, আর সকলের মত তাঁরাও একটা আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপাদন, সেহেতু গৌরীর খুনে অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক জামিন এবং মালা পরিয়ে বরণের দৃশ্যও আমাকে অবাক করেনি। মুচকি হেসে স্ক্রোল করে অন্য খবরে চলে যেতে আমার অসুবিধা হয়নি।

“বাট গৌরী লঙ্কেশ ওয়াজ নট আ জার্নালিস্ট। শি ওয়াজ অ্যান অ্যাক্টিভিস্ট।”

৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭। বক্তা পঞ্চাশের বেশি সংস্করণবিশিষ্ট একটি ভারতীয় ইংরিজি কাগজের একাধিক সংস্করণের একজন সম্পাদক। ঠিক তার আগের দিন গৌরী নিজের বাড়ির সামনে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছেন। কথাগুলো ভদ্রলোক বলছিলেন একঝাঁক অতি তরুণ সাংবাদিককে, যারা সদ্য কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সাংবাদিকতায় পা রেখেছে। স্বাধীনতার ৭০ বছর পরে কলকাতার যে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিসে দাঁড়িয়ে নিজের পদের সুযোগ নিয়ে উনি কথাগুলো বলছিলেন, পরাধীন দেশে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে লিখে লিখে মরে যাওয়া হিন্দু প্যাট্রিয়ট কাগজের সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত রাস্তাটা সেখান থেকে কিলোমিটার দেড়েক। এমনকি যে অফিসে দাঁড়িয়ে তিনি কথা বলছিলেন, সেই অফিসের সামনের রাস্তার নামকরণ হয়েছিল সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে। হরিশ তবু সরকারি কর্মচারী ছিলেন, দলীয় রাজনীতি করতেন না। সুরেন বাঁড়ুজ্জে রীতিমত কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন। সেইসঙ্গে দ্য বেঙ্গলি নামের কাগজ সম্পাদনা করতেন। সম্ভবত তিনিই প্রথম ভারতীয় সাংবাদিক, যাঁকে কাগজের একটি লেখার জন্যে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হয়। আরও পিছিয়ে গেলে এই কলকাতাতেই রামমোহন রায় বলে একজন সাংবাদিকের নাম পাওয়া যাবে। রামমোহনের কলমের জোরে ইংরেজ আমলের সুপ্রিম কোর্টকেও গেঁয়ো রায়তের চাবুক খেয়ে মৃত্যুর ঘটনায় জেলা জজের কৈফিয়ত তলব করতে হয়েছিল। সেই শহরে বসে একজন শীর্ষস্থানীয় সম্পাদক গৌরীর মৃত্যুর পরদিনই বলতে পেরেছিলেন যে গৌরী সাংবাদিক ছিলেন না, কারণ তিনি অ্যাক্টিভিস্ট ছিলেন।

দৃশ্যটা দেখেছিলাম এবং কথাগুলো শুনেছিলাম ফুটখানেক দূর থেকে। চুপ করে থাকতে হয়েছিল, কারণ ওই যে বললাম – আমি তখন কর্পোরেট ক্রীতদাস। ক্রীতদাসের প্রতিবাদ করার অধিকার থাকে না, সাহসও থাকে না। তবে আমাদের পায়ের তলার জমি যে সরছে সেটা সেদিনই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে। যে দেশে একজন সাংবাদিক খুন হলে অন্য সাংবাদিকরা বলে – ও সাংবাদিক নয় কারণ ও অ্যাক্টিভিস্ট, সে দেশে কোনো সাংবাদিকের জীবনেরই যে দাম থাকবে না অদূর ভবিষ্যতে, চাকরি থাকা দূর অস্ত, তা বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি। আমার অনুমান নির্ভুল প্রমাণ করে বছর তিনেকের মধ্যেই অতিমারীর অজুহাতে ভারতের মিডিয়ায় ব্যাপক সাংবাদিক ছাঁটাই শুরু হয়। যেহেতু সাংবাদিকরা আকাশ থেকে পড়েন না, আর সকলের মত তাঁরাও একটা আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপাদন, সেহেতু গৌরীর খুনে অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক জামিন এবং মালা পরিয়ে বরণের দৃশ্যও আমাকে অবাক করেনি। মুচকি হেসে স্ক্রোল করে অন্য খবরে চলে যেতে আমার অসুবিধা হয়নি। কারণ সাংবাদিক হত্যা আর সাংবাদিক ছাঁটাইয়ের উদ্দেশ্য একই – ক্ষমতাশালীর সমালোচনা বন্ধ করা, ক্ষমতার দিকে আঙুল তোলা বন্ধ করা, ক্ষমতাহীনের কণ্ঠ সকলের কানে পৌঁছবার ব্যবস্থা নষ্ট করা।

আরও পড়ুন তালিবান শাসন: ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

লজ্জাজনক হলেও স্বীকার না করে উপায় নেই, যে খুন হওয়ার আগে পর্যন্ত গৌরী আমার কাছে খুব পরিচিত ছিলেন না। দু-একবার নাম শুনেছিলাম। কিন্তু দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, সানডে পত্রিকা, ইনাড়ু টিভি চ্যানেলের মত বড় বড় কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে দেড় দশক কাজ করলেও গৌরীকে আমরা যেসব কাজের জন্য আজও মনে রেখেছি সেসব তিনি করেছেন মাতৃভাষা কন্নড়ে, মূলত তাঁর বাবা পলিয়া লঙ্কেশের মৃত্যুর পর তাঁরই প্রতিষ্ঠিত কাগজ লঙ্কেশ পত্রিকে (পরবর্তীকালে গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে)-র দায়িত্ব নিয়ে। আমরা বাঙালিরা আমেরিকায় কী হচ্ছে খবর রাখি, ইউরোপের সাংবাদিকতার হাল হকিকতও জানি। কিন্তু বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সাংবাদিকদের খবর জানি না। বড়জোর হিন্দি ভাষার রবীশ কুমারদের আমরা চিনি। তাও তাঁরা কর্পোরেট টিভি চ্যানেলে তারকা হয়ে উঠেছিলেন বলে। গৌরীর মত বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সংবাদমাধ্যমে যাঁরা মরণপণ সাংবাদিকতা করেন তাঁদের খবর আমরা পাই কোথায়? হয়ত চাই না বলেই পাই না। তাই আমাদের নিজেদের বিকল্প সাংবাদিকতা হয়ে দাঁড়ায় শিকড়হীন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুবিধাবাদীও। লিটল ম্যাগাজিনের দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও বাংলায় বিকল্প সংবাদমাধ্যম সম্ভবত তৈরিই হত না মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতার পরিসর ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে না গেলে। অন্যদের দোষ দেব না, আমারও তো দিব্যি চলে যাচ্ছিল দেড় দশক কর্পোরেট ক্রীতদাস হয়ে মাসান্তে মোটা মাইনে পকেটস্থ করে। গৌরীর হত্যা নাড়া দিলেও, নড়াতে তো পারেনি। বিকল্প হওয়ার জ্বালা যে অনেক। যা পাওয়া যায় তার চেয়ে ছাড়তে হয় অনেক বেশি।

আসলে গৌরীর মৃত্যু কেবল তাদেরই নড়াতে পেরেছে, গৌরী যাদের জন্য নিজের কলমকে হাতিয়ারের মত ব্যবহার করেছিলেন। নইলে নিজের বাড়ির সামনে খুন হওয়ার সাতবছর পরেও, কারা সম্ভাব্য খুনি তার মোটামুটি হদিশ থাকা সত্ত্বেও গৌরীর হত্যাকারীরা শাস্তি পাবে না কেন? মনে রাখা ভাল, গৌরী হিন্দুত্ববাদীদের দীর্ঘদিনের শত্রু হলেও তাঁকে যখন খুন করা হয় তখন কর্ণাটকে ছিল সিদ্দারামাইয়ার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার। সেই সরকারের পুলিসও অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার কাজে তেমন এগোয়নি। ইতিমধ্যে একাধিকবার সরকার বদল হয়ে গতবছর গৌরীর রাজ্যে আবার ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস, আবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন সিদ্দারামাইয়া। বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে কংগ্রেসের কর্ণাটক জয়ের অন্যতম কারণ রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো যাত্রা এবং হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান। তবু কিন্তু হিন্দুত্ববাদের আমৃত্যু প্রতিপক্ষ গৌরীর হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ১৭ জনের মধ্যে ১১ জন ইতিমধ্যেই জামিনে মুক্ত। রাহুলের মহব্বতের দোকানে গৌরীর জন্যে কি তবে কিছুই নেই? যেমন চারবছর ধরে বিনা বিচারে আটক সেই উমর খালিদের জন্য তাঁর দোকানে নেই একটা শব্দও, যাঁকে গৌরী নিজের ছেলে বলতেন?

আসলে বোবার যেমন শত্রু নেই, তেমনি যথার্থ সাংবাদিকের শত্রুর অভাব নেই। গৌরীরও ছিল না। কর্ণাটকের আজকের উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারের বিরুদ্ধেও গৌরী একসময় লেখালিখি করেছিলেন। এমনকি সিদ্দারামাইয়া সরকারের টিপু সুলতান জয়ন্তী পালন করার সিদ্ধান্তকেও তিনি ভাল চোখে দেখেননি। তিনি ওই সিদ্ধান্তকে ‘নরম সাম্প্রদায়িকতা’ আখ্যা দিয়েছিলেন। এমন একজনের হত্যাকারীরা শাস্তি পেল কি পেল না, তা নিয়ে কেনই বা মাথা ঘামাতে যাবে কোনো দল বা তার নেতৃত্ব? যে ভারতে প্রয়োজনীয় অর্ণব গোস্বামী, নাভিকা কুমার, মৌপিয়া নন্দীর মত সরকারি তোতাপাখিরা; সেখানে গৌরী যে অপ্রয়োজনীয় তা বলাই বাহুল্য।

গৌরীর মৃত্যুর পর তাঁর আমৃত্যু বন্ধু এবং প্রাক্তন স্বামী সাংবাদিক চিদানন্দ রাজঘাট্টা এক দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট করেছিলেন, যা একান্ত ব্যক্তিগত অথচ গৌরী লঙ্কেশের শত্রু কারা এবং কেন – তা বোঝার সবচেয়ে ভাল উপায়। সেই পোস্ট পড়ে হয়ত বাঙালি বদভ্যাসেই আমার মনে পড়েছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেইসব লাইন ‘অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে/তোমার মুখ অশ্রু-ঝলোমলো/লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কিনা?’ আজ সাতবছর পরে মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা আর কাব্যে আটকে নেই। গৌরী এই দেশের কাছে ব্যবহারিকভাবেও অবান্তর স্মৃতিই হয়ে গেছেন।

রোববার.ইন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

প্রশান্ত বুদবুদ ফেটে যাওয়ায় প্রশ্ন: গণতন্ত্র চালাচ্ছে মার্কেট রিসার্চ?

রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন দলের কর্মীদের লড়তে হচ্ছে মার্কেট রিসার্চ কোম্পানির সঙ্গে? গরিব মানুষের গণতন্ত্র ভারতের জন্য এটা কি ভালো লক্ষণ?

অতি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রশান্ত কিশোর বলেছেন, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস এমন কিছু উন্নতি করেনি। কারণ দেশের ২০% মানুষ সংখ্যালঘু – ১৮% মুসলমান আর অন্যান্য সংখ্যালঘু আরও ২%। তারা কংগ্রেসের ‘ফ্রি ভোটব্যাংক’, আর কংগ্রেস পেয়েছে ২৩ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ সংখ্যালঘু বাদে মাত্র ৩% ভোটারের ভোট আদায় করতে পেরেছে রাহুল গান্ধির দল। এই তত্ত্বের আগাগোড়া সবটাই ভুল তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। যেহেতু তথ্যগুলোই ভুল, সেহেতু তত্ত্বটির একমাত্র ঠিকানা বাজে কাগজের ঝুড়ি।

প্রথমত, কংগ্রেস পেয়েছে ২১.১৯% ভোট (২০১৯ সালে পেয়েছিল ১৯.৪৬%)। দ্বিতীয়ত, সর্বশেষ আদমশুমারি অনুসারে মুসলমানরা এদেশের জনসংখ্যার ১৪.২%। তার সঙ্গে খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, আরও ছোট ছোট ধর্মের মানুষ এবং যাঁরা নিজেদের কোনও ধর্মের সঙ্গে যুক্ত বলেননি তাঁদের যোগ করলে তবে হয় ২০.২%। কিন্তু সংখ্যালঘুরা গোটা দেশে কংগ্রেস ছাড়া কাউকে ভোট দেন না – একথা একেবারে ভুল। পশ্চিমবঙ্গেই যেমন সেই ২০১১ সাল থেকে বেশিরভাগ সংখ্যালঘু মানুষ ভোট দিয়ে আসছেন তৃণমূল কংগ্রেসকে, তার আগে দিতেন বামফ্রন্টকে। তামিলনাডু সহ অনেক রাজ্যেই আঞ্চলিক দলগুলো বেশিরভাগ সংখ্যালঘুর ভোট পেয়ে থাকে। এবারেও পেয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, জনসংখ্যার সকলেই ভোটার নাকি? শিশুরাও ভোট দেয়? তার উপর কংগ্রেস এবার লড়েছে ৩২৮ আসনে, কিন্তু ২০১৯ সালে লড়েছিল ৪২৩ আসনে। প্রায় একশো কম আসনে লড়ে কংগ্রেস ভোট বাড়িয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। আসন যে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। অতএব এটা ফেলে দেওয়ার মতো সাফল্য নয়।

এখন কথা হল, প্রশান্তের তত্ত্বটি যখন নেহাত আবর্জনা, তখন লেখার শুরুতেই এতগুলো শব্দ তা নিয়ে খরচ করলাম কেন? কারণ প্রশান্তকে যে ভারতীয় রাজনীতির একজন বিশেষজ্ঞ বলে মনে করা হয়, করণ থাপারের হাতে ল্যাজেগোবরে হওয়ার পরেও যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে এখনও উদ্গ্রীব, তার কারণ ভোট কুশলী হিসাবে তাঁর কীর্তি। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে প্রশান্ত বিখ্যাত হয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, ওই জয়ের কারিগর তিনিই। প্রশান্তের খ্যাতির সূত্রে ভারতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল এক নতুন পেশা, যার নাম ইংরেজিতে ‘ইলেকশন স্ট্র্যাটেজিস্ট’। বাংলায় ভোট কুশলী বলতে পারি।

ভোট কুশলী ব্যাপারটা দেখতে শুনতে এত ভালো যে বঙ্গে দিশেহারা বামপন্থীদের মধ্যেও কথাবার্তা শুরু হয়েছে – একজন প্রশান্ত বা সুনীল কানুগোলু (কংগ্রেসের ভোট কুশলী সংস্থা মাইন্ডশেয়ার অ্যানালিটিক্সের কর্ণধার) দরকার। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, তামিলনাডু, উত্তরপ্রদেশের মতো যথেষ্ট সংখ্যালঘু থাকা রাজ্যে কাজ করা সংস্থার একদা কর্ণধার প্রশান্তের মূর্খামি দেখে সেই বামপন্থীরা কী বুঝবেন জানি না, আমি যা বুঝলাম বলি।

হয় প্রশান্ত এতটাই কংগ্রেসবিদ্বেষী ও মুসলমানবিদ্বেষী যে বিদ্বেষে তাঁর বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়েছে। নয় তাঁর সাফল্যের পিছনে ১০০% কৃতিত্ব আইপ্যাকের সেইসব কর্মীদের, যাঁদের নাম কেউ জানে না। তিনি শুধু মাইনে করা কর্মীদের পরিশ্রম আত্মসাৎ করে নাম কিনেছেন। কিন্তু কর্পোরেট দুনিয়ায় এ তো প্রায় নিয়ম। ফলে তেমন হয়ে থাকলে রাজনীতির দিক থেকে ভাবনার কিছু নেই। তৃতীয় একটা সম্ভাবনা আছে, যা বেশি চিন্তার।

ব্যাপারটা কি আসলে এরকম, যে এই সংস্থাগুলো যা করে তা আসলে বিজ্ঞাপন জগতে যাকে ‘মার্কেট রিসার্চ’ বলে তার বেশি কিছুই নয়? লক্ষণীয়, আইপ্যাক বা মাইন্ডশেয়ার সেইসব মক্কেলকেই জেতাতে পেরেছে যারা জেতার অবস্থায় ছিল। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচন বিজেপি জিততই, কারণ ইউপিএ সরকারের প্রতি বিপুল অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। ২০২১ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন বিজেপি জিতে যাবে বলে যতই হাওয়া তৈরি হয়ে থাক, বিজেপির না ছিল সংগঠন, না ছিল মমতার সমতুল্য কোনও মুখ।

২০০৫ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে নীতীশ কুমারের সরকার যে অনেক কাজ করেছিল তা তাঁর অতি বড় শত্রুও অস্বীকার করে না। ফলে ২০১৫ সালে জেডিইউ-আরজেডি জোটের জয়ও এমন কিছু অত্যাশ্চর্য ব্যাপার ছিল না, খিঁচ ছিল নীতীশ মহাগঠবন্ধনে যোগ দেওয়ায়। তামিলনাডুর মানুষ পরপর দু’বার একই দলকে জেতান না। ১৯৮৪ সাল থেকে চলে আসা সেই ধারা ভেঙে এমনিতেই ২০১৬ সালে এআইএডিএমকে পরপর দু’বার জিতে গিয়েছিল। সুতরাং ২০২১ সালে ডিএমকের জয় প্রায় অনিবার্য ছিল। ২০১৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে কিন্তু সংগঠনহীন, কর্মসূচিহীন কংগ্রেস আইপ্যাকের সাহায্য নিয়েও সাতটার বেশি আসন জেতেনি। সুনীলও কি কংগ্রেসকে তেলেঙ্গানা জেতাতে পারতেন সংগঠন এবং রেবন্ত রেড্ডির মতো আক্রমণাত্মক নেতা না থাকলে? কর্ণাটক জেতা হত সিদ্দারামাইয়া আর ডিকে শিবকুমার ছাড়া?

আরও পড়ুন কানহাইয়ার কেরিয়ার আর কমিউনিস্ট আদর্শবাদ: তার ছিঁড়ে গেছে কবে

অনেকে অবশ্য স্বীকার করেন যে এই সংস্থাগুলো বা তাদের কর্ণধাররা জাদুকর নন। কিন্তু তাঁদের মতে, এরা ‘ভ্যালু অ্যাড করে’। সে ভ্যালু কি পরিমাপযোগ্য? হলে প্রশান্তের মতো মহাপণ্ডিত কি ভ্যালু অ্যাড করেন? যদি পরিমাপযোগ্য না হয়, তাহলে কীসের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করছে এদের পিছনে? দলগুলোর টাকা মানে তো আসলে নাগরিকদেরই টাকা। কর্পোরেটগুলো পিছন দরজা দিয়ে যে চাঁদা দলগুলোকে দেয় (নির্বাচনি বন্ডেই হোক আর নগদেই হোক) সে টাকাও তো তারা উশুল করে নেয় নাগরিকদের পকেট থেকেই। শুধু তাই নয়, এই সংস্থাগুলোর পরামর্শেই তো আজকাল ক্ষমতাসীন দলগুলোর, অর্থাৎ রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ হচ্ছে। তাহলে কি কতকগুলো মার্কেট রিসার্চ কোম্পানি নির্ধারণ করছে আমাদের গণতন্ত্রের অভিমুখ?

এদের কাজের সীমা কতটুকু? কেউ বলেন, এরাই নাকি দলের প্রার্থীতালিকা থেকে নির্বাচনি প্রচার – সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আবার কিছুদিন আগে মমতা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আইপ্যাকের ভূমিকা নেহাতই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালানো। এসব গোপনীয় ব্যাপার, ফলে সম্যক জানা অসম্ভব। কিন্তু একটা ব্যাপারে সকলেই একমত। ভোট কুশলী সংস্থার আবশ্যিক কাজ হল মক্কেল পার্টির জন্য ভোটারদের সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ। তথ্য কাটাছেঁড়া করেই তারা দলগুলোকে পরামর্শ দেয় – এটা বলুন, ওটা বলবেন না। অমুক প্রকল্প চালু করুন, তমুক কাজে পার্টির ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।

সন্দেহ নেই, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে রাজনীতিতে সাফল্য পেতে গেলে তথ্য আর প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। সে কারণেই তো আইপ্যাকের প্রস্থানের পর ডিএমকে ভোট কুশলী হিসাবে নিযুক্ত করেছে পপুলাস এমপাওয়ারমেন্ট নেটওয়ার্ক (পেন)-কে। তবে আইপ্যাক বা মাইন্ডশেয়ারের সঙ্গে পেনের তফাত আছে। পেনের কর্ণধার এমকে স্ট্যালিনের জামাই ভি সবরীসন। এখনও পর্যন্ত পেন অন্য কোনও দলের হয়ে কাজ করেনি। তারা মূলত পার্টি এবং ডিএমকে সরকারের বার্তা ডিজিটাল উপায়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে। সেই লক্ষ্যে স্ট্যালিনের মোবাইল অ্যাপ বানিয়েছে তারা এবং মুখ্যমন্ত্রীর নিয়মিত পডকাস্ট চালু করেছে। কীভাবে মানুষের কাছ থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করে রাজনৈতিক কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে প্রশিক্ষণও দেয় ডিএমকে কর্মীদের। কিন্তু ডিএমকের রাজনীতি তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে, এমন অভিযোগ বা প্রশংসা এখনও অবধি শোনা যায়নি। অথচ তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আইপ্যাক নিচ্ছে – এমন অভিযোগ উঠেছে প্রশান্ত ছেড়ে যাওয়ার আগে ও পরে।

আবার মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থানের নির্বাচনে সুনীল কাজ করুন – এমনটা নাকি সেখানকার কংগ্রেস নেতারা চাননি। তাহলে রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন দলের কর্মীদের লড়তে হচ্ছে মার্কেট রিসার্চ কোম্পানির সঙ্গে? গরিব মানুষের গণতন্ত্র ভারতের জন্য এটা কি ভালো লক্ষণ?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

হিন্দুরাষ্ট্রের ক্রিকেট দলের কোচ হিসাবে গম্ভীর সেরা পছন্দ

২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন।

ভালমানুষ রাহুল দ্রাবিড় আর পেরে উঠছেন না। তাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড পুরুষদের জাতীয় দলের নতুন কর্ণধারের খোঁজ করছে। শোনা যাচ্ছে বোর্ড একজন শাঁসালো কোচ চায়। স্টিফেন ফ্লেমিংকে নাকি মহেন্দ্র সিং ধোনি রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। রিকি পন্টিংকে নাকি বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি রাজি নন। জাস্টিন ল্যাঙ্গারও রাজি হচ্ছেন না বলে শোনা যাচ্ছে। এসব অবশ্য নেহাত গুজব বলে বিবৃতি দিয়েছেন বোর্ডের সর্বেসর্বা জয় শাহ। তবে গৌতম গম্ভীরের নাম যে উঠে এসেছে, এই প্রচার সম্পর্কে কিছু বলেননি। এই কাজের জন্যে ওই নামটি কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক।

গৌতম সত্যিই গম্ভীর। তাঁকে চট করে হাসতে দেখা যায় না। সম্প্রতি রবিচন্দ্রন অশ্বিনের পডকাস্টে এসে গৌতম বলেছেন ‘লোকে আমার হাসি দেখতে আসে না। আমার জয় দেখতে আসে।’ ফুর্তিবাজ রবি শাস্ত্রীর সঙ্গে এতবছর ঘর করার পরে রোহিত শর্মা, বিরাটরা কি এত গম্ভীর লোকের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারবেন? গুরুতর প্রশ্ন।

গম্ভীরের কথা উঠলেই এসে পড়ে বিরাটের কথাও। দুজনেই দিল্লির ছেলে। শুধু জাতীয় দল নয়, রঞ্জি দলেও একসঙ্গে খেলেছেন। কিন্তু সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়। প্রাক্তন ক্রিকেটারদের যে কজন আজও বিরাটের ব্যাটিংয়ের সমালোচনা করার সাহস দেখান, গম্ভীর তাঁদের একজন। গতবছর আইপিএলে গম্ভীরের তখনকার দল লখনৌ সুপার জায়ান্টস আর বিরাটের রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর ম্যাচের পর তো হাতাহাতির উপক্রম হয়েছিল। ভারতীয় ক্রিকেটের বর্তমান মহাতারকার সঙ্গে এমন সম্পর্ক যাঁর, তিনি কী করে দল চালাবেন? কুম্বলের সময়ে  অবশ্য বিরাট অধিনায়ক ছিলেন, এখন সে ঝামেলা নেই। কিন্তু এই প্রজন্ম তো আবার সৌরভ গাঙ্গুলিদের প্রজন্ম নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাত্র হাজার নয়েক রানের মালিক জন রাইট তাঁর ইন্ডিয়ান সামার্স বইয়ে লিখেছেন, ভারতীয় দলের কোচ থাকার সময়ে তিনি একবার খারাপ শট খেলে আউট হওয়ার জন্যে রাগের চোটে বীরেন্দ্র সেওয়াগের কলার ধরেছিলেন, মারতে গিয়েছিলেন। অথচ সেই ঘটনা দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার বহুবছর পরে রাইট নিজেই লেখার আগে কেউ জানতেও পারেনি। আজ এর অর্ধেক ঘটলেও সোশাল মিডিয়ায় ‘সূত্রের খবর’ বলে ঘটনাটা ভাইরাল হবে, বোর্ড বিবৃতি দেবে এমন কিচ্ছু ঘটেনি। কিন্তু কোচের চাকরিটি চলে যাবে।

গম্ভীর যে কোচ হওয়ার যোগ্য তাতে সন্দেহ নেই। ২০০৭ আর ২০১১ – দুই ধরনের ক্রিকেটে ভারতের দুই বিশ্ব খেতাব জয়েই তাঁর বড় অবদান ছিল। দুটো ফাইনালেই তিনি সর্বোচ্চ রান করেন। আটান্নটা টেস্ট ম্যাচেও তাঁর কীর্তি ফেলে দেওয়ার মত নয়। আর কিচ্ছু না করে শুধু যদি ২০০৯ সালে নিউজিল্যান্ডের নেপিয়ারে এগারো ঘন্টা ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচানো ইনিংসটাই খেলতেন, তাহলেও তাঁর নাম ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে লেখা থাকত। তার উপর তিনি দুবার কলকাতা নাইট রাইডার্স অধিনায়ক হিসাবে আইপিএল খেতাব জিতেছেন। লখনৌ সুপার জায়ান্টস তাঁর মেন্টরশিপে আইপিএলে যোগ দিয়েই শেষ চারে পৌঁছেছিল। ফলে দল চালানোর ক্ষমতা যে তাঁর আছে, তা নিয়েও সংশয় নেই।

কিন্তু ভারতীয় দল আর পাঁচটা দলের চেয়ে আলাদা। অস্ট্রেলিয় ল্যাঙ্গার অতশত বোঝেন না। তিনি সরল মনে সংবাদমাধ্যমকে বলে বসেছেন, কে এল রাহুল নাকি তাঁকে বলেছেন – আইপিএলের দলে যদি চাপ আর রাজনীতি আছে বলে মনে করো, সেটাকে হাজার দিয়ে গুণ করলে তবে ভারতীয় দলের কোচিং কীরকম চাপের সেটা বুঝতে পারবে। তাই ল্যাঙ্গার ঠিক করেছেন ও কাজ তাঁর জন্যে নয়।

বলে ফেলার জন্যে রাহুলের হয়ত গর্দান যাবে, কিন্তু কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। প্রসিদ্ধ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পত্রিকা উইজডেন-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায় বর্ষীয়ান সাংবাদিক শারদা উগ্রা ‘মোদী অপারেন্ডি: দ্য পলিটিসাইজেশন অফ ইন্ডিয়ান ক্রিকেট’ শীর্ষক নিবন্ধে সবিস্তারে লিখেছেন, কীভাবে ক্রিকেট বোর্ডকে বিজেপি দলের একটা ইউনিটে পরিণত করা হয়েছে। ২০২৩ বিশ্বকাপকেও কীভাবে বিজেপির স্বার্থে চালানো হচ্ছিল। সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা – ২০২৩ বিশ্বকাপে পাকিস্তান ম্যাচে নীল জার্সির বদলে সম্পূর্ণ গেরুয়া জার্সি পরতে বলা হয়েছিল ভারতীয় দলকে। কিন্তু ক্রিকেটাররা বেঁকে বসেন। কেন? শারদা দুটো সূত্র থেকে দুরকম খবর পেয়েছেন। একটা বলছে, ক্রিকেটাররা ওই জার্সি বাতিল করেন জার্সিটা হল্যান্ডের মত দেখতে বলে। দ্বিতীয়টা বলছে, ক্রিকেটাররা বলেন – এ কাজ আমরা করব না। এতে আমাদের দলের ক্রিকেটারদেরই অসম্মান করা হবে। কারণ ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ দৃশ্যতই হয়ে দাঁড়াবে হিন্দু বনাম মুসলমান ম্যাচ। অথচ ভারতীয় দলে আছেন মহম্মদ শামি আর মহম্মদ সিরাজ। অনেক পাঠকের হয়ত খেয়াল আছে, ওই গেরুয়া জার্সির ছবি সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিল। তখন বোর্ডের হিসাবরক্ষক বলেছিলেন, ওটা ভুয়ো। কিন্তু শারদা লিখেছেন, দল, ক্রিকেট বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক নিয়ামক সংস্থা আইসিসি – তিনটে সূত্র থেকে তিনি খবর পেয়েছেন যে এমন পরিকল্পনা সত্যিই নেওয়া হয়েছিল।

আগামী ৪ জুন নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় ফিরলে হয়ত ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা জার্সির রং বদল আর আটকাতে পারবেন না। এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়, গম্ভীরই দ্রাবিড়ের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার উপযুক্ত লোক। কারণ তিনি ‘মোদী কা পরিবার’-এর গর্বিত সদস্য, বিদায়ী লোকসভায় বিজেপি সাংসদও ছিলেন। জাতীয় ক্রিকেট দলের লাগাম নিজেদের হাতে রাখতে গেলে মোদীর তো গম্ভীরকেই দরকার। যদি মোদী ক্ষমতায় না ফেরেন তাহলে গম্ভীরের গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে। কারণ একটা নির্বাচনে হার হলেই দেশের জন্যে মোদীর এক হাজার বছরের পরিকল্পনার পরিসমাপ্তি ঘটবে না। ভারতীয় সংস্কৃতির সমস্ত অভিজ্ঞান শরীরে ধারণ করা ক্রিকেট দল যাতে বেপথু না হয়ে যায়, তার জন্যে তো গম্ভীরের মত নির্ভরযোগ্য লোককেই দরকার। ভুললে চলবে না, ২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লি দলের অধিনায়ক তখন প্রত্যেক দিন খেলার শুরুতে তিনি ও কোচ বিজয় দাহিয়া গোটা দলকে দিয়ে সূর্যপ্রণাম করাতেন। এক সাংবাদিক দাহিয়াকে বলেছিলেন যে কাণ্ডটা দেখে ইনজামাম উল হকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান দলের মাঠেই নমাজ পড়ার মত হয়ে যাচ্ছে। দাহিয়া বলেছিলেন, মোটেই তা নয়। সূর্যপ্রণামটা নাকি ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। ওতে চাপ কমে, মন শান্ত হয়।

সরকার হাতে থাক আর না-ই থাক, এই ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন’ তো বজায় রাখতে হবে জাতীয় ক্রিকেট দলে। তার জন্যে গম্ভীরের চেয়ে উপযুক্ত আর কে আছে?

এই সময় কাগজে প্রকাশিত

সত্যজিৎ রায়কে পূজার ছলে ভুলে থাকা চলে না

অদূর ভবিষ্যতে এদেশে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সত্যজিৎও গণশত্রু বলে চিহ্নিত হবেন হয়ত।

চার্লস চ্যাপলিনকে কি সত্যিই অ্যাডলফ হিটলারের মত দেখতে ছিল? একেবারেই না। আসলে চ্যাপলিন দাড়িগোঁফহীন অত্যন্ত সুপুরুষ একজন লোক। বাংলায় যাকে বলে রমণীমোহন, উচ্চতার ব্যাপারটা বাদ দিলে তিনি তাই। বেশিরভাগ ছবিতেই অবশ্য ঐ মাছি গোঁফটাসুদ্ধই চ্যাপলিনকে দেখা যায়; কিন্তু সে চেহারাও চোখের ভাষায়, চুলের ছাঁটে, বেশভূষায় টোমেনিয়ার একনায়ক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেলের থেকে বহুযোজন দূরে। বলাই বাহুল্য যে চ্যাপলিন ইচ্ছে করেই হিঙ্কেলকে হিটলারের আদল দিয়েছিলেন। কিন্তু হিটলার কি হিঙ্কেলের মত হাস্যকর একজন লোক ছিল? তা তো নয়। বেলুন নিয়ে খেলা করার মত ছেলেমানুষি তার ছিল না, পর্দা বেয়ে ওঠার মত জোকারসুলভ কাজও সে করত বলে তার ঘনিষ্ঠ কারোর স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায় না। তাহলে চ্যাপলিন কেন এরকম হাস্যকর করে দেখালেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খুনেটাকে?

দ্য গ্রেট ডিক্টেটর ছবির ৪০ বছর পর মুক্তি পায় হীরক রাজার দেশে। আরেক একনায়কের গল্প। হীরক রাজার চরিত্রে উৎপল দত্তকে মনে করে দেখুন। বিশাল চেহারা, লম্বা গোঁফ, মোটা গলা – বেশ ভয় ধরানো চেহারা। হিঙ্কেলের ঠিক উলটো। কিন্তু মুখের ভাষাটা? প্রথমত সে কথা বলে ছড়া কেটে। যা শুনে হাসি পেতে বাধ্য। দ্বিতীয়ত, উৎপল দত্ত পরে বলেছিলেন, শুটিংয়ের সময়ে সত্যজিৎ রায় তাঁকে বলেন ‘হীরক রাজার সংলাপগুলো গ্রাম্য উচ্চারণে বলো। যারা পড়াশোনা বিশেষ জানে না, তাদের মত। লোকটাকে দর্শকের কাছে হাস্যাস্পদ করে দাও।’

চল্লিশ বছরের ব্যবধানে দুই একনায়ককে পর্দায় দেখাতে গিয়ে দুই জিনিয়াসই দেখালেন হাস্যকর করে, অর্থাৎ ভয়ানক লোকেদের সম্পর্কে ভয় ভেঙে দিলেন। দুই স্রষ্টা একটা ব্যাপারে একমত – একনায়করা সবচেয়ে অপছন্দ করে তাদের নিয়ে হাসাহাসি, কারণ আমাদের ভয়ই তাদের শক্তি। হাসাহাসিতে ভয় কেটে যায়।

চ্যাপলিন বা সত্যজিতের সময়ে ইন্টারনেট ছিল না, মিম ছিল না। ব্যঙ্গ ছিল, শ্লেষ ছিল, একনায়ক ছিল। চ্যাপলিনের সময়ে হিটলার, সত্যজিতের সময়ে ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে, হিটলারের কুকীর্তির সবটা তখনো জার্মানির বাইরের মানুষ জানেন না। কিন্তু দ্রষ্টা চ্যাপলিন ফ্যাসিবাদের বিপদ বুঝেছেন, তাকে নিয়ে প্রবল ঠাট্টা করছেন, বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষকে অন্য ভবিষ্যতের কথা বলছেন। ১৯৮০ সালে সত্যজিৎ যখন হীরক রাজার দেশে আমাদের নিয়ে গেলেন তখন ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ফেরত এসেছেন। ততদিনে বিশ্ববন্দিত পরিচালক ছোটদের দেখার মত রূপকথার এমন এক গল্প নিয়ে এলেন পর্দায়, যাকে উৎপল পরে বলবেন জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে সত্যজিতের প্রতিবাদ। শুধু কি তাই করেছেন সত্যজিৎ? নাকি যে স্রষ্টারা দ্রষ্টা হন, তাঁদের মতই ভবিষ্যতের একনায়কদেরও একহাত নিয়েছেন, ভবিষ্যতের প্রতিবাদীদের ভাষা জুগিয়েছেন?

গত কয়েক বছরে সোশাল মিডিয়ায় যতবার মমতা ব্যানার্জিকে হীরক রানী আর নরেন্দ্র মোদীকে হীরক রাজা বলা হয়েছে, হীরক রাজার সঙ্গে তার সভাসদদের কথোপকথনের অনুকরণে যত পোস্ট তৈরি হয়েছে – তা প্রমাণ করে সত্যজিৎ এখনো আমাদের প্রতিবাদের ভাষা। মৃত্যুর তিন দশক পরেও তাঁর কাজ আমরা ফিরে দেখব কেন? অভ্যাসবশত? না। সত্যজিৎ শুধু অভ্যাসে পরিণত হওয়ার মত শিল্পী নন, তার চেয়ে অনেক বড়। তিনি দারুণভাবে সমকালীন, তাই চিরকালীন। যেমনটা বলেছেন উৎপল, এই বক্তৃতায়

One has a sneaking suspicion that all this talk of Renaissance ideas may well be a ruse to remove from sight the living contemporaneity of Ray’s ideas and relegate him to a museum of ancient statuary which has ceased to bother us now. This suspicion is strengthened when we consider a film like Ray’s Hirak Rajar Deshe (Kingdom of Diamonds, 1980) which was his response to Mrs Gandhi’s Emergency decree. This film in the guise of a fairytale is a blast against all forms of dictatorship which believes in thought-control, prison for the workers, arrests and deportations but which all the while is preparing its own ultimate destruction.

Renaissance is an inadequate term for Ray. He was a moment in the conscience of man.

এই বক্তৃতার উপলক্ষ ছিল সাহিত্য আকাদেমি, সঙ্গীতনাটক আকাদেমি আর ললিতকলা আকাদেমির যৌথ প্রচেষ্টায় আয়োজিত এক সেমিনার। সত্যজিৎ মারা যাওয়ার ১৩ দিন পরে। মৃত্যুর পর সমস্ত সরকারি মহল থেকে – দূরদর্শনে, রেডিওতে, এমনকি এই সেমিনারে বিলি করা কাগজেও তাঁকে উল্লেখ করা হচ্ছিল “representative of Indian Renaissance” বলে। সেই তকমার বিরুদ্ধে এখানে গর্জে উঠেছেন উৎপল। বলছেন এটা আসলে প্রতিবাদীর প্রতিবাদী চরিত্র ভুলিয়ে দেওয়ার সরকারি চক্রান্ত। ভারতীয় রেনেসাঁ আবার কী জিনিস? খায় না মাথায় দেয়? ঐতিহাসিকরা যেটার কথা বলতেন তা হল বাংলার রেনেসাঁ – হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও আর তাঁর ছাত্রদের দিয়ে যার শুরু আর রবীন্দ্রনাথে যার পূর্ণতা। কিন্তু সেটাও রেনেসাঁ বলতে যা বোঝায়, সেই স্তরে পৌঁছয়নি। সমাজের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে নতুন সমাজ গড়া হয়নি। তাই পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকরা এর নাম দিয়েছেন বাংলার সংস্কার আন্দোলন। কিন্তু সত্যজিৎ শুধু সেই সংস্কারের সন্তান নন, তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি।

তাহলে? আজ সত্যজিতের জন্মদিনে আমরা, আত্মবিস্মৃত বাঙালিরা, তাঁকে স্মরণ করব কি শুধু মোদী, মমতার বিরুদ্ধে তিনি আমাদের মিম বানানোর সুযোগ দিয়েছেন বলে? আজকে আমাদের সামনে, গোটা ভারতের সামনে, গোটা পৃথিবীর সামনে কি দুটো মাত্র বিপদ – মোদী আর মমতা? তা তো নয়। গোটা পৃথিবী জুড়েই এখন একনায়কত্বের উত্থানের যুগ। ভারতে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী নরেন্দ্র মোদীর চেহারায়, ইজরায়েলে হানাদারি বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর চেহারায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্পোরেট মুঘল ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেহারায়, রাশিয়ায় যুদ্ধবাজ জাতীয়তাবাদী ভ্লাদিমির পুতিনের চেহারায়, তুরস্কে রচপ তায়িপ এর্দোগানের চেহারায়। এই লড়াইয়ে আমাদের ভাষা যোগাতে পারেন কি সত্যজিৎ?

যতবার হীরক রাজার দেশে দেখি ততবার মনে হয় সারাজীবনে এমন বৈপ্লবিক ছবি সত্যজিৎ আর বোধহয় বানাননি। বিজ্ঞানের উপর আক্রমণের প্রতিবাদে খোদ মার্কিন মুলুকে বিজ্ঞানীরা মিছিল করেছিলেন ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে। এদেশেও বিজ্ঞানীরা এবং বিজ্ঞানচর্চা আক্রমণের মুখে পড়েছে প্রবলভাবেই, যতই চন্দ্রযান আর মঙ্গলযান পাঠানো হোক মহাকাশে। আমাদের দেশে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অপবিজ্ঞানের চর্চা চালু করা হচ্ছে। মোদীরাজের প্রথম দিকে বিজ্ঞান কংগ্রেসে আলোচনা হত প্রাচীন ভারতের পরমাণু বোমা নিয়ে, ক্রমশ বিজ্ঞান কংগ্রেস বন্ধই করে দেওয়া হল। এখন রামলালার কপালে সূর্যতিলক এঁকে দেওয়াই বিজ্ঞানের বিরাট অর্জন বলে প্রচার করা হচ্ছে। এক বাবাজি করোনার ওষুধ, ক্যান্সারের ওষুধ – সবই আবিষ্কার করে ফেলেছেন, এমন অবৈজ্ঞানিক দাবি করে কোটিপতি হয়ে যান সরকারি মদতে।

এদিকে পিএইচডি স্কলারদের ভাতা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, প্রতিবাদের ঘাঁটি জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ধাক্কায় আটশোর কাছাকাছি পিএইচডি আসন লোপ করে দেওয়ার ঘটনাও বাসি হয়ে গেছে। কারণ ‘এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।’ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালা। দিনের পর দিন কারারুদ্ধ থাকছেন জিএন সাইবাবার মত অধ্যাপক আর উমর খালিদের মত ছাত্ররা। বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই যে অতিকায় সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি আসলে কার মূর্তি। আমাদের গোটা দেশটাই এখন মূর্তির মাঠ।

কিন্তু হীরক রাজার দেশে আটকে থাকলে ভুল করবেন। ১৯৫৫ সালের পথের পাঁচালী থেকে ১৯৯১ সালের আগন্তুক পর্যন্ত ওই একটিমাত্র ছবিই সত্যজিৎ করে গেছেন যা এই দুঃসময়ে আমাদের সম্বল – তা নয়। মনে রাখবেন, সত্যজিৎ সেই পরিচালক যাঁর প্রথম ছবি দেখে এক রাষ্ট্রপতি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন পর্দায় এত দারিদ্র্য দেখালে বিশ্বের কাছে দেশের অসম্মান হবে না? সত্যজিতের সপাট প্রতিপ্রশ্ন ছিল ‘দেশে এত দারিদ্র্য আছে সেটা সহ্য করা যদি আপনার পক্ষে অন্যায় না হয়, আমার পক্ষে সেই দারিদ্র্য দেখানো অন্যায় হবে কেন?’ একের পর এক দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডা ছবির যুগে, ইন্টারনেট ট্রোলদের প্রশ্নের মুখে এমন শিল্পীই তো আমাদের ধ্রুবতারা।

আরও পড়ুন টলমলে ট্রিবিউটে ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি গুবলেট

তিনি মারা যান ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে আর ধর্মান্ধ রাজনীতি এদেশে সবচেয়ে বড় সাফল্য পায় ডিসেম্বরে – বাবরি মসজিদ ভেঙে। তার ঠিক ৩২ বছর পরে, আজ, ধর্মান্ধতা এদেশে ফ্যাশনে পরিণত। বাবারা জাঁকিয়ে বসেছেন, দিনকে রাত রাতকে দিন করছেন, গোমূত্র দিয়ে ক্যান্সার সারানোর নিদান দিচ্ছেন, মুখ্যমন্ত্রীও হয়ে বসছেন। লেখাপড়া না জানা, গাঁইয়া, গরীব মানুষ নয়; এই বাবাদের ভক্ত এবং শক্তি সম্ভ্রান্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিপ্রাপ্ত ক্ষমতাশালীরা। মনে পড়ে না বিরিঞ্চিবাবার ভক্তদের? কিন্তু এহেন মহাপুরুষরা শেষ কথা বলেন না। যদি ভরসা হারিয়ে ফেলে থাকেন, একবার দেখুন, বারবার দেখুন কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫)। যমুনাবক্ষে মোচ্ছব করে নদীর বারোটা বাজান এক বাবা আর তাঁর কাছে উপঢৌকন হিসাবে সরকারি আশীর্বাদ নিয়ে পৌঁছন রাষ্ট্রনেতা, দেশের শ্রেষ্ঠ ধনীরা। আমার-আপনার নিরাপত্তার জন্য তৈরি সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হয় ব্যক্তিগত ভৃত্যবাহিনী হিসাবে। মনে হয় না, আমাদের যদি একজন ফেলুদা থাকত, যে বাবাকে গারদে পাঠিয়ে, ধনী ভক্তকে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড় করিয়ে সার্কাসের খেল দেখাত, তবে বেশ হত?

আমরা কি হঠাৎ পৌঁছেছি এই অন্ধকার সময়ে? এক হ্যাঁচকা টানে সংঘ পরিবার আমাদের প্রগতিশীল সমাজকে উল্টোদিকে টেনে নিয়ে গেছে? না। ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ে ফাঁকি ছিল বরাবর। ছিল বলেই ১৯৮৭ সালেও রূপ কানোয়ার সতী হয়, শাস্তি হয় না একজনেরও। ছিল বলেই শাহ বানো সুবিচার পাননি, এত বছর পরেও তিন তালাককে হাতিয়ার করে মুসলমান বিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছে হীরক রাজার লোকেরা। ধর্মের হাতে মেয়েদের এহেন লাঞ্ছনার কালে, অ্যান্টি-রোমিও স্কোয়াডের নামে, লাভ জিহাদের নামে মেয়েদের অধিকারকে অস্বীকার করার দিনে মনে না পড়ে উপায় নেই সত্যজিতের ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি দেবী। সেখানে জমিদার বাড়ির তরুণী বউ দয়াময়ীকে কালীভক্ত শ্বশুরের অন্ধবিশ্বাসের ভারে দেবী হয়ে উঠতে হচ্ছে, যার পরিণতি তার সাজানো জীবন তছনছ হয়ে যাওয়ায়।

বারবার উৎপলের যে বক্তৃতার উল্লেখ করছি, এই অন্ধকারে সত্যজিৎকে খুঁজতে গিয়ে যে বক্তৃতা আমাদের জোরালো টর্চ হতে পারে, সেখানে দেবী সম্পর্কে উৎপল বলছেন

“A proper tribute to Ray would have been… to make arrangements for Devi to be shown all over the country at cheaper rates. Devi is a revolutionary film in the Indian context. It challenges religion as it has been understood in the depths of the Indian countryside for hundreds of years. It is a direct attack on the black magic that is passed off as divinity in this country. Instead of the vulgarized Ramayana and Mahabharata, the Indian TV could have telecast Devi again and again; then perhaps today we would not have to discuss the outrages of the monkey brigade in Ayodhya.”

বুঝতেই পারছেন হীরক রাজার কত বড় শত্রু আমাদের সত্যজিৎ। অদূর ভবিষ্যতে এদেশে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সত্যজিৎও গণশত্রু বলে চিহ্নিত হবেন হয়ত। এমন একজন গণশত্রুকে আমরা এখন গোয়েন্দায় বেঁধে রাখলে তা হবে রবীন্দ্রনাথের সেই গানটার মত – তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত