সঠিক সময়ে ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন সোবার্স

যতই অমর বলি, পাঁচ বছর পরে সোবার্সকে ক’জন ক্রিকেটপ্রেমীর মনে থাকবে সন্দেহ আছে। শচীন, কোহলি, রুটদের ৩০-৪০ হাজার রানের পাশে সোবার্সের আর কী দাম? অলরাউন্ডার হিসেবে কপিলদেব, ইয়ান বোথাম, রিচার্ড হেডলি, ইমরান খান তো ছিলেনই; এখন জাদেজাও ৪০০০ রান আর সাড়ে তিনশো উইকেট নিয়ে ফেলেছেন। কপিলদের সময়ে কিন্তু সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল— অলরাউন্ডার হিসাবে সবার ওপরে স্যর গ্যারি। বাকি সবাই তাঁর নীচে। কারণ তখন ক্রিকেটার, দর্শক, সাংবাদিক বা ধারাভাষ্যকার— কেউ-ই খেলাটাকে এক্সেল শিট মনে করতেন না।

খেলাধুলোর ইতিহাস বলে আগামিদিনে কিছু থাকবে কি না জানি না, কারণ এখন ইতিহাসকে ‘নস্ট্যালজিয়া’ বলে দেগে দিয়ে বর্তমানের সবকিছুকেই সর্বকালের সেরা বলার যুগ। এ-যুগের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমার মতো চল্লিশোর্ধ্বদের বেশ অসুবিধে হয়। আমার বাড়াবাড়ি রকমের দুষ্টু বন্ধুদের পাড়ার জ্যাঠামশাই থেকে স্কুলের মাস্টারমশাই প্রকাশ্যে ‘হনুমান’ বলে অপমান করতেন। এখন সেই বন্ধুরা ভাবে ‘একবার যদি দিনগুলো ফিরে পাই, স্যরদের দেখে নেব।’ আমি অঙ্ক ভুল করে কানমলা খেয়ে ধমক শুনতাম ‘ছাগল’। এখন দেখছি, কাউকে ছাগল বলে না মানলে তাকে অপমান করা হয়। আমরা জানতাম A for apple, B for bat যেমন, তেমনই G for goat। এখন দেখি ছোটবেলায় শেখা ইংরেজি ব্যাকরণের নিয়ম লঙ্ঘন করে লিখতে হয় GOAT. কিন্তু সেকথার ছাগল ছাড়াও একটা গূঢ়তর, বৃহত্তর অর্থ আছে— সর্বকালের সেরা (Greatest of All Time)। তাই সকল ভক্তকুল নিজেদের পছন্দের খেলোয়াড়কেই ছাগল বলে প্রমাণ করতে ব্যস্ত।

অবশ্য ব্যাপারটা ভক্তকুলের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে বহুজাতিক ব্যবসায়িক সংস্থা আর গণমাধ্যমের ভূমিকা অতুলনীয়। যে ফুটবলারকে দিয়ে বিজ্ঞাপন করালে সবচেয়ে বেশি জিনিস বিক্রি হয়, তাঁকে ছাগলের সঙ্গে বসিয়ে ফটোশুট, মাঠের মধ্যে তাঁর ছায়া হিসাবে একখানা ছাগলের ছায়া দেখিয়ে ছবি তৈরি— সুচারু ব্যবস্থা। ক্রিকেটের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও নিদারুণ। গোটের ছড়াছড়ি। সব ধরনের ক্রিকেট মিলিয়ে নাকি বিরাট কোহলি গোট, একদিনের ক্রিকেটে নাকি রোহিত শর্মা গোট, রবিচন্দ্রন অশ্বিন অবসর নেওয়ার সময়ে শুনলাম তিনিও গোট, ইদানীং শোনা যায় অলরাউন্ডার হিসাবে রবীন্দ্র জাদেজা গোট, এমনকী, মাঝেসাঝে খেলে এক-আধটা ম্যাচ জিতিয়ে দিলে কয়েক ঘণ্টার জন্যে হার্দিক পান্ডিয়াও গোট হয়ে যান। এর ওপর আছেন ‘ইউনিভার্স বস’ ক্রিস গেল এবং ‘গড’ শচীন তেন্ডুলকর। মানে ক্রিকেট মাঠে দিন-দিন মানুষই সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে। এমন দিনে কি তারে বলা যায় যে, গ্যারি সোবার্স বলে একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন, যিনি যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন তখন টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড (৩৬৫) তাঁর দখলে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে মোট সর্বোচ্চ রানও তাঁর?

শুধু তাই নয়, ৯৩ খানা টেস্ট খেলে প্রায় ৫৮ গড় ধরে রাখার রেকর্ড আজও খুব বেশি ক্রিকেটারের নেই। এই ২০২৬ সালেও গড়ের দিক থেকে তিনি টেস্টের ইতিহাসে ১১ নম্বরে। কিন্তু ওপরের দশজনের চারজন ৩০ খানা টেস্টও খেলেননি। এদিকে অবসরের সময়ে সোবার্স ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী (লান্স গিবসের পরেই)। কী বল করতেন? আঙুলের কারিকুরিতে স্পিন, কবজির মোচড়ে স্পিন, সুইং, সিম— এককথায় যতরকম বোলিং সম্ভব। এখানেই শেষ নয়। স্লিপে আর ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে তাঁর মতো ফিল্ডারও ক্রিকেটের ইতিহাসে খুব বেশি আসেনি।

পরিসংখ্যানের খাতিরে বলা যেতে পারে, তিনি টেস্টে ১০৯ খানা ক্যাচ নিয়েছিলেন, তার চেয়ে বেশি ক্যাচ সেইসময় একমাত্র কলিন কাউড্রে আর ওয়াল্টার হ্যামন্ডের ছিল। কিন্তু ওই পরিসংখ্যান আসল কথা নয়। অমন ফিল্ডার যে বিরল, সেকথা বলেছেন কারা? যাঁরা সোবার্সের খেলা দেখেছেন, তাঁরা, যাঁরা ওঁর সঙ্গে বা বিরুদ্ধে খেলেছেন, তাঁরাও। তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলা ছেড়েছেন ১৯৭৪ সালে। স্বভাবতই তাঁর খেলার খুব বেশি ভিডিও সংরক্ষিত নেই। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, ভিডিও আবিষ্কারের আগে, দিনরাত যাবতীয় খেলার সরাসরি সম্প্রচারের আগেও পৃথিবীর অস্তিত্ব ছিল। তখনও মানুষ প্রেম করত, সন্তানের জন্ম দিত, তাকে বুক দিয়ে লালন করত, ছবি আঁকত, কবিতা লিখত, গান গাইত এবং খেলাধুলো করত। কারণ এসব করতে ভাল লাগত। যারা দেখত, তারাও ভাল লাগত বলেই দেখত। আর যা দেখতে ভাল লাগে, তা মানুষ শতমুখে বলে এবং লিখে অন্যকে জানায়। তাই ব্র্যাডম্যান, সোবার্স, পেলে, রড লেভার, দিয়েগো মারাদোনাদের মহত্ত্বের লিখিত ইতিহাস আছে। তাঁদের কেউ গোট বলত না, কারণ কে সবার সেরা— তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা ছিল না।

খেলার প্রাথমিক উদ্দেশ্য আনন্দ পাওয়া— যে খেলে তার পক্ষেও, যে দেখে তার পক্ষেও। তারপর আসে স্কোরবোর্ড, হার-জিতের হিসেব। তারও পরে আসত খেলাকে ঘিরে ব্যবসা। সেটা মন্দ নয়, কারণ খেলা যদি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক দিতে পারে, তাহলে তাঁরা আরও মন দিয়ে খেলতে পারবেন। কিন্তু সোবার্স যে যুগের ক্রিকেটার, তখন ক্রিকেট নিয়ে ব্যবসা হত, ব্যবসার জন্যে ক্রিকেট হত না। ব্র্যাডম্যান, সোবার্সদের ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার তাগিদ ছিল না। তাঁদের ব্র্যান্ড করে তোলার জন্যে পাকা মাথার লোকেরা দিবারাত্র লেগেও থাকত না। ফলে দর্শক, সাংবাদিক, সমালোচক— সকলের কাছেই মুহূর্তের মূল্য ছিল, সৌন্দর্যের দাম ছিল। অতি সফল অলরাউন্ডার সোবার্সের জন্য সবাই পাগল হত, কিন্তু জর্জ হেডলি বা রয় ফ্রেডরিক্সকেও কেউ ভুলত না। যে-দল হেরে গেল, সে-দলের ক্রিকেটারদের জন্যও জয়ী দলের সমর্থকদের ভালবাসা থাকত।

সে-যুগের লোক বলেই সোবার্স ওরকম ঝুঁকি নিতে পারতেন, যা নিয়েছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক হিসাবে ১৯৬৮ সালে পোর্ট অফ স্পেনে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চতুর্থ টেস্টে। তিনি এমন এক সময়ে দ্বিতীয় ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করেন, যখন ইংল্যান্ডকে ঘণ্টাদুয়েক ব্যাট করতে হবে আর জিততে গেলে দরকার মাত্র ২১৫ রান। সোবার্সের ধারণা ছিল, ইংল্যান্ড ওইটুকু সময়ও টিকতে পারবে না, ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতে যাবে। কিন্তু কাউড্রের ইংল্যান্ড অনায়াসে সাত উইকেটে জেতে। কেন ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? ‘দ্য গার্ডিয়ান ’ কাগজে সোবার্সকে নিয়ে লিখতে গিয়ে ভিক মার্কস জানিয়েছেন, সোবার্সের উত্তর ছিল, ‘সিরিজটা বড্ড বোরিং ছিল। প্রথম তিনটে টেস্ট ড্র হয়েছিল। ইংল্যান্ড ঘণ্টায় ১২-১৩ ওভার করে বল করছিল। আমি ভীষণ হতাশ হয়েছিলাম। আমি ক্রিকেট বলতে যা বুঝি, ওটা তা নয়।’ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম আর বেন স্টোকসের টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা যেভাবে দর্শকদের আশীর্বাদ পেলেও ক্রিকেটমহলে সমালোচিত হয়েছে, তাতে বোঝা যায়— পৃথিবী বদলে গেছে। এখানে জেতাটাই বড় কথা, কারণ জয়ই বিক্রয়যোগ্য। পরাজয় নয়। জয়ীই ব্র্যান্ড হয়। তাই সারাক্ষণ তর্ক লাগিয়ে রাখতে হবে— মেসি গোট, না রোনাল্ডো? বিরাট গোট, না জো রুট? কখনও বিশ্বকাপ না জেতা জোহান ক্রুয়েফ বা অতি সামান্য টেস্ট খেলতে সুযোগ পাওয়া ব্যারি রিচার্ডসকে সর্বকালের সেরাদের আলোচনায় আনা যাবে না। তাছাড়া কোনওমতেই যা করা যাবে না, তা হল অতীতের কেউ বর্তমানের কারও চেয়ে মহান খেলোয়াড় ছিলেন, তা বলা। কারণ ওটা বিপণনবিরোধী ব্যাপার। কোনও কোম্পানি কি তার এখনকার ঠান্ডা পানীয়ের বিজ্ঞাপনে বলতে পারে ‘এই যেটা বের করেছি এটা ভাল, তবে আগেরটা আরও ভাল ছিল?’ খেলাকে এবং সফল খেলোয়াড়কে বিক্রি করাই আজকের খেলার উদ্দেশ্য। তাঁদের ব্যবহার করে যত বেশি সম্ভব বিজ্ঞাপন দেখানোই উদ্দেশ্য। তাই আইপিএলে আছে ‘টাইম আউট’, ফুটবল বিশ্বকাপে ‘হাইড্রেশন ব্রেক।’ কুড়ি-বাইশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সন্ধে-রাতের খেলায় মিনিট কুড়ি অন্তরই নাকি খেলোয়াড়দের বিরতির দরকার হচ্ছে।

ব্যাপারটা সব খেলাতেই হচ্ছে, দুদ্দাড় করে সব রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছে। কাল যে রেকর্ডকে মনে হত ধরাছোঁয়ার বাইরে, আজ সে রেকর্ড ধুলোয় লুটোচ্ছে। শচীনের একদিনের ক্রিকেটে শতরানের রেকর্ড বিরাট ভেঙে দিয়েছেন। সে-রেকর্ড হয়তো আর ভাঙবে না, কারণ খেলাটাই থাকবে না। কিন্তু কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে রেকর্ড ভাঙাগড়ার খেলা চলছেই। আইপিএলে বৈভব সূর্যবংশী এক মরশুমেই সবথেকে বেশি ছয়, অভিষেক হওয়া খেলোয়াড় হিসেবে সবথেকে বেশি রান, সবচেয়ে কম বয়সে ৭০০-র বেশি রান আর এক মরশুমে সবচেয়ে বেশি পুরস্কার জেতার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। আর্লিং হাল্যান্ড যেভাবে এগোচ্ছেন, তাতে অনেকে মনে করছেন মেসির গোল করার যাবতীয় রেকর্ডও তিনি ভেঙে দিতে পারেন। খেলা যেহেতু আর প্রাথমিকভাবে আনন্দ পাওয়ার, সৌন্দর্যের রসাস্বাদন করার জিনিস নেই, তাই খেলোয়াড়দের মহত্ত্বের মাপকাঠি হয়ে গেছে পরিসংখ্যান। যাঁর পরিসংখ্যান দুর্দান্ত নয় বা পাওয়া যায় না, তাঁরা সর্বকালের সেরাদের আলোচনায় ঢুকতে পারেন না। তাই ক্রিকেটে গোটের আলোচনায় কখনও অ্যাডাম গিলক্রিস্ট বা অ্যালান নট আসেন না। ফুটবলের গোটের আলোচনায় লেভ ইয়াশিন বা গর্ডন ব্যাংকস, ববি মুর, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার বা ফ্র্যাংকো বারেসির নাম আসে না।

আরও পড়ুন বেদি আর ববিকে ভোলা বিবেকের কাছে অপরাধ

সুতরাং, যতই অমর বলি, পাঁচ বছর পরে সোবার্সকে ক’জন ক্রিকেটপ্রেমীর মনে থাকবে সন্দেহ আছে। শচীন, কোহলি, রুটদের ৩০-৪০ হাজার রানের পাশে সোবার্সের আর কী দাম? অলরাউন্ডার হিসেবে কপিলদেব, ইয়ান বোথাম, রিচার্ড হেডলি, ইমরান খান তো ছিলেনই; এখন জাদেজাও ৪০০০ রান আর সাড়ে তিনশো উইকেট নিয়ে ফেলেছেন। কপিলদের সময়ে কিন্তু সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল— অলরাউন্ডার হিসাবে সবার ওপরে স্যর গ্যারি। বাকি সবাই তাঁর নীচে। কারণ তখন ক্রিকেটার, দর্শক, সাংবাদিক বা ধারাভাষ্যকার— কেউ-ই খেলাটাকে এক্সেল শিট মনে করতেন না। আসলে বিপণনের লোকেদের এক্সেল শিটই দরকার। সব খেলাই এখন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, তাই সব খেলাতেই ব্র্যান্ড নির্মাণ আর এক্সেল শিট তৈরি চলছে সচেতনভাবে। খেলার সৌন্দর্যকে (এবং মহান অনিশ্চয়তাকে) মারো গুলি। টেনিস নিয়ে এই কথা ক’দিন আগে বলেছেন স্বয়ং রজার ফেডেরার। এক পডকাস্টে তিনি বলেছেন, সমস্ত প্রতিযোগিতায় কোর্ট অল্পবিস্তর একইরকম করে দেওয়া হচ্ছে, বলও। যাতে শেষমেশ ফাইনালে পৌঁছন কার্লোস আলকারাজ আর ইয়ানিক সিনার। ঘাসের কোর্ট, হার্ড কোর্ট, ক্লে কোর্টে টেনিস খেলার আলাদা চ্যালেঞ্জ ক্রমশ মুছে যাচ্ছে। ব্যাপারটা বদলানো দরকার।

তাই বলতে হবে, সোবার্স এবারে সঠিক সময়ে ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। আগামী ২৮ তারিখ নব্বইয়ে পা দেওয়ার কথা ছিল, নির্ঘাত অনেকেই সেদিন তাঁর শতায়ু কামনা করতেন। কিন্তু শততম জন্মদিনে কি আর কেউ স্মৃতিচারণ করত, বিশ্ব একাদশের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ১৯৭১-’৭২ মরশুমে ডেনিস লিলিকে তছনছ করে দেওয়া ২৫৪ রানের কথা? ও জিনিসের মূল্য দিতে গেলে তো বুঝতে হবে, লিলি কেমন ছিলেন? আজকের প্রজন্ম তো পরিসংখ্যান দেখে বলবে— টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীদের তালিকায় লিলি অনেক নীচে। তাঁকে পেটানো আর এমন কী ব্যাপার? লিলির গতি বা সোবার্সের স্ট্রোকের শৌর্য ও সৌন্দর্য আলোচ্যই নয়।

লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ: আমাদের ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’ দেশের মুখ

রবি শাস্ত্রীর বরাবরই জনপ্রিয়তার কারণ ছিল অতিকথন আর গলা সপ্তমে চড়িয়ে কথা বলা, ইদানীং উত্তেজনার বশে খেলোয়াড়দের নামও ভুল করেন। টসে গিয়ে কার সঙ্গে কথা বলছেন গুলিয়ে ফেলেন, তবু তিনিই টসে যাবেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জয়ী প্রাক্তন অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি ২০২০ সালে ক্রিকেট দুনিয়ায় হইচই ফেলে দিয়েছিলেন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ খেলার সময়ে বর্ণবৈষম্যবাদী কথা শুনতে হয়েছে অভিযোগ তুলে। স্যামি বলেছিলেন, ২০১৩ আর ২০১৪ মরশুমে তিনি যখন সানরাইজার্স হায়দরাবাদে খেলতেন, তখন ইশান্ত শর্মা তাঁর নামকরণ করেছিলেন ‘কালু’। দলের অনেকেই তাঁকে ওই নামেই সম্বোধন করতেন। স্যামি তখন জানতেও পারেননি, যত আদর করেই ওই নাম রাখা হয়ে থাক, ওটা আসলে তাঁর গায়ের রং নিয়ে নোংরা রসিকতা। ২০২০ সালে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েড শ্বেতাঙ্গ পুলিসকর্মীর হাতে খুন হওয়ার পরে পৃথিবীজুড়ে বর্ণবৈষম্য নিয়ে প্রকাশ্যে কথাবার্তা চালু হয়ে যায়, তখন স্যামি ইশান্তের কীর্তি প্রকাশ্যে আনেন। তখনকার সতীর্থদের উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন, আমাকে কালু বলে তোমরা কী বোঝাতে চাইতে? এরপর কী হয়? কিচ্ছু না। এই ঘটনা ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মত শ্বেতাঙ্গপ্রধান দেশে প্রকাশ্যে এলে হয়তো সানরাইজার্স বা আইপিএল কর্তৃপক্ষ অথবা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) কোনো তদন্ত শুরু করে দিত, যেমনটা আজীম রফিকের অভিযোগ নিয়ে ইয়র্কশায়ার কাউন্টি করেছিল। কিন্তু আমরা তো ভারতীয়, আমাদের তো ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’, আরও নানা বকম বকম। অতএব আমরা বর্ণবৈষম্যবাদী হতেই পারি না। তাই স্রেফ ইশান্ত স্যামির সঙ্গে কথা বলে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন।

কেন আবার এতদিন পরে এসব কথা? কারণ সম্প্রতি প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ ঘোষণা করেছেন যে তিনি আর ধারাভাষ্যকারের কাজ করবেন না। তিনি সোশাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন এর কারণ— তিনি গায়ের রঙের কারণে বৈষম্যের শিকার হতে হতে ক্লান্ত। কালো বলে তাঁকে এত বছর ধারাভাষ্য দেওয়ার পরেও কোনোদিন টসের সময়ে মাঠে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

একথা অবিশ্বাস করার কারণ আছে, যেহেতু ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রাক্তন জোরে বোলার ইয়ান বিশপ এবং জিম্বাবোয়ের প্রাক্তন ক্রিকেটার পুমেলেলো বাঙ্গোয়াকে প্রায়ই টসে দেখা যায়। কিন্তু গতকাল দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের দুই সাংবাদিক – শ্রীরাম বীরা ও আর ভেঙ্কট কৃষ্ণ – এক দীর্ঘ প্রতিবেদন লিখেছেন শিবরামকৃষ্ণণের সঙ্গে কথা বলে। সেই প্রতিবেদন পড়লে পরিষ্কার হয়, শিবরামকৃষ্ণণ নেহাত আন্দাজে এই অভিযোগ তোলেননি। আটের দশকে বিরল প্রতিভা হিসাবে চিহ্নিত এই লেগস্পিনার সেই খেলোয়াড় জীবন থেকেই গায়ের রঙের কারণে নিজের দেশে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। সুতরাং শিকারি বেড়াল যে তিনি গোঁফ দেখলেই চিনতে পারবেন— এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। আমরা চিনি বা না-ই চিনি। তাছাড়া নিজেদের দিকে ভালো করে তাকালেই টের পাওয়া যাবে— আমরা আফ্রিকা-জাত খেলোয়াড়দের প্রতি যে সম্ভ্রম নিয়ে তাকাই, তা আমাদের আশপাশের কালো মানুষদের জন্য বরাদ্দ করি না। একদা কলকাতা ফুটবল মাতানো চিমা ওকোরি, ক্রিস্টোফার, প্রয়াত চিবুজোর, ওমোলো, ওডাফা ওকোলিদের নিয়ে আমরা নাচানাচি করতাম ঠিকই; তা বলে পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে ‘অমুক মেয়েটা কালো হলেও সুন্দর’ বলা বন্ধ করিনি। মজার কথা, ভারতীয়দের বর্ণবৈষম্য এমন বহুমাত্রিক যে তার মধ্যে এমন লিঙ্গবৈষম্যও মিশে থাকে যার শিকার ছেলেরা! কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে মেয়ে বন্ধুদের আলোচনা করতে শুনতাম ‘অত ফরসা ছেলে আমার ভালো লাগে না, একেবারে মেয়েদের মত টুকটুকে গায়ের রং।’ সুতরাং শিবরামকৃষ্ণণকে যে টিভি প্রোডিউসার বলেছেন ‘বসরা আপনাকে টসে বা প্রেজেন্টেশনে না রাখতে’, তিনি খুব অবিশ্বাস্য কিছু বলেননি।

ক্রিকেট মাঠ যে ভারতীয় সমাজের বাইরে নয় তা বুঝতে হলে শিবরামকৃষ্ণণের এই আখ্যান অবশ্যপাঠ্য। মাত্র ১৭ বছর বয়সে টেস্ট অভিষেক (শচীন তেন্ডুলকরের আগে সবচেয়ে কম বয়সে অভিষেকের রেকর্ড) হওয়ার আগেই শিবরামকৃষ্ণণকে নেট বোলার থাকার সময়ে ভারতীয় দলের এক সিনিয়র ক্রিকেটার তাঁর জুতো পালিশ করে দিতে বলেছিলেন। টেস্ট দলে ঢুকে পড়ার পর এবং নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখার পরে কটুকাটব্য আরও বাড়ে। পাকিস্তান সফরে গিয়ে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে অধিনায়ক সুনীল গাভস্কর চকোলেট কেক আনান দলের সকলে মিলে জন্মদিন পালন করার জন্য। সেখানে দলের এক ক্রিকেটার বলেন ‘সানি, তুমি ঠিক রঙের কেক আনিয়েছ। কালো ছেলের জন্যে ডার্ক চকোলেট কেক।’ শিবরামকৃষ্ণণ বলেছেন, তিনি কেঁদে ফেলেন এবং কেক কাটতে চাননি। গাভস্কর বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাঁকে শান্ত করেন, কেক কাটা হয়।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট: জাহান্নামের আগুনে পুষ্পের হাসি

আমরা শিবরামকৃষ্ণণের খেলা দেখেছি পরে সোশাল মিডিয়ার ক্লিপে বা ইউটিউবে, কারণ আমাদের জন্মের আগেই তাঁর স্বল্পমেয়াদি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটজীবন শেষ হয়ে গিয়েছিল। যাঁরা দেখেছেন এবং তাঁর প্রতিভায় চমৎকৃত হয়েছেন, তাঁরা বরাবরই বলেন যে শিবরামকৃষ্ণণের কেরিয়ার লম্বা না হওয়ার পিছনে দায়ী তিনি নিজেই। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মুখেও শুনেছি— শিবরামকৃষ্ণণ প্রথমে মদ খেতেন, পরে মদ তাঁকে খেয়েছে। কিন্তু এত বছর পরে তিনি বলছেন, ক্রমাগত টিটকিরি শুনতে শুনতে ওই ১৮-১৯ বছর বয়সে তিনি হীনমন্যতায় ভুগতেন এবং যখন স্বাভাবিক কারণেই ব্যর্থ হতে শুরু করেন, তখন কেউ পিঠে হাত দিয়ে ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়নি। উলটে তিনি খুব মদ খান— এই গল্প ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আরও চমৎকৃত হওয়ার মত কথা হল, ওই ছোট্ট আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে শিবরামকৃষ্ণণ নিজের দলের ড্রেসিং রুমের চেয়ে বেশি স্বস্তি পেতেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ড্রেসিং রুমে। বলেছেন তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলেন ডেসমন্ড হেইনস। অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েড তাঁকে সর্বদা স্বাগত জানাতেন। মনে পড়ে যায় মহম্মদ আলির কথা, যিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকার করে বলেছিলেন ‘ভিয়েত কংদের সঙ্গে আমার কোনো ঝগড়া নেই। কোনো ভিয়েত কং আমাকে কখনো নিগার বলেনি।’

শিবরামকৃষ্ণণ অবশ্য আলির মত সিংহহৃদয় লড়াকু কেউ নন। তিনি খুবই সাধারণ লোক, ফলে এই মানসিক চাপ সহ্য করতে পারেননি। ছিটকে গিয়েছিলেন। সোশাল মিডিয়া পোস্ট থেকে তাঁর রাজনৈতিক ভাবনাচিন্তা যেটুকু জানা যায়, তাও বেশ গোলমেলে। কিন্তু এখানে সে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক। দুর্ভাগ্যজনক হল— পরে ধারাভাষ্যকার হিসাবে যখন তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে আসেন, তখনো তাঁকে একই ব্যবহার সহ্য করতে হয়েছে। ভারতীয় সমাজ যে এগোবার বদলে পিছিয়ে যাচ্ছে তা আমরা আজকাল অনেক ঘটনাতেই বুঝতে পারি, শিবরামকৃষ্ণণ আরও একটা প্রমাণ জুগিয়ে দিলেন।

ভারতীয় ক্রিকেটের ধারাভাষ্য বেশ কিছুদিন হল আবর্জনায় পরিণত হয়েছে। চমৎকার ইংরিজি এবং গভীর বিশ্লেষণে একসময় মোহিত করে দেওয়া গাভস্কর, শিবরামকৃষ্ণণকে বুক দিয়ে আগলানো অধিনায়ক গাভস্কর এখন চটুল কথাবার্তা বলে নিজেকে জাতীয়তাবাদী বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন সারাক্ষণ। রবি শাস্ত্রীর বরাবরই জনপ্রিয়তার কারণ ছিল অতিকথন আর গলা সপ্তমে চড়িয়ে কথা বলা, ইদানীং উত্তেজনার বশে খেলোয়াড়দের নামও ভুল করেন। টসে গিয়ে কার সঙ্গে কথা বলছেন গুলিয়ে ফেলেন, তবু তিনিই টসে যাবেন। একদা মুগ্ধ করে দেওয়া হর্ষ ভোগলেও এখন ভারতীয় ক্রিকেটার আর বিসিসিআইয়ের চাটুকারিতা ছাড়া কিছু করে উঠতে পারেন না। মহেন্দ্র সিং ধোনির অসন্তোষের কারণ হয়ে একবার ধারাভাষ্যের চুক্তি খুইয়েছিলেন, ফের কেন ঝুঁকি নিতে যাবেন? ঠেকে শেখেননি বলে সঞ্জয় মঞ্জরেকর তো ধারাভাষ্যের চুক্তি হারিয়েছেন চোখের সামনেই। রিকি পন্টিং, ম্যাথু হেডেনরাও হাওয়া বুঝে ভীষণ ভারতপ্রেমী হয়ে যান মাইক হাতে নিলেই। ফলে নিশ্চিত হওয়া যায়, শিবরামকৃষ্ণণের ব্যাপারটা নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা হবে না। ফ্লয়েড হত্যার পরে ইংল্যান্ড বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের প্রথম টেস্টের প্রথম দিন মাইকেল হোল্ডিং স্কাই স্পোর্টসের সরাসরি সম্প্রচারে বর্ণবৈষম্য নিয়ে এক অবিস্মরণীয় আলোচনা করেছিলেন। তাঁর সঙ্গী ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত, কিন্তু সাহেবদের মত ফরসা নাসের হুসেন, আর শ্বেতাঙ্গ এবোনি রেনফোর্ড-ব্রেন্ট।

অমনটা আমাদের এখানে হবে না। কারণ ভারতীয় সমাজে কোনো বৈষম্য নেই। আমরা পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র, আমাদের দেশ একেবারে ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’। তাই ফ্লয়েডের স্মৃতিতে সেবারের আইপিএলে কিছু করার কথা ভাবেনি কর্তৃপক্ষ। এক হাঁটু মুড়ে বসে মুষ্টিবদ্ধ হাত উপরে তোলার যে রীতি তখন প্রায় গোটা ক্রিকেট বিশ্বে চালু হয়েছিল, তা একক উদ্যোগে পালন করেছিলেন হার্দিক পান্ডিয়া। তাও ১৯ সেপ্টেম্বর চালু হওয়া আইপিএলে ২৬ অক্টোবরের ম্যাচে। এই হার্দিককে আবার ভারতীয় ক্রিকেটভক্তরা সোশাল মিডিয়ায় প্রায়ই ‘ছাপড়ি’ বলে গালি দেন। সদ্য কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জেতার পরেও দিয়েছেন। হার্দিকের অপরাধ? তিনি বান্ধবীকে খোলা মাঠেই চুমু খাচ্ছিলেন। ভেবে দেখুন, অন্যের বান্ধবীও নয়। নিজের বান্ধবীকেই চুমু খাচ্ছিলেন। অত্যন্ত অশ্লীল আচরণ সন্দেহ নেই। বান্ধবী বা বউকে প্রকাশ্যে চুলের মুঠি ধরে পেটানো যেতে পারে, চুমু খাওয়া কি কোনো ভদ্রলোকের কাজ? ওসব যারা ‘ছাপড়ি’, তারাই করে। কথাটার মানে জানেন তো? ছাপরবন্দ বলে এক ‘ডি-নোটিফায়েড’ জনগোষ্ঠীর মানুষ। ওঁদের সংস্কৃতি আর অসভ্যতা সমার্থক। বুঝলেন কিনা?

এতদ্বারা প্রমাণিত হইল যে, শিবরামকৃষ্ণণ বাজে কথা বলেছেন। আমরা ভারতীয়রা কোনোরকম বৈষম্যে বিশ্বাস করি না।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সবার উপরে জয় শাহ সত্য

আমরা তো ছোটবেলায় শুনতাম যা রাজার নীতি সেটাই নাকি রাজনীতি। সুতরাং রাজা যা করেন সেটাকেই নৈতিক বলে ধরতে হবে। দয়া করে আবার জিজ্ঞেস করে বসবেন না ‘কে রাজা?’

পশ্চিমবঙ্গে অনেকেই সেই শনিবার থেকে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর উপর চটে রয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য— বিজেপির নির্বাচনী প্রচার করতে এসে কেন সেই প্রচারেরই পাশের মঞ্চ থেকে সরকারি কাজ করা হবে? এটা অনৈতিক। এত রাগ করার কোনো মানেই হয় না। আরে বাপু, রাজনীতি কথাটার মধ্যে আগে তো ‘রাজ’, পরে ‘নীতি’। তাছাড়া আমরা তো ছোটবেলায় শুনতাম যা রাজার নীতি সেটাই নাকি রাজনীতি। সুতরাং রাজা যা করেন সেটাকেই নৈতিক বলে ধরতে হবে। দয়া করে আবার জিজ্ঞেস করে বসবেন না ‘কে রাজা?’ যিনি শাসক, তিনিই রাজা। কী বলছেন? ভারত রাজতান্ত্রিক দেশ নয়, গণতান্ত্রিক? হ্যাঁ সে তো বটেই। মোদীজি নিজেই তো বারবার বলেন যে আমরা হলাম পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ, আমাদের গর্ব হওয়া উচিত। ঠিকই বলেন। আমরা তো ভোট দিয়ে রাজা নির্বাচন করি, অতএব আমরা গণতন্ত্র।

এখন কথা হচ্ছে, এত বড় দেশের সবকিছু তো আর একজন রাজার পক্ষে চালানো সম্ভব নয় (এমনিতেই মোদীজি দিনে চার ঘন্টার বেশি ঘুমোন না)। তাই সবকিছুর জন্যে আবার আলাদা করে ছোট ছোট রাজা রাখতে হয়। ক্রিকেটের রাজা হলেন মোদীজির প্রধান মন্ত্রণাদাতা অমিত শাহের সুপুত্র জয় শাহ। ভারতকে বিশ্বগুরু করার যে স্বপ্ন মোদীজি দেখেছিলেন, তা আপাতত হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়েছে বলে আপনারা অনেকে খিল্লি করছেন বটে, কিন্তু সে স্বপ্ন ক্রিকেটবিশ্বে সফল করে ফেলেছেন মোদীজির স্নেহভাজন জয়।

মোদীজির মত পরিশ্রমী মানুষকে ছোট থেকে দেখে বড় হওয়া জয় তাঁকেই যে জীবনের ধ্রুবতারা করেছেন তা একেবারে পদে পদে টের পাওয়া যায়। যেমন ধরুন, মোদীজি যেমন সরকারে আর পার্টিতে তফাত করেননি ব্রিগেডে, জয়ও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলে তফাত করেন না। তিনি এখন আর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কেউ নন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। অথচ ভারত জিতলে তিনি উল্লাস প্রকাশ করেন। ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরে করেছিলেন, কয়েকদিন আগে ভারত কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জেতার পরেও করেছেন। এবারে আরও এক ধাপ এগিয়ে ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব আর কোচ গৌতম গম্ভীরকে সঙ্গে করে ট্রফিসুদ্ধ মন্দিরে নিয়ে গেছেন, পুজো দিয়েছেন। যেন তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের কর্তা নন, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডেরই কর্তা। জয় প্রথম ভারতীয় নন যিনি আইসিসির মাথায় বসেছেন। ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী (তথা প্রভাবশালী) ক্রিকেট বোর্ড হওয়ায়, ভারতীয় বোর্ডের সর্বোচ্চ পদাধিকারীরা অনেকেই পরে আইসিসি প্রধান হয়েছেন। আইসিসির সংবিধান বদল করার আগে সর্বোচ্চ পদ ছিল সভাপতির। বাংলা থেকে জগমোহন ডালমিয়া, মুম্বাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন থেকে শরদ পাওয়ার, বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন থেকে শশাঙ্ক মনোহর সেই দায়িত্ব সামলেছেন। চেন্নাইয়ের এন শ্রীনিবাসন প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন। ওঁদের কাউকেই এই কাণ্ড করতে দেখা যায়নি। যে অস্ট্রেলীয় আর ইংরেজ ক্রিকেট প্রশাসকদের একসময় আইসিসিতে একাধিপত্য ছিল, তাঁদের কাউকেও নিজের দেশের কোনো ট্রফি জয়ে উল্লাস করতে দেখা যায়নি।

যাবেই বা কেন? যাঁর উপরে গোটা পৃথিবীর খেলাটার দায়িত্ব, তিনি কখনো নিজের দেশের সাফল্য নিয়ে মেতে থাকতে পারেন? থাকলে তাঁকে অন্যরা অভিভাবক হিসাবে বিশ্বাস করবে? ব্রিটিশ কিংবদন্তি অ্যাথলিট সেবাস্তিয়ান কো একসময় ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনসের সভাপতি ছিলেন। অলিম্পিকে ব্রিটেনের অ্যাথলিটরা সোনা জিতলে তিনি লাফালাফি করছেন— এমন দৃশ্য কল্পনাও করা যায়নি। অবশ্য ওঁদের জয় কেনই বা অনুসরণ করতে যাবেন মোদীজির মত আদর্শ সামনে থাকতে? মোদীজি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে দিল্লির চেয়ে আমাদের জাতীয় জীবনে যে আমেদাবাদের গুরুত্ব বেড়ে গেছে, সেকথা কে না জানে? অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এলে আমেদাবাদে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হবেই। মার্কিন রাষ্ট্রপতি, জাপানের প্রধানমন্ত্রী, চীনের রাষ্ট্রপতি, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী— তালিকায় কে নেই? পুরনো সর্দার প্যাটেল স্টেডিয়াম ভেঙে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নামাঙ্কিত দেশের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়ামও তৈরি করা হয়েছে আমেদাবাদে, যদিও হালে যশপ্রীত বুমরা-অক্ষর প্যাটেল আসার আগে পর্যন্ত ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে ওই শহরের অবদান শূন্য বললে ভুল বলা হয় না। রঞ্জি সিং থেকে শুরু করে চেতেশ্বর পূজারা, রবীন্দ্র জাদেজা পর্যন্ত যে কজন ভারতীয় ক্রিকেটার গুজরাট রাজ্য থেকে জাতীয় দলে এসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছাপ ফেলেছেন, তাঁরা কেউই আমেদাবাদের ক্রিকেটার নন। ওঁরা খেলতেন সৌরাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের হয়ে। আমেদাবাদ যে ক্রিকেট সংস্থার ঘরের মাঠ, সেই গুজরাট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের দলটা আজ পর্যন্ত রঞ্জি ট্রফি জিতেছে মোটে একবার, তাও মোটে এক দশক আগে, ২০১৬-১৭ মরশুমে। মানে ঐতিহ্য বলতে তেমন কিছুই নেই। সবচেয়ে বড় কথা— আমেদাবাদে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা মুম্বাই, কলকাতা, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, দিল্লির চেয়ে অনেক কম। কলকাতায় এবারের বিশ্বকাপেও ইতালি বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ দেখতে মেলা লোক হয়েছিল, আমেদাবাদে ২০২৩ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ প্রায় ফাঁকা গ্যালারিতে হয়েছে। সেই স্টেডিয়ামের উদ্বোধন আবার ক্রিকেট ম্যাচ দিয়ে হয়নি, হয়েছিল মোদী-ট্রাম্পের যুগ্ম সমাবেশ দিয়ে। সেদিন কিন্তু দর্শকের অভাব হয়নি।
স্পষ্ট বোঝা যায়, জয় মোদীজির যে জীবনাদর্শ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন তা হল— সবার উপরে গুজরাট সত্য তাহার উপরে নাই। এ পথেই তিনি চলতেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সচিব থাকার সময়ে, গোটা ভারত নিয়ে ভাবতেন না।

অতএব আইসিসি কর্তা হয়ে গিয়ে তাঁর ভারত নিয়েই মেতে থাকায় আশ্চর্যের কিছু নেই। বরং এই আচরণ যে রীতিমত প্রশংসনীয়, তা দেশের সংবাদমাধ্যমও মনে করছে। তাই গত শনিবার সিএনবিসি-টিভি১৮ ইন্ডিয়া বিজনেস লিডার অ্যাওয়ার্ডসে তাঁকে ক্রিকেটের প্রতি ব্যতিক্রমী অবদানের জন্য পুরস্কারও দেওয়া হয়েছে। সত্যিই তো! জয়ের আগে কে-ই বা নিজের দায়িত্ব, কর্তব্য, পদমর্যাদার তোয়াক্কা না করে দেশসেবা করতে পেরেছে!

সেবা বলে সেবা? ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড গত রবিবার ভারতের ২০২৬ কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জয়ী পুরুষদের দল এবং ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়ী দল, ২০২৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী ছেলেদের দল, ২০২৫ পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপ জয়ী মহিলাদের দল এবং ২০২৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী মেয়েদের দলকে সংবর্ধনা দিয়েছে। সেখানেও সশরীরে হাজির ছিলেন জয়। বোর্ড সভাপতি মিঠুন মনহাসের চেয়ে তাঁরই ছবি দেখা যাচ্ছে বেশি।

আরও পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে

আবার ভারতের ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠন জয়কে সংবর্ধনা জানিয়েছে। সেখানে তিনি বড় মুখ করে বলেছেন, তিনি নাকি বোর্ডের কর্তা থাকার সময়ে একেবারে ২০২৮ অলিম্পিক পর্যন্ত কী কী করতে হবে তার পরিকল্পনা করে দিয়েছেন। এখন যাঁরা বোর্ড চালাচ্ছেন তাঁদের ২০৩৬ অলিম্পিক পর্যন্ত কীভাবে কী করা হবে তা ছকে ফেলা উচিত। এখানেও জয় অনন্য। অতীতে কোনো ক্রিকেট প্রশাসককে ক্রীড়া সাংবাদিকরা সংবর্ধনা জানিয়েছেন কিনা খুঁজে বের করতে গবেষক লাগবে। প্রশাসকদের সাংবাদিকরা সংবর্ধনা দেবেন কী জন্যে? দিল্লির এডিটর্স গিল্ড কোনোদিন কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে ডেকে সংবর্ধনা দিয়েছে নাকি? দেশ চালানোটাই কি একটা অভিনন্দনযোগ্য কাজ, যার জন্যে প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনা প্রাপ্য? যদি তা না হয়, তাহলে ক্রীড়া সাংবাদিকরাই বা কোন অর্জনের জন্যে জয়কে সংবর্ধনা দিলেন? ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাফল্যের জন্যে নাকি? তাহলে তো ক্রিকেটারদের সংবর্ধনা দেওয়া উচিত ছিল। বড় জোর বোর্ড সভাপতি বা সচিবদের। আইসিসি চেয়ারম্যানকে যদি ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা ভারতীয় ক্রিকেটের সাফল্যের জন্যে সংবর্ধনা দেন, তাহলে তো…
যাকগে, অমৃতকালের ভারতে সবই সম্ভব। “পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ” গেয়ে খেলতে নামা হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পারসিকদের ক্রিকেট দল বিশ্বকাপ জেতার পর সেই ট্রফি নিয়ে যদি হিন্দু অধিনায়ক, কোচ আর জয় শাহ দেশের মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে বেড়ালে দোষ না হয়, তাহলে সাংবাদিকরা প্রশাসকদের প্রশ্ন করার কর্তব্য ভুলে তাঁদের সংবর্ধনা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও দোষ হয় না। শেষে “জয় জয় জয় জয় হে” গেয়ে নিলেই সাত খুন মাপ।

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

না হয় আজ চ্যাম্পিয়ন হলাম, কিন্তু ভারতীয় দলটা আসলে কার?

নয়ের দশকে রঙিন জামার ক্রিকেট চালু হওয়ার পর থেকে নানা ধরনের নীল জার্সি পরে আসছে ভারত, তার মধ্যেও গেরুয়া রং ঢুকে পড়েছে।

যদি বলি আজ গ্রহ, উপগ্রহগুলো চিন্তায় আছে— তাহলে হাসাহাসি করবেন না। ব্যাপার খুব গুরুতর। টানা দ্বিতীয়বার যদি ভারতীয় দল কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ জিতে যায়, তাহলে কোনও কথা নেই। কিন্তু যদি হেরে যায়, তখন বৃহস্পতি কোন অবস্থানে থাকার জন্যে চরম মুহূর্তে ঈশান কিষণের হাত থেকে অমুক ক্যাচটা পড়ে গেল, অথবা শনির কোন চক্রান্তে যশপ্রীত বুমরার ইয়র্কারটা লেংথ মিস করে ফুলটস হয়ে গেল আর ড্যারিল মিচেল বোল্ড হওয়ার বদলে ছক্কা মেরে দিলেন— তা নিয়ে শোরগোল পড়ে যেতে পারে। তাতে কোন জ্যোতিষীর কপাল পুড়বে আমরা জানি না। যাঁর পুড়বে তিনি নিজের পিঠ বাঁচাতে বলতেই পারেন “আমার গণনায় ভুল ছিল না। হতভাগা শনি নিজের গতি কমিয়ে ফেলেছে চক্রান্ত করে। ভাগ্যিস বৃহস্পতিটাকে বেঁধে রেখেছিলাম, তাই শেষ ওভার পর্যন্ত গেছে। নইলে দু ওভার আগেই খেল খতম হয়ে যেত।”

আষাঢ়ে গপ্পো লিখছি ভেবে অন্য লেখায় চলে যাচ্ছেন তো? আচ্ছা যাবেন নাহয়। যাওয়ার আগে শুনে যান, বাংলার সাংবাদিক বা ইউটিউবাররা আপনাকে খবরটা না দিলেও, দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের সাংবাদিক দেবেন্দ্র পাণ্ডে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের আগেরদিন লিখেছিলেন যে, ভারতীয় দলের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অনুশীলন করার কথা ছিল সন্ধে ছটা থেকে। কিন্তু যেহেতু সেদিন চন্দ্রগ্রহণ চলার কথা বিকেল তিনটে কুড়ি থেকে ছটা বেজে সাতচল্লিশ মিনিট পর্যন্ত, সেহেতু টিম ম্যানেজমেন্ট ঠিক করে, এই অশুভ সময়ে শুভ কাজ করতে না যাওয়াই ভালো। তাই অনুশীলন শুরু হয় চন্দ্রগ্রহণের পরে।

শাস্ত্রে বলেছে— মহান ব্যক্তিরা যে পথে চলেন সেটাই সঠিক পথ। আর কে না জানে, ভারতীয় ক্রিকেটের ভাগ্যনিয়ন্তারা সকলেই মহান! গৌতম গম্ভীর থেকে শুরু করে বোর্ড সভাপতি মিঠুন মানহাস, সকলেই সনাতনী। ২০১৫-১৬ মরশুমে গম্ভীর যখন দিল্লির রঞ্জি দলের অধিনায়ক ছিলেন, তখনও নাকি এসব হতো। তবে তফাতটা হল, তখন গম্ভীর আর কোচ বিজয় দাহিয়া বুক ফুলিয়ে বলতেন যে তাঁরাই এটা করাচ্ছেন। এখন কে যে চন্দ্রগ্রহণের সময়ে অনুশীলন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা কিন্তু প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে না। দেবেন্দ্র পাণ্ডের ওই প্রতিবেদনেও বলা নেই। প্রতিবেদনে কেবল বলা আছে ‘টিম ম্যানেজমেন্ট’। সাধারণত এই শব্দগুলো দিয়ে বোঝানো হয় অধিনায়ক, কোচ আর নির্বাচকদের। আজকাল ‘সাপোর্ট স্টাফ’-ও গুরুত্বপূর্ণ, ফলে ব্যাটিং কোচ সীতাংশু কোটকও সিদ্ধান্তটা নিয়ে থাকতে পারেন। বোলিং কোচ মর্নি মর্কেলের ধর্মে চন্দ্রগ্রহণ অশুভ বলা আছে বলে তো জানা নেই। সিদ্ধান্তটা সূর্যকুমার যাদব, গম্ভীর, কোটক, নির্বাচন সমিতির প্রধান অজিত আগরকর— সকলে মিলেও নিয়ে থাকতে পারেন। দলে যতই সঞ্জু স্যামসনের মত খ্রিস্টান, অর্শদীপ সিংহের মতো শিখ আর মহম্মদ সিরাজের মত মুসলমান ক্রিকেটার থাকুন, দলটা তো সনাতনীদেরই। ফলে তাঁদের ধর্মে যে সময়টাকে অশুভ বলা হয়েছে, সেইসময় অনুশীলন করা যে কোনওভাবেই চলতে পারে না তাতে সন্দেহ কী?

এ মা! রেগে গেলেন নাকি? আরে আমি কি বলেছি যে ব্যাপারটা অন্যায় হয়েছে? আমি শুধু বলছি, অক্ষরে অক্ষরে শাস্তর মেনে পাঁজি-টাজি দেখে যখন মাঠে নামা হচ্ছে, তখন দল হেরে গেলে তার দোষ কখনওই খেলোয়াড়দের বা কোচদের হতে পারে না। সব গ্রহদোষ। এমনিতেও সর্বশক্তিমান জয় শাহ বিসিসিআই ছেড়ে আইসিসির চেয়ারম্যান হয়ে যাওয়ার পরে বিসিসিআইয়ের কোনও সিদ্ধান্ত যে কে নেন তা কেউ বলে না। সিদ্ধান্তগুলো সর্বসমক্ষে জানান বোর্ড সচিব দেবজিৎ শইকিয়া, কিন্তু নেন কে? সেকথা কিন্তু দেবজিৎও বলেন না।

যেমন ধরুন, বাংলাদেশে দীপু দাসকে হত্যা করা হয়েছে বলে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে খেলতে দেওয়া যাবে না— এই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে? ভারত সরকার? না তো! বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংহ মোটেই এরকম কিছু বলেননি। তাঁদের মন্ত্রকের কোনও উচ্চপদস্থ অফিসারও বলেননি। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আমাদের সরকারের সম্পর্কেরও কোনও অবনতি হয়নি ওদেশের প্রাক-নির্বাচনী খুনোখুনির কারণে। বেগম খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পরে জয়শংকর, রাজনাথ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। খালেদা-পুত্র তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে তাঁর সঙ্গে কুশল বিনিময়ও হয়েছে। তাহলে মুস্তাফিজুরের অপরাধটা কী? কেউ জানে না। আপাতত বাংলাদেশে হিন্দুবিদ্বেষী জামাত-এ-ইসলামি তো হেরে ভূত, তাহলে আইপিএলের সময়ে মুস্তাফিজুরকে ডেকে নেওয়া হবে কি? কেউ জানে না। কারণ তাড়ানোর সিদ্ধান্তটা কে নিয়েছিল তা-ই কেউ জানে না। কেবল দেবজিৎ একদিন ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে— ওকে বাড়ি পাঠাতে হবে।

তেমনই পহলগামে সন্ত্রাসবাদীরা হানা দিয়ে অনেককে খুন করেছে বলে ভারতীয় ক্রিকেটাররা পাকিস্তানিদের সঙ্গে খেলবেন কিন্তু করমর্দন করবেন না, অর্থাৎ ‘যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভিজাব না’— এই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল, তাও কেউ জানে না। বলা হয়, বিসিসিআই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিসিসিআই কি গা ছমছমে হলিউডি কল্পবিজ্ঞান ফিল্মে দেখা সর্বশক্তিমান কোনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যে মানুষকে দিয়ে যা ইচ্ছে করিয়ে নেয়, মানুষ টেরই পায় না? বিসিসিআইয়ের তো একজন সভাপতি আছেন। বোর্ডের সংবিধান অনুযায়ী তিনিই সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক। অথচ তিনি তো কই কিছু বলেননি! আচ্ছা কে এই ভদ্রলোক? চেনেন তাঁকে? না চিনলে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। দিল্লির বাইরে তাঁকে বিশেষ কেউ চেনে না। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মন্দ ব্যাট করতেন না, দিল্লির হয়ে খেলতেন। বিসিসিআইয়ের সভাপতির আসনে বসেছেন জগমোহন ডালমিয়া, এন শ্রীনিবাসনের মত নামকরা শিল্পপতিরা; কখনও এনকেপি সালভে, মাধবরাও সিন্ধিয়া, শরদ পাওয়ারের মত বড় মাপের রাজনৈতিক নেতারা, কিম্বা রাজ সিংহ দুঙ্গারপুর, সৌরভ গাঙ্গুলির মতো প্রাক্তন ক্রিকেটার অথবা শশাঙ্ক মনোহরের মত ক্রিকেটপ্রেমী ক্ষমতাশালী লোকেরা। এই আসনে মিঠুনকে বসানো মানে হল “চন্দ্র সূর্য অস্ত গেল/জোনাক ধরে বাতি/ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ গেল/শল্য হল রথী।” এই লজ্জাতেই হয়তো মিঠুন মুখ খোলেন না বা সংবাদমাধ্যম তাঁর কাছে কিছু জানতেও চায় না, যা বলার দেবজিতই বলেন। তাহলে দেবজিৎ কি শ্রীরামকৃষ্ণ, আর মিঠুন গিরিশ ঘোষ? দেবজিতকে বকলমা দিয়েছেন? কেন দিলেন? কার নির্দেশে দিলেন? উত্তর নেই।

অবশ্য মিঠুনের পূর্বসুরি রজার বিনি, যাঁর ক্রিকেটিয় কীর্তি ভোলার নয় কারণ তিনি ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য, তিনিও কোনও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানা যায় না। যা ঘটত সবই যে তৎকালীন সচিব জয়ের নির্দেশে, তা নিয়ে তখন রাখঢাক ছিল না। ব্যাপারটা রেখে ঢেকে করা হতো সৌরভ বিসিসিআই সভাপতি থাকাকালীন।

সাংবাদিক শারদা উগ্রা ২০২৩ সালেদ্য ক্যারাভ্যান পত্রিকায় এক দীর্ঘ প্রতিবদনে লেখেন যে, সৌরভের আমলের শেষদিকে জয়ের নির্দেশে বিসিসিআইয়ের অন্যরা সৌরভের ফোনই ধরতেন না। সৌরভ যে বোর্ড সভাপতি হতে পেরেছিলেন জয়ের বাবা, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের আনুকূল্যে— সেকথা এখন অনেকেরই জানা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তৈরি নতুন সংবিধান ফের বদলাতে আদালতে বারবার আবেদন করে সৌরভ অনেকদিন পদে টিকে ছিলেন জয়ের সঙ্গে গলাগলি করে। তার মূল্য তাঁকে চোকাতে হয়েছে। যা-ই হোক, কথা হল, এখন তো আর জয় বিসিসিআই কর্তা নন। তাহলে বিসিসিআই চালাচ্ছে কে? এই প্রশ্ন মনে জাগতে পারে। তাই মনে রাখবেন— শারদার ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘Shah’s Playground: BJP’s Control of Cricket in India’।

অর্থাৎ বিসিসিআই হল জয়ের খেলার মাঠ তথা বিজেপির শাখা অফিস। এই কথাটি ক্রিকেটমহলে জানে সবাই, কিন্তু লেখার মত মেরুদণ্ড গোটা ভারতে হাতে গোনা যে কজনের আছে (বাংলায় কারও নেই), তাঁদের মধ্যে এক নম্বরে আছেন শারদা। ২০২৩ সালের অগাস্ট মাসে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন ইংরিজিতে লিখিত এবং বেশ দামি একটা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বলেই বেশিরভাগ ক্রিকেটপ্রেমীর নজরে পড়েনি। পড়লেও যে খুব বিশ্বাস করতেন তা অবশ্য নয়। কারণ ক্রিকেট ভারতে ধর্মের স্তরে উন্নীত হয়েছে অনেককাল হলো। এই ধর্মের ভক্তরা আবার হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন বা খ্রিস্টানদের চেয়েও এককাঠি সরেস। সারা পৃথিবীতে সব ধর্মের গোঁড়া লোকেরা চিরকাল নিজের ধর্মের না হোক, অন্য ধর্মের দোষ দেখতে পায়। তা নিয়ে খুনোখুনি করে। সহিষ্ণু ধর্মাবলম্বীরা এবং নাস্তিকরা তাদের নিন্দা করেন। গত বিশ-তিরিশ বছরে যেহেতু বিজেপি এদেশে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছে, সেহেতু রাজনৈতিকভাবে যাঁরা বিজেপির বিরোধী তাঁরাও চারদিকে এত ধর্মের বাড়বাড়ন্তের নিন্দা করেন। সবেতে ধর্মকে টেনে আনা, নিজের ধর্মবিশ্বাসের উগ্র প্রকাশের মাধ্যমে অন্য ধর্মের মানুষের পিছনে লাগার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানুষ এদেশে এখনও পাওয়া যায়। কিছুদিন আগেই যেমন হিমাচল প্রদেশের এক যুবককে পেয়েছি, যিনি উন্মত্ত হিন্দু গুন্ডাদের হাত থেকে এক মুসলমান বৃদ্ধকে বাঁচাতে নিজের নাম বলেছেন মহম্মদ দীপক। কিন্তু ভারতে ক্রিকেট এমন এক ধর্ম, যার কোনো দোষ উপরে উল্লিখিত ধর্মগুলোর কেউই দেখতে পান না। ফলে দেশের ক্রিকেট চালাচ্ছে বিজেপি— একথা নাস্তিক, ঘোর বামপন্থী ক্রিকেটপ্রেমীদের বললেও তাঁরা পাত্তা দেন না। নার্সারি স্কুলের বাচ্চাদের মতই তাঁদের চোখে ভারতীয় ক্রিকেট দল আজও ফুলের মত নিষ্পাপ এবং ক্রিকেটাররা স্রেফ ননীচোর বালগোপাল।

বিজেপি আমলে যেমন, তেমনই চন্দ্রগ্রহণের সময়ে অনুশীলন না করার মত ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে ক্রিকেট দল। বিসিসিআইকে তুষ্ট করতে ব্যস্ত সম্প্রচারকারী সংস্থা একেবারে বিজেপির ঢঙেই উগ্র জাতীয়তাবাদী, খেলোয়াড়ি মনোভাব বর্জিত কুরুচিকর প্রোমো প্রচার করে যাচ্ছে বছরের পর বছর। এশিয়া কাপ জিতে ক্রিকেট অধিনায়ক বলে দিয়েছেন, মনে হচ্ছিল নরেন্দ্র মোদী নিজেই স্ট্রাইক নিয়ে রান করে দিলেন। ভাবা যায়!

নয়ের দশকে রঙিন জামার ক্রিকেট চালু হওয়ার পর থেকে নানা ধরনের নীল জার্সি পরে আসছে ভারত, তার মধ্যেও গেরুয়া রং ঢুকে পড়েছে। এদিকে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী মহম্মদ শামি এখন আগরকরের কথা মতো ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে ঝুড়ি ঝুড়ি উইকেট নেওয়ার পরেও দলে সুযোগ পাচ্ছেন না (কুড়ি বিশের দলে সুযোগ দেওয়া উচিত বলছি না)। সরফরাজ খান শয়ে শয়ে রান করেও নড়বড়ে ভারতীয় টেস্ট ব্যাটিংয়ের অংশ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। হর্ষিত রানা আহত না হলে মহম্মদ সিরাজকেও চলতি বিশ্বকাপের ১৬ জনের মধ্যে রাখা যাচ্ছিল না। অথচ তিনি ভারতীয় পেসারদের মধ্যে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে ফিট, লম্বা লম্বা স্পেলে বল করেছেন, ম্যাচ জেতানো বোলিংও করেছেন। এসবের কোনওটাই ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে ভারতীয় ক্রিকেটের বিজেপি-চালিত হওয়ার প্রমাণ নয়। কারণ ওঁদের মধ্যে যাঁরা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিবাদী ইত্যাদি বলেন, তাঁদের চোখেও ক্রিকেটাররা ‘নন-বায়োলজিকাল’।

যাঁরা বিজেপির দেশ শাসনের ব্যর্থতা দেখতে পান না, তাঁদের বিসিসিআইয়ের অপদার্থতা দেখতে না পাওয়ার মধ্যে তবু ধারাবাহিকতা আছে। কিন্তু যাঁরা প্রথমটা নিয়ে রীতিমতো সোচ্চার, তাঁরা ২০২৩ বিশ্বকাপের মতও এবারও টিকিট বিক্রির অব্যবস্থা নিয়ে টুঁ শব্দ করলেন না। স্রেফ গা জোয়ারি করে, বিসিসিআইয়ের জেদ বজায় রাখতে, জয়ের নেতৃত্বাধীন আইসিসির বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়ে দেওয়াও চার হাত-পা তুলে সমর্থন করলেন। এ হল বিশ্বের অষ্টমাশ্চর্য!

আরো পড়ুন ভারতের দাপুটে বিশ্বকাপ: কিছু কাঁটা রহিয়া গেল

ভারত, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার বোর্ড ক্রিকেট বাণিজ্যের মুনাফার সিংহভাগ নিজেদের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিয়ে একদা প্রতিষ্ঠিত দেশগুলোতেও যে খেলাটার কফিনে পেরেক ঠুকে দিচ্ছে— সেকথা স্বীকার করার মানসিকতাও ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা হারিয়েছেন। তাই সেমিফাইনালে হারার পর ইংল্যান্ড দল দেশে ফিরছে চার্টার্ড বিমানে আর আগেই হেরে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভারতেই বসে থাকতে হচ্ছে— এ নিয়ে খেলোয়াড়রা অসন্তোষ প্রকাশ করলে সোশাল মিডিয়ায় কুযুক্তি এবং গালাগালির শিকার হচ্ছেন। কী আশ্চর্য দেখুন! যে সুনীল গাভাসকর আজকাল কথায় কথায় বিসিসিআইয়ের ধ্বজা ধরে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার অতীতের অপরাধের প্রতিশোধ নেওয়ার তত্ত্ব আওড়ান, তিনি এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি। যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটপ্রেমীরা একসময় গাভসকরের নামে গান বেঁধেছেন, নিজেদের দেশে রাস্তার নাম রেখেছেন, সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটারদের প্রতি বৈষম্য দেখেও তিনি কিন্তু চুপ। যে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরাতে মুখ্য ভূমিকা ছিল বিসিসিআইয়ের, তাদের প্রতি বৈষম্য নিয়ে বিসিসিআই (যদি সরল শিশুর মত ধরে নিই, আইসিসিকে বিসিসিআই নিয়ন্ত্রণ করে না) চুপ। মুখ খুলেছেন কে? ইংল্যান্ডেরই প্রাক্তন অধিনায়ক মাইকেল ভন। তিনি সোশাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ব্যবহার সব দলের প্রতি সমান হওয়া উচিত। কার আইসিসিতে কত প্রভাব তার ভিত্তিতে কাজ হওয়া উচিত নয়।

পণ্ডিতরা বলেন, হিন্দুশাস্ত্রে লেখা আছে “অতিথি দেবো ভব”। মানে অতিথি হল ঈশ্বর। সংবিধানকে মারো গুলি, আমাদের ক্রিকেটে সবই হিন্দু মতে চলছে। শুধু অতিথিদের বেলায় ব্যতিক্রম। অন্য দেশের সমর্থকরা যাতে বেশি সংখ্যায় বিশ্বকাপ দেখতে আসতে না পারে, তার ব্যবস্থা পাকা করা হয় ভিসা নিয়ে নানা গ্যাঁড়াকল করে। এমনকি অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের পাক বংশোদ্ভূত ক্রিকেটারদের ভিসা নিয়েও প্রতিবার ঝামেলা পাকানো হয়।

অ্যাঁ, কী বলছেন? বিজেপি ক্রিকেট চালাচ্ছে তো কী হল, আসল কথা হল মাঠে জেতা? আজ্ঞে তা তো বটেই। তবে কিনা জগতের নিয়ম হল, কোনো দেশ চিরকাল জেতে না। কে ভেবেছিল ক্লাইভ লয়েড, ভিভিয়ান রিচার্ডসদের ওয়েস্ট ইন্ডিজের আজকের অবস্থা হবে? কে-ই বা ভেবেছিল, অস্ট্রেলিয়া চলতি বিশ্বকাপের শেষ চারেও উঠতে পারবে না? কেবল খেলার মাঠে নয়, জগতের কোনও ময়দানেই কেউ চিরকাল জেতে না। হারার সময় যখন আসে, তখন মানসম্মান তাদেরই বজায় থাকে, যারা নিজেদের সুসময়ে পরাজিতকে সম্মান দিয়েছিল। বেপরোয়া মস্তানদের শেষ পরিণতি নিয়ে বিস্তর বই-টই, সিনেমা-টিনেমা হয়েছে। চ্যাটজিপিটিকে তালিকা বানিয়ে দিতে বলুন।

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত