আর জি কর নিয়ে একটি দলীয় রাজনৈতিক মিছিলে যা দেখলাম

নাগরিক সমাজের কর্ণধাররা এঁদের নিজের সমাজের মানুষ বলে ধরেন বলে মনে হয় না। লাল পতাকাধারীরা এঁদের হাতে পতাকা ছেড়ে দিতে পারেন কিনা, এঁদের মিছিলে টেনে আনতে পারেন কিনা – তার উপর নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ।

মঙ্গলবার বিকেলে কলকাতায় একটি রাজনৈতিক মিছিল ছিল। অদলীয় রাজনীতির আড়ালও সে মিছিলে ছিল না। যাঁরা সংগঠিতভাবে এসেছিলেন তাঁরা লাল পতাকা হাতেই এসেছিলেন। কারোর পতাকায় লালের উপর সাদায় কাস্তে হাতুড়ি আঁকা, কারোর আবার লালের উপর হলুদ রংয়ের বাঘ। সাদার উপর লাল তারা আঁকা পতাকাও ছিল এই মিছিলে। মিছিলটি ঘোষিতভাবেই বামফ্রন্টের মিছিল, অর্থাৎ এ রাজ্যে ১৯৭৭-২০১১ যেসব দল জোট বেঁধে ক্ষমতায় ছিল তাদের এবং তাদের বিভিন্ন গণসংগঠনের ডাকেই এই মিছিল। কয়েক হাজার লোকের এই মিছিলে কোনো জুনিয়র বা সিনিয়র ডাক্তার ছিলেন কিনা জানি না, থাকলেও ডাক্তার পরিচয়ে ছিলেন না। পতাকা নিয়ে হাঁটা অসংখ্য মানুষের একেকজন হয়ে ছিলেন। মিছিল চিরকাল অনেকের, একের নয়।

তা বলে বামফ্রন্টের মিছিল ডাক্তারদের ভুলে গিয়ে, আর জি কর হাসপাতালে ধর্ষিত ও নিহত মেয়েটিকে ভুলে গিয়ে কেবল মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে মসনদে বসতে চাওয়ার মিছিল হয়ে দাঁড়ায়নি। পরিশীলিত শহুরে মধ্যবিত্তদের গলাগুলি স্লোগান তুলেছে

সময় যত দীর্ঘ হবে
আওয়াজ তত তীক্ষ্ণ হবে।
বিচার যত থমকে রবে
আওয়াজ তত তীক্ষ্ণ হবে।

আবার রংচটা জামা প্যান্ট, শস্তা ছাপা শাড়ি পরা পালিশবিহীন মানুষ স্লোগান দিয়েছেন

নেংটি ছেড়ে ধেড়ে ধরো
আর জি করের মাথা ধরো।

এই মিছিল শহুরের, এই মিছিল গেঁয়োর। এই মিছিল টি-শার্ট আর পনিটেলের, এই মিছিল ফেজ টুপি আর দাড়ির। এই মিছিল ক্রপ টপের, এই মিছিল হিজাবের। এই মিছিল স্নিকার্সের, এই মিছিল হাওয়াই চটির। আপনার প্রিয় টিভি চ্যানেল বা ইউটিউব চ্যানেল হয়ত দেখাবে না, তাই সবচেয়ে বেশি করে বলা প্রয়োজন – এই মিছিলে শুধু বহু মানুষ হাঁটেননি, যাঁরা হাঁটেননি তাঁরা পথের দুধার থেকে মিছিলকে আপন করে নিয়েছেন। তবে গোড়া থেকে শুরু করাই ভাল।

***

রাজাবাজার ট্রাম ডিপো থেকে তখনো মিছিল শুরু হয়নি, জমায়েত ক্রমে স্ফীত হচ্ছে। দেখি এক কাঁচাপাকা চুলের শীর্ণকায় ভদ্রলোক একটি সদ্য গোঁফদাড়ি ওঠা বাবুসোনা প্রজাতির ছেলেকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছেন এক বৃদ্ধার দিকে ‘দেখছ? অন্তত ৮০ বছর বয়স হবে ওনার।’ কানে খাপছাড়া কয়েকটি শব্দ যেতে সেই বৃদ্ধা এবং তাঁর সঙ্গিনীরা ঘুরে তাকালেন। ভদ্রলোক বললেন ‘খারাপ কথা বলছি না দিদিভাই। আপনার উদাহরণ দিচ্ছি। শেখাচ্ছি।’ ওঁরা হেসে এগিয়ে যেতেই ছেলেটিকে বললেন ‘উনি এত বয়সে মিছিলে আসতে পেরেছেন, তোমার অসুবিধাটা কী?’ অপ্রস্তুত ধোপদুরস্ত ছেলেটি সহসা কথা খুঁজে পেল না। উনি বললেন ‘অন্যের জন্যেও কিছু করতে হয় তো।’

অনতিদূরেই আরও ভাল দৃষ্টান্ত ছিল। ওঁর চোখে পড়েনি, আমার চোখে পড়ল কিছুক্ষণের মধ্যেই।

ভদ্রলোকের বয়স খুব বেশি হবে না। কিন্তু কোনো গভীর অসুখ তাঁকে প্রায় চলচ্ছক্তিহীন করে ফেলেছে। হাত দুটো বেঁকে গেছে, পা দুটোও। কয়েক ইঞ্চি এগোতেও তাঁর কয়েক মিনিট সময় লাগে। দেখে ভেবেছিলাম ইনি আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে এসেছেন, নিশ্চয়ই মিছিলে যাবেন না। কিন্তু সন্ধের মুখে শ্যামবাজারে নেতাজি মূর্তির পাদদেশে পুলিস যখন মিছিলের গতি রোধ করল, বিস্মিত হয়ে দেখলাম ওই ভদ্রলোক আমার পাশে এসে গেছেন আবার।

ওই পথ হাঁটতে হাঁটতে ততক্ষণে তরুণ-তরুণী, মাঝবয়সীদের দল যেমন চোখে পড়েছে, তেমনি দেখেছি এমন বন্ধুদের যারা দুজনে স্রেফ একে অপরের হাত ধরে চলে এসেছে। তাদের মুখ বলছে, শরীরী ভাষা বলছে – আগে কখনো কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। তাই স্লোগানে গলা মেলাতে প্রথম প্রথম তারা রাঙা হয়ে উঠছিল, পরে লজ্জা ভেঙে গেল। মিছিল চিরকাল লজ্জা ভাঙে, ব্যক্তিকে সমষ্টির একজন হতে শেখায়। সমষ্টিতে মিশে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে ব্যক্তি। এ জিনিস যে মিছিলে ঘটে না, সে কি সত্যি মিছিল?

হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম – মানুষ কেন মিছিলে যায়? নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকার জন্যে? এই মিছিলে মানুষ কেন গিয়েছিল? এখন গোটা পশ্চিমবঙ্গে রোজ যে নানা সংগঠনের ডাকে মিছিল বেরোচ্ছে, মানুষ কেন যাচ্ছে সেসবে? ‘চরম অন্যায় দেখে আমি প্রতিবাদ করেছিলাম আমার মত করে’ – ভবিষ্যতের এই তৃপ্তিটুকুর জন্যে? হয়ত তাই। তাতেই বা দোষ কী? কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আজকের বহুনিন্দিত লাল পতাকার মিছিলে কেন এসেছেন এত মানুষ? কোনো পতাকাহীন মিছিলে গেলেও তো পাপস্খালনের অনুভূতি পাওয়া যায়। এ রহস্য উদ্ঘাটন আমার পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু জানি না, কোনো পতাকা বা কোনো দলের প্রতি টান না থাকলে অতি বৃদ্ধ বাবাকে ছোট্ট ছেলের মত হাত ধরে মিছিলে নিয়ে আসতে পারে কিনা তাঁর ছেলে। ছেলেটি আমারই বয়সী। বেশভূষা দেখে এবং মুখের ভাষায় মনে হল, দূর গ্রাম থেকে এসেছেন ওঁরা। দুজনেরই ঘাড়ে লাল পতাকা। হয়ত জোয়ান বয়সে বাবাই মিছিলে হাঁটা শিখিয়েছিলেন ওই ছেলেকে, আজ দ্বিতীয় শৈশবে পৌঁছে সেই ছেলে তাঁকে হাত ধরে নিয়ে এসেছে। এভাবেই তো মিছিল এগোয়। মিছিল, বিশেষত লাল পতাকার মিছিল, আসলে তো রিলে। অদলীয় মিছিলেও কি এমন হয়? জানি না।

***

সপ্তাহের গোড়ার দিকে এক কর্মব্যস্ত দিনে কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে ট্র্যাফিক স্তব্ধ করে দেওয়া কোনো মিছিল সম্পর্কে এত ভাল ভাল কথা লেখা প্রায় অসম্ভব ছিল আর জি করের ওই ডাক্তার মেয়েটির ধর্ষণ ও হত্যার আগে পর্যন্ত। যথাসময়ে নিজ নিজ কাজে যাওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু যে থাকতে পারে, তা টের পাওয়ার জন্যে আমাদের একটি সম্ভাবনাময় প্রাণ খোয়াতে হল। আজ যখন বিপুল জমায়েতের কারণে রাজাবাজার ট্রাম ডিপোয় পৌঁছবার আগেই বাস দাঁড়িয়ে পড়ল আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোডের উপর, তখন ভেবেছিলাম বাসযাত্রীরা কর্মনাশা মিছিলকে দু-চারটে গালমন্দ করবেন। অবাক কাণ্ড! তেমন কিছু হল না। বাস খালি করতে করতে তাঁরা বলাবলি করলেন ‘একটা দিন একটু হেঁটে চলে যাব।’ স্কুলফেরত একটি ছেলে ক্লান্তি প্রকাশ করে মাকে বলছিল ‘আমি কিন্তু আর হাঁটতে পারব না।’ মা বললেন ‘ঠিক পারবি।’ মিছিল শুরু হওয়ার পর থেকে কেবলই তাকাচ্ছিলাম বিডন স্ট্রিটের মত শহরের যেসব গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা এপিসি রোডে এসে মিশেছে, সেখানে আটকে থাকা বাসযাত্রী, বাইক আরোহী, চারচাকার আরোহীদের মুখের দিকে। যদি বিরক্তি থেকেও থাকে, কোনো মুখে তার বহিঃপ্রকাশ চোখে পড়ল না। এখনকার দস্তুর অনুযায়ী অনেকে বরং নিজের মোবাইলে ধরে রাখছিলেন মিছিলের ছবি। যা বিরক্তির কারণ তা কি কেউ সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করার জন্যে মোবাইলে ধরে রাখে? বোধহয় না।

পতাকাওলা, পতাকাহীন মিলিয়ে নয় নয় করে কম মিছিলে যাইনি গত ৩০-৩২ বছরে। কিন্তু মঙ্গলবারের মিছিল যত শ্যামবাজারের দিকে এগোল, তত যেসব দৃশ্য দেখলাম তা ইতিপূর্বে দেখিনি। রাস্তার ধারের বহুতলের বারান্দা জুড়ে সপরিবারে দাঁড়িয়ে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে চিৎকার করছেন মানুষ। বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলফেরত মায়েরা দাঁড়িয়ে পড়েছেন মিছিল দেখে আর মিছিল থেকে কেউ গিয়ে একখানা লাল পতাকা ধরিয়ে দিয়েছে এক পড়ুয়ার হাতে। সে একখানা উঁচু জায়গায় উঠে সজোরে নাড়ছে সেই পতাকা, স্লোগান দেওয়া হচ্ছে সবাই মিলে।

আরও পড়ুন সিপিএম পথে ফিরেছে, কিন্তু ব্যালটে ফিরবে কি?

রাস্তার ধারের দোকানের নীল কলারের কর্মচারীরা ফুটপাথ থেকে পথে নেমে এসে স্লোগান দিচ্ছেন। সবচেয়ে অবাক করলেন মহিলারা – নিম্ন মধ্যবিত্ত, গরিব পরিবারের মহিলারা। যে যেভাবে পেরেছেন বেরিয়ে এসেছেন পথে। মলিন নাইটির উপর গামছা জড়িয়ে, বাচ্চা কোলে নিয়েও। এপিসি রোডের অন্য পারে দাঁড়িয়ে তাঁরা স্লোগান দিচ্ছিলেন মিছিলের লোকেদের চেয়েও বেশি উৎসাহে। রাস্তার দুপাশে এত মানুষ এত প্রাণ যোগ করলেন মিছিলে, মনে হচ্ছিল যাঁরা হাঁটছেন তাঁদের গার্ড অফ অনার দিচ্ছেন ওঁরা। সবচেয়ে আশ্চর্য, অনেক জায়গায় মহিলারা লাল পতাকার এই মিছিলকে এমন অকুণ্ঠ সমর্থন জানাচ্ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকায় সজ্জিত এলাকায় দাঁড়িয়ে। খান্না মোড়ের সামান্য আগে একটি জরাজীর্ণ বাড়ি। তার দোতলার বারান্দায় ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়েছিলেন জনা দশেক মহিলা। এত তাঁদের গলার জোর এবং ঘুণধরা কাঠের রেলিংয়ের উপর ঝুঁকে পড়ে স্লোগান দেওয়ার উৎসাহ, যে ভয় হচ্ছিল, বাড়িটি তখনই ভেঙে পড়বে। আশ্চর্যের কথা, ওই বারান্দা থেকে কিন্তু ঝুলছিল একটি তিনকোণা ক্রুদ্ধ হনুমানের পতাকা।

স্পষ্টত, এ রাজ্যের গরিব মানুষও ক্রুদ্ধ। মহিলারা ক্রুদ্ধ। হতে পারে, এখন তাঁরা কার হাতে কোন পতাকা আছে তা দেখছেন না। তাঁরা কেবল জানেন, কোন পতাকা তাঁদের অপছন্দ। লক্ষণীয় বিষয় হল, এই শ্রেণির মানুষ বামেদের থেকে ক্রমশ দূরে গেছেন বলেই ২০১১ সাল থেকে কমতে কমতে রাজ্যের ও দেশের আইনসভায় এ রাজ্যের বামেরা আজ শূন্য। অন্যদিকে এই শ্রেণির মানুষের, বিশেষত মহিলাদের, আশীর্বাদই মমতা ব্যানার্জির সরকারের পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি সত্ত্বেও একের পর এক বিরাট নির্বাচনী জয়ের বড় কারণ। আর তা থেকেই সীমাহীন ঔদ্ধত্যের জন্ম, যে ঔদ্ধত্য গোটা রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিকে সন্দীপ ঘোষদের রাজত্ব করে রেখেছে। নইলে আজ হবু ডাক্তার মেয়েটিকে মরতে হত না।

লালবাজারে ডাক্তারদের অবরোধের কাছে শেষমেশ কলকাতার নগরপাল বিনীত গোয়েলের মাথা নোয়ানো আর ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস বরাবর অরাজনৈতিক মানববন্ধনে হয়ত চাপা পড়ে যাবে বামফ্রন্টের আপাদমস্তক রাজনৈতিক মিছিলের খবর। কিন্তু মিছিলের বাইরের মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হল না, তাঁদের রাজনীতি সম্পর্কে বা লাল পতাকা সম্পর্কে অন্তত এই মুহূর্তে কোনো ছুঁতমার্গ আছে। কে এই আন্দোলন থেকে ফায়দা তুলবে না তুলবে তা নিয়ে ওঁরা ভাবিত নন তথাকথিত নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দের মত। অবশ্য নাগরিক সমাজের কর্ণধাররা এঁদের নিজের সমাজের মানুষ বলে ধরেন বলে মনে হয় না। লাল পতাকাধারীরা এঁদের হাতে পতাকা ছেড়ে দিতে পারেন কিনা, এঁদের মিছিলে টেনে আনতে পারেন কিনা – তার উপর নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ। সে ভবিষ্যৎ কিন্তু রাজ্যের রাজধানীতে একদিনের মিছিল দিয়ে গড়া যাবে না।

মিছিলে
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪: খান্না মোড়

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

প্রশান্ত বুদবুদ ফেটে যাওয়ায় প্রশ্ন: গণতন্ত্র চালাচ্ছে মার্কেট রিসার্চ?

রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন দলের কর্মীদের লড়তে হচ্ছে মার্কেট রিসার্চ কোম্পানির সঙ্গে? গরিব মানুষের গণতন্ত্র ভারতের জন্য এটা কি ভালো লক্ষণ?

অতি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রশান্ত কিশোর বলেছেন, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস এমন কিছু উন্নতি করেনি। কারণ দেশের ২০% মানুষ সংখ্যালঘু – ১৮% মুসলমান আর অন্যান্য সংখ্যালঘু আরও ২%। তারা কংগ্রেসের ‘ফ্রি ভোটব্যাংক’, আর কংগ্রেস পেয়েছে ২৩ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ সংখ্যালঘু বাদে মাত্র ৩% ভোটারের ভোট আদায় করতে পেরেছে রাহুল গান্ধির দল। এই তত্ত্বের আগাগোড়া সবটাই ভুল তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। যেহেতু তথ্যগুলোই ভুল, সেহেতু তত্ত্বটির একমাত্র ঠিকানা বাজে কাগজের ঝুড়ি।

প্রথমত, কংগ্রেস পেয়েছে ২১.১৯% ভোট (২০১৯ সালে পেয়েছিল ১৯.৪৬%)। দ্বিতীয়ত, সর্বশেষ আদমশুমারি অনুসারে মুসলমানরা এদেশের জনসংখ্যার ১৪.২%। তার সঙ্গে খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, আরও ছোট ছোট ধর্মের মানুষ এবং যাঁরা নিজেদের কোনও ধর্মের সঙ্গে যুক্ত বলেননি তাঁদের যোগ করলে তবে হয় ২০.২%। কিন্তু সংখ্যালঘুরা গোটা দেশে কংগ্রেস ছাড়া কাউকে ভোট দেন না – একথা একেবারে ভুল। পশ্চিমবঙ্গেই যেমন সেই ২০১১ সাল থেকে বেশিরভাগ সংখ্যালঘু মানুষ ভোট দিয়ে আসছেন তৃণমূল কংগ্রেসকে, তার আগে দিতেন বামফ্রন্টকে। তামিলনাডু সহ অনেক রাজ্যেই আঞ্চলিক দলগুলো বেশিরভাগ সংখ্যালঘুর ভোট পেয়ে থাকে। এবারেও পেয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, জনসংখ্যার সকলেই ভোটার নাকি? শিশুরাও ভোট দেয়? তার উপর কংগ্রেস এবার লড়েছে ৩২৮ আসনে, কিন্তু ২০১৯ সালে লড়েছিল ৪২৩ আসনে। প্রায় একশো কম আসনে লড়ে কংগ্রেস ভোট বাড়িয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। আসন যে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। অতএব এটা ফেলে দেওয়ার মতো সাফল্য নয়।

এখন কথা হল, প্রশান্তের তত্ত্বটি যখন নেহাত আবর্জনা, তখন লেখার শুরুতেই এতগুলো শব্দ তা নিয়ে খরচ করলাম কেন? কারণ প্রশান্তকে যে ভারতীয় রাজনীতির একজন বিশেষজ্ঞ বলে মনে করা হয়, করণ থাপারের হাতে ল্যাজেগোবরে হওয়ার পরেও যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে এখনও উদ্গ্রীব, তার কারণ ভোট কুশলী হিসাবে তাঁর কীর্তি। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে প্রশান্ত বিখ্যাত হয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, ওই জয়ের কারিগর তিনিই। প্রশান্তের খ্যাতির সূত্রে ভারতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল এক নতুন পেশা, যার নাম ইংরেজিতে ‘ইলেকশন স্ট্র্যাটেজিস্ট’। বাংলায় ভোট কুশলী বলতে পারি।

ভোট কুশলী ব্যাপারটা দেখতে শুনতে এত ভালো যে বঙ্গে দিশেহারা বামপন্থীদের মধ্যেও কথাবার্তা শুরু হয়েছে – একজন প্রশান্ত বা সুনীল কানুগোলু (কংগ্রেসের ভোট কুশলী সংস্থা মাইন্ডশেয়ার অ্যানালিটিক্সের কর্ণধার) দরকার। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, তামিলনাডু, উত্তরপ্রদেশের মতো যথেষ্ট সংখ্যালঘু থাকা রাজ্যে কাজ করা সংস্থার একদা কর্ণধার প্রশান্তের মূর্খামি দেখে সেই বামপন্থীরা কী বুঝবেন জানি না, আমি যা বুঝলাম বলি।

হয় প্রশান্ত এতটাই কংগ্রেসবিদ্বেষী ও মুসলমানবিদ্বেষী যে বিদ্বেষে তাঁর বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়েছে। নয় তাঁর সাফল্যের পিছনে ১০০% কৃতিত্ব আইপ্যাকের সেইসব কর্মীদের, যাঁদের নাম কেউ জানে না। তিনি শুধু মাইনে করা কর্মীদের পরিশ্রম আত্মসাৎ করে নাম কিনেছেন। কিন্তু কর্পোরেট দুনিয়ায় এ তো প্রায় নিয়ম। ফলে তেমন হয়ে থাকলে রাজনীতির দিক থেকে ভাবনার কিছু নেই। তৃতীয় একটা সম্ভাবনা আছে, যা বেশি চিন্তার।

ব্যাপারটা কি আসলে এরকম, যে এই সংস্থাগুলো যা করে তা আসলে বিজ্ঞাপন জগতে যাকে ‘মার্কেট রিসার্চ’ বলে তার বেশি কিছুই নয়? লক্ষণীয়, আইপ্যাক বা মাইন্ডশেয়ার সেইসব মক্কেলকেই জেতাতে পেরেছে যারা জেতার অবস্থায় ছিল। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচন বিজেপি জিততই, কারণ ইউপিএ সরকারের প্রতি বিপুল অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। ২০২১ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন বিজেপি জিতে যাবে বলে যতই হাওয়া তৈরি হয়ে থাক, বিজেপির না ছিল সংগঠন, না ছিল মমতার সমতুল্য কোনও মুখ।

২০০৫ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে নীতীশ কুমারের সরকার যে অনেক কাজ করেছিল তা তাঁর অতি বড় শত্রুও অস্বীকার করে না। ফলে ২০১৫ সালে জেডিইউ-আরজেডি জোটের জয়ও এমন কিছু অত্যাশ্চর্য ব্যাপার ছিল না, খিঁচ ছিল নীতীশ মহাগঠবন্ধনে যোগ দেওয়ায়। তামিলনাডুর মানুষ পরপর দু’বার একই দলকে জেতান না। ১৯৮৪ সাল থেকে চলে আসা সেই ধারা ভেঙে এমনিতেই ২০১৬ সালে এআইএডিএমকে পরপর দু’বার জিতে গিয়েছিল। সুতরাং ২০২১ সালে ডিএমকের জয় প্রায় অনিবার্য ছিল। ২০১৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে কিন্তু সংগঠনহীন, কর্মসূচিহীন কংগ্রেস আইপ্যাকের সাহায্য নিয়েও সাতটার বেশি আসন জেতেনি। সুনীলও কি কংগ্রেসকে তেলেঙ্গানা জেতাতে পারতেন সংগঠন এবং রেবন্ত রেড্ডির মতো আক্রমণাত্মক নেতা না থাকলে? কর্ণাটক জেতা হত সিদ্দারামাইয়া আর ডিকে শিবকুমার ছাড়া?

আরও পড়ুন কানহাইয়ার কেরিয়ার আর কমিউনিস্ট আদর্শবাদ: তার ছিঁড়ে গেছে কবে

অনেকে অবশ্য স্বীকার করেন যে এই সংস্থাগুলো বা তাদের কর্ণধাররা জাদুকর নন। কিন্তু তাঁদের মতে, এরা ‘ভ্যালু অ্যাড করে’। সে ভ্যালু কি পরিমাপযোগ্য? হলে প্রশান্তের মতো মহাপণ্ডিত কি ভ্যালু অ্যাড করেন? যদি পরিমাপযোগ্য না হয়, তাহলে কীসের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করছে এদের পিছনে? দলগুলোর টাকা মানে তো আসলে নাগরিকদেরই টাকা। কর্পোরেটগুলো পিছন দরজা দিয়ে যে চাঁদা দলগুলোকে দেয় (নির্বাচনি বন্ডেই হোক আর নগদেই হোক) সে টাকাও তো তারা উশুল করে নেয় নাগরিকদের পকেট থেকেই। শুধু তাই নয়, এই সংস্থাগুলোর পরামর্শেই তো আজকাল ক্ষমতাসীন দলগুলোর, অর্থাৎ রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ হচ্ছে। তাহলে কি কতকগুলো মার্কেট রিসার্চ কোম্পানি নির্ধারণ করছে আমাদের গণতন্ত্রের অভিমুখ?

এদের কাজের সীমা কতটুকু? কেউ বলেন, এরাই নাকি দলের প্রার্থীতালিকা থেকে নির্বাচনি প্রচার – সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আবার কিছুদিন আগে মমতা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আইপ্যাকের ভূমিকা নেহাতই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালানো। এসব গোপনীয় ব্যাপার, ফলে সম্যক জানা অসম্ভব। কিন্তু একটা ব্যাপারে সকলেই একমত। ভোট কুশলী সংস্থার আবশ্যিক কাজ হল মক্কেল পার্টির জন্য ভোটারদের সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ। তথ্য কাটাছেঁড়া করেই তারা দলগুলোকে পরামর্শ দেয় – এটা বলুন, ওটা বলবেন না। অমুক প্রকল্প চালু করুন, তমুক কাজে পার্টির ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।

সন্দেহ নেই, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে রাজনীতিতে সাফল্য পেতে গেলে তথ্য আর প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। সে কারণেই তো আইপ্যাকের প্রস্থানের পর ডিএমকে ভোট কুশলী হিসাবে নিযুক্ত করেছে পপুলাস এমপাওয়ারমেন্ট নেটওয়ার্ক (পেন)-কে। তবে আইপ্যাক বা মাইন্ডশেয়ারের সঙ্গে পেনের তফাত আছে। পেনের কর্ণধার এমকে স্ট্যালিনের জামাই ভি সবরীসন। এখনও পর্যন্ত পেন অন্য কোনও দলের হয়ে কাজ করেনি। তারা মূলত পার্টি এবং ডিএমকে সরকারের বার্তা ডিজিটাল উপায়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে। সেই লক্ষ্যে স্ট্যালিনের মোবাইল অ্যাপ বানিয়েছে তারা এবং মুখ্যমন্ত্রীর নিয়মিত পডকাস্ট চালু করেছে। কীভাবে মানুষের কাছ থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করে রাজনৈতিক কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে প্রশিক্ষণও দেয় ডিএমকে কর্মীদের। কিন্তু ডিএমকের রাজনীতি তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে, এমন অভিযোগ বা প্রশংসা এখনও অবধি শোনা যায়নি। অথচ তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আইপ্যাক নিচ্ছে – এমন অভিযোগ উঠেছে প্রশান্ত ছেড়ে যাওয়ার আগে ও পরে।

আবার মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থানের নির্বাচনে সুনীল কাজ করুন – এমনটা নাকি সেখানকার কংগ্রেস নেতারা চাননি। তাহলে রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন দলের কর্মীদের লড়তে হচ্ছে মার্কেট রিসার্চ কোম্পানির সঙ্গে? গরিব মানুষের গণতন্ত্র ভারতের জন্য এটা কি ভালো লক্ষণ?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

এই নির্বাচনে দেশ পশ্চাদপসরণ আটকাতে লড়ছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ?

মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধি, নির্বাচনী বন্ডের মত ইস্যু নিয়ে কথা বললে নিজেরই ফাঁপরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা – একথা বুঝেই কি মমতা শেষ দু-তিন দফার নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তুললেন ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে?

গোপালকৃষ্ণ গোখেলের একটা বাক্যকে সম্বল করে আমরা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা প্রায় একশো বছর ধরে রেলা নিয়েই চলেছি – ‘হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো’ (বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত কাল তা ভাবে)। অথচ কথাটা বহুদিন হল অর্থহীন হয়ে গেছে। একে তো গোখেল যে বাংলার কথা বলেছিলেন, সে বাংলার অর্ধেকটা এখন আলাদা দেশ। তার উপর বাংলার রাজনীতির সর্বভারতীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও দীর্ঘকাল হল অন্তর্হিত। বাংলার সাংসদদের সমর্থন ছাড়া সরকার পড়ে যাবে – এমন সরকার দিল্লিতে শেষবার হয়েছিল ২০০৪ সালে। বাংলার রাজনীতিতে যোগ্য রাজনীতিবিদের এখন এতই আকাল, যে প্রধান বিরোধী দল তো বটেই, পরপর তিনবার বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা শাসক দলকেও নির্বাচনে প্রার্থী বেছে নিতে বারবার বাংলা সিনেমা বা বাংলার ক্রিকেট, ফুটবলের দ্বারস্থ হতে হয়। সব কুড়িয়ে কাচিয়েও ৪২ খানা আসনে বাংলা থেকে প্রার্থী দিয়ে উঠতে পারেনি বাঙালির শাসক দল, কিছু শূন্যস্থান রয়েই গিয়েছিল। সেগুলো পূরণ করতে বিহার থেকে প্রাক্তন বলিউড অভিনেতা, গুজরাট থেকে প্রাক্তন ক্রিকেটার ডেকে আনতে হয়েছে। অথচ ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে এই দলেরই প্রচারের অন্যতম অভিমুখ ছিল – তৃণমূল কংগ্রেসই বাঙালির দল। দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয়েছিল স্লোগান – ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’। এখন দেখা যাচ্ছে, কয়েকজন ‘পরের ছেলে’-কে পাশে দাঁড় না করালে নিজের মেয়ের কাজ চলে না।

এ অবস্থাতেও গত এক দশকে বাঙালি বামপন্থী ও উদারপন্থীদের গর্বের শেষ ছিল না কিছু ব্যাপার নিয়ে – এ রাজ্যের রাজনীতি গোবলয়ের মত নয়। এখানে নাকি জাতপাতের রাজনীতি চলে না, হিন্দুত্ব চলে না, ধর্ম নির্বাচনে কোনো ইস্যু হয় না, আরও নানা ভাল ভাল ব্যাপার।

কিন্তু সেই ২০১১ সাল থেকেই দেখা গেছে যে মতুয়ারা বাংলার ভোটে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখা যাচ্ছে কুড়মিরাও আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ।

হিন্দুত্বও দিব্যি চলে। নইলে রামনবমী এলেই দাঙ্গা, বকরি ঈদ এসে পড়লেই সোশাল মিডিয়ায় হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষদের নিরীহ গবাদি পশুদের জন্যে প্রাণ কেঁদে ওঠা, সর্বোপরি বিধানসভায় ৭৭ খানা আসন পেয়ে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির প্রধান বিরোধী দল হয়ে বসা সম্ভব হত না। ২০২১ সালের ফলাফল দেখে যে সরলমতি ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিরা হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে আটকে দিলেন ভেবে প্রবল আত্মপ্রসাদ অনুভব করেছেন, তাঁরা আসলে কল্পনার জগতে বাস করেন। নইলে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখে নিতে পারতেন – কতগুলো আসনে কয়েকশো, হাজার দুয়েক, হাজার তিনেক – এরকম ব্যবধানে ফয়সালা হয়েছিল। একটা আসনে তো সাত ভোটের ব্যবধানেও ফয়সালা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে তৃণমূল কংগ্রেসকে জিতিয়েছিল জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি আর আতঙ্কিত সংখ্যালঘু মানুষের ভোট। সংখ্যাগুরু বাঙালির দুর্গাপুজোর সময়ে চাগাড় দিয়ে ওঠা ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ মার্কা বাছাই করা ধর্মনিরপেক্ষতা নয়।

ধর্মকে যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ইস্যু করে তোলা যায় তা গত দেড় দশকে নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হয়েছে। গত বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে শুভেন্দু অধিকারীর বিষাক্ত প্রচার জয়যুক্ত হওয়ার পর আর বাঙালিদের বড় বড় কথা না বলাই ভাল। বিজেপি আইটি সেলের তৈরি মমতাকে ‘মমতাজ’ নাম দিয়ে নানারকম রসিকতা যেভাবে কট্টর সিপিএম সমর্থকরাও হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকে শেয়ার করেন তাতে ধর্মের মদ এক চুমুকও খায় না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া যে দুষ্কর হয়ে উঠেছে তা অস্বীকার করা মানে নিজেকে ঠকানো।

সুতরাং গুজরাট-রাজস্থান-উত্তরপ্রদেশ-মধ্যপ্রদেশ-বিহার-ঝাড়খণ্ডের নাগরিকদের যে জাতপাত নির্ভরতা, যে রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব, যে ধর্মসর্বস্বতায় অভিযুক্ত করে এসেছে সুমিত, প্রমিত বাঙালি; এবারের নির্বাচনে গোটা দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেই সেই দোষগুলো সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। বাকি দেশের সঙ্গে ব্যবধান চোখে পড়ার মত বেশি। কী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারে, কী মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর অবস্থানে, গোটা দেশের প্রবণতার বিপরীতে চলছে বাংলার ভোট।

বাকি দেশের নির্বাচনী প্রচারের দিকে তাকালে সাদা চোখেই দেখা যাচ্ছে, নরেন্দ্র মোদী ২০১৪ আর ২০১৯ সালের মত আলেখ্য নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ করার খেলায় হেরে গেছেন। মোদী কি গ্যারান্টি নামের ইশতেহার প্রকাশ করে বিকশিত ভারতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরুটা ভালই করেছিলেন। কিন্তু অনতিবিলম্বেই – কংগ্রেসের ইশতেহারে সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার কথা আছে, ওটা মুসলিম লিগ মার্কা ইশতেহার, ওরা হিন্দুদের সম্পত্তি শুধু নয় মহিলাদের মঙ্গলসূত্র পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়ে মুসলমানদের দিয়ে দেবে – এইসব আষাঢ়ে গল্প বলতে শুরু করেন। শেষপর্যন্ত নির্বাচনে ফলাফল যা-ই হোক,

এইসব ভুয়ো তথ্য ছড়িয়েও যে মোদী প্রত্যাশিত মাত্রায় ভোট আদায় করতে পারছেন না, তার প্রমাণ হল তিনি আবার মাঝে এক সাক্ষাৎকারে বলে বসেছেন, যে তিনি কখনো সাম্প্রদায়িক প্রচার করেন না। যেদিন করবেন সেদিন জনজীবনে থাকার অধিকার হারাবেন। পরদিন আবার জনসভায় ঘৃণা ছড়ানোর কাজে ফিরে গেছেন। ফলে রাহুল গান্ধী বলতে বাধ্য হয়েছেন, মোদীজি কি গজনী হয়ে গেছেন? কিছুই মনে থাকে না!

কিন্তু এত আক্রমণ সত্ত্বেও কংগ্রেস বা তার জোটসঙ্গী রাষ্ট্রীয় জনতা দল, সমাজবাদী পার্টি, ডিএমকে, জেএমএম, সিপিআই, সিপিএম, লিবারেশন এই সাম্প্রদায়িক কাদা ছোড়াছুড়িতে প্রশ্রয় দেয়নি। তারা কেবলই সংবিধান বাঁচানোর কথা, জাতভিত্তিক আদমশুমারির প্রতিশ্রুতির কথা, বিপুল বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষকদের দুর্দশার কথা বলে যাচ্ছে। নিজেরা ক্ষমতায় এলে এসবের কী সমাধান করবে তার উত্তরও বেশ বিস্তারিতভাবেই কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলো দিয়ে চলেছে। উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের রাজত্বে চাকরির পরীক্ষা হলেই প্রশ্ন ফাঁস হয় যায় বলে অভিযোগ, কিন্তু আদিত্যনাথ প্রিয় মোদীজির জন্যে যে বিরোধীদের এই প্রশ্নপত্র আসতে চলেছে তা আগে থেকে জেনে উঠতে পারেননি বোধহয়। ফলে তথাকথিত দারুণ বক্তা মোদীকে এবার নির্বাচনে আক্ষরিক অর্থেই কান্নাকাটি করতে হচ্ছে। মাতৃগর্ভে জন্মাননি, পরমাত্মা থেকে সরাসরি জন্ম হয়েছে – এসব রূপকথার গল্পই তাঁর নির্বাচনী প্রচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ডিসেম্বর মাসে বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরোবার পর যেসব নির্বাচন-জ্যোতিষী এবং সাংবাদিক ঘোষণা করে দিয়েছিলেন বিজেপি ২০২৪ জিতেই গেছে, তাঁরা এখন সাবধানী সুরে কথা বলছেন।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারের দিকে তাকিয়ে দেখুন। নীতীশ কুমার কেটে পড়ার পরে ইন্ডিয়া ব্লককে তাসের ঘরের মত মনে হচ্ছিল। কিন্তু অতি গুরুত্বপূর্ণ তিনটে রাজ্যেই শেষপর্যন্ত জমাট জোট হয়েছে – উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র। বিশ্লেষকরা প্রায় সকলেই একমত যে এবারের ভোটের ফল নির্ধারিত হবে পাঁচটা রাজ্যের ফল দিয়ে। উপরিলিখিত তিনটে, কর্ণাটক আর পশ্চিমবঙ্গ। কর্ণাটকে কংগ্রেস সদ্য বিপুল ভোটে বিধানসভা নির্বাচনে জিতে সরকারে এসেছে, তার উপর বিজেপির জোটসঙ্গী জেডিএসের হাসান কেন্দ্রের সাংসদ প্রোজ্জ্বল রেবন্নর পর্যায়ক্রমিক ধর্ষণের কাণ্ড প্রকাশ্যে এসে যাওয়ায় বিজেপি বিপাকে। উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব আর রাহুল যেভাবে একসঙ্গে একের পর এক জনসভা করছেন তাতে বিজেপির বিরুদ্ধে যে আন্তরিক লড়াই করছে ইন্ডিয়া ব্লক, তাতে সন্দেহ থাকে না। একই দৃশ্য বিহারেও। সেখানে আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব আর রাহুলের রসায়ন যে দারুণ জমেছে তা বিরাট বিরাট জনসভায় দেখা গেছে। মহারাষ্ট্রেও শেষপর্যন্ত উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা আর শরদ পাওয়ারের এনসিপির সঙ্গে কংগ্রেসের জোট জমাট বেঁধেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মমতা বলে দিয়েছিলেন ‘এখানে তৃণমূলই ইন্ডিয়া’।

তেরো বছর ক্ষমতায় থাকা মমতা মনেই করেননি তাঁর বিরুদ্ধে রাজ্যের মানুষের কোনো অংশের কোনো অসন্তোষ থাকতে পারে। টানা এতদিন ক্ষমতায় থাকলে যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার মনোভাব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক তাও তিনি বিশ্বাস করেননি। তাই যখন জোটের কথাবার্তা চলছিল তখনো তিনি এবং তাঁর দলের মুখপাত্ররা কংগ্রেস বিজেপিকে হারাতে কত অযোগ্য, রাহুল কতবার সর্বভারতীয় নেতা হয়ে ওঠার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন – এইসব বলে নিজেদের ওজনের ভারে কংগ্রেসকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বিজেপিশাসিত মণিপুর আর আসাম বাদ দিলে এই রাজ্যের সরকারই রাহুলের ন্যায় যাত্রার সময়ে সবচেয়ে বেশি অসুবিধা সৃষ্টি করেছিল। অমুক জায়গায় রাত্রিবাস করা যাবে না, তমুক জায়গা দিয়ে যাওয়া যাবে না – এসব নানাবিধ বায়নাক্কা ছিল প্রশাসনের। এমনকি ন্যায় যাত্রার পালের হাওয়া কেড়ে নিতে ঠিক ন্যায় যাত্রার এলাকাতেই পদযাত্রা করেছিলেন মমতা স্বয়ং। শেষমেশ একতরফা ৪২ আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করে দেওয়া হয় ব্রিগেডের জনগর্জন সভা থেকে। তখনো মমতা রীতিমত খড়্গহস্ত ছিলেন কংগ্রেস বা ইন্ডিয়া ব্লকের প্রতি। যুক্তি ছিল, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস আর সিপিএম তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপির সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করে। তাই তাদের সঙ্গে জোট করা যায় না। উপরন্তু তৃণমূল একাই বিজেপিকে হারিয়ে দিতে পারে, বিধানসভায় হারিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এতৎসত্ত্বেও মমতা সম্পর্কে কড়া মন্তব্য করেননি। মমতাকে যা আক্রমণ করার তা করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতারা, বিশেষত সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী। মমতা সেটাকেই বিজেপির সহায়তা করা বলে গণ্য করেছেন।

এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। এত প্রবীণ এবং পোড়খাওয়া একজন জননেত্রী যদি মনে করেন তিনি একাই একশো, তাতে আপত্তির কিছু নেই। মুশকিল হল প্রচার শুরু হতেই বাকি ভারতে যে কৌশলে বিজেপিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে বিরোধীরা, মমতা তার উল্টো পথে হেঁটেছেন। ফলে রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কের মান ক্রমশ নিম্নগামী হয়েছে। বাকি ভারতের চেয়েও নিম্নগামী।

বিজেপির কৌশলে অবশ্য কিছুমাত্র বদল হয়নি। তাদের ১৮ জন সাংসদ বলার মত কোনো কাজ করেননি, প্রচারে কী আর বলবেন? বিজেপির সেই ২০১৯ সাল থেকে একটাই কাজ – তৃণমূলকে হিন্দুবিরোধী দল হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাওয়া। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এ কাজে এবার তারা ব্যবহার করল সন্দেশখালির ঘটনাবলীকে। মূল অভিযুক্ত যেহেতু শাহজাহান, তাই তাদের কাজটা সহজ হয়ে গিয়েছিল। প্রচার পর্বের প্রথম দিকটা তৃণমূলকে কেবলই আত্মপক্ষ সমর্থন করে যেতে হয়েছে। বিজেপি কর্মী গঙ্গাধর কয়ালের ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর তৃণমূল আক্রমণে যাওয়ার সুযোগ পায়। কে সত্যি বলছে কে মিথ্যে বলছে তা আমরা জানি না। কিন্তু কোনো পক্ষ অবলম্বন না করেও নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বিজেপি ফাঁপরে পড়েছে ওই ভিডিও নিয়ে। বিশেষত যখন মহিলারা একের পরে এক মামলা প্রত্যাহার করতে শুরু করলেন, ভিডিও ক্যামেরার সামনে বললেন তাঁদের ভুল বুঝিয়ে সাদা কাগজে সই করিয়ে পুলিসে অভিযোগ করানো হয়েছিল। বসিরহাট কেন্দ্রের প্রার্থী রেখা পাত্র স্বয়ং বলে বসলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে ধর্ষিতা বলে যে মেয়েদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদের তিনি চেনেন না। শুভেন্দু অধিকারী, যিনি এই চক্রান্তের মাথা বলে তৃণমূল অভিযোগ করেছে, তিনিও কোনো সদুত্তর দিয়ে উঠতে পারেননি। না পারার আক্রোশে সাংবাদিকদের খিস্তি দিতে পেরেছিলেন কেবল।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বামাল সমেত যদি বিজেপির চক্রান্তকারীরা ধরা পড়েই থাকে, তাহলে তারা গ্রেফতার হল না কেন? গঙ্গাধরবাবু মন মজায়ে লুকালেন কোথায়? পুলিস তাঁকে এই জঘন্য চক্রান্তের জন্য গ্রেফতার করেছে বলে তো আমাদের জানা নেই। আমরা সংবাদমাধ্যম থেকে জেনেছিলাম তিনি নাকি পুলিসের কাছে কাদের বিরুদ্ধে কীসব অভিযোগ জানিয়েছিলেন তাঁকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে। সেই অভিযোগেরই বা কী হল? কদিন সন্দেশখালি নিয়ে প্রচণ্ড হইচই হওয়ার পরে, দুই প্রধান প্রতিপক্ষের সমস্ত নির্বাচনী সভায় সন্দেশখালি নিয়ে বাদানুবাদ হওয়ার পরে দুপক্ষই কি ঠিক করল সন্দেশখালিতে সন্দেশ নাই? কজন মহিলার অভিযোগ সত্যি, কজনের অভিযোগ মিথ্যা, আদৌ কোনোটা সত্যি কিনা – তা তো আমাদের জানা হল না। লাভের লাভ যা হল, তা হচ্ছে রাজ্য সরকারের কাজের খতিয়ান বিজেপি চাইল না, কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ বা অকাজ নিয়েও তৃণমূলের প্রচারে কথাবার্তা কমে গেল। নির্বাচনী বন্ড নিয়ে কটা সভায় কথা বলেছেন মমতা বা অভিষেক? কর্মসংস্থানের অভাব নিয়েই বা কবার আক্রমণ করেছেন মোদীকে? মোদী, শাহরাই বা পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে এসে গোদাভাবে তৃণমূলকে চোর বলা ছাড়া কী সমালোচনা করেছেন? নির্দিষ্ট করে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়েই বা কতটা কথা বলেছেন? মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তো কোনো পক্ষই পারতপক্ষে কথা বলছে না। সেসব আলোচনা কেবল শোনা যাচ্ছে বাম, কংগ্রেস জোটের প্রার্থীদের মিটিং মিছিলে।

সাংসদের সংখ্যার বিচারে রাজ্যের দুই বৃহত্তম শক্তি কী নিয়ে তর্ক চালাচ্ছে? প্রথমে চলল সন্দেশখালিতে ধর্ষণ হয়েছে নাকি হয়নি। তারপর চলল রাজ্যপালের রিপুকর্ম নিয়ে বাদানুবাদ। সে বাদানুবাদও কোনো গুরুত্বপূর্ণ অভিমুখ নিল না। মুখ্যমন্ত্রী একবার রাজ্যপালের পদত্যাগের দাবি তুললেন, প্রধানমন্ত্রী মুখই খুললেন না, রাজ্যপাল অভিযোগকারিণী মহিলার সম্মান এবং প্রাইভেসির অধিকারের তোয়াক্কা না করে সাংবাদিকদের রাজভবনে ডেকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখিয়ে দিলেন। সংবাদমাধ্যমগুলো রাজ্য পুলিসের ‘সূত্র’ উদ্ধৃত করে জানাল, পুলিসের কাছে নাকি বিস্ফোরক তথ্য আছে। এবিপি আনন্দের মত সদ্য গোদি মিডিয়া হয়ে ওঠা টিভি চ্যানেলের বিশেষজ্ঞ ও সঞ্চালকরা আবার, কোন জাদুতে কে জানে, নিঃসন্দেহে বলে গেলেন সবটাই রাজ্যপালের বিরুদ্ধে তৃণমূলের চক্রান্ত। এমতাবস্থায় শ্লীলতাহানিতে অভিযুক্ত রাজ্যপালকে সরে দাঁড়াতে বলার সভ্যতা যে বিজেপির নেই, তা জানতে কারোর বাকি নেই। আর সেই নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সময় ও সদিচ্ছা যে ভোটের মরশুমে তৃণমূলের নেই তাও পরিষ্কার হয়ে গেল।

তাহলে? সন্দেশখালি বা রাজ্যপাল – কোনোটাই নির্বাচনের ইস্যু নয়, তাই তো? কিন্তু দিব্যি ভোটারদের ওই আলোচনাতেই ব্যস্ত রাখা গেল। অতঃপর মুখ্যমন্ত্রী চালু করলেন সেই খেলা, যা মোদীর ভীষণ পছন্দের। মমতা মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের সন্ন্যাসী কার্তিক মহারাজের নাম করে বললেন, ওঁকে সাধু বলেই মনে করেন না। কারণ ওঁর কাছে খবর আছে, ওই সন্ন্যাসী ভোটে তৃণমূলের এজেন্ট বসতে দেন না। মানে পুরোদস্তুর রাজনীতি করেন। একইসঙ্গে ইস্কন আর রামকৃষ্ণ মিশনও নিজেদের ভক্তদের বিজেপিকে ভোট দিতে বলছে বলে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করে বসলেন।

হিন্দুপ্রধান ভারতে ইসলামিক ধর্মীয় সংগঠন মানেই সন্ত্রাসবাদীদের আখড়া – এই ধারণা সমস্ত রাষ্ট্রীয় শক্তি, সিনেমা আর সংবাদমাধ্যম মিলে বহু যুগ ধরে জনমানসে গেঁথে দিয়েছে। কিন্তু হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনগুলো যে ধোয়া তুলসীপাতা নয়, সেকথা চট করে কেউ বলে না। গেরুয়া সন্ত্রাস নিয়ে এস এম মুশরিফের বইগুলোর কথা এখনো বিশেষ আলোচিত না হলেও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস যে বহুকাল ধরে তলে তলে এদেশের অনেককিছুতে ছড়ি ঘুরিয়েছে তা এখন অনেকের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। এই মুহূর্তে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বহু কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, উপরাষ্ট্রপতি, বিজেপিশাসিত সমস্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আরএসএসের শিক্ষায় শিক্ষিত। উপরন্তু কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি চিত্তরঞ্জন দাশ অবসর নেওয়ার সময়ে বিদায়ী ভাষণে খোশমেজাজে জানিয়েছেন, তিনি বরাবর আরএসএসের সঙ্গে ছিলেন। আরেক বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় তো আজ অবসর নিয়ে কাল বিজেপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে গেছেন। তাঁর মুখের ভাষা এমন, যে ঠুঁটো জগন্নাথ নির্বাচন কমিশনও চক্ষুলজ্জার খাতিরে মমতার বিরুদ্ধে অশালীন মন্তব্যের কারণে অভিজিৎকে ২৪ ঘন্টা প্রচারে নিরস্ত করেছে।

আরও পড়ুন যারা বিজেপিতে ভিজেছিল

ভারত সেবাশ্রমের কার্তিক মহারাজ মুখ্যমন্ত্রীকে আইনি নোটিস পাঠিয়ে বলেছেন তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই তার মুখের মত জবাব দেবেন, নতুবা ক্ষমা চাইবেন। কিন্তু কার্তিক মহারাজ যে ওই তল্লাটে রীতিমত রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান তার পর্যাপ্ত ভিডিও প্রমাণ রয়েছে। সেসব ভিডিওতে তাঁকে মোটেই সর্বত্যাগী, সংসারে আসক্তিহীন সন্ন্যাসী বলে মনে হয় না। বরং তাঁর শরীরী ভাষা ও মুখের ভাষা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বসা গোরক্ষ মঠের যোগীর বেশি কাছাকাছি।

বিদেশি মুদ্রায় বলীয়ান আন্তর্জাতিক সংগঠন ইস্কন তার ভক্তমণ্ডলীকে বিজেপিকে ভোট দিতে বলছে কিনা সে খবর মুখ্যমন্ত্রীর কাছে থাকতেই পারে। তেমনটা ঘটা আদৌ অসম্ভব নয়। কারণ আরএসএস এক আদ্যন্ত বাঙালিবিদ্বেষী সংগঠন, আর ইস্কনের মধ্যে যে বাঙালিবিদ্বেষ পুরোমাত্রায় আছে তার প্রমাণ একবছর আগেই পাওয়া গিয়েছিল, যখন অমোঘ লীলা দাস বলে ওই সংগঠনের এক সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দকে সিদ্ধপুরুষ বলে মানতে অস্বীকার করেন তিনি আমিষ খেতেন, চুরুট খেতেন বলে। ইস্কন কী ব্যবস্থা নিয়েছিল লোকটির বিরুদ্ধে? কয়েকদিন মুখ বন্ধ করে থাকতে বলা হয়েছিল। ব্যাস!

আসলে বাঙালির মান-অপমান বোধ সম্পর্কে কারোরই খুব উচ্চ ধারণা নেই। বাঙালির আদরের সংগঠন রামকৃষ্ণ মিশনেরও নেই। থাকলে সেইসময় তারা অমোঘ লীলাকে বুঝিয়ে দিত শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মাচরণে কেন আমিষ-নিরামিষ ভেদ নেই। শ্রীরামকৃষ্ণ আদতে একজন ধর্মগুরু হলেও সত্যের সন্ধান করেছেন গবেষকের মত। শিষ্যদের মধ্যেও অনুসন্ধিৎসা উস্কে দিতেন, বলতেন ‘সাধুকে দিনে দেখবি, রাতে দেখবি’। অর্থাৎ পরখ করে নিবি, লোকটা সত্যিই সাধু কিনা। ফলে ‘যত মত তত পথ’ কথাটা তিনি স্রেফ বাণী বিতরণ করার জন্যে বলেননি। কলমা পড়ে মুসলমান হয়েছিলেন, খ্রিস্টধর্মও অবলম্বন করে দেখেছিলেন। তিনি খুঁজছিলেন আধ্যাত্মিক সত্য। নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যেখানে যেখানে তা পাওয়া গেছে, সেই সব পথকেই সত্য বলতে তাঁর কোথাও বাধেনি। ফলে আমিষাশী তন্ত্রসাধক বা নিরামিষাশী বৈষ্ণব – কেউই তাঁর কাছে ব্রাত্য নয়, অহিন্দুও নয়। সেই কারণেই রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের আমিষ খাওয়ায় বারণ নেই। সিদ্ধপুরুষ কী করে হতে হয় বা আদৌ হওয়া যায় কিনা তা অন্য তর্ক। কিন্তু রামকৃষ্ণের তত্ত্বানুযায়ী, তাঁর কোনো শিষ্যের এই কারণেই আমিষ খেয়েও সিদ্ধপুরুষ হতে বাধা নেই।

মিশন কিন্তু এসব ধর্মালোচনায় যায়নি। কারণ হিন্দু উদারপন্থী – এমনকি বামপন্থী – বাঙালির ন্যাকা আবদার রক্ষা করে ধর্মীয়, অথচ ধর্মনিরপেক্ষ, জগাখিচুড়ি হওয়ার কোনো দায় রামকৃষ্ণ মিশনের নেই। তারা পুরোদস্তুর ধর্মীয় সংগঠন এবং বিশাল আকারের কারণে রীতিমত ব্যবসায়িক সংগঠন বললেও ভুল হয় না। বউবাজারের গয়নার দোকানগুলো যেমন নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করে না, রামকৃষ্ণ মিশনও ইস্কন বা ভারত সেবাশ্রমের সঙ্গে কোনোরকম তর্কে জড়ায় না। উপরন্তু দেশে হিন্দু আধিপত্যবাদী সরকার হলে এরা সকলেই খুশি হয়, কারণ কলাটা মুলোটা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। কেন্দ্রে অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকার থাকার সময়েই সুদৃশ্য বেলুড় মঠ স্টেশন তৈরি করে হাওড়া-বেলুড় মঠ লোকাল ট্রেন চালু হয়েছিল। বিশেষ উৎসবের দিন ছাড়া সে ট্রেনে কাকপক্ষীও চাপত না। অথচ অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিক্রি করে দেওয়ায় উৎসাহী একটা সরকারও ওই লাইন তুলে দেওয়ার কথা ভাবেনি। রামকৃষ্ণ মিশনের সাধুদের মোদীমুগ্ধতাও এমন কিছু ঢাকঢাক গুড়গুড় করার জিনিস নয়। তিনি যখন বেলুড় মঠে এসে রাত্রিযাপন করেছিলেন, সেইসময় তাঁর সঙ্গে দন্তবিকাশ করে সন্ন্যাসীদের সেলফি তোলার বহর আমরা সকলেই দেখেছি। একজন রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে মিশনের সন্ন্যাসীদের এমন নালে ঝোলে অম্বলে হতে দেখলে কী মনে করতেন মিশনের সেইসব প্রতিষ্ঠাতা সন্ন্যাসীরা, যাঁদের জন্যে ভগিনী নিবেদিতাকে মিশনের সংস্রব ত্যাগ করতে হয়েছিল, কারণ তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সক্রিয়ভাবে সাহায্য করছিলেন?

যা-ই মনে করুন, মোদ্দাকথা হল, মমতা পশ্চিমবঙ্গের তিনটে জনপ্রিয় ধর্মীয় সংগঠনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছেন তা মোটেই পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়ার জিনিস নয়। কিন্তু ঘটনাগুলো তো আজ ঘটতে শুরু করেনি। কার্তিক মহারাজের দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়ার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে তা বেআইনি কাজ, তাঁর বিরুদ্ধে পুলিসি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু কোনো সংগঠনের নিজেদের সদস্যদের কোনো বিশেষ দলকে ভোট দিতে বলা তো বেআইনি নয়। তাছাড়া মমতা নিজেই তো রাজ্যে ইমাম ভাতা, পুরোহিত ভাতা চালু করেছেন, সরকারি টাকায় দীঘায় বিরাট মন্দির বানাচ্ছেন। আবার ঈদের নমাজে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতাও দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে ধর্মীয় সংগঠনগুলো রাজনীতি বিযুক্ত হয়ে থাকবে – এমনটা আশা করা কি যৌক্তিক? তাহলে নির্বাচনে এই কথাগুলো মমতা কেন বললেন? মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধি, নির্বাচনী বন্ডের মত ইস্যু নিয়ে কথা বললে নিজেরই ফাঁপরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা – একথা বুঝেই কি মমতা শেষ দু-তিন দফার নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তুললেন ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে? তাহলে গোটা দেশে অনর্গল মিথ্যাভাষণ আর ধর্মীয় মেরুকরণ করে মোদী নির্বাচনটাকে যেভাবে নিজের দিকে টেনে আনতে চাইছেন, সেভাবেই কি মমতাও চাইছেন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন হয়ে দাঁড়াক হিন্দু বনাম মুসলমানের? ভারত সেবাশ্রম, ইস্কন ও রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে অসন্তোষ জ্ঞাপন করেছেন আর বিজেপি নেতারা মহানন্দে প্রচার করে বেড়াচ্ছেন – মমতা সংখ্যালঘু তোষণ করার জন্যে এখন হিন্দু সাধু সন্তদের আক্রমণ করছেন। পশ্চিমবঙ্গকে মনে হচ্ছে নয়ের দশকের উত্তরপ্রদেশ, যেখানে রাজনৈতিক আলেখ্য আবর্তিত হয় অমুক স্বামী, তমুক সরস্বতী, অমুক শঙ্করাচার্যকে ঘিরে।

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে এই তবে বাঙালির সবচেয়ে বড় অবদান।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

মহিলা ভোটাররা কি এখনো ততটা মানুষ নন পশ্চিমবঙ্গে?

ভারত জুড়ে মহিলা ভোটারদের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গেই বিধানসভা নির্বাচন আছে অন্ধ্রপ্রদেশে। প্রায় সব বিশ্লেষক বলছেন, ওই রাজ্যে কে ক্ষমতায় আসবে তা নির্ধারিত হবে মহিলাদের হাতে। পশ্চিমবঙ্গেও যে মহিলাদের ভোট অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা জানতে কারোর বাকি নেই। নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গে এখন ৩.৭৩ কোটি মহিলা ভোটার। পুরুষদের চেয়ে মাত্র ১২ লক্ষ কম। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে আমাদের রাজ্যে পুরুষদের চেয়ে বেশি মহিলা ভোট দিয়েছিলেন। বলা হয়, তৃণমূল কংগ্রেসের বারবার ভোটে জেতার অন্যতম কারণ মমতা ব্যানার্জির মহিলা ভোটব্যাঙ্ক। সেই ভোটব্যাঙ্ককে আরও জোরদার করতেই নাকি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের কথা ভাবা হয়েছিল। সাধারণ বুদ্ধি বলে, এমন একটা রাজ্যে ভোটের সময়ে মহিলাদের গুরুত্ব সব দলের কাছেই আকাশছোঁয়া হবে। নির্বাচনী প্রচার ভরে থাকবে মহিলাদের দাবিদাওয়া নিয়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ভারত এমন একটা দেশ যে দেশে সাধারণ বুদ্ধি বিশেষ কাজে লাগে না। এখানে সারাক্ষণই অসাধারণ ব্যাপারস্যাপার ঘটতে থাকে। এখন যেমন পশ্চিমবঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রে মহিলারাই, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো তাঁদের ভোট পাওয়ার জন্যে ‘এই করব, সেই দেব, তাই বানিয়ে দেব’ বলছে বলে নয়। বরং দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল মহিলাদের সম্মানকে দড়ি টানাটানির বিষয়বস্তু করে তুলেছে বলে।

আমরা যখন কলেজে পড়ি, তখন গরীবের সম্মান নামের এক বাংলা ছবির পোস্টার লেগেছিল আমাদের হোস্টেলের পাড়ার বেশকিছু দেওয়ালে। তা দেখে আমার এক বন্ধু বলেছিল, ‘এ থেকেই বোঝা যায় যে দেশে গরিবের কোনো সম্মান নেই।’ পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে বহু আলোচিত মহিলাদের সম্মান সম্পর্কে একই কথা প্রযোজ্য। তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপি – দুপক্ষ থেকেই যত ফিল্মি সংলাপ ছোড়া হচ্ছে, তত পরিষ্কার হচ্ছে আসলে মহিলাদের সম্মান নয়, তাঁদের ভোটই অভীষ্ট লক্ষ্য। সন্দেশখালিতে আসলে কোনো ধর্ষণ হয়নি, বিজেপি মহিলাদের দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করিয়েছে – এই মর্মে বিজেপিরই অঞ্চল সভাপতি গঙ্গাধর কয়ালের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সোমবার এক সভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন ‘মেয়েদের কাছে টাকার চেয়ে শাড়ির আঁচল অনেক গুরুত্বপূর্ণ, সম্মান গুরুত্বপূর্ণ। বেশি চক্রান্ত করো না। সব কিছু পরিকল্পনা (করে) করেছে।’ পালটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন ‘মমতা দিদি আপনার লজ্জা হওয়া উচিত। আপনি মহিলা মুখ্যমন্ত্রী, আপনার নাকের ডগায় হাজার হাজার বোনের উপর অত্যাচার, ধর্ষণ হয়েছে। কিন্তু আমি আজ বলতে চাই, সন্দেশখালিতে যে অত্যাচার করেছে, সে যদি পাতালেও লুকিয়ে থাকে… মমতা দিদি তাঁদের পাতালে লুকিয়ে রাখলেও সেখান থেকে খুঁজে বের করে জেলে ঢোকাব।’

শাহের বক্তব্যের পুরোটাই ফেনা, অতএব তা নিয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। মুখ্যমন্ত্রীর নাটকীয় প্রথম বাক্য বাদ দিয়ে বাকিটা বিচার করা যাক। তাঁর বক্তব্য সত্যি হওয়া মোটেই অসম্ভব নয়। নাগরিক ডট নেট যেহেতু বিজেপি নেতার ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে তদন্ত করেনি, করার উপযুক্তও নয়, সেহেতু ওতে প্রযুক্তিগত কারিকুরি আছে কিনা তা আমরা বলতে পারি না। কিন্তু যেভাবে ভিডিও প্রকাশ্যে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই এক খবরের চ্যানেলে গঙ্গাধর স্বীকার করেছিলেন – ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে সেই ব্যক্তি উনিই এবং ওই কথোপকথন সত্যিই হয়েছিল, তাতে পরবর্তীকালে স্পষ্টতই দলের নির্দেশে তিনি যে ভিডিও বিবৃতি দিয়েছেন তাকে বিশ্বাস করা শক্ত হয়ে পড়ে।

তিনি এখানে কোনোমতে আত্মপক্ষ সমর্থনে এটুকুই বলতে পেরেছেন যে তাঁকে দিয়ে কথাগুলো বলানো হয়েছিল। কীভাবে? প্রলোভন দেখিয়ে, নাকি ভয় দেখিয়ে? সে ব্যাপারেও কিছু বলেননি তখন। এমনকি পরে বিবৃতি বদলে ফেলেও তা বলেননি, বলেছেন এতে যান্ত্রিক কারচুপি আছে। অর্থাৎ দুটো বিবৃতি পরস্পরবিরোধী। গঙ্গাধরের কথা অনুযায়ী যে ব্যক্তি এসবের পরিকল্পনা করেছিলেন, সেই শুভেন্দু অধিকারীও এই ভিডিও অসত্য – এ কথার অকাট্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত দিতে পারেননি। যাঁরা ধর্ষণের অভিযোগে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাঁদের অন্যতম এবং বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী রেখা পাত্র তবু টিভি ক্যামেরার সামনে বলেছেন, গঙ্গাধরকে ভয় দেখিয়ে তৃণমূল এসব করে থাকতে পারে। কিন্তু সে তো তাঁর বিশ্বাস। এখন কথা হল, মুখ্যমন্ত্রী যদি মনে করেন এই ভিডিও বিজেপির ষড়যন্ত্রের অকাট্য প্রমাণ, তাহলে নির্বাচনী প্রচারে তাদের বদমাইশি ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হচ্ছে না কেন? ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করিয়ে একটা এলাকায় অশান্তি সৃষ্টি করা, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চেষ্টা করা – এগুলো তো মারাত্মক অপরাধ। কেউ এই অপরাধ করেছেন জানলে স্রেফ বাদানুবাদে থেমে থাকবে কেন একটা রাজ্যের সরকার? কেনই বা যে মহিলারা ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেছেন, পুলিস তাঁরা কী বলছেন তা জানার চেষ্টা করবে না? একথা তো সত্যি, যে আইনত গঙ্গাধর সত্যি বলে থাকলেও প্রমাণ হয় না সব সাজানো। একজন অভিযোগকারী মহিলা কী বলছেন সেটাই বিচার্য।

এখানেই সন্দেহ হয়, সন্দেশখালিতে সত্যিই মহিলারা ধর্ষিত হয়েছেন কি হননি তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ততটা মাথাব্যথা নেই। তিনি শুধু রাজ্যের মহিলা ভোটারদের কাছে একথা প্রমাণ করতে চান যে বিজেপি এতই হীন একটা দল, যে মহিলাদের মানসম্মানের তোয়াক্কা করে না। রাজনৈতিক ফায়দার জন্যে তাঁদের দিয়ে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ করাতেও পিছপা হয় না। রাজ্যের আরেকটা ঘটনাতেও এই একই সন্দেহ হয় মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে। সেটাও চমকে দেওয়ার মত ঘটনা।

রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনেছেন রাজভবনের এক অস্থায়ী কর্মচারী। হেয়ার স্ট্রিট থানায় এফআইআর করেছেন। এই খবর প্রকাশ হওয়ার পর থেকে রাজ্যপাল এমন একটা কাজও করেননি যাতে তিনি যে নির্দোষ তা প্রমাণ করার আন্তরিকতা বোঝা যায়। তিনি কেবল রাজভবনে পুলিসের আর মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের প্রবেশ নিষেধ করেছেন। বিবৃতি দিয়ে বলেছেন এটা রাজনৈতিক চক্রান্ত। এমন নয় যে অতীতে কখনো কোনো রাজ্যের রাজ্যপালের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠেনি। কিন্তু তাঁদের প্রতিক্রিয়া আনন্দ বোসের মত হয়নি।

২০০৯ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্যপাল পদ ছাড়তে হয়েছিল নারায়ণ দত্ত তিওয়ারিকে। কারণ রাজভবনে তাঁর যৌন কীর্তিকলাপের টেপ প্রকাশ্যে এসেছিল এবং বিরোধীরা সমস্বরে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছিল। সিপিএম নেত্রী বৃন্দা কারাত রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিলকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, যদি তিওয়ারি পদত্যাগ করতে রাজি না হন তাহলে তাঁকে বরখাস্ত করা উচিত। অভিযোগ ওঠার পরে আনন্দ বোসের মত বুক ফুলিয়ে চলা তিওয়ারির পক্ষে সম্ভব হয়নি। অনস্বীকার্য যে অভিযোগ উঠেছে মানেই বোস অপরাধী তা নয়। অপরাধ প্রমাণিত হতে হয়। কিন্তু সে তো তদন্তসাপেক্ষ, আর রাজ্যপাল পদের সাংবিধানিক রক্ষাকবচ থাকায় বোসের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করাও সম্ভব নয়। কিন্তু নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পদত্যাগ করার নামটি নেই; উল্টে রাজভবনের কর্মীদেরও এ বিষয়ে শমন অগ্রাহ্য করার নির্দেশ দেওয়া, পুলিসকে সিসিটিভি ফুটেজ না দেওয়ার আদেশ করার মত ঔদ্ধত্য রাজ্যপালের আসে কোথা থেকে?

উত্তরটা খুব শক্ত নয়। তিওয়ারির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার সময়ে কেন্দ্রে ছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পরামর্শে রাজ্যপাল নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। তিওয়ারি অবশ্যই বুঝেছিলেন যে কেন্দ্রের সরকার তাঁর পদ বাঁচানোর চেষ্টা করবে না। তাই মানে মানে কেটে পড়েন। বোস নির্ঘাত জানেন, এই অভিযোগের কারণে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের পরামর্শে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁকে সরে যেতে বলবেন না। শুধু বোস কেন, আপনি-আমিও জানি যে যৌন অপরাধের অভিযোগ বিজেপির কাছে কোনো অভিযোগের মধ্যেই পড়ে না। তাদের সরকার বিলকিস বানোর ধর্ষক বলে শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষমা করে দেয়, জেল থেকে বেরোবার পর মালা পরিয়ে বরণ করে। ওই দলের নেতা আট বছরের মেয়ে আসিফাকে ধর্ষণ করে খুন করায় অভিযুক্তদের সমর্থনে মিছিল করে। পদক জয়ী অলিম্পিয়ানরা রাস্তায় বসে আন্দোলন করলেও ব্রিজভূষণ শরণ সিং গ্রেফতার হন না। ঝামেলা খুব বেড়ে যাওয়ায় তাঁকে কুস্তি ফেডারেশনের সর্বোচ্চ পদ থেকে সরিয়ে তাঁরই ডানহাতকে ওই পদে বসানোর ব্যবস্থা করে দেওয়া হয় আর নির্বাচনের টিকিটটা তাঁকে না দিয়ে তাঁর ছেলেকে দেওয়া হয়। উত্তরপ্রদেশের হাথরাসের মেয়েটার কী হাল করা হয়েছিল তাও আমরা জানি। সোমবার উত্তরবঙ্গ সংবাদ কাগজের প্রথম পাতায় এক প্রতিবেদনে রূপায়ণ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, তার পরিবারকে আজও নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে আর ধর্ষকরা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কর্ণাটকে তো বিজেপির নেতাই অভিযোগ করেছেন, প্রোজ্জ্বল রেবন্ন নামক নরকের কীটটি সম্পর্কে তিনি আগেই নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন এবং জেডিএসের সঙ্গে জোটে থাকা উচিত হচ্ছে না বলেছিলেন। কেউ কান দেয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, যে প্রধানমন্ত্রী এক বছরে একবারও মণিপুরে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি, কুকি মহিলাদের উলঙ্গ করে হাঁটানোর নিন্দা করতে সময় নেন আড়াই মাস, তিনি সামান্য শ্লীলতাহানির অভিযোগেই একজন রাজ্যপালকে সরতে বলবেন? যাঃ!

প্রমাণ হয়ে গেছে, বোসের অনুমান নির্ভুল। প্রধানমন্ত্রী ওই অভিযোগ ওঠার পরে পরেই পশ্চিমবঙ্গে এসে ভোটের প্রচার করে গেছেন, রাজভবনের আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সেখানকার কর্মচারীর অভিযোগ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। মানে সন্দেশখালির প্রধান অভিযুক্তের নাম শাহজাহান না হলে বা সে বিজেপির সদস্য হলে সিবিআই তদন্তের কথা হয়ত উঠত না। গঙ্গাধর সত্যি বলছেন না মিথ্যে, তা নিয়েও মাথা ঘামানোর দরকার হত না। কিন্তু এখন নির্বাচনের মরসুম, সন্দেশখালিতে বিজেপির ‘দোনো হাথ মে লাড্ডু’ হয়ে গেছে। একে হিন্দু বনাম মুসলমান বয়ান তৈরি করা গেছে (গোদি মিডিয়ার সহায়তায় দিব্যি চেপে যাওয়া গেছে যে শাহজাহানের দুই প্রধান স্যাঙাতই হিন্দু), তার উপর ভোটের বাজারে পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ভোটারদের সামনে তৃণমূলকে নারীবিরোধী প্রমাণ করার সুযোগ পাওয়া গেছে। সত্যিই নারীর সম্মান মূল্যবান মনে করলে আনন্দ বোসকে আপাতত পদ ছেড়ে দিতে বলা হত।

কিন্তু এ তো বিজেপির সন্দেহাতীত ব্যবহার। এই ঘটনাতেও মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ আছে বলছি কেন? তার কারণ মুখ্যমন্ত্রী প্রচারে এই কাণ্ড নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন, এরকম আরও অনেক ঘটনা সম্পর্কে তিনি আগেই জানতেন। প্রশ্ন হল, জানলে আগেই কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়ে এই রাজ্যপালকে সরানোর ব্যবস্থা করেননি কেন? তাহলে কি তিনি নির্বাচনের অপেক্ষায় ছিলেন? রাজভবনের কর্মচারী মহিলার অভিযোগকে কি তিনি স্রেফ বিজেপিকে মহিলাবিরোধী এবং নিজের দলকে মহিলাবান্ধব প্রমাণ করার কাজে লাগাচ্ছেন? অর্থাৎ সন্দেহ হয়, এখানেও উদ্দেশ্য সেই মহিলাদের ভোট, মহিলাদের সম্মানরক্ষা নয়।

আলোচনাটা এখানেই শেষ করে দিলে বিজেপি-তৃণমূল বাইনারিকে উৎসাহ দেওয়া হয়ে যাবে হয়ত। যারা রাজ্যের তৃতীয় শক্তি এবং এই নির্বাচনে আরও শক্তিশালী তৃতীয় শক্তি হয়ে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের ভূমিকা সম্পর্কেও কিছু বলা দরকার।

বামফ্রন্টের বড় শরিক সিপিএম, আর কংগ্রেস, দুই দলের নির্বাচনী ইশতেহারেই মহিলাদের সম্পর্কে প্রচুর পরিকল্পনার কথা আছে। সিপিএমের ইশতেহারে ‘women’ শব্দটা আছে ৪৯ বার, কংগ্রেসের ইশতেহারে ৪০ বার। দুই দলেরই ক্ষমতায় এলে মহিলাদের জন্যে অনেক ভাল ভাল পরিকল্পনা আছে, যা পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদেরও যে কাজে লাগবে তা বলাই বাহুল্য। সিপিএম এবারে মহিলা ভোটারদের গুরুত্ব দিয়ে আলাদা করে সাংবাদিক সম্মেলনও করেছে। কিন্তু এখানে আমরা যে দুটো ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছি, সেগুলো সম্পর্কে দুই দলেরই অবস্থান অস্পষ্ট বা আপত্তিকর।

সন্দেশখালির শাহজাহানবিরোধী আন্দোলনে সিপিএম তথা সিপিএম-কংগ্রেস জোটের বসিরহাট কেন্দ্রের প্রার্থী নিরাপদ সর্দার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। পুলিস তাঁকে গ্রেফতারও করেছিল। মীনাক্ষী মুখার্জি সমেত অন্যান্য বাম নেতৃত্বকে সন্দেশখালি যেতে বাধাও দেওয়া হয়েছিল। বিজেপির মত কেবল হিন্দু মহিলা ধর্ষিত হয়েছেন এমন দাবি না করে থাকলেও মহিলাদের উপর নির্যাতন নিয়ে সিপিএমও সরব ছিল। কংগ্রেস ওই এলাকায় প্রায় অস্তিত্বহীন। কিন্তু তারাও ওই আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। এখন গঙ্গাধরকে নিয়ে কী করা হবে সেটা দুই দলের নেতৃত্ব কি বুঝে উঠতে পারছেন না?

প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি এবং বহরমপুর কেন্দ্রের প্রার্থী অধীররঞ্জন চৌধুরী ভিডিওর প্রতিক্রিয়ায় ঘুরে ফিরে মমতাকেই দায়ী করেছেন। কেন তা বোঝা শক্ত। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক তথা মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রের প্রার্থী মহম্মদ সেলিম বলেছেন রাজ্যের যেখানে যা কুকর্ম হয় সবেতেই হয় তৃণমূল, নয় বিজেপি অথবা দুই দলই যুক্ত থাকে। বিজেপি নিজের সুবিধা করতে গিয়ে তৃণমূলের দুঃশাসনের সুবিধা করে দিয়েছে গত দশ বছরে। এ কথারই বা মানে কী? গঙ্গাধরের কথায় সিপিএম বিশ্বাস করছে, নাকি ওটা তৃণমূলের চক্রান্ত বলেই ধরছে? সত্যিই ধর্ষণ হয়নি, নাকি হয়েছিল? স্থানীয় সিপিএম জানে না সত্যিটা কী? কিছুই পরিষ্কার হল না। বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা এবং দমদম কেন্দ্রের কংগ্রেস সমর্থিত প্রার্থী সুজন চক্রবর্তী যা বলেছেন তা আরও অদ্ভুত।

সেলিমের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, তিনি জিমন্যাস্টের মত ব্যালান্স বিমের উপরে রয়েছেন। একটু এদিক ওদিক হলেই পড়ে যাবেন, প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যাবেন। আইন এবং সহবত বলে, তদন্ত ছাড়াই কোনো মহিলার লাঞ্ছনার অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। তার উপর রাজ্যের প্রায় অর্ধেক ভোটার মহিলা। তাই সেলিম ধর্ষণের অভিযোগগুলোকে এখনই মিথ্যে বলতে পারছেন না। ওদিকে গঙ্গাধরের ভিডিওটাও যে উড়িয়ে দেওয়া যায় না তা না বোঝার লোক তিনি নন। এর উপর আছে তৃণমূল ও বিজেপি, দুপক্ষই খারাপ – এই অবস্থান বজায় রাখার দায়িত্ব। সুজন যা বলেছেন তাতে আবার মনে হয় তিনি সেলিমের সঙ্গে একমত নন। তিনি নিশ্চিত জানেন যে গঙ্গাধরের ভিডিও ভুয়ো। একই পার্টির দুজন নেতা যদি এরকম প্রায় পরস্পরবিরোধী বিবৃতি দেন, তাহলে পার্টির মত কোনটা তা বোঝা দায় হয়ে পড়ে। যদি স্রেফ ভোট বৈতরণী পার হওয়াই উদ্দেশ্য হয়, তাহলেও এমন গোলমেলে অবস্থান কোনো দলের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়।

তবে এ নিয়ে তবু বাম-কংগ্রেস কোনো একটা অবস্থান নিয়েছে। রাজভবনের কাণ্ডে তাদের অবস্থান কী তা এখন পর্যন্ত অজানা। একমাত্র বিমান বসু ‘অন রেকর্ড’ মতামত দিয়েছেন, যদি একে কোনো মতামত বলা যায় – ‘রাজ্যপালের ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক। সবটা না জেনে এখনই কোনো মন্তব্য করব না।’ অধীর চৌধুরীর রাজ্যপালকে আক্রমণ না করা তবু মেনে নেওয়া যায়। হাজার হোক তিনি কংগ্রেস নেতা। কেন্দ্রে কংগ্রেসের সরকার থাকার সময়ে রাজ্যপালদের দিয়ে কী কী করানো হয়েছে তা হয়ত তাঁর মনে আছে। তাই তিনি রাজ্যপালের খুব একটা দোষ ধরেন না। কিন্তু সিপিএম নেতাদের রাজ্যপালের প্রতি এত সম্ভ্রম কৌতূহলোদ্দীপক।

আরও পড়ুন শুধু কুস্তির পদক নয়, দেবতার গ্রাসে আজ সবার সন্তান

ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর থেকেই বঙ্গ সিপিএমের নেতারা রাজ্যপালদের সম্পর্কে খুব সাবধানী হয়ে উঠেছেন। বরাবর কিন্তু এমন ছিল না। সিপিএম দল একসময় রাজ্যপাল পদটারই অবলুপ্তি দাবি করত। এবারের ইশতেহারেও লেখা রয়েছে ‘It [CPI(M)] stands for a Governor to be chosen out of a panel of three eminent persons proposed by the chief minister…’। অর্থাৎ সিপিএম চায়, রাজ্যপাল বেছে নিক মুখ্যমন্ত্রী দ্বারা প্রস্তাবিত তিন বিশিষ্ট ব্যক্তির এক প্যানেল। কেরালার রাজ্যপালের সঙ্গে গত কয়েকমাস ধরে ধুন্ধুমার চলছে সে রাজ্যের সিপিএম নেতৃত্বাধীন সরকারের। পার্টির ছাত্র সংগঠন রাজ্যপালের বিরুদ্ধে একের পর এক কর্মসূচি গ্রহণ করে চলেছে। অথচ এ রাজ্যের সিপিএম নেতারা সেই জগদীপ ধনখড়ের আমল থেকেই রাজ্য সরকার আর রাজ্যপালের সংঘাত হলে দুপক্ষই খারাপ – একথা বলতে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জ্যোতি বসু আর তাঁর প্রথম অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতে রাজ্যের পক্ষ নিতেন। বিরোধীশাসিত রাজ্যগুলোকে একজোট করে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের জন্য তাঁরা দীর্ঘদিন পরিশ্রম করেছেন। সারকারিয়া কমিশন অনেকটা সেই পরিশ্রমের ফসল। মোদী সরকারের আমলে যে রাজ্যপাল আর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের লেফটেন্যান্ট গভর্নররা সাংবিধানিক অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করেছেন বারবার, সেকথা কিন্তু সিপিএমের নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যন্ত লেখা হয়েছে। অথচ মমতা সরকারের সঙ্গে যতবার ধনখড়ের সংঘাত হয়েছে, সিপিএম নেতারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন দোষ যে দুজনেরই তা প্রমাণ করতে। বোস আসার পরেও প্রথম দিকে ব্যাপারটা বদলায়নি, ইদানীং অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। বোস যখন গতবছর রাজনৈতিক হিংসায় আক্রান্তদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখন সেলিম বলেছিলেন, এটা রাজ্যপালের কাজ নয়। রাজ্যপাল শাহের নির্দেশে বিজেপি নেতা হওয়ার চেষ্টা করছেন। রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতি এবং হিংসা চলছে অভিযোগ করে বোস বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন গতমাসে। কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল একযোগে বলে – রাজ্যপালের এ কাজ করার এক্তিয়ার নেই।

সেসব না হয় সাংবিধানিক অধিকারের ব্যাপার। বোসের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ নিয়ে মতামত দেওয়া তো তুলনায় সহজ। যে সহবতের কারণে সেলিম সন্দেশখালির মহিলাদের অভিযোগ উড়িয়ে দিতে পারছেন না, সেই সহবত অনুযায়ীই বলতে পারার কথা যে রাজ্যপালের উচিত সরে গিয়ে তদন্তের পথ করে দেওয়া। তিনি দোষী না নির্দোষ তা পরে দেখা যাবে। রাজ্যের প্রায় ৫০% মহিলা ভোটারের কথা ভেবেও বাম, কংগ্রেস নেতারা এইটুকু বলে উঠতে পারছেন না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

এসএসসি কেলেঙ্কারি: বনলতা সেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত আর পরের ছেলে

রাম পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পেয়েছে জানলে শ্যাম এসএসসির উপর হামলা করতে যাবে কেন? ১৯৯৮ সাল থেকে তো তেমন কিছু ঘটেনি।

ছোটবেলায় এক নিকটাত্মীয়কে দেখতাম ‘গনি খান’ বলতে অজ্ঞান। তখনো আবু বরকত আলি গনি খান চৌধুরী কংগ্রেসের কত বড় নেতা, কোথাকার নেতা, কী তাঁর দোষ বা গুণ – সেসব জানার বয়স আমার হয়নি। এটুকু জানতাম যে তিনি কংগ্রেস নেতা এবং কংগ্রেস আমাদের শত্রু। কারণ কংগ্রেস আমলে আমার বাবাকে অন্য পার্টি করার অপরাধে জেল খাটতে হয়েছে, পরিবারের অন্যদের উপরেও দমনপীড়ন চলেছে। ফলে ওই আত্মীয়ের গনি-মুগ্ধতা দেখে রাগে ফুলতাম। একদিন আমার মা বোঝালেন ‘আরে রাগ করিস কেন? গনি খানের জন্যে চাকরি পেয়েছেন উনি। নুন খাবেন আর গুণ গাবেন না?’ বড় হয়ে জেনেছি, গনি খান রেলমন্ত্রী থাকার সময়ে অনেক বঙ্গসন্তানকেই রেলে চাকরি দিয়েছিলেন এবং সেজন্যে বহু পরিবার আজীবন তাঁকে ভগবানের মত ভক্তি করত। তাঁর ভাইপো ঈশা খান যদি মালদা দক্ষিণ কেন্দ্রে জেতেন, তাতেও ওই কাজের কিছুটা অবদান থাকবে। সেই বঙ্গসন্তানরা সকলেই কি যোগ্য ছিল? আমার আত্মীয় কি যোগ্য ছিলেন? জানি না। তখন যোগ্যতার মাপকাঠি কী ছিল, আদৌ কিছু ছিল কিনা – তাও জানি না। মোদ্দাকথা গনি খান যে বিস্তর লোককে ক্ষমতা প্রয়োগ করে চাকরি পাইয়ে দিয়েছিলেন তা একটি সর্বজনবিদিত গোপনীয় তথ্য। শুনেছি কলকাতার শিয়ালদা অঞ্চলেও বহু পরিবার আছে যারা একসময় সোমেন মিত্র বলতে অজ্ঞান ছিল অনেকটা একই কারণে। বামফ্রন্ট আমলেও পার্টি-ঘনিষ্ঠ বলেই যে অনেকে চাকরি পেয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার উদাহরণও আমার পরিচিতদের মধ্যে আছে। তারা সকলে যে অযোগ্য তা নয়, কিন্তু পার্টি-ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তারা যে অগ্রাধিকার পেয়েছিল তাতে ভুল নেই। কিন্তু ওসবের সঙ্গে এখন যে নিয়োগ দুর্নীতির রায় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল, সেই দুর্নীতির কোনো তুলনা চলে না।

কেন চলে না সে ব্যাখ্যায় আসব, তার আগে বলে নিই প্রথম অনুচ্ছেদেই কংগ্রেস আমল, বাম আমলের পিছন দরজা দিয়ে নিয়োগের কথা কেন বললাম। বনলতা সেনগিরি (‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’) যে কোনো আলোচনাকে লাইনচ্যুত করে। ওই বিড়ালটি প্রথম রাত্রে মেরে রাখার জন্যেই বললাম। বিচারপতিদের কলমের এক আঁচড়ে পঁচিশ হাজারের বেশি স্কুলশিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি চলে গেল যে দুর্নীতির জেরে, তার সঙ্গে অতীতে কোনো আমলে শাসকের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে পাওয়া চাকরির তুলনা চলে না প্রথমত এই কারণে, যে সেখানে শাসক চাকরি বিক্রির ব্যবসা ফেঁদে বসেনি। এখন অবধি যতটুকু আদালতে প্রমাণিত এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত, তাতেই দেখা যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা স্কুলের চাকরি কেনাবেচার রাজ্যজোড়া বাজার খুলে বসেছিলেন। ও জিনিস এ রাজ্যে অভূতপূর্ব। মধ্যপ্রদেশের ব্যাপম কেলেঙ্কারির সঙ্গে হয়ত তুলনা চলতে পারে।

দ্বিতীয়ত, মাপকাঠির প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গে বহুকাল ধরে কলেজে শিক্ষক নিয়োগের জন্য কলেজ সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা চালু থাকলেও স্কুলশিক্ষক নিয়োগের কোনো মাপকাঠি ছিল না। স্কুলগুলো শূন্য পদ থাকলে নিজেরাই বিজ্ঞাপন দিত, ইন্টারভিউ নিত, নিয়োগ করত। এই ব্যবস্থারই সুযোগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে নিয়োগ চলত। সে রাস্তা বন্ধ করতেই স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু করা হয়েছিল। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য সর্বভারতীয় নেট (National Eligibility Test) বা রাজ্যস্তরের স্লেট (State Level Eligibility Test) পরীক্ষার মত ১৯৯৭ সালে আইন করে পশ্চিমবঙ্গে চালু হয় স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা (প্রথম পরীক্ষা ১৯৯৮ সালে)। অর্থাৎ রাজ্যের সব সরকারপোষিত স্কুলে শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগের জন্য একটিই পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষা এবং কমিশনের বিশেষজ্ঞদের কাছে ইন্টারভিউতে পাস করলেই স্কুলের চাকরির পাকাপাকি ব্যবস্থা।

বাম আমলের শেষ দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা জানত, এ রাজ্যে তাদের জন্যে আর কিছু না থাক, একটা সরকারি চাকরি আছেই – স্কুলের চাকরি। ১৯৯৮-২০১০ – এক যুগ এই পরীক্ষা হয়েছে, মেধা তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, নিয়োগ হয়েছে। যোগ্যতার যে মাপকাঠি এসএসসি ঠিক করেছিল সেটাই সঠিক কিনা, যারা এই পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি তারাই যে অযোগ্য তার প্রমাণ কী – এসব সূক্ষ্ম তর্ক করাই যায়। কিন্তু ওই বছরগুলোতে অমুককে টপকে তমুক চাকরি পেয়ে গেল কী করে, অমুক তমুকের থেকে কম নম্বর পেয়েছে তাও আগে চাকরি পেল কী করে – এইসব অভিযোগ নিয়ে থানা পুলিস মামলা মোকদ্দমা হয়নি। অন্যায়ভাবে বাদ পড়ার অভিযোগ করে কাউকে রাজপথে বসে থাকতে হয়নি একদিনও। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু অবশ্য গতবছর মার্চে বলেছিলেন যে সিএজি রিপোর্টে উল্লেখ আছে, বাম আমলেও ৪৬,০০০ নিয়োগে অনিয়ম ছিল। তাঁদের সরকার ভদ্রতাবশত সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে যেভাবে তৃণমূল সরকারের নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে রাজনীতি করছে বিরোধীরা, তাতে এইবার মুখ্যমন্ত্রীকে জানানো হবে। তিনি যা বলবেন তাই হবে। ব্রাত্যবাবু কি আজও জানাননি, নাকি মুখ্যমন্ত্রী এখনো চিরশত্রু বামেদের সঙ্গে ভদ্রতা করছেন? জানি না। সেইসময় ব্রাত্যবাবু বলেছিলেন ১৯৯৭ থেকে পশ্চিমবঙ্গে স্কুলে যত নিয়োগ হয়েছে তা নিয়ে শ্বেতপত্রও প্রকাশ করবে রাজ্য সরকার। সেই শ্বেতপত্রই বা কোথায় গেল?

এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না
যা-ই হোক, এসএসসি পরীক্ষা চালু রেখেই কীভাবে চাকরি বিক্রির বাজার খোলা যায়, সে বুদ্ধি সম্ভবত তৃণমূল সরকারের আমলে কেউ জোগাড় করে উঠতে পারেনি। তাই ব্যবস্থাটাকেই ধসিয়ে দেওয়া হল ক্রমশ। ২০১৩-১৪ থেকেই নানা অভিযোগ উঠতে শুরু করে, ২০১৬ থেকে অভিযোগের বন্যা। এখন যে ছেলেমেয়েরা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে তাদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায় যে শিক্ষক হওয়ার প্রত্যাশা তারা অনেকেই ত্যাগ করেছে। এসএসসি পরীক্ষা আর কখনো সুষ্ঠুভাবে হয়ে স্কুলে তাদের চাকরি হবে বলে তারা মনে করে না। এই হতাশা নেহাত যুক্তিহীন বলা যাবে না। কারণ আজকাল নিজের ঘরে আগুন লাগার আগে পর্যন্ত কেউ কোথাও আগুন লেগেছে দেখলে গা করে না, আর স্কুলে নিয়োগের সংকট শেষ বিচারে খুব বেশি সংখ্যক পশ্চিমবঙ্গবাসীর সংকট নয়। যাদের চাকরি গেল তাদের সংকট, যারা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল তাদের সংকট, হয়ত যারা দেবে ভেবেছিল তাদের মানসিক হতাশার কারণ। আর সংকট স্কুল চালাতে নাকের জলে চোখের জলে হওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাদের, যাঁরা আদালতের সাম্প্রতিকতম রায়ের পরে আরও বিপদে পড়ে গেলেন। কারণ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে আমরা জেনে গেছি যে অনেক স্কুলে আর কোনো স্থায়ী শিক্ষকই থাকবেন না ২০১৬ সালে এসএসসি পাস করা ব্যক্তিরা বরখাস্ত হওয়ার পর। অনেক স্কুলে কোনো কোনো বিষয় আর পড়ানো যাবে না শিক্ষক নেই বলে। বিচারপতি দেবাংশু বসাক আর বিচারপতি মহম্মদ শব্বর রশীদি এই রায় দেওয়ার অনেক আগে থেকেই তো জানা যাচ্ছিল, কোথাও মাসিক তিন-চার হাজার টাকা বেতনে আংশিক সময়ের শিক্ষক চাইছে স্কুল, কোথাও আবার স্থানীয় মানুষের কাছে আবেদন জানানো হচ্ছে – যদি কোনো সহৃদয় ব্যক্তি এসে অমুক বিষয়টা বিনামূল্যে পড়িয়ে দিয়ে যান তো ভাল হয়। স্কুলে ওই বিষয়ের শিক্ষক নেই, অথচ ছাত্রছাত্রী আছে।

কিন্তু এসব স্কুলশিক্ষার সঙ্গে জড়িত মানুষের সমস্যা। যাঁরা পড়ান তাঁদের সমস্যা, যারা পড়ে তাদের আর তাদের বাবা-মায়েদের সমস্যা। এ নিয়ে নিয়মিত সান্ধ্য টিভি বিতর্ক হয় না। আজকাল তো এতরকম সমীক্ষা হয়। কেউ যদি সমীক্ষা করে, কলকাতার সম্পাদকদের কতজনের ছেলেমেয়ে সরকারপোষিত স্কুলে পড়ে আর যাঁরা স্টুডিওতে এসে গলা ফাটান তাঁদের কতজনের সন্তান ওসব স্কুলে পড়ে – তাহলেই বোঝা যাবে কেন সান্ধ্য বিতর্ক হয় না। এবারে নির্বাচন পর্বের মধ্যে এতগুলো লোকের চাকরি গেছে তাই, নইলে রাজ্যের মূলধারার সংবাদমাধ্যম কতদূর পাত্তা দিত সন্দেহ আছে। কলকাতা নাকি প্রতিবাদের শহর। সেখানে কয়েকশো ছেলেমেয়ে হাজার দিনের বেশি রাস্তায় বসে আছে (সকলে চাকরির দাবি করেও নয়, অনেকে যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ দাবি করে), অথচ সরকারি স্কুলশিক্ষায় কিছু এসে যায় না এমন কজন মানুষ একবার গিয়ে দাঁড়িয়েছেন সেখানে? টিভি ক্যামেরাও পৌঁছয় কখনো সরকার বা বিরোধী পক্ষের কোনো নেতার কথায়, কি আদালতের খোঁচায় এই ইস্যু উঠে এলে তবেই। এমনকি এই ১১০০ দিন পেরিয়ে যাওয়া আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর কথা চাকরি পেয়ে যাওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও কোনোদিন মনে পড়েনি। তাঁরা বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের উদ্যোগে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বসলেন কখন? যখন রাজ্য সরকার মহার্ঘ ভাতার দাবি উড়িয়ে দিল। তার আগে চাকরিপ্রার্থীদের হয়ে একটাও মিছিল করেছেন এসএসসির যুগে চাকরি পাওয়া নবীন বা তার আগের যুগে চাকরি পাওয়া প্রবীণ শিক্ষকরা? একদিনও আন্দোলনের সঙ্গে সহমর্মিতা জানাতে গিয়ে বসেছেন পথে?

২০১৯ সালে যখন ধর্মতলায় প্রায় একমাস ধরে অনশন করেছিলেন চাকরিপ্রার্থীরা, তখন একদিন অফিস যাওয়ার পথে গিয়েছিলাম সেখানে। সেদিনও প্রবল গরম আর অদূরে ইডেন উদ্যানে আইপিএলের প্রথম খেলা। কাতারে কাতারে মানুষ ইডেনমুখো। তার মধ্যে ভরদুপুরে মুখ অন্ধকার করে শহরের একেবারে মধ্যিখানে বসেছিল কতকগুলো ছেলেমেয়ে। কখনো বিমান বসু গেছেন বলে টিভি ক্যামেরা গেছে, কখনো কোনো বিজেপি নেতা গেছেন বলে গেছে। সেবার ব্যাপারটা একটু বিপজ্জনক দিকে চলে যাওয়ায় (আসলে বোধহয় সেটাও নির্বাচনের বছর হওয়ায়) শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজে গিয়ে চাকরি হবে আশ্বাস দিয়ে অনশন ভাঙিয়েছিলেন। চাকরি হয়নি। কিন্তু সেকথা কে মনে রেখেছিল এতদিন? যে কোনো আন্দোলন অবশ্য এ রাজ্যে এমন প্রতিক্রিয়াই পায়। ছন্দা সাহা, রেবতী রাউত, তাপস বর – এই মানুষগুলোর কারোর মনে আছে আজ? করুণাময়ী মোড় থেকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে যখন রাস্তা দিয়ে টেনে হিঁচড়ে আন্দোলনকারীদের নিয়ে গেছে পুলিস, তখন মনে করতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। কারণ টিভিতে দেখা গেছে, কাগজে ছবি বেরিয়েছে। ব্যাস ওটুকুই।

এখন হাজার পঁচিশেক মানুষের চাকরি গেছে শুনে প্রায় অর্ধশতক আগের বেকারত্বের হারে পৌঁছে যাওয়া দেশের কিছু মানুষ আশ্চর্য রকম খুশি। কেন খুশি জানি না। এদের অনেককেই তো বেকারত্ব নিয়ে অন্য সময়ে চিন্তিত দেখি। ওই যে অটোর পিছনে লেখা থাকে ‘দ্যাখ কেমন লাগে’ – তেমন কোনো ধর্ষকাম মানসিকতা ছাড়া এর কোনো ব্যাখ্যা নেই বলেই মনে হয়। অবশ্য যে মানুষ পাশের বাড়িতে আগুন লেগেছে দেখে বালতি ভরে জল নিয়ে দৌড়ে যাওয়া দূরে থাক, হায় হায় বলে আর্তনাদও করে না, সে যে ধর্ষকাম তাতে আর সন্দেহ কী? এ যুগে ক্ষেত্রবিশেষে আমরা সবাই ধর্ষকাম। সুতরাং আমাদের তৈরি রাষ্ট্র যে ধর্ষকাম হবে তা বলাই বাহুল্য। আদালত বারবার চাইলেও নিয়ামক সংস্থা কারা পাস করেছিল আর কারা টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছে তা ঝাড়াই বাছাই করার জন্যে প্রয়োজনীয় ওএমআর শিট জমা দেয় না। সরকার ওএমআর শিট তিনবছর রেখে দেওয়ার নিয়ম বদলে একবছর করে দেয়, তারপর বিপদ বুঝে বলে – এবার থেকে দশবছর রাখা থাকবে। আর আদালত ঝাড়াই বাছাই করা যাচ্ছে না বলে সকলেরই চাকরি খায়।

এমনিতে যে ভারতীয় আদালতে কোনো মামলার নিষ্পত্তি হওয়ার গতি সবচেয়ে বেশি, সেটা হল হিন্দি সিনেমার আদালত – আড়াই থেকে তিন ঘন্টায় পুলিস তদন্ত শেষ করে আদালতে রিপোর্ট দাখিল করে, বিচারপতি সাক্ষী সাবুদ যাচাই করে রায় দিয়ে দেন। এদেশের অন্য সব আদালতই রাবীন্দ্রিক – এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না। কিন্তু এই মামলায় দেখা গেল আদালত রীতিমত ‘ফাস্ট ট্র্যাক’। গত ৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট নিয়োগ সংক্রান্ত সব মামলার একত্রে বিচার করার জন্য কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করতে অনুরোধ করেছিল। তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায়ে যাদের চাকরি গিয়েছিল তাদের বরখাস্ত করার নির্দেশও ছমাসের জন্য রদ করে দিয়েছিল, যাতে ইতিমধ্যে বিশেষ বেঞ্চ বিচারের কাজ শেষ করতে পারে। পাঁচ মাস ২১ দিনের মাথায় রায় ঘোষণা করে দিলেন মহামান্য বিচারপতিরা। এমন নির্দিষ্ট তারিখ মেনে দেশে খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাসবাদী হামলার অভিযোগের বিচারও যদি হত! বোঝা যাচ্ছে আদালতের তাড়া ছিল। এত তাড়া ছিল যে তিনবার বৈধ চাকুরেদের তালিকা দিতে বলা সত্ত্বেও যখন স্কুল সার্ভিস কমিশন দিল না, তখন তার চেয়ারম্যানকে গ্রেফতার করানো বা বরখাস্ত করার সময় পেল না আদালত। গোটা কেলেঙ্কারিতে ক্যাবিনেটের দায় আছে বোঝা সত্ত্বেও যিনি এ রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী তাঁকেও তখনই ধরতে বলা হল না সিবিআইকে। ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার মামলায় ঘুষ কে বা কারা নিয়েছে তার খোঁজ পরে হবে, আগে বরখাস্ত হল যারা ঘুষ দিয়েছে তারা। সঙ্গে যারা ঘুষ দেয়নি বলে আদালতেরও বিশ্বাস, তারাও।

পরের ছেলে পরমানন্দ
বিচারকদের তাড়া থাকতেই পারে। কার রাজ্যপাল হওয়ার তাড়া, কার সাংসদ হওয়ার তাড়া তা আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। আমরা আইন-টাইনও তত বুঝি না। কিন্তু আশ্চর্য লাগে যখন দেখি ঘুষ নেওয়ার চেয়েও বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ঘুষ দেওয়া। আমাদের উদাসীনতা বা ধর্ষকাম মানসিকতা স্বীকার করে নিয়ে মনে করিয়ে দিই, আমরা এমন এক রাজ্যে বাস করি যেখানে কয়েক বছর আগে যথেষ্ট নম্বর পেয়েও কলেজে ভর্তি হতে গেলে শাসক দলের ছাত্র সংসদকে মোটা টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছিল। সেই রাজ্যে ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়াকে ঠিক কতখানি অপরাধ বলে গণ্য করা উচিত, সেই নৈতিক প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেকে দিয়ে উঠতে পারছি না। আইনে সবকিছু মোটা হরফে লেখা আছে, নীতি ব্যাপারটা তো অত সোজা নয়। পশ্চিমবঙ্গে বসে সন্দেহ করা আদৌ অন্যায় নয় যে যাঁরা টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছেন তাঁদের মধ্যেও এমন প্রার্থী আছেন, যিনি সসম্মানে পরীক্ষায় পাস করেছিলেন। কিন্তু অমুক দাদা বা তমুক দিদি হয়ত ডেকে বলেছিলেন, অমুক পরিমাণ টাকা না দিলে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে না।

এমন কোনো মতলব না থাকলে পার্থ চ্যাটার্জি শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মেধা তালিকা প্রকাশ না করে এসএমএসে যোগ্য প্রার্থীদের জানানো হবে বলেছিলেন কেন? পাবলিক পরীক্ষায় কে কে পাস করেছে সে তথ্য প্রাইভেট হবে কেন? এ তো নির্বাচনী বন্ডের মত হয়ে গেল – কে টাকা দিল, কাকে টাকা দিল তা তৃতীয় ব্যক্তি যেন জানতে না পারে। শুধু যে টাকা পেল সে জানবে আর যে দিল সে জানবে। এক্ষেত্রেও যে চাকরি পেল শুধু সে-ই জানল আর যে চাকরি দিল সে জানল। নির্বাচনী বন্ডে ওই ব্যবস্থা করার পক্ষে তবু একটা অজুহাত ছিল। কোন দলকে কে চাঁদা দিচ্ছে জানলে অন্য দল দাতার উপর হামলা করতে পারে। কিন্তু রাম পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পেয়েছে জানলে শ্যাম এসএসসির উপর হামলা করতে যাবে কেন? ১৯৯৮ সাল থেকে তো তেমন কিছু ঘটেনি। বরং বহু চাকরিপ্রার্থীই একবার পাস করতে না পেরে আবার পরীক্ষা দিয়েছেন, দ্বিতীয় বা তৃতীয় বারে উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি পেয়েছেন। আর এখন হাজার জোরাজুরিতেও কমিশন জানিয়ে উঠতে পারছে না যে কারা উত্তীর্ণ হয়েছিলেন? এ তো বড় রঙ্গ যাদু।

এই কারণেই না ভেবে উপায় নেই যে আদালতকে যোগ্য-অযোগ্য আলাদা করতে সাহায্য না করার কারণ আসলে অনুত্তীর্ণরা। কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মজুমদার জোর দিয়ে বলছেন চাকরি যাওয়া ২৫,৭৫৩ জনের মধ্যে মাত্র ৫,২৫০ জন অযোগ্য। অথচ ‘(বাকিরা যে প্রত্যেকে যোগ্য) সেই বিষয়ে নিশ্চিত নই। পুরোপুরি শংসাপত্র দিতে পারব না।’ কেন পারবেন না? ওএমআর শিট নেই বলে? কেন নেই? ঠিক ২০১৬ সালেই নিয়ম বদলে ওএমআর শিট তিন বছরের বদলে এক বছর রাখলেই চলবে এই নিয়ম করা হয়েছিল বলে? সেই নিয়ম কি করাই হয়েছিল ওএমআর শিট পুড়িয়ে দেওয়া হবে বলে? পুড়িয়ে দেওয়ার তাড়াহুড়ো কি আজকের মত পরিস্থিতির কথা ভেবে করা হয়েছিল? যদি আদালতকে ২০,৫০৩ জন যোগ্য প্রার্থীর নাম জানিয়ে দেওয়া হত তাহলে তাঁদের চাকরি যেত না। যেত কেবল বাকিদের। তখন ওই হাজার পাঁচেক মানুষ সদলবলে যাঁদের হাতে টাকা দিয়েছেন তাঁদের কাছে টাকা ফেরত চাইতেন এবং ব্যাপারটা একেবারে অহিংস থাকত, এমন সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ আদালতের রায়ে এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অপরাধের কারবারীদের পিঠ আক্ষরিক অর্থে বেঁচে গেল। এখন মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর ভাইপো, শিক্ষামন্ত্রী, এসএসসি চেয়ারম্যান – সকলেই সুপ্রিম কোর্ট দেখিয়ে বলতে পারছেন, এই তো আবেদন করেছি। কোনো চিন্তা নেই।

ঘটনা হল, আবেদন করলেও চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। হাইকোর্টের এই বিশেষ বেঞ্চ গঠিতই হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের অনুরোধে (পড়ুন নির্দেশে)। সেই বেঞ্চের রায় কি একেবারে উল্টে দেবেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা? বড়জোর তমলুকের বিজেপি প্রার্থী, থুড়ি প্রাক্তন বিচারপতি, অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায়ের যেমন প্রয়োগ আটকে দেওয়া হয়েছিল কিছুদিনের জন্যে, তেমন কিছু হতে পারে। নির্বাচন পর্ব শেষ হওয়ার আগেই তা হলে তৃণমূলের লাভ, না হলে বিজেপির। যাঁদের চাকরি গেল তাঁদের অবস্থা উনিশ-বিশ হবে আর যাঁরা রাস্তায় বসে আছেন তাঁদের দুর্দশারও কোনো সুরাহা হবে না। ইতিমধ্যে যারা ঘুষ নিয়েছিল তারা হয়ত বাঙ্কার-টাঙ্কার বানাবে অথবা য পলায়তি স জীবতি উপদেশ শিরোধার্য করবে।

আর আমরা? কদিন পরেই যোগ্য, অযোগ্য, যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ না পাওয়া – সকলের কথাই ভুলে যাব। তারপর হয়ত একদিন সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোবে। তাতে যদি রায় উল্টে যায় তাহলে যাঁদের চাকরি বেঁচে গেল তাঁদের এবং তাঁদের পরিবার পরিজনের কাছে তৃণমূল স্বচ্ছ দল হয়ে যাবে; যদি হাইকোর্টের রায় বহাল থাকে তাঁরা সুদ্ধ সকলের কাছে তৃণমূল চোর বলে প্রমাণিত হবে। বাংলার লক্ষ স্কুল নিরাশায়, আলোহীনতায় ডুবে নিস্তব্ধ নিস্তেল হয়ে গেলে তৃণমূলের কী, বিজেপির কী, আদালতের কী আর আমাদেরই বা কী? আমাদের ছেলেমেয়েরা তো আর ওসব স্কুলে পড়ে না। ওগুলো না হয় কদিন পরে উঠে যাবে বা বেসরকারি হয়ে যাবে। সকলেই জানে – বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে।

অতএব ও নিয়ে ভেবে লাভ নেই। নির্বাচনে কে জিতল সেটাই আসল কথা।

পিপলস রিপোর্টারে প্রকাশিত

যারা বিজেপিতে ভিজেছিল

১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর থেকে বদলের হাওয়া বুঝে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে বেশকিছু রাজনৈতিক দল বিজেপির সঙ্গে গলাগলি বা ঈষৎ আশনাই করেছে। সেই দলগুলোর আজকের অবস্থা খেয়াল করলে ওই কথাই মনে হবে – বুঝতে পারি না ওর বিষনজরে থাকা বেশি খারাপ, নাকি সুনজরে?

দেশের রাজধানী এমনিতেই রাজনৈতিক কানাকানির কারখানা, অরবিন্দ কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির পর তো আরও বেশি। তিনি কারান্তরালে থেকেই সরকার চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো সাংবিধানিক বাধা না থাকায় কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেও কিছু করে উঠতে পারছে না। পাশাপাশি রাজনৈতিক ভয়ও আছে। এমনিতেই নাকি দিল্লির মানুষ কেজরিওয়ালের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েছেন। গোদি মিডিয়ার ‘মুড অফ দ্য নেশন’ পোলে দেখা গেছে গতবারের মত দিল্লিতে লোকসভার সাতটা আসনের সাতটাই বিজেপির জেতার সম্ভাবনা প্রায় অন্তর্হিত। এখন রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে আম আদমি পার্টির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করলে যদি কেজরিওয়াল আরও সহানুভূতি পেয়ে যান! তাই ও পথে এখনো যায়নি নরেন্দ্র মোদীর সরকার। কেজরিওয়ালের আপ্ত সহায়ককে বহু পুরনো মামলা দেখিয়ে বরখাস্ত করা, খালি পদে অফিসার নিয়োগ না করা, লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে দিয়ে মন্ত্রিসভাকে ব্যতিব্যস্ত করা ইত্যাদি ঘুরপথেই হয়রান করছে। কানাকানির কারখানা বলছে, দল গঠনের সময় থেকে কেজরিওয়ালের সঙ্গে থাকা কোনো এক ওজনদার আপ নেতা নাকি দলত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন। ইতিমধ্যেই কেজরিওয়ালের মন্ত্রিসভার এক সদস্য পদত্যাগ করেছেন। কারণ হিসাবে যা দেখিয়েছেন তা ২০২১ সালে দলে দলে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়ার সময়ে পশ্চিমবঙ্গের অনেক নেতা যা বলেছিলেন তার কাছাকাছি। যদিও ইনি শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিজেপিতে যোগ দেননি। ওদিকে আপের আরেক তরুণ এবং প্রভাবশালী নেতা রাঘব চাড্ডা বহুদিন হল বেপাত্তা। বলিউড অভিনেত্রী পরিণীতি চোপড়াকে বিয়ে করার পর থেকে তিনি আমেরিকায় না ইউরোপে, কেউ জানে না। বস্তুত, দলের এই সংকট মুহূর্তে আপের দশজন রাজ্যসভার সাংসদের মধ্যে সাতজনই নীরব। কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির পরে আপ নেত্রী আতিশী মারলেনা দাবি করেছিলেন যে কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে এবং আরও কয়েকজন আপ নেতাকে গ্রেফতার করার ফন্দি এঁটেছে। শুক্রবার বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার তালে আছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, গোটা দলটাকেই তুলে দেওয়ার অভিলাষ পোষণ করছে বিজেপি। কেবল আপ নয়। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, একথা বুঝতে কারোরই কোনো অসুবিধা হচ্ছে না যে দেশে অন্য কোনো দল থাকুক তা প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর দল চায় না।

সবচেয়ে বেশি রাজ্যে বিজেপির লড়াই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। তাই আয়কর বিভাগকে দিয়ে বহু পুরনো রিটার্নে অসঙ্গতি দেখিয়ে নোটিস পাঠিয়ে তাদের টাকাপয়সা খরচ করার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আইনি পথে আবেদন করে লাভ হয়নি। পরে বোধহয় ব্যাপারটা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও অসন্তোষ প্রকাশ করায় সরকারের জ্ঞান হল যে এটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। তাই আপাতত আয়কর বিভাগ জানিয়েছে তারা নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে না। কংগ্রেসের পর বিজেপির সবচেয়ে বড় শত্রু অবশ্যই আপ। তারা দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে পরপর দুবার বিজেপিকে দুরমুশ করার পর পাঞ্জাবেও ক্ষমতায় এসেছে। আরও মুশকিল হল, দিল্লিতে তবু আপকে লোকসভায় বিজেপি পর্যুদস্ত করতে পেরেছিল। পাঞ্জাবে আপ অল্পদিনের মধ্যেই প্রবেশ করে ক্ষমতায় পৌঁছে গেল। ওদিকে বিজেপি বহুবছর চেষ্টা করেও এখন ভোঁ ভাঁ হয়ে গেছে। এমনকি মোদী সরকারের কৃষকবিরোধী অবস্থানের প্রতিবাদে দীর্ঘদিনের সঙ্গী পাঞ্জাবের আঞ্চলিক দল, শিরোমণি অকালি দলও বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করেছে। অতি বড় বিজেপি সমর্থকও জানেন, লোকসভা নির্বাচনে পাঞ্জাবে বিজেপি শূন্য ছাড়া কিছুই পাবে না। তাই আপ হল দ্বিতীয় লক্ষ্য।

আপের দুই, তিন এবং চার নম্বর নেতা মনীশ সিসোদিয়া, সত্যেন্দ্র জৈন এবং সঞ্জয় সিংকে দীর্ঘদিন বন্দি করে রাখা হয়েছে। মামলাগুলোর কোনো অগ্রগতি নেই, একটি টাকাও উদ্ধার হয়নি। সঞ্জয়কে জামিন দেওয়ার পিছনে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অন্যতম যুক্তি ছিল সেটাই। এত সবেও আপ অনড় দেখেই হয়ত একেবারে এক নম্বর নেতাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। আপের গুরুত্বপূর্ণ নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, কেজরিওয়াল পদত্যাগ করলেই আপের বাকি নেতৃত্বকেও গ্রেফতার করা হবে। তারপর একই কায়দায় পাঞ্জাবের সরকারকেও ক্ষমতাচ্যুত করা হবে। আগেই এ চেষ্টা ঝাড়খণ্ডে করা হয়েছিল, কিন্তু সাফল্য আসেনি। এখন এভাবে দুটো রাজ্যের সরকার ফেলে দেওয়া গেলে কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া, তেলেঙ্গানার রেবন্ত রেড্ডি, তামিলনাড়ুর এম কে স্ট্যালিন, পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির মত সমস্ত বিরোধী দলের মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেফতার করে সরকার ফেলে দেবে বিজেপি। অর্থাৎ এক দেশ এক নির্বাচন তো পরের কথা, ২০২৪ লোকসভাতেই এক দল এক নির্বাচন সম্ভব হবে। অতজন নেতা গ্রেফতার হয়ে গেলে নির্বাচনের প্রচার করবে কে আর সংগঠন চালাবে কে? হতোদ্যম বিরোধী দলগুলোকে দেখে ভোটই বা দেবেন কোন ভোটার? তাঁদের মধ্যেও কি আতঙ্ক কাজ করবে না?

বলা যেতেই পারে, কেজরিওয়ালের পদত্যাগ না করাকে সমর্থন করতে গিয়ে সৌরভ কষ্টকল্পিত আতঙ্ক সৃষ্টি করছেন সাধারণ মানুষের মনে। সত্যিই ওরকম একনায়কতন্ত্র মোদীর লক্ষ্য হলে আদৌ নির্বাচন করাচ্ছেন কেন? এ প্রশ্নের উত্তর কিন্তু খুব সোজা। আজকের একনায়করা কেউ একনায়ক তকমাটা পছন্দ করেন না। তাঁরা চান একনায়কের লাগামহীন ক্ষমতার সঙ্গে গণতন্ত্রের গ্ল্যামার। একজন শাসক ধর্মে মুসলমান বা রাজনীতিতে কমিউনিস্ট না হলে বাকি পৃথিবীর কাছে গণতান্ত্রিক বলে পরিচিতি পাওয়া খুব কঠিনও নয়। তাই তুরস্কের রচপ তায়িপ এর্দোগান বা রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনও নিজের দেশে নির্বাচন করান, আর বিশ্বগুরু মোদী করাবেন না?

কোনো দেশে একনায়কের জন্ম হঠাৎ করে হয় না। পরিবারে, সমাজে দীর্ঘকাল ধরে একনায়কত্বের প্রতি সমর্থন তৈরি না হলে একটা বিরাট গণতান্ত্রিক দেশের মানুষ রাষ্ট্রক্ষমতায় একনায়ককে চাইবেন কেন? কোনো সন্দেহ নেই, ভারতে পরিবার থেকে শুরু করে কর্পোরেট অফিস পর্যন্ত সর্বত্র একনায়করা বিচরণ করে। তেমন একজন বসের অধীনে কাজ করার সময়ে আমার এক তিতিবিরক্ত সহকর্মী একটা মন্তব্য করেছিলেন, যা বিজেপি-আরএসএসের ক্ষেত্রে দারুণ লাগসই। ‘বুঝতে পারি না ওর বিষনজরে থাকা বেশি খারাপ, নাকি সুনজরে?’ ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর থেকে বদলের হাওয়া বুঝে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে বেশকিছু রাজনৈতিক দল বিজেপির সঙ্গে গলাগলি বা ঈষৎ আশনাই করেছে। সেই দলগুলোর আজকের অবস্থা খেয়াল করলে ওই কথাই মনে হবে – বুঝতে পারি না ওর বিষনজরে থাকা বেশি খারাপ, নাকি সুনজরে?

সেই দলগুলোর কথা আজ স্মরণ করা জরুরি। কারণ ভারত জুড়ে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি রাতারাতি এতখানি শক্তি সঞ্চয় করেনি। বহু রাজ্যে তাদের রাজনৈতিক, এবং তার চেয়েও বড় কথা সামাজিক স্বীকৃতি পাইয়ে দিয়েছে এই দলগুলো। নইলে সংঘ পরিবারের নানা সামাজিক সংগঠনের ৩৬৫ দিনের কাজ সত্ত্বেও এত নির্বাচনী সাফল্য সম্ভব হত কিনা তা তর্কসাপেক্ষ। কোন দলগুলোর কথা বলছি? আসুন, একেবারে ভারতের মানচিত্রের উপর দিক থেকে শুরু করা যাক।

ন্যাশনাল কনফারেন্স, জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি
ন্যাশনাল কনফারেন্স কাশ্মীর উপত্যকার সুপ্রাচীন দল। কাশ্মীরের ভারতভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শেখ আবদুল্লার। স্বাধীন ভারতে তিনি, তাঁর ছেলে ফারুক এবং নাতি ওমর – তিনজনেই দলের নেতা হিসাবে জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। ১৯৯৬ পর্যন্ত ফারুক ছিলেন বিজেপির সোচ্চার সমালোচক। অনেক পশ্চিমবঙ্গবাসীর হয়ত মনে আছে, ১৯৯৬ সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে বামপন্থীদের উদ্যোগে কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে কংগ্রেস ও বিজেপিবিরোধী ফ্রন্টের যে সমাবেশ হয়েছিল, তাতে ফারুক বিজেপির বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর দল অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) সরকারকে সমর্থন দেয়। তখন ফারুকের দল কাশ্মীরে ক্ষমতাসীন।

কাশ্মীরের রাজনীতিতে ন্যাশনাল কনফারেন্সের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হল মুফতি মহম্মদ সঈদ প্রতিষ্ঠিত দল জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি)। ১৯৮৯ সালে জনতা দল নেতা ভি পি সিংয়ের নেতৃত্বে কেন্দ্রে যে সরকার হয়েছিল সেই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মুফতি সাহেব (এ পর্যন্ত ভারতের একমাত্র মুসলমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)। সেই সরকারের প্রতি বিজেপিরও সমর্থন ছিল বটে, কিন্তু সে ছিল সাড়ে বত্রিশ ভাজা সরকার। বামপন্থীরাও সেই সরকারকে সমর্থন করেছিল। উপরন্তু রামমন্দিরের দাবিতে রথযাত্রায় বেরনো লালকৃষ্ণ আদবানিকে বিহারের লালুপ্রসাদ (তখন জনতা দলেই) সরকার গ্রেফতার করলে বিজেপি ভিপির সরকারের থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে। এছাড়া পিডিপির কখনো বিজেপির সঙ্গে সখ্য হয়নি। বরং মুফতি নিজে সুদূর অতীতে যেমন ন্যাশনাল কনফারেন্সে ছিলেন, তেমনি কংগ্রেসেও ছিলেন। কিন্তু সেই মুফতিই ২০১৪ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গঠন করেন। ২০১৬ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সেই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি। তারপর মুখ্যমন্ত্রী হন তাঁর মেয়ে মেহবুবা। বিজেপি সেই সরকার ফেলে দেয় ২০১৮ সালের ১৯ জুন।

তারপর থেকে কাশ্মীরের মানুষ কীরকমভাবে বেঁচে আছেন আমরা সবাই জানি। এই দুই দলের অবস্থাও তথৈবচ। ২০১৯ সালের ৫ অগাস্ট কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করে দেওয়ার পরে গোটা কাশ্মীরকে যখন জেলখানা করে তোলা হয়েছিল, তখন আবদুল্লা বা মুফতিরা বিজেপিসঙ্গের ইতিহাস থাকার জন্যে কোনো বিশেষ সুবিধা পাননি। তাঁদেরও গৃহবন্দি করে রাখা হয়। এখন ফারুক-ওমরের মত মেহবুবাও ঠুঁটো জগন্নাথ। দুই দলেরই সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়েছে, দুই দলই ইন্ডিয়া ব্লকের মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী জোট তৈরি করার প্রশ্নে দুপক্ষই অনড়। ফলে কাশ্মীরের চারটে লোকসভা আসনে দুই দলই প্রার্থী দিয়ে বসে আছে।

শিরোমণি অকালি দল
ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম পাঞ্জাবের এই আঞ্চলিক দল। দীর্ঘ ইতিহাস, ধর্মীয় সংযোগ এবং পাঞ্জাব রাজ্যের গঠনেও গুরুতর ভূমিকা থাকায় এই দলের পাঞ্জাবে বিপুল সমর্থন ছিল দীর্ঘকাল। এই দলও প্রয়াত প্রকাশ সিং বাদলের নেতৃত্বে বিজেপির জোটসঙ্গী হয়েছিল সেই ১৯৯৬ সালেই, অর্থাৎ বাজপেয়ী সরকারের আমলে। পরিণতি কী?

পাঞ্জাবি পরিচিতি এবং পাঞ্জাবিদের স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখাই যে দলের মতাদর্শ, নরেন্দ্র মোদীর আমলে তিনটে কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে কৃষক আন্দোলনের সময়ে সেই দলের অবস্থা হয়েছিল শ্যাম রাখি না কুল রাখি। শেষমেশ তারা কুল রাখারই সিদ্ধান্ত নেয়। নেত্রী হরসিমরত কৌর বাদল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন এবং তাঁর দল এনডিএ ছেড়ে বেরিয়ে আসে। বিজেপি কিন্তু চেয়েছিল লোকসভা নির্বাচনে আবার জোট হোক। অকালি দল পাত্তা দেয়নি। তারা বড় দেরিতে বুঝতে পেরেছে যে বিজেপি অন্য দলের ঘাড়ে পা দিয়ে উপরে ওঠায় বিশ্বাসী। বিজেপির সঙ্গে থাকায় যা হয়েছে তা হল পাঞ্জাবিদের স্বার্থরক্ষাকারী দল হিসাবে বাদল পরিবারের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে গেছে। পাঞ্জাবের কংগ্রেস দুর্বল হয়ে পড়লেও ফাঁক ভরাট করতে ঢুকে পড়েছে আপ। এখন শিরোমণি অকালি দল ভুগছে অস্তিত্বের সংকটে।

বহুজন সমাজ পার্টি
দ্বিখণ্ডিত হওয়ার পরেও ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশ, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যও বটে। কারণ এই রাজ্যেই অযোধ্যা, কাশী, মথুরা। রাম না থাকলে যেমন রামায়ণ লেখা হত না, তেমনি এই জায়গাগুলো না থাকলে সারা ভারতের হিন্দুদের মনে খতরার ধারণা তৈরি করাও সম্ভব হত না সংঘ পরিবারের পক্ষে। বাবরি মসজিদ বাঁচাতে সমাজবাদী পার্টির সরকার গুলি চালাল, কিছু মানুষের মৃত্যু হল – তবে না রণহুঙ্কারে পরিণত হল ‘মন্দির ওয়হি বনায়েঙ্গে’ স্লোগান? এই সংঘর্ষে মতাদর্শের দিক থেকে ভাবলে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংঘ পরিবারের বিপক্ষেই থাকার কথা ছিল আম্বেদকরপন্থী কাঁসিরামের হাতে তৈরি বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি)। কিন্তু ১৯৯৩ সাল থেকে সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে জোট সরকার চালানোর পর কাঁসিরামের উত্তরাধিকারী মায়াবতী মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং যাদবের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করে ১৯৯৫ সালের ২ জুন সমর্থন প্রত্যাহার করেন। কী আশ্চর্য! ঠিক পরদিনই বিজেপির সমর্থনে সরকার গঠন করেন মায়াবতী। সেই থেকে বহুজন সমাজ পার্টির চিরশত্রু হয়ে যায় সমাজবাদী পার্টি, বিজেপি নয়। যদিও বিজেপি তাঁর সরকারকে সে বছরের অক্টোবর মাসেই ফেলে দেয়। তারপরেও তিনবার উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মায়াবতী, এমনকি ফের বিজেপির সমর্থনেও। শুধু ২০০৭-১২ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুরো মেয়াদ কাটাতে পেরেছিলেন।

ভারতের আর পাঁচটা দলের মত মায়াবতীর দলের বিরুদ্ধেও বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ আছে। কিন্তু তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বে উত্তরপ্রদেশে যে নেহাত খারাপ উন্নয়ন হয়নি তাও স্বীকার করেন অনেক বিরোধী। তবু আজ ‘বহেনজি’ উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে গেছেন। জাতপাতের সমীকরণ ভেঙে দিয়ে যে অভিন্ন হিন্দু পরিচিতি তৈরি করার রাজনীতি বাজারে এনেছে মোদী-অমিত শাহ-যোগী আদিত্যনাথের বিজেপি, তাতে মায়াবতীর চিরাচরিত নিম্নবর্গীয় হিন্দু ও মুসলমান ভোটাররা তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন। স্পষ্টতই বিজেপির সঙ্গে জোট করে লাভ হয়েছে বিজেপির, বিএসপির নয়। দুর্নীতির অভিযোগগুলোকে হাতিয়ার করে একদা ভারতীয় রাজনীতির দাপুটে নেত্রী মায়াবতীকে এতটাই নখদন্তহীন করে দেওয়া গেছে যে সংসদে দাঁড়িয়ে তাঁর দলের সাংসদ দানিশ আলিকে মুসলমান বলে যা খুশি গালাগালি দিয়ে গেলেন বিজেপির রমেশ বিধুরী। বহেনজি রা কাড়লেন না। স্বভাবতই দানিশ সম্প্রতি কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে মায়াবতী কী আশায় একলা লড়ছেন তা কেউ জানে না। কংগ্রেস কিন্তু তাঁকে ইন্ডিয়া ব্লকে যোগ দিতে ডেকেছিল।

তৃণমূল কংগ্রেস
উপরে উল্লিখিত কাশ্মীরের দল দুটো যদি বলে বিজেপির হাত ধরা ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না, তাহলে হেসে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ সেই জওহরলাল নেহরুর আমলে অন্যায়ভাবে শেখ আবদুল্লাকে কারারুদ্ধ করার সময় থেকেই দিল্লিতে যে দলের সরকারই থাক, শ্রীনগরের সরকারকে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়নি (অনুচ্ছেদ ৩৭০ কাশ্মীরিদের অধিকারের চেয়ে বাকি ভারতের কাছে বদনাম দিয়েছে বেশি)। একাধিক মহলের মতে কাশ্মীরের মানুষকে সন্ত্রাসবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে একের পর এক কেন্দ্রীয় সরকারের কারচুপি করা নির্বাচন। শক্তি সামন্তের কাশ্মীর কি কলি (১৯৬৪) দেখে যে কাশ্মীরকে চেনা যায়, আসল কাশ্মীর যে তার চেয়ে বিশাল ভরদ্বাজের হায়দর (২০১৪) ছবিরই বেশি কাছাকাছি তা বুঝতে কয়েকশো বই পড়ার প্রয়োজন হয় না। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়তে হয় না। চোখ, কান আর মন খোলা রাখলেই বোঝা যায়। তাই মেহবুবা যখন সাংবাদিক সঙ্কর্ষণ ঠাকুরকে বলেন যে বিজেপির সঙ্গে জোট করার তিনি বিরোধী ছিলেন এবং বাবা মুফতি তাঁকে বলেন, এটা না করে কোনো উপায় নেই – তখন তাঁকে বিশ্বাস করা যায়। পরবর্তী ঘটনাবলী প্রমাণ করছে, মুফতি ভুল ভাবেননি। বাজপেয়ী সরকারের আমলেও কার্গিল যুদ্ধ বাদ দিলে কাশ্মীর যে মোটামুটি শান্ত ছিল সে হয়ত ন্যাশনাল কনফারেন্স ওই সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল বলেই। অন্য দুটো দল, অর্থাৎ শিরোমণি অকালি দল আর বহুজন সমাজ পার্টি কিন্তু এই যুক্তি দিতে পারে না। তবে উভয়ের রাজনীতিরই জন্ম কংগ্রেসবিরোধিতা থেকে। ভারতের আরও অনেক রাজ্যের আঞ্চলিক দলেরই তাই। তৃণমূল কংগ্রেস এই তালিকায় সম্ভবত একমাত্র দল যাদের ইতিহাস উলটো।

এই দলের জন্ম কংগ্রেস ভেঙে এবং মূল রাজনীতি বামবিরোধিতা। নিম্নবর্গীয় মানুষের জন্য সামাজিক ন্যায়ের দাবি বা বাঙালি পরিচিতি সত্তাও তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মের কারণ নয়। যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করছিলেন কংগ্রেস যথেষ্ট বামবিরোধিতা করছে না, তাই তিনি ক্রমশ জঙ্গি আন্দোলনের পথ নেন। তা নিয়ে রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘাত আর অজিত পাঁজার মত কয়েকজন বর্ষীয়ান নেতার সমর্থন লাভই তৃণমূলের জন্মের কারণ। জনশ্রুতি হল, তাতেও তৃণমূলের জন্ম হত না কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির সমর্থন না থাকলে। কিন্তু জনশ্রুতির কথা থাক, যা সর্বসমক্ষে আছে তা নিয়েই আলোচনা করি। শেষপর্যন্ত মমতার যা ঘোষিত একমাত্র এজেন্ডা – বামফ্রন্ট সরকারের অপসারণ – প্রায় এক যুগ বিজেপির হাত ধরেও বাস্তবায়িত করা যায়নি। বরং সেই পর্বে তৃণমূলকে ২০০৪ লোকসভা এবং ২০০৬ বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। শেষপর্যন্ত কংগ্রেসের হাত ধরেই ২০১১ সালে মমতার লক্ষ্যপূরণ হয়।

কিন্তু মমতার সঙ্গে জোট করে বিজেপির নিঃসন্দেহে লাভ হয়েছে। কখনো পশ্চিমবঙ্গের এই কোণে, কখনো ওই কোণে একটা কি দুটো বিধানসভা আসন জেতা বিজেপি এ রাজ্য থেকে সাংসদ পেয়েছে ওই জোট তৈরি হওয়ার পর। ২০১১ সালের পর থেকে কেবল বিজেপির নয়, পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের সংগঠনও বেড়েছে হু হু করে। দক্ষিণবঙ্গে কংগ্রেস ক্রমশ তৃণমূলে মিশে গেছে, সরাসরি সংঘাতে বামপন্থীরাও এঁটে উঠতে পারেনি শাসক দলের সঙ্গে। এত বড় শূন্যতা ভরাট করে আজ পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। এ রাজ্যের রাজনীতিতে যা বছর বিশেক আগেও অভাবনীয় ছিল, আজ ঠিক তাই ঘটছে। বহু আসনে স্রেফ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যাচ্ছেন ভোটাররা।

কেউ বলতে পারেন, বিজেপির লাভ হয়েছে না হয় বোঝা গেল। তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষতি হল কোথায়? বিলক্ষণ ক্ষতি হয়েছে। প্রথমত, তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়া আর বিজেপি থেকে তৃণমূলে আসার রাজপথ তৈরি হয়ে গেছে। ফলে কখন কোন ঘটনার ভিত্তিতে, কোন প্রলোভনে বা আতঙ্কে দলটা তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়বে তা মমতা নিজেও সম্ভবত জানেন না। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগে যাঁরা ‘দলে থেকে কাজ করতে পারছি না’ বলে চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ফিরে এসেছেন। তাঁদের যুক্তি না হয় বোঝা গেল। তাঁরা যে কোনো মূল্যে জয়ী দলে থাকতে চান, তৃণমূল হেরে গেলে ফিরতেন না। কিন্তু মমতা যে তাঁদের ফিরিয়ে নিলেন, এ থেকে কি প্রমাণ হয় না যে তাঁর ঘর আসলে তাসের ঘর? ক্ষমতার ঠেকনা দিয়ে খাড়া রাখা হয়েছে, সরিয়ে নিলেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে? মুকুল রায় যে শ্রডিংগারের বেড়ালের মত বিজেপিতেও আছেন আবার তৃণমূলেও আছেন হয়ে থেকে গেলেন – তাও কি এটাই প্রমাণ করে না যে তৃণমূল নেতৃত্বের আশঙ্কা, একটা তাস এদিক ওদিক হলেই বাকিগুলো ভেঙে পড়বে? এমন নড়বড়ে সরকার চালাতে কি মমতা পছন্দ করেন? কোনো নেতারই কি পছন্দ করার কথা? ইডি, সিবিআই, আয়কর বিভাগের জ্বালায় ব্যতিব্যস্ত হওয়ার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম।

বিজেপি প্রধান বিরোধী হয়ে যাওয়ায় শাসক হিসাবে তৃণমূলের কিছু সুবিধা নিশ্চয়ই হয়েছে। যেমন, বিধানসভায় কাজের বিতর্ক প্রায় হয়ই না। রাজ্য সরকারের কাজ নিয়ে বিরোধী দলনেতা যত কৈফিয়ত চান সবই বিধানসভা ভবনের বাইরে বিভিন্ন চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে। তাছাড়া রাজ্য রাজনীতির আলোচ্য বিষয়গুলোই এমন হয়ে গেছে যাতে কাজের কাজ না করলেও চলে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা প্রায় বন্ধ। বাজেটেও কেবল চালু ভাতাগুলোর টাকার অঙ্কটা বাড়িয়ে দিলেই চলে যায়। অযোধ্যার মন্দিরের পালটা দীঘার মন্দিরের কথা হয়। ইমাম ভাতায় কেউ চটে গেলে পুরোহিত ভাতা দিলেই যথেষ্ট। রামনবমীর বিপরীতে বজরংবলী পুজো হয়। তাতেও কাজ হচ্ছে না বুঝলে রামনবমীতে সরকারি ছুটি দেওয়া হয়। তারপরেও খোঁজ করতে হয়, চিরশত্রু বামেরা কত ভোট পাবে। এত নড়বড়ে, পরনির্ভরশীল, তৃণমূল কংগ্রেস ১৯৯৬ সালেও ছিল না। এই কারণেই ইন্ডিয়া ব্লকে মমতা ছিলেন বটে, কিন্তু এখনো আছেন না নেই, তা দেবা ন জানন্তি।

এখানে একটা মজার কথা স্মর্তব্য। বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। বহু বছর পরে দেখা যায়, আজীবন কংগ্রেসি হলেও আরএসএস তাঁকে রীতিমত শ্রদ্ধা করে। নিজেদের অনুষ্ঠানে বক্তা হিসাবে আমন্ত্রণ জানায়, তিনি সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করে বক্তৃতাও দিয়ে আসেন। ২০১৯ সালে বিজেপির সরকার তাঁকে ভারতরত্ন পুরস্কারও দেয়।

জনতা দল ইউনাইটেড
বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে আর যা-ই ঘটে যাক না কেন, সূর্য পূর্ব দিকে উঠবেই আর নীতীশ কুমারই বিহারের মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। ব্যাপার কতকটা এরকমই দাঁড়িয়েছে। দাঁড়াত না, যদি মণ্ডল রাজনীতির সন্তান, লালুপ্রসাদের এক সময়কার সতীর্থ নীতীশ বারবার বিজেপির সঙ্গে ঘর না করতেন। বিহারে গত বিধানসভা নির্বাচনে জিতে আরও একবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েও একসময় তাঁর আশঙ্কা হল, নিজের চেয়ার বাঁচাতে গিয়ে দলটা চলে যাচ্ছে বিজেপির পেটে। তাই পালটি খেয়ে পুরনো বন্ধু লালু, পুরনো শত্রু কংগ্রেস আর বামপন্থীদের সঙ্গে জোট করে মুখ্যমন্ত্রী রইলেন। সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। তবে বোধহয় এবার আরও বড় স্বপ্ন ছিল। তাই উদ্যোগ নিয়ে বিজেপিবিরোধী দলগুলোকে একজোট করে ইন্ডিয়া ব্লক তৈরি করলেন। তাঁর প্রবীণতাকে সম্মান দিয়ে সকলে আহ্বায়ক হিসাবে তাঁকে মেনেও নিল। তারপর ‘কী হইতে কী হইয়া গেল’, নীতীশ হঠাৎ একদিন সকালে আবার এনডিএ-তে ফিরে গেলেন। বিকেলবেলা নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রীও হয়ে গেলেন।

উপমুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তেজস্বী বন্ধুপুত্রের তেজ সহ্য হল না, নাকি রাহুল গান্ধী যেমন বলেছেন – ইডি, সিবিআই বা আয়কর বিভাগের ভয়ে নীতীশ এমনটা করলেন, তা হয়ত ভবিষ্যতের কোনো ঐতিহাসিক খুঁজে বার করবেন। তবে সমস্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষকই বলছেন, বিহারের মানুষের কাছে নীতীশের এবং তাঁর দলের আর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা অবশিষ্ট নেই। লোকসভায় যা ভোট পাবেন সে-ও মোদীর কল্যাণে, আর আগামী বিধানসভা নির্বাচনে নাকি তাঁর দলকে খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হবে। এতদিন মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যে নীতীশ বহু ভাল কাজ করেছেন তা বিরোধীরাও অস্বীকার করেন না। কিন্তু সেসবই নাকি এখন মূল্যহীন হয়ে পড়েছে ভোটারদের কাছে। সম্ভবত নীতীশও তা জানেন, নইলে কেবলই সঙ্গী খুঁজে হয়রান হবেন কেন? একলা লড়তে ভয় পাবেন কেন?

বিজু জনতা দল
বিজু পট্টনায়ক ওড়িশার প্রবাদপ্রতিম নেতা। একসময় কংগ্রেসে ছিলেন, পরে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সংঘাতে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন, জনতা পার্টিতে যোগ দেন, পরবর্তীকালে জনতা দলে। ওড়িশার এই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ছেলে নবীনই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজুর নামাঙ্কিত দলের একমেবাদ্বিতীয়ম নেতা। তিনি বিদেশে পড়াশোনা করেছেন এবং শোনা যায় ওড়িয়া ভাষায় ভাল করে কথাও বলতে পারেন না। তবু ওড়িশা রাজ্যটাকে এই শতকের শুরু থেকে চালিয়ে যাচ্ছেন প্রায় বিরোধীশূন্য অবস্থায়। কংগ্রেস ফিকে হয়ে গেছে, বিজেপি সেই জায়গায় উঠে এসেছে। উঠে আসার পিছনে নবীন স্বয়ং। ১৯৯৭ সালে জনতা দল ভেঙে বেরিয়ে নতুন দল গঠন করেই তিনি এনডিএ-তে যোগ দেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হয়ে যান। ওড়িশায় ক্ষমতা দখলও করেন বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধেই। ২০০৯ লোকসভা ভোটের আগে বিজেপির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ তুলে এনডিএ ত্যাগ করলেও সংসদে বড় বড় ইস্যুতে নবীনের দলের সাংসদরা কখনো বিজেপির বিরুদ্ধাচরণ করেননি। জাতীয় রাজনীতি নিয়ে নবীন প্রায় কথাই বলেন না। বিজেপিও, কোনো অজ্ঞাত কারণে, অন্যান্য রাজ্যে ক্ষমতা দখল করার জন্যে যতখানি আক্রমণাত্মক হয়েছে, ওড়িশায় আজও হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ বা দক্ষিণ ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর মত কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা আটকে দিয়েছে বলেও চট করে শোনা যায় না। প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধে ওড়িশা সরকার আন্তর্জাতিক মানের কাজ করেছে। তবে ওড়িশায় আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে শিল্প-টিল্প দিব্যি হয়, স্কুলে মিড ডে মিল দেওয়ার টাকা থাকে না, শিক্ষকরা উপযুক্ত পারিশ্রমিক পান না, তা নিয়ে আন্দোলনও করেন। এদিকে সরকার ভুবনেশ্বরে ঝাঁ চকচকে হকি স্টেডিয়াম বানায়, ভারতীয় হকি দলের স্পনসর হয়। অন্যান্য অবিজেপিশাসিত রাজ্যে এমন হলে গোদি মিডিয়া সে রাজ্যের সরকারকে তুলে আছাড় মারে। ওড়িশাকে কিন্তু দেখতেই পায় না। ওই রাজ্যে লোকসভার বছরেই বিধানসভা নির্বাচন হয়। ২০১৪ আর ২০১৯ – দুবারই দেখা গিয়েছিল বিধানসভায় বিজেডি হইহই করে জিতেছে আর লোকসভায় বিজেপি বেশ কয়েকটা আসন পেয়েছে।

এতদিন এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চালিয়ে হঠাৎ এবার ভোটের আগে কোনো কারণে নবীন বুঝতে পেরেছেন, তাঁর অজান্তেই তাঁর রাজ্য বিজেপির গ্রাসে চলে যাচ্ছে। তাই আসন সমঝোতার কথাবার্তা চালিয়েও শেষ মুহূর্তে আলাদা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে নেতাদের বিজেপি গমন কিন্তু ঠেকাতে পারেননি। নবীনের দলের বেশ কয়েকজন বিধায়ক এবং অন্যান্য নেতা বিজেপিতে চলে গেছেন। তার মধ্যে একজন ছবারের সাংসদ, আরেকজন পদ্মশ্রী প্রাপ্ত আদিবাসী নেত্রী। ভোটের ফল বেরোলেই বোঝা যাবে নবীন ঘর সামলাতে পারলেন, নাকি নীতীশের মত অবস্থা হল।

তেলুগু দেশম, ওয়াইএসআর কংগ্রেস
ব্রিগেডের যে সভায় ফারুক আবদুল্লা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেই সভায় চন্দ্রবাবু নাইডুও ছিলেন। তেলুগু দেশমের জন্মও কংগ্রেসবিরোধিতার মধ্যে দিয়ে, ইন্দিরার আমলে। জন্মদাতা ছিলেন চন্দ্রবাবুর শ্বশুরমশাই, তেলুগু সিনেমার এককালের জনপ্রিয় নায়ক, এন টি রামারাও। তাঁর মতই চন্দ্রবাবুও জাতীয় স্তরে তৃতীয় শক্তির অন্যতম নেতা হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ১৯৯৯ সালে কেন্দ্রে বাজপেয়ীর পাকাপোক্ত সরকার হতেই চন্দ্রবাবুর কংগ্রেসবিরোধিতা বিজেপিবিরোধিতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া তিনিও নবীনের মত ‘উন্নয়নমুখী’ মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের। অতএব কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতে যাবেন কেন? বিশ্বায়নের প্রথম যুগে শহরে মাখনের মত রাস্তা আর গাদা গাদা তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পকেই যারা উন্নয়ন মনে করে তাদের মতে দেশের সেরা মুখ্যমন্ত্রীদের একজন ছিলেন চন্দ্রবাবু। কিন্তু সে মলাট ছিঁড়তে বেশি সময় লাগেনি। অন্ধ্রের গ্রামে যে উন্নয়নের আলো বিশেষ পৌঁছয়নি তা বোঝা যায় ২০০৪ সালে তাঁর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মধ্যে দিয়ে। তার একবছর আগেই একটুর জন্যে প্রাণে বেঁচেছেন। পিপলস ওয়ার ল্যান্ডমাইন পেতে রেখেছিল তাঁর জন্যে।

২০১৪ সালে তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হয়ে যাওয়ার পর অন্ধ্রপ্রদেশের প্রথম নির্বাচনে বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় ফেরেন চন্দ্রবাবু। কিন্তু ২০১৮ সালে বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যায় কেন্দ্র অন্ধ্রকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা না দেওয়ায়। ২০১৯ সালে চন্দ্রবাবুর তেলুগু দেশম কংগ্রেস এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জোট করে হেরে যায় জগন্মোহন রেড্ডির নতুন দল ওয়াইএসআর কংগ্রেসের কাছে।

জগনের উত্থানও কংগ্রেসের বিরোধিতা করেই। অবিভক্ত অন্ধ্রে চন্দ্রবাবুর পরেই মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ওয়াই এস রাজশেখর রেড্ডি। ২০০৯ সালে কপ্টার দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। জগন সোজা বাবার চেয়ারে বসতে চেয়েছিলেন। কংগ্রেস হাইকমান্ড সে গুড়ে বালি দেওয়ায় নিজেই দল খুলে ফেলেন। ইনিও কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার লোক নন। তাই বিজেপির সঙ্গে জোট না থাকলেও বেশ মিষ্টিমধুর সম্পর্ক ছিল। সংসদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিলের ভোটাভুটিতে জগনের দল সরকারের পক্ষেই ভোট দিয়ে এসেছে। অন্ধ্রে বিজেপি এখনো ক্ষমতাসীন দলকে চিন্তায় ফেলে দেওয়ার মত শক্তি নয়। সেখান থেকে তাদের কোনো সাংসদ নেই। অনেকে ভেবেছিলেন বিজেপি তুলনায় শক্তিশালী জগনকেই এনডিএ-তে চাইবে। কিন্তু সকলকে অবাক করে কদিন আগেই দুর্নীতির মামলায় হাজতবাস করা চন্দ্রবাবুকে বেছে নিয়েছে বিজেপি, সঙ্গে থাকছে জন সেনা পার্টি।

চন্দ্রবাবু এনডিএ-তে ফিরে যাওয়ার যুক্তি হিসাবে বলেছেন, জগনের অপশাসন থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে রাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্য লাগবে। বিজেপি কেন জগনকে হতাশ করে তাঁকে বেছে নিল তা খোলসা করেনি। হতে পারে রাজ্য সরকার তাঁকে হাজতবাস করানোয় তিনি ভোটারদের সহানুভূতি পাবেন বলে বিজেপির বিশ্বাস। তবে এতে যা হল, তা হচ্ছে এতদিন সুসম্পর্ক বজায় রাখায় জগনের বিজেপির প্রতি আক্রমণ ভোঁতা হয়ে গেল। অন্যদিকে চন্দ্রবাবু ভাল ফল করলেও বিজেপির অবাধ্য হতে পারবেন না।

ভারত রাষ্ট্র সমিতি
তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হওয়ার পিছনে তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতির (এখন ভারত রাষ্ট্র সমিতি) এবং তাদের সর্বোচ্চ নেতা কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই সুবাদে পরে তারা তেলেঙ্গানায় বিধানসভা নির্বাচন জেতে এবং কেসিআর মুখ্যমন্ত্রী হন। তবে তার আগেই ২০০৯ সালে অবিভক্ত অন্ধ্রের ভোটে তেলুগু দেশম ও বিজেপির সঙ্গে জোট করেছিল বিআরএস। যদিও রাজ্য আলাদা হওয়ার আগে দলটা বলার মত নির্বাচনী সাফল্য পায়নি। বিজেপি কিন্তু কেসিআরের হাত ধরে ঢুকে পড়তে পেরেছে ওই রাজ্যে। ২০২০ সালে রাজধানী হায়দরাবাদের পৌর নির্বাচনে বিজেপি সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হয়। তখন মনে করা হয়েছিল তেলেঙ্গানায় বিআরএসকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিজেপি ক্ষমতা দখল করবে। শেষপর্যন্ত তা হয়নি এবং কংগ্রেস অনেক পিছন থেকে শুরু করেও জয়ী হয়। তবে বিজেপির ভোট শতাংশ আগেরবারের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। প্রশান্ত কিশোরের মত কেউ কেউ আবার মনে করছেন, লোকসভায় তেলেঙ্গানায় দুই বা এক নম্বরে থাকবে বিজেপি। স্পষ্টত, নিজেদের রাজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকা, বিজেপিকে বিশেষ আক্রমণ না করার সুবিধা বিআরএস পায়নি। বিজেপিই পেয়েছে।

জনপ্রিয় সাংসদ বন্ডি সঞ্জয় কুমারকে নির্বাচনের কয়েক মাস আগে রাজ্য বিজেপির প্রধান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ভোটের সপ্তাহখানেক আগে কংগ্রেস নেতাদের বাড়িতে ইডি হানা থেকে অনেকেরই সন্দেহ হয়েছিল যে বিজেপি বিআরএসকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইছে না। চাইছে কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসা আটকাতে। একে বিআরএসের সাময়িক লাভ বলে ভাবা যেতে পারে। তবে ‘দ্য ওয়্যার’ ওয়েবসাইটের এক প্রতিবেদন বলছে, তেলেঙ্গানা বিজেপির নেতারা চেয়েছিলেন কেসিআরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার করা হোক। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তা হতে দেননি। কেসিআরের মেয়ে কে কবিতাকে দিল্লির মদ কেলেঙ্কারিতে গ্রেফতার করা হোক – এটাও তখনই তাঁদের দাবি ছিল, কান দেওয়া হয়নি। সেই গ্রেফতারি হল লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে। অর্থাৎ বিআরএস এখন পুরোপুরি বিজেপির কবজায়।

শিবসেনা, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি
শোলে ছবির জয় আর বীরুর বন্ধুত্ব কোনোদিন ভেঙে যেতে পারে একথা কল্পনা করাও কঠিন। তার চেয়েও কঠিন ছিল বিজেপির সঙ্গে শিবসেনার বিচ্ছেদ কল্পনা করা। কিন্তু সেটাও হয়ে গেল মহারাষ্ট্রে গত বিধানসভা নির্বাচনের পর। সংঘ পরিবারের বাইরে বালাসাহেব ঠাকরে প্রতিষ্ঠিত এই দলটার সঙ্গেই বিজেপির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ভাবনার মিল ছিল সবচেয়ে বেশি। ফলে রামমন্দির আন্দোলন থেকে শুরু করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি – সমস্ত আদর্শগত ব্যাপারেই শিবসেনার সমর্থন উপভোগ করে এসেছে বিজেপি। মহারাষ্ট্রে একসঙ্গে সরকারও চালিয়েছে। কিন্তু ঠাকরের মৃত্যুর পর দলের কর্তৃত্ব নিয়ে তাঁর ছেলে উদ্ধব আর ভাইপো রাজের মধ্যে কোন্দলে সব গোলমাল হয়ে গেল। দেখা গেল হাবভাবে, আক্রমণাত্মক কথাবার্তায় বালাসাহেবের সঙ্গে তাঁর ছেলের চেয়ে ভাইপোরই মিল বেশি। উদ্ধব তুলনায় নরম। কিন্তু বিস্তর দড়ি টানাটানির পরে উদ্ধবই কর্মীবাহিনীকে নিজের দিকে টেনে রাখতে সফল হলেন। তাই মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা তৈরি করে রাজ এককোণে পড়ে রইলেন (এবার অবশ্য আবার তাঁর ডাক পড়েছে), বিজেপি উদ্ধবকেই আপন করে নিল।

কিন্তু নীতীশ কুমারের মত উদ্ধবও ২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পরে টের পেলেন, মোদী-শাহের বিজেপি তাঁর উপর ছড়ি ঘোরাতে চাইছে। তাই জোট ভেঙে দিয়ে কংগ্রেস আর শরদ পাওয়ারের ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির হাত ধরে মুখ্যমন্ত্রী হলেন। যে কল বিজেপি বহু রাজ্যে করে থাকে, সেই কল করেই এভাবে তুলে আছাড় মারবেন উদ্ধব তা বিজেপি নেতারা ভাবেননি। কিন্তু এই অপমানের শোধ না তুলে ছেড়ে দেওয়ার লোক মোদী-শাহ নন। তাই তিন বছরের বেশি চলতে পারল না উদ্ধবের সরকার। তাঁরই দলের বেশকিছু বিধায়ককে ভাঙিয়ে নিয়ে, রাজ্যপালের বদান্যতায় একনাথ শিন্ডেকে সাক্ষী গোপাল মুখ্যমন্ত্রী করে সরকার গড়ে ফেললেন বিজেপি নেতা এবং মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ। সেখানেই শেষ নয়। বালাসাহেবের উত্তরাধিকারীর হাত থেকে শিবসেনার প্রতীক তীর ধনুকটা পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। শিন্ডেদের দলত্যাগ বিরোধী আইনে শাস্তি হওয়া দূরে থাক, আইনত তাঁরাই আসল শিবসেনা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন। উদ্ধবের ডান হাত সঞ্জয় রাউতকে বেশ কিছুদিন হাজতবাস করতে হয়েছে।

কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করার পরে আজকাল উদ্ধবের দলেরা নেতারা এবং তাঁর ছেলে আদিত্য বেশ ধর্মনিরপেক্ষ গোছের কথাবার্তা বলেন। তাতে সততা কতটা আর অস্তিত্বের সংকট কতটা কে জানে? তবে তরুণরা শিবসেনাকে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে দেখে, এক মঞ্চে রাহুল গান্ধী আর উদ্ধবকে বক্তৃতা দিতে দেখে যতই অবাক হোন না কেন, প্রবীণদের ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে শিবসেনার উত্থান কংগ্রেসেরই মদতে। উদ্দেশ্য ছিল মুম্বাইয়ের ট্রেড ইউনিয়নগুলোতে প্রবল শক্তিশালী বামপন্থীদের একেবারে শারীরিকভাবে শেষ করে দেওয়া। তারই অঙ্গ হিসাবে বালাসাহেব ‘মারাঠি মানুস’ তত্ত্ব খাড়া করেন অন্য রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের কোণঠাসা করতে। বামপন্থীদের নিকেশ করতে সফল হয়েছিল বলেই মহারাষ্ট্রের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল শিবসেনা। বিজেপিকেও দীর্ঘকাল বালাসাহেবের মর্জি মত চলতে হয়েছে। কিন্তু যে কোনো কাল্টের যা হয়, তাঁর মৃত্যুর পর শিবসেনারও তাই হয়েছে। উদ্ধবের তাই আপাতত ইন্ডিয়া ব্লকের সদস্য হয়ে প্রগতিশীল হওয়ার চেষ্টা করা ছাড়া উপায় নেই। একনাথ মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারটা পেয়েছেন বটে, কিন্তু প্রত্যেক অনুষ্ঠানে বা সাংবাদিক সম্মেলনেই বিজেপি টের পাইয়ে দেয় যে তিনি ঠুঁটো জগন্নাথ। মানে একদা মুম্বাই শাসন করা শিবসেনা বিজেপির ছোঁয়ায় এখন দ্বিখণ্ডিত এবং বিপন্ন।

অবশ্য উদ্ধবের চেয়েও করুণ অবস্থা মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শরদ পাওয়ারের। তিনি কেবল নিজের রাজ্যের প্রবীণতম নেতাই নন, কংগ্রেসের জাতীয় স্তরের ডাকসাইটে নেতা ছিলেন। দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন একসময়, লোকসভায় বিরোধী দলনেতাও। ভারতের ক্রিকেট বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের শীর্ষ পদেও আসীন ছিলেন। মহারাষ্ট্রে তাঁর বিপুল সম্পত্তি এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তৃণমূল স্তরে একসময় দারুণ জনপ্রিয়তা ছিল। এমন অমিত ক্ষমতাধর শরদকে একেবারে ক্ষমতাহীন করে দিয়েছে তাঁর পুরনো সঙ্গী বিজেপি। বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে মহারাষ্ট্রে সরকার চালিয়েছে পাওয়ারের দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি)। ১৯৯৯ সালে কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত হওয়ার কারণটাও বেশ বিজেপিসুলভ। ‘বিদেশিনী’ সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্ব মেনে নিতে তাঁর আপত্তি ছিল। তিনি, প্রয়াত পূর্ণ সাংমা এবং তারিক আনোয়ার মিলে বহিষ্কৃত হওয়ার পর এই পার্টি গড়ে তোলেন। কথিত আছে এর পিছনে মহারাষ্ট্রের বিজেপি নেতা প্রমোদ মহাজনের হাত ছিল। তা সত্যি হোক আর না-ই হোক, ২০১৪-১৯ তাঁর দল যে মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল তা তো আর মিথ্যা নয়। আসলে বরাবরই ক্ষমতা যেখানে পাওয়ার সেখানেই থাকতে চেয়েছেন। যে সোনিয়ার জন্যে কংগ্রেস ছাড়লেন তাঁর সভাপতিত্বের কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারেই আবার মন্ত্রী হয়ে কাটিয়েছেন ২০০৪-১৪। কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকেই তাঁর সব হিসাব গুলিয়ে দিচ্ছে বিজেপি। তাঁর একসময়ের অনুগত নেতা ছগন ভুজবলকে টেনে নিয়েছে বিজেপি। চূড়ান্ত আঘাতটা অবশ্য এসেছে মাত্র কয়েকদিন আগে। শরদের ভাইপো অজিতকেও নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছে বিজেপি। দুর্নীতিতে অভিযুক্ত অজিতকে একেবারে উপমুখ্যমন্ত্রী করে দেওয়া হয়েছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মত শরদের পার্টির প্রতীকও কেড়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বলা হয়েছে অজিতের দলটাই নাকি আসল এনসিপি। তাই দলের প্রতীক অ্যালার্ম ঘড়ি তাঁরাই ব্যবহার করতে পারবেন, প্রতিষ্ঠাতা শরদের দলকে অন্য প্রতীকে লড়তে হবে।

অর্থাৎ ২০২৪ শরদের কাছেও অস্তিত্বের লড়াই। কী কুক্ষণে বিজেপির সঙ্গে ভাব করতে গিয়েছিলেন!

বিআরএসের সাময়িক লাভ বলে ভাবা যেতে পারে। তবে ‘দ্য ওয়্যার’ ওয়েবসাইটের এক প্রতিবেদন বলছে, তেলেঙ্গানা বিজেপির নেতারা চেয়েছিলেন কেসিআরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার করা হোক। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তা হতে দেননি। কেসিআরের মেয়ে কে কবিতাকে দিল্লির মদ কেলেঙ্কারিতে গ্রেফতার করা হোক – এটাও তখনই তাঁদের দাবি ছিল, কান দেওয়া হয়নি। সেই গ্রেফতারি হল লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে। অর্থাৎ বিআরএস এখন পুরোপুরি বিজেপির কবজায়।

ডিএমকে, এআইএডিএমকে
এই তালিকায় বিজেপির সঙ্গে সবচেয়ে কম সময়ের সম্পর্ক সম্ভবত তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমের (ডিএমকে)। তামিলনাড়ুর রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরে আবর্তিত হচ্ছে দুই দ্রাবিড় ভাবাদর্শের দল ডিএমকে আর অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমের (এআইএডিএমকে) মধ্যে। ১৯৯৮ সালে তৈরি হওয়া বাজপেয়ী সরকারেরও শরিক ছিল জয়ললিতার নেতৃত্বাধীন এআইএডিএমকে। কিন্তু সেই সরকার পড়ে যায় জয়ললিতা সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ায়। দাবি ছিল, তাঁর বিরুদ্ধে আয়কর সংক্রান্ত মামলাগুলো প্রত্যাহার করাতে হবে এবং তামিলনাড়ুর ডিএমকে সরকার ফেলে দিতে হবে। দাবি না মেটানোয় জয়ললিতা সরকার তো ভেঙে দিলেন বটেই, ১৯৯৯ সালের ভোটে উল্টে ডিএমকে নেতা এম করুণানিধি জোট করে ফেললেন বিজেপির সঙ্গে।

আজ করুণানিধির নাতি দয়ানিধি স্ট্যালিনের মুখে যে সনাতন ধর্মবিরোধী, বর্ণবাদবিরোধী কথাবার্তা বিজেপির গাত্রদাহের কারণ – সেগুলো নতুন কিছু নয়। ওই ভাবাদর্শই ডিএমকে-র ভিত্তি। সেদিক থেকে একেবারে বিপরীত মেরুতে দাঁড়ানো বিজেপির সঙ্গে কেন জোট করেছিলেন করুণানিধি, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। হয়ত তিনি ভেবেছিলেন, কেন্দ্রের সরকারের সঙ্গে বিবাদ করে সরকার টিকিয়ে রাখা মুশকিল হবে। কারণ তামিলনাড়ুতে কোনো পক্ষেরই দুর্নীতি কিছু কম ছিল না। জয়ললিতা ২০০১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে দুর্নীতির মামলায় ৭৮ বছর বয়সী করুণানিধিকে রাত দুটোর সময়ে গ্রেফতারও করিয়েছিলেন। কথিত আছে যে ২০০২ সালের গুজরাট গণহত্যার পর থেকেই ডিএমকে বিজেপির সঙ্গে জোট নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগছিল, কারণ তাদের সমর্থকদের উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলমান আর খ্রিস্টান। শেষমেশ ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে ডিএমকে এনডিএ ত্যাগ করে।

এআইএডিএমকে কিন্তু বারবার বিজেপির কাছে ফিরে গেছে। ১৯৯৯ সালে জোট ভেঙে দেওয়ার পর আবার ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেই তামিলনাড়ুতে বিজেপি-এআইএডিএমকে জোট হয়। কিন্তু সেই জোট শূন্য পায়, বিজেপি অবিলম্বে জোট ভেঙে দেয়। ২০১৬ সালে জয়ললিতার মৃত্যুর পরে যখন এআইএডিএমকে নেতৃত্ব দিশেহারা, তখন আবার বিজেপির সঙ্গে জোট বাঁধে। কিন্তু তাতেও বিজেপি শূন্যের গেরো কাটাতে পারেনি, এআইএডিএমকে জেতে মাত্র একটা আসন। তবু ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত এই জোট বজায় ছিল। গতবছর মে মাস নাগাদ এআইএডিএমকে মনে করতে থাকে বিজেপির সঙ্গে থাকলে তাদের ক্ষতি হচ্ছে। এআইএডিএমকে নেতা সি পোন্নাইয়ান প্রকাশ্যে বলে দেন যে বিজেপি এআইএডিএমকের ক্ষতি করে নিজেদের সংগঠন বাড়াচ্ছে।

তারপরেও হয়ত জোট ভাঙত না। কিন্তু তামিলনাড়ু বিজেপির প্রধান কে আন্নামালাই গত এক বছরে পরপর এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা এআইএডিএমকে সহ্য করলে তামিল দল হিসাবে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতায় আঘাত লাগত। আন্নামালাই প্রথমে এক সাক্ষাৎকারে বলেন তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীরা সব আদালতের হাতে শাস্তিপ্রাপ্ত এবং রাজ্যটা ভারতের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজ্যগুলোর অন্যতম। এআইএডিএমকে তখনই জেপি নাড্ডা আর অমিত শাহকে বলেছিল আন্নামালাইকে থামাতে, কিন্তু বিজেপি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এরপর আন্নামালাই ডিএমকে প্রতিষ্ঠাতা সিএন আন্নাদুরাই সম্পর্কেও কিছু আপত্তিকর মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ। শেষমেশ ২৫ সেপ্টেম্বর এআইএডিএমকে এনডিএ ত্যাগ করে।

এখন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা যা বলছে তা এআইএডিএমকে-র জন্য আশাব্যঞ্জক নয়। বিজেপি যে খাতা খুলতে পারবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও, অনেকে বলছে তাদের ভোট শতাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ বিজেপির সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের মাসুল এখানেও দিতে হচ্ছে আঞ্চলিক দলটাকেই। বিজেপির প্রেমে পড়েছ কি মরেছ।

আরও পড়ুন ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত আলোচনা হয়েছে। এবার যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে ফিরে আসি – আম আদমি পার্টি। আজ যেভাবে চক্রব্যূহে ফেলা হয়েছে দলটাকে, গণতন্ত্র নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবনা থাকলে যে কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলবেন। তবে তাদের আজ যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে তাও কিন্তু একার্থে আরএসএস-বিজেপির সঙ্গে আশনাইয়ের পরেই। ‘ইন্ডিয়া এগেনস্ট করাপশন’ বলে যে সংগঠন থেকে আপ দলের উদ্ভব, তার পিছনে কারা ছিল তা এখন অনেকটা পরিষ্কার। রামলীলা ময়দানের সেই দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের গুরু হয়ে বসেছিলেন যে আন্না হাজারে, তাঁর স্বরূপও উদ্ঘাটিত হয়েছে ২০১৪ সালের পর থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে বিরাট বিরাট স্মার্ট দুর্নীতির অভিযোগে নীরবতা এবং সম্প্রতি কেজরিওয়ালের গ্রেফতারি সমর্থন করা থেকে। কিরণ বেদির মত মানুষের আসল চেহারাও দেখা গেছে।

তবে হ্যাঁ। সংঘ পরিবারের প্রেমে নানাভাবে সিক্ত দল এবং ব্যক্তিদের ইতিহাস কাজে লাগবে তখনই, যদি ভারতের গণতন্ত্র বাঁচে। নইলে এরা তো স্বখাতসলিলে ডুববেই, এদের বিচার করার মতও কেউ থাকবে না।

পিপলস রিপোর্টারে প্রকাশিত

চাপা পড়া গার্ডেনরিচ খুঁড়ে যা বেরোল

বাঙালি ভদ্রলোকদের মধ্যে গার্ডেনরিচ আর রাজাবাজারকে জনান্তিকে শাসনের অযোগ্য এলাকা বলা বহুদিন ধরেই চালু। ইদানীং হিন্দুত্বের হাওয়া খেয়ে ফুরফুরে মেজাজে সেসব প্রকাশ্যে বলা আরম্ভ হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম ভূপতিনগরে এনআইএ আধিকারিকদের আক্রান্ত হওয়া এবং স্থানীয় তৃণমূল নেতার স্ত্রীর পালটা শ্লীলতাহানির অভিযোগ (মুখ্যমন্ত্রী যে অভিযোগে সিলমোহর দিয়েছেন) নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তা বাদে পশ্চিমবঙ্গের ৪২ লোকসভা আসনেই প্রায় সব দলের প্রার্থী ঘোষণা হয়ে গেছে, তা নিয়েও হইচই তুঙ্গে। ফলে গার্ডেনরিচে বাড়ি চাপা পড়ে যাওয়া মানুষগুলোর স্মৃতিও চাপা পড়ে গেছে। আর কে গ্রেফতার হল ওই কাণ্ডে, শেষমেশ কাউন্সিলর না কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নাকি মেয়র-ইন-কাউন্সিল – কে অতগুলো মৃত্যুর দায়িত্ব স্বীকার করলেন তা আর আমরা জানতে পারছি না। সম্ভবত আর কোনোদিন পারবও না। যদি নির্বাচনের পর কলকাতায় আবার কোনো বেআইনি নির্মাণ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে, তাহলে আলাদা কথা। তা এই চাপা পড়ে যাওয়া গার্ডেনরিচ কাণ্ড নিয়ে কিছু কুচিন্তা কিছুতেই মন থেকে যাচ্ছে না। এই চিন্তাগুলো আসন্ন নির্বাচনে হয়ত অপ্রাসঙ্গিক (কোন বিষয়গুলোর ভিত্তিতে মানুষ ভোট দেন তা অনুমান করতে গিয়ে আজকাল তো পোড়খাওয়া ব্যক্তিদেরও ঘোল খেয়ে যেতে দেখা যায়; আমি কোন ছার), কিন্তু বাংলার মানুষের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জরুরি বলেই মনে হয়।

সাধারণত তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো নেতা, মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কুকর্মের অভিযোগ উঠলেই দল যা করে তা হল আগেভাগে তাঁকে নির্দোষ বলে দেওয়া। গোটা ব্যাপারটাকেই চক্রান্ত বলে দেগে দেওয়া। অনুব্রত মন্ডল থেকে শাহজাহান শেখ পর্যন্ত সকলের ক্ষেত্রেই তাই করা হয়েছে। বড়জোর তৃণমূলের মুখপাত্ররা বলেন – আইন আইনের পথে চলুক। ব্যাপারটা তো প্রমাণসাপেক্ষ। কেউ দোষ করে থাকলে দল তার পাশে দাঁড়াবে না। সাম্প্রতিককালে এর ব্যতিক্রম অবশ্য ঘটেছে। বিশেষ করে নিয়োগ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত অনেকের সঙ্গে যোগাযোগই তৃণমূল বেমালুম অস্বীকার করেছে। কিন্তু তারা সব চুনোপুঁটি। রাঘব বোয়ালদের মধ্যে একমাত্র প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জির ক্ষেত্রেই তৃণমূল উলটো পথ নিয়েছিল। বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকার অযোধ্যা (পাহাড়) উদ্ধার হওয়ার অব্যবহিত পরেই তাঁকে দলের মহাসচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, পরবর্তীকালে মন্ত্রিসভা থেকেও। এমনকি তাঁর দুর্নীতির দায়ও দল সত্বর নিজের গা থেকে ঝেড়ে ফেলেছিল। বলা হয়েছিল, তিনি যদি ঘুষ নিয়ে থাকেন তাহলে ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন। দল বা মুখ্যমন্ত্রী এর বিন্দুবিসর্গ জানতেন না। পার্থ যে দলের আর পাঁচজন অভিযুক্তের মত নন, তা বারবার পরিষ্কার হয়ে গেছে। দলের বাকি যে নেতারা বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত, তাদের সম্পর্কে কথা বলার সময়ে মমতা ব্যানার্জি বা অভিষেক ব্যানার্জির মূল সুরটা থাকে এইরকম, যে তারা আসলে নির্দোষ। স্রেফ তৃণমূল করে বলে বিজেপি কেন্দ্রীয় সংস্থা দিয়ে তাদের হয়রান করাচ্ছে। যেমন অনুব্রত সম্পর্কে অভিষেক দিনদুয়েক আগেও বলেছেন ‘অনুব্রতই যদি আজ বিজেপিতে চলে যেতেন, ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে যেতেন। বিজেপিতে যাননি, তাই জেল খাটছেন।’ মুখ্যমন্ত্রী তো একাধিকবার বলেছেন ‘কেষ্ট’ যখন ফিরে আসবে তখন তাকে বীরের সম্মান দেওয়া হবে। পার্থ কিন্তু দলের এমন সমর্থন পাননি। বহুকাল হল তাঁর নাম পর্যন্ত শোনা যায় না মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর ভাইপোর মুখে। গার্ডেনরিচ কাণ্ডের পর দেখা গেল সেখানকার বিধায়ক তথা নগরোন্নয়ন মন্ত্রী এবং কলকাতার মেয়র ফিরহাদ (ববি) হাকিমও একলা পড়ে গেছেন।

গতমাসের তৃতীয় সপ্তাহে গার্ডেনরিচ কাণ্ড ঘটার ঠিক পরেই মমতা স্বয়ং এলাকায় গিয়েছিলেন এবং হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু সংবাদমাধ্যমকে যা বলেন তাতে ববি হাকিমকে আড়াল করার কোনো চেষ্টা ছিল না। তৃণমূলের দু নম্বর নেতা অভিষেক তো আদৌ ওমুখো হননি। গোটা রাজ্যের সংবাদমাধ্যম এবং বিরোধীরা যখন বেআইনি নির্মাণ নিয়ে ববিকে সঙ্গত কারণেই অভিযুক্ত করছেন, তখন তৃণমূল যেভাবে অনুব্রত বা শাহজাহানের মত জেলা স্তরের নেতার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেভাবে ববির পাশে দাঁড়ায়নি। টিভি স্টুডিওতেও তৃণমূলের মুখপাত্ররা কেবল বনলতা সেনগিরি করছিলেন। অর্থাৎ বামফ্রন্ট আমলেও বেআইনি নির্মাণ হত এবং ভেঙে পড়ত (শিবালিক অ্যাপার্টমেন্টের বারংবার উল্লেখ সমেত) – এই ছিল তাঁদের সার কথা। ববি নিজে আবার ব্যস্ত ছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলরকে বাঁচাতে। তা করতে গিয়ে কর্পোরেশনের ইঞ্জিনিয়ারদের ঘাড়ে পর্যন্ত দোষ চাপিয়েছেন। কিন্তু দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নীরব ছিলেন। তেরোজন মানুষের মৃত্যুর পরেও এই নীরবতার একটা ব্যাখ্যা অবশ্যই বিষয়টাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া। কিন্তু অন্য দিক থেকে ভাবলে, দলের অতি গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা প্যাঁচে পড়েছেন দেখেও তাঁর পক্ষ নিয়ে সোচ্চার না হওয়ার ব্যাখ্যা কী? একটা ব্যাখ্যা অবশ্যই পার্থ আর ববির মিল থেকে পাওয়া যায়। লুকিয়ে চুরিয়ে নয়, প্রকাশ্যেই তৃণমূলের প্রবীণদের সঙ্গে অভিষেকের নেতৃত্বাধীন নবীনদের সংঘাত হয়েছিল গতবছর। পার্থ, ববি দুজনেই প্রবীণ শিবিরের লোক – অভিষেকের অপছন্দের লোক। সেই সংঘাতে প্রবীণদের একেবারে সামনের সারিতে ছিলেন ববি। অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির উপর নজর রাখা যে কোনো মানুষ জানেন শাসক দলে এখন অভিষেকের অনুগামীদের পাল্লা ভারি। এতটাই ভারি যে আরেকটু হলে প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের টিকিট ফস্কে যাচ্ছিল। স্বভাবতই পার্থর মত, কোণঠাসা ববির পাশেও দল দাঁড়ায়নি।

কেউ বলতেই পারেন, তাঁকে তো মেয়র পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি। তেমন দাবিকে পাত্তাও দেওয়া হয়নি। তাহলে দল পাশে দাঁড়ায়নি কী করে বলা যায়? প্রশ্নটা খুব বুদ্ধিমানের মত হবে না। কারণ একটা বেআইনি ফ্ল্যাটবাড়ি ভেঙে পড়েছে বলে মেয়রকে বরখাস্ত করলে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যেত লোকসভা নির্বাচনের মুখে। প্রথমত, বিরোধীদের কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ স্বীকৃতি পেয়ে যেত। দ্বিতীয়ত, শিশুরাও জানে যে সত্যি সত্যি একা ববির অঙ্গুলিহেলনে কলকাতায় বেআইনি নির্মাণ, পুকুর ভরাট করে ফ্ল্যাট তৈরি ইত্যাদি চলে না। তিনি বড়জোর তাঁর দুটো বড় বড় পদাধিকার বলে ব্যাপারটায় পৌরোহিত্য করেন। সুতরাং এই সময়ে চটালে তিনি রেগেমেগে মুখ খুলে ফেলতে পারতেন, তাতে তৃণমূলের বিপদ বাড়ত বই কমত না। উপরন্তু তাঁকে ঘিরে যে চক্র, যাকে সংবাদমাধ্যমের মান্য ভাষায় বলা যায় ‘ইলেকশন মেশিনারি’, তাও তৃণমূলের হাত থেকে পিছলে যেতে পারত। গোটা রাজ্যের বেআইনি প্রোমোটিং ব্যবসায়ীদের কাছে যে বার্তা যেত সেকথা না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল। ভোটের বাজারে টাকার জোগানের কী হত সেকথাও না হয় থাক। নির্বাচনী বন্ড তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। অভিষেকের ববিকে যতই অপছন্দ হোক, দলের নির্বাচনী স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে লবিবাজি করার মত বোকা রাজনীতিবিদ অবশ্যই মমতার ভাইপো নন। ফলে ওটাকে পাশে দাঁড়ানো বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। পাশে দাঁড়ানো মানে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বিরোধীদের এবং জনগণকে প্রকাশ্য বার্তা দেওয়া, যে যাকে আক্রমণ করা হচ্ছে আমরা তার পাশে আছি। অনুব্রতদের ক্ষেত্রে বারবার যা করা হয়।

ববির ক্ষেত্রে তা না করা কি শুধুই দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে? সেই প্রশ্নটাই আরেকটু তলিয়ে দেখা যাক। কেবল তৃণমূল নয়, গার্ডেনরিচ কাণ্ড নিয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যম আর বিরোধী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া নিয়েও আরেকটু কাটাছেঁড়া করা যাক। কারণ আজকের ভারতে প্রায় কোনোকিছুই কোনো লুকনো এজেন্ডা ছাড়া করা হচ্ছে না। তাই এখন ‘সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে’। না দেখে উপায় নেই।

গার্ডেনরিচ ছাড়া যখন বাংলা সংবাদমাধ্যমে আর কোনো খবর ছিল না, সেইসময় একদিন এবিপি আনন্দের সান্ধ্য জটলায় তৃণমূল প্রতিনিধির বনলতা সেনগিরির জবাবে সিপিএম প্রতিনিধি শতরূপ ঘোষ বলেন, যে বামফ্রন্ট আমলেও কলকাতায় বেআইনি নির্মাণ হয়েছে – একথা বলে তৃণমূল পার পেতে পারে না। কারণ সে আমলেও দীর্ঘদিন কলকাতা কর্পোরেশন তৃণমূল চালিত ছিল। উপরন্তু ২০১০ সাল থেকে টানা ১৪ বছর তৃণমূলই কর্পোরেশন চালিয়েছে। মজার ব্যাপার ঘটে এরপর। সঞ্চালক সুমন দে শতরূপকে সমর্থন করলেন, কিন্তু সেই সূত্রে তৃণমূলের আর যে নেতারা কলকাতার মেয়র ছিলেন – সুব্রত মুখার্জি বা শোভন চট্টোপাধ্যায় – তাঁদের আমলে বেআইনি নির্মাণ কতটা কী হয়েছিল সেসব তথ্য তুলে ধরলেন না। ইদানীং প্রায় সব বাংলা খবরের চ্যানেলেই কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথের কবিতার লাইন, নজরুল বা সুকুমার রায়ের কবিতার লাগসই লাইন উদ্ধৃত করে রসবোধের পরিচয় দেন অতি বুদ্ধিমান সঞ্চালকরা। সুদূর অতীতের নানা তথ্যও তাঁদের হাতের কাছে সাজিয়ে দেয় রিসার্চ টিম। অথচ আগের দুই মেয়রের আমলে কী অবস্থা ছিল কলকাতার প্রোমোটিংয়ের – প্রায় দু সপ্তাহের বিতর্কে কোনো কাগজে বা টিভি চ্যানেলে এ নিয়ে একটি শব্দও দেখা গেল না। আশ্চর্য নয়? না সাংবাদিক, না বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা – কেউই ওসবের মধ্যে গেলেন না। পূর্ব কলকাতার জগদ্বিখ্যাত জলাভূমির কীভাবে বারোটা বাজানো হয়েছে সে আলোচনা রোজ হয়েছে। অথচ এমনভাবে আলোচনা হয়েছে যেন সবটাই ঘটেছে বর্তমান মেয়রের আমলে। ‘জল শোভন’ বলে পরিচিত পূর্বতন মেয়রকে সবাই যেন ভুলে গেছে। অথচ তাঁর বিবাহ বহির্ভূত প্রেম নিয়ে এই সংবাদমাধ্যমই ঘন্টার পর ঘন্টা খরচ করেছে অনতি অতীতে। তিনি কি সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে গেছেন বিজেপিতে চলে যাওয়ায়? কদিন আগে আবার তৃণমূলে ফিরেছিলেন না? পশ্চিমবঙ্গ অবশ্য অধুনা গেছোদাদাদের রাজ্য। কে যে কখন কোথায় আছেন বলা ঝুঁকিপূর্ণ। গুগলও সবসময় সঠিক তথ্য দিতে পারে না।

মোট কথা ববি কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত, মেয়রের পদে থাকার পক্ষে তিনি কতটা অযোগ্য তা প্রমাণ করতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা এবং সঞ্চালকরা চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু পর্যন্ত চলে গেলেন আর সাম্প্রতিককালের মেয়রদের কথা মনে পড়ল না – এ তো বড় রঙ্গ। এমন রঙ্গ কেন হল তা পরিষ্কার হতে অবশ্য সময় লাগেনি। মনে রাখতে হবে, গার্ডেনরিচের ঘটনা ঘটার আগে বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছিল সন্দেশখালি। সেখানে মূল অভিযুক্তের নাম শাহজাহান শেখ আর তার ভাইয়ের নাম আলমগীর। ফলে বিজেপি এবং রিপাবলিক বাংলার মত গর্বিত গোদি মিডিয়া যথেচ্ছ মুসলমানবিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছিল। ইতিহাসের কুখ্যাত লম্পটদের ধারা ভেঙে নিজের সম্প্রদায়ের মেয়েদের মায়ের চোখে দেখে, কেবলমাত্র হিন্দু মহিলাদের দিকেই হাত বাড়াত সন্দেশখালির তৃণমূলী দুষ্কৃতীরা – এই বয়ান ছড়িয়ে পড়েছিল। অগ্রাহ্য করা হচ্ছিল এই তথ্য, যে শাহজাহানের ডান হাত, বাঁ হাত দুজনেই হিন্দু – শিবু হাজরা আর উত্তম সর্দার।

ইতিমধ্যে গার্ডেনরিচে বেআইনি ফ্ল্যাটবাড়ি ভেঙে পড়ে মানুষের মৃত্যু। যারা গোদি মিডিয়া বলে পরিচিত নয়, তাদেরও মুখোশের আড়াল থেকে মুখ বেরিয়ে এল। সমস্ত আলোচনাই এমনভাবে হতে থাকল, যেন গোটা পশ্চিমবঙ্গে বা গোটা কলকাতায় একমাত্র গার্ডেনরিচেই ফ্ল্যাটের গায়ে ফ্ল্যাট লেগেছে। একমাত্র ওই এলাকার বাসিন্দারাই জেনে বুঝে পুকুর বোজানো জমিতে তৈরি হওয়া ফ্ল্যাট কেনেন, দুটো বাড়ির মাঝে যথেষ্ট জায়গা ছাড়া আছে কিনা সেসব দেখেন না। কেবল ওই এলাকার প্রোমোটাররাই যাবতীয় আইন ভাঙেন। কেন? সেকথা একদিন এক অধ্যাপক (যিনি ইদানীং রাজনৈতিক দলের মুখপাত্রদের থেকেও বেশি চেঁচামেচি করেন) বলেই দিলেন একটি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে। বললেন, একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের লোককে তোষণ করার জন্যে গার্ডেনরিচে যে যা খুশি আইন ভাঙলেও প্রশাসন কিচ্ছুটি বলে না। বিজেপির প্রতিনিধি দূরের কথা, স্টুডিওতে উপস্থিত বাম বা কংগ্রেস প্রতিনিধিও কথাটার প্রতিবাদ করলেন না। সুটবুট পরা বাবু সুমন দে তো বেশ জোরে জোরেই মাথা ঝাঁকালেন।

ঠিক কথা। আমরা তো জানি যে অমৃতকালের ভারতবর্ষের গার্ডেনরিচ এক ভয়ংকর অঞ্চল। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেন মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদের প্রশাসন, আইন, আদালত সকলেই হিন্দুদের চেয়ে বেশি ভালবাসে। তাই ওই সম্প্রদায়ের লোকেদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। অধ্যাপক, ব্যারিস্টার, পুলিসকর্তা, সেনাবাহিনীর অফিসার একেবারে গিজগিজ করছে। ওঁরাই তো দেশটা চালান আর কলকাতা তো চালান বটেই। কারণ কলকাতার মেয়র স্বয়ং ওই সম্প্রদায়ের লোক, ওই এলাকারই বিধায়ক। সেই মেয়রের এত ক্ষমতা যে মুখ্যমন্ত্রী মেয়র ঘোষিত নতুন পার্কিং ফি বাতিল করে দিতে পারেন। সেকথা আবার সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ, যিনি সরকার বা কর্পোরেশনের কেউ নন। কর্পোরেশনের সিদ্ধান্ত বাতিল করার সাংবিধানিক এক্তিয়ার মুখ্যমন্ত্রীর আছে কিনা সে প্রশ্নও কেউ তোলে না। মেয়রকে ঢোঁক গিলে মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত হজম করতে হয়।

যা-ই হোক, এভাবে ভালই চলছিল। খবরের কাগজ এবং সোশাল মিডিয়ার দৌলতে সকলের ঠোঁটস্থ হয়ে গিয়েছিল গার্ডেনরিচ এলাকায় ঠিক কতগুলো পুকুর বোজানো হয়েছে, কতগুলো ফ্ল্যাট কত ইঞ্চি ফাঁকের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে। এসব প্রকাশিত হওয়ায় গোটা রাজ্যের অসাধু প্রোমোটার এবং তাদের সঙ্গে শাসক দলের যোগসাজশ নিয়ে যেরকম অন্তর্তদন্ত হওয়া উচিত ছিল, তা কিন্তু হচ্ছিল না। বিরোধীরাও সে উৎসাহ দেখাচ্ছিলেন না। শুধু সন্ধে নামলেই বিষোদ্গার হচ্ছিল, কলকাতার সমস্ত বেআইনি নির্মাণ কেন ভেঙে ফেলা হচ্ছে না। তারপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। গার্ডেনরিচ এলাকাতেই একটি বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে গিয়ে বিরাট বাধার মুখে পড়লেন কর্পোরেশনের কর্মীরা এবং পুলিসবাহিনী। টিভির পর্দায় দেখানো হল, শেষপর্যন্ত সে বাড়ি না ভেঙেই তাঁদের ফিরে আসতে হচ্ছে। বড় বড় চোখে সুমন দে ও তাঁর অতিথিরা বিস্ময় প্রকাশ করলেন – কলকাতার এ কী ভয়ঙ্কর অবস্থা! মজার কথা, পর্দায় পরিষ্কার দেখানো হল, যিনি ভাঙতে না দেওয়ার পান্ডা, তিনি কর্পোরেশনের কর্মীদের কাছে দাবি করলেন ওই নির্মাণ অবৈধ নয়। তাঁর কাছে বৈধ কাগজপত্র আছে। কিন্তু সে কাগজ দেখালেন না। অথচ সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের বললেন, তাঁদের ফ্ল্যাট ভেঙে দেওয়া হচ্ছে কারণ তিনি বিজেপি করেন। মেয়রের বাইটও দেখানো হল। তিনি বললেন, বেআইনি নির্মাণ ভেঙে দেব বললেই ভাঙা যায় না। অনেক সমস্যা আছে। তার একটা ঝলকই আজ দেখা গেছে। তারপরে স্টুডিওতে কর্পোরেশনের এবং মেয়রের অনেক সমালোচনা হল, কিন্তু দুঁদে সাংবাদিক সুমন দে বিজেপির প্রতিনিধিকে একবারও জিজ্ঞেস করলেন না, কী মশাই? আপনাদের লোকই তো বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে দিচ্ছে না দেখা যাচ্ছে। এবার কী বলবেন? জানা কথা, বিজেপির প্রতিনিধি হয় ওই লোকটিকে বিজেপির প্রতিনিধি বলে স্বীকার করতেন না, নয়ত বলতেন ব্যাপারটা তো এখন আদালতের বিচারাধীন। দেখতে হবে পৌরসভা আসল দোষীদের বাড়ি বাঁচিয়ে নির্দোষ লোকের বাড়ি ভাঙছে কিনা। কিন্তু প্রশ্নটা কি সম্পাদকমশায়ের করা উচিত ছিল না? রিপাবলিক টিভির মত গর্বিত গোদি মিডিয়ার পাশে আনন্দবাজার গোষ্ঠী তো এখনো নিরপেক্ষ বলে পরিচিত। তারাও যে হাতে প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বিজেপির প্রতিনিধিকে ছাড় দিয়ে দিল গার্ডেনরিচ কাণ্ডে, তাতে একটা জিনিসই প্রমাণ হয়।

আরও পড়ুন বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে ইমাম রশিদি

গার্ডেনরিচ মুসলমানদের এলাকা। অতএব ওখানে কাউন্সিলর, প্রোমোটার মায় বাড়ি চাপা পড়ে মারা যাওয়া মানুষগুলো, সকলেই দুর্নীতিগ্রস্ত – এই ধারণা গেড়ে বসেছে সংবাদমাধ্যমের মনে। হয়ত আগে থেকেই বসেছিল, এখন সাহস পেয়ে প্রকাশ করা হচ্ছে। সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধরার মত ববি হাকিমকে আক্রমণও সেই কারণেই। স্টুডিওর জটলায় এ প্রশ্নও উঠেছে যে একই লোকের হাতে তিনটে পদ কেন? অথচ শোভন চাটুজ্জে মেয়র থাকার সময়ে এবং পরবর্তীকালে তাঁর মেয়র পদ নিয়ে যখন টানাপোড়েন চলছিল, তখন কেউ প্রশ্ন তোলেনি – উনি একইসঙ্গে বেহালার বিধায়ক আর কর্পোরেশনের মেয়র কেন? তাঁকে মেয়রের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরেও বাংলার এই সংবাদমাধ্যমগুলোই গদগদ ছিল তাঁর আর প্রেমিকা বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাচগান, কাশ্মীর ভ্রমণ দেখাতে। দুর্নীতি নিয়ে এত আলোচনা হয়, অথচ তখন শোভনের বিপুল সম্পত্তি নিয়েও কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি।

আসলে বাঙালি ভদ্রলোকদের মধ্যে গার্ডেনরিচ আর রাজাবাজারকে জনান্তিকে শাসনের অযোগ্য এলাকা বলা বহুদিন ধরেই চালু। ইদানীং হিন্দুত্বের হাওয়া খেয়ে ফুরফুরে মেজাজে সেসব প্রকাশ্যে বলা আরম্ভ হয়েছে। এমন নয় যে একা সুমন দে বা আনন্দবাজার গোষ্ঠী এই দোষে দুষ্ট। ভোটের বাজারে ফ্যাসিবিরোধী সভা সমাবেশে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানো এক সাংবাদিক যেমন কদিন আগে এক অনলাইন বিতর্কে বললেন, রাজাবাজারের অটোওলাদের দৌরাত্ম্যের কারণেই নাকি হিন্দুদের মনে মুসলমানদের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি হয় এবং বিজেপির কাজ সহজ হয়। অর্থাৎ গোটা রাজ্যের অন্য সব এলাকার হিন্দু অটোওলারা সুবোধ বালক। একমাত্র রাজাবাজারের মুসলমান অটোওলারাই ভীষণ দৌরাত্ম্য চালায় আরোহীদের উপর। ঠিক যেমন গোটা রাজ্যে আর কোথাও জলা জায়গা ভরাট করে বহুতল তৈরি হচ্ছে না, দুটো বাড়ির মধ্যে যতখানি ফাঁক থাকা উচিত তা অগ্রাহ্য করে ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি হচ্ছে না, যেখানে তিনতলা বানানোর অনুমতি আছে সেখানে পাঁচতলা তুলে ফেলা হচ্ছে না। যত কাণ্ড গার্ডেনরিচে।

বহুল প্রচারিত সংবাদমাধ্যম এবং প্রগতিশীল বলে পরিচিত সাংবাদিক, অধ্যাপকরাও যখন এই বয়ান প্রচার করেন আর বিজেপিবিরোধী রাজনৈতিক দলের মুখপাত্ররাও চুপচাপ বসে শোনেন, সজোরে প্রতিবাদ করেন না – তখন বোঝা যায় পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির শিকড় গভীরে চারিয়ে গেছে। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি শেষমেশ একশো আসনও পেল না দেখে যাঁরা উদ্বাহু নৃত্য করেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা জিতে গেল বলে, তাঁরা দিবাস্বপ্নে মগ্ন ছিলেন। আসন্ন ভোটের ফল যা-ই হোক, পশ্চিমবঙ্গের এটাই বাস্তবতা। তাই বোধহয় তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বও ভোটের মুখে ববির পক্ষ নিয়ে বেশি কথাবার্তা বলে সংখ্যাগুরু ভোটারদের চক্ষুশূল হতে চাইলেন না। স্বঘোষিত প্রগতিশীলদের শত বুকনি সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ তামিলনাড়ু নয়, যেখানে বিজেপির এক নম্বর নেতা কে আন্নামালাইকেও বলতে হয় – আমাদের এখানকার ভোটে ইস্যু উন্নয়ন আর দুর্নীতি। হিন্দুত্ব নয়।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করেও যে বিজেপি চারশো আসন পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয় তা পরিষ্কার। বিরোধী নেতাদের ভীরুতাকে তারা হাতিয়ার করতে চাইছে। ইডি, সিবিআইয়ের খাতায় কেবল নীতীশ কুমার বা মমতার দলের নেতা মন্ত্রীদের নামেই অভিযোগ আছে তা তো নয়। কেরালায় সিপিএম নেতা, মন্ত্রীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল।

জার্মানিতে নাজি পার্টির উত্থান ও পতন নিয়ে মার্কিন সাংবাদিক উইলিয়াম শাইরারের লেখা একখানা বই সারা বিশ্বে সমাদৃত। দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অফ দ্য থার্ড রাইখ নামে এই বইতে শাইরার লিখেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর হোহেনজোলার্ন রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছিল একটা দুর্ঘটনা (“proclaimed by accident!”)। কারণ যুদ্ধে পরাজয়ের পর কাইজার (জার্মান সম্রাট) সিংহাসন ছেড়ে দেন, ওদিকে বার্লিনে তখন জোরদার সাধারণ ধর্মঘট চলছে। রোজা লুক্সেমবার্গ আর কার্ল লিবনেখটের নেতৃত্বে বামপন্থী সমাজতন্ত্রীরা রাশিয়ার মত বিপ্লব করে ফেলতে পারে – এই ভয় চেপে ধরে সোশাল ডেমোক্র্যাট নেতা ফ্রেডরিশ এবার্ট আর ফিলিপ শাইডেমানকে, যাঁরা চ্যান্সেলর প্রিন্স ম্যাক্স অফ ব্যাডেনও পদত্যাগ করে দেওয়ায়, সেই মুহূর্তে দেশের দায়িত্বে ছিলেন। শাইরারের মতে, ওঁরা চেয়েছিলেন যেনতেনপ্রকারেণ রাজতন্ত্র বজায় থাকুক। তা হচ্ছে না দেখে বিপ্লবের আতঙ্কেই ১৯১৮ সালের ৯ নভেম্বর তড়িঘড়ি কোনিগসপ্লাৎজের সামনে জড়ো হওয়ার জনতার সামনে শাইডেমান ঘোষণা করে দেন – জার্মানি এখন থেকে ‘রিপাবলিক’। সেই রিপাবলিকের সংবিধান ঘোষণা হয় আরও একবছর পরে ওয়াইমার বলে একটা শহরে আয়োজিত অ্যাসেম্বলি থেকে। তাই তাকে ওয়াইমার রিপাবলিক বলা হয়ে থাকে। বিপ্লবের সম্ভাবনা দমন করতে যে ওয়াইমার রিপাবলিক দারুণ সফল হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। এমনকি রোজা আর কার্লকেও একেবারে প্রাণে মেরে দেওয়া হয়েছিল জানুয়ারি মাসেই। কিন্তু এসব করতে গিয়ে গণতন্ত্র যেমন হওয়া উচিত তেমন করে জার্মানিকে গড়ে তোলার দিকে মোটে নজর দেওয়া হয়নি। সামন্তপ্রভু, উচ্চবর্গীয় জার্মান এবং সেনাবাহিনীর লোকজন – যাদের গণতন্ত্র ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ ছিল না, তাদের পোষ মানানোর নরম বা গরম – কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। ফলে তৈরি হয় এক জগাখিচুড়ি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে সেনাবাহিনীর যতটা প্রভাব প্রতিপত্তি থাকা উচিত তার চেয়ে বেশিই ছিল। সঙ্গে ছিল ক্ষমতাশালী শ্রেণিগুলোর দুর্নীতি। সব মিলিয়ে কেমন অবস্থা হয় সাধারণ জার্মানদের? ভাষান্তরে শাইরার বর্ণিত সেই অসহনীয় পরিস্থিতি এইরকম:

… তবে জনতা বুঝতে পারেনি যে জার্মান মুদ্রার বিপর্যয়ে বৃহৎ শিল্পপতি, সেনাবাহিনী আর রাষ্ট্র কেমন লাভবান হচ্ছিল। তারা শুধু দেখতে পাচ্ছিল যে ব্যাঙ্কে অনেক টাকা থাকলেও খানিকটা গাজর, কিছুটা আলু, কয়েক আউন্স চিনি, এক পাউন্ড ময়দা কেনা যাচ্ছিল না। প্রত্যেকটি ব্যক্তি জানত যে সে দেউলিয়া আর প্রতিদিন খিদের জ্বালা টের পেত। এই যন্ত্রণা আর আশাহীনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে তারা যা কিছু হয়েছে তার জন্য গণতন্ত্রকে দায়ী করত।

এমন একটা সময় অ্যাডলফ হিটলারের জন্যে ছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত।

গত সোমবার কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে ভুবনেশ্বরে এক সভায় বলেছেন, কিছু নেতা এবং সাধারণ মানুষ যদি ভীরুতা অবলম্বন করেন তাহলে সংবিধান ও গণতন্ত্রের বাঁচা শক্ত। তার আগেরদিনই নীতীশ কুমার কংগ্রেস, রাষ্ট্রীয় জনতা দল এবং বাম দলগুলোর সমর্থন ছেড়ে বেরিয়ে ফের বিজেপির সঙ্গে জোট করে আরও একবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়ে ফেলেছেন। ফলে বোঝা শক্ত নয়, খড়্গের আঙুল কার দিকে ছিল। খড়্গে অবশ্য রাখঢাক করেননি, শুধু নীতীশের দিকে আঙুল তুলেও থামেননি। নীতীশ চলে যাওয়ায় ইন্ডিয়া জোট দুর্বল হবে না বলেছেন, একইসঙ্গে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কেরও নিন্দা করেছেন বিজেপির বিরুদ্ধে না দাঁড়ানোর জন্যে। দেশের সংকট মুহূর্তে কিছু রাজনীতিবিদের ভীরুতার কী দাম একটা দেশকে দিতে হয় তা শাইরারের বইয়ের যে অংশ নিয়ে আলোচনা করলাম তা পড়লেই বোঝা যায়। তবে খড়্গে সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছেন যে বিজেপির বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একা নীতীশই ভীরু নন।

বস্তুত, ভীরুদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করলে ইন্ডিয়া জোট আরও দুর্বল হয়ে পড়বে, আখেরে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়েরই ক্ষতি হবে – এই আশঙ্কাতেই সম্ভবত খড়্গে আর কারোর নাম করেননি। নইলে নিঃসন্দেহে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নামও করতে হত। তিনি ইন্ডিয়া জোটে আছেন, অথচ তাঁর দলের শাসনে থাকা পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই ঘোষণা করে দিয়েছেন – পাঞ্জাবে তাঁরা একাই লড়বেন, কংগ্রেসকে কোনো আসন ছাড়বেন না।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও করতে হত। তাঁর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল – কংগ্রেস দাদাগিরি করে, কংগ্রেস বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করার ব্যাপারে আন্তরিক নয়। কংগ্রেস ইন্ডিয়া জোটে এল, তাঁকে জোটের মিটিংয়ে একেবারে রাহুল গান্ধীর পাশে জায়গাও দেওয়া হল। অথচ কোনো মিটিংয়ে তিনি নিজে যান না, কখনো কোনো প্রতিনিধিকেও পাঠান না, কখনো আবার সংযুক্ত ঘোষণাপত্রে তাঁর দলের স্বাক্ষর থাকে না। গত কয়েকদিনে আবার সটান বলে দিয়েছেন, ইন্ডিয়া জোটে আছেন দেশে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে একাই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বেন। ত্রিপুরা, মেঘালয়, গোয়া ইত্যাদি নির্বাচনে লড়তে গিয়ে আদৌ সুবিধা করতে না পারার পরেও তিনি রাজ্যের বাইরে নিজের শক্তি সম্পর্কে কী করে আত্মবিশ্বাসী হচ্ছেন তা বোঝা শক্ত। রাহুলের ভারত ন্যায় যাত্রা মমতার রাজ্যে ঢুকে পড়েছে, অথচ তৃণমূল কংগ্রেসের দিক থেকে তাতে সঙ্গত করার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উলটে কংগ্রেস অভিযোগ করছে তৃণমূলই নাকি ন্যায় যাত্রার পতাকা ছিঁড়ে দিচ্ছে, রাহুলকে সরকারি গেস্ট হাউসে মধ্যাহ্নভোজন করতে দেওয়ার সৌজন্যটুকুও দেখানো হচ্ছে না। এর পিছনে ইডি, সিবিআই আতঙ্ক ছাড়া অন্য কিছু কি থাকা সম্ভব? এ যদি ভীরুতা না হয়, তাহলে তো ভাবতে হবে সিপিএম নেতারা যে তৃণমূল-বিজেপি সেটিংয়ের তত্ত্ব খাড়া করেন সেটাই সত্যি। নইলে বিজেপি যে দেশের শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু সেকথা তো খড়্গের মত মমতাও বলে থাকেন। তাহলে মিলেমিশে লড়তে আপত্তি থাকবে কেন? ইন্ডিয়া জোটে তাঁর চেয়ে বেশি সিপিএমকে গুরুত্ব দেওয়া হয় – এ তো অভিমানের কথা। এই কি মান-অভিমানের সময়? তাও যদি অভিমানের ভিত্তি থাকত। সিপিএমের সাংসদ সংখ্যা তৃণমূলের ধারেকাছে নয়। তাদের নেতা সীতারাম ইয়েচুরি মিটিংয়ে গুরুত্ব পেলেন কি পেলেন না তাতে কী-ই বা এসে যায়?

আরও পড়ুন মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু 

রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করেও যে বিজেপি চারশো আসন পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয় তা পরিষ্কার। বিরোধী নেতাদের ভীরুতাকে তারা হাতিয়ার করতে চাইছে। ইডি, সিবিআইয়ের খাতায় কেবল নীতীশ কুমার বা মমতার দলের নেতা মন্ত্রীদের নামেই অভিযোগ আছে তা তো নয়। কেরালায় সিপিএম নেতা, মন্ত্রীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল। সম্ভবত স্ট্যালিনের সরকার পালটা এক ইডি অফিসারকে গ্রেফতার করায়, মাদুরাইয়ের ইডি দফতরে হানা দেওয়ায় উৎসাহে ভাঁটা পড়েছে। নীতীশ এনডিএতে ফিরে যাওয়া মাত্রই তেজস্বী যাদবকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকেও এক মামলায় গ্রেফতার করা হতে পারে বলে হাওয়ায় খবর ভাসছে। ইন্ডিয়া জোটের আরেক শরিক শিবসেনা। তাদের ডাকাবুকো নেতা সঞ্জয় রাউত। তাঁর নামেও মামলা আছে ইডির হাতে, ইতিপূর্বে তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। দরকার পড়লে শিবসেনার ভীরুতার পরীক্ষাও নিশ্চয়ই নেওয়া হবে।

এবার্ট আর শাইডেমানের ভূমিকা ভারতে কারা পালন করলেন তা তো এখনই বোঝা যাবে না, স্পষ্ট হবে আজকের ইতিহাস যখন লেখা হবে তখন। কিন্তু কৌতূহল হয়, বিরোধী দলগুলো দুর্নীতিমুক্ত হলে বিজেপিবিরোধী জোটের এমন নড়বড়ে অবস্থা হত কিনা। কোনো সন্দেহ নেই, যেসব মামলায় বিভিন্ন দলের নেতাকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে তার অনেকগুলোরই ভিত্তি নেই। রাউতকে জামিন দেওয়ার সময়ে যেমন বিচারপতি বলেছিলেন, ওই গ্রেফতারি বেআইনি। যে কোনো দেওয়ানি গোলমালকে আর্থিক দুর্নীতির তকমা দেওয়া চলে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হল, গত কয়েক দশকে ভারতের প্রায় সব দলের নেতাদের এত আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হয়েছে, যে কোন ক্ষেত্রে পালে সত্যিই বাঘ পড়েছে আর কোথায় স্রেফ বিরোধী শক্তিকে গ্রাস করে নিতে কেন্দ্রীয় এজেন্সি ‘চোর চোর’ বলে চেঁচাচ্ছে – তা বোঝা শক্ত। এই ধোঁয়াশার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলগুলোকে ভোটারদের চোখে আরও ছোট করে দেওয়া এবং সম্ভব হলে দলে টেনে আনা চলছে।

হিটলারের অবশ্য ইডি, সিবিআই ছিল না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

হিংসার রাজনীতির মোকাবিলায় বামপন্থীরা কোথায়?

ওরা আসে গেরুয়া ঝান্ডা নিয়ে, কমিউনিস্টরা লাল ঝান্ডা নিয়ে নামতে পারে। তাতে দুটো জিনিস হবে। এক, দাঙ্গাবাজরা একটু হলেও ভয় পাবে। জানবে, প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থাকলেও দাঙ্গা আটকানোর লোক আছে। আর দুই, সাধারণ মানুষ দেখবেন কারা দাঙ্গা আটকাতে নেমেছে।

রামের নাম করে গত কয়েকদিন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় যে রাবণসুলভ আচরণ চলেছে, খবর পেলাম, তার জেরে আমার দুই খুদে আত্মীয়ার স্কুলের পরীক্ষা পিছিয়ে গেছে। এতদ্বারা সময় জানান দিল যে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে আমরা কোনও উন্নততর ভারতবর্ষ তৈরি করতে পারিনি। কারণ, তিন দশক আগে একইভাবে আমার স্কুলের পরীক্ষাও পিছিয়ে গিয়েছিল। বস্তুত, আমার সময় এর চেয়ে ভালই ছিল বলতে হবে। কারণ, রিষড়া এলাকায় তখন যে অশান্তি দেখা দিয়েছিল তার কারণটা ছিল বিরাট— বাবরি মসজিদ ধ্বংস। সেই ঘটনা ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক ইতিহাসকেই বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত, বদলে দিয়েছিলও। কিন্তু আজকের কচিকাঁচাদের পরীক্ষা বাতিল হল এক স্থানীয় গোলমালে, রামনবমী মিটে যাওয়ার পরেও মিছিল বার করে হিংসা ছড়ানোর প্রচেষ্টায়। অর্থাৎ এ রাজ্যে গত শতকের নয়ের দশকে যে অশান্তি সৃষ্টি করতে হলে জাতীয় স্তরে কোনও ঐতিহাসিক কাণ্ড ঘটাতে হত, এখন স্থানীয় স্তরে খানিকটা গুণ্ডামি করেই তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করা সম্ভব হচ্ছে।

প্রশ্ন হল, কেন সম্ভব হচ্ছে? কী বদলেছে গত ৩০ বছরে? হিন্দুত্ববাদীদের রাজনৈতিক শক্তি বিপুল পরিমাণে বেড়ে গেছে, তারা লোকসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, সংসদকে নিজেদের বৈঠকখানায় পরিণত করেছে, প্রধানমন্ত্রী এবং বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদে স্বয়ংসেবকদের বসিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি বিজেপির সদস্য, বিধায়ক এবং মন্ত্রী ছিলেন। উপরাষ্ট্রপতিরও আরএসএসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ইতিহাস রয়েছে। তা ছাড়া ভারতের সমস্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানই যে নানা কৌশলে তাদের দখলে চলে গেছে— যেগুলো যায়নি সেগুলোকে দখলে আনার প্রাণপণ চেষ্টা চলছে— তা বুঝতে এখন আর কারও বাকি নেই। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। আসল কথা হল, হিন্দুত্ববাদীরা দখল করতে পেরেছে মানুষের মস্তিষ্ক।

বাঙালি হিন্দুরা শ-দুয়েক বছর ধরেই মনে করে তারা দেশের আর সকলের চেয়ে প্রগতিশীল। ইতিহাসে অবশ্য এর কোনও নৈর্ব্যক্তিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। বাংলায় চিরকালই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন, রাধাকান্ত দেবও ছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও ছিলেন। দুর্গাপুজো এসে পড়লেই বাঙালি হিন্দুরা ফেসবুকে লিখতে শুরু করে “পুজো যার যার, উৎসব সবার।” কিন্তু ঈদ-উল-ফিতর আর ঈদুজ্জোহার তফাত জানার সাধ নেই। বড়দিনে কেক খেতে না-পারলে ভাত হজম হয় না, পার্ক স্ট্রিটে সপরিবারে নেত্য করতে যেতে হয়। কিন্তু ঈদে কেউ বিরিয়ানি বা হালিম খাচ্ছে দেখলে ফ্যাক করে হেসে ফেলে “এ মা! তুই কি মুসলমান” বলে। জিভে জল আনা খাবারের সম্ভার থাকলেও জাকারিয়া স্ট্রিটে ঈদের মরসুমে এত ভিড় হয় না, যে টিভি চ্যানেলের রিপোর্টাররা মাথায় ফেজ পরে (বড়দিনের সময়ে যেমন স্যান্টা টুপি পরেন আর কি) ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ভিড়ের মধ্যে থেকে একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করবেন “কেমন লাগছে”। সংঘ বাঙালির এই বিভাজনরেখাটাই কাজে লাগিয়েছে। তাই এত স্থানীয় দাঙ্গা করা সম্ভব হচ্ছে।

এ দেশে যাঁরা হিন্দুত্ব রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘকাল চর্চা করছেন তাঁরা অনেকে মনে করেন, ২০০২ সালের গুজরাতের মতো রাজ্যব্যাপী দাঙ্গার পরিকল্পনা আরএসএস ত্যাগ করেছে। কারণ শিবপুর, ডালখোলা, রিষড়ার মতো এলাকায় ছোট-ছোট দাঙ্গা করতে পারলে লাভ অনেক দীর্ঘমেয়াদি। দাঙ্গার আগুন ঘরের কাছে চলে এলে মানুষ বেশি ভয় পায়। ফলে “হিন্দু খতরে মে হ্যায়”— এ কথা মনের গভীরে প্রোথিত করা সহজ হয়। যেমন রিষড়ায় দাঙ্গা হলে ঘটনার ল্যাজা-মুড়ো না-জেনেও শ্রীরামপুর, কোন্নগর, হিন্দমোটর, উত্তরপাড়ার সংখ্যাগুরু হিন্দুরা ভাবতে শুরু করেন, তাঁরা খুব বিপদের মধ্যে আছেন। এইসব এলাকার সংখ্যালঘু মুসলমানদের মধ্যেও নিরাপত্তার অভাববোধ বাড়তে থাকে। উভয় পক্ষই ভুলে যান, কয়েক প্রজন্ম ধরে গলাগলি না-হোক, অন্তত পাশাপাশি বাস করছেন তাঁরা। বহু রামনবমী, বহু মহরম গিয়েছে। শীত বসন্ত এসেছে চক্রাকারে, অথচ কারওই কোনও খতরা হয়নি। অর্থাৎ এইসব ছোট-ছোট অল্প তীব্রতার দাঙ্গা লাগানোর উদ্দেশ্য “আমাদেরি আন্তরিকতাতে / আমাদেরি সন্দেহের ছায়াপাত টেনে এনে ব্যথা/ খুঁজে আনা।”

সে কাজে সাহায্য করে নিষ্ক্রিয় প্রশাসন। অন্তর্যামী মুখ্যমন্ত্রী সাতদিন আগে থেকে একের পর এক প্রকাশ্য সভায় বলে যাচ্ছেন “ওরা রামনবমীতে ঝামেলা করবে”, অথচ তাঁরই অধীন পুলিস সে দাঙ্গা আটকাতে পারে না। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী কখনও বলেন বিনা অনুমতিতে মিছিল বার করা হয়েছে, কখনও বলেন ওরা মিছিলের রুট বদলে ফেলেছে। যে মিছিলের অনুমতি ছিল না সে মিছিল পুলিস চলতে দিল কেন— দিদিকে এ প্রশ্ন করতে বিখ্যাত সাংবাদিক ভাইটি ভুলে যান। সর্বত্রই যাঁরা স্থানীয় মানুষ, সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, তাঁদের সঙ্গে কথা বললে প্রদীপ জ্বালাবার আগে সলতে পাকাবার গল্পও শোনা যাচ্ছে এবং সে গল্পে হিন্দুত্ব ব্রিগেড খলনায়কের ভূমিকায় থাকলেও রাজ্যের শাসক দল নেহাত যাত্রার বিবেকের ভূমিকায় নেই। আশার কথা এটুকুই যে, রিষড়ায় ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা অশান্তির আগুন নিভে যাওয়ার আগেই কোন্নগর স্টেশনে দাঁড়িয়ে অপরিচিত মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখলাম— যা আশঙ্কা করেছিলাম কথাবার্তা সে পথে এগোল না। আগের দিন রাতে বাড়ি ফিরতে গিয়ে রিষড়ার গণ্ডগোলে ট্রেনে আটকে ছিলেন রাত দেড়টা-দুটো অবধি, এমন কয়েকজন আমার আর এক সাংবাদিক বন্ধুর আলোচনায় এসে যোগ দিলেন। আশঙ্কা করছিলাম দু-চার কথার পরেই কিছু অন্য ধর্মের মানুষকে দায়ী করে কিছু মন্তব্য ছুটে আসবে। তা কিন্তু হল না। যাঁরা কথা বলছিলেন তাঁরা পরস্পরের পরিচিত নন, নামধামও জানতে চাননি, ফলে ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু সকলেই দেখলাম দায়ী করলেন দুটো রাজনৈতিক দলকে, কোনও সম্প্রদায়কে নয়।

যদিও তারপর যে কথা উঠে এল তাতে অস্বস্তি বাড়ল বই কমল না। একজন বললেন “আজকাল তো আমাদের এখানে যা যা হচ্ছে সবই বিশেষ এক ধরনের লোকের জন্যে হচ্ছে। কী ধরনের লোক সেটা আর বলছি না, আপনারা সবাই বুঝতে পারছেন। বিজেপি তো সারাক্ষণ হিন্দু হিন্দু করে। আমরাও তো হিন্দু, আমাদের রোজগারের কিছু সুবিধা হচ্ছে? বাঙালি হিন্দু তো কোনওমতে খেয়েপরে বাঁচছে। লালে লাল হচ্ছে কারা? তারাই তো দাঙ্গা করছে।” রিষড়ায় বরাবরই এক বড় অংশের মানুষ হিন্দিভাষী, হিন্দমোটরেও। বিশেষত যখন বিড়লাদের গাড়ি তৈরির কারখানা চালু ছিল। কিন্তু ইদানীংকালে কোন্নগর, শ্রীরামপুর ইত্যাদি এলাকাতেও দ্রুত হিন্দিভাষী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সেই প্রেক্ষিতে এই ভদ্রলোকের কথা অশনি সঙ্কেত।

প্রথমত, এ কথায় অন্যের ঘাড়ে নিজের দোষ চাপিয়ে দেওয়ার চিরাচরিত বাঙালি প্রবণতা প্রকট। যেদিন উনি ও কথা বললেন, সেদিনই বিহারের মুঙ্গের থেকে পুলিস গ্রেফতার করে আনল হাওড়ার সালকিয়ার ভেতো বাঙালি সুমিত সাউকে, যাকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের টুইটে বন্দুক হাতে দেখা গিয়েছিল, যার মা সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরায় বলেছেন সে আগে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে কাজ করত। সুতরাং অবাঙালিরা দাঙ্গা করছে, বাঙালিরা শান্তিপ্রিয় জাত— এ কথায় সত্য ততটা নেই, যতটা আছে পরজাতিবিদ্বেষ।

দ্বিতীয়ত, বোঝাই যাচ্ছে এ তল্লাটে বাঙালি বনাম অবাঙালি সংঘাতের পটভূমি তৈরি হচ্ছে। যেভাবে ভারতের প্রায় ৮০ শতাংশ হিন্দুকে বিশ্বাস করানো হয়েছে ২০-২২ শতাংশ মুসলমান তাদের জন্য বিপদ, প্রায় সেভাবেই হুগলি জেলার শহর-মফস্বলের সংখ্যাগুরু বাঙালি ক্রমশ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, তারা হিন্দিভাষীদের কারণে কোণঠাসা হচ্ছে। বিশেষত মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তদের বিশ্রম্ভালাপে আজকাল অন্যতম জনপ্রিয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কীভাবে “ওরা চারিদিকে ছেয়ে যাচ্ছে”। এর পিছনে স্থানীয় হিন্দিভাষীদের ব্যবহার যে একেবারেই দায়ী নয় তা-ও বলা যাবে না। শুধু এখানে কেন, পশ্চিমবঙ্গের বহু জায়গাতেই এমন অনেক আবাসন গড়ে উঠছে যেখানকার সংখ্যাগুরু হিন্দিভাষী ফ্ল্যাটমালিকরা নিয়ম করে দিচ্ছেন, আমিষাশী হলে তাকে ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া যাবে না। বাজারঘাটে বিক্রেতা বা অন্য লোকেদের হিন্দিতে কথা বলতে বাধ্য করা, না-বললে বাংলা না-বোঝার ভান করার মতো ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। এ রাজ্যের বামপন্থীরা তো অর্থনৈতিক সমস্যা ছাড়া সব সমস্যাকেই মনে করেন নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। তাই যেমন হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা থামানোর কাজে তাঁদের দেখা যাচ্ছে না, তেমন এইসব ক্রমবর্ধমান সামাজিক দ্বন্দ্বের নিরসনেও তাঁদের পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ঢুকে পড়ছে বাংলাপক্ষের মতো দক্ষিণপন্থী সংগঠন। এখন যেমন হিন্দু-মুসলমানে লাঠালাঠি লাগিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টায় রয়েছে তৃণমূল, বিজেপি; আগামীদিনে নগরায়নে ভোল বদলে ফেলা এলাকাগুলোতে তেমনই বাঙালি বনাম অবাঙালি বাইনারি সৃষ্টি করে একই খেলা চলতে থাকবে বলে আশঙ্কা হয়। গত বিধানসভা নির্বাচনেই তার লক্ষণ দেখা গেছে। তৃণমূল বিজেপির হিন্দুত্বকে যতখানি আক্রমণ করেছিল তার চেয়ে বেশি করে বলেছিল বিজেপি বহিরাগতদের পার্টি। ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’ স্লোগানেও প্রচ্ছন্ন ছিল এই ইঙ্গিত। এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ছটপুজোয় সরকারি ছুটি দেয়, হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে। পাশাপাশি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোকে লাটে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।

কোনও না-কোনও কাল্পনিক বাইনারি তৈরি করে আমাদের নিয়ে শাটল ককের মতো খেলে চলেছে দুটো রাজনৈতিক শক্তি। এ জিনিস আটকাতে দরকার এমন এক তৃতীয় পক্ষ, যারা স্রেফ কেন্দ্র আর রাজ্য সরকারের কর্মসূচি এবং দুর্নীতিকে নয়, আক্রমণ করে আদর্শকে। অথচ এ রাজ্যের বামপন্থীরা কিছুতেই সিবিআই, ইডি, ডিএ, নিয়োগ দুর্নীতির বাইরে কোনওকিছু নিয়ে আক্রমণাত্মক হতে রাজি নন। দাঙ্গা কেন হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা দিয়েই তাঁরা ক্ষান্ত। এমন নয় যে ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, কিন্তু সেখানেই তাঁদের কাজ শেষ হয় কী করে? কার্ল মার্কস তো বলেছিলেন, দার্শনিকরা পৃথিবীটাকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু কাজ হল পৃথিবীটাকে বদলানো। কমরেডরা সে কথা ভুলে গেলেন নাকি? এ রাজ্যে যে বামপন্থী দলগুলোর উপস্থিতি আছে তাদের সদস্য-সমর্থকদের কথা শুনলে দুঃখে হাসি পায়।

সিপিএমের লোকেরা বারবার শুনিয়ে যান সরকারে থাকার সময়ে তাঁদের দল কীভাবে দাঙ্গা আটকাত আর তৃণমূল সরকার তার সাপেক্ষে কতখানি ব্যর্থ। মার্কসবাদে দেবতা নেই জানি, অপদেবতা আছে কিনা জানি না। এঁদের কথা শুনলে মনে হয় আশা করে আছেন জ্যোতি বসুর ভূত এসে দাঙ্গাবাজদের ঘাড় মটকে দিয়ে যাবে, এঁদের স্বহস্তে কিছু করার প্রয়োজন নেই। তাঁরা কী করছেন, এ প্রশ্ন তুললে আবার কেউ কেউ খাঁটি আমলাতান্ত্রিক ঢঙে বলেন “দাঙ্গা আটকানো সরকারের দায়িত্ব।” কেউ বা বলেন “পুলিশ মিছিল করার অনুমতি দিচ্ছে না। কী করব?” জ্যোতি বসু, মহম্মদ ইসমাইল, বিনয় চৌধুরীরা এত লক্ষ্মী ছেলে হলে সিপিএম কোনওদিন ক্ষমতায় আসত বলে মনে হয় না। এঁরাও সে আমলে কীভাবে দাঙ্গা আটকানো হত, তা নিয়ে জাঁক করার সুযোগ পেতেন না।

অন্যদিকে লিবারেশনের নেতা-কর্মীরা আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন দাঙ্গার দায় যেন সবটাই বিজেপির ঘাড়ে চাপে। তৃণমূল সরকারের গায়ে ছিটেফোঁটা কাদা লাগলেও ফ্যাসিবিরোধী লড়াই দুর্বল হয়ে যাবে। অথচ তাঁদেরই পার্টির উত্তরপাড়া আঞ্চলিক কমিটির প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান রিপোর্ট রিষড়ার ঘটনা সম্পর্কে বলছে “যেখানে গত বছর মসজিদের সামনে দিয়ে মিছিল যাওয়ার সময়ে রীতিমতো রাস্তার ধারে ব্যারিকেড করে মিছিল পার করা হয়েছিল সেখানে এ-বছর তেমন কিছু ছিল না এবং অল্পসংখ্যক কয়েকজন পুলিশকর্মী মসজিদের সামনে মোতায়েন ছিলেন, যাদের অধিকাংশই গণ্ডগোলের সময়ে রীতিমত আহত হন।”

আরও বামদিকে যেসব দল আছে, যাদের কোনও নির্বাচনী স্বার্থ নেই, তারা ঠিক কী করছে জানি না। এনআরসি-সিএএ বিরোধী আন্দোলনে কিন্তু তাদের উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল। স্বীকার্য যে, তারপর থেকে তাদের উপরে রাষ্ট্রীয় আক্রমণ (রাজ্য সরকারের দিক থেকেও) বেড়েছে। তা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ জায়গায়, বিশেষত রিষড়া বা শিবপুরের মতো নগরায়িত এলাকায় তাদের ক্ষমতাও নগণ্য।

ভারতের কমিউনিস্টদের দাঙ্গার সময়ে রাস্তায় নেমে দাঙ্গা আটকানোর ইতিহাস আছে বলেই তাঁদের কাছে আশা করা। ক্ষমতাসর্বস্ব তৃণমূল আর পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ অঞ্চল থেকে উধাও কংগ্রেসের কাছে আশা করতে যাবে কোন আহাম্মক?

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হলে ক্ষতি নেই বিজেপির

এসব নিয়ে এক মার্কসবাদী দলের কর্মী বন্ধুর কাছে দুঃখ করছিলাম। সে যা বলল সেটাই বোধহয় সার কথা। তার বক্তব্য, সংসদীয় এবং সংসদ-বহির্ভূত— সব ধরনের কমিউনিস্ট মিলিয়ে বিজেপি শাসনের আট বছরে হাজার খানেক সেমিনার ও সভা করে ফেলেছে, যার বিষয় ভারতে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং তাকে আটকানোর উপায়সমূহ। তারপরেও শিবপুর, ডালখোলা বা রিষড়া ঘটেই চলেছে। ঘটে যাওয়ার পর কমিউনিস্টরা কিছু শান্তি মিছিল, মিটিং, পোস্টারিং ইত্যাদি করছে। কিন্তু দাঙ্গা আটকাতে পারছে না। এর কারণ হল, হিন্দুত্ববাদীরা এবং তাদের স্যাঙাত দলগুলো দাঙ্গা লাগানোকে একটা রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখে। তার জন্যে রীতিমত পরিকল্পনা করে, সেই পরিকল্পনাই রাস্তায় নেমে প্রয়োগ করে। কিন্তু কমিউনিস্টরা দাঙ্গা আটকানোকে প্রকল্প হিসেবে দেখছে না কিছুতেই। দাঙ্গাবাজদের বিরাট দল থাকতে পারে, কমিউনিস্টদের তো অন্তত ছোটখাটো দল আছে নানা জায়গাতেই। সেই কটা লোককে একত্র করেও তো পাল্টা রাস্তায় নামা যায়। ওরা আসে গেরুয়া ঝান্ডা নিয়ে, কমিউনিস্টরা লাল ঝান্ডা নিয়ে নামতে পারে। তাতে দুটো জিনিস হবে। এক, দাঙ্গাবাজরা একটু হলেও ভয় পাবে। জানবে, প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থাকলেও দাঙ্গা আটকানোর লোক আছে। আর দুই, সাধারণ মানুষ দেখবেন কারা দাঙ্গা আটকাতে নেমেছে। ফলে বাইনারি যদি তৈরি হয়ও, তা ভেঙে যাবে।

নিশ্চয়ই আমার বন্ধুটি একমাত্র লোক নয় যে এভাবে ভাবছে। কিন্তু এরকম ভাবনার লোকেরা সম্ভবত সব দলেই সংখ্যালঘু। ফলে দোকানপাট পুড়লে, মাথা ফাটলে, হাত-পা ভাঙলে, পরীক্ষা পেছোলে আমরা এই ভেবে সান্ত্বনা পাব যে, কেউ মারা যায়নি, কেউ ধর্ষিত হয়নি। রামনবমীর পর হনুমান জয়ন্তী নিয়ে তটস্থ হয়ে থাকব। সেটা মিটলে ক্যালেন্ডারে খুঁজব, আবার কবে কোন পুজো আছে। সেদিন বাড়ি থেকে না-বেরোলে চলে কিনা।

সত্যিই, কী চমৎকার ভারতবর্ষ সাজিয়েছি ছোটদের জন্যে!

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

২০২৪ আসলে গণভোট, বহুত্ববাদী ভারতের মুখ রাহুল গান্ধী

প্রশ্ন একটাই— ভারত এক ধর্ম এক ভাষার দেশ হবে, নাকি নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানের দেশ থাকবে। প্রথমটার মুখ নরেন্দ্র মোদী, দ্বিতীয়টার রাহুল গান্ধী।

সেই কোন কালে চকোলেট কোম্পানি ক্যাডবেরি’জ অমিতাভ বচ্চনকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করে একগুচ্ছ বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিল। তার একটায় তিনি পাপ্পু নামে একটি ছেলের বাবা, যার বয়স বেড়েই চলেছে কিন্তু সে স্কুলের গণ্ডি আর পেরোতে পারছেন না। তা পাপ্পুর হতাশ দোকানদার বাবাকে ছেলের বন্ধুরা এসে খবর দিল, পাপ্পু পাশ করে গেছে। অতএব তারা চকোলেট খাবে, পয়সা পাপ্পু দেবে। বাবা মহানন্দে সকলকে বিনিপয়সায় চকোলেট বিলোতে লাগলেন। এমন খুশির খবরে কি মিষ্টিমুখ না করে থাকা যায়? ওই সিরিজেরই আরেকটি বিজ্ঞাপনে অমিতাভ কলেজের অধ্যাপক। সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে দেখেন, ছেলেমেয়েরা সব ঊর্ধ্বশ্বাসে কোথায় যেন দৌড়চ্ছে। একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন, পাপ্পুর নাকি পরীক্ষা, তাই তারা সবাই দৌড়চ্ছে। অবাক অধ্যাপক সরেজমিনে তদন্ত করতে গিয়ে দেখেন পরীক্ষা মানে হল, একটি সুন্দরী মেয়ে (রাইমা সেন) কলেজে ঢুকছে আর মোটা কাচের চশমা পরা, সচরাচর যাদের ক্যাবলা বলা হয় তেমন ছেলে পাপ্পু প্রেম নিবেদন করবে বলে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি এল, দেখল এবং পাপ্পুকে জয়যুক্ত করল। ফলে সকলে মিলে পাপ্পু পাশ করে গেছে বলে ফের নাচানাচি শুরু করল। এ খবরেও মিষ্টিমুখ না-করে থাকা যায় না, অতএব ফের চকোলেট খাওয়া হল। এই পাপ্পু যে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে জায়গা করে নিতে চলেছে, তখন কে জানত!

আরএসএস-বিজেপির প্রচারযন্ত্র তুলনাহীন। আজ না হয় যাবতীয় টিভি চ্যানেল এবং অধিকাংশ সর্বভারতীয় খবরের কাগজের উপর আম্বানি-আদানির সহায়তায় তাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, নরেন্দ্র মোদীর সর্বভারতীয় উত্থানের সময়ে তো এতখানি আধিপত্য ছিল না। তবু বিজেপি নেতারা বারবার আউড়ে এবং হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকের বিপুল ব্যবহারের মাধ্যমে জনমনে প্রতিষ্ঠা করে দিতে পেরেছিলেন এই কথা যে, হার্ভার্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া রাহুল গান্ধি হলেন ওই বিজ্ঞাপন সিরিজের অকর্মণ্য, অজস্রবার ফেল করা পাপ্পু। অন্যদিকে তথ্যের অধিকার আইন ব্যবহার করে যাঁর পাশ করার বছরের তথ্য জানতে চাইলে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে মুখে কুলুপ আঁটে, সেই মোদী হলেন এক প্রাজ্ঞ ব্যক্তি, বিশ্বগুরু হওয়ার উপযুক্ত। যেহেতু মোদীর শিক্ষাগত যোগ্যতা সন্দেহজনক (গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত তাঁর মার্কশিটে অধ্যয়নের বিষয় লেখা ছিল “entire political science”), সেহেতু ডিগ্রি ব্যাপারটাই যে অপ্রয়োজনীয় তা প্রমাণ করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে আরএসএস-বিজেপির প্রচারযন্ত্র। বারো ক্লাসের গণ্ডি না-পেরনো স্মৃতি ইরানিকে মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী করা হয়েছিল এবং ডিগ্রি যে কিছুই প্রমাণ করে না তা প্রমাণ করতে দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র মতো বিরাট কাগজ রীতিমত গ্রাফিক্স তৈরি করেছিল— যাতে দেখানো হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-সহ বহু ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বেরই ডিগ্রির বালাই ছিল না। মনে রাখতে হবে, এই স্মৃতি সংসদে পৌঁছেছিলেন অমেঠি কেন্দ্রে রাহুলকে পরাজিত করে। অর্থাৎ স্মৃতিকে মাথায় তোলার পিছনেও অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল রাহুলকে পাপ্পু প্রমাণ করা।

স্বীকার্য যে, প্রচুর লেখাপড়া জেনেও রাজনীতিতে কেউ অকর্মণ্য হতেই পারেন। আবার বেশিদূর লেখাপড়া না-করেও ক্ষুরধার বুদ্ধি, সাহস এবং পরিশ্রমের জোরে একজন রাজনীতিবিদ দারুণ সফল হতে পারেন। সাফল্য বলতে কী বোঝানো হচ্ছে সেটা অবশ্য গুরুতর প্রশ্ন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেমন স্পষ্টতই মনে করেন, চা বিক্রেতার ছেলে হয়েও দেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসাই সাফল্য। কীভাবে সে চেয়ার অবধি পৌঁছনো হল এবং চেয়ারে বসে কী করা হচ্ছে তার তেমন গুরুত্ব নেই। তিনি যে গত আট বছরে এমনকি কাশ্মিরি পণ্ডিতদের জন্যও গঠনমূলক কিছু করে উঠতে পারেননি, তা তাঁর কাছে ব্যর্থতা বলে প্রতিভাত হয় বলে তো মনে হয় না। উলটে সারাক্ষণ নিজেই নিজেকে শংসাপত্র দিয়ে বেড়াচ্ছেন— “সব চঙ্গা সি”। এহেন প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দলের মানদণ্ডে রাহুল যা-ই করুন, প্রধানমন্ত্রী না-হতে পারলে পাপ্পুই থাকবেন। তাতে কিছু এসে যায় না। মুশকিল হল, পাপ্পু মিথ নির্মাণ এতই সফল হয়েছে যে, বিজেপিবিরোধী মানুষও কিছুতেই ওই মিথ ভুলে রাহুলকে দেখে উঠতে পারছেন না। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁদের এই ভুল না ভাঙলে বিপদ।

গত কয়েক দিনে যে চরম অন্যায় অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে সম্পন্ন করে রাহুলকে লোকসভা থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে, বহু উদারপন্থী, এমনকি বামপন্থী মানুষও তাতে তেমন দোষ দেখছেন না। বিজেপি বাদে সব দলের নেতৃস্থানীয়রাই অবশ্য এর নিন্দা করেছেন, কিন্তু তার অনেকটাই “চাচা আপন প্রাণ বাঁচা” যুক্তিতে। কারণ, আজ এর প্রতিবাদ না-করলে কাল এত বড় দেশের কোনও এক নিম্ন আদালতে তাঁদের কারও কোনও প্রধানমন্ত্রীবিরোধী মন্তব্যকে হাতিয়ার করে কেউ যদি মানহানির মামলা ঠুকে দেয় আর আদালত তুরন্ত দুবছরের কারাদণ্ড দিয়ে দেয়, তাহলে তাঁদের সাংসদ বা বিধায়ক পদও নিমেষে খারিজ হয়ে যাবে। কিছু বলার মুখ থাকবে না। এই নেতা-নেত্রীদের কে কে ভারতের গণতন্ত্রের এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সত্যিই চিন্তিত তা আরও কিছুদিন না কাটলে, তাঁদের দলের কার্যকলাপ না দেখলে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। যেমন ধরুন, এর পরেও যদি আম আদমি পার্টি মধ্যপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী ধ্বজা উড়িয়ে কংগ্রেসের ভোট কাটতে যায়, তা হলে বুঝতে হবে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের লুকোবার মতো আরও অনেক কিছু আছে। সেসবের গুরুত্ব ভারতের গণতন্ত্র বাঁচানোর চেয়ে বেশি।

কিন্তু ইতিমধ্যেই দলগুলোর সাধারণ সদস্য, সমর্থকদের অনেকেরই দেখা যাচ্ছে রাহুল পাদপ্রদীপের আলোয় চলে এসেছেন এবং অনেকে তাঁর মধ্যে আশার আলো দেখছেন বলে প্রবল গাত্রদাহ। এর কারণ রাহুলের কার্যকলাপ তাঁরা এত বছর ধরে ভাল করে লক্ষই করেননি। নিজেদের অজান্তেই সরকারি প্রচারযন্ত্রের চোখ দিয়ে রাহুলকে দেখেছেন। তাই এখন চোখকান যা বলছে, মস্তিষ্ক কিছুতেই তা মানতে চাইছে না। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ভারত জোড়ো যাত্রার পরে রাহুল সর্বক্ষণের রাজনীতিবিদ নন— এই অভিযোগ আর করা যাচ্ছে না। লৌহমানব মোদীর বিপরীতে তিনি যে ঠুনকো পুতুল নন, তা সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরেছেন। কংগ্রেসেও যে নেতৃত্বের সঙ্কট দীর্ঘকাল ধরে চলছিল তার নিষ্পত্তি ঘটেছে। গুলাম নবি আজাদের মতো সুযোগসন্ধানীরা বিদায় হয়েছেন। কপিল সিব্বলের মতো অতিবৃদ্ধ, জনসংযোগহীন আইনজীবী নেতারা পথপার্শ্বে পড়ে আছেন। সুদর্শন, সাহেবদের মতো ইংরেজি বলায় দক্ষ শশী থারুর টিভি স্টুডিও আর টুইটার আলো করেই বসে আছেন। মল্লিকার্জুন খড়গেকে সর্বভারতীয় সভাপতির দায়িত্ব দিয়ে ঝাড়া হাত-পা রাহুল জনপ্রিয়তায় অনেক এগিয়ে গেছেন।

কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। দেশ কীভাবে চালানো উচিত, ভারতের আগামীদিনের অর্থনীতি কেমন হওয়া উচিত, আজকের দুনিয়ায় জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণার পুনঃপ্রয়োগ কীভাবে করা সম্ভব— এসব নিয়ে গত কয়েক বছরে মৌলিক চিন্তাভাবনার পরিচয় দিয়েছেন রাহুল। কিন্তু গোদি মিডিয়া আর বিজেপি-র আইটি সেল সেসব দিকে আলো ফেলেনি। কেবলই পাপ্পু ভাবমূর্তি তুলে ধরেছে এবং জওহরলাল নেহরুর চিন-নীতির ব্যর্থতা থেকে শুরু করে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা জারির স্বৈরতান্ত্রিকতা— এগুলোকে রাহুল গান্ধীর সমার্থক করে দিয়েছে। দুঃখের বিষয়, বহু বিজেপি-বিরোধী, বিশেষত বামপন্থীরা, এই চশমা দিয়েই রাহুলকে দেখেছেন এবং এখনও দেখে চলেছেন। তাঁরা খেয়ালই করেন না, ২০১৯ নির্বাচনের প্রাক্কালে রাহুল সকলের জন্য ন্যূনতম আয়ের যে প্রস্তাব রেখেছিলেন তা এই মুহূর্তে যে নব্য উদারবাদী অর্থনীতির কবলে আমরা পড়েছি তার প্রেক্ষিতে বৈপ্লবিক, এবং বলা বাহুল্য, বামপন্থী। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ও মনে করেন ভারতে অমন একটা প্রকল্প দারুণ কাজে দেবে। এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ অবশ্যই আছে। কিন্তু অন্তত এই শতকে ভারতের কোনও বামপন্থী দলের নেতাকে অর্থনীতি নিয়ে এরকম বিকল্প চিন্তা করতে দেখা যায়নি। পশ্চিমবঙ্গের শেষ বামফ্রন্ট সরকার বরং অনেকাংশে নব্য উদারবাদী অর্থনীতি নিয়ে চলছিল, কেরলের বাম সরকারও যে মৌলিকভাবে আলাদা কোনও পথ দেখাতে পারছে এমন নয়। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো যেমন (যাকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে মোদী সরকার) তাতে কেন্দ্রীয় সরকারের চেয়ে খুব আলাদা কোনও পথ নেওয়া হয়তো কোনও রাজ্য সরকারের পক্ষে সম্ভবও নয়। কিন্তু প্রস্তাব হিসেবে, পরিকল্পনা হিসেবেও ডি রাজা, পিনারাই বিজয়ন বা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যরা কোনও মৌলিক অর্থনৈতিক নীতির কথা বলেছেন কি? সরকারে এলে কী করবেন সে তো পরের কথা, রাহুল অন্তত অন্য কিছু ভাবার এবং বলার সাহস তো দেখিয়েছেন।

ভারত জোড়ো যাত্রা চলাকালীন রাহুল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজনের সঙ্গে আলাপচারিতায় বসেছিলেন। সেই আলোচনা শুনলে বোঝা যায় গোটা বিশ্বের অর্থনীতিকে রাহুল কীভাবে দেখেন এবং ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অসাম্যকে কতটা গভীরভাবে জানেন। বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পের সাফল্য কীভাবে এল, ভারতে সেরকম কিছু করা সম্ভব কিনা জানতে চান এবং সেই প্রসঙ্গে জিএসটি ও নোটবন্দির ফলে কর্নাটকের বেল্লারির রমরমা জিনস শিল্পের অপূরণীয় ক্ষতির কথা জানান। দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লবের সম্ভাবনা নিয়েও সুনির্দিষ্ট আলোচনা করেন। কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মির পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে তিনি সাধারণ মানুষের জীবনকে কতটা গভীরভাবে দেখেছেন তা মিনিট পঁচিশেকের ওই ভিডিওতে বেশ বোঝা যায়। রঘুরাম কিন্তু ঘোর পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদ। রাহুল আলোচনার এক জায়গায় প্রশ্ন করেন, “দেখতে পাচ্ছি স্টক এক্সচেঞ্জে টাকা লাগিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে আপনার কী মত?”

দিল্লির রাজনৈতিক মহলে সকলেই জানেন, রাহুলকে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতাদের অপছন্দ হওয়ার অন্যতম কারণ তাঁর এই বামপন্থী প্রবণতা। তিনি যেভাবে নাম করে দেশের সবচেয়ে বড় দুই ধনী— মুকেশ আম্বানি আর গৌতম আদানিকে আক্রমণ করেন, তা অনেকেরই পছন্দ নয়। কারণ অর্থনীতির দিক থেকে কংগ্রেসের ক্রমশ ডাইনে সরে যাওয়া আরম্ভ হয়েছিল রাহুলের বাবা রাজীব গান্ধীর আমলে, যা তুঙ্গে পৌঁছয় নরসিংহ-মনমোহন জুটির নেতৃত্বে। সেই কারণেই নরসিংহ বিজেপির বিশেষ পছন্দের লোক। শেখর গুপ্তার মত দক্ষিণপন্থী সাংবাদিকরা তাঁকে ‘ভারতের প্রথম বিজেপি প্রধানমন্ত্রী’ আখ্যাও দিয়ে থাকেন। সেই দলের নেতা হয়ে রাহুলের এভাবে বৃহৎ পুঁজিকে আক্রমণ, বারবার ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ নিয়ে কথা বলা অনেক কংগ্রেসিরই না-পসন্দ।

তা বলে রাহুল বিপ্লবী নন, লেনিন বা মাও জে দং নন। কিন্তু তাঁকে অমন হতে হবে— এমন প্রত্যাশা করবই বা কেন? এ দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও যখন বহুধাবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর মধ্যে থেকে তেমন কেউ উঠে এলেন না, তখন বহুত্ববাদী ভারত থাকবে কি থাকবে না— এই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে কমিউনিজমের দাঁড়িপাল্লায় রাহুলকে মাপার মূঢ়তা ক্ষমার অযোগ্য। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি আর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রায় একই সময়ে। একশো বছর পূর্ণ করার আগেই আরএসএস ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করার পরিকল্পনায় চূড়ান্ত সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সেখানে ভারতীয় কমিউনিস্টরা দারুণ শুরু করেও ১৯৬৪ সালের পর থেকে নিজেদের ভাঙতে-ভাঙতে এমন জায়গায় নিয়ে এসেছেন যে, অস্তিত্বেরই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। ১৯৮৯ থেকে সংঘের শক্তি দ্রুত বেড়েছে, অথচ কমিউনিস্টরা সম্মুখসমরে যাওয়ার শক্তি ক্রমশ হারিয়েছেন। নব্বইয়ের দশকে তবু বিকল্প সরকার তৈরি করার ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা নেওয়ার শক্তি ছিল, ২০০৯ সালের পর থেকে তা-ও আর অবশিষ্ট নেই।

স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় রাজনীতির বাস্তুতন্ত্র মানে ছিল বামপন্থা বনাম মধ্যপন্থার লড়াই। সংঘ পরিবার সফলভাবে অটলবিহারী বাজপেয়ির আমল থেকে সেই বাস্তুতন্ত্রকে মধ্যপন্থা বনাম দক্ষিণপন্থার লড়াইয়ে পরিণত করতে শুরু করে। ২০২৪ নির্বাচনে রাহুল তথা কংগ্রেসকে উড়িয়ে দিয়ে জিততে পারলে ব্যাপারটা পুরোপুরি দক্ষিণপন্থা বনাম দক্ষিণপন্থা হয়ে দাঁড়াবে। কেবল মমতা ব্যানার্জি, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, নবীন পট্টনায়করাই যদি বিরোধী দল হিসেবে টিঁকে থাকেন তা হলে বনাম শব্দটারও আর প্রয়োজন থাকবে কি না, সন্দেহ। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় যেমন শাসক-বিরোধী সংঘাত বলে কিছু হয় না। যা হয় সব বিধানসভার বাইরে টিভি ক্যামেরার সামনে। সুতরাং গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী ভারতকে বাঁচাতে হলে ভারতের আরএসএসবিরোধী শক্তিগুলোর হাতে কংগ্রেসের পাশে দাঁড়ানো ছাড়া কোনও বিকল্প নেই। বামপন্থীদের সামনেও নেই। নেহরুর নাম্বুদ্রিপাদ সরকারকে অকারণে বরখাস্ত করা, ইন্দিরার জরুরি অবস্থা, মনমোহনের অপারেশন গ্রিন হান্ট ইত্যাদি কারণে কংগ্রেস সম্পর্কে যত বিতৃষ্ণাই থাক, রাজনীতিতে আশু বিপদের চেয়ে বড় কোনও বিপদ নেই, কোনওদিন ছিল না। সে কারণেই ইন্দিরা যখন দেশের গণতন্ত্রের জন্য মূর্তিমান বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছিলেন তখন জ্যোতি বসুর মতো প্রবাদপ্রতিম বাম নেতারা সংঘ-ঘেঁষা শক্তির উপস্থিতি সত্ত্বেও জয়প্রকাশ নারায়ণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

আরও পড়ুন কতটা পথ পেরোলে পরে ভারত পাওয়া যায়?

রাহুল আরও একটা জায়গায় দেশের অন্য সব বিরোধী নেতার চেয়ে এগিয়ে আছেন, তা হল সরাসরি সংঘ-বিরোধিতা। অন্য সব দলের নেতাদেরই বিজেপির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা যায়। একমাত্র রাহুলই বারবার বলেন, লড়াইটা আরএসএসের বিরুদ্ধে। দেশের মাটিতে জনসভায় বলেন, সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন। আবার কেমব্রিজে বক্তৃতা দিতে গিয়েও বলেন। এ দেশের কমিউনিস্টদের চিরকালীন বদভ্যাস, তাঁরা অর্থনৈতিক বিভাজন ছাড়া আর কোনও বিভাজন স্বীকারই করতে চান না। গত শতকের তিনের দশকে এই কারণেই গিরনি কামগর ইউনিয়নের ধর্মঘটে শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গের নেতৃত্বাধীন শ্রমিকদের সঙ্গে বাবাসাহেব ভীমরাও অম্বেডকরের নেতৃত্বাধীন দলিত শ্রমিকদের ঐক্য হয়নি। একশো বছর হতে চলল, কমিউনিস্টরা নিজেদের অবস্থানে অনড়। তাই রামমন্দির, হিজাব পরার জন্য মেয়েদের শিক্ষায়তনে ঢুকতে না-দেওয়া কিংবা গোমাংস ভক্ষণ বা পাচারের অভিযোগে মুসলমান হত্যার মতো ঘটনাগুলোকে বামপন্থীরা বলেন— আসল ইস্যু থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। আসল ইস্যুগুলো কী? না বেকারত্ব, দারিদ্র্য, মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি। তাঁরা কিছুতেই মানবেন না, আরএসএস-বিজেপি মন্দির-মসজিদ, শিবাজি-মোগল ইত্যাদিকেই বৃহদংশের মানুষের কাছে আসল ইস্যু বলে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছে। সে কারণেই উত্তরভারতের বিভিন্ন জায়গায় ধর্ম সংসদ আয়োজিত হয়, যেখানে প্রকাশ্যে গণহত্যার ডাক দেওয়া হয়। প্রশাসন যে কিছুই করে না সে তো প্রত্যাশিত, কিন্তু আমার-আপনার মতো সাধারণ মানুষই যে এইসব সংসদে যান তা সম্ভবই হত না তাঁদের কাছে বামপন্থীরা যেগুলোকে আসল ইস্যু বলেন সেগুলো নকল ইস্যু হয়ে না-গিয়ে থাকলে।

রাহুল কিন্তু এই কথাটা বোঝেন। তিনি জানেন, আসলে লড়াইটা সাংস্কৃতিক। সংঘ মানুষের মস্তিষ্কের দখল নিয়ে ফেলেছে। ভারত জোড়ো যাত্রায় তিনি যে বারবার বলছিলেন “নফরত কে বাজার মে মহব্বত কা দুকান খোলনে আয়া হুঁ” (ঘৃণার বাজারে ভালবাসার দোকান খুলতে এসেছি) তা স্রেফ কাব্যি নয়, সচেতন রাজনৈতিক স্লোগান। এই সময়ের প্রয়োজনীয় স্লোগান। সম্প্রতি এক আলোচনাসভায় নাগরিকত্ব আইন-বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবাস করে আসা লেখক মনীশ আজাদের কথা শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। শ্রোতাদের একজন প্রশ্ন করলেন, হাথরসের সেই ভয়ঙ্কর ধর্ষণ ও খুনের পরেও সেখানকার নির্বাচনে বিজেপি কেন জেতে? লখিমপুর খেড়িতে বিজেপি নেতার ছেলে গাড়ির চাকার তলায় কৃষকদের পিষে দেওয়ার পরেও সেখানে বিজেপি কী করে জেতে? মনীশ বললেন, ৪০-৫০ বছরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সংঘ মানুষের মধ্যে এই ভাবনা প্রোথিত করতে সক্ষম হয়েছে যে, আসল ইস্যু হল ধর্ম, বর্ণ, জাতি— এইসব। অন্যান্য ইস্যুতে তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারো, রেগেও যেতে পারো। কিন্তু ভোট দেওয়ার সময়ে সেসব ভুলে ধর্মের ভিত্তিতে দেবে। উদাহরণ দিয়ে বললেন, জিএসটি নিয়ে ক্ষুব্ধ গুজরাতের ব্যবসায়ীরা কয়েকদিন প্রবল আন্দোলন করার পরেই একটা শহরের রাজপথের ফেস্টুন ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন, “হম নারাজ হ্যাঁয়, গদ্দার নহি” (আমরা বিরক্ত, কিন্তু বিশ্বাসঘাতক নই)। তারপর গুজরাত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি যথারীতি জেতে। সুতরাং বিজেপিকে হারাতে হলে এই মানসিকতাকে হারাতে হবে। অর্থনৈতিক অভাব অনটনই আসল ইস্যু, বাকি সবই নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা— এই বালখিল্য রাজনীতি ফল দেবে না। কারণ, অপ্রিয় হলেও এটাই সত্য যে, বাজারটা ঘৃণার। রাহুল তাই ভালবাসার দোকান খোলার কথা বলেছেন। দোকানে কতজন খদ্দের আসবে, সে তো পরের কথা। কিন্তু যত বেশি দোকান খোলা হবে বাজারের পরিবেশ যে তত বদলাবে, তাতে তো সন্দেহ নেই। সত্যিকারের বিজেপি-বিরোধীরা এ কথা যত তাড়াতাড়ি বোঝেন তত ভাল। রাহুল মহাপুরুষ নন, সাধুসন্ত নন, বিপ্লবী তো ননই। তিনি একা কতটুকু পারবেন? তাঁর ক্ষয়িষ্ণু পার্টিই বা কতটা পারবে?

২০২৪ সালের নির্বাচন বস্তুত গণভোটে পরিণত হতে যাচ্ছে। প্রশ্ন একটাই— ভারত এক ধর্ম এক ভাষার দেশ হবে, নাকি নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানের দেশ থাকবে। প্রথমটার মুখ নরেন্দ্র মোদী, দ্বিতীয়টার রাহুল গান্ধী। কার সঙ্গে কার কোথায় নির্বাচনী আসন সমঝোতা হবে না-হবে সেসব পরের কথা, পাটিগাণিতিক আলোচনার বিষয়। রাজনৈতিক প্রশ্ন ওই একটাই। এ কথা অস্বীকার করলে আত্মপ্রতারণা হবে।

এমন বাইনারি নিঃসন্দেহে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়। কিন্তু আমাদের সামনে আশু বিপদটা যে একদলীয় শাসন।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত