এ বাঁচা কেমন বাঁচা? হাসাতে হাসাতে প্রশ্ন তুলে দিল ভূত তেরিকি

গত কয়েক বছরে ‘হরর কমেডি’-র মধ্যে দিয়ে লিঙ্গ রাজনীতি উলটে দেওয়ার দৃষ্টান্ত হিসাবে অমর কৌশিক নির্দেশিত হিন্দি ছবি স্ত্রী (২০১৮) এবং স্ত্রী ২ (২০২৪) নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। বাংলায় তেমন প্রয়াস এই সিরিজের আগে হয়নি বললেই চলে।

অনেকদিন আগে এক সাদা দাড়িওলা নাট্যকার বলেছিলেন ‘লোককে যদি সত্যিটা বলতে চাও, তাহলে তাদের হাসাও। নইলে লোকে তোমাকে মেরে ফেলবে।’ না, তাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নয়। নাট্যকার বলেছি বলে যদি বাদল সরকার ভাবেন, সেটাও ভুল। দুনিয়ার সব ভাল ভাল কথা বাঙালিরাই বলেছে এমন তো নয়। কথাটা বলেছিলেন আইরিশ নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ। পরিচালক কৌশিক হাফিজী আর সৃজনশীল পরিচালক অনির্বাণ ভট্টাচার্য, যে কোনো কারণেই হোক, কথাটা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছেন। তাই হইচইয়ের জন্য তাঁরা যে নতুন ওয়েব সিরিজ বানিয়েছেন, সেই ভূত তেরিকি, ভয় দেখাতে দেখাতেও হাসায়। হাসতে হাসতেও ভয় পেতে হয়, কারণ যা দেখানো হচ্ছে তা যে নেহাত বানানো নয়, সেটা ভুলে থাকতে চাইলেও দিব্যি টের পাওয়া যায়।

নির্মাতারা অবশ্য সত্যকথনের উদ্দেশ্য গোপন করার বিশেষ চেষ্টা করেননি। মৃণাল সেনের আকালের সন্ধানে ছবিতে কলকাতা থেকে এক দল যুবক-যুবতী গ্রামে গিয়েছিল দুর্ভিক্ষ নিয়ে কাহিনিচিত্র তৈরি করতে। এখানে ভূতের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্য সরাসরি তথ্যচিত্র বানানো। শুরুতেই প্রযোজক মিস্টার ডি’সুজা বলে দিয়েছেন ‘বাঙালি ভূত নিয়ে সিনেমা অনেক হয়েছে। কিন্তু, ডকুমেন্টারি একটাও হয়নি।’ তা এই তথ্যচিত্র থেকে যেসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে, সেগুলো বাংলা সংবাদমাধ্যমের ভাষায় ‘বিস্ফোরক’। ছবির প্রযোজক শুটিং শুরু হওয়ার আগেই মরে ভূত হয়ে যান! তাঁর জীবিত হিসাবরক্ষক ছবির বাজেট এক কোপে অর্ধেক করে দেন! ভূতুড়ে বাড়িতে চারজন পেতনির সঙ্গে বাস করে একজন মানুষ! সেই পেতনিরা আবার মানুষের সঙ্গে ‘ইন্টু মিন্টু’ করে!

কেলেঙ্কারির এখানেই শেষ নয়। একেক পেতনির একেকরকম পদ্ধতি পছন্দ। রাজিয়ার (দীপান্বিতা সরকার) একটি লোককেই পছন্দ – জয়ন্ত চক্রবর্তী (দেবরাজ ভট্টাচার্য)। কিন্তু রাজিয়া সঙ্গমে লিপ্ত হতে একেকবার একেকজন জীবিত মহিলার শরীরে ঢুকে পড়ে। তাতেও শখ মেটে না। আরও বৈচিত্র্যের সন্ধানে সে কী করে তা না বলাই ভাল। বললে ‘স্পয়লার’ দেওয়াও হয়ে যাবে, বাঙালির যৌনতা নিয়ে ছুঁতমার্গকে এক লপ্তে বড্ড বেশি আঘাত করাও হয়ে যাবে। সেই আঘাতে কোনো পাঠক তথ্যচিত্রের প্রযোজকের মত পটল তুললে এই প্রবন্ধের লেখক বিপদে পড়ে যাবেন। তিনি তথ্যচিত্রের পরিচালক, ‘ফা** ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকার’ সঞ্জয় লীলা ব্যানার্জির (দুর্বার শর্মা) চেয়ে কোনো অংশে কম অসহায় নন।

রাজিয়া তবু ১৭৫৯ সালে মারা যাওয়া পাঠান বাবা ও বাঙালি মায়ের গোলমেলে পরিবারের সন্তান। বিশুদ্ধ বাঙালি ঘরের বিধবা লবঙ্গ (রাত্রি চ্যাটার্জী) আবার নিশির ডাক ডেকে একেক রাতে একেকজন পুরুষ ধরে আনে! কখনো কখনো এক ডাকে একাধিক পুরুষও হাজির হয়! সবচেয়ে আধুনিক পেতনি সুকুমারী (ঐশ্বর্য সেন) অবশ্য সঞ্চয়িতা, শেষের কবিতা নিয়েই মগ্ন ছিল। কিন্তু তারও জীবদ্দশায় প্রেম করার, চুমু খাওয়ার, ‘মাজা দুলিয়ে দুলিয়ে’ নাচার সাধ পূরণ হয়নি। ফলে…দেখে নেবেন।

কী ভাবছেন? ‘ইরোটিক থ্রিলার’? না মশাই। মোটে একটা ‘অ্যাডাল্ট = বাজে/খারাপ’ দৃশ্য আছে। সেখানেও মহিলাটির দিকে ‘মেল গেজ’ দিতে গেলে ভিরমি খেতে হবে।

এই তিন পেতনির অভিভাবক যে, সেই বিষ্ণুপ্রিয়া বা ভানুদিদি (আভেরী সিংহ রায়) অবশ্য সেদিক থেকে সাত্ত্বিক মহিলা। তার সময় কাটে সদ্যমৃত মানুষকে ভীতিপ্রদ ভূত হয়ে ওঠার শিক্ষা দিয়ে। তবে চার পেতনির কেউ কিন্তু অতি পরিচিত ‘মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু’ তত্ত্ব প্রমাণ করে একে অন্যের পিছনে নিন্দেমন্দ করে না। বরং নিজেদের মধ্যে প্রাচীন বাংলায় গালাগালি দিয়ে চুলোচুলি করলেও পিছনে একে অপরের প্রশংসাই করে। লবঙ্গ পিসি যে শরবতে বিষ মিশিয়ে মানুষ মারে – সঞ্জয় লীলার দলকে এইটুকু সাবধানবাণী দেওয়া ছাড়া অন্যের পিছনে তার সম্পর্কে খারাপ কিছু বলার কোনো দৃষ্টান্ত নেই। বরং রাজিয়া আর সুকুমারী এক বাক্যে স্বীকার করে যে ভানুদিদি তাদের নেত্রী; রাজিয়া আর বিষ্ণুপ্রিয়া বলে সুকুমারী তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী। বেঁচে থাকলে ‘বাংলা বইয়ের হিরোইন’ হতে পারত।

সব মিলিয়ে ব্যাপারটা সাংঘাতিক না? বাঙালি পত্নী, থুড়ি পেতনি, এতখানি স্বনির্ভর হয়ে গেলে ব্যাপারটা যে খুবই ভয়ের হয়ে দাঁড়ায় তাতে সন্দেহ নেই। সেইজন্যেই তো ভীত সহকারী দেবদাসকে সঞ্জয় লীলা বলতে বাধ্য হয় – বউকে সব কথা বলতে নেই। সব পুরুষ সব কথা বউকে বলতে শুরু করলে পৃথিবীতে একটি পুরুষও আর বেঁচে থাকবে না। লক্ষণীয়, কথাটা শুনেই ভীত দেবদাস (সুব্রত সরকার) তাকায় পাশে বসা সহকারী পরিচালক মেয়েটির (উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি) দিকে। মায়ের নাম নিজের নামে যোগ করা সঞ্জয় লীলার সঙ্গে মেয়েটির ‘ইন্টু মিন্টু’ আছে, এমন ইঙ্গিত বারবার দেওয়া হয়েছে। এদিকে সঞ্জয় লীলা বিবাহিত না অবিবাহিত – তা কিন্তু জানতে পারা যায় না। কী ভাবছেন? ‘ফেমিনিস্ট টেক্সট’? আরে না না, অত গুরুতর কিছু নয়। তবে হ্যাঁ, এখানে কিন্তু ডাকাত ভূতকেও মেছো পেতনি বউয়ের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতে হয়। গত কয়েক বছরে ‘হরর কমেডি’-র মধ্যে দিয়ে লিঙ্গ রাজনীতি উলটে দেওয়ার দৃষ্টান্ত হিসাবে অমর কৌশিক নির্দেশিত হিন্দি ছবি স্ত্রী (২০১৮) এবং স্ত্রী ২ (২০২৪) নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। বাংলায় তেমন প্রয়াস এই সিরিজের আগে হয়নি বললেই চলে। কিন্তু ভূত তেরিকি কেবল ওতে আটকে থাকেনি। মজাটা সেখানেই।

নিশ্চয়ই ভাবছেন, হাসানোর ব্যাপারটা বোঝা গেল। ভয়ের ব্যাপারটাও নাহয় বোঝা গেল। কিন্তু এসবের মধ্যে সত্যি কোথায়? আজ্ঞে তা বুঝতে গেলে তো নিজে দেখতে হবে। আড়াই মিনিটের বেশি যে আমাদের ধৈর্য থাকে না সেকথা আজকাল কে না জানে! তার উপর বাংলা ভাষায় তৈরি কোনোকিছুর জন্যে আমাদের ধৈর্য আরও কম। তাই এই সিরিজের নির্মাতারা দর্শকদের জন্যে কিছু সহায়িকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন পর্দায়। সেগুলো খেয়াল করলে মজা পাবেন, সমৃদ্ধও হবেন। যেমন সমৃদ্ধ হবেন সদ্যোজাতকেও জয়ন্তর স্ত্রীর (মৈত্রী ব্যানার্জি) ইংরিজি বলতে শেখানোর তাড়া দেখে।

কণিষ্ককে নিয়ে অনাবশ্যক লম্বা মজা বা জয়ন্তর নিশির ডাক শোনার অভিনয়ের দৃশ্যের মত কিছু বাহুল্য বাদ দিলে এই অভিনব সিরিজের সবচেয়ে বড় জোর এর চমৎকার চিত্রনাট্য এবং বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ। স্রেফ চতুর কথার খেলা (pun) আর বহু ব্যবহৃত খিস্তি দিয়ে হাততালি পাওয়ার মত সংলাপ লেখার যে ধারা সাম্প্রতিককালে বাংলা সিনেমা আর ওয়েব সিরিজে দেখা যায়, ভূত তেরিকি একেবারেই সেই রাস্তায় হাঁটেনি। এখানে খিস্তি মানে সরাসরি কানে আঙুল দেওয়ার মত খিস্তি এবং অভিনব খিস্তি, যেমনটা বেরিয়েছে তথ্যচিত্রের জন্যে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময়ে ভূতের বাড়ির একমাত্র মানুষ বাসিন্দা তাপসের (শুভঙ্কর ঘটক) মুখ থেকে।

কিন্তু হাস্যরস, অদ্ভুতরস, আদিরস পেরিয়ে আরও এগিয়ে গেছে এই ওয়েব সিরিজ। দ্বিতীয় পর্বেই গল্পে এসেছে নতুন মোড় এবং সিরিজ যেখানে শেষ হয়েছে তা অপ্রত্যাশিত। এই পরিবর্তন সম্ভব হত না সকলের উঁচু মানের অভিনয় ছাড়া। যে পেতনিদের উপর গোটা সিরিজ দাঁড়িয়ে আছে, তাঁরা চোখ ফেরাতে দেন না। সাধারণত কলকাতার বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য কোনো বাংলায় কথা বলতে হলেই আজকের অভিনেতারা অনিচ্ছাকৃত হাস্যরস সৃষ্টি করে বসেন। কিন্তু এখানে বাঙাল টানে চমৎকার চালিয়ে গেছেন দীপান্বিতা; আভেরী নাকি সুর বজায় রেখে খাস পশ্চিমবঙ্গীয় ভাষায় কথা বলেছেন আগাগোড়া। ১৯৭০-এর দশকের আধুনিকার চরিত্রে ঐশ্বর্যও দারুণ সফল। তিনজনের হাঁটাচলা, ছলাকলায় যে বিভিন্নতা থাকার কথা ছিল তাও তাঁরা সযত্নে রক্ষা করেছেন। তার উপর আছে ভয় দেখানো – কোথাও চাউনির সামান্য পরিবর্তনে, কোথাও বসার বা দাঁড়ানোর ভঙ্গি বদলে। সেসবেও তিনজনেই সফল। ঐশ্বর্যকে এর উপর প্রেমের অভিনয়ও করতে হয়েছে।

আরও পড়ুন মানিকবাবুর মেঘ: অনন্য রোম্যান্টিক ছবি

দুর্বার এর আগে অনির্বাণের সৃজনশীল পরিচালনায় দুটো ওয়েব সিরিজে একেবারে দুই মেরুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন – ব্যোমকেশ ও পিঁজরাপোল-এ তলোয়ারের মত তীক্ষ্ণ ভুজঙ্গ ডাক্তার, আর তালমার রোমিও জুলিয়েট-এ গোবেচারা তপন। এখানে তিনি একইসঙ্গে বেচারা, ভীতু, আবার দলনেতা। ভয় পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু সেটা লুকিয়েও রাখতে হবে। নইলে শুটিংয়ের কর্তৃত্ব হাত থেকে বেরিয়ে যাবে। একখানা টুপি আর চশমায় ভর দিয়ে ভীরু, সংস্কৃতিবান অথচ অসহায় বাঙালির মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন এই তরুণ অভিনেতা। পেতনিরা কী করতে বললে মানবে আর কিসে রেগে যাবে, তা নিয়ে তাঁর সর্বক্ষণের আতঙ্ক; সহকারীদের কাজকর্মে, প্রযোজকের কীর্তিকলাপে হতাশা; পার্টির দৃশ্যে সহকর্মীর এবং নিজের প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা যেমন হাসির উদ্রেক করে, তেমনই টের পাওয়ায় – ঠিক কোন গাড্ডায় পড়ে আছি আমরা।

বাবা-মা-বউয়ের চোখে ফালতু, অথচ পেতনির সঙ্গে মাঠে ঘাটে খাটে খাটে খেলে বেড়ানো বেচারা ভদ্রলোকের চরিত্রে দেবরাজ এতটাই জ্যান্ত, থুড়ি জয়ন্ত, হয়ে উঠেছেন যে তাঁকে দেখলেই মনে পড়ে নবারুণ ভট্টাচার্যের লাইন ‘বাঙালি শুধুই খচ্চর নয়, তদুপরি অসহায়’। ভদ্রলোকের যাবতীয় ভালমানুষি ও ভণ্ডামি ভারি নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন দেবরাজ।

কমলেশ নামক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আছেন শৌনক কুন্ডু। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁকে দ্বিধা, বিষাদ, পূর্বরাগ, প্রেম, বিস্মৃতি – অনেককিছু ফুটিয়ে তুলতে হয়েছে। তাঁরই ঠোঁটে আছে এই সিরিজের সূক্ষ্ম অথচ সবচেয়ে মোক্ষম খোঁচা দেওয়া সংলাপ ‘কী হয়েছে মানুষের? এত রাগ, এত হিংসে…’। দ্বিতীয় পর্বের কমলেশ আর শেষ পর্বের কমলেশ প্রায় দুটো আলাদা চরিত্র। দুটোতেই দিব্য উতরে গেছেন শৌনক। গোটা সিরিজে সাকুল্যে আড়াই-তিন লাইন সংলাপ বলতে হওয়া উজ্জয়িনী বা শুটিং দলের অন্যদের অভিনয়েও এক চুল খামতি নেই।

ভূতুড়ে পরিবেশ তৈরি করতে অসামান্য ভূমিকা নিয়েছে অনিমেষ ঘড়ুইয়ের ক্যামেরা আর উজান চ্যাটার্জির আবহসঙ্গীত। অনিমেষের নৈপুণ্য তুঙ্গে উঠেছে একেবারে শেষ পর্বে রবীন্দ্রসঙ্গীতের গায়ে কাঁটা দেওয়া ব্যবহারে। এক স্মরণীয় শটে তিনি মিলিয়ে দিয়েছেন ভূতের বাড়ির আলো আঁধারি আর গানের ‘সেইখানেতে সাদায় কালোয়   মিলে গেছে আঁধার আলোয় –’ । ভূতের ছবির আবহসঙ্গীত প্রায়শই অকারণে কান ঝালাপালা করে। কিন্তু উজান মজা আর গা শিরশিরে ভাব মিলিয়েছেন শব্দের পরিমিত ব্যবহারে।

তবে এত উপাদেয় রান্নায় নুন কিন্তু গানগুলো। আগেও দেখা গেছে, অনির্বাণের কলম আর দেবরাজের সুর ও কণ্ঠ মিললে গুনগুন করার মত এক বা একাধিক গান তৈরি হয়ে যায়। এই সিরিজেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। মধুপূর্ণা গাঙ্গুলির গাওয়া শীর্ষসঙ্গীত তো বটেই, দেবরাজ আর ঝিনুক বসুর গাওয়া ‘একটা প্রেম করি’-ও শ্রুতিমাধুর্যে তেমন গান হয়ে উঠেছে। গানের কথায় আশ্চর্য কাণ্ড অবশ্য ঘটেছে ঐশ্বর্য রায়ের গাওয়া ভূতেদের পার্টির গানে।

ভয় দেখাও, ঘাড় মটকাও, খেয়ে নাও সমস্যা
পূর্ণিমা খেয়ে নাও, ঢেঁকুর তোলো অমাবস্যা।

রাজনীতি খেয়ে নাও, ঢেঁকুর তোলো মানবিকতা।

এসব লাইন সহজে ভোলার নয়, যেমন ভোলা যাবে না সমাধানবাবুকে। র‍্যাপার ভূতো (বুদ্ধদেব দাস; কণ্ঠে অনির্বাণ) আর রজনীগন্ধার স্টিক লাগিয়ে হারমোনিয়াম নিয়ে ‘কেউ বেঁচে নেই’ গাইতে বসা গায়ককে (উজান) আবার হজম করা শক্ত বলে ভোলা কঠিন।

এই সিরিজের দুর্বলতা বলতে প্রথম দেড়খানা পর্বের বিপুল মজা সত্ত্বেও গল্প দানা না বাঁধা। তাছাড়া ভানুদিদি কী করে মারা গেলেন সে ব্যাখ্যাও কোথাও নেই। ব্যাপারটা বিসদৃশ লাগত না, যদি একমাত্র তাঁর বেলাতেই এমনটা না ঘটত। আর সবচেয়ে বড় শক্তি কী? প্রচণ্ড হুল্লোড় সত্ত্বেও গিলতে আসা বিষাদ। কারণ এই সিরিজে সারাক্ষণ মনে হয়, অশরীরীরা শরীরী হয়ে উঠতে চাইছে আর শরীরীরা মরলে বাঁচে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

জনপ্রিয় বাংলা ছবির সযত্ন সন্ধানে তালমার রোমিও জুলিয়েট

তালমা কোথায়? যাদবপুর এইট বি থেকে দমদম বিমানবন্দর, হাওড়া স্টেশন থেকে নিউটাউন পর্যন্ত বাংলা সিনেমার যে পরিচিত প্রেক্ষাপটে চরিত্রগুলো ঘোরাফেরা করে, তালমা সেখান থেকে অনেক দূরে।

‘শিক্ষিত, রুচিশীল দর্শকের জন্য ছবি বানিয়েছেন অমুক।’

‘তমুকের ছবি গ্রামের দিকে দারুণ চলে।’

‘বহুদিন পরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জন্যে বাংলা ছবি করেছেন অমুক।’

‘তমুক জানেন গ্রামের দর্শককে কীভাবে হলে আনতে হয়।’

‘শহরের দর্শকের পালস অমুক যেমন ধরতে পারেন, আর কেউ পারে না।’

এই কথাগুলো এবং এই জাতীয় আরও অনেক ক্ষতিকর এবং/অথবা মিথ্যা বুলি পরম সন্তোষে প্রায় বিশ বছর ধরে আওড়ানোর পর আমরা এতদিনে টের পেয়েছি – বাংলা ছবি বলে যে জিনিসটা ছিল, সেটাকে অন্তর্জলি যাত্রায় পাঠানো হয়ে গেছে। টালিগঞ্জের মাত্রাছাড়া তোলাবাজি আর পেশিশক্তি হাজির হয়েছে ডোম হয়ে; মাল্টিপ্লেক্সের দুর্মূল্য টিকিট আর সারা পৃথিবীর ‘কনটেন্ট’ দেখার জন্যে সুলভ স্মার্টফোন এসেছে শাস্ত্র মতে প্রায়শ্চিত্ত করে মৃত্যু নিশ্চিত করার পুরুতঠাকুর হিসাবে। সেকালে নদীর ধারে শায়িত মানুষটার নাভিশ্বাস উঠতে দেখে তারই আত্মীয় পরিজন যেভাবে পরমানন্দে খোল করতাল বাজিয়ে মৃত্যু ত্বরান্বিত করত, সেভাবে পশ্চিমবাংলার সিনেমার তথাকথিত জনপ্রিয় পরিচালক, অভিনেতা প্রমুখ এখনো ফেলুদা-ব্যোমকেশ-একেন-সোনাদা আর রিমেক নিয়ে মেতে আছেন। অনেকে আবার নাকটাকে আকাশের দিকে তুলে আশা করছেন যে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল স্বর্গ থেকে তাঁদের সিনেমা বৈঠক ছেড়ে নেমে এসে বাংলা ছবিকে বাঁচাবেন। আশার কথা হল, বাঙালি সংস্কৃতির এই ধাপার মাঠে দাঁড়িয়েও শহর, গ্রাম, ধনী, গরিব নির্বিশেষে দেখবে এবং ভাল লাগবে – এমন বড় পর্দার ছবি বা ওটিটি কনটেন্ট বানানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন গুটিকতক শিল্পী। তেমনই কয়েকজন মিলে উইলিয়ম শেক্সপিয়রের কাছে হাত পেতে নিয়ে এসেছেন তালমার রোমিও জুলিয়েট। সকলেই তো আর মজা দেখে না বা উদাসীন থাকে না, কেউ কেউ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে মুমূর্ষুর প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টাও করে। কতটা পারলেন আর কতটা ব্যর্থ হলেন তা নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করব। দর্শকরা তো রায় দেবেনই।

তালমা কোথায়? যাদবপুর এইট বি থেকে দমদম বিমানবন্দর, হাওড়া স্টেশন থেকে নিউটাউন পর্যন্ত বাংলা সিনেমার যে পরিচিত প্রেক্ষাপটে চরিত্রগুলো ঘোরাফেরা করে, তালমা সেখান থেকে অনেক দূরে। হইচই প্ল্যাটফর্মে সদ্য মুক্তি পাওয়া এই ওয়েব সিরিজের সৃজন নির্দেশক অনির্বাণ ভট্টাচার্য এর আগে একক নির্দেশনায় শেক্সপিয়রেরই আরেক বিখ্যাত ট্র্যাজেডি ম্যাকবেথ স্বীকরণ করে তৈরি করেছিলেন মন্দার (২০২১)। সেখানেও বাঙালি সংস্কৃতির চেনা এলাকা ছাড়িয়ে তিনি দর্শককে নিয়ে গিয়েছিলেন গেইলপুর নামে সমুদ্র তীরবর্তী এক মফস্বলে। জায়গাটা দারুণ জীবন্ত হলেও নামটা ছিল কাল্পনিক। এখানে কিন্তু পরিচালক অর্পণ গড়াই, অনির্বাণ আর চিত্রনাট্যকার দুর্বার শর্মা জলপাইগুড়ি জেলার এক সত্যিকারের জনপদে নিয়ে ফেলেছেন শেক্সপিয়রের চিরকালীন প্রেমের আখ্যানকে। আমরা তালমা চিনি না, কারণ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি শিশিরবিন্দু দেখা আমাদের স্বভাব নয়। উত্তরবঙ্গ আমাদের কাছে বেড়াতে যাওয়ার জায়গা। উত্তরবঙ্গ মানেই পাহাড়, কাঞ্চনজঙ্ঘা, মেঘ। অথচ তালমার রোমিও রানা আর জুলিয়েট জাহানারা কিন্তু তাদের শেক্সপিয়র নির্ধারিত চিরবিচ্ছেদের মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে প্রথমবার পাহাড়ে যায়। গেইলপুরের চরিত্রগুলোর ভাষা যেমন কলকাতার বাংলা নয়, তালমার ভাষাও তেমন কলকাতার তথাকথিত মান্য বাংলা নয়। তালমা স্রেফ শুটিংয়ের জায়গা নয় এই ওয়েব সিরিজে। এই গল্প একান্ত তালমার, সেখানকার মানুষের। ভুয়ো আধার কার্ড, বেআইনি অস্ত্র, ভেড়ুয়া পুলিস আর তোলাবাজির রাজনীতি সমেত। সেই কারণেই ৪০০ বছর আগেকার ইংরেজ নাট্যকারের ইতালি থেকে আমদানি করা আখ্যান আমাদের তালমার সঙ্গে দিব্যি মানিয়ে যায়। যা একান্ত ব্যক্তিগত, তা-ই তো সর্বজনীন।

বস্তুত গেইলপুরের চেয়ে তালমা আরও জলজ্যান্ত। অতিকায় ট্র্যাজেডির ধারা মেনে এখানে মজুমদার বেকারীর মালিকদের বাড়ির ছোট ছেলে, ফুটবলার এবং ‘লুচ্চা’ রানা (দেবদত্ত রাহা) আর চৌধুরী বাড়ির আদুরে বড় মেয়ে জাহানারা (হিয়া রায়) আছে। দুর্ধর্ষ খলনায়ক মোস্তাক (অনির্বাণ) আছে। পুরনো শত্রুতায় পুড়তে থাকা মজুমদার বাড়ির কর্তা বাদল (কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়) আর চৌধুরী বাড়ির কর্তা লিয়াকত (জয়দীপ মুখার্জি) আছে। শেক্সপিয়রের টাইবল্টের জায়গা নেওয়া মোস্তাকের বিপরীতে বেনভোলিওর স্থানে আছে রানার দাদা সোমনাথ (অনুজয় চট্টোপাধ্যায়)। আছে সুযোগসন্ধানী পুলিস ইন্সপেক্টর সামন্ত (দেবদাস ঘোষ)। কিন্তু পাশাপাশি আছে সাধারণত্ব ছাড়া বিন্দুমাত্র অসাধারণত্ব নেই এমন অনেকে। যেমন শেক্সপিয়রের রোমিওর ঘনিষ্ঠ মার্কুশিওর মত রানার বন্ধু পাপাই (উজান চ্যাটার্জি) আর দীপ (শিলাদিত্য চ্যাটার্জি)। অমিতাভ বচ্চন, সলমান খান, রোনাল্ডো, জিদানের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ছবি লাগিয়ে রাখা সেলুন মালিক টান্টু (রাজু ধর)। আছে সোমনাথের বাল্যবন্ধু তপন (দুর্বার), যার ট্র্যাভেল এজেন্সির ব্যবসা কিছুতেই সুবিধা করতে পারে না, প্রথমবার কাটা বন্দুক চালাতে গিয়ে যে ঘেমে চান হয়। কিন্তু সোমনাথের মাথায় মোস্তাক বন্দুক ধরলে যার পালটা বন্দুক তাক করতে হাত কাঁপে না। আর আছে রানার স্নেহশীল বৌদি মৌসুমি (পায়েল দে), যার অসাধারণ সাধারণত্ব আখ্যানের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

তালমায় আরও আছে ফাইনালে জিতলে নগদ টাকার সঙ্গে খাসি পুরস্কার আর হারলে কিছু কম টাকার সঙ্গে মুরগি পুরস্কার দেওয়ার ফুটবল টুর্নামেন্ট, ধন্যি মেয়ে (১৯৭১) ছবির সুখেন দাসের কথা মনে করিয়ে দেওয়া ঘোষক ও ধারাভাষ্যকার। আর আছে আজব উচ্চারণে হিন্দি, বাংলা, এমনকি রবীন্দ্রসঙ্গীতের লাইন মিশিয়ে চকড়া বকড়া কোট পরা ঘোষক সমেত, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেখানো নানারকম ভেলকির সান্ধ্য বিনোদন। উত্তরবঙ্গের এমন মফস্বল আর এইরকম চরিত্রের দেখা পেয়েছিলাম বছর চারেক আগে সাহিত্যিক এণাক্ষী রায়ের সুখেন মুর্মুর চদরবদর গল্প সংকলনে। কিন্তু বাংলা সিনেমা, ওয়েব সিরিজের পর্দায় এদের দেখা পাওয়া যায় না। সবার দেখার মত কনটেন্টের সন্ধানে কলকাতা ছেড়ে এই বেরিয়ে পড়া তালমার রোমিও জুলিয়েট সিরিজের বড় গুণ। সাম্প্রতিককালে এই গুণ আমরা দেখেছি প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ওয়েব সিরিজ বিরহী (২০২১-২৩), প্রসূন চ্যাটার্জির দোস্তজী (২০২১) ছবির মত কিছু প্রয়াসে। সময় চলে যায়, মানুষ থাকে না। কিন্তু বলার মত গল্পগুলো থেকে যায়। সে গল্প খুঁজে পাওয়ার চোখ থাকা চাই। অর্পণ-দুর্বার-অনির্বাণ সেই চোখের প্রমাণ দিয়েছেন।

অনুরাগ কাশ্যপ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বলিউডি সিনেমা বাস্তবের থেকে দূরে সরে যায় একেবারে সিনেমা তৈরির সময়েই। আউটডোর শুটিং করতে গিয়ে ধুলোমাখা রাস্তা পেলে আগে জল দিয়ে সেই রাস্তা ধোয়া হয়। ওই নকল রাস্তায় আর আসল সিনেমা হবে কোত্থেকে? এই বানানো পরিচ্ছন্নতাকে সৌমিক হালদারের ক্যামেরার ধারেকাছে ঘেঁষতে দেননি অর্পণ-অনির্বাণ। খাসির মাংসের দোকানের সাইনবোর্ডের ভুল বানান থেকে শুরু করে দোলের দিন রুপোলি রং মেখে ভূত ছেলে পর্যন্ত সবকিছুই তালমার রোজকার জীবনের একেকটা খণ্ড, তার বেশি কিছু নয়। সৌমিক তাঁর স্বভাবসিদ্ধ শৈল্পিকতায় ধ্বংসের পর শূন্য হয়ে যাওয়া নদীর কোলে কাত হওয়া নৌকো থেকে শুরু করে বিচ্ছেদকালীন সন্ধ্যার আকাশ, বাইসাইকেল কিকে গোলের উত্তেজক মুহূর্ত থেকে প্রতিশোধের তাড়নায় ছুটে বেড়ানোর ঠিক আগে বৌদ্ধমঠের প্রশান্তি ধরেছেন নিখুঁতভাবে। কিন্তু কখনো মনে হয় না এসব বানানো। ট্র্যাজেডির অনিবার্যতা যেন ভর করে সৌমিকের ক্যামেরায়।

রোমিও আর জুলিয়েটের আখ্যান ট্র্যাজেডি বটে, কিন্তু শেক্সপিয়রের অন্যান্য ট্র্যাজেডির সঙ্গে এই আখ্যানের এক বড় তফাত হল নিখাদ রোম্যান্টিকতা। ম্যাকবেথ, হ্যামলেট বা জুলিয়াস সিজার নাটকের মত ক্ষমতার লোভ, নিষিদ্ধ যৌনতা, অপরাধবোধ ইত্যাদি কিন্তু এই আখ্যানের চালিকা শক্তি নয়। যদিও এর সবগুলোই এই আখ্যানেও আছে। ফলে অর্পণদের এত আয়োজন মাটি হয়ে যেত রানা আর জাহানারার প্রেমের তীব্রতায় ঘাটতি থাকলে। নবাগত দেবদত্ত আর হিয়া তা হতে দেননি। দুর্বারের চিত্রনাট্যের গুণ এইখানে যে, ট্র্যাজিক জুটির জন্য এক বুক আবেগ বজায় রেখেও একবিংশ শতাব্দীর ইনস্টারিল প্রজন্মের প্রেমে যে দায়িত্ববোধের অভাব, দেখনদারির প্রাবল্য ঢুকে পড়েছে তার এক ধরনের সমালোচনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। রানা সেই কারণে শেক্সপিয়রের রোমিওর চেয়েও মানসিকভাবে দুর্বল। সে যতখানি আবেগপ্রবণ প্রেমিক, ততখানি সাহসী এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নয়। দেবদত্ত চরিত্রের এই দুটো দিক চমৎকার দক্ষতায় তুলে ধরেছেন। বেশ কয়েকদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে থাকার পরে বৌদির স্নেহের ছোঁয়া পেয়ে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলার দৃশ্যে আদৌ মনে হয়নি তিনি অভিনয় করছেন। অমন অভিনয় আজকাল সুলভ নয়।

হিয়ার প্রথম শক্তি হল তাঁর সৌন্দর্য। শেক্সপিয়রের রোমিও যখন জুলিয়েটকে বিখ্যাত ব্যালকনির দৃশ্যে দেখে, তখন তার মনে হয়েছিল ওদিকটা পূর্বদিক এবং জুলিয়েট হল সূর্য। তাঁকে চাঁদ হিংসা করছে। স্বর্গের সবচেয়ে উজ্জ্বল দুই তারা জুলিয়েটের চোখের মণি হয়ে বসেছে। দিনের আলো যেভাবে লণ্ঠনকে লজ্জা দেয়, সেভাবেই তার প্রোজ্জ্বল গাল লজ্জিত করে আকাশের তারাদের। সেই দ্বিতীয় দর্শনেই রোমিওর জুলিয়েটের হাতের দস্তানা হতে ইচ্ছে করেছিল, কারণ তাহলে তার গাল ছোঁয়া যেত। সুতরাং সুন্দর, নিষ্পাপ একখানা মুখ না থাকলে জাহানারার ট্র্যাজেডি দর্শককে ছুঁতে পারার কথা নয়। কিন্তু সুন্দর মুখই রোম্যান্টিক নায়িকা হওয়ার জন্যে যথেষ্ট নয়, ট্র্যাজেডিতে তো নয়ই। হিয়া আসল রাগ, কপট রাগ, উদ্ধত যৌনতা – সবেতেই নিজের ছাপ রাখতে পেরেছেন। তবে তাঁকে কিছুটা দুর্বল দেখিয়েছে একেবারে শেষদিকে, অবাধ্য হয়ে ওঠার মুহূর্তগুলোতে।

বরং চমকে দিয়েছেন মৌসুমির চরিত্রে পায়েল। উঁচু তারে বাঁধা নাটকীয় সিরিজে তিনি আটপৌরে গৃহবধূ হিসাবে আগাগোড়া নিচু স্বরের অভিনয় বজায় রেখেছেন। আখ্যানের এক মোক্ষম মুহূর্তে তাঁর রূপান্তর সেই কারণেই চমৎকৃত করে বেশি। বাদলের চরিত্রে কমলেশ্বর তাঁর অন্য অনেক অভিনয়ের মতই পরিমিত। এই সিরিজের ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের অভিনেতারাও যথাযথ। তবে চরিত্রের সঙ্গে দারুণ মানানসই চেহারা সত্ত্বেও লিয়াকতের চরিত্রে জয়দীপকে কিঞ্চিৎ দুর্বল লাগে। তালমার যে বাংলা উচ্চারণে অন্য সকলেই স্বচ্ছন্দ, তাতে তিনি ঠিক মানিয়ে নিতে পেরেছেন বলে মনে হয় না।

পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করলেও, দুজন অভিনেতা যতক্ষণ পর্দায় থাকেন, চোখ ফেরানো যায় না। একজন সিদ্দিকীর চরিত্রে বুদ্ধদেব, অন্যজন তপনের চরিত্রে দুর্বার নিজে। মাথামোটা অথচ অনুগত, প্রভুর প্রয়োজনে হিংস্র অনুচরের ভূমিকায় বুদ্ধদেব অসামান্য। তেমনি ছাপোষা, কিছুটা বোকা, বন্ধু অন্তপ্রাণ অথচ নিরীহ, ভীতু চরিত্রে দুর্বার নিখুঁত। তাঁর অভিনয় আরও অবাক করে এইজন্যে যে তাঁকে এর আগে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিড়িয়াখানা অবলম্বনে ব্যোমকেশ ও পিঁজরাপোল (২০২৩) সিরিজে ধুরন্ধর খুনি ভুজঙ্গধরের ভূমিকায় চকচকে তলোয়ারের মত দেখিয়েছিল।

সব শেষে যাঁর কথা বলতে হয় তিনি মোস্তাক, অর্থাৎ অনির্বাণ। শেক্সপিয়র টাইবল্টকে ভীতিপ্রদ করেই এঁকেছিলেন, দুর্বারের চিত্রনাট্য তাতে এক নতুন পরত যোগ করেছে। অনির্বাণ চরিত্রের দুদিকের জমিই সমান আধিপত্যে অধিকার করেছেন, তাঁর ছায়া আখ্যানের উপরে আরও দীর্ঘ হয়েছে। মোস্তাক কখনো ভয়ানক হিংস্র, কখনো ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুন। তাঁর সংলাপগুলোর মধ্যে ‘রিল্যাক্শ, ফুল বডি রিল্যাক্শ’ সিরিজের টিজার মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই সোশাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হয়ে গেছে। কিন্তু অভিনেতা অনির্বাণের জাত ঢের বেশি চেনা গেছে ‘দুনিয়ায় বাঁইচা থাকার থেকে বড় কোনো শাস্তি নাই’ বলার সময়ে, আর এমন একটি গোপন মুহূর্তে, যখন মোস্তাক অন্য মানুষ ছিল।

এইরকম কিছু মুহূর্ত, আর শেক্সপিয়রের নাটকে আসন্ন ট্র্যাজেডির ইঙ্গিত ছড়ানো সংলাপগুলোর উচ্চতা ছুঁয়ে ফেলার মত কিছু সংলাপের জন্য বলতেই হচ্ছে যে এই সিরিজের সবচেয়ে বড় শক্তি এর চিত্রনাট্য। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দুই ধর্মের প্রেমিক-প্রেমিকার রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি নিয়ে ওয়েব সিরিজ তৈরি করা হল অথচ সাম্প্রদায়িক স্টিরিওটাইপ ভেঙে দেওয়া হল – এও বড় কম কথা নয়। একথা ঠিক যে তালমার রাজনৈতিক দখল নিয়ে মজুমদার আর চৌধুরী পরিবারের রেষারেষি কিছুটা অস্পষ্ট রয়ে গেছে। ফলে রানার দাদা সোমনাথ কেন পকেটের টাকা খরচ করে পরোপকার করে বেড়ায় তারও একটামাত্র সংলাপ ছাড়া সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। জাহানারার বোন শাহীনের চরিত্রটাও না থাকলে কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি হত না। তবু বলতেই হবে যে এ এমন এক স্বীকরণ যা মূল আখ্যানে কিছু যোগ করতে পেরেছে। চারশো বছরে যুগ এত বদলে গেছে যে মৃত্যু আজ করুণতম ট্র্যাজেডি নয় – এই নিদারুণ সত্য তুলে ধরেছে তালমার রোমিও জুলিয়েট।

এই বিরাট কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে প্রাঞ্জল বিশ্বাস, দেবরাজ ভট্টাচার্য, দেবায়ন ব্যানার্জি, সুরঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়, ইমন চক্রবর্তীর গাওয়া গানগুলো। ইদানীং শোনার বহুক্ষণ পরেও গুনগুন করে গাইতে ইচ্ছে হয় এমন বাংলা গান খুঁজে পাওয়া ভার। একই সিরিজে সেরকম গোটা তিনেক গান উপহার দেওয়ার জন্যও সুরকার দেবরাজ ও বলরাম কংসবণিক এবং গীতিকার অনির্বাণ, অনির্বাণ সেনগুপ্ত, নীলাঞ্জন ঘোষালদের প্রশংসা প্রাপ্য। শুরুতেই ট্র্যাজেডির বিষাদ ছড়িয়ে দিতে হেমাঙ্গ বিশ্বাস রচিত গানের ব্যবহারও সার্থক।

সিরিজটা সফল হয়েছে না ব্যর্থ, তা ঠিক করবে জনতা জনার্দন আর মহাকাল। কিন্তু জনপ্রিয় বাংলা ছবি, ওয়েব সিরিজের জন্য এঁদের সন্ধানে যে যত্নের ছাপ দেখা গেছে তা তৃপ্তিদায়ক। অন্য কোনো যুগে হয়ত নির্মাতারা সাহস করে এ জিনিস বড় পর্দার জন্যেই করতে পারতেন। তেমন রসদ এতে আছে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ব্যোমকেশ ও পিঁজরাপোল: পুরনো কাহিনি, নতুন দিগন্ত

ব্যোমকেশের সঙ্গে এই ভুজঙ্গের ভেদ এতটাই কম যে অজিত তার মধ্যে অপরাধীসুলভ ধূর্ততা আছে বলে সন্দেহ করায় ব্যোমকেশ বলে ফেলে “পরিচয় না থাকলে বোধহয় আমাকেও সেরকমই ভাবতে।”

“পৃথিবী বদলে গেছে/তাতে কি নতুন লাগে?/তুমি আমি একই আছি/দুজনে যা ছিলাম আগে”। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি দর্শক আর গোয়েন্দা গল্প নিয়ে ছবি বা ওয়েব সিরিজের সম্পর্কটা অনেকটা উত্তমকুমার অভিনীত আনন্দ আশ্রম ছবির এই গানটার মত। দুনিয়া জুড়ে এই ধরনের ছবিতে (এবং সাহিত্যে) আমূল পরিবর্তন এসে গেছে। অথচ এখানে আজও ধুতি পাঞ্জাবি পরা কলঙ্কহীন ব্যোমকেশ, নিখুঁত দক্ষিণ কলকাতার ভদ্রলোক ফেলুদা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এই মহাজনদের পথে গমন করেই এখানে ওখানে একটু-আধটু রং বদলে সোনাদা, মিতিন মাসি, একেনবাবুরা চালিয়ে যাচ্ছেন। দর্শককুলের কারোর যে একেবারেই ক্লান্তি আসে না তা নয়, কিন্তু বহুবার দেখা জিনিসই ফের দেখে ‘আহা! কি দেখিলাম! জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না’ বলার লোকও নেহাত কম পড়ে না। ফলে প্রযোজক, পরিচালকরাও চালিয়ে যাচ্ছেন একই মাল প্যাকেট বদলে। হইচই ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ব্যোমকেশ সিরিজও প্রথম সাতটা সিজনে এই ছকের বাইরে বেরোতে পারেনি। নতুনত্ব হিসাবে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের টেক্সটে যা যা আমদানি করা হয়েছে, তাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রস ঘনীভূত হওয়ার বদলে পিরিয়ড পিসের দফারফা হয়েছে। দেখতে দেখতে মনে হয়েছে – period in pieces। সেই কারণে অষ্টম সিজন নিয়ে প্রত্যাশার পারদ খুব উঁচুতে রাখিনি। আগ্রহ ছিল শুধু দুটো কারণে – ১) এই নিয়ে চতুর্থবার চিড়িয়াখানা উপন্যাসটাকে পর্দায় নিয়ে আসা হচ্ছে। গল্পটা যারপরনাই রহস্যময় এবং গল্পে নানা পরত আছে। তা সত্ত্বেও, এমনকি সত্যজিৎ রায়ের হাতেও তেমন উৎকৃষ্ট ছবি হয়ে উঠতে পারেনি। এবার কী হবে? ২) মন্দার ওয়েব সিরিজের নির্দেশক অনির্বাণ ভট্টাচার্য এই সিজনে কেবল ব্যোমকেশের ভূমিকায় ক্যামেরার সামনে নেই, ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসাবে ক্যামেরার পিছনেও তাঁর বড় ভূমিকা থাকছে। পারবেন কি নতুন কিছু দেখাতে?

নূতনের কেতন দিব্যি উড়েছে, তাতে কালবোশেখীর ঝড় উঠল কিনা দর্শককুলের প্রতিক্রিয়ায় বোঝা যাবে। কিন্তু যাবতীয় একঘেয়েমি এবং স্টিরিওটাইপকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রবল চেষ্টা যে করা হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।

শরদিন্দুর গল্পের নাম চিড়িয়াখানা, সত্যজিতের ছবির নামও চিড়িয়াখানা, অঞ্জন দত্তের ছবির নাম ব্যোমকেশ ও চিড়িয়াখানা। কিন্তু পরিচালক সুদীপ্ত রায় ও ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর অনির্বাণ একই গল্প অবলম্বনে ছবি করলেও নামে নিয়ে এসেছেন পিঁজরাপোল শব্দটা। শরদিন্দু স্বয়ং গল্পে এই শব্দ ব্যবহার করেছেন বটে, কিন্তু শব্দটাকে স্বতন্ত্র গুরুত্ব দান করেছে এই সিরিজের অকুস্থল নির্মাণ। শরদিন্দু লিখেছেন খোলামেলা গোলাপ কলোনীর কথা, যার আয়ের উৎস ফুলের ব্যবসা। সত্যজিৎ, অঞ্জনও তেমনই দেখিয়েছিলেন। সুদীপ্ত-অনির্বাণ ঘটনাবলীকে এনে স্থাপন করেছেন এক চকমেলানো ইংরেজ আমলের বাড়িতে, যার নাম রোজি ম্যানশন। এখানকার ব্যবসা মাটির তৈরি জিনিসপত্রের। রোজি মেমসাহেবের প্রতি প্রেম অক্ষয় করে রাখতে থমাস সাহেবের তৈরি এই প্রাসাদোপম বাড়ির ঘরে বারান্দায় লিফটে চার পর্বের এই সিজনের অধিকাংশ দৃশ্যের অবতারণা। ফলে সমাজের মূলধারায় মিশতে না পারা এ বাড়ির বাসিন্দারা সকলেই পিঞ্জরাবদ্ধ, হয়ত দর্শক নিজেও – এই ধারণা ক্রমশ চেপে ধরে। অবশ্য এহ বাহ্য। পরিবর্তন এই একটা নয়, সব পরিবর্তনের কথা লিখবও না। কারণ তাতে সাহেবদের ভাষায় ‘স্পয়লার’ দেওয়া হয়ে যাবে।

অজিত চরিত্রের অভিনেতা বদলেছে এই সিজনে, এসেছেন ভাস্বর চ্যাটার্জি। তিনি একেবারে বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা অজিত – মিতভাষী, মিষ্টভাষী। তিনি শুধু ব্যোমকেশ নয়, সত্যবতীরও (ঋদ্ধিমা ঘোষ) ভরসাস্থল। টিনে মুড়ি ভরে রাখা, বাজার থেকে কাঁচকলা নিয়ে আসা, আটা মেখে দেওয়া – সবেতেই অজিত পারদর্শী। সাইডকিক কথাটার নিকটতম বাংলা প্রতিশব্দ সম্ভবত লেজুড়। শার্লক হোমসের ওয়াটসন বা আর্কুল পয়রোর হেস্টিংসকে সাইডকিক বলা হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলা ভাষায় সাইডকিকের একেবারে সমার্থক শব্দ যে পাওয়া যায় না, তার কারণ সম্ভবত বিখ্যাত বাঙালিরাও বন্ধুদের নিজের চেয়ে ছোট করে ভাবতেন না একসময়। শরদিন্দু তাই অজিতকে সাইডকিক হিসাবে আঁকেননি, সত্যজিৎও লালমোহন গাঙ্গুলিকে সাইডকিক হিসাবে নির্মাণ করেননি। আজকের পরিচালক এবং অভিনেতারা বোধহয় অন্য ধারণার মানুষ। তাই তাঁদের অজিত, লালমোহনরা ভাঁড় হয়ে ওঠেন। এই কুৎসিত প্রবণতা পরিহার করার জন্য সুদীপ্ত-অনির্বাণের প্রশংসা প্রাপ্য। ভাস্বরের মাধ্যমে তাঁরা এমন এক অজিতকে তৈরি করেছেন যে শরদিন্দুর অজিতের চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে। সে নেপাল গুপ্তের চ্যালেঞ্জ কবুল করে দাবা খেলতে বসে যায় এবং তাকে হারিয়েও দেয়।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে অবশ্য ব্যোমকেশ চরিত্রে। গত সাতটা সিজনের মত এই সিজনেও অভিনেতা সেই অনির্বাণই, কিন্তু এই সত্যান্বেষী একেবারে নতুন। শরদিন্দু যে লিখেছেন ব্যোমকেশ নিজেকে গোয়েন্দা বলতে পছন্দ করত না, তা সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের গোয়েন্দা গল্পগুলোর প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা, নাকি গোয়েন্দা চরিত্রের যে বহুমাত্রিকতা বিশ্বসাহিত্যে এবং সিনেমা/ওয়েব সিরিজে আজকাল দেখা যায় সেদিকে যাওয়ার নিজের সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা প্রচেষ্টা – তা বলা দুষ্কর। কিন্তু সন্দেহ নেই, শরদিন্দু সে লক্ষ্যে খুব বেশিদূর এগোননি। ‘কী হইতে কী হইয়া গেল’ কাহিনির সর্বশক্তিমান গোয়েন্দা না করে শরদিন্দু ব্যোমকেশকে আটপৌরে করেছেন ঠিকই, কিন্তু ব্যোমকেশ নিঃসন্দেহে সর্বগুণান্বিত। সে পাঁচজনের একজন নয়, একেবারে পঞ্চম। সে তার প্রতিপক্ষদের চেয়ে তীক্ষ্ণ তো বটেই, বেশি শক্তিশালী এবং বেশি সৎও বটে। এ ধরনের সত্যান্বেষী এই ২০২৩ সালে অবিশ্বাস্য মনে হয়। কারণ অমন মানুষ আজ দুনিয়ায় বিরল, যাত্রার বিবেকের মতই অলীক। এই ওয়েব সিরিজে অনির্বাণ যে ব্যোমকেশের ভূমিকায় অবতীর্ণ, সে কিন্তু অন্য লোক।

সত্যজিতের উত্তমকুমার, বাসু চ্যাটার্জির রজিত কাপুর, অঞ্জনের আবীর চ্যাটার্জি বা যীশু সেনগুপ্ত, দিবাকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুশান্ত সিং রাজপুত – সকলেই ব্যোমকেশের মূল পোশাক হিসাবে ধুতি পাঞ্জাবিকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। অনির্বাণকেও এর আগের সিজনগুলোতে মূলত সেই পোশাকেই দেখা গেছে। এখানে অজিত ধুতি পাঞ্জাবিতে থাকলেও ব্যোমকেশ বাড়িতে পাঞ্জাবি পাজামায়, বাইরে আগাগোড়া শার্ট প্যান্টে। এই বহিরঙ্গের আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শরদিন্দুর ব্যোমকেশের মত এই ব্যোমকেশ নিশানাথ সেন ৫০ টাকার জায়গায় ভুল করে ৬০ টাকা দিয়ে গেছেন দেখে ফেরত দেওয়ার কথা চিন্তাও করে না। দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে অজিতকে বলে, ভেবে নেওয়া যাক পরিশ্রমের দাম হিসাব করতে জজসাহেব ভুল করেছেন। উপরন্তু আগাগোড়া ব্যোমকেশ একজন পেটরোগা লোক। বারবার শৌচালয়ে যাওয়ার প্রয়োজন তার তদন্তেও ব্যাঘাত ঘটায়। বরং অজিত শক্তপোক্ত। পানুগোপালের মৃত্যুর খবরে দেখা যায় রেগে গেলে ব্যোমকেশের মাথার ঠিক থাকে না। জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে দেয়, চিৎকার করে, অজিতকে ওই মৃত্যুর জন্য দায়ী করে। এই নিজের উপর শারীরিক ও মানসিক নিয়ন্ত্রণহীন গোয়েন্দা (আচ্ছা, সত্যান্বেষীই হল) বাংলা ছবি, সিনেমায় প্রায় অপরিচিত। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে তৈরি শবর সিরিজের শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে তবু কিছুটা মানবিক দোষ, মানসিক অসুখ – এসব দেখা যায়। কিন্তু সে পেশায় পুলিস অফিসার। পদমর্যাদা তার রক্ষাকবচের কাজ করে, এই ব্যোমকেশের তেমন কোনো রক্ষাকবচ নেই। উল্টে রহস্যের শেষ জটটা ছাড়াতে তাকে হাফপ্যান্ট পরা হাবিলদারের ছদ্মবেশ ধারণ করতে হয়।

অভিনয়ক্ষমতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে এই নতুন ব্যোমকেশকে জীবন্ত করে তুলেছেন অনির্বাণ। প্রতীক দত্তের চিত্রনাট্য এবং সংলাপের গুণে আরও যা হয়েছে তা হল স্বাধীনতার সামান্য পরের যুগের এমন এক চিন্তাশীল যুবকের নির্মাণ, যার চিন্তাভাবনা এই ২০২৩ সালেও অনুরণন তোলে। হইচইয়ের এই সিরিজে অতীতে ব্যোমকেশকে জীবনানন্দ দাশের কবিতার লাইন আওড়াতে দেখা গেছে। কিন্তু তা নেহাতই প্রক্ষিপ্ত মনে হয়েছে। একে তো যে সময়কাল তুলে ধরা হয়েছে তখন জীবনানন্দ মোটেই যুবকদের মুখে মুখে ফিরতেন না, উপরন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতির সঙ্গে লাগসই না হলে কোনো দৃশ্যে অমন শক্তিশালী কবির পংক্তি স্রেফ জ্ঞান ফলানোর প্রচেষ্টা বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক। এই সিজনে ব্যোমকেশ জীবনানন্দ আওড়ায় না, অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে পড়ে থাকা গাড়ির ধ্বংসস্তূপ দেখে তার প্রতিক্রিয়ায় সংবেদনশীল দর্শকের কেবল জীবনানন্দ নয়, টি এস এলিয়টও মনে পড়তে পারে। তবে এমন ব্যোমকেশ নিজের ডায়রিতে ‘বনলক্ষ্মী’ না লিখে ‘বনলক্ষী’ লিখলে মর্মাহত হতে হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পূর্ব দাঙ্গা দেখে মনুষ্যত্ব সম্পর্কে আশাহীনতা ও বিষাদ এখানে কেবল ব্যোমকেশ নয়, নিশানাথেরও অভিজ্ঞান। তা অবশ্য শরদিন্দুর কলমেও এসেছিল, কিন্তু এই নিশানাথ (বাবু দত্তরায়) আরও বেশি কটু। তাঁর বয়স যত বাড়ছে তত জীবের চেয়ে জড়ের উপরেই নাকি টান বেড়ে চলেছে। এমনকি অজিতও তার গল্পে বড় বেশি নৃশংসতা এনে ফেলছে বলে সত্যবতী অভিযোগ করে। পিরিয়ড পিস মানে যে কেবল জামাকাপড়ের সাবেকিয়ানা আর সেপিয়া টোনের ছবি নয়, ব্যোমকেশ ও পিঁজরাপোল তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এখানে চরিত্রগুলো, দৃশ্যাবলী এবং শব্দ – সব মিলেই সময়কে ধারণ করেছে। রেডিওতে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠ পর্যন্ত এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খবর নিয়ে। এসেছেন দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেন। এ জন্যে সঙ্গীত ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের দায়িত্বপ্রাপ্ত শুভদীপ গুহ প্রশংসার্হ। আবহে স্রেফ লাইন দুয়েক রবীন্দ্রনাথের গান দৃশ্যকে কোন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে, হিন্দি ছবির গান বাজানো বাংলা মেগাসিরিয়ালের যুগে দাঁড়িয়ে এই ওয়েব সিরিজ তাও দেখিয়ে দিল। সেতারের কথা আর না-ই বা বললাম।

শরদিন্দুর ডায়রি অনুযায়ী, চিড়িয়াখানা লেখা শেষ হয় ২০ জুলাই ১৯৫৩। এই সিজন শেষ হয়েছে ১৯৫২ সালের নির্বাচনে (তথ্যটা বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকার বাহুল্য না দেখালেই ভাল হত) ব্যোমকেশ, অজিত ও সত্যবতীর ভোটদান করে বেরিয়ে আসার দৃশ্য দিয়ে। যে নিশানাথ জাঁক করে বলেছিলেন “I deserve democracy, they don’t”, অর্থাৎ পিঁজরাপোলের অন্যরা গণতন্ত্রের যোগ্য নয়, সেই নিশানাথের ভোট দেওয়া হয়নি। ব্যোমকেশ তাঁর কথাকে ব্যঙ্গ করে স্ত্রী এবং বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে, ও কথার মানে কী? গণতন্ত্র সকলের জন্য না হলে যে কারোর জন্যই টেকে না, তা তিনি জীবন দিয়ে বুঝেছেন, এখন আমরা বুঝছি। নিশানাথকে শরদিন্দুর অজিত ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেনি, দময়ন্তীকেও নয়। তার মতে “… এ জগতে কর্মফলের হাত এড়ানো যায় না, বিনামূল্যে কিছু পাওয়া যায় না। নিশানাথ কঠিন মূল্য দিয়াছেন, দময়ন্তীও লজ্জা ভয় ও শোকের মাশুল দিয়া জীবনের ঋণ পরিশোধ করিতেছেন।” শরদিন্দুর এই সামাজিক রক্ষণশীলতাকে অতিক্রম করে গেছেন চিত্রনাট্যকার প্রতীক। এখানে ব্যোমকেশ নিশানাথের প্রতি সহানুভূতিহীন কারণ তিনি বিচারক হয়ে, অন্যের অসহায়তার সুযোগ নিয়েও নিজেকে অন্যদের চেয়ে উঁচু ভাবতেন, অগণতান্ত্রিক ছিলেন। কিন্তু দময়ন্তীকে সমান দোষী ভাবা হয়নি, লাল সিংয়ের মৃত্যু সংবাদ জানার পর তাকে (মৈত্রী ব্যানার্জি) বৈধব্য পালন করতে দেখা গেছে। অর্থাৎ তার অন্তরের পবিত্রতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হল। এতসব করা গেছে অতিনাটকীয় সংলাপ বা কান্নাকাটি ছাড়াই, স্রেফ কয়েকটা শটে। চিত্রনাট্যকারের এ প্রশংসনীয় সাফল্য।

আরও পড়ুন টলমলে ট্রিবিউটে ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি গুবলেট

তবে চিত্রনাট্যকার, নির্দেশক আর ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টরের সবচেয়ে বড় সাফল্য বোধহয় শরদিন্দুর থেকে এতখানি সরে এসেও তাঁর সমস্ত ব্যোমকেশ কাহিনিতে উপস্থিত সেই উপাদানকে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা – যা এই চিড়িয়াখানা গল্পে প্রচুর পরিমাণে থাকলেও এর আগেকার চলচ্চিত্রকাররা হয় ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন, অথবা সন্তর্পণে পাশ কাটিয়ে গেছেন। উপাদানটা হল যৌনতা। ব্যোমকেশের প্রায় সব গল্পেই আদিম রিপু কোনো না কোনো ভূমিকায় থাকে। প্রচ্ছন্ন অথচ তীব্র – এই হল শরদিন্দুর ব্যোমকেশ কাহিনির যৌনতার বিশেষত্ব। এখানে পানুগোপাল চরিত্রে বুদ্ধদেব দাস, নজর বিবির চরিত্রে দীপান্বিতা সরকার, সর্বোপরি বনলক্ষ্মীর চরিত্রে অনুষ্কা চক্রবর্তী সে জিনিস জীবন্ত করে তুলেছেন। প্রথম দুজন তো প্রায় বিনা সংলাপে। তিনজনকেই যোগ্য সঙ্গত করেছে অয়ন শীলের ক্যামেরা। এমনকি সত্যবতীর চরিত্রে ক্রমশ উন্নতি করতে থাকা ঋদ্ধিমাও নীরবে যৌন ব্যাকুলতা ফুটিয়ে তোলেন আলো নেভানোর মন্থরতায়, পাশের খালি বালিশে হাত রাখায়। অকৃতদার অজিতের স্বপ্নে বনলক্ষ্মীর মুখ বদলে সত্যবতী হয়ে যাওয়াও অতুলনীয়।

তবে এতকিছুর সবই মাটি হতে পারত ভুজঙ্গ ডাক্তারের চরিত্রে দুর্বার শর্মা অমন দুর্দান্ত অভিনয় করতে না পারলে। ব্যোমকেশের প্রতিস্পর্ধী খলনায়ক রচনা করতে শরদিন্দু ভালবাসতেন। ‘সত্যান্বেষী’ গল্পের অনুকূল ডাক্তার থেকেই ম্যাড়মেড়ে খলনায়ক তাঁর অপছন্দ, ব্যোমকেশকে তার স্রষ্টা বিনাযুদ্ধে সূচ্যগ্র মেদিনী জয় করতে দেননি। এখানেও শেষ সকালের আগে পর্যন্ত ভুজঙ্গ ব্যোমকেশের চেয়ে বেশি তৎপর, বেশি স্থিতধী, বেশি আত্মবিশ্বাসী। দুর্বার প্রত্যেকটা সংলাপ বলেন ভেবেচিন্তে, একটা তিরও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। আবার ডাক্তারি করার সময়ে তাঁর মধ্যে সংবেদনশীলতার কোনো অভাব দেখা যায় না। ব্যোমকেশের সঙ্গে এই ভুজঙ্গের ভেদ এতটাই কম যে অজিত তার মধ্যে অপরাধীসুলভ ধূর্ততা আছে বলে সন্দেহ করায় ব্যোমকেশ বলে ফেলে “পরিচয় না থাকলে বোধহয় আমাকেও সেরকমই ভাবতে।” দুর্বার যে দৃশ্যে ব্যোমকেশকে তার পেশা নিয়ে দুকথা শোনান, সেখানে তাঁর অভিনয় তলোয়ারের মত ঝলসে ওঠে। এই না হলে খলনায়ক! তাই বোধহয় শেষমেশ ব্যোমকেশেরও ভুজঙ্গকে একটা সুযোগ দিতে ইচ্ছা হয়। গল্পের ব্যোমকেশ কিন্তু ইচ্ছা করে সুযোগ দেয়নি। সে টেরই পায়নি ভুজঙ্গর মতলব।

এখানে ব্যোমকেশ সুযোগ তো দিল, তারপর কী হল? সেটা দেখে নেবেন। আমার দেখার আগ্রহ রইল, রহস্য গল্প নিয়ে তৈরি ছবি দেখার অভ্যাস বদলে দেওয়ার এত চেষ্টা সফল হয় কিনা।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত