ভারতে মেয়েদের ক্রিকেটের পথ এখনো বন্ধুর

জেমিমাকে মাঠের মধ্যে এনে ধর্ষণ করা উচিত – এমন কথাও পোস্ট করা হচ্ছিল সোশাল মিডিয়ায়। নারীবাদীরা কেউ তখন টুঁ শব্দ করেছিলেন বলে জানি না। এখন করছেন, কারণ জেমিমাকে চেনা গেছে। বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে, মহিলাদের ক্রিকেটের খবর নারীবাদীরাও বিশেষ রাখেন না।

লক্ষ করে দেখলাম, বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো মতপার্থক্য নেই যে ৩০ অক্টোবর ২০২৫ মেয়েদের ক্রিকেটের ইতিহাসে একটা বিশেষ দিন ছিল। মেয়েদের ক্রিকেটে এত রান তাড়া করে কোনো দল কখনো জেতেনি। শুধু তাই নয়, ছেলেদের বিশ্বকাপেও নক আউট ম্যাচে এত রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড নেই। জেমিমা রডরিগসের অপরাজিত ১২৭ রান যে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে কোনো ভারতীয়ের সেরা ইনিংস তা নিয়েও মনে হয় না বিশেষ তর্কের অবকাশ আছে। ২০১১ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে শচীন তেন্ডুলকর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একা কুম্ভ হয়ে ৮৫ রান করেছিলেন, যা পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল। শচীনও একাধিকবার আউট হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন জেমিমার মতই। কিন্তু সেদিন ভারত প্রথমে ব্যাট করেছিল, ঘাড়ে পাহাড়প্রমাণ রানের বোঝা ছিল না। সেই পাকিস্তান কোনো ভয় ধরানো দলও ছিল না। বৃহস্পতিবার রাতে যে অস্ট্রেলিয়াকে হরমনপ্রীত কৌররা হারালেন, তারা কিন্তু ছেলেদের ক্রিকেটে ১৯৯৯-২০১১ পর্বের অস্ট্রেলিয়ার মত দুর্ধর্ষ। এরা বিশ্বকাপে শেষবার একটা ম্যাচ হেরেছিল সেই ২০১৭ সালে। এই অবিস্মরণীয় রাতের পর দেশজুড়ে সবাই উচ্ছ্বসিত। অনেকে বলছেন, এরপর জেমিমারা বিশ্বকাপ জিতুন আর না-ই জিতুন, ভারতে মেয়েদের ক্রিকেটের দারুণ উন্নতি হতে চলেছে। সুতরাং অপ্রিয় কথাগুলো বলে ফেলার এটাই সঠিক সময়।

ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত মেয়েদের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ শেষ লগ্নে পৌঁছে গেছে। এই বিশ্বকাপ নিয়ে কথাবার্তা সম্ভবত বহুবছর পরেও শেষ হবে না। তার কারণটা স্রেফ ক্রিকেটীয় হলে চমৎকার হত। জেমিমার ঐতিহাসিক ইনিংস, ভারতের ঐতিহাসিক জয় তো রইলই, ফাইনালে যে দল জিতবে তাদেরই এটা প্রথমবার বিশ্বকাপ জয় হবে। কেবল সেগুলোই চর্চার বিষয় হয়ে থাকলে ভালো হত। প্রথম সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়িকা লরা উলভার্ট যে অনবদ্য শতরান (১৪৩ বলে ১৬৯) করেছেন, যদি তা নিয়ে আলোচনা হয় তাহলেও ক্ষতি নেই। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার ফিবি লিচফিল্ডের মারকাটারি শতরান (৯৩ বলে ১১৯), হরমনপ্রীত কৌরের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের খেলা নিয়ে কাটাছেঁড়া হলেও কোনো কথা ছিল না। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন, বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়ার পর থেকে, এদেশে না হলেও বাকি ক্রিকেট দুনিয়ায় এসবের চেয়ে বেশি আলোচনা হবে মাঠের বাইরের একটা ঘটনা নিয়ে। তার কারণ গত ২৬ অক্টোবর (রবিবার) ইন্দোরে যে ঘটনা ঘটেছে, তা ক্রিকেটে কেন, কোনো খেলার আন্তর্জাতিক আঙিনাতেই বিরল। বিশ্বকাপ খেলতে এসে অস্ট্রেলিয়ার দুই মহিলা ক্রিকেটারের সেই অভিজ্ঞতা হয়েছে যা এদেশের মেয়েদের রাস্তাঘাটে প্রায় রোজই হয়। অর্থাৎ তাঁরা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। টিম হোটেল থেকে বেরিয়ে তাঁরা কাছাকাছি এক কাফেতে যাচ্ছিলেন, পথে আকিল খান নামে একজন বাইক নিয়ে তাঁদের পিছু ধাওয়া করে, এমনকি তাঁদের শরীরেও হাত দেয়।

ব্যাপারটা নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দেড় দিনের বেশি হইচই হয়নি, ফলে হয়ত অনেকেরই নজর এড়িয়ে গেছে। কেনই বা হবে? ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত নিত্যযাত্রী মহিলারাই তো এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন প্রায়ই। ছাত্রীজীবন থেকে সাংবাদিক জীবনে পৌঁছতে পৌঁছতেই এটা এমন অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায় যে তাঁরা অফিসে বা বাড়িতে – কোথাও আর এ নিয়ে বাক্য ব্যয় করেন না। করলে বাড়িতে যার যেমন অভিজ্ঞতাই হোক, অফিসের পুরুষ সহকর্মীরা যে এটাকে কোনো ব্যাপার বলেই মনে করবেন না – একথা তাঁরা জেনে যান। অফিসের ভিতরেই তাঁদের যৌন হয়রানির ঘটনা যে ঘটে তা তো ‘মি টু’ আন্দোলনের সময়ে সংবাদমাধ্যমের বাইরের লোকেরাও জেনে গেছেন। যৌন হয়রানি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে তৈরি আভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটিগুলো (ICC) অনেক অফিসেই হয় নিষ্ক্রিয়, নয় যারা হয়রান করে তাদেরই আখড়া। তাছাড়া আর সব পেশার মত সাংবাদিকতাতেও অধিকাংশ জায়গাতেই লাগাম তো পুরুষদের হাতে। কোনটা খবর আর কোনটা নয়, কোনটা কত বড় খবর – এসব সিদ্ধান্ত পুরুষরাই নেন। ফলে যে দিন দুয়েক অস্ট্রেলিয়ার মেয়েদের খবরটা টিভি চ্যানেল এবং খবরের কাগজে জায়গা জুড়ে ছিল, তখনো সেটা এমনকি খেলার বিভাগেরও সবচেয়ে বড় খবর হয়ে দাঁড়ায়নি। মধ্যপ্রদেশের শাসক দল বিজেপির অন্যতম পরিচিত মুখ কৈলাস বিজয়বর্গীয় যদি খাঁটি ভারতীয় কায়দায়, আক্রান্ত ক্রিকেটারদেরই এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত – এই মর্মে বক্তব্য না রাখতেন, তাহলে আরও কমেই নটে গাছ মুড়িয়ে যেত।

সত্যি বলতে, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের সম্ভবত ভারতের মেয়েরা কীভাবে বাঁচে সে ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই। হোটেলে আসা খবরের কাগজও তাঁরা বিশেষ পড়েন না বা ভারতীয় খবরের চ্যানেলগুলো দেখেন না। দেখলে হয়ত কৈলাসকেই শুভাকাঙ্ক্ষী বলে মনে করতেন, কারণ ওই ঘটনার ঠিক দুদিন আগে মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলায় এক মহিলা ডাক্তার হাতের তালুতে সুইসাইড নোট লিখে আত্মহত্যা করেন। কারণ একজন পুলিশকর্মী তাঁকে পাঁচ মাস ধরে বারবার ধর্ষণ করেছেন এবং অন্য এক পুলিশকর্মী তাঁর উপর মানসিক অত্যাচার চালাচ্ছিলেন। রক্ষকই ভক্ষক কথাটার এমন প্রাঞ্জল উদাহরণ চট করে পাওয়া যায় না। কিন্তু আমাদের দেশের মেয়েরা এমন ঘটনাতেও অবাক হবেন না। কারণ তাঁরা হাথরাসের কথা জানেন, মহিলা কুস্তিগিরদের দুর্দশাও দেখেছেন। অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটাররা অত খবর পাবেন কোথায়? ফলে নিশ্চয়ই তাঁদের মনে হয়েছিল – শহরের মাঝখানে রয়েছি, রাস্তায় লোকজনও আছে, অতএব একটু এদিক ওদিক ঘুরে আসাই যায়। ওঁরা কী করে জানবেন যে ভারতের রাস্তায় নির্জনতাই কোনো মেয়ের একমাত্র শত্রু নয়, বরং লোক বেশি থাকলে ভয় বেশি!

এ মাসের গোড়ার দিকে হায়দরাবাদ বেড়াতে গিয়ে একদিন চারমিনার দেখতে গিয়েছিলাম, সঙ্গীদের মধ্যে তিনজন লিঙ্গ পরিচয়ে নারী। একজনের বয়স ১৩, একজন চল্লিশোর্ধ্ব, আরেকজন প্রায় ৭০। সেদিন রবিবার, সন্ধে হয়ে গেছে। সামনে দেখতে পাচ্ছি চারমিনার, কিন্তু যত এগোচ্ছি সেটা যেন পিছিয়ে যাচ্ছে, কিছুতেই পৌঁছতে পারছি না। কারণ রাস্তাটায় তিলধারণের জায়গা নেই। নিজের শরীরটাকে ওই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে এদিক ওদিক করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আক্ষরিক অর্থে রুদ্ধশ্বাস ‘অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্ট’। সেই ভিড় পেরিয়ে যখন গন্তব্যে পৌঁছলাম, তখন সঙ্গী তিন নারী এক যোগে যে মন্তব্য করলেন তাতেই টের পাওয়া যায় ভারতের রাস্তাঘাট মেয়েদের জন্যে কেমন। বললেন ‘জীবনে এই প্রথম ভিড়ের মধ্যে কেউ অসভ্যতা করল না’।

এই অবস্থা অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটারদের জানার কথা নয়। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডও নাকি জানে না। অস্ট্রেলিয়ার দুই মহিলা ক্রিকেটার আক্রান্ত হওয়ার পর বোর্ডের অনারারি সেক্রেটারি দেবজিৎ শইকিয়া যে বিবৃতি দেন, তাতে বলা হয় ‘এটা গভীরভাবে দুঃখজনক এবং বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ভারত চিরকাল তার সমস্ত অতিথির প্রতি উষ্ণতা, আতিথ্য ও যত্নের জন্য পরিচিত।’ বিচ্ছিন্ন ঘটনা! মধ্যপ্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন, যাদের আতিথ্যে অস্ট্রেলিয়া দল ছিল, তাদের অনারারি সেক্রেটারি সুধীর আসনানির বিবৃতির একটা অংশ আরও এককাঠি সরেস – ‘এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় এটা পরীক্ষা করে দেখতেই হবে যে খেলোয়াড়রা হোটেলের বাইরে ঘোরাফেরা করার জন্যে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেছিলেন, নাকি তেমন কোনো অনুরোধ ছাড়াই বেরিয়েছিলেন।’ যদিও অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের চিফ এক্সিকিউটিভ পল মার্শ অচিরেই জানিয়ে দেন, খেলোয়াড়রা নিরাপত্তা প্রোটোকল মেনেই বাইরে বেরিয়েছিলেন।

এইসব কথাও আমাদের অতি পরিচিত। বাইরে বেরোল কেন, না বেরোলেই তো ধর্ষণ হত না – একথা ভারতের কত নেতা যে কতবার বলেছেন তার ঠিক নেই। নেহাত এক্ষেত্রে ব্যাপারটা আন্তর্জাতিক, বিশ্বগুরুর সম্মানের প্রশ্ন জড়িত। তার উপর যে লোকটি এই কাণ্ড করে ধরা পড়েছে সে মুসলমান। নইলে হয়ত বলা হত – মেয়েগুলো উত্তেজক জামাকাপড় পরে বেরিয়েছিল। অথবা এমনও বলা যেতে পারত যে মেয়েগুলোই লোকটাকে উত্তেজিত করে আকর্ষণ করেছিল। মানে আগামীকাল অমনজোত কৌর বা রিচা ঘোষ এমনভাবে আক্রান্ত হলে যে কর্তারা সেরকম বলবেন না তার গ্যারান্টি কিন্তু বিশ্বকাপ জিতলেও পাওয়া যাবে না। সাক্ষী মালিক, বিনেশ ফোগতদের বেলায় আমরা দেখেছি যে দেশের জন্যে সোনার মেডেল জেতাও ভারতের মেয়েদের নিরাপত্তার বা যৌন অত্যাচারের শিকার হলে তার প্রতিকারের গ্যারান্টি নয়।

আসলে মেয়েরা বাইরে বেরোবে, নিজেদের মত করে ঘুরে বেড়াবে, ক্রিকেট খেলবে – এসব ভারতের বড় অংশের মানুষের আজও পছন্দ নয় (মানুষই লিখলাম, কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে অনেক মেয়েও ঘোর পিতৃতান্ত্রিক)। তেমন লোকেদের হাতেই এখন দেশের ভার এবং সেই সূত্রে ক্রিকেট বোর্ডের ভার। সম্ভব হলে এঁরা নতুন বন্ধু তালিবানদের মত মেয়েদের ক্রিকেট দলটা তুলেই দিতেন। কিন্তু স্বাধীনতার পরের প্রায় আট দশকে দেশটা যেখানে পৌঁছেছে সেটা তো দুম করে অস্বীকার করা যায় না, চোখের চামড়া আছে তো। সুট বুট পরা ইংরিজি জানা মৌলবাদীদের ‘মেয়েদের ক্রিকেট খেলা চলবে না’ বলতেও একটু কেমন কেমন লাগে। নইলে বিজেপির করতলগত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের মেয়েদের ক্রিকেট সম্পর্কে অবজ্ঞা কিছু কম নয়।

প্রমাণ চান? ভারতে কোথায় কোথায় বিশ্বকাপের খেলাগুলো হল দেখুন – গৌহাটি, ইন্দোর, বিশাখাপত্তনম আর মুম্বই। কল্পনা করতে পারেন, ভারতে ছেলেদের বিশ্বকাপ হচ্ছে আর কলকাতার ইডেন উদ্যান, দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা (ইদানীং অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম), চেন্নাইয়ের চিপক বা বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে একটাও খেলা নেই? ২০২৩ সালে যখন এদেশে ছেলেদের বিশ্বকাপ হল, তখন এই প্রত্যেকটা জায়গায় খেলা ছিল। মেয়েদের খেলা দেখতে এইসব বড় শহরে লোক আসবে না, তাই ছোট শহরে খেলা দেওয়া হয়েছে – এই যুক্তির কিন্তু কোনো পরিমাপযোগ্য প্রমাণ নেই। বরং বোর্ডের পক্ষ থেকে বিশ্বকাপসুলভ প্রচার না থাকা সত্ত্বেও যে চার শহরে খেলা হয়েছে, সেখানে ভারতের ম্যাচগুলোতে নিয়মিত ২৫,০০০-৩০,০০০ দর্শক হয়েছে। এর বেশি দর্শক আজকাল ছেলেদের ৫০ ওভারের ম্যাচেও প্রায়শই হয় না। এমনকি আমেদাবাদে ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ম্যাচ হচ্ছে, বিরাট কোহলি বহুদিন পরে শতরান করছেন, অথচ গ্যালারি খাঁ খাঁ – এই দৃশ্যও সাম্প্রতিক অতীতে দেখা গেছে। উপরন্তু ভারত ফাইনালে ওঠায় এখন ফাইনালের টিকিটের দাম বেড়ে গেছে বহুগুণ, কারণ চাহিদা বিপুল বেড়েছে।

মুম্বইতেও ঐতিহ্যশালী ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম বা ব্র্যাবোর্ন স্টেডিয়ামে খেলা দেওয়া হয়নি। ডি ওয়াই পাতিল স্টেডিয়াম এমন জায়গায়, যার সম্পর্কে ২০০৮ সালে মুম্বইয়ের সাংবাদিকরা মজা করে বলতেন ‘ওটা মুম্বইয়ের চেয়ে পুনের বেশি কাছাকাছি।’ শ্রীলঙ্কায় যে খেলাগুলো ছিল তার সবকটাই কিন্তু রাজধানী কলম্বোর বিখ্যাত রণসিঙ্ঘে প্রেমদাসা স্টেডিয়ামে হয়েছে। ডাম্বুলা বা ক্যান্ডিতে নয়।

তবে মেয়েদের ক্রিকেটের প্রতি বোর্ডের অবহেলা এটুকুই নয়। বিজেপির মত বিসিসিআইয়েরও গোদি মিডিয়া আছে। তার সাংবাদিকরা সোশাল মিডিয়া বিদীর্ণ করে লিখে থাকেন, মেয়েদের ক্রিকেটের জন্যে বোর্ড কতকিছু করছে। ২০২২ সালে জয় শাহ বোর্ডের সরাসরি দায়িত্বে থাকার সময়ে ঘটা করে ঘোষণা করা হয়েছিল – এখন থেকে বোর্ডের সঙ্গে কেন্দ্রীয় চুক্তিতে আবদ্ধ ছেলে আর মেয়ে ক্রিকেটাররা সমান ম্যাচ ফি (টেস্ট পিছু ১৫ লক্ষ টাকা, একদিনের ম্যাচ পিছু ৬ লক্ষ টাকা, কুড়ি বিশের ম্যাচ পিছু ৩ লক্ষ টাকা) পাবেন। গোদি মিডিয়া ঢাকঢোল পিটিয়ে একে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলেছিল। কিন্তু এর চেয়ে ন্যক্কারজনক অর্ধসত্য কমই হয়। কারণ কোহলি, রোহিত শর্মা, শুভমান গিলরা এক বছরে যত ম্যাচ খেলেন হরমনপ্রীত, জেমিমারা তার অর্ধেকেরও কম খেলেন। ২০২২ সালের উদাহরণই নেওয়া যাক। ভারতের ছেলেদের দল খেলেছিল ১১ খানা টেস্ট ম্যাচ, ২৯ খানা একদিনের ম্যাচ আর ২২ খানা কুড়ি বিশের ম্যাচ। ভারতের মেয়েরা খেলেছিলেন মাত্র দুটো টেস্ট, ২১ খানা একদিনের ম্যাচ আর ১৭ খানা কুড়ি বিশের ম্যাচ। ২০২১ সালে করোনা অতিমারীর জন্যে স্থগিত মেয়েদের একদিনের ম্যাচের বিশ্বকাপ ২০২২ সালে হয়েছিল। নইলে একদিনের ম্যাচের সংখ্যাটা আরও কম হত। মেয়েদের ক্রিকেট এভাবে চলে বলেই ২০২৩ সালে টেস্ট অভিষেক হওয়া জেমিমা এ পর্যন্ত খেলেছেন মাত্র তিনটে টেস্ট, অথচ একই বছরে টেস্ট খেলা শুরু করে যশস্বী জয়সোয়াল খেলে ফেলেছেন ২৬ খানা ম্যাচ। সমান কাজ না দিলে সমান পারিশ্রমিক দেওয়ার ঘোষণা যে বিশুদ্ধ গঞ্জিকা, তা বলাই বাহুল্য।

পৃথিবীর যে কোনো খেলায় সাফল্য অনেককিছু বদলে দেয়। এই বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা বা খেতাব জিতে নেওয়া মেয়েদের ক্রিকেট সম্পর্কে বোর্ডের ভাবনাচিন্তা বদলাবে কিনা সেটা সময় বলবে। লোকের আগ্রহ নেই কথাটা কিন্তু মিথ্যে। যে হাজার হাজার দর্শক মাঠে এসেছেন তাঁরা সকলে যে মহিলা নন তা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না। উপরন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের তথ্য বলছে, এই বিশ্বকাপের প্রথম ১১ ম্যাচেই লিনিয়ার ও ডিজিটাল রিচের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে গেছে। বাহাত্তর মিলিয়ন দর্শকের কাছে পৌঁছেছে এই ম্যাচগুলো। গত বিশ্বকাপের চেয়ে এটা ১৬৬% বেশি। বিশেষত ৫ অক্টোবরের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মেয়েদের ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দর্শকের দেখা ম্যাচ হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন ঝুলন সেরা বাঙালি ক্রিকেটার? মোটেই না

শেষে যে কথাটা বলব, সেটা সম্ভবত অনেক নারীবাদীরও ভালো লাগবে না। যে জেমিমার হাউ হাউ করে কান্না নিয়ে সকলে মিলে কাব্যি করা চলছে এখন, গতবছর অক্টোবরে কুৎসিতভাবে তাঁরই পিছনে লেগেছিল এদেশের সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে অনেকেই। মুম্বইয়ের খার জিমখানার প্রথম মহিলা সদস্য জেমিমাকে সেই ক্লাব ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল, তাঁর বাবার বিরুদ্ধে ক্লাব চত্বরে ধর্মান্তরের আসর বসানোর অভিযোগ তুলে। ধর্মপ্রাণ ইভান রডরিগসকে বিবৃতি দিয়ে জানাতে হয়েছিল – তিনি প্রার্থনা সভার আয়োজন করেছিলেন, তাও ক্লাব কর্তৃপক্ষের আপত্তিতে বন্ধ করে দেন। সেইসময় জেমিমাকে মাঠের মধ্যে এনে ধর্ষণ করা উচিত – এমন কথাও পোস্ট করা হচ্ছিল সোশাল মিডিয়ায়। নারীবাদীরা কেউ তখন টুঁ শব্দ করেছিলেন বলে জানি না। এখন করছেন, কারণ জেমিমাকে চেনা গেছে। বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে, মহিলাদের ক্রিকেটের খবর নারীবাদীরাও বিশেষ রাখেন না। সেটা যে খুব দোষের তা নয়। খেলার জগতে জয় না এলে মানুষের আগ্রহ তৈরি হয় না। ঠিক যে কারণে ভারতের ছেলেদের জাতীয় ফুটবল দলের থেকে ক্রিকেট দলের খবর বেশি রাখি আমরা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। যে কারণে সায়না নেহওয়াল, পি ভি সিন্ধুর সাফল্যের পর আমাদের সকলের ব্যাডমিন্টনে আগ্রহ বেড়েছে। নীরজ চোপড়ার কারণেই তো আমরা জ্যাভেলিনের খবর রাখতে শুরু করেছি।

বলার কথা এটুকুই যে খেলার মাঠে কেঁদে ফেলা অভিনব কোনো ব্যাপার নয়, পুরুষরাও কাঁদেন। ভারতীয় পুরুষরাও। স্মৃতিশক্তি নিতান্ত দুর্বল না হলে সকলেরই মনে থাকার কথা। ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের ফুটেজ দেখুন, শচীনের অবসর নেওয়ার দিনের ফুটেজ দেখুন। দিয়েগো মারাদোনার সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে পড়ে তাঁর কান্নার ছবি। সামনের বছর ফুটবল বিশ্বকাপে আবার তেমন দৃশ্য দেখতে পাবেন। কিন্তু জেমিমার কান্না মাঠে থামেনি। তিনি ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে গিয়েও ফোঁপাচ্ছিলেন। বলেছেন তিনি প্রবল উদ্বেগের শিকার (‘anxiety’) হয়েছেন গোটা বিশ্বকাপ জুড়ে। কেন এই উদ্বেগ, তাঁর কান্না কেবলই আনন্দাশ্রু কিনা, তা তলিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। মাত্র কয়েক ঘন্টার প্রশংসার পরেই সোশাল মিডিয়ায় জেমিমার কৈশোরের ভিডিও খুঁড়ে আনা শুরু হয়ে গেছে, যেখানে তিনি খ্রিস্টানদের সভায় কিছু ধর্মীয় কথাবার্তা বলছেন। সেটা নাকি ভীষণ অপরাধ। দাঁত নখ বেরিয়ে এসেছে হিন্দুত্ববাদীদের, কারণ জেমিমা ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলতে পারার জন্যে বাইবেলকে, যিশুকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা। ফাইনালে জেমিমা শূন্য রানে আউট হতে পারেন, লোপ্পা ক্যাচ ফেলে দিতে পারেন। তাঁর জন্যে আমাদের গদগদ আবেগ যেন সেদিনও অক্ষত থাকে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

রাষ্ট্রীয় ক্রিকেট-সেবক সংঘ

দেশের আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মত জাতীয় ক্রিকেট দলগুলোও এখন বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা, যার সদর দফতর আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেট স্টেডিয়াম।

সূর্যকুমার যাদবের প্রতিযোগী বেড়ে গেল সম্ভবত। ভবিষ্যতে বিজেপির টিকিটে সাংসদ বা বিধায়ক হওয়ার দৌড়ে ঢুকে পড়লেন হরমনপ্রীত কৌরও। ভারত আর শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে মেয়েদের ৫০ ওভারের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ হচ্ছে এবারে। যদি প্রবল পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়া আর শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বাধা টপকে হরমনপ্রীতরা বিশ্বকাপটা জিতে ফেলতে পারেন, তাহলে বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাঁদের দলকে নিয়ে নির্ঘাত দেশজুড়ে বিপুল প্রচার করা হবে। পোস্টারে অপারেশন সিঁদুরের সময়ে যাঁদের সামনে আনা হয়েছিল, সেই কর্নেল সোফিয়া কুরেশি আর উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিংয়ের পাশেও বসিয়ে দেওয়া হতে পারে অধিনায়িকাকে। পাকিস্তানকে হারানো আর পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে করমর্দন না করা – দুটো কাজই করে ফেলেছেন হরমনপ্রীত, স্মৃতি মান্ধনা, দীপ্তি শর্মা, জেমিমা রডরিগসরা। এবার যেনতেনপ্রকারেণ বিহার বিধানসভা করায়ত্ত করার লড়াইয়ে নরেন্দ্র মোদীর দলকে সঙ্গ দিলেই নানাবিধ উপঢৌকন বাঁধা। পহলগামে যে পর্যটকরা খুন হয়েছিলেন তাঁদের হত্যাকারীদের শাস্তি প্রদান (যা ২০০৮ সালের মুম্বাই সন্ত্রাসবাদী হানার বেলায় আজমল কাসভ ও তার সঙ্গীদের ক্ষেত্রে হয়েছিল) দূর অস্ত, অপারেশন সিঁদুরে দেশ ঠিক কতটা লাভবান হয়েছে সেটাই এখনো ঠিক করে বলে উঠতে পারল না মোদী সরকার। চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ সেইসময় বলে ফেলেছিলেন আমাদের ক্ষতি হয়েছে, আবার এখন সেনাবাহিনির প্রধান বলছেন ওসব নাকি ছেলে-ভোলানো গল্প। মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারবার বলেন অপারেশন সিঁদুর থেমেছিল তাঁর কথায়, ভারত সরকার প্রতিবাদ করে না। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তো স্পিকটি নট, অন্য মন্ত্রীরা এবং তাঁর দলের মেজ সেজ রাঙা নেতারা বাহারি শব্দে ঢেকেঢুকে বলেন – যখন যুদ্ধ থামে তখন নাকি ভারতই জিতছিল। তাহলে যুদ্ধ থামল কেন, কে থামাল – এসবের আজও উত্তর নেই। ফলে মোদীজির লৌহপুরুষ ভাবমূর্তি ধাক্কা খাচ্ছে স্পষ্টতই। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত রাহুল গান্ধী ভোট চুরির অভিযোগ তুলে, রীতিমত কাগজপত্তর দেখিয়ে পরিস্থিতি ঘোরালো করে তুলেছেন। কিন্তু ভোটে যে জিততেই হবে শতবর্ষে পা দেওয়া রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের রোজগেরে সন্তান বিজেপিকে। অতএব ক্রিকেটের ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে ফেলো যাবতীয় সরকারি অকর্মণ্যতা।

আজকের ভারতের জনতার আফিম হল ক্রিকেট, তাই ওই খেলার দলকেই হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা দরকার। সুতরাং পুরুষদের এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে টিভি থেকে আয় হওয়া কোটি কোটি টাকা নিশ্চিত করাও চাই; আবার ম্যাচের শেষে করমর্দন না করে, অধিনায়ককে দিয়ে গরম গরম কথা বলিয়ে ভোটের প্রচার করাও চাই। তাতেও চিত্রনাট্য যথেষ্ট নাটকীয় হল না মনে করে ট্রফি হাতে তুলে দেবেন কে, তা নিয়েও গা জোয়ারি করা হল। কেবল বিহার নির্বাচনে জেতার জন্যে এতসব কাণ্ড করে এখন ফাটা বাঁশের মধ্যে পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) কর্মকর্তা তথা পাক মন্ত্রী বলছেন, তোমাদের ট্রফি দেওয়ার জন্যে তো মঞ্চ সাজিয়ে বসাই হয়েছিল। নাওনি কেন? অফিসে রাখা আছে, এসে নিয়ে যাও।

এদিকে এখন সে কাজ করলে ধরা পড়ে যায় যে অকারণে ধুলো ওড়ানো হয়েছিল। সত্যিই তো! এসিসি সভাপতি হিসাবে বিজয়ী দলের হাতে ট্রফিটা যে মহসীন নকভিই তুলে দেবেন তা তো প্রতিযোগিতার আগে থেকেই ঠিক ছিল। ভারতীয় দল জানত না? ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত রাম শ্যাম যদু মধু সকলেই, এমনকি বোর্ডের গোদি মিডিয়ার সাংবাদিকরাও, সগর্বে বলে থাকেন যে কেবল এশিয়া নয়, গোটা বিশ্বের ক্রিকেটকে নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই)। তাদের এটুকু ক্ষমতা নেই যে কোনো পাকিস্তানির এসিসি সভাপতি হওয়া আটকায়? আগে থাকতে সে কাজটা করলেই তো আর অপছন্দের লোকের হাত থেকে ট্রফি নেওয়ার ব্যাপার থাকত না। নাকি তখন বোঝা যায়নি যে অপারেশন সিঁদুর সম্বন্ধে যাবতীয় প্রচার মুখ থুবড়ে পড়বে এবং ক্রিকেট দলকে কাজে লাগাতে হবে ভোটারদের পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা চাগিয়ে তুলে ভোটে জিততে? ব্যাপারটা কি এরকম, যে বিশ্ব ক্রিকেটের ভাগ্যনিয়ন্তা জয় শাহের বাবা অমিত শাহ আর নরেনজেঠু ভেবেছিলেন লোকে পুলওয়ামার মত পহলগামও ভুলে যাবে শিগগির, তারপর আবিষ্কার করলেন – নিজেদের একনিষ্ঠ ভক্তরাও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলা বয়কট করা হচ্ছে না বলে খচে বোম? এমতাবস্থায় নিজেদের খাসতালুক হিন্দি বলয়ের অন্যতম বৃহৎ রাজ্য বিহারে ভোট। বল মা তারা দাঁড়াই কোথা!

পাকিস্তানের দিকে কথায় কথায় আঙুল তুলে এতদিন পরম সন্তোষে দেশের মানুষকে নিজেদের কুকীর্তি ভুলিয়ে রেখেছেন। সেটাই যে কাল হয়ে দাঁড়াবে তা মোদী-শাহ কী করেই বা জানবেন? ফ্যাসিবাদীরা কবে আর নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়? অবস্থা সামলাতে ১৪ সেপ্টেম্বর সূর্যকুমারের দলকে দিয়ে ম্যাচের পর করমর্দন না করার নাটক করানো হল পৃথিবীর সমস্ত খেলার সমস্ত আদবকায়দা শিকেয় তুলে দিয়ে। ক্রিকেট দলের কাছ থেকে যদি এটুকু সেবা না পাওয়া যায়, তাহলে আর ক্ষমতায় আসার পর থেকে ক্রমশ ক্রিকেট বোর্ডের দখল নেওয়া, প্রাক্তন ও বর্তমান ক্রিকেটারদের রামমন্দিরের উদ্বোধনে নেমন্তন্ন করা, কৃষক আন্দোলনের বিরুদ্ধে বা মোদীজির জন্মদিন উপলক্ষে তাঁদের দিয়ে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করানো, নিজেদের দলের প্রাক্তন সাংসদ গৌতম গম্ভীরকে দলের কোচ বানানো – এসব করা কেন? এত কাজ থোড়াই ক্রিকেটের স্বার্থে করা হয়েছে। তবে ব্যাপারটা সেখানেও থামেনি। সাংবাদিক সম্মেলনে এসে ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার লম্বা চওড়া বক্তৃতা দিলেন। পহলগামে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছেন, অপারেশন সিঁদুরে যুক্ত সেনাবাহিনির জওয়ানদের উদ্দেশে জয় উৎসর্গ করছেন, নিজের পারিশ্রমিক পর্যন্ত কৃতজ্ঞতা হিসাবে তাঁদের দিয়ে দেবেন ইত্যাদি।

চট করে শুনতে চমৎকার লাগে। খেলার ময়দানে কতখানি রাজনীতি ঢুকতে পারে বা ঢোকা উচিত তা নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে যদি ধরেও নিই সূর্য যা বলেছেন বেশ করেছেন (আইসিসির ম্যাচ রেফারি রিচি রিচার্ডসন অবশ্য তা ভাবেননি, বরং আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ৩০% ম্যাচ ফি জরিমানা করেছেন), তাহলেও কথাগুলো নিয়ে তলিয়ে ভাবতে গেলে ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া কিছু মনে হবে না। পহলগামে মৃত মানুষজনের পরিবারের পাশে থাকতে গেলে তো সরকারকে প্রশ্ন করতে হবে – পহলগামের আততায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? সূর্যকুমারের ঘাড়ে কটা মাথা যে সে প্রশ্ন করবেন? গত ২৯ জুলাই সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন বটে, চারজন সন্ত্রাসবাদীর তিনজন সেনাবাহিনির সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে। কিন্তু চতুর্থ জনকে কি মহামতি ভারত সরকার ক্ষমা করে দিয়েছেন? তাকে নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই কেন? যে তিনজন মরেছে তারা আবার পকেটে পাকিস্তানি পরিচয়পত্র এবং পাকিস্তানি চকলেট নিয়ে ঘুরছিল। এমন সুবোধ বালক সন্ত্রাসবাদীদের কেন জীবন্ত অবস্থায় হিড়হিড় করে টানতে টানতে আদালতে, নিদেন জনসমক্ষে, নিয়ে আসা গেল না – সে প্রশ্নও সূর্যকুমার করে উঠতে পারবেন না। সেপ্টেম্বর মাসের ক্রিকেট ম্যাচে মে মাসের অপারেশনে অংশ নেওয়া সেনাবাহিনিকে টেনে আনার যে কী মানে তাও বোঝা শক্ত। পুরোদস্তুর যুদ্ধ হয়নি, সাময়িক সংঘর্ষ কয়েকদিনের মধ্যে থেমেও গিয়েছিল। তার জন্যে এতদিন পরে সেনাবাহিনিকে সম্মান জানানো! ১৯৯৯ সালে যখন বিশ্বকাপে ম্যানচেস্টারে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হয়, তখন কিন্তু কার্গিলে যুদ্ধ চলছিল। ভারতে তখনো বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার, প্রধানমন্ত্রীর নাম অটলবিহারী বাজপেয়ী। সে ম্যাচ নিয়েও দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছিল, খেলার মধ্যেও উত্তেজনার অভাব হয়নি। তবে ম্যাচের পর আলাদা করে নাটক করার দরকার হয়নি। ভারত কিন্তু সে ম্যাচও জিতেছিল। অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিন গুরুত্বপূর্ণ ৫৯ রান করেন, ভেঙ্কটেশ প্রসাদ পাঁচ উইকেট নেন।

আসলে তখন সরকার দেশ চালাত, ক্রিকেট চালাত ক্রিকেট বোর্ড। এখন দুটোই চালায় বিজেপি। ফলে বিজেপির নীতিই ক্রিকেট দলের নীতি। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে যুদ্ধের চেহারা দেওয়ার নীতি তারা এই এশিয়া কাপে প্রথম নিল তা নয়। ২০২৩ সালে ভারতে আয়োজিত পুরুষদের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপেই এই পরিকল্পনা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। যাঁরা চোখ বন্ধ করেছিলেন, তাঁরা দেখতে পাননি। সেই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হল না, দুই ইনিংসের মাঝে মোচ্ছব হল আমেদাবাদে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে। যেন বিশ্বকাপটা গৌণ, আসল হল ভারত-পাক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। বহুদিন ধরে ক্রিকেট মাঠকে বিদ্বেষ ছড়ানোর কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল সেই বিরাট কোহলির আমলে। ২০১৯ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর দল একদিনের ম্যাচ খেলতে নামেন টিম ক্যাপের বদলে সেনাবাহিনির ক্যামোফ্লাজ ক্যাপ পরে। কেন? না পুলওয়ামার শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো দরকার ছিল। সে এমন শ্রদ্ধা, যে ক্যাপ থেকে নাইকির লোগোটা বাদ দেওয়া হয়নি। সন্ত্রাসবাদী হানায় নিহত মানুষের স্মৃতি নিয়ে এমন নির্লজ্জ বেওসার দৃষ্টান্ত মেলা ভার। কিন্তু ততদিনে আমরা এমন অনুভূতিশূন্য নির্বোধের দেশে পরিণত হয়েছি, যে কারোর আচরণটা অন্যায় মনে হয়নি। জাতীয় দলের সামরিকীকরণ তখনই হয়ে গিয়েছিল। ম্যাচটা পাকিস্তানের সঙ্গে ছিল না বলেই করমর্দন না করার নাটকটা সেদিন করা হয়নি। তবে তখনো কিন্তু অনতিদূরে ছিল লোকসভা নির্বাচন। আজ অন্তত কারোর বুঝতে না পারার কথা নয়, যে সেদিন ভারতীয় দল আসলে বিজেপির নির্বাচনী প্রচার সারছিল। এবারেও তাই করছে।

কাজটা শুরু করা হল সূর্যকুমারদের দিয়ে, এখন হরমনপ্রীতদেরও নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্রিকেট খেলায় ভারতের টাকার গরম এতটাই যে এসব করে যাওয়া যাচ্ছে। অন্য কোনো খেলায় কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই ধাষ্টামো চলতে দেওয়া হয় না। ২১ সেপ্টেম্বর, যেদিন সূর্যকুমাররা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার খেললেন এশিয়া কাপে, কাঠমান্ডুতে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলে ভারত বনাম পাকিস্তানের খেলা ছিল। সেই ম্যাচ ভারত ৩-০ জেতে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দন করেই মাঠ ছাড়ে। কারণ ফিফার সঙ্গে আইসিসির তফাত আকাশের সূর্য আর বিজেপি সাংসদ তেজস্বী সূর্যের মত। ফুটবলে খেলার মাঠের নিয়ম না মানলে সরাসরি সাসপেন্ড করে দেওয়া হতে পারে। যথার্থ দেশপ্রেম থাকলে সেই ঝুঁকি নেওয়া উচিত। বিজেপি নেতা কল্যাণ চৌবের নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন যে সে ঝুঁকি নেয়নি, তাতেই প্রমাণ হয় যে দেশপ্রেম-টেম বাজে কথা। আসলে এরা শক্তের ভক্ত, নরমের যম। উপরন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে গোটা নাটকটাই নির্বাচনমুখী। বিহার কেন, ভারতের কোনো রাজ্যের ভোটারেরই অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবল নিয়ে মাথাব্যথা নেই। অতএব ওখানে দেশপ্রেম দেখানোর আয়োজন নেই। নিজেরাই অশান্তি শুরু করে খেলার পরিবেশ নষ্ট করে দেওয়ার পর পাক ক্রিকেটাররা অসভ্যতা করলে হাত-পা ছুড়ে কান্নাকাটি করার ব্যাপার নেই। কার হাত থেকে পুরস্কার নেব সেটা ঠিক করতে চাওয়ার অন্যায় আবদারও নেই। খেতাব জিতলে প্রধানমন্ত্রী সোশাল মিডিয়ায় জ্বালাময়ী পোস্টও করবেন না, অধিনায়কও বলবেন না – সিঁদুর-স্পন্দিত ব্যাটে, মনে হয় আমিই পিএম।

আরও পড়ুন অপমানে হতে হবে মহম্মদ শামির সমান

রাজনৈতিক কারণে বহু খেলাতেই এক দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশ খেলতে চায় না। যেমন এই মুহূর্তে পৃথিবীর বহু দেশ দাবি করছে, আগামী বছরের ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে যেন ইজরায়েলকে বাদ দেওয়া হয় গাজায় গণহত্যা চালানোর অপরাধে। ফিফা সভাপতি অবশ্য বলে দিয়েছেন, তাঁরা এ দাবি মানবেন না। না মানলে এবং ইজরায়েল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলে, কোনো দেশ তাদের বিরুদ্ধে না খেলার সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। তাতে তাদের পয়েন্ট কাটা যাবে। নীতিগত অবস্থান নিতে হলে এই ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ক্রিকেটেই এমন দৃষ্টান্ত আছে। ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড জিম্বাবোয়েতে খেলতে যায়নি রবার্ট মুগাবের বর্ণবিদ্বেষী শাসনের প্রতিবাদে, নিউজিল্যান্ড কেনিয়ায় খেলতে যায়নি নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে আবার অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় খেলতে যায়নি সন্ত্রাসবাদী হানার আশঙ্কায়। সব ক্ষেত্রেই যে দেশ খেলতে যায়নি, তাদের পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী দেশ মনে করলে বা তাদের ক্রিকেটারদের সন্ত্রাসবাদী মনে করলে ভারতের সম্পূর্ণ অধিকার আছে তাদের সঙ্গে না খেলার। কিন্তু ভারত সরকারের সমার্থক আজকের ক্রিকেট বোর্ডের এই ‘গাছেরও খাব, তলারও কুড়োব’ মানসিকতা আর যা-ই হোক জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা হলে যে বিপুল পরিমাণ টাকা আয় হয় বিজ্ঞাপন বাবদ – তার লোভ বিসিসিআই ছাড়তে রাজি নয়। তাই ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলেন কেন’ জিজ্ঞেস করলেই বোর্ড কর্তা তথা বিজেপি নেতারা আমতা আমতা করতে থাকেন। ওদিকে নিজেদের উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখাতে, ভোটারদের ‘বিকাশ’ ভুলিয়ে পাকিস্তান আর মুসলমানে ব্যস্ত রাখতে খেলাটাও আর খেলার নিয়মে হতে দিচ্ছেন না।

দেশের আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মত জাতীয় ক্রিকেট দলগুলোও এখন বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা, যার সদর দফতর আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেট স্টেডিয়াম। নইলে প্রত্যেকবার মাঠে মাছি তাড়ানোর লোক কম পড়লেও বারবার ওখানেই টেস্ট ম্যাচ হয়, আর ২০০১ সালের পর থেকে ইডেন উদ্যানে ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট দেওয়া যায় না কেন?

সুনীল গাভস্কর, শচীন তেন্ডুলকরের মত মহীরুহ আগেই সংঘের কাছে নাকখত দিয়েছেন। সেখানে সূর্যকুমারের আর কী-ই বা ইয়ে বলুন? যে দেশে মনসুর আলি খান পতৌদির মত নেতার ইতিহাস মুছে ফেলা হয় আর বর্তমান ও প্রাক্তন ক্রিকেটাররা ইনিয়ে বিনিয়ে সেই সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ান, সে দেশের ক্রিকেট দলের সূর্যকুমারের মত মোসাহেব নেতাই প্রাপ্য।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ইতিহাস মুছে দেওয়ার প্রকল্পের অঙ্গ পতৌদি ট্রফির নাম বদল

আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, শক, হুন, পাঠান, মোগলকে এক দেহে লীন করার যে ক্ষমতা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসেও খুব বেশি নেতা দেখাতে পারেননি; ঠিক সেটাই ছিল ‘টাইগার’ পতৌদির।

২০২২ সালে করোনা অতিমারীর চোটে স্কুল বন্ধ থাকায় ছাত্রছাত্রীদের উপর পাঠ্যক্রমের ভার কমানোর দোহাই দিয়ে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার অঙ্গ হিসাবে ধাপে ধাপে গত তিন বছরে ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি) তাদের বিভিন্ন ক্লাসের ইতিহাস বই থেকে মোগল যুগ একেবারে বাদ দিয়ে দিয়েছে। এর ফল কী? সারা দেশের সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশনের অধীন স্কুল এবং বহু রাজ্যের বোর্ডের স্কুল এনসিইআরটি-র বই পড়ায়। সেইসব স্কুলের ছেলেমেয়েরা মোগল সম্রাটদের শাসন সম্পর্কে জানবে না, তাঁদের ভাল কাজ মন্দ কাজ জানবে না। ভারতের ধর্মীয় সমন্বয়ের ইতিহাসে মোগলদের অবদান সম্পর্কেও কিছু জানবে না। ঋজু বিদূষক বরুণ গ্রোভার সকৌতুকে বলেছেন, তাজমহল কারা বানিয়েছিল – এ প্রশ্নের উত্তর হল ‘ইউ পি পি ডব্লিউ ডি কে এক ইঞ্জিনিয়ার থে… শ্রীবাস্তব সাহব। উনহো নে বিজলি বিভাগ কা এক দফতর বনওয়ায়া থা, ইস লিয়ে মিনার হ্যাঁয়… চার সাইড পে চার মিনার হ্যাঁয়, উস সে চার ফেজ – এ বি সি ডি – নিকলতে হ্যাঁয়। আগ্রা কে চার হিসসোঁ মে বিজলি জাতি থি ইয়হাঁ সে। ১৫২৬ মে পানিপথ কি পহলি লড়াই মে ইব্রাহিম লোদী কো হরা কর ইন্ডিয়া মে শ্রীবাস্তব ডাইনেস্টি আয়ি থি। করীবন তিনসো সাল উনহো নে রাজ কিয়া, ফির ১৮৫৭ মে কুইন ভিক্টোরিয়া আঈ, শ্রীবাস্তব সাহব কো পকড়ি, মুহ দবাঈ, বোলি বিয়া হো গয়া তুমহারা? শ্রীবাস্তব সাহব কি থোড়ি ফট গঈ… বোলি কাঁপ কাহে রহে হো? শ্রীবাস্তব সাহব বোলে অচ্ছা ঠিক হ্যায়, হম নিকল লেতে হ্যাঁয়। আপ দেখ লো আপ কো জো করনা হ্যায়।’

এই কৌতুকের বাংলা তরজমা করার প্রয়োজন নেই, কারণ আজকের বাঙালি এটুকু হিন্দি জানে। কিন্তু একথা বলা এইজন্যে যে ভারতের ইতিহাস থেকে নিজেদের অপছন্দের পর্বগুলো মুছে দেওয়ার যে হাস্যকর কিন্তু ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদী প্রকল্প ভারতে চালু করেছে বিজেপিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার, তা এবার স্কুলপাঠ্য বই থেকে বেরিয়ে পৌঁছে গেছে ক্রিকেট মাঠেও। আপনি যদি বোকা বা ন্যাকা না হন, তাহলে অস্বীকার করবেন না যে বিশ্ব ক্রিকেটকে এখন নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। জাতীয়তাবাদী হলে তো আপনি এ নিয়ে গর্বিতই হবেন। বিসিসিআই বহুদিন ধরেই গোটা ক্রিকেট দুনিয়ার উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে টাকার জোরে, আর এখন তো বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সম্পাদকই হয়ে বসেছেন অমিত শাহের ছেলে জয় শাহ। ঔপনিবেশিক যুগের ইতিহাস যা-ই থাক, এখন কিন্তু ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের লেজুড় ছাড়া কিছুই নয়। তাদের ঘাড়ে কটা মাথা, যে ভারতীয় বোর্ডের অনুমতি ছাড়া ট্রফির নাম বদল করবে? ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠেয় ভারত-ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজের বিজয়ীকে দেয় ট্রফির নাম ২০০৭ সালে রাখা হয়েছিল পতৌদি ট্রফি। সে নাম বদলে ফেলা হয়েছে বেমালুম। ২০ জুন থেকে যে সিরিজ শুরু হতে যাচ্ছে, তাতে জয়ী দলকে দেওয়া হবে তেন্ডুলকর-অ্যান্ডারসন ট্রফি। এটাও ইতিহাস মুছে দেওয়ার চেষ্টা।

২০০৭ সালে কেন ট্রফির নাম রাখা হয়েছিল পতৌদি ট্রফি? কারণ সেবার ভারতীয় দলের ইংল্যান্ড সফরের ৭৫ বছর পূর্তি হল। তাকে স্মরণীয় করে রাখতেই এমন একটা নাম রাখা হয়, যে নামের সঙ্গে দুই দেশের ক্রিকেটই জড়িয়ে আছে। ইফতিকার আলি খান পতৌদি ভারত, ইংল্যান্ড – দুই দেশের হয়েই টেস্ট খেলেছেন। ভারতের অধিনায়কত্বও করেছেন। ক্রিকেটার হিসাবে সাধারণ ছিলেন, কিন্তু ক্রিকেটের ইতিহাসে তাঁর একটা কাজের অসাধারণত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। ১৯৩২-৩৩ সালের অ্যাশেজ সিরিজে যখন ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন বডিলাইন কৌশল (লেগ সাইডে যত বেশি সম্ভব ফিল্ডার রেখে ক্রমাগত ব্যাটারদের শরীর লক্ষ্য করে শর্টপিচ বল করে যাওয়া) অবলম্বন করেন ডন ব্র্যাডম্যানের রান আটকাতে, তখন ইফতিকার বলেন যে ওটা ক্রিকেট নয় এবং তিনি লেগ সাইডে ফিল্ডিং করবেন না। ফলে অধিনায়ক জার্ডিন তাঁকে দল থেকে বাদ দিয়ে দেন এবং কথিত আছে যে হুমকি দিয়েছিলেন, আর কোনোদিন ইফতিকার ইংল্যান্ড দলে জায়গা পাবেন না। ইফতিকার কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত বদল করেননি। মনে রাখা ভাল, ভারতের স্বাধীনতা তখন দূর অস্ত। ফলে আর কখনো টেস্ট খেলা হবে না – এ সম্ভাবনা জেনেই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কেউ বলতেই পারেন, ক্রিকেট ইফতিকারের পেশা ছিল না। তাঁর মত ধনীর দুলালের টেস্ট না খেললে কী-ই বা এসে যেত? তাই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন। যুক্তিটা ভুল নয়, কিন্তু পরাধীন দেশের একজন ক্রিকেটারের শাসক জাতির অধিনায়কের বিরুদ্ধে ওই অবস্থান যে ইংরেজদেরও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল তার প্রমাণ আছে। ১৯৮৪ সালে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন একখানা টিভি মিনি সিরিজ নির্মাণ করে ওই বডিলাইন সিরিজ নিয়ে। সেখানে জার্ডিন আর ইফতিকারের ওই কথোপকথন দেখানো হয়েছে। নয়ের দশকে দূরদর্শনে আমরা কেউ কেউ সেই সিরিজ খানিকটা দেখেছি। আজকের তরুণরা, যাঁরা মনে করেন যা নাই ইন্টারনেটে তা নাই ভুবনে – তাঁরা এই লিংকে ক্লিক করে দৃশ্যটা দেখে নিতে পারেন।

কিন্তু ইফতিকারের চেয়ে ক্রিকেটার এবং ভারত অধিনায়ক হিসাবে অনেক বড় ছিলেন, ঐতিহাসিকভাবে অনেক মহত্তর ভূমিকা পালন করেছেন তাঁর ছেলে মনসুর আলি খান পতৌদি। তাঁরও ইংল্যান্ড, ভারত – দুই দেশের ক্রিকেটের সঙ্গেই সম্পর্ক। ভারতের হয়ে টেস্ট খেলেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন আর সাসেক্স কাউন্টির হয়ে দীর্ঘদিন খেলেছেন। মনসুর মাত্র ২১ বছর বয়সে ভারত অধিনায়ক হন। তার আগেই গাড়ি দুর্ঘটনায় একটা চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাঁর ব্যাটিংয়ের অনেকখানি ক্ষতি হয়। ছেচল্লিশটা টেস্ট খেলে ছটা শতরান সমেত ৩৪.৯১ গড়ে ২৭৯৩ রান একজন সাধারণ ক্রিকেটারের পরিসংখ্যান। কিন্তু যাঁরা তাঁকে ব্যাট করতে দেখেছেন, তাঁরা কেউ কেউ বলেছেন, লিখেছেন যে দুটো চোখই ঠিক থাকলে তিনি হয়ত বিশ্বের সেরা ব্যাটার হতে পারতেন। সেই আমলে ফিল্ডার হিসাবেও তিনি যে অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন, সেকথা বহু প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে পাওয়া যায়। ওসব না হয় বাদই দেওয়া গেল। এটুকুই যথেষ্ট যে মনসুর সেই অধিনায়ক যিনি ভারতকে প্রথমবার বিদেশে সিরিজ জেতান (নিউজিল্যান্ড, ১৯৬৭-৬৮)। বস্তুত ভারতীয় ক্রিকেটে তিনি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটান। বিদেশের মাঠে, যেখানে স্পিন সহায়ক পিচ হয় না, সেখানেও তিন স্পিনার খেলানোর সিদ্ধান্ত তাঁরই। সেটাই ইতিহাস বদলে দেয়। নিউজিল্যান্ডের ওই ঐতিহাসিক জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন অফস্পিনার এরাপল্লি প্রসন্ন, সঙ্গে ছিলেন বিষাণ সিং বেদি। প্রবাদপ্রতিম বেদি কারোর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করার লোক ছিলেন না, কিন্তু তিনিও আজীবন বলেছেন, মনসুর তাঁদের সময়ের সেরা ক্রিকেটার। অন্যত্র তিনি বলেছেন, ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে মনসুর ভারতীয়ত্ব জাগিয়ে তোলেন।

অর্থাৎ আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, শক, হুন, পাঠান, মোগলকে এক দেহে লীন করার যে ক্ষমতা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসেও খুব বেশি নেতা দেখাতে পারেননি; ঠিক সেটাই ছিল ‘টাইগার’ পতৌদির। দুঃখের বিষয়, ভারতের সমাজের কোনো শাখাতেই সুঅভ্যাসগুলো বেশিদিন টেকে না। ফলে মনসুরের প্রস্থানের পর প্রাদেশিকতা, স্বজনপোষণ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো ফিরে এসেছিল। একুশ শতকের শুরুতে আবার সেসব দূর করে জাতীয় দলকে যথার্থ ভারতীয় দল করে তুলতে দেখা গিয়েছিল অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিকে। মনসুর আর সৌরভের যুগের ক্রিকেটারদের মধ্যে যোগ্যতার বিস্তর পার্থক্য ছিল। স্বভাবতই অধিনায়ক সৌরভের সাফল্য অনেক বেশি। সৌরভের পরবর্তীকালের মহেন্দ্র সিং ধোনি বা বিরাট কোহলিরা আরও বেশি সফল হয়েছেন অধিনায়ক হিসাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শিকড় ছাড়া গাছ হয় না; ইতিহাস ছাড়া মানুষ হয় না। ফলে টাইগার ছাড়া আজকের বিরাটও হয় না। কিন্তু এই সত্য স্বীকার করা আজকের ভারতীয় ক্রিকেটের নিয়ামকদের পক্ষে অসম্ভব। ভারত নামক ‘একটি বিরাট হিয়া’ জাগিয়ে তুলতে মোগল শাসকদের ভূমিকার কথা স্বীকার করা সংঘ পরিবারের পক্ষে অসম্ভব, কারণ তাহলে ‘ভারত আসলে একটি হিন্দুরাষ্ট্র’ – এই তত্ত্ব ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ঠিক তেমনি, ভারতীয় ক্রিকেট আজ পত্রে পুষ্পে পল্লবিত হয়ে যে চেহারা নিয়েছে তার শিকড় যে একজন মুসলমান অধিনায়ক – সেকথাও স্বীকার করা চলে না। হিন্দুরাষ্ট্রের জনতার আফিম যে ক্রিকেট, তা যে আদ্যোপান্ত হিন্দুদের হাতেই তৈরি – এমনটা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে চলবে কেন? ইতিহাসে অন্য কিছু থাকলে তা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে হবে।

টাইগার পতৌদিকে ব্যক্তি হিসাবেও অপছন্দ করার কারণ আছে সংঘ পরিবারের। তিনি বিয়ে করেছিলেন বাঙালি বামুনের মেয়ে শর্মিলা ঠাকুরকে। তাঁদের ছেলে সঈফ দুবার বিয়ে করেছেন, দুবারই বউ অমুসলমান। সংঘ পরিবারের আজকের লব্জে যাকে বলে ‘লভ জিহাদ’। টাইগার-শর্মিলার মেয়ে সোহার বর আবার কেবল হিন্দু নন, একেবারে কাশ্মীরী পণ্ডিত। কুণাল খেমুর জন্মও শ্রীনগরে। ভারতের সর্বত্র কাশ্মীরী পণ্ডিতদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেই মুসলমানরা কত খারাপ সেকথা প্রচার করে থাকে হিন্দুত্ববাদীরা, অথচ এই পরিবারের সকলে মিলে সব ধর্মীয় গোঁড়ামির বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছেন। শর্মিলা, অমৃতা বা করিনাকে হিজাব বা বোরখা পরে ঘুরতে দেখা যায়নি। কুণালকেও সোহার সঙ্গে বিয়ের পর দাড়ি রেখে ফেজ পরে ঘুরতে দেখা যায় না। মুসলমানদের যে যে স্টিরিওটাইপ হিন্দুদের সামনে তুলে ধরে ভয় দেখায় সংঘ পরিবার, তাকে এভাবে প্রতিনিয়ত নস্যাৎ করে চলা পরিবারের নাম কী করে জড়িয়ে থাকতে দেওয়া যায় নরেন্দ্র মোদীর ভারতের এক নম্বর জনপ্রিয় খেলার সঙ্গে? পারে না বলেই বোধহয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড ২০১৩ সালে চালু হওয়া বার্ষিক পতৌদি স্মারক বক্তৃতাও বন্ধ করে দিয়েছে ২০২০ সালের পর থেকে।

লক্ষণীয়, বিশেষ করে ২০১৯ সাল থেকে, এদেশের জনপরিসর থেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতি মুছে দেওয়ার সযত্ন প্রচেষ্টা চলছে। বলিউডে ক্রমাগত মুসলমানবিরোধী, ইতিহাসবিকৃত, যুদ্ধবাজ ছবি বানানো হচ্ছে। উপরন্তু বলিউড শাসন করতেন যে তিন খান – তাঁদের বিরুদ্ধেও নানা শক্তি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শাহরুখ খানের ছেলেকে অতি সামান্য অভিযোগে হাজতবাস করানো হয়েছে, সলমন খানকে খুন করার পরিকল্পনা হয়েছে, আমির খানের ছবি মুক্তি পাওয়ার সময় এলেই দক্ষিণপন্থী আই টি সেল বয়কটের ডাক দিয়েছে। এর বাইরে মনসুর-শর্মিলার ছেলেকেও খুনের চেষ্টা হয়েছে কিছুদিন আগে।

এই দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে তিষ্ঠোতে দেওয়া হবে পতৌদি পিতা-পুত্রকে? কক্ষনো না। বরং থাকুন বাধ্য মারাঠি ব্রাহ্মণ তেন্ডুলকর, যিনি হাসিমুখে অযোধ্যার রামমন্দিরের উদ্বোধনে গিয়েছিলেন। সঙ্গে থাকুন সর্বকালের সেরা ইংরেজ ক্রিকেটারদের একজন – জেমস অ্যান্ডারসন। তাহলে সাপও মরে, লাঠিও ভাঙে না।

আরও পড়ুন অপমানে হতে হবে মহম্মদ শামির সমান

যাঁদের এখনো ধারণা ক্রিকেট খেলা হয় শুধু মাঠের ভিতরে, এসব রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে আনা নেহাত বাচালতা (অল্পবয়সীদের ভাষায় ‘ফেসবুকের কাকুদের হ্যাজ’), তাঁরা বলবেন শচীনের মত মহান ক্রিকেটারের নামে ট্রফির নাম রাখা হলে আপত্তির কী আছে? লোকটা টেস্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান এবং শতরান করেছে। সে কি অযোগ্য? নাকি অ্যান্ডারসন অযোগ্য? তিনি তো জোরে বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টেস্ট উইকেট নিয়েছেন (৭০৪)। আজ্ঞে না, দুজনের কেউই অযোগ্য নন। সমস্যা অন্য জায়গায়। সাধারণ গ্র্যাজুয়েট বাবা-মায়ের ছেলে যদি নোবেল পুরস্কার পেয়ে বলে ‘বাড়িটা ওঁদের নামে থাকবে কেন? আমার যোগ্যতা বেশি, বাড়ি আমার নামে করে নেব’, তাহলে কি আমরা হাততালি দেব? অবশ্য আজকের ভারতে দেব হয়ত। কারণ এই ভারতের ইতিহাস তো ২০১৪ সাল থেকে শুরু। তার আগে ভারতীয়রা নাকি খুবই লজ্জা পেতেন নিজেদের ভারতীয় হিসাবে পরিচয় দিতে। ঠিক তেমনি আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসও শুরু করতে হবে ক্রিকেট নামক ধর্মের ভগবান শচীন থেকে।

তাই হোক, তবে তাই হোক। বরাবর কামনা করেছি, লালকৃষ্ণ আদবানি শতায়ু হোন। যাতে তাঁর রথযাত্রার চাকার নিচে গোটা দেশটার তলিয়ে যাওয়া তাঁকে দেখে যেতে হয়। এখন থেকে কামনা করব, শচীনও শতায়ু হোন। যাতে বছর দশেক পরেই তাঁকে দেখতে হয়, এই ট্রফির নাম বদলে হয়ে গেল কোহলি-রুট ট্রফি। তার বছর দশেক পরে হয়ত জয়সোয়াল-ব্রুক ট্রফি। তারপর আর টেস্ট ক্রিকেট বেঁচে থাকুক না থাকুক, শচীন আর বিরাট যেন সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকেন। পূর্বসুরিদের অস্বীকার করার অসম্মান যেন তাঁদেরও ভোগ করতে হয়। যে দেশে ক্রিকেটপ্রেমীদের জীবনের দাম ফুটো পয়সার সমানও নয় আর ক্রিকেটাররা হয়ে গেছেন ভগবান, সেদেশে কোনো ভগবানই যে চিরায়ু নন – এই উপলব্ধি যেন তাঁদের ইহকালেই হয়।

আর দেশটার কী হবে? সেকথা বোধহয় জর্জ সান্তায়ানার এই উক্তিতে আছে ‘Those who cannot remember the past are condemned to repeat it.’ অর্থাৎ যারা ইতিহাস ভুলে যায়, তারা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করার অভিশাপে অভিশপ্ত।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

হাশিম আমলা, ভিভিএস লক্ষ্মণের সমগোত্রীয় বিরাট কোহলি

গাভস্করের জীবনের শেষ টেস্ট ইনিংসকে বলা হয় ঘূর্ণি উইকেটে উচ্চমানের স্পিনের বিরুদ্ধে ব্যাটিংয়ের টিউটোরিয়াল। ওই মানের কোনো ইনিংস বিরাটের ব্যাট থেকে এসেছে কি? ১৯৯৮ সালে চিপকে সিরিজের প্রথম টেস্টেই শচীনের ওয়ার্নকে দমিয়ে দেওয়া ১৫৫, ওই মাঠেই পরের বছর চতুর্থ ইনিংসে আক্রম-ওয়াকার-সাকলিন সমৃদ্ধ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৩৬ – এসব ছিল অতিমানবিক ইনিংস। কারণ ব্যাটার একক লড়াই লড়ছিলেন। তেমন ইনিংসই বা বিরাট খেললেন কবে?

যদি কোনো অস্ট্রেলিয়কে জিজ্ঞেস করেন ‘ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা ডন ব্র্যাডম্যানকে বাদ দিলে আপনাদের সর্বকালের সেরা টেস্ট ব্যাটার কারা?’ উত্তরে মোটামুটি সকলেই যে নামগুলো বলবেন সেগুলো হল – গ্রেগ চ্যাপেল (গড় ৫৩.৮৬), অ্যালান বর্ডার (৫০.৫৬), স্টিভ ওয় (৫১.০৬), রিকি পন্টিং (৫১.৮৫), স্টিভ স্মিথ (৫৬.৭৪)। একই প্রশ্ন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কাউকে করলে যে নামগুলো আসবে সেগুলোও সবার জানা – গারফিল্ড সোবার্স (৫৭.৭৮), ব্রায়ান লারা (৫২.৮৮), ভিভিয়ান রিচার্ডস (৫০.২৩)। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের তিন ডব্লিউও – এভার্টন উইকস (৫৮.৬১), ক্লাইড ওয়ালকট (৫৬.৬৮), ফ্র্যাংক ওরেল (৪৯.৪৮) – আলোচনায় আসবেন। দু-একজন হয়ত জর্জ হেডলির (৬০.৮৩) নামও করতে পারেন, তবে হেডলি মাত্র ২২ খানা টেস্ট খেলেছেন।

ইংরেজদের এই প্রশ্ন করলে তাঁরা আধুনিক ক্রিকেটারদের মধ্যে জো রুটের নাম অবশ্যই করবেন, কারণ জো প্রায় ১৩,০০০ রান করে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই (৫০.৮৭)। ইনিংস শুরু করার মত শক্ত কাজ করে প্রায় সাড়ে বারো হাজার রান করেছেন এবং অধিনায়কত্ব করেছেন বলে অ্যালাস্টেয়ার কুকের নামও এসে পড়বে (৪৫.৩৫)। কিন্তু ইংরেজরা কুকের চেয়ে বেশি করে বলবেন ওয়াল্টার হ্যামন্ড (৫৮.৪৫), কেন ব্যারিংটনের (৫৮.৬৭) কথা। পাকিস্তানিদের সর্বকালের সেরা টেস্ট ব্যাটারদের নাম জিজ্ঞেস করলে অবশ্যই তাঁরা জাভেদ মিয়াঁদাদ (৫২.৫৭), ইনজামাম-উল হক (৪৯.৬০), ইউনিস খানের (৫২.০৫) নাম করবেন। পুরনো দিনের লোকেরা হয়ত জাহির আব্বাস (৪৪.৭৯), হানিফ মহম্মদের (৪৩.৯৯) কথাও বলতে পারেন। কিন্তু প্রথম তিনজনের কীর্তি যে এই দুজনকে ছাড়িয়ে অনেকদূর চলে গেছে তা নিয়ে বিশেষ বিতর্কের অবকাশ নেই।

এই দেশগুলোর চেয়ে অনেক পরে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে শুরু করা শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটপ্রেমীরা অনায়াসে বলবেন তাঁদের দেশের সর্বকালের সেরা ব্যাটারের নাম কুমার সঙ্গকারা (১২,৪০০ রান, গড় ৫৭.৪০)। তাছাড়াও বলবেন মাহেলা জয়বর্ধনের (১১,৮১৪ রান, গড় ৪৯.৮৪) কথা। অরবিন্দ ডি সিলভার নাম আসবে তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে। তিনিই শ্রীলঙ্কার প্রথম তারকা ব্যাটার। কিন্তু সাফল্যে অনেক পিছিয়ে (৬৩৬১ রান, গড় ৪২.৯৭)। বর্ণবৈষম্যের কারণে নির্বাসনে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট ক্রিকেটে ফেরত এসেছে ১৯৯১ সালে। তাই সেদেশের দুজন অসামান্য প্রতিভাধর ব্যাটার গ্রেম পোলক (৬০.৯৭) আর ব্যারি রিচার্ডস (৭২.৫৭) যথাক্রমে ২২ খানা আর চারখানা টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটপ্রেমীরা সর্বকালের সেরা ব্যাটার বলতে জাক কালিস (৫৫.৩৭) আর এবি ডেভিলিয়ার্সের (৫০.৬৬) নাম করবেন। অত্যন্ত অল্প বয়সে, দলের দুঃসময়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে একশোর বেশি টেস্টে অধিনায়কত্ব করে সফল হয়ে, ইনিংস শুরু করার গুরুদায়িত্ব পালন করেও প্রায় দশ হাজার রান করে ফেলা গ্রেম স্মিথের (৪৮.৭০) নামও বলবেন নির্ঘাত। এঁদের পরে হাশিম আমলার (৪৬.৬৪) নামও বলতে পারেন, কারণ তিনিও প্রায় দশ হাজার রান করেছেন। কিন্তু কখনোই ওই তিনজনের আগে আমলার কথা বলবেন না। ঠিক যেমন কোনো ক্যারিবিয়ান ভুলেও তাঁদের সর্বকালের সেরাদের পাশে বসাবেন না শিবনারায়ণ চান্দেরপলকে, যতই তিনি ৫১.৩৭ গড়ে ১১,৮৬৭ রান করুন। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটপ্রেমীরা জানেন যে ৫০ থেকে ৫৫ গড়ের ব্যাটার আর ৪৭ গড়ের ব্যাটারের জাতই আলাদা। এদের এক বন্ধনীতে রেখে আলোচনা করার কোনো মানে হয় না। আর কুড়ি বিশের ক্রিকেটের পেটে চলে যাওয়া ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটরসিকরা আজও বোঝেন, শুধু ধারাবাহিকতা সর্বকালের সেরাদের ক্লাবের পাস নয়। সর্বোচ্চ মানের বোলিংয়ের ঘাড়ে চেপে বসার ক্ষমতাও থাকতে হয়। সেটা চান্দেরপলের ছিল না।

বিরাট কোহলির অবসরগ্রহণ নিয়ে লেখায় তিন-তিনটে অনুচ্ছেদ জুড়ে এই আলোচনা কেন? কারণ এই মুহূর্তে কোনো ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীকে ভারতের সর্বকালের টেস্ট ব্যাটারদের নাম বলতে বললে সুনীল গাভস্কর (৫১.১৪) আর শচীন তেন্ডুলকরের (৫৩.৭৮) সঙ্গে বিরাট কোহলির (৪৬.৮৫) নামই বলবেন, রাহুল দ্রাবিড়ের (৫২.৩১) নাম বলবেন না। এমনকি সোশাল মিডিয়ায় অসংখ্য মানুষকে দেখা যাচ্ছে বিরাটকেই ভারতের সর্বকালের সেরা বলে দিতে। অবশ্য এ আর নতুন কী? তাঁকে তো কবেই গোটা খেলাটার GOAT (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম) আখ্যা দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। অথচ ভারতীয়দের মধ্যে টেস্টে মোট রান (১৩,২৮৮) এবং গড়ের দিক থেকে রাহুল ঠিক শচীনের (১৫,৯২১) পরেই। এমনকি গড়ের দিক থেকে বীরেন্দ্র সেওয়াগও (৪৯.৩৪) কোহলির চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু ৪৭ গড়ের ব্যাটার আর পঞ্চাশের উপরে গড় যে ব্যাটারদের, তারা যে কোনোভাবেই তুলনীয় নয় – সেকথা বললে এখন কেবল ক্রিকেটভক্তরা নয়, প্রাজ্ঞ ধারাভাষ্যকার, ক্রিকেট সাংবাদিক এবং প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও মানবেন না। কথাটা অন্য দেশের ক্রিকেটারদের সম্পর্কে বললে মানতে পারেন, চাই কি ওকথার সপক্ষে চাট্টি যুক্তিও জুগিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু এদেশের ক্রিকেটারদের নিয়ে বললে, বিশেষত বিরাটকে নিয়ে বললে তো গাভস্কর, তেন্ডুলকরও মানবেন না। গাভস্কর তো ইদানীং এত মহান হয়েছেন (বা এত নিচে নেমেছেন) যে ধারাভাষ্যে ঋষভ পন্থের কঠোর সমালোচনা করে পরে আবার সেই সমালোচনাকে ব্যঙ্গ করে তৈরি বিজ্ঞাপনে ঋষভের সঙ্গে মুখও দেখাচ্ছেন।

অতএব বিশেষজ্ঞ এবং ভক্তদের বিরাটপুজোর প্যান্ডেল থেকে বেরিয়ে এসে উনি টেস্ট ক্রিকেটে সর্বকালের সেরাদের মধ্যে ঠিক কোথায় পড়েন তা নিয়ে একটা নির্মোহ আলোচনা করার চেষ্টা চালাচ্ছি। তার সূচনা পরিসংখ্যান দিয়েই করতে হত। কারণ ফুটবল বা হকির চেয়ে ক্রিকেটে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সাফল্য-ব্যর্থতা অনেক বেশি পরিমাপযোগ্য এবং একজন ব্যাটারের সাফল্য পরিমাপ করার জন্য রান আর গড়কে গুরুত্ব দেওয়া আদ্যিকাল থেকে চলে আসছে। তবে কোনো সন্দেহ নেই, আজকাল ক্রিকেটালোচনায় যে পরিসংখ্যানসর্বস্বতা এসে পড়েছে তা পরিহার্য। ক্রিকেট সম্প্রচার প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহজলভ্যতায় আজকাল এমন অনেক পরিসংখ্যান নিয়ে আলোচনা চলে যা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গোঁসাইবাগানের ভূত গল্পের অঙ্কের মাস্টার করালীবাবুর জন্যে মনোরঞ্জক হতে পারে, কিন্তু খেলাটা সম্পর্কে কোনো সত্য উদ্ঘাটন করে না। তাছাড়া খেলাটা খেলে মানুষ, তার মানবিক সুবিধা-অসুবিধা সুস্থতা-অসুস্থতা সমেত; খেলা হয় বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে। এসবের যে প্রভাব খেলার উপর পড়ে, তা অতিক্রম করে মানবিক প্রয়াসের সাফল্য-ব্যর্থতাই ক্রিকেটকে মনোমুগ্ধকর করে তোলে। তার সবকিছু পরিসংখ্যানে ধরা পড়া অসম্ভব। নেভিল কার্ডাসের কথা অনুযায়ী স্কোরবোর্ড গাধা। তা যদি না-ও হয়, স্কোরবোর্ড যে সর্বজ্ঞ নয় তা মানতেই হবে। সুতরাং পরিসংখ্যান পেরিয়েও বিরাটের অবদান নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।

সংখ্যাতীত

সমস্যা হল, সেটা করতে গেলে বিরাটকে বিরাট তো দেখাবেই না, উলটে আরও সাধারণ দেখাবে। কারণ সর্বকালের সেরা যেসব নামের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা হয় (যাঁদের নিয়ে প্রথম তিনটে অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে), তাঁদের আমলের তুলনায় বিরাটের আমলে টেস্ট ক্রিকেট যে অনেক সহজ হয়ে গেছে তা অস্বীকার করা শক্ত। কথাটা কেবল আমিই বলছি এমন নয়। হর্ষ ভোগলে ২০২২ সালে ‘দ্য ফাইনাল ওয়ার্ড’ নামে এক পডকাস্টে কথাটা সবিস্তারে বলেছিলেন এবং সেজন্যে বিস্তর ট্রোলিংয়ের শিকার হয়েছিলেন। প্রসঙ্গটা ছিল তার আগের ৭-৮ বছরে টেস্ট ক্রিকেটে ভারতের আধিপত্য। তিনি যা বলেছিলেন তার বাংলা করলে এরকম দাঁড়ায়

আমি চাই না কেউ মনে করুক একটা দারুণ রেকর্ডের মধ্যে আমি ছিদ্রান্বেষণ করছি। কিন্তু মন দিয়ে রেকর্ডটা দেখলে আপনি দেখবেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় আমরা জিতিনি, নিউজিল্যান্ডে জিতিনি, ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডে ৪-১ হেরেছিলাম। ক্রিকেটের ইতিহাসে এক নম্বর হওয়ার জন্যে এটাই সবচেয়ে সহজ সময়। ৪-০ ফলে অ্যাশেজ জিতলেও এই অস্ট্রেলিয়া অতীতের অস্ট্রেলিয়া দলগুলোর মত নয়। ইংল্যান্ডের অবস্থা বেশ খারাপ। দক্ষিণ আফ্রিকা দলটা নির্বাসন থেকে ফিরে আসার পরে সম্ভবত সবচেয়ে দুর্বল এখন। আমি জানি এটা বিতর্কিত মন্তব্য হয়ে যাচ্ছে। ওদের বোলিং এখনো ওদের দেশে দারুণ। কিন্তু এই দলটা কালিস, আমলা, ডেভিলিয়ার্স, ফ্যাফ, গ্রেম স্মিথের সেই দল নয়। এই দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভারতের দক্ষিণ আফ্রিকায় হারাতে পারা উচিত ছিল।

এই লেখায় আমরা যখন অধিনায়ক বিরাটকে নিয়ে আলোচনা করব, তখন হর্ষের এই উক্তির কাছে আবার ফিরতে হবে। কিন্তু আপাতত এখানে তিনি যা বলেছেন তাকে বিরাটের ব্যাটিং বিচারে কাজে লাগালে কী পাব? বুঝতে পারব যে বিরাটের খেলোয়াড় জীবনের বেশিরভাগ সময় জুড়ে যেসব বোলিং আক্রমণের মোকাবিলা তাঁকে করতে হয়েছে, সেগুলো ক্রিকেটের ইতিহাসে কোথাও জায়গা করে নেওয়ার মত নয়।

অতীতে টেস্ট ক্রিকেটে প্রায় সব দলেই অন্তত একজন সত্যিকারের ফাস্ট বোলার থাকতেন। ‘সত্যিকারের’ বলতে যে বোলারের গতিই মূল শক্তি, স্পিড গানের যুগে বলতে হবে – ঘন্টায় ১৪৫ কিলোমিটারের বেশি। গাভস্করের আমলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের তেমন ৪-৫ জন ছিলেন – অ্যান্ডি রবার্টস, জোয়েল গার্নার, কলিন ক্রফট, মাইকেল হোল্ডিং, ম্যালকম মার্শাল। দম ফেলার ফুরসত পাওয়া যেত না। অস্ট্রেলিয়ার ছিল ডেনিস লিলি আর জেফ থমসনের জুটি, সঙ্গী হিসাবে লেন প্যাসকোর মত কেউ কেউ জুটে যেতেন। ইংল্যান্ডের ছিলেন বব উইলিস, পাকিস্তানের ইমরান খান। নিউজিল্যান্ডের রিচার্ড হেডলি তো একাই একশো। শচীনের আমলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছিল কার্টলি অ্যামব্রোস আর কোর্টনি ওয়ালশের জোড়া ফলা। সঙ্গে কখনো ইয়ান বিশপ, কখনো প্যাট্রিক প্যাটারসন, কখনো উইনস্টন বেঞ্জামিন বা কেনেথ বেঞ্জামিন, কখনো আবার সেই বার্বাডোজের বিভীষিকা ফ্র্যাংকলিন রোজ। পাকিস্তানের সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে বিরাটের একটাও টেস্ট খেলা হল না, শচীনও অল্পই খেলেছেন। কিন্তু যখন খেলেছেন তখন পাকিস্তানের হয়ে বল করেছেন ওয়াসিম আক্রম-ওয়াকার ইউনিস, শোয়েব আখতার। শচীনের ক্রিকেটজীবনের শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ার জোরে বোলার ছিলেন মার্ভ হিউজ, ক্রেগ ম্যাকডারমট, মার্ক হুইটনিরা। পরে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তাদের বোলিং আক্রমণ। নেতৃত্বে গ্লেন ম্যাকগ্রা, যিনি ঠিক ‘ফাস্ট’ বোলার নন, কিন্তু নিখুঁত লাইন লেংথ এবং সুইং আর সিমের ব্যবহারে ক্রিকেট ইতিহাসে অনন্য। গতি জোগাতে তাঁর পাশে এসে যান ব্রেট লি। তাছাড়াও ছিলেন জেসন গিলেসপি। পল রিফেল, মাইকেল কাসপ্রোউইচ, ড্যামিয়েন ফ্লেমিংরা আসা যাওয়া করেছেন। একমাত্র ইংল্যান্ডেই সে যুগে ডমিনিক কর্ক আর অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ ছাড়া সত্যিকারের জোরে বোলার আসেনি, কিন্তু নিউজিল্যান্ড পেয়েছিল শেন বন্ডকে। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত শচীনের আমলে অ্যালান ডোনাল্ডের নেতৃত্বে এসে পড়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার জোরে বোলাররা – ব্রেট শুলজ, ব্রায়ান ম্যাকমিলান, গতি কম হলেও প্রায় ম্যাকগ্রার মত নিখুঁত ফ্যানি ডেভিলিয়ার্স, লান্স ক্লুজনার, শন পোলক; পরের প্রজন্মে মাখায়া এনতিনি, ডেল স্টেইন, মর্নি মর্কেল।

বিরাট খেললেন কাদের? সারা পৃথিবীতে ক্রিকেট যে হারে বেড়েছে তাতে জোরে বোলারদের পক্ষে গতি ধরে রাখা যে শক্ত তা বলাই বাহুল্য। বিরাটের ক্রিকেটজীবনে গোটা বিশ্বে ১৪৫+ কিলোমিটার/ঘন্টা গতিতে বল করা বোলার হাতে গোনা। একমাত্র ২০১৩-১৪ সাল নাগাদ মিচেল জনসনের সেই গতি ছিল, পরের দিকে ইংল্যান্ডের জোফ্রা আর্চার আর মার্ক উডের। কিন্তু আর্চার ভারতের বিরুদ্ধে মাত্র দুটো টেস্ট খেলেছেন, উড খেলেছেন চারটে। বিরাটের সময়ের বিশ্বসেরা বোলার বলতে দক্ষিণ আফ্রিকার কাগিসো রাবাদা, ইংল্যান্ডের সুইং শিল্পীদ্বয় জেমস অ্যান্ডারসন আর স্টুয়ার্ট ব্রড, অস্ট্রেলিয়ার ত্রয়ী মিচেল স্টার্ক-জশ হেজলউড-প্যাট কামিন্স। রাবাদা, স্টার্ক আর কামিন্স নিজেদের সেরা দিনে নতুন বলে ১৪০-১৪৫ কিলোমিটার/ঘন্টা গতিতে বল করেন। বল পুরনো হয়ে গেলে, পিচ বোলিং সহায়ক না হলে স্টার্ককে ভীষণই নিরামিষ দেখায়। এতটাই, যে ২০১৪ সালে শেন ওয়ার্ন বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করেছিলেন – স্টার্কের শরীরী ভাষা এবং পারফরম্যান্স ‘সফট’। ২০২২ সালে তো বলে দিয়েছিলেন স্টার্ককে দল থেকে বাদ দেওয়া উচিত। কামিন্স তেমন নন, কিন্তু তিনিও কদাচিৎ ব্যাটারকে স্রেফ গতিতে পরাস্ত করেন। হেজলউডের তো গতি অস্ত্রই নয়। তিনি খানিকটা ম্যাকগ্রার মত, মূলত লাইন লেংথ আর বাউন্স ব্যবহার করে সুইং আর সিমের উপর নির্ভর করেন।

ব্রড আর অ্যান্ডারসন যখন তরুণ ছিলেন তখন রাবাদা বা স্টার্কের মত গতিতেই বল করতেন, কিন্তু বিরাটের কেরিয়ার যত এগিয়েছে তত ওঁদের বয়স বেড়েছে এবং গতি কমেছে। ওঁরা মূলত সুইং শিল্পী। তাতেই বিরাটকে বিস্তর নাকানি চোবানি খাইয়েছেন। সেই কারণেই ইংল্যান্ডে ১৭ খানা টেস্ট খেলে বিরাটের গড় মাত্র ৩৩.২১ (১০৪৯ রান, শতরান ২, অর্ধশতরান ৫)। সুইং বোলিং নির্ভর আরেকটা দেশ হল নিউজিল্যান্ড, যাদের দলে টিম সাউদি আর ট্রেন্ট বোল্টের মত বোলার ছিলেন এবং যারা বিরাটের যুগের অন্যতম সেরা টেস্ট দলও বটে। সেই নিউজিল্যান্ডের মাটিতে বিরাট খেলেছেন মাত্র চারটে টেস্ট, গড় ৩৬। নিজের দেশে বা ইংল্যান্ডে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালেও নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিরাটের রেকর্ড বলার মত নয়। সাউদি-বোল্টের দেশের বিরুদ্ধে মোট চোদ্দখানা টেস্ট খেলে এক হাজার রানও করে উঠতে পারেননি, গড় মাত্র ৩৮.৩৬।

তবু তো বেশকিছু বিশ্বমানের সুইং বোলারকে খেলতে হয়েছে, যে ঝামেলায় বিরাটকে একেবারেই পড়তে হয়নি, তা হল বছরের পর বছর উঁচু মানের স্পিনারদের খেলা। শচীন, লারা, পন্টিং, কালিসদের যুগের মত শেন ওয়ার্ন, মুথাইয়া মুরলীধরন, মুস্তাক আহমেদ, সাকলিন মুস্তাকদের মানের স্পিনার আজ একজনও নেই। নাথান লায়ন বড়জোর প্রয়াত ডেরেক আন্ডারউডের মানের। ঘরের মাঠে একটা সিরিজে গ্রেম সোয়ান আর মন্টি পানেসরের বিরুদ্ধে গোটা ভারতীয় ব্যাটিং লাইন-আপ ল্যাজেগোবরে হয়েছিল সেই ২০১২-১৩ মরশুমে, বিরাটও হয়েছিলেন। ওই দুজনের কেরিয়ার লম্বা হলে আলাদা কথা ছিল। কিন্তু সোয়ান দ্রুত অবসর নিয়ে নেন আর পানেসর নাইট ক্লাবে অত্যধিক পান করে ফেলে কেলেঙ্কারি বাধিয়ে ইংল্যান্ড দল থেকে বিতাড়িত হন, ফিরতে পারেননি। বিরাটের ক্রিকেটজীবনে পাকিস্তানের হয়ে অন্তত দুজন বিশ্বমানের স্পিনার টেস্ট ক্রিকেট খেলেছেন – সঈদ আজমল আর ইয়াসির শাহ। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে বিরাটের খেলা হয়নি। কেরিয়ারের শেষদিকে ভারতের মাটিতে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের আনকোরা স্পিনারদের খেলতে গিয়েই বিরাটের কী হাল হয়েছে আমরা দেখেছি। বিরাটভক্তরা অবশ্য এর মধ্যেও তাঁর মহানতা খুঁজে বার করেন। তিনি নাকি অধিনায়ক হিসাবে জিততে চান বলে ভীষণ স্পিন সহায়ক পিচ বানাতে বলতেন, তাই তত রান করতে পারেননি। একই কারণে নাকি তাঁর সমসাময়িক রোহিত শর্মা, অজিঙ্ক রাহানে, চেতেশ্বর পূজারাও দেশের মাঠে স্পিনের বিরুদ্ধে সুবিধা করতে পারেননি। এর চেয়ে হাস্যকর যুক্তি কিছু হতে পারে না। তার কারণ অনেকগুলো।

প্রথমত, ভারতে চিরকালই স্পিন সহায়ক পিচ হয়। এরকম পিচে খেলেই ভারতীয় ব্যাটাররা বড় হন। তাই শচীন, গাভস্কর, রাহুলের মত সর্বকালের সেরাদের কথা ছেড়ে দিন; নভজ্যোৎ সিং সিধুর মত সাধারণ ব্যাটারও দেশের মাঠে স্পিনারদের বিরুদ্ধে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করতেন। ওয়ার্ন এখানে এসে সুবিধা করতে পারেননি, মুরলীরও ভারতের মাটিতে গড় ৪৫.৪৫, যেখানে তাঁর গোটা কেরিয়ারে গড় ২২.৭২। অথচ ওঁদের দলের বিরুদ্ধে ভারতের কুম্বলে, হরভজন সিং প্রমুখ কিন্তু দিব্যি উইকেট নিয়ে গেছেন। সেওয়াগও স্পিনারদের ত্রাস ছিলেন, মহম্মদ আজহারউদ্দিন বা ভিভিএস লক্ষ্মণ ব্যাট করলে তো স্পিন বোলিং একটা করার যোগ্য কাজ বলেই মনে হত না। সুতরাং স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে বিরাট এবং তাঁর প্রজন্মের অন্য ভারতীয় ব্যাটাররা স্পিনটা ভাল খেলতে পারেন না।

দ্বিতীয়ত, স্পিনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতা সত্ত্বেও দেশের মাটিতে বিরাট কিন্তু অনেক রান করেছেন। চোদ্দটা শতরান সহ ৫৫ টেস্টে ৪৩৩৬ রান, গড় ৫৫.৫৮। এই রানগুলো কোন ধরনের পিচে হয়েছিল তাহলে?

তৃতীয়ত, যদি বলা হয় বিরাটের অধিনায়কত্বে এমন ঘূর্ণি পিচ বানানো হত যা ভারতে অভূতপূর্ব এবং তাতে যে কোনো স্পিনার বল করলেই খেলা শক্ত হত, তাহলে মানতে হবে যে ৬৮ টেস্টে অধিনায়কত্ব করে ৪০ খানা জিতে নেওয়ার যে রেকর্ড, তাতে পিচের অবদান বিরাটের অধিনায়কত্বের চেয়ে বেশি। উপরন্তু, রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজার কৃতিত্বও তাহলে যতখানি বলা হয় ততখানি নয়। যে কোনো দুজন স্পিনারই ওই ম্যাচগুলো জিতিয়ে দিতে পারতেন। বিরাটভক্তরা এ যুক্তি মানবেন কি?

বিরাটের অধিনায়কত্ব এবং তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে ব্যাটিং নিয়ে কথাবার্তা শেষ করে নেওয়া যাক। এই যে দেখা গেল সত্যিকারের ফাস্ট বোলার এবং উচ্চমানের স্পিনারদের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বিরাট শেষ করলেন ৪৭ গড়ে, তা থেকে কী কী প্রমাণ হয় ভাবি।

তিনি বিশ্বের সর্বকালের সেরাদের মধ্যে তো পড়েনই না, এমনকি পরিসংখ্যানের দিক থেকে ভারতের সেরা পাঁচজন ব্যাটারের মধ্যে পড়লেও নৈপুণ্যে তিনি গাভস্কর, শচীন, রাহুলের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। বরং লক্ষ্মণের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা যায়। দুজনেই অস্ট্রেলিয়ায় সফল আর লক্ষ্মণও কোনোদিন ইংল্যান্ডের মাটিতে সুবিধা করতে পারেননি। বিরাটের ওখানকার রেকর্ডটা তবু ভদ্রস্থ দেখায় ২০১৮ সালের দ্বিতীয় সফরটার জন্যে। ইংল্যান্ড সফরকে যে কোনো ব্যাটারের জাত চেনানোর পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়। সেখানে বিরাটের চেয়ে এমনকি দিলীপ বেঙ্গসরকর আর সৌরভ গাঙ্গুলিও বেশি সফল

তবে শুধু সেকথা নয়। গাভস্কর গোটা ক্রিকেটজীবনে কত হারা ম্যাচ বাঁচিয়ে দিয়েছেন তার হিসাব করাই শক্ত। তা বাদে ১৯৭৬ সালে পোর্ট অফ স্পেনে চতুর্থ ইনিংসে ৪০৩ রান তাড়া করার সময়ে তাঁর ম্যাচ জেতানো শতরান বিপক্ষ বোলিং আর পরিস্থিতির বিচারে মহাকাব্যিক। তেমনই অবিশ্বাস্য ১৯৭৯ সালে লন্ডনের ওভালে চতুর্থ ইনিংসে ৪৩৮ তাড়া করতে নেমে ২২১ রান, যা ভারতকে এক অভাবনীয় জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল। এমনকি গাভস্করের জীবনের শেষ টেস্ট ইনিংসকে বলা হয় ঘূর্ণি উইকেটে উচ্চমানের স্পিনের বিরুদ্ধে ব্যাটিংয়ের টিউটোরিয়াল। ওই মানের কোনো ইনিংস বিরাটের ব্যাট থেকে এসেছে কি?

১৯৯৮ সালে চিপকে সিরিজের প্রথম টেস্টেই শচীনের ওয়ার্নকে দমিয়ে দেওয়া ১৫৫, ওই মাঠেই পরের বছর চতুর্থ ইনিংসে আক্রম-ওয়াকার-সাকলিন সমৃদ্ধ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৩৬ – এসব ছিল অতিমানবিক ইনিংস। কারণ ব্যাটার একক লড়াই লড়ছিলেন। তেমন ইনিংসই বা বিরাট খেললেন কবে? পাকিস্তান ম্যাচটা তো তাও জেতাতে পারেননি শচীন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে চিপকের ঘূর্ণি উইকেটে সোয়ান-পানেসর জুটির বিরুদ্ধে চতুর্থ ইনিংসে শতরান করে সে কাজও করে দিয়েছিলেন। ২০০৪ সালে সিডনিতে তাঁর অপরাজিত ২৪১ রানও ভোলার নয়। ওই ইনিংস যে ঋষিপ্রতিম সংযমের দৃষ্টান্ত, সেকথা বারবার বলা হয়। যা আমরা খেয়াল করি না, তা হল কতগুলো স্কোরিং শট তূণে থাকলে অফসাইডে ড্রাইভ করা প্রায় বন্ধ করে দিয়েও অতগুলো রান করা যায়। বিরাটের হাতে যদি অতরকম শট থাকত, তাহলে শেষ পাঁচ বছরে সাফল্যের লেখচিত্র এভাবে নামত না।

দুই লিটল মাস্টারের তবু অনেক ভক্ত আছে, বিস্তর লেখালিখি হয় ওঁদের নিয়ে। কিন্তু দ্রাবিড়? জীবনের প্রথম টেস্ট সিরিজ ইংল্যান্ডে, দলে তখন ডামাডোল। লর্ডসে অভিষেকেই ৯৫ চাপা পড়ে গিয়েছিল সৌরভের ঝলমলে শতরানের পাশে। কিন্তু নিজের নবম টেস্টেই সব গাছ ছাড়িয়ে ওঠে তাঁর মাথা। জোহানেসবার্গে ডোনাল্ড, পোলক, ম্যাকমিলান, ক্লুজনারের বোলিংয়ে ১৪৮ আর ৮১ করেন। ২০০২ সালে হেডিংলিতে সবুজ পিচে মেঘলা দিনে ১৪৮ তো প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে জেতার অসামান্য কাহিনি। এমনকি জীবনের শেষ ইংল্যান্ড সফরেও, যখন গোটা দলের ব্যাটিং ব্যর্থ, দ্রাবিড় চারটে টেস্টে তিনটে শতরান করে গেছেন। আর এই রত্নখচিত মুকুটের কোহ-ই-নূর অবশ্যই ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ইডেন টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসের ১৮০। বিরাট কোন বিচারে এঁর চেয়ে বড় ব্যাটার?

বিরাট নিজের প্রজন্মেরও এক নম্বর ব্যাটার নন। স্মিথ আর রুট তো বটেই, কেন উইলিয়ামসনের (১০৫ টেস্টে ৯,২৭৬ রান; গড় ৫৪.৮৮, শতরান ৩৩) সঙ্গেও টেস্টে তাঁর তুলনা চলে না।

নিঃসংশয়ে বিরাট নিজের প্রজন্মের সেরা ভারতীয় টেস্ট ব্যাটার। ব্যাট হাতে তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব অস্ট্রেলিয়ার মাঠে রীতিমত মস্তানি। ২০১৪-১৫ মরশুমে চার টেস্টে চারটে শতরান অবিস্মরণীয়। অ্যাডিলেডে দুই ইনিংসেই শতরানও অসাধারণ কীর্তি। পরবর্তীকালেও অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর সেরা খেলা বেরিয়ে এসেছে। ও দেশে সাতখানা শতরান, নিজের কেরিয়ারের গড়ের চেয়ে বেশি গড়ে রান করা যে কোনো ব্যাটারের পক্ষে গর্বের। তিরিশটা শতরান করেছেন, ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দ্বিশতরানও করেছেন। এ তো চাট্টিখানি কথা নয়।

পরিসংখ্যানের বাইরে চলে গেলে অবশ্য বলতে হয় যে গত শতকের তুলনায় এই শতকে অস্ট্রেলিয়ার পিচগুলোর চরিত্র বদলেছে অনেক। তাতে রান করা সহজ হয়েছে। ১৯৯১-৯২ সফরে ভারত যে পিচগুলোতে খেলেছিল তার প্রচণ্ড গতি এবং বাউন্স আজও টের পাওয়া যায় ইউটিউব খুললে। তার সঙ্গে গত ১০-১৫ বছরের পিচগুলোর তফাত বোঝা কঠিন নয়। এই তফাত হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় ড্রপ-ইন পিচ ব্যবহার শুরু হওয়ার পর থেকে। ভারতের এবারের অস্ট্রেলিয়া সফরে পার্থের অপটাস স্টেডিয়ামের পিচ বরং নয়ের দশকের ওয়াকা (Western Australia Cricket Association) মাঠের পিচের কাছাকাছি আচরণ করেছে। এখানে একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আজ পর্যন্ত মাত্র চারটে ত্রিশতরান হয়েছে। প্রথমটা এসেছিল ১৯৬৬ সালে মেলবোর্নে বব কাউপারের ব্যাট থেকে। বাকি তিনটেই এই শতাব্দীতে। প্রথমে ২০০৩ সালে ম্যাথু হেডেন পার্থে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ৩৮০ করেন, তারপর ২০১২ সালে ভারতের বিরুদ্ধে অ্যাডিলেডে মাইকেল ক্লার্ক করেন অপরাজিত ৩২৯ আর ২০১৯ সালে সিডনিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ডেভিড ওয়ার্নার অপরাজিত ছিলেন ৩৩৫ রানে।

অধিনায়কত্ব ও উত্তরাধিকার

হর্ষ ভোগলের যে মন্তব্যের কথা উল্লেখ করেছিলাম গোড়ার দিকে, তার কাছে ফিরে যাওয়া যাক। মহেন্দ্র সিং ধোনি আর বিরাটের আমলে ভারতীয় দলের কোচ, টিম ডিরেক্টর ইত্যাদি পদে থাকা রবি শাস্ত্রী যা-ই বলে থাকুন, ঘটনা হল বিরাটের আমলে ভারতের টেস্ট দলের বিদেশে সাফল্য মোটেই ঈর্ষণীয় নয়। হর্ষ একেবারে সত্যি কথা বলেছিলেন। বিরাটের আমলে ভারত নিউজিল্যান্ডকে নিউজিল্যান্ডে হারাতে পারেনি, দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে দুর্বল দলটাকে সামনে পেয়েও দুবারের চেষ্টায় একবারও সিরিজ জিততে পারেনি। গর্ব করার মত সাফল্য বলতে পরপর দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা। তার মধ্যে ২০২০-২১ মরশুমে কিন্তু প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে লজ্জাজনকভাবে ৩৬ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছিল বিরাটের ভারত। দ্বিতীয় টেস্ট থেকে তিনি ছিলেন না। মেলবোর্নে লড়াকু শতরান করেন অস্থায়ী অধিনায়ক রাহানে, ভারত জেতে। তারপর সিডনির তৃতীয় টেস্টে হনুমা বিহারী আর অশ্বিন শেষদিনে অত্যাশ্চর্য ব্যাটিং করে ম্যাচ বাঁচিয়ে দেন। ব্রিসবেনে চতুর্থ টেস্ট জিতে ভারত সিরিজ পকেটস্থ করে। এই জয়ের কৃতিত্বও অধিনায়ক বিরাটের হলে আইআইটি, আইআইএম তৈরির কৃতিত্ব ইংরেজদের।

আমাদের আজকাল তথ্যের প্রতি প্রবল অনীহা আর নাটকীয়তার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ। তাই বিরাটের অবসর ঘোষণার পর থেকেই প্রচুর লেখালিখি হচ্ছে ২০২১ সালের লর্ডস টেস্ট নিয়ে। সেখানে চতুর্থ ইনিংসে ৬০ ওভার মত বল করার সুযোগ পেয়ে ভারত ইংল্যান্ডকে ৫১.৫ ওভারেই অল আউট করে ম্যাচ জিতে নেয়। শোনা গিয়েছিল, বিরাট ইংল্যান্ডের ইনিংস শুরুর আগে দলের সবাইকে বলেছেন ‘এই ৬০ ওভার যেন ওদের জন্যে নরক হয়ে দাঁড়ায়’। তারপর ওই জয়। সুতরাং বলা হচ্ছে – ওই আগ্রাসনই ভারতীয় ক্রিকেটকে বিরাটের দান, ওই তাঁর উত্তরাধিকার। যা বলা হচ্ছে না, তা হল, ওই সিরিজটাও কিন্তু ভারত জেতেনি। ঠিক পরের টেস্টেই প্রথম ইনিংসে ভারত ৭৮ রানে অল আউট হয়ে যায়, বিরাট নিজে করেন সাত। আগ্রাসনের ‘আ’ দেখা যায়নি। ম্যাচটা ইনিংসে হারতে হয়।

ভারত ২-১ এগিয়ে থাকা অবস্থায় সিরিজের শেষ টেস্ট খেলাই হয়নি অদ্ভুত কারণে। শাস্ত্রী আর বিরাট কোভিডজনিত বায়ো বাবল ভেঙে এক বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে চলে গিয়েছিলেন। তারপর দেখা যায় শাস্ত্রী, ফিল্ডিং কোচ শ্রীধর, বোলিং কোচ ভরত অরুণ কোভিড পজিটিভ। ফলে ভারত আর শেষ টেস্ট খেলতে চায়নি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের অবশ্য অভিযোগ – তার কয়েকদিন পরেই আইপিএল ফের চালু হওয়ার কথা ছিল। ভারতীয় ক্রিকেটাররা তার জন্যে সুস্থ থাকতেই টেস্টটা খেলতে চাননি। না হয় সেকথা আমরা বিশ্বাস করলাম না। কিন্তু যে বিরাট টেস্ট অন্তপ্রাণ ছিলেন বলে লেখালিখি চলছে, তিনি কোন আক্কেলে বায়ো বাবল ভেঙে অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন ঠিক শেষ টেস্টের আগে? এ প্রশ্ন এতদিন কেউ তোলেননি, আর তুলেই বা কী হবে? যা-ই হোক, ওই পঞ্চম টেস্ট খেলা হয় পরের বছর জুলাইয়ে। ততদিনে বিরাটের টেস্ট অধিনায়কত্ব চলে গেছে। সে ম্যাচে ভারত হারে, সুতরাং সিরিজের ফল হয় ২-২। তার আগের সফরে, অর্থাৎ ২০১৮ সালে, বিরাট প্রায় ছশো রান করলেও সিরিজটা কিন্তু ৪-১ ব্যবধানে হারতে হয়েছিল।

একথা ঠিক যে বিরাটের নেতৃত্বে ভারতকে ভারতে কেউ হারাতে পারেনি। কিন্তু সে এমন কিছু চোখ কপালে তোলার মত ব্যাপার নয়। ভারত সম্পর্কে চিরকালই বলা হত – দেশে বাঘ বিদেশে বেড়াল। গতবছর নিউজিল্যান্ডের কাছে ৩-০ হারার আগে ভারত ঘরের মাঠে শেষ সিরিজ হেরেছিল ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের কাছে। তার আগে ২০০৪-০৫ মরশুমে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট-পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার কাছে। তার আগের সিরিজ হার ছিল ১৯৯৯-২০০০ মরশুমে, হ্যানসি ক্রোনিয়ের দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। অর্থাৎ আড়াই দশকে মোটে চারটে সিরিজ হার। আর গত শতকের ইতিহাস?

অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। সেই অস্ট্রেলিয়া ২০০৪-০৫ মরশুমের ওই জয়ের আগে ভারতে শেষ জিতেছিল ১৯৬৯-৭০ সালে। ইংল্যান্ডের আগের সিরিজ জয় ছিল ১৯৮৪-৮৫ মরশুমে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ দেশে এসে শেষবার সিরিজ জিতেছে ১৯৮৩-৮৪ মরশুমে। শ্রীলঙ্কা আজ পর্যন্ত জেতেনি, নিউজিল্যান্ড তো গতবছরই প্রথম জিতল। তারা শেষবার এ দেশে একটা টেস্ট ম্যাচই জিতেছিল সেই ১৯৮৮ সালে, তাও ১৯৬৯ সালের পর। এমনকি পাকিস্তান, যাদের সঙ্গে আমাদের আবহাওয়া এবং পিচের চরিত্র সবচেয়ে বেশি মেলে, তারাও ১৯৫২-৫৩ থেকে ২০০৭-০৮ পর্যন্ত ভারত সফরে এসে সিরিজ জিততে পেরেছিল মাত্র একবার – ১৯৮৬-৮৭ মরশুমে।

অন্যদিকে ভারতের বিদেশ সফরের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ইংল্যান্ডই একমাত্র দেশ যেখানে ভারত মাঝেমধ্যেই সিরিজ জিতেছে। অধিনায়ক হিসাবে অজিত ওয়াড়েকর জিতেছেন (১৯৭১), কপিল জিতেছেন (১৯৮৬), দ্রাবিড় জিতেছেন (২০০৭)। বিরাট পারেননি। এমনকি নিউজিল্যান্ডেও ভারত মনসুর আলি খান পতৌদি (১৯৬৭-৬৮) আর ধোনির আমলে (২০০৮-০৯) সিরিজ জিতেছিল। বিরাটের আমলে পারেনি।

ভারতকে জোরে বোলারদের দলে পরিণত করা বিরাটের উত্তরাধিকার বলে গণ্য করা হচ্ছে। যেন আটের দশকে ইমরান পাকিস্তানের জন্যে যা করেছিলেন, বিরাট তাই করেছেন। অর্থাৎ ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে খুঁজে খুঁজে আবিষ্কার করেছেন বুমরা, মহম্মদ শামি, মহম্মদ সিরাজ, উমেশ যাদব, ভুবনেশ্বর কুমার প্রমুখকে। অথচ ঘটনা তা নয়, হওয়া সম্ভবও ছিল না। কারণ ভারতীয় দল সারাবছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে বছর পঁচিশেক হয়ে গেল। তার উপর আছে আইপিএল। ফলে বিরাটের মত শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার সুযোগই হয় না। কী করে জানবেন কোথায় কোন ভাল জোরে বোলার আছে? ওই কৃতিত্ব যদি কাউকে দিতে হয় তো দিতে হবে এই পর্বে যাঁরা নির্বাচক ছিলেন তাঁদের। বস্তুত ভারতে জোরে বোলারের সংখ্যা এবং গুণমান বাড়ার একটা ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসের সুবিধাই অধিনায়ক বিরাট পেয়েছেন। একসময় বেদিকে নতুন বলে বল করতে হত, এমনকি গাভস্করও করেছেন দু-একবার। সেখান থেকে বুমরা-শামিতে পৌঁছনো বিরাট নামক কোনো জাদুকরের ইন্দ্রজাল নয়। জিনিয়াস কপিল; তাঁর পিছু পিছু মধ্যমেধার চেতন শর্মা, মনোজ প্রভাকর; তারপর সত্যিকারের গতিময় জাভাগাল শ্রীনাথের সঙ্গে মূলত সুইং বোলার ভেঙ্কটেশ প্রসাদ; অতঃপর জাহির খান, আশিস নেহরা, ইরফান পাঠান, শান্তাকুমারণ শ্রীশান্ত, আর পি সিং; রঞ্জি ট্রফিতে সবুজ পিচ, ন্যাশনাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমির যত্ন – এত কিছু পেরিয়ে আজকের জোরে বোলাররা এসেছেন। বস্তুত বিরাট অধিনায়ক হওয়ার আগেই এসে পড়েছিলেন ইশান্ত শর্মা, উমেশ, ভুবনেশ্বর, বুমরা, শামি। এঁদের মধ্যে একমাত্র বুমরার টেস্ট অভিষেকই বিরাটের অধিনায়কত্বে।

তারপর যে জোরে বোলাররা এসেছেন তাঁরা কেউ কিন্তু এখনো ভরসা জাগানোর জায়গায় পৌঁছতে পারেননি। টানা দু-তিনটে সিরিজই খেলে উঠতে পারেন না ফিটনেসের সমস্যায়। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ, আকাশ দীপ, হর্ষিত রানাদের উপরে পরবর্তী টিম ম্যানেজমেন্টের ভরসা এত কম যে পরপর ৪-৫ খানা টেস্টে সুযোগ দেয় না। অস্ট্রেলিয়া সফরে মেলবোর্নে অবস্থা এমন দাঁড়াল যে অধিনায়ক পারলে বুমরাকে দিয়েই সবকটা ওভার করিয়ে নেন। তাঁকে নিজমুখে বলতে হল – আর পারছি না। শেষ টেস্টে খেলতেই পারলেন না। তাহলে কীরকম পেস ব্যাটারির উত্তরাধিকার অধিনায়ক বিরাটের? উত্তরাধিকার তো তাই, যা একজনের প্রস্থানের পরেও রয়ে যায়।

সুতরাং প্রচারের ঢক্কানিনাদ আর আবেগের বাষ্প সরালে যা দেখতে পাচ্ছি, তা হল বিরাট টেস্ট ব্যাটার হিসাবে সর্বকালের সেরাদের দলে পড়েন না। পড়েন আমলা, লক্ষ্মণদের দলে। এই দলে ঢুকে পড়াও বড় কম কথা নয়। অবশ্য আমলার খাতায় একটা ত্রিশতরান আছে, লক্ষ্মণের এমন একখানা ২৮১ আছে যার জন্যে তাঁর নাম ক্রিকেটের ইতিহাসে অক্ষয়। বিরাটের সেসব নেই। অধিনায়ক হিসাবে পরিসংখ্যানগতভাবে অবশ্যই তিনি ভারতের সেরা, কিন্তু তা ভারতীয় ক্রিকেটের উন্নতির ধারাবাহিকতাতেই। শ্রীকান্তের পর থেকে যাঁরা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি টেস্ট অধিনায়ক হয়েছেন তাঁদের সাফল্যের হার ক্রমশ বেড়েছে। আজহার অতীতের সকলের চেয়ে বেশি সফল, সৌরভ আজহারের চেয়ে বেশি সফল, ধোনি সৌরভের চেয়ে বেশি সফল, বিরাট ধোনির চেয়ে বেশি সফল। আর বিরাটের উত্তরাধিকার কী – সে প্রশ্ন আপাতত উত্তরকালের জন্যে তুলে রাখাই ভাল।

গম্ভীর যুগ নয়, শুরু হচ্ছে নতুন ব্র্যান্ড সন্ধান

ভারত সিন্ধুনদের জল আটকে দিয়ে পাকিস্তানকে সত্যিই শুকিয়ে মারতে পারে কিনা সেটা এখনো ঠিক পরিষ্কার হল না। বিশেষজ্ঞরা একরকম বলছেন, সরকার একরকম বলছে। কিন্তু বিরাট কোহলি আর রোহিত শর্মা টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ায় প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক এবং সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা যে পরিমাণ চোখের জল ফেলছেন তা যদি পাকিস্তানের দিকে গড়িয়ে যায় – তাহলে পাকিস্তানিদের আর সিন্ধুর জল নিয়ে দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে। বিশেষ করে বিরাটের অবসরের পর দেখা যাচ্ছে কোনো প্রাক্তন বিস্ময়ে হতবাক, কেউ ভারতীয় দলে নেতৃত্বের শূন্যতা নিয়ে চিন্তিত, কেউ আবার বলছেন বিরাট এখনো হেসে খেলে ২-৩ বছর খেলে দিতে পারত। কেউ কেউ বলেছেন রোহিতকে স্রেফ অধিনায়ক হিসাবেই আসন্ন ইংল্যান্ড সফরে দরকার ছিল। তারপর রান পেয়ে গেলে আরও কয়েকটা সিরিজ খেলতে পারত। এসব যাঁরা বলছেন তাঁরা প্রত্যেকে দীর্ঘদিন পেশাদার ক্রিকেট খেলেছেন, জানেন কত ধানে কত চাল হয়। বহুবছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কভার করা সাংবাদিকরাও লিখে চলেছেন বিরাটের মধ্যে কত ক্রিকেট বাকি ছিল। এই যখন অবস্থা, তখন পাড়া ক্রিকেটের গণ্ডি না পেরনো ক্রিকেটপ্রেমীরা সোশাল মিডিয়ায় ‘অভি না যাও ছোড় কর/কে দিল অভি ভরা নহি’ ইত্যাদি কাব্যি করলে তাঁদের দোষ দেওয়া চলে না। ব্যাপারটা নভেম্বর-ডিসেম্বরে ঘটলে নির্ঘাত কলকাতা বইমেলায় বিরাটকে নিয়ে কবিতা সংকলন, লিটল ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যা ইত্যাদি বেরিয়ে যেত। সেই উপনিবেশের যুগে নাক উঁচু সাহেবরা ঘোষণা করেছিল – জনগণের স্মৃতিশক্তি ভাল নয়। কথাটার বহু প্রমাণ আছে, এখন সোশাল মিডিয়ার যুগে তো স্মৃতি নিজেই স্মৃতি হয়ে গেছে। তাই এই হাহুতাশের মাঝে একটু স্মৃতি তাজা করে নেওয়া যাক। যে দুজনের জন্যে এত কান্নাকাটি, শেষ তিনটে সিরিজে (যার প্রথমটা দুর্বল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে, আর পরের দুটোতে ভারত হেরেছে) তাঁদের রানগুলো দেখে নেওয়া যাক।

বিরাট – ৬, ১৭, ৪৭, অপরাজিত ২৯, ০, ৭০, ১, ১৭, ৪, ১, ৫, অপরাজিত ১০০, ৭, ১১, ৩, ব্যাট করেননি, ৩৬, ৫, ১৭, ৬।

রোহিত – ৬, ৫, ২৩, ৮, ২, ৫২, ০, ৮, ১৮, ১১, ৩, ৬, ১০, ব্যাট করেননি, ৩, ৯।

এগুলো দুই তরুণ ক্রিকেটারের রান হলে তাঁদের পৃথিবীর যে কোনো দেশে দল থেকে বাদ দিয়ে বলা হত ‘যাও, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলো গে। ওখানে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করো, তখন আবার সুযোগ দেব।’ কিন্তু কোহলির বয়স ৩৬, রোহিতের ৩৮। এ বয়সে আর ফিরে আসা যায় না। যায় না যে, তার প্রমাণ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের চাপে বহু যুগ পরে রঞ্জি ট্রফি খেলতে গিয়েই দুজনে পেয়ে গিয়েছেন। একজনের স্টাম্প সাধারণ বোলারের আপাত নিরীহ একটা ডেলিভারিতে মাটিতে গড়াগড়ি খেয়েছে।

অন্যজন লেগের দিকে খেলতে গিয়ে ব্যাটের বাইরের কানায় বল লাগিয়ে হাস্যকরভাবে আউট হয়েছেন।

দেশের মাঠে ঘরোয়া ক্রিকেটের পেসারদের খেলতে গিয়েই যাঁদের এই অবস্থা, তাঁরা যে ইংল্যান্ডের গ্রীষ্মে সেখানকার পেসারদের বিরুদ্ধে চোখে অন্ধকার দেখবেন – এটা বোঝার জন্যে সুনীল গাভস্কর বা অনিল কুম্বলের মত বিরাট ক্রিকেটার হতে হয় না, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কভার করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও থাকতে হয় না। যখন রোহিত আর বিরাটের বয়স কম ছিল, তখন ইংল্যান্ডে গিয়ে তাঁরা কী করেছেন তা খেয়াল রাখলে আরও পরিষ্কার হয় যে এবার ইংল্যান্ডে গিয়ে দলের উপকারে আসা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব ছিল।

রোহিত ইংল্যান্ডের মাটিতে সাতটা টেস্ট খেলেছেন। সেখানে ১৪ ইনিংসে ৫০ পেরিয়েছেন মাত্র দুবার, শতরান মোটে একটা। তাঁর পক্ষে বলার মত কথা একটাই – তিনি ৫২৪ রান করেছেন ৪০.৩০ গড়ে, যা তাঁর গোটা টেস্ট জীবনের গড়ের প্রায় সমান। অর্থাৎ তিনি অন্য দেশের চেয়ে ইংল্যান্ডে বেশি খারাপ খেলেননি। কিন্তু বিরাট?

ইংল্যান্ডে ১৭ খানা টেস্ট খেলে ৩৩ ইনিংসে ১০৯৬ রান। শতরান দুটো, অর্ধশতরান পাঁচটা। বিরাটের টেস্টে গড় যেখানে ৪৬.৮৫, সেখানে ইংল্যান্ডে গড় মাত্র ৩৩.২১। ২০১৪ সালের সফরে তো তাঁর সর্বোচ্চ রান ৩৯, জেমস অ্যান্ডারসন সাক্ষাৎ যম হয়ে উঠেছিলেন বিরাটের জন্য। ২০১৮ সালে অনেক উন্নতি করেন। সিরিজটা শুরুই করেন এজবাস্টনের প্রথম ইনিংসে ১৪৯ দিয়ে, দ্বিতীয় ইনিংসেও ৫১। তৃতীয় টেস্টে ট্রেন্টব্রিজে প্রথম ইনিংসে প্রায় শতরান (৯৭), দ্বিতীয় ইনিংসে ১০৩। পরের দুটো টেস্টেও ধারাবাহিক ছিলেন, শুধু ওভালের শেষ টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য রানে আউট হন। ২০২১-২২ জুড়ে হওয়া পাঁচ টেস্টের সিরিজে কিন্তু আবার ব্যর্থ। মাত্র দুবার ৫০ পেরিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের জুনে ওভালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালেও ১৪ আর ৪৯। এই বিরাট আগামী ইংল্যান্ড সফরে থাকবেন না বলে ভারতীয় দলের বিরাট ক্ষতি হবে? সচেতনভাবে একথা দুই ধরনের লোক বলতে পারে – ১) অন্ধ বিরাট ভক্ত, ২) বিরাট নামক ব্র্যান্ড ঘিরে যাদের ব্যবসা।

আমাদের প্রবাদপ্রতিম প্রাক্তন ক্রিকেটাররা, ধারাভাষ্যকাররা এবং সংবাদমাধ্যম দ্বিতীয় দলের সদস্য। বিশ্ব ক্রিকেটে বিরাটের উপর যত টাকা লগ্নি করা রয়েছে তার ধারে কাছে কেউ নেই। ভারতীয় ক্রিকেটে দ্বিতীয় স্থানে রোহিত। এটা বোঝার জন্যে খুব বেশি গবেষণা করতে হবে না। নিজের বাড়ির টিভি বা হাতের মোবাইলের ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপনগুলো খেয়াল করলেই টের পাবেন। ভারত-ইংল্যান্ড সিরিজের সম্প্রচার স্বত্ব পেতে যে টাকা খরচ করেছে সম্প্রচার সংস্থা, ওঁরা দুজন না খেললে সে টাকা উঠে আসবে কিনা সন্দেহ। কারণ অধিকাংশ ভারতীয় ক্রিকেট দেখেন না, ক্রিকেটার দেখেন। প্রীতি জিন্টা থেকে শুরু করে পাড়ার পাঁচুদা – অনেককেই বলতে দেখা যাচ্ছে ‘বিরাট না খেললে আর টেস্ট দেখব না’। এ থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় – এঁরা কোনোদিনই টেস্ট দেখতেন না, বিরাটকেই দেখতেন। এমনিতে এমন দর্শক চিরকালই ছিল। শচীন তেন্ডুলকর আউট হয়ে গেলে টিভি বন্ধ করে দেওয়া, বাঙালির ক্ষেত্রে সৌরভ আউট হয়ে গেলে টিভি বন্ধ করে দেওয়া – এসব হত। গাভস্করের যুগে রেডিও বন্ধ করে দেওয়ার কাহিনিও আছে। কারণ ভারতীয়দের ব্যক্তিপুজোর অভ্যাস সুপ্রাচীন। আমাদের দেশের প্রাচীনতম দুটো মহাকাব্যই লেখা হয়েছে দুজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে – রাম আর কৃষ্ণ। তার উপর ক্রিকেট বোধহয় একমাত্র দলগত খেলা, যেখানে মূল লড়াইটা সারাক্ষণ দুজন ব্যক্তির মধ্যে চলে। তার উপর ব্যাটারকে হেলমেট-টেলমেট পরে বেশ যোদ্ধা যোদ্ধা দেখায়। বিরাট, রোহিতের যুগ আবার ‘নিউ ইন্ডিয়া’-র যুগ। মানে অশোক চক্রের চেয়ে সুদর্শন চক্রের জনপ্রিয়তা বেশি। ফলে তাঁদের নিয়ে যে মানুষ বেশি গদগদ হবে এতে আর আশ্চর্য কী? কিন্তু সমস্যা অন্যত্র।

গাভস্কর, শচীনদের আমলের তুলনায় এখন কিন্তু ভারত দল হিসাবে অনেক বেশি পরিপূর্ণ। দুজনের কারোর খেলোয়াড় জীবনেই যশপ্রীত বুমরার মত কেউ ভারতীয় দলে ছিলেন না, যিনি কখনো গতিতে কখনো সুইংয়ে কখনো কাটে ব্যাটারদের পরাস্ত করতে পারেন। কপিলদেব ছিলেন, কিন্তু যোগ্য সঙ্গী পাননি। বুমরা অন্য প্রান্তে মহম্মদ শামিকে পেয়েছেন, বিভিন্ন সময়ে আরও অনেককে পেয়েছেন। শচীনের ক্রিকেটজীবনের দ্বিতীয়ার্ধে রাহুল দ্রাবিড়, সৌরভ গাঙ্গুলি, বীরেন্দ্র সেওয়াগ, ভিভিএস লক্ষ্মণরা এসেছিলেন বটে, কিন্তু বালক বয়সে ভারতীয় ব্যাটিং বলতেই ছিলেন তিনি। ফলে তাঁর অতিমানবিক ভাবমূর্তি তৈরি হওয়ার ক্রিকেটিয় কারণও ছিল। গাভস্করের তো গোটা ক্রিকেটজীবনেই ভারতীয় দল মানে তিনি একা এবং কয়েকজন। সেই কয়েকজনের মধ্যে আবার ৯০% হলেন বেদি-এরাপল্লি প্রসন্ন-ভাগবত চন্দ্রশেখর। ফলে ভারত জিতত কালেভদ্রে। বিরাট, রোহিতদের আমলে কিন্তু দল অনেক বেশি ম্যাচ জেতে। মনোরঞ্জক খেলোয়াড়ও দু-একজন নয়। তবু এরকম ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা কেন? কারণ আমাদের মাথা – ক্ষয়ে গেছে ওটা, ব্র্যান্ডে গিলিয়াছে গোটা। তাই ক্রমাগত ব্যর্থ হয়ে চলা, স্পষ্টত ফুরিয়ে যাওয়া ক্রিকেটারকেও দলবদ্ধভাবে ‘যেতে নাহি দিব’ বলা চলছে।

ক্রিকেটভক্তদের অনেকে দেরিতে হলেও উপলব্ধি করেছেন যে ভারতীয় ক্রিকেট দলটা আসলে বিজেপির করতলগত হয়েছে, তারা যেভাবে চালাচ্ছে সেভাবেই চলছে। কিন্তু সেই উপলব্ধি থেকে আশ্চর্য অতিসরলীকৃত ধারণায় পৌঁছে গেছেন। তাঁদের তত্ত্ব হল – প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ গৌতম গম্ভীর দলটাকে নিজের মর্জি মত চালাতে চান, এই দুজন থাকলে সুবিধা হচ্ছিল না। তাই ওঁরই চক্রান্তে এঁদের চলে যেতে হল। গম্ভীর যে সুবিধার লোক নন তাতে সন্দেহ নেই, তাঁর হাতে জাতীয় ক্রিকেট দলের রাশ থাকলে যে আরএসএস-বিজেপির খুশি হওয়ার কথা তাও অতীতে লিখেছি। কিন্তু তাতে তো বিরাট, রোহিতের ক্রমাগত ব্যর্থতা মিথ্যে হয়ে যায় না। দলের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দুজনকে স্রেফ ব্র্যান্ড মূল্যের জন্যে বয়ে চলার অন্যায়টাও ন্যায় হয়ে যায় না। তাছাড়া বিরাট আর রোহিত দলের মধ্যে মোটেই কোনো ধুন্ধুমার ধর্মনিরপেক্ষ লড়াই চালাচ্ছিলেন না, যে সে জন্যে তাঁদের দল থেকে বার করা বিজেপির আশু প্রয়োজন হয়ে উঠবে।

টেস্ট ক্রিকেটে রোহিত শর্মা একজন মাঝারি ক্রিকেটারের নাম কিনা, আর বিরাট কোহলি এমনকি নিজের সময়েরও অবিসংবাদী বিশ্বসেরা কিনা, তা অন্য আলোচনার বিষয়। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটে গম্ভীর যুগ শুরু হতে চলেছে বলে যে হইচই চলছে কদিন ধরে, সে ব্যাপারে কটা কথা বলা দরকার। ভারতীয় দলের সঙ্গে নিয়মিত ঘোরেন যে সাংবাদিকরা, তাঁদের পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদনগুলো থেকে যে নির্যাস বেরিয়ে আসে তা হল – গম্ভীর তারকা প্রথা ভাঙতে চান। কিন্তু ভাঙতে চাইলেই তো হল না। ভারতে ক্রিকেট হল কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। সেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তারকা, মহাতারকা লাগবেই আর ক্রিকেট ব্যবসায়ীরা নিজেদের প্রয়োজনে তা বানিয়েও নেবে। গম্ভীর আটকাতে পারবেন না, আটকাতে চাওয়ার মত বোকাও তিনি নিশ্চয়ই নন। আসলে তিনি দল সংক্রান্ত বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো নিজে নিতে চাইছেন। সেটা আধুনিক ক্রিকেটের ইতিহাসে অভূতপূর্ব কিছু নয়। আটের দশকে অস্ট্রেলিয়া দলে বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো ববি সিম্পসনই নিতেন, যতদিন না অ্যালান বর্ডার অধিনায়ক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। নয়ের দশকে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ করতেন বব উলমার। তাতে দলের ক্ষতি হয়নি, ভালই হয়েছে। উলমারের তো এত প্রভাব ছিল দলের উপর যে, ১৯৯৯ বিশ্বকাপে তিনি ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে ফিল্ডিংয়ের সময়ে অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রোনিয়েকে ইয়ারফোনের মাধ্যমে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। আইসিসি নিষেধ করে দেয়

লেখালিখি হচ্ছে – গম্ভীর যুগ এসে পড়ায় ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে এই প্রথম নাকি এমন একটা যুগ আসতে চলেছে যখন কোনো ক্রিকেটারের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হবেন কোচ। একেবারে ভুল তথ্য। ভারতের সফলতম টেস্ট অধিনায়ক হিসাবে এখনো চার নম্বরে থাকা মহম্মদ আজহারউদ্দিনকে প্রবল প্রতাপশালী রাজ সিং দুঙ্গারপুর, কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্তের পর অধিনায়ক করে দিয়েছিলেন দলে কপিলদেব, দিলীপ বেঙ্গসরকর, রবি শাস্ত্রীর মত প্রাক্তন অধিনায়ক এবং তারকা থাকা সত্ত্বেও। আজহার তখন শুভমান গিলের (যিনি অধিনায়ক হবেন বলে শোনা যাচ্ছে) মতই উঠতি তারকা, একদিন ভারত অধিনায়ক হতে পারেন বলে অনেকে ভাবে। কিন্তু অত তাড়াতাড়ি হয়ে যাবেন – একথা আজহার নিজেও ভাবেননি। বোর্ডের ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল এমন একজনকে অধিনায়ক করা, যার নিজের প্রবল প্রতাপ নেই। আজহারের দলের কোচ করে দেওয়া হয়েছিল প্রবাদপ্রতিম বিষাণ সিং বেদিকে, ক্রিকেটার হিসাবে গম্ভীর যাঁর নখের যুগ্যি নন। তারপর প্রবল অশান্তি। ১৯৯০ সালে ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে লর্ডস টেস্টে বেদি নাকি আজহারকে বলেছিলেন টস জিতে ব্যাটিং নিতে, কিন্তু আজহার ফিল্ডিং নেন। তারপর গ্রাহাম গুচ একাই ৩৩৩ করেন, ভারত কোনোমতে ফলো অন বাঁচালেও শোচনীয়ভাবে হারে। সিরিজ তো হারেই। তার আগে নিউজিল্যান্ডে ব্যর্থতা, ইংল্যান্ডের পর অস্ট্রেলিয়ায় চূড়ান্ত ব্যর্থতা এবং একটা জেতা একদিনের ম্যাচ হেরে যাওয়া নিয়ে বেদির প্রকাশ্য মন্তব্যে বিতর্ক। বেদির জায়গায় আব্বাস আলি বেগ দায়িত্ব নেওয়ার পরে আজহারের প্রভাব বাড়ে, কিন্তু দল সাফল্যের মুখ দেখেনি। আজহার জিততে শুরু করেন ১৯৯২-৯৩ মরশুমে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড সিরিজ থেকে। তার পিছনেও বড় কারণ কোচ অজিত ওয়াড়েকরের মাথা। ঘূর্ণি পিচ বানিয়ে কুম্বলে-ভেঙ্কটপতি রাজু-রাজেশ চৌহানকে লেলিয়ে দেওয়ার বুদ্ধি তাঁরই ছিল। ১৯৯৬ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে হারের আগে আজহার-ওয়াড়েকর জুটিকে ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই দলে ছিলেন অস্তাচলের কপিল, অধিনায়কের সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকলেও তারকা শাস্ত্রী আর ক্রমশ তারকা হয়ে উঠতে থাকা শচীন, বিনোদ কাম্বলি, কুম্বলেরা।

আসন্ন ইংল্যান্ড সফরে গম্ভীর যে দল নিয়ে যাবেন তার চেহারা অনেকটা আজহার-ওয়াড়েকরের প্রথম দলটার মত হতে চলেছে। যে দলে বুমরা আছেন, সে দলে তারকা নেই – একথা বলা আহাম্মকি। গিল যতটা সাড়া জাগিয়ে শুরু করেছিলেন, এখন সেই তুলনায় বিবর্ণ। কিন্তু তাঁর প্রায় গোটা ক্রিকেটজীবন পড়ে আছে ফর্ম ফিরে পাওয়ার জন্যে। তাছাড়াও থাকবেন প্রতিভাবান পন্থ, ৫৮ খানা টেস্ট খেলার পরেও প্রতিশ্রুতিমান কে এল রাহুল, ৮০ খানা টেস্ট খেলে ফেলা রবীন্দ্র জাদেজা। একটা দল খেলতে পারলে জেতার জন্যে এর থেকে বেশি অভিজ্ঞতার প্রয়োজন পড়ে না। এঁদের সঙ্গে যুক্ত হবেন ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে ভাল খেলে আসা তরুণ সাই সুদর্শন বা ধ্রুব জুড়েলরা। ফলে বিজ্ঞাপনদাতাদেরও একজন বা কয়েকজনকে খুঁজে নিয়ে নতুন ব্র্যান্ড তৈরি করার যথেষ্ট অবকাশ আছে। কেউ একজন সফল হলেই তাকে আকাশে তুলে দেওয়া হবে নিমেষের মধ্যে। দু-এক বছরের মধ্যেই এমন অনেককে পাওয়া যাবে যারা বলবে ‘শুভমানের জন্যেই খেলা দেখি’ বা ‘ঋষভের জন্যেই খেলা দেখি’। সুতরাং নিশ্চিন্ত থাকুন, গম্ভীর যুগ-টুগ নয়। ইংল্যান্ড সফর থেকে শুরু হতে চলেছে ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন ব্র্যান্ড সন্ধান। দল ব্যর্থ হলে গম্ভীরও চাকরি খোয়াতে পারেন, ব্র্যান্ড তৈরির কাজ জারি থাকবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি একাদশ – যে ফুল না ফুটিতে ঝরেছে ধরণীতে

গত শতকের নয়ের দশকটাকে ভারতীয় ক্রিকেটে বিস্ময়বালকদের দশক বললে খুব ভুল হবে না। সবচেয়ে বড় নাম অবশ্যই শচীন তেন্ডুলকর। কিন্তু তাছাড়াও উঠে এসেছিলেন শচীনের স্কুলের বন্ধু বিনোদ কাম্বলি। সাড়ে ষোলো বছরে জাতীয় দলে না ঢুকলেও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে রানের বন্যা বইয়ে দিচ্ছিলেন শুরু থেকেই। তখন সংবাদমাধ্যম ওই স্তরের ক্রিকেটকে গুরুত্ব দিত, ক্রিকেটপ্রেমীরাও আগ্রহী ছিলেন। তাই কাম্বলি কবে ভারতীয় দলে ঢুকবে – তা নিয়ে আলোচনা হত। দুজনে সারা দেশে পরিচিত হয়ে যান স্কুল ক্রিকেট খেলার সময়েই। হ্যারিস শিল্ডের ম্যাচে সারদাশ্রম বিদ্যামন্দিরের হয়ে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলের বিরুদ্ধে দুজনে ৬৬৪ রান করে যে কোনো ধরনের ক্রিকেটে জুটিতে সর্বোচ্চ রানের বিশ্বরেকর্ড গড়েন। রেকর্ডটা বহুদিন ভাঙেনি।

সেই কাম্বলি ২০ বছর বয়সে ভারতীয় দলে এসে ইংল্যান্ড আর জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে পরপর দুটো দ্বিশতরান করে ফেললেন। সেই কীর্তি তখন পর্যন্ত ডন ব্র্যাডম্যান আর ওয়াল্টার হ্যামন্ড ছাড়া কারোর ছিল না। কিন্তু কী হল শেষমেশ? প্রথমে কোর্টনি ওয়ালশ তাঁর গলদ ধরে ফেললেন ভারত সফরে এসে। তারপর রান না পেতে পেতে যেই আত্মবিশ্বাস কমে এল, অমনি আরও হাজারটা ত্রুটি ধরা পড়ে গেল। কাম্বলি শোধরাতে পারলেন না। মাত্র ১৭ খানা টেস্ট আর ১০৪ খানা একদিনের ম্যাচ খেলেই তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ার সমাপ্ত হল। টেস্টে ১,০৮৪ রান আর একদিনের ক্রিকেটে ২,৪৭৭। মোটে আধ ডজন শতরান।

দুই বাল্যবন্ধুর ক্রিকেটজীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত পরিণাম বোধহয় সেই কথাটার প্রমাণ – প্রতিভা হল ১% সহজাত ক্ষমতা আর ৯৯% পরিশ্রম। কথাটা মানুষ চিরকালই কম বিশ্বাস করে, আজকাল বিশ্বাস করানো আরও শক্ত। ফলে এক-আধটা ইনিংসের পরেই একজন ক্রিকেটার সম্পর্কে উচ্ছ্বাস আকাশ ছোঁয়। বৈভব সূর্যবংশী, যাঁর নাকি বয়স সবে ১৪, তিনি আইপিএলে ৩৫ বলে শতরান করে ফেলতেই শচীনের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত পর্যন্ত ছেলেটিকে শচীনের সঙ্গে তুলনা করে ফেলেছেন। সারা দেশের ক্রিকেটপ্রেমী আবেগে ভাসছেন। আবার পরপর কয়েকটা ম্যাচে ব্যর্থ হলেই হয়ত বলা শুরু হয়ে যাবে ‘অল্প বয়সে এত টাকা দেখে ফেলেছে, খেলা আর হবে?’ ইত্যাদি।

এমন খামখেয়ালিপনার সবচেয়ে টাটকা শিকার পৃথ্বী শ। ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেকে শতরান করার আগেই অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতে ফেলেছিলেন অধিনায়ক হিসাবে। তিন-চারটে আইপিএলে ধুন্ধুমার খেলার পাশাপাশি অমন টেস্ট অভিষেকের পর তাঁকে নিয়ে প্রত্যাশার পারদ চড়ছিল। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে বারবার বোল্ড হলেন, তারপর সঙ্গত কারণেই দল থেকে বাদ। এখন পৃথ্বীকে এখন মুম্বাই দলে ঢুকতেও লড়তে হচ্ছে।

কাম্বলি তবু সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছিলেন, প্রায় তাঁরই বয়সী অমল মজুমদারের তো কোনোদিন ভারতীয় দলের পোশাক পরাই হল না। অমল বছর কুড়ি বয়সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট শুরুই করেন দ্বিশতরান করে। ফি মরশুম এত রান করতেন যে একসময় মনে করা হত, তাঁর ভারতীয় দলে ঢোকা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু সে অপেক্ষা কোনোদিন শেষ হল না। অমল কিন্তু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৪৮ গড়ে ১১ হাজারের বেশি রান করেছেন। আসলে দলগত খেলার একটা ট্র্যাজেডি হল – কেবল নিজে সফল হলে হয় না, অন্যের ব্যর্থতার জন্যেও অপেক্ষা করতে হয়। অমলের পূজা হয়ত সেজন্যেই সারা হল না।

প্রায় অমলের মতই দুর্ভাগ্যের শিকার তামিলনাড়ুর সুব্রহ্মণ্যম বদ্রীনাথ। কুড়ি বছর বয়সে শুরু করে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রায় ৫৫ গড়ে ১০,২৪৫ রান করেও খেলতে পেরেছেন মাত্র দুটো টেস্ট আর সাতটা একদিনের ম্যাচ। কোথায় খেলবেন? তাঁর সময়ে ভারতের মিডল অর্ডার মানে রাহুল দ্রাবিড়, শচীন, সৌরভ গাঙ্গুলি, ভিভিএস লক্ষ্মণরা। একদিনের ক্রিকেটে এঁদের সঙ্গে যুবরাজ সিং, মহম্মদ কাইফরা।

প্রবীণ আমরে আবার সুযোগ পেয়েও সদ্ব্যবহার করতে পারেননি। তাঁর এক অসামান্য কীর্তি আছে – টেস্ট অভিষেকে বিদেশের মাঠে শতরান। চব্বিশ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভয় ধরানো বোলিং আক্রমণের মুখে তিনি ১০৩ রান করেন। অমন সূচনার পরেও যে কেউ মাত্র ১১ খানা টেস্ট খেলে হারিয়ে যেতে পারে তা আমরেকে না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত।

২০১২ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী ভারত অধিনায়ক, দিল্লির উন্মুক্ত চন্দকে নিয়েও অনেকের আশা ছিল। স্কুলে থাকতেই উন্মুক্ত রঞ্জি ট্রফিতে তাঁর প্রথম শতরান হাঁকিয়ে ফেলেন। আঠারো বছর বয়সে আইপিএলে অভিষেক হওয়া উন্মুক্তের কেরিয়ার তারপর আর কোথাও পৌঁছল না। কোনোদিন ধারাবাহিক হতে পারলেন না, অধুনা ক্রিকেট কেরিয়ারের মায়া ছেড়ে আমেরিকাবাসী।

আটের দশকেও অন্তত দুজন বিস্ময়বালক ছিলেন। একজন লেগস্পিনার লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ, অন্যজন বাঁহাতি স্পিনার মণিন্দর সিং। সতেরোয় পা দেওয়ার আগে ভারতীয় দলে ঢুকে পড়েন শিবরামকৃষ্ণণ। প্রথম দিকে মনে হত জাদুকর। ১৯৮৪-৮৫ মরশুমে অস্ট্রেলিয়ায় ভারতের বেনসন অ্যান্ড হেজেস কাপ জয়ের অন্যতম স্থপতি ছিলেন ইনি। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটা ঘরোয়া টেস্ট সিরিজে ২৩ খানা উইকেট নেন। কিন্তু বছর তিনেক যেতে না যেতেই দেখা গেল ব্যাটাররা অনায়াসে তাঁকে খেলে দিচ্ছেন।

মণিন্দরকে মনে করা হয়েছিল বিষাণ সিং বেদির উত্তরাধিকারী। ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডের মাঠে এবং ঘরের মাঠে পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে প্রতিভার প্রমাণও দেন। কিন্তু ৩৫ খানা টেস্ট আর ৫৯ খানা একদিনের ম্যাচেই প্রতিভা ফুরিয়ে গেল। কারো কারো হয়ত তাঁকে মনে আছে ১৯৮৭ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে তিনটে উইকেট নেওয়া বা মাদ্রাজের টাই টেস্টে আউট হওয়া শেষ ব্যাটার হিসাবে।

সদানন্দ বিশ্বনাথকে আবার মনে করা হয়েছিল সৈয়দ কিরমানির যোগ্য উত্তরসূরি। এখনো ইউটিউবে বেনসন অ্যান্ড হেজেস সিরিজে শিবার বোলিংয়ের সঙ্গে বিশ্বনাথের উইকেটরক্ষা দেখলে শিহরিত হতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মাত্র তিনটে টেস্ট আর ২২ খানা একদিনের ম্যাচের পরে আর এগোতে পারেননি তিনি।

এঁদের সকলের চেয়ে বেশি প্রতিভার প্রমাণ রেখে এগোচ্ছিলেন ইরফান পাঠান। এই বাঁ হাতি পেসার মাত্র ১৯ বছর বয়সে যখন টেস্ট ক্রিকেটে এলেন তখন বেশ ভাল গতিতে দুদিকে সুইং করাতে পারেন। অস্ট্রেলিয়ায় অভিষেকেই অ্যাডাম গিলক্রিস্টকে অপূর্ব ইয়র্কারে বোকা বানালেন। ২০০৬ সালে করাচিতে হ্যাটট্রিক করে বসলেন। তাঁর ইনসুইং খেলতে গিয়ে সব ক্রিকেটেই নাজেহাল ডানহাতিরা। ব্যাটের হাতটা ভাল হওয়ায় অনেকে বলল – এসে গেছে পরবর্তী কপিলদেব। গ্রেগ চ্যাপেলও তাঁকে অলরাউন্ডার করে তুলতে ব্যাটিং অর্ডারে প্রায়ই প্রোমোশন দিতেন। ইরফান রান করে দিতেন, কিন্তু নিশ্চয়ই বোলিং অনুশীলন কমছিল। তারপর এল চোট-আঘাত। কপিল হওয়া হল না, সুইং হারিয়ে ফেলে ইরফানও রইলেন না।

আরও পড়ুন শীর্ষে উঠেও গলি-ক্রিকেট না ভোলা অশ্বিন

খানিকটা একইরকম আশাভঙ্গের কারণ মুনাফ প্যাটেল। কৈশোরে এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশনে থাকার সময় থেকেই বিরল গতির বোলার, ২০০৬ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেকে আগুন ঝরান ৯৭ রানে সাত উইকেট নিয়ে। পরবর্তী কিছুদিন দারুণ গতিময় বোলিং করে বিশ্বত্রাস বোলার হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু দলে নিয়মিত হয়ে যাওয়ার পরেই চোট-আঘাত, অস্ত্রোপচারের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গতি কমতে থাকে। ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ী দলে তিনি ছিলেন ঠিকই, মন্দ বলও করেননি। কিন্তু সে নিতান্তই তৃতীয় পেসার হিসাবে।

প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারা একটা ভারতীয় একাদশ এরকম হতে পারে

পৃথ্বী শ, অমল মজুমদার, বিনোদ কাম্বলি, প্রবীণ আমরে, উন্মুক্ত চন্দ, সুব্রহ্মণ্যম বদ্রীনাথ, সদানন্দ বিশ্বনাথ, ইরফান পাঠান, মুনাফ প্যাটেল, মানিন্দর সিং, লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

শীর্ষে উঠেও গলি-ক্রিকেট না ভোলা অশ্বিন

কোনওদিন ভারত অধিনায়ক হওয়া হল না— এই নিয়ে আফসোস আছে কিনা জিজ্ঞেস করায় বলেছেন, তিনি ভেবে নিয়েছেন যে তিনি এমন এক কর্পোরেট কোম্পানিতে কাজ করতেন যারা তাঁকে ওই ভূমিকায় দেখতে চায়নি।

চাহি না রহিতে বসে ফুরাইলে বেলা,
তখনি চলিয়া যাব শেষ হলে খেলা।

রবীন্দ্রনাথের গান সম্পর্কে একটা কথা অনেকেরই মনে হয়— যেন সকলের জীবনের সব মুহূর্তের সঙ্গেই লাগসই দু-চারখানা লাইন লিখে গেছেন। সম্প্রতি ভারতীয় দলের ক্রিকেটার রবিচন্দ্রন অশ্বিন যে অনায়াস ভঙ্গিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেন, তাতে মনে হয় উপরের লাইন দুটো যেন তাঁরই কথা।

২০১১ সালের নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল অশ্বিনের। তারপর থেকে দেশের মাটিতে যত সিরিজ খেলেছে ভারত, তার মধ্যে হার হয়েছিল কেবল ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। ভারতীয় স্পিনারদের সেই সিরিজে টেক্কা দিয়েছিলেন দুই ইংরেজ স্পিনার— গ্রেম সোয়ান আর মন্টি পানেসার। অশ্বিন চার টেস্টে ১৪টা উইকেট নিয়েছিলেন, প্রজ্ঞান ওঝা ২০টা, রবীন্দ্র জাদেজা আর পীযূষ চাওলা মিলে আরও সাতখানা। কিন্তু অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছিল সোয়ান-পানেসারের ৩৭ (যথাক্রমে ২০ আর ১৭)-টা উইকেট। অশ্বিন বলেছেন, ওই সিরিজের পর তিনি প্রতিজ্ঞা করেন— যতদিন খেলবেন, ঘরের মাঠে ভারতকে হারতে দেবেন না। তাঁর প্রতিজ্ঞা অটুট থেকেছে এতগুলো বছর, ভেঙে গেল ২০২৪ সালের শেষে এসে নিউজিল্যান্ড সিরিজে। অশ্বিন একেবারেই সুবিধা করতে পারলেন না। তিন টেস্টের সিরিজে মাত্র ন-খানা উইকেট, গড় ৪১। তিনি আর জাদেজা এতগুলো বছর ধরে যেভাবে ঘোল খাইয়ে ছেড়েছেন অতিথি ব্যাটারদের, তা এবারে হয়নি। উপরন্তু সেই ইংল্যান্ড সিরিজের মতোই এবারে নিউজিল্যান্ডের মিচেল স্যান্টনার (১৩ উইকেট) আর আজাজ প্যাটেল (১৫ উইকেট) টেক্কা দিয়েছেন ভারতীয় স্পিনারদের।

যদিও অস্ট্রেলিয়ায় খুব কম ক্ষেত্রেই একটা টেস্টে একজনের বেশি স্পিনার খেলানোর প্রয়োজন হয়, তবু ভারতীয় নির্বাচকরা এবার অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়েছিলেন তিনজনকে। তাছাড়া উপায়ই বা কী ছিল? ওয়াশিংটন সুন্দর যে দুটো টেস্ট খেলেই ১৬ খানা উইকেট নিয়ে ফেলেছেন নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। তার উপর সাড়ে চুয়াল্লিশ গড়ে রানও করে ফেলেছেন। ভারতীয় টেস্ট দল আবার অদ্ভুত নিয়মে চলে। ব্যাটাররা রান করতে পারবেন না জেনে, বোলার নির্বাচনের সময়ে একদিনের ক্রিকেট বা কুড়ি-বিশের ক্রিকেটের মতো মাথায় রাখা হয় সে রান করতে পারবে কিনা। এই নিয়ম মহেন্দ্র সিং ধোনির আমল থেকেই অল্পবিস্তর চলছিল, গত পাঁচ বছরে তুঙ্গে উঠেছে। কারণ দুই মহাতারকা ব্যাটার বিরাট কোহলি আর রোহিত শর্মার রান করার ঘটনা নরেন্দ্র মোদির সংসদে উপস্থিত থাকার মতোই বিরল হয়ে গেছে। কেএল রাহুল, শুভমান গিলরাও ধারাবাহিক নন। অশ্বিন বিলক্ষণ জানতেন, দেশের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বোলারদের সামলাতেই হিমশিম খেয়ে যাওয়া ভারতীয় ব্যাটারদের অস্ট্রেলিয়ায় রান করার সম্ভাবনা আরও কম। অতএব ওখানে চূড়ান্ত একাদশ নির্বাচন করার সময়ে আরও বেশি করে মাথায় রাখা হবে কোন বোলার বেশি রান করতে পারে। অশ্বিন এও জানতেন যে টেস্টে আধডজন শতরান, ১৪ খানা অর্ধশতরান, আগের অস্ট্রেলিয়া সফরে নায়কোচিত ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস, ২০২২ সালে মীরপুরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ঘূর্ণি উইকেটে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলার পরেও টিম ম্যানেজমেন্টের তাঁর ব্যাটিং দক্ষতায় বিশ্বাস নেই। অতএব প্যাট কামিন্সদের বিরুদ্ধে তাঁর খেলার সম্ভাবনা কম। প্রথম দুই টেস্টের এলোমেলো দল নির্বাচন সে-কথা প্রমাণও করে দেয়। তাই দ্বিতীয় টেস্টের পরেই তিনি অবসর নিয়ে নেন। অধিনায়ক রোহিত শর্মা সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, অশ্বিন নাকি পার্থেই অবসর নিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। রোহিতের অনুরোধেই অ্যাডিলেড পর্যন্ত থেকে যেতে রাজি হন।

ভারত অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জিতে গেলেই বা কী হত? বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠলেও সেই ম্যাচ হবে ইংল্যান্ডে। অর্থাৎ সেখানেও অশ্বিনকে বসিয়ে রাখা হত— এই সম্ভাবনা প্রবল। তারপর ভারতের টেস্ট সিরিজ বলতে ইংল্যান্ডে পাঁচ টেস্টের সিরিজ। ফের দেশের মাঠে টেস্ট সিরিজ আসতে আসতে অশ্বিনের বয়স চল্লিশের দিকে এগিয়ে যাবে। অশ্বিন ততদিন আর অপেক্ষা করলেন না। কেন করলেন না? ঠিক কী কথাবার্তা হয়েছিল অধিনায়ক আর কোচ গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে? সম্যক জানা যাচ্ছে না বলেই নানারকম গুজব এবং প্রচার ডালপালা মেলেছে। সেসব কথা থাক। এখানে বলার কথা হল, অশ্বিনের সঙ্গে যে-কোনও গড়পড়তা ভারতীয় ক্রিকেট-তারকার বিস্তর অমিল। তিনি কোহলির মতো বলিউড অভিনেত্রীর সঙ্গে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং করেননি। ব্যক্তিগত জীবন হাট করে ইনস্টাগ্রামে খুলে দেওয়ার পর ‘আমার বাচ্চার ছবি তুলছেন কেন’ বলে অস্ট্রেলীয় সাংবাদিকদের দিকে তেড়েও যাননি। সোশাল মিডিয়ায় তাঁর স্ত্রী, সন্তানদের ছবি বা ভিডিও রোহিতের পরিবারের চেয়েও কম দেখা যায়। সোশাল মিডিয়া মানে অশ্বিনের কাছে এক্সে একেবারেই ক্রিকেট সংক্রান্ত কিছু পোস্ট আর নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল। সেখানে মূলত ক্রিকেট নিয়েই ভিডিও পোস্ট করেন, কিন্তু দাবাও থাকে। আজ্ঞে হ্যাঁ, দাবা। এমন একজন ক্রিকেটার সদ্য প্রকাশ করেছেন আত্মজীবনীমূলক বই। এ বই তো পড়বই।

বহু বিখ্যাত খেলোয়াড় এই ধরনের বই লিখেছেন। সাধারণত লেখার কাজে তাঁর সঙ্গে থাকেন কোনও ক্রীড়া সাংবাদিক। ভারতীয় দাবার জীবন্ত কিংবদন্তি বিশ্বনাথন আনন্দের আত্মজীবনীর নাম যেমন মাইন্ড মাস্টার (২০১৯), তাঁর সঙ্গে লিখেছেন সাংবাদিক সুজান নাইনান। শচীন তেন্ডুলকরের আত্মজীবনী প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে (২০১৪), সহলেখক বোরিয়া মজুমদার। আন্দ্রে আগাসির আত্মজীবনী ওপেন (২০০৯) লেখায় তাঁকে সাহায্য করেছিলেন পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক জে আর মোরিঙ্গার। এই বইগুলোর কাটতি বেশ ভাল। কারণ খেলাপাগল লোকেদের মধ্যে এমন মানুষ কম নেই যারা খেলোয়াড়দের জীবনযাত্রা, ভাবনার ধরন, প্রস্তুতি, মনস্তত্ত্ব, ব্যক্তিগত জীবনের লড়াই সম্পর্কে জানতে চান। আবার কেউ হয়তো তেমন পড়ুয়া নন, কিন্তু প্রিয় খেলোয়াড়ের আত্মজীবনী স্রেফ সংগ্রহে রাখার আগ্রহে কিনে ফেলেন। অশ্বিনের বইও লেখা হয়েছে এক সাংবাদিকের সাহায্য নিয়ে। তিনি ক্রিকেট সাংবাদিক সিদ্ধার্থ মঙ্গা। কিন্তু মজার কথা, সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রায় দেড় দশক ক্রিকেট খেলে ফেলা অশ্বিনের বইয়ের নাম আই হ্যাভ দ্য স্ট্রিটস। প্রচ্ছদে দেখা যায় বল হাতে নয়, ব্যাটের উপর ভর দিয়ে বসে আছেন ভারতের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী বোলার।

এ কি অশ্বিনের শ্লেষ? ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যাটারদের সমান সম্মান যে হাজার সাফল্য সত্ত্বেও বোলারদের কপালে জোটে না— এ-কথা তো সর্বজনবিদিত। মাত্র একটা সিরিজে ব্যর্থ হয়েই নিজের বয়সের ভার স্বীকার করে নিয়ে অশ্বিন অবসর নিলেন। অথচ সমবয়স্ক কোহলি কালেভদ্রে একটা শতরান করলেই ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পারমানেন্ট’ জাতীয় কথা বলে সাংবাদিক, ধারাভাষ্যকার, ক্রিকেটভক্ত— সকলেই একেবারে গদগদ হয়ে যান। রোহিত নিতান্ত চাপে পড়ে এত বছর পরে রঞ্জি ট্রফি খেলতে নেমে জম্মু-কাশ্মীরের পেসারের গতিতেও চোখে অন্ধকার দেখছেন, অথচ নির্বাচকরা এখনও সাহস করে বলতে পারছেন না— এবার অবসর নাও। উল্টে অস্ট্রেলিয়ায় একটা টেস্টে তিনি নাকি নিজেকে বিশ্রাম দিয়েছিলেন। তাতে অবসর নেবেন কিনা জল্পনা শুরু হওয়ায় টিভি ক্যামেরার সামনে এসে সগর্বে বলে দিয়েছেন— আমি এখন আছি। কোথাও যাচ্ছি না। ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যাটারদের এই রাজার ব্যাটাসুলভ অবস্থানকেই কি নীরবে ব্যঙ্গ করছে অশ্বিনের বইয়ের প্রচ্ছদ?

আরও পড়ুন বিরাট, রোহিত, রাহুলদের সত্য রচনা চলছে চলবে

লোকটার নাম অশ্বিন বলেই এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না এবং ওই বইয়ের ভিতরে কী আছে তা জানার কৌতূহল বাড়ে। পরিতাপের বিষয় হল, ভারতীয় ক্রিকেট-সাংবাদিকতা মোটের উপর বিশ্লেষণহীন পেজ থ্রি সাংবাদিকতায় পরিণত হয়েছে। তাই অশ্বিনের অবসরের পর থেকে আজ পর্যন্ত কেউ তাঁর দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনের নানা দিক নিয়ে একখানা গভীর সাক্ষাৎকার নিল না। নিলে সামগ্রিকভাবে গত দেড় দশকে যেভাবে ভারতীয় ক্রিকেট পরিচালিত হয়েছে, যার ক্ষতি তাৎক্ষণিক না হলেও এখন টের পাওয়া যাচ্ছে, তা নিয়ে অনেক কিছু জানা যেতে পারত। অশ্বিনের মতো একজন ভাবুক ক্রিকেটারের ক্রিকেট-ভাবনা নিংড়ে নেওয়ার কাজ তো হতই। কাজটা করেছেন স্কাই ক্রিকেটের পডকাস্টে দুই প্রাক্তন ইংল্যান্ড অধিনায়ক— মাইকেল অ্যাথারটন আর নাসের হুসেন। সেই পডকাস্ট শুনলে অশ্বিনের বইখানা পড়ার আগ্রহ আরও বেড়ে যেতে বাধ্য। অশ্বিন বলেছেন তিনি বই পড়তে ভালবাসেন। নির্দিষ্ট করে বলেছেন ‘সেলফ-হেল্প বই নয়, উপন্যাস পড়তে ভালবাসি।’ তারপর জানিয়েছেন নিজের বইটাকেও তিনি এমনভাবে সাজাতে চেয়েছেন যাতে নিজেকে বইয়ের প্রথম অংশে লেখক হিসাবে বা বইয়ের প্রধান চরিত্র (“author or protagonist”) হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। ফলে শেষমেশ বইটা উপন্যাসের মতো হয়ে ওঠে। আরও বলেছেন ‘আমি আজও একজন গলি-ক্রিকেটার।’ বোঝা যায়, নিজের শিকড়ের প্রতি বিশ্বস্ততা বোঝাতেই তাঁর বইয়ের নামকরণ।

কোনও রাখঢাক না করে ওই পডকাস্টে অশ্বিন নির্দ্বিধায় বলেছেন, একজন বোলারের জীবন মোটেই খুব রঙিন নয়। তাই অনেকসময় দেখা যায়, উইকেট নিল অশ্বিন আর লাফিয়ে বেড়াচ্ছে বিরাট। কোনওদিন ভারত অধিনায়ক হওয়া হল না— এই নিয়ে আফসোস আছে কিনা জিজ্ঞেস করায় বলেছেন, তিনি ভেবে নিয়েছেন যে তিনি এমন এক কর্পোরেট কোম্পানিতে কাজ করতেন যারা তাঁকে ওই ভূমিকায় দেখতে চায়নি। ২০২৫ সালের ভারতে ক্রিকেটার, কোচ, বোর্ড, সাংবাদিক, বিশেষজ্ঞ, প্রাক্তন ক্রিকেটার— সকলে মিলে জাতীয় দলকে দেশের সমার্থক করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। সেখানে অশ্বিনের মতো উচ্চতার একজন ক্রিকেটার বোর্ডকে কর্পোরেট কোম্পানি বলছেন, জাতীয় দলে খেলাকে স্রেফ আরেকটা চাকরির মতো করে বর্ণনা করছেন— এই প্রবল কাণ্ডজ্ঞান তাঁকে এবং তাঁর বইকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

এমন নয় যে বড় ক্রিকেটার হলেই তাঁর আত্মজীবনী বা জীবনী খুব আকর্ষণীয়, পাঠযোগ্য হয়। শচীনের বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত কিছু অংশ পড়ে গাঁটের কড়ি খরচ করে আর কিনতে ইচ্ছে করেনি। যারা কিনে পড়েছে, প্রায় কারও মুখে প্রশংসা শুনিনি। সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগ শুনেছি তা হল, বইতে এমন একটা কথাও নেই যা শচীন সম্পর্কে ক্রিকেটভক্তরা আগেই জানত না। হয়তো তা খুব অবাক করার মতো নয়। কারণ শচীনের ব্যাটিং যতখানি চিত্তাকর্ষক ছিল, তাঁর কথাবার্তা ঠিক ততখানিই একঘেয়ে। অশ্বিন কিন্তু অন্য মানুষ। কার্টুনিস্ট প্রাণ তাঁর সৃষ্ট চরিত্র চাচা চৌধুরী সম্পর্কে যে কথা কমিক স্ট্রিপে লিখতেন, সে-কথা অশ্বিন সম্পর্কেও বলা যায়— অশ্বিনের মাথা কাজ করে কম্পিউটারের মতো।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অশ্বিনের অবসর ব্যাটারদের পিঠ বাঁচানোর নীতির গালে চড়

অশ্বিন কেন, যে কোনো বুদ্ধিমান মানুষ বুঝতে পারবেন যে আসলে আমাদের কোচ আর অধিনায়ক দল তৈরি করেন ব্যর্থ ব্যাটারদের পিঠ বাঁচাতে। কাজটা যে আজ নতুন হচ্ছে, তাও নয়। এ জিনিস চালু করে দিয়েছিলেন ধুমধাম ধোনি। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।

ভারতের হয়ে টেস্ট খেলেছেন মাত্র ১৭টা, নিয়েছেন ৪২.৪০ গড়ে ৪৪ খানা উইকেট। একদিনের ম্যাচ খেলেছেন ১২০টা, ৩১.৭২ গড়ে নিয়েছেন ১৫৭ খানা উইকেট। কুড়ি বিশের ম্যাচ খেলেছেন ২৭টা, ২২.২৯ গড়ে নিয়েছেন মোটে ৩৪ খানা উইকেট। না, রবিচন্দ্রন অশ্বিনের কথা হচ্ছে না। বলছি আশিস নেহরার কথা। উপরের পরিসংখ্যান সাধারণ বললেও বেশি বলা হয়। বলা উচিত আলোচনার অযোগ্য। শেষ টেস্ট ম্যাচ খেলেছিলেন ২০০৪ সালে, শেষ একদিনের ম্যাচ ছিল ২০১১ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। সেই নেহরার জন্যে ঘটা করে তাঁর ঘরের মাঠে বিদায়ী ম্যাচের বন্দোবস্ত করেছিল ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) – তারিখটা ছিল ১ নভেম্বর ২০১৭। ভারতের বিজেপি সরকারের মত ক্রিকেট বোর্ডেরও আছে গোদি মিডিয়া। সেই মিডিয়া ভরে গিয়েছিল স্বনামধন্য সাংবাদিকদের লম্বা লম্বা লেখায়। তাঁরা যেনতেনপ্রকারেণ প্রমাণ করেছিলেন – নেহরা মহান ক্রিকেটার, তাই তাঁর এই সম্মান প্রাপ্য। বোর্ডের মাইনে করা প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও নিজেদের শব্দভাণ্ডার উজাড় করে দিয়েছিলেন নেহরার জন্য। তিনি নাকি অসম্ভব সম্ভাবনাময় ছিলেন, কেবল চোট আঘাতের জন্যে বেশি খেলে উঠতে পারলেন না। পারলেই…

হতেও পারে। সম্ভাবনা তো আর মাপা যায় না, আর কী হলে কী হত তা নিয়েও অনন্তকাল আলোচনা চালানো যায়। সুকান্ত ভট্টাচার্য ৮০ বছর বাঁচলে রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বড় কবি হতেন – একথা প্রমাণ করার যেমন উপায় নেই, অপ্রমাণ করারও উপায় নেই। কিন্তু সাফল্য তো পরিমাপযোগ্য। নেহরা যদি বিদায়ী ম্যাচ পাওয়ার যোগ্য হন, তাহলে টেস্টে তিনশোর বেশি, একদিনের ক্রিকেটেও প্রায় তিনশো উইকেট পাওয়া, ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম কাণ্ডারী জাহির খান কী দোষ করেছিলেন? কী দোষ ছিল হরভজন সিংয়ের? তিনি তো টেস্টে চারশোর বেশি উইকেটের মালিক, একদিনের ক্রিকেটেও আড়াইশোর বেশি। বহু স্মরণীয় জয়ের নায়ক। নেহরার তো স্মরণীয় পারফরম্যান্স বলতে ঠিক একটা – ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ডারবানে ২৩ রানে ছয় উইকেট নেওয়া। ভারতীয় ক্রিকেটে মহান হওয়া এত সহজ তাহলে?

এসব পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে হত না, অশ্বিন অস্ট্রেলিয়া সিরিজের মাঝখানেই অবসর নিয়ে না ফেললে। এই ওয়েবসাইটেই নিউজিল্যান্ড সিরিজে ভারত গোহারান হারার পরে লিখেছিলাম অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজা হলেন মাঝারিয়ানার দেবদূত। সেই মত পরিবর্তন করার মত কিছু ঘটেনি। কিন্তু সে মাঝারিয়ানা তো সর্বকালের সেরাদের সাপেক্ষে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে অশ্বিন ভারতের বর্তমান প্রজন্মের সেরা স্পিনার। তাছাড়া মাঝারিয়ানা এক জিনিস, অপকর্ষ আরেক জিনিস। যে দেশে নেহরাকে ধূপধুনো দিয়ে পুজো করে বিদায় জানানো হয়, সেখানে অনিল কুম্বলের পরেই ভারতের সবচেয়ে সফল টেস্ট বোলার, সবচেয়ে বেশিবার সিরিজের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার বিশ্বরেকর্ড করে ফেলা অশ্বিন একটা সিরিজের মাঝখানে এমন চকিতে বিদায় নেবেন – এটা ক্রিকেটপ্রেমীরা নীরবে হজম করবেন? প্রশ্ন করবেন না, কেন এভাবে বিদায় নিলেন অশ্বিন?

যদি আর টেস্ট খেলতে পারবেন না বলেই মনে করে থাকেন, তাহলে তো নিউজিল্যান্ড সিরিজের পরেই অবসর নিতে পারতেন। অথবা বলে দিতে পারতেন – অস্ট্রেলিয়া সিরিজই হবে আমার শেষ সিরিজ। অনেকেই তো এভাবে অবসর নেন। নিউজিল্যান্ডের নির্ভরযোগ্য জোরে বোলার টিম সাউদি অশ্বিনের আগেরদিনই টেস্ট কেরিয়ার শেষ করলেন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের শেষ টেস্ট খেলে। তিনি কিন্তু ম্যাচের আগেই বলে দিয়েছিলেন, ওটাই হতে চলেছে তাঁর শেষ টেস্ট। কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডের জেমস অ্যান্ডারসন আর স্টুয়ার্ট ব্রডও আগে থেকে ঘোষণা করে অবসর নিয়েছেন। যেসব ক্রিকেটারের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ার হয়, ভক্তকুল তৈরি হয় – তাঁরা তো এভাবেই বিদায় নেন। শেষ সময়ে ভক্ত, সহখেলোয়াড়, প্রাক্তনদের অভিবাদন পেতে কার না ভাল লাগে? মানুষ যে পেশাতেই থাকুক, কোনো বয়সেই অবসর নেওয়া সোজা নয়। ভাল হোক, মন্দ হোক, অনেকগুলো সম্পর্ক তৈরি হয় কর্মস্থলে। কাজ থেকে অবসর নিতেই হয়। কারণ শরীর প্রাকৃতিক নিয়মে একসময় কাজের অনুপযোগী হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের মন তো প্রকৃতির নিয়মে চলে না। কাজ ছেড়ে যেতে এবং কাজের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলোকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হয়, বিষণ্ণতা তৈরি হয়। শুধু যে অবসর নিচ্ছে তারই হয় তা নয়, তার সহকর্মীদেরও হয়। অশ্বিনের মত বিখ্যাত খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে যারা কোনোদিন তাঁর ধারেকাছে যেতে পারেনি, কেবল কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে টিভি বা মোবাইলের পর্দায় দেখেছে, তারাও বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। অত মানুষের বিষণ্ণতা, শেষ মুহূর্তের ভালবাসা ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনই আবার অবসরপ্রাপ্ত মানুষটার বাকি জীবনের পাথেয়। এক্ষেত্রে অশ্বিন বা আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই। সেই ভালবাসা গুছিয়ে চেটেপুটে নেওয়ার সুযোগ কে ছাড়তে চায়? চাওয়ায় কোনো দোষও নেই। তাহলে অশ্বিন এমন হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?

ব্রিসবেনে বৃষ্টিতে শেষদিনের খেলা ভেস্তে যাওয়ার পর অধিনায়ক রোহিত শর্মার সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে অশ্বিন কী বলেছেন এতদিনে সবাই জানেন। দু মিনিটেরও কম দৈর্ঘ্যের সেই বক্তব্য শুনলে মনে হয়, সিদ্ধান্তটা চট করে নেওয়া। অথচ অশ্বিনের ক্রিকেটজীবন যাঁরা অনুসরণ করেছেন তাঁরা জানেন, অশ্বিন হুটহাট কাজ করার লোক নন। এমনিতেই স্পিন বোলিং ব্যাপারটায় গায়ের জোরের চেয়ে মস্তিষ্কের কাজ বেশি বৈ কম নয়। তার উপর অশ্বিন এমন একজন ক্রিকেটার, যাঁর মাথা ব্যাট করার সময়েও একইরকম সক্রিয় থাকত। শেন ওয়ার্ন সম্পর্কে একসময় বলা হত ‘the best captain Australia never had’। অশ্বিন সম্পর্কেও বলা যায়, তিনি ভারতের সেরা না-হওয়া অধিনায়ক। এমন লোক আজ ভাবলেন, আর এখুনি অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন – এমনটা না হওয়াই স্বাভাবিক। অশ্বিনের প্রস্থানের পর রোহিত যা বলেছেন, তা থেকে কিন্তু পরিষ্কার যে এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ নেওয়া হয়নি। রোহিত বলেন ‘আমি পার্থে এসে এটা শুনি। এটা তখন থেকেই ওর মাথায় ঘুরছিল। আমি কোনো মতে ওকে গোলাপি বলের টেস্টটা [অ্যাডিলেড] অব্দি থেকে যেতে রাজি করাই। ওর মনে হয়েছে, যদি আমার প্রয়োজন না পড়ে তাহলে আমার বিদায় নেওয়াই ভাল।’

হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে অশ্বিনের বাবা রবিচন্দ্রন মেলবোর্ন আর সিডনির শেষ দুটো টেস্ট দেখতে যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট কেটে ফেলেছিলেন। ছেলে অবসর নেওয়ার খবর জানানোর পরে টিকিটগুলো বাতিল করেন। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রবিচন্দ্রন অবসরের কারণ হিসাবে ছেলের অপমানিত বোধ করার সম্ভাবনাও জানিয়ে ফেলেছেন। তবে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হতেই অশ্বিন এক্স হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করেছেন, তাঁর বাবার মিডিয়া সামলানোর প্রশিক্ষণ নেই। অতএব তাঁকে সবাই দয়া করে ক্ষমা করে দিন। লক্ষ করুন, অশ্বিন বলেছেন, বাবা মিডিয়াকে কী বলতে হয় না হয় জানেন না, তাই ওরকম বলে ফেলেছেন। বাবা ভুল বুঝেছেন, আমি খুশি মনেই অবসর নিয়েছি – এমন কথা বলেননি কিন্তু। পাশাপাশি রোহিত বলেছেন যে পার্থ থেকেই অশ্বিন অবসরের চিন্তা করছিলেন। তার মানে রোহিত অ্যাডিলেডের দ্বিতীয় টেস্ট পর্যন্ত থেকে যাওয়ার কথা না বললে হয়ত পার্থেই অবসর ঘোষণা করে দিতেন। এখানেই ভারতীয় দল যেভাবে চালানো হয় তা নিয়ে একগুচ্ছ প্রশ্ন তোলার অবকাশ তৈরি হয়।

কী হয়েছিল পার্থে? দলে দুজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ স্পিনার থাকা সত্ত্বেও খেলানো হয়েছিল মাত্র চারটে টেস্ট খেলা ওয়াশিংটন সুন্দরকে। ওয়াশিংটনকে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ৫১.২ ওভারের মধ্যে মাত্র দু ওভার বল করতে দেওয়া হয়, দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫ ওভার বল করলেও মিচেল স্টার্ক আর নাথান লায়ন নামে দুই বোলারের উইকেট নেওয়ার বেশি প্রভাব ফেলতে পারেননি। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন ব্যাট হাতে তিনি অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজার চেয়েও বেশি নির্ভরযোগ্য হওয়াই নাকি তাঁর সুযোগ পাওয়ার আসল কারণ। কিন্তু ওয়াশিংটন প্রথম ইনিংসে করেন ৪, দ্বিতীয় ইনিংসে ২৯। তবে তরুণ ক্রিকেটারকে একটা টেস্টে ব্যর্থ হওয়ার জন্য সমালোচনা করা অন্যায়। বিশেষত প্রথম ইনিংসে যেখানে দুই দলের সমস্ত ব্যাটার ব্যর্থ হয়েছিলেন আর ভারতের বোলিংয়ের সময়েও পিচ, আবহাওয়া – সবকিছুই ছিল জোরে বোলারদের জন্যে আদর্শ। কিন্তু কথা হল, ওয়াশিংটনকে তাহলে অ্যাডিলেডের দ্বিতীয় টেস্টে বাদ দেওয়া হল কেন? তাঁর বোলিং ও ব্যাটিং দক্ষতার প্রতি ভরসা রোহিত-গৌতম গম্ভীরের টিম ম্যানেজমেন্ট মাত্র একটা ম্যাচের পরেই হারিয়ে ফেলল? এভাবে কোনো তরুণ ক্রিকেটারকে লম্বা রেসের ঘোড়া করে তোলা যায়?

নাকি ব্যাপারটা আসলে এইরকম, যে অশ্বিন পাঁচশোর বেশি উইকেট নিয়ে ফেলার পরেও বিদেশের মাঠে বারবার বাদ পড়ায় বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যাবেন বলছেন শুনে প্রথম টেস্টে না খেলা অধিনায়ক রোহিত তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন – অ্যাডিলেডে ওঁকেই খেলানো হবে? যদি তা হয়, তাহলে কিন্তু বলতে হবে টিম ম্যানেজমেন্ট অবৈজ্ঞানিক, যুক্তিহীন, আবেগসর্বস্ব পদ্ধতিতে দল চালান। অশ্বিন অ্যাডিলেডে খেললেন এবং মন্দ খেললেন না। প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয়ের মধ্যে ২২ বলে ২২ রান করলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে আর সকলের মত তিনিও ব্যর্থ। তাঁর প্রধান কাজ তো বল করা। তাতে কিন্তু প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হয়েছেন বলা যাবে না। ১৮ ওভার বল করেছেন, অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের বেশি রান করতে দেননি এবং অলরাউন্ডার মিচেল মার্শের উইকেট তুলে নিয়েছেন।

তারপরেও তৃতীয় টেস্টে অশ্বিনকে বাদ দিয়ে জাদেজাকে খেলানো হল কোন যুক্তিতে? একটা যুক্তিই থাকা সম্ভব। প্রথম দুই টেস্টে ব্যাটাররা ডুবিয়েছেন, আবার ডোবাতে পারেন। জাদেজা টেনে তোলার কাজটা ওয়াশিংটন আর অশ্বিনের চেয়েও ভাল পারবেন, তাই। সেই মহেন্দ্র সিং ধোনির আমল থেকে ভারতীয় ক্রিকেটে চালু ধারণা – জাদেজা অশ্বিনের থেকে ভাল ব্যাট করেন। যদিও দুজনের মধ্যে তফাত মোটেই আকাশপাতাল নয়। অশ্বিন বিদেশে ৪০ খানা টেস্ট খেলে ১৪৮৫ রান করেছেন ২৫.৬০ গড়ে, দুটো শতরান আর ছটা অর্ধশতরান সমেত। জাদেজা ২৭ খানা টেস্ট খেলে ১২১০ রান করেছেন ৩৪.৫৭ গড়ে, একটা শতরান আর নটা অর্ধশতরান সমেত। জাদেজার গড় অশ্বিনের চেয়ে নিঃসন্দেহে অনেকটা ভাল হলেও মনে রাখতে হবে, গত অস্ট্রেলিয়া সফরে সিডনিতে হনুমা বিহারীর সঙ্গে অশ্বিন যে ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস খেলেছিলেন, তেমন অবিশ্বাস্য ইনিংস বিশ্বমানের জোরে বোলিংয়ের বিপক্ষে জাদেজা বিদেশে কখনো খেলেননি। ব্রিসবেনে সদ্য যে ৭৭ রানের ইনিংস খেললেন, তা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনজন বিশেষজ্ঞ বোলারের বিরুদ্ধে। কারণ আহত জশ হেজলউড ইনিংসের শুরুর দিকেই মাঠ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

আরো পড়ুন স্বর্গহারা মাঝারিয়ানার দেবদূত: বিরাট, রোহিত ও সম্প্রদায়

তবে এই তুলনামূলক আলোচনা যে করতে হচ্ছে – সেটাই অশ্বিন, জাদেজা, ওয়াশিংটনের প্রতি অবিচার। তুলনা করতে হলে তো করা উচিত তাঁদের বোলিং নিয়ে, কারণ ওঁরা প্রথমত বোলার। ব্যাটের হাত ভাল সেটা বোনাস হিসাবেই ধরা উচিত, কারণ খেলাটা টেস্ট ক্রিকেট। কুড়ি বিশের ক্রিকেট নয়, যেখানে ১ থেকে ১১ সকলেরই রান করতে পারা দরকার। ওয়াশিংটন যেহেতু মোটে ছটা টেস্ট খেলেছেন, সেহেতু তাঁকে আলোচনার বাইরে রেখে অশ্বিন আর জাদেজার বিদেশের মাঠের পরিসংখ্যান দেখি।

অশ্বিন ৪০ টেস্টে ৩০.৫৫ গড়ে ১৫০ খানা উইকেট নিয়েছেন। এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন আটবার, আর ম্যাচে দশ উইকেট দুবার। অন্যদিকে জাদেজা ২৭ টেস্টে ৩৪.০৩ গড়ে মাত্র ৭৬ খানা উইকেট নিতে পেরেছেন। এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট মাত্র দুবার, ম্যাচে দশ উইকেট একবারও নয়। অর্থাৎ বিদেশে জাদেজা কোনো আলোচনার যোগ্য বোলারই নন। উপমহাদেশের বাইরে তাঁর বোলিং এতই পানসে হয়ে যায় যে ২০১৩ ইংল্যান্ড সফরে একটা টেস্টে ধোনি উইকেট থেকে পিছিয়ে দাঁড়িয়ে জাদেজাকে দিয়ে কয়েক ওভার মিডিয়াম পেস বল করিয়েছিলেন। ব্রিসবেনে টেস্টেও দেখা গেল, পিচে কিঞ্চিৎ টার্ন ও বাউন্স থাকলেও জাদেজা কিছুই করতে পারলেন না। বরং ২৩ ওভার বল করে ৯৫ রান দিয়ে ফেললেন।

এসব দেখে অশ্বিন কেন, যে কোনো বুদ্ধিমান মানুষ বুঝতে পারবেন যে আসলে আমাদের কোচ আর অধিনায়ক দল তৈরি করেন ব্যর্থ ব্যাটারদের পিঠ বাঁচাতে। কাজটা যে আজ নতুন হচ্ছে, তাও নয়। এ জিনিস চালু করে দিয়েছিলেন ধুমধাম ধোনি। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। ২০১৪-১৫ মরশুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রথম টেস্টই ছিল অ্যাডিলেডে। অধিনায়ক বিরাট কোহলি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে অশ্বিনকে বসিয়ে রেখে লেগস্পিনার কর্ণ শর্মাকে খেলিয়ে দেন। দুই ইনিংস মিলিয়ে কর্ণ চারটে উইকেট নিলেও বেধড়ক মার খান। প্রথম ইনিংসে ৩৩ ওভার বল করে ১৪৩ রান দেন, দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬ ওভার বল করে ৯৫। ওটাই তাঁর জীবনের প্রথম ও শেষ টেস্ট। মনে রাখবেন, ওই টেস্টে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন লায়ন। পরের তিনটে টেস্টে অশ্বিনই খেলেন এবং ইনিংস পিছু গোটা দু-চার করে উইকেটও নেন। কিন্তু কর্ণ কুন্তীর প্রথম পছন্দ না হলেও ধোনি, কোহলিদের প্রথম পছন্দ হতে পেরেছিলেন কোন গুণে? আইপিএলে কিছু চার, ছয় মারতে পারার সুনাম ছিল বলে।

ওই সিরিজের মাঝখানেই ধোনি অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়ে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। অশ্বিন হয়ত ভেবেছিলেন নতুন আমলে দেশের মত বিদেশেও তিনি প্রথম পছন্দ হয়ে উঠবেন। কিন্তু বিরাট কোহলির আমলেও তা ঘটল না, জাদেজা এসে পড়লেন। পৃথিবীর সর্বত্র সব বোলারের বিরুদ্ধে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করা স্টিভ স্মিথকে ২০২০-২১ সিরিজে বোতলবন্দি করতে পেরে এবং সিডনির সেই ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস খেলার পরে অশ্বিন নির্ঘাত ভেবেছিলেন – আর বিদেশে বেঞ্চে বসে থাকতে হবে না। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তিনি দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় পছন্দ হতে চলেছেন। গত এক দশকে টেমস ইত্যাদি নদী দিয়ে কত জল গড়াল। ধোনি আর বিরাটের অভিভাবক রবি শাস্ত্রী গেলেন, রাহুল দ্রাবিড় এলেন। তাও এই ধারা বদলাল না। বিরাটের বদলে রোহিত টেস্ট অধিনায়ক হলেন। তাতেও অশ্বিন বিদেশে দ্বিতীয় পছন্দই রয়ে গেলেন। দ্রাবিড়ের জায়গায় গম্ভীর এলেন। অশ্বিন যে তিমিরে সেই তিমিরেই। কেন? ক্রিকেটের আদিম যুগের ভাষায় বললে – ভারতীয় দলের জেন্টলম্যান হলেন ব্যাটাররা। তাঁদের বছরের পর বছর ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার অধিকার আছে। সেই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব প্লেয়ারদের, মানে স্পিনারদের, ঘাড়ে। সেই অধিকার রক্ষার্থে সেরা স্পিনারকে নয়, খেলানো হবে স্পিনারদের মধ্যে সেরা ব্যাটারকে। সেটাও আবার তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ঠিক হবে না, হবে অধিনায়ক আর কোচের মতানুসারে। আটত্রিশ বছর বয়সে এসে এই অবিচার আর সহ্য না হওয়ারই কথা। আমাদের অনেককেই বিভিন্ন পেশায় এ জিনিস সহ্য করতে হয়। বহু ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ ভুল লোক ভুল উদ্দেশ্য নিয়ে ‘টিম লিডার’ হয়ে বসে আছে। তাদের কাছে অভিজ্ঞতা, নৈপুণ্যের দাম থাকে না। সিনিয়র কর্মচারীরা মুখ বুজে নিজের যোগ্যতার অবমূল্যায়ন হচ্ছে বুঝেও কাজ চালিয়ে যান। কারণ তাঁদের কাছে আইপিএলের মত বিকল্প নেই। অশ্বিনের মত তুখোড় ইউটিউবার হতেও সবাই পারে না। উনি পারেন। সুতরাং এই ধাষ্টামো কেন মেনে নেবেন?

অশ্বিন এভাবে বিদায় জানিয়ে আরেকটা জরুরি কাজও করে গেলেন। তাঁরই বয়সী রোহিত আর বিরাটের নির্লজ্জতা উন্মোচিত করে দিলেন। দেশের মাঠেও নিউজিল্যান্ডের স্পিনাররা এসে বেশি উইকেট নিয়ে চলে যাচ্ছেন মানে সূর্যাস্তের দিকে যাত্রা যে শুরু হয়ে গেছে সেটা বোঝামাত্রই আর পরের হোম সিরিজের জন্য অপেক্ষা করলেন না অশ্বিন। চলতি সিরিজের পরের দুটো টেস্ট মেলবোর্ন আর সিডনিতে। শোনা যাচ্ছে মেলবোর্নে নাকি স্পিনের দরকার বেশি পড়বে প্রথম তিন টেস্টের তুলনায়, আর সিডনি তো ঐতিহাসিকভাবেই অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে স্পিনারবান্ধব পিচ। তার জন্যেও দাঁড়ালেন না। অথচ রোহিত আর বিরাট প্রায় পাঁচ বছর ধরে পণ করে আছেন, যতক্ষণ না কেরিয়ার ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে ততক্ষণ খেলে যাবেন।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

স্বর্গহারা মাঝারিয়ানার দেবদূত: বিরাট, রোহিত ও সম্প্রদায়

২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজে চূড়ান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরে শচীন তেন্ডুলকর সম্পর্কে কপিলদেব কিন্তু টিভি স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন ‘জিন্দগি ঔর ভি হ্যায়’। অর্থাৎ শচীনের বোঝা উচিত যে ক্রিকেটের বাইরেও জীবন আছে। অথচ নিজের দেশের মাঠে রোহিত, বিরাটের নাকানি চোবানি খাওয়া দেখেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাক্তন বলেননি যে ওদের এবার অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে।

ভারতীয় বোলিংয়ের মাঝারিয়ানার আলোচনা যেখানে শেষ হয়েছিল, ব্যাটিংয়ের মাঝারিয়ানার আলোচনা সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। অর্থাৎ রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজা থেকে। বোলার হিসাবে এঁদের মাঝারিয়ানা আগের লেখায় দেখিয়েছি, কিন্তু ভারতীয় দলের মেগাস্টার ব্যাটারদের মাঝারিয়ানা আরও সরেস। এতটাই সরেস যে এই দুজনের ব্যাটের হাত সাধারণ বোলারদের তুলনায় অস্বাভাবিক ভাল না হলে নিউজিল্যান্ড সিরিজের লজ্জায় ভারতকে অনেক আগেই পড়তে হত। কিন্তু ভারত এমন এক দেশ যেখানে ব্যাটারদের সাত খুন মাফ। তাই বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মারা বছরের পর বছর রান না করেও কলার তুলে ঘুরতে পারেন। ভাগ্যিস নিউজিল্যান্ড ৩-০ করে দিয়ে গেছে। ওয়াংখেড়ের ‘ডেড রাবার’ যদি কোনোমতে ঋষভ পন্থ জিতিয়ে দিতেন, তাহলে এই যে এখন দীনেশ কার্তিকের মত প্রাক্তনরা ঢোঁক গিলে বিরাট, রোহিতকে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে বলছেন – এটুকুও হত না।

দেশে, বিদেশে গত এক যুগ অধিনায়ক মহেন্দ্র সিংহ ধোনি থেকে বিরাট হয়ে রোহিতের আমল পর্যন্ত ভারতীয় ব্যাটিংকে বারবার চরম লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে লোয়ার অর্ডার ব্যাটিং। তার অনেকখানি কৃতিত্ব অশ্বিন আর জাদেজার। বস্তুত গ্যারি সোবার্স, জাক কালিস, ইয়ান বোথাম, কপিলদেব, ইমরান খান, রিচার্ড হেডলির মত কিংবদন্তি অলরাউন্ডারদের বাদ দিলে টেস্টে অশ্বিন আর জাদেজার মত অতগুলো উইকেটের সঙ্গে এত রান করা ক্রিকেটার খুঁজে পাওয়া ভার। ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের কাছে ঘরের মাঠে সিরিজ হারার পর থেকে এই নিউজিল্যান্ড সিরিজে হারের মাঝের যে সময়টা নিয়ে বিস্তর গর্ব আমাদের, সেই সময়কালের প্রায় সমস্ত স্মরণীয় জয় এবং ড্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন ভারতের নিচের দিকের ব্যাটাররা। বিশেষত শেষ ৫-৬ বছরে উইকেটরক্ষক পন্থ আর বোলাররাই ভারতের হয়ে ব্যাট হাতে সবচেয়ে ধারাবাহিক। এমনকি ২০২০-২১ মরশুমে ব্রিসবেনের গাব্বায় যে জয় নিয়ে আমাদের যারপরনাই গর্ব, সেই টেস্টেও ব্যাট হাতে রোহিতের অবদান ছিল ৪৪, ৭। বিরাট সেই টেস্টে খেলেননি। প্রথম ইনিংসে শুভমান গিল, পূজারা, রাহানে, মায়াঙ্ক আগরওয়াল – কেউই সুবিধা করতে পারেননি। ওয়াশিংটন সুন্দর আর শার্দূল ঠাকুর জোড়া অর্ধশতরান না করলে অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসেই বিরাট লিড পেয়ে যেত। দ্বিতীয় ইনিংসেও গিল (৯১) আর পূজারার (৫৬) লড়াই বৃথা যেত পন্থ (অপরাজিত ৮৯) আর ওয়াশিংটন (২২) না থাকলে।

চট করে প্রথম চার-পাঁচটা উইকেট পড়ে যাবে। তারপর কোনো একজন মিডল অর্ডার ব্যাটার অশ্বিন, জাদেজা বা অন্য বোলারদের সঙ্গে নিয়ে ভদ্রস্থ রান তুলে দেবেন বা ম্যাচ জিতিয়ে দেবেন, নিদেনপক্ষে হার বাঁচিয়ে দেবেন – এটাই নিয়ম হয়ে গেছে ভারতীয় ক্রিকেটে। পৃথিবীর সর্বত্র, যে কোনো বোলিংয়ের বিরুদ্ধে, এমনকি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও। অথচ এবার ৩-০ হওয়ার পরে এমন ভান করা হচ্ছে যেন স্রেফ স্পিন খেলতে না পেরেই আমাদের এই অবস্থা হয়েছে এবং ভারি অপ্রত্যাশিত একটা ব্যাপার ঘটেছে। অথচ গত কয়েক বছরে ভারতের বারবার ঘটে চলা ব্যাটিং ব্যর্থতা খেয়াল করলে বোঝা যায় – এটাই প্রত্যাশিত ছিল। আগে কেন ঘটেনি সেটাই আশ্চর্যের।

বেশি পিছোতে হবে না। যে বাংলাদেশকে দুদিনে হারিয়ে দিয়েছি বলে কদিন আগেই পেশি ফোলালাম আমরা, তাদের সঙ্গেই সেপ্টেম্বরে চেন্নাইতে প্রথম টেস্টের প্রথম দিন সকালে ৯৬ রানে চার উইকেট চলে গিয়েছিল আমাদের। তথাকথিত বিশ্বসেরা ওপেনার রোহিত আর তথাকথিত সর্বকালের সেরা ব্যাটার কোহলি আনকোরা হাসান মাহমুদের সুইং সামলাতে না পেরে ছখানা করে রান করে প্যাভিলিয়নের পথ ধরলেন। গিল তো খাতাই খুলতে পারলেন না। পন্থ ৩৯ রান করেছিলেন, সুপ্ত প্রতিভাসম্পন্ন কে এল রাহুল আবার ব্যর্থ। সেদিনও জাদেজা ৮৬ আর অশ্বিন শতরান না করলে শ দুয়েক রানেই গুটিয়ে যেত ভারতের ইনিংস। বিপক্ষ দলের মান বাংলাদেশের চেয়ে ভাল হলে কী হত সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেল নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বেঙ্গালুরুর প্রথম টেস্টে। প্রথম দিন বৃষ্টিতে খেলা না হওয়ার পর দ্বিতীয় দিন জোরে বোলিং সহায়ক আবহাওয়ায় ম্যাট হেনরি আর বাচ্চা ছেলে উইলিয়াম ও’রুর্ক ৪৬ রানে গুটিয়ে দিলেন ভারতের ইনিংস। স্কোরবোর্ড জুড়ে শূন্য আর দুইয়ের ছড়াছড়ি। রোহিত সুইং সামলাতে পারবেন না বুঝে স্টেপ আউট করে মারতে গিয়ে দুই রানে বোল্ড, আর কোহলি দীর্ঘকায় ও’রুর্কের বাউন্স সামলাতে না পেরে লেগ স্লিপের হাতে বল জমা দিয়ে শূন্য রানে আউট। দ্বিতীয় ইনিংসের ভাল ব্যাটিং ইনিংস হার বাঁচানোর কাজটুকু করতে পেরেছিল। তাও রোহিত যেভাবে আউট হলেন, তাতে বোঝা যায় তিনি সেই স্তরে পৌঁছেছেন যেখানে শরীর চলে তো মাথা কাজ করে না। নইলে নিজের ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ স্ট্রোকে মুগ্ধ হয়ে থেকে বলটা গড়িয়ে উইকেটে যাচ্ছে কিনা তা খেয়াল করতে ভুলে যাবেন কেন?

ভারতীয় দল এবার অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছে বর্ডার-গাভস্কর ট্রফির অঙ্গ হিসাবে পাঁচখানা টেস্ট খেলতে। অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। তার একটা বড় কারণ – দীর্ঘ সময় ধরে ব্যর্থ কোনো ক্রিকেটারকে প্রতিভাবান, বা সম্ভাবনাময়, বা সিনিয়র, বা অধিনায়ক, বা রেকর্ড করবে – এই অজুহাতে তারা বয়ে বেড়ায়নি কোনোদিন। বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক স্টিভ ওয়কেও ২০০৩ বিশ্বকাপের একবছর আগে একদিনের দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, কারণ তাঁর বয়স তখন ৩৭। ফর্ম নেহাত খারাপ ছিল না, অর্থাৎ বর্তমান ছিল, কিন্তু ভবিষ্যৎ ছিল না। আর এদেশে আমরা কী করছি? স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ৩৭ বছরের রোহিতের না শরীর চলছে, না মাথা ঠিকমত কাজ করছে (সদ্যসমাপ্ত সিরিজে অধিনায়কত্বে অজস্র ভুলও স্মর্তব্য)। তাঁর চেয়ে বছর দেড়েকের ছোট বিরাটও সোজা ফুলটসে ক্রস ব্যাট চালিয়ে বোল্ড হচ্ছেন, বেশিক্ষণ ক্রিজে টিকতেই পারছেন না। অথচ এতদিনে এঁদের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ওসব পরামর্শ ৩০-৩২ বছরের ব্যাটারদের দিতে হয়, কারণ তাঁদের বয়স অনুযায়ী খেলা বদলে নিয়ে ফিরে আসার সময় থাকে। রোহিত, বিরাটের বয়সটা সটান বলে দেওয়ার সময় – বাপু, এবার মানে মানে বিদায় হও। কিন্তু আমাদের বিশেষজ্ঞরা, সাংবাদিকরা, নির্বাচকরা – কেউ সেকথা বলবেন না।

কোনোদিনই যে কেউ বলতেন না তা কিন্তু নয়। ২০১২-১৩ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজে চূড়ান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরে শচীন তেন্ডুলকর সম্পর্কে কপিলদেব কিন্তু টিভি স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন ‘জিন্দগি ঔর ভি হ্যায়’। অর্থাৎ শচীনের বোঝা উচিত যে ক্রিকেটের বাইরেও জীবন আছে। আর ঠোঁটকাটা জিওফ্রে বয়কট আরও সরাসরি বলেছিলেন ‘হি শুড ইম্প্রুভ অর রিটায়ার’। মানে উন্নতি করতে না পারলে ওর অবসর নেওয়া উচিত। অথচ নিজের দেশের মাঠে রোহিত, বিরাটের নাকানি চোবানি খাওয়া দেখেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাক্তন বলেননি যে ওদের এবার অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে। বরং বলা হচ্ছে – কে জানে! হয়ত অস্ট্রেলিয়ার পিচে ওদের সুবিধাই হবে। এই আজগুবি তত্ত্বটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সব মহল থেকে বলা হচ্ছে, ভারতীয় ব্যাটাররা স্পিন খেলতে ভুলে গেছে। কথাটা সত্যি। কিন্তু ভাবখানা এমন, যেন জোরে বোলিং আমাদের ব্যাটাররা চমৎকার খেলেন।

অস্ট্রেলিয়ায় রোহিতদের স্বাগত জানাতে বসে আছেন মিচেল স্টার্ক, জশ হেজলউড আর প্যাট কামিন্স। এই অস্ট্রেলিয়াতেই গত সফরে অ্যাডিলেডে ভরদুপুরে ৩৬ অল আউট হয়ে গিয়েছিলেন আমাদের বিশ্বসেরা, সর্বকালের সেরা প্রমুখরা। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়েছিল মেলবোর্নে পরের টেস্টে অস্থায়ী অধিনায়ক রাহানের শতরানের পাশে জাদেজার অর্ধশতরানের জন্যে। তবে তারপরেও সিডনিতেই ভারত হেরে যেত দুজন ক্রিকেটার অতিমানবিক ইনিংস না খেললে। একজনের নাম হনুমা বিহারী, অন্যজন সেই অশ্বিন। প্রথম জন পায়ে চোট নিয়ে দৌড়তে পারছিলেন না, দ্বিতীয় জন পিঠের ব্যথায় কাবু ছিলেন। সেভাবেই দুজনে মিলে মোট ২৮৯ খানা বল, অর্থাৎ প্রায় ৫০ ওভার, কেবল ব্লক করে আর বল ছেড়ে অস্ট্রেলিয়াকে আটকে দিয়েছিলেন। অন্য যে কোনো দেশে ওই টেস্টের পর থেকে যে কোনো ম্যাচে নির্বাচন সমিতির সভা শুরু হত বিহারীর নামটা প্রথমে লিখে। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট কেবল ক্রিকেটিয় যুক্তিতে চলে না। তাই তারপর বিহারী খেলেছেন আর মাত্র চারখানা টেস্ট। সেগুলোতে তাঁর রান যথাক্রমে ২০, অপরাজিত ৪০, ৫৮, ৩১, ৩৫, ২০, ১১। মানে অসাধারণ নয়, কিন্তু একেবারে ফেলে দেওয়ার মতও নয়। কিন্তু উনি তো আইপিএলে খেলতে পারেন না, পকেটে বিজ্ঞাপনী চুক্তিও নেই। অতএব ২০২২ সালের পর থেকে তিনি আর আলোচনায় নেই। ওই গর্বের সিরিজ জয়ে কিন্তু ব্যাটিংয়ের দুই মহাতারকার অবদান যৎসামান্য। কোহলি একটা ম্যাচ খেলে দুই ইনিংস মিলিয়ে ৭৮ রান করেছিলেন আর রোহিত দুটো ম্যাচ খেলে সোয়া বত্রিশ গড়ে ১২৯ রান। ওই সিরিজে ব্যাট হাতে নায়ক ছিলেন পন্থ আর পূজারা, সঙ্গতে গিল। পূজারার গড় ছিল মোটে ৩৩.৮৭। কিন্তু দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়া আর ভারতের মধ্যে, খেলেছিলেন ৯২৮ খানা বল।

মাঝারি শব্দটা ব্যবহার করলে আবার আমাদের দেশের ক্রিকেটতারকাদের ভক্তরা বেজায় রেখে যান। তার উপর রোহিত আর কোহলির ভক্তকুল রীতিমত সহিংস। বছর কয়েক আগে এক কোহলিভক্ত তার রোহিতভক্ত বন্ধুর সঙ্গে তর্কাতর্কি করতে করতে বন্ধুটিকে খুনই করে ফেলে শেষপর্যন্ত। তাই এঁদের মাঝারি বলে প্রমাণ করতে গেলে আটঘাট বেঁধে এগোতে হবে। আগে রোহিতের ব্যাপারটাই আলোচনা করা যাক। কারণ একে টেস্টে তাঁর রান বিরাটের চেয়ে অনেক কম, তার উপর তাঁকে বিশ্বসেরা ওপেনার বলে দাবি করলেও সর্বকালের সেরাদের পাশে বসায় না আমাদের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র। যাঁকে বসায় তাঁকে নিয়ে তো আরও বেশি শব্দ খরচ করতে হবে।

বস্তুত, আজ ফর্ম পড়ে গেছে বলে নয়, রোহিত কোনোদিনই টেস্টে অসাধারণ ছিলেন না। যে যুগে পিচ ঢাকা থাকত না, হেলমেট ছিল না, সে যুগের কথা আলাদা। কিন্তু নয়ের দশকের পর থেকে পঞ্চাশের ঘরে গড় না থাকলে কোনো ব্যাটারকে বিশ্বসেরাদের মধ্যে ধরা হয় না। রোহিতের গড় ৬৪ খানা টেস্ট খেলে ফেলার পরেও ৪২.২৭-এ আটকে আছে। বিদেশে তাঁর ব্যাটিংকে মাঝারি বললেও বাড়াবাড়ি করা হবে। এগারো বছর খেলে গড় ৩৩.৬০, শতরান মাত্র দুটো। তার একটা আবার আজকের দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজে। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকায় কখনো তিন অঙ্কে পৌঁছতে পারেননি। ইংল্যান্ডে শতরান করলেন ২০২১ সালে পৌঁছে। পাঁচ টেস্টের ওই সিরিজটা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছিল। কোভিড বিধি মানা হয়েছে না হয়নি, আইপিএল খেলার তাড়া আছে না নেই – এই নিয়ে এক আশ্চর্য বিতর্কে বিরাট-শাস্ত্রীর দল দেশে ফেরত চলে আসে শেষ টেস্ট না খেলেই। পরের বছর ফেরত যায় পঞ্চম টেস্ট খেলতে এবং হেরে বসে। কিন্তু বলার কথাটা হল, ওই সিরিজেও বারবার ভারত ব্যাটিং বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। হেডিংলির তৃতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৭৮ অল আউট হয়ে গিয়েছিল, ওভালে চতুর্থ টেস্টের প্রথম ইনিংসেও ২০০ পেরোতে পারেনি।

টেস্ট ক্রিকেটে রোহিতের শুরুটা নিঃসন্দেহে সাড়া জাগিয়ে হয়েছিল। অভিষেকে ইডেন উদ্যানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ১৭৭, পরের টেস্টে ওয়াংখেড়েতেও শতরান। তবে দুটোই ছ নম্বরে ব্যাট করে। তারপর দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছেই কিন্তু দেখা গেল রোহিত অকুল পাথারে পড়েছেন। জোহানেসবার্গ আর ডারবানের চারটে ইনিংসে দুবার বোল্ড, একবার এলবিডব্লিউ। পরের দেড় বছরে নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ঘুরে তিনি মাত্র চারটে অর্ধশতরান করেন। তৃতীয় টেস্ট শতরান আসে ২০১৭ সালে নাগপুরে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে। অন্য কেউ হলে ততদিনে দল থেকে বাদ পড়ে যেতেন। কিন্তু ভারতের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের সকলেই রোহিতের ‘ট্যালেন্ট’ সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। তার উপর সাদা বলের ক্রিকেটে, বিশেষত আইপিএলে, তিনি ততদিনে তারকা। ফলে দামি ব্র্যান্ড হয়ে গেছেন। উপরন্তু ধোনি শিখিয়েছিলেন ‘ইনটেন্ট’ নামক একটা পবিত্র জিনিস ব্যাটিংয়ে থাকতেই হবে। শাস্ত্রী আর বিরাটও মনে প্রাণে তা বিশ্বাস করতেন। ওটা না থাকার যুক্তিতে পূজারা, রাহানেকে বারবার বাদ দিয়েছেন। রোহিতের জিনিসটা ছিল। তাই তিনি অপরিহার্য।

যা-ই হোক, ২০১৭ সালের সেই শ্রীলঙ্কা সিরিজটায় রোহিত আরও দুটো অর্ধশতরান করেন। তারপর কিন্তু আবার খরা। সেবছর আর একটামাত্র অর্ধশতরান করেন বছরের শেষ টেস্টে মেলবোর্নে। তাঁকে দিয়ে যে চলবে না তার এর থেকে বেশি প্রমাণের দরকার হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যিনি ব্র্যান্ড এবং যাঁর ট্যালেন্ট আর ইনটেন্ট আছে তাঁকে তো যে করেই হোক দলে রাখতে হবে। অতএব নতুন বছরে রোহিত হয়ে গেলেন ওপেনার। তখন ভারত সফরে এসেছে ভাঙাচোরা দক্ষিণ আফ্রিকা। সে দলে আন্তর্জাতিক মানের বোলার বলতে কাগিসো রাবাদা। অ্যানরিখ নর্খের সবে প্রথম সিরিজ। রোহিত প্রথম টেস্টের দুই ইনিংসেই বেধড়ক পিটিয়ে শতরান করলেন। দ্বিতীয় টেস্টে পুনেতে রান পাননি, রাঁচিতে পৌঁছেই একেবারে ২১২। আর পায় কে? বলা শুরু হয়ে গেল, একদিনের ক্রিকেটের মত টেস্টেও উনি বিশ্বসেরা ওপেনার। এমন আর দুটো হয় না। দুঃখের বিষয়, রোহিতের এরপরের রানের বহর কিন্তু সেকথা বলছে না। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে দুটো টেস্টে সর্বোচ্চ রান ২১। অতিমারী পেরিয়ে যখন আবার টেস্ট খেললেন অস্ট্রেলিয়ায়, চারটে ইনিংসে একবার ৫০ পেরোলেন। দেশে ফিরে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সাত ইনিংসে একটা বড় শতরান আর একটা অর্ধশতরান। তারপর থেকে কেবলই মাঝেমধ্যে একটা শতরান বা গোটা দুয়েক অর্ধশতরানের কাহিনি। বাকিটা ব্যর্থতার গল্প।

গত এক বছরে রোহিতকে দেখে মনে হয়, তিনিও জানেন যে বয়সের কারণে তাঁর লম্বা ইনিংস খেলার ক্ষমতা কমেছে। রিফ্লেক্স তো কমেছেই। অতএব তিনি এখন ঠিক করে নিয়েছেন অনেক বেশি ঝুঁকি নেবেন, তাতে যা রান হয়। এই পরিকল্পনা টি টোয়েন্টি এবং একদিনের ক্রিকেটে কার্যকরী, কারণ সাদা বল সুইং করে লাল বলের চেয়ে কম এবং ফিল্ডিং দলও অনেক বেশি রক্ষণাত্মক ফিল্ড সাজাতে বাধ্য। উপরন্তু নিজের দলের পক্ষেও এই কৌশল উপকারী। গতবছর ভারতের বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছবার পিছনে রোহিতের ঝোড়ো ইনিংসগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু ও জিনিস টেস্টে ভাল বোলিংয়ের বিরুদ্ধে যে চলবে না তা নিউজিল্যান্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। এমনকি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও ওই কৌশল খাটেনি। চারটে ইনিংসে রোহিতের সর্বোচ্চ রান ছিল ২৩। এ যদি মাঝারিয়ানা না হয়, তবে মাঝারিয়ানা বলে কাকে? কোনো দলের ওপেনার তথা অধিনায়ক এত মাঝারি হলে সে দলের কপালে অনেক দুঃখ। সেই ধোনির আমল থেকে শাস্ত্রী বুক ফুলিয়ে বলে গেছেন, এই দলটা নাকি ভারতের সেরা সফরকারী দল। অথচ এই আমলে না নিউজিল্যান্ডে সিরিজ জেতা হয়েছে, না ইংল্যান্ডে – যা অতীতে একাধিক ভারতীয় দল করে দেখিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ধোনির দল অন্তত একবার সিরিজ ড্র রেখে আসতে পেরেছিল। কোহলির দল দুবার সুযোগ পেয়ে সেটুকুও করতে পারেনি। এমন নড়বড়ে ওপেনার থাকলে পারা প্রায় অসম্ভব। অথচ ঘরোয়া ক্রিকেটে সাই সুদর্শন বা অভিমন্যু ঈশ্বরনরা যতই রান করুন, তাঁদের দলে নেওয়া যাবে না। রোহিতের মত ব্র্যান্ডের মূল্য কি আর রান দিয়ে মাপা চলে?

আরও পড়ুন বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

বিরাট কিন্তু মাঝারিয়ানায় রোহিত-সুলভ নন। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর শুরুটা রোহিতের মত হয়নি। টেস্ট জীবনের প্রথম বারোটা ইনিংসে দেশের মাঠে দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দুটো অর্ধশতরান ছাড়া বলার মত কিছুই ছিল না। ২০১১-১২ মরশুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রথম দুটো টেস্টে রান করতে না পেরে প্রায় বাদ পড়ে গিয়েছিলেন। পার্থ টেস্ট ছিল শেষ সুযোগ। সেখানে দুই ইনিংসেই রান করেন, পরের টেস্টে অ্যাডিলেডে প্রথম শতরান। তারপর থেকে সাফল্যের লেখচিত্র ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছিল। এটা পরিসংখ্যানের যুগ, সোশাল মিডিয়ার যুগ। তরুণ ক্রিকেটপ্রেমীরা মনে করেন ক্রিকেটারদের উৎকর্ষ, অপকর্ষ পুরোটাই স্কোরবোর্ডে আর ডেটা অ্যানালিটিক্সে ধরা থাকে। নেভিল কার্ডাস লিখেছিলেন – স্কোরবোর্ড একটা গাধা। আমাদের দেশে তাঁর এমন কোনো উত্তরসূরি নেই যিনি ধরিয়ে দেবেন, যে স্কোরবোর্ড একেবারে গাধা না হলেও তার দৈর্ঘ্য প্রস্থের সীমাবদ্ধতা আছে। ক্রিকেট খেলার মানবিক প্রয়াসের দিকটার অনেককিছুই স্কোরবোর্ডের পরিসরে ধরা পড়ে না। ফলে গোটা কেরিয়ারে অস্তগামী মিচেল জনসন ছাড়া একজনও সারাক্ষণ ৯০ মাইল+/ঘন্টার বোলারকে না খেললেও, নাথান লায়ন ছাড়া কোনো উঁচু দরের স্পিনারকে খেলতে না হলেও বিরাটকে ভিভিয়ান রিচার্ডস, শচীন, রিকি পন্টিংদের পাশে বসানো হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞাপন জগৎ বুদ্ধিমানের মত সর্বকালের সেরার (GOAT) মুকুটও সোশাল মিডিয়ার সাহায্যে বিরাটের মাথায় পরিয়ে দিয়েছিল।

খেয়াল করা হয়নি, যে কোনো ব্যাটারের অন্যতম কঠিন পরীক্ষাগার ইংল্যান্ডে বিরাট একাধিকবার সফরে গিয়েও মূলত অসফল। সতেরোটা টেস্ট খেলে মাত্র দুটো শতরান, গড় মাত্র ৩৩.২১। আসলে বিরাটের সাফল্যকে বিরাটতর করে তুলেছিল তিনটে জিনিস – ১) একদিনের ক্রিকেটে শতরান করে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় শচীনের রেকর্ডকে ধাওয়া করা, ২) ২০১৩-১৪ মরশুমের অস্ট্রেলিয়া সফরের অপ্রতিরোধ্য ফর্ম থেকে শুরু করে বছর পাঁচেক টেস্টে রানের বন্যা, ৩) এই সময়কালে তাঁর অধিনায়কত্বে যশপ্রীত বুমরা, মহম্মদ শামি, অশ্বিন-জাদেজার কল্যাণে দেশ বিদেশে শচীন, রাহুল দ্রাবিড়দের যুগের চেয়ে ভারতের বেশি ম্যাচ জেতা। লোভনীয় ব্র্যান্ডকে সে যত বড় তার চেয়েও বড় করে দেখানোর যে প্যাঁচ পয়জার চলে এবং এখনো চলছে তা নিয়ে আর আলাদা করে বলব না, কারণ তা পৃথক আলোচনা দাবি করে। সে আলোচনা আগেই করেছি এই লেখায়। কিন্তু ঘটনা হল, বিরাটের সমকক্ষ অন্তত তিনজন ব্যাটার যে তাঁর নিজের প্রজন্মেই রয়েছেন – সেকথাকে পাত্তা না দিয়ে বিরাটকে আকাশে তুলে দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে তাঁর দ্রুত পতন হয়েছে গত ৫-৬ বছরে। আগেই বলেছি, নয়ের দশকের পর থেকে অন্তত ৫০ গড় না হলে আর বিশ্বসেরাদের দলে ঢোকার ছাড়পত্র পাওয়া যায় না। সর্বকালের সেরা হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। বিরাটের গড় এখন নামতে নামতে ৪৭.৮৩। নিজের প্রজন্মের প্রতিদ্বন্দ্বী জো রুট প্রায় ১৩,০০০ রান করে ফেলেছেন, গড় ৫১.০১। স্টিভ স্মিথও অতিমারীর আগের ফর্মে নেই, তবু তাঁর গড় ৫৬.৯৭ – এখনো অসাধারণ। মোট রানের দিক থেকে একমাত্র কেন উইলিয়ামসনই এখনো বিরাটের থেকে পিছিয়ে, তবে তিনি ম্যাচও খেলেছেন কম। গড় যেহেতু ৫৪.৪৮, তাই বিরাটকে টপকে যাওয়া সময়ের অপেক্ষা।

তবে এসব পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় কথা হল, সেই ২০১৯ সালের নভেম্বরে ইডেন উদ্যানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শতরান করার পর থেকে বিরাটের ফর্ম সেই যে পড়তে শুরু করেছে, সে পতন থামছে না। তার ফল ভুগছে দল। ওই শতরানের পর থেকে ৩৪ খানা টেস্টের ৬০ ইনিংসে তিনি মাত্র ১৮৩৮ রান করেছেন ৩১.৬৮ গড়ে। শতরান মাত্র দুটো, অর্ধশতরান নটা, পাঁচবার শূন্য রানে আউট হয়েছেন। উপরন্তু প্রমাণ হয়ে গেছে যে ঘূর্ণি উইকেটে সাধারণ স্পিনারদের মাথায় চেপে বসার ক্ষমতাও তাঁর নেই। তাইজুল ইসলাম থেকে মিচেল স্যান্টনার – সবাই বিরাটের পক্ষে একইরকম দমবন্ধ করা, বিপজ্জনক। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাদা বলের ক্রিকেটেও তাঁকে বেঁধে রাখতে স্পিনারদের ব্যবহার করা শুরু করেছে দলগুলো। সুইং সামলাতেও যে বিরাট তেমন দড় নন তা তাঁর ইংল্যান্ডের রেকর্ড প্রমাণ করে। আজকাল তো দেশের মাঠেও ঘেমে উঠছেন বেঙ্গালুরুর মত। এই বয়সে শচীন কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ডেল স্টেইন আর মর্নি মর্কেলের বিরুদ্ধে তিনটে টেস্টে দুটো শতরান করেছেন। সুনীল গাভস্কর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জীবনের শেষ টেস্টে এমন একটা ইনিংস খেলেছেন, যাকে বলা হয় ঘূর্ণি পিচে স্পিন খেলার টিউটোরিয়াল।

সোজা কথা হল, যেরকম ব্যর্থতার কারণে পূজারা আর রাহানেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেরকম ব্যর্থতা সত্ত্বেও বিরাট আর রোহিত এখনো নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছেন। কারণ তাঁদের মাঝারিয়ানা কেউ স্বীকার করবে না। বিশেষজ্ঞরা কেন বলছেন না? সাংবাদিকরা কেন লিখছেন না? কারণ কিন্তু এটা নয় যে ভবিষ্যতের কথা কেউ বলতে পারে না, দুই হুজুর অস্ট্রেলিয়ায় ফের রান করে দিতে পারেন। সে তো পারেনই, কিন্তু তাতে তো গত ৫-৬ বছরের টানা ব্যর্থতা মিথ্যে হয়ে যাবে না। কিন্তু ওই যে – ব্র্যান্ড মূল্য। টিভি খুললে, ওটিটি চালালে কতশত বিজ্ঞাপনে দুজনকে দেখতে পান তা খেয়াল করবেন। ক্রিকেট খেলা ভারতে যত বড় ব্যবসা, পৃথিবীর আর কোনো দেশে তত বড় নয়। ফলে অত্যন্ত মাঝারি রাহুলকে (৫৩ টেস্ট খেলে ফেলার পর গড় ৩৩.৮৭) যেনতেনপ্রকারেণ দলে রাখার চেষ্টার পিছনেও এনডর্সমেন্ট। এঁরা খেললে এঁদের বিজ্ঞাপন দেখানোর মানে থাকবে। থাকলে বিজ্ঞাপনদাতাদের টাকায় বিসিসিআইয়ের সঙ্গে যে সম্প্রচারের চুক্তি করেছে টিভি/ওটিটি নেটওয়ার্ক, তা উসুল হবে।

উপরন্তু ভারতের মাটিতে ভারতীয় দলের ম্যাচগুলোর প্রযোজনার দায়িত্বে থাকে বিসিসিআই নিজে। নিজেদের ব্র্যান্ড সম্পর্কে মন্দ কথা তারা মেনে নেবে না। অতএব ভারতীয় ক্রিকেটারদের দোষগুণ নিয়ে নির্মোহ আলোচনা করলে ধারাভাষ্যকারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে দেবে। সম্প্রচার সংস্থাকেও বাধ্য করতে পারে তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কাউকে বাদ দিতে। সে তিনি যত বড় বিশেষজ্ঞই হোন। টাকার পাহাড়ে বসে থাকা নিয়োগকর্তা বিসিসিআইয়ের কাছে গাভস্কর আর মুরলী কার্তিকের দর একই। তার উপর সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ট্রোলবাহিনী লেলিয়ে দেওয়ার কায়দাও আজকের ক্রিকেটারদের জানা আছে। সেভাবেও ধারাভাষ্যকারদের ভাতে মারা যায়। ব্যাপারটা একবার টের পেয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে, আরেকবার সঞ্জয় মঞ্জরেকর। এই কারণেই ২০১৩ সালে ইয়ান চ্যাপেল ভারতে ধারাভাষ্য দেওয়ার চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন

আরেকটা কারণ হল খারাপ দৃষ্টান্ত। এই দৃষ্টান্ত তৈরি করে দিয়ে গেছেন পৃথিবীর সর্বকালের সেরা দুজন ক্রিকেটার – শচীন আর ধোনি। ২০১১ সালের ২ এপ্রিল বিশ্বকাপ জেতার পর বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে ভারতীয় দল পরপর আটটা টেস্টে হারে। স্পষ্ট বোঝা যায়, যাঁরা আছেন তাঁদের দিয়ে আর চলবে না। অথচ একমাত্র দ্রাবিড় আর ভাঙ্গিপুরাপ্পু ভেঙ্কটসাই লক্ষ্মণ ছাড়া কেউ এই সত্য মেনে নিলেন না। ওঁরা দুজন অবসর নিলেন, শচীন রয়ে গেলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শততম শতরান আর দুশোতম টেস্ট খেলার রেকর্ড করার জন্যে। উইকেটরক্ষক ব্যাটার হিসাবে, অধিনায়ক হিসাবে ব্যর্থ ধোনিকে বাঁচিয়ে দিলেন তাঁর গডফাদার এন শ্রীনিবাসন। শচীন বহাল তবিয়তে ২০১৩ পর্যন্ত খেলে গেলেন আর ধোনি অধিনায়কত্ব চালিয়ে গেলেন ২০১৩-১৪ অস্ট্রেলিয়া সফর পর্যন্ত। তারপর টেস্ট সিরিজের মাঝখানে দুম করে অবসর নিলেন।

যাঁরা আট টেস্টে হারের পরেও ধোনিকে রেখে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন, তাঁরা সেইসময় বলতেন ‘এখন ছাড়লে ক্যাপ্টেন হবে কে?’ সত্যিই তেমন কেউ ছিলেন না, কারণ প্রজন্ম বদলের কোনো পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়নি বোর্ড। তাই ধোনি বহাল তবিয়তে যতদিন ইচ্ছা খেলে যেতে পেরেছিলেন। এখন ভারতীয় ক্রিকেট ফের সেই জায়গায় এসে পৌঁছেছে। যে রাহুলকে বছর দুয়েক আগে ভবিষ্যৎ অধিনায়ক বলে ভাবা হচ্ছিল, তিনি এখন দলে নিজের জায়গা ধরে রাখতেই খাবি খাচ্ছেন। ‘এ’ দলের হয়ে খেলতে নেমেও হাস্যকর কায়দায় আউট হচ্ছেন। গিল ধারাবাহিকতা হারিয়েছেন, পন্থ প্রতিভাবান কিন্তু এখনই নেতৃত্ব দিতে কি তৈরি? কেউ নিশ্চিত নয়।

অর্থাৎ গত এক যুগে এত জয় সত্ত্বেও ভারতীয় ক্রিকেট যে তিমিরে সেই তিমিরেই আছে। ব্র্যান্ড সর্বস্বতা, বিশেষত মাঝারিয়ানা সর্বস্বতা, এভাবেই প্রগতি আটকায়।

সমস্ত পরিসংখ্যান ক্রিকইনফো থেকে

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য আরও আঘাত অপেক্ষা করছে

একজন-দুজন নয়, গোটা ক্লাসই ফেল। এরপরেও রোহিত বুক ফুলিয়ে বললেন, কাটাছেঁড়া করার দরকার নেই।

মনে করুন আপনি একটা ক্লাসের ক্লাস টিচার। আপনার ক্লাসের সবকটা ছাত্রছাত্রী বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করেছে। হেডমাস্টার আপনার কাছে কৈফিয়ত চাইলেন। আপনি বললেন “এ নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। এতবছর তো সবাই পাস করেছে। একদিন তো এই রেকর্ড ভাঙতই, না হয় এবছরই ভাঙল।” কী ফল হবে? স্কুল বেসরকারি হলে চাকরিটি যাবে। সরকারি স্কুলে তা হবে না, কিন্তু বিলক্ষণ গালমন্দ হজম করতে হবে। ঘটনা হল, নিউজিল্যান্ডের কাছে একটা টেস্ট বাকি থাকতেই সিরিজ হেরে যাওয়ার পরে ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা প্রায় এই কথাগুলোই বলেছেন।

বলেছেন, এত কাটাছেঁড়া করার কী আছে? বারো বছর পরে একটা সিরিজ (ঘরের মাঠে) তো দল হারতেই পারে। যা চেপে গেছেন, তা হল দল সমানে সমানে লড়াই করে হারেনি, ল্যাজেগোবরে হয়েছে। প্রথম টেস্টের প্রথম দিনে ভিজে আবহাওয়ায় বল সুইং করতেই রোহিত বাহিনী ৪৬ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে ঋষভ পন্থ আর সরফরাজ খান দুর্দান্ত ব্যাটিং করায় ইনিংস হার বেঁচেছে। পুনের দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে স্পিনারদের পিচেও দেড়শো রানেই জারিজুরি শেষ। দ্বিতীয় ইনিংসেও যশস্বী জয়সোয়াল ছাড়া সব ব্যাটার ব্যর্থ। নিচের দিকে রবীন্দ্র জাদেজা কিছু রান না করলে আবার দুশোর নিচে ইনিংস গুটিয়ে যেত। শুধু কি তাই? প্রথম টেস্টে জোরে বোলিং সহায়ক পিচকে বুঝতে ভুল করে তিন স্পিনারে খেলা হল। ফলে আবহাওয়া যেমনই থাকুক, টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া ছাড়া উপায় রইল না। ওদিকে এখনই যাঁকে কপিলদেবের চেয়েও ভাল বলা শুরু হয়ে গেছে, সেই যশপ্রীত বুমরা ওই পিচে বিশেষ কিছু করতে পারলেন না। আরেক ‘গোট’ (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম) রবিচন্দ্রন অশ্বিনকেও নির্বিষ দেখাল। জাদেজা আর কুলদীপ যাদব তিনটে করে উইকেট নিলেন বটে, কিন্তু নিউজিল্যান্ড চারশো রান তুলে ফেলল। দ্বিতীয় টেস্টেও ভারতের আটশোর বেশি উইকেট নিয়ে ফেলা ‘রবি-অ্যাশ’ জুটি ব্যর্থ। এক ব্যাগ অভিজ্ঞতা নিয়ে, ওয়াশিংটন সুন্দর আর মিচেল স্যান্টনারের বোলিং দেখেও, তাঁরা বুঝেই উঠতে পারলেন না যে এই পিচে আস্তে বল করতে হবে। জোরে জোরে বল করে লাভ নেই। বুমরা এখানেও রিভার্স সুইং-টুইং করাতে পারলেন না। মানে একজন-দুজন নয়, গোটা ক্লাসই ফেল। এরপরেও রোহিত বুক ফুলিয়ে বললেন, কাটাছেঁড়া করার দরকার নেই।

আসলে রোহিত জানেন, তিনি যে ক্রিকেট বোর্ডের কর্মচারী তারা টাকা দিয়ে কিনে রেখেছে যাদের কাটাছেঁড়া করা কাজ তাদের এক বড় অংশকে। প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার আর সাংবাদিকদের কথা বলছি। আরেকটা অংশ ভয়েই চুপ করে থাকবে। কারণ সত্যি কথা বলে/লিখে ফেললে ক্রিকেট বোর্ড ধারাভাষ্যের চুক্তি থেকে বাদ দিয়ে দেবে বা আর মাঠে ঢুকতে দেবে না। হাতে না মেরে ভাতে মারা যাকে বলে আর কি। রোহিত নির্ভুল আন্দাজ করেছেন। একই দিনে পাকিস্তানে, অর্থাৎ বিদেশের মাঠে, ইংল্যান্ডের হারের পর নাসের হুসেন, মাইকেল আথারটনরা চুলচেরা সমালোচনা করছেন বেন স্টোকসের দলের। অন্যদিকে সুনীল গাভস্কর, রবি শাস্ত্রী, সঞ্জয় মঞ্জরেকর, অনিল কুম্বলেরা ‘আহা! ওরা তো খারাপ খেলোয়াড় নয়। খেলায় হার জিত তো আছেই। ঘরের মাঠে টানা ১২ বছর, ১৮ খানা সিরিজ জিতেছে। সেটা তো মনে রাখতে হবে’ – এই জাতীয় কথাবার্তা বলছেন। বেশ, ওঁদের কথাও থাক। অত বড় ক্রিকেটারদের তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই ১২ বছর অপরাজিত থাকার রেকর্ডটা নিয়েই বরং কাটাছেঁড়া করা যাক।

ভারত কি কোনোদিন ঘরের মাঠে দুর্বল দল ছিল, বা মাঝেমধ্যেই এর তার কাছে সিরিজ হারত? সোজা উত্তর – না। এই শতাব্দীর ইতিহাসে ২০১২ সালে অ্যালাস্টেয়ার কুকের ইংল্যান্ডের আগে ভারত শেষ সিরিজে হেরেছিল আরও আট বছর আগে, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট-রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার কাছে। অর্থাৎ আড়াই দশকে মোটে চারটে সিরিজ হার। তার আগের সিরিজ হার ছিল ২০০০ সালে, হ্যানসি ক্রোনিয়ের দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। আর গত শতকের ইতিহাস?

অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। সেই অস্ট্রেলিয়া ২০০৪-০৫ মরশুমের ওই জয়ের আগে ভারতে শেষ জিতেছিল ১৯৬৯-৭০ সালে। ইংল্যান্ডের ভারতের মাঠে কুকের দলের আগে শেষ সিরিজ জয় ছিল ১৯৮৪-৮৫ মরশুমে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ দেশে এসে শেষবার সিরিজ জিতেছে ১৯৮৩-৮৪ মরশুমে। শ্রীলঙ্কা আজ পর্যন্ত জেতেনি, নিউজিল্যান্ড যে আগে কখনো জেতেনি তা তো এখন সকলেই জানেন। তারা শেষবার এ দেশে একটা টেস্ট ম্যাচই জিতেছিল সেই ১৯৮৮ সালে, তাও ১৯৬৯ সালের পর প্রথমবার। এমনকি পাকিস্তান, যাদের সঙ্গে আমাদের আবহাওয়া এবং পিচের চরিত্র সবচেয়ে বেশি মেলে, তারাও ১৯৫২-৫৩ থেকে ২০০৭-০৮ পর্যন্ত ভারত সফরে এসে সিরিজ জিততে পেরেছিল মাত্র একবার – ১৯৮৬-৮৭ মরশুমে। সুতরাং ভারত চিরকালই নিজের দেশে বাঘ। কোহলি, রোহিতরা নতুন কিছু করেননি। বস্তুত, সব দলই নিজের দেশে বাঘ। তাই যে কোনো টেস্ট দলেরই উৎকর্ষ বিচার করা হয় বিদেশে তারা কেমন তাই দিয়ে। অজিত ওয়াড়েকরের ভারতীয় দল শ্রদ্ধেয়, কারণ ১৯৭১ সালে তারা ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং ইংল্যান্ডে সিরিজ জিতেছিল। সৌরভ গাঙ্গুলির দল ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে চিরকাল উঁচু জায়গায় থাকবে, কারণ তারা নিয়মিত বিদেশে টেস্ট ম্যাচ জেতা শুরু করেছিল। গত এক দশকে কোহলির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের কলার তোলার মত সাফল্যও দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা। দেশের মাঠে একের পর এক দলকে দুরমুশ করা নয়।

আরও পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে

এর সঙ্গে আরেকটা কথা না বললেই নয়, যা এক পডকাস্টে বলে বিস্তর ট্রোলড হয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে। কথাটা হল, গত ১০-১২ বছরে টেস্ট ক্রিকেট সম্ভবত খেলাটার ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। ২০১১ বিশ্বকাপের পর থেকে ধাপে ধাপে অবসর নিলেন শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের মহীরুহরা। ছোট্ট দেশে চট করে সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেটার পাওয়া শক্ত, ফলে দলটা একেবারে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক কারণে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলেনি। মাঝেমধ্যে এক-আধটা অঘটন ছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজও অতি দুর্বল হয়ে পড়েছে এইসময়। ওখানে বাস্কেটবল, বেসবলের দিকেই বেশি ধাবিত হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বিপদে পড়েছিল কালো মানুষদের জন্য সংরক্ষণ নীতির প্রভাবে বহু ক্রিকেটার দেশত্যাগ করায়। অর্থাৎ ভাল মানের আন্তর্জাতিক দল ছিল ভারতকে নিয়ে বড়জোর চারটে। সুতরাং ১২ বছর দেশে হারিনি – এই নিয়ে উদ্বাহু না হয়ে বরং মনে রাখা ভাল, এই যুগেও কিন্তু আমরা দক্ষিণ আফ্রিকাকে ও দেশে হারাতে পারিনি, ইংল্যান্ডে সিরিজ জিততে পারিনি, নিউজিল্যান্ডেও নয়। এমনকি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শুধু ফাইনালটা ইংল্যান্ডে হতেই পরপর দুবার হেরে বসেছি।

বাংলাদেশকে দুদিনে হারিয়েছি বলে পেশি ফোলানোর ফল এই সিরিজে দেখা যাচ্ছে। এখনো ভুল কারণে নাচানাচি চালু রাখলে অদূর ভবিষ্যতে আরও আঘাত পেতে হবে। অবশ্য সেটা প্রায় অনিবার্য। কারণ এই সিরিজ ৩-০ হারলে, এমনকি আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সফরে ৫-০ হারলেও, কিছু বদলানোর আশা কম। কারণ ২০১১-১২ মরশুমে পরপর আটটা টেস্ট হারার পরেও মহেন্দ্র সিং ধোনির অধিনায়কত্ব যায়নি, শচীনকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়নি। ফলাফলকে সেদিনই গুরুত্বহীন করে দেওয়া হয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদ কাগজে প্রকাশিত