আলতো ফ্লিক: ক্রিকেট নিয়ে ব্যতিক্রমী বই

‘দাস্তান-এ ফাস্ট বোলিং’ লেখাটায় লেখক কলিন কাউড্রের একখানা মাত্র ২২ রানের ইনিংসের কথা লিখেছেন, যার মূল্য সংখ্যায় ধরা পড়ে না। এই বইটাও মাত্র ৬৬ পাতার। কিন্তু এমন বই মোটা হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

পশ্চিমবঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার চিরকালই বিরল। তা বলে ক্রিকেট নিয়ে লিখিত বইয়ের সংখ্যা কম নয়। আসন্ন কলকাতা বইমেলায় আরও কয়েক বস্তা বই বেরোবে ক্রিকেট নিয়ে। ফেসবুকে চোখ রাখলেই তা দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ বইতেই প্রথিতযশা সাংবাদিকদের তারকাদের সঙ্গে ওঠাবসার কাহিনি অথবা স্বঘোষিত ক্রিকেটবোদ্ধাদের আবেগসর্বস্ব গদ্যের মোড়কে পরিবেশিত আজগুবি কথাবার্তা ছাড়া বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় যখন এমন একটা বই হাতে এসে পৌঁছয় যার প্রায় প্রত্যেকটা পাতাই উদ্ধৃত করতে ইচ্ছা করে, তখন চমকে উঠতে হয়। ক্রিকেট এমন একটা খেলা, যা নিয়ে ক্রিকেট খেলিয়ে দেশগুলোর সাহিত্যিকরাও বিস্তর লেখালিখি করেছেন। আবার সিএলআর জেমস, নেভিল কার্ডাস, পিটার রোবাক, গিডেয়ন হাইয়ের মত সাংবাদিকদের লেখা সাহিত্যে উত্তীর্ণ হয়েছে। বাংলাতেও একসময় অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, শঙ্করীপ্রসাদ বসু, মতি নন্দীরা ক্রিকেট নিয়ে লিখেছেন। শেষেরজন তো বেশি সাংবাদিক না বেশি সাহিত্যিক তা বলা বেশ কঠিন। অথচ ইদানীং ক্রিকেট নিয়ে গন্ডা গন্ডা বই বেরোলেও, বুক ঠুকে কটাকে আর সেই ধারার উত্তরসূরী বলা যায়? অরিজিৎ সেনের আলতো ফ্লিক – এক চিলতে ক্রিকেটের গল্প কিন্তু ক্রিকেটারদের হাঁড়ির খবর লেখা আর দর্শক হিসাবে ক্রিকেট দেখে বিশেষজ্ঞ হিসাবে বই লেখার চলতি হাওয়ার পন্থী না হয়ে, ক্রিকেটের ইতিহাস খুঁড়ে সচরাচর অনালোচিত ক্রিকেটারদের কথা বলেছে। ক্রিকেট যেভাবে জীবনকে প্রতিফলিত করে আর জীবন যে অলৌকিক কায়দায় ক্রিকেট মাঠে এসে বসে, তার সন্ধানে বহুদূর গেছে এই বই। তাই সৃষ্টি হয়েছে খাঁটি সাহিত্য।

এ বইকে যদি কেউ ব্যক্তিগত গদ্যের বই আখ্যা দেন, তাতেও লেখকের কৃতিত্ব এতটুকু কমে না। বস্তুত ফ্ল্যাপের লেখক পরিচিতিতে লেখাই রয়েছে “ক্রিকেট নিয়ে লেখার জন্য যে যে যোগ্যতা লাগে… মানে শচীন তেন্ডুলকরের সাথে হোটেল লাউঞ্জে ছবি বা গোপাল বসুর সাথে আড্ডার স্মৃতি বা নিদেনপক্ষে ক্লাব হাউসে যাতায়াত… কোনটাই ঝুলিতে নেই। একবার দূর থেকে উরকেরি রামনকে দেখা আর একবার কাছ থেকে রাসেল আর্নল্ডকে… ব্যাস…”। মুশকিল হল, এসব তথাকথিত যোগ্যতা ছাড়া যাঁরা ক্রিকেট নিয়ে লেখেন আজকাল, তাঁরা আবার সগর্বে ফেনা পরিবেশন করেন। কিন্তু অরিজিৎ একেবারেই সেরকম ‘জিয়া নস্ট্যাল’ করে দিয়ে বাজিমাত করার চেষ্টা করেননি। অথচ স্মৃতি এ বইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অসম্ভব সংবেদনশীল স্মৃতি না থাকলে ‘ফেলুকে নিয়ে মোনোলগ’ শীর্ষক রচনার এই অনুচ্ছেদগুলো লেখা অসম্ভব

এদিকে ওয়াসিম জাফর ব্যাটে [ব্যাট হাতে?] দাঁড়িয়ে আছে। দুটো ছায়া [,] নিজের আর ব্যাটের। দুটোই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হছে [হচ্ছে]। কত রান করেছে জাফর… একশ [।] একশ চল্লিশ, একদিনে এত? এখনো খেলা বাকি, ইস্ কেন সকাল থেকে নেই আমি! আমি এভাবে অন্য কাজে আটকে গেলাম? সারা জীবনই আমি অন্য কাজে আটকে গেছি। যখন আমার সেখানে [যেখানে?] থাকার কথা, আমি তার থেকে কয়েক যোজন দূরে থেকেছি, পরে হাঁফাতে হাঁফাতে পৌঁছে গেছি সেখানে। তখন আর কিছু করার নেই। আমি যখন আমার পেশেন্টের বাড়ির লোকেদের বলি – আর কিছু করার নেই… কিস্যু না, আমি তখনও জানি একটা জিনিস করা বাকি… ক্ষমা চাওয়া, এখন কিছু করার নেই কিন্তু যখন করার ছিল, আমি করতে পারিনি। আমি শুধু আমিই, নার্স না, আয়া না, অন্য ডাক্তার না শুধু আমিই পারতাম বাবু তোমাকে বাঁচাতে। কিন্তু তখন আমি অন্য কোথাও ছিলাম, অন্য কিছু ভাবছিলাম। …

তুমি যখন শত মুহূর্ত আমায় উপহার দিয়েছ, দুচোখ ভরে তোমার কভার ড্রাইভ [,] ফ্লিক, গ্লান্স দেখার জন্য… তোমাকে বাঁচানোর… তোমাকে লুকিয়ে রাখার জন্য, “ফেলু”… তখন আমি পাগলের মত এগারো নম্বর গেট খুঁজে বেড়াচ্ছি। আর যখন পেলাম… রোদ পড়তে শুরু করেছে। তোমার ছায়া, ব্যাটের ছায়া বাড়তে বাড়তে পুরো সবুজ মাঠ গ্রাস করে নিয়েছে।

এই ছায়াভরা মাঠে আর কাউকে দেখতে পাব না আমি। ওয়াসিম জাফর… তেন্ডুলকার… ফেলু কাউকে না। আমি শুধু আমাকেই দেখতে পাচ্ছি। এই সঙ্গঁ [সঙ্গ] আমার আর সহ্য হচ্ছে না। সব শান্ত হয়ে গেল কেন? তেন্ডুলকার আউট… বিরাশি রানে। একশ ছেচল্লিশ মিনিট মাঠে ছিল, দু-ঘন্টা ছাব্বিশ মিনিট। তাতেই এত থম্ মেরে গেল সবাই। ফেলু দু-বছর ছিল – দুবছর প্লাস আরও কিছু দিন… কত দিন এক্স্যাক্ট্… মনে পড়ে… মনে পড়ে না।

কে এই ফেলু? রজনী সেন রোডের বাসিন্দা জনপ্রিয় গোয়েন্দা নয়। ওইসব চর্বিতচর্বণ থেকে এ বই বহু দূরে। ফেলু কে, জাফরের ম্যারাথন ইনিংস দেখতে দেরিতে মাঠে পৌঁছে, অথবা ইউসুফ ইউহানা আর ইউনিস খানের লম্বা জুটি দেখতে দেখতে পেশায় চিকিৎসক লেখকের কেন ফেলুকে মনে পড়ে – তা জানতে গেলে পড়তে হবে বইটা। উৎসুক পাঠকের জন্যে এই কাজটুকু তোলা থাক।

অরিজিৎ অনেক লেখাতেই নিজের আর পাঠকের মাঝে একজন কথককে রেখেছেন বড় বা ছোট ভূমিকায়। কোথাও সেই কথক লেখকের বাবা, কোথাও কোনো মাস্টারমশাই। সেভাবেই আলোচনায় এসে পড়েছেন ক্রিকেট-ইতিহাসের অনেক বিস্মৃত চরিত্র। যেমন শ্রীলঙ্কার জোরে বোলার ডিএস জয়সুন্দরা। শ্রীলঙ্কার জোরে বোলারদের সম্পর্কে লেখার সংকল্প নিয়ে বসে যাঁর নাম শুনে লেখকের প্রতিক্রিয়া “জয়বর্ধনে ইয়েস। জয়সূর্য ইয়েস। কিন্তু হু অন আর্থ ইজ জয়সুন্দরা?”

লেখকের বাবা তখন বলেন “তবে? তুমি বাংলা গদ্য নিয়ে গবেষণা করছ অথচ বিদ্যাসাগরের কথা জানো না… ছোটগল্পের ছাত্র – কিন্তু মঁপাসা পড়নি – এভাবে হয়?”

এরপর ডন সুমিগেন জয়সুন্দরা সম্পর্কে জানা যায় যতটুকু জানা সম্ভব। মহম্মদ নিসার আর অমর সিংকে মনে রেখেও, তিনি অনেকের মতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে উপমহাদেশের দ্রুততম বোলার। এমনিতেই শ্রীলঙ্কা তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনো শক্তি নয়। তার উপর তাঁর কেরিয়ারের অর্ধেক চলে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গ্রাসে। কেরিয়ারের শুরুর দিকে চাকিং করায় সাসপেন্ডও হয়েছিলেন। কিন্তু যেটুকু তথ্য আছে তা থেকে জানা যায় ক্লাব ক্রিকেটে পাঁচবার হ্যাটট্রিক করেছেন, তিনবার ইনিংসে দশ উইকেট নিয়েছেন। ১৯৪০-৪১ সালে শ্রীলঙ্কার একটা দলের সঙ্গে ভারত সফরে এসেছিলেন জয়সুন্দরা। দুটো বেসরকারি টেস্টে খেলেছিলেন। তার একটা ভারত জেতে, অন্যটা ড্র হয়। মাদ্রাজের বিপক্ষে একটা টুর গেমে জেতে জয়সুন্দরার দল এবং তিনি সে ম্যাচে ছয় উইকেট নেন।

জয়সুন্দরার কাহিনি লেখকের বাবা শেষ করেন একটি নিদারুণ মন্তব্যে

অন্য বিষয় বাছো বাবু। ইতিহাস বড় বিশ্বাসঘাতক। কোন ডন সিংহাসন পায়… কোন ডন নীরবে বয়ে চলে… বয়েই চলে…

আরও পড়ুন এটা যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট; ওঁরা গ্ল্যাডিয়েটর নন, ক্রিকেটার

যারা সিংহাসন পায়নি, জয়সুন্দরার মত যারা রয়ে গেছে নিষ্ফলের, হতাশের দলে; তাদের প্রতি লেখকের মমতা আগাগোড়া বহমান। পত্রপত্রিকায় কাল্পনিক একাদশ তো কতই তৈরি হয়, কে আর বসে বসে কোনোদিন টেস্ট খেলতে না পাওয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সফল ভারতীয় ক্রিকেটারদের একাদশ তৈরি করে? লেখকের তৈরি একাদশটা এইরকম – সুরেন্দ্র ভাবে (সহ-অধিনায়ক), এমভি শ্রীধর, বিবি নিম্বলকর, অমল মজুমদার, কেপি ভাস্কর, সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (অধিনায়ক), দেবরাজ গোবিন্দরাজ, পান্ডুরাং সালগাঁওকর, দুর্গাশঙ্কর মুখার্জী, পদ্মাকর শিভালকর, কানোয়ালজিৎ সিং। ১৯০৭ সালের ইংল্যান্ড সফরে দক্ষিণ আফ্রিকা দলে খেলা চার গুগলি বোলারকে নিয়েই বা কে আলাদা করে লিখতে যায়?

তবে এ বই একবার পড়ে, আবার পড়তে হবে, বারবার পড়তে হবে অজানা ইতিহাস বা সংবেদনশীলতা বা মহম্মদ আজহারউদ্দিনের একটা ফ্লিকের বিশ্লেষণে গভীরতার জন্যে নয়। পড়তে হবে ক্রিকেটকে ব্যক্তিগত আর ব্যক্তিগতকে ক্রিকেট করে তোলার দক্ষতার টানে। যা শিখরে পৌঁছেছে ‘১৯.৪.২০২৩’ শীর্ষক লেখায়। শুরুর দিকটা উদ্ধৃত না করলে চলে না

বাবাকে দিয়ে এলাম। মানে গঙ্গায় দিয়ে এলাম। ছ-ফুটের লোকটা বিনা প্রতিবাদে ভেসে গেল।

বন্ধুরা দুহাতে আমায় ধরে বাবুঘাটের সিঁড়ি দিয়ে তুলল। জানি না কেন ওরা আমায় ধরে আছে… এমন সময় তো একা থাকতে হয়… এমন সময়ের মুখোমুখি তো একা হতে হয়… নেভিল কার্ডাস সেই কবে বলে গেছেন

“… terrible are the emotions of long on when the ball is driven high towards him and when he waits for it – alone in the world…”

হঠাৎ মনে হল অরুণ লালের কথা। ক্যানসার সার্জারির রাতে। ম্যাচ ৫০-৫০। মানে রাত কাটতেও পারে… নাও পারে। অরুণ লাল ডান হাতে পায়ে টোকা মেরে মনে মনে বললেন “লালজী… আজ রাতে উইকেটটা দিও না…”

আমিও মনে মনে বলতে লাগলাম “আজ রাতে উইকেটটা দিও না… নো সফ্ট ডিসমিসল… আমায় আউট করুক এসে… আমি উইকেট দেব না।”

‘দাস্তান-এ ফাস্ট বোলিং’ লেখাটায় লেখক কলিন কাউড্রের একখানা মাত্র ২২ রানের ইনিংসের কথা লিখেছেন, যার মূল্য সংখ্যায় ধরা পড়ে না। এই বইটাও মাত্র ৬৬ পাতার। কিন্তু এমন বই মোটা হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

তবে বই নির্মাণে আরও যত্নবান হওয়া দরকার ছিল। র আর ড় প্রয়োগে ভুল হয়েছে প্রায়শই, যতিচিহ্নের গোলমাল আর শব্দের মাঝের ফাঁক অজায়গায় পড়ার বিভ্রাটও বিরল নয়। সর্বোপরি চিন্ময় মুখোপাধ্যায়ের প্রচ্ছদ একেবারেই বইয়ের নামের এবং লেখার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারেনি। তবে এ বইকে মলাট দিয়ে বিচার করতে গেলে নেহাতই অবিচার হবে।

আলতো ফ্লিক – এক চিলতে ক্রিকেটের গল্প
লেখক: অরিজিৎ সেন
প্রকাশক: কুবোপাখি প্রকাশন
মূল্য: ২৫০ টাকা

প্রিয় স্মৃতির ফাইনাল

ছলছলে চোখে যুবরাজ বললেন “আজ সত্যিই মনে হচ্ছে একটা বড় কিছু করেছি।” তখনো আমরা জানি না, তিনিও জানেন না, শরীরে বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার।

যে কোনো নিরপেক্ষ বিচারে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা ফাইনাল হিসাবে প্রথমেই উঠে আসে ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের কথা। সর্বকালের সেরা একদিনের ম্যাচের তালিকাতেও ওই ম্যাচের স্থান হবে উপর দিকে। কিন্তু তাতে কী? প্রিয় ব্যাপারটা একান্ত ব্যক্তিগত। যে খেলছে না তার কাছে খেলা যেহেতু এক প্রদর্শনী, সেহেতু কোন খেলার কোন মুহূর্ত যে তার কাছে গোটা খেলাটাকে অবিস্মরণীয় করে তুলবে তা বলা মুশকিল। তার উপর আছে স্মৃতির ভূমিকা। যে খেলা দেখতে দেখতে মনে হয় জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না, সামান্য সময় পেরোলেই তা ফিকে হয়ে যায়। আবার যে খেলা দেখার সময়ে অসাধারণ মনে হয়নি, তা বহুকাল পরেও চোখের সামনে ভেসে ওঠে সিনেমার মত। কেন এমন হয় জানি না। কখনো খেলার বাইরের কোনো ঘটনা প্রভাবিত করে স্মৃতিকে, কখনো বা খেলা দেখার সঙ্গীদের স্মৃতিও এমন কাণ্ড ঘটায়। এমনটা না ঘটলে কোনো প্রিয় খেলা থাকত না একা একা জাবর কাটার জন্যে। কোনো আড্ডায় বা লেখায় সেই খেলার গল্প করে আরও অনেকের যে ওই খেলাটা প্রিয়, তা আবিষ্কার করার আনন্দও মাটি হয়ে যেত।

আমার অনেক বেশি প্রিয় ১৯৯২ বিশ্বকাপের ফাইনাল

তখনো ভূগোল বলতে বুঝি জল থেকে কীভাবে মেঘ তৈরি হয় আর মেঘ থেকে কীভাবে বৃষ্টি হয় – এইসব। গ্লোব জিনিসটা দেখেছি কেবল বড়লোক আত্মীয়ের বাড়িতে। ফলে বাবা রাতভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়ে টিভিতে খেলা দেখছেন – এ জিনিস দেখে বিস্মিত হওয়ার বয়স চলে যায়নি। আমার বয়সী অনেকেরই ওই বিশ্বকাপ নিয়ে মুগ্ধতা আজও কাটেনি, কাটবেও না। কারণ ক্রিকেট খেলায় অত রং আগে কখনো দেখিনি। ১৯৮৭ বিশ্বকাপের সময়ে আমাদের বাড়িতে টিভি ছিল না, ’৯২ বিশ্বকাপের সময়ে হয়েছে সাদাকালো পোর্টেবল টিভি। বাড়ির উল্টোদিকের লাইব্রেরিতে স্পোর্টস্টারের পাতায় জাহাজের ডেকে দাঁড়ানো অধিনায়কদের গ্রুপ ফটোতে দেখা জার্সির রংগুলো মনে রেখে দিয়েছিলাম। খেলা দেখার সময়ে সেই রং লাগিয়ে নিতাম খেলোয়াড়দের পোশাকে, মাঠে, আকাশে। কথা ছিল, মহম্মদ আজহারউদ্দিনের দল ফাইনালে উঠলে পাড়ায় যে দু-একজনের বাড়িতে রঙিন টিভি আছে সেখানে গিয়ে খেলা দেখব। কিন্তু সে গুড়ে বালি পড়ে যায় ফাইনালের অনেক আগেই।

বাবার দ্বিতীয় পছন্দের দল ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তারাও সেবার সেমিফাইনালে উঠতে পারেনি। তবে মেরুন জার্সির ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিন্তু দাপটে হারিয়েছিল কচি কলাপাতা জার্সির পাকিস্তানকে – একেবারে ১০ উইকেটে। দিনটা ছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২, জায়গাটা মেলবোর্ন। পরবর্তী এক মাসে ইমরান খান আর তাঁর দলবল যে রূপকথা রচনা করেন তা গল্পের বইয়ের বাইরে একমাত্র পাকিস্তানের ক্রিকেট দলই পারে। আজকের পাকিস্তানিরা তাকে বলেন ‘কুদরত কা নিজাম’, অর্থাৎ প্রকৃতির নিয়ম। ২৭ ফেব্রুয়ারি নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে হোবার্টে দুর্বল জিম্বাবোয়েকে দাপটে হারানোর পর ১ মার্চ অ্যাডিলেড ওভালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাত্র ৭৪ রানে অল আউট হয়ে যান ইমরান, মিয়াঁদাদরা। সেদিন পাকিস্তানকে আক্ষরিক অর্থেই কুদরত বাঁচিয়ে দেয়। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ১৬ ওভারে ৬৩ রান করতে হত জেতার জন্যে। কিন্তু এত বৃষ্টি নামে যে খেলা ভেস্তে যায়, পাকিস্তান পেয়ে যায় একটা মহামূল্যবান পয়েন্ট। তারপর সিডনিতে ভারতের কাছে হার, ব্রিসবেনে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে। পার্থে অস্ট্রেলিয়াকে হারাবার পরেও পাকিস্তানের সেমিফাইনালে যাওয়া অনিশ্চিত ছিল। পয়েন্ট টেবিলে এতটাই পিছিয়ে পড়েছিল যে শ্রীলঙ্কাকে হারানোর পরেও রাউন্ড রবিন লিগের শেষ খেলায় নিউজিল্যান্ডকে না হারালে বিদায় নিতে হত।

বিশ্বকাপে তখন পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডই সবচেয়ে নিখুঁত দল। সব ম্যাচ জিতে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে। শুধু তাই নয়, অধিনায়ক মার্টিন ক্রো ব্যাট করছেন রাজার মত। তাঁর দুটো অভিনব চালে কিস্তিমাত হচ্ছে প্রতিপক্ষ। এক, বোলিং শুরু করাচ্ছেন স্পিনার দীপক প্যাটেলকে দিয়ে। তাঁর বলে বিশেষ রান করা যাচ্ছে না। দুই, ব্যাটিং শুরু করাচ্ছেন প্রথম দুই ম্যাচে বেঞ্চে বসে থাকা মার্ক গ্রেটব্যাচকে দিয়ে। গ্রেটব্যাচ শুরু থেকেই ফিল্ডারদের মাথার উপর দিয়ে মারছেন। ১৯৯২ সালে ওই আক্রমণ অভূতপূর্ব। তার উপর পাকিস্তান দলে ইমরান আর মিয়াঁদাদের মধ্যে গণ্ডগোল। ইমরান নিজে পুরো সুস্থ নন। বোলার ইমরানের থেকে যতটা পাওয়া সম্ভব, তা পাচ্ছে না পাকিস্তান।

ক্রাইস্টচার্চের সেই ম্যাচে তারা অসাধ্য সাধন করল। লেগস্পিনার মুস্তাক আহমেদকে দিয়ে গ্রেটব্যাচকে শান্ত রাখলেন ইমরান। ফর্মে থাকা ক্রো ২০ বল খেলে তিন রানের বেশি করতে পারলেন না, আক্রম তাঁকে সুদ্ধ চারজনকে আউট করলেন। রামিজ রাজার শতরানে সহজেই জিতে গেল পাকিস্তান। অকল্যান্ডের সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফের রোমাঞ্চকর জয়। ২৫ মার্চের ফাইনাল খেলতে সেই মেলবোর্নে ফেরত এল পাকিস্তান। সামনে আবার ইংল্যান্ড। জীবন সকলকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না, পাকিস্তানকে একসঙ্গে দুটো দিল।

ফাইনালেও ইংল্যান্ডেরই পাল্লা ভারি ছিল নিঃসন্দেহে। কারণ সেরা দল নিউজিল্যান্ড ছাড়া আর কেউ তাদের বেগ দিতে পারেনি। জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে হার নেহাতই অঘটন। ব্যাটে বলে বিশ্বকাপ মাতাচ্ছিলেন বুড়ো ইয়ান বোথাম। গ্রেম হিক, অ্যালেক স্টুয়ার্ট, নিল ফেয়ারব্রাদাররা নিয়মিত রান করছিলেন। অলরাউন্ডার ক্রিস লুইস আর মিডিয়াম পেসার ডেরেক প্রিঙ্গলও ফর্মে।

কিন্তু ফাইনাল খেলল অন্য পাকিস্তান। একে অপরকে কোনোদিন পছন্দ না করা ইমরান আর মিয়াঁদাদ তৃতীয় উইকেটে ১৩৯ রান যোগ করলেন। তাও মিয়াঁদাদ সেদিন পুরো ফিট ছিলেন না, শেষদিকে রানার নিতে হয়েছিল। স্লগ ওভারে দারুণ মেরে দলের রান আড়াইশোর কাছে নিয়ে গেলেন ইনজামাম উল হক (৩৫ বলে ৪২) আর দুর্দম আক্রম (১৮ বলে ৩৩)। প্রিঙ্গল তিনটে উইকেট নিলেও বোথাম আর লুইস মার খেয়ে গেলেন।

আমার জ্যাঠতুতো, পিসতুতো দিদিদের মধ্যে তখন সুদর্শন ইমরানের প্রবল জনপ্রিয়তা, তবে দ্রুত তাঁর বাজার দখল করছেন আক্রম। আমাদের বাঙাল পাড়ায় সেই ২৫ মার্চ অনেকেই হয়ে গিয়েছিল পাকিস্তান সমর্থক; আমার বাবাও। সুতরাং আমিও। ইংল্যান্ডের প্রথম চারজন যখন ৬৯ রানের মধ্যে ফিরে গেলেন, তখন আমরা উল্লসিত। কিন্তু উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠলেন ফেয়ারব্রাদার আর অ্যালান ল্যাম্ব। বাবা একের পর এক বিড়ি শেষ করছেন, রান হয়ে যাচ্ছে, উইকেট পড়ছে না। শেষমেশ ইমরান ফেরত আনলেন আক্রমকে। তিনি রাউন্ড দ্য উইকেট দৌড়ে এসে পরপর দুবার ম্যাজিক করলেন। অ্যালান ল্যাম্ব আর ক্রিস লুইসের হতভম্ব স্টাম্পগুলো আমাদের উদ্বেগের অবসান ঘটাল।

ইংল্যান্ড আর বেগ দিতে পারেনি। ইমরান যখন ক্রিস্টালের ট্রফিটা হাতে নিয়ে দলের কথা ভুলে কেবল মা শওকত খানুমের নামে ক্যান্সার হাসপাতাল করার সংকল্প বর্ণনা করে চলেছেন, তখন আমি আর বাবা গিয়ে বসলাম পল্লী মঙ্গল সমিতির মাঠে। সেখানে আক্রমের স্তুতি চলছে, কোনো কাকু আবার বলছেন তাঁর মতে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ ইনজামাম। একজন বললেন “বেল পাকলে কাকের কী?” অন্য এক কাকু রুখে উঠলেন “কেন? কাগজে তো দেখলাম গাভাসকার বলেছে ’৮৩ সালে যখন আমরা কাপ জিতলাম, ওরা খুব আনন্দ করেছিল। আমরা আনন্দ করব না? হাজার হোক এশিয়ার টিম।” এক জেঠুর মন্তব্য “হারাইছে তো ইংল্যান্ড রে। অগো ক্যান সাপোর্ট করুম? করতে অইলে পাকিস্তানরেই করা ভাল।”

আজকাল এই স্মৃতিকেও ছাপিয়ে যায় ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনাল

ততদিনে ক্রিকেটের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা স্রেফ দর্শক আর প্রদর্শনীর নয়। তিনটে খবরের কাগজের খেলার পাতায় কাজ করা হয়ে গেছে, চতুর্থ চাকরিতে সাংবাদিক হিসাবে বিশ্বকাপ কভারেজের সঙ্গে যুক্ত আছি। বাড়িতে রঙিন টিভি এসে গেছে, কিন্তু বাবার সঙ্গে বসে খেলা দেখা আর হয় না। যত বড় খেলা হয়, আমার তত বেশি কাজ থাকে। অফিসের হাই ডেফিনিশন টিভিতেই দেখি বেশিরভাগ খেলা।

সহকর্মীরা অনেকেই একমত হচ্ছিলেন না, কিন্তু আমি শুরু থেকে বলছিলাম, এবার ভারত চ্যাম্পিয়ন না হলে অবাক হব। কারণ আমাদের শচীন শুরু থেকেই ফর্মে। একা শচীনে রক্ষে নেই, বীরেন্দ্র সেওয়াগ দোসর। হেলায় ম্যাচ শুরু করছেন চার মেরে। জাহির খান বল হাতে নিলে উইকেট পড়া যেন সময়ের অপেক্ষা। অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি রান পাচ্ছেন না, কিন্তু ইংল্যান্ডের সঙ্গে টাই হয়ে যাওয়া ম্যাচেও স্নায়ুর চাপে অধিনায়কত্বে ভুলচুক করেননি। মিডল অর্ডারে অভিজ্ঞ গৌতম গম্ভীর ধারাবাহিক। কিন্তু সবচেয়ে বড় সম্পদ যুবরাজ সিং। হয় ব্যাটে নয় বলে তিনি ভরসার জায়গা হয়ে উঠছিলেন। আর কী লাগে বিশ্বকাপ জিততে? ’৯২ বিশ্বকাপে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করতাম বাবাকে, সেবার বাবার প্রশ্ন করার পালা। খেলার পাতায় কাজ করি, অতএব বাবার ধারণা আমি একটু বেশি জানি। আমি আমার এইসব যুক্তি বলি, বাবা নীরবে শোনেন। একমত হলেন কিনা জিজ্ঞেস করার সময়ও আমার থাকে না।

এমন চলতে চলতেই ভারত কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল। আমাকে যেতে হল আমেদাবাদে। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল স্টেডিয়ামে প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, মানে ক্রিকেটের ব্রাজিল। যাদের বিশ্বকাপের যে কোনো স্তরে হারানো প্রায় বিশ্বকাপ জেতার মতই কঠিন। ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারতীয় বোলিংকে ছিঁড়ে খাওয়া রিকি পন্টিং আবার শতরান করলেন। যুবরাজ মোক্ষম সময়ে ব্র্যাড হ্যাডিন আর মাইকেল ক্লার্কের উইকেট না নিলে লক্ষ্য আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারত। সেমিফাইনালে উঠতে দরকার ২৬১, সেওয়াগ বেশিক্ষণ টিকলেন না। শচীন সাবলীল ব্যাট করছেন দেখে শততম শতরানের আলাদা কপি লিখতে শুরু করেছি, এমন সময় শন টেটের বলে উইকেটের পিছনে ক্যাচ দিয়ে তিনি আউট। গম্ভীরের সঙ্গে বেশিক্ষণ থাকতে পারলেন না বিরাট কোহলি। গম্ভীরও কাজ শেষ করে যেতে পারলেন না, ধোনি ফের ব্যর্থ। সিঁদুরে মেঘ দেখছি প্রেস বক্সে বসে, যুবরাজ খেলতে শুরু করলেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস। সুরেশ রায়নাকে সঙ্গে নিয়ে শেষপর্যন্ত আড়াই ওভার আগেই খেলা শেষ করে দিলেন। ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনের ঘরে এসে ঢুকতেই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে সম্মান জানালেন ভারতীয়, অভারতীয় সমস্ত সাংবাদিক। ছলছলে চোখে যুবরাজ বললেন “আজ সত্যিই মনে হচ্ছে একটা বড় কিছু করেছি।” তখনো আমরা জানি না, তিনিও জানেন না, শরীরে বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর জানা যাবে, তিনি গোটা বিশ্বকাপ খেলেছেন শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা – এসব নিয়েই।

আরও পড়ুন দায়সারা বিশ্বকাপ, শেষ বিশ্বকাপ? 

বিশ্বকাপ যত এগোয়, জেতা তত কঠিন হয়। কিন্তু সেমিফাইনালে পাকিস্তান খুব দৃঢ় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারল না। ব্যাটে আর কেউ বেশি রান করতে না পারলেও শচীন আবার খেলে দিলেন, যুবরাজ ব্যাটে ব্যর্থ হলেও দুটো জরুরি উইকেট নিলেন। তবে আজ যে তরুণদের স্মৃতিতে ২০১১ নেই, তারা এখনকার শ্রীলঙ্কাকে দেখে কল্পনা করতে পারবে না সেই ফাইনাল কত কঠিন ছিল। শ্রীলঙ্কা গোটা বিশ্বকাপে হেরেছিল শুধু পাকিস্তানের কাছে। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড আর সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে সহজে হারিয়েছিল। ফাইনালের দিন জাহির যথারীতি নতুন বলে উইকেট নিলেন, কিন্তু মুনাফ প্যাটেল ছাড়া সবাইকে মেরে দিলেন শ্রীলঙ্কার সর্বকালের সেরা ব্যাটারদের অন্যতম মাহেলা জয়বর্ধনে এবং অন্যরা। তবু তো কুমার সাঙ্গাকারাকে ৪৮ রানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন যুবরাজ।

বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌনে তিনশো রান তাড়া করার চাপ অতুলনীয়, আর সেদিনই কিনা প্রথম ওভারে শূন্য রানে আউট হয়ে গেলেন সেওয়াগ। একটু পরেই শচীন। কোহলি তখনো চেজমাস্টার হয়ে ওঠেননি, গম্ভীরের সঙ্গে তাঁর জুটি সেদিন জমল না। এরপর নিজের অধিনায়কত্ব, নিজের কেরিয়ারের তোয়াক্কা না করে ব্যাট করতে নামলেন ধোনি। কোনো ক্রিকেটপ্রেমীকে মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই পরের কয়েকটা ঘন্টা।

খবরের কাগজ তৈরি করে ছাপাখানায় পাঠানো যাদের চাকরি, তারা বাড়ি ফেরে গভীর রাতে। অমন দিনে দেরি হয় আরও বেশি। আমি বাড়ি ফিরলে সাধারণত ঘুম চোখে উঠে দরজা খুলে দিতেন বাবা। সে রাতেও তিনিই খুলে দেন, তবে একেবারে সজাগ। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বললেন “দারুণ দেখলাম, বুঝলি? একেবারে সাধ মিটিয়ে।” তখনো জানি না, বাবাও জানেন না, তাঁর ফুসফুসে বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার। তিনি দেখে ফেলেছেন শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল।

আরও অনেক ফাইনাল হবে, কোনোটা স্মৃতিতে এভাবে অক্ষয় হবে কিনা জানি না। স্মৃতিতেই তো সঞ্চিত থাকে আমাদের সত্তা, ভবিষ্যৎ।

সংবাদ প্রতিদিন কাগজের রোববার পত্রিকায় প্রকাশিত

যত দোষ ক্রিকেট খেললে: ভারত-পাক বৈরিতার আজব শর্তাবলী

বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি বা এশিয়া কাপের মত প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা পড়লে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিস্ময়করভাবে সিয়াচেনের জওয়ানদের খরচের খাতায় ফেলে দেয়।

 

শচীন তেন্ডুলকর-পরবর্তী প্রজন্মের সেরা ভারতীয় টেস্ট ব্যাটার বিরাট কোহলি যে খেলোয়াড়জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ আজ পর্যন্ত চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাঁর একটি টেস্টও খেলা হয়নি। এই মুহূর্তে পাকিস্তানের টেস্ট দল যথেষ্ট সমীহ করার মত। বাঁহাতি পেসার শাহীন আফ্রিদি তিন ধরনের ক্রিকেটেই নতুন বলে উইকেট তুলে নেওয়ার ব্যাপারে দারুণ ধারাবাহিক। সঙ্গে আছেন তরুণ গতিময় পেসার নাসিম শাহ আর জীবনের প্রথম ছটা টেস্টেই ৩৮ উইকেট নিয়ে ফেলা লেগস্পিনার অবরার আহমেদ। এই বোলিংয়ের বিরুদ্ধে বিরাটদের দাঁড় করিয়ে দিলে খেলা কতটা চিত্তাকর্ষক হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার পাকিস্তান অধিনায়ক বাবর আজম এই মুহূর্তে সব ধরনের ক্রিকেটে বিশ্বের সবচেয়ে ধারাবাহিক এবং নয়নাভিরাম ব্যাটারদের একজন। মহম্মদ রিজওয়ান ব্যাট হাতে এত সফল যে এখন তিনি কখনো কখনো স্রেফ ব্যাটার হিসাবে খেলছেন, উইকেটরক্ষা করছেন প্রাক্তন অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদ। পাকিস্তান বহুকাল পরে পেয়ে গেছে একজন ওপেনারকে, যাঁর বয়স এখন মাত্র ২৩, কিন্তু এমন কিছু কাণ্ড করে বসে আছেন যা অতীতে শুধুমাত্র সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। যেমন প্রথম ছটা টেস্টে তিনি যত রান করেছিলেন তার চেয়ে বেশি রানের রেকর্ড আছে শুধুমাত্র সুনীল গাভস্কর, ডন ব্র্যাডম্যান আর জর্জ হেডলির। এই মুহূর্তে ১৪টা টেস্ট খেলে শফিকের রান ১২২০। এর মধ্যেই চারটে শতরান করে ফেলেছেন, যার একটা আবার দ্বিশতরান। এই পাক ব্যাটিংয়ের বিরুদ্ধে যশপ্রীত বুমরা, মহম্মদ শামি, মহম্মদ সিরাজ বা অশ্বিন-জাদেজার একটা লড়াইয়ের কথা ভাবলে জিভে জল আসবে যে কোনো ক্রিকেটরসিকের। আস্ত সিরিজ হলে তো কথাই নেই। কিন্তু এখানেই মুশকিল।

কোনো অতিনাটকীয় ঘটনা না ঘটলে কোহলি অবসর নেওয়ার আগে এরকম সিরিজ হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। যদি দুই দলই ২০২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠে তাহলে হয়ত একবার এই ঘটনা ঘটতে দেখা যেতে পারে, কারণ বহুদলীয় প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত খেললে ভারত সরকার বা ভারতীয় বোর্ড আপত্তি করে না। বিশেষত যদি খেলাটা হয় তৃতীয় কোনো দেশে। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক সিরিজ? নৈব নৈব চ। কেন? এককথায় উত্তর দিতে গেলে বলতে হবে “সিয়াচেন মেঁ জওয়ান হমারে লিয়ে লড় রহে হ্যাঁয়।”

ব্যাপারটার সূত্রপাত ২০০৮ সালে। সে বছর ১৮ অগাস্ট বিরাট প্রথমবার ভারতের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন আর ২৬ নভেম্বর মুম্বইয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের ঘটনায় দেড়শোর বেশি মানুষের প্রাণ যায়। আক্রমণকারীদের পাক যোগ প্রমাণিত হয়। পরের বছর, অর্থাৎ ২০০৯ সালে, ভারতীয় ক্রিকেট দলের পাকিস্তান সফরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের পর ভারতে প্রায় সব মহল একমত হয় যে ওই পরিবেশে ক্রিকেট খেলা হওয়া সঙ্গত নয়। ফলে মহেন্দ্র সিং ধোনির দলের আর পাকিস্তানে যাওয়া হয়নি। সেবছরই লাহোরে সফররত শ্রীলঙ্কা দলের টিম বাস এবং আম্পায়ার, ম্যাচ রেফারিদের গাড়ির উপর সন্ত্রাসবাদীরা গুলি চালায়। বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার, রিজার্ভ আম্পায়ার এহসান রাজা এবং শ্রীলঙ্কার সহকারী কোচ পল ফারব্রেস আহত হন। আটজন পাকিস্তানি নাগরিক মারাও যান। স্বভাবতই তারপর বহুবছর কোনো দেশের দলই পাকিস্তানে ক্রিকেট খেলতে যেতে রাজি হয়নি। তারপর থেকে দীর্ঘকাল সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর দুবাই বা শারজার মাঠই হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানের ‘হোম গ্রাউন্ড’।

তারপর কিন্তু গঙ্গা এবং সিন্ধু দিয়ে বিস্তর জল গড়িয়ে গেছে। পাকিস্তানের টালমাটাল রাজনীতির নিয়ম মেনে অসংখ্যবার সরকার বদল হয়েছে, পাক আদালতের রায়ে জামাত-উদ দাওয়া প্রধান হাফীজ সঈদের মত কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদীর কারাবাস হয়েছে। ভারতে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদলেছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা পাকিস্তান সম্পর্কে খড়্গহস্ত হলেও তাদের প্রিয় নেতা নরেন্দ্র মোদী আচমকা পাক প্রধানমন্ত্রীর নাতনির বিয়েতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইকে অভূতপূর্ব স্বাধীনতা দিয়ে ভারতের পাঠানকোট সেনা ছাউনিতে ‘তদন্ত’ করতে দিয়েছে ভারত সরকার। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনের কথা উঠলেই – সিয়াচেন… । এই পর্বে পাকিস্তান দল ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ভারতে এসে একদিনের ম্যাচ এবং টি টোয়েন্টি সিরিজ খেলে গেছে। তবে তখনো ভারতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। মোদীজি ক্ষমতায় আসার পর থেকে আর দ্বিপাক্ষিক সফর হয়নি। বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি বা এশিয়া কাপের মত প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা পড়লে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিস্ময়করভাবে সিয়াচেনের জওয়ানদের খরচের খাতায় ফেলে দেয়। সম্ভবত বহুকাল পরে এই দুই দলের একটা ম্যাচের টিকিট ও বিজ্ঞাপন থেকে যত টাকা রোজগার করে যতগুলো পক্ষ, তাতে আদিগন্ত বরফের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা জওয়ানের কষ্ট চাপা পড়ে যায়।

ব্যবস্থাটা ততদিন দিব্যি চলছিল যতদিন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ভারত পাকিস্তানে যাবে না, কিন্তু প্রয়োজনে তাদের ভারতে এসে খেলতে হবে – এটা সুবোধ বালকের মত মেনে নিচ্ছিল। এখন আর মানতে চাইছে না। কারণ সাত বছর হল সফলভাবে পাকিস্তান সুপার লিগ আয়োজিত হচ্ছে, যেখানে ভারত ছাড়া আর সব দেশের ক্রিকেটাররা খেলতে যান। উপরন্তু গত দুবছরে নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মত দেশও পাকিস্তানে এসে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলে গেছে। ফলে টাকার জোরে এবং/অথবা রাজনৈতিক কারণে ভারতীয় বোর্ড তাদের যেখানে ইচ্ছে খেলতে বাধ্য করবে, অথচ নিজেরা পাকিস্তানে খেলতে যাবে না – এ জিনিস পাক বোর্ড মানবে কেন? তাই সম্প্রতি এশিয়া কাপ নিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। বহুকাল আগে থেকে ঠিক ছিল এবারের এশিয়া কাপ হবে পাকিস্তানে। কিন্তু ভারতীয় দল কিছুতেই পাকিস্তানে যাবে না। বিস্তর দড়ি টানাটানির পর পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচটা বাদে অন্যগুলো নিজের দেশে খেলবে আর ভারত খেলবে শ্রীলঙ্কায়; সুপার ফোর স্তরের খেলাগুলো দুই দেশ মিলিয়ে খেলা হবে এবং ফাইনালও হবে শ্রীলঙ্কায় – এরকম দোআঁশলা ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব অন্যায় আবদার চিরকাল চলবে না।

চলার প্রয়োজন কী – সে প্রশ্নটাও তোলার সময় এসেছে। ২৬/১১-র পরেও বহুবার অন্য খেলার পাকিস্তান দল ভারত সফরে এসেছে, ভারতীয় দলও পাকিস্তানে গেছে। ২০২০ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়ে এক মজার কাণ্ড হয়েছিল। ভারতের ক্রীড়ামন্ত্রক এবং সর্বভারতীয় সংস্থা দাবি করেছিল তারা নাকি কোনো দলকে পাঠায়নি, ওদিকে ওয়াগা সীমান্ত পার হয়ে আস্ত একটি দল পাকিস্তানে হাজির হয়।

এ মাসেই চেন্নাইয়ে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস ট্রফি হকিতে পাকিস্তান খেলে গেল। এসবে বোধহয় সিয়াচেনের বরফও গলে না, ২৬/১১-তে মৃত মানুষদের স্মৃতিকেও অসম্মান করা হয় না। মজার এখানেই শেষ নয়। আসন্ন এশিয়ান গেমসে সোনা জিতলে ভারতীয় হকি দল সরাসরি প্যারিস অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। কিন্তু না পারলে যোগ্যতার্জন পর্বের খেলায় যোগ দিতে হবে, যা হবে পাকিস্তানে। হকি ইন্ডিয়ার প্রধান দিলীপ তিরকে ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছেন, সেরকম হলে দল পাকিস্তানে খেলতে যাবে।

আরও পড়ুন এটা যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট; ওঁরা গ্ল্যাডিয়েটর নন, ক্রিকেটার

তাহলে কি অলিম্পিক টিকিটের চেয়ে জওয়ান, শহিদ, মৃত নাগরিকদের প্রাণের দাম কম? নাকি একমাত্র ক্রিকেট দলেরই দায়িত্ব তাঁদের প্রাণের দাম দেওয়া? সে দায়িত্বও বিশ্বকাপ-টাপ এসে পড়লে কদিনের জন্য ভুলে থাকার লাইসেন্স দেওয়া আছে নাকি বোর্ডকে? এ তো বড় রঙ্গ জাদু!

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

এটা যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট; ওঁরা গ্ল্যাডিয়েটর নন, ক্রিকেটার

বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, এশিয়া কাপের সময়ে কি জওয়ানরা লড়েন না? তা যদি হয় তাহলে তো আরও বেশি করে ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ হওয়া উচিত।

ম্যাচে তখন টানটান উত্তেজনা। টিভির পর্দায় দেখা গেল ওভারের মাঝখানে দীর্ঘদেহী হার্দিকের খর্বকায় রিজওয়ানকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য। চমকে যাওয়ার পর রিজওয়ানও ভালবেসে টেনে নিলেন হার্দিকের হাত। ম্যাচের আগের কদিন টুইটারে ভাইরাল হয়েছিল একটা ভিডিও। চোটের কারণে এশিয়া কাপ ক্রিকেট থেকে ছিটকে যাওয়া শাহীন আফ্রিদি মনমরা হয়ে প্র্যাকটিসের মাঠের ধারে বসেছিলেন। বিরাট কোহলিকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়ালেন। বিরাট জিজ্ঞেস করলেন পা কেমন আছে। আফ্রিদি বললেন, আমরা আপনার জন্য প্রার্থনা করছি, যেন আপনার ফর্ম ফিরে আসে।

এই আবহে খেলা হল রবিবারের ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ। এর আগের ম্যাচ হয়েছিল ২৪ অক্টোবর ২০২১, ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি উপলক্ষে। সে ম্যাচ দাপটে জিতেছিল পাকিস্তান। এবারে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হল। শেষপর্যন্ত তফাত গড়ে দিলেন পান্ড্য, ভারত জিতল। কিন্তু কোনো ম্যাচেই কোনো অবাঞ্ছিত উত্তাপ তৈরি হয়নি। বরং সাম্প্রতিককালে ভারত বনাম ইংল্যান্ড খেলা হলে ম্যাচের আগে, পরে এবং মাঝে বেশ কিছু অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে দেখা গেছে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রতিবেশীর খেলা বরং ঠিক সেভাবেই হল যেভাবে হওয়া উচিত – ব্যাট বলের লড়াইতে কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়ল না, কিন্তু মুখের হাসিটি বজায় রইল। শুধু তা-ই নয়, পাক ব্যাটার ফখর জমান আউটের আবেদন না হলেও বল ব্যাটে লেগেছে বুঝতে পেরে নিজেই হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। তবু কিন্তু এই দুই দলের মধ্যে সিরিজ খেলা হবে না।

আরও পড়ুন টুপির আমি টুপির তুমি?

শেষ ভারত-পাকিস্তান টেস্ট খেলা হয়েছিল ২০০৭ সালে আর শেষ একদিনের ম্যাচ ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে। দীর্ঘকাল হল ভারত বহুদলীয় প্রতিযোগিতার বাইরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে না। আবার আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ বহুদলীয় হওয়া সত্ত্বেও সেখানে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে না। কেন খেলে না? কারণ স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান কুণাল কামরার ভাষায় “জওয়ান সীমা পে লড় রহে হ্যাঁয়”। তাহলে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, এশিয়া কাপের সময়ে কি জওয়ানরা লড়েন না? শান্ত হয়ে বসে টিভিতে খেলা দেখেন? তা যদি হয় তাহলে তো আরও বেশি করে ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ হওয়া উচিত। প্রক্সি ওয়ারে সীমান্তের এপারে ওপারে নিয়মিত যে জওয়ানদের প্রাণ যায়, সেগুলো বেঁচে যাবে। আসল কথা, নিয়মিত খেলা হলে প্রত্যেকটা ম্যাচ নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ পরিবেশ তৈরি করা আর সম্ভব হবে না। মাঠে ক্রিকেটারদের হাসিঠাট্টা, স্বাভাবিক ব্যবহার দেখতে দেখতে এপারের দেড়শো কোটি আর ওপারের কোটি পঁচিশেক মানুষ যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে, প্রতিবেশী দেশের মানুষ মানেই ইবলিশের বাচ্চা বা রক্তপিপাসু জেহাদি সন্ত্রাসবাদী নয়, তাহলে সমূহ বিপদ দুই দেশের শাসকদেরই। তখন দেশের বেকারত্ব, দেশের মুদ্রাস্ফীতি, দেশের সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি নিয়ে জবাবদিহি করতে হবে। সে বিপদ এড়াতে কালেভদ্রে ম্যাচ হবে, পিচে পপিং ক্রিজ চিহ্নিত করতে টানা লাইনটাকে নিয়ন্ত্রণরেখার সাথে তুলনা করে সম্প্রচারকারী সংস্থা বিজ্ঞাপন দেবে আর প্রগলভ রবি শাস্ত্রীর কণ্ঠে শোনানো হবে – এটা স্টেডিয়াম নয়, কলিসিয়াম। ওরা ক্রিকেটার নয়, গ্ল্যাডিয়েটর। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই খেলার মাঠ লড়াইয়ের মাঠ হয়ে উঠবে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

পরমাণু বোমার রাজনৈতিক ক্ষতিসাধনের প্রমাণ এই যুদ্ধ

লক্ষ করে দেখুন, এই মুহূর্তে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি শোষণমূলক, অগণতান্ত্রিক, বুলডোজার-নির্ভর শাসন চলছে।

ইউক্রেনকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সদস্যপদ দিতে উদগ্রীব। ইউরোপিয়ান কমিশন শুক্রবার (১৭ জুন, ২০২২) ভোলোদিমির জেলেনস্কির দেশকে সদস্য করে নেওয়ার সুপারিশ করেছে। সাতাশটা সদস্য দেশের অনুমোদন পেলেই ইউক্রেন পুরোদস্তুর পশ্চিমি দেশ হয়ে উঠবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন দের লেয়েন বলেছেন, ইউরোপ চায় ইউক্রেন “ইউরোপিয়ান ড্রিম” যাপন করুক। কথাগুলো শুনতে চমৎকার। কিন্তু পড়ে কি মনে হচ্ছে, কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের কথা বলা হচ্ছে? অথচ গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর প্রায় চার মাস কেটে গেছে। ক্রমশ একের পর এক এলাকায় যুদ্ধ ছড়িয়েছে এবং সাধারণ মানুষও আক্রান্ত হয়েছেন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে। যত দিন যাচ্ছে সেসব অভিযোগ বেড়েই চলেছে। যদিও ইউক্রেনের মত ছোট্ট একটা দেশ যত সহজে হেরে যাবে বলে মনে করা হয়েছিল, তত সহজে তারা হারছে না। রাশিয়া চার মাসেও আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি। কিন্তু ইউক্রেন বিশ্বের অন্য শক্তিগুলোর কাছ থেকে যতটা সাহায্য আশা করেছিল, তা পেয়েছে কি? এই প্রশ্নটা নিয়ে আলোচনা দরকার। কারণ আমাদের সকলের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত এখান থেকে পাওয়া যাবে।

রাশিয়া যে যে কারণে ইউক্রেন আক্রমণ করেছিল, তার অন্যতম হল গত কয়েক বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটোর সাথে ইউক্রেনের আশনাই। পুতিন যে নির্বাচনী গণতন্ত্রের ভেক ধরে রাশিয়ায় একনায়কতন্ত্র চালান, তা নিয়ে সারা বিশ্বের কোনো রাজনৈতিক মতের লোকেরই বিশেষ সন্দেহ নেই। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর মুখেই মার্কিন বিদেশনীতির ঘোরতর বিরোধী নোয়ম চমস্কি বলেছিলেন, পুতিনের জায়গায় মহাত্মা গান্ধী রাশিয়ার কর্ণধার হলেও ন্যাটোর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে আরও কাছাকাছি, আরও কাছে এসো বলা মেনে নিতেন না। ন্যাটো তৈরি হয়েছিল ঠান্ডা যুদ্ধের আমলে, সোভিয়েত ব্লকের দেশগুলোর প্রতিস্পর্ধী সংগঠন হিসাবে। অথচ সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই আজ তিরিশ বছর, ন্যাটো কিন্তু পূর্ব ইউরোপে ডালপালা বিস্তার করেই চলেছে। তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক, এটা নেহাত মার্কিনবিরোধী বামপন্থী যুক্তি। ইউক্রেন একটা স্বাধীন দেশ। সে যদি মনে করে রাশিয়ার পাড়ায় বাস করেও ভ্লাদিমির পুতিনের অপছন্দের আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের সাথে অভিসারে যাবে, তাতে কার কী বলার থাকতে পারে? কিন্তু কথা হল, রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর থেকে জেলেন্সকি যে বারবার ন্যাটোর সাহায্য প্রার্থনা করলেন, তার ফল কী? ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে তো সারা পৃথিবীর মানুষ মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের কথাবার্তা শুনে আশঙ্কা করছিলেন, ন্যাটো রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যাবে। তেমন কিছু ঘটল না তো!

যুদ্ধ শুরু হওয়ার দু সপ্তাহের মধ্যেই (৯ মার্চ) জেলেন্সকি বলে দিয়েছিলেন ইউক্রেন আর ন্যাটোর সদস্য হতে চায় না। কারণ ন্যাটো ইউক্রেনকে যুক্ত করতে তৈরি নয়। তৎসত্ত্বেও ২৪ মার্চ ব্রাসেলসে ন্যাটোর যে জরুরি বৈঠক হয় সেই বৈঠকে তিনি বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ যথেষ্ট নয়। “আপনাদের এক শতাংশ যুদ্ধবিমান আর এক শতাংশ ট্যাঙ্ক আমাদের দিন। আমাদের কিনে নেওয়ার ক্ষমতা নেই। যদি আমাদের ওগুলো দিয়ে সাহায্য করেন, তাহলে আমরা একশো শতাংশ সুরক্ষিত হতে পারি।” ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রঁ কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন “ন্যাটো ঠিক করেছে এই যুদ্ধে ইউক্রেনকে সাহায্য করবে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে না জড়িয়ে।” ইউক্রেনের প্রেমের এই প্রতিদান দিল ন্যাটো। এ যেন এক পৃথিবী লিখব বলে একটা খাতাও শেষ না করার মত প্রেম। আর এতদিন পরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ‘ক্যান্ডিডেট মেম্বারশিপ’ (চূড়ান্ত সদস্যপদ পেতে সাধারণত বছর দশেক লাগে) দেওয়া হল জড়োয়ার গয়নার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইমিটেশন দুল উপহার দেওয়া।

কেন এমন করল ন্যাটো? এক কথায় এর উত্তর সম্ভবত – পরমাণু শক্তি। মনে করুন পরমাণু বোমা যদি ১৯৩০-এর দশকেই আবিষ্কৃত হত, তাহলে অ্যাডলফ হিটলার একের পর এক অস্ট্রিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে নিল দেখেও ইংল্যান্ড, ফ্রান্স যেমন বিনীতভাবে হাত কচলাচ্ছিল; ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণ করার পরেও হয়ত সেভাবেই চালিয়ে যেত। তাহলে পৃথিবীর ইতিহাস কী হত ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। পরমাণু শক্তি আমাদের কী কী ক্ষতি করেছে তা নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন হিরোশিমা-নাগাসাকি, চেরনোবিল, ফুকুশিমা, তেজষ্ক্রিয়তা – এসব নিয়েই বেশি কথা হয়। কিন্তু পরমাণু বোমার অস্তিত্ব আমাদের যে বিপুল রাজনৈতিক ক্ষতি করেছে তা চট করে স্মরণে আসে না। পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো আজকের বিশ্বে তার প্রতিবেশে যদৃচ্ছা মাস্তানি করতে পারে। ছোট দেশগুলোর পক্ষ নিয়ে কেউ লড়তে আসবে না, কারণ পরমাণু বোমার ভয়। এ এমন এক শক্তি, যার পরিমাণ বাড়লে শক্তি বাড়ে না। ধরুন রাশিয়ার একশোটা পরমাণু বোমা আছে, আমেরিকার আছে পাঁচশোটা। আমেরিকা তবু রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না। কারণ একখানা উড়ে এসে পড়লেই তো যথেষ্ট। তারপর ফিরে পাঁচখানা ছুঁড়লেই বা কী লাভ হবে? হপ্তা দুয়েক আগেই বাইডেন বলে বসেছিলেন, চীন তাইওয়ান আক্রমণ করলে আমেরিকা সামরিকভাবে তার মোকাবিলা করবে। অনতিবিলম্বেই কিন্তু হোয়াইট হাউস এক বিবৃতি দিয়ে জানায়, চীন সম্পর্কে আমেরিকার দীর্ঘকালীন নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। সোজা কথায়, ঢোঁক গেলে। কারণটা একই।

তাহলে আমাদের নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত তো? কারণ ভারত পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র। আমরা তো প্রয়োজন পড়লে এ তল্লাটে যা ইচ্ছে তাই করতেই পারি। আমরা গান্ধী-নেহরুর দেশ বলেই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করাকে অন্যায় মনে করব, সে যুগ চলে গেছে। আমাদের দেশনায়কদের এখন আরাধ্য ইজরায়েল, যাদের অস্তিত্ব ও বিস্তার প্যালেস্তাইনকে গিলে নিয়ে। তাহলে?

আরও পড়ুন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

হাতে বিষের নাড়ুর মত বোমা আছে বলে অত আহ্লাদিত হবেন না। কারণ আমাদের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রও (চীন ও পাকিস্তান) পরমাণু শক্তিধর। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিপদ অন্যখানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হলে ইউরোপের কী হত, বাকি পৃথিবীর কী হত সেকথা থাক। জার্মানির মানুষের কী হত ভাবুন। নাজিদের সবচেয়ে বেশি অত্যাচারের শিকার হয়েছেন তো সে দেশের মানুষই। আরও কত গ্যাস চেম্বার হত, ইহুদী ফুরিয়ে যাওয়ার পর কাদের সেগুলোতে ঢোকানো হত ভেবে দেখুন। যুদ্ধের হাওয়ায় নাজি জার্মানির অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছিল একটা সময়ে। যুদ্ধ মিটে গেলে কী হত? কত মানুষ অনাহারে মারা যেতেন? লক্ষ করে দেখুন, এই মুহূর্তে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি শোষণমূলক, অগণতান্ত্রিক, বুলডোজার-নির্ভর শাসন চলছে। তা নিয়ে অন্য কোনো দেশ সমালোচনা করলেই চট করে বলা হয় “আভ্যন্তরীণ বিষয়”। এ নেহাত কাকতালীয় ঘটনা নয়। এই দেশগুলোর শাসকরা জানে, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, গ্যাস চেম্বার বা তার চেয়েও খারাপ কিছু ঘটে গেলেও অন্য কোনো দেশ সেনাবাহিনী পাঠিয়ে কোনো দেশের মানুষকে মুক্ত করার কথা স্বপ্নেও ভাববে না। কারণ পুতিন, মোদী, জিনপিংদের হাতে আছে একটা সর্বশক্তিমান ব্রিফকেস। সুতরাং পরমাণু শক্তিধর দেশের নাগরিক হিসাবে আমাদের বরং বেশি দুশ্চিন্তায় থাকা উচিত। আমরা স্বাধীন নই, পরমাণু শক্তির অধীন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

সবাই চুপ করে থাকবে, মানিয়ে নিন শামি

পাকিস্তান ম্যাচে হিন্দুরা খারাপ পারফরম্যান্স করলে সন্দেহ করার কিছু নেই, মুসলমানকে সন্দেহ করতে হবে — এই মানসিকতার বিরুদ্ধে কুম্বলে, শচীনরা একটাও কথা বলেননি।

ঘটনা ১

রাজস্থানের বাসিন্দা নাফিসা আত্তারি গত মঙ্গলবার তাঁর চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন, বুধবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। কারণ তিনি সোশাল মিডিয়ায় রবিবারের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে পাকিস্তান জিতে যাওয়ার পর আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন।

ঘটনা ২

কাশ্মীরের শ্রীনগরের শের-এ-কাশ্মীর ইনস্টিটিউট অফ মেডিকাল সাইন্সেস আর গভমেন্ট মেডিকাল কলেজের ছাত্রছাত্রী, ওয়ার্ডেন ও ম্যানেজমেন্টের লোকেদের বিরুদ্ধে কুখ্যাত ইউএপিএ আইনে মামলা দায়ের করেছে পুলিস। অভিযোগ পাকিস্তানের জয়ে উল্লাস করা, বাজি পোড়ানো ইত্যাদি। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা হয়নি, তবে পুলিস বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। ক্যাম্পাসে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে।

ঘটনা ৩

রবিবার ভারত-পাক ম্যাচের পর একটি দক্ষিণপন্থী ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করা হয় যে মুসলমান পাড়ায় পাকিস্তান জেতার পর বাজি পোড়ানো হয়েছে। পুলিস তদন্ত করে দেখে যে ওই পাড়ায় সেদিন বিয়ে ছিল এবং বাজি আসলে সেখানেই পোড়ানো হচ্ছিল। যারা ফেসবুক পোস্টটি করেছিল, তারা দোষ স্বীকার করে লিখিতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। পুলিস তাদের প্রত্যেককে দিয়ে ২৫ হাজার টাকার বন্ড জমা করিয়েছে।

ঘটনা ৪

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেছেন পাকিস্তানের জয় যারা উদযাপন করেছে তাদের বিরুদ্ধে সিডিশন ল, অর্থাৎ দেশদ্রোহবিরোধী আইন প্রয়োগ করা হবে। আগ্রাতে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ইতিমধ্যেই ।

সব ঘটনা উল্লেখ করা গেল না, নিশ্চিতভাবেই অনেক ঘটনা বাদ পড়ে গেল। পাঠকরা নিজেদের জানা ঘটনা এই তালিকায় জুড়ে নিতে পারবেন। এমন ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা সম্ভব হলে তা কুড়ি বিশের বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের একমাত্র মুসলমান ক্রিকেটার মহম্মদ শামির কাছে পাঠানো যেতে পারে। তাতে তাঁর মানসিক যন্ত্রণার কিছু উপশম হলেও হতে পারে। কারণ এই ঘটনাগুলো জানলে তিনি বুঝতে পারবেন, পাকিস্তানের কাছে ভারত হেরে যাওয়ার পর থেকে তাঁকে যা সহ্য করতে হয়েছে তা ভারতের সাধারণ মুসলমানদের দুর্গতির তুলনায় কিছুই নয়। তাঁকে নাহক অনলাইন গালাগালি সহ্য করতে হয়েছে, জামিন অযোগ্য ধারায় পুলিশ কেস তো আর হয়নি। চাকরিও খোয়াতে হয়নি। বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ উঠেছে মাত্র, সে অভিযোগের ভিত্তিতে অন্তত গ্রেপ্তার করা হয়নি। শামির নিয়োগকর্তা যে ক্রিকেট বোর্ড, সে বোর্ডের সেক্রেটারি যখন খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র, তখন দেশে ফিরলেও যে শামিকে ৩.৫ ওভারে ৪৩ রান দেওয়ার জন্য গ্রেপ্তার করা হবে না তা নিশ্চিত করে বলা যায়। সে নিশ্চয়তা এ মুহূর্তে ভারতের অধিকাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বীর নেই।

ফুটবলপ্রেমীরা জানেন ১৯৬৯ সালে একটা ফুটবল ম্যাচের জন্য হন্ডুরাস আর এল সালভাদোরের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। মানে খেলার জন্য যুদ্ধ হওয়ার ইতিহাস আছে। কিন্তু ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ হল যুদ্ধের জন্য খেলা — গত পাঁচ দিনের ঘটনাবলী তা প্রমাণ করে দিয়েছে। পাকিস্তানের গণতন্ত্র নিয়ে অতি বড় পাকিস্তানিও গলা তুলে কথা বলতে সঙ্কোচ বোধ করেন। আর ভারত এখন এত মহান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যে ক্রিকেট ম্যাচে অন্য দেশের দলকে সমর্থন করলে চাকরি হারাতে হয়, গ্রেপ্তার হতে হয়, এমনকি দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগেও অভিযুক্ত হতে হয়। কিন্তু সে কথা বললে অর্ধেক বলা হয়। কোনো ভারতীয় অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, এমনকি ইংল্যান্ডকেও সমর্থন করতে পারেন। জেলে যেতে হবে না। যত দোষ পাকিস্তানকে সমর্থন করলেই। কেবল অন্ধ ক্রিকেটভক্তরা নয়, ক্রিকেটাররা পর্যন্ত তা-ই মনে করেন। প্রাক্তন ক্রিকেটার গৌতম গম্ভীর রবিবারই টুইট করেছিলেন, যারা ভারতের জয়ে বাজি পোড়াচ্ছে তারা ভারতীয় হতে পারে না। তিনি অবশ্য এখন বিজেপি সাংসদ, তাই এমন মন্তব্য তাঁর থেকে অপ্রত্যাশিত নয়, কিন্তু বীরেন্দ্র সেওয়াগও তীর্যক টুইট করতে ছাড়েননি। তাঁর বক্তব্য দীপাবলিতে ভারতের বেশকিছু এলাকায় বাজি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, অথচ পাকিস্তান জেতার পরে লোকে বাজি পোড়াচ্ছে। তারা বোধহয় ক্রিকেটের জয় উদযাপন করছে। তাহলে দীপাবলিতেই বা বাজি পোড়ালে দোষ কী? এই ভণ্ডামির কী প্রয়োজন? সব জ্ঞান দীপাবলির বেলাতেই কেন? সীমান্তের ওপারের ওঁরাও কিছু কম যান না। এক মন্ত্রী বলেছেন এই জয় ইসলামের জয়। প্রাক্তন ক্রিকেটার ওয়াকার ইউনিস লাইভ টিভিতে বলেছেন, রিজওয়ানের ব্যাটিংয়ের চেয়েও তৃপ্তিদায়ক ব্যাপার হল হিন্দুদের মধ্যে গিয়ে নমাজ পড়া। অর্থাৎ এতগুলো লোক তক্কে তক্কে ছিল যুদ্ধ করবে বলে — ধর্মযুদ্ধ।

আরও পড়ুন এটা যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট; ওঁরা গ্ল্যাডিয়েটর নন, ক্রিকেটার

কিন্তু এতেও সবটা বলা হল না। কারণ পাকিস্তানে এখন পর্যন্ত বিরাট কোহলি চার-ছয় মারার সময়ে উল্লাস করার জন্য কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে খবর নেই। ওয়াকারকেও তাঁর মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করে টুইট করতে হয়েছে । কিন্তু সেওয়াগ, গম্ভীররা ওসবের ধারে কাছে যাননি। কারণ পাকিস্তানি মন্ত্রী, প্রাক্তন ক্রিকেটাররা যেমন শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করেছেন, এঁরা মনে করেন এঁরাও তেমনই শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করেছেন। কে সেই শত্রু? উত্তরটা খুব সোজা। কানে বাজির আওয়াজ এলেই যাদের সম্বন্ধে মনে হয় নির্ঘাত ওরাই পোড়াচ্ছে এবং পাকিস্তান জিতেছে বলেই পোড়াচ্ছে, তারাই শত্রু, তারাই দেশদ্রোহী। অর্থাৎ আপনি ভারতীয় হয়ে পাকিস্তানকে সমর্থন করেও বেঁচে যেতে পারেন, যদি মুসলমান না হন।

নেহাত গা জোয়ারি মন্তব্য করা হল? মুসলমানদের দিকে ঝোল টেনে কথা বলা হল মনে হচ্ছে? মহম্মদ শামিকে রাম, শ্যাম, যদু, মধুর ‘গদ্দার’ ইত্যাদি বলা দেখেই সে সন্দেহ দূর হয়ে যাওয়ার কথা। যদি তারপরেও সন্দেহ থাকে, তাহলে শামির সমর্থনে ভারতীয় প্রাক্তন ক্রিকেটারদের টুইটগুলো লক্ষ করবেন। গম্ভীর, সেওয়াগ তো বটেই; অনিল কুম্বলে, ভারতীয় ক্রিকেটের মৌনীবাবা শচীন তেন্ডুলকর — সকলেই শামি যে নির্দোষ সেই মর্মে টুইট করেছেন। সকলেরই বক্তব্য মোটামুটি এক। শামি চ্যাম্পিয়ন বোলার; খেলার মাঠে একটা খারাপ দিন যে কোনো খেলোয়াড়ের যেতে পারে; শামি, আমরা তোমাকে ভালবাসি, ইত্যাদি। একজনও কিন্তু বলেননি, শামি ভারতের হয়ে ক্রিকেট খেলে, আমরাও ভারতের হয়ে খেলেছি। ওকে সন্দেহ করা আর আমাদের সন্দেহ করা একই কথা। যারা তা করে তাদের মত ফ্যান আমাদের দরকার নেই। ইংল্যান্ডের ফুটবল দলের অধিনায়ক হ্যারি কেন কিন্তু পেনাল্টি শুট আউটে গোল করতে ব্যর্থ কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলারদের সমর্থনে ঠিক এই কথাই বলেছিলেন। শচীনরা বলেননি, কারণ ওঁরা খুব ভাল করে জানেন শামি মুসলমান বলেই সে সন্দেহের পাত্র। উইকেট না পেলেও, মার খেলেও যশপ্রীত বুমরা, ভুবনেশ্বর কুমার, রবীন্দ্র জাদেজা সন্দেহের পাত্র নয়। পাকিস্তান ম্যাচে হিন্দুরা খারাপ পারফরম্যান্স করলে সন্দেহ করার কিছু নেই, মুসলমানকে সন্দেহ করতে হবে — এই মানসিকতার বিরুদ্ধে কুম্বলে, শচীনরা একটাও কথা বলেননি। তাঁরা তবু মুখ খুলেছেন, অধিনায়ক ডাকাবুকো কোহলির থেকে পাওয়া গেছে বিরাট নীরবতা। সমালোচকদের বিরুদ্ধে কথার ফুলঝুরি ছোটানো কোচ রবি শাস্ত্রীরও মুখে কুলুপ। এমনকি টিমের বড়দা (মেন্টরের বাংলা প্রতিশব্দ পরামর্শদাতা। ধোনির জন্য সেটা বড্ড ম্যাড়মেড়ে নয়?) মহেন্দ্র সিং ধোনিও চুপ।

কেনই বা চুপ থাকবেন না? ওঁরাও তো আমার, আপনার মত কাগজ পড়েন, টিভি দেখেন, সোশাল মিডিয়া ঘাঁটেন। ফলে ওঁরা দেশের অবস্থা সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। ওঁরা হয়ত জানেন গুজরাটের আনন্দ (আমুল খ্যাত) শহরের মঙ্গলবারের ঘটনা। সেখানে একটি নতুন হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ব্যাঙ্কোয়েট হলের উদ্বোধন আটকাতে বিরাট জনতা হাজির হয় গত পরশু। তারা গঙ্গাজল দিয়ে এলাকা শুদ্ধিকরণের প্রয়াস করেছে। স্লোগান দিয়েছে, ভারতে থাকতে হলে জয় শ্রীরাম বলতে হবে। হিন্দু এলাকায় মুসলমান মালিকের হোটেল থাকবে, এ অনাচার তারা মানতে রাজি নয়। খবরে প্রকাশ, হোটেলটির তিন মালিকের একজন হিন্দু। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।

ধোনি ঝাড়খন্ডের মানুষ, দিব্যি বাংলা বলতে পারেন। রাঁচিতে তাঁর ঘনিষ্ঠ লোকজনদের মধ্যেও বাঙালি আছেন। তাঁর প্রতিভা প্রথম চিনেছিলেন কেশব ব্যানার্জি নামের এক বাঙালি মাস্টারমশাই। ফলে ধোনি হয়ত ত্রিপুরার খবরও রাখেন। হয়ত ভাল করেই জানেন, ওই রাজ্যে কীভাবে মুসলমান খ্যাদানো চলছে কদিন ধরে আর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মালিকানায় চলা সংবাদমাধ্যম চোখ বুজে আছে। এই পরিবেশের মধ্যে ধোনির কী দায় পড়েছে মুসলমান সতীর্থের হয়ে মুখ খোলার?

এত ঘটনা না জানলেও আইপিএল খেলা তারকা ক্রিকেটাররা বিলক্ষণ জানেন, এক গ্রাম মাদক উদ্ধার না হওয়া সত্ত্বেও শাহরুখ খানের ছেলেকে তিন সপ্তাহ কারাবাস করতে হল। ইতিমধ্যে তদন্তকারী অফিসারের বিরুদ্ধে নানা কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠে এসেছে। যে দেশে অর্ণব গোস্বামীর জামিনের জন্য মধ্যরাতে আদালত বসতে পারে, সে দেশে আদালতের সময়ই হয় না মাসের পর মাস, বছরের পর বছর উমর খালিদের জামিনের আবেদন শোনার। শার্জিল ইমাম যে কথা বলেননি তার জন্য, সিদ্দিক কাপ্পান যে প্রতিবেদন লেখেননি তার জন্য, মুনাওয়ার ফারুকি যে কৌতুক করেননি তার জন্য এবং আরিয়ান খান যে মাদক নেননি তার জন্য — কারাবাস করতে পারেন। একজন আদানির বন্দরে কয়েক হাজার গ্রামের মাদক পাওয়া গেলেও তেমন হেলদোল হয় না আইনের রক্ষকদের, একজন খানকে রেভ পার্টিতে পাওয়া গেলেই সে কেবল মাদকাসক্ত নয়, মাদক ব্যবসায়ী হয়ে যায় সারা দেশের চোখে — এ কথা আমাদের মত ক্রিকেট তারকারাও জানেন। তাই তাঁরা চুপ করেই থাকবেন।

শামি, আপনি মানিয়ে নিন। আপনার চেয়ে অনেক দূরে, অনেক নীচে থাকা ভারতীয় মুসলমানরা প্রতিনিয়ত যেমন মানিয়ে নিচ্ছেন।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ভারত-পাক না হলে যাদের লাভ, হলে তাদের বেশি লাভ

তবে কি রাজনৈতিক ক্ষতি স্বীকার করে ব্যবসায়িক লাভ করার রাস্তা তৈরি করা হয় ভারত-পাক ম্যাচে? মোটেই না।

১৯৭১ সালের ভারত-পাক যুদ্ধে যখন সীমান্তে আমাদের জওয়ানরা লড়ছিল, তখন আপনি কোথায় ছিলেন?

সুনীল গাভস্করকে যদি কেউ এই প্রশ্নটা করে বসে, তাহলে ভদ্রলোকের দেশপ্রেম বর্তমান সংজ্ঞা অনুযায়ী প্রমাণ করা মুশকিল হবে। কারণ তিনি তখন অস্ট্রেলিয়ায় অবশিষ্ট বিশ্ব একাদশের হয়ে খেলছিলেন। শুধু তা-ই নয়, সেই দলে গাভস্কর, বিষাণ সিং বেদি আর ফারোখ ইঞ্জিনিয়ার যেমন ছিলেন, তেমনি পাকিস্তানের ইন্তিখাব আলম, আসিফ মাসুদ, জাহির আব্বাসরাও ছিলেন। এমনকি যুদ্ধ নিয়ে সেই দলে রসিকতাও হত। যেমন সহখেলোয়াড় রিচার্ড হাটন (ইংল্যান্ড) বলেছিলেন যুদ্ধ করতে করতে ফারোখ যদি ইন্তিখাবের পেটে বেয়নেট ঢুকিয়ে দেন, তাহলেও ইন্তিখাব মরবেন না। ওঁর পেটে চর্বি এতই বেশি, যে বেয়নেট ওখানেই আটকে যাবে। এসব কথা গাভস্কর ‘সানি ডেজ’ নামে তাঁর বইতে সকৌতুকে লিখেছেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তিনি বহু স্মরণীয় ইনিংস খেলেছেন, এমনকি শেষ টেস্ট ইনিংসেও অসম্ভব কঠিন পিচে প্রায় শতরান করে ফেলেছিলেন। অর্থাৎ ব্যাটসম্যান গাভস্কর পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের যারপরনাই জ্বালাতন করেছেন। তবু, সত্যিকারের যুদ্ধ চলাকালীনও পাক ক্রিকেটারদের সাথে কী ধরনের বন্ধুত্ব বজায় ছিল তা এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়। আরও বোঝা যায়, ভারত বা পাকিস্তানের সরকারও এই ক্রিকেটারদের একসাথে খেলা নিয়ে মাথা ঘামাননি। তাঁদের কাজ তখন যুদ্ধ পরিচালনা করা। তা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। ক্রিকেটারদের কাজ ক্রিকেট খেলা, তাঁরাও সেটাই করছিলেন। যে দেশের সাথে যুদ্ধ হচ্ছে সে দেশের ক্রিকেটারদের সাথে খেললে মহাভারত অশুদ্ধ হবে — এমন ভাবার ফুরসত ছিল না কারোর।

কিন্তু যুগ বদলেছে। ১৯৯৯ সালের পর থেকে ভারত-পাক যুদ্ধ আর হয়নি (প্রক্সি ওয়ার ১৯৪৭ থেকে কখনো থেমেছে কিনা সন্দেহ)। তবু পাকিস্তানের সাথে ক্রিকেটীয় সম্পর্ক রাখলে সীমান্তের জওয়ানদের অসম্মান করা হবে — এমন বলা হয়। পাকিস্তানের ছায়া মাড়ানোও বারণ। তাই আইপিএলে পর্যন্ত পাকিস্তানের ক্রিকেটার বা কোচ নেই বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। দু দেশের মধ্যে শেষবার সাদা বলের সিরিজ খেলা হয়েছিল ২০১২-১৩ মরসুমে আর শেষ টেস্ট সিরিজ ২০০৭ সালে। যখন কোনো আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে, তখন কিন্তু জওয়ানদের অসম্মান করা হল বলে ভারত সরকার মনে করেন না। ফলে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি বা বিশ্বকাপে ম্যাচটা হয়। এই ম্যাচে আইসিসির লক্ষ্মীর ভান্ডার উপচে পড়ে। পৃথিবীর যেখানেই খেলা হোক, অনাবাসী ভারতীয় ও পাকিস্তানিরা মাঠ ভরিয়ে দেন। সরাসরি টিভি সম্প্রচারের সেদিন মোচ্ছব। যে প্রবল দেশপ্রেমিকরা এমনিতে দু দেশের মধ্যে খেলাধুলোর তীব্র বিরোধী, তাঁরা কেউ ম্যাচটা বয়কট করার ডাক দেন না। টুইটারে টিভি বন্ধ রাখার কোনো হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেনও চলে না।

আসলে সবার উপরে ব্যবসা সত্য, তাহার উপরে নাই। খেলা না হলে রাজনৈতিক লাভ, কিন্তু নিয়মিত খেলা হয় না বলেই আইসিসি টুর্নামেন্টে খেলা হলে ব্যবসায়িক লাভ দ্বিগুণ। আর সে লাভে হস্তক্ষেপ করলে মহাশক্তিধর নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহও অসুবিধায় পড়বেন। তাই রাত পোহালে ওয়ার্ল্ড টি২০-তে যে ভারত-পাক ম্যাচ, কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী হানার প্রতিবাদে সেই ম্যাচে খেলা উচিত নয় — এমন বিবৃতি দেন গিরিরাজ সিংয়ের মত কম গুরুত্বপূর্ণ বিজেপি নেতারা। অনুরাগ ঠাকুর বা অমিত শাহ নন। অমিতবাবুর সুপুত্র নিজেই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের হর্তাকর্তা, চাইলেই তো ম্যাচ বয়কট করাতে পারতেন। বিরাট কোহলিদের মাত্র কয়েকটা পয়েন্টের লোকসান হত। কিন্তু পিতা পুত্রকে অমন করতে বলবেন না, কারণ আসল লোকসান হত কয়েকশো কোটি টাকার। কেবল বোর্ড নয়, সরকার-বান্ধব বহু ব্যবসায়ীর।

আরো পড়ুন টুপির আমি টুপির তুমি?

তবে কি রাজনৈতিক ক্ষতি স্বীকার করে ব্যবসায়িক লাভ করার রাস্তা তৈরি করা হয় ভারত-পাক ম্যাচে? মোটেই না। জর্জ অরওয়েল খেলাধুলো সম্পর্কে বলেছিলেন, এ হল গুলিবর্ষণ না করে যুদ্ধ। কালেভদ্রে হওয়া ভারত-পাক ম্যাচে দু দেশের ক্রিকেটমোদীদের মধ্যে ঘৃণার বান ডাকে, সোশাল মিডিয়ায় খিস্তির ঢল নামে। দু দেশের সরকার তো তেমনটাই চান। বরং অন্য সময় এই ঘৃণা জিইয়ে রাখতে বাড়তি প্রয়াসের দরকার হয়, এই ম্যাচের আগে, পরে পায়ের উপর পা তুলে মজা দেখা যায়।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

সুবোধ কুমারের সন্ততি

ভেবে দেখলাম যে অক্ষয় ধন আমার সন্তানকে দিয়ে যেতে পারি তা হল সমাজ, সংসারের সঙ্গে, সারা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের বোধ

ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

– শঙ্খ ঘোষ (বাবরের প্রার্থনা)

যেদিন বাবা হয়েছি সেদিন থেকে ভেবে চলেছি, মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার সময় সন্তানকে যা যা দিয়ে যেতে পারে তার মধ্যে কোনটা সবচেয়ে মূল্যবান?

অনেকে টাকাপয়সা, ধনসম্পদ দিয়ে যান। টাকার দাম মুদ্রাস্ফীতির কারণে দিন দিন কমে, সম্পত্তির মূল্যও নানা কারণে বাড়ে কমে। কথায় বলে কুবেরের ধনও ফুরিয়ে যায়। ফলে সন্তানকে যত ধনসম্পত্তিই দিয়ে যান না কেন, তার মূল্য অবিকৃত থাকবে না।

সফল, কৃতি মানুষেরা তাঁদের সন্তানদের খ্যাতি দিয়ে যান। কিন্তু সেই খ্যাতি বজায় রাখতে হলে সন্তানকেও বিখ্যাত বাবা কি মায়ের মত প্রতিভাবান এবং সফল হতে হয়, যা প্রায়শই হয় না। উপরন্তু বাবা-মায়ের খ্যাতির অপব্যবহার করে সন্তান তাঁদের দুর্নামের কারণ হচ্ছে — এমন দৃষ্টান্তই চোখে পড়ে বেশি। উপেন্দ্রকিশোরের পরে সুকুমার, সুকুমারের পর সত্যজিৎ নেহাতই ব্যতিক্রম। সে জন্যেই মনে থাকে। ঈশ্বরচন্দ্রের পরে নারায়ণচন্দ্রই বরং বেশি দেখা যায়।

আমরা সাধারণ মানুষ। এ যুগে সন্তানের ভোগ করার মত যথেষ্ট সম্পত্তি রেখে যাওয়ার সুযোগ আমাদের অনেকেরই হবে না। মৃত্যুর পরেও সন্তান “অমুকের ছেলে” বা “তমুকের মেয়ে” হিসাবে সমাজে অতিরিক্ত সম্মান, সুযোগসুবিধা বা খ্যাতি ভোগ করবে তেমন সম্ভাবনাও নেই। তবে কি এমন কিছুই নেই যা আমাদের মৃত্যুর পরেও সন্তানদের সম্পদ না হোক, অন্তত ছাতা হিসাবে কাজ করতে পারে? আমার সন্তানের সঙ্গে আমার সম্পর্কের সীমা তবে আমার শরীর? সেই শরীর অবলুপ্ত হওয়ার পর আমার সাথে সম্পর্কের কোন মূল্যবান অর্জন তার কাছে থাকবে না? তাহলে কেন দেশ কাল নির্বিশেষে বাবা-মায়েরা নিজের জীবনের চেয়েও সন্তানের মঙ্গলকে ঊর্ধ্বে স্থান দেন? আমাদের অষ্টাদশ শতকের কবির কেন মনে হল ঈশ্বরীর দেখা পেলে বাংলার নিরক্ষর পাটনী প্রার্থনা করবে “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”? প্রায় তিনশো বছর পরের কবির কেন মনে হল ভাগ্যান্বেষী উজবেক যোদ্ধা বাবর, যার সাথে সেই বাঙালি পাটনীর কোন দিক থেকে কোন মিল নেই, তিনিও নিজের ঈশ্বরের কাছে বলতেন, আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও আমার সন্তানের জীবন দাও? কবির কল্পনা তো আকাশ থেকে পড়েনি, এমনই আকুতি বিভিন্ন ভাষায় কত বাবা-মাকে তো আজও উচ্চারণ করতে দেখি আমরা। সেই বাবা মায়েরা তাহলে জীবন ফুরোলেই ফুরিয়ে যাবেন সন্তানের কাছেও?
কেউ কেউ বলবেন বাবা-মা শিক্ষা দেন, জীবনে নিজের পায়ে দাঁড় করান। সেটাই তো সারাজীবন সঙ্গে থাকে। সেকথা ঠিক, কিন্তু সে অবদান বাবা-মায়ের অনন্য অবদান নয়। মানুষ আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের থেকেও শিক্ষা পায়, সর্বোপরি শিক্ষক শিক্ষিকাদের থেকে পায়। এবং যে শিক্ষা সে পায় তার বেশিরভাগটাই স্বোপার্জিত। বাবা-মা বড় জোর সুযোগ তৈরি করে দেন।

ভেবে দেখলাম যে অক্ষয় ধন আমার সন্তানকে দিয়ে যেতে পারি তা হল সমাজ, সংসারের সঙ্গে, সারা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের বোধ। সুসময়ে, এবং দারুণ দুঃসময়ে, সেই বোধ তাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে।

সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের প্রত্যেককে আমাদের বাবা-মায়েরাও জেনে বা না জেনে ঐ বোধই দিয়ে গেছেন, দিয়ে যাচ্ছেন। ইতিহাসের কোন মুহূর্তে ঠিক কোন জায়গাটায় আমি দাঁড়িয়ে আছি এবং তার সাপেক্ষে বর্তমানে আর ভবিষ্যতে আমার কোথায় দাঁড়ানো উচিৎ সেই বোধ সচেতন বাবা-মায়েরা আমাদের দিয়ে যান জেনে বুঝে। আর যে বাবা-মায়েরা তত সচেতন নন আসলে তাঁরাও স্থান নির্দেশ করে দিয়ে যান তাঁদের কথাবার্তায়, জীবনচর্যায়।
কথাটা নতুন করে উপলব্ধি করলাম টিভিতে তথাকথিত গোরক্ষকদের হাতে নিহত পুলিশকর্মী সুবোধ কুমার সিংয়ের ছেলে অভিষেকের কথা শুনতে শুনতে।

সুবোধ কুমার খুন হওয়ার পর যত সময় যাচ্ছে তত পরিষ্কার হচ্ছে যে খুন হওয়ার দিনের ঘটনাবলী সুপরিকল্পিত, হঠাৎ উত্তেজিত জনতা তাঁকে হত্যা করেনি। তিনি সাম্প্রতিক অতীতে গোহত্যার “অপরাধে” প্রথম যে খুনটা হয়েছিল দাদরিতে, সেই খুনের তদন্তকারী অফিসার ছিলেন। সেই খুনের অপরাধীদের হাজতবাস করার পেছনে তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল। বদলি হয়ে বুলন্দশহরে এসে পড়ার পরেও আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশে আপোষ না করে তিনি হিন্দুত্ববাদীদের যথেষ্ট বিরাগভাজন হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী বলেছেন সুবোধ কুমারকে প্রায়শই খুনের হুমকি দেওয়া হত। খবরে প্রকাশ বিজেপি নেতারা বুলন্দশহর থেকে তাঁর বদলি দাবী করেছিলেন অতি সম্প্রতি। বিপদের মধ্যে দিয়ে হাঁটছেন জেনেও সুবোধ কুমার ঘটনার দিন পুলিশ ইন্সপেক্টর হিসাবে যা কর্তব্য ঠিক তাই করছিলেন। কোন সাহস তাঁকে প্রণোদিত করেছিল তা বলার জন্যে তিনি নেই, তা দেশ হিসাবে আমাদের ব্যর্থতা। কিন্তু বাবা হিসাবে তাঁর সাফল্য এই অন্ধকারে আমাদের ক্ষীণ আলো দেখাচ্ছে।

আরও পড়ুন ওয়কীল হাসানের গণতন্ত্র, না মুকেশ আম্বানির ধনতন্ত্র?

সকালের কাগজে মুন্ডিতমস্তক যে ছেলেদুটির ছবি কয়েকশো কিলোমিটার দূরে বসা আমাকে ক্ষিপ্ত করে তুলছিল, সেই বাবা হারা কিশোর যখন টিভির পর্দায় বলে “শুধু মুখ্যমন্ত্রীকে নয়, সারা ভারতের লোকের কাছে আমার আবেদন, হিন্দু মুসলমান নিয়ে দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক হিংসা দয়া করে বন্ধ করুন,” তখন বোঝা যায় সুবোধ কুমার ছেলেটির সঙ্গেই আছেন।

আরও পরিষ্কার হয় যখন অভিষেক বলেন “আমার বাবা একটা কথাই বলতেন ‘আর কিছু হতে পারো না পারো, সুনাগরিক হও। সব ধর্ম, সব জাতির লোকই এক। তুমি কারো চেয়ে বড় নও, কারো চেয়ে ছোটও নও।”

বাবা খুন হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে এই ভাষায় এই কথাগুলো বলতে পারা মুখস্থ বিদ্যায় সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী যে বিদ্যার বলে মধ্যে মধ্যে মহাত্মা গান্ধীর বন্দনা করেন সে বিদ্যার কর্ম নয় এসব। অনুভূতিদেশ থেকে আলো না পেলে শুধু ক্রিয়া, বিশেষণের জোরে এসব কথা বেরোয় না। অভিষেক যখন আমাদের সবাইকে সাবধান করেন এই বলে যে আমরা আত্মহননের পথে এগোচ্ছি; পাকিস্তান, চীনের দরকার নেই, আমরাই একে অপরের অনেক বড় শত্রু হয়ে উঠছি; তখন বোঝা যায় অভিষেকের প্রয়াত বাবা, এবং অবশ্যই মা, এই যুগসন্ধিক্ষণে তার যে স্থান নির্দেশ করেছেন সে সেই স্থানের যোগ্য হয়ে উঠছে। এইখানে মৃত সুবোধ কুমারের জিত, হত্যাকারীদের হার। হত্যাকারীদের সরকার তাঁর নামে রাস্তার নামকরণ করুক আর না-ই করুক, সুবোধ কুমার সন্তানের মধ্যে বেঁচে রইলেন। আমাদেরও বাঁচার রাস্তার সন্ধান দিলেন।

এত কথা বলার পরে একটা প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। সন্তান কি সবসময় বাবা-মায়ের দেখানো অবস্থান মেনে নেয়? নেয় না। প্রকৃতপক্ষে সর্বদা মেনে নেওয়া উচিৎও নয়। কারণ অনেক বাবা-মা এমন অবস্থানও ঠিক করেন যা সমাজের পক্ষে, সন্তানের চারপাশের মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর, পশ্চাৎমুখী। সেইসব বাবা-মায়েদের অবাধ্য সন্তানেরাই যুগে যুগে সমাজকে বদলে দেন, এগিয়ে নিয়ে যান। সেই জন্যেই আমাদেরও বারবার ভাবতে হবে সন্তানকে ঠিক কোথায় দাঁড়াতে বলছি। কার পক্ষে, কার বিপক্ষে? তাকে যে অবস্থান নিতে শেখাচ্ছি তা শুধু তার জন্যে ভাল, না আর পাঁচজনের জন্যেও ভাল — সেকথাও ভাবতে হবে। এমনি এমনি তো আর ঠাকুমা, দিদিমারা বলতেন না “প্রসব করলেই হয় না মাতা।”