আটপৌরে জীবনের মধ্যে থেকে বিশ্বসাথে যোগে বিহার করার সাধনাই একসময় বাঙালি মধ্যবিত্তের অভিজ্ঞান ছিল। সেই জীবনযাপনকে মঞ্চায়িত করতে গিয়ে নির্দেশক সুমন সেনগুপ্ত যেভাবে একবিংশ শতাব্দীর হোমো স্যাপিয়েন্সের বিশ্ববীক্ষা এবং জ্ঞানচর্চা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন, সেটাই এই নাটককে বিশিষ্ট করে তোলে।
জন্মান্ধ মেয়েকে জ্যোৎস্নার ধারণা দিতে চেয়েছেন আমাদের ভাষার কবি জয় গোস্বামী। আর জন্মান্ধ ছেলেকে এই মহাবিশ্বের আলো, গান, তারামণ্ডলের রহস্য সন্ধানে প্রবৃত্ত করতে চেয়েছেন পদার্থবিদ্যার শিক্ষক অতীন। কেবল অন্ধ নয়, কোমরের নিচ থেকে পঙ্গু হয়ে যাওয়া একমাত্র ছেলে পলাশকে ঘিরে অতীন আর তাঁর স্ত্রী আরতির যে জীবনসংগ্রাম, ইন্দ্রিয়গত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ওঠার জন্য পলাশের যে সংগ্রাম – তা নিয়েই আমার গান নাটক বুনেছে চেতলা কৃষ্টি সংসদ। এই নাটকের নাম আমার আলো বা আমার মুক্তি হলে হয়ত আরও যথাযথ হত, কারণ গান এই নাটকে ধরতাই, নাটকের প্রাণ নয়। অন্তত এই আলোচকের তাই মনে হয়েছে। কিন্তু আসল কথা সেটা নয়। অতীন-আরতি-পলাশের মত সাধারণ পরিবার বাংলার শহরে বা মফস্বলে কোনোদিনই বিরল নয়। আটপৌরে জীবনের মধ্যে থেকে বিশ্বসাথে যোগে বিহার করার সাধনাই একসময় বাঙালি মধ্যবিত্তের অভিজ্ঞান ছিল। সেই জীবনযাপনকে মঞ্চায়িত করতে গিয়ে নির্দেশক সুমন সেনগুপ্ত যেভাবে একবিংশ শতাব্দীর হোমো স্যাপিয়েন্সের বিশ্ববীক্ষা এবং জ্ঞানচর্চা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন, সেটাই এই নাটককে বিশিষ্ট করে তোলে। একবার দেখে মনে হয় – আরও কী যেন ছিল, খেয়াল করলাম না! আরেকবার দেখলে হয়।
পলাশ এমন একজন যুবক যার কৌতূহলের শেষ নেই এবং যে উন্মাদের মত জানতে চায় – আলো কী? যেহেতু সে চক্ষুষ্মান নয়, তাই তার আলোকে জানার একমাত্র উপায় জ্ঞানার্জন। বাবা আর ব্রেইল – এই তার সহায়। আর সহায় বাবার একদা ছাত্র বাবুদা, যে প্রবল তার্কিক, লোকের চোখে পাগল। কখনো সে প্রহেলিকা; আবার কখনো জলবৎ তরলং করে বুঝিয়ে দেয় মহাকর্ষ থেকে শুরু করে অণু, পরমাণুর রহস্য। মানুষকে যেভাবে সর্বদাই ঘিরে থাকে আলো আর অন্ধকার, তেমন করেই পলাশকে ঘিরে থাকে তার বাল্যবন্ধু মুনমুন। মোটের উপর এই কজনকে নিয়েই পলাশের মনোজগৎ। আর যারা আছে, তারা সকলেই বাইরের লোক। অবশ্য আরেকজন ব্যক্তি আছে যাকে দৃষ্টিহীন পলাশই কেবল দেখতে পায়, কিন্তু তার কথা বলে দিলে এই নাটকের রহস্য উদ্ঘাটন করে দেওয়ার অপরাধ ঘটে যাবে।
পলাশের চোখ দিয়ে, অর্থাৎ মন দিয়ে, জগৎটাকে দেখানোর জন্যে মঞ্চসজ্জায় (সুরজিৎ দে) এবং পোশাক-আশাকে (পিয়ালী সামন্ত, রুশতি চৌধুরী) সাদা, কালো আর ধূসরের বাইরে কোনো রং ব্যবহার করা হয়নি। ব্যতিক্রম শুধু পলাশের কল্পনায় তৈরি দিগন্ত, মানুষ বা পাখির মূর্তি। এই কল্পনাশক্তি মুগ্ধ করে। আগাগোড়া হুইলচেয়ারে বসা পলাশের চরিত্র বহুমাত্রিক। সে যেমন জ্ঞানপিপাসু, তেমনি অবুঝ। যত সরল, তত দুর্বোধ্য। সে অনাবিল আনন্দ পেতে পারে, আবার হতাশার চোটে হিংস্রও হয়ে উঠতে পারে। অভিনেতা সায়ন্তন মৈত্র এই পরস্পরবিরোধিতা তুলে ধরতে অনেকটাই সফল, তবে কিছু কিছু মুহূর্তে মনে হয়েছে তিনি অভিব্যক্তির বৈচিত্র্যের অভাবে ভুগছেন। তাঁর হাহাকার আর চরম আনন্দের অভিব্যক্তি প্রায় এক হয়ে গেছে।
ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পলাশের বাবা এবং পথপ্রদর্শক অতীন। এই চরিত্রের অভিনেতা ময়ূখ দত্তের (নির্দেশনা সহকারীও বটে) বৈজ্ঞানিক আলোচনায় মশগুল হয়ে জটিল তত্ত্ব সহজ করে বুঝিয়ে দেওয়ার সাবলীলতা যতখানি মনোমুগ্ধকর, প্রতিবন্ধী সন্তানের বাবা হিসাবে অসহায়তা ততখানি স্পষ্ট হয় না। মঞ্জিমা চট্টোপাধ্যায় অভিনীত আরতি চরিত্রের পরিসর বড্ড সীমিত মনে হয়। তিনি তো স্বামীর মত ছেলের সঙ্গে জ্ঞানবিজ্ঞানের অভিযানে বেরোতে পারেন না, ফলে তাঁর সঙ্গে রসায়ন নিশ্চয়ই ভিন্নতর; মা হিসাবে তাঁর যন্ত্রণারও কিছু নিজস্বতা থাকার কথা। তা নাটকে তেমনভাবে আলাদা করে দেখা যায় না। পিয়ালী অভিনীত মুনমুনের চরিত্রও যতটা সকলের ভালোবাসা ও আক্রমণের লক্ষ্য, ততটা সোচ্চার নয়। সেদিক থেকে এই নাটকের নারী চরিত্রগুলোকে তুলনায় দুর্বল বললে ভুল হবে না। মঞ্চে সামান্য সময় কাটানো ইন্দ্রাণীও (সৃজনী দে) যেমন একেবারেই প্রান্তিক চরিত্র। জানার ইচ্ছা, জানার জন্যে ক্লেশ স্বীকার করার রোমাঞ্চ উপলব্ধি করা অতীনের বিপরীতে উপরচালাক সাংবাদিকের চরিত্রে সুস্নাত ভট্টাচার্য্যের অভিনয় খুবই বিশ্বাসযোগ্য। খুব বেশি সময় মঞ্চে না থাকলেও যিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী অভিনয় করেন তিনি হলেন পলাশের দেখা ব্যক্তির চরিত্রে অরিত্র দে। নাটকের তুঙ্গ মুহূর্তে পলাশের সঙ্গে তাঁর মানসিক দ্বন্দ্বযুদ্ধ রীতিমত রোমাঞ্চকর।
যে অভিনেতার কথা শেষে বলতে হবে, তিনি হলেন বাবুদার চরিত্রে অভিনয় করা অর্ক চক্রবর্তী। চরিত্রটা বেশ বিপজ্জনক। একাধারে যাত্রার বিবেক, ‘কমিক রিলিফ’, বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ চিরছাত্র, অতীন-আরতি-পলাশের পরিবারের প্রায় অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু যা সবচেয়ে বিপজ্জনক – সে দর্শককে বারংবার অস্বস্তিতে ফেলে স্বাভাবিকত্ব আর পাগলামির ধারণাকে ওলটপালট করে দিয়ে। অর্কর চরিত্র নাট্যকারের পূর্ণ সহায়তা পেয়েছে। সবচেয়ে হাস্যরস উদ্রেককারী সংলাপগুলো তার, আবার সবচেয়ে ভাবিয়ে তোলার মত সংলাপগুলোও তার। এই মহাবিশ্বকে পলাশের কাছে ভাঙতে ভাঙতে ফার্মিয়ন আর বোসন কণায় এনে ফেলার দায়িত্বও পালন করে বাবুদাই। নাটকটাকে যদি ঘুড়ি হিসাবে ভাবা হয়, তাহলে তার লাটাই অনেকাংশে অর্কর হাতেই থাকে এবং তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ঘুড়ির উড়ান নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর পাগলামি মাত্রা ছাড়ায় না বা লোক হাসানোর চেষ্টা বলে মনে হয় না। আবার অন্য চরিত্রগুলোকে হাস্যাস্পদ করে তুলে নিজে হাসলেও, বিজ্ঞানালোচনার সময়ে গাম্ভীর্যের ঘাটতি হয় না।
শুরুতেই বলেছিলাম – গান এই নাটকের ধরতাই। রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে নাটকের ভাবনাকে সংহত করতে চেয়েছেন নির্দেশক। যে গানগুলো ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো যে নাটকের বিষয়বস্তু এবং পরিস্থিতির সঙ্গে জুতসই তা নিয়ে সন্দেহ নেই। সেঁজুতি গুপ্ত, অরিত্র এবং মঞ্জিমার গাওয়াও চমৎকার। কিন্তু গানের ব্যবহার কিঞ্চিৎ কম হলেই ভালো হত মনে হয়। বিশেষত যে গানের দু কলি পলাশ গাইছে মঞ্চের উপর, আলো নিভে যাওয়ার পর সেই গানেরই আরও খানিকটা অংশ অন্য কণ্ঠে বাজছে – এ জিনিস নেহাতই বাহুল্য। বাহুল্যের সমস্যা মঞ্চসজ্জাতেও রয়েছে। পলাশের বিজ্ঞানমগ্নতা বোঝাতে বেশকিছু জিনিস টাঙিয়ে মঞ্চটাকে ছোট করে আনা হয়েছে। তাতে ক্ষতি নেই, কিন্তু দর্শকের দেখতে পাওয়ার মত করে একখানা বাক্সের গায়ে ‘And God Said’ এবং জটিল অঙ্ক লিখে রাখার কি খুব প্রয়োজন ছিল? অত নিচু জায়গায় কোনোকিছুর গায়ে বড় বড় করে লিখে নিশ্চয়ই অতীন অন্ধ ছেলেকে অঙ্ক শেখান না? আজকের বাড়িতে ল্যান্ডলাইনের ভূমিকা যতটুকু দেখানো হয়েছে তাতে ওটাও না থাকলে ক্ষতিবৃদ্ধি হত না।
এ নাটক যেমন ভাললাগার, তেমনই যন্ত্রণার। অতীন এক জায়গায় বলছেনও ‘ব্যথাকে উপভোগ করতে শেখো’। স্বভাবতই এই নাটকে ফিরে ফিরে এসেছেন জীবনানন্দ দাশ। চিরায়ত জ্ঞানের সঙ্গে এ যুগের কেজো জ্ঞানের দ্বন্দ্ব যথার্থ ধরা পড়েছে ব্যক্তির সংলাপে ‘আমাদের এই শতকের/বিজ্ঞান তো সংকলিত জিনিসের ভিড় শুধু— বেড়ে যায় শুধু’ উচ্চারণে। কিন্তু এমন নাটকের সংলাপে মাঝেমাঝে এত পেলবতা কেন? পলাশ নামের ছেলেটাকে বাবা, মা, বন্ধু মিলে বারবার ‘পলাশ ফুল’ বলে ডাকা কেন? আবহসঙ্গীতে ফিরে ফিরে আরামদায়ক ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’ সুর বাজানোই বা কেন? রাবীন্দ্রিকতা আসলে বেশ বিপজ্জনক ব্যাপার। মাত্রা ছাড়ালেই অশ্লীল লাগতে শুরু করে।
তবে যতই দোষ ধরা যাক, এই নাটক যে বিষয়কে তুলে ধরেছে তার যে দৃশ্যায়ন সম্ভব – না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত, এবং নাটকের শুরুতে দর্শকের মনে যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করা হয়েছে, শেষে তার নিরসনের মুহূর্তটা বিশুদ্ধ ম্যাজিক। সেই ম্যাজিকের বড় কৃতিত্ব অবশ্যই আলোর দায়িত্বে থাকা কল্যাণ ঘোষের। তিনি মঞ্চে আলো ফেলার পাশাপাশি দর্শকের দেখতে পাওয়ার মত অন্ধকারও সৃষ্টি করেছেন। নইলে রেশ থেকে যাওয়ার মত ম্যাজিক সৃষ্টি হত না ক্লাইম্যাক্সে।
হিন্দু উচ্চবর্গীয়দের পারিবারিক আড্ডা থেকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ হয়ে এখন সরকারি নীতি নির্ধারণেও এরাই দেশের যত নষ্টের গোড়া হিসাবে স্বীকৃত। শোয়েবদের যাওয়ার জন্যে তো গোটা পঞ্চাশেক দেশ আছে। তবু যে তারা কেন এদেশে পড়ে থাকে তা উচ্চবর্গীয় শিক্ষিত মানুষ বুঝেই উঠতে পারেন না। আর সরকার তো চন্দনদের জন্যেই সবকিছু করে, ওদের আর চিন্তা কী?
আলো আঁধারিতে ঢাকা একফালি জায়গা, তার এদিক থেকে ওদিকে হেঁটে যাচ্ছে ছোট ছোট পিঁপড়ে। প্রথম চোটে তাই মনে হয় বটে, তবে কয়েক সেকেন্ড কাটতে না কাটতেই বোঝা যায় – জায়গাটা আসলে গাড়িঘোড়াহীন ফ্লাইওভার। যারা হেঁটে যাচ্ছে তারা নিরুপায়, শ্রান্ত মানুষ। প্রতীক শাহের ক্যামেরায় লকডাউনে ঘরে ফিরতে চাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের এভাবেই দেখিয়েছেন হোমবাউন্ড ছবির পরিচালক নীরজ ঘেওয়ান। মাল্টিপ্লেক্সের ঠান্ডা ঘরে বসে মনে হয়, যেন ধরে ফেলেছেন আমরা আসলে কীভাবে দেখি ওই মানুষগুলোকে, রাষ্ট্র কীভাবে দেখে। ধরে ফেলেছেন বলেই ছবি শুরুর আগের, স্পষ্টতই সেন্সরের চাপে লিখিত, দীর্ঘ ‘ডিসক্লেমার’ দ্বিগুণ হাস্যকর মনে হয় ছবি শেষ হওয়ার পর। তার চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় ডিসক্লেমারের পরেই পর্দায় ভেসে ওঠা সম্পূর্ণ বিপরীতার্থক শব্দবন্ধ, যার অর্থ – সত্য ঘটনা অবলম্বনে।
নীরজ, বরুণ গ্রোভার এবং শ্রীধর দুবে লিখিত এই ছবির সংলাপে করুণ মুহূর্তে নানা সূক্ষ্ম ও স্থূল রসিকতা থাকলেও, হোমবাউন্ড যে হাস্যরস উৎপাদন করে তার গায়ে ভিড়ে ঠাসাঠাসি প্যাসেঞ্জার ট্রেনের যাত্রীদের মত করে লেগে থাকে চোখের জল। ইদানীং এদেশে ঘর ছেড়ে কাজের খোঁজে অন্যত্র যাওয়া মানুষ সর্বত্র খলনায়ক। এই ছবির দুই প্রধান চরিত্র মহম্মদ শোয়েব (ঈশান খট্টর) আর চন্দন কুমার বাল্মীকি (বিশাল জেঠওয়া) আবার সেই শ্রেণিতে পড়ে, যারা সবচেয়ে বেশি ঘৃণার – অর্থাৎ সাদা কলারের কর্মী নয়, একেবারে গায়ে গতরে খেটে খাওয়া মানুষ। অবশ্য শ্রমজীবী না হলেও হয়ত বিশেষ তফাত হত না, কারণ নামেই প্রমাণ – প্রথম জন মুসলমান, দ্বিতীয় জন দলিত। হিন্দু উচ্চবর্গীয়দের পারিবারিক আড্ডা থেকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ হয়ে এখন সরকারি নীতি নির্ধারণেও এরাই দেশের যত নষ্টের গোড়া হিসাবে স্বীকৃত। শোয়েবদের যাওয়ার জন্যে তো গোটা পঞ্চাশেক দেশ আছে। তবু যে তারা কেন এদেশে পড়ে থাকে তা উচ্চবর্গীয় শিক্ষিত মানুষ বুঝেই উঠতে পারেন না। আর সরকার তো চন্দনদের জন্যেই সবকিছু করে, ওদের আর চিন্তা কী? যেমনটা এক সরকারি অফিসার তাকে বলেছে। এই ছবির লেখক দল – বরুণ, বশারত পীর, সুমিত রায় এবং নীরজ স্বয়ং – স্লোগানধর্মিতার দিকে না গিয়েও বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন শোয়েবরা কেন সুযোগ পেলেও দুবাই যেতে চায় না। চন্দনদের বিড়ম্বনাও দেখিয়ে দিয়েছেন। আসল পদবি লিখলে লোকে নিচু নজরে দেখে আর না লিখলে নিজের চোখে ছোট হয়ে যেতে হয়। সরকারি চাকরির পরীক্ষার ফর্মে পদবি লিখব কি লিখব না, ‘সংরক্ষিত’ লেখা বাক্সে টিক দেব কি দেব না – নিজের সঙ্গে এই লড়াইটা লড়তে লড়তেই বয়স বেড়ে যায়।
ন্যাকা লাগছে ব্যাপারগুলো? লাগারই কথা। মানুষের চোখে পিঁপড়ের জীবনসংগ্রাম তো ন্যাকাই লাগে। ‘গেটেড কমিউনিটি’-র মধ্যে কাটানো নিশ্চিন্ত জীবন আর সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন আফ্রিকার সমান দারিদ্র্যে ক্রমশ বিভাজিত হতে থাকা এই দেশে হোমবাউন্ডের পাত্রপাত্রীদের জীবন মাল্টিপ্লেক্সের দর্শকদের চোখে অলীক, অবাস্তব মনে হওয়াই স্বাভাবিক। এ তো সেই রাজ কাপুরের আমল নয় যে সিনেমার পর্দায় চালচুলোহীন শ্রী ৪২০-এর সঙ্গে প্রেম হয়ে যাবে বস্তির বাচ্চাদের লিখতে পড়তে শেখানো সুন্দরী নার্গিসের, আর তা দেখে মোহিত হবে আসমুদ্রহিমাচল হিন্দি সিনেমার দর্শক। নতুন ভারতের মহানগরে শ্রী ৪২০ হয়ে থাকাই যাবে না, আধার কার্ড দেখাতে হবে। শোয়েবের মত মুসলমান হলে সামান্য চাপরাশির চাকরি পাকা করতে কেবল নিজের আধার কার্ড নয়, বাবা-মায়ের আধার কার্ডও দেখাতে হবে। আজকের হিন্দি সিনেমায় বস্তিবাসী কি ফুটপাথবাসী তো দূরের কথা, শোয়েব আর চন্দনের মত গাঁয়ের লোকদেরও দেখা যায় না চট করে। সেই নয়ের দশক থেকে, প্রাসাদোপম বাড়ির মালিক ব্যবসায়ী আর অনাবাসী ভারতীয়রাই তো নায়ক, নায়িকা। ইদানীং আবার প্রাচীন ও অপ্রাচীন যোদ্ধা এবং ধর্মযোদ্ধারা নায়ক, নায়িকা হচ্ছেন। নীরজ উলটো পথের পথিক। এক দশক আগে নিজের প্রথম ছবি মসান-এ তিনি দেখিয়েছিলেন বারাণসীর ডোম পরিবারের ছেলের সঙ্গে উচ্চবর্ণের মেয়ের প্রেমের স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গ। প্রশ্ন তুলেছিলেন – এই দুঃখ কিছুতেই শেষ হয় না কেন? সেই প্রশ্নেরই যেন এবার উত্তর খুঁজেছেন দুই গ্রামের ছেলের কাহিনিতে।
দুঃখ শেষ হয় না, কারণ চন্দনের মায়ের রান্না যতই ভালো হোক, সে মিড ডে মিল রাঁধলে বাবা-মায়েরা স্কুলে পাঠাবেন না ছেলেমেয়েদের। চন্দনের দিদি স্কুলের বাচ্চাদের হেগো পোঁদ ধুইয়ে দেবে – ওই পর্যন্ত ঠিক আছে। ব্যতিক্রমী হেডমাস্টার যতই আইনের ভয় দেখান, তাতে কাজ হবে না। বাবাসাহেব আম্বেদকর দলিতদের বাড়ির বিয়েতে গৌতম বুদ্ধের পাশে যতই পূজিত হোন, সংবিধান বা আইন মানা হবে কিনা, কোথায় কতটুকু মানা হবে, তা ঠিক করবেন উচ্চবর্গীয়রাই। দুঃখ শেষ হয় না, কারণ শোয়েবের মা যতই সুস্বাদু হালুয়া রাঁধুন আর শোয়েবের বিপণন ক্ষমতা যতই অসাধারণ হোক, শেষ কথা হল সে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে কাকে সমর্থন করে এবং সে নিজে যা-ই মনে করুক, সবাই নিশ্চিত যে পাকিস্তান হারলে সে দুঃখ পায়। দুঃখ শেষ হয় না, কারণ পথে অসুস্থ হয়ে পড়া প্রবাসী শ্রমিককে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্যে পুলিশ প্রশাসনের টিকি পাওয়া যায় না। কিন্তু মারা যাওয়ার পর মর্গে নিয়ে যেতে পত্রপাঠ সবাই হাজির। চারতলা পায়ের তলায় রাখবে তিনতলাকে, তিনতলা পায়ের তলায় রাখবে দোতলাকে, দোতলা পায়ের তলায় রাখবে একতলাকে – হাজার হাজার বছরের এই সুবিন্যস্ত শোষণব্যবস্থাকে কোনোরকম তত্ত্ব না কপচিয়ে সিনেমায় তুলে এনেছেন নীরজ। দুই প্রাণের বন্ধুর একজন চাকরির পরীক্ষায় পাশ করল, অন্যজন করল না। অমনি কিন্তু সম্পর্ক চিড় খেল, একে অপরের ধর্মীয় পরিচয় এবং জাতি পরিচয় উল্লেখ করে দাঁত নখ বের করে ফেলল। আবার হতদরিদ্র চন্দনের পরিবার সর্বস্ব পণ করে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে যায় চন্দনের জন্যে, তার দিদির জন্যে নয়। দলিত মেয়ে সুধা ভারতী যতই প্রেমে পড়ুক, সে অন্তত গ্র্যাজুয়েট নয় এমন ছেলেকে – পুলিশের কনস্টেবলকে – বিয়ে করতে রাজি নয়। কারণ বাবার সরকারি চাকরির কল্যাণে সুধার জাত না বদলাক, শ্রেণি বদলে গেছে। এই হল নীরজের ভারত, আমাদের ভারত।
অভিনেতার কাজই হল তিনি যে লোক নন সেই লোক হয়ে ওঠা। তবু হয়ত চারপাশের পরিস্থিতির কারণেই ঈশানকে মিতভাষী, অপমান বুকে চেপে রাখা গরিব মুসলমান যুবকের চরিত্রে এত বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করতে দেখে একটু বেশিই ভালো লাগে। নীরবে অপমানিত হওয়ার দৃশ্যগুলোতে ঈশান সবচেয়ে বাঙ্ময়। ছবির শেষ প্রান্তে চরম অসহায়তার মুহূর্তে তিনি সবচেয়ে শক্তিশালী অভিনয় করেন। তবে চমকে দেন চন্দনের চরিত্রে বিশাল। তাঁর চেহারার সবচেয়ে চোখে পড়ার মত জিনিস হল অস্বাভাবিক কটা চোখ। ওই চোখদুটোকে তিনি মরদানি ২ ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন নারীবিদ্বেষী সাইকোপ্যাথের হিংস্রতা ফুটিয়ে তুলতে। এখানে প্রায় ম্যাজিকের মত ব্যবহার করেছেন দলিতের গ্লানিকে মুখরতা দিতে। পছন্দের নারীর সামনে প্রেমিকের চিরকালীন ক্যাবলামি করতে করতে, ভেঙে পড়া বন্ধুকে কাঁদার জন্যে কাঁধ এগিয়ে দিতে দিতে ছবি যত এগিয়েছে, বিশাল বিশালতর হয়েছেন।
নীরজের ছবির নায়িকার গ্ল্যামার থাকে না, সুধারও নেই। সেই চরিত্রে জাহ্নবী কাপুর যথাযথ। তবে বিশালের সঙ্গে ঈশানের রসায়ন যত নিখুঁত, জাহ্নবী আর বিশালের রসায়ন ততটা জমেনি। পর্দায় বেশিক্ষণ না থাকলেও মনে থেকে যায় চন্দনের মায়ের চরিত্রে শালিনী বৎস্যা আর ঈশানের বসের চরিত্রে শ্রীধরের অভিনয়। বরুণ অতীতে বহু ছবিতে একবার শুনলে কানে লেগে থাকার মত গান লিখেছেন। যাঁরা তাঁর কবিতার কথা জানেন, তাঁকে ঋজু বিদূষক হিসাবেও চেনেন, তাঁরা আরও ভালো করে জানেন তাঁর ভাষার উপর প্রশ্নাতীত দখলের কথা। সব মিলিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, অমিত ত্রিবেদী সুরারোপিত, জাভেদ আলি আর পাপোনের গাওয়া এই ছবির ‘ইয়ার মেরে’ সেই প্রত্যাশা পূরণ করে না।
ছবি শেষ হওয়ার পরেও চোখে লেগে থাকার মত দৃশ্যের অবশ্য শেষ নেই। তেমনই একটা দৃশ্য দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। পরের দিকে শিশি ভর্তি আচারের, বন্ধুদের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে খাওয়ার জিনিস থেকে বেঁচে থাকার শেষ সম্বল হয়ে পড়ার দৃশ্যও অবিস্মরণীয়। কে জানে সে জন্যেই সচেতনভাবে নীরজ ওই করুণ দৃশ্যে ফ্রেমের মাঝখানে ‘সব ইয়াদ রখখা জায়গা’ কবিতার রচয়িতা আমির আজিজকে রেখেছেন কিনা! এই আলোচককে অবশ্য ছবি দেখার সপ্তাহখানেক পরেও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দুখানা ফাটা পা আর এক জোড়া নতুন চটি। এইসব কারণে নীতিন বৈদের সম্পাদনার কথাও আলাদা করে বলতেই হবে।
ছবি শেষ হওয়ার পরেও চোখে লেগে থাকার মত দৃশ্যের অবশ্য শেষ নেই। তেমনই একটা দৃশ্য দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। পরের দিকে শিশি ভর্তি আচারের, বন্ধুদের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে খাওয়ার জিনিস থেকে বেঁচে থাকার শেষ সম্বল হয়ে পড়ার দৃশ্যও অবিস্মরণীয়। কে জানে সে জন্যেই সচেতনভাবে নীরজ ওই করুণ দৃশ্যে ফ্রেমের মাঝখানে ‘সব ইয়াদ রখখা জায়গা’ কবিতার রচয়িতা আমির আজিজকে রেখেছেন কিনা! এই আলোচককে অবশ্য ছবি দেখার সপ্তাহখানেক পরেও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দুখানা ফাটা পা আর এক জোড়া নতুন চটি। এইসব কারণে নীতিন বৈদের সম্পাদনার কথাও আলাদা করে বলতেই হবে।
নীরজ একজন আশ্চর্য পরিচালক। তিনি গোটা ছবিতে মানুষের শঠতা, অত্যাচার, অনাচার, অবিচার, দুঃখকষ্ট দেখান। তারপরেও এক চিলতে আশায় ছবি শেষ করেন। মসান ছবিতে শ্মশানের বামুনের মেয়ে দেবী পাঠক (রিচা চাড্ডা) আর ডোমের ছেলে দীপক চৌধুরীর (ভিকি কৌশল) সমান্তরালভাবে চলতে থাকা জীবন একসাথে বয়ে গিয়েছিল সঙ্গমের দিকে। এখানেও শেষমেশ দুরকমভাবে ঘরে ফিরেছে দুই বন্ধু। নীরজ শেষপর্যন্ত এমন এক দেশের স্বপ্ন জিইয়ে রেখেছেন, যেখানে হিন্দু বন্ধুর গৃহপ্রবেশে দরজা ফুল দিয়ে সাজায় মুসলমান বন্ধু। এ দৃশ্যই এদেশে স্বাভাবিক ছিল, ক্রমশ অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে – মুসলমান রোগী দেখেন বলে হিন্দু ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ করিয়ে দেওয়া হয়েছে খোদ পশ্চিমবঙ্গে। তাই বুক দুরুদুরু করে। পরিচালককে প্রশ্ন করতে সাধ হয় ‘ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি/হারিয়েছ দেশ কাল জানো না কি?’
অবশ্য হয়ত নীরজই ঠিক, আমরা যারা আশঙ্কিত, তারাই ভুল। সংখ্যাগুরুবাদীদের গত কয়েক বছরের আপ্রাণ চেষ্টার পরেও, প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রচার চালানোর পরেও, হিন্দি সিনেমার দর্শকরা ঘৃণা ছড়ানো সিনেমাকে বাতিল করে দিলেন তো। তাছাড়া ধর্মা প্রোডাকশনসের মত বলিউডের বিরাট প্রযোজনা সংস্থা এ ছবির দায়িত্ব নিল তো। যতই মার্টিন স্করসেসি এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার হোন, অত বড় ব্যানারের ছায়া না থাকলে যে এ ছবি দর্শকের মুখ দেখত না, তা সাম্প্রতিক কিছু উদাহরণ খেয়াল করলেই বোঝা যায়। অতএব হয়ত এখনো আশা করা অযৌক্তিক নয় যে, ক্রিকেট খেলতে খেলতে মুসলমান বন্ধুকে কেউ তার ধর্ম তুলে ‘নিজেদের এলাকায় গিয়ে খেল গে যা’ বললে হিন্দু বন্ধুর মারপিট করতে যাওয়ার দিন এদেশে ফুরোবে না। এ যুগের কোনো কবিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মত ছোটবেলার বন্ধু আনোয়ারকে স্মরণ করে লিখতে হবে না ‘বন্ধু হারালে দুনিয়াটা খাঁ খাঁ করে/ভেঙে যায় গ্রাম, নদীও শুকনো ধূ ধূ/খেলার বয়েস পেরোলেও একা ঘরে/বার বার দেখি বন্ধুরই মুখ শুধু।’
গত কয়েক বছরে ‘হরর কমেডি’-র মধ্যে দিয়ে লিঙ্গ রাজনীতি উলটে দেওয়ার দৃষ্টান্ত হিসাবে অমর কৌশিক নির্দেশিত হিন্দি ছবি স্ত্রী (২০১৮) এবং স্ত্রী ২ (২০২৪) নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। বাংলায় তেমন প্রয়াস এই সিরিজের আগে হয়নি বললেই চলে।
অনেকদিন আগে এক সাদা দাড়িওলা নাট্যকার বলেছিলেন ‘লোককে যদি সত্যিটা বলতে চাও, তাহলে তাদের হাসাও। নইলে লোকে তোমাকে মেরে ফেলবে।’ না, তাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নয়। নাট্যকার বলেছি বলে যদি বাদল সরকার ভাবেন, সেটাও ভুল। দুনিয়ার সব ভাল ভাল কথা বাঙালিরাই বলেছে এমন তো নয়। কথাটা বলেছিলেন আইরিশ নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ। পরিচালক কৌশিক হাফিজী আর সৃজনশীল পরিচালক অনির্বাণ ভট্টাচার্য, যে কোনো কারণেই হোক, কথাটা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছেন। তাই হইচইয়ের জন্য তাঁরা যে নতুন ওয়েব সিরিজ বানিয়েছেন, সেই ভূত তেরিকি, ভয় দেখাতে দেখাতেও হাসায়। হাসতে হাসতেও ভয় পেতে হয়, কারণ যা দেখানো হচ্ছে তা যে নেহাত বানানো নয়, সেটা ভুলে থাকতে চাইলেও দিব্যি টের পাওয়া যায়।
নির্মাতারা অবশ্য সত্যকথনের উদ্দেশ্য গোপন করার বিশেষ চেষ্টা করেননি। মৃণাল সেনের আকালের সন্ধানে ছবিতে কলকাতা থেকে এক দল যুবক-যুবতী গ্রামে গিয়েছিল দুর্ভিক্ষ নিয়ে কাহিনিচিত্র তৈরি করতে। এখানে ভূতের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্য সরাসরি তথ্যচিত্র বানানো। শুরুতেই প্রযোজক মিস্টার ডি’সুজা বলে দিয়েছেন ‘বাঙালি ভূত নিয়ে সিনেমা অনেক হয়েছে। কিন্তু, ডকুমেন্টারি একটাও হয়নি।’ তা এই তথ্যচিত্র থেকে যেসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে, সেগুলো বাংলা সংবাদমাধ্যমের ভাষায় ‘বিস্ফোরক’। ছবির প্রযোজক শুটিং শুরু হওয়ার আগেই মরে ভূত হয়ে যান! তাঁর জীবিত হিসাবরক্ষক ছবির বাজেট এক কোপে অর্ধেক করে দেন! ভূতুড়ে বাড়িতে চারজন পেতনির সঙ্গে বাস করে একজন মানুষ! সেই পেতনিরা আবার মানুষের সঙ্গে ‘ইন্টু মিন্টু’ করে!
কেলেঙ্কারির এখানেই শেষ নয়। একেক পেতনির একেকরকম পদ্ধতি পছন্দ। রাজিয়ার (দীপান্বিতা সরকার) একটি লোককেই পছন্দ – জয়ন্ত চক্রবর্তী (দেবরাজ ভট্টাচার্য)। কিন্তু রাজিয়া সঙ্গমে লিপ্ত হতে একেকবার একেকজন জীবিত মহিলার শরীরে ঢুকে পড়ে। তাতেও শখ মেটে না। আরও বৈচিত্র্যের সন্ধানে সে কী করে তা না বলাই ভাল। বললে ‘স্পয়লার’ দেওয়াও হয়ে যাবে, বাঙালির যৌনতা নিয়ে ছুঁতমার্গকে এক লপ্তে বড্ড বেশি আঘাত করাও হয়ে যাবে। সেই আঘাতে কোনো পাঠক তথ্যচিত্রের প্রযোজকের মত পটল তুললে এই প্রবন্ধের লেখক বিপদে পড়ে যাবেন। তিনি তথ্যচিত্রের পরিচালক, ‘ফা** ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকার’ সঞ্জয় লীলা ব্যানার্জির (দুর্বার শর্মা) চেয়ে কোনো অংশে কম অসহায় নন।
রাজিয়া তবু ১৭৫৯ সালে মারা যাওয়া পাঠান বাবা ও বাঙালি মায়ের গোলমেলে পরিবারের সন্তান। বিশুদ্ধ বাঙালি ঘরের বিধবা লবঙ্গ (রাত্রি চ্যাটার্জী) আবার নিশির ডাক ডেকে একেক রাতে একেকজন পুরুষ ধরে আনে! কখনো কখনো এক ডাকে একাধিক পুরুষও হাজির হয়! সবচেয়ে আধুনিক পেতনি সুকুমারী (ঐশ্বর্য সেন) অবশ্য সঞ্চয়িতা, শেষের কবিতা নিয়েই মগ্ন ছিল। কিন্তু তারও জীবদ্দশায় প্রেম করার, চুমু খাওয়ার, ‘মাজা দুলিয়ে দুলিয়ে’ নাচার সাধ পূরণ হয়নি। ফলে…দেখে নেবেন।
কী ভাবছেন? ‘ইরোটিক থ্রিলার’? না মশাই। মোটে একটা ‘অ্যাডাল্ট = বাজে/খারাপ’ দৃশ্য আছে। সেখানেও মহিলাটির দিকে ‘মেল গেজ’ দিতে গেলে ভিরমি খেতে হবে।
এই তিন পেতনির অভিভাবক যে, সেই বিষ্ণুপ্রিয়া বা ভানুদিদি (আভেরী সিংহ রায়) অবশ্য সেদিক থেকে সাত্ত্বিক মহিলা। তার সময় কাটে সদ্যমৃত মানুষকে ভীতিপ্রদ ভূত হয়ে ওঠার শিক্ষা দিয়ে। তবে চার পেতনির কেউ কিন্তু অতি পরিচিত ‘মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু’ তত্ত্ব প্রমাণ করে একে অন্যের পিছনে নিন্দেমন্দ করে না। বরং নিজেদের মধ্যে প্রাচীন বাংলায় গালাগালি দিয়ে চুলোচুলি করলেও পিছনে একে অপরের প্রশংসাই করে। লবঙ্গ পিসি যে শরবতে বিষ মিশিয়ে মানুষ মারে – সঞ্জয় লীলার দলকে এইটুকু সাবধানবাণী দেওয়া ছাড়া অন্যের পিছনে তার সম্পর্কে খারাপ কিছু বলার কোনো দৃষ্টান্ত নেই। বরং রাজিয়া আর সুকুমারী এক বাক্যে স্বীকার করে যে ভানুদিদি তাদের নেত্রী; রাজিয়া আর বিষ্ণুপ্রিয়া বলে সুকুমারী তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী। বেঁচে থাকলে ‘বাংলা বইয়ের হিরোইন’ হতে পারত।
সব মিলিয়ে ব্যাপারটা সাংঘাতিক না? বাঙালি পত্নী, থুড়ি পেতনি, এতখানি স্বনির্ভর হয়ে গেলে ব্যাপারটা যে খুবই ভয়ের হয়ে দাঁড়ায় তাতে সন্দেহ নেই। সেইজন্যেই তো ভীত সহকারী দেবদাসকে সঞ্জয় লীলা বলতে বাধ্য হয় – বউকে সব কথা বলতে নেই। সব পুরুষ সব কথা বউকে বলতে শুরু করলে পৃথিবীতে একটি পুরুষও আর বেঁচে থাকবে না। লক্ষণীয়, কথাটা শুনেই ভীত দেবদাস (সুব্রত সরকার) তাকায় পাশে বসা সহকারী পরিচালক মেয়েটির (উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি) দিকে। মায়ের নাম নিজের নামে যোগ করা সঞ্জয় লীলার সঙ্গে মেয়েটির ‘ইন্টু মিন্টু’ আছে, এমন ইঙ্গিত বারবার দেওয়া হয়েছে। এদিকে সঞ্জয় লীলা বিবাহিত না অবিবাহিত – তা কিন্তু জানতে পারা যায় না। কী ভাবছেন? ‘ফেমিনিস্ট টেক্সট’? আরে না না, অত গুরুতর কিছু নয়। তবে হ্যাঁ, এখানে কিন্তু ডাকাত ভূতকেও মেছো পেতনি বউয়ের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতে হয়। গত কয়েক বছরে ‘হরর কমেডি’-র মধ্যে দিয়ে লিঙ্গ রাজনীতি উলটে দেওয়ার দৃষ্টান্ত হিসাবে অমর কৌশিক নির্দেশিত হিন্দি ছবি স্ত্রী (২০১৮) এবং স্ত্রী ২ (২০২৪) নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। বাংলায় তেমন প্রয়াস এই সিরিজের আগে হয়নি বললেই চলে। কিন্তু ভূত তেরিকি কেবল ওতে আটকে থাকেনি। মজাটা সেখানেই।
নিশ্চয়ই ভাবছেন, হাসানোর ব্যাপারটা বোঝা গেল। ভয়ের ব্যাপারটাও নাহয় বোঝা গেল। কিন্তু এসবের মধ্যে সত্যি কোথায়? আজ্ঞে তা বুঝতে গেলে তো নিজে দেখতে হবে। আড়াই মিনিটের বেশি যে আমাদের ধৈর্য থাকে না সেকথা আজকাল কে না জানে! তার উপর বাংলা ভাষায় তৈরি কোনোকিছুর জন্যে আমাদের ধৈর্য আরও কম। তাই এই সিরিজের নির্মাতারা দর্শকদের জন্যে কিছু সহায়িকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন পর্দায়। সেগুলো খেয়াল করলে মজা পাবেন, সমৃদ্ধও হবেন। যেমন সমৃদ্ধ হবেন সদ্যোজাতকেও জয়ন্তর স্ত্রীর (মৈত্রী ব্যানার্জি) ইংরিজি বলতে শেখানোর তাড়া দেখে।
কণিষ্ককে নিয়ে অনাবশ্যক লম্বা মজা বা জয়ন্তর নিশির ডাক শোনার অভিনয়ের দৃশ্যের মত কিছু বাহুল্য বাদ দিলে এই অভিনব সিরিজের সবচেয়ে বড় জোর এর চমৎকার চিত্রনাট্য এবং বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ। স্রেফ চতুর কথার খেলা (pun) আর বহু ব্যবহৃত খিস্তি দিয়ে হাততালি পাওয়ার মত সংলাপ লেখার যে ধারা সাম্প্রতিককালে বাংলা সিনেমা আর ওয়েব সিরিজে দেখা যায়, ভূত তেরিকি একেবারেই সেই রাস্তায় হাঁটেনি। এখানে খিস্তি মানে সরাসরি কানে আঙুল দেওয়ার মত খিস্তি এবং অভিনব খিস্তি, যেমনটা বেরিয়েছে তথ্যচিত্রের জন্যে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময়ে ভূতের বাড়ির একমাত্র মানুষ বাসিন্দা তাপসের (শুভঙ্কর ঘটক) মুখ থেকে।
কিন্তু হাস্যরস, অদ্ভুতরস, আদিরস পেরিয়ে আরও এগিয়ে গেছে এই ওয়েব সিরিজ। দ্বিতীয় পর্বেই গল্পে এসেছে নতুন মোড় এবং সিরিজ যেখানে শেষ হয়েছে তা অপ্রত্যাশিত। এই পরিবর্তন সম্ভব হত না সকলের উঁচু মানের অভিনয় ছাড়া। যে পেতনিদের উপর গোটা সিরিজ দাঁড়িয়ে আছে, তাঁরা চোখ ফেরাতে দেন না। সাধারণত কলকাতার বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য কোনো বাংলায় কথা বলতে হলেই আজকের অভিনেতারা অনিচ্ছাকৃত হাস্যরস সৃষ্টি করে বসেন। কিন্তু এখানে বাঙাল টানে চমৎকার চালিয়ে গেছেন দীপান্বিতা; আভেরী নাকি সুর বজায় রেখে খাস পশ্চিমবঙ্গীয় ভাষায় কথা বলেছেন আগাগোড়া। ১৯৭০-এর দশকের আধুনিকার চরিত্রে ঐশ্বর্যও দারুণ সফল। তিনজনের হাঁটাচলা, ছলাকলায় যে বিভিন্নতা থাকার কথা ছিল তাও তাঁরা সযত্নে রক্ষা করেছেন। তার উপর আছে ভয় দেখানো – কোথাও চাউনির সামান্য পরিবর্তনে, কোথাও বসার বা দাঁড়ানোর ভঙ্গি বদলে। সেসবেও তিনজনেই সফল। ঐশ্বর্যকে এর উপর প্রেমের অভিনয়ও করতে হয়েছে।
দুর্বার এর আগে অনির্বাণের সৃজনশীল পরিচালনায় দুটো ওয়েব সিরিজে একেবারে দুই মেরুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন – ব্যোমকেশ ও পিঁজরাপোল-এ তলোয়ারের মত তীক্ষ্ণ ভুজঙ্গ ডাক্তার, আর তালমার রোমিও জুলিয়েট-এ গোবেচারা তপন। এখানে তিনি একইসঙ্গে বেচারা, ভীতু, আবার দলনেতা। ভয় পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু সেটা লুকিয়েও রাখতে হবে। নইলে শুটিংয়ের কর্তৃত্ব হাত থেকে বেরিয়ে যাবে। একখানা টুপি আর চশমায় ভর দিয়ে ভীরু, সংস্কৃতিবান অথচ অসহায় বাঙালির মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন এই তরুণ অভিনেতা। পেতনিরা কী করতে বললে মানবে আর কিসে রেগে যাবে, তা নিয়ে তাঁর সর্বক্ষণের আতঙ্ক; সহকারীদের কাজকর্মে, প্রযোজকের কীর্তিকলাপে হতাশা; পার্টির দৃশ্যে সহকর্মীর এবং নিজের প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা যেমন হাসির উদ্রেক করে, তেমনই টের পাওয়ায় – ঠিক কোন গাড্ডায় পড়ে আছি আমরা।
বাবা-মা-বউয়ের চোখে ফালতু, অথচ পেতনির সঙ্গে মাঠে ঘাটে খাটে খাটে খেলে বেড়ানো বেচারা ভদ্রলোকের চরিত্রে দেবরাজ এতটাই জ্যান্ত, থুড়ি জয়ন্ত, হয়ে উঠেছেন যে তাঁকে দেখলেই মনে পড়ে নবারুণ ভট্টাচার্যের লাইন ‘বাঙালি শুধুই খচ্চর নয়, তদুপরি অসহায়’। ভদ্রলোকের যাবতীয় ভালমানুষি ও ভণ্ডামি ভারি নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন দেবরাজ।
কমলেশ নামক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আছেন শৌনক কুন্ডু। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁকে দ্বিধা, বিষাদ, পূর্বরাগ, প্রেম, বিস্মৃতি – অনেককিছু ফুটিয়ে তুলতে হয়েছে। তাঁরই ঠোঁটে আছে এই সিরিজের সূক্ষ্ম অথচ সবচেয়ে মোক্ষম খোঁচা দেওয়া সংলাপ ‘কী হয়েছে মানুষের? এত রাগ, এত হিংসে…’। দ্বিতীয় পর্বের কমলেশ আর শেষ পর্বের কমলেশ প্রায় দুটো আলাদা চরিত্র। দুটোতেই দিব্য উতরে গেছেন শৌনক। গোটা সিরিজে সাকুল্যে আড়াই-তিন লাইন সংলাপ বলতে হওয়া উজ্জয়িনী বা শুটিং দলের অন্যদের অভিনয়েও এক চুল খামতি নেই।
ভূতুড়ে পরিবেশ তৈরি করতে অসামান্য ভূমিকা নিয়েছে অনিমেষ ঘড়ুইয়ের ক্যামেরা আর উজান চ্যাটার্জির আবহসঙ্গীত। অনিমেষের নৈপুণ্য তুঙ্গে উঠেছে একেবারে শেষ পর্বে রবীন্দ্রসঙ্গীতের গায়ে কাঁটা দেওয়া ব্যবহারে। এক স্মরণীয় শটে তিনি মিলিয়ে দিয়েছেন ভূতের বাড়ির আলো আঁধারি আর গানের ‘সেইখানেতে সাদায় কালোয় মিলে গেছে আঁধার আলোয় –’ । ভূতের ছবির আবহসঙ্গীত প্রায়শই অকারণে কান ঝালাপালা করে। কিন্তু উজান মজা আর গা শিরশিরে ভাব মিলিয়েছেন শব্দের পরিমিত ব্যবহারে।
তবে এত উপাদেয় রান্নায় নুন কিন্তু গানগুলো। আগেও দেখা গেছে, অনির্বাণের কলম আর দেবরাজের সুর ও কণ্ঠ মিললে গুনগুন করার মত এক বা একাধিক গান তৈরি হয়ে যায়। এই সিরিজেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। মধুপূর্ণা গাঙ্গুলির গাওয়া শীর্ষসঙ্গীত তো বটেই, দেবরাজ আর ঝিনুক বসুর গাওয়া ‘একটা প্রেম করি’-ও শ্রুতিমাধুর্যে তেমন গান হয়ে উঠেছে। গানের কথায় আশ্চর্য কাণ্ড অবশ্য ঘটেছে ঐশ্বর্য রায়ের গাওয়া ভূতেদের পার্টির গানে।
এসব লাইন সহজে ভোলার নয়, যেমন ভোলা যাবে না সমাধানবাবুকে। র্যাপার ভূতো (বুদ্ধদেব দাস; কণ্ঠে অনির্বাণ) আর রজনীগন্ধার স্টিক লাগিয়ে হারমোনিয়াম নিয়ে ‘কেউ বেঁচে নেই’ গাইতে বসা গায়ককে (উজান) আবার হজম করা শক্ত বলে ভোলা কঠিন।
এই সিরিজের দুর্বলতা বলতে প্রথম দেড়খানা পর্বের বিপুল মজা সত্ত্বেও গল্প দানা না বাঁধা। তাছাড়া ভানুদিদি কী করে মারা গেলেন সে ব্যাখ্যাও কোথাও নেই। ব্যাপারটা বিসদৃশ লাগত না, যদি একমাত্র তাঁর বেলাতেই এমনটা না ঘটত। আর সবচেয়ে বড় শক্তি কী? প্রচণ্ড হুল্লোড় সত্ত্বেও গিলতে আসা বিষাদ। কারণ এই সিরিজে সারাক্ষণ মনে হয়, অশরীরীরা শরীরী হয়ে উঠতে চাইছে আর শরীরীরা মরলে বাঁচে।
অভিমন্যুকে আমরা ক্ষণজন্মা প্রতিভাবান যোদ্ধা হিসাবে ভাবতেই অভ্যস্ত, যার যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা অথচ বয়সের কারণে চক্রব্যূহ সম্পর্কে অসম্পূর্ণ জ্ঞান তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই নাটকের অভিমন্যুর ট্র্যাজেডি কিন্তু তাকে আজকের পৃথিবীর যুবকের অনেক কাছাকাছি এনে দিয়েছে।
‘তোমরা কার পক্ষে?’
‘হস্তিনাপুরের পক্ষে।’
দুর্যোধন খুশি হন না, সশস্ত্র বাহিনী প্রজাদের পিছনে এসে দাঁড়ায়।
‘তোমরা কার পক্ষে?’
‘কৌরবদের পক্ষে।’
দুর্যোধন তাতেও খুশি হন না, প্রজাদের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলে আরও বেশি সৈনিক।
‘তোমরা কার পক্ষে?’
‘দুর্যোধনের পক্ষে।’
এবার দুর্যোধনের মুখে হাসি ফোটে।
নটধা নাট্যদলের প্রযোজনা মহাভারত ২-এর এই দৃশ্যে দুর্যোধন আসলে কে? শাসক দলই দেশ আর দলের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিই দল – এই সূত্রটা কেমন চেনা চেনা লাগছে না? ওই দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় – India is Indira and Indira is India। এবছর জরুরি অবস্থার ৫০ বছর পূর্ণ হল। কিন্তু সে তো আজকের গতিময় দুনিয়ায় আদ্যিকালের কথা। তখন আমার জন্ম হয়নি, এই নাটকের অভিনেতাদের অধিকাংশেরও জন্ম হয়নি। তাহলে ২০২৫ সালের এক সন্ধ্যাতেও এই নাটক এত জ্যান্ত মনে হয় কেন? কারণ আজও, যা মহাভারতে নেই তা ভারতে নেই। উলটো দিক থেকে দেখলে, মহাভারতে যা যা আছে তার সবই ভারতে আছে। আজও আছে। ফলে শিব মুখোপাধ্যায়ের কলমে, অর্ণ মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় মহাভারতের উদ্যোগ পর্বের এই সৃজনান্তর কখনো প্রাচীন মনে হয় না, সেকেলে তো নয়ই।
মহাভারত মহাকাব্য, কারণ প্রত্যেক পাঠেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসে কোনো না কোনো নতুন বয়ান। মহাভারত ২ নাটকে মহাকাব্যের পরিচিত চরিত্রগুলো থেকেও নাট্যকার বের করে এনেছেন আশ্চর্য নতুন সব পরত। যেমন শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দ্রৌপদীর সখ্য বহু আলোচিত, কিন্তু এখানে সেই সম্পর্কের অন্য এক মাত্রারও আভাস দেওয়া হয়েছে। দ্রৌপদীর প্রতি যৌন বুভুক্ষায় পাণ্ডবরা যে কৃষ্ণকেও সন্দেহ করে এবং তাদের নিজেদের মধ্যেকার সম্পর্কে ছায়া ফেলে দ্রৌপদীর প্রতি কামনা – তাও জীবন্ত হয়ে উঠেছে মঞ্চে। পাণ্ডবদের কাছে দ্রৌপদীর প্রত্যাশা, নিজের অপমানের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে তাদের যুদ্ধের দিকে চালনা করার তীব্র অভিলাষে সোহিনী সরকারকে দেখে মনে পড়ে অডিও ক্যাসেটে শোনা নাথবতী অনাথবৎ নাটকের শাঁওলী মিত্রকে। কিন্তু এখানে, বিশেষত দ্বিতীয়ার্ধে, যোগ হয়েছে অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার খিদের সঙ্গে মা হিসাবে সন্তানকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্যে গ্লানিবোধ। এই দ্বিধায় ভিতরে ভিতরে তছনছ হতে থাকা, অথচ প্রবল ব্যক্তিত্বশালী পাঞ্চালীকে জীবন্ত করে তুলেছেন সোহিনী।
আবার ছবিতে মহাভারত, রাজশেখর বসুর মহাভারত বা দূরদর্শনের মহাভারতেও যে খল মামা শকুনিকে দেখা যায়, এই নাটকের শকুনি তার থেকে ভিন্ন এক চরিত্র। এমনকি বহুবছর আগে একক নাটক শকুনির পাশা-য় বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় শকুনির খল হয়ে ওঠার কাহিনির মধ্যে দিয়ে তার যে অসহায়তা তুলে ধরেছিলেন, এই শকুনির অসহায়তা তার চেয়েও বেশি। ভাগ্নে দুর্যোধন ক্ষমতার মদে মত্ত হয়ে এই শকুনিকে বিশ্বাস করে না। শকুনিও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে তার চেহারা দেখে, কর্ণকে বোঝায় – দুর্যোধন এমন এক একাকিত্বে পৌঁছেছে যেখানে মামা বা নিকট বন্ধুও তার ব্যবহার্য বস্তু মাত্র। এই ভীত, নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা শকুনির চরিত্রে আশ্চর্য অভিনয় করেছেন ঋতম। যুগপৎ শারীরিক ও মানসিক আঘাতে পঙ্গু একটা মানুষকে দেখিয়েছেন তিনি।
বিরাট রাজকন্যা উত্তরার যে অর্জুনের প্রতি অনুরাগ ছিল – এর ইঙ্গিতটুকু আছে মহাভারতে। বলা আছে বিরাটরাজ অর্জুনকেই জামাই করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অর্জুন বলেন যেহেতু উত্তরা তাঁর শিষ্যা, তাই তিনি তাকে বিয়ে করতে পারেন না। বিয়ে হোক অভিমন্যুর সঙ্গে। এই নাটকে সেই ইঙ্গিতকে অবয়ব দেওয়া হয়েছে। প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকা থেকে পুত্রবধূ হয়ে যাওয়ার নিরুচ্চার বেদনা বেশ ফুটিয়ে তুলেছেন উপাবেলা, যদিও অর্জুনের চরিত্রে শুভম আগাগোড়াই আড়ষ্ট। উপরন্তু অভিমন্যুর চরিত্রাভিনেতা জ্যোতির্ময় আর শুভমকে প্রায় সমবয়সী মনে হয়েছে, উপাবেলার সঙ্গে জ্যোতির্ময়ের রসায়নও তেমন ঘনীভূত হয়নি।
তবে এই নাটকের অভিমন্যুর চরিত্র সবচেয়ে চমকপ্রদ। অভিমন্যুকে আমরা ক্ষণজন্মা প্রতিভাবান যোদ্ধা হিসাবে ভাবতেই অভ্যস্ত, যার যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা অথচ বয়সের কারণে চক্রব্যূহ সম্পর্কে অসম্পূর্ণ জ্ঞান তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই নাটকের অভিমন্যুর ট্র্যাজেডি কিন্তু তাকে আজকের পৃথিবীর যুবকের অনেক কাছাকাছি এনে দিয়েছে। তার সমরানুরাগে কোনো গৌরব নেই, বরং যুদ্ধ লাগলে নিজেরই আত্মীয়দের হত্যা করতে হবে ভেবে সে বিহ্বল। অনেকটা গীতার গোড়ার দিকের অর্জুনের মত। অথচ এমনভাবে তাকে বড় করা হয়েছে যে যুদ্ধ ছাড়া জীবনের কোনো সার্থকতা আছে বলেও তার জানা নেই। এই দ্বন্দ্বে সে আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে যায়। ভারতীয় সমাজে আত্মহননের চেষ্টাকে সচরাচর কাপুরুষতা বলেই ধরা হয়। অভিমন্যুকে সেই পথে টেনে নিয়ে গিয়ে নাট্যকার চরিত্রটার গা থেকে সমস্ত নায়কোচিত অলঙ্কার খুলে নিয়ে তাকে রক্তমাংসের মানুষে পরিণত করেছেন। তাই এই অভিমন্যুকে দেখে, উত্তরার সঙ্গে তার প্রেমের দৃশ্য দেখে মনে পড়ে ইংরেজ কবি উইলফ্রেড ওয়েনের কবিতায় বর্ণিত সেই তরুণদের, যাদের যুদ্ধযাত্রার বর্ণনায় কবি লেখেন এইসব পংক্তি
So secretly, like wrongs hushed-up, they went.
They were not ours:
We never heard to which front these were sent.
Nor there if they yet mock what women meant
Who gave them flowers.
Shall they return to beatings of great bells
In wild trainloads?
A few, a few, too few for drums and yells,
May creep back, silent, to still village wells
Up half-known roads.
তরুণদের মধ্যে যুদ্ধোন্মাদনা জাগিয়ে তুলে, তাদের প্রাণহানিকে বীরত্ব নাম দিয়ে সেই আগুনে হাত সেঁকার সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যেহেতু আসলে গৃহযুদ্ধ, সেহেতু এই নাটকের অভিমন্যুকে দেখে আরও মনে পড়ে তরুণ গল্পকার প্রবুদ্ধ ঘোষের ‘আনন্দ ময়দান ছেড়ে পালায়নি’ গল্পের আনন্দকে। তাকে ক্ষমতাসন্ধানী এক পণ্ডিতজি শিখিয়েছিলেন যে এতদিন আসল ইতিহাস জানতেই দেয়নি কেউ। ‘কীভাবে জবরদস্তি মেরেছে, মন্দির-মঠ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ওদের জন্যই দেশভাগ আর খুন। রামনাথ স্বামীর বইতে লেখা আছে তুর্কিরা বাংলা দখল করতে আসার অনেক আগে থেকে সুফি-টুফিরা বাংলায় এক-ধারসে ধর্ম পালটে দিচ্ছিল। গান গেয়ে সম্মোহন করত। তারপর গরু খাইয়ে দিত, সুন্নত করিয়ে দিত বাচ্চাদের তুলে এনে। আনন্দর কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে রাগে। বল্লাল সেন, লক্ষ্মণ সেন প্রজাদের বাঁচাতে কিছু বর্ণের ভাগ তৈরি ক’রে দিয়েছিল। সে তো নিজেদের ধর্ম বাঁচাতেই।’ সেই গল্পের শেষে ‘আনন্দর বুকে চাপাতির কোপ পরিচ্ছন্নভাবে নেমে আসবে। যন্ত্রণায়, রক্তের ফোঁটায় চোখ খুলতে পারবে না। আগুনের হলকা আরও বাড়বে কারণ মিছিল থেকে ছুটে যাওয়া লোক মহল্লার ঘরে আগুন দিচ্ছে। বোম আর গুলির আওয়াজে আনন্দর কান বুজে আসবে। ঠোঁট নড়বে। স্যার, ওরা আমাদের মিছিলে ইট মেরেছে। নোংরা নোংরা খিস্তি।’ কেন মরছে আনন্দ? কারণ ‘রিষড়ায় রামনবমীর মিছিলে সংঘর্ষ। দোকানে আগুন। পাথরবৃষ্টি। আহত প্রায় পনেরোজন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভরতি নুরুল আলম নামে এক ব্যক্তি। সংঘর্ষে মৃত এক যুবক। যুবকের পরিচয়…’
এবং দুর্যোধন। রাজশেখর লিখেছেন ‘দুর্যোধন মহাভারতের প্রতিনায়ক এবং পূর্ণ পাপী।’ এই নাটকের দুর্যোধন পূর্ণ পাপী ঠিকই, কিন্তু সে একাধারে এই নাটকের প্রতিনায়ক এবং নায়ক। এই চরিত্রে অর্ণ পুরাণের প্রতিনায়কের মধ্যে থেকে তুলে এনেছেন একজন সুচতুর একনায়ককে, যে সন্ত্রাস কায়েম করে জনমত নিয়ে আসতে পারে নিজের দিকে, তারপর চরম শঠতায় স্বয়ং কৃষ্ণকেও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়ে নিজমুখে বলে যে সে যুদ্ধ চায় না। তারপর আতঙ্কিত জনতার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেয় ‘বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’। আত্মম্ভরিতার উত্তুঙ্গ শিখর অর্ণ দেখিয়ে দিয়েছেন তাঁর অভিনয়ে। তিনি কখনো সচেতনে, কখনো অবচেতনেই নিজেকে বলেন সুযোধন। অভিনয়ে অন্যমনস্কতা তুলে ধরার আশ্চর্য ক্ষমতা দেখিয়েছেন অর্ণ। খোঁড়া মামা শকুনি, বাবা অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকেও তিনি শারীরিক পীড়ন করতে ছাড়েন না। অর্ণর অভিনয় তুঙ্গে ওঠে ধৃতরাষ্ট্রের (কৌশিক চট্টোপাধ্যায়) সঙ্গে একান্ত মুহূর্তগুলোতে এবং কৃষ্ণের (অর্পণ ঘোষাল) সঙ্গে নাচের দ্বন্দ্বযুদ্ধে। নাটকের একেবারে শেষদিকে, যুদ্ধে যাওয়ার আগে মা গান্ধারীর (সাধনা মুখোপাধ্যায়) কাছে বিদায় নেওয়ার দৃশ্যে একেবারে অন্য এক দুর্যোধন বেরিয়ে আসে। মঞ্চের উপর গর্ভস্থ শিশুর মত কুঁকড়ে শুয়ে পড়েন অর্ণ, তারপর মাকে বলে যান – দুর্যোধনের মনে কেবল অন্ধকার, কারণ বাবা জন্মান্ধ আর মা স্বেচ্ছান্ধ। তাই তাকে আলো দেখানোর কেউ ছিল না। নাটকের সবচেয়ে বড় খল চরিত্রের যাবতীয় পাপ সত্ত্বেও ওই দৃশ্যে কঠিন হয়ে পড়ে দুর্যোধনের জন্যে চোখ ভিজে আসা আটকানো।
স্নেহান্ধ ধৃতরাষ্ট্রের ক্ষমতা ও অক্ষমতা মাত্র কয়েকটা সুযোগে জীবন্ত করে তোলেন কৌশিক। অর্ণর সঙ্গে তাঁর মুহূর্তগুলো বহুদিন মনে থাকার মত। একান্ত অনুচরকে যখন তিনি বলেন যে তাঁকে খাদের সামনে দাঁড় করালেও তিনি তাকেই বিশ্বাস করবেন, কারণ অন্ধ লোকের বিশ্বাস করা ছাড়া কোনো উপায় নেই – তখন তৈরি হয় এমন মুহূর্ত, যখন পরম সত্যকে ছুঁয়ে ফেলতে পারেন একজন অভিনেতা। ফলে সন্দেহ হয় – ধৃতরাষ্ট্র আসলে কে? দৃষ্টিহীন রাজা, বখে যাওয়া ছেলের স্নেহান্ধ বাবা, নাকি কোনো দেশের একনায়কের প্রোপাগান্ডায় নিজের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা নাগরিক? ধৃতরাষ্ট্র কি এমন এক বিকল্পহীন রাজনৈতিক অবস্থার শিকার, যেখানে লম্পট ছেলে দুঃশাসনকেও তাঁর সময়ে সময়ে দুর্যোধনের চেয়ে ভাল বলে মনে হয়?
দুঃশাসনের চরিত্রে যে লাম্পট্য ছাড়াও অনেককিছু আছে, তা সামান্য সুযোগেই দেখিয়ে দিয়েছেন সৌরভ। ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর একার কয়েকটা মাত্র মুহূর্ত দুঃশাসন চরিত্রের একমাত্রিকতা ঘুচিয়ে দিয়েছে।
কৃষ্ণের চরিত্রে অর্পণ মুরলীধর হিসাবে পাণ্ডব এবং দ্রৌপদীর সঙ্গে সাবলীল। কিন্তু কূটনীতিবিদ হিসাবে কর্ণ (অনুজয় চট্টোপাধ্যায়), শকুনি বা ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে দৃশ্যগুলোতে তাঁকে যতখানি ভারি দেখানো উচিত ছিল, তা দেখায় না। অন্যদিকে এই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অভিনেতা অনুজয়ের বিশেষ কিছু করার নেই এই নাটকে।
তবে মানানসই আবহসঙ্গীত এবং এত নিপুণ অভিনয় সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত এই প্রযোজনার সেরার শিরোপা বোধহয় নাট্যকারকেই দিতে হবে। তাঁর নির্মিত চরিত্রগুলো বেদব্যাসের মহাকাব্যের মতই বহুবর্ণ, উপরন্তু সমসাময়িক। স্ত্রী ভানুমতীর (স্বাগতা) সঙ্গে একমাত্র একান্ত দৃশ্যে দুর্যোধনের মুখে শোনা যায়, সকলের ভয়ের পাত্র হওয়ার মধ্যে এক ধরনের মাদকতা আছে। একনায়কদের মনস্তত্ত্বের গভীর থেকে তুলে আনা এই সংলাপ শাশ্বত সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
অর্ধসত্য যে মিথ্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর সে তো সকলেই জানেন। কিন্তু ক্লিকটোপের যুগে অর্ধসত্য আবার সত্যের চেয়ে সুবিধাজনকও বটে। অর্ধসত্যে ক্লিক পাওয়া যায় বেশি, তাই সংবাদমাধ্যমের সুবিধা। অর্ধসত্য নিয়ে কয়েকদিন সোশাল মিডিয়ায় রাগ-টাগ দেখিয়ে বিবেক দংশন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, তাই যে সংবাদ গিলছে তার সুবিধা। আবার পুরো সত্যটা জেনে গেলে হয়ত ব্যক্তির এত বেশি রাগ হবে বা গ্লানি হবে যে সত্যিকারের কিছু একটা করতে ইচ্ছে হবে। সেটা ব্যক্তির পক্ষে বিপজ্জনক, ব্যক্তি সমষ্টি হয়ে উঠলে ক্ষমতার পক্ষেও। এরকমই একটা অর্ধসত্য নিয়ে কদিন ধরে বাংলার নিস্তরঙ্গ সংস্কৃতি জগৎ কিছুটা উত্তাল – অনির্বাণ ভট্টাচার্য কাজ পাচ্ছেন না। গোটা ব্যাপারটা যা, তাতে এই খবরটাকে অর্ধসত্য না বলে সোয়া সত্য বা এক দশমাংশ সত্য বললেও ভুল হয় না।
ব্যাপারটা কী আসলে? ব্যাপার হল, টলিউডের কিছু শিল্পীকে কলাকুশলীরা (আজকাল বাংলায় যাঁদের টেকনিশিয়ান বলা হয়) বয়কট করেছেন। কী করে জানা গেল বয়কট করা হয়েছে? কেউ ঘোষণা করেছে? না। কিন্তু ওই শিল্পীরা কোনো ফিল্মের বা ওয়েব সিরিজের নির্দেশক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা, গীতিকার, গায়ক বা অন্য যে ভূমিকাতেই থাকুন না কেন – শুটিংয়ের জন্য ডাকলে কোনো কলাকুশলী যাচ্ছেন না। এই বয়কটের আওতায় পড়ে যাওয়া শিল্পীদেরই একজন অনির্বাণ। এমনকি তিনি তাঁদের গানের দল হুলিগানইজমের মিউজিক ভিডিও শুট করতে গিয়েও দেখেন কোনো কলাকুশলী আসেননি। কিন্তু মূলধারার সংবাদমাধ্যম যেভাবে শুধু অনির্বাণের নাম নিয়ে হইচই করেই ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে চাইছে, তাতে বোঝা যায় যে গভীরে যাওয়ার সাধ নেই। হয়ত সাধ্যও নেই, কারণ সেটা করতে গেলে সরাসরি এ রাজ্যের ক্ষমতাসীনদের চটাতে হবে।
ঘটনা হল, অনির্বাণের একার ভাত মারার চেষ্টা চলছে না টালিগঞ্জে। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে তাঁর পাশাপাশি বাংলা ছবি ও সিরিজের দর্শকদের পরিচিত মুখ পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের নামোল্লেখ করা হয়েছে। বিকল্প সংবাদমাধ্যমগুলো এঁদের পাশাপাশি নির্দেশক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর নামও করেছে, কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে টিভির এক সময়কার পরিচিত মুখ এবং বড় পর্দার বেশকিছু ছবির পরিচালক সুদেষ্ণা রায়ের উল্লেখও করা হয়েছে। এও সেই সোয়া সত্যেরই বেসাতি। এর সুবিধা হল, পাঠক/দর্শক ভাববেন বা তাঁদের ভাবানো যাবে যে এই দু-চারজনের সঙ্গে দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের কোনো ব্যক্তিগত ঠোকাঠুকি লেগেছে। একেকজনের অতীত কার্যকলাপ উল্লেখ করে ‘যা হচ্ছে ওদের নিজেদের মধ্যে হচ্ছে, আমাদের ভাবার দরকার নেই’ – এরকম একটা বয়ান খাড়া করে দেওয়া যাবে। ফলে কয়েকদিন হইচইয়ের পরে সবাই ব্যাপারটা ভুলে যাবে, সোশাল মিডিয়ার যুগে হইচই করার মত নতুন কিছু ঠিক এসে পড়বে (এক্ষেত্রে যেমন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মাতৃভাষা সম্পর্কে হীনমন্যতা এসে পড়েছে)। ফলে কেউ আর খুঁজে দেখতে যাবে না, আসলে কী হয়েছে।
এই কুচক্র থেকে বেরোতে প্রথমেই বলা যাক যে বয়কট হচ্ছেন মূলত ১৩ জন। কোন ১৩ জন? যে ১৩ জন কলকাতা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেছেন এই মর্মে, যে ভারতের একজন নাগরিকের এদেশে কাজ করে উপার্জন করার যে সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার রয়েছে, তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে তাঁদের বেলায়। কাজ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এই ১৩ জন কারা? সুদেষ্ণা রায়, সুব্রত সেন, কিংশুক দে, বিদুলা ভট্টাচার্য, আশিস সেন চৌধুরী, সুমিত দাম, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, অভিষেক সাহা, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, দেবাশীষ চক্রবর্তী, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, প্রসেনজিৎ মল্লিক, সৌরভ ভট্টাচার্য।
বাংলা সিনেমার যাঁরা রীতিমত খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের কাছেও হয়ত বেশিরভাগ নাম অচেনা। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে এই তালিকার কারোর কাজ করার অধিকার অন্যদের চেয়ে কম। সুতরাং বোঝা দরকার, একটা বিরাট অন্যায় ঘটে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা শিল্পে এবং সেই অন্যায় ঘটছে রাজ্য সরকারের মদতে। এটা আমার মতামত নয়। পিটিশনাররা এই দাবিটাই করেছেন। বস্তুত, রিট পিটিশন সরকারের বিরুদ্ধেই দাখিল করা যায়। কারণ নাগরিকের যে কোনো সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। ফলে এই শিল্পীদের কাজ করতে না দেওয়ার পিছনে টলিউডের কুখ্যাত ফেডারেশন – যার কর্তা মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস – আছেন বলে অভিযোগ থাকলেও, পিটিশন কিন্তু করা হয়েছে সরকার পিটিশনারদের অধিকার রক্ষা করছে না, এই অভিযোগে। এতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিক্রিয়া কী?
গতবছর এই জুলাই মাসেই যখন টালিগঞ্জে ফেডারেশন বনাম পরিচালক টানাপোড়েন শুরু হয় শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস প্রযোজিত এবং রাহুল মুখার্জি নির্দেশিত একটি ছবির শুটিং নিয়ে এবং তার জেরে কাজ বন্ধ হয়ে যায় পুরো সিনেমাপাড়ায়, তখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি স্বয়ং সব পক্ষকে ডেকেছিলেন। সেই সভায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে সরকার একখানা কমিটি গঠন করে দেবে এবং সেই কমিটি সব মিটিয়ে দেবে। সে কমিটিও গঠন হল না আর তা নিয়ে বিস্তর ইমেল পাঠানোর পরেও কোনো জবাব পাওয়া গেল না দেখে পরিচালকরা আদালতে এই পিটিশন দাখিল করলেন। মজার কথা, হাইকোর্টে বিচারপতি অমৃতা সিনহার এজলাসে এই মামলার শুনানিতে কিন্তু রাজ্য সরকারের কৌঁসুলি কেবলই প্রমাণ করার চেষ্টা করে গেছেন যে এই মামলার দুটি পক্ষ হল ফেডারেশন আর পরিচালকরা। এতে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই, কিছু করার নেই। বিচারপতি অবশ্য সেকথায় আমল দেননি। ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন জানিয়েও রাজ্য সরকার সুবিধা করতে পারেনি। মামলা আবার ফেরত এসেছে বিচারপতি সিনহার এজলাসেই। ইতিমধ্যে বিচারপতি সিনহার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের সচিবকে দেওয়া স্পষ্ট নির্দেশ সত্ত্বেও পিটিশনারদের কাজে বাধা পড়ায় তাঁরা আদালত অবমাননার মামলাও করেছেন। সে মামলার শুনানি হওয়ার কথা আগামীকাল। তাহলে ভাবুন, রাজ্য সরকার ফেডারেশনের স্বার্থরক্ষায় কতখানি মরিয়া আর পরিচালকদের নাগরিক অধিকার রক্ষায় কতখানি উদাসীন। অর্থাৎ ব্যাপারটা স্রেফ অনির্বাণ বা কয়েকজন শিল্পীকে কলাকুশলীদের বয়কট করার ব্যাপার নয়। এ রাজ্যে যে কোনো নাগরিক আইনি পথে নিজের কাজকর্ম করতে পারবেন কি পারবেন না – প্রশ্নটা সেইখানে।
সমস্যার গভীরতা বোঝার জন্যে আরও দুটো তথ্য খুব জরুরি। এই পিটিশন যখন দাখিল করা হয় তখন পিটিশনার ছিলেন ১৫ জন, এখন ১৩। গত এক বছরে আরও একটি মামলা দায়ের করেছেন বয়কট হয়ে যাওয়া শিল্পীরা। সেটা সরাসরি ফেডারেশনের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা স্বরূপের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা, কারণ তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন যে বেশিরভাগ নির্দেশকের নামেই নাকি যৌন হয়রানির অভিযোগ জমা পড়েছে তাঁর কাছে। সেই মামলা করেছিলেন ২৩০-৩৫ জন। মামলার শুনানি এখনো শুরুই হয়নি, অথচ ৭০-৮০ জন মামলাকারী মামলা প্রত্যাহার করে ফেলেছেন।
কেন এমন হল? ঠিক যে কারণে প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যস্ত রাস্তায় খুন হওয়ার পরেও পুলিস একজন সাক্ষী পায় না খুনিকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্যে। ঠিক যে কারণে আর জি কর কাণ্ডের সময়ে সারা রাজ্যের মেডিকাল কলেজের জুনিয়র ডাক্তাররা হুমকি সংস্কৃতির কথা বলছিলেন; যে কারণে সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজে ছাত্রীর ধর্ষণের পর জানা যাচ্ছে, ম্যাংগো কুমার আগেও বিস্তর কুকর্ম করেছে। কিন্তু কেউ তার টিকি স্পর্শ করতে পারেনি। উপরন্তু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে যে রাজ্যের বহু কলেজই নানা জাতের ম্যাংগোর গন্ধে বারো মাস ম ম করে। এহেন ম্যাংগোরাই এ রাজ্যের সর্বময় কর্তা এখন। গত ২০ জুন উত্তরবঙ্গ সংবাদের পাতায় বর্ষীয়ান সাংবাদিক রূপায়ণ ভট্টাচার্যকে লিখতে হয়েছে
মমতা রাত জেগে টিভি সিরিয়াল দেখেন, তাঁর মতো করে সাহিত্যচর্চা করেন, সবার জানা। অথচ টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিই সবচেয়ে বিপন্ন শিল্প। সাহিত্য আকাদেমি, নাট্য আকাদেমিতেও হাত মিলিয়ে অনেক কাজ চলছে, যা দিদিই জানেন না। যে কোনও সময় টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিতে তালাচাবি লেগে যাবে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপের দাদাগিরিতে। এই স্বরূপ কাউন্সিলারও নন, অথচ মমতা-অরূপকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে প্রসেনজিৎ-দেব-সৃজিত-কৌশিক-পরমব্রত-অনির্বাণদের কাজ বন্ধ করতে এক মিনিট লাগে তাঁর। এক বছর ধরে স্বরূপ তাঁর স্বরূপ বোঝাচ্ছেন মিটিং না ডেকে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ না মেনে। মমতা রহস্যজনক চুপ। মাঝে তিনি নিজের ভাই বাবুনকে পর্যন্ত কিছুদিনের জন্য ত্যাজ্য করেছিলেন। এখানে এসব হয় না।
দেব-শতাব্দী-জুন থেকে শুরু করে সায়নী-লাভলি-সায়ন্তনীরা তৃণমূলের এমপি, এমএলএ। অথচ মমতা স্থানীয় বিধায়কের কীর্তিমান ভাইকে টালিগঞ্জ সামলাতে দিলেন কেন? সাহিত্যজগৎ কি তাহলে কলেজ স্ট্রিটের বিধায়কের ভাই সামলাবেন, যাত্রাপাড়া চিৎপুরের বিধায়কের ভাই, খেলার ময়দান চৌরঙ্গির বিধায়কের ভাই? অরূপকে দিদি অনেক জায়গায় জট খুলতে পাঠান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অরূপ সফল, সবাইকে নিয়ে চলার গুণের জন্য। শুধু ভাইকেই সামলাতে চূড়ান্ত ফ্লপ। অভিনেতারা বলেন, ভাই এখন দাদাকেই পাত্তা দেয় না। মমতার প্রতি সহানুভূতি সম্পন্নদের সঙ্গে রাজ্য সরকারের ঝামেলা লাগিয়ে দিতে ওস্তাদ স্বরূপ কোম্পানি।
এরপরেও যদি আপনি কেন-র উত্তর না পান, তাহলে দেখে নিন স্বরূপের নেতৃত্বাধীন ফেডারেশনের গুণগান করে তৈরি বাংলা ছবির তথাকথিত ফার্স্ট বয় সৃজিত মুখার্জি, গতবছর জুলাইয়ে যাঁর ছবির কাজ বয়কট নিয়ে এই বিবাদের সূত্রপাত সেই রাহুল মুখার্জি এবং সঙ্গীত পরিচালক তথা পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের ভিডিও।
এই ভিডিও পোস্ট করা হয়েছিল গত ১১ জুন, যুযুধান পরিচালকরা তাঁদের বক্তব্য জানিয়ে দুখানা ভিডিও ৩০ এপ্রিল ও ২৮ মে প্রকাশ করার পর। মজার কথা, মামলাকারী পরিচালকরা ভিডিওগুলো পোস্ট করেছেন একখানা স্বতন্ত্র ইউটিউব চ্যানেলে এবং নিজ নিজ সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলোতে। ফেডারেশনের গুণগান করা ত্রয়ীর ভিডিও কিন্তু পোস্ট হয়েছে ফেডারেশনেরই ফেসবুক পেজ থেকে। আরও মজার কথা, পর্দায় এক কোণে তিন পরিচালককে দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে আছে একটি বাণী
আমরা একসাথে
কাজ করার পক্ষে
মিথ্যা মামলার বিপক্ষে।
ফেডারেশনে ছিলাম
আছি থাকবো
এই ভিডিওতে কলাকুশলীরা যে ছবি বানানোর কাজে নির্দেশকদের সমান জরুরি, সেকথা বলা হয়েছে। গোটা টলিউড যে পরিবারের মত, তাও বলা হয়েছে। এমনকি ‘স্বরূপদা’ কত ভাল – সেকথাও বলেছেন সেই রাহুল, যিনি ফেডারেশনের অনুমতি না নিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে একখানা ওয়েব সিরিজের শুটিং করে এসেছিলেন বলে তাঁর এখানকার ছবির শুটিং করতে দেওয়া হচ্ছিল না। তা থেকেই গোটা গোলমালের সূত্রপাত। তাঁর পাশে দাঁড়িয়েই ফেডারেশনের গা জোয়ারির প্রতিবাদ আরম্ভ করেছিলেন সুদেষ্ণা, ইন্দ্রনীল, সুব্রত, পরমব্রত, অনির্বাণ, বিদুলা প্রমুখ। সৃজিত প্রথম থেকেই ধারেকাছে ঘেঁষেননি; কৌশিক গাঙ্গুলি, শিবপ্রসাদ মুখার্জিরা মাঝপথে সরে পড়েছেন। রাহুল স্বয়ং ‘স্বরূপদা’-র ভক্ত হয়ে গেছেন। তা হোক, সকলের মেরুদণ্ড কখনো সমান শক্ত হয় না। কিন্তু উপরের ভিডিওতে লক্ষ করার মত বিষয় হল, রাহুল বলছেন, তিনি ‘স্কেপগোট’ হয়েছিলেন, ফেডারেশনের সঙ্গে তাঁর ‘সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল’ এবং তারপর তিনি প্রায় ২২২ দিন বেকার ছিলেন। অর্থাৎ প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেওয়া হল যে ফেডারেশন (বা স্বরূপদা) হল কুমীর। টালিগঞ্জের জলে থেকে তার সঙ্গে বিবাদ করলে কাজ পাওয়া যায় না। সৃজিত আর ইন্দ্রদীপ ফেডারেশনকে খুব প্রয়োজনীয় সংস্থা বলেছেন, কেন প্রয়োজনীয় তা বলেননি। টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের জন্য কী কী ভাল কাজ ফেডারেশন করেছে বা করছে – তা বলার বিন্দুমাত্র চেষ্টা নেই। সৃজিত ভিডিওর শুরুতেই ছিলেন। তিনি তো যা বলছেন তা কেন বলছেন তা-ই ভেবে পাচ্ছেন না বলে মনে হয়। কথা আটকে যায়, তারপর অনেক কষ্টে খুঁজে বার করেন ‘অসুবিধা হচ্ছে’ শব্দবন্ধ। কী অসুবিধা, কেন অসুবিধা – সেসবের মধ্যে যাননি। ইনিয়ে বিনিয়ে তিনজনেই বলেছেন, যে অসুবিধাই হয়ে থাক তা আলাপ আলোচনা করে মিটিয়ে নেওয়াই উচিত। আদালতে যাওয়া অন্যায় হয়েছে।
টলিউড যদি সত্যিই একটা পরিবার হয়, তাহলে বলতেই হবে যে এ হল গার্হস্থ্য হিংসায় লিপ্ত পরিবারের ভাষা। দীর্ঘদিন নির্যাতিত বাড়ির বউ যেই থানায় গিয়ে ডায়রি করে দেয়, অমনি শ্বশুরবাড়ির লোক বলতে শুরু করে ‘বাড়ির ঝামেলা বাড়িতেই মেটানো উচিত ছিল। এসব নিয়ে কেউ থানা-পুলিস করে? ছি ছি! পরিবারের একটা মানসম্মান নেই?’ উপরন্তু, আলোচনায় যে ফেডারেশনই বসেনি, সেকথাও চেপে গেছেন পরিচালক ত্রয়ী। আর ‘মিথ্যা মামলা’ কথাটা কিন্তু কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিরা এখন পর্যন্ত মানেননি।
এবার প্রশ্ন উঠবে, কী এমন নির্যাতন করা হয়েছিল যে পিটিশনার পরিচালকরা আদালতে গেলেন? এই প্রশ্নের উত্তর গত এক বছরে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদী পরিচালকরা সাংবাদিক সম্মেলন করে দিয়েছেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনেও বলেছেন। পুনরাবৃত্তি করে লেখার কলেবর বাড়াব না এবং পাঠকের আলস্যকেও প্রশ্রয় দেব না। যাঁরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবিত, প্রসেনজিৎ বাংলা বলতে বুক ফুলিয়ে লজ্জিত হওয়ায় যাঁরা সত্যিই ক্রুদ্ধ, তাঁরা নিজ আগ্রহে জেনে নেবেন। যাঁরা কিছু না জেনেই বোদ্ধা, তাঁদের জন্যে এ লেখা নয়। তাঁরা তো মনেই করেন না বাংলা ছবি কোনো দেখার মত জিনিস। কেন দেখার মত হয় না, তা নিয়েও এতদিন তাঁরা কোনো প্রশ্ন তোলেননি। এখন অনির্বাণ, পরমব্রতর নাম জড়িয়ে যাওয়ায় সোশাল মিডিয়ায় ‘এনগেজমেন্ট ফার্মিং’ করতে সুবিধা হবে বলে হঠাৎ এ বিষয়ে আগ্রহী হয়েছেন। ওঁরা ‘ওয়ার্ল্ড সিনেমা’ নিয়ে থাকেন, সোশাল মিডিয়ার উত্তেজনা থিতিয়ে গেলে নির্ঘাত আবার ওতেই ফিরে যাবেন।
তবে যে পাঠকরা বোদ্ধা নন তাঁদের সাধারণ বুদ্ধি আছে। তাঁরা নিশ্চয়ই বোঝেন যে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সিনেমা একটি রুগ্ন শিল্প। এখানে ছবির বাজেট কম, তাই শুটিংয়ের সময় কম, তাই নির্দেশক ও অভিনেতাদের পারিশ্রমিক কম, ফলে কলাকুশলীদের পারিশ্রমিক আরও কম। এমতাবস্থায় ফেডারেশনের উদ্যোগের ফলে কলাকুশলীরা খুব ভাল আছেন – একথা বলা অর্থহীন। এরকম একটা ইন্ডাস্ট্রিতে সক্রিয় শিল্পীদের কাজ করতে না দিলে কাজ যে আরও কমে যায়, তা বুঝতেও বোদ্ধা হওয়ার দরকার নেই। কারখানায় কাজ না হলে শ্রমিক কী করে ভাল থাকতে পারেন? যে ট্রেড ইউনিয়ন কাজ কমিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, সে শ্রমিক দরদী, সে প্রয়োজনীয় – একথারই বা মানে কী? আসলে যা চলছে তা যে ট্রেড ইউনিয়নের নামে গুন্ডামি বা আমির খান অভিনীত গুলাম ছবির মত মাফিয়ারাজ, তা বুঝতে অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতা লাগে না।
বলিউডের অনেক হিট ছবির মতই ওই ছবিটাও একখানা হলিউডি ছবির পুনর্নির্মাণ। অন দ্য ওয়াটার ফ্রন্ট নামের সেই ছবিতে নায়কের চরিত্রে ছিলেন মার্লন ব্রান্ডো, পরিচালক এলিয়া কাজান। মূল ছবি আর তার পুনর্নির্মাণ – দুটোতেই নায়ককে অনেককিছু খোয়াতে হয়, আক্ষরিক অর্থে মারও খেতে হয়। ওটা কিন্তু গল্প হলেও সত্যি। কাজান ছবিটা বানিয়েছিলেন পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ম্যালকম জনসনের একগুচ্ছ প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে। সেসব যদি বাদও দেন, ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের দিকে তাকালেও বুঝবেন যে আন্দোলনকারীদের ত্যাগ ছাড়া কোনো আন্দোলন হয় না। আজকাল ও জিনিসটারই অভাব, তাই কোনো প্রতিবাদই ফেসবুকের বাইরে বেশিদূর ছড়ায় না, অভীষ্ট লক্ষ্যেও পৌঁছয় না। কারণ আজকাল রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরাও প্রতীকী প্রতিবাদের বেশি কিছু করতে চান না। এই ১৩ জন পিটিশনার কিন্তু নিজেদের রুজি রোজগার বাজি রেখে লড়তে নেমেছেন। আর জি কর আন্দোলনে কেন মুখ খোলেননি, কেন একটা কথাও বলেননি – এসব বলে অনির্বাণকে আক্রমণ করতে পারেন। তৃণমূল সরকার গঠিত কমিটিতে ছিলেন বলে পরমব্রত, সুদেষ্ণাকেও গাল দিতে পারেন। কিন্তু নিজের অফিসে একটা সামান্য দাবির জন্যে লড়ে দেখুন, টের পাবেন যে মোমবাতি হাতে কদিন রাতে মিছিলে যাওয়া আর ক্যামেরার সামনে বাইট দেওয়া অতি সহজ কাজ। খেয়াল করবেন, আর জি কর আন্দোলনের সময়ে টলিউডের যে তারকারা ও কাজটা গোড়ায় করেছিলেন এবং পরে চেপে গিয়েছিলেন, তাঁদের কিন্তু তৃণমূল নেতা পরিচালিত ফেডারেশন বয়কট করছে না। কারণ ওতে ক্ষমতার কাঁচকলা।
ভাবুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন। আর যদি মনে হয় বাংলা সিনেমার ভবিষ্যতের জন্যে, বাঙালি সংস্কৃতির জন্যে এই লড়াইয়ের এক কণাও দাম আছে – তাহলে তির্যক মন্তব্য বন্ধ রাখুন। যদি এই লড়াইয়ের গুরুত্ব আরও বেশি বলে মনে করেন, তাহলে পাশেও দাঁড়াতে পারেন। বাংলা সিনেমার পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে অনেক জরুরি কাজ হবে সেটা। আইনি লড়াইয়ে কীভাবে পাশে দাঁড়াবেন? আগ্রহ থাকলে প্রশ্নটা নিজেই তুলুন, উত্তর পেয়ে যাবেন।
আধুনিক বাঙালি বিজ্ঞানী হতে চায় না, কেউ কেউ হয়ে যায়। তাই আমাদের গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমায় বিষয় হিসাবে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানী বিরল।
আকাশের লক্ষ লক্ষ তারার মধ্যে একটা হল সূর্য। সেই সূর্যের আটটা গ্রহ, তার একটা হল পৃথিবী। সেই পৃথিবীর একটা ছোট্ট জায়গা হল আকাশগঞ্জ। সেখানকার একটা স্কুলের একটা পরীক্ষায় যদি আমি ফেল করি, তাহলে কি আমি বিজ্ঞানী হতে পারব না? সৌকর্য ঘোষালের পক্ষীরাজের ডিম ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রীমান ঘোতন ওরফে সার্থক (মহাব্রত বসু) তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আপন মনে এই প্রশ্ন তোলে মাধ্যমিকের টেস্টে, বিজ্ঞান পড়তে গেলে যা না জানলে একেবারেই চলে না, সেই অঙ্কে শূন্য পাওয়ার পরে।
নিজের অস্তিত্বকে এভাবে প্রশ্ন করতে একমাত্র মানুষই পারে – একথা একাধিকবার নানাভাবে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর এই মহাবিশ্বের সাপেক্ষে মানুষের ক্ষুদ্রতার কথা লিখেছেন বিশ্বখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান। তাঁর একখানা বিখ্যাত বইয়ের নাম পেল ব্লু ডট: এ ভিশন অফ দ্য হিউম্যান ফিউচার ইন স্পেস। সেই বইয়ের এক জায়গায় তিনি যা লিখেছেন তার বাংলা তরজমা করলে এরকম দাঁড়ায় ‘ওই বিন্দুটাকে আবার দেখুন। ওটাই এই জায়গাটা। আমাদের বাড়ি। ওটাই আমরা। ওর মধ্যেই আপনি যাদের ভালবাসেন, যাদের চেনেন, যাদের কথা কোনোদিন শুনেছেন, যত মানুষ কোনোদিন ছিল, জীবন কাটিয়েছিল, তারা সকলে আছে…পৃথিবীটা এক বিরাট ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে একটা ছোট্ট মঞ্চ।’ সেগানের জন্মের সাত বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ‘আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,/তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান…’। এই লাইনগুলো রবীন্দ্রনাথের কলম থেকে আসা খুবই স্বাভাবিক। কারণ তাঁর বিশেষ বন্ধু ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু আর স্নেহভাজন ছিলেন আরেক বিশ্ববিশ্রুত বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ছোটদের বিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ দিতে বিশ্বপরিচয় বইখানা লিখে সত্যেন্দ্রনাথকেই উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু কী আশ্চর্য! বাঙালির ‘কালচার’ চর্চায় কোনোদিন বিজ্ঞানীদের জায়গা হল না! আমাদের সাংস্কৃতিক মহীরুহ কারা জিজ্ঞেস করলে কোনো বাঙালিকে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র, সত্যেন্দ্রনাথ বা মেঘনাদ সাহার নাম করতে শোনা যায় না। বোধহয় তাই, বাঙালি বাবা-মায়েরা বহুকাল ধরে ছেলেমেয়েদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার করতে চাইলেও বিজ্ঞানী হয়ে উঠতে উৎসাহ দেন না। আধুনিক বাঙালি বিজ্ঞানী হতে চায় না, কেউ কেউ হয়ে যায়। তাই আমাদের গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমায় বিষয় হিসাবে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানী বিরল; যদি না সেটা কল্পবিজ্ঞান হয়। সৌকর্য কিন্তু এমন এক ছবি তৈরি করেছেন যার কেন্দ্রে আছে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানে আগ্রহ, বিজ্ঞান গবেষণা, এক কিশোরের বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন।
বিশ্বপরিচয়ে সত্যেন্দ্রনাথের উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘মানুষ একমাত্র জীব যে আপনার সহজ বোধকেই সন্দেহ করেছে, প্রতিবাদ করেছে, হার মানাতে পারলেই খুশি হয়েছে। মানুষ সহজশক্তির সীমানা ছাড়াবার সাধনায় দূরকে করেছে নিকট, অদৃশ্যকে করেছে প্রত্যক্ষ, দুর্বোধকে দিয়েছে ভাষা। প্রকাশলোকের অন্তরে আছে যে অপ্রকাশলোক, মানুষ সেই গহনে প্রবেশ করে বিশ্বব্যাপারের মূলরহস্য কেবলই অবারিত করছে। যে সাধনায় এটা সম্ভব হয়েছে তার সুযোগ ও শক্তি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষেরই নেই। অথচ যারা এই সাধনার শক্তি ও দান থেকে একেবারেই বঞ্চিত হল তারা আধুনিক যুগের প্রত্যন্তদেশে একঘরে হয়ে রইল।’ যেন ঘোতনের কথাই লিখেছেন!
শুধু যে ঘোতন বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখে তা নয়, তার অঙ্কের মাস্টারমশাই বটব্যালও (অনির্বাণ ভট্টাচার্য) মনেপ্রাণে বিজ্ঞানী, তাঁর বাবাও ছিলেন বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান গবেষণা করতে বিদেশ যাওয়ার অভিলাষ পূরণ হয়নি, তবু বটব্যাল স্যার বিজ্ঞান-পাগল। আকাশগঞ্জ হাইস্কুলের ছাত্রদের ঘর্ষণ ব্যাপারটা হাতেনাতে বোঝাতে বারান্দায় মোবিল ঢেলে দেন, তার উপর পিছলে পড়েন একের পর এক মাস্টারমশাই। শেষমেশ হেডস্যারও। ফলে বটব্যাল স্যারকে চাকরিটি খোয়াতে হয়। স্যারের ঘরে বড় বড় দুটো ছবিতে আছেন জগদীশচন্দ্র; আর অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, যিনি আলো যে সবসময় সরলরেখায় চলে না তা প্রমাণ করতে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন। এখানেই শেষ নয়, যেভাবে সৌমিক হালদারের মায়াবী ক্যামেরায় ক্লোজ আপে ধরা পড়ে সামান্য ফড়িংও, তাতে মনে পড়ে আরেক বাঙালি বিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যকে। ছোটদের বোধগম্য করে কীটপতঙ্গদের নিয়েও বাংলায় বই লেখার যত্ন ছিল যাঁর। ছোটদের ভাল লাগার জন্যে একটা ছবিতে যা যা দরকার, সেসব মশলা দিয়েও এমন বিজ্ঞানকেন্দ্রিক ছবি তৈরি করার জন্যে নির্দেশক সৌকর্যের প্রশংসা প্রাপ্য। সন্দীপ রায়ের বিস্মরণযোগ্য প্রফেসর শঙ্কুকে (ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়) বাদ দিলে বাংলা ছবির পর্দায় শেষ মনে রেখে দেওয়ার মত বিজ্ঞানী চরিত্র পাতালঘর (২০০৩) ছবির অঘোর সেন (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) আর ভূতনাথ (জয় সেনগুপ্ত)। কিন্তু সেই ছবিতে বিজ্ঞানের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল ভূত ও রূপকথা, যেমনটা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের যে কোনো কাহিনিতে থাকে। এখানে কিন্তু পক্ষীরাজের রূপকথাকে বিজ্ঞানমনস্কতার দিকে ঠেলে দেয় চিত্রনাট্য।
সৌকর্যের ২০১৮ সালের ছবি রেনবো জেলি যাঁরা দেখেছেন (স্বতঃপ্রণোদিত অবাঞ্ছিত পরামর্শ দিচ্ছি – না দেখে থাকলে দেখে নিন), তাঁদের অতি পরিচিত ঘোতন আর তার বন্ধু পপিন্স (অনুমেঘা ব্যানার্জি)। এই ছবিতে তারা আর শিশু নেই, কিশোর-কিশোরী। তার সঙ্গে তাল রেখে সম্পর্কের রসায়নেও বয়ঃসন্ধিসুলভ পরিবর্তন এসেছে, যা ছবিতে অন্য এক রস যোগ করেছে। রেনবো জেলির পরে সৌকর্যের গতবছর মুক্তি পাওয়া ভূতপরী (২০২৪) ছবিতে মজা, ভূত, রূপকথার সঙ্গে মিশেছিল অনিবার্য বিষাদ। এই ছবিতে তার চেয়ে মৃদু অথচ গভীর বিষাদ আছে। সে কারণেই ছবি শেষ হওয়ার পরেও বেশ খানিকক্ষণ রেশ থেকে যায়। দুই খুদে অভিনেতাই চমৎকার কাজ করেছে। ‘মার্জিনাল আই কিউ’ থাকলেই যে মানুষের কৌতূহলের অভাব হয় না, আগ্রহের অভাব হয় না, অনুভূতির অভাব হয় না, তা মহাব্রতর অভিনয়ে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। রেনবো জেলির পর এই ছবি দেখলে মনে হয় মহাব্রতর সহজাত অভিনয় ক্ষমতা আছে। পপিন্সের সঙ্গে একান্ত দৃশ্যগুলোতে তার শরীরী ভাষায়, গলার স্বরে যে আকুতি ফুটে ওঠে তা এখনো বয়ঃসন্ধির স্মৃতি আছে যাঁদের, তাঁরা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে পারবেন। অনুমেঘার সংলাপ বলার ধরনে রেনবো জেলিতে খানিকটা কবিতা আবৃত্তির ঢং ছিল, যার ক্ষতিপূরণ হয়ে গিয়েছিল শৈশবের মিষ্টতায়। এই ছবিতে তার অভিনয়ে প্রয়োজনীয় পরিণতি দেখা গেছে। জগদীশচন্দ্রের বন্ধুর লেখা লাগসই গানটা গাওয়ার সময়ে বোঝা গেছে, অনুমেঘার গানের গলাটাও বেশ।
মজাদার সংলাপ আর সুরেলা গান এই ছবির জোরের জায়গা। বিশেষত সৌকর্যের কথায় এবং নবারুণ বোসের সুরে ‘অঙ্কে জিরো, কিসের হিরো, খ্যাপা স্যারের বিশেষ গেরো’ গানখানা যেমন ছবির গল্প আর মেজাজের সঙ্গে দারুণ খাপ খায়, তেমনি একবার শুনলে চট করে ভুলতে পারাও শক্ত। অবশ্য ওই গানে একটা চালু বাঙালি ভ্রান্তি ঢুকে পড়েছে। ম্যাজিকের সঙ্গে কিন্তু ম্যাজিক রিয়ালিজমের কোনো সম্পর্ক নেই। ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ ব্যাপারটা আসলে কী তা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের নোবেল প্রাপ্তি বক্তৃতা পড়লে পরিষ্কার বোঝা যায়।
গানখানা চমৎকার গেয়েছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য, কিন্তু হতাশ করেছে তাঁর অভিনয়। অনির্বাণকে নিজের বয়সের থেকে অনেক বেশি বয়সী একখানা চরিত্র দেওয়া হয়েছিল। তা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তিনি একটা বিশেষ কণ্ঠস্বর, কতকগুলো মুদ্রাদোষের সাহায্য নিয়েছেন। তাতে হাস্যরসের উৎপাদন হয়েছে বটে, কিন্তু উৎপাদনের চেষ্টা বড় বেশি করে ধরা পড়েছে। বরং যেসব দৃশ্যে তিনি বাবার স্মৃতিতে, প্রয়াত বন্ধুর স্মৃতিতে বিষণ্ণ – সেখানে অভিনেতা অনির্বাণকে চেনা গেছে। অতি অভিনয়ে দুষ্ট আরেক বিশিষ্ট অভিনেতা, পঞ্চায়েত প্রধানের চরিত্রে, দেবেশ রায়চৌধুরীও। প্যাংলার চরিত্রে শ্যামল চক্রবর্তী আর বিল্টুর চরিত্রে অনুজয় চট্টোপাধ্যায়ের মত দুজন চমৎকার অভিনেতার বিশেষ কিছু করার ছিল না।
এইখানেই এসে পড়ে চিত্রনাট্যের দুর্বলতার প্রশ্ন। এই দুজন যেমন অনেকখানি অব্যবহৃত রয়ে গেছেন, তেমনি বটব্যাল স্যারের বিজ্ঞান-পাগলামিও আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার ছিল বলে মনে হয়। বটব্যাল স্যারের অল্পবয়সের যে চেহারা দেখানো হয়েছে তার সঙ্গে বেশি বয়সের চেহারা আর হাবভাবের তফাতও চোখে লাগার মত। হয়ত দুজন আলাদা অভিনেতাকে ব্যবহার করলে ব্যাপারটা তত বিসদৃশ লাগত না। এছাড়া যে জিনিসটা এই ছবিতে বেখাপ্পা লাগে তা হল পঞ্চায়েত প্রধানের পিছনের দেওয়ালের ছবিগুলো। এমন কোনো রাজনৈতিক নেতা কি এদেশে আছেন যিনি পাশাপাশি টাঙিয়ে রাখেন লেনিন, জোসেফ স্তালিন, জওহরলাল নেহরু আর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ছবি?
তবে এসব ত্রুটিকে ছাপিয়ে গেছে এই ছবির আদর্শগত দিক। আকাশগঞ্জে কোনো উঁচু নিচু ভেদ নেই। বিজ্ঞানীর বাড়ির চাকর প্যাংলা অঙ্কে যথেষ্ট দড়। সে-ই ঘোতনের পরীক্ষা নিয়ে নিতে পারে। গ্রামের স্কুলে পাশ করতে গলদঘর্ম ঘোতনের গোটা দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় বন্ধু হল কলকাতার স্কুলে ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া পপিন্স। বটব্যাল স্যার তো বটেই, হেডস্যার গুণধর বাগচী (সুব্রত সেনগুপ্ত) পর্যন্ত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়াই জীবন সার্থক হওয়ার একমাত্র নিদর্শন বলে মনে করেন না। দুর্নীতিগ্রস্ত, আত্মরতিপ্রবণ পঞ্চায়েত প্রধানের মাথায় বন্দুক ধরার সুযোগ পেয়ে তাঁরা কী দাবি করেন? স্কুলে লাইব্রেরি আর ল্যাবরেটরি বানিয়ে দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, অনুভূতিপ্রবণ মন না থাকলে ডিগ্রি, বুদ্ধি, পরীক্ষার নম্বর যে বৃথা – এই কথাটা এই ছবির কোষে কোষে।
এসব দেখলে মনে পড়ে, আকাশগঞ্জ আমাদের আশপাশেই ছিল। আমাদেরই অবহেলায় হারিয়ে গেছে। সৌকর্য কল্পনাশক্তির জোরে তাকে ভারি সহজ, সুন্দর করে আবার আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছেন। আমাদের ছেলেমেয়েদের সেই আকাশগঞ্জ দেখানোর সুযোগ না ছাড়াই ভাল। অন্তত তাদের স্বপ্নে আকাশগঞ্জ ঢুকে পড়ুক। তারপর কে বলতে পারে? ভোরের স্বপ্ন, মিথ্যে না-ও তো হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গডফাদার বলা হয় যাঁকে, সেই নোবেল পুরস্কার জয়ী বিজ্ঞানী জিওফ্রে হিন্টনও এখন এআই কোথায় গিয়ে পৌঁছবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তিনি ভয় পাচ্ছেন যে ‘এআই টেকওভার’ হয়ে যেতে পারে যে কোনোদিন। তাঁর কথাবার্তা শুনলে মনে হয় তিনিই এ যুগের ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন।
‘তোমার নাম কী?’ ‘জানি না। ও তো কোনো নাম দেয়নি আমায়।’
ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন, মেরি শেলি (অনুবাদ – সিদ্ধার্থ বিশ্বাস; লেখনী প্রকাশন, প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ১৯৯৬)
স্রষ্টা ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে উত্তর মেরুর বরফের মধ্যে অদৃশ্য হওয়ার আগে উপন্যাসে এই ছিল দানবের শেষ সংলাপ। অথচ কী ট্র্যাজেডি! এই উপন্যাস প্রকাশের (১৮১৮) দুশো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন শব্দটা আমরা ব্যবহার করি স্রষ্টার ভুলে দানব হয়ে ওঠা মানুষকে বোঝাতে। আসলে স্রষ্টা, ক্ষমতাবান বা সংখ্যাগুরুর বয়ানই প্রতিষ্ঠা পায় সব যুগে। সে-ই নাম করে। তার অপছন্দের পক্ষের হয় বদনাম। নয়ত নামটা স্রেফ হারিয়ে যায়, অথবা যা খুশি একটা নাম চাপিয়ে দেয় ক্ষমতাশালী পক্ষ। আজ যেমন সোশাল মিডিয়ায় সব মুসলমান পুরুষই আবদুল, বহুকাল ধরে বাঙালিদের কাছে সব নেপালিই বাহাদুর।
এই নামহীন দুর্নামই হল ‘অপর’-এর জীবনের, দাসের জীবনের একমাত্র প্রাপ্তি। এর যন্ত্রণা অনুভব করা, যে কখনো অপরত্ব অনুভব করেনি তার পক্ষে বোঝা প্রায় অসম্ভব। রিডলি স্কটের ব্লেড রানার (১৯৮২) ছবিতে যেমন মৃত্যুবরণ করার আগে দাসত্ব কী তা রিক ডেকার্ডকে (হ্যারিসন ফোর্ড) হাতেনাতে দেখিয়ে দেয় কৃত্রিম উপায়ে তৈরি মানুষ – ছবির ভাষায় ‘রেপ্লিক্যান্ট’ – রয় ব্যাটি (রাইটজার হাওয়ার)। তবু কেন ডেকার্ডকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে ব্যাটি নিজে নীরবে মৃত্যুবরণ করল শেষপর্যন্ত, তা ডেকার্ডের বোধগম্য হয় না। দাসের বা অপরের, জীবনের প্রতি মমত্ব, তার ভালবাসা, আমরা বুঝে উঠতে পারি না কিছুতেই। অপরকে দানব বা খুনি ভেবে যে স্বস্তি পাই, তা তাকে অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ ভেবে পাই না।
নামহীন অপরের এই ট্র্যাজেডি কলকাতার মঞ্চে জীবন্ত করে তুলেছে থিয়েটার ফাউন্ডেশন পরিবর্তক ও ক্যান্টিন আর্ট স্পেস ইনিশিয়েটিভের নাটক ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’। শ্রাবন্তীর পরিচালনায় মেরির উপন্যাসে উত্থিত মৌলিক প্রশ্নগুলো – সৃষ্টির অনিশ্চয়তা, স্রষ্টার দায়, মনুষ্যত্বের সংজ্ঞা, বিশ্বাসের বাস্তবকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা – সবই মূর্ত হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞান তথা মানবসভ্যতা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আজও হিমশিম খাচ্ছে। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন ঈশ্বর হয়ে ওঠার দুর্দম লোভে, প্রকৃতির রহস্য ভেদ করার প্রবল উত্তেজনায় আবিষ্কারের পরিণাম ভেবে দেখেনি। ফলে ছারখার হয়ে গেছে নিজের, তার প্রিয়জনদের এবং তার সৃষ্টির জীবন। তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গডফাদার বলা হয় যাঁকে, সেই নোবেল পুরস্কার জয়ী বিজ্ঞানী জিওফ্রে হিন্টনও এখন এআই কোথায় গিয়ে পৌঁছবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তিনি ভয় পাচ্ছেন যে ‘এআই টেকওভার’ হয়ে যেতে পারে যে কোনোদিন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বেদখল হয়ে যেতে পারে তার ফলে। তাই তিনি নিজের টাকাপয়সা তিনটে ব্যাংকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখছেন। তাঁর কথাবার্তা শুনলে মনে হয় তিনিই এ যুগের ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন।
এই দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, আতঙ্ক অতি জটিল সংলাপ রচনা না করেও সফলভাবে সাধারণ দর্শকের সামনে উপস্থাপনার কৃতিত্ব শ্রাবন্তীর। পাশাপাশি যার অনুভূতি আছে, যে ভালবাসতে চায়, তাকে মানুষ বলে গণ্য করা যাবে না কেন – সে প্রশ্নও তুলে দেয় এই নাটক। স্কটের ছবিতে ‘রেপ্লিক্যান্ট’ প্রিস (ড্যারিল হানা) দার্শনিক রেনে দেকার্তের বিখ্যাত উক্তি ব্যবহার করে বলেছিল ‘আই থিংক দেয়ারফোর আই একজিস্ট’। শ্রাবন্তীর ‘ক্রিচার’ যেন বলতে চায় ‘আমি অনুভব করি, আমি ভালবাসি। এটাই আমার মনুষ্যত্বের প্রমাণ।’ কিন্তু মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণির বড় তফাত তো এই যে সে ঠান্ডা মাথায় অমানুষ হয়ে উঠতে পারে, মিথ্যে বলতে পারে। তার সৃষ্টিকেও সেই প্রতিহিংসা, সেই শঠতা শিখে নিতেই হয়। ক্রিচারও শিখে ফেলে, স্রষ্টা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের উপর প্রয়োগও করে।
মেরির উনবিংশ শতাব্দীতে লেখা উপন্যাসের এই সৃজনান্তর (adaptation) অনায়াসে সমসাময়িক হয়ে উঠেছে ক্রিচারের প্রতি ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের সন্দেহকে ব্যবহার করে। তার বোন উইলিকে ক্রিচারই হত্যা করেছে – এমন প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন তাকেই সরাসরি অভিযুক্ত করে। কোনো সংশয় থাকে না তার কণ্ঠে। তখনই ক্রিচার (জয়রাজ ভট্টাচার্য) ছুড়ে দেয় সেই সংলাপ, যা সংবেদনশীল পাঠককে নিজের অবস্থান সম্পর্কেও ভাবিয়ে তুলবে – ‘আমি হত্যা করেছি এটা তোমার বিশ্বাস’। এরকম নিঃসংশয় বিশ্বাসে কত মানুষকে আমরা অভিযুক্ত করে চলেছি রোজ! পথে ঘাটে, অফিস কাছারিতে, স্কুল কলেজে, ঘরোয়া আড্ডায় আর সোশাল মিডিয়ায়। অপরাধ না করেও নিরন্তর অবিশ্বাসের শিকার হওয়া, ঘৃণার পাত্র হওয়া মানুষকে সত্যি সত্যি দানব করে তোলার ক্ষমতা ধরে। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন সেই ট্র্যাজেডির মঞ্চায়ন।
এই নাটকে প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত যিনি অভিনয় দিয়ে দর্শককে চুম্বকের মত টেনে রাখেন, তিনি জয়রাজ। নাটকের শুরুতেই প্রাপ্তবয়স্ক শিশুর মত মরণ থেকে জেগে ওঠার সময়ে সারা গায়ে অসংখ্য নল জড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাঁর শরীরী অভিনয় এবং জন্ম পরবর্তী আশ্চর্য আর্তনাদ অলৌকিক মুহূর্ত তৈরি করে। জন্মের অব্যবহিত পরে তাঁর ভাল করে হাঁটতে না শেখা শিশুর মত নড়াচড়া, সদ্যোজাতের মতই মুখ দিয়ে অর্থহীন আওয়াজ করা থেকে ক্রমশ দৃষ্টিহীন বৃদ্ধ ডি ল্যাসির সাহায্যে একটু একটু করে কথা বলতে শেখা, হাঁটাচলা স্বাভাবিক হয়ে আসা – একজন অভিনেতার ধাপে ধাপে এই প্রক্রিয়া পেরনো চোখের সামনে দেখা এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। বৃদ্ধের সঙ্গে দৃশ্যগুলোতে জয়রাজ যে শিশুসুলভ সারল্য দেখিয়েছেন, গাছের পাতা ঝরা বা বরফ পড়ার দৃশ্যে যে অপাপবিদ্ধ আনন্দ দেখা দিয়েছে তাঁর চোখেমুখে, তা বজায় রেখেই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের সঙ্গে বৌদ্ধিক ঠোকাঠুকির দৃশ্যগুলোতে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় এবং দার্শনিক প্রশ্ন তোলা এই অভিনয়কে স্মরণীয় করে রাখে। কেবল ওই অভিনয় দেখার লোভেই এ নাটক একাধিকবার দেখা যেতে পারে।
ক্রিচারের জন্ম, একাকিত্বের যন্ত্রণা, ভালবাসা, প্রতিহিংসা ফুটিয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে শুভঙ্কর, রাজু ধর, বিশ্বজিৎ, প্রীতম, তারক, অক্ষয় ও সুজয়ের আলোকসম্পাত। সময়ে সময়ে, বিশেষত ক্রিচারকে যখন শেষবার দেখা যায়, সে আলো হয়ে উঠেছে অলৌকিক। অন্যান্য চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্ধ বৃদ্ধের চরিত্রে তাপস রায় প্রশংসনীয় অভিনয় করেছেন। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন চরিত্রে ঋদ্ধিবেশ ভট্টাচার্য একটু উচ্চকিত।
তবে নাটকে মঞ্চের পিছনের পর্দার সিনেম্যাটিক ব্যবহার সময়ে সময়ে বাহুল্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, অভিনেতারা যা করছেন তাতে মনোযোগ দেওয়াও কঠিন হয়ে গেছে কোনো কোনো মুহূর্তে। যেখানে মঞ্চের উপরে পাতা ঝরানো হয়েছে বা তুষারপাত দেখানো হয়েছে, সেখানে পিছনের পর্দাতেও একই দৃশ্য দেখানোর প্রয়োজন ছিল না। প্রায় প্রত্যেক দৃশ্যে পিছনের পর্দার ছবি বদলে দেওয়ারও বোধহয় দরকার ছিল না। কোনটা ডি ল্যাসি, ফেলিক্স, আগাথাদের বাড়ি আর কোনটা জঙ্গল বা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের জেনিভার বাড়ি – তা বুঝে নিতে নাটকের দর্শকের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কারণ নাটক তৈরি হয় নির্দেশক, অভিনেতা আর দর্শকের মিলিত কল্পনাশক্তির জোরেই। এই নাটকে সামান্য কয়েকটা কাঠের টুকরো, বাক্স ইত্যাদিকে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের বিয়ের রাতের শয্যা ভেবে নিতে যখন দর্শকের অসুবিধা হচ্ছে না, তখন নির্দেশক আরেকটু বেশি বিশ্বাস রাখতেই পারতেন। আর বেমানান লেগেছে ফেলিক্স-আগাথার কণ্ঠে একদা ভারতের শ্রমিক আন্দোলনে ব্যবহৃত সেই গানটা, যা কোরাস (১৯৭৪) ছবিতে মৃণাল সেন ব্যবহার করেছিলেন। কারণ ইংরিজি উপন্যাসের এই সৃজনান্তরে আর কোথাও ভারতীয়করণের চেষ্টা নেই। চরিত্রগুলোর নাম, স্থানের নাম, পোশাক আশাক – সবকিছুই ইউরোপিয় রাখা হয়েছে। এমনকি জন মিলটনের প্যারাডাইস লস্ট আবৃত্তি করে ক্রিচার তার সংকট, তার একাকিত্বকে আরও জীবন্ত করে তোলে। সেই নাটকে ওই হিন্দি গানের ব্যবহার একেবারেই খাপ খায় না।
কিন্তু শ্রাবন্তীর সবচেয়ে বড় সাফল্য এই যে, ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন আজকের নাটক হয়ে উঠেছে। বস্তুত, ঠিক এখনই এই নাটক মঞ্চস্থ হওয়া দরকার ছিল। তবে এই সৃজনান্তরকে হয়ত আরও সমসাময়িক করে ফেলার, আরও বেশি দেশি করে তোলার সুযোগ ছিল। কারণ মেরির উপন্যাসে আছে ইংগোলস্টাডে প্লেগের কথা, যা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের পক্ষে বিভিন্ন শবদেহ থেকে দেহাংশ জোগাড় করা সহজ করে দিয়েছিল। আমরাও মাত্র বছর পাঁচেক আগে পেরিয়ে এলাম একটা অতিমারী, যেখানে নদীর পাড়ে পোড়ানো হচ্ছিল শবদেহ। ঠিক কত লোক মারা গেছে তা লুকোবার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল এদেশের সমস্ত সরকার। মরণ থেকে কাউকে জাগিয়ে তোলার সেই তো প্রকৃষ্ট সময়।
গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।
ভয়েস অফ আমেরিকা নামটা সংবাদ জগতের সঙ্গে যুক্ত না থাকা বাঙালির অপরিচিত মনে হতে পারে। তবে যাঁরা কবীর সুমনের ভক্ত, কদিন আগেই তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে খুশিয়াল হয়ে উঠেছিলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন এই মার্কিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কথা। কারণ বাংলা গানে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করার আগে একসময় সুমন ভয়েস অফ আমেরিকায় সাংবাদিকের চাকরি করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মার্কিন সরকারের আনুকূল্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যম ইংরিজি সমেত মোট ৪৯ খানা ভাষায় সারা বিশ্বে পরিষেবা দিয়ে থাকে। সম্ভবত শিগগির বলতে হবে – দিত। কারণ গত রবিবার (১৬ মার্চ) ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার ভয়েস অফ আমেরিকা এবং অন্যান্য সরকারপোষিত সংবাদমাধ্যমগুলোতে গণ ছাঁটাই আরম্ভ করেছে। আজকাল সারা পৃথিবীর কর্পোরেট চাকরিতে ইদানীং যা দস্তুর, সেই অনুযায়ী রাতারাতি ইমেল করে কর্মরত সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মীদের জানানো হয়েছে – কেটে পড়ো।
ট্রাম্প (অনেকে বলছে বকলমে ইলন মাস্ক) ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার’ দিয়ে মার্কিন সরকারের নানা দফতরের হাজার হাজার কর্মচারীর চাকরি ইতিমধ্যেই খেয়েছেন। সরকারের আস্ত বিভাগ তুলে দেওয়া হচ্ছে। নেহাত ওদেশের জজসাহেবদের সাক্ষাৎকার দেওয়ার উৎসাহ কম, সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করার উৎসাহ বেশি। তাই অনেকের এখনো সেসব চাকরি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় রোজ কোনো না কোনো আদালতের বিচারক ট্রাম্পের কোনো ছাঁটাইয়ের আদেশকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দিচ্ছেন। এই দড়ি টানাটানিতে শেষমেশ কে জিতবে এখনো বলা যাচ্ছে না, তবে ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, সম্ভব হলে ট্রাম্প-মাস্ক সরকারটাই তুলে দিতে চান খরচ কমানোর নাম করে। সে কাজের অঙ্গ হিসাবেই যে ভয়েস অফ আমেরিকার উপর খড়্গহস্ত হয়েছেন তা বোঝা যাচ্ছে। কেবল ভয়েস অফ আমেরিকা তো নয়, রেডিও ফ্রি ইউরোপ, রেডিও ফ্রি এশিয়া, ফারসি ভাষার রেডিও ফারদা, আরবি ভাষার আলহুরা – এই সমস্ত সরকারপোষিত মিডিয়ার কর্মীদেরই টা টা বাই বাই করা হচ্ছে।
ব্যাপারটাকে স্রেফ অন্য দফতরের কর্মচারীদের ছাঁটাইয়ের সঙ্গে এক করে দেখলে সবটা দেখা হবে না। কারণ মার্কিন গণতন্ত্রের হাজার দোষ থাকলেও, অস্বীকার করার উপায় নেই যে আলাদা আলাদা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ভারতীয় গণতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি। এখানে আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম কী লিখতে/বলতে পারে বা পারে না তা কোনোদিনই সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল না। বলা বাহুল্য, ইদানীং সে নিয়ন্ত্রণ গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অফ আমেরিকার মত প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থে পুষ্ট হলেও তাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অতীতের রাষ্ট্রপতিদের ছিল না। ট্রাম্প প্রশাসন মোটেই গোপন করছে না যে ওই ব্যাপারটা মোটেই তাদের পছন্দ নয়। ধনকুবের ট্রাম্প-মাস্ক সরকার শুধু বলতে বাকি রেখেছে যে নুন খাবে আর গুণ গাবে না, তা হবে না। ছাঁটাইয়ের খবর প্রকাশ করে সোল্লাসে হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়েছে – এর ফলে মার্কিন করদাতাদের আর দেশের প্রোপাগান্ডার পিছনে টাকা খরচ করতে হবে না। একথা ঠিক যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের জন্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যমগুলো তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল এমন সব দেশে মার্কিনি দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করা, যেখানে মার্কিন সরকারের সঙ্গে সদ্ভাব নেই এমন সরকার রয়েছে। যেমন ঠান্ডা যুদ্ধকালীন পূর্ব ইউরোপ, চীন, ৯/১১ পরবর্তী মুসলমান-প্রধান দেশগুলো। যে কারণে ভয়েস অফ আমেরিকার মৃত্যুঘন্টা বেজেছে জেনে ট্রাম্পের ঘোষিত শত্রু চীনের সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম উল্লাস প্রকাশ করেছে। কিন্তু তেমন প্রোপাগান্ডায় ট্রাম্প সরকারের উৎসাহ নেই – একথা কি বিশ্বাসযোগ্য? মোটেই না। কারণ ট্রাম্প হলেন প্রোপাগান্ডার রাজা। তাঁর উত্থানের পিছনে ভারতের গোদি মিডিয়ার মত আমেরিকার সহিংস, দক্ষিণপন্থী মিডিয়ার যথেষ্ট বড় ভূমিকা আছে। সুতরাং তিনি কেন প্রোপাগান্ডায় করদাতার টাকা খরচ হচ্ছে ভেবে মায়া করতে যাবেন? আসল কথা ট্রাম্প এর আগের চার বছরের শাসনকালেই দেখে নিয়েছেন যে ভয়েস অফ আমেরিকাকে তিনি ফক্স নিউজ বানাতে পারবেন না। তারা তাঁর কথায় ওঠবোস করবে না। অতএব ওটা তাঁর কাছে বাজে খরচ। যে সাংবাদিক চাটুকার নয়, তাকে নিয়ে ট্রাম্প কী করবেন?
লক্ষণীয়, মাস্ক টুইটার (অধুনা এক্স) কিনে নেওয়ার পর ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে টুইট করেছিলেন যে এখন থেকে টুইটারে ‘সিটিজেন জার্নালিজম’-কে প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং ‘মিডিয়া এলিট’ তা আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করবে। তদ্দিনে তিনি টুইটারে সত্যাসত্য বিচার করা, ঘৃণা ভাষণ আটকানোর যেসব বিভাগ ছিল সেগুলোকে লাটে তুলে দিয়েছেন। অর্থাৎ বুঝতে অসুবিধা হয় না যে তিনি বোঝাতে চাইছিলেন, এবার থেকে যার যা প্রাণে চায় তাই তথ্য বলে চালিয়ে দিতে পারবে। কে না জানে সোশাল মিডিয়ার ক্ষমতা আজকের দিনে কতখানি? অনেক মানুষই যে খবরের জন্যে সংবাদমাধ্যমের চেয়ে সোশাল মিডিয়ার উপর বেশি নির্ভর করেন, সোশাল মিডিয়া থেকে যা জানা গেছে তার সত্যাসত্য যাচাই করার কথা ভুলেও ভাবেন না – এ তো কোনো গোপন কথা নয়। এমনকি সমস্ত সংবাদমাধ্যমকেও সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করতে হয়, খবরের জন্যে সেদিকে নজরও রাখতে হয়। যারা আরও এককাঠি সরেস, তারা তো সাধারণ মানুষের মতই সোশাল মিডিয়ার তথ্য যাচাই না করেই খবর হিসাবে চালিয়ে দেয়। তা এহেন সোশাল মিডিয়ার মালিকরা যার প্রাণের বন্ধু, তার আর প্রোপাগান্ডা চালানোর জন্যে পেশাদার সাংবাদিকের দরকার হবে কেন? এবারে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের আগেই তো মেটার (অর্থাৎ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটস্যাপের) মালিক মার্ক জুকেরবার্গ ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে এখন থেকে ফেসবুকও যাকে যা খুশি বলার ব্যাপারে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেবে। মাস্ক তো টুইটারের মালিকানা হাতে পেয়েই আজীবন নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া ট্রাম্পকে ফেরত এনেছিলেন। তারপর ট্রাম্পের হয়ে রীতিমত প্রচার করেন। কী আশায় করেন তা এখন আমেরিকানরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। উপরন্তু ট্রাম্পের নিজের কোম্পানিও একখানা সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম খুলে ফেলেছে। কানার নাম পদ্মলোচন রাখার মত তার নাম রাখা হয়েছে ট্রুথ। এমতাবস্থায় সাংবাদিকরা মার্কিন সরকারের কাছে কেবল উদ্বৃত্ত নয়, রীতিমত বালাই। গেলে বাঁচা যায়।
বস্তুত, সর্বত্রই সাংবাদিকরা তাই। প্রণয় রায় আর রাধিকার রায় নাকি কীসব আর্থিক গোলমাল করেছেন – এই অভিযোগে তাঁদের নামে কত মামলা মোকদ্দমা হল নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে। কতবার তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হল, এনডিটিভির দফতরে কত কেন্দ্রীয় এজেন্সির কত হানা হল। শেষমেশ প্রায় দেউলে অবস্থায় ওঁদের হাত থেকে এনডিটিভি কিনে ফেললেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন – গৌতম আদানি। ও মা! এবছর জানুয়ারি মাসে সিবিআই আদালতে জানিয়ে দিল, রায় দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি! অতএব ‘যাও সবে নিজ নিজ কাজে’। সাত বছর ধরে চলা তদন্তের ফলটা তাহলে কী? সরকারবিরোধী সাংবাদিকতার জন্যে প্রসিদ্ধ এনডিটিভির সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হওয়া; রায় দম্পতির হাত থেকে লাগাম বেরিয়ে যাওয়ায় রবীশ কুমার, অনিন্দ্য চক্রবর্তীর মত সাংবাদিকদের প্রথমে কর্মহীন হওয়া; পরে নিজের ব্লগ বা ইউটিউব চ্যানেল খুলে সীমিত পরিসরে সাংবাদিকতা করতে বাধ্য হওয়া। দেশজুড়ে কত সাংবাদিক যে জেল খেটেছেন এবং খাটছেন সেকথা লিখতে বসলে তো আলাদা ওয়েবসাইট তৈরি হয়ে যাবে। কোনো সাংবাদিক আরও বাড়াবাড়ি করলে অবশ্য জেল নয়, গৌরী লঙ্কেশ বা মুকেশ চন্দ্রকর করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।
ভাবছেন কেবল দুষ্টু লোক, দুষ্টু সরকারই সাংবাদিকদের সরিয়ে ফেলছে? মোটেই তা নয়। দুষ্টু লোকেদের বিরোধীরাও আহ্লাদে আটখানা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। মাস্কের গ্রোককে মোদীজি বা বিজেপি সম্পর্কে প্রশ্ন করলেই সে টপাটপ এমন সব উত্তর দিচ্ছে যে সব কুকীর্তি বেরিয়ে আসছে। মোদীবিরোধীদের ধারণা, এই অস্ত্রেই ফ্যাসিবাদী বধ হবে। তাঁরা ভুলেই গেছেন যে গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।
অতএব যারা এখনো সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে তাদের বলি – আর যেখানে যাও না রে ভাই সপ্তসাগর পার/জার্নালিজম ক্লাসের কাছে যেও না খবরদার।
সিনেমা হলে ঢুকে হিয়া টুপটাপ, জিয়া নস্ট্যাল হলেই হাততালি দিই। পরিচালক আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্ত মায়ানগর ছবিতে করেছেন ঠিক উল্টোটা। শেষ বছর বিশেকে কলকাতা যেভাবে গোল্লায় গেছে তার স্মৃতি নিখুঁত নির্মমতায় পর্দায় তুলে এনেছেন।
বামুন চিনি পৈতে প্রমাণ, বাঙালি চিনি কেমনে? নস্ট্যালজিয়া দিয়ে। ওই জিনিসটারই বিক্রয়যোগ্যতা বাঙালি সমাজে এখনো নিশ্চিত। তাই বাংলায় দুজন এখনো বিক্রি হন – রবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিৎ রায়। ওটা আছে বলেই শতবর্ষ এসে পড়লে বিক্রি হন মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকও। নস্ট্যালজিয়ার তোড়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা বিশেষ কেউ পড়ে না, অথচ সিগনালে তাঁর গান বাজে। ছোটরা সত্যজিতের গুগাবাবা দেখতে শেখে না, বড়রা ফেলুদাকে নিয়ে বছরের পর বছর ছেলেমানুষি চালিয়ে যায়, ভুলেও কেউ দেবী (১৯৬০) বা সীমাবদ্ধ (১৯৭১) দেখে না। তবে সত্যজিতের মেলায় হারিয়ে যাওয়া নাতিকে নায়ক বানিয়ে ছবি করলে হাউজ ফুল হয়। লোকে পথের পাঁচালী (১৯৫৫)-র বিখ্যাত দৃশ্যের হুবহু নকল দেখে আহা, উহু করে। মৃণালের রাজনীতি যতই বাতিল হয়ে যাক কলকাতা শহরে, ছবিগুলো যতই বিস্মৃত হোক, তাঁর বায়োপিকের বাহুল্য হয় বাংলা সিনেমায়। খারিজ (১৯৮২) কেউ দেখে না, কিন্তু তার সিকুয়েল তৈরি হয়। ঋত্বিকের ছবি কলকাতা শহরে দেখানোর অনুমতি বাতিল হয়, কিন্তু তাঁর নাম করে এবং না করে একাধিক বায়োপিক বানানো হয়, তাঁর নামে মেট্রো স্টেশন হয়। এসব নস্ট্যালজিয়া ছাড়া আর কী? এমনিতে স্মৃতি খুবই কাজের জিনিস, নইলে সাহিত্যিক মিলান কুন্দেরা লিখতেন না ‘ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম হল বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম।’ কিন্তু কলকাতা তথা বাংলায় আমরা সমস্ত অস্বস্তিকর স্মৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে ন্যাকা স্মৃতিমেদুরতায় ডুবে আছি। তাই সিনেমা হলে ঢুকে হিয়া টুপটাপ, জিয়া নস্ট্যাল হলেই হাততালি দিই। পরিচালক আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্ত মায়ানগর ছবিতে করেছেন ঠিক উল্টোটা। শেষ বছর বিশেকে কলকাতা যেভাবে গোল্লায় গেছে তার স্মৃতি নিখুঁত নির্মমতায় পর্দায় তুলে এনেছেন।
কেন এমন হয়ে গেল কলকাতা? দেখতে দেখতে পপকর্ন খাওয়া যায় এমন স্মৃতিমেদুরতা বজায় রাখতে হলে সিনেমায় দোষটা চাপিয়ে দিতে হয় কোনো অনির্দেশ্য শক্তির ঘাড়ে। ক্ষমতাশালীদের দিকে আঙুল তোলা তো নৈব নৈব চ, এমনকি নিজেদের দিকেও আঙুল তোলা চলে না। অথচ আদিত্যবিক্রম দেখিয়েছেন – লোভের গুড় ছড়িয়ে দিয়েছে ক্ষমতাশালীরা আর তা চেটেপুটে নিতে পিঁপড়ের মত এগিয়ে গেছে অভিনেত্রী হয়ে ওঠার স্বপ্ন মুছে যাওয়া গৃহবধূ এলার (শ্রীলেখা মিত্র) মত মানুষ। এই কালপর্বে বড় ফ্ল্যাট, নতুন বাইক, অনেক টাকা, বিদেশযাত্রার স্বপ্নে বিভোর করে দেওয়া হয়েছে রোজগারের অন্য পথ খুঁজে না পাওয়া রাজা (সায়ক রায়), পিংকিদের (রিকিতা নন্দিনী শিমু)। তারপর সর্বস্বান্ত করে দেওয়া হয়েছে। এই লোভের গুড়ের কল্পতরু বেয়ে শিখরে পৌঁছবার প্রতিযোগিতায় যারা নামেনি তাদের প্রায় সমাজচ্যুত করেছে কলকাতা। মাস্টারির চাকরি জোটাতে না পারা শিশির (সত্রাজিৎ সরকার), যে প্রাঞ্জল করে ছেলেমেয়েদের বুঝিয়ে দিতে পারে পদার্থবিদ্যার গূঢ় তত্ত্ব, তাকে প্রায়ান্ধকার পুরনো বাড়িতে গৃহশিক্ষক হয়েই থেকে যেতে হয়েছে। নিজের বউয়ের কাছেও বাতিল হয়ে গেছে সে। ভীতু হলেও প্রোমোটারদের হাতে বন্ধ থিয়েটার হল তুলে না দেওয়ার মরণপণ সংকল্প নিয়ে একা একা মদ খেতে খেতে অবসাদে ডুবে গেছে বুবুদা (ব্রাত্য বসু)। ওরা ডাইনোসর, ওদের সরিয়ে দিয়ে আধুনিক হয়ে উঠেছে কলকাতা।
আদিত্যবিক্রম দেখালেন বলে খেয়াল হল, আমাদের চোখের সামনে কী দারুণ এক মায়ানগর নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছে! এখানে নগদে রোজগার করলে ব্যাংক ঋণ দেয় না। অথচ গরিব, নিম্নবিত্ত মানুষের বহু কষ্টে সঞ্চিত কোটি কোটি টাকা নগদে আত্মসাৎ করে ধনী হয়ে যায় প্রদীপ্ত পাল (অনির্বাণ চক্রবর্তী)। কলকাতার ইন্দ্রপ্রস্থের মত এক মায়ানগর হয়ে ওঠার ইতিহাস আদিত্যবিক্রম ধরে রেখেছেন গোখান তিরয়াকির ক্যামেরায়। এই ইন্দ্রপ্রস্থে স্ফটিকের ফাঁকিতে উপরে ওঠাকেই সুখ ভেবে একেবারে একলা হয়ে যায় এলা। তারপর দুর্যোধনের পুষ্পশোভিত সরোবরকে শুকনো ডাঙা ভেবে ঝপাং করে পড়ে যাওয়ার মত আছড়ে পড়তে হয় সহায়সম্বলহীন মাটিতে। এই মায়ানগর রাজাকেও ফকির বানিয়ে ছাড়ে। এ মায়ানগর এমন এক সিন্ডিকেট যেখানে সৎ থাকতে চেয়েও পারে না ইঞ্জিনিয়ার ভাস্কর (অরিন্দম ঘোষ)। এ শহরে একমাত্র ডেঙ্গুর মশা তাড়ানোর ধোঁয়াই রচনা করতে পারে স্বপ্নের মায়াজাল।
এবং রবীন্দ্রনাথ। তিনিও বিকৃত ও বিক্রীত হন এই মায়ানগরে। মোটের উপর নরম শব্দ এবং নৈঃশব্দ্যে নির্মিত মিংকো এগার্সম্যানের সাউন্ডট্র্যাকে কান ঝালাপালা করে দেয় শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের গান। আজকের বাঙালির দুই শালগ্রাম শিলার আসলে কী অবস্থা করেছে কলকাতা, তা এতদিনে কোনো বাংলা ছবি দেখিয়ে দিল। আদিত্যবিক্রম রবীন্দ্রনাথের রক্তাক্ত হয়ে যাওয়া দেখিয়েছেন কোনো রাখঢাক না রেখে, আর সত্যজিতের অবস্থা দেখাতে চেয়েছেন কিনা নিশ্চিত হওয়া যায় না। কিন্তু এলা যখন ফ্ল্যাট পাওয়ার লোভে প্রদীপ্তর হোটেলের ঘরে পৌঁছে যায়, তখন কিছুতেই অগ্রাহ্য করা যায় না এই অনুভূতি, যে জন অরণ্য (১৯৭৬) ছবির সেই দৃশ্যই আবার দেখছি, যেখানে নিজের কাজ হাসিল করতে বন্ধুর বোনকে ক্লায়েন্টের ঘরের দরজায় পৌঁছে দেয় বিবেকের দংশনে ছিন্নভিন্ন সোমনাথ। তফাত বলতে, আজকের কলকাতায় অভাব নয়, এলার কম্পাস ঠিক করে লোভ। তাই তার কোনো ‘মিডলম্যান’ প্রয়োজন হয় না।
বিলাস যাদের প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে আর প্রয়োজনটুকুও যাদের বিলাসে পরিণত হয়েছে, তাদের কাছে জলজ্যান্ত একটা শহরের মায়ানগর হয়ে যাওয়ার ইতিহাস তুলে ধরেছেন পরিচালক। বাংলা ছবি অরাজনৈতিক হয়ে গেছে বলে আমাদের অনেকেরই আক্ষেপ। অদূর ভবিষ্যতে সে আক্ষেপ দূর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ এই ছবি করতেও বিদেশি প্রযোজক, বিদেশি কলাকুশলীদের সাহায্য নিতে হয়েছে পরিচালককে। তবে তার সদ্ব্যবহার করে তিনি বানিয়ে ফেলেছেন গত দেড় দশকের সবচেয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক ছবি। ফলে এই তথ্য অবাক করে না যে ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির পটভূমিকা যে কলকাতা শহর, সেখানকার সিনেমা হলেই ছবিটা এসে পৌঁছল চার বছর পরে।
তবে ছবির রাজনীতি ব্যর্থ হয়ে যেত, একজন দর্শকের কাছেও নিজের বার্তা পৌঁছে দিতে পারতেন না পরিচালক, যদি তাঁর প্রয়াস শিল্পোত্তীর্ণ না হত। আশ্চর্য সব দৃশ্যের জন্ম দিয়েছেন আদিত্য বিক্রম। ডেঙ্গু তাড়ানোর ধোঁয়াকে সিনেমার চিরাচরিত স্বপ্নদৃশ্যের কায়দায় ব্যবহার করার কথা আগেই বলেছি। তার চেয়েও বেশি অবাক করে পরিবারের কনিষ্ঠতমের মৃত্যুতে বিষণ্ণ পোষা কুকুর, প্রেমের ফুর্তির বাঁশির সঙ্গে সুর মিলিয়ে জ্বলে ওঠা নকল তাজমহলের আলো। শেষ দৃশ্যের ম্যাজিক গোপন থাক। যাঁরা এই পরিচালকের প্রথম ছবি আসা যাওয়ার মাঝে (২০১৪) দেখেছেন তাঁরা জানেন, আদ্যন্ত বাস্তবে পা রেখে দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ কল্পনার রাজ্যে চলে গিয়ে কী অসামান্য ম্যাজিক দেখাতে পারেন আদিত্য বিক্রম। রবীন্দ্রনাথের কথাও তোলা থাক যাঁরা এখনো ছবিটা দেখেননি তাঁদের জন্য। না, ট্রেলারে দেখানো শটগুলোর কথা হচ্ছে না। এটা সেই জাতের বাংলা ছবি নয় যার ট্রেলার দেখাই যথেষ্ট।
তা বলে কোনো দুর্ধর্ষ চমক আশা করবেন না। পরিচালক নিচু তারে বেঁধেছেন দৃশ্যগুলোকে, আর সেই সুরেই সুর মিলিয়ে কাজ করেছেন ক্যামেরার সামনের শিল্পীরা। এই ছবির চমক বলতে ওই নিচু তারের উঁচু মানের অভিনয়ই। শ্রীলেখা আশ্চর্য দক্ষতায় একইসঙ্গে লাস্যময়ী এবং ঘরোয়া; কৌশলী এবং অগোছালো; কুটিল এবং বোকা। বস্তুত একই চরিত্রে দুজন মেয়ের অভিনয় করেছেন তিনি। এমন এক মেয়ে যাকে অপাপবিদ্ধ কিশোরী থেকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী চতুর মহিলা করে তুলেছে জীবন। যার লোভ ষোল আনা, কিন্তু কল্পতরুর মালিক প্রদীপ্তর মত নির্দ্বিধায় অন্য মানুষের ক্ষতির বিনিময়ে লাভবান হতে যার বাধে।
এলার স্বামী শিশিরের চরিত্রে সত্রাজিৎকে পুরুষ দর্শকের মাঝে মাঝে মনে হবে ভেড়ুয়া। কী নির্লিপ্তভাবে বিয়ে করা বউয়ের দিকে প্রায় না তাকিয়ে কাটিয়ে দেয় লোকটা! নিজের ব্যর্থতা মেনে নেওয়া একজন মানুষের অভিনয়ে সত্রাজিৎ আবেগ চেপে রাখেন আশ্চর্য দক্ষতায়, অথচ রসবোধ একটুও চিড় খায় না। তা ছাত্রকে কুকুরের ভয় দেখানোতেই হোক, আর সেই কুকুরের সামনে পড়ে গিয়ে সন্ত্রস্ত রাজাকে ‘আমি কী করব? ও আমার কথা শোনে না’ বলাতেই হোক। কণ্ঠস্বরের ওঠানামা ছাড়াই সত্রাজিৎ এমন একজন মানুষকে দেখিয়ে দেন যার মমত্ববোধ আছে পুরোমাত্রায়, স্ত্রীর প্রতি প্রেমও আছে যথেষ্ট। কিন্তু সেসব সে প্রকাশ করে না, কারণ জানে তাতে লাভ নেই। শ্রীলেখা শেষমেশ গৃহত্যাগ করার পরে সত্রাজিতের চোখ ভরে আসে, তবু তিনি কাঁদেন না। আবার ঝড়জলের রাতে মত্ত স্ত্রী হঠাৎ ফিরে এলেও আবেগে বিহ্বল হয়ে পড়েন না।
ব্রাত্য বসু এতটাই বুবুদা হয়ে গেছেন যে সন্দেহ জাগে, তিনি আদৌ অভিনয় করছেন কিনা। তাঁর চেয়ারে বসতে গিয়ে মাঝপথে থমকে যাওয়া, জবুথবু বসার ভঙ্গি, দরদরিয়ে ঘেমে চলা, একই কথা বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করা শারীরিক ও মানসিক অস্থিরতার প্রমাণ দেয়। তাঁর সারা শরীরে আতঙ্ক জেগে থাকে সারাক্ষণ। অথচ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মস্তিষ্কের উপর নিয়ন্ত্রণ হারালেও, মুখে ‘বাড়ি বেচে দেব’ বললেও নিজের জায়গা ছেড়ে না যাওয়ার আকুতি পরিষ্কার ফুটে ওঠে।
মানুষ মাত্রেই বহুমাত্রিক। তেমন এক আপাত ভালমানুষ, বহুমাত্রিক চরিত্রে যথাযথ অভিনয় করেছেন অরিন্দম।
সায়ক তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষায়, অক্ষম রাগে, ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়ায় এবং অব্যক্ত হতাশায় আমাদের সকলের পরিচিত নিম্নবিত্ত পরিবারের চিট ফান্ড এজেন্টদের একজন হয়ে উঠেছেন। রিকিতাও তাঁর চরিত্রে যথাযথ। অতি স্বল্প সুযোগেও চিট ফান্ডের সর্বদা মিষ্টি কথা বলা চালু কর্মকর্তা হিসাবে জ্যান্ত হয়ে উঠেছেন লোকনাথ দে।
গত কয়েক বছরে কলকাতার যেসব মানুষকে আমরা দেখি না, দেখতে চাই না, তাদের সিনেমার পর্দায় তুলে এনেছে অন্তত তিনটে ছবি – মায়ার জঞ্জাল (২০২০), ঝিল্লি (২০২১) আর মানিকবাবুর মেঘ (২০২১)। আদিত্যবিক্রম মায়ানগর ছবিতে ধরে রেখেছেন আমাদের দেখা লোকেদের বদলে যাওয়া, আমাদের চেনা শহরের হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া। তা করতে গিয়ে তিনি ক্যামেরাবন্দি করে ফেলেছেন গোটা রাজ্যটার যুগান্তর। তিনি যে সচেতনভাবেই ঘটনা আর কল্পনা মিশিয়ে দিচ্ছেন, গুলিয়ে দিচ্ছেন, তা পরিষ্কার হয় যখন একটা শটে এক বাড়ির ছাদে মোবাইলে কথোপকথনে ব্যস্ত রাজার পিছনে দেখা যায় পোস্তার ভেঙে পড়া ফ্লাইওভারের অবশিষ্টাংশ; আর এক রডের মাথায় হাওয়ায় দোলে অধুনা দেশের সকলের পরিচিত তিনকোণা পতাকা। উপরন্তু কল্পতরুর মালিক প্রদীপ্ত হাওয়া খারাপ দেখে বিমানবন্দরের দিকে রওনা দেন, গন্তব্য কাশ্মীর। এ রাজ্যের যেসব মানুষের স্মৃতি দুর্বল নয়, তাঁদের স্থান মাহাত্ম্য বলে বোঝাতে হবে না।
এই ছবিতে যে কালপর্ব দেখানো হয়েছে, সেই পর্ব আমাদের প্রজন্মের প্রথম যৌবন। ফলত, বৃদ্ধ যুগের গলিত শবের পাশে প্রাণকল্লোলে নবযুগ আসার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সেইসময়, তা যে নেহাতই ফাঁকা বুলি ছিল তা আমরা এতদিনে বুঝে গেছি। কিন্তু সেই উপলব্ধি সবিস্তারে বাংলা ছবিতে বড় পর্দায় এতদিন দেখা যায়নি। সে অর্থে আদিত্যবিক্রমের এই ছবি আমাদের প্রজন্মের বয়ান। এটা আমাদের ছবি। তাই সত্যজিতের মহানগর (১৯৬৩)-এর অকারণ আশাবাদী সমাপ্তি আদিত্যবিক্রমের মায়ানগরে সম্ভব হয় না। তাঁকে ম্যাজিকের আশ্রয় নিতে হয়।
২০২২ সালে রাশিয়ায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টুইটার নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ জুকেরবার্গ চীনের বিরুদ্ধে সরব হলেও রাশিয়া সম্পর্কে নীরব। আর ভারত? ২০২৩ পর্যন্ত টানা ছয় বছর আমাদের দেশ সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট শাটডাউন করা দেশের শিরোপা অর্জন করেছে। ইন্টারনেট না থাকলে মেটার কোনো অ্যাপ চলাই সম্ভব নয়। অথচ জুকেরবার্গের কিন্তু ভারত সরকারের সেন্সরশিপ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই।
বিশ শতকের প্রথম আড়াই দশকের মধ্যে অন্তত দুটো পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেওয়ার মত ঘটনা ঘটেছিল। একটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮), অন্যটা রুশ বিপ্লব (১৯১৭)। দুটোরই অকুস্থল অবশ্য মূলত ইউরোপ। তার বাইরে এগুলোর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে সময় লেগেছে। দুটোর সঙ্গেই বিস্তর রক্তপাত জড়িয়ে। এই শতকের প্রথম আড়াই দশকে একাধিকবার বিশ্বযুদ্ধ লাগব লাগব মনে হলেও লাগেনি। কিন্তু কেবল ইউরোপ বা আমেরিকা নয়, গোটা দুনিয়া জুড়ে একটা রক্তপাতহীন বিপ্লব ঘটে গেছে বলে আমরা মনে করেছিলাম। খুবই অল্পসংখ্যক মানুষ সে বিপ্লব নিয়ে উল্লসিত হতে অস্বীকার করেছিলেন এবং আমরা যারা নাচছিলাম তাদের সতর্ক করে বলেছিলেন – ওটা বিপ্লব তো নয়ই; বরং গত কয়েক শতকে বিক্ষোভ, বিদ্রোহ, বিপ্লব এবং বিজ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ যতখানি এগিয়েছিল সেই অগ্রগতিকে একেবারে নস্যাৎ করে দেওয়ার কৌশল। কোন বিপ্লবের কথা বলছি? সোশাল মিডিয়া বিপ্লব। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে এসে শেষমেশ পরিষ্কার হয়ে গেল যে সোশাল মিডিয়া আসলে মানুষের যাবতীয় প্রগতির বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব। মুশকিল হল, আমি আপনি সবাই এই প্রতিবিপ্লবে অংশগ্রহণ করে ফেলেছি এবং এখন আর বেরোবার রাস্তা পাওয়া যাচ্ছে না।
বহু মানুষ এবং গোষ্ঠী আছেন যাঁরা সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ব্যবসায়িক, রাজনৈতিক এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক ইতিবাচক কাজকর্ম চালান। তাঁরা সোশাল মিডিয়াকে সরাসরি প্রগতির বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব আখ্যা দিচ্ছি বলে রেগে যেতে পারেন। তাঁদের একটু ধৈর্য ধরতে বলব। এ সপ্তাহে মেটার মালিক – অর্থাৎ ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ, ইনস্টাগ্রাম এবং থ্রেড নামক সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর মালিক – মার্ক জুকেরবার্গ একখানা নাতিদীর্ঘ ভিডিও বক্তৃতা প্রকাশ করেছেন। সেখানে যা বলেছেন তা বাংলায় ভাষান্তরিত করলে এইরকম দাঁড়ায়
বন্ধুগণ, আজ আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে চাই। কারণ ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে আমাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। আমি সোশাল মিডিয়া গড়ে তুলতে শুরু করেছিলাম মানুষকে তার নিজের কণ্ঠস্বর দেওয়ার জন্যে। প্রায় পাঁচ বছর আগে জর্জটাউনে একটা বক্তৃতা দিয়েছিলাম বাকস্বাধীনতা বজায় রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে। আমি আজও তাতে বিশ্বাস করি। কিন্তু গত কয়েক বছরে অনেককিছু ঘটে গেছে। বিস্তারিত বিতর্ক হয়েছে অনলাইন কনটেন্ট কতখানি ক্ষতি করে তা নিয়ে। সরকারগুলো আর ঐতিহ্যশালী মূলধারার সংবাদমাধ্যম বেশি বেশি করে সেন্সর চাপিয়ে দিয়েছে। এর অনেকটাই স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক। কিন্তু একথাও ঠিক যে সত্যিই অনেক ক্ষতিকর কনটেন্ট সোশাল মিডিয়ায় রয়েছে – ড্রাগ, সন্ত্রাসবাদ, শিশু নির্যাতন। আমরা এই বিষয়গুলোকে খুব গুরুত্ব দিয়ে বিচার করি এবং আমি এগুলোর দায়িত্বপূর্ণ মোকাবিলা নিশ্চিত করতে চাই। তাই কনটেন্ট মডারেট করার জন্যে আমরা অনেক জটিল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু জটিল ব্যবস্থা গড়ে তোলার মুশকিল হল, তাতে প্রচুর ভুলও হয়। যদি ভুল করে ১% পোস্টও সেন্সর করা হয়, সেটাও কয়েক লক্ষ মানুষকে সেন্সর করা। আর আমরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেছিলাম যেখানে বড় বেশি ভুল হচ্ছিল আর বড় বেশি সেন্সরশিপ চলছিল। সাম্প্রতিক নির্বাচনটাকেও [মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন] মনে হল বাকস্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সাংস্কৃতিক তুঙ্গ মুহূর্ত। সুতরাং আমরা আমাদের শিকড়ে ফিরে যেতে চলেছি এবং আমাদের ভুলের সংখ্যা কমানোর দিকে জোর দিতে চলেছি, আমাদের নীতিগুলোর সরলীকরণ করতে চলেছি এবং আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাকস্বাধীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চলেছি। আরও নির্দিষ্টভাবে বললে আমরা যা করতে চলেছি তা হল – প্রথমত, আমরা তথ্য যাচাইকারীদের বাদ দিয়ে তার বদলে এক্স সাইটের মত কমিউনিটি নোট চালু করতে চলেছি। এ কাজ শুরু হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালে প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার পরে ঐতিহ্যশালী মূলধারার সংবাদমাধ্যম ক্রমাগত লিখে গেছে ভুয়ো তথ্য কীভাবে গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কোনটা সত্যি সেটার নির্ধারক হয়ে না বসে আমরা সৎভাবে ওই দুর্ভাবনাগুলো দূর করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তথ্য যাচাইকারীরা রাজনৈতিকভাবে বড় বেশি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে কাজ করেছেন এবং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বাস অর্জন করার চেয়ে বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন বেশি। অতএব আগামী কয়েক মাস ধরে আমরা অনেক বেশি করে সবদিক রক্ষা করে এমন কমিউনিটি নোট ব্যবস্থা ধাপে ধাপে চালু করতে যাচ্ছি।
দ্বিতীয়ত, আমরা আমাদের কনটেন্ট নীতিগুলোর সরলীকরণ করে অভিবাসন আর লিঙ্গ সম্পর্কে এমন একগুচ্ছ নিষেধ তুলে দিতে যাচ্ছি যেগুলো মূলধারার বয়ানের সঙ্গে একেবারে বেমানান। যা আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠার আন্দোলন হিসাবে শুরু হয়েছিল, তা ক্রমশই হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিন্নমত এবং ভিন্নমতের লোকেদের চুপ করানোর উপায়। এখানে বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। সুতরাং আমি নিশ্চিত করতে যাই যে মানুষ নিজের বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতা আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে শেয়ার করতে পারছে।
তৃতীয়ত, আমরা যেভাবে আমাদের নীতিগুলো প্রয়োগ করি তাতেও পরিবর্তন আনতে চলেছি। ওগুলোই আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে যত সেন্সরশিপ হয় তার বেশিরভাগ ভুলের জন্যে দায়ী। আমাদের যে কোনো নীতিকে লঙ্ঘন করে যেসব পোস্ট সেগুলোকে ধরার জন্যে আমাদের ফিল্টার ছিল। এখন থেকে সেই ফিল্টারগুলো মূলত নজর দেবে বেআইনি এবং গুরুতর নীতি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর উপর। আর সেগুলোর ক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নেওয়ার আগে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীরা রিপোর্ট করেছেন কিনা তার উপর নির্ভর করব। সমস্যা হল, ফিল্টারগুলোও ভুল করে এবং এমন প্রচুর কনটেন্ট মুছে দেয় যেগুলো মোছা উচিত নয়। সুতরাং ফিল্টারগুলোর ভূমিকা কমিয়ে আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মের সেন্সরশিপ অনেকখানি কমিয়ে ফেলতে পারব। এছাড়াও আমরা কনটেন্ট ফিল্টারগুলোকে এমনভাবে টিউন করতে চলেছি যে কোনো কনটেন্ট মুছে দেওয়ার আগে ফিল্টারগুলোকে অনেক বেশি নিশ্চিত হতে হবে।
সত্যি কথা বলতে এগুলো করলে কিছু ক্ষতিস্বীকারও করতে হবে। এই ব্যবস্থায় অনেক কম খারাপ জিনিস ধরা পড়বে, কিন্তু যত নিরপরাধ মানুষের পোস্ট আমরা ভুল করে মুছে দিই তার সংখ্যা কমবে।
চতুর্থত, আমরা সিভিক কনটেন্ট ফিরিয়ে আনছি। বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুক সমাজ রাজনীতি কম দেখতে চাইছিল কারণ এতে মানুষের মানসিক চাপ বেড়ে যাচ্ছিল। তাই আমরা ওই ধরনের পোস্ট সুপারিশ করা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু মনে হচ্ছে আমরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছি এবং আমরা জানতে পারছি যে লোকে ওই ধরনের কনটেন্ট আবার দেখতে চাইছে। তাই আমরা ধাপে ধাপে সেই ধরনের কনটেন্ট ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আর থ্রেডে ফিরিয়ে আনতে চলেছি যাতে গোষ্ঠীগুলো বন্ধুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক থাকে।
পঞ্চমত, আমরা আমাদের ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি অ্যান্ড কনটেন্ট মডারেশন টিমগুলোকে ক্যালিফোর্নিয়ার বাইরে নিয়ে যাচ্ছি এবং আমাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কনটেন্ট রিভিউ হবে টেক্সাস থেকে। আমরা যেহেতু বাকস্বাধীনতা বৃদ্ধি করতে চলেছি, সেহেতু আমার মনে হয় এমন জায়গা থেকে কাজ করলে বেশি বিশ্বস্ত হওয়া যাবে যেখানে আমাদের টিমের পক্ষপাত নিয়ে ভাবনা কম।
শেষত, আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সেইসব সরকারের বিরুদ্ধে লড়ব যারা আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে আক্রমণ করছে আরও সেন্সর করার জন্যে। গোটা পৃথিবীর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই বাকস্বাধীনতা রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী সাংবিধানিক ব্যবস্থা রয়েছে। ইউরোপে ক্রমশ এমন সব আইন বেড়ে যাচ্ছে যেগুলো সেন্সরশিপকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। ফলে সেখানে উদ্ভাবনীমূলক কিছু করা শক্ত হয়ে যাচ্ছে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর এমন গোপন কোড আছে যা দিয়ে তারা চুপিসারে কোম্পানিগুলোকে নানা পোস্ট মুছে দিতে বলতে পারে। চীন আমাদের অ্যাপগুলোকে তাদের দেশে একেবারেই নিষিদ্ধ করে রেখেছে। এই বিশ্বব্যাপী প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই করা যেতে পারে একমাত্র মার্কিন সরকারের সঙ্গে মিলে কাজ করলেই। সেই কারণেই গত চার বছরে কাজ করা খুব শক্ত হয়ে গিয়েছিল, কারণ মার্কিন সরকারও সেন্সরশিপ চালানোর জন্যে চাপ দিচ্ছিল। আমাদের এবং অন্য আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে আক্রমণ করে মার্কিন সরকার অন্য দেশের সরকারগুলোর আমাদের সেন্সর করার সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এবার আমাদের সামনে বাকস্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার সুযোগ এসেছে এবং আমি সেই সুযোগ নিতে উদগ্রীব। এতে সময় লাগবে আর এগুলো জটিল ব্যবস্থা। ফলে কখনোই একেবারে নিখুঁত হবে না। তাছাড়াও প্রচুর বেআইনি জিনিস আছে যেগুলোকে সরাতে আমাদের এরপরেও অনেক পরিশ্রম করতে হবে। কিন্তু আসল কথা হল, বহুবছর ধরে আমাদের কনটেন্ট মডারেশন প্রোগ্রামের প্রধান কাজ ছিল কনটেন্ট মুছে দেওয়া। এবার সময় এসেছে ভুল কমানোর উপর জোর দেওয়ার, আমাদের ব্যবস্থাগুলোর সরলীকরণ করার এবং আমাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার, অর্থাৎ মানুষকে তার নিজের কথা বলতে দেওয়ার। আমি এই নতুন অধ্যায়ের দিকে সাগ্রহে তাকিয়ে আছি। ভাল থাকুন, শিগগির আরও কিছু নিয়ে ফিরে আসব।’
অতীতে কখনো এরকম বুক ফুলিয়ে কোনো বহুজাতিক কোম্পানি মার্কিন সরকারের সঙ্গে মিলে অন্য দেশের সরকারগুলোর আইনকানুনের বিরুদ্ধে লড়ার কথা ঘোষণা করেছে কিনা তা ঐতিহাসিক গবেষণার বিষয় হতে পারে। এসব বরাবর চোরাগোপ্তা চলেছে। কিন্তু জুকেরবার্গের এই ঘোষণা প্রমাণ করে দিল যে বিশ্বজুড়ে বহু ইন্টারনেট অ্যাক্টিভিস্ট যে অভিযোগ করে আসছেন এই দৈত্যাকৃতি তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে – তা সত্যি। অর্থাৎ এদের হাতে এমন উপকরণ আছে যা দিয়ে এরা মার্কিন সরকারের হয়ে অন্য দেশের সরকারের তো বটেই, সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী কাজও করতে পারে।
করেও থাকে। সোশাল মিডিয়া যেভাবে বিশ্বব্যাপী জাল বিস্তার করেছে তা করতেই পারত না, যদি না যোগাযোগ বিপ্লব ঘটত। সেই বিপ্লবে সবচেয়ে লাভবান হওয়া কোম্পানিগুলোর অন্যতম হল স্টিভ জোবস স্থাপিত অ্যাপল। এ মাসের গোড়াতেই অ্যাপল একখানা মামলা মিটিয়ে নিতে ৯৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া প্রদেশের ওকলাহোমার ফেডেরাল কোর্টে চলা এই মামলায় মামলাকারীর অভিযোগ ছিল, আইফোন ও অন্যান্য অ্যাপল উৎপাদিত যন্ত্রপাতির ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘সিরি’, যন্ত্রের মালিকের অজান্তে তার কথাবার্তা রেকর্ড করে নিয়েছে। তারপর সেই কথাবার্তা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বেচে দেওয়া হয়েছে। তেমন হলে যে মার্কিন সরকারের কাছে বা আপনি যে দেশের লোক সে দেশের সরকারের কাছেও বেচবে না তার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। তেমন অভিযোগও ওঠে, কেবল অ্যাপল বা ফেসবুকের বিরুদ্ধে নয়। সুন্দর পিচাইয়ের গুগল এবং সত্য নাডেলার মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধেও নানারকম অভিযোগ আছে। পিচাইকে মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের সামনে বসে প্রাইভেসি, রাজনৈতিক পক্ষপাত, হিংসায় ধুয়ো দেওয়া ইত্যাদি অভিযোগ সম্পর্কে কৈফিয়তও দিতে হয়েছে।
এগুলো কোনোটাই আমেরিকাবিরোধী বা পুঁজিবাদবিরোধী বামপন্থীদের তৈরি ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব নয়। অভিযোগগুলো নিয়ে অন্তর্তদন্ত, লেখালিখি করে থাকে ফোর্বসের মত মার্কিন এবং ঘোর পুঁজিবাদী সংবাদমাধ্যমগুলোই। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি হলিউড তো এসব নিয়ে একগুচ্ছ ছায়াছবি বানিয়ে বসে আছে। এসব যদি কেবল গালগল্প হত তাহলে এডওয়ার্ড স্নোডেনকে নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গিয়ে আত্মগোপন করে থাকতে হত না।
যা-ই হোক, জুকেরবার্গের মিনিট পাঁচেকের ঘোষণার শুধু ওটুকু নিয়ে পড়ে থাকলে আমাদের চলবে না। এগোনো যাক।
ইলন মাস্ক যখন টুইটার (অধুনা এক্স) কিনে নিলেন, তখন প্রচুর লোককে ছাঁটাই করেন। তাঁদের একটা বড় অংশ ছিলেন তথ্য যাচাইকারী, অর্থাৎ যাঁরা ওই প্ল্যাটফর্মে ভুয়ো তথ্য পরিবেশন আটকানোর দায়িত্বে ছিলেন। এবার লক্ষ করুন, জুকেরবার্গও বলছেন তথ্য যাচাইকারীদের দরকার নেই। তারা বড্ড পক্ষপাতদুষ্ট। আমরা বরং এক্সের মত কমিউনিটি নোট চালু করব। অর্থাৎ আগে যদি ফেসবুকে আপনি পোস্ট করতেন যে বারাক ওবামা হলেন ওসামা বিন লাদেনের খুড়তুতো ভাই, তাহলে ফেসবুক হয়ত তা মুছে দিত। এখন থেকে মুছবে না। যদি অন্য ব্যবহারকারীরা কথাটা যে মিথ্যে তা উল্লেখ করেন, তাহলে পোস্টের তলায় একখানা নোট দেওয়া থাকবে যে অনেকে জানিয়েছেন এই তথ্য মিথ্যা। তেমন কিছু পোস্টের দৃষ্টান্তও দেওয়া থাকবে। বলা বাহুল্য, স্মার্টফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমাদের মনোযোগ যে তলানিতে এসে পৌঁছেছে তাতে অধিকাংশ লোক ওসব নোট-ফোট খুলে দেখতে যাবে না। ফলে ভুয়ো তথ্যের রমরমা হবে। ওরকম পোস্ট যদি ছবি সহকারে করা হয় তাহলে তো কথাই নেই। আমাদের দেশে অল্টনিউজ, বুমলাইভের কর্মীদের উদয়াস্ত পরিশ্রম সত্ত্বেও বারবার জওহরলাল নেহরু এক সুন্দরী মেমের সঙ্গে নাক ঘষছেন – এমন একখানা ছবি কিছুদিন পরপরই সোশাল মিডিয়ায় ঘোরে। অথচ বহুবার প্রমাণিত হয়েছে যে ওটা ফটোশপের কারসাজি। ছবিতে আসলে নেহরুর পাশে ছিলেন মহাত্মা গান্ধী, দুজনের মধ্যে হাসিঠাট্টা চলছিল।
অল্টনিউজের কথা যখন উঠলই তখন মনে করিয়ে দিই, ২০২১ সালে নাগরিক ডট নেটকে এক সাক্ষাৎকারে ওই সংস্থার কর্ণধার প্রতীক সিনহা বলেছিলেন, যে সমাজে তীব্র মেরুকরণ হয়ে গেছে সেখানে তথ্য যাচাই যথেষ্ট নয়। কথাটা সব দেশের সব সমাজের জন্যেই সত্যি। কারণ তেমন সমাজে আপনি যাদের অপছন্দ করেন তার সম্পর্কে বানিয়ে বলা খারাপ কথাও আপনি অন্ধের মত বিশ্বাস করবেন, পছন্দের লোকেদের সম্পর্কে বানিয়ে বলা ভাল কথাও একইভাবে বিশ্বাস করবেন। যাচাই করে দেখতে যাবেন না সত্যি বলা হয়েছে না মিথ্যা। একথা জুকেরবার্গও জানেন আর আজকের আমেরিকা যে প্রবল মেরুকরণ হয়ে যাওয়া এক দেশ – সেকথাও বিলক্ষণ বোঝেন। তা সত্ত্বেও তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার মানে এর পিছনে যে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এদেশে আরএসএস-বিজেপির নেতা, কর্মী, সমর্থকরা প্রতীক, মহম্মদ জুবের প্রমুখ তথ্য যাচাইকারীদের পক্ষপাতদুষ্ট বলেন। সোশাল মিডিয়ায় গালাগালি দিয়েই ক্ষান্ত থাকেন না, এফআইআর-ও করে দেন। তার জেরে জুবেরকে ইতিমধ্যেই একবার কারাবাস করতে হয়েছে, এই মুহূর্তেও তাঁর নামে মামলা চলছে আদালতে। লক্ষ করুন, জুকেরবার্গও অভিযোগ করছেন যে তথ্য যাচাইকারীরা পক্ষপাতদুষ্ট। কোন পক্ষ? সেই পক্ষকে কেন জুকেরবার্গের অপছন্দ? তা একেবারে শেষে এসে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পের পক্ষে, অর্থাৎ তথ্য যাচাইকারীরা ট্রাম্পের বিরুদ্ধ পক্ষের। গোটা বক্তৃতায় জুকেরবার্গ বাকস্বাধীনতার হয়ে ধর্মযুদ্ধে নামার ভান করেছেন। বাকস্বাধীনতা কথাটা শুনতে অতি চমৎকার। কিন্তু কার বাকস্বাধীনতা? এক্ষেত্রে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে – অভিবাসীবিদ্বেষী, কৃষ্ণাঙ্গবিদ্বেষী, মুসলমানবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী এবং রূপান্তরকামী বিদ্বেষী ট্রাম্প ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের বাকস্বাধীনতা।
কার বাকস্বাধীনতা – এই প্রশ্নটা করতে আমরা প্রায়শই ভুলে যাই। ইউরোপের নবজাগরণ, ফরাসি বিপ্লব, পাশ্চাত্যের উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় আমরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে প্রশ্নটা উঠলেও সটান বলে দিই ‘সকলের বাকস্বাধীনতা থাকা উচিত।’ সেন্সরশিপ ব্যাপারটা যে খুব খারাপ সেটাও আমরা বিনা প্রশ্নে মেনে নিই। কথাটার মধ্যে যে একটা মস্ত ফাঁক (বা ফাঁকি) আছে সেটা একুশ শতকে এসে মাস্ক, জুকেরবার্গরা দেখিয়ে দিলেন। বলা ভাল, দেখিয়ে ফেললেন। ওই ফাঁক দিয়েই তাঁরা ভুয়ো তথ্য ও ঘৃণাভাষণের হাতি গলিয়ে দিলেন। দেখুন জুকেরবার্গ কেমন অবলীলাক্রমে বলেছেন যে এসব পরিবর্তন করলে কিছু ক্ষতি হবেই। সত্যিই সোশাল মিডিয়ায় ড্রাগ, সন্ত্রাসবাদ, শিশু নির্যাতনের মত ভয়ঙ্কর জিনিস ছড়িয়ে আছে এবং নতুন ব্যবস্থায় সেগুলো বেড়ে যাবে। কিন্তু তাতে কী হয়েছে? সেন্সরশিপ তো কমবে। অর্থাৎ মানুষের স্বার্থে বাকস্বাধীনতা চাইছেন না, বাকস্বাধীনতার স্বার্থে মানুষকে বলি দিতে চাইছেন। আপনার স্মার্টফোন হাতে পাওয়া সন্তানের কোনো বিকৃতকাম লোকের পাল্লায় পড়ে যাওয়া আটকানোর চেয়ে বিকৃতকাম লোকটার বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা বেশি জরুরি – এই হল জুকেরবার্গের যুক্তি। একইভাবে কালো মানুষকে তার চামড়ার রং নিয়ে গালাগালি দেওয়ার বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা জরুরি। মহিলাদের প্রতি লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য করা, অশ্লীল ইঙ্গিত করা, ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার বাকস্বাধীনতাও জরুরি। যে কোনো প্রান্তিক পরিচিতিসম্পন্ন ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীকে যথেচ্ছ গালাগালি দেওয়া, তাদের বিরুদ্ধে ভুয়ো তথ্য ছড়ানো, সোশাল মিডিয়ায় ঘৃণাভাষণের স্বাধীনতা রক্ষাও জুকেরবার্গের খুবই জরুরি মনে হয়েছে।
কেন মনে হল? জুকেরবার্গ আদতে তো ব্যবসায়ী। তাঁর লক্ষ্য তো মুনাফা। তাহলে এইরকম বাকস্বাধীনতায় কি মুনাফার সম্ভাবনা বাড়বে? অবশ্যই। কারণ দেশের রাষ্ট্রপতি, যিনি মূলত একজন ধনকুবের, তিনি আপনার হাতে। ফলে তাঁর রাজনীতিকে জায়গা করে দিলেই আপনার ব্যবসা যে ফুলে ফেঁপে উঠবে সে তো জানা কথাই। মাস্ক যখন টুইটার কিনে নিলেন তখন অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক বলেছিলেন যে এটা ভুল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। কারণ ওটা আসলে ক্ষতিতে চলা ব্যবসা। মাস্ক নিজেও ২০২২ সালের নভেম্বরে বলেছিলেন যে টুইটারের দৈনিক ৪ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। ক্ষতিকে লাভে পরিণত করার জন্যে তারপর তিনি নানারকম ব্যবস্থা নেন। ভেরিফিকেশন টিক দেওয়ার জন্যে টাকা নেওয়া, বিনামূল্যে যত শব্দ পোস্ট করা যায় তার চেয়ে মাসিক মূল্যে কিছু বেশি শব্দ পোস্ট করতে দেওয়া, পোস্ট সম্পাদনা করতে দেওয়া – ইত্যাদি ব্যবস্থা চালু হয়। কিন্তু এহ বাহ্য। এখন বোঝা যাচ্ছে, আসলে মাস্কের উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্পকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করা। তিনি টুইটারের মালিকানা হস্তান্তরের পরেই ট্রাম্পের উপর চাপানো আজীবন নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনেন। তারপর ভুয়ো তথ্য, ঘৃণাভাষণ আটকানোর ব্যবস্থাগুলোর সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দেন। দেশে নিজের পছন্দের রাষ্ট্রপতি বসাতে পারলে অনেক ব্যবসার একটা ব্যবসায় যা ক্ষতি হবে তা পুষিয়ে নেওয়া এমন কী ব্যাপার? জুকেরবার্গও মাস্কের পথের পথিক।
এবার জুকেরবার্গের বক্তব্যের শেষ অনুচ্ছেদে আসা যাক। তিনি জো বাইডেনের আমলের নিন্দা করে বলেছেন, এমনিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই বাকস্বাধীনতার সাংবিধানিক রক্ষাকবচ সবচেয়ে বেশি। কিন্তু গত চার বছরে তাঁদের উপর এবং অন্য মার্কিন কোম্পানিগুলোর উপর মার্কিন সরকার সেন্সরশিপ চাপিয়ে দিচ্ছিল। ফলে অন্য দেশের সরকারগুলোরও সাহস বেড়ে গেছে। অতঃপর জুকেরবার্গ নির্দিষ্ট করে কিছু দেশ ও মহাদেশের নাম করেছেন, যারা নাকি এতই সেন্সরশিপ চালায় যে সেখানে কোনোরকম উদ্ভাবনীমূলক কাজ করা যায় না। নামগুলো কৌতূহলোদ্দীপক। চীনে মেটার অ্যাপগুলো নিষিদ্ধ, তাঁর দোকান খুলতেই দেওয়া হয়নি, অতএব চীনকে জুকেরবার্গের অপছন্দের কারণ বোঝা যায়। সত্যি বলতে বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে চীনের রেকর্ড খুব ভাল – এমনটা ভারতের কিছু কমিউনিস্ট ছাড়া বিশেষ কেউ দাবি করে না। বোধহয় শি জিনপিংকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলবেন – বেশ করি বাকস্বাধীনতা দিই না। যা পারিস কর গে যা। ফলে চীনের কথা না হয় বাদ দেওয়া গেল। লাতিন আমেরিকাকে নিয়ে আপত্তি তো থাকবেই। ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা সহ একাধিক দেশে এখন বামপন্থী দলগুলোর সরকার। এদের মার্কিন পুঁজিবাদীদের কোনোদিনই পছন্দ হয় না, হওয়ার কথাও নয়। সুতরাং তাদের প্রতি জুকেরবার্গের অসন্তোষও স্বাভাবিক। মজার ব্যাপার হল, ইউরোপের নাম করা। ইউরোপের প্রায় সব দেশের সরকারই তো পুঁজিবাদে ঘোর বিশ্বাসী। ফ্রান্সে, স্পেনে ইদানীং বামপন্থীদের প্রভাব যেমন খানিক বেড়েছে তেমনই নেদারল্যান্ডস, ইতালির মত দেশে ঘোর দক্ষিণপন্থী সরকার এসেছে। জার্মানিও ক্রমশ অতি দক্ষিণপন্থীদের দিকে ঝুঁকছে। তাহলে ইউরোপের উপর গোঁসা কেন?
আসলে ইউরোপের দেশগুলো ইন্টারনেট, প্রাইভেসি ইত্যাদি ব্যাপারে ভারতের মত কাছাখোলা নয়। এসব ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আইন আছে। সেইসব আইনভঙ্গের অভিযোগে সাম্প্রতিক অতীতে সিলিকন ভ্যালির টেক দৈত্যতের ফাঁপরে পড়তে হয়েছে। ২০১৮ সালে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পরে জুকেরবার্গকে সশরীরে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর দিতে যেতে হয়েছিল। ইউরোপের সরকারগুলোর উপরে ট্রাম্পের ডান হাত মাস্কও রুষ্ট (অনেকে বলছে ট্রাম্পই মাস্কের ডান হাত)। গত ৬ জানুয়ারি তিনি নিজের এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করেছেন ‘আমেরিকার উচিত ব্রিটেনের মানুষকে তাদের অত্যাচারী সরকারের হাত থেকে মুক্ত করা’। কারণ তাঁর মতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টার্মার মুসলমান অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর নন। আবার অতি দক্ষিণপন্থী ব্রিটিশ নেতা নাইজেল ফারাজকেও মাস্কের পছন্দ নয়। অন্য দেশে কার ক্ষমতায় থাকা উচিত আর কার উচিত নয় – তা নিয়ে এতকাল মন্তব্য করার একচেটিয়া অধিকার ছিল মার্কিন আর ইউরোপিয় দেশের রাষ্ট্রপতিদের। মন্তব্যগুলো করা হত লাতিন আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে। ২০২৫ সালে এসে দেখা যাচ্ছে মন্তব্য করছে টেক দৈত্যরা; এমনকি ইউরোপের যেসব দেশ নিজেদের গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতার পরাকাষ্ঠা বলে মনে করে তাদের সম্পর্কেও। তাহলে বোঝা যাচ্ছে গত দুশো-আড়াইশো বছর ধরে অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কেমন ইউ টার্ন নিয়ে ফরাসি বিপ্লবের আগের যুগে ফিরে যাচ্ছে? বোঝা যাচ্ছে কেন সোশাল মিডিয়াকে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব বলছি?
জুকেরবার্গ যা বলেছেন শুধু তা-ই যে তাৎপর্যপূর্ণ তা কিন্তু নয়। যা বলেননি তা খেয়াল করলেও গণতন্ত্রবিরোধী বা প্রতিবিপ্লবী প্রবণতাটা ধরা যাবে। লক্ষ করুন, যেসব দেশের সরকার সেন্সরশিপ চাপিয়ে দিচ্ছে বলে জুকেরবার্গ অভিযোগ করেছেন তার মধ্যে ভারত নেই, রাশিয়া নেই। কেউ বলতেই পারেন, হাতে ফর্দ নিয়ে বসে দুনিয়ায় যতগুলো দেশে অপছন্দের সরকার আছে তাদের নাম করবে নাকি? নিশ্চয়ই তা প্রত্যাশিত নয়। কিন্তু বাজার হিসাবে ভারত আর রাশিয়া বিরাট। রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিন কীরকম দমনমূলক শাসন চালান তা জানতে কারোর বাকি নেই। বিরোধিতা করলে কী অবস্থা হয় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ একদা বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনি, যিনি গতবছর কারাগারে মারা গেছেন। কিন্তু আজও পুতিনের সরকার সন্ত্রাসবাদীদের তালিকা থেকে তাঁর নাম সরাতে রাজি নয়। যদি একটু হাসিঠাট্টার মেজাজে আরও বিস্তারিত জানতে চান পুতিনের রাশিয়া সম্পর্কে, তাহলে বিদূষক জন অলিভারের শোয়ের এই পর্বটা দেখে নিতে পারেন।
উপরন্তু ২০২২ সালে রাশিয়ায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টুইটার নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ জুকেরবার্গ চীনের বিরুদ্ধে সরব হলেও রাশিয়া সম্পর্কে নীরব। আর ভারত? ২০২৩ পর্যন্ত টানা ছয় বছর আমাদের দেশ সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট শাটডাউন করা দেশের শিরোপা অর্জন করেছে। ইন্টারনেট না থাকলে মেটার কোনো অ্যাপ চলাই সম্ভব নয়। অথচ জুকেরবার্গের কিন্তু ভারত সরকারের সেন্সরশিপ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই।
এই মনোভাবের কারণ বোঝা কি সত্যিই শক্ত? পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুই সোশাল মিডিয়া মালিক জুকেরবার্গ আর মাস্ক হলেন ট্রাম্পের বন্ধু। আবার পুতিন আর আমাদের নরেন্দ্র মোদীর বন্ধু হলেন ট্রাম্প। মোদী আমেরিকায় গিয়ে অনাবাসী ভারতীয় ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের হয়ে প্রায় নির্বাচনী প্রচার করে এসেছিলেন। স্লোগান চালু হয়েছিল ‘অব কি বার, ট্রাম্প সরকার’। ট্রাম্পও ভারতে এসে এলাহি অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন মোদীর নিজের শহর আমেদাবাদে। মোদীর নামাঙ্কিত ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথম অনুষ্ঠান ছিল ট্রাম্পের অভ্যর্থনা, কোনো ক্রিকেট ম্যাচ নয়। তখন করোনা অতিমারী চলছে। দেশসুদ্ধ লোককে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখতে বলে কেবল ট্রাম্পের জন্যে লক্ষ লক্ষ লোককে সেদিন জড়ো করা হয়েছিল ওই স্টেডিয়ামে। তাছাড়া নির্বাচন এসে পড়লেই বিজেপি ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিতে কী বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে তাও তো গোপন নেই।
পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা তো আরও গভীর। ট্রাম্প প্রথমবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার সময় থেকেই অভিযোগ উঠেছে মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়া হস্তক্ষেপ করে ট্রাম্পকে সাহায্য করতে। সেই ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কোনো মার্কিন রাজনীতিবিদ রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে ট্রাম্পের মত উদগ্রীব হননি। পুতিনও ট্রাম্পের প্রশংসা করে থাকেন। ট্রাম্প এবারে ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই পুতিনের ইউক্রেনের জমি দখলকে সমর্থন করে চলেছেন। সম্প্রতি বাইডেন সরকারের অনুসৃত বিদেশনীতির একেবারে উল্টো পথে হেঁটে বলেছেন ইউক্রেনের ন্যাটোয় যোগদানে রাশিয়ার আপত্তি যুক্তিযুক্ত।
যা নিয়ে বাইডেন আর ট্রাম্পের মধ্যে বিশেষ ফারাক নেই তা হল ইজরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে যে গণহত্যা চালাচ্ছে তার প্রতি সমর্থন। সেই গণহত্যাকে কীভাবে মদত দেওয়া হয়েছে সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে, তা আমরা দেখেছি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলে হামাসের অতর্কিতে হানাকে অজুহাত হিসাবে খাড়া করে ইজরায়েল প্যালেস্তাইনে যে গণহত্যা শুরু করে তার প্রতি সমর্থন আদায় করতে ছড়িয়ে দিয়েছিল এই ভুয়ো খবর, যে হামাস শিশুদের মাথা কেটে নিয়েছে। এত জোরদার ছিল সেই প্রচার যে বাইডেন সাংবাদিক সম্মেলনে ওই দৃশ্য উল্লেখ করে বসেন। পরে হোয়াইট হাউসকে স্বীকার করতে হয় যে ভুল হয়েছিল। ওরকম কিছু আদৌ ঘটেনি।
জুকেরবার্গ যে বাকস্বাধীনতার ধ্বজা ওড়াচ্ছেন সেটা আসলে এরকম যাচ্ছেতাই মিথ্যা ছড়ানোর, ঘৃণা ছড়ানোর স্বাধীনতা। ট্রাম্পের আমলে যা হবে তা হল ট্রাম্প কখনোই বলবেন না, আমার ভুল হয়েছিল। ওরকম কিছু ঘটেনি। তিনি মিথ্যে কথা বলার রাজা, ঘৃণাভাষণের সম্রাট। প্রথমবার রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন একবার নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রথম পাতা ভরে শুধু ট্রাম্পের মুখনিঃসৃত মিথ্যার তালিকা ছেপেছিল। সেই ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরেছেন। তাঁকে ফিরে আসতে সক্রিয় সাহায্য করেছে সোশাল মিডিয়া। অতঃপর তাঁর মিথ্যা, তাঁর ঘৃণা ছড়িয়ে দিতেও বিপুল বিক্রমে সাহায্য করবে তারাই। দুনিয়া জুড়ে যাবতীয় রাষ্ট্রীয় অন্যায়ে মদত দিয়ে আরও ফুলে ফেঁপে উঠবেন মাস্ক আর জুকেরবার্গ। যতই অভূতপূর্ব গরমের পর দাবানলে পুড়ে খাক হয়ে যাক লস এঞ্জেলস, সমুদ্র তীরবর্তী ম্যালিবু, হলিউডের অভিজাত অঞ্চল; সোশাল মিডিয়ায় মানুষকে বোঝানো হবে জলবায়ু পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। ও নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। কোনো দেশে বোঝানো হবে থালা বাসন বাজালেই অতিমারীর ভাইরাস পালাবে, মুসলমানরা ছয় বছর বয়স হলেই সন্ত্রাসবাদী হয়ে যায় – এইসব। আমার আপনার হাতের মগজ ধোলাই যন্ত্র আগামী দিনে আরও বেশি বেশি করে ভরে যাবে অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভুয়ো তথ্যে। সত্যের চেয়ে অর্ধসত্য বেশি মারাত্মক। সেই অর্ধসত্য এত বাড়িয়ে দেওয়া হবে বাকস্বাধীনতার নাম করে যে আমরা আর সত্য চিনতে পারব না। এদেশের সুপ্রাচীন জ্ঞানীদের কথা মানলে বলতে হয়, সত্যকে দেখতে পাব না মানে শিবকে দেখতে পাব না। শিবকে দেখতে পাব না মানে সুন্দরকে দেখতে পাব না। ফলে অবাধে কয়েকটা বড় বড় রাষ্ট্র দুনিয়া জুড়ে গণহত্যা চালাবে। একটার জায়গায় হয়ত দশটা হলোকস্ট হবে। পুতিন ক্রিমিয়া আর ইউক্রেনে হানা দিয়েছেন, নেতানিয়াহু প্যালেস্তাইনকে গণকবরে পরিণত করেছেন, ট্রাম্প হয়ত মেক্সিকো আর কানাডায় হানা দেবেন। ফলে চীন তাইওয়ানে হানা দিলেই বা কার কী বলার থাকতে পারে? কে বলে ইতিহাসের চাকা উল্টোদিকে ঘোরানো যায় না? দিব্যি তো ঔপনিবেশিক আমলের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছেন বড় বড় গণতন্ত্রের শাসকরা। কানাডাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম প্রদেশে পরিণত করব, গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্কের থেকে ছিনিয়ে নেব বলার পরেই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট স্বাধীন দেশ ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে ধরে দিতে পারলে ২৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার দেবে বলে ঘোষণা করেছে।
সোশাল মিডিয়া বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছিল। আমরা সেই ফাঁদে পড়ে গেছি। আমরা টের পাইনি কখন আমাদের যুক্তিবোধ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, প্রতিবাদ করার ইচ্ছা, প্রতিবাদ সংগঠিত করার ক্ষমতা – সব সেঁধিয়ে গেছে সোশাল মিডিয়ায়। ২০১০ সালে কায়রোর তাহরীর স্কোয়্যার থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে কলকাতার ধর্মতলা পর্যন্ত যত আন্দোলন সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়েছে, কোনোটার আহ্বান মাঠ ঘাট বন পেরিয়ে যায়নি। দুস্তর বাধা, প্রস্তর ঠেলে বন্যার মত পেরিয়ে যায়নি। যুগসঞ্চিত সুপ্তি সাড়া দেয়নি, হিমগিরি সূর্যের ইশারা শুনতে পায়নি। আমরা সোশাল মিডিয়ার বালুচরেই আশার তরণি বেঁধে ফেলেছি। এই লেখাও সোশাল মিডিয়াতেই শেয়ার করতে হবে। জুকেরবার্গ, মাস্কের সাহায্য ছাড়া আমরা বার্তা আদানপ্রদান করতে পারব না। বড়জোর ফেডিভার্স ব্যবহার করতে পারি বা ব্লুস্কাই-এর মত অন্য কোনো সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে যেতে পারি। কারণ সোশাল মিডিয়া আমাদের আসলে কাছাকাছি আনেনি। তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে, তারও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। হাতের উপর হাত রাখার মন্ত্র আমরা ভুলে গেছি। আসলে আমরা হীরক রাজার দেশে ছবির সেই কৃষক, শ্রমিকদের মত হয়ে গেছি যারা বুঝতেও পারে না তারা অন্যদের দ্বারা চালিত। মগজ ধোলাই কথাটার যথার্থ ইংরিজি এতদিনে খুঁজে পেয়েছে অক্সফোর্ড ডিকশনারি – ব্রেন রট। ব্রেন ওয়াশিং নয়।
অস্বীকার করি না যে এই পচন আটকানোর উপায় কী, সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। কিন্তু এখনো যাঁরা ভাবছেন পেশাদার বা অপেশাদার সোশাল মিডিয়া পরিচালকদের দিয়ে রাজনৈতিক যুদ্ধ জয় করবেন বা অধিকার আদায় করবেন, তাঁদের দেখে হাসার শক্তিটুকু আছে। কারণ জুকেরবার্গ, মাস্ক, ট্রাম্প, পুতিন, নেতানিয়াহু, মোদীদের মহাজোট প্রতিবাদকে সোশাল মিডিয়ায় আবদ্ধ করে ফেলার লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে। পরবর্তী লক্ষ্য সেখানেও প্রতিবাদী স্বর স্তব্ধ করে দেওয়া। এই জোট দেখেছে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিকল্প সংবাদমাধ্যম, ইউটিউবাররা মোদীর চারশো পার আটকাতে কী ভূমিকা নিয়েছে। তারা দেখেছে ইজরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কীভাবে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বাইরে গিয়ে মেহদি হাসানের মত সাংবাদিকরা ইউটিউব চ্যানেল খুলে ফেলে সাংবাদিকতা করছেন।
ভারতে এসব আটকাতে মোদী সরকার নতুন আইনের খসড়া তৈরি করে ফেলেছে, সেই খসড়া প্রকাশ করতে অস্বীকারও করেছে। কোনো সন্দেহ নেই, অদূর ভবিষ্যতে ট্রাম্পও একই পথে এগোবেন। বস্তুত তিনি হুমকি দিয়েই রেখেছেন। নতুন আইন না করলেও অবশ্য ক্ষতি নেই। এঁদের বন্ধু জুকেরবার্গ, মাস্ক, পিচাইরা যে নিজেদের প্ল্যাটফর্মে বিকল্প সংবাদমাধ্যম থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দল – সকলেরই গলা টিপে ধরবেন তা নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। এমনিতেই চুপিসারে অনেক প্রোফাইলের রীচ কমিয়ে দেওয়া হয়, কোনো কোনো পোস্ট আপনা আপনি উধাও হয়ে যায়। দলবদ্ধভাবে রিপোর্ট করে দক্ষিণপন্থীদের অপছন্দের পোস্ট মুছিয়ে দেওয়া তো এখনই জলভাত। এসব এবার বাড়বে বৈ কমবে না। রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা সেকথা যত বেশিদিন রাজনৈতিক বিরোধীরা ভুলে থাকবে, ততদিন গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই প্রতিবিপ্লব চলছে চলবে।