যদি ধরে নিই ৭০ বছর বাঁচব, তাহলে জীবনের বেশিরভাগটাই পেরিয়ে এসেছি। এর মধ্যে প্রথম বছর ছয়েক বাদ দিলে, যে জিনিসটা ছাড়া এই সেদিন পর্যন্তও চলত না, সেটা হল খবরের কাগজ। ও জিনিসটার প্রতি আকর্ষণ এত প্রবল ছিল এবং পড়তে এত সময় ব্যয় করতাম যে মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে বাবা বাড়ি থেকে বেরোবার সময়ে মাকে বলে যেতেন— আমাকে যেন কাগজের ধারে কাছে যেতে না দেওয়া হয়। আমি কী করতাম? বাবা-মায়েরও আগে ঘুম থেকে উঠে পড়ে, বারান্দায় এসে পড়ে থাকা কাগজটা তুলে নিয়ে অন্তত সবকটা শিরোনাম আর খেলার পাতাটা পড়ে ফেলতাম। তারপর যেখানে যেভাবে পড়ে ছিল, সেখানে ঠিক সেইভাবে ফেলে রেখে দাঁত মাজতে যেতাম। ফলে মাঝে মাঝে অবিশ্বাস্য লাগে যে, খবরের কাগজ দিয়ে যাওয়ার জন্যে যে ব্যাগটা আমাদের বহুতলের বারান্দা থেকে ঝুলিয়ে রাখার কথা, সেটা ঝোলাতে আজকাল প্রায়ই ভুলে যাই। যেদিন ভুলি না সেদিনও কাগজ আসার সঙ্গে সঙ্গেই যে পড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে তা নয়। আদ্যোপান্ত পড়া ছেড়েই দিয়েছি; পড়ি মূলত শিরোনামগুলো আর উত্তর-সম্পাদকীয় পাতার কোনো লেখা কৌতূহলোদ্দীপক মনে হলে। মাঝে মাঝে এমনও হয়— কাগজ তোলা হল, কিন্তু সারাদিনে পড়েই উঠতে পারলাম না। পড়ে রইল একপাশে দুয়োরানির মত। বহুতলের বাকি পরিবারগুলোর কাছেও যে খবরের কাগজের আর কদর নেই তা বুঝতে পারি, যখন দেখি একমাত্র আমার ফ্ল্যাট থেকেই কাগজের ব্যাগ ঝোলে সকালে। সিঁড়িতে দিনের পর দিন জমতে থাকে আরও উপরতলার ফ্ল্যাটমালিকদের তুলে নিয়ে না যাওয়া কাগজ। অথচ প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে গিয়ে বোঝা যায়— প্রায় সব ঘটনাই সকলের জানা। অনেকের ক্ষেত্রে তার কারণ টিভির খবর দেখার অভ্যাস, আমার ক্ষেত্রে তার চেয়েও বড় কারণ মোবাইল ফোন।
ছোটবেলার সংবাদপত্র-প্রীতি শুধু নয়, পরবর্তীকালে দেড় দশক খবরের কাগজের সাংবাদিক হিসাবে কাটানোর ফলেও এই পরিস্থিতি মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। দেখতে পাই, আমার পরের প্রজন্মের কাছে খবরের কাগজ ইতিমধ্যেই একেবারে মূল্যহীন হয়ে গেছে। পৃথিবীতে পরিবর্তনই যে একমাত্র অপরিবর্তনীয় সত্য, সেকথা জানি। প্রযুক্তির বদল জীবনযাত্রায় বদল আনবে— এ-ও অনিবার্য। কিন্তু কোভিড অতিমারীর পর থেকে খবরের কাগজের জনপ্রিয়তায় (বা প্রয়োজনীয়তায়) এই যে ধস, তার পিছনে কাগজগুলোর নিজেদের দায়ও কম নয়।
ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের যুগে সকালের কাগজের বাসি হয়ে যাওয়া আটকানোর কোনো উপায় নেই। খবরের কাগজগুলোরও সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল আছে, সেখান থেকে নিয়মিত আপডেট দেওয়া হয়। যেমন আছে টিভি চ্যানেলগুলোর। সুতরাং তাজা থাকতে গেলে, পাঠকের কাছে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে গেলে, কাগজগুলোর ক্রমশ বিশ্লেষণাত্মক হয়ে ওঠা দরকার ছিল। কিন্তু এখনো তারা আগের দিন সকালবেলায় কী ঘটেছে তা-ই লিখে চলেছে মোটের উপর, কেমনভাবে ঘটেছে তাতে জোর নেই। যেহেতু কী ঘটেছে তা জানানোর দায়মুক্ত হওয়া যায় এ যুগে, সেহেতু তাড়াহুড়ো না করে অনেক বেশি তদন্তমূলক সাংবাদিকতা করার সুযোগও এখন খবরের কাগজের হাতে। আরও স্থানীয় হওয়ারও সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু দু-একটা কাগজ বাদ দিলে সকলেই থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড় পরিবেশন করতে ব্যস্ত। এর দায় অবশ্যই অনেকটা মালিকপক্ষের। কাগজের ভোল বদল করতে গেলে যে বিশেষ পারদর্শিতা ও অভিজ্ঞতা দরকার, তা পেতে গাঁটের কড়ি খরচ করতে হয়। করোনা অতিমারীর সময়ে “লোকে কাগজ পড়ছে না” এই অজুহাতে তাঁরা বিশেষত মাঝারি ও উপরের স্তরের সাংবাদিকদের ব্যাপক ছাঁটাই করে মাইনের খরচ বাঁচিয়ে নিজেদের লাভের গুড়ের হাঁড়ি ভর্তি রেখেছেন। ফলে ওসব বদল-টদল করবে কারা?
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। টিভি চ্যানেলগুলোর মত কাগজগুলোও যে একপেশে, সরকারের পদলেহনকারী হয়ে গেছে— সেকথা পাঠকদের কাছে গোপন নেই। একদা বলা হত, পাঠককে আকর্ষণ করতে গেলে সরকারবিরোধী লেখালিখিই করতে হবে। সত্যিই পশ্চিমবঙ্গে বছরের পর বছর সর্বাধিক বিক্রীত দুটো কাগজের নাম ছিল আনন্দবাজার পত্রিকা আর বর্তমান, যারা বামফ্রন্ট সরকারের তীব্র বিরোধী ছিল। বামেদের প্রতি নরম আজকাল তুমুল বিক্রি হত বিশেষ কোনো খেলা থাকলে। এদের চেয়ে বয়সে নবীন সংবাদ প্রতিদিন-ও সরকারবিরোধী বলে পরিচিত ছিল। আরও তরুণ দৈনিক স্টেটসম্যান তো সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে বিক্রি বাড়িয়ে ফেলেছিল সরকারবিরোধিতার কারণেই। কলকাতার প্রাচীন ইংরিজি কাগজ দ্য স্টেটসম্যান আর ১৯৮০-র দশকে স্থাপিত আনন্দবাজার গ্রুপের ইংরিজি কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ-ও সরকারবিরোধী হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিল। ২০১১ সালে কলকাতায় আর ২০১৪ সালে দিল্লিতে সরকার বদলানোর পরে ক্রমশ এমন হয়েছে যে, আজ বিজেপিশাসিত পশ্চিমবঙ্গে আনন্দবাজার প্রথম পাতায় ‘গেরুয়া গুন্ডামি’ শিরোনাম দিলে বাম, ডান, মধ্যপন্থী— সব পক্ষ আপ্লুত হচ্ছে। স্রেফ শিরোনাম এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটেছে, আগেরদিনই হাতের মোবাইলে যা দেখে ফেলেছে সবাই— সেটুকু হুবহু বিবৃত করার জন্যেই। তার বেশি কিছু নয়। অর্থাৎ যা ঘটেছে, কাগজে ঠিক তা লেখা হবে না, যেমনটি ঘটেছে তেমনটি লেখা হবে না— এটাই আমাদের প্রত্যাশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা জেনে গেছি, কেবল সেই বয়ানই লেখা হবে বা টিভিতে দেখানো হবে, যা সরকার চায়। অন্য বয়ানের জন্যে আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে বিকল্প সংবাদমাধ্যমের দিকে। মূলধারার সংবাদমাধ্যম যদ্দৃষ্টং তদ লিখিতং করলেই আমরা উল্লসিত হয়ে বলে উঠছি “অহো! কী দুঃসহ স্পর্ধা!”
আমরা যে ইতিহাস-বিস্মৃত তার প্রচুর প্রমাণ রোজই পাওয়া যায়, এ-ও তেমনই একটা প্রমাণ। সেদিনের প্রথম পাতার জন্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হুমকি, অতঃপর আনন্দবাজারের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা এবং আনন্দবাজার অফিসের গায়ে গেরুয়া রং লেপে দেওয়া— এসব আমরা আর কাগজটার প্রথম পাতায় দেখিনি কিন্তু। দেখেছি অন্য সংবাদমাধ্যমে বা সোশাল মিডিয়ায়। যে কাগজের গায়ে হাত পড়ল তারা নিজেদের উপর আক্রমণের খবরই ক্রমশ ঠেলে দিল ভিতরের পাতায়, আকারে ছোট হতে হতে এখন মিলিয়ে গেছে। গেরুয়া ছিল, আবার সাদা করে দিয়েছি— এ নিয়ে রাবীন্দ্রিক বাহাদুরিটা পর্যন্ত কাগজের পাতায় হল না। হল সোশাল মিডিয়ায়। অর্থাৎ যে কাগজের সাংবাদিকরা আক্রান্ত, সেই কাগজই সেই খবর ছাপার উপযুক্ত জায়গা দিচ্ছে না। একে সাধারণ পাঠক কাগজের মহানুভবতা বলে ভাবতে পারেন, মনে করতে পারেন নিজেদের ঊর্ধ্বে কাগজ অন্য খবরকে রেখেছে। নিউজরুমে কাজ করার অভিজ্ঞতায়, একে মিটমাট করে নেওয়ার চেষ্টা ছাড়া অন্য কিছু বলে ভাবা আমার পক্ষে শক্ত। বিশেষত যখন সবেমাত্র জুন মাসে জানতে পেরেছি যে, এবিপি গ্রুপেরই ইংরিজি কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রাক্তন সম্পাদক আর রাজাগোপালের নাম ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল এবং তার ফলে তাঁর পাসপোর্ট দিনের পর দিন পুনর্নবীকরণ করা হয়নি; তাঁকে হয়রান করা হয়েছে বহুদিন ধরে। তাতে আজকের বিদ্রোহী মিডিয়া এবিপি গ্রুপ কিন্তু পাশে দাঁড়ায়নি। শেষমেশ রাজাগোপাল লিখিত বার্তা পরঞ্জয় গুহঠাকুরতার মত বিকল্প মাধ্যমের সাংবাদিক সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করে দেন, তা ভাইরাল হয় এবং তারপর বিভিন্ন বিকল্প সংবাদমাধ্যমে তা নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়। তারপর কেরালার মুখ্যমন্ত্রী প্রতিকার চেয়ে চিঠি লেখেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে, তবে রাজাগোপাল পাসপোর্ট পান। এই গোটা পর্বে টেলিগ্রাফ বা আনন্দবাজার অথবা তাদের নিউজ চ্যানেল এবিপি আনন্দ কিন্তু এক লাইন আলোচনা করেনি এ নিয়ে।
আরও পড়ুন ব্যাকফুটে গোদি মিডিয়া
এই যদি স্পর্ধা হয়, তাহলে ভণ্ডামি কোনটা? জরুরি অবস্থার সময়ে বরুণ সেনগুপ্ত, গৌরকিশোর ঘোষ, সি আর ইরানিরা যা দেখিয়েছিলেন তাকেই বা কী বলা উচিত? বস্তুত, সাংবাদিকের নামে মামলা হওয়া কোনো অভিনব ব্যাপার নয়। তৃণমূল সরকারের আমলেও হয়েছে, এবিপি গ্রুপের সাংবাদিকদের নামেও হয়েছে। তা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় কেউ হইচই করেনি এই যা। আসলে কর্পোরেট মিডিয়া সম্পর্কে একটা অপ্রিয় সত্য হল, কোন সাংবাদিক লোকের চোখে ‘হিরো’ হবেন আর কে রাজাগোপালের মত বিস্মৃত হবেন, তা-ও ঠিক করে মালিক। মনে রাখা ভালো, রাজাগোপাল হলেন সেই সম্পাদক যাঁর আমলে টেলিগ্রাফের প্রথম পাতা উদ্ভাবনীমূলক শিরোনাম এবং চেহারার কারণে যেসব জায়গায় কাগজ পৌঁছয় না সেখানেও প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল। সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সেসব পাতা নিয়মিত ভাইরাল হত এবং বিজেপিবিরোধী মহলে লড়াকু কাগজ হিসাবে পরিচিত হয়েছিল টেলিগ্রাফ। আনন্দবাজার পত্রিকা বা এবিপি আনন্দ কিন্তু ওরকম বিদ্রোহী চেহারা নেয়নি কখনো। বরং এবিপি আনন্দ পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী চলাকালীন বিজেপি-প্রচারিত “পশ্চিমবঙ্গ রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশিতে ভরে গেছে” এবং “তারা এসআইআরের ভয়ে বাংলাদেশে পালাচ্ছে” বয়ানের প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। এসব আসলে কর্পোরেট কৌশল। এক মুখ দিয়ে রাম বলব, আরেক মুখ দিয়ে শ্যাম। সংবাদ মূলত ব্যবসা, আর সব পক্ষের লোককেই ক্রেতা হিসাবে বজায় রাখা দরকার। এর মধ্যে বিদ্রোহও তো নেই-ই, স্পর্ধাও নেই। সত্যি কথা বলতে, ভারতের মিডিয়ার অর্থনীতি যে চেহারা নিয়েছে তাতে বড় সংবাদমাধ্যমগুলোর স্পর্ধা দেখানোর বিশেষ অবকাশও নেই। বিশ্বাস না হয়, প্রণয় রায়কে জিজ্ঞেস করুন। স্পর্ধা দেখাচ্ছিলেন বলেই বিভিন্ন সরকারি দফতর মিথ্যা অভিযোগ (আদালতে ইতিমধ্যে প্রমাণিত) করে বছরের পর বছর হয়রান করে তাঁর এবং স্ত্রী রাধিকা রায়ের তৈরি বিজেপিবিরোধী বড় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-কে কেড়ে নিল।
অতএব বড় সংবাদমাধ্যমে স্পর্ধা খুঁজতে না যাওয়াই ভালো। স্পর্ধা কি কম পড়িয়াছে? বাংলায় হয়ত পড়িয়াছে, কিন্তু বাংলার বাইরে তাকিয়ে দেখুন। জেন জি আন্দোলনের সত্য মার খেয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনার হাতের মোবাইলে পৌঁছে দিল যেসব ছোট ছোট ইউটিউব চ্যানেল বা ইনস্টাগ্রামার, তাঁরা সাংবাদিক নন? ক্ষমতাকে প্রশ্ন করাই যদি সংবাদমাধ্যমের কাজ হয়, তাহলে সেই কাজটা এখন সবচেয়ে ভালো করছেন ওঁরাই। করতে গিয়ে কত বড় ঝুঁকি নিচ্ছেন তার হাতে গরম প্রমাণ ৪ পিএম নিউজ নেটওয়ার্ক নামের ডিজিটাল মিডিয়ার দুই সাংবাদিক শাহীন খান আর নাফিসা খান। তাঁরা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তাকে প্রশ্ন করতে গিয়ে সাকেত থানায় পুলিশের হাতে বেদম মার খেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, তাঁরা মুসলমান বলে বেশি মারা হয়েছে— এমন অভিযোগও উঠেছে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে। এর প্রতিবাদে দিল্লির বহু সাংবাদিক মিলে থানা ঘেরাও করে ফেলেন ৪ সেপ্টেম্বর। প্রেস ক্লাব, বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি ইত্যাদি মহল থেকে প্রতিবাদ এবং নিন্দার পরেও এই কলাম লেখার সময় পর্যন্ত পুলিশ এফআইআর নেয়নি।
এবার ভেবে দেখুন, স্পর্ধা কথাটাকে খুব শস্তা করে দেওয়া কি উচিত? যা বিরল, তারই তো দাম বেশি।
