সংবাদ, রিল, বিজ্ঞাপন: ঘেঁটে ঘ

বাজারের মাছ, মাংস বিক্রেতা এবং ছোট দোকানদাররা অনেকে ১৫ অক্টোবরের অপেক্ষা না করে এখন থেকেই নগদ ছাড়া জিনিসপত্র বেচা বন্ধ করে দিয়েছেন। অথচ এটা বাংলার কোনো সংবাদমাধ্যমের বিতর্কের বিষয় নয়।

বিজ্ঞাপন

‘গণতন্ত্রে রাজার জন্মদিন’। এই হল শনিবারের (১৯ সেপ্টেম্বর) গণশক্তির সম্পাদকীয় কলামের শিরোনাম। ঠিক তার আগের দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আবির্ভাব দিবস উপলক্ষে দেশজুড়ে সরকারি পয়সায় যে মোচ্ছবটি করা হয়েছে তার এর চেয়ে সঠিক বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। অথচ সিপিএমের এই দলীয় মুখপত্র ছাড়া আর কোনো সংবাদমাধ্যম বুক ঠুকে এই কথাটা বলতে পেরেছে বলে দেখলাম না। বরং বড় বড় মিডিয়ার ওয়েবসাইটে শুক্রবার সারাদিন দেখা গেছে দেশের কোথায় কত লক্ষ প্রদীপ জ্বালিয়ে মানুষ মোদীজিকে আশীর্বাদ করেছেন। আনন্দবাজার ডট কমের এক ভিডিওতে দেখছিলাম, খোদ কলকাতায় ঘটা করে যজ্ঞ হচ্ছে। প্রবীণ কংগ্রেসি, থুড়ি তৃণমূলী, থুড়ি বিজেপি নেতা তথা রাজ্যের মন্ত্রী তাপস রায় স্বয়ং যজ্ঞের আগুনে চামচে করে ঘি ঢালছেন। গেরুয়া কেকেরও নাকি আয়োজন হয়েছিল। জন্মদিনের কেক পর্যন্ত গেরুয়া হতে হবে— এই বিধান কোন শাস্ত্রে দেওয়া আছে জানি না। অবশ্য কতকিছুই তো জানি না। পরিবারের জ্যেষ্ঠ ছোটদের জন্মদিনে আশীর্বাদ করেন জানতাম, এখন জানলাম পরিবারের জ্যেষ্ঠকেই আশীর্বাদ করতে হয় সবাই মিলে। অবশ্য এই মোচ্ছবের ফলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কতটা আশীর্বাদ কুড়োলেন আর কতটা অভিশাপ— তা নিয়ে সন্দেহ আছে। পরিচিত বিজেপি সমর্থকদের মধ্যেও উচ্ছ্বাসের প্রকাশ দেখলাম না। করোনা অতিমারীর সময়ে যাঁর এক কথায় পাড়াসুদ্ধ লোক থালা বাজিয়েছিল, তাঁর জন্মদিনে সরকারি উদ্যোগ সত্ত্বেও কেউ বাড়িতে প্রদীপ জ্বেলেছে চোখে পড়ল না। যেসব সরকারি কর্মচারীর রুটিরুজি নিয়ে টানাটানি পড়তে পারে প্রদীপ না জ্বালালে, তাদেরই দেখলাম প্রদীপ জ্বালিয়ে ছবি-টবি তুলে জিও ট্যাগ করে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে। যদিও সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করাও নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল কিনা জানি না। সেদিন সন্ধেবেলা বরং গেরুয়া পতাকা লাগানো একখানা টোটোতে উঠে টোটোচালকের মুখে এক রাশ অভিযোগ শুনলাম বিজেপি শাসন এবং এভাবে জন্মদিন পালন নিয়ে। শেষে তো তিনি প্রশ্ন তুলে বসলেন “এত কোটি টাকা খরচ করে যে জন্মদিন করা হচ্ছে, একটা গরিব মানুষের একটা মিষ্টি দেয়া হয়েছে? বড়দের হাতেও দিতে হবে না। দেশে এত মানুষ খেতে পায় না, তাদের বাড়ির বাচ্চাদের হাতে একটা করে এক টাকা দামের লজেন্স দিলেও বুঝতাম।” অথচ সংবাদমাধ্যমে এসব চেহারা উঠে আসছে না। তাদের চোখে তো সকলই শোভন, সকলই নবীন, সকলই বিমল। কিন্তু গোলমাল পাকিয়েছে হাতে হাতে ইন্টারনেট। বিবিসি নিজেদের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করেছিল— মোদীকে তাঁর জন্মদিনে আপনি কী উপহার দিতে চান? উত্তরে বিস্তর গালিগালাজ আসতে শুরু করে। তখন বিবিসি পোস্টে লেখে— দয়া করে কুরুচিপূর্ণ ভাষা প্রয়োগ করবেন না। তাতেও চিঁড়ে ভেজেনি, অগত্যা বিবিসি ওই পোস্টের কমেন্টস সেকশন বন্ধ করে দেয়। অর্থাৎ জন্মদিন পালন ঠিক পরিকল্পনামাফিক এগোয়নি। অথচ চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। মালদা টাইমসের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে যে, ভূতনির চরে বানভাসি মানুষের হাতে ত্রাণ তুলে দেওয়ার আগে তাঁদের দিয়ে বার্থডে বয়ের নামে জয়ধ্বনি করানো হয়েছে।

মালদা টাইমস নামটা শুনে আবার ভারতবিখ্যাত টাইমস গ্রুপের কোনো সংবাদমাধ্যম বলে ভেবে বসবেন না। দুয়ের মধ্যে কোনো সম্বন্ধ নেই, থাকলে অমন একখানা খবর কখনো তারা প্রচার করত না। আজকের ভারতে তথা বাংলায়, ততক্ষণই ক্ষমতাসীনের পক্ষে অপ্রীতিকর খবর প্রচার করা চলে, যতক্ষণ সংবাদমাধ্যমটি ক্ষুদ্র বা অতি ক্ষুদ্র। অবশ্য কোন খবর অপ্রীতিকর তা ঠিকও হয় ক্ষমতাসীনের মর্জি অনুযায়ী। ভূতনির কাণ্ড যেহেতু লুকিয়ে চুরিয়ে করা হয়নি, সেহেতু মনে করা অন্যায় নয় যে ও কাজ লুকোনো সরকারের উদ্দেশ্যও ছিল না। বরং পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের মত বুক ফুলিয়ে সকলকে দেখিয়ে কাজ করাই হয়ত শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের পন্থা। যদিও তাঁর কাজ খুব জনপ্রিয় হচ্ছে বলে মনে হয় না, যদি না তিনি জনপ্রিয় হওয়া বলতে মিম ও রিলের বিষয়বস্তু হয়ে যাওয়া বোঝেন। ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকের রিলে যে মানুষদের দেখা যাচ্ছে, তাঁদের বেশভূষা যদি শ্রেণির পরিচায়ক হয় তাহলে বলতে হবে যে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবিত্ত বা গরিব, কেউই খুশি নন মন্ত্রীর কর্মকাণ্ডে। কিন্তু আজ এই তালিকা, কাল ওই তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার ভারতে, যেখানে নাগরিক সরকারকে বেছে নেন না, সরকার নাগরিককে বেছে নেন, সেখানে মন্ত্রীসান্ত্রীদের উপর রুষ্ট হলে তাঁদের নিয়ে হাসাহাসি করা ছাড়া কী-ই বা করতে পারে সাধারণ মানুষ? তাই চতুর্দিক ভরে গেছে অগ্নিমিত্রাকে নিয়ে তৈরি মিম আর রিলে। একটায় যেমন দেখলাম— প্রথম শটে কয়েকটি ছেলে রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে। পরের শটে মেগাফোন নিয়ে তিনি বলছেন “রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন না”। তৃতীয় শটে ছেলেগুলি রাস্তা ছেড়ে ব্রিজের রেলিংয়ের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বাগেশ্বর বাবার বিরুদ্ধে কথা বললে গ্রেফতার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এখন পর্যন্ত তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে রিল বা মিম বানানো/শেয়ার করার জন্য গ্রেফতারির আদেশ নেই ভাগ্যিস! নইলে পশ্চিমবঙ্গের হাজতগুলোতে জায়গা কম পড়ে যেতে পারে।

আজকাল অবশ্য কোনটা রিল, কোনটা খবর আর কোনটা বিজ্ঞাপন তা বোঝা দায়। যেমন গত কয়েক দিনে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে সরকারি ঘোষণা নিয়ে সর্বাধিক চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে তা হল ইউপিআই পেমেন্টের উপরে মাশুল বসা। সরকার বারবারই বলছে, এ নিয়ে ক্রেতা/উপভোক্তাদের চিন্তা করার কিছু নেই। তাঁদের পকেট থেকে একটি টাকাও খসবে না, ও টাকা দেবেন ব্যবসায়ীরা। তাও লেনদেন দু হাজার টাকার বেশি হলে তবেই। কিন্তু রাস্তাঘাটে কান পাতলে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষ ব্যাপারটা নিয়ে খুশি নন। কিছুতেই আশ্বস্ত হচ্ছেন না। বাজারের মাছ, মাংস বিক্রেতা এবং ছোট দোকানদাররা অনেকে ১৫ অক্টোবরের অপেক্ষা না করে এখন থেকেই নগদ ছাড়া জিনিসপত্র বেচা বন্ধ করে দিয়েছেন। অথচ এটা বাংলার কোনো সংবাদমাধ্যমের বিতর্কের বিষয় নয়। জাতীয় স্তরের গোদি মিডিয়া তবু এ নিয়ে আলোচনা করেছে, ইন্ডিয়া টুডে টিভির লাইভ অনুষ্ঠানে পেমেন্টস পার্টনার কোম্পানি ভারতপে-র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন ম্যানেজিং ডিরেক্টর অশনীর গ্রোভার সরকারকে তুলোধোনা করেছেন। সাত তাড়াতাড়ি ভারতপে-র বর্তমান সিইও নলিন নেগি বলে দিয়েছেন যে তাঁরা নতুন নিয়মের পক্ষে। ভারতপে-র মুখপত্র আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন— ওসব অশনীরের ব্যক্তিগত মতামত, ওর সঙ্গে ভারতপে-র কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত মানুষ ইউপিআই পেমেন্টের উপর খরচ চাপা নিয়ে অসন্তুষ্ট। এই অসন্তোষ বাংলার সংবাদমাধ্যম সযত্নে এড়িয়ে গেলেও সরকার পাতা জোড়া বিজ্ঞাপন দিয়েছেন শনিবারের কাগজে। সরকার মানে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া, সঙ্গী হয়েছে ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট বাস্তুতন্ত্রে উপস্থিত নন-ব্যাংকিং কোম্পানিগুলোর সংগঠন পেমেন্টস কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া। তাতে আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে প্রমাণ করার, যে ইউপিআই পেমেন্টের জন্য ব্যবসায়ীদের মাশুল দিতে হলে তা নাগরিকদের জন্য ভালো। এ কাজ নাকি করা হচ্ছে আরও বেশি মানুষ যাতে ইউপিআই ব্যবহার করেন তারই জন্য। হিসাবও দেওয়া হয়েছে— এই ১২০ কোটি মোবাইল ব্যবহারকারীর মধ্যে মাত্র ৫৬.৫ কোটি ইউপিআই ব্যবহার করেন। অর্থাৎ ভাবুন, সংবাদমাধ্যম এই সরকারি সিদ্ধান্তের খবর দিয়েছে, তাতে মানুষের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেনি, অথচ সরকারের বয়ানটা বিজ্ঞাপন হিসাবে তুলে ধরে লক্ষ লক্ষ টাকা কামিয়ে নিল। কোন কোন কাগজ ছেপেছে এই বিজ্ঞাপন? আমার চোখে একটা কাগজই পড়েছে— সিপিএমের মুখপত্র গণশক্তি। জানি না এবিপি গ্রুপের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি কেন। এখনো ‘গেরুয়া গুন্ডামি’-র প্রভাব কাটেনি কি? গণশক্তির একই সংস্করণের ছ নম্বর পাতায় খবর হিসাবে এ ব্যাপারে সরকারের দাবি কী তা লেখা হয়েছে, সঙ্গে বিশ্লেষকরা যে একে অর্থনীতির মৌলিক নিয়মের পরিপন্থী বলছেন, তা-ও লেখা হয়েছে।

আরও দেখুন গিলি গিলি গে: মোদী ম্যাজিক বলতে যা বোঝায়

যা দিনকাল, তাতে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের হাত থেকে প্রতীক কেড়ে নেওয়া এবং কংগ্রেস প্রার্থীকে পুরনো মামলায় গ্রেফতার করে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনকে বিরোধীশূন্য করে দেওয়ার প্রয়াসকে যে বাংলার প্রায় সব সংবাদমাধ্যমই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে, তাতেই আমাদের আপ্লুত হওয়া উচিত। কে এতে উল্লাস করল আর কে সাংবিধানিক অন্যায় বলে চিহ্নিত করল তা নিয়ে না ভাবাই ভালো। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বহুকাল ধরেই আবর্তিত হচ্ছে এক লাইনের একটা নীতির উপর ভিত্তি করে— আমার যে বিরোধী তার প্রতি অন্যায় করা হলে সেটা অন্যায় নয়। আমার প্রতি করা হলে তবেই অন্যায়। এই নীতি নিয়ে কংগ্রেস চলেছে, মমতা ব্যানার্জি চলেছেন সেই আটের দশক থেকে, সিপিএম চলেছে এবং চলছে, বিজেপি তো চলেই। কোনো রাজ্যের বা দেশের সংবাদমাধ্যম তার রাজনৈতিক ধারার একেবারে বিপরীতে চলে না। কারণ সংবাদমাধ্যম একই বাস্তুতন্ত্রের অংশ।

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

Leave a Reply