হকারদের নিয়ে বেকার গোলমাল!

আমরা যারা লেখাপড়া শিখেছি খানিকটা, মাথার উপরে পাকা ছাদ আছে এবং ঘরে এসি, গ্যারেজে গাড়ি আছে— তারা চাই আইন একেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালিত হোক। রেলের জমিতে কেবল রেলের জিনিস থাকবে। দোকান কেন থাকবে? ঘরবাড়ি কেন থাকবে? অটো, টোটো কেন দাঁড়াবে?

যদি উচ্ছেদই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এসব ভাবার প্রয়োজন নেই। সরকারি সম্পত্তি মানে যে আসলে নাগরিকের সম্পত্তি— সেকথা কজন নাগরিকই বা জানে, বোঝে এবং বিশ্বাস করে? সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সকলকে জানানোর ব্যবস্থা তো কোনোদিন করাই হয়নি। আর এখন তো কে নাগরিক তা ঠিক করছে রাষ্ট্র। ফলে যদি কাল রেলের জমিতে ব্যবসা করা বা বসবাস করা মানুষকে অনাগরিক বলে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়, তাহলেই মুশকিল আসান।

পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের একমাস পূর্ণ হয়েছে। রাজ্যটা যে বদলে গেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ৯ মে-র আগে পর্যন্ত রাজ্যের সাধারণ মানুষ বলুন, বিরোধী রাজনৈতিক দলের লোকেরা বলুন আর সংবাদমাধ্যমই বলুন— সকলেই বলত যে পশ্চিমবঙ্গের বিরাট সমস্যা হল বেকার সমস্যা। গত একমাসে বেকার সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, প্রধান হয়ে গেছে হকার সমস্যা। হকাররা কার সমস্যা? এখন পর্যন্ত তাঁরা রেলের সমস্যা। কেন? না তাঁরা গোটা রাজ্যজুড়ে রেলের জমি দখল করে রেখেছেন। সম্ভবত সেই কারণেই লোকাল ট্রেন ঠিক সময়ে চলছে না, দূরপাল্লার ট্রেন ৩-৪ ঘন্টা লেট। রেলের জমি দখলমুক্ত হলেই স্টেশনগুলো হয়ে যাবে হলিউডি সিনেমার স্টেশনগুলোর মত। শিয়ালদা বা হাওড়া স্টেশন দখলমুক্ত করা হয়েছে, বাকিগুলোকেও করতে পারলেই আমাদের আর পাঁচ টাকার ভাঁড়ের চা বাদাম বিস্কুট দিয়ে খেতে হবে না। আমরা উন্নত দেশের লোকেদের মত এই অসহ্য গরমে আড়াইশো-তিনশো টাকার আইসড টি বা কোল্ড কফি খাব, সঙ্গে থাকবে কনফেকশনারির সম্ভার। যে নিত্যযাত্রীদের স্টেশনে পৌঁছলেই খিদেয় পেট চুঁই চুঁই করে, তাঁদেরও আর ডিম-পাঁউরুটি, ঘুগনি, মুড়ি-তরকারি— এ সমস্ত ছাইপাঁশ খেয়ে থাকতে হবে না। গত নভেম্বরেই রেল বোর্ড খাবারদাবার সম্পর্কে নিয়ম বদলে স্টেশন চত্বরে কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ড’স, পিৎজা হাট, হলদিরামদের দোকান খোলার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু দোকান খুলবে কোথায়? হকাররা বসে আছেন যে। হকারদের পাশেই দোকান খুললেও চলবে না। কজন আর ভাঁড়ের চা থাকতে লাটে, ফ্র্যাপে, ক্যাপুচিনো খেতে যাবে? এই সমস্যার সমাধান করতেই হত। অতএব পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার রেলের জায়গা খালি করতে নেমেছে।

যতই আসুক বিঘ্ন বিপদ, হাওয়া হোক প্রতিকূল, সরকার হকার ও বস্তি উচ্ছেদ করেই ছাড়বে। কাজটা দক্ষভাবে করতে রাজ্যের মুখ্যসচিবকে চেয়ারম্যান করে, রেলমন্ত্রক আর রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি আর কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে নিয়ে গঠন করা হয়েছে টাস্ক ফোর্স। টাস্কটি এমন যে ফোর্স ব্যবহার করতেই হবে। প্রথমে কেবল হকার উচ্ছেদ, বস্তি উচ্ছেদ চলছিল। এখন দেখা যাচ্ছে উত্তরপাড়া বা কোন্নগরের মত জায়গায় হকার উচ্ছেদের সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে টোটো স্ট্যান্ড, অটো স্ট্যান্ড স্টেশন চত্বর থেকে সরিয়ে দেওয়ার কাজকে। আপনি বয়স্ক হতে পারেন, অসুস্থ হতে পারেন, প্রতিবন্ধী হতে পারেন। আইন আপনাকে মানতেই হবে, অর্থাৎ ৫০/৬০/১০০ মিটার দূর থেকে হেঁটে স্টেশনে আসতে হবে। আইন সকলের জন্য এক। কথাটা আমাদের সংবিধানে লেখা আছে। তাই আমরা যারা লেখাপড়া শিখেছি খানিকটা, মাথার উপরে পাকা ছাদ আছে এবং ঘরে এসি, গ্যারেজে গাড়ি আছে— তারা চাই আইন একেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালিত হোক। রেলের জমিতে কেবল রেলের জিনিস থাকবে। দোকান কেন থাকবে? ঘরবাড়ি কেন থাকবে? অটো, টোটো কেন দাঁড়াবে?

ঠিক কথা। আমার জমিতে যেমন কেবল আমার সম্পত্তিই থাকতে পারে। সেখানে অন্য কাউকে কিছু করতে গেলে আমার অনুমতি নিতে হবে, আমার থেকে জমি কিনতে হবে বা লিজ নিতে হবে। নিদেনপক্ষে আমাকে ভাড়া দিতে হবে। রেলের বেলাতেই বা অন্য নিয়ম হবে কেন? তুমি গরিব বলে নিয়মকানুন মানবে না? যাদবপুর হোক আর ব্যারাকপুর। তোমাকে উঠে যেতেই হবে, না উঠলে বুলডোজার দিয়ে তুলে দেওয়া হবে। আইনে বুলডোজারের কথা কোথায় লেখা আছে সেটা অবশ্য জানা একটু শক্ত। আইনে বরং আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথা আছে, দেশের সব আইনেই থাকে। কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশেও যে আইনের কিছু এসে যায় না সেটা যাদবপুরের ক্ষেত্রে দেখা গেল। যাক সে কথা। দুনিয়া জুড়েই তো দেখা যাচ্ছে একটা আইনই স্বতঃসিদ্ধ— জোর যার মুলুক তার। নাহয় আমাদের এখানেও তাই হল। তাছাড়া অতীতে কি কখনো হকার উচ্ছেদ হয়নি? ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিপুল জয় পাওয়ার পরে পরেই তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারও করেছিল, তার বহু আগে বামফ্রন্ট সরকার কলকাতা শহরে ‘অপারেশন সানশাইন’ করেছিল। রেল করলেই দোষ?

হক কথা। আইন মেনে চলা উচিত, তার বাইরে কারও পা দেওয়া উচিত নয়। স্ট্রিট ভেন্ডার্স (প্রোটেকশন অফ লাইভলিহুড অ্যান্ড রেগুলেশন অফ স্ট্রিট ভেন্ডিং) অ্যাক্ট, ২০১৪ নামে একখানা আইন আছে। সেই আইনে বলে আছে, ততক্ষণ রাস্তার বিক্রেতাদের উচ্ছেদ করা যাবে না যতক্ষণ না টাউন ভেন্ডিং কমিটি সমস্ত বিক্রেতাদের বিষয়ে সমীক্ষা চালাচ্ছে এবং তারা যে বিক্রেতা, সেই সার্টিফিকেট দিচ্ছে। তারপর কোনো প্রয়োজনে ওইসব দোকান সরানোর দরকার থাকলে বিক্রেতাদের কমপক্ষে ৩০ দিনের নোটিশ দিতে হবে। আরও বলা আছে, উচ্ছেদ শেষ অস্ত্র। বরং বিক্রেতাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের অন্যত্র ব্যবসা করার সুযোগ দিতে হবে এবং এমন জায়গা চিহ্নিত করে দিতে হবে যেখানে তাঁরা ব্যবসা চালাতে পারেন। এই আইন অবশ্য চালু হয়েছিল ১ মে ২০১৪, মানে নরেন্দ্র মোদীর সরকার তৈরি হওয়ার হপ্তা দুয়েক আগে। এমন হতেই পারে যে আইনটি ওঁদের পছন্দ নয়। ওঁরা মনে করছেন এসব আদিখ্যেতা। তাহলেও তো আইনটি আগে বদল করতে হবে সংসদে পাশ করিয়ে। রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে স্বাক্ষর করাতে হবে। অবশ্য উন্নয়নে দেরি করা ঠিক নয়। সোনার বাংলা যত তাড়াতাড়ি বানানো যায় তত ভালো। সেক্ষেত্রে অত আইনকানুনের তোয়াক্কা করলে চলবে না।

আরও পড়ুন এসএসসি: স্থান কাল পাত্র গুলিয়ে যাওয়া সাংবাদিকের স্বীকারোক্তি

বোধহয় এই সূত্র মেনেই দিকে দিকে উচ্ছেদ চলছে। তবে ওই রেলের জমি সম্পর্কে দু-একখানা কথা আছে। রেল তো বি আর চোপড়ার বানানো দূরদর্শনের মহাভারতের কালচক্র নয় যে আদি অনন্তকাল ধরে ছিল। ১৮৫৩ সালের আগে ভারতে রেল বলে কিছু ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের রেলপথ এবং যেসব স্টেশনে উচ্ছেদ হয়েছে এখন পর্যন্ত, তাদের বয়স আরও কম। তা এই স্টেশনগুলো বানানোর জন্য রেল জমি পেল কোথায়? রেলের আগে এসব জমির মালিক ছিল কারা? ভারতের বহু সরকারি স্কুল, কলেজ, হাসপাতালের মত রেলের ইতিহাস ঘাঁটলেও দেখা যাবে যে এইসব জমি এক বা একাধিক ব্যক্তির সম্পত্তি ছিল। কোথাও বা কোনো গোষ্ঠীর সম্পত্তি ছিল। তাঁদের থেকে যৎসামান্য দামে, কখনো বা বিনামূল্যে রেল এইসব জমি পেয়েছিল। মানুষ সানন্দে দিয়েছিলেন, কারণ রেল হলে অনেক মানুষের সুবিধা হবে, তাঁদের নিজেদেরও হবে। সরকারি সম্পত্তি কথাটার ইংরিজি যে public property, সে তো আর এমনি এমনি নয়। এই পাবলিকের মধ্যে কিন্তু স্টেশন চত্বরের দোকানদার, টোটোচালক, অটোচালক— সবাই পড়েন। ফলে রেলের মালিক তথা রেলের জমির মালিক তাঁরাও। অন্তত যতক্ষণ না ভারতীয় রেল সরকারি সম্পত্তি থেকে এক বা একাধিক কর্পোরেটের সম্পত্তি হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বক্তব্য যদি এই হয় যে, রেলকে ভাড়া দিচ্ছ না বা লিজ নাওনি বলে তোমাকে রেলের এলাকায় ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না, তাহলে সমাধান খুব সহজ। এই হকার, বস্তিবাসী, টোটোচালক, অটোচালকদের সঙ্গে কাগজে কলমে চুক্তি করা। তাতে রেলেরও আয় হয়, এঁদেরও চোখের জল ফেলতে হয় না।

অবশ্য যদি উচ্ছেদই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এসব ভাবার প্রয়োজন নেই। সরকারি সম্পত্তি মানে যে আসলে নাগরিকের সম্পত্তি— সেকথা কজন নাগরিকই বা জানে, বোঝে এবং বিশ্বাস করে? সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সকলকে জানানোর ব্যবস্থা তো কোনোদিন করাই হয়নি। আর এখন তো কে নাগরিক তা ঠিক করছে রাষ্ট্র। ফলে যদি কাল রেলের জমিতে ব্যবসা করা বা বসবাস করা মানুষকে অনাগরিক বলে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়, তাহলেই মুশকিল আসান। যে নাগরিক নয় তার আবার অধিকার কী? বুলডোজার চালানোর চেয়ে এটা করা সহজ কাজ। বুলডোজার চালিয়ে দোকানপাট, ঘরদোর ভেঙে দিতে গিয়ে খামোকা বহু জায়গায় রক্তারক্তি হচ্ছে। সরকারবিরোধী নেতাদের হাজতে পুরতে হচ্ছে। তাতে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন নতুন করে তৈরি হচ্ছে। এসব বাজে ঝামেলার কোনো মানে হয়?

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

মহাভারত ২: আজকের মহাকাব্য

অভিমন্যুকে আমরা ক্ষণজন্মা প্রতিভাবান যোদ্ধা হিসাবে ভাবতেই অভ্যস্ত, যার যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা অথচ বয়সের কারণে চক্রব্যূহ সম্পর্কে অসম্পূর্ণ জ্ঞান তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই নাটকের অভিমন্যুর ট্র্যাজেডি কিন্তু তাকে আজকের পৃথিবীর যুবকের অনেক কাছাকাছি এনে দিয়েছে।

‘তোমরা কার পক্ষে?’

‘হস্তিনাপুরের পক্ষে।’

দুর্যোধন খুশি হন না, সশস্ত্র বাহিনী প্রজাদের পিছনে এসে দাঁড়ায়।

‘তোমরা কার পক্ষে?’

‘কৌরবদের পক্ষে।’

দুর্যোধন তাতেও খুশি হন না, প্রজাদের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলে আরও বেশি সৈনিক।

‘তোমরা কার পক্ষে?’

‘দুর্যোধনের পক্ষে।’

এবার দুর্যোধনের মুখে হাসি ফোটে।

নটধা নাট্যদলের প্রযোজনা মহাভারত ২-এর এই দৃশ্যে দুর্যোধন আসলে কে? শাসক দলই দেশ আর দলের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিই দল – এই সূত্রটা কেমন চেনা চেনা লাগছে না? ওই দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় – India is Indira and Indira is India। এবছর জরুরি অবস্থার ৫০ বছর পূর্ণ হল। কিন্তু সে তো আজকের গতিময় দুনিয়ায় আদ্যিকালের কথা। তখন আমার জন্ম হয়নি, এই নাটকের অভিনেতাদের অধিকাংশেরও জন্ম হয়নি। তাহলে ২০২৫ সালের এক সন্ধ্যাতেও এই নাটক এত জ্যান্ত মনে হয় কেন? কারণ আজও, যা মহাভারতে নেই তা ভারতে নেই। উলটো দিক থেকে দেখলে, মহাভারতে যা যা আছে তার সবই ভারতে আছে। আজও আছে। ফলে শিব মুখোপাধ্যায়ের কলমে, অর্ণ মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় মহাভারতের উদ্যোগ পর্বের এই সৃজনান্তর কখনো প্রাচীন মনে হয় না, সেকেলে তো নয়ই।

মহাভারত মহাকাব্য, কারণ প্রত্যেক পাঠেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসে কোনো না কোনো নতুন বয়ান। মহাভারত ২ নাটকে মহাকাব্যের পরিচিত চরিত্রগুলো থেকেও নাট্যকার বের করে এনেছেন আশ্চর্য নতুন সব পরত। যেমন শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দ্রৌপদীর সখ্য বহু আলোচিত, কিন্তু এখানে সেই সম্পর্কের অন্য এক মাত্রারও আভাস দেওয়া হয়েছে। দ্রৌপদীর প্রতি যৌন বুভুক্ষায় পাণ্ডবরা যে কৃষ্ণকেও সন্দেহ করে এবং তাদের নিজেদের মধ্যেকার সম্পর্কে ছায়া ফেলে দ্রৌপদীর প্রতি কামনা – তাও জীবন্ত হয়ে উঠেছে মঞ্চে। পাণ্ডবদের কাছে দ্রৌপদীর প্রত্যাশা, নিজের অপমানের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে তাদের যুদ্ধের দিকে চালনা করার তীব্র অভিলাষে সোহিনী সরকারকে দেখে মনে পড়ে অডিও ক্যাসেটে শোনা নাথবতী অনাথবৎ নাটকের শাঁওলী মিত্রকে। কিন্তু এখানে, বিশেষত দ্বিতীয়ার্ধে, যোগ হয়েছে অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার খিদের সঙ্গে মা হিসাবে সন্তানকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্যে গ্লানিবোধ। এই দ্বিধায় ভিতরে ভিতরে তছনছ হতে থাকা, অথচ প্রবল ব্যক্তিত্বশালী পাঞ্চালীকে জীবন্ত করে তুলেছেন সোহিনী।

আবার ছবিতে মহাভারত, রাজশেখর বসুর মহাভারত বা দূরদর্শনের মহাভারতেও যে খল মামা শকুনিকে দেখা যায়, এই নাটকের শকুনি তার থেকে ভিন্ন এক চরিত্র। এমনকি বহুবছর আগে একক নাটক শকুনির পাশা-য় বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় শকুনির খল হয়ে ওঠার কাহিনির মধ্যে দিয়ে তার যে অসহায়তা তুলে ধরেছিলেন, এই শকুনির অসহায়তা তার চেয়েও বেশি। ভাগ্নে দুর্যোধন ক্ষমতার মদে মত্ত হয়ে এই শকুনিকে বিশ্বাস করে না। শকুনিও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে তার চেহারা দেখে, কর্ণকে বোঝায় – দুর্যোধন এমন এক একাকিত্বে পৌঁছেছে যেখানে মামা বা নিকট বন্ধুও তার ব্যবহার্য বস্তু মাত্র। এই ভীত, নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা শকুনির চরিত্রে আশ্চর্য অভিনয় করেছেন ঋতম। যুগপৎ শারীরিক ও মানসিক আঘাতে পঙ্গু একটা মানুষকে দেখিয়েছেন তিনি।

বিরাট রাজকন্যা উত্তরার যে অর্জুনের প্রতি অনুরাগ ছিল – এর ইঙ্গিতটুকু আছে মহাভারতে। বলা আছে বিরাটরাজ অর্জুনকেই জামাই করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অর্জুন বলেন যেহেতু উত্তরা তাঁর শিষ্যা, তাই তিনি তাকে বিয়ে করতে পারেন না। বিয়ে হোক অভিমন্যুর সঙ্গে। এই নাটকে সেই ইঙ্গিতকে অবয়ব দেওয়া হয়েছে। প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকা থেকে পুত্রবধূ হয়ে যাওয়ার নিরুচ্চার বেদনা বেশ ফুটিয়ে তুলেছেন উপাবেলা, যদিও অর্জুনের চরিত্রে শুভম আগাগোড়াই আড়ষ্ট। উপরন্তু অভিমন্যুর চরিত্রাভিনেতা জ্যোতির্ময় আর শুভমকে প্রায় সমবয়সী মনে হয়েছে, উপাবেলার সঙ্গে জ্যোতির্ময়ের রসায়নও তেমন ঘনীভূত হয়নি।

তবে এই নাটকের অভিমন্যুর চরিত্র সবচেয়ে চমকপ্রদ। অভিমন্যুকে আমরা ক্ষণজন্মা প্রতিভাবান যোদ্ধা হিসাবে ভাবতেই অভ্যস্ত, যার যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা অথচ বয়সের কারণে চক্রব্যূহ সম্পর্কে অসম্পূর্ণ জ্ঞান তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই নাটকের অভিমন্যুর ট্র্যাজেডি কিন্তু তাকে আজকের পৃথিবীর যুবকের অনেক কাছাকাছি এনে দিয়েছে। তার সমরানুরাগে কোনো গৌরব নেই, বরং যুদ্ধ লাগলে নিজেরই আত্মীয়দের হত্যা করতে হবে ভেবে সে বিহ্বল। অনেকটা গীতার গোড়ার দিকের অর্জুনের মত। অথচ এমনভাবে তাকে বড় করা হয়েছে যে যুদ্ধ ছাড়া জীবনের কোনো সার্থকতা আছে বলেও তার জানা নেই। এই দ্বন্দ্বে সে আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে যায়। ভারতীয় সমাজে আত্মহননের চেষ্টাকে সচরাচর কাপুরুষতা বলেই ধরা হয়। অভিমন্যুকে সেই পথে টেনে নিয়ে গিয়ে নাট্যকার চরিত্রটার গা থেকে সমস্ত নায়কোচিত অলঙ্কার খুলে নিয়ে তাকে রক্তমাংসের মানুষে পরিণত করেছেন। তাই এই অভিমন্যুকে দেখে, উত্তরার সঙ্গে তার প্রেমের দৃশ্য দেখে মনে পড়ে ইংরেজ কবি উইলফ্রেড ওয়েনের কবিতায় বর্ণিত সেই তরুণদের, যাদের যুদ্ধযাত্রার বর্ণনায় কবি লেখেন এইসব পংক্তি

So secretly, like wrongs hushed-up, they went.
They were not ours:
We never heard to which front these were sent.

Nor there if they yet mock what women meant
Who gave them flowers.

Shall they return to beatings of great bells
In wild trainloads?
A few, a few, too few for drums and yells,
May creep back, silent, to still village wells
Up half-known roads.

তরুণদের মধ্যে যুদ্ধোন্মাদনা জাগিয়ে তুলে, তাদের প্রাণহানিকে বীরত্ব নাম দিয়ে সেই আগুনে হাত সেঁকার সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যেহেতু আসলে গৃহযুদ্ধ, সেহেতু এই নাটকের অভিমন্যুকে দেখে আরও মনে পড়ে তরুণ গল্পকার প্রবুদ্ধ ঘোষের ‘আনন্দ ময়দান ছেড়ে পালায়নি’ গল্পের আনন্দকে। তাকে ক্ষমতাসন্ধানী এক পণ্ডিতজি শিখিয়েছিলেন যে এতদিন আসল ইতিহাস জানতেই দেয়নি কেউ। ‘কীভাবে জবরদস্তি মেরেছে, মন্দির-মঠ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ওদের জন্যই দেশভাগ আর খুন। রামনাথ স্বামীর বইতে লেখা আছে তুর্কিরা বাংলা দখল করতে আসার অনেক আগে থেকে সুফি-টুফিরা বাংলায় এক-ধারসে ধর্ম পালটে দিচ্ছিল। গান গেয়ে সম্মোহন করত। তারপর গরু খাইয়ে দিত, সুন্নত করিয়ে দিত বাচ্চাদের তুলে এনে। আনন্দর কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে রাগে। বল্লাল সেন, লক্ষ্মণ সেন প্রজাদের বাঁচাতে কিছু বর্ণের ভাগ তৈরি ক’রে দিয়েছিল। সে তো নিজেদের ধর্ম বাঁচাতেই।’ সেই গল্পের শেষে ‘আনন্দর বুকে চাপাতির কোপ পরিচ্ছন্নভাবে নেমে আসবে। যন্ত্রণায়, রক্তের ফোঁটায় চোখ খুলতে পারবে না। আগুনের হলকা আরও বাড়বে কারণ মিছিল থেকে ছুটে যাওয়া লোক মহল্লার ঘরে আগুন দিচ্ছে। বোম আর গুলির আওয়াজে আনন্দর কান বুজে আসবে। ঠোঁট নড়বে। স্যার, ওরা আমাদের মিছিলে ইট মেরেছে। নোংরা নোংরা খিস্তি।’ কেন মরছে আনন্দ? কারণ ‘রিষড়ায় রামনবমীর মিছিলে সংঘর্ষ। দোকানে আগুন। পাথরবৃষ্টি। আহত প্রায় পনেরোজন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভরতি নুরুল আলম নামে এক ব্যক্তি। সংঘর্ষে মৃত এক যুবক। যুবকের পরিচয়…’

এবং দুর্যোধন। রাজশেখর লিখেছেন ‘দুর্যোধন মহাভারতের প্রতিনায়ক এবং পূর্ণ পাপী।’ এই নাটকের দুর্যোধন পূর্ণ পাপী ঠিকই, কিন্তু সে একাধারে এই নাটকের প্রতিনায়ক এবং নায়ক। এই চরিত্রে অর্ণ পুরাণের প্রতিনায়কের মধ্যে থেকে তুলে এনেছেন একজন সুচতুর একনায়ককে, যে সন্ত্রাস কায়েম করে জনমত নিয়ে আসতে পারে নিজের দিকে, তারপর চরম শঠতায় স্বয়ং কৃষ্ণকেও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়ে নিজমুখে বলে যে সে যুদ্ধ চায় না। তারপর আতঙ্কিত জনতার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেয় ‘বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’। আত্মম্ভরিতার উত্তুঙ্গ শিখর অর্ণ দেখিয়ে দিয়েছেন তাঁর অভিনয়ে। তিনি কখনো সচেতনে, কখনো অবচেতনেই নিজেকে বলেন সুযোধন। অভিনয়ে অন্যমনস্কতা তুলে ধরার আশ্চর্য ক্ষমতা দেখিয়েছেন অর্ণ। খোঁড়া মামা শকুনি, বাবা অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকেও তিনি শারীরিক পীড়ন করতে ছাড়েন না। অর্ণর অভিনয় তুঙ্গে ওঠে ধৃতরাষ্ট্রের (কৌশিক চট্টোপাধ্যায়) সঙ্গে একান্ত মুহূর্তগুলোতে এবং কৃষ্ণের (অর্পণ ঘোষাল) সঙ্গে নাচের দ্বন্দ্বযুদ্ধে। নাটকের একেবারে শেষদিকে, যুদ্ধে যাওয়ার আগে মা গান্ধারীর (সাধনা মুখোপাধ্যায়) কাছে বিদায় নেওয়ার দৃশ্যে একেবারে অন্য এক দুর্যোধন বেরিয়ে আসে। মঞ্চের উপর গর্ভস্থ শিশুর মত কুঁকড়ে শুয়ে পড়েন অর্ণ, তারপর মাকে বলে যান – দুর্যোধনের মনে কেবল অন্ধকার, কারণ বাবা জন্মান্ধ আর মা স্বেচ্ছান্ধ। তাই তাকে আলো দেখানোর কেউ ছিল না। নাটকের সবচেয়ে বড় খল চরিত্রের যাবতীয় পাপ সত্ত্বেও ওই দৃশ্যে কঠিন হয়ে পড়ে দুর্যোধনের জন্যে চোখ ভিজে আসা আটকানো।

স্নেহান্ধ ধৃতরাষ্ট্রের ক্ষমতা ও অক্ষমতা মাত্র কয়েকটা সুযোগে জীবন্ত করে তোলেন কৌশিক। অর্ণর সঙ্গে তাঁর মুহূর্তগুলো বহুদিন মনে থাকার মত। একান্ত অনুচরকে যখন তিনি বলেন যে তাঁকে খাদের সামনে দাঁড় করালেও তিনি তাকেই বিশ্বাস করবেন, কারণ অন্ধ লোকের বিশ্বাস করা ছাড়া কোনো উপায় নেই – তখন তৈরি হয় এমন মুহূর্ত, যখন পরম সত্যকে ছুঁয়ে ফেলতে পারেন একজন অভিনেতা। ফলে সন্দেহ হয় – ধৃতরাষ্ট্র আসলে কে? দৃষ্টিহীন রাজা, বখে যাওয়া ছেলের স্নেহান্ধ বাবা, নাকি কোনো দেশের একনায়কের প্রোপাগান্ডায় নিজের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা নাগরিক? ধৃতরাষ্ট্র কি এমন এক বিকল্পহীন রাজনৈতিক অবস্থার শিকার, যেখানে লম্পট ছেলে দুঃশাসনকেও তাঁর সময়ে সময়ে দুর্যোধনের চেয়ে ভাল বলে মনে হয়?

দুঃশাসনের চরিত্রে যে লাম্পট্য ছাড়াও অনেককিছু আছে, তা সামান্য সুযোগেই দেখিয়ে দিয়েছেন সৌরভ। ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর একার কয়েকটা মাত্র মুহূর্ত দুঃশাসন চরিত্রের একমাত্রিকতা ঘুচিয়ে দিয়েছে।

আরও পড়ুন জনপ্রিয় বাংলা ছবির সযত্ন সন্ধানে তালমার রোমিও জুলিয়েট

কৃষ্ণের চরিত্রে অর্পণ মুরলীধর হিসাবে পাণ্ডব এবং দ্রৌপদীর সঙ্গে সাবলীল। কিন্তু কূটনীতিবিদ হিসাবে কর্ণ (অনুজয় চট্টোপাধ্যায়), শকুনি বা ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে দৃশ্যগুলোতে তাঁকে যতখানি ভারি দেখানো উচিত ছিল, তা দেখায় না। অন্যদিকে এই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অভিনেতা অনুজয়ের বিশেষ কিছু করার নেই এই নাটকে।

তবে মানানসই আবহসঙ্গীত এবং এত নিপুণ অভিনয় সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত এই প্রযোজনার সেরার শিরোপা বোধহয় নাট্যকারকেই দিতে হবে। তাঁর নির্মিত চরিত্রগুলো বেদব্যাসের মহাকাব্যের মতই বহুবর্ণ, উপরন্তু সমসাময়িক। স্ত্রী ভানুমতীর (স্বাগতা) সঙ্গে একমাত্র একান্ত দৃশ্যে দুর্যোধনের মুখে শোনা যায়, সকলের ভয়ের পাত্র হওয়ার মধ্যে এক ধরনের মাদকতা আছে। একনায়কদের মনস্তত্ত্বের গভীর থেকে তুলে আনা এই সংলাপ শাশ্বত সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত