সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা তুলে দেওয়াই কি উদ্দেশ্য?

পশ্চিমবঙ্গের কাগজ, টিভি চ্যানেলের মালিক, সম্পাদক, উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিশেষজ্ঞ ও বিখ্যাতদের ছেলেপুলেরা প্রায় কেউই সরকারি স্কুলে পড়ে না। ফলে দিব্যি ওসব স্কুলের রোগবালাইকে অগ্রাহ্য করে থাকা গিয়েছিল।

ঘটনাচক্রে আমার পিতৃকুল, মাতৃকুলের অধিকাংশ আত্মীয় পেশায় শিক্ষক। তাঁরা অনেকেই আজ প্রয়াত। রাজনৈতিকভাবে সরকারি, বিরোধী, দুয়ের মাঝামাঝি— নানারকম দলের সদস্য, সমর্থক হলেও গত শতকের নয়ের দশকের শেষদিকে দেখতাম সকলেই একটি ব্যাপারে একমত— পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলো ক্রমশ উঠে যাবে। কারণ ওই স্কুলগুলো ভরে থাকত মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেমেয়েতে, যাদের বাবা-মায়েরা ক্রমশ তাদের বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। আমার শিক্ষক আত্মীয়রা বলতেন এই প্রবণতা বাড়তে বাড়তে একসময় সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলোতে পড়ে থাকবে কেবল তারা, যাদের বাবা-মায়েরা বেসরকারি স্কুলের খরচ পোষাতে পারবেন না। তাদের পড়াশোনা হল কি হল না তা নিয়ে শিক্ষকদেরও বিশেষ মাথাব্যথা থাকবে না, সরকারও দায়সারা স্কুল চালাবে। তখন কথাগুলো বিশ্বাস করিনি, কিন্তু আজ পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষার অবস্থা দেখে সেই আত্মীয়দের বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ দর্শনের পারদর্শিতা স্বীকার না করে উপায় নেই।

আমাদের ছাত্রাবস্থাতেই সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলো ধুঁকতে শুরু করেছিল। তার জন্যে দায়ী করা হয় বামফ্রন্ট সরকারের প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে। কিন্তু এই শতকে কী কারণে মধ্যবিত্ত বাবা-মায়েরা সরকারি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক স্কুলগুলোকে ত্যাগ করলেন তা অত সহজে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। একটা কারণ অবশ্যই কোন মাধ্যমে পড়ানো হচ্ছে তা নিয়ে বাঙালির অত্যধিক মাথাব্যথা। শিক্ষার গুণমান নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে অনেক বাবা-মাই ছেলেমেয়ের ইংরেজিতে গড়গড়িয়ে কথা বলতে পারা নিশ্চিত করতে চান। অর্থাৎ স্কুল তাঁদের কাছে প্রকৃতপক্ষে সারাদিনব্যাপী স্পোকেন ইংলিশ ক্লাস। সঙ্গে অন্য বিষয়গুলো পড়িয়ে দিলেই হল। ফলে সাধ্যাতীত এবং বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা নেই এমন মাইনে দিয়েও বেসরকারি স্কুলেই তাঁরা ছেলেমেয়েকে পাঠান। সে ধরনের অনেক স্কুলেরই শিক্ষকদের যোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয়, ফলে অনেকসময় ওই অভিভাবকরাই পড়াশোনার মান নিয়ে একান্ত আলোচনায় সন্দেহ প্রকাশ করেন। অথচ পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলোতে যাঁরা পড়ান, তাঁরা অন্তত ১৯৯৭-৯৮ সাল থেকে একটা প্রতিযোগিতামূলক লিখিত পরীক্ষা এবং ইন্টারভিউতে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে নিযুক্ত হচ্ছিলেন। তা সত্ত্বেও মধ্যবিত্তের বেসরকারি স্কুলে ছোটার পিছনে কি ‘বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে’ কুসংস্কার? নাকি বাজার অর্থনীতির ‘যা পয়সা দিয়ে কিনতে হয় না তা ভাল নয়’ আদর্শে আস্থা? উত্তর যা-ই হোক, মধ্যবিত্ত ছেলেমেয়েরা সরে যাওয়ায় স্কুলের প্রতি শিক্ষকদের এবং সরকারের আগ্রহ যে কমে গেছে তাতে সন্দেহ নেই। কিছুদিন আগেই তো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ স্কুল। বহু জায়গায় স্কুল চালু রাখতে শিক্ষকরা এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রছাত্রী ধরে আনছেন।

শিক্ষকসমাজ অবশ্যই কোনও মনোলিথ নয়। পশ্চিমবঙ্গের সব শিক্ষক একইরকম ভাবেন বা সকলেই ফাঁকিবাজ, বসে বসে মাইনে পান— এমন একটা মত ইদানীং রীতিমত জনপ্রিয় হয়েছে। সে মতে সায় দিচ্ছি না। কারণ ফাঁকিবাজ সব পেশাতেই ছিল, আছে এবং থাকবে। তা বলে একটা গোটা পেশার সকলেই অলস, অনিচ্ছুক কর্মী হয়ে যান না। কিন্তু যা বলার, তা হল স্কুলের পঠনপাঠন নিয়ে শিক্ষকদের নিরুৎসাহ করার সবরকম চেষ্টা সরকারি তরফে করা হয়েছে। মন দিয়ে পড়াতে চান এমন অনেক শিক্ষকই সখেদে বলেন, সিলেবাস শেষ করানো অতিমারির আগেও রীতিমত কঠিন ছিল। কারণ তাঁদের অনেকখানি সময় চলে যায় বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের জন্য ছেলেমেয়েদের তথ্যাবলি সংগ্রহ ও নথিবদ্ধ করতে, জিনিসপত্র বিলি করতে। স্কুলগুলো প্রায় রেশন দোকানের চেহারা নেয়, ক্লাস কাটছাঁট করতে হয়। তার উপর বর্তমান সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ছুটি কত বেড়েছে তা নিয়েও আলাদা গবেষণা হতে পারে। পুজোর ছুটি ফুরোতেই চায় না, গরমের ছুটি প্রায়শই নির্ধারিত দিনের আগেই শুরু হয়ে যায়, তারপর বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আগে ছুটির তালিকার বেশিরভাগটা ঠিক করতেন স্কুল কর্তৃপক্ষ, এখন চলে অঘোষিত এক-রাজ্য-এক-ছুটি নীতি। ফলে দক্ষিণবঙ্গ গরমে পুড়লে শীতল উত্তরবঙ্গেও স্কুল বন্ধ থাকে। কোনও স্কুল কর্তৃপক্ষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সরকারি ছুটি অগ্রাহ্য করে পঠনপাঠন চালু রাখতে চাইলে শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়। এর উপর আছে শূন্য পদের বিপদ। বহু স্কুলে অশিক্ষক কর্মীদের পদ ফাঁকা পড়ে আছে। সে কাজও শিক্ষকদেরই করতে হয়। এতসব করে আর কতটুকু পড়ানো সম্ভব?

এসব অভিভাবকদেরও বিলক্ষণ চোখে পড়ে। ছেলেমেয়েকে সরকারি স্কুলমুখো না করার পিছনে এসব কারণও কাজ করে এবং সেজন্য তাঁদের দোষ দেওয়া চলে না। উপর্যুক্ত বিপত্তিগুলোর চেয়েও শিক্ষকদের কাজকর্মে বেশি প্রভাব ফেলছে শিক্ষকের অভাব। যেসব স্কুলে এখনও ছাত্রছাত্রীর অভাব নেই, সেখানেও শিক্ষকের অভাব প্রকট। স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের যে স্বচ্ছ ও নিয়মিত ব্যবস্থা তৃণমূল সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল তাকে লাটে তুলে দেওয়ার ফলে বহু স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। উপরন্তু ইচ্ছামত বদলির ব্যবস্থায় কোথাও একই বিষয়ের শিক্ষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি, অথচ অন্য কোনও বিষয়ের একজন শিক্ষকও নেই।

অর্থাৎ শুধু যে রাস্তায় বসে থাকা (এবং মধ্যরাতে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যাওয়া) হবু শিক্ষকরাই অবিচারের শিকার, তা নয়। যাঁরা স্কুলে পড়াচ্ছেন তাঁরাও ভাল নেই। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সেইসব ছাত্রছাত্রীদের, যাদের বাবা-মা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্কুলের মাইনে জোগাতে পারেন না। অতিমারির সময়ে সরকার স্কুল খোলার নামই করছিল না, যেনতেনপ্রকারেণ বন্ধ রাখছিল দেখে অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন স্কুলগুলোকে লাটে তুলে দেওয়াই উদ্দেশ্য। সে কাজে অতিমারিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা যথার্থ। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, নিয়োগের পরীক্ষা নিয়ে বেলাগাম দুর্নীতি এবং চালু চাকরির পরীক্ষাটাকে অকেজো করে দেওয়া যে কেবল কর্মসংস্থান সংক্রান্ত ইস্যু নয়, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা লাটে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনারও অংশ সেকথা গত এগারো বছরে কারও মনে হয়নি। সেই ২০১৩ সালেই যখন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু পরিষ্কার বলেছিলেন, এসএসসি কি দুর্গাপুজো যে প্রতি বছর করতে হবে? একথা যে স্কুলশিক্ষার উপরে কুঠারাঘাত সেকথা রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীরা ছাড়া কেউ তখন বলেননি। পরবর্তীকালে যখন তদানীন্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় ঘোষণা করলেন এসএসসি, টেট ইত্যাদি পরীক্ষার মেধাতালিকা প্রকাশ করা হবে না, পাশ করলে প্রার্থীর কাছে এসএমএস যাবে কেবল, তখনও রাজ্যের লেখাপড়া জানা মানুষ কোনও উচ্চবাচ্য করেননি। একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হবে সরকারি উদ্যোগে অথচ তার মেধাতালিকা প্রকাশ করা হবে না— এ যে দুর্নীতির পথ প্রস্তুত করা, তা তখন কোন সাংবাদিক লিখেছিলেন? কোন শিক্ষাবিদ একটি উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লিখেছিলেন? আজকের দুর্নীতির নিন্দা করতে গিয়ে অনেকেই বাম আমলের নিয়োগ দুর্নীতি টেনে আনছেন। এতে হয়ত নিরপেক্ষতা প্রমাণ হয়, কিন্তু অস্বীকার করা হয় যে এসএসসি, টেট দুর্নীতির সঙ্গে প্রাক-এসএসসি যুগে টাকা দিয়ে চাকরি পাওয়ার তুলনা বস্তুত আলুর সঙ্গে আপেলের তুলনা। কারণ সেখানে স্থানীয় স্তরে দুর্নীতি হত, যা বন্ধ করতে সরকার কেন্দ্রীয় পরীক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিল। এখানে সরকার সচেতনভাবে একটি চালু ব্যবস্থা ধাপে ধাপে তুলে দিয়েছে যাতে কেন্দ্রীয়ভাবে দুর্নীতি করা সম্ভব হয়। যাঁরা বলেন পাঁচ টাকার দুর্নীতিও দুর্নীতি আর পাঁচ কোটি টাকার দুর্নীতিও দুর্নীতি, তাঁদের দেখলে সশরীরে ঈশ্বর দর্শনের মত অনুভূতি হতে পারে। কিন্তু তাতে একথা অপ্রমাণ হয় না যে তাঁরা যে কোনও কারণেই হোক স্থিতাবস্থার সমর্থক। পরিস্থিতির চাপে বর্তমান সরকারকে খানিকটা গাল দিচ্ছেন মাত্র। হয়ত কিছুটা বিবেকের দায়ে, কিছুটা নইলে লোকে খারাপ বলবে বলে।

আরও পড়ুন শিক্ষক দিবসের প্রশ্ন: শিক্ষকদের বাঁচাবে কে?

তৃণমূল সরকারের বরাবরের সমর্থক কেউ কেউ যেমন রাতের অন্ধকারে মহিলাসুদ্ধ আন্দোলনকারীদের পুলিসের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দৃশ্যে আর স্থির থাকতে পারেননি। বলেছেন বলপ্রয়োগ কাম্য নয়, আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যা মিটিয়ে ফেলা হোক। এসব বিবৃতি দিলে হয়ত বিবেকের ডাকে সাড়া দেওয়া হয় বা সাধারণ মানুষের কাছে নিজের ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল করা যায়। কিন্তু এগুলির বক্তব্য দুর্বোধ্য। ভাবখানা এমন যেন সরকার বাহাদুর এ দুর্নীতিতে যুক্তই নন। তৃতীয় পক্ষ টাকা নিয়ে চাকরি দিয়ে যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করেছে। এখন সরকার এদের অভিভাবকের আসনে বসে বুঝিয়েসুঝিয়ে মিটিয়ে দিলেই সব মিটে যায়। যেন সরকার মেধাতালিকা প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয়নি, প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী এই মামলায় হাজতবাস করছেন না, যেন আদালত কান ধরার আগে সরকার নিজেই দোষীদের খুঁজে খুঁজে শাস্তি দেওয়া শুরু করেছিল।

হিন্দিভাষীরা বলে থাকেন “দাল মে কুছ কালা নেহি হ্যায়, পুরা দাল হি কালা হ্যায়।” পশ্চিমবঙ্গের নিয়োগ দুর্নীতির ব্যাপারটাও যে তাই তা এখনও অনেকেই বুঝতে পারছেন না বা বুঝতে চাইছেন না। কারণ এই সত্য তাঁদের রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। কিন্তু চুপ করে থাকতেও পারছেন না, কারণ যে ছেলেমেয়েগুলোকে লাঞ্ছিত হতে দেখা গেছে তারা মোটের উপর নিজের শ্রেণির। এরা মইদুল ইসলাম মিদ্যার মত বিরোধী দলের মিছিলে আসা বা আনিস খানের মত দলীয় রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া গেঁয়ো মুসলমান নয় যে তাদের মৃত্যুতে চোখ ফিরিয়ে থাকা যাবে। পশ্চিমবঙ্গের কাগজ, টিভি চ্যানেলের মালিক, সম্পাদক, উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিশেষজ্ঞ ও বিখ্যাতদের ছেলেপুলেরা প্রায় কেউই সরকারি স্কুলে পড়ে না। ফলে দিব্যি ওসব স্কুলের রোগবালাইকে অগ্রাহ্য করে থাকা গিয়েছিল। কিন্তু এখন যারা মার খাচ্ছে তাদের মুখের ভাষা শুনে, বেশভূষা দেখে পরের ছেলে পরমানন্দ, যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ ভেবে আর থাকা যাচ্ছে না। এতদিনে সত্যিই গা শিরশির করছে— এরপর কোনও ইস্যুতে যদি আমাদের ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গেই সরকার এরকম ব্যবহার করে! এতদিন যারা মার খেয়েছে, নানাভাবে অত্যাচারিত হয়েছে তাদের অবস্থা এবং অবস্থানকে নানা যুক্তিতে আমল না দেওয়া এই মানুষদের জন্যই বোধহয় কবি লিখেছিলেন “যাদের করেছ অপমান/অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।”

চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন হয়ত শেষ অবধি ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে সরকারি প্রতাপে বা কৌশলে, হয়ত সব যেমন চলছিল তেমনই চলবে। কিন্তু তারা অন্তত সাতে পাঁচে না থাকা বাঙালির হাড়ে ঠকঠকানি ধরানোর কাজটুকু করতে পেরেছে বলে ধন্যবাদার্হ।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

মমতা ও পশ্চিমবঙ্গ: মাঝির হাতেই নৌকাডুবি?

মঙ্গলবার দুপুরে যখন সরকার নির্ধারিত স্থান উপচে ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে গিয়ে পড়েছে সিপিএমের ছাত্র ও যুব সংগঠনের মিটিং, সেইসময় একটি জনপ্রিয় বাংলা খবরের চ্যানেল সে মিটিং না দেখিয়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সুবীরেশ ভট্টাচার্যের গ্রেপ্তারের খবর দেখাচ্ছিল। অ্যাঙ্কর, নিউজরুমে দাঁড়ানো এক সাংবাদিক এবং আরও এক প্রতিবেদকের মধ্যে এসএসসি দুর্নীতির চর্বিতচর্বণ চলছিল। অনিবার্যভাবে এসে পড়ছিল অর্পিতা-পার্থ সম্পর্কের আলোচনা। তার খানিকক্ষণ আগেই ওই চ্যানেলে ফ্লোরা সাইনি বলে কোনো এক মডেলের চেহারা ফটোশুটের আগে কীভাবে বদলে যায় তা-ও দেখানো হচ্ছিল বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে। কোন চ্যানেলে ‘ইনসাফ’ আন্দোলন কীভাবে দেখানো হচ্ছে দেখতে গিয়ে ওই চ্যানেলটিতে গিয়েই বারবার হতাশ হতে হচ্ছিল। এমনকি মাঝে মাঝে প্রধান খবর বলে পরপর যে খবরগুলোর ঝলক দেখানো হয়, সেখানেও ইনসাফ সভার সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হচ্ছিল, সাক্ষাৎকারে ধর্মাবতার অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় কেমন তিনমাস জেলের ভয় দেখিয়েছেন অভিষেক ব্যানার্জিকে।

হঠাৎই সেই চ্যানেলেও লাইভ হয়ে গেল সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বক্তৃতা। সমস্তটাই লাইভ হল। শুধু ওই একটি চ্যানেল নয়, কোনো চ্যানেলেই কমিউনিস্টরা আবার সেকালের মত কলকাতাকে অচল করে দিয়েছে, নৈরাজ্যের দিন ফিরিয়ে আনছে, পুলিসের কথা না শুনে ঘোর অন্যায় করছে – এরকম অভিযোগ উঠতে দেখলাম না। ওই জমায়েতের জন্য কোন রাস্তায় কত বড় যানজট তৈরি হয়েছে, কার প্লেন মিস হয়ে যাচ্ছে, কে ইন্টারভিউতে পৌঁছতে পারল না – এই নিয়ে অশ্রু বিসর্জনও চোখে পড়ল না। বরং বিজেপি মনোনীত প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদের চ্যানেলের স্টুডিও যেভাবে সাজানো হয়েছিল এবং অ্যাঙ্কররা যেরকম উদ্দীপ্ত ছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল গণশক্তি নতুন চ্যানেল খুলেছে। কলকাতার যে খবরের কাগজটি মিটিং মিছিলে সাধারণ নাগরিকের অসুবিধা নিয়ে সাধারণত সবচেয়ে বেশি অসন্তোষ প্রকাশ করে থাকে, তাদের বুধবার সকালের সংস্করণেও ইনসাফ সভার প্রতিবেদনে ওসব নিয়ে একটি শব্দ নেই।

কলকাতার সংবাদমাধ্যম দারুণ বিরোধী-বান্ধব – এমন অভিযোগ মমতা ব্যানার্জিও করবেন না। তাহলে এ হেন আচরণের কারণ কী? একটা কারণ নির্ঘাত প্রস্তুতির অভাব। জনতা যে আসলে চিড়িয়াখানা দেখতে এসেছিল, সে স্টোরির প্রস্তুতি থাকে ব্রিগেডে মিটিং হলে। যানজট ইত্যাদিও খেয়াল রাখা হয় সেইসব দিনে। কিন্তু ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে হওয়ার কথা যে জমায়েত, তা যে গোটা ধর্মতলা দখল করে নেবে তা বোধহয় কোনো প্রথিতযশা চ্যানেল সম্পাদক আন্দাজ করতে পারেননি। কিন্তু প্রস্তুতি না থাকলে খুঁত ধরতে অসুবিধা হতে পারে, প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে হবে কেন? মাসখানেক আগে ওই ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে থেকেই চাকরির দাবিতে ৫০০ দিন ধরে মেয়ো রোডে বসে থাকা ছেলেমেয়েদের কাছ পর্যন্ত একটি নাগরিক মিছিলের ডাক দিয়েছিল বামেরা। লেখার প্রয়োজনে এবং কিছুটা নিজের প্রতিবাদ জানানোর তাগিদে সেদিন গিয়েছিলাম। সেই মিছিলে নেতারা এবং বিখ্যাতরা ছিলেন, কিন্তু প্রাণ ছিল না। লাভ বলতে এক প্রাক্তন সহকর্মীর সঙ্গে অনেকদিন পরে সাক্ষাৎ। সে গিয়েছিল নিজের কাগজ থেকে মিছিল কভার করতে। বলেছিল, কলকাতার সংবাদমাধ্যম নাকি এখন বামেদের প্রতি কিছুটা নরম হয়েছে। চাইছে বামেদের হাল ফিরুক। সেদিন কথাটা খুব একটা বিশ্বাস করিনি। কিন্তু মঙ্গলবারের পর বিশ্বাস না করে উপায় নেই।

কথা হল, সংবাদমাধ্যমের নরম হওয়ার প্রয়োজন কী? বিজ্ঞাপনের রাশ তো এখনো নবান্নের হাতেই। সিবিআই আর ইডি যতই জ্বালাতন করুক, সাংবাদিকদের প্রয়োজনে টাইট দেওয়ার জন্য কেস দিতে রাজ্য পুলিস তো আছেই। আসলে হাজার হোক, চ্যানেলের টিআরপি চাই। কাগজেরও পাঠকের মর্জি কিছুটা খেয়াল রাখতেই হয়। বহু দর্শক/পাঠকেরই মর্জি যে গত কয়েক মাসে সরকারবিরোধী হয়ে উঠেছে তা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়া, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাজারে আলু পটল ঝিঙে মাছ মাংস কিনতে যাওয়া সম্পাদকরাও দিব্যি টের পাচ্ছেন।

বিধানসভার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে যে বিশ্লেষণ এ রাজ্যে প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল, তা হল কোনো সরকারবিরোধী হাওয়া আদপেই ছিল না। সবটাই বিরোধীদের কল্পনা। বিজেপির ভোট ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচন থেকে এক লাফে ২৮.১৩% বাড়ল। মুখ্যমন্ত্রী নিজে হেরে গেছেন কিন্তু তাঁর পার্টি জিতেছে – এমন ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। ঠিক তাই ঘটল, অথচ প্রাজ্ঞ সম্পাদক এবং তৃণমূল সমর্থকরা ঘোষণা করলেন সরকারের বিরুদ্ধে কোনো হাওয়া ছিল না। কেউ কেউ বললেন মমতা হেরেছেন শুভেন্দু অধিকারীর ধর্মীয় মেরুকরণমূলক প্রচারের কারণে, তার সঙ্গে সরকারের প্রতি অসন্তোষের কোনো সম্পর্ক নেই। আশ্চর্য! জ্যোতি বসুর পরে বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা নাকি স্রেফ ধর্মীয় মেরুকরণের কারণে হেরে গেছেন। এসব বলে আসলে যা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে, তা হল সরকারবিরোধী হাওয়া টেনে নিয়েছিল বিজেপি। সাধারণ ভোটার তৃণমূল নেতা, মন্ত্রীদের দুর্নীতি নিয়ে যথেষ্ট অসন্তুষ্ট ছিলেন। বিজেপির পরাজিত প্রার্থীদের তালিকায় তৃণমূলাগতদের বিরাট উপস্থিতিই তার প্রমাণ। কিন্তু মমতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ছিল অটুট। দলীয় রাজনীতির বাইরের মানুষের সাথে কথা বললেই শোনা যেত, তাঁরা মনে করেন অমুক নেতাটা বদমাইশ কিন্তু দিদি ভাল। তমুক মন্ত্রী চোর কিন্তু দিদি ভাল। অনেকের মতেই ভাইপোও সুবিধের লোক নয়, কিন্তু মমতা ভাল। তাঁর দুর্ভাগ্য, এইসব আজেবাজে লোককে নিয়ে চলতে হয়। ফলে দুর্নীতিগ্রস্তরা “দলে থেকে কাজ করতে পারছি না” বলে বিজেপিতে চলে যাওয়ায় মমতার জনপ্রিয়তা বরং বেড়েই গিয়েছিল। তিনি নন্দীগ্রামে হারলেন স্থানীয় বটগাছ শুভেন্দুর কাছে, অন্য কেউ প্রার্থী হলেই হয়ত জিতে জেতেন। কিন্তু এ কথা তো সত্যি, যে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকেই মমতা আসলে ২৯৪ আসনেই প্রার্থী। ভোটাররা যাদের অপছন্দ করছিলেন তারা দল ছেড়ে চলে যাওয়ায় প্রসন্ন চিত্তে আবার মমতাকেই ভোট দিয়েছিলেন। এই গগনচুম্বী ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও কিন্তু আজ টলমল করছে।

ইনসাফ সভায় লোক টানতে মীনাক্ষী মুখার্জি, কলতান দাশগুপ্তরা স্থানীয় স্তরে অসংখ্য ছোট ছোট সভা করেছেন বলে জানা যাচ্ছে। অর্থাৎ সংগঠনের একেবারে নিচের স্তর থেকে ইমারত গড়ে তোলার চেষ্টা। এ মাসে সিপিএম রাজ্যের প্রত্যেকটা পঞ্চায়েতে ডেপুটেশন দেওয়ার কর্মসূচিও নিয়েছে। সেই ডেপুটেশনের প্রস্তুতি হিসাবে আবার প্রত্যেক পঞ্চায়েত এলাকার প্রত্যেক পাড়ায় স্ট্রিট কর্নার হচ্ছে। এর আগে হয়েছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসংযোগ অভিযান। এই সক্রিয়তা শুধু যে গত ১১ বছরে দেখা যায়নি তা-ই নয়, শ্বেতশুভ্র বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে জনসংযোগে এমনই ভাঁটা পড়েছিল যে লেখাপড়া জানা শহুরে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত ছাড়া অধিকাংশ মানুষেরই মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর দলকে দূর গ্রহের বাসিন্দা বলে মনে হত। তার বিপরীতে মমতা কাছের লোক। যে ভাষা বিভ্রাটের জন্য মমতা নাক উঁচু সিপিএম কর্মী সমর্থকদের হাসির পাত্র, সে ভাষা একজন রিকশাচালক বা পরিচারিকাকে মনে করাত তিনি কাছের মানুষ। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে মমতার দেবীপ্রতিম জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল এভাবেই। সেই জনপ্রিয়তা তাঁর দলকে নিঃসন্দেহে ২০২১ উতরে দিতে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। কিন্তু ইদানীং সব ধরনের মানুষের বিশ্বাসেই চিড় ধরার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কেন?

একসময় হিট বাংলা ছবির রিমেক হত বলিউডে এবং সে ছবিও হিট হত। সেভাবেই অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের নিশি পদ্ম শক্তি সামন্তের হাতে হয়েছিল অমর প্রেম। সে ছবির গান তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল। গীতিকার আনন্দ বক্সী একটি গানে তুলেছিলেন মোক্ষম প্রশ্ন – মাঝনদীতে নৌকো দুললে তো মাঝি সামলে-সুমলে পারে নৌকো ভেড়ায়, কিন্তু মাঝি নিজেই নৌকো ডুবিয়ে দেবে ঠিক করলে সে নৌকোকে বাঁচাবে কে (মজধার মে নইয়া ডোলে/তো মাঝি পার লগায়ে।/মাঝি জো নাও ডুবোয়ে/উসে কৌন বচায়ে)? অতি সাম্প্রতিককালে সম্ভবত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে এই জাতীয় সংশয় তৈরি হয়েছে মানুষের মনে। এসএসসি দুর্নীতি অবধি তবু ঠিক ছিল। মুখ্যমন্ত্রী বিশেষ সমর্থন করতে যাননি, বরং ঝটপট মন্ত্রিসভা থেকে পার্থকে ছেঁটে ফেলা হয়েছিল। ফলে ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হওয়া কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি দিদি সমর্থন করেন – এমন ভাবার অবকাশ তৈরি হয়নি। কিন্তু অনুব্রত মণ্ডলের বেলায় দিদির একেবারে অন্য রূপ। কেষ্টবাবুর ঘরে নোটের পাহাড় দেখা যায়নি বটে, কিন্তু রোজই তাঁর বিপুল পরিমাণ ফিক্সড ডিপোজিট, জমিজমা, সাদা-কালো ব্যবসার কাহিনি প্রকাশিত হচ্ছে। দিদি কিন্তু বরাভয় নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। বলেছেন যেদিন ফিরে আসবে, সেদিন বীরের সম্মান দিয়ে নিয়ে আসতে হবে। যে মানুষ নিশ্চিন্তে ছিলেন এই ভেবে, যে আশেপাশে চোর ডাকাত থাকলেও নৌকার হাল দিদির হাতে, তিনি এরপর কী ভাবছেন কে জানে? একথা ঠিক যে নারদ কেলেঙ্কারির অভিযুক্তদেরও মমতা একইভাবে সমর্থন করেছিলেন, তাতে জনপ্রিয়তা কমেনি। কিন্তু মানুষের ধৈর্যেরও সীমা থাকে, আর সে সীমা কখন লঙ্ঘিত হয় কেউ জানে না। হয়ত বিরোধীদের সক্রিয়তার মাত্রাও সেই সীমা নিয়ন্ত্রণ করে। নারদ কেলেঙ্কারির পর পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীরা সাংবাদিক সম্মেলন ছাড়া আর কী করেছিলেন মনে করতে বেশ কষ্ট হবে।

কারণ যা-ই থাক, গত কয়েক মাসে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটছে। দোকানে বাজারে মানুষ মমতার সততা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। একজন রিকশাচালক এমনকি তাঁর হাওয়াই চটি, নীল পাড় সাদা শাড়িতেও দুর্নীতির গন্ধ পাচ্ছেন। সেসবের দাম সম্পর্কে এমন সব কথা উড়ে বেড়াচ্ছে যেগুলো নিঃসন্দেহে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির অবদান। নতুনত্ব এইখানে, যে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটি এর আগে মমতাকে মমতাজ বলত, আরও নানা অশ্লীল ব্যক্তিগত আক্রমণ করত। কিন্তু মমতা দুর্নীতিগ্রস্ত বললে ভাইরাল হওয়া যাবে না – ইউনিভার্সিটির অধ্যাপকদের কাছে বোধহয় এরকমই তথ্য ছিল। সে তথ্য কি বদলে গেল?

একা রামে রক্ষে নেই, সুগ্রীব দোসর। রাজ্যে চাকরি-বাকরি নেই; চাকরি সংক্রান্ত কেলেঙ্কারির তদন্তেই সিবিআই, ইডির রমরমা। ওদিকে মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং জড়িয়ে পড়লেন ভুয়ো চাকরি বিলোবার কাণ্ডে। ঘটা করে সভা ডেকে চাকরির নিয়োগপত্র বলে যা বিলোলেন তা প্রথমত বেসরকারি চাকরির। তারপর জানা গেল ওগুলো সঠিক অর্থে চাকরিও নয়, শিক্ষানবিশির সুযোগ মাত্র। পশ্চিমবঙ্গে কর্মসংস্থানের যা অবস্থা তাতে অসহায় যুবকরা ওই মোটা অফারই মাথায় তুলে নিতেন নিশ্চয়ই, কিন্তু অতঃপর ঝুলি থেকে বেরোল প্রফেসর শঙ্কুর ‘মরুরহস্য’ গল্পের বিজ্ঞানী ডিমেট্রিয়াসের পোষ্যের আকারের একটি বেড়াল। যে সংস্থার অফার লেটার দেওয়া হয়েছে সেই সংস্থা আদৌ ওগুলি ইস্যু করেনি। চিঠিতে যাঁর সই রয়েছে সেই বেদপ্রকাশ সিং সটান বলে দিলেন চিঠিগুলি ভুয়ো। ঘটনার পর বেশ কয়েকদিন পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম গান্ধীজির তিন বাঁদর হয়ে বসেছিল। তারপর থেকে মন্ত্রী, আমলা যাকেই এ নিয়ে প্রশ্ন করেছে তিনিই বলেছেন তিনি কিছু জানেন না। জানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। ফলে মাঝির নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ার ভয় ঢুকে পড়ল এখানেও।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এমন মানুষও আছেন যাঁরা তৃণমূলে দুর্নীতি আছে, শঠতা আছে জেনে, তৃণমূল নেতারা সন্ত্রাস চালান মেনে, মমতাকে ভক্তি না করেও তাঁর মুখ চেয়ে ভোট দিয়ে এসেছেন। কারণ তিনি ধর্মনিরপেক্ষ, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করেন। অধুনা তাঁরাও মাঝির হাতে নৌকাডুবির ভয় পাচ্ছেন, পেতে বাধ্য। গত বছর এ রাজ্যের নির্বাচনী প্রচার রাজ্য সরকারের কাজকর্ম সম্পর্কে হয়নি বলা যায়। যদি বলা হয় ভোটটাকে করে তোলা হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে গণভোট, তাহলে ভুল হবে না। সেই ভোটে জিতলেন মমতা। তারপর থেকে গত এক বছরে তিনি কী কী করেছেন? বিজেপির দুই নেতাকে দলে নিয়ে একজনকে সাংসদ, আরেকজনকে বিধায়ক তথা মন্ত্রী করেছেন। আরেকজন প্রবীণ বিজেপি নেতাকে দলে নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী করে সারা ভারতের বিরোধীদের সমর্থন জোগাড় করেছেন। তারপর শেষ মুহূর্তে বলেছেন আগে জানলে বিজেপি মনোনীত প্রার্থীকেই সমর্থন করতেন। তারপর উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধীদের সম্মিলিতভাবে মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন করেননি। সেখানেই শেষ নয়। কদিন আগে বলেছেন বিজেপি খারাপ, আরএসএস খারাপ নয়। শেষমেশ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভাল, অন্য বিজেপি নেতারা ইডি, সিবিআইকে কাজে লাগাচ্ছেন। ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ তো মাঝির হাতে নৌকাডুবির ভয় করবেনই।

আরও পড়ুন রাহুলে না, বাবুলে হ্যাঁ: তৃণমূলের প্রকৃত এজেন্ডা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

এমন হতেই পারে যে এরপরেও মমতা তথা তাঁর দল হইহই করে নির্বাচনে জিতবে। তবে মনে রাখা ভাল, রাজনীতিতে অমর প্রেম বলে কিছু হয় না।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কেবল গুণী মানুষ নন, তাঁর প্রতিভা বহুমুখী। তিনি সাহিত্য রচনা করেন, ছবি আঁকেন, গান লেখেন। তার উপর রাজ্যের প্রশাসন চালাতে হয়। একজন মানুষকে এত কাজ করতে হলে কাগজ পড়ার সময়ের অভাব ঘটা খুবই স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই প্রতিদিন কাগজ পড়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী পান না। পেলে চোখে পড়ত কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজের একটা খবর, যার শিরোনাম ‘RSS yet to clear air on bombing claim affidavit’। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের প্রধান পবন খেরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) এক প্রাক্তন প্রচারকের মহারাষ্ট্রের নানদেড় জেলা ও সেশনস আদালতে জমা দেওয়া হলফনামা প্রকাশ্যে এনেছেন। সেই হলফনামায় যশবন্ত শিন্ডে নামক ওই লোকটি দাবি করেছে, সংঘ পরিবারের সদস্য সংগঠনগুলো দেশের বিভিন্ন জায়গায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সংবাদমাধ্যমের একাংশ এবং পুলিস প্রশাসনের সহযোগিতায় তার দোষ মুসলমান সম্প্রদায়ের ঘাড়ে চাপিয়েছে। ফলে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি লাভবান হয়েছে।

খবরটা মুখ্যমন্ত্রীর চোখ এড়িয়ে গিয়ে থাকতেই পারে, কারণ এ নিয়ে কোনো চ্যানেলে কোনো বিতর্কসভা বসেনি। কলকাতার অন্যান্য তথাকথিত উদার খবরের কাগজগুলোতেও আতসকাচ দিয়ে খুঁজে দেখতে হবে এই খবর। তাছাড়া কংগ্রেস তো বানিয়েও বলতে পারে। কারণ তারা তৃণমূল কংগ্রেসকে বিজেপির প্রধান বিরোধী হয়ে উঠতে দিতে চায় না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর শক্তিশালী সোশাল মিডিয়া টিম আছে। টুইটারে তাঁর সাত মিলিয়ন ফলোয়ার, ফেসবুকে ৪.৯ মিলিয়ন। সেই সোশাল মিডিয়া টিমের সাহায্য নিলেই মুখ্যমন্ত্রী জানতে পারবেন যে ওই মর্মে হলফনামা সত্যিই ফাইল করা হয়েছে। চাইলে স্বয়ং যশবন্তের মুখ থেকেই হলফনামায় লিখিত অভিযোগগুলো সংক্ষেপে শুনে নিতেও পারবেন। মারাঠি যশবন্তের ভিডিও ইংরেজি সাবটাইটেল সমেত সোশাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

যশবন্তের হলফনামার কথা প্রকাশ্যে এল বৃহস্পতিবার, কলকাতার কাগজের প্রথম পাতায় সে খবর বেরোল শুক্রবার সকালে। সেদিনই সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বললেন “আরএসএস এত খারাপ ছিল না, এবং এত খারাপ বলে আমি বিশ্বাস করি না।” মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই খবরটা জানতে পারেননি বলেই ওরকম বলেছেন। স্বীকার্য যে যশবন্তের কথাগুলো অভিযোগ মাত্র। কিন্তু যে সংগঠনের একদা প্রচারকরা এই মুহূর্তে দেশের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বহু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী – তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ যে মারাত্মক, সে কথা না বোঝার মত রাজনীতিবিদ মমতা ব্যানার্জি নন। তাছাড়া তিনদিন হয়ে গেল, এখন পর্যন্ত আরএসএস যশবন্তকে মিথ্যাবাদী বলে কোনো বিবৃতি দেয়নি। অবশ্য জবাবদিহি না চাইলে বিবৃতি দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। ২০০৬ সালের নানদেড় বিস্ফোরণ কাণ্ডে সরকারি সাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হতে চেয়ে আবেদন করেছিল যশবন্ত। আদালত সবেমাত্র সেই আবেদন গ্রহণ করেছে, আরএসএসকে জবাবদিহি করতে তো ডাকেনি। সাংবাদিকদেরই বা ঘাড়ে কটা মাথা, যে এ নিয়ে মোহন ভাগবতকে প্রশ্ন করবে? অতএব আরএসএসের বয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা বলে ঘোষণা করতে। কথায় আছে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। মুখ্যমন্ত্রী তো বিশ্বাসই করেন না আরএসএস খারাপ। ফলে যতক্ষণ তারা নিজেরা না বলছে “হ্যাঁ, আমরা খারাপ”, মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চিন্ত। কিন্তু খটকা অন্যত্র।

“এত খারাপ ছিল না”। এত খারাপ মানে কত খারাপ? তার মানে মুখ্যমন্ত্রী জানেন যে আরএসএস একটু একটু খারাপ? সেই পরিমাণটা কি তাঁর পক্ষে সুবিধাজনক? খারাপ ছিল না মানেই বা কী? আগে যতটুকু খারাপ ছিল তাতে তাঁর আপত্তি ছিল না, এখন বেশি খারাপ হয়ে গেছে – এ কথাই কি বলতে চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী? তাঁর কাছে কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ তা অবশ্য আমাদের জানা নেই। মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা কি খারাপ? সে হত্যায় আরএসএস যোগ প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ হয়নি বটে, তবে সেই ঘটনার পরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লিখেছিলেন, আরএসএস নেতাদের ভাষণগুলো যে বিষ ছড়িয়েছে তারই পরিণতি গান্ধীহত্যা। তাই ভারত সরকার আরএসএসকে নিষিদ্ধ করে। কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন? সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। জওহরলাল নেহরুর বদলে যিনি প্রধানমন্ত্রী হলে ভারত সোনার দেশ হত বলে আরএসএস এখন দিনরাত ঘোষণা করে। মুখ্যমন্ত্রী নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাই ধরে নিচ্ছি অতকাল আগের ব্যাপার তাঁর মনে নেই। তাই তার ভালমন্দ ভেবে দেখেননি। তবে যেহেতু তিনি একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী এবং নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করেন, সেহেতু ধরে নিতে দোষ নেই যে যশবন্ত শিন্ডে তার হলফনামায় যে ধরনের কার্যকলাপের কথা লিখেছে সেগুলো আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর চোখে খারাপই। কারণ কাজগুলো বেআইনি এবং সাম্প্রদায়িক।

এখন কথা হল, যশবন্ত যে অভিযোগ করেছে আরএসএসের বিরুদ্ধে, সে অভিযোগও কিন্তু এই প্রথম উঠল তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী কাগজ পড়ারই সময় পান না যখন, বই পড়ার সুযোগ না পাওয়ারই কথা। তবে তাঁর তো পড়ুয়া পারিষদের অভাব নেই। তাঁরা কেউ কেউ নির্ঘাত মহারাষ্ট্র পুলিসের প্রাক্তন ইন্সপেক্টর জেনারেল এস এম মুশরিফের লেখাপত্র পড়েছেন। তাঁর লেখা আরএসএস: দেশ কা সবসে বড়া আতঙ্কবাদী সংগঠন বইতে ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত মোট ১৮টা বোমা বিস্ফোরণে আরএসএস, অভিনব ভারত, জয় বন্দেমাতরম, বজরং দল এবং সনাতন সংস্থা – এই পাঁচটা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনকে দায়ী করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর পার্ষদরা কেন যে এসব কথা তাঁকে জানাননি! জানলে নিশ্চয়ই আরএসএস খারাপ “ছিল না” – একথা মুখ্যমন্ত্রী অতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলতেন না। অবশ্য মুশরিফ যা লিখেছেন তার সমস্তই তো স্রেফ অভিযোগ। মালেগাঁও বিস্ফোরণের প্রধান অভিযুক্ত সাধ্বী প্রজ্ঞা যেভাবে ছাড়া পেয়ে সাংসদ হয়ে গেছেন, তাতে ওসব অভিযোগকে আর আমল দেওয়া চলে কিনা সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে আরএসএসের উপর অত্যন্ত জোরালো বিশ্বাস না থাকলে এসব জেনে সংঘ পরিবারের সদস্য নয় এমন এক রাজনৈতিক দলের সর্বময় নেত্রীর কিছুটা সন্দিহান হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিজের বিশ্বাসে অটল।

রাজনীতিতে দুজন ব্যক্তি, দুটো সংগঠন বা একজন ব্যক্তির সঙ্গে একটা সংগঠনের সম্পর্ক চোখ বন্ধ করে ভরসা করার মত পর্যায়ে পৌঁছনো চাট্টিখানি কথা নয়। বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস না থাকলে তেমনটা হওয়া শক্ত। সেদিক থেকে মমতার আরএসএসের প্রতি এই বিশ্বাস বুঝতে অসুবিধা হয় না। আজকের মুখ্যমন্ত্রী গত শতকের শেষ দশকে যখন ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন এককালের স্বয়ংসেবক অটলবিহারী বাজপেয়ী আর লালকৃষ্ণ আদবানির স্নেহ না পেলে মমতার পক্ষে আস্ত একখানা রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা সম্ভব হত কি? হলেও সদ্যোজাত দলটাই মধ্যগগনে থাকা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের বিরোধী হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে – এ বিশ্বাস কংগ্রেসের ভোটার তথা কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা যেত কি? মাত্র আটজন সাংসদ যে দলের, সেই দলের নেত্রীকে রেল মন্ত্রকের দায়িত্ব দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের প্রভাবিত করার মহার্ঘ সুযোগ দিয়েছিল বিজেপি। শুধু কি তাই? তেহেলকা কাণ্ড প্রকাশিত হওয়ার পরেই সততার প্রতীক মমতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এনডিএ ত্যাগ করেন। তা সত্ত্বেও ২০০৩ সালে তাঁকে দপ্তরহীন মন্ত্রী করে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। আরএসএস আর বিজেপি আলাদা – এই তত্ত্বে এখনো বিশ্বাস করেন যাঁরা, তাঁদের কথা আলাদা। বাকিরা নিশ্চয়ই মানবেন, এভাবে পাশে থাকার পরেও যদি মমতা আরএসএসকে বিশ্বাস না করতেন তাহলে ভারি অন্যায় হত।

আসলে মমতার আরএসএসে বিশ্বাস ততটা অসুবিধাজনক নয়। তাঁর বারংবার আরএসএস প্রীতি ঘোষণা সত্ত্বেও দেশসুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের কেষ্টবিষ্টুদের মমতায় বিশ্বাস বরং বৃহত্তর বিপদের কারণ। গত বছর বিধানসভা নির্বাচনে যখন বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানোই মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াল, তখন বামপন্থীদের মধ্যে লেগে গেল প্রবল ঝগড়া। সিপিএম নেতৃত্বাধীন বাম দলগুলো বলতে শুরু করল বিজেপি আর তৃণমূল অভিন্ন, তাই তৃণমূলকে ভোট দেওয়া আর বিজেপিকে ভোট দেওয়া একই কথা। উঠে এল একটা নতুন শব্দ – বিজেমূল। অন্যদিকে নকশালপন্থীরা বলতে লাগল, যেখানে যে প্রার্থী বিজেপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী তাকে ভোট দিতে। বিজেমূল তত্ত্বের প্রমাণ হিসাবে সিপিএম “দলে থেকে কাজ করতে পারছি না” বলে লাইন দিয়ে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়া শীর্ষস্থানীয় নেতা, মন্ত্রীদের দেখাতে লাগল। আর যত না তৃণমূল, তার চেয়েও বেশি করে নকশালরা তার জবাবে তালিকা দিতে থাকল, কোন ব্লক স্তরের সিপিএম নেতা বিজেপিতে গেছে, কোন জেলা স্তরের নেত্রী বিজেপিতে যোগ দিলেন। অর্থাৎ দুপক্ষের কেউই তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতি কী, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকলে কেন আছে বা না থাকলে কেন নেই – সে আলোচনায় গেল না। অথচ ঠিক তখনই ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে বসে লাইভ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন “আমি সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়ছি না। ওরা তো নির্বাচনে লড়ে না। ওরা বিজেপিকে সমর্থন করে। আমি লড়ছি বিজেপির সঙ্গে।” এই নেত্রীর দল জয়যুক্ত হল, একমাত্র বিরোধী দল হিসাবে উঠে এল বিজেপি। অর্থাৎ ঘোষিতভাবে আরএসএসের বন্ধু দুটো দলের হাতে চলে গেল বাংলার আইনসভা। অথচ পশ্চিমবঙ্গের ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিমানরা উল্লসিত হয়ে ঘোষণা করলেন, বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য জিতে গেল। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ জিতে গেলেন, ইত্যাদি।

আরও মজার কথা, নির্বাচনে গোল্লা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিপিএমও পরিত্যাগ করল বিজেমূল তত্ত্ব। আরও এক ধাপ এগিয়ে এ বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দেশের একমাত্র যে নেতা সর্বদা নাম করে আরএসএসকে আক্রমণ করেন, সেই রাহুল গান্ধীর দল কংগ্রেস থেকে শুরু করে সিপিএম, লিবারেশন সমেত সমস্ত বাম দল সমর্থন করে বসল মমতার পছন্দের প্রার্থীকে। সে আরেক যশবন্ত – বিজেপি থেকে তৃণমূলে এসেছেন। এ থেকে যা প্রমাণিত হয় তা হল, মমতার মত আরএসএস-বান্ধব নয় যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো, তারাও ব্যাপারটাকে নির্বাচনী লড়াইয়ের বেশি কিছু ভাবে না।

আরএসএসের কাছে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করে তোলা মতাদর্শগত মরণপণ লড়াই। সে লক্ষ্যে পৌঁছতে তারা সাংবিধানিক, অসাংবিধানিক – সবরকম পথই নিতে রাজি। প্রয়োজনে আদবানির মত আগুনে নেতাকে বঞ্চিত করে বাজপেয়ীর মত নরমপন্থীকে প্রধানমন্ত্রী করতে রাজি ছিল। জমি শক্ত হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদীর মত কড়া হিন্দুত্ববাদীকে নেতা করেছে, ভবিষ্যতে তাঁকেও আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে আরও গোঁড়া আদিত্যনাথকে সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসাতে পারে। বিরোধীরা ওই বিস্তারে ভেবেই উঠতে পারেনি এখনো। এমনকি তথাকথিত কমিউনিস্ট দলগুলোও কেবল স্ট্র্যাটেজি সন্ধানে ব্যস্ত। কোথায় কাকে সমর্থন করলে বা কার সাথে নির্বাচনী জোট গড়লে বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানো যাবে – এটুকুই তাদের চিন্তার গণ্ডি। সে কারণেই বিজেমূল শব্দটা নির্বাচনের আগে ভেসে ওঠে, পরাজয়ের পর মিলিয়ে যায়। যদি সিপিএমের পক্ষ থেকে সংঘমূল কথাটা বলা হত এবং শূন্য হয়ে যাওয়ার পরেও বলে যাওয়া হত, তাহলে জনমানসে সত্যি সত্যি প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হতে পারত। হিন্দুরাষ্ট্র কী, তা হওয়া আটকানো কেন দরকার, আটকানোর ক্ষেত্রে মমতাকে সত্যিই প্রয়োজন, নাকি তিনি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া – শতকরা ৮০-৯০ জন মানুষ এই মুহূর্তে এসব নিয়ে ভাবছেন না (সোশাল মিডিয়া দেখে যা-ই মনে হোক)। সংঘ পরিবারকে সরাসরি রাজনৈতিক ভাষণে, কর্মসূচিতে আক্রমণ করা হলে ভাবতে বাধ্য হতেন।

বিহারে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুযোগ আসা মাত্রই সমস্ত বাম দল একজোট হয়ে নীতীশকুমারকে সমর্থন করেছে। কেবল লিবারেশন নয়, সিপিএমও। সে জোটে কংগ্রেসও আছে। অথচ নীতীশও মমতার মতই বিজেপির সঙ্গে ঘর করেছেন। শুধু তা-ই নয়, মমতার বিজেপির সাথে শেষ জোট ছিল ২০০৬ সালে। নীতীশ কিন্তু ২০১৬ বিধানসভা ভোটে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সঙ্গে লড়ে জিতেও বিশ্বাসঘাতকতা করে বিজেপির কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। কেন নীতীশ আরএসএস-বিরোধী বাম দল এবং কংগ্রেসের কাছে গ্রহণযোগ্য আর কেন মমতা নন, তা নিয়ে কোনো আলোচনাই শুনলাম না আমরা। আলোচনাটা হল না সম্ভবত এইজন্যে, যে বামেরা বা কংগ্রেস নিজেরাই ওসব নিয়ে ভাবে না। বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পারলেই খুশি, শেষমেশ আরএসএসের প্রকল্পই সফল হয়ে যাবে কিনা তা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। অথবা ‘যখন হবে তখন দেখা যাবে’ নীতি নিয়ে চলছে।

আসলে কিন্তু মমতায় আর নীতীশে তফাত বড় কম নয়। নীতীশ সুযোগসন্ধানী, ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ। তারই অনিবার্য ফল হিসাবে ভূতপূর্ব জনতা দলের সঙ্গে, একদা সতীর্থ লালুপ্রসাদের সাথে তাঁর বিচ্ছেদ হয়েছিল। কিন্তু তাঁর রাজনীতির সূতিকাগার হল সমাজবাদী রাজনীতি, নিম্নবর্গীয় মানুষের রাজনীতি। সে কারণেই নীতীশ কখনো বিজেপিকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি, বিজেপিও পারেনি। নীতীশ কখনো মমতার মত সোচ্চার আরএসএস বন্দনাও করেননি। কারণ আরএসএস হল ব্রাহ্মণদের দ্বারা পরিচালিত, হিন্দু সমাজের উপর ব্রাহ্মণ আধিপত্য বজায় রাখার জন্য গঠিত সংস্থা। নীতীশের দলের নিম্নবর্গীয় সদস্য, সমর্থকদের সঙ্গে আরএসএসের আড়চোখে দেখার সম্পর্কটুকুই হওয়া সম্ভব। তার বেশি নয়।

অন্যদিকে মমতা ব্রাহ্মণকন্যা। তাঁকে দুর্গা বলে সম্বোধন করতে আরএসএসের কোথাও বাধে না। মমতার রাজনীতির ইতিহাস অন্য দিক থেকেও নীতীশের সঙ্গে মেলে না। বস্তুত যুগপৎ কংগ্রেস বিরোধিতা এবং কমিউনিস্ট বিরোধিতার ইতিহাস সম্ভবত মমতা ছাড়া ভারতের কোনো আঞ্চলিক দলের নেই। তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় রাজনীতির ভিত্তিতে তৈরি দলগুলোর স্বভাবতই প্যাথোলজিকাল বাম বিরোধিতা নেই, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেস বিরোধিতা ছিল। তেলুগু দেশম, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি, জগন্মোহন রেড্ডির দল বা ওড়িশার বিজু জনতা দলের জন্ম তৃণমূলের মতই কংগ্রেস ভেঙে। কিন্তু তাদেরও বামেদের সাথে ধুন্ধুমার সংঘাতের ইতিহাস নেই। তাদের এলাকায় বামেদের দুর্বলতা তার কারণ হতে পারে, কিন্তু এ কি নেহাত সমাপতন যে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তর দিকে আরএসএস বাদ দিলে তৃণমূলই একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি, কমিউনিস্ট এবং কংগ্রেস, দু পক্ষই যাদের ঘোষিত শত্রু? লক্ষণীয়, ২০১১ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল আর কংগ্রেসের জোট গড়তে দারুণ উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখা গেল, তিনি আরএসএসের বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন। সেই জোট বামফ্রন্টকে হারাতে পেরেছিল বটে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ভাঙনের গতিও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

তাহলে আরএসএসের সাথে সম্পর্ক মমতাকে কী কী দিয়েছে তা বোঝা গেল। এবার আরএসএস কী কী পেয়েছে সে আলোচনায় আসা যাক? রাজনীতিতে তো কেউ “আমি   নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি,/ তুমি   অবসরমত বাসিয়ো” গায় না। আরএসএস যা যা পেয়েছে সবকটাই অমূল্য।

১) আরএসএসের দুই ঘোষিত শত্রু মুসলমান আর কমিউনিস্ট। তৃণমূলের উদ্যোগে কমিউনিস্টরা প্রথমে তাদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি থেকে ক্ষমতাচ্যুত, পরে ছত্রভঙ্গ হয়েছে। তার জন্যে আরএসএসের আগমার্কা কোম্পানি বিজেপিকে বিন্দুমাত্র কসরত করতে হয়নি। মুসলমানরা আগে প্রান্তিক ছিলেন, তৃণমূল আমলে বাংলার হিন্দুদের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত হয়ে গেছেন। মমতা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে ইমাম ভাতা চালু করলেন, বিজেপি প্রায় বিনা আয়াসেই হিন্দুদের বোঝাতে সক্ষম হল, মুসলমানরা মমতার দুধেল গাই। পরে মমতা নিজেই অনবধানবশত (নাকি সচেতনভাবেই?) সেকথা বললেনও। এখন পরিস্থিতি এমন, যে বাম আমলে মুসলমানরা বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ভাড়া পেতেন না, এখন খোদ সল্টলেকে হোটেলের ঘর ভাড়া পান না।

২) মুসলমান তোষণ হচ্ছে – এই প্রোপাগান্ডা হিন্দুদের একটা বড় অংশের বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয়েছে তৃণমূল শাসনের ১১ বছরে। ইতিমধ্যে বেলাগাম হিন্দু তোষণ চলছে। বিজেপি আজগুবি অনলাইন প্রচার শুরু করল “পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো করতে দেওয়া হয় না”, তৃণমূল সরকার দুর্গাপুজোগুলোকে নগদ অনুদান দিতে শুরু করল। আরএসএস শুরু করল রামনবমীতে অস্ত্র মিছিল, তৃণমূল আরম্ভ করল বজরংবলী পুজো। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরির পথ খুলে গেল, আরএসএসের প্রতিশ্রুতি পূরণ হল। এদিকে দিদি দীঘায় জগন্নাথ মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা নিলেন। রাজ্যে বিজেপির সরকার থাকলেও এভাবে হিন্দুত্বকে রাজনীতির এজেন্ডায় নিয়ে আসতে পারত কিনা সন্দেহ।

৩) ভারতের একেক রাজ্যের একেকটা বিশিষ্ট গুণ আছে, যা সেই রাজ্যের মানুষের মূলধন। গুজরাটের যেমন ব্যবসা, পাঞ্জাবের কৃষিকাজ। বাংলার ছিল লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা ইত্যাদি। অন্য রাজ্যের লোকেরা যাকে কটাক্ষ করে এককথায় বলে কালচার। এই কালচার আরএসএসের হিন্দুত্বের একেবারে বিপরীত মেরুর জিনিস। তৃণমূল আমলে সবচেয়ে নির্বিঘ্নে সাড়ে সর্বনাশ ঘটানো গেছে এই কালচারের। বাংলার ছেলেমেয়েরা ফড়ফড় করে ইংরেজি বলতে না পারলেও দেশে বিদেশে গবেষক, অধ্যাপক হিসাবে তাদের দাম ছিল। এখনো সর্বভারতীয় বিজ্ঞান পুরস্কারগুলোর প্রাপকদের তালিকা মাঝে মাঝে সেকথা জানান দেয়। সে দাম ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে স্কুল, কলেজের চাকরি বিক্রি করে লেখাপড়া লাটে তুলে দিয়ে। নায়ক, নায়িকা, গায়ক, গায়িকারা কাতারে কাতারে বিধায়ক আর সাংসদ হয়ে গেছেন। লেখকরা ব্যস্ত পুষ্পাঞ্জলি দিতে আর চরণামৃত পান করতে। সিনেমার কথা না বলাই ভাল। শৈল্পিক উৎকর্ষ বাদ দিন, পারিশ্রমিকের হাল এত খারাপ যে কলকাতার শিল্পীরা স্রেফ বাংলা ছবিতে, ওয়েব সিরিজে কাজ করে টিকে থাকতে পারবেন কিনা সন্দেহ। মন্ত্রীর বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়ার ছবি দেখে প্রথম সারির অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য হা-হুতাশ করছেন, ওই পরিমাণ টাকার অর্ধেক পেলেও বাংলা ছবিগুলো অনেক ভাল করে করা যেত।

কিন্তু এসব গোল্লায় যাওয়ার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে। লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা মিলিয়ে যে বাঙালি মনন ছিল সেটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আসল ক্ষতি সেটা। বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকের অন্তত একটা ভান ছিল, যে সে ভারতের অন্য অনেক রাজ্যের লোকেদের মত ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না। দুর্গাপুজো এলে কদিন পাগলামি করে; নিজের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো, সত্যনারায়ণের সিন্নি চলে। কিন্তু বাইরে সে একজন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। এখন সেসব গেছে। নতুন ফ্ল্যাটবাড়ি হলে তার গায়ে খোদাই করা হচ্ছে গণেশের মুখ, শিবলিঙ্গ বা স্বস্তিকা। কলিং বেলে বেজে উঠছে “ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ”। অক্ষয় তৃতীয়ায় এখনো গণেশপুজো এবং হালখাতা হয় এমন দোকান খুঁজে পাওয়া দায়, অথচ গণেশ চতুর্থী এক দশকের মধ্যে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। শিগগির পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনন্ত ছুটির তালিকায় যোগ হবে নির্ঘাত। অল্পবয়সী বাঙালি কথা বলছে হিন্দি মিশিয়ে, ছোটরা স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে শিখছে হিন্দি। বঙ্গভঙ্গের নাম করতেই লর্ড কার্জনের ঘুম কেড়ে নেওয়া বাঙালি নিজে নিজেই প্রায় উত্তর ভারতীয় হিন্দু হয়ে গেল তৃণমূল আমলে। এই সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ তামিলনাড়ুতে কিছুতেই হয়ে উঠছে না আরএসএসের দ্বারা। কেরালায় মার খেতে হচ্ছে, এমনকি নিজেদের হাতে থাকা কর্ণাটকেও করতে গিয়ে অনবরত সংঘাত হচ্ছে। বাংলায় কিন্তু ওসবের দরকারই হচ্ছে না। বিনা রক্তপাতে বাঙালি বাঙালিয়ানা বিসর্জন দিচ্ছে।

আরও পড়ুন শাহেনশাহ ও ফ্যাসিবিরোধী ইশতেহার

এর বেশি আর কী চাইতে পারত আরএসএস? মমতা হিন্দুরাষ্ট্রের জন্য রুক্ষ, পাথুরে বাংলার মাটিতে হাল চালিয়ে নরম তুলতুলে করে দিয়েছেন। বীজ বপনও সারা। ফসল তোলার কাজটা শুধু বাকি।

রেউড়ি সংস্কৃতি: যে গল্পে ডান-বাম গুলিয়ে গিয়েছে

১৯৯১ পরবর্তী যুগে দিনরাত মন্ত্রের মত কানের কাছে বলে বলে যে কয়েকটি কথা আমাদের মর্মে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার অন্যতম হল, কোনও পরিষেবা বা পণ্য বাজার থেকে পয়সা দিয়ে না কিনে পাচ্ছে মানেই সেটা দান।

আমি কোন পথে যে চলি, কোন কথা যে বলি
তোমায় সামনে পেয়েও খুঁজে বেড়াই মনের চোরা গলি।

এই প্রকল্প বারবার বিরোধীদের ফাঁপরে ফেলতে সমর্থ হয়। এমন গতিতে এমন এক লেংথে পিচ পড়ে মোদি সরকারের সিদ্ধান্তগুলো, যাতে ব্যাকফুটে যাব না ফ্রন্টফুটে খেলব ঠিক করতে করতেই বিরোধীদের ব্যাট-প্যাডের ফাঁক দিয়ে বল গলে গিয়ে উইকেট ভেঙে দেয়। এই মুহূর্তে যেমন কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের যে শেষ চিহ্নটুকু ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে, সেটুকুও মুছে ফেলতে সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু হয়েছে।

প্রাক্তন বিজেপি মুখপাত্র অশ্বিনী উপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন নির্বাচনী প্রচারে যেসব রাজনৈতিক দল ভোটারদের আকর্ষণ করতে “freebies” দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাদের নির্বাচনী প্রতীক ফ্রিজ করে দেওয়া এবং রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার দাবিতে। পিটিশনার বলেছেন “irrational freebies” অর্থাৎ মুফতে অযৌক্তিক সুযোগসুবিধা বিলোবার আগে তার অর্থনৈতিক প্রভাব আলোচনা করতে হবে। এই মামলার শুনানিতে ১১ আগস্ট মহামান্য প্রধান বিচারপতি এন ভি রামান্না বলে বসলেন, অর্থনীতির ক্ষতি আর মানুষের কল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার। অবশ্য তিনি যোগ করেছেন “আমি রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার দিকটা দেখতে চাই না। সেটা অগণতান্ত্রিক। হাজার হোক, ভারত তো একটা গণতন্ত্র।” তার আগেই ৩ আগস্ট বিচারকরা বলেছিলেন, ব্যাপারটা গুরুতর। অতএব নীতি আয়োগ, অর্থ কমিশন, আইন কমিশন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং শাসক ও বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা কমিটি তৈরি হোক মুফতের সুযোগসুবিধার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতে। ১৭ আগস্ট ছিল এ যাবৎ এই মামলার শেষ শুনানি, আগামী সপ্তাহে ফের শুনানি হওয়ার কথা। মজার ব্যাপার, ১১ তারিখ প্রধান বিচারপতি নিজেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, এ বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ করার কতটুকু অধিকার আছে তা নিয়ে। অথচ সেই যুক্তিতে পিটিশন বাতিল করে দেননি।

এই মামলার শুনানিতে দেশের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার কিছু মন্তব্য একবার দেখে নেওয়া যাক। “এই ফ্রিবি কালচারটাকে এখন শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আর নির্বাচন এখন এই নিয়ে লড়া হয়। ফ্রিবিগুলোকে যদি জনকল্যাণ বলে ধরা হয়, তাহলে বিপর্যয় ঘটবে। এটাই যদি নর্ম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মাননীয় বিচারকরা নর্মগুলো ঠিক করে দিন। আইনসভা যতক্ষণ না কিছু করছে, মাননীয় বিচারকরা কিছু নর্ম ঠিক করে দিতেই পারেন।”

এই বিতর্কে দুটো জিনিস বিশেষভাবে লক্ষ করার মত। প্রথমত, ফ্রিবি বলতে স্পষ্টতই বোঝানো হচ্ছে সরকার সাধারণ মানুষকে যেসব সুযোগসুবিধা দেয় সেগুলোকে। কারণ প্রধান বিচারপতি বলেছেন অর্থনীতির ক্ষতি (“economy losing money”) আর মানুষের কল্যাণ (“welfare of the people”)— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা দরকার। অর্থাৎ বলেই দেওয়া হল অর্থনীতির কাজ মানুষের কল্যাণ করা নয়। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি তুষার ইঙ্গিত দিয়েছেন আইনসভা ফ্রিবি সম্পর্কে কিছু করবে। অর্থাৎ কোনও আইন প্রণয়ন করবে। সে করতেই পারে। লোকসভায় যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বিজেপির, তাকে ব্যবহার করে এবং রাজ্যসভায় বিল পাশ করাতে অসুবিধা হলে বিরোধী সাংসদদের সাসপেন্ড করে দিয়ে যে কোনও আইনই কেন্দ্রীয় সরকার করে ফেলতে পারে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সরকারের সে পর্যন্তও তর সইছে না। তুষার চাইছেন তার আগেই আদালত কিছু নিয়মকানুন ঘোষণা করুক।

এই জনস্বার্থ মামলা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ এই মামলা দায়ের হওয়ার কিছুদিন আগেই, গত মাসের শেষদিকে, উত্তরপ্রদেশে বুন্দেলখণ্ড এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশে “রেউড়ি কালচার” চালু হয়েছে। রেউড়ি, অর্থাৎ মিষ্টি, বিতরণ করে ভোট কিনে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। দেশের পক্ষে এই সংস্কৃতি খুব বিপজ্জনক। দেশের মানুষকে, বিশেষ করে যুবসমাজকে, এই কালচার সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। রেউড়ি কালচারের লোকেরা এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দর বা ডিফেন্স করিডোর বানাতে পারবে না।

রেউড়ি মন্তব্যের পিছনের ছকটা খুব পরিষ্কার। প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের সংজ্ঞা ঘোর নব্য-উদারবাদী। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য— এসবের উন্নতি হল কি হল না তা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। উন্নয়ন বলতে তিনি বোঝেন এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দর, ডিফেন্স করিডোর। নব্য উদারবাদী অর্থনীতিতে ভর্তুকি যেমন একটি অশ্লীল শব্দ, তেমনই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সরকারগুলো গরিব নাগরিকদের জন্য যেসব আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করেছে বা বিভিন্ন পরিষেবার মূল্যে বিশেষ ছাড় দিয়ে থাকে— সেগুলোও ক্ষতিকর, অবান্তর। তাই ওগুলোকে রেউড়ি বলা। মতাদর্শগতভাবেই মোদি সরকার ওসবের বিরোধী। সেটা বুঝতে অবশ্য কারও বাকি নেই। ২০১৪ সালের পর থেকে মহাত্মা গান্ধি ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিমকে যেরকম হেলাছেদ্দা করা হয়েছে সেদিকে নজর রাখলেই বোঝা যায়। নতুন কথাটা হল, এবার অন্য দলগুলোর সরকার ও পথে হাঁটতে না চাইলে আইন করে, পারলে আদালতের নির্দেশকে শিখণ্ডী করে তাদের শায়েস্তা করা হবে। এক দেশ, এক অর্থনীতি কায়েম করতে চাইছে মোদি সরকার। সে দেশে রেউড়ি জাতীয় প্রকল্পের কোনো স্থান নেই।

তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক কারণটাও সহজবোধ্য। সাম্প্রতিককালে যে কটা রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপিকে হারতে হয়েছে, তার প্রায় প্রত্যেকটাতেই তাদের পথ আটকে দাঁড়িয়েছে এই কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো, যা রেউড়ি – প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়। আরএসএস-বিজেপির নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি আর ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে দিল্লি আর পাঞ্জাবে আম আদমি পার্টির সস্তায় বিদ্যুৎ, চাষিদের ঋণ মকুবের প্রতিশ্রুতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ভর্তুকি এবং সরকারের সক্রিয়তায় সরকারি স্কুল ও মহল্লা ক্লিনিকের উন্নতির সামনে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের জন্য প্রায় সব বিশ্লেষকই কৃতিত্ব দিয়েছেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, দুয়ারে সরকারের মত পদক্ষেপকে। কন্যাশ্রীর মত প্রকল্প তো আগে থেকেই চলছিল। স্তালিনের দল দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমও ক্ষমতায় এলে যে গৃহবধূদের রেশন কার্ড আছে তাঁদের মাসে ১০০০ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সুতরাং নির্বাচনের ময়দানেও এই একটা বাধা বিজেপি কিছুতেই টপকাতে পারছে না। ফলে বিরোধীদের হাতে পড়ে থাকা এই শেষ অস্ত্রটা কেড়ে না নিলেই নয়। তাই এই আক্রমণ।

এবার শুরুতেই যে দ্বিধার কথা বলেছিলাম, সেই আলোচনায় আসি। বিজেপি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক, দুদিক থেকেই যে একটি দক্ষিণপন্থী দল তাতে সন্দেহ নেই। সেই কারণেই কয়েক লক্ষ কোটি টাকার কর্পোরেট কর মকুব করে দেওয়া তাদের মতে ফ্রিবি নয়। কিন্তু কর্মসংস্থানহীন বা দরিদ্র মহিলাদের হাতে সরকার মাসে মাসে নগদ টাকা দিলে অর্থনীতির ক্ষতি হয়ে যাবে, বিপর্যয় সৃষ্টি হবে বলে তাদের চিন্তা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাম দলগুলো, বিধানসভায় শূন্য হলেও যাদের রাস্তাঘাটে প্রধান বিরোধী হিসাবে দেখা যাচ্ছে, তারা প্রায় মোদির সুরেই গত দশ বছর ধরে তৃণমূল সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো সম্পর্কে কথা বলে আসছে কেন? সিপিএমের যে কোনও স্তরের সদস্য এবং সমর্থকরা কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ইত্যাদি প্রকল্প সম্পর্কে “খয়রাতি”, “দয়ার দান”, “টাকা দিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ রাখছে”, “মানুষকে দয়ার পাত্র করে দিয়েছে” ইত্যাদি বাক্যবন্ধ ব্যবহার করেন। মানুষ বসে বসে টাকা পেতে ভালবাসে, তাই তৃণমূলকে ভোট দিয়ে যাচ্ছে— এতদূরও বলা হয়। গরিব মানুষ রাজনীতি বোঝেন না, ভিক্ষা পেলেই খুশি— এই জাতীয় অপমানকর মন্তব্যও প্রকাশ্যেই করা হয়। স্রেফ সোশাল মিডিয়ার বিপ্লবীরা নন, শতরূপ ঘোষের মত সংবাদমাধ্যমে দলের প্রতিনিধি হিসাবে নিয়মিত মুখ দেখানো নেতারাও সামান্য পালিশ করা ভাষায় এসব বলে থাকেন।

স্বভাবতই সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির টুইট ছাড়া রেউড়ি বিতর্কে সিপিএমের কোনও সুসংহত বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্গাপুজোর জন্য ক্লাবগুলোকে টাকা দেওয়া আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে টাকা দেওয়াকে তাঁরা এক করে দেখেন কিনা— তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট আলোচনা সিপিএম নেতারা করেন কি? অথচ এই আলোচনা জরুরি। এ রাজ্যে জনমত বলতে যে শ্রেণির মানুষের বক্তব্যকে বোঝানো হয় সাধারণত, সেই শ্রেণির মধ্যে জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে দানখয়রাতি বলে ভাবার মানসিকতা কিন্তু সুদূরপ্রসারী। ভদ্রলোক শ্রেণির যেসব ভোটার তৃণমূলকে ভোট দেন, তাঁরাও “এই শ্রী, ওই শ্রী” না থাকলেই খুশি হতেন। সরকারি কর্মচারীদের ডিএ দিতে রাজ্য সরকারের যে অনীহা তার বিপরীতে ওই প্রকল্পগুলোকে রেখে আলোচনা করতে বাঙালি মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তরা বিলক্ষণ ভালবাসেন। তৃণমূলের নেতা, মন্ত্রীদের দুর্নীতি ফাঁস হলে “এই টাকাগুলো দিয়ে ডিএ দেওয়া যেত না?”— এ প্রশ্ন শোনা যায়। কিন্তু কাউকে বলতে শোনা যায় না “এই টাকা দিয়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে এক হাজার টাকা করে দেওয়া যায় না?” অথচ এঁরা এমনিতে ভাল করেই জানেন পাঁচশো টাকায় আজকাল কিছুই হয় না। আসলে মনে করা হয়, ডিএ পাওয়া অধিকার কিন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দয়ার দান।

এর কারণ ১৯৯১ পরবর্তী যুগে দিনরাত মন্ত্রের মত কানের কাছে বলে বলে যে কয়েকটি কথা আমাদের মর্মে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার অন্যতম হল, কোনও পরিষেবা বা পণ্য বাজার থেকে পয়সা দিয়ে না কিনে পাচ্ছে মানেই সেটা দান। সরকার দিচ্ছে মানেই দান করছে। আরেকটি কথা হল, চাকুরিজীবীরা করদাতা, গরিব শ্রমজীবী মানুষ করদাতা নয়। তারা করদাতাদের টাকায় বেঁচে থাকা পরজীবী।

এই দুটিই যে সর্বৈব মিথ্যা, তা বোঝানোর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল বামপন্থীদের। কিন্তু সে দায়িত্ব তাঁরা মোটেই পালন করেননি, এখনও করেন না। ভর্তুকি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পণ্য— একথা বলে নব্য-উদারনীতিবাদ। অন্যদিকে, যে কোনও ধরনের বামপন্থার খাতায় এগুলো অধিকার। এটুকু বুঝতে এবং বোঝাতে বামপন্থীদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বঙ্গ সিপিএমের এই অ আ ক খ প্রবলভাবে গুলিয়ে গেছে। ফলে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের সাফল্যের তালিকা দিতে গিয়ে তাঁরা দিব্যি নানা কল্যাণমূলক প্রকল্পের কথা বলেন। স্কুলের মেয়েদের সাইকেল দেওয়া যে তাঁদের আমলেই চালু হয়ে গিয়েছিল— সেকথাও বলেন। নিজেরা গরিব মানুষের জন্য কম টাকায় খাওয়ার ব্যবস্থা করতে কমিউনিটি ক্যান্টিনও চালান। কিন্তু সরকারি প্রকল্পগুলোকে বলেন দানখয়রাতি।

আমি যেমন করদাতা, আমার বাড়ির পরিচারিকাও করদাতা। তফাত হল আমি আয়কর দিই, তিনি দেন না। কারণ করের আওতায় আসার মত আয় তাঁর নেই। কিন্তু তিনি নিজের আয়ের টাকায় যা যা কেনেন সবেতেই কর দেন। আগের প্রত্যক্ষ করের যুগেও দিতেন, এখন পণ্য ও পরিষেবা করের (GST) যুগেও দেন। সুতরাং লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে যে টাকা পান বা দু টাকা কিলো চালে যে ভর্তুকি পান তাতে তাঁরও অবদান আছে, তিনি পরজীবী নন। ব্যতিক্রম বাদ দিলে এই কথাগুলো সিপিএমের সদস্য, সমর্থকরা নিজেরাই বোঝেন না বা বুঝতে অস্বীকার করেন। অন্যদের আর বোঝাবেন কী করে?

পশ্চিমবঙ্গে বাম দল বলতে অবশ্য শুধু সিপিএম বা বামফ্রন্টের দলগুলোকে বোঝায় না। কিন্তু বিকল্প বামেদের সংগঠন, অন্তত চাক্ষুষ প্রমাণে, আরও সীমিত। কিন্তু তাঁরাও যে রেউড়ি বিতর্কে খুব সোচ্চার এমন নয়। দশ বছর ধরে রাস্তায় নামার মত একাধিক ইস্যু থাকা সত্ত্বেও পথে না নামা সিপিএম অবশেষে পার্থ চ্যাটার্জি, অনুব্রত মণ্ডলের গ্রেফতারির পর বিরোধীসুলভ সক্রিয়তা দেখাচ্ছে। আর বিকল্প বামেরা সক্রিয়তা দেখাচ্ছেন ইডি-সিবিআই যেহেতু বিজেপি সরকারের হাতে, সেহেতু তৃণমূল নেতাদের বিপুল দুর্নীতি নিয়ে কেন পথে নামা উচিত নয় সেই তর্কে। উন্নয়ন মানে কী বা কী হওয়া উচিত— সে আলোচনাতেও মাঝেমধ্যে দেখা যায় ভারতীয় বামপন্থীদের। যে কারণে বেশিরভাগ বামপন্থী দলের কাছেই আজও পরিবেশ কোনও রাজনৈতিক ইস্যু নয়। নব্য-উদারবাদীদের মতই তাঁরা ভাবেন পরিবেশের সামান্য ক্ষতি করে যদি শিল্প হয়, কর্মসংস্থান হয় তাহলে তেমন ক্ষতি নেই। পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের নানা গাঢ়ত্বের লালেরা কিন্তু এ পথে হাঁটছেন না। অর্থাৎ পথ সামনে রয়েছে, কিন্তু উত্তমকুমার অভিনীত অবিনাশের মতই আমাদের বামপন্থীরাও নিজেদের চোরাগলিতে দিশেহারা।

বামেরা কী করছেন, কী বলছেন, তা কেন গুরুত্বপূর্ণ? এই জন্যে, যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার চিরকাল থাকবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের গা জোয়ারিতেই হোক বা নাগরিকদের ভোটে, প্রাকৃতিক নিয়মেই এই সরকার একদিন চলে যাবে। তখন যে দলের সরকারই আসুক, সরকারি নীতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে দক্ষিণপন্থী ভাবনার যে আসন তৈরি হয়েছে তা ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যতেও মানবিক সরকার দেখতে পাব না আমরা। এই ভাঙার দাবি কাদের কাছে করা যায়? বিজেপির কাছে তো নয়। রামচন্দ্র গুহ নিজেকে বলেন “ল্যাপ্সড মার্ক্সিস্ট”। আমারও এক বয়োজ্যেষ্ঠ ল্যাপ্সড মার্ক্সিস্ট বন্ধু আছেন। তিনি সর্বদাই বলেন, বামপন্থীদের থেকে কিছু আশা করা উচিত নয়। কিন্তু বামেদের বাদ দিলে যদি পড়ে থাকে বিজেপি, তাহলে আর উপায় কী? আশা করা বেঁচে থাকার জন্য জরুরি একটা কাজ। সে কাজ তো ছাড়া যায় না।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সাংবাদিক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছেন, শিক্ষার মাথায় ছাতা ধরবে কে?

বাংলায় দেরিতে হলেও বর্ষা এসে পড়েছে। এই সময়ে ছাতার চাহিদা বাড়ে। কিন্তু সোশাল মিডিয়া দেখে বোধ হচ্ছে এবার বর্ষায় ছাতা নিয়ে কথা বললে বিপদ হবে। এক সাংবাদিক পূর্বজন্মের পাপের ফল হিসাবেই বোধহয় একটি মেয়েকে ছাতার ইংরেজি প্রতিশব্দ umbrella বানান জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলেন। এখন সকলে সাংবাদিকের ‘এলিটিজম’, ‘ক্লাসিজম’, ‘সেক্সিজম’, আরও নানা ইজম নিয়ে দিনরাত শাপ শাপান্ত করছেন। স্বীকার্য যে সাংবাদিকরা কেউ দেবতা, গন্ধর্ব নন। বিভিন্ন চ্যানেলের বুম ধরে কলকাতা শহরে ঘুরে বেড়ান যে সাংবাদিকরা, কাগজগুলো ভরে আছেন যে সাংবাদিকরা তাঁরা অনেকেই আসেন এলিট পরিবার থেকে। ভারতীয় সাংবাদিকতার ধারাটাই এমন। খুব সাধারণ পরিবার থেকে যাঁরা আসেন তাঁরাও তো একই সমাজের উৎপাদন। ‘এলিটিস্ট’, ‘ক্লাসিস্ট’, ‘সেক্সিস্ট’ সমাজ থেকে অন্যরকম সাংবাদিক তো সংখ্যায় কমই বেরোবে। কিন্তু দু-তিনদিন কেটে যাওয়ার পরও বাঙালি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা যেভাবে সাংবাদিকটিকে আক্রমণ করে চলেছেন তাতে “সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধর” মানসিকতাই প্রকট।

সোশাল মিডিয়ার কুপ্রভাব নিয়ে অনেক কথা বলা যায়, অনেকেই আজকাল প্রভাবগুলো সম্পর্কে সচেতন, ফলে সচেতনভাবে সোশাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ কী নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে তা বোঝার জন্য সোশাল মিডিয়া গুরুত্ব আজ অস্বীকার করা যায় না। ফলে সোশাল মিডিয়ায় যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তাকেও “ওটা ভার্চুয়াল দুনিয়া” বলে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। সোশাল মিডিয়ার সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভাব এখন আর গোপন নেই এবং অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না।

হজরত মহম্মদের বিরুদ্ধে নূপুর শর্মা আর নবীন জিন্দালের বক্তব্য এবং তা নিয়ে জায়গায় জায়গায় উত্তেজনা, ভাংচুর থিতিয়ে গেছে। বাঙালি ভদ্রসমাজের বুলডোজারের ব্যাপারে চোখ বুজে থেকে “ওরা এত অসহিষ্ণু কেন” পোস্ট করাও বন্ধ হয়ে গেছে। বর্ষা চলে এল অথচ স্কুলে গরমের ছুটি কেন বাড়িয়ে দেওয়া হল, তা নিয়ে কিছু চুটকি আর কয়েকটা মিম ছাড়া রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঢেউ নেই ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে। মাসের পর মাস স্কুল বন্ধ রাখাকে রাজনৈতিক ইস্যু করে বিরোধী দলগুলো কেন রাজ্যব্যাপী রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে না, সে প্রশ্নও বড় একটা কেউ তুলছেন না। দিল্লিতে গত কয়েকদিন ধরে দেশের অন্যতম বিরোধী দল কংগ্রেসের প্রধানতম নেতা রাহুল গান্ধীকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের অফিসে ডেকে পাঠিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কী যে জেরা করা হচ্ছে কেউ জানে না। কংগ্রেসের অফিসে ঢুকে পড়ছে দিল্লি পুলিস, নেতা কর্মীদের নানা ছুতোয় শারীরিক নিগ্রহ করা হচ্ছে। ভারতীয় গণতন্ত্রে জরুরি অবস্থার সময়টা বাদ দিলে এরকম ঘটনা খুব বেশি পাওয়া যাবে না। ভয়ানক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি হচ্ছে। তা নিয়েও গণতন্ত্রপ্রিয় বাঙালির ফেসবুকে বিশেষ উচ্চবাচ্য নেই। অথচ ইংরেজিতে ফেল করে প্রতিবাদী হয়ে ওঠা একটি মেয়েকে কেন সাংবাদিক আমব্রেলা বানান জিজ্ঞেস করল, তা নিয়ে পোস্ট আর ফুরোচ্ছেই না।

আমাদের রাজ্যে, বিশেষত কলকাতায়, নানা দাবিতে নিয়মিত মিছিল মিটিং হয়ে থাকে (অনেক ভদ্রজনের তাতে বিষম আপত্তি থাকে চিরকালই)। সেইসব আন্দোলনে সাংবাদিকদের যেতে হয় খবর সংগ্রহে। সেখানে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলেন, জিজ্ঞেস করেন কী কী দাবি নিয়ে আন্দোলন, সেই দাবির সপক্ষে যুক্তিগুলো কী কী। অনেকসময় তা করেন না, কেবল অকুস্থল থেকে নিজের (অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসলে চ্যানেলের বা কাগজের) মতামত দর্শককে/পাঠককে গিলিয়ে দেন। সেটা বরং অন্যায়, আন্দোলনকারীর থেকে তাঁদের দাবির ব্যাখ্যা চাওয়া মোটেই অন্যায় নয়। এক্ষেত্রে সাংবাদিক সেই কাজটাই করছিলেন। যে বলে তাকে অন্যায়ভাবে ইংরেজিতে ফেল করানো হয়েছে, তার যোগ্যতার প্রমাণ চাওয়া আদপেই অন্যায় নয়। নইলে এরপর কৃষক আন্দোলন হলে প্রশ্ন করা যাবে না, কোথা থেকে এসেছেন? আপনার কত বিঘা জমি আছে? সেখানে কী চাষ করেন? নতুন কৃষি আইন নিয়ে আপত্তি করছেন কেন? সরকারকে বিশ্বাস করতে অসুবিধা কোথায়? প্রশ্নগুলো করার উদ্দেশ্য আন্দোলন সম্পর্কে তথ্য বের করে আনা। উত্তরে আন্দোলনকারীরা যা বলেন, তা তাঁদের বিরুদ্ধে গেল কিনা তা দেখা কিন্তু সাংবাদিকের কাজ নয়। সাধারণত যদি যা করছেন সে সম্পর্কে আন্দোলনকারীর সম্যক ধারণা থাকে, যদি ইস্যুগুলো সত্যিকারের ইস্যু হয়, তাহলে এমন কিছু বলে ফেলেন না যাতে আন্দোলন লোকের চোখে হাস্যকর হয়ে যায়। তবে হাস্যকর কারণে আন্দোলন করলে উত্তর তো হাস্যকরই হবে।

দাঁড়ান, দাঁড়ান। ক্ষেপে উঠবেন না। কী বলবেন জানি। এক্ষুনি বলবেন, যেভাবে ওই মেয়েটিকে প্রশ্ন করা হয়েছে সেইভাবে সরকারকে প্রশ্ন করতে পারে না? এই দেখুন, বনলতা সেনগিরি হয়ে গেল। সরকারকে যে সংবাদমাধ্যম কড়া কড়া প্রশ্ন করে না তা নিঃসন্দেহে অন্যায়। কিন্তু সেটা পারে না বলে আর কাউকেই কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না? এ-ও তো সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে চাওয়াই হল একরকম। তার মানে মমতা ব্যানার্জি বা নরেন্দ্র মোদীর মত আপনিও চান, সংবাদমাধ্যম একমাত্র আপনার পছন্দের প্রশ্নগুলোই করুক। এমন প্রশ্ন যেন না করে যাতে উত্তরদাতা অস্বস্তিতে পড়ে যায়।

পশ্চিমবঙ্গে তথা ভারতবর্ষে আজকাল নানা অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। একটা ঘটনা প্রায় রোজই ঘটে। সেটা হল কোনো ইস্যুতে যার দায় সবচেয়ে বেশি, তাকে বাদ দিয়ে আর সকলকে আক্রমণ করা। যেমন ধরুন আজকের বেহাল অর্থনীতির জন্য মনমোহন সিংকে আক্রমণ করা, চীন লাদাখে একের পর এক এলাকা দখল করে নিচ্ছে বলে জওহরলাল নেহরুকে আক্রমণ করা, দেশে চাকরি-বাকরি নেই বলে মোগলদের আক্রমণ করা। এগুলো একরকম। আরেকরকম হল এসএসসি নিয়োগে দুর্নীতি নিয়ে সিবিআই তদন্ত হচ্ছে বলে সিপিএমকে আক্রমণ করা, কেকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বলে রূপঙ্কর বাগচীকে আক্রমণ করা, বগটুই কাণ্ড নিয়ে রাজ্য সরকারের চেয়ে বিখ্যাতদের বেশি আক্রমণ করা। এক্ষেত্রেও দেখছি সেই ব্যাপার ঘটছে। সাংবাদিক নয়, অভিযোগের আঙুল ওঠা উচিত ছিল শিক্ষাব্যবস্থার দিকে। প্রশ্ন ওঠা উচিত ছিল, সামান্য আমব্রেলা বানান না জেনে ওই মেয়েটি যে ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত চলে এসেছে সে দায় কার? শিক্ষাব্যবস্থার এমন দুর্দশা হল কী করে? যাঁরা ওই মেয়েটিকে এবং তার সহপাঠীদের ইংরেজি পড়িয়েছেন ছোট থেকে, তাঁরা কেমন শিক্ষক? শিক্ষকদের দিক থেকে এ প্রশ্নের একটা সম্ভাব্য উত্তর – ক্লাস এইট পর্যন্ত পাস-ফেল তুলে দেওয়া হয়েছে। যে কিছুই শিখতে পারেনি তাকে যে আরও এক বছর একই ক্লাসে রেখে দিয়ে শেখাব, তার অবকাশ কোথায়? কথাটা ভেবে দেখার মত। ভাবলে এইট অব্দি পাস-ফেল তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত কিনা সেই আলোচনায় যেতে হবে। চুটকি, মিম, গালাগালি দিয়ে সে আলোচনা চলবে না। সাংবাদিককেও সে আলোচনার চাঁদমারি করা যাবে না।

আরও যে প্রশ্ন ওঠা উচিত ছিল, তা প্রাইভেট টিউশন নিয়ে। দেশের আর কোনো রাজ্যের শিক্ষার্থীরা এত বেশি টিউশনের উপর নির্ভরশীল নয়। ২০২১ সালের Annual Status of Education Report (ASER) অনুযায়ী, আমাদের রাজ্যে ৭৬% ছাত্রছাত্রী প্রাইভেট টিউশনের উপর নির্ভর করে, যা গোটা দেশের গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। গত শতাব্দীর আশি, নব্বইয়ের দশক থেকে এ রাজ্যে প্রাইভেট টিউশন এক সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। সেই ব্যবস্থা কীভাবে মূল শিক্ষাব্যবস্থার কোমর ভেঙে দিল তার কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা স্বল্পমেয়াদি মূল্যায়ন আজ অব্দি হয়নি। অথচ সকলেরই জানা আছে, প্রাইভেট টিউশনের রমরমায় কতরকম নৈতিক ও আইনগত দুর্নীতি শিক্ষাজগতে প্রবেশ করেছে। বাড়িতে টোল খুলে প্রবল পরিশ্রম করে মাস্টারমশাই স্কুলে গিয়ে ঝিমোচ্ছেন – এ দৃশ্য আমাদের ছাত্রাবস্থাতেই বিরল ছিল না। স্কুলের পরীক্ষায় কঠিন প্রশ্ন করে ছেলেমেয়েদের কম নম্বর পাইয়ে দিয়ে অভিভাবকদের নিরুপায় করে দেওয়া হয়েছে। তিনি স্কুলে এসে শিক্ষককে জিজ্ঞেস করেছেন কী করলে সন্তান ওই বিষয়ে উন্নতি করতে পারবে। উত্তরে বলা হয়েছে, আমার কাছে পড়তে পাঠিয়ে দেবেন। এমন ঘটনাও দেখেছি। এ তো গেল স্কুল স্তরের দুর্নীতি। বৃহত্তর ক্ষেত্রে কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে বোর্ডের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ইতিহাসও আছে। সত্যদার কোচিংয়ের কথা সকলেই ভুলে যাননি আশা করি। তা স্কুল আর টিউশন – দুটো জায়গায় পড়াশোনা করেও আমাদের ছেলেমেয়েরা আমব্রেলা বানানটুকুও শিখে উঠতে পারছে না?

আরও পড়ুন প্রখর তপন তাপে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা কাঁপে

ভেবে দেখুন, এতগুলো প্রশ্ন করার পরিসর তৈরি হল ওই সাংবাদিক আপনার অপছন্দের প্রশ্নটা করেছিলেন বলে, এবং এই প্রশ্নগুলো করা উচিত শিক্ষাব্যবস্থা যাঁরা চালান তাঁদের। তা না করে আপনি সাংবাদিকটি কত অযোগ্য তা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। না হয় মেনে নেওয়া গেল, সাংবাদিক অযোগ্য। তাতে কী? আপনি আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারেন, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থার কোনো লাভ হবে কী?

শিক্ষক, অধ্যাপক, শিক্ষা নিয়ে গবেষণারত মানুষজন, ডাক্তার, উকিল নির্বিশেষে মানুষ যেভাবে ফেল করে পাস করিয়ে দেওয়ার আন্দোলনে ব্রতীদের পাশে দাঁড়িয়ে সাংবাদিক খেদাতে নেমেছেন তাতে রাজ্যের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ে বই কমে না। কোনো সন্দেহ নেই যে এক-আধবার ফেল করা মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বস্তুত পরীক্ষায় ভাল নম্বর, খারাপ নম্বর সবকিছুর প্রমাণ নয়। ইংরেজিতে কত নম্বর পেলাম তা দিয়ে যে সবকিছু প্রমাণ হয় না তা-ও ঠিক। পৃথিবীতে কত লোক তো আদৌ লেখাপড়াই করে না, পরীক্ষা দেয় না। তারা কি ফেলনা নাকি? কিন্তু মুশকিল হল, ফেল করলে পাস করিয়ে দেওয়ার দাবিতে পথ অবরোধ করব – এই মানসিকতাকে প্রশ্রয় দিলে সমূহ বিপদ। তাহলে স্কুল, কলেজ থেকে পরীক্ষা ব্যবস্থা তুলে দিলেই তো হয়। আহা বাছা, ফেল করেছ তো কী হয়েছে? তোমার দোষ নয়, দুনিয়ার আর সক্কলের দোষ – এই বলে যদি কারোর পাশে দাঁড়ানো হয়, তাহলে আর সে নিজেকে শুধরে নিয়ে পাস করার চেষ্টা করবে কেন? পাস করা যে প্রয়োজন, এটা অন্তত মানেন তো নাকি? না রবীন্দ্রনাথের উদাহরণ টেনে বলবেন, পাস না করলেই বা কী? তা বলতেই পারেন, তবে মনে রাখবেন, অনেকেই দেবেন্দ্রনাথের মত বিত্তশালী, প্রভাবশালী অভিভাবক নয়। ফলে তাদের ছেলেমেয়েদের পরীক্ষায় পাস করে সার্টিফিকেট, ডিগ্রি ইত্যাদি পাওয়ার প্রয়োজন আছে। যাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তাদেরও দরকার আছে। নইলে রাস্তা অবরোধ করত না।

আসলে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে এসে ঠেকেছে। এমনিতেই ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক প্রাইভেট টিউশনের কল্যাণে এবং বিশ্বায়নের গুণে ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল আগেই, এখন আবার শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকরা দেখে ফেলেছে যে বহু শিক্ষক পরীক্ষা না দিয়ে বা সাদা খাতা জমা দিয়ে, স্রেফ ঘুষ দিয়ে মাস্টার হয়েছে। উপরন্তু বাঙালি ভদ্রসমাজের নীতিবোধে আমূল পরিবর্তন এসেছে। যে ছেলে হল ম্যানেজের কথা বাবা-মা জানতে পারলে কী বলবে তা নিয়ে ভয়ে থাকত, সে এখন বাবা হয়ে ছেলেমেয়ের স্কুলে দাবি জানাচ্ছে অতিমারী কেটে গিয়ে থাকলেও পরীক্ষাটা অনলাইনেই হোক। কেন এই দাবি তা বলে দেওয়ার দরকার নেই। মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সোশাল মিডিয়ায় এবং তার বাইরে খাতা দেখার যেসব অভিজ্ঞতা বিবৃত করছেন সেগুলো খেয়াল করলেই বোঝা যাবে।

পশ্চিমবঙ্গে ছাত্র রাজনীতির সুপ্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইস্যু থেকে শুরু করে জাতীয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইস্যু নিয়েও আন্দোলন করে থাকে। কিন্তু কদিন আগে দেখা গেল আরও এক অভূতপূর্ব ঘটনা। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী আন্দোলন করল অফলাইন পরীক্ষা দেবে না বলে। তাদের অন্যতম যুক্তি ছিল, সিলেবাস শেষ করানো হয়নি। সেক্ষেত্রে পরীক্ষাই বাতিল হোক দাবি করলেও না হয় কথা ছিল। কিন্তু তারা পরীক্ষা দিতে রাজি, শুধু বাড়িতে বসে পরীক্ষা দেওয়ার স্বাধীনতা চায়। এই দাবির কারণ কি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে? এরা তবু কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। বাবা-মা এদের মতামত নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। কিন্তু সদ্য স্কুল ছাড়তে অকৃতকার্য ছেলেমেয়েরা যে বাবা-মায়েদের সম্মতি ছাড়া রাস্তা অবরোধ করার সাহস পেত না, তা বলাই বাহুল্য। অনেক বাবা-মাকে তো সগর্বে ক্যামেরার সামনে বাইট দিতেও দেখা যাচ্ছে। একজন যেমন বলেছেন, যারা মোবাইলে বাংলায় মেসেজ করে তারা ইংরেজিতে পাস করে গেল আর তাঁর মেয়ে ইংরেজিতে মেসেজ করেও পাস করতে পারল না – এ অসম্ভব।

এই পরিস্থিতি হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। রিচার্ড ফাইনম্যান ইংরেজিতে খারাপ ছিলেন, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন স্কুলজীবনে অঙ্কে দুর্বল ছিলেন – এইসব আবোল তাবোল কথা বলে এদের পাশে দাঁড়ালে সাড়ে সর্বনাশ। এই অকৃতকার্য শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া থেকে এক হাড় হিম করা সত্য বেরিয়ে আসছে। তা হল পড়াশোনা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার সংজ্ঞাগুলোই একেবারে উল্টে গেছে এই রাজ্যে। যেনতেনপ্রকারেণ নম্বর পেলেই হয় এবং নম্বর দেওয়া শিক্ষকদের কর্তব্য – এমন ধারণা সমাজের গভীরে প্রোথিত হয়েছে। আমরা সম্ভবত গণটোকাটুকির যুগে ফেরত যেতে চলেছি। এবার আর রাজনৈতিক অশান্তির কারণে নয়, সামাজিক সম্মতিপূর্বক।

২০১৫ সালে বিহারের একটা ছবি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমেরিকার দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, ইংল্যান্ডের দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রভৃতি বিশ্বখ্যাত কাগজ এ নিয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ছবিটা এরকম – পরীক্ষা হচ্ছে একটা স্কুলে, আর পরীক্ষার্থীদের বাবা-মায়েরা দেয়াল বেয়ে উঠে জানলা দিয়ে পরীক্ষার্থীদের সাহায্য করছেন। আগামীদিনে পশ্চিমবঙ্গে এরকম কিছু দেখা গেলে অবাক হবেন না। দয়া করে তখন আলোকচিত্রীকে গাল দেবেন না – এইটুকু অনুরোধ। তিনি সাংবাদিক, তাঁর কাজই ওই।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

আকাদেমি সমাচার: সাহিত্য পুরস্কার যার যার, তিরস্কার সবার

সাহেবরা বলে থাকে রোম একদিনে তৈরি হয়নি। মমতা ব্যানার্জিকে নিরলস সাহিত্যচর্চার জন্য পুরস্কার দিয়ে মানুষকে হাসির খোরাক জোগানোও একদিনে হয়নি। একে সাহিত্যের অপমান বা সাহিত্যিকদের অপমান – যা-ই বলুন, ঘটনাটি কিন্তু ধারাবাহিকতা মেনে ঘটানো হয়েছে। ২০১৮ সালকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ প্রায়শই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। কারণ ওই বছর পঞ্চায়েত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শাসক দলের প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। যেভাবে এই কাণ্ড ঘটানো হয় তাতে পশ্চিমবঙ্গে আর গণতন্ত্র অবশিষ্ট ছিল না বলে বিরোধীরা অভিযোগ করে থাকেন। কিন্তু রাজ্যের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে যাঁদের আগ্রহ আছে তাঁদের একইসঙ্গে খেয়াল থাকা উচিত, মনোনয়ন পর্বের হিংসা নিয়ে শঙ্খ ঘোষের কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পরে তৃণমূলের বীরভূম জেলার নেতা অনুব্রত মণ্ডল কবিকে কোন ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন।

“বড় বড় কথা বলছেন কবি? এ কোন কবি? আমরা তো কবি বলতে জানতাম রবীন্দ্রনাথ, নজরুল। এ কোন নতুন কবি উঠে এসেছেন, যে আমার উন্নয়ন নিয়ে কথা বলছেন। কবির নাম শঙ্খ রাখা ঠিক হয়নি, শঙ্খ নামের অপমান করেছেন উনি। এখনও বলছি, রাস্তায় উন্নয়ন দাঁড়িয়ে আছে।”

আনন্দবাজার পত্রিকার ১০ মে ২০১৮ তারিখের সংস্করণে এই প্রতিবেদনের সঙ্গেই ছিল আরেকটি প্রতিবেদন, যেখানে অনুব্রতর আক্রমণ সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্টজনদের মতামত প্রকাশিত হয়েছিল। যাঁরা মত দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে আছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির দুই বর্তমান সদস্য – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও জয় গোস্বামী। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর কথা যদি সত্যি হয় (মিথ্যে বলে মনে করার কোনো কারণ ঘটেনি, যেহেতু সে কথার কোনো প্রতিবাদ হয়নি এখনো), তাহলে মমতা ব্যানার্জিকে আকাদেমির সর্বপ্রথম রিট্রিভারশিপ (নাকি সাবভার্সিভ? বলতে গিয়ে ভুল হয়েছে?) পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তে এঁদেরও সম্মতি ছিল। কী বলেছিলেন সেদিন ওই দুজন? শীর্ষেন্দুর বক্তব্য ছিল “এটা রাজনৈতিক চাপানউতোর। আমি যেহেতু রাজনীতি করিনা, তাই এ নিয়ে মন্তব্য করতে পারছি না।” আর জয় বলেছিলেন “পঞ্চাশের দশক থেকে অপ্রতিহত গতিতে কবিতা লিখছেন শঙ্খ ঘোষ। তিনি আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন। জ্ঞানপীঠ পেয়েছেন। এ রকম একজন সম্পর্কে যদি কেউ এ কথা বলেন, তবে কবিতা সম্পর্কে তাঁর কোনও বক্তব্যে মাথা না ঘামানোই ভাল। তাঁর কোনও কথাকে গুরুত্ব দেওয়াই উচিত নয়।”

অর্থাৎ বাংলার শ্রেষ্ঠ জীবিত কবিকে শাসক দলের একজন পদাধিকারী গুন্ডা ব্যক্তিগত আক্রমণ করলে সেটা শীর্ষেন্দুর কাছে রাজনৈতিক চাপান উতোর। যেন শঙ্খ ঘোষ বিরোধী দলের একজন নেতা, সাহিত্য জগতের কেউ নন। অতএব প্রবীণ সাহিত্যিক শীর্ষেন্দুর এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার দায় নেই। আনন্দবাজার পত্রিকার একটি প্রিয় শব্দ আছে – দলদাস। শব্দটি কোনো অজ্ঞাত কারণে শুধুমাত্র বাম দলের সাথে যুক্ত মানুষজনের জন্যই ব্যবহার করা হয়। নইলে দলদাসত্বের এমন চমৎকার উদাহরণ চোখ এড়াত না। পুরোদস্তুর রাজনৈতিক অবস্থান নিলাম, অথচ বললাম আমি রাজনীতি করি না। ভাষার এমন চাতুর্য একমাত্র শীর্ষেন্দুর মত উচ্চাঙ্গের কথাশিল্পীর পক্ষেই সম্ভব।

জয়ের মন্তব্যটিও অতুলনীয়। শঙ্খ ঘোষের মহানতা কোথায়? প্রথমত, অর্ধ শতকের বেশি কবিতা লেখায়। দ্বিতীয়ত, দুটি বড় বড় পুরস্কার পাওয়ায়। অর্থাৎ যদি পনেরো-বিশ বছর কবিতা লিখছেন, কোনো পুরস্কার পাননি – এমন কবি সম্পর্কে অনুব্রত কথাগুলি বলতেন তাহলে তেমন দোষ হত না। তাছাড়া দোষ হয়েছে বলেও জয় মনে করছিলেন কিনা বোঝার উপায় নেই, কারণ তিনি বলছেন যে লোক কবিতা বোঝে না তার কথায় গুরুত্ব দেওয়ার মানে হয় না। অর্থাৎ কথাগুলি কে বলছে তার কোনো গুরুত্ব নেই। জয় এমন এক স্বপ্নলোকে বিচরণ করেন যেখানে ক্ষমতা নেই, ক্ষমতার বিন্যাস নেই। কেবল দু দল মানুষ আছে – এক দল কবিতা বোঝে, আরেক দল কবিতা বোঝে না। যারা বোঝে না তাদের মধ্যে কে কী বলল তা নিয়ে না ভাবলেই মিটে গেল। অর্থাৎ সেদিন পশ্চিমবঙ্গের গদ্য আর পদ্য সাহিত্যের দুই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী শিল্পী অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে ছিলেন। সাহিত্য যে অতি খেলো ব্যাপার – এ কথা পশ্চিমবঙ্গে সেদিনই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর একটি গল্পে ভজহরি নামে এক চাকরের কথা আছে। একদিন বাড়িতে চোর এল, ভজহরি ঠিক করল ব্যাটাকে ধরতে হবে। সে মাথায় শিং বেঁধে, লেজ পরে উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল। তার ধারণা চোর তাকে ছাগল মনে করে চুরি করতে আসবে, অমনি সে চোরকে জড়িয়ে ধরবে। চোর এল, ঘরে ঢুকল, ভজহরি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে শুধু বলল “ম্যা-আ-আ-আ”। চোর সব জিনিসপত্র বার করে এনে নিশ্চিন্তে পুঁটুলি বাঁধল, ভজহরি কেবল আওয়াজ করল “ম্যা-আ-আ-আ”। চোর চুরির মাল নিয়ে আস্তাকুঁড় পেরিয়ে ছুটে পালাল, ভজহরি হেসে খুন। বলল “ব্যাটা কি বোকা, আস্তাকুঁড় মাড়িয়ে গেল, এখন বাড়ি গিয়ে স্নান করতে হবে!” নিজেদের বুদ্ধি সম্পর্কে ভজহরিসুলভ মুগ্ধতায় আকাদেমির সম্মানীয় সদস্যরা নিজেদের, বাংলা আকাদেমির এবং বাংলা সাহিত্যের বিশ্বাসযোগ্যতার বারোটা বাজালেন।

এমনিতে বাঙালি চিরকাল গুণ এবং গুণীর দারুণ কদর করে এসেছে বললে ডাহা মিথ্যা বলা হবে। বাঙালি বরাবরই স্বীকৃতির কাঙাল এবং হুজুগে মাততে পছন্দ করে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন বিশ্বভারতী গড়ে তুলতে বাঙালিরা তাঁকে একটি পয়সা দিয়ে সাহায্য করেনি, শুধু মোহিত সেন নামে এক অধ্যাপক এক হাজার টাকা দিয়েছিলেন। অথচ মৃত্যুর পর স্যুভেনির হিসাবে সেই লোকের দাড়ি ছিঁড়ে নিতে হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল। পথের পাঁচালী বিদেশে সম্মানিত না হলে সত্যজিৎ রায়কে নিয়েও আমরা গদগদ হতাম কিনা সন্দেহ। এ বিষয়ে সেরা উদাহরণ অবশ্য মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অবিস্মরণীয় রিপোর্টাজে লিখেছেন, মাণিক যখন মারা যাচ্ছিলেন তখন কেউ তাঁর খবর নেয়নি। অথচ মারা যাওয়ার পর ফুলে ফুলে ঢেকে যাওয়ার জোগাড়। সে দৃশ্য নিজে চোখে দেখেছিলেন বলেই বোধহয় সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ফুল জমে জমে পাথর হয়। এতকিছু সত্ত্বেও বাঙালি গুণীদের মধ্যে ক্ষমতার প্রসাদ পাওয়ার জন্য এ হেন কাতরতা, যা-ই ঘটুক তা মুখ বুজে মেনে নেওয়ার এমন ব্যগ্রতা নিঃসন্দেহে অভিনব। সুভাষ নিজে বামপন্থী হয়েও বামফ্রন্ট সরকারের পেয়ারের লোক ছিলেন না। মৃত্যুর পর বরং মমতা ব্যানার্জি তাঁকে নিজেদের লোক বলে দাবি করেছিলেন। শঙ্খ ঘোষ কংগ্রেস আমলে তাদের বিরুদ্ধে লিখেছেন, বাম আমলে সিপিএম নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক সত্ত্বেও নন্দীগ্রাম কাণ্ডের পর মিছিলে হেঁটেছিলেন। তফাতের মধ্যে তাঁকে দলে টানতে বিমান বসু তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন, ব্যর্থ হওয়ার পরেও “এ কোন কবি” বলেননি।

অল্পবয়সী, কম বিখ্যাতদের স্বীকৃতির লোভ তবু বোঝা যায়। সারাজীবন পাঠক, সমালোচকদের কাছ থেকে সম্মান পাওয়া এবং গত এক দশকে ফণিভূষণ, মণিভূষণ, বিধুভূষণে ভূষিত কৃতীরা কিসের অনুপ্রেরণায় নিজের সাধনার চরম অসম্মানেও রা কাড়েন না – সে এক রহস্য। কিন্তু সে রহস্য বাদ দিয়েও পশ্চিমবঙ্গে সাহিত্য কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে এবং কোন পথে চলেছে তা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা করার পরিস্থিতি তৈরি করে দিল মুখ্যমন্ত্রীকে পুরস্কার প্রদান। নিজেদের অজান্তে এই কাজটি করার জন্য হয়ত পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিকে ধন্যবাদ দেওয়া যেতে পারে। কারণ বাংলার লেখক, প্রকাশক, পাঠক গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসাতে বিলক্ষণ ভালবাসেন। নিজেদের দোষত্রুটি নিয়ে ভাবতে কেউ রাজি নন। বাংলা সাহিত্য একদিনে এতটা খেলো হয়নি। এই সুযোগে এ বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

রত্না রশিদ বলে এক সাহিত্যিক মুখ্যমন্ত্রীকে পুরস্কার দেওয়ার প্রতিবাদে নিজের পুরস্কার ফিরিয়ে দেবেন বলেছেন। তাতে তৃণমূল কংগ্রেস মুখপাত্র দেবাংশু ভট্টাচার্যের প্রতিক্রিয়ার কাটাছেঁড়া করলেই অনেকগুলি দিক বেরিয়ে আসবে। রত্নাকে ফালতু প্রমাণ করতে দেবাংশুর প্রথম যুক্তি, মমতা ব্যানার্জির বই বেস্টসেলার আর রত্নার বন্ধুবৃত্তেরও নব্বই শতাংশ লোকই তাঁর বইয়ের নাম বলতে পারবে না।

প্রথমত, বাংলার প্রকাশনা জগতের সার্বিক অডিট কে করে? একটি বই কত কপি বিক্রি হলে বেস্টসেলার হয়? আরও বড় প্রশ্ন – বেস্টসেলার মানেই ভাল সাহিত্য, এমনটা কে ঠিক করল? রত্নার বইয়ের নাম কজন জানেন তা দিয়ে কেন ঠিক হবে তিনি কেমন লেখেন? দেবাংশু মমতা ব্যানার্জির দলের লোক, তাই এই পুরস্কার প্রদানের পক্ষ নিয়ে যা পেরেছেন বলেছেন – এই যুক্তিতে তাঁর কথাগুলি উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ বেস্টসেলার মানেই ভাল – এ ধারণায় আজকাল বেশিরভাগ পাঠক ভোগেন। প্রকাশকদের মধ্যেও বেস্টসেলার প্রকাশ করার হুড়োহুড়ি। বিপ্লব করে ফেলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাজারে নামা অনেক ছোট প্রকাশকও চটজলদি রোজগার এবং প্রকাশনা জগতে নাম করার তাগিদে জনপ্রিয় ফেসবুকারদের প্রচুর লাইক পাওয়া পোস্ট একত্র করে বই প্রকাশ করছেন। বেস্টসেলার বই করার তাগিদে কবিরা নিভৃতে সারস্বত সাধনা করার বদলে ফেসবুকেই পরের পর কবিতা প্রকাশ করছেন। এমনকি সাংবাদিকদের মত ঘটনাভিত্তিক কবিতা লিখছেন। বিখ্যাত মানুষদের জন্মদিনে, মৃত্যুদিনে কবিতা; কেউ মারা গিয়ে শ্মশানে পৌঁছবার আগেই কবিতা। সম্পাদনা রুগ্ন শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা লেখা হয় সবই প্রকাশযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। ভুল, ঠিক বলে আর কিছু নেই। বিশিষ্ট লেখকদের পুরনো বইয়ের যেসব নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে দীর্ঘদিনের প্রকাশনা সংস্থা থেকে, সেগুলিতে নতুন নতুন বানান ভুল, যতিচিহ্নের যথেচ্ছ অন্তর্ধান এবং আবির্ভাব দেখা যাচ্ছে।

এর বিপরীতে ‘যাহা বেস্টসেলার, তাহাই বর্জনীয়’ ব্রিগেডও আছে। কোনো লেখকের বই ভাল বিক্রি হচ্ছে জানলেই তাঁরা নিশ্চিত হয়ে যান ওটি আদৌ সাহিত্য নয়। বেস্টসেলার আর লিটারেচার দুটি পৃথক বস্তু – এমন অভূতপূর্ব তত্ত্বও উঠে আসছে। শতাধিক বছরের শেক্সপিয়র চর্চা এই ফল দিচ্ছে জানলে গিরীশ ঘোষ, উৎপল দত্তরা কী করতেন কে জানে! অর্থাৎ প্রকারান্তরে বেস্টসেলার বিরোধীরাও বেস্টসেলার হওয়া বা না হওয়াকেই উৎকর্ষের মাপকাঠি বলে ধরছেন। এভাবে যে ভাষার সাহিত্য চলে, সেখানে আকাদেমি, পুরস্কার – এসব নিয়ে তো ভূতে ফুটবল খেলবেই।

দেবাংশু তাঁর পোস্টে এরপর যা লিখেছেন তা আরও গুরুতর। তিনি লিখেছেন ২০২১ সালে মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় না ফিরলে বাংলায় এন আর সি হত, রত্না রশিদকেও ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে হত ইত্যাদি। অর্থাৎ মমতা বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকেছেন, তাই তাঁর সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্য। মানে সাহিত্য এমন একটি বিষয়, যার পুরস্কার আদৌ সাহিত্যচর্চা না করেও পাওয়া যেতে পারে। কোনো পুলিসকর্মী হয়ত ভাল গুন্ডা দমন করেন, তার পুরস্কার হিসাবেও সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে। এই যে সাহিত্যকে একটি বিশেষ কাজ, বিশেষ শৃঙ্খলা হিসাবে না ভাবা – এটিও কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এখন দারুণ ‘কুল’। ২০১৪ সালে যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হোক কলরব আন্দোলন চলছিল, তখন বাংলার সাংবাদিক কুলচূড়ামণি সুমন চট্টোপাধ্যায় ফেসবুকে লিখেছিলেন যাদবপুর এমন একটি জায়গা, যেখানে তুলনামূলক সাহিত্যের মত অর্থহীন বিষয় পড়ানো হয়। তিনি তবু সাহিত্যের বাইরের লোক, ইদানীং কবিরাও “সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি” বললে রেগে যান। চিরকাল গরীব মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ নিজেদের মত করে গান বাঁধেন, ছড়া কাটেন, শিল্প সৃষ্টি করেন – এই যুক্তিতে যে কেউ কবি হতে পারে এই যুক্তি দেওয়া হয়। যেন গরীব, খেটে খাওয়া মানুষদের মধ্যে যাঁরা এসব করেন তাঁদের সৃজনে কোনো অধ্যবসায় নেই, কোনো শৃঙ্খলা নেই। যাঁরা ছৌ নাচেন তাঁদের যেন নাচ শিখতে হয় না, যেমন তেমন লম্ফঝম্প করলেই চলে। যাঁরা পটশিল্পী তাঁদের গল্পটি সযত্নে গড়ে তুলতে হয় না, ছবিগুলি ভেবেচিন্তে আঁকতে হয় না।

স্বতঃস্ফূর্ততা বলে এক আজব ধারণা তৈরি করা হয়েছে, যা কেবল কবিরা নয়, যাঁরা গল্প, উপন্যাস লেখেন তাঁরাও একমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিস বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। মনে যা এল তা-ই ঝটপট লিখে ফেলা যদি কবিতা বা সাহিত্য হয়, তাহলে সত্যিই মমতার “এপাং ওপাং ঝপাং”-কে কবিতা বলে স্বীকার করতে আপত্তি করা চলে না। অন্নদাশংকর রায়ের সৃষ্টি ছড়া আর মমতা ব্যানার্জির লেখা ছড়া নয়, তার সবচেয়ে বড় কারণ (আর কোনো কারণ দর্শানোর আদৌ প্রয়োজন নেই) যে প্রথমটিতে ছন্দ আছে, দ্বিতীয়টিতে ছন্দের হদ্দমুদ্দ হয়েছে – এ কথাও বলা উচিত নয়। কারণ ছন্দ তো স্বতঃস্ফূর্ত নয়, রীতিমত মাত্রা হিসাব করে অঙ্ক কষে মেলাতে হয়। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর যখন থেকে মুখ্যমন্ত্রীর কাব্যপ্রতিভা প্রকাশ পেয়েছে, তখন থেকে তাঁর লেখা এবং তদনুরূপ লেখা কবিতা হচ্ছে না বললে বা ব্যঙ্গ করলেই বলা শুরু হয়েছে, কবিতা লেখা কি ভদ্রলোকদের মনোপলি নাকি? সবার অধিকার আছে কবিতা লেখার। অর্থাৎ কবিতাকে ভদ্রলোক বনাম সাবল্টার্নের রণভূমিতে পরিণত করা হয়েছে। রাজধানী নিবাসী, বরাবর ক্ষমতার বৃত্তে থাকা ব্রাহ্মণকন্যা কী করে সাবল্টার্ন হন সে প্রশ্ন থাক। কিন্তু সাবল্টার্ন হলেই যে যা-ই লিখুক তাকেই কবিতা বলতে হবে, এমনটা কি গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক লিখেছেন? স্বীকার্য যে কবিতার কোনো সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা নেই। এমনকি অ্যান্টি-পোয়েট্রি বলেও একটি জিনিসের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু ব্যাকরণ ভাঙতে গেলে আগে তো ব্যাকরণ শিখতে হয়, সে ব্যাকরণ ভদ্রলোকদের তৈরি হলেও।

এসব বললে রে রে করে তেড়ে আসার মত লোক এখন পশ্চিমবঙ্গে কম নেই। এই ক্ষতির তুলনায় মুখ্যমন্ত্রীর হাতে সাহিত্য পুরস্কার তুলে দেওয়া সামান্য ক্ষতি। বস্তুত, ওই ক্ষতিগুলো আটকানো গেলে হয়ত এই ক্ষতি দেখতে হত না।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

আরও পড়ুন

পূজার ছলে তোমায় ভুলে

প্রখর তপন তাপে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা কাঁপে

হুগলি জেলায় বসে এই লেখা শুরু করার সময়ে আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর জানিয়ে দিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই বৃষ্টি হবে দক্ষিণবঙ্গে। সেইসঙ্গে কমবে তাপমাত্রা, তাপপ্রবাহও স্তিমিত হবে। সত্যি কথা বলতে, এমনটা যে হবে তা আলিপুর কদিন ধরেই বলছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার যাঁরা ভাগ্যনিয়ন্তা তাঁরা হয় আবহাওয়াবিদ্যার উপর জ্যোতিষশাস্ত্রের চেয়ে বেশি ভরসা করেন না, অথবা কোনো কারণে স্কুলগুলোকে বন্ধ করে দেওয়ার ভীষণ তাড়া ছিল। নইলে ২৭ এপ্রিল (বুধবার) নবান্নে তাপপ্রবাহ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকের পরেই ২ মে (সোমবার) থেকে গরমের ছুটি শুরু করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা হয় না।

গত কয়েক দিনে শিক্ষামন্ত্রকের দুটো সিদ্ধান্ত খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে। প্রথমটা গরমের ছুটি এগিয়ে আনা, দ্বিতীয়টা কলেজে ভর্তি কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে করা। কয়েক বছর আগে পশ্চিমবঙ্গে উচ্চমাধ্যমিকের ফল বেরোবার পর কলেজে ভর্তি নিয়ে চমকপ্রদ সব কাণ্ড হয়েছিল। পরীক্ষায় যত নম্বরই পান না কেন, তৃণমূল ছাত্র পরিষদকে মোটা টাকা প্রণামী না দিলে কলেজে ভর্তি হওয়া যাচ্ছে না – এমন অভিযোগ উঠেছিল। পছন্দের বিষয়ে অনার্স নিতে গেলে কোথাও কোথাও ৪০-৫০ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে, এমনও শোনা যাচ্ছিল। তারপর চালু হয় কলেজের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভর্তি। কারণ এ দেশে গত দুই দশকে দুর্নীতির একমাত্র সমাধান হিসাবে জনপ্রিয় হয়েছে অনলাইন ব্যবস্থা, সে ব্যবস্থা সকলের নাগালের মধ্যে কিনা তা নিয়ে আলোচনা করলে লোকে বোকা এবং সেকেলে বলে। কিন্তু বোধহয় সে ব্যবস্থাও দুর্নীতিমুক্ত করা যায়নি, তাই এবার সোজা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভর্তি হবে শোনা যাচ্ছে। যতক্ষণ না ব্যাপারটা চালু হচ্ছে ততক্ষণ এর অসুবিধাগুলো জানা যাবে না। ফলে এই মুহূর্তে ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষিকা সকলেই এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তাই সংবাদমাধ্যমেও তাঁদের প্রতিক্রিয়াগুলো ঘটা করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। মজার কথা, গরমের ছুটি এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাঁরা কী ভাবছেন তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের উৎসাহ তুলনায় কম। কারণটা সোশাল মিডিয়া দেখলেই দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। এই সিদ্ধান্তে পুরোপুরি খুশি হয়েছেন এমন কাউকে দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হচ্ছে। বলা বাহুল্য, অফলাইন প্রতিক্রিয়াও খুব আলাদা হবে না। পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম অত্যন্ত সাবধানী। প্রতিবেদনের শেষ প্যারায় “অমুক শিক্ষক সংগঠন বলেছে এতে তমুক অসুবিধা হবে। কিন্তু তমুক শিক্ষক সংগঠন এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে” লিখেই ক্ষান্ত দিচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গে এমনিতে শিক্ষাবিদের ছড়াছড়ি। অনেকে এত বিদ্বান যে শিক্ষা ছাড়াও নাটক, সিনেমা, সঙ্গীত, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত খবরের কাগজের উত্তর-সম্পাদকীয় স্তম্ভে লিখে থাকেন। কারো কারো মতে এ রাজ্যের সাধারণ মানুষ কাকে ভোট দেবেন তা-ও এঁরা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। অথচ কোভিডের প্রতাপে প্রায় দু বছর বন্ধ থাকার পর খোলা স্কুল, কলেজ ফের টানা দেড় মাসের জন্য বন্ধ হয়ে গেল – এ নিয়ে শিক্ষাবিদদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই।

কিছু বামপন্থী ছাত্র সংগঠন কয়েক মাস আগে পথে নেমেছিল স্কুল, কলেজ অবিলম্বে খোলার দাবিতে। যখন খুলে গেল, তখন একে আন্দোলনের সাফল্য বলেও সোচ্চারে দাবি করেছিল। এখন পর্যন্ত তারাও চুপ। পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষক সংগঠনগুলোর কী অবস্থা তা নিয়োগ থেকে বদলি – সব ক্ষেত্রে শোষিত মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের একলা লড়াই বা অস্থায়ী অরাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি করে লড়াই করা দেখলেই টের পাওয়া যায়। যে নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতি বাম আমলে এমন দোর্দণ্ডপ্রতাপ ছিল যে অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত বাজেট বক্তৃতায় সরকারি বেতন পাওয়া মাস্টারদের প্রাইভেট টিউশন বন্ধ করার নিদান দিয়েও পরে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই সমিতির অস্তিত্ব এখন টের পাওয়া যায় কেবল সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিবৃতি থেকে। তা সেই সমিতি বলেছে আপাতত সাতদিনের ছুটি দিয়ে পরীক্ষা ইত্যাদি আশু কাজগুলো শেষ করে নিয়ে তারপর ছুটি দিলে ভাল হত। আরও দু-একটি শিক্ষক সংগঠন ক্ষীণ স্বরে এরকম নানা পরামর্শ দিয়েছে। মমতা ব্যানার্জির সে পরামর্শ শুনতে বয়ে গেছে। তিনি অবিসংবাদী জননেত্রী, তিনি যখন মনে করেছেন এই গরমে স্কুল করা যায় না, তখন যায় না।

গত বছর অতিমারীর কারণে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা হয়নি। এ বছরের মাধ্যমিক শেষ করা গেছে, উচ্চমাধ্যমিকেরও লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে নবান্নের সভার দিন। কিন্তু একাদশ শ্রেণির প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস শুরু হওয়ার কথা ছিল আজ থেকে। সরকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে সেসব মাথায় রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি। স্কুলের পরীক্ষা আর বোর্ডের পরীক্ষা গুরুত্বের দিক থেকে এক নয় – এমনটা ভাববার কী-ই বা দরকার? ঠিক দুটো অনুচ্ছেদের সরকারি নির্দেশে ছুটির সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাতিল পরীক্ষাগুলো কবে হবে না হবে তা নিয়ে একটা শব্দও খরচ করা হয়নি। ক্লাস ফাইভ থেকে টেন পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের এই শিক্ষাবর্ষের প্রথম সামেটিভ পরীক্ষা ৭ মের মধ্যে শেষ করতে হবে – সরকারি নির্দেশ ছিল। সে নির্দেশও চোখের পলকে বাতিল হল। মানে যে ছেলেমেয়েরা কোনো পরীক্ষার মুখোমুখি হয়নি সেই ২০২০ সাল থেকে, তাদের প্রথম পরীক্ষাটাও বাতিল হল। নিজের নির্দেশ বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দিল সরকার নিজেই। এসব অবশ্য ইদানীং প্রায়ই হয়। এমনকি আগের নির্দেশের সাথে পরের নির্দেশের সাযুজ্য বজায় রাখার প্রয়োজনও বোধ করে না পশ্চিমবঙ্গ সরকার। অনেকসময় সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী যা বলেন, কয়েক ঘন্টা পরের সরকারি সার্কুলারেই তা বেশ খানিকটা বদলে যায়।

যাক সে কথা। লক্ষ করার মত বিষয় হল, এই হঠাৎ ছুটিতে পড়াশোনার যে ক্ষতি হবে সরকার তা বোঝে না এমন নয়। বোঝে বলেই বলা হয়েছে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস চলতে পারে। এমনিতেই বহু বেসরকারি স্কুল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নির্দেশ মেনে গরমের ছুটি শুরু করছে না বলে জানিয়েছে। তারা কেউ কেউ অত্যধিক গরমের কারণে অনলাইন ক্লাস নেবে। আইসিএসই, সিবিএসই-র অধীন স্কুলগুলোর পরীক্ষাও চলবে। তার মানে দেড় মাস লেখাপড়া বন্ধ থাকবে শুধু পশ্চিমবঙ্গের সরকারি এবং সরকারপোষিত স্কুলগুলোর ছাত্রছাত্রীদের। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও যাদের পক্ষে অনলাইন ক্লাস করা সম্ভব নয় তারা বঞ্চিত হবে। সুতরাং অতিমারীর সময়ে যে ডিজিটাল বিভাজন শুরু হয়েছিল, সরকার জেনেশুনে তা বাড়িয়ে তুললেন।

ক্ষুব্ধ অভিভাবকদের অনলাইন এবং অফলাইন প্রতিক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে, তাঁরা যথারীতি স্কুলশিক্ষকদের সৌভাগ্যে বিরক্ত ও ঈর্ষান্বিত। “এরা আর কত ছুটি খাবে” জাতীয় মন্তব্য ছুড়ে দেওয়া চলছে। তৃণমূল সরকারের আমলে নিয়োগের অভাবে যতগুলো ক্লাস নেওয়ার কথা, যতগুলো খাতা দেখার কথা তার চেয়ে অনেক বেশি কাজ করতে হয় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। উপরন্তু সরকার নাগরিকদের শ্রীবৃদ্ধির যতরকম পরিকল্পনা নিয়েছেন সেসবের দায়িত্বও তাঁদেরই ঘাড়ে। গত কয়েক বছর প্রবল গরমে যতবার সরকার গ্রীষ্মাবকাশ বাড়িয়েছেন, ততবার নির্দিষ্ট করে বলে দিয়েছেন, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কিন্তু স্কুলে যেতে হবে। অর্থাৎ গরমে তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন না। এতৎসত্ত্বেও রাজ্যসুদ্ধ বাবা-মা ভাবছেন “এরা আর কত ছুটি খাবে”। অথচ অধিকাংশ মাস্টারমশাই, দিদিমণি এই ছুটি চান না – লেখাপড়ার ক্ষতির কথা ভেবে তো বটেই, তাঁরা যে ক্রমশই গণশত্রু বলে প্রতিপন্ন হচ্ছেন সেই দুশ্চিন্তাতেও। চিন্তাটা অমূলক নয়। এই প্রখর তপন তাপে সরকারের সামনে আর কোন পথ খোলা ছিল, সে আলোচনা করতে গিয়ে যেসব বিকল্পের কথা বলছেন অনেকে, তা থেকে রাজ্যের স্কুলগুলো কী অবস্থায় আছে সে সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণার অভাব এবং সে কারণে মাস্টাররা মহা সুখে আছেন – এই ধারণার প্রাধান্য প্রকট হচ্ছে।

যেমন অনেকেই সকালে স্কুল করার কথা বলছেন। এঁরা সম্ভবত জানেন না, স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু হওয়ার পর থেকে রাজ্যের স্কুলগুলোতে স্থানীয় শিক্ষক-শিক্ষিকার পরিমাণ অনেক কমে গেছে। অনেকেই স্কুলে আসেন ৩০-৪০ কিলোমিটার বা তারও বেশি দূর থেকে ট্রেন, বাস, আরও নানারকম যানবাহনে। সম্প্রতি উৎসশ্রী নামে বদলির যে প্রকল্প চালু হয়েছে তাতে ইতিমধ্যেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, মামলাও চলছে। ফলে সে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ মোটেই খুব বেশি মানুষের হয়নি। হয়ত কোনো স্কুলে ৫০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা, উৎসশ্রীর সুবিধা নিয়ে এসেছেন জনা চারেক। সঙ্গে আরও জনা পাঁচেক স্থানীয় শিক্ষক-শিক্ষিকা থাকা সম্ভব। পঞ্চাশ জনের ক্লাস যদি এই জনা দশেককে নিতে হয় সকালের স্কুলে, তাহলে কেমন পড়াশোনা হবে? নাকি দূর থেকে আসা মাস্টারদের স্কুলেই রাত কাটানোর দাবি করা হচ্ছে? মুখ্যমন্ত্রীর মর্জিই যেখানে আইন সেখানে অদূর ভবিষ্যতে হয়ত এমন নিয়মও হতে পারে। তখন মাস্টাররা কেমন টাইট হল তা দেখে অন্য পেশার লোকেরা প্রভূত আনন্দ পাবেন।

আসলে একটা তৈরি করা সমস্যার সমাধান খুঁজে চলেছি আমরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এবার গ্রীষ্মে একদিনও কালবৈশাখী হয়নি দক্ষিণবঙ্গে, তাপমাত্রা চল্লিশ ডিগ্রি ছুঁয়ে ফেলেছে কোথাও কোথাও। কিন্তু এমন তো নয় যে পশ্চিমবঙ্গ ছিল শীতের দেশ, বিশ্ব উষ্ণায়ন জায়গাটাকে রাতারাতি থর মুরুভূমি করে তুলেছে। পশ্চিমবঙ্গে গরম চিরকালই পড়ত, কিন্তু গরমের ছুটি কবে থেকে কবে অব্দি থাকবে সেই সিদ্ধান্তগুলো নিজেদের বিবেচনা অনুযায়ী স্কুল কর্তৃপক্ষই নিতেন। সাধারণত দক্ষিণবঙ্গের স্কুলগুলোতে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে টানা ২০-২৫ দিন ছুটি থাকত, স্কুল খুলতে খুলতে এসে যেত বর্ষা। উত্তরবঙ্গের স্কুলেও স্থানীয় আবহাওয়া বুঝে গরমের ছুটি দেওয়া হত। আর ছুটির দিনক্ষণ শিক্ষাবর্ষের গোড়াতেই ঠিক হয়ে যেত, ফলে পড়াশোনা এবং পরীক্ষার নির্ঘণ্ট রাতারাতি বদলাতে হত না। বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষায় দুর্নীতির বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত কেন্দ্রীকরণ হয়েছে। কবে পরীক্ষা হবে, কবে ছুটি দেওয়া হবে, ছাত্রছাত্রীদের কী অ্যাক্টিভিটি টাস্ক দেওয়া হবে – সবই ঠিক হয় কেন্দ্রীয়ভাবে। ফলে যথেষ্ট সহনীয় আবহাওয়ার জলপাইগুড়ি জেলার স্কুলের সঙ্গেই ২ মে থেকে ছুটি শুরু হয়ে যাচ্ছে পুরুলিয়া জেলার স্কুলের। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় প্রতি বছরই দীর্ঘায়িত হচ্ছে গরমের ছুটি। এগারো বছর কেটে গেল, এখনো গরমের ছুটির দিন নির্দিষ্ট করতে পারল না রাজ্য সরকার।

এতদ্বারা সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলোকে সবদিক থেকে পঙ্গু করে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বেসরকারি শিক্ষার রাস্তা চওড়া করা হচ্ছে কিনা সে প্রশ্নে না গেলেও একটা প্রশ্ন অনিবার্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০২২ গ্রীষ্মের মত পরিস্থিতি অদূর ভবিষ্যতে তো আরও বাড়বে। তাহলে কি এবার থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীন স্কুলগুলো গরমকালে বন্ধই থাকবে? ভারত তথা পৃথিবীর যে যে অঞ্চলে প্রচণ্ড গরম পড়ে, সেখানকার ছেলেমেয়েরা কি স্কুল যায় না? নাকি রাজ্য সরকার এ ব্যাপারে পথপ্রদর্শক হতে চাইছে?

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত। ছবি ইন্টারনেট থেকে

রাজ্যের করোনা সামলানো দেখে হাসছে পাশবালিশ

পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন অতিমারির শুরু থেকেই নিঃসন্দেহ যে করোনা সবচেয়ে বেশি ছড়ায় স্কুল, কলেজ আর লোকাল ট্রেন থেকে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি ইন্টারনেট থেকে

২০২০ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন “করোনাকে পাশবালিশ করে নিন।” অর্থাৎ করোনা থাকবে, করোনাকে নিয়েই চলতে হবে। তখন করোনার প্রথম ঢেউ চলছে, ভ্যাক্সিন আবিষ্কার হয়নি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organisation) থেকে শুরু করে কোনো দেশের কোনো দায়িত্বশীল সংস্থাই করোনার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানে না। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর সেই মন্তব্য অনেককেই বিস্মিত করেছিল, মন্তব্যের সমালোচনা হয়েছিল, বিলক্ষণ হাসিঠাট্টাও হয়েছিল। কেউ কেউ অবশ্য চোখের সামনে গাদা গাদা মানুষকে মরতে দেখেও দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলেন, যে করোনা কোনো রোগই নয়, স্রেফ চক্রান্ত। এঁদের মধ্যে যাঁরা দক্ষিণপন্থী তাঁরা বলতেন চীনের চক্রান্ত, আর বামপন্থীরা বলতেন স্বৈরাচারী শাসকদের গণতন্ত্র ধ্বংস করার চক্রান্ত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে অতি বিচক্ষণ বলেই পাশবালিশের পরামর্শ দিয়েছেন, এ কথা সেইসময় জোর গলায় একমাত্র ওঁরাই বলেছিলেন। পরে যখন বিজ্ঞানীরা বললেন অন্য অনেক ভাইরাসের মত করোনাও ক্রমশ শক্তি হারিয়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মত হয়ে যাবে কিন্তু মরবে না, তখন ওঁরা সোল্লাসে বলেছিলেন, হুঁ হুঁ বাওয়া, আমরা তখনই জানতুম। মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে হাসাহাসি করা? উনি কি না জেনে কথা বলেন?

এখন ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস, সারা পৃথিবীতে ভ্যাক্সিন দেওয়া চলছে। এ দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৩১শে ডিসেম্বর, ২০২১ তারিখের মধ্যে সকলকে বিনামূল্যে ভ্যাক্সিন দেওয়া না হয়ে থাকলেও অনেক মানুষ ভ্যাক্সিন পেয়েছেন। কোনো কোনো দেশে বুস্টার ডোজও দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বহু প্রাণ নিয়ে চলে গেছে, ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের হাত ধরে তৃতীয় ঢেউ এসে পড়েছে। অনেক দেশে দেখা যাচ্ছে ভাইরাসটা ছড়াচ্ছে আগের চেয়েও দ্রুত, কিন্তু ক্ষতি করার শক্তি আগের চেয়ে কম। আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে এমন মানুষের সংখ্যা কম, মৃত্যুহারও কম। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনো সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে, কারণ তাদের মতে আমাদের হাতে ওমিক্রন সম্পর্কে এখনো যথেষ্ট তথ্য নেই।৩ কিন্তু যা নিশ্চিত, তা হল শিশুদের করোনায় আক্রান্ত হওয়া বা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মত অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ওমিক্রন বলে নয়, অতিমারির শুরু থেকেই দেখা গেছে খুব কম শিশুকেই কোভিড-১৯ কাবু করতে পারছে। তবু পশ্চিমবঙ্গের শিশুরা স্কুলে যাওয়ার অনুমতি পাচ্ছে না। অর্থাৎ করোনাকে পাশবালিশ করে নেওয়ার ক্ষমতা যাদের সবচেয়ে বেশি, তাদেরই বেরোতে দেওয়া হচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রীর ভাইরোলজি সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান সম্পর্কে যাঁরা দু বছর আগে নিঃসন্দেহ ছিলেন, এখন দেখা যাচ্ছে তাঁরাই স্কুল কেন খোলা হল না, যেটুকু খোলা হয়েছিল সেটুকুও কেন বন্ধ করে দেওয়া হল — তা নিয়ে বিস্তর রাগারাগি করছেন।

বাকি পৃথিবীর গবেষণা যা-ই বলুক, পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন অতিমারির শুরু থেকেই নিঃসন্দেহ যে করোনা সবচেয়ে বেশি ছড়ায় স্কুল, কলেজ আর লোকাল ট্রেন থেকে। লোকাল ট্রেন বন্ধ রেখে বা কমিয়ে দিয়ে রাস্তাঘাটের ভিড় কমানোর ভাবনা কতটা হাস্যকর তা আলাদা করে বলে দিতে হয় না। বরং স্কুল খোলা সম্পর্কে কিছু জরুরি কথা বলা দরকার।

১ নভেম্বর ২০২১ থেকে দিল্লিতে সমস্ত ক্লাসের জন্য ৫০% হাজিরার শর্তে স্কুল খুলে গিয়েছিল, গত কয়েকদিন করোনা আবার বৃদ্ধি পাওয়ায় ফের বন্ধ করা হয়েছে। একই সময়ে কোভিড বিধি মেনে খুলে গিয়েছিল কেরালার স্কুলগুলোও।৫ কর্ণাটকে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস শুরু হয়েছিল ২৫ অক্টোবর। সম্প্রতি আক্রান্ত বাড়তে থাকায় অনেক স্কুলে বড়দিনের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। মহারাষ্ট্রে হাইস্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস শুরু হয়েছিল অক্টোবর মাসের গোড়াতেই, প্রাথমিক স্তরের শিশুদের ক্লাস শুরু হয়েছে ডিসেম্বরে।৭ পাশের রাজ্য ঝাড়খন্ডে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস চালু হয়ে গিয়েছিল ২ আগস্টেই, দীপাবলির পর থেকে নীচু ক্লাস এবং প্রাথমিক স্কুলগুলোও খুলেছে। বলাই বাহুল্য, প্রয়োজন হলে সব রাজ্যের সরকারই ফের স্কুল বন্ধ করার নির্দেশ দেবেন। কিন্তু লক্ষণীয় ব্যাপার হল, এতগুলো রাজ্যে সমস্ত শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্কুল খুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে বিচক্ষণ মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি সত্ত্বেও হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সালের এপ্রিল-মে মাসে বিধানসভা নির্বাচন ছিল। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভোটকর্মী হতে হবে বলে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়েছিল। যাঁরা সে যাত্রায় ভ্যাক্সিন পাননি, তাঁদেরও সরকার চাইলে সত্বর ভ্যাক্সিন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারতেন। তারপর স্কুল খোলা যেতে পারত। সেসব করা হয়নি। সুতরাং মনে করা অমূলক নয় যে দিল্লির আপ সরকার, মহারাষ্ট্রের শিবসেনার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার, ঝাড়খণ্ডের জেএমএম-কংগ্রেস সরকার, এমনকি কর্ণাটকের বিজেপি সরকারেরও স্কুলশিক্ষা নিয়ে মাথাব্যথা আছে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারের নেই।

মুখ্যমন্ত্রী যে করোনাকে পাশবালিশ করে ফেলতে বলেছিলেন, সেটা কিন্তু স্রেফ কথার কথা নয়। অন্তত পশ্চিমবঙ্গে নয়। অনেক ক্ষেত্রেই করোনাকে বুকে জড়িয়েই এগোনো হয়েছে, যেমন নির্বাচন। ২০২০ সালের মার্চের পর থেকে স্কুল, কলেজ একটানা বন্ধ থেকেছে; এই কয়েক মাসের জন্য খুলে আবার বন্ধ হয়ে গেল। রাজ্যের সবচেয়ে বড় দুটো পরীক্ষা — মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিক— বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু নির্বাচন হয়েছে যথাসময়ে, ভরপুর প্রচার সমেত। কেবল বিধানসভা নয়, সামান্য দেরিতে হলেও কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচন হয়েছে। রাজ্যের বাকি কর্পোরেশন এবং ছোট পৌরসভাগুলোর নির্বাচনও পাশবালিশ নিয়ে খেলতে খেলতেই হয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। বড়দিন, নতুন বছর উদযাপন করতে যারা পার্ক স্ট্রিটে ভিড় জমিয়েছিল, তাদের পাশবালিশের অধিকারকেও সরকার সম্মান দিয়েছেন। গঙ্গাসাগরের তীর্থযাত্রীদেরও পাশবালিশের অধিকার সুরক্ষিত।

স্কুল, কলেজ ফের বন্ধ করে দেওয়ায় যে ক্ষতি তার তবু কিছুটা পরিমাপ হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, সমাজসেবী সংস্থার কল্যাণে এবং কিছুটা সোশাল মিডিয়ার দৌলতে আমরা জানতে পেরেছি বিশেষত গ্রামাঞ্চলে স্কুলশিক্ষার কী অপরিসীম ক্ষতি এর মধ্যেই হয়ে গিয়েছে। ক্লাসে ফার্স্ট হয় যে মেয়ে, তার বিয়ে হয়ে গেছে — এমন খবরও আমাদের অজানা নেই। কিন্তু যে ক্ষতির কোনো পরিমাপ হয়নি, হয়ত হবেও না, তা হল মাসের পর মাস লোকাল ট্রেন বন্ধ করে রাখার ক্ষতি। কেবল শহর ঘেঁষা মফস্বল নয়, দূর গ্রামেরও বিপুল সংখ্যক মানুষকে রুটিরুজির জন্য নিত্য কলকাতায় আসতে হয়। সেই আসা যাওয়ার প্রধান মাধ্যম হল হাওড়া, শিয়ালদা থেকে ছাড়া লোকাল ট্রেন। শুধু যাত্রীদের কথা বললেও সবটা বলা হয় না। এই লোকাল ট্রেনে হকারি করে দিন গুজরান হয় বহু মানুষের। লোকাল ট্রেন বন্ধ রাখা মানে তাঁদের জীবিকারও সর্বনাশ করা। মার্চ ২০২০ থেকে অক্টোবর ২০২১ পর্যন্ত কতজন লোকাল ট্রেনের হকার আত্মহত্যা করেছেন তার কোনো পরিসংখ্যান কখনো পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। আর অনাহারে মৃত্যু বলে তো এ দেশে, এ রাজ্যে কিছু হয় না আজকাল। রাত দশটা অব্দি লোকাল ট্রেন চললে আশা করি হকাররা সপরিবারে অন্তত অর্ধাহারের উপযোগী রোজগার করতে পারবেন।

তা এসবের প্রতিকার কী? প্রতিকার নেই। কারণ কোনো সরকার যখন পাশবালিশের বেশি ভেবে উঠতে পারে না, তখন খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা স্বাস্থ্যের কথা বলার দায়িত্ব নিতে হয় বিরোধীদের। অধিকার কী তা যখন মানুষ ভুলে যায়, গণতন্ত্রে তা মনে করিয়ে দেওয়ার, অধিকার আদায়ের আন্দোলন করার দায়িত্ব বিরোধীদের। কিন্তু এ রাজ্যের বিরোধীরাও নিজ নিজ পাশবালিশ নিয়ে ব্যস্ত। প্রধান বিরোধী দল বিজেপির পাশবালিশ হল হিন্দুত্ব। স্কুল, কলেজ, লোকাল ট্রেন নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। উপস্থিত লোকলস্করও নেই, কারণ অনেকেই এসেছিল তবু আসে নাই। নির্বাচনের পর তৃণমূলে ফিরে গেছে। আর যে বিরোধীরা বিধানসভায় আসনের নিরিখে শূন্য হলেও এখনো কিছুটা লোকবলের অধিকারী, তাদের পাশবালিশ হল সোশাল মিডিয়া। ফেসবুক, টুইটার খুললেই সিপিএম নেতা, কর্মীদের পোস্ট দেখে জানা যাচ্ছে (১) স্কুল, কলেজ বন্ধ রাখা হীরক রাজার পাঠশালা বন্ধ করে দেওয়ার সমতুল্য এবং একই উদ্দেশ্যে করা; (২) পশ্চিমবঙ্গের গোটা গোটা প্রজন্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এর ফলে; (৩) লোকাল ট্রেন কমালে আরও বেশি ভিড় হবে, তাতে বরং সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা বাড়বে। আরও নানা কথা যা সকলেরই জানা আছে। বিকল্প বামেরাও ফেসবুক বিদীর্ণ করে এসব বলছেন, সঙ্গে থাকছে করোনা কীভাবে গণতন্ত্রের সর্বনাশ করেছে তার উল্লেখ।

উভয় পক্ষই যা বলছেন সঠিক বলছেন, কিন্তু মুশকিল হল সোশাল মিডিয়ায় ওসব লেখার জন্যে তো আমাদের মত অক্ষম নিষ্কর্মারা রয়েছে। বিরোধী রাজনীতির লোকেদের তো এগুলো নিয়ে রাস্তায় নামার কথা। কোথায় আইন অমান্য? কোথায় স্কুল খোলার দাবিতে নবান্ন অভিযান? কোথায় লোকাল ট্রেন যেমন চলছিল তেমন রাখার দাবি নিয়ে রাস্তায় বসে পড়া? সুজনবাবু, সেলিমবাবু, সূর্যবাবুরা মমতা ব্যানার্জির ভূমিকার নিন্দা করে এন্তার লাইক কুড়োচ্ছেন। দীপঙ্করবাবু সর্বভারতীয় নেতা, ফলে ওঁর নীরবতা নিয়ে অভিযোগ করা চলে না। উনি পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে টুইট করার মধ্যেও যাননি গত কয়েক দিনে। নেতারা যে পথে চলেন, স্বাভাবিকভাবে কর্মীরাও সে পথেই চলবেন। ফলে সোশাল মিডিয়ায় সরকারের অগণতান্ত্রিকতা নিয়ে লেখালিখির পাশাপাশি বড়দিনে যারা ফুর্তি করতে বেরিয়েছিল তাদের নির্বুদ্ধিতা, ভোগবাদ ইত্যাদিকে আক্রমণ করা চলছে। যেন ক্ষমতা প্রয়োগ করে ফুর্তি স্থগিত করে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব ছিল না, যেন সাধারণ মানুষ এতই অবাধ্য যে এ বছর সরকার পার্ক স্ট্রিটে সমস্ত উদযাপন বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিলেও বৈপ্লবিক কায়দায় সান্টা ক্লসের টুপি পরে ঝাঁপিয়ে পড়ত। আরও মজার কথা, বিপ্লবীরা সেইসব দিন আনি দিন খাই লোকেদের কথা ভুলেই গেছেন, যাঁরা বছরের এই সময়টায় মানুষ ফুর্তি করতে বেরোয় বলে দুটো পয়সা রোজগার করতে পারেন।

রাজ্যের এই দুর্দশা দেখে কারোর হয়ত চোখে জল আসতে পারে, তবে হাসছে পাশবালিশ।

তথ্যসূত্র

১। https://bangla.hindustantimes.com/

২। https://timesofindia.indiatimes.com/world/rest-of-world/why-an-omicron-wave-may-not-be-as-severe-as-delta/articleshow/88498802.cms

৩। https://fortune.com/2021/12/30/omicron-less-dangerous-covid-too-soon-to-know-who-warns/

৪। https://www.livemint.com/news/india/all-schools-in-delhi-to-reopen-from-today-covid-19-guidelines-and-other-details-11635725583788.html

৫। https://timesofindia.indiatimes.com/home/education/news/kerala-schools-reopen-after-long-covid-19-break/articleshow/87463018.cms

৬। https://timesofindia.indiatimes.com/home/education/news/after-18-months-schools-reopen-across-maharashtra-for-physical-classes/articleshow/86745389.cms

৭। https://indianexpress.com/article/cities/pune/maharashtra-offline-classes-for-primary-schools-students-to-resume-december-1-7641081/

৮। https://www.indiatoday.in/education-today/news/story/jharkhand-schools-reopen-from-today-for-classes-9-to-12-1835746-2021-08-02

৯। https://www.news18.com/news/education-career/jharkhand-schools-to-open-and-close-at-8-am-and-noon-respectively-4557812.html

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

%d bloggers like this: